Tuesday, May 3, 2016

গণতন্ত্র তখনই বিকশিত হবে যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে -বার্নিকাট

আজকে আমরা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপন করছি। জাতিসংঘ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই দিবসটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্র বিকাশের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা উদযাপন করার সুযোগ করে দেয়। প্রেসিডেন্ট ওবামা যেমনটি বলেছেন, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস এমন একটি দিবস যখন আমরা ঐসকল সাংবাদিকদেরকে সম্মান প্রদর্শন করি, আমরা যখন এই মুহুর্তে কথা বলছি তারা হয়ত কারাভোগ করছেন, লাঞ্ছিত হচ্ছেন এবং বিপদে রয়েছেন এবং অবশ্যই তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি যারা এই কারণে প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্বব্যাপী আমরা সাংবাদিকদের সম্মান জানাই যারা অনেক বিপদের মোকাবেলা করেও সত্য উন্মোচনের এবং তা ছড়িয়ে দেয়ার অঙ্গীকারের জন্য গণতান্ত্রিক আদর্শকে রক্ষা করেন।
একটি গণতন্ত্রে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। তারা আমাদের নেতাদেরকে এবং আমাদেরকে অর্থাৎ জনগনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনেন। তারা আমাদের ও আমাদের সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে তারা সাহায্য করেন। সাংবাদিকরা তাদের ভূমিকার জন্য প্রায়শঃই অন্যদের লক্ষবস্তুতে পরিণত হন।
যারা মনে করে সাংবাদিকদের কারনে তারা হুমকির মুখে রয়েছে। আমাদের বিশ্ব, দেশ এবং সমাজ সেসকল প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয় তা নিয়ে প্রতিবেদন করার প্রচেষ্টার কারণে অনেকেই কারাবরণ করেছেন, হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং এমনকি নিহত হয়েছেন।
গণতন্ত্র কেবল সেখানেই বিকশিত হতে পারে যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। সাংবাদিকরা যেমন আমাদের গণতন্ত্র রক্ষা করে তেমন আমাদেরও উচিত তাদের রক্ষা করা। বিশ্বের সর্বত্র নাগরিকদের সুবিধার জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে আমাদের রক্ষা করতে হবে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, চিত্তে যেখা ভয়শূণ্য, উচ্চ যেথা শির; জ্ঞান যেথা মুক্ত। আমি বিশ্বাস করি তিনি এমন একটা বাংলাদেশে স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে সব ধরনের লেখক চিন্তাবিদ ও সাংবাদিকরা কাদের বোধে আসা যে কোন সত্য কোন প্রকার প্রতিহিংসার ভয় ছাড়াই সবার সাথে ভাগাভাগি করে নিতে পারবেন। আমরা সবাই এই স্বপ্নের প্রতি সম্মান জানাই।
মার্শা বার্নিকাট, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত

ফেসবুকের সমাধিক্ষেত্র : ‘আমি কবে মরে গেছি, আজও মনে করো?’ by ফারুক ওয়াসিফ

দুনিয়ায় যত কাল আছে, এর বাইরে আরেকটি কাল হচ্ছে—ফেসবুককাল। সেখানে একটাই সময়—বর্তমান। আমার এক বন্ধু ক্যানসারে মারা গেছে চার বছর আগে। কিন্তু খুঁজলে এখনো তাকে পাই। ইহজগতে সে নেই। তার স্মৃতিও একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে মন থেকে। কিন্তু এখনো ফেসবুক তার জন্মদিনের কথা জানায়। হঠাৎ টাইমলাইনে ঘোষণা আসে : ‘অন দিস ডে ইউ হ্যাভ মেমোরি উইথ...।’ হয়তো ভুল করে ক্লিক করি তার প্রোফাইলে। তার অ্যাকাউন্টটি কেউ বন্ধ করে দেওয়ার অনুরোধ করেনি ফেসবুককে। সব তেমনই আছে। অনেক ছবি, অনেক কথা, অনেক পোস্ট। না থেকেও এভাবে সে আছে। ফেসবুক হয়ে থাকছে অক্ষয় স্মৃতির জাদুঘর। মানুষ ভোলে, ডিজিটাল মেমোরি ভোলে না কিছুই। ফেসবুকে রয়ে গেছে তার স্থায়ী ডিজিটাল উত্তরাধিকার। ডিজিটাল যুগের ভার্চ্যুয়াল রিয়্যালিটি বদলে দিচ্ছে আমাদের জীবন। এমনকি মৃত্যুর অর্থও বদলে যাচ্ছে। শারীরিকভাবে মরে গেলেও আপনি বাঁচিয়ে রাখতে পারেন আপনার আপনজনের ডিজিটাল অস্তিত্ব। ফেসবুককে অনুরোধ করে, মৃত্যুর সনদনামা দেখিয়ে একটা ফরম পূরণ করে তার অ্যাকাউন্টটি চালু রাখতে পারেন। ওটাকে বানিয়ে ফেলতে পারেন তার স্মৃতির স্মারক, নয়তো যেমন ছিল, তেমনই রাখতে পারেন। শুধু ওই না-থাকা মানুষটির নিজের কোনো সাড়া মাথা কুটলেও মিলবে না। কেবল বৈধ উত্তরাধিকারই পারবে ওই অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে। আউটলুক ম্যাগাজিনে দিলীপ বব লিখেছেন, ‘এখন এই ডিজিটাল যুগে, সব সময়ই অতীতও বর্তমান। মরে গেলেও আমরা সবাই জীবিত, যদিও তারা পারবে না আপনার প্রশ্নে সাড়া দিতে ।’ তারপরও হয়তো অনেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে, তার পোস্টে ট্যাগ করবে। পোক করবে কেউ, কিন্তু আমি টেরটি পাব না। কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো করে মরে যাওয়া কারও কথা মনে হবে অন্য কারও : সে বোধ হয় ভাবছে, ‘আমি কবে মরে গেছি, আজও মনে করো?’
এ থেকে এক চিন্তা এসেছে। মৃত্যুর পর কাউকে উত্তরাধিকারী করে যাব আমার অ্যাকাউন্টের। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো, সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মতো কাউকে করে যাব আমার ডিজিটাল স্মৃতির উত্তরাধিকারী। জন্মদিনে-মৃত্যুদিনে সে হয়তো আমার পৃষ্ঠাগুলোতে বিষণ্ন মনে ঘুরে বেড়াবে। হয়তো পুরোনো কোনো কথা বা ছবি থেকে আমার সম্পর্কে নতুন কোনো উপলব্ধি জন্মাবে তার। আমি নিজে যেমন ভাবতাম না নিজেকে, আমার অতীত তার সামনে তেমন কোনো রূপে হাজির হবে হয়তো। কিংবা জেনে যাবে কেউ যা জানেনি, তা-ও। তখন আমার কিছুই করার থাকবে না। হয়তো, এটাই একধরনের ডিজিটাল অমরত্ব। লোকে যেমন কবরস্থানে যায়, হয়তো সে সময়ের মানুষ কারও স্মরণে ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে এক তোড়া ডিজিটাল-পুষ্প দিয়ে আসবে। কষ্ট করে দূরের কোনো কবরস্থানে গিয়ে মুছে যাওয়া সমাধিলিপিগুলো থেকে কারও নাম খুঁজে বের করতে হবে না। তা ছাড়া কবরের ওপর যখন কবর উঠছে, তখন কজনারই বা নিজস্ব কবর কিনে রাখার সামর্থ্য থাকবে? বরং ফেসবুকের সমাধিটা হবে একদম নিজস্ব। আমার স্মৃতির উত্তরাধিকারী চাইলে সেটাকে আমার নামেই রেখে দিতে পারবে। সেটাই হয়তো হয়ে উঠবে মৃতকে স্মরণ করার নতুন প্রথা। কে জানে?
আমরা যার যার জায়গায় মরে যাব। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মেনলো পার্ক নামের জায়গার কোনো এক সার্ভারে আমি বেঁচে থাকব ডিজিটাল তথ্যপুঞ্জের ভেতর। এই তথ্য আমাকে বিষণ্ন না সুখী করে? জানি না। এক অর্থে ফেসবুক ক্রমেই কবরস্থান হয়ে উঠছে। ফেসবুক চালু হয়েছে এক যুগ হলো। গত বছরের এক হিসাবে, এই ১২ বছরে ৫ কোটি ফেসবুকার মারা গেছেন। এখন বিশ্বে ফেসবুকারের সংখ্যা ১৬০ কোটি। এদের মধ্যে প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন ৮ হাজার জন। সুতরাং, নিকট ভবিষ্যতে জীবিত ব্যক্তিদের চেয়ে মৃত ফেসবুকারের সংখ্যা বেশি হবে। ঢাকার রায়ের বাজার বধ্যভূমির পেছনে এশিয়ার বৃহত্তম কবরস্থান নির্মাণ করে গর্বিত বাংলাদেশ সরকার। ফেসবুক তাদেরও ছাপিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে তা হয়ে উঠেছে দুনিয়ার বৃহত্তম ডিজিটাল কবরস্থান। অনলাইনে আমরা যা-ই করি, তার চিহ্ন রয়ে যায়। দিলীপ বব বলছেন, ‘এভাবে আমরা আসলে রচনা করে যাচ্ছি আমাদেরই আত্মজীবনী। আমরা তো সবই করি সেখানে। আর আছে আমাদের ছবি—অফুরান। মারাত্মক এক বিপদও আছে এই রয়ে যাওয়ার। ফেসবুক ও গুগলের ব্যবহারকারীদের যাবতীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকা বিপজ্জনকও। আমেরিকায় রক্ষিত সেই তথ্যভান্ডারে আমেরিকান সরকার প্রবেশ করতে পারবে। কোনো কোম্পানি সেগুলো কিনে নিতে পারবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য এসবের ব্যবহার ঠেকানো যাবে কেমন করে?’
গত বছরের অক্টোবর মাসে বেলজিয়ামে অবস্থিত ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস একটা রায় দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে রক্ষিত ইউরোপীয় নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য খারাপ উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো হতে পারে। এই যুগান্তকারী রায় ফেসবুক, গুগল, আমাজনসহ অনেক প্রাযুক্তিক কোম্পানিকে জনতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে বেশ কজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করেছে ফেসবুক। এতে করে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হলো না? যেখানে আমাদের সরকারই ফেসবুকের গোপন তথ্য ব্যবহার করছে, সেখানে বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের নামে নেওয়া আঙুলের ছাপের অপব্যবহার না হওয়ার নিশ্চয়তা কে দেবে? জীবিতর মতো, মৃত ব্যক্তির তথ্যেরও দাম আছে। একেকজনের আস্ত জীবনের সব তথ্য, ছবি, কথা, আবেগ কত দামে বিক্রি হবে? কিংবা কোনো রাজনৈতিক চক্রান্তে সেসবের ব্যবহার হবে? আমরা জানি না। শুধু এটুকু জানি, এই বিশ্বে জীবনে যেমন মরণের পরও আমরা অনিরাপদ। তারপরও অমরত্বের বাসনা রয়ে গেছে আমাদের। ইতিহাসের হাতছানি ডাকে আমাদের। তাই অনেকেই চাইবে, মরে গিয়ে ফেসবুকের তথ্যভান্ডারে রয়ে যেতে। রবীন্দ্রনাথের মতো বলতে, ‘রূপনারানের কূলে/জেগে উঠিলাম’ । উঠে দেখলাম, সব বন্ধু ও শত্রুর সঙ্গে একসঙ্গে তথ্য হয়ে আছি। কিংবা জীবনানন্দ দাশের মতো ভাবতে ইচ্ছা তো হয়ই, ‘আমরা মরে যাইনি আজও—তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়’।

জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ও নিরাপত্তা চাই by আনু মুহাম্মদ

‘সবার জন্য প্রযোজ্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি এবং নিরাপদে কাজের অধিকার’—এই দাবি হওয়া উচিত আমাদের সবার। মে দিবসের সঙ্গে এই দাবি অবিচ্ছেদ্য। দেশের প্রতিটি নাগরিক কাজ করে নিরাপদে বাঁচার অধিকার নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। একটি ন্যূনতম আয়সীমা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হচ্ছে ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ বা মাস ভিত্তিতে এ রকম মজুরি, যার নিচে দেশের কোথাও কোনো কাজে, কোনো মজুরি বা বেতন হতে পারবে না। যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে এই শর্ত পূরণ করতে হবে। এবং এই মজুরি অবশ্যই বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় পরিমাণ হতে হবে। সে জন্য তা দারিদ্র্যসীমার আয়ের নিচে হতে পারবে না। আট ঘণ্টা শ্রম দিবসের অধিকার এখন বিশ্বে এমনভাবে স্বীকৃত যে তাকে স্বতঃসিদ্ধ বলেই মনে হয়। কিন্তু এই অধিকার মানুষ এমনি এমনি পায়নি। তার জন্য অসংখ্য মানুষের শ্রম, ঘাম, মেধা কাজ করেছে, অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। যে ঘটনাপ্রবাহ এই মে দিবস তৈরি করেছিল, তার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল উনিশ শতকে, অনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কর্মক্ষেত্রে শিশু-নারীসহ শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা ও নির্যাতন দূর করার জন্য কয়েক দশকে মানুষের চিন্তা, সক্রিয়তা ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কাজের সময় কিংবা মজুরির তখন ঠিক ছিল না। ক্রমেই নারী-শিশুসহ শ্রমিকদের অবর্ণনীয় জীবন পরিবর্তনের জন্য অসংখ্য প্রতিবাদ–বিক্ষোভ তৈরি হয়। সংগঠন গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তা আট ঘণ্টা কাজ করে বাঁচার মতো মজুরির অধিকারের দাবিতে একটি ঐকমত্য তৈরি করে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই ১৮৮৬ সালের মে মাসের প্রথম দিনে তিন লক্ষাধিক শ্রমিকের ধর্মঘটের মধ্যে অন্য অনেক শহরের মতো শিকাগো শহরেও বড় সমাবেশ হয়। আতঙ্কে হামলা করে রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষ। প্রতিবাদে আবারও সমাবেশ, আবার হামলা। গুলিতে, সংঘর্ষে শ্রমিক নিহত হন, পুলিশও। পরে প্রহসনমূলক বিচারে সংগঠকদের ফাঁসি দেওয়া হয়। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দিবসটি ক্রমে প্রতীক হয়ে ওঠে। বিশ্বের প্রায় সব দেশে মে দিবস এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাও এই দিবস পালন করছে নিয়মিত। অবশ্য যে দেশে ‘মে দিবসের’ জন্ম, সেই যুক্তরাষ্ট্রে মে দিবস পালিত হয় না, সেখানে সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয় শ্রম দিবস।
কিন্তু এত বছর পরেও আট ঘণ্টা কাজ করে বাঁচার মতো মজুরির অধিকার প্রতিষ্ঠা থেকে বাংলাদেশ অনেক দূরে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নেহাত টিকে থাকতেও শুধু আট ঘণ্টার বেশি কাজ করলেই হয় না, শিশুসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে কাজে যোগ দিতে হয়। এ ছাড়া মজুরিবিহীন শ্রমের অস্তিত্ব আছে, আছে নারীর অস্বীকৃত শ্রম। আইএলও কনভেনশনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করলেও সেই কনভেনশনে স্বীকৃত শ্রমিকদের বহু অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নন, যাঁরা শ্রমিক বলে নিজেদের ভাবেন না—এ রকম পেশাজীবীরাও এখন পরিবারের একাধিক সদস্যের রোজগার ছাড়া জীবন চালাতে পারেন না। কিন্তু তা হওয়ার কথা নয়। একজনের আয়ে অন্তত চারজনের পরিবার বাঁচার মতো আয় করতে পারবেন সেটাই স্বীকৃত অধিকার।
মজুরি কীভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে হতে পারে, এই প্রশ্ন খুবই জোরেশোরে তোলা দরকার বর্তমানে দেশে কোনো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নেই। শ্রমিকদের মধ্যে খাতওয়ারি কিছু ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে, সব প্রতিষ্ঠানে তা-ও কার্যকর হয়নি। জাতীয় ন্যূনতম মজুরির অনুপস্থিতি, চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি থাকা এবং অসংগঠিত খাতের প্রাধান্যের কারণে সব পর্যায়ে মজুরি ও বেতনের ক্ষেত্রে সব সময়ই একটি নিম্নমুখী ঝোঁক বা টান থাকছে। ক্ষুদ্রশিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত যেখানে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান করে, সেখানে কোনো মজুরিবিধি নেই, সরকারেরও সে ক্ষেত্রে কোনো দায়-দায়িত্ব বা ভূমিকা দেখা যায় না। দেশে শিশু শ্রমিকদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য, যাদের অনেক ক্ষেত্রে কোনো মজুরিই থাকে না, থাকলেও খুবই কম। আর শিশু শ্রমিকেরাই, আর তাদের মধ্যে মেয়েরা আরও বেশি, সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় থাকে। নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার নানা ঘটনার কমই প্রকাশিত হয়। বর্তমানে দেশে শিল্পশ্রমিকদের একক বৃহৎ অংশ পোশাকশ্রমিক। অনেক শিল্প উপখাতের শ্রমিকদের অবস্থা পোশাকশ্রমিকদের থেকেও খারাপ। এখানেও ন্যূনতম মজুরি নিয়ে আন্দোলন তো বটেই, এমনকি বকেয়া মজুরি, ওভারটাইম পরিশোধ, সংগঠনের গণতান্ত্রিক অধিকার, বেআইনি ছাঁটাইবিরোধী আন্দোলন—এগুলো সব সময়ই চলছে। নির্যাতন, হুমকি, যৌন নিপীড়ন—এসবও নানাভাবে জারি আছে।
সরকারি পরিসংখ্যান এ রকম দাবি করতে চায় যে ৪৫ বছর আগের তুলনায় কৃষি, শিল্পসহ সব পর্যায়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বর্ণনামতে, ১৯৬৯-৭০ সালে মজুরি সূচক ১০০ ধরে ২০১৫ সালে নামিক বা টাকার অঙ্কে মজুরি সূচক দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯৭, টাকার অঙ্কে বেড়েছে প্রায় ৮০ গুণ। তবে লক্ষ্য করতে হবে যে একই সময়ে চলতি দামস্তরে জিডিপি বেড়েছে প্রায় ৩০০ গুণ। সরকারি দলিলে দেশের শ্রমিকদের গড় মজুরি ধরা হয়েছে মাসিক ৫ হাজার ৫৬২ টাকা। গড় এই মজুরি সঠিক তথ্যের কাছাকাছি হতে পারে, যদি সব শ্রমিকের মজুরি পরিশোধিত হয়, তাঁদের ১২ মাস কাজ থাকে এবং ১২ মাস কাজ করার ক্ষমতা থাকে। কিন্তু বাস্তবতা তার থেকে অনেক দূরে।
পরিসংখ্যানের ধরন থেকে এটা ধারণা করার যথেষ্ট যুক্তি আছে যে সরকারি প্রতিষ্ঠান মজুরির পরিবর্তন হিসাব করতে গিয়ে আগের প্রান্তের মজুরির কম দিকটা ধরেছে এবং পরের প্রান্তের মজুরির ঊর্ধ্বসীমা ধরেছে। এর ফলে প্রকৃত মজুরির যে বৃদ্ধি দেখা যায়, তা স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মজুরিচিত্র ছাড়া বাকি অধিকাংশ ক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ নয়। এ ছাড়া সরকারি পরিসংখ্যানে অন্য বড় ঘাটতি হলো কর্মঘণ্টা বিবেচনায় না নেওয়া। একজন মানুষ যদি কর্মঘণ্টা বৃদ্ধির মাধ্যমে তার মজুরি বৃদ্ধি করে, সেই বর্ধিত মজুরিকে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি হিসেবে অভিহিত করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।  বিদ্যমান বাজারদর অনুযায়ী হিসাব করলে সরকার নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমায় পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনতে চার সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক আয় হতে হয় কমপক্ষে ১৬ হাজার টাকা। তার মানে, সরকারের হিসাবে প্রাপ্ত গড় মজুরিও দারিদ্র্যসীমার আয়ের শতকরা ৫০ ভাগের নিচে। গার্মেন্টসে সর্বশেষ ঘোষিত ন্যূনতম মজুরিও তাই। মজুরি কীভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে হতে পারে, এই প্রশ্ন খুবই জোরেশোরে তোলা দরকার।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমিকদের অবস্থান শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, জাতীয় আয়ে তাঁদের অংশীদারত্ব বাড়ল না কমল, সেই প্রশ্নের উত্তর থেকে অর্থনীতির বিকাশের গতিমুখ চিহ্নিত করা সম্ভব। তিন দশক আগে সইফ উদ দাহার এই অংশীদারত্বের অনুপাত হিসাব করে দেখিয়েছিলেন। বিশ্লেষণ থেকে তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল স্বাধীনতার পর জাতীয় আয়ে শ্রমিক শ্রেণি ও বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষের অংশীদারত্ব উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে হিসাবটি আমি আরও বিস্তৃতভাবে করেছি। এই অনুসন্ধান স্পষ্ট করে যে স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে দেশের অর্থনীতির বিস্তার ঘটেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়, রোজগারি কাজে যুক্ততা বেড়েছে, লেনদেনের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয়েছে প্রায় সব দিকে। কৃষি, শিল্পসহ সব ক্ষেত্রে নতুন সম্পদ যোগ হয়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু এই সম্পদ বিস্তারের ওপর অধিকার কেন্দ্রীভূত হয়েছে, বিকাশের ধরনের মধ্য থেকেই উদ্ভূত, একটি ক্ষুদ্র শ্রেণির হাতে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ, দেশের অর্থনীতি বিস্তারে যাঁরা মূল ভূমিকা পালন করেছেন, এই বর্ধিত সম্পদে তাঁদের অংশীদারত্ব ক্রমাগত কমেছে। স্বাধীনতার সময়ে এই অংশীদারত্ব ছিল জিডিপির শতকরা ৪০ ভাগ, এখন তা নেমে এসে দাঁড়িয়েছে শতকরা ২০ ভাগেরও কমে। চার বছর আগেও আমি এই হিসাবে পেয়েছিলাম শতকরা ২৪ ভাগ। (এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে সর্বজনকথা, মে ২০১৬ সংখ্যায়) অর্থনীতির দৃশ্যমান সমৃদ্ধির পেছনে কৃষিশ্রমিক, পোশাকশ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকদের কৃতিত্বই বেশি। এর পাশাপাশি আছে নির্মাণ, পরিষেবা ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক মানুষ। অথচ এই প্রবৃদ্ধির অংশীদারত্বের অবস্থানের ক্রমাবনতি তাদের রাজনৈতিক সাংগঠনিক শক্তির আপেক্ষিকদুর্বলতার বিষয়টিকেই নির্দেশ করে। বর্তমানে আইনি-বেআইনি সম্পদ যাদের হাতে কেন্দ্রীভূত, তারা আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত ও আগ্রাসী এবং রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, আইনি-বেআইনি সব ক্ষমতাই তারা চর্চা করে থাকে। আর গ্রাম-শহরের শ্রমজীবী পেশাজীবী নারী-পুরুষসহ বাকি সবাই আগের তুলনায় অনেক বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত ও দিশাহীন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন অবশ্যই হতে হবে। এর জন্য ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ এবং ‘নিরাপদে কাজের অধিকার’-এর দাবি শ্রমিকসহ সব পর্যায়ের মানুষের ঐক্যবদ্ধ সক্রিয়তা তৈরির অভিন্ন ক্ষেত্র হতে পারে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu/anujuniv@gmail.com

মিউনিখে গার্দিওলার অগ্নিপরীক্ষা

বায়ার্ন মিউনিখের জেরোম বোয়াটেং আর ফ্রাঙ্ক রিবেরিরা প্রস্তুত
হচ্ছেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের জন্য। কাল মিউনিখে অনুশীলনে l এএফপি
বায়ার্ন মিউনিখে এটি তাঁর তৃতীয় মৌসুম। আগের দুই মৌসুমে বুন্দেসলিগা জিতেছেন, এবারও যে জিতবেন—তা নিয়ে সন্দেহ নেই বললেই চলে। ২০১৩-১৪ মৌসুমে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মৌসুমেই জার্মান কাপ জিতেছেন, এবারও তাঁর দল এরই মধ্যে ফাইনালে উঠে গেছে। সঙ্গে একটি করে উয়েফা সুপার কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ। তিন বছরে এত কিছু! যেকোনো ক্লাবের হয়ে যেকোনো কোচের এসব অর্জনকে সাফল্য বলে দেওয়া যায় চোখ বুজে। কিন্তু ক্লাবটা বায়ার্ন মিউনিখ বলেই এত কিছু করেও পেপ গার্দিওলা সেখানে মূল্যায়িত হচ্ছেন খুবই সাধারণ হিসেবে। বায়ার্নকে যে একবারও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাতে পারেননি তিনি! জার্মানিতে বাকি দলগুলোর সঙ্গে বায়ার্নের এত ব্যবধান যে ওরা বুন্দেসলিগা না জিতলে সেটিই কিছুটা চমক হয়ে আসে। একই কথা বলা যায় জার্মান কাপ নিয়েও। আর এমন একটা দলকে নিয়ে পেপ গার্দিওলা সর্বশেষ দুবারই বিদায় নিয়েছেন চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনাল থেকে। প্রথমবার রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হেরে, পরের বার প্রতিপক্ষ ছিল বার্সেলোনা। এবারও সেই সেমিফাইনালেই আরও এক স্প্যানিশ প্রতিপক্ষ এবং এবারও প্রথম লেগ শেষে ১-০ গোলে পিছিয়ে বায়ার্ন। ঘরের মাঠে আজ দ্বিতীয় লেগটা পেপ গার্দিওলার জন্য অগ্নিপরীক্ষা ছাড়া আর কী!
কঠিন এ বাস্তবতাটা যে গার্দিওলাও জানেন, সেটি বোঝা যাবে তাঁর কথা শুনলেই, ‘আমি জার্মান সংবাদমাধ্যমেই পড়েছি, মিউনিখে আমার কাজের মূল্যায়ন হবে শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগ দিয়ে এবং আমাকে তখনই সফল বলা হবে, যদি আমি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাতে পারি। এটাই সত্যি।’ ভিসেন্তে ক্যালদেরনে গত সপ্তাহে প্রথম লেগ হেরে যাওয়ায় বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত সমালোচনা আরও বাড়ছে। প্রবল আত্মবিশ্বাসী গার্দিওলা অবশ্য দুই দিন আগেই বলেছেন, ‘এখনো তো কিছুই শেষ হয়ে যায়নি। দ্বিতীয় লেগে আমাদের সুযোগ আছে। আমরা যদি ওই ম্যাচটা হেরেই যাই, তখন নাহয় আমাকে মারতে আসবেন।’ এই আত্মবিশ্বাসের অবশ্য একটা কারণও আছে। ঘরের মাঠে চ্যাম্পিয়নস লিগে কোনো ম্যাচ হারেনি বায়ার্ন। পাঁচ ম্যাচের সবগুলোতে জয়। এর মধ্যে শেষ ষোলোতে তো জুভেন্টাসের মাঠে ২-২ ড্র করে আসার পর মিউনিখে জিতেছে ৪-২ ব্যবধানে। সব মিলিয়ে ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় নিজের মাঠে টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত বায়ার্ন। ঘরের মাঠে বায়ার্নের এই দুর্দান্ত ফর্মের কথা অজানা নয় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ কোচ ডিয়েগো সিমিওনেরও। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে বার্সেলোনার মতো দলকে বিদায় করে দিয়ে এসেছেন বলেই সিমিওনেরও আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই, ‘মিউনিখে তারা কত শক্তিশালী দল, এটা আমরা জানি। পুরো গ্যালারি ওদের পক্ষে থাকবে। তবে আমাদেরও সুযোগ আছে অ্যাওয়ে গোল করার। আর সেটা করতে পারলে আমাদের সুযোগও বেড়ে যাবে।’
কোচ এই আত্মবিশ্বাসটা ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর খেলোয়াড়দের মধ্যে। ২০১৩-১৪ মৌসুমের পর আরও একবার চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলার স্বপ্নের বিভোর তাঁরা। অ্যাটলেটিকো ফরোয়ার্ড আতোয়াঁ গ্রিজমানও তাই বলছেন, ‘আমরা খুবই ইতিবাচক। আমাদের দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের স্বপ্ন চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলা। আমরা সর্বস্ব দিয়ে লড়ব।’ গার্দিওলার দল কি পারবে অ্যাটলেটিকোর এই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে? এএফপি।
খেলোয়াড় হিসেবে ক্লাবের হয়ে ১০ বার ডিয়েগো সিমিওনের (অ্যাটলেটিকো, সেভিয়া) মুখোমুখি হয়েছেন পেপ গার্দিওলা (বার্সেলোনা)। সিমিওনে জিতেছেন তিনবার, চারবার গার্দিওলা। আর্জেন্টিনার হয়েও একবার পেপ গার্দিওলার স্পেনের বিপক্ষে খেলেছেন সিমিওনে। ১৯৯৯ সালের ওই ম্যাচে ২-০ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।

এনামুল-ঝড়ে সহজ জয় গাজীর

কাল মিরপুরে ব্যাটে ঝড় তুলেছেন গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সের ওপেনার
এনামুল হক। সেঞ্চুরি করেছেন ৮৩ বলে l প্রথম আলো
দুজন গুরুত্বপূর্ণ ‘দর্শক’ ছিলেন মাঠে। এনামুল হকের সৌভাগ্য, তাঁর সেঞ্চুরির মুহূর্তটিতেই দুজন একসঙ্গে! সেদিকে ব্যাট উঁচিয়েই করলেন শতরানের উদ্যাপন। ব্যাট হাতে দুই-তিন দিকে তাকাতে হলো না। দুই দর্শকের একজন নির্বাচক হাবিবুল বাশার। আরেকজন ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। এনামুলের ঝোড়ো সেঞ্চুরিতে তাঁরা যেমন মোহিত, ব্যাটসম্যান এনামুলও জাতীয় দলের ‘নিউক্লিয়াসে’র দুই প্রতিনিধির সামনে এমন ইনিংস খেলে নিজেকে মনে করতে পারেন সৌভাগ্যবান। আর তাঁর দল গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্স তো নগদই পেয়ে গেছে সেঞ্চুরির সুফল। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সিসিএসের ১৭৬ রান ৩৩.৪ ওভারেই টপকে তারা ম্যাচ জিতেছে ৬ উইকেটে। এনামুলের দুর্নাম, তিনি স্ট্রাইক বদলে খেলতে পারেন না। তাঁর সেঞ্চুরি মানেই অনেক বলের গচ্চা। লিগের প্রথম ম্যাচে ৬৭ রান করেও তাই সমালোচিত হয়েছেন। বল যে খেলেছিলেন ১০১টি! পরের ম্যাচে কিছুটা উন্নতি, ৬৬টি বলে ৪২। সেই এনামুলই কাল ব্যাট হাতে চালালেন তাণ্ডব। ফিফটি করেছেন ৫৪ বলে, ৮৩ বলে সেঞ্চুরি। ফিফটিতে এক বাউন্ডারি আর তিন ছক্কা। প্রথম ছক্কাটি সাইফুদ্দিনের করা ইনিংসের প্রথম ওভারের চতুর্থ বলেই। এই সাইফুদ্দিনই অবশ্য সিসিএসের একমাত্র সফল বোলার। এনামুলের উইকেটটি শেষ পর্যন্ত তাঁর ভাগেই গেছে, নিয়েছেন আরও দুই উইকেট। বাকিদের বোলিংয়ে কোনো ধার তো ছিলই না, উল্টো বাজে বল করে গেছেন সমানে। শর্ট পিচ, ফুলটসগুলোকে যোগ্য ‘সম্মান’ই জানিয়েছেন এনামুল।
সিসিএসের অনভিজ্ঞ বোলারদের সামনে এনামুল রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন ফিফটির পর। দ্বিতীয় পঞ্চাশ করতে খেলেছেন মাত্র ২৯ বল! ততক্ষণে যোগ হয়ে গেছে আরও তিন বাউন্ডারি ও চারটি ছয়। বাঁহাতি স্পিনার সালেহ আহমেদকে ছক্কা মেরে পঞ্চাশ পূর্ণ করার পরের ওভারেই পরপর দুই ছক্কা অফ স্পিনার সাঈদ সরকারকে। ইনিংসের ৩২তম ওভারে সাইফুদ্দিনকে মিড অফে ঠেলে সেঞ্চুরি। পয়েন্টে সালেহর হাতে সহজ ক্যাচ দিয়ে আউটও হয়ে গেছেন ওই ওভারের শেষ বলে। সেঞ্চুরির জন্য এনামুল কৃতজ্ঞ থাকতে পারেন সঙ্গী ব্যাটসম্যান ফরহাদ হোসেনের (৪৫) কাছে। শেষ দিকে যখন ‘সেঞ্চুরি আগে হবে নাকি গাজীর জয়’ প্রশ্নটা জাগছিল, তখন নিজে শট না খেলে বারবার এনামুলকেই স্ট্রাইক দিচ্ছিলেন ফরহাদ। ২৮ রানে ২ উইকেট পড়ার পর তাদের ১৬৭ রানের অংশীদারিতেই জয় সহজ করে গাজীর।
সিসিএসের ইনিংসকে দুই ভাগ করে দিয়েছে সালমান (৫২) ও উত্তমের (৫৪) ৬৯ রানের পঞ্চম উইকেট জুটি। এই জুটির আগে ৪ উইকেট পড়েছে ৬৫ রানে। দলের ১৩৪ রানে জুটিটা ভাঙার মধ্য দিয়ে শুরু দ্বিতীয় ও শেষ বিপর্যয়ের। মাত্র ৪২ রানে পড়েছে শেষ ৬ উইকেট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
সিসিএস: ৪৭ ওভারে ১৭৬ (উত্তম ৫৪, সালমান ৫২; শরীফ ২/২২, মেহেদী ২/২৭)। গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্স: ৩৩.৪ ওভারে ১৭৯/৪ (এনামুল ১০০, ফরহাদ ৪৫; সাইফুদ্দিন ৩/২৬)। ফল: গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্স ৬ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: এনামুল হক।

আবদুস শাকুর শাহর একক প্রদর্শনী

শিল্পী আবদুস শাকুরের একটি চিত্রকর্ম
শিল্পাঙ্গনের উদ্যোক্তা প্রয়াত ফয়েজ আহমদের ৮৮তম জন্মদিনে আয়োজন করা হয়েছে বরেণ্য চিত্রশিল্পী আবদুস শাকুর শাহর পক্ষকালব্যাপী একক প্রদর্শনী ‘রেট্রোস্পেকটিভ’। প্রদর্শনীতে শিল্পীর ৭০টি ড্রয়িং ও পেইন্টিং স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে আশি ও নব্বই দশকে আঁকা বেশ কিছু শিল্পকর্ম এবারই প্রদর্শনীতে প্রথম স্থান পেয়েছে। প্রদর্শনী চলবে ১৫ মে পর্যন্ত। পয়লা মে ধানমন্ডির শিল্পাঙ্গনে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান। এ সময় আরও বক্তব্য দেন শিল্পী আবদুস শাকু শাহ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মফিদুল হক, শিল্প সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ ও গ্যালারি শিল্পাঙ্গনের পরিচালক সাংবাদিক রুমী নোমান। আজিজ খান বলেন, দেশে একসময় তেমন কোনো গ্যালারি ছিল না, ছিল না শিল্পীদের ছবি বিক্রির কোনো উপযুক্ত স্থান। সেই সময় ফয়েজ আহমদ প্রতিষ্ঠা করেন শিল্পাঙ্গন। শিল্পী ও শিল্পের জন্য অভাবনীয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ বলেন, ‘আমার জানামতে ফয়েজ ভাই ছিলেন একজন বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী। তিনি ছবি বিক্রির জন্য একটি গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি ফয়েজ আহমদের সঙ্গে আড্ডা দিতে মাঝেমধ্যে আসতাম শিল্পাঙ্গনে। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। কীভাবে তিনি বিনা পাসপোর্টে আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আহত অবস্থায় ভারতে গেছেন, তা শুনতাম।’
চিত্র সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ বলেন, ‘ফোক মোটিভ নিয়ে আধুনিক চিন্তায় যে পথে ছিলেন যামিনী রায়, কামরুল হাসান ও কিছুদিন আগেও কাইয়ুম চৌধুরী, সেই পথেই কয়েক দশক ধরে আবদুস শাকুরের যাত্রা। তিনি যে কাজে হাত দিয়েছেন, চিত্রে তাঁর যে গবেষণা—তা আমাদের গ্রামবাংলার অনবদ্য জীবনকথা।’

ক্যাম্পাসের বাইরে পদ্মাবতীর আখ্যান

পদ্মাবতী নাটকের একটি দৃশ্য
মহাদেবের মেয়ে পদ্মাবতী, পূজা চেয়েছিলেন চাঁদ সওদাগরের কাছে। কিন্তু মহাদেবের পূজারি চাঁদ সওদাগর তাঁকে পূজা দিতে নারাজ। এ নিয়েই দ্বন্দ্ব। তাঁদের এই দ্বন্দ্ব নিয়ে নাটক ‘পদ্মাবতীর আখ্যান’, বেহুলা ও লখিন্দরের কাহিনি। লোকজ এই গল্প গাঁয়ের পুঁথি থেকে যাত্রাপালায় আর সেখান থেকে উঠে এসেছে মঞ্চে। এই পালা বেশ আগেই যুক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটকের পাঠ্যে। আজ সোমবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হলো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের নাটক ‘পদ্মাবতীর আখ্যান’। আগে ক্যাম্পাসে বেশ কবার এর মঞ্চায়ন হলেও ক্যাম্পাসের বাইরে এবারই প্রথম নাটকটি মঞ্চস্থ করা হলো। নাটকটির রচনা, পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক নুসরাত শারমিন। নাটক প্রসঙ্গে নুসরাত শারমিন জানিয়েছেন, কবি বিজয় গুপ্ত ও রাধানাথ রায় চৌধুরীর ‘পদ্মাপুরাণ’ অবলম্বনে তিনি নাটকটি লিখেছেন। এর বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থীরা। আগামীকাল সন্ধ্যা সাতটায় একই মিলনায়তনে আবারও মঞ্চস্থ হবে নাটকটি।

‘সিক্রেট সুপারস্টার’-এ আমির

আমির খান
আমির খান ‘দঙ্গল’ ছবিতে একজন কুস্তিগিরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই ছবির জন্য অনেকখানি ওজন বাড়াতে হয়েছিল এই তারকাকে। পরনের কাপড়চোপড়ও বিলিয়ে দিতে হয়েছিল। এ বছর শেষের দিকে মুক্তি পাবে এই ছবিটি। এসব খবর পুরোনো হতে না হতেই খবর এসেছে আমিরের নতুন ছবির। ‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ নতুন একটি ছবিতে চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। ছবির নাম ‘সিক্রেট সুপারস্টার’। তবে, এ ছবিতে তিনি মূল চরিত্রে অভিনয় করছেন না। আমিরকে এখানে দেখা যাবে একজন সুরকারের চরিত্রে। আমির খানের ব্যবস্থাপক আদভাইট চন্দন পরিচালিত এটি প্রথম ছবি। এই ছবিটি একটি শিশু ও তার মায়ের গল্প নিয়ে। এ সিনেমার নাম আগে ‘আজ ফির জিনে কি তামান্না হ্যায়’ হওয়ার কথা ছিল। নাম পাল্টে এই ছবির শুটিং শুরু হতে যাচ্ছে এ বছর জুন মাসে। বলিউড হাঙ্গামা।

উত্তর প্রদেশে শুল্কমুক্ত ‘সুলতান’?

সালমান খান
সালমান খানের নতুন ছবি ‘সুলতান’-এর শুটিং হয়েছে ভারতের উত্তর প্রদেশের মুজাফফরনগরে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব ‘ভাইজান’ সালমানের ছবিটির শুটিং যেন কোনো রকমের ঝঞ্ঝাট ছাড়াই শেষ হতে পারে, সেই ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছিলেন। সম্প্রতি শেষ হয়েছে ‘সুলতান’-এর শুটিং। শোনা যাচ্ছে, এবার নাকি পুরো উত্তর প্রদেশে ছবিটি শুল্কমুক্ত করার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ‘সুলতান’ ছবির শুটিং চলাকালীন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য সরকারের আতিথ্যে মুগ্ধ হয়েছেন অভিনেতা সালমান খান ও এই ছবির নির্মাতা আলী আব্বাস জাফর। শুটিং শেষ। মুম্বাই ফিরেই টুইটারে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন দুজনেই। এর পরপরই উত্তর প্রদেশে এই সিনেমাটি শুল্কমুক্ত হওয়ার ঘোষণা আসে। উত্তর প্রদেশের সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রী মদন চৌহান এই কথা দিয়েছেন। এই এলাকায় ছবির শুটিং বাড়ানোর জন্যই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ‘সুলতান’ ছবিতে সালমান খানের সঙ্গে অভিনয় করেছেন আনুশকা শর্মা, রণদীপ হুদা। এবারের ঈদে ছবিটি মুক্তি পাবে। এনডিটিভি।

পয়সা চুরি করতেন অ্যানিস্টন!

জেনিফার অ্যানিস্টন
ছোটবেলায় মা-বাবার পকেট কমবেশি সবাই কেটেছেন। ছোটখাটো শখ পূরণের জন্য এমন ‘নিষ্পাপ চুরি’ বড় হলে আর অপরাধ হিসেবে ধরাও হয় না। এ দলে অনেকেই আছেন। এমনকি হলিউডের অভিনেত্রী জেনিফার অ্যানিস্টনও এই দলের বাইরে নন। ছোটবেলায় মায়ের ব্যাগ থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে পয়সা চুরি করতেন তিনি। সম্প্রতি নিজের সম্পর্কে এই মজার তথ্যটি জানিয়েছেন অ্যানিস্টন। ছোটবেলায় কী কী দুষ্টুমি করতেন জানতে চাইলে অ্যানিস্টন নিজেই তাঁর গুমর ফাঁস করে দেন। তাঁর মা অভিনেত্রী ন্যান্সি ডোয়ের টাকার ব্যাগ থেকে প্রায়ই টাকা গায়েব করে দিতেন ছোট্ট অ্যানিস্টন। তবে খুব বেশি টাকা মারতেন না তিনি। তখন এক ডলারেই তাঁর অনেক শখ পূরণ হয়ে যেত। ‘ভিডিও গেম বা এ ধরনের খুব ছোটখাটো প্রয়োজনেই চুপিচুপি মায়ের ব্যাগ থেকে টাকা সরাতাম। খুব বড় কিছুর জন্য নয়,’ বলেছেন তিনি। জেনিফার অ্যানিস্টনের বাবা জন অ্যানিস্টন ছিলেন একজন অভিনেতা। মা-বাবার কাছ থেকেই নাকি কৌতুকবোধ পেয়েছেন মেয়ে জেনিফার। এমনটাই মনে করেন ‘পিপলস’ ম্যাগাজিনের বিচারে বছরের সবচেয়ে সুন্দরী এই অভিনেত্রী।

ইসরায়েলকে বাঁচাতে পারবে না ওবামার মতো ‘ঘুঁটি’

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মতো ‘দাবার ঘুঁটি’ ইসরায়েলকে বাঁচাতে পারবে না। গতকাল মঙ্গলবার দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামাকে উদ্দেশ করে আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘আপনি এমন এক “দাবার ঘুঁটি”, যাকে মার্কিন ও ইহুদি সরকারব্যবস্থাকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আপনি তা রক্ষা করতে সমর্থ হবেন না।’
আহমাদিনেজাদ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ইরানের মানুষের প্রতিরোধের মুখে প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা ব্যক্তি (ওবামা) এর আগে বিদায় নেওয়া ব্যক্তির চেয়েও বেশি অপদস্থ হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিদায় নেবেন।’
আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে তারা ফিলিস্তিনের মাটিতে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির চেষ্টা করছে। একটি রাষ্ট ফিলিস্তিনিদের জন্য, অন্যটি অবৈধ দখলদারদের জন্য। আজ তারা আবার আশা করছে, এ অঞ্চলের মানুষ ইহুদি সরকারব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেবে। এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে।’
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ গতকাল দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আবাদানে অবস্থিত তেল শোধনাগারের একটি ইউনিটের উদ্বোধন করতে গেলে সেখানে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় একজন নিহত, ২০ জনের বেশি আহত হয়েছে।