Showing posts with label আহমেদ মুনির. Show all posts
Showing posts with label আহমেদ মুনির. Show all posts

Monday, July 27, 2026

একসময় দর্শক আবিষ্কার করেন, দেলুপি আসলে বাংলাদেশ by আহমেদ মুনির

প্রকাশ ২৪ নভেম্বর ২০২৫ঃ ঘটনার শুরু খুলনার পাইকগাছা উপজেলার একটি ইউনিয়নে।নাম দেলুপি। যাত্রাপালার মহড়া চলছিল গ্রামের একটি বাড়িতে। মথুরার মহারাজা উগ্রসেনের রাজ্যে মহা দুর্বিপাক। তার ছেলে যুবরাজ কংসের অত্যাচারে দেশবাসী বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে যাত্রাপালার এক অভিনেতার মুঠোফোন বেজে ওঠে। খবর আসে প্রধানমন্ত্রী ‘সাবিনা’ পালিয়ে গেছেন।

মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের ‘দেলুপি’ সিনেমার গল্প ঠিক এখান থেকে শুরু। একটা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। আর তার প্রায় কাছাকাছি সময়ে দেখা দেওয়া আকস্মিক বন্যায় দেলুপির মানুষ হতভম্ব। শুরু হয় নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আর প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক, এই দুই দুর্যোগ যেভাবে দেলুপির মানুষজন মোকাবিলা করে, সে গল্প নিয়েই এই চলচ্চিত্র।

সিনেমা দেখতে দেখতে একসময় দর্শক আবিষ্কার করেন, দেলুপি আসলে বাংলাদেশ। যে ঘটনাপ্রবাহ দেলুপির কৃষক, জেলে, যাত্রাপালা দলের সদস্য, রাজনীতিবিদ, তরুণদের ছুঁয়ে এগিয়ে চলে, তা পুরো দেশেরই কাহিনি।

দেবেশ রায় তাঁর ‘উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে’ বইয়ে অভিযোগ করেছিলেন, এ দেশের লেখকেরা পাশ্চাত্য গদ্যরীতিতে ভর করে, তাঁদের মননে উপন্যাসের কাঠামো নির্মাণ করেছেন। বাংলার পুঁথি, পালা বা গীতিকার ধারা থেকে সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদি সে ধারায় বাংলা উপন্যাস এগিয়ে যেত তবে নিশ্চয় ভিন্ন কিছু পেতাম আমরা।

চলচ্চিত্র মাধ্যমের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা খাটে। এ দেশের শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রে আমরা তেমন স্বতন্ত্র দেশীয় ভাষা খুঁজে পাই না। সেটা যে থাকতে হবে, তা–ও নয়। কিন্তু ‘দেলুপি’ যেন সেই চেষ্টা করেছে। সেদিক দিয়ে ‘দেলুপি’ বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একটা ঘটনাও হয়ে থাকল।

যাত্রাপালার নাটকীয়তাকে ধরে নতুন নির্মাণের পথে এগিয়েছে এই চলচ্চিত্র। একই সঙ্গে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা থেকেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেনি। লম্বা বেড়িবাঁধ ধরে যাত্রাপালার অভিনেতাদের হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় ইংমার বার্গম্যানের ‘সেভেন্থ সিল’–এর দৃশ্যকে। অথবা ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ও যেন উঠে আসে মিহিরকে বলা পলাশের সংলাপে।

পলাশ যেন বিজন ভট্টাচার্যের কণ্ঠেই মিহিরকে বলতে থাকে, ‘তুই চলে যা।’ দুঃখকে মেনে নেওয়া বাঙালির নিয়তি, ট্র্যাজেডিকে বরণ করে নেওয়াই তার পরমার্থ—এই সংলাপে সেই মনোভাবকে যেন ঠাট্টা করা হলো। কিন্তু তরুণ মিহির এই অমোঘ সত্যকে বদলে দিল।

‘দেলুপি’তে কোনো ভিলেন নেই। কোনো বিদ্বেষ নেই। আছে বিশ্বাস, আছে প্রেম। নতুন কিছু হবে, সেই স্বপ্নের বীজ। যারা বাংলাদেশের বড় পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে আবার আশাহত হয়েছেন, ‘দেলুপি’ তাদের শুশ্রূষা দেবে। এই চলচ্চিত্র আশাবাদের চলচ্চিত্র। সেই আশাবাদ কোনো রাজনৈতিক প্রত্যয় থেকে আসেনি। এসেছে এ দেশের মানুষের প্রতি বিশ্বাস থেকে।

চট্টগ্রামে আমি যখন প্রেক্ষাগৃহে বসে সিনেমাটি দেখছিলাম, তখন দর্শকদের ক্ষণে ক্ষণে হেসে উঠতে, হাততালি দিতে শুনেছি। বিশেষ করে যখন একদিকে কংসের বধ হচ্ছে আর অন্যদিকে একটি যুগলের প্রেম পরিণতি পাচ্ছে। অশুভের পতন আর প্রেমের জয়, এর বাইরে মানুষ আর কী চাইতে পারে। এক দর্শক তো বলে ফেললেন, ‘দেলুপি’ না দেখাটা রীতিমতো অন্যায়।

‘দেলুপি’র দৃশ্য। নির্মাতার সৌজন্যে
‘দেলুপি’র দৃশ্য। নির্মাতার সৌজন্যে

Wednesday, January 15, 2025

গল্প- কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি by আহমেদ মুনির

‘তোমার কোথায় দেশ? কিবা পরমাত্মা-পরিচয়?

তুমি ছোট ঘরে বসে আজীবন পড়াশুনা করো

তোমার সামান্য আয়, তুমি স্ফীতোদর।’

(‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি অন্ধকারে’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

বুকসেলফ …

একবার খুব টানাটানির মধ্যে পড়ে গেলাম। ২০০৯ সালের কথা। সুজলার বয়স তিন আর স্বননের সাত-আট মাস হবে। চট্টগ্রামের যে-দৈনিকটাতে কাজ করতাম সেখানে নিয়মিত বেতন হতো না। বকেয়া পড়ত প্রায়ই। তো সেরকম একটা রাতে পত্রিকার একটা বিজ্ঞাপন দেখিয়ে, দীপ্তির প্রশ্ন,

বই পাঠিয়েছ?

আমি বুঝতে পারিনি প্রথমে। তখন আমার প্রথম কবিতার বইখানা সদ্য প্রকাশিত হয়েছে। কোনো একটি পুরস্কারের জন্য বই পাঠাতে বলছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনে দেখা গেল বই পাঠানোর শেষ তারিখ ছিল সেদিনই।

যে-রুমটায় থাকতাম আমরা সেখানে মেঝেতে আমার বইগুলো একটা বিছানার চাদরের ওপর সত্মূপ করে রাখা। তখন কোনো বুকসেলফ ছিল না। বই পাঠানোর সময়সীমা পার হয়েছে শুনে দীপ্তির দীর্ঘ নিশ্বাস। ছড়ানো-ছিটানো বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, একটা বুকসেলফ তো কিনতে পারতে পুরস্কারের টাকাটা হাতে পেলে।

আশ্চর্য হলাম ওর কথা শুনে। প্রথমত আমি পুরস্কার পেতে পারি এই বিশ্বাস কি করে এলো ওর মধ্যে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চার দুধ কেনার টাকা থাকে না প্রায় সময়, এমন প্রয়োজনের বিষয় না ভেবে বুকসেলফের কথাই তার মাথায় এলো?

পরদিন এক বন্ধুর পরামর্শে যোগাযোগ করলাম পুরস্কারদাতা সংস্থার অফিসে। ওরা বলল, সময় পার হয়ে গেলেও ঈদের ছুটির কারণে অনেকের বই সময়মতো আসেনি। একদিনের মধ্যে পাঠাতে পারলে সেটা গ্রহণ করা হবে।

বই পাঠিয়ে বিষয়টা মাথা থেকে একরকম ফেলে দিয়েছি। অপেক্ষার প্রশ্নই আসে না। কারণ জানতাম, আমি কী লিখি। আর আমার সামনে কেউ বই হাতে নিলে কুঁকড়ে যেতাম সংকোচে। মনে হতো পোশাক পরিনি। ওই পাঠক নেড়েচেড়ে দেখছে আমাকে।

মাসচারেক পর হঠাৎ ফোনে জানানো হলো পুরস্কার পেয়েছি আমি। যার মূল্যমান এক লাখ টাকা।

আলমগীর মিস্ত্রি দেখতে ছোটখাটো হলেও বেশ চটপটে। সাত ফুট বাই আট ফুটের ভিনিয়ার বোর্ড কেটে বানানো বুকসেলফের নকশা দীপ্তি নিজে করেছিল। গত দশ বছরে সেলফটার নিচের অংশের গস্নাসডোরের একটাও অক্ষত নেই। দুবার বাড়ি বদলানোর ধাক্কায় কোথাও কোথাও ওপরের পস্নাস্টিক সরে গিয়ে কাঠের গুঁড়ি বেরিয়ে পড়েছে। পেছনের পায়ার দিকে সামান্য পচনও ধরেছে। বছর কয়েক আগে এক লেখকবন্ধু অটবির শক্তপোক্ত একটা বুকসেলফ উপহার দিয়েছেন। সেটা আসার পর পুরনোটা বহাল হয়েছে বাড়ির নিভৃত কোণে, স্টাডি রুমে আর নতুনটা ড্রয়িংরুমে।

জীর্ণ বুকসেলফটা তবু অনেক আপন মনে হয়। তার কাছে গেলেই একটা অন্যরকম গন্ধ পাই আমি। এই গন্ধটা অনেকটা নতুন কচি বাঁশ, সুগন্ধি তেল আর ন্যাপথালিনের মিশেল বলে মনে হয়। নিউমার্কেটের মোড়ে শুকতারা নামে একটা বইয়ের দোকান ছিল। এখন নেই। সেখানে স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, শিশু, নবারুণ এসব ওলটাতাম। সেখানেই পেয়েছিলাম আলেক্সান্দার বেলায়েভের উভচর মানুষ। সেই বইয়ের ভেতরেও ছিল এমন অদ্ভুত ঘ্রাণ।

এজন্য বুকসেলফটাকে জীবন্ত মনে হয় আমার। জীবন্ত আর স্মৃতিভারাতুর। কত কাহিনি ওর পেটের ভেতর, শরীর জুড়ে। অথচ নতুন বুকসেলফটাকে মনে হয় নিশ্চল আর মৃত। কোনো গন্ধও নেই তার।

পাশে এসে বসো

চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়ঘেরা একটা বাড়িতে থাকি তখন। বাড়িটাও গাছে ঘেরা একটা টিলার ওপরে। সেখানে আমার সকাল হতো বেলা দশটায়। তার আগে ঘুম ভাঙতো কদাচিৎ। লেখাপড়া, ক্লাস করার কোনো বালাই নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম মাঝে কালেভদ্রে। বন্ধু রোজাউল করিম সুমন নিয়মিতই আসত তখন। মাঝে মাঝে আমার ঘুম ভাঙার আগে। খবর পেয়ে এসে দেখতাম বারান্দায় বসে একমনে স্কেচ খাতা খুলে উবু হয়ে বসা কুকুরটার ছবি আঁকছে।

দুপুরের কিছু আগে আমরা বেরিয়ে পড়তাম। গন্তব্য জলসা মার্কেটের পুরনো বইয়ের দোকানগুলো, বিশেষত অমর বইঘর। সেখান থেকে কবি জ্যোতির্ময় নন্দীর রহমতগঞ্জের বাসায় কিংবা লালখান বাজারের বাগঘোনার আরেক বন্ধুর বাড়িতে। মাঝে মাঝে প্রয়াত লেখক অধ্যাপক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের বাসায়ও যাওয়া হতো। জ্যোতিদার বাড়িতে আমরা অনাহূতই ছিলাম। খুব বিরক্ত হতেন। বলতেন, আপনাদের আর কোনো কাজ নাই? কবিতা একটা লিখেই শোনানোর জন্য এখানে ছুটে আসতে হবে? তবু আমরা ছিলাম নাছোড়বান্দা। আসলে ভীষণ রকমের স্নেহই করতেন আমাদের। কয়েকদিন না গেলে জানতে চাইতেন কেন আসিনি।

নিপাট ভালোমানুষ বউদি আমাদের সাহিত্য আলোচনার কাছে ঘেঁষতেন না। চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে তাঁর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন আবার। একবার জ্যোতিদার বাসায় গিয়ে শুনলাম, তিনি নেই। বউদি বললেন, আপনাদের দাদা শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। আপনারাও তাড়াতাড়ি যান। নন্দনকাননের ফুলকিতে ওরা বসেছেন।

বুঝলাম সাহিত্যের আলোচনায় যোগ না দিলেও শঙ্খ ঘোষ যে আমাদের প্রিয় কবি এ-কথাটা বউদির কানে ঠিকই পৌঁছেছে। না হয় এমন উত্তেজিত হয়ে কেন খবরটা দেবেন তিনি।

তখনো জ্যোতিদা আর ওমর কায়সার ছাড়া চট্টগ্রামের কবিদের তেমন কারো সঙ্গে আলাপ-পরিচয় নেই। আবুল মোমেন, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, শাহিদ আনোয়ার, শেলিনা শেলী এদের দূর থেকে চিনি। ততোদিনে তাঁদের অনেকের কবিতাই পড়া হয়েছে। একটা মুগ্ধতাও ছিল। তবে সাহস করে কথা বলা হয়নি। এদের আসরেই শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে চলছিল সাহিত্য-আড্ডা। সেখানে কোন পরিচয়ে হাজির হই? কেমন কুণ্ঠিত ছিলাম মনে মনে। সালটা ১৯৯৮ হবে। তারিখ মনে নেই। শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে এক বন্ধুর কাছ থেকে একটা ছোট অডিও রেকর্ডার জোগাড় করে নিয়েছিল সুমন। আসরের মাঝামাঝি তখন, সবাই গোল হয়ে বসেছেন। তাঁদের মাঝে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি আর মোজা পরা শঙ্খ ঘোষ। ভূত দেখার মতো সবার দৃষ্টি আমাদের দিকে নিবদ্ধ। এমনকি শঙ্খ ঘোষেরও। তবে সেখানে উপস্থিত জ্যোতিদা আর আসর পরিচালনা করছিলেন যিনি, কবি ওমর কায়সার তাঁদের দেখেই সাহস পেলাম। ভেতরে ঢুকে বসে পড়লাম এক কোণে। সস্নেহে কায়সারভাই বললেন, এখানে সবাই কবিতা পড়েছে। এরপর শঙ্খ ঘোষ পড়বেন। তোমরা কি কবিতা নিয়ে এসেছো? আমি দুপাশে মাথা নেড়ে জানালাম, না, পড়ব না। কিন্তু সুমন আসরের সবার সামনে জানিয়ে দিলো সদ্য লেখা একটা কবিতা পকেটে আছে আমার। আসলে সেটা পকেটে করে নিয়ে বের হয়েছিলাম জ্যোতিদাকে শোনানোর জন্য। ওমর কায়সার সে-কথা শুনে ঘোষণা দিলেন, এখন আহমেদ মুনির কবিতা পড়বে।

আমার সারাশরীর কাঁপছে ভয়ে, লজ্জায়। ভাঁজ করা কাগজটা বের করতে করতে বলেছিলাম, দুর্ভাগ্য যে, একটা কবিতা পকেটে ছিল। সেই কবিতাখানা তুলে দিলাম এখানে –

‘ধূসর সন্ধ্যায় বাইরে আসি

বাতাসে ফুলের গন্ধ;

বাতাসে ফুলের গন্ধ;

আর কিসের হাহাকার।’

এই সমস্ত কিছুকেই আমি বলেছি ভাবালুতা

এবং অসময়ের বর্ষণও আমার আবেগকে

এখন আর জাগাতে পারছে না।

এখন আমি সকালকে বলছি সকাল

বিকেলকে বিকেল

আর সন্ধ্যাকে বলেছি কেবলমাত্র সন্ধ্যা।

বস্ত্তত এখন আমি এক প্রকার বর্ণান্ধ।

তবু এই বিকেলে আমাকে বেরোতে হলো

সমুদ্রের নোনা বাতাসের ঝাপটের মধ্যে,

জল আর জলের সবরকম তরলতার ভিতরে

ডুবে যেতে যেতে একটি উজ্জ্বল মাছ

কেবল প্রাণ পেল

অথবা বেরিয়ে এল কঠিন আড়াল থেকে;

তবু সেই বাড়িটার সামনে

আমার পদক্ষেপ কেমন টলোমলো হলো;

আর বাতাসে কিসের যেন হাহাকার

সবরকম ফুলের গন্ধকে ছাপিয়ে !

(‘ক্রমাগত ধূসর সন্ধ্যা’, আমি ও বাঘারু)

পাঠ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আমার কাঁপুনি থামছিল না। হঠাৎ শুনতে পেলাম শঙ্খ ঘোষ বলছেন, আমারও দুর্ভাগ্য যে তোমার পকেটে একটা কবিতাই ছিল, আর শোনা হলো না। তুমি আমার পাশে এসে বসো।

নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছিল না। আসরভর্তি মানুষের চোখ আমার দিকে। চোখের পানি লুকাতে চেষ্টা করছি প্রাণপণ। কিন্তু সহজ করে দিলেন শঙ্খ ঘোষ। তাঁর পাশে বসতেই বললেন, তুমি বাছাই করে দাও আমি পড়ি। আমি তাঁর বই থেকে এক-এক করে নিজের পছন্দের কবিতা উলটে সামনে এগিয়ে দিতে থাকলাম, আর তিনি পড়তে লাগলেন। পাশে এই সব যন্ত্রে ধারণ করছিল বন্ধু সুমন। বারোটি কবিতার সেই রেকর্ডটি পরে কবিকন্যা সেবমত্মী ঘোষ অর্থাৎ টিয়াদিকেও পাঠানো হয়েছিল। সেই আসরে উপস্থিত টিয়াদি পরে বলেছিলেন, তাঁকে তখন পিএইচ.ডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে হচ্ছিল। প্রবাসে বাবার কণ্ঠ শুনবেন বলে কিছু কবিতা রেকর্ড করে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ তাতে রাজি ছিলেন না। বলেছিলেন, যন্ত্রে স্বস্তি পান না তিনি (অবশ্য পরে সংখ্যায় নগণ্য হলেও তাঁর ধারণ করা কবিতা খুঁজে পেয়েছি নানা জায়গায়)। অথচ এখানে কি অবলীলায় যন্ত্রে কবিতা ধারণের সম্মতি দিলেন!

আজ এতোকাল পর সেই সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে। অচেনা এক বালকের প্রায় না হয়ে ওঠা, কাঁচা কবিতার এমন প্রশংসা করা আর তাকে পাশে ডেকে নিয়ে বসানোর মধ্যে কেবল একটা প্রশ্রয়ই ছিল বলে মনে হয়। তরুণটি কবিতা লিখছে, আর সেই লেখার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে, কুণ্ঠা আছে, এটা বুঝতে পেরেছিলেন হয়তো। আর সেটা দূর করতেই তাঁর এই প্রচেষ্টা? ভাবতে গেলে আজো শঙ্খ ঘোষের প্রতি ভালোবাসায় মন আচ্ছন্ন হয়ে আসে।

শব্দ করে হাসো, যত পারো আজ বাঁচো

শোকের আপেল থেকে মুক্ত হও নরম খোসার মতো

মমতা-মাখানো ধান রুয়েছি মাটিতে

যাও তার ঘ্রাণ নিয়ে এসো।

এই নাও শেষ মদ, শস্যের সোনালি স্বেদ

জীবনের সাদা ফেনা, আশা ও শান্তির গাঢ় জল

প্রশান্ত স্নেহের জলে ডুবে আছে কালো এই পাড়া

যদি দুঃখ পেয়ে থাকো অচেনা পথের বাঁকে

দ্যাখো ধুলোলীন ঘাস, সহজ করুণ আমাদের ঘর।

(‘চাকমা বুড়োটা যা বলেছিল’, আমি ও বাঘারু)

২০০১ সালের দিকে একটা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে বছরখানেক রাঙামাটিতে কেটেছিল। শহরের রাজবাড়ি এলাকার কে কে রায় রোডের একটা বাড়িতে আরো চার চাকমা তরুণের সঙ্গে আমার নতুন সংসার। সে-বাড়ির বাসিন্দাদের একজন নন্দ চাকমার বাড়ি শুভলংয়ের কাছের একটা গ্রাম হাজাছড়ায়। নন্দর নিমন্ত্রণে একবার যাওয়া হয়েছিল ছবির মতো সুন্দর গ্রামটিতে।

শহরের রিজার্ভ বাজার ঘাট থেকে লঞ্চে শুভলং, সেখান থেকে ভাড়া নৌকায় হাজাছড়া। গ্রাম বলতে যে সহজ-সরল ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, হাজাছড়া সেরকম নয় মোটেও। কাপ্তাই হ্রদের মাঝে জলমগ্ন শান্ত এক গ্রাম। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি একেকটা টিলার ওপর। সেই টিলা আবার ডুবে আছে হ্রদের জলে। যেন অসংখ্য দ্বীপের একটা মালা। সেরকমই একটা টিলার সামনে এসে থামল আমাদের নৌকা। মূল বাড়ির আগে নৌকা ভেড়ার ঘাট, সেই ঘাট সংলগ্ন সেগুনবাগানের একটা অংশ হ্রদের জলে নিচু হয়ে মিশে গেছে। নৌকা থেকে নেমে, নন্দদা পথটা দেখিয়ে দিলেন,

সেগুনবাগানের ভেতর দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ, এই পথে সোজা গেলেই বাড়ি। আপনি দেখতে দেখতে আসেন, আমি বাড়ি গিয়ে খবর দিয়ে আসি।

টিলায় উঠতেই অপূর্ব দৃশ্য। সামনের নীল হ্রদের জলে ঝুঁকে পড়া সেগুনবাগানের টলটলে প্রতিবিম্ব। জলের ওপর ওঠা ঘূর্ণি বাতাস ক্ষণে ক্ষণে তাকে ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। ঢেউ শান্ত হয়ে এলে সেটা আবার ভরে উঠছে আগের চেয়ে স্পষ্ট চেহারা নিয়ে। কোথাও কোনো গাছের ডাল থেকে ডেকে উঠছে একটা কোকিল। একবার ডাকতেই তার প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যেতে সময় নিচ্ছে বেশ কয়েক মিনিট। বাতাসে ঘাস আর পাহাড়ি লতার অতিপরিচিত মিষ্টি ঘ্রাণ।

এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ল বাগানের প্রান্তে হ্রদের তীর ঘেঁষে একটা ছোট্ট মাচান ঘর। কাছে যেতেই দেখলাম, মাচানের দাওয়ায় দা-হাতে বাঁশের কঞ্চি কাটছে এক চাকমাবুড়ো। চোখাচোখি হতেই তিনি ইশারায় ডাকলেন। হাত ধরে মাচাঙে উঠে বসতে সাহায্য করলেন।

বুড়োর চোখে-মুখে হাসির ছটা। কথা বলে জানলাম, নন্দদার সেগুনবাগানের পাহারাদার তিনি। বাগানের পরিচর্যা করেন। জুমে আবাদ করে আর মাছ ধরে বেশ ভালোই কেটে যায় একার জীবন।

কথা বলতে বলতে ঘোলাটে এক গস্নাস পানীয় এগিয়ে দিলেন।

বললেন, ডাবের জল। বলেই আকর্ণবিসত্মৃত হাসি। তবে আমি যে বুঝতে পেরেছি এটা ডাবের জল নয়, তা বুঝতে দিইনি তাঁকে। বেশ ভালো এক চোয়ানি ছিল সেটা। একে তো নীরব, নিস্তব্ধ উদার
প্রকৃতি তার ওপর এমন উৎকৃষ্ট পানীয় – আমাকে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। চাকমা বুড়ো তখনো পর্যন্ত আমার নাম জানতে চায়নি। নন্দর সঙ্গে এসেছি এটুকু জেনেই আলাপ জমায়।

আমাদের কথোপকথন পুরোটা মনে নেই। তবে যা মনে আছে তুলে দিচ্ছি –

আপনার ডাবের পানি তো বেশ ভালো!

হা হা, হ্যাঁ নিজে বানাইসি। আমার শ্বশুর এসে বেশির ভাগ

খেয়ে ফেলসে।

বউ কই আপনার?

সে মারা গেসে দশ বছর।

তারপরও শ্বশুর আসে এখানে?

হা হা, আসে, ডাবের পানি খাইতে আসে।

আপনি চট্টগ্রাম গেছেন কখনো?

আমি রাঙ্গামাটিও যাই নাই কখনো।

বলেন কি কেন যান নাই?

হুই দূরে, কি কামে যাব? কোনো কাম নাই সেখানে।

আপনার একা থাকতে ভয় লাগে না?

ভয়? ভয় কেন লাগবে, কোনো ভয় লাগে না।

আপনার জীবনে কোনো সমস্যা নাই?

কি নাই?

সমস্যা, সমস্যা।

মাচানের ওপর দাবা (হুঁকো) টানতে টানতে কয়েকজন বাগানি আমাদের কথা শুনছিল। তাদেরই একজন সমস্যার অর্থটা বুড়োকে বুঝিয়ে বললো।

বুড়ো উত্তর দিলো,

আছে আছে, একটা অসুবিধা আসে। এখানে রাতের বেলা দেওতারা দিস্টাব (বিরক্ত) করে।

দেওতা মানে ভূত?

আমাদের মধ্যে যারা মারা যায় তারা আর কী, আশপাশেই থাকে। রাতের বেলায় মাছ ধরতে গেলে মশাল তেনে (টেনে) ধরে পানিতে দুবিয়ে (ডুবিয়ে) নিভিয়ে দেয়। ক্ষতি করে না। খেলে আর কি আমার সঙ্গে।

এটা ছাড়া অন্য কোনো অসুবিধা নাই জীবনে?

বুড়ো হাসে, হা হা হা। কেন থাকবে?

হাসি সংক্রামক। আমি আর মাচাঙে বসা পাঁচ-ছয়জন বাগানিও তাতে যোগ দিই। একজন লম্বা বাঁশের দাবা এগিয়ে দেয় টানার জন্য। তার আগে শিখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কীভাবে টানতে হবে। আমি সেই মতো টানার চেষ্টা করি। প্রথম বারে ধোঁয়া বের হয় না। এবার ফুসফুসে দম নিয়ে আবার চেষ্টা। জোরে টান। ধোঁয়ায় মুখ ভরে যায়। কড়া তামাকে প্রচ- কাশির দমক ওঠে। আমি কাশতে থাকি আর দাওয়ায় বুড়ো আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে পড়ে। আমার কাশির দমক যত বাড়ে তাদের আছাড়ি-পিছাড়ি হাসিও তত বাঁধভাঙা হয়ে ওঠে।

Tuesday, September 15, 2020

গল্প- রোহিঙ্গা জাতক by আহমেদ মুনির

কোনো এক বর্ষণমুখর সকাল। শ্রাবন্তী নগরে ঋষি আনন্দের আশ্রমে তরুণ শ্রমণদের ভিড় ঠেলে একজন আগন্তুক সামনে এগিয়ে যেতে চাইল। তার পিঠে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা সোলার প্যানেল, এক হাতে আরএফএল কোম্পানির একটা বালতি, তার ভেতরে কাপড়ে জড়ানো একটা রাজহাঁস। হাঁসটা ভাঙা গলায় গাঁক গাঁক করে উপস্থিতি জানান দিলে আনন্দ ধ্যান ভেঙে তাকান। চোখের ইশারায় শ্রমণদের পথ করে দিতে নির্দেশ দেন তিনি। শ্রমণদের মাঝ দিয়ে যুবকটি এগিয়ে যায়। আনন্দের সামনে এসে দাঁড়ায়।

হাত জোড়া করে সে বলে, ‘হে মহান ঋষি, আঁর নাম মহম্মদ রশিদ, বাড়ি হাসুরাতা গ্রাম, জিলা মংডু, রাখাইন প্রদেশ, বার্মা। মঘেরা আঁর ঘর পোড়া দিয়ে, বউরে লই গিয়ে, ফোয়ারে খাডি ফালাইয়ে, অনে বিচার গরণ…’

আনন্দ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। অত্যাচারিতের এমন নিস্পৃহ বিবরণে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। এই যুবকের সন্তান, স্ত্রী, ঘর – সবই শেষ কিন্তু শোকসন্তপ্ত বা ক্রোধান্বিত হওয়ার মতো মানসিক শক্তিও যেন তার অবশিষ্ট নেই।

তিনি যুবকের মাথায় হাত রাখেন, তাকে বুকে টেনে নেন। পাশে বসিয়ে প্রশ্ন করেন, এমন ঘটনা আর কতজনের সঙ্গে হয়েছে? যুবক আঙুল তুলে দূরের এক ঢেউয়ের দিকে ইশারা করে। এই শুষ্ক প্রান্তরে এমন ঢেউ কখনো কেউ দেখেনি। মহাসাগরের ঢেউয়ের চেয়েও প্রচণ্ড আর প্রকা- এক মানবঢেউ। তাদের প্রত্যেকের হাতে প্লাস্টিকের বালতি, টিনের স্যুটকেস কিংবা কাপড়ের পুঁটলি। না, খালি হাতে কেউ আসেনি। জীবন থেকে কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে আসতে পেরেছে তারা বেঁচে থাকার চিহ্নস্বরূপ।

সাগরের গর্জনের মতো সবার মুখে একই কথা।

ঘর ফোড়া দিয়ে, খাডি ফালাইয়ে, গুলি মারি দিয়ে…’

আনন্দ দাঁড়িয়ে রইলেন সেই জনস্রোতের সামনে, তাঁর বুকে অসহ্য যন্ত্রণা, কিন্তু মুখ দিয়ে কথা সরছে না। কী বলে তিনি শুশ্রূষা দেবেন তাদের। কয়েক সহস্র বছর কেটে যাবে প্রত্যেক মানুষের ক্ষত সারাতে। তবু আনন্দ এগিয়ে গেলেন, আহত মানুষগুলোর মধ্য দিয়ে শুরু হলো তাঁর পথচলা। এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত ছুঁয়েছে সারিবদ্ধ মানুষেরা। যার শুরু নেই, শেষও নেই।

---দুই---

কক্সবাজার লিংক রোড পার হয়ে টেকনাফের রাস্তায় গাড়ি উঠেই দুবার হোঁচট খেয়ে থেমে গেছে। সামনের চাকাটা পাংচার হয়েছে। গাড়ি থেমে যেতেই আনন্দের ভাবনায় ছেদ পড়ল।

যেখানে গাড়িটা খারাপ হয়েছে সেখান থেকে উখিয়া সদর সাত থেকে আট কিলোমিটার। বিরান জায়গাটার দুপাশে বিল। দূরে আবছামতো ঘরবাড়ি জেগে আছে। লিভার লাগিয়ে গাড়িটার ডানপাশ উঁচু করা হয়েছে। দু-একজন ছাড়া সব যাত্রীই নেমে এসেছে। অনেকের ঠোঁটে সিগারেট জ্বলছে। পাশের একজন এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, আপনে ত্রাণ দিতে আসছেন?

আনন্দ দুপাশে মাথা নাড়ল, না।

তবে?

দেখতে।

লোকটা যেন এ-কথায় সন্তুষ্ট হলো না।

কী করেন?

কিছু না, তেমন কিছু না।

ও, সাংবাদিক, রিপোর্ট করবেন, তাই বলেন…

লোকটা আবিষ্কারের আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। তবে আনন্দ তাঁর উৎসাহে আবারো পানি ঢেলে দিয়ে বলে, রিপোর্ট করতে নয়, দেখতে। কেবলই দেখতে।

আনন্দ যে আসলেই নিউজ কাভার করতে কিংবা ত্রাণ দিতে আসেনি এটা আশপাশের মানুষকে বোঝানোর তেমন গরজ অনুভব করে না। সময় পরিভ্রমণ করে এতদূর এসেছে সে কেবল সত্য জানার জন্য।

আধঘণ্টার মধ্যে চাকা লেগে গেল। ভোরের নরম আলো মাড়িয়ে গাড়ি চলতে লাগল টেকনাফের দিকে। দুপাশে ছোট ছোট টিলা। তার পুরোটাই ঢেকে আছে পলিথিনের তাঁবুতে। এক ইঞ্চি পরিমাণ খালি জায়গা নেই কোথাও। হালকা বৃষ্টির মধ্যে ভিজে যাচ্ছে তাঁবুগুলো। পলিথিন পুড়িয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে এক জায়গায়, সেই আগুনের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে এক কিশোরী। চোখ বন্ধ হয়ে আসে তার। এই দৃশ্য দেখা সম্ভব নয়। চোখ খুলে সে আরো দূরে তাকাতে চেষ্টা করে। রাস্তার ওপর পাশে টেকনাফ রিজার্ভ ফরেস্টের পাহাড়সারির দিকে চোখ যায়। চোখের শুশ্রূষা হয়। এবার বাঁয়ে আর ক্যাম্পগুলো চোখে পড়ছে না। কেবল দু-এক জায়গায় বিচ্ছিন্ন কিছু বসতি, কয়েকটা সাইনবোর্ড, ইউএনএইচসিআর, ফাও, আশা এসব সংস্থার।

সড়কের পাশ দিয়ে রিলিফের বস্তা মাথায় নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। তাদের চোখ-মুখে ত্রস্ত ভাব নেই। বরং একটা রুটিন কাজের ভঙ্গি যেন ফুটে ওঠে।

বাঁদিকে হঠাৎই এসে পড়ে নাফ নদ। তার নীল জলরাশির ওপারে মেঘসমান উঁচু পাহাড়। সেখানে মেঘ আর আগুনের ধোঁয়া দুইয়ের রংই সাদা।

----তিন----

ঋষি আনন্দ এখন নিজেকে যেখানে হাজির করেছেন, সেখানে তাঁর নাম পালটায়নি বটে কিন্তু ঠিকুজি, কুলজি, বংশপরিচয় – সব বদলে গেছে। এখানে তাঁর দাদার নাম নতুন করে পড়তে হবে হাজি আসমত উল্লাহ। আর তাঁর দাদার বাবা শরিয়ত উল্লাহ সওদাগর। শরিয়ত উল্লাহ সওদাগর রেঙ্গুনে আরেকটা বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন। সে ব্রিটিশ আমলের কথা। সতেরো বছরের তরুণী স্ত্রী ফুলবানু আর এক মাসের শিশুসন্তানকে ঘরে রেখে এক বর্ষণমুখর সকালে চাক্তাইঘাট থেকে নৌকায় উঠে রেঙ্গুন পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। এরপর আর কখনো বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। পরিবারের সবাই সওদাগরের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করে একসময় হাল ছেড়ে দিয়েছিল। কেবল ফুলবানু তার ছেলে আসমত উল্লাহর বেয়াড়াপনায় লাগাম টানতে গিয়ে প্রায় সময় বলত, ‘তোর বাফে আইলে ব্যাক খইউম, ফিডর সাল তুলি ফালাইব, বুঝিবি মজা।’

কিন্তু পিঠের ছাল-চামড়া তোলার জন্য শরিয়ত উল্লাহ আর কখনো এমুখো হননি। আসমত শুনেছে এক মগ নারী নাকি তাঁর বাবাকে জাদু করে রেখেছে। বাড়ির নাম-ঠিকানাও ভুলে বসে আছে লোকটি। রেঙ্গুন কি আকিয়াব নিয়মিত যাতায়াত করেন এমনসব লোকজন তাঁর বাবাকে দেখেছে। কিন্তু শরিয়ত তাদের সঙ্গে খুব একটা আলাপ-সালাপে যায়নি। সওদাগরদের বর্মি স্ত্রী থাকবে সেটা দোষের কিছু নয়। লোকে বলে নৌকার সঙ্গে নৌকা জোড়া দিয়ে টেকনাফ থেকে মংডু যাতায়াত করা যত সহজ তার চেয়ে সহজ বার্মায় আরেকটা সংসার করা। কিন্তু তাই বলে বাড়ির কথা ভুলে যেতে হবে?

হাজি আসমত উল্লাহর বাবা শরিয়ত উল্লাহ সওদাগরকে একসময় সবাই ভুলে গিয়েছিল। এখানকার লোকজনের রেঙ্গুন যাওয়া-আসাও তখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবু গ্রামের বাজারে যখন আসর জমিয়ে কেউ গাইত, ‘বানুরে, কী? ও বানু, কী, কী, কী? আই যাইয়ুম রেঙ্গুন শহর তোর লাই আইন্নুম কী?’ তখন আসমত উল্লাহর মনে হতো, তাঁর মা ফুলবানুকে নিয়ে সস্তা রসিকতা করতেই কেউ এমন গান বেঁধেছে।

আসমত উল্লাহ তবু ফিরিঙ্গিবাজারে বার্মা-রাজুর হোটেলে বসে সেই গান শুনত আর ভাবত শরিয়ত উল্লাহর বর্মি ছেলেরা দেখতে কি তার মতোই হয়েছে? তাদের নাক হয়তো একটু চাপা, গায়ের রং হলুদে কমলায় মাখানো। সেই বর্মি ভাইদের জন্য মন উচাটন হয়ে উঠত তাঁর। হোটেলবয় এসে তাঁর চিন্তায় ছেদ ঘটাত। ‘আজিয়া কি দিউম চাচা? খৈতরের রোস্ট খাইবা না?’ হোটেল বালকের কথায় অনিচ্ছায় সায় দিতে হতো তাকে। প্লেটভর্তি কবুতরের রোস্ট নিয়ে উদাস হয়ে বসে থাকত সে। মাঝে মাঝে ছিঁড়ে ছিঁড়ে দু-এক টুকরো মুখে পুরত।

ষাটের দশকে নে উইন যখন বাঙালি তাড়ানো শুরু করল, তখন আসমত আশায় বুক বেঁধেছিল। ভেবেছিল বৃদ্ধ বাবা হয়তো এবার দেশে ফিরবেন। কিন্তু এককাপড়ে অনেক বাঙালি সওদাগর ব্যবসাপাতি-দোকান আর ঘর ফেলে চলে এলেও শরিয়ত উল্লাহ আসেননি। এদেশের চেয়ে তিনগুণ বড় দেশটাকে নিজের দেশ মনে করে থেকে গিয়েছিলেন।

----চার----

শরিয়ত উল্লাহর এভাবে হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি আনন্দ শুনেছিল তার দাদি বিলকিস বেগমের কাছ থেকে। ছোটবেলায় বেশ কিছুদিন ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রেলওয়ে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল আনন্দকে। বাবা কামাল উদ্দিন রেলওয়ে হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন বলে সিআরবিতে তাদের কোয়ার্টারের পাশের হাসপাতালেই তাকে ভর্তি করা হয়েছিল। ফেলসিফেরাম ম্যালেরিয়ায় জীবনহানির আশঙ্কা থেকেও তখন বড় হয়ে উঠেছিল কুইনাইনের তেতো অবসাদ আর দুর্বলতা। সে-সময় দাদি বিলকিস ছিলেন তার সঙ্গী। দাদির গল্পে সেই তেতো ভাব আর অবসাদ থেকে মুক্তি মিলত। বার্লি আর সাগুদানা মুখে তুলে দিতে দিতে দাদি গল্প বলতেন। স্বামী আসমত উল্লাহ আর তাঁর শ্বশুর শরিয়ত উল্লাহর গল্প। দুজনের একজনকেও দেখেনি আনন্দ। তবু শুনে শুনে আনন্দের মনে হতো আসমত উল্লাহ রোগা-পাতলা আর রুক্ষ মেজাজের মানুষ। তবে শরিয়ত উল্লাহর পেটানো শক্তপোক্ত শরীর, লম্বা দাঁড়ি নেমে এসেছে বুক পর্যন্ত।

শরিয়ত উল্লাহ কেন বার্মাতেই থেকে গেল দাদির কাছে সে-প্রশ্ন করেও কোনো উত্তর পায়নি সে। দাদি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলতেন, হয়তো লোকের কথাই ঠিক, বর্মি মেয়েরা বান-টোনা জানে। আসলে শরিয়ত উল্লাহর বংশেই নাকি এমন ধারা চলেছে। তার দাদাও নাকি বার্মা গিয়ে আর ফিরে আসেনি।

হাসপাতালের কেবিনের জানালা দিয়ে কাঠবাদাম গাছের কচি লাল পাতার দিকে তাকিয়ে দাদি বলে যান, সেই শাহ সুজার বার্মা যাওয়ার আগে থেকে তার পরদাদা, পরদাদার পরদাদাও নাকি বার্মা যেত-আসত। সে রাজা নরমিখলার আমল থেকে। দাদি সুর করে বলতেন :

কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী

রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী

‘সেই রোসাঙ্গ, জিন-পরিদের রাজ্য আছিল। সে বরাবরই মায়া নগর। এক হাতে মাইনষেরে ডাকে, অইন্য হাতে নিষেধ করে। কিন্তু যেবার জাপান-ব্রিটিশ যুদ্ধ লাগল, সেবার যে হাতে ডাকে, সেই হাতটা ভাইঙা গেল জাপানিগো বোমায়। আরাকানের সামনে গভীর সাগরে সেই মূর্তিআছে। এরপর থেইকা খালি মানা করে। রোসাঙ্গে যাওয়ার বিষয়ে

সবাইরে নিষেধ করে। কিন্তু লোকে তবু যায়। যেখানে নিষেধ, সেখানে যাওয়াই তো মাইনষের নিশা, কী কও ভাই!’

সেই চাঁদপুরের লদুয়া গ্রাম থেকে তেরো বছর বয়সে চট্টগ্রামে এসেও দাদি চট্টগ্রামের বুলি রপ্ত করেননি। দাদা নাকি তাঁকে ঠাট্টা করে বলত দারাইল্যা। দাদি বলতেন, ‘চট্টগ্রাম আসলে আরাকানের মইধ্যে আছিল। চাঁটগাইয়াদের আমরা তাই মগ বলতাম। তাদের বউ-ঝিরাও আরাকানিদের মতো থামি-ব্লাউজ পরত। আর আমরা পরতাম শাড়ি।’

----পাঁচ---

টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডে সকাল ছয়টায় নেমে কোথাও এক কাপ চা পেল না। এত সকালে চায়ের ঝাঁপি খোলে না এখানে। যেখানে বাস দাঁড়িয়েছে তার পাশেই একটা পান-সিগারেটের দোকান। সিগারেট কিনে ধরিয়ে একটা টান দিতেই দেখল কয়েকজন তরম্নণ দলবেঁধে সামনের দিকে যাচ্ছে। তাদের একজন তারই বাসের যাত্রী। চিনতে পেরে এগিয়ে এলো তরুণটি। যে-পথ দিয়ে রোহিঙ্গারা আসছে তারা যাচ্ছে সেখানে। শাহপরীর দ্বীপের ভাঙা রাস্তার মাথায়। ছবি তুলবে। বিবিসি আর সিএনএনে দেখেছে এতদিন, আজ এই মহাঘটনা নিজের চোখে দেখবে।

ভাঙার বেশ খানিকটা আগেই অটো নামিয়ে দিলো তাদের। সারি সারি ত্রাণের গাড়ি আর দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কার-জিপের লম্বা লাইন। সবাই ভীষণ ব্যস্ত। কারোই কথা বলার সময় নেই। গাড়িবহর পার হয়ে সামনে এগোতেই আস্ত সড়কটাই উধাও। ভাঙতে ভাঙতে সরু বল্লমের ফলার আকার নিয়ে রাস্তাটা সোজা গিয়ে ঢুকেছে সাগরের পেটে। আগে এ-পথ দিয়েই গাড়ি চালিয়ে সোজা শাহপরীর দ্বীপে যাওয়া যেত। এখন ভাঙনে নিশ্চিহ্ন। তাই জায়গাটার নাম হয়েছে ভাঙা। সরু রাস্তাটায় সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এর মধ্যেই সরু বল্লমের ফলার মতো জায়গাটায় টিভি ক্যামেরার ভিড়। ক্যামেরা আর তার সামনে ভিকটিমদের অত্যাচারের বয়ান। সব বয়ানই একরকম। আঁরার ঘর ফোড়া দিইয়ে, গুলি মারি দিইয়ে…

২৪ আগস্ট থেকে টেলিভিশনে কথাগুলো প্রচার হচ্ছে। ঘটনাগুলো নৃশংসতার দিক থেকে অনন্য, কিন্তু ভয়ংকর একঘেয়ে আর পুনরাবৃত্তিময়। গ্রামের পর গ্রাম একই কায়দায় জ্বালিয়ে দিয়েছে ওরা। একই কায়দায় শিশুদের আছড়ে ফেলেছে। একই কায়দায় নারীদের ধর্ষণ করেছে। একই কায়দায় পুরুষদের দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করেছে। গুলি শেষ হয়ে গেলে জবাই করেছে। শুনতে শুনতে তার একসময় মনে হয় প্রত্যেকেরই গল্প এক। কারো সঙ্গে কারোর ভেদ রাখা হয়নি।

জোরে বৃষ্টি এলো। বাতাসও শুরু হলো একসঙ্গে। ত্রাণবহরের লোকজন আর সংবাদকর্মীদের মধ্যে হঠাৎই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এইমাত্র সীমান্ত অতিক্রম করে কয়েকটা নতুন নৌকা এসে ভিড়েছে। ত্রাণ নিয়ে, ক্যামেরা নিয়ে সবাই সেদিকে ছুটে যায়। জটলা পার হয়ে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মানুষগুলো আসতে থাকে সারি করে। কেউ একশ টাকা, কেউ পানি, জুস, কলা আর পাউরুটি গুঁজে দেয় হাতে। এসব নেওয়ারও শক্তি নেই অনেকের। বোরকা পরা এক নারী কোলে শিশু, এক হাতে একটা পুঁটলি নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে।

স্বামী কোথায়, কে যেন প্রশ্ন করে ভিড়ের ভেতর থেকে।

শিশু কোলে তরুণী মা নির্বিকারভাবে জবাব দেয়, মিলিটারি গুলি মারি দিয়ে…।

আনন্দ যেন হৃদয়হীন এক নির্বিকার জগতের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে। সে কি মনের কোণে ক্ষীণ হলেও একটা আশা জাগিয়ে রেখেছিল? এখানে এসে সে-কারণেই বারবার বৃদ্ধ মানুষের মুখগুলো লক্ষ করছিল সে? কিন্তু তেমনটা ঘটল না। স্বাস্থ্যবান পেটানো শরীরের সাদা দাড়িওয়ালা কোনো বুড়ো মানুষ তার সামনে এসে দাঁড়ায়নি। বলেনি, তার নাম শরিয়ত উল্লাহ। এত বছর পর দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছে।

শরিয়ত উল্লাহর ছেলে হাজি আসমত উল্লাহ বহু বছর আগেই মারা গেছে। কিন্তু এই ভিড়ে তাঁর বর্মি ভাইদের কেউ কি আছে? নাকি তারা বাপ-দাদার নাম-পরিচয় সব বিসর্জন দিয়ে পুরোপুরি বর্মি হয়ে গেছে?

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শক্তপোক্ত এক যুবক তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। চোখের দৃষ্টি কোনোদিকেই নিবদ্ধ নয়। ত্রাণ দিতে চাইলেও সে ফিরে তাকাল না কারো দিকে।

আনন্দ তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, আপনার নাম?

ডা. হামিদ হোসেন।

আপনি ডাক্তার?

হ্যাঁ, পল্লি চিকিৎসক।

গ্রাম?

নলবইন্যা, বর্মিরা বলে পন্ডুভিয়ান।

আপনার কি একটা বর্মি নাম আছে?

অং সা থোয়ে, এটুকু বলে লোকটা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।

আনন্দ জানে এমন বর্মি নাম প্রত্যেক রোহিঙ্গারই আছে। তবু সে লোকটার পেছন পেছন ছুটল।

কিন্তু ভিড়ের ভেতরে আর খুঁজে পেল না লোকটাকে। সে কি তার বর্মি ভাই? শুশুকের মতো একবার মুখ দেখিয়ে ভিড়ের গভীরে হারিয়ে যাওয়া ওই লোকটা? ওই পল্লি চিকিৎসক? এমন ভাবনায় মন আচ্ছন্ন হলেও তার গলার কাছে কিছু একটা এসে ঠেকল না। চোখটা ঝাপসা হয়ে এলো না। বরং অর্থহীন এক যাত্রায় নিজেকে আরো সামনের দিকে ঠেলে দিলো সে। এখানে সরু বল্লমের ফলার মতো সড়কটা শেষ। এক হাঁটুপানির নিচে ধারালো পাথর। বাঁয়ে মংডুর পাহাড় এসে মিশেছে তাতে, নীলাভ ছায়াময় সেই পাহাড়ের গা-বেয়ে নেমে আসছে মানুষ। এতদূর থেকে তাদের পিঁপড়ের মতো মনে হয়।

----ছয়----

পুরাকালে বোধিসত্ত্ব ব্রহ্মদেশের রোসাঙ্গের মংডু জেলার হাসুরাতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরিণত বয়সে এক রোসাঙ্গি কন্যার সঙ্গে তার বিবাহ হয়। বিবাহের পর তাদের তিন সন্তান হলো। দুই মেয়ে, এক ছেলে। দুই মেয়ে মরিয়ম ও জয়নব আর ছেলে মহম্মদ রশিদকে রেখে বোধিসত্ত্ব অকালে মারা যান। এরপর তাদের পরিবার ভীষণ অভাবে পড়ে যায়। অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টে তাদের দিন কাটতে লাগল। বোধিসত্ত্বের স্ত্রী প্রতিবেশীদের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে দিন কাটাতে লাগল। ঠিক এই সময়ে ব্রহ্মদেশের সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব আইন জারি করল। নতুন আইন অনুযায়ী রশিদ, তার দুই বোন ও মা বিদেশি বলে চিহ্নিত হলো। গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই তাদের। দুই-তিনদিন পরপর তাবেবদের নিয়ে গ্রামে সৈন্যরা আসে। এসে সব ঘরের লোক গণনা করে। আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাদের দেখে। একবার তারা সঙ্গে করে ওজন মাপার যন্ত্রও নিয়ে আসে। রশিদ, তার দুই বোন ও মায়ের ওজন মাপে তারা। সবার ওজন দেখে তারা বিস্মিত হয়।
গ্রাম ছাড়ার উপায় নেই। ফসলের ক্ষেতে আগুন দেওয়া হয়েছে তবু সবার ওজন সুস্থ মানুষের মতোই। এমন বাড়বাড়ন্ত শরীর কীভাবে হলো?

তাবেব মানে দালালরা সৈন্যদের হয়ে তাদের জেরা করে। জেরার জবাবে তারা বলে, আমরা বোধিসত্ত্বের সন্তান, তিনিই আমাদের রক্ষা করেন। এ-কথা শুনে ব্রহ্মদেশের সৈন্যরা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। এমন ফাজলামির উচিত শিক্ষা দিতে তারা বোধিসত্ত্বের ঘর জ্বালিয়ে দেয়। রশিদের বোন আর মাকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। কীভাবে যেন সেখান থেকে পালিয়ে আসে রশিদ। পালিয়ে আসার সময় নিয়ে আসে একটা সোলার প্যানেল, আরএফএল কোম্পানির একটা বালতি, তার ভেতরে কাপড়ে জড়ানো একটা রাজহাঁস।

এমন কাহিনি বলে ঋষি আনন্দ আবার চোখ বন্ধ করেন। তাঁর পাশে বসা মহম্মদ রশিদকে শ্রমণরা আরেকবার ভালো করে দেখে। উপস্থিত শ্রমণদের একজন হঠাৎ প্রশ্ন করে, ঋষি এই গল্প জাতকে নেই। এই জাতকের নামই-বা কী। আনন্দ চোখ খোলেন। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে ওঠেন, রোহিঙ্গা জাতক।