Wednesday, January 10, 2018

সিএসইর নতুন পরিচালক হলেন ছায়েদুর রহমান


চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) নতুন শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হলেন সাবেক বিএমবিএ সভাপতি ও ইবিএল সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ছায়েদুর রহমান। তিনি সাবেক শেয়ারহোল্ডার পরিচালক মোহাম্মদ খায়রুল আনাম চৌধুরীর স্থালাভিষিক্ত হলেন।

আজ বুধবার অনুষ্ঠিত সিএসইর পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ পদটি ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে শুন্য ছিল।

ছায়েদুর রহমান প্রায় ৩৩ বছর ধরে ব্যাংক, বিমা ও পুঁজিবাজারের বিভিন্ন বিভাগে কাজ করেছেন। তিনি ২০০৮ সালে ইবিএলের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রধান হয়ে যোগদান করেন। ২০১৩ সালে তিনি ইবিএল সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

চট্টগ্রামে ‘বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্য’ ভাঙল চসিক ম্যাজিস্ট্রেট


চট্টগ্রাম নগরীর জহুর হকার্স মার্কেটের প্রবেশ পথে নির্মাণাধীন একটি স্থাপনা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত ভেঙে দিয়েছে; ব্যবসায়ীদের দাবি, সেখানে তারা বঙ্গবন্ধুসহ তিন আওয়ামী লীগ নেতার ভাস্কর্য বানাচ্ছিলেন।

ওই ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী হাকিম বলছেন, অনুমতি না নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ শুরু করায় তিনি নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন।

কিন্তু বুধবার বেলা দেড়টার দিকে ওই ঘটনার পর হকাররা সেখানে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন।

চট্টগ্রাম পৌর জহুর হকার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম  বলেন, মার্কেটের লালদীঘি অংশের প্রবেশ পথের পাশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জহুর হকার মার্কেট যার নামে সেই প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী এবং সম্প্রতি প্রয়াত নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর আবক্ষ মূর্তি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারা। এর অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এনে কাজও শুরু হয়েছিল।

“এর মধ্যে আজ দুপুরে সিটি করপোরেশনের একটি দল এখানে আসে। তখন নামাজের সময় বলে সমিতির নেতারা কেউ ছিলেন না। এই প্রতিকৃতিকে অবৈধ বলে তারা সেটা ভেঙে দিয়ে চলে গেছে। এতে আমাদের ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষুব্ধ।”

সিটি করপোরেশনের পক্ষে ওই উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাহানারা ফেরদৌস ও আছিয়া আক্তার।
 
জাহানারা ফেরদৌস বলেন, দেড়টার দিকে তারা সেখানে গিয়ে দেখেন, নালার ওপর স্ল্যাব বসিয়ে একটি স্থাপনা করা হচ্ছে। অথচ সেজন্য কোনো অনুমতি মার্কেট কর্তৃপক্ষ নেয়নি।

“হকার সমিতির নেতারা আমাদের সাথে কথা বলতে এসেছিলেন। আমরা বলেছি, আপনারা মেয়র মহোদয়ের অনুমতি নিয়ে আসুন। এরপর আমরা চলে আসি। সেখানে শুধু একটা দেয়াল ছিল। আর কিছু ছিল না।”

প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন শুক্রবার

সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন বলে জানিয়েছেন সংষ্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।
 
বুধবার  বিকালে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, সন্ধ্যা ৭টায় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন।
 
মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংস্কৃতিমন্ত্রীসহ অন্যরাভাষণটি আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ইজতেমায় মুসল্লিদের খেদমতে ৫০টি বাস দিলেন ডিপজল


চলচ্চিত্র অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজল এবার বিশ্ব ইজতেমায় মুসল্লিদের আসা যাওয়ার জন্য নিজস্ব পরিবহন প্রতিষ্ঠান থেকে বিনামূল্যে ৫০টি বাস সার্ভিস দেয়ার কথা জানিয়েছেন। ইজতেমায় মুসল্লিদের যাতায়াতের কষ্ট লাঘব করতেই এ পরিবহন সেবা দেয়া হচ্ছে।

চলতি বছর বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ১২-১৪ জানুয়ারি, আর দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা ১৯-২১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। গেলো বছর বিশ্ব ইজতেমায় ডিপজল ১৯৫টি বাস দিয়েছিলেন। যার ফলে দেশের দূর দূরান্তের অসংখ্য মুসল্লি খুব সহজেই ইজতেমায় অংশ নিতে পেরেছিলেন।

এ ব্যাপারে ডিপজল জানান, আমাকে একসাথে ৮৮টি বাস বিক্রি করে দিতে হয়েছে। তাই খুব বেশি বাস এবার ইজতেমায় দিতে পারছি না। এবার আমি ৫০টি বাস দিতে পারছি। এজন্য আমার নিজেরও মন খারাপ, আরো বেশি বাস দিতে পারলে ভালো হতো।

ডিপজল ১৯৮৯ সালে ‘টাকার পাহাড়’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন। পরিচালনা করেন মনতাজুর রহমান আকবর। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালে। ওই ছবিতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছিলেন ডিপজল। পরবর্তীতে খলনায়ক হিসেবে বেশ পরিচিতি পান তিনি। এ অভিনেতা ‘চাচ্চু’ ছবির মাধ্যমে ফের ইতিবাচক চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। তখন থেকেই প্রতিটি  সিনেমাপ্রেমী বাঙালির মনে জায়গা করে নেন ডিপজল।

সবশেষ ডিপজল অভিনীত ‘দুলাভাই জিন্দাবাদ’ ছবিটি গেলো বছর ১৩ অক্টোবর মুক্তি পায়। ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী।

স্বামীসহ জাপা এমপি মাহজাবিনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

 
বেসিক ব্যাংকের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সংসদ সদস্য মাহজাবিন মোরশেদ ও বেসিক ব্যাংকের সাবেক দুই এমডিসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আলাদা দুইটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বুধবার চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় দুদকের সহকারী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মামলা দুটি করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল হক।

একটি মামলার আসামি চট্টগ্রাম জাতীয় পার্টির মহিলা আসন-৪৫ এর এমপি ও আইজি নেভিগেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহজাবিন মোরশেদ, আইজি নেভিগেশনের পরিচালক সৈয়দ মোজাফফার হোসেন এবং বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম।

তারা পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেসিক ব্যাংকের সহায়ক জামানত না নিয়ে শাখার নেতিবাচক মতামত থাকা সত্ত্বেও ঋণ মঞ্জুর এবং ঋণ উত্তোলনপূর্বক মঞ্জুরি পত্রের শর্তভঙ্গ করে ব্যাংকের টাকা যথাসময়ে পরিশোধ না করে সুদে-আসলে ১৪১ কোটি ৫ লাখ ৪৬ হাজার ১০৫ টাকা আত্মসাৎ করেন।

অন্য মামলায় সংসদ সদস্য মাহজাবিন মোরশেদের স্বামী এবং জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহীম ও বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাজেদুর রহমান পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুদে-আসলে বেসিক ব্যাংকের ১৩৪ কোটি ৯৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৫ টাকা আত্মসাৎ করেন।

দুটি মামলাই বেসিক ব্যাংকের সাবেক দুজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জড়িত।

মানবাধিকার অবহেলিত by সুলতানা কামাল

মানবাধিকার বিষয়টি নিশ্চয়ই আমরা সবাই জানি, বুঝি। রাস্তাঘাট, সেতু, আকাশছোঁয়া ইমারত, ঝলমলে দোকানপাট, অত্যন্ত উচ্চমূল্যের ব্যক্তিমালিকানাধীন বাহন অথবা আর্থসামাজিক সূচকে উন্নয়নের মাপকাঠিতে বেশ ওপরের দিকে স্থান পাওয়া—উন্নতির এসব মাপকাঠিতে মানবাধিকারের বিচার করা যায় না। কারণ, মানবাধিকার প্রকৃতপক্ষে একটি বোধের নাম, যে বোধ মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে শিক্ষা দেয় এবং অপরের মনুষ্য পরিচয়কে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান করার দীক্ষায় দীক্ষিত করে। মানবাধিকার একটি সমাজে কতটা বিরাজ করছে, তার মাপকাঠি সমাজের একজন মানুষ নিজের জীবনটা কতটা নিশ্চিন্তে যাপন করতে পারছেন।
তাঁর আর্থসামাজিক অবস্থান, ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, লৈঙ্গিক পরিচয় কিংবা বয়স তাঁর আত্মপরিচয়কে ছাপিয়ে যাবে না—এই আশ্বাসে তাঁকে আশ্বস্ত থাকতে হবে। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাঁর জীবনটা তিনি সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে কোনো রকম হেনস্তা বা হয়রানির শিকার না হয়ে মোটামুটি শান্তিতে যাপন করে যেতে পারবেন। কোনো বিশেষ পরিচয়ের কারণে তাঁকে নিগৃহীত বা অপমানিত হতে হবে না। বা কোনো অজুহাতে দখল করে নেওয়া হবে না তাঁর সহায়-সম্পদ, তাঁকে হতে হবে না বাস্তুহারা, নিতে হবে না দেশত্যাগের মতো চরম সিদ্ধান্ত। মানবাধিকার বলে, মানুষ মানুষ হয়ে জন্মেছে বলেই কিছু অধিকার তার সহজাত। এসব অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না, সে কোনো ব্যক্তিই হোক, কি রাষ্ট্র, কি সমাজ। আজ অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলতেই হয়, বাংলাদেশ নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নের স্বাক্ষর রেখে থাকলেও মানবাধিকারের বিষয়ে যে অবহেলা, উদাসীনতা ও অনগ্রসরতার উদাহরণ রেখেছে, তা খুব কম করে বললেও বলতে হয়, অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উদ্বেগটা অনেক বেশি গভীর আকার ধারণ করে এ কারণে যে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো কেমন করে যেন সমাজে একটা গ্রহণযোগ্যতা আদায় করে নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বোধ হয় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নারী নির্যাতন। বাংলাদেশে নারীদের এত উন্নতি সত্ত্বেও নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যানে শঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্র কি শিক্ষালয়—সর্বত্র নারী নানা ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন আর হয়রানির শিকার হচ্ছে। ১০০ জনের মধ্যে ৮৭ জন নারী কোনো না কোনোভাবে পরিবারের মধ্যেই নির্যাতিত হন। একটি মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে শুধু ২০১৭ সালেই ধর্ষণ করা হয়েছে প্রায় ৮০০ জন নারীকে, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৯০ জনেরও বেশি নারীর ওপর। ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, যেটা সরকারেরই একটি সংস্থা, সেটির হিসাব আরও ভয়াবহ: এই এক বছরে শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন (যার মধ্যে ধর্ষণের মতো অপরাধও আছে), এমন নারীর সংখ্যা দুই হাজারেরও অধিক।
নারী নির্যাতনের ধরন যে বীভৎসতার পরিচয় দিচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত বিবরণে নাই-বা গেলাম। একই সঙ্গে আমরা খবর পাচ্ছি নারী নির্যাতনের অপরাধে শাস্তির আওতায় এসেছে হাজারে দুজনেরও কম ব্যক্তি। এখানেই মানবাধিকারের প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। একটি সমাজে নানা ধরনের অপরাধ ঘটতেই পারে। কিন্তু সেই অপরাধের প্রতিকার দেওয়াতে, অপরাধ থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদানে এবং অপরাধীকে জবাবদিহির সামনে দাঁড় করানোতে রাষ্ট্র কী ভূমিকা রাখছে, সেটাই এখানে বিবেচ্য। নারী নির্যাতনের এক বছরের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা এখানে কত প্রকট! আর ধর্ম, বর্ণ, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী হিসেবে যাদের পরিচয় ভিন্ন, এ ধরনের ঘটনা যখন তাদের ওপর ঘটে, তারা যে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাটুকুও করে না, সে কথা বারবার করে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু ফল লাভ যে হয়নি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারের চার বছরের সালতামামির সময় রিশা, তনু, রূপা—এদের সঙ্গে আরও অসংখ্য মুখ ভেসে ওঠে। সেই মুখগুলোকে কি তাড়িয়ে দিতে পারি আমরা? রাজন, রাকিব, সাগর—আমাদের চোখের সামনে এদের প্রকাশ্য দিবালোকে দুর্বৃত্তরা নির্মমভাবে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যাচার করে মেরে ফেলল, তার বিচারের শেষ এখনো দেখা হলো না আমাদের। শিশু নির্যাতন, হত্যা আর সহিংসতা মিলে দেড় হাজারেরও বেশিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র এক বছরে। যে মানুষগুলো হারিয়ে গেলেন বা যাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশেরই কোনো হদিস করতে পারছি না আমরা। কেন তাঁরা হারিয়ে যাচ্ছেন (বা অনেকের মত অনুযায়ী, ‘আত্মগোপন’ করছেন), বা যাঁরা ফিরে আসছেন, তাঁরা কেন কোনো কথা বলছেন না—এ বিষয়গুলো মানুষকে গভীর শঙ্কার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যাঁরা ফিরে এলেন, তাঁরা কি তাঁদের ওপর যাঁরা এই অমানবিক ঘটনা ঘটাল, তাদের শাস্তি চান না? না চাওয়ার পেছনের কারণটা কী? আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভীতি? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কেন তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না তথ্য উদ্ধারের? নাকি এর অন্যতম কারণ এই যে, অভিযোগের আঙুলটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের দিকেই তোলা? এ রহস্য রয়েই গেল। বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে বলে রাষ্ট্র দাবি করলেও প্রতিদিনই ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে মানুষ নিহত হচ্ছে এক-দুজন করে। এ বছরই এই ঘটনা ঘটেছে কম করে হলেও ১৫১টি। মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায় (বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী—যা-ই বলি না কেন) এখনো তাদের পরিচয়ের স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষমাণ। সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক একটি ভূমি কমিশনের দাবিটিও এখনো পর্যন্ত উপেক্ষিতই থেকে গেল।
গোবিন্দগঞ্জের মানুষগুলো রাত কাটাচ্ছে মাঠের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছর পূর্তি হলো, চুক্তির বাস্তবায়ন থেমে থাকল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ধারাগুলোকে পাশ কাটিয়ে। মাত্র এক বছরে হাজারের ওপর হিন্দু দেশ ছেড়ে চলে গেছে। একটি হিসাবে ২৩৫টি মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। নাসিরনগর, গঙ্গাচড়া, তারও আগে দিনাজপুর, হোমনা, কুমিল্লা—কোনো ঘটনার বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি। অথচ রামুর উত্তম বড়ুয়ার মতো অন্যান্য ঘটনা যাঁদের ওপর মিথ্যা দোষারোপ করে ঘটানো হয়েছিল, তাঁরা হয় কারাগারে, নয়তো মামলা মাথায় করে জামিনে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের লাখ লাখ একর জমি দখল হয়ে যাচ্ছে, প্রত্যর্পণের আইনকে অকার্যকর করার সকল কৌশল কাজে লাগিয়ে তা দখলকারীদের ভোগেই রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হচ্ছে। হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভাষায়: ‘পূজামণ্ডপ বাড়ছে, কিন্তু পূজারি কমছে।’ এ কথা যেন কেউ অনুধাবন করছেন না। এখন তো আমরা আর ঔপনিবেশিক শক্তির অধীন নই। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া গর্বিত এক জাতি। আজ যারা এ দেশে মানুষের অধিকার হরণ করছে, তারা তো এ দেশেরই সন্তান, আজ ‘আপন সন্তানই করিছে অপমান’। আমরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যেভাবে দুহাত বাড়িয়ে টেনে নিয়েছি, বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছি মানবতাবোধের পরিচয় রাখার জন্য, সেই দেশ থেকে এ দেশেরই মানুষ প্রতিনিয়ত চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন নিরাপত্তার অভাবে। এই অসংগতি দূর করতে না পারলে মানবতার প্রশংসা টিকাতে পারব কি? এ প্রসঙ্গগুলো অনেক বেশি করে আলোচনায় আসে, কারণ আজ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে শুধু নয়, বাংলাদেশের সকল প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। গণতন্ত্র, প্রগতিশীলতার সঙ্গে মানবাধিকারের, সুশাসনের সম্পর্ক যেমন অবিচ্ছেদ্য, সেটা তেমনি সত্য উন্নয়নের প্রশ্নেও। মানবাধিকারের বোধবর্জিত উন্নয়ন কখনো গণতন্ত্রকে অর্থবহ করে তুলতে পারে না। উন্নয়ন তো মানুষের জন্যই। মানুষ যেখানে আতঙ্কিত, অনিরাপদ, অরক্ষিত বোধ করে, সেখানে উন্নয়নও তো নিষ্ফল হয়ে যায়। সে উন্নয়ন হয়তো গুটিকয় ব্যক্তিকে সুফল এনে দিতে পারে, সবাইকে স্বস্তি দিতে পারে না। একটা ছোট কথা বলে শেষ করি। যত জরুরি কাজই থাকুক না কেন পথে বের হলে দীর্ঘ সময় যানজটে অপেক্ষা করতে হয়। ক্লান্ত, বিরক্ত হতে হতে কখনো কখনো দেখি, দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে বিশেষ কারও পথ পরিষ্কার রাখতে। চালকের ভাষায় ‘কেউ’ যাবে বোধ হয়। আর আমরা যারা ‘কেউ না’, তারা দাঁড়িয়ে থাকবে। এই ‘কেউ’ আর ‘কেউ না’তে বিভক্ত সমাজ তো আমরা চাইনি। মুক্তিযুদ্ধের মূল কথাই ছিল দেশটা হবে সবার—প্রকৃত অর্থে সবার সমান অধিকার, মর্যাদা আর সম্মানের দেশ। নতুন বছরে সেই প্রত্যাশা আর প্রত্যয়েই সামনে তাকিয়ে থাকি।
সুলতানা কামাল: আইনজীবী, মানবাধিকার-কর্মী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

বহুপাক্ষিকতা পথ থেকে সরে আসা? by আসজাদুল কিবরিয়া

যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত প্রায় তা-ই হয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১১তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে। বিধিভিত্তিক বহুপাক্ষিক বাণিজ্যব্যবস্থা জোরদার করার দীর্ঘদিনের প্রয়াসকে অনেকটা পাশে ঠেলে কয়েক পাক্ষিক বাণিজ্য সমঝোতার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে। গত বছরের ১০ থেকে ১৩ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিওর সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এই বৈঠকে সদস্যদেশগুলো কার্যত তাদের মতভেদ ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।  অথচ ১৯৯৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে ডব্লিউটিওর মূল লক্ষ্য ছিল সমঝোতার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য যথাসম্ভব ভারসাম্যমূলক বিধিবিধান তৈরি করা। ভাবা হয়েছিল, এই বিধিবিধান বহুপাক্ষিক (মাল্টিলেটারাল) উদার বাণিজ্যব্যবস্থাকে ক্রমেই প্রসারিত করবে এবং বাণিজ্য বিস্তারের পথে অন্তরায় হয়ে থাকা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমিয়ে আনবে। এ জন্য ২০০১ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় চতুর্থ মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে সদস্যদেশগুলো দোহা উন্নয়ন অ্যাজেন্ডা (ডিডিএ) গ্রহণ করে। তারা একমত হয়েছিল যে এই কর্মসূচির আওতায় কৃষি বাণিজ্যে ভর্তুকি এবং শিল্পপণ্যে আমদানি শুল্কহার কমানোসহ বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উন্নয়নমুখী বৈশ্বিক বাণিজ্যবিধান তৈরি করা হবে। বাস্তবে দেখা গেল, এই সমঝোতা বা দর-কষাকষি (যা দোহা পর্ব নামে পরিচিত) ক্রমেই জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে দুই বছর অন্তর মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন হলেও সদস্যদেশগুলোর নানামুখী ও বিপরীতধর্মী বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং তাতে ছাড় না দিতে অনীহা তাদের ডব্লিউটিওর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়ার পথে বাধা তৈরি করে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বিভিন্ন বিষয়ে একে অন্যকে দোষারোপ করায় মতভেদ বহাল থাকে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতি এবং ধরনেও কিছু পরিবর্তন চলে আসে; আসে নতুন নতুন বিষয় ও জটিলতা। এই বাস্তবতায় বিভিন্ন দেশ, বিশেষত উন্নত দেশগুলো প্রলম্বিত ও অসমাপ্ত দোহা পর্বের আলোচনা টেনে নিতে আর আগ্রহী হলো না। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বুয়েনস এইরেসে যখন আবার ডব্লিউটিওর ১৬৪টি সদস্যদেশ মিলিত হলো, তখন কিন্তু এই মতভেদটাই নতুনভাবে ফুটে উঠল। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বিশ্ববাণিজ্যকে অবাধ থেকে সংরক্ষিত এবং বহুপাক্ষিক থেকে দ্বিপাক্ষিক করার নীতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার ডব্লিউটিওর আওতায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিভিন্ন সময়ে অন্য দেশের কাছে হেরে যাওয়ায় এই সংস্থার ওপর তাদের ক্ষোভও গোপন নেই। তাই বুয়েনস এইরেসে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই কোনো রকম ছাড় না দেওয়ার কথা জানিয়ে দেয়। ফলে এই সম্মেলনে খাদ্যনিরাপত্তাজনিত ভর্তুকিকে বাণিজ্য বিরোধের বাইরে রাখা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধভাবে মাছ ধরার ব্যবসা আটকানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়নি।
বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর শতভাগ বাজারসুবিধা নিয়ে কথা হয়নি। বরং বিভিন্ন উন্নত ও কিছু উন্নয়নশীল দেশ মিলে তিনটি নতুন বিষয়ে কয়েক পাক্ষিক (প্লুরিলেটারাল) বাণিজ্য আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে। ৭১টি সদস্যদেশ ইলেকট্রনিক কমার্স (ই-কমার্স), ৭০টি সদস্য বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণ (ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন) এবং সদস্যদেশ অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই) বিষয়ে বৈশ্বিক বিধিবিধান প্রণয়নের জন্য জোটবদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ অবশ্য এর কোনোটিতেই নিজেকে যুক্ত করেনি। আপাতত তা সঠিক সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করা যায়। তবে দুই বছর ধরে এ বিষয়গুলোর বৈশ্বিক বাণিজ্য বিধান প্রণয়নে ডব্লিউটিওতে আলোচনা শুরু করার কথা বলে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপানসহ ধনী দেশগুলো। কিছু উন্নয়নশীল দেশও এর পক্ষে সমর্থন দেয়। কিন্তু ভারতসহ বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশ এতে আপত্তি জানায়। যেহেতু ডব্লিউটিওতে প্রতিটি সদস্যের সমান ভোটাধিকার এবং যেকোনো সদস্য ভেটো দিয়ে যেকোনো আলোচনা আটকে দিতে পারে, সেহেতু ১১তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে এই নতুন বিষয়গুলো জায়গা পেল না। তবে ডব্লিউটিওর প্রায় অর্ধেক সদস্যই কোনো না কোনোভাবে এ বিষয়গুলোতে আগ্রহী হওয়ায় কয়েক পাক্ষিক আলোচনার দ্বার খুলে গেল। আর এই বিষয়গুলো ডব্লিউটিওর পরবর্তী কর্মসূচিতেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তার মানে ডব্লিউটিও এই কয়েক পাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনাকে সমর্থন করছে, ডব্লিউটিওর বিধানে এ ধরনের আলোচনা করতে বাধাও নেই। ১৯৪৭ সালে সূচিত জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড (গ্যাট) থেকে যখন ১৯৯৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ডব্লিউটিওর যাত্রা শুরু হয়, বহুপাক্ষিক চুক্তিগুলোর পাশাপাশি চারটি বিষয়ে কয়েক পাক্ষিক চুক্তি ছিল। এগুলো হলো বেসামরিক বিমান, সরকারি ক্রয়, ডেইরি বাণিজ্য ও মাংস বাণিজ্য। এর মধ্যে শেষ দুটির মেয়াদ ১৯৯৭ সালে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে আর সরকারি ক্রয় চুক্তিটি ২০১৪ সালে সংশোধন করা হয়েছে। একই বছর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও চীন পরিবেশবিষয়ক পণ্যে কয়েক পাক্ষিক আলোচনা শুরু করেছে। আবার ২০১৫ সালে নাইরোবি সম্মেলনে ৫৪টি সদস্যদেশ তথ্যপ্রযুক্তি চুক্তি কার্যকর করার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। তবে মনে রাখা দরকার, কয়েক পাক্ষিক বাণিজ্য সমঝোতা থেকে চুক্তি হলে তা প্রাথমিকভাবে শুধু সমঝোতাকারী দেশগুলোর জন্যই প্রযোজ্য। এতে চুক্তির বাইরে থাকা দেশগুলো স্বাভাবিকভাবেই সুবিধা পায় না। পরবর্তী সময়ে কোনো দেশ এতে শামিল হতে চাইলে তাকে বিদ্যমান চুক্তিই মেনে নিতে হয়। মুশকিল হতে পারে যদি এই কয়েক পাক্ষিক চুক্তি একপর্যায়ে বহুপাক্ষিক হয়ে ওঠে তখন। কেননা, যারা এই সমঝোতা বা দর-কষাকষিতে ছিল না, তাদের এখানে আর কথা বলার সুযোগই থাকে না। এতে তারা বৈষম্যের শিকার হয়। সর্বোপরি আগামী দিনগুলোয় কয়েক পাক্ষিক আলোচনা অর্থবহভাবে অগ্রসর হলে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে ডব্লিউটিওর সব সদস্যদেশের ওপর। এমন আশঙ্কাও রয়েছে যে কয়েক পাক্ষিক চুক্তিই পরবর্তীকালে বহুপাক্ষিক চুক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে সবার জন্য বাধ্যতামূলক হতে পারে। সে ক্ষেত্রে যারা মূল আলোচনায় থাকেনি বা থাকতে পারেনি, তারা নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আপস করতে বাধ্য হবে। আর কয়েক পাক্ষিক আলোচনায় উন্নত বা শক্তিশালী দেশগুলো একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে। ফলে উন্নয়নশীল বা দুর্বল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর সেখানে খুব ক্ষীণ হয়ে পড়ে। অথচ ডব্লিউটিওর বহুপাক্ষিক আলোচনায় গরিব বা ছোট দেশও নিজেদের কথা অনেকটা জোরের সঙ্গে বলতে পারে। বাংলাদেশ যেহেতু আগামী ছয় বছরের মধ্যে এলডিসির তালিকা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে, সেহেতু চ্যালেঞ্জটা বাড়তি। কোনো কয়েক পাক্ষিক সমঝোতায় যুক্ত না থাকলে এলডিসির ছাড় ও এলডিসি-উত্তরণ পরবর্তী পর্যায়ে সমন্বয়ের সুবিধা দাবি করার সুযোগ থাকবে না। আবার এ ধরনের উদ্যোগে যুক্ত হতে গেলে দর-কষাকষিতে যে বাড়তি সক্ষমতা প্রয়োজন, তার যথেষ্ট ঘাটতি এখনো বাংলাদেশের রয়ে গেছে। আর তাই কয়েক পাক্ষিক বাণিজ্য সমঝোতাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতে সম্ভাব্য কৌশল ও করণীয় নির্ধারণে অনতিবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আসজাদুল কিবরিয়া: সাংবাদিক।
asjadulk@gmail.com

সিআইএর তৎপরতা নিয়ে আমরা নীরব কেন by রবার্ট ফিস্ক

ইরানে সম্প্রতি যে ছোটখাটো বিপ্লব ঘটে গেল, তা যে একরকম অদ্ভুত প্রকৃতির, সেটা বুঝতে আমার কিছুটা সময় লেগে গেল। ব্যাপারটা নতুন না হলেও ভীতিজাগানিয়া বটে। ওখানকার ঘটনাপরম্পরার দিকে নজর দেওয়া যাক। বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও ভাগ্যাহত তরুণ মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশের রাস্তায় নেমে এসে দারিদ্র্য, সরকারের দুর্নীতি ও স্বাধীনতাহীনতার ব্যাপারে অভিযোগ জানালেন। বেশ দ্রুত তাঁরা নিজেদের নেতাদের বিরুদ্ধে লেগে গেলেন। ব্যাপারটা খুবই ঠিক। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে দেখা গেল, সরকারবিরোধীদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হলো। অন্তত ২১ জন প্রাণ হারান, যাঁদের মধ্যে দুজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও আছেন। অন্যদিকে মানুষও ইটের বদলে পাটকেলটি মেরেছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট দেশটির সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন, এই উত্তেজনার পেছনে বিদেশি, বিশ্বাসঘাতক ও গোয়েন্দাদের ভূমিকা আছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নেতা পুরো বিষয়টিকে ‘টাকা, অস্ত্র, রাজনীতি, গোয়েন্দা’ তৎপরতার ফল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
প্রধান সন্দেহভাজনদের তালিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সৌদি আরব। এরপর বিপুলসংখ্যক সরকার সমর্থক মাথায় প্রিয় নেতার ছবি ধারণ করে এই প্রতিবাদ আন্দোলনের বিরোধিতা করতে রাস্তায় নেমে আসে। এরপর সরকার ঘোষণা দিল, আন্দোলন ‘শেষ’ হয়ে গেছে। ২০১১ সালে সিরিয়ার বিক্ষোভের সঙ্গে এর তুলনা টানা ঠিক হবে না। কিন্তু এটা কি সেই একই দৃশ্যপট, একই মঞ্চনাটক বা পাণ্ডুলিপি নয়? সিরিয়ায় তো একদল দরিদ্র কৃষক সরকারের খ্যাপাটে কৃষিনীতির বিরোধিতা করতে রাস্তায় নেমেছিলেন। এরপর তাঁরা সরকারের দুর্নীতির প্রতিবাদ জানালেন এবং তারপর সরকার উৎখাতের দাবি করলেন, ঠিক যেমন এবার ইরানের প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ও প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির বিরোধিতা করল। সিরিয়ার সরকারি বাহিনী জনতার ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করলে সরকারের সশস্ত্র বিরোধিতাকারীরা আচমকা সিরিয়ার সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করতে শুরু করে। ওই সময় আসাদ সরকারও বলেছিল, এই ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে বিদেশি হাত আছে, যদিও ইরান এখনো ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটা ব্যবহার করছে না। এরপর হাজার হাজার আসাদ সমর্থক তাঁর পোস্টার হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে এবং সরকার ঘোষণা দেয়, সংকটের ‘সমাধান’ হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সমাধান হয়নি, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের নানা চেষ্টা সত্ত্বেও আসাদ নাছোড়বান্দার মতো ক্ষমতা আঁকড়ে থাকলেন। ইরানে ২০০৯ সালে সন্দেহজনক নির্বাচনে আহমাদিনেজাদ (যাঁর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিল আছে) নির্বাচিত হলে যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়, তা খুব শক্ত হাতে দমন করা হয়েছিল, আসাদও ঠিক সেই কায়দায় ক্ষমতা ধরে রাখেন। ইরানে পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র নেই। কারণ, দেশটির কর্মকর্তারা ঠিক করেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে দাঁড়াতে পারবেন আর কে পারবেন না। কিন্তু দেশটির সংসদ প্রকৃত অর্থেই ক্রিয়াশীল। আর ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর ইরানের স্বাধীনতাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার সঙ্গে এখনই তুলনা করা ঠিক হবে না। তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির চেয়ে দেশটির সরকারের নৃশংসতা নিয়েই আমি বেশি চিন্তিত। ব্যাপারটা হলো পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা যায়, কিন্তু মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে ২০০৯ সালে ২৩ বছর বয়সী দেলারা দারাবির মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ করা যায়। তাঁকে যখন ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন মোবাইল ফোনে তিনি মাকে বলছিলেন, ‘মা, ফাঁসুড়ে আমার সামনে দড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা আমাকে ঝুলিয়ে দেবে। আমাকে বাঁচাও।’ ছেলেবন্ধুকে বাঁচাতে দেলারা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে নিজেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাবার দূরসম্পর্কের ভাইকে তিনি হত্যা করেছেন। ফাঁসিতে ঝোলানোর সময় পুরুষ ফাঁসুড়ে তাঁর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে বিদ্রুপের হাসি দিয়ে বলেছিলেন, আপনার মেয়েকে এখন আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ সে বছর আমাকে বলেছিলেন, তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। কিন্তু ইরানের বিচার বিভাগ স্বাধীন, তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এমনকি একটি পিঁপড়াও মারতে চাই না’। অবশ্যই এ ব্যাপারে তিনি কিছু করেননি। ২০১৫ সালে প্রায় ৭০০ ও ২০১৬ সালে আরও ৫৬৭ জনকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছিল। তবে এটা ঠিক, তাঁদের অনেকেই ছিলেন মাদক ব্যবসায়ী। এই বিচারগুলো খুবই বিশৃঙ্খল ছিল। এই মৃত্যুদণ্ডে যেমন ইসলামি রিপাবলিকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছিল, তেমনি হাসান রুহানির কর্তৃত্ব কলঙ্কিত হয়েছিল। অথচ তেহরান পারমাণবিক চুক্তির পর তাঁর ওপরই আমরা আশা রেখেছিলাম।
এবার সিরিয়া ও ইরানের মধ্যকার সেই তুলনার প্রসঙ্গে যাই, যেটা ঘুরেফিরে আমাদের মনে আসছে। লেবাননে ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ ছিল দেশটিতে সিরিয়ার ঘনিষ্ঠতম মিত্রকে শেষ করে দেওয়া, যারা আবার ইরানের অনুগ্রহপ্রাপ্ত। সেটা ব্যর্থ হয়েছিল। হিজবুল্লাহ্ দাবি করে, তারা এই যুদ্ধে জিতেছিল। তারা যুদ্ধে জেতেনি, কিন্তু ইসরায়েল হেরেছিল। এরপরের লক্ষ্যবস্তু ছিল সিরিয়া, সময়টা ছিল ২০১১ সাল। তখন থেকে যে শোক ও নির্মমতার কাহিনি আমরা শুনছি, তা কেবল বরফখণ্ডের চূড়ামাত্র। কিন্তু পশ্চিম ও ইসরায়েল আরও একবার পরাজিত হলো। আসাদ বেঁচে যান, যাঁর সহায়তায় ছিল সেই বিরক্তিকর রুশ, ইরান ও হিজবুল্লাহরা। এবার ইরানের পালা, সেই একই কৌশল ও পাণ্ডুলিপি। সেই একই শত্রু সৌদি আরব আনন্দের সঙ্গে তা দেখছে। ব্রিটেন মানবাধিকার নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নানা কিছু বলছে এবং আহা-উহু করছে। মার্কিনরা আবার নিরপরাধ প্রতিবাদকারীদের ব্যাপারে অতি উৎসাহী। কিন্তু একটি ব্যাপার আমাকে ধন্দ্বে ফেলে দিচ্ছে আর সেটা হলো মার্কিন গণমাধ্যম এ ব্যাপারে সেই মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নাম একবারও বলেনি, যারা কেবল ছয় মাস আগে ট্রাম্প কর্তৃক নিযুক্ত হয়ে ইরানে সিআইয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পদোন্নতি পেয়েছিলেন। মোদ্দা কথা হলো যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে ইরানের বন্ধুদের দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস-এর তথ্যমতে, সিআইএ ২০০৮ সালে হিজবুল্লাহর অন্যতম শীর্ষ নেতা ইমাদ মুগনিয়েহকে হত্যা করে। এই পত্রিকাটি মনে করে, যা কিছু ছাপার যোগ্য, তাই ছাপাতে হবে। তারা এ কথাও ছেপেছে যে ‘ইরান সিআইএর সবচেয়ে কঠিন লক্ষ্য’। আমরা কি ইরানের এই সাম্প্রতিক ঘটনাবলির মধ্যে কোনো সূত্র খুঁজে পাচ্ছি না? ট্রাম্পের নিযুক্ত সিআইয়ের কর্মকর্তারা কি বসে আছেন? নিশ্চয়ই নয়? কিন্তু গণমাধ্যম এ ব্যাপারে নীরব কেন?
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া।
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

‘নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলেও বিশ্ব আমাদের ছেড়ে যায়নি’

প্রথম আলো: গত চার বছরে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকার এগিয়েছে। এসব ঘটনাপ্রবাহকে কীভাবে দেখেন?
তৌহিদ হোসেন: কূটনীতিকেরা হলেন বিপণন কর্মকর্তা। আপনি সেটাই বিক্রি করতে পারেন, যা আপনি তৈরি করেন এবং যার চাহিদা রয়েছে। তাহলে বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে কূটনীতিকদের বিদেশে নিজের দেশকে তুলে ধরতে হলে, সব ক্ষেত্রে দেশ যেভাবে চলবে, যা নিয়ে বাইরের আগ্রহ আছে সেটাই তুলে ধরেন। মানবাধিকারের লঙ্ঘন হচ্ছে না, এটা বাইরের দুনিয়ার চাহিদা। তাই আপনার দেশে যদি মানবাধিকারের লঙ্ঘন হতে থাকে, আপনার কূটনীতিক যত চেষ্টাই করুক না কেন বিক্রি করতে পারবে না। বলা হচ্ছিল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে (২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির) নির্বাচন হবে। তখন কিন্তু একটা ইঙ্গিত ছিল, নির্বাচনটা সাময়িক আরেকটা নির্বাচন হবে। পরে সেটা যে হয়নি, তা নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাদের মতো দেশগুলোতে ক্ষমতায় গিয়ে মেয়াদ পূরণের আগে কেউ দায়িত্ব ছেড়ে দেবে, এটা ঘটে না। পরে আর নির্বাচন না হওয়ায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো সংকট হয়নি।
প্রথম আলো: জানুয়ারিতে যেভাবে বলা হয়েছিল, সেই অনুযায়ী পরে নির্বাচন হলো না। এ নিয়ে কিন্তু কারও সঙ্গে সম্পর্কের তেমন টানাপোড়েন হয়নি।
তৌহিদ হোসেন: বাংলাদেশের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, এটাই পৃথিবীর একমাত্র বিবেচ্য নয়। সারা বিশ্বে তো আরও অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। এ দেশে সংকট তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত কোনো দেশের জন্য তা লাভজনক নয়। বিশ্বজুড়ে ভারতের একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে। ভারত যেহেতু নির্বাচনের সময় পাশে দাঁড়িয়েছে, সেটা হয়তো পরবর্তী সময়ে অন্য দেশগুলো গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি প্রত্যেক দেশেরই নিজের স্বার্থ আছে। তা ছাড়া মুখ ফিরিয়ে নিলে কার কী লাভ!
প্রথম আলো: আপনি বলছেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর সুশাসনই বিশ্বের কাছে একমাত্র বিবেচ্য নয়। সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর প্রত্যেক দেশ নিজের স্বার্থটাই গুরুত্ব দিয়েছে। তার মানে ‘রিয়েলপলিটিক’টাই সবাই বড় করে দেখেছে?
তৌহিদ হোসেন: রিয়েলপলিটিক সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই সরকার নির্বাচনের পর বড় সমস্যার মুখে পড়েনি।
প্রথম আলো: ২০১৫ সালে স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হলো। এটা তো দুই দেশের সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক অর্জন।
তৌহিদ হোসেন: এটি দুই দেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দুই দেশেরও কারও কারও মধ্যে এটিকে শুধু আমাদের সমস্যা হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখা যায়। ভুলে গেলে চলবে না এটি দুই দেশের সমস্যা। মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় এ দেশের জনগণ একটু বেশি বিচলিত হয়। তাই ছিটমহলের মানুষের কারণে আমরা বেশি সংবেদনশীল ছিলাম। অথচ দেখানোর চেষ্টা আছে, ভারত বাংলাদেশকে কিছু একটা দিল। এটা কিন্তু ঠিক নয়। বরং ভারত যে এত দিন এটা করছিল না, এটি তাদের ব্যর্থতা। বিজেপির কারণেই এটি আরও দুই বছর আগে হতে পারেনি।
প্রথম আলো: রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
তৌহিদ হোসেন: রোহিঙ্গাদের চিরতরে বের করে দিতে মিয়ানমার এবার আটঘাট বেঁধেই নেমেছে। আরসার হামলার নামে যা বলা হয়, তা পুরোপুরি আইওয়াশ। এটা মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিজেরাই করিয়েছে। আমার বিশ্বাস, সেনাবাহিনীই ওই ঘটনায় মদদ দিয়েছে। ২৫ আগস্টের তিন সপ্তাহ আগেই রাখাইনে সেনা মোতায়েন শুরু হয়। কাজেই রাখাইনে এবার যা হয়েছে, তা বেশ পূর্বপরিকল্পিত। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ মিয়ানমারের বাইরে। কেন তারা এটা করেছে? রাশিয়া, চীন ও ভারত তাদের সঙ্গে আছে। জাতিসংঘ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না। তাই এই অপকর্ম করার সাহস মিয়ানমার করেছে। তবে এই সমস্যা সমাধানের কোনো ভবিষ্যৎ দেখছি না। যতই চুক্তি সই করি না কেন, আমি খুব একটা আশার আলো দেখছি না।
প্রথম আলো: সব মিলিয়ে সরকারের চার বছরের কূটনীতির মূল্যায়ন কীভাবে করবেন?
তৌহিদ হোসেন: গত চার বছরে বড় কোনো ব্যর্থতা আমাদের নেই। সাফল্য আছে। বিপণনের কাজটা আমরা একেবারে খারাপ করিনি। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলেও পৃথিবী তো আমাদের ছেড়ে যায়নি। কাজেই আমরা আমাদের কূটনীতিকদের কেন কৃতিত্ব দেব না? আমাদের অর্থনীতির চাকা তো ঘুরছে। সেখানে তো কূটনীতির কৃতিত্ব আছে। লোকজন বাইরে যাচ্ছেন, বড় বড় প্রকল্প আছে। তবে এটা ঠিক যে দেশের ভেতরে যদি আরও ভালো করতে পারতাম, বিপণনকারী হিসেবে আমাদের কূটনীতিকেরা আরও সফল হতেন।

ভারসাম্যের টানাপোড়েন by রাহীদ এজাজ

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের পর সরকারের যাত্রার শুরুতে পাশে ছিল শুধু ভারত। ফলে সরকারের পক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার স্বীকৃতি আদায় ছিল সে বছরের প্রথম মাসগুলোতে কূটনীতিকদের প্রধান কাজ। মেয়াদের শেষ বছরে এসে দেখা যাচ্ছে, বৃহৎ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টাই কূটনৈতিক অঙ্গনে সরকারের অন্যতম প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে। ভারতের পর চীন, রাশিয়া ও জাপানের মতো অর্থনৈতিক শক্তিগুলো সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে। বাংলাদেশ চীনের ‘এক অঞ্চল ও এক পথ’ আর জাপানের ‘বিগ বি’র মতো বৃহদায়তন উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে যুক্ততার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক সম্প্রসারিত করেছে বাংলাদেশ। ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলা বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বড় পরিসরে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এরপর থেকে জঙ্গিদের অবস্থান, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি নানা কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সফর বন্ধ হয়ে যায়। পশ্চিমা কূটনীতিকেরা পরিবারের সদস্যদের ঢাকায় আনা বন্ধ করেন। নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি অব্যাহত রাখায় নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে যায় বাংলাদেশ। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান, নিরাপত্তা বাড়ানোসহ অভ্যন্তরীণ নানা পদক্ষেপে বেশ কয়েক মাস পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, যদিও ব্যবসায়ী মহলের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ কখনো কখনো এখানে জঙ্গিদের উপস্থিতি নিয়ে তাদের আশঙ্কা করে থাকে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা সংকট, যা একটি বৈশ্বিক রূপ নিয়ে বাংলাদেশকে এক অভাবনীয় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ, মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে।
এর ওপর ভর করে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর—এই তিন মাসে রোহিঙ্গা সমস্যার দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় মাত্রা যখন যেটাকে দরকার, সেটাকেই সামনে এনেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য, সামুদ্রিক অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ জোরালো। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান দৃশ্যমান না হলে রোহিঙ্গা সংকটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাদে প্রায় সব আন্তর্জাতিক পক্ষকে এভাবে পাশে পাওয়া সম্ভব হতো না। তবে বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক শক্তিকে পাশে পেলেও প্রতিবেশী ভারতের পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশকে রোহিঙ্গা সংকটে সেভাবে পাশে পায়নি বাংলাদেশ। প্রকাশ্যে রাজনীতিবিদদের মতো কূটনীতিকেরাও এসব দেশের সহযোগিতা পাওয়ার কথা বারবার বলেছেন। অথচ এই তিন দেশই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মানবিক ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলেনি। নিকট-প্রতিবেশী হওয়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোর সম্পর্কের বিশেষ মাত্রার কারণে ভারতের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা হতাশা আছে বাংলাদেশের। রোহিঙ্গা সংকটে চীনের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় চীনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশের। চীন এটা বেশ ভালোভাবেই জানে বলে রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের দিকেই ঝুঁকে ছিল। কারণ, মিয়ানমারে জাতিসংঘের কোনো হস্তক্ষেপ চীন মেনে নেবে না। এ ক্ষেত্রে ভারতও পাশে থাকবে, এটা চীন বুঝেছে। এ প্রক্রিয়ায় রাশিয়াকে সঙ্গে রেখেছে চীন। গত চার বছরের পরিসরে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের বড় জায়গাজুড়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পর্ক বাড়লেও গত কয়েক বছরে একটা জায়গায় গিয়ে থমকে আছে। এরপরও প্রতিরক্ষা, সন্ত্রাস দমন, উন্নয়ন সহায়তার মতো অনেক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা রয়েছে। তবে সব মিলিয়ে সম্পর্ক সম্প্রসারিত হলেও সব সময় বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলেছে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক। অতীতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি ডেমোক্র্যাটদের পক্ষপাতিত্বের কারণে নাগরিক অধিকার, সুশাসন ইত্যাদি প্রশ্নে টানাপোড়েন হয়েছে দুই দেশের সম্পর্কে। তবে ২০১৬ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বাংলাদেশ সফরটি ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকায় এসে তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক পরিবর্তন ও সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করেন বাংলাদেশের কূটনীতিকেরা। এ ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের প্রতিফলন বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। ২৮ দেশের এই জোটের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকলেও শ্রমিক অধিকারের বিষয়টির তেমন সুরাহা হয়নি। ফলে বারবার বিষয়টি এসেছে। আর শ্রমিক অধিকারের সুরাহা না হলে ভবিষ্যতে বাণিজ্য সম্পর্কে তা প্রভাব ফেলবে। নির্বাচনী বছরে শ্রমিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশকে জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। ফলে এ বছরের প্রথম প্রান্তিক বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জের। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈতরণি ২০১৭ সালে সফলভাবে পার হয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের শুরু থেকেই অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরানোর জন্য চাপ ছিল। বাংলাদেশকে চুক্তি করতে খসড়া দিলেও প্রায় দেড় বছর নানাভাবে তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে চুক্তিটি সই করেছে বাংলাদেশ। তবে এতে বাংলাদেশ এটা নিশ্চিত করেছে যে ফিরে আসা লোকজনের পুনর্বাসনে উন্নয়ন সহায়তা দেবে ইইউ। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরপর ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দুই প্রস্তাবকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বাংলাদেশ। কারণ, ওই প্রস্তাব দুটিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার ও জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে ইউরোপের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। ব্রাসেলসে ইইউ সদর দপ্তর এবং স্ত্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নিবিড় যোগাযোগের ফলে এটা সম্ভব হয়েছে বলে কূটনীতিকেরা মনে করেন। চিরাচরিত শ্রমবাজারকেন্দ্রিক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, ব্যবসার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন হামলায় সমর্থন, আইএসবিরোধী সৌদি জোটে যোগ দিয়েও অস্ত্র হাতে নেয়নি বাংলাদেশ। আবার ইরান ও কাতারের সঙ্গে সৌদি আরবের বৈরিতায় নিরাপদ দূরত্বে থেকেছে বাংলাদেশ। রিয়াদের অব্যাহত চাপের পরও আইএসবিরোধী জোটে সৈন্য পাঠানো, ইরান ও কাতার প্রশ্নে ঢাকা স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে সফল হয়েছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কে একধরনের গুণগত পরিবর্তন আনতে পেরেছে বাংলাদেশ। গত চার বছরে ভারতের পাশাপাশি চীন ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্ককে বিশেষ মাত্রায় নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশকে মনোযোগী হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করার ক্ষেত্রে ভারত ও জাপানের সঙ্গে ভারসাম্য রাখার কথা বাংলাদেশকে ভাবতে হয়েছে। মধ্যম আয়ের দেশের পথে বাংলাদেশের এগিয়ে চলা, অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ আর অবকাঠামো উন্নয়নের কথা ভেবে চীন ও জাপান বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছে। দুই দেশই বাংলাদেশের বৃহদায়তনের প্রকল্পগুলোতে যুক্ত হয়েছে। আবার চীন এক অঞ্চল ও এক পথ আর জাপান বিগ বির মতো উদ্যোগে যুক্ত করেছে বাংলাদেশকে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে ‘উন্নয়ন সহযোগিতার কৌশলগত সম্পর্ক’ আর দুটি সাবমেরিন কেনার পর ভারতের সঙ্গে সামরিক চুক্তি সই ও ঋণ চুক্তিতে অস্ত্র কিনতে হয়েছে। বড় শক্তিগুলোকে পাশে পেতে গিয়ে ‍বাংলাদেশ কতটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, সেটা সময় বলে দেবে। কিন্তু ভারতের কাছ থেকে তিন ঋণচুক্তিতে ৮ বিলিয়ন ডলার, চীনের কাছ থেকে ২২ চুক্তিতে ৪০ বিলিয়ন ডলার সামলানোর সক্ষমতা আমাদের আছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কূটনীতির বড় জায়গাজুড়ে আছে ভারত। একতরফা নির্বাচনে জোরালো সমর্থনের কারণে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরও বেড়েছে। যদিও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মাথায় ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় এলে স্বল্প সময়ের জন্য সম্পর্কের মাত্রা নিয়ে সংশয় ছিল। বিজেপি সুষমা স্বরাজকে ঢাকায় পাঠিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতার যতই পালাবদল হোক, কংগ্রেসের ধারাবাহিকতায় সম্পর্ক এগিয়ে যাবে। তাই ২০১৫ সালের জুনে ঢাকায় আসার আগে ভারতের সব দলকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত চুক্তির সুরাহা করেন নরেন্দ্র মোদি। তিস্তা চুক্তি সইয়ের জন্য সময় চাইলেও ২০১৭-তে নরেন্দ্র মোদি তা করতে পারেননি। এখন দেখার আছে দুই সরকারের বর্তমান মেয়াদে সেটি হচ্ছে কি না। মোদি বলেছেন, শেখ হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে বর্তমান মেয়াদে চুক্তিটি করবেন। বাংলাদেশের চার বছরের কূটনীতির পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখা যায়, বৈদেশিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি, হোলি আর্টিজান-পরবর্তী নাজুক ভাবমূর্তি, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে ভারসাম্য, সৌদি আরব আর ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই আমরা অ্যাডহক ভিত্তিতে চলেছি। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এভাবে অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নিয়ে কতটা এগোনো যাবে, সামনের দিনগুলোতে সেটা বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিতে পারে।
রাহীদ এজাজ: কূটনৈতিক প্রতিবেদক, প্রথম আলো

ছাত্রলীগের নববর্ষ: দামি পিস্তল ও সস্তা জীবন by ফারুক ওয়াসিফ

কোনো কোনো দেশে আইন আছে, সব তরুণকেই বাধ্যতামূলকভাবে কিছুদিন সামরিক সার্ভিসে যোগ দিতে হবে। বাংলাদেশে তেমন কোনো নিয়ম নেই। তবে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বাধ্যতামূলকভাবে ছাত্রলীগ করার ‘নিয়ম’ আছে। নবাগত শিক্ষার্থী হিসেবে আপনি যদি হলে সিট পেতে চান, সম্মান বাঁচিয়ে চলতে চান, তাহলে ছাত্রলীগের মিছিলে মাঝেমধ্যে যেতেই হবে। এইভাবে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে মিছিল করাত ইসলামী ছাত্রশিবির, এইভাবে মিছিল করাত বাংলাদেশ ছাত্রদল। নিজেদের সুদিনে ছাত্রলীগও সেই ধারা বজায় রেখেছে। খ্রিস্টিয় নববর্ষ এসেছে সবার জীবনে। ছাত্রলীগের জীবনেও। তার জানান দিতে মিছিল করতে হবে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে। তা নিয়ে ছাত্রলীগের দু্ই পক্ষে দ্বন্দ্ব হবে। ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে অস্ত্রের মহড়ার জের ধরে সিলেটে নিহত হলেন ছাত্রলীগ কর্মী তানিম খান। প্রকাশ্যে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া ও তিন খুনের ঘটনায় জড়িত টিলাগড় ছাত্রলীগ। গত মঙ্গলবার নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক ছাত্রলীগ কর্মীকে। চট্টগ্রামেও দলীয় কোন্দলে ছাত্রলীগ নেতারা খুন হচ্ছেন। অভিযোগ দলীয় কর্মীর বিরুদ্ধে এবং হত্যার অস্ত্র প্রায়শই পিস্তল। গত শুক্রবারের প্রথম আলোয় সিলেটের পিস্তলধারী ছাত্রলীগ নেতার ছবি ছাপা হয়েছে। এভাবে নিহত হওয়ার জন্য কিংবা হত্যা করার জন্য নতুন মুখ চাই। মিছিলের দৈর্ঘ্য বাড়ানোর জন্যও নতুন মুখ চাই। পিস্তল কেনার জন্যও অনেক টাকা চাই। নেতা হওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন নেতার ভালবাসা চাই। খেলা চলতে থাকে, খেলারামরা খেলে যান। বনেদি ও প্রাচীন ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের মিছিল করা তো গৌরবের ব্যাপার। সংগঠনটির ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মিছিলে যোগ দেওয়ার সেই গৌরব থেকে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়, সে জন্য দেশব্যাপী ব্যাপক মিছিল-সমাবেশের আয়োজন করা হয়। কক্সবাজার শহরে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর অভূতপূর্ব মিছিল হওয়ার সংবাদ দেখেছি। সেসব মিছিলে ‘বাধ্যতামূলক’ আনন্দে শামিল হতে হয়েছে অনেককেই। যেখানে প্রতিবাদ করা বৃথা সেখানে, মানে ছাত্রাবাস নামক মুরগির খোঁয়াড়ে এসব মেনে নেওয়াই নিয়ম।
এই নিয়ম সব ছাত্রাবাসে মোটামুটি চালু রয়েছে। নতুন ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীর জোগান যত দিন থাকবে, আর যত দিন থাকবে রাষ্ট্রক্ষমতার মদদ, তত দিন নতুন মুখের অভাব পড়বে না। কিন্তু ভেড়ার পালে আরেকটি ভেড়া হতে চাননি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আফসানা আহমেদ ইভা। ছাত্রলীগের মিছিলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ মানেননি বিধায় তাঁকে হল থেকে বের করে দিয়েছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ রকম ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। ইভাকে তাঁরা বের করে দিয়েছেন তীব্র শীতের রাতে। প্রাধ্যক্ষ ও প্রক্টরকে ফোন দিয়ে সাড়া পাননি এই ছাত্রী। স্মরণকালের তীব্র শীতে লেপ-কম্বলের উষ্ণতা থেকে বের না-হওয়ায় তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না। জীবনটা তো একটু উষ্ণতার জন্যই নিবেদিত, সেই উষ্ণতা ক্ষমতারও। সারা রাত হলের ফটকের সামনে শীতে কাঁপতে হয়েছে তাঁকে। কারণ, তিনি যে সংগঠন করেন, সেই সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ক্ষমতার উষ্ণতা থেকে কিছুটা দূরে। ইভা যা পেরেছেন, তা কোনো সাধারণ ছাত্রছাত্রীর পক্ষে পারা কঠিন। আদর্শ ও নীতিনিষ্ঠতা মানুষকে সাহস দেয়। ইভা সাহসী হয়েছেন। কিন্তু কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে দেখা গেল না তাঁর পাশে দাঁড়াতে। এক ইভার শীতার্ত নিঃসঙ্গতা থেকে বোঝা যায়, কতটা ভয়ের হিমে জমে অনেকের চেতনাই বরফ হয়ে গিয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওয়ালিদ আশরাফ উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আমরণ অনশন করেছিলেন, তখনো তাঁকে একাই বসে থাকতে হয়েছে। হলে থাকা কোনো শিক্ষার্থীর সাহস হয়নি তাঁর পাশে বসার। অবশ্য অনেকে গোপনে এসে সংহতি খাতায় সংহতি জানিয়ে গেছেন—তবে হল বা বিভাগের পরিচয় গোপন করেই। জানতে পারলে হলের সিট বাতিল হতে পারে, বেয়াদবির শারীরিক শাস্তিও বিরল নয়। শিক্ষাঙ্গনে নিঃসঙ্গ প্রতিবাদই বুঝিয়ে দেয়, সাহস দেখানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ছেলেটি বা মেয়েটিকে অঢেল আদরে বড় করেন মা-বাবা। সামান্যতম ব্যথা-বেদনা তারা যাতে না পায়, সাধ্যমতো সেদিকে খেয়াল রাখেন। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে আশা করেন, পুত্রধন-কন্যারত্নটি অন্তত নিরাপদ থাকবে। এদের অনেককেই ছাত্রাবাস-ছাত্রীবাসে থাকতে হয়। সেই আদরের পুত্র-কন্যারা বাড়িতে হাসিমুখে ফেরে বটে, কিন্তু হলগুলোয় তারা কীভাবে থাকে, কী আচরণ পায়, সেই কাহিনি বোবা হয়ে থাকে। আদরের পুত্র-কন্যারা ঘুণাক্ষরেও সেসব কাহিনি মা-বাবাকে বলে না। যদি তাঁরা কষ্ট পান, যদি উদ্বেগে তাঁদের ঘুম না হয়? ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে বের করে দেওয়ার ঘটনাটায় কোনো নতুনত্ব নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের চেহারাছবিই এই। হেন কোনো ক্যাম্পাসের হেন কোনো আবাসিক ছাত্রছাত্রী নেই, যাঁদের প্রথম বর্ষে এ রকম বাধ্যতামূলক মিছিল করতে হয় না। সেই নীরব নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে তাঁদের অনেকের আত্মবিশ্বাস কমে যায়, তাঁদের স্বাধীন ইচ্ছার ব্যক্তিত্ব এমন বেঁকে যায়, সারা জীবনে আর সোজা হয় না। এইভাবে রাজনৈতিক দলে কর্মীর জোগান চলতেই থাকে, আনুগত্যের আর দাসত্বের প্রজন্ম তৈরি হতেই থাকে।
জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা এভাবে ভয়ে বা প্রতাপে কাটানোর দুর্ভাগ্য আমাদের শেষ হয় না। এভাবেই উজ্জীবিত তরুণেরা বদলে ‘নিরীহ’ হয়ে যায়। দিনবদলের এই অতিমানবিক কাহিনি সংবাদমাধ্যমে কমই আসে। কেউ কেউ আবার ‘বুদ্ধিমান’। তারা কেউ লোভে পড়ে কেউবা চাপের বশে ক্ষমতাসীন সংগঠনে যোগ দেয়। প্রথম বর্ষের এই রিক্রুটদের দিয়েই তাদেরই সহপাঠীদের দলে টানা হয়, দরকার পড়লে নির্যাতনও করা হয়। তাদের মধ্যে থেকেই তৈরি হয় পিস্তল বা কিরিচ হাতের সন্ত্রাসী—বিশ্বজিতের খুনিরা, আফসানার ঘাতকেরা, খাদিজাকে রক্তাক্তকারী দানবেরা। গোলাগুলি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে এভাবে তৈরি হয় সেলিব্রিটি সন্ত্রাসী, সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে ক্যাম্পাসে পয়দা হয় উদীয়মান ছাত্রনেতার—মাঝখানে পড়ে থাকে নিহত লাশ অথবা জীবিত বোবা প্রজন্ম। সন্ত্রাসীদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ মন্ত্রী-সাংসদ হন। নীরব প্রজন্ম নীরবেই সর্বংসহা নাগরিকে পরিণত হয়। দেশটা এভাবেই এগিয়ে চলে—রসাতলের দিকে। এটা সেই সময়, যা সন্ত্রাস-মাদক-দুর্নীতি ও নারী নির্যাতনের দাগে ক্ষতবিক্ষত। এরাও আমাদেরই তরুণ, যারা অন্তর্কোন্দলে নিহত হয়। এরাও আমাদেরই তরুণ, যারা শীতের রাতে নিরাশ্রয় হয়। যারা মারে তারাও আমরা, যারা মরে তারাও আমরাই। আমরা আর আমাগো মামুদের এই কারবারে তারুণ্য নিজে যেমন হুমকি, তেমনি তারা নিজেরাও হত্যা, মাদক ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়ার হুমকিতে পড়ে থাকছে। জীবন ও তারুণ্য কি এতই সস্তা এ দেশে? এত অবলীলায় মেরে ও মরে শেষ হওয়া যায়?
ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

নারী ক্যাডেটদের কর্মসংস্থান

নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে পাস করা ১৬ জন নারী ক্যাডেটের সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরি না পাওয়ার বিষয়টি হতাশাজনক। রোববার প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০১২ সালে মেরিন একাডেমিতে প্রথমবারের মতো ১৬ জন নারী ভর্তি হন। সমুদ্রগামী জাহাজে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণসহ যোগ্যতার সব পরীক্ষায় তাঁরা সফল হলেও গত দুই বছরে তাঁদের একজনও চাকরিতে ঢুকতে পারেননি। এর কারণ হিসেবে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলছেন সমুদ্রগামী জাহাজমালিকেরা। অথচ নারী মেরিন ক্যাডেটদের চাকরির ক্ষেত্র শুধু সমুদ্রগামী জাহাজ। এখন এই নারী ক্যাডেটদের যদি কোনো সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরিই না হয়, তাহলে তাঁরা যাবেন কোথায়? তাঁদের এত কষ্টের ফল কি তাহলে বৃথা যাবে? এই নারীদের সঙ্গে পাস করা পুরুষ ক্যাডেটদের অনেকে ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরি করেছেন এবং করছেন। এখন নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে নারী ক্যাডেটের সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরিতে নিয়োগ দিতে না চাওয়ার যুক্তিটি কোনোভাবেই ধোপে টেকে না।
আমাদের দেশের নারীরা উড়োজাহাজ চালাচ্ছেন, সশস্ত্র বাহিনীতে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, নৌবাহিনীতে নাবিকের মতো পেশায় সাফল্য দেখিয়েছেন। এসব জায়গায় যদি নিরাপত্তার বিষয়টি বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরির ক্ষেত্রে সেটাকে কেন অজুহাত হিসেবে খাড়া করা হচ্ছে? সরকারও যে এ ব্যাপারে খুব একটা গা করছে না, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। সরকারের যদি মাথাব্যথা থাকত তাহলে পাস করার দুই বছর পরও ১৬ জন নারী ক্যাডেটকে বেকার বসে থাকতে হতো না। নারীদের জন্য কোর্স খোলার সিদ্ধান্ত যখন কার্যকর হয়েছে, তখন পাস করলে তঁারা কোথায় কাজ করবেন, সেটাও সরকার ও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করতে হবে। এ সমস্যা সমাধানে এখন সরকারকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বেশ কয়েকটি নতুন জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এসব জাহাজে সরকার নারী ক্যাডেটদের নিয়োগ দিতে পারে। বেসরকারি জাহাজগুলো যাতে নারীদের নিয়োগ দেয়, বিধিবিধান তৈরিসহ সরকার তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে।

মাদকাসক্তির ব্যাপকতা

কোনো সমস্যা, তা যতই গুরুতর হোক না কেন, যদি স্থায়ী রূপ ধারণ করে, তাহলে একটা সময় তা যেন গা সওয়া ব্যাপারে পরিণত হয়। বাংলাদেশে মাদকাসক্তি তেমনই এক ভয়ংকর সমস্যা, যা সমাধানের তাগিদ আছে বলে মনে হয় না। তরুণ-যুবকদের বেশ বড় একটা অংশ এই আত্মঘাতী আসক্তির শিকার। তবে মাদকাসক্তি শুধু এই বয়সীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, পূর্ণবয়স্ক, এমনকি শিশু-কিশোরদের মধ্যেও মাদকাসক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকাসক্তির এলাকাও সীমাবদ্ধ নেই—রাজধানী ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম-মফস্বল পর্যন্ত সারা দেশে মাদকাসক্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সঠিক পরিসংখ্যান মেলে না। বাংলাদেশে কতসংখ্যক মানুষ মাদকাসক্ত, এ বিষয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কিংবা সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। জানা যায়, সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোকে তারা এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য অনুরোধ করেছিল, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। পরিসংখ্যান না থাকা কোনো সামান্য ব্যাপার নয়; এ থেকে বোঝা যায় সমস্যাটি সরকারের কাছে গুরুত্ব পায় কি না। সংখ্যার হিসাব প্রকাশ পেলে সমস্যাটা যে কত ব্যাপক, তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত এবং সমাজে এ বিষয়ে কিছু করার জোরালো তাগিদ সৃষ্টি হতো। মাদকাসক্তি স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিচারহীনতার কারণে। দেশের অসংখ্য স্থানে প্রকাশ্যে মাদকদ্রব্য কেনাবেচা চলে। প্রথম আলোয় সম্প্রতি প্রকাশিত এক ধারাবাহিক প্রতিবেদনে মাদক ব্যবসার ব্যাপকতা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। পুলিশের আইজি সম্প্রতি বলেছেন, পুলিশ মাদক নির্মূল করতে পারেনি। আমরা বলি, নির্মূল করা দূরে থাক, নিয়ন্ত্রণও করতে পারছে না। অভিযোগ আছে, পুলিশের সদস্য ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের একাংশের সঙ্গে যোগসাজশেই মাদকের ব্যবসা অবাধে চলছে।  অধিকাংশ মাদকদ্রব্য আসে বিদেশ থেকে অবৈধ পথে। আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সদস্য সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে এত অনায়াসে এত বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য পাচার হয়ে আসা সম্ভব নয়। সীমান্তপথে মাদক চোরাচালান ও দেশের ভেতরে মাদকদ্রব্যের কেনাবেচা অত্যন্ত কঠোর হাতে বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে বিজিবি, পুলিশ, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জবাবদিহি নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। কারণ, তাদের একাংশের সহযোগিতা ছাড়া এই মাত্রায় মাদকের ব্যবসা চলা সম্ভব নয়। মাদকাসক্তি দূর করার জন্য সামাজিক ও পারিবারিক প্রচেষ্টাও খুব জরুরি। প্রতিটি পরিবারের সন্তানদের দিকে দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন; খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

নিজের অস্ত্রেই ট্রাম্প ঘায়েল by মারুফ মল্লিক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মহাশয় এতটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়বেন বলে ধারণা করা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এখন রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করতে হচ্ছে, তিনি মানসিকভাবে সুস্থ এবং ভালো কলেজে পাঠ গ্রহণ করে সুশিক্ষায় শিক্ষিত। এর আগেও অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্পের মতো কেউ হেনস্তা হয়েছেন বলে জানা নেই। ট্রাম্পকে নিয়ে গণমাধ্যমের ক্যারিকেচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা এখন নিত্যকার ঘটনা। এর সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে সাংবাদিক মাইকেল উলফের বই ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি: ইনসাইড দ্য ট্রাম্পস হোয়াইট হাউস’-এর প্রকাশ। উলফের বই ট্রাম্পের জন্য চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এটি ট্রাম্পের বিরুদ্ধ মতকে আরও উসকে দেবে। কার্যত ট্রাম্পকে এখন অনেকগুলো ফ্রন্টে খেলতে হচ্ছে। এর বেশির ভাগই সামরিক ও হেজেমনিক ফ্রন্ট। এর সঙ্গে এখন নিজেকে সুস্থ প্রমাণ করার বিষয়টিও যুক্ত হলো। শনিবার সকালে মার্কিনরা ঘুম থেকে জেগে ওঠার আগেই ট্রাম্প টুইট করে দেশবাসীকে জানিয়েছেন, তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ও কাজ করার মতো যোগ্য। নিজেকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা বলেও দাবি করেছেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে বলা যায়, বইটিতে উলফ সরাসরিই ট্রাম্পকে অযোগ্য ও অদক্ষ বলে মন্তব্য করেছেন। ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট পদে থাকার যোগ্য নন বলেও মনে করছেন। উলফ দাবি করেছেন, ট্রাম্পসহ তাঁর আশপাশে থাকা শ দুয়েক লোকের সঙ্গে কথা বলে তিনি বইটি রচনা করেছেন। এ জন্য তিনি দীর্ঘ ১৮ মাসে সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। যদিও ট্রাম্প অস্বীকার করেছেন যে উলফের সঙ্গে কখনোই তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। বইটি সত্য ঘটনা অনুসারে লেখা হোক বা কল্পকাহিনিই হোক না কেন, মাইকেল উলফ সফল। প্রকাশের পরপরই বইটি বেস্ট সেলার হিসেবে তালিকার শীর্ষে উঠে গিয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনেকটা অংশজুড়েই ছিল এ নিয়ে আলোচনা। বইটি যাতে বিক্রি না হয়, ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সে ধরনের চেষ্টা করা হলেও বইয়ের দোকানগুলোয় পাঠকেরা বেশ আগ্রহ নিয়েই ক্রয় করেছেন। ওদিকে অনলাইন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান আমাজন তাদের ওয়েবসাইটে বইটি নিয়ে পাঠকের মন্তব্যগুলো মুছে দিচ্ছে। আমেরিকার বাইরেও ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য বা দূরপ্রাচ্যের সর্বত্র বইটি আগ্রহের তৈরি করেছে। উলফ বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করছেন, বই প্রকাশ করে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সব কীর্তিকলাপ তিনি প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন। ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’র সমালোচনা করতে গিয়ে মার্কিন জীবনীকার মাইকেল ডিএন্টনিও বলেছেন, উলফের বই ট্রাম্পের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের একটি ধাক্কা দিয়েছে। বইটিতে ট্রাম্পকে নির্বোধ (ইডিয়ট) ও তাঁর আশপাশের লোকজনকে ভাঁড় (ক্লাউন) হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে বলে ডিঅ্যান্টনিও মন্তব্য করেছেন। রাজনীতিতে শাসকদের ভাবমূর্তি গঠন বলে একটি বিষয় আছে। যেকোনো শাসকের একটি শক্তিশালী ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনের চেষ্টা করা হয় শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। আবার বিপক্ষ মতবাদের দিক থেকে নেতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনেরও চেষ্টা চলে। ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ সেই দিক থেকে ট্রাম্প চরিত্রের হাস্যকর ও খেলো দিকগুলো আরও বেশি করে তুলে ধরেছে। আগেই বলেছি, ট্রাম্পকে এখন অনেকগুলা ফ্রন্টে লড়াই করতে হচ্ছে। সৌদি আরবের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যোগাযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের বিক্ষোভেও মার্কিনদের নিয়ে কথা হচ্ছে। সম্প্রতি আবার ট্রাম্প পাকিস্তান নিয়েও মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছেন। সিরিয়া ও ইরাক ফ্রন্টেও সুবিধাজনক বিদায় হয়নি মার্কিনদের। জেরুজালেম প্রশ্নে মার্কিন নীতি সারা বিশ্বেই নিন্দিত হয়েছে। এমতাবস্থায় হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বিষয়াদি ও তাঁর সম্পর্কে হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাদের বিরূপ মন্তব্যের প্রকাশ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির জন্য খুব একটা সুখকর হবে না। মার্কিন প্রশাসনকে এখন ঘরে-বাইরে দুই ফ্রন্টেই লড়তে হবে। মার্কিন জনসাধারণকে বিশ্বাস করাতে হবে, তাদের প্রেসিডেন্ট মানসিকভাবে সুস্থ। মার্কিন নিওকনজারভেটিভদের (নিওকন) প্রোপাগান্ডার বিপরীতে এখন যেমন মুসলিমদের বলতে হচ্ছে, ইসলাম মানেই সন্ত্রাস নয়। প্রথমে যদি ধরে নিই, উলফ আসলেই বইটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখেছেন। তিনি হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েই রচনা করেছেন। আরেকটি হতে পারে, উলফ কল্পিত চিন্তা থেকে নিছক প্রোপাগান্ডামূলক বই লিখেছেন। যা-ই হোক না কেন, এতে ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন হেজেমনির ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। পাগলাটে, খ্যাপা ট্রাম্পের ভাবমূর্তিকে আরও হাস্যকর করে তুলবে এই বই।
ট্রাম্প হাস্যস্পদ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এখান থেকে ফিরে আসা মার্কিনদের জন্য খুবই কঠিন হবে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত। এই বই প্রকাশ করে উলফ মার্কিন কনজারভেটিভদের অনেক দিনের পুরোনো অস্ত্র নিওকন রিপাবলিকানদের দিকেই ছুড়েছেন। গত শতকের মাঝামাঝি থেকে মার্কিন কনজারভেটিভরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রোপাগান্ডার আশ্রয় নিত। সামরিক আগ্রাসনের দরকারে বা বিরোধী মতবাদের সরকার ফেলে দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রশাসনের এই নীতির প্রয়োগ দেখা গিয়েছে অনেকবারই। স্মায়ুযুদ্ধকালে আফগানিস্তান বা ভিয়েতনাম যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলোয় আমরা দেখেছি, নায়ক র‍্যাম্বো একাই শত্রুপক্ষকে ধরাশায়ী করছে। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো আর দশটা যুদ্ধের চলচ্চিত্র বলে মনে হলেও বলার অপেক্ষা রাখে না, ওই সব মুভিতে বাম ধারার বা মার্কসবাদীদের শত্রু হিসেবে দেখানো হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে ওই সব সাংস্কৃতিক প্রোপাগান্ডার অগ্রবর্তী ভূমিকা ছিল। সাংস্কৃতিক প্রোপাগান্ডা সারা বিশ্বেই কমিউনিজমবিরোধী মনোভাব তৈরিতে ব্যাপক আকারে ভূমিকা রেখেছিল। এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত নিওকনজারভেটিভ স্যামুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত বিষয় বইয়ের কথাও বলা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন-পরবর্তী মার্কিন হেজেমনি প্রতিষ্ঠার অগ্রবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে হান্টিংটনের বইয়ের গভীর ভূমিকা আছে। সভ্যতার সংঘাতে আরব ও ইউরোপীয় বা খ্রিষ্টান সভ্যতার সঙ্গে ইসলামিক সভ্যতার যে সংঘাতের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, আজকের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে আমরা তারই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। মোদ্দা কথা, এসব বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রোপাগান্ডার যে নীতি মার্কিন কনজারভেটিভরা প্রয়োগ করত, এখন তারই প্রয়োগ দেখতে পাচ্ছি নিওকন রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধেও। মাইকেল উলফের বই তার অন্যতম বড় উদাহরণ। হতে পারে উলফ নিওকনদের এই ধারণা সচেতনভাবে গ্রহণ করেননি। বা সবার মনযোগ আকর্ষণ ও বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্যই বইটি রচনা করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের বাঁকবদল ও পরিবর্তন খুবই বৈচিত্র্যময়, স্বয়ংক্রিয় এবং কখনো কখনো নির্মম হয়ে ফিরে আসে। নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য যে অস্ত্র আপনি প্রয়োগ করবেন, সেটি আবার আপনার দিকেই যে নিক্ষেপিত হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ড. মারুফ মল্লিক: রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর কনটেমপোরারি কনসার্নস, জার্মানি।

রাজনৈতিক দল, গণতন্ত্র ও মন্ত্রিত্ব by সৈয়দ আবুল মকসুদ

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা সংগঠন বা রাজনৈতিক দল ছাড়া সম্ভব নয়। বহুদলীয় গণতন্ত্র বলতে গণতান্ত্রিক দেশগুলো বোঝে একাধিক রাজনৈতিক দল। একাধিক বলতে দু-তিনটি প্রধান দল আর কয়েকটি ছোট-মাঝারি দল। তবে ‘যত গুড় তত মিঠা’ প্রবচনটি শুধু বাংলাদেশি বহুদলীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। বাংলাবাসী রাজনীতিবিদদের প্রতিজ্ঞা, অগণিত দল গঠন করে গণতন্ত্রকে বাংলার মাটির প্রতি ইঞ্চি জায়গায় দৃঢ়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত ঘরে ফিরবেন না। তাই চল্লিশটির মতো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থাকার পরে অনিবন্ধিত আরও যে শতাধিক দল আছে, সেগুলোও নিবন্ধনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। বছরের শেষের দিকে নির্বাচন; নিবন্ধিত না হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সরকার গঠন করা অথবা নিদেনপক্ষে সংসদে বিরোধী দলে থাকাও তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নতুন ৭৬টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। আবেদন জমা দেওয়ার দিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর। কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ১৫টি দল আবেদন করার সময় বাড়ানোর প্রার্থনা করেছিল, কিন্তু সময় বাড়ানো হবে না। কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি যাচাই করে দেখবে আবেদনকারী দলগুলো নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করেছে কি না। প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে তদন্ত করা হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যাচাই-বাছাইয়ে যাদের আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে, তাদের নাম কমিশনে সুপারিশ করা হবে। কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। যারা নিবন্ধিত হবে, তারা সামনের সব নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে।’ নির্বাচনেই যদি অংশগ্রহণ না করবে এবং বিজয়ী হয়ে এককভাবে অথবা কোয়ালিশন করে সরকার গঠনের আশাই না করবে, তাহলে খামোকা শেরেবাংলা নগরে দৌড়ঝাঁপ করবে কেন? ৭৬টি দলের সভাপতি/চেয়ারপারসন এবং সাধারণ সম্পাদক/মহাসচিবদের সঙ্গে প্রাথমিক কথা বলার জন্য যদি তাঁদের নির্বাচন কমিশনে ডাকা হয়, তাঁদের বসতে দেওয়ার জন্য ১৫২টি চেয়ারের প্রয়োজন হবে। সে এক বড় রকমের সভা! তাঁদের চা-নাশতা খাওয়ানোও কম ঝামেলার ব্যাপার নয়। কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্বার্থে রাষ্ট্রকে তা করতেই হবে। সাধারণত একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয় নেতা-কর্মী-সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের সম্মেলনের মাধ্যমে। নেতৃত্বে থাকেন নামজাদা নেতারা। সেভাবেই গঠিত হয়েছিল উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৮৮৫ সালে। ভারতবর্ষের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে বাঙালি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ছিলেন। কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত এবং প্রতিষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। উপমহাদেশে দ্বিতীয় দল গঠিত হয় ২১ বছর পর ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। ঢাকায় অনুষ্ঠিত যে সম্মেলনে নবাব খাজা সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ গঠিত হয়, তাতে যোগ দিয়েছিলেন নবাব ওয়াকার-উল মুল্‌কসহ উপমহাদেশের কয়েক হাজার মুসলমান নেতা। লীগের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান। যে আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়, সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে, ঢাকাতেই ১৯৪৯ সালে, নেতা-কর্মীদের এক সম্মেলনে। সেই আওয়ামী লীগই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ—শখানেক দলের প্রয়োজন হয়নি। দলের মতো দল দু-একটিই যথেষ্ট। নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারী দলগুলোর নাম উপভোগ করার মতো। কোনোটির নামই বলে দেয় তার নীতি, আদর্শ ও লক্ষ্য। কোনোটির আদর্শ বিপ্লবী, কোনোটি প্রায়-বিপ্লবী, কোনোটি ইসলামবাদী, কোনোটির নাম প্রবন্ধগ্রন্থের মতো, কোনোটি বিমূর্ত কাব্যধর্মী, কোনোটির নাম দেখে মনে হয় পরাবাস্তববাদী, কোনোটির নামের কোনো অর্থই হয় না। মানব জাতির ইতিহাসে একসঙ্গে এত দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল কি না জানি না। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ নিবন্ধন ছাড়াই জন্ম লাভ করে মানুষের মধ্যে কাজ করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ বছর যেসব ছেলেমেয়ে পিএসসি/জেএসসি পরীক্ষা দেবে, তারা যদি এসব দলের নেতাদের গিয়ে জিজ্ঞেস করে ‘রাজনৈতিক দল কাকে বলে এবং তার নেতাদের কাজ কী’—তারা কী জবাব পাবে বলতে পারব না। সাধারণ বুদ্ধিতে যা বুঝি তা হলো রাজনৈতিক দলের কাজ জাতির সমস্যাগুলো শনাক্ত করে তা সমাধানের জন্য জনমত সৃষ্টি করা এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নেতাদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কাজ করা। জাতির একেক অবস্থায় রাজনৈতিক দলের একেক রকম কাজ। দেশ যখন পরাধীন ছিল, তখন স্বাধিকার ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কাজ করেছেন। ঔপনিবেশিক সরকার অন্যায় বা জনবিরোধী কাজ করলে তার প্রতিবাদ করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পার্লামেন্ট নির্বাচেনে অংশগ্রহণ করে কেউ সরকার গঠন করেছেন, কেউ বিরোধী দলে থেকে জনগণের অধিকার বা স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন। রাজনীতি করলে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে অনেকে সেসব না হয়েও মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান পান। মহাত্মা গান্ধী, আবদুল গাফ্ফার খান, কমরেড মোজাফফর আহমদ, মাওলানা ভাসানী, সুভাষচন্দ্র বসু, জয়প্রকাশ নারায়ণ প্রমুখ উপমহাদেশের শ্রদ্ধেয় নেতা মন্ত্রী বা কোনো রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণ করেননি। আজও তাঁদের নাম উচ্চারিত হয়। রাজনৈতিক দলের নেতারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই তাঁরা নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে যাবেন, কেউ মন্ত্রী হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। সংসদনেতা সরকার পরিচালনার জন্য তাঁকে সহায়তা করতে তাঁর আস্থাভাজনদের থেকে মন্ত্রিসভার সদস্য মনোনীত করেন। মন্ত্রিসভার আকার কী হবে, তা প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনার বিষয়। দশ-বারোজন মন্ত্রী দিয়ে একটি বিরাট দেশ চালানো যায়। ব্রিটিশ আমলে আফগানিস্তানের সীমান্ত থেকে বার্মা (মিয়ানমার) পর্যন্ত বিস্তীর্ণ উপমহাদেশ চালিয়েছেন ভারতের গভর্নর জেনারেলের জনা দশেক কাউন্সিল সদস্য (মন্ত্রী)। ১৯৪৬-৪৭-এ প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কেবিনেটে মন্ত্রী ছিলেন ১৩ জন। তাঁরা এখনকার ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্মিলিত এলাকার শাসনকাজ পরিকল্পনা করেছেন। পাকিস্তান ও ভারত দুই দেশই স্বাধীনতা লাভের পর ১০-১২ জন মন্ত্রীই দেশ চালিয়েছেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এ বাংলাদেশের সবচেয়ে জটিল সময়ে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় ১০-১২ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দেশ চালিয়েছেন। মন্ত্রিসভার আকার প্রকাণ্ড হলেই সরকার দক্ষ হয় এমন নজির নেই। সব ক্ষেত্রেই অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট প্রবচনটি অর্থবহ।
যে দেশে বেশি বেশি রাজনৈতিক দল, সে দেশে গণতন্ত্রের পরিমাণ বেশি; যে দেশে মন্ত্রিসভা যত বড় সে দেশের সরকার তত দক্ষ এবং যে দেশে অকাল পদোন্নতিপ্রাপ্ত আমলার সংখ্যা অগণিত, সে দেশের প্রশাসন তত দক্ষ—এই তত্ত্ব যদি সঠিক হয়, তাহলে বাংলাদেশ আজ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র। স্বাধীন মিডিয়া সরকার ও বিরোধী দলকে কঠোর সমালোচনা করতে দ্বিধা করে না। সরকারের ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দেয়। কিন্তু মিডিয়ার ভুল ধরবে কে? হঠাৎ একশ্রেণির মিডিয়া থেকে শোনা গেল, নতুন বছরে ‘চমক’ আসছে। চমকটা কী? মন্ত্রিসভায় রদবদল। এই রদবদলের কথা ঘোষিত হওয়ায় জনগণ যতটা চমকিত হয়েছে, তার চেয়ে শতগুণ বেশি চমকিত নয় বরং আতঙ্কিত হয়ে পড়েন অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। চমক শব্দের অর্থ ভয়ে বা বিস্ময়ে চমকে ওঠা অথবা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে আঁতকে ওঠা। আকস্মিক কোনো কোনো ঘটনা দেশবাসীকে চমকে দিতে পারে। সে রকম ঘটনা অনেক গণতান্ত্রিক দেশে ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গোটা মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে পদত্যাগপত্র পেশ করে নতুন নির্বাচনের আহ্বান জানায়। মন্ত্রিসভা থেকে কেউ পদত্যাগ করেননি, কেউ বাদ পড়েননি, যুক্ত হয়েছেন কয়েকজন, প্রমোশন পেয়েছেন একজন, রদবদল হয়েছে দপ্তর—এগুলোকে কেউ ‘চমক’ বলে না। তবে এই পরিবর্তনে যদি কেউ ‘অসন্তুষ্ট’ হয়ে থাকেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। অবেলায় কেউ যে বাদ পড়েননি সেটা পরম স্বস্তির। টক শো থেকে প্রাজ্ঞ কেউ কেউ বলে দিলেন, এই পরিবর্তনে ‘সরকারে গতি সঞ্চার হলো’; যেন নতুন দক্ষদের না নেওয়ায় এত দিন সরকার স্থবির হয়ে পড়েছিল। তা যে খানিকটা ছিল তা বোঝা যায় নবনিযুক্তদের কারও কারও কথাবার্তায়। জনগণের অনেকের চমকটা সেখানেই। বাংলাদেশ বিমানের অবস্থা শোচনীয়, তা দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ জানে। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যিনি পেয়েছেন, তাঁর সূচনা বক্তব্য বিস্ময়কর। তিনি বলেছেন, একচুল ছাড় তো কাউকে দেবেনই না, লোকসানে থাকা বিমানকে ‘আমার রক্ত দিয়ে হলেও লাভজনক করব’। তিনি বলেছেন, ‘মন্ত্রী হব, জীবনেও ভাবিনি। আমার দায়িত্ব নেওয়াকে অনেকে আগুনে নিক্ষেপ করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আগুন নয়, এটা আমার জন্য পানি। বিমানকে লাভজনক করা খুব কঠিন কাজ নয় বলে আমি মনে করি।’ তিনি আগামী আট মাসে বিমানকে ‘এশিয়ার সেরা এয়ারলাইনসে’ পরিণত করার প্রত্যয় ঘোষণা করেন। তাঁর মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। অব্যবহিত আগের বিমানমন্ত্রী বললেন, তিনি আকাশে ছিলেন, মাটিতে নামলেন। ঊর্ধ্বলোক থেকে ধরায় নামার অর্থ ধরাশায়ী হওয়া নয়। মাটির মানুষের সমাজে কল্যাণমূলক কাজ করা আরও সুখের। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী যিনি ছিলেন তাঁর নিষ্ঠা, সততা, দক্ষতা এবং দলের ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আনুগত্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তাঁকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দিয়ে যাঁকে মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়েছে তাঁর অভিজ্ঞতা যথেষ্ট। নিযুক্তির পর তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একটি ডুবন্ত নৌকাকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব আমার ওপর দিয়েছেন। আমি সফল হলে প্রধানমন্ত্রীও সফল হবেন। সাত দিন আমি ছাত্র থাকব, এরপর আমি আমার কাজ শুরু করব।’ মন্ত্রণালয়কে ‘ডুবন্ত নৌকা’ বলা শুধু তাঁর পূর্বসূরিকে অসম্মান করা নয়, নয় বছরের সরকারকেও অমর্যাদা করা। তাহলে কি নয়টি বছর এই বিভাগে সরকার কিছুই করেনি? রাজনৈতিক নেতাদের অনেক সময় পুলিশের লাঠিপেটাসহ নির্যাতন-নিপীড়ন সইতে হয়। গান্ধী, নেহরু, ভাসানীর মতো নেতাও শারীরিক আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তাঁরা অবিচলভাবে জাতির জন্য কাজ করেছেন। রাজনীতি করলেই মর্যাদার উঁচু আসন সবাই পান না। সৌভাগ্যবশত যাঁরা পান, তাঁদের আচরণ ও কথাবার্তা সুন্দর ও সংযত হবে মানুষের সেটাই প্রত্যাশা। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে একটি জাতিকে মর্যাদাসম্পন্ন করা যায় না।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

নতুন মধ্যবিত্ত উদার গণতন্ত্রে আগ্রহী নয়? by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে আমরা দেখতে পাই, মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার বড় হচ্ছে, অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমে দুর্বল হয়েছে এবং এখন একধরনের ‘দোআঁশলা’ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যার কিছু উপাদান কর্তৃত্ববাদী। সমাজে ধর্মের দৃশ্যমানতা স্পষ্ট এবং ধর্মের সেই ব্যাখ্যাগুলোই প্রসার লাভ করছে, যেগুলো ধর্মের অনুদার দিকগুলোকেই প্রাধান্য দেয়। এগুলো সাধারণভাবে মধ্যবিত্তের প্রচলিত বিশ্ববীক্ষা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলেই আমরা এত দিন জেনে এসেছি। তা সত্ত্বেও এই বিরাজমান অবস্থার প্রতি বিকাশমান মধ্যবিত্তের সমর্থন লক্ষণীয়। মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক আছে। মধ্যবিত্তবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় ব্যবহৃত সংজ্ঞাগুলোকে দুই ভাবে ভাগ করা যায়-ব্যক্তিক (সাবজেক্টিভ) ও নৈর্ব্যক্তিক (অবজেক্টিভ)। ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শ্রেণি হচ্ছে একধরনের মানসিক অবস্থান; একজন মানুষ নিজেকে মধ্যবিত্ত মনে করছে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে তাকে আমরা সেই শ্রেণিভুক্ত করব কি না। অন্যদিকে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক শ্রেণি নির্ধারিত হয় কতকগুলো সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে। এই সূচক নির্ধারণের দুটি ধারা-একটি পরিমাণবাচক (কোয়ান্টিটেটিভ), যেমন আয়, শিক্ষা, পেশা ইত্যাদি। অন্যটি গুণবাচক (কোয়ালিটেটিভ), যেখানে বলা হচ্ছে যে মধ্যবিত্ত হচ্ছে তারাই, যারা কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যা তাদের অন্যান্য প্রবণতা থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। মধ্যবিত্তবিষয়ক আলোচনায় সাধারণত পরিমাণবাচক দিকটি প্রাধান্য পায়। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত বলতে আসলে অর্থনৈতিক বিবেচনায় মধ্যবিত্ত বোঝায়। আমরা এই বিকাশমান শ্রেণির বিত্তের সম্ভাব্য উৎসের দিকে মনোযোগ দিতে পারি। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে কৃষি খাতের অবদান নাটকীয়ভাবে কমেছে এবং সেবা খাত প্রধান খাত হিসেবে বিকশিত হয়েছে। স্বাধীনতার প্রথম দশকে (১৯৭১-৮০) গড়ে মোট অভ্যন্তরীণ আয়ের ৪৫ শতাংশ আসত কৃষি থেকে, সেবা খাতের অবদান ছিল ৪৪ শতাংশ, শিল্প খাতের অবদান ছিল ১১ শতাংশ। ২০০০ সালে যেখানে কৃষি খাতের অবদান ছিল ২৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ, তা ২০১৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশে; সেবা খাত ৫২ দশমিক ৯১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। শিল্প খাতের অবদান ২৩ দশমিক ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। মাঝারি আয়ের দেশগুলোতে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে অকৃষি খাতের অবদান বৃদ্ধি মোটেই অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বাংলাদেশে গত দুই দশকে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে, তার বিত্তের সূত্রের প্রধান উৎস বিকাশমান সেবা খাত। সেবা খাতের যে দুটি বৈশিষ্ট্যের দিকে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই তা হচ্ছে, উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্কের অভাব এবং বিশ্বায়নের ফলে তার বৈশ্বিক যোগাযোগ। এই দুই-ই এই শ্রেণির সদস্যদের বিশ্ববীক্ষা, মানস গঠন ও সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকায় প্রভাব ফেলবে বলে আমরা অনুমান করতে পারি। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকট নতুন নয় এই অর্থে যে স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে স্থায়ী রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯০ সালের পর এই অবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও গত আড়াই দশকে সাফল্য আশাব্যঞ্জক নয়।
তদুপরি ২০১৪ সালে প্রায় সব বিরোধী দলের বর্জন সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দল এককভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন করে, যার ফলে সংসদে বিরোধী দলের কোনো অস্তিত্বই নেই। ওই নির্বাচনের আগে ও পরে ক্ষমতাসীন দল এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যা মর্মবস্তুর দিক থেকে গণতান্ত্রিক বলে বিবেচিত হতে পারে কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এখন যে ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, তাকে আমরা ‘দোআঁশলা ব্যবস্থা’ (হাইব্রিড রেজিম) বলতে পারি। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে আছে এমন ব্যবস্থার উপস্থিতি, যেখানে দৃশ্যত গণতন্ত্রের কিছু দিক, যেমন নিয়মিত নির্বাচন, বিরোধী দলের উপস্থিতি, নিয়ন্ত্রিতভাবে মতপ্রকাশের উপায় এবং বিচার বিভাগের কাগুজে স্বাধীনতা থাকলেও শাসনব্যবস্থার মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়, নতুবা সেগুলো কার্যকর থাকে না, জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও আইনের শাসন অনুপস্থিত থাকে এবং সাংবিধানিকভাবেই ব্যক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়া, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা (ইনটিগ্রিটি) প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, ভিন্নমতের প্রকাশ সংকুচিত হওয়া, বিদ্যমান একাধিক আইনের অপব্যবহার (যেমন আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা, যার আওতায় মামলার সংখ্যা ২০১৬ সালে ছিল ৩৫ টি), ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণমূলক নতুন আইনের প্রস্তাব (যেমন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ অপরাধ আইন ২০১৬), ক্রমবর্ধমান বিচারবহির্ভূত হত্যা (২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭৮) এবং গুমের (২০১৬ সালে ছিল ৯০ জন) ঘটনা বৃদ্ধি সত্ত্বেও এসব বিষয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যথেষ্ট উদ্বেগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এ থেকে প্রশ্ন তোলা যায়, গত এক দশকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্য থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনে কি অনুৎসাহ লক্ষ করা যাচ্ছে? গণতন্ত্র সম্পর্কে কি ভিন্ন কোনো ধারণা তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে ‘উন্নয়ন’কে গণতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপনের যে চেষ্টা হচ্ছে, তা কি এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে? একজন বিশ্লেষক বলছেন, ‘রাষ্ট্রের চরিত্র কী হবে, সেখানে গণতন্ত্র ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে, রাষ্ট্রপরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো যাবে ইত্যাদি বিষয়েও সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্রমেই একধরনের নির্লিপ্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে’ (আবু তাহের খান, কালের কণ্ঠ, ৩ নভেম্বর ২০১৫)। একই সময়ে সরকার-সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের একাংশের কাছ থেকে ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের’ ধারণা প্রচার ও তা প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির আগ্রহ ও অবদান ছিল বেশি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পটভূমিবিষয়ক গবেষণালব্ধ ফলাফলগুলোয় সুস্পষ্টভাবে এটাই চিহ্নিত যে বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে মধ্যবিত্ত শ্রেণি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তদুপরি ১৯৮০-এর দশকে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও এই শ্রেণি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের সমাজে ধর্মের ভূমিকা ও অবস্থান বিষয়ে কথা উঠলে সাধারণত গত কয়েক দশকে সাংবিধানিক পরিবর্তন, রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের বিকাশ, প্রধান দলগুলোর সঙ্গে তাদের সখ্য এবং তাদের ভূমিকার কথাই আলোচিত হয়। এসব বিষয়ের গুরুত্ব অস্বীকার না করেও বলা দরকার, এর বাইরে দৈনন্দিন জীবনাচরণেও আমরা ধর্মের উপস্থিতি দেখতে পাই। এখানে ইসলাম ধর্মের উপস্থিতি নতুন বিষয় নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি দিকের প্রতি আমি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। প্রথমত, ব্যক্তিগত জীবনাচরণের অংশ হিসেবে ধর্ম পালন করার চেয়ে তাকে সবার কাছে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে হাজির করার প্রবণতা; দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে ইসলাম ধর্মের যে সমন্বয়বাদী, উদার ধারা ও ব্যাখ্যা প্রাধান্য পেয়ে এসেছে, এখন তার বিপরীতে একধরনের আক্ষরিক এবং অনুদার ব্যাখ্যা, যার অধিকাংশ ইসলামপন্থী তাত্ত্বিকদের করা, তা প্রধান হয়ে উঠেছে। এই প্রবণতাগুলো সমাজের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই বেশি লক্ষণীয়। তাদের মধ্যে কেবল ধর্মের ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহই দেখা যাচ্ছে তা নয়, ধর্মাচরণকে জনসমক্ষে উপস্থাপনের মাধ্যমে তার একধরনের সামাজিক স্বীকৃতি লাভের চেষ্টাও স্পষ্ট। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের বাক্য, বাগ্ধারা, সম্ভাষণ থেকেও এর পক্ষে প্রমাণ মেলে। এর সবচেয়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রমাণ হচ্ছে কিছু কিছু আরবি শব্দের ব্যাপক প্রচলন। তদুপরি বাংলাদেশে প্রচলিত পোশাক-পরিচ্ছদেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। একে কেউ কেউ চিহ্নিত করেছেন ‘আরবিকরণ’ বলে। গণতন্ত্র ও ধর্মের প্রশ্নে মধ্যবিত্তদের আচরণ বিষয়ে এসব পর্যবেক্ষণের অর্থ এই নয় যে গোটা মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্যই তা প্রযোজ্য। অবশ্যই মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে একটি অংশ দৃশ্যত ভিন্ন আচরণ করে এবং তারা ঐতিহ্যগত ভূমিকা পালনে সচেষ্ট। কিন্তু গত এক দশকের বেশি সময়ের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আমি মনে করি যে এসব প্রশ্নে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভেতরে একটা বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে গত এক বা দেড় দশকে মধ্যবিত্তদের যে অংশের বিকাশ ঘটেছে, যাদের আমি ‘নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি’ বলে বর্ণনা করতে চাই, তাদের ভেতরেই গণতন্ত্রের উদারনৈতিক দিকগুলোর আবেদন কম এবং একই সঙ্গে তাদের মধ্য থেকেই সমাজে ও রাষ্ট্রে ধর্মের প্রত্যক্ষ ও প্রকাশ্য ভূমিকার তাগিদ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের এই নতুন বিকাশমান মধ্যবিত্তকে রেহমান সোবহান বর্ণনা করেছেন ‘এক্সক্লুসিভ’ এবং বিশ্বায়িত বা গ্লোবালাইজড বলে। এই দুই ধরনের মধ্যবিত্তের মধ্যকার পার্থক্যগুলো কী? আগামীকাল: নতুন মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক ভূমিকার অবসান?
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

হেফাজতে মৃত্যু রোধ

নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। ২০১৩ সালে কিছুটা দায়সারা মনোভাব নিয়েই নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ বিলটি সংসদে পাস হয়েছিল। কিন্তু আমরা কখনো সংসদের কোনো কমিটিকে এর কার্যকর হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে উদ্বিগ্ন হতে দেখিনি। সোমবার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রতিটি কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তখন খবর বেরিয়েছে যে পুলিশ আবারও সরকারের কাছে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ আইনটি সংশোধনের দাবি জানিয়েছে। পুলিশের অভ্যন্তরের একটি উল্লেখযোগ্য মহল শুরু থেকেই আইনটিকে স্বাগত জানাতে অপারগ থেকেছে। সংশোধন নয়, প্রকৃতপক্ষে তারা আইনটির বাতিল চায়। গত বছর জানুয়ারিতে রাজারবাগেই এই দাবি তুলে তারা প্রধানমন্ত্রীকে রীতিমতো বিব্রত করেছিল। প্রধানমন্ত্রী তখন বলেছিলেন, সংসদে পাস করা আইন বাতিল করা সমীচীন কি না, সেটা তাঁর জানা নেই। আমরা অবাক হই যে মানবাধিকারের প্রশ্ন জড়িত আছে এমন একটি আইন সরাসরি সরকারপ্রধানের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে কী করে বাতিল চাওয়া সম্ভব হতে পারে। এর আগে তারা ওই আইনের সংশোধনী প্রস্তাব লিখিতভাবে সরকারকে দিয়েছে। আমরা মনে করি, এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঔদাসীন্য দেখানো উচিত নয়। বিষয়টি শুনে নিষ্পত্তি করে দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির আশু হস্তক্ষেপ আমরা আশা করি। পুলিশ যদি ওই আইনের আওতায় কোনোভাবে অপব্যবহার বা হয়রানির শিকার হয়, তাহলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অপনোদনে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি রাখে। কোনো অন্যায্য বিধানের উপস্থিতি নিশ্চয় পুলিশের মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু মুশকিল হলো এই আইনের কারণে তারা সত্যিই কোনো সমস্যার মুখে পড়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। আইনে বলা আছে, কাউকে মানসিক কষ্ট দিলেও পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। ‘মানসিক কষ্ট’ নির্ণয়ের কোনো মানদণ্ড না থাকায় পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরের সুযোগ থাকছে বলে পুলিশ এই আইনের সংশোধন চাইছে। আমাদের প্রশ্ন, এ ধরনের ‘মিথ্যা’ মামলা দায়েরের কোনো ঘটনা কি ঘটেছে? যদি হয়ে থাকে, তবে তা পুলিশের প্রকাশ করা উচিত। বাস্তবতা হচ্ছে সার্বিক বিচারে ওই আইনটি একটি কাগুজে আইন হিসেবেই রয়ে গেছে। এই আইন বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম নয় মাসে পুলিশি হেফাজতে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আইনে এর শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিন্তু আদৌ কেউ বিচারের সম্মুখীন হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। তাই আমরা বলব, আগে আইনটি যথাযথভাবে কার্যকর হোক, পুলিশি হেফাজতে কেউ মারা গেলে তার যথাযথ তদন্ত, বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হোক। আইন কার্যকর করতে গিয়ে যদি কোনো সমস্যা বা জটিলতা দেখা দেয়, তখন আইনের কোনো ধরনের সংশোধনের দাবিটি যৌক্তিক ভিত্তি পাবে।

শীতের থাবা

আবহাওয়ার চরমভাব থেকে নিস্তার পাচ্ছে না ধনী-দরিদ্র কোনো দেশ। ফলে শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা—কোনো মৌসুমেই প্রকৃতি ঠিক স্বাভাবিক আচরণ করছে না। গত কয়েক বছর স্বাভাবিক মাত্রার শীত না পড়লেও এবার বাংলাদেশে তাপমাত্রা এসে ঠেকেছে ২ দশমিক ৬-এ, যা অর্ধশত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশে কনকনে শীতের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সাইবেরিয়া থেকে আসা শীতলতম বায়ুকে। ৪০-৫০ হাজার ফুট ওপরের জেট বায়ু নেমে এসেছে ৩০-৩৫ হাজার ফুটে। বর্তমানে উল্টো ঘূর্ণাবর্ত নামে শীতল বায়ুপ্রবাহ বইছে বলে আবহাওয়াবিদেরা মনে করেন। গতকাল তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও সামনে আরেকটি শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা আছে। রেকর্ড ভাঙা শীতে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনজীবন প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
ইতিমধ্যে শীতের প্রকোপে বেশ কয়েকজন মারা গেছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। শীতের কারণে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিসসহ ঠান্ডাজনিত নানা রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো এবারও শীতের প্রথম ধাক্কাটা এসে পড়েছে গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষের গায়ে। দেশে শীতের প্রকোপ কতটা ভয়াবহ, তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো সেই শীত নিবারণের সুযোগ ও সামর্থ্য আমাদের আছে কি না। উন্নত দেশগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নানা রকম আগাম পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষগুলোর বাড়িঘর এতই নাজুক ও নড়বড়ে যে তা শীত ঠেকাতে পারে না। এ অবস্থায় শীতকাতর অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে প্রথমত প্রশাসন তথা সরকারকেই। সেই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে। দিনমজুর ও হতদরিদ্রদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সবাই এগিয়ে এলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটালেন মুন জে ইন by মনজুরুল হক

বছর দুয়েক ধরে চলা বাগ্‌যুদ্ধের শেষে দুই কোরিয়া অবশেষে আজ বুধবার সীমান্তবর্তী অস্ত্রবিরতির এলাকাভুক্ত গ্রাম পানমুনজমে আলোচনায় বসছে। আলোচনার মূল বিষয়বস্তু যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংচেনে নির্ধারিত শীতকালীন অলিম্পিকে উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণ, তবে এর তাৎপর্য যে কেবল অলিম্পিকে উত্তর কোরিয়ার যোগদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা সহজেই অনুমেয়। কতটা সুদূরপ্রসারী এর প্রভাব, তা নিয়ে সহজ ধারণা লাভের চেষ্টায় মাত্র কিছুদিন আগে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের মধ্যকার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের দিকে আলোকপাত করা যেতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে ‘হেন করেঙ্গা, তেন করেঙ্গা’ ধরনের খিস্তিসুলভ অভিব্যক্তি আওড়ে চলার মুখে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, পরমাণু অস্ত্র ছোড়ার বোতাম যে তাঁর হাতের কাছেই আছে, তিনি যেন সেটা ভুলে না যান। এর জবাবে বিলম্ব না করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তাঁরও আঙুলও সে রকম বোতামের ওপর বসানো আছে এবং তাঁর সেই যন্ত্র আরও বড় এবং আরও অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক শেষ হতে যাওয়ার অল্প কিছুকাল আগে বিশ্বের প্রধান শক্তিধর দেশের প্রধান এবং সেই শক্তির বশ্যতা স্বীকার না করা একটি দেশের রাষ্ট্রীয় নেতাদের এমন বক্তব্য আমরা শুনছি। এই দুই মন্তব্য থেকে আভাস পাওয়া যায়, কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে দেশ দুটির সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য মাসাধিককাল ধরে বলে আসছে উত্তর কোরিয়াকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। উত্তর কোরিয়ার অস্তিত্ব লোপাট করে দেওয়ার হুমকিও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দিয়েছেন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতাকে ‘বোমা বামন’ আখ্যায়িত করেছেন। সেই বাগাড়ম্বরের জবাব দিতেই হয়তো কিম জং উন বললেন, তাঁর হাত প্যান্টের বোতামে নয়, পারমাণবিক অস্ত্রের বোতামে রাখা আছে। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের এ রকম বিতণ্ডা চলতে থাকার মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন শুরু থেকেই বলে আসছেন যে বলপ্রয়োগ না করে বরং আলোচনার টেবিলে সমস্যার সমাধান খুঁজবেন তিনি। গত বছরের মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রচার অভিযান শুরু করার সময় থেকেই এটা ছিল তাঁর ঘোষিত প্রতিশ্রুতির একটি। দক্ষিণ কোরিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতোই প্রেসিডেন্ট মুনেরও এটা ভালোভাবেই জানা আছে যে ট্রাম্প সাহেব তাঁর মরণখেলার বোতাম টিপে দিলে উত্তর কোরিয়াই যে কেবল সংকটের মধ্যে পড়বে তা নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার নিজের অস্তিত্বও ভয়ংকর সংকটাপন্ন হয়ে উঠবে। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে আলোচনা শুরু করা যায়, সেই সুযোগের অপেক্ষায় তিনি ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রকে এভাবে পাশ কাটিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সহজ কাজ নয়।
এ কারণে তা নয় যে দেশটি হচ্ছে মার্কিন সামরিক কৌশলের একটি ফ্রন্টলাইন এবং হাজার চল্লিশেক মার্কিন সেনা সেই দেশে মোতায়েন আছে। ফলে ওয়াশিংটনকে পাশ কাটিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রুদেশ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসুক, ওয়াশিংটনের সেটা কখনো কাম্য নয়। তবে বিগত দিনগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লাগামহীন প্রলাপ বকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সেই সুযোগ তিনি নিজেই তৈরি করে দিয়েছেন। পরমাণু যুদ্ধ আচমকা শুরু হয়ে গেলে কোন পরিণতির দিকে দেশকে যেতে হতে পারে, তা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার নেতৃত্বের পাশাপাশি দেশটির জনগণও উদ্বিগ্ন। সে রকম এক কঠিন সময়ে নববর্ষ উপলক্ষে প্রদত্ত বিবৃতিতে উত্তরের নেতা কিম জং উনের দক্ষিণের সঙ্গে সংলাপ শুরু করতে প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দক্ষিণের নেতা সাদরে গ্রহণ করেন এবং আলোচনার প্রস্তুতি শুরুর নির্দেশ দেন কর্মকর্তাদের। দীর্ঘ বিরতি শেষে আবারও শুরু হতে যাওয়া দুই কোরিয়ার আলোচনার অর্থ যে সংকট থেকে বের হয়ে আসা, তা অবশ্যই নয়। মূল আলোচনা শুরু হলে নতুন কোন শর্ত উত্তর কোরিয়া চাপিয়ে দিতে চাইবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। দুই দেশের মধ্যে বন্ধ থাকা হটলাইন যোগাযোগ পুনরায় চালু হওয়ার আগেই উত্তর কোরিয়া অবশ্য জানিয়ে দিয়েছিল, আলোচনায় বসতে হলে ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক মহড়া দক্ষিণ কোরিয়ার বাতিল করতে হবে। দক্ষিণের নেতা অবশ্য বাতিলের পথে না গিয়ে মহড়া স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রকে। দক্ষিণ কোরিয়া আগে থেকেই চাইছিল, শীতকালীন অলিম্পিক চলার সময় নির্ধারিত সেই মহড়ার সময়সূচি যুক্তরাষ্ট্র যেন পুনর্নির্ধারণ করে। মার্কিন প্রশাসন অবশ্য এতে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে দিয়েছে। ফলে বলা যায়, স’ওলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের একধরনের পরোক্ষ টানাপোড়েন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এই চাপ দক্ষিণ কোরিয়া কত দিন পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবে, তার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। দক্ষিণ কোরিয়া জন্মলগ্ন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এক ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশ। তবে মৈত্রীর সুযোগ নিয়ে নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে ওয়াশিংটন কখনোই পিছপা হয়নি। অঞ্চলজুড়ে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়ে চলার মুখে দক্ষিণ কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের এখন আরও বেশি দরকার। ফলে ওয়াশিংটন চাইবে নানা রকম উপায়ে দেশটিকে নিজেদের প্রভাববলয়ের মধ্যে ধরে রাখতে, যেমনটা এর আগে দেখা গিয়েছিল জাপানের বেলায়। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের লাগামহীন মুখের বুলি ও অপ্রত্যাশিত আচরণ ওয়াশিংটনের অনেক মিত্রদেশের জন্যও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার বেলায়ও তা লক্ষ করা যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনেকেই চাইছেন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটন আর সিউলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে। তবে বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বিভাজন ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি এখনো সে রকম কোনো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে না। ফলে আপাতত হঠাৎ সৃষ্ট সুযোগ হাতছাড়া না করাই হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে জুতসই বিকল্প। কোরীয় উপদ্বীপের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যকার আলোচনা কেবল দুই কোরিয়ার মধ্যকার বিবাদ নিরসনের প্রচেষ্টা এবং এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির যৌক্তিকতার দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; একই সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তনশীল এই সময়ে চীন ও রাশিয়াকে যুক্ত করে বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিমণ্ডলের রাজনীতি কোন পথে অগ্রসর হতে পারে এবং এসব বিষয়ে দুই কোরিয়ার আরেক নিকট প্রতিবেশী দেশ জাপানের ভবিষ্যৎ অবস্থান কী হবে, তারও হয়তো কিছু পরোক্ষ ইঙ্গিত আলোচনা থেকে পাওয়া যাবে। তবে আগেই যেমন বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এটা সহজ আলোচনা নয়। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার অন্তত দুজন উদারপন্থী প্রেসিডেন্ট উত্তরের সঙ্গে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি নিশ্চিত করার পরও দেশের ভেতরের ও বাইরের অশুভ শক্তি নানা পাঁয়তারা করেছে, যদিও সবটাই শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গিয়েছিল। এবারও যে তেমন কিছু হবে না, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। তবে আশাব্যঞ্জক দিকটি হলো এ রকম যে দক্ষিণের নেতা তাঁর দুজন পূর্বসূরির সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাননি এবং সেই স্মৃতি তাঁকে আরও সতর্ক করবে।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

নতুন মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক ভূমিকার অবসান? by আলী রীয়াজ

যেকোনো সমাজে শ্রেণি হিসেবে মধ্যবিত্তকে বিবেচনা করা হয় একাদিক্রমে বিত্তের হিসাবে এবং সমাজে ওই শ্রেণির ভূমিকা দিয়ে। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য যে কেবল বিত্তই শ্রেণিবিচারের মাপকাঠি হতে পারে না। বলা হয়ে থাকে, মধ্যবিত্ত হচ্ছে তারাই, যারা কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যা তাদের অন্য শ্রেণিগুলো থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। বাংলাদেশে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, বিশেষত সেবা খাতের বিকাশ, বিশ্বায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পরিপোষণের মধ্য দিয়ে যে নতুন মধ্যবিত্ত তৈরি হয়েছে, তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো কী? তাদের সঙ্গে পুরোনো মধ্যবিত্তের পার্থক্য কী? নতুন ও পুরোনো মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যকার একটি বড় পার্থক্য মানস গঠনের। একে আমরা ‘সাংস্কৃতিক পুঁজির’ ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি। আমি এই ধারণা ধার করেছি ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বর্দোর কাছ থেকে। তাঁর বক্তব্যের সারাংশ করলে দাঁড়ায় এই রকম-সাংস্কৃতিক পুঁজি অর্জিত হয় জীবনাচরণের মধ্য দিয়ে। ব্যক্তির জীবনযাপনের অভিজ্ঞতাই ব্যক্তির রুচি, অভ্যাস, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করে দেয়। আমি তাঁর বক্তব্য আরও সম্প্রসারিত করে বলতে চাই, এটা কেবল ব্যক্তির ক্ষেত্রেই ঘটে তা নয়, একটি শ্রেণির ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। একটি শ্রেণি কীভাবে গড়ে উঠেছে, কীভাবে বিকশিত হয়েছে, সেটা ওই শ্রেণির সদস্যদের বিশ্ববীক্ষা ও সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকা নির্ধারণ করে দেয় বলে আমি মনে করি। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ২০১৪ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তবিষয়ক আলোচনায় এই সাংস্কৃতিক পুঁজির দিকে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটেনের বাইরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে যে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় তা হচ্ছে, ‘মানব, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুঁজি’। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বদলাতে শুরু করেছে ১৯৮০-র দশকে, যখন ব্যাপকভাবে মধ্যবিত্তের একাংশের উন্নত দেশগুলোতে অভিবাসন এবং একটি ছোট অংশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ ব্যবহার করে উঁচু শ্রেণিতে উঠে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর ফলে একটা শূন্যতার সূচনা হয়। সেই জায়গাতে আসে গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষ, যাদের মানসম্পন্ন শিক্ষার এবং রুচিগত পরিশীলনের (সফিস্টিকেশন) অভাব আছে। তারা অবশিষ্ট পুরোনো মধ্যবিত্তদের ‘নিমজ্জিত’ করে ফেলে। তিনি বলেন, ‘এখনো শিক্ষা (ডিগ্রির বিবেচনায়) ও পেশার (মূলত ব্যবসা) গুরুত্ব আছে, কিন্তু সেগুলো আর নির্ণায়ক বিষয় নয়। আয় ও সম্পদ, যা সম্প্রতি অর্জিত হয়েছে, তা-ই এই বিকাশমান মধ্যবিত্তের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব লাভ করে এবং সেগুলো পুরোনো মূল্যবোধ ও সেক্যুলার সংস্কৃতির জায়গাগুলো নিয়ে নিচ্ছে।’ ইসলামের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমি এখানে একমত যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা এখন আরও সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আমার ভিন্নমত হচ্ছে সময়ের বিবেচনা। আমি অনুমান করি, এই পরিবর্তন হয়েছে ১৯৯০-এর দশকের পরে। এই বিষয়ে সেলিম জাহানের প্রস্তাবিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিভাজন আমাদের মনোযোগ দাবি করে। সেলিম জাহান ২০১১ সালে ইউএনডিপির একটি প্রকাশনায় বেশ কয়েকটি দেশে অর্থনীতিক উন্নয়নে মধ্যবিত্তের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। বাংলাদেশ সেই গবেষণার বিষয় ছিল না। তবে তাঁর বক্তব্য বাংলাদেশকে বোঝার জন্য সাহায্য করে। সেলিম জাহান বলেছেন, গত কয়েক দশকে বিশ্বায়ন ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের ফলে ঐতিহ্যগতভাবে যে শ্রেণিকে আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণি বলে জানতাম, তাদের মধ্যে একটা বিভাজন তৈরি হয়েছে। এর এক অংশকে সেলিম জাহান বলছেন ‘সামাজিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি’, অন্যটিকে বলছেন ‘অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি’। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঐতিহ্যগতভাবে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল, তাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘সাধারণ জীবনযাপন, উঁচু মানের চিন্তাভাবনা’ (‘সিম্পল লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিং’)। এই শ্রেণি কিছু আচারপদ্ধতি ও মূল্যবোধ ধারণ করে। সমাজের ক্রান্তিকালে এই সামাজিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে এবং সমাজের অন্য শ্রেণি, বিশেষত দরিদ্র শ্রেণি তাদের ওপর আস্থা রেখেছে। বিপরীতক্রমে যে নতুন ‘অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি’র বিকাশ ঘটেছে, তারা প্রধানত বয়সে তরুণ, উচ্চশিক্ষিত ও পেশাজীবী। কিন্তু সামাজিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি যেসব মূল্যবোধ ও আচারকে গুরুত্ব দিত, এরা তাকে একইভাবে গুরুত্ব দেয় না। ‘তারা অর্থের দ্বারা চালিত এবং ব্যবসা ও ভোগবাদ তাদের মননের অংশ’। তিনি বলছেন যে এদের ‘নতুন ধনিক’ বলে অভিহিত করা হয়। সেলিম জাহানের এই পর্যবেক্ষণের জন্য যেসব দেশকে ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে এই নতুন শ্রেণির মধ্যবিত্তরা তরুণ ও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এই নতুন শ্রেণির ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’, যা প্রথাসিদ্ধ মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক পুঁজির চেয়ে ভিন্ন, তার ভেতরে অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক (এবং অর্থনৈতিক) ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণেই কি আমরা গণতন্ত্রের বিষয়ে তাদের অনাগ্রহ লক্ষ করছি? তাহলে কি বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার সংকট স্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে? একই সঙ্গে তারা যে সমাজে ধর্মের ভূমিকার প্রশ্নে মধ্যবিত্তের আগের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভিন্ন অবস্থা নিচ্ছে, সেটা কি একই কারণে? এই শ্রেণির সদস্যরা ধর্মকে ব্যক্তির আদর্শের চেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের আদর্শিক নির্দেশক হিসেবে দেখতে চান, নাকি কেবল ধর্মের ব্যাপারে দৃশ্যমানতার মাধ্যমে তাঁদের অন্যান্য আচরণকে বৈধতা দিতে চান? বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক বড় অংশের মধ্যে জনসমক্ষে ধর্মাচরণের প্রচারের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যকার বিভাজন বিষয়ে কী ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে? বাংলাদেশের সমাজে সেক্যুলারাইজেশনের প্রক্রিয়া কখনোই শক্তিশালী ছিল না, কিন্তু সমন্বয়বাদী ইসলামের যে ধারাটি প্রধান ধারা বলে বিবেচিত হতো, মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক বড় অংশই যদি আর সেই ধারা বহন না করে, তবে ভবিষ্যৎ পথরেখা কী? বাংলাদেশে কি মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক ভূমিকার অবসানের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে ধর্মের প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব নিয়েই উপস্থিত হয়েছে, কিন্তু এই বিষয়ে বিতর্কমূলক আলোচনার বাইরে ধর্ম ও রাজনীতি, ধর্ম ও সমাজ এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ে ভূয়োদর্শনলব্ধ আলোচনা খুব সীমিত। পূর্বধারণার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের দিকে আমাদের নজর দেওয়া দরকার। বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতি এসব বিষয়ে আলোচনা দাবি করে।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

তুষার চাদরে ঢাকলো সাহারা মরুভূমি

আবহাওয়া পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব প্রত্যক্ষ করছে বিশ্ব। সারা বিশ্বে এখন অদ্ভুত এক আবহাওয়া বিরাজ করছে। যেমন কয়েক দিন আগে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে গেছে ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশ। এমনকি চলতি বছরের শুরু থেকে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে ২৯ জন মারাও গেছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া দেখছে ভিন্ন চিত্র। কয়েকদিন আগে সেখানে তাপমাত্রা ছাড়িয়ে যায় ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপর।

তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে সাহারা মরুভূমিতে। বিশ্বের অন্যতম এই উষ্ণ স্থানে তুষারপাতের ঘটনা ঘটেছে।

আইন সেফরা আলজেরিয়ার একটি মরু শহর। এটিকে ‘সাহারার প্রবেশপথ’ বলা হয়। সেখানে এ বছর বরফ পড়েছে। গেলো ৪০ বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো সেখানে তুষারপাতের ঘটনা ঘটলো। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ ইঞ্চি বরফের পুরুতে ঢেকে যায় আইন সেফরা। তবে সেখানে বরফের উচ্চতা এক ইঞ্চির কম ছিল বলে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে শহর কর্তৃপক্ষ।

তুষারপাতের বিষয়টা অনেকের নজরও কেড়েছে। তবে বিশ্বে এখন যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে কোনো কিছু খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। কেননা এখন মরু এলাকায়ও রাতে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে তুষারপাত আরো কয়েকদিন দেখা যাওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।

করিম বুচেটাটা নামের এক আলোকচিত্রী বলেছেন, ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর তুষার দেখে আমরা সত্যিই অবাক হয়ে যাই। রোববার সারাদিন ওই বরফ জমে ছিল। বিকেল ৫টার দিকে বরফগুলো গলতে শুরু করে।

মরু অঞ্চলে সাধারণত তুষারপাতের ঘটনা দেখা যায় না। তবে গেলো বছরই একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে আইন সেফরার। এর আগে ৩৭ বছর আগে আরো একবার তুষারপাতের স্বাদ পেয়েছিল আইন সেফরাবাসী।

মানবতাবিরোধী অপরাধে ২ জনের ফাঁসি, ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৌলভীবাজারে দুই জনের মৃত্যুদণ্ড ও তিন জনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। 

আজ বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- মো. নেছার আলী ও  মো. উজের আহমেদ চৌধুরী (৬৩)।

আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- সামছুল হোসেন তরফদার ওরফে আশরাফ, মোবারক মিয়া এবং ইউনুছ আহমদ (৭১)। এর মধ্যে ইউনুছ আহমদ ও উজের আহমেদ চৌধুরী কারাগারে, বাকিরা পলাতক রয়েছে।

গেলো বছরের ২০ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল মামলাটির রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখে।

আদালতে এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও তাপস কান্তি বল; আর ইউনুছের পক্ষে আইনজীবী আবদুস সোবহান তরফদার ও ওজায়েরের পক্ষে আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, আটক, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে এ মামলার পাঁচজনের বিরুদ্ধে।

২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর ওই পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর পর ২০১৬ সালের ২৬ মে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই বছর ৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারি।

এর আগে ২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে ওইদিন বিকেলেই রাজনগর উপজেলার গয়াসপুর গ্রামের ওজায়ের আহমেদ চৌধুরীকে (৬০) মৌলভীবাজার শহরের চৌমোহনা থেকে ও ইউনুছ আহমদকে (৭০) তার সোনাটিকি গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামিদের মধ্যে সামছুল হোসেন তরফদার একাত্তরে আল-বদর বাহিনীর এবং নেছার আলী রাজাকার বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার ছিলেন। বাকি তিনজন রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হন।


মেয়েকে নিয়ে বাবার চ্যালেঞ্জ

"জন্মের পর থেকে আমার মেয়ের প্রতি চারপাশের মানুষ যে অবহেলা, যে অনীহা আর কুসংস্কারমূলক কথাবার্তা বলেছে, তা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু সেই অনীহাই আমাকে উৎসাহিত করেছে তাকে নিয়ে কিছু করার ব্যাপারে। আমার ইচ্ছা ছিল এই মেয়েকে নিয়ে আমি এমন কিছু করে দেখাব যেন সবাইকে বলতে পারি, দেখো আমার মেয়ে প্রতিবন্ধী নয়।" কথাগুলো বলছিলেন যশোরের ঝিকরগাছার বাসিন্দা রওশন আলী। তিনি এক অদম্য কিশোরী তামান্না আকতারের বাবা। তার মেয়ের জন্ম হয়েছিলো মাত্র একটি পা নিয়ে। তার কোনো হাত নেই। কিন্তু এই কিশোরীই সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিকে সর্বোচ্চ গ্রেডে পাশ করার পর এখন সে পড়ছে দশম শ্রেণীতে। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সে বেছে নিয়েছে বিজ্ঞান বিভাগ। পা দিয়ে লেখার পাশাপাশি সুন্দর ছবি আকার জন্য প্রশংসিত হচ্ছে এই কিশোরী। তামান্নার এ পর্যায়ে উঠে আসা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিলো? সেই গল্প বলছিলেন বাবা রওশন আলী। "আমার মেয়ের জন্য আমি এতো শিক্ষিত হয়েও, কোনো চাকরি করিনি। ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে আমার মনে চ্যালেঞ্জ ফুটে উঠলো যে ওকে অনেক ওপরে নিয়ে যেতে হবে।"
"প্রথম যখন ওর পায়ের আঙুলের ফাঁকে চক দেই, ও বলছিল, আব্বু একটু যেন ব্যথা করে। এরপর আমি কলমের মত বলে পাটখড়ি দিতাম পায়ের আঙুলের ফাকে। একটা সময় যখন সেটা ওর অভ্যাস হলো, তখন আস্তে আস্তে কলম দিতে শুরু করলাম। কিছুদিন পর সে বর্ণমালা লেখা শিখে ফেললো।" "কিন্তু স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে যাওয়ার পর সবাই বললো, 'একে আনছেন কেনো?' 'এ কি পারবে নাকি'? এরকম কথা আমাকে ভীষণ আহত করেছিল। আমার মনে হয়েছিল, এই মেয়েকে নিয়ে আমাকে এগিয়ে যেতে হবে।" স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তামান্না প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ওঠে ফার্স্ট হয়ে, সেটা যেন ওর উৎসাহ আরো বাড়িয়ে দেয়। এখন বাবা-মায়ের স্বপ্ন মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করা। ২০১৬ তে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় তামান্না জিপিএ-৫ পেয়েছেন। ২০১২ সালে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তামান্না। জন্মের সময় তার দুটি হাত ও দুটি পা নয়, শুধু একটি পা ছিল। তা দিয়েই তার সব কাজ। এমনকি পা দিয়ে সুন্দর ছবিও আঁকে তামান্না। - বিবিসি