Monday, April 9, 2018

পুরুষেরা তাদের কন্যা সন্তানকে ধর্ষণ করছে, খুন করছে by তসলিমা নাসরিন

তসলিমা নাসরিন
বাবা মেয়েকে ধর্ষণ করছে, মেয়ের পেটে বাবার বাচ্চা, আবার বাবার বাচ্চা জন্ম দিচ্ছে মেয়ে। যখন একটি কন্যা-সন্তানের কথা ভাবি, তার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা তার বাবা মা। বাবা তার মেয়েকে নিরাপত্তা দেবে, মেয়ে সেরকমই জানে। পরিবার, সমাজ সে রকমই জানে। কিন্তু বাস্তবটা বড় কুৎসিত, বড় ভয়ংকর। বাস্তবে এগারো বারো বছর বয়সী কন্যাকে তো বটেই, তিন চার বছর বয়সী কন্যাকেও রেহাই দেয় না বাবা। নিম্নবিত্তের এইসব খবর আমরা পেয়ে যাই।  কিন্তু ধনী ধর্ষক পিতার খুব কম কীর্তিকলাপই বাইরে প্রকাশ পায়।
ধর্ষক-স্বামীদের খবরও আমাদের কাছে আসে না। যে সমাজের পুরুষেরা মেয়েদের কী করে ‘সম্পূর্ণ মানুষ’ হিসেবে দেখতে হয়, সেটা জানে না, তারা আবার কোনও মেয়ের সঙ্গে ভালোবেসে যৌন সম্পর্ক কী করে করতে হয় জানবে কী করে! যৌনতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা উচিত প্রেম ভালোবাসার, সেখানে আমাদের সমাজে যৌনতার সঙ্গে সম্পর্ক গায়ের জোরের। মেয়েদের ওপর পুরুষের এই গায়ের জোর খাটানোকে সমাজ এক রকম মেনেই নিয়েছে।
পুরুষই দেখায় এই গায়ের জোর, কারণ মেয়েদের চেয়ে গায়ের জোর সাধারণত পুরুষের বেশি, অনেক সময় পুরুষের চেয়ে গায়ের জোর, বুদ্ধির জোর মেয়েদের বেশি হলেও, পুরুষেরা ‘সম্পর্কের জোর’ দেখায়। সম্পর্কের জোরেই মেয়েদের দাবিয়ে রাখে তারা। স্বামীর জোর, ভাইয়ের জোর, বাবার জোর, মামার জোর, কাকার জোর, প্রেমিকের জোর। তারা ভেবেই নিয়েছে মেয়েদের ওপর যা কিছু করার অধিকার তাদের আছে।
জরিপে বার বার দেখা যাচ্ছে, মেয়েদের ধর্ষণ, অপমান, মারধোর ইত্যাদি পরিবারের লোক, বা কাছের পুরুষই করে। অথচ কাছের পুরুষদের মেয়েরা সবচেয়ে বেশি আপন ভাবে, তারা কাছে থাকলেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করে মেয়েরা, তাদের সান্নিধ্যেই সবচেয়ে বেশি নিশ্চিন্ত তারা। পৃথিবীতে মেয়েরা যারা এ যাবৎ ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাদের ধর্ষকদের লিস্টে ধর্ষিতার বাবা,ভাই, মামা, কাকা, প্রেমিক, স্বামী, শ্বশুর, ভাসুর, দেবর, প্রতিবেশি, বন্ধু, শিক্ষক আছে। অপরিচিত, অচেনা লোক যত আছে, তারও চেয়ে বেশি। কী ভয়ঙ্কর রোমহর্ষক এইসব তথ্য।
মেয়েদের সত্যি বলতে কী, কোথাও কোনও নিরাপত্তা নেই। ধর্মীয় আইন তাকে নিরাপত্তা দেয় না অর্থাৎ রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দেয় না, বিদ্যালয় দেয় না, রাস্তাঘাট দেয় না অর্থাৎ সমাজ তাকে নিরাপত্তা দেয় না, ঘর তাকে নিরাপত্তা দেয় না অর্থাৎ পরিবার তাকে নিরাপত্তা দেয় না। কোথায় যাবে একটা মেয়ে? নিজের শরীর নিয়ে তাকে সর্বদা লজ্জা এবং ভয় নিয়ে বাঁচতে হয়। যে কোনও সময়, যে কোনও জায়গায় ঘরে অথবা বাইরে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে যে কেউ। প্রতিনিয়ত এই আশঙ্কা একটি মেয়েকে বহন করতে হয়। সব পুরুষের যৌনদাসি সে। এমনকী আপন বাবাও তাকে তার যৌনদাসি হিসেবে ভোগ করতে পারে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ পুরুষ মেয়েদের যৌনদাসিই মনে করে। শৈশব থেকে তাদের এই ধারণা দিয়েই বড় করা হয়েছে মেয়েরা পুরুষের চেয়ে বুদ্ধিতে কম, বিদ্যায় কম, শক্তিতে কম, শৌর্যে কম, তাদের কাজ শারীরিক অর্থনৈতিক সামাজিক নিরাপত্তার জন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা, পুরুষের সেবা করা, পুরুষের যৌনক্ষুধা মেটানো, আর পুরুষের সন্তান প্রসব করা, আর সেই সন্তানদের লালন পালন করা। নারী নামের এই ইতর শ্রেণির প্রাণীকে প্রাণী হিসেবে শ্রদ্ধা করার, বা মানুষ হিসেবে সম্মান করার কোনও কারণ তারা দেখে না। সে কারণে ধর্ষণ ঘটায়।
সে কারণে মেয়েদের কাপড় চোপড় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সে কারণে বোরখা হিজাবের ব্যবহার বাড়ে। মেয়েরা কোনও না কোনও পুরুষের সম্পত্তি। সেই পুরুষ চায় না তার সম্পত্তির ওপর লোভ করুক অন্য কোনও পুরুষ, সে কারণেই মেয়েদের হিজাব বোরখা দিয়ে ঢেকে রাখতে হয় নিজের শরীর। শরীরটাই মেয়েদের মূলধন। শরীরটা স্বামীর ভোগের জন্য, সুতরাং একে অক্ষত রাখতে চায় স্বামীরা। তাহলে সেই বৃদ্ধাকেও কেন শরীর ঢেকে রাখতে হয়, যার মালিক নেই, মরে গেছে? সেই মালিকের সম্মানেই ঢেকে রাখতে হয়। স্বামী মৃত হলেও স্বামী। স্ত্রী সতীত্ব বজায় রাখলে স্বামীর পূণ্য হবে। সুতরাং যা কিছু মেয়েরা করে, সবই স্বামীর আরামের জন্য, সুখের জন্য, ভোগের জন্য, মঙ্গলের জন্য।
আসলে আমাদের সংস্কৃতিটাই ধর্ষণের। ধর্ষণের বলেই রাস্তাঘাটে, অলিতে গলিতে, পাহাড়ে সমুদ্রে, বাসে- ট্রেনে-নৌকোয়, ভিড়ে নির্জনে, রাতে অন্ধকারে একা মেয়েদের দেখা মেলে না, কারণ মেয়েরা একা যায় না ওসব জায়গায়, যায় না ধর্ষণের ভয়ে। কোনও অচেনা পুরুষকে ঘরে ঢুকতে দেয় না ধর্ষণের ভয়ে। কোনও পুরুষের ঘরে একলা ঢোকে না ধর্ষণের ভয়ে। ছাত্রীনিবাসগুলোকে ছাত্রাবাস থেকে আলাদা করা হয় ধর্ষণের ভয়ে। কিছুটা বড় হওয়ার পর পরিবারের পুরুষ থেকে সরিয়ে আলাদা বিছানায় মেয়েদের ঘুমোতে দেওয়া হয়, ধর্ষণের ভয়। এই ধর্ষণের ভয় একটু একটু  করে একটি মেয়ে যখন বড় হতে থাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তার সমস্ত অস্তিত্বে। স্বাভাবিক জামা কাপড়ের ওপর বাড়তি কাপড়– ওড়না, হিজাব, বোরখা ইত্যাদি পরতে হয় ধর্ষণের ভয়ে। ধর্ষণের ভয়েই যে মেয়েদের চাল চলন পুরুষের চেয়ে ভিন্ন, তা, ধর্ষণ যদি সংস্কৃতির অংশ না হত, চোখে পড়তো। সংস্কৃতির অংশ বলেই ধর্ষণের হাত থেকে শরীরকে বাঁচানোর জন্য মেয়েরা যা যা পদক্ষেপ করে, তা স্বাভাবিক বলেই মনে হয় সবার কাছে। 
ধর্ষণ কখনও মেয়েদের সমস্যার কারণে ঘটে না। ঘটে পুরুষের সমস্যার কারণে। আজ পর্যন্ত পুরুষেরা এটি বন্ধ করতে পারেনি। অবশ্য বন্ধ করতে চাইলে করতে পারতো।
বাবুল মিয়া নামের একটি বিবাহিত দু’ সন্তানের জনক হবিগঞ্জের কিশোরী বিউটিকে অপহরণ করে দু’ সপ্তাহ ধর্ষণ করেছে। এতে নাকি বিউটি ‘নষ্ট’ হয়ে গেছে, যেহেতু নষ্ট মেয়েকে কেউ বিয়ে করে না, তাই নিজের বাবা তাকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে । আমরা কিন্তু বিউটির ধর্ষক বাবুল মিয়া আর বিউটির বাবা সায়েদ আলীরই প্রজাতি। এই অতীব কদাকার এবং ভয়ঙ্কর মানুষ প্রজাতি নিয়ে আমরা কত কাব্য রচনা করি। আমাদের আদিখ্যেতার শেষ নেই। মানুষের যত মঙ্গলই কামনা করি না কেন, মানুষ মূলত এমন, এমন ভয়ঙ্কর। এই প্রজাতির পুরুষেরা যতটা নারীবিরোধী, জগতে আর কোনও প্রজাতি নেই যে প্রজাতির পুংলিঙ্গ স্ত্রী লিঙ্গকে এভাবে নৃশংস ভাবে ধর্ষণ করে করে হত্যা করে।
আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা মনুষ্য সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মেছি। এর চেয়ে মানবেতর জন্ম বোধ হয় আর কোথাও নেই।
লেখক: কবি, সাহিত্যিক, মুক্তচিন্তক, নারীবাদী, মানববাদী, ডাক্তার

‘প্লিজ ডোন্ট ডিকটেক্ট মি’ by শফিকুল ইসলাম

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে
বৈঠক শেষে ব্রিফিং করছেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের
প্রেস ব্রিফিংয়ের একাধিক বিষয়ে বারবার মনে করিয়ে দেওয়ায়  কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতি ও পালি বিভাগের ছাত্রী কানিজ ফাতিমার প্রতি কিছুটা উষ্মা প্রকাশ করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কানিজ ফাতেমার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘প্লিজ ডোন্ট ডিকটেক্ট মি’। সোমবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এই কথা বলেন।
এর আগে সোমবার বিকাল সাড়ে চারটার পর সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে সরকারের প্রতিনিধিরা। সরকারের  প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন, এনামুল হক শামীম, আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজল হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, উপ-দফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এসএম কামাল হোসেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিশ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন। এই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে কানিজ ফাতিমাও এসেছিলেন ওই বৈঠকে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানিয়ে শুরুতেই বক্তব্য দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংগঠন—‘বাংলাদেশ সাধারন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর আহ্বায়ক হাসান আল মামুন। তার বক্তব্যের সময় সেতুমন্ত্রী ও আহ্বায়কের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কানিজ ফাতিমা। মন্ত্রী যখন সমাপনী বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন কিছু কিছু শব্দ যুক্ত করার জন্য পেছন থেকে মন্ত্রীর উদ্দেশে কথা বলে যাচ্ছিলেন তিনি। 
মন্ত্রীর বক্তব্য চলার সময় কানিজ ফাতিমা বলেন, ‘আন্দোলন প্রত্যাহার নয়, স্থগিত বলুন।’ এ সময় মন্ত্রী বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি, প্রত্যাহার নয়, স্থগিত। স্থগিতই তো বলেছি।’ কানিজ ফাতেমা আবারও মন্ত্রীকে মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘শুধু আহত নয়, পুলিশের হামলায় আহত’, আরেকবার বলেন, ‘আন্দোলন ৯ মে পর্যন্ত নয়, ৭ মে পর্যন্ত স্থগিত’  ইত্যাদি।
প্রথমে কানিজ ফাতিমার এই সংশোধনীমূলক বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিলেও কিছুক্ষণ পর কিছুটা ক্ষুব্ধ হন সেতুমন্ত্রী। এ সময় তিনি কানিজ ফাতেমার উদ্দেশে বলেন, ‘প্লিজ ডোন্ট ডিকটেক্ট মি। তোমরা সবাই যখন বক্তব্য দিয়েছ, আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছি। বিশেষ করে, তুমি অনেক বেশি সময় নিয়ে বক্তব্য দিয়েছো। আমরা তো কেউ কিছু বলিনি। শুধু শুনেছি। এ ছাড়া তোমার কনভেনর তো বলেছে, যা বলার। তারপর তুমি কেন বলছো? সভার তো একটা শৃঙ্খলা আছে। তোমরা যখন কথা বলেছো, আমার এতজন কলিগ, এখানে এমপি আছেন, দলের সিনিয়র নেতারা আছেন, একজন মানুষও তো কথা বলেননি। তোমাকে সুযোগ দিয়েছি সবার চেয়ে বেশি। তুমি সুযোগ পেয়েছো বেশি। এখন আমাদের পালা। আমাদের কেউ তো বলছে না। আমি একা বলছি। সো, তুমি আমাকে ডিকটেক্ট করো না।’

কোটা সংস্কার আন্দোলন কতটা যৌক্তিক? by এস এম আববাস

কোটা দিয়ে কামলা নয়, মেধা দিয়ে আমলা চাই
সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল চায় না কেউ, তবে বিদ্যমান পদ্ধতির সংস্কার চায় সবাই। সরকার বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়ায় এবং কোটা সংস্কারে কোনও ধরনের উদ্যোগ না নেওয়ায় নতুন করে সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়েছে। আর কোটা সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে বা সংস্কার না করা হলে ছাত্রদের আন্দোলন থামানো যাবে না বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তান/নাতি-নাতনি কোটা ৩০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা পাঁচ শতাংশ। এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে ১ শতাংশ পদে প্রতিবন্ধী নিয়োগের বিধান রয়েছে। তবে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, বিভিন্ন করপোরেশন ও দফতরে সরাসরি নিয়োগে জেলার জনসংখ্যার ভিত্তিতে জেলা কোটা পুনঃনির্ধারণ করা হয়।
এই কোটা সংস্কার করে যৌক্তিকভাবে বণ্টন করা উচিত বলে মনে করেন আন্দোলনকারী ও সাধারণ ছাত্ররা। এ কারণে তারা বিগত সময়ে ১০ শতাংশ কোটা বহাল রেখে বিদ্যমান পদ্ধতি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তবে চলমান আন্দোলনে যুক্ত আন্দোলনকারী ও সাধারণ ছাত্ররা এ দাবি থেকেও আরও খানিকটা সরে এসেছেন। তারা বলছেন, সরকার যৌক্তিকভাবে কোটা পদ্ধতিতে সংস্কার আনুক আমরা সেই দাবিই জানিয়ে আসছি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছাত্রদের কোটা সংস্কারের দাবি যৌক্তিক, সরকারের এটি বিবেচনা করা উচিত। কোনও দেশেই স্থায়ীভাবে কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাকা হয় না। কয়েক বছর পর পর রিভিউ করে দেখতে হয় এটা কার্যকর আছে কিনা। আর পঞ্চাশ শতাংশের বেশি কোটা অসাংবিধানিক। পঞ্চাশ শতাংশের নিচে থাকতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা পুরস্কার দেওয়ার জন্য দেওয়া যাবে না। যারা দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা তাদেরকেই দেওয়া যাবে। আমি যে রিপোর্ট করেছি এই ধরনের অনেক নীতিই পিএসসিকে দিয়েছি। পিএসসির কাছ থেকে বিবেচনা করে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সরকার এইটা বিবেচনা করে দেখবে।’    
কোটা সংস্কারের আন্দোলন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক  আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোটা সংস্কার নিয়ে যে আন্দোলন হচ্ছে, তা যৌক্তিকভাবে চলুক। কোনও আন্দোলনই যেন সহিংস রূপ না নেয়, যারা আন্দোলন করছেন এবং যারা আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করছেন তাদের সবাইকেই বিষয়টি নজর রাখতে হবে। এর আগেও আন্দোলন হয়েছে। কেন বার বার আন্দোলন হচ্ছে তা দেখা দরকার। সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এর আগে আরেফিন সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, কার জন্য কত শতাংশ রাখা হবে তা পরিসংখ্যানসহ হিসেব করে বণ্টন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তা না হলে বারবার আন্দোলন হতে পারে।’
ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জেলা কোটা ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংস্কার করা জরুরি। এছাড়া সব মিলিয়ে ৩০ শতাংশ কোটা রেখে বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কার করা প্রয়োজন।’ যৌক্তিকভাবে সংস্কার না করায় আন্দোলন হচ্ছে বলে মনে করেন লিটন নন্দী। তা না করায় এবার আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। আন্দোলন এবং নিয়ন্ত্রণ দুটোই যেন সহিংস না হয়, সেদিকে আন্দোলনকারী ও সরকারের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন লিটন নন্দী।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নাঈমা খালেদ মনিকা এবং সাধারণ সম্পাদক স্নেহাদ্রি চক্রবর্তী রিন্টু বলেন,  প্রতিবছর শ্রমবাজারে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ১২ থেকে ১৩ লাখ যুবক। এর মধ্য প্রায় ৪৭ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত বেকার। নতুন নতুন কর্মসংস্থান নেই, সরকারি চাকরি খুবই অপ্রতুল। প্রায় চার লাখের মতো পরীক্ষার্থী বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিলেও আসন আছে মাত্র দুই হাজার ২০০ জনের জন্য। তার মধ্যে কোটা খড়গের কারণে মেধার ভিত্তিতে মাত্র ৪৫ শতাংশ সাধারণ শিক্ষার্থী সুযোগ পাচ্ছে। আর বাকি ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোটার ভিত্তিতে। বৈষম্য কমানোর দাবিতে কোটা প্রথা চালু করা হলেও কোটায় এখন বৈষম্য তৈরি করছে। তাই কোটা প্রথা সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নাঈমা খালেদ মনিকা বলেন, স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে সহযোগিতার জন্য নানা আয়োজন করতে হয়েছে। কিন্তু তাদের সন্তানসহ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা কোনোভাবে যৌক্তিক হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, জেলা কোটার ক্ষেত্রে বৈষম্য কাজ করে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে এ পদ্ধতি চালু থাকায় ছোট জেলাগুলো কোনও কোটা না পাওয়াসহ এ পদ্ধতি ব্যাপক দুর্নীতিতে পর্যবসিত হয়েছে। এজন্য কোটা সংস্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহিদ নিলয় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘কোটা পদ্ধতি সংস্কার না করায় মেধাবীরা নিষ্পেষিত হচ্ছে। কোটার অপব্যবহার হচ্ছে, সরকার বন্ধ করতে পারেনি।’
তিনি জানান, বিগত সময়ে বিদ্যমান কোটার কারণে ২৮তম বিসিএসে ৮১৩টি, ২৯তম বিসিএসে ৭৯২টি, ৩০তম বিসিএসে ৭৮৪টি, ৩১তম বিসিএসে ৭৭৩টি আর  ৩৫তম বিসিএসে ৩৩৮টি পদ খালিই থেকেছে।
শাহিদ নিলয় মেধাবী শিক্ষার্থী থাকতেও পদ খালি রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে পদ্ধতি সংস্কার না করায়। কারণ বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। ফাঁস-ফোকর রয়েছে। আমি মনে করি, কোটা সংস্কার না হওয়ায় জনপ্রশাসনে যোগ্য ও মেধাবী অনেক প্রার্থী সুযোগ পাচ্ছেন না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনামিকা সরকার ও প্রিয়াংকা দে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদ্যমান কোটা সংস্কারে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন। দ্রুত উদ্যোগ না নেওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছে। সংস্কার না করলে আন্দোলন থেকে থাকবে হয়তো, কিন্তু বন্ধ হবে না। তাই কোটা পদ্ধতির দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।’    
মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড এর সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চালু করা এই কোটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সাল থেকে আবার মুক্তিযোদ্ধা ও  তাদের সন্তানদের জন্য কোটা চালু করা হয়। বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়াদের জন্য কোটা থাকতে হবে। তবে প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। আমরা সংস্কারের বিপক্ষে নই।’
উল্লেখ্য,  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ১৯৭২ সালে কোটা চালু করেছিলেন উপহার হিসেবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাকে নির্মমভাবে হত্যার পর এই কোটা বাতিল করা হয়। পরবর্তী ২৪ বছর মুক্তিযোদ্ধাদের এই কোটা দেওয়া হয়নি। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য আবার কোটা চালু করেন। এছাড়া সমাজের পিছিয়ে পড়াদের জন্য কোটা পদ্ধতি চালু আছে। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর জেলাওয়ারি কোটা নির্ধারণ করা হয়।

তিন সন্দেহ সরকারের, প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্ন এরা কারা? by পাভেল হায়দার চৌধুরী

পুলিশের অ্যাকশনের পর আবারও পথে নেমে আসে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন নিয়ে তিন সন্দেহ বিরাজ করছে সরকারের ভেতরে। সন্দেহগুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রথমত বিএনপি-জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সাধারণ ছাত্রের বেশ ধরে এই আন্দোলনে মিলিত হয়ে উস্কানি দিচ্ছে—যাতে বেকায়দায় ফেলা যায় সরকারকে। দ্বিতীয়ত, গত কয়েক বছরে ছাত্রলীগে যাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে তারাও এই আন্দোলনে জড়িয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে। তৃতীয়ত, ছাত্রলীগের আসন্ন সম্মেলন বানচাল করতে চায় এমন একটি অংশও চক্রান্তে নেমেছে। এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রলীগের মুষ্টিমেয় একটি অংশ বলে মনে করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দাবি, এ ধরনের অস্থিরতা থাকলে ছাত্রলীগের একটি অংশ মনে করছে সম্মেলন ঠেকানো সম্ভব হবে। ফলে তারাও কিছু শিক্ষার্থীকে মাঠে নামিয়েছে বলে মনে করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো কোটা সংস্কারের নামে ডাকা আন্দোলনকে এভাবেই দেখছেন। তারা এই তিন কারণ মাথায় নিয়ে এই আন্দোলন থামাতে কাজ শুরু করেছেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কোটা সংস্কারের এই আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখছেন। তিনি গত রবিবার রাতে দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় দলের অপর নেতাদের কাছে জানতে চেয়েছেন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামা এরা কারা? এদের পারিবারিক পরিচয় কী? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহনকারী পরিবারের কোনও সন্তান এই আন্দোলনে জড়াতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী এদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, গত রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উল্লিখিত এই তিন কারণ অবহিত করেছেন সেখানে উপস্থিত নেতারা।
ওই বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এই আন্দোলনকারীদের ব্যাপারে অনমনীয় অবস্থান থাকবে সরকারের। তবে আন্দোলনকারীদের 'কাউন্সিলিং' করে এখান থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এজন্য দল ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আন্দোলনকারীদের এ পথ থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। এরই অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে সকালে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রবিবার গভীর রাতে উপাচার্যের বাসভবনে হামলার ঘটনার পর ফোন করে তার খোঁজ-খবর নেন প্রধানমন্ত্রী।

ভারতে রোহিঙ্গা শিবিরের অবস্থা জানতে চেয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট by রঞ্জন বসু

দিল্লির কালিন্দী কুঞ্জের রোহিঙ্গা শিবির
ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যে ৪০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থী আছেন, তাদের শিবিরগুলোতে কি পানীয় জল বা শৌচাগারের মতো ন্যূনতম মৌলিক সুবিধাটুকুও আছে? কী ব্যবস্থা আছে তাদের শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের জন্য?
ওই শিবিরগুলোর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে এ ব্যাপারে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ আদালত। সোমবার (৯ এপ্রিল) এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দিল্লির কালিন্দী কুঞ্জে এবং হরিয়ানার ফরিদাবাদ ও মেওয়াটে অবস্থিত মোট তিনটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরকেও চিহ্নিত করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট, সরেজমিনে যেগুলো খতিয়ে দেখে সরকারকে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চের দেওয়া এই নির্দেশে আশার আলো দেখছে ভারতে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা।
ভারতে রোহিঙ্গা সমাজের নেতৃস্থানীয় মুখ ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আলি জোহর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ও স্বয়ং প্রধান বিচারপতি যেখানে আমাদের সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে বলেছেন, তাই আমরা আশাবাদী যে হয়তো শেষ পর্যন্ত ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের নির্দেশ দেবেন না।’
রোহিঙ্গারা ভারতে থাকতে পারবেন কিনা, সে ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য এদিন কোনও চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেননি।
এই গুরুত্বপূর্ণ মামলায় পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ৯ মে, অর্থাৎ শরণার্থী শিবিরগুলোর হাল নিয়ে সরকারের প্রতিবেদন জমা পড়ার পর।
এর আগে রোহিঙ্গারা ভারতের ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ এবং সে কারণেই তাদের দেশ থেকে চলে যেতে হবে, এই মর্মে শীর্ষ আদালতে হলফনামা জমা দিয়েছে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তবে সলিমুল্লাহ ও মহম্মদ শাকির নামে দুজন রোহিঙ্গা শরণার্থী সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে আবেদন জানিয়েছেন, ভারতের তামিলনাডুতে শ্রীলঙ্কা থেকে আসা তামিল শরণার্থীদের জন্য ভারতে যেভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে, একইভাবে রোহিঙ্গাদেরও সে সুবিধা দেওয়া উচিত।
ওই মামলারই শুনানি চলছে কয়েক মাস ধরে, আর এই রায়ের ওপরেই নির্ভর করছে ভারতে বসবাসকারী কয়েক হাজার রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ।
তবে রোহিঙ্গাদের শিবিরগুলোতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা করে গত ১৯ মার্চ কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে সুপ্রিম কোর্ট অস্বীকার করেছিলেন।
সে সময় ভারত সরকারের কৌঁসুলি আদালতকে বলেন, “রোহিঙ্গাদের অনুকূলে কোনও অন্তর্বর্তী রায় দিলে সেটা ‘মিডিয়ার শিরোনাম’ হবে এবং বিরূপ প্রভাব ফেলবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে।” সুপ্রিম কোর্ট সেই যুক্তি তখনকার মতো মেনে নেন।
তবে এখন যেভাবে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর অবস্থা খতিয়ে দেখে সরকারকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন, তাতে অনেকেই ধারণা করছেন ভারতে রোহিঙ্গারা যে আসলে একেবারেই মানবেতর অবস্থায় বাস করছে, দেশের শীর্ষ আদালতও সেটা উপলব্ধি করেছেন। বা অন্তত সেরকম সন্দেহ করছেন।
এই মামলায় চূড়ান্ত রায়ের ওপর ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও অনেকটা নির্ভর করছে।
এর কারণ হলো সুপ্রিম কোর্ট যদি সত্যিই ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নে অনুমতি দেন তাহলে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিন্তু এই চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশেই পুশব্যাক করার চেষ্টা করবে। কারণ, তাদের যুক্তি হলো এরা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়েই ভারতে ঢুকেছে।
এর মধ্যেই অল্প কিছু রোহিঙ্গাকে ভারত বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছে বলে বিএসএফের মহাপরিচালক কে কে শর্মা মাস চারেক আগে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেন।
ফলে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনও ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার গতিপ্রকৃতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।

‘তাণ্ডবের প্রতিটি মুহূর্তে বারবার মৃত্যু ভয়ে আঁতকে উঠেছি’ by নুরুজ্জামান লাবু

উপাচার্যের স্ত্রী সালমা জামান
রাতভর তাণ্ডবের প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যু ভয়ে কেটেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের স্ত্রী সালমা জামান। তিনি বলেন, ‘হামলার সময় মেয়েকে নিয়ে বাসার মধ্যেই লুকিয়ে ছিলাম। মেয়ে ভয়ে কাঁদছিল। তখন মেয়ের হাত শক্ত করে ধরেছিলাম। তাণ্ডবের প্রতিটি মুহূর্তে বারবার মৃত্যু ভয়ে আঁতকে উঠেছি।’
রবিবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া ‘সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে’ আন্দোলনের একপর্যায়ে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালায় আন্দোলনকারীর। এ সময় উপাচার্যের বাসার ফ্রিজ, আলমারি থেকে  শুরু করে সব ধরনের আসবাবপত্র ভেঙে ফেলা হয়। ঘণ্টাব্যাপী তাণ্ডবের সময় বাসার মধ্যেই লুকিয়ে ছিলেন উপাচার্যের পরিবারের সদস্যরা। হামলার সময় বাসায় ছিলেন উপাচার্যসহ তার স্ত্রী সালমা জামান, ছেলে আশিক খান, মেয়ে আফিয়া খান। 
ঘটনা প্রসঙ্গে উপাচার্যের স্ত্রী সালমা জামান বলেন, ‘রাত একটায় বাসায় হামলা হয়, সে সময় বাসভবনের প্রধান ফটক ভেঙে কয়েকশ’ ছেলে ও মেয়ে আন্দোলনকারী ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখন পুলিশ ডাকতে বললেও উপাচার্য পুলিশ ডাকতে চাননি। তখন তিনি (উপাচার্য) বারবার বলেছেন, পুলিশ ডাকলে ওরা ছাত্রদের ওপর হামলা করবে। ছাত্রদের মেরে ফেলবে। তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আমাদের ওপর হামলা হবে না। আমি ওদের বোঝাচ্ছি।’
সালমা জামান আরও বলেন, ‘তারা (আন্দোলনকারীরা) ভাঙচুর করতে শুরু করলে তিনি (উপাচার্য) তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। স্যার (উপাচার্য) ছেলেকে নিয়ে নিচে নেমে যান, আমি মেয়েকে নিয়ে লুকিয়ে থাকি। এ সময় তারা বাসার সবকিছু ভেঙে লুটপাট করে নিয়ে গেছে। তখন চোখে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।’
এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘সন্ধ্যা থেকেই আন্দোলন চলছিল। সন্ধ্যায় একবার বাসার সামনে বসেছিল আন্দোলনকারীরা। পরে তারা চলে গেছে। এরপর বাসার কেউ ঘুমায় নাই। কারণ, উত্তেজনা চলছিল। স্যারের (উপাচার্যের) ফোনে বারবার ফোন আসছিল। তিনি বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। রাত ৯টার দিকে বাসা ছেড়ে রাতের জন্য অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে চাইলেও স্যার বাসা ছেড়ে যেতে চাননি।’ 
সরেজমিনে দেখা যায়, উপাচার্যের বাসার আসবাবপত্র থেকে শুরু করে ব্যবহার্য এমন কোনও জিনিসপত্র নাই যা ভাঙেনি। টিভি-ফ্রিজ সব ভাঙা। বিভিন্ন জিনিসপত্র এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে।
উপাচার্যের ভবনে হামলার ব্যাপারে শিক্ষক ও স্বজনদের বক্তব্য: 
সোমবার সকালে উপাচার্যের বাসভবন ঘুরে দেখার পরে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন, ‘আমরা অনেক আন্দোলন দেখেছি, এরশাদের সময়কার আন্দোলনও দেখেছি, কিন্তু কখনও এমন দৃশ্য দেখিনি। এমন ভয়াবহ তাণ্ডব কারা করেছে, তাদের খুঁজে বের করা জরুরি।’
সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হামলার সময় মুখোশধারী লোকজন ছিল। আমরা শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে চাই বৃহত্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে এই হামলাকারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হোক।’
উপাচার্যের স্ত্রী সালমা জামানের বোন খাদিজা খুশবু বলেন, ‘রাতে আমার ভাগ্নি আফিয়া খান ফোন করে আমাকে বলে, খালামনি, আমরা বোধহয় আর বাঁচবো না, আমাদের ভবনে ভাঙচুর-লুটপাট চলছে। আমরা লুকিয়ে আছি। আমাদের পেলে হয়তো মেরে ফেলবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ও ফিসফিসিয়ে কথা বলছিল। ওরা মা-মেয়ে এক জায়গায় লুকিয়ে ছিল, ফলে জোরে কথাও বলতে পারছিল না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম পরিবারের সবাইকে শেষ করে ফেলা হয়েছে। এখন আল্লাহর কাছে হাজার শোকর, ওদের প্রাণে মারেনি। জীবনটা বেঁচেছে এই আমাদের বড় পাওয়া।’
হামলার পর ভিসির বাসার সামনের দৃশ্য

কাশ্মিরের জন্য স্বাধীনতা কোনো বিকল্প নয়: ফারুক আবদুল্লাহ

ডা. ফারুক আবদুল্লাহ (ফাইল ফটো)
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রধান ডা. ফারুক আবদুল্লাহ বলেছেন, কাশ্মিরের জন্য স্বাধীনতা কোনো বিকল্প নয়। গত (শনিবার) পুঞ্চের মান্ডিতে দলীয় এক জনসমাবেশে ভাষণ দেয়ার সময় তিনি ওই মন্তব্য করেন।
ফারুক আবদুল্লাহ বলেন, ‘একদিকে, চীন ও পাকিস্তানের মতো পরমাণু শক্তিধর দেশ, অন্যদিকে ভারত। সকলের কাছেই পরমাণু বোমা রয়েছে। আমাদের কাছে আল্লাহ্‌র নাম ছাড়া কিছুই নেই। আমাদের কোনো পারমাণবিক বোমা নেই, কোনো সেনাবাহিনী নেই এবং কোনো যুদ্ধ বিমানও নেই। আমরা কীভাবে বেঁচে থাকতে যাচ্ছি।’
ফারুক আবদুল্লাহ অবশ্য বলেন, ‘কাশ্মির ভারতের গোলাম নয় এবং ভারতকে অবশ্যই কাশ্মিরের জনগণের সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ না আপনারা আমাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিচ্ছেন ততক্ষণ কাশ্মিরের অবস্থার পরিবর্তন হবে না। এমনকী সোনার সড়ক তৈরি করে দিলেও তাতেও কিছু হবে না। কাশ্মিরি জনগণের হৃদয় ও মন জয় করতে হবে এবং তাদের কষ্ট দূর করতে হবে।’
ডা. ফারুক আবদুল্লাহ প্রতিবেশী পাকিস্তান সম্পর্কে বলেন, ‘পাকিস্তান নিজের সমস্যাই সমাধান করতে পারছে না, ওরা আমাদের জন্য কী করবে? কাশ্মির সমস্যার সমাধান বন্দুক দিয়ে হবে না বলেও তিনি বলেন।
ডা. ফারুক আবদুল্লাহ গত ফেব্রুয়ারিতে মন্তব্য করেছিলেন, পাকিস্তান কাশ্মির দখল করার মিথ্যে আশায় রয়েছে। কিন্তু কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল, আছে এবং থাকবে। যুদ্ধ কোনো সমাধান নয় বরং এর ফল খারাপ হতে পারে বলেও ফারুক আবদুল্লাহ সেসময় বলেন।

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ভূমিকা রেখেছিলেন যে গোপন দূত

গত সপ্তাহে যখন আনা শেনওয়াল্ট ৯৪ বছর বয়সে মারা যান, তখন বিশ্বের খুব কম মানুষই জানতে পেরেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা তাইওয়ানের মতো দেশের মাঝে মধ্যস্থতা করার মতো অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন ব্যক্তিকে বিশ্ব হারিয়েছে। তার চীনা নাম চেন জিয়ানজেমি, যার ওয়াশিংটন ডিসির কূটনীতিক মহলে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই সঙ্গে যোগাযোগ ছিল চীন আর তাইওয়ানের সরকারের সঙ্গেও।
তিনি ছিলেন একজন অনানুষ্ঠানিক কূটনীতিক কর্মকর্তা, যিনি বিংশ শতকের রাজনীতির নানা ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি আর রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছিল। চীনের নেতা ডেং জিয়াওপিং আর তাইওয়ানের চিয়াং কাইশেকের সঙ্গেও তার বৈঠক হয়েছে।
যুদ্ধের সময়ের ভালোবাসা
তাকে কমিউনিজম বিরোধী বলে আমেরিকানরা জানতো। কিন্তু চীনে তাকে বিবেচনা করা হতো নামী একজন যোদ্ধার বিধবা স্ত্রী হিসাবে। আর তাইওয়ানের কাছে তিনি গুরুত্বপূর্ণ একজন লবিয়িস্ট, যে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯২৩ সালে বেইজিংয়ে একটি শিক্ষিত আর ধনী পরিবারে তার জন্ম। হংকংয়ে পড়াশোনা শেষে একটি চীনা বার্তা সংস্থায় প্রতিবেদক হিসাবে কাজ শুরু করেন।
১৯৪৪ সালে তিনি এমন একটি দায়িত্ব পান, যা তার জীবনকে বদলে দেয়। কুনমিংয়ে মার্কিন মেজর জেনারেল ক্লারেল শেনওয়াল্টের সাক্ষাৎকার নেয়ার দায়িত্ব পান। শেনওয়াল্ট তখন মার্কিন বিমানচালকদের একটি স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপ, ফ্লায়িং টাইগারের দায়িত্বে ছিলেন, যারা জাপানী হামলা থেকে চীনকে রক্ষায় কাজ করছিল। দু’জনের মধ্যে তিন দশক বয়সের ব্যবধান থাকলেও, দুজনে প্রেমে পড়ে যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে চেন শিয়ানজেমিকে বিয়ে করেন শেনওয়াল্ট। তার নতুন নাম হয় আনা শেনওয়াল্ট।
তখন নিজের দুই কন্যাকে নিয়ে ওয়াশিংটনে পাড়ি জমান ৩৫ বছরের আনা। সেখানেও তিনি সাংবাদিক, অনুবাদক আর পরে স্বামীর বিমান পরিবহন ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তার পেন্ট হাউজ অ্যাপার্টমেন্ট ছিল ওয়াটার গেট কমপ্লেক্সে, যে ভবনেই ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারিরও জন্ম হয়। সেখানে তার দেয়া পার্টিতে এসেছিলেন রিচার্ড নিক্সনও, যিনি তাকে 'ড্রাগন লেডি' বলে ডাকতেন। তবে তিনি পুরোপুরি বিতর্কের বাইরেও ছিলেন না। তার মৃত স্বামীর একটি কো¤পানি পরে সিআইএ কিনে নেয়। বলা হয়, সেটি কমিউনিজম বিরোধী কর্মকা-ে ব্যবহার করা হয়েছে। এফবিআইয়ের একটি গোপন রেকর্ডিয়ে জানা যায়, তিনি তৎকালীন দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন তারা প্যারিসে শান্তি আলোচনা বর্জন করে, যা রিচার্ড নিক্সনের নির্বাচনী প্রচারণায় সহায়তা করেছিল। তার বিরুদ্ধে এ জন্য অভিযোগ আনা হলেও, পরে নিক্সন ক্ষমতায় আসার পর সেটি আর এগোয় নি।
বন্ধুত্বের দূত
চীনে আনা শেনওয়াল্টকে দেখা হয় খানিকটা আলাদাভাবে। চীনে এখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ফ্লাইং টাইগার্স আর মেজর জেনারেল ক্লারেল শেনওয়াল্টকে সম্মানের চোখে দেখা হয়। আর তাই আনাকেও দেখা হয় তাদের সম্মানের ধারক হিসাবেই। এমনকি ২০১৫ সালে তাকে একটি সম্মানসূচক পদকও দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র-চীন স¤পর্ক তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। চীনা বার্তা সংস্থা সিনহুয়া তার বিষয়ে লিখেছে ‘তিনি এমন একজন চীনা-আমেরিকান যিনি চীন আর আমেরিকার বন্ধুত্বের দূত হিসাবে কাজ করেছেন।’ তাকে দেখা হতো প্রথম চীনা নাগরিক হিসাবে যিনি হোয়াইট হাউজে কোন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কিন্তু বরাবরই কম্যুনিজমের বিরোধী ছিলেন আনা। চীনের গৃহযুদ্ধের পর যখন কুয়োমিনটাং নেতারা তাইওয়ানে সরকার গঠন করে, তাদের নেতা চিয়াং কাইশেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ স¤পর্ক ছিল আনার। দীর্ঘদিন তাইওয়ানের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেন দরবার করেন আনা শেনওয়াল্ট।
তবে ১৯৭৯ সালে চীনের কম্যুনিস্ট সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির পর তারও অবস্থান পাল্টায়। ১৯৮১ সালে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগ্যানের অনানুষ্ঠানিক দূত হিসাবে চীনে যান এবং দুই দেশের স¤পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। একই সময় তিনি তাইওয়ানের সঙ্গেও স¤পর্ক রাখেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাইওয়ানের স্বার্থে কাজ করে যান। পরবর্তী জীবনে এই তিন ভিন্ন ঘরানার দেশের মধ্যে স¤পর্ক বৃদ্ধিতে অব্যাহতভাবে কাজ করে যান। বলা হয়, কোন আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল একজন কূটনীতিক।
১৯৯০ সালে তার মধ্যস্থতাতেই তাইওয়ানের প্রথম একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল মেইন ল্যান্ড চীন সফর করে। ২০০২ সালে চীনের সাংবাদিকদের দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে নিজের এই জীবন নিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাসনে থাকার সময়, সাংবাদিক হিসাবে কাজ করার সময়, যুক্তরাষ্ট্রে একা থাকার সময় আমার অনেক অ¤¬মধুর অভিজ্ঞতা হয়েছে আর সেগুলোই আমার কাজে লেগেছে। আটজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদে আমি অনেক বিনা বেতনের কাজ করেছি আর সেসব ছিল খুবই বৈচিত্রময়। তাই তার বদলে আমি কিছু আশাও করিনি।’

ভুয়া ছবি পোস্ট করে বিপাকে ইবি প্রো-ভিসি

ভারতের এক আন্দোলনের মুখোশধারীদের ছবি শাহাবাগের নামে চালিয়ে দিয়ে বিপাকে পড়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ড. শাহিনুর রহমান। চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে ওই ভুয়া ছবি ফেসবুকে শেয়ার দেবার পর থেকেই এর বিড়ম্বনার শিকার হন তিনি। অবশেষে দুই ঘণ্টা পর তিনি ছবিটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হন।
সূত্র মতে, সম্প্রতি কোটা সংস্কার দাবিতে চলমান আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ফেসবুকে একটি ছবি ভাইরাল হয়। ছবিটি ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার একটি আন্দোলনের মুখোশ পরিহিত কিছু যুবকের। ছবিটিকে শাহবাগে আন্দোলনকারীদের বলে প্রচার করা হয়। সেই একই ছবি প্রো-ভিসি ড. শাহিন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বলে চালাতে ফেসবুকে শেয়ার দেন। তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে ওই ভুয়া ছবিটি পোস্ট করেন। এর পর পরই তার বিরোধিতা ও তিরস্কার করে প্রচুর মন্তব্য আসতে থাকে। মেহেদি মেনন নামে একজন তাকে কটাক্ষ করে মন্তব্য করেন, ‘দালালি ছাড়–ন, আপনাদের থেকে দালালি আশা করিনা স্যার।’ আকবর হোসেন নামে একজন লিখেন, ‘আপনার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করছিলাম, স্যার।’ মাসুম সাগর নামে আরেকজন লিখেন, ‘স্যার মনে হয় পিকটা ভালোভাবে জাজ করার সময় পাননি।’ এছাড়া আরো বেশ কয়েকজন ভারতের ওই আন্দোলনের ছবিসহ বিভিন্ন লিংক তার পোস্টে কমেন্ট করেন। এতে চরম বিপাকে পড়েন তিনি। বিদ্রূপে অতিষ্ঠ হয়ে মুল বিষয় বুঝতে পেরে তিনি দুই ঘণ্টা পর পোস্টটি তুলে নেন।
এর আগে সকাল দশটায় ইবি শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে প্রশাসন ও পুলিশ তাদের বাধা দেয়। দেশের সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করলেও তাদের সে সুযোগ দেয়া হয়নি। বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপার মেহেদী হাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে আসলে প্রো-ভিসি ড. শাহিন তার সাথে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা অবস্থান করেন। এসময় তিনি পুলিশের সাথে আড্ডা দিলেও পাশেই অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের সাথে কোন কথা বলেননি।
এ ব্যাপারে প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. শাহিনুর রহমান বলেন, ‘কেউ যদি মুখোশ পড়ে আন্দোলন করে তা কখনো ভালো লক্ষণ নয়। আমি সকালে ছবিটি শেয়ার করেছিলাম। ভারতের ছবি কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে জানি না।’ পোস্ট রিমুভ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আইডি তিন জন (স্ত্রী, কন্যা ও নিজে) মেইনটেইন করে। রিমুভ করা হয়েছে কিনা তা আমি জানি না।’

অভিনেত্রীর 'নগ্ন প্রতিবাদ', অতঃপর...

ভারতের তেলেগু ছবির এক অভিনেত্রী প্রকাশ্যে কাপড় খুলে এক নগ্ন প্রতিবাদে অংশ নিয়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন।
বলা হচ্ছে চলচ্চিত্র শিল্পে যৌন হয়রানি এবং তেলেগু ছবিতে স্থানীয় শিল্পীদের যথেষ্ট সুযোগ না দেয়ার প্রতিবাদ জানাতে অভিনেত্রী শ্রী রেড্ডি এই কাজ করেন।
হায়দ্রাবাদে তেলেগু ফিল্ম চেম্বার অব কমার্সে এই অভিনব প্রতিবাদের পর অভিনেত্রী শ্রী রেড্ডিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অশ্লীল আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
টুইটারে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, পার্ক করে রাখা কিছু গাড়ির সামনের একটি খোলা চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে শ্রী রেড্ডি কাপড় খুলতে শুরু করেছেন। এরপর দুহাতে বুক ঢেকে তাকে সেখানে বসে থাকতে দেখা যায়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, শ্রী রেড্ডির মূল অভিযোগটি হচ্ছে, তেলেগু চলচ্চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজকরা স্থানীয় শিল্পীদের সুযোগ না দিয়ে অন্য রাজ্যের শিল্পীদের প্রাধান্য দিচ্ছেন।
তাকে কেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্য করা হচ্ছে না সেটি নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তবে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, শ্রী রেড্ডি চলচ্চিত্র শিল্পে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এই অভিনব কাজটি করেছেন। অনেকদিন ধরেই তিনি নাকি এ নিয়ে সরব ছিলেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তার এই 'নগ্ন প্রতিবাদ' নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। তেলেগু ছবিতে কাজ দেয়ার জন্য চলচ্চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজকরা নাকি তার কাছে নগ্ন ছবি দাবি করতেন।
অনেকে শ্রী রেড্ডির এই প্রতিবাদকে ভারতের 'হার্ভি ওয়েইনস্টেইন মোমেন্ট' বলে তুলনা করছেন।
উল্লেখ্য হলিউডের নামকরা প্রযোজক হার্ভি ওয়েইনস্টেইনের বিরুদ্ধে গত বছর বেশ কয়েকজন অভিনেত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলার পর এ নিয়ে সেখানকার চলচ্চিত্র শিল্পে বিরাট প্রতিবাদ শুরু হয়।
শ্রী রেড্ডির বিরুদ্ধে ভারতীয় দন্ডবিধির ২৯৪ ধারায় একটি মামলা করা হয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি

সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল: রাশিয়া ও সিরিয়া

সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় হোমস প্রদেশের একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। ইসরাইল ওই ঘাঁটিতে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে যার মধ্যে পাঁচটি ভূপাতিত করতে সক্ষম হয় সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, আজ (সোমবার) দুটি ইসরাইলি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান লেবাননের আকাশ থেকে সিরিয়ার টি-ফোর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। বিমানগুলো সিরিয়ার আকাশে প্রবেশ করে নি। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, আটটির মধ্যে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এর আগে সিরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা ‘সানা’ বলেছিল, বিমানঘাঁটিতে হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীকে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ হামলায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। পরে সিরিয়ার সরকারি গণমাধ্যমগুলো বলেছে, ইহুদিবাদী ইসরাইল এ হামলা চালিয়েছে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির কয়েক ঘন্টা পরই এ হামলা হলো। দামেস্কের কাছে রাসায়নিক হামলা হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প গতকাল বলেছেন, এর জন্য সিরিয়া সরকারকে চড়া মূল্য দিতে হবে। পূর্ব গৌতার দুমা শহরে যখন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সিরিয় বাহিনী চূড়ান্ত বিজয়ের পথে রয়েছে তখন রাসায়নিক হামলার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

‘ব্ল্যাক প্যানথার’ দিয়ে খুলছে সৌদির সিনেমা হল

সৌদি আরবে সিনেমা হল খুলছে আগামী ১৮ই এপ্রিল। মারভেলের সুপারহিরো ‘ব্ল্যাক প্যানথার’ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে রক্ষণশীল সৌদি আরবের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। সাড়ে তিন দশক পর সৌদি আরবের মানুষ আবারো হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে শুরু করবেন। এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেছে সৌদি আরবের তথ্য মন্ত্রণালয়। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।
খবরে বলা হয়, রাজধানী রিয়াদের কিং আবদুল্লাহ জেলায় গানের কনসার্টের জন্য বানানো একটি হলে প্রথমবারের মতো সিনেমা প্রদর্শন করা হবে। এই হলে পাঁচশ’টি আসন থাকবে। দ্রুতই সেখানে আরো তিনটি পর্দা যুক্ত হবে। রক্ষণশীল ভাবধারা থেকে ক্রমশ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। এর অংশ হিসেবে দেশটিতে বিনোদনের জন্য সিনেমা হল চালু করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ নাগরিকদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কিন্তু দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে কিনা, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন রয়েছে। সিনেমা প্রদর্শনের জন্য সৌদি আরবের প্রধান আর্থিক তহবিল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বিশ্বের সবচাইতে বড় সিনেমা হল চেইন আমেরিকান মুভি ক্লাসিক বা এএমসি’র সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, দুই পক্ষ যৌথভাবে আগামী পাঁচ বছরে সৌদি আরবের ১৫টি শহরে ৪০টি সিনেমা হল নির্মাণ করবে। এর পরের সাত বছরে ২৫টি শহরে ৫০ থেকে একশ’টি সিনেমা হল নির্মাণ করা হবে।  সৌদি আরবের মানুষ সর্বশেষ সিনেমা দেখেছিলেন ১৯৭০ সালে। সে সময় দেশটির কট্টরপন্থি ধর্মীয় নেতাদের চাপে সিনেমা হলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ৩৫ বছর ধরে দেশটিতে কোনো সিনেমা হল ছিল না। সৌদি আরবের ক্ষমতাসীন বাদশাহ পরিবার কট্টরপন্থি ওয়াহাবী মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল। যে মতবাদে নারী-পুরুষের পোশাকসহ অনেক আচার কঠোরভাবে পালন করতে হয়। এখন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটিতে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছেন। তিনি সৌদি আরবকে রক্ষণশীল সমাজ থেকে বের করে আনতে চাইছেন। তবে সৌদি জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী। তারা অনেক আগে থেকেই স্যাটেলাইট টেলিভিশন, মোবাইল ফোন সহ বিভিন্নভাবে পশ্চিমা অনুষ্ঠান দেখে থাকেন। এখন অ্যাকশন মুভি ব্ল্যাক প্যানথার দিয়ে সেখানে প্রকাশ্যে পশ্চিমা সিনেমা দেখা শুরু হচ্ছে। সৌদি আরবে হলিউডের সিনেমা প্রদর্শন শুরু হলেও কিছু সেন্সর করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সিনেমা দেখানো শুরু হলেই অথবা নারীরা গাড়ি চালাতে পারলেই, সেখানেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সূচনা হবে, এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বাদশাহর পরিবার নিয়ে সমালোচনা করা যাবে না, সেই দেশটির আইনেই বলা আছে।

পরকীয়ার জেরে খুন কেন এই নৃশংসতা by মারুফ কিবরিয়া

প্রেম-পরকীয়ায় জড়িয়ে খুনের ঘটনা বাড়ছে। স্বামীর হাতে স্ত্রী কিংবা স্ত্রীর হাতে স্বামী খুনের শিকার হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পরকীয়ার বলি হচ্ছে তৃতীয় কেউ। সমাজ বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন সামাজিক বন্ধনে চিড় ধরা, অস্থিরতা ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব-টানাপড়েনে আপনজনকে খুনের সংখ্যা বেড়েই চলছে। তবে এর পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে হতাশা, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যাওয়া, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।
সম্প্রতি রংপুরে আইনজীবী রথীশ চন্দ্র ভৌমিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকের পরকীয়ার জেরে। স্নিগ্ধা তার সহকর্মী কামরুলের প্রেমে পড়েন। আর সেটা যখন গাঢ় রূপ নেয় তাতেই বাধে বিপত্তি। স্ত্রীর ‘অবৈধ’ সম্পর্কটা কিছুতেই মানতে পারছিলেন না রথীশ। স্বামীর বাধা পেয়ে প্রেমিককে নিয়ে দুই মাস ধরে খুনের পরিকল্পনা করেন স্নিগ্ধা। একপর্যায়ে চলতি মাসেই এই আইনজীবী স্বামীকে দুধের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে হত্যা করেন। রথীশচন্দ্র ও স্নিগ্ধার দীর্ঘ সংসার জীবনে অনার্স পড়ুয়া এক ছেলে ও নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি মেয়ে রয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কুদরত আলী নামে এক ঘটককে গলা কেটে হত্যা করেছে তার স্ত্রী মাছুরা খাতুন। দীর্ঘ দিনের সংসারে কোনো অভাব-অনটন ছিল না তাদের। জানা গেছে, দুজনের মাঝে বোঝাপড়ার অনেক অভাব ছিল। কিন্তু কখনো সমাধানের পথে হাঁটতে চাননি মাছুমা। বরং পাশের এলাকার আরিফ নামের এক যুবকের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন। দিনকে দিন সে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। স্ত্রীর পরকীয়ার বিষয়টি লোক মারফত জানতে পারেন কুদরত। এ নিয়ে একাধিকবার সতর্ক করেছেন তিনি। এমনকি প্রেমিক আরিফকেও নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তাতেও কাজ হয়নি। বরং হিংস্র হয়ে উঠে মাছুমা। স্বামীকে গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায় সে।
চলতি বছরের ১৮ই জানুয়ারি সন্ধ্যায় সাভারের জামসিং সোলায়মান মার্কেট এলাকায় সিদ্দিক মিয়ার বাড়িতে দিনমজুর স্বামী মোহাম্মদ হোসেন আলী ঘুমন্ত স্ত্রী মারুফাকে গলা কেটে হত্যা করে। এ ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। জানা যায়, মোহাম্মদ হোসেন আলী এক নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। বিষয়টি নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া বিবাধ লেগে থাকতো। কিন্তু মারুফার প্রতিদিনের ঝগড়া যেন বিষের মতো হয়ে উঠেছিল হোসেন আলীর কাছে। একপর্যায়ে পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলতে গিয়ে স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করে হোসেন আলী।
গত ৭ই ফেব্রুয়ারি প্রবাসী স্বামীকে হত্যা করে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করে স্ত্রী। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের পুটিমারা গ্রামে ঘটে এই ঘটনা। সকালে থানায় ঢুকেই পুলিশকে বলে, আমি আমার স্বামীকে খুন করেছি। আপনারা আমাকে গ্রেপ্তার করুন। মধ্য বয়সী এই নারীর কথা শুনে চমকে উঠেন থানার পুলিশ সদস্যরা। আটক করা হয় ওই নারীকে। তার কথানুসারেই বসত ঘরের বারান্দা থেকে উদ্ধার করা হয় স্বামী অলিউল্লাহ’র লাশ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে সৌদি আরবে চাকরি করছেন অলিউল্লাহ। প্রবাসের আয় দিয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী মাজেদা বেগমের নামে অর্ধকোটি টাকা মূল্যের জমি কিনেছেন তিনি। গত তিন মাস আগে দেশে ফেরার পর মাজেদার সন্দেহ হয় তার স্বামী সৌদিতে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এই সন্দেহ থেকেই কলহের সৃষ্টি। শেষ পর্যন্ত ঘুমন্ত স্বামীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে স্ত্রী মাজেদা। এ হত্যার পেছনেও ছিল তার পরকীয়া।
পরকীয়ার কারণে এমন হত্যাকাণ্ড দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কিছুতেই। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে পারিবারিক বন্ধন জোরদার করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর পাশাপাশি চাহিদা এবং প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান কমাতে হবে। সমাজে বিজ্ঞজন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করেন তারা।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, পরকীয়ার কারণে খুন বেড়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বহুগামিতা, ভালোবাসার বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, ধর্মীয় মূল্যবোধ না থাকা। আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাটি দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর ওপর বেশি জোর দিতে হবে। আর সে সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধন অটুট রাখতে হবে। স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে প্রচুর সময় দিতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানদের প্রতিও তাদের যত্নবান হতে হবে। একটা বিষয় খুব পরিষ্কার, স্বামী বা স্ত্রী যদি পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে যায় সেক্ষেত্রে ভালোবাসার মাধ্যমেই তাদের ফেরাতে হবে। তাছাড়া কিছুতে এ ধরনের সম্পর্কের কারণে মানুষের খুন হওয়ার ঘটনা বাড়তেই থাকবে। মানুষ আরো হিংস্র হয়ে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন. পরকীয়া এক ধরনের সম্পর্ক। কিন্তু এটা আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধের জায়গা থেকে গ্রহণ করতে পারি না। আইনের দিক থেকে জোরালো কোনো বাধা না থাকলেও সামাজিকভাবে এর বড় একটা বাধা রয়েছে। একই সমাজে চলতে গেলে কারো প্রতি ভালো লাগা বা মন্দলাগা তৈরি হতেই পারে। তবে যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে অন্য কোনো সম্পর্ক চলে আসে তাহলে সেটা নিয়ে ঝামেলায় না গিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত। একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর মধ্যে বিশেষ করে স্বামী- স্ত্রীর সম্পর্কে শেয়ারিংয়ের জায়গাটি একেবারেই নেই। যে কারণে এত দ্বন্দ্ব। এত নৃশংসতা। যতদিন পর্যন্ত এ সমস্যা দূর করতে না পারবে ততদিন এটা চলতে থাকবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শাহরিয়ার আফরিন বলেন, আমরা আধুনিক হয়ে যাচ্ছি। সবাই স্বাধীন। কোনো বাধা ছাড়াই আমরা ঘোরাফেরা করতে পারি। যখন যা খুশি করতে পারি। এসব তো রয়েছেই, তার সঙ্গে নতুন সংযোজন হিসেবে আছে সোশ্যাল মিডিয়া। খুব সহজেই আমরা একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছি। একটি সম্পর্ক তৈরি করে ফেলছি। ভাবছি না সেটা সঠিক না ভুল। আর নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় তো ঘটছেই। বড় কথা আমরা আমাদের সংস্কৃতি থেকেই সরে যাচ্ছি দিন দিন। আর এসব কারণেই পরকীয়া বাড়ছে। বাড়ছে নৃশংসতা। এই নৃশংসতা থেকে নিজেদের রেহাই পেতে হলে সবার আগে মূল্যবোধ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সংসারে বন্ধনের জায়গাটি অটুট রাখতে হবে।

অনিরাপদ ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ ট্রেনের ছাদে ১ বছরে ৪২ খুন by মতিউল আলম

ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেনে ছিনতাইকারীদের দাপট বেড়েছে। একের পর এক নিরীহ যাত্রীদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে তারা। নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হচ্ছে ট্রেন যাত্রীদের। ট্রেনের ছাদে গত ২০১৭ সালে ছিনতাইকারীর হাতে ৪২ জন খুন হয়েছে। এসব নির্মম হত্যাকাণ্ডে ট্রেনের যাত্রীরা অসহায় ও আতঙ্কিত।
ব্যবসায়ী খোকন খান (৩৮)। নেভী সিগারেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। দুই মাস আগে চাকরি ছেড়ে সিগারেট বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। ২৩শে মার্চ দিনভর গাজীপুরের টঙ্গী চেরাগআলী মার্কেট এলাকায় সিগারেট সাল্পাই দেন। পরে বাড়ির আকুলতায় রাতের ট্রেনে চেপেই রওনা হন। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কি বুঝতে পেরেছিলেন, জীবনের শেষ ট্রেনে চেপে বসেছেন তিনি। ট্রেনটি গফরগাঁওয়ের চারিপাড়া রেলসেতু সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছলে সর্বস্ব লুটে নিয়ে তাকে ট্রেন থেকে ফেলে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। নিহত খোকন গফরগাঁওয়ের পাঁচবাগ ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামের আবদুস ছালামের ছেলে।
১লা এপ্রিল ঢাকাগামী আন্তঃনগর তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে ছিনতাইকারীরা গণছিনতাই শেষে ১৬ বছর বয়সের এক কিশোরকে হত্যা করে। ট্রেনটি গফরগাঁও-ময়মনসিংহের মধ্যবর্তী আউলিয়া নগর রেলস্টেশন অতিক্রমকালে ট্রেনের ছাদ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়তে দেখে যাত্রীরা হৈ চৈ শুরু করে। পরে দায়িত্বরত জিআরপি পুলিশ ছাদে উঠে অজ্ঞাত এক কিশোরের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে গফরগাঁও জিআরপি পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেয়। এ সময় জিআরপি পুলিশ ছাদে ভ্রমণরত সন্দেহ জনক ফুলপুর গোদারিয়া গ্রামের লালমিয়ার ছেলে বাবুল (১৮), গৌরীপুর থানার নয়াপাড়া গ্রামের আমিনুল ইসলামের ছেলে ফরিদুল ইসলাম (২৫), শেরপুর সদরের রামকৃষ্ণপুর এলাকার আব্দুল করিমের ছেলে ফারুক মিয়া (২৫) ও নেত্রকোনা জেলার বাহাম গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে কাইজুল মিয়াকে (২০) আটক করে। এ রেলপথে এর আগেও অসংখ্য যাত্রীর প্রাণ গেছে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের হাতে। সামান্য কিছু টাকা আর মুঠোফোনের জন্য যাত্রীদের হত্যা করছে ছিনতাইকারীরা। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথটি ছিনতাইকারীদের নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে মাত্র তিন মাসে এ পথে ৩৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। গত বছরের ২৯শে ডিসেম্বর ধলা ও বালিপাড়া এলাকায় দুই জনকে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। একই বছরের ১০ই আগস্ট গফরগাঁওয়ের রৌহা নামক স্থানে ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে অজ্ঞাত যুবককে ট্রেন থেকে ফেলে দিলে যুবক মারা যান। একই বছরের ১১ই সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা জামালপুর, বাহাদুরাবাদ ঘাটগামী সেভেন আপ ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবককে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। এ ছাড়াও ট্রেনের ছাদে ছিনতাই শেষে অনেক যাত্রী ফেলে দেয়ার ঘটনায় কেউ নিহত হচ্ছেন কেউবা আবার চিরতরে পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আর নিহত হওয়া অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের জামাকাপড় রেলওয়ে ডোম ঘরের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। তবে, বছর দুয়েকের মধ্যে স্বজনদের সন্ধান না পাওয়া গেলে ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবেই থেকে যায়। চলন্ত ট্রেনে আওয়াজ থাকায় কেউ কিছুই টের পাবে না-এ সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে পেশাদার চক্রটি। এভাবেই প্রাণ হারাচ্ছেন রাতে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণকারী যাত্রীরা। তবু কোনো প্রতিকার খুঁজে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। আবার দুয়েকটা ঘটনায় হাতেনাতে ধরাও পড়ে ছিনতাইকারীরা। কিন্তু পর্যাপ্ত সাক্ষী আর আলামতের অভাবে সহজেই জামিন পেয়ে যায় অপরাধীরা।
শুক্রবার বিকালে গফরগাঁওয়ে কমিউটার ট্রেনে চলন্ত অবস্থায় গণ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এ সময় যাত্রীরা রায়হান নামে এক ছিনতাইকারীকে আটক করে জিআরপি পুলিশে সোর্পদ করে। আটক ছিনতাইকারীকে ছিনিয়ে নিতে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী দল গফরগাঁও জিআরপি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালায়। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে চলে এ তাণ্ডব। কিন্তু জিআপরপি পুলিশ ভেতর থেকে দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়ায় আটক ছিনতাইকারীকে ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। ৬ই এপ্রিল বিকাল সোয়া ৫টার দিকে গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে এ ঘটনা ঘটে।
গফরগাঁও জিআরপি ফাঁড়ির ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম খান দাবি করে বলেন, স্থানীয় কিছু ছেলে-পেলে আটক ছিনতাকারীকে ছাড়িয়ে নিতে ফাঁড়ির দরজার ধাক্কাধাক্কি করেছে। তবে, ছিনতাইকারীকে ময়মনসিংহ জিআরপি থানায় পাঠানো হয়েছে। ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ইব্রাহীম (৩২) ও গাজীপুর শহরের দক্ষিণ চত্বর এলাকার নূরুল হক (৩৫) জানায়, বালিপাড়া স্টেশন অতিক্রমকালে ছিনতাইকারীদল ছিনতাই শুরু করে। এ সময় বাধা দেয়ায় চেষ্টা করলে ছিনতাইকারীরা যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে মারধর করে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিতে চায়। সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা, মোবাইলসহ জিনিসপত্রসহ সর্বস্ব ছিনতাইকারীদের হাতে তুলে দিয়ে যাত্রীরা রক্ষা পায়। গত সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে চলাচলকারী বলাকা ট্রেনটি ময়মনসিংহ স্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ট্রেনটি ফাতেমানগর পার হওয়ার সময় ছাদে ভ্রমণরত যাত্রী গফরগাঁওয়ের রৌহা গ্রামের বাসিন্দা হানু মিয়া ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। এ সময় বাধা দেয়ায় ছিনতাইকারীরা তাকে মারধর করে। পরে ট্রেনটি গফরগাঁও স্টেশনে দাঁড়ালে ছিনতাইকারীরা দৌড়ে পালানোর সময় আক্রান্ত হানু মিয়া চিৎকারে জিআরপি ফাঁড়ি পুলিশ জনি মিয়া, অনন্ত ও আনারুল নামের তিন ছিনতাইকারীকে আটক করে। এ নিয়ে গত ১৫ দিনে এ রেলপথে অন্তত পাঁচটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল মান্নান বলেন, ট্রেন যাত্রীদের হত্যার ঘটনায় তদন্ত করছে রেলওয়ে পুলিশ। পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারে কাজ চলছে।

মোবাইল ফোনের অপব্যবহার শুরু মিথ্যা দিয়ে by হাফিজ মুহাম্মদ

দিশারী পরিবহন। চিড়িয়াখানা থেকে কদমতলী রুটের বাস। মিরপুর-১ নম্বর থেকে এক তরুণের যাত্রা। গন্তব্য শাহবাগ। বাসটি শ্যামলী যেতেই তরুণের মোবাইল ফোনে রিং বেজে ওঠে। ফোন রিসিভ করেই ওই তরুণ বলে উঠেন আমি ফার্মগেট। পাশের যাত্রী তার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। এরপরে আবার স্বাভাবিক সবাই। কিছুক্ষণ পর আবার রিং। ততক্ষণে বাসটি খামারবাড়ি সিগন্যালে আটকে আছে। এবার ছেলেটি মোবাইল রিসিভ করে বলে আমি বাংলামোটর। আর মাত্র পাঁচ মিনিট লাগবে আসতে। একটু অপেক্ষা করো। কিন্তু বাসটি ওই একই সিগন্যালে পার করলো আরো ৩৫ মিনিট। এবার তার ফোন  বেজে উঠলেও রিসিভ করেননি। পরপর দুই তিনবার রিং হওয়ার পরে ফোন ধরলেন। আর বললেন, ‘বাবু সরি, আমি বাংলামোটর জ্যামে আটকে আছি। কি করবো বলো’। তখনো তিনি খামারবাড়ি জ্যামে আটকা। পাশের যাত্রী কৌতূহল মনে জানতে চাইলো, ভাই আপনি তো খামারবাড়ি। কেন বাংলামোটর বলছেন বারবার। তরুণের উত্তর- ভাই কি করবো বলেন, আমার গার্লফ্রেন্ড এক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছে। আর আমি জ্যামে আটকে আছি। ওর মন তো রক্ষা করতে পারবো না। আপনি কি বারবার মিথ্যা বলছেন না জানতে চাইলে তরুণ বলেন, মিথ্যা আর কি? আমি তো যাচ্ছি। কিন্তু পথ একটু বাড়িয়ে বলছি এই আর কি। এটা কি মিথ্যা বলা হচ্ছে। আমি তার মন রক্ষা করতে এটা বলেছি।
মোবাইল ফোন কিংবা মুঠোফোন। যন্ত্রের সহজলভ্যতায় মানুষ দিব্যি কাছাকাছি বাস করে। এক নিমিষেই তারা হয়ে যায় পরস্পরের। কিন্তু মোবাইল ফোন মানুষকে কাছে নিয়েছে ঠিক কিন্তু শিখাচ্ছে অপব্যবহারও। অনেকেই জানে না কিংবা জানতে চায় না সে কীভাবে মিথ্যার অনুশীলন করছেন মোবাইলের মাধ্যমে। জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। ভেঙে যাচ্ছে সুখের সংসার কিংবা শখের চাকরি। চার পাশে হরহামেশাই বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় অনেককে। দেখা যায় ওই ব্যক্তি তার মোবাইলের বিপরীতের পাশের মানুষকে মিথ্যা কথার ফুলঝুরি ছাড়ছে। তার সম্পর্কে চাপাবাজি করতে থাকে। তার যা নেই তাই বলে বেড়ায়। কারণ তার বিপরীত পাশের লোক তো তাকে দেখতে পাচ্ছেন না। আবার বিত্তবান থেকে নিম্ন শ্রেণির সন্তানরা বিভিন্ন অপকর্মে জড়ানোর প্রাথমিক দাপটটা শুরু করেন মোবাইল ফোনে মিথ্যা কথা বলার মাধ্যমেই।
মো. জাবের হোসেন। পাওনাদারদের তাগাদায় মাথা গুঁজে থাকেন প্রায়। তার ফোন বন্ধও রাখেন অনেক সময়। ছুটির দিনে মোবাইল ফোন খোলা রাখলেও ধরিয়ে দেন সন্তানদের কিংবা বউকে। তাকে কেউ ফোনে পায় না। এর বাইরে মাঝেমধ্যে ফোন যখন ওপেন করেন তখনই পাওনাদারদের কল। হুট করে তিনি তার সাত বছরের মেয়েকে ফোন ধরিয়ে বলতে বলেন, বাবা ভুল করে ফোন বাসায় রেখে গেছে। কখন বাসায় ফিরবে তাও বলতে পারছি না। ফোন কেন বন্ধ থাকে এমন কিছু জানতে চাইলে ছোট্ট এ মেয়েটি আগে থেকেই বাবার শিখানো মিথ্যা কথা বলে। বাবার কাছে টাকা নেই এ কারণে মোবাইলেও টাকা থাকে না। এজন্য আপনাদের ফোনও দিতে পারেন না। ফোন কল কেটে দেয়ার পরে জাবেদ তার মেয়েকে বলেন, ‘মা তুই আমাকে এবার বাঁচাইলি। এ লোক কয়েকদিনে আর ফোন দিবে না।’
শ্রাবণী রায় শুয়ে শুয়ে টিভিতে সিরিয়াল দেখছেন। কোনোভাবেই মনোযোগ বিনষ্ট করা যাবে না। হঠাৎ তার স্বামীর ফোন। মোবাইল রিং বেজে উঠতেই বাচ্চা ছেলেকে ফোন ধরিয়ে দিলেন। আর ‘তাকে বলতে বললো তোর আব্বুকে বল আম্মু ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ করে প্রেসার বেড়ে গেছে। খুব মাথাব্যথা করছে’। শ্রাবণী নিজেই সন্তানকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মিথ্যা শিক্ষা দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি চিন্তাও করছেন না এর ভয়াবহতা। পরবর্তীতে যখন বড় হয়ে এ সন্তান তার মা-বাবা এবং পাড়াপড়শির সঙ্গে মিথ্যা বলে তখনই বলে বেড়ান ছেলেটি বখে গেছে। কিন্তু এর চারা তো সেদিন তিনিই বপন করেছিলেন।
সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, মোবাইল ফোন মানুষের যোগাযোগ মাধ্যমে বিপ্লব ঘটিয়েছে। সময়কে সহজ করেছে। তবে এটার অপব্যবহারও হচ্ছে অহরহ। যেমন সামাজিক অবক্ষয়ে মোবাইল ফোনের একটা ভূমিকা রয়েছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিলে সাধারণত এমনটা ঘটতো না। এর পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষারও একটা বড় অভাব দেখা যায় তাদের মধ্যে।
মোবাইল ফোনের অপব্যবহার এবং এটাকে ভিত্তি করে মিথ্যা শিখানো হচ্ছে এ বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাসুদা এম. রশিদ চৌধুরী। তিনি বলেন, মোবাইল ফোন পৃথিবীতে একটা আধুনিক প্রযুক্তি হিসেবে এসেছে। এর ব্যবহার যোগাযোগ অনেক সহজ করে দিয়েছে। সঙ্গে আমাকে নিরাপত্তাও দিচ্ছে। আমি কোথাও বিপদে পড়লে তা দ্রুত জানাতে পারছি মোবাইলের মাধ্যমে। কিন্তু আধুনিক এ যন্ত্রটির মারাত্মক অপব্যবহার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কীভাবে এটাকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে তার অনুশীলন করা হচ্ছে। সব থেকে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। কেননা, বাচ্চারা আমাদের বড়দের কাছ থেকেই শিখে। আমরা বড়রাই এদের দিন দিন নষ্ট করে দিচ্ছি। আমরা তাদের হাতে একটা ডিভাইস তুলে দিচ্ছি। কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জানাচ্ছি না। আগেরদিনে যেমন বাবা-মা সন্তানদের সৎ কথা বলা শিখাতো, সঠিক সময় বাড়িতে আসার নির্দেশ দিতো, সুস্থভাবে চলা শিখাতো এবং মুরব্বিদের মান্য করা শিখাতো। এখন বড়রাও শিখে না, নিজেরাও মানে না।
তিনি আরো বলেন, এখন বাবা-মা উদাসীন। বাচ্চারাই দেখছে তার পিতা-মাতা ওটাকে কত অন্যায়ভাবে ব্যবহার করছে। তারা ছোট ছোট সন্তানদের সামনেই মোবাইল ফোনে মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছে। আগেকার বাবা-মা কোনো গোপন কথা আলাপ করলে দূরে সরে গিয়ে কিংবা অন্য ঘরে গিয়ে আলাপ করতো। আর এখন তারা সবকিছু ওপেন বলছে। মোবাইলে সন্তানদের সামনেই হর-হামেশা আলাপ করছে। এর ফলে তারা মিথ্যা তো শিখছেই সঙ্গে একটা বিভ্রান্তিকর মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে। বর্তমানে বাবা-মা সন্তানদের সময় না দেয়াতে তারাও বিভিন্নভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে। তারা মোবাইল ফোনে কি বলছে, কি দেখছে, কার সঙ্গে গোপনালাপ করছে সেসব বিষয়ে একেবারেই উদাসীন। এখন বাচ্চাদের হাতেও একটা মোবাইল ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে আর তাতে তারা ফেসবুকসহ একাধিক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে নোংরা এবং মিথ্যা কথা শিখছে। যা ভাবাও যায় না।
হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আল্লামা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, মোবাইল ফোনে মিথ্যা বলা এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ব্যক্তি বলতেও পারছে না যে, সে কীভাবে অহরহ মিথ্যা বলছে। আধুনিক প্রযুক্তির সবকিছু হচ্ছে বিজ্ঞান। আর ইসলাম এটাকে খুব সহজভাবে নেয় যদি এটা অবৈধ, হারাম এবং পাপের কিছু না থাকে।
মোবাইল ফোন ব্যবহার আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এটাকে ব্যবহার করে মিথ্যা কথায় লিপ্ত হয়ে যেন একটা কবিরা গুনাহ হয়। তাহলে এটা ব্যবহার হারাম। এছাড়াও মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে কেউ যদি চোখের গুনাহ, মুখের গুনাহ এবং অশ্লীলতা করে তাহলে এটা হারাম। বর্তমানে মোবাইলের মাধ্যমে বড়রা ছোটদের, বাবা তার সন্তানদের মিথ্যা শিক্ষা দিচ্ছে। আবার সন্তানরা তাদের মা-বাবার সঙ্গেও একইভাবে মিথ্যা বলছে। এ কারণে তারা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধে এবং খারাপ কাজে। যে ব্যাপারে অভিভাবকরা খেয়াল রাখছে না। তিনি শিশু ও শিক্ষার্থীদের মোবাইলের অপব্যবহার সম্পর্কে হেফাজতে ইসলামের আমীরের একটি কথা তুলে ধরে বলেন, মোবাইলিজমের মাধ্যমে মানুষকে চরমভাবে মিথ্যা ও খারাপ কাজ  শেখানো হচ্ছে। বিজ্ঞান আধুনিক যন্ত্র আমাদের উপকারের জন্য দিলেও আমরা তার মাধ্যমে যত রকম খারাপ কাজ করে যাচ্ছি। আর এসবের জন্য আমাদের অভিভাবকরাই সম্পূর্ণরূপে দায়ী। তারা সন্তান এবং শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় এবং নৈতিক শিক্ষা না দিলে সামনে আরো ভয়ঙ্কর অবস্থা দেখা দেবে।

আমিনুল হত্যায় একজনের মৃত্যুদণ্ড

পোশাক শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যা মামলায় মোস্তাফিজুর রহমান (২৩) নামে এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার কাদিরপাড়া গ্রামের শমসের কারিগরের ছেলে। গতকাল টাঙ্গাইলের বিশেষ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ওয়াহিদুজ্জামান শিকদার এ দণ্ডাদেশ দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত মোস্তাফিজ পলাতক রয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতেই আদালত এই আদেশ দেন।
নিহত আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) সংগঠক ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের নেতা ছিলেন। তার বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার হিজলহাটি গ্রামে। তার পিতার নাম মফিজ উদ্দিন আকন্দ।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, ২০১২ সালের ৪ঠা এপ্রিল আশুলিয়ার অফিস থেকে বোরকা পরিহিত এক নারী ও মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তি আমিনুলকে ডেকে নিয়ে যায়। রাতে সে বাড়ি ফিরে না এলে আমিনুলের স্ত্রী ও কন্যা ৬ই এপ্রিল আশুলিা থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন। এদিকে ৫ই এপ্রিল সকালে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ব্রাহ্মণশাসন মহিলা কলেজের সামনে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের পাশ থেকে ঘাটাইল থানার পুলিশ অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে। পরে ঘাটাইল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহীন মিয়া থানায় মামলা করেন। নিহতের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। বিভিন্ন পত্রিকায় লাশ উদ্ধার সংক্রান্ত সংবাদ পড়ে আমিনুলের স্ত্রী হোসনে আরা, মেয়ে ফাহিমা ও ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম ঘাটাইল থানায় এসে থানায় রক্ষিত ছবি দেখে লাশ শনাক্ত করেন।
পরে রফিকুল লাশ উত্তোলনের জন্য আদালতে আবেদন করেন। ৯ই এপ্রিল টাঙ্গাইল কবরস্থান থেকে লাশ উত্তোলন করে আমিনুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলার হিজলহাটি গ্রামে নিয়ে পুনরায় দাফন করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে ঘাটাইল থানায় মামলা করেন।
ঘাটাইল থানার এসআই আবুল বাশার মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন, পরে টাঙ্গাইল গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির ও উপপরিদর্শক দুলাল হোসেন মামলাটি তদন্ত করেন। সর্বশেষ ঢাকা মেট্রোপলিটনের কোতোয়ালি ইউনিটের সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবির তদন্তের দায়িত্ব পান। দির্ঘদিন তদন্ত শেষে তিনি মোস্তাফিজুর রহমানকে একমাত্র আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
এ ব্যাপারে বিশেষ জেলা ও দায়েরা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মুলতান উদ্দিন বলেন, এটি একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা। নিহত আমিনুল ইসলাম আশুলিয়ার শ্রমিদের পক্ষে কাজ করতেন। যাতে তিনি শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করতে না পারেন- এজন্য তাকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়। এই হত্যা মামলায় ২৫ জন ব্যক্তি সাক্ষী দেয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে গতকাল আদালত এই হত্যা মামলায় ফাঁসি দেন। এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তবে রাষ্ট্রকর্তৃক নিয়োজিত আসামি পক্ষের আইনজীবী গোলাম মোস্তফা মিয়া বলেন, এ মামলায় সাক্ষী দ্বারা আসামির বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অপরাধ প্রমানিত হয় নাই। আদালত ভাবাবেগের বশবর্তী হইয়া আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আশা করি উচ্চ আদালতে আসামি খালাস পাবেন।

হঠাৎ ডায়রিয়ার প্রকোপ: আইসিডিডিআর,বি’তে তিন বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালের সিটে ৯ বছরের শিশু আবু বকর সিদ্দিকের পাশে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন মা রুবিনা বেগম। শিশুটি সাত-আট ঘণ্টা পাতলা পায়খানা করতে করতে চোখ-মুখ ছোট হয়ে এসেছে। একপর্যায়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি খারাপ দেখে গতকাল দুপুরের দিকে কেরানীগঞ্জ কদমতলী থেকে দ্রুত আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে চলে আসেন তার স্বজনরা। হাসপাতালে ভর্তির পর দেয়া হয় স্যালাইন। এতে শিশুটির শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে একটু উন্নত হচ্ছিল বলে তার মা জানিয়েছেন। আরেক রোগী মিয়া চাঁন বেপারি। বয়স ৫০। শরীয়তপুর থেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শুধু শিশু আবু বকর বা বয়স্ক চাঁন বেপারী নন, ডায়রিয়া রোগীর আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র’ বাংলাদেশে (আইসিডিডিআর’বি) প্রতিদিনই শত শত রোগী আসছে। অন্যান্য হাসপাতালেও ভিড় বাড়ছে। এতে হিমশিম খাচ্ছেন আইসিডিডিআর’বি কর্তৃপক্ষ। প্রতি ঘণ্টায় আসছে ৩১ জন রোগী। হাসপাতালটির তথ্য মতে, গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত (১৬ ঘণ্টায়) ভর্তি হয়েছে ৪৯৭ জন রোগী। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ রোগী বয়স্ক এবং ৩০ শতাংশ শিশু। হাসপাতালের তথ্য মতে, ৭ই এপ্রিল ভর্তি হয়েছে ৭৩৫ জন, ৬ই এপ্রিল ৭৮৮ জন, ৫ই এপ্রিল ৬৬২ জন, ৪ঠা এপ্রিল ৬৪২ জন, ৩রা এপ্রিল ৭৫২ জন এবং ২রা এপ্রিল ৬২৯ ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী আইসিডিডিআর‘বিতে ভর্তি হয়। হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিন রোগী বাড়ছেই। গড়ে দৈনিক যে রোগী আসছে, তা গত তিন বছরের মধ্যে দেখা যায়নি। বেশি রোগী আসছে যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, দক্ষিণ খান, বাড্ডা, রামপুরা, লালবাগ, মিরপুর, মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে। সেসব এলাকায় ওয়াসার সুয়ারেজের নির্মাণ কাজ হচ্ছে; ওইসব এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়া রোগীর আক্রান্তের সংখ্যা ৯৮০ জন। আর সাত দিনের ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৩৭৬২ জন। এর আগের সপ্তাহে এই সংখ্যা ছিল ২৯৮৭ জন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ওয়াসার সুয়ারেজের কাজের কারণে পাইপ দিয়ে অপরিষ্কার পানি ঢুকে। ফলে দূষিত পানি খেয়ে ডায়রিয়া আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। তাছাড়া বেড়েছে গরমের তীব্রতা। আর এ গরমের সঙ্গে বাড়ছে রাজধানীতে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। আইসিডিডিআর’বির তথ্যানুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে ৪শ’ থেকে সোয়া ৪শ’ ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। তবে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে এ সংখ্যা ছাড়িয়েছে। মার্চের শুরুতে আক্রান্ত শিশু রোগী বেশি ছিল এবং সবাই ভাইরাল ডায়রিয়াতে আক্রান্ত। ডায়রিয়া পানিবাহিত রোগ। বর্তমানে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময় বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। তারা আরও বলেন, তীব্র গরমে ঘন ঘন পিপাসা পাওয়ায় রাস্তাঘাটে আইসক্রিম বা বিভিন্ন ধরনের শরবত পান করা হয়। এসব খাদ্যে যে খাবার পানি বা বরফ ব্যবহৃত হয় তা বিশুদ্ধ না হলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া বেশি গরমে বিভিন্ন ধরনের নষ্ট খাবার খেলেও ডায়রিয়া হয়। প্রতি বছর মার্চ থেকে মে মাসে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. আয়েশা আকতার মানবজমিনকে জানান, বিভিন্ন জায়গায় ওয়াসার সুয়ারেজের কাজের কারণে পাইপ দিয়ে দূষিত পানি ঢোকার কারণে ওইসব এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এটি পানিবাহিত রোগ। মার্চ, এপ্রিল ও মে মাস পর্যন্ত ডায়রিয়ার রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তারপর কমে আসে। তিনি আরো বলেন, আমাদের বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। রাস্তার খাবার ও পানির শরবত গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিক সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। চিকিৎসকরা জানান, মূলত বিশুদ্ধ পানির অভাব বা ভালোভাবে হাত না ধৌত করে খাবার গ্রহণই ডায়রিয়ার মূল কারণ। ডায়রিয়া থেকে মুক্ত থাকতে বিশুদ্ধ পানি পান ও সবাইকে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করে খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেন তারা। একই সঙ্গে কেউ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে তাকে স্যালাইন খাওয়ান। বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। এই বিষয়ে ডায়রিয়ার আইসিডিডিআর’বির বিশেষজ্ঞ এবং সংস্থাটির হাসপাতালের প্রধান ডা. আজহারুল ইসলাম খান মানবজমিনকে বলেন, রাজধানীতে ডায়রিয়া বেশি। ঢাকার বাইরে কম। এটি পানিবাহিত রোগ। মূলত পানিবাহিত জীবাণু থেকেই ডায়রিয়া ও কলেরা দেখা দেয়। রাস্তার খোঁড়াখুঁড়িতে কোথায় পাইপ দিয়ে দূষিত পানি ঢুকে যেতে পারে। আর এটা থেকে ওইসব এলাকায় এই রোগ হলেও হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেখার পরামর্শ দেন তিনি। নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত পানি পানের ব্যাপারে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাস্তা-ঘাটে পানি শরবত ও খাবার খাওয়ার গ্রহণের আগে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বিয়ানীবাজারে সালিশে ‘সমাজচ্যুত’ পরিবার: শিক্ষার্থীদের স্কুল, মক্তবে যেতে বাধা by মিলাদ জয়নুল

গ্রাম্য মাতব্বররা সমাজচ্যুত করেছে একটি পরিবারকে। ওই পরিবারের দুই শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকেও বের করে দেয়া হয়েছে। তাদের স্কুল ও মক্তবে যেতে নিষেধ করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য। বিয়ানীবাজারের দুইবাগ ইউনিয়নের পাঞ্জিপুরী গ্রামের এ ঘটনায় উপজেলাজুড়ে তোলপাড় চলছে। প্রশাসনের একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। দুবাগ ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সালাম জানান, ‘জমিজমা নিয়ে বিরোধের জের ধরে পাঞ্জিপুরী গ্রামের মুরব্বিরা একই গ্রামের তোতা মিয়ার পরিবারের ওপর নাখোশ হয়ে ওঠেন। গ্রামবাসীর সিদ্ধান্তে স্থানীয় ইউপি সদস্য মউর উদ্দিন ওই পরিবারের কোনো সদস্য যাতে স্কুল-মক্তবে আসতে না পারে, সে কথা জানিয়ে আসেন।’ চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম জানান, ‘শুক্রবার তিনি গ্রামের লোকজনকে ডেকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ওই পরিবারের সদস্যরা যাতে স্কুল-মক্তবে যেতে পারে, সে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’ সমাজচ্যুত পরিবারের কর্তা তোতা মিয়া অভিযোগ করেন, ‘তিনি ও তার পরিবারের লোকজন পার্শ্ববর্তী ঘরের দুদু মিয়া ও সাহাব উদ্দিন সাধুর পরিবার কর্তৃক দীর্ঘ দিন থেকে শারিরিক ও মানষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। সম্প্রতি জমিজমা নিয়ে বিরোধের জের ধরে তারা তোতা মিয়ার ঘরে অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা তার স্ত্রীকেও মারধর করে। গত সোমবার রাতে আবারো তোতা মিয়ার ঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। তখন তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পুলিশ মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিবদর্শন করে।’ তোতা মিয়া জানান, ‘তিনি থানায় কেন অভিযোগ করলেন এবং এলাকায় কেন পুলিশ গেল-এ অভিযোগে বুধবার রাতে তোতা মিয়ার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেন মাতবররা। গভীর রাতে গ্রামবাসীর সিদ্ধান্তের এ কথা ইউপি সদস্য মউর উদ্দিন গিয়ে তাদের জানান এবং মসজিদ, মক্তব ও স্কুলে যেতে তাদের নিষেধ প্রদান করেন।’
তোতা মিয়া বলেন, ‘বৃহস্পতিবার আমি আমার নাতি-নাতনিদের স্কুলে পাঠালে সেখান থেকে তাদের বের করে দেয়া হয়। আমার নাতনি পাঞ্জিপুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আফরিন আক্তার মাহিয়া স্কুল থেকে কেঁদে কেঁদে বাড়িতে আসে। এ সময় সে জানায় তাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এর কিছুৃক্ষণ পরে কুশিয়ারা দ্বিপক্ষীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্র আমার নাতি মিজানুর রহমান বাড়িতে চলে আসে। সেও জানায়, স্কুল কমিটির লোকজন তাকেও স্কুলে না আসার জন্য বলে দিয়েছে।’ অবশ্য এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা মো. কর্মকর্তা মাছুম মিয়া বলেন, আমি খোঁজ নিয়ে এ সংক্রান্ত অভিযোগের কোনো সত্যতা পাইনি। তবে কুশিয়ারা দ্বিপক্ষীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে ১০ দিন স্কুলে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান জানান, আমি এ ধরনের সংবাদ পেয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাকে পাইনি। এদিকে ইউপি সদস্য মউরউদ্দিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি তোতা মিয়ার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি নিজে তোতা মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তা জানিয়ে দিয়ে এসেছি। সমাজচ্যুত করা আর বাচ্চাদের স্কুল-মসজিদে যাতায়াতে বাধা দান বেআইনি তা জানেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মউরউদ্দিন বলেন, আমি আইনের বই পড়েছি। আইন মোতাবেক আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই প্রধানমন্ত্রী নিজে এলেও আমাদের এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে না। বিয়ানীবাজার থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাহিদুল হক জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

বাংলাদেশ ও দরিদ্র দেশগুলোতে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করছে যুক্তরাষ্ট্র

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক লড়াই ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েকদিন আগে চীনা বাণিজ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক কড়াকড়ির জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয় চীন। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে চীনা পণ্যের ওপর আরো কড়াকড়ি শুল্ক আরোপ করার হুমকি দিচ্ছেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, এতে তাদের বাণিজ্য নিম্নতম পর্যায়ে নেমে যাবে। ভোক্তাকে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে। ন্যাশনাল রিটেইলার ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ শাই বলেছেন, ঢিলটি দিলে পাটকেলটি খেতে হয় বা পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বসবাসকারী মার্কিনিদের নিত্যদিনের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে। অনলাইন কুয়ার্টজ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, এর ফলে ধারণা করে নেয়া যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এই বাণিজ্যিক অচলাবস্থায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন খুচরা বিক্রেতারা। তবে এটা বিস্ময়ের বিষয় নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি শুল্ক বসাতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে এশিয়ার দরিদ্র প্রতিবেশী দেশগুলোতেও তা আরোপিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ পোশাক ও জুতা রপ্তানি করে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো দেশ। এগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে বৈষম্যমূলকভাবে উচ্চ হারে কর বসানো আছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিশন থেকে পাওয়া ডাটা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে পিউ রিসার্চ সেন্টার। তাতে দেখা গেছে, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম সহ এমন আরো দেশ উচ্চ হারে আমদানি শুল্কের মুখে। কারণ, তারা পোশাক ও জুতাশিল্পে পর্যাপ্ত পরিমাণ বাণিজ্য করে। এসব বাণিজ্যের বেশির ভাগই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে বাংলাদেশ এখন তার তৈরি পোশাকের শতকরা ৯৭ ভাগেরও বেশি রপ্তানি করে বাংলাদেশ। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র যেসব জিনিস বিপুল পরিমাণে আমদানি করে সেক্ষেত্রে যথেষ্ট কম শুল্ক আরোপ করা থাকে। কিন্তু পিউ রিসার্চ গবেষণায় এর আগেই দেখিয়েছে, এক্ষেত্রে প্রধান ব্যতিক্রম হলো পোশাক খাত। পরিস্থিতি এমন যে, ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির পরেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব শুল্ক আসে সোয়েটার আমদানি থেকে। পিউ রিচার্স বলেছে, বাংলাদেশ থেকে কোনো পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা হলে প্রায় সব পণ্যেই শুল্ক দিতে হয়। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মোট যে পরিমাণ অর্থের শিপমেন্ট যায়, সেই শুল্ক মোট অর্থের শতকরা ১৫.২ ভাগের সমান। এটা হলো ২৩২টি দেশ, অঞ্চল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশনের আওতাভুক্ত ব্যবস্থায় এই গড় হার হলো সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৫৭০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগ হলো পোশাক, জুতা, হেডগিয়ার ও সংশ্লিষ্ট পণ্য। উচ্চ হারে শুল্কের কারণ হলো ক্লাসিক। অনেকেই বলতে পারেন সেকেলে- সংরক্ষণবাদিতা। ২০১৩ সালে ওয়াশিংটন পোস্ট একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র শিল্পে শেয়ারের ক্ষীণ অবক্ষয় হয়েছে। এক সময় তা ছিল ছোট পরিসরের প্রস্তুতকারক। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে তাদের রয়েছে শক্তিশালী অবস্থান, যারা তাদের বাণিজ্যিক চুক্তির জন্য লড়াই করে। ওয়াশিংটন পোস্টকে সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট-এর কিম এলিয়ট বলেন, সমন্বিত পরিকল্পনায় এটি হলো একটি সমস্যার ক্লাসিক কাহিনী। ওই সব খাতের প্রতিনিধিরা খুব কড়া দরকষাকষি করছেন। শুল্কহার কম হলে আপনি অথবা আমি কিছুটা সুবিধা পেতে পারি। তবে এর ওপরে আমরা ভোট দিতে যাচ্ছি না। এটা স্বার্থের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ নয়।
এসব নীতি কোনো কাজে এসেছে বলে মনে হয় না। যদিও এসে থাকে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রে জুতা বা পোশাক তৈরির কাজ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা যখন বিদেশি তৈরি একটি স্নিকারস বা জিন্স কিনতে যান তখন তারা প্রতিবারই বুঝতে পারেন বিষয়টি। বাংলাদেশের মতো দেশের কারখানাগুলো অতীব চাপের মুখে। তাদেরকে মূল্য অনেক কম রাখতে এমন চাপ দেয়া হয়, যাতে খুচরা বিক্রেতারা সস্তায় ক্রেতার হাতে পোশাক তুলে দিতে পারেন। এর ফলে বাংলাদেশের ওইসব শ্রমিকের অবস্থা থেকে যাচ্ছে অনিরাপদ। তাদের প্রতিনিধিত্ব করে এমন বড় বড় ব্রান্ড, খুচরা বিক্রেতা বা গ্রুপ যেমন ফুটওয়্যার রিটেইলারস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটরস অব আমেরিকা বিভিন্ন সময়ে এসব শুল্কের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি করেছে এমন অজুহাতে ট্রাম্প প্রশাসন চীনকে টার্গেট করছেন। তিনি তাদের পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়েছেন বা বসাতে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় ওই সংস্থা ট্রাম্পের এসব নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে। তারা চীনা পণ্য এবং বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ দেখতে চান না।
(কুয়ার্টজ-এ প্রকাশিত মার্ক বাইনের লেখা অবলম্বনে)

‘ভূমি কুতুব’ গ্রেপ্তার

রাজউকের খাস জমি দখল ও অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কুতুব উদ্দীন। গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচার রাজস্ব ভবনের সামনে থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি দল গ্রেপ্তার করে তাকে। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব ভট্টাচার্য জানান, সরকারি জমি দখল ও অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গুলশান থানায় করা এক মামলায় কুতুব উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভূমিমন্ত্রী শামসুজ্জামান শরীফের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন কুতুব। তিনি মন্ত্রণালয়ে ভূমি কুতুব হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর গুলশানে ১০ কাঠা জমি ভুয়া আম মোক্তারনামা দেখিয়ে নিজের শ্বশুরের নামে হস্তান্তর করেন তিনি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মীর্জা জাহিদুল আলম কুতুব উদ্দীনকে আটক করেছেন। গ্রেপ্তারের পর তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার নির্দেশ দেন আদালত। জানা গেছে, শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলার নাগেরপাড়া ইউনিয়নের ছয়গাঁও গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান কুতুব উদ্দীনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই সময় ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রটোকল কর্মকর্তা কুতুব উদ্দীন অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়ান। পাশাপাশি জমি দখলেরও অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এরপর থেকে কুতুব উদ্দীন অন্যদের কাছে ‘ভূমি কুতুব’ হিসেবেই পরিচিত হতে থাকেন। অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি খাস জমি তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিয়েছেন। এ সব অভিযোগে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও তাকে গ্রেপ্তার করে দুদক। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি কারাগার থেকে বের হন।

নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়

ঢাকায় পৌঁছেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠকে দেশের ১০ বিশিষ্ট নাগরিক অংশ নেন। ভারতীয়   হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাসহ হাই কমিশনের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠকে গোখলে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, রোহিঙ্গা সংকট, চীনা বিনিয়োগসহ ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নানা বিষয় জানার চেষ্টা করেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে- ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, বর্ডার কিলিং এবং প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন লন্ডন সফরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রস্তাবিত বৈঠকের বিষয়েও বৈঠকে কথা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন এবং অন্যান্য বিষয়ে বিস্তারিত শুনেছেন তিনি। বলেছেন খুবই সামান্য। সেখানে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব যে বার্তাটি দেয়ার চেষ্টা করেছেন তা হলো- নির্বাচনটি একান্তই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকা সফর করেছিলেন। তার সফরটি সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আলোচিত ছিল। রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে দিল্লি বিদেশ সচিব বলেছেন, এটি কেবল দুই দেশের ইস্যু নয়। এর সঙ্গে গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িয়ে গেছে। এ নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ রয়েছে জানিয়ে বৈঠকে তিনি বলেন, ভারত চায় সংকটের দ্রুত এবং টেকসই সমাধান। এ নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের আলোচনা হয়েছে। তারা চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসনের বিষয়েও আশাবাদী। সচিব এ-ও জানান, রাখাইনের উন্নয়নে ভারতের বিনিয়োগ রয়েছে। নাগরিক সমাজের সঙ্গে বৈঠকে তিস্তা ইস্যুতে কোনো সুখবর দিতে পারেননি বিদেশ সচিব। তার কথায় ভারতের ফেডারেল সিস্টেমে রাজ্যের প্রভাবের বিষয়টিই ওঠে এসেছে। তিস্তা ইস্যুতে সরাসরি পরামর্শ দেয়া না হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর ওপরই জোর ছিল সচিবের কথায়। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি তুলেছেন নাগরিক সমাজের এক প্রতিনিধি। জবাবে সচিব যা বলেছেন তার মর্মার্থ হলো- এখানে চীনের সঙ্গে ভারতের কোনো প্রতিযোগিতা নেই। ভবিষ্যতেও তারা কোনো প্রতিযোগিতায় যেতে চায় না।
বাংলাদেশের সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি যেন দিনে দিনে কমে আসছে। এখানকার অনেক ঘটনার কারণে এমনটি মনে হয় বলে মন্তব্য করেন নাগরিক সমাজের এক প্রতিনিধি। কিন্তু তিনি আর কথা বাড়াননি। দিল্লির বিদেশ সচিবও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। সূত্র মতে, সচিব বিজয় কেশব গোখলের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জামির, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত শমসের মবিন চৌধুরী, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, মাহজাবিন খালেদ এমপি, অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশ গুপ্ত, বিশ্লেষক মোহাম্মদ এ আরাফাত, ফয়জুল হক রাজু,  সিনিয়র সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু প্রমুখ।
আজ প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে বৈঠক: তাৎপর্যপূর্ণ সফরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে এখন বাংলাদেশে। গতকাল বিকাল সোয়া ৪টার পরে জেট এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। এ সময় পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব গোখলের এটাই প্রথম বাংলাদেশ সফর।
সফরটি পরিচিতিমূলক হলেও তাতে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। নির্বাচনী বছরে প্রতিবেশী দেশের জ্যেষ্ঠ ওই কূটনীতিকের সফরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে মোদি সরকারের মনোভাবের বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে। সফর প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, আগামী ১৯-২০শে এপ্রিল লন্ডনে অনুষ্ঠেয় কমনওয়েলথ সামিটের সাইড লাইনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠকের কথাবার্তা চলছে। সেই বৈঠকের প্রেক্ষাপটেও পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলের সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ। আজ পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হবে। মূলত বিদেশ সচিবের ঢাকার বৈঠক ও সাক্ষাৎ-আলোচনার মধ্য দিয়ে লন্ডনে প্রস্তাবিত হাসিনা-মোদি বৈঠকটি চূড়ান্ত হবে। কূটনীতিকরা বলছেন, বহুল প্রত্যাশিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির জন্য মুখিয়ে আছে বাংলাদেশ। হাসিনা-মোদি সরকারের আমলেই চুক্তিটি সম্পাদনে দিল্লির দৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে। যদিও এ নিয়ে এখনো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে রাজি করাতে পারেনি ভারতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তিস্তা ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলেও ভারতীয় মিডিয়ার তরফে এরইমধ্যে খবর চাউর হয়েছে চলতি বছরের শেষার্ধে অর্থাৎ বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকা সফর করবেন মোদি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ নিয়ে আগেভাগে কোনো মন্তব্য না করার নীতি নিয়েছেন। তারা সময় ও পরিস্থিতির ওপর পুরো বিষয়টি ঠেলে দিয়েছেন। ভারতীয় হাইকমিশন সূত্র জানিয়েছে, পররাষ্ট্র সচিব গোখলে আজ দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে ইনস্টিটিউট অব পলিসি, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের (আইপিএজি) আয়োজিত বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতা এবং আগামীর পথ চলা বিষয়ে একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করবেন। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করবেন। ওই অনুষ্ঠানে সচিব গোখলে ঢাকা-দিল্লির আগামীর সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা বিশেষ করে সার্ক, বিমসটেক, বিসিআইএম ইসিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত বলবেন বলে আভাস মিলেছে। উল্লেখ্য, সচিবের সফরে গণমাধ্যম ও নাগরিক সেবা বিষয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।

সেনা মোতায়েনের এখতিয়ার নেই ইসির -ওবায়দুল কাদের

গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে কাজ করবে। কিন্তু সেনাবাহিনী থাকবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তাই ইসি চাইলেও সেনা মোতায়েন করতে পারবে না। গতকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স     ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপ-কমিটির বৈঠক শেষে তিনি একথা বলেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, তারা (নির্বাচন কমিশন) সরকারকে শুধু অনুরোধ করতে পারবে। সরকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজন মনে করলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করবে।
এ বিষয়ে সংবিধানে সব কিছু বলা আছে। কেউ চাইলেও সংবিধানের বাইরে যেতে পারবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনী শুধু স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেয়া হবে পরিস্থিতি বিবেচনায়। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে থাকেন। তাহলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও এমপিরা কেন পারবে না। এ বিষয়ে আমরা ইসির সঙ্গে বসবো। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি নেতারা বেগম জিয়াকে নিয়ে একেক সময় একেক রকম বক্তব্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করছিলেন। তাকে জোর করে হাসপাতালে নেয়ার প্রশ্নই আসে না। তিনি হাসপাতালে যাওয়াতে অবশ্য একদিক থেকে সুবিধা হয়েছে।
জাতি দেখেছে তিনি কতটুকু অসুস্থ। তিনি বলেন, আমার তো মনে হয় তিনি জেলে যাওয়ার আগে যতটুকু সুস্থ ছিলেন, জেলে যাওয়ার পর আরো বেশি হাস্যোজ্জ্বল ও সুস্থ মনে হয়েছে। তিনি সুস্থ থাকুক আমরা চাই। এ সময় বিএনপির সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিএনপি কথায় কথায় বিদেশিদের কাছে ছুটে যায়। তাদের এ কাজ জাতীয় সম্মানের জন্য মোটেই শুভ নয়। বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, যদি আপনাদের নালিশ থেকেই থাকে জনগণের কাছে করুন। উপ-কমিটির দায়িত্ব তুলে ধরে ওবায়দুল কাদের বলেন, মাঝে মাঝে এমন কিছু ইস্যু আমাদের সামনে চলে আসে, যেখানে দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। উপ-কমিটির দায়িত্ব থাকবে এসব ইস্যুতে পার্টির বক্তব্য তুলে ধরা। সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ, উপ-কমিটির সদস্য নিয়াজ মোর্শেদ এলিট, প্রলয় সমদ্দার, কান্তি দাশ প্রমুখ।

জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পক্ষে সিইসি

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পক্ষে মত দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা। গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক গোলটেবিল আলোচনায় সিইসি বলেন, অতীতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, আগামী নির্বাচনেও সেনা মোতায়েন হতে পারে। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনে  সেনা মোতায়েন করা উচিত। তবে স্থানীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন আমরা একেবারেই চাই না। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। আরো কমিশনার রয়েছেন। আমরা সবাই মিলেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব। ‘বাংলাদেশে প্রবাসী ভোটাধিকার প্রবর্তন: সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক ওই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি)।
একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসি যে আইন সংশোধনের খসড়া করেছে সেখানেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করেনি ইসি। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে আয়োজিত ইডব্লিউজির সেমিনারে উপস্থিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা সেনা মোতায়েনের প্রসঙ্গ তুলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের সেনাবাহিনী সারা দুনিয়ায় শান্তিরক্ষায় কাজ করছে, বিভিন্ন দেশের সুষ্ঠু নির্বাচনে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দেশের নির্বাচনে সেনাবাহিনী কাজ করতে পারবে না, এটা হয় না। সেনাবাহিনী থাকলে একটি পক্ষের অসুবিধা হতে পারে। নির্বাচন কমিশন তো তাদের পক্ষ নেয়া উচিত হবে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে কোনো আপত্তি জানায়নি। আমাদের সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করেছে। আমরা মনে করি, কমিশন এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। সেনা মোতায়েন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ দুই নেতার বক্তব্যের ব্যাপারে সিইসির বক্তব্য জানতে চান সাংবাদিকরা। তখন সিইসি সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে তার নিজের মত দেন। তবে এ ব্যাপারে এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
প্রবাসীদের ভোটাধিকারের ব্যাপারে সিইসি বলেন, বর্তমানে নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচনী কাজে সংশ্লিষ্ট থাকায় ১২ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না। সে সঙ্গে কারাগারে কিংবা পুলিশ হেফাজতে থাকা আরো  ৭৫ হাজার ভোটার ভোট দিতে পারেন না। এ ভোটাররা কিভাবে ভোট দিতে পারেন। সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছি।
তিনি বলেন, আমাদের বিদ্যমান আইনে প্রক্সি ও পোস্টাল ভোট দেয়ার সুযোগ আছে। তফসিল ঘোষণার ১৫ দিনের ভেতর আবেদন করলে প্রবাসীরাও ভোট দিতে পারেন। তবে এটা অনেকেই জানে না। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে আগামী নির্বাচনের আগে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। প্রচার চালাতে দূতাবাসগুলোকেও চিঠি দেয়া হবে। সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে কমিশন সচেষ্ট রয়েছে।
এ ছাড়াও বিপুলসংখ্যক প্রবাসীকে কীভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করে দেয়া যায় বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের ভাবনায় আছে বলে জানান সিইসি। তিনি জানান, আগামী ১৯শে এপ্রিল এ ব্যাপারে কমিশন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে দেশের মধ্যে অবস্থান করা নাগরিকরাই ভোট দিতে পারছেন না। তাই সবার আগে দেশের মধ্যে অবস্থান করা নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৪ জন সংসদ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এ ছাড়াও ইলেকশনের সময় ভোটের কাজে নিয়োজিত থাকা ১২ লাখ ভোটার এবং কারাগারে থাকায় আরো ৭৫ হাজার ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না। তাই দেশে অবস্থান করা যেসব নাগরিক ভোট দিতে পারেন না। আগে তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ছিল। এ ব্যাপারে কমিশনকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে। নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক হয়, সবাই যেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারে সেটা আমরা চাই। এখানে সবার সহযোগিতা করতে হবে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ভোট বাংলাদেশে বাধ্যতামূূলক নয়। এজন্য ভোট বর্জনের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত ভোটিংয়ের প্রধান অন্তরায় হলো আমাদের আইন। পোস্টাল ভোটিং এর জন্য সময় দরকার। সে সময় আমাদের হাতে নেই। এই সময় কিভাবে পাওয়া যায় সেটি আমাদের দেখা দরকার।
ভোটের কাজে যারা নিয়োজিত থাকে তারাও ভোট দিতে পারে না। এই ভোটগুলো কিভাবে নেয়া যায় সেটিই আমাদের আগে নিশ্চিত করতে হবে। ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য আবদুল আউয়ালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন সাবেক রাষ্ট্রদূত আবদুল মুমিন চৌধুরী, নাসিম ফেরদৌস, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মুবিন চৌধুরী, এশিয়া ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি সারাহ টেইলর। অনুষ্ঠানের কি-নোট উপস্থাপন করেন ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের পরিচালক আবদুল আলিম।