Thursday, February 20, 2020

জেনে নিন ফিটকিরির বিভিন্ন উপকারিতা

ফিটকিরি একপ্রকার অর্ধস্বচ্ছ কাচ সদৃশ কঠিন পদার্থ যার স্বাদ মিষ্টি ও কষা এবং অত্যন্ত শুষ্ক প্রকৃতির। মূলত: এটি খনিজ দ্রব্য। পরে বিজ্ঞানীগণ ল্যাবরেটরীতে কৃত্রিম ফিটকিরি তৈরি করেন। এটি খুব সাধারণ সস্তা ও সহজলভ্য বস্তু। ফিটকিরি কয়েক প্রকার। তবে ওষুধে ব্যবহারে জন্য লাল রং এর কাচ সদৃশ বা স্বচ্ছ ফিটকিরি সবচেয়ে উত্তম। চলুন জেনে নিই ফিটকিরির নানাবিধ উপকারিতা...
এন্টিসেপ্টিক হিসেবে:- বাড়িতে কারো চামড়া কেটে গেলে, ছিলে গেলে ঐ জায়গা জলে ধূয়ে ফিটকিরি দিলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়। জীবাণু সংক্রমণ হয় না। দাড়ি শেভ করার সময় নাপিত ফিটকিরি ঘষে দেয়।
মুখের ঘা এ উপশম:- অনেক সময় মুখের চারপাশে ঘা হয়। এই ঘা এর উপশমও ফিটকিরি করতে পারে। মুখের ঘাতে ফিটকিরি ব্যবহারের নিয়ম- ১ চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ ও ১ গ্লাস জল নিন। জল একটা পাত্রে চুলায় দিন। ফুটে উঠলে ফিটকিরির গুড়াঁ মিশিয়ে নিন ও চুলা বন্ধ করে নিন। জল কুসুম গরম অবস্হায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এবার এটা দিয়ে কুলকুচি করে নিন, দিনে ২-৩ বার করুন, আরাম পাবেন।
ত্বকের যত্নে:- আগেরদিনে মেয়েরা রূপচর্চায় ফিটকিরি ব্যবহার করত। কারণ ফিটকিরি ত্বকে বলিরেখা পড়তে দেয় না। এছাড়া মুখে ব্রণ, ফুসকুড়ি, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চামড়া কুচকে যাওয়া রোধে ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়। এজন্য মুখ ভালো করে ধুয়ে সারা মুখে অনেকক্ষণ ধরে ফিটকিরি ঘষুন। অথবা ফিটকিরি চূর্ণ জলে গুলে ওই জলখে মাখুন। শুকিয়ে গেলে ভালো করে মুখ ধুয়ে নিন। এভাবে কিছুদিন করলে মুখের উজ্জ্বলতা বাড়বে এবং ব্রণ-ফুসকুড়ির সমস্যা কমবে।
দাঁত ও মুখের যত্নে:- ফিটকিরি এ্যান্টিব্যকটেরিয়াল পদার্থ। তাই দাঁতের রোগ সারাতে ভালো কাজ দেয়। মুখের দুর্গন্ধও দূর করে ফিটকিরি। এজন্য জলে ফিটকিরি গুলে সে জলয়ে কুলকুচি করতে হবে। এতে দাঁতের যন্ত্রণা ও মুখের দুর্গন্ধ দূর হবে।
আঙুলে হাজা:- যারা জল নিয়ে বেশি কাজ করেন অনেক সময় তাদের হাত ও নখের কোনে ঘা হয় কিংবা পায়ের পাতা ফোলা কমাতে ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়। এক টুকরো ফিটকিরি জলে দিয়ে জলটা ভালোকরে গরম করে তারপর ঠাণ্ডা করে নিয়ে তাতে পা দুটো ডুবিয়ে রাখতে দ্রুতই বেশ আরাম পাওয়া যাবে।
ব্রন-ফুসকুড়ি:- মুখে ব্রন-ফুসকুড়ি হচ্ছে? মুখ ড্রাই হয়ে, চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে? চিন্তা করবেন না। ভালো করে মুখ ধুয়ে নিয়ে, সারা মুখে অনেকক্ষণ ধরে ফটকিরি ঘষুন। বা ফিটকিরি চূর্ণ জলে গুলে, মুখে মাখুন। শুকিয়ে গেলে, কিছুক্ষণ পর মুখটা ধুয়ে ফেলুন। এ ভাবে কিছু দিন করলে, মুখে ঊজ্জ্বলতা ফিরবে। ব্রন-ফুসকুড়ির হাত থেকেও মুক্তি পাবেন।
হঠাত্‍ রক্ত:- সেভ করতে গিয়ে গাল কেটে গেলে এখনো সেলুনে ফিটকিরি ঘষে দেয়। এছাড়া আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হঠাত্‍ রক্তপাত শুরু হলে ফিটকিরি চূর্ণ করে ওই স্থানে লাগালে রক্তপাত মুহূর্তেই বন্ধ হবে।
টনসিলে আরাম:- ঠাণ্ডা লেগে গলা ব্যাথা হলে বা গ্ল্যান্ড ফুলে গেলে গরম জলেমটি লবণ ও ফিটকিরি চূর্ণ মিশিয়ে দিনে কয়েকবার গার্গল করলে বেশ আরম পাওয়া যাবে।
উকুন ধ্বংসে:- চুলে উকুন হয়েছে? চিন্তা নেই, ফিটকিরিই দূর করে দিবে উকুন। ১/২ লিটার জলে ৪ গ্রাম ফিটকিরি মিশিয়ে নিন। এবার মাথার তালুতে লাগান। ৩০ মিনিট পরে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ১/২ দিন ব্যবহার করুন।
অধিক ঘাম ও প্রতিকার:- গরমে তো ঘাম হবেই। কিন্তু যারা বেশি ঘামেন, পরনের পোশাক ভিজে যায়, তাদের এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে এক টুকরো ফিটকিরি। গোসলের সময় এক টুকরো ফিটকিরি জলে ভালোভাবে মিশিয়ে ওই জলে ঢালুন। এভাবে কয়েকদিন গোসল করলে স্বস্তি মিলবে।
ডিওডেরেন্ট হিসেবে:- ফিটকিরি বা ফিটকিরির গুঁড়া শরীরের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। এটাকে প্রাকৃতিক ডিওডেরেন্ট বলা যায়। ফিটকিরির টুকরা ভিজিয়ে আন্ডারআর্ম বা বগলে ঘষুন, ২ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন। অথবা গোলাপজলের সাথে ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে বগলে লাগান। ৫-১০ মিনিট পরে ধুয়ে ফেলুন। এটা দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারি ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে। তবে প্রতিদিন ব্যবহার না করে সপ্তাহে ২ দিন ব্যবহার করুন।
মাথা ব্যথা সারাতে:- লাল কাচা ফিটকিরি ১ গ্রাম ও ছোট এলাচি বীজ ৬ গ্রাম উভয় উপাদানকে পৃথক পৃথক কুটে পিষে কাপড়ে ছেঁকে নিতে হয়। অল্প কিছু জলসহ পান করলে মাথা ব্যথা দ্রুত সেরে যায়।
কান ব্যথা:- ফিটকিরি ভেজে গুড়া করে সামান্য একটু গুড়া কানে দিতে হয়। তারপর কয়েক ফোঁটা লেবুর রস অথবা পেঁয়াজের রস কানে দিলে কান ব্যথা চলে যায়।
পা ফাটা উপশমে:- ফিটকিরি খুব দক্ষতার সঙ্গে পা ফাটা আরোগ্য করতে পারে। পায়ের মরা চামড়া তুলে পা কে নরম ও মসৃণ করে তোলে। পায়ের ফাটা ভালো করতে একটা প্যাক তৈরি করুন। একটা বাটিতে ২ চা চামচ ফিটকিরি গুঁড়া , ১ চা চামচ নারিকেল তেল ও ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে নিন। পা ভালো করে ধুয়ে, শুকিয়ে নিন। এরপর প্যাক লাগিয়ে ৫ মিনিট ম্যাসাজ করুন। তারপর ১০-১৫ রেখে কুসুম গরম জলে ধুয়ে নিন। ভালো ফল পেতে সপ্তাহে ২-৩ বার ব্যবহার করুন।
দাঁত ব্যথা:- ভুনা ফিটকিরি, লবণ ও বাবলা গাছের ছাল সমপরিমাণ নিয়ে সূক্ষ্ম করে পিষলে এমন মাজন হয় যা দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত ব্যথা চলে যায়।
ব্রণ দূর করতে:- প্রাকৃতিক উপায়ে ব্রণ দূর করতে ফিটকিরি অত্যন্ত কার্যকর।মাত্র-৩ উপাদানেই তৈরি করুন ব্রণের জন্য ফেসপ্যাক।১ চা চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ, ২ চা চামচ মুলতানি মাটি, ২ চা চামচ গোলাপজল একসাথে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। ব্রণে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।ভালো ফল পেতে সপ্তাহে ১ বার ব্যবহার করুন। ২ মাস নিয়মিত ব্যবহারে লক্ষণীয় উন্নতি দেখা যাবে।
জল বিশুদ্ধকরনে:- দূষিত জলে কিছু ফিটকিরি মেশালে জলের ময়লাগুলো নিজেরা নিজেদের সাথে লেগে ভারি হয়ে জলের নীচে জমা হয়। উপরে বিশুদ্ধ জল অবস্থান করে। ফিটকিরির ব্যবহার জলশুদ্ধকরনে খুব জনপ্রিয়। প্রতি ১ লিটার জলে ১ গ্রাম ফিটকিরি বা ফিটকিরির গুঁড়া ব্যবহার করুন। ময়লা বা কাঁদাযুক্ত জলেরি মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে দিন। এরপরে দেখবেন কাঁদা সব নিছে জমা হয়েছে, এখন উপরে ভালো জল ছেঁকে নিন।
বলিরেখা দূর করতে:- ফিটকিরি ত্বককে টানটান করতে সাহায্য করে। ১চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ ও ২ চামচ গেলাপজল বা জল মিশিয়ে মুখে লাগান ( চোখ বাদে)। কিছুক্ষণ পরে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ফিটকিরির গুড়াঁ না থাকলে, একটা ফিটকিরির টুকরা ভেজা মুখে ঘষুন। কিছু সময় পরে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ত্বকের বলি রেখা দূর করে, আপনাকে করে তুলবে সতেজ ও লাবন্যময়ী।
ক্রিয়াবিদের পায়ের যত্নে:- ফিটকিরিতে আছে অ্যান্টিমাইক্রোবাইয়াল উপাদান। এটা ক্রিয়াবিদের পায়ে ফাঙ্গাসকে মেরে ফেলে। একারনে ক্রিয়াবিদের পায়ের যত্নে ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়। গোলাপজলের সাথে ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে পা ও পায়ের পাতাতে লাগিয়ে রাখুন। শুকালে কুসুম গরম জলে ধুয়ে ফেলুন। অন্যভাবে, হালকা গরম জলে ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে পা কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে পা ধুয়ে, মুছে নিন।
আরও কিছু উপকারিতা নিম্নরুপ:-
১) মুখের ভেতরে কোনও ঘা হলে, সেখানে ফিটকিরি লাগান। জ্বালা করতে পারে, কিন্তু তাড়াতাড়ি ঘা শুকাবে। তবে লালা গিলে ফেলবেন না। আর শিশুদের থেকে দূরে রাখবেন ফিটকিরি।
২) ব্যাকটেরিয়ার ফলে মুখে গন্ধ হয়। ফিটকিরি ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সক্ষম। এক গ্লাস জল ফোটান। তার মধ্যে এক চিমটি লবণ দিয়ে মেশান। এবারে ফিটকিরির গুঁড়া মেশান। মিশ্রণ ঠান্ডা হলে, তা দিয়ে কুলকুচি করুন।
৩) শিশুদের মাথায় প্রায়ই উকুন ও উকুনের ডিম হয়। জলে ফিটকিরি গুঁড়া মিশিয়ে তার মধ্যে একটু চা গাছের তেল (টি ট্রি অয়েল) মেশান। এবারে ১০ মিনিট ধরে মাসাজ করুন স্ক্যাল্পে। এর পরে শ্যাম্পু করে নিন।
৪) মুখে ব্রণ হলে ফিটকিরি ব্যবহার করতে পারেন। এক চামচ মুলতানি মাটি, দু'চামচ ডিমের সাদা অংশ ও এক চামচ ফিটকিরি গুঁড়ো দিয়ে প্যাক বানান। প্যাকটি মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
৫) দাড়ি কামানোর পরে বা কেটে গেলে ফটকিরি লাগিয়ে ঠান্ডা জলয়ে ধুয়ে ফেলুন।
৬) বয়সের ছাপ পড়লে এক টুকরো ফিটকিরি জলে ভিজিয়ে তা মুখে ঘষুন। তার পরে ঠান্ডা জলয়ে মুখ ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন।
৭) ডিওডোর‌্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ফিটকিরির গুঁড়োর সঙ্গে গন্ধরস মেশান। গন্ধরস বা মস্তকি এক ধরনের গাছের আঠা বিশেষ।
৮) পায়ে শিরায় টান পড়লে ফিটকারির গুঁড়ো, হলুদ এবং জল দিয়ে একটি পেস্ট বানান। ব্যথা হলে সেখানে লাগান।

অকার্যকর মেগাসিটি: ঢাকা কেন নর্দমায় সয়লাব

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর ঢাকা
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের জনাকীর্ণ রাজধানী ঢাকায় নর্দমা পরিস্কারের কাজ করেছেন সুজন লাল। বহু দুর্ভোগের সাক্ষী তিনি। কিন্তু ২০০৮ সালের ঘটনাটা ছিল সবচেয়ে করুণ। একদিনের ভারি বৃষ্টির কারণে স্বাভাবিকভাবেই রাস্তাগুলো ডুবে গেছে। সাতজন কর্মী রামপুরায় ম্যানহোল পরিস্কারের কাজ করছে। সাধারণত ক্লিনাররা নর্দমার কোথাও আবর্জনা আটকে গেলে সেগুলো পরিস্কার করার সময় দড়ি ধরে রাখেন যাতে পানির তোড়ে ভেসে না যান। কিন্তু এই গ্রুপটা ছিল নতুন। তাদের জানা ছিল না এ রকম পরিস্থিতিতে কি ধরনের বিপদ আসতে পারে। নর্দমার পানি সেদিন গিলে নিয়েছিল তাদের।
পথচারীরা হাতুরি বেলচা দিয়ে রাস্তা খুঁড়ে ফেলেছিল। এক পর্যায়ে তিনজনকে পাওয়া গেলো, মৃত। বাকি চারজনের অবস্থা খুবই গুরুতর। এদের একজন হাসপাতালে মারা যায়। সুজন বললেন, “ওই ঘটনায় আতঙ্ক ভর করে আমাদের মধ্যে। বহু মাস এরপর নর্দমার দিকে তাকাতেও ভয় করতো।”
বাংলাদেশের প্রবল বর্ষার মৌসুমে ঢাকা মাসে কয়েকবার পানির নিচে চলে যায়। ড্রেনগুলোতে অতিরিক্ত চাপ আর শহর নিচু হওয়ায় বাথটাবের মতো সবসময় পানি ভর্তিই থাকে ঢাকা। ঢাকা ট্রিবিউনের মতো পত্রিকাগুলোর পাতা পানিতে ডোবা বাসের ছবিতে ভর্তি হয়ে যায়। শহর বিশেষজ্ঞদের সেই পুরনো অভিমত: ‘আবারও পানির নিচে ঢাকা’ অথবা ‘সেই একই পুরনো অবস্থা’।
২০১৭ সালের জুলাইয়ে ভারি বৃষ্টিপাতের সময় পথচারীদের এমনকি রাস্তার এপার ওপার যেতেও রিক্সা ব্যবহার করতে হয়েছে।
ঢাকা শহরের স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ যে বর্ষাকালে তা প্রায়ই উপচে পড়ে, ছবি: গেটি ইমেজ
সড়কের পাশে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে কাজ করতে বের হয় নর্দমা ক্লিনারদের। অনেকে ম্যানহোলে বাঁশ দিয়ে গুঁতাতে থাকেন। অন্যেরা হয়তো অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে তরল নর্দমার মধ্যে দাঁড়িয়ে খালি হাতে আবর্জনা তুলছে। এই নর্দমার মধ্যে গলাপর্যন্ত ডুবে কাজ করার ছবি বিশ্ব মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর এই ক্লিনারদের কাজকে বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজের তকমা দেয়া হয়।
জাতিসংঘ হ্যাবিটেটের মতে, ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহর। প্রতি বর্গকিলোমিটারে এখানে ৪৪,৫০০ জনেরও বেশি মানুষের বসবাস। প্রতিদিনই গ্রাম্য এলাকা থেকে আরও মানুষ আসছে। ক্লিনারদের মাসিক রোজগার গড়ে ২২৫ পাউন্ডের মতো। নিজেদের স্বাস্থ্য ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনসংখ্যার ভাড়ে ন্যুব্জ এখানকার অবকাঠামোগুলোকে কোনরকমে ঠেকিয়ে রেখেছেন তারা।
বহু বহু মানুষ, অতি সামান্য সম্পদ
অতিরিক্ত জনসংখ্যা বলতে বোঝায় কোন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের বসবাস। অথবা, বিদ্যমান সম্পদ দিয়ে যত মানুষের জীবন নির্বাহ সম্ভব, তারও অতিরিক্ত মানুষ। এ সব বিবেচনায় ঢাকা একেবারে আদর্শ উদাহরণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশান সায়েন্স বিভাগের প্রজেক্ট ডিরেক্টর অধ্যাপক নুরুন্নবী বললেন, “পৃথিবীতে ঢাকার চেয়েও বড় শহর রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি সেগুলোর বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতির দিকে তাকান, তাহলে জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটি।”
অতিরিক্ত ঘনবসতি না থাকলেও শহর ঘনবসতিপূর্ণ হতে পারে। সিঙ্গাপুর একটি ছোট্ট দ্বীপ। সেখানকার জনসংখ্যার ঘনত্বও কম নয়। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০,২০০ জন। কিন্তু খুব অল্প মানুষই একে অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ বলবে। নাগরিকদের বসতির জায়গা সঙ্কুলানের জন্য বহুতল ভবন গড়া হয়েছে। উপরের দিকে বেড়েছে শহর। অনেক জায়গায় ছাদেও স্কাই-গার্ডেন তৈরি করা হয়েছে।
জনসংখ্যা অতিরিক্ত হয়ে ওঠে তখন, যখন বারতি মানুষের ব্যবস্থাপনার আর কোন উপায় থাকে না।
‘বাধ্য হয়ে এ কাজ করছি’
সুজন বললেন, সরকার ঢাকা শহরটাকে ভালোভাবে পরিচালনার চেষ্টা করছে। কিন্তু যতটা আশা ছিল, ততটা সফল হয়নি তারা। ঢাকার মধ্যভাগে মোটামুটি ধরনের ফ্লাটে পরিবার নিয়ে বাস করে সে। দুধ চায়ে চুমুক দিতে দিতে কথা বলছিল সে। পাশেই পানিতে ডুবে থাকা চিপা রাস্তা দিয়ে ঘন্টা বাজিয়ে চলছে রঙচঙা রিক্সাগুলো।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বেশির ভাগ মুসলিম হলেও সুজনের মতো আরও অনেক হিন্দু রয়েছে এ পেশায়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হিন্দুদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয়। এখনও তারা বৈষম্যের শিকার। সুজন আবার দলিত শ্রেণীর হিন্দু। পুরো এশিয়াতেই তাদেরকে দেখা হয় ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে। এবং নিকৃষ্ট ধরনের কাজ করতে হয় তাদের। বাংলাদেশে তাদেরকে ডাকা হয় মেথর নামে। অর্থ হলো যারা বিষ্ঠা পরিস্কার করে।
বর্ষাকালজুড়ে ঢাকায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করে, ছবি: এএফপি
সুজন জানালেন, “দাদার সূত্রে অনেকটা উত্তরাধিকারের মতো এ কাজ পেয়েছেন তিনি। অন্য কোন কাজের দক্ষতাও নেই আমার।” সুজন দীর্ঘদেহী, চল্লিশোর্ধ বয়স, লম্বাটে চিকন চেহারা আর ছিমছাম ছাঁটের গোফ রয়েছে তার। “আমার পরিবার চালাতে হয়। বাচ্চাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে হয়। সাথে রয়েছে মাসিক ভাড়া আর বিল পরিশোধের চাপ। “আমি বাধ্য হয়ে এই কাজ করছি, যদিও আমি জানি এই কাজ আমার জন্য অসম্মান আর অপমানের কারণ হবে।”
সে জানালো, “পচে যাওয়া বর্জ্যের কারণে নর্দমার নালাগুলো অ্যাসিডিক ও বিষাক্ত হয়ে আছে। তাই ক্লিনাররা শতভাগ নিশ্চিত যে তাদের স্বাস্থ্য সমস্যা হবেই। বিশেষ করে চর্মরোগ হবেই। প্রায়ই তারা এটা বুঝতেও পারে না। স্থানীয় মদের দোকান থেকে তারা মদ কিনে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে থাকে। ঘুমিয়ে গেলেই দুনিয়া থেকে অন্য জগতে চলে যায় তারা। তাদের জ্ঞান থাকলে হয়তো তারা বুঝতে পারতো, স্বাস্থ্যের কি ক্ষতি হচ্ছে তাদের।”
সবচেয়ে নিম্ন বাসযোগ্য শহর
ঢাকায় বসবাস করা মানেই নানা দুর্ভোগের মধ্যে থাকা। যারা গরিব, তারা গজিয়ে ওঠা বস্তিগুলোতে গাদা করে থাকে, যেখানে সংক্রামক রোগব্যাধি এবং আগুন বাতাসের গতিতে ছড়ায়। ঢাকার জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই বস্তিবাসী। মধ্য আর উচ্চবিত্ত শ্রেণীকে আবার তাদের বড় একটা সময় রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকতে হয়। এই শহর প্রায় নিয়মিত ‘সবচেয়ে নিম্ন বাসযোগ্য শহরের’ তালিকার উপরের দিকে থাকে। এ বছর নাইজেরিয়ার লাগোস এবং যুদ্ধ-বিধ্বস্ত লিবিয়া ও সিরিয়ার রাজধানীর পরেই ঢাকার অবস্থান।
আর অনেকটা মজা করে সেটাকেই একটা উন্নতি হিসেবে মন্তব্য করলেন অধ্যাপক নুরুন্নবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের অফিসে বসে কথা বলছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটাতে বেশ কিছু গাছপালা থাকার কারণে একটা সবুজ চেহারা পেয়েছে ক্যাম্পাস, যেটা রাজধানীর আর অন্য কোথাও দেখা যাবে না। নিজের বিষয়টাকে অনেকটা হাস্যরস আর আশাবাদের মিশ্রন হিসেবে দেখেন অধ্যাপক নবী। তিনি বললেন, “এই র‍্যাংকিংয়ে কয়েক বছর আমরা এক নম্বরে ছিলাম।”
সব সময় অবশ্য চিত্রটা এমন ছিল না। নবী মনে করার চেষ্টা করলেন। ষাটের দশকে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার আগে ঢাকায় শূন্য সড়কে পথ চলতে হতো। পুরনো ঢাকায় মুঘল আমলের ক্যানালগুলোতে গোসল করতো মানুষ। ওই এলাকায় এখনও কয়েক শতাব্দি পুরনো বাড়িঘর রয়েছে। যদিও এগুলোর অনেকগুলো উন্নয়নের চাপায় হারিয়ে গেছে। ক্যানালগুলোও ভর্তি হয়ে গেছে। আর সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেছে নর্দমা নিষ্কাষণের পথগুলো।
পৃথিবীর আরও বহু জায়গার মতোই বাংলাদেশেও দ্রুত, অপরিকল্পিত শহরায়ন হয়েছে। অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধার সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্বায়ন। সাথে এসেছে গ্রামীণ ও উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়। সে কারণে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ রাজধানীতে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেছে। এতে প্রচুর চাপ পড়েছে সীমিত সম্পদের উপর। অধ্যাপক নবী বললেন, “আমরা দেখছি গ্রামীণ এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ শহরের দিকে আসছে। মানুষ আসছে তো আসছেই। তাদের বসবাসের জন্য যথেষ্ট আবাসনের ব্যবস্থা কি আমাদের আছে? গরিব মানুষদের বসবাসের জন্য ব্যবস্থা কোথায়?
ঢাকার একজন স্যুয়ারেজ ক্লিনার, ছবি: বারক্রফট
ঢাকায় শহর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে হ-য-ব-র-ল অবস্থায় ভাগাভাগি হয়ে আছে। নবী বললেন, “সরকারের বিভিন্ন সেবাদানকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এ শহরের দুরবস্থার একটা বড় কারণ।”
দুজন আলাদা মেয়রসহ সরকারের সাতটি দফতর জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ করছে। এই জটিলতার কারণে একে অন্যের উপর দায় চাপানোটা সহজ হয়ে গেছে। গত জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাইদ খোকন হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে বলেন এ পরিস্থিতির জন্য ওয়াসা দায়ী। কিন্তু তাদেরকে কাজে দেখা যায় না। এর পরপরই খোকনকে দোষারোপ করে ওয়াসা। এর আগে, ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকও বিভিন্ন জলমগ্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি এমন প্রশ্নও করেন যে: “কেউ একজন আমাকে বলুন, এর কি সমাধান?”
‘এ জাতির লোকেরা আরও বহু গল্প লিখবে’
কিন্তু অকার্যকর প্রশাসন বাংলাদেশে কাজ সম্পাদনের জন্য সবসময় বাধা হয়ে থাকেনি। এই দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার ব্যাপারে প্রশংসা পেয়েছে।
কিছু শহরবিদ এখন বস্তিগুলোর ব্যাপারে বিদ্যমান নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে অন্যভাবে ভাবতে চাইছেন। শহরের বিস্তারের ফলে যেহেতু জন্ম হার কিছুটা কমে, তাই তাদের মতে এটাকে খানিকটা সমাধানের অংশও ভাবা যেতে পারে।
অনেকে মনে করেন যে শহুরে এলাকার সীমিত পরিসরে যে সব সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠছে, সেগুলো পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং সরকারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে।
নবী বলেন, “রাজনৈতিক দলের কথা ভুলে যান, কিন্তু এ দেশের মানুষ আরও অনেক গল্প লিখবে। একদিন জনগণ জেগে উঠবে এবং রাজনীতিবিদরা তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবে।”