Monday, January 27, 2014

রাজনীতি- ‘অল্প’ নয়, আরও গণতন্ত্র by এ কে এম জাকারিয়া

নির্বাচন না হওয়ার চেয়ে কম অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনও ভালো—এ ধারণা বোস্টন গ্লোব-এর নিয়মিত কলাম লেখক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক টম কিনের। একেবারেই মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সিনেটের আগাম বিশেষ নির্বাচনে ভোটারদের কম অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি এ মন্তব্য করেছেন এক কলামে।

রাজসিক সংবর্ধনা- বর্ণিল তোরণ আর সোনার নৌকা by আলী ইমাম মজুমদার

অতীতে ভূরি ভূরি হয়েছে। সমালোচনা যতই হোক, থেমে থাকেনি। তবে আশা করা হয়েছিল, এবার অন্তত এসব কিছু পরিহার করা হবে। কেননা, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি স্বাভাবিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়নি, এটা সবার জানা।
জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ কী পরিমাণ ছিল, তা দেশ কিংবা বিদেশেও অনেকের জানা। তাই নির্বাচনের পর সরকার গঠনে কিছুটা ইতিবাচক দিক নজরে এল। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ কতিপয় নেতা সরকারে যোগ দিলেন। বাদ পড়লেন বিতর্কিত কিছু ব্যক্তি। এতে ধারণা করা হয়, সরকার নির্বাচনের ঘাটতিটি আপাতত সুশাসনের মাধ্যমে পূরণের চেষ্টা করবে। অবশ্য উল্লেখ করা আবশ্যক যে সুশাসন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিকল্প নয়; বরং পরিপূরক।

যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত, তা উপেক্ষা করার নয়। প্রথমটি যমুনার অপর পারের এক জেলার। একজন সাংসদ মন্ত্রী হয়ে আসছেন নিজ এলাকায়। এক শ মাইক্রোবাস আর তিন হাজার মোটরসাইকেলের বহর তাঁকে স্বাগত জানায়। স্বাগত জানায় প্রায় দেড় শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা। তীব্র ঠান্ডায় তারা তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল। বন্ধ করে দেওয়া হয় সেদিনের পাঠক্রম। অপর ঘটনাটিও একই জেলার। একজন সাংসদকে সংবর্ধনার খবর। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ নিয়ে ঢাকা থেকে ফিরলেন। খবরে প্রকাশ, নিজ এলাকার কাছাকাছি আসতেই শতাধিক গাড়ি আর সহস্রাধিক মোটরসাইকেলের বহর যুক্ত হয় তাঁর গাড়ির সামনে-পেছনে। রাস্তার দুই পাশে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকেরা প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, ফেস্টুন আর রঙিন বেলুন হাতে নিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। নির্মিত হয়েছে শতাধিক তোরণ।
হরতাল-অবরোধে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা গোল্লায় যেতে বসেছে। সেখানে এক দিনের জন্য হলেও মন্ত্রী-সাংসদকে স্বাগত জানাতে ছাত্র-শিক্ষকেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবেন কেন? এভাবে স্বাগত না জানানোর জন্য সরকারের নির্দেশও রয়েছে। তা সত্ত্বেও এমনটা ঘটে চলছে। পরবর্তী ঘটনাটি ব্রহ্মপুত্রতীরের একটি জেলা শহরের। সেই শহরের একজন নেতা মন্ত্রী হয়ে জেলা সদর সফরে আসছেন। জানা যায়, শহরেই নির্মিত হয়েছে গোটা ত্রিশেক তোরণ। তার বেশ কয়েকটি বর্ণিল ও ব্যয়বহুল। তদুপরি আগমনপথে অন্যান্য স্থানেও এ ধরনের সংবর্ধনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কেউ মন্ত্রিত্ব পেলে তাঁকে সংবর্ধনা জানানোর রেওয়াজ রয়েছে। তবে তাতে এরূপ রাজসিক আয়োজন করার আবশ্যকতা আছে কি? সরকারের টাকায় না হলেও যারা এগুলো করছে, তারা বিনিয়োগের সহস্র গুণ কড়ায়-গন্ডায় উশুল করে নেবে। সেটা নেবে মন্ত্রী-সাংসদদের আশীর্বাদধন্য হয়ে। অপর খবরটি হচ্ছে, দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি উপজেলায় একজন সাংসদকে সংবর্ধনায় উপহার দেওয়া হয়েছে সোনার নৌকা। সমালোচনা হলে আয়োজকেরা বলেন, নৌকাটি রুপার। সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়েছে মাত্র। হতেও পারে। তবে রাজসিক মানসিকতার প্রমাণ কিন্তু এতেই মেলে। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন। তবে ইদানীং প্রতিদিনই ঘটে চলছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
অনেক মন্ত্রী-সাংসদ এ ধরনের সংবর্ধনা নেন। আর তা আয়োজন করতে কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ নেমে পড়েন চাঁদা তোলায়। কেউ বা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে শুরুতে নিজেই দেন কিছু অর্থ। তদুপরি একেবারে হাতের মুঠোয় থাকা ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যবহার করেন বিবেচনাহীনভাবে। এ ধরনের রাজসিক চমকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-সাংসদ তৃপ্ত হতে পারেন। তবে তাঁদের জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার নিম্নমুখী হওয়ারই কথা। কেননা, আমাদের মতো দেশে সাধারণ মানুষের কোনো ভাষা নেই। তবে তারা সব বোঝে। আর সুযোগ পেলেই ব্যালটের মাধ্যমে এই রাজসিক বিলাসিতার বিরুদ্ধে মতামত দেয়। অতীতে তা-ই দিয়েছে। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে চারদলীয় জোট সরকারের সময়েও একই ধরনের রাজসিক সংবর্ধনা মানুষ দেখেছে। জেনেছে একজন সাংসদের সোনার মুকুট উপহার নেওয়ার কাহিনি। সময়ে ব্যালটে এর মীমাংসা করেছে তারা।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক। ২০০৯-এর সূচনায় যে ধরনের জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছিল, ২০১৪-তে তা কিন্তু হয়নি। এই সরকারের সাংবিধানিক ও আইনি বৈধতা থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় অসম্পূর্ণতার ভার বহন করতে হবে। আর তা দেশে ও বিদেশে সমান তালে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট, ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট—সবাই আমাদের গেল নির্বাচনটি নিয়ে ব্যক্ত করেছে হতাশা। আশঙ্কা করছে গণতান্ত্রিক পথ থেকে আমাদের বিচ্যুতির। ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সহিংসতা ও অস্থিরতার বিষয়ে। আশা প্রকাশ করেছে, রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পর্কে সমঝোতার। এই দুটি মহাদেশ আমাদের রপ্তানির প্রধান বাজার। আমাদের উন্নয়নের অংশীদার বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ আর এডিবির ওপরও তাদের রয়েছে প্রভূত প্রভাব। সুতরাং বাংলাদেশকে নিজ স্বার্থেই এসব মতামত বিবেচনায় নিতে হবে।
অন্যদিকে, জাতীয় বাস্তবতার বিষয়টিও উপেক্ষা করার নয়। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে আপাতত একটি স্বস্তির পরিবেশ বইছে। তবে একে স্থায়ী ও নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যৌক্তিক হবে না। এটা সবাই জানেন ও বোঝেন যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটকে নির্বাচনে আনতে সরকার তেমন কোনো জোরদার উদ্যোগ নেয়নি। তেমনি তারাও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রাসী প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। ফলে ভোটারের উপস্থিতি খুব কম হলেও নির্বাচনটি হয়ে গেছে। তবে এটাকে জনসমর্থিত বলার সুযোগ নেই।
উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে সুশাসন জনগণের অধিকার। আর সেই অধিকার নিকট অতীতে আমরা ভোগ করতে পারিনি। চারদলীয় জোট সরকারের শাসনে হতাশ হয়ে ২০০৮-এর শেষে মহাজোটকে মহাবিজয় দিয়েছিল দেশবাসী। কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলেও তারা সুশাসন দিতে পারেনি জাতিকে। দলীয়করণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারহীনতা, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ইত্যাদি মিলিয়ে তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ প্রায় কাছাকাছি। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে সমঝোতার অভাব গেল নির্বাচনটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই এই নির্বাচনে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে, এটা জোর দিয়ে বলার সুযোগ নেই। অন্যদিকে যারা নির্বাচন বর্জন করে বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়েছিল, তাদের পক্ষে জনমত সৃষ্টি হয়েছে—এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই। বিশেষ করে তাদের লাগাতার সহিংস কর্মসূচি সরকারের বিরুদ্ধে দাবি করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটাকে জনগণের বিরুদ্ধে বলেই মনে করলে দোষ দেওয়া যাবে না। তাই জনগণ অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলেও তাদেরই সমর্থন দেবে, এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না।
এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের সুযোগ রয়েছে তাদের নিকট অতীতের কালিমা দূর করে আবার জনগণের মুখোমুখি হওয়ার। সরকারের গঠনকাঠামো কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে অনেকটা সেই প্রত্যাশারই ইঙ্গিত দেয়। এমনকি সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী নয়াদিল্লি সফরকালে গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অদূর ভবিষ্যতে নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। তাঁর ভাষায়, ‘ভোট নয়। আমাদের মাথায় এখন সুশাসনের চিন্তা। হিংসা থামানোর চিন্তা।’ এ চিন্তা বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে দলমত-নির্বিশেষে যেকোনো হিংসাত্মক কর্মসূচির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে তা করতে গিয়ে একের পর এক মামলার আসামিকে এখানে-সেখানে নিহত অবস্থায় উদ্ধার হলে হিংসার রাজনীতি আবারও জোরদার হতে পারে। পাশাপাশি বাদ দিতে হবে বিরোধী দলের নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিঘ্ন সৃষ্টি। বিবেচনায় রাখা দরকার, প্রকৃতপক্ষে প্রধান বিরোধী দল সংসদে নেই। তবে মাঠে আছে। আর তার কলেবর উপেক্ষা করার নয়। সংসদের বিরোধী দলটি সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য কতটা সহায়ক হবে, এটা বোধগম্য হচ্ছে না। যা-ই হোক, প্রধান বিরোধী দলের অস্তিত্বকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
বলা হয়তো যায়, মন্ত্রী-সাংসদেরা কেউ কেউ জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা নিলেই সুশাসনের ঘাটতি হতে পারে না। বক্তব্যটি সমর্থনযোগ্য নয়। কেননা, এর ব্যয় জনগণই কোনো না কোনোভাবে মেটাবে। তদুপরি স্কুল-কলেজ বন্ধ করে ছাত্র-শিক্ষকদের এতে অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। আবার জানা যায়, ইতিমধ্যে সাংসদদের কেউ কেউ খবরদারি শুরু করেছেন স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থার ওপর। এগুলো অনুচিত, অযাচিত আর সুশাসনের প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। একজন সাংসদ তো একটি সিটি করপোরেশনের ময়লা নিষ্কাশন স্থানটি বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো বিকল্প পরামর্শ তিনি দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে কতিপয় পরিবহন কোম্পানির অভিযোগ ছিল চাঁদাবাজির। এখন তাদের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজির মামলা হচ্ছে। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও এ ধরনের ঘটনা সুশাসনের অন্তরায়। আর সরকারের সদিচ্ছার পরিপন্থী। যাঁরা এগুলো করছেন, তাঁরা তাঁদের নির্বাচনে নৈতিক ভিত্তিটা কি তলিয়ে দেখেছেন? দেখলে এমন হওয়ার কথা ছিল না। তাঁরা না দেখলেও কিন্তু দেশ-বিদেশের অনেকেই তা দেখছেন। আর সবাইকে দীর্ঘকাল অব্যাহতভাবে উপেক্ষা করা যাবে না।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

রাজনীতি ও নির্বাচন- আস্থা ফিরবে কীভাবে by এম সাখাওয়াত হোসেন

বহু নাটকের মধ্যে সমাপ্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কে কী পেল তার অঙ্ক অনেকে করছেন। নির্বাচন কমিশনের হিসাবমতে, দুই কোটির কম ভোটার ভোট দিয়েছেন। অবশ্য অনেকেই এই তথ্যের সঙ্গে একমত নন।
অনেকের ধারণা, ১০-১২ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। কিছু কেন্দ্রে কোনো ভোটই পড়েনি। ফলে দেশের নির্বাচনব্যবস্থায় কিছুটা হলেও যে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা বহুলভাবে ব্যাহত হয়েছে। ভবিষ্যতে সুস্থ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে।

নির্বাচন নিয়ে যত বিতর্ক এবং পশ্চিমা দেশের কাছে যতই অগ্রহণযোগ্য হোক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে একটি নির্বাচন হয়েছে এবং তা সংবিধান ও আইনের দৃষ্টিতে বৈধ। ফলাফলের গেজেট প্রকাশ ও দশম জাতীয় সংসদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন করার পর এক নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। নবম সংসদের মেয়াদকালেই দশম জাতীয় সংসদকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়টি কতখানি সংবিধানসম্মত বা আইনানুগ, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। নবম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া এই সরকারকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছেন। আর ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট নাগরিক ফজলে হাসান আবেদ বলেছেন, ‘এ সরকার অবৈধও নয়, বৈধও নয়’।
বর্তমান সরকার ‘জনপ্রিয়’ হিসেবে জোর গলায় দাবি করতে পারে তেমন নয়। কাজেই প্রধানমন্ত্রী যেখানে এই নির্বাচনকে সংবিধান ও নিয়মরক্ষার নির্বাচন বলেছেন, সেখানে সরকারের মেয়াদ নিয়ে অহেতুক অতি মন্তব্য জনগণের কাছে শ্রুতিমধুর হওয়ার কথা নয়। দলমত-নির্বিশেষে এসব ভোটার, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে একটা হতাশা বিরাজমান। কারণ, তাঁরা সংসদ ও সরকার গঠনে অংশ নিতে পারেননি। সিংহভাগ ভোটারের ভোটদানে বিরত থাকা বা ভোট দিতে না পারার মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদ ও সরকার প্রকৃতপক্ষে জনসমর্থিত বলে বিবেচিত হয় না।
এ ধরনের সরকার আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে আবার জনমত নিয়ে থাকে বা নেওয়া বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়ে। নবগঠিত সরকার কখন এ ধরনের জনমত পুনর্যাচাইয়ে যাবে তা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে বলে মনে হয়। সরকারের ওপর বিদেশের চাপ রয়েছে, তবে এটা ছাড়াও যে দুটি অভ্যন্তরীণ কারণে সরকার আগাম নির্বাচনে যেতে পারে, তার একটি রাজনৈতিক ও অপরটি নৈতিক। ২৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক চাপ কতখানি সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করবে, তা পরের বিষয়। রাজনৈতিক চাপ তেমন অনুভব না করলেও নৈতিক কারণেও সরকার আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে সুবিধামতো সময়ে, জনসমর্থন পুনর্যাচাই করতে পারে।
শুধু বিরোধী ১৮-দলীয়জোট নয়, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে আরও প্রায় ডজন খানেক দল, যার মধ্যে রয়েছে এ অনেক পুরোনো দলও। এমন অনেক দলও রয়েছে, যেগুলো একটি আদর্শিক ভাবধারায় পরিচালিত। তবে বৃহত্তর দল হিসেবে সর্বাগ্রে রয়েছে তিনবার ক্ষমতায় থাকা বিএনপি, যার রয়েছে ব্যাপক জনসমর্থন ও অনুসারী। মূলত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে ১৮-দলীয় জোটের সঙ্গে কিছু কিছু বিষয়ে মতানৈক্য থাকলেও আদর্শভিত্তিক এবং অন্যান্য নির্বাচন বর্জনকারী দল একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে নিজেদের অবস্থান থেকে বৃহত্তর বিরোধী দল বিএনপির সমমনা ছিল। লক্ষণীয় বিষয় হবে আগাম নির্বাচনের দাবিতে এসব দলের অবস্থান।
বিএনপি এ নির্বাচন শুধু বর্জনই করেনি, প্রতিহত করার ঘোষণাও দিয়েছিল। এ ঘোষণার পর ১৮-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াতে ইসলামীর সহিংস তৎপরতাও নির্বাচন প্রতিহত করতে পারেনি। তবে শুধু সহিংসতার মাধ্যমে অতীতেও যেমন এ ধরনের নির্বাচন বানচাল করা যায়নি, তেমনিভাবে এ নির্বাচনও বানচাল করা যায়নি। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে জনসম্পৃক্ততা যত কমই থাকুক না কেন। নির্বাচন কেমন হয়েছে তার সাক্ষী এ দেশের জনগণ। বিরোধী দলের আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা দৃশ্যত কম থাকলেও একাধিক কারণে ভোটার সমাগম হয়নি। তবে সর্বক্ষেত্রে সহিংসতা একমাত্র কারণ নয়। এর উদাহরণ ঢাকা শহর, যেখানে নির্বাচনের দিনের পরিস্থিতি দেশের যেকোনো স্থানের তুলনায় শান্তিপূর্ণ থাকলেও ভোটের বাক্সে আশাতীত ভোট পড়েনি। এর কারণ বিরোধী বিএনপিসহ সিংহভাগ দলের নির্বাচন বর্জনও বটে।
তাই বিরোধী দলের আন্দোলন যে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে এমনটা বলা যায় না। ১৪৭টি আসনে যেভাবে, যে পরিবেশে, ব্যাপক কারচুপির অভিযোগের এবং অব্যবস্থার মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে আমাদের দেশে ক্ষমতায় থেকে সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার মতো পরিস্থিতি, পরিবেশ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। কাজেই বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ পরিবেশ না হলে ভবিষ্যতে ভোটারদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
বিরোধী জোট হয়তো সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পেরেছে কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে কাছে টানতে পারেনি। জনগণকে আন্দোলনে তেমনভাবে উদ্বুদ্ধ করতেও পারেনি। দেশের আপামর জনসাধারণ সহিংস নয় অহিংস আন্দোলন সমর্থন করতে পারে আর বিরোধী দল যদি সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে চায় তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের উদ্বুদ্ধ করে আন্দোলন করতে হবে। আর আন্দোলন করতে হবে নিজস্ব ক্ষমতায়।
গত কয়েক মাসের আন্দোলন দমাতে সরকারের তরফ থেকে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে যে মাত্রায়, সহিংসতাও ওই মাত্রায় হয়েছে। এ সহিংসতার শিকার শুধু রাজনৈতিক কর্মীই হননি, হয়েছে জনগণ, যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় নন। মানুষ আগুনে পুড়েছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের জানমালের। দুঃখের বিষয়, এর দায়দায়িত্বের কথা উঠলে দোষারোপের বিতর্ক উঠে আসে। যেহেতু বিরোধী জোট সহিংস আন্দোলনে ছিল, তাই দৃশ্যত দায়দায়িত্বের সিংহভাগ তাদের ওপরই বর্তায়। অপরদিকে সরকারি দল বা জোট বিরোধী জোটকে দায়ী করেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে কিন্তু প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে এখনো সুষ্ঠু তদন্তের ব্যবস্থা করেনি।
তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ও নিন্দনীয় হলো নির্বাচনোত্তর সহিংস কর্মকাণ্ড। নির্বাচনের বলি হতে হয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের। শুধু ভোট দেওয়া না-দেওয়ার অথবা নির্ধারিত ব্যক্তিকে ভোট দেওয়াসহ অন্যান্য কারণে গরিব শ্রেণীর এসব বাংলাদেশিকে এবং ভোটারের নিরাপত্তা বিধানে ব্যর্থ হয়েছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ভোটারদের সুরক্ষা করা। শুধু ভোট দেওয়ার জন্য কাউকে নির্যাতন যাতে না করা হয়, তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশাল আয়োজন করা হয়। এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। কেন এবারও এ ধরনের ঘটনা ঘটল তার সঠিক কারণ নিরূপণ করা জরুরি। এ ধরনের হামলা শুধু দোষারোপ অথবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহার না করে একটি বিচার বিভাগীয় নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করা হোক।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার এবং নির্বাচনের বাইরে থাকা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে কোন পথে হাঁটবে, তা হয়তো দু-এক মাসের মধ্যেই পরিষ্কার হবে । তবে এ কথা ঠিক যে দুই পক্ষই জনসম্পৃক্ততা হারিয়েছে এবং এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ একটি নির্বাচন। এ জন্য দরকার জাতীয় সংলাপের, যার মাধ্যমে সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। আর প্রয়োজন ভেঙে পড়া নির্বাচনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। অন্যথায় জনগণ নির্বাচন-প্রক্রিয়ার ওপর ফের আস্থা হারিয়ে ফেলবে। নির্বাচন যেভাবেই হোক, একটি সরকার গঠিত হয়েছে এবং এ সরকারের অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে প্রধান দায়িত্ব হবে জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় আস্থা ফিরিয়ে আনা।

এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

অরণ্যে রোদন- ভাই, শান্তিতে থাকতে দিন by আনিসুল হক

গণতন্ত্রে তাঁরাই দেশ শাসন করবেন, যাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে, এমন একটা নির্বাচনের মাধ্যমে এই প্রতিনিধিরা ক্ষমতায় আসবেন। তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের সমর্থনধন্য হবেন।

সঙ্গিনীর সঙ্গে বিচ্ছেদের কথা নিশ্চিত করলেন ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ

প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ, জুলি গায়েত, ভ্যালেরি ত্রিয়াবেলার,
দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী ভ্যালেরি ত্রিয়াবেলারের সঙ্গে বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফাঁসোয়া ওলাঁদ। প্রথমে এ-সংক্রান্ত খবরকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছিল প্রেসিডেন্টের দপ্তর। তবে গত শনিবার বিচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেন প্রেসিডেন্ট নিজেই। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিচ্ছেদ সত্ত্বেও দাতব্যকাজে ভারত সফরে যাচ্ছেন কাগজে-কলমে এত দিন ফার্স্ট লেডি থাকা ভ্যালেরি ত্রিয়াবেলার। গতকাল রোববার রাতেই তাঁর ভারতের মুম্বাইয়ে পৌঁছানোর কথা। বার্তা সংস্থা এএফপিকে প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ শনিবার টেলিফোনে বলেন, ‘সবাইকে জানাতে চাই যে আমি ভ্যালেরি ত্রিয়াবেলারের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি ঘটিয়েছি।’
তিনি বলেন, বিষয়টি ব্যক্তিগত বলে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নন, বরং কথা বলছেন একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে। এদিকে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গারের কার্যক্রম দেখতে গতকাল রাতে ভারতের মুম্বাইয়ে পৌঁছার কথা ত্রিয়াবেলারের। সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওলাঁদের সঙ্গে বিচ্ছেদের ঘোষণা সত্ত্বেও ত্রিয়াবেলারের মুম্বাই সফর নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে তাঁর সফরসূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে। গত মাসে ফরাসি বিনোদন সাময়িকী ক্লোজার অভিনেত্রী জুলি গায়েতের সঙ্গে ওলাঁদের পরকীয়ার খবর ফাঁস করার পর এই প্রথম জনসমক্ষে আসছেন ত্রিয়াবেলার। প্রেসিডেন্টের পরকীয়ার খবর প্রকাশ হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।দীর্ঘদিনের জুটি ওলাঁদ ও ত্রিয়াবেলার ২০০৭ সাল থেকে একত্রে বসবাস করছিলেন। এএফপি।

বাধায় আগাম ভোট গ্রহণ ভন্ডুল

নেতার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা গতকাল রোববার আগাম ভোটদানে নাগরিকদের বাধা দিয়েছে। তারা রাজধানী ব্যাংককের বেশির ভাগ কেন্দ্রই বন্ধ রাখতে বাধ্য করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আগামী সপ্তাহের নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল থেকে আগাম ভোট গ্রহণ শুরু হয়। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। নির্বাচনের দিন বিদেশে থাকাসহ নানা কারণে আগাম ভোট দেবেন ২০ লাখের বেশি নাগরিক। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নিয়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে এ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা গতকাল রাজধানী ব্যাংককসহ দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি প্রদেশের ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে অবস্থান নেয়। তারা নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেন্দ্রে প্রবেশে নানাভাবে বাধা দেয়। অন্তত ৪৫টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এর ফলে আগাম ভোট দেওয়ার বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হাজার হাজার নিবন্ধিত ভোটার ভোট দিতে পারেননি। জরুরি অবস্থা উপেক্ষা করে বিক্ষোভকারীরা ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে জড়ো হয়। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার আশঙ্কায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ভোটারদের বড় ধরনের সংঘর্ষের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। কিছুসংখ্যক কেন্দ্রে ভোটারদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের বাগিবতণ্ডা হয়।
গতকালের আগাম ভোটদানের বিষয়টিকে ২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হবে কি না, তার একটা পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। উপপ্রধানমন্ত্রী সুরাপোং তোভিচাকশাইকুল বলেন, ‘রাজধানী ব্যাংককের ৫০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৫টিই বন্ধ করতে হয়েছে।’ নির্বাচন কমিশনের মহাসচিব পুচং নুত্রাওং এ খবর নিশ্চিত করেছেন। রাজধানীর বাইরে দেশটির ৭৬টি প্রদেশের মধ্যে ৬৬টিতে ভোট গ্রহণ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ইংলাকের ক্ষমতাসীন দল পুয়ে থাই পার্টির শক্ত ঘাঁটি উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো। ইংলাক এখন পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের দাবি মোতাবেক পদত্যাগ বা নির্বাচন পেছানোর বিষয়টি নাকচ করে এসেছেন। তবে দেশটির সাংবিধানিক আদালত সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন আইনগতভাবে পেছানো যেতে পারে বলে সম্প্রতি রায় দেওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি আগামীকাল মঙ্গলবার নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ইংলাকের পদত্যাগ এবং দেশে নতুন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সংস্কারের স্বার্থে একটি অনির্বাচিত ‘গণপরিষদ’-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে প্রায় তিন মাস ধরে বিক্ষোভ চলছে। এ পর্যন্ত নয়জনের প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হয়েছে কয়েক শ মানুষ। বিক্ষোভের অন্যতম নেতাকে হত্যা: সরকারবিরোধী বিক্ষোভের একজন নেতাকে গতকাল ব্যাংককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। বিক্ষোভকারীদের একজন মুখপাত্র এ কথা জানিয়েছেন। সুথিন থারাথিন নামের ওই নেতা ঘটনার সময় একটি পিকআপ ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তাঁকে পেছন থেকে মাথায় গুলি করা হয়। এএফপি ও রয়টার্স।

বন্দী বিষয়ে আলোচনা হবে

পরস্পরের কাছে থাকা বন্দীদের মুক্তি নিয়ে সরাসরি আলোচনায় বসছে সিরিয়ার সরকার ও বিদ্রোহীরা। চলমান জেনেভা ২ শান্তি সম্মেলনে গতকাল রোববারই এ আলোচনা হওয়ার কথা। জাতিসংঘের সিরিয়াবিষয়ক দূত লাখদার ব্রাহিমি গত শনিবার জেনেভায় সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা জানান। সিরিয়ায় রক্তপাত বন্ধের পথ খুঁজতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় শনিবার থেকে দুই পক্ষের সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। প্রথম দিন সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সরাসরি কথা হয়নি বলে যে খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা উড়িয়ে দিয়েছেন জাতিসংঘের দূত ব্রাহিমি। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে ব্রাহিমি বলেন, ‘সব বয়সী বন্দী বা অপহূত ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হবে। আমাদের প্রত্যাশা, সবাই স্বাধীনতা ফিরে পাবেন।...সিরীয় সরকারের কারাগারে হাজার হাজার বন্দী রয়েছে। আমরা আশা করব, শুরুতে অন্তত নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের মুক্তি দেওয়া হবে।’ সংবাদ সম্মেলনে ব্রাহিমি স্বীকার করেন, চলমান শান্তি সম্মেলনের গতি বেশ মন্থর। তবে সম্মেলনে দুই পক্ষের সরাসরি আলোচনা হয়নি বলে যে খবর বেরিয়েছে, তা তিনি উড়িয়ে দেন। জাতিসংঘের এ দূত বলেন, ‘আপনারা কীভাবে ভাবেন যে একই কক্ষে বসেও কথা না বলা সম্ভব? কেউ বাঁয়ে, কেউ ডানে। তাঁরা পরস্পরের মুখোমুখি ছিলেন, কথাও বলেছেন।
আমার মাধ্যমে তাঁরা কথা বলেছেন—বিষয়টি এমন নয়। ভদ্রভাবেই তাঁদের মধ্যে কথা হয়েছে।’ ব্রাহিমি সরাসরি আলোচনা শুরুর বিষয়টিকে ‘ভালো শুরু’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো তেমন কিছু অর্জন করতে পারিনি, তবে শুরু করেছি।’ দুই পক্ষের মুখোমুখি বৈঠকে সিরিয়া সরকারের প্রতিনিধিদলের প্রধান ও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ মুয়াল্লেম অংশ নেননি। যোগ দেননি বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিদলের প্রধান আহমেদ জাবরাসহ বেশ কয়েকজন। তবে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি কোনো কথা বলেননি ব্রাহিমি। শনিবারের বৈঠক শেষে লাখদার ব্রাহিমি সংবাদ সম্মেলন করলেও সিরিয়ার সরকার বা বিদ্রোহী পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা বা বিবৃতি দেয়নি। ওই আলোচনায় অবরুদ্ধ হোমস শহরে মানবিক সহায়তা পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায় বলে জানা গেছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পদত্যাগের দাবিতে ২০১১ সালে বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এই সংঘাতে এক লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আল-জাজিরা ও বিবিসি।

গল্প- অষ্টাদশী by উম্মে মুসলিমা

তরুবুর সঙ্গে দেখা ফরিদপুর রেলওয়ে স্টেশনে। ঢাকা থেকে দেশের বাড়ি যাওয়ার পথে আমারও ফরিদপুরে ট্রেন বদল। সেই সুচিদি। অনেকটা সুচিত্রা সেনের মতো দেখতে ছিল বলে আমরা বন্ধুরা তরুবুকে ডাকতাম সুচিদি।
সুচিত্রা সেন এ বয়সে দেখতে কেমন হয়েছিলেন, জানার কোনো উপায় নেই। কদিন আগে কে যেন ফেসবুকে সুচিত্রা সেনের এখনকার একটা ছবি আপলোড করেছিল। আমি ভালো করে না তাকিয়েই দ্রুত মাউস ঘুরিয়ে নিচে চলে আসি। সেটা হতে পারে আমি সেই সাগরিকা বা হারানো সুর-এর মোহনীয়াকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই বা সুচিত্রার নিজেকে আর প্রকাশিত না করার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে চাই বলে। সুচিদিকে দেখে আন্দাজ করা যায় কি মৃত্যুর এই কদিন আগেও দেখতে কেমন ছিলেন সুচিত্রা সেন? সিঁথি অনেক চওড়া, পাতলা চুল, সাদার আধিক্য। পাবনাই তাঁতের সবুজ-কমলা শাড়ি, ব্লাউজের হাতার ভাঁজে ছেঁড়া, দুটো সোনার ক্ষয়ে যাওয়া চুড়ির সঙ্গে দুটো কাচের চুড়ি, এক পা তুলে কংক্রিটের বেঞ্চের ওপর হাতের ব্যাগটা কষে চেপে ধরে বসে আছে। পা তুলে রাখার কারণে উরুর কিছুটা অংশ বেখেয়ালে বেরিয়ে আছে। দু-একজন পথচারী আড়চোখে দেখেও নিচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে পানের পিক ফেলতে গেলে শাড়ির ওপর খানিকটা ছলকে পড়লে সুচিদি তটস্থ হয়ে কী দিয়ে তা মোছা যায় তার অনুসন্ধান করতে লাগল। পানের খিলি জড়ানো ফেলে দেওয়া কাগজটা নিচু হয়ে মাটি থেকে তুলতে গিয়ে পা নামাতে হলো। যাক, এতক্ষণে স্বস্তি পেলাম। পান চিবিয়ে চিবিয়ে দাঁতের কী ছিরি করেছে? আগে হাসলে একগালে টোল পড়ত। এখনো হেসে উঠল। কিন্তু টোলটা পুকুরের জলে ঢিল ফেলার মতো ঢেউ না তুলে বলিরেখার সঙ্গে এক লাইনে হারিয়ে গেল। দাঁড়িয়েছিলাম। আমার হাতে পানের পিকলাগা আঙুল ছুঁইয়ে পাশে বসতে বলল আমাদের সেদিনের সুচিত্রা সেন। কত বদলেছি আমি, সুচিদি—আমাদের চারপাশ। তবুও ঠিক, সেই ফেলে আসা দিনগুলোর মতোই আপনস্বরে একটুও অবাক না হয়ে সুচিদি বলল,

‘এখেনটায় বোস রুমা। কদ্দিন পর দেখা বল তো। বাড়ি যাচ্ছিস? চাচি বেঁচে আছে?’

‘না গো সুচিদি।’

সুচিদি কি একটু কেঁপে উঠল? আমার মায়ের মৃত্যু তাকে কেঁপে ওঠার মতো আঘাত দেওয়ার অতখানি যোগ্যতা রাখে না। তাহলে? ‘কদ্দিন পর নামটা শুনলাম! ভুলেই গেছলাম’—স্বগতোক্তির মতো করে বলে কী মনে করে আনমনে নিজের গালে হাত বুলাল সে। হয়তো বা কারও প্রশংসা বা হারানো যৌবনের কথা মনে হলো তার। দেখলাম, সুচিদির চিবুকের বিখ্যাত তিলটির ওপর একটা চুল। সাদা।

‘বাড়িতে কার কাছে যাচ্ছিস? কে আছে?’

‘আর বোলো না। রবুদার মেয়েটাকে নিয়ে ভারি ঝামেলা হচ্ছে। ভাবি মারা গেছে চার বছর হলো, জানো তো। ভারি জেদি আর একরোখা মেয়েটি। রবুদা সামলাতে পারছে না। গত পরশু ঘুমের ওষুধ খেয়ে সে এক কাণ্ড...’

‘ও। কত বয়স হলো ওর?’

‘এই তো আঠারো।’

সুচিদি আবার পা তুলে বসল। স্টেশনের লাল দালান ছাড়িয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছে ঝলমলে রাধাচূড়া। তার ওপরে ঝুঁকে আছে কৃষ্ণ মেঘ। সুচিদি কোন দিকে চেয়ে আছে বুঝলাম না। হয়তো আকাশে। কিন্তু আমি জানি, সুচিদিকে ‘এই তো আঠারো’ টেনে নিয়ে যাচ্ছে পেছনের দিকে।

সুচিদি, মানে তরুবু ছিল পাতার বড় বোন। পাতা আমার বন্ধু। আমাদের বাড়ি থেকে ওদের বাড়ির দূরত্ব মাঝে একটা মসজিদ আর ক্লাবঘরের। ক্লাবটা ওদের বাড়ির ঠিক পাশে। পাতার বাবা ছিলেন রেজিস্ট্রি অফিসের মুহুরি। তরুবু তখন তিন-চার বছর আগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ডাইনিং চেয়ারের কভারে কাটওয়ার্ক করে, কেক-টিকিয়া-কাবাব বানানো শেখে, একতলার ছাদে রোদ পড়ে এলে আচারের বয়াম তুলতে গেলে ক্যারমবোর্ড থেকে চোখ তোলা ক্লাবের সব ছেলের একমাত্র দর্শনীয় বস্তুতে পরিণত হয়। ছেলেগুলোর সারা দিনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটে। তো আমার ভাই রবিউল মাহমুদ ছিল ওই ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। বাবা ওর নাম রেখেছিল মো. রবিউল হোসেন। তখন কবি আল মাহমুদের সোনালি কাবিন-এর ভক্তরা নিজেদের নামের শেষে সবাই মাহমুদ যোগ করতে শুরু করল। আমার ভাই রবু কবিতা লিখত। একদিন ক্লাবে কবিতা পাঠের আসরে মাইক এনে মাইকের মুখ পাতাদের বাসার দিকে ঘুরিয়ে ‘জন্ম আমার আজন্ম বৃথা’ নামে তার নিজের লেখা কবিতা পড়ল। ক্লাবের আর এক ত্যাঁদড় সদস্য মোমিনুল রবুদার কবিতা আবৃত্তির পরপরই মাইক কেড়ে নিয়ে ঘোষণা দিল—‘রবিউল মাহমুদ এতক্ষণ যে কবিতাটি পড়লেন, সেটি দাউদ হায়দারের “জন্ম আমার আজন্ম পাপ”-এর হুবহু নকল। এ ক্লাব থেকে নকল কবিদের উচ্ছেদ করা প্রয়োজন।’

আমি আর পাতা তখন ওদের চিলেকোঠায় সুচিদির বানানো মুড়ির মোয়া খাচ্ছিলাম আর সব কানে আসছিল। আমার ভাইয়ের ভরাট গলার কবিতা আমাকে কবির বোন হিসেবে যখন গর্বিত করতে উদ্যত, তখনই ওই ঘোষণা। আমি দ্রুত অন্য গল্পে মোড় নিলাম। কিন্তু পাতা বিশ্বাস করল না। বলল,

‘এ হতেই পারে না। মাসিক পাথরকুচিতে রবুদার কবিতা আমি পড়েছি। একটাও নকল না। বললেই হলো!’

কিন্তু যার জন্য এত কবিতা রচনা, এত কবিদের আবির্ভাব, তার কোনো বিকার নেই। কবিতা-টবিতা ওসব ওর কানেই যায় না। সুচিদি দিব্যি বালিশের ওয়ারে ক্রুশকাঁটার কাজ করছে আর মুখ না তুলেই তার জিজ্ঞাসা,

‘কীসের এত হইচই রে ক্লাবে?’

‘রাজকন্যাকে জয় করার মহড়া চলছে’—পাতার বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর। তরুর তুলনায় পাতা একেবারেই সাদামাটা। কিন্তু পাতা ক্লাসে থার্ড-ফোর্থ হয়। অনেক বই পড়ে। আমাদের বাড়ি এসে রবুদার আলমারি থেকে বই নিয়ে যায়। আমার কেন জানি মনে হয়, পাতা রবুদাকে ভালোবাসে। রবুদা অবশ্য ভাবে পাতা তরুর অনুরোধে বই নিয়ে যায়। ক্লাস নাইনে পড়া পাতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হজম করতে পারবে এ বিশ্বাস তার ছিল না বলেই একদিন বইয়ের মধ্যে চালান করে দেয় তরুর উদ্দেশ্যে প্রেমপত্র। পাতা আর আমি ওদের চিলেকোঠার ছাদে দরজা বন্ধ করে সে চিঠি পড়েছিলাম। এখনো মনে আছে, চিঠিতে এ রকম লেখা ছিল—‘সুচরিতাসু, আমি কত বসন্তরজনী তোমাকে নিয়ে শয্যা রচনা করেছি।’ আমার ভারি লজ্জা লাগছিল বলে আমি আর পড়িনি। পাতা তা হস্তান্তর করেনি প্রাপককে। করবেই বা কেন? সুচিদির তখন ফরিদপুর কলেজের ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টরের সঙ্গে বিয়ের কথা প্রায় পাকা। তবে পাত্র বছর খানেক সময় নিয়েছিল এমএ পাস করার জন্য। এমএ পাস করলে পাংশা কলেজে পৌরনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করতে পারবে—এ রকম নিশ্চয়তা সে পেয়েছিল। সুচিত্রা সেনকে গ্রহণের যোগ্য করে তুলতে হবে না নিজেকে!

চিঠিটা পেলে তরু কী সিদ্ধান্ত নিত জানি না। তবে তরুর ভালো গৃহিণী হওয়ার স্বপ্ন, ঘর-সংসার সামলানো, অনুগত পুত্রবধূ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেখে মনে হয়নি সে কোনো বিপ্লব করার ক্ষমতা রাখে। রবুদাকে বিয়ে করার মতো বোকামি কেন করতে যাবে তরু? পাত্র হিসেবে রবুদার কী পরিচয়? বিএ পাস করে কেবল সাহিত্য করলে ওর কাছে কে মেয়ে দেবে? হ্যাঁ, জমাজমি আমাদের ভালোই ছিল। কিন্তু কলেজের অধ্যাপক আর বেকারের মধ্যে তুলনা চলে? তবে কেন জানি রবুদা ধরেই নিয়েছিল, তরু তাকেই ভালোবাসে। জোর করে তরুর বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

‘আজ তরুবুর মুখে ক্ষীর। দুলাভাইয়ের বোন আর ভগ্নিপতি আসবে। তুই আসিস কিন্তু’—একটু গলা বাড়িয়ে রবুদার ঘরের দিকে মুখ করে আমাকে দাওয়াত দিয়ে গেল পাতা।

রবুদা খানিক ঝিম ধরে বসে থেকে গায়ে একটা জামা চড়িয়ে বেরিয়ে গেল। গ্রামে ঢোকার মুখে রেলগেটের দোকানে গিয়ে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বসে থাকল যতক্ষণ না তরুর বৈবাহিক লোকজন আসে। রবুদা নাকি ওদের মোটরবাইক আটকেছিল। তরুর হবু ননদাইকে নামিয়ে দোকানের পেছনে দাঁড়িয়ে তরু সম্পর্কে যাচ্ছেতাই অপবাদ দিয়েছিল, যাতে ওরা ওখান থেকেই ফিরে যায়। 

ফিরে তো যায়ইনি, উপরন্তু মুখে ক্ষীরের দিন পাত্রকে ডেকে পাঠিয়ে পরদিনই কলমা পড়িয়ে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে কেদারনাথের পগারপার। মোটা, বিরল কেশ, ভোঁতামুখের অধ্যাপককে সুচিদির ভক্তরা নাম দিয়েছিল কেদারনাথ। হূদয় ভেঙে গেল অনেক যুবকের। ক্লাবঘর কিশোরদের দখলে চলে গেল। খড়ের ছাউনির দুর্বল ক্লাবঘরের চাল অভিভাবকদের মনোযোগের অভাবে এক বৈশাখে উড়ে গিয়ে পাতাদের উঠোনে গিয়ে পড়ল। সবকিছু লন্ডভন্ড। রবুদা একমুখ দাড়ি নিয়ে দেড় মাস পর খালার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ি এল। আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হলে পাতার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি রাজশাহী সরকারি কলেজে পড়তে গেলাম। পাতা শহরের স্থানীয় কলেজে ভর্তি হলো। মা রবুদার জন্য সুন্দরী পাত্রী জোগাড়ের প্রাণান্ত চেষ্টা চালাতে লাগল। রবুদা কবিতা ছেড়ে ঠিকাদারি শুরু করেছে। চোখের দিকে তাকানো যায় না। কেমন জিঘাংসার আগুন জ্বলজ্বল করে।

দুই বছর পর মায়ের চিঠি।

‘পর সমাচার এই যে, গতরাতে তোমার প্রাণের বান্ধবী পাতা বিষপানে আত্মহত্যা করিয়াছে। পুলিশ আসিয়াছিল। সে লিখিয়া গিয়াছে তাহার মৃত্যুর জন্য কেহ দায়ী নহে। তরু ও তরুর স্বামী আসিয়া সব ব্যবস্থা করিয়াছে। তাহার মা পাগলপ্রায়। ছুটি হইলে চলিয়া আসিও। রবুর জন্য পাত্রী পছন্দ হইয়াছে। ইতি মা।’

আমার হোস্টেলের বান্ধবীরা আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখল। আমি পাতার চিঠিগুলো বের করে পড়ার চেষ্টা করলাম। কোথায় পাতার বেদনা তা খোঁজার জন্য বারবার করে পড়তে থাকলাম। কিন্তু কান্নায় আমার সবকিছু ঝাপসা হয়ে এল। আমার রুমমেট আমার ব্যাগ গুছিয়ে দিল। ছুটি হতে আরও দিন সাতেক দেরি থাকলেও আমার রুমমেট আমাকে নিয়ে পরদিনই রওনা দিল। আমি ছুটে গিয়ে পাতার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। পাতার মা উদ্ভ্রান্তের মতো অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল, তার ছড়ানো দু-হাত আমার পিঠে উঠে এল না। তরুবু তার বাঁ হাতে স্ফীত তলপেট চেপে আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত দিল। সে হাতের ছোঁয়া আমার আবেগকে দু-কূল প্লাবিত করতে ব্যর্থ হলো। আমি চোখ তুলে সুচিত্রা সেনকে খুঁজলাম। এ কবছরেই সুচিদির বয়স এত বেড়েছে! নাকি গর্ভবতীদের চেহারা এ রকম হয়ে যায়? অত টিকলো নাক ওরকম মোটা দেখাচ্ছে কেন? নাকি এসবই আমার ঝাপসা চোখের প্রতিফলন? শোকে-বিহ্বলে কেমন নিষপ্রাণ আচরণ সবার। কেন পাতা এমন করল, কী হয়েছিল ওর—কাউকে জিজ্ঞাসা করার সে পরিবেশও আমাকে কেউ উপহার দিল না। আমি একাই ওর ঘরে গেলাম। ওর বইখাতা ছুঁয়ে ওর হাতের স্পর্শ নিলাম। আমার দেওয়া মানিপ্ল্যান্টটা ওর খোলা জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে উদ্যত। ওর বালিশ টেনে নাকে ধরলাম। নারকেল তেলে মেথি মিশিয়ে সারা বছর চুলে দিত পাতা। বালিশে পাতার জীবন্ত গন্ধ। আমি ‘পাতা পাতা’ বলে ডুকরে কেঁদে উঠলাম। মানিপ্ল্যান্টের পাতারা একটুখানি নড়ে উঠল।

সুচিদি সংবিৎ ফিরে আমার ঘাড়ে হাত রাখল। এ স্পর্শেও প্রাণের ছোঁয়া নেই। অন্যদিকে তাকিয়েই বলল,

‘আব্বা তো ছবছর হলো মারা গেছে। মাও অসুস্থ। আমার কাছে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। যেতে চায় না।’

‘তোমার কটা গো সুচিদি?’

‘দুটো। ছেলেটা বড়। মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দেব ভাবছি।’

‘ওমা! এত তাড়াতাড়ি?’

‘মেয়েটা পাতার মতো দেখতে।’

‘তো?’—বলে ফেলেও আমি চাইলাম না সুচিদি পাতার কথা তুলুক। পাতার জন্য আমার কষ্ট তো সুচিদির কষ্টের কাছে কিছুই না।

সুচিদি আবার আনমনা। মাথার ঘোমটা ঘাড়ে এসে পড়ল। কানে ভারী দুটো পাশা। অনেক দিন ধরে পরে থাকার কারণে কানের লতি কেটে পাশা ঝুলে পড়েছে। সুচিদিকে এখন বেশ দেখাচ্ছে। কিন্তু আলো আমার আলো-এর সুচিত্রা সেনের মতো নয়। আঁচলের খুঁটে চোখ মুছল সে। ট্রেন আসার ঘণ্টা হলে সবাই তটস্থ হয়ে নামিয়ে রাখা ব্যাগ হাতে তুলে নিল। আমার ঘাড় থেকে হাত সরিয়ে আবার মাথার ঘোমটা টেনে ব্যাগটা কোলের ওপর তুলে সুচিদি বলল,

‘পাতা তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল।’

আমার হাতের ব্যাগ বেঞ্চের ওপর ধপ করে পড়ে গেল। মানুষজন প্লাটফর্মে জড়ো হতে শুরু করেছে। আর আমি ভারসাম্য রাখতে না পেরে বেঞ্চের ওপর বসে পড়লাম। সুচিদি উঠে দাঁড়াল।

‘রবুর মেয়ের বয়স কত বললি?’

‘আঠারো, কেন?’

‘পাতারও আঠারোই ছিল কিনা।’ 

ইঞ্জিনের মুখে ঘন ধুলো উড়িয়ে ট্রেন আরও সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সুচিদি বসে থাকা আমাকে কোনো ধরনের তাড়া না দিয়েই ট্রেনের দিকে এগিয়ে গেল। সুচিদি যে বগিতে উঠল, আমি সেটাতে উঠেও আবার নেমে এসে পরের বগির জন্য একটু জোরে পা চালালাম।

গল্প- অষ্টাদশী by উম্মে মুসলিমা

তরুবুর সঙ্গে দেখা ফরিদপুর রেলওয়ে স্টেশনে। ঢাকা থেকে দেশের বাড়ি যাওয়ার পথে আমারও ফরিদপুরে ট্রেন বদল। সেই সুচিদি। অনেকটা সুচিত্রা সেনের মতো দেখতে ছিল বলে আমরা বন্ধুরা তরুবুকে ডাকতাম সুচিদি।

দক্ষিণ এশিয়া- কংগ্রেসের হাতে ভারতের অবক্ষয় by যশবন্ত সিং

মনমোহন সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ২০০৪ সাল থেকে। তাঁর চলতি দ্বিতীয় মেয়াদ যখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো একটি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন সম্প্রতি।
সেখানে সমবেত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা যেভাবে তাঁর শাসনামলের মূল্যায়ন করেন, ইতিহাস তার থেকে বেশি সদয়ভাবে সেটা করবে বলে তিনি আশা করেন।

কিন্তু সে রকম সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। বরং মনমোহন সিংয়ের দল, একসময়ের মহান কংগ্রেস দল এখন এক রাজনৈতিক কানাগলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। দলটি তার ধ্বংসাত্মক পরিবারতান্ত্রিক নেতৃত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলেই কেবল এই কানাগলি থেকে বেরোবার পথ খুঁজে পেতে পারে। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ভারত ইতিমধ্যে অর্ধশতকের বেশি সময় পেরিয়ে এসেছে। এই সময়ের অধিকাংশটাই সরকারের দায়িত্বে ছিল কংগ্রেস দল। এখন মনে হচ্ছে, কংগ্রেসের এই আধিপত্যের যুগ শেষ হতে চলেছে।
দলটির অবক্ষয়ের সবচেয়ে পরিষ্কার লক্ষণটি ফুটে উঠেছে গত ডিসেম্বরে, যখন ভারতের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটেছে। রাজস্থানে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ২১টি আসন, আর ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জিতেছে ১৬২টি আসন। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সেখানে পেয়েছিল ৯৬টি আর বিজেপি পেয়েছিল ৭৮টি আসন।
একইভাবে দিল্লিতে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর কংগ্রেস এবার ৭০টি আসনের মধ্যে পেয়েছে মাত্র আটটি; এমনকি দলটির যে নেত্রী সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই শিলা দীক্ষিতও আসন হারিয়েছেন এমন এক ব্যক্তির কাছে, যিনি রাজনীতিতে নবাগত। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ছোট্ট রাজ্য মিজোরামেই শুধু কংগ্রেস তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পেরেছে।
এটা কংগ্রেসের জন্য এক নজিরবিহীন ভরাডুবি। আগামী জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে দলটির জন্য ভালো কিছুর পূর্বাভাস এতে নেই। কেন এ রকম হলো এবং কংগ্রেস নিজের ক্ষয় ঠেকাতে পারবে কি না, এসব বুঝতে হলে বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমেক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) হাত থেকে ২০০৪ সালে কংগ্রেস জাতীয় নেতৃত্ব ফিরে পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কী ঘটেছে, তা বুঝতে হবে।
ভারতের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেস ২০০৪ সালে নবনির্বাচিত ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের (ইউপিএ) কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, দলটির প্রধান নেতা সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে সম্মত হলেন না, তিনি এই পদের জন্য ইউপিএর প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করলেন মনমোহন সিংয়ের নাম। মনমোহন সিং একজন অধ্যাপক ও আমলা, যাঁর কোনো নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রায় ৪০ দিন নানা নাটকীয়তার পর মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, যদিও কোনো নির্বাচনী এলাকায় তাঁর প্রতি কোনো প্রত্যক্ষ ভোটার-সমর্থন ছিল না।
এই অস্বাভাবিক বন্দোবস্ত তাৎক্ষণিকভাবে নানা রকমের তিক্ত মন্তব্য-সমালোচনার কারণ ঘটায়। একজন পর্যবেক্ষক বিচক্ষণতার সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, ‘যেখানে কর্তৃত্ব আছে, সেখানে যোগ্যতা নেই; কিন্তু যেখানে কিছুটা যোগ্যতা আছে, সেখানে কোনো কর্তৃত্ব নেই।’ মনমোহন সিংয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক পদে তাঁর কর্তৃত্বের সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত সীমিত। যতই দিন গড়িয়েছে, ততই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, মনমোহন সিংয়ের সরকার একেবারেই অকার্যকর। তাঁর ব্যর্থতাই ছিল অবধারিত, কারণ মনমোহন সিংয়ের যা কিছু শক্তি-সামর্থ্য ছিল, তা একজন অনুগত ও সামর্থ্যবান অধস্তন কর্মকর্তা হিসেবে; কার্যসূচি নির্ধারণ করে দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করার মতো নেতৃত্বের গুণ তাঁর ছিল না।
১৯৯০-এর দশকে মনমোহন সিং যখন ভারতের অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখন দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা বিবেচনা করে দেখা যাক। অর্থনৈতিক রূপান্তরের উদ্যোগকে তাঁর সমর্থকেরা তাঁর দূরদৃষ্টি ও যোগ্যতা-সক্ষমতার দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করতেন। গত বছর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নটবর সিং হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন যে, ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের উদ্যোগটি আসলে ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের, যিনি ছিলেন কংগ্রেসের একজন চতুর ও বর্ষীয়ান নেতা। প্রয়োজনীয় কাজ করার ক্ষেত্রে মনমোহন সিংয়ের অনাগ্রহ ছিল; নরসীমা রাও ক্ষেত্র প্রস্তুত করে না দিলে এবং সংস্কারের পক্ষে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠিত না করলে মনমোহন তেমন কিছুই অর্জন করতে পারতেন না। সরকারের এজেন্ডা অনুসারে কাজ করতেও মনমোহনের অনীহা ছিল। আগে এমন বলাবলি হতো যে, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর যোগ্যতাকে খাটো করে দেখা যেমন উচিত নয়, তেমনি অর্থনীতির ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁর দক্ষতার অতিমূল্যায়ন করাও ঠিক হবে না।
কিন্তু নরসীমা রাওয়ের ভূমিকা উন্মোচিত হওয়ার আগেই একজন নেতা হিসেবে মনমোহন সিংয়ের অযোগ্যতা-অদক্ষতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি শুধু যে স্থবির হয়ে গেছে তা-ই নয়, তিনি সোনিয়া গান্ধীর সব কথা মান্য করে গেছেন, সেগুলো বৈধ হোক বা না হোক। ফলে শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতির অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) সমন্বয়ে গঠিত একটি সংবিধানবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ভারত; সেই সংস্থার নাম ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল (এনএসি), সোনিয়া গান্ধী যার সভানেত্রী। মন্ত্রিসভা হয়ে পড়েছে অর্থহীন, ইউরোপীয় কল্যাণরাষ্ট্রের অপুষ্ট ধারণার দ্বারা অনুপ্রাণিত এনএসির ফরমানগুলোই হয়ে উঠেছে সরকারি নীতি।
ফলে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে অর্থনীতির অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, বিশেষত খাদ্যদ্রব্যের দাম। এ ছাড়া ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেসের শাসনামলে রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ও অর্থসংক্রান্ত কেলেঙ্কারি বেড়েছে, বিস্তার ঘটেছে নানা রকমের অপরাধবৃত্তি। ইউপিএ শাসকগোষ্ঠী দক্ষতার সঙ্গে লুটপাট চালিয়েছে; ব্যাপক দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবে এই জোটের প্রধান শরিক দল কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা নিঃশেষিত হয়েছে। এসব কিছু ঘটেছে অর্থনীতিতে আপাত-শিক্ষিত মনমোহন সিংয়ের নীরব দর্শকের ভূমিকায়; তিনি শুধু দায়িত্বশীলতা দেখাতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আর রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরের অবস্থান থেকে তুচ্ছ মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছেন। মনমোহন সিং কংগ্রেস দলের যে ক্ষতির কারণ ঘটিয়েছেন, সেটা পূরণ করার কাজ দলটিরই। আর তাঁর নির্লিপ্ততার কারণে প্রধানমন্ত্রী নামের প্রতিষ্ঠানটির যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা ভারতের সব মানুষের সমস্যা। মনমোহন সিংয়ের বিপর্যয়কর নেতৃত্বের এক দশকের বৈশিষ্ট্য হলো দুর্বলতা ও ক্ষয়। এর পরিণামে সামনের অনেক বছর ধরে ভারতকে ভুগতে হবে। তাঁর কাজের ন্যায্যতা প্রতিপাদন দূরে থাক, ইতিহাসবিদেরা জানবেন, নিশ্চিতভাবে কাকে দায়ী করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
যশবন্ত সিং: ভারতের অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। জিন্না: ইন্ডিয়া-পার্টিশন—ইনডিপেনডেন্স গ্রন্থের লেখক।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

দক্ষিণ এশিয়া- কংগ্রেসের হাতে ভারতের অবক্ষয় by যশবন্ত সিং

মনমোহন সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ২০০৪ সাল থেকে। তাঁর চলতি দ্বিতীয় মেয়াদ যখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো একটি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন সম্প্রতি।

অরণ্যে রোদন- ভাই, শান্তিতে থাকতে দিন by আনিসুল হক

গণতন্ত্রে তাঁরাই দেশ শাসন করবেন, যাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে, এমন একটা নির্বাচনের মাধ্যমে এই প্রতিনিধিরা ক্ষমতায় আসবেন। তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের সমর্থনধন্য হবেন।
কাজেই একটা সুন্দর, অর্থবহ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রের একেবারে প্রাথমিক ও মৌলিক একটা শর্ত। তবে, এটা অন্যতম শর্ত। গণতন্ত্রের আরও কতগুলো শর্ত আছে, লক্ষণ আছে।

আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থিতরাই কেবল দেশ চালাবে, গণতন্ত্রে তা সব সময় না-ও হতে পারে। দুটো উদাহরণ দিই। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বুশ যখন দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হন, বাস্তবে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন কি না, এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু যেহেতু আদালত তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটরা এবং তাঁদের দেশের সব মানুষ এটা মেনে নিয়েছিলেন। শুধু তাঁদের দেশের মানুষ মেনে নিয়েছিলেন, তা-ই বা বলি কেন, সারা পৃথিবীর মানুষ হাসিমুখে কিংবা বেজারমুখে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর ভারতে তো হরহামেশাই কম ভোট পাওয়া দল বেশি ভোট পাওয়া দলের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসছে। সেটা পরোক্ষভাবে জনগণের সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় বসা। যাঁদের জনগণ ভোট দিয়েছেন, তাঁরা আবার সরকার গঠনের জন্য আমাদের সমর্থন দিয়েছেন, কাজেই আমরাই জনপ্রতিনিধি।
এই নিয়ে নৈতিক বিতর্ক তোলা যায়, জনগণ কেন তোমাদেরই সরাসরি ভোটে জেতাল না, কাজেই তোমরা সেই রকম সরাসরি প্রতিনিধি কি? কিন্তু সেই প্রশ্ন কেউ তোলে না। কারণ, আবারও বলি, নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ও মৌলিক শর্ত বটে, কিন্তু গণতন্ত্রের আরও অনেক অপরিহার্য উপাদান আছে, যেগুলো না থাকলে নির্বাচিত সরকার থাকলেও আসলে গণতন্ত্র থাকে না।
সেসব উপাদানের এক নম্বর হলো আইনের শাসন। তা ছাড়া আছে সরকারের জবাবদিহি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দক্ষতা ও কার্যকারিতা। আরেকটা হলো, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। একটা দেশে সব মানুষই সমান। রাজার ছেলেরও এক ভোট, রাস্তার ধারে পড়ে থাকা খঞ্জ ভিখারিরও এক ভোট। রাজার ছেলের যতটুকু মর্যাদা, রাখাল বালকেরও ততটুকু মর্যাদা। সেটা কে বিধান করবে? প্রতিনিয়তই তো আমরা দেখি, রাষ্ট্র, ক্ষমতাবানেরা কীভাবে ব্যক্তি মানুষের অধিকার খর্ব করে থাকে। তাহলে এই বিপুল বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র বা ক্ষমতাদর্পী শাসকদের হাত থেকে একজন ব্যক্তি মানুষ কীভাবে তার অধিকার রক্ষা করে চলবে? কে তাকে রক্ষা করবে? আইনের শাসন, স্বাধীন ও দক্ষ বিচার বিভাগ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। কাজেই আমরা যদি গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে ভোটের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই আমাদের বলতে হবে আইনের শাসনের কথা, মানবাধিকারের কথা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা, বলতে হবে জবাবদিহির কথা।
এই সরকার যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, সেটা বিতর্কিত। কিন্তু বাস্তবে এটাই এখন আমাদের সরকার। বিএনপিকেও এখন বলতে হচ্ছে এই সরকারের সঙ্গেই আলোচনায় বসার কথা।
আমেরিকানরা নির্বাচনের পরে প্রথম যে বিবৃতি দিয়েছিল, তাতেও আছে সরকারের সঙ্গেই আলোচনায় বসার সুপারিশ। অর্থাৎ এখন এই সরকারই সরকার, এই সরকার নিয়েই আমাদের চলতে হবে। সেটা কত দিন, তা উভয় পক্ষ মিলেমিশে ঠিক করুক। কিন্তু সরকার কী? সরকার তো আমাদের ম্যানেজার। একটা ফ্ল্যাট ভবনে একটা সমিতি থাকে। এক বছর বা দুই বছরের জন্য তারা নির্বাচিত হয়। কেউ সভাপতি, কেউ সাধারণ সম্পাদক, কেউ বা কোষাধ্যক্ষ। আমরা তাঁদের চাঁদা দিই। তার বিনিময়ে তাঁরা কোনো মাসোহারা নেন না, তাঁরা আমাদের বিদ্যুৎ বা পানির দেখভাল করেন, আমাদের নিরাপত্তা দেন, রক্ষণাবেক্ষণ করেন, মাঝেমধ্যে আমাদের বিনোদনেরও ব্যবস্থা করেন। মেয়াদ শেষে নতুন কর্মকর্তা নির্বাচিতও হন। তাঁরা আবার কর্মচারী নিয়োগ দেন, সুপারভাইজার, দ্বাররক্ষী। এখন এই সমিতির কর্মকর্তারা যদি এই দারোয়ান বা হিসাবরক্ষক নিয়োগের সময় ঘুষ খান, কিংবা নিজের ঘরে বেশি বিদ্যুৎ নিয়ে অন্যদের কম দেন, তাহলে কি হবে? এটা কখনো হয় না।
সরকারের কাজ আমাদের নিরাপত্তা দেওয়া, অবকাঠামোসুবিধা দেওয়া, আমাদের অর্থনীতি চালানো। তারা দেশের মালিক নয়। তারা দেশের সেবক। এই কথাটা সরকারি লোকজন ভুলে যান। কথায় আছে, ক্ষমতা মানুষকে নীতিভ্রষ্ট করে; চূড়ান্ত ক্ষমতা নীতিভ্রষ্ট করে চূড়ান্তভাবে। সারা পৃথিবীতে চিরটাকাল দুর্নীতি ছিল। কোথাও খুব কম, কোথাও খুব বেশি। আমাদের দেশে মোগল আমলে দুর্নীতি হয়েছে, ইংরেজ আমলে হয়েছে, পাকিস্তানি আমলে হয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশে তো দুর্নীতির সাগরে আমরা ভাসছি। কিন্তু এটার তো লাগাম টানতে হবে। কে টানবে? রাষ্ট্র যখন মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, কে তাকে বাধা দেবে? বিচার বিভাগকে দিতে হবে, নাগরিকদের উচ্চকণ্ঠ হতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে সজাগ ও সোচ্চার থাকতে হবে। এই সরকারকে তা-ই বলব, যেহেতু আপনারা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছেন, আপনাদের উচিত খুব বেশি করে ভালো ভালো কাজ করা। দেশের মানুষের উপকার হয়, এই রকম কাজ করতে থাকুন, যেন আপনার মেয়াদটার কথা স্বস্তির সঙ্গে স্মরণ করতে পারে।
সেখানেই আসবে মানবাধিকার রক্ষার কথা। সত্য বটে, গত এক বছরে সারা দেশে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র, জামায়াত-শিবির বা এই ধরনের শক্তি যেভাবে হামলা করেছে, যেভাবে বাড়িঘর পুড়িয়েছে, যেভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যববসায়িক স্থাপনা, উপাসনালয়ে আক্রমণ করেছে, যেভাবে আওয়ামী লীগারদের হত্যা করেছে, তার প্রতিবিধানে শক্ত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই শক্ত হওয়াটাও যেন হয় আইনানুগ। মানবাধিকারের সব বিধান ও রীতি মান্য করে। দরকার হলে দ্রুত বিচার আদালত করুন, দরকার হলে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল করুন। তবু স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করুন। কোনো অপরাধী যেন ছাড়া না পায়, তেমনি বিনা বিচারে কাউকে যেন শাস্তি দেওয়া না হয়।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। আমরা জানি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে কীভাবে দাঙ্গায় উৎসাহিত করা হয়েছে, কীভাবে ব্যক্তি অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এসব সংবাদমাধ্যমের পক্ষে কথা বলার মুখ তারা নিজেরাই রাখেনি। তবু যা করা হয়, তা যেন করা হয় আইনের মাধ্যমে। এবং আইনটি যেন কালো আইন না হয়। এই সরকার যেহেতু একপক্ষীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত, কাজেই সরকারকেই এসব দিক সবচেয়ে বেশি সতর্কতার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে। সাধারণত মানুষের প্রবণতা থাকে, যে নৈতিক দিক থেকে দুর্বল অবস্থানে থাকে, সে তত বলপ্রয়োগের চেষ্টা করে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি।
আর দেশে ও বিদেশে একটা ব্যাপক জনমত তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে গঠিত দল, যারা গণ-আন্দোলনের নামে নৃশংসতার প্রমাণ একাত্তরে রেখেছে, এখনো রেখে চলেছে, তাদের বর্জন করার। এখন বিএনপি নেতারা তো টেলিভিশনগুলোর টক শোয় এবং সভা-সেমিনারে প্রকাশ্যে বলছেন, সরকার নিষিদ্ধ করে দিক জামায়াতে ইসলামীকে। এই সুযোগ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রহণ করতে হবে। বিএনপিকে বুঝতে হবে, জামায়াতের ভোট কখনো সাত থেকে আট শতাংশের বেশি ছিল না, সর্বশেষ জরিপে তা নেমে এসেছিল তিন শতাংশের নিচে। কিন্তু বিএনপি বা আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে জয়লাভ করে, একাই জয়লাভ করার মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করে বলেই করে।
এই কলামে বহুবার বলা হয়েছে, বিএনপির উচিত সংবিধানের অধীনেই নির্বাচনে যাওয়া। বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক, সে কারণেই তো বিএনপির নির্বাচন করা উচিত। আজ প্রমাণিত হয়েছে, শুধু আওয়ামী লীগ চায়নি বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ, কথা শুধু এতটুকুনই সত্য নয়, সত্য এই যে বিএনপিও চায়নি নির্বাচনে অংশ নিতে। তারা ভেবেছিল, তারা সরকারকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে তারপর নির্বাচনে যাবে। কিন্তু গণ-আন্দোলনের বদলে আমরা দেখেছি পেট্রলবোমা। আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষ, গরু ও সবজির ট্রাক। দেখেছি হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা। দেরিতে হলেও বিএনপির নেতারা বুঝেছেন, সন্ত্রাস করে আন্দোলনে জেতা যায় না।
এটা আরও আগে বুঝলে তাঁরাও ভালো করতেন, দেশের ও মানুষের এত ক্ষতিও হতো না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণে একবারও আক্রমণ করার কথা বলেননি, সবচেয়ে কঠিন কথাটা ছিল, আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব। কিন্তু দম ফেলার আগেই তিনি বলেছেন, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে ফিরে যাও, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। আর বলেছেন, এই বাংলার হিন্দু, মুসলিম, বাঙালি, অবাঙালি সবাইকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের, আমাদের যেন বদনাম না হয়।
কথা শেষ করি। সরকারকে বলতে চাই, অপরাধীদের কঠোর হাতে দমন করুন, কিন্তু মানবাধিকার রক্ষা করে চলুন, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত রাখুন, ভালো ভালো কাজ করে দেশের মানুষের চিত্ত জয়ের চেষ্টা করুন। বিএনপিকে বলব, যুদ্ধাপরাধী স্বাধীনতাবিরোধীদের বর্জন করুন। অহিংস আন্দোলন করুন। আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির চেষ্টা করুন। আমরা সামনের দিনগুলোয় শান্তি চাই। এখন যেখানেই যাই, সবাই বলে, ভাই, আমাদের শান্তিতে থাকতে দিন, কাজ করতে দিন, ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে দিন, চলাফেরা করতে দিন। জনগণের এই চাওয়াটা যেন আমাদের নেতাদের কানে পৌঁছায়।
আনিসুল হক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

কালের পুরাণ- জামায়াতমুক্ত বিএনপি! দেশ সন্ত্রাসমুক্ত হবে কি? by সোহরাব হাসান

নির্বাচনের আগে ও পরে সারা দেশে যে সংঘাত, সহিংসতা, গাড়ি পোড়ানো, বাড়ি জ্বালানোর ঘটনা ঘটেছে; তার মূল হোতা যে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির—এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ নেই।
সরকারের দমন-পীড়নও এর পক্ষে কোনো সাফাই হতে পারে না। এসব নারকীয় ঘটনা অস্বীকার কিংবা সেই ঘটনাকে একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা—দুটোই রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয়।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি প্রায় গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দল, সারা দেশে যাদের জনসমর্থন এখন ৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে; দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যার অংশ নেওয়ারই যোগ্যতা ছিল না এবং নবম জাতীয় সংসদে মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল, সেই দলটি কীভাবে বছরজুড়ে এত সব তাণ্ডব ঘটাল? এটি কি নিছক বিএনপির সঙ্গে জোট বাধার জন্য, না আরও গভীরে এর কারণ লুকিয়ে আছে?
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ কেন তাঁর নির্বাচনী এলাকার জামায়াতের একজন রুকনকে ফুলের মালাসমেত দলে নিয়ে এলেন, তার ব্যাখ্যা নেই। এখন যদি ওই রুকনের পথ অনুসরণ করে জামায়াতের সব নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য লাইন দেন, তাহলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কি তাঁদের সাদরে বরণ করে নেবে? ক্ষমতার রাজনীতির অঙ্ক এমন সরলরেখায় চালিত হলেও আদর্শের রাজনীতি বড় কঠিন। সেই কঠিনকে আওয়ামী লীগ ভালোবাসতে প্রস্তুত আছে বলে মনে হয় না।
বিএনপি জামায়াতে ইসলামী নামের দলটির সঙ্গে গাঁটছড়া রাখবে কি রাখবে না, সেটি তাদের একান্ত নিজস্ব বিষয়। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে যে জামায়াতের কারণেই আজ তাদের মৌলবাদের দোসর, জঙ্গিবাদের সহযোগী এবং যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষকের যে বদনাম হয়েছে, তা ঘোচানো কঠিন হবে। মধ্যপন্থী বিএনপি কী করে একটি মৌলবাদী দলের সঙ্গে একীভূত হলো?
এসব কথা বললে নিশ্চয়ই বিএনপি-সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা হইচই করে উঠবেন এবং জানান দিতে চাইবেন, জামায়াতের সঙ্গে কেবল বিএনপিই জোটবদ্ধ হয়নি; আশির দশকে ও নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগও জোট বেঁধেছিল। আওয়ামী লীগ ছিয়াশি সালে ও পঁচানব্বই-ছিয়ানব্বইয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধেনি। ছিয়াশিতে দলটি তার নিজের স্বার্থেই নির্বাচন করেছিল; যেমনটি করেছিল আওয়ামী লীগ। আর ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তোলে, সেই আন্দোলনে জামায়াত ও জাতীয় পার্টিও যোগ দিয়েছিল রাজনৈতিক সুবিধা পেতে। এরশাদ আমলে তিন জোটের পাশাপাশি জামায়াত যে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল, তার যোগসূত্রটি ছিল বিএনপিই। ১৯৯৫-৯৬ সালের আন্দোলনে জামায়াত সহযাত্রী হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্দোলনেও জোরালো ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে সেই আন্দোলনের কারণে বিএনপি সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে। বিএনপির বাকি আমল সেই মামলা ঝুলে ছিল; বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে তা প্রত্যাহার করে নেয়।
এখন বিএনপি যদি যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জামায়াতের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন করত, তাহলে কারও কিছু বলার থাকত না। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিএনপির নেতৃত্ব কেবল জামায়াতকেই আন্দোলনের সহযাত্রী করেনি, ১৮-দলীয় জোটে এমন কিছু ধর্মান্ধ দলকে যুক্ত করেছে, যারা কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না। তারা বিশ্বাস করে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফায়। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিকেরা যত কমজোরিই হোক না কেন, তারা চিন্তাচেতনায় বামপন্থার অনুসারী। দুই জোটের মৌলিক পার্থক্যটাও এখানে। তবে আমরা একইভাবে সাবেক স্বৈরাচারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গাঁটছড়া বাঁধাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে বিপদে ফেলেছে এরশাদ। তার অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডই নির্বাচনকে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাজাকারের মতো স্বৈরাচারও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
বিএনপির নেতৃত্ব স্বীকার করুক আর না করুক জামায়াত-শিবির যে তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে সারা দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই সরকার ও প্রশাসনকে অকেজো করে দিতে তারা একের পর এক বোমা হামলা চালিয়েছে, বাস-ট্রাক পুড়িয়েছে, পুলিশ খুন করেছে। বিএনপির মতো একটি নিয়মতান্ত্রিক দল কেন সেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করল সেটাই বড় প্রশ্ন। শত্রুর শত্রু যে সব সময় মিত্র হয় না, সেটা আবার প্রমাণিত হলো।
বিএনপির নেতৃত্বের ব্যর্থতা হলো, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনটিকে জামায়াত-শিবিরের যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে পরিচালিত আন্দোলন থেকে পৃথক করতে পারেনি। যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং জোটের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের নাশকতায় তারা সমভাবে মৌনতা অবলম্বন করেছে। ক্ষেত্রবিশেষে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা তিন মাস ধরে চললেও জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও নাশকতা চলেছে বছরজুড়েই; নির্বাচনের প্রাক-মুহূর্তে এবং পরে যা সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কীভাবে ঘটল? গণতন্ত্রের সঙ্গে স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের যতটুকু দূরত্ব, তার চেয়ে কম দূরত্ব নয় সাম্প্রদায়িকতার। আমাদের দুর্ভাগ্য, এক পক্ষ কেবল স্বৈরতন্ত্রকে গণতন্ত্রের বিপদ মনে করে, সাম্প্রদায়িকতাকে নয়। অন্য পক্ষ সাম্প্রদায়িকতাকে বিপদ ভাবলেও স্বৈরতন্ত্রের বিপদ আমলে নেয় না।
প্রধানমন্ত্রী অভয়নগরের মালোপাড়ায় আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এই মাটির সন্তান আপনারা। অধিকার নিয়েই আপনারা এখানে থাকবেন। কেউ আপনাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারবে না। মনে জোর নিয়ে আপনাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা আপনাদের পাশে আছি।’ প্রধানমন্ত্রীর কথায় আবেগ ও আন্তরিকতা আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মী কি প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য হূদয়ে ধারণ করেন? করেন না। করলে আক্রান্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সাহায্য চেয়েও কেন পায়নি? কেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সময়মতো এগিয়ে এলেন না। কেন প্রশাসন ও পুলিশ নির্বিকার ছিল? আসলে সাম্প্রদায়িকতা যখন সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মনের গভীরে বাসা বাঁধে, তখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি থাকে না; সব এক হয়ে যায়। কেউ আক্রমণ করে, কেউ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। ৪২ বছর ধরেই সংখ্যালঘুদের ওপর এ নির্যাতন চলে আসছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ওহাবের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ আছে। সরকার কি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? এ রকম একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে কীভাবে গেলেন? সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কারণ এই বিচারহীনতা। অপরাধীদের শাস্তি না পাওয়া।
সরকার সংখ্যালঘুদের পুড়িয়ে দেওয়া বাড়িঘর দ্রুত নির্মাণ করেছে। কিন্তু তাদের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, ইটপাথরের দেয়াল তা মুছে ফেলতে পারবে না। সে জন্য চাই সরকার, রাজনৈতিক দল ও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ।
মওলানা ভাসানী একবার বলেছিলেন, নকশাল কারও গায়ে লেখা থাকে না। সেই কথাটি একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, সাম্প্রদায়িকতাও কারও গায়ে লেখা থাকে না। খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির অন্যান্য নেতা যখন কথায় কথায় ভারতীয় জুজুর ভয় দেখান, তখন তার মধ্যে বৃহৎ প্রতিবেশী সম্পর্কে ক্ষোভের পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিও দলটির প্রচ্ছন্ন হুমকি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যাঁরা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে বলে বক্তৃতা করেন এবং যাঁরা ভোটের হিসাবে সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দিয়ে রাখেন; সংখ্যালঘুরা কোন ভরসায় তাঁদের ভোট দেবেন?
ডেইলি স্টার-এ মাহ্ফুজ আনাম বিএনপিকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, পুরোনো ধ্যানধারণা, পুরোনো কৌশল, পুরোনো মিত্র কোনো সুফল বয়ে আনবে না; বরং বোঝা হয়ে থাকবে। তবে এটি কেবল বিএনপির জন্য নয়, ক্ষমতাসীন দলটির জন্যও সমান সত্য। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে বুঝতে হবে সবকিছুর দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর চাপালে দেশে শান্তি আসবে না, সুশাসনও প্রতিষ্ঠিত হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে জামায়াতমুক্ত হতে বলেছেন। তিনি বোঝাতে চাইছেন, জামায়াতমুক্ত হলে বিএনপি সন্ত্রাসমুক্ত হবে। কিন্তু দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করার এবং রাখার দায়িত্ব সরকারেরই। অতএব আওয়ামী লীগকেও পুরোনো কৌশল, দোষারোপের পুরোনো রাজনীতি পরিহার করে দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে হবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সমালোচনা সহ্য করার ধৈর্য থাকতে হবে। সবকিছু বিএনপি-জামায়াতের কাজ বলে দায় এড়ানোর প্রবণতা কাজে দেবে না।
বিএনপি সংসদে থাকুক বা না থাকুক, তার সঙ্গে একটি কর্মসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও শক্তি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি নেত্রী নির্বাচনে না গিয়ে যে ভুল করেছেন, এখন তাঁকে খেসারত দিতে হবে। খেসারত দিচ্ছেনও। তবে একটি রাজনৈতিক দল বা নেত্রী ভুল করলে তার খেসারত দলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে যে, একটি সরকার ভুল করলে তার খেসারত গোটা জাতিকেই দিতে হয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

কালের পুরাণ- জামায়াতমুক্ত বিএনপি! দেশ সন্ত্রাসমুক্ত হবে কি? by সোহরাব হাসান

নির্বাচনের আগে ও পরে সারা দেশে যে সংঘাত, সহিংসতা, গাড়ি পোড়ানো, বাড়ি জ্বালানোর ঘটনা ঘটেছে; তার মূল হোতা যে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির—এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ নেই।

রাজনীতি ও নির্বাচন- আস্থা ফিরবে কীভাবে by এম সাখাওয়াত হোসেন

বহু নাটকের মধ্যে সমাপ্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কে কী পেল তার অঙ্ক অনেকে করছেন। নির্বাচন কমিশনের হিসাবমতে, দুই কোটির কম ভোটার ভোট দিয়েছেন। অবশ্য অনেকেই এই তথ্যের সঙ্গে একমত নন।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এক মানুষ by শাহ মোহাম্মদ ইমাম মেহদী

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার মৃত্যুর পর নয়টি বছর পূর্ণ হলো। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ বৈদ্যেরবাজারে এক জনসভায় ভাষণদানকালে তাঁকে হত্যা করে ঘাতকেরা।
বিএনপি-জামায়াত সরকার তখন ক্ষমতায়। তারা কিবরিয়া হত্যার বিচার করেনি। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারের বিগত আমলেও কিবরিয়া হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়া দুঃখজনক।

কিবরিয়া কেবল একজন সফল অর্থমন্ত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তাঁর অনন্য অবদান দেশের মানুষ চিরদিন মনে রাখবে। কিন্তু তিনি যে দলের জন্য জীবন দিলেন, সেই আওয়ামী লীগ কি তাঁকে মনে রেখেছে? দল বা নেতা-নেত্রীরা ভুলে গেলেও বাংলাদেশের মানুষ এই ব্যতিক্রমী ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিককে ভুলবে না।
১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। সে সময় সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। দুই ক্ষেত্রেই শাহ এ এম এস কিবরিয়া সফল হয়েছিলেন। দেশের অর্থনীতিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করে। এর আগে কম্পিউটারের দাম ছিল সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। মোবাইল ফোনের ব্যবহার ছিল উচ্চ ও ধনিক শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিবরিয়াই কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করেন। তিনি ভাবতেন, এই দরকারি জিনিস দুটি সুলভে সাধারণ মানুষকে দিতে পারলে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
আমি ছিলাম তাঁর অনুজ। তাই অনেক সময়ই দেশের রাজনীতি, মানুষ, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করতাম। একবার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, ব্রিটেনের মতো দেশ যদি বৃদ্ধ, বিধবা, বিকলাঙ্গ রোগীদের বছরের পর বছর ভাতা দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ সরকার তা করছে না কেন? জবাবে তিনি বললেন, ‘আমরা গরিব দেশের মানুষ, এতটা মূলধন এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যারা নিতান্তই অসহায় তাদের জন্য রাষ্ট্রেরও কর্তব্য আছে। আর সে কারণেই বৃদ্ধ, বিধবা ও দুস্থ ভাতা চালু করেছি।’ প্রথম দিকে এই ভাতার পরিমাণ কম থাকলেও উত্তরোত্তর বেড়েছে এবং পরবর্তী সব সরকারই কিবরিয়ার এই নীতি চালু রেখেছে। তাঁর আরেকটি বড় সাফল্য আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। শহরে গরিব ও বেকারদের চাপ কমাতে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করেছিলেন। গ্রামে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে কিবরিয়ার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভৈরব সেতু। রাজধানী ঢাকা শহরের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের জন্য এটি খুবই জরুরি ছিল। তাঁর পূর্বসূরি সাইফুর রহমান অনেক চেষ্টা-তদবির করেও এই সেতুর প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারেননি। কিবরিয়া প্যারিসে গিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন অর্থ প্রদানকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেনদরবার করে এর অর্থ জোগাড় করেন। আওয়ামী লীগ আমলে সেতুর অধিকাংশ কাজ হলেও শেষ হয় চারদলীয় জোট আমলে এবং তাঁরা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি উদ্বোধন করেন। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো যে সেই অনুষ্ঠানে কিবরিয়াকে দাওয়াত পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এটাই বাংলাদেশের সংকীর্ণ রাজনীতি।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। আমার সুযোগ হয়েছিল কিবরিয়াকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করার। এ প্রসঙ্গে তিনি দাদা শাহ ফোরকান আলীর একটি ঘটনা বলেছিলেন। ১৯৪৬ সাল। তিনি রাতে গদিঘরে ঘুমাতেন। এর খুব কাছে গান-বাজনা করতেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। দাদা পরহেজগার ব্যক্তি, সারা রাত নামাজ পড়তেন ও কোরআন তেলাওয়াত করতেন। একদিন হিন্দুদের কীর্তন শুরু হলে হাজার খানেক লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাদার কাছে হাজির হন। তাঁরা তাঁর কাছে জানতে চান, এই গান-বাজনার জন্য তিনি নিশ্চয়ই নামাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না। তাঁর অনুমতি পেলে তাঁরা আখড়া উড়িয়ে দেবেন। জবাবে দাদা বললেন, ‘কেন? আমি যখন নামাজে দাঁড়াই, আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকি, তখন তো কিছুই শুনি না। ওরা তো যুগ যুগ ধরে গান-বাজনা করে আসছে, এতে আমার মোটেই অসুবিধা হচ্ছে না।’ তাঁর এই দৃঢ় মনোভাব দেখে সবাই চলে যায়।
কিবরিয়া বলতেন, এ দেশে হিন্দু-মুসলমান শত শত বছর একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। কোনো সমস্যা হয়নি, এখন কেন হবে? তিনি এ জন্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকেই দায়ী করতেন। কিবরিয়া শৈশব থেকে যে অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা পেয়েছেন আজীবন সেটিই লালন করেছেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন।
আরেকটি ঘটনা। সবেমাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিবরিয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পয়লা মস্কো সফর। আবদুস সামাদ আজাদ তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশকে কীভাবে এই পরাশক্তির কাছে তুলে ধরা হবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা। শেষ পর্যন্ত কিবরিয়ার প্রাজ্ঞ ভূমিকায় সবাই খুশি হলেন।
১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিবরিয়া এসকাপের সেক্রেটারি পদে যোগ দেন। বাংলাদেশ সরকার তাদের পছন্দসই এক ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করলেও জাতিসংঘের মহাসচিব কুট ওয়াল্ডহাম কিবরিয়াকেই বেছে নেন।
কিবরিয়া ছিলেন একজন বড় মনের সমাজসেবক ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। তিনি দেশের স্বার্থকে সবার ওপর দেখতেন। সংকীর্ণতা তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। রাজনীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়াকে তিনি মনে-প্রাণে ঘৃণা করতেন। আজ যদি কিবরিয়া বেঁচে থাকতেন, তাহলে সাহস, ধৈর্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে দেশের এই কঠিন সংকটময় মুহূর্তে সঠিক নির্দেশনা দিতে পারতেন।
শাহ মোহাম্মদ ইমাম মেহদী: লন্ডন প্রবাসী আইনজীবী।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এক মানুষ by শাহ মোহাম্মদ ইমাম মেহদী

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার মৃত্যুর পর নয়টি বছর পূর্ণ হলো। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ বৈদ্যেরবাজারে এক জনসভায় ভাষণদানকালে তাঁকে হত্যা করে ঘাতকেরা।

রাজসিক সংবর্ধনা- বর্ণিল তোরণ আর সোনার নৌকা by আলী ইমাম মজুমদার

অতীতে ভূরি ভূরি হয়েছে। সমালোচনা যতই হোক, থেমে থাকেনি। তবে আশা করা হয়েছিল, এবার অন্তত এসব কিছু পরিহার করা হবে। কেননা, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি স্বাভাবিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়নি, এটা সবার জানা।

ভারতে কংগ্রেস যুগের অবসান ঘটতে চলেছে?

আগামী মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে এখন থেকেই জনমত সমীক্ষায় যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তাতে ভারতে কংগ্রেস যুগের অবসান ঘটতে চলেছে। উত্থান হওয়ার সম্ভাবনা হিন্দুত্ববাদী শক্তি বিজেপির।
ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন সমীক্ষায় জানানো হয়েছে, কংগ্রেসের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে উঠে আসছে বিজেপি। জনমত সমীক্ষার ইঙ্গিত সব সময় যে মিলে যায় তা মোটেই নয়। বরং নানা সমীকরণের অঙ্কে অনেক কিছুরই বদল ঘটতে পারে শেষ মুহূর্তে। তবে এখন পর্যন্ত সমীক্ষার ফলাফলে বিজেপি শিবিরে খুশির হওয়া। বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট এনডিএ পেতে পারে সর্বোচ্চ ২৩১টি আসন ও সর্বনিম্ন ২০৭টি আসন। অন্যদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ইউপিএ জোট অনেক কষ্টে পৌঁছতে পারে ১০০টিতে। সর্বোচ্চ পেতে পারে ১২৭টি আসন। কংগ্রেসের পক্ষে যে দুই অঙ্ক পেরোনো সম্ভব নয়- তা ফুটে উঠেছে সব ক’টি সমীক্ষাতেই। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে আগামী লোকসভায় তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। সমীক্ষাগুলোর অনুমান, তৃতীয় বৃহত্তম দল হওয়ার দৌড়ে জয়ললিতার এআইডিএমকে, মায়াবতীর বিএসপি ও মুলায়মের সমাজবাদী পার্টিকে পেছনে ফেলে দিতে পারেন মমতা। লোকসভা নির্বাচনে দিল্লির বাইরে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, চন্ডীগড় ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে কয়েকটি করে আসন পেলেও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি দেশজুড়ে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না। আইবিএন-সিএসডিএস-এর সমীক্ষা যেখানে এনডিএ জোটের সম্ভাব্য আসন হিসেবে জানানো হয়েছে ২১১ থেকে ২৩১, সেখানে ইন্ডিয়া টুডে-সি ভোটার জানাচ্ছে, এই জোট পেতে পারে ২০৭ থেকে ২১৭টি আসন। আর এবিপি আনন্দ-এসি নিয়েলসেনের সমীক্ষা বলছে, এনডিএ জোট পেতে পারে ২২৬টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি একাই পেতে পারে ২১০টি আসন। অন্য দিকে কংগ্রেস-সহ ইউপিএ জোটকে আইবিএন-সিএসডিএস-এর সমীক্ষা ১০৭ থেকে ১২৭টি আসন দিলেও ইন্ডিয়া টুডে-সি ভোটার দিয়েছে ৯৮ থেকে ১০৮টি আসন। আর এবিপি আনন্দ-এসি নিয়েলসেনের বক্তব্য, ইউপিএ জোট পেতে পারে মাত্র ১০১টি আসন। এবিপি আনন্দ-এসি নিয়েলসেনের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ২৬টি আসন। বামরা সব মিলিয়ে ৩০টি আসন জিততে পারে। এবিপি আনন্দ-এসি নিয়েলসেনের সমীক্ষায় ৫৩ শতাংশই জানিয়েছেন, তারা মোদীকে প্রধানমন্ত্রীর গদিতে চাইছেন। রাহুলকে চাইছেন মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ। ৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। তবে, রাজধানী দিল্লিতে ৪১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা কেজরিওয়ালকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। তিনটি সমীক্ষার ফলে আসন সংখ্যায় কম-বেশি ফারাক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে প্রায় ১০০টি আসনের ফারাক থাকতে পারে। কিন্তু ভারতে কে সরকার গঠন করবে? লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২৭২-এর ম্যাজিক সংখ্যা। বর্তমান চেহারার এনডিএ এতগুলো আসন পাবে বলে কোন সমীক্ষাই মনে করছে না। যা থেকে স্পষ্ট, পাঁচ বছরের জন্য স্থায়ী সরকার গঠন করতে হলে বিজেপিকে নতুন শরিকের সন্ধানে নামতেই হবে। সেক্ষেত্রে, বিজেপি যদি এনডিএ জোটের পুরনো শরিকদের ফিরিয়ে আনতে পারে এবং টিআরএস-এর মতো নতুন শরিকদের কাছে টানতে পারে, তা হলে মোদীর প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসা হয়তো কঠিন হবে না। তবে এবারের লোকসভা নির্বাচনের পরে সরকার গঠনে আঞ্চলিক দলগুলোর ভূমিকা যে বিশেষ গুরুত্ব পাবে- সেটা এক প্রকার নিশ্চিত।

ভারতে কংগ্রেস যুগের অবসান ঘটতে চলেছে?

আগামী মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে এখন থেকেই জনমত সমীক্ষায় যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তাতে ভারতে কংগ্রেস যুগের অবসান ঘটতে চলেছে। উত্থান হওয়ার সম্ভাবনা হিন্দুত্ববাদী শক্তি বিজেপির।

নেপথ্যে লিভটুগেদার by শর্মী চক্রবর্তী

লিভটুগেদারের বলি হলো জহিরুল। ফোনে পরিচয় হয়েছিল লাভলী নামে এক তরুণীর সঙ্গে। পরিচয় থেকে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। এ বন্ধুত্বই রূপ নেয় ভালবাসায়। শুরু হয় লিভটুগেদার।
স্ত্রী-সন্তান থাকা সত্ত্বেও ভালবাসার টানে সব  কিছু ভুলে জহিরুল এ সম্পর্ক চালিয়ে যান। সে সম্পর্কই কাল হলো তার। প্রেমিকা লাভলীর প্ররোচনায় আত্মহত্যা করে বসেন জহিরুল।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক ছিল জহিরুল-লাভলীর। সবার অগোচরে গড়ে ওঠে এ সম্পর্ক। জহিরুল বিবাহিত ছিলেন। তার স্ত্রী-সন্তান আছে। অন্যদিকে লাভলীও বিবাহিতা। তারও সন্তান রয়েছে। স্বামী থাকেন ইতালিতে। স্বামীর অবর্তমানে এ সম্পর্কে জড়িয়ে যান তিনি। সম্পর্কের এক পর্যায়ে তারা একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্ত থেকেই ৪-৫ মাস আগে যাত্রাবাড়ী কাউন্সিল রোডের বড়বাড়িতে সাবলেট ভাড়া নেন। নিজেদের পরিচয় দেন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। এখানে প্রায় সময়ই তারা দু’জনে একসঙ্গে কাটাতেন। জহিরুল লিভটুগেদারের পাশাপাশি স্ত্রী সাজু বেগমের সঙ্গেও সংসার করে আসছিলেন। কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার নাম করে যেতেন লাভলীর কাছে। সন্ধ্যা হলে ফিরে আসতেন বাসায়। এ কারণে জহিরুলের পরিবারের সদস্যরাও বিষয়টি বুঝতে পারেননি। এমনকি তার স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ভাল ছিল। কোন অভাব ছিল না তাদের পরিবারে।
গত শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত জহিরুল তার বড় ভাই শহিদুলের সঙ্গে ছিলেন। এরপরই ফোন এলে তিনি ছুটে যান লাভলীর বাসায়। সেখানে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। পরে বিকাল সাড়ে ৫টায় শহিদুলের পরিবার জানতে পারে জহিরুল মারা গেছেন। তার পরিবারের দাবি, জহিরুল আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার বড় ভাই শহিদুল জানান, আমরা যাত্রাবাড়ীর শাহজালাল রোড এলাকায় দুই ভাই থাকি। তার স্ত্রী-সন্তান আছে। সুখের সংসার ছিল। এর মধ্যে জহিরুল কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে- এমন কোন কথা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আর তাদের সংসারে এমন কোন ঝামেলাও ছিল না- যে কারণে সে আত্মহত্যা করতে পারে। তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গতকাল জহিরুলের বড় ভাই শহীদুল বাদি হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেন। এতে কথিত স্ত্রী লাভলীর বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচণার অভিযোগ আনা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক মাহবুবুল আলম বলেন, তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। প্রাথমিক তদন্তে আমরা ধারণা করছি তারা লিভটুগেদার করতো। লাভলী দাবি করেছেন, তাদের বিয়ে হয়েছে। তবে আমরা এমন কোন কাগজ পাইনি। ঘটনার দিন বিকালে তাদের ঝগড়া হয়। লাভলী চেয়েছিল জহিরুল যেন তার স্ত্রী সাজু বেগমকে তালাক দেয়। কিন্তু জহিরুল সেটা চাচ্ছিল না। এ নিয়ে কোন ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে পারে সে। আমরা বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখছি। তদন্ত পুরোপুরি শেষ হলেই এর আসল কারণ জানা যাবে।
এদিকে ঢামেক হাসপাতালে লাভলী জানান, সে জহিরুলের বিবাহিতা স্ত্রী। গত বছরের ১৩ই আগস্ট জহিরুল তাকে বিয়ে করেছে। বিয়ের কাবিননামাও আছে। ৪-৫ মাস ধরে যাত্রাবাড়ীর ৫ তলা বাসায় সাবলেট থাকেন। কয়েক দিন ধরে পারিবারিক কারণে তাদের ঝগড়া চলছিল। তার দাবি ছিল, প্রথম স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে হবে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। গত শনিবার বিকালেও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। রাগ করে তিনি নিচে নেমে আসেন। অপেক্ষায় ছিলেন স্বামী তাকে মোবাইল ফোনে কল দেবেন। কিন্তু কল না আসায় কিছুক্ষণ পর আবার বাসায় গিয়ে দেখেন জহিরুল গালায় ফাঁস দিয়েছেন। তারপর তিনি নিজেই স্বামী জহিরুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালে লাভলী দুই ধরনের তথ্য দিলে পুলিশের সন্দেহ হয়। সে সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাকে আটক করে। এদিকে জহিরুলের পরিবারের দাবি, তারা লাভলীকে চেনেন না। তিনি তার স্ত্রীও নন। জহিরুলের ঠিকানা ডেমরার কোনাপাড়া। তাদের সন্দেহ, জহিরুলকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে।


নেপথ্যে লিভটুগেদার by শর্মী চক্রবর্তী

লিভটুগেদারের বলি হলো জহিরুল। ফোনে পরিচয় হয়েছিল লাভলী নামে এক তরুণীর সঙ্গে। পরিচয় থেকে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। এ বন্ধুত্বই রূপ নেয় ভালবাসায়। শুরু হয় লিভটুগেদার।

৯ মাসেও রানা প্লাজা নিয়ে স্বচ্ছ পরিসংখ্যান হয়নি

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ৯ মাসেও নিহত ও নিখোঁজের প্রকৃত পরিসংখ্যান বের করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানার জন্য আজ পর্যন্ত কোন ওয়েবসাইট বা ডাটাবেজ তৈরি হয়নি।
আর এতে আগামীতে নেয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর সরকারি-বেসরকারি যেসব প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, সেগুলোরও সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। এ অবস্থায় রানা প্লাজা নিয়ে সার্বিক তথ্য বের করা জরুরি। গতকাল ব্র্যাক সেন্টার ইনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেয়া প্যানেল আলোচকরা এসব কথা বলেন। এতে ‘রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ও পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের সর্বশেষ পরিস্থিতিবিষয়ক’ রিপোর্ট উপস্থাপন করেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন সিপিডি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন শ্রম সচিব মিকাইল শিপার, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক এমএম আকাশ, বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি টিপু মুন্সী, সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিসের (বিলস) যুগ্ম সচিব জাফরুল হাসান, বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান প্রমুখ।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রানা প্লাজা ধসের পরে নিহত-আহত শ্রমিকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে কত টাকা জমা হয়েছে, কে কত টাকা দিয়েছেন, আর কাকে কত টাকা দেয়া হয়েছে তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আমরা শেষ পর্যন্ত দেখবো শ্রমিকরা কত টাকা পেয়েছে। আর শ্রমিকদের দেখিয়ে কে কত টাকা নিয়েছে। কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকলে কোন প্রশ্ন উঠবে না। তিনি বলেন, রানা প্লাজায় দুর্ঘটনার ফলে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি হয়নি। ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্ত সামগ্রিকভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এসব বিষয় সামনে রেখে দ্বিতীয় প্রজন্মের গার্মেন্ট শিল্প তৈরি করতে একটি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। ড. দেবপ্রিয় বলেন, এখন তিনটি বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত, নিহত-আহত শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সমাধান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় মেয়াদের কারখানাগুলো কিভাবে হবে তা ঠিক করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দরকষাকষি করে কারখানায় কাজ নিতে হবে। অনেকেই ঋণ দেয়ার কথা বলেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়নে ঋণ কিভাবে পাওয়া যাবে সেটা ঠিক করা দরকার। তিনি বলেন, একটা সমন্বয়ের অভাব ছিল রানাপ্লাজা উত্তর পরিস্থিতিতে। মানুষের নিহত ও নিখোঁজের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো সৃষ্টিতে কিভাবে ঋণ পাওয়া যায় তা নিয়ে চিন্তা করা উচিত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি করতে হবে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, স্বচ্ছতার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হতে হবে। ডিএনএ টেস্টে কাদের পরিচয় মিললো তা-ও প্রকাশিত হয়নি।
বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, যে সব শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পায়নি তাদেরকেও ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। এতিম শিশুদের শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসাসহ সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। ৩০০ জন এতিম শিশুর দায়িত্ব বিজিএমইএ নেবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, উত্তর আমেরিকান ক্রেতাদের জোট (অ্যাকর্ড) ও ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট (অ্যালায়েন্স) যে শর্ত দিচ্ছে তাতে দেশের কোন কারখানাই থাকবে না। তারা বলছে, নিচে দোকান ও উপরে কারখানা থাকলে কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। এভাবে করলে পুরো পোশাকখাত লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। তারা আর্থিক সহযোগিতা করার কথা বললেও এক টাকাও দেয়নি। জাইকা একটি ফান্ড দেয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু তাদের চাহিদা পূরণ করে ফান্ড পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, গার্মেন্ট শিল্পে রাজনীতি ঢুকে গেছে। এ শিল্পকে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে একটি চক্র। ২১ বিলিয়ন রপ্তানির এ খাত অনেকেই সহ্য করতে পারছে না। আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে এটাই আমাদের দোষ।
টিপু মুন্সি বলেন, নিহত-আহত শ্রমিকদের সহায়তার মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। যাতে সবাই সমান ভাবে ক্ষতিপূরণ পায়। তিনি সিপিডি’র উদ্দেশে বলেন, শুধু নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে কথা বললে সামনের দিকে এগোনো সম্ভব হবে না। সবাইকে মিলেই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
জাফরুল হাসান বলেন, শ্রম আইনে ভাল-মন্দ দুই দিকই আছে। ২০০৬ সালের শ্রম আইনের অনেক কিছুই সংশোধন করতে হবে। যে করেই হোক আমাদেরকে গার্মেন্ট শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে। রানাপ্লাজা ও তাজরীনের মতো আর কোন ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
শ্রমিক নেতা বাবুল আকতার বলেন, রানা প্লাজায় যারা কাজ করেছেন তারা এখন কোন গার্মেন্টে কাজ করতে চান না। তাদেরকে অন্য চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির কথা এলেই বলে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু কোন কারখানাই বন্ধ হয়নি। মালিকদের মানসিকতা পরিবর্তন হলে সবকিছু সম্ভব হবে। নয়তো কোন কিছুই সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত মোজাম্মেল হকের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, রানা প্লাজার তিন তলায় নিউ বটনে কাজ করতো তার স্বামী। তাকে কবর দেয়ার পরে এ পর্যন্ত বিকাশের মাধ্যমে মাত্র ২০ হাজার টাকা পেয়েছি। এরপর আর কেউ কোন খোঁজখবর নেয়নি। ঘরে এখন বাতি জ্বলে না। টাকার অভাবে ছোট মেয়ের বই কিনতে পারি না। মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ।
বেঁচে যাওয়া আরেক শ্রমিক মরিয়ম বলেন, আমাকে একটা কৃত্রিম হাত দেয়া হয়েছে। কিন্তু এটা দিয়ে কাজ করতে পারি না। কারণ এটা অনেক ভারি, ব্যবহার করলে খুব কষ্ট হয়, শরীরে যন্ত্রণা হয়।
রানা প্লাজার ওপর প্রতিবেদনে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে একেকটি সংস্থা একেক ধরনের তথ্য দিয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস নিখোঁজের সংখ্যা জানাচ্ছে ৩৭৯ জন। অন্যদিকে রানা প্লাজা কো-অর্ডিনেশন সেল এই সংখ্যা ১৮৯ জন এবং সিপিডি’র মতে ৯৮ জন। প্রতিবেদনে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার সময় ভবনটিতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। বিজিএমইএ-অ্যাকশন এইড-এর রিপোর্ট বলছে ৩৫৭২ জন, সিপিডি ৩৬৭০, বিলস ৩৯৪৮ আর কো-অর্ডিনেশন সেল ৩৮৪৮ জন। দুর্ঘটনার নয় মাসেও নিহত ও নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা বের করতে না পারা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এ কারণেই পরবর্তী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান গোলাম মোয়াজ্জেম। প্রতিবেদনে আরও বলেন, দুর্ঘটনায় আহতদের যারা পরে কাজে যোগ দিয়েছেন তাদের কেউই কাজের জন্য পুরোমাত্রায় সক্ষম নন। এতে তাদের আয় কমেছে। গার্মেন্ট খাতে স্বাভাবিক আয়ের তুলনায় ৬০ শতাংশ কম আয় করছেন এই শ্রমিকরা।

৯ মাসেও রানা প্লাজা নিয়ে স্বচ্ছ পরিসংখ্যান হয়নি

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ৯ মাসেও নিহত ও নিখোঁজের প্রকৃত পরিসংখ্যান বের করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানার জন্য আজ পর্যন্ত কোন ওয়েবসাইট বা ডাটাবেজ তৈরি হয়নি।

পুলিশের পা ধরেও ভাইকে বাঁচাতে পারলো না স্বর্ণা

সোহানকে যখন কোপাচ্ছিল তখন ফাঁড়ির ভেতরে ছোট বোন স্বর্ণা পুলিশের পা ধরে ভাইকে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানাচ্ছিল। কিন্তু পুলিশ তাৎক্ষণিক সেখানে ছুটে আসেনি। কিছুক্ষণ পর এলো পুলিশ।
কিন্তু তার আগেই বড় ভাই সোহানকে নির্মমভাবে কোপালো ঘাতকরা। পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করলো কিন্তু ততক্ষণে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো কলেজছাত্র সোহান। এরপর ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গতকাল বিকালে সিলেট নগরীর ভিআইপি রোডে লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সোহান ইসলাম সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর সাহানা বেগম সানুর দ্বিতীয় ছেলে। এ ঘটনায় নগরীর কুয়ারপাড় ও খুলিয়াপাড়া এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত সোহান ইসলাম (১৮) সিলেট মদন মোহন কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র এবং খুলিয়াপাড়া ৫২-৪ নম্বর বাসার তাজুল ইসলামের ও সাবেক কাউন্সিলর শাহানা বেগম শানুর পুত্র। পূর্বশত্রুতার জের ধরে এলাকার লোকদের হাতে সে খুন হয়েছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কামাল আহমদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব হয়। শুক্রবার সোহানের লোকজন কামালকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। কামাল বর্তমানে সিলেট ওসমানী হাসপাতালের ১৩ নং ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে। এ ঘটনায় সিলেট কোতোয়ালি থানায় মামলাও হয়েছে। রোববার বিকালে নগরীর জিন্দাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ছোট বোন নুশরাত জাহান স্বর্ণাকে নিয়ে বাসায় ফিরছিল সোহান। লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির কাছে পৌঁছলে প্রতিপক্ষ গুলজার ও কামালের  লোকজন তার গতিরোধ করে প্রথমে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। পরে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে তাকে রাস্তায় ফেলে চলে যায়। ভাইয়ের উপর হামলার ঘটনার পর স্বর্ণা দৌড়ে ঢোকে পার্শ্ববর্তী লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে। এ সময় সে পুলিশের কাছে ভাইকে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানায়। তবে, ঘটনা বুঝতে না পেরে পুলিশ কর্মকর্তারা কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। এক পর্যায়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের চিৎকারে পুলিশ ফাঁড়ির বাইরে গিয়ে ধাওয়া করলে খুনিরা গলি দিয়ে পালিয়ে যায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সিলেট ওসমানী  মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সাবেক কাউন্সিলর প্রার্থী গুলজার আহমদের নেতৃত্বে ১৫-১৬ জন হামলা চালিয়ে তাকে খুন করে বলে নিহতের পরিবার দাবি করেছে। নিহতের মা সাবেক কাউন্সিলর সাহানারা বেগম সানু হাসপাতালে ছেলের মৃতদেহ ধরে বিলাপ করছিলেন। এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, গুলজার ও কামালের লোকজন তার ছেলেকে খুন করেছে। তিনি ঘাতকদের ফাঁসি দাবি করেন। পিতা তাজুল ইসলাম ছেলের লাশ দেখে নির্বাক হয়ে গেছেন। তিনি জানান, ওরা এতটা ভয়ংকর কাজ করতে পারে জানা ছিল না। তিনি বলেন, পুলিশ আরও আগে বেরিয়ে এলে হয়তো ছেলেকে বাঁচানো সম্ভব হতো। ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ১০-১২ জন লোক মোটরসাইকেল থামিয়ে সোহানের ওপর হামলা চালায়। তাদের হাতে দা-লাঠি সহ ধারালো অস্ত্র ছিল।
 ঘটনার পরপরই তারা খুলিয়াপাড়া ও বিলপাড় এলাকা দিয়ে পালিয়ে যায়। এদিকে, লামাবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মনির জানিয়েছেন, ঘটনা চলাকালেই পুলিশ ফাঁড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ধাওয়া করে। এ সময় ঘাতকরা পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ সোহানকে হাসপাতালে নিয়ে আসে।

পুলিশের পা ধরেও ভাইকে বাঁচাতে পারলো না স্বর্ণা

সোহানকে যখন কোপাচ্ছিল তখন ফাঁড়ির ভেতরে ছোট বোন স্বর্ণা পুলিশের পা ধরে ভাইকে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানাচ্ছিল। কিন্তু পুলিশ তাৎক্ষণিক সেখানে ছুটে আসেনি। কিছুক্ষণ পর এলো পুলিশ।

প্রসঙ্গ জামায়াত- আওয়ামী লীগের উস্কানি বিপদে বিএনপি

বিএনপির কারাবন্দি জ্যেষ্ঠ নেতা মওদুদ আহমদ ইঙ্গিত করেছেন যে, ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে ‘আওয়ামী লীগের উস্কানিতেই’ জামায়াতকে বিপদে ফেলেছিল।
আবার তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার দাবির মুখেই জেনারেল এরশাদকে গুলশানের সাব-জেল থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়েছিল। অথচ আওয়ামী লীগ পরে এই দু’টি দলকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির নির্বাচিত সরকার উৎখাতের আন্দোলনে শরিক হয়েছিল।

২০১২ সালে মওদুদ আহমদের বইটি প্রকাশ করেছে ইউপিএল। ‘বাংলাদেশ এ স্টাডি অব দ্য ডেমোক্রেটিক রেজিমস’ শীর্ষক বইয়ে মওদুদ আহমদ জামায়াত-বিএনপি সমঝোতা এবং তা ভঙ্গ হওয়ার নেপথ্য ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। মওদুদের বর্ণনা মতে, জেনারেল মোহাম্মদ নুর উদ্দীন খান খালেদা জিয়া ও গোলাম আযমের মধ্যে দূতিয়ালি করেন। স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জি ডব্লিউ চৌধুরীর বাসভবন। এখানে বেগম খালেদা জিয়া, গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর মধ্যে বৈঠকটি হয়। সে সময় ১৮ আসনধারী জামায়াত ওই বৈঠকের পর প্রেসিডেন্টকে লিখিতভাবে বিএনপিকে সমর্থনের কথা জানিয়ে দেয়।
মওদুদ লিখেছেন, ‘কি করে সমঝোতা রদ হলো সে প্রশ্নটি কোন আদালতের মামলার বিষয় ছিল না। কিংবা তার নাগরিকত্বের কারিগরি দিক নিয়েও ছিল না। এমনকি অধ্যাপক গোলাম আযম একজন কোলাবরেটর ছিলেন কি ছিলেন না কিংবা এই প্রশ্নও ছিল না যে বাংলাদেশ থেকে তাকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল কি ছিল না।’
এরপর মওদুদ বলেন, ‘কিন্তু এই প্রশ্নটি এক বিশাল বিস্ময়ের সঙ্গে তোলা যেতে পারে যে কি করে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে গঠিত সরকার তাদের আমীরকেই কারাগারে পাঠিয়েছিল? সেটা কেবল দুই নেতার মধ্যকার সমঝোতার লঙ্ঘন নয় সেটা রাজনৈতিক আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে একটি ঘোরতর প্রতারণাও বটে। যদি জামায়াত ও অধ্যাপক  গোলাম আযম পাাকিস্তানি দখলদার সরকারের সহযোগীই হয়ে থাকবেন, তাহলে বেগম জিয়া কেন সরকার গঠনে ১১ বামপন্থি সংসদ সদস্যের সমর্থন নিলেন না?’ তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ওই বামেরা যাদের কেউ কেউ এখন মহাজোটে সক্রিয় তারা খালেদা জিয়াকে সমর্থন দিতে চেয়েছিলেন।
মওদুদ আরও লিখেছেন, গোলাম আযম দেশের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণায় অংশ নেন বলে বিএনপি সরকারের পক্ষে আদালতে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়। ১৯৭১ সালের পর গোলাম আযম পাকিস্তানের নাগরিক হন। বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ তিনি নেননি। জামায়াতে ইসলামীর সশস্ত্র ক্যাডাররা রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয় কেবল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতেই। গোলাম আযম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজাকার, আলবদর এবং আল-শামসের মতো বাহিনী গঠনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বর্বর জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে তাকে দেখা যায়। অধ্যাপক আযমকে লিবিয়ায় একটি সম্মেলনে যোগ দিতেও দেখা যায়। সেখানে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রতি আবেদন জানান। মুজিব সরকার গোলাম আযমসহ ৩৮ জনকে তাই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করে।
মওদুদ আহমদ তথ্য প্রকাশ করেন যে, ‘জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে গোলাম আযমের নিয়োগ এবং তার নাগরিকত্ব ফেরত দান ছিল সমঝোতার শর্ত। মওদুদ আহমদ পরোক্ষ মন্তব্য করেন যে, সেদিন প্রকারান্তরে জামায়াতের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করা হয়েছিল। নাগরিকত্ব ও আমীরত্ব না দিয়ে বরং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গোলাম আযম কারাগারে ছিলেন পুরো রমজান মাস।
এরশাদ ও জাপা: মওদুদ মনে করেন, ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বরের পর জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি ও তার নেতাকর্মীদের প্রতি বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতি অনুসরণ করে। তার ভাষায়, ‘অভিযোগ রয়েছে যে জামায়াতে ইসলামীর মতোই জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধেও বিএনপি প্রতিহিংসামূলক নীতির আশ্রয় নিয়েছিল। আর তাতে আওয়ামী লীগ অনেকটাই উস্কানি দিয়েছিল। এর ফলে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে দেশের প্রধান ধারার দল এবং শক্তিশালী মিত্রদের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি করে।’
মওদুদ আহমদ স্মৃতিচারণ করেন যে, ‘সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, এরশাদ কেন কূটনৈতিক এলাকার বিলাসবহুল বাড়িতে থাকবেন? এরপরই খালেদা জিয়া তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠান। আবার গোলাম আযমের ক্ষেত্রেও দলটি একই সুর তোলে। বলে যে, বাংলাদেশের নাগরিক না হওয়া সত্ত্বেও গোলাম আযম কেন আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশে থাকবেন? দেশের একটি রাজনৈতিক দলের আমীর হবেন? তখন বিএনপি সরকার অমনি তাকে দ্রুত দেশের বাইরে পাঠাতে তোড়জোড় শুরু করে। অথচ সময় গড়ালে দেখা গেল জামায়াত ও জাতীয় পার্টি সেই আওয়ামী লীগের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের অসম্মানজনক গদিচ্যুতি নিশ্চিত করেছিল।’

প্রসঙ্গ জামায়াত- আওয়ামী লীগের উস্কানি বিপদে বিএনপি

বিএনপির কারাবন্দি জ্যেষ্ঠ নেতা মওদুদ আহমদ ইঙ্গিত করেছেন যে, ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে ‘আওয়ামী লীগের উস্কানিতেই’ জামায়াতকে বিপদে ফেলেছিল।

এ ডিফিকাল্ট ভিকটরি @জটিল বিজয় by সুবীর ভৌমিক

জটিল এক বিজয় অর্জন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে সমর্থন দিয়েছে চীন। হতে পারে এর মাধ্যমে ভারতকে একটি বার্তা দেয়া হয়েছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ যখন ভূমিধস বিজয় অর্জন করে তখন বেশির ভাগ মানুষ প্রশ্ন করেছিলেন, এ সরকার টিকবে কতদিন।

এ ডিফিকাল্ট ভিকটরি @জটিল বিজয় by সুবীর ভৌমিক

জটিল এক বিজয় অর্জন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে সমর্থন দিয়েছে চীন। হতে পারে এর মাধ্যমে ভারতকে একটি বার্তা দেয়া হয়েছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ যখন ভূমিধস বিজয় অর্জন করে তখন বেশির ভাগ মানুষ প্রশ্ন করেছিলেন, এ সরকার টিকবে কতদিন।
এটা কোন অযৌক্তিক প্রশ্ন নয়। ১৯৯৬ সালের শুরুর দিকে একই রকম নির্বাচন করেছিলেন তখন ক্ষমতায় থাকা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। এতে তীব্র প্রতিবাদ সৃষ্টি হয়। তার প্রেক্ষিতে বিএনপির এ নেত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা মেনে নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে অবাধ নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। এবারও অনেকেই সেই সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতিকে তুলনা করেন। খালেদা জিয়ার দেয়া ওই নির্বাচনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এবার ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর পরিস্থিতিকে সেই সময়ের সঙ্গে সমান্তরালে তুলনা করছেন  বেশির ভাগ মানুষ। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ভোট পড়েছিল শতকরা মাত্র ৭ ভাগ। ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ। তবে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে তার চেয়ে অনেক ভাল ভোট পড়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ ভোট পড়ে। সে তুলনায় এবারের ভোট ধারেকাছেও ছিল না। এবারের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। এছাড়া, তীব্র সহিংসতা ভোটদানে বাধা সৃষ্টি করে। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রিত্ব নেয়ার সময় শেখ হাসিনা ওয়াজেদ তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তাই তিনি বিরোধী দলের সঙ্গে একটি সংলাপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছেন, সমঝোতা হওয়ার পর পরই যত তাড়াতাড়ি একটি অবাধ নির্বাচন হবে। এবারের নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্যতার চেয়ে কম বলে আখ্যায়িত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন এবং মধ্যবর্তী একটি নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যে নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ অবাধে তাদের মত প্রকাশের সুযোগ পাবে। এ নির্বাচনকে একদলীয় বলে আখ্যায়িত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কমনওয়েলথ। তারাও সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী ভারত সমর্থন দেয় শেখ হাসিনা ওয়াজেদকে। তারা বলেছে, বাংলাদেশের এ নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে শেখ হাসিনার জন্য পাল্টে গেছে পরিস্থিতি। তার সরকারকে সমর্থন দিয়েছে রাশিয়া। তারা বলেছে, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতামূলক কাজ করতে চায়। আরও মজার কথা, সহিংসতা ও নির্বাচন বর্জনের জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করেছে রাশিয়া। তবে তারা একদলীয় নির্বাচনের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করে। এতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়কার স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল ভারত ও রাশিয়া। পাকিস্তানি সেনারা নৃশংসতা চালাচ্ছিল সাধারণ বাঙালিদের ওপর। পাকিস্তানি সেনাদের সমর্থন দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। সিরিয়া পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করেছে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া। তারপর রাশিয়া এবার সমর্থন করছে শেখ হাসিনা ওয়াজেদকে। একে এশিয়ার একটি বড় ইস্যুতে ক্রেমলিনের শক্ত অবস্থান বলে দেখা হয়। কিন্তু তারপরে যা ঘটলো তা আরও বিস্ময়কর।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছিল চীন। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে তারা ভাল সম্পর্ক গড়ে তোলে বাংলাদেশের সঙ্গে। বাংলাদেশের দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তারা সম-দূরত্ব বজায় রাখে। এ দু’টি দলই ১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শাসন করেছে বাংলাদেশকে। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি চুন বরাবরই চুপচাপ থাকেন। কিন্তু এবার ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংলাপ আহ্বান করেন, যাতে সহিংসতার বিরুদ্ধে বিচক্ষণতা জয়ী হয়। কিন্তু শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতা নিয়ে গঠন করেছেন মন্ত্রিসভা। এ সময়ে তিনি একটি বার্তা পেয়েছেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি  খেছিয়াং-এর কাছ থেকে। তাতে বলা হয়েছে, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সমন্বিত ও সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে হাত মেলাতে তার সরকার উদগ্রীব। রাষ্ট্রদূত লি চুন এ বিষয়ক একটি চিঠি পৌঁছে দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হকের কাছে। এতে আরও পরিষ্কার করে যে বার্তা দেয়া হয় তাহলো এই সমর্থনের অর্থ অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। তবে লি’র ওই চিঠিতে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বা এর একদলীয় প্রকৃতির উল্লেখ করা দূরের কথা নির্বাচন প্রসঙ্গই অনুপস্থিত। পশ্চিমাদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এর মাধ্যমে চীন একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে। তাতে বোঝানো হয়েছে ঢাকার সরকারের কাছেই গণতন্ত্র ও সুশাসনের বিষয়টি ছেড়ে দেয়া ভাল। ডিসেম্বরে খুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিসিআইএম-এর মিটিং। ওই বৈঠকে ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের কাছে চীন জানায় যে, তারা কলকাতা ও খুনমিংয়ের অর্থনৈতিক সংযোগ করিডোর উন্নয়নে দিল্লি ও ঢাকার সঙ্গে কাজ করতে উদগ্রীব হয়ে আছে। চীন জানায়, এতে ‘আমাদের সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা’ হবে। কিন্তু চীন এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সমদূরত্ব বজায় রাখার নীতি থেকে দূরে সরে এসেছে এবং তারা সমর্থন দিয়েছে শেখ হাসিনার সরকারকে। একই সঙ্গে তারা ভারতের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়তে চায়। এর মাধ্যমে তারা একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চায় যে, তারা ভারতের সঙ্গে এ অঞ্চলে কাজ করতে পারলে ভীষণ সন্তুষ্ট হবে। এটা এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়ে ঘটনায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে। এর আগে ভারতীয় কূটনীতিকদের কাছে চীন একটি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, কক্সবাজার উপকূলে সোনাদিয়ায় তারা যে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগে সহায়ক হবে। ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের কব্জা থেকে বের করে আনতে ভীষণভাবে তৎপর পেইচিং। তা করতে এখনকার চেয়ে ভাল সময় আর কখন? শেখ হাসিনাকে দেখা হয় ভারতের খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবে। তাই তার প্রতি চীনের সমর্থনকে দেখা হয় এক ঢিলে দুই পাখি শিকার হিসেবে।
গোপনীয় কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা কেন বিএনপিকে নির্বাচনে এত দৃঢ়তার সঙ্গে সমর্থন দিয়েছেন এবং দৃশ্যত এখনও দিচ্ছেন তাতে বিস্মিত চীনা কূটনীতিকরা। দক্ষিণ ভারতে একটি ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে। তাই বঙ্গোপসাগরে এমন ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করার উপযোগী করে খালেদা জিয়াকে ওয়াশিংটন গড়ে তুলছে বলে সন্দেহ ওই সব কূটনীতিকের। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্র সংযোগ রুটের খুব কাছাকাছি ঘাঁটি বসাতে তৎপর যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়টি চীনের কাছে স্পর্শকাতর। রাখাইন রাজ্যে চীন নির্মাণ করেছে কিইয়াউকপিউ বন্দর, একটি বিশাল তেল ও গ্যাস পাইপলাইন। এ পাইপলাইনের মধ্যে কিউকপুর সঙ্গে ইউন্নানকে সংযুক্ত করা হয়েছে। মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে চলবে কিনা সে সিদ্ধান্তে আসা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পেইচিং এই প্রণালীকে দেখে একটি ‘চোক-পয়েন্ট’ হিসেবে। তাই পরিবহন খাতে বিপুল পরিমাণ খরচ কমাতে তারা এই প্রণালী ব্যবহার করা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। শেখ হাসিনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিরোধ রয়েছে চীনা নেতারা নিশ্চিত এর ফলে ওয়াশিংটন যদি বাংলাদেশে একটি ঘাঁটি স্থাপন করতে চায় তাতে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে সায় দেবেন না। এতে ভারতও সন্তুষ্ট হবে। কারণ, প্রতিবেশী দেশে তেমন মার্কিন ঘাঁটির বিরোধী দিল্লি, যেমন ঘাঁটি ডারউইনে স্থাপন করার অনুমতি দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি চীন সমর্থন দিয়ে বিবৃতি দেয়ার একদিন পরেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দৃশ্যত নমনীয় হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেরি হার্ফ বলেছেন, আমরা শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। দ্রুততার সঙ্গে তিনি আরও বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে নি। ড্যান ডব্লিউ মজিনা গত সপ্তাহে ‘অবিলম্বে নির্বাচন’ দেয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন মেরি হার্ফ সে বিষয়টি উল্লেখ করেন নি।
যে নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হতে পারতো তা থেকে সরে এসে তারা বড় একটি ভুল করেছে এটা বুঝতে পেরে হরতাল অবরোধ, যা তারা নির্বাচনের আগে ব্যাপক আকারে করেছে তা অব্যাহতভাবে করার মুডে নেই বিএনপি। তারা ক্ষোভ প্রকাশ স্থগিত করেছে। এ কর্মসূচির সমালোচনা হয়েছে সব মহল থেকে। যে সহিংসতা হয়েছে তাতে অর্থনীতি আক্রান্ত হয়েছে। রাজপথে চলমান মানুষ বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। শহরের বাজারে উৎপাদিত ফসল পৌঁছে দিতে পারলে কৃষক স্বস্তি অনুভব করে। কারণ, এতে তারা ভাল দাম পান। রপ্তানিকারকরা ব্যাপক ক্ষতির পরে আইনশৃঙ্খলা ফিরে আসুক এমনটা চাইছেন। ছাত্রছাত্রীরা স্কুল-কলেজে ফিরতে উদগ্রীব। অফিসগামী মানুষ ভাবতে চান তারা আর আতঙ্কের ভিতর নেই।
অনেক কিছুই হয়ে গেছে এমনটা সম্ভবত অনুধাবন করতে শুরু করেছেন খালেদা জিয়া। বাংলাদেশে নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ভোটাররা প্রস্তুত ছিলেন তাকে ভোট দিতে। দেশকে সুপথে রাখার জন্য এটা বিএনপির জন্য একটি সুযোগই ছিল না, একই সঙ্গে এটা ছিল দেশরক্ষার জন্য একটি নিশ্চিত সুযোগ। ক্ষমতা কোন একক দলের একচ্ছত্র দখলের বিষয় নয় একথা নিশ্চিত করতে ভোটাররা ক্ষমতাসীনদের পরিবর্তন করে। বাংলাদেশের অনেক ভোটার রাজনৈতিক মেরুর নন। আওয়ামী লীগকে এখন ক্ষমতা থেকে উৎখাতের মতো ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলার আগ্রহ তাদের নেই। অন্যদিকে গণআন্দোলন বেগবান করার পরিবর্তে বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন বর্জনের সন্ত্রাসী কৌশলকে সমর্থন দেয়। এ নির্বাচন শেষ হয়েছে শেখ হাসিনা ওয়াজেদের বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এতে তার আত্মতুষ্টির কোন কারণ নেই। মন্ত্রিসভায় তিনি বহু দলকে ঠাঁই দিয়েছেন। তিনি হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছেন সামনেই তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

সুবীর ভৌমিক ভারতের সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর সিনিয়র ফেলো। এর আগে তিনি বিবিসি’র সাংবাদিকতা করেন। লিখেছেন বেশ কিছু আলোচিত বই।
(গতকাল ভারতের দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘এ ডিফিকাল্ট ভিকটরি’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ)

কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৬ কোটি টাকা লুট by আশরাফুল ইসলাম

গোপন সুড়ঙ্গপথে কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। জেলা শহরের রথখলা এলাকায় ব্যাংকের ওই শাখার পাশের বাসভবনের একটি কক্ষ থেকে সুড়ঙ্গপথ তৈরি করে ব্যাংকের ভল্টরুমে রাখা এ টাকা লুট করা হয়।
শুক্র ও শনিবার ব্যাংক বন্ধ থাকার পর গতকাল ব্যাংক খোলার পর বেলা আড়াইটার দিকে টাকা লুট হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। শুক্র কিংবা শনিবারের কোন একসময় এ ঘটনা ঘটেছে বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা ধারণা করছেন। শহরের অন্যতম ব্যস্ততম এলাকার প্রধান সড়কের ওপর অবস্থিত ব্যাংকের শাখা থেকে দুঃসাহসিক লুটের ঘটনায় পুরো এলাকায় ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক হুমায়ূন কবির ভূঁইয়া ও প্রিন্সিপাল অফিসার হাসান আহমেদ মঈন জানান, ভল্টরুমে দু’টি কক্ষ রয়েছে, তবে প্রবেশপথ একটিই। সামনের কক্ষ পেরিয়ে পেছনের কক্ষে যেতে হয়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ব্যাংক চলাকালে ভল্টরুমে তারা প্রবেশ করেছিলেন। তারা জানান, সে সময় ভল্টের দু’টি কক্ষের মধ্যে পেছনের কক্ষটিতে ৬টি স্টিলের আলমারির বাইরে টেবিলের ওপর উন্মুক্ত অবস্থায় ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রার রাখা ছিল। এরপর নির্ধারিত সাপ্তাহিক ছুটির কারণে শুক্র ও শনিবার ব্যাংক বন্ধ ছিল। গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসের শুরুতে ভল্ট খুলে দু’টি কক্ষের সামনেরটিতে তারা কাজ করেন। বেলা আড়াইটায় তালাবদ্ধ পেছনের কক্ষটি খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। সে সময় টেবিলের ওপর রাখা টাকা দেখতে না পেয়ে এবং কক্ষের মেঝেতে গর্ত দেখতে পেয়ে টাকা লুট হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন। দুর্বৃত্তরা স্টিলের আলমারির লক ভাঙারও চেষ্টা করেছিল বলে তারা জানান। বিষয়টি সদর মডেল থানার ওসিকে অবহিত করার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।

এদিকে ঘটনাটি জানার পরপরই রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও সিআইডি তদন্তে নামে। ভল্টরুমের সুড়ঙ্গপথ ধরে তারা পাশের একটি টিনশেড বাসায় সুড়ঙ্গপথের উৎসমুখ আবিষ্কার করে। ওই সুড়ঙ্গপথের মাধ্যমেই ভল্টরুম থেকে লুট করা টাকা সরানো হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। সুড়ঙ্গপথের বর্ণনা দিতে গিয়ে সদর থানার এসআই শফিকুল ইসলাম জানান, সুড়ঙ্গপথটি খুব কৌশলে তৈরি করা হয়েছে। প্রায় ১৮ ফুট দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথটি যেন ভেঙে না পড়ে সে জন্য সুড়ঙ্গের দু’পাশের পাড়ে বাঁশের খুঁটি দেয়া হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৩ ফুট উঁচু ও ৩ ফুট প্রস্থ সুড়ঙ্গপথ ধরে একজন ব্যক্তি অনায়াসেই চলাচল করতে পারবেন।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুড়ঙ্গপথের উৎসমুখটি যে টিনশেড বাসার একটি কক্ষে পাওয়া গেছে সে বাসাটির মালিক আমিনুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। তিনি বেশ কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। বর্তমানে ওই বাসার মালিক তার মেয়ে মিনা আক্তার। তিনি ঢাকার উত্তরায় ১২ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর রোডের ৫৩নং বাসায় স্বামীর সঙ্গে বসবাস করেন। মিনা আক্তার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা এবং তার স্বামী মো. ইব্রাহীম উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। ঢাকায় বসবাসকারী মিনা আক্তারের মালিকানাধীন ওই বাসায় বর্তমানে ১১টি পরিবার ভাড়ায় রয়েছেন। বাসার যে রুমে সুড়ঙ্গপথটির উৎসমুখ পাওয়া গেছে সে বাসার ১নং রুমে সোহেল নামে ৩২-৩৩ বছর বয়সী যুবক ভাড়া থাকতেন বলে জানান বাসার ৩নং রুমের ভাড়াটিয়া মার্জিয়া আক্তার। মার্জিয়া জানান, প্রায় আড়াই বছর আগে সোহেল বাসার ওই রুমটি ভাড়া নিলেও অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে তার তেমন কোন সম্পর্ক ছিল না। সে একাকী ওই রুমে বসবাস করতো। তার বাবা ঢাকায় সোনালী ব্যাংকের কোন এক শাখায় চাকরি করেন বলে তারা শুনেছেন। তার বাড়ি হোসেনপুরের চরপুমদি এলাকায় হতে পারে বলে তিনি ধারণা দেন। বাসায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে সে সোনালী ব্যাংক গলির দিকের দরজা ব্যবহার করতো বলেও তিনি জানান।
ওই বাসার মালিক মিনা আক্তারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, সেলিম নামে শহরের এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সোহেলকে তার বাড়ির দায়িত্বে থাকা গোকুল বাবু বাসাভাড়া দিয়েছিলেন। সোহেলের বাবার নাম না জানলেও তিনি ঢাকায় সোনালী ব্যাংকের কোন এক শাখায় চাকরি করেন বলে তিনি জানতেন।
এ ঘটনার মূল সন্দিগ্ধ সোহেলের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, দুই রুমবিশিষ্ট বাসার একটি রুমে কাঠের কিছু আসবাবপত্র এলোপাতাড়ি পড়ে রয়েছে। অন্য রুমের অবস্থাও তথৈবচ। সোনালী ব্যাংক ভবনের ভল্টরুম থেকে সবচেয়ে কাছের ওই বাসার দরজা সংলগ্ন পরিত্যক্ত একটি টয়লেটের পাশে খোঁড়া হয়েছে সুড়ঙ্গটি। সুড়ঙ্গের পাশে একটি হাতুড়ি ও কোদাল পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। কোন রুমেই থাকার কোন খাট পাওয়া যায়নি। তবে প্রথম রুমটিতে খাট ছিল বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনার পর পালানোর আগে খাটটি অন্যত্র নিয়ে গেছে সোহেল।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বখাটে টাইপের সোহেল অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে মিশতো না। কয়েক দিন ধরে রাতে তার বাসায় হাতুড়ির শব্দও শোনা গেছে। বিষয়টি নিয়ে কেউ জিজ্ঞেস করলে বাসায় কাঠের কাজ করছেন বলে সে জানাতো। সর্বশেষ শুক্রবার রাতেও বাসায় সোহেলের অবস্থান টের পেয়েছিলেন ২-১ জন প্রতিবেশী ও ভাড়াটিয়া।
এদিকে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের ওই শাখায় দায়িত্বরত কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যাংকেই অবস্থান করছিলেন। এ ছাড়া সোহেলকে বাসা ভাড়া পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতাকারী স্থানীয় ব্যবসায়ী সেলিমকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে জানান সদর সার্কেলের এএসপি মো. শাহেন শাহ। অন্যদিকে ব্যাংকের নিরাপত্তা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী ২ এএসআই ও ৬ কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। পরে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন খান জানান, ভাড়াটিয়া সোহেলসহ একাধিক ব্যক্তি এ কাজে জড়িত থাকতে পারে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের চিহ্নিত করার জন্য পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে।

কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৬ কোটি টাকা লুট by আশরাফুল ইসলাম

গোপন সুড়ঙ্গপথে কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। জেলা শহরের রথখলা এলাকায় ব্যাংকের ওই শাখার পাশের বাসভবনের একটি কক্ষ থেকে সুড়ঙ্গপথ তৈরি করে ব্যাংকের ভল্টরুমে রাখা এ টাকা লুট করা হয়।

উপজেলা নির্বাচন: চ্যালেঞ্জে বড় দু’দল

উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে সরগরম সারা দেশ। মনোনয়ন দাখিল করা প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠে। ভোটযুদ্ধে আছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের নেতারা।
প্রথম ধাপের ৯৮টি উপজেলায় ৬৯২ প্রার্থীর মধ্যে ২৫২ জন আওয়ামী লীগের, ২৩৫ জন বিএনপির ও জামায়াতের ২৬ জন প্রার্থী হয়েছেন। জাতীয় পার্টির বিভক্ত গ্রুপের নেতারা নির্বাচনে অংশ নিলেও দলীয় সমর্থনের বিষয়ে প্রার্থীরা আছেন বিভ্রান্তিতে। এদিকে জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী জোটের প্রার্থীরা। কৌশলে একক প্রার্থী রাখারও চেষ্টা চলছে। বিরোধী জোট এ নির্বাচনে তাদের প্রার্থীদের বিজয়ী করার মাধ্যমে নিজেদের জনসমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট করতে চায়। এজন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সামনে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের নয়া চ্যালেঞ্জ। দলীয় প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তৃণমূলে। প্রত্যেক উপজেলায় দল সমর্থিত একক প্রার্থী ঠিক করতে জেলা নেতাদেরও নির্দেশনা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের নির্দেশ না মেনে কেউ প্রার্থী হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও বলা হয়েছে। যদিও মনোনয়নপত্র দাখিল করা নেতারা প্রত্যেকে নির্বাচন করার জন্য মরিয়া। এক্ষেত্রে বেশির ভাগ উপজেলায়ই ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রার্থী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের একাধিক প্রার্থী থাকলেও অনেকে ক্ষেত্রে রাখা হয়েছে কৌশল হিসেবে। নির্বাচন কমিশন কোন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করলেও যাতে বিকল্প প্রার্থী থাকে সে হিসেবে দল বা জোটের ইঙ্গিতেই একাধিক নেতা প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও এ নির্বাচনের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন। সূত্র জানিয়েছে, প্রার্থী সমর্থন দেয়ার বিষয়ে কেন্দ্র থেকেই আলোচনা হচ্ছে। কেন্দ্রের নির্দেশনায়ই প্রার্থী হয়েছেন নেতারা। এক্ষেত্রে কোন উপজেলায় ১৯ দলের একাধিক প্রার্থী থাকলে সেক্ষেত্রে আলোচনার ভিত্তিতে একক প্রার্থী রাখার চেষ্টা করা হবে। জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দল অংশ না নিলে উপজেলা নির্বাচন ঘিরে প্রধান দুই জোট ও দলের জনপ্রিয়তা ভোটের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে বলে মনে করছেন দলগুলোর নেতারা। আর এটি মাথায় রেখেই তারা উপজেলা নির্বাচনে কাজ করছেন। এদিকে উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে অংশ নিচ্ছে। দলটির পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছিল, দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি করা হবে। কিছু প্রার্থী তা কিনেছেনও। তবে দলীয় বিভক্তি থাকায় প্রার্থীরা আছেন বিভ্রান্তিতে। এ কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়নপত্র কিনেননি। যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচন হিসেবে উপজেলায় দলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন বিক্রির কোন সুযোগ নেই।
গতকাল পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায় বলেন, জাতীয় পার্টি উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বনানীর কার্যালয় থেকে আবেদনপত্র বিক্রি করা হয়েছে। তবে সময় স্বল্পতার কারণে অনেকে দলীয় আবেদন ফরম কিনতে পারেননি। যারা দলীয় মনোনয়ন কিনতে পারেননি তাদের বলা হয়েছে, সরকারি মনোনয়ন যথাসময়ে জমা দিতে। পরে সময় বুঝে পছন্দের প্রার্থীকে দলের সমর্থন জানিয়ে দেয়া হবে। মূলত মনোনয়ন বিক্রিতে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়া এবং মনোনয়ন বাণিজ্য করতেই দলটি এ কৌশল নিয়েছে বলে জানা গেছে। সবকটি উপজেলা নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় পার্টি। আর তাই দলীয় মনোনয়ন ফরমও বিক্রি করেছে। জাপার নীতিনির্ধারকরা মনে করেছিল দলের চেয়ারম্যানের সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া যাবে এই বিবেচনায় অনেক নেতা উপজেলা নির্বাচনে জাপা দলীয় প্রার্থী হয়ে লড়তে ফরম কিনতে যাবেন। কিন্তু তাতেও কোন কাজ হয়নি। বুধবার প্রথম দিনে ২০টি ফরম বিক্রি হলেও বৃহস্পতিবার শেষ দিনসহ দুদিনে মোট কতটি ফরম বিক্রি হয়েছে তা জানায়নি দলের দায়িত্বশীল কোন মহল। দলীয় মনোনয়ন ও কোন ধরনের সাক্ষাৎকার ছাড়াই সরকারি মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে জাপা সমর্থিত প্রার্থীদের। বৃহস্পতিবার জাপা থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। এতে সময় স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে বলা হয়, আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে  যেসব প্রার্থী জাতীয় পার্টির সমর্থন প্রত্যাশা করেন, তাদের সবাইকে যথাসময়ে রিটার্নিং অফিসারের বরাবরে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য দলীয়ভাবে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সময়ের স্বল্পতার কারণে  ১০২টি উপজেলার সমর্থনপ্রত্যাশী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ সম্ভব হলো না। মনোনয়ন জমা দেয়ার পর জাপার জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার করে দলীয় সমর্থন ঘোষণা করা হবে। উপজেলা নির্বাচনে  জাপার সমর্থনে একক প্রার্থী থাকবেন। দলের সমর্থন ব্যতীত দলীয়  কোন প্রার্থীকে উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার জন্য মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ২২ ও ২৩শে জানুয়ারি এরশাদের বনানীর কার্যালয়ে থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়েছে। আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে চেয়ারম্যান প্রার্থীর জন্য তিন হাজার এবং ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীর দুই হাজার টাকা দিতে বলা হয়েছিল হয়েছিল।
এদিকে এককভাবে উপজেলা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর মাধ্যমে কাটিয়ে উঠতে চায় রাজনৈতিক বিপর্যয়। সংগঠিত করতে চায় ছন্নছাড়া নেতাকর্মী সমর্থকদের। যুদ্ধাপরাধ, সন্ত্রাসবাদসহ নানা অভিযোগে কোণঠাসা জামায়াতে ইসলামী। উচ্চ আদালতে নিবন্ধন বাতিল ঘোষণার পর রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়েছে ১৮ দলের শরিক দলটি। ১২ই জানুয়ারি চরম বৈরী নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর পর এই ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের প্রায় সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা আত্মরক্ষায় ব্যস্ত। এ পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্তর উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির নীতিনির্ধারকরা। বিষয়টি স্বীকার করে ঢাকা মহানগর জামায়াতের সক্রিয় সদস্য আতাউর রহমান সরকার বলেন, যে কোন পর্যায়ের নির্বাচনে তাৎক্ষণিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো প্রস্তুতি আমাদের সব সময় থাকে। নির্বাচন কমিশন দুই দফায় ২১৯টি উপজেলার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সম্ভাব্য প্রার্থীদের সবুজ সঙ্কেত দেয়া হয়েছে। প্রার্থীরা স্থানীয় পর্যায়ে যার যার অবস্থান বিবেচনা করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতিমধ্যে কমপক্ষে ২৫টি উপজেলায় একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলের নেতারা। আরও শতাধিক উপজেলায় জামায়াতের গ্রহণযোগ্য প্রার্থী আছেন বলে আতাউর রহমান দাবি করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিরোধী আন্দোলনে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয় জামায়াত। উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে ওই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে চান তারা। সাম্প্রতিক আন্দোলনের কোন সুফল না পেলেও মাঠপর্যায়ে দলের ভিত্তি মজবুত হয়েছে, কর্মী-সমর্থকের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বেড়েছে- এমন ধারণা জামায়াতের। উপজেলা নির্বাচনে এই সহানুভূতি কাজে লাগাতে চান তারা। জামায়াত নেতারা বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণের মাঝে সরকার তথা আওয়ামী লীগের অবস্থান পরিষ্কার বোঝা গেছে। দেশের মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় থাকলে উপজেলা নির্বাচনে সরকার সমর্থক প্রার্থীদের ভরাডুবি হবে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে আড়াই শতাধিক উপজেলায় এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াত। এর মধ্যে ২৫টি উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ১০টি উপজেলায় মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে তারা জয়ী হন। ৫ বছরের পালাবদলের পর জামায়াতের জয়ের পাল্লা আরও ভারি হবে এমন ধারণা তাদের।