Wednesday, October 9, 2019

অনন্য এক মেধাবী by শামীমুল হক

অনন্ত মহাকালে মোর যাত্রা অসীম মহাকাশের অন্তে। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের ফেসবুকের ইন্ট্রোতে লেখা এ বাণী। সত্যিই আবরারের ঠিকানা আজ মহাকাশের অন্তেই। কিন্তু বড় অকালেই তাকে চলে যেতে হলো। না! তাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো। কুৎসিত ছাত্র রাজনীতির বলি হলেন মেধাবী আবরার। একই সঙ্গে ভেঙে চুরমার হলো একটি পরিবারের স্বপ্ন। আশা।
আবরারের বায়োডাটায় জীবনে দ্বিতীয় হওয়ার রেকর্ড নেই। এমন মেধাবী আবরারকে নিয়ে গর্ব করতেন কুষ্টিয়ায় তার গ্রামের মানুষ। প্রশ্ন হলো- আবরার কী শুধুই মেধাবী? আবরারের বায়োডাটা তো জানান দেয়, তিনি মেধাবীদের মেধাবী। এক হীরের টুকরো আবরারের না জানি কত স্বপ্ন ছিল। আশা ছিল। তাকে ঘিরে পরিবারেরও হাজারো স্বপ্ন ছিল। আবরারের জীবনে সবকিছুতেই ফার্স্ট আর ফার্স্ট। তাইতো মেডিকেলে ভর্তির চান্স পেয়ে আবরার তার ফেসবুকে লিখেছেন, মেডিকেলের  প্রফের রেজাল্ট শিটটা অর্ধউলঙ্গ টাইপের। এটলিস্ট মার্কসের পারসেন্টেজ থাকা উচিত ছিল। জীবনের সকল ক্ষেত্রে ফার্স্ট হওয়া আবরারের ক্ষেত্রে এটা লেখাই স্বাভাবিক। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে ক্লাসে দ্বিতীয় হওয়ার নজির নেই তার। প্রথম স্থান তার ছিল অবধারিত। কুষ্টিয়ার এমন হীরের টুকরোর করুণ মৃত্যু নিয়ে সেখানে বইছে শোকের মাতম। দেশজুড়ে চলছে ধিক্কার আর ক্ষোভ। আবরারের ছাত্র জীবনের রেজাল্ট চমকে ওঠার মতো। এমন সমৃদ্ধ রেজাল্ট ক’জন ছাত্রের হতে পারে? অষ্টম ও দশম শ্রেণিতে বিশেষ বৃত্তি পাওয়া আবরার ২০১৫ সালে কুষ্টিয়া জেলা স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সবক’টি বিষয়ে এ প্লাস মার্কস পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান। এইচএসসিতে ভর্তি হন রাজধানীর সেরা নটর ডেম কলেজে। ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষাতেও সবক’টি বিষয়ে এ প্লাস মার্কস পেয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর আসে ভার্সিটিতে ভর্তির পালা। আবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায়ও সুযোগ পান। একইসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটেও ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তালিকায় তার নাম ছিল প্রথম সারিতে। শুধু তাই নয়, রাশিয়ার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ডাক আসে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু আবরার ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে। আবরার বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ১০১১ নং কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল ইলেকট্রিক্যাল প্রকৌশলী হওয়ার। ইতিমধ্যে অনেকটা পথ পাড়িও দিয়েছেন। কিন্তু ছাত্রলীগের ক’জন নেতাকর্মীর কালো থাবায় তাকে জীবন দিতে হয়েছে অকালে। আবরারের মৃতদেহের পুরোটাই যেন লাল দাগে ভরা। রক্ত জমাট বাঁধার চিহ্ন। এমন দৃশ্য দেখে যে কেউ শিহরে ওঠার কথা। কিন্তু শিহরে উঠেনি নরপশুরা। ওদের হিংস্র থাবায় অঙ্কুরেই বিনষ্ট হলো একটি স্বপ্ন। মৃত্যু হলো মা-বাবার আশা, চাওয়া। মাত্র একদিন আগে শনিবার আবরার কুষ্টিয়া থেকে ক্যাম্পাসে আসেন। সামনে সেমিস্টার পরীক্ষা। তাই ছুটি না কাটিয়ে ফিরে এসেছিলেন প্রিয় ক্যাম্পাসে। বিকালে বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছিলেন ঢাকায় পৌঁছানোর খবর। এরপর আর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়নি। হবে কীভাবে? রাতেই তো হায়েনার দল আবরারের যমদূত হয়ে আসে। একটুও বুক কাঁপেনি তাদের। আবরারকে লাশ বানিয়ে ওরা গিয়েছে পার্টি করতে। একসঙ্গে সুখের খাবার খেয়েছে। আবরারের অপরাধ কি? সে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। সেখানে তার স্বাধীন মতামত তুলে ধরেছে। এ তুচ্ছ কারণে তাকে মেরেই ফেলতে হলো? এমন মেধাবী আবরারদের দুর্ভাগ্য ওরা এদেশে জন্মেছে। ওদের দুর্ভাগ্য সর্বনাশা ছাত্র রাজনীতি। তাই তো আবরারের মা শোকের মাতম নিয়ে বলছিলেন, ওকে আমি রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে দেইনি। সেখানে পারমাণবিক বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করতে হতো। শুনেছি পারমাণবিক নিয়ে কাজ করলে ক্যানসার হয়। কিন্তু আমি কি জানতাম দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বুয়েটেই রয়েছে মরণঘাতী ছাত্র রাজনীতি নামের ক্যানসার। যে ক্যানসার আমার স্বপ্নকে কেড়ে নিয়েছে। আমার বুক শূন্য করে দিয়েছে।

চীনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভিসায় বিধিনিষেধ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মুসলিমদের বিরুদ্ধে নিষ্পেষণে জড়িত চীনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভিসা ইস্যুতে বিধিনিষেধ আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। চীন সরকারের কর্মকর্তা, কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এর আগে সোমবার চীনের ২৮টি সংগঠনকে কালো তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সিনজিয়াং অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নিষ্পেষণের অভিযোগে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। উচ্চ মাত্রায় নিষ্পেষণ চালিয়েছে চীন সরকার- এমন অভিযোগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে চীন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

উইঘুর, জাতিগত কাজাখ, কিরগিজ মুসলিম ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চীন সরকার টানা নির্যাতন চালিয়ে আসছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন মাইক পম্পেও।
এসব নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে অন্তর্বর্তী শিবিরে বিপুল সংখ্যক মানুষকে আটক রাখা, এর ব্যাপকতা, উচ্চ মাত্রায় নজরদারি করা, সাংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চায় কুখ্যাত নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া ব্যক্তিবিশেষ বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এক ভয়াবহ পরিণতির শিকার হন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযোগ আমলে নেয় নি চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেং শুয়াং সোমবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার বিষয়ক তথাকথিত যেসব ইস্যুর অবতারণা করেছে তেমন কিছুই নেই চীনে। চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তক্ষেপ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তাই তারা অজুহাত হিসেবে এসব অভিযোগ উত্থাপন করছে। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

যুক্তরাষ্ট্র তার বিবৃতিতে বলেছে, সিনজিয়াং প্রদেশে যে নিষ্পেষণ চালাচ্ছে চীন অবিলম্বে তার ইতি চায় যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে খেয়ালখুশি মতো গ্রেপ্তার করা সব ব্যক্তির মুক্তি দাবি করে। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানকারী চীনা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের সদস্যদের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখাতে হবে, যাতে তারা দেশে ফিরে অনিশ্চিত ভাগ্যের মুখে না পড়েন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে বাণিজ্য যুদ্ধের মুখোমুখি। এই উত্তেজনা নিরসনের জন্য এ সপ্তাহের শেষের দিকে আলোচনার জন্য এরই মধ্যে ওয়াশিংটনে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে চীন। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের একেবারে পশ্চিমের সিনজিয়াং প্রদেশে বড় ধরনের নিরাপত্তামুলক অভিযান চালু করেছে চীন। এ অভিযান নিয়ে সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ ও জাতিসংঘ। তারা বলেছে, চীন ওই অঞ্চল থেকে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের কমপক্ষে ১০ লাখ সদস্যকে আটক করেছে এবং তাদেরকে রেখেছে বন্দিশিবিরে। সেখানে তাদেরকে জোর করে ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদেরকে শুধু মান্দারিন চাইনিজ ভাষায় কথা বলতে দেয়া হচ্ছে। শিখানো হচ্ছে কমিউনিস্ট সরকারের প্রতি অনুগত থাকার শিক্ষা।

এর জবাবে চীন বলছে, এসব মানুষ ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ সেন্টারে যোগ দিয়েছে। এসব সেন্টার তাদেরকে কাজ দিচ্ছে। তাদেরকে চীন সমাজের সঙ্গে অঙ্গীভূত হতে সহায়তা করছে। এর মধ্য দিয়ে তাদেরকে সন্ত্রাস থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। কিন্তু এর কড়া নিন্দা করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ থেকে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অভিযোগ করেছেন যে, চীন চায় জনগণ ঈশ্বরের প্রার্থনা না করে সরকারের উপাসনা করুক। উইঘুর ও অন্য মুসলিমদের সঙ্গে চীনের আচরণের কড়া সমালোচনা করে জুলাইয়ে কমপক্ষে ২০টি দেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক পরিষদে একটি যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করে।

রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করার সুযোগ কতটা আছে? by সায়েদুল ইসলাম

বাংলাদেশের চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন রোহিঙ্গা তরুণীর পড়াশোনার খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হলেও ওই তরুণী নিজের চেষ্টায় স্কুল ও কলেজের পড়াশোনা শেষ করে এখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।
কিন্তু এ সময় তিনি নিজের রোহিঙ্গা পরিচয় লুকিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন বলে বলছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।
পরিচয় লুকিয়ে ভর্তির ঘটনাটি তদন্ত দেখার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা শেষে যারা উচ্চ শিক্ষা নিতে আগ্রহী, সেই রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীদের কতটা সুযোগ আছে?

৫ম শ্রেণির ওপর পড়াশোনার সুযোগ নেই

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে অন্তত বারোটি স্কুল ও মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া যায়। জাতিসংঘ ও বেসরকারি সংস্থা মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
এছাড়া কুতুপালং ক্যাম্প ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে দুইটি সরকারি স্কুল রয়েছে, যেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ আছে।
সেভ দি চিলড্রেনের শিক্ষা খাতের কর্মকর্তা মোর্তুজা আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''বর্তমানে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য শিক্ষার লেভেল ১ ও ২ এর অনুমোদন দিয়েছে সরকার, অর্থাৎ রোহিঙ্গারা এখন প্রাইমারি পর্যায় পর্যন্ত পড়তে পারে।''
পরবর্তী আরো তিনটি লেভেল যার মধ্যে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো চালুর ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে তিনি জানান।
অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত পঞ্চম শ্রেণীর বাইরে রোহিঙ্গা শিশু কিশোরদের পড়াশোনার আনুষ্ঠানিক কোন সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিপুল শিশু-কিশোরদের সঠিক শিক্ষা দেয়া না গেলে, ভবিষ্যতে সামাজিকভাবে সমস্যা তৈরি হতে পারে
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে কোন স্কুল-কলেজে পড়তে পারেন না। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের ভর্তির অনুমতি নেই।
যদিও ২০১৬ সালের আগে এ ব্যাপারটি খুব কড়াকড়িভাবে দেখা হতো না। ফলে তখন অনেকে রোহিঙ্গা পরিচয়ে তখন স্কুল কলেজে পড়াশোনাও করেছেন।
কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকে এ ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
সংবাদদাতারা বলছেন, কোন শিক্ষার্থীর রোহিঙ্গা পরিচয় জানলে ক্যাম্পের বাইরের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাকে ভর্তি করা হয় না।

ক্যাম্পের স্কুলে কী পড়ানো হয়?

ক্যাম্পের ভেতরে যে স্কুলগুলো রয়েছে, সেগুলোয় রোহিঙ্গাদের ভাষা এবং ইংরেজিতে পড়াশোনা করানো হয়, কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা অনুযায়ী পড়াশোনা করানো নিষেধ বলে জানিয়েছেন সেভ দি চিলড্রেনের শিক্ষা খাতের কর্মকর্তা মোর্তুজা আহমেদ।
তিনি বলছেন, ''বাংলাদেশের কারিকুলামে এসব বিদ্যালয় পরিচালিত হয় না। এখানে বাংলা ভাষাতেও পড়াশোনা করানো হয় না। ফলে এই স্কুলের পড়াশোনা শেষে সে এখানকার একটি সার্টিফিকেট পেলেও, ক্যাম্পের বাইরে সেটার কোন মূল্য নেই।''
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা রয়েছে, সেগুলোয় আরবি ভাষা ও ইসলামী শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে পড়াশোনা করানো হয়।

কতটা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয় রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের?

এ বছর ইন্টারমিডিয়েট উত্তীর্ণ হয়েছেন রোহিঙ্গা তরুণ মোহাম্মদ ইউনুছ (ছদ্মনাম)। কিন্তু কয়েকদিন আগেও যখন স্কুলে পড়তেন, তখন তাকে নানা রকম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল।
তিনি বলছেন, ক্যাম্পের স্কুলে পড়াশোনা করে খুব বেশিদূর শিক্ষা অর্জনের সুযোগ নেই।
তবে তিনি উখিয়ার স্থানীয় একটি স্কুলে পড়েছিলেন। তবে আরো প্রায় দশ বছর আগে রোহিঙ্গা পরিচয় জানা সত্ত্বেও তার ভর্তি হতে সমস্যা হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নানা সমস্যায় পড়েন।
মি. ইউনুছ বলছেন, ''একবার স্কুলের ম্যানেজমেন্ট কমিটি আমাদের স্কুল থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন প্রধান শিক্ষক আমাদের ডেকে কয়েকদিন স্কুলে না আসার জন্য বলেন। আমরা চার পাঁচজন শিক্ষার্থী কয়েকদিন আর স্কুলে যাইনি। পরে স্যাররা আমাদের আবার ডেকে স্কুলে ক্লাস করতে বলেন।''
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া না পেলেও কোন কোন শিক্ষক তাদের সঙ্গে বেশ বৈষম্যমূলক আচরণ করতেন বলে তিনি জানান।
কয়েকটি প্রাথমিক স্কুলের বাইরে বেশ কয়েকটি মাদ্রাস রয়েছে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া হয়
ইউনুছ জানাচ্ছেন, যখন তিনি স্কুলে পড়েছেন, তখন তাকে রোহিঙ্গা পরিচয়টি গোপন করতে হয়নি। কারণ সে সময় রোহিঙ্গাদের স্কুলে ভর্তি করতে না দেয়ার সিদ্ধান্তের এতো কড়াকড়ি ছিল না। কিন্তু এখন কারো রোহিঙ্গা পরিচয় জানলে তাকে আর কক্সবাজারের কোন স্কুল-কলেজে ভর্তি করা হয়না।
বিবিসির পক্ষ থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ওই তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ের কারণে তিনি আপাতত গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না বলে জানান।

জালিয়াতির আশ্রয়

অভিযোগ আছে যে, স্কুলের কড়াকড়ি এড়াতে অর্থের বিনিময়ে এবং মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে অনেক রোহিঙ্গা শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজে ভর্তি হচ্ছেন।
কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিক তোফায়েল আহমেদ জানান, কক্সবাজার, চট্টগ্রামের অনেক স্কুল-কলেজে রোহিঙ্গা ছেলে মেয়েরা পড়ে। এমনকি ঢাকার অনেক নামী কলেজে পড়ছে, এমন শিক্ষার্থীর খোঁজও আমরা পেয়েছি।
''তারা সবাই নিজের নাম পরিচয় লুকিয়ে এসব স্কুল কলেজে ভর্তি হয়েছেন। অনেকে টাকার বিনিময়ে স্থানীয় নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে জমা দিয়েছেন।''
সংবাদদাতারা বলছেন, স্থানীয় অনেক জনপ্রতিনিধি বড় অংকের টাকার বিনিময়ে এসব রোহিঙ্গাকে নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। অনেক বেসরকারি স্কুল কর্তৃপক্ষ মোটা অংকের অনুদানের বিনিময়ে এই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করেছেন।
মোহাম্মদ ইউনুছ বলছেন, অনেক তরুণ-তরুণী ভালো ছাত্রছাত্রী, কিন্তু কোথাও হয়তো সে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে না। তখন হয়তো কেউ কেউ নিজের পরিচয় লুকিয়ে পড়াশোনা করার চেষ্টা করে।
সেভ দি চিলড্রেনের শিক্ষা খাতের কর্মকর্তা মোর্তুজা আহমেদ বলছেন, ''প্রচলিত ব্যবস্থায় ক্যাম্পের বাইরের কোন প্রতিষ্ঠানে রোহিঙ্গাদের পড়াশোনা করার নিয়ম নেই। কিন্তু যে এখন পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণীর পড়াশোনা শেষ করেছে, এরপরে সে কি করবে? এটা নিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করছি, যাতে তাদের শিক্ষার সুযোগ আরো বিস্তৃত হয়।''
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার পর বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে পাঁচ বছর থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুকিশোর রয়েছে দুই লাখ ১৫ হাজারের বেশি। ১২ বছর থেকে ১৭ বছর বয়সীদের সংখ্যা সোয়া এক লাখ।
বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিপুল শিশু-কিশোরকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বাইরে রাখা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি স্থানীয় সমাজের ওপরেও পড়তে পারে।
বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় সোয়া দুই লাখের বেশি শিশু-কিশোর রয়েছে বলে বলছে জাতিসংঘ।

হলে হলে টর্চার সেল by মরিয়ম চম্পা

হলে হলে টর্চার সেল। কোথায় নেই? বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা কলেজের হোস্টেলগুলোতে রয়েছে টর্চার সেল। সব হলে শাস্তি পদ্ধতি প্রায় একই ধরনের। টার্গেটে থাকা শিক্ষার্থীকে টর্চার করার আগে দেয়া হয় বিরোধী কোনো সংগঠনের তকমা। এরপর বড় ভাইয়ের কক্ষে কিংবা তার পরের পদ পদবিধারি ভাইয়ের কক্ষকেই মূলত টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মাঝে মাঝে হলের ছাদকে নিরাপদ টর্চার সেল বানানো হয়। বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার হোসেন ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটের সবগুলো হলে মানবজমিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র। হলে থাকা শিক্ষার্থীরা জানান, প্রায় সবগুলো হলেই রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের টর্চার সেল।
শেরে বাংলা হলেই তিনটি টর্চার সেল বা রুমের খোঁজ মিলেছে।   
এসকল সেলে বসে ছাত্রদের মারের টু শব্দটিও জানতে পায় না পাশের রুমের শিক্ষার্থীরা। হলে থাকা ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, মারার সময় তাদের মুখ গামছা দিয়ে বেধে নেয়া হয়। আবরারের বেলাতে তাই ঘটেছিল। আবরারকে যে ভবনে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ওই ভবনের শিক্ষার্থীরা জানায় তাকেও মুখে গামছা বেধে নেয়া হয়েছিল বলে তারা মনে করছেন। শেরে বাংলা হলে টর্চারের শিকার ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের হলে ২০০৫, ২০১১, ৩০০৮ নং তিনটি রুমই মূলত টর্চার সেল হিসেবে একেক সময় ব্যবহার করা হয়। জিএস রাসেলসহ আরো কয়েকজন মিলে এই টর্চারের লিড দিতেন। দেড় বছর আগে আমাকে শিবির বলে মারা হয়েছিল। ওরা কাউকে টার্গেট করলে প্রথমেই তার ফোন, ল্যাপটপ অনুসন্ধান করে দেখে সে ভিন্ন কোনো দলের সমর্থক কি না। ফেসবুকে কি ধরনের পোস্ট দেয়। কোন পেইজে লাইক দেয়। কোনো শিক্ষার্থী ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার পর যদি তাদের মনে হয় এটা তাদের পছন্দ হয়নি। তখনই তাকে রুমে ডেকে মারধর করে। ২০১১ নং কক্ষের তিনজন এখনো পলাতক। যারা আবরারকে মারের সময় ছিল। বুয়েটের জিমনেশিয়ামে নিয়েও মারা হয়। মারের ঘটনাগুলো মূলত শুরু হতো রাত ১২ টার পর। সম্প্রতি দুই শিক্ষার্থীর কান ফাটানোকে কেন্দ্র করে আমরা বিচার চাইলেও ভিসি গুরুত্ব দেননি। আবরারকে যে কক্ষে নির্যাতন করা হয় তার পাশের রুমে থাকা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী বলেন, আমি প্রায়ই বাসায় যাই। আবার হলেও থাকি। ঘটনার দিন রাতে আমি রুমে পড়ছিলাম। যখন বুয়েটের ডাক্তার আসে তখন আবরারের বিষয়টি জানতে পারি। এ ধরনের মারধরের ঘটনা নতুন নয়। এই কক্ষে প্রায়ই এই ধরনের ঘটনা ঘটে। চলতি সপ্তাহে একই কক্ষে আরো দুজনকে মার ধরের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি চোখের সামনে দেখছি একজনকে স্ট্যাম্প দিয়ে পিটানো হচ্ছে, তখন যদি থামাতে যাই আমার অবস্থা কি হবে একবার ভেবে দেখেন। আমি গেলে আমাকেও তারা শিবির বানিয়ে দিবে।
আবরার যে ফ্লোরে থাকতেন সেখানকার দুই শিক্ষার্থী বলেন, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আমরা দুজনেই ওদের টর্চারের শিকার হয়েছি। ওরা শিক্ষার্থীদের মারধরের জন্য ছুটির সময়টা বেছে নেয়। বুধবার, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার রাতগুলোকে ওরা মারের জন্য উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেয়। বিশেষ করে বুধবার রাত হচ্ছে প্রথম বর্ষের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছে ভয়ংকর রাত। গত এক বছর আগে র‌্যাগিং এর কারণে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। যখন যেখানে সুবিধা সেখানে নিয়ে তারা র‌্যাগ দেয়।
সোহরাওয়ার্দী হলের সিএসসির শিক্ষার্থী বলেন, র‌্যাগিংয়ের ঘটনা প্রত্যেকটি হলেই আছে। কোনোটা প্রকাশ পায় কোনোটা পায় না। একমাস আগে আমাদের হলে একজন শিক্ষার্থীর কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। আমাদের হলে নির্দিষ্ট কোনো রুম মেনটেন করা হয় না। এটা নির্ভর করে তাদের ইচ্ছার ওপর। তারা দেখে কোন রুম ফাঁকা আছে সেখানে নিয়েই ছেলেদের পিটানো হয়।
ড. এম. এ. রশীদ হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, মারামারির ঘটনা এখানে প্রতিমাসেই কম বেশি হয়। তবে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। আবরার মারা যাওয়াতে তার ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। বাকিদেরটা পায় না। পাঁচ মাস আগে আমাদের হলে ডাইনিং ম্যানেজার শিক্ষার্থীকে এক জুনিয়রকে দিয়ে পিটানো হয়েছে। আমাদের হলেও টর্চারের জন্য রুম আছে। যেটা সব হলেই থাকে। ভবনের দুপাশের চার তলায় টর্চার রুম আছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের রুমগুলোই মূলত টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমাদের হলে প্রায় পাঁচ শ’র মতো শিক্ষার্থী আছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে এই ধরনের ঘটনার কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। আমাদের ১৫ তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থীকে সাত থেকে আট মাস আগে একটি রুমে নিয়ে হাত পা ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে।   
একই হলের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী বলেন, এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কয়েকদিন আগে আহসানউল্লাহ হলে, সোহরাওয়ার্দী হলে টর্চারের ঘটনা ঘটেছে। একজনকে মেরে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে একজন শিক্ষার্থীর হাত পা ভেঙ্গে দিয়েছে। এর আগে এমন অনেক ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়েছে।
বুয়েটে হলের সংখ্যা মোট ৮টি। আহসান উল্লাহ হল, তিতুমীর হল, কাজী নজরুল ইসলাম হল, ছাত্রী হল, শের-এ-বাংলা হল, সোহরাওয়াার্দী হল, ড. এম. এ. রশীদ হল, শহীদ স্মৃতি হল। মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সারে পাঁচ হাজার। এসব হলের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় র‌্যাগিং হচ্ছে শেরে বাংলা হলে। এ হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, হলের কোনো শিক্ষার্থী যদি বিরুদ্ধ মত দেয় কিংবা কাউকে যদি অপছন্দ হয় তাকেই শিবির বলে রুমে আলাদাভাবে ডেকে নেয়া হয়। আমি নিজ চোখে আমার রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চার থেকে পাঁচবার দশ বারোজন ছেলেকে অন্তত পিটাতে দেখেছি। একজন দৌঁড়াচ্ছে আর বাকীরা হল থেকে পিটিয়ে নামাচ্ছে। পিটিয়ে আধমরা করে পুলিশে খবর দিয়ে তুলে দিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে জুনিয়র একজন শিক্ষার্থীকে দিয়ে সিনিয়র শিক্ষার্থীকে পিটিয়েছে। পরবর্তীতে তাকে হল থেকে বের করে দিয়েছে। র‌্যাগিং সবগুলো হলে রেগুলার একটি ঘটনা। তিতুমীর হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, অন্যান্য হলের মতো আমাদের হলে খুব বেশি টর্চারের ঘটনা না ঘটলেও একেবারেই যে ঘটেনা সেটা বলা যাবে না। তবে শেরে বাংলায় যেটা হয়েছে সেটা একেবারেই ব্যক্তিগত আক্রোস থেকে হয়েছে। আমাদের হলে মারা যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি। কিছু কিছু সময় পলিটিক্যাল ভাইয়েরা ডেকে ছাদে নিয়ে যায়। নিজেদের রুমে নিয়ে যায়। এরপর স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো, চড় থাপ্পর মারা হয়। হলে সিসি ক্যামেরা থাকায় ভয়ে অনেক সময় ছাদে নিয়ে যায়। মেয়েদের হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, মেয়েদের হলে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে না। আমাদের হলে সিকিউরিটি নিয়ে কিছু সমস্যা থাকলেও র‌্যাগিয়ের বিষয়টি একদমই নেই। আমাদের হলে প্রায় সাড়ে ৪শ থেকে ৫শ মেয়ে রয়েছে। কখনো র‌্যাগিং-এর শিকার হইনি। এ ধরনের কোনো ঘটনা শুনিনি। মেয়েদের হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, মেয়েদের হলে ওভাবে রাজনীতির বিষয়টি নেই। কাজেই এটা হওয়ারও সুযোগ নেই। তবে ছেলেদের হলের অবস্থা এতোটা ভয়াবহ হয়েছে এটা আবরারের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদেরও জানা ছিল না। নজরুল ইসলাম হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের হলে জুনিয়ররা ভর্তির পরে পরিচয় পর্বের নামে টর্চার বা বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। আবরার যদি মারা না যেত তাহলে এখন হয়তো হাত পা ভেঙ্গে হাসপাতালে শুয়ে থাকতো। আমরা কেউ জানতে পারতাম না। এমনকি মিডিয়াও না। প্রায়ই এই টর্চারের ঘটনা ঘটে কিন্তু বুয়েট প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

ছাত্রলীগের টর্চার সেল থেকে বেঁচে ফেরা আরেক বুয়েট ছাত্রের জবানবন্দি

বুয়েট ছাত্রলীগের টর্চার সেল থেকে আবরার ফাহাদ ফিরতে না পারলেও ভাগ্যের জোরে বেঁচে ফিরেছেন অনেকেই। তবে টর্চার সেলের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি যেনো কিছুতেই মুছে ফেলতে পারেননি তারা। গা শিউরে ওঠা সেই সব ঘটনার কথা আত্মীয়-স্বজন-পরিবার-পরিজনকেও বলতে ভয় পেয়েছেন তারা। এমনই একজন মো. এনামুল হক। বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী। সম্প্রতি আবরার হত্যার পর তিনি ফেসবুকে তার নিজের ওপর চলা নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। এনামুল লিখেছেন, পরীক্ষার হল থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর টর্চার সেলে বিকাল ৫টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত নির্যাতন চলেছে। তিনি ওই নির্যাতনের ছবিও প্রকাশ করেছেন।
তার এই ফেসবুক স্ট্যাটাসটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে।

পাঠকদের জন্য মো. এনামুল হকের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে দেয়া হলো-

‘এগুলো আমারই ছবি, ছয় বছর আগের, আবরার মারা গেছে, আমি ওই দফায় বেঁচে ফিরেছি।

বুয়েটের ও এ বি এর দোতলায় মেকানিক্যাল ড্রয়িং কুইজ দেয়া শেষ হওয়া মাত্রই পরীক্ষার রুম থেকে তন্ময়, আরাফাত, শুভ্র জ্যোতি টিকাদারদের নেতৃত্বে ৮-১০ জন ছাত্রলীগের ছেলে শিক্ষকের সামনে থেকে তুলে নিয়ে আহসানউল্লাহ হলের তখনকার টর্চার সেল ৩১৯ নাম্বার রুমে নির্যাতন করে।

আমি কারও সাথে যেখানে রাগারাগি পর্যন্ত করতাম না, কারো সাথে কখনোই সম্পর্ক খারাপ পর্যন্ত যেখানে ছিল না, শুধুমাত্র ফেইসবুকে সরকারি নীতির সমালোচনা করে পোস্টের কারণে বুয়েটের মতো একটা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রলীগ আমার সাথে এমন আচরণ করে।

এর ৬ দিন আগে সাবেক বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি শুভ্র জ্যোতি টিকাদার (’০৯) ও কাজল (’০৯) ল্যাব থেকে আমাকে ধরতে এসে ব্যর্থ হয়ে পরীক্ষার রুম থেকে আমাকে একা ধরতে ওরা ৮-১০ জন প্রস্তুতি নিয়ে আসে!

বিকেল ৫ টা থেকে রাত ১১ টা ৩০!! বদ্ধ রুমে আমার পিঠের ওপর লোহা দিয়ে ’১০ ব্যাচের এক ভাই প্রধানত তার শক্তি পরীক্ষা করে।

এর কতদিন আগে কোনো একটা নামাজ মিস দিয়েছি ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন তারা আসর আর মাগরিব নামাজ পর্যন্ত পড়ার সুযোগ দেয়নি।

সারাজীবন একটি মাত্র স্বপ্ন দেখেছিলাম- বুয়েটে পড়বো। বুয়েটের ছাত্রদের ভাবতাম আদর্শ। অথচ সেখানেও এমন হবে- জানা ছিল না।

ভর্তি পরীক্ষার সময় গুরুজনেরা বলতেন- দোয়া কর, যেখানে তোমার জন্য কল্যাণ, আল্লাহ যেন সেখানেই তোমাকে চান্স পাইয়ে দেন। আর বুয়েটের অন্ধপ্রেমিক এই আমি দোয়া করতাম- আল্লাহ, বুয়েটেই আমার কল্যাণ দাও।

আসলে বুয়েটে পড়ার প্রথম ইচ্ছে হয়েছিল ক্লাস ফাইভে, বাবা বলেছিলেন- ছেলেকে বুয়েটে পড়াতে চাই, সেই থেকে। ভার্সিটি এডমিশনের সময় বাবা অন্য ভার্সিটিগুলোর ফর্ম নিতে দিচ্ছিলেন না, বলছিলেন- ওসবে কালো রাজনীতি ছেয়ে গেছে, বুয়েটেই চান্স পেতে হবে, ওখানেই পড়তে হবে, ওখানে কালো রাজনীতি নেই। জানি, তুমি পারবা।

পরবর্তীতে আমার বাবা আমার ওপর নির্যাতন দেখে ডুকরে কেঁদেছেন। আমি হাসিমুখে বলেছি- সব ঠিক হবে, আল্লাহ ভরসা, কোনো অন্যায় করিনি, আমার আল্লাহ সাক্ষী, আল্লাহই এর প্রতিদান দেবেন।

মায়ের কান্নাজড়িত চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার ছিল না, মনে মনে ভেবেছি- ‘আর কেহ না জানুক, তুমি তো জানো মা, তোমার ছেলে কেমন।’

এত নির্যাতনের পর আবার আমাকেই উলটো পুলিশে দেয়ার জন্য পুলিশ ডেকে আনে। কিছু শিক্ষক অনেক চেষ্টা করে আর অনেক অপমান সহ্য করেও তা থেকে বাঁচিয়ে নেন।

ছাত্রকল্যাণ পরিচালক দেলোয়ার স্যারকে পরে অভিযোগ জানালে উনি বলেন- ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চল না কেন? হায়রে!!!!!

সেদিন চ্যালেঞ্জ করেছিলাম স্যারকে- এ রকম শুধু আমাকেই না, আরো ১৭টি নির্যাতনের ঘটনা কিছুদিনেই ঘটেছে। অথচ যারা ভুক্তভোগী তাদের বিরুদ্ধে একটা মাত্র বুয়েটের শৃংখলা ভঙ্গ বা কারো সাথে ঝামেলার ঘটনার প্রমাণ দেন। আর যারা নির্যাতন করছে- তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কত গুণ্ডামীর প্রমাণ লাগে বলুন।

আল্লাহ তুমি সাক্ষী.......

আমার বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগ ওরা প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু আমার এই ছবিগুলো তখনই প্রচার হয় বলে ওরা এতে ব্যাপক ক্ষেপে যায়। পাশাপাশি বুয়েট শিক্ষক সমিতি এর বিচারের দাবী জানিয়ে লিখিত বিবৃতি দিয়েছিল। আমাকে ওরা এজন্য ক্যাম্পাসেই ঢুকতে দিতো না, মৃত্যুর হুমকি দিতো। এসব দেখে অন্য নির্যাতিত আরও অসংখ্য ছাত্র নির্যাতিত হলেও প্রকাশ করতো না। নইলে বুয়েটে পড়াশোনা কন্টিনিউ করাই সম্ভব হবে না ওদের।

সেদিন দলকানা ছাত্রকল্যাণ পরিচালক চরম অসহযোগিতা করেছেন। পক্ষান্তরে নিরপেক্ষ শিক্ষকেরা অপমান সহ্য করেও আমাকে উদ্ধার করেছেন। দলকানা শিক্ষকেরা সব সময় স্বার্থবাদী হয়। আমি জীবন নিয়ে ফিরতে পারলেও আবরার জীবন দিল। এভাবে অপরাজনীতির শিকার আরও কত জীবন হবে তা ভাবা অসম্ভব।

এসব অপরাজনীতি থাকলে ক্যাম্পাসে রক্ত ঝরবেই। তাই নির্যাতিত ছাত্র হিসেবে দাবী জানাই-
ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হোক,
ছাত্র এবং শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক।

আমি বুয়েটিয়ান হিসেবে লজ্জিত নই, লজ্জা তাদেরই পাওয়া উচিৎ, যারা অন্যায় করেছে অথবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে।

ভালোবাসি বুয়েট, ভালোবাসি বাংলাদেশ।’

বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই দলীয় নেতাকর্মীরা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়েছে: -স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন by কাজল ঘোষ

বুয়েটের ঘটনায় একজন ছাত্রকে হত্যা করা হয়নি আমার বুয়েটকে হত্যা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ ও প্রশাসন সম্পূর্ণরুপে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু দল থেকে বহিষ্কারের নামে আইওয়াশ প্রদর্শনে কাজ হবে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই দলীয় নেতাকর্মীরা আজ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়েছে। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড আর ক্যাসিনো কাণ্ডে সরকারের ইমেজ ক্ষুন্ন হয়েছে। বুয়েট পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র দেশের খ্যতনামা স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে মনে করি, বুয়েটের ঘটনা আমাদের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এ ঘটনার মাধ্যমে একজন ছাত্রকে হত্যা করা হয়নি, আমার বুয়েটকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার আদ্যপান্ত বিশ্লেষণ করে বেশকিছু বিষয় লক্ষ্য করার আছে।
যদি মাঝরাতে কোন একটি কক্ষে কাউকে টর্চার করা হয়, তাহলে তার চিৎকারে আশপাশের রুম থেকে অন্য শিক্ষার্থীদের ভিড় করার কথা। এখানে এমনটি ঘটেনি। অর্থাৎ এখানে নিয়মিত এ ধরণের টর্চার চলত। এটা সকলেরই জানা। আর এ ধরণের টর্চার সেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা কতৃপক্ষ অবগত, না হলে দিনের পর দিন কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কক্ষ টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হল?
এমন নয় এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। অন্যান্য হলেও একইরকমের টর্চার সেল আছে বলে শোনা যাচ্ছে যা বুয়েটের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্টানের মর্যাদাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। আমি জোড় দিয়ে বলতে চাই, এ ধরণের ঘটনা জেনেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও কতৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, বুয়েট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্টানের মত নয়। এখানকার সকল শিক্ষার্থীদের ডাটা অনলাইনেই রয়েছে। আর যারা দিনের পর দিন এ ধরণের ঘটনা ঘটিয়েছে তারা কেউ বাইরের নন, এরা ভেতরের। তাহলে এদের বিষয়ে সব তথ্য জেনেও বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নেয়নি? বুয়েটে হল প্রভোস্ট, প্রক্টরিয়াল টিম ছাড়াও রয়েছে ডিএসডব্লিউ অর্থাৎ  ডিরেক্টর অব স্টুডেন্টস উইংস যাদের কাজ কেবল ছাত্রদের বিষয়াদি তদারক করা, খোঁজ রাখা কোথায় কি হচ্ছে? অর্থাৎ এ ঘটনায় আমি মনে করি তাদেরও অবহেলা রয়েছে। এদেরকেও আইনের আওতায় আনা উচিৎ।
ব্যর্থতা কি কেবলই বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও?
প্রথমে আসি, বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে। এটা অন্য বিশ্বদ্যিালয়ের মত না। এখানে সবসময় ভিন্নমতের সহ অবস্থান ছিল ঐতিহ্য। ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের সময় নির্মল সেন, মনি সিং, ফরহাদ ভাইয়ের মতো বড় বড় ছাত্র নেতারা আমার কক্ষে এসে লুকিয়ে থাকতেন। তারা বিছানায় পর্যন্ত থাকতেন না। নিচে শুয়ে পড়তেন। আমাদের সময় ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ সকলেই একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হলো কেন? এটাতো রাতারাতি একদিনে হয়নি। এর পেছনে রয়েছে সবকিছুকে রাজনীতিকরণ। গত তিন টার্মে উপাচার্য পদকে দলীয় পদে পরিণত করা হয়েছে। তারা ব্যক্তিগত স্বার্থে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেছে। ফলে ছাত্রলীগের সব ধরণের অন্যায় কাজে তারা নতজানু হয়ে সমর্থন দিয়েছে। আর এভাবেই প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় ছাত্র রাজনীতির নামে একটি গ্রুপ বুয়েটের ইমেজ পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।   
মিডিয়ায় খবর এসেছে পুলিশ এসেও ফিরে গিয়েছে?
ঘটনার রাতে খবর পেয়ে পুলিশও এসেছিল। কিন্তু হল গেটে থেকেই তারা ফিরে যায়। আমরা জানতে পেরেছি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশে তারা ফিরে যায়। যে দেশে সবই রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে নিয়ন্ত্রিত সেদেশে এমন হওয়াই স্বাভাবিক। কদিন আগেই ক্যাসিনো কাণ্ডে রাজধানীর তিন থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হলো। কিন্তু তাদের প্রত্যাহার করে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। অর্থাৎ তাদের আয় একটু কমিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের কৃত অপরাধের জন্য আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হয়নি। যতদিন পর্যন্ত অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করা হবে না, ততদিন এ ধরণের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। বুয়েটের হল গেট থেকে পুলিশ ফিরে যাওয়াটাও এসবেরই ধারাবাহিকতা। এ দেশে অপরাধ করে কোনধরণের শাস্তি হয় না।
তাহলে আইনহীনতার সংস্কৃতিই কি আমাদের নিয়তি?
লক্ষ্য করুণ, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পরায় দলের সভানেত্রী ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বহিষ্কার করেছেন। কিন্তু এরপর কি হওয়া উচিৎ ছিল? তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা। কিন্তু তা তো হয়নি। এখন দলীয় লোকদের যদি আইনের আওতায় এনে সাজা নিশ্চিত না করা হয় এবং দল থেকে বহিষ্কার করার নামে লোক দেখানো আইওয়াশ করা হয় তাহলে বিচারহীনতার বলে দলের লোকেরাই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হবে। বুয়েটের ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছে। তারা দেখেছে, অপরাধ করে কোনরকম শাস্তি পেতে হয় না।
এ অবস্থার পরিবর্তনে করনীয় কি?
একটাই পথ। কঠোর থেকে কঠোরতর আইনের শাসন বাস্তবায়ন করা। বুয়েটের ঘটনায় সমস্যা কোথায় পুলিশের উচিৎ এই তথ্যগুলি পরিষ্কার করে সকলকে বলা। যদি সত্যিকার আইনের শাসন প্রতিষ্টা করতে হয় তাহলে আমি মনে করি, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জড়িত তাদের সবধরণের টেলিফোন কনভারসেশন রেকর্ড করে পরীক্ষা করা। যদিও এ ঘটনার পর জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার বলেছে, দ্রুত বিচার আইনে জড়িতদের সাজা নিশ্চিত করা হবে। এখন দেখার বিষয় কি হচ্ছে? আবার ভয়ও পাচ্ছি, প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা চেষ্টার বিচার যদি ১৪ বছরেও শেষ না হয়, তাহলে আবরার হত্যার বিচার কত বছরে হয় সেটাই দেখার বিষয়।

বাংলাদেশের প্রশংসা, মোদির সমালোচনায় অমর্ত্য সেন

ভারতে গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বেশ কিছুদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে চলেছেন। সম্প্রতি আমেরিকান সাময়িকী দ্য নিউ ইয়র্কারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতে গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে ফের উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, মানুষ ভয়ে আছেন। এটা আগে কখনো  দেখিনি। আমার সঙ্গে ফোনেও সরকারের সমালোচনার প্রসঙ্গ উঠলে অনেকে বলছেন, ‘থাক,  দেখা হলে বলব’খন।’ আমি নিশ্চিত ওরা আমাদের কথা শুনছে। এটা গণতন্ত্রের পন্থা নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কী চান, সেটা  বোঝারও পথ নয় এটা। তবে ভারতের চেয়ে অনেক দিক দিয়ে বাংলাদেশ সফল বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। অমর্ত্য সেন বলেন, বাংলাদেশের এসব উন্নতির ক্ষেত্রে বহুজাতিকতা বা জাতিগত সহাবস্থান বিশাল ভূমিকা রেখেছে।
অতীতে এই একই কারণে ভারতও বিপুল সাফল্যের মুখ দেখেছিল।
ওই সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে অমর্ত্য সেন বলেছেন, বহু ধর্ম ও বহু জাতির  দেশ ভারতকে বোঝার মতো মনের প্রসারতাই নেই মোদির। জন স্টুয়ার্ট মিলের বক্তব্যের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, আমরা তার কাছ থেকে জেনেছি, গণতন্ত্র মানে আলোচনার ভিত্তিতে চলা সরকার।  ভোট যেভাবেই গোনো, আলোচনাকে ভয়ের বস্তু করে তুললে তুমি গণতন্ত্র পাবে না। তার আক্ষেপ, ভারতে এখন কট্টর হিন্দুত্বের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। দাপট চলছে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, সরকার যদি বিরুদ্ধে থাকে, তবে সরকারি শুধু নয়, সম্ভবত অনেক  বেসরকারি বিজ্ঞাপনও পায় না সংবাদমাধ্যম। ফলে স্বাধীন সংবাদপত্র বা সংবাদ চ্যানেল পাওয়াই দুষ্কর। তবে তিনি মনে করেন, সব কিছুই হারিয়ে যায়নি। এখনো সাহসী কয়েকটি সংবাদপত্র আছে, যারা ঝুঁকি নিয়ে কিছু ছাপতে ভয় পায় না। দু’-একটা টিভি চ্যানেল ও রেডিও স্টেশনও আছে। প্রকাশ্য সভাও হচ্ছে কিছু। ভারতের কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রীয়। বেশক’টি রাজ্যে বিজেপিই একমাত্র প্রভাবশালী শক্তি নয়। দুঃসময়ের প্রসঙ্গে ছোটবেলার স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, ছেলেবেলাতেও খুব খারাপ সময় দেখেছি। দেখেছি, কাকাদের সকলকে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। ন’বছর বয়সে  দেখেছি মন্বন্তর। তিন লাখ মানুষ এতে মারা যান। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা দেখেছি। মুসলিম জনমজুরকে কুপিয়ে খুন করেছে আমারই পাড়ার কিছু হিন্দু। আমার বয়স তখন দশ কি এগারো। বাগানে খেলছিলাম। দেখি, রক্তাক্ত অবস্থায় ছুটে আসছেন একজন। চিৎকার করে বাবাকে ডাকলাম। জল খেতে দিলাম। এত রক্ত কখনো দেখিনি। আমার কোলে মাথা, স্পষ্ট বলেছিলেন- ‘বিবি বলেছিল হিন্দু এলাকায় কাজ করো না। কিন্তু বাচ্চারা না খেয়ে আছে। কিছু তো রোজগার করতেই হবে। বাবা ওকে হাসপাতালে নিয়ে  গেলেন। পুলিশকেও জানিয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দু এলাকার পুলিশ কিছু করতে রাজি হয়নি। আবার অনেক বড় বড় সমস্যা মিটে যেতেও দেখেছি। তবে তার অর্থ এই নয় যে, আমি নিশ্চিত। কোনো কিছু সম্পর্কেই আমি নিশ্চিত নই। এর অর্থ এটাও নয় যে, হতাশার পরিস্থিতিতে সব আশা ছেড়ে দিতে হবে।      
এক পর্যায়ে তাকে তার কাজের মধ্যে বহুজাতিকতার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, অবশ্যই। এটা (আমার কাজের) অত্যন্ত কেন্দ্রীয় একটি বিষয়। তিনি বলেন, আপনি চিন্তা করলে দেখবেন বাংলাদেশ এখন বহুদিক দিয়ে ভারতের চেয়ে সফল। পূর্বে বাংলাদেশের গড় আয়ু ভারতের চেয়ে কম ছিল, আর এখন তা ভারতের চেয়ে পাঁচ বছর বেশি। এ ছাড়া, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের সাক্ষরতার হারও বেশি। আর ভারতে যেরকম সংকীর্ণমনা হিন্দু চিন্তাধারার বিস্তার ঘটেছে, বাংলাদেশে তেমন সংকীর্ণমনা মুসলিম চিন্তাধারার প্রতিফলন দেখা যায় না। আমি মনে করি জাতিগত সহাবস্থান বাংলাদেশের জন্য অনেক সুফল বয়ে এনেছে।
অমর্ত্য সেন আরো বলেন, এই বহুজাতিকতাকে ভারতকেও সফলতা এনে দিচ্ছিল। তবে একসময় ইচ্ছাকৃতভাবে এই জাতিগত সহাবস্থানকে ধ্বংস করার চেষ্টা শুরু হয়। অতীতের ভারতে এটা বিদ্যমান ছিল। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে ভারতে জোরদার হিন্দুপন্থি আন্দোলন হয়। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) মহাত্মা গান্ধীজীকে গুলি করে খুন করে। বর্তমানে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির ওপর তাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ক্ষমতায় আসার আগে তাদের নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু ছিল না। তাদের একটা আঁচলার মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু সে আঁচলা ধীরে ধীরে প্রভাবশালী হতে থাকে। আর গত নির্বাচনে এক নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে নেয়। আংশিকভাবে তাদের রাজনৈতিক কার্যকারিতার জন্যই এই জয় এসেছে।

আবরারকে উদ্ধার করতে দু’বার পুলিশ গিয়েছিলো, তবে...

বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদের নির্যাতনের খবর শুনে পুলিশ হলে গিয়েছিলো। একবার নয়, দু’বার। কিন্তু ছাত্রলীগের বাধার কারণে হলের ভেতরে ঢুকতে পারেনি তারা। প্রথমবার হলের গেটেই থামিয়ে দেয়া হয়েছিলো তাদের। অগত্য গেস্টরুমে অপেক্ষা করেন। একঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে যান তারা। আর দ্বিতীয়বার যখন তারা হলে যান, ততক্ষণে পরপারে পাড়ি জমিয়েছিলেন আবরার। শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ও  পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
শিক্ষার্থীরা বলছে, সময়মতো তাকে উদ্ধার করা গেলে হয়তো বেঁচে যেতেন দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী। 

প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশের লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার কামাল হোসেন শেরেবাংলা হলে পুলিশ গিয়ে ফিরে আসার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, খবর পেয়ে চকবাজার থানার একটি দল শেরেবাংলা হলের ফটকে গেলেও তাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে পুলিশ ফিরে আসে। কারা ঢুকতে দেয়নি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, যিনি গিয়েছিলেন, তার সঙ্গে কথা বলুন।

ওই রাতে খবর পেয়ে হলের ফটকে গিয়েছিলেন চকবাজার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার হোসেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাত দেড়টার দিকে তিনি খবর পেয়ে সেখানে গেলে তাকে অভ্যর্থনাকক্ষে বসিয়ে রাখা হয়। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক (ঘটনার পর ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত) মেহেদি হাসান ওরফে রাসেল তাকে বসে থাকতে বলেন। তারা এক ঘণ্টা বসে থাকার পর ফিরে যান। একটি ছেলেকে মারধর করার খবর পেয়ে কেন বসে থাকলেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনুমতি ছাড়া হলের ভেতরে  গেলে অন্য কিছু হতে পারে ভেবে ভেতরে যাননি।

পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক নাঈম আহমেদ বলেন, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের প্রধান কাজ হলো ঘটনার শিকার ব্যক্তিকে উদ্ধার করা। কেউ যখন মৃত্যুঝুঁকিতে থাকেন, শারীরিক ক্ষতির শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন, তখন তাকে উদ্ধার করাই প্রধান কাজ।

আবরার হত্যা মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র জানায়, আবরারকে ডেকে আনা, মারধর করা এবং পুলিশকে খবর দেয়া থেকে শুরু করে সবকিছুই তদারক করছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেল। লাশ গুম ও আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন ছাত্রলীগ  নেতারা। এ কাজে রাসেলকে সহায়তা করেন শাখা ছাত্রলীগের অন্য  নেতাকর্মীরা। পুলিশ মনে করছে, ২৪-২৫ জন এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ জনকে চিহ্নিত করে মামলার আসামি করা হয়েছে।

রাত দেড়টার পর ছাত্রলীগ নেতা রাসেল লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার কামাল হোসেনকে ফোন করে ঘটনা জানান। তবে কামাল বলেন, রাসেল তাকে ফোন করেননি, তিনি সরাসরি থানায় ফোন করেছিলেন। থানাে থেকে তিনি ঘটনা জানতে পারেন। রাসেলের ফোন  পেয়ে টহলে থাকা উপপরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন হলের সামনে যান। এ সময় ছাত্রলীগ নেতারা আবরারকে পুলিশে দেবেন, নাকি অন্য কিছু করবেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েন। তারা পুলিশকে জানান, তারা এক ‘শিবিরকর্মী’ ধরেছেন, তাকে পুলিশে না দিয়ে কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে  দেবেন। এ সময় পুলিশকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন রাসেল। পুলিশ  সেখানে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে ফিরে যায়।

তবে ওই হলের একজন ছাত্র জানান, পুলিশ এসে ঘটনার বিবরণ শুনে  ভেতরে না ঢুকে চলে যায়। পুলিশ চাইলে ভেতরে গিয়ে আবরারকে হাসপাতালে নিতে পারতো। তাহলে হয়তো আবরার বেঁচে যেতেন।

অন্য একজন ছাত্র জানান, পুলিশ চলে যাওয়ার পর ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশে ছাত্রলীগের চার কর্মী আবরারকে চ্যাংদোলা করে ২০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে একটি বিছানায়  শোয়ানোর পরই নিথর হয়ে যান আবরার। এরপর ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীদের সেখানে ডাকা হয়। তারা ২০০৫ নম্বর কক্ষে গিয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলেন না। কেউ আবরারকে হলের বাইরে রাস্তায় ফেলে দিতে বলেন। কেউ বলেন সিঁড়ির গোড়ায় বা ছাদে রেখে আসতে। তখন আবরারকে সরিয়ে ফেলার জন্য কয়েকজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা একটি চাদরে মুড়িয়ে আবরারের নিথর দেহটি দোতলা ও নিচতলার মাঝামাঝি সিঁড়িতে নিয়ে রাখেন।

হলের একজন কর্মী প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খানকে ফোন করে ঘটনাটি জানালে তিনি গেটের সামনে আসেন। প্রভোস্ট বলেন, রাত পৌনে তিনটার দিকে খবর পাই একজন শিক্ষার্থী পড়ে আছে। তাৎক্ষণিকভাবে বুয়েটের চিকিৎসক মাসুক এলাহীকে জানাই। তিনি এসে জানান ছেলেটি  বেঁচে নেই। পরে পুলিশকে খবর দিই।

ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী বললেন- উনি কেমন ভিসি?

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বুয়েট ভিসিকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, উনি কেমন ভিসি? একটা ছাত্র মারা গেল, আর তিনি এতটা সময় বাইরে ছিলেন? আবরারের জানাজায়ও তার অংশ নেয়া উচিত ছিল। ক্ষোভ প্রকাশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, হত্যার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের ক্যাম্পাসে যাওয়া উচিত ছিল। মঙ্গলবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে অনির্ধারিত আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এর সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি পেতেই হবে। কাউকে একচুলও ছাড় দেয়া হবে না। শুধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই নয়, আমি একজন মা হিসেবে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করবো।

তিনি বলেন, এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক, অনাকাঙ্খিত। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ধরা হয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখনই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটল, সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। অনেকে আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করেছিল। আমি ফুটেজগুলো সংরক্ষণ করতে বলেছি। আমরা ব্যবস্থা তো নিচ্ছি। নিজ দলের বলে কাউকে তো ছাড় দিচ্ছি না। তার পরও কিছু মানুষ ও কিছু সংগঠন আছে, যারা সরকারের ভালো কিছু চোখেই দেখে না। সবসময় তারা নেগেটিভ বিষয় খোঁজার চেষ্টা করে।
শেখ হাসিনা বলেন, ও তো বাচ্চা ছেলে, মাত্র ২১ বছর বয়স। ওর ভিন্নমত থাকতেই পারে। তাই তাকে এমন নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে? যারা মেরেছে তারাও তো একই ক্লাসে পড়ে? কীভাবে এটা সম্ভব?
তিনি বলেন, বন্ধু হয়ে বন্ধুকে পিটিয়ে মেরে ফেলবে? একটু মায়া লাগেনি? ও (আরবাব) মোংলাবন্দরের কথা বলেছে, আসলে সে সময় তো মোংলাবন্দর ছিল না। ছিল চালনাবন্দর। ও ছোট মানুষ। তার ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু এভাবে মারতে হবে? এটি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন ভারত নিয়ে অনেক কথাবার্তা বলা হচ্ছে। বুধবার আমি সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরবো। কী পেলাম আর কী দিয়ে এলাম তা জাতিকে জানাবো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডের পর আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। আরও নেয়া হবে। তারপরও আন্দোলন কেন? বিএনপির আমলে মেধাবী শিক্ষার্থী সাবিকুন নাহার সনি হত্যাকাণ্ডের বিচার তো হয়নি। পুলিশ তখন ছাত্রদের মিছিল পর্যন্ত করতে দেয়নি। আমরা তো সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছি। আমি তো দল দেখিনি? তার পরও কেন আন্দোলন? বিভিন্নজন বিভিন্ন জায়গায় থেকে নানা ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করছে।

এ ঘটনায় কেউ যেন ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করতে না পারে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এ জন্য আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, কাদের নির্দেশনায় এটা হয়েছে, সব খুঁজে বের করা হবে। তিনি বলেন, আমি দেশটাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি। এমন সময় নানারকম ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল মতিন খসরু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এনামুল হক শামীম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, কেন্দ্রীয় সদস্য আনোয়ার হোসেন, ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য প্রমুখ। এর আগে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। উপস্থিত নেতারা জানান, বুয়েটের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী খুবই মর্মাহত। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে বিমর্ষ দেখা যায়।

এদিকে আজ বুধবার বেলা ১১টায় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছে। এতে আবরার হত্যাকাণ্ডসহ সমসাময়িক বিষয়ে কথা বলবেন ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা।

কোয়েনাকে ফ্ল্যাটের বাথরুমে আটকে রাখত বয়ফ্রেন্ড

বলিউডের অন্দরমহলে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত ঘটনা ঘটে থাকে। এবার তেমনই এক খবর পাওয়া গেল। নিজের মুখে অত্যাচারের চরম কাহিনি বললেন বলিউড অভিনেত্রী কোয়েনা মিত্র। ‘বিগবস ১৩’ -এ এবারের প্রতিযোগী বঙ্গ সুন্দরী কোয়েনা মিত্র। তিনি গত শুক্রবারের পর্বে ফাস করেন এক  গোপন কথা। জানান তার প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে সম্পর্কের কথা। তুরস্কের বাসিন্দা ছিলেন  কোয়েনার প্রাক্তন প্রেমিক। অনুষ্ঠানে কোয়েনা জানান, বয়ফ্রেন্ড ছিলেন অত্যন্ত ‘পজেসিভ’।
একবার তুরস্ক থেকে মুম্বই এসেছিলেন সেই বয়ফ্রেন্ড, তখনই কোয়েনার সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করতে শুরু করেন। অত্যাচারের সীমা বাড়িয়ে কোয়েনার বয়ফ্রেন্ড তাকে ফ্ল্যাটের বাথরুমে আটকে রেখে দিয়েছিলেন বলে জানান কোয়েনা। এই বলিউডের তারকা আরও জানান, তার বয়ফ্রেন্ড বলেছিলেন তাদের বিয়ের পর তুরস্কে কোয়েনা গেলে তার পাসপোর্ট পুড়িয়ে ফেলে দেবেন তিনি। যাতে  কোয়েনা কোনো দিন ভারত ফিরতে না পারেন। এটা শোনার পরই কোয়েনা সতর্ক হন। ভেঙে যায় তাদের সম্পর্ক।

আবরারের লাশ সিঁড়িতে রেখে টিভিতে খেলা দেখে খুনিরা by পিয়াস সরকার

একজন নিরীহ ছাত্র। তার ওপর অন্তত ডজন খানেক মানুষরূপী হায়েনার নির্যাতন। লাঠি, স্ট্যাম্পের আঘাতে রক্তাক্ত আবরার ফাহাদের পুরো শরীর। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা নরপশুদের আদিম উল্লাস। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বর্ষের নেতারা এসে পালাক্রমে পিটায় আবরারকে। বিরামহীন পিটুনিতে নেতিয়ে পড়ে আবরার। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা আবরারের মৃত্যু গোঙানিও খুনিদের মনে এতটুকু দাগ কাটেনি। জাগেনি বিন্দুমাত্র দয়া।
বরং মৃত ভেবে তাকে ধরাধরি করে সিঁড়িতে রেখে নিশ্চিন্তে টেলিভিশনে লা লিগার ফুটবল ম্যাচ দেখছিল তারা। এমনকি সেখানে রাতের খাবারও খেয়েছে পাষণ্ড ঘাতকরা। হত্যাকাণ্ডের দিন হলে অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা এমন তথ্য জানিয়েছেন। ঘাতক সন্দেহে এমন ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের অনেকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা বর্ণনা দিয়েছে কি নির্মমতায় হত্যা করা হয়েছে আবরারকে। আবরার থাকতেন শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর রুমে। রোববার বিকালে পলাশী থেকে চা নাস্তা খেয়ে রুমে যান আবরার। এরপর সাড়ে ৭টার দিকে তাকে ডেকে পাঠান বড় ভাইয়েরা। ২০১১ নম্বর রুমে তাকে ডেকে নেন ৩ জন। এরপর সেখানে আবরারের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও ম্যাসেঞ্জার পরীক্ষা করেন তারা। এরপর তার সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই স্ট্যাটাস নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে তাকে মারধর শুরু করে উপস্থিত ছাত্রলীগ নেতারা। কয়েক ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে চলে নির্যাতন। রাত ১০ টার দিকে আবরারের কাপড় নিয়ে যান তারা। আবরারের এক বন্ধু বলেন, ধারণা করি রক্তাক্ত হয়েছে আবরার। ২০১১ নম্বরের পাশের রুম ২০১০ নম্বর থেকে শোনা যাচ্ছিল চিৎকারের শব্দ। একাধিক শিক্ষার্থী জানান, এই রকম রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের চিত্র এটিই নতুন না। আগেও হয়েছে। আবরারের সেই বন্ধু রাত ২ টার দিকে চিৎকার শুনে ছুটে গিয়ে দেখেন, তোশকের মধ্যে শোয়ানো আবরার। ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। বলছিলেন, আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। এরকিছু সময় পর অ্যাম্বুলেন্স ও ডাক্তার আসার আগেই না ফেরার দেশে চলে যান আবরার। সোমবার এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন আবরারের বাবা। সেদিনই ছাত্রলীগের ১০ নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্দ্ধতন এক কর্মকর্তা বলেন, তারা প্রত্যেকেই হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তিনি আরো বলেন, আবরারকে ইয়ার বাই ইয়ার পিটানো হয়। কয়েকজন করে দলে ভাগ হয়ে। দ্বিতীয় বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত সবাই তাকে আঘাত করে। তাদের প্রত্যেকের ১০ দিনের রিমাণ্ড আবেদন করার প্রেক্ষিতে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্ত ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানায়, প্রথমে আবরারকে পেটায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক। পরে উপ-দপ্তর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মুজতবা রাফিদ, সমাজসেবা বিষয়ক উপ-সম্পাদক ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ইফতি মোশারফ সকালসহ আরো অনেকে তার ওপর নির্যাতন চালায়। এছাড়াও তাদের সঙ্গে ছিলেন তৃতীয় বর্ষের বেশ কজন শিক্ষার্থী। এরপর পেটানো শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনীক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ কয়েকজন। জানা যায়, তারা সকলেই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলের অনুসারী। এই ঘটনায় আটক ১০ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হলেন, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন, অনীক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশারেফ, বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না, ছাত্রলীগের সদস্য মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর ও মোহাজিদুর রহমান। এরপর গতকাল ফের দুইজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। নির্যাতনে জড়িত অমিত সাহার নাম আসলেও মামলায় তার নাম নেই। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। জিয়নকে সোমবার পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রায় ১৫ মিনিটের জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। পুলিশের গাড়িতে যাবার সময় জিয়নের মুখে ছিলো না কোন ভীতির ছাপ। জিয়নের হাসিমাখা মুখের ছবি ফেসবুকে হয়েছে ভাইরাল। ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনজন আবরারকে ধরে নিচে নিয়ে আসছেন। আর তাদের পিছনে ছিলেন কয়েকজন।

প্রতিবেশীসুলভ হও by দেব মুখার্জী

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩রা অক্টোবর থেকে ৬ই অক্টোবর পর্যন্ত চারদিনের ভারত সফর সম্পন্ন করেছেন। এ সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি তিনি বক্তব্য রেখেছেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে। এই সফরের পরে যে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়েছে, তাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৃহীত পদক্ষেপের পারস্পরিক প্রশংসা করা হয়েছে। জোর দেয়া হয়েছে বন্দর ব্যবহারে, সংযুক্তি বা কানেক্টিভিটি, পানি বন্টন, বিদ্যুত, গ্যাস, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রতিরক্ষার ওপর। বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত’ ব্যক্তিদের দুর্ভোগের রেফারেন্স তুলে ধরা একটি ইতিবাচক দিক। প্রথমদিকে এই ইস্যুতে মিয়ানমারের দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুততার সঙ্গে গ্রহণ করেছিল ভারত। বাংলাদেশ আশা করছে এর মধ্য দিয়ে ভারত তার সেই ভুল সংশোধন করে নিচ্ছে। ২০১০ সালে শেখ হাসিনার সফরের পরে ইস্যু করা একটি যৌথ বিবৃতিতে যদি কোনো দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি থাকে, তাহলে তা অবশ্যই বলা যেতে পারে যে, সন্দেহের ও শত্রুতার এক অন্ধকার সময়ের পরে সম্পর্কের উন্নয়ন করার প্রচেষ্টা এটা।
বর্তমানে এই সম্পর্ক অনেকটাই পরিপক্ব। জোরালো ধারাবাহিকতা ও আন্তঃনির্ভরতার প্রকল্পগুলো নেয়া সম্ভব হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে একটি সুবর্ণ সময়ের প্রত্যাশা করছেন শেখ হাসিনা। 
মতভেদের বাইরে গিয়ে, যা সাধারণত উচ্চ পর্যায়ের যৌথ বিবৃতি অনুমোদন করে সেখানে এক পক্ষ স্পর্শকাতর ইস্যুতে অন্ধকারে থেকে যায়। এক্ষেত্রে, রেকর্ড অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য রেখেছেন ইন্দো-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামে। সেখানে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যত কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্ট জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। এই প্রেসক্রিফশনের প্রথমটিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদেরকে অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘিষ্ট মানসিকতা পরিহার করতে হবে। প্লুরালিজম অথবা বহুত্ববাদই হয়েছে শক্তিশালী। তাই আমাদেরকে দক্ষিণ এশিয়ার ধর্ম, জাতি ও ভাষাগত বৈচিত্রকে সেলিব্রেট করা উচিত।’ এটা তার নিজের দেশ সহ সবার জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু হয়নি। কিন্তু বর্তমান ভারতের ‘এস্টাবলিশমেন্টের’ কাছে এটাকে দেখা হতে পারে একটি অবগুণ্ঠিত উপদেশ হিসেবে।
আরেকটি প্রেসক্রিপশনে বলা হয়েছে, ‘বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার মাধ্যমে আমাদের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ম্যানেজ করতে হবে। আসুন আমাদের নিজেদের জনগণের স্বার্থে আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রশংসা করি ও ভারসাম্য রক্ষা করি। আমরা সাময়িক সময়ের অর্জনের কাছে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে ছেড়ে দিতে পারি না।’ এটা হতে পারে রাষ্ট্রের মৌলিকত্বের জন্য সার্বজনীন। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার বিষয়ে তার দেশের যেসব মানুষ অনিচ্ছুক তাদের প্রেক্ষিত বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে বিএনপির সদস্যরা ভারত সফর করেন দুটি বিষয়ে ভারতকে রাজি করাতে। তাদের সেই দুটি বিষয়ের প্রথমটি হলো, তারা যদি পুনরায় নির্বাচিত হয় তাহলে তাদের এ যাবতকালের ভারত বিরোধী অবস্থান ত্যাগ করবে। এর ফলে তার প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতার একটি পথ তৈরি হবে। দ্বিতীয় বিষয়টি ছিল, বাংলাদেশের জনমত দ্রুতই আওয়ামী লীগের অপশাসনের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। তাই ভারত যে আওয়ামী লীগের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, নিজেদের স্বার্থে তাদের সেটা আর মনে করা উচিত নয়। ভারতে যারা গেম-খেলোয়াড় তাদের দেখে মনে হয়েছে বিএনপির যুক্তি তাদের কাছে ভিন্ন কিছু বলে মনে হয়নি। বাংলাদেশে সরকার বেছে নেয় এ দেশের মানুষ। এক্ষেত্রে ভারতের অনুমোদনের বিষয়টি শুধুই বিবেচ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এই ধারণাই অনেক বড় ব্যাপার। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রতি ভারতের আপাতদৃষ্টিতে সমর্থন এবং এর পরিণামের বিষয়টি হালকাভাবে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
দুই দফায় ক্ষমতায় থাকার পর, যদি জনগণের মনোযোগ আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে তাহলে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু ছিল না।  কিন্তু হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে  যুক্ত হওয়া উচিত মসৃণভাবে জাতীয় প্রবৃদ্ধি বাড়া, অর্থনেতিক কর্মকাণ্ডের সব নিয়ামকের উন্নতি এবং একই সঙ্গে আইন শৃংখলার উন্নতি। সর্বোপরি বিদেশী সমর্থনপুষ্ট জিহাদি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রয়েছে পুশব্যাকের প্রতিশ্রুতি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পূর্ববর্তী সময়ের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। স্মরণ করা যেতে পারে অসহায়ত্বের কথা, রাষ্ট্র ও এর মিত্রদের মদতে তখন উগ্রবাদের উত্থান ঘটেছিল।
যুক্তি দেয়া হতে পারে যে, বর্তমানে বাংলাদেশ সমালোচনার ক্ষেত্রে অসহিষ্ণুতা দেখাচ্ছে। ফটোসাংবাদিক শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগ ব্যাখ্যামুলক। দুর্ভাগ্যজনক হলো, এটা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে ভারতীয়রা এখন কোনো পরামর্শ দেয়ার সুযোগ নিতে পারে না।
কয়েক মাস ধরেই বাংলাদেশের কাছে উদ্বেগের বিষয় এনআরসি। সর্বোচ্চ পর্যায়কে বার বার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে যে, তাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে দৃশ্যত ফর্মুলা হতে পারে যে, এনআরসি হলো আসামে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা। এখনও এ প্রক্রিয়ায় আপিল করার অনেকগুলো ধাপ আছে। যারা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা দরিদ্র ও অশিক্ষিত। এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে আপিল প্রক্রিয়ার সুবিধা, তারা কোন পর্যায়ে, কিভাবে নেবেন তা নিয়ে। প্রক্রিয়াটি যখন শেষ হয়ে যাবে তখন এ বিষয়ে কি করা হবে সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট কিছু বলা নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, আমাদেরকে বলা হয়েছে এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখন উত্তমের মধ্যে সেরা। তবে একই সঙ্গে আমরা আমাদের চোখ খোলা রাখছি (এনআরসি ইস্যুতে)।
এখানে ‘বর্তমানে’ এবং ‘আমাদের চোখ খোলা’ শব্দগুলো গাফিলতি করে উচ্চারণ করা হয় নি। সারা ভারতে এনআরসি হতে পারে ব্যাপক অর্থে আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের একটি বিষয়। কিন্তু এর পরিণতি বাংলাদেশের ওপর পড়ে এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দূরে সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রমাণ হতে পারে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভারসাম্যের দিকে তাকিয়ে এটা স্বীকার করা যায় যে, এতে লেজারটি বাংলাদেশের পক্ষেই, সম্ভবত অনেকটা বেশি ঝুঁকে যেতে পারে। গঙ্গা পানি চুক্তি সরিয়ে রাখা হয়েছিল। এতে উভয় দেশের মধ্যে স্থায়ীভাবে একটি বড় সমস্যা সৃষ্টি হলো। দীর্ঘদিনের জমে থাকা আবেগ তুলে ধরে তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ইস্যুটিকে গঠনমুলকভাবে তুলে ধরে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাহস প্রদর্শন করেন। স্থল ও নৌ সীমান্ত বিষয়ক চুক্তিতে পারস্পরিক সুবিধা হয়েছে। এতে তারা পারস্পরিক আলস্যের শিকারে পরিণত হয়েছে। চূড়ান্তভাবে তা বিজেপি চার বছরের জন্য অচল করে রাখে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জঙ্গিদের বিষয়ে দীর্ঘদিন উদ্বিগ্ন ছিল ভারত। কিন্তু তাদেরকে সমর্থন দেয়ার বিষয়ে ভারতের যে উদ্বেগ সে বিষয়ে বিস্তৃতভাবে দৃষ্টি দিয়েছে বাংলাদেশ। নিজের পক্ষ থেকে ভারত তিস্তার পানি দিতে অব্যাহতভাবে অক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশে গঙ্গা ব্যারেজ নিয়ে এসেছে অর্থনৈতিক  ও রাজনৈতিক সুবিধা। তবে বাইরের তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উপযুক্ত হিসেবে তুলে ধরতে পারেনি ভারত। বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া, নেপাল ইনিশিয়েটিভ বা বিবিআইএন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ব্যাখ্যাতীত। এমনকি ভারত যদিও এক্ষেত্রে প্রধান দায়বদ্ধ নয়, তবু তাদের কাছে অধিকতর মনোযোগ আশা করা যেতে পারে।
শেষ দফায় বলতে হয়, ভারতে ঘৃণাপ্রসূত অপরাধ এবং মুসলিমদের পিটানোর ঘটনা জনগণের ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। এখানে আওয়ামী লীগ সরকারকে কৃতিত্ব দেয়াই যায়। কারণ, আমরা ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর যে প্রতিক্রিয়া দেখেছি তার বিবেচনায় এখনও আমরা জনগণের পক্ষ থেকে কোনো শত্রুতাপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখি নি। তবে এটা হতে পারে ধীর গতির গলন। আন্তরিকভাবে কেউ আশা করতে পারেন যে, আমরা প্রতিবেশীর সঙ্গে যে গঠনমূলক সম্পর্ক উন্নত করেছি তা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিচ্যুতির কারণে বিচ্যুত হোক।
(লেখক বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার। অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ)

এশিয়ার সমরখাতে যুক্তরাষ্ট্র কি চীনের কাছে একাধিপত্য হারাতে বসেছে by জোনাথন মার্কাস

চীনের সামরিক খাতে যে আধুনিকায়ন চলছিল, সেই প্রেক্ষাপটে দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরে একটি 'উঠতি শক্তি' হিসেবে বর্ণনা করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা।
কিন্তু এই বিশ্লেষণ মনে হয় তামাদি হয়ে গেছে। চীন এখন আর উঠতি শক্তি নেই, তারা মারাত্মক শক্তিতে বা সুপারপাওয়ারে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করছে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির যুক্তরাষ্ট্র স্টাডিজ সেন্টারে নতুন একটি প্রতিবেদনে এমনটাই জানা গেছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশল ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নজিরবিহীন সংকটে রয়েছে। ওয়াশিংটনকে হয়তবা তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে রক্ষা করার জন্য চীনের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।
তারা বলছেন "আমেরিকা সামরিক শক্তির দিকে থেকে ভারত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আর একাধিপত্য উপভোগ করতে পারছে না" এবং "দেশটির নিজেদের সপক্ষে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে"।
রিপোর্টে বলা হচ্ছে বেইজিংয়ের দারুণ সব ক্ষেপণাস্ত্রের যে সম্ভার রয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এবং তার বন্ধু দেশগুলোর জন্য হুমকি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করছে চীন, দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিকায়ন করছে ( ফাইল ফটো)
চীন যুক্তরাষ্ট্রের মত বৈশ্বিক সুপারপাওয়ার না। কিন্তু তারা যে সেরকম একটা উচ্চাভিলাষ নিয়ে আগাচ্ছে না সেটাও বলা যাবে না। এরই মধ্যে তারা বিদেশে নিজেদের বন্দর এবং ঘাঁটির একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।
এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে চীনের অবস্থান মূলত তার অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে।
চীনের যে জিনিসটির অভাব রয়েছে সেটা হল দেশের বাইরে অর্থাৎ যেটাকে 'ওভারসিজ মিশন' বলে। পুরো বিংশ শতাব্দী ধরে দেখা গেছে এই ওভারসিজ মিশনের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে দাপিয়ে বেড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বে এগিয়ে আছে। যেমন: গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান।
এশিয়া এবং নেটোর মাধ্যমে ‌ইউরোপে গভীর নেটওয়ার্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
চীনের আবার এই ধরণের জোট ব্যবস্থা নেই। কিন্তু ওয়াশিংটনের প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বকে দ্রুত দুর্বল করছে চীন।
চীনের কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল এশিয়া এবং নিজেদের আশপাশে শক্তিবৃদ্ধি। এখানে দুটি মূল বিষয়- লক্ষ এবং তার নাগাল পাওয়া।
তার অর্থ এশিয়াতে চীন ইতিমধ্যে একটা সুপার-পাওয়ার হয়ে উঠেছে যেটার ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল নিয়ে গবেষনা করেছে চীন
চীন যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং যুদ্ধের লড়াই নিয়ে গবেষণা করেছে এবং তারা একটা কার্যকর কৌশল তৈরি করেছে।
সংকটের সময় চীনের লক্ষ্য হল 'ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন' এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাতে প্রবেশ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা। ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন হল দক্ষিণ চীন সাগর বরাবর একগুচ্ছ দ্বীপ। মানচিত্রে দেখলে, এই দ্বীপের সারি শুরু হয়েছে জাপানের তলা থেকে যা তাইওয়ানকে পার হয়ে ফিলিপাইনের পশ্চিম দিকটাকে অতিক্রম করেছে।
কিন্তু চীন 'সেকেন্ড আইল্যান্ড চেইন' এর বাইরেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চায়। সেকেন্ড আইল্যন্ড চেইনটি সাগরের আরো দূরবর্তী অংশের দ্বীপপুঞ্জের একটি সারি যার মধ্যে গুয়াম দ্বীপও রয়েছে। এই গুয়াম দ্বীপে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। চীন তাদের অস্ত্র ব্যাবহার করে এই গুয়ামকেও ঠেকাতে চায়।
তবে এটা ভাবার কারণ নেই পেন্টাগন চীনের এসব চিন্তা সম্পর্কে অবগত না।
দশকের পর দশক ধরে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ চালানোর মধ্যে দিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী পুনর্গঠিত হয়ে গেছে। তারা নতুনভাবে অস্ত্রসজ্জিত হয়েছে এবং েই সাথে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুতও হয়ে গেছে।
স্নায়ু যুদ্ধের যে সামরিক বাহিনীটির লক্ষ্য ছিল মোটা দাগে শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন, আজ সেই বাহিনীটিই প্রস্তুতি নিচ্ছে চীনকে লক্ষ্য করে।
দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা চীনের দ্রুত সামরিক ক্ষেত্রে আধুনিকায়নকে ' একটি উঠতি শক্তি' হিসেবে দেখছেন

আবরার হত্যার দায় স্বীকার করেছে আটক ছাত্রলীগ নেতারা, বুয়েট ভিসি অবরুদ্ধ

আদালত প্রাঙ্গনে আটক ছাত্রলীগ নেতারা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে আটক ছাত্রলীগ নেতারা। এ ঘটনায় ১৪ জন জড়িত ছিল বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়।

বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র ফাহাদ শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক কিছু চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার জেরে রোববার রাতে ফাহাদকে ডেকে নিয়ে অন্য একটি কক্ষে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা।

এ ঘটনায় সোমবার (৭ অক্টোবর) রাতে আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনের নামে চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল এবং দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদকে।

পুলিশের গোয়েন্দা শাখার একজন উর্দতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আটক ছাত্রলীগ নেতারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এর আগে পুলিশ জানিয়েছে, ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে। হলের ভিডিও ফুটেজ থেকে চিহ্নিতদের দশজনকে গতকালই আটক করা হয়েছে। মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখাকে। 

এদিকে, আজ দুপুরে গ্রেফতারকৃত ১০ জন ছাত্রলীগের নেতাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরী প্রত্যেককে ৫ দিন করে পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিকে, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে চলমান আন্দোলন পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় না বসায় বৈঠক চলাকালীন ভিসির কার্যালয়ের গেটে তালা লাগিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। 

মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টায় বুয়েটের ভিসির কার্যালয়ে এ বৈঠক শুরু হয় বলে নিশ্চিত করেছেন ভিসির পিএস (একান্ত সচিব) কামরুল ইসলাম।

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরারের হত্যাকারীদের ফাঁসিসহ আট দফা দাবিতে আজ দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের দুই দিন হতে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা ভিসিকে বিকেল ৫টার মধ্যে ক্যাম্পাসে এসে জবাবদিহিতাসহ আট দফা দাবি জানান। পরে ভিসি উপস্থিত না হলে তারা কার্যালয় ঘেরাও করেন।
আবরারের হত্যাকারীদের ফাঁসিসহ আট দফা দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল বুয়েট

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভে উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভে উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ক্ষুব্ধ পুরো দেশ। সবার একটাই দাবি আবরার হত্যার সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি। এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েট ভিসির রহস্যময় আড়ালে অবস্থান নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রায় ৩৮ ঘণ্টা পর তিনি গতকাল সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে এসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি শিক্ষার্থীদের দাবি ‘নীতিগত’ভাবে মেনে নেয়ার কথা জানালে শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। ভিসির এমন ঘোষণার পর শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, তাদের দাবি মেনে নেয়ার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে হবে।
ভিসি এমন কোনো ঘোষণা না দেয়ায় শিক্ষার্থীদের  তোপের মুখে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি তার কার্যালয়ে ফিরে যান। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভিসির কার্যালয় অবরোধ করে রাখেন। তারা জানান, রাতভর আন্দোলন চলবে। বুধবার সকালে পরবর্তী ঘোষণা দেয়া হবে। এর আগে গতকাল সকাল ১০টার দিকে বুয়েটের ক্যাফেটেরিয়া থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন আবরারের সহপাঠীরা। মিছিলটি বুয়েটের সকল একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন ও হল প্রদক্ষিণ করে। এরপর মিছিলটি পলাশী মোড় হয়ে জগন্নাথ হলের সামনে দিয়ে বকশীবাজার মোড় ঘুরে বুয়েটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। এসময় আবরার আবরার স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে পুরো ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। এসময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ৮ দফা দাবি উত্থাপন করেন। শিক্ষার্থীদের আট দফা দবি হলো- খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করতে হবে; আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে এবং ভিন্নমত দমানোর নামে নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে; ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পরও ভিসি কেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি, মঙ্গলবার বিকাল ৫টার মধ্যে ভিসিকে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে এর জবাব দিতে হবে; হত্যা মামলার খরচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে; এর আগের ঘটনাগুলোর বিচার করতে হবে; ১১ অক্টোবরের মধ্যে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করতে হবে; ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে। দুপুর সাড়ে ১১টায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে এসে তোপের মুখে পড়েন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। এরপর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানায় বুয়েট শিক্ষক সমিতি, সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এসময় তারাও আবরারের হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেন। আন্দোলনকারীরা আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। দাবি করেন অবিলম্বে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের মাধ্যমে হত্যাকারীদের ফাঁসি নিশ্চিত করতে। ভিসিকে আল্টিমেটাম দেয়া হয় বিকেল ৫টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে এসে কথা বলতে। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করার হুশিয়ারিও দেয়া হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়া হয়।

এদিকে বেলা সোয়া ৩টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ভিসির সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের এ প্রস্তাবের কথা জানান বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ভিসির পিএস (ব্যক্তিগত সচিব) আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন, ভিসি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাঁচ প্রতিনিধির সঙ্গে বসতে চান। সেখানে বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও আমি উপস্থিত থাকব। শিক্ষার্থীরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সেখানে ডিন ও বড় বড় শিক্ষকরা থাকবেন, আমাদের কথার কোনো জোর থাকবে না। ফলে আমরা সেখানে যাবো না। এদিকে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে না যাওয়ায় বিকেল ৫টার দিকে ভিসি কার্যালয়ে তালা দেয় শিক্ষার্থীরা। যদিও ভিসি সাইফুল ইসলাম সে সময় ডিন, প্রভোস্টদের সঙ্গে নিয়ে সভা করছিলেন। এরপর বিক্ষোভকারীরা সেখানে অবস্থান নেন।

৩৮ ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীদের সামনে ভিসি, বললেন আলোচনা করে দাবি পূরণ করা হবে: আবরার হত্যার ৩৮ ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীদের সামনে আসেন ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি নিজ কার্যালয়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে চান। এসময় তিনি শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। বিক্ষুব্ধ শিক্ষাথীরা বিভিন্ন প্রশ্ন করা শুরু করলে তিনি বিব্রত হন। এসময় তিনি বলেন, আমি তোমাদের এখানে প্রশ্নের উত্তর দিতে আসিনি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি সরকারের উচ্চমহলের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বলেন, তোমরা যা দাবি দিয়েছ তোমাদের দাবির সঙ্গে অ্যাগ্রি করছি। আমরা নীতিগতভাবে সব দাবি মেনে নিচ্ছি। এসময় শিক্ষার্থীরা ভিসিকে দাবিগুলো পড়ে শুনিয়ে ঠিক কোন দাবিগুলো মানা হলো তা জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে চলে যেতে চান। এত পরে কেন এলেন জানতে চাইলে ভিসি বলেন, আমি সারাদিন মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, মিটিং করেছি। এগুলো না করলে দাবিগুলোর সমাধান হবে কীভাবে। সব তো আমার হাতে নেই। এসময় শিক্ষার্থীদের আলাদা ডেকে নিয়ে কথা বলার প্রস্তাব দিলে ভিসির সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন শিক্ষার্থীরা। পরে ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দেন আন্দোলনরতরা। ভিসির আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে না পেরে আন্দোলনকারীরা তার কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন।

তোপের মুখে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক: এদিকে শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করতে এসে তোপেরমুখে পড়েন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে তোপের মুখে পড়েন। এসময় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি করেন। শিক্ষার্থীরা বলেন, স্যার, যে ঘটনা ঘটলো ক্যাম্পাসে। তাতে আপনি ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ঘোষণা দেবেন কিনা। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের কাছ থেকে সন্তোষজনক জবাব না পেলে ক্ষুব্ধ হন তারা। এসময় বিক্ষুব্ধরা শেইম শেইম, লজ্জা লজ্জা স্লোগান দেন। পরে অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আমি মনে করি বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন নেই। আমাদের বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন নাই। এসময় শিক্ষার্থীরা করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। এরপর শিক্ষার্থীরা বুয়েট ভিসিকে ক্যাম্পাসে আসার জন্য ছাত্রলকলাণ পরিচালককে ফোন দেয়ার দাবি করেন। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবির মধ্যে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক এক পর্যায়ে বলতে বাধ্য হন তোমরা এমন করলেতো আমি কথা বলতে পারবো না।

ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি, একমত শিক্ষকরাও: এদিকে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ৯ দফা দাবির মধ্যে বুয়েট শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ। যে দাবিতে একমত শিক্ষকরাও। ছাত্রদের দাবির সঙ্গে নিজেদের একাত্মতা পোষণ করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। সাবেক শিক্ষার্থীরা বুয়েটে পেশীশক্তির রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে। গতকাল আন্দোলনকারীরা বুয়েটের শহীদ মিনার থেকে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের জোর দাবি তুলেন। তাদের যুক্তি- যে রাজনীতি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নকে হত্যা করে সে রাজনীতি তারা  চায় না। অবিলম্বে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দাবি করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। গতকাল দুপুরে বুয়েট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একত্মতা পোষণ করে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদ রানা বলেন, বাবা-মা শিক্ষার্থীদের আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা শিক্ষার্থীদের সব দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করছি। বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আমি মনে করি, বাংলাদেশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন নেই। এসময় তিনিও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে বুয়েটের ৮৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেছেন, এক সময় রাজনীতি করা হতো আদর্শের জন্য। এখন করা হয় চাঁদাবাজি, বড় দলকে পাহারা দেয়ার জন্য। তিনি বলেন, আমার চাই বুয়েটে বিতর্ক ক্লাস, সংস্কৃতি ক্লাব এ ধরনের সংগঠনগুলো থাকুক। পেশিশক্তির রাজনীতি না থাকুক।

হত্যার  জন্য প্রশাসন দায়ী, দাবি বুয়েট শিক্ষক সমিতি: এদিকে, বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও হত্যাকারীদের শাস্তি দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছে, বুয়েট শিক্ষক সমিতি। গতকাল বুয়েটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ সংহতি জানান শিক্ষকরা। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানান। সকালে বুয়েটের শহীদ মিনারে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশকালে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ কে এম মাসুদ বলেন, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদের সব দাবির সঙ্গে একমত। এদিকে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. এ কে এম মাসুদ ও সাধারণ সম্পাদক ড. মো. মোস্তফা আলী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, আবরার হত্যার দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এড়াতে পারেনা। অতীতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন ও র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিতকরণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার ফলে ক্রমাগত আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। যার ফলশ্রুতিতে আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যার দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের স্বীকার হবে এবং মৃত্যুবরণ করবে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলসহ গোটা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। আবরার হত্যার ঘটনা প্রমাণ করছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

আন্দোলনে সাবেকরাও: এদিকে, আবরার হত্যার প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছে সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও। গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানান তারা। ব্যানার ফেস্টুন হাতে নিয়ে মৌন মিছিলও করে সাবেক শিক্ষার্থীরা। ‘ভয় নেই, আমরা আছি তোমাদের সাথে’, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার বুয়েট’, ‘বিচার চাই’, ‘খুনিদের ফাঁসি চাই’, ‘আমার সেই গর্বের ক্যাম্পাস ফিরিয়ে দাও’ ইত্যাদি লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন সাবেকরা। এসময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে বুয়েটের ৮৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, এক সময় রাজনীতি করা হতো আদর্শের জন্য। এখন করা হয় চাঁদাবাজি, বড় দলকে পাহারা দেয়ার জন্য। তিনি বলেন, বুয়েটে সারা দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের তুলে আনা হয়। পৃথিবীর সব জায়গায় বুয়েটের সুনাম রয়েছে। অথচ বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থীকে এমন পরিণতি ভোগ করতে হলো।

ঢাবিতে আবরারের গায়েবানা জানাজা: এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবরার ফাহাদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকার দুপুর বারোটার দিকে টিএসসি চত্বরে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেন। জানাজা পূর্বে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর, সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনসহ বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা আবরার হত্যার সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের ফাঁসি দাবি করেন। আর বিচারকার্যে কোনো অবহেলা লক্ষ্য করা গেলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। তারা আববারকে শহীদ হিসেবে অবহিত করেন। তারা বলেন, আবরার দেশের পক্ষে কথা বলে শহীদ হয়েছেন। জানাজা শেষে আববারের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এসময় আবরারের স্বজনদের জন্যও দোয়া করা হয়। 

ক্যাম্পাসে শেষবারের মতো আবরার:  এর আগে গত সোমবার রাতে ঢাকা মেডিকেল থেকে আবরারের লাশ বুয়েটে আনা হয়। এসময় এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। এরপর রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে বুয়েট কেন্দ্রীয় মসজিদে আবরারের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আবরারের পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সহপাঠীরা জানাজায় অংশ নেন। জানাজার পর শের-ই বাংলা হলে আবরারের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এরপর সেখান থেকে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়িতে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ করেন। সমাবেশ করেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা দেয়া হয়।

এদিকে, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ১১ ছাত্রলীগ নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত সোমবার সংগঠনটির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

পটুয়াখালীতে বিক্ষোভ
বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও খুনিদের বিচারের দাবিতে পটুয়াখালী সরকারি কলেজে ও বাউফল উপজেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পটুয়াখালী সরকারি কলেজের সর্বস্তরের ছাত্র সমাজের ব্যানারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিন করে শিক্ষার্থীরা। সরকারি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে আধাঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন শেষে শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় কলেজের প্রধান গেটে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মানিক, হাসান, সুমন ও মাহাদি। বক্তারা আবরার হত্যার তীব্র ঘৃণা, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খুনিদের দ্রুত বিচারের কাঠগড়ায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেন।  বক্তারা দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশসহ নিরাপদে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করতে পারে তার আহ্বান জানান।

আবরার হত্যায় রাবি শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ
বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। মহাসড়কে অবস্থান নেয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একাধিকবার ধস্তাধস্তি ও বাকবিতণ্ডা হয়। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা আবরার হত্যার বিচার ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি জানান।

এর আগে বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে প্রধান ফটকের সামনে মহাসড়কে অবস্থান নেন। মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একাধিকবার ধস্তাধস্তি ও বাকবিতণ্ডা হয়। দ্রুত রাস্তা ছেড়ে না দিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হবেন বলে ঘোষণা দেন মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) মাসুদ রানা। এর কিছুক্ষণ পর সেখানে প্রক্টর লুৎফর রহমানসহ প্রক্টরিয়াল বডি এসে উপস্থিত হন।

প্রক্টর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের চলে যেতে বলেন। শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যা ছয়টায় মশাল মিছিলের ঘোষণা দিয়ে দুপুর সোয়া ১২টায় আন্দোলন স্থগিত করেন।

আবরারকে হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল রংপুর
উত্তাল রংপুর। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন সমাবেশ, সড়ক অবরোধসহ বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। গতকাল বেলা ১২টায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নগরীর মডার্ন মোড় এলাকায় সড়ক রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। পরে সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এসে মানববন্ধন সমাবেশ করে। ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, সাধারণ শিক্ষার্থী হাছান মাহমুদ, আলমগীর কবির, সাজাহান, রিনা মুরমু, মিজান, রাব্বি, রিপন, শাহ্‌ আলম, মিলন, নজরুল ইসলাম, আফরিন আক্তার, ফাতেমা আক্তারসহ অন্যরা। মানববন্ধন-সমাবেশ শিক্ষার্থীরা বলেন, রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের নির্মম নির্যাতনের কারণে প্রাণ গেল বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারের। শিক্ষাঙ্গনে এখন শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা নেই। ঠুনকো অভিযোগ এনে আবরারকে হত্যা করেছে ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীরা। দেশপ্রেমিক আবরারের ভারতবিদ্বেষী স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমরা চাই না কোনো কুলাঙ্গারের হাতে আর কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি হোক। প্রতিটি ক্যাম্পাসে এই মানুষরূপী হায়েনাদের চিহ্নিত করে বহিষ্কারসহ আবরার হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। যদি আমাদের দাবি মানা না হয়, তবে রংপুর থেকে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলে গোটা দেশকে অচল করে দেয়া হবে। এরপরই লালবাগ এলাকায় কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন সমাবেশ করে একই দাবি তোলেন। সকালে নগরীর বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল চত্বর এলাকায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন সমাবেশ করে আবরার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

আবরার হত্যায় জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে বেরোবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যার প্রতিবাদে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। গতকাল দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে নগরীর মডার্র্ন মোড়ে মহাসড়কে অবস্থান করে শিক্ষার্থীরা। এ সময় আবরারের খুনিদের ফাঁসির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। পরে বিক্ষোভ মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন পার্কের মোড়ে এসে  মানববন্ধনে রূপ নেয়।

ময়মনসিংহে মানববন্ধন
বুয়েট ছাত্র আবরারের হত্যাকারীদের দ্রুত  গ্রেপ্তার করে ফাঁসির দাবিতে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ময়মনসিংহের প্রগতিশীল ছাত্র জোট। সকাল ১১টা  থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত নগরীর শহীদ ফিরোজ-জাহাঙ্গীর চত্বরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে করে ।

মানববন্ধন চলাকালে বক্তব্য দেন জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি এমদাদুল হক মিল্লাত, সুজন মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আলী ইউসুফ, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি আসজাদুল বোরহান তাহসিন, সাধারণ সম্পাদক বাহার উদ্দিন শুভ, যুব-ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল আমিন রনি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফন্টের দপ্তর সম্পাদক ফজলুল হক রনি এবং রিফা সানজিদাসহ অন্যরা।
অবিলম্বে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দখলমুক্ত ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের করে সব ছাত্র হত্যাকারীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন দাবি জানায়।

আবারার হত্যার প্রতিবাদে মণিরামপুরে বিক্ষোভ
বুয়েট ছাত্র আবারার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে মণিরামপুর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্র রাজগঞ্জ মোড়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ সমাবেশে বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বক্তারা হত্যার সাথে জড়িতদের আটক ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

আবরার হত্যার প্রতিবাদে সিলেটে বিক্ষোভ মিছিল
বুয়েটে ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যার প্রতিবাদে সিলেটে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার দুপুর ১২ টায় নগরের চৌহাট্টাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে  কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে উঠা সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। সংগঠনের সিলেট বিভাগীয় প্রধান সমন্বয়ক মো. নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম আহবায়ক নোমান হোসেন খন্দকারের পরিচালনায় মানববন্ধনে বক্তরা বলেন, আবরার হত্যার পেছনে ছাত্রলীগের অতিমাত্রায় ভারতপ্রেম প্রেরণা জুগিয়েছে। ভারতের সঙ্গে কয়েক’টি দেশবিরোধী চুক্তির সমালোচনা করায় আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। এই রাষ্ট্র জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিলেও বাংলাদেশকে তার ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না। ভারত আমাদের তিস্তার পানি দিচ্ছে না অথচ ফেনি নদীর পানি নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের দু’টি রাজ্য যখন কোনো বিনিময় ছাড়া একে-অপরকে কিছু দিতে রাজি হয় না, সেখানে বাংলাদেশ কোনো বিনিময় ছাড়া ভারতকে আমাদের সমস্ত সম্পদ তুলে দিচ্ছে।’ একদিকে জনগণ বাসাবাড়িতে গ্যাস পাচ্ছে না অন্যদিকে ভারতে গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। ভারত সীমান্তে নিরপরাধ বাংলাদেশি হত্যা করছে। এই সরকার জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না তাই জনগণের অধিকার আদায়ে সচেতন নয়। ৩০শে ডিসেম্বর দেশের জনগণ ভোট দিতে পারেনি। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন- বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ সিলেট বিভাগীয় সমন্বয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুস সাকিব, আল মামুন সুজন, এসএম মনসুর, তাহসান খান, সালমান হোসেন, আলী হোসেন, ইমরান খান ও সাবিনা সেবিন প্রমুখ। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল নগরের চৌহাট্টা  থেকে শুরু হয়ে কোর্ট পয়েন্টে গিয়ে শেষ হয়।

কুমিল্লায় বিক্ষোভ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যার প্রতিবাদে কুমিল্লায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সকাল দশটায় কুমিল্লা নগরীর টাউনহল থেকে মিছিল শুরু করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিল। এসময় শিক্ষার্থীদের স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে কুমিল্লা নগরী। 

নোয়াখালী
বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার দাবিতে নোয়াখালী টাউন হল মোড়ে সকাল ১০টায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় তাদের ধাওয়া করে লাঠিচার্জ করার চেষ্টা চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। পরে সকাল সাড়ে ১০টায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে পুনরায় নোয়াখালী প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন-সমাবেশে মিলিত হয়। প্রায় আধা ঘণ্টাব্যপী ওই কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন কলেজ ও মাদ্রাসার শতাধিক শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তারা হত্যার প্রতিবাদে ও বিচার দাবীতে নানা স্লোগান দেন। এ সময় একাধিক শিক্ষার্থী বক্তব্য রাখেন, তারা আবরার হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার আইনে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবী জানান।

খুলনা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার প্রতিবাদে খুলনায় মানববন্ধন কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার  বেলা ১২টায় নগরীর শিববাড়ী মোড়ে ‘আগুয়ান-৭১’ নামের একটি সংগঠন?ের ব্যানারে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি পালন করে। এ সময় শিক্ষার্থীরা বাক স্বাধীনতার দাবিসহ বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন স্লোগান খচিত প্ল্যাকার্ড বহন করে। কেউ কেউ প্রতিকী আবরার সেজে মানববন্ধনে অংশ নেয়।

ইবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
বুয়েট শিক্ষার্থী ফাহাদকে নির্মমভাবে হত্যার প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার তিন দফা দাবিতে ২য় দিনের মত প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে তারা। এসময় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করে মেইন গেট আটকে রাখায় মহাসড়কে যেতে পারেনি বিক্ষুব্ধরা। বিকেল ৪টায় জিয়া  মোড় থেকে প্রতিবাদ মিছিল শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটকে বিক্ষোভ সমাবেশ করে।

নারায়ণগঞ্জ
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার বিচারের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে পৃথক ভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এবং মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে প্রথমে নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে নগরের চাষাঢ়া শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন এবং এরপর প্রগতিশীল ছাত্র জোটের ব্যানারে একই স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

প্রগতিশীল ছাত্র জোটের সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন প্রগতিশীল ছাত্র জোট নারায়ণগঞ্জ জেলার সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি সুলতানা আক্তার। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নারায়ণগঞ্জ জেলা সংসদের সভাপতি সুমাইয়া সেতু, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নারায়ণগঞ্জ জেলা সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক শুভ বনিক।

পানি চুক্তির সমালোচনা করায় আবরার হত্যা: বিদেশি গণমাধ্যমের খবর

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পানি চুক্তির সমালোচনা করায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে আবরার ফাহাদ (২১) নামে এক শিক্ষার্থীকে। তিনি অভিজাত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র। তার হত্যার প্রতিবাদে সোমবার ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। বড় বড় সড়কে অবরোধ করা হয়েছে। ঢাকায় ও রাজশাহীতে এই হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। এতে যোগ দেন কিছু শিক্ষকও। বিক্ষোভ থেকে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে স্লোগান দেয়া হয়। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে এসব কথা লিখেছে বিদেশি বিভিন্ন মিডিয়া।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে উদ্ধৃত করে ভয়েস অব আমেরিকা লিখেছে, ঢাকায় পুলিশের উপ- কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম বলেছেন, ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ জন্য ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতাকর্মীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ফাহাদের মৃতদেহ পাওয়া যায় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমেটরিতে। সেখানকার অন্য আবাসিক ছাত্রদের উদ্ধৃত করে মিডিয়া বলেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্যরা ফাহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তাকে প্রহার করে। ছাত্রলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট আশিকুল ইসলাম বিটু এনটিভি’কে বলেছেন, একটি ইসলামপন্থি দলের যুব শাখার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ফাহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।

তবে এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে ফাহাদ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন। তা তাড়াতাড়ি ভাইরাল হয়ে যায়। ওই পোস্টে তিনি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটি চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন। ওই চুক্তিতে দুই দেশের সীমান্ত এলাকার ফেনী নদী থেকে ভারতকে পানি নিতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গত বছর সরকারবিরোধী একটি ছাত্র আন্দোলনকে নির্মূল করে দিতে ছাত্রলীগের সদস্যরা হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা ও চাঁদাবাজি করেছেন বলে অভিযোগ আছে। এ অভিযোগে দুর্নাম কুড়িয়েছে তারা। গত বছর দ্রুতগতিতে চলমান একটি বাসের নিচে পড়ে দু’শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে ওই ছাত্র আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানের কাছে অর্থ দাবি করার অভিযোগে গত মাসে বহিষ্কার করা হয়েছে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে।

ওদিকে অনলাইন আল জাজিরা লিখেছে, ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে সোমবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজধানী ঢাকা ও বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে বিক্ষোভ করেছেন। শনিবার ঢাকা ও নয়াদিল্লি বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ফেনী নদী থেকে ভারতকে ১.৮২ কিউসেক (প্রতি ঘণ্টায় ১,৮৫,৫৩২ লিটার) পানি নিতে অনুমোদন দিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর সমালোচনা করে আবরার একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। এ জন্য তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এতে আরো বলা হয়, কয়েক দশক ধরে নদীর পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি করতে এক রকম সংগ্রাম করছে ঢাকা ও নয়াদিল্লি। গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে একটি বিতর্কিত চুক্তিকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন দেখা হয় এমন একটি চুক্তি হিসেবে, যা থেকে সুবিধা পায় ভারত। আবরারের এক সহপাঠী বলেছেন, ফেসবুকের পোস্টের কারণে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। এ এক উন্মাদনা। ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করেছে। আমরা এর বিচার চাই।

ফাহাদের পিতা ৫৭ বছর বয়সী বরকত উল্লাহ। তিনি সন্তান হারানোর বেদনায় মুষড়ে পড়েছেন। তবুও বলছেন, আমার ছেলে নিরপরাধ। সে তার জোরালো মতামত ব্যক্ত করেছে এবং এর জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে। ফাহাদের কাজিন আবু তালহা রাসেল (৩১) বলেন, পরিষ্কার প্রমাণ রয়েছে যে, কারা ফাহাদকে হত্যা করেছে। শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্ররা এবং তার বেশ কয়েকজন সহপাঠী আল জাজিরার কাছে ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দায়ী করে তাদের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। আল জাজিরা আরো লিখেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বলেছেন, শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ ও অতিরিক্ত ব্যথায় মারা গেছেন ফাহাদ। তাকে ভয়াবহ প্রহার করা হয়েছে থেঁতলানো কোনো কিছু দিয়ে। সেটা হতে পারে ক্রিকেট স্ট্যাম্প অথবা বাঁশের লাঠি।

এ হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে রাজশাহীতে। সেখানে বড় বড় সড়কগুলো অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষকরাও যোগ দেন বলে মনে করা হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্রকে আটক করা হয়েছে। তাদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত এবং এই হত্যার সঙ্গে জড়িত। এর আগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার আবদুল বাতেন সাংবাদিকদের বলেছেন, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজের ওপর ভিত্তি করে চিহ্নিত করার পর তারা ওইসব শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়েছেন। তবে কি কারণে হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার মোটিভ এখনো জানায় নি পুলিশ। ওদিকে এই হত্যা নিয়ে জনগণের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।
আল জাজিরা লিখেছে, ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়ে ফাহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ছাত্রশিবির হলো বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রয়েছে সম্পর্ক। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহকারী সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু স্বীকার করেছেন, ফাহাদ ছাত্রশিবিরের কর্মী এমন সন্দেহে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাকে তার কক্ষ থেকে তুলে নিয়ে যান। ওদিকে বুয়েটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মাশুক এলাহি সাংবাদিকদের বলেছেন, ঘটনার রাত ৩টার দিকে শেরে বাংলা হলের শিক্ষার্থীরা তাকে ডেকে নেয়। তার ভাষায়, আমি হলে গেলাম। দেখলাম সিঁড়ির কাছে পড়ে আছে একটি মানুষের দেহ। ততক্ষণে সে মারা গেছে। তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আইন তার নিজস্বগতিতে চলবে। তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের দায়ী পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই হত্যার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের হাত রক্তে রঞ্জিত। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমরা এক মৃত্যু উপত্যকায় বসবাস করছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীও। তিনি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সহিংসতা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। গত মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানিকে বরখাস্ত করেছেন তাদের পদ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, ছাত্রশিবিরে যুক্ত থাকার অভিযোগে অথবা সরকারবিরোধী পোস্ট ফেসবুকে দেয়ার কারণে একজন সহপাঠী ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের অধিকার ছাত্রলীগকে কে দিয়েছে? তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ছাত্রলীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাদের প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।

ওদিকে প্রায় একই রকম কথা লিখেছে ভারতের অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। এতেও বলা হয়, বুয়েট শিক্ষার্থী ফাহাদ হত্যার ব্যাপক প্রতিবাদ করেছেন বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে যোগ দিয়েছেন শিক্ষকরা পর্যন্ত।