Tuesday, January 16, 2018

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার দাবি

দেরিতে হলেও তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে মজুরি বোর্ড গঠন করায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। তবে প্রতিবারের মতো এবারও মজুরি বোর্ডে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধি নিশ্চিতের দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইউনিয়নের নেতারা।আজ সোমবার গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার এক বিবৃতিতে বলেন, প্রতিবার ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে সরকারদলীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের মনোনীত করা হয়। তাঁরা কখনোই শ্রমিক স্বার্থের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না। ফলে মালিকপক্ষের চরম আধিপত্য হয় মজুরি বোর্ডের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য। এবারও মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের একক আধিপত্বের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নেতারা।  মজুরি বোর্ডে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধি না থাকায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ মজুরি না পাওয়ায় পোশাকশ্রমিকেরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার দাবিতে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র দুই বছরের অধিক সময় ধরে আন্দোলন করে আসছে। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নেতারা মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম দ্রুত শেষ করা এবং পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিম্নতম মূল মজুরি ১০ হাজার টাকা এবং মোট মজুরি ১৬ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানান। এই দাবিতে ২৬ জানুয়ারি বেলা তিনটায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সংহতি সমাবেশ ডেকেছে।

বুধবার শুরু হচ্ছে বিডিএফ সভা

আগামী বুধবার থেকে ঢাকায় বসছে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরাম বা বিডিএফ সভা। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিডিএফ সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভার উদ্বোধন করবেন। দুই দিনব্যাপী এই সভার বিভিন্ন অধিবেশনে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ, দাতা দেশ ও সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। এবারের সভায় দাতাদের কাছে বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরা হবে। আজ সোমবার বিডিএফ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি মিলনায়তনে এই সংবাদ সম্মেলন হয়। এতে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুই দিনের বিডিএফ বৈঠকে মোট আটটি বিষয়ে আটটি কর্ম অধিবেশন হবে। বিষয়গুলো হলো কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমানো; বিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে পরিবেশ সৃষ্টি; বৈষম্য দূর ও সবার জন্য স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করা; দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি; নারীর ক্ষমতা বৃদ্ধি ও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ; স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ; টেকসই উন্নয়নে নগর-সুবিধা উন্নয়ন এবং এসডিজির অর্থায়ন। এসব বিষয়ের ওপর আলোচনা শেষে সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হবে। এবারের অতিথিদের তালিকায় আছেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেট ডিক্সন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েন চাই ঝ্যাং, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমহাপরিচালক মিনরু মাসুঝিমা। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে সর্বশেষ বিডিএফ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, এসডিজি অর্জনে আমরা বিনিয়োগের ওপর জোর দিচ্ছি। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদাই বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসবে। এখনো বিদেশি বিনিয়োগপ্রবাহ যথেষ্ট ভালো। অর্থমন্ত্রীর মতে, এসডিজি অর্জনে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার পাওয়া যাবে না। কম পাওয়া যাবে এটা ধরেই কাজ করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ঢাকা-সিলেট চার লেনের সড়ক নিজস্ব অর্থায়নেই হবে। এটি চীনের অর্থে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো কারণে তা হয়নি। চীনের প্রেসিডেন্টের সফলকালে সমঝোতা চুক্তি হওয়া ২২ বিলিয়ন ডলারের সাহায্যে ২৬ প্রকল্প হওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত চারটি প্রকল্পের ঋণচুক্তি হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ইআরডি সচিব কাজী সফিকুল আযম, অতিরিক্ত সচিব মনোয়ার আহমেদ প্রমুখ।

১০৮ টাকা কেজিতে গরুর মাংস আমদানি

দেশে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি হয়। আমদানিতে এসব মাংসের কেজিপ্রতি দাম দেখানো হয় ১০৮ থেকে ২২৫ টাকা। এই দর বাংলাদেশের বাজারের চেয়ে অনেক কম। ঢাকার বাজারে এখন গরুর মাংসের কেজিপ্রতি দাম ৪৮০ টাকার মতো। হিমায়িত গরুর মাংস আমদানির এ তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের (বিটিসি) এক প্রতিবেদনে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গরুর মাংস আমদানির বিষয়ে মতামত চেয়ে ট্যারিফ কমিশনের কাছে একটি প্রতিবেদন চেয়েছিল। কমিশন তা তৈরি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ট্যারিফ কমিশন গরুর মাংস আমদানির বিষয়ে সাতটি মতামত বা পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশে গরুর খামার বাড়ছে এবং গরুর মাংসের উৎপাদন এখন চাহিদার চেয়েও বেশি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে দাম কমে যাবে। ভারত থেকে হিমায়িত মাংস আমদানি বাড়লে বরং খামারিদের ক্ষতি হতে পারে। দেশের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ভারত থেকে হিমায়িত মাংস আমদানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চেয়েছে। গত জুলাই মাসে ভারতের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে মাংস রপ্তানির প্রস্তাব দেয়। ২৮ নভেম্বর এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়। এরপর ওই সভায় এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মতামত চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ট্যারিফ কমিশন এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে শিক্ষিত বেকার যুবকেরা গরু পালন ও গরু মোটাতাজাকরণ কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গরু কেনা, গরু লালন-পালন, গরুর সংকরায়ণ, দুগ্ধজাতীয় খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন ও বিপণন খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে। দেশে সরকারি ও বেসরকারি গবাদিপশু পালনে ব্যাপক বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে গরুর মাংসের দাম কমে যাবে বলে অনুমিত হয়। কমিশন বলছে, হিমায়িত মাংস আমদানি বাড়লে এসব খামারির ক্ষতি হবে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণ আদায় কঠিন হবে। চার বন্ধুর উদ্যোগে দেড় বছর আগে ঢাকার উত্তরখানে একটি খামার গড়ে তোলা হয়েছে। ওই খামারে এখন ৫০টি গরু আছে, বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার মতো। গরুর মাংস আমদানির বিষয়ে জানতে চাইলে ওই খামারের মালিকদের একজন আরিফুর রহমান খান বলেন, দেশে এখন বহু গরুর খামার গড়ে উঠেছে। মাংস আমদানি হলে এসব খামারের মালিকেরা বিশাল ক্ষতির মুখে পড়বেন। তিনি বলেন, ‘আমরা খামারের জন্য গরু কিনতে গিয়ে দেখেছি, গ্রামের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন খামারিরা উন্নত জাতের গরু পালন করছেন। দেশে খামারের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ঘটে গেছে, তা সমীক্ষা ছাড়া বোঝা যাবে না।’
২০ হাজার কেজি মাংস আমদানি!
কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২০ টন বা ২০ হাজার কেজি গরুর মাংস আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫৫ হাজার কেজি গরুর মাংস আমদানি হয়েছিল। তবে তার আগের, অর্থাৎ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১৮ হাজার কেজি গরুর মাংস। এসব মাংস এসেছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকে হিমায়িত অবস্থায়। দেশে গত বছর বেশি মাংস এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কেজি। আর মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ৪ হাজার ২০০ কেজি। এ ছাড়া ভারত থেকে এসেছে ৯২০ কেজি। বাকিটা আমদানি হয়েছে অন্যান্য দেশ থেকে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিতে গড় দাম পড়েছে কেজিপ্রতি ২২৫ টাকা। মালয়েশিয়া থেকে আমদানিতে মাংসের দাম গড়ে কেজিপ্রতি ১০৮ টাকা ও ভারত থেকে আমদানিতে ১২০ টাকা পড়েছে।
আমদানি নিষিদ্ধ নয়
বাংলাদেশে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি নিষিদ্ধ নয়। আমদানি নীতি আদেশ ২০১৫-১৮ অনুযায়ী, দেশে শূকর ছাড়া অন্যান্য পশুর মাংস আমদানি করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে আমদানি করতে হয়। আমদানির ক্ষেত্রে নানা শর্ত আছে। শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো গরু, ছাগল ও মুরগির মাংস এবং মানুষের খাওয়ার উপযোগী অন্যান্য পশুর মাংস আমদানির ক্ষেত্রে মোড়কের গায়ে রপ্তানিকারক দেশের উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ মুদ্রিত থাকতে হবে। পাশাপাশি পৃথক লেবেল ছাপিয়ে মোড়কের গায়ে লাগানো যাবে না। এ ছাড়া মাংস নানা ধরনের ক্ষতিকর উপাদান, অ্যান্টিবায়োটিক ও রোগমুক্ত বলে সনদ থাকতে হবে। মাংস বন্দরে পরীক্ষা করবে বাংলাদেশি সরকারি সংস্থা। গরুর মাংস আমদানিতে মোট করভার ৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩ শতাংশ।

এফটিএ করতে রাজি বাংলাদেশ ও ভুটান

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে আগ্রহী বাংলাদেশ ও ভুটান। এফটিএ হলে দুই দেশের মধ্যে সব ধরনের পণ্য ও সেবা শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা যাবে। এ ছাড়া স্থলপথে ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি করার জন্য বাংলাদেশের কয়েকটি স্থলবন্দর খুলে দেওয়া হচ্ছে। গত ২১ ও ২২ ডিসেম্বর কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত উভয় দেশের বাণিজ্যসচিব পর্যায়ের সভায় উভয় পক্ষ এফটিএ করার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে একমত হয়। দুই দিনের ওই সভায় বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বাণিজ্যসচিব শুভাশীষ বসু। ভুটানের নেতৃত্ব দেন দেশটির অর্থনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব দাসো ইয়েশি ওয়াংদি। ভুটান বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে ১৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পায়। বাণিজ্যসচিব পর্যায়ের সভায় ভুটানের পক্ষ থেকে চুনাপাথর, বোল্ডারসহ আরও ১৬টি পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভুটান বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্য নয়। ডব্লিউটিওর চেতনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ওই সংস্থাটির সদস্য নয়—এমন কোনো দেশকে পুরোপুরি শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে পারে না। তাই দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে এফটিএ করাটাই দুই দেশের জন্য লাভজনক। বাংলাদেশের এমন প্রস্তাবে ভুটানের প্রতিনিধিরা মত দেন।
তাঁরা জানান, দুই দেশের মধ্যে এফটিএর বিষয়ে ভুটান একটি পর্যালোচনা সমীক্ষা করছে। এফটিএ কিংবা অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি (প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট) সম্পর্কে শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশকে জানানো হবে। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। ওই সভায় অংশ নেওয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রথম সচিব এহতেশামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এফটিএ হলে উভয় দেশই লাভবান হবে। দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। শিগগিরই এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হবে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ওষুধের নতুন বাজার হতে পারে ভুটান। এই দুই দেশের বাণিজ্য এখনো ব্যাপকভাবে ভুটানের অনুকূলে। সর্বশেষ গত অর্থবছরে ভুটান থেকে ৩ কোটি ৩১ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে অন্যতম হলো কমলা, দারুচিনি ও পাথর। গত অর্থবছরে ভুটান থেকে প্রায় ১ কোটি ডলারের কমলা এবং ৯১ লাখ ডলারের দারুচিনি আমদানি করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে গত অর্থবছরে ভুটানে রপ্তানি হয় ৩২ লাখ ডলারের পণ্য। এর মধ্যে ৬ লাখ ডলারের পাউরুটি, বিস্কুট ও কেক আছে। ভুটানের সঙ্গে এফটিএ হলে তা হবে কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম এফটিএ। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা হলেও কোনোটিই সম্ভব হয়নি। যেসব দেশের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা চলছে, এর মধ্যে অন্যতম হলো শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, তুরস্ক। গত বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভুটান সফরকালে ট্রানজিট বিষয়ে সমঝোতা স্মারক হয়। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারে আগ্রহী ভুটান। গত নভেম্বর মাসে দুই দেশের যৌথ কার্যদলের সভায় এটি নিয়ে আলোচনা হয়। এবারের বাণিজ্যসচিব পর্যায়ের সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ট্রানজিটের চুক্তি ও প্রটোকল চূড়ান্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়। তবে ভুটানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ট্রানজিটের বিষয়টি নিয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই ওই কমিটি প্রতিবেদন দেবে, এরপর ভুটান ট্রানজিট আলোচনা শুরু করবে। অন্যদিকে তামাবিল, বাংলাবান্ধা ও নাকুগাঁও স্থলবন্দর ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে ভুটান। বর্তমানে বুড়িমারী, বাংলাবান্ধা ও তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে ভুটানের সঙ্গে আমদানি–রপ্তানির অনুমোদন আছে। শুধু বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়েই পণ্য আনা–নেওয়া হয়। অন্য দুটি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয় না। বাংলাদেশ বলেছে, এসব বন্দরের অবকাঠামো সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভুটান চাইলে ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ। ভুটানের প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, দ্বৈত কর পরিহার চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য ভুটানের সংসদের উচ্চকক্ষ এখনো অনুমোদন দেয়নি।

এজেন্টদের শাস্তি হওয়া ভালো দৃষ্টান্ত by প্রতীক বর্ধন

দেশের আর্থিক খাতে বড় বড় দুর্নীতির খবর বেরোনোর পরও যখন কোনো কূলকিনারা হচ্ছে না, তখন আমরা দেখলাম, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশের সাতজন এজেন্টকে অবৈধভাবে প্রবাসী আয়ের অর্থ লেনদেনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খবরটি নিঃসন্দেহে ভালো। অন্তত এই অর্থে যে দেশে আর্থিক খাতে নিয়মবহির্ভূত কাজ করে পার পাওয়া যায় না। আবার গ্রেপ্তারই সব নয়, শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু ছোট মাছ ধরার সন্তুষ্টিতে আমরা যেন রাঘব বোয়ালদের কথা ভুলে না যাই। তবে অভিযোগ ওঠার পর বিকাশ এ ব্যাপারে রাখঢাক না করে অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তুলে দিয়েছে।  প্রতি মাসেই তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মনিটরিং  প্রতিবেদন দিয়ে থাকে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই এই এজেন্টদের গ্রেপ্তার করা হলো। একই সঙ্গে তারা পত্রিকা ও টেলিভিশনে ক্রমাগত এ নিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে যাচ্ছে। প্রবাসীদের অবৈধ পথে প্রবাসী আয় না পাঠিয়ে বৈধ পথে তা পাঠাতে উৎসাহিত করছে তারা। তবে এটাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা তাকে করে যেতে হবে। যা হোক, মূল বিষয় হলো আর্থিক খাতের সুশাসন। দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এই ঋণ আদায়ে এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের তেমন তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষ মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম এবং কানাডায় বেগমপাড়া বানাচ্ছেন। কিন্তু কারা সেটা করছেন, তাঁদের নাম আমরা জানি না। যে বেসিক ব্যাংকের কেলেঙ্কারি নিয়ে এত কথা, সেই ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে এই সেদিন জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে দুদক। অন্যদিকে ফারমার্স ব্যাংক তো একের পর এক অনিয়মের ভারে ডুবতে বসেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ব্যাংকটির আমানতকারীরা টাকা ফেরত না পাওয়ার আশঙ্কায় আছেন। তাঁরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছেন। অন্যদিকে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) বয়স প্রায় সাত বছর হয়ে এল। ইতিমধ্যে খাতটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দেশে মূলধারার এতগুলো ব্যাংক যেখানে গ্রামে বা সাধারণ মানুষের কাছে যেতে পারেনি, সেখানে অবকাঠামোগত কারণেই এমএফএস অনেক দূর চলে গেছে।
তাদের গ্রাহকের সংখ্যা ছয় কোটির কাছাকাছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে গত নভেম্বর মাসে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে দৈনিক লেনদেন হয়েছে গড়ে ৯১৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। একদিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, অন্যদিকে ডিজিটাল অর্থনীতি—এ দুটি ক্ষেত্রে এমএফএস আমাদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ২০১১ সাল থেকে এমএফএস একটি নীতিমালার ভিত্তিতে চলছে, যা এখন প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের পর্যায়ে আছে। তারপর এটি কি কোনো ব্যাংকের শাখা হিসেবে থাকবে, নাকি স্বতন্ত্র কোম্পানি হবে তার ফয়সালা হয়নি। যদিও দেশে এখন এই দুই ধরনের মডেলের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে এমএফএসের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর খরচ নিয়ে অনেকের আপত্তি আছে। বর্তমানে এমএফএসে ১০০ টাকা পাঠাতে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ খরচ হচ্ছে। কিন্তু মোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ভাড়া বা ইউএসএসডি খরচ বাবদ বিভিন্ন সময়ে যেসব প্রস্তাব পাঠিয়েছে, তার অর্ধেকও যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এমএফএসের লেনদেনের খরচ কমবে তো না-ই, বরং তা আরও বেড়ে যাবে। এতে খাতটির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। খরচ বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষও এই মাধ্যমে লেনদেন করতে আগ্রহী হবে না। অথচ অনেক প্রযুক্তিবিদই মনে করেন, সামান্য একটি নির্ধারিত মূল্যে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো এই সেবা দিতে পারে। কারণ, এতে তাদের বিশেষ খরচ হয় না। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই খরচ আরও কমে আসবে। ইউএসএসডির খরচ নির্ধারণ নিয়ে এ পর্যন্ত বেশ কটি কমিটি গঠিত হলেও একটির সঙ্গে আরেকটির সামঞ্জস্য দেখা যায় না। প্রথমত, ২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিগ্যাপকে এই খরচ নির্ধারণের লক্ষ্যে সমীক্ষার দায়িত্ব দিলেও মোবাইল ফোন সেবাদাতাদের বিরোধিতার কারণে তার পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা যায়। এরপর টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি গঠিত হয়। তারাও সিদ্ধান্ত নেয়, একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমীক্ষা করানো হবে। সেই কমিটিও এখন পর্যন্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে সমীক্ষার দায়িত্ব দিতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাঁরা বলছেন, এমএফএস খাতটি যেন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। ফলে তাঁরা এখন খেই হারিয়ে ফেলছেন। কয়েক মাস আগে ভারতীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বাংলাদেশ সফরের সময় বলেছেন, নগদ লেনদেনে দুর্নীতির সুযোগ বেশি থাকে এবং অপচয় হয়। ফলে উন্নত দেশগুলোর মতো ভারতেও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসার ঘটছে। আমাদের দেশেও সীমিত পরিসরে এটি চালু হয়েছে। অর্থনীতিকে আরও দক্ষ করতে এর বিকল্প নেই। ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন হলে যেহেতু হিসাব রাখা সহজ, সেহেতু এখানে আরও বেশি নজরদারি করা সম্ভব। অবৈধভাবে আসা হুন্ডির গন্তব্যও সে কারণে দ্রুত শনাক্ত করা গেছে। আর কারা সেটা করেছে, তা-ও বের করা গেছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে প্রবাসীদের ঝামেলাহীনভাবে প্রবাসী আয় পাঠানোর ওপর জোর দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বৈধভাবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যায়। এ প্রসঙ্গেই শেষ কথায় আসি, গত বছর প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার অভিযোগে এমএফএসের লেনদেনের সীমা কমিয়ে দেওয়ার কারণে এই খাতের প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। তাই এই খাত নিয়ে সুদূরপ্রসারী ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা এটা যত তাড়াতাড়ি বুঝব, ততই আমাদের মঙ্গল।
প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক ও অনুবাদক।
bardhanprotik@gmail.com

উন্নয়নের মানে কি করাতকল? by ফারুক ওয়াসিফ

কন্যার নানির একদিন ইচ্ছা হলো, বাড়ির সামনের ছোট চত্বরটার উন্নয়ন করবেন। তো হুকুম হলো, বুড়ো ডুমুরগাছটা কাটো। সবুজ ও খয়েরি মার্বেলের মতো ডুমুরে উঠানটা ভরে থাকে, পরিষ্কার করায় ঝামেলা। মেয়ের মা মৃদু আপত্তি করায় ধমক খেয়ে ফিরে এসেছেন, মায়ের ছোট ভাই যে মামা, সে-ও গাছটার পক্ষে ওকালতি করে ধরা। উজানিয়ার নানি জাঁদরেল মহিলা; তাঁর সঙ্গে তর্ক করা আর পাথরে মাথা ঠোকা সমান। কিন্তু পাঁচ বছরের মেয়েটি অতশত বোঝে না। ডুমুরগাছটা ওর প্রিয়। বেঁটেখাটো গাছটায় ওঠানামা তার প্রিয় খেলা। গাছ কাটার খবর শুনে সে সোজা নানির সামনে হাজির।
তো সে গিয়ে নানিকে বলে, ‘আনু, তুমি নাকি ডুমুরগাছ কাটতে বলছ?’
নানির টিভির দিকে মনোযোগ। সেদিকে তাকিয়েই বললেন, ‘হ, কাটা লাগবে।’
: কেন কাটা লাগবে?
: বুড়া হয়ে গেইছে, কাইটে ফেলতে হবে। নাতনি ঝামটি দিয়ে উত্তর দেয়, ‘তুমিও তো বুড়া হয়ে গেছ, তোমারেও কি কাটা লাগবে?’ কথা শুনে নানি লাজওয়াব। ডুমুরগাছটা সে যাত্রায় রক্ষা পেল। বয়স হয়ে গেলেই অথবা অবলা প্রাণ হলেই তাকে কাটা যায় না; এটা শিশুরাই বোঝে শুধু। কারণ তাদের স্বার্থবোধ কম।
দুই. যশোর রোডের উন্নয়ন হবে। দুই লেন থেকে চার লেন হবে। এ জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে দুপাশের গাছগুলো কাটতে হবে। গাছগুলো কালের সাক্ষী। শতাব্দীরও বেশি বছর ধরে তারা যুদ্ধ, মহামারি, দেশভাগ, ঝড় ও মানুষের দস্যুতা সহ্য করে টিকে আছে। রাস্তাটি সম্রাট শের শাহের আমলে বানানো গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের সঙ্গে মিশেছে। মানুষের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ দেশান্তরের অন্যতম পথ ছিল এটি। মুক্তিযুদ্ধের কোটি শরণার্থীর অনেকেই এই পথে দেশান্তরি হয়েছিল। অনেকের মৃত্যুও হয়েছিল সেই দুঃসহ যাত্রায়। তাদের কবর ও দাহও সম্ভবত এসব গাছের নিচে ও আশপাশেই হয়েছিল। আবার এসব গাছের নিচেই প্রসবশয্যা নিয়েছিলেন অনেক মা। স্বাধীনতার পর এ পথেই আবার তারা ফিরেও এসেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সেই মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি ও এক্সোডাস অভিভূত করেছিল মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গকে। অন্নহারা আশ্রয়হারা ‘দুইটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষছায়/নীরব চোখে আমায় শুধু দেখেই যায়’—লিখেছিলেন তিনি। কত কালজয়ী ঘটনার সাক্ষী এসব গাছ। উন্নয়নঅলারা কি কালের সাক্ষীকে ভয় পান? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও তো ৪৭ বছরে পা দিল। বুড়ো গাছের মতো তাকেও কি উন্নয়নের ঝকমকিতে কেটেকুটে নতুন বানাবেন তাঁরা? একটি-দুটি নয়, ২ হাজার ৩০০ গাছের মামলা। আর গাছ কি কেবলই গাছ? যশোরের সাবেক জমিদার কালি পোদ্দার তাঁর মায়ের গঙ্গাযাত্রাকে ছায়াঘেরা করতে তিন শতাধিক মেঘ শিরীষগাছ লাগিয়েছিলেন। সেই গাছগুলো প্রায় পৌনে দুই শ বছরের সাক্ষী। অথচ সহজেই গাছগুলোকে অক্ষত রেখে দুপাশে মহাসড়ক তৈরি হতে পারে। পশ্চিম বাংলায়ও তো যশোর রোড গেছে। সীমান্তের পেট্রাপোল থেকে বনগাঁ পর্যন্ত অনেক জায়গায় সেভাবেই সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে (ছবিতে দেখুন)।
এই সড়কটি ভারত-বাংলাদেশ সড়ক ট্রানজিটের অংশ। তাই এর সম্প্রসারণ করার প্রকল্প সরকারের একটা বাধ্যবাধকতা। তারই অংশ হিসেবে গত বছর ভারতীয় অংশের গাছ কাটা শুরু হয়। কিন্তু স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং সুপ্রিম কোর্টে মামলার জেরে গাছ কাটা বন্ধ হয়। বাংলাদেশেও সরকারিভাবে গাছ না কাটারই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ২০১৭ সালের ২১ জুলাই প্রকাশিত প্রথম আলোর খবর বলছে, ‘কোনো গাছ না কেটে পুনর্নির্মাণ করা হবে যশোর-বেনাপোল জাতীয় মহাসড়ক। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগকে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী মহাসড়কটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এর আগে মহাসড়কটির দুই পাশের বিভিন্ন প্রজাতির ২ হাজার ৩১২টি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’ সওজ বিভাগ খুলনা জোনের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রকৌশলী মো. রুহুল আমীন তখন বলেছিলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় ১৩ জুলাই গাছগুলো রেখে মহাসড়কটি পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। সে অনুযায়ী ডিপিপি সংশোধনের কাজ চলছে। গাছ না কেটেই মহাসড়কটি পুনর্নির্মাণ করা হবে।’ তাহলে ৬ জানুয়ারি উল্টো সিদ্ধান্ত কীভাবে নিল যশোর জেলা প্রশাসন? বৈঠকটির নামও মশকরামূলক। বৈঠকের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক যথাযথ মানের ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় রাস্তার দুই পার্শ্বে গাছসমূহ অপসারণের বিষয়ে’। সভায় উপস্থিত প্রশাসক, প্রকৌশলী, জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদ সবাই ‘জনস্বার্থে গাছ কাটা’ বিষয়ে একমত হন। কাষ্ঠব্যবসায়ী বৃক্ষ দেখলে প্রাণ ভাবে না, প্রকৃতি দেখে না, দেখে শুধু কাঠ। কাঠ মানে টাকা, টাকা মানে উন্নয়ন। প্রাণ মানে কী, তা কি তাঁরা জানেন?
কদিন আগেই অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলতে বাধ্য হয়েছেন, প্রকৃতিবিরোধী উন্নয়ন করে আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানিনিষ্কাশন–ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছি। সঙ্গে এটাও বলা দরকার, এক আশ্চর্য শ্যামল বনভূমিময় দেশকে আমরা করাতকল বানিয়ে ছাড়ছি। উন্নয়ন মানে কি করাতকল? উন্নয়ন মানে কি পরশুরামের কুঠার? এটাই এখন চলছে বাংলাদেশে। যাবতীয় গণবিরোধী কার্যকলাপের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনস্বার্থ’। নদী-বিল-হাওর-বন ধ্বংস করাকে বলা হচ্ছে উন্নয়ন। সুন্দরবনের বুক ঘেঁষে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোকে বলা হচ্ছে উন্নয়ন। পাহাড় কাটা, বন কাটাও উন্নয়ন। আমরা বলছি না কোথাও হাত দেওয়া যাবে না। আমরা বলছি উত্তম বিকল্পের কথা। বেশি লাভের পথের বদলে আমরা বেশি খরচে বেশি ক্ষতির রাস্তা কেন নিচ্ছি? পদ্মা সেতুর বিকল্প নেই, কিন্তু যশোর রোডের গাছগুলো কাটার বিকল্প আছে। দুর্নীতি ও ভুলের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৭ গুণ পর্যন্ত খরচ করায় অসুবিধা হয় না, কিন্তু গাছগুলোকে মাঝখানে রেখে দুপাশে সড়ক বানাতে কেন অসুবিধা! যশোর রোড দেশের সুন্দরতম সড়ক-নিসর্গের একটি। কড়া রোদের দিনে এই সড়কে ঘন মেঘের মতো ছায়া জমে। ঝুম বৃষ্টির দিনে এর তলায় কোনো পাতা কুড়ানো কিশোরী কিংবা রাখাল কিশোরের আশ্রয় নেওয়ার দৃশ্য শ্রেষ্ঠতম চিত্রকলা হয়ে যায়। বিকেলের সোনালি আলোয় বৃক্ষচূড়ায় সোনালি গম্বুজের ঐশী আভা কারও মনে অলৌকিক অনুভূতির জন্ম দিতে পারে। শীতের কুয়াশা ঘিরে এলে মনে হয় যেন কোনো শুভ্র সুড়ঙ্গ দিয়ে স্বর্গের দিকে চলেছি। পৃথিবীর কোনো ওয়ান্ডারল্যান্ড বা বিনোদনপুরী এমন সুন্দর ফিরিয়ে দিতে পারবে?
ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

শ্রেষ্ঠ উপহার গাছের চারা by রোকেয়া রহমান

দাওয়াত খেয়ে একে একে অতিথিরা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করছেন আর তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে গাছের চারা। গত বছরের শেষ দিনে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকায় একটি বউভাতের অনুষ্ঠানে এমন মনোরম দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বয়ং বর-কনে অতিথিদের হাতে এ উপহার তুলে দেন। কাউকে একটি, কাউকে একাধিক চারা উপহার দেওয়া হয়। সত্যিই, কী সুন্দর একটি উদ্যোগ! ২ জানুয়ারি প্রথম আলোয় মন ভালো করা এই খবর ছাপা হয়। খবরে বলা হয়, বউভাতের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন সিলেটের পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ভূমিসন্তান বাংলাদেশ’-এর কর্মীরা। তাঁরাই উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন ৫০০ ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা। পরে ওই পরিবেশবাদী সংগঠনের কর্মীদের সম্মতিতেই বিয়ের আয়োজনে আসা অতিথিদের গাছগুলো ফিরতি উপহার হিসেবে তুলে দেন নবদম্পতি। খবরটি পড়ে প্রচণ্ড উদ্দীপিত হই। প্রায় প্রতি মাসেই আমার কোনো না কোনো দাওয়াত থাকে। হয় কারও জন্মদিন, কারও বিয়ে বা কারও বিবাহবার্ষিকী। উপহার হিসেবে কত কীই-না দিই তাঁদের। বিছানার চাদর, কাচের বাসনকোসন, কাপ সেট, গ্লাস সেট, ঘনিষ্ঠজন হলে সোনার দুল, আংটি আরও কত-কী। কিন্তু উপহার হিসেবে গাছের চারা দেওয়ার কথা তো কখনো ভাবনায় আসেনি! এখন তো আমার মনে হচ্ছে, এর চেয়ে ভালো উপহার আর কিছুই হতে পারে না। কেন গাছের চারাকে শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে মনে হচ্ছে, তার কারণ এখানে ব্যাখ্যা করছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ও সুষম জলবায়ুর প্রয়োজনে একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে গত পাঁচ দশকে বন ও বনভূমির পরিমাণ কমে ৭ থেকে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে সরকারি হিসাবে বনভূমির পরিমাণ ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ। কিন্তু এটাও তো অনেক কম। বনভূমি কমে যাওয়ার জন্য প্রকৃতি যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী আমরা। নিজেদের প্রয়োজনে নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলছি। কৃষিজমি লাগবে, সাফ করে ফেল জঙ্গল। বাড়িঘর বানাতে হবে, কেটে ফেল গাছ। আসবাব বানাতে হবে, কেটে ফেল গাছ। কী বোকাই না আমরা! এ রকম করতে গিয়ে আমরা যে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনছি, তা একটুও ভাবছি না। গাছ কাটার পর নতুন করে গাছ না লাগানোর কারণে কত প্রজাতির গাছ যে এখন ধ্বংসের মুখে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। গাছ পাখিদের আশ্রয়স্থল। গাছ উজাড় হওয়ায় বিলুপ্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির পাখিও। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে আর অক্সিজেন ত্যাগ করে। আর অক্সিজেন হচ্ছে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। আসলে গাছই হচ্ছে মানুষের পরম বন্ধু। গাছের উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। ক্লান্ত পথিককে ছায়া দেওয়া থেকে শুরু করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে গাছ। গাছ বজ্রপাত ঠেকায়। গাছ ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে আমাদের রক্ষা করে। গাছ থেকে ফল পাই, গাছ থেকে তৈরি হয় মূল‍্যবান ওষুধ। কোনো দেশে পর্যাপ্ত গাছ না থাকলে সে দেশে বৃষ্টিপাত হয় কম, ফলে মরুভূমিতে পরিণত হয়। আমাদের দেশ মনে হয় সেই মরুকরণের পথেই যাচ্ছে। বনভূমি কমে আসায় আমাদের সরকার অবশ্য বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। পালিত হচ্ছে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ, আয়োজন করা হচ্ছে বৃক্ষমেলার। জনগণের মাঝে বিনা মূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষের চারা। সৃজন করা হচ্ছে নার্সারি। জাতীয় পর্যায়ে দেওয়া হচ্ছে পুরস্কার। কিন্তু এসব উদ্যোগ খুব একটা কাজে আসছে বলে মনে হয় না। কারণ, গাছ কাটা চলছেই এবং তা ব্যাপক হারে। অতিলোভী কাঠ ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি ও ভূমিদস্যুদের সংঘবদ্ধ চক্র গাছপালা অবাধে নিধন করেই চলেছে। চলছে পাহাড় ও টিলা কাটা। সেই সঙ্গে কাটা পড়ছে পাহাড়ে ও টিলায় থাকা গাছ। ইটভাটায় পোড়ানো হচ্ছে গাছ। যেকোনো নতুন উদ্যোগ বা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সবার আগে গাছের ওপরই কোপ পড়ে। এভাবে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে অথচ তা বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ খুবই কম। এসব অপকর্ম যারা করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। গাছপালা উজাড় হওয়া ঠেকাতে বন বিভাগের কোনো তৎপরতা নেই। আমরা উল্টো বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বনের রক্ষক হিসেবে না পেয়ে ভক্ষক হিসেবেই বেশি পাই। এই বিভাগের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বনদস্যুদের সঙ্গে আঁতাত গড়ে তুলে দেশের সর্বনাশ করছেন। এ ছাড়া গাছ কাটার নীতিমালা অনুসরণ না করার ফলেও বনজ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। কোন গাছ কখন কাটা যাবে, একটি গাছ কাটার পর কত গাছ লাগানো দরকার, সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষের ধারণা নেই। আচ্ছা, যারা নিজেদের সাময়িক লাভের জন্য নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলছে, তারা কি জানে না যে গাছ কাটলে কী কী ক্ষতি হয়? তারা যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে একটি মরুময় পৃথিবী রাখতে চলেছে, সে খেয়াল কি তাদের আছে? এদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের বনভূমি রক্ষায় সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবে শুধু সরকারের ওপর সব দায়ভার চাপিয়ে দিলে তো হবে না। দেশের সাধারণ নাগরিক, মানে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের এই শস্য-শ্যামলা দেশটিকে আরও সবুজ করার জন্য বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। যেখানে পারুন সেখানেই গাছ লাগান। বাড়ির পাশের ছোট্ট জমিতে, আঙিনায়, বারান্দায়, ছাদে গাছ লাগান। আর আসুন, আমরা পরস্পরকে গাছের চারা উপহার দিই। এটাই এখন সেরা উপহার।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক।

ভুয়া খবর, ফেসবুক, টুইটার ও নির্বাচন by কামাল আহমেদ

যে বছর বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, সে বছরই ফেক নিউজ কথাটি জোরেশোরে শোনা গেল। বাংলায় এর প্রতিশব্দ ভুয়া বা বানোয়াট খবর। ২০১৬ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারির বিবেচনায় বছরের সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ছিল ফেক নিউজ। ২০১৭–তেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কল্যাণে শব্দটি শীর্ষ আলোচিত শব্দাবলির তালিকায় ছিল। তবে পরিহাসের বিষয় হলো যেসব খবরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের কেলেঙ্কারির কথা প্রকাশিত হয়, সেগুলোকেই তিনি বানোয়াট খবর বলে উড়িয়ে দেন। বিপরীতে তাঁর অনুসারী কট্টর ডানপন্থী কিছু গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অজস্র বানোয়াট তথ্য ব্যবহার করে অপপ্রচার চালায়। আর সেই বানোয়াট খবরের সফল প্রচারই তাঁর নির্বাচনী সাফল্যের অন্যতম কারণ। ভুয়া খবর ছড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা কীভাবে সম্ভব, এটি এখন আর কোনো প্রশ্ন নয়; বরং প্রশ্ন হচ্ছে এটি কেন মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিতে ফেসবুক, টুইটার ও গুগলকে এখন সে জন্য জবাবদিহি করতে হচ্ছে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে ওই অপপ্রচারে সচেতন বা অচেতনভাবে সহায়তা করারও অভিযোগ উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নির্বাচনগুলোতে রাশিয়া থেকে সোৎসাহে এই অপপ্রচারের কাজটি করা হয়েছে বলে জোরালো অভিযোগ আছে এবং সে ধরনের আলামতও মিলছে। ট্রাম্পের প্রচারে দলের কোনো যোগসাজশ ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কিছু বলা না গেলেও হিলারির বিরুদ্ধে রাশিয়ার ভেতর থেকে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে অপপ্রচার চালানোর বিষয়টি প্রযুক্তিজগতে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। সামাজিক মাধ্যমে কারও বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজটি যে বা যাঁরা করেন, তাঁদের ট্রল বলে অভিহিত করা হয়। এ রকম অজস্র ট্রলের উৎস যে রাশিয়া এবং তার ঘনিষ্ঠ সার্বিয়া,সে বিষয়ে অসংখ্য নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ব্রিটেনের ইউরোপের সঙ্গে বিচ্ছেদবিষয়ক ব্রেক্সিট গণভোটের ক্ষেত্রেও একই আলামতের কথা বলেছেন ব্রিটিশ এমপিদের অনেকেই। অবশ্য তাতে নির্বাচনের ফল পাল্টে গেছে, এমনটি কেউ দাবি করেননি। এ ধরনের অপচেষ্টার বিপদকে তাই গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাধারণ ভোটার, বিশেষ করে তরুণ এবং সহস্রাব্দ প্রজন্মের (মিলেনিয়ালস)কাছে পৌঁছানোর জন্য যে এক অভূতপূর্ব মাধ্যম, এটি রাজনীতিক এবং রাজনৈতিক দলের চিন্তকেরা বুঝতে পেরেছেন। ফলে দলের নেতৃত্বের ভাবমূর্তি গড়ায় এই মাধ্যমে তাঁরা নজর দিয়েছেন। ট্রাম্পের আগে এই সুবিধা পেয়ে আলোচিত হয়েছেন যে রাজনীতিক, তিনি নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগেই টুইটারে সর্বাধিক সংখ্যক অনুসারী ছিল তাঁর। এখনো ফেসবুক ও টুইটারে তাঁর অনুসারী প্রায় ১০ কোটি। তবে পরে জানা গেছে, টুইটারে তাঁর ভক্তের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেশি হওয়ার পেছনে একটা রহস্য আছে। বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে ২০১৪-এর মে মাসে ভারতের নির্বাচনের সময়ে। ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ মে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত ৫ কোটি ৬০ লাখ টুইট ছিল নির্বাচনবিষয়ক। ওই চার মাসে মোদির অনুসারী ২৮ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৪০ লাখে পৌঁছায়।
ভুয়া অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করতে সক্ষম এক সফটওয়্যারের উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠান সোশ্যালবেকারস তখন জানায় যে তাঁর সমর্থকদের অর্ধেকই সন্দেহজনক। ২০১৩ সালে টাইম সাময়িকী বছরের আলোচিত চরিত্র নির্বাচনের জন্য মোদির টুইটার অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করে। সে সময় তারা দেখতে পায়, ‘আমি মনে করি, নরেন্দ্র মোদির টাইম-এর বর্ষমানব হওয়া উচিত’—এমন মন্তব্যের হাজার হাজার টুইট আসছে নিয়মিত বিরতিতে। ২৪ ঘণ্টাই একইভাবে তা আসতে থাকে। শিগগিরই তার পাল্টা টুইটও শুরু হয়। (সূত্র: হোয়াই ফেক টুইটার অ্যাকাউন্টস আর এ পলিটিক্যাল প্রবলেম, নিউ স্টেটসম্যান, ২৮ মে ২০১৪)। ইন্টারনেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সক্ষম কিছু সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছেন প্রযুক্তিবিদেরা, যা বট নামে পরিচিত। এসব বটই ভুয়া সমর্থকের কাজ করে। টুইটার ২০১৪ সালেই স্বীকার করেছিল যে তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের পাঁচ শতাংশের মতো অ্যাকাউন্ট ভুয়া। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সম্প্রতি প্রকাশিত খবরেও বলা হচ্ছে, টুইটারে রাজনীতিকদের অনুসারীদের অ্যাকাউন্ট নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, এঁদের বেশির ভাগই ভুয়া। টুইটার অডিট নামের একটি ডেটা-অ্যানালিটিকস বলছে যে অরবিন্দ কেজরিওয়াল, নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী—এঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এটি ঘটেছে। কেজরিওয়ালের ১ কোটি ২৪ লাখ অনুসারীর ৬৫ ভাগ ও মোদির দুটি অ্যাকাউন্টের ৪ কোটি ৮০ লাখ অনুসারীর ৬৩ শতাংশই সন্দেহজনক। টুইটারে নতুন রাহুল গান্ধীর ক্ষেত্রে আসল অনুসারী প্রায় ৫১ শতাংশ। (ডেকান হেরাল্ড, ২৪ অক্টোবর ২০১৭)। সামাজিক মাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা সব সময় যে জনপ্রিয়তার যথার্থ প্রতিফলন নয়, তা মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য তার গুরুত্ব তো মানতেই হবে। বাংলাদেশে ভুয়া বা বানোয়াট খবরের বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। সাংবাদিকতা পেশায় যাঁরা কয়েক দশক ধরে আছেন, তাঁদের কাছে বানোয়াট খবরের একটি নজির খুবই পরিচিত। নব্বইয়ের দশকে ঢাকার নতুন প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু সাড়া জাগানো এক দৈনিকে দেশের প্রধান একটি দলের একজন নেত্রীর একটি সাক্ষাৎকার ছাপানো হয়, যার পুরোটাই ছিল ওই সাংবাদিকের মনগড়া। যে নেত্রীর সঙ্গে যে স্থানে সাক্ষাৎকারটি নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেখানে সেই নেত্রী সেদিন যাননি এবং সেই সাংবাদিকের সঙ্গেও তাঁর সেদিন দেখা হয়নি। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে সেদিন সেই কথিত সাক্ষাৎকারের বিষয়ে ওই নেত্রীর পক্ষ থেকে বা তাঁর দল থেকেও কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি। সেই সাংবাদিক এখনো এই পেশায় আছেন। সম্প্রতি এ রকম একটি ভুয়া খবর ছিল, নোবেল কমিটি শান্তি পুরস্কারের জন্য আগের রাতেই ফোন করে নাকি সম্ভাব্য প্রাপককে পরের দিন সকালে টেলিফোনের পাশে থাকতে অনুরোধ জানিয়েছে। অথচ যাঁরা কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন যে পুরস্কার ঘোষণার আগ পর্যন্ত সেটা গোপন থাকে এবং ঘোষণার সামান্য আগে বিজয়ীকে তা জানানো হয়। সম্প্রতি এমন অনেক খবরই ভুঁইফোড় পোর্টাল ও সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, যেগুলোর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে মূলধারার কাগজগুলোর সাংবাদিকেরা রীতিমতো গলদঘর্ম হয়েও সেগুলোর কোনো হদিস করতে পারেননি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশের সম্পদ পাচার করে সৌদি আরবে বিপণিবিতান কিনে থাকলে অবশ্যই সেই সম্পদ উদ্ধার এবং কথিত দুর্নীতির বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু বিএনপি বলছে, যেসব বিদেশি সংবাদমাধ্যমের খবর বলে তা প্রচার করা হয়েছে, সেগুলো হয় অস্তিত্বহীন, নয়তো তারা কখনোই এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকেরা কয়েক বছর ধরেই যে সমস্যা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছেন, সেই সমস্যা এখন বাংলাদেশেও আসর করেছে। এখানে অবশ্য আরও একটি কথা বলে রাখা ভালো যে আমাদের রাজনীতিকেরাও তাঁদের সম্পর্কে বিব্রতকর কোনো তথ্য বা অভিযোগ প্রকাশিত হলে সেগুলোকে বানোয়াট বলে উড়িয়ে দেওয়ায় অভ্যস্ত। আর আমাদের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে শেষ পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগ আদালতে খুব একটা নিষ্পত্তিও হয় না। ফলে অনেক সময় সত্য হলেও তা আইনি মারপ্যাঁচে শেষ পর্যন্ত বানোয়াটই থেকে যায়। আমার আজকের আলোচ্য অবশ্য অতীত নিয়ে নয়, বরং নির্বাচনের বছরে বানোয়াট তথ্য কীভাবে আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারে, সেই বিপদ সম্পর্কে আলোচনার সূত্রপাত করা। দলীয় বক্তব্য প্রচার এবং নেতা-নেত্রীদের ভাবমূর্তি গঠনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগানোর দিকটিতে বড় দলগুলো যে নজর দিয়েছে, সেটা মোটামুটি সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু তা কতটা কার্যকর, বলা মুশকিল। এখানেও সরকারবিরোধীরা যে কিছুটা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়বেন। কেননা, বিদ্যমান ৫৭ ধারা অথবা প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিধানগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দলনিরপেক্ষতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী নেতা-নেত্রীদের সম্ভাব্য চরিত্রহননকারী ভুয়া তথ্য বা অভিযোগের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে তাঁরা কতটা প্রতিকার পাবেন, তা এখনো পরীক্ষিত নয়। কিন্তু সরকারি দলের নেতাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমালোচনার ক্ষেত্রেও ৫৭ ধারা ব্যবহারের নজির অনেক। রাজনীতি ও নির্বাচনকে প্রভাবিত করায় ফেসবুক ও টুইটারের ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছু অনুসন্ধানমূলক গবেষণা হয়েছে। ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এ বিষয়ে যে বিশেষ শাখা কার্যক্রম পরিচালনা করে, তার কিছু বিবরণ তুলে ধরেছেন সাংবাদিক স্বাতী চতুর্বেদী তাঁর আই অ্যাম আ ট্রল: ইনসাইড দ্য সিক্রেট ওয়ার্ল্ড অব দ্য বিজেপি’স ডিজিটাল আর্মি নামের বইয়ে। অভিনেতা আমির খান ভারতে সহিষ্ণুতা কমে যাওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করার পর তাঁর মডেলিং চুক্তি বাতিলের জন্য স্ন্যাপডিল (অনলাইন মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম) কোম্পানির বিরুদ্ধে এই গোষ্ঠী টুইটারে কী ধরনের হয়রানি করেছিল, তার বিবরণ রয়েছে এই বইয়ে। অনলাইনে এই বিশেষ ধরনের হয়রানিকে প্যাট্রিয়টিক ট্রল (দেশপ্রেমিক হয়রানি) বলে অভিহিত করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস বলছে, প্যাট্রিয়টিক ট্রলের উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারি ভাষ্যের বাইরে অন্য কোনো ভাষ্য বা ভিন্নমত দমন করা। ফেসবুক এ ক্ষেত্রে কতটা তৎপর, তার একটা ভয়াবহ চিত্র সম্প্রতি তুলে এনেছে ব্লুমবার্গ (২১ ডিসেম্বর ২০১৭)। ফেসবুকের বৈশ্বিক রাজনীতি ও সরকার ইউনিট বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রচারকৌশলের বিষয়ে কাজ করে থাকে। ভারত ছাড়াও ফিলিপাইন ও জার্মানির নির্বাচনে ফেসবুকের সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়ে এই প্রতিবেদনে তুলে ধরে বলা হয়েছে যে এসব বিষয়ে কোনো ধরনের স্বচ্ছতা নেই। ফেসবুক তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতার দাবি নানাভাবে এড়িয়ে এবং প্রতিহত করে চলেছে।  বাংলাদেশে নির্বাচনের বছরে অনলাইনে রাজনৈতিক প্রচার বাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গণতন্ত্রের যে নাজুক দশা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং এ ক্ষেত্রে বাড়তি ঝুঁকি হচ্ছে প্রযুক্তির বিষয়ে আমাদের সীমিত জ্ঞান, সামর্থ্যের ঘাটতি এবং নীতিমালা প্রশ্নে বিতর্ক ও সমঝোতার অভাব। এ ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক গোষ্ঠীগুলোর দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ডিজিটাল জগৎটি গণতান্ত্রিক এবং সমসুবিধার নিশ্চয়তা দেয়।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

শীতলক্ষ্যায় নৌযান নোঙর

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে বিভিন্ন নৌযান দীর্ঘদিন ধরে নোঙর করে রাখার ফলে যেভাবে নৌপথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে, তা উদ্বেগজনক। কিন্তু এসব দেখার যেন কেউ নেই। প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, নগরের হাজীগঞ্জ এম সার্কাস এলাকায় বাংলাঘাট, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল এবং বন্দর উপজেলার নবীগঞ্জ ঘাটসহ বেশ কয়েকটি স্থানে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে লাইটার কার্গো জাহাজ, ড্রেজার পরিদপ্তরের পন্টুন, ফেরিসহ বিভিন্ন নৌযান নোঙর করে রাখা আছে। শুধু তীরে নয়, মাঝনদীতেও বছরের পর বছর ধরে এলোমেলোভাবে নৌযান নোঙর করে রাখা হচ্ছে।
এভাবে নোঙর করা শতাধিক নৌযানের কারণে নদীপথ সরু হয়ে পড়ায় কার্গো ও জ্বালানি তেলের ট্যাংকারগুলোর চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা যেমন আছে, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে নৌযানগুলো পানিতে থাকায় নদীর তলদেশে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। শীতলক্ষ্যা নদীটি দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। প্রাচ্যের ডান্ডি নামে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণই হলো শীতলক্ষ্যা নদী। শহরটি একসময় বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছিল শীতলক্ষ্যার জন্যই। এই নদীকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে অনেক শিল্প ও কলকারখানা। দখল-দূষণের কবলে পড়ে এই নদীর অস্তিত্ব এমনিতেই হুমকির সম্মুখীন। তার ওপর যোগ হয়েছে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন নৌযান নোঙর করে রাখার এই সংস্কৃতি। নৌ চ্যানেল পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু তারা কী করছে? কেন তারা এভাবে নৌযানগুলোকে নদীতে নোঙর করতে দিচ্ছে? এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর গাফিলতি করার আর কোনো সুযোগ নেই। যারা এভাবে নৌযান নোঙর করে নদীর ক্ষতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীতে যাতে অযথা কোনো নৌযান দীর্ঘদিন ধরে নোঙর করা না থাকে, তা নজরদারি করতে হবে। নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নদীর তলদেশ খনন করাসহ অন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা নিতে হবে।

জাকারবার্গ কি ভুল করছেন? by মো. মিন্টু হোসেন

যখনই ফেসবুক বিপদে পড়েছে, বাঁচাতে ছুটে চলে এসেছেন এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। কখনো বুদ্ধিতে, কখনো কৌশলে হুমকি হয়ে দাঁড়ানো প্রতিদ্বন্দ্বীদের কিনে নিয়েছেন, নয়তো তাদের মতো ফিচার ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু গত বছর থেকে নির্বাচনে প্রভাব খাটানো, ভুয়া খবর আর সরকারি চাপ বৃদ্ধিতে ‘বেপথে’ ফেসবুক। এ বছর ফেসবুককে ঠিক করার ব্রত নেওয়ার ঘোষণা দিলেন। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রথম কোপটা দিলেন ফেসবুকের বিরোধী ও শত্রু হয়ে ওঠা মিডিয়া ও ব্র্যান্ড পেজগুলোকে। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ট্রাফিক টানা বন্ধ। ফেলো কড়ি মাখো তেল! টাকা না দিলে পোস্টে রিচ নেই। ব্র্যান্ড পেজ, সেলিব্রেটি পেজ থাকবে, কিন্তু তা কোনো এক চিপায়। ফেসবুক ব্যবহারকারীর দরকার হলে সেখানে গিয়ে দেখে আসবে। এই ভিডিওর যুগে এখন ব্যক্তিজীবনের ঘটনাগুলো নিউজ ফিডে দেখানো বেশি জরুরি তাঁর কাছে। গবেষণা যতই বলুক না কেন, ফেসবুকে বন্ধুর ভালো খবরের পোস্টে মনে হিংসা জন্মে। তবু ফেসবুকে বন্ধু ও পরিবারের পোস্টগুলোতেই বেশি আদান-প্রদান হয়। ফেসবুকের রি-অ্যাকশন বাটন লাভ, লাইক তো সেখানেই বেশি প্রযোজ্য। তবে জাকারবার্গের এই উদ্যোগ কি ভালোভাবে নেবে প্রচুর অর্থ খরচ করে লাখো-কোটি লাইক জমানো, ফলোয়ার তৈরি করা ব্র্যান্ডগুলো? তারা ইতিমধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। নিউজ ফিডে পরিবর্তন ঘোষণা দেওয়ার এক দিনের ব্যবধানেই মার্ক জাকারবার্গের সম্পদের পরিমাণ কমেছে ৩৩০ কোটি ডলার, যা তাঁর মোট সম্পদের ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। নিউজ ফিডে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেওয়ার পর ফেসবুকের শেয়ারের দাম কমেছে আট ডলারের বেশি। শেয়ারের মূল্যে দরপতন ঘটায় কমেছে বিশ্বের এই পঞ্চম শীর্ষ ধনীর সম্পদের পরিমাণও।
তবে শেয়ারের দর কমলেও ফেসবুকের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবেই নিচ্ছে ওয়ালস্ট্রিট। সেখানকার আর্থিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দীর্ঘ মেয়াদে কোম্পানির জন্য সুফল বয়ে আনবে এ পরিবর্তন। তবে এখনই ফেসবুকের আয় কমবে না বলেও মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। অবশ্য ফেসবুক নিউজ ফিডে সংবাদমাধ্যমের পোস্ট কমিয়ে আনতে মার্ক জাকারবার্গের সিদ্ধান্তের পেছনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য আছে। তবে তাঁর এই সিদ্ধান্ত অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য বড় সুযোগ বলে মনে করেন অনেকেই। তবে আমাদের দেশের ফেসবুক পেজগুলোর ওপরেও প্রভাব পড়তে পারে। যেহেতু জাকারবার্গ ঠিক করেছেন মিডিয়া, তারকা ও ব্র্যান্ড পেজের কনটেন্ট বেশি দেখাবেন না। তাই এটিকে স্বনির্ভরতার সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। দিন শেষে ফেসবুক একটা ব্যবসা বৈ কিছু নয়! ফেসবুক ভাবছে, অন্তত যাঁরা বিজ্ঞাপন দেবেন না, তাঁদেরটা নিউজ ফিডে দেখাবে না। বেশি দেখাবে বন্ধুদের মধ্যকার আলোচনা। নিউজ ফিডে এ পরিবর্তনে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডগুলো ক্ষতি হবে কি? ক্ষতি তো কিছুটা অবশ্যই হবে। তবে আশার কথা, মিডিয়া ও ব্র্যান্ডগুলোর ফেসবুক নির্ভরতা কমবে। নিজস্ব কনটেন্টের মান ভালো হবে। নিজস্ব ইউজার বাড়বে। পরোক্ষ ট্রাফিক টানা লাগবে না। ফেসবুক আজ ২০০ কোটির বেশি ব্যবহারকারীকে একটি প্ল্যাটফর্মে এনেছে। এখন তো তাদের কথাও ভাবতে হবে! ব্যবহারকারীদের কাজে লাগিয়ে যত বেশি আয়, ততই তাদের সুবিধা। তবে গত কয়েক বছরের গতিধারা কিন্তু ফেসবুকের পক্ষে কথা বলে না। তরুণেরা এখন আকর্ষণীয় অন্য প্ল্যাটফর্ম স্ন্যাপচ্যাট, ইনস্টাগ্রামের মতো সাইটে ঢুকছে। যাঁরা পেশাদার, তাঁরা যাচ্ছেন লিংকডইনে। ফেসবুকরে ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপের মতো ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিংয়ে যোগাযোগ হচ্ছে। ফেসবুকে তাহলে তাঁরা কোন আকর্ষণে যাবেন? ফেসবুক নানা ফিচার এনে মানুষকে আটকাতে চাইছে। এখন তো ইউটিউবের মতো ভিডিওর দিকে বেশি মনোযোগ। কারণ, মানুষ ভিডিও দেখছে বেশি। ফেসবুক সে পথেও হাঁটছে। ব্যবহারকারীদের ধরে রাখতে হেন কোনো কাজ নেই, যা তারা করছে না। জাকারবার্গ বলেছেন, ফেসবুকের ব্যবহারকে সুখকর করে তুলতে নতুন এ পরিবর্তন আনছেন তিনি। ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাকে সাবলীল করে তোলা ফেসবুকের দায়িত্ব তাঁর কাছে। জাকারবার্গ বলেন, ‘আমরা যখন এটা চালু করব, আপনারা নিউজ ফিডে বাণিজ্যিক পণ্য ও সংবাদমাধ্যমের পোস্ট অনেক কম দেখতে পাবেন। এ ছাড়া যেসব সর্বজনীন বিষয় আপনারা পাবেন, তা-ও হবে একই মানের। তা যেন মানুষের মধ্যে অর্থবহ অন্তরঙ্গতা সৃষ্টিতে উৎসাহ জোগায়।’ তাহলে জাকারবার্গ কি ভুল করছেন? উত্তরটা হচ্ছে, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের উৎসাহ ধরে রাখতে পারলে তিনি সফল। তা না হলে ফেসবুক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে মানুষ। তবে জাকারবার্গ নিশ্চয় কাঁচা খেলোয়াড় নন!
তথ্যপ্রযুক্তি লেখক

সাংবিধানিক পদে শূন্যতা

যেকোনো মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রের কতগুলো মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকে। আবার সেই মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যেও কতগুলো অতি মৌলিক থাকে। সব অবস্থায় একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি থাকতেই হবে। আমাদের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী এই তিনটি পদ অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন শীর্ষ পদ হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে এই তিনটি পদের একটিও দীর্ঘকাল শূন্য রাখা সংবিধান কোনোভাবেই সমর্থন করে না। কোনো জাতির জীবনে কোনো ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা, জরুরি অবস্থা বা ক্রান্তিকালের মতো কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও সামরিক শাসনে সাময়িক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য ছিল। সংসদও ছিল না। প্রধান বিচারপতিকে আমরা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হতে দেখেছি। আবার প্রধান বিচারপতিকে আমরা রাষ্ট্রপতি করে পরে সেই প্রধান বিচারপতির পদেই ফিরিয়ে এনেছি। সে জন্য আমরা নির্দিষ্টভাবে ভূতাপেক্ষ বৈধতা দিয়ে সংবিধান সংশোধন করেছি। কিন্তু অতীতের সেই সব উপাখ্যানের কোনোটিই স্বাভাবিক বা আদর্শস্থানীয় বলে গণ্য হওয়ার নয়। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রশ্নে আইন ও বিচারমন্ত্রী দুঃখজনকভাবে আমাদের অতীত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু মন্দ নজির কখনোই পুনরাবৃত্তির ভিত্তি হতে পারে না।
প্রধান বিচারপতির পদ অনির্দিষ্টকাল ধরে খালি রাখার যে নজির তৈরি হচ্ছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এর পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কেন রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভের শীর্ষ পদ শূন্য রাখতে হবে, সে বিষয়ে আদৌ ব্যাখ্যা নেই। আমরা দেখছি, এ বিষয়ে ভুলভাবে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি যেকোনো মেয়াদে কার্যভার পালন করতে পারেন। যদিও আইনমন্ত্রীর এমন মতের সঙ্গে দ্বিমত করেছেন আওয়ামী লীগেরই দুই সাবেক আইনমন্ত্রী। প্রধান বিচারপতির পদ খালি থাকা অবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট দিবস পালিত হয়েছে। দেশে সংসদের অধিবেশন চলছে, কিন্তু সরকার অনুগত বিরোধী দলের মুখে এ নিয়ে টুঁ-শব্দটি নেই। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার স্বাভাবিক অবসরে যাওয়ার তারিখ ছিল ৩১ জানুয়ারি। রেওয়াজ অনুযায়ী ওই তারিখের আগেই নতুন প্রধান বিচারপতি কে হবেন, তা চূড়ান্ত হওয়ার কথা। এস কে সিনহার পদত্যাগের ৬৫ দিনেও প্রধান বিচারপতির পদটি শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। আমরা মনে করি, প্রধান বিচারপতির পদে নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়টি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যে ধারণা ও মর্যাদা, তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অনতিবিলম্বে এই পরিস্থিতির অবসান হোক। নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হোক।

ভারত-ইসরায়েল এত মাখামাখি কেন? by মাহফুজার রহমান

ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গত রোববার ভারতে পৌঁছান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিমানবন্দরে একজন মন্ত্রী তাঁকে স্বাগত জানাবেন—এমনই কথা ছিল। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই হাজির সেখানে। করমর্দন করে বুক মেলান ‘বন্ধু’ নেতানিয়াহুর সঙ্গে। ছয় মাস আগে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফরে গিয়ে এক ভাষণে নেতানিয়াহুকে ‘বন্ধু’ সম্বোধন করেন মোদি। বলেন, বন্ধুত্ব শুধু ভারত-ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মোদি-নেতানিয়াহুরও রয়েছে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধের সময় ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের প্রকাশ্য কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে গত প্রায় ২৫ বছরে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ভারত। কিন্তু কেন এত মাখামাখি? ইতিহাস অবশ্য বলে, শুরু থেকেই যেন ইসরায়েলের প্রতি কিছুটা নমনীয় ভারত। ১৯৪৭ সালে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জাতিসংঘের পরিকল্পনার বিপক্ষে ভোট দেয় ভারত। ১৯৫০ সালে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় ইসরায়েলকে। ১৯৫৩ সালে ইসরায়েল কনস্যুলেট খোলে মুম্বাইয়ে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন-যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ব্লকে ছিল ভারত। আবার ওই সময় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) অন্যতম রূপকার ছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। বলা হয়, এসব কারণেই হয়তো ওই সময়টায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্যে কোনো সম্পর্ক রাখেনি নয়াদিল্লি। তবে ভারত-ইসরায়েল আবার কাছাকাছি আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। ১৯৯২ সালে ভারত পুরোপুরি কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ইসরায়েলের সঙ্গে। এরপর মসৃণ গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে দুই দেশের সম্পর্ক। এর ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে মহাকাশ গবেষণা সহযোগিতার জন্য ইসরায়েলি মহাকাশ সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। ২০০৬ সালে দুই দেশের মধ্যে কৃষি সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। আর গত বছর ২৫০ কোটি ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়তে যৌথ কর্মসূচি নেয়। যদিও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার পক্ষেও বিভিন্ন সময় অবস্থান দেখা যায় ভারতের। কারও কারও মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে ভারত।
এর একটি কারণ হলো ভারতের বিপুলসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী। ভোটের কারণে কোনো সরকারই তাদের নাখোশ করতে চায় না। অন্য কারণটি হলো, ভারত তেল আমদানির জন্য ইরান ও আরব দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এই দেশগুলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে। তাদের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে যেতে চায়নি নয়াদিল্লি। গত মাসেও জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে দেখা গেছে ভারতকে। পবিত্র জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের পক্ষে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব অনুমোদন হয়। ওই প্রস্তাব নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ১২৮ সদস্য ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। যার একটি ছিল ভারত। নয়াদিল্লির এমন অবস্থানের বিষয়ে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামীদের সংগঠন বিডিএসের ভারত শাখার প্রধান অপূর্ব গৌতম বলেন, জাতিসংঘের ভোটাভুটির সময় ভারত আসলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতের বাইরে যেতে চায়নি। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি চাপও ছিল নয়াদিল্লির ওপর। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দাবি থেকে ইসরায়েলের চাওয়া হয়তো ছিল জাতিসংঘে ভারত অন্তত ভোটদানে বিরত থাকুক; যেমন বিরত ছিল অন্য ৩৫ দেশ। ও পি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ডিন শ্রীরাম চাউলিয়া বলেন, ইসরায়েল ভারতের বাস্তব পরিস্থিতির বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। এ কারণে বিপক্ষে ভোট দেওয়ার পরও ইসরায়েল ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কোনো শর্ত দেয়নি। জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্নায়ুযুদ্ধের সময় নেহরু ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্যে সম্পর্ক না রাখলেও ১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় অস্ত্র চান ইসরায়েলের কাছে। ওই সময় অস্ত্র সহায়তা দেয় ইসরায়েল। এ ছাড়া ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালেও ভারতকে অস্ত্র দেয় ইসরায়েল। ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ছিল ভারত-পাকিস্তানের ওপর। তাই তৃতীয় কোনো দেশের কাছে যেতে হয় নয়াদিল্লিকে। এরপর সোভিয়েতের পতনের পর ভারত মূলত সহজে আধুনিক অস্ত্র পেতে তাই ইসরায়েলের কাছে যায়। কারণ হিসেবে বলা যায়, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ভারত বিভিন্ন সময় পুরোনো প্রথাগত অস্ত্র কিনেছে। আধুনিক অস্ত্রের জন্য ইসরায়েলই তাদের কাছে ভালো বিকল্প। এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারত। ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে হাতে গোনা কয়েকটি দেশের একটি হিসেবে ভারতকে কাছে পাচ্ছে ইসরায়েল। এটাকেও ইসরায়েলের জন্য একধরনের পাওয়া বলা যায়। এ ছাড়া ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ভারত। দেশটি প্রতিবছর ১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বা সরঞ্জাম আমদানি করে ইসরায়েলের কাছ থেকে। এর বাইরে ধীরে ধীরে জ্বালানি, কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ছে তাদের। এটাকে বড় ইতিবাচকভাবে দেখছে ইসরায়েল। এ কারণেই কি না জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভোটের প্রসঙ্গ তুলে ভারতে নেতানিয়াহু বললেন, ‘কোনো কোনো সময় পারস্পরিক সম্পর্ককে শুধু একটি ভোট দিয়ে বিচার করা যায় না।’ ১৫ বছরের মধ্যে প্রথম ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতে আসা নেতানিয়াহুর সঙ্গে নিয়ে এসেছে ১৩০ জনের প্রতিনিধিদল। নয়াদিল্লি বলছে, নেতানিয়াহুর এই সফরে দুই দেশের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি, মহাকাশে সহযোগিতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণ খাতে চুক্তি হবে। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে এর আগে স্বাক্ষরিত প্রযুক্তি, পানি ও কৃষিবিষয়ক চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। তবে ভারত-ইসরায়েলের পারস্পরিক সহযোগিতার কেন্দ্রে থাকবে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাত—সেটা বলাই যায়।
মাহফুজার রহমান: সাংবাদিক
manik.mahfuz@gmail.com

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাপানের বিভ্রান্তি by মনজুরুল হক

মিয়ানমারের পশ্চিমের রাখাইন রাজ্যে ঠিক কী ঘটছে এবং কারা সেই সব ঘটনা ঘটাচ্ছে, তা নিয়ে মনে হয় এখনো বিভ্রান্তিমুক্ত হতে পারেনি জাপান। সারা বিশ্ব যখন বলছে, সেখানে যা ঘটছে তা মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন এবং জাতিগত নিধন ছাড়া আর কিছুই নয়, জাপানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখন বিষয়টি নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকার পথ বেছে নিয়েছিলেন। এমনকি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার কমিশনে বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ যখন মিয়ানমারের নিন্দায় সোচ্চার ছিল, জাপান কিন্তু তখনো সেই ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থা থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারেনি। ফলে গত সপ্তাহে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো মিয়ানমার সফরে গেলে মনে করা হয়েছিল যে এবার বুঝি এশিয়ার এই প্রভাবশালী রাষ্ট্রটি একটু নড়েচড়ে বসার ইঙ্গিত দেবে। কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নরম সুরে মিয়ানমারকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ দেখিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না এবং মিয়ানমারের উচিত হবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়া। অন্যদিকে মিয়ানমারের সরকার ও দেশটির কার্যত নেত্রী অং সান সু চি জাপানের সে রকম নরম মনোভাবে আপ্লুত হয়ে অঙ্গীকার করছেন যে রোহিঙ্গাদের জামাই আদরে ফিরিয়ে আনা হবে। তবে কীভাবে সেটা তাঁরা করবেন এবং হতভাগ্য সেই জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন করে নিপীড়ন শুরু হওয়া প্রতিহত করার জন্য কী পদক্ষেপ তাঁরা নেবেন, তার কোনো উল্লেখ অবশ্য কোথাও করা হয়নি। সর্বোপরি, সমস্যা তৈরি হওয়ার পেছনের যে মূল কারণ, অর্থাৎ ভিন্ন জাতিসত্তা হিসেবে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব মিয়ানমার মেনে নেবে কি না, সে বিষয়েও অং সান সু চি ছিলেন একেবারে নিশ্চুপ। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নেত্রীর মুখের কথায় খুশি হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শরণার্থী পুনর্বাসনে সহায়তা করার জন্য ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের থোক এগিয়ে দিয়ে বলেছেন যে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক অগ্রগতিতে জাপানকে দেশটি সব সময় সঙ্গে পাবে। এটাকে বোধ হয় বলতে হয় সমস্যার চমৎকার সমাধান। মিয়ানমারের নেতৃত্ব অবশ্য খুশিতে গদগদ হয়ে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে রাখাইন অঞ্চলের কিছু শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন এবং প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে সে রকম একটি শিবির ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একটি সেতু তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলা হয়েছে, সেই সেতু পার হয়ে অচিরেই শরণার্থীরা ফিরে আসবে। বাইরে থেকে তাকিয়ে দেখলে এটাকে খুবই উল্লেখযোগ্য এক অগ্রগতি বলে মনে হতে পারে। তবে ঘটনাপরম্পরা বিচার-বিশ্লেষণ করলে অনেকগুলো যে ফাঁক সহজেই চোখে পড়বে, জাপানের দৃষ্টি মনে হয় তার সবটাই এড়িয়ে গেছে। ফলে বলা যায় যে উচ্চপর্যায়ের সফর সত্ত্বেও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে শুরু থেকে ভুগতে থাকা বিভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে জাপান বের হয়ে আসতে পারেনি। সংকট তৈরি করার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে কি না এবং সমস্যার মূলে যে বিষয়টি, অর্থাৎ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশের ভিন্ন জাতিসত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার এদের দেওয়া হবে কি না, গুরুত্বপূর্ণ সেই সব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো রকম আলোচনা হয়নি। ফলে ধরে নেওয়া যায়, অগ্রগতি যেটুকু হয়েছে তার সবটাই লোকদেখানো। এর বাইরে আরও আছে শরণার্থী প্রত্যাবাসন তদারকির দিকটি। মিয়ানমার শুরু থেকে বিদেশের কোনো রকম হস্তক্ষেপ সেই প্রক্রিয়ায় দেখতে চাইছে না। এর কারণ অবশ্য সহজেই অনুমেয়। বিদেশের বিভিন্ন নাগরিক অধিকার গ্রুপ কিংবা শান্তিরক্ষা কর্মীরা শরণার্থী প্রত্যাবাসনের দেখভাল করতে থাকলে থলের বিড়াল বের হয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে এবং সে রকম অবস্থায় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ঘটানোর জন্য মিয়ানমারের বিশেষ কিছু মহলের বিচারের আহ্বান আরও জোরালো হয়ে উঠবে। সেই বিশেষ মহলের মধ্যে যে দেশের সামরিক বাহিনীই কেবল সম্পৃক্ত নেই, সেই সত্য এখন অনেকেরই জানা। ত্রাসের আগুন শুরুতে সামরিক বাহিনী জ্বালায়নি, বরং সেটা জ্বালিয়েছে দেশের ধর্মীয় আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সামরিক বাহিনী পরে এদের দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে এগিয়ে যায়। ফলে বিচারের বাইরে এরা কোনো অবস্থাতেই থেকে যেতে পারে না। সে রকম কিছু হলে তা হবে মানবাধিকার লঙ্ঘনেরই আরও একটি নগ্ন দৃষ্টান্ত। আর তাই জাপান এবং সমস্যা সমাধানে আগ্রহ দেখানো বিভিন্ন দেশের সেই দিকগুলো পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। জাপান হয়তো মনে করে থাকতে পারে টাকার বস্তা দিয়ে সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে সব পক্ষকে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
তবে কথা হচ্ছে, সীমিত পরিমাণের যে অর্থ শরণার্থী পুনর্বাসনের জন্য দেওয়া হচ্ছে, তা কীভাবে খরচ করা হবে তারও কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। মিয়ানমার সরকারের হাতে সেই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হলে হতদরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ যে ওপর থেকেই লোপাট হয়ে যাবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। দেশটির সামরিক বাহিনীর অতীতের রেকর্ড কিন্তু সে রকম প্রমাণই তুলে ধরে। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের বিপরীতে মিয়ানমার জাপানের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের কাছে অনেক বেশি কাঙ্ক্ষিত এক গন্তব্য। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই মিয়ানমারকে জাপানের এতটা পছন্দ। জাপানের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, মিয়ানমারের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা হলে দেশটি চীনের দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকে পড়বে এবং জাপান সেখানে নিজস্ব অবস্থান হারাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বেলায় সেই দুই সম্ভাবনার কোনোটাই সে রকম তীব্র নয় বলে জাপানি নেতৃত্বের ধারণা। অন্যদিকে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা নামের একটি রহস্যজনক গ্রুপের অস্তিত্বও জাপানকে বিচলিত করছে। তবে আরসার পেছনে ঠিক কারা আছে, তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত এটাকে সন্ত্রাসবাদের নব উত্থান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, আরসা হচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে তৈরি হওয়া একটি দল, ঘটনা ভিন্ন খাতে পরিচালিত করে বিভ্রান্তির পোক্ত দেয়াল তুলে দেওয়া যাদের লক্ষ্য। আরসার ঝটিকা হামলা এবং এর ঠিক পরপর কালক্ষেপণ না করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ভয়াবহ রকমের হত্যা ও জ্বালাও-পোড়াও অভিযানে লিপ্ত হওয়া সে রকমই ইঙ্গিত দেয়। তবে বিষয়টি আরও গভীরে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন অবশ্যই আছে। অন্যদিকে জাপানের সংবাদমাধ্যম মনে হয় সে রকম বিশ্লেষণের পেছনে সময় খরচ করতে রাজি নয়। এদের অনেকেই আজকাল বাংলাদেশের দক্ষিণে যাচ্ছে আরসার অস্তিত্ব প্রমাণ করার লক্ষ্য নিয়ে, ঠিক যেমনটা দেখা গেছে বামঘেঁষা পত্রিকা হিসেবে পরিচিত মাইনিচি শিম্বুন-এ কিছুদিন আগে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে। মাইনিচির দিল্লি ব্যুরোর জুন কানেকো ঠিক সেই উদ্দেশ্য নিয়েই শরণার্থীদের আগমনের এলাকা সফর করেছেন। সেখানে তিনি স্বঘোষিত এক আরসা যোদ্ধার দেখাও পেয়েছেন, যিনি জাপানি সাংবাদিককে বলেছেন যে আড়াই বছর ধরে তিনি আরসার সঙ্গে জড়িত আছেন। গত আগস্ট মাসে পুলিশের কয়েকটি চৌকিতে হামলা চালানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, অনেক আরসা জঙ্গি পালিয়ে আছেন এবং পরবর্তী হামলা চালানোর নির্দেশ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। অস্ত্র কোথায় জানতে চাওয়া হলে যোদ্ধা বলেন যে মিয়ানমারের ভেতরে গোপন এক স্থানে তাঁরা তাঁদের অস্ত্র জমা রেখেছেন। তবে এই সাক্ষাৎকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। শরণার্থীদের মধ্যে অনেকেই বাড়তি কিছু অর্থ প্রাপ্তির আশায় উদ্গ্রীব। হতে পারে জাপানি সেই সাংবাদিকের বাংলাদেশি পয়েন্ট ম্যান টাকার টোপ ফেলে এসব কথা সেই ব্যক্তিকে দিয়ে বলিয়ে নিয়ে থাকবেন এবং অন্যদিকে জাপানি সাংবাদিক আরসার অস্তিত্বের সন্ধান পেয়ে নিজের মিশন সফল হওয়ার অনুভূতি নিয়ে দিল্লি ফিরে গিয়ে তাঁর সেই প্রতিবেদন দাখিল করে থাকবেন। আরসার অস্তিত্বের মতো খুবই সংবেদনশীল কিছু বিষয়ে যে আরও বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়ার দরকার আছে, সেই সাংবাদিকের কাছে তা মনে হয়নি। গ্রহণযোগ্য রিপোর্ট সেটা হতে পারত মাইনিচির সাংবাদিক যদি আরসা যোদ্ধার বর্ণনা করা মিয়ানমারের গ্রামে গিয়ে আরও কিছু তথ্য সংগ্রহ করতেন। মনে হয়, সেই সাহস তিনি পাননি এবং বাংলাদেশের তুলনামূলক উন্মুক্ত পরিবেশের সুযোগ গ্রহণ করে দেশটিতে আরসার অস্তিত্বের কথা বিশ্বজুড়ে জানিয়ে দিয়েছেন।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

বাগদাদে জোড়া বোমা হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬, আহত ৯০

ইরাকের রাজধানী বাগদাদে সোমবার জোড়া বোমা হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। বাগদাদে তিন দিনের মধ্যে এটি এ ধরনের দ্বিতীয় হামলা। পূর্ব বাগদাদের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. আব্দেল গণি আল-সাদি জানান, এই হামলায় এখন পর্যন্ত ২৬ জন নিহত ও আরো ৯০ জন আহত হয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। জয়েন্ট অপারেশন কমান্ডের মুখপাত্র জেনারেল সাদমান বলেন, ‘বাগদাদের মধ্যাঞ্চলীয় তাইয়ারান স্কোয়ারে দুই আত্মঘাতী হামলাকারী শরীরে বেঁধে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়।’ তায়ারান স্কোয়ারে একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। দিনমজুররা প্রতিদিন ভোরে কাজের সন্ধানে এখানো জড়ো হয়। তাৎক্ষণিকভাবে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি। সাধারণত ইসলামিক স্টেট গ্রুপ ইরাকে এ ধরনের অধিকাংশ হামলা চালিয়েছে।

এবার এত ঠাণ্ডা পড়ল কেন?

বাংলাদেশে গত ৮ জানুয়ারির শীত ৫০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। সে দিন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা নামে ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে ১৯৬৮ সালে মৌলভীবাজারের চা-বাগান বেষ্টিত শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি ও জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর মেরিন অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক রিসার্চের প্যাসিফিক ইএনএসও অ্যাপ্লিকেশন ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান গবেষণা বিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধুরী এবার চরম ঠাণ্ডা কেন পড়েছে এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, দুর্বল লা-নিনা ও মেরু অঞ্চলের বায়ুপ্রবাহ এবারকার চরম ঠাণ্ডার জন্য দায়ী। তিনি বলেন, লা-নিনা হলে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি ঠাণ্ডা হয়, বেশি বৃষ্টি হয়। পূর্ব প্রশান্ত মহাসগারীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি নিচে নেমে গেলে এ ধরনের একটি ক্লাইমেট বা ওয়েদার এনোম্যালি হয়ে থাকে। এর প্রভাব সারা পৃথিবীতে এমনকি বাংলাদেশেও পড়ে। সে রকম একটি প্রভাব ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে লক্ষ করা যাচ্ছিল যেটা নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে প্রকটভাবে দেখা দেয়। এবারের লা-নিনাটি কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির। আমরা যদি ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের শক্তিশালী লা নিনার সাথে এবারেরটা তুলনা করি তাহলে দেখি যে, এবারেরটা তেমন শক্তিশালী নয়। তারপরও লা-নিনার যে স্বাভাবিক প্রভাব পড়ার কথা এবার সেটাই ঘটেছে; কিন্তু তারপরও প্রশ্ন উঠেছে, ‘এই দুর্বল লা-নিনার সময়ে এত ঠাণ্ডা পড়ল কেন? স্বাভাবিক লা-নিনার সময় তো এত ঠাণ্ডা পড়ে না।’ এ প্রসঙ্গে জলবায়ু বিজ্ঞানী রাশেদ চৌধুরী বলেন, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ার পেছনে বিশ্বের ক্লাইমেট বিশেষজ্ঞরা মেরু অঞ্চলের ঠাণ্ডা বায়ুপ্রবাহকে (আর্কটিক সার্কুলেশন) দায়ী করছেন। আর্কটিক সার্কুলেশনের কারণে শীতকালে আমেরিকার আলাস্কাতে প্রচুর তুষারপাত হয় এবং অনেক ঠাণ্ডা অনুভূত হয়; কিন্তু বিজ্ঞানীরা এবার লক্ষ করেছেন যে, এবার আলাস্কাতে সে রকম ঠাণ্ডা অথবা তুষারপাত হয়নি।
এবার আলাস্কাতে ঠাণ্ডা না পড়ে আমেরিকার মেইন ল্যান্ডে প্রচুর ঠাণ্ডা পড়েছে, তুষারপাতও হয়েছে। ফ্লোরিডার মতো জায়গায় যেখানে তুষারপাত হওয়ার কথা ছিল না সেখানেও এ বছর তুষারপাত হয়েছে। ক্লাইমেট বিশেষজ্ঞরা মেরু অঞ্চলের জেট স্ট্রিম এবং ভোরটেক্সকে (হিম শীতল বায়ুপ্রবাহ) ঠাণ্ডা পড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটা ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘুরে মেরু অঞ্চলের কাছে অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা বায়ুপ্রবাহ ধরে রাখতে সহায়তা করে। মেরু অঞ্চলের বিশাল এলাকার লঘুচাপ ও ঠাণ্ডা বায়ু গ্রীষ্মকালে দুর্বল হয়ে যায় এবং শীতকালে শক্তিশালী ও প্রসারিত হয়ে জেট স্ট্রিমের সাথে দক্ষিণ দিকে তাড়িত হয় ঠাণ্ডা বায়ুর সাথে। ২০০০ সাল থেকেই জেট স্ট্রিম দুর্বল এবং গতি ধীর হতে শুরু করে। যখন এ রকম ঘটে তখন মেরু অঞ্চলের বায়ু দক্ষিণ দিকে এবং কোনো কোনো সময় একেবারে দক্ষিণ দিকে নেমে যায়। চলতি জানুয়ারি মাসে চরম ঠাণ্ডা পড়ার পেছনে এটাও কারণ। এ রকম ঘটনা ২০১৪’র জানুয়ারি মাসেও ঘটেছিল এবং আরো পেছনে ১৯৮৯, ১৯৮২ এবং ১৯৭৭ সালে এমন ঘটনা ঘটে। রাশেদ চৌধুরী জানান, ‘অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে জেট স্ট্রিম দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।’ তাহলে বাংলাদেশে কেন শীত পড়েছে এ প্রশ্নের জবাবে রাশেদ চৌধুরী বলেন, ‘আর্কটিক সার্কুলেশনের প্রভাব তো আছেই, একই সাথে আমি বলব বাংলাদেশের তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ঘটার পেছনে জেট স্ট্রিম প্রবাহের প্রভাবও কাজ করছে। মেরু অঞ্চলের ঠাণ্ডা বায়ু সাইবেরিয়া থেকে তাড়িত হয়ে হিমালয়ে আঘাত করে এবং পরে হিমালয়ের পাশ দিয়ে এসে বাংলাদেশে আছড়ে পড়ে। আবার জেট স্ট্রিমের সাথে শীতকালীন লা-নিনার প্রভাবও আছে।’ বাংলাদেশ সব সময় এল-নিনো বা লা-নিনার দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত বলে রাশেদ চৌধুরী জানান। লা-নিনা সাধারণত এপ্রিল, মে অথবা জুন মাসে গঠিত হয় এবং আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসে সর্বোচ্চপর্যায়ে পৌঁছে; কিন্তু এবারের লা-নিনা শীতকালীন এবং এটা গঠিতই হয়েছে অক্টোবর মাসে। এ সময়ে গঠন হলে শীতকালটা সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের এবারের শীতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার অন্যতম কারণ এটা। ভবিষতে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশে আর কী প্রভাব পড়তে পারে এর উত্তরে রাশেদ চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ুর মডেলগুলো দেখাচ্ছে যে, আগামী দিনে এল-নিনো ও লা-নিনার ফ্রিকোয়েন্সি বেড়ে যাবে অর্থাৎ এল-নিনো ও লা-নিনা ঘন ঘন হতে পারে। এমন হলে গরমের সময় প্রচুর গরম পড়বে এবং শীতের সময় প্রচুর ঠাণ্ডা পড়বে। সে পূর্বাভাস থেকে বলা যায় যে, এ বছর যতটুকু ঠাণ্ডা পড়ার কথা এর চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা পড়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, আমেরিকায় যখন মানুষ ঠাণ্ডায় কাবু ঠিক একই সময়ে অস্ট্রেলিয়া গরমে পুড়ছে, মানুষ টিকতে পারছে না সেখানে। এল-নিনো ও লা-নিনা ঘন ঘন হওয়ার সময় পৃথিবীর কোনো এক জায়গায় প্রচুর ঠাণ্ডা হবে আবার একই সময় অন্য জায়গায় প্রচুর গরম পড়বে। অস্ট্রেলিয়াতে গত ৭ জানুয়ারির তাপমাত্রা ছিল ৪৭.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৮৩৯ সালের পর অস্ট্রেলিয়াতে এটা ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। ১৯১৮, ১৯৫৭, ১৯৮৮ ও ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাপী ফ্লু’র প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। ইনফ্লুয়েঞ্জার আক্রমণে বিশ্ব বিপর্যস্ত ছিল। এটা হয়েছে লা-নিনার পরের সময়টুকুতেই। অর্থাৎ লা-নিনা গঠনের পরের বছর ফ্লু’র আশঙ্কা থাকতে পারে।

বেলগ্রেডেও আঘাত হানবে উ. কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র!

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে বলেছেন, উত্তর কোরিয়া গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। বেলগ্রেড সফররত অ্যাবে সোমবার সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুচিচের সাথে সাক্ষাতে এ দাবি করেন।জাপানি প্রধানমন্ত্রী সার্বিয়াকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র বেলগ্রেডেও আঘাত হানতে সক্ষম। জাপানসহ আমেরিকার মিত্র দেশগুলো উত্তর কোরিয়াকে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে তারই অংশ হিসেবে শিনজো অ্যাবে এ দাবি করেছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু পিয়ংইয়ং বলছে, মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা যতদিন উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে উসকানিমূলক তৎপরতা অব্যাহত রাখবে ততদিন দেশটি নিজের সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী করতে থাকবে। সোমবার সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাতের পর জাপানি প্রধানমন্ত্রী এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আরো বলেন, সার্বিয়াসহ বলকান অঞ্চলের সবগুলো দেশের সাথে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে চায় টোকিও। তিনি সার্বিয়াসহ বলকান অঞ্চলের দেশগুলোকে বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ বলে অভিহিত করেন। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে কোরিয় উপদ্বীপে চলমান উত্তেজনা আলোচনার মাধ্যমে নিরসনের আহ্বান জানান সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুচিচ। জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে ইউরোপের ছয়টি দেশে ধারাবাহিক সফরের অংশ হিসেবে সোমবার সার্বিয়া সফর করেন। এর আগে তিনি এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও বুলগেরিয়া সফর করেন। মঙ্গলবার তার রুমানিয়া সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।

মিতব্যয়িতা কৃপণতা নয় by ইকতেদার আহমেদ

মিতব্যয়িতা ও মিতব্যয় উভয়ই বিশেষ্য। মিতব্যয়িতা অর্থ, প্রয়োজন মতো অথবা হিসাব করে ব্যয় করা। আবার পরিমিত ব্যয় কিংবা আয় বুঝে ব্যয় করার স্বভাবও মিতব্যয়িতা। মিতব্যয়িতার বিপরীত শব্দ অমিতব্যয়িতা। একজন ব্যক্তি অপব্যয়ের মাধ্যমে যখন অর্থ ব্যয় করে, তখন তাকে অমিতব্যয়ী বলা হয়। অপর দিকে অতিমিতব্যয়িতা কৃপণতা বা কার্পণ্যের সমার্থক। কৃপণ ব্যক্তি সব সময় প্রয়োজন মতো অর্থ ব্যয় থেকে নিজেকে দূরে রাখে। মিতব্যয়িতা একটি গুণ। মিতব্যয়ী ব্যক্তিকে সবাই পছন্দ করে। তিনি দেশ ও সমাজের জন্য ভালো ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত। জীবনে চলার পথে মিতব্যয়ী ব্যক্তিকে খুব কমই অর্থসঙ্কটের মুখাপেক্ষী হতে হয়। তার ব্যক্তি ও সংসার জীবন সচরাচর সুখময় হয়ে থাকে। অমিতব্যয়ী ব্যক্তি অর্থসঙ্কটে পড়লে অনেকটা দিশেহারা হয়ে যায়। এ সময় তাকে মূল্যবান সহায়সম্পদ বিক্রি করতে কোনোরূপ দ্বিধান্বিত হতে দেখা যায় না। অমিতব্যয়ী ব্যক্তির অপরিণামদর্শিতার কারণে জীবনের সূচনালগ্নে সচ্ছল ছিলেন, এরূপ ব্যক্তিকে মাঝ বয়সে বা বার্ধক্যে উপনীত হলে অর্থ সঙ্কটের কারণে দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে শেষ জীবন অতিবাহিত করতে দেখা যায়। অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে মানুষের মধ্যে তিন ধরনের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। এর একটি হলো মিতব্যয়িতা এবং অপর দু’টি অপব্যয়িতা ও কৃপণতা। ইসলাম ধর্মে অপব্যয় ও কৃপণতাকে নিরুৎসাহিত করে মিতব্যয়কে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলাম ধর্ম মতে, মিতব্যয়িতা একটি উত্তম কাজ এবং মিতব্যয়ী ব্যক্তিদের বলা হয় ‘মধ্যমপন্থী’। ইসলামের শিক্ষা হলো, কৃপণতা ও অপব্যয় নিন্দনীয় কাজ। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এমন অনেক সচ্ছল ব্যক্তি দেখা যায় মিতব্যয়িতার কারণে অনেকে যাদের কৃপণ হিসেবে আখ্যা দেয়ার প্রয়াস পান। দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের ত্রিশোর্ধ্ব বয়স নয়, এমন একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির নাম অ্যাডাম খো। তাকে ব্যবসায়িক কাজে প্রায়ই বিমানযোগে বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করতে হয়। তার মতো ব্যক্তির আর্থিক অবস্থান, সঙ্গতি ও সামাজিক মর্যাদাকে বিবেচনায় নেয়া হলে এরূপ ব্যক্তির বিমানের বিজনেস ক্লাশে ভ্রমণ করার কথা; কিন্তু তিনি বিমানে ভ্রমণকালে সব সময় ইকোনমি ক্লাসের যাত্রী হিসেবে যাতায়াত করেন। এত ধনী হওয়া সত্ত্বেও ইকোনমি ক্লাসে যাত্রার কারণে তাকে যখন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, প্রতিবারই তার উত্তর- ‘ইকোনমি ক্লাসে ভ্রমণের কারণেই আমি এখনো এ বয়সে সিঙ্গাপুরের বিশিষ্ট ধনীদের অন্যতম।’ অ্যাডাম খো প্রায়ই তার বন্ধুমহলে আলাপচারিতায় বলেন- ‘বিলাসিতার কোনো শেষ নেই। বিলাসিতা কখনো একজন ব্যক্তির তৃপ্তি শেষ করতে পারে না। যেমন আপনি একটি দামি ব্র্যান্ডের শার্ট কিনলেন, কেনা ও পরা অবধি আপনার আনন্দ।
এরপর কিন্তু আপনার অপর একটি ব্র্যান্ডের দামি শার্ট পছন্দ হবে, আপনি সেটিও কিনলেন এবং পরলেন, তারপর আরেকটা- তারপর আরেকটা- এটা আসলে কখনো নিঃশেষিত হয় না এমন একটি প্রবণতা।’ সুখ সব সময় তৃপ্তির মধ্যে নিহিত। বিলাসিতার আসলে কোনো শেষ নেই। কোনো বিলাসিতাই অতৃপ্ত ব্যক্তির তৃপ্তি শেষ করতে পারে না। অপর দিকে, একজন মিতব্যয়ী ব্যক্তি অল্পতেই তুষ্ট। আর এ তুষ্টির মধ্যেই তার জীবনের অন্তর্নিহিত সুখের গূঢ় রহস্য। অ্যাডাম খো তৃপ্তি বা সুখকে যে আঙ্গিকে দেখেন, তা বিবেচনায় নেয়া হলে তার আর্থিক সঙ্গতি সত্ত্বেও বিমানের ইকোনমি ক্লাসের ভ্রমণকে কৃপণতারূপে আখ্যা দেয়ার যুক্তি নেই। ঢাকায় বসবাসরত চল্লিশোর্ধ্ব বয়সের এক ব্যক্তি কলকাতার উপকণ্ঠে তার দূরসম্পর্কীয় এক আত্মীয়ের বাড়িতে গেলে দীর্ঘ আলাপচারিতার পর গৃহস্বামী তাকে কলকাতায় কয় দিন থাকবেন এ কথা জিজ্ঞেস করে বলেন, ‘আজ ঘরে তোমার কাকী মা নেই, তাই তোমাকে চা দিতে পারলাম না। আরেক দিন এসে চা খেয়ে যেও।’ ঢাকা থেকে আগত ব্যক্তি পরদিনই দেশে ফিরবেন- এ কথা জানালে ষাটোর্ধ্ব সেই গৃহকর্তা বললেন, তোমার কাকী মা চিনি যে কোথায় রেখে গেছে তাতো আমি জানি না। তা না হলে আমি নিজেই তোমাকে চা বানিয়ে খাওয়াতে পারতাম। ঢাকার ব্যক্তিটি যখন বললেন, তিনি ডায়াবেটিসের রোগী, চিনি ছাড়া চা খান, তখন কলকাতার ভদ্রলোক বললেন, ঘরে চা পাতাও নেই। আর দোকান থেকে চা পাতা আনতে গেলে যে সময় লাগবে সে সময় পর্যন্ত তো তুমি থাকবে না। আর তাই পরের বার কলকাতায় এলে চা না খেয়ে কিন্তু যেতে পারবে না।’ আমাদের ঢাকার ভদ্রলোক রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে, অভিমানে মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন- প্রায় দু’ঘণ্টা সময় ব্যয় করে এক শ’ রুপির কাছাকাছি অর্থ ব্যয় করে কাকার সঙ্গে দেখা করতে আসা। আবার এখান থেকে ফিরতেও সমপরিমাণ রুপি ও সময় ব্যয় হবে। তাই কাকা তোমাকে নমস্কার। আর কখনো আমাকে যেন এরূপ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। ঢাকার ভদ্রলোক কলকাতায় বসবাসরত তার কাকার কাছ থেকে চা পানের নামে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন এটি কৃপণতার জ্বলন্ত উদাহরণ। একটি দেশ ও সমাজে এরূপ কৃপণ ব্যক্তির যত বেশি আধিক্য পরিলক্ষিত হবে, সে দেশ ও সমাজ তত বেশি আন্তরিকতাবিহীন মনে করা যায়। বিগত শতকের ৫০ দশকের আগে সৌদি আরব ধনী দেশ ছিল না। সে সময় সৌদি আরব থেকে সেখানকার দরিদ্র জনমানুষ জীবিকার তাগিদে অর্থ উপার্জনের জন্য বিভিন্ন মুসলিম দেশে পাড়ি দিত। আমাদের এ দেশ তখন প্রথমত ব্রিটিশ এবং অতঃপর পাকিস্তানের শাসনাধীন ছিল। এ দেশের সাধারণ জনমানুষ বিশেষত গ্রামাঞ্চলের মানুষ সুদূর অতীত থেকে ধর্মপরায়ণ। সৌদি নাগরিকেরা নবীজীর দেশের মানুষ হওয়ায় এবং মুসলমানদের পুণ্যভূমি মক্কা ও মদিনার ছোঁয়ায় বেড়ে ওঠায় এ দেশের মানুষজন নিজেদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পরম স্নেহমমতায় তাদের আপ্যায়িত করতেন এবং বিদায়কালে তাদের হাতে কিছু অর্থ গুঁজে দিয়ে তাদের যাতায়াত ও জীবনযাপন এবং পুণ্যভূমির মসজিদের জন্য ব্যয়ের অভিলাষ ব্যক্ত করতেন। এ দেশের জনমানুষের ধর্মবিশ্বাসের কারণে প্রদত্ত অর্থের বেশির ভাগই যে তারা তাদের জীবনযাপনের পেছনে ব্যয় করতেন, এ কথাটি সে সময় আমাদের গ্রামের সাধারণ জনমানুষের উপলব্ধিতে না এলেও সময়ের পরিক্রমায় তা এখন এ দেশের মানুষ বুঝতে শিখেছে। অবশ্য, এখন আর তেলের বদৌলতে আর্থিক অবস্থার চরম উন্নতির কারণে তাদের আর আগের মতো উপলক্ষ নিয়ে আমাদের দেশে আসার আবশ্যকতা দেখা দেয় না। বরং আমাদের দেশ থেকে জীবিকার সন্ধানে হতদরিদ্র মানুষজন ভাগ্যোন্নয়নের আশায় সে দেশে পাড়ি জমায়। সে দেশের মানুষের জীবনযাপন বর্তমানে বিলাসিতায় পরিপূর্ণ। তারা নিত্য আহারের পর যা উচ্ছিষ্ট থাকে তা দিয়ে পৃথিবীর লাখো দুর্ভিক্ষ পীড়িতের দু’বেলা অন্নের সংস্থান সম্ভব; কিন্তু তাদের অনেকেই আজ এই বোধশক্তিবিহীন। সহজলভ্য অর্থের আতিশয্যে তারা মিতব্যয়িতা ও অমিতব্যয়িতার ফারাক বুঝতে অক্ষম। মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য অর্থ অপরিহার্য। মানুষ ভবিষ্যতে সুখে ও নির্বিঘ্নে জীবনযাপনের জন্য কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সঞ্চয় করে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, বৈধ ও হালাল পন্থায় যারা অর্থ উপার্জন করে আল্লাহ তায়ালার কাছে তাদের ইবাদত কবুল হয়। কুরআন ও হাদিসে অপব্যয় ও কার্পণ্য পরিহার করে মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য মুমিনদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। পবিত্র কুরআন মজিদে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন- ‘আর তোমরা খাবে ও পান করবে, কিন্তু অপচয় করবে না; নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ অপরাপর প্রধান ধর্মমতেও মিতব্যয়িতাকে প্রাধান্য দিয়ে অমিতব্যয়িতা ও কার্পণ্যকে বর্জনের কথা বলা হয়েছে। আর তাই ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে অর্থ ও সম্পদের অপচয় না করে প্রত্যেক মানুষের মিতব্যয়ী হওয়া কর্তব্য। অন্যান্য দিবসের মতো সমগ্র বিশ্বে আন্তর্জাতিকভাবে মিতব্যয়িতা দিবসও পালিত হয় প্রতি বছর। এ দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণে মিতব্যয়ী হওয়ার বিষয়ে আত্মসচেতনতা সৃষ্টি করা। ১৯২৪ সালে ইতালির মিলানে বিশ্বের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের প্রথম বিশ্ব কংগ্রেসে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দিবসটি পালন শুরু হয়। সেই থেকে বিভিন্ন দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দিবসটি পালন করে আসছে। আমাদের দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ জাতীয় সঞ্চয় পরিদফতর প্রতি বছর এ দিবসটি আড়ম্বরে সাথে পালন করে থাকে। অপচয় পরিহারপূর্বক মিতব্যয় হওয়ার অর্থ, কৃপণতা নয়। ইসলাম ধর্মে মিতব্যয়কে গুরুত্ব দিয়ে উৎসাহিত করা হলেও কৃপণতাকে তিরস্কার করা হয়েছে। এ বিষয়ে সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ পাক বলেন- ‘তুমি বদ্ধমুষ্টি হওয়া থেকে বিরত থাকো এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ে যেয়ো না; যদি তা হও, তবে তুমি তিরস্কৃত ও অনুতপ্ত (নিঃস্ব) হয়ে পড়বে।’ মিতব্যয়িতা একজন মানুষকে সফলতা এনে দেয়। রাসূল সা: তার সাহাবিদের মিতব্যয়িতার অভ্যাস তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ বিষয়ে রাসূল সা: এরশাদ করেন- ‘যে ব্যক্তি মিতব্যয়িতা অবলম্বন করে, আল্লাহতায়ালা তাকে ধনী বানিয়ে দেবেন, আর যে ব্যক্তি মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে গরিব বানিয়ে দেবেন।’ অমিতব্যয়িতার স্বভাব একবার গড়ে উঠলে তা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। অমিতব্যয়িতা পাপের কাজ ও মিতব্যয়ের পরিপন্থী। মিতব্যয়িতা মানুষকে অন্যায় পথে যাওয়া থেকে বিরত করে। অপর দিকে অমিতব্যয়িতা মানুষকে অন্যায় পথে চলতে ও অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনে উৎসাহ জোগায়। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য যে পরিমাণ ব্যয় প্রয়োজন, সে পরিমাণ ব্যয় করে অবশিষ্টাংশ সঞ্চয় করাই মিতব্যয়িতা। অনেকে এটা কৃপণতার সাথে তুলনা করে থাকেন। অথচ কৃপণতা হলো প্রয়োজনের সময়েও খরচ না করা। অপর দিকে মিতব্যয়িতা হলো প্রয়োজন যতটুকু, ততটুকু ব্যয় করা।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

নেতানিয়াহুর ভারত সফর : একই আদর্শ একই শত্রু

নেতানিয়াহু ও নরেন্দ্র মোদি বিশ্বব্যবস্থায় এমন একটি অংশীদারি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেনÑ যা হবে একচেটিয়া জাতীয়তাবাদী মনোভাব দ্বারা উৎসাহিত, বাছাই করা এবং অতীতের পৌরাণিক কাহিনীর আদর্শে অনুপ্রাণিত। নরেন্দ্র মোদি একমাত্র ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, যিনি ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো ইসরাইল সফর করেছেন এবং ইহুদিবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও আধুনিক ইসরাইলের আধ্যাত্মিক গুরু থিওডোর হার্জেলের সমাধি পরিদর্শন করেন। ৬৭ বছরের পুরনো এ জায়গাটিতে একটা কালো মার্বেলের চূড়ায় ছোট পাথর বসানো আছে, যা জেরুসালেমের মাউন্ট হার্জেল নামে পরিচিত। এ দিকে ১৪ জানুয়ারি নেতানিয়াহু দ্বিতীয় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত সফর করছেন। দিল্লির মহাত্মা গান্ধী স্মৃতিস্তম্ভ পরিদর্শন করবেন তিনি; যদিও ইসরাইল ও ভারতের প্রতিষ্ঠাতা জনকদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য ছিল। এটি সত্যিই এক বিস্ময় যে, ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছে ইসরাইল। গান্ধী ক্রমাগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিবাদী কার্যক্রমে সমর্থন দেয়া থেকে বিরত ছিলেন। জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন চালানোর ফলে ১৯৩৮ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য আলাদা দেশ গঠনের যে ডাক দেয়া হয় তা থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেন গান্ধী, যা ভারতের ‘হরিজন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমার সহানুভূতি সব ইহুদির জন্য।’
তিনি আরো লিখেছিলেনÑ ‘কিন্তু আমার সহানুভূতি ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা থেকে আমাকে দূরে সরাতে পারবে না। ইহুদিদের জন্য আলাদা দেশ গঠনের উদ্যোগ তাই আমার কাছে কোনো আবেদন তৈরি করে না। এই শাস্তির কথা বাইবেলেই উল্লেখ করা হয়েছে।’ তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বাইবেলে উল্লিখিত ধারণা ভৌগোলিক সীমা নির্দেশ করে না। তাই তারা যদি ভৌগোলিক কারণে ফিলিস্তিনে তাদের দেশ গঠনের উদ্যোগ নেয়, তবে ব্রিটিশদের ছত্রছায়ায় এমন পদক্ষেপ হবে সত্যিকারের ভুল। ধর্মীয় কার্যক্রম অস্ত্র কিংবা বোমার সাহায্যে চলতে পারে না। একমাত্র আরবদের সম্মতিতেই তারা ফিলিস্তিনে স্থায়ী হতে পারে।’ গান্ধীর এমন মনোভাব পরিবর্তনের জন্য পরবর্তী বছরগুলোয় কমপক্ষে চারজন ইহুদিবাদী উকিল ভারত সফর করে তাদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। ১৯৪৬ সালে গান্ধী লিখেছেনÑ ‘আমার মতে, ইহুদিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সহায়তায় ফিলিস্তিনে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ার সুযোগ খুঁজেছে এবং এখন নগ্ন সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে তা করে যাচ্ছে।’ ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি, ভারতের স্বাধীনতার ছয় মাস পর হিন্দু উগ্রবাদীরা গান্ধীকে খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। তার এই মনোভাব ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে আরো কয়েক দশক ধরে প্রভাবিত করতে পারত। যদিও দিল্লি ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় ১৯৫০ সালে; কিন্তু পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে ১৯৯২ সালে। ২০০৩ সালে অ্যারিয়েল শ্যারন প্রথম ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত সফর করেন।
ক্ষমতামুখী বিজেপি উত্থান
হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরপরই দেশ দু’টির সম্পর্কের উন্নয়ন একেবারে কাকতালীয়। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিজেপি ১৯৮২ সালে পার্লামেন্টে মাত্র দু’টি আসন পেলেও ১৯৯১ সালে ১২০ আসন পায় এবং ১৯৯৯ সালে নিশ্চিত করে ১৮২টি আসন। তাদের এই উত্থান হয়েছে তীব্র মুসলিমবিদ্বেষী অবস্থানের কারণে। এর একটি বড় উদাহরণ, ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা। বলা হয়ে থাকে, দেবতা রামের জন্মস্থানে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। পালাবদলের ধারাবাহিকতায় বিজেপি ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে। ওই বছরেরই মে মাসে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। অন্য অনেক বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে নেতানিয়াহুও মোদিকে অভিন্দন জানান এবং একই সাথে বাণিজ্যের দুয়ার খুলে যায় দুই দেশের মধ্যে। মোদি নির্বাচিত হওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যেই ইসরাইল ভারতে ৬৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অস্ত্র রফতানি করে, যা ভারতে ইসরাইলের গত তিন বছরের মোট রফতানির চেয়েও বেশি। ইসরাইল সফরের সময় হার্জেলের সমাধিতে মোদির শ্রদ্ধা জানানো নেতানিয়াহুকে খুশি করেছে। তাই নেতানিয়াহুও তার ভারত সফরে গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভে যাওয়ার ব্যাপারে একটু বেশিই আগ্রহী, যদিও মহাত্মা গান্ধীকে মোদি খুব কমই পছন্দ করেন। কেননা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি যে কাজটি শুরুতেই করেছেন, তা হলো- বিনায়ক দামোদর সাভারকারের প্রতিকৃতিতে সম্মান জানিয়েছেন। এ প্রতিকৃতিটি ভারতীয় পার্লামেন্টের মূল সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে, গান্ধীর স্মৃতিস্তম্ভ তার ঠিক উল্টো পাশেই অবস্থিত। ২০০৩ সালে বিজেপির উদ্যোগেই ওই প্রতিকৃতিটি স্থাপন করা হয়।
ভারতের হার্জেল
সাভারকার খুবই বিতর্কিত ব্যক্তি ছিলেন। তাকে বলা যেতে পারে ভারতের হার্জেল। তিনিই মূলত ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধারণার প্রবর্তন করেছেন। গান্ধী যেখানে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, সেখানে সাভারকার চেয়েছেন হিন্দুদের আদি বাসস্থান বা ‘হিন্দুস্তান’ প্রতিষ্ঠা করতে। তার মতে, হিন্দু তারাই যারা ভারতকে তাদের মাতৃভূমি ও পবিত্র ভূমি হিসেবে গণ্য করে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভারতে হাজার বছর ধরে বসবাস করা ২০ কোটি খ্রিষ্টান ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য টিকে থাকাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও এই পবিত্র মন্দির বা কুঠি ভারতের সর্বত্রই দেখা যায়। তিনি কড়াভাবেই বলতেন, তাজমহল ভারতের মাটিতে বিদেশী সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। উগ্র হিন্দুরা বলেন, ভারতের মাটিতে তাজমহলের ঠাঁই হবে না। সভারকার গান্ধীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধীই শুধু নন, গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে তার বিশেষ অনুগামী ছিলেন এবং গান্ধীকে হত্যার এক সপ্তাহ আগে সাভারকারের সাথে তার দুইবার সাক্ষাৎ হয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন, নাথুরাম গডসে শুধু হুকুম তামিল করেছেন, মূল হোতা ছিলেন সাভারকার। এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে সাভারকারসহ তাদের কয়েক হাজার হিন্দু জাতীয়তাবাদী জেলও খেটেছেন, যদিও হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণ করা যায়নি। নাথুরাম হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলের অঙ্গসংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ আরএসএসের আজীবন সদস্য ছিলেন। এ সংগঠনের রাজনৈতিক শাখাই বিজেপি। নরেন্দ্র মোদি ও তার সরকারের অনেক মন্ত্রী ছোটবেলা থেকেই আরএসএসের সদস্য।
একই লক্ষ্য
সাভারকার ও হার্জেল মূলত জাতীয়তাবাদী ধারণা ও পৌরাণিক ইতিহাসের সমর্থক হিসেবে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এই মিলই বর্তমানে দুই দেশকে একই সমতলে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ২০০৩ সালে বিজেপি শ্যারনকে যেসব কথা বলে স্বাগত জানিয়েছিল, তার ভিত্তিতেই এই পথচলা। বিজেপি সেই স্বাগত বক্তব্যে বলেছিল, ‘পুরো বিশ্ব স্বীকার করে, ইসরাইল কার্যকর ও নির্মমভাবে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাস মোকাবেলা করেছে। বহু আগে থেকেই ভারত ও ইসরাইল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। কাজেই এ ক্ষেত্রে একে অপরের কাছ থেকে শেখার অনেক কিছুই আছে। সম্ভবত এটিও আশ্চর্যের বিষয় যে, ইসরাইল এখন ভারতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। পুরোপুরি কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের বছর ১৯৯২ সালে উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য যেখানে ছিল ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সেখানে ২০১৬ সালে এসে তা দাঁড়ায় ৪ বিলিয়ন ডলারে, যার একটি বড় অংশই অস্ত্র ব্যবসায়। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গাজায় পরীক্ষা চালানো ইসরাইলের তৈরী ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি চুক্তির ব্যাপারে আবার আলোচনা করতে গত বৃহস্পতিবার ভারত সম্মত হয়েছে। তবে এটি নিশ্চিত, সিদ্ধান্তে রদবদল যাই হোক, চুক্তিটি যেন হয়ে যায় তাই এক সপ্তাহ আগেই কাজ শুরু হয়। নেতানিয়াহু যদি চান তাহলে দুই দেশের ব্যবসায় আরো সম্প্রসারিত হবে। এই সফরে তিনি একা নন, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘দ্য ক্রিম ডি লা ক্রিম’সহ কম করে হলেও ১০২টি ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এসেছেন তার সাথে। যা হোক, ইসরাইলের ইহুদিবাদী ও ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা যখন একই বিশ্বাসের অনুসারী হয় তখন দুই দেশের মধ্যে গভীর সম্পর্ক স্থাপনে নেতানিয়াহুর যে স্বপ্ন, তা একমাত্রিকও সহজ হয়ে যায়। ইসরাইল যখন সারা বিশ্বে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, সেখানে কারো অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক স্বার্থ আদায় করার জন্য ভারত খুবই জটিল একটি দেশ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইরান ভারতের একটি বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, তাই দিল্লিও চাইবে না মুসলিম দেশটি তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াক আর পাকিস্তানের মতো শত্রুদেশ ক্ষেপে যাক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক দেশ এবং দেশটির ২০ কোটি মুসলমানের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ। জানুয়ারি মাসেই মোদির নিজ এলাকা গুজরাটের নির্বাচনে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি স্পষ্ট বার্তা পেয়েছে, চলতি পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তারা যা খুশি তাই করতে পারে না। তাই জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতের সাম্প্রতিক ভোট দেয়াও বিস্ময়ের বিষয় নয়। হ
লেখক : হল্যান্ডের সাংবাদিক। ২০ বছর ধরে লেবাননে বসবাস করছেন। তিনি ‘২০০০ সন্ত্রাসী’ প্রামাণ্যচিত্রের নির্দেশকদের একজন। তিনি প্রায়ই ভারত সফর করেন এবং ১৯ শতকের লেখকেরা প্রাচ্যকে কিভাবে তুলে ধরেছেন, সে বিষয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী।
‘মিডল ইস্ট আই’ থেকে ভাষান্তর করেছেন মো: সাজেদুল ইসলাম

সোনালি দিনের প্রতীক্ষায় - দুই by ড. গাজী মো: আহসানুল কবীর

সরকার বিনামূল্যে পঠ্যপুস্তক বিতরণ করে থাকে। অবশ্যই ভালো উদ্যোগ; কিন্তু এ উদ্যোগের সুফল শিক্ষার্থী বা অভিভাবকেরা কতটুকু পাচ্ছেন?
কারণ চার-পাঁচ শ’ টাকার বইয়ের সেট বিনামূল্যে পেলেও স্কুল থেকে দেয়া দীর্ঘ তালিকার অন্য বইগুলো কিনতে নাকি অভিভাবকদের ঠিকই এর দু-তিন গুণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষে এটি খুবই অনৈতিক কাজ। একধরনের অসাধু বই ব্যবসায়ীর যোগসাজশেই এসব করা হয়। স্কুলের সরবরাহ করা তালিকার অপ্রয়োজনীয় বই কেনার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারলে বরং বিনামূল্যে বই সরবরাহ না করলেও চলত। তাতেও অভিভাবকদের অনেক অর্থে সাশ্রয় হতো। এ দিকে, বিনামূল্যে বইয়ের পেছনে ব্যয় করা জাতীয় কোষাগারের শত শত কোটি টাকাও বেঁচে যেত। এ দেশের কর দাতাদের করের বোঝাও কিছু কমতো। এ প্রোগ্রামের বিকল্প হিসেবে শুধু নিডি বা অভাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই সরবরাহ করা যায়। এ নিড প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষই স্বচ্ছতার সাথে নির্ধারণ করতে পারে।  আমাদের দেশে সম্প্রতি শিশুদের ওপর এক বাড়তি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা চাপানো হয়েছে। তা হলো শিশু বয়সেই পাবলিক পরীক্ষার দৌরাত্ম্য। যে প্রাইমারি সমাপনী (পিইসি) এবং জুনিয়র সেকেন্ডারি সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা দুটোর প্রবর্তন করা হয়েছে, অনেক বিশেষজ্ঞই তার বিরোধিতা করছেন। সবার যুক্তি হলো- এ সার্টিফিকেট দুটো দিয়ে কী হবে? ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণীতে ভর্তিই তো; এর অতিরিক্ত কিছু তো নয়। সেটি তো আগে যেভাবে ছিল তাতেই বেশ ভালোভাবে চলছিল।
এ পরীক্ষা দুটোর কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়েই তীব্র মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণীর ১১-১২ বছরের শিশুদের জন্য এ চাপ খুবই ক্ষতিকর। তা ছাড়া শুধু কোচিং বাণিজ্যের সম্প্রসারণই নয়, চাকরিজীবী মা-বাবার জন্য সময় এবং অর্থ দুটোরই বাড়তি চাপ সইতে হচ্ছে। এত অসুবিধা ও স্খলনের বিপরীতে এ পরীক্ষা দুটো থেকে কোনোই প্রাপ্তি নেই। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে অন্তত আটটি শিক্ষা কমিশন হয়েছে। কয়েকটি কমিশনের সুপারিশ ছিল প্রাইমারি শিক্ষাস্তরকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সম্প্রসারণ। শেষ পর্যন্ত এ সম্পর্কিত কোনো কমিশনের প্রস্তাবই বাস্তবায়ন হয়নি। এর কারণ হলো- এটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিশাল কর্মযজ্ঞ, সাথে ব্যাপক অপচয়সংশ্লিষ্টতা তো আছেই। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের হাজার হাজার হাইস্কুলের প্রতিটিতে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত তিনটি শ্রেণিকক্ষ অব্যবহৃত পড়ে থাকবে, জড়িত শিক্ষকেরা হবেন অতিরিক্ত। সুতরাং হতে হবে ছাঁটাই। আবার এক লাখ প্রাইমারি স্কুলের প্রতিটিতে কমপক্ষে তিনটি করে শ্রেণিকক্ষ এবং সাথে আরো কিছু প্রয়োজনীয় কক্ষ ও অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়বে। লাগবে আসবাবপত্রসহ অন্যান্য উপকরণ। প্রয়োজন হবে বিপুলসংখ্যক (কয়েক লাখ) শিক্ষক নিয়োগ। এসব কাজে লাগবে কয়েক লাখ কোটি টাকা, যা কয়েকটি জাতীয় বাজেটের সমপরিমাণ অর্থ। এ ছাড়া সময় আর বিরাট কর্মযজ্ঞের ব্যবস্থাপনার দক্ষতার কথা না-ই বা বললাম। কিন্তু এতসবের পরও এবারের (২০১৩ এর) শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট অনুসারে প্রাইমারি শিক্ষা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করার কাজকর্ম শুরু করে দেয়া হয়েছে। অবশ্য এখন পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারি ছাড়া তেমন কোনো বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয়নি। অনেকের মতে, এত বিপুল ব্যয়বহুল পরিবর্তনটির মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মানে কি কোনো পরিবর্তন আসবে? নাকি সময় পেরোতে থাকবে, আর আমরা সেই পুরনো আবর্তেই আটকে থাকব? তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে যে সমস্যাটি, তা হলো প্রশ্নপত্র ফাঁস। গত কয়েক বছরে এটি রীতিমতো মহামারী আকারে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে তছনছ করে দিচ্ছে। পাবলিক পরীক্ষা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সাময়িক পরীক্ষা অর্থাৎ এমন কোনো পরীক্ষা নেই যার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে না। অথচ কোনোভাবেই এ প্রবণতা রোধ করা যাচ্ছে না। স্থানীয় থেকে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ সবাই যেন অসহায়। এর ফল দাঁড়াচ্ছে, ধীরে ধীরে পড়ালেখার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এ প্রবণতা জাতীয় জীবনে কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে তা কাউকে বলে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করে যাওয়া উচিত। এত প্রতিবন্ধকতার তোড়ে আমরা আসলে এগোতে পারছি না। অর্জনের চেয়ে হারাচ্ছি বেশি। সময় হারাচ্ছি, হারাচ্ছি মেধা। শিক্ষার গুণগত মান আমাদের বাড়ছে না। সেটি প্রাইমারি-সেকেন্ডারি হোক আর কারিগরি বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে হোক। যদি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেই বলি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটকে তার স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে নিই তবে স্বীকার না করে কোনো উপায় নেই যে, পঞ্চাশ-ষাট বা সত্তর দশকে গুণগত মানের তুঙ্গে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান আজ প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন দুনিয়া কাঁপানো জ্ঞান তাপস অধ্যাপক সত্যেন বোস, জ্ঞান ঘোষ বা ড. শহীদুল্লাহ প্রমুখরা পড়াতেন সেখানে আজ কিছু শিক্ষক ক্লাসরুম চর্চার চেয়ে রাজনীতি আর কনসালট্যান্সি নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন বলে শোনা যায়। ক’জনার জন্য পুরো শিক্ষকসমাজ ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে। তারা যদি শিক্ষার্থী আর দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি একটু করুণা করে ফুলটাইম রাজনীতি বা কনসালট্যান্সিতে মনোনিবেশ করতেন তাহলে দেশ ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক উপকৃত হতো। একই কথা প্রযোজ্য স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও। শিক্ষক সংগঠনের নামে অনেকেই রাজনীতির অঙ্গনে নিয়মিত বিচরণ করেন।
এর মধ্যে আবার পত্রিকার পাতায় আর্থিক অনিয়ম ও চারিত্রিক স্খলনের কিছু সংবাদও দেখা যায়। শিক্ষকতা পেশাটি তো অন্য পেশা থেকে ভিন্ন। এটি পেশা নয়- নেশা, একটি দায়িত্ব, স্রষ্টার এক বিরাট অর্পণ। ষাটের দশকে আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন কুমিল্লার চাঁদপুরে মতলব হাইস্কুলের অনেক নাম-ডাক ছিল। এ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রায়ই সমগ্র ইস্ট পাকিস্তান বোর্ডে প্রথম স্থানসহ মেধা তালিকায় অনেকেই থাকত। প্রাইমারি ও এমই স্কলারশিপেরও বেশির ভাগ স্থান এ স্কুলের ছাত্রদেরই দখলে থাকত। এর পেছনে বড় ভূমিকা ছিল সে স্কুলের হেডমাস্টার শ্রদ্ধেয় ওয়ালিউল্লাহ পাটোয়ারীর। তিনি সারা দিন স্কুলে পড়িয়ে, মনিটর করে আবার সন্ধ্যায় হারিকেন হাতে বেরোতেন গ্রামের অন্ধকার পথ ধরে। ছাত্রদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখতেন কে কে পড়ছে, কী পড়ছে। কী নিষ্ঠাবান, নিজের সব কিছু উজাড় করে দেয়া এক কিংবদন্তি শিক্ষক। একইভাবে ফেনী পাইলট হাইস্কুলের হেডমাস্টার জালাল উদ্দীনসহ অনেকের নাম আমরা শুনতাম। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রসরতার জন্য এমন আত্মনিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকেরই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। কবি গোলাম মোস্তফার মতো জ্ঞানী স্কুলশিক্ষক, অর্থনীতির ড. এ আর মল্লিক, প্রফেসর মাহমুদ হোসেন, বাংলার অধ্যাপক আবুল ফজল, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, পদার্থবিদ্যার প্রফেসর ইন্নাস আলী, ড. মতিন চৌধুরী, রসায়নের প্রফেসর মোকারম হোসেন খোন্দকার ও প্রফেসর মফিজ উদ্দিন আহম্মদ, গণিত বা পরিসংখ্যানের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, বুয়েটের চিরভাস্বর উপাচার্য প্রফেসর এম এ রশিদ বা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর মুহাম্মদ ইব্রাহীম, নুরুল ইসলাম এবং জি এম চৌধুরীসহ আরো অনেকে ছিলেন এ দেশের শিক্ষাজগতের কিংবদন্তি গুরু বা আলোকবর্তিকা। এসব মহাপুরুষের কয়েক দশকের দাপুটে বিচরণের পর আমাদের দেশের শিক্ষাজগৎ যেন এখন সব হারিয়ে রীতিমতো খাঁখাঁ করেছে, অসম্ভব খরায় ভুগছে। যে কারণে আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। এতে তারা উপকৃত হচ্ছে। উপকৃত হচ্ছে সেসব দেশগুলোও; কিন্তু আমরা হারাচ্ছি মেধা। কী হারে মেধা হারাচ্ছি তার হিসাব নিয়ে কেউ যদি বসতেন তাহলে চোখ কপালে উঠে যেত। এ লেখাটি যখন শেষ করছি তখনই চোখ কপালে ওঠার মতো একটি খবর দেখলাম সকালের পত্রিকার শিরোনামে। একাধিক পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ডিআইএ’র অফিসারদের এক অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী নাকি বলেছেন ‘ঘুষ খান। তবে সহনীয় পর্যায়ে খাবেন। খাবেন না, এ কথা বলছি না, কারণ এ কথা বলার সাহস আমার নেই।’
কত অধৈর্য হয়ে একজন মন্ত্রী তার অধস্তন কর্মকর্তাদের এ ধরনের উপদেশ দিতে পারেন! আবার অন্য এক অফিসার সম্পর্কে তিনি বলেছেন ওই অফিসার পরিদর্শনে যাওয়ার আগে পাঁচটি স্কুলে খবর পাঠিয়েছেন যে, ওই পাঁচ স্কুলের পিয়ন থেকে শুরু করে হেডমাস্টার পর্যন্ত সবার এক মাসের নেট বেতনের সমপরিমাণ অর্থ যেন তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়। এ অফিসারকে তিনি শেষ পর্যন্ত দুদকে সমর্পণ করে দিয়েছেন। ডিআইএ’র আরেক অফিসার সম্পর্কে বলতে গিয়ে মন্ত্রী জানিয়েছেন- তিনি নাকি চাকরিজীবনের এ অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ১৩টি বাড়ির মালিক বনে গেছেন। মন্ত্রীর এসব কথাতেই বোঝা যায় শিক্ষা বিভাগে দুর্নীতি কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে শুধু এটুকুই বলা যায়, ‘আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।’ তবে সব কিছুকে ছাড়িয়ে চমকের শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে যে খবরটি তা হলো ‘চলন্ত সিড়ি’। হ্যাঁ, শিক্ষাঙ্গন সম্পর্কিত এ খবরটি শতাব্দীর সেরা কৌতুকে পরিণত হয়েছে। খবরে প্রকাশ, দেশের ২৬৩টি বিদ্যালয়ে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘এসক্যালেটর’ অর্থাৎ চলন্ত সিড়ি নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে অনেক বিদ্যালয়ে দেয়ালের পলেস্তারা নেই, দরজা-জানালা ঠিক নেই, এমনকি নেই ন্যূনতম স্যানিটেশন ব্যবস্থা বা শৌচাগার, পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই, শিশুদের পরনে ঠিকমতো কাপড় নেই সেখানে নিচতলা থেকে দোতলা বা তিনতলায় উঠতে এসক্যালেটর স্থাপনের প্রস্তাব কোন যুক্তিতে করা হলো বা একনেকে পাস পর্যন্ত হয়ে গেল, তা বোধগম্য নয়। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলেছেন- এটি হলো লুঙ্গির সাথে টাই পরে ছবি তোলার মতো হাস্যোদ্দীপক বিষয়; কিন্তু কথা হলো, জাতির কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকা অপচয় করার অধিকার যেমন কারো নেই, তেমনি এ নিয়ে হাস্যকৌতুকও মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সময়মতো বোধোদয় হবে, এটিই সবার কাম্য। এত বাধাবিপত্তি-নীতিহীনতা-উদ্যোগ আর পরিকল্পনার বিশাল অভাব কাটিয়ে কবে আবার এ দেশের শিক্ষাক্ষেত্র প্রোজ্জ্বল আলোকবর্তিকার আলোকিত সোপান বেয়ে অগ্রসর হবে, সে শুধু ভবিতব্যই জানে। তবে এটি নিশ্চিত, জাতি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার একটিই পথ তা হলো মজবুত শিক্ষা। ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের দেশটির ভূখণ্ড খুবই ছোট অথচ জনসংখ্যা বিপুল। নেই কোনো প্রাকৃতিক সম্পদও। সম্বল হলো প্রত্যেকের দুটো করে হাত আর অর্জনের পথ শিক্ষা। তাই শিক্ষাই হওয়া উচিত আমাদের প্রথম মনোযোগ। চলার পথ হতে হবে পরিকল্পিত, নিখাদ ও স্বচ্ছ। আর থাকতে হবে ঝাঁপিয়ে পড়ার মনোভাব। কারণ, আমরা হাল ছাড়ছি না। হতাশও হবো না। রক্তঝরা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে জাতি স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে, স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে সে জাতি কি আবারো একইভাবে জেগে উঠতে পারে না? পারে না উজ্জীবিত হয়ে আলোকিত জ্ঞানের পথ ধরে চলতে? যেন বিশ্বদরবারে সবাই একই সুরে বলে ওঠে- এই তো চাই। ছোট্ট অথচ প্রবল ইচ্ছাশক্তির অধিকারী বাংলাদেশের মতো আমরা সেই সোনালি দিনের প্রতীক্ষায়। তবে বসে থেকে নয়, এগিয়ে যেতে হবে সচেষ্ট উদ্যোগ নিয়ে, দৃপ্ত পদক্ষেপে চার দিকে তোলপাড় করে এবং রীতিমতো প্রলয় ঘটিয়ে।
লেখক : অধ্যাপক, রসায়ন ও সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

বসনিয়াকে অস্থিতিশীল করতে গোপন আঞ্চলিক সার্ব বাহিনী গঠন

গত শুক্রবার বসনিয়ার অনলাইন সংবাদমাধ্যম জুরনালের এক খবরে সার্বস্কি পোনস (সার্বিয়ার মর্যাদা) নামে একটি আধা সামরিক বাহিনীর অস্তিত্বের কথা প্রকাশ করা হয়েছে। পত্রিকাটি বলেছে, সার্বিয়ার নিস শহরে রাশিয়ার একটি কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিয়েছে এই বাহিনীর সদস্যরা। যার অর্থ হচ্ছে সার্বিয়া ও রাশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে এই বাহিনী। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সার্ব অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সার্বস্কা রিপাবলিকার প্রেসিডেন্ট ও বসনিয়ান সার্ব ন্যাশনালিস্ট পার্টির নেতা মিলোরাড দোদিক এই বাহিনী তৈরি করেছেন বলে বলা হচ্ছে। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার য্দ্ধুাবসানের ডেটন চুক্তির অধীনে সার্বস্কা রিপাবলিকা অঞ্চলটিকে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়। স্বাধীন রাষ্ট্র বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার দু’টি প্রধান অঞ্চল বসনিয়ান মুসলিম ও ক্রোয়েট অধ্যুষিত অঞ্চলটির নাম বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ফেডারেশন, আর সার্ব অধ্যুষিত অঞ্চল সার্বস্কা রিপাবলিকা। সার্বস্কাকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করে রাশিয়া ও সার্বিয়া। শুক্রবারই বসনিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ড্রাগান মেকতিক ও সার্বস্কা রিপাবলিকার আঞ্চলিক পার্লামেন্টের বিরোধী দলের নেতা সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন, তাদের আঞ্চলিক সরকারের অধীনে একটি আধা সামরিক বাহিনী গঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। জুরনাল নিউজের সাংবাদিক অ্যাডভো অ্যাডভিক তার অনুসন্ধানে জানতে পেরেছেন, এই আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা রাশিয়া ও সার্বিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এমনকি কিছু কিছু সদস্য ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধও করেছে। এই গ্রুপটির সদস্যরা সার্বস্কা রিপাবলিকার তথাকথিত রাষ্ট্রীয় দিবসে গত ৯ জানুয়ারি আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছে। বসনিয়ার শীর্ষ আদালত কর্তৃক এমন আয়োজনকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলেও আঞ্চলিক সরকার তা অগ্রাহ্য করেই দিবসটি উদযাপন করেছে। আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অনেকেই অতীতে অপরাধের সাথে জড়িত ছিল।
রুশ সংযোগ
বলকান অঞ্চলের ন্যাটো সদস্য তালিকার দিকে তাকালে দেখা যাবে, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রিস, আলবেনিয়া, মন্টেনিগ্রো, ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া সদস্য হয়েছে এই জোটের। মেসিডোনিয়া, বসনিয়া কসোভো ও সার্বিয়া আছে ন্যাটোর বাইরে। সার্বিয়া আগেই জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ন্যাটোতে যোগ দিতে রাজি নয়। ১৯৯৫ ও ’৯৯ সালে তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ায় ন্যাটোর বোমা বর্ষণের ঘটনা থেকেই দেশটি ন্যাটো বিমুখ হিসেবে পরিচিত। তবে অন্য তিনটি দেশ আগ্রহী ন্যাটোর সদস্য হতে। বসনিয়ার সাবেক একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্রাসেলসে জুলাই মাসে পরবর্তী সম্মেলনে বসনিয়া ন্যাটোর ‘সদস্য কার্যক্রম পরিকল্পনা’ পেতে যাচ্ছে। যেটি হবে সদস্যপদ লাভের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ। বসনিয়ার ন্যাটো জোটে যোগদানের বিরোধিতা করছে সার্বস্কা রিপাবলিকা, এ জন্য তারা রাষ্ট্রীয় সামরিক সম্পদের নিবন্ধনের বিরোধিতাও করে আসছে। মূলত বসনিয়ার এই অঞ্চলটি শুরু থেকেই রাশিয়া ও সার্বিয়াপন্থী হিসেবে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট দোদিকসহ অঞ্চলটির অনেক নেতাই মস্কোপন্থী। ইতোমধ্যে তারা ন্যাটোতে যোগদানের বিষয়ে গণভোট আয়োজনের ধারণা দিয়ে আসছে। বসনিয়ার ন্যাটোতে যোগদান নিয়ে স্বস্তিতে নেই রাশিয়াও। বলকান অঞ্চরে রাশিয়ার অনধিকার চর্চার এটিই প্রথম উদাহরণ নয়। ২০১৬ সালে অক্টোবরে মন্টেনিগ্রোতে বেশ কয়েকজন রুশ ও সার্বিয়ান নাগরিককে গ্রেফতার করা হয় সরকারবিরোধী অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের দায়ে। গ্রেফতারদের মধ্যে ছিলেন সার্বিয়ার সাবেক এক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাও। মন্টেনিগ্রোর ন্যাটোতে যোগ দেয়া ঠেকাতেই ওই অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। তবে তা সত্ত্বেও গত বছর জুনে ন্যাটোর সদস্যপদ লাভ করেছে দেশটি। সেই সাথে মরে গেছে সেখানে নৌঘাঁটি স্থাপনের রুশ স্বপ্ন। গত বছর মেসিডোনিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়েও হস্তক্ষেপ করেছে রাশিয়া। রুশ গুপ্তচর ও কূটনীতিকেরা দেশটিতে অস্থিতিশীল করতে চেষ্টা করছিল। একই সাথে তারা রাশিয়াপন্থীদেরও সমর্থন করে। মিলোরাড দোদিক ও তার অনুসারীদের সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া। এই সম্পর্ক কতটা গভীর তা অচিরেই জানা যাবে। আগামী অক্টোবরে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ নির্বাচন। বসনিয়ানদের মধ্যে ক্ষোভ আছে ক্রিমিয়া ও দক্ষিণ অসেটিয়ায় রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন নিয়ে। বিদেশী হস্তক্ষেপ দেশটিকে আবারো অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। সূত্র : আলজাজিরা

উবার-পাঠাওসহ অ্যাপসভিত্তিক পরিবহনসেবার অনুমোদন

অবশেষে বৈধতা পেল অ্যাপসভিত্তিক পরিবহনসেবা উবার-পাঠাও। এ জন্য ‘রাইডিং শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালার’ খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সোমবার ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই নীতিমালার খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নীতিমালায় ‘ট্যাক্সি ক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন, ২০১০’ অনুযায়ী ভাড়ার হার নির্ধারিত হবে। পাঠাও সার্ভিসের মতো মোটরসাইকেলের মাধ্যমেও এই সেবা দেয়া যাবে। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করলে সনদ বাতিলসহ প্রচলিত আইনে শাস্তি পাবে। বাংলাদেশে প্রথম ২০১৬ সালের ৮ মে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ চালু হয়। ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস’ এমন একটি পরিবহনসেবা ব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তিগত মোটরযানের মালিক নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে অবসর সময়ে স্মার্টফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটভিত্তিক অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে ব্যক্তিগত মোটরযানকে ভাড়ায় পরিচালনা করে থাকেন। সভা শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানান, রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট’-এর জন্য অনলাইনে বিআরটিএ বরাবর আবেদন করতে হবে। রাইড শেয়ারিং মোটরযান এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য দেয়া হবে। মেয়াদ শেষে তা নবায়ন করা যাবে। বর্তমানেও এ ধরনের সেবা কার্যক্রম চলছে। এটি আইনি কাঠামোয় আনতে নীতিমালা করা হচ্ছে।