Monday, March 24, 2025

‘গোল্ডেন ডোম’ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা : কীভাবে কাজ করবে?

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলিতে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রকে এক ‘ভালো ছেলেটি’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যার শত্রু সারাবিশ্ব। আর এখন, সেই ‘ভালো ছেলেটির’ সুরক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় তিনি একের পর এক দুনিয়া কাঁপানো পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন, তার সর্বশেষ চিন্তা ‘গোল্ডেন ডোম’।

গোল্ডেন ডোম— নামটি যতটা বাহারি, তার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ এবং অত্যাধুনিক একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষিত রাখা, বিশেষত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি থেকে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা শব্দের চেয়েও পাঁচগুণ দ্রুত চলে, তার আঘাত প্রতিরোধ করতে গোল্ডেন ডোম তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার আকাশ ও ভূখণ্ডকে এমন শক্তিশালী সুরক্ষা দেবে, যা বর্তমানে কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করতে সক্ষম নয়।

শনিবার (২২ মার্চ) সংবাদমাধ্যম সিএনএন এর এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন গোল্ডেন ডোমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করতে বিশাল অর্থের চাহিদা জানিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের কাছে হিসাব তুলে ধরেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ট্রাম্প ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, যাতে কংগ্রেস এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সঠিক রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে।

অবশ্য গোল্ডেন ডোমের নাম শুনলে অনেকের মনে হতে পারে এটি ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’-এর মতো, তবে দুটি ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। আয়রন ডোম মূলত স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এটি রাডার সিস্টেমের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে, মাঝ আকাশে তা ধ্বংস করে।

কিন্তু গোল্ডেন ডোম হবে অনেক বেশি উন্নত এবং এর প্রযুক্তি হবে স্যাটেলাইটভিত্তিক। এটি মহাকাশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে, ইনফ্রারেড লেজারের মাধ্যমে সেগুলোকে ধ্বংস করবে। গোল্ডেন ডোমের প্রযুক্তি হবে এমনভাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ ও ভূখণ্ডকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম।

এছাড়া, গোল্ডেন ডোমের লেজার প্রযুক্তির অন্যতম বিশেষত্ব হলো এটি আয়রন ডোমের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী হবে। মহাকাশ থেকে লেজারের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রের চলার পথ শনাক্ত করে তা ধ্বংস করা হবে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য এবং শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

এতটা উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ংকর নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে। রাশিয়া, চীন এবং ইরান— এই তিনটি দেশ বর্তমানে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির দিক থেকে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ‘অরেসটনিক’ এবং ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। গোল্ডেন ডোম এসব হুমকিকে মোকাবিলা করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এভাবে গোল্ডেন ডোমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় না, বরং বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে তার আধিপত্যও দৃঢ় করতে চাইছে। এই অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যদি সফল হয়, তবে এটি বিশ্বের সামরিক শক্তির ভারসাম্যকেও নতুন করে শেকল ভাঙবে।

গোল্ডেন ডোম তৈরির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার আকাশ ও ভূখণ্ডকে শক্তিশালী সুরক্ষা দেবে। ছবি : সংগৃহীত
গোল্ডেন ডোম তৈরির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার আকাশ ও ভূখণ্ডকে শক্তিশালী সুরক্ষা দেবে। ছবি : সংগৃহীত



পুতিন ‘সুপার স্মার্ট’: রুশ প্রেসিডেন্টের প্রশংসায় মাতলেন ট্রাম্পের দূত

‘পুতিনকে খারাপ মানুষ বলে মনে করি না। তিনি সুপার স্মার্ট’—বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ট্রাম্পপন্থী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত টাকার কার্লসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি। শুধু তা–ই নয়, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে তিনি যে ‘পছন্দ’ করেন, তা–ও সাক্ষাৎকারে জানিয়ে দিয়েছেন উইটকফ।

১০ দিন আগেই পুতিনের সঙ্গে দেখা করেছেন উইটকফ। কার্লসনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ‘অমায়িক ও অকপট’ ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেন। উইটকফের ভাষ্যমতে, পুতিন তাঁকে বলেছেন, গত বছর ট্রাম্প হত্যাচেষ্টার শিকার হওয়ার পর তিনি তাঁর জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। উপহার হিসেবে ট্রাম্পের একটি প্রতিকৃতিও আঁকিয়েছেন। এটা নিশ্চিতভাবে ট্রাম্পের ‘হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল।’

ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে রাশিয়ার উত্থাপন করা বিভিন্ন যুক্তি আবার তুলে ধরেন ট্রাম্পের দূত। রাশিয়ার মতো তিনিও ইউক্রেনকে ‘একটি মিথ্যা দেশ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। পাশাপাশি ইউক্রেনে দখল করা অঞ্চলগুলো রাশিয়ার ভূখণ্ড বলে বিশ্ব কখন স্বীকৃতি দেবে—সে প্রশ্নও রাখেন স্টিভ উইটকফ।

ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে দেশটিতে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। সাক্ষাৎকারে তা বাতিল করে দেন উইটকফ। স্টারমার ও ইউরোপের অন্য নেতাদের দেওয়া প্রস্তাবটি ‘অতিসরল’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় যুদ্ধবিরতির যে আলোচনা চলছে, তাতে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উইটকফ। এ নিয়ে তিনি রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। তবে রাশিয়ার সেনাসদস্যরা ইউক্রেনের যে পাঁচটি অঞ্চল অধিকৃত করেছে বা আংশিক দখলে নিয়েছে, সাক্ষাৎকারে সেগুলোর নাম বলতে পারেননি উইটকফ।

সাক্ষাৎকারে স্টিভ উইটকফ বলেন, ‘তথাকথিত চারটি অঞ্চলই এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দনবাস, ক্রিমিয়া—কী জানি নাম, আপনি তো জানেনই এবং আরও দুটি অঞ্চল।’ আসলে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের পাঁচটি অঞ্চল বা প্রশাসনিক এলাকা হলো লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপোরিঝঝিয়া, খেরসন ও ক্রিমিয়া। লুহানস্ক ও দোনেৎস্কের অধিকাংশ অঞ্চল দনবাসের অন্তর্ভুক্ত।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে এরই মধ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌদি আরবে বৈঠক করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। একই বিষয়ে সৌদি আরবে আজ রোববার ও আগামীকাল সোমবারও বৈঠকের কথা রয়েছে। এর আগে গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে কিয়েভে রুশ বাহিনী ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেন। এতে পাঁচ বছরের এক শিশুসহ তিনজন মারা গেছে। আহত আটজন।

আগের দিন শুক্রবার ইউক্রেনের দক্ষিণের শহর জাপোরিঝঝিয়ায় রাশিয়ার হামলায় একই পরিবারের তিনজন প্রাণ হারান। এরই মধ্যে আজ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা নিজেদের দক্ষিণাঞ্চল ও ক্রিমিয়ার আকাশ থেকে ৫৯টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ক্রিমিয়া উপদ্বীপটি ২০১৪ সালে অবৈধভাবে দখল করে নেয় রাশিয়া।

সাক্ষাৎকারে রাশিয়া কী কারণে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তা নিয়েও কথা বলেছেন স্টিভ উইটকফ। এ প্রসঙ্গেও তিনি ক্রেমলিনের সুরে কথা বলেন। কৃষ্ণসাগর যুদ্ধবিরতি ‘আগামী সপ্তাহ বা তার কাছাকাছি সময়ে কার্যকর হবে’ বলে জানিয়েছেন উইটকফ। আর ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি ‘বেশি দূরে নয়’ বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্পের এই বিশেষ দূত।

সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে কীভাবে মিলেমিশে কাজ করতে চান, সেই বিষয়েও বিস্তারিত কথা বলেছেন উইটকফ। অনেকটা জিজ্ঞাসার সুরে তিনি বলেন, ‘এমন একটি বিশ্ব কে না চায়, যেখানে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে মিলে ভালো ভালো কাজ করবে, আর্কটিকে নিজেদের জ্বালানিনীতিতে কীভাবে সমন্বয় আনা যায়—সে বিষয়ে চিন্তা করবে, সম্ভব হলে জলপথ ভাগাভাগি করবে, একসঙ্গে ইউরোপে এলএনজি গ্যাস পাঠাবে, আর হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়েও সহযোগিতা করবে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। সৌদি আরবের রিয়াদে, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। সৌদি আরবের রিয়াদে, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

‘নেতানিয়াহু ইসরায়েলের বড় শত্রু’: ইসরায়েলে টানা তৃতীয় দিন ব্যাপক বিক্ষোভ

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা শেন বেতের প্রধান রোনেন বারকে বরখাস্ত করার সরকারি সিদ্ধান্ত এবং গাজায় আবার হামলা শুরুর প্রতিবাদে গতকাল শনিবার রাজধানী তেল আবিবে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে গোয়েন্দা তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার গোয়েন্দাপ্রধান রোনেনকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে বলেন, তিনি রোনেন বারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। ২০২১ সালে গোয়েন্দা সংস্থা শেন বেতের প্রধান হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়। রোনেনের বরখাস্তের আদেশ আগামী ১০ এপ্রিল কার্যকর করা হবে বলে জানানো হয়।

নেতানিয়াহু সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরই টানা তিন দিন ধরে ইসরায়েলে বিক্ষোভ চলছে।

ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট গত শুক্রবার সরকারি সিদ্ধান্তকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে আদেশ জারি করেন।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তিনি এই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তিনি এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন।

সমালোচকেরা বলছেন, রোনেন বারকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও এগুলোর ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে চাইছেন।

যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে গত মঙ্গলবার গাজায় নৃশংস হামলা শুরু করে ইসরায়েল। হামাস ও ইসরায়েলের হাতে বন্দীদের মুক্তির জন্য হওয়া ওই চুক্তি গাজাসহ ওই অঞ্চলে খানিকটা স্বস্তি বয়ে এনেছিল।

ইসরায়েলের নীল–সাদা পতাকা হাতে তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী অবস্থান নেন। তাঁরা গাজায় হামাসের হাতে বন্দী ইসরায়েলের বাকি ব্যক্তিদের মুক্ত করে আনতে নতুন করে চুক্তি করার দাবি জানান।

প্রতিবাদ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মোশে হাহারোনি (৬৩) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘ইসরায়েলে সবচেয়ে বড় ভয়ানক শত্রু হচ্ছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২০ বছর ধরে তিনি আমাদের দেশকে গ্রাহ্য করেননি, আমাদের দেশের নাগরিকদের গ্রাহ্য করেননি।’

গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা শুরুর পর থেকে হামাসের হাতে বন্দী ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও সমর্থকেরা প্রায় নিয়মিত বিক্ষোভ করে আসছেন। ওই সব বিক্ষোভ সমাবেশে নানা সময়ে নেতানিয়াহু সরকারের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।

বিক্ষোভকারী ইরেজ বারম্যান (৪৪) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা দেড় বছর পর আবারও গাজায় ভয়াবহ যুদ্ধ দেখছি। এখনো গাজার ক্ষমতায় হামাস। এখনো ওই সংগঠনের হাজার হাজার যোদ্ধা রয়ে গেছে। সুতরাং এই যুদ্ধে ইসরায়েলের নেতানিয়াহু সরকার তার লক্ষ্য অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।’

ইসরায়েল নতুন করে হামলা শুরুর ফলে গাজায় বন্দী ৫৯ ইসরায়েলির ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব ইসরায়েলি বন্দীর মধ্যে এখনো ২৪ জন জীবিত রয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, ইসরায়েলি বোমা হামলা শুরুর পর ওই সব বন্দী হয় হামাসের হাতে নিহত হবেন অথবা দুর্ঘটনবশত ইসরায়েলি বাহিনীর বোমায় তাঁদের প্রাণ যাবে।

নেতানিয়ানিয়াহুর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা অফির ফক রয়টার্সকে বলেন, ‘হামাসের হাতে জিম্মি ব্যক্তিদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে আমাদের যা করার দরকার, আমরা তা–ই করব।’

অফির ফক বলেন, ‘হামাস সামরিক চাপের বিষয়টি বুঝতে পারছে। একমাত্র সামরিক চাপেই তারা কাবু হবে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এই সামরিক চাপকে কাজে লাগিয়ে ৮০ জন জিম্মিকে মুক্ত করা হয়েছে। একমাত্র সামরিক চাপের কারণে তারা আলোচনা টেবিলে এসেছে। আর এখন আমরা আবার সেই কাজটিই করছি।’

গাজায় বন্দী ব্যক্তিদের মুক্তি দাবি ও নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ। ২২ মার্চ, তেল আবিব
গাজায় বন্দী ব্যক্তিদের মুক্তি দাবি ও নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ। ২২ মার্চ, তেল আবিব ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি নৃশংসতায় গাজায় নিহত ৫০ হাজার ছাড়াল, ১৭ হাজারই শিশু

গাজায় নিহতের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এদের মধ্যে কেবল শিশুই ১৭ হাজার। ইসরায়েলের ১৭ মাসের নির্বিচার হামলায় অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে এত বেশি শিশু নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি পুরো প্রজন্মই ধুলায় মিশে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে আল–জাজিরার এক মন্তব্য প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়েছে, এটি বেশ বিষণ্ন ও ভয়ংকর এক মাইলফলক। যেসব শিশু স্বপ্ন দেখত, যাদের উচ্চাশা ছিল, যারা জীবনে বড় কিছু করতে চাইত, তারা আজ হারিয়ে গেছে।

গাজা সিটি থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে আরও বেশি। গাজার স্বাস্থ্য বিভাগ শুধু নথিবদ্ধ হতাহতের হিসাবে রেখেছে। এমন অসংখ্য নিহত ব্যক্তিকে কবর দেওয়া হয়েছে, যাদের নথিবদ্ধ করেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তা ছাড়া অনেকে নিখোঁজ রয়েছে, তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আর অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

অল্প সময়ে এত বেশি শিশু নিহত হওয়ায় একটি জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে, যা বর্তমান প্রজন্ম সহজে কাটিয়ে উঠতে পারবে না।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভাষ্যকার ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, গাজায় নিহতের সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করা নিয়ে ইসরায়েলের নাগরিকদের মধ্যে তেমন একটি অনুশোচনা হবে না।

ব্যক্তিগতভাবে নিজে ক্রুদ্ধ, দুঃখিত এবং হতভম্ব জানিয়ে গোল্ডবার্গ বলেন, ‘৫০ হাজারের বিষণ্ন মাইলফলক ইসরায়েলিদের এতটা নাড়া দেবে না। কারণ, শুরু থেকেই তারা হামাসের হতাহতের পরিসংখ্যানকে ভুয়া বলে দাবি করে আসছিল।’

‘ইসরায়েলের জনগণ সাধারণভাবে ফিলিস্তিনি হতাহতের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নয়। গাজায় ইসরায়েলের যেসব নাগরিক নিহত হয়েছে, তারা সেটার দায়িত্ব নিতেও অনাগ্রহী।’

ইসরায়েলের এই রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলেন, ইসরায়েলের টেলিভিশন গাজার হত্যাকাণ্ড এবং দুর্ভোগের ছবি দেখায়। কিন্তু ‘তা এত দীর্ঘ সময় ধরে চলছে যে কিছুক্ষণ পর মন অসাড় হয়ে যায়।’

‘যুদ্ধের শুরু থেকে ইসরায়েলের জনগণ বলে আসছে, গাজায় নিহতের সবাই হামাসের সদস্য। বিভিন্ন কারণে তারা এমন কথা বলছে।’

ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার কার্যক্রম দেখছে গাজার শিশুরা। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে, ২৩ মার্চ ২০২৫

‘বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক’ কি শুধু পুরুষেরই অপরাধ by ইশরাত হাসান

ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুত করার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদন হওয়া খসড়া অনুযায়ী ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অবৈধ যৌন সম্পর্ক’কে ধর্ষণের সংজ্ঞায় রাখা হয়নি। এটি আইনে আলাদা ধারায় চিহ্নিত করা হয়েছে। আর এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হবে সাত বছরের কারাদণ্ড। (প্রথম আলো অনলাইন, ২০ মার্চ ২০২৫)

বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিয়ে ছাড়া ১৬ বছরের বেশি বয়সী নারীর ক্ষেত্রে প্রতারণামূলকভাবে তাঁর সম্মতি আদায় করে যৌন সংগম করাকে ধর্ষণ হিসেবে বলা হয়েছে। এর ফলে বহু মামলায় বিয়ের ‘প্রতিশ্রুতি’ বা ‘প্রলোভনে’ ধর্ষণ, এ রকম অভিযোগের উল্লেখ দেখা যায়।

অনুমোদিত খসড়া অনুযায়ী ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে অবৈধ যৌন সম্পর্ক’কে ধর্ষণের সংজ্ঞায় না রাখার বিষয়টি এক অর্থে ‘ইতিবাচক’। কিন্তু এর পরও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।

আগে ‘প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়ের’ কথা বলা হলেও  সংশোধিত খসড়া অধ্যাদেশে সুনির্দিষ্টভাবে ‘বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক’কে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান করা হয়েছে। কিন্তু ঠিক কী করলে প্রকৃত অর্থে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তার সুস্পস্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কেউ বিয়ের কথা বলে যৌন সম্পর্ক করার সঙ্গে সঙ্গেই অপরাধ সংঘটিত হবে, নাকি পরবর্তী সময়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি পালন না করলে অপরাধ হবে? অর্থাৎ অপরাধকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখালেই তিনি শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বেন—এই ধরনের চিন্তা বা অনুমান খুবই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন নারীকে  ‘লোভী’ বা ‘নির্বোধ’ হিসেবে দেখা হয়, যিনি কোনো পুরুষের প্রলোভনে যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পরেন। আর এ ক্ষেত্রে তাঁর পুরুষ সঙ্গীটির সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।

সম্মতির ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক নারী–পুরষের শারীরিক সম্পর্কে ‘কন্ট্রিবিউটরি পার্টিসিপেশন’ থাকে। তাহলে শুধু এক পক্ষকে শাস্তি দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। অনেক ক্ষেত্রে  নারীরাও প্রেম বা সম্পর্ক ভেঙে দেন। সে ক্ষেত্রে তাঁর প্রাক্তন কি একইভাবে সেই নারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন? খসড়া অধ্যাদেশে এ রকম কোনো কিছুর সুযোগ নেই। তাহলে আইনের এ ধারাটা কি বৈষম্যমূলক হচ্ছে না?

‘বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক’কে- অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে ‘ব্লাকমেলিং’ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিশোধপরায়ণ কেউ এ আইনের অপব্যবহার করতে পারেন। কেউ কেউ এ রকম ধারায় মামলা করে নিজের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করতে পারেন। এর ফলে মামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, মামলাবাণিজ্যও হতে পারে।

বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা তা রক্ষা করা একটি নৈতিক এবং সামাজিক বিষয় হতে পারে, কিন্তু শুধু প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার কারণে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়। সম্পর্কের টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত মতপার্থক্য বা পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে অনেক সময়ই কারও পক্ষে বিয়ের প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব না–ও হতে পারে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় না রেখেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা সমাজ ও রাষ্ট্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

* ইশরাত হাসান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

‘বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক’ কি শুধু পুরুষেরই অপরাধ

গাজায় চারদিকে শুধুই লাশ: ‘ইসরাইলের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু নেতানিয়াহু’

ভয়াবহ। হৃদয় হরণকারী। চারদিকে শুধুই লাশ। ধ্বংসস্তূপ। লোকালয় ক্রমশ মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। একসময় গাজায় জনবসতি ছিল, সেই চিহ্নকে জোর কদমে মুছে দিচ্ছে ইসরাইল। সেখানকার মানুষদের স্বপ্ন ছিল। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। উন্নত জীবনের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু তা এখন স্মৃতির পাতা থেকে যেন হারিয়ে গেছে। শিশুরা এই নৃশংসতার মধ্যে আর বাঁচতে চায় না। তারা ইসরাইলের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মৃত্যুকে কাছে ডাকে। অভিভাবকদের নিউরনও যেন ঘুমিয়ে গেছে। প্রিয়জনের লাশ দেখে শুধু হাউমাউ করেন। চোখে অশ্রু নেই। শুকিয়ে গেছে। গাজার মাটি খুঁড়লেই এখন লাশ। যেখানে সেখানে দাফন করা হয়েছে মানুষ। ধ্বংসস্তূপ যেন জীবন্ত কবর। সব মিলে সেখানে কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন ইসরাইলের হামলায়। এ সংখ্যা শুধু গাজা জুড়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর রেজিস্ট্রার অনুযায়ী। কিন্তু জীবন্ত কবর রচনা হয়েছে কতোজনের তার হিসাব নেই কারও কাছে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর আবার শুরু করা হামলায় গাজা থেকে একটি প্রজন্মকে মুছে দিচ্ছে ইসরাইল। রোববার ভোরেও তাদের হামলায় কমপক্ষে ৩৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন গাজায়। এর মধ্যে আছেন হামাসের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা সালাহ আল বারদায়িল এবং তার স্ত্রী। তারা ভোরে একটি তাঁবুতে ঘুমাচ্ছিলেন। এখানেই শেষ নয়, ইয়েমেনে নতুন করে বোমা হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা সেখানকার একটি বিমানবন্দর এবং হোদেইদাহ বন্দরে অভিযান চালিয়েছে। অভিযান চালিয়েছে মারিব এবং সা’দার উত্তরাঞ্চলে। লেবাননে তারা হত্যা করেছে কমপক্ষে সাতজনকে। এর ফলে চার মাস আগে হিজবুল্লাহর সঙ্গে করা যুদ্ধবিরতি চুক্তি সংকটাপন্ন হয়ে পড়লো।

ওদিকে ফিলিস্তিনের দখল করে নেয়া পশ্চিম তীরে ১৩টি অবৈধ বসতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ইসরাইল। এর কড়া সমালোচনা করেছে হামাস। বলেছে, এটা হলো বর্ণবাদীদের দিয়ে মানুষ সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা। রোববার ইসরাইলের উগ্র-ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজেলেল স্মোট্রিস ওই বসতিকে স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। জবাবে হামাস বলেছে, এটা হলো ফিলিস্তিনিদের ভূমি চুরি করা, পবিত্র স্থাপনাগুলোকে চুরি করা, জাতিবিদ্বেষী একটি ঘৃণা আরোপ করা। একই সঙ্গে ইসরাইল এর মাধ্যমে সব রকম আন্তর্জাতিক ও মানবিক আইন ও কনভেনশনকে লঙ্ঘন করেছে। বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে মুখ খোলার জন্য আরব ও ইসলামিক দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হামাস। ওদিকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ইসরাইলে খাদ্য, পানি ও ওষুধ সহ সব রকম ত্রাণ সামগ্রী প্রবেশে পুরোপুরি অবরোধ দিয়েছে ইসরাইল। এর ফলে ফিলিস্তিনিরা অনাহারে, পিপাসার্ত অবস্থায় মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। খান ইউনিসে একটি দাতব্য কিচেনে ১৯ বছর বয়সী ইমান আল বারদায়িল বলেন, বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা খাদ্য ও পানি যোগাড় করতে লড়াই করছে। এই পবিত্র রমজানের মাসে সবার চারপাশেই শুধু হতাশা। ওই কিচেনে উপস্থিত হয়েছেন সাইদ আবু আল জিদায়েন। তিনি বলেছেন, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেয়ার জন্য চাপ পাওয়ার আশায় এখানে এসেছিলাম। কিন্তু তা শেষ হয়ে গেছে। ক্রসিং বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আমার বেতন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গাজায় কোনো খাবার নেই।

mzamin

‘ইসরাইলের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু নেতানিয়াহু’

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতে’র প্রধান রোনেন বার’কে বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে তেল আবিবে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মানুষ। এই সপ্তাহে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, তিনি রোনেনে’র ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এ অভিযোগ এনে তাকে বরখাস্ত করেন নেতানিয়াহু। ২০২১ সালে শিন বেতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রোনেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল-জাজিরা। শনিবার নেতানিয়াহু বলেন,  রোনেন’কে বরখাস্ত করা হলেও দেশটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেই থাকবে। এদিকে তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে ইসরাইলি পতাকা নাড়িয়ে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মানুষ। তারা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের কাছে থাকা বাকি জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে একটি চুক্তির আহ্বান জানান। মোশে হাহয়ারোনি (৬৩) নামে এক বিক্ষোভকারী বলেন, ইসরাইলের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু হলো নেতানিয়াহু। ২০ বছর ধরে তিনি দেশের কথা ভাবেননি। তবে রোনেন’কে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নেতানিয়াহু। এদিকে সমালোচনাকারীরা ইসরাইলের গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেয়ার অভিযোগে তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। শুক্রবার ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করে রোনেন’কে বরখাস্তের বিষয়টি স্থগিত করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঘুষের তদন্তকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে নেতানিয়াহু ও রোনেনে’র মধ্যে দ্বন্দ্ব চলমান। এছাড়া রোনেনে’র বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের আক্রমণকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও এনেছেন নেতানিয়াহু।
mzamin

জুলাই আন্দোলনে আহতদের সব সময় পাশে থাকবো: সেনাপ্রধান

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আহতদের সব ধরনের সহযোগিতা নিয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। রোববার রাজধানীর সেনামালঞ্চে আন্দোলনে আহতদের সম্মানে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন। বলেন, আজকে আমরা এই আহত যোদ্ধাদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করেছি। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সবাইকে মনে করিয়ে দেয়া যে, আমরা সব সময় তাদের পাশে থাকবো, তাদের সাথে থাকবো।

সেনাপ্রধান বলেন, এখানে ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তারা আছেন, ব্যাংকার্সরা উপস্থিত রয়েছেন, তারা সবাই টাকা দিয়েছেন। ডিজিএফআই টাকা দিয়েছে, এসএসএফ আপনাদের জন্য অর্থ দান করেছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে টাকা খরচ করা হচ্ছে। এই চেষ্টা আমাদের সব সময় জারি থাকবে। আমাদের চেষ্টা থাকবে আপনাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। আপনারা মনোবল হারাবেন না। মনোবল হারানোর কিছু নেই। আপনারা এই জাতির কৃতী সন্তান। আপনারা এই দেশ এবং জাতির জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করেছেন। আমি আপনাদের অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি সব সময় আপনাদের পাশে থাকবো ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, আহতদের অনেকেই চলাফেরা করতে পারেন না, দেখতে পারেন না। আমরা সব সময় আপনাদের পাশে থাকবো। ৪২০০ জনের উপরে আহতদের আমরা চিকিৎসা দিয়েছি এবং দিয়ে যাচ্ছি। এটা সব সময় জারি থাকবে ইনশাআল্লাহ।

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর জানিয়েছে, ইফতার ও নৈশভোজে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ছাত্রছাত্রীরা, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বেসামরিক পরিমণ্ডলের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের পরিচালকরা অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আহতদের হাতে ঈদ উপহার তুলে দেয়া হয়।

mzamin

সিলেটের ম্যাজিক ম্যান by মিজানুর রহমান

সরকার পরিবর্তন হলে চাপে পড়েন। থাকেন দৌড়ের উপরে। তবে অজানা এক জাদুর বলে দ্রুত সব আয়ত্তে নিয়ে নেন। যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার অদ্ভুত এক ক্যারিশমা তার। অনেকে তাকে বলেন, ‘ম্যাজিক ম্যান’, কেউ বলে ম্যানেজ ম্যান। সব সরকারের আমলে একই হাল। প্রথমে বিপাকে কিন্তু শেষ পর্যন্ত অজেয়-অপ্রতিরোধ্য। আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে জুয়া-যাত্রা এবং ক্যাসিনোর মতো সামাজিক অপরাধে জাহাঙ্গীর আলমের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বহু পুরনো। সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেপ্তার এবং জেল খেটেছেন অনেক বার। সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়েছেন কিন্তু রাজনীতির রং বদলে নিজস্ব অপরাধের সাম্রাজ্যে এখনো আছেন বহাল তবিয়তে!

শেখঘাট-কাজিরবাজার তথা সিলেট জুড়ে তার অপরাধের নেটওয়ার্ক। বিতর্কিত জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী জমানায় কাউন্সিলর ভাইয়ের কল্যাণে ছিলেন দলটির নেতৃত্বের আসনে। অবশ্য তার পদ-পদবির প্রয়োজন পড়েনি। সেই সময়ে অনেকদিন ছিলেন কমিউনিটি পুলিশের সভাপতির দায়িত্বে। ৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের খোলস পাল্টে এবার ফের তিনি বিএনপি’র রাজনীতিতে। যুক্তি তার জিনে নাকি জাতীয়তাবাদ। সব কিছুকে পেছনে ফেলে দুই দশক আগে ওয়ার্ড বিএনপি’র সেক্রেটারি পরিচয়ে জাহাঙ্গীর এবার বাগিয়ে নিয়েছেন মহানগর বিএনপি’র সহ-সভাপতির পদ! আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জাহাঙ্গীরের টিকি ছুঁতে পারে না- এমনটা ভুল। সঠিক হচ্ছে তাকে বেশিদিন আটকে বা অপরাধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। ছলে-বলে, কলে-কৌশলে তিনি নিজের অপরাধ-রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেন। তার আগে তিনি ক্ষমতাসীনদের  ম্যানেজ করেন। বহুরূপী জাহাঙ্গীর আলম তার অপকর্ম আড়াল করতে প্রায়শই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন সিলেট সদর মৎস্য আড়তদার কল্যাণ সমবায় সমিতিকে। তিনি ওই সমিতির সাধারণ সম্পাদক। জনশ্রুতি আছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেই থাকুক কাজির বাজারের গদি জাহাঙ্গীরের।

সিলেট সদর মৎস্য আড়তদার কল্যাণ সমিতির দায়িত্বশীল একাধিক প্রতিনিধি সম্প্রতি মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে বলেন, জাহাঙ্গীর আলম সমিতির বারবার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে অনেক রিপোর্ট হয়েছে। আমরা বাধ্য হয়ে প্রতিবাদ করেছি। এক প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি আমাদের সমিতির জন্য ভালো, টাকা পয়সাও খরচ করেন। পারিবারিকভাবে তাদের সঙ্গে অনেকের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এ কারণে তার ভাই কাউন্সিলর সিকান্দর আলীকে নিয়েও অনেক রিপোর্ট হয়েছে। বাধ্য হয়ে আমরা প্রতিবাদ করেছি। সমিতির এক সিনিয়র নেতা বলেন- ‘কাজিরবাজারের মাছ বাজারটি ঐতিহ্যবাহী। সোয়া শ’ বছরের পুরনো। এতে অনেকের চোখ। এ জন্য ক’দিন পরপর বাজারে অভিযান হয়। জুয়ার বোর্ডেই বেশি অভিযান হয়। সব সরকারের আমলে জাহাঙ্গীরের আস্তানায় অভিযান হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজারের নিয়ন্ত্রণ জাহাঙ্গীর পরিবারেরই হাতে। ব্যবসায়ীরা জানান, বাজার অন্যত্র সরিয়ে নিতে বহু চেষ্টা হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিজ করার সময়। জাহাঙ্গীর আলম এবং তার পরিবার বাজার এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় সরব ছিলেন। এজন্য অপকর্ম করলেও ব্যবসায়ীরা তা মেনে নেন। এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে তার অর্জিত সম্পদ অবৈধ নয়। কিন্তু তার অন্য অনেক ধান্দা আছে, বদনামও আছে। তার কামাই রোজগার কতোটা ‘হালাল’ তা নিয়ে আমাদের মনেও খটকা আছে। কিন্তু কে এ নিয়ে কথা বলবে? তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে আমরা কিছুই না!’

শেখঘাটের নিয়ন্ত্রক জাহাঙ্গীর গং: হযরত শাহজালাল (রহ.) এর পুণ্যস্মৃতি বিজড়িত শাহজালাল ঘাট তথা শেখঘাট। এটি সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যার সঙ্গে নগরীসহ গোটা সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। সুরমা নদীর তীরবর্তী শেখঘাটের পাশে ইটাখলা, ভাঙ্গাটিকর, কুয়ারপাড়, সওদাগরটিলা। বৃহত্তর শেখঘাট সিলেট সিটি করপোরেশনের ১২ নং ওয়ার্ডভুক্ত। সরকারি ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত তথ্য অনুযায়ী শেখঘাট এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা বেশ ভালো। শেখঘাট পঞ্চায়েতের মৃত মো. শহিদ উল্লাহ’র সন্তান জাহাঙ্গীর আলম। হজ করার পর তার নামের আগে হাজী বসিয়েছেন নিজেই। শুভেচ্ছা-৪১৭, শেখঘাট এই ঠিকানায় তার বর্তমান বসবাস। জাহাঙ্গীরের বড় ভাই সাবেক সিটি কাউন্সিলর সিকান্দর আলী। তিনি বৈষম্যবিরোধী  ছাত্র আন্দোলন চলাকালে তার এলাকা তো বটেই, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ঠেকাতে অকুস্থল মদিনা মার্কেট পর্যন্ত সামাল দিয়েছেন। সেখানে অন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তার তৎপরতার দালিলিক প্রমাণ হতে এসেছে মানবজমিনের। সূত্র মতে, শেখঘাটে আওয়ামী বিরোধী মানুষই বেশি। জাহাঙ্গীর পরিবার সেই ব্লকেই ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষমতা প্রলম্বিত হওয়ায় তারা তর সইতে পারেনি। আধিপত্য বিস্তারে তারা এক পর্যায়ে গোটা পরিবারই আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। তাদের পরিবারে অন্তত ৬ জনের পদ-পদবি থাকার তথ্য মিলেছে। জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই সিলেট মহানগর যুবলীগ নেতা মো. রেদওয়ান আহমদ বাপ্পিকে গত ২৪শে সেপ্টেম্বর আটক করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। তখন মিডিয়া ব্রিফিংয়ে র‍্যাব-৯ এর তরফে জানানো হয়- ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে বিস্ফোরক আইনে আদালতে মামলা রয়েছে তার। আসামি বাপ্পী দীর্ঘ সময় পলাতক ছিলেন। গোয়েন্দা তৎপরতা ও অভিযানে ধরা পড়েছেন। ওদিকে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে খুন, দুর্নীতি, নদী ও সমতলের জায়গা দখল এবং চাঁদাবাজির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এটা করে তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পত্তি অর্জন করেছেন। তবে জুয়া আর অনৈতিক কর্মকাণ্ড তার নেশা। ঘুরে ফিরে সব সময় সরকারি দলে থাকা জাহাঙ্গীর পরিবারের অন্যরাও ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে গড়ে তুলেছে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। স্মরণ করা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে ২০০৩ সালে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ পরিচালিত হয়। তখন সিলেটে জাহাঙ্গীর এবং দুষ্টচক্রকে গ্রেপ্তারে নগরীর কাজিরবাজারসহ শেখঘাট এলাকায় যৌথ বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালায়। সে সময় নদীপথে নৌকা নিয়ে পালিয়ে যায় জাহাঙ্গীর বাহিনী। এরপর অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাবস্থায় আর এলাকায় ফিরতে পারেনি। পলাতক ছিল। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের শেষ সময়ে জাহাঙ্গীর এলাকায় ফিরেন। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ফের দৌড়ের ওপর থাকে জাহাঙ্গীর বাহিনী। এলাকায় জমি দখলসহ বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে যৌথ বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে তারা গাঢাকা দেয়। এ অবস্থায় ছিল দীর্ঘদিন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরও কিছুদিন এলাকার বাইরে ছিল জাহাঙ্গীর বাহিনী। কিন্তু না ২০১১ সালে কাউন্সিলর সিকান্দর আলী সব ‘ভাও’ করে নেন। তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেন। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু হয় তাদের। ছোট ভাই জাহাঙ্গীর ও আরেক ছোট ভাই সন্ত্রাসী আছকিরের নেতৃত্বে তখন জায়গা দখল শুরু হয়ে গেছে। বিপত্তি ঘটে দিনমজুর লাকী মিয়াকে প্রহারে। সে নিহত হলে ৩ ভাই ফেঁসে যান। লাকি হত্যাকাণ্ডে উত্তাল হয়ে উঠে সিলেট। বাধ্য হয়ে পুলিশ চার্জশিট দেয় ৩ ভাইয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু না হত্যা মামলাটি সিকান্দর-জাহাঙ্গীর- আছকির ধামা চাপা দিতে সক্ষম হন আওয়ামী যোগসাজশে।

জুয়ার বোর্ডসহ গ্রেপ্তার, কীন ব্রিজের নিচে প্রকাশ্য আদালতে সাজা জাহাঙ্গীরের: ২০১৭ সালে জুয়ার বোর্ডসহ প্রথম গ্রেপ্তার হন জাহাঙ্গীর। দীর্ঘদিন জেল খাটেন। জেল থেকে বেরিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। প্রকাশ্যে জুয়ার আসর জমালেও এলাকার কাউন্সিলর সিকান্দর আলী ও জাহাঙ্গীরের ভয়ে তখন কেউ প্রতিবাদ করেননি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে কাজিরবাজারে জাহাঙ্গীর আলমের জুয়ার বোর্ডে অভিযান হয়। তখন জাহাঙ্গীর আলমহ বেশ ক’জন জুয়াড়িকে আটক করে পুলিশ। পরে কীন ব্রিজের নিচে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের এক বছর কারাদণ্ড দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি পুনরায় কুকর্মে জড়ান। ২০১৯ সালের ২৭শে জুন, বৃহস্পতিবার। জাহাঙ্গীরের জুয়ার বোর্ডে সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ। সেটি ছিল ওই সময়ে সিলেটে জুয়া-ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সফল অপারেশন। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, জাহাঙ্গীর আলমের জুয়ার বোর্ডে অভিযান চালিয়ে সেদিন একসঙ্গে ২২ জনকে আটক করে পুলিশ। সন্ধ্যাকালীন সেই অভিযানের নেতৃত্বে ছিল সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। জব্দ করা হয় জুয়া খেলার সরঞ্জামাদি। কিন্তু জাহাঙ্গীর থামেননি। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি তার জুয়া বাণিজ্য আরও বাড়িয়ে তুলেন। জেলা জুড়ে ‘ওয়ানটেন’ নামক জুয়ার আসর ছড়িয়ে দেন। তার শেখঘাটের আস্তানা তখন আরও জমজমাট হয়। অভিযোগ আছে- ক’বছর আগে নগরীর ঐতিহ্যবাহী বন্দরবাজারে অবস্থিত জালাল বাজার নামীয় একটি মৎস্য বাজারে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন জাহাঙ্গীর। বাজার কমিটি  আদালতের দ্বারস্থ হয়। জাহাঙ্গীরসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে একটি চাঁদাবাজির মামলা করা হয়। যার নং ৪৩/৬৭৩। ঘটনার তারিখ: ১১/০৮/২০২১ইং। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। অভিযোগ আছে- সিলেটের কাজিরবাজারে জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে এবং ভাঙ্গাটিকরপাড়ায় তার ছোট ভাই আছকির আলীর নেতৃত্বে অবৈধ সিলং তীর নামক জুয়াও চলে। যা অনেক খেটে খাওয়া ও অসহায় গরিব মানুষকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।  জাহাঙ্গীরের তীর কাউন্টারে খেলতে গিয়ে অত্র এলাকার মতিন মিয়ার মিলের একজন কর্মচারী সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই (সর্বকনিষ্ঠ) যুবলীগ নেতা রেদওয়ান আহমদ বাপ্পী’র নামে নগরীর কাজিরবাজার থেকে শেখঘাট পর্যন্ত মেইন রোডে থাকা ট্রাক এবং বিভিন্ন মিল-কারখানা থেকে মাসোহারা  আদায়ের অভিযোগ ছিল।  বর্তমানে এটা হাতবদল হয়েছে। জাহাঙ্গীর তার লোক দিয়ে ছোট ভাই’র চাঁদার লাইন ঠিক রেখেছেন বলে জানা গেছে। তার তত্ত্বাবধানে তৈরি হওয়া কাজিরবাজার জামে মসজিদের পেছনে দক্ষিণ পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় এখনো গরুর খামার রয়েছে। বর্তমানে এটি তার আরেক সহোদর আঙ্গুর আলী ও সহযোগী যুবদল নেতা আমিনুল ইসলাম তুহিন দেখভাল করেন। যার ফলে মসজিদের আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দুর্গন্ধের কারণে মসজিদে আগত মুসল্লিদের নামাজ পড়তে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। অভিযোগ আছে জাহাঙ্গীর-আছকির সহোদর সিন্ডিকেট বর্তমানে ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে আসা চিনির কারবারে যুক্ত।  কাজিরবাজার ব্রিজ দিয়ে পারাপার হওয়া চোরাই মালবাহী ট্রাক যারই হোক না কেন কাজিরবাজার এলাকায় ঢুকলেই ওই সিন্ডিকেটকে চাঁদা দিতে হয়। জাহাঙ্গীর পরিবারের জুনিয়র কয়েকজন মিলে অত্র এলাকায় কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছে। তাদের যন্ত্রণায় সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। বর্তমান ছাত্রলীগ ১২ নং ওয়ার্ড শাখার দায়িত্বে রয়েছে- সিয়াম আহমদ সিতাব (ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, ১২নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ), পিতা-সাবেক কাউন্সিলর সিকান্দর আলী, মেহরাজ জাহাঙ্গীর জয় (সহ সভাপতি, ১২ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ), পিতা-জাহাঙ্গীর আলম, মিরাজ আহমদ সিজান (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ১২ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ), পিতা- সাবেক কাউন্সিলর সিকান্দর আলী, বিজয় (১২ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ নেতা), পিতা-জাহাঙ্গীর আলম। অভিযোগ আছে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা কাউন্সিলর সিকান্দর আলী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপিতে জায়গা করার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে সিলেট মহানগর বিএনপি’র এক নেতা বলেন, আমরাও তার নতুন তৎপরতা দেখছি। তিনি পরিস্থিতির কারণে আওয়ামী লীগে গেছেন বলে প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমরা দলের হাইকমান্ডের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত আশা করি।

ক্যাসিনো থেকেই বেশির ভাগ সম্পদ গড়েছেন জাহাঙ্গীর: ২০১৫ সালের দিকে সিলেটে ক্যাসিনো শুরু করেন জাহাঙ্গীর। চলে ২০১৯ সাল অবধি। ঢাকায় ক্যাসিনো সম্রাটের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর সব গুটিয়ে নেন। তার পরিবারের সদস্যরাও নানাভাবে ক্যাসিনোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ থেকেই তারা বেশির ভাগ সম্পদ গড়েছেন। শেখঘাটে তারা ৪ তলার যে ভবনে থাকেন সেটি দখল করা। এ ছাড়া নগরীতে আরও অন্তত ৮টি বাড়ি রয়েছে জাহাঙ্গীর পরিবারের। আছে একটি লাঠিয়াল বাহিনী। দামি দামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের একাধিক গাড়িতে (এলিয়ন, প্রাডো, রেভ ফোর, সিআরবি) চড়েন তারা।

জাহাঙ্গীর যা বলেছেন: দল বদল, জুয়া, ক্যাসিনোসহ উপরোল্লিখিত বিস্তর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম গত রাতে মানবজমিনকে বলেন, আমি ৮৫ সাল থেকে বিএনপি’র রাজনীতি করি। ছাত্রদল করেছি, যুবদল করেছি, এখন বিএনপি’র মহানগরের সহ-সভাপতি এবং ১২নং ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি হিসেবে আছি। আওয়ামী লীগের গত ১৫ বছরে আমার এলাকার অনেকে দল ছেড়ে গেলেও আমি বিএনপিতেই ছিলাম। আমি রাস্তা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছি বার বার বিএনপি করার কারণে। কিন্তু পুলিশ আমাকে রাজনৈতিক মামলা না দিয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গে জুয়ার মামলায় চালান দিয়েছে। আমি জীবনে কোনো দিন জুয়া খেলিনি, জুয়ার বোর্ড বসাইনি। ক্যাসিনো কি জিনিস আমি চিনি  না। আমার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা অনুসন্ধান করুক, যদি কোথাও জমি দখল, জুয়া, ক্যাসিনোর সম্পৃক্ততা প্রমাণ হয় তাহলে আমি এক কোটি টাকা পুরস্কার দেবো।

mzamin

জাফলং লুট চাঁদাবাজিতে হুমায়ূনই সব

মাইটিভি’র হুমায়ূন নামেই পরিচিত। এ টিভির জাফলং প্রতিনিধি সে। তবে নামেই কেবল প্রতিনিধি। কাজে চিহ্নিত চাঁদাবাজ। জাফলংয়ে যাই ঘটবে সেখান থেকে তার নামে কিংবা তার টিভির নামে চাঁদা আসবে। চলে দখলবাজি। জাফলং জিরোপয়েন্টে ক’বছর আগে অস্থায়ী কাপড়ের দোকান বসিয়ে সেখান থেকে পুলিশের নামে চাঁদা তুলতো। পরে জড়িয়ে পড়ে সীমান্তের ওপার ভারত থেকে আসা চিনি চোরাকারবারিতে। সেখানে তার শেষ রক্ষা হয়নি। গণপিটুুনি খেতে হয়েছিল হুমায়ূনকে। এই হুমায়ূনের শেষ রক্ষা হলো না এবার। দীর্ঘদিন ধরে আরেক সহযোগী সাংবাদিকদের মারধরের ঘটনায় পলাতক থাকা অবস্থায় র‌্যাবের হাতে ধরে পড়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৫ই আগস্টের পর জাফলংয়ে নতুন রূপে আভির্ভূত হয় হুমায়ূন আহমদ ওরফে মাইটিভি হুমায়ূন। শেখ হাসিনা হটানোর পর বিজয় মিছিলে দেয় নেতৃত্ব। আওয়ামী লীগ কর্মীদের বাড়িঘরে ভাঙচুরের নেতৃত্ব দিয়েছে নিজেকে নেতা হিসেবে জাহির করে। অথচ তার ছেলে সানোয়ার হচ্ছে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক।

৫ই আগস্ট দিনভর এমন নাটকীয়তার পর যখন সন্ধ্যা নামে তখন জাফলংয়ের পরিবেশ বদলে যায়। লুট হয় কোয়ারিতে। হাত দিয়েই সরিয়ে ফেলা হয় পাথর। আর এতে দলবল নিয়ে নামেন হুমায়ূন। নিজেও পাথর লুট করেন। একই সঙ্গে পুলিশের ঠিকাদার হিসেবে ওই সময় পুলিশের নামে চাঁদাবাজি করে। এতে করে জাফলং কোয়ারিতে অন্যতম শক্তিধর হিসেবে আভির্ভূত হয় হুমায়ূন। প্রথম ২০-২২ দিনে জাফলং কোয়ারিতে ১২৫ কোটি টাকার বালু ও পাথর লুট করা হয়। এ তথ্য প্রশাসনের। ওই সময় নেতৃত্বে ছিল বিএনপি’র বহিষ্কৃত দুই নেতা স্বপন ও শাহপরান। তাদের সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে পুলিশ ও সাংবাদিকদের ম্যানেজ করতো হুমায়ূন। পরে যখন বোমা মেশিন দিয়ে লুটপাট শুরু হয় তখন আরও বেশি আধিপত্য নেয় হুমায়ূন। নিজেই গড়ে তোলে বলয়। আর এই বলয়ে নেতৃত্ব দেয় তার ছেলে সানোয়ার। জাফলংয়ের বর্তমান বিট অফিসার গোয়াইনঘাট থানার সাব-ইন্সপেক্টর ওবায়দুল্লাহ। তার চাঁদাবাজির টাকা তুলতে অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো হুমায়ূনকে। কোয়ারি থেকে প্রতিদিন ওবায়দুল্লাহ অন্তত ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেন বলে জানিয়েছেন জাফলংসহ আশপাশ এলাকার মানুষ। এসআই ওবায়দুল্লাহ’র শেল্টারে থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল হুমায়ূন।

গত ১৭ই মার্চ জাফলং ব্রিজের মুখে হুমায়ূনের ঘটনা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। জৈন্তাপুরে আরেক টিভি সাংবাদিক রাজু। তিনি বাংলা টিভি’র জৈন্তাপুর প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। জাফলংয়ে হুমায়ূন ও তার বাহিনীর আধিপত্যের ঘোর বিরোধী ছিলেন রাজু। তার বাড়ি জৈন্তাপুর উপজেলায় হলে জাফলংয়ের কাছাকাছি এলাকায় তার গ্রামের অবস্থান। হুমায়ূনের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় ঘটনার দিন মধ্যরাতে মোটরসাইকেলযোগে ফেরার পথে জাফলং ব্রিজ সংলগ্ন বাজারে আসা মাত্র হুমায়ূনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ নেতা সানোয়ার, সালাউদ্দিন, সুফিয়ানসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে রাজুর ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত জখম করে নগদ অর্থ, মোটরসাইকেল, ক্যামেরা, ওয়ারলেস মাইক্রোফোন বুম্ব, মোবাইল সেটসহ অন্যান্য ডিভাইস সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে যায়। স্থানীয়রা হামলায় আহত গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্ধার করে গোয়াইনঘাট হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতালে নেয়ার পর সাংবাদিক দুলাল হোসেন রাজুর মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসক তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলে হুমায়ূন জাফলং থেকে পালায়। তবে ঘটনাটি আলোচিত হওয়ায় অভিযানে নামে র‌্যাব। গতকাল সিলেট র‌্যাব-৯ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে গোয়েন্দা সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-৯ ও র‌্যাব-১০ যৌথ অভিযান পরিচালনা করে ঢাকার বংশাল থানাধীন ৭৮/৩সি নাজিমউদ্দিন রোড, চানখারপুল চৌরাস্তা এলাকা থেকে হুমায়ূনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় হুমায়ূনকে গোয়াইনঘাট প্রেস ক্লাব থেকে বহিষ্কার ছাড়াও টিভি চ্যানেল থেকে ইস্তফা দেয়া হয়েছে।

mzamin

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা পুতিনের প্রশংসা

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ও ইউরোপিয়ান নেতাদের সমালোচনা করলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। অন্যদিকে প্রশংসা করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু উইটকফ তা উড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, এটা তাদের একরকম ভঙ্গি। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের জন্য যে পরিকল্পনা নিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ও ইউরোপিয়ান নেতারা, তাতে তারা মনে করেছেন ‘আমাদের সবাইকে উইনস্টন চার্চিলের মতো হতে হবে। ট্রাম্পপন্থি সাংবাদিক টাকার কার্লসনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে তিনি পছন্দ করেন। বলেন, পুতিনকে আমি খারাপ বলবো না। তিনি একজন সুপার স্মার্ট মানুষ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। উল্লেখ্য, ১০ দিন আগে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন উইটকফ। এরপর তিনি বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট তার সঙ্গে সরল এবং দয়ালু আচরণ করেছেন। পুতিন তাকে বলেছেন, গত বছর ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার পর ট্রাম্পের জন্য প্রার্থনা করেছেন পুতিন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি ছবি উপহার হিসেবে দিয়েছেন। তাতে ট্রাম্পের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার বিভিন্ন যুক্তিতর্ক পুনরুল্লেখ করেন। বলেন, ইউক্রেন একটি ‘মিথ্যা দেশ’। ইউক্রেনের দখল করে নেয়া ভূখণ্ড বিশ্ব কখন রাশিয়ার বলে স্বীকৃতি দেবে তা জানতে চেয়েছেন। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন উইটকফ। কিন্তু রাশিয়ান বাহিনী ইউক্রেনের যেসব ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে তার মধ্যে ৫টি অঞ্চলের নাম বলতে পারেননি তিনি। উইটকফ বলেন, কথিত চারটি অঞ্চল ডনবাস, ক্রাইমিয়াসহ চারটি অঞ্চলের যুদ্ধ হলো সবচেয়ে বড় ইস্যু। আপনারা জানেন আরও দুটি অঞ্চল আছে। কিন্তু চারটি নয়। এমন অঞ্চল ৫টি। তা হলো- লুহানস্ক,  দোনেতস্ক, ঝাপোরিঝিয়া, খেরসন ও ক্রাইমিরয়। ডসকাম গনো পূর্বদিকে একটি শিল্প এলাকা। এর সঙ্গে আছে লুহানস্ক ও দোনেতস্ক অঞ্চলের কিছু অংশ। তিনি আরও বলেন, কুরস্কে বহু ইউক্রেনিয়ান সেনাকে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। তবে তার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইউক্রেন সরকার। উইটকফ আরও বলেন, ইউক্রেনের থেকে দখল করে নেয়া চারটি অঞ্চলের আংশিক এলাকায় গণভোট হয়েছে। সেখানকার জনগণ রাশিয়ার শাসনের অধীনে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনের দখলীকৃত কিছু অঞ্চলে গণভোট হয়েছিল।  যে প্রক্রিয়ায় এই ভোট হয়েছে এবং এর যে ফল তা নিয়ে ব্যাপক বিরোধ আছে। কেউ এটাকে কৃতিত্ব দেয় না।

ওদিকে রোববার ও সোমবার দু’দিনে সৌদি আরবে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে আলাদা আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ বলে দিয়েছে, শনিবার দিবাগত রাতে কিয়েভের ওপর ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে তিনজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আছে একটি ৫ বছর বয়সী শিশু। আহত হয়েছেন আটজন। ওদিকে শুক্রবার দক্ষিণের জাপোরিঝিয়া শহরে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। তাতে নিহত হয়েছেন একই পরিবারের তিনজন। রোববার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ক্রাইমিয়া সহ দক্ষিণের বিভিন্ন অঞ্চলে ইউক্রেনের ৫৯টি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে তারা। সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় উইটকফ বার বার রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের কারণ নিয়ে কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এটা এখন বলাই যায় যে, দখল করে নেয়া কিছু অংশ এখন সঠিকভাবেই রাশিয়ার অংশ। রাশিয়ায় একটি ধারণা কাজ করে যে, ইউক্রেন একটি মিথ্যা রাষ্ট্র। এটাই হয়তো এই যুদ্ধের মূল কারণ।
তবে বার বার পুতিন বলেছেন, ইউক্রেনে হামলার মূল কারণ হলো ন্যাটোর বিস্তার ঘটিয়ে রাশিয়ার জন্য হুমকি সৃষ্টি করা। উইটকফ বলেন, কেন রাশিয়া পুরো ইউক্রেনকে নিয়ে নিতে চাইবে? কি উদ্দেশ্যে? তাদের তো ইউক্রেনকে গ্রাস করার দরকার নেই।

mzamin

স্বামীকে হত্যা: প্রেমিককে নিয়ে একসঙ্গে জেলে থাকতে চান মুসকান

কারাগারে এক সঙ্গে থাকতে চান স্বামী সৌরভ রাজপুতকে নৃশংসভাবে হত্যাকারী ভারতীয় নারী মুসকান রাস্তোগি ও তার প্রেমিক সাহিল শুক্লা। তবে তাদের এ দাবি প্রত্যাখান করেছে জেল কর্তৃপক্ষ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

এক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাহিলকে অস্থির দেখাচ্ছে। তিনি ঠিকমতো ঘুমাচ্ছেন না। মেজাজও খিটখিটে। ধারণা করা হচ্ছে তিনি মাদকাসক্ত। মুসকান ও সাহিল অন্য কয়েদিদের সঙ্গে কথাও বলছেন না। কারাগারে প্রথম দিন মুসকান কিছু খাননি। এরপর থেকে অবশ্য তিনি নিয়মিত খাবার খাচ্ছেন। তারা দু’জন বর্তমানে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে আছেন। মিরাত পুলিশের এক সূত্র জানায়, বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাদের রিমান্ড চাইবে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে একে অপরকে ভালবেসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মুসকান ও সৌরভ। তাদের ছয় বছরের একটি মেয়ে আছে। বিয়ের পর সৌরভের পরিবারের সঙ্গে মুসকানের সম্পর্ক তিক্ত হতে থাকে। এর জেরে স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাসায় ওঠেন সৌরভ। ২০১৯ সালে নিজের বন্ধুর সঙ্গে স্ত্রীর পরকিয়ার সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন সৌরভ। তবে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। সৌরভ নৌবাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা। স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পর দু’বছর ধরে লন্ডনে কাজ করছিলেন। গত মাসে মেয়ের জন্মদিন পালন করতে দেশে আসেন।

পুলিশের সূত্রমতে, ৪ঠা মার্চ সৌরভের ওপর মাদক প্রয়োগ করেন মুসকান। এরপর তাকে কুপিয়ে হত্যা করেন। এরপর তার দেহকে কেটে কেটে ১৫ টুকরো করে। একটি প্লাস্টকের ড্রামে তা ভরে সিমেন্ট দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়। এরপর তারা হিমাচল প্রদেশ ত্যাগ করে। সেখান থেকে সৌরভের ছবি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে তারা। পরে মুসকান তার পিতামাতার কাছে স্বীকার করে সাহিল এবং সে হত্যা করেছে সৌরভকে। অথচ ভালবেসে সৌরভ এবং মুসকান বিয়ে করেছিলেন।

mzamin

হাসনাতের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন সারজিস

‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে অভিযোগ তুলে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনিসহ আরও দুইজনের কাছে ক্যান্টনমেন্ট থেকে এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয় বলে উল্লেখ করেন।

হাসনাতের ওই পোস্ট প্রসঙ্গে এবার মুখ খুললেন এনসিপি’র মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। রোববার দুপুরে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিষয়টি নিয়ে পোস্ট করেন তিনি।

‘১১ মার্চ সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে আমার জায়গা থেকে কিছু সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজন’ শিরোনামে ওই পোস্টে সারজিস আলম লিখেন, ‘‘সেদিন আমি ও হাসনাত সেনাপ্রধানের সঙ্গে গিয়ে কথা বলি। আমাদের সঙ্গে আমাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ আরেকজন সদস্যেরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে তিনি যেতে পারেননি। প্রথমেই স্পষ্ট করে জানিয়ে রাখি সেদিন সেনানিবাসে আমাদের ডেকে নেয়া হয়নি বরং সেনাপ্রধানের মিলিটারি অ্যাডভাইজারের সঙ্গে যখন প্রয়োজন হতো তখন ম্যাসেজের মাধ্যমে আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা ও উত্তর আদান-প্রদান হতো।যেদিন সেনাপ্রধান পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবসে অনেকটা কড়া ভাষায় বক্তব্য দিলেন এবং বললেন ‘এনাফ ইজ এনাফ’ তখন আমি সেনাপ্রধানের মিলিটারি অ্যাডভাইসরকে জিজ্ঞাসা করি আপনাদের দৃষ্টিতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু দেখছেন কিনা? সেনাপ্রধানের বক্তব্য তুলনামূলক straight-forward এবং harsh মনে হচ্ছে। তিনি আমাকে বললেন, তোমরা কি এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে চাও? আমি বললাম-বলা যেতে পারে। এরপরে সেদিন সেনাপ্রধানের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। সেনাভবনে সেই রুমে আমরা তিনজনই ছিলাম। সেনাপ্রধান, হাসনাত ও আমি।’’

হাসনাতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তিনি লিখেন, ‘‘মানুষ হিসেবে যেকোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তির অভিমতকে একেকজন একেকভাবে অবজার্ভ করে। হাসনাত সেদিন তার জায়গা থেকে যেভাবে সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে অবজার্ভ ও রিসিভ করেছে এবং ফেসবুকে লিখেছে আমার সেক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিমত আছে। আমার জায়গা থেকে আমি সেদিনের বক্তব্যকে সরাসরি ‘প্রস্তাব’ দেয়ার আঙ্গিকে দেখিনা বরং ‘সরাসরি অভিমত প্রকাশের’ মতো করে দেখি। ‘অভিমত প্রকাশ’ এবং ‘প্রস্তাব দেয়া’ দু’টি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যদিও পূর্বের তুলনায় সেদিন সেনাপ্রধান অনেকটা স্ট্রেইথ-ফরোয়ার্ড ভাষায় কথা বলছিলেন। পাশাপাশি ‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগের জন্য ‘চাপ দেয়ার’ যে বিষয়টি এসেছে সেখানে ‘চাপ দেয়া হয়েছে’ এমনটি আমার মনে হয়নি। বরং রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ না আসলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সমস্যার সৃষ্টি হবে সেটা তিনি অতি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছিলেন। হাসনাতের বক্তব্যে যে টপিকগুলো এসেছিল, যেমন-রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ, সাবের হোসেন, শিরিন শারমিন চৌধুরী, সোহেল তাজ-এসব নিয়ে কথা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে কিনা, এই ইলেকশনে আওয়ামী লীগ থাকলে কি হবে না থাকলে কি হবে, আওয়ামী লীগ এই ইলেকশন না করলে কবে ফিরে আসতে পারে কিংবা আদৌ আসবে কিনা এসব বিষয় নিয়ে কথা হয়েছিল। এসব সমীকরণে দেশের ওপরে কি প্রভাব পড়তে পারে, স্থিতিশীলতা কিংবা অস্থিতিশীলতা কোন পর্যায়ে যেতে পারে সেসব নিয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু যেই টোনে হাসনাতের ফেসবুক লেখা উপস্থাপন করা হয়েছে আমি মনে করি-কনভারসেশন ততটা এক্সট্রিম ছিল না। তবে অন্য কোনো একদিনের চেয়ে অবশ্যই স্ট্রেইথ-ফরওয়ার্ড এবং সো-কনফিডেন্ট ছিল। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ইলেকশনে অংশগ্রহণ করা যে প্রয়োজনীয় সেই বিষয়ে সরাসরি অভিমত ছিল।’’

সারজিস লিখেন, ‘‘হাসনাত তার বক্তব্যে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করেছে-‘আলোচনার এক পর্যায়ে বলি-যেই দল এখনো ক্ষমা চায় নাই, অপরাধ স্বীকার করে নাই,সেই দলকে আপনারা কীভাবে ক্ষমা করে দেবেন! অপরপক্ষ থেকে রেগে গিয়ে উত্তর আসে, ইউ পিপল নো নাথিং। ইউ ল্যাক উইজডোম এন্ড এক্সপিরিয়েন্স। উই আর ইন দিজ সার্ভিস ফর এটলিস্ট ফোর্টি ইয়ার্স। তোমার বয়সের থেকে বেশি।’ এই কনভারসেশনটা হয়েছে এটা সত্য। কিন্তু আমাদের রুমে বসে হওয়া কনভারসেশন হঠাৎ এককভাবে শেষ করে যখন সেনাপ্রধান উঠে দাঁড়ালেন এবং রুম থেকে কথা বলতে বলতে বের হয়ে এসে যখন আমরা গাড়িতে করে ফিরবো তার পূর্বে বিদায় নেয়ার সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই কনভারসেশন হয়েছে। সেনাপ্রধান রেগে যাওয়ার সুরে এই কথা বলেছেন বলে আমার মনে হয়নি বরং বয়সে তুলনামূলক বেশ সিনিয়র কেউ জুনিয়রদেরকে যেভাবে অভিজ্ঞতার ভারের কথা ব্যক্ত করে সেই টোন এবং এক্সপ্রেশনে বলেছেন।’’

এনসিপি’র মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম লিখেন,‘‘হাসনাত না ওয়াকার’ এই ন্যারেটিভ এবং স্লোগানকে আমি প্রত্যাশা করি না। হাসনাতের জায়গা ভিন্ন এবং সেনাপ্রধান জনাব জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের জায়গাও ভিন্ন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি অন্যান্য রাজনৈতিক দল কিংবা জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করানোও কখনো প্রাসঙ্গিক নয়। পাশাপাশি সেনাপ্রধানের পদত্যাগ নিয়ে যে কথা দুয়েক জায়গায় আসছে সেটিও আমাদের বক্তব্য নয়। এসবের পাশাপাশি আমি আমার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে একটি অভিমত প্রকাশ করতে চাই। আমি ভুল হতে পারি, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার এটিই সঠিক মনে হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ না কেউ যোগাযোগ রক্ষা করে। সেই প্রাইভেসি তারা বজায় রাখে। আমাদের সঙ্গে সেনাপ্রধানের যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়েছে সেগুলোর সঙ্গে আমাদের সরাসরি দ্বিমত থাকলেও আমরা সেগুলো নিয়ে আমাদের দলের ফোরামে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারতাম, সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম, সে অনুযায়ী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারতাম। কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আওয়ামী লীগের যেকোনো ভার্সনের বিরুদ্ধে এখনকার মতই রাজপথে নামতে পারতাম। অথবা অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি আমাদের সঙ্গে ঐক্যমতে না পৌঁছালে আমরা শুধুমাত্র আমাদের দলের পক্ষ থেকেই এই দাবি নিয়ে রাজপথে নামতে পারতাম। কিন্তু যেভাবে এই কথাগুলো ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এসেছে এই প্রক্রিয়াটি আমার সমীচীন মনে হয়নি বরং এর ফলে পরবর্তীতে যেকোনো স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আস্থার সংকটে পড়তে পারে। আমার এই বক্তব্যে আমার সহযোদ্ধা হাসনাতের বক্তব্যের সঙ্গে বেশ কিছু ক্ষেত্রে দ্বিমত এসেছে। এটার জন্য অনেকে আমার সমালোচনা করতে পারেন কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমাদের ব্যক্তিত্ব স্রোতে গা ভাসানোর মতো কখনোই ছিল না। ছিল না বলেই আমরা হাসিনা রেজিমের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম।’’

সারজিস আরও লিখেন, ‘‘আজও কেউ হাসনাতের দিকে বন্দুক তাক করলে তার সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কমিটমেন্ট আমাদের আছে। কিন্তু সহযোদ্ধার কোনো বিষয় যখন নিজের জায়গা থেকে সংশোধন দেয়ার প্রয়োজন মনে করি, তখন সেটাও আমি করব। সেই বিবেকবোধটুকু ছিল বলেই ৬ জুন প্রথম যেদিন শহীদ মিনারে কয়েকজন কোটা প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় তাদের মধ্যে সামনের সারিতে আমরা ছিলাম। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের এই বিবেকবোধের জায়গাটুকুই আমাদেরকে সঠিক পথে রাখবে। আত্মসমালোচনা করার এই মানসিকতাই আমাদেরকে আমাদের কাঙ্খিত গন্তব্যে নিয়ে যাবে। জুলাই গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড ঘটানো ‘আওয়ামী লীগের যেকোনো ভার্সনের’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। Truth shall prevail.’’

mzamin

ঐকমত্যের সুপারিশে নানা দ্বিমত

ছয়টি বিষয়ে গঠিত সংস্কার কমিশনের সুপারিশে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মতামত জমা দিয়েছে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। গতকাল বিএনপি ও এনসিপি তাদের মতামত জমা দিয়েছে। এসব মতামতে বিভিন্ন বিষয়ে একমতের সঙ্গে এসেছে নানা বিষয়ে ভিন্নমত। এ ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে দলগুলোর পক্ষ থেকে বিপরীতধর্মী মতামতও এসেছে। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের বিষয়ে দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়েছে।

সব দলের মতামত পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে জাতীয় ঐকমত্যের সুপারিশ চূড়ান্ত করবে এ সংক্রান্ত কমিশন। গতকাল জমা দেয়া দলীয় মতামতে বেশ কিছু বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছে বিএনপি। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে ১৯৭১ সাল এবং ২০২৪ সালকে এক কাতারে আনার বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত পোষণ করেছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবেও সায় দেয়নি দলটি। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে প্রায় সব প্রস্তাবে বিএনপি একমত। ৩১ দফা সুপারিশের মধ্যে চার-পাঁচটি বিষয়ে মতামত দেয়া হয়েছে। বিএনপি বলছে, অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধনী দিয়ে নির্বাচন কমিশনের হাতে ডিলিমিটেশনের এখতিয়ার রাখা হোক। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার নিয়ে ২০টি সুপারিশের ১১টিতে একমত দলটি। একটি প্রস্তাবে মন্তব্যসহ ভিন্নমত পোষণ করেছে দলটি। প্রশাসন সংস্কারে প্রায় অর্ধেক প্রস্তাবে একমত বিএনপি। ২৬টি প্রস্তাবনার মধ্যে অর্ধেকে নিজস্ব মতামত দিয়েছে দলটি। এদিকে ৫টি বিষয়ের ওপর সংস্কার প্রস্তাব জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে জমা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সংবিধানের মূলনীতিতে আল্লাহর প্রতি অবিচল ঈমান-আস্থা ফিরিয়ে আনতে মত দিয়েছে জামায়াত। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংস্কার প্রস্তাব জমা দেয়া হয়। দলটি সংবিধান, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া ও দুর্নীতি দমন কমিশনের বিষয়ে কিছু পয়েন্টে দ্বিমত করেছে। দলটি বলছে, নির্বাচন কমিশনের যারা কর্মকর্তা, রিটার্নিং ও প্রিজাইডিং অফিসার যারা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না তাদের এড়াতে বলা হয়েছে। দলটি পিআর বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন চায়। সংবিধানে সাম্য, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছে জামায়াত। ন্যাশনাল কনস্টিটিউশনাল কাউন্সিলের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত নয় দলটি। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের সঙ্গে একমত হলেও পুরাপুরি একমত নয় দলটি। তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত দিয়েছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে জামায়াত আস্থাভোট, বাজেট সম্পর্কে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে সে ব্যাপারে মতামত দিয়েছে। জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের আগে গণপরিষদ নির্বাচন চায় না।

ওদিকে রাষ্ট্রসংস্কার প্রশ্নে নিজেদের মতামত জানানোর পাশাপাশি ঐকমত্য কমিশনের কাছে তিনটি বিষয় জানতে চেয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রোববার জাতীয় সংসদের এলডি হলে ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজের কাছে দলটি নিজেদের লিখিত মতামত হস্তান্তর করে। কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশের মধ্যে ১১৩টির পক্ষে মত দিয়েছে দলটি। ২৯টি প্রস্তাবে আংশিকভাবে একমত এবং ২২টি প্রস্তাবের বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করে দলটি। পুলিশ সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে না পাঠানোর কারণও জানতে চেয়েছে এনসিপি।   

এনসিপি দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদদের বিষয়ে একমত পোষণ করেছে। তবে তারা বলেছে, নির্বাচনের আগেই উচ্চকক্ষের প্রার্থী কারা, তা দলগুলোকে ঘোষণা করতে হবে। এনসিপি বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার হতে হবে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের মেয়াদ ৭০ থেকে ৭৫ দিন হতে পারে।

কমিশনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। কমিশনের ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪২টি প্রস্তাবের সঙ্গে এলডিপি একমত নয় বলে জানিয়েছে। দুটো প্রস্তাবের সঙ্গে আংশিকভাবে একমত। দুটি প্রস্তাবের বিষয়ে তারা এখনো স্পষ্ট নয়। গত বৃহস্পতিবার এলডিপি নিজেদের মতামত জমা দিয়েছে।

এদিকে খেলাফত মজলিশ গণপরিষদের পক্ষে নয়। তারা ৪০০ আসনে নারীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচনের প্রস্তাব দেয়। সংসদের মেয়াদ তারা পাঁচ বছর চায়।  এ ছাড়া উচ্চকক্ষে (সিনেটে) সংখ্যালঘুদের ১ শতাংশ ভোটের ভিত্তিতে আসন বণ্টনের মতামত দিয়েছে। সংবিধানে মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা বিশ্বাস রাখতে মতামত দিয়েছে দলটি।

শনিবার জমা দেয়া মতামতে লেবার পার্টি ১৪৭টি সুপারিশে একমত হয়েছে, সাতটিতে মতপার্থক্য আছে বলে জানিয়েছে। ১২টিতে আংশিকভাবে সম্মত হয়েছে। দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের পক্ষে মত দিলেও দেশকে চারটি প্রদেশে ভাগ করার বিপক্ষে মত দেয়া হয়েছে। গতকাল মতামত জমা দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। জরুরিভিত্তিতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। ব্যাপক আলোচনার মাধ্যমে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ব্যাপক সংস্কার চালানোর পক্ষে মত দিয়েছে দলটি।
সংস্কার কমিশনে প্রস্তাব জমা দিয়েছে জমিয়তে ওলামা ইসলাম বাংলাদেশ, এবি পার্টি, জাকের পার্টি, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, এনডিএম ও আমজনতার দলসহ আরও কয়েকটি দল। এসব দলও নিজস্ব মতামত তুলে দিয়েছে কমিশনের হাতে।

অনেক সুপারিশে দ্বিমত জানিয়ে বিএনপি’র মতামত পেশ
রাষ্ট্র সংস্কারে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ১৬৬টি প্রশ্নমালার যে স্প্রেডশিট পাঠিয়েছে তার মধ্যে অনেক সুপারিশে দ্বিমত পোষণ করেছে বিএনপি। এরমধ্যে দুর্র্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের স্প্রেডশিটে ২০টির মধ্যে ১১টিতে সরাসরি একমত, ৭ থেকে ৮টিতে মন্তব্যসহ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে এবং একটি প্রস্তাবে ভিন্নমত পোষণ করেছে দলটি। প্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২৬টি বিষয়ে প্রস্তাবনা আছে, সেখানে প্রায় অর্ধেক বিষয়ে একমত এবং বাকি অর্ধেক বিষয়ে নিজস্ব মতামত-মন্তব্য জুড়ে দিয়েছে দলটি।  

এ ছাড়া সুপারিশে ১৯৭১ ও ২০২৪ সালকে এক কাতারে আনা হয়েছে। এটি সমুচিত বলে মনে করে না বিএনপি। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় নাম পরিবর্তন করার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করে না দলটি। ওদিকে দলটি নির্বাচন সংক্রান্ত সংস্কার কমিশন সম্পর্কে বলছে, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার বিষয়ক রিপোর্টে ২৭টার মতো প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে অধিকাংশ প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নির্বাচন কমিশন কিংবা নির্বাচন ব্যবস্থা সংক্রান্ত রিপোর্টে কিছু কিছু বিষয়ে সংবিধানের সংশ্লিষ্টতা আছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, নির্বাচনী সংস্কার নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। সেই বিষয়ে সংবিধান সংস্কার বিষয়ক রিপোর্টে মতামত দিয়েছে বিএনপি। রোববার জাতীয় সংসদে ঐকমত্য কমিশনের কো-চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী রীয়াজের কাছে বিএনপি’র মতামত জমা এবং কমিশনের সঙ্গে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, আমরা আজকে ৫টা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ওপরে বিএনপি’র পক্ষ থেকে আমাদের মতামত তারা যে স্প্রেডশিট আমাদেরকে দিয়েছেন, সেটা এবং বিস্তারিত মতামত তার ওপরে দুইটিই একসঙ্গে দিয়ে এসেছি। অন্যগুলো কয়েকদিন পরে বিস্তারিত মতামত দেবো। প্রায় যেগুলোতে একমত হওয়া উচিত সেগুলোতে একমত হয়েছি। আর যেগুলো আমাদের ভিন্নমত দেয়া প্রয়োজন, সেগুলোতে আমরা মতামত সহকারে দিয়েছি। মোটামুটি আমরা পুরোপুরি সহযোগিতার মধ্যে আছি।

বেলা ১টায় সংসদ ভবনের এলডি ভবনে সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কো-চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী রীয়াজের কাছে বিএনপি’র মতামত হস্তান্তর করেন। এ সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান ছিলেন। ঐকমত্য কমিশনের কো-চেয়ারম্যানের সঙ্গে সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, ইফতেখারুজ্জামান ও প্রধান উপদেষ্টা বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।

সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশের বিষয়ে মতামত চেয়ে গত ৬ই মার্চ বিএনপিসহ ৩৭টি রাজনৈতিক দলকে ‘চিঠি ও স্প্রেডশিট’ পাঠিয়েছিল ঐকমত্য কমিশন। ১৩ই মার্চের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত জানাতে বলা হয়। রোববার পর্যন্ত ১৬টি রাজনৈতিক দল তাদের মতামত জমা দেয়।
 
একাত্তর আর ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান এক হতে পারে না: সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, উনারা একাত্তর সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে একই কাতারে ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানকে নিয়ে এসেছেন যেটা আমরা মনে করি সমীচীন নয়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অংশটি সংবিধানের অন্য জায়গায় কীভাবে চতুর্থ তফসিল যুক্ত করা যায় সেটা পরে আলোচনা করা যায়। এখানে সরকারের কোনো লেজিটেমেসির অভাব আছে বলে আমরা মনে করি না। এই সরকার  সাংবিধানিকভাবেই গঠিত হয়েছে, আর্টিকেল ১০৬ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের মতামতের ভিত্তিতে এডভাইজারি রোল হিসেবে যেটা আছে সেটার ভিত্তিতে এই সরকার শপথ গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, আমরা সবাইকে যুক্ত করেই এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে সাজাতে চাই, বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলো সংস্কার করতে চাই, একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্মাণের জন্য বৈষম্যহীন একটি সত্যিকার সুশাসন ও ন্যায়বিচার ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের জন্য। যেখানে সবারই মর্যাদা থাকবে সাম্য থাকবে। গণপরিষদ ও গণভোট নির্বাচন নয়: সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, গণপরিষদ নিয়ে অনেক বক্তৃতা দিয়েছে। নতুন রাষ্ট্র হয়েছে সেখানে সংবিধান রচনা করা দরকার, রাষ্ট্রের সংবিধান নাই সেজন্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে প্রতিনিধিত্ব আকারে গণপরিষদ গঠন করা হয়, সেটা নির্বাচনের মাধ্যমে হতে পারে, সিলেকশনের মাধ্যমেও হতে পারে। সেই গণপরিষদ একটা সংবিধান প্রণয়ন করে এবং সেটা গৃহীত হওয়ার পরে সংবিধানের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচন হয়। এখানে আমাদের রাষ্ট্র কি নতুন হয়েছে? আমাদের রাষ্ট্র পুরাতন রাষ্ট্র ৫৩/৫৪ বছর। আমাদের একটা সংবিধান আছে, সেই সংবিধানের হয়তো গণতান্ত্রিক চরিত্র বিনষ্ট হয়েছে তার সঙ্গে আমরা একমত নই। যার জন্য রাষ্ট্র কাঠামো ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণ করা দরকার নতুনভাবে। সেই জন্য আমরা সংবিধানের ব্যাপক সংশোধনী এনেছি, যারা গণপরিষদ দাবি করছে তারাও ৬৯টা প্রস্তাব দিয়েছে সংশোধনের জন্য আমরা একটু কম দিয়েছি। এগুলো আলোচনা করে আমরা একটা বৃহত্তর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের একটা ব্যাপক সংশোধিত সংবিধান পেতে পারি। সেই সংবিধানকে তারা নতুন সংবিধান বলতে পারে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। এখানে গণপরিষদের কোনো প্রয়োজন নেই।

তিনি বলেন, সংশোধিত সংবিধানকে তারা নতুন নামে ‘রিপাবলিক’ বলতে পারে আমাদের তো আপত্তি নাই। কিন্তু তাদের সেই আইডিয়াটা পুরো জাতির উপরে চাপিয়ে দেয়াটা কতোটা যুক্তিসঙ্গত সেটার দাবি রাখে। সালাহউদ্দিন বলেন, গণভোটের বিধান তো আছে সংবিধানের ১৪২ আর্টিকেলে। সেখানে বলা আছে, আর্টিকেল ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ ইটসেলফ। এগুলো যখন সংশোধিত হবে তখন গণভোটের প্রয়োজন হবে। যদি নতুন সংবিধানে আলাপ-আলোচনার মধ্যদিয়ে আরও কোনো প্রভিশন যদি এই গণভোটের অধীনে নিয়ে আসা হয় সেটা তখন দেখা যাবে। সেই সমস্ত ক্ষেত্রে গণভোটের কথা আসতে পারে।’ আমরা মনে করি, এখন সংসদ নির্বাচন করা উচিত। গণভোট নির্বাচন নয়। আমরা মনে করি, আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে একটি রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা হলে সমস্ত আলাপ-আলোচনা সংসদে হতে পারবে।

বিএনপি’র মতামতসমূহ:
দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার: সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, স্প্রেডশিটে ২০টির মতো প্রস্তাবনা সুপারিশ ছিল। ২০টার মধ্যে আমরা ১১টিতে সরাসরি একমত আর ৭/৮টাতে মন্তব্যসহ নীতিগতভাবে একমত হয়েছি। শুধুমাত্র একটি প্রস্তাবে আমরা ভিন্নমত পোষণ করেছি। কারণ ওখানে একটা আইন সংশোধনের বিষয় রয়েছে, আয়কর সংক্রান্ত।

প্রশাসন সংস্কার কমিশন: সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এখানে ২৬টা বিষয়ে প্রস্তাবনা আছে। সেখানে আমরা এর প্রায় অর্ধেক বিষয়ে একমত। আর বাকি অর্ধেক বিষয়ে আমাদের মতামত-মন্তব্য আছে, বিস্তারিত আলাপ-আলোচনায় একটা জায়গায় আসা যাবে। এসব প্রস্তাবনার মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কর্মকর্তাদের সচিব পদোন্নতির জন্য পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেইজ থেকে, সেখানে বিদ্যমান এসএসবি বাতিলের একটা সুপারিশ করা হয়েছে। এর সঙ্গে আমরা একমত নই। তার পরিবর্তনে মন্ত্রিপরিষদ কমিটি করার একটা প্রস্তাব করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এর মধ্যদিয়ে প্রশাসনে রাজনীতিকরণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেজন্য আমরা দ্বিমত পোষণ করেছি। আরেকটা বিষয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে যে প্রস্তাবনা দেয়া আছে, সে বিষয়ে আদালতের রায় আছে। আদালতের রায় বহাল থাকা অবস্থায় এ বিষয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাইনি। আমরা স্টেটাসকো (স্থিতিবস্থা) রাখা বাঞ্ছনীয় মনে করি।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন: কমিশনের প্রায় সকল প্রস্তাবের সঙ্গে আমরা একমত। যেহেতু আপনারা জানেন যে, আমরা আমাদের ৩১ দফা প্রস্তাবের মধ্যে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার জন্য অনেকগুলো প্রস্তাব আমরা ওখানে দিয়েছিলাম। তার মধ্যে অধস্তন আদালতের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের জন্য অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করার জন্য সংবিধানের আর্টিকেল ১১৬ আমরা পরিবর্তন বা সংশোধনের সুপারিশ করেছিলাম। যাতে করে বর্তমানে সংবিধানের বিদ্যমান প্রভিশন তাতে বলা আছে যে, প্রেসিডেন্ট করবে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে। এখানে প্রধান বিচারপতিকে প্রধান করে আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে রাখতে চাই সেটা আমাদের প্রস্তাব। যাতে করে সুপ্রিম কোর্টের আলাদা একটি সেক্রেটারিয়েট হবে সেই প্রস্তাবের সঙ্গে আমরা একমত। আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পরবর্তিতে বাজেটে কি হবে না হবে সেটা বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে সেটা আমরা মন্তব্যে দিয়েছি।

সালাহউদ্দিন বলেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আপনারা জানেন সেটা অলরেডি পঞ্চদশ সংশোধনী মামলায় হাইকোর্টের রায়ে এটা বহাল হয়েছে এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে আদলে লোয়ার জুডিশিয়ারির জন্য লোয়ার জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করেছি। যাতে একটা জবাবদিহিতা থাকে নিম্ন আদালতের জন্য। এখানে সেক্রেটারিয়েট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে লোয়ার জুডিশিয়ারির জবাবদিহিতা কতোটুক নিশ্চিত কীভাবে করা যাবে সেটা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও আলোচনা করার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি। বিচার বিভাগের যেসব প্রস্তাবনা তারা দিয়ে তার সবগুলোর সঙ্গে আমরা একমত এবং আমাদের নিজস্ব অভিমতও আছে। বিচার বিভাগের ৪/৫টি বিষয়ে একটু মন্তব্য সহকারে মতামত দিয়েছি।

নির্বাচন সংক্রান্ত সংস্কার কমিশন:
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার বিষয়ক রিপোর্টে দেখা যায় উনারা ২৭টার মতো প্রস্তাব দিয়েছেন। তাতে অধিকাংশ প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আমরা ঠিক বুঝতে পারেনি যে, নির্বাচন কমিশন কিংবা নির্বাচন ব্যবস্থা সংক্রান্ত রিপোর্টে কিছু কিছু বিষয়ে সংবিধানের সংশ্লিষ্টতা আছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, নির্বাচনী সংস্কার নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়।  আমরা সেই বিষয়ে সংবিধান সংস্কার বিষয়ক রিপোর্টে মতামত দিয়েছি।

তিনি বলেন, একটি বিষয়ে আমাদের মতামত পজেটিভলি দিয়েছি। কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশন, এই ইসি’র ক্ষমতাকে খর্ব করার জন্য সংস্কার কমিশন কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। যেগুলো আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার ওপরে হস্তক্ষেপ। যেগুলো আমরা মনে করি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে থাকা দরকার। যেমন এনআইডি, এটা যদি আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে দেয়া হয় তাহলে ইসিকে বারবার এনআইডি বিষয়ে সহযোগিতার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে যেতে হবে। তার চাইতে বর্তমানে যে বহাল আছে, অবশ্য একটা আইন আছে যেটা আওয়ামী লীগের আমলে করেছে যে, এনআইডি’র কার্যক্রম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, আইনটি এখনো বাতিল করা হয়নি, বাতিলের জন্য বিবেচনাধীন ছিল। আমরা মনে করি, এই আইনটি বাতিল করে এনআইডি’র কার্যক্রম পুরোটাই নির্বাচন কমিশনের হাতে রাখা উচিত।

সীমানা নির্ধারণও নির্বাচন কমিশনের কাছে রাখা উচিত বলে বিএনপি মনে করে বলে জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, সীমানা নির্ধারণ ইসি’র আইন আছে এবং সাংবিধানিক এখতিয়ার। নির্বাচন কমিশনের সেই আইনে সামান্য একটা প্রিন্টিং মিসটেক ছিল সেটা আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে দিয়েছিলাম, আইন মন্ত্রণালয় সেটা গিয়েছে কিন্তু এখনো সংশোধন হয়নি। না হওয়ার কারণ ইসি এখনো ডিলিমিটেশন সংক্রান্ত কোনো শুনানি করতে পারছে না। তার ফলে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। আমরা সরকারকে আহ্বান জানাবো যে, অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধনীটা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে সীমানা নির্ধারণের ক্ষমতা রাখা হোক। আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে রাখার বিষয়টা আমরা নাকচ করছি।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতার জন্য সংসদীয় কমিটির কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে বলে কমিশনের একটা সুপারিশ আছে। তাতে আমরা মনে করি নির্বাচন কমিশনে বর্তমানে যারা আছেন এবং ভবিষ্যতে যারা আসবেন তারা তাদের দায়বদ্ধতার জায়গাটা পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে না রেখে বিদ্যমান যে ব্যবস্থা আছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের আওতাধীন আছে, যে একজন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক যে প্রক্রিয়ায় অপসারিত হয় সেই একই প্রক্রিয়ায়টা নির্বাচন কমিশন এবং দুই-একটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেটা সংবিধানের আর্টিক্যাল ৯৬-এ বলা আছে সেই হিসেবে এবং আরও বড় অথোরিটির কাছে দায়বদ্ধতা আছে সেখানে সংসদীয় কমিটির কাছে নেয়াটা অনেকটা রাজনৈতিক বলে আমরা মনে করি। সেখানে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা রাখাটা উচিত বলে মনে করছি না আমরা।

সংবিধান সংস্কার কমিশন: সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন. স্প্রেড শিটে উনারা সংবিধানের প্রস্তাবনা উল্লেখ করে নাই। সংবিধানের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রস্তাবনা যেটা প্রিয়াম্বল নামে আমরা চিনি সেটা পুরোপুরি সংশোধনের বা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অনেকটা রিরাইটিংয়ের মতো। সেখানে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানকে এক কাতারে নিয়ে আসা হয়েছে যেটা সমুচিত বলে আমরা মনে করি না। এটাকে অন্য জায়গায় রাখার বা তফসিল অংশে রাখার বা স্বীকৃতি দেয়ার বিভিন্ন রকমের সুযোগ আছে সেটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমরা পরে প্রকাশ করবো। কিন্তু সেই প্রিয়াম্বলটা আমরা চাই। যেটা অষ্টাদশ সংশোধনীর পূর্বাবস্থা যেটা পঞ্চম সংশোধনীর পরে গৃহীত হয়েছিল বাংলাদেশের জনগণের সকল অভিপ্রায় হিসেবে সেইটা বহাল থাকা উচিত।

তিনি বলেন, সুপারিশে উনারা শুরু করেছেন রিপাবলিক দিয়ে, রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন দিয়ে যেটাকে প্রজাতন্ত্র না বলে জনগণতন্ত্র বা নাগরিকতন্ত্র বা পিপলস রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ এর ক্ষেত্রে বাংলায় বলছেন যে, জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, বাংলায় উনারা নাগরিকতন্ত্র এবং জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ লিখতে চান। সেটা কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। দীর্ঘদিনের প্র্যাকটিসের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের নাম মেনে নিয়েছে। এখন বিষয়টা নিয়ে যে আসলে কতোটুকু কি অর্জন হবে সেটা প্রশ্নের দাবি রাখে। আমরা এ বিষয়ে একমত নই। তাছাড়া মৌলিক অধিকার এবং মূলনীতির ক্ষেত্রে উনার ব্যাপক পরিবর্তনের একটা প্রস্তাব ওখানে রেখেছেন। আমরা প্রস্তাব করেছি যে, বর্তমানে সংবিধানিক ধারাগুলো আছে, অনুচ্ছেদগুলো আছে তার মধ্যে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের প্রস্তাব অনুসারে মূলনীতির মধ্যে যেসব প্রস্তাব আছে তার হয়তো সংশোধনী আনা যায় কিন্তু আমরা দলের পক্ষ থেকে পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্বাবস্থায় বহাল রাখার জন্য প্রস্তাব করেছি।

‘মৌলিক অধিকার এবং স্বাধীনতা’ নামে আলাদা চাপ্টার সংযুক্ত করার জন্য সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, যেটা আসলে অনেকটা আমরা মনে করি যে, অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে হয়তো যাদের পার্লামেন্টের এক্সপেরিয়েন্স বা রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে অভিমত আসতে পারে বা দিয়ে থাকতে পারেন। মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রকে নিশ্চিয়তা বিধান করতে হবে.. সেজন্য মৌলিক অধিকারের সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটগুলো সীমিত। এ ছাড়া সোশ্যাল কালচারাল ইকোনমিক রাইটগুলো সেগুলো রাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপরে ভিত্তি করে গুড গভার্নেন্সের ওপরে ছেড়ে দিতে হয়, সেই জায়গায় উনার জিনিসটা একটু মিলিয়ে ফেলেছেন, এমালগেমেট করে ফেলেছে.. সেটা আমরা আশা করি আলোচনার সময়ে বুঝাতে সক্ষম হবো।
সালাহউদ্দিন বলেন, নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ- এখানে উনার যেসমস্ত প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন এবং যেগুলো কমিশনের কথা বলেছেন, বিশেষ করে ন্যাশনাল কন্টিটিউশনাল কাউন্সিল গঠন করে কিছু অনির্বাচিত ব্যক্তিদের, এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানদের এখানে মেম্বার করে যেসমস্ত এখতিয়ার, গঠন এবং ধরন কার্যাবলীর প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে করে দেখা যাবে যে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আর কোনো গুরুত্ব থাকে না। রাষ্ট্র নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে এটা সংবিধানের মূল চেতনা সেই জায়গায় এটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আমরা মনে করি।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের বিষয়ে উচ্চ কক্ষের আসন ও মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গেও ভিন্নমত পোষণ করেছেন বলে জানান সালাহউদ্দিন। মহিলাদের সংসদীয় আসন সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ করার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হলেও মনোনয়ন প্রক্রিয়ার বিষয়ে কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে ভিন্নমতের কথাও বলেন তিনি। সালাহউদ্দিন বলেন, সংবিধানের প্রায় শতাধিক প্রস্তাবের মধ্যে এখানে স্প্রেড শিটে ৫৭টা এসেছে। সেই জায়গায় বিস্তারিত প্রতিবেদন আমরা যুক্ত করেছি। পুরো পুস্তকটাতে তাদের সুপারিশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সেগুলো এক জায়গায় এসে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেবো- অন্যান্য কয়েকটি কমিশনের প্রস্তাবের প্রতিবেদন আমরা কয়েকদিন পরে দেব বলে উনাদের জানিয়েছি।

১১৩টিতে সম্পূর্ণ, ২৯টিতে আংশিক একমত এনসিপি
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের স্প্রেডশিটে সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ যে ১৬৬টি সুপারিশ রয়েছে তার মধ্যে ১১৩টিতে পুরোপুরি একমত বলে জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। এ ছাড়া ২৯টি প্রস্তাবে আংশিক একমত এবং ২২টি প্রস্তাবের ব্যাপারে একমত হতে পারিনি দলটি। সবমিলিয়ে ১৪২টি প্রস্তাবে সম্পূর্ণ ও আংশিক একমত হয়েছে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন এনসিপি। গতকাল দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে সংস্কার নিয়ে নিজেদের লিখিত মতামত জমা দিয়ে দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার সমন্বয় কমিটির কো-অর্ডিনেটর সারোয়ার তুষার বলেছেন, অনেকগুলোর ক্ষেত্রে আমরা একমত হয়েছি আবার পাশের ঘরে মন্তব্য করেছি।

তিনি বলেন, আংশিক মন্তব্যের ক্ষেত্রেও আমরা আংশিকে টিক দিয়ে পাশে মন্তব্য লিখেছি। যেগুলোতে একমত নই- কেন নই, পাশে যে অল্প জায়গাটুকু রয়েছে তার মধ্যে লিখেছি। সামনে যখন আমরা বসবো, তখন বিষয়গুলো আরও বিস্তারিত বলবো। জরুরি বিষয়গুলো হলো, রাষ্ট্রভাষা বাংলা এ ব্যাপারে আমাদের আপত্তি নেই। কথাটা দাপ্তরিক ভাষা হওয়া উচিত। দাপ্তরিক ভাষা এক বা একাধিক হবে কিনা সেটা অন্য আলোচনার বিষয়। বিদ্যমান সংবিধানে দুই রকম করে আছে জনগণ বাঙালি, আর নাগরিকরা বাংলাদেশি। এটাকে তারা বলেছেন বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া বিবেচিত হবে। এটার সঙ্গে আমরা একমত হয়েছি। পাশাপাশি মন্তব্য করেছি বাংলাদেশে বিভিন্ন যে জাতিসত্তা রয়েছে তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকতে হবে। মৌলিক অধিকারের বিষয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগ মিলে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা নামকরণ করেছেন এটাতে আরও থাকা উচিত প্রাণ প্রকৃতি সুরক্ষা। এটা মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

সারোয়ার তুষার বলেন, প্রত্যেকটি অধিকারের সীমা রয়েছে। তারা একটি সাধারণ সীমা দেয়ার কথা ভেবেছেন। আমরা বলেছি সাধারণ সীমা নির্ধারণে সর্বোচ্চ আদালতে এখতিয়ার সুনির্দিষ্ট করতে হবে। নির্বাচনে প্রত্যেক দলকে ১০ শতাংশ তরুণ-তরুণী মনোনয়ন দিতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা তরুণ-তরুণীর সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ বছরের প্রস্তাব করেছি। ন্যূনতম প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বয়স ২৩ করা উচিত। ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হওয়া উচিত। অর্থবিল ও দলীয় অনাস্থা ভোট ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বাধীন মতামত দিতে পারবেন সংসদ সদস্যরা। ডেপুটি স্পিকার তারা দুইজন প্রস্তাব করেছে, আমার বলেছি একজন হওয়াই যথেষ্ট এবং তা বিরোধী দল থেকেই হওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান যেন একই ব্যক্তি না হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বলেছি প্রধানমন্ত্রী হবেন মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ প্রথম ব্যক্তি। এর বাইরে তার আলাদা প্রধানের স্ট্যাটাস না থাকুক। তারা বলেছেন অর্থবিল ছাড়া দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে মন্তব্য দেয়া যাবে। আমরা বলেছি দলের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটে এটাও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। অর্থাৎ অর্থবিল ও দলীয় অনাস্থা ভোট ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বাধীন মতামত দিতে পারবেন সংসদ সদস্যরা। উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের দুই কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের যে প্রস্তাবটা এসেছে। এক্ষেত্রে আমরা বলেছি উচ্চকক্ষের প্রার্থী নির্বাচনের আগেই ঘোষণা করতে হবে। যেটা অন্যান্য দলগুলো চাচ্ছে না। একজন ভোটার একটাই ভোট দিবেন। ওই ভোটের একটা পার্সেন্টটেন্স জমা হবে। সেক্ষেত্রে আমার জানার অধিকার আছে উচ্চকক্ষে কে যাচ্ছে। আমি যদি না জানি, ভোট দিয়ে দিলাম। একটা দল ৩৫টা ভোট পেলো এবং ৩৫ জন উচ্চকক্ষে গেল। এবং তারা তাদের মত করে ৩৫ জনকে দিয়ে দিলো। আমার কাছে যদি তালিকা থাকে যে নিম্নকক্ষ ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে চিন্তা করবো কারা উচ্চকক্ষে রয়েছে। নিম্নকক্ষে যেমন আগেই ঘোষণা করতে হবে প্রার্থী তেমনি উচ্চকক্ষেও করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিতে পারবেন। তবে সেটা সবক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এখন যেমন থাকে তেমন না। এটা হতে হবে নন বাইন্ডিং। জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের প্রস্তাব এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের একটা বিধান রয়েছে। এটা হতে হবে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেক্ষেত্রে আমরা বুঝতে পারবো তাদের কাজ শুধু নির্বাচন আয়োজন করা। সামনে বা এই নির্বাচন আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে করতে পারি।

সারোয়ার তুষার আরও বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার নির্বাচন কমিশন বলেছে চার মাস হতে হবে। সংস্কার কমিশন বলেছে তিন মাস আমরা বলেছি ৭০ থেকে ৭৫ দিনই যথেষ্ট। নির্বাচনকালীন সময় একটা সরকার থেকে আরেকটা সরকার আসার সময় পর্যন্ত মাঝখানের সময়টা এনসিসি’র বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংসদ চলাকালীন যদি জরুরি অবস্থা জারি করার মতো পরিস্থিতি আসে। তাহলে উভয়কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে। নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো অবস্থাতেই জরুরি অবস্থা জারি করা যাবে না। নির্বাচন কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন উচ্চকক্ষের সিটের ক্ষেত্রে বলেছেন ৩ শতাংশ ভোট পেলে তার ভিত্তিতে আপনাকে আসন দেয়া হবে। সংবিধান সংস্কার কমিশন এ বিষয়ে বলেছে ১ শতাংশ। আমরা ১ শতাংশই মনে করি যথাযথ। দুদক কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা বলেছে কিছু প্রতিষ্ঠানে ১৫ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আমরা বলেছি এটা ১০ বছর থাকলেই চলবে। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতে বিচারক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী প্রতি তিন বছর অন্তর দেয়ার কথা তারা বলেছেন। আমরা বলেছি এটা প্রত্যেক বছর করতে হবে।

জনপ্রশাসনের ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশনের কথা উল্লেখ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, তারা প্রস্তাব করেছে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মামলা গ্রহণের ক্ষমতা থাকা দরকার। আমরা বলেছি বিচার বিভাগের ক্ষমতা বিচার বিভাগের পেশাজীবী ছাড়া বাইরে কারও হাতে থাকা ঠিক হবে না। সংসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য নিয়োগ জনপ্রশাসনের পক্ষ থেকে এসেছে। আমরা নীতিগতভাবে একমত। কিন্তু এটা জনপ্রশাসনের মধ্যে পড়ে না। আমরা জনপ্রশাসনে বেশি বিরোধিতা করেছি। সেটা হলো প্রাদেশিক শাসনের দেশের জন্য বিপজ্জনক। এটা বাতিল করে দেয়া উচিত। বিভাগীয় ভূমি আদালতের বিষয়টা পরিষ্কার না থাকায় আমরা এটার সঙ্গে একমত হতে পারি নাই।
এ সময় দলটির সংস্কার সমন্বয় কমিটির সদস্য মুনিরা শারমিন, জাবেদ রাশিম, আরমান হোসাইন ও সালেউদ্দিন সিফাত উপস্থিত ছিলেন।

mzamin