Tuesday, August 25, 2026
হিজাব পরা ইসলামে অপরিহার্য আচার নয়: ভারতের হাইকোর্ট
প্রয়াগরাজের আটারসুইয়ার ‘টাগোর পাবলিক স্কুল’-এর একাদশ শ্রেণির নাবালিকা ছাত্রী সুকাইনা রিজভীর দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি জে জে মুনীর এবং বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ শুক্লার সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় দেন।
আবেদনকারী সুকাইনা রিজভী আদালতকে জানান, তিনি শৈশব থেকেই হিজাব পরেন। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ওই স্কুলে পড়ার সময়ও তিনি ইউনিফর্মের সঙ্গে হিজাব পরার অনুমতি পেয়েছিলেন। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময়ও হিজাব পরার অধিকার বজায় রাখার দাবি জানান তিনি।
সুকাইনা রিজভীর দাবি ছিল, তাকে হিজাব পরতে না দেওয়া সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা এবং ১৯(১)(এ) নম্বর ধারার লঙ্ঘন। তবে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, শুধু মৌখিক দাবি বা বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারার অধীন সুরক্ষা দাবি করা যায় না।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, সংবিধানের ২৫ নম্বর ধারার ওপর নির্ভর করে করা কোনো দাবি পর্যাপ্ত তথ্য ও আইনি ভিত্তি ছাড়া কেবল মৌখিক সমর্থনের ভিত্তিতে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
দ্বৈত বেঞ্চ তাদের রায়ে বিদ্যালয়ের ড্রেস কোড এবং নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ড্রেস কোড যদি নিরপেক্ষ, সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন হয়, তাহলে শৃঙ্খলা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিচয় বজায় রাখতে সেটি কার্যকর করার পূর্ণ অধিকার কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
আদালত আরও বলেন, ইউনিফর্ম শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতা এবং ধর্মীয় দিক থেকে নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করে। অতীতে স্কুল কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানায়নি বলেই ভবিষ্যতেও ছাড় দিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে না।
স্কুল কর্তৃপক্ষ আদালতে যুক্তি দেয়, একজন শিক্ষার্থীকে ড্রেস কোডে ছাড় দেওয়া হলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে। তাছাড়া ওই স্কুলের অন্যান্য মুসলিম ছাত্রীরাও নির্ধারিত ড্রেস কোড মেনে চলছেন।
রায়ে কর্নাটক হাইকোর্টের ২০২২ সালের একটি রায়েরও উল্লেখ করেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বেঞ্চ। ওই রায়ে হিজাবকে ইসলামের অপরিহার্য অঙ্গ নয় বলে গণ্য করা হয়েছিল উল্লেখ করে বেঞ্চ বলেন, বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।
এভাবেই প্রয়াগরাজের টাগোর পাবলিক স্কুলে ইউনিফর্মের সঙ্গে হিজাব পরার অনুমতি চেয়ে করা মুসলিম ছাত্রীর রিট আবেদন খারিজ করে দেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট।
![]() |
| প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত |
Wednesday, August 19, 2026
নেতানিয়াহুকে রক্ষার চেষ্টা—আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও কৌঁসুলির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ–ভিত্তিক এ আন্তর্জাতিক আদালতের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবেই নেওয়া হলো এই সর্বশেষ পদক্ষেপ।
যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে আইসিসি গঠিত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ আদালতের সদস্য নয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানান, আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও জাপানি বিচারক তোমোকো আকানে এবং আদালতটির ‘সিনিয়র ট্রায়াল লয়ার’ (জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি) সেনেগালের নাগরিক আবদুলায়ে সেয়ের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গত বছর আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির অনুমোদন দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা একটি নির্বাহী আদেশের আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কো রুবিও বলেন, ‘যেসব দেশের সরকার আইসিসির এখতিয়ারে সম্মতি দেয়নি, সেসব দেশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা, গ্রেপ্তার, আটক কিংবা তাঁদের বিচারের আওতায় আনার আইসিসির প্রচেষ্টায় এই ব্যক্তিরা (আইসিসির প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি) সরাসরি জড়িত।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আইসিসি। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আইনের শাসনকে ক্ষুণ্ন করে।
বিবৃতিতে আইসিসি আরও বলেছে, ‘আইন প্রয়োগের কারণে যখন বিচারিক কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা হুমকির সম্মুখীন হন, তখন মূলত আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।’
নিষেধাজ্ঞার শিকার আবদুলায়ে সেয়ে আইসিসির সেই কৌঁসুলি দলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য, যাঁরা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছিলেন। এ ছাড়া আইসিসির বিচারক হিসেবে নির্বাচনের জন্যও তিনি মনোনীত হয়েছেন।
নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই মার্কিন তৎপরতা ইউরোপে তাদের মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে একধরনের দূরত্ব তৈরি করেছে।
আদালতের স্বাগতিক দেশ নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে নেদারল্যান্ডস তার অসম্মতি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের ধারাবাহিক সমর্থনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি তোমোকো আকানেকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
টম বেরেন্ডসেন আরও লেখেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোর স্বাধীনভাবে নিজেদের ম্যান্ডেট বা দায়িত্ব পালন করার সুযোগ থাকা উচিত।’
আইসিসির শীর্ষ বিচারক তোমোকো আকানে গত ডিসেম্বরেই সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা ‘সব ধরনের পরিস্থিতি ও মামলায় আদালতের কার্যক্রমকে দ্রুত স্থবির করে দেবে এবং এর অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলবে।’
আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে অতীতের একটি তদন্ত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর জের ধরে গত বছর আদালতের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা, কৌঁসুলি ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন।
এদিকে নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ জব্দ করা হবে। একই সঙ্গে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের সব ধরনের লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে, যার সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে কার্যত প্রায় সব ব্যাংকেরই নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ (অর্থ মন্ত্রণালয়) গতকাল একটি সাধারণ লাইসেন্স ইস্যু করেছে। এর আওতায় তোমোকো আকানে এবং আবদুলায়ে সেয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনগুলো গুটিয়ে নিতে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
নেতানিয়াহুকে রক্ষা করার চেষ্টা
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে চলতি বছরের জুনে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন আইসিসির তিন বিচারক। এ পদক্ষেপকে বেআইনি বলে দাবি করেন তাঁরা।
এ ছাড়া মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দুটি আলাদা মামলায় বলেছে, বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইসিসির সঙ্গে যেসব সংস্থা কাজ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ তৎপরতা তাদের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।
মার্কো রুবিও গত মাসে বলেছিলেন, আইসিসির কার্যক্রম ব্যাহত করতে মার্কিন প্রশাসন তাদের চেষ্টা আরও জোরদার করবে। এর অংশ হিসেবে অন্য দেশগুলোকে এ সংস্থা ত্যাগ করতে রাজি করানোর জন্য একটি কূটনৈতিক প্রচারণাও চালানো হবে। ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছে।
রুবিওর যুক্তি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা, মাদক বহনের অভিযোগে নৌযানে অভিযান পরিচালনাকারী দল এবং অন্যান্য মার্কিন সামরিক সদস্যদের জন্য এ আদালত এক বড় হুমকি।
অবশ্য ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এ প্রচারণার লক্ষ্য নিজেকে বিচার থেকে বাঁচানো নয়, বরং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অন্যদের রক্ষা করা।
যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এ আদালতের সদস্য ছিল না। কোনো সদস্যরাষ্ট্র যখন নিজের দেশে ঘটে যাওয়া কোনো নৃশংসতার বিচার করতে অসমর্থ বা অনিচ্ছুক হয়, শুধু তখনই আইসিসি সেখানে নিজের এখতিয়ার খাটায়।
তবে আইসিসির সংবিধিতে এ-ও বলা আছে যে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে যদি সদস্য নয় এমন কোনো দেশের নাগরিকও নৃশংস অপরাধ করেন, তবে তাঁর বিচার করার ক্ষমতা এ আদালতের রয়েছে।
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Sunday, August 9, 2026
পুলিশের গুলিতে পচন ধরে কেটে ফেলতে হয় শিবির নেতার পা
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ ভুক্তভোগী রুহুল আমিনের জাবানবন্দিতে এসব তথ্য ওঠে আসে। এ ঘটনায় যশোরের তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে রুহুল আমিন বলেন, বর্তমান বয়স আনুমানিক ২৯ বছর। বর্তমানে যশোরের ইবনে সিনা হাসপাতালে কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত আছি। ২০১৬ সালে আমি যশোর সরকারি এমএম কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে আমি চৌগাছা উপজেলার ছাত্রশিবিরের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলাম। আমার বন্ধু ইসরাফিল হোসেন তখন একই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র এবং চৌগাছা উপজেলার ছাত্র শিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন। ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট দুপুরে পর আমি এবং ইসরাফিলকে মোটরসাইকেল করে গ্রামের বাড়ি নারায়ণপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা পথে ওৎ পেতে থাকা চৌগাছা থানা পুলিশ আমাদের গতিরোধ করে থানায় নিয়ে যায়।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ওইদিন রাতে ওসির রুমে নিয়ে আমাদেরকে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে আমরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে ওসি ভিডিওকলে আমাদেরকে এসপি আনিসুর রহমানকে দেখায়। তখন এসপি সাহেব বলেন, তাদের আগামীকালকে আমার এখানে পাঠিয়ে দাও; তারপর আমার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে। ওসির রুমে থাকা পুলিশ সদস্যরা আমাদের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে কে কে আন্দোলন করছে তাদের নাম ও পরিচয় জানতে চায়। তখন এসআই আকিকুল ইসলাম, ওসি মশিউর রহমানকে বলেন, স্যার এদের ব্রেইন ওয়াশ করা হয়েছে, এরা কিছুতেই কোনো নাম বলছে না, এদেরকে গুলি করে দেই।
জবানবন্দিতে ভুক্তভোগী রুহুল বলেন, পরদিন আমাদের যশোর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন ডিবি কর্মকর্তা আমাদের জানায়, তোদের আজকে গুলি করা হবে, এমন আদেশ আছে। ওদিন রাতে চৌগাছা থানার উদ্দেশে গাড়িতে করে আমাদের নিয়ে রওয়ানা করে পুলিশ। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়িটি থামিয়ে আমাদের চোখ বেঁধে পিছ মোড়া করে হ্যান্ডকাফ লাগানো হয়। এরপর বুন্দলীতলা মাঠের দিকে নিয়ে যায়। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর আমাদের গাড়ি থেকে নামায়। তখন আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাই। পুলিশ সদস্যরা চিৎকার চেঁচামেচি করে ওই স্থানে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। এসময় ওসি মশিউর রহমান বলেন, সাজ্জাদ, জহুরুল ফায়ার। এরপর আমার ডান পায়ের হাটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। এ পর্যায়ে সাক্ষী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এর পরপরই আরেকটি গুলির শব্দ শুনতে পাই। তখন আমার বন্ধু ইসরাফিলের কান্নাকাটির শব্দ শুনতে পাই। আমাদের চোখের গামছা খুলে, ক্ষতস্থানে বালু ভরে ওই গামছা দিয়ে ক্ষতস্থান বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর পুলিশের গাড়ির আলোতে ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, কনেস্টেবল সাজ্জাদ ও জহিরুলসহ আরো অনেক পুলিশ সদস্যদের দেখতে পাই।
জবানবব্দিতে এই সাক্ষী বলেন, এরপর আমাদের চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর আমাদের পুলিশি প্রহরায় এ্যাম্বুলেন্সে করে যশোর সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুইদিন বিনা চিকিৎসায় রাখার পর আমাদের ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে রেফার্ড করে। পঙ্গু হাসপাতালে সপ্তাহখানেক চিকিৎসার পর হাঁটুতে পচন ধরার কারণে আমার এবং আমার বন্ধুর পা কেটে ফেলা হয়। এরপর আমাদের নামে পুলিশ দুটি মামলা দিয়েছিলো। ৪২ দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পাই। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, কনেস্টেবল সাজ্জাদ ও জহুরুলসহ সবার বিচার চাই।
![]() |
| পুলিশের গুলিতে পচন ধরে কেটে ফেলতে হয় শিবির নেতার পা। ছবি: সংগৃহীত |
Thursday, July 30, 2026
ফিলিস্তিনের স্কুল ও বসতবাড়ি ভাঙার পথ খুলে দিল ইসরাইলি আদালত
আলজাজিরাকে দেওয়া সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় মেয়েদের একটি মাধ্যমিক স্কুল ভেঙে ফেলার যে সামরিক নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, তা স্থগিত করার আর্জি বাতিল করে দিয়েছে আদালত। ২০১৬ সাল থেকেই স্কুলটি ধ্বংসের হুমকির মুখে ছিল।
এর পাশাপাশি, মাসাফের ইয়াত্তার স্থানীয় ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের তিনটি বসতবাড়ি ধ্বংসের বিরুদ্ধে আনা পৃথক তিনটি পিটিশনও একই আদেশে খারিজ করে দেওয়া হয়।
সংবাদ মাধ্যমকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আদালতের এই রায়ের ফলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এখন যেকোনো মুহূর্তে স্কুলটি ও ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে তাদের উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Wednesday, July 15, 2026
যৌন নিপীড়ন মামলায় ৫৬ লাখ ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দিলেন ট্রাম্প
ক্যারলের আইনজীবী রবার্টা ক্যাপলান জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ট্রাম্প ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করেছেন। এতে ৫০ লাখ ডলারের মূল ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি আপিল চলাকালে জমা হওয়া সুদের অর্থও রয়েছে।
ক্যারল অভিযোগ করেছিলেন, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বার্গডর্ফ গুডম্যান ডিপার্টমেন্ট স্টোরের পোশাক পরিবর্তনের কক্ষে ট্রাম্প তাকে যৌন নিপীড়ন করেন।
পরে ২০২২ সালে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ওই অভিযোগ অস্বীকার করেন। ক্যারলের দাবি ছিল, ওই পোস্টের মাধ্যমে তার মানহানি করা হয়েছে।
২০২৩ সালে নিউইয়র্কের একটি জুরি ট্রাম্পকে যৌন নিপীড়ন ও মানহানির দায়ে ক্যারলকে ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ট্রাম্প রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও গত বছর ফেডারেল আপিল আদালত সেই রায় বহাল রাখে। এরপর গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টও মামলাটি পুনর্বিবেচনায় নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
এর পর বিচারকের নির্দেশে ট্রাম্প ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প বরাবরই অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছেন। তার আইনজীবীরা মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
এদিকে ২০২৪ সালে আরেকটি মানহানি মামলায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের যে রায় হয়েছিল, সেটির বিরুদ্ধেও তিনি এখনো আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
![]() |
| লেখিকা ই. জিন ক্যারল। ছবি: সংগৃহীত |
Thursday, July 9, 2026
ট্রাম্পের যৌন নিপীড়নের শিকার ক্যারলকে ৫০ লাখ ডলার দিতে আদালতের নির্দেশ
এই মামলা দীর্ঘ তিন দশকের পুরোনো। সাময়িকীর সাবেক কলামিস্ট জ্যঁ ক্যারলের অভিযোগ, ১৯৯৬ সালে নিউইয়র্কের একটি বিলাসবহুল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের চেঞ্জিং রুমে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে যৌন নিপীড়ন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে ক্যারল বিষয়টি প্রকাশ্যে আনলে ট্রাম্প এটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দেন।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন ক্যারল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালের মে মাসে আদালতের একটি জুরিবোর্ড ক্যারলের যৌন নিপীড়ন ও মানহানির মামলায় ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করে ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের রায় দিয়েছিলেন।
জুরিবোর্ডের সেই রায়ের পর থেকেই ট্রাম্প নিজেকে নির্দোষ দাবি করে উচ্চ আদালতে আপিল করে আসছিলেন এবং সম্প্রতি বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।
আদালতের এই নতুন আদেশ এমন এক সময়ে এল, যখন ট্রাম্পের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টের দোহাই দিয়ে এই অর্থ আটকে রাখার আবেদন করেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের করা পুনর্বিবেচনার আবেদনটি ঝুলে থাকা পর্যন্ত যেন ক্যারলকে কোনো অর্থ না দেওয়া হয়। তবে বিচারক কাপলান সেই যুক্তি কানে তোলেননি।
আদালতের এই নতুন সিদ্ধান্তের পর জ্যঁ ক্যারলের আইনজীবীদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে ট্রাম্পের আইনজীবীরা বলেছেন, তাঁরা এই আদেশের বিরুদ্ধে আবার উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
ট্রাম্প শিবিরের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশেই আছেন। ডেমোক্র্যাটদের পয়সায় ক্যারল যে বানোয়াট নাটক সাজিয়েছেন, তার অবসান হওয়া দরকার। এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধের দাবি জানাচ্ছি আমরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব আইনি নোংরামি রুখে দেবেন এবং দেশকে আবার মহান করার মিশনে মনোযোগ দেবেন।’
এর আগে ট্রাম্পের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগপর্যন্ত এই অর্থ আটকে রাখলে ক্যারলের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু প্রেসিডেন্টের জন্য তা অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।
ট্রাম্পের আইনজীবীরা আদালতে লিখিত আবেদনে বলেন, ‘এখনই ক্যারলকে অর্থ দেওয়া হলে পরে ট্রাম্প আপিলে জিতলেও সেই অর্থ আর ফেরত পাওয়া যাবে না। কারণ, ক্যারল নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, এই অর্থ তিনি বিভিন্ন সংস্থায় দান করে দেবেন। একবার এই অর্থ তৃতীয় পক্ষের হাতে চলে গেলে তা আর উদ্ধার করা সম্ভব নয়।’
আইনজীবীরা আরও দাবি করেন, সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় আসার আগে অর্থ আটকে রাখলে ক্যারলের কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ, দেরি হওয়ার কারণে যে ক্ষতি হবে, তা পরবর্তী সময়ে সুদের মাধ্যমেই মিটিয়ে দেওয়া যাবে।
গত সপ্তাহে ফেডারেল আদালতের রায় বাতিল করতে ট্রাম্পের করা আপিলটি খারিজ করে দেন সুপ্রিম কোর্ট। এর পরপরই ক্যারলের আইনজীবীরা নিম্ন আদালতের বিচারকের কাছে ট্রাম্পের জমা দেওয়া টাকা ছাড় করার অনুরোধ জানান। এ খবর পেয়ে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে তড়িঘড়ি করে সুপ্রিম কোর্টে আবার একটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জ্যঁ ক্যারলের করা দুটি মামলার মধ্যে এটি ছিল প্রথমটি। ২০২২ সালে করা দ্বিতীয় মানহানির মামলায় জুরিবোর্ড ট্রাম্পকে আরও ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার জরিমানা করেছিল। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওই রায়ের বিরুদ্ধেও তিনি চলতি মাসের শেষ নাগাদ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন।
![]() |
| এলিজাবেথ জিন ক্যারল (ডান থেকে দ্বিতীয়) ছবি: এএফপি |
Sunday, May 10, 2026
রেস্তোরাঁয় কী অপরাধ করেছে দুই কিশোর, যার ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে ৩ লাখ ডলার
ঘটনাটি গত ২০২৫ ২৪ ফেব্রুয়ারিতে চীনের সবচেয়ে বড় হটপট চেইন হাইদিলাও–এর সাংহাই শাখায় ঘটেছে। এই ঘটনা ঘটিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ১৭ বছর বয়সী ওই দুই কিশোর। তারা নিজেদের এই ‘কীর্তি’ ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। এতে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন গ্রাহকেরা। এ কারণে গত শুক্রবার আদালত চীনের দুটি ক্যাটারিং কোম্পানিকে ওই ক্ষতিপূরণ দিতে দুই কিশোরকে নির্দেশ দিয়েছেন।
সেদিন ওই স্যুপ কেউ খেয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি। এরপরও ঘটনার পরবর্তী কয়েক দিনে ওই রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া ৪ হাজারের বেশি গ্রাহককে তাদের বিল ফেরত দেওয়াসহ ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ গুণ অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় হাইদিলাও।
গত মার্চে হাইদিলাও ২ কোটি ৩০ লাখ ইউয়ানের বেশি ক্ষতিপূরণের দাবি দাবি করে আদালতে মামলা করে। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ বলেছিল, এ অর্থের মধ্যে গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ বাবদ দেওয়া অর্থও ধরা হয়েছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ এই মামলার রায়ে সাংহাই আদালত বলেছেন, ওই দুই কিশোর ‘অপমানজনক কাজের’ মাধ্যমে কোম্পানির সম্পত্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। এ ছাড়া এই ঘটনা ‘জনগণের মধ্যে প্রবল অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে’।
রায়ে আরও বলা হয়, ওই কিশোরদের অভিভাবকেরা সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই এই ক্ষতিপূরণের অর্থ তাঁদের পরিশোধ করতে হবে।
এই ক্ষতিপূরণের মধ্যে আছে—কার্যক্রম ও সুনাম ক্ষুণ্নের জন্য ২০ লাখ ইউয়ান; সব হাঁড়ি, চুল্লি, এমনকি টেবিলও বদলে ফেলাসহ জীবাণুমুক্তকরণ বাবদ এক ক্যাটারারকে ১ লাখ ৩০ হাজার ইউয়ান এবং আইনি খরচ বাবদ ৭০ হাজার ইউয়ান।
আদালত রায়ে আরও বলেছেন, হাইদিলাও তাদের গ্রাহকদের যে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তা বিলের বাইরে এবং তাদের ‘স্বেচ্ছায় নেওয়া ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত’। তাই এর দায়ভার ওই কিশোরদের ওপর চাপানো যাবে না।
হাইদিলাও ইতিমধ্যে তাদের সব সরঞ্জাম বদলে ফেলেছে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ সবকিছু জীবাণুমুক্ত করেছে।
চীনের হটপট চেইন হাইদিলাও প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল সিচুয়ান প্রদেশের ছোট্ট শহর জিয়ানইয়াং থেকে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এই চেইন রেস্তোরাঁটির এক হাজারের বেশি শাখা আছে। আর তাদের পরিচিতি শুধু সুস্বাদু খাবারের জন্য নয়—খাবারের অপেক্ষার সময় নারী গ্রাহকদের বিনা মূল্যে ম্যানিকিউর ও শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া কটন ক্যান্ডির জন্যও।
![]() |
| চীনের সবচেয়ে বড় হটপট চেইন রেস্তোরাঁ হাইদিলাও। ফাইল ছবি: এএফপি |
Thursday, April 30, 2026
কেন লাতিন আমেরিকান এত নেতা আইনি জটিলতায়?
এ খবর দিয়ে অনলাইন সিএনএন বলছে, আসলে লাতিন আমেরিকার প্রায় দেশেই কমপক্ষে একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারিক তদন্তের মুখোমুখি। ব্যতিক্রম মাত্র একটি দেশ। ইকুয়েডরে ১৯৯৬ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিজন প্রেসিডেন্ট (মোট আটজন) আইনি তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। রাফায়েল কোরেয়া ঘুষকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হয়ে বর্তমানে বেলজিয়ামে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। পেরুতে নতুন শতাব্দীর শুরু থেকে সাতজন প্রেসিডেন্ট দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিচার বা তদন্তের সম্মুখীন। পুলিশ গ্রেপ্তার করতে গেলে অষ্টমজন আত্মহত্যা করেন। আর্জেন্টিনা, গুয়াতেমালা, মেক্সিকো ও এল সালভাদর- প্রতিটি দেশে পাঁচজন সাবেক প্রেসিডেন্ট আইনি ঝামেলায় পড়েছেন। আর্জেন্টিনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ দে কির্চনার ২০২২ সালে প্রতারণার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে গৃহবন্দি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ। ব্রাজিল, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে ও কোস্টারিকা- প্রতিটি দেশে চারজন সাবেক নেতা আইনি তদন্তের মুখে পড়েছেন। পানামা ও হন্ডুরাসে এ সংখ্যা তিনজন করে। নিকারাগুয়া, হাইতি, ডোমিনিকান রিপাবলিক, ভেনিজুয়েলা, চিলি ও কলোম্বিয়ার প্রতিটি দেশে কমপক্ষে একজন করে প্রেসিডেন্ট আইনি তদন্তের মুখে।
একমাত্র ব্যতিক্রম উরুগুয়ে: উরুগুয়ের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এ পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি, কারও বিরুদ্ধে উন্মুক্ত তদন্তও হয়নি। বরং দেশটি গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে শীর্ষে। দ্য ইকোনমিস্ট ডেমোক্রেসি ইনডেক্স ২০২৪ এ উরুগুয়ে বিশ্বে ১৫তম এবং এ অঞ্চলের একমাত্র ‘পূর্ণ গণতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উরুগুয়ের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যানজেল আরেয়ানো বলেন, এর পেছনে রয়েছে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি’। মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, সাধারণ বাড়িতে বসবাস এবং বিলাসী সুবিধার অভাব এ সংস্কৃতির অংশ।
উরুগুয়ে ছাড়া বাকি লাতিন আমেরিকায় নেতাদের আইনি জটিলতার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন- দুর্নীতি ও ঘুষকাণ্ড, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রেসিডেন্ট-কেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার দেশগুলো গড়ে ১০০ এর মধ্যে মাত্র ৪২ পয়েন্ট পেয়েছে। যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় ২২ পয়েন্ট কম। আরেয়ানোর মতে, লাতিন আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণ দুর্নীতির বড় কারণ।
গবেষকরা বলছেন, ১৯৮০-এর দশকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের পর থেকে সাবেক প্রেসিডেন্টদের বিচারের প্রবণতা বেড়েছে। আর্জেন্টিনার অধ্যাপক ক্যাটালিনা স্মুলোভিত্জের মতে, দুর্নীতি নিয়ে জনসচেতনতা আগে কম থাকায় আগের তুলনায় এখন মামলার সংখ্যা বেড়েছে নাকি নজরদারি বেড়েছে-তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ল’ফেয়ার বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মামলার ফাঁদে ফেলার প্রবণতাও বাড়ছে। এতে জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
লাতিন আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট পদে থেকে দুর্নীতির সুযোগ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অধিকাংশ নেতা আইনি জটিলতায় জড়ান। তবে উরুগুয়ে প্রমাণ করেছে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকলে ব্যতিক্রম হওয়া সম্ভব।

Friday, March 27, 2026
জুলাই হত্যাকাণ্ড ও আওয়ামী এমপি: কাঠগড়ায় কি ভুল মানুষ? by ডেভিড বার্গম্যান
তবে ১৬ জুলাই শুধু আবু সাঈদই নিহত হননি। ওই দিনই চট্টগ্রাম শহরে আরও তিনজন নিহত হন। তাঁরা হলেন—ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ওয়াসিম আকরাম ও মো. ফারুক। রংপুরের ঘটনার মতো এখানে পুলিশের ভূমিকা মুখ্য ছিল না। চট্টগ্রামে গুলির ঘটনায় জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগের কর্মী ও তাঁদের রাজনৈতিক নেতারা।
ঘটনার ছয় দিন পর, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজ চট্টগ্রামের এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং একই সময়ের মাঠপর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। অনুসন্ধানে যাঁদের গুলি করতে দেখা যায়, তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কর্মী বলে শনাক্ত হন।
নেত্র নিউজ জানায়, এই শুটাররা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনির পরিচিত ও প্রমানিত অনুসারী। অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, বাবর নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, গুলিতে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো বাবরের এক সহযোগীর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল।
এই লেখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে বলা হয়, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনি ছিলেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ তৃণমূল সহযোগীদের’ মধ্যে দুজন। সে সময় নওফেল ছিলেন দেশের শিক্ষামন্ত্রী এবং যে আসনে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, তিনি ছিলেন সেই এলাকার সংসদ সদস্য।
নেত্র নিউজ জানায়, তারা নওফেল ও বাবরের একসঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রায় এক শটি ছবি সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি, নওফেল যে বহুবার বাবরের বাড়িতে গিয়েছেন—এমন ছবিও তাদের কাছে আছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রনিকে চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের এলাকায় নওফেলপন্থী ছাত্রলীগের প্রকৃত নেতা হিসেবে ধরা হতো।
নেত্র নিউজের এই অনুসন্ধান অবশ্যই চট্টগ্রামের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার জন্য কারও অপরাধ শত ভাগ প্রমাণ করে না। কিন্তু এটি তদন্তের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়। বাংলাদেশ পুলিশ হোক বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা—এই প্রতিবেদন থেকে তাঁরা জানতে পারেন কারা গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ, অস্ত্রের উৎস কোথা থেকে এসেছে, বাবর ও রনি কীভাবে শুটারদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, এবং সেই সঙ্গে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তথ্যও এতে উঠে এসেছে।
ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেপ্তার
এসব তথ্য থাকার পরও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কৌঁসুলিরা চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রথমে নেত্র নিউজ যাঁদের চিহ্নিত করেছিল, তাঁদের কাউকে নিয়েই তদন্ত করেননি। বরং তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যকে অভিযুক্ত করেন। ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান আসনের সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে আইসিটির বিচারকদের সামনে হাজির করা হয়। কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমানের আবেদনের পর তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আটক রাখা হয়।
সেই সময় স্পষ্ট ছিল না, ঠিক কোন অপরাধের জন্য ফজলে করিমকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের আটকাদেশে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ ছিল না। সেখানে শুধু খুব সাধারণভাবে বলা হয়—সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ, সহায়তা, উসকানি ও নির্দেশনার মাধ্যমে হত্যা, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা অপরাধ সংঘটিত করেছেন বলে কৌঁসুলি অভিযোগ করেছেন।
এরপর আইসিটির কৌঁসুলিরা ফজলে করিমের আইনজীবীদের একটি এক পৃষ্ঠার নোট দেন, যেখানে তাঁর আটকের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। ওই নোটে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত তিনটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, ওই দিন ফজলে করিম অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মিলে দলীয় কর্মীদের ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ’ চালান এবং তারই ফলস্রুতিতে তিনজন নিহত হন।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে ওই নোটে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। সে সময় পর্যন্ত এই তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একমাত্র ফজলে করিম চৌধুরীকেই আটক বা গ্রেপ্তারের আবেদন করেছিল আইসিটি।
অনেকের কাছেই এই আটক অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। কারণ, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য যে প্রমাণ পাওয়া গেছে; বিশেষ করে নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে যেগুলো উঠে এসেছে—সেগুলোতে চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ডে সম্পূর্ণ ভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তা ছাড়া ফজলে করিমের নিজ নির্বাচনী এলাকা রাউজানে (যা চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে) জুলাইয়ের অস্থিরতার সময় কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি, কেউ গুরুতর আহত হননি, এমনকি কোনো আন্দোলনকারী নিহতও হয়নি।
পুরোনো শত্রুতার নিষ্পত্তি?
এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে গেলে দুজন ব্যক্তির পরিচয়ের দিকে নজর দিতে হয়। ফজলে করিম চৌধুরীর আটকাদেশ দেওয়ার কয়েক মিনিট পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাইরে এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা দাবি করেন, তাঁদের ‘অভিযোগের’ ভিত্তিতেই আইসিটি ফজলে করিমকে গ্রেপ্তার করেছে। এই দুজন ব্যক্তি বলেন যে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনি শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের লোক না। তাদের দাবী হলো বাবর ও রনি আসলে ফজলে করিম চৌধুরীর লোক। উল্লেখ্য, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনায় এই বাবর ও রনিকেই মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল নেত্র নিউজের অনুসন্ধানি প্রতিবেদন।
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলা এই দুই ব্যক্তি হলো আবদুল্লাহ আল মামুন ও জুবায়ের আহমেদ। তারা ফজলে করিমের সাবেক নির্বাচনী এলাকা রাউজানকেন্দ্রিক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী মুনিরিয়া যুব তাবলিগ-এর সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ এই সংগঠনটিকে একটি স্বাভাবিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে দেখেন। আবার অনেকের মতে এটি চরমপন্থী এবং ভূমি দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মুনিরিয়ার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ কতটা সত্য, তা আলাদা বিষয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে রাউজানের সংসদ সদস্য থাকাকালে ফজলে করিম ও মুনিরিয়া যুব তাবলিগের মধ্যে প্রায়ই পরষ্পর বিরোধিতা হয়েছে। ফজলে করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তাদের অপরাধমূলক তৎপরতা দমনে চেষ্টা করেছিলেন।
ফজলে করিমের পরিবার মনে করে, এই দ্বন্দ্বই তাঁর দীর্ঘ আটক থাকার মূল কারণ। তাদের দাবি—এখন প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা চাপ সৃষ্টি করছে, আর সেই চাপের ফলেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
এটা নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত এবং নতুন কিছু ছাত্রগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা বারবার ফজলে করিমের আটক, বিচার, এমনকি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ফজলে করিম গ্রেফতার হবার আগে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে, মুনিরিয়ার এক সদস্য সম্রাট রোবায়েত (যিনি পরবর্তীতে আইসিটিতে দেওয়া মূল অভিযোগটি লেখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন) চট্টগ্রামের একটি আদালতের সামনে এক সমাবেশের নেতৃত্ব দেন। সেখানে একটি ব্যানারে ফজলে করিমের গলায় ফাঁসের ছবি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই তাঁর ‘ফাঁসি’ দাবি করা হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একদল ছাত্র (যাদের মধ্যে অন্তত একজন মুনিরিয়া যুব তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত) অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাৎ নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে বলা হয়, এটি ছিল—‘বিচার ব্যাবস্থা ও আওমী সন্ত্রাসীদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ ও রাউজানের শীর্ষ সন্ত্রাসী ফজলে করিমের সর্বোচ্চ শাস্তি সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রাফাত আহমেদ এর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ।’ ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ বলতে সাধারণভাবে মৃত্যুদণ্ডকেই বোঝানো হয়।
এরপর ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি ফজলে করিমের গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে পরিবার তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার আবেদন করলে রোবায়েতসহ অন্যান্য লোকজন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল—ফজলে করিম যেন কোনোভাবেই, তাদের ভাষায়, ‘জামিন’ না পান। ওই কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে রোবায়েত বলেন, ‘চট্টগ্রামের অন্যতম গণহত্যাকারী এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, তাঁকে জামিন দেয়ার নাকি…চক্রান্ত চালাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট চক্র…আমরা চাই এইসব হত্যাকারি যাতে কোনভাবেই জামিন না পায়।’
এমনকি এর কয়েক সপ্তাহ আগেই রাউজানে এক সভায় আরেকজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়—যদি ‘তাকে ট্রাইব্যুনাল থেকে তাঁকে মুক্ত দেয়ার যে পাঁয়তারা যে গল্প আপনারা সাজাচ্ছেন তা আমাদের জানা…যদি সত্য হয়’, চট্টগ্রামের মানুষ তথা রাউজানের মানুষ প্রত্যেকটা মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আপনাদের ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেব।
আইসিটির জবাব
এই মামলার দায়িত্বে থাকা আইসিটির কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমান স্বীকার করেছেন, ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার জন্য ট্রাইব্যুনালের ওপর বাইরের কিছু গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৌঁসুলিরা এমন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন না।
নোমান বলেন, ‘এটা ঠিক যে মুনিরিয়া কোনোভাবে বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে এবং ফজলে করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিশ্চিত করতে জনতার চাপ তৈরি করতে চাইছে। কিন্তু আমরা আইসিটির কৌঁসুলি হিসেবে; এবং এই মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কৌঁসুলি হিসেবে যতক্ষণ না পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে প্রাথমিকভাবে (প্রাইমা ফেসি) অভিযোগের ভিত্তি পাই, ততক্ষণ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছি না। সে কারণেই মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।’
নোমান আরও স্বীকার করেন, ফজলে করিমের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘যে আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সেই এলাকায় কোনো নৃশংস ঘটনা ঘটেনি বা সংঘটিত হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম শহরে, অর্থাৎ যেখানে ওই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, সেখানে ফজলে করিমের কোনো সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল না; তিনি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগের কোনো পদে ছিলেন না।
তবে নোমান উল্লেখ করেন, মুনিরিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া মূল অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় ফজলে করিম ছাত্রদের হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগটি আমরা এখনো তদন্ত করে দেখছি।’
এর ফলে আটক হওয়ার এক বছর পরও ফজলে করিম ও তাঁর পরিবারকে তাঁর ভবিষ্যৎ কী হবে—তা জানার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এদিকে চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগ বা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তিকে এখন গ্রেফতার করা হয়েছে বা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে এই হত্যাগুলোর মামলায়। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও।
এই পরিস্থিতির আলোকে ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেফতার নিয়ে উদ্বেগ হলো তাঁকে যে এখনো অন্তরীন রাখা হয়ছে তা কি আদৌ কোন প্রমানের ভিত্তিতে হচ্ছে কিনা। বরং বাস্তবতা হলো—মুনিরিয়া যুব তাবলিগ ও তাদের সঙ্গে যুক্ত কিছু ছাত্রগোষ্ঠীর সংগঠিত প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় আইসিটির কৌঁসুলিরা কার্যত একজন সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যকে মুক্তি দিতে সাহস পাচ্ছেন না, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
* ডেভিড বার্গম্যান, সাংবাদিক। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david.bergman.77377
- ইংরেজি থেকে অনূদিত। মতামত লেখকের নিজস্ব।
![]() |
| গত বছরের ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নগরের মুরাদপুর এলাকায় হামলা করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা। ছবি: জুয়েল শীল |
Tuesday, March 24, 2026
ভারতে অসুস্থ যুবকের ‘পরোক্ষ মৃত্যুর’ পক্ষে রায় দিলেন সুপ্রিম কোর্ট
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে বি পর্দিওয়ালা ও বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বুধবার এই রায় দিয়ে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি মনোযোগী হওয়া। মর্যাদার সঙ্গে নিষ্কৃতি মৃত্যু নিশ্চিত করতে আইন আনা দরকার।
বাইরের জগৎ কিংবা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে চেতনাহীন কোনো ব্যক্তি, যাঁকে সুস্থ করে তোলার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা চিকিৎসাশাস্ত্রে নেই, কৃত্রিম উপায়ে যাঁর শরীরে প্রাণবায়ুটুকু শুধু অবশিষ্ট রয়েছে, তাঁর নিষ্কৃতি মৃত্যু বা পরোক্ষ মৃত্যুর অধিকার থাকা নিয়ে ভারতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। আইন–আদালত এই অধিকার নিয়ে সহমত হননি। সরকারও আইন প্রণয়ন করেনি। এ বিবেচনায় গতকাল হরিশ রানার মা–বাবার আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের সম্মতিদান নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।
রায়ে বলা হয়েছে, হরিশকে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (এইমস) ভর্তি করাতে হবে। সেখানেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় মর্যাদার সঙ্গে তাঁকে দেওয়া জীবনদায়ী ব্যবস্থা (লাইফ সাপোর্ট) সরিয়ে ফেলতে হবে। তা করার আগে চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত বোর্ডকে অবশ্য জানাতে হবে, রোগীর সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
পাঞ্জাবের চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন হরিশ। ২০১৩ সালে ছাত্রাবাসের পাঁচতলা থেকে পড়ে তিনি মাথায় গুরুতর চোট পান। চিকিৎসকদের অক্লান্ত চেষ্টায় প্রাণে বাঁচলেও ক্রমেই তিনি ‘কোয়াড্রিপ্লেজিয়া’ বা সর্বাঙ্গ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। শ্বাস–প্রশ্বাস চালানো, খাওয়াদাওয়া—সবই চলতে থাকে কৃত্রিম উপায়ে। প্রথমে হাসপাতাল, তারপর নিজের বাড়িতে রেখেই চলতে থাকে হরিশের চিকিৎসা।
১৩ বছর ধরে চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে নিজের বাড়িও বিক্রি করে দিতে হয়েছে হরিশের মা–বাবাকে। হরিশের ছোট ভাইয়ের রোজগারে কোনোরকমে সংসার চালানো ওই দম্পতি ছেলের মৃত্যুর অধিকার পেতে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আগেও বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে এসেছেন।
২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট হরিশের পরিবারের আবেদন গ্রাহ্য করেননি। সে সময় শীর্ষ আদালত এই মামলাকে ‘অত্যন্ত কঠিন সমস্যা’ বলেছিলেন। বলেছিলেন, রোগীকে বাড়িতে রাখতে হবে। চিকিৎসকেরা তাঁকে নিয়মিত দেখতে যাবেন।
অবশেষে সর্বোচ্চ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ হরিশের মা–বাবার আবেদন মেনে নিলেন। বৃদ্ধ মা–বাবার আরজি ছিল, তাঁদের অবর্তমানে অসুস্থ ছেলেকে কে দেখবে, কীভাবে আসবে চিকিৎসার খরচ—সেই ভাবনায় তাঁরা অস্থির। দিন দিন অসুস্থতাও বেড়ে চলেছে।
আরজিতে বলা হয়েছিল, এ অবস্থায় ছেলের কষ্ট লাঘবের জন্য মৃত্যুই একমাত্র উপায়। তবে সেই মৃত্যু যেন প্রত্যক্ষ না হয়। অর্থাৎ কোনো ইনজেকশন বা ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নিয়ে মৃত্যুদানের অনুরোধ জানিয়েছিলেন হরিশের মা–বাবা। বিচারপতিরা সেই অনুরোধই মেনে ‘প্যাসিভ ইউথানেসিয়া’র পক্ষে রায় দেন।
ভারতে প্রত্যক্ষ মৃত্যু বা অ্যাকটিভ ইউথানেসিয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ। প্যাসিভ বা পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকারও এত দিন আদালত দেননি। গতকাল রায় দিতে গিয়ে বিচারপতিরা বলেন, হরিশের চিকিৎসাব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি ও তাঁর ভবিষ্যৎ এবং রোগীর পক্ষে কোনটা মঙ্গল, তা বিবেচনা করে এই মৃত্যুতে তাঁরা সায় দিয়েছেন।
২০১৮ সালে ‘কমন কজ’ বনাম কেন্দ্রীয় সরকার মামলারও উল্লেখ করেন বিচারপতিরা। সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলার রায়ে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
![]() |
| হরিশ রানার শয্যাপাশে বাবা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া |
Thursday, March 5, 2026
র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার, ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা হোক: ইকবাল করিম ভূঁইয়া
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে আজ সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া এ কথাগুলো বলেন। এর আগে গতকাল রোববার তিনি জবানবন্দি দেন।
সাবেক এই সেনাপ্রধান জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘আমি চাই র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার এবং সেটি সম্ভব না হলে সামরিক সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমি আরও চাই ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ, এই সংগঠনটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পরে টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলার জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল–১–এর অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এ মামলার একমাত্র আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তাঁকে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
আজকের জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘এত কিছুর পরও যখন বুঝতে পারি ক্রসফায়ার থামছে না, তখন আমি ডিজিএফআই, বিজিবি এবং র্যাব থেকে অফিসার নিয়ে আসা ও পোস্টিং বন্ধ করে দিই। আমাকে অনেকে মনে করিয়ে দেন যে আমি যা করছি, তা বিদ্রোহের শামিল। আমার উত্তর একটাই ছিল যে হাশরের ময়দানে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। পোস্টিং বন্ধ করার প্রতিক্রিয়াও ছিল মারাত্মক। আমি প্রতিনিয়ত অফিসার পোস্টিং করার জন্য টেলিফোন পেতে থাকি। একসময় র্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ আমার অফিসে আসেন এবং র্যাব অফিসার দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। তাঁকে কোনো কথা দিইনি।’
সাবেক এই সেনাপ্রধান জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘চট্টগ্রামে হোটেল র্যাডিসন উদ্বোধনের সময় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠককালে আমাকে ডেকে নেন এবং র্যাব অফিসার দিতে বলেন। এই স্বল্পতার কারণে র্যাবে অফিসার দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানাই। আমার অবসর গ্রহণের আগপর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত ছিল। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।’
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘র্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে আমার দায়িত্বকালীন সময়টি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কিছু করতে না পারার বেদনা আমাকে সব সময় আচ্ছন্ন করে রাখত। আজ সুযোগ এসেছে সেই করতে না পারার কাজটি সম্পন্ন করার। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে না, বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চ শিখরে আসীন হবে। পুরো জাতি জানবে সেনাবাহিনী কখনো দোষী ব্যক্তিদের ছাড় দেয় না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব এবং সম্মানের সাইনবোর্ডের আড়ালে অফিসারদের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি দূর হবে।’
আজকে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি শেষ হয়। পরে তাঁকে জেরা করা শুরু করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনি। জেরায় এক প্রশ্নের জবাবে সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি একজন ডিহিউম্যানাইজড সেনা কর্মকর্তা। আমি আমার চাকরিজীবনের ৪০ বছরে শিখেছি কীভাবে মানুষ হত্যা করতে হয়। শুধু আমি নই, পৃথিবীর সব সেনাসদস্যকে এই একই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’
প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জেরা আজকের মতো শেষ হয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি জেরার জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।
![]() |
| সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ছবি: ইকবাল করিম ভূঁইয়ার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে |
Sunday, March 1, 2026
ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি: সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল, গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে ওঠে
ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি: সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল, গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে ওঠে
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি অসমাপ্ত রয়েছে। আগামীকাল সোমবার তাঁর আবার জবানবন্দি দেওয়ার কথা। ইকবাল করিম ভূঁইয়ার দেওয়া প্রথম দিনের জবানবন্দির পূর্ণ বিবরণ এখানে দেওয়া হলো—
‘আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক সেনাপ্রধান। আমি ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলাম। আমি সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুম ও খুনের সংস্কৃতি কীভাবে বেড়ে উঠেছে, সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। পাশাপাশি আমি সেনাপ্রধান থাকাকালে র্যাব সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে এসেছি।’
সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল। গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে উঠেছে। আমরা যদি ধরে নিই যে ২০০৮ সাল থেকে খুন শুরু হয়েছে, তবে সেটা ভুল বলা হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনা ক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে তার সংখ্যা ছিল সীমিত। পরে তদন্ত আদালতের মাধ্যমে এবং আইন প্রয়োগ করে সেগুলোকে নিয়মিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলাকালে বেশ কিছু মৃত্যু হয়েছে। যেগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে, সেগুলোকে ধর্তব্যে নিয়ে দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ হচ্ছে বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সামরিক বাহিনীকে তাদের সাহায্যে সময়–সময় মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া দুর্যোগকালেও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। এমনকি নির্বাচনকালেও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। সবার ধারণা সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, তাই এটি একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সেনাবাহিনীকে যখনই বাইরে মোতায়েন করা হয়, অধিনায়কদের মনে একটি সার্বক্ষণিক চাপ থাকে তাদের কত তাড়াতাড়ি সেনানিবাসে ফেরত আনা হবে। কারণ, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ‘এক গুলি, এক শত্রু’ নীতির ওপর পরিচালিত হয়ে থাকে। বস্তুত এটি না হলে সেনাবাহিনী কখনো যুদ্ধ করতে পারবে না। এ জন্য প্রশিক্ষণকালে সেনাসদস্যদের ডিহিউম্যানাইজ করা হয়। তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়, মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্বিক বাধা দূর করা হয়। এ কথা মনে রেখে সেনাবাহিনীকে কখনো বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে, যখন র্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনাসদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। র্যাব গঠনের পূর্বে অপারেশন ক্লিনহার্টে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেনাসূত্র অনুযায়ী ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এই সংখ্যাটি ছিল ৬০ জন। পরে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। বস্তুত এই ইনডেমনিটি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান।
২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর জন্য যে সংঘাত শুরু হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে স্টেট অব ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই হয়ে ওঠে দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক। বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে তাদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করত। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ছিলেন। তাঁরা বিএনপির জনাব তারেক রহমানকেও উঠিয়ে এনে নির্যাতন করে। এ সময় থেকে বস্তুত বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে আটক রাখার সেলের মধ্যে রাখা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। বস্তুত যেকোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা ইচ্ছা তাই করা যায় মর্মে তারা ভাবতে শুরু করে। তারা ভাবতে শুরু করে যা কিছুই তারা করুক না কেন শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে। জরুরি অবস্থায় সেনাসদস্যদের সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। তারা রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের মধ্যে আধিপত্যবোধের জন্ম হয়, সিনিয়র ও জুনিয়রের মধ্যে একটি বিভাজন সৃষ্টি হয়, নগদ সংস্কৃতির উত্থান হয় এবং উপরস্থদের আদেশ অন্ধভাবে পালন করার প্রবণতা জন্ম হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিডিআর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। পরে বিদ্রোহ দমন করার পর বিডিআর সদস্যদের অন্তরিণ করা হয় এবং সেখানে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদকালে পিলখানায় (বিডিআর সদর দপ্তর) র্যাব ও সামরিক সদস্য দ্বারা নির্যাতনের কারণে আনুমানিক ৫০ জন বিডিআর সদস্য মৃত্যুবরণ করেন বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়। পরে দায়রা আদালত কর্তৃক ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ অনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনা অফিসারদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্রতর হয়, সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে, পেশাদার অফিসারদের এক পাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করে বাহিনীটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। এর বড় কারণ হলো শেখ হাসিনা ভাবতেন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।
পরে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের শাসন আমলের দুর্বল দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ ও প্রশাসনের ওপর তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন। এ জন্য তিনি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেন।
এ সময় তিনি তাঁর আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁর মাধ্যমে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সচেষ্ট হন। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব, এনটিএমসি, আনসার, বিজিবি ইত্যাদি সংস্থাগুলোকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে চারটি চক্রের উদ্ভব ঘটে। প্রথম চক্রটি হচ্ছে অপরাধ চক্র, যেটি ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব ও এনটিএমসিকে নিয়ে তিনি পরিচালনা করতেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন, হত্যা ও গুমের মতো ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। দ্বিতীয় চক্রটি ছিল ডিপ স্টেট। এটি তিনি পরিচালনা করতেন এমএসপিএম (প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব), ডিজিএফআই, এনএসআই ইত্যাদির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে তিনি তিন বাহিনী সম্পর্কে সব নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতেন। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বাহিনী প্রধানদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তৃতীয় চক্রটি ছিল কেনাকাটা চক্র। এটিতে সংযুক্ত ছিল পিএসও, এএফডি, ডিজিডিপি, বাহিনী প্রধান ইত্যাদি। এই চক্রের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করতেন। চতুর্থ চক্রটি ছিল সামরিক প্রকৌশলী চক্র। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের অফিসার হওয়ায় তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে আলাদা চক্র গড়ে তোলেন। এদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে তাঁর প্রভাব বিস্তার করা শুরু করেন। এটি ছিল অবৈধ অর্থের প্রধান উৎস।
এবার র্যাবের কথা বলছি। সেনাপ্রধান হওয়ার পূর্ব থেকেই অন্য সামরিক সদস্যদের মতোই র্যাব সদস্যদের অবৈধ ও বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। সেনাপ্রধান হওয়ার পরপরই আমি র্যাবের এডিজি তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তী সময় লে. জেনারেল) মুজিবকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং এসব ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। আমি তাকে র্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলি। তিনি আমাকে কথা দেন আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। পরবর্তী কিছুদিন আমি পত্রিকাতে ক্রসফায়ারের ঘটনা দেখিনি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করতে পারি ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও বদলে যায় যখন বেনজীর আহম্মেদ র্যাবের ডিজি হয়ে আসেন এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (যিনি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আছেন) জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে বলি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান এসে আমাকে জানান তিনি কথা বলেছেন কিন্তু কোনো ভালো প্রতিশ্রুতি তাঁর কাছ থেকে পাননি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল এসে আমাকে জানান কথা বলে কোনো লাভ হয়নি, ওর মাথা ইট ও পাথরের টুকরা দিয়ে ঠাসা। পরে আমাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল জানায় জিয়াউল আহসান তার বাসায় অস্ত্র রাখে, গার্ড মোতায়েন রাখে ও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে। তাকে সামরিক কোয়ার্টারে থাকার নিয়মকানুন মেনে এগুলো পরিত্যাগ করতে বলা হয়। পরে জিয়াউল আহসান, মেজর জেনারেল সিদ্দীকি ও তার কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুবের (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ছত্রচ্ছায়ায় আমার আদেশ অমান্য করতে শুরু করে। দুজন অফিসারকে বিভিন্ন নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে শান্তি দেওয়ার জন্য র্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য পোস্টিং আদেশ জারি করার পরও সে তাদের ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে। আমি জিয়াউল আহসানকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করি। এটি কার্যকরী করার জন্য লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে দায়িত্ব দেই। পরে তিনি বিষয়টি মেজর জেনারেল তারেক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে না জানানোর জন্য তার বিরাগভাজন হন। অচিরেই আমি এমএসপিএম মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে ফোন পাই। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জিয়াউল আহসানের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তা তুলে নেওয়ার জন্য। আমি না বলেছি। আমাকে তখন মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিন জিজ্ঞাসা করেন কোনো চাকরিরত অফিসারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা কি বিশেষ পদক্ষেপ? আমি বলি হ্যাঁ, এটি বিশেষ পদক্ষেপ এবং তুমি যদি সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করো, তাহলে তোমারও একই অবস্থা হবে। দুদিন পর সংঘাত এড়ানোর জন্য আমি নিজে থেকেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেই।
আমাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করত তা হলো আমরা সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দেই র্যাব, ডিজিএফআই এবং বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার পূর্বে ও পরে আমার ইন্টারভিউতে আসবে। যারা র্যাবে যেত তাদের আমি এই বলে মোটিভেট করতাম যে নরহত্যা মহাপাপ এবং কাউকে হত্যা করলে তার পরিবারের অভিশাপ তোমার পরিবারের ওপর পড়বে। একজনকে হাত–পা বেঁধে হত্যা করা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ। সত্যিকারের সাহস হচ্ছে হাত–পা খুলে তার হাতে একটি অস্ত্র দিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। যারা ফেরত আসত, তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীর র্যাব সদস্যদের সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করলেন র্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
পরে আমি ইন্টারভিউতে আসা অফিসারদের এই বলে সাহস জোগালাম যদি কাউকে কোনো কিলিং মিশনের জন্য বলা হয়, সে যেন আমাকে সরাসরি ফোন করে। আমি তাদের সেনাবাহিনীতে সম্মানের সঙ্গে ফেরত নিয়ে আসব এবং পুনর্বাসিত করব। আমার পাশাপাশি যারা র্যাবে নতুন যাচ্ছেন, তাঁদের মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর জেনারেল আনোয়ার, ডিএমআই এবং আমার পিএস কর্নেল সাজ্জাদও (বর্তমানে মেজর জেনারেল) মোটিভেট করতে থাকেন। কিছুদিন পর ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল আমাকে এসে জানান, আমাদের মোটিভেশনে কোনো কাজ হচ্ছে না। র্যাবে যোগদানের পরে অফিসারদের ডিমোটিভেট করা হচ্ছে। তবুও দুজন অফিসারকে যখন প্রথম রাত্রেই কিলিং মিশনে যেতে বলা হয়, তাঁরা ওখান থেকে চলে এসে ঢাকা সেনানিবাসের এমপি চেকপোস্টে রিপোর্ট করেন। আমি তাঁদের সসম্মানে সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত করি।
এর মধ্যে ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল কর্নেল জিয়াউল আহসানের বিরাগভাজন হন। তাঁকে মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দীকি ডিএমআই পদ থেকে সরিয়ে দেন। সাধারণত ডিএমআই সেনাপ্রধানের পছন্দের ব্যক্তি হয়ে থাকেন এবং তাঁকে সেনাপ্রধানই নিয়োগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বদলি করে দেওয়া হয়, যা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার ফজলকেও বদলি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমার প্রবল বিরোধিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়।
![]() |
| সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ছবি: তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে |
Monday, February 23, 2026
অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়োলের মৃত্যুদণ্ড নয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
ইয়ুন ইতিমধ্যেই ব্যর্থ সামরিক আইন জারির আরেক মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাভোগ করছেন। তার বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আজকের রায় দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সিউলের একটি আদালত আজ স্থানীয় সময় বিকেলে ৩টায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়োলের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিদ্রোহ মামলার দেয়া শুরু হবে। শেষে রায় ঘোষণা করবে। এই রায় দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এ অবস্থায় সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বাইরে ডজনখানেক পুলিশ বাস দিয়ে নিরাপত্তা বলয় গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রায় ১০০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি মূলত শান্ত থাকলেও ইয়ুন-সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে ছোটখাটো ধস্তাধস্তির খবর পাওয়া গেছে। ইয়ুন সমর্থকরা আদালতকে আজ ‘অভিযোগ খারিজ’ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, বিরোধী বিক্ষোভকারীরা বিদ্রোহের নেতা ইয়ুনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দাবি তুলেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার ফৌজদারি আইনে বিদ্রোহ বলতে বোঝায়, সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় অঙ্গকে উৎখাত করা বা তাদের কার্যক্রম বলপ্রয়োগে অকার্যকর করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত দাঙ্গা বা সহিংস কর্মকাণ্ড। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টরা সাধারণত ফৌজদারি মামলায় দায়মুক্ত থাকেন। তবে বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের ক্ষেত্রে এই দায়মুক্তি প্রযোজ্য নয়।
এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত
সিউল সংবাদদাতা জেক কোয়নের মতে, আজকের রায় দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এক বিশাল ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ইয়ুন ইতিমধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামরিক আইন জারির অপচেষ্টার দায়ে দণ্ডিত হয়ে কারাভোগ করছেন। তবে বিদ্রোহের অভিযোগ সবচেয়ে গুরুতর। প্রসিকিউটরদের মতে, কঠোর শাস্তি না দিলে ভবিষ্যতে কেউ সামরিক শাসন জারির মতো পদক্ষেপ নেয়ার সাহস পেতে পারে। ইয়ুনকে সেই একই আদালতকক্ষে রায় শোনানো হবে, যেখানে প্রায় ৩০ বছর আগে সাবেক সামরিক শাসক চুন ডু-হওয়ান’কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। পরে তাকে দুই বছর কারাভোগের পর ক্ষমা করা হয়।
বিভক্ত দেশ
ইয়ুনের সামরিক আইন জারি মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু তা দেশকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলে। নেতৃত্বের শূন্যতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ এখনো কাটেনি। সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ২০-৩০ ভাগ ভোটার মনে করেন ইয়ুন বিদ্রোহে দোষী নন। ফলে রায় যা-ই হোক না কেন, দেশকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

Tuesday, February 10, 2026
হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী মিডিয়া মোগল জিমি লাইকে ২০ বছরের জেল
এতে বলা হয়, ৭৮ বছর বয়সী বৃটিশ নাগরিক জিমি লাইয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তার পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এ রায়কে কার্যত মৃত্যুদণ্ডের শামিল বলে অভিহিত করেছেন তারা। তবে হংকংয়ের প্রশাসন বলছে, এই রায় শহরের আইনের শাসনেরই প্রমাণ।
২০১৯ সালে গণতন্ত্র ও অধিক স্বাধীনতার দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভের পর চীন হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারি করে। বেইজিংয়ের দাবি, শহরের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য আইনটি অপরিহার্য। সমালোচকদের মতে, এই আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে কার্যত স্তব্ধ করে দিয়েছে।
জিমি লাই এই আইনে গ্রেপ্তার হওয়া শত শত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চীনা সরকারের কট্টর সমালোচক ছিলেন এবং তার পত্রিকা অ্যাপল ডেইলিকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন।
রায়ের পর জিমি লাইয়ের ছেলে সেবাস্তিয়ান লাই বিবিসিকে বলেন, এটা ভীষণ হৃদয়বিদারক। আমরা বারবার বৃটিশ সরকারের কাছে বিষয়টি তুলেছি, কিন্তু আমার বাবা এখনও কারাগারে। তিনি বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সাম্প্রতিক চীন সফরকেও একটি হারানো সুযোগ বলে সমালোচনা করেন।
আদালতে সাজা ঘোষণার সময় বিচারকরা লাইয়ের কর্মকাণ্ডকে গুরুতর ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেন। সোমবার সকালে আদালত চত্বরে ছিল কড়া পুলিশি নিরাপত্তা। একই সঙ্গে বহু সমর্থক দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে রায় শোনার আশায় আদালতে উপস্থিত হন।

Monday, February 2, 2026
জবানবন্দিতে আমান আযমী: ২ হাজার ৯০৮ দিন চাঁদ-সূর্য, মেঘ-বৃষ্টি দেখিনি
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুমের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে আবদুল্লাহিল আমান আযমী জবানবন্দি দিয়েছেন। আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি এ জবানবন্দি দেন।
আবদুল্লাহিল আমান আযমী জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির প্রয়াত গোলাম আযমের ছেলে। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাতে রাজধানীর বড় মগবাজারের বাসা থেকে ৫০ থেকে ৬০ জন সাধারণ পোশাকধারী লোক তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। তুলে নেওয়ার সময় জমটুপি পরানোর আগেই তিনি অপহরণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হককে দেখতে পান এবং তাঁকে চিনতে পারেন। তাঁর জানা ছিল, মখছুরুল ডিজিএফআইয়ের (প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর) একজন কর্মকর্তা।
জবানবন্দিতে আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আটক থাকাকালে তাঁর সেলে কোনো প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ছিল না। ২ হাজার ৯০৮ দিন তিনি আকাশ দেখেননি, চাঁদ-সূর্য দেখেননি, মেঘ-বৃষ্টি দেখেননি, গাছ-মাটি দেখেননি। সারা দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এই দীর্ঘদিন যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় বলেও উল্লেখ করেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।
আজ আবদুল্লাহিল আমান আযমীর জবানবন্দি গ্রহণ শুরুর আগে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. হাসিনুর রহমানের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। এ ছাড়া এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
জেআইসিতে গুম করে রাখার এ মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে ৩ জন গ্রেপ্তার আছেন। তাঁরা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিন পরিচালক—মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তাঁদের আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
মামলার বাকি ১০ আসামি পলাতক। তাঁদের মধ্যে আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
পলাতক আসামিদের মধ্যে আরও আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।
পলাতক আসামিদের মধ্যে আরও আছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।
![]() |
| সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমী। ফাইল ছবি: প্রথম আলো |
Sunday, February 1, 2026
আটক ৫ বছরের শিশু ও তার বাবাকে ছেড়ে দিতে আইসিইর প্রতি মার্কিন বিচারকের নির্দেশ
গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক ফ্রেড বিয়েরি এমন আদেশ দিয়েছেন।
সম্প্রতি মিনিয়াপোলিস থেকে লিয়াম কোনেহো রামোস নামের ৫ বছর বয়সী শিশু ও তার বাবাকে আটক করেন আইসিইর সদস্যরা। গতকাল বিচারক বিয়েরি তাঁর রুলে লিয়ামের আটককে অবৈধ বলে উল্লেখ করেন।
ভাইরাল হওয়া এক ছবিতে দেখা গেছে, লিয়ামকে মিনিয়াপোলিসের একটি এলাকা থেকে আইসিই কর্মকর্তারা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। ওই সময় লিয়ামের মাথায় নীল রঙের হ্যাট ছিল, সঙ্গে একটি ব্যাকপ্যাক। এ ঘটনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া কঠোর অভিবাসননীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিচারক ফ্রেড বিয়েরি রুলে লিখেছেন, শেষ পর্যন্ত আবেদনকারীদের (অভিবাসনের জন্য) যুক্তরাষ্ট্রের জটিল অভিবাসনব্যবস্থার কারণে জোরপূর্বক বা স্বেচ্ছায় নিজেদের দেশে ফিরে যেতে হতে পারে। তবে প্রক্রিয়াটি বর্তমানে যা ঘটছে, সে তুলনায় আরও সুশৃঙ্খল ও মানবিক নীতির মাধ্যমে হওয়া উচিত।
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে চলমান অভিযানটি এখন পর্যন্ত আইসিইর সবচেয়ে বড় অভিযান। অঙ্গরাজ্যটির মিনিয়াপোলিস শহরে সংস্থাটির প্রায় তিন হাজার সদস্য মোতায়েন আছেন। সেখানে অধিকারকর্মী ও অভিবাসন কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায়দিনই সংঘর্ষ হচ্ছে। ইতিমধ্যে সেখানে আইসিই সদস্যদের গুলিতে দুই মার্কিন নিহত হয়েছেন।
আইসিইর এমন প্রাণঘাতী অভিযানের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।মিনিয়াপোলিসের কলাম্বিয়া হাইটস স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত মাসে ওই এলাকায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে কমপক্ষে চার শিক্ষার্থী আটক হয়েছে। লিয়াম তাদের একজন।
স্কুলের তত্ত্বাবধায়ক জেনা স্টেনভিক বলেছেন, ২০ জানুয়ারি আইসিইর সদস্যরা শিশুটিকে বাড়ির প্রবেশপথে থাকা একটি চলন্ত গাড়ি থেকে বের করে আনেন। পরে তাকে বাড়ির দরজার কাছে নিয়ে যান এবং কড়া নাড়তে বলেন।
স্টেনভিক মনে করেন, পরিবারের অন্য সদস্যদের ধরতে শিশুটিকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহারের কৌশল অবলম্বন করেছেন আইসিইর সদস্যরা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার তা অস্বীকার করেছে। মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ট্রিসিয়া ম্যাকলাফলিন বলেছেন, শিশু লিয়ামের সুরক্ষার কথা ভেবে আইসিই সদস্যরা তার সঙ্গে ছিলেন। কারণ, ওই সময় অন্য কর্মকর্তারা তার বাবাকে আটক করায় শিশুটি একা হয়ে পড়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জোরালোভাবে মিনেসোটায় আইসিইর নেওয়া কৌশল সমর্থন করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যদিও এ ধরনের আটকের ঘটনা শিশুদের জন্য পীড়াদায়ক হতে পারে, তবে তার মানে এই নয় যে মা–বাবা হওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তি আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর কাছ থেকে দায়মুক্তি পেয়ে যাবেন।’
এর আগে আইনজীবীর বরাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লিয়াম ও তার বাবা ইকুয়েডরের নাগরিক। দুজনের পক্ষ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদন করা হয়েছিল এবং আবেদনকারী হিসেবে তাঁরা দেশটিতে বৈধভাবে ছিলেন। দুজনকেই টেক্সাসের ডিলিতে একটি পারিবারিক আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
![]() |
| মুখোশধারী আইসিই এজেন্টরা এক শিশুর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। এক প্রত্যক্ষদর্শী শিশুটিকে ৫ বছর বয়সী লিয়াম কোনেহো রামোস নামে শনাক্ত করেছেন। স্কুলের কর্মকর্তারা বলেন, গত ২০ জানুয়ারি মিনেসোটার মিনিয়াপোলিস থেকে তাকে আটক করা হয়। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Thursday, January 29, 2026
আইসিজেতে শুনানিতে গাম্বিয়া: রোহিঙ্গাদের জীবন বিভীষিকাময় করে তুলেছে মিয়ানমার
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলাটি করে। মামলাটির এ শুনানি বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গত এক দশকের বেশি সময়ে জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) অভিযোগে প্রথম মামলা হিসেবে এটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ শুনানি হচ্ছে। তাই এ মামলার রায়ের প্রভাব শুধু মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং অন্যান্য দেশের ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা জাতিগত নিধন মামলার ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো গতকাল আইসিজের শুনানিতে বলেন, রোহিঙ্গারা ‘সহজ–সরল মানুষ। তাঁরা শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখতেন। ধ্বংস করার জন্য তাঁদের নিশানা করা হয়েছে। মিয়ানমার তাঁদের স্বপ্নকে শুধু অস্বীকার করেনি, বরং তাঁদের জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। তাঁরা এমন নৃশংস সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছেন, যা কল্পনাতীত।’
২০১৯ সালে মামলাটি করার পর প্রাথমিক শুনানিতেই মিয়ানমার সব অভিযোগ অস্বীকার করে। তখন মামলার অভিযোগে গাম্বিয়া বলেছিল, মিয়ানমার নিজেদের রাখাইন রাজ্যের প্রত্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলের প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালিয়েছে।
আইসিজেতে মামলা হওয়ার দুই বছর আগে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চালায়। নির্বিচার হামলার মুখে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ, ব্যাপক ধর্ষণ এবং তাঁদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে ‘জাতিগত নিধনের মতো ঘটনা’ ঘটেছে।
গাম্বিয়াকে আইসিজেতে মামলা করতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৭ দেশের জোট ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সহযোগিতা করেছে। মামলাটির প্রাথমিক শুনানিতে অংশ নিয়ে মিয়ানমারের তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি গাম্বিয়ার জাতিগত নিধনের অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করেন। ২০২২ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতটি মিয়ানমারের ‘প্রাথমিক আপত্তি’ খারিজ করে দেন।
চলমান শুনানি ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪ কার্যদিবস চলবে। এতে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কথা শোনা হবে। তবে সংবেদনশীলতা ও গোপনীয়তার কারণে এসব সেশনে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত থাকতে পারবেন না।
![]() |
| মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। ফাইল ছবি |
Wednesday, January 28, 2026
আমার চোখের সামনেই শিশুদের আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল: মিয়ানমারে নিপীড়িত রোহিঙ্গা নারী
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) অভিযোগসংক্রান্ত শুনানি শুরু হওয়া প্রসঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন মোনাইরা (ছদ্মনাম)। তিনি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো নির্মম দমন-পীড়নে বেঁচে যাওয়া মানুষদের একজন।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালায়, তখন এ রোহিঙ্গা নারীকে নিজের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।
মোনাইরা বলেন, সেই সহিংসতার সময় তাঁর ভাইকে সেনাসদস্যরা ধরে নিয়ে যায়, গুলি করে হত্যা করে ও তাঁর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেনাসদস্যদের হাতে তিনি নিজেও ধর্ষণের শিকার হন।
মোনাইরা বলেন, ‘আমার চোখের সামনেই শিশুদের আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল।’
গতকাল সোমবার জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনসংক্রান্ত মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। মোনাইরার মতো রোহিঙ্গাদের অনেকের আশা, এর মধ্য দিয়ে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পথে তাঁরা অন্তত এক ধাপ এগোতে পারবেন।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে গাম্বিয়া। মূলত ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে এ মামলা করা হয়। ওই অভিযানের কারণে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
মোনাইরা বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই।’ শুনানিতে অংশ নিতে তিনি বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থিত শরণার্থীশিবির থেকে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে গিয়েছেন।
এটি গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) প্রথম কোনো জাতিগত নিধনসংক্রান্ত মামলার শুনানি। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে জাতিগত নিধনের অভিযোগগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে ক্ষেত্রে এই শুনানি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
এর মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার করা একটি মামলাও রয়েছে।
গতকাল সোমবার শুনানির শুরুতে গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো আদালতকে বলেন, এই মামলা আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বোধ্য তাত্ত্বিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাস্তব মানুষ, বাস্তব গল্প ও একটি বাস্তব মানবগোষ্ঠীকে ঘিরে মামলাটি করা হয়েছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা হলো সেই মানবগোষ্ঠী, ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্যেই যাঁদের নিশানা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছে—কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, মা, বাবা, ছেলে, মেয়ে, দাদা-দাদি।
জ্যালো আরও বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জীবনকে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। তাঁদের এমন সহিংসতা ও ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা কল্পনা করাও কঠিন।
গাম্বিয়া আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিচার আদালতে তাদের প্রথম পর্যায়ের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। দেশটির অভিযোগ, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল, রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করা।
দাউদা জ্যালো আদালতে বলেছেন, ‘আমরা হালকা ধরনের প্রস্তুতির ভিত্তিতে এ মামলা করিনি। বহু বছর ধরে অবমাননা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া একটি অসহায় গোষ্ঠীর ওপর যে নৃশংস ও নির্মম নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করার পরই আমরা এই মামলা দায়ের করেছি।’
মিয়ানমার জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা ১৬ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারির ভেতর তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। নিপীড়নের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষেরা এই মামলায় সাক্ষ্য দেবেন, যা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের জন্য বিরল ঘটনা। ২৯ জানুয়ারি শুনানি শেষ হবে।
এর আগে মিয়ানমারের ৮০ বছর বয়সী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি আদালতে গিয়ে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে জাতিগত নিধনসংক্রান্ত অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন। ওই সময় তিনি মিয়ানমার সরকারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী ছিলেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সেনা অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। বর্তমানে সু চি সেনাবাহিনীর নির্দেশে আটক রয়েছেন। ২০২১ সালের ওই সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা মিয়ানমারকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের প্রেসিডেন্ট তুন খিন বলেন, কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আসা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হচ্ছে।
তুন খিন আরও বলেন, ‘এটি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দীর্ঘ পথে বড় এক অগ্রগতি।’
তুন খিন আঞ্চলিক রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের চেয়ারপারসন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
২০২০ সালে আইসিজে মিয়ানমারের ওপর জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী পদক্ষেপ জারি করেছিল। এর আওতায় রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনমূলক সহিংসতা রোধ ও অতীতের অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে মিয়ানমার সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সেনাবাহিনী এখনো নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক গবেষক শায়না বাউচনার বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর উচিত ‘নৃশংস নির্যাতন ও দমনমূলক অব্যবস্থাপনার চক্র’ শেষ করা। তাঁর মতে, দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের জান্তাকে আইসিজে-নির্ধারিত অস্থায়ী ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে আইনগত বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য করা।
আইসিজেতে করা মামলাটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করা হবে, মিয়ানমার জাতিগত নিধন (জেনোসাইড) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘন করেছে কি না।
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অপরাধের তদন্ত শুরু করেছিলেন। ২০২৪ সালে আইসিসির কৌঁসুলি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান মিন অং হ্লাইং–এর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়ে আবেদন করেন।
লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক অ্যান্টোনিয়া মালভি বলেন, ‘আমরা যখন সশস্ত্র সংঘাত, ন্যায়বিচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখছি, তখন ২০২৬ সালের শুরুতেই এমন একটি মামলায় বিচারকাজ শুরু হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না।’
মালভি বলেন, ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে মামলার রায় আসতে পারে। তিনি আরও মনে করেন, যদি মিয়ানমারে বর্তমান পরিস্থিতিতে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না হয়, তবু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে থেকে যাবে।
![]() |
| মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর বিমান হামলার পর আগুন ধরে যাওয়া একটি বাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি |
Saturday, January 17, 2026
দম্পতির শোবার ঘরের ঝগড়া গড়াল আদালতে
দুবাইয়ের সংবাদপত্র আমিরাত আল ইউম–এর খবর অনুযায়ী, ঘটনার মূল দুই চরিত্রের একজন ইউরোপীয় স্ত্রী ও অন্যজন তাঁর আরব স্বামী। ঘটনার দিন সকালে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে শয়নকক্ষে ঢোকেন। সে সময় স্বামী ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। শব্দে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বিরক্ত স্বামী স্ত্রীকে বাচ্চাদের নিয়ে কক্ষটি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন।
কিছুক্ষণ পর স্ত্রী তাঁর পোশাক পরিবর্তন করতে আবারও শোবার ঘরে ঢোকেন। স্বামী আবার বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং দুজনের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। ঝগড়া থেকে হাতাহাতি-মারামারি। এরপর পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আদালতে উপস্থিত হন দুজনই। ফলে শোবার ঘরের বিবাদ আদালতে ফৌজদারি মামলায় গড়ায়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দুজন দুই রকম বয়ান দেন। স্বামীর দাবি, স্ত্রী তাঁকে একটি বেল্ট দিয়ে আঘাত করলে এই বিবাদের শুরু। তিনি আরও দাবি করেন, এরপর স্ত্রী নিজে নিজে মাটিতে পড়ে যান এবং চিৎকার করে আহত হওয়ার অভিনয় করতে থাকেন।
অন্যদিকে স্ত্রী তদন্তকারীদের বলেছেন, তাঁর স্বামীই তাঁকে আক্রমণ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঝগড়ার সময় তিনি ভীষণ আতঙ্কিত এবং নিজের ও সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং পারিবারিক পরিবেশ বিবেচনা করে আদালত স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই দোষী সাব্যস্ত করেন। দুজনকেই করেন সমান ২ হাজার দিরহাম জরিমানা। রায়ে বলা হয়, বাড়ির ভেতরে শুরু হওয়ায় পারিবারিক বিবাদ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাড়ির বাইরে চলে যাওয়াকে আটকানো জরুরি। আদালত পরামর্শ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে পরিবারের মধ্যে সহনশীলতা ও আলোচনার পরিবেশ বাড়ানো প্রয়োজন।
| প্রতীকী ছবি |
Thursday, January 15, 2026
পূর্ণাঙ্গ রায়: হাসিনা–মাকসুদ কথোপকথনের ব্যাখ্যা নিয়ে কিছু প্রশ্ন by ডেভিড বার্গম্যান
সেই নিবন্ধে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের মধ্যে হওয়া একটি আড়ি পাতা কথোপকথন নিয়ে আলোচনা করা হয়।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আদালতে যে রায়ের অংশবিশেষ পড়ে শোনানো হয়, তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে-ট্রাইব্যুনাল ওই কথোপকথনকে এমন একটি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যার মাধ্যমে তাঁরা মনে করেছেন, ওই দিনই শেখ হাসিনা ‘হত্যার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা প্রথম অভিযোগের ক্ষেত্রে এই অডিও রেকর্ডিংটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই অভিযোগেই তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগটি ১৪ থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যকার ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত।
এই সময়পর্বে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করার নির্দেশ’ শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ যে প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, তার মধ্যে এই কথোপকথনই একমাত্র সরাসরি প্রমাণ।
আগের লেখায় আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, ১৪ জুলাইয়ের ওই কথোপকথন ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। তবে লেখার শেষে আমি এটাও বলেছিলাম—‘পরিপূর্ণ রায় পাওয়ার পর বোঝা সম্ভব হবে সেখানে ১৪ জুলাইয়ের ফোনালাপ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের যে ভাষ্য এখন পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত আইনি যুক্তি ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে কি না।’
এখন চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হয়েছে, ফলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। তা হলো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে যে মোট দণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এই একটি অডিও কথোপকথনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই।
এমনকি যদি প্রথম অভিযোগটি বাতিলও হয়ে যায়, তাহলেও দুটি অভিযোগে থাকে যাতে তিনি যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
এই দুই অভিযোগের প্রমানের জন্য হাসিনা ও মাকসুদ কামালের মধ্যকার ফোনালাপের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করার প্রয়োজন নেই।
তবু এই অডিও রেকর্ডিংটি ট্রাইব্যুনাল যেভাবে ব্যাবহার করেছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিচারকেরা তাঁদের সামনে পেশ করা প্রমাণগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করার সক্ষমতা ও মানসিকতা কতটা রাখেন, তা এর মাধ্যমে বোঝা যায়।
একই সঙ্গে প্রমাণ যদি শেখ হাসিনার (বা অন্য কোনো আওয়ামী লীগ নেতার) পক্ষে যায়, সে ক্ষেত্রে বিচারকেরা কি আদৌ তাঁদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত দিতে প্রস্তুত আছেন কি না, সেটিও এর মাধ্যমে বোঝা যায়।
অন্যভাবে বললে, বিষয়টি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, এই ট্রাইব্যুনাল সত্যিই কি একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছেন, নাকি এটি মূলত রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও জনমতের চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একটি “সিলমোহর মারা” প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে; ঠিক যেমনটি ভিন্ন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার আগের ট্রাইব্যুনালগুলোর বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যেত।
মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথন: অভিযোগসমূহ
মাকসুদ ও শেখ হাসিনার মধ্যকার কথোপকথনের বিষয়টি তিনটি অভিযোগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিটি অভিযোগে বিষয়টি ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
কথোপকথনের একটি অংশ উদ্ধৃত করার পর প্রথম অভিযোগে (রায়ের ৩৫ নম্বর পৃষ্ঠায়) বলা হয়—‘এভাবে শেখ হাসিনা ওই কথোপকথনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন যে তিনি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
এরপর ওই অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি আলাদা কাউন্ট বা অপরাধ উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে দুটি অপরাধ পুরোপুরি এই কথোপকথনের এমন ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে।
একটি অপরাধ হলো—‘আন্দোলনকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া’; অন্যটি হলো-‘তাঁর নির্দেশ অনুসারেই আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়েছে’।
দ্বিতীয় অভিযোগেও আড়ি পাতা ওই কথোপকথনের একই অংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে লক্ষণীয় হলো, কথোপকথনটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে-‘এটি স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা আগেভাগেই আন্দোলনকারীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল) এবং একই সঙ্গে ইংল্যান্ডে এ ধরনের আন্দোলনের সময় যেভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তেমনভাবেই তাঁদের হত্যা করার নির্দেশও দিয়েছেন।’
আর তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে-এই কথোপকথনে শেখ হাসিনা ‘উল্লেখ করেছেন, তিনি আগেভাগেই আন্দোলনকারীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল)।’
এখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, তৃতীয় অভিযোগে ‘হত্যার নির্দেশ’ দেওয়ার কোনো কথা উল্লেখ করা হয়নি।
ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত
তাহলে এই কথোপকথন নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত কী ছিল?
৪৫০ পৃষ্ঠার রায়ের পুরো নথিতে ট্রাইব্যুনাল এই রেকর্ডিংটির অর্থ বা ব্যাখ্যা নিয়ে আলাদা কোনো বিশ্লেষণ দেননি। বরং দুটি জায়গায় ট্রাইব্যুনাল সরাসরি সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন।
রায়ের ৩৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনে অভিযুক্ত শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, তিনি ইতিমধ্যেই শিক্ষার্থীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যুক্তরাজ্যে যেভাবে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হচ্ছে, সেভাবেই তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
বাস্তবে এটি দ্বিতীয় অভিযোগে ব্যবহৃত ভাষারই প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তি। আর রায়ের ৪৫২ নম্বর পৃষ্ঠায় ওই কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে—‘এটি একেবারেই স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথনের ‘আসল’ অর্থ
কিন্তু এই রেকর্ডিংগুলো কি সত্যিই এমন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে?
ট্রাইব্যুনাল মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথনের দুটি আলাদা অংশ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
কিন্তু রায়ে এই কথোপকথন নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ না থাকায়, কোন অংশটিকে প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন, সেটি স্পষ্ট নয়।
দুটি অংশ মিলিয়েই ট্রাইব্যুনাল এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন কি না, তা-ও এখানে পরিষ্কার নয়।
এ কারণে এখন আমরা কথোপকথনের প্রতিটি অংশ আলাদা করে পর্যালোচনা করব।
কথোপকথনের প্রথম অংশে শেখ হাসিনার জবানিতে বলা হয়েছে, ‘রাজাকার তো ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও তাই করব। একটাও ছাড়ব না, আমি বলে দিছি।’
তবে শেষের অংশের বাক্যটি-‘আমি বলে দিছি’-বিভিন্ন অর্থ বহন করে এবং একাধিকভাবে এর অনুবাদ করা সম্ভব। এটি হতে পারে-‘আমি তাদেরকে বলেছি’; ‘আমি আগেই বলেছি’ বা ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি।’
এই বাক্যটি ব্যবহার করে হাসিনা ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে; এটি চূড়ান্ত রায়ে স্পষ্টও হয়ে ওঠে। অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা করার সময় এবং ট্রাইব্যুনালের নিজেদের সিদ্ধান্তে (যেমন ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে) এই বাক্যটি ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে।
আবার রায়ে কথোপকথনের পূর্ণ অনূদিত ট্রান্সক্রিপ্ট বা প্রতিলিপিতে সেই একই বাক্যটিকে ‘আমি তোমাকে বলেছি’ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। রায় কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কেন এক প্রসঙ্গে এক অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে এবং অন্য প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থে নেওয়া হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যদি ট্রাইব্যুনাল কথোপকথনের সরাসরি প্রসঙ্গ, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি ভালোভাবে দেখতেন বা বিবেচনা করতেন, তাহলে তাঁর পক্ষে এটি যৌক্তিকভাবে বা যুক্তিসংগতভাবে বলা কঠিন হতো যে ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি’ বাক্যটি দিয়ে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করার নির্দেশ’ দিয়েছেন।
প্রথমত, কথোপকথনের মধ্যে আসা ‘নির্দেশ’ শব্দটি মূলত রাজাকারদের ফাঁসির উদাহরণ প্রসঙ্গে এসেছে।
এখানে হাসিনা যা বলছিলেন, সেটি ছিল অতীতের ঘটনা-যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর যেসব নেতার কথা তিনি উল্লেখ করছিলেন, তাঁদের আটক, গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ, এটি কোনো স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি যাতে মনে হয়, হাসিনা আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করার, বিচার করার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা বা নির্দেশ দিয়েছিলেন কিংবা সরকারের মধ্যে এমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, যদি ধরেও নেওয়া হয়, ট্রাইব্যুনাল বিশ্বাস করেছিলেন যে, হাসিনা রূপকভাবে কথাটি বলছিলেন এবং তাঁর ‘রাজাকারদের ফাঁসি’ উল্লেখ করা মানে ছিল ছাত্র আন্দোলনকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া (যেমনটা বিচারকেরা মনে করছেন)।
তারপরও এমন ব্যাখ্যার কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অর্থাৎ, কথোপকথনের বাস্তব অর্থ বা তার প্রভাব দেখার মতো এমন কোনো তথ্য বা নথি নেই, যা বলে হাসিনা আসলেই আন্দোলনকারীদের হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন।
যদি সত্যিই এমন কোনো আদেশ দেওয়া হয়ে থাকে, তা কার কাছে পৌঁছেছিল? রাষ্ট্রপক্ষ কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি যে ১৪ জুলাইয়ের কথোপকথনের আগে বা ঠিক এই কথোপকথনের পরই কাউকে এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবে অন্তত পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) তা জানানো হতো; কিন্তু আইজিপির স্বীকারোক্তি বা ট্রাইব্যুনালের সামনে তাঁর দেওয়া সাক্ষ্য এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না।
তৃতীয়ত, ১৪ জুলাই হাসিনা ‘হত্যার নির্দেশ’ দিয়েছেন-এই ধারণা রাষ্ট্রপক্ষের পেশ করা প্রমাণের সঙ্গে মিলছে না এবং তা হয়তো কিছুটা বিরোধপূর্ণও। কারণ, ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের প্রমান গ্রহন করেছেন যে, ১৮ জুলাই হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
১৮ জুলাইয়ের এই আদেশের প্রমাণ একটি স্পষ্ট আড়ি পাতা কথোপকথন এবং আইজিপির সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত। তাহলে কি রাষ্ট্রপক্ষ এবং ট্রাইব্যুনালের দাবি অনুযায়ী হাসিনা একই আদেশ দুবার দিয়েছেন?
চতুর্থত, পরের দিনগুলোয় যা ঘটেছে, তা দেখায়, ১৪ জুলাই ‘হত্যার আদেশ’ দেওয়া হয়েছিল-এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
কারণ যদি ১৪ জুলাই আসলেই এমন আদেশ দেওয়া হতো, তাহলে তার পরের দিন ১৫ জুলাই স্বাভাবিকভাবেই কোনো না কোনো হত্যার ঘটনা প্রত্যাশিত হতো। কিন্তু ১৫ জুলাই কোনো হত্যার ঘটনা ঘটেনি। তবে ১৬ জুলাই পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
এর মধ্যে একটি ঘটেছে রংপুরে, দুটি ঘটেছে ঢাকায় এবং তিনটি ঘটেছে চট্টগ্রামে। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথবা আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বলা হলেও এগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমন্বিত হত্যার নীতি নয়, বরং বিক্ষিপ্ত গুলির ঘটনা হিসেবে বোঝানো অনেক বেশি যৌক্তিক।
দ্বিতীয় অংশ
তবে সম্ভবত ট্রাইব্যুনাল কথোপকথনের দ্বিতীয় অংশটিকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে।
দ্বিতীয় অংশটি হলো: ‘সব এইগুলাকে বাইর করে দিতে হবে...আমি বলে দিচ্ছি আজকে সহ্য করার পর অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেয়ার নেবে...কারণ ইংল্যান্ডে এ রকম ছাত্ররাজনীতির জন্য মাঠে নামল, কতগুলি মেরে ফেলায় দিল না?’
কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এই কথাগুলোকে অনুবাদ করেছেন এভাবে: (“They all have to be ousted. I already ordered to arrest them after waiting this day to take appropriate action as same as that that of England where protesting students were killed. ”) ‘তাদের সবাইকে অপসারণ করতে হবে। আজ পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমি ইতিমধ্যেই তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছি এবং ইংল্যান্ডে যেভাবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
এই অনুবাদের মাধ্যমে এমন একটি ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে তিনি শুধু শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশই দেননি, বরং ইংল্যান্ডে যা ঘটেছিল, (যেখানে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়েছিল বলে বলা হয়ে থাকে), সেই রকম ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দিয়েছেন।
এ কথাগুলোর অর্থ ট্রাইব্যুনাল যেভাবে অনুবাদ করেছে তাতে ভাষার পরিপূর্ণ চিত্র আসেনি। আর এই বক্তব্য থেকে প্রমান মেলে যে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন-এমন ব্যাখ্যা করা কঠিন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এভাবেই দেখেছেন কথোপকথনের এই অংশকে।
এই বাক্যের একটি অংশ অবশ্যই স্পষ্ট। হাসিনা যখন বলেন, ‘আমি নির্দেশ দিচ্ছি’, তখন তিনি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশের কথাই বলছেন। এবং বাস্তবে সেটিই কয়েকদিনের মধ্যে ঘটেছিল। তিনি এ কথা বলছিলেন সরাসরি সেই ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখেন।
তবে এই বাক্যে হাসিনা যা কিছুই বলেছেন, তার মধ্যে “...আজকে সহ্য করার পরে অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে” কথগুলো আছে।
যেখানে ‘যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে’ বলতে হত্যার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; কিন্তু তারপরও এটি মোটেও পরিষ্কার করে না, তিনি ১৪ জুলাই বা ঠিক তার পরপরই এ ধরনের নির্দিষ্ট ‘হত্যার আদেশ’ দিয়েছিলেন।
এর পাশাপাশি কথোপকথনের প্রথম অংশের প্রসঙ্গে ওপরে যেভাবে বলা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, এ ধরনের কোনো আদেশ আদৌ দেওয়া হয়েছিল, এমন দাবি না কথোপকথনের পটভূমি সমর্থন করে, না এটি রাষ্ট্রপক্ষের নিজস্ব প্রমাণ।
কথোপকথনের এই অংশে হাসিনা যা বলছেন, সেটিকে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে হত্যা করার আদেশ হিসেবে না দেখে বরং তাঁর চিন্তার ধারাবাহিকতা হিসেবে বোঝাই বেশি যুক্তিসংগত হবে। অর্থাৎ, তিনি তখন কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন-সে বিষয়ে ভাবছিলেন এবং সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছিলেন।
এই চিন্তাভাবনার ধারাই শেষ পর্যন্ত ১৮ জুলাইয়ের একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে গিয়ে শেষ হয়-যেদিন তিনি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার অনুমোদন দেন।
এই ১৮ জুলাইয়ের আদেশটি নিয়ে পর্যাপ্ত ও শক্ত প্রমাণ রয়েছে (আড়ি পাতা কথোপকথন, সাক্ষ্য ইত্যাদি)।
উপসংহার
রায়ে হাসিনা-মাকসুদ কথোপকথন নিয়ে কোনো বিশদ আলোচনা নেই। ফলে ট্রাইব্যুনাল কীভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল কিংবা উল্লিখিত বিষয়গুলো তাঁরা আদৌ বিবেচনা করেছেন কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই।
সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যকে পুরোপুরি ও প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করেছেন।
যেহেতু কথোপকথনটি প্রথম অভিযোগের জন্য মূল ও কেন্দ্রীয় প্রমাণ এবং যেহেতু এর ব্যাখ্যা ট্রাইব্যুনাল যে অর্থে নিয়েছে তার থেকে ভিন্ন ও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যাও সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বিচারকদের সিদ্ধান্তের যুক্তি ব্যাখ্যা না করাটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
* ডেভিড বার্গম্যান, সাংবাদিক।
- ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david. bergman.77377
- ইংরেজি থেকে অনূদিত।
- মতামত লেখকের নিজস্ব।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...













