Saturday, November 29, 2025

খারাপ চুক্তি, নয়তো আরও যুদ্ধ—মহাসংকটে জেলেনস্কি

সিএনএন বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধে ২৮ দফার শান্তিচুক্তিতে সম্মতি দেওয়ার জন্য ইউক্রেনকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু কিয়েভের ইউরোপীয় মিত্রদের চাপের মুখে ট্রাম্প তা থেকে সরে এসেছেন। এরই মধ্যে ইউরোপীয়রা একটি পাল্টা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে চলছে নিবিড় কূটনৈতিক দর-কষাকষি।

কিন্তু যতই দর-কষাকষি হোক, দিন শেষে যে চুক্তি হবে, তা ইউক্রেনের পক্ষে যাবে না। আর কিয়েভ যদি এই ‘খারাপ চুক্তিতে’ রাজি না হয়, তাহলে তাকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইউক্রেন কত দিন রাশিয়ার সেনাদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে, তা যথেষ্ট শঙ্কার বিষয়।

দর-কষাকষির জন্য ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আবারও শিগগির মস্কো সফরে যাবেন। সফরে পুতিনসহ রাশিয়ার অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে। উইটকফের এবারের সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য সম্ভবত ইউক্রেনের ভূমি ছাড়ের বিষয়ে রাশিয়াকে ছাড় দিতে রাজি করানো। বিশেষ করে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের দোনেৎস্কের দাবি ছেড়ে দিতে মস্কোকে সম্মত করা। রাশিয়া এটা ছাড়তে রাজি হবে কি না, তা কিছুদিনের মধ্যে স্পষ্ট হবে।

ইউক্রেনে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরোদমে হামলা শুরু করে রাশিয়া। কিন্তু ইউক্রেনের পূর্ব দিকের দনবাস অঞ্চলে মূলত ২০১৪ সাল থেকে সরকারি সেনাদের সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘাত চলছে। বিদ্রোহীদের সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক—এই দুই প্রশাসনিক অঞ্চল নিয়ে দনবাস গঠিত। লুহানস্কের প্রায় পুরোটা রুশ সেনারা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। দোনেৎস্কের অধিকাংশ অঞ্চলও রুশ সেনাদের দখলে। শান্তিচুক্তির জন্য রাশিয়ার অন্যতম প্রধান দাবি, দনবাসের পুরোটা রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হবে। বিনিময়ে ইউক্রেনের অন্যান্য অঞ্চলের দখলকৃত ভূখণ্ড ছাড়বে রাশিয়া।

যুদ্ধের এই পর্যায়ে ইউক্রেনের আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। বর্তমানে রণক্ষেত্রের পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবেও নানা সমস্যায় জর্জরিত ইউক্রেন। আজ শুক্রবার দুর্নীতি তদন্তকারীরা ইউক্রেনের চিফ অব স্টাফ ও প্রধান আলোচক আন্দ্রিয় ইয়ারমাকের বাড়ি তল্লাশি করেছেন। মার্কিন শান্তি প্রস্তাব মেনে যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে চাপে থাকা জেলেনস্কি প্রশাসনের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা।

এদিকে রণক্ষেত্রে ইউক্রেনের বড় সংকটগুলোর মধ্যে সেনা সংখ্যার ঘাটতি অন্যতম। তা ছাড়া কিয়েভ আগামী বছর ইউরোপীয় মিত্রদের থেকে কতটুকু তহবিল পাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এসব সংকটের পাশাপাশি রণক্ষেত্রে ইউক্রেন বর্তমানে তিনটি পৃথক প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে। রুশ সেনারা জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছেন। ধীর হলেও পোক্রোভস্ক ও দোনেৎস্ক অঞ্চলেও রুশ সেনাদের গতি অব্যাহত রয়েছে। উত্তর দিকের কুপিয়ানস্ক অঞ্চলেও রুশ সেনারা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। একসঙ্গে এতগুলো অঞ্চলে রুশ সেনাদের অগ্রগতি থামানোর সামর্থ্য জনবল-ঘাটতিতে থাকা ইউক্রেনের নেই। এ নাজুক অবস্থায় চলতি শীতে দোনেৎস্কের যেসব অঞ্চল এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে আছে, তা-ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।

শুধু তা-ই নয়, রুশ সেনারা ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র ক্রামাতোরস্কের বেশ কাছে চলে এসেছেন। তাঁরা সেখানে এখন স্বল্পপাল্লার ড্রোন দিয়ে নিয়মিতভাবে হামলা চালাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে হারানো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ইউক্রেনের সেনারা সহজে নিতে পারবেন, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং এখন কিয়েভ ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মূল চাওয়া, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে রাশিয়া অস্থিতিশীল হয়ে পড়ুক।

কিয়েভ ও তার মিত্রদের আরেকটি গোপন আশা, যত বেশি সম্ভব রুশ সেনাদের প্রাণহানি এবং যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া যে অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, তা ভেঙে পড়ুক। এ চাওয়া সম্ভবত বেশ দুর্বল। কারণ, রাশিয়ার মতো একটি আবদ্ধ সমাজ এসব চাপে কতটা ভেঙে পড়বে, তা পূর্বাভাস করা প্রায় অসম্ভব।

২০২৩ সালের রাশিয়ার ভাড়াটে বেসরকারি সামরিক বাহিনী ‘ওয়াগনার’ বিদ্রোহ করেছিল। রণক্ষেত্র থেকে বাহিনীটির সেনারা বিদ্রোহ করে মস্কোর দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। এ বিদ্রোহ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গুটিয়ে গিয়েছিল। বাহিনীর প্রধান ইভগেনি প্রিগোশিন বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন।

তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বলা যায়, জেলেনস্কির কাছে এখন দর-কষাকষির তেমন সুযোগ নেই। অন্যদিকে গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বলা যায়, একটি চুক্তি প্রায় আসন্ন। এখন ট্রাম্পের প্রস্তাব মেনে চুক্তি করা বা বড় ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই জেলেনস্কির। অন্যদিকে মস্কোয় রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে উইটকফের আসন্ন আলোচনা শেষে শান্তি প্রস্তাব মেনে নিতে ট্রাম্প ইউক্রেনকে হয়তো আরেকটি সময়সীমা বেঁধে দেবেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-28%2Foxavz1v0%2FAS3656042724.JPG?rect=0%2C0%2C1202%2C801&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখন এক অচিন্তনীয় শান্তি প্রস্তাবের মুখোমুখি। ফাইল ছবি: এএফপি

ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কী কথা হলো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি অব্যাহত রাখার মধ্যে এই আলোচনা হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানেন এমন দুজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, সপ্তাহের শেষ দিকে ফোনে দুজনের কথা হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানায়, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রে দুজনের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে এমন বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা নেই।

দুই নেতার ফোনে কথা বলার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এর মাত্র কয়েক দিন পরই পররাষ্ট্র দপ্তর মাদুরোকে ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামক একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করার পর ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ কার্যকর করে।

ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁদের লক্ষ্য হলো মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ করা। তবে তাঁরা এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁরা মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চান, প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে।

গত অক্টোবরে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাদুরো উত্তেজনা প্রশমিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাঁর দেশের তেলক্ষেত্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব দেওয়ার এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য আরও অনেক সুযোগ–সুবিধার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। ফলে মার্কিন কর্মকর্তারা গত মাসের শুরুতে সেই আলোচনা বন্ধ করে দেন।

হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যেকার ফোনে কথা বলা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। ভেনেজুয়েলার সরকারও এ নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

তবে ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন, দুই নেতার মধ্যে সরাসরি ফোনে কথা হয়েছিল। প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তাঁরাও নিজেদের নাম–পরিচয় দিতে চাননি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-26%2Fao9mc3it%2FMaduro-2.jpg?rect=56%2C0%2C524%2C349&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। রয়টার্স ফাইল ছবি

ওয়াশিংটন সফরে বড় জয় হাতিয়েছেন মোহাম্মদ বিন সালমান by মোহাম্মদ এলমাসরি

যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ নভেম্বর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সফরটি হোয়াইট হাউসের কূটনৈতিক সফর-ইতিহাসে সবচেয়ে নজরকাড়া সফরগুলোর একটি হয়ে থাকল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মোহাম্মদ বিন সালমানকে আক্ষরিক অর্থেই রাজকীয় অভ্যর্থনা দিয়েছেন। মেরিন ব্যান্ডের সংগীত, অশ্বারোহী বাহিনীর কুচকাওয়াজ, সামরিক বিমান উড্ডয়ন প্রদর্শনী, ২১ বার তোপধ্বনি—সবই ছিল তাঁর জন্য। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতার বাইরে ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা।

এটি ছিল যুবরাজের ২০১৮ সালের অক্টোবরে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যা ও তাঁর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করার ঘটনার পর প্রথম ওয়াশিংটন সফর। সে ঘটনার কারণে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় একঘরে হয়ে পড়েছিলেন।

এ সফরের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে ‘খাসোগি অধ্যায়’ কার্যত বন্ধ হলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোহাম্মদ বিন সালমানের সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরে এল।

বৈঠকটি সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন দিক নির্দেশ করল। দুই দেশ এমন এক পর্যায়ের সহযোগিতায় সম্মত হলো, যা ভবিষ্যতে তাদের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

বৈঠক থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে।

আদতে খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, এ বৈঠক তা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করল।

যুবরাজ সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করলেও ঘটনাটির সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হয়েছিল। সিআইএর তদন্তে বলা হয়েছিল, সালমান ব্যক্তিগতভাবে এ হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

২০১৯ সালের মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণায় জো বাইডেন বলেছিলেন, তিনি সৌদিদের ‘যে ধরনের একঘরে হওয়া উচিত, সে রকমই করবেন’ এবং খাসোগি হত্যার জন্য তাঁদের ‘মূল্য দিতে বাধ্য করবেন’।

কিন্তু পরে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সৌদিদের খুব বেশি চাপে রাখেনি। সম্ভবত ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাব হলো, সৌদি আরবকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

মঙ্গলবারের যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে একটি মুহূর্ত বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো ছিল। এবিসি নিউজের সাংবাদিক ম্যারি ব্রুস খাসোগি প্রসঙ্গে সরাসরি যুবরাজকে প্রশ্ন করেন।

ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে মাঝখান থেকে বাধা দিয়ে তাঁর হয়ে উত্তর দিতে শুরু করেন। তিনি এবিসিকে ‘ফেক নিউজ’ বলেন এবং চ্যানেলটিকে সাংবাদিকতার সবচেয়ে খারাপ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বলে আখ্যা দেন।

ট্রাম্প দাবি করেন, খাসোগি ‘খুব বিতর্কিত ব্যক্তি’ ছিলেন এবং ‘অনেকেই তাঁকে পছন্দ করতেন না’।

হত্যা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটে, কিন্তু (যুবরাজ) এর কিছুই জানতেন না। পরে তিনি ব্রুসকে ‘ভয়ংকর মানুষ’ এবং ‘ভয়ংকর রিপোর্টার’ বলেও আক্রমণ করেন।

ট্রাম্পের এ প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের দৃষ্টিতে খাসোগি হত্যার বিষয়টি এখন ইতিহাসের পুরোনো ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মঙ্গলবারের সফরের আগেই ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে হলিউড পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সৌদির অর্থ প্রবাহিত ছিল। তবে এবার সেই অর্থ আরও ব্যাপকভাবে বাড়বে।

গত মে মাসে মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৬০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। মঙ্গলবার তিনি সেই অঙ্ক বাড়িয়ে এক ট্রিলিয়ন ডলার করার ঘোষণা দেন। এতে ট্রাম্প খুবই খুশি হন।

এ বিনিয়োগ ট্রাম্পকে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে বড় সহায়তা করতে পারে।

এক ট্রিলিয়ন ডলার প্রায় সেই অঙ্কের সমান, যা যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আট বছরের যুদ্ধে খরচ করেছিল। এ কারণে এটি মার্কিন কোম্পানিগুলোকেও বড় ধরনের সুবিধা দেবে।
ট্রাম্প মনে করেন, এসব বিনিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রে ‘অনেক চাকরি’ তৈরি হবে।

তবে এত বিশাল বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি শক্তির ভারসাম্যে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনবে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র সৌদির ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারত। কিন্তু সৌদির এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এত বড় প্রভাব তৈরি হওয়ায় সেই ভারসাম্য সৌদির দিকেই ঝুঁকছে।

এ বিনিয়োগের মাধ্যমে যুবরাজ কার্যত রাজনৈতিক প্রভাবই কিনে ফেলেছেন। যে খাতগুলোর ব্যবসা সৌদির অর্থে চলবে, তারা ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারে সৌদির পক্ষে লবিং করবে।

এ বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সৌদির মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অন্যান্য নীতি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বা (এআই) ও পারমাণবিক শক্তিতে সৌদির বিনিয়োগ তাদের বিশ্ব ও আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াবে। মোহাম্মদ বিন সালমান বহুদিন ধরে উন্নতমানের কম্পিউটার চিপ কিনতে চেয়েছেন, যাতে রাষ্ট্রীয় এআই প্রতিষ্ঠান হিউমেইন বৃহৎ ডেটা সেন্টার চালাতে পারে।

বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিমাণে চিপ বিক্রির অনুমোদন দেবে। এই চিপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিজ্ঞান সৌদিকে যে ক্ষমতা দেবে, তাতে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে। কারণ, ইউএই-ও বৈশ্বিক এআইয়ের কেন্দ্র হতে চায়। ইউএই সম্প্রতি এনভিডিয়ার কাছ থেকে কয়েক লাখ এআই চিপ কেনার চুক্তি করেছে।

যুবরাজ ও ট্রাম্প একটি পারমাণবিক চুক্তিও সই করেছেন। এ চুক্তি সৌদির বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিকে অনেক এগিয়ে নিতে পারে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, উপকরণ ও দক্ষতা চাইছে, যাতে তারা ইরান ও ইউএইর পারমাণবিক সক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।

২০২৩ সালে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান বলেন, তাঁদের লক্ষ্য ‘সম্পূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি চক্র’। এর মধ্যে ইয়েলোকেক উৎপাদন, কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি এবং পারমাণবিক জ্বালানি প্রস্তুত করা—সবই রয়েছে।

চুক্তির বিস্তারিত পরে জানানো হবে। যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধির অনুমতি দেবে কি না বা ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ১২৩ অ্যাগ্রিমেন্ট’ মানতে বলবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও যুবরাজের জন্য এটি বড় জয়।
মঙ্গলবার যুবরাজ যে সাফল্যগুলো পেয়েছেন, এর মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতের অর্জন সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প সৌদি আরবকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ (এমএনএনএ) ঘোষণা করেছেন এবং একটি মার্কিন-সৌদি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে (এসডিএ) সই করেছেন।

এই প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্ভবত কাতারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা চুক্তির মতো হবে। যদিও সৌদি আরব আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি রক্ষা করতে বাধ্য হবে কি না, তা এখনো জানা যায়নি।

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যুবরাজ ও ট্রাম্প এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতেও পৌঁছেছেন।

এফ-৩৫ বিক্রি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কারণ, মার্কিন আইন অনুযায়ী, যেকোনো চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হয়, সব আরব ও মুসলিম দেশের তুলনায় ইসরায়েলের ‘গুণগত সামরিক সুবিধা’ বজায় রাখা হবে। আরেকটি উদ্বেগ হলো, এই প্রযুক্তি চীনের হাতে চলে যেতে পারে।

এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইসরায়েলই এফ-৩৫ ব্যবহার করে। সৌদি আরব এ ধরনের ৪৮টি জেট চায়, যা কিনা ইসরায়েলের হাতে থাকা এফ-৩৫ বিমানের সংখ্যার চেয়ে বেশি।

যদিও আগে খবর এসেছিল, সৌদির এফ-৩৫-এর সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হবে, যাতে ইসরায়েলের সুবিধা বজায় থাকে। তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, সৌদি বিমানগুলো হবে ‘টপ অব দ্য লাইন’, অর্থাৎ মানের দিক থেকে সেগুলো হবে সর্বোচ্চ।

এমএনএনএ মর্যাদা, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং এফ-৩৫ কেনা—সব মিলিয়ে সৌদির প্রতিরক্ষা শক্তি অনেক বেড়ে যাবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে।

ইসরায়েল এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে থাকবে, কিন্তু সৌদি আরব সেই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ফেলবে এবং ইরানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে ছাড়িয়ে যাবে।

* মোহাম্মদ এলমাসরি, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডির মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমান
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধবিরতির আলোচনা: ইউক্রেনকে ছাড় দেবে না রাশিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে শান্তি পরিকল্পনায় রাশিয়া বড় ধরনের কোনো ছাড় দেবে না। দেশটির জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ইউরি উশাকভ গত বুধবার এ মন্তব্য করেছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে ইউরি উশাকভের টেলিফোনে আলাপের নথি ফাঁস হয়। ওই আলাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে কীভাবে প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে, সে বিষয়ে মস্কোকে পরামর্শ দিয়েছেন উইটকফ।

আগামী সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মস্কো সফর করার কথা রয়েছে উইটকফের। তিনি সেখানে গিয়ে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ২৮ দফা পরিকল্পনা সামনে এনেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে রাশিয়া। তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনা সংশোধন–পরিমার্জন করে আরেকটি প্রস্তাব এনেছে ইউক্রেন ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও গত মঙ্গলবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কাঠামো এগিয়ে নিতে তিনি প্রস্তুত। তবে বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি আলোচনা করতে চান। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় মিত্রদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ট্রাম্পের প্রস্তাব ও উইটকফের ফাঁস হওয়া ওই ফোনালাপ ঘিরে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকানদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা চলছে। আইনপ্রণেতা ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক কৌশল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উইটকফের ফোনকলকে বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ

ধরনের হাস্যকর পার্শ্বনাটক ও গোপন বৈঠক বন্ধ হওয়া দরকার।

রিপাবলিকান সাবেক সিনেটর মিচ ম্যাককনেল বলেন, রাশিয়াকে কোনোভাবেই পুরস্কৃত করা উচিত নয়। সমালোচনা সত্ত্বেও ট্রাম্প বলেন, অগ্রগতি হচ্ছে এবং মস্কো ছাড় দিচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানালেও রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বুধবার মস্কোতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মূল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় বা আমাদের অবস্থান থেকে সরে আসার প্রশ্নই ওঠে না।’

নথি ফাঁস

ব্লুমবার্গ নিউজে উইটকফ ও পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভের মধ্যকার

একটি ফোনালাপের নথি ফাঁস হওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মস্কো। ওই ফোনালাপে মার্কিন দূত উইটকফ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে

কীভাবে একটি শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে উশাকভকে পরামর্শ দেন। তবে এ নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা উড়িয়ে দেন। মস্কো বলেছে, এই নথি ফাঁস শান্তি প্রচেষ্টা ব্যাহত করার একটি অগ্রহণযোগ্য চেষ্টা এবং এটি হাইব্রিড যুদ্ধের শামিল।

শান্তিচুক্তি নিয়ে কথা বলার সময় আসেনি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর দূত উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার আলোচনা করবেন। রুশ কূটনীতিক উশাকভ বলেছেন, ‘উইটকফের বিষয়ে আমি বলতে পারি, প্রাথমিকভাবে একটি সমঝোতা হয়েছে যে তিনি আগামী সপ্তাহে মস্কো আসবেন।’

শান্তিচুক্তি কি তাহলে কাছাকাছি—এমন প্রশ্নে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভকে উদ্ধৃত করে রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানায়, ‘অপেক্ষা করুন। এখনো এ বিষয়ে বলার সময় আসেনি।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-27%2Fk3x47jdi%2FUntitled-1.jpg?rect=40%2C0%2C432%2C288&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের সঙ্গে কথা বলছেন। গতকাল কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে এক সম্মেলনে। ছবি : এএফপি

সাড়ে ৩ কেজি সোনা পরেন রাজস্থানের ফল ব্যবসায়ী, এখন চাঁদা দাবি করছে সন্ত্রাসীরা

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের চিতোরগড়ের ব্যবসায়ী কানাইয়ালাল খাটিকের অভিযোগ, গ্যাংস্টার রোহিত গোদারার সঙ্গে সম্পর্ক আছে দাবি করে কিছু লোক ফোন করে তাঁর কাছে চাঁদা চেয়েছে। খাটিক ফল ব্যবসায়ী।

প্রচুর সোনা পরার প্রতি খাটিকের আগ্রহের কারণে চিতোরগড়ের মানুষের কাছে তিনি ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী–সুরকার ‘বাপ্পি লাহিড়ী’ নামে পরিচিত। তিনি বাপ্পী লাহিড়ীকে দেখেই নাকি এভাবে সোনা পরার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, দুই দিন আগে খাটিকের মুঠোফোনে প্রথম একটি মিসড কল আসে। এরপর একই নম্বর থেকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ কল আসে। তিনি ফোন ধরেননি। এরপর তাঁর ফোনে একটি অডিও রেকর্ডিং পাঠানো হয়। এতে ভয়েস দেওয়া ব্যক্তি তাঁর কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন।

খাটিক পুলিশকে জানিয়েছেন, মুঠোফোনে কল করা ওই ব্যক্তি তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দাবি মানা না হলে তিনি ‘সোনা পরার মতো অবস্থায়ও আর থাকবেন না’।

এ ছাড়া খাটিককে চুপচাপ বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

খাটিক কোনো কিছু না বলায় তাঁর মুঠোফোনে আবারও কল আসে। সেখানে অপর প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আবার পুরোনো কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। চিতোরগড়ের কোতোয়ালি থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে।

৫০ বছর বয়সী খাটিক ফল ব্যবসা শুরু করার আগে একসময় হাতে টানা ভ্যানে সবজি বিক্রি করতেন। আপেলের ব্যবসা শুরু করার পর তার ভাগ্য বদলে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সোনার গয়নার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন।

বর্তমানে খাটিক প্রায় সাড়ে ৩ কেজি সোনার গয়না পরেন। এ জন্য স্থানীয়দের কাছে তিনি বেশ পরিচিত। এ কারণে চিতোরগড়ের মানুষ তাঁকে ‘গোল্ডম্যান’ নামে ডাকে।

‘গ্যাংস্টার’ রোহিত গোদারা কে

বিকানেরের লুনাকারানের বাসিন্দা গোদারা বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হয়। ভারতের বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ৩২টির বেশি মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গোদারা রাজস্থানের ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজি করতেন, তাঁর একটি বড় বাহিনী ছিল। গত বছরের ২৯ মে পাঞ্জাবের মানসা জেলায় গুলিতে নিহত হওয়া পাঞ্জাবি র‍্যাপার সিধু মুস ওয়ালার চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম গোদারা। তিনি সিকারের গ্যাংস্টার রাজু থেহাট হত্যাকাণ্ডেরও প্রধান অভিযুক্ত আসামি।

২০২২ সালের ১৩ জুন গোদারা ‘পবন কুমার’ নামে একটি জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে নয়াদিল্লি থেকে দুবাই পালিয়ে যান। তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করা আছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-28%2Fc9b6p7it%2FWhatsApp-Image-2025-11-28-at-3.39.25-PM.jpeg?rect=0%2C0%2C1200%2C800&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বিপুল পরিমাণ সোনা পরিহিত রাজস্থান রাজ্যের ব্যবসায়ী কানাইয়ালাল খাটিক। ছবি: খাটিকের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

বিশ্বে জনবহুল নগরীর তালিকায় সাত ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা

শহরমুখী মানুষের ঢল বিশ্বব্যাপী নগরায়ণকে ত্বরান্বিত করছে। বাড়ছে জনসংখ্যা, বাড়ছে মেগা সিটির সংখ্যা। জাতিসংঘের সদ্য প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শহরভিত্তিক এই জনঘনত্বের নতুন চিত্র। যেখানে বড় উল্লম্ফন হয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার। এক লাফে সাত ধাপ এগিয়ে উঠে এসেছে দ্বিতীয় অবস্থানে।

বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল নগরের শীর্ষস্থান দখল করেছে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। পূর্বের তালিকায় শীর্ষে থাকা টোকিওকে পেছনে ফেলে এখন ৪ কোটি ১৯ লাখ মানুষের আবাস এই উপকূলীয় শহরটি। ঢাকার অবস্থানও পাল্টে গেছে নাটকীয়ভাবে। আগের তালিকার ৯ নম্বর থেকে এক লাফে উঠে এসেছে দ্বিতীয় অবস্থানে। বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ। জাতিসংঘের পূর্বাভাস, বর্তমান প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে জাকার্তাকেও ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরে পরিণত হতে পারে ঢাকা।

জাতিসংঘের ‘ইউনাইটেড নেশনস ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স’ প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের তথ্য হালনাগাদ করে শহরে বসবাসকারীদের বিস্ময়কর বৃদ্ধির নতুন ট্রেন্ড তুলে ধরা হয়েছে। স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে- এটি মূলত ভবিষ্যৎ অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি একটি মূল্যায়ন।

তৃতীয় স্থানে রয়েছে জাপানের রাজধানী টোকিও। প্রায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ মানুষের শহরটির জনসংখ্যা গত ২৫ বছরে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও জাকার্তা ও ঢাকার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৫ ও ৭ গুণ। বিশ্বের মেগা সিটির সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বর্তমানে এক কোটির বেশি জনসংখ্যার শহর রয়েছে ৩৩টি। যেখানে ১৯টি এশিয়ায়। শীর্ষ ১০-এর মধ্যে ৯টিই এশিয়ান নগরী।

জাকার্তা, ঢাকা ও টোকিওর পর ৪ নম্বরে আছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি (বাসিন্দা ৩ কোটি ২ লাখ), চীনের সাংহাই (২ কোটি ৯৬ লাখ), চীনের গুয়াংজু (২ কোটি ৭৬ লাখ), ফিলিপাইনের ম্যানিলা (২ কোটি ৪৭ লাখ), ভারতের কলকাতা (২ কোটি ২৫ লাখ) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল (২ কোটি ২৫ লাখ)। ৯. সিউল (২ কোটি ২৫ লাখ)

এশিয়ার বাইরে একমাত্র প্রতিনিধি মিশরের রাজধানী কায়রো, যার জনসংখ্যা ৩ কোটি ২০ লাখ। লাতিন আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল শহর ব্রাজিলের সাও পাওলো (১ কোটি ৮৯ লাখ)। আর সাব-সাহারান আফ্রিকার মধ্যে দ্রুততম প্রবৃদ্ধির শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নাইজেরিয়ার লাগোস।

mzamin

তিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার: ছাত্র–জনতা হত্যাকাণ্ডে ক্ষমা চাইলেন না শেখ হাসিনা

গত বছর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার একযোগে শেখ হাসিনার তিনটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারগুলো প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট। সাক্ষাৎকারগুলো নেওয়া হয়েছে ই–মেইলে।

সাক্ষাৎকারগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যায় তাঁর দায়, আসন্ন নির্বাচন, দেশে ফেরা, ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে লিখিত প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। এগুলোই পলাতক জীবনে তাঁর দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকার।

তিনটি সাক্ষাৎকারেই শেখ হাসিনা একই ভাষায় কথা বলেছেন। নিজে কোনো কিছুর দায় নেননি, কোনো কিছুর জন্যই অনুশোচনা করেননি। ছাত্র-জনতার হত্যার জন্য মাঠপর্যায়ে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়ী করেছেন। এমনকি গণ–অভ্যুত্থানকে ‘সহিংস বিদ্রোহ’ দাবি করে এর দমনকে সাংবিধানিক অধিকার বলেও বর্ণনা করেছেন তিনি।

আবার নিজে পরপর তিনটি একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চেয়েছেন। নিজে প্রধান বিরোধী দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে বিভেদ বাড়ালেও এখন বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে দেশে বিভেদ বাড়বে।

ক্ষমা চাইতে অস্বীকার

দ্য ইনডিপেনডেন্ট তাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে বলেছে, ১৫ বছরের বেশি সময় কঠোরভাবে দেশ শাসন করা হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, গত বছর নিহত আন্দোলনকারীদের পরিবারের কাছে তিনি ক্ষমা চাইবেন কি না, তখন হাসিনা বলেন, ‘আমি আমাদের জাতি হিসেবে হারানো প্রতিটি সন্তান, ভাই-বোন, আত্মীয় ও বন্ধুর জন্য শোক প্রকাশ করি এবং তা করতে থাকব।’

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা গত বছরের বিক্ষোভ দমনের সময়কার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন। তবে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তিগত দায় স্বীকার করেন না, আর ওই আন্দোলন ছিল একটি সহিংস বিদ্রোহ।

শেখ হাসিনার দাবি, বেশিসংখ্যক প্রাণহানির জন্য দায়ী ছিল ‘মাঠপর্যায়ে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন নেতা হিসেবে আমি অবশ্যই সামগ্রিক দায় স্বীকার করি, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে—যে আমি নিজে নিরাপত্তা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালাতে বলেছিলাম, এটা ঠিক নয়।’

শেখ হাসিনা দাবি করেন, প্রথম দিকের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাঁর সরকারই একটি স্বাধীন তদন্ত শুরু করেছিল, কিন্তু পরে তা বন্ধ করে দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমি ব্যক্তিগতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছি, এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘চেইন অব কমান্ডের মধ্যে কিছু ভুল অবশ্যই হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে, সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত ছিল পরিমিত, সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এবং যতটা সম্ভব প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যে।’ তিনি এ প্রসঙ্গে ইনডিপেনডেন্টকে আরও বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা, যাঁদের সুপ্রতিষ্ঠিত কার্যক্রম পরিচালনাবিষয়ক নির্দেশিকা মেনে চলার কথা ছিল। এসব নির্দেশিকায় বিশেষ পরিস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া ছিল। এমনটা হতে পারে যে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যেগুলো ভুল ছিল।’

নিজের বিচার প্রসঙ্গে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছে শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের। শেখ হাসিনাকে ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করা হয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে, শেখ হাসিনা ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ফলে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, ছাত্র আন্দোলনের সময়ের ১ হাজার ৪০০ মৃত্যুর সংখ্যাটি ‘অতিরঞ্জিত’। তাঁর ভাষায়, ‘এই সংখ্যা ট্রাইব্যুনালের প্রচারণার কাজে লাগে, কিন্তু বাস্তবে তা বাড়িয়ে বলা।’

এ নিয়ে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, ‘যদি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তাতে আমি অবাক হব না বা ভয়ও পাব না। এটি একটি প্রহসনের বিচার, যার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কাজ করছে। এই ট্রাইব্যুনাল একটি প্রহসনের আদালত, যেটি পরিচালনা করছে আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে গঠিত একটি অনির্বাচিত সরকার। এই প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকেই আমাকে সরাতে যেকোনো কিছু করতে পারে।’

ইনডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, আদালতে এমন অডিও রেকর্ডিং বাজানো হয়েছে, যেখানে হাসিনাকে বলতে শোনা যায় যে তিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে বলছেন। তবে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, এই রেকর্ডিংগুলো প্রসঙ্গের বাইরে কেটে নেওয়া ও বিকৃত করা হয়েছে। হাসিনা এ নিয়ে বলেছেন, ‘সহিংসতা ঘটেছে মাঠপর্যায়ে থাকা কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে, সরকারের আদেশে নয়।’

দ্য ইনডিপেনডেন্ট এ পর্যায়ে মন্তব্য করে বলেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা হবে এবং সম্ভবত তিনি জানেন ইতিহাস তাঁকে সদয়ভাবে বিচার করবে না। যদিও শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সহিংস বিদ্রোহের মুখে দেশ রক্ষায় সাংবিধানিক কর্তব্য পালনের জন্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কোনো নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত নয়।’

শেখ হাসিনা সব দায় অস্বীকার করলেও দ্য ইনডিপেনডেন্ট মন্তব্য করেছে যে গত বছর বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের ওপর যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, তা বিশ্বকে শোকার্ত করে তুলেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উপ–আঞ্চলিক পরিচালক বাবু রাম পান্ত তখন বলেছিলেন, বাড়তে থাকা মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের বিক্ষোভকারী বা ভিন্নমতের প্রতি একেবারেই অসহিষ্ণুতাকে তুলে ধরেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক তখন বলেছিলেন, ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ বিশেষভাবে দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনেও বলা হয়, বাংলাদেশে গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিক্ষোভ চলাকালে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন, আহত হন কয়েক হাজার। এসব হতাহতের বেশির ভাগ হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে। এটি ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে সহিংস ঘটনা। পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শেখ হাসিনা সরকারকে বিরোধীদের দমন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার ও একতরফা নির্বাচনের জন্য অভিযুক্ত করেছিল।

দেশত্যাগ ও উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে

দেশত্যাগ প্রসঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট দেশে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ায় তিনি চলে যান। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘থেকে গেলে আমার জীবন যেমন ঝুঁকিতে পড়ত, আশপাশের মানুষদের জীবনও তেমনি বিপদে পড়ত।’ তবে নির্বাসনে থাকলেও তিনি বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর ভাষায়, ‘শুধু অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই দেশকে ঠিক করতে পারে।’

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো সরকার যদি এমন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়, যেখানে তাঁর দল থাকবে না, তবে তিনি সেই সরকারের অধীনে বাংলাদেশে ফিরবেন না। তিনি ভারতে থাকার পরিকল্পনা করেছেন।’

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ একদিন আবার বাংলাদেশের ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখবে, সরকারে থাকুক বা বিরোধী দলে। আর এই দল পরিচালনার জন্য তাঁর পরিবার দরকার নেই। তিনি বলেন, ‘এটা আমার বা আমার পরিবারের বিষয় নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সংবিধান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর। কোনো ব্যক্তি বা পরিবার দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।’

তবে এ ক্ষেত্রে রয়টার্স উল্লেখ করে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী তাঁর ছেলে ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ গত বছর রয়টার্সকে বলেছিলেন যে দল চাইলে তিনি নেতৃত্বের কথা বিবেচনা করতে পারেন।

ভোট বর্জন

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে তাদের লাখ লাখ সমর্থক নির্বাচন বর্জন করবে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অবিচারই নয়, এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। পরবর্তী সরকারের অবশ্যই নির্বাচনী বৈধতা থাকতে হবে। লাখ লাখ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। এখন যে অবস্থা রয়েছে, তাতে তারা ভোট দেবে না। আপনি যদি একটি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা চান, তাহলে আপনি লাখ লাখ ভোটারকে বঞ্চিত করতে পারেন না।’

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেওয়া হবে সে আশা প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের অন্যান্য দলকে সমর্থন করতে বলছি না। আমরা এখনো আশা করি, বোধোদয় হবে এবং আমাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হবে।’

আর এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগসহ সব বড় রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা মানে দেশে ভবিষ্যৎ বিভেদের বীজ বপন করা।

গুম নিয়ে কথা বলেননি

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ক্ষমতাচ্যুতির পর তাঁর সমর্থকদের ওপর বড় ধরনের দমন অভিযান চালানো হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে একটি অভিযানে হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা রাষ্ট্র অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে।

এ নিয়ে রয়টার্স সবশেষে বলেছে, তবে নিজের শাসনামলে গোপন বন্দিশালায় নিখোঁজ হওয়া শত শত মানুষের ভাগ্য সম্পর্কে শেখ হাসিনা কিছুই বলেননি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-29%2Ftkvckt24%2FUntitled-4.jpg?rect=0%2C0%2C1377%2C918&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গত বছর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গণহত্যা বন্ধ হয়নি, গাজায় হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল: অ্যামনেস্টির সতর্কর্তা

ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মাঝেও গাজায় হামলা ও মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক সতর্কবার্তায় বলেছে, গাজায় এখনও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব। সংস্থাটির দাবি গত সাত সপ্তাহে ইসরাইল ৫০০ বার যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে অ্যামনেস্টির সেক্রেটারি-জেনারেল অ্যাগনেস কালামার্ড বলেন, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন এনেছে এমন প্রমাণ নেই। বরং মানবিক সহায়তা ও জরুরি সেবার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ফিলিস্তিনিদের শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে দেশটি। তার ভাষায়, বিশ্বের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই যে ইসরাইলের গণহত্যা এখনো শেষ হয়নি।

এদিন সকালে গাজার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বুরেইজ শরণার্থী শিবির ও খান ইউনিসের পূর্বাংশে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এসব হামলা যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেই পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি গাজা সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের।

এদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ক্বালকিলিয়া, তুবাস, হেবরন, তুলকারেম ও নাবলুসে নতুন করে অভিযান চালিয়ে বহু ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরাইল। তুবাসে অভিযানের সময় অন্তত ২৫ জনকে মারধর ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে স্থানীয় রেড ক্রিসেন্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতি এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দক্ষিণ গাজার ইয়েলো লাইন-এর ইসরাইল অধিকৃত অংশের টানেলে আটকে থাকা কয়েক ডজন হামাস যোদ্ধার পরিস্থিতি উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ইসরাইলের দাবি, গত সপ্তাহে এদের অন্তত ২০ জনকে তারা হত্যা করেছে। হামাস বলছে, এসব আক্রমণ যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন।

গাজায় আন্তর্জাতিক অস্ত্রধারী স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন, গাজায় একটি অস্থায়ী আন্তর্জাতিক প্রশাসন এবং পুনর্গঠন পরিকল্পনা- এসব নিয়ে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা চলছে। কায়রোতে তুরস্ক, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতাকারীরা বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তবে ইসরাইলের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো মোহাম্মদ শেহাদার মতে, ইসরাইল এখনো গাজাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অযোগ্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেনি।

অ্যামনেস্টির কালামার্ড আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি যেন ইসরাইলের চলমান নৃশংসতার আড়াল না হয়। তার আহ্বান- ইসরাইলের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা, গাজা থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং পূর্ণ মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করা। 

mzamin