Monday, June 9, 2014

চীনে নেকেড কর্মকর্তা বাছাই অভিযান

চাকরি করেন দেশে, কিন্তু স্ত্রী-সন্তান বাস করেন বিদেশে- এমন হাজারো সরকারি কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করেছে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডং প্রদেশের কর্তৃপক্ষ। ওইসব কর্মকর্তাকে তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বলা হয়েছে। নয়তো তাদের চাকরি হারানো বা পদাবনতির হুমকি দেয়া হয়েছে। গত বছর দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা বো জিলাই। তিনিও তার ছেলেকে পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে পাঠিয়েছিলেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার বরাত দিয়ে রোববার বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। চীনের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের স্ত্রী ও সন্তান দেশের বাইরে থাকেন, তাদের নেকেড কর্মকর্তা হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ ধরনের প্রবণতা বেআইনি নয়। কিন্তু তা দুর্নীতির জন্য সহায়ক। এর মধ্য দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা দেশের বাইরে অর্থ পাঠানোর সুযোগ পান বলে মনে করা হয়। এ কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের স্ত্রী-সন্তানদের বিদেশে পাঠানো বন্ধের পক্ষে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা।

শুদ্ধ আওয়ামী লীগ চাই, হাইব্রিড নয়

একেবারে দলকানা অথবা স্তাবক না হলে সবাই স্বীকার করবেন, বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে একধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছে। আমার এই মন্তব্যে অনেকে ক্ষুব্ধ হতে পারেন, তার পরও সত্য কথাটি না বললে নিজেকে নিজের কাছে অপরাধী মনে হবে। প্রতিদিন সকালে যখন পত্রিকার পাতা খুলি আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্যে দিনের বেলায় খুনের খবর পড়ি; তখন স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের অবস্থার কথা মনে পড়ে যায়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্র জামায়াত আর ইসলামী ছাত্র সংঘের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা। তারা কৌশলে তখন লেবাস পাল্টে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল), পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন চীনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মিশে যায়। এসব দলই ছিল গলাকাটা রাজনীতির প্রবক্তা। গঠিত হয় জাসদ আর গণবাহিনী। অনেকে সেখানে গিয়েও ভিড় করে। এরা সবাই জোটবদ্ধ হয়ে তখন শুরু করে দেশের ভেতর নানা ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড আর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বেপরোয়াভাবে হত্যা। আজ এই পাটের গুদামে আগুন লাগে তো কাল ওই নেতাকে হত্যা করা হয়। এই সময় সবচেয়ে ভয়াবহ অন্তর্ঘাতমূলক ঘটনাটি ছিল ঘোড়াশাল সার কারখানার কন্ট্রোল রুমে বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণে কারখানার শুধু ব্যাপক ক্ষতিই হয়নি, একই সঙ্গে নিহত হন বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আবদুল হক ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ‘আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন করে চিঠি লিখে তাঁর কাছে শেখ মুজিবকে উৎখাত করার জন্য অর্থ, অস্ত্র ও বেতারযন্ত্র সহায়তা চান, যা ভুট্টো তাঁর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিগত সহকারীর কাছে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার জন্য পাঠিয়ে দেন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষের হাতে দলের প্রায় ৭০ জন নেতা-কর্মী নিহত হন, যাঁদের মধ্যে কয়েকজন সাংসদও ছিলেন। পরিস্থিতি দ্রুত ক্রমাবনতির দিকে যেতে থাকে। একটি নতুন অনভিজ্ঞ সরকারের জন্য এটি ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসবের প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন করেছিলেন, যাঁদের সবাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এঁদের অনেকেরই নিয়মিত সেনাবাহিনীতে যাওয়ার নির্ধারিত যোগ্যতার ঘাটতি ছিল। বঙ্গবন্ধু মনে করেছিলেন, এঁদের আধা সামরিক বাহিনীর আদলে গড়ে তুলে দেশের ক্রমাবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে কাজে লাগাবেন। কিন্তু এই কাজে তিনি খুব বেশি সফল হয়েছিলেন তা বলা যাবে না। ইদানীং রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে অনেক সমালোচনা শোনা যায়, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর রক্ষীবাহিনীর সব সদস্যকে জেনারেল জিয়া নিয়মিত সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণ করেন৷ স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হলেও বর্তমানের ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সারা দেশে সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে নিজেরাই নিজেদের খুন করছে।বাদ যাচ্ছে না ছাত্রলীগের হাতে ছাত্রলীগ খুন বা যুবলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, রাজশাহী—কোনো অঞ্চল বা জেলা বাদ যাচ্ছে না। নিজেদের মধ্যে এই হানাহানির সুযোগ নিচ্ছে প্রধানত জামায়াত-শিবির। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে তারা ছাত্রলীগের একজন নেতার পায়ের গোড়ালি কেটে দুই টুকরা করে দিয়েছে, তার নৃশংসতা নজিরবিহীন। সার্বিক বিচারে এটা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, আওয়ামী লীগ নামক দলটির অস্তিত্ব এখন অনেকটা হুমকির মুখে।
দলের প্রধান শেখ হাসিনাই এই দলটির হাল ধরে রেখেছেন। সম্প্রতি আমার সুযোগ হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে তাঁর সঙ্গে জাপান যাওয়ার। তাঁর এই সফর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সফল, কথাটি যাঁরা অস্বীকার করবেন, বলতে হয় তাঁরা শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতাই করছেন অথবা তাঁদের মধ্যে একধরনের হীনমন্যতা কাজ করে। যাত্রার আগে ও বিমানের ভেতরে অনেকে আমাকে বলেছেন, ‘একজন শেখ হাসিনা দেশের জন্য কত কষ্ট করেন, কিন্তু তাঁর সব অর্জন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দেন তাঁর নিজ দলেরই কিছু অপরিণামদর্শী নেতা-কর্মী, স্রেফ ব্যক্তিস্বার্থে। তাঁর চারপাশে যাঁরা তাঁকে ঘিরে থাকেন, তাঁরা কতটুকু তাঁর বা দলের মঙ্গল চান তা কি তিনি ভেবে দেখেছেন?’ দেশে ফেরার পর অনেকে জানতে চান, এই প্রসঙ্গে আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কোনো কথা হয়েছে কি না। বলি, তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। এঁরা সবাই যে সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তা নয়, কিন্তু তাঁরা শেখ হাসিনার বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। তাঁরা তাঁর সরকারের বিকল্প দেখছেন না। এঁদের প্রায় কারও ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। পটুয়াখালী থেকে একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ফোন করে জানান, তাঁর বয়স ৮৫। তিনি সেই বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে আওয়ামী লীগের একজন সমর্থক। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দলটি কোনো ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হোক, দেখতে চান না। তাঁর মতে, এক ছাত্রলীগই এই দলটির সর্বনাশ করছে। তাঁকে বলি, যারা এই কাজটি করছে তারা ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্ত।ছাত্রলীগের আদর্শে বিশ্বাস করে তেমন কোনো ব্যক্তি এমন আত্মঘাতী কাজ করতে পারে না। সেই স্কুলশিক্ষক তার পরও অনুরোধ করেন, আমি যেন এই দুর্বৃত্তদের কথা লিখি। তাঁকে বলি, ছাত্রলীগ নিয়ে কিছু লিখতে চাই না কারণ,
এতে তেমন কোনো কাজ হয় না। একবার লিখেছিলাম। ফল হয়েছিল, তারা আমাকে আমার আগের কর্মক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল। সুযোগ পেলেই নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর আর পাবনার কথা সবাই বলেন। বলেন, এসব এলাকার ‘গডফাদারদের’ দল থেকে বহিষ্কার করলে দলের কোনো ক্ষতি নেই। একই সঙ্গে ছাত্রলীগ আর যুবলীগ নামধারীদের লাগাম টেনে ধরলে সাধারণ মানুষের কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বাস্তবে আওয়ামী লীগের এই শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতের সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। দলের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে সভানেত্রী একাধিকবার বলেছেন দলের ভেতরে, বিশেষ করে ছাত্রলীগে অনেক জামায়াত-শিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং এর ফলে মূল দল এবং ছাত্রলীগ উভয়ই হাইব্রিড ‘নেতা-কর্মী’ দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছে৷ এর দায়-দায়িত্ব তো একান্তভাবে দলকেই নিতে হবে। বুঝতে হবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে জামায়াতের অস্তিত্ব এখন হুমকির সম্মুখীন। তারা চাইবেই যেভাবে হোক তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এবং দলের ক্ষতি করার জন্য আওয়ামী লীগের ভেতরে অনুপ্রবেশ করতে। এই পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সতর্ক হওয়ার বদলে অনেককে দেখা যাচ্ছে, তাদের ফুলের তোড়া দিয়ে সাদরে দলে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছেন। এই নেতারা নিশ্চয় এত বোকা নন যে এটা বুঝতে অক্ষম—কেউটে সাপের বাচ্চা কেউটে সাপই হয়। দলের জন্য এমন একটি কাজ যে চরম আত্মঘাতী, তা বোঝার জন্য কোনো বড় মাপের নেতা হওয়ার তো প্রয়োজন নেই। এরই মধ্যে আবার শুরু হয়েছে জামায়াতকে দল হিসেবে নিষিদ্ধ করা নিয়ে আইনমন্ত্রীর দেওয়া একটি বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা। এমনিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারের রায় প্রকাশে বিলম্বের কারণে কিছুটা হলেও বিভ্রান্তি আর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। তার ওপর জামায়াতের বিচার নিয়ে আইনমন্ত্রীর এই অপ্রয়োজনীয় উক্তি। পরিস্থিতিকে আরও একটু ঘোলাটে করে দিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তাঁর মিন্ত্রসভার সদস্যকে সমর্থন করলেন।
এসবের কোনোটাই প্রয়োজন হতো না, যদি আইনমন্ত্রী বিষয়টা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করতেন। দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার অনেক আইন আছে। একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ঠিকই জানেন কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের আইনমন্ত্রী তাঁর বাবার মতো একজন প্রথিতযশা আইনজীবী, কিন্তু এখনো সম্ভবত তিনি একজন রাজনীতিবিদ হয়ে উঠতে পারেননি। গণজাগরণ মঞ্চকে প্রতিপক্ষ বানানোর মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। এর ফলে সাধারণ মানুষ ভুল সংকেত পাচ্ছে। এসব থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্যই ক্ষতির কারণ। এসব বিষয় কেবল একজন শেখ হাসিনাকে বুঝলে হবে না, বুঝতে হবে দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে। সাধারণ মানুষের অনেককে বলতে শুনেছি, তাঁরা ‘বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে’ ফেরত চান। তাঁদের বলি, চাইতে দোষ নেই, কিন্তু তা কতটুকু পাওয়া যাবে তা নির্ভর করে দলের অর্বাচীন নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে শেখ হাসিনা কতটুকু কঠোর হতে পারেন তার ওপর৷ তাঁদের অভয় দিয়ে বলি, সাম্প্রতিক কালে শেখ হাসিনা কিছু কিছু ব্যাপারে একাধিক কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনিই দলকে সঠিক পথে আনতে পারেন। এরই মধ্যে মঙ্গলবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হলো। সেই সভায় তিনি সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সব পর্যায়ের নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন।হুঁশিয়ার করেছেন দলের অর্বাচীন নেতা-কর্মীদের। এই কাজ তিনি আগেও করেছেন, কিন্তু তা তেমন একটা কাজে আসেনি। দলের সাধারণ সম্পাদকের এলাকায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে কোনো কাউন্সিল হয় না বলে আমাকে বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন। পরিস্থিতি যদি তেমনটা হয়, তাহলে দলের অবস্থা তো দুর্বল হবেই। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার চেয়ে দলে সময় দেওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তেমন নেতা আওয়ামী লীগে কজন আছেন? আগেও বলেছি, আবারও বলি—সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় মনে হয়, শেখ হাসিনা একাই পাহাড় ঠেলছেন৷ এ অবস্থায় খুব বেশি দূর অগ্রসর হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের বিকল্প আওয়ামী লীগ নিজেই, তবে তা হতে হবে শুদ্ধ আওয়ামী লীগ, হাইব্রিড নয়।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

জোচ্চোরদের কেন চরম দণ্ড দেওয়া হবে না?

একের পর এক যেসব ঘটে যাচ্ছে, তাতে করে নতুন ঘটনার ছায়ায় অপেক্ষাকৃত পুরোনো অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। সব ছাপিয়ে এখন সবার দৃষ্টি নারায়ণগঞ্জে। এর মধ্যেই উঠল মোদি–ঝড়। সঙ্গে সঙ্গে সবাই ঝাপিয়ে পড়ল, কে কার আগে অভিন্দন জানাবে এবং এর মাধ্যমে দিল্লিতে একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হবে, ‘আমি তোমাদেরই লোক’। এই ডামাডোলে প্রায় অলক্ষ্যে চলে যেতে বসেছে এ দেশে ঘটে যাওয়া বড় কেলেঙ্কারিগুলোর একটি, ক্রেস্ট নিয়ে সমুদ্রচুরি। একটা আপ্তবাক্য প্রায় সবারই জানা, চকচক করলেই সোনা হয় না। গণমাধ্যমের কল্যাণে তা আবার প্রমাণিত হলো। মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননার প্রতীক এই ক্রেস্ট নিয়ে যে জোচ্চুরি হলো, তা নিছক দুর্নীতি হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। জাতি হিসেবে আমরা বেইজ্জত হয়েছি। আর যারা এ কাজ করল, তারা এটা করার সাহস পেল কোথায়। তা নিয়ে গলদঘর্ম হচ্ছেন অনেকেই। এ নিয়ে তদন্ত হয়েছে, হয়তো আরও হবে। একটি কমিটি প্রতিবেদনও দিয়েছে। কয়েকজন ‘অপরাধী’কে শনাক্ত করাও হয়েছে। অবশ্য তঁাদের বিচারের আওতায় আদৌ আনা হবে কি না, আনলেও সাজা হবে কি না, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ আছে। এ দেশে অপরাধীরা যদি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পক্ষভুক্ত হয়, তবে তাদের সাত খুন মাফ, এ রকম ধারণা আমজনতার। ‘ভুল’ করে যদিও বা কেউ দণ্ড পেয়ে যান, মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাঁর বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে ওই অপরাধীকে মাফও করে দিতে পারেন। ইতিমধ্যে অনেক খুনি আসামিও রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা পেয়ে গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। হয়তো এমনও হতে পারে, ‘মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের কথা বিবেচনা করে’ ক্রেস্ট কেলেঙ্কারির খলনায়কদের লঘু শাস্তি কিংবা ভর্ৎসনা করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এ দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জাল-জুয়াচুরি হয়েছে অনেক এবং তা হয়েছে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলোর ইচ্ছায় কিংবা প্রশ্রয়ে। দেশটা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধায় ছেয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নানা রকম ‘সুযোগ-সুবিধা’ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে পণ্য করার যে কুৎসিত পরিকল্পনা দেশে চালু আছে, তার ফলে মুক্তিযুদ্ধের একটা সনদ এখন খুবই মূল্যবান। কোনোমতে একটা সনদ জোগাড় করতে পারলেই চাকরিতে কোটার সুবিধা হচ্ছে বংশপরম্পরায়, প্লট পাওয়া যাচ্ছে, ভাতাও বাড়ছে দিনকে দিন। আর চাকরির মেয়াদ বাড়ছে। গরিব মানুষের কষ্টের রোজগার থেকে সংগ্রহ করা খাজনার টাকায় এই লুটপাট চলছে মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে ব্যবহার করে। প্রয়োজনের সময় একজন তরুণ সর্বস্বপণ করে লড়াই করবেন দেশ ও মানুষের মুক্তির জন্য। এটা তো বিবেকের তাড়না থেকেই উৎসারিত হওয়ার কথা। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তো আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। একটাই লক্ষ্য ছিল, দেশকে শত্রুমুক্ত করে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এটা তো কোনো চাকরি ছিল না? যখনই সুযোগ–সুবিধা দেওয়া শুরু হলো, তখনই থেকেই শুরু হলো এর অপব্যবহার। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর যঁারা মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন, আজ তঁাদেরই জয়জয়কার। মুক্তিযোদ্ধার সনদ লেনদেন করে অনেকেই আখের গুছিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। মুক্তিযুদ্ধকে বিক্রি করে একটা সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে উঠেছে। এঁরাই এখন নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেন, এঁরাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখেন, এঁরাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাগাড়ম্বর করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেওয়া নিয়েও সমস্যা আছে। সত্যিকারের সব মুক্তিযোদ্ধার কি সনদ আছে? নেই।
সবাই তো আর একটা সনদ বা দুই বছর অতিরিক্ত চাকরি করার লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেননি। কিন্তু আমাদের সরকারগুলো সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করে তঁাদের স্বীকৃতি ও সম্মান দেওয়ার স্বাভাবিক দায়িত্বটুকু পালন করতে ও ব্যর্থ হয়েছে। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ নেওয়ার আবেদনপত্র দেখেছি। এটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন মনে হয় শুধু সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। অথচ এটা ছিল একটা জনযুদ্ধ, যাতে অংশ নিয়েছিলেন সর্বস্তরের মানুষ। সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধের প্রধান অবলম্বন ছিলেন ছাত্র-যুবারা। তাঁদের অনেকেই ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী, যাঁরা যুদ্ধ করেছেন রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যে। আমার জানামতে, বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডারদের আওতার বাইরে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের অনেক সদস্য আলাদা প্রশিক্ষণ পেয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই কোনো সনদ পাননি এবং এ জন্য তাঁদের খুব একটা আক্ষেপ আছে বলেও মনে হয় না। কিন্তু যখন অন্যদের, যঁাদের মধ্যে অনেকেই সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা এবং অনেকেই ভুয়া, এঁরা যখন সনদ এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেতে শুরু করলেন, তখনই প্রশ্ন উঠল অবিচার এবং বৈষম্যের। এখানে আমি একটা উদাহরণ দিতে চাই। কয়েক বছর আগে একটা বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে মরণোত্তর সনদ দেন। এঁদের মধ্যে মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক শেখ ফজলুল হক মণি এবং মুজিব বাহিনীর সদস্য শেখ জামালও আছেন। এটা করে প্রধানমন্ত্রী সুবিবেচনার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁরা দুজন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্য।
অথচ আমার জানামতে, মুজিব বাহিনীর সদস্য ছিলেন সাত হাজার। তাহলে আর যঁারা আছেন, তাঁরা কেন সনদ পাবেন না? একটি সনদের জন্য আবেদনপত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারাইবা কেন ছোটাছুটি করবেন? এটা তো রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁদের খুঁজে বের করা এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্বীকৃতি দেওয়া? এঁদের তালিকা সংগ্রহ করা তো তেমন কঠিন কাজ নয়৷ এঁদের চার অধিনায়কের একজন এখনো প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার সদস্য৷ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দুটো ঘোরতর অন্যায় কাজ হয়েছে। সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধাদের অনেককেই অবহেলা এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অনেককেই প্রশ্রয় ও মদদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান করা হয়েছে। শেষমেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দিতে গিয়ে আমাদের বিদেশি বন্ধুদের ইমিটেশন ক্রেস্ট দিয়ে জালিয়াতি করে সারা দেশ ও জাতিকে ছোট করা হয়েছে। যারা এটা করেছে, তাদের কি বিচার হবে? আমাদের পেনাল কোডে জালিয়াতির জন্য কী ধরনের সাজা বরাদ্দ আছে জানি না। ছোটবেলায় রূপকথার গল্পে পড়েছি, এককালে রাজা-রানিদের সুশাসন ছিল। বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খেত। ন্যায়বিচার ছিল। বিচারে বড় অপরাধীদের শূলে চড়ানো হতো। এ সময় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতো এবং সবাই ধন্য ধন্য করত। প্রজারা মহাসুখে বসবাস করত। আমাদের পেনাল কোডে শূলে চড়ানোর বিধান নেই। এটা হয়তো মানবাধিকারকর্মীদের পছন্দ হবে না। রাজা-রানিদের আমলে তো মানবাধিকার সংগঠন ছিল না৷ আমাদের পেনাল কোডে গুরুতর অপরাধীদের জন্য ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলার বিধান আছে। সোনা-রুপা গায়েব করে দেওয়ার জন্য হয়তো এ রকম দণ্ড নেই। কিন্তু লোভের বশবর্তী হয়ে যারা একটা জাতির সম্মান খুন করতে পিছপা হয় না, তাদের কোনো চরম দণ্ড দেওয়া হবে না?
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com

পাবনায় খুনের মিছিল

কেবল একটি জেলায় পাঁচ মাসে ৩২ জন কিংবা দেড় বছরে ১২১ জন মানুষের খুন হওয়ার ঘটনা মোটেই স্বাভাবিক বলা যায় না৷ পাবনায় প্রথম আলোর সরেজমিন প্রতিবেদনে এই অস্বাভাবিক তথ্যই বেরিয়ে এসেছে৷ নারায়ণগঞ্জ, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরে উপর্যুপরি হত্যাকাণ্ডের পর পাবনার এই চিত্র কিসের ইঙ্গিত দেয়? সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যতই স্বাভাবিক বলে দাবি করুক না কেন, কেবল পাবনা নয়, সারা দেশেই জনজীবন হয়ে পড়েছে প্রায় নিরাপত্তাহীন৷ গত বছরের খুনখারাবি ও রাজনৈতিক সংঘাতের দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানো গেলেও গত ৫ জানুয়ারির পর সেটি আর ধোপে টেকে না৷ ১০ মে জেলার আতাইকুলা উপজেলায় স্থানীয় বিএনপির নেতা ইব্রাহিম মৃধা নিহত হওয়ার পর ৩১ মে পুষ্পপাড়া হাটে দিনদুপুরে ঝটিকা হামলা চালিয়ে চারজনকে খুন করা হয়৷ খুনের ধরন দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, এটি চরমপন্থীদের কাজ৷ এই ঘটনায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা সুলতান আহমেদ সিকদারসহ দুই ব্যক্তি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলেও অন্য দুজন দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ৷ একদা চরমপন্থীদের ঘাঁটি বলে পরিচিত পাবনায় ফের যে তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলিই তার প্রমাণ৷ আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আগে নানা বাহিনীর নামে প্রকাশ্যে চরমপন্থীরা তৎপরতা চালালেও এখন বিভিন্ন দলে ঢুকে খুনখারাবি চালাচ্ছে৷ পুষ্পপাড়ার হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষমতাসীনেরা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করেছে৷ অন্যদিকে, বিএনপির দাবি, হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই চরমপন্থী দলের মধ্যে বিরোধের জের ধরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে৷
একসময় আতাইকুলা উপজেলায় বিএনপি-জামায়াতের আধিপত্য ছিল৷ কিন্তু গত নির্বাচনের পর স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ায় সেই আধিপত্য অনেকখানি খর্ব হয়৷ আর যাঁরা যোগ দিয়েছেন, তাঁরা একসময়ে চরমপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন৷ এলাকার আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে চরমপন্থীদের দলে টানা বা ব্যবহার করার পরিণতি যে ভয়ংকর হতে পারে, নিকট অতীতে তার অজস্র উদাহরণ থাকলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মোটেই আমলে নিচ্ছে না৷ এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে উত্তরাঞ্চলে চরমপন্থীদের হাতে একজন প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজা খুন হওয়ার ঘটনায় সরকারি দলের মদদেই জেএমবি তথা বাংলা ভাইয়ের উত্থান হয়েছিল৷ এবার কে কোন পক্ষকে ব্যবহার করছে, সেটি খুঁজে বের করতে হবে নিরপেক্ষভাবেই৷ এ ক্ষেত্রে পক্ষপাত দেখালে পরিস্থিতিরই কেবল অবনিত হবে না, অপরাধীরাও পার পেয়ে যাবে৷ এসব ঘটনা বিরোধী দলের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের অপপ্রয়াস, না সরকারি দলের একচ্ছত্র দৌরাত্ম্যের ফল, সেটিও খুঁজে বের করা জরুরি৷ ধারণা করা হয়েছিল, শেখ হাসিনার আমলে চরমপন্থীদের আস্তানাগুলো উপড়ে ফেলা গেছে, এত দিন সরকারের তরফ থেকে সে ধরনের দাবিই করে অাসা হচ্ছিল৷ কিন্তু পাবনার ঘটনা বিপরীত বার্তাই দিচ্ছে৷ অতএব, যা করার এখনই করুন৷