Wednesday, December 17, 2025

ট্রাম্পের এজেন্ডায় সুদানের গৃহযুদ্ধ, কী ঘটতে যাচ্ছে by ওসামা আবুজাইদ

প্রকাশ ২৮ নভেম্বর ২০২৫ঃ সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে সুদানের যুদ্ধের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।

হোয়াইট হাউস আগে থেকেই সুদানের জটিল পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যকার চলমান যুদ্ধ নিয়ে। তবে সৌদি যুবরাজের সফরের পর হোয়াইট হাউসের সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে বলে মনে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লোহিত সাগরে জাতীয় নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সন্ত্রাসবাদ দমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়ার কারণে তাদের অগ্রাধিকারও সেভাবেই নির্ধারিত হচ্ছে।

আগেও হোয়াইট হাউস সতর্ক করে বলেছিল, সুদানের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। শান্তির পথ তৈরি করতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে একাধিকবার আলোচনাও হয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি তথাকথিত ‘কোয়াড’ বা যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমন্বিত মঞ্চযুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, সুদানের যুদ্ধ আগে তার ‘এজেন্ডায় ছিল না’ এবং বিষয়টি তিনি যুবরাজের অনুরোধের পর গুরুত্ব দিয়েছেন। ট্রাম্পের এ বক্তব্য কোনো বড় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না; বরং একে সৌদি যুবরাজের প্রতি সৌজন্য ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ বলেই ধরা যেতে পারে।

এটি মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য বিশ্বাসযোগ্য আঞ্চলিক নেতা ও শান্তি উদ্যোগের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে আসার সুযোগ, যার ওপর ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে নির্ভর করতে পারে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প আঞ্চলিক কূটনীতিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন ভূমিকার প্রতি তার সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার আগ্রহের প্রতিফলন দেখিয়েছেন।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পর সুদান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতাও বেড়েছে। শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন, যা সুদান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা এবং ‘কোয়াড’ অংশীদারদের সঙ্গে চলমান সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।

তবে নতুন করে সক্রিয় হওয়া এই উদ্যোগ এসেছে অত্যন্ত দেরিতে, এক সংকটময় সময়ে। জাতিসংঘ বারবার বলেছে, সুদান বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটির মুখে রয়েছে। আগেভাগে হস্তক্ষেপ করা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো যেত। যেমন সম্প্রতি এল-ফাশির শহরটি আরএসএফ বাহিনীর দখলে চলে যাওয়ার ঘটনা ঠেকানো গেলে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যাপক নৃশংসতা রোধ করা সম্ভব হতো। একই সঙ্গে মানবিক বিপর্যয়ও কিছুটা কমানো যেত। দেশটিতে এখন বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট, জরুরি অবকাঠামোর ধ্বংস এবং ব্যাপক হারে বাস্তুচ্যুতিও এই মানবিক বিপর্যয়ের অন্তর্ভুক্ত।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুদানের পরিস্থিতিকে প্রায়ই ‘ভুলে যাওয়া যুদ্ধ’ বলা হয়। কারণ, বড় বড় বৈশ্বিক শক্তি একে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় নিচের দিকে রাখে। শান্তিপ্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের যুক্ত হওয়া হয়তো সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ফিরিয়ে আনবে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মনোযোগ আবারও মলিন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

সুদানের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বে দেশটির রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব কাউন্সিল সবার আগে সৌদি আরবের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিও তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

এর আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা কোয়াডের মানবিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পরোক্ষভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। এ অবস্থান পরিবর্তনের কারণ হতে পারে ট্রাম্পের সরাসরি তত্ত্বাবধানে শান্তিপ্রক্রিয়াটি নতুনভাবে গুরুত্ব পাওয়া। কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা মানতে গিয়ে দেশের ভেতরে যে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সে বিষয়ে বুরহানকে দেওয়া কোনো আশ্বাস।

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানিয়ে বুরহানের এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টের পর দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ কিছুটা কমে আসে। সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর (এসএএফ) সমর্থকেরা ও সুদানের ইসলামিক মুভমেন্টের মহাসচিব আলী কার্তিও নতুন করে স্থিতিশীলতার আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে আরএসএফ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানালেও ‘যারা সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে’ তাদের ‘শান্তির পথে বাধা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে তারা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান এবং একটি ‘নতুন সুদান’ গড়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও তুলে ধরে।

এরপর কী ঘটবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সৌদি-ট্রাম্প সমঝোতা যে কোয়াডের জন্য হোয়াইট হাউসের পরিকল্পিত ও সমর্থিত রূপরেখাকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে—এমনটা ধরে নেওয়া ভুল হবে। তবে ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা কোনো পক্ষকে বাড়তি সুবিধা না দিলেও বা নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণ না করলেও সমঝোতা বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে পারে।

সংক্ষিপ্ত মেয়াদে সমাধান ছাড়াও সুদানে শান্তির পথে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো রয়ে গেছে। যেসব পক্ষ যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে, তারা হয়তো শান্তি উদ্যোগের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হবে। শান্তি রক্ষা করা সহজ হবে না। যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তবে এটি মানবিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। মধ্যস্থতাকারী গোষ্ঠী যুদ্ধরত পক্ষগুলোর কাছ থেকে অর্থবহ ছাড় বা সমঝোতা বের করতে সম্মিলিত চাপ প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু মূল ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তন না–ও আসতে পারে। যুদ্ধবিরতি কেবল সাময়িক হতে পারে এবং রাজনৈতিক আলোচনার শুরুতে তা ভেঙেও যেতে পারে।

ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা দুটি দিকই বহন করে। একদিকে দেশটির বাস্তবতায় এটা রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাবকে দৃঢ় করতে পারে, আবার সুদানের ভবিষ্যৎকে দেনদরবারের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িয়ে দিতে পারে।

বুরহানের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া শান্তির ক্ষেত্রে একটি অর্থবহ সুযোগের ইঙ্গিত হলেও সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন সত্যিকারের প্রয়োগ, সুদানিদের নেতৃত্বে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপান্তর ও নিশ্চয়তা।

মুহূর্তটি সঠিকভাবে কাজে লাগালে সুদান সম্ভবত শেষ পর্যন্ত নাগরিক নেতৃত্বাধীন ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারবে। তা না হলে সুযোগটি আবারও ট্র্যাজেডিতে পরিণত হতে পারে।

* ওসামা আবুজাইদ, গবেষক, গ্রাসরুটস ও মানবিক নিরাপত্তা প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

সুদান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা এবং ‘কোয়াড’ অংশীদারদের সঙ্গে চলমান সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।
সুদান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা এবং ‘কোয়াড’ অংশীদারদের সঙ্গে চলমান সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়। ছবি: এএফপি

‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে সরব মোদি কেন শেষ পর্যন্ত চুপসে গেলেন by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতের নির্বাচন কমিশন ও তার কাজ–সম্পর্কিত পাঁচটি প্রশ্ন তুলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে মুখোমুখি বিতর্কে বসার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী। কিন্তু অমিত শাহ তা গ্রহণ করলেন না। নির্বাচন ঘিরে কমিশনের (ইসি) এখতিয়ার এবং ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন পদ্ধতি (এসআইআর) নিয়ে বিরোধীদের তোলা প্রশ্নের উত্তরগুলো তাই অনুচ্চারিতই রয়ে গেল।

এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর আজ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন দেয়নি। লোকসভার দুই দিনের বিতর্ক শেষেও তা পাওয়া গেল না। বিতর্ক ঘিরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব কার্যত রাজনৈতিক হয়ে রইল।

লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনের শুরু থেকেই বিরোধীরা এসআইআর নিয়ে আলোচনার দাবি তুলেছিলেন। অন্যদিকে সরকার চাইছিল জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’–এর সার্ধশতবর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে আলোচনা করতে। বিরোধীরা সরকারের দাবি মেনে নেওয়ায় সরকারও বাধ্য হয় বিরোধীদের দাবি মানতে।

তবে আলোচনা শুধু ‘এসআইআর’–এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকার ঠিক করে, বিতর্কের বিষয়বস্তু হবে ‘নির্বাচনী সংস্কার’। সরকার জানায়, প্রথমে আলোচিত হবে ‘বন্দে মাতরম’, পরে নির্বাচনী সংস্কার।

বিজেপি ও সরকার ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কে কোণঠাসা করতে চেয়েছিল প্রধানত কংগ্রেসকে। তাদের অভিযোগ ছিল, কংগ্রেস নেতৃত্ব প্রধানত জওহরলাল নেহরু ‘বন্দে মাতরম’ গানের অঙ্গচ্ছেদের জন্য দায়ী এবং সেটি তিনি করেছিলেন মুসলিম লিগ ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চাপে। তাদের মতে, ওটা ছিল কংগ্রেসের ‘মুসলিম তোষণের’ বড় প্রমাণ।

কিন্তু লোকসভা ও রাজ্যসভার বিতর্কে দেখা গেল, সব বিরোধী দল ‘বন্দে মাতরম’ প্রশ্নে কংগ্রেসের পাশে দাঁড়াল, এমনকি বিজেপির শরিক জেডিইউ পর্যন্ত। প্রত্যেকেই তথ্য দিয়ে জানাল, ‘বন্দে মাতরম’–এর প্রথম দুই স্তবক রেখে বাকিগুলো না গাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তাঁর সঙ্গে পূর্ণ সহমত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী, সরদার বল্লভভাই প্যাটেল, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বাবাসাহেব আম্বেদকরেরা।

দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক বিরোধী বক্তা এই বিতর্কে বিজেপিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করান, স্বাধীনতা সংগ্রামে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) বিন্দুমাত্র ‘ইতিবাচক ভূমিকা’ না থাকার অপরাধে। এই অভিযোগেও বিজেপিকে বিদ্ধ হতে হলো যে তারাও বহু বছর পর্যন্ত ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ করেনি।

বিরোধীরা বলেন, আরএসএসের সদর দপ্তর ও শাখাগুলোতেও ‘বন্দে মাতরম’ ওই গান গাওয়া হয়নি। এমনকি বহু বছর আরএসএস শাখা ও সদর দপ্তরে স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকাও তোলা হয়নি। একের পর এক বিরোধী নেতা বরং বলেছেন, কংগ্রেস নেতা–কর্মীরা যখন ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে গাইতে ফাঁসির মঞ্চে এগিয়ে গেছেন, আরএসএস তখন ব্রিটিশ শাসকদের ‘পক্ষে’ কাজ করেছে।

বিরোধী নেতারা এ কথাও বলেছেন, হঠাৎ ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিজেপির সরব হওয়ার একমাত্র কারণ পশ্চিমবঙ্গের ভোটে জেতা। কিন্তু সেখানেও তাঁদের মুশকিলে ফেলে দেয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ, যিনি ‘বন্দে মাতরম’–এর স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’, বিপ্লবী পুলিনবিহারী দাসকে ‘পুলিন বিকাশ’ ও সূর্য সেনকে ‘মাস্টার’ বলে অভিহিত করে ক্ষীণ ‘ইতিহাসজ্ঞানের’ পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি নিজেকে হাস্যাস্পদও করে তুলেছেন।

বিতর্ক শেষে মূল্যায়ন, ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্ক বিজেপির পক্ষে হিতে বিপরীতই হয়েছে।

এমনকি এই বিতর্কেও বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, আরএসএসের চারজন নেতারও নাম তাঁরা করেন, যাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে কারাভোগ করেছেন। বিজেপির কোনো বক্তা সেই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে পারেননি।

চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও। নির্বাচন সংস্কার নিয়ে বিতর্কে। লোকসভায় অমিত শাহকে সরাসরি সেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী।

রাহুল তাঁর ভাষণে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছিলেন। যেমন কেন মোদি সরকার নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইনের বাছাই কমিটিতে দেশের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও লোকসভার বিরোধী নেতাকে রেখেছে।

রাহুলের অভিযোগ, তিনজনের কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা ঠিক করবেন, সেটিই চূড়ান্ত। কমিটিতে বিরোধী নেতার (রাহুল নিজেই) কোনো ভূমিকাই নেই।

রাহুলের দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, আইন সংশোধন করে মোদি সরকার নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যকে এক অদ্ভুত রক্ষাকবচ দিয়েছে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, কমিশনের কারও বিরুদ্ধে কমিশন–সংক্রান্ত কাজের জন্য ফৌজদারি বা দেওয়ানি কোনো মামলা করা যাবে না।

রাহুল বলেন, সরকার বদল হলে এই আইন বদলানো হবে। যাঁরা বেআইনি কাজ করে চলেছেন, শাসক দলের হয়ে কাজ করছেন, তাঁদের প্রত্যেককে শাস্তির আওতায় আনা হবে।

রাহুলের তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, ভোটের ৪৫ দিন পর সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট করে দেওয়ার নতুন নিয়ম। এই নিয়ম নির্বাচন কমিশন তৈরি করেছে। তাঁর চতুর্থ প্রশ্ন ছিল, কমিশন কেন রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘মেশিন রিডঅ্যাবল’ ভোটার তালিকা দিতে অস্বীকার করছে। ওই তালিকা দেওয়া হলে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে দ্রুত নিরীক্ষণ করা যায়।

রাহুলের পঞ্চম প্রশ্ন ছিল ইভিএম–সংক্রান্ত। সেই মেশিন রাজনৈতিক দলের হাতে তুলে দেওয়া হলে প্রমাণ করা যাবে, কীভাবে তাতে কারচুপি করা যায়। রাহুল তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, এই কমিশন পুরোপুরি বিজেপির হয়ে কাজ করছে। ভোট চুরি করছে। নতুন উপায়ে। নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে।

গতকাল বুধবার বিতর্ক শেষে জবাবি ভাষণ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ; কিন্তু কোনো জবাবই বিরোধীদের সন্তুষ্ট করেনি। রাহুল বলেন, ভোট চুরি নিয়ে বারবার যে দাবি তিনি জানিয়ে আসছেন, তা নিয়ে বিতর্কে বসতে তিনি সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। অমিত শাহর উদ্দেশে রাহুল বলেন, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। বিজেপির জন্য নির্বাচন কমিশনের ভোট চুরির প্রমাণ দিয়ে ছাড়ব।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি। উল্টো তিনি বলেন, জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধীরা ভোট চুরি করে ক্ষমতায় থেকেছেন। নেহরু মাত্র দুটি ভোট পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। অথচ সরদার প্যাটেল পেয়েছিলেন ২৮টি ভোট। ইন্দিরা এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের পর ক্ষমতা ধরে রাখতে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন এবং সোনিয়া গান্ধী নাগরিকত্ব পাওয়ার আগেই ভোটার হয়েছিলেন।

নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত রাহুল গান্ধীর তোলা একটি অভিযোগেরও জবাব দেয়নি। রাহুলের বিরুদ্ধে ‘অসত্য’ অভিযোগ করার জন্য আইনি ব্যবস্থাও নেয়নি।

অমিত শাহও রাহুলের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন না। ফলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিজেপির হয়ে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগের উত্তরগুলো অনুচ্চারিতই রয়ে গেল। রাহুল পরে গণমাধ্যমকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর তোলা একটি প্রশ্নেরও জবাব দিলেন না। চ্যালেঞ্জও গ্রহণ করলেন না। অমিত শাহর প্রতিক্রিয়া ছিল পুরোপুরি রক্ষণাত্মক।

‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হলো নরেন্দ্র মোদিকে
‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হলো নরেন্দ্র মোদিকে। ছবি: এএনআই

সুদানে গৃহযুদ্ধের আড়ালে আসলে কী হচ্ছে, কেনই-বা এ রক্তক্ষয়ী সংঘাত

সুদানের কোরদোফান অঞ্চলের আবেই এলাকায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের হামলায় বাংলাদেশের ছয় সেনাসদস্য নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। প্রায় আড়াই বছর ধরে সুদানে চলা যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন দেড় লক্ষাধিক মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও লাখ লাখ। প্রায় দুই কোটি মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। এর মধ্যে ৬০ লাখের মতো মানুষ দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতিতে রয়েছেন।

আফ্রিকার সোনা ও জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ দেশ সুদানে ২০২৩ সালে নতুন করে এ গৃহযুদ্ধের শুরু। সরকারি বাহিনী সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (এসএএফ) ও বিদ্রোহী আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়েই মূলত এ যুদ্ধ।

আরএসএফের বিরুদ্ধে গণহত্যা, জাতিগত হত্যা এবং নারী ও শিশুদের ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। আরএসএফ ও এসএএফের পক্ষে-বিপক্ষে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা দেশ। জাতিসংঘ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সুদানে এ মুহূর্তে বিশ্বের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয় চলছে।

কেন এ গৃহযুদ্ধ

সুদানে সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। সংঘাতের শুরুটা সেই ২০১৯ সালে। তখন এক সামরিক অভ্যুত্থানে দেশটির দীর্ঘদিনের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের পতন হয়। তবে এ সামরিক অভ্যুত্থানের আগে থেকে বশিরের প্রায় তিন দশকের শাসন অবসানের দাবিতে সুদানে বিক্ষোভ হচ্ছিল। বশিরের পতনের পরও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সুদানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ চলতে থাকে।

বশিরের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এসএএফপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও আরএসএফের প্রধান জেনারেল হামদান দাগালো, যিনি ‘হেমেদতি’ নামে বেশি পরিচিত। সফল সামরিক অভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারে প্রেসিডেন্ট হন বুরহান। হেমেদতি হন বুরহানের ডেপুটি।

বুরহান ও হেমেদতির মধ্যে বিরোধ

একটা সময় পর দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে এবং বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে বুরহান ও হেমেদতির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বলা হয়ে থাকে, হেমেদতির দাবি ছিল, আরএসএফের এক লাখ সদস্যকে সেনাবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করতে হবে। এরপর নতুন বাহিনীর নেতৃত্ব থাকবে তাঁর হাতে।

কিন্তু হেমেদতির এ প্রস্তাব নিয়ে বুরহানের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। তাঁর আশঙ্কা হয়, হেমেদতি তাঁকে কৌশলে সরিয়ে দিতে চাইছেন। এ পরিস্থিতিতে দুজনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

সাম্প্রতিকতম গৃহযুদ্ধের শুরু

এমন একটি উত্তপ্ত সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরএসএফ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। সেনাবাহিনী এটিকে হুমকি হিসেবে দেখে। প্রতিক্রিয়ায় এসএএফ সদস্যদের রাজধানী খার্তুমের রাস্তায় নামানো হয়। কয়েক দিনের উত্তেজনা শেষে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল খার্তুমে টানা অনেকগুলো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। শুরু হয় তীব্র বন্দুকযুদ্ধ।

কোন পক্ষে আগে বন্দুক চালিয়েছে, তা নিয়ে এসএএফ ও আরএসএফ সদস্যদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে।

আরএসএফ যোদ্ধা কারা

আরএসএফ গঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালে। মূলত জানজাবিদ মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এটি গঠন করা হয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে বশিরই তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। বিদ্রোহীদের পরাস্ত করতে বশির সরকারের পক্ষে তারা দারফুরে দীর্ঘদিন লড়াই করে। তাদের বিরুদ্ধে ওই অঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান ও অ-আরব জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত হত্যা চালানোর অভিযোগ ওঠে।

একপর্যায়ে হেমেদতির আরএসএফ বাহিনী ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পরে তারা ইয়েমেন ও লিবিয়ার সংঘাতেও অংশ নেয়। বলা হয়ে থাকে, ওই সময় থেকে হেমেদতি সুদানের কিছু সোনার খনি নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং আহরণ করা সোনা সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পাচার করতেন।

ইউএইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশটি আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহ করে। দেশটির ড্রোন নিয়েই তারা সম্প্রতি সুদানে সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু ইউএই আরএসএফকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আরএসএফের সাফল্য

গত জুনে আরএসএফ লিবিয়া ও মিসর সীমান্তে সুদানের বেশ কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। গত অক্টোবরের শেষ দিকে গুরুত্বপূর্ণ আল-ফাশের এলাকা দখল করে তারা। আল–ফাশের ছিল সুদানের সরকারি সেনাদের সর্বশেষ শক্তিশালী ঘাঁটি। আল–ফাশেরের মধ্য দিয়ে প্রায় পুরো দারফুর অঞ্চল আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।

বর্তমানে দারফুরের পার্শ্ববর্তী কোরদোফায় মনোযোগ দিয়েছে আরএসএফ। দক্ষিণ সুদানের সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলেই এখন ব্যাপক ড্রোন হামলা চালাচ্ছে আরএফএফ।

সম্প্রতি বুরহান সরকারের সমান্তরাল বিদ্রোহী সরকার ঘোষণা করেছেন হেমেদতি। তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০১১ সালের পর সুদান হয়তো দ্বিতীয়বারের মতো ভাগ হতে যাচ্ছে।

বুরহান সরকারের নিয়ন্ত্রণ

বুরহানের নেতৃত্বাধীন এসএএফ উত্তর ও পূর্ব সুদানের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। মিসরই তাদের প্রধান সমর্থক। নীল নদের পানির ভাগাভাগি নিয়ে মিসর তাদের ওপর নির্ভরশীল।

লোহিত সাগরের তীরবর্তী পোর্ট সুদানে নিজের সদর দপ্তর চালু করেছেন বুরহান। তাঁর সরকারকে সুদানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ।

কিন্তু পোর্ট সুদান কত দিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ, গত মার্চে সেখানে ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালিয়েছিল আরএসএফ। এ হামলার পেছনে কারণ, ওই মাসে রাজধানী খার্তুমের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তারা। সুদানের প্রেসিডেন্টের ভবন রিপাবলিকান প্যালেসও এসএফের দখলে চলে গিয়েছিল। সাম্প্রতিকতম গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে এটি আরএসএফ দখল করেছিল।

খার্তুম দখলের ক্ষেত্রে এসএএফ ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার করেছে। বলা হয়, এসব ড্রোন ইরান থেকে গেছে।

[তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান ও গ্লোবাল কনফ্লিক্ট ট্র্যাকার]

আরএসএফের হামলার মুখে বাস্তুচ্যুত মানুষ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন। উত্তর দারফুরের তাওয়িলা শহর, ১৫ এপ্রিল ২০২৫
আরএসএফের হামলার মুখে বাস্তুচ্যুত মানুষ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন। উত্তর দারফুরের তাওয়িলা শহর, ১৫ এপ্রিল ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

সিডনির ‘বীর’ আহমেদ নিয়ে কী বলছেন তাঁর মা–বাবা

দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডঃ অস্ট্রেলিয়ার সিডনির জনপ্রিয় বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে গতকাল রোববার এক বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র করে প্রশংসায় ভাসছেন আহমেদ আল আহমেদ। শরীরে প্রায় পাঁচটি গুলি নিয়ে সিডনির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহমেদ বলেন, ‘ঝুঁকি নিয়ে বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র করতে আমার বিন্দুমাত্র ভয় কাজ করেনি। বরং এমন কোনো ঘটনা আবার ঘটলে আমি আবার একই কাজ করব।’

স্থানীয় সময় আজ সোমবার রাতে আহমেদের অভিবাসন আইনজীবী স্যাম ইসা তাঁর সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করার পর এ কথা বলেন। ইসা জানান, আহমেদের ব্যথা ক্রমশ বাড়ছে। এটা তাঁকে ক্লান্ত করে তুলছে।

সিডনির সেন্ট জর্জ হাসপাতালে আহমেদের চিকিৎসা চলছে। তাঁর প্রথম অস্ত্রোপচার সফলভাবে শেষ হয়েছে। তবে গুলির যন্ত্রণায় তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। ইসার ভাষায়, ‘আমাদের নায়ক এই মুহূর্তে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।’ আহমেদ তাঁর বাঁ হাত চিরতরে হারাতে পারেন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইসা।

ইসা জানান, আহমেদের বাঁ হাতের বিভিন্ন অংশে প্রায় পাঁচটি গুলির আঘাত লেগেছে। একটি গুলি তাঁর বাঁ কাঁধের দিকে চলে গেছে, যা কিছুটা ‘অদ্ভুত’। গুলিটি এখনো বের করা যায়নি।

ঘটনাস্থলের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বন্দুকধারীকে পেছন দিক থেকে গলায় ধরে মাটিতে ফেলে দেন এক ব্যক্তি। তিনি বন্দুকটি কেড়ে নিয়ে হামলাকারীর দিকে লক্ষ্য করে তাক করেন। এতে ভয়ে পেয়ে হামলাকারী দূরে সরে যান। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে অদূরে থাকা আরেক বন্দুকধারীর গুলি তাঁকে নিশানা করে গুলি ছোড়েন।

পরে জানা যায়, নিরস্ত্রকারী এই সাহসী ব্যক্তিই আহমেদ আল আহমেদ। প্রাথমিকভাবে তাঁর হাতে দুটি গুলি লেগেছিল বলে জানা গিয়েছিল। এখন ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর প্রায় পাঁচটি গুলি লেগেছে।

আহমেদ বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র না করলে আরও মানুষ প্রাণ হারাতে পারত। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ক্রিস মিনস এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অনেক বিশ্বনেতা আহমেদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তিনি এখন রীতিমতো ‘বীরের’ মর্যাদা পাচ্ছেন।

আহমেদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ইসা বলেন, ‘তাঁর অবস্থা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক খারাপ। বাঁ হাতে গুলি লাগাটা এতটা গুরুতর ব্যাপার ছিল না। কিন্তু তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে।’

২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়া আহমেদ দেশটির ‘সমাজের প্রতি গভীরভাবে ঋণী’ জানিয়ে ইসা বলেন, ‘তিনি একজন বিনয়ী মানুষ। সংবাদমাধ্যমের এত প্রচারের প্রতি তাঁর তেমন কোনো আগ্রহ নেই। একজন মানুষ হিসেবে যা করা দরকার, তিনি শুধু তাই করেছেন।’ আহমেদ অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে পারা এবং নাগরিকত্ব পাওয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বলেও জানান আহমেদ।

বাবা ফাতেহ ও মা মালাকা

আজ সকালে আহমেদের বাবা ফাতেহ এবং মা মালাকা বলেন, তাঁদের ছেলের মনের অবস্থা বেশ ‘ফুরফুরে’।

ফাতেহ বলেন, ‘দানব ও খুনিদের’ কাছ থেকে নিষ্পাপ মানুষকে রক্ষায় সাহায্য করতে পারায় আহমেদ সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানান।

আহমেদের মা মালাকা জানান, তাঁর ছেলে মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন, এ খবর শোনার পর তাঁর কান্না চলে আসে। অনেকক্ষণ তিনি কান্না থামাতে পারেননি।

আহমেদের সাহসিকতার প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার এক সাহসী মানুষের কথা আপনারা হয়তো খবরের কাগজে পড়েছেন। তিনি একজন অত্যন্ত সাহসী মানুষ। তিনি সরাসরি এক বন্দুকধারীকে নিরস্ত্র করেছেন।’

আহমেদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ট্রাম্প যুক্ত করেন, ‘তিনি অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত সাহসী মানুষ। তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় এখন হাসপাতালে আছেন।’

আহমেদ ২০০৬ সালে সিরিয়ার থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। ৪৩ বছর বয়সী আহমেদ একটি তামাকের (অবশ্য শুরুতে বলা হয়েছিল ফলের) দোকানের মালিক। তাঁর দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। তাঁদের বয়স ছয় ও পাঁচ বছর।

আহমেদের চাচাতো ভাই মোস্তফা বলেন, রোববার রাতে হাসপাতালে পৌঁছার পর থেকে তিনি ঘুমাতে পারেননি।

মোস্তফা বলেন, ‘আহমেদ অন্যদের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনও হারাতে পারতেন। নিঃসন্দেহে তিনি একজন নায়ক। আমি আশা করি, অস্ট্রেলিয়ার সবাই আহমেদের জন্য শুভকামনা জানাবে এবং তিনি আবার তাঁর পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন।’

আহমেদের দোকান যে এলাকায়, সেখানকার লরি অ্যান্টোনিয়াডিস নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘যখন আমি জানতে পারলাম বন্দুকধারীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করা ব্যক্তি আমার মহল্লার তামাকের দোকানের মালিক। তখন আমি তাঁর দোকানে যাই। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়েছিলাম। তিনি একজন অসাধারণ মানুষ। কিন্তু আজ আহমেদের দোকান বন্ধ ছিল।’

গতকাল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে দুই বন্দুকধারীর গুলিতে অন্তত ১১ জন নিহত হন। এক শিশুসহ আহত হন ২৯ জন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। সন্দেহভাজন হামলাকারীদের একজন নিহত হয়েছেন। আরেকজনকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়।

বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইহুদিদের বার্ষিক ‘হানুক্কাহ’ উৎসব শুরু উপলক্ষে বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে গতকাল এক হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। সেই উৎসব লক্ষ্য করেই এ হামলা চালানো হয়।

হামলাকারীর একজন ২৪ বছর বয়সী নাভিদ আকরাম। তিনি পেশায় নির্মাণশ্রমিক। সম্প্রতি বেকার হয়ে পড়েন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে পুলিশ। তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল আছে।

অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, নাভিদের বাবা সাজিদ ১৯৯৮ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। তবে তিনি কোন দেশ থেকে এসেছিলেন, তা জানাননি।

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেছেন, নাভিদ জন্মসূত্রে অস্ট্রেলীয় নাগরিক। ২০১৯ সালের অক্টোবরে তিনি অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন (এএসআইও) নামের গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে ছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-15%2Fy8xs4xnx%2FMinns-visits-Ahmed-al-Ahmed.jpg?rect=0%2C490%2C930%2C620&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আহত আহমেদ আল আহমেদকে হাসপাতালে দেখতে যান নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ক্রিস মিনস। ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

সোনা, চোরাচালান ও ক্ষুধা: সুদানে যেভাবে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ by ওসামা আবুজায়েদ

৮ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানের আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) দেশটির সবচেয়ে বড় তেলক্ষেত্র হেগলিগ দখল করে। এর ফলে দক্ষিণ সুদানের তেল রপ্তানির প্রধান প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এই তেল রপ্তানি থেকেই দেশটির প্রায় সব রাজস্ব আসে। তেলক্ষেত্রটি সুদানের দক্ষিণ সীমান্তের কাছে পশ্চিম কোরদোফান এলাকায় অবস্থিত, যেখানে ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীগুলো প্রায়ই সংঘর্ষে জড়ায়। এর আগে আরএসএফের বিরুদ্ধে সুদানি সশস্ত্র বাহিনী ওই স্থাপনায় ড্রোন হামলার অভিযোগ তোলে। ওই ড্রোন হামলার কারণে গত আগস্ট মাসেও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক উত্তর কোরদোফানের হামরাত আল শেখ এলাকায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির একটি ট্রাকে হামলার নিন্দা জানান। ট্রাকটি উত্তর দারফুরের তাওইলায় বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া একটি বহরের অংশ ছিল। বাস্তুচ্যুত মানুষেরা মূলত এল ফাশের ও আশপাশের এলাকায় সংঘাতের কারণে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল।

ওই হামলায় আটজন নিহত হয় এবং অনেক আহত হয়। গত এক বছরে সুদানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মী, স্থাপনা বা সম্পদের ওপর এটি ছিল ষষ্ঠ বড় ধরনের হামলা।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এমন এক যুদ্ধের বহিঃপ্রকাশ, যা নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে চলছে। হেগলিগের মতো রাজস্ব আয়ের অবকাঠামো দখল করা এবং মানবিক সহায়তার পথগুলোয় হামলা চালানো একই সংঘাত-যন্ত্রের দুটি চালিকা শক্তি। একদিকে এগুলো যুদ্ধ চালানোর অর্থ জোগাড় করে, অন্যদিকে অভাব ও সংকটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে এবং প্রতিরোধের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

সুদানের সংঘাত যখন চতুর্থ বছরে পা দিতে যাচ্ছে, তখন বিশ্বের দৃষ্টি ধীরে ধীরে সরে গেছে নানা দিকে। কিন্তু ১ কোটি ২৪ লাখ বাস্তুচ্যুত সুদানির জন্য এ যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য সংকটের কারণে। সেটি হলো দেশের অর্থনীতিকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া।

আকাশপথে হামলা ও ব্যাপক সহিংসতা সংবাদ শিরোনামে থাকলেও এর পাশাপাশি আরেকটি নীরব যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধ চালানো হচ্ছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, সম্পদ লুট এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করার মাধ্যমে।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদানি সশস্ত্র বাহিনী ও র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সুদানি পাউন্ডের মূল্য অন্তত ২৩৩ শতাংশ কমে গেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়ে গেছে ১১৩ শতাংশ। বর্তমানে ২ কোটি ৪৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছে, যা বিশ্বে এখন পর্যন্ত রেকর্ড সর্বোচ্চ সংখ্যা!

কিন্তু এই পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে একটি হিসাবি বাস্তবতা। সুদানের যুদ্ধকে শুধু সামরিক বিশ্লেষণ দিয়ে বোঝা যায় না।

দেশটিতে স্পষ্টভাবে একটি মুদ্রাযুদ্ধ চলছে এবং মূল্যস্ফীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিপর্যয় কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি ইচ্ছাকৃত কৌশল।

সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোয় ব্যাংকব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ব্যাংকের শাখা লুট হয়েছে, ভল্ট খালি করে নেওয়া হয়েছে। দারফুরের কিছু এলাকায় মানুষ খাবারের বিনিময়ে নিজেদের ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম সোনার ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও সুদানের এ সম্পদই এখন যুদ্ধের অর্থের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর উৎপাদিত সোনার ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ প্রতিবেশী দেশ হয়ে পাচার করা হয়। শুধু ২০২৪ সালেই এর মাধ্যমে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার আয় হয়েছে।

দারফুরের ক্ষুদ্র সোনার খনির ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে আরএসএফ। অন্যদিকে সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রীয় খনি আয়ের পয়সা অস্ত্র কেনার কাজে ব্যবহার করছে।

আরএসএফ তাদের যুদ্ধ চালানোর অর্থ জোগাড় করতে সুদানের গাম অ্যারাবিক বাণিজ্যকেও অস্ত্রে পরিণত করেছে। গাম অ্যারাবিক একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পণ্য, যা কোকাকোলার মতো পণ্যে ব্যবহৃত হয়। কোরদোফান ও দারফুরের প্রধান উৎপাদন অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোষ্ঠীটি অনানুষ্ঠানিক কর আরোপ করেছে, গুদাম লুট করেছে এবং সীমান্ত পেরিয়ে রজন পাচার করেছে।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে মাত্র ছয় মাসে লুট করা গাম অ্যারাবিক বিক্রি করে পাওয়া ১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার আরএসএফের কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সহায়তা লুট এবং টিকে থাকার নামে কর আদায়ের মাধ্যমে লুটতরাজভিত্তিক একটি অর্থনীতি গড়ে তুলেছে আরএসএফ।
খাদ্যসহায়তার বহর জব্দ করে সেগুলো আরএসএফ পরিচালিত বাজারে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হয়। ত্রাণকর্মীরা আরএসএফ–নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয় পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধেও তুলেছেন।

এত কিছুর পরও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল। ২০২৫ সালের জন্য জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা আহ্বানের মাত্র ২১ শতাংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। বড় দাতারা ২০২৪ সালের তুলনায় সহায়তা বাজেট ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

নিজস্ব আয়ের উৎসে ভর করে চলা এই যুদ্ধ শুধু যুদ্ধবিরতিতে থামবে না। সহিংসতাকে বারবার নতুন করে জিইয়ে রাখে যে আর্থিক কাঠামো, তা ভেঙে না ফেললে কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াই অর্থবহ হতে পারে না।

কাগজে লেখা কূটনৈতিক সমঝোতায় সুদানের যুদ্ধের অবসান হবে না। এর অবসান ঘটবে তখনই, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবশেষে সেই অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কগুলোর মুখোমুখি হবে, যেগুলো এই যুদ্ধকে টিকিয়ে রেখেছে। বার্তাটি স্পষ্ট। ছায়া অর্থনীতির এই যুগে টেকসই শান্তি চাইলে অবশ্যই একটি কঠোর অর্থনৈতিক জবাবদিহির পথে যেতে হবে।

ওসামা আবুজায়েদ, খার্তুমভিত্তিক উন্নয়ন ও সুশাসনবিষয়ক গবেষক
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

সুদানে রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধ চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে
সুদানে রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধ চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। ছবি: রয়টার্স

শিশু সাজিদের করুণ মৃত্যু ও রুষ্ট কৃষকদের বিপদ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

প্রকাশ ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ কয়েক বছর আগের কথা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে পানি খেতে চেয়েছিলাম। তিনি আলমারি থেকে একটা পানির বোতল বের করলেন। তারপর পিয়নকে ডেকে বললেন, ‘ওনাকে হাফ গ্লাসের একটু বেশি পানি দাও। লাগলে উনি আবার নেবেন।’ সেই প্রথম পানি মেপে দেওয়ার ঘটনায় আমি যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিলাম। আর ওই চিকিৎসককে মনে মনে কঞ্জুস ভেবেছিলাম।

এর কয়েক বছর পরের কথা। ২০২২ সালের মার্চ মাসে সেচের পানি না পেয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দুই সাঁওতাল কৃষক অভিনাথ মারান্ডি ও রবি মারান্ডি বিষ পান করে আত্মহত্যা করলেন। এরপর আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ওই চিকিৎসক কতটা দূরদর্শী ছিলেন। আবার বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটা গবেষণা তথ্য দেখে চমকে উঠলাম, ‘এক কেজি ধান উৎপাদনে নাকি বরেন্দ্র অঞ্চলে তিন হাজার লিটার পানি খরচ হয়।’

এদিকে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে তুলতে মাটির নিচের জলধারক স্তর (অ্যাকুইফার) মারা যাচ্ছে। যে স্তরে পানি থাকে, সেই স্তরে মোটা বালু থাকে। তাকে অ্যাকুইফার বলা হয়। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে অ্যাকুইফারের মোটা বালু যখন ধুলা হয়ে যায়, তখন ওই অ্যাকুইফারকে মৃত বলা হয়। তারপর ওপর থেকে যতই বৃষ্টি হোক, ওই স্তরে আর পানি জমে না। রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর ও গোমস্তাপুর উপজেলা এবং নওগাঁর পোরসা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের মাটির নিচের অবস্থা এখন সেই রকম।

সুইজারল্যান্ড সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় বেসরকারি সংস্থা ডাসকো ফাউন্ডেশন ও সুইস রেডক্রস যৌথভাবে ‘সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ আওতায় ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একটি জরিপ সম্পন্ন করেছে। এই জরিপ থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের এই তথ্য জানা গেছে। তার আলোকে গত ২৫ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ নির্বাহী কমিটি এলাকাটিকে পানি সংকটাপন্ন ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। গত ৬ নভেম্বর সরকার এই এলাকাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। তার আগে ওয়ারপো ২০১৮ সালে পানি বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এখন এই বিধিমালা অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে হবে। এতে অগ্রাধিকার পানি খাওয়ার পানি।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার শুরু করে। তারা মাটির নিচের পানি শূন্যতার অবস্থা আন্দাজ করে ২০১৫ সাল থেকে বরেন্দ্র এলাকায় সেচের জন্য আর নতুন নলকূপ না বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই ঘোষণা ষোলো আনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা যেখানে–সেখানে সেচপাম্প বসানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। বোরিং করে দেখছেন মাটির নিচে কোথায় অ্যাকুইফার পাওয়া যায়। গবেষকেরা বলছেন, কোথাও কোথাও পকেট অ্যাকুইফার রয়েছে। তাতে কিছু পানি অবশিষ্ট রয়েছে। তা যেকোনো সময় ফুরিয়ে যেতে পারে। আর ফুরিয়ে গেলেই সেই এলাকার মানুষকে পানি কিনে খেতে হবে। কিন্তু কার কথা কে শোনে! ওই এলাকার কৃষকেরা এতে রুষ্ট হচ্ছেন। আমি যেমন ওই চিকিৎসককে কঞ্জুস ভেবে মনে মনে রুষ্ট হয়েছিলাম।

কৃষকেরাও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ জারি করায় সরকারের ওপর মনে মনে রুষ্ট। তাঁরা উপজেলা সেচ কমিটির অনুমতি ছাড়াই পানির সন্ধানে জমিতে ‘বোরিং’ করেই যাচ্ছেন। কেউ কেউ বোরিংয়ের মুখটাও বন্ধ করার কথা ভাবছেন না। গত বুধবার (১০ ডিসেম্বর) সেই রকম একটা বোরিংয়ে পড়ে যায় তানোরের শিশু সাজিদ। উদ্ধারের পর শিশুটি পরে মারা যায়। সাজিদের মা রুনা খাতুন দোষী ব্যক্তির বিচার দাবি করেছেন। তাঁর আহাজারি দেখে হাজার হাজার মানুষ চোখের পানি ফেলেছেন। শিশুটি উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখতেও অনলাইনে চোখ রেখেছিলেন সারা দেশের মানুষ। শিশুটি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছে না–ফেরার দেশে।

এখন কার কথা বলবেন—সেচের পানি না পেয়ে আত্মহত্যাকারী কৃষক অভিনাথ মারান্ডি, রবি মারান্ডি, তাঁদের মামলার আসামি গভীর নলকূপের অপারেটর সাখাওয়াত হোসেন আর তানোরের পানির খোঁজে সরকারি বিধিনিষেধ অমান্য করে বোরিং করা কৃষক কছির উদ্দিন—কাকে কী বলবেন? আসামি সাখাওয়াত হোসেন ৪ মাস ৯ দিন হাজত খেটে বেরিয়েছেন। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। সাজিদের মা শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) দুপুর পর্যন্ত মামলা করেননি। করেন আর না করেন, দায়িত্ব অবহেলার দায় কিছুতেই কৃষক কছির উদ্দিন এড়াতে পারেন না। এই সবকিছু ঘটছে পানির জন্য। পানি দিয়ে ধান চাষের জন্য।

বাংলাদেশ সরকারের একজন উপসচিব রাজ্জাকুল ইসলাম ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি শাসনব্যবস্থা’ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এতে তিনি দেখিয়েছেন, ‘এই এলাকায় ধান চাষের চেয়ে অন্য ফসল করা কৃষকের জন্য লাভজনক। কিন্তু কৃষক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ধান ছাড়তে চান না। অন্য ফসল চাষের ঝুঁকি নিতে চান না। তা ছাড়া তিনি ধান চাষের টেকনোলজি ঐতিহ্যগতভাবেই জানে। গোলাভরা ধান থাকবে—এটা তাঁর মানসিক শান্তি ও সামাজিক মর্যাদা।’

তাঁরা বুঝতে পারছেন না যে তাঁরা গাছের ডালে বসে গোড়া কাটছেন। মানে ভবিষ্যৎ নষ্ট করছেন। এভাবে পানির স্তর নেমে যেতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে তাঁদের ধান চাষ ছাড়তে হবে, তা–ই নয়, বোতলজাত পানিও কিনে খেতে হবে।

এবার শিশু সাজিদের মায়ের কান্না সারা দেশের মানুষকে কাঁদিয়েছে। সরকার পানিনীতি বাস্তবায়ন করুক। বিএমডিএ পানি রেশনিং করুক। আমাদের চোখের পানি আর সেচের পানি মিলেমিশে যেন একাকার না হয়।

* আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
- মতামত লেখকের নিজস্ব

গত বুধবার এক কৃষকের খোঁড়া একটা বোরিংয়ে পড়ে যায় তানোরের শিশু সাজিদ। উদ্ধারের পর শিশুটি পরে মারা যায়
গত ১০ ডিসেম্বর বুধবার এক কৃষকের খোঁড়া একটা বোরিংয়ে পড়ে যায় তানোরের শিশু সাজিদ। উদ্ধারের পর শিশুটি পরে মারা যায়

বার্লিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে আলোচনায় কী পেল ইউক্রেন

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে একটি শান্তিচুক্তির জন্য সবশেষ জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে ইউরোপ ও ইউক্রেনের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে কিয়েভকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র কী কী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সোমবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ ইউরোপের নেতারা নিরাপত্তা নিশ্চয়তার একটি তালিকা সামনে এনেছেন। এতে বলা হয়েছে, কিয়েভ বাহিনীকে সহায়তা এবং দেশটির আকাশ ও জলসীমা রক্ষার জন্য ইউরোপের নেতৃত্বে একটি বাহিনী গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে হামলা থেকে ইউক্রেনকে রক্ষা করার জন্য আইনি প্রতিশ্রুতি দেবে ইউরোপ।

তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেনের যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের সমর্থনের কথা বলা হয়েছে। ইউক্রেনের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দেশটিকে সহায়তা করবে ইউরোপ। এই বাহিনীর সেনাসংখ্যা আট লাখের মধ্যে সীমিত থাকবে। যদিও একটি শান্তিচুক্তির জন্য ইউক্রেনের এর চেয়ে অনেক কম সেনা থাকতে হবে বলে দাবি করে আসছে মস্কো।

ইউক্রেনের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে। সেটি হলো রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করবে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন একটি ব্যবস্থা। ইউক্রেনে ভবিষ্যতে কোনো হামলার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা দেবে তারা। এ ছাড়া তালিকায় ইউক্রেনের পুনর্গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আসতে পারে জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে।

এর আগেও শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে ইউক্রেনের সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা হয়েছে। তবে কিয়েভের সুরক্ষার জন্য বার্লিনে ইউরোপীয় নেতাদের তুলনামূলক বেশি জোর দিতে দেখা গেছে। এবারের বৈঠকে কিয়েভে জন্য সবচেয়ে ভালো বিষয়টি হলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য ইউক্রেনের মাটিতে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর সেনাদের পেতে পারে তারা।

নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওই তালিকায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানি ছাড়াও ইউরোপের আরও সাত দেশের নেতারা সই করেছেন। দেশগুলোর ভাষ্য, যুদ্ধ বন্ধে রাজি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনে বিরাট নিরাপত্ত নিশ্চয়তা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সহায়তা দেবে এই তালিকা। আর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেছেন, ‘এখন আমাদের সত্যিকারের শান্তিপ্রক্রিয়ার সুযোগ রয়েছে।’

তাহলে কি এখন যুদ্ধ থেমে যাবে? এখনই তা বলা যাচ্ছে না। কারণ, আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এখন এই তালিকা রাশিয়ার কাছে নিয়ে যাবেন। এটা এখনো স্পষ্ট নয় যে ইউরোপের দেওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তার এই তালিকা আদৌ ক্রেমলিন মেনে নেবে কি না।

কারণ, প্রথমত, রাশিয়া চায় না ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ন্যাটোর কোনো সেনা মোতায়েন করা হোক। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনে রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চলগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। শিগগিরই হবে বলেও মনে হয় না। এরপরও মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা বলছেন, চুক্তির ৯০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে তাঁরা গুছিয়ে এনেছেন। এ বক্তব্যের সঙ্গে মাঠের চিত্র মেলালে সামনে শুধু অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-16%2Fd53o3n0k%2Fberlin.jpg?rect=10%2C0%2C678%2C452&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে বার্লিনে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিয়েভের আলোচনা। ছবি: রয়টার্স

সুশীলতা করে লাভ নেই, এবার লাশ পড়লে লাশ নেব: মাহফুজ আলম

জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর কোনো আক্রমণ হলে এবার পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেন অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।

তিনি বলেছেন, ‘আমাদের গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। একটা লাশ পড়লে আমরা কিন্তু লাশ নেব। অত সুশীলতা করে লাভ নেই। কারণ, অনেক ধৈর্য ধরা হয়েছে।’

জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আলোচনায় উঠে আসা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদে আজ সোমবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বদলীয় সমাবেশে বক্তব্যে এই হুঁশিয়ারি দেন মাহফুজ আলম। ইনকিলাব মঞ্চ এই সমাবেশ আয়োজন করে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবির আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা ওসমান হাদিকে গত শুক্রবার ঢাকার বিজয়নগরে গুলি চালায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই দুর্বৃত্ত। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আজ সরকারি ব্যবস্থাপনায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়েছে। তিনি ঢাকা–৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে প্রচার চালাচ্ছিলেন।

আগামী ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বানচাল করতেই ওসমান হাদির ওপর হামলা বলে মনে করছে পুলিশ। গুলিবর্ষণকারী হিসেবে পুলিশ যাকে চিহ্নিত করেছে, সেই ফয়সল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সন্দেহভাজন আরেক হামলাকারী শেখ আলমগীর ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হাদির ওপর হামলার পর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বৈঠকে এ ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে সর্বদলীয় প্রতিবাদ সভা করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তার আলোকে আজ অনুষ্ঠিত সমাবেশে জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণেরা যোগ দেন।

নির্বাচনের আগে ১০ ডিসেম্বর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে আসা মাহফুজ আলমকে আজই প্রথম কোনো প্রকাশ্য সভায় দেখা গেল। তিনি দেশের সামনে ‘সংকটময়’ পরিস্থিতি আসার শঙ্কা প্রকাশ করে বক্তব্য দেন।

মাহফুজ আলম বলেন, ‘৫ আগস্টের পর যখন মুজিববাদীদের, আওয়ামী লীগ ও ১৪–দলীয় সন্ত্রাসীদের প্রতিটি বাড়ি চুরমার করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল, সেদিন আমরা নিজেদের সংবরণ করেছিলাম বলে আজকে তারা এই সাহস পাচ্ছে। আমরা ক্ষমা করে যদি ভুল করে থাকি, তাহলে আমরা প্রতিজ্ঞা নেব, আমরা আর ক্ষমা করব না।’

বাংলাদেশে থেকে যারা ভারত ও ভিনদেশিদের স্বার্থ রক্ষা করবে, তাদেরও নিরাপদ থাকতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের ভেতরের রাজনৈতিক লড়াইকে যারা বাইরে নিয়ে গেছে, তাদের হুঁশিয়ার করে দিতে চাই যে যদি দেশের লড়াই দেশের বাইরে যায়, তাহলে মুক্তির লড়াইও এ দেশের বাইরে যাবে। আমরা যদি নিরাপদ না থাকি, এই দেশে আমাদের শত্রুরাও নিরাপদে থাকতে পারবে না। এটা হচ্ছে বেসিক কন্ডিশন।’

গত বছর অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার সে দেশে বসে বক্তব্য–বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করে মাহফুজ আলম বলেন, ‘ভারত থেকে আপনারা সন্ত্রাসের উসকানি দেবেন, সন্ত্রাস চালাবেন, আমার ভাইয়ের ওপর গুলি চালাবেন—এটা আমরা বরদাশত করব না।’

জুলাইয় অভ্যুত্থানের পক্ষে জেলায় জেলায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, জুলাইয়ের শক্তি গঠনমূলকভাবে শক্তিশালী হলে বিভিন্ন লড়াই মোকাবিলা করা সহজ হবে।

মুজিববাদীদের গণপ্রতিরোধের ঘোষণা নাহিদের

ওসমান হাদিকে গুলি করার মাধ্যমে জুলাই বিপ্লব ও বাংলাদেশকে আক্রান্ত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি সমাবেশে আগামীকাল মঙ্গলবার রাস্তায় রাস্তায় ‘প্রতিরোধযাত্রা’ করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া ও আইন অঙ্গনে যারা মুজিববাদের রাজনীতি পুনরায় শুরু করতে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ চলবে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারত যদি মনে করে তারা আগের মতোই বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ, নির্বাচনে কারসাজি করবে, সেই ভাবনা ভুল। ভারতের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্বও বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের সাবধান থাকতে হবে।

হাদির ওপর হামলাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ উল্লেখ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার পর সিইসির দায়িত্বে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ চাই, কিন্তু এই অথর্ব কমিশনের অধীনে তা সম্ভব বলে মনে করছি না।

সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর মানবতাবিরোধী অপরাধী হাসিনাকে ভারত জায়গা দিয়েছে। ভারতকে বলতে চাই, হাসিনাসহ বাংলাদেশে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক খুনিকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।’

নীল দলের শিক্ষকদের বের করে দিতে হবে: হাসনাত

সমাবেশে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ভারত বাংলাদেশকে ফিলিস্তিন বানাতে চায়। ওসমান হাদির ওপর যারা আক্রমণ করেছে, তারাসহ বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের ভারত আশ্রয়–প্রশ্রয় দিচ্ছে। স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এটা চলতে থাকলে আমরাও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়–প্রশ্রয় দেব।

‘নীল দলের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগ সমর্থক শিক্ষকদের সংগঠন) পা চাটা শিক্ষকদের ধরে ধরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দিতে হবে’—এমন মন্তব্য করে হাসনাত বলেন, ‘নাটক-সিনেমা থেকে আওয়ামী লীগ ও মুজিবের পা চাটা দালালদের বের করতে হবে।’ তিনি বলেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বৈধতা উৎপাদনকারী ‘টক শোজীবীরা’ ফ্যাসিস্টদের মানবাধিকারে বিশ্বাস করেন, মজলুমদের মানবাধিকারে বিশ্বাস করে না।

এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সমাবেশে বলেন, ভারত যদি মনে করে হাসিনা ও ওসমান হাদির ঘাতকদের আশ্রয় দিয়ে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, তা কোনো দিন হবে না।

সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আপ বাংলাদেশ, লেবার পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন দলের নেতারা অংশ নেন।

মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরের সঞ্চালনায় এই সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমিতি রাওয়া ক্লাবের সভাপতি কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খান, খেলাফত মজলিসের নেতা আহমদ আলী কাসেমী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, আপ বাংলাদেশের সদস্যসচিব আরেফিন মোহাম্মদ, জনতার দলের মহাসচিব আজম খান, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার, ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ফাতিমা তাসনিম জুমা প্রমুখ।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-15%2Fduqdx2vx%2Finquilab-mancha-mahfuj.jpg?rect=1%2C0%2C1599%2C1066&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। আজ সোমবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ইনকিলাব মঞ্চ আয়োজিত ‘সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশে’ ছবি: প্রথম আলো