Thursday, July 9, 2015

তিস্তার পানি বণ্টন- প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিন by আলী ইমাম মজুমদার

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরটি ফলপ্রসূ ও অর্থবহ হয়েছে এমনটা বলা যায়। এই সফরকালে দীর্ঘ ৬৮ বছরের অমীমাংসিত ছিটমহল বিনিময় কাজটির আইনি দিক চূড়ান্ত হয়। এতে ছিটমহলগুলোর অধিবাসী প্রায় ৫০ হাজার লোকসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোর একটি যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়ের অবসান ঘটল। বস্তুত, এটা ১৯৭৪ সালে সম্পাদিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির বাস্তবায়ন। এর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কাটল ৪১ বছর। চুক্তিটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সে বছরই অনুসমর্থন করে। কিন্তু তা করতে ভারতের দীর্ঘকাল কেটে যায়। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসে আটঘাট বেঁধে নামেন। তিনি সক্ষম হন এর পক্ষে ভারতীয় পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের সর্বসম্মত সমর্থন পেতে। সুতরাং এই কৃতিত্ব অনেকাংশে তাঁর। এর সাফল্য তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে। সদা সচেষ্ট তৎপরতার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহকর্মীরা।
বাংলাদেশ আশা করেছিল, নরেন্দ্র মোদির সফরকালে উভয় দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা হবে। একটি হয়েছে, অপরটি হয়নি। তা হচ্ছে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি। উভয় দেশ ২০১১ সালে সেই চুক্তির একটি সম্মত খসড়া তৈরি করেছিল। শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতায় তা হয়নি। এবার তা আনুষ্ঠানিক আলোচনায়ও আসেনি। তবে নেপথ্যে হয়তো কিছু আলোচনা হয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সে রকমই বলেছেন। পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বণ্টন বিষয়টির ন্যায্য সমাধান হবে।’ সম্ভবত এ জন্য তাঁকে আরও ‘হোমওয়ার্ক’ করতে হবে। তবে এক বছরের শাসনকালে আমরা নরেন্দ্র মোদির মধ্যে একটি নিষ্ঠার ভাব দেখতে পাই। তিনি যেটা করতে চান সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে দৃঢ় পদক্ষেপ নেন। প্রায় ক্ষেত্রে সফলও হচ্ছেন তিনি। ভারত–বাংলাদেশের যৌথ নদীগুলোর পানি বণ্টন স্পর্শকাতর ও জটিল প্রক্রিয়া হলেও অসম্ভব নয়। এর ন্যায্য সমাধান সবাই চায়। বিশেষ করে তিস্তা চুক্তিটি তো হতে হতে শেষ মুহূর্তে ঠেকে গেছে ২০১১ সালেই। এবারও হলো না। এর ফলে বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান অনুভূতি সম্পর্কে ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস-এর সম্পাদকীয়র শিরোনাম ‘যে নদী বাংলাদেশের মন পোড়ায়’। এতে অনেক কথার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চলতি সফরের নানা সাফল্যের মাঝেও চোরাস্রোত হিসেবে রয়ে যাচ্ছে তিস্তা।’
বলতে হয়, মোদির এই সফর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে আরও গভীরতায় নিয়ে যেতে অবদান রাখবে। সম্পাদিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলোর কোনো কোনোটির যৌক্তিকতা সম্পর্কে আমাদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে বটে। সেই বিতর্ক দীর্ঘ এবং এই নিবন্ধের বিবেচ্যও নয়। আলোচ্য সফরে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়টি নিষ্পত্তি না হলেও এর ন্যায্য সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এটাকেও আমরা বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা অর্জন বলে ধরে নিতে পারি। সেই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে একসময় সাফল্যের মুখ দেখতে পারে। তবে সেটা কবে আর কত ক্ষতির পর, এটা এখনই অনুমান করা দুষ্কর।
ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ মার্চ বাংলাদেশ তিস্তার ২৩২ কিউসেক পানি পেয়েছে। এটা ইতিহাসে সর্বনিম্ন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। গত চার বছরে শুষ্ক মৌসুমের চূড়ান্ত পর্যায়ে (মার্চের শেষ ১০ দিন) তিস্তায় বাংলাদেশ অংশে পানি প্রাপ্তি ছিল ২০১৫, ২০১৪, ২০১৩ ও ২০১২ সালে গড়ে যথাক্রমে ৩১৫, ৫৫০, ২৯৫০ ও ৩৫০৬ কিউসেক। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৫ সময়কালে গজলডোবা বাঁধ চালু করার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ অংশে এর গড় প্রবাহ ছিল ৬৭১০ কিউসেক। ওই ইংরেজি দৈনিকটির ভাষ্য অনুসারে, ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে ২০১১ সালের তিস্তা চুক্তি খসড়া তৈরি করার পরপরই এর প্রবাহ শোচনীয়ভাবে কমতে থাকে। তিস্তায় পানিপ্রবাহের অস্বাভাবিক হ্রাসে বিশাল অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ পাল্টে যাচ্ছে। ফসল ফলছে না। ‘নদীতে’ নৌকার পরিবর্তে চলে গরুর গাড়ি। মাছ ও জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন। কৃষক, নৌকার মাঝি আর জেলে সবাই সংকটের মুখে।
ভারত সরকারের সদিচ্ছাও হার মানছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জেদের কাছে। তারা আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতেই রাজি নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন সংগ্রামী নেতা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি আজ এই অবস্থানে। লক্ষণীয় যে তিনি পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সম্ভ্রম নিশ্চিত করে তাদের কাছে প্রশংসিত ও আস্থাভাজন হয়েছেন। তিস্তার পানি বণ্টন প্রশ্নে তাঁর রাজ্যবাসীর স্বার্থকে তিনি সামনে রাখতে উদ্যোগী হবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে নদীটি যৌথ এবং পানি যে ভাটির দেশেরও পাওনা আছে, এমনটা কীভাবে তিনি বিস্মৃত হতে পারেন তা বিস্ময়কর। দুই দিন পর বর্ষা নামলে তো সেই নদীর পানি আমাদের দেশের ওপর দিয়েই যাবে। কখনো বা বাড়িঘর, ফসল নষ্ট করে ঘটাবে বিপর্যয়। তিস্তার পানির ন্যায্য বণ্টন হলে তিনি তাঁর রাজ্যের জনগণকে বোঝাতে পারবেন না এমনটা মনে করার কারণ নেই। যার যেটুকু প্রাপ্য, তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে সাধারণ মানুষও। বরং তাদের মধ্যে অযৌক্তিক আশাবাদ জাগিয়ে তুললে ক্ষতিই হয়।
আমরা আরও বেদনার সঙ্গে লক্ষ করি আত্রাই নদে আমাদের একটি রাবার ড্যাম নির্মাণকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাম্প্রতিক ভূমিকা। এ রাবার ড্যাম হওয়ায় পশ্চিম দিনাজপুরের মানুষ সেচের পানি পাচ্ছে না—এমন অভিযোগ তারা করছে ভারত সরকারের কাছে। ড্যামটি উচ্চতায় চার মিটার এবং দৈর্ঘ্যে ১৩৫ মিটার। সেচের আওতাধীন জমি পাঁচ হাজার হেক্টর। আর গজলডোবায় পরিকল্পিত সেচের আওতাধীন জমি নয় লাখ হেক্টর। অবকাঠামো নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকলেও এর এক-চতুর্থাংশ ইতিমধ্যে সেচের আওতায় এসেছে। আত্রাই তিস্তার একটি শাখা নদ। এটি ভারত থেকে বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করে। একপর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গের ভেতরে কিছুটা গিয়ে আবার বাংলাদেশমুখী হয়েছে। উজানের দেশ ভারত গজলডোবায় বাঁধ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে আত্রাইয়েও। ভাটির দেশ বাংলাদেশ রাবার ড্যাম দিয়ে আত্রাইয়ে অতি সামান্য পানির ব্যবস্থা করল। এতেই নালিশ, আলাপ-আলোচনা না করে বাঁধ দেওয়ার। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার নিম্নোক্ত চরণ দুটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—
কহিলাম তবে, ‘আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব—
দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব।’
অবশ্য নীরবে আমরা এ অধিকার ছাড়িনি। প্রতিবাদ করে যাচ্ছি। আর সেটা চলবেও।
নরেন্দ্র মোদি বাস্তববাদী মানুষ। তিনি বিশাল দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী। দেশটি আঞ্চলিক পরাশক্তির বটে। পরাশক্তির বিকাশে নিকট প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্ববহ একটি উপাদান। সম্ভবত তাই সূচনাতেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন মোদি। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য যেখানেই গেছেন, সেখানেই তিনি রাখতে সক্ষম হয়েছেন সাফল্যের ছাপ। সবাই তাঁকে আজ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিচ্ছে। আমাদের দুটি দেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন প্রশ্নেও তিনি একটি মূল্যবান কথা বলেছেন। তা হচ্ছে, ‘আমাদের নদীগুলো দুই দেশের বিরোধের কারণ নয়, বরং সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারণ হওয়া উচিত।’ আমরা ভারতকে সড়ক, রেল ও নৌপথে চলাচলে সুযোগ করে দিচ্ছি। পানি না থাকলে সেই নৌপথও থাকবে না। তাই আমাদের নদীর পানিও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইতিবাচক অবদানই রাখতে পারে। মোদির ক্যারিশমা আজ সর্বোচ্চ আলোচিত। দীর্ঘ সংগ্রাম করে তিনি এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। তাই আমরা আস্থা রাখতে চাই তিনি দ্রুততার সঙ্গে পানি বণ্টনসংক্রান্ত তাঁর আশ্বাস বাস্তবায়ন করবেন।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

রাজনীতি by মাহবুব তালুকদার

চাচা জিজ্ঞাসা করলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন কেমন?
প্রশ্নটা শুনে আমি হকচকিয়ে গেলাম। চাচার কাছ থেকে এ ধরনের প্রশ্ন আমি কখনো আশা করি না। আমাকে নিয়ে তার মনে দুটো ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে। প্রথমত, আমি রাজনীতি বুঝি না। দ্বিতীয়ত, আমি কারণে বা অকারণে সরকারের সমালোচনা করি। এমতাবস্থায়, চাচার উপরোক্ত প্রশ্ন আমাকে স্বাভাবিকভাবে বিব্রত করল।
কি হলো? তুমি আমার কথার জবাব দিচ্ছ না কেন? চাচা ঈষৎ হেসে বললেন, যেহেতু দেশের সার্বিক অবস্থা এখন খুব ভাল, সেজন্য সত্য কথাটা তোমার মুখে আটকে যাচ্ছে।
বললাম, আপনি নিজেই তো আপনার প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন। তাহলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে লাভ কি?
আমি তোমার মতামতটা জানতে চাচ্ছি।
আমার মতামত কি খুব গুরুত্বপূর্ণ?
অবশ্যই। তুমি সাধারণ মানুষের একটা অংশের প্রতিনিধি। তাই তোমার কাছ থেকে মতামত যাচাই এ মুহূর্তে বিশেষ প্রয়োজন।
এ মুহূর্তে কেন?
ব্যাপারটা তাহলে তোমাকে খুলেই বলি। সরকার এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবছে।
তাই নাকি? হঠাৎ এ সময়ে এমন অশুভ চিন্তা কেন?
এমন একটা মহৎ চিন্তাকে তুমি অশুভ বলছ কোন যুক্তিতে?
চাচা! আপনার কথা অনুযায়ী দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখন ভাল। তাহলে এভাবেই চলুক না দেশটা। অযথা নির্বাচনের কথা তুলে ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কি?
ঝামেলা হবে কেন? সিটি করপোরেশন নির্বাচন তো চমৎকার হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ পর্যন্ত প্রশংসা করে বলেছেন, কোথাও কোন রক্তক্ষয় হয়নি। সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুসরণ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি রক্তপাতহীন হয়, তাহলে নির্বাচনের ইতিহাসে তা একটা মডেল হয়ে থাকবে।
৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের মডেল বাদ দিয়ে এখন কি সিটি করপোরেশনের মতো জাতীয় নির্বাচন করার কথা ভাবা হচ্ছে?
অসুবিধা কি? জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি আসেনি, কিন্তু সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে তারা তো এসেছিল। পরে তারা নিজেরাই কেটে পড়েছে, সেটা তাদের ব্যাপার। জাতীয় নির্বাচনে তারা যদি আসে, পরে কেটে পড়লেই বা কি আসে যায়?
আমার তো মনে হয় না, বিএনপি কেবল বৈধতা দিতে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে?
চাচা বললেন, ৫ই জানুয়ারি বিএনপি নির্বাচনে না আসায় ক্ষতিটা কার হয়েছে? বিএনপি এখন সংসদের বাইরে। তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা ঝুলছে। তাদের বড় বড় নেতারা সবাই কারাগারে। নির্বাচনে না এসে বিএনপি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে। সত্যি বলতে কি, খালেদা জিয়া এখন মনে মনে পস্তাচ্ছেন।
এরপরও আমি মনে করি না খালেদা জিয়া ৫ই জানুয়ারি মার্কা কোনো নির্বাচনে আসবেন।
কেন? তার অসুবিধা কি? নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা হলেই তো হলো।
আমার মনে হয়, জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে কিছু সাংবিধানিক সংকট রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা না হলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। আর নির্বাচন কমিশনের কথা বলছেন? একটা অনুগত নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার অর্থ অধিকতর অনুগত করা।
আজকাল তুমি বড় কঠিন কথা বলতে শুরু করেছ।
কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছি না, দেশের এমন চমৎকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবা হচ্ছে কেন?
সরকার যখন ভাল অবস্থায় থাকে তখনই তো মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবা হয়। দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্ব প্রায় শূন্যের কোঠায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করে জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা হচ্ছে। খালেদা জিয়াও তার ব্যক্তিগত মামলায় ফেঁসে যেতে পারেন। তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ারই সম্ভাবনা। বিএনপিতে ভাঙন ধরাতে সবরকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সংস্কারপন্থিরা তো আছেনই, মামলার ভারে জর্জরিত অন্য নেতারা বিএনপির নামে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। জামায়াতকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করারও ব্যবস্থা হয়েছে। তাছাড়া দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এখন অনেক উন্নতি হয়েছে।
চাচা! বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু উন্নতিটা নড়বড়ে’।
বিদেশীরা কি বলল না বলল, তাতে কি আসে যায়?
কিছু তো নিশ্চয়ই আসে যায়। সম্প্রতি বৃটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় তাতে বাংলাদেশ বিষয়ক সর্বদলীয় কমিটি সভাপতি কনজারভেটিভ দলীয় এমপি অ্যান মেইন রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতাকে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য এক এমপি কেরি ম্যাকার্থি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি আছে। কিন্তু যে কথা বলা প্রয়োজন, তা হচ্ছে দেশটিতে গণতন্ত্র প্রয়োজন। প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে ক্ষমতার পালাবদলের ব্যবস্থা। এর কোনো বিকল্প নেই।’
বৃটিশ পার্লামেন্টের এমপিদের গায়ে পড়ে এসব কথা বলার উদ্দেশ্যটা কি?
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তারা খুবই উদ্বিগ্ন।
আমরা তো তাদের রাজনীতির ব্যাপারে গায়ে পড়ে কোনো পরামর্শ দিতে যাই না।
চাচা! বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বিবদমান দুটি দলের রাজনৈতিক উত্তেজনা যখন বৃটিশ পার্লামেন্টের সামনে উত্তাপ ছড়ায় তখন তারা নীরব থাকবেন কি করে? পৃথিবীতে বাংলাদেশ সম্ভবত একমাত্র দেশ যার রাজনৈতিক দলের বৈদেশিক শাখা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বৃটিশ কনজারভেটিভ পার্টি বা লেবারপার্টির সমর্থকদের কোন সংগঠন বা অফিস নেই। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈদেশিক শাখা আছে, বাংলাদেশে তেমন ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকান পার্টির কোন শাখা সংগঠন নেই।
এতে তুমি কি বোঝাতে চাও? এতে কি প্রমাণিত হয় না যে, বাংলাদেশের রাজনীতি চর্চা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে?
আমি বাংলাদেশের রাজনীতির নষ্ট চরিত্রের বিষয়টা মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর উক্তি দিয়ে বোঝাতে চাই।
তিনি কি রাজনীতি সম্পর্কে কোন নেতিবাচক উক্তি করেছেন?
না। তা করেননি। তবে তিনি সম্প্রতি একটি সত্য কথা বলেছেন।
কি সেই সত্য কথা?
ওবায়দুল কাদের সাহেব বলেছেন, ‘রাজনৈতিক কারণেই রাস্তা ও ফুটপাথ দখলমুক্ত করা যায় না।’
এতো খুবই সত্য কথা। চাচা বললেন।
কথাটা চিন্তা করে দেখার মতো। সম্প্রতি দেশের একটি প্রধান পত্রিকা এর সম্পাদকীয়তে বলেছে: ‘কথা সত্য। কিন্তু তিনি কোন রাজনীতির কথা বলেছেন? যে রাজনীতির তিনি একজন নেতা এবং যে রাজনীতি তাকে মন্ত্রী করেছে, সেই রাজনীতির কাছে তিনি এত অসহায় হলে চলবে কেন?’ পত্রিকাটি আরো লিখেছে: ‘সঠিকভাবেই সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেছেন, রাস্তা দখলমুক্ত করতে না পারলে ষোল লেন করেও যানজট দূর করা যাবে না। দখলদারেরা ক্ষমতাবান। কিন্তু তারা কি মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান?’
এসব কথা বলে তুমি কি বোঝাতে চাচ্ছ?
চাচা! আমরা এক অর্থে রাজনীতির রাহুগ্রাসে পতিত হয়েছি। দেশের স্বাধীনতাসহ আমাদের রাজনীতিবিদদের বিশাল অর্জন রয়েছে, একথা যেমন সত্য, তেমনি রাজনীতির দোহাই দিয়ে আমাদের জনগণকে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
তুমি কি বুঝতে পারছ, তুমি কি বলছ?
আমি না বুঝে কোন কথা বলছি না। মাননীয় অর্থমন্ত্রী যখন বলেন, শেয়ার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না, কারণ তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, এরও অলক্ষ্যে রয়েছে রাজনীতি। ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে যখন কোন ব্যবস্থা নেয়া যায় না, তখনও বোঝা যায় এর পেছনে রাজনীতির স্বার্থ জড়িত। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধে হামলাকারী আওয়ামী ক্যাডারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে গেলে সেখানেও রাজনৈতিক স্বার্থ এসে বিচারের পথ রোধ করে দাঁড়ায়। ঢাকার দুজন মেয়রই ভেবেছিলেন, তারা নগরবাসীকে একটা জঞ্জালমুক্ত আধুনিক ঢাকা শহর উপহার দেবেন। কিন্তু তাদের নির্দেশে বিলবোর্ড সরানোই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি জমি দখল করে নিচ্ছে, সেখানেও দখলকারীর পরিচয় তিনি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিক। সুতরাং দখলদারিত্ব তার অধিকার।
এসব বলে তুমি কি বোঝাতে চাইছ?
রাজনীতির নামে এসব অপকর্ম যারা করে, আমরা তাদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
তোমার কথাবার্তা কি বিরাজনীতিকরণের হোতাদের উসকে দেবে না?
আমি কখনও বিরাজনীতিকরণের পক্ষে নই, তা আপনিও জানেন। আমি মনে করি, রাজনীতি সর্বদা সুস্থধারায় প্রবাহিত হওয়া উচিত। আমি বললাম।
আমাদের আলোচনার এই পর্যায়ে চাচি ঘরে ঢুকলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, খুব সরগরম মনে হচ্ছে। আজকের আলোচনা কি নিয়ে?
রাজনীতি। আমি বললাম, রাজনীতি আমাদের দিয়েছে অনেক, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে কম নয়।
এজন্য রাজনীতি দায়ী নয়, দায়ী রাজনীতিকের আবরণে যারা অপকর্ম করছে, তারা। চাচি বললেন।
চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, তোমরা রাজনীতির অর্জনগুলো দেখছ না।
কি অর্জন? চাচির প্রশ্ন।
বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত চুক্তি কি একটা অর্জন নয়?
সেটা অবশ্যই অর্জন। আমি তা খাটো করে দেখছি না। কিন্তু ট্রানজিট? চাচি আবার প্রশ্ন করলেন।
সেটাও একটা বড় অর্জন।
চাচি ঘরের তাক থেকে একটা পত্রিকা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, তুমি কি পত্রিকা পড়া বাদ দিয়েছ?
কেন?
পত্রিকার পাতা মেলে ধরে চাচি জানালেন, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে ট্রানজিটের কারণে বাংলাদেশের কোন লাভ হবে না। ট্রানজিটের মাশুল বা অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত কি দেবে সে বিষয়ে কোন চুক্তি বা নীতিমালা হয়নি। পুরো বিষয়টি নিয়ে সরকারের কোন পরিকল্পনা ছিল না। যে কারণে ইতিমধ্যেই ভারত মাশুল ছাড়াই চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার শুরু করেছে।’
এসবই হচ্ছে ভারতবিরোধী কথা।
তা হবে কেন? এসব হচ্ছে বাংলাদেশের স্বার্থের কথা। আমি জানালাম।
তোমরা দেখছি নরেন্দ্র মোদির সফরের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের সাফল্য খাটো করতে চাও। চাচার বক্তব্য।
আমরা একজন ভারতীয় সাংবাদিকের মতামতের ভিত্তিতে নরেন্দ্র মোদির সফরের তাৎপর্য তুলে ধরতে চাই। বলে চাচি আরেকটা পত্রিকার পাতা মেলে ধরলেন।
কে তিনি? চাচার জিজ্ঞাসা।
কুলদীপ নায়ার। তিনি বলেছেন, ‘ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরটি হয়েছে অসময়ে। দেখে মনে হয়েছিল তিনি যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পড়তি ইমেজ ঠেকাতে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে কেবল ভারতবিরোধী অনুভূতিকেই আরও তীব্রতর করে তুলেছেন। কেননা, নয়াদিল্লিকে নিরপেক্ষ হিসাবে মনে হয়নি। আমি জানিনা কেন এবং কতদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ন শাসনকে সমর্থন দিয়ে যেতে হবে আমাদের’।
কি আশ্চর্য! চাচা সবিস্ময়ে উচ্চারণ করলেন।
আশ্চর্যের কিছু নেই। চাচি জানালেন, ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কূটনীতিক কুলদীপ নায়ার আরও অনেক কঠোর ও কঠিন কথা বলেছেন। সেটা পড়ে নিও। বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত মনোভাবই তার লেখায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের মানুষ কখনোই ভারত বিদ্বেষী নয়। চাচা উচ্চকণ্ঠে জানালেন।
বাংলাদেশের মানুষ খালেদা জিয়াও নয় যে, অবস্থান পরিবর্তন করে ভারত প্রেমের কথা ঘোষণা করবে। তবে আমরা সমতা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।
তাহলে বাংলাদেশের মানুষের রাজনীতিটা কি?
আমরা বাংলাদেশের মানুষ বাংলাদেশপ্রেমী। দলীয় রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বেরিয়ে আমরা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বুঝে নিতে চাই। এটাই বাংলাদেশীদের রাজনীতি। চাচি মৃদুকণ্ঠে বললেন।

অপমানে মুক্তিযোদ্ধার আত্মহত্যা? তদন্ত দাবি পরিবারের

আত্মহত্যার আগে একটি চিরকুট লিখেছিলেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ইউনিটের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব খান। তাকে গলাধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ হান্নান। এ অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন এ মুক্তিযোদ্ধা। চিরকুটটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ মুক্তিযোদ্ধার লাশ উদ্ধারের একদিন পেরিয়ে গেলে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে কোন মামলা হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হওয়ায় বিপাকে রয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাজধানীর তোপখানা রোডে হোটেল কর্ণফুলীর ২০৪ নম্বর কক্ষ থেকে আইয়ুব খানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৫ দিন আগে ওই হোটেলে উঠেছিলেন তিনি। মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ হোটেল কক্ষের ভেতর থেকে কীটনাশকের গন্ধ বের হলে হোটেল কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। তারা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ দেখতে পায়। খবর পেয়ে দরজা ভেঙে আইয়ুব খানকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে এই মুক্তিযোদ্ধাকে হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন তাকে। হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্তের পর মরদেহ গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল সকালে সেখানে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সূত্র জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা আত্মহত্যার আগে একটি সুইসাইড নোট (চিরকুট) রেখে গেছেন। এতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অভিযুক্ত করে লেখা রয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ইউনিট ঘোষণার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ হান্নানকে টাকা দিয়েছিলাম। টাকা দিয়ে বারবার আবেদন করার পরও তিনি দক্ষিণ জেলা ইউনিট ঘোষণা করেননি। তার বাসায় গিয়ে টাকা ফেরত চাইলে তিনি গলাধাক্কা দিয়ে অপমান করে বের করে দেয়ায় আমি আত্মহত্যা করলাম। আমার লাশটা যেন ঢাকায় দাফন করা হয়। নিহতের মামাতো ভাই আমীর হোসেন বলেন, আইয়ুব খান যে হোটেলে আত্মহত্যা করেছেন সেখানে পাওয়া একটি চিরকুটের অনুলিপি শাহবাগ থানা-পুলিশের কাছে আছে। তিনি কেন এ আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন সে সম্পর্কে ওই চিরকুটে বিস্তারিত লেখা আছে। চিরকুটে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি আবেদনও ছিল। কিন্তু ওই চিরকুটের কোন অনুলিপি পুলিশ তাদের দেয়নি। তিনি এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের শাস্তি দাবি করেন। চিরকুটপ্রাপ্তির বিষয় স্বীকার করে শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মামুন ফরাজী জানান, অপমৃত্যুর অভিযোগে মামলা হয়েছে। প্ররোচনার বিষয়ে মামলা হবে কি-না তা নিহতের পরিবার ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাপার বলে জানান তিনি। তবে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান এসআই মামুন ফরাজী। তবে মুক্তিযোদ্ধার আত্মহত্যার পেছনে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ হান্নান। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। কিন্তু পত্রিকায় কমিটি গঠন, অর্থ নেয়া এবং অপমান করা সংক্রান্ত যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে এর সঙ্গে সচিবের কোন সম্পর্ক নেই। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চট্টগ্রাম (দক্ষিণ) ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়ে যে বিষয়টি বলা হয়েছে তাতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই, বিষয়টি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের এখতিয়ারাধীন। সচিব এম এ হান্নান মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব খানকে গলাধাক্কা দেয়ার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি আইয়ুব খানকে চেনেন না। তার কাছে তিনি কখনও আসেননি। আইয়ুব খান আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিলেন। তার দুই পুত্র ও দুই কন্যা রয়েছে। বড় পুত্র আরিফ হোসেন (১৮) চট্টগ্রামে একটি দোকানে কাজ করে।

খালেদার বিচার হবে ট্রাব্যুনালে -শেখ হাসিনা

পেট্রলবোমা হামলার নির্দেশ দানকারী হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার সহযোগীদের বিচারে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। গতকাল সংসদে লিখিত প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একথা বলেন। সরকারি দলের সদস্য সেলিনা বেগমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রলবোমা হামলার মামলার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মামলাসমূহ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। পেট্রলবোমা হামলার প্রতিটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। এসব মামলার তদন্ত সুষ্ঠু ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যা যথাযথভাবে প্রতিপালনের বিষয়টি মনিটর করা হচ্ছে। তিনি জানান, ওই ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এ আইনের অধীন অপরাধগুলোর দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করার জন্য দায়রা জজ বা দায়রা জজ কর্তৃক অতিরিক্ত দায়রা জজের কাছে স্থানান্তরিত হওয়ার ক্ষেত্রে, অতিরিক্ত দায়রা জজকে বিচারকার্য সম্পন্ন করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হুকুমে এ বছর ৫ই জানুয়ারি থেকে চলমান হরতাল ও অবরোধকালীন এবং গত ২রা জুন ২০১৫ তারিখে পবিত্র শবেবরাতের রাতে কুমিল্লায় একাটি বাসে ৬ জনসহ পেট্রলবোমা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে ১৩৪ জনকে হত্যা করা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরে নিহত ও আহতদের পরিবারের সহায়তার পরিসংখ্যান উল্লেখ করেন। তিনি জানান, পেট্রলবোমায় গুরুতর আহত ৪ জনকে (এসএসসি পরীক্ষার্থী অনিক ও হৃদয়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল কাদের এবং ট্রাক ড্রাইভার লিটন মিয়া) উন্নত চিকিৎসার জন্য একাধিকবার বিদেশে পাঠানো হয়েছে। তাদের চিকিৎসা খরচ নির্বাহের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ৩৮ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।
মাথাপিছু আয় দুই হাজার মার্কিন ডলার
সরকারি দলের সদস্য মো. মনিরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধ্য মেয়াদের ষষ্ঠ ও পরে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর মেয়াদে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা মেয়াদ শেষে ২০২১ সালে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় হবে প্রায় ২ হাজার মার্কিন ডলার। ফলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। তিনি বলেন, রূপকল্প ২০২১-এর বাস্তব রূপান্তরের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনের বাংলাদেশকে বিশ্বে অগ্রগামী ও উন্নত জনপদে পরিণত করতে আমরা জাতিকে শিগগিরই রূপকল্প ২০৪১ উপহার দেবো।
বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৪ হাজার মেগাওয়াট
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি আমরা ক্ষমতা গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াটে। এ সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা দিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে ফেলে। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আমরা তাৎক্ষণিকভাবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করি। ফলে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। সেই সঙ্গে আমরা বাড়িয়ে চলেছি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন। ২০০৬ সালে সঞ্চালন লাইন ছিল ৬৬ হাজার ৯৭৩ সার্কিট কিলোমিটার, বর্তমান সঞ্চালন লাইন হচ্ছে ৯ হাজার ৫৫৫ কিলোমিটার। একইভাবে ২০০৬ সালে বিতরণ লাইন ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ২৬৩ কিলোমিটার। বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার কিলোমিটার।
বাংলাদেশের অনুকূলে ১১১টি ছিটমহল
স্বতন্ত্র সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, স্থলসীমান্ত চুক্তির ফলে মোট ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের অনুকূলে আসবে। এর মধ্যে লালমনিরহাট জেলায় ৫৯, কুড়িগ্রাম জেলায় ৩৬, পঞ্চগড় জেলায় ১২ এবং নীলফামারী জেলায় ৪টি বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ২০১১ সালের হেডকাউন্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী এর মধ্যে বসবাসকারী নাগরিকের সংখ্যা ৩৭ হাজার ৩৮৬ এবং ১৭ হাজার ১৬১ একর জমি বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত হবে। অন্যদিকে ভারতের অনুকূলে ৫১টি ছিটমহল যাবে। যেখানে নাগরিকের সংখ্যা ১৪ হাজার ৯০ এবং জমির পরিমাণ ৭ হাজার ১১০ একর।
খালেদা জিয়া মিথ্যাচার করছেন
এদিকে অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের সময় প্রতিদিন বিএনপি নেত্রী মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন। নিজের অপরাধ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন। পবিত্র রমজান মাসে মিথ্যাচারের জন্য আল্লাহই তার বিচার করবেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াত জোটের ৯২ দিনব্যাপী হরতাল-অবরোধের নামে ভয়াল নাশকতা-সন্ত্রাস ও পেট্রলবোমা মেরে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার অসংখ্য আলোকচিত্র সংসদে প্রদর্শন করে বলেন, বিএনপি নেত্রী ইফতার মাহফিলে শুধু আমাদের বিরুদ্ধেই অপবাদ বা মিথ্যাচার করছেন না, যারা দিনরাত পরিশ্রম করে দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিচ্ছেন সেই পুলিশ বাহিনীকে জড়িয়েও মিথ্যাচার করেছেন। তিনি বলেন, ইফতার মাহফিলে বিএনপি নেত্রী বলেছেন, পুলিশ বাহিনী নাকি পেট্রলবোমা মেরে মানুষ খুন করেছে! রমজান মাসে এমন মিথ্যাচার শুনে তাজ্জব হয়ে যাই। রমজান মাসে কীভাবে উনি এমন মিথ্যাচার করেন? অথচ সব দেশবাসীই জানেন এবং দেখেছেন, কীভাবে বিএনপি নেত্রীর নির্দেশে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, পেট্রলবোমা মেরে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, পুলিশের ওপর আক্রমণ করে হত্যা করেছে। নিজের দোষ উনি পুলিশের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। এ প্রসঙ্গে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে বলেন, তখনও বিএনপি নেত্রী বলেছিলেন, আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে আমিই মেরেছি! তখনকার মতো এখনও নিজের দোষ বিএনপি নেত্রী অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্যে রাখেন বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার প্রেসিডেন্টের আদেশ পাঠের পর বিকাল চারটায় বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ঘোষণা করেন। এর আগে গত ১লা জুন বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। ৪ঠা জুন সংসদে চলতি অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, যা ৩০শে জুন পাস হয়। সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আগামী ৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে- এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। হতদরিদ্রের সংখ্যা ৭ দশমিক ৯ ভাগে নামিয়ে আনতে আমরা সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যখন সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে, দেশের মানুষ উন্নত জীবন পাচ্ছে- ঠিক তখন দেশের মানুষের ওপর বিএনপি-জামায়াত জোটের জুলুম-নির্যাতন সবাই প্রত্যক্ষ করেছে। আন্দোলনের নামে ৯২ দিন ধরে দেশের মানুষকে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাস-সহিংসতা ও নাশকতা মোকাবিলা করেছে। বিএনপি নেত্রী ওই সময় নিজের দলীয় কার্যালয় থেকে ঘোষণা দিয়েছিলেন আমার পতন না হওয়া পর্যন্ত উনি ঘরে ফিরে যাবেন না। কিন্তু কিছু অর্জন ছাড়াই উনাকে আদালতে আত্মসমর্পণ করেই ঘরে ফিরে যেতে হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেন। উনি ভাল করেই জানেন, আদালতে গেলে তার দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে। এ কারণে উনি আদালতে লাঠিসোটা নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সবশেষে আদালতেই তাকে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। ‘গ্রামে খাবার নেই, কাজ নেই’- বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এমন অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রামের একজন দিনমজুর দিনে যা আয় করেন, তা দিয়ে ৮-১০ কেজি চাল কিনতে পারেন। গ্রামে খাবার ও কাজ না থাকলে দিনমজুর ও শ্রমিকের মজুরি এত বেশি বৃদ্ধি পেলো কীভাবে? তার এসব অভিযোগ মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। যানজট প্রসঙ্গে বিরোধী দলের নেতার অভিযোগের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, দেশের অর্থনীতি যত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে, যানবাহনের সংখ্যাও তত বাড়ছে। এরশাদ সাহেব আমার ইফতার মাহফিলে এলেন, কিন্তু যানজটের কারণে বিরোধী দলের নেতা নাকি আসতে পারেননি। কিন্তু দুজনে যদি একসঙ্গে এক গাড়িতে আসতেন তবে এ অসুবিধাও হতো না, যানজটও কিছুটা কম হতো। এভাবে একাধিক গাড়ি ব্যবহারের কারণেই যানজট বাড়ছে। তিনি বলেন, আমরা বসে নেই, বসে থাকলে দেশের এত উন্নয়ন হতো না। প্রতিদিন মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, মানব পাচারকারীদের ধরা হচ্ছে। আমরা এক কোটি ২৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। এখন আর বিদেশে যেতে মানুষের ঘরবাড়ি বেচতে হয় না। তিনি বলেন, আমার ক্ষমতায় আসার আগে সৌদি আরবে সাড়ে ৮ লাখ এবং মালয়েশিয়ায় সাড়ে ৬ লাখ অবৈধ বাংলাদেশী ছিল। আমরা ক্ষমতায় এসেই সফল কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সবাইকে বৈধ করিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিরলসভাবে আমরা দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি, যার সুফল দেশের মানুষ পাচ্ছে। ১৬ কোটি জনগণের ভাগ্যের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হলেও আমরা সেই কঠিনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আমরা চার গুণ বিশাল বাজেট দিয়েছি। এ বাজেটও বাস্তবায়ন করে আমরা দেশকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাব। আগামী ৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরই বদলে যায় সবকিছু by আশরাফুল ইসলাম

নিজ নির্বাচনী এলাকায় পূর্বনির্ধারিত দু’দিনের সরকারি সফরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন এলজিআরডি মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। মঙ্গলবার দুপুরে এমন প্রস্তুতির মাঝে জরুরি ফোন আসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। ফোন পেয়েই গণভবনে ছুটে যান সৈয়দ আশরাফ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সৈয়দ আশরাফকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে- এমন একটি খবর বেসরকারি টেলিভিশনগুলোতে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে এর আগে থেকেই প্রচার হতে থাকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৈয়দ আশরাফের সাক্ষাতের পর পরই দ্রুত বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। শেষ বিকালে নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৩ ঘণ্টা পর কিশোরগঞ্জ পৌঁছে সৈয়দ আশরাফ নিজেই বিষয়টিকে ‘গুজব’ হিসেবে অভিহিত করে এতে কান না দেয়ার পরামর্শ দেন সাংবাদিকদের। এরপর থেকেই ক্রমাগত গণমাধ্যমকে এড়িয়ে গেছেন তিনি। কিশোরগঞ্জ জেলায় গত দু’দিনের সফরে গণমাধ্যমকর্মীরা এ ব্যাপারে তার আর কোন মন্তব্য আদায় করতে পারেননি। তবে এলজিআরডি মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রণালয়ের কাজে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া, দল এবং মন্ত্রিসভায় তার বিরুদ্ধে অনেকেই কথা বলছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাকে সে ব্যাপারেও সতর্ক করেন। কিন্তু গণমাধ্যমের নিকট সৈয়দ আশরাফ এব্যাপারে কোন কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। গতকাল বুধবার সকালে সদরের যশোদল ইউনিয়নের বীরদামপাড়া গ্রামের বাড়ি পরিদর্শনের সময় ‘আপনার বিরুদ্ধে কারা ষড়যন্ত্র করছেন?’ এই প্রশ্নে সৈয়দ আশরাফ দু’ঠোটে তর্জনী আঙুল চেপে নিরুত্তর থাকেন। তবে বেলা ২টায় কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার সকল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দের পরিচিতি সভায় যোগ দিতে সৈয়দ আশরাফ সার্কিট হাউজে এসে পৌঁছালে উপস্থিত নেতাকর্মীদের ‘ষড়যন্ত্রের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’- এমন স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় এলজিআরডি মন্ত্রীর বেইলী রোডের বাসভবন থেকে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। মন্ত্রীর সঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ নিতে তার ২১ বেইলী রোডের বাসভবনে নির্ধারিত সময়ে যান কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক ও তার ছোট ভাই রাসেল আহাম্মদ তুহিনও। কিন্তু এর মাঝেই সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতির খবর বেসরকারি টেলিভিশনগুলোতে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার হতে থাকলে দেশজুড়ে এ নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়। এ নিয়ে কিশোরগঞ্জেও মন্ত্রীর সফর নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ফোন আসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। প্রধানমন্ত্রীর জরুরি ফোন পেয়ে তৎক্ষণাত গণভবনে ছুটে যান সৈয়দ আশরাফ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের কারণে সৈয়দ আশরাফকে অনেকটা বিলম্বে তার নির্ধারিত সফরের জন্য কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানা দিতে হয়। বিকাল ৩টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছার কথা থাকলেও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ বিকাল সোয়া ৬টার দিকে তার খরমপট্টি এলাকার বাসভবনে পৌঁছান। সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতির বিষয়টিকে ‘গুজব’ হিসেবে উল্লেখ করে এতে কান না দেয়ার পরামর্শ দেন। পরে শহরের সমবায় কমিউনিটি সেন্টারে কিশোরগঞ্জ জেলা ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত ইফতার পার্টিতে যোগ দিয়ে সেখানে ইফতারের পূর্বে সৈয়দ আশরাফ মাত্র এক মিনিটের বক্তৃতায় কিশোরগঞ্জ ও হোসেনপুর উপজেলায় দু’দিন দু’টি ইফতারে অংশ নিতে এসেছেন জানিয়ে ইফতার আয়োজকদের কৃতজ্ঞতা জানান। ইফতারের আগে ও পরে গণমাধ্যমকর্মীরা মন্ত্রিত্ব নিয়ে বার বার এলজিআরডি মন্ত্রীর বক্তব্য চাইলেও তাদের হতাশ করেন মন্ত্রী। ইফতার শেষে রাতে শহরের খরমপট্টি এলাকার বাসভবন ‘পূর্ণি ভিলা’য় মন্ত্রী রাতযাপন করেন। মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, বাসায় দলীয় নেতৃবৃন্দের অনেকেই মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তবে সেটি কুশলাদি বিনিময় পর্যন্তই ছিল। রাত একটার দিকে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফাঁকে ফাঁকে পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গেও অনুরূপ কুশল বিনিময় করেন। তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি নিয়ে তিনি টুকটাক কথা বলেন। এ সময় তিনি এও বলেন, ‘নো নিউজ ইজ গুড নিউজ, গুড নিউজ ইজ নো নিউজ।’ সকালে ঘুম থেকে ওঠে সোয়া দশটার দিকে তিনি যশোদল ইউনিয়নের বীরদামপাড়া গ্রামের বাড়ি পরিদর্শনের উদ্দেশে বের হন। বেলা ১১টার দিকে সেখানে পৌঁছে পারিবারিক কবরস্থানে সদ্যপ্রয়াত ফুফু সৈয়দা সজেতুন নেছার কবর জিয়ারত, নবনির্মিত মসজিদ পরিদর্শন ও শাহ সৈয়দ গওহর আলীর মাজার জিয়ারত করেন। সেখান থেকে বেলা পৌনে ১২টার দিকে তিনি কিশোরগঞ্জের বাসভবনের উদ্দেশে রওনা দিয়ে সাড়ে ১২টার দিকে বাসায় পৌঁছান। পরে বেলা ২টার দিকে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার সকল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দের পরিচিতি সভায় যোগ দিতে সৈয়দ আশরাফ সার্কিট হাউজে যান।

২০৫০-এর মধ্যে ৩ শূন্য অর্জনে ড. ইউনূসের ফর্মুলা

বিশ্বের নজর এখন রাশিয়ায় অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের দিকে। একে সামনে রেখে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও  সাউথ আফ্রিকা) দেশগুলোর প্রস্তাবিত নতুন ব্যাংক এনডিবি (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) বিশ্বব্যাংকের ক্লোন হওয়া উচিত নয়। ২০৫০ সালের মধ্যে এনডিবিকে তিনটি জিরোর লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এক. শূন্য দারিদ্র্য, দুই. শূন্য বেকারত্ব, তিন. শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণ।
উল্লেখ্য, রাশিয়ার উফ শহরে আজ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বৈঠকটি বসবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ ব্রিকস নেতারা ইতিমধ্যেই রাশিয়ার উফ শহরে পৌঁছেছেন। এই সম্মেলনকে সামনে রেখেই গতকাল ভারতের দৈনিক দি হিন্দু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। এতে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক কার্যক্রমের হূদয় হতে হবে মানবাধিকার ও সুশাসন।  
দি হিন্দুতে ‘একটি নতুন যুগের জন্য একটি নতুন ব্যাংক’ শিরোনামে প্রকাশিত এক নিবন্ধে গ্রামীণ ব্যাংক জনক ড. ইউনূস লিখেছেন, চলতি সপ্তাহে রাশিয়ায় অনুষ্ঠেয় ব্রিকস এর বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে একশ’ বিলিয়ন ডলারের মূলধন নিয়ে বিশ্বের নবীনতম বহুজাতিক ব্যাংক হিসেবে এনডিবি প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসছে। কিন্তু এই ব্যাংক যেন বিশ্ব ব্যাংকের মতো পুরনো ধ্যান-ধারণা ও মানসিকতা নিয়ে প্রকল্প তৈরি না করে। এই ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য এমার্জিং দেশগুলোর আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হতে দেয়া উচিত নয়। এর প্রতিষ্ঠার কারণ হওয়া উচিত খুবই উল্লেখযোগ্য। বিশ্বব্যাংক দেশে দেশে যেভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করা খুবই সহজ কিন্তু তাকে এই প্রবণতা প্রথম দিন থেকেই পরিহার করতে হবে।
ড. ইউনূস বলেন, আমি তাই এই নতুন ব্যাংকের উল্লিখিত তিনটি কোর বা মূল লক্ষ্য নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব করছি। এজন্য তরুণ প্রজন্মকে উদ্বেলিত করে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক ব্যবসায়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থানহীনতাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। প্রত্যেক মানব সন্তানের ডিএনএ-তে উদ্যোক্তা-সত্তা রয়েছে।

চার্জশিট গ্রহণ ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের দুটি মামলায় চার্জশিট (অভিযোগপত্র) গ্রহণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে পলাতক ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ারা জারি করেছেন আদালত। এর আগে একটি মামলার বাদীর নারাজি আবেদন খারিজ করেন আদালত। বুধবার সকালে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইদুজ্জামান শরীফ এ আদেশ দেন। সাত খুনের ঘটনায় জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) দাখিল করা চার্জশিটের (অভিযোগপত্র) বিরুদ্ধে একটি মামলার বাদী নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি নারাজি আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনের ওপর গত ৮ই জুন শুনানি হয়। আদেশের জন্য  বুধবার তারিখ ধার্য ছিল। আদালত ওই আবেদন নাকচ করে দুই মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) গ্রহণ করেন। আদেশের সময় সাত খুনের মামলায় অভিযুক্ত র‌্যাব-১১ এর সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার এমএম রানাসহ ২২ আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
সেলিনা ইসলাম বিউটির মামলার আইনজীবী জেলা বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, মামলার তদন্ত সংস্থা আদালতে যে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল তাতে অনেক অসঙ্গতি এবং এজাহার নামীয় অনেক আসামিকে বাদ দেয়ার কারণে আদালতে নারাজি পিটিশন দেয়া হয়েছিল। আমরা আশা করেছিলাম সুবিচার পাবো। কিন্তু আদালতের আদেশে আমরা ব্যথিত, হতাশ ও সংক্ষুব্ধ হয়েছি। আদেশের সই মুড়ি নকল হাতে পাওয়ার পর আমরা এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতে যাবো। সেলিনা ইসলাম বিউটি জানান, মামলার এজাহার থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর দুই আসামি ইকবাল ও আমিনুল হক রাজু এলাকায় ফিরে এসে হুমকিধমকি দিচ্ছে। রাজু মিজমিজি এলাকায় বলে বেড়াচ্ছে দেড় কোটি টাকা খরচ করে নাকি মামলা থেকে বেরিয়ে এসেছে। যারা মামলা করেছে তাদের এখন দেখে নেবে। আর সাত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে যারা আন্দোলন করেছে ইকবাল তাদের হুমকি দিচ্ছে। এতে আমরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছি। হত্যার পরিকল্পনাকারীদের চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অথচ তারা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল ১৫ দিনের মধ্যে নজরুল ইসলামকে শেষ করে দেবে। আমি আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবো।
রাষ্ট্রপক্ষের এপিপি কেএম ফজলুর রহমান জানান, সাত খুনের ঘটনায় দুটি মামলার মধ্যে একটি মামলার বাদী নিহত চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল আদালতে উপস্থিত থেকে কোন আপত্তি উত্থাপন করেনি। এবং চার্জশিট গ্রহণ করলে তার কোন আপত্তি নেই বলে আদালতকে জানান। আরেকটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি নারাজি দিয়েছিল, আদালত পর্যালোচনা ও উভয় পক্ষের শুনানি শেষে নারাজি পিটিশন খারিজ করে দিয়ে দুটি মামলায় চার্জশিট গ্রহণ করেছেন এবং মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছেন। নারাজি খারিজের পর আদালত প্রাঙ্গণে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার অনেকেই মন্তব্য করেন, একচেটিয়া ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এবং এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে সেলিনা ইসলাম বিউটি চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়েছেন। তিনি এজাহারে ৬ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। অথচ পুলিশ তদন্ত করে ৩৫ জনকে শনাক্ত করেছেন। এরমধ্যে র‌্যাবেরই ২৫ জন। কিন্তু মামলায় তিনি র‌্যাবের কাউকে আসামি করেননি। শুধুমাত্র নজরুলের নানা অপকর্মের বিরোধিতা করার কারণে মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া ৫ জনকে মামলায় আসামি করেছেন সেলিনা ইসলাম এবং নারাজি দিয়েছেন।
নাসিক প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণ শেষে হত্যার ঘটনায় নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে নূর হোসেনসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ্য করে একটি মামলা করেন। অন্যদিকে অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীমকে অপহরণ ও হত্যা মামলার বাদী ছিলেন চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। এ মামলায় আসামি অজ্ঞাত ছিল। গত ৮ই এপ্রিল মামলার তদন্তকারী সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সেভেন মার্ডারের দুটি মামলার অভিন্ন চার্জশিটে ভারতের কলকাতায় গ্রেপ্তারকৃত সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি নূর হোসেন এবং র‌্যাব-১১ এর সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার এমএম রানাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে বিউটির মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে এজাহারভুক্ত ৫ জনসহ ১৬ জনকে। এ ঘটনায় গত ১১ই মে আদালতে সেলিনা ইসলাম বিউটি চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি পিটিশন দাখিল করেন। অন্যদিকে একটি মামলার বাদী নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ের জামাতা বিজয় কুমার পাল চার্জশিটে সন্তোষ প্রকাশ করেন। উল্লেখ, ২০১৪ সালের ২৭শে এপ্রিল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোডের ফতুল্লা খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নাসিক প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহীমকে অপহরণ করে র‌্যাব-১১ এর একটি টিম। পরে তাদের প্রত্যেককে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ গুম করার জন্য লাশের পেট ফুটো করে বস্তাভর্তি ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। ৩০শে এপ্রিল বিকালে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১লা মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
যে ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ারা
এদিকে অভিযুক্ত ৩৫ জনের মধ্যে পলাতক ১৩ জন এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। তারা হলো, করপোরাল লতিফুর রহমান, সিপাহী আবদুল বারী, মহিউদ্দিন মুন্সী, আলামীন শরীফ, তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবীর, এএসআই কামাল হোসেন, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান, নাসিক কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি নূর হোসেন, তার সহযোগী মো. সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন। তাদের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ারা জারি করেছেন। এদিকে চার্জশিটে অভিযুক্ত ৩৫ জনের মধ্যে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৫ জন এবং নূর হোসেন ও তার ৯ সহযোগী। এদের মধ্যে নূর হোসেন ও তার সহযোগী সেলিম কলকতায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি রয়েছে।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ খন্দকার মুহিদ উদ্দিন জানান, অভিযুক্ত ৩৫ আসামির মধ্যে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালত আজ (বুধবার) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তারাও পর্যায়ক্রমে গ্রেপ্তার হয়ে যাবে। তিনি আবারও দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমরা স্পর্শকাতর সেভেন মার্ডারের ২টি মামলা তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছি। একটি মামলার বাদী বিজয় কুমার পাল শুরু থেকে চার্জশিটে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আরেকটি মামলার বাদী নারাজি পিটিশন দিয়েছেন। বিজ্ঞ আদালত শুনানি শেষে তা খারিজ করে দিয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, মামলার সবগুলো তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে চলে আসে। যার আর কোন কিছু অবশিষ্ট ছিল না। তাই চার্জশিট দিতে পেরেছি। এখন নূর হোসেনকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই আসতে হবে। এবং নূর হোসেন দেশে আসলেই গ্রেপ্তার হবে।

ব্লাড ব্যাংকে অভিযান: যেভাবে পানি হয়ে যায় রক্ত

কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মাদকাসক্ত ও পেশাদার দাতার রক্ত সংগ্রহ করছিল রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় ফেমাস জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ও বাংলাদেশ ব্লাড ব্যাংক। শুধু তাই নয়, স্যালাইন মিশিয়ে এক ব্যাগ রক্তকে দুই ব্যাগ বানিয়ে বিক্রি করছিল প্রতিষ্ঠান দুটি। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত গতকাল দুপুরে প্রতিষ্ঠান দুটিতে অভিযান চালিয়ে ভেজাল ও অপরীক্ষিত রক্ত জব্দ করেছে। পাশাপাশি দুই লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে তাদের।
র‌্যাব জানিয়েছে, ফেমাস জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ও বাংলাদেশ ব্লাড ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অপরীক্ষিত রক্ত জব্দ করা হয়। ব্লাড ব্যাংক দুটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও অধিক মুনাফার লোভে পরীক্ষা- নিরীক্ষা রক্ত সংগ্রহ করে থাকে। এমনকি রক্তের সঙ্গে স্যালাইন মিশিয়ে এক ব্যাগ রক্তকে দুই ব্যাগ বানিয়ে বিক্রয় করে প্রতিষ্ঠান দুটি। ব্লাড সংরক্ষণ করার জন্য ব্লাড প্রিজারভিশন রিফ্রেজারেটর ব্যবহার করা আবশ্যক হলে সাধারণ ফ্রিজ ব্যবহার করে এই দুটি প্রতিষ্ঠান। যা রক্ত সংরক্ষণের উপযোগী নয়। এসব অনিয়মের দায়ে বাংলাদেশ ব্লাড ব্যাংককে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ও ফেমাস জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক থেকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। র‌্যাব-২ উপপরিচালক ড. মো. দিদারুল আলমের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠান দুটিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন, র‌্যাব-২ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. স্বপন কুমার তপাদার।

পর্যাপ্ত বরাদ্দ কমানোর যুক্তি কী by নূরুননবী শান্ত

২৮ জুন জাতীয় সংসদের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ঘানা ও কেনিয়ার মতো দেশেও শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বাজেটের শতকরা ৩১ ভাগ। আর বাজেটের বরাদ্দ শতকরা ৪ দশমিক ৩ ভাগ। (প্রথম আলো ২৯ জুন) শিক্ষামন্ত্রী স্পিকারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানব সম্পদে পরিণত করার প্রয়োজনে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন শিক্ষায় বাজেট বাড়ানোর জন্য (ডেইলি স্টার ২৯ জুন)। ১০১৫-১৬ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার এতটাই বড় যে, অর্থমন্ত্রী নিজে এটাকে উচ্চাকাক্সক্ষী হিসেবে অভিহিত করেছেন। অবশ্য ইতোমধ্যে এই বাজেট পাসও হয়ে গেছে। বাজেট যখন বড় হয় তখন সাধারণভাবে ধরে নেয়া যায় যে, গুরুত্ব বিবেচনায় সব খাতেই আনুপাতিক হারে বাজেট বাড়বে। কিন্তু বাজেট প্রণয়নে এ ধরনের সংস্কৃতি অনুপস্থিত। বিশেষ করে, শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমে আসার প্রবণতায় আমরা হতাশ হই। ২ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার জন্য রাখা হয়েছে, যা জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ। আনুপাতিক হিসেবে গত বছরও শিক্ষা বাজেট ছিল জিডিপির ২ দশমিক ১৬ শতাংশ। বাজেটের আকার রেকর্ড ভাঙলেও শিক্ষায় বাজেট কমে যাচ্ছে। বরাদ্দের সিংহভাগই প্রাথমিক ও গণশিক্ষার হওয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পুরোপুরি বাজারের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে যা গরিবদের শিক্ষা অধিকার ক্ষুন্ন করবে। আবার বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বাজেট কমানোর কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পারফরমেন্সের ভিত্তিতেও তো শিক্ষায় বাজেট আনুপাতিকভাবে বাড়ার কথা। কিন্তু শিক্ষা প্রাধান্যের ক্রমাবনতিই স্পষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ হিসেবে মানব সম্পদকে বিবেচনা করা হয়।
২০১০ থেকে ২০১৪ সময়কালে বিশ্বব্যাংক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৩০ ভাগই ১৪ বছর বয়সের  কমে জনগণের মধ্যমা বয়স (মিডিয়ান এজ) এখন ২৫.৪ বছর (http://www.worldometers.info/world-population/bangladesh-population/)। তার মানে জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স পঁচিশের নিচে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সর্বোচ্চ সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে আমরা আছি। এই সুবিধার সঠিক ব্যবহারের ওপরেই নির্ভর করছে আমাদের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন। এর বাইরে আরো দুটি দৃশ্যমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট আমাদের তৈরি হয়েছে। প্রথমত, মোবাইল ফোন ও মোবাইল ফোনভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবহার প্রান্তিক অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত জনগণের হাতেও পৌঁছে গেছে। দ্বিতীয়ত, অবাধ অপরিকল্পিত দ্রুত বর্ধমান নগরায়নের বিপরীতে নাগরিক সুবিধা সীমিত হচ্ছে। একইসঙ্গে জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে গিয়ে সেবা খাতের অবদান বাড়ছে অথচ আনুপাতিকভাবে শিল্পায়নের বিকাশ থমকে আছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, আমাদের বিরাট জনসংখ্যার অর্ধেক, অর্থাৎ নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত, দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তোলার ওপরেই নির্ভর করছে আগামী দিনের সত্যিকার টেকসই উন্নয়ন। অতএব শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
আমরা বিশ্বাস করি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের স্বতঃস্ফূর্ত সুবিধার ওপর ভর করে আমরা হয়তো মধ্য আয়ের দেশে সময়মতোই পৌঁছে যাব, দারিদ্র্যও আশানুরূপ কমে যাবে, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম সে অর্জন ধরে রাখতে সক্ষম না হলে সবকিছু অর্থহীন হয়ে পড়বে, যেমনটা হয়েছে নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীনের উন্নয়ন ইতিহাস থেকে আমার শিক্ষা নেয়ার আছে। শিক্ষা প্রাসঙ্গিক ও মানসম্পন্ন হলে প্রজন্ম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা অর্জন করবে। এর ইতিবাচক প্রভাব আপনা-আপনি আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক সবক্ষেত্রেই পড়বে। বিশ্বব্যাংকসহ অনেক আন্তর্জাতিক মহলই অবশ্য বলছে যে, শিক্ষায়; বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ তুলনামূলক ভালো। কিন্তু এই প্রশংসা করার আগে বাংলাদেশের শিক্ষা গ্রহণের যোগ্য বয়সীদের সংখ্যা ও আনুপাতিক প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যদিকে, আমাদের শিক্ষামন্ত্রীসহ সবাই জানেন ও মানেন যে শিক্ষার মান সন্তোষজনক নয়। পঞ্চম শ্রেণী পাস করেও আমাদের অনেক শিশু মাতৃভাষায় শুদ্ধ বাক্য লিখতে সক্ষম হচ্ছে না। এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন যে, প্রাথমিক শিক্ষার পরে শিশুরা ঝরে পড়ে, মানসম্মত শিক্ষকের অভাব প্রকট এবং এই (মাধ্যমিক) স্তরে শিক্ষার মান নিম্ন পর্যায়ে আছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে এই বাস্তব উপলব্ধি সত্ত্বেও ঘোষিত বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন নেই। এটা নীতি-নির্ধারকদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বটে। আজকাল বাজেট ঘোষণা টেলিভিশনের পর্দায় দেখা এখন প্রায় ক্রিকেট খেলা দেখার মতোই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাজেট বক্তৃতা দীর্ঘ বা হ্রস্ব যাই হোক, দর্শক তথা জনসাধারণের মনোজগতে তা একটা প্রভাব ফেলে। তরুণরা এখান থেকে শিক্ষাও গ্রহণ করে। বাজেট এখন জনপ্রিয় ডিসকোর্স। করের আওতা বাড়লেও, কর্পোরেট কর কমানো; কালো টাকা সাদা করার চিরায়ত ব্যবস্থা কিংবা বিদেশের ব্যাংকে টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া ইত্যাদি বিষয়ে জনগণ সরকারের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করে। ধনীদের টাকা পাচার করার প্রবণতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রচার মাধ্যমের সামনে অর্থমন্ত্রী যখন বলেন যে, ‘এটা আসলে দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ’, তখন এভাবে বিশাল অঙ্কের কর লোকসান মেনে নেয়াকে দুর্নীতিগ্রস্ততাকে উৎসাহিত করার শামিল বিবেচনা করা যায়। করারোপে ন্যায্যতা নিশ্চিত না করতে পারলে উন্নয়ন বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে না। ধনীরা অধিকতর ধনী হতে থাকবে। অন্যদিকে, বাজেটের ব্যয় খাতে মানব সম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন প্রাধান্যকে খাটো করা ঘরের খুঁটিকে দুর্বল করে রেখে ঘরের বেড়াকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ানোই সব কথা নয়। কর আদায়ের পদ্ধতি ও কোথায় ব্যয় করলে নব্বই ভাগ সাধারণ মানুষের কল্যাণ হবে, বৈষম্য কমবে এসব কিছুই আসল কথা। বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করার জন্য সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে। জনসংখ্যার অর্ধেকই যেহেতু শিক্ষা খাতের ওপর নির্ভরশীল, সুতরাং শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো, উপকরণ, বিষয়বস্তু, শিখন-শিক্ষণ প্রক্রিয়া, শিখন মূল্যায়ন পদ্ধতি, পাঠ্যক্রম হালনাগাদকরণ, শিক্ষকের মান ও সম্মান বৃদ্ধি, শিক্ষা গবেষণা, ঝরেপড়াদের দক্ষতা উন্নয়ন ও জীবনমুখী শিক্ষার আওতায় আনা, শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন ইত্যাদি কোনোকিছুই সম্ভব নয় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ছাড়া। কৈলাস সত্যার্থী সম্প্রতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেছেন, দেশকে উন্নত দেশ হিসেবে দেখতে হলে প্রতিটি শিশু, কিশোর-কিশোরীর অধিকার আছে দেশ গড়ার কাজে অবদান রাখার উদ্দেশ্যে নিজের যোগ্যতা তৈরির শিক্ষা পাওয়ার। এই অধিকার নিশ্চিত হলে উন্নয়নের কারিগরের অভাব বাংলাদেশে হবে না। দারিদ্র্যমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ জনগণ নিজেরাই গড়ে তুলতে পারবে যদি তাদের উপযুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত হয় অথচ আমরা কেবল হতাশাই দেখতে পাচ্ছি। অর্থ মন্ত্রণালয় কি অন্তত একটা ব্যাখ্যা জনগণের সামনে পেশ করতে পারে কী কী যুক্তিতে শিক্ষায় বরাদ্দ কমানো হলো?   
লেখক: গল্পকার ও উন্নয়নকর্মী

ঈদের জামা পরা হলো না ফাহিমের

এবার ঈদে শার্ট-প্যান্ট কেনার বায়না ধরেছিল ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ফাহিম। আবদার মেটাতে চা বিক্রেতা পিতার আগ্রহের কমতি ছিল না। ঈদের কেনাকাটা করতে মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় এসেছিল ফাহিম। কিন্তু কেনাকাটা করার আগেই তার জীবন কেড়ে নিয়েছে ঘাতক বাস। গতকাল দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষুব্ধ জনতা ওই বাসে অগ্নিসংযোগ করে। এসময় রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রকাশ করে তারা। এ ঘটনায় দুই বাসের চালককে আটক করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দুপুরে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ট্রান্সসিলভা পরিবহনের বাস থেকে নামছিল ফাহিম। এ সময় পেছন থেকে ভিআইপি-২৭ নামের অপর একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়। এতে গুরুতর আহত হয় ফাহিম। এসময় বিক্ষুব্ধ লোকজন ওই দুই বাসের চালককে ধরে মারধর করে। সেইসঙ্গে ভিআইপি-২৭ নামের বাসটিতে অগ্নিসংযোগ করে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে।
নিহতের স্বজনরা জানান, গাজীপুর থেকে আজিমপুরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে ওই বাসে উঠেছিল ফাহিম। কিন্তু আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ওই বাসটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গাড়ি থেকে নামেন ফাহিমসহ অন্য যাত্রীরা। আজিমপুরে ওই শিশুর নানার বাড়ি। সেখান থেকে পরে ঈদের কেনাকাটা করার কথা ছিল তাদের।  নিহত ফাহিম গাজীপুরের পলপপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। তার পিতার নাম জাহাঙ্গীর আলম। তিনি একজন চা বিক্রেতা। মায়ের নাম ঝরনা বেগম। তাদের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুরের দমনী গ্রামে।
ধানমন্ডি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আজম মিয়া জানান, বাসটি আজিমপুরে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। এ ঘটনায় দুই বাসের চালককে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে ফাহিমের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

বৃষ্টিতে নিউমার্কেটে দুর্ভোগ -ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
পবিত্র ঈদের কেনাকাটায় ঢাকার বিপণিবিতানগুলোতে ভিড় বেড়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলেই এসব বিপণিবিতানে আসা লোকজন দুর্ভোগে পড়ে। যেমন বুধবারের একটু বৃষ্টিতেই রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় সাধারণ মানুষকে চলাফেরা করতে হয় সড়ক বিভাজনের ওপর দিয়ে। ছবিটি বুধবার ঢাকা কলেজের সামনে থেকে তোলা। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
একটু বৃষ্টিতেই রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পবিত্র ঈদে বিপণিবিতানে কেনাকাটা করতে আসা মানুষগুলোকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ছবিটি বুধবার রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা থেকে তোলা। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকার অনেক সড়কে পানি জমে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ছোট সড়ক বিভাজকেও হাঁটতে না পেরে কাদার মধ্যেই চলছেন পথচারী। ছবিটি বুধবার ঢাকা কলেজের সামনে থেকে তোলা। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
পাশেই পদচারী-সেতু। কিন্তু অনেকে সেটিতে না উঠে ঝুঁকি নিয়েই সড়ক পার হচ্ছেন। ছবিটি বুধবার বিকেলে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকা থেকে তোলা। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
পবিত্র ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার সড়কে বেড়েছে যানবাহনের চাপ। ছবিটি বুধবার বিকেলে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকা থেকে তোলা। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷
বৃষ্টি হলেই রাজধানীর অনেক এলাকায় জমে পানি। পবিত্র ঈদে কেনাকাটা করতে পানি উপেক্ষা করেই বিপণিবিতানে যেতে হচ্ছে মানুষকে। ছবিটি বুধবার ঢাকার নিউমার্কেট এলাকা থেকে তোলা। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন ৷

মালয়েশিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ উপ-প্রধানমন্ত্রীর

প্রায় ৭০ কোটি ডলার দুর্নীতির অভিযোগে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পড়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। এমন কি তার দল ইউনাইডেট মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনে (উমনো) ভাঙন ধরার আলামত পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। গতকাল সকালের দিকে পুলিশ জালান সুলতান ইসমাইল এলাকায় ‘ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ’ (১এমডিবি) অফিসে তল্লাশি চালিয়েছে। তারা সেখান থেকে বেশ কিছু দলিলপত্র নিয়ে যায়। নাজিব রাজাক যতই দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করুন না কেন, এরই মধ্যে দৃশ্যত তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন উপ-প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল যে ডকুমেন্টারি অভিযোগ উত্থাপন করেছে মুহিউদ্দিন ইয়াসিন সে ব্যাপারে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন উমনো’র ভাইস প্রেসিডেন্ট শাফি আবদাল। এর মধ্য দিয়ে দলে ভাঙনের সুস্পর্শ একটি ইঙ্গিত মিলেছে। অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রকাশক ডো জনসের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করেছেন। কিন্তু এমন হুমকিতে ভীত নন ডো জোনস। তার পত্রিকায় যে রিপোর্ট, প্রমাণমূলক ডকুমেন্ট প্রকাশ হয়েছে তার যথার্থতার সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত। তবে কি করে তারা মালয়েশিয়ার ব্যাংকের এসব ডকুমেন্ট পেলেন তা তদন্ত করে বের করার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন মালয়েশিয়া পুলিশের মহাপরিদর্শক খালিদ আবু বকর। আবার এরই মধ্যে এই দুর্নীতি সংক্রান্ত কারণে ছয়টি ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল গনি পাতাইল বলেছেন এর মধ্যে নাজিব রাজাকের কোন একাউন্ট নেই। অন্যদিকে কিভাবে ৭০ কোটি ডলারের আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস হয়েছে তা তদন্তেরও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সবকিছু মিলে এই যখন অবস্থা তখন গতকাল মালয়েশিয়ার স্টার পত্রিকা প্রধানমন্ত্রী ও তার দল উমনোর জন্য স্পর্শকাতর সময় শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রশাসনের জন্য ‘ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ’ (১এমডিবি) ইস্যুটি এখন রাজনৈতিক দৈত্যের রূপ নিচ্ছে। এ অবস্থায় নাজিব রাজাক তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গত শুক্রবার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যে, ১এমডিবি তহবিলের প্রায় ৭০ কোটি ডলার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্টে স্থানান্তর হয়েছে। এর স্বপক্ষে তারা এরই মধ্যে ৯টি ডকুমেন্ট প্রকাশ করেছে। এ ঘটনা এখন আর্থিক খাত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। দুর্নীতির এ অভিযোগকে নাজিব রাজাক কতিপয় সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির কারসাজি বলে দাবি করেছেন। তার দাবি, ব্যক্তিগত স্বার্থে তিনি কোন অর্থ ব্যবহার করেন নি। এই অভিযোগ উঠার আগে পর্যন্ত দলে নাজিব রাজাকের সমর্থন ছিল ব্যাপক। উমনোর প্রধানদের মধ্যেও তার প্রতি ছিল সমর্থন। তারা এখনও তার পাশে থাকতে চান। কিন্তু তার জন্য তাদের প্রয়োজন একটি পরিষ্কার জবাব। নাজিব পরিষ্কার করেছেন যে, তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে মামলা করবেন। তার আইনজীবী ডো জোনসের বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ মামলা করা হবে যেন, তার নাম এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না থাকে অথবা তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। কিন্তু নাজিব রাজাকের ওপর চাপটা আরও বেড়ে গেছে যখন মঙ্গলবার দেশের শীর্ষ চারটি রেগুলেটরি বডি ও আইন প্রয়োগকারীরা একটি যৌথ বিবৃতি দেন। ওই বিবৃতিতে তারা বলেন, ১এমডিবি দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগে যে ছয়টি ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হয়েছে তা তদন্ত করছে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। এসব ব্যাংক একাউন্ট কার কার তা জানানো হয় নি। ফলে তদন্ত যে এখন গুরুতর মোড় নিয়েছে এবং তা জটিল হয়ে উঠছে তা বলা যায়। সন্দেহের যে ‘স্নো বল’ তা আস্তে আস্তে বড় হতে শুরু করেছে। স্টার পত্রিকা লিখেছে, উপ-প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিন আরও চাপে ফেলেছেন নাজিব রাজাককে। কারণ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দল ইউনাইডেট মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (উমনো)’র ভাইস প্রেসিডেন্ট শাফি আবদাল। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের এ সময়ে তাদের এ ভূমিকা দলে রাজনৈতিক বিভক্তি নিশ্চিত করে। দল এরই মধ্যে লক্ষ্য করছে, কিছুদিন আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের ওপর হামলার পর তিনি নীরব রয়েছেন। এর অর্থ হতে পারে দুটি। এক. তিনি মনে করতে পারেন তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে। তিনি নাজিব রাজাককে একপেশে করে ফেলতে পেরেছেন। দুই. দল থেকে তিনি প্রধানকে সরাতে সক্ষম হয়েছেন। ওদিকে রোববার রাতে উমনোর সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্যরা নাজিবের সঙ্গে তার সরকারি বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাৎ নিয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি নন। এতে ধারণা করা হয়, বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা হয়তো দলীয় প্রধানের ওপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে থাকতে পারেন। যদি তা-ই না হতো তাহলে তারা কেন এতটা গোপনীয়তা বজায় রাখবেন। গতকাল আবারও নাজিব রাজাক বলেছেন, তিনি ১এমডিবি তহবিল থেকে কখনও ব্যক্তিগত স্বার্থে অর্থ নেন নি। ওদিকে পুলিশ মহাপরিদর্শক খালিদ আবু বকর বলেছেন, ব্যাংক কর্মকর্তা, এমনকি ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়াসহ প্রতিটি ব্যক্তিকে তদন্তের আওতায় আনা হবে। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হবে ১এমডিবি কেলেঙ্কারির এ দলিলগুলো কিভাবে ফাঁস হলো। তিনি বলেন, আমরা ব্যাংকিং ডকুমেন্টগুলোর বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়ার জন্য দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালেও তদন্ত করবো।

পুলিশের চড়...

নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের উকিল পাড়া এলাকা। এখানে উল্টো পথে মোটরসাইকেল চালানোর জন্য নারায়ণগঞ্জ মডেল থানার ইন্সপেক্টর-তদন্ত শাহজালাল কয়েকজন মোটরসাইকেল আরোহীকে চড়-থাপড় মারেন। ঘটনাটি আজ বুধবার বেলা আড়াইটার। ছবিগুলো তুলেছেন ফটোসাংবাদিক পাপ্পু ভট্টাচার্য্য
ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ শহরের উকিল পাড়ায় ঢোকার জন্য বঙ্গবন্ধু সড়কে উল্টো পথ দিয়ে যাওয়ার অভিযোগে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে আটকে তাঁর হেলমেট খোলার চেষ্টা। 
ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য, নারায়ণগঞ্জ
অন্য পুলিশের সহযোগিতায় মোটরসাইকেল আরোহীর হেলমেট খুলছেন পুলিশ কর্মকর্তা। 
ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য, নারায়ণগঞ্জ
হেলমেট খুলে মাটিতে ফেলে দিয়ে চর-থাপড় দিচ্ছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। 
ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য, নারায়ণগঞ্জ
চড়-থাপড় চলছেই। থামানোর চেষ্টা মোটরসাইকেল আরোহীর। 
ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য, নারায়ণগঞ্জ
এরপর করা হচ্ছে জরিমানা। 
ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য, নারায়ণগঞ্জ
অন্য আরেক মোটরসাইকেল আরোহীকে একই অভিযোগে চড় মারছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

স্বপ্নার স্ক্যান্ডাল সিলেটে তোলপাড় by ওয়েছ খছরু

কখনও জেএসডি নেত্রী। কখনও মানবাধিকার কর্মী। আবার কখনও একজন ব্যবসায়ী। বহু পরিচয়ে চলেন সিলেটের   স্বপ্না আক্তার। মধ্য বয়সী এই নারীকে নিয়ে সিলেটে কৌতুহলের অন্ত নেই। সমপ্রতি তার সেক্স স্ক্যান্ডাল নিয়ে তোলপাড় চলছে সিলেটজুড়ে। বহু পুরুষের সঙ্গী এই স্বপ্না আক্তার। পুরুষদের সঙ্গে প্রেম, অভিসার, এক সঙ্গে যাপন সব কিছুই তার কাছে ছেলেখেলা। এক সঙ্গে বহু পুরুষের সঙ্গে রোমাঞ্চ প্রেম চালিয়ে যাওয়া স্বপ্না আক্তার ইতিমধ্যে সিলেটের যুবকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন ভিন্নরূপে। ইন্টারনেট মিডিয়ার বদৌলতে রাতারাতি পরিচিতি পেয়ে গেছেন তিনি। বেশ কয়েক মাস ধরে ইউটিউবে সিলেটের স্বপ্নার স্ক্যান্ডাল ভিডিও ঝড় তুলেছে ওয়েব দুনিয়ায়। এক যুবকের সঙ্গে হোটেল কক্ষে অবাধে মেলামেশার দৃশ্য বেশ অকপটে ধারণ করেন স্বপ্না। মাত্র দেড় মিনিটের স্থায়ী ওই ভিডিওতে স্বপ্না নিজেকে উপস্থাপন করেছেন যৌন ভঙ্গিমায়। আর তার এসব নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই সিলেটে। চলছে মাতামাতি। সবখানেই আলোচনা। স্বপ্নাকে ঘিরে জল্পনার ডালপালা ছড়াচ্ছে সিলেটে। সেই কলেজে পড়ার জমানা থেকেই তিনি বাস করছেন সিলেটে। এর আগে স্বপ্নার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। স্বামী ছিল পল্লী চিকিৎসক। স্বামীর সঙ্গে বাস করেছেন নগরীর চারাদিঘীরপাড় এলাকায়। স্বপ্নার একটি পুত্র সন্তানও রয়েছে। সিলেটে স্বপ্নার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে জকিগঞ্জের শিহাব নামের এক ব্যবসায়ীর। একপর্যায়ে ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ওই সময় স্বপ্না আক্তার নিজেকে উজাড় করে দেন শিহাবের উপর। স্বামীর সঙ্গ ছেড়ে তিনি পাড়ি জমান নগরীর উপশহর এলাকায়। ওই এলাকায় দুটি বাসা ভাড়া করে পর্যায়ক্রমে করেন বসবাস। ওই সময় স্বপ্না স্বামী হিসেবে জকিগঞ্জের ওই ব্যবসায়ীর নাম জানিয়েছিলেন। কোথাও কোথাও শিহাবকে ভাই হিসেবেও পরিচয় দেন স্বপ্না। ওই সময় শিহাবও স্বপ্নার ঘরে টিভি, ফ্রিজ, ফার্নিচার দেন। পাশাপাশি স্বপ্নার ছেলের পড়ালেখার খরচ দেন। স্বপ্নার সম্পর্কের বিষয়টি এক সময় জানতে পারেন শিহাবের পরিবারও। এ নিয়ে পারিবারিকভাবে অশান্তিতে পড়েন শিহাব। শিহাবের পরামর্শে সিলেট নগরীর মীরাবাজারের আগপাড়া গলির মুখে মা টেইলার্স চালু করেছিলেন স্বপ্না বেগম। ওই টেইলার্সের মালিক ছিলেন স্বপ্না নিজেই। টেইলার্সের কাজের জন্য স্বপ্না আরও কয়েকটি মেয়ে রাখেন। ওই মেয়েদের দিয়ে অসামাজিক কাজ চালানোর অভিযোগ উঠে স্বপ্নার বিরুদ্ধে। এলাকার যুবকদের কাছে ওই টেইলার্স ছিল পরিচিত স্থান। এর সামনে গড়ে উঠেছিল যুবকদের আড্ডাস্থলও। সিলেটের সোনাপাড়া এলাকার নবারুন ৬৫নং বড়বাড়ির বাসিন্দা মুক্তার মিয়ার বাসার দুই তলার ভাড়াটে ছিলেন স্বপ্না আক্তার। ওই সময় স্বপ্নার সঙ্গে বাড়ির মালিকেরও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্ক এক সময় আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি জানাজানি হয় বাড়িওয়ালার পরিবারে। পরে বাড়িওয়ালার পক্ষ থেকে স্বপ্নাকে বাসা ছাড়ার নোটিশ প্রদান করা হলে স্বপ্না নিজেকে বাসার মালিক দাবি করেন। এ নিয়ে স্বপ্না আক্তার সিলেটের শাহপরান থানায় মামলাও করেছিলেন। এতসব স্ক্যান্ডালের ভিড়ে স্বপ্নার নতুন সংযোজন ওয়েব মিডিয়া। ইউটিউবে চলে গেছে স্বপ্নার যৌন লিলার অশালীন ফুটেজ। সেগুলো নিয়ে ঝড় উঠেছে সামাজিক গণমাধ্যমে। এ সংক্রান্ত দুটি ফুটেজও চলে এসেছে মানবজমিনের এ প্রতিবেদকের হাতে। ফুটেজে দেখা গেছে, স্বপ্না আক্তার সিলেট শহরের একটি হোটেল কক্ষে আমেরিকান প্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়েছেন। ফুটেজে ওই যুবকের সঙ্গে স্বপ্নার অশ্লীলতার এমন কোন দৃশ্য নেই যা ক্যামেরাবন্দি হয়নি। দুটি ফুটেজের সবচেয়ে আলোচিত দেড় মিনিটের ফুটেজ কয়েক মাস আগে ইউটিউবে পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন স্বপ্নার কয়েকজন বয়ফ্রেন্ড। আর অশ্লীলতার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ হওয়ার পর স্বপ্নার সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলতে থাকা যুবকরা চলে যায় দূরে। বছরখানেক আগের ঘটনা। স্বপ্নার ছোটো ভাই দুলাল ছিল প্রবাসী। প্রবাস থেকে ফেরার পথে দুলাল বিয়ে করেন। আর বোনের ফাঁদে পড়ে এক পরিবারভুক্ত হন তিনি। কিন্তু দুলালের কাছে এক সময় পরিষ্কার হয় স্বপ্নার চরিত্র। বোনের বহুগামিতা বিচলিত করে তোলে দুলালকে। এসব নিয়ে স্বপ্নার সঙ্গে দুলালের দ্বন্দ্ব হয়। দুলালও খারাপ আচরণের জন্য বোনকে মারধর করেন। এরপর থেকে আলাদা ভাবে বাস করছেন দুলাল। এদিকে, এতসবের ভিড়ে বড় আকারের প্রতারণা শুরু করেছিলেন সিলেটের স্বপ্না আক্তার। তিনি জালালাবাদ সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির ব্যানারে একটি সঞ্চয়ী সমিতি খুলেছিলেন। ওই সমিতির মাধ্যমে হাজারো মহিলার টাকা লুটে নেন তিনি।

জাতীয় পার্টির মহাসচিবের উপস্থিতিতে সিলেট সার্কিট হাউস রণক্ষেত্র, গোলাগুলি by ওয়েছ খছরু

সিলেট সার্কিট হাউসে জাতীয় পার্টির দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় সার্কিট হাউস। এ সময় জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু সার্কিট হাউসে উপস্থিত ছিলেন। সংঘর্ষকালে সিলেট সার্কিট হাউস ব্যাপক ভাঙচুর ছাড়াও উভয় পক্ষ বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ ২০ জনকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাব্বির আহমদসহ ১৮ জনকে আটক করেছে। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ২২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ ঘটনার পর সিলেট সার্কিট হাউসে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ পাহারায় জিয়াউদ্দিন বাবলুকে নিয়ে যাওয়া হয় সার্কিট হাউসের ওপরের কক্ষে। সিলেট জেলা জাতীয় পার্টির ইফতার মাহফিলে যোগ দিতে গতকাল বিকালে সিলেটে আসেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু। তিনি বিকালে নগরের মেট্রো হোটেলে সার্কিট হাউস অনুষ্ঠানে যোগ দেন। আর সন্ধ্যায় সিলেট জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির নেতাদের নিয়ে সার্কিট হাউসের ভিআইপি কক্ষে বৈঠক শুরু করেন। এ সময় সেখানে যান জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব সেলিম উদ্দিন ও এমপি ইয়াহহিয়া চৌধুরী এহিয়া গ্রুপের কর্মীরা। এ সময় দুই এমপিকে রেখে কেন বৈঠক হচ্ছে- এ বিষয়টি জানতে চান সেলিম ও এহিয়া গ্রুপের কর্মীরা। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রথমে ভিআইপি কক্ষের ভেতরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একপক্ষ আরেক পক্ষের ওপর হামলা চালায়। কক্ষের বাইরে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির ঘটনা ঘটে। আধঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ একপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে সার্কিট হাউসের বাইরে। দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে পুলিশ ২২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষকালে এমপি এহিয়া গ্রুপ ও তাজ রহমান গ্রুপের কর্মীরা পাল্টাপাল্টি গুলি ছুড়ে বলে জানিয়েছের প্রত্যক্ষদর্শীরা। সংঘর্ষে বিশ্বনাথ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লালু, জাবের আহমদ, দিনার হোসেন, হালিম বাছির আহমদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। আহতদের গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে, সংঘর্ষের পর পুলিশ সার্কিট হাউস এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় পুলিশ জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাব্বির আহমদ, জেলা জাপার যুগ্ম আহ্বাক আবদুল মালেক খান, ফয়েজ আহমদসহ ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের সিলেটের কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর যাদের আটক করা হয়েছে তারা নিচের সারির নেতা। সিলেটের কোতোয়ালি থানার ওসি সোহেল আহমদ জানিয়েছেন, খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে পুলিশ ১৮ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে থানায় মামলা হলে আটককৃতদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে। এদিকে, সিলেট জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আবদুল্লাহ সিদ্দিকী এ ঘটনার জন্য বহিরাগতদের দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, এমপি এহিয়ার নেতৃত্বে সার্কিট হাউসে হামলা ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। তারা সশস্ত্র অবস্থায় এসে হামলা চালায়। তবে, এমপি এহিয়া জানিয়েছেন, তার গ্রুপের কর্মীরা সার্কিট হাউসে গেলে ওখানে থাকা সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। তারা মারধর করে কর্মীদের তাড়িয়ে দিতে চাইলে এ ঘটনা ঘটে। তার পক্ষের কেউ গুলি ছুড়েনি বলে জানান তিনি।
বাবলুকে হুইপ সেলিম উদ্দিনের ‘ঠক্কর’
সিলেটে এসে ‘ঠক্কর’ খেলেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু। দলের অধিকতর জুনিয়র নেতা ও পার্টির যুগ্ম মহাসচিব বিরোধীদলীয় হুইপ সেলিম উদ্দিনের সঙ্গে এ ঠক্কর খেলেন তিনি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সিলেট নগরীতে জাতীয় পার্টির তার বলয়ের নেতাদের নিয়ে ইফতার পার্টির আয়োজন করেছেন। আর জাতীয় পার্টির সিলেটের বর্তমান কমিটির নেতাদের নিয়ে আলাদা ইফতার পার্টির আয়োজন করলেন দলের কেন্দ্রীয় মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু। এ ইফতার পার্টির আয়োজনকে কেন্দ্র করে সিলেটে জাতীয় পার্টির নেতারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেন। অনেক নেতাই কোন ইফতার পার্টিতে যোগ দেননি। তবে, বর্তমান কমিটির মূল স্রোতের নেতারা পার্টির মহাসচিবের ইফতার পার্টিতে যোগ দেন। সিলেটে জাতীয় পার্টিতে বিভক্তি নতুন নয়। দলের চেয়ারম্যান আলহাজ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একেক সময় এক-এক নেতার হাতে দলের দায়িত্ব দেয়ার কারণে সিলেটের বিভক্তি চরমে। এ বিভক্তির সর্বশেষ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য তাজ রহমান ও দলের যুগ্ম মহাসচিব সেলিমউদ্দিনের মধ্যে। তাজ রহমান দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেও তিনি সংসদ সদস্য কিংবা হুইপ হতে পারেননি। আর সেলিম উদ্দিন দলের যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পাশাপাশি সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে এটিইউ তাজ রহমান দলের প্রেসিডেন্ট আলহাজ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও সেলিম উদ্দিন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলয়ের নেতা হিসেবে পরিচিত। এ দুই নেতার দ্বন্দ্বের কারণে বছরখানেক আগে জাতীয় পার্টির সেলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে থাকা কমিটি ভেঙে দেন তাজ রহমান। আর সিলেট জাতীয় পার্টির ত্যাগী নেতা কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল্লাহ সিদ্দিকীকে আহ্বায়ক ও উসমান আলীকে সদস্য সচিব করে কমিটি গঠন করেন। এরপর সেলিম উদ্দিন অংশের নেতারা জাতীয় পার্টির ওই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর থেকে সিলেটে জাতীয় পার্টি দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এবার রমজানে সিলেট জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টি কয়েক দিন ধরে ইফতারের আয়োজন করছিলেন। এ আয়োজনে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছেন দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু। গতকাল সিলেট নগরীর ধোপাদিঘীড় পাড় এলাকার হোটেল মেট্রোতে এ ইফতার পার্টি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে দুপুরে দলের মহাসচিব সিলেটে এসে পৌঁছলে বিমানবন্দরে দলের সিনিয়র নেতারা বরণ করেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এটিইউ তাজ রহমান, আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, উসমান আলী, সদর দক্ষিণের আহ্বায়ক ফরিদুর রহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম আহমদ মিন্টুসহ সিনিয়র নেতারা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। গতকালের ইফতার সম্পর্কে সিলেট জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আবদুল্লাহ সিদ্দিকী গতকাল জানিয়েছেন, সেলিম আহমদ দলের যুগ্ম মহাসচিব হওয়ায় আমি নিজে গিয়ে দাওয়াত দিয়েছি। তিনি বলেছেন, জকিগঞ্জে তার একটি ইফতার মাহফিল রয়েছে তিনি সেখানে যাবেন। এ কারণে আসতে পারবেন না। এর পরও আমরা তাকে উপস্থিত থাকার জন্য বারবার অনুরোধ জানিয়েছি। তিনি বলেন, দলের মহাসচিবের সঙ্গে সিলেটের কারও ঠক্কর হতে পারে না। কেউ ইফতারে না এলে কিছু হবে না। এদিকে, জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব সেলিম উদ্দিন জানিয়েছেন, ভোরের দিকে সিদ্ধান্ত নিয়ে নগরীর শিবগঞ্জের শাকিল কমিউনিটি সেন্টারে আমরা ইফতারের আয়োজন করেছি। এ আয়োজনে ৫০০-এর বেশি নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। সেলিম উদ্দিন বলয়ে জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল শহীদ লস্কর বশীর ছাড়াও বিদ্রোহী অংশের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

‘লুটনে যাবো কিভাবে, ঢুকলেই গ্রেপ্তার হবো’ -সিরিয়া থেকে মিনারা by ওয়েছ খছরু

‘মামলা করায় আমরা বিপাকে পড়েছি। এখন লুটনে যাবো কিভাবে। ঢুকলেই পুলিশ গ্রেপ্তার করবে।’-সিরিয়া থেকে টেলিফোনে লন্ডনে থাকা স্বজনদের উপর এভাবে ক্ষোভ জানান আবদুল মান্নানের দ্বিতীয় স্ত্রী মিনারা খানম। দেশে থাকা দেবর আবদুল লতিফের কাছে ফোনে এ কথা জানিয়েছিলেন মিনারা। আর ওই ফোনেই মিনারা জানিয়েছিলেন, তারা তুরস্ক হয়ে সিরিয়াতে চলে গেছেন। এবং দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। পুরুষ ও মহিলা বিভক্ত হয়ে পড়ার কারণে পরবর্তীতে কি করবেন-সে ব্যাপারে তারা দ্রুত সিদ্ধান্তও নিতে পারছেন না। সিরিয়া চলে গেছে যাওয়ার ২০ দিনের মাথায় দেশে থাকা স্বজনদের কাছে একবারই ফোন দিয়েছিলেন সিরিয়ায় থাকা মিনারা খানম। আর এই ফোনে সিরিয়া থেকে কেবল কথা বলেন- আবদুল মান্নানের দ্বিতীয় স্ত্রী মিনারা খানম। তারা ভাল আছেন জানিয়ে দেয়া ফোন কলে মিনারা জানান, লন্ডনে এখন তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সুতরাং তারা লন্ডনে গেলেই গ্রেপ্তার হবেন। লুটন শহরে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের লন্ডন প্রবাসী আবদুল মান্নানের বাসা। দ্বিতীয় স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তুরস্ক হয়ে সিরিয়া হয়ে গেছেন। প্রায় দুই মাস হতে চললো পরিবারের ১২ সদস্যই অবস্থান করছেন যুদ্ধের ময়দান সিরিয়াতে। প্রবাসে থাকা স্বজনরা জানিয়েছেন, ১১ই মে আবদুল মান্নানসহ পরিবারের সদস্য বাংলাদেশ থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। পথিমধ্যে তুরস্কতে ছিল তাদের তিন দিনের যাত্রা বিরতি। তুর্কি এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে তারা তিন দিনের যাত্রা বিরতি করবেন-সেটি দেশে থাকা স্বজনদের জানিয়েছিলেন আগেই। এর ফলে তারা তুরস্কতে তিন দিন অবস্থানের পর নিয়ম মতো ১৪ই মে লন্ডনে গিয়ে পৌঁছার কথা। কিন্তু ১৬ই মে পর্যন্ত তারা লন্ডনে না পৌঁছায় বৃটেনের পুলিশকেও ১৭ই মে প্রথমে বিষয়টি জানান আবদুল মান্নানের সন্তান সেলিম আহমদ। তিনি লুটন পুলিশকে বিষয়টি জানানোর পর পুলিশ তাদের বাসা দফায় দফায় তল্লাশি করে। আর তল্লাশির সময় পুলিশ হেলিকপ্টার দিয়ে বাসার উপরে টহল দেয়। এতে করে আবদুল মান্নানের বাসা নিয়ে ওই এলাকার স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। এরপর তাদের খোঁজ না পাওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী সেলিম আহমদ পিতাসহ পরিবারের সদস্যদের খোঁজ দাবি করে লুটন পুলিশে মামলা করেন। আর এই মামলা করায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন সিরিয়ায় অবস্থানরত মিনারা খানম। দেশে থাকা দেবরের কাছে ফোন করে এ ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেন। এদিকে, সিরিয়া থেকে ফোন করার খবর লুটন পুলিশের কাছে পৌঁছার পর লুটন মেট্রোপলিটন পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা কয়েক দিন আগে ফোন দিয়েছেন দেশে থাকা আবদুল লতিফ লুলু মিয়াকে। লুটন পুলিশ মূলত তাদের কাছে জানতে চেয়েছিল- সিরিয়া থেকে ফোন করে ওরা কি বলেছে। লুটন পুলিশের প্রশ্নের জবাবে যা যা কথা হয়েছে তা সবই বলেছেন আবদুল লতিফ লুলু মিয়া। এ সময় মামলা করার কারণে তারা যে বেকায়দায় পড়েছে সেটিও জানান তিনি। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাও গ্রামে অবস্থানকারী আবদুল লতিফ লুলু মিয়া সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, লুটন মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা তাকে ফোন করেছিলেন। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘মামলা করার কারণে তারা কিছুটা রাগান্বিত। কিন্তু যখন তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না তখন লুটন পুলিশের কাছে মামলা করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। আর মামলা তো করা হয়েছে তাদের সন্ধানের জন্য। আমার অনুমতি নিয়েই ভাতিজা সেলিম লুটনের পুলিশকে বিষয়টি জানায়। ১৭ই মে এই মামলা করা হয়। আর মামলার পর বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে জানাজানি হয়।’ সিরিয়া থাকায় ১২ সদস্যদের সঙ্গে আবদুল লতিফের ছেলে আবুল কাশেম সাকেরও রয়েছে। আবদুল মান্নানের বড় মেয়ে মারিয়া খানমকে বিয়ে করেন আবুল কাশেম। এ কারণে আবদুল লতিফের পরিবারে আরও উদ্বেগ বাড়ছে। তবে, দেশে থাকা স্বজনরা জানিয়েছেন, তাদের উৎকণ্ঠার খবর বিশ্ব মাধ্যমে প্রচার হয়েছে। বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কর্মীরা ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাওয়ে ছুটে গেছেন। তারাও রিপোর্ট করেছেন। এ কারণে তারা কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছেন। দেশে থাকা স্বজনরা জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন মারফতে খবর পেয়েছেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়া আবদুল মান্নানের পরিবারের সদস্যরা সিরিয়াতে এক হতে চাইছেন। এক সঙ্গে হওয়ার পর তারা ফেরার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
গ্রামের বাড়িতে নজরদারি: আইএসে যোগ দেয়া যুক্তরাজ্যের লুটন শহরের ১২ সদস্যের সিলেটী পরিবারের গ্রামের বাড়িতে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। ওই পরিবারের গ্রামের বাড়ি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁও গ্রামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি চলছে। এ ছাড়া সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যরাও নজরদারি করছেন। লুটন শহরের ১২ সদস্যের যে পরিবারটি গত দেড়মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছে তারা হলেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁওয়ের আবদুল মান্নান (৮২), তার স্ত্রী মিনারা খানম (৫৩), তাদের মেয়ে রাজিয়া খানম (২১), সেইদা খানম (২৭) ও তার স্বামী আবুল কাশেম সাকের (৩১), আবদুল মান্নানের ছেলে মোহাম্মদ জাঈদ হোসেন (২৫), মোহাম্মদ তৌফিক হোসেন (১৯), মোহাম্মদ সালেহ হোসেন (২৬), তার স্ত্রী রোশনারা বেগম (২৪) এবং ওই পরিবারের তিন শিশু সন্তান। গত ১১ই  মে তারা বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে ফেরার পথে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে তিন দিন যাত্রা বিরতির পর সেখান থেকে তারা উধাও হয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা আইএসে যোগ দেয়ার খবরে আবদুল মান্নানের গ্রামের বাড়ি মাইজগাঁওয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ওসি নন্দন কান্তি কয়েক দিন আগে আবদুল লতিফের বাড়িতে গেছেন। তিনিও নিজে খোঁজ খবর নিয়ে এসেছেন। তিনি মানবজমিনকে জানান, ওই পরিবারের ১২ সদস্য আইএসে যোগ দেয়ার খবরে গ্রামের বাড়িতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে, সেটি আতঙ্কের কিছু নয়।