Thursday, May 21, 2020

কোয়েলের ডিমের যত গুণ

মুরগির ডিমের চাইতেও বেশি প্রোটিন থাকে কোয়েলের ডিমে। এই ডিমে প্রোটিন ছাড়া আরও মিলবে ফসফরাস, আয়রন, কার্বোহাইড্রেট, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, জিঙ্ক, ফলেট, ভিটামিন এ, ই, ডি এবং বি-১২। জেনে নিন কোয়েলের ডিম খেলে কী কী উপকার পাবেন।
কোয়েলের ডিম
  • *উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় কোয়েলের ডিমে থাকা পটাশিয়াম।
  • *কোয়েলের ডিমে থাকা প্রোটিনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান শারীরিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
  • *রক্তের দূষিত পদার্থ দূর করে।
  • *কোয়েলের ডিমে ওভোমুকোয়েড প্রোটিন আছে। এটি শরীরের প্রাকৃতিক অ্যান্টি অ্যালার্জিক হিসেবে কাজ করে।
  • *রক্তশূন্যতা দূর করে।
  • *কিডনি ও লিভার ভালো রাখে। কোয়েলের ডিমে থাকা একটি উপাদান ‘লেসিটিন।’ এই উপাদানটি কিডনিতে পাথর হওয়া রোধ করে।
  • *এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ঠাণ্ডাজাতীয় সমস্যা থেকে পরিত্রাণ দেয়।
  • *এতে থাকা ভিটামিন ও ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখে। 
জেনে নিন
যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি তারা অতিরিক্ত কোয়েলের ডিম খাবেন না। কোনও ধরনের এলার্জি বা শারীরিক সমস্যা হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন ডিম।
>>>তথ্য: বোল্ডস্কাই

কলকাতার মধ্যরাতের জাদু

কলকাতার আইকনিক স্টুয়ার্ট হগ মার্কেটের আঙিনায় তখন মধ্যরাত। সকালে যে জায়গাটায় হকার আর খদ্দেরদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে তোলপাড় থাকে, সেই স্থানটি মধ্যরাতে হয়ে গেল গণবিছানা। সেখানকার কর্মীসহ স্থানীয়রা কার্ডবোর্ড, কম্বল, সংবাদপত্র – যে যা পেরেছে, তাই বিছিয়ে বিছানা বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
রাস্তার বাতিগুলো উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। প্রাইভেসি বলতে এখানে কিছুই নেই।
এই দৃশ্য দেখার মজাই আলাদা। আর এ কারণেই গভীর রাতে ভারতীয় মহানগরীগুলোর দৃশ্য দেখার আয়োজন বাড়ছে।
এই উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন অ্যান্থনি খাতচুতুরিয়ান। উপনিবেশ আমলের কলকাতার এক নির্মাতার নাতি তিনি। নগরীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হেঁটে হেঁটে দেখানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এসব স্থাপনার আপিল কোনো দিনই ফুরাবার নয়।
আইডিয়াটি কলকাতার লোকজনকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। খরচও বেশি নয়। মাথাপিছু মাত্র ১৫ ডলার। বেসরকারি অনেক কোম্পানি এখন নৈশ অভিযানে নিয়ে যাচ্ছে পর্যটকদের। এসব কোম্পানির একটি হলো লেট আজ গো। এই ট্যুরে সবচেয়ে বেশি যে লাভটি হয় তা হলো নগরীর ইতিহাসে আরো সহজে প্রবেশ করা যায়।
আগ্রহী অংশগ্রহণকারীরা শেষ রাতের শ্রমিকদের ঠিক বিপরীত দিক দিয়ে চলে এই আগ্রহী পর্যটকেরা। এই সময় রাস্তা থাকে ফাঁকা। ফলে নির্জন রাস্তায় চলার আলাদা মজাও পাওয়া যায়।
এই পর্যটনের একটি বিখ্যাত যাত্রাবিরতি ঘটে আর্ট ডেকো স্টেটসম্যান হাউজে। একসময় এখান থেকেই কিংবদান্তিপ্রতীম সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হতো।এখন ভবনটি আগের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর আছে অল ইন্ডিয়া রেডিওর একসময়ের অফিস ভবনটি। পাশেই আছে সেন্ট জন্স চার্চ। এই চার্চের ঘন্টা কথা বলে পর্যটকদের সাথে। রেডিও অফিস ভবনটির অস্তিত্ব নেই, তবে একটি বটবৃক্ষ এখনো মৃদুমন্দ বাতাস দিয়ে অতীত দিনের স্মৃতি জানিয়ে রাখছে। এই ভবনেই এক বিখ্যাত পিয়ানো বাদকের মৃত্যু ঘটেছিল। এখনো নাকি তিনি তার বাজনা থামাননি। অ্যান্থনি খাতচুতুরিয়ান জানিয়েছেন, তার প্রথম দিকের এক ট্যুরে হঠাৎ করে দুই নারী দৌড় দিয়েছিলেন। তাদের একজন আবার কাঁদছিলেন। দুজনই দাবি করেছেন, তারা পিয়ানো মিউজিক শুনেছেন।
তিনি জানান, মজার ব্যাপার হলো, ওই পিয়ানোবাদক যে এখানে মারা গিয়েছিল, তা কিন্তু তখনো ওই দুই নারী জানতেন না। পরে তারা শুনেছিলেন ঘটনাটি।

রাতের সফরে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশই উপনিবেশ আমলের ভবনগুলোতে ঢু মারতে যান। আর এসব অফিস নিশুতি রাতে থাকে সুনশান। তাদের সফর তালিকায় ব্ল্যাক হোলও থাকে। ব্রিটিশরা বলেছিল, এখানে বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বদ্ধঘরে আটকিয়ে ১৪৩ জন ইংরেজকে দম বন্ধ করে মেরেছিলেন। আজো সফরের সময় এটিও পর্যটকদের মনে দাগ কাটে।
মধ্যরাতের সফরে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই ভুতুরে কাহিনীর ঝাপি মেলে ধরেন। প্রায় সবারই নিজেদেরই ভূত দেখার অভিজ্ঞতা আছে কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে কাহিনী শুনেছে। আবার অনেকে ব্ল্যাক হোলে গিয়েও ভুতুরে কাণ্ডকারখানার সাথে পরিচিত হন।
কলকাতায় অবশ্য রাতের বেলায় নয়, দিনের বেলাতেও ভূতের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে দিনের বেলাতেও থাকে ভীতিকর নীরবতা। এই কলকাতা ১৯১১ সাল পর্যন্ত ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। ওই আমলে করা কলকাতা হাইকোর্ট, রাজভবন, রাইটার্স বিল্ডিং এখনো আগের দিনের কথা সামনে নিয়ে আসছে।
ওই আমলের অনেক ভবন পরিত্যক্ত হয়ে হয়ে এখন বট গাছের আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
খাতচুতুরিয়ান জানান, অনেকেই এসব ভবনে ভূতের দেখা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তারা এসব কাহিনী বেশ জোর দিয়ে বলেও থাকেন।
বাঙালিদের মধ্যে ভূতের গল্প বেশ প্রচলিত। গল্পকাহিনীতে ২৫ ধরনের ভূতের দেখা মেলে। এসব কাহিনী নিয়ে অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে আসছে।
হেরিটেজ ওয়াক কলকাতার মালিক ড. তথাগত নিয়োগি ও তার স্ত্রী চেলসি ম্যাকগিলের মতে, কলকাতার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ভালোবাসা এই নগরীকে অতিপ্রাকৃতি পর্যায়ে এনে দিয়েছে।
এসব কাহিনী শুনতে শুনতেই অনেক সময় সফর শেষ হয়ে যায়। ভোরের আলো তখন ফুটে ওঠে। ভূত থাকুক বা না থাকুক, ভূতুরে এই সফর আপনাকে নিশ্চিতভাবেই আনন্দ দেবে। অজানাকে জানার আনন্দে আপনার মন ভরে ওঠবে।

করলার পুষ্টিগুণ

তিতকুটে করলা খেতে অনেকেই পছন্দ করেন না। তবে জানেন কি সুস্বাস্থ্যের জন্য করলা খাওয়া কতোটা জরুরি? করলায় রয়েছে প্রোটিন, আয়রন, ফাইবার, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, জিঙ্ক, কপারসহ আরও অনেক ভিটামিন ও মিনারেল। জেনে নিন নিয়মিত করলা খাবেন কেন।
  • রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে করলায় থাকা অ্যান্টিডায়াবেটিক উপাদান। প্রতিদিন করলার রস পান করলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।
  • মেদ দূর করতে সাহায্য করে করলা।
  • উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায় করলা। নিয়মিত করলা খেলে রক্তে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টরলের মাত্রা কমে। করলায় রয়েছে প্রচুর মাত্রায় আয়রন এবং ফলিক অ্যাসিড। এই দুটি উপাদান কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর পাশাপাশি শরীরের লবণের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
  • লিভার ভালো রাখে এই সবজি।
  • করলায় থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান ও ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অ্যালার্জি এবং সংক্রমণের প্রকোপ কমাতেও সাহায্য করে এটি।
  • লিভার, স্তন ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমে নিয়মিত করলা খেলে।

যৌথ পরিবারের একাল-সেকাল

যৌথ পরিবার
আত্মকেন্দ্রিক ও নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ায় ভাঙছে যৌথ পরিবার। বড় পরিবার ভেঙ্গে ছোট পরিবারে রূপ নেওয়ায় শিথিল হচ্ছে সম্পর্কের বন্ধন। সময় বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে মূল্যবোধ। সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে সমাজের অনুশাসন। আগে যৌথ পরিবারগুলো যখন এক ছিল তখন সবাই নিজেদের স্বার্থ পরিত্যাগ করে এক থাকার চেষ্টা করে গেছেন বছরের পর বছর। পরিবারের সন্তানরা দাদা-দাদি, চাচা-চাচিদের কাছে বড় হয়েছে। কিন্তু এখন যৌথ পরিবার থেকে বেরিয়ে আসা চাকরিজীবী বাবা-মায়ের সন্তানরা কাজের লোক কিংবা চাইল্ড কেয়ারে বড় হচ্ছে। অনেকেই বৃদ্ধ মা-বাবাকে ওল্ড হোমে রেখে আসছেন। পেশাগত কারণেও যৌথ পরিবার পৃথক হচ্ছে। যৌথ পরিবারে বড় পাতিলে রান্না, একসঙ্গে খাওয়ার মতো অসাধারণ ব্যাপারগুলো এখন শুধুই স্বপ্ন। প্রতিবেদনে বাংলা ট্রিবিউনের রাজশাহী প্রতিনিধি দুলাল আবদুল্লাহ তুলে ধরেছেন ৪৬ বছর একসঙ্গে থাকা একটি যৌথ পরিবারের কথা। চট্টগ্রাম প্রতিবেদক হুমায়ুন মাসুদ লিখেছেন এক সময়ের ঐহিত্যবাহী দোভাষ পরিবারের জৌলুস হারানোর গল্প। আর সিলেট প্রতিনিধি তুহিন আহমেদ বলেছেন ৩৩ সদস্যের এক যৌথ পরিবার ভাগ হয়ে যাওয়ার গল্প।
৪৬ বছর যৌথ পরিবারে রাজশাহীর রথ বাড়ি
স্বাধীনতার পরপরই রাস বিহারী সরকারের মৃত্যু হয়। অনেক জমিজমা ও সম্পদসহ সাত ছেলের জন্য রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানা ভবনের পাশে পাঁচ কাঠা জায়গায় রেখে গেছেন একটি বাড়ি। সেই বাড়িতে ৪৬ বছর ধরে এখনও এক হাঁড়িতে পরিবারের সদস্যদের জন্য রান্না হয়। শুধু তাই নয়, পরিবারের সবার চিন্তা ও মতামতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। এ কারণে শহরের মধ্যে এই রথ বাড়িতে যৌথ পরিবারটি টিকে রয়েছে। কীভাবে সম্ভব হয়েছে জানতে চাইলে রথ বাড়ি পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান বিমল কুমার সরকার বলেন, ‘বাবা-মা ও বড় ভাই মারা যাওয়ার পরও আমরা সবাই একসঙ্গে থাকার মূলমন্ত্র হচ্ছে- ব্যক্তি শাসনতন্ত্র প্রথাকে এড়িয়ে চলেছি। কেউ বেশি আয় করে। আবার কেউ কম করে। এ নিয়ে কারও মধ্যে কোনও হিংসা-প্রতিহিংসা তৈরি করি না। বাড়ির বৌ’দের সেভাবে গড়ে তুলেছি। কারণ তারা তো অন্য পরিবারের সদস্য। তাদের মধ্যে আমাদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটতে নাও পারে। সেজন্য তাদের আমরা যৌথ পরিবারের ভালো দিকগুলো তুলে ধরে আমাদের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। যদি আমরা কোনোদিন দেউলিয়া না হই, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাজে প্রভাব না পড়ে তাহলে ভবিষ্যতেও এভাবেই যৌথ পরিবার নিয়ে বসবাস করে যাবো। আমাদের পরিবারে কাজের বুয়াসহ ২৫ জনের রান্না এক সঙ্গে হয়।’ বাড়ির নামকরণ ‘রথ’ রাখা হলো কেন- এমন প্রশ্নে বিমল কুমার সরকার জানান, স্বাধীনতার পর থেকে বিনা খাজনায় আমাদের পরিবার রাজশাহীতে রথমেলা করে থাকে। এজন্য বাড়ির নামটা রাখা হয়েছে রথ বাড়ি।
নগরীর আলুপট্টি এলাকার শফিউল ইসলাম বকুল জানান, দুই ছেলে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে আমাদের পরিবার। দুই বোন বিদেশে থাকে। তাই সংসারটা তেমন বড় নয়। তবে বর্তমানে যৌথ পরিবারের প্রথা আবার ফিরে আসছে। কারণ সবাই এখন ব্যস্ত জীবনযাপন করছে। এতে পরিবারের সন্তানদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যৌথ পরিবার ভূমিকা রাখতে পারে। স্বামী-স্ত্রী দুইজন চাকরি করেন। আর সন্তানকে কাজের লোকের কাছে রেখে যান। কিন্তু যৌথ পরিবার থাকলে সন্তান দাদি, নানি, চাচির কাছে রেখে যেতে পারতো। আবার দেখা যায়, অনেকের ছেলেমেয়ে বৃদ্ধ মা-বাবাকে ওল্ড হোমে রেখে আসেন। এটা হবে কেন? যৌথ পরিবার থাকলে এটা সম্ভব হতো না। তাই নিজেদের চিন্তা ও মতামতকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে আত্মত্যাগের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে যৌথ পরিবার টিকিয়ে রাখতে হবে। আর বর্তমান যুগে এটা খুব বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগেও অপরাধ প্রবণতা ছিল। কিন্তু বর্তমান সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। বড়দের প্রতি সম্মানবোধ কমে গেছে। তাই এসব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। লোভ-লালসা কমিয়ে ফেলতে হবে। সমাজ ও দেশের উন্নয়নে পরিবার থেকে ভালো শিক্ষা নিয়ে আগামীর জন্য সন্তানদের গড়ে তুলতে হবে।’
গোদাগাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘নিজেদের চিন্তা ও মতামতকে যখন বেশি করে গুরুত্ব দেওয়া হয় তখনই যৌথ পরিবার ভেঙে যায়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর বেড়ে যায়। আবার পেশাগত কারণেও যৌথ পরিবারে ভাঙন তৈরি হয়। এতে একে-অপরের মধ্যে সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, মূল্যবোধ, নৈতিকতার অভাব হয়। বর্তমানে যৌথ পরিবারের অভাবে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
ছয় ভাই ও চার বোনের যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠেছেন সহকারী অধ্যাপক মহিশাল বাড়ী এলাকার মুশফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার চাচারা ছিলেন সাতজন। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন চাচাদের ভয়ে কোন অপরাধমূলক কাজে জড়ানোর সাহস পেতাম না। তারা যদি আমার ভুল ধরে বকা দেন। আর বর্তমানে ছোট ছোট পরিবার হওয়ার কারণে ছেলেমেয়েদের মধ্যে ব্যক্তি স্বাধীনতা বেড়ে গেছে। পরিবারের ছোট সদস্যরাও এতে করে বড়দের সামনে কথা বলার ধৃষ্টতা দেখায়। এমনকি যৌথ পরিবার প্রায় বিলুপ্তির কারণে চাচাদের কাছ থেকেও এখন পরিবারের সদস্যরা সহযোগিতা পায় না।’
চট্টগ্রামের দোভাষ পরিবারে নেই আগের জৌলুস
এক সময় ফিরিঙ্গি বাজারসহ পুরো চট্টগ্রামে যাদের ছিল আধিপত্য, ঐতিহ্যবাহী সেই দোভাষ পরিবার এখন হারাতে বসছে জৌলুস। খান বাহাদুর আব্দুল হক দোভাষ ছিলেন জমিদার। তার হাত ধরেই নগরীর ফিরিঙ্গি বাজারে গড়ে উঠে ঐতিহ্যবাহী দোভাষ পরিবারের গোড়াপত্তন। পরবর্তীতে এই পরিবারের নিয়ন্ত্রণে আসে তৎকালীন চট্টগ্রাম নগরীর রাজনীতি। তার একমাত্র ছেলে ছিলেন নবী দোভাষ। আব্দুল হক দোভাষের মৃত্যুর দুই বছরের মাথায় মারা যান নবী দোভাষ। এরপরই মূলত ছোট পরিবারে রূপ নেয় দোভাষ পরিবার। বাবার মৃত্যুর পর নবী দোভাষের তিন ছেলে শাহ আলম দোভাষ, জানে আলম দোভাষ ও বদিউল আলম দোভাষ আলাদা হয়ে যান। তখন ঐতিহ্যবাহী দোভাষ পরিবার ঝিমিয়ে পড়ে। অবশ্য পরে আবার জৌলুস ফিরিয়ে আনেন জানে আলম দোভাষ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে রাজনীতি শুরু করেন জানে আলম দোভাষ। তার হাত ধরে জৌলুস ফিরে আসে দোভাষ পরিবারে। সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে রাজনীতি শুরুর পর ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন হয়ে উঠেন জানে আলম। আর তখন থেকে নগরীর রাজনীতির আঁতুড় ঘরে পরিণত হতে থাকে দোভাষ পরিবার।
জানে আলম দোভাষ মারা যাওয়ার পর দোভাষ পরিবারের সেই জৌলুস আবার কমতে শুরু করে। পরে এই পরিবারের ভাই বোনদের মাঝে সম্পদ ভাগাভাগির কারণে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে তৈরি হয় ছোট পরিবার। জানে আলম দোভাষের বাবা নবী দোভাষের মৃত্যুর পর দোভাষ পরিবার ভেঙ্গে রূপ নেয় চারভাগে। তিন ভাই ও এক বোন আলাদা হয়ে যান। জানে আলম দোভাষ এক ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে যান।
পরবর্তীতে জানে আলম দোভাষের পরিবার ভেঙ্গে রূপ নেয় চার পরিবারে। অন্যদিকে তার দুই ভাইয়ের একজন শাহ আলম দোভাষ রেখে যান দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। শাহ আলমের মৃত্যুর পর তার পরিবার ভেঙ্গে রূপ নেয় ৮ পরিবারে। জানে আলমের আরেক ভাই বদিউল আলম দোভাষ এখনও বেঁচে আছেন। তার দুই ছেলে রয়েছে। এক সময়কার দোভাষ পরিবার এখন ১৩ পরিবারে পরিণত হয়েছে।
সবাই যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত
সিলেট নগরের সাদারপাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম চৌধুরীর পরিবারে ছয় ভাই-বোনসহ সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৩ জন। এছাড়া কৃষিসহ গৃহস্থালি দেখাশোনার জন্য নারী-পুরুষসহ ছিলেন আরও সাতজন। নিজস্ব কৃষি জমিতে ধান চাষ করে তাতেই চলতো পুরো বছর। জমিতে চাষ হতো নানা ফসল। কিন্তু সেই যৌথ পরিবার এখন আর নেই। যৌথ পরিবারে বড় হওয়া নজরুল ইসলামরা প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যার যার মতো করে বাসা তৈরি করে আলাদা হয়ে গেছেন। এখন সবাই যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। একই দেয়ালের ভেতরে সবাই বসবাস করলেও সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া একে-অন্যের সঙ্গে তেমনভাবে দেখা হয় না।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আসলে যৌথ পরিবার বড় হতে থাকলে আলাদা হওয়াটা উত্তম। এতে পরিবারের কর্তাদের উপর অনেক চাপ কমার পাশাপাশি ব্যয়ও কমে যায়। দাদা-বাবাদের রেখে যাওয়া যৌথ পরিবারটি এক রাখার নিরন্তর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু সময়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে যৌথ পরিবারের মধ্যে থাকাটা খুবই আনন্দের যা বলে শেষ করা যায় না। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘যৌথ পরিবারে গৃহবধূরা একসঙ্গে বড় বড় পাতিলে রান্না করতেন। সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়াটা ছিল অসাধারণ ব্যাপার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এগুলো আর নেই। এসব বিষয় এখন অনেকটা স্বপ্নের মতো। এককথায় যৌথ পরিবারের মধ্যে আনন্দের মাখামাখি ছিল খুব বেশি।’
ওই পরিবারের গৃহিণী সেলিনা চৌধুরী জানান, যৌথ পরিবারের মধ্যে বসবাস করা যেমনটি আনন্দের তেমনি পরিবার যখন বড় হয়ে যায় তখন এর দায়িত্ব বহন করা এবং পরিচালনা অনেক কষ্টকর হয়ে যায়। এছাড়া যৌথ পরিবারের মধ্যে থাকতে হলে প্রথমেই পরিবারের সদস্যদের একই মন মানসিকতা থাকতে হবে। সবাইকে ছোট-বড় ভুলগুলো ছাড় দেওয়ার উদারতা থাকতে হবে। তবে যৌথ পরিবার বড় হয়ে গেলে আলাদা হওয়াটা অনেক ক্ষেত্রে উত্তম বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এসএম শওকত আমিন তৌহিদ বলেন, ‘যৌথ পরিবার ভাঙার পেছনে নগরায়ন একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সবচেয়ে মারাত্মক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশি চ্যানেলগুলো যেমন স্টার জলসা, জি বাংলা। এসব কারণেই যৌথ পরিবারগুলোর এক থাকা খুবই কষ্টকর। এসব চ্যানেল শুধু পরিবার ভাঙা দেখায় যৌথ থাকতে দেখায় না। এই চ্যানেলগুলোতে যা কিছু প্রচার করা হয় সবই পরিবারকেন্দ্রিক। এসব চ্যানেল যখন ছিল না তখন আমাদের দেশের পরিবারগুলোর মধ্যে খুবই আন্তরিকতা আর সহমর্মিতা ছিল। আমাদের দাদা-বাবারা যেভাবে যৌথ পরিবার দুঃখ দুর্দশার মধ্যে টেনে নিয়েছেন বছরের পর বছর- এখন আর সেটা নেই। সবাই যার যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। মনে করেন আলাদা হলেই জীবনব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। আমি মনে করি এটা সর্ম্পণ ভুল ধারণা।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এখন একই পরিবারের মধ্যে বসবাস করেও কেউ কারও ভালো চায় না। সন্তানদের পড়ালেখাসহ নানা বিষয়ের অজুহাতে এখন যৌথ পরিবার তেমন দেখা যায় না। সবাই মিলেমিশে থাকাটা এখন স্বপ্নের মতো হয়ে গেছে। এজন্য জাতিসংঘ আন্তর্জাতিকভাবে পরিবার দিবস উদযাপন করে।’ তিনি আরও বলেন, মুল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই বৃদ্ধ মা-বাবাকে সন্তানরা বৃদ্ধাশ্রমে রাখছেন। যদি যৌথ পরিবারগুলো একই ছাদের নিচে থাকতো তাহলে এই সমস্যা প্রকট হতো না। সবাই মিলেমিশে থাকার মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে তা আলাদা হয়ে গেলে আর থাকে না। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যৌথ পরিবার এক থাকলে তা কতটুকু শক্তি সঞ্চার করে তা বলে শেষ করা যাবে না।’

পশ্চিম তীরকেও ইসরায়েলের মানচিত্রে ঢোকাতে চান নেতানিয়াহু

লাস্ট আপডেট- ৭ এপ্রিল ২০১৯: ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পুননির্বাচিত হলে পশ্চিম তীরের সব ইহুদী বসতিকে ইসরায়েলের অংশ করে নেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
মঙ্গলবার ইসরায়েলে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে মিস্টার নেতানিয়াহুকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে দক্ষিণপন্থী দলগুলোর সঙ্গে - যারা চায় পশ্চিম তীরের অংশবিশেষ ইসরায়েল নিজের সীমানার মধ্যে ঢুকিয়ে নিক।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েল যেসব ইহুদী বসতি গড়ে তুলেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেগুলো অবৈধ। তবে ইসরায়েল তা মনে করে না।
ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সিরিয়ার কাছ থেকে যে গোলান মালভূমি দখল করে নেয়, সেটিকে নিজের সীমানায় ঢুকিয়ে নিয়েছিল আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে। গতমাসে যুক্তরাষ্ট্র গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের ভূমি বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
পশ্চিম তীরের ইহুদী বসতিগুলোতে প্রায় চার লাখ ইহুদীকে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে ইসরায়েল। পূর্ব জেরুসালেমেও একই ভাবে ২০ হাজার ইহুদীর জন্য বসতি গড়ে তোলা হয়েছে।
পশ্চিম তীরে থাকে প্রায় ২৫ লাখ ফিলিস্তিনি। যে ভবিষ্যত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে ফিলিস্তিনিরা, সেটি হওয়ার কথা পশ্চিম তীর এবং গাজা ভূখন্ড নিয়ে। আর তাদের রাজধানী হওয়ার কথা পূর্ব জেরুসালেম।
ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘাত নিরসনে যে কোন শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিতর্কিত একটি ইস্যু হচ্ছে পশ্চিম তীরের এসব বিতর্কিত ইহুদী বসতি।
পশ্চিম তীরে গড়ে তোলা ইহুদী বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।
ফিলিস্তিনিরা মনে করে, এই ইহুদী বসতিগুলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম বাধা। এগুলো একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারটিকে রীতিমত অসম্ভব করে তুলেছে।

কী বলেছেন নেতানিয়াহু

একটি ইসরায়েলি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে জিজ্ঞেস করা হয় কেন তিনি পশ্চিম তীরের বিরাট ইহুদী বসতির পর্যন্ত ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করছেন না।
জবাবে তিনি বলেন, "আপনি জানতে চাইছেন আমরা পরবর্তী ধাপে যাচ্ছি কীনা। আমার উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, আমরা পরবর্তী ধাপের দিকে যাবো।আমি ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করবো এবং আমি গুচ্ছ বসতি এবং বিচ্ছিন্ন বসতির মধ্যে কোন তফাৎ করি না। "

ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া কী?

একজন সিনিয়র ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা সায়েব এরেকাত বলেছেন, ইহুদী বসতির প্রশ্নে মিস্টার নেতানিয়াহু যে অবস্থান নিয়েছেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
তিনি বলেন, "যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্টের ট্রাম্প প্রশাসন, ইসরায়েলকে যা খুশি তা করার সুযোগ দিয়ে যাবে, ততদিন তারা নির্লজ্জভাবে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে যাবে। যেভাবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জনগণের জাতীয় অধিকার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে, তার জন্য ইসরায়েলকে বরং উল্টো পুরস্কৃত করা হচ্ছে।"
ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, "যে ঘোষণা বা যে পদক্ষেপই নেয়া হোক, তাতে সত্য বদলাবে না। এই ইহুদী বসতিগুলো অবৈধ এবং এগুলো অপসারণ করা হবে।"
'বিস্ফোরক মন্তব্য'
বিবিসির আরব বিষয়ক বিশ্লেষক সেবাস্টিয়ান আশার বলছেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইহুদী বসতি সম্পর্কে যা বলেছেন, তা সম্ভাব্য মারাত্মক গণবিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। কারণ বহু বছর ধরে এই ইস্যুতেই শান্তি প্রক্রিয়া বার বার থমকে গেছে।
তিনি বলছেন, মিস্টার নেতানিয়াহু যেসব দলের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করতে চাইছেন, তারা এই কথা শুনে বেশ খুশি হবে। কিন্তু এটি ফিলিস্তিনিদের মারাত্মক বিক্ষুব্ধ করে তুলবে। এটি আন্তর্জাতিকভাবেও নিন্দিত হবে।
সেবাস্টিয়ান আশার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাতে হয়তো বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।

এর পেছনে রাজনীতিটা কী?

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দক্ষিণপন্থী লিকুদ পার্টির সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে নীল এবং সাদা জোটের।
কিন্তু অন্য অনেক ছোট ছোট দক্ষিণপন্থী দল আছে, যাদের সমর্থন হয়তো পরবর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। লিকুদ পার্টির ২৯ জন এমপির মধ্যে মিস্টার নেতানিয়াহু ছাড়া আর সবাই চান, ইহুদী বসতিগুলোর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে।
এতদিন পর্যন্ত মিস্টার নেতানিয়াহু ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম। এখন মনে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তিনিও তার অবস্থান বদলাচ্ছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন বেপরোয়া করে তুলেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে

শ্রীলঙ্কার ওয়েরেলেগামা মন্দিরে গৈরিক পোশাকধারী তরুণ প্রহরীদের মন গড়ে দিচ্ছেন এক শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা

শান্তভাবে সারি বেঁধে একে একে এগিয়ে চলেছেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। লাইনের একেবারে শেষপ্রান্তে আছে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য, সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন তার পরিধেয় বস্ত্র সংযত রাখতে। তার বয়স ৫ বছর। ভিক্ষুরা ক্যান্ডির একটি পল্লীর মঠ থেকে কলম্বোর সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত বৌদ্ধ উপাসনালয় গঙ্গারামায়া মঠে এসেছে। সন্ন্যাসীদের সামনে আছেন শ্রদ্ধেয় সূর্যগোদা জিনাসিরি হিমি। তিনি শিক্ষক ও তরুণ ভিক্ষুদের কাছে পিতৃতুল্য ব্যক্তিত্ব। তারা বৌদ্ধ মূর্তির কাছে তাদের প্রার্থনা সম্পূর্ণ করলেন। তবে তরুণ সন্ন্যাসী থেকে শিশুতে পরিণত হতে বেশি সময় লাগল না তাদের।
একজন দৌড়ে জিনাসিরি হিমির জোব্বা টেনে ধরলেন। আরেকজনও অনুসরণ করলেন তাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই ছাত্রদের দল তাকে ঘিরে ফেলল। ছুটির দিনে শিশুরা যা করে, তারাও সেটি করার সুযোগ হারাতে চাইলেন না। সাগর সৈকতে কখন তারা খেলার সুযোগ পাবেন? তারা কি নৌকায় চড়তে পারবেন? মন্দিরের শোভাযাত্রায় অংশ নেয়ার আগে তারা কি হাতিগুলো দেখার সুযোগ পাবেন? জিনাসিরি হিমি প্রশ্নগুলোর জবাব দিলেন, সবকিছুর জবাবে বললেন, হ্যাঁ।
এখানে ৫ বছর বয়সের আরেকজন আছেন। তাকে তার মা-বাবা কয়েক সপ্তাহ আগে মঠের কাছে হস্তান্তর করেছেন। তিনি এখন ৪০ দিনের বৌদ্ধ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। এটি শেষ হলে তিনি পোশাক পাবেন। চেহারায় রুষ্ট ভাব তার। এক বয়স্ক সন্ন্যাসী হেসে জানালেন, এই শিশুটিও গৈরিক পোশাক পরে কলম্বো আসতে চেয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার পার্বত্য রাজধানী ক্যান্ডির ওয়েরেলেগামা গ্রামের একটি মঠ থেকে ১৫টি শিশু এসেছে। তারা ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বার্ষিক হেরাহেরা (ধর্মীয় শোভাযাত্রা) ও পূর্ণ পোয়া দিবস উদযাপন করতে। ওই দিন বৌদ্ধ ছুটির দিন। কলম্বোর সবচেয়ে পুরনো ও জাঁকজমকপূর্ণ মঠ হলো গঙ্গারামায়া। তরুণ সন্ন্যাসীরা শ্রদ্ধায় অবনত। তাদের অনেকে এই প্রথম রাজধানী নগরীতে এসেছে।
জিনাসিরি হিমি বলেন, তার সাথে এখন ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১৫ জন ইন-হাউস প্রশিক্ষণ গ্রহণরত সন্ন্যাসী রয়েছেন। তারা রিরিভেনায় তারই ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়ন করে। ৪৭ বছর বয়স্ক জিনাসিরি হিমি বলেন, তরুণ সন্ন্যাসীদের শিক্ষা ও কল্যাণের জন্য অনেক কিছু করা উচিত।
তিনি বলেন, আমি তাদের মা, বাবা, শিক্ষক ও প্রধান সন্ন্যাসী। আমি ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনরত থাকি। এই এক দিন আগে একজন গাছে চড়তে গিয়ে পা ভেঙে ফেলেছে। আমার সবসময় মনে থাকে যে তারা শিশু, তাদের পরিচর্যার প্রয়োজন, যত্নের সাথে তাদের পরিচর্যা করা উচিত। অনেক সময় শিশুদের মা-বাবা ও স্বজনেরা মন্দিরে আসেন। শিশুরা তাদের বাড়িতে যায়, তবে তারা তাদের নতুন বাড়ি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকে, এখানকার শিশুরা তাদের নতুন ভাইয়ে পরিণত হয়ে যায়।
জিনাসিরি হিমি বলেন, ১৯৮৮ সালে তিনি নিজে ১৩ বছর বয়সে একটি পল্লী মঠে প্রবেশ করেছিলেন। তখন সিংহলি প্রদেশগুলোতে জেভিপি মাক্সির্স্ট আন্দোলনে আক্রান্ত। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কার্যক্রমে প্রবেশের এক বছরের কম সময়ের মধ্যে একটি সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে মঠের প্রধান নিহত হন। তার মৃত্যুর পর যিনি মঠের দায়িত্ব লাভ করেন, তিনি জিনাসিরি হিমিকে পছন্দ করলেন না। তখন শুরু হলো তার বিভিন্ন মঠে গিয়ে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা চালানো। এই প্রক্রিয়ায় অনেক কষ্টের পর তিনি পেরাডেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজতত্ত্বে ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষা জীবন শেষ করেন।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শৈশবের মঠ (এই মঠটিকে তিনি গৃহ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন) ত্যাগ করে কার্যত গৃহহীন অবস্থায় থাকার স্মৃতি নিয়ে তিনি শিশুদের জন্য একটি মঠ আবাস কাম স্কুল নির্মাণের ইচ্ছাপ্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এখানে যেসব শিশু আসে, তারা চরম গরিব। তাদের পরিবারগুলো তাদের ব্যয়ভার বহন করতে পারে না। তাদের মা-বাবার যথার্থ আয় নেই, তাছাড়া শিশুদের জন্য ক্ষতিকর অনেক বিষয়ও থাকে। অনেকের মা-বাবাও থাকে না। আবার কারো মা বা বাবা আবার বিয়ে করায় শিশুটিকে তাদের সাথে রাখতেও চায় না। তবে এই মন্দির-স্কুলে এলে তারা যথার্থ শিক্ষা পায়। সাধারণ স্কুলের সিলেবাসের পাশাপাশি তাদেরকে পালি, সংস্কৃত ও বৌদ্ধ ধর্ম শেখানো হয়। তারো অন্যান্য ধর্মীয় দর্শনও শেখে।
তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সাত শতাধিক সন্ন্যাসীকে পড়াশোনা করিয়েছেন। তাদের একটি বড় অংশই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছে। শিক্ষা সমাপ্ত করে অনেকে পুরোহিত্বও ত্যাগ করেছে। তিনি বলেন, থাকা বা না-থাকাটা ইচ্ছার ব্যাপার। শৈশবে এখানে এসে শিক্ষা গ্রহণ করার আগ্রহ থাকায় এসব শিশুকে নিয়ে আমি খুশি।
পাশ্চাত্য ও অন্যান্য দেশের বেশ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী ইংরেজি শিক্ষা দিয়ে থাকেন শিশু সন্ন্যাসীদের। এছাড়া জিনাসিরি হিমি প্রতিষ্ঠা করেছেন টিম গ্রিন লাইফ ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তরুণ ছাত্র সন্ন্যাসীরা যাতে গ্রাম পর্যায়ের সামাজিক কার্যক্রমে জড়িত হতে পারে, সেজন্যই তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তরুণ সন্ন্যাসীদের মনে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার ভালোবাসা সৃষ্টি করা হয়। মন্দির প্রাঙ্গনের একটি বড় অংশ ফলমূল, সব্জি ও ওষুধ গাছ লাগানোর জন্য ছেড়ে রাখা হয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে এই বাগানটি জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কৃষি উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশে ধর্মের সাথে যখন অস্থিরতা সম্পৃক্ত, তখন জিনাসিরি হিমির বৌদ্ধ স্কুলটি তরুণ সিংহলি শিশুদের অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির লোকজনের জন্য সন্ন্যাসী হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে। তার মঠের আশপাশে বেশ কয়েকটি মুসলিম পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারের সদস্যরা এসব শিশু সন্ন্যাসীদের দেখাশোনা করেন, তাদের যত্ন নেন।
তরুণ সন্ন্যাসীরা সাধারণত কঠোর সময়সূচি মেনে চলে, প্রার্থনা করে। তবে রোববারগুলোতে তারা অবৌদ্ধসহ অন্য সম্প্রদায়ের সদস্যদের সাথে খেলাধুলা করে। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে জিনাসিরি হিমি দেশের অন্যান্য স্থানে ঘুরতে নিয়ে যান শিশুদের। তাদেরকে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন।
ওয়েরেলগামার পাশের গ্রামের একটি স্কুলের শরত বিজেসিঙ্গে নানাভাবে জিনাসিরি হিমিকে সহায়তা কর থাকেন। তিনি বলেন, শিশুরা খুবই দুষ্টু। তিনি ৫ বছর বয়সের এক শিশু সন্ন্যাসীকে শূন্যে ছুঁড়ে দেন। শিশুটি এই খেলায় খুশিই হয়। হাসিতে ফেটে পড়ে। তবে তার পরপরই তার মনে পড়ে, সে সন্ন্যাসী। সাথে সাথে লজ্জায় জিনাসিরি হিমির পেছনে লুকায়।
অন্যরাও তার সাথে হাসি-তামাশায় মেতে ওঠে। তবে সবকিছুই ম্লান হয়ে যায় ১১ বছর বয়স্ক ক্রিকেটপ্রেমীর নাম ঘোষিত হওয়ার সময়। সন্ন্যাসী হিসেবে ভর্তি হওয়ার সময় তার নাম ছিল ভিন্ন। মন্দিরে তাদের নাম রাখার ব্যবস্থাটি বেশ ভিন্ন। এর সাথে জড়িত থাকে তাদের জন্মস্থানের ঠিকানাও। যেমন মহাসেনপুরা ধাম্মানান্দ। তার নামের প্রথম অংশটি তার গ্রামের নাম। শ্রীলঙ্কার নর্থ সেন্ট্রাল প্রদেশের পুলুনেরুয়ায় গ্রামটি অবস্থিত। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, ব্যাট করার সময় সে কয়টি জানালার কাচ ভেঙেছে, তখন সে হাসি থামাতে পারল না।
মহাসেনপুরা ধাম্মানান্দের বয়স যখন ৩ তখন তাকে মঠে নিয়ে আসেন তার মা-বাবা। স্কুলে তার প্রিয় বিষয় হলো ইংরেজি। তবে সুকণ্ঠ ও বৌদ্ধ প্রার্থনা আবৃতির জন্যও সে বিখ্যাত। এসব কথাবার্তায় একটি সাবলীল পরিবেশ সৃষ্টি হলে শিশুরাও মনখুলে কথা বলতে শুরু করে। তারা একে একে তাদের প্রিয় বিষয় ও বড় হলে কী করতে চায়, সবই বলতে থাকে। বেশির ভাগই জানান, তারা বড় হয়ে হবেন বিখ্যাত সন্ন্যাসী। তবে ১২ বছর বয়স্ক কাতুকেলিয়াওয়ে মেদাননান্দ ঘোষণা করেন, তিনি হতে চান ইঞ্জিনিয়ার। আরেকটি ভিন্ন একটি প্রশ্ন নিয়ে হাত তোলেন। তিনি জানতে চান, নতুন ইংলিশ কোচিং কবে থেকে শুরু হবে।
গ্রামের স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালনকারী বিজেসিঙ্গে জানেন, শ্রীলঙ্কার স্কুলগুলোতে মৌলিক সুবিধাগুলো কত অপ্রতুল। এই প্রেক্ষাপটে তিনি স্বীকার করছেন, মঠ-স্কুলগুলো কতটা ভালো করছে তুলনামূলক। এখানে পড়াশোনাকারী শিশুরা ভালো চাকরি পায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগও পায়। আর সন্ন্যাসীর জীবন অব্যাহত রাখবে কিনা তা তাদের নিজের ব্যাপার হয়ে পড়ে।
জিনাসিরি হিমির এখন তার শিক্ষা মন্দিরটি সম্প্রসারণই বড় কথা। তিনি শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা, বিশেষ করে হস্তশিল্প শেখানোর কাজটি শুরু করতে চান। এসব শিল্প দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা থেকে। এগুলো সংরক্ষণ করা খুবই প্রয়োজন।
মনের মুক্তির বৈজ্ঞানিক নীতিমালা প্রতিষ্ঠাকারী গৌতম বুদ্ধের পথ অনুসরণকারী শিশুরা এখন তাদের বাড়ি থেকে দূরে এক বাড়িতে অবস্থান করছে। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে, ভবিষ্যতে তারা কী হতে চায়।