Sunday, July 19, 2020

প্রয়াণ দিবসে হুমায়ূন স্মৃতি by লুৎফর রহমান রিটন

২০০১ এর জুন থেকে আমি দেশান্তরী। ২০০৭ এর নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ফিরতে পারিনি। প্রথমে বাংলাদেশ থেকে জাপান। জাপান থেকে আমেরিকা। আমেরিকা থেকে কানাডা। এক দেশ থেকে আরেক দেশ। লম্বা জার্নি। জীবনটা কাটছিলো মোটামুটি দৌঁড়ের ওপর।
কতো কতো প্রিয় জিনিস যে ফেলতে ফেলতে গেলাম! কতোজন যে আমার হাতছাড়া হয়ে গেলো! কতোজন যে আমার হাতটি ছেড়ে দিলো! কিন্তু একজনের সঙ্গে সম্পর্কটা আমার ছিন্ন হলো না। তিনি হুমায়ূন আহমেদ।

আমি যেদিন সন্ধ্যায় দেশ ছাড়ি সেদিন বিমানে আমার সঙ্গে ছিলো হুমায়ূনের বই। টোকিওর একটি হাসপাতালে আমার স্ত্রী শার্লির অপারেশন হলো। প্রতিদিন সকালে হাসপাতালে যাই ফিরে আসি রাত বারোটায়। বারোটার পর আর ওখানে থাকার নিয়ম নেই। কড়া ডোজের পেইন কিলার ইনজেকশন নিয়ে শার্লি হাসপাতালের বেডে ঘুমিয়ে থাকে। আমি ওর পাশে সারাদিন বসে থাকি। আমার সঙ্গে থাকে হুমায়ূনের বই।

কানাডার ইউনিভার্সিটিতে আমার কন্যা নদীর ক্লাশ কিংবা পরীক্ষার কারণে ওকে পৌঁছে দিয়ে ওখানেই গাড়ি পার্ক করে তিন চার ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। আমার একটুও বিরক্তি লাগে না কারণ আমার সঙ্গে থাকেন হুমায়ূন আহমেদ। এখন প্রতি বছর কানাডা থেকে বাংলাদেশে যেতে অটোয়া-হিথ্রো-দুবাই-ঢাকার দীর্ঘ ক্লান্তিকর বিমান যাত্রায় আমার সমস্ত ক্লান্তি মোচনে সঙ্গী হিশেবে উপস্থিত থাকেন হুমায়ূন আহমেদ। ফিরতি পথেও ধ্রুব এষের অসাধারণ প্রচ্ছদের ভেতর থেকে হুমায়ূন আহমেদ যেনো পরম মমতায় তাঁর হাতটি বাড়িয়ে দেন—এনিমেশন মুভিটা দেখার পরে একটা ব্রেক নাও, তারপর নো চিন্তা, আমি তো আছিই...।

হুমায়ূন আহমেদকে ছাড়া আমাদের ঈদ হয় না। ঈদের রাতে টিভিতে হুমায়ুনের নাটক না দেখলে বাঙালির কি ঈদ পরিপূর্ণ হয়? আমার এক নিত্যশুভার্থীর কল্যাণে ঢাকার ঈদ সংখ্যাগুলো দ্রুতই চলে আসে কানাডায়, আমার হাতে। গত ঈদের আগে আগেও পেয়েছিলাম বিশাল একটা ওজনদার প্যাকেট। প্যাকেটের ভেতর প্রথম আলো, আনন্দ আলো, অন্যদিন, সাপ্তাহিক, আর ইত্তেফাক। অন্যদিনের হিমু, ইত্তেফাকের মিসির আলী, প্রথম আলোর মেঘের ওপর বাড়ি আর আনন্দ আলোর কবি সাহেব পড়েছি সবার আগে। তারপর বাকিদের বাকি লেখাগুলো।

কানাডায় একান্ত পারিবারিক পরিবেশে আমাদের বাড়িতে পালিত হয় প্রিয়জনদের জন্মদিন। সেটাও আবার সপ্তাহ ব্যাপী। যেমন সত্যজিৎ সপ্তাহ। অমিতাভ সপ্তাহ। বিশেষ সেই সপ্তাহে সাতদিন ধরে আমাদের বাড়িতে চলে সত্যজিতের বই পুনঃপাঠ এবং সত্যজিতের ফিল্মগুলোর প্রদর্শনী। প্রতিরাতে একটা করে। হীরক রাজার দেশে দিয়ে শুরু আর শেষ হয় পথের পাঁচালি দিয়ে। অমিতাভের ক্ষেত্রে তাঁর অভিনীত ছবিগুলো দেখি। প্রতিরাতে একটা করে। শোলে দিয়ে যার শুরু হয়। একই পদ্ধতিতে চলে চার্লি চ্যাপলিন আর মিঃ বিন সপ্তাহ। তবে সবচে আনন্দের সঙ্গে উদযাপিত হয় হুমায়ূন সপ্তাহটি। এই সময় আমার সঙ্গে আমার স্ত্রীও থাকেন দর্শকের আসনে। বাকিদের বেলায় দর্শক আমি একাই।

১৯৯৪ সালে অবসর থেকে প্রকাশিত আমার বই ‘ভূতের জাদু’ আমি উৎসর্গ করেছিলাম হুমায়ূন আহমেদকে। বইটির প্রকাশক আলমগীর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বইটি তাঁর হাতে অর্পণ করতে গিয়েছিলাম। তিনি তখন হাতিরপুলের ল্যাবএইডসংলগ্ন এপার্টমেন্টে থাকেন। তিনি নিজে ফ্লোরে বসতেন। অতিথিদেরও ফ্লোরেই বসাতেন। আমাদেরও ফ্লোরে বসিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন সেদিন। উৎসর্গ পাতাটা খুলে মিষ্টি করে হেসেছিলেন। কন্যাদের ডেকে আনন্দ শেয়ার করেছিলেন।

১৯৯৫ সালে আমার সম্পাদিত ছোটদের কাগজ পত্রিকাটিতে ‘কালো জাদুকর’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলেন হুমায়ূন। আসলে আমাদের সাহিত্যে হুমায়ূন নিজেই একজন জাদুকর। অসামান্য জাদুকর। এমন সম্মোহনী শক্তি নিয়ে আর কেউ আসেননি। আমরা আমাদের সময়ে একজন হুমায়ূন আহমেদকে পেয়েছি। এটা অনেক বড় প্রাপ্তি। (‘কালো জাদুকর’ তিনি শেষ করেননি ছোটদের কাগজে।)

--------২------- কতো স্মৃতি এই মানুষটাকে ঘিরে!

১৯৮৫ সালের শেষ দিকের কথা। তখন দেশে কম্পিউটার আসেনি সুতরাং কম্পিউটার কম্পোজ বলে কোনো জিনিস ছিলো না। ছিলো হ্যান্ড কম্পোজ আর মনো টাইপ। নবাবপুর রোডের মডার্ণ টাইপ ফাউন্ড্রির মালিক নাজমুল হক ‘অনিন্দ্য প্রকাশন’ নামে নতুন একটি প্রকাশনা সংস্থা চালু করেছিলেন। আমীরুল আর ওর বন্ধু হাবিব ওয়াহিদ আমার সঙ্গে নাজমুল হকের পরিচয় করিয়ে দিলো। অনিন্দ্য প্রকাশন থেকে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘এইসব দিনরাত্রি’ বেরুবে। ছোটদের জন্যে আমার প্রথম গল্পের বই ‘নিখোঁজ সংবাদ’ও বেরুবে ওই প্রকাশনা সংস্থা এবং ওই মডার্ণ প্রেস থেকেই। প্রায় সারাদিনই কেটে যায় প্রেসের ভেতরেই। প্রুফ দেখা। মেকাপ করা। অনেক কাজ। রোজ দেখা হয় হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁকে একটা নড়বড়ে হোন্ডায় বসিয়ে ওখানে নিয়ে আসেন দৈনিক বাংলার সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী। পাশাপাশি টেবিলে বসে আমরা কাজ করি। মাঝে মধ্যেই হুমায়ূন ভাই রঙ্গ-তামাশায় মেতে ওঠেন। তবে বেশির ভাগ সময়ই ঘাড় গুঁজে একটানা লেখেন অথবা প্রুফ সংশোধন করেন বা ফাইনাল প্রিন্টঅর্ডার দেন।

অসাধারণ রসিক মানুষ হুমায়ূন ভাই। কাজের ফাঁকে আমরা আড্ডা দেই জম্পেশ। প্রকাশক নাজমুল হকের ছিলো বিশাল বপু। একটা বড় চেয়ারে বসে থাকতেন। আমাদের কথায় নাজমুল হাসতেন অদ্ভুত ভঙ্গিতে। চেয়ারে বসা অবস্থায় নাজমুল তার হাত দুটি ভাঁজ করে বিশাল ভূঁড়ির ওপর রাখতেন। তার হাসি শুরু হতো পেটের নিচ দিক থেকে। প্রথমে পেটের নিচের অংশে একটা কাঁপুনি তৈরি হতো। তারপর কাঁপুনিটা একটা দুলুনি হয়ে ধিরে ধিরে পেটের ওপর দিকে উঠতে উঠতে প্রায় বুকের কাছে এসে দুলতে থাকতো। পেটের ওপর ভাঁজ করে রাখা দুই হাতের কব্জিতে তখন একটা রিদম তৈরি হতো। নাজমুল ভুট্টা অর্ডার দিতেন। কয়লাপোড়া ভুট্টা খেতে খেতে আমরা হুমায়ূন ভাইয়ের রসিকতা উপভোগ করতাম। হুমায়ূন ভাই খুব আগ্রহ নিয়ে খেতেন এই ভুট্টাপোড়া।
দীর্ঘদিন আমেরিকায় পড়াশুনা ও বসবাসকারী এই নাজমুল আমাদের প্রকাশনা জগতের ইতিহাসে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। সালেহ চৌধুরীর নড়বড়ে হোন্ডায় হুমায়ুণ ভাইকে আসতে যেতে দেখে তিনি এক কাণ্ড করলেন। হুমায়ূন ভাইকে রয়্যালিটির টাকা দেই-দিচ্ছি দেই-দিচ্ছি করে কিছুদিন ঘুরিয়ে হঠাৎ একদিন শাদা একটা গাড়ি কিনে দিয়েছিলেন হুমায়ূন ভাইকে। হুমায়ূন ভাই সবাইকে চমকে দেন কিন্তু নাজমুল চমকে দিলেন স্বয়ং হুমায়ূন ভাইকেই! বলেছিলেন--এটাই আপনার রয়্যালিটি! হুমায়ূনের আহমেদের জীবনে সেটাই ছিলো প্রথম গাড়ি। সেই গাড়িতে চড়ে হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে রামপুরা টিভি ভবনেও গিয়েছি অনিন্দ্য প্রকাশনীর কাজ সেরে। প্রকাশক কর্তৃক লেখককে গাড়ি দেয়ার ঘটনা আমাদের দেশে সেটাই ছিলো প্রথম এবং শেষ ঘটনা। বাদবাকি প্রকাশকদের চক্ষু উঠেছিলো কপালে। সে অন্য কাহিনি। ঘটনায় ফিরে আসি।

এক বিকেলে নাজমুলের প্রেসের সেই জম্পেশ আড্ডায় বিটিভি প্রযোজক ও লেখক আলী ইমাম সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিচ্ছি। হুমায়ূন ভাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। আলী ইমাম ভাইয়ের অসাধারণ একটা গুণের কথা বললাম। গুণটি হচ্ছে—টাইম ধরে ঘুমানো। আলী ইমাম চাইলে কাজের ফাঁকে দশ কিংবা পনেরো মিনিটের একটা সলিড ঘুম দিতে পারেন। তিনি নিজের ইচ্ছে মাফিক কাজটা করেন। কেউ তাকে জাগিয়ে দেয়না। ঘড়িতে এলার্মও বাজেনা। কিন্তু আলী ইমাম ঠিক ঠিক জেগে ওঠেন সময় মতো। দশ মিনিট চাইলে দশ মিনিট। বারো মিনিট চাইলে বারো। এমনও হয়েছে, সারারাত ছবি দেখে ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমরা শুতে গেছি। আলী ইমাম বললেন, সকাল সাতটায় রেডিওতে আমার প্রোগ্রাম আছে। আমি পৌণে এক ঘন্টা ঘুমাবো। তারপর উঠে গোসল করে রেডিওতে চলে যাবো। তোমরা ঘুমিয়ে থেকো। এসে নাস্তা করবো একসঙ্গে।
এবং ঠিক ঠিক তাই-ই হলো। আমরা(আমি, আমীরুলসহ আরো চার পাঁচজন)ঘুমিয়ে আছি। আর আলী ইমাম টাইমলি জেগে লাইভ রেডিও প্রোগ্রাম শেষ করে আমাদের এসে জাগালেন।

তো হুমায়ূন ভাই এই গল্পটাকে বিশ্বাস করলেননা। তিনি বললেন, তোমাদের চমকে দেবার জন্যে এটা হয়তো আলী ইমামের একটা টেকনিক। ও হয়তো ঘুমাতেই যায়নি। সারারাত জেগেই ছিলো। কিংবা দশ মিনিটের কথা বলে ও হয়তো ঘুমায়ইনা। ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে। তারপর সময় মতো জেগে উঠে চমকে দেয় তোমাদের। এই প্রবণতাটার একটা ইংরেজি নামও বললেন হুমায়ূন ভাই। এই মুহূর্তে নামটা মনে নেই।

এর কয়েকদিন পর। সেই মডার্ণ প্রেস। তখন প্রায় সন্ধ্যা। পাশের টেবিলে হুমায়ূন ভাই খসখস করে লিখে চলেছেন। হঠাৎ দেখা গেলো হুমায়ূন ভাইয়ের লেখা বন্ধ। কলম বন্ধ করে অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলেন তিনি। তারপর চশমাটা খুলে চোখ মুছলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার হুমায়ূন ভাই!

হুমায়ূন ভাই চোখ মুছতে মুছতে বললেন, এইসব দিনরাত্রির শেষ লাইনটা এইমাত্র লিখলাম। একটা পরিবারের সঙ্গে এইমাত্র আমার এতোদিনের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলো।
ঘটনাটা আলী ইমামকে বললাম। সব শুনে আলী ইমাম বললেন, ওটা হুমায়ূন ভাইয়ের একটা টেকনিক। তোমাদের চমকে দেবার জন্যে হুমায়ূন ভাই কাজটা করেছেন। ( হেহ্‌ হেহ্‌ হে...)

---------------৩---------------
তখন বাংলাদেশে কোনো প্রাইভেট টিভি চ্যানেল ছিলো না। টিভি বলতে বাঙালির ছিলো সবেধন নীলমনি বিটিভি। এবং বিটিভির শাদাকালো আমলে বাঙালির একজন হুমায়ূন আহমেদ ছিলো। সেই হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি খুব সুখি ছিলো। বাঙালি মধ্যবিত্তের আনন্দ-বেদনার অপরূপ রূপকার ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালির ঈদ উৎসব হুমায়ূন আহমেদকে ছাড়া আনন্দময় হতো না, পরিপূর্ণতা পেতো না। মধ্যবিত্ত বাঙালির ঈদ উৎসবে পোলাও-কোর্মা, ফিন্নি-শেমাই এবং নতুন জামা-কাপড়ের সঙ্গে হুমায়ূনের ঈদের নাটকও ছিলো একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ঈদের সারা দিনের নানান সামাজিক-পারিবারিক আমন্ত্রন-নিমন্ত্রন, সৌজন্য-সাক্ষাৎ, ভোজের আয়োজন এবং অতিথি আপ্যায়নের বিচিত্র ঝক্কি-ঝামেলার পর সন্ধ্যায় টিভি সেটের সামনে আয়েস করে বসে বাঙালি অপেক্ষা করতো হুমায়ূনের নাটকের। সন্ধ্যার পর রাস্তায় লোক চলাচল কমে যেতো। একজন হুমায়ূন আহমেদের একটি টিভি নাটক দেখার জন্যে বাঙালির সম্মিলিত অপেক্ষার সেই চিত্রটি ছিলো অকল্পনীয়। না, শুধু রাজধানী ঢাকার চিত্র ছিলো না এটা। পুরো বাংলাদেশেরই ছিলো একই অবস্থা। হুমায়ূন আহমেদের ঈদের নাটকটি ছিলো মধ্যবিত্ত বাঙালির অন্যতম প্রধান বিনোদন মাধ্যম। ফাঁকা রাস্তা। হুমায়ূনের নাটক চলছে বিটিভিতে। বিভিন্ন বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত আনন্দময় হাস্যধ্বনি শোনা যেতো। মাঝে মাঝেই অট্টহাসির উল্লাসধ্বনিও জানান দিতো যে হুমায়ূন আহমেদ নামক একজন জাদুকরলেখক-নাট্যকারের ঈদের নাটকটি বাঙালি উপভোগ করছে। একই ঘটনার পূনরাবৃত্তি ঘটেছে বছরের পর বছর।

ঈদের বিশেষ নাটক ছাড়াও হুমায়ূনের কোনো সাপ্তাহিক কিংবা ধারাবাহিক নাটক প্রচারের রাতেও একই পরিস্থিতি। রাস্তা ফাঁকা। বাড়ির অধিকাংশ সদস্যই টিভি সেটের সামনে। শুধু হাসির নাটক নয়, হুমায়ূনের দুঃখের বা কষ্টের নাটকও বাঙালি মধ্যবিত্তের চিত্তকে হরণ করতো অনায়াস দক্ষতায়। বিটিভিতে তাঁর প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ তো ইতিহাস সৃষ্টিকারী। এই নাটকের ছোট্ট মেয়েটি—টুনি, ক্যান্সারে যার মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু দর্শক সেটা মেনে নিতে পারছে না। ছোট্ট প্রিয় মেয়েটিকে মেরে না ফেলতে দর্শকরা কতো ভাবেই না অনুরোধ জানালো নাট্যকার হুমায়ূনকে! কিন্তু হুমায়ূন জেদী। তিনি টুনিকে মেরেই ফেললেন। ফলে, তাঁর বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও মিছিল হলো। ব্যানারে লেখা—টুনির কেনো মৃত্যু হলো/হুমায়ূন আহমেদ জবাব চাই।

বিটিভিতে হুমায়ূনের আরেকটি ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’ প্রচারের সময়েও ঘটেছে একই কাণ্ড। এই নাটকে ‘বাকের ভাই’ নামের চরিত্রটির ফাঁসি হয়ে যাচ্ছে। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি রুখতেও মিছিল হলো। পত্রিকায় সে খবর ছাপাও হলো। জেদী হুমায়ূন বাকের ভাইকেও বাঁচালেন না। নাটকের প্রয়োজনে বাকেরকে মরতেই হবে। হুমায়ূন তাকে মারলেনই। দর্শকদের দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে নাটক বা গল্পের দাবিকেই মিটিয়েছেন নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশে টিভি নাটকের ইতিহাসে এইরকম ঘটনা আর কোনো লেখক-নাট্যকারের ক্ষেত্রে ঘটেনি।

এরপর বাংলাদেশে প্রাইভেট টিভি চ্যানেল এসেছে। হুমায়ূন আহমেদকে বিভিন্ন চ্যানেল পাকড়াও করেছে। নাটক চাই। তিনিও লিখেছেন।
হুমায়ূনের নাটক ছাড়া তো ঈদের আনন্দ পূর্ণ হবার নয়!

বাঙালির ঈদ বিনোদনের আরেকটি অনুষঙ্গ হচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যা। আর ঈদ সংখ্যারও প্রধান আকর্ষণ সেই একই ব্যাক্তি, হুমায়ূন আহমেদ। কোনো পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাস থাকা মানেই সেটি বিপুল পরিমানে বিক্রি হবার ক্ষেত্রে একটি নিশ্চিন্ত গ্যারান্টিসিল। সুতরাং হুমায়ূনের একটি উপন্যাসের জন্যে পত্রিকার মালিক-সম্পাদকের ছুটোছুটির অন্ত ছিলো না।
হুমায়ূনের উপন্যাস ছাড়া তো ঈদ সংখ্যাও পরিপূর্ণ নয়!

বাংলা একাডেমীর একুশের বইমেলা হুমায়ূন আহমদকে ছাড়া কি কল্পনা করা যায়? একজন হুমায়ূন আহমেদকে সামনা সামনি এক ঝলক দেখতে, তাঁর লেখা একটি বই কিনতে এবং বইতে তাঁর একটি অটোগ্রাফ পেতে বাঙালি ভিড় করেছে বইমেলায়। সেই ভিড় সামাল দিতে কর্তৃপক্ষকে পুলিশি সহায়তা নিতে হয়েছে প্রতিবছর। একবার তো এক মহাপরিচালক(সৈয়দ আনোয়ার হোসেন) হুমায়ূন আহমেদকে নিষেধই করেছিলেন যেনো তিনি বইমেলায় না আসেন! কী হাস্যকর!!

একুশের বইমেলায় বছরের পর বছর একটি নির্দিষ্ট বইয়ের স্টলের সামনে আমরা দেখেছি সহস্র পাঠকের জমাট অপেক্ষা। প্রায় প্রতিদিন। উদ্দেশ্য—হুমায়ূনের সাম্প্রতিক বইটি সংগ্রহ করা! বাংলাদেশে আর কোনো লেখকের ক্ষেত্রে এমনটি কখনোই ঘটেনি।
হুমায়ূনের বই ছাড়া তো একুশের বইমেলাও পরিপূর্ণ নয়!

তাঁর মতো আর কে পেরেছে বাঙালি মধ্যবিত্তের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অনুভূতিগুলোতে এতোটা মমতার সঙ্গে আলো ফেলতে? তারচে বেশি কে চিনেছে মধ্যবিত্ত বাঙালির চিরদিনের টানাপোড়েনগুলোকে? বাঙালি মধ্যবিত্তের আনন্দ-বেদনা আর হাসি-কান্নার সঙ্গে একজন হুমায়ূন আহমেদ জড়িয়ে আছেন চারটি দশক ধরে একই ধারাবাহিকতায়! সমান দক্ষতায় বাঙালিকে তিনি হাসিয়েছেন। কাঁদিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ নামটা একাকার হয়ে মিশে আছে বাঙালির হাসিতে। বাঙালির অশ্রুতে।
হুমায়ূনহীন ঈদের টিভি, হুমায়ূনহীন ঈদ সংখ্যা আর হুমায়ূনহীন একুশের বইমেলাকে বাঙালি কী ভাবে উদযাপন করবে!
আজ অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানাচ্ছি বাঙালির প্রিয় কথক হুমায়ূন আহমেদকে।

>>>>রচনাকাল/ অটোয়া, কানাডা, ২০জুলাই২০১২

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে by ড. মাহফুজ পারভেজ

হুমায়ূন আহমেদ
তিনি বলেছিলেন, তার মৃত্যুতে কেউ যেন না কাঁদে। বিষাদ কণ্ঠে গেয়েছিলেন গান, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় রে জাদু ধন। মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

কিন্তু সাত বছর আগে সুদূর আমেরিকায় তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন পুরো বাংলাদেশ কেঁদেছিল তার জন্য। শুধু সেদিনই নয়, বাংলা সাহিত্যের ভক্ত-অনুরাগীরা প্রতিটি দিনই তাকে স্মরণ করেন। তার কথা ভাবেন। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। জীবনের প্রতিটি দিন তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল ও কর্মমুখর। জীবনকে উপভোগ করেছেন তিনি সৃজনের বিবিধ উপাচারে।

হাওর-বাওর-গানের দেশ বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই জেলার কেন্দুয়ার কুতুবপুর তার পিতৃভূমি।

পিতার চাকরির সুবাদে হুমায়ূনের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশের বহু স্থানে। সিলেটের মীরাবাজার, চট্টগ্রাম শহর, পিরোজপুরের মনকাড়া প্রকৃতিতে। যেসব কথা তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।

স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নের স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি নেন আমেরিকার থেকে। শুরু করেন অধ্যাপনা।

কিন্তু তার ভাগ্য মিশে ছিল সাহিত্যে। সার্বক্ষণিক লেখালেখি, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণকে তিনি বেছে নেন। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে লেখক জীবনের সূচনা ঘটে, তা পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয়-জনপ্রিয় লেখক সত্তায়।

গল্প-উপন্যাসের জাদুকরী ক্ষমতায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন তিনি। মানুষ লাইন ধরে কেনে তার বই। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয় হাজার হাজার কপি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।

আর তিনি ছিলেন মেধা, প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার এক বিরল ব্যক্তিত্ব। সমকাল তো বটেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি গড়েছিলেন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী রেকর্ড। যে রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা আদৌ সম্ভব হবে না।

‘অচিনপুর’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’, ‘লীলাবতী’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘অচিনপুর’, ‘বাদশাহ নামদার’, ‘দেয়াল’, এমন তিন শতাধিক পাঠকনন্দিত উপন্যাসের রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে অর্জন করেন নিজস্ব পরিচিতি ও ভূগোল। একা লড়াই করে সাহিত্যের পাঠক সৃষ্টির পাশাপাশি মৃতপ্রায় প্রকাশনাকে বাঁচিয়ে দেন তিনি।

টিভি নাটকেও জনপ্রিয়তার ইতিহাস গড়েন তিনি। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘দূরে কোথাও’, এমন হৃদয়ছোঁয়া নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় টেনে আনেন হাজার হাজার দর্শক।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও সোনা ফলিয়েছেন হুমায়ূন। সিনেমাহলমুখী করেছেন মানুষকে। তার নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মতো ছবি বাণিজ্য সফল ও পুরস্কৃত হয়েছে।

নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি লোকবাংলার বহু গান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা বলেছেন। মানব-মানবীর অন্তর্গত হৃদয়ের দাহ ও বিষাদকে তুলে ধরেছেন অনন্য সুষমায়। তাকে ঘিরে শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের এক নান্দনিক জগত উন্মোচিত হয়েছিল।

প্রেম ও রহস্যময় বেদনার প্রতীক নগ্নপদে হলুদপাঞ্জাবির ‘হিমু’ তার অনবদ্য সৃষ্টি। যুক্তিবাদী বিশ্লেষক মিসির আলীর মতো চরিত্রও তিনি সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ূনের এই দুই চরিত্রের কথা বাংলা সাহিত্যের পাঠক সহজে ভুলবে না। ভুলবে না এমন আরো অনেক মানবিক চরিত্র ও কাহিনীর নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকেও।

মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদ, পুলিশ অফিসার বাবার জেষ্ঠ্য সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির পুরোটা জুড়েই আছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ূনের উপন্যাস ‘১৯৭১’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘উতল হাওয়া’ এবং চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়স্পর্শী কাহিনীচিত্র। যুদ্ধাপরাধ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লেখার পাশাপাশি আন্দোলনও করেছেন তিনি।

প্রেম ও বিরহ হুমায়ূনের লেখার মূল উপজীব্য হলেও তিনি তার লেখায় অপরূপ দক্ষতায় স্পর্শ করেছেন রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ঘটনাবলি। লেখার মায়াবী টানে তিনি পৌঁছে গেছেন মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে। নীল জোছনায় বেদনাহত একটি তরুণ কিংবা নীলপদ্ম হাতে একটি তরুণীর স্মৃতি-সত্তা পেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন মানুষের চেতনার গহীন প্রদেশে। হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে।

বৃষ্টিবিলাসী জ্যোৎস্নার রাত by শাকুর মজিদ

মাত্র কুড়ি দিনের জন্যে চিকিৎসা-বিরতির ছুটি পেয়ে এসেছিলেন দেশে। ১১ মে ২০১২ বিমানবন্দর থেকে নেমেই প্রিয় নুহাশপল্লীতে চলে গিয়েছিলেন। ঢাকা ফিরলেন ১৪ মে। আবার ২২ মে চলে গেলেন নুহাশপল্লী। আরও ২-৩ দিন থেকে ২৫ মে ফিরে আসবেন ঢাকায়। ২৯ মে পর্যন্ত থাকবেন দখিন হাওয়ার ফ্ল্যাটে। বাকি থাকে দু’রাত। সে দু’রাত একেবারেই একান্তে কাটানোর জন্যে, বিশেষ করে গুণগ্রাহী ও সাংবাদিকদের থেকে দূরে থাকার জন্যে থাকবেন গুলশানে শ্বশুরবাড়িতে। তারপর অপারেশনের জন্যে আমেরিকাযাত্রা।
১৪ মে থেকে প্রায় প্রতিদিনই আমাদের দেখা হয়েছে। কখনো দিনে একবার, কখনো দু’বার। প্রায় প্রতিরাতেই রাতের খাবার খেতে হতো দখিন হাওয়ায়, কখনো কখনো দিনের বেলাও। যে ক’দিন দেশে ছিলেন, তাদের নিজের চুলায় হাঁড়ি বসাতে হয়নি। বন্ধুবান্ধব, স্বজনরা রুটিন করে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন বাসায়। খাবারের পরিমাণ—এলাহি কাণ্ড। দশ পদের নিচে কেউ খাবার পাঠান না। বেশির ভাগই নিজের হাতে রেঁধে, কেউ কেউ নামিদামি হোটেলের খাবারও পাঠিয়েছেন। কেবল নুহাশপল্লীতে যে ক’দিন ছিলেন, সে ক’দিন তার বাবুর্চি রেঁধেছেন। গরুর মাংস, মুরগির মাংসের বাইরেও তার প্রিয় জিয়ল মাছের একটা তরকারিও সব সময় থাকতো।
দখিন হাওয়ার সময়টা তিনি দিনের বেলা একান্তে কাটাতে পারতেন। এ সময় বারান্দায় বসে বসে বই পড়তেন, কিংবা ছবি আঁকতেন। এর মধ্যে একটা টেলিফিল্মের চিত্রনাট্য লিখেছেন এবং দেশ ছাড়ার দু’দিন আগে এর প্রযোজক ও পরিচালককে পড়িয়ে শুনিয়েছেনও। তার শেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’ নিয়ে আদালতের নজরে আনা হয়। প্রথম আলো-তে এর দু’টো অধ্যায় ছাপা হয়েছিল মাত্র। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তাকে একটা বিশাল আকৃতির বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পেপার বুক পাঠিয়ে তাকে অনুরোধ করা হয় এ নথিটি অনুসরণ করার জন্যে। শেখ রাসেলকে হত্যা করার আগে সে ভাবির কাছে লুকিয়ে ছিল, না কাজের ছেলে রমার কাছে লুকিয়ে ছিল—এটা নিয়ে ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে। তার কাছে যে দু’টো বই আছে সেখানে লেখা ভাবির কাছে, সরকারি নথিতে আছে কাজের ছেলের কাছে। এসব নিয়ে প্রতিদিনই বেশ কিছু লোক তাকে নানা রকম পরামর্শ দিতেন। আর মাঝে মাঝে ছবি আঁকতেন। নিউইয়র্কে বসে বেশ ক’টি ছবি আঁকা হয়েছিল তার—এগুলো নিয়ে একটা প্রদর্শনী হবে জুন মাসের ২৯ তারিখে নিউইয়র্কে। সেটার ক্যাটালগ তৈরি, নতুন ছবি আঁকা, নিউইয়র্কের ডাক্তার কখন কী বলল, সে সবের কাহিনি শোনানো—এমন করেই তার দিনরাত্রি কেটে যাচ্ছিল।
তিনি নুহাশপল্লী বা দখিন হাওয়া, যেখানেই থাকুন না কেন, তার সঙ্গে ছিলেন তার মা আর বোন, শিখু আপা। মা’র একটা গল্প প্রায়ই শোনাতেন। আমেরিকায় তিনি যখন চিকিৎসাধীন, তখন মা তার সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাঁচ হাজার ডলার পাঠিয়ে দিয়েছেন ছেলের চিকিৎসার জন্যে। মা’র এ টাকা পাঠানোর বিষয়টিই মূলত তাকে অনেক বেশি আবেগাপ্লুত করে। সিদ্ধান্ত নেন, দেশে যে ক’টি দিন থাকবেন, মাকে সঙ্গে নিয়েই থাকবেন।
২৪মে আমি আর আলমগীর ভাই একসঙ্গে রওয়ানা দেই নুহাশপল্লীতে। সপরিবারে মাজহার ও কমল চলে গেছে আগেই। তাদের সঙ্গে আলমগীর ভাইর স্ত্রী ঝর্ণা ভাবিও আছেন। আলমগীর ভাই তার নিজের বিছানা ছাড়া রাতে ঘুমাতে পারেন না, আর রাতে কখনো একা চলতে পারেন না। একারণে তার যাওয়া হয়নি। আজ ভোরেই রওয়ানা দেবেন আমাকে নিয়ে। আমি রাতে থাকব না, ঢাকা ফেরত আসব। তার অনেক খুশি, রাতে তিনি আমার সঙ্গে ফিরবেন।
আমরা দুপুরবেলা পৌঁছাই। বেশ নিরিবিলি পরিবেশ। সাংবাদিক নেই, ক্যামেরা নেই। কোনো একটা নাটকের শুটিং ছিল আজ, সে নাটকের শুটিংও শেষ হয়েছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। আকাশে চাঁদ, কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি। এক সময় বৃষ্টির মাত্রা বেড়ে গেলো অনেকগুণ। হ‌ুমায়ূন  আহমেদের বেডরুমেই আমরা সবাই বসে। আলমগীর ভাই উশখুশ শুরু করেন। এখনই না বেরোলে দেরি হয়ে যাবে। অন্তত তিনঘণ্টা সময় লাগে ঢাকা যেতে। তিনি আমাকে নিয়েই যেতে চান—ড্রাইভার এসে খবর দিয়েছে। হ‌ুমায়ূন   আহমেদ ড্রাইভারকে জানালেন, শাকুর যেতে চাচ্ছে না, তাকেও থাকতে বলছে।
এরপর তার কোনো খবর নেই। আমরা বৃষ্টি দেখি, জ্যোৎস্না দেখি, চাঁদ দেখি,  মেঘ দেখি। বৃষ্টি ও জ্যোৎস্না একসঙ্গে দেখা যায় না। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, এই জ্যোৎস্না ও বৃষ্টির বিলাসীর জন্য আজ এ দু’য়ের একত্র সঙ্গম ঘটছে। ঘটনাটা অন্য রকম। বেশ জোরে বৃষ্টি হচ্ছে, হ‌ুমায়ূন আহমেদ তার বেডরুমের দরোজা খুলে রেখেছেন।
দরোজার পরেই বারান্দা। সেই বারান্দার পরে চল্লিশ ফুট দূরে একটা লাইটপোস্ট। সেই লাইটপোস্টের বাতি জ্বলছে। বৃষ্টি ও অন্ধকারের জন্য ওই বাতিটুকু ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঘরটির সামনে বেশ বড়সড় গাছ, সেই গাছের চিকন চিরল পাতার ফাঁক দিয়ে যেটুকু আলোর কিরণ চোখে এসে লাগছে তাকে জ্যোৎস্নার বৃষ্টির রাত বলেই মনে হচ্ছে। এর মধ্যে মাঝে মাঝে শাওন গাইছে হুমায়ূনের মন ভালো করানো গান।
আমরা সবাই আলমগীর ভাইয়ের কথা ভুলে যাই। বৃষ্টি থামলে আলমগীর ভাইকে ফোনে পাওয়া যায়। তিনি তখন গাজীপুর চৌরাস্তা পার হয়ে গেছেন। বৃষ্টি থেমে গেছে খানিক আগে। আকাশে চাঁদ। আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি।
জ্যোৎস্নাবিলাসী এ মানুষটির জ্যোৎস্নাপ্রীতির খবর কারো কাছে নতুন নয়। তার সেই প্রথম উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’ থেকে শুরু করে শেষ জীবনের যে-কোনো লেখাতেই জ্যোৎস্নার কথা বলা থাকবেই। জ্যোৎস্না নিয়ে অনেকগুলো গানও আছে তার। তার নিজের লেখা মরণগীতিতেও তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছেন, যাতে চন্দ্রালোকিত রাতে তার মৃত্যু হয়। চন্দ্রালোকিত রাতকে তিনি বলতেন ‘চান্নি পসর’ রাইত। ‘চান্নি পসর’ খাস নেত্রকোনার শব্দ। আমাদের সিলেটের সঙ্গে মিল আছে। আমরা বলি ‘চান্নি রাইত’। এই ‘চান্নি পসর’ তাকে দেখিয়েছিল মামা বাড়ির এক লোক। বলছিল, ভাইগনা ‘চান্নি’ দেখতে অইলে আও আমার লগে। নেত্রকোনার বিশাল খোলা মাঠে ভরা পূর্ণিমা রাতে মামা বাড়ির লোক তাকে যা দেখিয়েছিল, সেটা তিনি ভুলতে পারেননি। আর সে কারণেই, হাছন রাজা যেমন আউলা হতেন ভরা পূর্ণিমা দেখা হাওড়ে, হ‌ুমায়ূন  কেও আউলা করতো জ্যোৎস্নার চাঁদ।
তার জ্যোৎস্নাভোগের অনেক কাহিনি শুনেছি, কিছু তার অনেক লেখাতেও পড়েছি। কিন্তু একসঙ্গে দেখা হয়নি তেমন। একবার ২০০৮ সালে ৫ দিনে সুন্দরবন সফরে আমরা একসঙ্গে ছিলাম। অন্ধকার রাতে বঙ্গোপসাগরের প্রান্ত ঘেঁষে একটা চাঁদ উদয় হওয়ার দৃশ্য দেখানোর জন্যে আমাকে আমার কেবিন থেকে ডেকে এনে ছবি তুলতে বলেছিলেন। আমি আমার মতো ছবি তুলেছি, তিনি তার মতো ঝিম মেরে বসে থাকলেন। এই আমাদের একত্রে চাঁদ দেখা।
নুহাশপল্লীতেও এক রাতে আমরা সবাই মিলে বসেছিলাম তার ঘরের সামনের জাপানি বটের নিচে। হঠাৎ দেখা গেলো আকাশে চাঁদ। আমি একটা বেঞ্চির ওপর শুয়ে পড়লাম। শুয়ে না পড়লে চাঁদ দেখা যায় না। ঘাড় বাঁকা করে চাঁদ দেখা বড়ই বিরক্তিকর। বিষয়টি দেখে তিনি মোস্তফাকে ডাকেন । বলেন—ওই কার্পেটটা এখানে বিছাও।
সঙ্গে সঙ্গে নুহাশপল্লীর ঘাসের ওপর বিছানো হলো বিশাল কার্পেট। চলে এলো বালিশও। আমাকে আরাম করে চাঁদ দেখানোর জন্যে তার এই আয়োজন।
নুহাশপল্লীর স্টাফদের অনেক গুণ। শুধুই মালি-বাবুর্চি-দারোয়ান নয়। প্রত্যেকে যে এতদিনে পাকা অভিনেতা হয়ে গিয়েছে তা তার নাটকগুলো দেখেই জেনেছি। কিন্তু তারা যে গানও গাইতে পারে এটা জানতাম না। চন্দ্রালোকিত রাতে তারা হারমোনিয়াম, তবলা, ঢোল, বাঁশি নিয়ে বসে পড়ে। স্যারকে গান শোনায়। তার বেশ কিছু স্যারের লেখা, বাকিগুলো স্যারের পছন্দের গান। কোনোটা হাছন রাজা, উকিল মুন্সী, রাধারমণ বা আবদুল করিমের।
আজকের রাতটিও অনেকটা সে রকম। কিন্তু এখন স্যারের শরীর খারাপ। তার স্টাফদের মধ্যে সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। সবাই মুখ বেজার করে আছে, কিসে স্যারকে তুষ্ট রাখা যায়, সেই চিন্তায়।
রাত প্রায় বারোটা হবে। আমাদের ৭-৮ জনের একটা দল রাতের বেলা নুহাশপল্লীতে হাঁটাহাঁটি করছি। সবার লক্ষ্য হ‌ুমায়ূন আহমেদ। তিনি যে দিকে হাঁটছেন, সবাই পিছু পিছু। এই দলে হ‌ুমায়ূন  আহমেদ, সস্ত্রীক মাজহার আর কমল। আমি আর ঝর্ণা ভাবি। আমার স্ত্রী কেন আমার সঙ্গে এখানে নেই এটা সবাই জানেন, কেউ এখন আর এ নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করে না।
আমরা হ‌ুমায়ূন আহমেদকে অনুসরণ করে করে চলে আসি একেবারে দিঘি বরাবর। এখানে নতুন দুটো কটেজ বানানো হয়েছে স্থপতি মেহের আফরোজ শাওনের ডিজাইনে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভূত বিলাস’। যারা ভূত দেখতে নুহাশপল্লীতে আসবেন, তাদের জন্যে এখানে থাকার ব্যবস্থা থাকবে। ভূত যদি থেকেই থাকে, তাহলে তো দেখবেনই, আর যদি না থাকে—তবে পয়দা করা হবে। নুহাশপল্লীতে ভূত পয়দা করার কারখানা তৈরি হবে।
দিঘিটির পূর্ব পাশে একনাগাড়ে ৫-৬টি কটেজ হবে। আমরা তার একটির ভেতর প্রবেশ করি। এখানে কোনো ফার্নিচার বসে নি এখনো, ফার্নিচার ছাড়া সবকিছুর কাজ শেষ। ফিটিংস বসানো আছে। ঘরের ওপাশে দিঘির উপর কেন্ডিলিভার করে প্রশস্ত বারান্দা। এ বারান্দায় আমরা ৮জনই বসে পড়ি। হ‌ুমায়ূন আহমেদ একের পর এক চুটকি শোনাতে থাকেন, শাওনকে গান গাইতে বলেন। শাওনও গান গায়। সবই গীতিকার হ‌ুমায়ূন  আহমেদের গান।
রাত প্রায় দুটো বাজে। হ‌ুমায়ূন  আহমেদ একসময় সিগারেটের জন্যে মরিয়া ছিলেন। তার সবচেয়ে পছন্দের উপকরণের একটা ছিল এই সিগারেট। অথচ এখন একবারের জন্যেও সিগারেট নিয়ে উশখুশ করছেন না। আমেরিকা যাওয়ার পরপরই তিনি সিগারেট ছেড়েছেন। আমাদের দলে প্রায় সবাই (আলমগীর ভাই সদ্য দলছাড়া হয়েছেন) স্মোকার। এ দলে নেতৃস্থানীয় ছিলেন হ‌ুমায়ূন। এখন তিনিও ‘আধূনিক’-এর সদস্য। সিগারেট খাচ্ছেন না। সামনে খেলে যদি তার কষ্ট বাড়ে, এ আশঙ্কায় আমরাও খাচ্ছি না। এটা দেখে তিনি অবাক হচ্ছেন। বারবার বলছেন, তোমাদের কী হলো, তোমরা খাচ্ছ না কেন ? খাও খাও, আমার সমস্যা হচ্ছে না এখন। সিগারেটের নেশা আমার মাথা থেকে চলে গেছে। এটা যেমন বলছেন, আবার এ-ও বলছেন যে, সিগারেটে আসলে কোনো লাভ নাই। কিন্তু মানুষ যে কেন এটা খায়! নিশ্চয় কারণ আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ এই জিনিসটার প্রতি আসক্ত। তাদের সবাই জানে যে এটা কাজের কাজ কিছুই করে না, কোনও লাভ নেই তার মধ্যে, তারপরও এটা পোড়ানোতে মানুষের এত আনন্দ।
রাত অনেক হয়ে গেছে। ‘ভূত বিলাস’ নিয়ে আরও কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ঠিক হয়, সামনের ১২ তারিখের অপারেশনের পর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ফেরত আসার পর এগুলো কার্যকর হবে।
আমরা আস্তে আস্তে উঠে আসি। নিচের দিঘির পাড় থেকে একটা উঁচু টিলা বেয়ে উঠতে হয়। এই টিলা বাওয়া নিয়েও কত রসিকতা করেছেন তিনি। একবার দখিন হাওয়ায় তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন এভারেস্ট জয়ী এম এ  মুহিত। আমাদের সঙ্গেও অনেক কাচ্চা-বাচ্চা-তরুণ খুব আগ্রহ নিয়ে এভারেস্টের ওপরে ওঠার কৌশল শিখতে চাইল মুহিতের কাছে। এক তরুণকে কাছে ডেকে বললেন, যাও, তুমি আগে নুহাশপল্লীর টিলাটা জয় করে আসো, তারপর এভারেস্টের খোঁজে যেয়ো।
আমরা সেই এভারেস্ট জয় করে ওপরে সমতলে উঠে আসি। সেখানে বিরাট মাঠ। পাশ দিয়ে ইট বিছানো হাঁটা পথ আছে। সেই পথে না গিয়ে মাঠের দিকে হাঁটতে থাকি। মাঠ পার হয়ে ওপরের সীমানা প্রাচীরের কাছে কতগুলো লিচুগাছ। গাছগুলোর নিচে গাছের গোড়াকে কেন্দ্র করে ঘোরানো প্ল্যাটফর্ম। নুহাশপল্লীর ম্যানেজার বুলবুল বলেছিলেন, মারা গেলে যেন এখানে তাকে কবর দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা কোনও কথাবার্তা বলি না। মহিলারা প্রায় সবাই ঘরের দিকে চলে যান। আমরা চারজন পুরুষ (হ‌ুমায়ূন, মাজহার, কমল আর আমি) এখানে কিছুক্ষণ বসি। নানা রকম কথাবার্তা বলি। আড্ডার সব কথা কি মনে থাকে! এক সময় শেষ রাতের দিকে আমরা ভেতরের ঘরে গিয়ে ঘুমাই।

স্মরণ: জাদুকর হুমায়ূন by অলোক আচার্য

হুমায়ূন আহমেদ
সাহিত্যকর্ম কেন সৃষ্টি হয় এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো পাঠকের জন্য। পাঠক পাঠ করে আনন্দ পায়। আত্মার ক্ষুধা মেটায়। সাহিত্য সৃষ্টির বিচারে কে জনপ্রিয় লেখক এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জনপ্রিয়তার ধরনেও রয়েছে পার্থক্য। তবে একটা কথা মেনে নিতে হয়, লেখকের লেখা পাঠকের অন্তরে স্থান করে নেয় তিনিই লেখক হিসেবে স্বার্থকতা পান। পাঠক মজে থাকে লেখকের লেখার জাদুতে। মঞ্চের জাদুকর কিছুক্ষণ জাদু দেখিয়ে দর্শকদের বাহবা পান।

একজন লেখক তার লেখার জাদুতে মুগ্ধ রাখেন বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। এই যেমন দেবদাস বা শেষের কবিতার অমিত বা এরকম কোনো চরিত্র নিয়ে আজও মানুষ আবেগপ্রবণ হয়, সত্যি মনে করে, অনেকটা সেরকম। তাই লেখকের চেয়ে বড় কোনো জাদুকর নেই। যেমন জাদুকর ছিলেন আমাদের প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বেঁচে থাকতে পাঠককে নিজের লেখার জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন, আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েও পাঠককে তার সৃষ্টির জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন। তাই এদেশের সবচেয়ে বড় জাদুকর মনে হয় তিনিই। বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রবাদ পুরুষ হুমায়ূন আহমেদ। বেঁচে থাকতে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গস্পর্শী এবং তার মৃত্যুর পরেও তার জনপ্রিয়তা কমেনি।

সহজ, সরল আর সাবলীল গতিতে সৃষ্টি হওয়া এক একটি সাহিত্যকর্ম যেন পাঠকের প্রাণ। লেখকের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো তার লেখায় পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতা। কোনো একটি বই পড়তে গিয়ে অর্ধেক পড়ার পর যদি বিরক্তির জন্ম হয় তখন বুঝতে হবে লেখায় পাঠককে টানার ক্ষমতা কম ছিল। একটি বইয়ের যত গভীরে যাওয়া যাবে তত বইটি শেষ করার ইচ্ছা জাগতে হবে। উপন্যাস বা ছোটগল্পের চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে কল্পনা করেও অনেক পাঠক তৃপ্তি বোধ করেন। যেমন কেউ হুমায়ূন আহমেদের হিমু সেজে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়।
  • লেখকের চেয়ে বড় কোনো জাদুকর নেই। যেমন জাদুকর ছিলেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বেঁচে থাকতে পাঠককে নিজের লেখার জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন, আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েও পাঠককে তার সৃষ্টির জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন। তাই এদেশের সবচেয়ে বড় জাদুকর মনে হয় তিনিই।
আজকের যুগে লেখালেখি করার ক্ষেত্র বা সুযোগ অনেক বেশি। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা ছাড়াও প্রতি বছর মেলায় গাদা গাদা বই প্রকাশিত হয়। প্রচুর নতুন লেখক, কবিদের আগমন ঘটে। আবার বইমেলা শেষ হলে সেসব লেখকের বেশিরভাগেরই আর দেখা পাওয়া যায় না। একজন লেখক তার লেখা চালিয়ে যান সারা বছর। পাঠকই লেখকের লেখা খুঁজে বের করে। হুমায়ূন আহমেদের চলে যাবার পর আজও সেই পাঠক তৈরি করার মতো লেখকের দেখা পাইনি। যারা লিখে এসেছে তারাই লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। হুমায়ূন আহমেদ চলে যাবার পরও প্রতিটি বইমেলায় তার বই কিনতে পাঠকদের আগ্রহ দেখেছি। তার সৃষ্টি মিসির আলী, হিমু বা রুপা চরিত্রগুলো আজও বইয়ের পাতা থেকে রাস্তায় দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যে এত তুমুল জনপ্রিয় লেখকের দেখা খুব কমই পেয়েছে সাহিত্যনুরাগীরা।

কোনো লেখকের শূন্যতাই পূরণ হবার নয়। তিনি ছিলেন পাঠক নন্দিত লেখক। পাঠকের অন্তরে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন বলেই এমন বলা হয়। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হয়, তখনই বোঝা গিয়েছিল কথাসাহিত্যের বিশাল জগতে তিনি অল্প সময়ের জন্য আসেননি, এসেছেন রাজত্ব করতে। সাহিত্যের ভুবনে ছিলেন সম্রাট। তার পাঠক শ্রেণি ছিল আলাদা। যারা গোগ্রাসে তার লেখা পড়তো। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রা অসাধারণ দক্ষতায় তুলে এনেছেন। অবশ্য তার সমালোচক শ্রেণিরও অভাব ছিল না। সমালোচনা তার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তিনি তার লেখার ধরন নিজের মতো ঠিখ রেখেছেন। সে সমালোচনা তাকে আরো উঁচুতে পৌঁছে দিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের লজিক ও অ্যান্টিলজিক চরিত্র হিমু ও মিসির আলী চরিত্র দুটি আমাদের দেশে খুবই জনপ্রিয়। এ চরিত্র নিয়েই দেশে বহু আলোচনা হয়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে মেলানোর প্রচেষ্টাও করা হয়েছে। অনেক সময় চরিত্র দুটির স্রষ্টাকেই এই চরিত্রের সত্যিকারের মানুষ বলে মনে হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশে যে তুমুল জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক ছিলেন সে কথা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়। তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তা জানতে হলে তার কর্ম এবং সৃষ্টির দিকে তাকাতে হবে। হুমায়ূন আহমেদের স্পর্শ যেন সফলতার অন্য নাম। সহজ, সরল সাবলীল ভাষায় পাঠককে গল্পের ভেতর টেনে নেওয়ার যে ক্ষমতা তা তার ছিল। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সফল হয়েছেন।

প্রকৃতির প্রতি বিশেষ টান তার চরিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদ ভালোবাসতেন সবুজ অরণ্য, বৃষ্টি আর টিনের চালে সেই ছন্দ, বৃষ্টির পানিতে ভেজা। তার তৈরি নুহাশপল্লীতে তিনি সেভাইে সাজিয়েছিলেন প্রকৃতিকে। তার লেখার বহু বর্ণনায় সেসব পাওয়া যায়।

বিংশ শতাব্দির জনপ্রিয় বাঙালি ঔপন্যাসিকদের তিনি অন্যতম। তার এই লেখার জাদুতে আরো বহু যুগ পাঠক মুগ্ধ থাকবে। বহু যুগ পার হয়ে গেলেও পাঠক হুমায়ূন আহমেদে মশগুল থাকবে—এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

>>>লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক
sopnil.roy@gmail.com