Saturday, August 31, 2019

দেশ এবং মানুষের জন্য কাজ করতে হবে -ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের প্রত্যেকটি নেতা-কর্মীকে জাতির পিতার আদর্শকে ধারণ করে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি নিজেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে হয় তাহলে সত্যিকারভাবে তাঁর আদর্শ বুকে ধারণ করে তাঁর মত ত্যাগী কর্মী হিসেবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আজ বিকালে তাঁর সরকারী বাসভবন গণভবনে জাতির পিতার ৪৪তম শাহাদাত বার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
জাতির পিতা তাঁর সারাটি জীবন কষ্ট সহ্য করেছেন এমনকি তাঁর জীবনটি পর্যন্ত মানুষের জন্য দিয়ে গেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা জনগণকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন। আমাদের কথা কিন্তু বলেননি। বলেছেন বাংলার সাধারণ মানুষের কথা। কাজেই তিনি যাদের ভালবাসতেন তাঁদের কল্যাণ করা সন্তান হিসেবে আমি এটাকে দায়িত্ব বলে মনে করি। এ বিষয়টি মুজিব আদর্শের সৈনিক ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী প্রত্যেকেরও দায়িত্ব বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
বলেন, আজকে আমাদের এটাই প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, জাতির পিতা এদেশের মানুষের কল্যাণে তাঁর সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন সেই মানুষের কল্যাণে কতটুকু আমরা কাজ করতে পারলাম, সেই হিসেব টাই আমাদের করতে হবে। কতটুকু আমরা দিতে পারলাম-সেটাই হবে একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছাত্রলীগ আমার বাবার হাতে গড়া। আমিও একদিন ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম।
সেই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি। সেখান থেকেই আমার যাত্রা।
তিনি বলেন, ‘কাজেই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের এইটুকুই বলবো চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে উঠে ত্যাগের মনোভাব নিয়ে আদর্শের সাথে নিজেকে গড়ে তুলবে। দেশের মানুষকে কিছু দিয়ে যাবে, যেন জাতির পিতার আত্মা শান্তি পায়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের নিয়মিত প্রকাশনা ’মাতৃভূমি’র মোড়ক উন্মোচন করেন এবং ছাত্রলীগের মাসিক পত্রিকা ’জয় বাংলা’র ও মোড়ক উন্মোচন করেন তিনি।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদি হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক মো. জোবাইর হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগ সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান হৃদয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি সঞ্জিব চন্দ্র দাস এবং সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেইন আলোচনা সভায় বক্তৃতা করেন। ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন সভায় সভাপত্বি করেন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সভা পরিচালনা করেন।

শুধু ভুটানেই সম্ভব: ইনিই প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং যিনি তার হাত ময়লা করছেন

আমরা প্রায়ই দেখি বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে রাজনীতিকরা আসেন। আর পরিচ্ছন্নতা কাজে অংশ নেয়ার নামে লোকদেখানো ভাবভঙ্গী করেন। কিন্তু ছবির মতো সাজানো হিমালয়ান রাজ্য ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সততার এমন এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যা সবার অনুসরণ করা উচিত।

সামাজিক গণমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো কিছু হৃদয় জয় করা ছবিতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং তার হাত ময়লা করছেন, আক্ষরিকভাবেই, নিজের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে তিনি কাজটি করছেন। ছবিগুলো মনকাড়া, এবং অবশ্যই তা হওয়া উচিত।

এমন একটি ছবিতে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রী ডোবা থেকে গাছের ডালপালা পরিষ্কার করছেন। আরেক ছবিতে দেখা যায় তিনি পাহাড়ের পাদদেশে ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া গাছ ও ডালপালা সরাচ্ছেন।

এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানে আরো অনেকের সঙ্গে লোটে শেরিং যোগ দিয়েছেন। মাটিতে নেমে এসে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এমন কাজ তিনি এবারই প্রথম করেননি।

চলতি বছরের গোড়ার দিকে তাকে স্টেডিয়ামের সাধারণ দর্শকের সারিতে বসে ভুটানি দলের ফুটবল খেলা দেখে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। সাধারণ বেশে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি তার দলকে বিপুলভাবে অনুপ্রাণীত করে। এই ছবি নেটিজেনদের বিপুল প্রশংসা কুড়ায়।

সাধারণ কাজ করার জন্য প্রায়ই খবরের শিরোনাম হন লোটে শেরিং। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর সপ্তাহান্তের দিনটি তিনি বরাদ্দ রেখেছেন নিজের মূল পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য। প্রতি শনিবারে তাকে ডাক্তারের সাদা এপ্রোন পরে হাসপাতালে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিতে দেখা যায়।

হিমালয়ান রাজ্যের এই প্রধানমন্ত্রী সত্যিকার অর্থেই সরলতা ও নম্রতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

গুম প্রতিরোধ দিবস: 'সে কোথায় আছে আমি জানি না, আমার বাচ্চা তার বাবাকে খোঁজে' by ফারহানা পারভীন

বাংলাদেশে গত দশ বছরে নিখোঁজ হওয়া মানুষের মধ্যে ১৭০ জনের এখানো কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার বলছে, এরা সবাই গুম হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে এসব নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সবার সাথে বার বার করে কথা বলেছেন। কিন্তু তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে বাংলাদেশে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো তাদের সংগ্রামের কথা জানিয়েছেন।
ঢাকায় গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সমাবেশ।
ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ধানমন্ডির নাসরিন আক্তার কথা বলতে বলতে বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন।
ছোট ছেলেকে সাথে নিয়ে নিখোঁজ বড় ছেলের একটি ছবি হাতে এসেছিলেন তিনি।
নাসরিন আক্তারের সাথে কথা বলে জানতে পারি, ২০১৭ সালে অগাস্ট মাসে তার ছেলে ইসরাক আহমেদ ক্যানাডা থেকে দেশে আসেন ঈদ করতে।
সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন ইসরাক।
কিন্তু যেদিন বাংলাদেশ থেকে তার ক্যানাডায় ফিরে যাওয়ার কথা, সেদিনই তিনি নিখোঁজ হন, বলছিলেন নাসরিন জাহান।
তিনি বলছিলেন, "ছেলে বললো মা আজ শেষ দিন বন্ধুদের সাথে বাইরে রেস্টুরেন্টে দেখা করবো। রাত আটটা নাগাদ বাসায় না ফিরলে তাকে আমি ফোন করি। তার বাবাকে দিয়েও ফোন করাই। কিন্তু তার ফোন বন্ধ পাই। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তার কোন খোঁজ পাইনি আমরা।"
ঘটনার সময় ২০১৩, ২রা ডিসেম্বর। স্থান ঢাকার শাহবাগ। রেশমা নামে এক ব্যক্তি বলছিলেন, তার স্বামী মো. চঞ্চলসহ চারজন নিখোঁজ হন ঢাকার শাহবাগ মোড় থেকে।
তিনি জানান, সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তিরা এই চারজনকে তুলে নিয়ে যায়, যেটা দেখেন সেখানে থাকা তাদের আরো দুই বন্ধু।
রেশমার সন্তান এখনও বাবাকে খোঁজে
তিনি বলছিলেন, "এই যে সে নাই, বা থাকলে কোথায় আছে সেটা আমি জানি না। আমার বাচ্চা তার বাবাকে খোঁজে। যখন তার বয়স দুই বছর তখন আমার স্বামী নিখোঁজ হয়।"
"আমি বলি 'তোমার বাবা বিদেশে'। আমরা ছবি হাতে মানববন্ধন করি। বাচ্চাকে তো উত্তর দিতে পারি না।"
তিনি বলছিলেন, "যদি জানতাম আমার স্বামী মারা গেছে বা কোথায় দাফন করা হয়েছে তাহলে তো সেখানে যেয়ে জিয়ারত করতে পারতাম। কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারি না। শুধুই অপেক্ষা আর অপেক্ষা।"
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে শুক্রবার বাংলাদেশে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় একত্রিত হন 'মায়ের ডাক' নামে এক সংগঠনের ব্যানারে।
সংগঠনটি বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ৫৩৮ জন গুম হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ জন অনেক দিন পর ফিরে এসেছে। আটষট্টি জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এবং ১৭০জন এখনো নিখোঁজ।
ভাইয়ের আশায় এখনও অপেক্ষা করছেন মারুফা ইসলাম।
মায়ের ডাকের আয়োজক সানজিদা ইসলাম বলছিলেন, গুম করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে। "এবং এর শিকার হয়েছেন বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা," বলছিলেন তিনি।
দু'হাজার তের সালের ৪ঠা ডিসেম্বর আরো একজন নিখোঁজ হন। তার নাম সাজেদুল ইসলাম সুমন। তিনি ঢাকা ২৫ নং ওয়ার্ডের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
তার বোন মারুফা ইসলাম বলছিলেন, প্রশাসনের এমন কোন স্তর নেই যেখানে তারা যোগাযোগ করেন নি। কিন্তু আজ প্রায় ছয় বছর হতে চললেও তার কোন খবর নেই।
শুক্রবার যেসব নিখোঁজ পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন তারা বলছেন, নিখোঁজদের কারো কারো হয়তো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল।
কিন্তু গুমের তালিকায় অনেকেই রয়েছেন রাজনৈতিক পরিচয়ের একেবারে বাইরে।
ছেলের ছবি হাতে নাসরিন আক্তার।

‘আমরা সবাই মায়েদের কান্না শুনছি’

‘আমার বয়স যখন মাত্র ৮ বছর তখন আমার বাবা গুম হন। আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। এখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। দীর্ঘ ৫ বছর আমি বাবাকে দেখি না। বাবাকে ছাড়াই কী আমি বেঁচে থাকবো? আমি আমার বাবাকে ফেরত পেতে চাই। বাবার সঙ্গে বেড়াতে যেতে চাই। আমি আমার বাবার বুকে ঘুমাতে চাই। আমি যখন স্কুলে যাই আমি দেখি আমার বন্ধুদের অনেকের বাবা তাদের স্কুল ছুটির পর নিতে আসেন।
কিন্তু, আমি একা একা বাসায় আসি। আমি আমার বাবার অনুপস্থিতি প্রতিটি পদে পদে অনুভব করি।’ কথাগুলো কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিল গুম হওয়া তেজগাঁও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনের মেয়ে রাইসা। রাইসা বাবা সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার কান্না উপস্থিত আলোচক ও শ্রোতাদেরও আপ্লুত করে। অনেকেই চোখ মুছতে থাকেন। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের মিলনায়তনে স্বজন হারানোদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক- Mother’s Call’ এর উদ্যোগে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস ২০১৯ উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল ‘মায়ের ডাক’-এর সভানেত্রী ও ২০১৩ সালে গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের মা হাজেরা বেগমের। কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় সুমনের বড়বোন মারুফা ইসলাম ফেরদৌসী সভাপতিত্ব করেন।

অনুষ্ঠানে প্রত্যেক মা ও তাদের স্বজনেরা গুম হওয়া সদস্যদের জন্য ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মঞ্চের  সামনে আগত ছোট ছোট শিশুরা তাদের বাবার ছবি তুলে ধরে। এতে লেখা ছিল ‘শুধু বাবাকে ফিরে পেতে চাই।’ মায়েদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারি হয়ে যায় প্রেস ক্লাবের হলরুম। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতির পরিবর্তে মায়েদের কান্নার রোল পড়ে যায় হলরুমে। অনুষ্ঠানে দেশে বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান করতে একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের উদ্যোগের দাবি জানান বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনসহ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। 
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ২০১৩ সালের ২৬শে এপ্রিল গুম হওয়া রনি হোসেনের মা আঞ্জুমান আরা বেগম, ২০১৫ সালের ২১শে আগস্ট গুম হওয়া সাজ্জাদ হোসেনের মা সাজেদা বেগম, ২০১৯ সালের ১৯শে জুন গুম হওয়া ইসমাঈল হোসেনের স্ত্রী নাসরিন আক্তার ও সাতক্ষীরা এলাকার গুম হওয়া মোখলেসুরের পিতা আব্দুর রশিদ ও বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর ছেলে আবরার ইলিয়াস, সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজা ইসলাম আঁখি, নিখোঁজ তপুর মা সালেহা বেগম, পিন্টুর বোন মুন্নী, পারভেজ হোসেনের শিশু কন্যা হৃদী, নিখোঁজ গাড়িচালক কাউসারের মেয়ে লামিয়া, যশোরের মোহন মিয়ার বাবা জামশেদ ও সুজনের ভাই শাকিলসহ অন্যরা। 

অনুষ্ঠানে গুম হওয়া পল্লী চিকিৎসক মোখলেসুরের পিতা আব্দুর রশিদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ২০১৬ সালের ৪ঠা আগস্ট সন্দেহবশত থানা পুলিশ আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। তিনদিন থানায় ছিল। থানায় পুলিশের মাধ্যমে খাবারও দিয়েছি। পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে আকুতি করে বলেছিল, সে কোনো দল করে না। কোনো উগ্রবাদেও বিশ্বাস করে না। পুলিশ আমাকে চাপ দিতে থাকে যে, তার ছেলে যাতে পুলিশের কাছে স্বীকার করে সে সরকার বিরোধী কাজে জড়িত। স্বীকার না করলে করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে। আমাকে গালিগালাজ করা হয়। কিন্তু, আমার ছেলে অন্যায় স্বীকারোক্তি দেয়নি। তিনদিন পর থানার ওসি আলতাফ জানায় যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অন্যস্থানে পাঠানো হয়েছে। সেই যে পাঠানো হলো আর ফিরে আসেনি আমার ছেলে। কথাগুলো বলতে বলতে একপর্যায়ে মূর্ছা যান সত্তরোর্ধ্ব আব্দুর রশীদ। তখন তার মাথায় পানি ঢালা হয়।

রাজধানীর রামপুরা থেকে নিখোঁজ ছাত্রলীগ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন তপুর মা সালেহা বেগম বলেন, আমার ছেলে তিন বছর ৭ মাস ধরে নিখোঁজ। যুবলীগের স্থানীয় নেতারা প্রশাসনকে দিয়ে আমার ছেলেকে গুম করে। আমি আমার ছেলেকে ফিরে পেতে হাজারও মানুষের দুয়ারে গেছি। সবাই শুধু আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু আজও আমি আমার ছেলেকে ফিরে পাইনি। আর কতদিন আমি ছেলের অপেক্ষায় থাকবো, বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন সালেহা বেগম।

ফেনীর মাহবুবুর রহমান রিপনের মা রওশন আরা বলেন, আমার ছেলেকে ২০১৪ সালের মার্চের ২০ তারিখে রাতের আঁধারে আমার বাড়ি থেকে ঘরের দরজা ভেঙে কালো পোশাকধারীরা চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। যখন রিপনকে নিয়ে যায়, তখন তার একটি শিশু বাচ্চা রেখে যায়। মামলা করতে গিয়েছি। তারা মামলাও নেয়নি। আজও আমি ছেলেকে ফেরত পাইনি। কোনো বিচারও পাইনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইউনাইটেড ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মাইকেল চাকমার বোন সুভদ্রা চাকমা বলেন, গত ৯ই এপ্রিল আমার ভাইকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যায়। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরনা দিয়েছি। প্রথমে তারা আটকের বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করে। 

সুভদ্রা বলেন, আমাদের দাবি আমার ভাই যদি অপরাধ করে থাকে, তাহলে তাকে আইনের মাধ্যমে বিচার করুন। নইলে আমার ভাইকে ফিরিয়ে দিন। এ পর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অনুষ্ঠানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এখনো সময় আছে অতীতের ভুলের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান। গুম হওয়া ব্যক্তিদের তাদের পরিবারের কাছে ফেরত দিন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের যদি তাদের পরিবারের কাছে ফেরত দিতে পারেন তাহলে পরিবারগুলো আপনাদের ক্ষমা করবে। আল্লাহ আপনাদের ক্ষমা করবে। অন্যথায় কারও কাছেই আপনারা ক্ষমা পাবেন না। তিনি আরো বলেন, দেশে প্রকৃত অর্থে কোনো আইনের শাসন নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, দেশের প্রতিটি গুমের সঙ্গে সরকার জড়িত। পরিবারগুলোর বর্ণনা মতে প্রতিটি গুমের সময়ে সরকারি গাড়ি কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকে বা তাদের গাড়ি ব্যবহার হলো কিভাবে? এ ছাড়া প্রতিটি ঘটনার পরে থানায়ই বা সাধারণ ডায়েরি নিতে অপারগতা প্রকাশ করে কেন? সরকার যদি গুমের সঙ্গে জড়িত নাই থাকে তাহলে স্বাধীন কমিশন গঠন করে এতগুলো গুমের ঘটনা তদন্ত করছে না কেন ?

ড. নজরুল  বলেন, গুম একটি অপরাধ যা, হত্যা বা খুনের চেয়েও নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ। কেননা গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার সারা জীবনই অবর্ণনীয় কষ্ট নিয়ে চলেন। পরিবার গুম হওয়া স্বামী কিংবা সন্তানের কোনো খোঁজ পায় না। অনেক পরিবার আছে যারা কারো কাছে কোনো অভিযোগ করবে না, শুধু লাশটি ফেরত চায় অথবা নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান শুধু চায়। 

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বর্তমান সরকারকে হৃদয়হীন উল্লেখ করে বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কান্নায় এই সরকারের হৃদয় নড়েও না, গলেও না। তিনি আরো বলেন, যে সরকার দেশের ১০ কোটি ভোটারের ভোট রাতের অন্ধকারে লুট করতে পারে সেই সরকারের কাছে কোনো কাকুতি মিনতি করেও কোনো লাভ হবে না। এই সরকারের জনগণের সরকার নয়। তাই এই সরকার জনগণের কথা শুনে না। জনগণের কথা এই সরকারের কানে প্রবেশ করবে না।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, নারায়ণগঞ্জের যে ৭ খুন হয়েছিল তাদের আগে সড়ক থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের লাশ যদি নদীতে ভেসে না উঠতো তাহলে তারাও গুম অবস্থায় থেকে যেত। জানি না, যারা গুম হয়েছে তাদের ভ্যাগে কী জুটেছে। আমরা পরিবারের কাছে জেনেছি যে, প্রত্যেকটি গুমের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত। গুম ব্যক্তিদের অবশ্যই পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং এইসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। যাতে কেউ এইসব অপরাধ না করতে পারে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড সাইফুল হক বলেন, এখানে মায়েদের, স্ত্রীদের, শিশুদের যে আর্তনাদ তাতে কারও সুস্থ থাকা সত্যিই কঠিন। এখানে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা যদি আজকের এ কর্মসূচি রেকর্ড করে থাকেন, ভিডিও করে থাকেন, তাহলে দয়া করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেবেন। কারণ তিনি প্রায়শই বলে থাকেন, স্বজন হারানোর বেদনা তিনি বোঝেন। আজকের এই যে আহাজারি তা প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাশালীরা দেখলে কিছুটা হলেও আপ্লুত হবেন। তাহলে স্বজন হারানোরা বিচার পেতে পারেন।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী বলেন, পাহাড়ে সমতলে আজ স্বজন হারানোদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আছে কি না, তা আমাদের প্রশ্ন রয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী ফরিদা আক্তার বলেন, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে গুমের শিকার হওয়া স্বজনদের প্রতি সংহতি জানাচ্ছি। গুমের শিকার হওয়া স্বজনরা যেভাবে কথা বলছেন, এটা অত্যন্ত শক্তিশালী। অত্যন্ত সাহসী কাজ। আমি আপনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঢাবি শিক্ষক অধ্যাপক আকমল হোসেন বলেন, আজকে এখানে আমরা সবাই কান্না শুনছি। মায়েদের কান্না শুনছি। একটা ফ্যাসিস্ট সরকার, নির্যাতক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এর বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থা না আসলে এ কান্না থামবে না।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই এ অনুষ্ঠানে আসি। কিন্তু আজকে অনেককেই দেখতে পাই না। কারণ তারা স্বজনদের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে পরপারে চলে গেছেন। অথচ বিচার দেখে যেতে পারেন নি।

অনুষ্ঠানে এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও মানবাধিকার কর্মী নাসির উদ্দিন এলানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

কাশ্মীর পরিস্থিতি: আমাদের পেটাবেন না, গুলি করুন

ভারতশাসিত অবরুদ্ধ কাশ্মীরে বেসামরিকদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে। স্থানীয়রা বলছেন, তাদের লাঠি দিয়ে পেটানো হচ্ছে, ইলেকট্রিক শক দেয়া হচ্ছে। বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা তাদের শরীরে মারধরের চিহ্ন দেখিয়েছে বিবিসির প্রতিবেদককে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছে গ্রামবাসীর এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন ও অপ্রমাণিত বলে আখ্যায়িত করেছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে  সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি নেতৃত্বাধীন সরকার। সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ সেনা।
পুরো অঞ্চলটি অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আটক করে রাখা হয়েছে। অনেককে রাজ্যের বাইরেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়।

‘চিৎকার করায়, আমাদের মুখে কাদা ভরে দিয়েছে’
বিবিসির প্রতিবেদক সামির হাশমী কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রায় ছয়টি গ্রাম ঘুরে দেখেছেন। সামপ্রতিক বছরগুলোয় সেখানে ভারত-বিরোধী জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানকার বাসিন্দারা হাশমীকে জানান, প্রায়ই সেখানে গভীর রাতে অভিযান চালায় সেনারা। স্থানীয়দের মারধর ও নির্যাতন করে। মারধরে অসুস্থ হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চান না স্থানীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। তবে গ্রামবাসীরা বিবিসিকে তাদের ক্ষত দেখিয়েছেন। জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনীরা মারধর করে আহত করেছেন তাদের।
একটি গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সেনারা তাদের প্রত্যেকটি ঘরে ঢুকে তল্লাশি চালিয়েছে। সেখানকার এক পরিবারের দুই ভাই বলেন, সেনারা তাদের ঘুম থেকে তুলে বাইরে নিয়ে যায়। সেখানে আগ থেকে আরো প্রায় এক ডজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিল। নিজেদের নাম না প্রকাশের শর্তে ওই দুই ভাই বলেন, তারা আমাদের মেরেছে। আমরা বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম যে, আমরা কী করেছি? কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথা শোনেনি। তারা কেবল আমাদের মারতে ব্যস্ত ছিল।
দুই ভাইয়ের একজন বলেন, তারা আমার শরীরের সবখানে মেরেছে। তারা আমাদের লাথি মেরেছে, লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে, আমাদের ইলেকট্রিক শক দিয়েছে। আমাদের পায়ের পেছন দিকে লাঠি দিয়ে মেরেছে। আমরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। তখন আমাদের ইলেকট্রিক শক দিয়েছে। লাঠি দিয়ে পেটানোর সময় আমরা চিৎকার করায়, আমাদের মুখে কাঁদা ভরে দিয়েছে।
এক ভাই বলেন, আমরা তাদের বলেছিলাম আমরা নির্দোষ। আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারা এসব কেন করছে? কিন্তু তারা আমাদের কথা শোনেনি। আমি তাদের আমাদের মারতে মানা করেছিলাম। বলেছিলাম, আমাদের সরাসরি গুলি করে মেরু ফেলুন। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে আমাকে তুলে নেয়ার প্রার্থনা করছিলাম। কেননা, ওই নির্যাতন অসহ্য ছিল।

‘আমি অস্ত্র হাতে তুলে নেবো, এসব সহ্য করতে পারবো না’
অপর এক তরুণ গ্রামবাসী জানান, নিরাপত্তা বাহিনী বারবার তাকে জিজ্ঞাসা করছিল, কারা পাথর ছুড়েছে তাদের নাম বলতে। উল্লেখ্য, ঘোষণার পরপরই কাশ্মীরে বিক্ষোভ দেখা দেয় ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পাথর ছোড়েন বিক্ষোভকারীরা। ওই তরুণ সেনাদের বলেছিল, তিনি পাথর নিক্ষেপকারী সমপর্কে কিছু জানেন না। তখন সেনারা তাকে তার চশমা, কাপড় ও জুতা খুলে ফেলার নির্দেশ দেন।
নাম না প্রকাশের শর্তে ওই তরুণ বলেন, আমি কাপড় খোলার পর তারা আমাকে রড ও লাঠি দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে নির্দয়ভাবে মেরেছে। মার খেয়ে আমি যখন অজ্ঞান হয়ে পড়েছি, তখন আমায় ইলেকট্রিক শক দিয়েছে। তারা যদি ফের আমার ওপর এমন নির্যাতন চালায়, তাহলে সব করতে রাজি আছি। আমি অস্ত্র হাতে তুলে নেবো। আমি প্রতিদিন এসব সহ্য করতে পারবো না।
ওই তরুণ বলেন, সেনারা তাকে সতর্ক করেছিল যে, গ্রামের কেউ যদি বিক্ষোভে অংশ নেয় তাহলে তাদেরও একই অবস্থা হবে। একথা যেন পুরো গ্রামকে জানিয়ে দেয়া হয়। বিবিসির প্রতিবেদক ওই গ্রামের বাকি যাদের সঙ্গেই কথা বলেছেন তাদের সবাই বলেছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গ্রামবাসীদের এমনভাবে ভয় দেখাতো যে কারোই বিক্ষোভ করার সাহস ছিল না।
এদিকে, বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে গ্রামবাসীদের সকল অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল আমান আনন্দ বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের নজরে পড়েনি। এই অভিযোগগুলো সম্ভবত ক্ষতিকর উদ্দেশ্য নিয়ে করা হচ্ছে। বেসামরিকদের প্রতিরক্ষা করতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপে কেউ হতাহত হয়নি।

‘আমাদের পশুর মতো মারে, তাদের কাছে আমরা মানুষ নই’
বিবিসির প্রতিবেদক জানান, তার সঙ্গে কথা বলা গ্রামের বাসিন্দারা বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহানূভিতিশীল ছিল। তারা ওই জঙ্গিদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বর্ণনা করেছে। তিনি জানান, ওই অঞ্চলে সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটি রয়েছে। সেখান থেকে তারা জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে থাকে। নির্দোষ গ্রামবাসীরা প্রায়ই এসব অভিযানের শিকার হয়। এমন একটি গ্রামের এক তরুণ বাসিন্দা বিবিসিকে জানায়, সেনাবাহিনী তাকে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে তথ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করতে বলেছে। কাজ না করলে তাকে ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। তিনি সেনাবাহিনীর প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে প্রচণ্ড মারধর করা হয়েছে। মারধর এতটাই তীব্র ছিল যে, কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পরও পিঠ নিচে দিয়ে শুয়ে থাকতে পারেন না। তিনি বলেন, এমনটা চলতে থাকলে আমার হাতে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকবে না। তারা আমাদের পশুর মতো মারে। তাদের কাছে আমরা মানুষ নই।
অপর এক ব্যক্তি জানান, তাকে মাটিতে ফেলে বন্দুক, লাঠি, কেবল ও সম্ভবত লোহার রড দিয়ে মারধর করেছে ১৫-১৬ সেনা। তিনি বলেন, আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। তারা আমার দাড়ি ধরে এত জোরে টেনেছে যে মনে হয়েছে, আমার দাঁত পড়ে যাবে।
অপর এক গ্রামের এক তরুণ বাসিন্দা জানায়, তার ভাই হিজবুল মুজাহিদিনে যোগ দিয়েছে। সমপ্রতি তার ভাই সমপর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে তাকে আটক করে সেনাবাহিনীর শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে এতটা মারধর করা হয় যে, তার পা ভেঙে যায়। তিনি বলেন, তারা আমার হাত-পা বেঁধে আমায় উল্টো করে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তারা আমাকে নির্মমভাবে মেরেছে।
তবে সেনাবাহিনী এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বিবিসিকে দেয়া বিবৃতিতে তারা বলেছে, তারা একটি পেশাদার সংস্থা যারা মানবাধিকার বোঝে ও মেনে চলে। এসব অভিযোগ দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
গত পাঁচ বছরে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ৩৭টি অভিযোগ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। সেনাবাহিনী জানায়, ওই ৩৭টি অভিযোগের মধ্যে ২০টি অভিযোগই ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। ১৫টি অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন আছে। মাত্র তিনটি অভিযোগে কিছু সত্যতা পাওয়া গেছে। যারা দোষী প্রমাণিত হয়েছে তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে।
তবে এ বছরে শুরুতে কাশ্মীরি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর এক প্রতিবেদনে গত তিন দশক ধরে রাজ্যটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। কাশ্মীরে ওইসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে দেখতে একটি কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন। ভারত সরকার অবশ্য ওই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে।

নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলো ওরা: সৌদি থেকে আসা ১১০ নারীর অনেকের বাড়ি ফেরার গাড়িভাড়াও নেই by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

২৬ আগস্ট সোমবার রাত ২টা। হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরের দুই নাম্বার টার্মিনাল। একেক করে বের হচ্ছে সৌদি ফেরত নারী শ্রমিকরা। তাদের  বেশিরভাগের পড়নে বোরকা। কালো নেকাবের ফাঁকে চোখে পড়ে তাদের ছল ছলে দৃষ্টি। মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার নারীরা দীর্ঘ সময় বির্পযস্ত অবস্থায় কাটিয়েছেন দেশটিতে। টার্মিনাল দিয়ে বের হয়েই কেউ কেউ এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছিলেন। মনে হচ্ছিলো মুক্ত আকাশের পাখির মতো ।
তাদের নিতে কারো স্বজন এসেছেন আবার কারো আসেনি। তাদের অনেকের কাছেই ছিলো না বাড়ি ফেরার গাড়ি ভাড়া। তেমনি একজন মুন্সিগঞ্জ জগন্নাথপুরের নাজনীন আক্তার। টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার পর কোনো স্বজনের দেখা পাননি তিনি।

কেউ তাকে নিতেও আসেনি। তিনি তিন মাস আগে সৌদিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজে। প্রথম মাস থেকেই তার উপর চলে অমানসিক নির্যাতন। ভেবেছিলেন মানিয়ে নেবেন। কিন্তু কোনো ভাবেই আর সহ্য করা সম্ভব হচ্ছিলো না। দুই মাস কাজ করলেও কোনো বেতন পাননি নাজনীন। বেতন চাইলেও চলতো আরো বেশি নির্যাতন। পরে খালি হাতে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেইফহোমে ছিলেন এক মাস। ২৭ আগস্ট রাতে আমিরাত এয়ারওয়েজ (ইকে-৫৮৪) এর একটি ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। কিন্তু দেশে ফিরে বাড়ির যাওয়ার গাড়ি ভাড়া ছিলো না তার কাছে। পরে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগিতায় ২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় তাকে বাড়িতে পাঠানো হয়। তার মতো নির্যাতনের শিকার ১১০ নারী সৌদি আরবের রিয়াদ ইমিগ্রেশন ক্যাম্প থেকে দেশে ফিরেছেন। ২৬ আগস্ট সোমবার বিকাল সাড়ে ৫ টার দিকে হয়রত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন ৪৫ জন। পরের ফ্লাইটে রাত ১২টায় আসেন আরো ৬৫ জন। এসব নারী শ্রমিকদের মধ্যে বেশীরভাগই ছিলেন নিঃস্ব।

এদের আরেকজন বরগুনার হেনা আক্তার (৩০)। ২০১৮ সালের অক্টোবরে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। গৃহকর্মীর কাজ করতেন রিয়াদে। তিনি বলেন, প্রথম একমাস ভালো গেলেও এর পরের মাস থেকে শুরু হয় নির্যাতন। প্রথমে এক বেলা করে এরপর থেকে কোনো দিন খাবার দিতো না। ফ্রিজ বা খাবার রাখার র‌্যাক তালা দিয়ে রাখতো। কত দিন যে কেঁদেছি একবেলা খাবার খাওয়ার জন্য। তারপরও পাষানদের মন গলেনি।

একবছরের মতো কাজ করেছি। কিন্তু কোনো বেতন দেয়নি। বেতন চাইলেই গায়ে হাত দিতো। মারধর করতো। ভয়ে আর বেতন চাইনি। পরে পালিয়ে দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছি।
নওগাঁর কল্পনা বেগম (২৮)। এক ছেলে আর রিকশা চালক স্বামীকে রেখে সৌদিতে গিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজ করতে। সেখানে তার অভিজ্ঞতা ভয়ঙ্কর। কল্পনা বেগম বলেন, আমার ডান হাতটা গরম পানি ঢেলে দিয়েছে কফিল। ওখানে ডাক্তারও দেখাতে পারিনি। কাউকে চিনিও না। কত কষ্ট আর নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে তা বলার ভাষা নেই। একবছর কাজ করছি একটা টাকাও দেয়নি । টাকা চাইলে উল্টা আরো বেশি অত্যাচর করতো। এই দেশে কি মানুষ আসে? এমন প্রশ্ন ছিলো কল্পনা বেগমের।
দিনাজপুরের হুসনাইনা বেগম (৪০)। মাত্র তিন মাস আগে সৌদিতে যান। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় তার উপর নির্যাতন। দিনমজুর স্বামী আর চার সন্তানের দিকে চেয়ে একটু সুখের আশায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। হুসনাইনা জানান, প্রথম দিন যাওয়ার পরই আমাকে কিছু খেতে দেয়নি। সকালে কফিলের বাসায় যাওয়ার পর রাত বারোটায় আমাকে একটা রুটি দিয়েছে। সারাদিনে না খেয়ে একটা রুটি দিয়ে কিছু হয়? খাবার চাইলেও গায়ে হাত দিতো। তাদের পরিবারের সবাই কথায় কথায় অত্যাচর করতো। আমি লেবানন, জর্ডানে দশ বছর ছিলাম। ওখানে তো কোনো ধরনের অত্যাচার করেনি। সৌদিতে দুই মাস কাজ করেছি এক টাকাও দেয়নি। আমি অনেক মেয়েকে দেখেছি, রাতের বেলায় কফিলরা খারাপ উদ্দেশ্যে গায়ে হাত দেয়। কফিলদের প্রস্তাবে রাজি না হলে নির্যাতন করে।

সুনামগঞ্জের জাহানার। বসে ছিলেন ট্রার্মিনালের ক্যানোপিতে। বাইরে রিকশা চালক স্বামী রিয়াজুল হক। দুই মাস আগে সৌদিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। রিয়াজুল হক বলেন, প্রতিদিন জাহানারা ফোন করে কান্নাকাটি করতো। তার হাত নাকি পুড়ে গেছে। প্রতিদিন নাকি তার কফিল অত্যাচার করে। পরে অসুস্থ হয়ে গেলে পালিয়ে দূতাবাসে চলে আসে।
মুন্সিগঞ্জের সাফিনা খাতুন (৩২)। তিনিও চার মাসে আগে গিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে। বলেন, আমাদের বলেছিলো মাসে একহাজার রিয়াল দিবে, কিন্তু যাওয়ার পর আমাদের দিয়েছে পাঁচ’শ রিয়াল। এক মাস বেতন দেয়ার পর থেকেই অত্যাচার শুরু করে। কফিল এসে বলে তাকে হাত-পা টিপে দিতে। না দিলেই চুলে ধরে হাতের কাছে যা পায় তা দিয়েই মারে। আমার পিঠে এখনো সেই দাগ আছে। দুই মাস পর আমি পালিয়ে সেইফ হোমে চলে আসি। অত্যাচার আর সহ্য হচ্ছিলো না।
২৬ আগস্ট বিমান বন্দরে এসব নারীদের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন পোগ্রামের পক্ষ থেকে তাদের খাবার দেয়া হয়েছে। তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছেন। যাদের স্বজন নিতে আসেনি এবং যাদের বাড়ি ফেরার ভাড়া ছিলো না তাদের সহযোগিতা করা হয়েছে।

ঢাকার হজরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরস্থ প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, যারা দেশে ফিরেছেন তাদের বেশির ভাগই নির্যাতিত। অনেকে আছেন সৌদি গেছেন মাত্র তিন মাস হয়েছে, তারা কোনো বেতন পাননি । উল্টো নির্যাতিত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পরে ইমিগ্রেশন ক্যাম্প ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সেইফ হোমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের দেশে আনা হয়েছে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন ফেরত আসা নারীকর্মীরা নিয়োগকর্তা কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়ে ইমিগ্রেশন ক্যাম্প ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সেইফ হোমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখান থেকে তারা দেশে ফিরেছেন।

পার্লামেন্ট বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেনি আদালত

পাঁচ সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্ট বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তার ঘোষণার বাস্তবায়ন ঠেকাতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল বিরোধীরা। অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশের মাধ্যমে  জনসনকে পার্লামেন্ট স্থগিত করা থেকে রুখতে আবেদন করেছিল স্কটল্যান্ডের আদালতে। কিন্তু বরিস জনসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী পার্লামেন্ট সাময়িক স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত বাতিলের আবেদন ওই আদালত খারিজ করে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার এক জরুরি শুনানি শেষে বিচারক জানান, এ বিষয়ে আগামী মঙ্গলবার সম্পূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এ খবর দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

আবেদনকারীদের দাবি ছিল, জনসন অবৈধভাবে ও সংবিধান লঙ্ঘন করে পার্লামেন্ট বন্ধের পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত রায় দেবেন না বলে জানান স্কটল্যান্ড আদালতের বিচারক লর্ড ডহেরটি। এক জরুরি শুনানি শেষে জানান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রানীর কাছে পার্লামেন্ট স্থগিতের অনুমতি চাওয়ার ক্ষমতা জনসনের আছে কিনা সে বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেবেন না আজ তিনি।
তিনি বলেন, এই পর্যায়ে এসে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ বা নির্দেশ অনুমোদনের দাবিতে আমি সন্তুষ্ট নই।
আগামী মঙ্গলবার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করছি। ভারসাম্যতার কথা বিবেচনায় আদালতের ইচ্ছা হচ্ছে, এই আবেদন নিয়ে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা।
স্কটল্যান্ড ছাড়া বেলফাস্ট ও লন্ডনেও সরকারের পার্লামেন্ট বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। সরকারি এক মুখপাত্র এ বিষয়ে বলেন, আমরা যেমনটা বলেছি, সরকারের একটি শক্তিশালী দেশীয় বিধানিক এজেন্ডা নিয়ে আসা উচিত। আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে আমাদের বিচ্ছেদ নিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে সংসদ সদস্যদের বাধা দেয়া হয়নি। আমরা খুশি যে, আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করার আবেদনটি গ্রহণযোগ্য মনে করেনি। আদতে এ রকম আবেদনের কোনো যথাযথ কারণ নেই। এ বিষয়ে আগামী সপ্তাহে পূর্ণ শুনানি হবে। আর পার্লামেন্টের স্থগিতাবস্থা শুরু হবে ৯ই সেপ্টেম্বর থেকে।

উল্লেখ্য, প্রতি অধিবেশন শেষেই পার্লামেন্ট কয়েকদিনের জন্য স্থগিত থাকার রেওয়াজ রয়েছে বৃটেনে। তবে অন্যবারের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি সময়ের জন্য পার্লামেন্ট বন্ধ রাখতে চাইছে জনসন সরকার। তাও এমন সময়ে যখন ইইউ থেকে বৃটেনের বিচ্ছেদ বা ব্রেক্সিটের সময় এগিয়ে আসছে। বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে আছেন বৃটিশ সংসদ সদস্যরা। ৩রা সেপ্টেম্বর তাদের পার্লামেন্টে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে। আর জনসন ১০ই সেপ্টেম্বর থেকে পার্লামেন্ট বন্ধ করতে চাইছেন। তার ঘোষণা অনুসারে, ১৩ই অক্টোবর পর্যন্ত পার্লামেন্ট বন্ধ থাকবে। ১৪ই অক্টোবর রাণীর ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে নতুন অধিবেশনের। সেদিন তার সরকার ‘অত্যন্ত চমৎকার একটি এজেন্ডা’ প্রকাশ করবে। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, চুক্তিহীন ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের লক্ষে পার্লামেন্ট বন্ধ করছে সরকার। যাতে করে ব্রেক্সিট নিয়ে বিতর্কের পর্যাপ্ত সময় না পায় সংসদ সদস্যরা। পাশাপাশি চুক্তিহীন ব্রেক্সিট ঠেকাতে কোনো বিল পাসের জন্য প্রয়োজনীয় সময় না পায়। উল্লেখ্য, ৩১শে অক্টোবর ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। আর এখনো ইইউ’র সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়েছে বৃটেন সরকার। বৃটিশ পার্লামেন্ট এখনো কোনো চুক্তিতে একমত হতে পারেনি।

বিরোধীদল লেবার পার্টির সংসদ সদস্য ইয়ান মুরে স্কটল্যান্ড আদালতের রায় নিয়ে বলেন, রায় অনুসারে, আগামী সপ্তাহে পূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এটা আধুনিক বৃটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সপ্তাহ এখন। এটা খুবই হতাশাজনক যে, বৃটিশ গণতন্ত্র রক্ষা করতে আমাদের আদালতে যেতে হচ্ছে। কিন্তু বরিস জনসন জনপ্রতিনিধিদের চুপ করিয়ে দেয়ার যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তার মোকাবিলা না করে থাকা যায় না। আদালতে এই আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সেও ব্রেক্সিট-বিরোধী প্রচারণা জারি রাখবো আমরা।

উল্লেখ্য, পার্লামেন্ট স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছেন জনসন। বিরোধী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ তার নিজ দলেও সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়েছে। উঠেছে অনাস্থা ভোটের প্রস্তাবও।

বাংলাদেশের রাজনীতিকে কলুষিত করেছে বিএনপি -প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে কলুষিত করেছে বিএনপি। এই গুম খুনের কালচার তো শুরু করেছিল জিয়াউর রহমান এই দেশে। আমাদের নারায়ণগঞ্জের ছাত্রনেতা মাহফুজ বাবু, তাকে যে তুলে নিয়ে গেল তার পরিবার তো আর তার লাশ পায়নি। শুধু আমাদের রাজনৈতিক দলের উপর এই জুলুম অত্যাচার তা নয়, সেনাবাহিনীতে যারা মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ছিল। যারা একদিন জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে যুদ্ধ করেছিল সেরকম বহু অফিসারকে নির্মমভাবে একের পর এক হত্যা করেছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারবালায় যেভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট যেন কারবালার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো ৩২ নম্বরে।
১৫ দিন আগে আমরা বিদেশে যাই। আমরা দুইবোন ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে যাই। বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি মানুষকে হত্যা করল যে মানুষ তাদের দেশ দিলো, স্বাধীনতা দিলো। সভায় এ নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আওয়ামী লীগ সভাপতি। বক্তব্যে বারবার শেখ হাসিনাকে আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদতে এবং চোখের পানি মুছতে দেখা যায়।

অতীতেও বিভিন্ন সময় ১৫ই আগস্টের নিষ্ঠুরতা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে কাঁদতে দেখা গেছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীর বিচার বন্ধ করলো। ট্রাইব্যুনাল বন্ধ করল। মন্ত্রিসভা যখন গঠন করলো, সেখানে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করলো, স্বাধীনতা বিরোধীদের মন্ত্রিসভায় স্থান দিলো। বিএনপির একটা কথা জানা উচিত, জিয়ার ক্ষমতা দখলকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছে। এজন্য বিএনপির সৃষ্টিটাও অবৈধ হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিকে কলুষিত করেছে তারা। আদর্শের রাজনীতি ধ্বংস করে খুনের রাজত্ব কায়েম করেছিল। শেখ হাসিনা বলেন, ১৫ই আগস্টে শুধু একটা পরিবারকে হত্যা নয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের ইতিহাসকে একবারে মুছে দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে যত আন্দোলন সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান তা মুছে দেয়া হয়েছিল। একমাত্র বিটিভি ছিল। সেখানে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা যেত না। একেবারে ইতিহাস থেকেই মুছে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু অবিনশ্বর। তিনি আজ জীবন্ত ইতিহাস। তিনি বেঁচে আছেন বাঙালির হৃদয়ে, বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মনে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে বিএনপি নেতারা নতুন সাফাই গাইতে শুরু করেছে।

বিএনপি নেতারা বলছে, ৭৫ সালে তো বিএনপি গঠনই হয়নি তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যায় বিএনপি কীভাবে জড়িত হলো? কিন্তু বিএনপির যে প্রতিষ্ঠাতা, সেই জিয়াউর রহমান নিজেই খুনি। জিয়াউর রহমান শুধু খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল না, এই হত্যার বিচার হবে না সেই ব্যবস্থাও জিয়াউর রহমান করেছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত ছিল তাদের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। ডালিমসহ অন্যদের যখন বিদেশে পাঠানো হলো অনেক দেশ তাদের গ্রহণ করেনি। যেসব দেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের সপক্ষে ছিল, তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের কূটনীতিক হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। তিনি আরো বলেন, দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল, তারাও পরবর্তীতে জিয়ার সঙ্গে গেছে। অনেকে এখনো বেঁচে আছে, বড় বড় কথাও বলে। কিন্তু তারা যে এই চক্রান্তের সঙ্গে সম্পূর্ণ জড়িত তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না এবং আজকে তা প্রমাণিত হয়েছে। এ সময় শেখ হাসিনা ১৫ই আগস্টের ঘটনায় বিদেশে অবস্থানের কারণে দুই বোনকে তৎকালীন সেনা সরকার দেশে ফিরে আসতে বাধা দিয়েছিল তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কারণ এই মিলিটারি ডিটেকটররা যখন ক্ষমতা নেয় তখন তাদের মনের ভেতর একটা সুপ্ত বাসনা থাকে, রাজনৈতিক নেতা হওয়ার। যদিও তারা রাজনৈতিক নেতাদেরই গালি দেয়। কারণ মোশতাক বেইমানি করে ক্ষমতায় গিয়েছিল। আড়াই মাসও কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ঠিক যেভাবে মীরজাফর বেইমানি করে সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করেছিল, মীরজাফরও কিন্তু ওই দুই মাসের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি।

ঠিক মোশতাকের ভাগ্যেও তাই ঘটলো, সেও থাকতে পারলো না। এই মোশতাকই কিন্তু জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেছিল। শেখ হাসিনা বলেন, আমি যখন দেশে ফিরতে পারলাম না। ১৯৭৯ সালে প্রথম রেহানা সুইডেনে যান। কারণ সুইডেনের যিনি আমাদের রাষ্ট্রদূত ছিলেন ড. রাজ্জাক। তিনি মোশতাক সরকারের কাছে আনুগত্য প্রকাশ করেননি এবং বলেছিলেন আমি খুনিদের চাকরি করবো না। তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সেই পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন এবং প্রতিবাদ করেছিলেন। শুধু তাই না, তিনি সেখানে একটা সভার আয়োজন করেন। তখন রেহানা ১৯৭৯ সালে সেখানে যায় এবং ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করে প্রথম রেহানাই সুইডেনে প্রতিবাদ করেছিল এবং বক্তব্য দিয়েছিল। ১৯৮০ সালে আমি যখন লন্ডনে যাই এবং রেহানার পাসপোর্টের সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল, বাংলাদেশের দূতাবাস সেই পাসপোর্টের মেয়াদ বৃদ্ধি করে দেয়নি। কারণ সরকারের নিষেধাজ্ঞা ছিল। আমি দিল্লিতে ছিলাম। দিল্লিতে আমাদের যিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন শামসুর রহমান সাহেব, তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আসামি ছিলেন। তিনি কোনো কিছু না বলে চুপচাপ আমাদের পাসপোর্টটা রিনিউ করে দিয়েছিলেন। লন্ডনের দূতাবাস রেহানার পাসপোর্ট দেয়নি। কারণ উদ্দেশ্য একটিই ছিল কোনোমতে যেন দেশে আসতে না পারে।

তবে বৃটিশ সরকার পরে তাকে অ্যাসাইলাম দেয় এবং তাকে সেখানেই নাগরিকত্ব দিয়েছিল। শেখ হাসিনা বলেন, আমি ১৯৮০ সালে লন্ডনে গেলাম। এই ব্যাপারে তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী আমাকে সহযোগিতা করেছিলেন এবং ভিসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এরপর লন্ডনে গিয়ে প্রতিবাদ সভা করি এবং সেখানে একটি ইনকোয়ারি কমিশন গঠন করি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যিনি জাতির পিতাকে সমর্থন করতে এসেছিলেন, স্যার টমাস উইলিয়ামস (কুইস কাউন্সিলের তিনি সদস্য)। তিনি বৃটিশ পার্লামেন্টের এমপি ছিলেন। তিনি এবং শন ম্যাকব্রাইড আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নোবেল লরিয়েট, তাকেসহ বৃটিশ অন্যান্য দলের এমপিদের নিয়ে আমরা একটা ইনকোয়ারি কমিটি করি এবং এই ইনকোয়ারি কমিটিতে প্রবাসী বাঙালিরা তারা সেখানে ডোনেশন দেয় এবং ইনকোয়ারি কমিটির পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি বাংলাদেশে আসবেন, এই ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করবার জন্য এবং স্যার টমাস উইলিয়াম কিউসি এমপিকে আমরা ঠিক করি তিনি আসবেন এবং ওনাকে একটি সলিসিটারও নিয়োগ দেয়া হয় যার কাছে ফান্ড থাকতো এবং সমস্ত কাজগুলো হবে। তিনি যখন ভিসা চাইলেন, জিয়াউর রহমান তখন প্রেসিডেন্ট। জিয়া কিন্তু স্যার টমাস উইলিয়াম এমপিকে ভিসা দেয়নি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় তিনি যখন এসেছিলেন, তখন কিন্তু পাকিস্তানি সরকারও ভিসা দিয়েছিল।

কিন্তু ১৫ই আগস্টের পরে যখন ১৯৮০ সালে স্যার টমাস উইলিয়ামস আসতে চাইলেন, জিয়াউর রহমান তাকে ভিসা দিলেন না। শেখ হাসিনা বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে বলেন, প্রশ্ন এখানে, বিএনপি নেতাদের এটা আমি বলতে চাই এবং জিজ্ঞাসা করি, জিয়া যদি খুনি না হবেন আর তার হাতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল এই বিএনপি, এরা যদি খুনিদের দল না হবে আর খুনির দল না হয়, তাহলে স্যার টমাস উইলিয়াম কিউসি এমপিকে কেন বাংলাদেশে তদন্ত করতে আসতে দেয়নি? তার দুর্বলতাটা কি ছিল? সে কিন্তু ভিসা দেয়নি। অর্থাৎ এই ঘটনার কোনো তদন্ত হোক, হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক, সেটা তো আইন করে আগেই বিচার বন্ধ, খুনিদের পুরস্কৃত করা এবং জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর সাধারণত মিলিটারি ডিটেকটর যখন ক্ষমতায় আসে আগে রাজনীতিবিদদের গালি দেয়। আর এরপরে নিজেরাই উর্দি খুলে তারপরে রাজনীতিবিদ সাজতে চায়। প্রথমে হ্যাঁ-না ভোট তারপরে প্রেসিডেন্ট ভোট অনেক নাটক করে এরপরে সে রাজনৈতিক দল করলো এবং সেটাও কয়েক দফা দলের নাম পরিবর্তন করে এই বিএনপির সৃষ্টি। আর সেই দলে যোগ দিলো কে? আওয়ামী লীগের যে সকল নেতাকর্মী বেইমান-মুনাফেক তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। তারা ছাড়া সব নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং কারাগারে ছিল। আবার ৩রা নভেম্বর কারাগারে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো। ১৯৭৫ থেকে ’৭৯ সাল পর্যন্ত আমাদের সব নেতাকর্মী কিন্তু কারাগারে বন্দি ছিল। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়েছে। বহু নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে গেছে। দিনের পর দিন অত্যাচার করেছে। তার পরিবার লাশটাও পায়নি। আজকে তারা গুম-খুনের কথা বলে। শেখ হাসিনা বলেন, শোনা যায়, জিয়াউর রহমান টেবিলে বসে খেতে খেতেই এই ধরনের মৃত্যুদণ্ডের ফাইলে সই করত। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যারা ছিল, তারা বলতে পারবে, এমন এমন রাত আটজন, দশজন করে জোড়ায় জোড়ায় ফাঁসি দিয়েছে এবং তাদের চিৎকার তাদের কান্নায় ওই কারাগারের আকাশ ভারী হয়েছে। চরিত্রটাই তো এই ধরনের খুনের।

যেটা আপনারা দেখতে পারেন ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায়। কীভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড হামলা হলো। আইভী রহমানসহ আমাদের ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত। তাদের লাশও তো দিতে চায়নি। ২০০১ সালে এসে ঠিক ’৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যেভাবে যে প্রক্রিয়ায় হত্যাকাণ্ড এবং গণহত্যা চালিয়েছে, বিএনপি কিন্তু সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করলো। জঙ্গিবাদ সৃষ্টি এবং সন্ত্রাস সৃষ্টি করে মদত দেয়া, চোরাকারবারি, মানি লন্ডারিং এমন কোনো অপকর্ম নেই, সমাজটাকে তারা ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছিল। এই ধারাবাহিকতায় ৭৫’র ১৫ই আগস্টের পর থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ২১ বছর, আবার ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত। এই দেশের মানুষ কি পেয়েছিল? মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তো কেউ কাজ করেনি। তাদের নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন ঘটেছিল। কিন্তু মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। এসব কাজে তাদের মনোযোগেই ছিল না। আলোচনা সভায় মহানগর নেতারা ১৫ই আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক খুনিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করার দাবি জানানোর পাশাপাশি ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার মাস্টারমাইন্ডদের সাজা কার্যকর করার দাবি জানান। ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি একেএম রহমতউল্লাহর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় ঢাকা মহানগর নেতাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- দক্ষিণের সহ-সভাপতি আবু আহম্মেদ মান্নাফী, উত্তরের সহ-সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, জাহানারা বেগম, সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি ও কামাল চৌধুরী।

এত কষ্ট কীভাবে সইছে শিশুটি! -সরজমিন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল

দুপুর ১টা ৫০ মিনিট। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের প্রবেশমুখে একটি টেলিভিশনের ক্যামেরা রোগীর স্বজনদের ফুটেজ নিতে ব্যস্ত। ছুটির দিনেও হাসপাতালের ইমার্জেন্সি সার্ভিসে জনাকতক মানুষের ভিড় দেখা যায়। সিঁড়ি বেয়ে ভবনের তিন তলার ১১ নং ওয়ার্ডে লবি থেকে শুরু করে সিঁড়ির দু’পাশে অধিকাংশই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। ওয়ার্ডের বাইরে ডান পাশের লবিতে চিকিৎসা নিচ্ছে সার্থক বিশ্বাস। বয়স ১১ মাস। হাতে মস্তবড় একটি ক্যানোলা। বেডের কাছে সাদা পোশাক পরিহিত কাউকে আসতে দেখলেই ভয়ে চিৎকার শুরু করে সার্থক।
এই বুঝি তাকে আবার ইনজেকশন দিবে। ভয়ে মায়ের কোলের মধ্যে লুকায়। এ সময় মা শিলা বিশ্বাস ছেলেকে বলেন, ভয় পেয়ো না বাবা। এরা তোমার মাসি হয়। শরীরের তুলনায় বুক পেটের অংশ অপেক্ষাকৃত বেশি ভারী শিশুটির। ফুসফুসে পানি জমেছে। লিভার বেড়ে গেছে। ১ মাস বয়সে পায়ুপথে ফোঁড়া হয়। সেখানে প্রায় তিনবার অস্ত্রোপচার করা হয়। তার ওপর নিয়মিত জ্বর থাকে শরীরে। গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জানান, তার ডেঙ্গু হয়েছে। ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। পরবর্তীতে এক সপ্তাহ আগে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিলা বিশ্বাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে মানবজমিনকে বলেন, আমার এত কম বয়সী ছেলেটার অবস্থা দেখেছেন কেমন হয়ে গেছে। ও আমার প্রথম সন্তান। ওর বাবা শংকর বিশ্বাস গ্রামে কৃষি কাজ করেন। ছেলে আমার জন্মের একমাস পর থেকেই একটার পর একটা অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে। অবশেষে ডেঙ্গু হলো। ছেলের ফুসফুসের একটি অংশ নাই বললেই চলে এমনটিই জানিয়েছেন ডাক্তাররা। এতোটুকু শরীরে এতো কষ্ট কিভাবে সইছে ও? ভগবান জানেন। ওর শরীরে কতো যে ইনজেকশন আর স্যালাইন পুশ করা হয়েছে তার হিসাব নেই। ছেলে আমার এখন সাদা পোশাকে কাউকে আসতে দেখলেই ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। ওর শরীর থেকে জ্বর’ই কমছে না। আশির্বাদ করবেন, ঈশ্বর যেন আমার ছেলেটার দিকে মুখ তুলে তাকায়।

ওয়ার্ডের ভেতরে ফ্লোরে শুয়ে আছে রহমত উল্লাহ। বয়স ৬ মাস। নাকে নল। কপালে ব্যান্ডিজ। মাথার কাছেই একটি স্টিলের বাটিতে বড় একটি ব্যবহৃত ইনজেকশন রাখা। বাবা মো. আল আমিন বলেন, আমাদের বাড়ি বরিশাল। এটা আমার তৃতীয় বাচ্চা। ৬ মাসের ছেলে আমার দেখলে মনে হবে সদ্য জন্ম নেয়া শিশু। ১৫ দিন আগে ওর ঠান্ডা লাগে। সেখান থেকে নিউমোনিয়া। পরবর্তীতে জ্বর। বরিশালের ডাক্তাররা বলেছে ওর ডেঙ্গু হয়েছে। কিন্তু এখানে চিকিৎসকরা বলেছে ডেঙ্গু নয় তবে নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়েছে। তার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বেড পাইনি।
আতিয়া। বয়স ৮ মাস। হাতে স্যালাইন চলছে। কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। বাবার কোলে উঠতে সে নানান ধরনের কসরত করে যাচ্ছে। মা মায়া আক্তার বলেন, আমাদের বাসা কল্যাণপুর। আতিয়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছে। চলতি মাসের পাঁচ তারিখ টেস্ট করালে ওর এনএসওয়ান পজেটিভ আসে। পরবর্তীতে বাসায় রেখে চিকিৎসা করালেও জ্বর না কমায় হাসপাতালে ভর্তি করি। এখন বুকের দুধ খেতে পারে। ডাক্তার বলেছে। দুই একদিনে ছেড়ে দিবে।

পাশের বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে জুবায়ের। বয়স মাত্র ১ মাস ৯ দিন। মা শারমিন বলেন, প্রথমে ঠান্ডা ছিল। এরপর কাশি। শরীরে জ্বর আছে। ধারণা করছি ডেঙ্গু হয়েছে। তবে আমার ছেলের মুখে হাসি লেগেই আছে। কোনো অসুস্থ্যতাকে থোরাই কেয়ার করছে। পাশে থাকা নানু বলেন, নাতি আমার এতো অসুস্থ্যতার মধ্যেও হেসে কুটি কুটি। বাচ্চারা সাধারণত দুই থেকে তিন মাসের আগে হাসে না। কিন্তু তার মুখের হাসি যেন ফুরায় না।

ওয়ার্ডের বাইরে বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছে ঝিলমিল। বয়স ৪ বছর। মা ও খালার মাঝখানে শুয়ে আছে ঝিলমিল। হাতে স্যালাইন চলছে। কিন্তু তার কোনো হুশ নেই। পাশে থাকা মা বলেন, আমরা হুমায়ুন রোডের জেনেভা ক্যাম্পে থাকি। গত ৪ দিন ধরে ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। ওর বাবা বাসায় বসে পোশাকে জরিবুটির কাজ করে। ওর রক্তের প্লাটিলেট কিছুটা ভালো থাকলেও প্রেসারটা খুব বেশি ওঠা নামা করছে। এটা নিয়েই যত ভয় হয়।

কাশ্মীরকে এড়িয়ে যেতে পারে না বিশ্ব, আমরা সবাই ঝুঁকিতে by ইমরান খান

গত আগস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর আমি যেসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম তার মধ্যে অন্যতম ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা। আমাদের কঠিন ইতিহাসজুড়ে ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রই একই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। এরমধ্যে আছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষ করে হিমবাহ গলে যাওয়া ও দু’দেশের কোটি কোটি মানুষের সুপেয় পানির অভাব।

বাণিজ্য ও কাশ্মীর ইস্যুর সমাধানের মধ্য দিয়ে আমি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলাম। কাশ্মীর ইস্যুই ছিল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথে সব থেকে বড় বাধা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জয় পাওয়ার পর গত বছরের ২৬শে জুলাই টেলিভিশনে আমার প্রথম বার্তায় বলেছিলাম, আমি ভারতের সঙ্গে শান্তি চাই। ভারত যদি এ লক্ষ্যে এক পা এগিয়ে আসে, আমরা তাহলে তাদের দিকে দুই পা এগিয়ে যাব। এরপর উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে একটি বৈঠক আয়োজন করা হয়।
কিন্তু ভারত ওই বৈঠক বাতিল করে। নরেন্দ্র মোদির কাছে লেখা আমার তিন চিঠির প্রথমটি আমি তখন লিখেছিলাম। এতে আমি তাকে আলোচনার ও শান্তির জন্য কাজ করার আহ্বান জানাই।

দুঃখজনকভাবে শান্তির জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসার আমার সব চেষ্টা ভেস্তে দেয় নয়াদিল্লি। তখন আমরা ধারণা করি, নরেন্দ্র মোদির কট্টরপন্থি অবস্থান ও পাকিস্তানবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে একটি জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যা গত মে মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোট পেতে তাকে সাহায্য করেছে।
ওই নির্বাচনের পূর্বে গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি এক কাশ্মীরি যুবক ভারতীয় সেনাদের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালায়। ভারত সরকার এ হামলার দায় পুরোপুরি পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়। আমরা তাদের কাছে এমন দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ দেখাতে বলি। কিন্তু মোদি সীমান্তের এপারে হামলা চালাতে তার বিমান বাহিনীকে পাঠায়। আমাদের বিমান বাহিনী তাদের একটি বিমান ভূপাতিত করে ও তার পাইলটকে আটক করে। আমরা তাদেরকে বার্তা দিতে চেয়েছিলাম যে হামলা চালিয়ে পাকিস্তান কোনো জীবন কেড়ে নিতে চায় না। আমরা আটক ভারতীয় পাইলটকে কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই ফেরত দিয়েছিলাম।

এরপর ২৩শে মে, নরেন্দ্র মোদি যখন পুনরায় নির্বাচিত হলেন আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছি। জুনে আমি আলোচনার আহ্বান জানিয়ে তার কাছে আরো একটি চিঠি পাঠাই। কিন্তু আবারো ভারত কোনো ধরনের আগ্রহ দেখায় নি। আমরা বুঝতে পারলাম, ভারত এখন পাকিস্তানকে কালো তালিকাভুক্ত করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

স্পষ্টভাবেই নরেন্দ্র মোদি শান্তির লক্ষ্যে আমাদের প্রস্তাবকে ভুল বুঝেছেন। আমরা কোনো শত্রুভাবাপন্ন সরকারের বিরুদ্ধে ছিলাম না। আমরা বিরুদ্ধে ছিলাম এমন একটি সরকারের বিরুদ্ধে যেটি হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ও আরো বেশ কয়েকজন মন্ত্রী আরএসএস সদস্য। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অ্যাডলভ হিটলার ও বেনিতো মুসোলিনির ভক্ত। নরেন্দ্র মোদির গুরু ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত এক বইয়ে লিখেছিলেন, কোনো জাতি ও এর সংস্কৃতিতে শুদ্ধতার জন্য জার্মানি শুদ্ধাভিযান চালাচ্ছে। সেখানে আমরা দেখতে পাই জাতীয় গর্ব চূড়ায় অবস্থান করছে। জার্মানি যা করেছে তা হিন্দুস্তানের জন্য একটি ভালো শিক্ষা। আমাদের এটি শেখা উচিত।

আমি আশা করেছিলাম, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মোদি যেরকম মানুষ ছিলেন নতুন করে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তার সেসব পুরোনো পদ্ধতি ভুলে যাবেন। গুজরাটের স্থানীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে দাঙ্গা হয়েছিল তার জন্য বিশ্বব্যাপী কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন মোদি। একইসঙ্গে এ জন্য তার ভিসা আবেদন বাতিল করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তার প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সময়টি মুসলিম, খ্রিস্টান ও দলিত সম্প্রদায়ের ওপর হিন্দুত্ববাদীদের হামলার মধ্য দিয়ে লেখা হয়েছিল।

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে আমরা দেখি, কাশ্মীরি মানুষদের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন বেড়েই চলেছে। তরুণ কাশ্মীরি বিক্ষোভকারীদের পেলেট বিদ্ধ করা হচ্ছে। এতে শত শত তরুণ অন্ধ হয়ে গেছে। গত ৫ই আগস্ট নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের স্বশাসনের অধিকার কেড়ে নিতে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে। ভারতের এমন পদক্ষেপ তাদের সংবিধান অনুযায়ী অবৈধ। তবে তার থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজুল্যুশনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত শিমলা চুক্তির লঙ্ঘন।

মোদির নতুন ভারত কাশ্মীরে আরো সেনা মোতায়েন করছে, এর জনগণকে কারাবন্দি করছে। কাশ্মীরিদের ঘরবন্দি করে তাদের ফোন লাইন, ইন্টারনেট ও টেলিভিশন সেবা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। তাদের কাছে নিজের আপনজন হতে শুরু করে সমগ্র পৃথিবীর কোনো খবর নেই। এই ঘোষণার পর হাজারো কাশ্মীরিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদেরকে সমগ্র ভারতজুড়ে থাকা বিভিন্ন কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে কাশ্মীরিরা এই ঘোষণার বিরোধিতা করতে রাস্তায় নেমে এসেছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই অঞ্চল থেকে কারফিউ উঠিয়ে নিলে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে।

যদি কাশ্মীরের মানুষদের ওপর ভারতীয় আগ্রাসন বন্ধে বিশ্ব কিছু না করে তাহলে তা কঠিন পরিণতি ডেকে আনবে। দুটি পরমাণু শক্তিসম্পন্ন দেশ সামরিকভাবে মুখোমুখি হতে চলেছে। এরইমধ্যে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পরমাণু বোমার নো ফার্স্ট ইউজ নীতি থেকে সরে আসার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে দেশটির নেতারাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের এই পরিকল্পনাকে সন্দেহের চোখে দেখেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় যখন পরমাণু যুদ্ধের বাতাস বইছে তখন আমার মনে হচ্ছে, পাকিস্তান ও ভারতের উচিত কাশ্মীর ইস্যু, কৌশলগত নানা বিষয় ও বাণিজ্য নিয়ে এখনি আলোচনায় বসা। কাশ্মীর নিয়ে আলোচনায় কাশ্মীরিদেরসহ এর সব অংশীদারদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আলোচনা ও দরকষাকষির মধ্য দিয়ে অংশীদাররা এমন একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারবে যা কাশ্মীরি জনগণের কয়েক দশক ধরে চলা দুর্দশার সমাপ্তি ঘটাবে। একইসঙ্গে এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু এই আলোচনা শুধু তখনই সম্ভব যখন ভারত কাশ্মীরিদের স্বশাসনের অধিকার ফিরিয়ে দেবে, এই অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে তাদেরকে মুক্তি দেবে ও ভারতীয় সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ব্যবসা ও বাণিজ্য সুবিধার বাইরে গিয়ে চিন্তা করা। মিউনিখ চুক্তির কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল। সেই একইরকম আরেকটি হুমকি এখন পৃথিবীতে নাড়া দিচ্ছে। কিন্তু এবার এটি হচ্ছে পরমাণু অস্ত্রের ছায়ায়।

গোলাম সারওয়ার শুধু সম্পাদক নন শিক্ষকও ছিলেন: -স্মরণসভায় বক্তারা

গোলাম সারওয়ার ছিলেন নির্ভীক ও সৎ সাংবাদিকতার প্রতীক। তিনি সৃজনশীলতায় সকলকে ছাড়িয়ে গেছেন। অন্যরা যা ভাবতো তিনি তা বাস্তাবায়ন করতেন। তিনি তরুণ সাংবাদিকদের জন্য ছিলেন সবসময় অনুকরণীয়। গোলাম সারওয়ার পক্ষ-বিপক্ষ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ছিলেন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। গতকাল রাজধানীর টাইমস মিডিয়া ভবনে গোলাম সারওয়ারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘গোলাম সারওয়ার নাগরিক পরিষদ’-এর উদ্যোগে স্মরণসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। স্মরণসভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

স্মরণসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সারওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ষাটের দশকে। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য আমরণ লড়াই করেছেন।
এখন এমন একটা সময় পার করছি যেখানে স্বাধীন সাংবাদিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এসময় কাটিয়ে আবার স্বাধীন সাংবাদিকতা ফিরে আসবে সেটাই আশা করছি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, শোকের মাসেই আমরা সারওয়ার ভাইকে হারিয়েছি। তার সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। তিনি মাঠের লড়াইয়ে ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনাম বলেন, গোলাম সারওয়ার ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় আমরা সম্পাদক পরিষদ গঠন করি। সারওয়ার ভাইকে একটা কাজ দিয়েই আমরা স্মরণ করতে পারি। আর তা হচ্ছে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা। আমি বিশ্বাস করি স্বাধীন সাংবাদিকতাই হচ্ছে সঠিক সাংবাদিকতা।

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, সারওয়ার ভাই সাংবাদিকতায় যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখন যে অনেক মিডিয়া তৈরি হয়েছে তাতে সারওয়ার ভাইয়ের অবদান রয়েছে। সারওয়ার ভাইকে তার কর্মের ও অবদানের জন্য আমরা মনে রাখবো।

সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, গোলাম সারওয়ার ছিলেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক। তিনি ছিলেন অকুতোভয়। নিরেট বঙ্গবন্ধুপ্রেমী। তিনি আগাগোড়া ছিলেন বাঙালি। তিনি তরুণ সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন যারা আজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত রয়েছে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, আমি গোলাম সারওয়ারের হাসিমুখ ছাড়া কখনো বিমর্ষ মুখ দেখিনি। তিনি আমার আত্মার মানুষ। তার সঙ্গে আমার ষাটের দশক থেকেই সম্পর্ক। সাংবাদিকতা, সংবাদে যে কৌশলী হতে হয় তাতে গোলাম সারওয়ারের তুলনা নেই। আর কথা হবে না, দেখা হবে না এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি কৌশলী ছিলেন, বিরোধী দলের নিউজ কিভাবে কাভার করতে হয় তা তিনি জানতেন। গোলাম সারওয়ারের মতো একজন উঁচুমানের সাংবাদিক আমাদের প্রয়োজন। সত্য যেন আমরা সাহসের সঙ্গে বলতে পারি। চোখের সামনে রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাবে, এই বেঁচে থাকায় কোনো আনন্দ নেই। অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করিনি। শারীরিকভাবে সারওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না হলেও নীতিগতভাবে দেখা হবে সে বিশ্বাস করি।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আমার পক্ষে কষ্টকর ব্যাপার সারওয়ার ভাইয়ের সম্পর্কে কথা বলা। তিনি আমাকে অত্যন্ত মায়া, স্নেহ করতেন। তিনি আমার পরমাত্মীয় ছিলেন। তিনি আমাকে দিকনির্দেশনা দিতেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার কথা আজও মনে পড়ে। সারওয়ার ভাই ছিলেন একজন হেমিলনের বংশীবাদক। তিনি যখন ইত্তেফাকে ছিলেন ইত্তেফাক হাতে নিয়েছি, যুগান্তরে যখন গেলেন তখন যুগান্তর হাতে নিয়েছি, সমকালে যখন গেলেন তখন হাতে নিলাম।

বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, সরওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল। তিনি আমাকে নানা উপদেশ দিতেন। তিনি আমাকে সাহস যুগিয়েছেন। প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, গোলাম সারওয়ার ছিলেন আমাদের বটবৃক্ষ, সাংবাদিকতার বাতিঘর। এখন প্রেস ক্লাব পরিচালনা করতে গিয়ে সারওয়ার ভাইয়ের অভাব অনুভব করছি।

সমকালের প্রকাশক ও এফবিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, সারওয়ার ভাই একজন পেশাজীবী সাংবাদিক ছিলেন। এ পেশায় যারা আছেন অনেক চ্যালেঞ্জ। এটা সব পেশা থেকে আলাদা। তাই আমি এটাকে সম্পূর্ণ আলাদা পেশা হিসেবে দেখি। সারওয়ার ভাই আমার পারিবারিক বন্ধু ও বড়ভাই ছিলেন। সারওয়ার ভাইয়ের মতো আদর্শ সাংবাদিক হতে হবে। এখন মানুষ সংবাদপত্র পড়তে চাচ্ছে না সে জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে।
সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, গোলাম সারওয়ার তার সংবাদিকতার ৫৪ বছরে ৫০০ এর অধিক সাংবাদিক তৈরি করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখে গেছেন। তার অবদানেই আজকের সমকাল পত্রিকা। বিএফইউজের সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, গোলাম সারওয়ার সম্পাদকের পাশাপাশি শিক্ষকও ছিলেন। আমি তাকে শিক্ষক মনে করি। গোলাম সারওয়ার ভাইয়ের স্মরণসভায় আজ একটাই কথা বলতে পারি তাকে যেন আমরা মনে করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আমরা গোলাম সারওয়ারের বন্ধু হিসেবে বলতে পারি, একজন ভালো মানুষই একজন ভালো সম্পাদক হতে পারে। আর তিনি তাই ছিলেন। তিনি যে একজন ভালো বার্তা সম্পাদক ছিলেন তার তুলনা নেই। তিনি সম্পাদক হিসেবেও ছিলেন অতুলনীয়। তিনি কি সুন্দরভাবে সংবাদ সাজাতেন তা তার পত্রিকায় দেখছি আমরা। তিনি অল্প কয়েক শব্দে কত সুন্দর নিউজ দিতেন। তিনি ছিলেন সংবাদপত্রে সৃজনশীলতার উৎকর্ষ। তিনি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা দেখিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, গোলাম সারওয়ার বহমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি সবক্ষেত্রেই ছিলেন অবিস্মরণীয়। সরওয়ার ভাই আপাদমস্তক একজন ভদ্র মানুষ ছিলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, আমি দুটি কারণে সারওয়ার ভাইয়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। মঞ্চ কালো কাপড়ে মোড়ানো এটা তার সঙ্গে যায় না, তিনি উজ্জ্বল রঙ পছন্দ করতেন। এছাড়া ১ মিনিট নীরবতা পালন করা এটাও তার সঙ্গে যায় না। গণমাধ্যমে নীতিনৈতিকতায় সারওয়ার ভাইয়ের সমকক্ষ কেউ নেই। স্মরণসভায় সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার প্রিয় ছাত্র ছিলেন গোলাম সারওয়ার। তার সঙ্গে আমার ষাটের দশকেই পরিচয়। সারওয়ারের সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ছিল শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ন। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

আসামঃ রাত পোহালেই ভারতের নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে যে ৪০ লক্ষ বাংলাভাষী

এনআরসির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তাদের ভাগ্য এখন সুতার ওপর ঝুলছে।
এরা গত বছর ঐ রাজ্যের 'প্রমাণিত নাগরিক' তালিকার বাইরে পড়ে গেছেন।
প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার করার লক্ষ্যে এক সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার অবশ্য দাবি করে থেকে যে আসামে তাদের কোন নাগরিক নেই।
এসব নাগরিক এখন উদ্বেগের মধ্য দিয়ে অপেক্ষা করছে যখন ৩১শে অগাস্ট আসামের নাগরিকত্বের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।

কীভাবে এই বিতর্কের শুরু?

বাংলাদেশ থেকে আসা তথাকথিত অবৈধ অভিবাসীদের ইস্যুটি কিন্তু কোন নতুন ঘটনা নয়।
আসামের ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস বা এনআরসির প্রথম তালিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। সেটা ছিল ভারত ভাগের চার বছর পর। সে সময় তৎকালীন পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পর লক্ষ লক্ষ লোক সীমান্ত অতিক্রম করে নবগঠিত ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
বিপুল সংখ্যক মুসলমানদের আগমন হিন্দু-প্রধান আসামের জনসংখ্যার ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে এই আশঙ্কায় সেখানকার অসমীয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলো আন্দোলন শুরু করে এবং নাগরিকত্বের প্রথম তালিকাটি তৈরি হয়।
এই সমস্যা আবার দেখা দেয় ১৯৭০-এর দশকে যখন বাংলাদেশে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু হয়। সে সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ পালিয়ে ভারতে চলে যায়। এদের একাংশ আসামে আশ্রয় নেয়।
অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) ১৯৭৯ সালে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৩ সালে এই আন্দোলন সহিংস রূপ নেয় যাতে ২০০০ সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসী প্রাণ হারান। এদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলমান।
আসু এবং কয়েকটি আঞ্চলিক দল এই প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে একটা চুক্তিতে আসে।
চুক্তিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চ আগে থেকে আসামের বাসিন্দা কেউ এমনটা প্রমাণ করতে না পারলে তাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে এবং তাকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
কিন্তু চুক্তিটি কখনই বাস্তবায়ন করা হয়নি।

তাহলে এত বছর এ নিয়ে কেন এত হৈচৈ?

অভিজিৎ শর্মা নামে এক ব্যক্তি ২০০৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোটের কাছে এক পিটিশন দায়ের করেন এবং এনআরসি তালিকা হালনাগাদ করার আবেদন করেন।
দু'হাজার চৌদ্দ সালে আদালত ঐ তালিকা ২০১৬ সালের ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে হালনাগাদ করার জন্য কেন্দ্র সরকারকে আদেশ দেয়।
তবে দু:সাধ্য এই কাজ - যাতে তিন কোটি ২০ লক্ষ মানুষের দলিলপত্র যাচাই করার ব্যাপার রয়েছে - তা সম্পন্ন করে সরকার ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশ করে।
যাচাই বাছাইয়ের পর ঐ খসড়ার দ্বিতীয় তালিকাটি প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের ৩০শে জুলাই।

কারা আছেন এই তালিকায়?

এনআরসিতে যাদের নাম রয়েছে তারা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চের আগে তারা আসামে এসে হাজির হয়েছেন।
নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য রাজ্যের সব অধিবাসীকে তাদের জমির দলিল, ভোটার আইডি এবং পাসপোর্টসহ নানা ধরনের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয়েছিল।
যারা ১৯৭১ সালের পর জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের প্রমাণ করতে হয়েছে যে তাদের বাবা-মা কিংবা তাদের বাবা-মা ঐ তারিখের আগে থেকেই আসামের বাসিন্দা।
খসড়া তালিকা অনুযায়ী, রাজ্যের মোট তিন কোটি ২৯ লক্ষ বাসিন্দা তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে সমর্থ হন।
কিন্তু ৪০ লক্ষ মানুষ এই তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।
নাগরিকত্বের বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম কেটে দেয়া হতে পারে।
এরপর নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হয় এবং ৩৬ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য দলিলপত্র জমা দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
চলতি বছর ২৬শে জুন আসাম সরকার ঘোষণা করে যে এক লক্ষ বাসিন্দাকে এনআরসি তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে এবং তাদের আবার নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে।
এনআরসি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে যে তালিকা থেকে বাদ পড়া বহু লোকের কাছে তারা চিঠি পাঠিয়েছে এবং কাছের অফিস বাদ দিয়ে বহু দূরের অফিসগুলোতে গিয়ে তাদের কাগজপত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
নাগরিকত্বের তালিকা হালনাগদ করার প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করছে সুপ্রিম কোর্ট।
চূড়ান্ত তালিকাটি ৩১শে অগাস্ট প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।

কেমন প্রতিক্রিয়া ছিল আসামে?

নাগরিকত্বের তালিকা নিয়ে নানা মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ভারত জুড়ে বহু হিন্দু আসামের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির প্রশংসা করে বলেছেন, অন্য রাজ্যগুলো সেটা করার 'সাহস' পায় নি, আসাম সেটাই করে দেখিয়েছে।
কিন্তু বিরোধী দলগুলো এই প্রক্রিয়ার কঠোর নিন্দা জানিয়েছে এবং বলেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার বহু পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে ও লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাতারাতি রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত করেছে।
বিরোধীদল কংগ্রেস পার্টির নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, এই তালিকা মানুষের মধ্যে ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এই তালিকার সবচেয়ে সরব সমালোচকদের একজন। তিনি আশঙ্কা করছেন, এই প্রশ্নে 'রক্তগঙ্গা' বয়ে যাবে এবং এই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটা পরিহাস।
কিন্তু স্থানীয় ভারতীয় কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, তারা 'মুসলমানদের লক্ষবস্তুতে' পরিণত করছেন না। তবে এনআরসির প্রধান প্রতীক হাজেলা বিবিসি উর্দুর কাছে স্বীকার করেছেন যে যারা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন তারা 'ভিন্ন ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষ'।
স্থানীয়ভাবে আসামের আদি বাসিন্দা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ অসমীয়ারা এই প্রক্রিয়াকে জোরালোভাবে সমর্থন করছেন। অসমীয়াদের মধ্যে নানা ধরনের জাতি ও ভাষা গোষ্ঠী এবং উপজাতি রয়েছে।
এই গোষ্ঠীগুলোর সবার ভাষা অহমীয়া হলেও তাদের ধর্মীয় পরিচয় বিভিন্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বড় অংশ হিন্দু এবং মুসলমান।
স্থানীয় হিন্দুরা বিপুলভাবে এনআরসির সমর্থক। কিন্তু স্থানীয় মুসলমানরা এনিয়ে কিছুটা নীরব। কারণ তাদের ভয় এ নিয়ে মুখ খুললে তাদেরও বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে।
আর তাদের এই আশঙ্কার মূলে রয়েছে আসামের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার প্রধানের বক্তব্য যেখানে তিনি খোলাখুলিভাবে বলেছেন যে তিনি মুসলমান অভিবাসীদের চেয়ে হিন্দু অভিবাসীদের প্রাধান্য দেবেন।

এনআরসি প্রক্রিয়াটি কেমন ছিল?

নাগরিকত্ব প্রমাণের প্রক্রিয়া থেকে চমকে যাওয়ার মতো ফলাফল দেখতে পাওয়া গেছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা, বর্তমান রাজনৈতিক নেতা এমনকি কিছু সরকারি কর্মকর্তাও ঐ তালিকায় তাদের নাম খুঁজে পাননি।
সামান্য বানান ভুলের জন্য আবেদনকারীদের দলিলপত্র খারিজ করে দেয়া হয়েছে। দেখা গেছে, কোন পরিবারের এক সদস্যের নাম তালিকায় রয়েছে। কিন্তু বাদ পড়েছেন অন্য সদস্য।
আসাম নিয়মিতভাবে বন্যার শিকার হয়। একারণে বহু পরিবারের সরকারি কাগজপত্র নষ্ট হয়েছে।
দলিলপত্র সংরক্ষণের দুর্বলতা, অশিক্ষা এবং অর্থ না থাকায় মামলা করতে পারেনি বহু পরিবার।
পরিবার ও আন্দোলনকারীরা বলছে, এই অনিশ্চয়তার চাপ নিতে না পেরে অনেকেই আত্মহত্যা করেছে।
আসামের প্রতিষ্ঠান সিটিজেন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস-এর নেতা জামির আলী বলছেন, 'মানসিক আঘাত ও চাপ' সইতে না পেরে আসামে ৫১ ব্যক্তির আত্মহত্যার তথ্য তাদের হাতে রয়েছে।
বেশিরভাগ আত্মহত্যা ঘটনা ঘটেছে ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের পর, যেসময়ে নাগরিক তালিকার প্রথম খসড়াটি প্রকাশিত হয়েছিল।

গণবহিষ্কারের ঘটনা কী আদৌ ঘটবে?

এটা এখনও পরিষ্কার না, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনও যে বহিষ্কার ঘটবে তার সম্ভাবনাও কম।
এনআরসি তালিকা থেকে যারা বাদ পড়বেন তাদের নাগরিকত্বও সাথে সাথে বাতিল হয়ে যাবে না। এর বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য তারা ১২০ দিন সময় পাবেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বহুবার বলেছেন যে আসামের অবৈধ মুসলমান অভিবাসীদের রাজ্য থেকে বহিষ্কার করা হবে।
তবে বিবিসির সৌতিক বিশ্বাস বলছেন, এসব মানুষকে যে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না, তা প্রায় নিশ্চিত।
তিনি বলছেন, এর পরিবর্তে ভারত মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতো 'নতুন একদল রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক তৈরি করে ফেলতে পারে' এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।
অবৈধ অভিবাসী হস্তান্তরের প্রশ্নে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোন চুক্তি নেই।
ঐ অঞ্চলের নিরাপত্তা বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ শেষাদ্রি চারি বলছেন, বাংলাদেশ বরাবরই এই ইস্যুটিকে ভারতের "অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে বিবেচনা করে এবং বলে যে এটা দু'দেশের দ্বিপাক্ষিক কোন বিষয় নয়।"
"এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের এই সিদ্ধান্তেরই প্রমাণ পাওয়া যায় যে ভারত পাঠাতে চাইলেও একজন অবৈধ অভিবাসীকেও বাংলাদেশ গ্রহণ করবেন না," তিনি বলেন।

সহিংসতার আশঙ্কা

এই তালিকায় যাদের নাম বাদ পড়ছে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
আসাম সরকার তালিকার বাইরে থাকা লোকেদের ধর্মীয় পরিচয়ের তথ্য প্রকাশ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে এদের বেশিরভাগই বাংলা-ভাষী মুসলমান।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির একটা সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো খবর দিচ্ছে, ৩১শে অগাস্টের পর যদি কিছু ঘটে সেটা মোকাবেলার কোন প্রস্তুতি সরকারের নেই।
পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য রাজ্য সরকার বন্দি শিবির তৈরি করছে, কথিত অবৈধ অভিবাসীদের জন্য শত শত ট্রাইবুনাল গঠন করছে এবং যারা বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হবেন তাদের একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি করছে।
তবে আসাম-ভিত্তিক সাংবাদিক রাজীব ভট্টাচার্য্য লিখেছেন: এনআরসি-পরবর্তী আসামের জন্য 'দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির' প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলছেন, সরকার বিদেশিদের ব্যাপারে কোন পরিকল্পনা নেয় নি, কারণ তারা জানে এদের বাংলাদেশে 'ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।'

তাহলে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর কী ঘটবে?

বিবিসির সংবাদদাতা নিতিন শ্রীবাস্তব জানাচ্ছে, "সব আপিল এবং চ্যালেঞ্জ দূর হওয়ার পর এই তালিকাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা শুরু হতে পারে।"
"আর সেটা শুরু হবে যখন এরা তাদের জমি, ভোটের অধিকার এবং মুক্তির প্রশ্নে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠবে।"

‘ওরা পরীক্ষা দিতে পারলো না’ by রাশিম মোল্লা

মোসা. মাহমুদা সুলতানা। ১৬ তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার্থী। এবার ছিল তার চাকরি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের শেষ পরীক্ষা। যানজটের কথা মাথায় নিয়ে বাসা থেকে একটু সময় নিয়েই বের হয়েছিলেন তিনি। অ্যাডমিট কার্ড অনুযায়ী মাহমুদার পরীক্ষা কেন্দ্র পল্লবীর মিরপুর বাংলা স্কুল এন্ড কলেজ। পুরো পল্লবী তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা কেন্দ্র খুঁজে হয়রান মাহমুদা। সকাল ৯ টা ৩০ মিনিট, তখনো মাহমুদা পল্লবীর মিরপুর ল’ কলেজের সামনে। ঘড়ির কাঁটা যেন দ্রুত ঘুরছে।
অনেকের কাছে জিজ্ঞেস করছেন, কেউ বলতে পারছে না মিরপুর বাংলা স্কুল এন্ড কলেজ কোথায়? স্থানীয় এক পথচারীর তাকে জানান, পল্লবীতে মিরপুর বাংলা স্কুল এন্ড কলেজ নামে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। তবে এখান থেকে ১০ মিনিট সামনে গেলে মিরপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (বালকশাখা) ও বালিকা শাখার দুটি স্কুল আছে। কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে দৌড়ে যান মিরপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় বালক শাখায়। অ্যাডমিট কার্ডে দেয়া পরীক্ষা কেন্দ্রের নাম অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামের মিল নেই। এরপর ওখান থেকে ১০টার সময় চলে আসেন মিরপুর উচ্চ   মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (বালক শাখা) আসেন। এই প্রতিষ্ঠানে সঙ্গেও মিল নেই অ্যাডমিট কার্ডের দেয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামের। তবু স্কুলের সামনে সাটাঁনো সিট প্লানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন অ্যাডমিট কার্ড। পরীক্ষার রোল অনুযায়ী পেয়ে যান কাঙ্খিত কক্ষ নম্বর। সিট খোঁজতে পাঁচ মিনিট লেট হয় তার। দ্রতু প্রবেশ মুখের গেটের সামনে গিয়ে দায়িত্বরত পুলিশ ও দারোয়ানকে গেট খুলতে বলেন মাহমুদা। কিন্তু কোনো সাড়া নেই তাদের। তার মতো আরো অনেক পরীক্ষার্থীই গেট খোলার জন্য নানা ভাবে আকুতি মিনুতি করছেন। গেটে জোরে জোরে শব্দ করছেন। কিছুক্ষণ পরে গেটের ফাঁক দিয়ে দায়িত্বরত এক পুলিশ জানায়, গেট খোলা যাবে না। দেরী করে আসছেন কেন? আপনাদের পরিক্ষা দেয়ার দরকার নেই। বাসায় চলে যান। পরিক্ষা দিতে না পেরে পুরো ১ ঘন্টা সময় তার মতো অনেকেই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আরো যারা নিবন্ধন পরিক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, এরা হলেন- লাকী আক্তার (রোল-৩০৪০১৯৫৪৬), কাজী মিরাজ হোসেন (রোল-৩০৪০১৯১৬৫), ইসরাত জাহান (রোল-৩০৪০১৯৮৪০), হীরা বেগম (রোল-৩০৪০১৯৮৯২),  আয়েশা আক্তার (রোল-৩০৪০১৯৯১৭), আজিজুন নাহার (রোল-৩০৪০২০৮৫৩), তানজিলা আক্তার (রোল-৩০৪০১৯৮৭০), পলাশ ও তৌহিদা জাহান। তারা জানান, অ্যাডমিট কার্ডের দেয়া নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পেতে তাদের ৫-১০ মিনিট দেরি হয়। গেটম্যান ও পুলিশদের অনেক অনুরোধ করেছি। কিন্তু কেউ গেট খুলেনি। এদের একজন তানজিলা আক্তার। তিনি জানান, সাভার থেকে খুব সকালেই আমি পরিক্ষা দেয়ার জন্য পল্লবীতে আসি। অ্যাডমিট কার্ডের দেয়া নামের পরীক্ষা কেন্দ্র কোথাও না পেয়ে চলে যাই মিরপুর বাংলা কলেজে। ওখানে গিয়ে সিট প্লানে রোল না থাকায়, কথা বলি গেটে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি জানান, সম্ভবতঃ পল্লবীর মিরপুর বাংলা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আপনার সিট পড়েছে। পরে তার কথা মতো দ্রুত চলে আসি ওই প্রতিষ্ঠানে। কেন্দ্রের সামনে টানানো সিট প্লানে দেখতে পাই নিজের রোল নম্বর। এরই মধ্যে ৫-৭ মিনিট দেরি হয়ে যায়। গেট আটকানো। গেট খুলতে বললেও তারা গেট খোলে নেই। পলাশ নামে অপর এক পরিক্ষার্থী বলেন, পরিক্ষা কেন্দ্রের নামের ভুলের কারণে আমাদের একটু দেরি হয়েছে। এ কারণে গেটে দায়িত্বরতরা আমাদের ঢুকতে দেয়নি। আমাদের ঢুকতে না দিয়ে তারা আমাদের সঙ্গে অবিচার করেছে। আমরা এর বিচার চাই। পরিক্ষা শেষে কেন্দ্র সচিব ও মিরপুর বাংলা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোস্তফা কামাল খোশ নবীর কাছে কয়েকজন অভিযোগও করেন। এ ব্যাপারে তিনি  বলেন, গেটে দায়িত্বরতরা আমাকে জানায়নি। তাছাড়া দেরিতে আসলে সাধারণত গেট খোলা হয় না। এর আগেও বেশ কয়েকবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের নামের সঙ্গে অ্যাডমিট কার্ডের নামের মিল না থাকায় চাকুরী প্রার্থী পরিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকজন পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। নেমপ্লেট পরিবর্তনের জন্য বোর্ডের অনুমতি লাগে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আমরা নাম পরিবর্তনের জন্য বোর্ডে একটি আবেদন জমা দেব। বোর্ড অনুমতি দিলেই নাম পরিবর্তন করা হবে।  এ ব্যপারে এনটিসিআর চেয়ারম্যান এস এম আশফাক হোসেন বলেন, কেউ দেরি করে আসলে ওই পরিক্ষার্থীর ক্ষতি। ৫-১০ মিনিট দেরী হওয়ার কারণে তাদেরকে ঢুকতে না দিয়ে কাজটি ঠিক করেন নি। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আসাম এনআরসি: বাংলাদেশের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত? by তাসলিমা ইয়াসমিন

গত বছরের জুলাই মাসে আসামের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) খসড়ায় ৪০ লাখের বেশি লোককে ভারতীয় নাগরিকত্বের বাইরে রাখা হয়। চলতি ৩১ আগস্টের মধ্যে এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এনআরসির অর্থ হলো, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর আসামে প্রবেশ করা ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ চিহ্নিত করে তালিকা থেকে বাদ দেয়া। বাংলাদেশ যখন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল, তখনই খসড়া এনআরসি প্রকাশ করা হয়েছিল। এ নিয়ে বাংলাদেশে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের এই উদ্বেগ ছিল অনেকাংশেই যৌক্তিক। কারণ অবৈধ ঘোষিত লোকদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হতে পারে বলে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়। তবে বাংলাদেশের সাথে সরকারি পর্যায়ের বৈঠকগুলোতে ভারত কখনো অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টি উত্থাপন না করায় বাংলাদেশও এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি।

অবশ্য বেসরকারিভাবে মিডিয়ায় কথা বলার সময় উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানিয়ে বলেছেন যে ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ থেকে কোনো ধরনের বেআইনি অভিবাসন আসামে ঘটেনি। উভয় দেশের মধ্যকার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগে বাংলাদেশকে বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে যে এটা ভারতের স্রেফ একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনের কোনো পরিকল্পনা ভারতের নেই।

অবশ্য এসব অনানুষ্ঠানিক অভিমত, সাক্ষাতকার, মিডিয়া বিশ্লেষণ- সবাই ভারতের নির্বাচন-পূর্ব প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত। কখনো কিন্তু পরিষ্কার করে বলা হয়নি যে এনআরসি হলো লোকসভার নির্বাচনে জয়ের একটি কৌশল। কিন্তু নির্বাচনের পর যে গতিতে এনআরসি বাস্তবায়নের কাজ চলছে, তাতে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে সেটা আর স্রেফ রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়। বরং বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে ভারতের অন্যান্য অংশেও এনআরসি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।

তাছাড়া এনআরসি প্রক্রিয়াটি হচ্ছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তদারকিতে। আর সেই সুপ্রিম কোর্ট সুস্পষ্টভাবে বলেছে যে এই প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত অবৈধ অভিবাসীদেরকে অবশ্যই বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। এটাই যদি হয়, তবে এনআরসি আর কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না।

অবশ্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক যে পর্যায়ে রয়েছে তাতে করে ভারত এত বিপুলসংখ্যক লোককে বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠাবে না বলেই আশা করা যায়। ক্ষমতাসীন বিজেপি ও এনআরসি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে যে যারা তালিকা থেকে বাদ পড়বে, তারা ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারবে। তাছাড়া তারা সুপ্রিম কোর্টেও যাওয়ার সুযোগ পাবে। ফলে যাদের নাম এনআরসির চূড়ান্ত তালিকায় না থাকবে, তাদের ভাগ্য নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে অনেক সময় লাগবে। ফলে আশা করা যেতে পারে অদূর ভবিষ্যতে কাউকে বাংলাদেশে বহিষ্কার করা হচ্ছে না।

কিন্তু এখনই বহিষ্কার করা না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এসব লোক তাদের রাজনৈতিসহ সব অধিকার হারিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো আটক কেন্দ্রে ঠাঁই পাবে। এখন পর্যন্ত হলো, জাতীয়তা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত থেকে এসব লোক কত দিন আসামে থাকা নিরাপদ মনে করবে? পুরো প্রক্রিয়াটি নিশ্চিতভাবেই নজিরবিহীন সংখ্যক লোককে রাষ্ট্রহীন করে তুলবে। আর এর জের ধরে সাম্প্রদায়িকতা ও অনিশ্চয়তা কেবল আসামেই সীমিত থাকবে না। আশঙ্কা করা যেতেই পারে, অধিকার বঞ্চিত এসব লোক প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করবে। অর্থাৎ অনাগরিককরণের এই প্রক্রিয়া এই অঞ্চলে বিপজ্জনক মেরুকরণ করতে পারে। পরিণতিতে একপর্যায়ে সীমান্ত পেরিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক লোককে গ্রহণ করা লাগতে পারে বাংলাদেশকে।

আর আসামের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জের ধরে বাংলাদেশেও বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূচনা হতে পারে। আসামের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যে কেবল সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা বোঝার জন্য খুব বেশি রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির প্রয়োজন পড়ে না। এত বিপুলসংখ্যক লোকের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া অবশ্যই এই অঞ্চলের সার্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর পড়বেই। আর এতে যে দেশ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবে তা হলো বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটেই ৩১ আগস্টের চূড়ান্ত এনআরসি প্রকাশের প্রেক্ষাপটে আসন্ন সঙ্কট নিরসনে বাংলাদেশ কী ধরনের কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত তা দেখার বিষয়।
>>>সাউথ এশিয়ান মনিটর

সামাজিক বনাম মূলধারার গণমাধ্যম কোন্‌টা বেশি শক্তিশালী? by মরিয়ম চম্পা

ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাপক আলোচনায়। পান থেকে চুন খসলেও তা চলে আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কারো কাছে দায়বদ্ধ নয়। তাই যার যা ইচ্ছা তা-ই লিখে দিতে পারছে। এতে কার ক্ষতি হলো, কার লাভ হলো- এটা বিবেচ্য নয়। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যম একটি নীতিমালার মধ্যে চলে। তাদের পাঠকের কাছে জববাদিহিতা আছে। ফলে ইচ্ছা করলেই যা ইচ্ছা তা লিখে দিতে পারে না।
তাদের প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট হাতে নিয়েই লিখতে হয়। প্রকাশ করতে হয়। তারপরও প্রশ্ন উঠেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক কি বিকল্প মিডিয়া? এ নিয়ে কথা বলেছেন শিক্ষাবিদ, যোগাযোগ গবেষক, সামাজিক বোদ্ধা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ ও তরুণ সংবাদকর্মীরা।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আ.আ.ম.স. আরেফিন সিদ্দিক বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া গণমাধ্যম হয়ে ওঠার সময় এখনও আসেনি। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা বলা যায় না। তবে এখন পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া সামাজিক গণমাধ্যম হিসেবেই কাজ করছে। সামাজিক গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের মধ্যে একটি মূল পার্থক্য হচ্ছে গণমাধ্যমে যে তথ্যটা দেয়া হয় সেটা সম্পাদনার মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়। অর্থাৎ একটি তথ্যকে সম্পাদনা, যাচাই-বাছাই, মূল্যায়ন করে নির্দিষ্ট ট্রিটমেন্ট দিয়ে পত্রপত্রিকায় বা টেলিভিশনে প্রচারিত এবং প্রকাশিত হয়। এই পার্থক্যের কারণে যারা গণমাধ্যমের ভোক্তা, পাঠক এবং দর্শক তারা গণামাধ্যমকে বিশ্বাস করে যে, নিউজটি সম্পাদিত হয়ে এসেছে। অতএব এটার ওপর বিশ্বাস রাখা যায়। সামাজিক গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যে কোনো বিষয় চলে আসে। মানুষ জানতে পারে। এক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকতার একটি মূল্যায়ন আছে। কিন্তু পাঠকের মনে গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের যে একটি পার্থক্য সেটা কিন্তু থেকেই যায়। সম্পাদনা হচ্ছে সাংবাদিকতার প্রাণ। যেখানে সম্পাদনা নেই সেখানে আসলে সাংবাদিকতা হয় না। সম্পাদনা ছাড়া যে সামাজিক মাধ্যম চলে সেগুলো কোনো গণমাধ্যম হতে পারে না।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ফেসবুক মূলধারার মিডিয়ার বিকল্প হচ্ছে এ রকম আমার এখনো মনে হয় না। ফেসবুকে যে সকল নিউজ পাওয়া যায় সেগুলোর অথেনটিসিটি নিয়ে নানাধরনের প্রশ্ন থাকে। ফেসবুকের এ সকল খবরের উৎস অস্পষ্ট থাকে। দ্বিতীয়ত, ফেসবুকে যে সব খবর আসে সেগুলোর পরবর্তী পর্যালোচনা করার মতো উপাত্ত থাকে না। মূলধারার মিডিয়াতে যতগুলো ইস্যু একত্রে পাওয়া যায় সেটা কিন্তু ফেসবুকে কভার করা সম্ভব হয় না। ফেসবুকের কারণে মূলধারার মিডিয়ার যে সংখ্যক দর্শক বা পাঠক হওয়ার কথা সেখানে হয়তো কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। এটার একটা প্রভাব পড়তে পারে।

একটা চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে। প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া যদি তাদের খবর পরিবেশনা বা কাঠামোর পরিবর্তন না আনে তাহলে হয়তো কিছুটা প্রভাব পড়বে। তার মানে এই নয় ফেসবুক রিপ্লেস করতে যাচ্ছে অন্য মিডিয়াকে। কারণ বিশ্বের অনেক দেশে ফেসবুকই ব্যবহার করে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মফিজুর রহমান বলেন, এখন তো প্রযুক্তিভিক্তিক সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর প্রতি মানুষের মনোযোগ বেড়েছে। এখন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের সংখ্যা বিশাল। প্রায় ১২ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন। চার থেকে পাঁচ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী। এত বিশাল ব্যবহারকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা তো একরকম নয়। তাদের বড় একটি অংশ গুজবে বিশ্বাসী। অতএব সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক একটি বাজার তৈরি হয়েছে। যেখানে বিশ্বাসযোগ্যতার চেয়ে বড় হচ্ছে এটা একটি মজা, ট্র্যাজেডি, দুঃখ সবকিছুই একটি পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। একটি বড় সংখ্যক ব্যবহারকারী সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে অভ্যস্ত। এক্ষেত্রে সিরিয়াস পাঠকের সংখ্যাটা কম। তিনি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া একটি বিশাল বাজার তৈরি করেছে। যেটা সত্যিকার অর্থেই মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য কিছুটা হলেও হুমকিস্বরূপ। এ অবস্থায় মূলধারার গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, বাজারমুখিতা কমে যাবে ধীরে ধীরে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের জন্য একটি কোম্পানি যে টাকা খরচ করে সেটা মূলধারার গণমাধ্যমে করে না। আস্তে আস্তে মার্কেট মডেলটা যখন সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক হয়ে যাবে তখন মূলধারার মিডিয়াগুলো সাফার করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, হ্যাঁ ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাই বলে মূলধারার গণমাধ্যমের আবেদন কখনো শেষ হবে না। কারণ, সামাজিক মাধ্যমে যে তথ্যগুলো আমরা পাই সে তথ্যগুলোর কোনো বৈধতা নেই। বস্তুনিষ্ঠতার জন্য লোকে এটা ব্যবহার করে না। তথ্য পাওয়ার জন্য এটা ভালো। বা কোনো মতামতকে সংগঠিত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভালো। কিন্তু কোনো একটি নিউজের বস্তুনিষ্ঠতা বিচার করতে হলে তখন আমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের কাছেই যেতে হবে। মানুষ যায়ও। গণমাধ্যম কিন্তু ফেসবুক থেকে অনেক তথ্য নেয়। কিন্তু তারা সেটা যাচাই করে। যাচাই করার পর পত্রিকায় সেটা ছাপে বা প্রকাশ করে। এই জায়গাটিই হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমের সঙ্গে মূলধারার গণমাধ্যমের পার্থক্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি তথ্যকে কে কতো আগে প্রকাশ করতে পারে সেটার প্রতিযোগিতায় নামে তারা। সেখানে কোনো জবাবদিহিতা থাকে না। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমে তাদের এই জবাবদিহিতা আছে। ফলে সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনমত গঠন করে। নানা ধরনের আদান প্রদান করে। কিন্তু কোনো একটি খবরের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করার জন্য তাদেরকে মূলধারার গণমাধ্যমের কাছে ফিরতে হয়। এটাই হচ্ছে মূলধারার গণমাধ্যমের শক্তির জায়গা। কাজেই প্রচলিত গণমাধ্যম যত বেশি বস্তুনিষ্ঠতা অর্জন করবে পাঠকের আস্থা তারা ততোটাই অর্জন করতে পারবে। এই আস্থা পাওয়ার কোনো দায় সামাজিক মাধ্যমের নেই।

তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ও প্রিয়.কমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাকারিয়া স্বপন বলেছেন, ফেসবুক ইতিমধ্যে বিকল্প মিডিয়া হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই মূল ধারার গণমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। আমরা যে সেন্সে মূলধারার মিডিয়ার কথা বলছি সেটার মূলধারাটা কিন্তু পৃথিবীব্যাপী ভেঙে গেছে ইতিমধ্যে। কারণ প্রতিটি সাধারণ মানুষ এখন ইনডিভিজুয়াল সাংবাদিক। তথ্য পাস করার যে টেনডেনসি সেটা চলে এসেছে তাদের মধ্যে। আমরা অনেক কিছু এখন ফেসবুকে পেয়ে যাই। যেটা একজন পেশাদার সাংবাদিক অনেক সময় বের করতে পারেন না। যে কারণে লাখ লাখ মানুষ এখন ফেসবুকের কাছে চলে গেছে। বর্তমানে আমরা মূলধারা বলতে যে রেডিও, টেলিভিশন, পত্রিকাকে বুঝি এটাই হয় তো একসময় মূলধারা থাকবে না। ইনডিভিজুয়াল জার্নালিজম বা ইনফরমেশন পাসিং এটাই এক সময় মূলধারা হয়ে যাবে। এখনো সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে আমরা খুব আরলি স্টেজে আছি। ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজের ক্ষেত্রে এডিটিং, ফিল্টার, গেটকিপিং অর্থাৎ কোন্‌টা যাবে বা যাবে না এই ফিল্টারিং মেশিনেই করে ফেলতে পারবে। কারণ মানুষের চেয়ে মেশিনের ব্রেইন অনেক শক্তিশালী।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দা আখতার জাহান বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া বিকল্প মাধ্যম আসলে ওই অর্থে হতে পারছে না। কিন্তু আমরা প্রকাশ প্রিয় জাতি তো। আমরা প্রকাশ করতে পছন্দ করি। বৃষ্টি হচ্ছে...ভালো লাগছে। আজকে অনেক গরম.....। এই ধরনের প্রকাশ করে থাকি। ফেসবুকের প্রতি মানুষের ঝুকে পড়ার একটি কারণ হচ্ছে মানুষ তার বক্তব্যটা কমন গণ্ডির মধ্যেই জানাতে পারছে। এরশাদ মারা যাওয়ার পর খুব কম লোক ফেসবুকে ইতিবাচক লিখেছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বড় অংশ নিশ্চুপ ছিল। তারা হ্যাঁ বা না কোনোটিই বলেনি। কিন্তু যখন একটি গুজব হলো ছেলে ধরা এবং সেই গুজবে মানুষ পিটিয়ে মারা হচ্ছে। তখন কিন্তু কমবেশি সবাই এটাতে অংশ নিচ্ছে। এটা ফেসবুক ব্যবহারকারীরা জানে খারাপ। তারপরও মানুষ কিন্তু থেমে থাকছে না। আমার মতে, ফেসবুক একেবারেই একটি প্রকাশের জায়গা। এখানে আমরা ফিডব্যাক দিতে পছন্দ করি।

বিটিভি’র সাংবাদিক আফরিন জাহান বলেন, ফেসবুক মানুষ ব্যবহার করছে। কিন্তু এর সত্যতা নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন আসে। অনেক সময় সত্য না জেনেই অনেক কিছু ভাইরাল করে ফেলি। ফেসবুক মানুষের বিশ্বস্ততার জায়গা অর্জন করতে পারেনি। মূলধারার নিউজের ক্ষেত্রে অনেক যাচাই-বাছাই করে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। অনেকের কাছে ফেসবুক হয়তো মূলধারার বিকল্প গণমাধ্যম। কিন্তু সেই বিশ্বাস যোগ্যতা এখনো ফেসবুক অর্জন করতে পারেনি।

ডেইলি স্টারের সাংবাদিক ইমরান মাহফুজ বলেন, গত এক দশকে ফেসবুক বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই জনপ্রিয়তার কারণ হচ্ছে প্রথমত, এটার সহজলভ্যতা। গণমাধ্যমকর্মীদের অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে যা প্রকাশ করতে পারে না সে তথ্যটা কিন্তু মানুষ ফেসবুকে পায়। ফলে মানুষ তখন ফেসবুকের প্রতি আরো আগ্রহী হয়ে ওঠে। আমাদের সংবাদপত্রগুলোর নিজস্ব কিছু সংকট আছে। এক্ষেত্রে কারো কারো ব্যবসায়িক মনোভাব আছে। সকল সংবাদ ঠিক সময়ে যেমন দেয় না। এবং ঠিক ওই অ্যাঙ্গেলে নিউজ আসে না। ফলে ওই ব্যক্তি ফেসবুকে তার কথাগুলো উন্মুক্তভাবে লিখছে, পড়ছে এবং লাইভে শোনারও সুযোগ পাচ্ছে। এটা হচ্ছে অংশগ্রহণ। কোনো কিছু ভাইরাল হলে বা অনেক বেশি আলোড়ন তৈরি করলে সেটার প্রতি হয়তো মূলধারার গণমাধ্যমের নজর আসে।

অনেক সময় আলোচিত ঘটনার কারণে মিডিয়া তখন নিউজ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু অধিকাংশ সময় আমরা দেখেছি ফেসবুকের খবরে তথ্যভিক্তিক যাচাই বাছাই না থাকার কারণে সেগুলো আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। ফলে গুজব তৈরি হয়। যারা সাংবাদিকতার ইথিক্যাল বিষয় সম্পর্কে জানে না। আমাদের দেশে অনেক পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জনপ্রিয় না। ঠিক একই ভাবে ফেসবুকও জনপ্রিয় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ না। এটা উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করা যায়। এখানে কোনো সেন্সর নেই।

দেশ রূপান্তর পত্রিকার সাংবাদিক পরাগ মাঝি বলেন, নিঃসন্দেহে ফেসবুক একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠছে। তবে নির্ভরশীলতার দিক থেকে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমকে এখনো অতিক্রম করতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব সংক্রান্ত ফেইক নিউজের একটি প্রবণতা দেখা গেছে। যেটা ফেসবুকে পাওয়া সংবাদ বা তথ্যকে নতুন করে পরীক্ষার সম্মুখীন করেছে। ফলে এখন ফেসবুকে পাওয়া খবরাখবর নিয়ে মানুষ দ্বিতীয়বার ভাবে। কোনো একটি খবর পেলেই চিন্তা ভাবনা করে এটা গুজব না কী সত্য ঘটনা। কিন্তু মূল ধারার সংবাদ পত্র পড়ে মানুষের মাঝে এমন ভাবনা আসে না। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়াকে সাধারণ মানুষের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য হতে হলে ফেক নিউজ নামে যে একটি টার্ম তৈরি হয়েছে সেটার পুরোপুরি নিষ্পত্তি হতে হবে।

পাকিস্তান-চীন সম্পর্ক ভারতীয় স্বার্থকে আঘাত করছে by কমলেন্দ্র কানোয়ার

চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে যে গভীর মিত্রতার বন্ধন রয়েছে, সেটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের প্রাধান্য বিস্তারের পথে একটা বড় বাধা। ভৌগলিকভাবে ভারত দুই দিক থেকে প্রতিকূল দুই শক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিলে জম্মু ও কাশ্মীর বিষয়ে ভারতের বিশেষ সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্তের যেভাবে প্রতিবাদ হয়েছে, সেটা ভারতের জন্য একটা শিক্ষা যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বন্ধুত্ব নিয়ে এত খুশি হওয়ার কিছু নেই। ভারত সরকারের কোন ভুল না থাকা সত্বেও দুই দেশের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্ঘাত হওয়ায় সেটা চীন-ভারত সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলেছে।

চীনের সাথে ভারতের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগামীতে আরও বাড়বে এবং সঙ্ঘাত ও বিবাদের বিষয়টি সেই ভাবে দূর হবে না। নয়াদিল্লীর একমাত্র বাস্তবসম্মত পন্থা হতে পারে ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করা এবং পারমাণবিক শক্তিকে সংহত করা যাতে সেটা চীনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে কাজ করে।

ভারত ও চীনের মধ্যে বিবাদের সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে যেগুলো দুই দেশের মতপার্থক্যকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বিষয়টি এখনও দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু উচ্চ শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার চীনের কাছে অত আকর্ষণীয় নয়, সেখানে চীনকে ভারতের বৃহৎ বাজারের উপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে। চীনা পণ্যের কারণে ভারতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এবং এটা ভারতে বেকারত্ব সৃষ্টি করছে। চীনের পণ্য – যেগুলো অনেক সময় নিম্নমানের – এগুলো ভারতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উৎপাদনের জায়গা নিয়েছে এবং হার্ডওয়্যার, বৈদ্যুতিক পণ্য, শিশুদের খেলনা, দিওয়ালি বাজি-পটকা এবং অন্যান্য পণ্যের বাজার দখল করেছে।

চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিশেষ কিছু সুবিধা থাকলেও কৌশলগত সম্পর্কের একটা পাল্টা দিক রয়েছে যেখানে চীন-পাক সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পাচ্ছে।

জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাম্প্রতিক বৈঠকে, ভারত লাদাখকে তাদের কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল ঘোষণা করায় চীন এর প্রতিবাদ জানিয়েছে কারণ এই অঞ্চলের একটা অংশকে নিজেদের দাবি করে তারা। পাকিস্তানের সাথে যোগ দিয়ে ভারতের উপর সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রস্তাব আরোপের চেষ্টা করেছে চীন, যেখানে তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।

চীন ও পাকিস্তান উভয়েই কাশ্মীরে চলমান অভিযানকালে ভারতের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে। এগুলো সবই চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ককে তিক্ত করবে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও রয়েছে।

চীন ও পাকিস্তানের ভেতরকার একটা প্রধান উপাদান হলো সিপিইসি (চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর) যেগুলো ৪৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্পের সমষ্টি। এর মধ্য ১১ বিলিয়ন ডলার এসেছে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে। সিপিইসি পাকিস্তানের ভেতরে বড় ধরনের অবকাঠামো সম্প্রসারণ করতে চায় এবং চীনের জিনজিয়াংয়ের সাথে পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরকে যুক্ত করতে চায়। এর কাজ শেষ হলে দুই দেশের আরও ভাল পরিবহন ও বাণিজ্য সুবিধা পাবে। তবে চীনারা বালুচ ও পশতুনদের ব্যাপারে শঙ্কিত যে, পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় তারা স্যাবোটাজ করতে পারে কি না।

ভারত, পাকিস্তান ও চীন সবাই বিতর্কিত হিমালয়ান অঞ্চলের বিভিন্ন অংশকে নিজেদের দাবি করে আসছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের সিদ্ধান্তে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের দিক থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছে ভারত। ভারত বলেছে যে, চীন অবৈধভাবে তাদের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের ৩৮০০০ বর্গকিলোমিটার দখল করে রেখেছে। বেইজিংয়ের দাবি উত্তরপূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশের ৯০০০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল মূলত চীনের।

এই সব ঘটনাপ্রবাহ দীর্ঘমেয়াদে ভারত ও চীনের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক হবে না। ভিন্ন রকম কৌশলগত স্বার্থের কারণে সুসম্পর্কের বিষয়টিতে ছাড় দেয়া হবে। চীন-পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা এটাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে, সেটা বলাটা কঠিন।

ভারতে সন্ত্রাস আয়ত্তে এসেছে, নির্মূল হয় নি by অজিত কুমার সিং

এ বছর ২৫ শে মার্চ বিহার এন্টি টেরোরিজম স্কোয়াডের (এটিএস) কর্মকর্তারা খাইরুল মন্ডল ও আবু সুলতান নামে দু’সন্ত্রাসীকে সনাক্ত করে রাজ্যের রাজধানী পাটনা থেকে। পুলিশি বিবৃতিতে বলা হয়, গ্রেপ্তার করা এই দু’ব্যক্তির কাছ থেকে পুলওয়ামা হামলার পরে জম্মুতে নিযুক্ত নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে অনেক সন্দেহজনক ডকুমেন্ট উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত জমিয়তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং ইসলামিক স্টেট বাংলাদেশ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য এরা।
একই দিনে দিল্লি থেকে মোহাম্মদ পারভেজ (৪২) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে রাজস্থান পুলিশ। অভিযোগ, সে পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করছিল। জিজ্ঞাসাবাদে পারভেজ বলেছে, আইএসআইয়ের সঙ্গে যুক্ত এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। গত ১৮ বছরে সে ১৭ বার পাকিস্তান সফরে গিয়েছে। এ বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি জৈশ ই মোহাম্মদের ( জেইএম) দু’সন্ত্রাসীতে উত্তর প্রদেশের শাহারান জেলার দেওবন্দ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তারা হলো শাহনাওয়াজ তেলি এবং আকিব আহমেদ মালিক।
সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টালের (এসটিএপি) আংশিক ডাটা অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ২৬/১১ মুম্বইতে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে ইসলামপন্থি উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কমপক্ষে ২৬৮৮ জনকে। এর মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসী ক্যাডার, পাকিস্তানি আইএসআইয়ের এজেন্ট। আছে বাংলাদেশী, নেপালি ও পাকিস্তানি নাগরিকও। এ তথ্য ২০১৯ সালের ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত। ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩১২ জনকে। ২০১৭ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৪৯ জনকে। ২০১৯ সালের ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত ডাটা অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯১ জনকে। অতীতের মতো ২০১৮ সালে যেসব মানুষকে দেশজুড়ে ভারতের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে, তার অনেকগুলো ঘটেছে সন্ত্রাসীদের গুপ্ত সেলকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়ার জন্য।
এক্ষেত্রে খুব জোর দিয়ে উল্লেখ করা যায় ২০১৮ সালের ২৬ শে ডিসেম্বর সকালের কথা। এদিন ইসলামিক স্টেটের আদর্শে গড়ে উঠা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে দিল্লি ও উত্তর প্রদেশের ১৭টি স্থানে তল্লাশি চালায় ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)। এমন সংগঠনের মধ্যে আছে হরকাতুল হার্বে ইসলাম। এনআইএর এই অভিযানে সক্রিয় সমর্থন দেয় দিল্লি পুলিশ, উত্তর প্রদেশ পুলিশ/উত্তর প্রদেশ সন্ত্রাস বিরোধী স্কোয়াড (এটিএস)। এ অভিযানে এ সংগঠনের কমপক্ষে ১০ জন ক্যাডেটকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিষ্ক্রিয় করা হয় দায়েশের সেল।
অতি সম্প্রতি দায়েশের (বা আইএস) আদর্শে উদ্বুদ্ধ একটি সন্ত্রাসী চক্রকে সনাক্ত করে ন্যাশনাল ফোর্স এবং তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করে। ২০১৯ সালের ২১-২২ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের থানে এবং আওরঙ্গবাদ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নিজস্ব স্টাইলে গড়ে উঠা উম্মতে মোহাম্মদিয়ার ৯ সদস্যকে। 
বিশেষ করে এসএটিপি’র ডাটাবেজ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত ভারতে দায়েশের প্রতি সহানুভূতিশীল/সদস্য সংগ্রহকারীদের ১৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে আরো ৭৩ জনকে। তাদেরকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে এবং ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সিরিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তানে গিয়ে আইএসের সঙ্গে যোগ দেয়ার জন্য আরো ৯৮ জন ভারত ত্যাগ করেছে বলে বিশ্বাস করা হয়। ভারতের মুসলিম জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা আণুবীক্ষণিক। যে ৯৮ জন দায়েশে যোগ দেয়ার জন্য বিদেশে গিয়েছে তার মধ্যে ৩৩ জন নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
উপরন্তু স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অব ইন্ডিয়া (সিমি)/ ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন (আইএম) ২০০৮ সালে বড় রকমের পরাজয়ের শিকার হয়। এরপরের বছরও তা অব্যাহত ছিল। এসএটিপির ডাটা অনুযায়ী, ২০০০ সালের ১১ই মার্চ থেকে ২০১৯ সালের ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত ১৩৫টি ঘটনায় সিমি/আইএমের কমপক্ষে ৭১৬ জন ক্যাডারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬ জনকে।
সফল অপারেশনের ফলে পাকিস্তান সমর্থিত ইসলামপন্থি সন্ত্রাসী সংগঠন যেমন দায়েশ এবং আল কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট-এর মতো সংগঠন ২০১৪ সাল থেকে ভারতে পথ করে নেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা তাদের উচ্চাকাঙ্খা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। পুরো ২০১৮ সালে জম্মু ও কাশ্মিরের বাইরে ভারতে মাত্র একটি ইসলামপন্থি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বরে পাঞ্জাবের জালান্ধার শহরে মাকসুদান পুলিশ স্টেশনে একটি বিস্ফোরণ হয়। সেখানে অল্প আহত হন এক পুলিশ সদস্য। এ মামলাটি এখনও তদন্ত করছে এনআইএ।
২০১৭ সালেও একটিমাত্র ইসলামপন্থি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময়ে অর্থাৎ ২০১৭ সালের ৭ই মার্চ মধ্যপ্রদেশের শাজাপুর জেলার জাবদি রেলওয়ে স্টেশনের কাছে একটি ট্রেনে বিস্ফোরণ হয়। এতে আহত হন ৯ জন। পরের দিন উত্তর প্রদেশের লক্ষেèৗতে সিকিউরিটি ফোর্স ওই বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত এক সন্ত্রাসীকে হত্যা করেছে। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, পাকিস্তানের বাইরে সংগঠিত ইসলামপন্থি সন্ত্রাসীরা ২০০৮ সালে জম্মু ও কাশ্মিরের বাইরে ভারতে ১০টি সন্ত্রাসী হামলা চালায়। এতে নিহত হন ৩৫২ জন। ২০০০ সালের পর এটাই হলো এক বছরের নিহতের সর্বোচ্চ সংখ্যা। এসব হামলায় নিহতদের মধ্যে ৩১০ জন বেসামরিক। ৩০ জন সিকিউরিটি ফোর্সের এবং ১২ জন সন্ত্রাসী। জম্মু ও কাশ্মিরের বাইরে ইসলামপন্থি সন্ত্রাসীরা সর্বশেষ যে বড়  হামলা চালায় তা ঘটে ২০১৩ সালের ২৭শে অক্টোবর। ওই সময় সন্ত্রাসীরা পাটনায় বোমা হামলা করেছিল। এতে ৭ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। এতে হামলাকারীদের একজনও নিহত হয়েছে।
ইসলামপন্থি সন্ত্রাস মোকাবিলায় ভারতকে সহযোগিতা করেছে বন্ধুপ্রতীম দেশগুলো। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০০২ সালের ২০ শে ফেব্রুয়ারি থেকে বিভিন্ন দেশের সরকার কমপক্ষে ৭১ জন পলাতক ব্যক্তিকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। এর মধ্যে ২১ জনকে ফেরত দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ৯ জনকে ফেরত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ৬ জনকে ফেরত দিয়েছে কানাডা। চার জনকে ফেরত দিয়েছে থাইল্যান্ড। তিন জন করে ফেরত দিয়েছে জার্মানি ও দক্ষিণ আফ্রিকা। দুইজন করে ফেরত দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, বেলজিয়াম, ইন্দোনেশিয়া, মৌরিতিয়াস, পর্তুগাল ও সিঙ্গাপুর। এ ছাড়া একজন করে ফেরত দিয়েছে বাহরাইন, বুলগেরিয়া, হংকং, মরক্কো, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, ওমান, পেরু, সৌদি আরব, তাঞ্জানিয়া ও বৃটেন। ৭১ জনের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মিরের বাইরে চালানো বেশির ভাগ হামলার সঙ্গে জড়িত এমন কমপক্ষে ১৯ জন। বাকি ৫২ জনকে ফেরত দেয়া হয়েছে। তারা বিভিন্ন রকম ফৌজদারি অপরাধে জড়িত। এর মধ্যে ১৫ জন রয়েছে খুনের দায়ে অভিযুক্ত।
উপরন্তু, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলো ইসলামপন্থি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, যখন প্রশ্ন করা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে চেক দেয়ার জন্য সরকার কার্যকর কি পদক্ষেপ নিয়েছেÑ এর জবাবে ২০১৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টকে সরকার জানিয়েছে যে, তারা সন্ত্রাস দমনে নানা রকম পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, অবজার্ভেশন পোস্ট স্থাপন, সীমান্তে বেড়া নির্মাণ, ফ্লাড লাইটিং স্থাপন, আধুনিক ও উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন নজরদারিকারী সরঞ্জাম মোতায়েন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে আধুনিকায়ন, উপকূলীয় এলাকায় নিরাপত্তা শক্তিশালী করা।
তা সত্ত্বেও অনেকেই এখনও উদ্বেগে।
২০১৯ সালের ৩১ শে জানুয়ারি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নোটিফিকেশনে জানিয়েছে, রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডের কারণে সিমি’কে আরো ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে সন্ত্রাসী হামলার ভয়াবহতার পর পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। এ কারণে, ২০০০এর দশকে ইসলামাবাদ সিমি/আইএম’কে সরিয়ে দেয়। বিস্ময়ের কিছু নেই যে, ভারতে যেসব সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে বা হচ্ছে তার বড় একটি অংশের সঙ্গে সিমি/আইএমের সংশ্লিষ্টটা লুক্কায়িত আছে। পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে রয়েছে তাদের সখ্য।
বিশ্বজুড়ে আইএসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে একাকি হামলা চালাচ্ছে এর সদস্যরা। তারা যদিও এখন পর্যন্ত ভারতে উল্লেখ করার মতো কোনো বড় ক্ষতি করতে ব্যর্থ হয়েছে, তবুও তারা হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের ইসলামপন্থি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ইসলামপন্থি সন্ত্রাসীদের যোগসূত্র রয়েছে আইএসের সঙ্গে। এটাই ভারতের কাছে একটি উদ্বেগের বিষয়। এখানে উল্লেখ করার বিষয় হলো, ২০১৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি আইএসের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার সন্দেহে পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়াকে নিষিদ্ধ করেছে ঝাড়খন্ড সরকার। এ বিষয়ে রাজ্য সরকার একটি বিবৃতি দেয়। তাতে বলা হয়, ঝাড়খন্ডে সক্রিয় পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া’কে ১৯০৮ সালের ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টের অধীনে নিষিদ্ধ করছে রাজ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নিষেধাজ্ঞায় সুপারিশ করেছে। পাকুর জেলায় খুব বেশি সক্রিয় এই পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া। কেরালায় গড়ে উঠেছে এই সংগঠনটি। এর সদস্যরা আইএসের আদর্শে উদ্বুদ্ধ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়ার কিছু সদস্য দক্ষিণের রাজ্যগুলো থেকে সিরিয়া গিয়েছে এবং সেখানে তারা আইএসের পক্ষে কাজ করছে। 
এটা সুস্পষ্ট যে, যদিও সিকিউরিটি ফোর্স এত লম্বা সময় ভারতকে ইসলামপন্থি সন্ত্রাসীদের হুমকি থেকে চেক দিয়েছেন, তবে তাতে আত্মতুষ্টিতে মজে থাকা উচিত হবে না। দুঃখজনক হলো, অতীতে বার বার এসএআইআর নোট দিয়েছে। বলেছে, সারাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের সক্ষমতা বাড়াতে খুব সামান্যই করা হয়েছে।
>>>(অজিত কুমার সিংয়ের এই লেখাটি ইউরেশিয়া রিভিউয়ে প্রকাশিত। তিনি ইন্সটিটিউট ফর কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের রিসার্স ফেলো। তার লেখাটির অনুবাদ প্রকাশ করা হলো)