Wednesday, April 16, 2025

ইসরায়েলের ‘শত্রু’ নেতানিয়াহু, তাকে কারাগারে পাঠানো উচিত : সাবেক সেনাপ্রধান

ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান দান হালুটজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘এই শত্রুর স্থান হওয়া উচিত কারাগারে।’

সোমবার (১৪ এপ্রিল) ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দান হালুটজ বলেন, একজন শত্রু আছেন, যিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। তার নাম বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি আরও বলেন, এই শত্রুকে হত্যা নয়, বন্দি করা উচিত।

হালুটজের এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, এটি একটি গুরুতর উসকানি, যা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং চরম বামপন্থিদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর হত্যার ডাককে উৎসাহিত করে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আইডিএফের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যর্থ চিফ অব স্টাফ দান হালুটজ প্রধানমন্ত্রীকে শত্রু হিসেবে অভিহিত করে তাকে বন্দি করার দাবি জানাচ্ছেন। এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, বরং ভয়ানক উসকানি।

দান হালুটজের এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইসরায়েলি সেনা সদস্য ও সাবেক সেনাদের মধ্যে গাজায় আটক ইসরায়েলি বন্দিদের ফেরত আনা এবং যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে জনমত বাড়ছে।

গত ১৮ মার্চ ইসরায়েল আবারও গাজায় হামলা শুরু করে, যা ১৯ জানুয়ারির যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় চুক্তিকে ভেঙে দেয়। অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৫১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

এছাড়া, গত নভেম্বর মাসে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গালান্টের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। একইসঙ্গে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলাও চলছে।

দান হালুটজের এমন সাহসী ও স্পষ্ট মন্তব্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে অনেকেই মনে করছেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে চলমান যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দেশটির ভেতর থেকেই বিরোধী কণ্ঠ আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

সূত্র : আনদোলু এজেন্সি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত



৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ইসরায়েলের

ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের হাতে থাকা জিম্মি মুক্তির বিনিময়ে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে ইসরায়েল। একইসঙ্গে এ প্রস্তাবে ১০ জন ইসরায়েলি জিম্মির বিনিময়ে কয়েকশ ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তির কথাও বলা হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর ও কাতার যৌথভাবে এ প্রস্তাব ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামীদের সংগঠন হামাসের কাছে পাঠিয়েছে।

সংবাদমাধ্যম এএফপি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জিম্মি মুক্তির বিনিময়ে সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে ইসরায়েল। তবে এতে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির গ্যারান্টি অন্তর্ভুক্ত নেই। হামাস যোদ্ধারা এখন প্রস্তাবের শর্তগুলো পর্যালোচনা করছেন বলে গোষ্ঠীটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন।

হামাসের ওই কর্মকর্তা এএফপিকে বলেছেন, ইসরায়েলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দি, যুদ্ধ বন্ধ, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যহ্যার এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশের বিনিময়ে সকল জিম্মিদের মুক্তি দিতে প্রস্তুত হামাস। তবে ওই কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যে, যুদ্ধবিরতির অগ্রগতিতে বাধা দিচ্ছে ইসরায়েল।

তিনি বলেছেন, বিষয়টি বন্দিদের সংখ্যার সঙ্গে জড়িত নয়, বরং দখলদারদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার সঙ্গে জড়িত। তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে এবং যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরও বলেছেন, ইসরায়েল আগেও ‍যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রতারণা করেছে, তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। আবারও তারা প্রতারণা করবেনা এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য দখলদার ইসরায়েলের কাছে যুদ্ধবিরতির চুক্তি বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে হামাস।

ওই কর্মকর্তার মতে, প্রস্তাবে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির জন্য একটি প্রাথমিক কাঠামোর রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। হামাস স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চায়। তবে তারা ইসরায়েলের সাময়িক যুদ্ধবিরতির এই প্রস্তাব মেনে নিতে পারে। কারণ, এই সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষ স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনা করতে পারবে।

সোমবার ইসরায়েলি সংবাদ ওয়েবসাইট ইয়নেট জানিয়েছে, হামাসের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চুক্তির অধীনে, ইসরায়েল দ্বিতীয় পর্যায়ের যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনায় অংশ নেবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চয়তার বিনিময়ে সংগঠনটি ১০ জন জীবিত জিম্মিকে মুক্তি দেবে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় তাঁবুতে থাকছেন মানুষ। ছবি : সংগৃহীত
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় তাঁবুতে থাকছেন মানুষ। ছবি : সংগৃহীত



ইরান-যুক্তরাষ্ট্র: এই বাঘ-বন্দি খেলায় জিতবে কে? by পাপলু রহমান

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ও সামরিক ইস্যু হচ্ছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে ইরান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিশেষ করে ইসরাইল, ইরানের সম্ভাব্য পরমাণু অস্ত্র অর্জনকে একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ সংঘাত এক নতুন মোড় নিয়েছে—যেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি ও সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি শুরু হয়েছে কূটনৈতিক সংলাপ।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ইতিহাস: শান্তিপূর্ণ না সামরিক?

১৯৫০ সালের দিকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। পশ্চিমা মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তাদের এ প্রযুক্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনামলে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে রিয়্যাক্টর নির্মাণে চুক্তিও হয়। লক্ষ্য ছিল মূলত শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে জ্বালানি উৎপাদন।

কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব সবকিছু পাল্টে দেয়। শাহের পতনের পর রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে পশ্চিমারা ইরানের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। পরমাণু প্রকল্পগুলোর আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ইরান নিজের মতো করে প্রযুক্তি উন্নয়ন শুরু করে, যা ধীরে ধীরে গোপনীয়তা ও সন্দেহের জন্ম দেয়।

২০০২ সালে আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের নাতাঞ্জ ও আরাক পরমাণু কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের খবর সামনে আসে। এরপর থেকেই শুরু হয় পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ, আর ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা।

২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি এবং উত্তেজনা

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ছয় পরাশক্তির (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানি) সঙ্গে ইরান ২০১৫ সালে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির মাধ্যমে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ সীমায় রাখতে সম্মত হয় এবং সর্বোচ্চ ৩০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ করতে পারে। হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং দেশটি আবার বৈশ্বিক তেলবাজারে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে আসে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, চুক্তি ইরানকে ব্যালিস্টিক মিসাইল উন্নয়ন বা মধ্যপ্রাচ্যে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। ফলে আবার শুরু হয় উত্তেজনা।

ইরানের সামরিক সক্ষমতা: হুমকি না প্রতিরক্ষা?

বর্তমানে ইরান দাবি করছে তারা ৯০০-রও বেশি ধরনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিজেরা তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে ড্রোন, ব্যালিস্টিক মিসাইল, সাইবার যুদ্ধ প্রযুক্তি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, এগুলো শুধুই প্রতিরক্ষার জন্য। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী এটি রাজনৈতিক চাপে ব্যবহার হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখন আর আগের মতো দুর্বল নয়। একদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া, লেবানন (হিজবুল্লাহ), ইরাক ও ইয়েমেনে প্রভাব—সব মিলিয়ে তারা একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন কেবল সামরিক সমাধান নয়, আলোচনার পথেও আগ্রহী।

সাম্প্রতিক আলোচনার প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি ওমানের রাজধানী মাসকটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। এ বৈঠককে বিশ্লেষকরা ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ ২০১৮ সালের পর এই প্রথম এত উচ্চ পর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো।

বৈঠকটি সরাসরি না হলেও ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষভাবে দুপক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হয়। ইরানের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এই আড়াই ঘণ্টার বৈঠকে দুই পক্ষই আলোচনার পরিবেশকে ‘শান্ত ও ইতিবাচক’ বলে উল্লেখ করে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ বৈঠকে কোনো ছবি তোলা হয়নি এবং আলোচনায় সরাসরি মুখোমুখি হয়নি দুপক্ষ—এটি ইরানের কট্টরপন্থীদের চাপে নেওয়া কৌশল। তবে উভয়পক্ষই স্বল্পমেয়াদে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং ১৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই দাবি করে আসছে, ইরান যদি চায় তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানায়, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে এবং তা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গেলে এটি অস্ত্র-মানের হবে। এই আশঙ্কাই মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার আলোচনায় টানছে।

তাদের ভয়, একদিন হঠাৎ করেই ইরান গাজা বা ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। আর এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল বৈশ্বিক তেলবাজারে নেমে আসবে ধস, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে।

ইরানের অবস্থান: হুমকি নাকি আত্মরক্ষা

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনির উপদেষ্টারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, যদি ইরানকে বাধ্য করা হয় বা আক্রমণের হুমকি দেওয়া হয়, তাহলে তারা আত্মরক্ষার্থে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তারা বারবার বলে এসেছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, তবে আত্মরক্ষার জন্য তারা যেকোনো কিছু করতে পারে।

এই বার্তা যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিচ্ছে—ইরান আলোচনায় আগ্রহী, কিন্তু ভয় দেখিয়ে তাদের থেকে কিছুই আদায় করা যাবে না।

যুদ্ধ নাকি সমঝোতা

বিশ্ব আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা, পরমাণু শক্তির কাছাকাছি অবস্থান, এবং আঞ্চলিক প্রভাব। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তা ও বিশ্ব নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইছে। ফলে, দুপক্ষই বুঝতে পারছে সামরিক সংঘাত হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।

এজন্যই হয়তো আজ ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি ছাপিয়ে আলোচনা টেবিলে ফিরেছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। বিশ্ববাসী এখন অপেক্ষা করছে—এই বাঘ-বন্দি খেলায় জয়ী হবে কে? 

সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হয়েছে কূটনৈতিক সংলাপ। ছবি: সংগৃহীত
সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হয়েছে কূটনৈতিক সংলাপ। ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলি আগ্রাসন: গাজায় নিহত ৫১ হাজার ছাড়াল - নেতানিয়াহু বললেন, ‘আরও আঘাতের’ শিকার হবে হামাস

ফিলিস্তিনের গাজায় প্রায় ১৮ মাস ধরে চলা ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় কমপক্ষে ৫১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ কথা জানায়। এদিকে জিম্মি মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েলের দেওয়া যুদ্ধবিরতির নতুন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল জানায়, ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় আরও ১৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৬৯ জন। এ নিয়ে গত ১৮ মার্চ ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে নতুন করে হামলা শুরুর পর গাজায় ১ হাজার ৬৩০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৩০২ জন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের হামলার জবাবে ওই দিনই গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এরপর গাজায় এ পর্যন্ত ৫১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৩৪৩ জন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি ও স্থাপনার ধ্বংসস্তূপে এখনো ১০ হাজারের বেশি মরদেহ পড়ে আছে। ভারী উদ্ধার সরঞ্জামের অভাব এবং রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ও অব্যাহত হামলার কারণে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে না পারায় এসব দেহাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে ১১ জিম্মির মুক্তির বিনিমিয়ে গাজায় ৪৫ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতির নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইসরায়েল। মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এক বিবৃতিতে হামাস জানিয়েছে, প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে সংগঠনটি। যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানানো হবে।

যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যেতে হামাস এখনো তাদের মূল দাবিতে অটল রয়েছে। হামাসের দাবি, গাজায় যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ হতে হবে এবং সেখান থেকে ইসরায়েলের সব সেনা প্রত্যাহার করে নিতে হবে।

এর আগে হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সামি আবু জুহরি রয়টার্সকে বলেন, ইসরায়েলকে শত্রুতা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে, হামাসের এই দাবি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে পূরণ হয়নি।

এ ছাড়া নতুন প্রস্তাবে ইসরায়েল প্রথমবারের মতো পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানিয়েছে।

গাজায় গিয়ে নেতানিয়াহু বললেন, ‘আরও আঘাতের’ শিকার হবে হামাস

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় বিরল সফর করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মঙ্গলবার তিনি এ সফর করেন বলে জানিয়েছে তাঁর কার্যালয়। এমন সময় নেতানিয়াহু গাজা সফর করলেন, যখন উপত্যকাটিতে নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মঙ্গলবার উত্তর গাজা সফর করেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। টাইমস অব ইসরায়েলের খবর অনুযায়ী, গাজা সফরে গিয়ে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘আরও আঘাতের’ শিকার হবে হামাস।

ইসরায়েলি সেনাদের ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি পোস্ট দেখান নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইরানের নেতা আবারও ইসরায়েলকে ধ্বংসের আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সময়ও তিনি একই কাজ করছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। পরে ১৯ জানুয়ারি উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। ১৮ মার্চ সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারও ব্যাপক হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। তখন থেকে গাজার বড় অংশ দখল করেছে তারা। হামলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে আবারও বাড়িঘর ছেড়ে পালানো শুরু করেছেন ফিলিস্তিনিরা।

নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, একমাত্র সামরিক চাপ দিয়েই হামাসের হাতে বন্দী জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দেওয়া ইসরায়েল সরকারের হিসাবে, ২৫১ জিম্মির মধ্যে গাজায় এখনো ৫৮ জন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ২৪ জন জীবিত আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত শিশুর মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। গতকাল গাজার খান ইউনিসে নাসের হাসপাতালে
ইসরায়েলি হামলায় নিহত শিশুর মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। গতকাল গাজার খান ইউনিসে নাসের হাসপাতালে। ছবি: রয়টার্স

ইউরোপ কি ট্রাম্পের এই হুমকি বুঝতে পারছে by মারিয়েত্যে শাখে ও ম্যাক্স ফন থুন

ইউরোপের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখা যাচ্ছে, তাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত এই হুমকির প্রকৃত রূপটি বোঝা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু অর্থনৈতিক মিত্র হিসেবে ধরে রেখে প্রতিযোগিতার যে বর্তমান কৌশল ইউরোপ অনুসরণ করে আসছে, তা থেকেও তাদের সরে আসা উচিত।

সত্যিকারের প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য ইউরোপকে কেবল প্রতিযোগিতা ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী কৌশলের পথে হাঁটতে হবে।

গত কয়েক বছরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিসংক্রান্ত আইন পাস করার পর এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন উদ্ভাবন বাড়াতে এবং প্রতিযোগিতা জোরদার করতে চাইছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাগির ২০২৪ সালের প্রভাবশালী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইউরোপীয় কমিশন সম্প্রতি প্রকাশ করেছে কম্পিটিটিভনেস কম্পাস। এটি দ্রাগির সুপারিশ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ।

প্রতিযোগিতা নিয়ে ইউরোপের বাড়তে থাকা উদ্বেগের মূল কারণ হলো মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের সঙ্গে বাজারে সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারা। দ্রাগির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের উৎপাদনশীলতার পার্থক্য অনেকটাই ইউরোপের প্রযুক্তি খাতের দুর্বলতার কারণে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন এবং প্রযুক্তি কমিশনার হেনা ভিরকুনেনের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নীতিনির্ধারকেরা দ্রাগির বার্তাকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন এবং এখন ইউরোপের প্রযুক্তিনীতির কেন্দ্রে প্রতিযোগিতাকে বসিয়েছেন।

কিন্তু এই একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনকার প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে যথেষ্ট নয়, বরং ক্ষতিকরও হতে পারে। প্রতিযোগিতায় মনোযোগ দেওয়া ইউরোপীয় অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর বিগ টেক কোম্পানিগুলোর প্রভাব কমাতে পারে; আবার একইভাবে তাদের আধিপত্য আরও মজবুতও করতে পারে।

ইউরোপীয় নেতারা এখন যে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার দিকে ঝুঁকছেন (দ্রাগির প্রতিবেদনের মাধ্যমে যার গতি আরও বেড়েছে), তা নীতিনির্ধারণকে বড় বড় কোম্পানির লবির কাছে আরও বেশি দুর্বল করে তুলছে এবং এমন কিছু নীতিকে বৈধতা দিতে পারে, যেগুলো ইউরোপীয় মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে খাপ খায় না।

ফলে ইউরোপীয় কমিশনের এই নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার উদ্যোগ, যেমন প্রস্তাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও গোপনীয়তা আইন স্থগিত রাখা, জিডিপিআরসহ প্রযুক্তি আইন সরলীকরণের ঘোষণা—এসব পদক্ষেপ বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেই বেশি সুবিধা দেবে, নতুন উদ্যোগ বা ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোকে নয়। একই সঙ্গে ‘এআই প্রতিযোগিতা’ নিয়ে ইউরোপের তাড়াহুড়া করা এবং সমালোচনাহীন দৃষ্টিভঙ্গি বিগ টেকের এআই প্রযুক্তিতে কর্তৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

দ্রাগি প্রতিবেদনে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার যে এজেন্ডা তুলে ধরা হয়েছে, তা সিলিকন ভ্যালিতে উষ্ণভাবে গ্রহণ করা হয়েছে—এমনকি ইলন মাস্ক নিজেও এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তবে কিছু প্রযুক্তি নেতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ফেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাস্কের এক্স (আগে যা ছিল টুইটার) ও স্টারলিংক ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন ও ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর প্রভাব বিস্তার, আর ট্রাম্প প্রশাসনের ইউরোপীয় প্রযুক্তি নীতিমালার ওপর প্রকাশ্য আক্রমণ—এসবই প্রমাণ করে, বিগ টেকের ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে ইউরোপের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও ওয়াশিংটনের তাদের মিত্রদের ক্রমবর্ধমান হুমকি থেকে নাগরিকদের অধিকার, সার্বভৌমত্ব ও মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষা করা। ইউরোপ এখন যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল (যেমন সেমিকন্ডাক্টর, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাবমেরিন কেব্‌ল ইত্যাদি), তা শুধু ইউরোপের প্রতিযোগিতার ক্ষমতাকেই দুর্বল করে না, বরং স্থানীয় বিকল্পগুলোর পথও রুদ্ধ করে দেয় এবং এই অবকাঠামোর মালিকেরা এটিকে লাভের জন্য ব্যবহার করতে পারে।

আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই প্রযুক্তিনির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও কিছু বড় কোম্পানিকে ইউরোপের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার ওপর অস্বাভাবিক ক্ষমতা দিয়ে দেয়। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে ইউরোপীয় প্রযুক্তি খাতের বিকাশে বাধা দেওয়া হতে পারে—উন্নত চিপ সরবরাহ সীমিত করে বা ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের প্রবেশাধিকারকে হালকা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে শর্তযুক্ত করে।

এ ধরনের চাপ থেকে ইউরোপকে রক্ষা করা হলে তা শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতাকেই বাড়িয়ে তুলবে। প্রতিযোগিতা আইন এবং ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট কঠোরভাবে প্রয়োগ করা গেলে বিগ টেকের প্রভাব কমবে এবং ইউরোপীয় স্টার্টআপ ও নতুন চ্যালেঞ্জারদের বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। একইভাবে ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইন (এআই অ্যাক্ট) বাস্তবায়ন করলে ক্ষতিকর কনটেন্ট ও বিপজ্জনক এআই সিস্টেম থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা যাবে এবং ইউরোপ সিলিকন ভ্যালির নজরদারিভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেলের একটি প্রকৃত বিকল্প দিতে পারবে।

এ প্রেক্ষাপটে ইউরোপের নিজস্ব বিকল্প ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ সম্প্রতি গতি পেয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ‘ইউরোস্ট্যাক’ নামের প্রকল্প, যা ইউরোপের স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার সক্ষমতা রক্ষার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত। ক্রমাগত অস্থির হয়ে উঠতে থাকা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সার্বভৌমত্ব মানে শুধু প্রতিযোগিতা নয়—এটা নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও আত্মনির্ভরতার ব্যাপার। তাই ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের উচিত প্রতিযোগিতার বিষয়টি অন্য—এবং প্রায়ই আরও গুরুত্বপূর্ণ—লক্ষ্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখা।

সৌভাগ্যক্রমে ইউরোপকে এমন কঠিন পছন্দ করতে হবে না। প্রযুক্তিগত নির্ভরতা দূর করে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা রক্ষা করে এবং মৌলিক অধিকার বজায় রেখে ইউরোপ সে ধরনের প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে পারে।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

* মারিয়েত্যে শাখে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার পলিসি সেন্টারে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী পরিচালক

* ম্যাক্স ফন থুন ওপেন মার্কেটস ইনস্টিটিউটে ইউরোপ ও ট্রান্স–আটলান্টিক অংশীদারত্ব–বিষয়ক পরিচালক।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধ বন্ধের শর্তে ইসরাইলের সকল জিম্মির মুক্তি দেবে হামাস

গাজায় যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা পেলে জিম্মিদের মুক্তি দেয়ার কথা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সোমবার সংগঠনটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, হামাস বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে সকল ইসরাইলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে প্রস্তুত হামাস। এক্ষেত্রে ইসরাইলকে যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে হবে বলে জোর দিয়েছেন তিনি। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। এতে বলা হয়, মিশরের রাজধানী কায়রোতে কাতারের মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করছে হামাস। এছাড়া মিশর ও কাতারের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করছে।

হামাসের ওই কর্মকর্তা এএফপিকে বলেছেন, ইসরাইলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দী, যুদ্ধ বন্ধ, গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যহ্যার এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশের বিনিময়ে সকল জিম্মিদের মুক্তি দিতে প্রস্তুত হামাস। তবে ওই কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যে, যুদ্ধবিরতির অগ্রগতিতে বাধা দিচ্ছে ইসরাইল। তিনি বলেছেন, বিষয়টি বন্দীদের সংখ্যার সঙ্গে জড়িত নয়, বরং দখলদারদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার সঙ্গে জড়িত। তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে এবং যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরও বলেছেন, এ জন্য দখলদার ইসরাইলের কাছে যুদ্ধবিরতির চুক্তি বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে হামাস।  

সোমবার ইসরাইলি সংবাদ ওয়েবসাইট ইয়নেট জানিয়েছে, হামাসের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। চুক্তির অধীনে, ইসরাইল দ্বিতীয় পর্যায়ের যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনায় অংশ নেবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চয়তার বিনিময়ে সংগঠনটি ১০ জন জীবিত জিম্মিকে মুক্তি দেবে।

যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ ১৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়। তখন একাধিক জিম্মি-বন্দী বিনিময় করে উভয় পক্ষ। দুই মাস না যেতেই একতরফাভাবে চুক্তি ভঙ্গ করে গাজায় পুনরায় হামলা শুরু করে ইসরাইল। রোববার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে কমপক্ষে ১,৫৭৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মোট মৃতের সংখ্যা  দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৯৪৪ জনে।

ইসরাইলি হামলায় আরও ৩৯ ফিলিস্তিনির মৃত্যু, নিহত ৫১ হাজার ছুঁই ছুঁই

গাজা উপত্যকায় দিন দিন হামলা জোরালো করছে ইসরাইলি বাহিনী। গত ২৪ ঘণ্টায় উপত্যকাটিতে হামলা চালিয়ে ৩৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তারা। এতে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৫১ হাজারে পৌঁছেছে। সোমবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। এ খবর দিয়ে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু বলছে, হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ অক্টোবর হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৫০ হাজার ৯৩৮ ফিলিস্তিনি। যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এছাড়া সর্বশেষ হামলায় আতহ হয়েছেন ১১৮ জন। আহতদের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এতে মোট আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৭৪ জনে। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এখনও বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। ইসরাইলি বাহিনীর তৎপরতার ফলে তাদের কাছে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারছে না। প্রায় ১৫ মাস যুদ্ধ চলার পর জানুয়ারিতে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইসরাইল। যার প্রথম ধাপ শেষ না হতেই গত ১৮ মার্চ একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভঙ্গ করে পুনরায় হামলা শুরু করেছে ইসরাইলি বাহিনী। দিন দিন তাদের হামলা জোরদার করা হচ্ছে। এসময়ের মধ্যে এক হাজার ১৩ জন নিহত ও চার হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। জানুয়ারির যুদ্ধবিরতির আওতায় উভয় পক্ষই কিছু বন্দি মুক্তি দিয়েছে। গত নভেম্বরে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। পাশাপাশি তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এছাড়া ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগও রয়েছে। যদিও তা তোয়াক্কা না করেই উপত্যকাটিতে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব।

এদিকে ফিলিস্তিনি সরকারের তথ্যের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে মৃতের সংখ্যা ৬১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বলেছে, এখনও হাজারের ওপর ফিলিস্তিনি নিখোঁজ। ধারণা করা হচ্ছে তারা নিহত হয়েছেন। 

mzamin

গোপন তথ্য ফাঁস, শিন বেতের কর্মকর্তা আটক, তদন্ত, ইসরাইলে তোলপাড়

ইসরাইলের আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতে তোলপাড় চলছে। সাংবাদিক এবং একজন মন্ত্রীর কাছে গোপন তথ্য ফাঁস করার অভিযোগে শিন বেতের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। চলছে তার বিরুদ্ধে তদন্ত। একে ‘ডিপ স্টেট তদন্ত’ অভিহিত করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সরকারে থাকা জোটসঙ্গীরা। আইনজীবীদের মতে, ফাঁস হওয়া তথ্যগুলি হামাসের ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের হামলার সমসাময়িক ব্যর্থতার বিষয়ে শিন বেটের তদন্তের অপ্রকাশিত অংশগুলির সাথেও সম্পর্কিত। এ ঘটনা রাজনৈতিক মহল, দেশের নিরাপত্তা ও বিচার ব্যবস্থার মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ইতিমধ্যেই অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারভ-মিয়ারা এবং শিন বেটের প্রধান রোনেন বারকে বরখাস্ত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তার সঙ্গে সর্বশেষ এই ঘটনা যুক্ত হয়ে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইসরাইল। এতে  মঙ্গলবার বলা হয়েছে, সাংবাদিক এবং একজন মন্ত্রীর কাছে গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগে শিন বেট নিরাপত্তা সংস্থা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সোমবার থেকে এ বিষয়গুলো গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

লিকুড এমকে দলের ট্যালি গটলিভ এবং আভিহাই বোরন আংশিক বিবরণ টুইট করেন। ফলে মামলার তত্ত্বাবধানকারী বিচারক তদন্তের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে প্রত্যাহার করেন। এই তদন্ত শিন বেত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিষেবা এবং বিচার মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পুলিশ তদন্ত বিভাগ (ডিআইপিআই) দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। আদালত গ্রেপ্তারকৃত শিন বেত কর্মকর্তার নাম প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। তবে ওই ব্যক্তিকে কেবল হিব্রু অক্ষর ‘আলেফ’ দ্বারা শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ফাঁস হওয়া তথ্যের অভিযুক্ত প্রাপকদের শনাক্ত করার উপর প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তাদের নামকরণ করা হয়েছে প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি, চ্যানেল ১২-এর সাংবাদিক অমিত সেগাল এবং ইসরায়েল হায়োমের প্রতিবেদক শিরিত আভিতান কোহেন। পুলিশ বাহিনীতে ক্রমবর্ধমান ‘কাহানিবাদ’ সম্পর্কিত তদন্তের তিনটি তথ্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শিন বেত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়টি অতি-ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের আওতাধীন। আলেফের আইনজীবীদের মতে, ফাঁস হওয়া তথ্য শিন বেতের ৭ অক্টোবরের তদন্তের সাথেও সম্পর্কিত- যা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। কাহানিজম হলো চরম-ডানপন্থি নেতা রাব্বি মীর কাহানে অনুপ্রাণিত মতাদর্শ। রাব্বি মীর কাহানে নেসেটের সাবেক সদস্য ছিলেন। ১৯৯০ সালে নিউইয়র্কে এক আততায়ীর হাতে মৃত্যুর আগে নিষিদ্ধ অতি-জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী কাচের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

বেন গভিরের অতি-ডানপন্থী ওজমা ইয়েহুদিত দলকে কাহানে প্রতিষ্ঠিত নিষিদ্ধ বর্ণবাদী কাচ দলের উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়, যদিও বেন গভির দাবি করেছেন, তিনি তার মতামত সংযত করেছেন। ক্ষুব্ধ জোট সদস্যরা বলেছেন, তদন্ত আরও প্রমাণ করে যে শিন বেত প্রধান রোনেন বারের পদে থাকা উচিত নয়। কিছু মন্ত্রী দাবি করেছেন, এটি বার এবং বাহারভ-মিয়ারা সহ- সরকারকে উৎখাতের জন্য ডিপ স্টেট ষড়যন্ত্রের প্রমাণ। প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভা গত মাসে বারকে বরখাস্ত করার পক্ষে ভোট দেয় এবং বাহারভ-মিয়ারাকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। হাইকোর্ট বারের বরখাস্ত সাময়িকভাবে স্থগিত করে।

এক্স-এ এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি বলেছে, রোনেন বার এবং বাহারভ-মিয়ারার অধীনে শিন বেত ‘সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে, হুমকি দিয়ে একজন পুলিশ অফিসারকে ব্ল্যাকমেইল করে এবং জোটের মন্ত্রী এবং নেসেট সদস্যদের বিরুদ্ধে নিরর্থক রাজনৈতিক তদন্ত শুরু করে। সবকিছুই করার উদ্দেশ্য হলো রোনেন বারের বরখাস্ত রোধ করা। প্রধানমন্ত্রীর দল অভিযোগ করেছে যে, রোনেন বার এবং বাহারভ-মিয়ারা নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অংশকে ডিপ স্টেট মিলিশিয়ায় পরিণত করেছেÑ  যা আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে ক্ষুন্ন করে। লিকুদ পার্টি বলেছে, রাজনৈতিক তদন্ত অবিলম্বে শেষ করা উচিত। বারকে তার পদ ছেড়ে দেয়া উচিত। বলা হয়েছে, শিন বেতে যেসব সদস্য কাজ করেন তাদের প্রয়োজন আলাদা একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এই বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করা হয়নি, নেতানিয়াহু তার ব্যক্তিগত এক্স অ্যাকাউন্টে লিকুদ পার্টির বিবৃতি শেয়ার করেছেন।

শিন বেট প্রধান রোনেন বারের পদত্যাগের পরিকল্পনা: টাইমস অব ইসরাইলের রিপোর্ট

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেটের প্রধান রোনেন বার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ করছেন। এ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে রিপোর্ট দিয়েছে ইসরাইলের চ্যানেল ১২। তাদেরকে উদ্ধৃত করে অনলাইন টাইমস অব ইসরাইল বলছে, গত সপ্তাহে হাইকোর্ট অব জাস্টিস একটি অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত বারকে অবশ্যই পদে বহাল থাকতে হবে। গত মাসে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে বরখাস্ত করার চেষ্টা করেন। এ  বিষয়ে আইনি বিরোধের একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য সরকার এবং অ্যাটর্নি জেনারেলকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। তবে, চ্যানেল ১২ জানিয়েছে- বার পদত্যাগ করতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন যে, চলমান লড়াই শিন বেটের জন্য বিরাট ক্ষতি করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার আগামী সপ্তাহে আদালতে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য জমা দেবেন। আশা করা হচ্ছে যে, তিনি চিঠিতে তার উদ্দেশ্য এবং পদত্যাগের তারিখ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করবেন। নেতানিয়াহু মার্চ মাসে বারকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেন এই বলে যে, তিনি তার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এই পদক্ষেপটি ইসরাইলি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেকর্ড গড়েছে। তা হলো সরকার দেশীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানকে বরখাস্ত করেছে। তবে, এই পদক্ষেপের বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, বারকে পদ থেকে অপসারণে নেতানিয়াহুর স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে। কারণ শিন বেট প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিযে যাচ্ছে। সমালোচকরা আরও বিস্তৃতভাবে নেতানিয়াহুকে ৭ অক্টোবর, ২০২৩ সালে ইসরাইলের উপর হামাসের হামলার জন্য বারকে বলির পাঁঠা বানানোর চেষ্টা করার অভিযোগ করেন, অথচ নিজেই দায় এড়িয়ে যান। শিন বেট প্রধান বার বলেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ করার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

mzamin


মালদ্বীপে ইসরাইলি প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিলাসবহুল দ্বীপপুঞ্জে ইসরাইলিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে মালদ্বীপ। এ বিষয়ে মঙ্গলবার পার্লামেন্টে একটি আইন অনুমোদিত হয়। তার পর তাতে সাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজু। ফলে এটি এখন আইনে পরিণত হলো। এর ফলে ইসরাইলি পাসপোর্টধারী কোনো ব্যক্তি মালদ্বীপে প্রবেশ করতে পারবেন না। প্রেসিডেন্টের কার্যালং থেকে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই অনুমোদন ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইলের অব্যাহত নৃশংসতা এবং গণহত্যার বিরুদ্ধে (মালদ্বীপ) সরকারের দৃঢ় অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মালদ্বীপ ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার দৃঢ় সংহতি পুনর্ব্যক্ত করে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইসরাইল। প্রেসিডেন্ট মুইজুর অফিসের এক মুখপাত্র বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে কার্যকর করা হবে। কৌশলগত অবস্থানে থাকা ১,১৯২টি প্রবাল দ্বীপের একটি ছোট ইসলামী প্রজাতন্ত্র মালদ্বীপ। তার নির্জন সাদা বালুকাময় সৈকত, অগভীর ফিরোজা উপহ্রদ এবং রবিনসন ক্রুসো-শৈলী ভ্রমণের জন্য পরিচিত। সরকারি তথ্য অনুসারে, ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ৫৯ জন ইসরাইলি পর্যটক এই দ্বীপপুঞ্জে ভ্রমণ করেন। অন্যদিকে মোট ২,১৪,০০০ বিদেশী পর্যটক ছিলেন। গত বছর প্রায় ১১,০০০ ইসরাইলি বিলাসবহুল পর্যটন কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন। যা মালদ্বীপের মোট পর্যটকের মাত্র ০.৬ শতাংশ ছিল। মালদ্বীপের বিরোধী দল এবং সরকারি মিত্ররা গাজা যুদ্ধের বিরোধিতা করে ইসরাইলিদের নিষিদ্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্ট মুইজুর উপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন। মঙ্গলবার দেশটি ঘোষণা করেছে, তারা ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে ‘দৃঢ় সংহতি’ প্রকাশ করে এই দ্বীপপুঞ্জে ইসরাইলিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করছে।

উল্লেখ্য, ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছর তার নাগরিকদের মালদ্বীপ ভ্রমণ এড়াতে অনুরোধ করে। সেই সময় মালদ্বীপ সরকার ইসরাইলি পাসপোর্টধারীদের দেশে প্রবেশ রোধে আইন পরিবর্তন করার এবং প্রক্রিয়াটি তদারকি করার জন্য একটি উপকমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইসরাইল তাদের নাগরিকদের মালদ্বীপ ভ্রমণের বিরুদ্ধে একটি ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। কারণ হামাসের সাথে যুদ্ধের সময় ইসরাইল-বিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল।

১৯৭৪ সালে ইসরাইলের সঙ্গে মালদ্বীপের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে মালদ্বীপ ইসরাইলি পর্যটকদের উপর থেকে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ২০১০ সালে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ নেয়ার পর থেকে ইসরাইলিদের দ্বীপপুঞ্জের জন্য বিখ্যাত এই দেশটিতে ভ্রমণের অনুমতি দেয়া হয়। যদিও সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ২০১৪ সালে পরিত্যক্ত হয়। যুদ্ধের ফলে ইসরাইলিদের বিদেশ ভ্রমণের উপর অন্যান্য দিক থেকেও প্রভাব পড়েছে। গাজা এবং এই অঞ্চলে ইরানের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ইসরাইলের উপর বোমাবর্ষণ শুরু হওয়ায় বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তাদের তেল আবিব রুট বাতিল করেছে। এছাড়াও ইসরাইল-বিরোধী ফিলিস্তিনিপন্থি গোষ্ঠীগুলি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বিদেশে থাকা ইসরাইলি পরিষেবা কর্মীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করেছে। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ফিলিস্তিনি যোদ্ধা গোষ্ঠী হামাস ইসরাইলে এক ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। এরপর শুরু হয় গাজা যুদ্ধ। হামাসের আক্রমনে ইসরাইলে ১,২০০ জন নিহত হয়। ২৫১ জন জিম্মিকে অপহরণ করে হামাস। ইসরাইল হামাসকে ধ্বংস করার জন্য, ক্ষমতা থেকে তাদের উৎখাত করার জন্য এবং ৫৯ জন বন্দী থাকা জিম্মির মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য সামরিক অভিযান চালায়। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রোববার জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনিদের মৃতের সংখ্যা ৫০,৯৮৩ জনে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব নয় এবং বেসামরিক এবং যোদ্ধাদের মধ্যে পার্থক্য করা হয় না।

mzamin

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী?

হত্যাসহ শতাধিক মামলায় তিনি এখন বিচারের মুখোমুখি। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। এর আগেও তিনি ছয় বছর ভারতের মেহমান ছিলেন। কারণ অবশ্য ভিন্ন। ’৭৫ সনের পট পরিবর্তনের পর তাকে ভারতেই থাকতে হয়েছিল। এখন তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত। দেশে না থেকে ভারতে যাওয়ার দরকষাকষির ফলশ্রুতিতে তিনি এখন সেখানেই।

৪ঠা আগস্ট থেকে শুরু করে ৫ই আগস্ট দুপুর পর্যন্ত টানা দরকষাকষি চলে। ভারত সরকারকে বুঝাতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন বাংলাদেশে থাকা নিরাপদ নয়। অজিত দোভালের সঙ্গে তিনি কয়েকদফা ফোনে কথা বলেন। তাদের বোঝাতে সক্ষম হন পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যেকোনো সময় গণভবন ঘেরাও হতে পারে। সেনারা তার পক্ষে নেই। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। তাই তারা যেন বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে তার বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে বিরামহীন আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় তাকে নিরাপদে চলে যেতে দেয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তিনি দেশ ছাড়েন।

এরপর অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে। বাংলাদেশে তার সাজানো বাগান তছনছ হয়ে গেছে। মাটির সঙ্গে মিশে গেছে ৩২ নম্বর। অসংখ্য হত্যা মামলা রুজু হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার দলের অস্তিত্ব থেকেও নেই। একটি লোকও নেই দলের পক্ষে কথা বলার। কোথায় যে এরা হারিয়ে গেল এ নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চলছে। তিনি আছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। মাঝে মধ্যেই তিনি সরব হন। আত্মগোপনরত অনেক সহকর্মীর সঙ্গে তিনি ফোনে কথা বলেন। তাদের এই বলে আশ্বস্ত করেন, আমি দ্রুত আসছি। ভয় পেয়ো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। শুরুর দিকে এসব কথাবার্তা অনেকেই আমলে নিতেন। উৎসাহিত বোধ করতেন। এখন জোয়ার-ভাটার মতো। সকাল-বিকাল মনোবল চাঙ্গা হচ্ছে। অনেকে আবার ক্যাম্প পরিবর্তন করছেন। পরিচয় গোপন করে অনেকেই জাতীয়তাবাদী অথবা জামাতি হয়ে যাচ্ছেন।  নরেন্দ্র মোদিকে ড. ইউনূস সরাসরি বলেছেন, শেখ হাসিনা যে ভাষায় কথা বলছেন তা রীতিমতো উস্কানিমূলক, নানা ষড়যন্ত্রের আলামত।  তাকে সতর্ক থাকার তাগিদও দেয়া হয় কূটনৈতিক চ্যানেলে।

হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি ইউনূস-মোদি বৈঠকে আলোচনায় এসেছিল। মোদি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। আলোচনাও বেশি দূর এগোয়নি। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই বৈঠকটির সমাপ্তি ঘটে। ফলাফল ছিল শূন্য। তবে বাংলাদেশ তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। তাকে ফেরত চেয়ে কূটনৈতিক চিঠির প্রসঙ্গ টেনে এনেছে বার কয়েক। এই অবস্থায় শেখ হাসিনা কী করবেন। তাকে ফেরত আনার ব্যাপারে চাপ আরও বাড়বে। নির্বাচন যত কাছাকাছি আসবে ততোই তাকে ফিরিয়ে আনার সুর হবে চড়া। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থ প্রায় অভিন্ন। তারা চাচ্ছে আওয়ামী লীগ যাতে অংশ না নেয়। আওয়ামী লীগ যেহেতু নিষিদ্ধ হয়নি তাই হিসাব-নিকাশে গরমিল আছে। অংক মেলানো সম্ভব হচ্ছে না। ভারতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলও চাচ্ছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। তারা বলতে চাচ্ছে- আওয়ামী লীগসহ সবাইকে নিয়েই নির্বাচন। তা নাহলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েই থেকে যাবে। তাদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতই রয়েছে।

ইউনূস প্রশাসন এখন দোটানায়। যদিও প্রফেসর ইউনূস নিজেই  বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে একবার বলেছিলেন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা তার সরকারের নেই। এ নিয়ে তার নিয়োগকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। অনেকেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন। নির্বাচন কমিশন পড়েছে বেকায়দায়। তারা কী করবে। তারা নির্বাচনের ঘুঁটি সাজাবে কীভাবে! নির্বাচনই বা কবে? এখনো সবুজ সংকেত আসেনি ইউনূস প্রশাসনের কাছ থেকে।

সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে নির্বাচন কমিশন একটা ফাইল পাঠিয়েছিল সরকারের কাছে। কিন্তু বেশ কিছুদিন হয়ে গেল ফাইলটি নড়েনি। এ থেকে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে ডিসেম্বরে নির্বাচনের ব্যাপারে এখনো সরকার মনস্থির করতে পারেনি। ৬ সদস্যের কিচেন কেবিনেটে প্রফেসর ইউনূস দ্রুত নির্বাচনের পক্ষেই মত দিয়ে আসছেন। বাস্তবে অবশ্য এর আলামত অনুপস্থিত। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না হলে কী হতে পারে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এমন একটি সূত্রমতে, আওয়ামী লীগের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যেতে পারে।

পরিস্থিতি শেখ হাসিনার জন্য কোনো অবস্থাতেই অনুকূলে নেই। একদিকে মামলা-মোকদ্দমা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ তাকে আরও কোণঠাসা করেছে। পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও জটিল করে তুলেছে। দল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াও ঝুলে গেছে। তিনি আসলে কারও কাছে নেতৃত্ব ছাড়তে রাজি নন, এমনকি পরিবারের কাছেও। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা বলছেন, শেখ হাসিনার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় চ্যালেঞ্জের মুখে।

-ম. চৌ.
সূত্র- জনতার চোখ

mzamin


বেসামাল ‘নেত্রী’ সিলেটের আরজু

চাল-চলনে ছিল বেপরোয়া ভাব। ভয়ে নারী রাজনীতিকরা তাকে এড়িয়ে চলতেন। সম্মান হারানোর ভয়ে পাশে জায়গা দিতেন না অনেকেই। কিন্তু সিলেটে পুরুষ রাজনীতিকদের কাছে তার কদর ছিল বেশি। আর কদরেই দিনে দিনে বেসামাল হয়ে ওঠে সিলেটের ‘নেত্রী’ আরজু। নামের পাশে আগে খান ব্যবহার করতো না। সাম্প্রতিক সময়ে খান শব্দটি জুড়ে দিয়েছে। সিলেটের ওই ‘নেত্রী’ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী। বিতর্কিত ওই নেত্রীকে আটক করেছে র‌্যাব। নগরের বালুচরের বাসা থেকে তাকে আটক করা হয় বলে র‌্যাব জানায়। পুরো নাম নাজমা আক্তার আরজু। পরে এই নাম পরিবর্তন করে হয় নাজমা খান আরজু। নগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। কয়েক বছর আগে মহিলা যুবলীগ করতেন। তখন থেকে অন্ধকার জগতে তার পথচলা শুরু। গ্রেপ্তারের পর গতকাল দলের কয়েকজন মহিলা নেত্রীর সঙ্গে আলাপ হয় মানবজমিনের। তার সম্পর্কে জানা গেছে অনেক তথ্য।

তারা জানিয়েছেন- যুব মহিলা লীগে থাকার সময় সিলেটের কয়েকজন অন্ধকার জগতের নারীদের সঙ্গে তার খ্যাতি গড়ে ওঠে। ওই নারীদের সঙ্গে তার রাজপথে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকতো। ফলে ওই সময় থেকে সে জড়িয়ে পড়ে অপরাধ কর্মে। নারীদের দিয়ে নগরে বাসা ভাড়া করে অসামাজিক কাজ, মাদক ব্যবসাসহ নানা কাজে জড়িয়ে পড়ে সে। এ কারণে পুরুষ রাজনীতিকদের কাছে সে ছিল পছন্দের। নিজেও নেতাদের মনোরঞ্জন দিতেন। রাতারাতি তার কদর বেড়ে যায়। এই অবস্থায় কয়েক বছর চলার পর নিজেকে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পরিচয় দিতে শুরু করে। মহিলা আওয়ামী লীগে নিজের পরিচয় দিলেও কোনো পদবিতে ছিল না। গ্রেপ্তারের পর সে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিজেকে নগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু ওই ওয়ার্ডের মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রীরা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- আরজু কখনোই ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগে ছিল না। কিছুদিন তার বসবাসস্থল ছিল ওই ওয়ার্ডে। সে বনকলাপাড়া, ফাজিলচিস্তসহ কয়েকটি এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করেছে। ওই সময় আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আফতাব হোসেন খানের ঘনিষ্ঠ নেত্রী ছিলেন। নানা সময় তাদের শেল্টারে থাকায় রাজনীতিতে সে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল বলে জানান তারা।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে আরজু সিলেট সদর উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য নির্বাচনী মাঠে ছিল। ওইসময় সে তার ঠিকানা ব্যবহার করে জালালাবাদ থানার জাহাঙ্গীরনগর এলাকায়। তবে মনোনয়ন দাখিলের আগে সে নির্বাচন থেকে সরে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- ৫ই আগস্টের আগে সিলেটের রাজপথে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের সময় সে নেতাকর্মীদের সঙ্গে রাজপথে ছিল। সংঘর্ষের সময়ও মাঠে অ্যাক্টিভ থাকে। গণ-অভ্যুত্থানের পর সে সুবিদবাজার এলাকা ছেড়ে চলে যায়। তার বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়। পলাতক অবস্থায় আশ্রয় নেন নগরের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের বালুচর এলাকায়। ওখানে ঘাপটি মেরে থেকে ছিল। তবে সরব ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সমালোচনাসহ সাম্প্রতিক নানা বিষয় নিয়ে লাইভে এসে অশালীন আচরণ করেছে। একইসঙ্গে সরকারবিরোধী নানা অপপ্রচারে অ্যাক্টিভ ছিল। ফিলিস্তিনে ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে সিলেটে ব্যাপক ভাঙচুর ঘটনায়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের মুখে এসেছে পলাতক থাকা নাজমা খান আরজুর নাম। এরপর তাকে ধরতে অভিযান শুরু করে র‌্যাব।

গত সোমবার রাতে তাকে বালুচর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। নগরের উপশহরে ছিল আরজুর সবচেয়ে বেশি আড্ডাস্থল। ওই এলাকার এক আওয়ামী লীগ নেত্রী যিনি মৎসজীবী দলের কমিটিতে ছিলেন তার সঙ্গে ছিল সখ্যতা। ওই নেত্রীর নাম নাহার। তার সঙ্গে সখ্যতা থাকার কারণে ওর বাসাতেই তার অসামাজিক কাজের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। গত কয়েক বছর ধরে উপশহরে বসেই তারা অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। মহিলা আওয়ামী লীগের গত কমিটি গঠনের সময় পুরুষ রাজনীতিকদের দিয়ে মহিলা নেত্রীদের চাপে রেখে কমিটিতে আসার চেষ্টা করে। তবে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীদের প্রতিবাদের কারণে তাকে কোনো কমিটিতে জায়গা দেয়া হয়নি বলে জানান কয়েকজন নেত্রী। তারা জানিয়েছেন- শুধু অসামাজিক কাজই নয়, তাদের নেটওয়ার্কে ছিল মাদক বিক্রেতারা। মদ, গাঁজা ও ইয়াবা আরজু ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিক্রি করতো। উপশহরে অপরাধীদের একটি গ্রুপ লোকজনকে ধরে নিয়ে উলঙ্গ করে নারীদের দিয়ে ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করতো। ওদের নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য হিসেবে আরজু কাজ করেছে। নানা সময় পুলিশের রোষানলে পড়লেও সে ও তার সিন্ডিকেট রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা এডিসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ছাত্র আন্দোলনের সময়ের দুটি মামলার আসামি দেখিয়ে র‌্যাব সদস্যরা তাকে কোতোয়ালি থানায় হস্তান্তর করেছে। এ মামলা তাকে পুলিশ আদালতে সোপর্দ করেছে বলে জানান তিনি।  

mzamin

হেলেনের দাপটে বেপরোয়া ছিল সিলেটের কয়েস

সিলেটের আওয়ামী লীগ নেত্রী হেলেন আহমদ। বর্তমানে লন্ডনে পলাতক। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের ঘনিষ্ঠ জননেত্রী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। সিলেটে দাপট দেখিয়েছেন এক তরফা। তার দাপটের কাছে অসহায় ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেই হেলেনের ব্যবসায়িক পার্টনার কয়েস পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। আগে সাদাসিদেই ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী হেলেন আহমদ। পার্টনার কয়েসই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই থেকেই হেলেনের জীবন রহস্যঘেরা। হেলেন থেকে আরও চতুর মিসবাউল ইসলাম কয়েস। হেলেনের সব অপকর্মের মূল নিয়ন্ত্রক তিনি। তবু থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে দাপটের সঙ্গে চলেন সিলেটে। হেলেনের যেকোনো বিতর্কিত ঘটনায় কয়েসই ঢাল হিসেবে দাঁড়াতেন। সেই কয়েসের এবার আর শেষ রক্ষা হলো না। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে হেলেন পালিয়ে গেলেও তিনি প্রকাশ্যেই ছিলেন। হেলেনের যাবতীয় অপকর্মকে ঢাকার চেষ্টা করছিলেন। অবশেষে শনিবার রাত ১১টার দিকে জিন্দাবাজার হেলেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে পুলিশ কয়েসকে আটক করেছে। আটক নিয়েও নানা নাটকীয়তা। গ্রেপ্তারকালীন সময়ে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল কয়েসকে আটক করতে যায়। এ সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাইরে দাঁড়িয়ে কয়েস পুলিশকে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছিলেন। পুলিশ দাবি করে- তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। কিন্তু কয়েস নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে বলেন, ঠিকানা দেখেন। আমি সেই ব্যক্তি কি না। পুলিশ ভোটার আইডি দেখে। পুলিশ সদস্যরা জানান, কয়েস আটকের সময় নিজেকে নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। প্রায় ১০ মিনিট বাদানুবাদের পর কয়েসকে পুলিশের ভ্যানে করে থানায় নিয়ে যায়। এ সময় সাংবাদিকরা ছবি ও ফুটেজ তুলতে গেলে তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন তিনি। থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ মামলার অনুসন্ধান করে। কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানায়, কয়েসের বিরুদ্ধে মারামারি, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার আইনে সাতটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা রয়েছে ৬টি এবং দক্ষিণ সুরমা থানায় ১টি। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলাও ছিল বলে জানায় পুলিশ। কোতোয়ালি থানার ওসি মো. জিয়াউল হক জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত কয়েস আওয়ামী লীগ নেতা। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় সাতটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার বিকালে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। কয়েসের মূল বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বসন্তপুরে। তার পিতার নাম নিমার আলী। সে বর্তমানে নগরের বিমানবন্দর এলাকার বড়শালা এলাকার বাসিন্দা। এই বড়শালায়ই অবস্থান হেলেনের। সেখানে রয়েছে হেলেনের মালিকানাধীন আহমদ হাউজিং। নামে-বেনামে অনেক সম্পদ। সেগুলোর পাহারাদার কয়েস। হেলেনের দখল করা সম্পদ দখলে রাখা, আইনি লড়াই করা, ক্ষমতার দাপট দেখানো- সবই করতেন কয়েস। ফলে হেলেনের পাশাপাশি কয়েসও ছিলেন বিগত দিনের আলোচিত চরিত্র। হেলেনের নাম আসলেই আসে কয়েসের নাম। আর নাম আসার কারণও রয়েছে। হেলেনের সঙ্গে সম্পর্ক কি- এ নিয়ে এন্তার প্রশ্ন। অনেকেই বলেন; সর্ম্পক স্বামী-স্ত্রীর। কিন্তু কয়েস সবসময়ই এ অভিযোগ উড়িয়ে দিতেন। ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে তাদের সর্ম্পক রয়েছে জানান দিতেন। হেলেনও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ চুপ। তবে তাদের বেপরোয়া জীবন নিয়ে নানা কানাঘুষা চলছে। জিন্দাবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রায় ২৫ বছর আগে যখন হেলেনের স্বামী ব্যবসায়ী রুহেল আহমদ নগরের জল্লারপাড় রোডে হোটেল ব্যবসা শুরু করেন, তখন ওখানে চাকরি নিয়েছিলেন কয়েস। এরপর সে হেলেনের কাছাকাছি চলে আসে। হেলেনের স্বামী রুহেল সম্পদ নিয়েও ছিলেন সমস্যায়। নানা ধরনের চাপ কাবু করেছিল তাকে। হোটেল ব্যবসা চালু করার কিছুদিনের মধ্যে রুহেল মারা যান। আর তখনই হেলেন হাল ধরেন স্বামীর ব্যবসায়। সঙ্গে কয়েসও। হেলেনের পার্টনার হিসেবে পুরো সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্ব পায় কয়েস। হেলেন নামে থাকলেও কয়েসই সব। ফলে হেলেনের সঙ্গে জমি সংক্রান্ত যত বিরোধ রয়েছে সবখানেই কয়েসের নাম জড়িয়ে আছে। আহমদ হাউজিং ও ওই এলাকায় জমি দখল নিয়ে এলাকাবাসী ও প্রবাসীদের দ্বন্দ্বের যাবতীয় নাটক মঞ্চস্থ করেন কয়েস। কয়েস গ্রেপ্তারের পর সরব হচ্ছে ভুক্তভোগীরা। তারা জানিয়েছেন, নানা সময় হেলেনের ক্ষমতার দাপটে প্রবাসীসহ অনেককেই হয়রানি করেছে কয়েস। এ নিয়ে সিলেটে একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন করেও প্রশাসনের সহযোগিতা চাইলে কোনো কাজ হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজেকে আওয়ামী লীগ নেত্রী পরিচয় দিয়ে হেলেন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এই সময়ে কয়েক একর ভূমিও তারা জোরপূর্বক দখলে নিয়েছে। এয়ারপোর্ট এলাকায় দখল করা ভূমিতে মোমেন ফাউন্ডেশনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় যারাই প্রতিবাদী হয়েছেন তাদের হুমকি, ধমকি দিয়ে সরিয়ে রাখা হতো। তাদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে। গত ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি রূপ পাল্টে ফেলেন কয়েস। হেলেন পালিয়ে যায় দেশ ছেড়ে। কিন্তু কয়েস প্রথমেই নিজেকে ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা পরিচয় দিয়ে অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করে। নতুন করে সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত আমিরের ছবি পোস্ট করে শুভকামনা জানান। জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করায় সে হালে পানি পায়নি। এর আগে তিনি নিয়মিত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের সকল অনুষ্ঠানের ছবি সংগ্রহ করে ফেসবুকে পোস্ট করতেন। সম্প্রতি প্রতারক মিসবাউল ইসলাম জেলা ও মহানগর বিএনপি’র দায়িত্বশীল পদে থাকা অনেকের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছিল। তবে, কোথাও সে আশ্রয় পায়নি। এদিকে, সিলেটে দাপট খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী হেলেন ও কয়েসের নাম উঠেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের তালিকায়। দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে হেলেন ও কয়েসের নানা দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তারা অবৈধ সম্পদ অর্জনের নানা বিষয় খতিয়ে দেখছেন। এসব বিষয় নিয়ে দুদকের পক্ষ থেকে আইনি উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে ওই সূত্র।
mzamin

কেন চীনা সেনারা ইউক্রেনে যুদ্ধ করছে?

৮ই এপ্রিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক্স-এ একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করার সময় ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে বন্দী দুই চীনা নাগরিকের একজনকে দেখানো হয়েছে। তিনি একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও বলেন, চীন এখন সামরিকভাবে রাশিয়াকে সমর্থন করছে এবং এ বিষয়ে ‘যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ দেয়া উচিত’। পরের দিন তিনি ওই দুই ব্যক্তির দ্বিতীয় ভিডিও পোস্ট করেন। এতে তাদের নাম ঝাং রেনবো এবং ওয়াং গুয়াংজুন বলে জানানো হয়। তাদের চীনা পাসপোর্টের ছবি প্রকাশ করা হয়।

জেলেনস্কি দাবি করেন, রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধরত ১৫০ জনেরও বেশি চীনা নাগরিকের কথা জানে ইউক্রেন। এ খবর দিয়ে অনলাইন দ্য ইকোনমিস্ট আরও বলেছে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- তারা ইউক্রেনীয়দের দাবি যাচাই করছে এবং ‘কোনও পক্ষের সামরিক অভিযানে’ তার নাগরিকদের অংশগ্রহণকে সমর্থন করে না। যদিও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য দ্বৈত-ব্যবহারের সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে চীন, জ্বালানি ক্রয়ের মাধ্যমে রাশিয়ার অর্থনীতিকে সচল রেখেছে এবং যুদ্ধের জন্য ইউক্রেন ও ন্যাটোকে দোষারোপ করে প্রচারণা চালিয়েছে , তবুও এর নেতারা ধারাবাহিকভাবে নিরপেক্ষতা দাবি করেছেন এবং সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা এড়াতে সতর্ক রয়েছেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধরত চীনা নাগরিকদের রাষ্ট্র-সমর্থিত বলে কোনও প্রমাণ নেই। তবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, তারা সেখানে রয়েছে। চীনা যোদ্ধারা যুদ্ধের সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের কৃতিত্বের ভিডিও পোস্ট করে আসছে। যারা রাশিয়ার হয়ে লড়াই করে তারা বলেছে- তারা রোমাঞ্চ এবং নগদ অর্থের সন্ধানে সেখানে গিয়েছে। কেউ কেউ জাতীয়তাবাদের আদর্শে পরিচালিত হয়েছে।

গানসু প্রদেশের ২৩ বছর বয়সী এক যুবক চীনের বাইরে অবস্থিত একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ইনিটিয়ামকে বলেছেন, তিনি ২০২৩ সালে উচ্চ মজুরির প্রতিশ্রুতি দেখতে পান সোশ্যাল মিডিয়ার একটি ভিডিওতে। এর পর মস্কোতে উড়ে যান। তিনি একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মী ছিলেন এবং মাসে ৩০০০ ইউয়ান উপার্জন করতেন। ভাড়াটে হিসেবে তিনি পাঁচগুণ বেশি উপার্জন করতে পারতেন। চীনের ডুয়িনে নিজেকে ‘রেড ম্যাকারন’ পরিচয় দিয়ে আরেক যোদ্ধা বলেন, তিনি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান। কারণ তিনি উগ্রবাদী চীনা চলচ্চিত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তিনি রাশিয়ান পক্ষের সাথে যোগ দিয়েছিলেন এ জন্য যে, ভিসা পাওয়া সহজ ছিল।

চংকিংয়ের ৩৮ বছর বয়সী ঝাও রুই যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ইউক্রেনকে সাহায্যকারী যেকোনো জাপানিদের সাথে লড়াই করতে চেয়েছিলেন। ২০২৩ সালে একটি ইউক্রেনীয় ড্রোন তাকে হত্যা করে। অনুশোচনার কারণে বেশিরভাগ চীনা সেনা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে ঝাও ডুয়িনে ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। সেখানে তিনি চীনাদের যুদ্ধে যেতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, চীনেই চাকরি খুঁজুন। আপনিও একই পরিমাণ আয় করতে পারবেন।

আরেকজন ভাড়াটে সেনা ঝৌ ঝিকিয়াং ডুয়িনে বলেন, রাশিয়ানরা ‘আমাদের সাথে মানুষের মতো আচরণ করে না’। নির্বাসিত চীনা সাংবাদিক চাই জিংয়ের সাথে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে, ‘রেড ম্যাকারন’ বলেছেন- রাশিয়ানরা তাদেরকে ‘কামানের খাবার’ হিসাবে ব্যবহার করছে। দুর্বল সরঞ্জামের অভিযোগ করার পরে তাকে রাশিয়ান পলাতকদের সাথে একটি গর্তে আটকে রাখা হয়েছিল। এখন তিনি লড়াই করার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেছেন। তাকে চলে যেতে দেওয়া হয়নি। তিনি মনে করছেন তাকে চীনা দূতাবাস সাহায্য করবে।

কিছু স্বেচ্ছাসেবক ইউক্রেনের পক্ষেও যুদ্ধ করছেন। ২০২৩ সালে এক্সে রাশিয়াবিরোধী এবং ইউক্রেনপন্থি বার্তা পোস্ট করার পর ইউনান প্রদেশের পেং চেনলিয়াংকে সাত মাস ধরে চীনে আটক রাখা হয়। ২০২৪ সালে তিনি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর বিদেশী শাখায় যোগ দেন। সেই বছরের শেষের দিকে তাকে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে পেং তাইওয়ানের পতাকা ধরে একটি ভিডিও তৈরি করেন। সেখানে তিনি বলেন- তিনি ২০২২ সালে ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধ করে মারা যাওয়া তাইওয়ানীয় স্বেচ্ছাসেবক সেং শেং-কুয়াং-এর সাথে স্মরণীয় হতে চান।

উভয় পক্ষের চীনা যোদ্ধাদের মৃত্যুর পর ইন্টারনেটে বিতর্কের সূত্রপাত হয় যে- তারা কি সাহসী বীর, নোংরা ভাড়াটে সেনা নাকি বিভ্রান্ত জাতীয়তাবাদী। চীনা সরকার সেই বিতর্কে এখনও হস্তক্ষেপ করেনি। এখন হয়তো তাদের তা করতেই হবে।

mzamin