Saturday, March 5, 2016

ভারতের ভেতর ‘আজাদি’ চাই

রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তিন সপ্তাহ কারাবাসের পর বৃহস্পতিবার থেকে বীরের বেশে নিজের প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরলেন কানাইয়া কুমার। বুধবার তাকে ছয় মাসের জমিন দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের এই সভাপতি এখন ভারতের জনগণের সত্যিকারের বীর। দিল্লির তিহার জেল থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুক্তি পাওয়ার পরই প্রিয় ক্যাম্পাসে প্রত্যাবর্তন করেন কানাইয়া। এদিন রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন কানাইয়া, বক্তৃতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজিপি) সরকার ও বিজেপির মাতৃসংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সমালোচনা করেন। এসময় বার বার ‘আজাদি’ বা মুক্তির কথা বলেছেন কানাইয়া। এই ‘আজাদি’ স্লোগানের জন্যই তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা ঠোকে ভারতের বিজেপি-আরএসএস সরকার। কানাইয়া তার প্রত্যাবর্তন ভাষণে বলেন, আমি ভারত থেকে স্বাধীনতা (আজাদি) চাইছি না, চাইছি ভারতের ভেতর (আজাদি) স্বাধীনতা। তার এ বক্তব্যের সময় সমবেত ৩ হাজার শিক্ষার্থী হাততালি ও আজাদি স্লোগানে মুখর করে তোলে পুরো জেএনইউ ক্যাম্পাস। তিনি বলেন, ‘আজাদি পেটের ক্ষুধা থেকে, আজাদি দুর্নীতি থেকে, আজাদি মনুবাদ থেকে।’ কানাইয়া তার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে বিদ্রুপ করে বলেন, উনি সংসদে স্তালিনের কথা বলেছেন, ক্রুশ্চেভের কথা বলেছেন। সে সময় আমার মনে হয়েছিল টিভি স্ক্রিনে ঢুকে ওর স্যুট ধরে জিজ্ঞাসা করি,
একটু হিটলারের কথা বললেন না তো?’ বক্তব্যে কানাইয়া অভিযোগ করে বলেন, কালো টাকা ফেরত আনা, ‘সাবকা সাথ সাবকা বিকাশ’ (সবার সঙ্গে সবার বিকাশ) স্লোগান রক্ষা করতে পারেননি মোদি। কথা বলেন মোদির রেডিও অনুষ্ঠান ‘মান কি বাত’ (মনের কথা) এবং টুইট ‘সত্যমেভ জয়তী’ (সত্যের জয় হবে) নিয়ে। তার দীর্ঘ বক্তব্যের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি তুলে ধরেছে হিন্দুস্তান টাইমস। এর আগে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে (জেএনইউ) কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী আফজাল গুরুর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে (৯ ফেব্রুয়ারি) ‘দ্য কাট্রি উইথদাউট ?এ পোস্টঅফিস’ শিরোনামে একটি কবিতা পাঠের আসরের আয়োজন করে কয়েকজন শিক্ষার্থী। অনুষ্ঠানে ভারতবিরোধী স্লোগান দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নেতা কানাইয়া, উমর খালেদ, অনির্বানসহ ৬ ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। গ্রেফতার হন কানাইয়া। কানাইয়া কুমারের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ভারতের গত ২৫ বছরের মধ্যে নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানুষের মুক্তি- এসব ইস্যুতে এ আন্দোলনে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, লেখক-সংস্কৃতিকর্মীরা যুক্ত হয়েছেন। ভারতের বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ আন্দোলনের সমর্থনে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ অব্যাহত আছে। নোয়াম চমস্কি, ওরহাম পামুকসহ বিশ্বের বেশ কয়েকজন লেখক-বুদ্ধিজীবী এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। সমর্থন জানিয়েছেন জেএনইউ-এর ছাত্রআন্দোলনকে। জেএনইউ ছাত্রনেতার বক্তব্য
১. আমরা ভারতের (ভারত রাষ্ট্রের) কাছ থেকে আজাদি (স্বাধীনতা) চাই না, ভারতে স্বাধীনতা চাই।
২. আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অনেক জায়গায় পার্থক্য আছে। তবে আমি তার টুইট সত্যমেভ জয়তীর সঙ্গে একমত। এই শব্দগুলো আমাদের সংবিধানে আছে।
৩. তারা (সরকার) কালো টাকা ফেরত আনা, কালো টাকা কমানো এবং সাব কা সাথ সাবকা বিকাশের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু তারা চায়, এসব অঙ্গীকারের কথা আমরা ভুলে যাই। আমরা জনগণকে এসব কথা ভুলতে দেব না।
৪. যত বেশি দমন করবে, তত বেশি রুখে দাঁড়াব। এটা দীর্ঘ লড়াই। মাথানত না করে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। আমরা আরএসএস ও বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ব। আমরা ইতিহাস গড়েছি, ইতিহাস গড়ব। আমরা লড়াই করব। আমরা জিতব।
৫. মোদিজি কেবল বলেছেন মান কি বাত (মনের কথা), কিন্তু তিনি তা শোনেন না।
৬. আপনি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে সাইবার সেল উল্টাপাল্টা ভিডিও বানিয়ে শায়েস্তা করবে আর হোস্টেলের কক্ষে কনডম গুঁজে দেবে।
৭. সীমান্তে যেসব সৈনিক মরছে, তাদের আমি স্যালুট জানাই। কিন্তু চরম দারিদ্র্যে নিপতিত হয়ে যেসব কৃষক আত্মহত্যা করছে, তাদের ব্যাপারে কী হবে? ওই কৃষকরাই বেশিরভাগ সেনার বাবা। আমার বাবা একজন কৃষক, ভাই সৈনিক।
৮. আমি যে গ্রাম থেকে এসেছি, সেখানে একটি জাদু দেখানো হয়। লোকজন জাদু দেখিয়ে আংটি বিক্রি করে। বলে, সে আংটি সব ইচ্ছা পূরণ করবে ... আমাদের দেশে এমন কিছু লোক আছে, যারা বলেন, কালো টাকা ফেরত আনা হবে, সবার বিকাশ হবে।

করের ভারে পাসপোর্ট ত্যাগের হিড়িক

করের যাতায় পিষ্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাসপোর্ট ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি সংখ্যায় আমেরিকান নিজের দেশের পাসপোর্ট ছাড়ছেন বলেও শুক্রবার সিএনএন মানির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং সেখানে দীর্ঘ মেয়াদে বসবাসরতদের দেশটির সরকারের সঙ্গে ‘আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক’ চুকিয়ে ফেলার হার আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড চার হাজার ২৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ সংখ্যা ২০০৮ সালের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটা প্রবণতা হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে সিএনএন মানি জানিয়েছে। কারণ হিসেবে বিদেশে বসবাসরত আমেরিকানদের কর সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ে জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ছয় বছর আগে নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর কর নিয়ে নাগরিকদের মাথাব্যথা আরও বেড়েছে বলে এতে বলা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ২৩১, ২০০৯ সালে ৭৪২, ২০১০ সালে ১৫৩৪, ২০১১ সালে ১৭৮১, ২০১২ সালে ৯৩৩, ২০১৩ সালে ৩০০০, ২০১৪ সালে ৩৪১৫ জন নাগরিকত্ব ছেড়েছেন। এদের বেশিরভাগই বিদেশে কর্মরত আমেরিকান। কর আদায়ের ক্ষেত্রে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ থেকে কঠোর নীতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নাগরিকদের সব ধরনের আয়ের ওপর কর আরোপ করা হয়েছে, তা যেখান থেকে আয় করা হোক বা নাগরিক যেখানে বসবাস করুক না কেন। ফলশ্র“তিতে বিদেশে বসবাসরত আমেরিকানদের জন্য করসংক্রান্ত বিপুল দাফতরিক কার্যক্রম এত জটিল হয়েছে যে, তারা বড় অংকের অর্থ খরচ করে অ্যাকাউন্টেন্ট ও আইনজীবী নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সমর্থকদের ধার-কর্জ শোধ করছি : মাশরাফি

প্রশ্ন : কাল রাত্তির থেকে আপনার দুটি ফোনই বন্ধ। বাংলাদেশী সাংবাদিকরাই বলছেন তারা যোগাযোগ করতে পারছেন না- এমন অবস্থা?
মাশরাফি : কাল রাতে প্রেস কনফারেন্স করলাম তো, যা বলার বলে দিয়েছি। তারপর ফোন বন্ধ করে রেখেছি।
প্রশ্ন : সেটাই তো অবাক লাগছে। গোটা বাংলাদেশ উদ্বেলিত টিমের এশিয়া কাপ ফাইনাল ওঠা নিয়ে। আর আপনি আসল লোক ফোন বন্ধ করে বসে আছেন? ফোন তো লোকে ম্যাচ হারলে বন্ধ করে?
মাশরাফি : আজকের (বৃহস্পতিবার) দিনটা রেস্ট নেয়ার জন্য রেখেছি। তাছাড়া জিতেছি বলে উচ্ছ্বাসে ভেসে যাব কেন? জীবনে প্রচুর হেরেছি। ইদানীং কিছু ম্যাচ জিতছি। জিনিসগুলো স্বাভাবিকভাবে নেয়াই ভালো।
প্রশ্ন : কী বলছেন, কাল ওইভাবে জেতার পর স্বাভাবিক থাকা সম্ভব নাকি? আপনার টিম তো উইনিং স্ট্রোকে বল বাইরে যেতে না যেতেই মাঠে ঢুকে একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল?
মাশরাফি : হ্যাঁ, ওটুকু হয়েছে। ড্রেসিংরুম অবধি খুব হয়ে থাকে। ওই পর্যন্ত। এর বাইরে হোটেলে গিয়ে আর একপ্রস্থ উল্লাস। কেক কাটা এগুলো হয় না। আমরা সব ড্রেসিংরুমেই ফেলে আসি।
প্রশ্ন : ক্রিকেট যেভাবে গোটা বাংলাদেশী সমাজকে এক করে দিয়েছে, এটা দেখে চমৎকৃত লাগছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী এসে এই যে তিন ঘণ্টা খেলা দেখছেন এটাও তো আশ্চর্য?
মাশরাফি : হ্যাঁ, উনি আসা মানে একটা দায়িত্ব চেপে যায় যে জিততে হবে।
প্রশ্ন : সেটা তো একটা বাড়তি চাপও যে ওনার সামনে খারাপ খেললে চলবে না?
মাশরাফি : না, চাপ তো নিতেই হবে। চাপ না নিলে চলবে কী করে।
প্রশ্ন : আমি বলতে চাইছিলাম ওই মুহূর্তটা। সাকিব ওরকম বিশ্রী আউট হলেন। উইকেটে মারলেন ব্যাট দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী বসে আছেন। আপনার টিম হারের মুখে। আর আপনি গিয়েই দুটি চার মেরে দিলেন। তাও কিনা আমিরকে। এটা করতে তো দম লাগে?
মাশরাফি : আমি ঠিক করে রেখেছিলাম ওভারে একটা বাউন্ডারি মারবই। ওই ওভারে প্রত্যেকটা বল চালাব এটা প্ল্যানই ছিল।
প্রশ্ন : সেটাই তো অবাক লাগছে। তখন আপনার উইকেট যাওয়া মানে তো বিপন্নতা আরও বাড়ত?
মাশরাফি : উপায় ছিল না। পরের ওভার অবধি রেখে দিলে শেষ দুই ওভারে মোটামুটি ২৩ রান করতে হতো। ওই ঝুঁকি নেব কেন? আমি তো পেছনে একজন ব্যাটসম্যান রেখেই দিয়েছিলাম। মিঠুনকে। আমার শুধু দেখার ছিল বল যাতে নষ্ট না করি। আউট তো প্রথম বলেই আউট।
প্রশ্ন : এই যে জাতীয় ক্রিকেট দলকে একাট্টা সমর্থনের জন্য এত মানুষ মিরপুরে জড়ো হচ্ছেন- এসব আগুনে সমর্থকদের সামনে খেলতে কেমন লাগে?
মাশরাফি : আমরা তো ক্রিকেট খেলে আমাদের দেশের জনগণকে কিছু দিতে পারিনি। দিনের পর দিন ওরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তখনও টিমে ভালো প্লেয়ার ছিল। সুমন ছিল। আশরাফুল ছিল। কিন্তু এক-দু’জন ভালো খেলত। টিমটা জিতত না। ২০০৭ ওয়ার্ল্ডকাপের ইন্ডিয়া ম্যাচটা আমরা প্রথম বড় খেলা জিতলাম। ওই ম্যাচটা যতদিন বেঁচে আছি মনে রাখব। কী কী প্লেয়ার ছিল ইন্ডিয়ার- শচীন, রাহুল, কুম্বলে, দাদা। ওই ম্যাচ থেকে আমাদের আত্মবিশ্বাস পাওয়া শুরু। ইদানীং আমরা দেশের মাঠে কিছু জিতছি। বলতে পারেন সমর্থকদের কাছে যে ধার-কর্জ হয়েছিল তার কিছু কিছু শোধ করছি। এবার বিদেশেও ভালো খেলতে হবে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে আপনার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু প্রেসবক্সেও আপনি যে সমর্থন পান ভাবা যায় না। আপনার বলের গতি কমে গেছে, নতুন পেসার চাই, এটুকু বলায় দু’দিক দিয়ে সিনিয়র দুই সাংবাদিক ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আপনাকে ঘিরে এই সøেহ অনুরাগের বলয় ভাবাই যায় না। এর রহস্য কী?
মাশরাফি : দেখুন, আমি শচীনের একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলাম। যেখানে ও বলেছিল, ভালো ক্রিকেটার তো অনেকেই হতে পারে। সঙ্গে ভালো মানুষ হওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি ওই কথাটা মনে রেখেছি। ক্রিকেট তো ক’দিনের। ভালো মানুষ হিসেবে যেন সবার মনে বেঁচে থাকতে পারি। তাই বলে চোট রয়েছে, সাতবার অপারেশন হয়েছে এই সহানুভূতি নিয়ে ক্রিকেট খেলতে চাই না। আমার যেন ছোট ছোট অবদান থাকে। হাফিজের উইকেটটা। আমার দুটি বাউন্ডারি। এগুলোও থাকতে হবে।
প্রশ্ন : আপনার ওপর বের হওয়া একটা বইয়ে কিছু কথা পড়ে রীতিমতো অবাক লাগল।
মাশরাফি : যেমন?
প্রশ্ন : যেমন আপনি বলেছেন, ক্রিকেটকে জাতীয়তাবাদের স্তম্ভ হিসেবে দেখাটা আপনি সমর্থন করেন না।
মাশরাফি : আমি নিজের মনের কথা বলেছি। আমি মনে করি, দিনের শেষে খেলাটা একটা বিনোদন। তাও তো ক্রিকেট হল স্পোর্টসের একটা অংশ। পুরো খেলা নয়। সেখানে এত হিরো ওয়ারশিপের দরকার কী?
প্রশ্ন : আপনার চোখে হিরো কারা?
মাশরাফি : সবচেয়ে বড় হিরো আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের জন্যই তো আজ স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা রয়েছি। আমি ওদের অসম্ভব সম্মান করি। আমি সম্মান করি বৈজ্ঞানিকদের। ওদের এক-একটা আবিষ্কার জাতিকে কত বছর এগিয়ে নিয়ে যায়। আমি সম্মান করি ডাক্তারদের। যারা মানুষের জীবন বাঁচান। এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে। আমাদের নিয়ে যত নাচানাচিই হোক, আমরা কি কারও জীবন বাঁচাতে পারি?
প্রশ্ন : একটা এত বড় ফাইনালে ওঠার পর আপনার মুখে কথাগুলো সত্যিই ব্যতিক্রমী।
মাশরাফি : আমি ভেতর থেকে বিশ্বাস করি, আমাদের সমর্থন করছেন খুব ভালো। আমার টিম কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই মেয়েটিকেও করুন যে এসএ গেমসে সোনা জিতে সবার অলক্ষ্যে ঢাকা ফিরেছে। আমরা যদি স্পোর্টসের লোক হই তো ওই মেয়েটিও স্পোর্টসেরই লোক। সাপোর্ট জীবনের সব বিভাগে করুন। তাহলেই তো বাংলাদেশ এগোতে পারবে। শুধু ক্রিকেটে পড়ে থেকে কী লাভ!
প্রশ্ন : আপনার ক্যাপ্টেন্সি মডেল নিয়ে সবাই এত উচ্ছ্বসিত। একটু বুঝিয়ে বলবেন মডেলটা ঠিক কী?
মাশরাফি : আমি যখন ক্যাপ্টেন হই তখন ক্যাপ্টেন্সি নিয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। বাবার সঙ্গে কথা বলি যে এত চোটাঘাত আর শরীরে সাতটা অপারেশন নিয়ে আমার ক্যাপ্টেন হওয়া আদৌ উচিত কিনা? বাবা বললেন, হয়েই যাও। তুমি পারবে। কিন্তু আমার মনে সেই ভয়। আবার না ইনজুরিতে পড়ি। ভাবলাম কেমন ক্যাপ্টেন হব আমি? মনে হল আমি যেমন আবেগপ্রবণ সৌরভ গাঙ্গুলীর স্টাইলের ক্যাপ্টেন্সিটাই আমাকে স্যুট করবে। ওই যে লর্ডসে জার্সি খোলা, ওটা নিয়ে কত কথা হয়েছে। কিন্তু আবেগ চাই ওটা করার জন্য।
প্রশ্ন : মনে হল আপনার সেই আবেগ আছে?
মাশরাফি : হ্যাঁ। তার পর ঠিক করলাম ড্রেসিংরুমটাকে ঠিক রাখতে হবে। ম্যাচ বাই ম্যাচ ভাবব। একসঙ্গে অনেকটা নয়। আর জুনিয়র-সিনিয়রে কোনো গ্যাপ হতে দেব না। ইউটিউবে অনেক ক্যাপ্টেনের ইন্টারভিউ এই সময় দেখে আমি ক্যাপ্টেন্সি ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করেছি। একটা শো রয়েছে ওখানে, যেখানে ভিভিএস লক্ষ্মণ আর দাদা ৪৫ মিনিট কথা বলেছেন। ওইটা শুনে আমি ঠিক করি ক্যাপ্টেন হিসেবে আমি কীভাবে এগোব। ম্যাচ হারতে পারি, কিন্তু আবেগটা যেন সত্যিকারের হয়। যেন সব সময় টিম সেরাটা দেয়।
প্রশ্ন : ফাইনালে কী হবে?
মাশরাফি : খুব পরিষ্কারভাবেই ভারত ফেভারিট। এটা তো র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বরের সঙ্গে দশ নম্বরের খেলা। আমাদের অবশ্য কনফিডেন্স আছে ভালো লড়ব। মুস্তাফিজকে মিস করছি। ও থাকলে পাকিস্তান ১০০ করতে পারত না। ও থাকলে ফাইনালে অনেক সুবিধা হতো। তবে লড়ব, যা হওয়ার হবে। আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে।

বিয়ের পর একসঙ্গে নাঈম-নাদিয়া

বিয়ের পর আলাদা আলাদা অভিনয় করলেও প্রথমবারের মতো একসঙ্গে অভিনয় করেছেন সদ্য বিবাহিত তারকা দম্পতি নাঈম ও নাদিয়া। বিয়ের পর দু’জনেই নিয়মিত শুটিংয়ে ফিরলেও একসঙ্গে কাজ করা হয়ে উঠেনি। অবশেষে সেই খরা কাটল। জুটি বেঁধে অভিনয় করা নতুন এ নাটকের নাম ‘কাঠফুল’। নাটকটি পরিচালনা করেছেন সৈয়দ ফয়েজ হাসান। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় একটি শুটিং হাউসে নাটকটির শুটিং শেষ হয়েছে।
এ নাটকে নাঈম একজন মাস্তানের চরিত্রে এবং তার বিয়ে হয়ে যাওয়া প্রেমিকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাদিয়া। নাটকটিতে অভিনয় প্রসঙ্গে নাদিয়া বলেন, ‘গল্প ভাবনা আমার কাছে নতুন। আমার চরিত্রটিতেও নতুনত্ব আছে। কাজটি করে ভীষণ ভালো লেগেছে। আশা করি দর্শক মুগ্ধ হবেন।’ নাঈম বলেন, ‘যেহেতু আমার চরিত্রটি একজন মাস্তানের। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার গেটআপে একটু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করতেই আমার ভালো লাগে। যে কারণে এতে অভিনয় করার সুযোগ থাকে।’ নাটকটি শিগগিরই একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হবে বলে নির্মাতা জানান।

দুই সন্তানকে হত্যা: জেসমিনের স্বীকারোক্তি বিশ্বাস করেন না পরিবার by নুরুজ্জামান লাবু ও রুদ্র মিজান

রামপুরার বনশ্রীতে দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করলেও মাহফুজা মালেক জেসমিনের স্বীকারোক্তি বিশ্বাস করেন না তার পরিবার। তাকে ফাঁসানো হচ্ছে বলেই মনে করেন তারা। হত্যার কারণ হিসেবে যে বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে তাও মানতে চান না তারা। পরিবারের দাবি, জেসমিনের মধ্যে মানসিক কোনো সমস্যা ছিল না। এমনকি তাদের পরিবারের কারও মধ্যে মানসিক কোনো সমস্যা নেই। প্রেম করে বিয়ে করলেও বেশ সুখেই ছিলেন আমান উল্লাহ আমান ও মাহফুজা মালেক জেসমিন দম্পতি। গতকাল সরজমিন ঢাকায় খালার বাসা ও জামালপুরের ইকবালপুরে গেলে আমান-জেসমিনের পরিবার, প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানান এসব তথ্য। এদিকে গতকাল আদালতে সোপর্দ করে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে নিহত দুই সন্তানের মা মাহফুজা মালেক জেসমিনকে।
জামালপুরের ইকবালপুর ঘুরে দেখা যায়, ঘটনার পর র‌্যাবের কাছে জেসমিনের স্বীকারোক্তির বিষয়টি প্রকাশের পর থেকে বাড়ির গেইটটি বন্ধ রয়েছে। দুই শিশুর শোকে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে ওই এলাকার। পাশের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সর্বত্র একই আলোচনা। সবার চোখে মুখে বিস্ময়। এটা কিভাবে সম্ভব? যথেষ্ট রক্ষণশীল ঘরানার, ভদ্র, মার্জিত হিসেবে পরিচিত জেসমিন নিজ হাতে তার দুই সন্তানকে হত্যা করেছে এটা মানতে নারাজ তারা। এই পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েছেন জেসমিনের পরিবারের সদস্যরা। কারও সঙ্গেই কথা বলতে চান না তারা। প্রতিবেশীরাও ওই বাড়ির ভেতরে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছেন না। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির গেইট খোলা হয় না। গতকাল দিনভর কয়েক দফা চেষ্টা করে ওই বাড়িতে ঢোকার সুযোগ পাওয়া যায়। টিনশেড পাকা ঘরের আঙ্গিনায় এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে জিনিসপত্র। একই অবস্থা ঘরের ভেতরের। ওই বাড়িতে জেসমিনের মা জুলেখা খাতুন, ভাই বুলবুল, তার স্ত্রী ও সন্তান থাকেন। জেসমিন ও তার দুই সন্তান হত্যার বিষয়ে তারা কেউ কোনো কথা বলতে চান না। ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শোনা যায়। কাঁদছিলেন জেসমিনের অসুস্থ বৃদ্ধা মা জুলেখা খাতুন। তিনি বলেন, আমার মেয়ে খুন করতে পারে না। নিজের বাচ্চাকে সে খুন করবে কেন। এগুলো সাজানো নাটক। অন্য কেউ দুই বাচ্চাকে খুন করেছে। জোর করে এখন তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে কারা খুন করতে পারে আমান-জেসমিন দম্পতির সন্তান নুসরাত আমান অরণি ও আলভী আমানকে এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারেননি তিনি।
কথা হয় জেসমিনের চাচাতো ভাই চর পলিশা জেএল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সোলায়মান সরকারের সঙ্গে। তিনি মনে করেন, আমান উল্লাহ আমানের ব্যবসায়িক কোনো শত্রু এটা ঘটাতে পারে। এছাড়া, হত্যাকাণ্ডের আগে ঢাকার বনশ্রীর ওই বাসায় দুই গৃহশিক্ষক ছিল। তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। সোলায়মান সরকার বলেন, জেসমিনের মানসিক কোনো সমস্যা ছিল না। এমনকি আমাদের পরিবারে কারও মানসিক সমস্যা নেই। এমন কী ঘটেছে যে, দুই সন্তানকে হত্যা করবে মা। জেসমিনের দুই বাচ্চা ভালো প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করতো। অর্থনৈতিকভাবেও তাদের কোনো সমস্যা ছিল না। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জেসমিন হতাশায় ভুগবে কেন? তিনি জানান, আমান-জেসমিন দম্পতি সুখি ছিল। আমান-জেসমিন পরস্পর চাচাতো ভাই-বোন। এই দম্পতির চাচাতো ভাই সোলায়মান সরকার জানান, ১৯৭৬ সাল থেকে জামালপুর সদরের ইকবালপুরে বাস করছেন তারা। পাশাপাশি তাদের বাবা-চাচা চারজনের বাসা। তবে আমানের পরিবারের লোকজন থাকতেন গ্রামে। চাচা আবদুল মালেক সরকারের বাসায় থেকে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে লেখাপড়া করতেন আমান। ওই সময় চাচাতো বোন জেসমিনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে আমানের। এ বিষয়ে আমানের বন্ধু রিলেশন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের প্রশাসনিক পরিচালক মাহবুব এ খোদা বলেন, ১৯৯৪ সালের দিকে আমানের সঙ্গে জেসমিনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। দীর্ঘদিন প্রেম করার পর ২০০২ সালে তাদের বিয়ে হয় পারিবারিকভাবে। বিয়ের পর থেকেই গার্মেন্ট সরঞ্জামের ব্যবসায় যুক্ত হয়ে বেশ ভালো করছিলো আমান। ২০০৯ সালে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। মাহবুব এ খোদা মনি বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো সমস্যা ছিল বলে জানা নেই। তবে নিজ বাচ্চাদের হত্যার যে কারণ প্রকাশ করা হয়েছে তাও বিশ্বাস করেন না তিনি। প্রতিবেশীরা জানান, জেসমিনের কাছে দুই সন্তান ছিল প্রাণের চেয়ে প্রিয়। জেসমিনদের বাসায় অগ্রণী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা কয়েক বছর ভাড়ায় থেকেছেন। তার স্ত্রী জানান, প্রতি বছরের ডিসেম্বর মাসে বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ হলে তাদের নিয়ে জামালপুরের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন আমান-জেসমিন। বাচ্চাদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। আলভী আমানকে নিজের কোলে ঘুম পাড়িয়ে তবেই ঘুমাতেন তিনি। কিন্তু এ বছরের ডিসেম্বরে তিনি বাড়িতে আসেননি। কেন আসেননি এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেসমিন ও আমানের চাচাতো ভাই সোলায়মান সরকার জানান, গত ২১শে ডিসেম্বর ঢাকা থেকে জামালপুরের উদ্দেশে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে যাত্রা করেন আমান। ময়মনসিংহ আসার পর হঠাৎ আলভী আমানের শরীরে বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। জেসমিন তখন বিচলিত হয়ে যান। পরে ঢাকায় ফিরে যান তারা। সেই জেসমিন নিজ হাতে তার দুই সন্তানকে হত্যা করবেন? এটা বিশ্বাস হয় না। ২৯শে ফেব্রুয়ারি দুই শিশু হত্যার পর গত ১লা মার্চ আমান-জেসমিন জামালপুরের বাসায় পৌঁছান। আশপাশের লোকজন তখন ভিড় জমান চারপাশে। সেখানে সেদিন উপস্থিত ছিলেন কামরুন নাহার কুয়াশা। প্রতিবেশী এই গৃহবধূ জানান, গাড়ি থেকে নামতেই চিৎকার করে কাঁদছিলেন জেসমিন। তারপর তাকে ধরে বাসার ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছু সময় পরপর মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানান, মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তখনও চাইনিজ খাবার খেয়ে বাচ্চা দুটির মৃত্যু হয়েছে বলে জানান জেসমিন। কামরুন নাহার জানান, পরবর্তীতে সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারেন বাচ্চা দুটিকে হত্যা করা হয়েছে। কামরুন নাহার জানান, বাড়িতে এলে অরণি তাদের বাসায় বেড়াতে যেতো। ঐশী নামে তাদের বোনঝির সঙ্গে খেলা করতো। সেই নিষ্পাপ অরণির মুখ আর কোনোদিন দেখা হবে না তা ভাবতেই পারছেন না তারা।
এদিকে আমানউল্লাহ আমানের বড় ভাইয়ের স্ত্রী মেলান্দহ ঝাউগড়ার বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ফাতেমা বিনতে মনসুর বলেন, আমানদের গ্রামের বাড়ি জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার উলিয়াবাহার রায়েরপাড়ায়। যমুনার ভাঙনে তা বিলীন প্রায়। যে কারণে ১৯৭৬ সাল থেকেই তাদের বাবা-চাচা চার জনের তিন জনই জামালপুরে বসবাস করছেন। ’৭৬ সালেই জন্ম হয় জেসমিনের। বাবা মৃত আবদুল মালেক সরকার ও মা জুলেখা খাতুনের এক পুত্র  ও তিন কন্যার মধ্যে জেসমিন সবার বড়।
বিশ্বাস করতে পারছে না বোন নীলাও: মাহফুজা মালেক জেসমিন তার নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারে, এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে- তা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না ছোট বোন আফরোজা মালেক নীলাও। বনশ্রীর বড় বোনের বাসার পাশের গলিতেই দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে থাকেন নীলা। গতকাল ওই বাসায় গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। নীলা বলছিলেন, আমার বোনের কথা আমরাও বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা কি করে সম্ভব? পাশাপাশি বাসা হওয়ায় আমি প্রায় প্রতিদিনই ওই বাসায় যেতাম। বোন কোনোদিন বলেনি এসব কথা। নীলা বলেন, ঘটনার দিন মাগরিবের নামাজের সময় আমাকে ফোন করে বড় আপা। দুই বাচ্চা অসুস্থ হওয়ার কথা জানায়। আমি দ্রুত গিয়ে একজন বিছানায়, একজন ফ্লোরে পড়ে আছে দেখতে পাই। আমি তাদের ডাকাডাকি করি। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। পরে বোনকে জিজ্ঞাসা করি কিভাবে এমনটা হলো? সে বলে আমি ঘুম থেকে উঠে এই অবস্থায় দেখি। দুই বাচ্চা বাসি চাইনিজ খাবার খেয়েছিল বলেও জানায় বড় আপা। কিছুক্ষণের মধ্যে জাহিদ ভাই ও হ্যাপী ভাই আসে। পরে আমি আলভীকে ও ওরা অরণিকে ধরে নিচে নামায়। নিয়ে যায় আল-রাজী হাসপাতালে। সঙ্গে আমার বোনও ছিল। সে তখন কান্নাকাটি করছিল। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখানে মৃত্যুর খবর পেয়ে আমার বোন মাটিতে গড়াগড়ি করে কাঁদছিল। সেখান থেকে স্বজনরা আমাদের আবার বাসায় নিয়ে আসে। নীলা বলেন, সারারাত আমি ওই বাসায় ছিলাম। এসময় আমার বোন বলেছিল যে ছেলে-মেয়েগুলোকে কাটা ছেঁড়া (ময়নাতদন্ত) করার দরকার নাই। আমার চোখের মণিদের আমি কাটতে দেবো না। কেন এই কথা বলেছিল আমার জানা নেই। সবাই তাকে বোঝায় যে, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীকে ধরতে হলে পোস্টমর্টেম করতেই হবে। পরদিন সকালে আমরা জামালপুর চলে যাই। স্বজনরা বলছিল, অরণি ও আলভীর লাশ মেডিকেল থেকে সোজা জামালপুরে নেয়া হবে। একারণে আমরা এদিক থেকে আগেই জামালপুরে রওনা দেই। নীলা বলেন, আমার বোন হত্যা করতে পারে এটা আমাদের ধারণাতেও ছিল না। আমরা এমনটা চিন্তাও করি নাই। বোনের স্বীকারোক্তি বিষয়ে জানতে চাইলে নীলা বলেন, এখন কেন সে এই কথা বলছে তা বুঝতে পারছি না। এমন সামান্য কারণে নিজ সন্তানদের হত্যা করবে এমনটা ভাবতেই পারছি না। এসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন নীলা।
৫ দিনের রিমান্ডে মা: ঢাকার রামপুরায় দুই শিশু খুনের ঘটনায় তাদের বাবার করা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মা মাহফুজা মালেক জেসমিনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুস্তাফিজুর রহমান জেসমিনকে ঢাকার হাকিম আদালতে হাজির করে দশ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। এসময়  আসামি পক্ষের আইনজীবী সাফায়েত আলী জামিনের বিরোধিতা করেন। এসময় তিনি বলেন,  মাহফুজা মালেক জেসমিনের মানসিক চিকিৎসা দরকার। রিমান্ডে নিলে তা হবে না। এসময় এজলাসে উপস্থিত কয়েকজন আইনজীবী সাফায়েত আলীকে শুনানিতে বাধা দেন। তাকে এই মামলা থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান তারা। এই হট্টগোলের মধ্যেই মহানগর হাকিম স্নিগ্ধা রানী চক্রবর্তী জামিন আবেদন নাকচ করে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালত সূত্র জানায়, রিমান্ড শুনানির আগে ঢাকার হাকিম আদালতে দুই শিশুর হত্যাকারী হিসেবে স্বীকার করা মা মাহফুজা মালেক জেসমিন চুপচাপ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাকে এসময় ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ভাবলেশহীন অবস্থায় এক পলকে তাকিয়ে ছিলেন। এজলাসে আনা-নেয়ার সময় সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাবও দেননি তিনি। বিকালে রামপুরা থানার পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তিনি একটু বমি করেন। কয়েকদিনের ধকলে তিনি অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
‘আমার সব শেষ হয়ে গেলো’: নিজের দুই সন্তানকে মা হত্যা করেছে এই তথ্য জানতে পেরে পাগলপ্রায় হয়ে গেছেন গার্মেন্ট এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী আমানউল্লাহ আমান। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে র‌্যাব হেফাজত থেকে ছেড়ে দেয়ার পর থানায় গিয়ে স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন তিনি। তারপর থেকে নানারকম বিলাপ করছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে মামলা দায়েরের আগে রামপুরা থানার যেই পুলিশ কর্মকর্তা আমানের সঙ্গে ছিলেন, তিনি বলেন, আমান শুধু বলছিল- আমার সব শেষ হয়ে গেলো। আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম। মামলা দায়ের শেষে দুই বন্ধু ও বড় ভাই আবুল ও চাচাত ভাই জাকিরসহ রামপুরায় নিজ বাসায় যান। সেখানে গিয়ে আবারো কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করার পর সেখান থেকে বেড়িয়ে এক বন্ধুর বাসায় যান। অসুস্থ হয়ে পড়ায় মোবাইল ফোন বন্ধ রেখে স্বজনরা তার শুশ্রূষা করছেন। বনশ্রীর ওই বাসার দারোয়ান আব্দুর রশিদ জানায়, আমান বাসায় ঢুকেই চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। ছেলেমেয়েদের পড়ার টেবিল, জামা-কাপড় বুকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করতে থাকেন। পরে বন্ধু ও স্বজনরা তাকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে যায়। আমানের বন্ধু অ্যাডভোকেট দীপু জানান, আমান শুধু বলছে তার ঘর ফাঁকা হয়ে গেলো। তার স্ত্রী যে সন্তানদের খুন করতে পারে প্রথমে সে বিশ্বাসই করতে পারেনি। কিন্তু স্ত্রীর নিজমুখে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ও কারণ শুনে নিজেই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন।
পুলিশের কাছেও একই কথা বলছে জেসমিন: সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে তাদের হত্যা করেছে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করছে মাহফুজা মালেক জেসমিন। বৃহস্পতিবার র‌্যাবের কাছ থেকে তাকে হস্তান্তর করা হয় রামপুরা থানার কাছে। রাতেই বাবা আমান বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলার এজাহারে আমান বলেছেন, দুই সন্তানকে হত্যার পর জেসমিন নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করে মর্মে আমার সামনে র‌্যাবের নিকট প্রকাশ করে। এজাহারে আমান বলেন, ঘটনার দিন বিকাল আনুমানিক সোয়া ৫টার দিকে গৃহ শিক্ষিকারা বাসা থেকে চলে যাওয়ার পর মেয়ে অরণি ভেতর থেকে মূল দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে তার স্ত্রী জেসমিনের সঙ্গে খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ে। জেসমিন ছেলেমেয়ের স্কুলের পড়ালেখার রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় মানসিক টেনশন করে। টেনশন নিয়ে তার মাথায় যন্ত্রণা হয়। সে আরও প্রকাশ করে, ছেলেমেয়ে না থাকলে টেনশন হতো না। এই যন্ত্রণার কারণে ছেলেমেয়েকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, র‌্যাব তাদের কাছে হস্তান্তরের পর তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। কিন্তু একই কথা বলছে জেসমিন। তাকে রিমান্ডে আনা হয়েছে। এখন সময় নিয়ে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

আলোর পথযাত্রীকে অভিবাদন -জাতিসংঘের ম্যান্ডেলা দিবস

একটি মানুষ, কিন্তু অনেক নাম তাঁর। তাঁর দেশবাসী তাঁকে ভালোবেসে ডাকে ‘মাদিবা’। বিশ্ববাসী তাঁকে চেনে ম্যান্ডেলা বলে। নেলসন ম্যান্ডেলা, দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতার নেতা, অহিংসার দিশারী, শান্তি ও সম্প্রীতির শিক্ষক। বিশ্বের বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের কাছে মাদিবার জীবনের একটাই অর্থ—স্বাধীনতা ও শান্তি। নেলসন ম্যান্ডেলার সংগ্রামী জীবনের প্রতি সম্মান জানাতে তাই তাঁর জন্মদিবস ১৮ জুলাইকে ‘ম্যান্ডেলা দিবস’ ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। আগামী ১৮ জুলাই তাঁর ৯১তম জন্মদিনে পালিত হবে প্রথম ‘ম্যান্ডেলা দিবস’।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কারসহ অজস্র আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন নেলসন ম্যান্ডেলা। এর পরও রয়ে গেছেন নিরহংকারী ও শিশুর মতো সরল। ১৯৯৭ সালে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অতিথি হিসেবে তিনি ঢাকা সফর করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক অভিযানের সময় যে কজন বিশ্বনেতা এর সমালোচনা করেছিলেন, ম্যান্ডেলা ছিলেন তাঁদের সামনের সারিতে। ফিলিস্তিনসহ পৃথিবীর সব স্বাধীনতা ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন তাঁর সমর্থন পেয়েছে। মরণব্যাধি এইডসের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি ও প্রতিকারে বৃদ্ধ বয়সেও তিনি কাজ করে চলেছেন। এসব কারণেই প্রতিবছর ম্যান্ডেলার জন্মদিন ১৮ জুলাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শান্তিকামী মানুষ উত্সাহের সঙ্গে উদ্যাপন করে। এরই ধারাবাহিকতায় দিনটিকে ‘ম্যান্ডেলা দিবস’ ঘোষণার প্রস্তাব তোলেন জাতিসংঘে দক্ষিণ আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধি। নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশনসহ অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠান এ জন্য প্রচারও চালায়। এরই ফল বিশ্বসভার এই সিদ্ধান্ত।
ম্যান্ডেলা তাঁর জীবদ্দশাতেই অসম্ভব সব স্বপ্নকে সম্ভব করেছিলেন। আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের অবসান একসময় অসম্ভব মনে হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিল, বহিরাগত শ্বেতাঙ্গদের কখনো প্রতিবেশী তথা সহনাগরিক হিসেবে মানবে না দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গরা। কিন্তু তিনি দুটোকেই সম্ভব করেছেন তাঁর জীবদ্দশায়। জীবনের একটা সময় সশস্ত্র আন্দোলনের নেতা হয়েও পরিণত বয়সে গ্রহণ করেছেন অহিংসার আদর্শ। জাতিসংঘ বলেছে, ম্যান্ডেলার মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের আদর্শই প্রতিফলিত হয়েছে। ম্যান্ডেলা দিবস যেন সেই আদর্শগুলো বাস্তবায়নের দিকে এক ধাপ অগ্রগতি হয়ে দেখা দিল।
মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছিল আফ্রিকা থেকে। সেই আফ্রিকারই এক সন্তান হয়ে উঠলেন শান্তি ও সহাবস্থানের বৈশ্বিক অনুপ্রেরণা। তাঁকে অভিবাদন।

কেমন হবে এবারের নির্বাচন by এম সাখাওয়াত হোসেন

২২ মার্চ ৪ হাজার ২৭৯টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ঘোষিত ৭৫২টির মধ্যে ৭২৮টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই মনোনয়ন বাছাই হয়ে প্রার্থীরা প্রচারণায় নেমেছেন। তবে নির্বাচনের প্রথম ধাপ প্রাক-নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়েই অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে প্রায় ১১৪টি জায়গায় বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় নানা পন্থায় বাধা দেওয়া হয়েছে, যার কারণে প্রার্থীরা মনোনয়ন দাখিল করতে পারেননি।
অপর দিকে বাংলাদেশ তথা পাকিস্তান সময় থেকে যেভাবে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হতো, তার আদল বদলেছে। হালের পৌরসভা নির্বাচনের মতোই ইউনিয়ন পরিষদের একমাত্র চেয়ারম্যান পদেই দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে দলীয়ও বলা যাবে না। কারণ, শুধু চেয়ারম্যান দলীয় হলেও পরিষদ আগের মতোই থাকছে। এ কারণেও তৃণমূল পর্যায়ের এই নির্বাচনও বেশ জটিল হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৫০টি চেয়ারম্যান পদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছে বা হয়েছে, যার মধ্যে ১৯টিই বাগেরহাট জেলায়। এ কাণ্ডও ঐতিহাসিক। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যায়ের নির্বাচনে এতসংখ্যক চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হননি। অন্তত আমার জানামতে নয়।
অবশ্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যাপক নির্বাচনের ধারাবাহিকতা চলে আসছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে। নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যাঁরা প্রচুর গবেষণা করছেন, তাঁদের মতে, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় যদি একবার বিপর্যয় ঘটে, তবে ওই নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সংস্থার ওপর জনগণ যেমন আস্থা হারায়, বেপরোয়া হয়ে ওঠে, মরিয়া প্রার্থীরা যেকোনো উপায়ে নির্বাচনকে নিজের অনুকূলে আনতে চান। এমনকি তৃণমূল পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায়ও ধস নামে। অবশ্য তাঁদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটে উঠতি গণতন্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে। অবশ্য এসব গবেষণার ক্ষেত্র আফ্রিকা এবং দু-একটি এশিয়ান রাষ্ট্র, যার মধ্যে ফিলিপাইন অন্তর্গত ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে বিগত নির্বাচনগুলো বিশেষ করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত গবেষণার নতুন ক্ষেত্র হতে পারে। গবেষণার বিষয় হতে পারে কেন বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পরের নির্বাচন, বিশেষ করে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেল না।
যা-ই হোক, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা যে ভঙ্গুরের পথে, তা নিয়ে বড় গবেষণার প্রয়োজন নেই। দৃশ্যমান যে তেমনটি হয়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশের সব স্তরের নির্বাচনগুলোর মধ্যে সর্বকালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সব সময়ই জটিল এবং সর্ববৃহৎ নির্বাচন
বলে বিবেচিত। শুধু প্রথম ধাপেই প্রায় ৩৯ হাজার ৪৩০ জন বিভিন্ন স্তরের প্রার্থীর সমাবেশ ঘটেছে। এই ধারায় ৪ হাজার ২৭৯ ইউনিয়নে সর্বমোট কত প্রার্থী হবেন, তা অনুমেয়। প্রায় সাড়ে সাত কোটি ভোটারের এই নির্বাচনে ভোট প্রয়োগ করার কথা রয়েছে।
শুধু নতুন নতুন চ্যালেঞ্জই নয়, প্রথম ধাপে যেসব অঞ্চলে নির্বাচন হচ্ছে, সেসব অঞ্চল বাংলাদেশের দুর্গম অঞ্চলগুলোর অন্যতম। এ অঞ্চলে রয়েছে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল। বঙ্গোপসাগরের মোহনার চরাঞ্চলগুলোর ইউনিয়ন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশের অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন অঞ্চল চর কুকরি–মুকরি ইউনিয়ন, ভোলা জেলার বিচ্ছিন্ন ইউনিয়নগুলো, যার মধ্যে মনপুরা উপজেলা অন্তর্গত। লক্ষ্মীপুর, ফেনী অঞ্চলের চরাঞ্চল, বাগেরহাটসহ সুন্দরবনের দুর্গম অঞ্চলের ইউনিয়নগুলো। এগুলো সাধারণ অবস্থায়ও আইনশৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলের নিম্ন অঞ্চল ও চরগুলোতে সব সময় জলদস্যুদের আতঙ্কে থাকেন সাধারণ জনগণ। কাজেই এসব অঞ্চলের ইউনিয়নগুলোর নির্বাচন এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। কাজেই বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং দৃশ্যমান অনিয়ম ও সংঘাত যোগ হলে এবারের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ তো হবেই, সংঘাতময়ও হয়ে উঠতে পারে। এ সংঘাত শুধু সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যেই নয়, সরকারি দল ও অন্যান্য দলের আন্তদলীয় কোন্দলে রূপ নিতে পারে।
যেমনটি আগেই বলেছি যে এবারই প্রথম দলীয় ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে, যার পরিসর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নির্বাচন বলে আখ্যায়িত। ২০১১ সালের শেষ নির্দলীয় নির্বাচনেও কয়েক ধাপে নির্বাচন হয়েছিল। তখন এক ধাপের ফলাফল অন্য ধাপকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তবে এবার বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। এতগুলো নির্বাচন এক দিনে অনুষ্ঠিত করা সম্ভব নয়, অবশ্যই ধাপে ধাপে করতে হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার চলমান পদ্ধতির অবশ্যই পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। পৃথিবীর প্রায় সব দলীয় পরিচয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচনের ফলাফল একটি নির্ধারিত দিনে প্রকাশ করা হয়, যাতে আগাম প্রভাব না পড়ে। আগাম প্রভাব পড়লে সে নির্বাচনকে অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য বলা যায় না। কারণ অতি সহজ। এক অঞ্চলের নির্বাচনের ফলাফল বাকি নির্বাচনকে ও নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করবেই। এ বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা বা চিন্তাভাবনা আদৌ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এই বিষয়টি অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ইউপি নির্বাচন ২০১৬, কতখানি সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ ইতিমধ্যেই জন্মাতে শুরু করেছে, বিশেষ করে যে ধরনের পরিস্থিতির আলামত দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনকে অনুকূলে আনার নানা ধরনের কৌশল বিভিন্ন নির্বাচনে বিভিন্নভাবে গ্রহণ করে থাকে। প্রতি নির্বাচনে প্রতিবার একই ধরনের কৌশল গৃহীত হয় না। বুথ দখল সবচেয়ে সহজ পন্থা। তবে অনেক সময় বিভিন্ন পন্থার সঙ্গে বুথ দখল করা হয়। সম্পূর্ণ নির্বাচনে যেসব জায়গায় কোনো শক্তিশালী দলীয় প্রার্থীর হারার আশঙ্কা থাকে, সেসব জায়গায় বেআইনিভাবে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হয় বেশি। আমাদের মতো দেশে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা সরকারি দলেরই বেশি। এই প্রভাবের মাত্রা বৃদ্ধি পায় যখন দলীয় সরকার ধারাবাহিকভাবে একাধিক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকে এবং থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করতে থাকে। দলীয় সরকারের হাত ততই শক্ত হয়, যখন বিরোধী পক্ষ দুর্বল হতে থাকে।
এমন কথাই বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত। নির্বাচন কেন বিতর্কিত বা পরাজিত হয়, তেমন একটি গ্রন্থে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ‘কমপেরেটিভ পলিটিকস’-এর প্রফেসর পিপ্পা নরিস তাঁর গবেষণাধর্মী পুস্তক হোয়াই ইলেকশন ফেইলস (Why Election Fails) প্রারম্ভে নির্বাচন বিতর্কিত, মানসম্পন্ন না হওয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার যত সব কারণ উল্লেখ করেছেন, তাতে বলেছেন যে ক্ষমতাসীনেরা যখন প্রতিপক্ষের নির্বাচনী চ্যালেঞ্জকে বিভিন্ন কৌশলে ভোঁতা করে এসব কৌশলেরও ফিরিস্তি দিয়েছেন, যা আমরা বিগত বেশ কিছু নির্বাচনে প্রত্যক্ষ করেছি।
অনেক কৌশলের মধ্যে কিছু কিছু কৌশল প্রত্যক্ষ করা যায়। যেমন বাইরে নিজস্ব সমর্থকদের বিশাল লাইন এবং ওই লাইন ধীরগতিতে বুথে প্রবেশ করে এবং একই সময়ে বুথের ভেতরে বুথ দখল করে ব্যালট ছিনতাই করে বাক্স ভর্তি করা হয়। এ পদ্ধতিকে বুথ জ্যাম বলা হয়ে থাকে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আড়াল করতে গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের বুথে প্রবেশাধিকার খর্ব করা হয়। অপর কৌশল যা কার্যকর বলে প্রতীয়মান, তা হচ্ছে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রদানে বাধা ও ভয়ভীতির মাধ্যমে প্রত্যাহার অথবা কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে বাতিল করা। এসবই নির্বাচনকে অনুকূলে আনতে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যবহার করে থাকেন। গবেষকদের মতে, এ ধরনের অরাজকতা তখনই সম্ভব, যখন নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সংস্থা বা নির্বাচন কমিশন কার্যকারিতা হারায় বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠে বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপে নত হয়।
বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আসন্ন ইউপি নির্বাচনের যে হালচিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে নির্বাচন কমিশন অনেকটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে।অন্যথায় যেসব অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বা হচ্ছে সেগুলো বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারত বা পারে। অতীত পর্যালোচনা করলেই বর্তমান পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পায়। বিশ্বব্যাপী বর্তমান ব্যবস্থাপনায় গণমাধ্যম নির্বাচন কমিশনের অন্যতম সহায়ক শক্তি। কাজেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত নির্বাচনী ব্যত্যয়গুলো নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা উচিত। মৌখিক অভিযোগও গুরুতর অভিযোগ। তা ছাড়া, নির্বাচনকে ন্যূনতম পক্ষে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে ‘রি-অ্যাক্টিভ’ নয় ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ হতে হবে। ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কমিশনের জন্য শক্ত চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এই কমিশন ইতিহাসে কীভাবে চিহ্নিত হবে। এটাই হয়তো তাদের শেষ বড় ধরনের নির্বাচন।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

সিটি ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং সম্মেলন

সিটি ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং সম্মেলন সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।
এ সময় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মাহমুদ সাত্তার, হেড অব রিটেইল ব্যাংকিং ও চিফ কমিউনিকেনস অফিসার মাসরুর আরেফিন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (বিজনেস) সোহেল আর কে হুসেইন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (পরিচালন) রায়হান উল আমিন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিআরও এহসান খসরু ও হেড অব ব্রাঞ্চের জাবেদ আমিন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সম্মেলনে ব্যাংকের ৮৭টি শাখার ব্যবস্থাপকসহ প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।

ভারতি এয়ারটেলের বাংলাদেশ কার্যক্রমের দায়িত্ব নিলেন টবিট

ওয়ারিদ টেলিকমের ৭০ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ভারতি এয়ারটেলের বাংলাদেশের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছেন ক্রিস টবিট।
গতকাল মঙ্গলবার থেকে তিনি গুলশানে ওয়ারিদের কার্যালয়ে কাজ শুরু করেছেন। এর আগে তিনি ভারতি এয়ারটেলের এন্টারপ্রাইজ ব্যবসায় বিভাগের পরিচালক (বিক্রয় ও পরিচালন) হিসেবে কাজ করেন।
ব্যবস্থাপনা, বিক্রয়, বিপণন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ ক্রিস টবিট ভারতীয় মোবাইল ফোন অপারেটর ভারতি এয়ারটেলে ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।

উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব

ভারতের উত্তর-পূর্বাঅঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে চারটি ব্যবসায়ী সংগঠনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। সমঝোতা স্মারকে চট্টগ্রাম চেম্বার, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার, ত্রিপুরা চেম্বার ও ফেডারেশন অব ইন্ডাস্ট্রি ফর নর্থ ইস্টার্ন রিজিওনের সভাপতিররা সই করেন।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি মিলনায়তনে গত শনিবার তাঁরা এই সমঝোতা স্মারকে সই করেন।
এর আগে সফররত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলকে নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে চট্টগ্রাম চেম্বার।
সভায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বলেন, ভারত চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করলে ব্যবসায়ী সমাজের আপত্তি নেই। বরং এতে দু’দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর বিরুদ্ধে যার যার অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়া যাবে।
সফররত ভারতের প্রতিনিধিদল আঞ্চলিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশকে আসাম থেকে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে ডিজেলসহ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।
সভায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের শিল্প, বাণিজ্য ও বিদ্যুত্ মন্ত্রী প্রদ্যুত বোরদোলোই, ত্রিপুরার শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী জিতেন্দ্র চৌধুরী, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার এ কে গোস্বামী, ত্রিপুরা চেম্বারের সভাপতি এম এল দেবনাথ বক্তব্য দেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি এম এ লতিফ, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন।
এম এ লতিফ দুই দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানীমুখী পণ্যের ওপর থেকে সকল প্রকার শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধা দূর করার তাগিদ দেন। তিনি ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরকে বাংলাদেশে একক অথবা যৌথভাবে বিনিয়োগ করারও আহবান জানান।
ত্রিপুরার মন্ত্রী জিতেন্দ্র চৌধুরী দুই দেশের জনসাধারণের অবাধ চলাচলের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করার বিষয়ে জোর দেন।

বাজারে সিন্ডিকেটের ধারণা নিয়ে প্রশ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ‘সিন্ডিকেট’ বা মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—এমন ধারণার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সদ্য প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এ জন্য প্রায়ই সিন্ডিকেট বা মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী চক্রের প্রভাবকে দায়ী করা হয়। কিন্তু এর কোনো শক্ত প্রমাণ বা তথ্য মিলে না।’
এতে আরও বলা হয়েছে, এটা সত্যি যে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজার ক্রমাগতভাবে অধিকতর সংগঠিত হয়েছে। এখানে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বড় ব্যবসায়ীদের প্রভাবও বাড়ছে।
প্রতিবেদনে আগামী দিনগুলোয় এই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ফটকা কারবারিদের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কাও করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এরা প্রভাব বিস্তার করলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
এই বাস্তবতায় বাজারে মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী চক্রের উত্থান ও ফটকা কারবারিদের প্রভাব নিয়ে একটি সর্বাত্মক গবেষণা পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে এ ধরনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে কী কী কার্যকর ও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করার নামে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ করতে গেলে তা জটিলতা বাড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ এমনই হওয়া প্রয়োজন যা জোগান-প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করবে না।
প্রতিবেদনে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সাময়িকভাবে কিছু নগদ সহায়তা বা সহনীয় মূল্যে খাদ্য সরবরাহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, জ্বালানি তেল, চিনির দাম বাড়তে থাকায় তা আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের ভোক্তামূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সম্পদ বাজার (শেয়ারবাজার ও জমি-বাড়ির বাজার) ইতিমধ্যে যথেষ্ট স্ফীত হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রবাসী-আয়ের উচ্চ প্রবাহ, অন্যদিকে কথিত কালো টাকা এই সম্পদ বাজারের স্ফীতি ঘটাতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, দেশি-বিদেশি বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকুলানমুখী মুদ্রানীতি ও সরকারের রাজস্ব প্রণোদনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর জন্য ব্যয়। এগুলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে, যা পর্যায়ক্রমে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে।
এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারের ঋণ গ্রহণ হ্রাস পাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে কৃষি খাতসহ সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।
প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি প্রশমন করার জন্য মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোর ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সম্পদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এই খাতে ঋণপ্রবাহে রাশ টেনে ধরার কথা।
এত কিছুর পরও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের শেষে এসে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যেই থাকবে।
অন্যদিকে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছর সাড়ে ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে তাকে রক্ষণশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকেই নতুন কিছু বিনিয়োগসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার হচ্ছে, যার পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ চাহিদা জোরদার হওয়া।
পাশাপাশি রপ্তানির গতি প্রত্যাশার চেয়ে শ্লথ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা টেকসই হলে তা বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মইনের বিরুদ্ধে মামলা নিষ্পত্তি হয়নি সাড়ে ৬ বছরেও by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

ধীর গতিতেই চলছে ১/১১-এর কুশীলবদের বিরুদ্ধে করা মামলা। সাড়ে ৬ বছরের বেশি সময়েও নিষ্পত্তি হয়নি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদের বিরুদ্ধে করা মামলাটি। সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মামলাটি করেছিলেন। এই মামলার বয়স হয়েছে ৬ বছর ৭ মাস। কিন্তু এখনও মামলার কোন কূল-কিনারা হয়নি। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি নিয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগে মইন ইউ আহমেদের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১২ই জুলাই এ মামলাটি করেন টুকু। ১০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয় এ মামলায়। টুকুর পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন জানিয়েছেন, এই পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০ বার সময় নিয়েছেন মইন ইউ আহমেদ। মামলাটি প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপাসনের উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মানবজমিনকে বলেন, মামলটি এখন নিম্ন আদালতে আছে। হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট থেকে আমার পক্ষে আদেশ হয়। ফলে মামলাটি চলবে। চলতি মাসের ১০ই মার্চ মামলটির শুনানির দিন ধার্য আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাদীর পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এই প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, মইন ইউ আহমেদ কালক্ষেপণ করে কমপক্ষে ৪০ বার সময় নিয়েছেন। উনি বিদেশে থাকায় যাতে তার বাড়িটি বিক্রি না করতে পারে আদালত তা এটাচমেন্ট (সংযুক্তি) করেছেন।
এদিকে, ২০১৪ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি মইন ইউ আহমেদের বিরুদ্ধে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দায়ের করা মানহানি মামলায় স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। মইন ইউ আহমেদের দায়ের করা আবেদন নিষ্পত্তি করে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি নিয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগে মইন ইউ আহমেদের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১২ই জুলাই এ মামলাটি করা হয়। সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী টুকু ১০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলাটি করেন। এতে বলা হয়, ২০০৭ সালের ২৭শে মার্চ প্যারেড গ্রাউন্ডের এক সমাবেশে জেনারেল মইন বলেছিলেন, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও বিদেশে পাচার হয়েছে। কিন্তু ওই আমলে বিদ্যুৎ খাতে মোট বরাদ্দ ছিল সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হয়েছে। তাই ২০ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের কথা বলা কাল্পনিক, অপপ্রচার ও মানহানিকর। মামলাটি বাতিলের জন্য ২০০৯ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর আবেদন করেন মইন ইউ আহমেদ। বিচারিক আদালত তার এ আবেদন নাকচ করে। নিম্ন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করলে তা খারিজ হয়। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভ টু আপিল) দায়ের করেন মইন ইউ আহমেদ। ২০১০ সালের ৪ঠা এপ্রিল আপিল বিভাগ নিম্ন আদালতে মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। ২০১৪ সালে আপিলের অনুমতি না দিয়ে ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

সংশয়ে ইউরোপের জানালা- সংশয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন! by সরাফ আহমেদ

কথামতো শরণার্থীদের গ্রহণ না করেই অনেক
দেশ তাদের সীমান্ত পথ বন্ধ করে দিচ্ছে
নতুন বছর ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে সংশয়ে পড়েছে ইউরোপের মানুষ। ইউরোপের জাতিগোষ্ঠীগুলোকে এক করে পারস্পরিক সমন্বয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গত শতাব্দীতে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, যা আপাতত ২৮টি আঞ্চলিক দেশের সমন্বয়ে উন্নয়ন ও সংহতির বৈশ্বিক মডেল, সেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে এখন নানা প্রশ্নে অনৈক্যের সুর।
গত বছরের শেষ দিক থেকে যুদ্ধ ও দাঙ্গাপীড়িত নানা দেশ থেকে লাখ লাখ শরণার্থীর ইউরোপে আগমনে ভীত হয়ে আন্তর্দেশীয় সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইউরোপে অবস্থানরত শরণার্থীদের বণ্টনের প্রশ্ন নিয়ে বিরোধ এখনো মেটেনি। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য কর্তৃক তাদের দেশে প্রচুর পূর্ব ইউরোপের অভিবাসী চাকরির কারণে প্রবেশ করছে বিধায় এবং কিছু অর্থনৈতিক ছাড় না দেওয়ার প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্জনের হুমকি এবং বেশির ভাগ দেশে মূলধারার রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রত্যাবর্তন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য ও সংহতির ভিতকে দুর্বল করছে।
পৃথিবীজুড়ে এই মুহূর্তে ৬ কোটি শরণার্থীর মধ্যে মাত্র ১০, ২০ বা ৩০ লাখ শরণার্থীকে গ্রহণ করতে গিয়ে যে নাটক পৃথিবীর অন্যতম ধনী মহাদেশ ইউরোপ করছে, তা গণতন্ত্র ও মানবিকতার অবতারদের জন্য একটা লজ্জাজনক ঘটনা। গত শতাব্দীতে ইউরোপ দুটি মহাযুদ্ধ দেখেছে, দেখেছে পূর্ব-পশ্চিম সমাজতন্ত্র আর পুঁজিবাদ ধারার ঠান্ডা যুদ্ধ। তদুপরি সব সমস্যা ও ভিন্নমতকে সমন্বিত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন এবং ইউনিয়নের মূল পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইউরোপীয় জাতিসত্তাগুলো নিঃসন্দেহে একটি বিশ্ব নজির স্থাপন করতে পেরেছে।
গত প্রায় ৭০ বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দাঁড়িয়েছে ২৮-এ, সদস্যসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাদেশীয় ঐক্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, তাই আগের আর এখনকার ইউরোপের চেহারার আদল অনেকটাই ভিন্ন। তা শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অভিবাসন, কর্মসংস্থান, শ্রমিক, পরিবহন, সামাজিক ভাতা, মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও মানবাধিকার—সব বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর নিয়মকানুন একই নিয়মে বাঁধার চেষ্টা করেছে। সদস্যদেশগুলো নিজেদের মধ্যে সীমান্তপ্রথা তুলে দেওয়া, বিশাল অভিন্ন বাজারব্যবস্থা, যেখানে পণ্য ও সেবা অবাধে চলাচল করতে পারছে। পাশাপাশি বৈদেশিক নীতি বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক নীতি—সব মিলিয়ে সব ক্ষেত্রেই সমন্বয় আর সহযোগিতার প্রয়াস। তবে সেই সমন্বয় ও সহযোগিতায় আপাতত ভাটা পড়েছে মূলত শরণার্থীদের গ্রহণ করার প্রশ্নে।
দীর্ঘদিন থেকেই ইউরোপীয় কমিশন প্রস্তাব রেখেছিল ইউরোপে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসনে কীভাবে যৌথভাবে কাজ করা যায়, ইউরোপীয় পার্লামেন্টেও একই আলোচনা ও প্রস্তাবের কথা অনেক দিন থেকে আলোচিত হলেও সদস্যদেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ইউরোপীয় কাউন্সিলের কিছু সদস্যদেশের বাধার মুখে শরণার্থীদের নিয়ে কোনো যৌথ সমন্বিত আলোচনা বেশি দূর এগোতে পারেনি আর তা হয়নি বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের কারণে।
দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রপথে যখন হাজার হাজার শরণার্থী ইতালির ল্যাম্পাডুসা ও গ্রিসের লেসবসে জমায়েত হচ্ছিল, তখন তা নিয়ে ইউনিয়নভুক্ত সদস্যরাষ্ট্রগুলো ততটা মাথা ঘামায়নি। কিন্তু এসব শরণার্থী যখন ইতালি ও গ্রিস ত্যাগ করে মধ্য ইউরোপের সচ্ছল দেশগুলোর দিকে পাড়ি জমাল, তখন থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে শরণার্থীবিষয়ক আলোচনা ও পুনর্বাসন-প্রক্রিয়ার ব্যাপারটি মাত্রা পেল। উল্লেখ্য, ইউরোপীয় কমিশন হলো ২৮টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সর্বোচ্চ ফোরাম আর ইউরোপীয় কাউন্সিল হলো সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের ফোরাম।
তবে ৫০ কোটি জনসংখ্যা-অধ্যুষিত ২৮ জাতিসত্তা আর ২৪ ভাষাভাষী জাতির নিজস্ব অতীত ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। যেমন আছে মাত্র ৫ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যা-অধ্যুষিত ছোট দেশ লুক্সেমবার্গ, তেমনি আছে ১১ কোটি জনসংখ্যা-অধ্যুষিত বড় দেশ জার্মানি। সদস্যদেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা সমান নয়, তা ছাড়া ইউরোপের পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চলের দেশগুলোতে রয়েছে ২০ শতাংশ বেকার, যাদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। দেশগুলোর ধনী ও দরিদ্রের পার্থক্যটাও বেশ প্রকট, তাই দরিদ্র সদস্যদেশগুলোর বেকারেরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসী আইনের আওতায় চাকরির সন্ধানে ধনী দেশগুলোয় অভিবাসিত হতে চাইছে।
শুধু গত বছরের মার্চ পর্যন্ত তিন লাখ ইউরোপীয় অভিবাসী দরিদ্র সদস্যদেশগুলো থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিল, তাদের মধ্যে প্রায় দুই লাখ অভিবাসী সেখানে চাকরিতে নিয়োজিত হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও অন্য ধনী দেশগুলোয় মূলত ১০টি সদস্যদেশ হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র, পোল্যান্ড, স্লোভেনিয়া, স্লোভাকিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া, লিথুয়​ানিয়া ও লাটভিয়া থেকে চাকরির সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছে মানুষ। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য থেকেও ১০ লাখের বেশি অভিবাসী চাকরির কারণে ইউরোপের অন্য দেশগুলোয় পাড়ি জমিয়েছে। এসব অভিবাসীর মধ্যে যারা চাকরি করছে, তারা একটি নির্দিষ্ট সময় পরে তাদের সন্তানেরা সঙ্গে না থাকলেও অনাবাসী শিশু ভাতা গ্রহণ করা ছাড়াও চার বছর পর রাষ্ট্রীয় সব সামাজিক ভাতা যেমন আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবন ধারণের জন্য কল্যাণ ভাতা পাচ্ছে।
একদিকে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলো গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালিতে অর্থনৈতিক সংকট বা কিছু দেশের রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় পুরোটাই ঋণনির্ভর হয়ে যাওয়ার কারণে জনগণের কাছ থেকে নানা খাতে অধিক রাজস্ব আদায় করছে। অন্যদিকে, ২০০৪ ও ২০০৭ সালে সদস্য হওয়া উল্লিখিত দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাজের সন্ধানে ধনী দেশগুলোয় অভিবাসী হওয়া এবং ইদানীং বিপুলসংখ্যক যুদ্ধপীড়িত শরণার্থীর ইউরোপে আগমন, যাদের অধিকাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী, পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশে জাতীয়তাবাদী রক্ষণশীলদের ক্ষমতা গ্রহণ, ফ্রান্সে কয়েক দফা সন্ত্রাসী হামলা, যুক্তরাজ্যের ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি—এসব টানাপোড়েনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রীতি ও সম্ভাব্যতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিভিন্ন দেশের অতি জাতীয়তাবাদী দলগুলো সেখানকার জনগণকে বোঝাতে সচেষ্ট হচ্ছে, এভাবে অন্য জাতিসত্তা ও অন্য ধর্মাবলম্বীরা, তা ইউরোপীয় অভিবাসী বা শরণার্থীরাই হোক, তারা এখানে আবাস গাড়লে আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, কৃষ্টি বা আত্মপরিচয়ের সংকট হুমকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া ইসলাম ধর্মাবলম্বী শরণার্থী নেওয়ার ব্যাপারেও তাদের আপত্তি আছে। যদিও তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল লক্ষ্য ও সনদের পরিপন্থী, তদুপরি হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী রক্ষণশীল সরকার এ ধরনের প্রচার চালাচ্ছে, আর ক্ষমতার বাইরে থাকলেও অতি জাতীয়তাবাদী দলগুলোর প্রচারণার কারণে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মানবিক সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে টানাপোড়েনে ভুগছে।
যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রাখার ব্যাপারে ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রাসেলসে ইউরোপীয় নীতিমালার বেশ কিছু কাটছাঁট করে বেশ ছাড় দেওয়া হয়েছে, তদুপরি আগামী ২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নে তাদের থাকা না-থাকার ব্যাপারে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাজ্যের ইউনিয়নে না থাকার প্রশ্নে সেখানকার বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভোডাফোন, জাগুয়ার, কিংফিশার, মার্কস অ্যান্ড স্পেনসারসেল, ল্যান্ডরোভার সম্প্রতি এই বলে সতর্ক করেছে যে ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেলে যুক্তরাজ্যে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়বে এবং যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
২০১৫ সালের শেষের দিক থেকে চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৩০ লাখ শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মধ্য থেকে ১০ লাখেরও বেশি শরণার্থী ইতিমধ্যে জার্মানিতে অবস্থান করছে। ইউরোপে শরণার্থীদের পুনর্বণ্টন ও পুনর্বাসনের জন্য গত ডিসেম্বরে ব্রাসেলসে শরণার্থীদের কোটাভিত্তিক বিভিন্ন দেশ গ্রহণ করবে বলে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তা এখন অনেক দেশই মানছে না। কথামতো শরণার্থীদের গ্রহণ না করেই অনেক দেশ তাদের সীমান্ত পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল গত বছরের শেষ দিকে যে বিপুল শরণার্থী নিজ দেশে গ্রহণ করেছিলেন এবং এই মানবিক বিপর্যয়ের ভার অন্য দেশগুলোকে নিতে বলেছিলেন, প্রথম দিকে অনেক ইউরোপীয় দেশ সহযোগিতার হাত বাড়ালেও, এখন অনেক দেশই তাদের হাত গুটিয়ে ফেলছে। এসব ঘটনায় ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জঁ ক্লদ জাঙ্কার, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট মার্টিন সুলজ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
৭০ বছর আগে যে অতিজাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টরা ইউরোপকে যুদ্ধ ও ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল, ইউরোপের দেশে দেশে এখন ঠিক সেই ধরনের ফ্যাসিস্ট রাজনীতি না হলেও অতিজাতীয়তাবাদী দলগুলোই জনগণকে উসকে দিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপের মূলধারার ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
সরাফ আহমেদ: প্রথম আলোর জার্মান প্রতিনিধি।
sharaf.ahmed@gmx.net

যেভাবে সময় কাটছে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের by কাজী সুমন

গুলশান-২ এর ৬৯ নম্বর রোড। সুনসান নীরব পরিবেশ। ওই রোডের ১০ নম্বর বাড়িটির নাম ‘গ্রাউন্ড প্রেসিডেন্ট বিকন্ড’। বাড়ির চতুর্থতলার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। ঠিক একটি বাড়ির পশ্চিমেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবন। ফলে ওই রোডের নিরাপত্তাও নিশ্ছিদ্র। সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও থাকেন তৎপর। অনেকটা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়েই নীরবে-নিভৃতে অবসর সময় কাটছে আলোচিত সাবেক এই প্রেসিডেন্টের। একসময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও তিনি এখন বৃত্তের বাইরের মানুষ। অনেকটা নির্বাসন জীবনযাপন করছেন। রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক কোনো আচার-অনুষ্ঠানে দেখা যায় না। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেলেও যোগ দেন না। থাকেন ছোট ছেলে সোহেল আহমদের ফ্ল্যাটেই।
৮৭ বছর বয়সী সাবেক এই প্রেসিডেন্ট ভুগছেন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে। শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়লে বাসায় চিকিৎসা করান। প্রয়োজনে ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে ডাক্তার এসে চেকআপ করে ওষুধপত্র দিয়ে যান। আহারও গ্রহণ করেন খুবই অল্প। বেশির ভাগ সময় বিভিন্ন ফলের জুস ও তরল জাতীয় খাবার খেতেই বেশি পছন্দ করেন। ছেলের বউ ও কয়েকজন কাজের লোক তার সেবা-শুশ্রূষা করেন। তবে অসুস্থ হওয়ার আগে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত আধাঘণ্টা মর্নিংওয়াক করতেন। ৬৯ নম্বর রোড থেকে হাঁটা শুরু করে দক্ষিণ পাশের ৫৮ নম্বর হয়ে ৬২ নম্বর সড়ক ঘুরে বাসায় ফিরতেন। এসময় তার সঙ্গে একজন স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) সদস্য থাকতেন। খুবই ধীরপায়ে এই কয়েকশ’ গজ রাস্তা হাঁটতেন। ওইসময় কোনো পথচারী তাকে সালাম দিলে মাথা নেড়ে উত্তর দিতেন। কিন্তু গত তিন মাস ধরে তিনি মর্নিংওয়াকে বের না হওয়ায় এসবি’র ওই সদস্য মাঝেমধ্যে সাবেক এই প্রেসিডেন্টের খোঁজখবর নিতে যান। অবসরের পর সবাই ভেবেছিলেন- লেখালেখি করবেন কিংবা নিজের আত্মজীবনী বের করবেন। কিন্তু সেপথে হাঁটেননি তিনি। ১০ নম্বর ওই বাড়িটির নিরাপত্তা রক্ষী সোহাগ জানান, স্যার অ্যাপার্টমেন্টের চতুর্থতলায় তার ছেলের সঙ্গে থাকেন। অসুস্থ হওয়ার আগে সকাল বেলা নিয়মিত হাঁটতেন। তিনি কারও সঙ্গে দেখাও করেন না এবং কথাও বলেন না। তবে গত তিন মাস ধরে স্যারের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছে। তাই তিনি এখন আর সকালে হাঁটতে বের হন না। সময় কাটছে বাসাতেই।
দুইবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বপালনকারী সাহাবুদ্দীন আহমদের জন্ম ১৯৩০ সালের ১লা জানুয়ারি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার পেমই গ্রামে। পিতা তালুকদার রিসাত আহমদ ছিলেন একজন সমাজসেবী।  নেত্রকোনায় প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষে সাহাবুদ্দীন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনপ্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। প্রথমেই ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। এরপর গোপালগঞ্জ ও নাটোরের মহকুমা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সহকারী জেলা প্রশাসক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৬০ সালে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগে বদলি হন তিনি। ঢাকা ও বরিশালের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে এবং কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। ১৯৭২ সালের ২০শে জানুয়ারি তাকে হাইকোর্টের বেঞ্চে বিচারক হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়। ১৯৭৩-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর তাকে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৮০ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি তাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরে হন প্রধান বিচারপতি। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে অনেকটা নাটকীয়ভাবে ক্ষমতায় আসেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। ১৯৯০ সালের ৫ই ডিসেম্বর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ উপ-রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। পরদিন প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে আস্থাহীনতা দেখা দেয়। পরে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকারী সাহাবুদ্দীন আহমদকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা হয়।  ১৯৯১ সালের ২৭শে জানুয়ারি তিনি একটি অবাধ, সুষ্ঠু পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেন। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ওই বছরের ২৩শে জুলাই তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে  সততা ও প্রজ্ঞা দিয়ে দেশের সকল স্তরের মানুষের মন জয় করেন। ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অবসর নেন অতি সাধারণ জীবনযাপন করা এই মানুষটি।

চিঠিতে লেখা সেই নারী কে?

কক্সবাজারে সাবেক সচিবের মৃত্যু নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে নানা প্রশ্ন। আপাতত নারীঘটিত ব্যাপারে তার মৃত্যু হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে কোন নারী তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে তা শনাক্ত করা যায়নি। হোটেল কক্ষ থেকে সচিবের লেখা ৮ পৃষ্ঠার চিরকুটে তিনি নারীসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বেশ কিছু ক্ষোভের কথা লিখে গেছেন। তিনি লিখেছেন, এই মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন। আজ না হয় কাল মরতেই হবে। চিরকুটে সবচেয়ে বেশি লিখা হয়েছে নারী প্রসঙ্গ নিয়ে। লিখেছেন, নারীর প্রতি সবারই মোহ থাকে। নারীর কারণে অনেক বিখ্যাত লোককেও কারাগারে যেতে হয়েছে। এ কারণেই আমেরিকার ২১ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা একজন গভর্নরকেও বিদায় নিতে হয়েছে। এমনকি বিল ক্লিনটনের মতো প্রেসিডেন্টকেও বিদায় নিতে হয়েছে নারীর কারণেই। এসব কারণেই পরিবারের সঙ্গে নারীঘটিত মান-অভিমানের কোনো বিষয় রয়েছে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এ কারণে তিনি পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছিলেন। সদর মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন বলেন, চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার লুন্তি নোয়াবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। কক্সবাজার এসে হোটেল সি-হেভেন গেস্ট হোম হোটেলটির ১০১ নম্বর কক্ষে টানা ২৬ দিন অতিবাহিত করেছেন সাবেক এই সচিব। গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি বিকালে কলাতলীস্থ হোটেল সি-হ্যাভেনের ১০১নং কক্ষ থেকে ওই লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারের পর কোনো পরিচয় না পাওয়ায় লাশটি ১লা মার্চ বেলা ৩টার দিকে শহরের ঘোনারপাড়াস্থ বড় কবরস্থানে দাফন করে কক্সবাজার পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। লাশ দাফনের পর তার কাছে পাওয়া এক মোবাইল নাম্বর থেকে জানা যায় তিনি সাবেক ভূমিসচিব ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন (৬২)। তিনি বান্দরবান জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বান্দরবান জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মরহুম মো. দেলোয়ার হোসেন ১৯৯৬ সালের ২রা সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৯ সালের ৫ই এপ্রিল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন পার্বত্য বান্দরবান জেলায়। ওসি বলেন, লাশের সঙ্গে উদ্ধার করা হয় আট পৃষ্ঠার একটি সুসাইড নোট। তবে সেখানে আত্মহত্যার জন্য কাউকে দায়ী করেননি তিনি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহীদুল ইসলাম বলেন, হোটেল কক্ষের ফ্যানের সঙ্গে গামছা দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় লাশটি উদ্ধার করা হয়েছিল। সুইসাইড নোটে শুধু নাম উল্লেখ ছিল, হোটেলের খাতায় পরিচয় এন্ট্রি নেই। পুলিশ জানায়, অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব ঢাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত সোনা মিয়া। তার ১ ছেলে ২ মেয়ে রয়েছে। তিনি সর্বশেষ দায়িত্ব পালন করেন ঢাকার সাভারে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র লোক প্রশাসন কেন্দ্রে। তিনি স্বেচ্ছায় অবসরপ্রাপ্ত হন। প্রাথমিক অবস্থায় দেখা যায়, গলায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। তবে কেন আত্মহত্যা করেছেন তা এখনও জানা যায়নি। এ ব্যাপারে হোটেল সি-হেভেন গেস্টহোমের জিএম শেখ মকবুল আহমদ বলেন, মুরব্বি ২ মাসের জন্য গত ৩রা ফেব্রুয়ারি হোটেলে উঠেন ও ২ মাসের ভাড়া বাবৎ ২৪ হাজার টাকা জমা দেন। তখন নিজের নাম শাহরিয়ার কামাল বলে জানিয়েছিলেন। এদিকে সাবেক ওই সচিবের মৃত্যুর ৪ দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার সকালে মোবাইল কোম্পানি টেলিটকে কর্মরত তার একমাত্র পুত্র রাজিব এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সরকারের একজন ডেপুটি সেক্রেটারি (ডিএস)-সহ কয়েকজন আত্মীয় কক্সবাজার আসেন। তারা মরহুম সচিব দেলোয়ার হোসেনের কবর জিয়ারত করেন। আত্মীয়স্বজনরা জানিয়েছেন, তারা নিহতের মরদেহ নিয়ে যাবেন না।

মার্চেই ঘটে পাকিস্তানের পরাজয় by সৈয়দ আবুল মকসুদ

স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সব জনগোষ্ঠীরই সহজাত। একটি স্বাধীন সার্বভৌম বহুজাতিক রাষ্ট্রের সব প্রদেশ বা প্রতিটি অংশই স্বাধীন। তাহলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরের একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে নতুন করে স্বাধীন করার জন্য সেখানকার জনগণ চঞ্চল হয়ে ওঠে কেন? একটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠী যখন দেখে তাদের ন্যায়সংগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি অধিকার রাষ্ট্র হরণ করছে এবং তারা হচ্ছে নির্মম অবিচার ও নিপীড়নের শিকার, তখন তাদের স্বশাসিত বা স্বাধীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। উনিশ শ একাত্তর খ্রিষ্টীয় অব্দের মার্চ মাসের প্রথম দিনই বাংলাদেশে তেমনটির প্রকাশ ঘটেছিল। বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন ছিল বহু কালের, তার বহিঃপ্রকাশ বা বিস্ফোরণ ঘটে একাত্তরের মার্চে।
কোনো রাষ্ট্রের কোনো একটি অংশের মানুষ স্বাধীনতা চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের স্বাধীনতা দিয়ে দেয়—এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। অন্যদিকে রাষ্ট্রের কোনো একটি অংশের মানুষ স্বাধীনতার দাবি তুললেই কেন্দ্রীয় সরকারের সশস্ত্র বাহিনী স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর হিংস্র শ্বাপদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, তেমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র একটি খুঁজে পাওয়া যাবে। সেটি একাত্তরের বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক কালের পৃথিবীর অন্যান্য দেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র একেবারেই আলাদা।ষাটের দশকে আমরা দেখেছি পৃথিবীর বহু জাতি সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রাম করছে; তাদের কেউ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, অনেকেরই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। অগণিত প্রাণ গেছে, কিন্তু স্বাধীনতা আসেনি। কেন আসেনি, তার কারণগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে ওই সব আন্দোলনে ত্রুটি ও দুর্বলতা ছিল। এবং সেগুলোতে স্বাধীনতা আন্দোলনের যৌক্তিকতার অভাব ছিল। আমাদের অনেক বিদ্বান ব্যক্তিরও বদ্ধমূল ধারণা যে সরকার নির্যাতন-নিপীড়ন খুব বেশি চালালেই এবং ব্যাপক রক্তপাত হলেই স্বাধীনতাপ্রাপ্তি খুব সহজ হয়। এই ধারণা ভিত্তিহীন।
ষাটের দশকে নাইজেরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তেলসমৃদ্ধ বায়াফ্রা প্রদেশ ‘বায়াফ্রা রিপাবলিক’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিল। একাত্তরের বাংলাদেশের মতো সেখানে অবর্ণনীয় গণহত্যা হয়। দুর্ভিক্ষে মানুষ মরে। স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক কিছু সমর্থনও পায়। কিন্তু স্বাধীনতা আসে না। আজও বায়াফ্রা নাইজেরিয়ার অংশ। মনে পড়ে একাত্তরে আমি রেডিও পাকিস্তানের সংবাদ ভাষ্যে শুনেছি, পাকিস্তানি রাজাকার আলবদর বিশ্লেষকেরা বলছেন: পূর্ব পাকিস্তানের নিয়তি হবে বায়াফ্রার মতো। তাঁদের অনুমান ও প্রত্যাশা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
পর্তুগিজ তিমুরের জনগণ ইন্দোনেশিয়া থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উত্তাল আন্দোলন করে। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অগণিত প্রাণ ঝরে পড়ে। স্বাধীনতা থাকে বহুদিনের জন্য সুদূরপরাহত। তুরস্ক, ইরান, ইরাক, গ্রিস প্রভৃতি দেশের কুর্দিরা কতকাল থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র চাইছে। তারা একটি প্রাচীন জাতি। আজও তাদের সংগ্রাম চলছে, তারা স্বাধীনতা পায়নি। বর্তমান জায়ার বা কঙ্গো ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক থেকে কাতাঙ্গা বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল। প্যাট্রিস লুমুম্বা কাতাঙ্গার বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ দিলেন। স্বাধীনতা এল না।
কানাডার ফরাসি ভাষাভাষী অঞ্চল কুইবেকের স্বাধীনতার দাবি উঠেছে। তবে সে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ। কাতালান ও বাস্ক ভাষাভাষীরা স্পেনে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র চায়। ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হতে স্কটল্যান্ড গণভোট করছে। হয়তো শান্তিপূর্ণ উপায়েই একদিন স্বাধীনতা পাবে। এ রকম দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বহু আছে।
কসোভো স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। স্বাধীনতা অত সোজা জিনিস নয়। ছেলের হাতের মোয়া তো একেবারেই নয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে, গণতান্ত্রিক উপায়ে, গায়ের জোরে নয়। বাংলাদেশও স্বাধীনতা অর্জন করে জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী, তবে সীমাহীন রক্ত ও নির্যাতনের বিনিময়ে। যদি ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচন হয়ে থাকে পাকিস্তানের জন্য গণভোট, তাহলে ২৪ বছর পর আর একটি সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে; এই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা বা স্বাধীনতার জন্য গণভোট।
১৯৭০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানের প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক শাসকগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সামান্যতম আস্থা থাকলে ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই অধিবেশন বসিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করত। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে
আমি বহুবার ভেবে দেখেছি, পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সংকট ১৯৭০ সালের ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই সমাধান হতে পারত কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তা ঝুলিয়ে রাখে ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিকেল পর্যন্ত।
সব সংগ্রাম ও যুদ্ধেরই দুটি দিক। একটি সামরিক ও আরেকটি নৈতিক। কোনো পক্ষ সামরিকভাবে বিজয়ী হলেও নৈতিকভাবে পরাজিত হয়। কেউ শক্তি পরীক্ষায় হেরে গেলেও নৈতিকভাবে জয়লাভ করে। পাকিস্তান একাত্তরে সামরিক ও নৈতিক দুভাবেই পরাজিত হয়। পাকিস্তান নৈতিকভাবে শেষ হয়ে যায়; তার নৈতিক পরাজয় ঘটে ’৭১-এর ২৫ মার্চ রাত ১২টা ১ মিনিটে। তার সামরিক পরাজয় ঘটে ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্ণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাসের চত্বরে। ওই পরাজয়ের গ্লানি থেকে সে বাঁচতে পারত যদি ২৫ মার্চের মধ্যে কোনো একদিন বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা দিয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে গিয়ে উড়োজাহাজে উঠে ইয়াহিয়া খান ইসলামাবাদ চলে যেতেন। সে পরামর্শই টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষের বুড়ো সারা মার্চ মাস ইয়াহিয়াকে দিয়েছেন: মাউন্টব্যাটেন যেমন জিন্নাহ-নেহরুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, সেভাবে আপনিও মুজিবের হাতে ক্ষমতা দিয়ে হ্যান্ডশেক করে চলে যান। তা না করলে বাংলাদেশের মানুষ যা করার তা-ই করবে।
সত্তরের নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে গ্রেপ্তার হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু একজন অবিচল গণতান্ত্রিক নেতার মতো অতি সংযত আচরণ করেছেন। তাঁর ওই তিন মাসের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক। অন্যদিকে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তার প্রতিটি কাজ ছিল অগণতান্ত্রিক ও ষড়যন্ত্রমূলক। একাত্তরে বাংলাদেশে মানুষ ছিল সাড়ে সাত কোটির মতো। তাদের মধ্যে যাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক ও ভোটার ছিলেন এবং যাঁদের সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদের দেড় কোটির মতো মানুষ এখনো বেঁচে আছেন। আমি তাঁদের একজন। কী রকম ছিল সেই একাত্তরের মার্চ, তা এখন যাদের বয়স ষাটের নিচে, তাদের বোঝাতে পারব না।
একাত্তরের পয়লা মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন হোটেল পূর্বাণীতে তাঁর দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক করছিলেন, তখনই ইয়াহিয়া খান রেডিওতে পাকিস্তানের মৃত্যুপরোয়ানা পাঠ করেন। আমি কী এক কাজে বা বিনা প্রয়োজনেই সিকান্দার আবু জাফরের সমকাল পত্রিকার অফিসে বসে ছিলাম। রাস্তায় শোরগোল শুনতে পেয়ে বেরিয়ে শিল্প ভবনের গোলচত্বরের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তখন এত সংবাদপত্রও ছিল না, টিভি চ্যানেল শব্দটাই কেউ শোনেনি, এত সাংবাদিকও ছিলেন না। হাঁটতে হাঁটতে বিমান অফিসের সামনে যাই। বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের অল্প কিছু বক্তব্য দিয়ে ‘অপেক্ষা’ করতে বলেন। পরে তাঁর হরতাল ও অসহযোগের ঘোষণা আসে।
ইয়াহিয়ার সংসদ অধিবেশন মুলতবির ঘোষণার পর মানুষ বুঝে যায় পঞ্চনদীর দেশ পাকিস্তান তাদের নয়, তাদের ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। পনেরো-কুড়ি মিনিটের মধ্যে ঢাকার চেহারা বদলে যায়। স্তব্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বাস, মোটরগাড়ি, রিকশা রাস্তা থেকে সরে যায়। মানুষ নেমে পড়ে রাস্তায়। তখন অল্প কয়েকটি বাড়িতে গ্যাস–সংযোগ ছিল। রান্নাবান্না হতো কেরোসিন ও লাকড়িতে। বিভিন্ন জায়গায় লাকড়ির দোকান ছিল। মণ দরে বিক্রি হতো। অনেক মানুষ দোকান থেকে লাকড়ি হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পাকিস্তানবিরোধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান দেয়। ওই লাকড়ি বা লাঠি ছিল সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতীকী অস্ত্র—মেশিনগান, কামানের সঙ্গে লড়াইয়ের হাতিয়ার।
পাকিস্তানি জান্তা শিশু, বৃদ্ধ, নারীসহ লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করে। ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে কোটি খানেক মানুষকে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আধুনিক অস্ত্র ও রণকৌশল শত্রুকে পরাজিত করতে অবশ্যই ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনে সবচেয়ে কঠিন ভূমিকা রেখেছে সাধারণ মানুষের ত্যাগ ও মনোবল এবং স্বাধীনতার জন্য তাদের অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

আর কত অমানবিক হবে মানুষ?

মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। বেঁচে থাকলে রবীন্দ্রনাথ আজও কি অকুণ্ঠচিত্তে তা বলতে পারতেন? হয়তো পারতেন, হয়তো পারতেন না। তবে ঘোর   অন্ধকার এ সময়ে অমানবিকতা প্রতিদিন নিজের বিজয় ঘোষণা করছে। সভ্যতার এ যেন এক নিষ্ঠুর পরিহাস। শিশু হত্যার ঘটনা প্রতিদিনই সংবাদ হচ্ছে। কারণে-অকারণে মানুষ হত্যা করছে মানুষকে।
আধুনিক রাষ্ট্র ক্রমেই মানুষ থেকে মানুষকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। নগরের ইমারতের নিচে চাপা পড়ছে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা-আবেগ। একসময় যৌথ পরিবার আজ ভেঙে খানখান। ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে পাশাপাশি বাসার মানুষ যোজন যোজন দূরত্বে। উত্তরায় গ্যাস বিস্ফোরণে একই পরিবারের তিনজন নিহত হওয়ার মর্মস্পর্শী ঘটনা অনেককেই নাড়া দিয়েছে। তবে ওই ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ গৃহকর্ত্রী সুমাইয়া আক্তার তার স্বজনদের কাছে যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে আঁতকে উঠবেন যে কেউ। খালাতো ভাই নওশাদ জামান সুমাইয়ার এ ভাষ্য রেকর্ড করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করেছেন। দগ্ধ পরিবারটিকে কেউ সহযোগিতা করতে এগিয়ে না যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। স্বজনদের সঙ্গে আলাপকালে সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘চিৎকার দিয়ে নামতাছি- আগুন লাগছে সাহায্য করেন। বাঁচান বাঁচান। গায়ে তো আগুন। তিন আর চার নম্বর ফ্লোর থেকে দরজা খুলছে। আমাদের দেখে দরজা বন্ধ করে দিছে। স্পষ্ট মনে আছে। সাত তলা থেকে নামছি। তিন তলার লোকরা একটা তোষক দিয়ে যদি জড়াইয়া ধরতো। একটা তোষক না হয় পুড়তো। আমার বাচ্চাগুলো তো বাঁচতো।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া অডিও রেকর্ডে সুমাইয়া আক্তারকে বলতে শোনা যায়, ‘বাসার চুলায় গ্যাসের পাওয়ার কম ছিল। বাসায় যখন উঠলাম সিলিন্ডার গ্যাস ছিল না। তিন দিন কিনে খেয়েছি খাবার। তারপর মিস্ত্রি এসে রাইজার বাড়িয়ে পাওয়ার ঠিক করে দিছে। তার পরও গ্যাস লিক করতো। গ্যাসের গন্ধ পাইছি। জানালা খোলা রাখতাম।’ সুমাইয়া বলেন, ‘গ্যাসের গন্ধ পেয়ে রাতেও তার স্বামী মোমবাতি জ্বালিয়ে চেক করেছেন। পরে বললো মনে হয় ওপরে ছাদ থেকে আসতেছে। চুলা অল্প জ্বালিয়ে চায়ের পানি দিছি। ওর আব্বু বললো ঘরে গ্যাসের গন্ধ আসছে, ফ্যানটা ছেড়ে দিই। ফ্যান ছেড়ে জানালা খুলে দেয়ার জন্যে। জায়ান ওর বাবার কোলে। যেই ফ্যানটা ছেড়ে দেবার পরে দাউ দাউ করে আগুন। সেকেন্ডের মধ্যে, এতো আগুন।’ সুমাইয়া বলেন, ‘আসলে ডাইনিং রুমটাই গ্যাসে ভরা ছিল। শার্লিনের রুম ছিল রান্নাঘরের পাশেই। একটা জানালা সম্ভবত বন্ধ ছিল।’ এরপর আরও করুণ ঘটনার বর্ণনা দেন স্বামী ও দুই সন্তান হারানো সুমাইয়া। তিনি বলেন, ‘আমি আর শার্লিনের আব্বু নামছি। আগুন জ্বলতেছে গায়ে। চিৎকার দিয়ে নামতেছি- আগুন লাগছে সাহায্য করেন। বাঁচান... বাঁচান। তিন আর চার নম্বর ফ্লোর থেকে দরজা খুলছে। আমাদের দেখে দরজা বন্ধ করে দিছে। একটা তোষক দিয়ে যদি জড়াইয়া ধরতো। একটা তোষক না হয় পুড়তো। আমার বাচ্চাগুলো তো বাঁচতো। কত মানুষ সব তাকায়া আছে। কেউ আগায় না।’ সুমাইয়া বলতে থাকেন, ‘পরে নিচে নেমে, কাপড় তো পুড়ে গেল। নিচে ছিল ছালার চট। টাইনা গায়ে দিছি। কত মানুষ, সবাই তাকাইয়া আছে, কেউ আগায় না।’ সুমাইয়া বলেন, ‘বলছি আমি মহিলা একটা চাদর দেন। কেউ দেয় না। বিল্ডিংয়ের মহিলারা কেউ দেয় না... আল্লাহ মাফ করুক সবাইকে।’ সুমাইয়া বলেন, ‘পরে নিচে নেমে চিৎকার দিয়ে দারোয়ানকে বললাম আমার দুই ছেলে ওপরে আটকা পড়ছে, আপনারা তাড়াতাড়ি যান। তারা যেতে যেতে শার্লিন পুড়ে গেছে। শার্লিন পুড়েছে বেশি। গায়ে পা থকথক হয়ে গেছে। শার্লিন বলে, আমি তো বাঁচবো না, আমাকে মাফ করে দিয়ো আম্মু। আমি বলি বাবা তুই বাঁচিস, আমি মইরা যাই। মানুষ এ রকম হয়। একটি খারাপ না? কেউ কাউরে একটু সাহায্য করে না। একটা কি কথা?’
এদিকে, সুমাইয়া বেগমের অবস্থা এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। মঙ্গলবার তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউ থেকে মোহাম্মদপুরের বেসরকারি সিটি হাসপাতালের আইসিইউতে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এর আগে গত রোববার থেকে ওই হাসপাতালের কেবিনে চিকিৎসাধীন একমাত্র শঙ্কামুক্ত মেজো ছেলে জারিফ বিন নেওয়াজ। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জারিফ শঙ্কামুক্ত। তার অবস্থা ধীরে ধীরে আরও উন্নতি হচ্ছে। তবে মা সুমাইয়া বেগমের অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে।