Tuesday, October 1, 2013
সরকারের শেষ সময়ে লোডশেডিং! by মোঃ আবু সালেহ সেকেন্দার

প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভাগকে বলে রেখেছি দিনে অন্তত দুই ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে, যাতে মানুষ লোডশেডিং যে ছিল এটা ভুলে না যায়’ (দৈনিক মানবজমিন, ৪ আগস্ট ২০১৩)। এ কারণেই বর্তমানে লোডশেডিং হচ্ছে কি-না, সে বিষয়টি অবশ্য কোনো গণমাধ্যমের সংবাদে উঠে আসেনি। আর বর্তমানে যে লোডশেডিং হচ্ছে তা দিনে দুই ঘণ্টা নয়; অনেক ঘণ্টা। ক’দিন ধরে ঠিক বুঝতে পারছি না, বিদ্যুৎ যায়, না আসে। গরমের কারণে জীবন যাপন কষ্টকর হয়ে পড়ছে। জনগণের জীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী এ লোডশেডিং কোনো প্রাকৃতিক কারণে ঘটেনি। জাপানের মতো হঠাৎ সুনামিতে অথবা পাকিস্তানের মতো হঠাৎ ভূমিকম্পে আমাদের কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিকল হয়ে পড়েনি। যেখানে গত ১২ জুলাই দেশে রেকর্ড পরিমাণ ৬,৬৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, সেখানে হঠাৎ করে এমন ঘন ঘন লোডশেডিং কেন শুরু হল, তার কোনো সদুত্তর এখনও পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে দেয়া হয়নি। সংবাদ মাধ্যমগুলো থেকে ছিটেফোঁটা যা জানা যাচ্ছে তার সার কথা হল, ২০ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেটের কৈলাশটিলা গ্যাসকূপের উন্নয়ন কাজ শুরু হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিডিবির একাধিক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমলে সারাদেশে দুর্বিষহ লোডশেডিং হতে পারে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনেই বড় ধরনের কোনো ঘাপলা হয়েছে।
তাই এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হয়। প্রথমত, এমন হতে পারে যে, প্রধানমন্ত্রীর ‘খাস লোক’ এমনটি প্রমাণ করতে অথবা বাহবা কুড়াতে একটি গ্র“প দুই ঘণ্টার জায়গায় অনেক ঘণ্টা লোডশেডিং করছে, যাতে জনগণের লোডশেডিংয়ের কথা বারবার মনে পড়ে এবং আসন্ন রাজনৈতিক সংকটের সময়ে আওয়ামী লীগের পাশে থাকে। দ্বিতীয়ত, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনার সিদ্ধান্ত যে সঠিক তা প্রমাণ করা। তৃতীয়ত, সুন্দরবনের কাছে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতাকারীদের পক্ষে যাতে জনসমর্থন কম হয়, সেই চিন্তা থেকে। আমার এমন ভাবনা শতভাগ সঠিক না হলেও যে ওই রকমটি ভাবার শতভাগ কারণ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
চলমান লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সরকার জনগণকে হয়তো এই বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, যদি আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় না আসে; তবে আবারও বিদ্যুৎ খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়বে। বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট হওয়ার ফলে লোডশেডিং তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। আর ভয়াবহ লোডশেডিং হলে জীবনযাত্রায় কী ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তা এখনই উপলব্ধি করার মধ্য দিয়ে জনগণ আওয়ামী লীগের প্রতি আবার সমর্থন ব্যক্ত করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকার হয়তো মানুষের সহজাত প্রবণতার কথা ভুলে গেছে। এদেশের মানুষ খুব সহজে অতীতকে ভুলে যায়। তাই বিরোধী দল বিগত সময়ে সরকারি দলে থাকা অবস্থায় কী কী দুর্নীতি করেছিল, ওই সময়ের সরকার জনবান্ধব ছিল, না জনবিরোধী ছিল তা নিয়ে বর্তমানে তাদের মাথাব্যথা থাকে না। তাই তারা পাঁচ বছর আগে যে সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, পাঁচ বছর পর ঠিকই তাদের আবার ক্ষমতার মসনদে বসায়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসের শিক্ষা এমনই। তাই বিএনপির পর আওয়ামী লীগ আবার আওয়ামী লীগের পর বিএনপি সরকার গঠন করে।
অন্যদিকে, জনগণের এই ভুলে যাওয়ার প্রবণতাই এখন আওয়ামী লীগের জন্য মহাবিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাদের লোডশেডিং তত্ত্বই তাদের জন্য বুমেরাং হবে। কারণ জনগণ যখনই লোডশেডিংয়ের কবলে পড়বে, তখনই এর জন্য বর্তমান সরকারকে দোষারোপ করবে। এমনকি জনবিক্ষোভ শুরু হয়ে যাবে। ফলে লোডশেডিং তত্ত্বে ভেসে যাবে আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কৃতিত্ব। কারণ জনগণের মধ্যে ওই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থাকায় তারা ভুলে যাবে যে, বিগত প্রায় পাঁচ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লোডশেডিং হয়নি। বরং বর্তমানের লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতা তাদের মনে দাগ কেটে থাকবে। পাল্টে যাবে ভোটের হিসাবনিকাশ। ফলে লোডশেডিংয়ের আগে আওয়ামী লীগ যে কয়টি আসন পেত, এবার সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসবে। অর্থাৎ আসন সংখ্যা আরও কমে যাবে। এছাড়া সরকারকে জনবিক্ষোভের মুখেও পড়তে হতে পারে। এরই মধ্যে অনেক এলাকায় তা শুরু হয়ে গেছে। সংবাদ মাধ্যমগুলো থেকে জানা যাচ্ছে, জনগণের মধ্যে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর লোডশেডিংয়ের এ ধারা অব্যাহত থাকলে সরকার যে কোনো সময় বড় ধরনের গণরোষের মুখেও পড়তে পারে, এমন আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সরকার যে কয়টি খাতকে তাদের সাফল্য হিসেবে জনগণের মাঝে প্রচার করতে উদ্যোগী হয়েছে, তার মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি অন্যতম। কিন্তু এভাবে যদি ভয়াবহ লোডশেডিং চলতে থাকে; তাহলে জনগণের কাছে ওই বিষয়টি প্রচারের যৌক্তিকতা হারাবে।
জনগণের উন্নয়ন করাই সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। আর সরকার উন্নয়ন করবে- সরকারের কাছে জনগণের এমন চাওয়া জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার। জনগণ তার ভাগ্যের পরিবর্তনের আশায় গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। তাই সরকার যদি জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনে কিছু করে থাকে, তবে তারা তাদের ওই গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন করেছে মাত্র।
মোঃ আবুসালেহ সেকেন্দার : শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
আদুরীদের পাশে দাঁড়াবার ডাক দিয়ে যাই by সাইফুল আলম

পার হয়ে এলি তুই শিশু জাদুকর।’
শিশুরা পৃথিবীতে আসে স্বর্গের দূতরূপে। তাদের নিষ্পাপ পবিত্রতা জাদু বলে প্রতিভাত হয়। যে উপলব্ধিকে কবি বর্ণনা করেন শিশু জাদুকর রূপে। পৃথিবীতে আসা স্বর্গের দূত শিশুদের পৃথিবীর সর্বত্রই চোখের মণির যত্নে লালন করা হয়। পালন করা হয় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে। ব্যতিক্রম শুধু আমরা। আমরা স্বর্গীয় দূত এই শিশুদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিই আমাদের সব কলুষ, ব্যর্থতা। মনুষ্যত্ব দূরের কথা, অনেকেই আমরা তাকে স ষ্টার সৃষ্টি একটি অসহায় প্রাণী বলেও বিবেচনা করি না। আর তাই হাঁটতে শিখতে না শিখতেই আমরা তার কাঁধে চাপিয়ে দেই শ্রমের জোয়াল। জঠর জ্বালায় বিক্রি হয়ে যায় কোলের সন্তান। এসব আমাদের দেশে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। কিন্তু সেই জানাশোনা বিষয়টিও মাঝে-মধ্যেই খবর হয়ে বজ বিদ্যুতের মতো ঝলসে ওঠে সংবাদপত্রের পাতায়। তেমনই একটি মর্মন্তুদ খবর ডাস্টবিন থেকে মৃতপ্রায় শিশু আদুরীকে উদ্ধার। মৃত ভেবে নির্যাতনকারী গৃহবধূ আদুরীকে ডাস্টবিনে ফেলে গিয়েছিল- এই সংবাদ ইসলামের ইতিহাসের সেই আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেয়ার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দুর্বিষহ ওই সংবাদ মানুষের চোখের অশ্র“কেও বাষ্পে পরিণত করে। হায় মানবতা! সেই মহিলার নাম ‘নদী’- অথচ হাঙ্গরের মতো তার আচরণ। গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার যথার্থই বলেছিলেন, ‘কি বিচিত্র এই দেশ সেলুকাস!’ পিতা-মাতা যে কন্যাশিশুটিকে আদুরী নামে ডেকেছিলেন পরম মমতায়, তার প্রতি অনাদর আর বর্বরতার কি সীমাহীন পরাকাষ্ঠা!
২.
গত শতকের আশির দশকে তখন আমি দৈনিক জনতার সিনিয়র রিপোর্টার। অফিসের কাজে রংপুর গেলাম। সেখানে দেখা হল সংবাদের সে সময়কার ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি মোনাজাত উদ্দিনের সঙ্গে। নানা কথার ফাঁকে মোনাজাত ভাই বললেন, সাইফুল এখানে একটি মেয়ে আছে অন্ধ। চিকিৎসা পেলে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে। কিন্তু অর্থাভাবে সেটি হচ্ছে না। আপনি ওকে নিয়ে জনতায় লেখেন। যদি কিছু হয়। যদি কারও দয়া বা করুণায় মেয়েটি আবার সব দেখতে পায়।
মোনাজাত ভাইয়ের কথার মধ্যে এমন গভীর আন্তরিকতার ছোঁয়া ছিল যে আমি তা এড়াতে পারিনি। দৈনিক জনতা তখন টিকাটুলি অভিসার সিনেমা হলের সামনে থেকে বের হয়। পত্রিকার মালিক তখনকার অঘোষিত প্রধান সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পত্রিকাটি দেখভাল করতেন তার ভায়রা ভাই মোস্তাফিজুর রহমান। ওই পত্রিকায় তখন যে কোনো নাগরিক ও মানবিক প্রকৃত সমস্যা নিয়ে লিখলেই পরদিন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। খুব ভোরে কাগজ পড়তেন এরশাদ এবং যথারীতি ‘জনতা’ সবার আগে। তাই ব্যবস্থা নিতে দেরি হতো না। যে কারণে সে সময় কাগজটি ব্যাপক জনপ্রিয়তাও লাভ করে। কিন্তু এক বছরের মাথায় মোস্তাফিজুর রহমানের কারণে সে কাগজ থেকে সব সাংবাদিক এক সঙ্গেই বিদায় হন। তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে অনেকদিন চলেছে পরিবর্তিত মালিকানায় এখনও চলছে। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।
রংপুরের অন্ধ মেয়েটিকে নিয়ে লিখলাম আমি ‘গোলাপ তার প্রিয়, গোলাপের নামে নাম তবু গোলাপ সে চোখে দেখেনি।’ জনতার প্রথম পাতায় ছবি দিয়ে গোলাপের করুণ কাহিনী ছাপার পরদিনই এরশাদ সাহেবের নির্দেশে সরকারের বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা শুরু হয়ে যায়। সুস্থ হয়ে ওঠে গোলাপ। আবার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় সে। তারপর যথারীতি ফিরে যায় রংপুরে।
জানি না কোথায়, কেমন আছে গোলাপ? দু’একবার দেখা সেই মুখটিও আর মনে নেই। কিন্তু স্মৃতিটা এখনও জ্বলজ্বল করছে। স্মৃতি কি কেবল বেদনাই জাগায়? নাকি বেদনার ভেতরও এক ধরনের আনন্দ ধারণ করে। আশা করব, গোলাপ এখনও বেঁচে আছে, আর এখন সে তার প্রিয় ফুল গোলাপ দেখতে পায়।
এতদিন পর গোলাপের কথা মনে পড়ল মিডিয়ায় আদুরীর খবর পড়ে ও দেখে। অভাবের সংসারে ৯ সন্তানের পরিবারে কত ভালোবেসেই না তার বাবা-মা নাম রেখেছিল আদুরী। কোথায় থাকার কথা, অথচ তাকে পাওয়া গেল ডাস্টবিনে। ২৩ সেপ্টেম্বর। অভাবের সংসারের একটি ছোট্ট মেয়ের জীবনযুদ্ধের শুরুটা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। তার পুরো শরীরে নির্যাতনের বিষাক্ত ছোবল সভ্যতার মুখে কালিমা লেপন করেছে। ইট, পাথর, বালু ও সিমেন্টের এই রাজধানীতে আদুরীরা আসলে কতটা নিষ্পেষিত, তা ভাবতে গেলে গা শিউরে ওঠে। মানুষের নির্মমতা কতটা বীভৎস হতে পারে আদুরী তার জ্বলন্ত প্রমাণ। কতটা নির্মম আর হৃদয়হীন হলে এতটা সম্ভব? নওরীন আক্তার নদী নামের ওই গৃহকর্ত্রীর পাশবিকতায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছিল আদুরী। নদী একজন মেয়ে। আদুরীও একটি মেয়ে। সে তো নদীর মেয়ে হতে পারত। বোন হতে পারত। কিন্তু এর কোনোটাই আদুরী হয়ে উঠতে পারেনি। নদী কেবল ডাইনির রূপ ধরে নিজের নামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
এ রকম ঘটনা মাঝে-মধ্যেই ঘটছে। এসব ঘটনায় আমাদের মানবতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এই সমাজ, সংসার কোথায় চলেছে? মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেললে মানুষের আর কী থাকে? কিছু কিছু পশুত্ব আছে, যা ছোঁয়াচে অসুখের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এটাও কি সে রকম কিছু?
আদুরীর ওপর যে নির্মমতা তা যদি আমাদের অন্তর্গত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে জাগ্রত করতে না পারে তবে মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের দাবি করতে পারি না।
৩.
আদুরীর মা-বাবা আদুরীকে নিয়ে গ্রামে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। তাদেরকে মামলা তুলে নেয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে অপরাধীরা। এ সংবাদও পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ অপ্রতিরোধ্য প্রভাবশালীর অপরাধে ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’ বলে যে বঞ্চনার কথা কবি লিখেছিলেন- সে বঞ্চনা, আর আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে রংপুরের গোলাপের চোখে যে আলো ফুটেছিল- সেই আলোর জগতেই ওই ঘটনার প্রায় ত্রিশ বছর পর বর্বর নির্যাতনে আদুরীদের জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। তাহলে কি বলব দীর্ঘ ত্রিশ বছরে আমাদের অর্জন শুধু নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা আর অমানবিকতা? অপরাধীর ঔদ্ধত্য সীমাহীন। সেই সীমাহীন ঔদ্ধত্য রুখতে, আদুরীদের পাশে সবাইকে দাঁড়াবার ডাক দিচ্ছি।
সাইফুল আলম : যুগান্তরের নির্বাহী সম্পাদক
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
শেখ হাসিনা by নুরুল ইসলাম বিএসসি

মাঝে-মধ্যে মনের মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক হয়। শেখ হাসিনা যদি এ দেশের শাসনক্ষমতায় না থাকেন, আমাদের কী হতে পারে, দেশের শাসনব্যবস্থায় কী ঘটতে পারে। এই বলে মনের মধ্যে ভয়ের উদ্রেক হয় যে, জামায়াতিরা বিএনপির কাঁধে ভর করে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, তাদের কচুকাটা করবে। হেফাজতিরা মহিলাদের ঘরে বন্দি রেখে, দেশটাকে বারোশ’ সালে নিয়ে যাবে। যুদ্ধাপরাধী যাদের বিচার চলছে, তারা বেরিয়ে এলে স্বভাবজাত কারণে প্রতিশোধ গ্রহণ করে সংখ্যালঘুসহ যারা বিচারের পক্ষে ছিলেন তাদের হত্যাসহ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করবে। এমনিতে কাদের মোল্লারা কসাই হিসেবে কুখ্যাতি লাভ করেছে। এই কসাই যদি ছাড়া পায়, কারও মান-ইজ্জতের কথা বাদ দিলাম, জান থাকবে?
এই সরকার সবগুলো কাজ ভালো করেছে এমন দাবি করি না। কিন্তু জাতির পিতার হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসা সোজা ব্যাপার নয়। শেখ হাসিনার পক্ষেই তা সম্ভব হয়েছে। শেখ হাসিনাবিহীন বাংলাদেশ কল্পনাও করা যায় না।
বিএনপি এখন সুর পালটিয়ে বলছে, নতুন ধরনের প্রতিহিংসাবিহীন দেশ গড়ে তুলবে। প্রশ্ন জাগে, তারা এখন নতুন ধরনের শাসনব্যবস্থার কথা বলছেন কেন? পুরনো ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রতিহিংসা না থাকলে, নতুন ধারার কথাই বা আসবে কেন?
প্রকৃত ঘটনা, বিএনপি এখন নতুন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। মুখে মধুর বাক্য উচ্চারিত হলেও অন্তরে বিষের থলি দিন দিন ফুলিয়ে-ফাপিয়ে তুলছে। কোন পাগলে বিশ্বাস করবে, বাড়ি থেকে উচ্ছেদের প্রতিহিংসায় বিএনপি ভুগছে না? কোন পাগলে বিশ্বাস করবে, কোকোর পাচারকৃত টাকা দেশে যারা ফেরত এনেছেন, তাদের ছেড়ে দেয়া হবে? মুখে শেখ ফরিদ বগলমে ইট।
বিএনপির নতুন ধারার শাসনব্যবস্থার কথা একটু ঘুরিয়ে চিন্তা করলে, জামায়াত-হেফাজতকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিহার তো করতে পারে। এ বিষয়গুলো জামায়াত আর হেফাজতিরা একটু তলিয়ে দেখলে পরিষ্কার হওয়ার কথা। হঠাৎ ভূতের মুখে রাম নাম। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তারেক রহমানের অনুরূপ কোনো সমঝোতা হয়েছে কি-না, প্রশ্নটি এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
সুশীল সমাজের দাবিদার যারা আছেন, তাদের কাছে মিনতি, শেখ হাসিনাকে অপছন্দের কারণে জামায়াত, হেফাজতিদের পক্ষ নিয়ে দেশের সর্বনাশ ডেকে আনলে কারও জন্য মঙ্গলজনক হবে না। শেখ হাসিনাকে পছন্দ না পছন্দ করা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু দেশ সবার। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে দেশের দুর্গতি ডেকে আনলে জাতি হিসেবে আমরা টিকতেই পারব না।
দোষেগুণে মানুষ। সবসময় সবাই ভালো ভালো কাজ করে এমন কথা নেই। গুণ বেশি না দোষ বেশি ওটার আলোকেই বিচার করতে হবে। যিনি দেশ পরিচালনা করছেন, তিনি শতভাগ সঠিকভাবে করতে পারবেন, এমন কথা নেই। ৭০-৮০ ভাগ কাজ যদি দেশের উন্নয়নের পক্ষে যায়, তবেই তো ওই সরকারকে জনবান্ধব সরকার বলা যায়। শেখ হাসিনা বিগত সাড়ে চার বছরে কোনটি দেশের বিরুদ্ধে করেছেন, কোন কাজটি দ্বারা দেশের ক্ষতি হয়েছে, এরূপ তত্ত্ব উপস্থাপন করতে কেউ কি পারবেন? যারা এখন সমালোচনা করছেন, একসময় তাদেরও দেশ চালাতে দেখেছি। কেউ কেউ মাঝ পথে ক্ষান্ত দিয়েছেন। বলা যত সহজ, করা বড়ই কঠিন।
নুরুল ইসলাম বিএসসি : সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
প্রবীণের জীবন হোক শান্তিময় by ডা. মোঃ নজরুল ইসলাম আখন্দ

সৌভাগ্যক্রমে আমার সংসার নবীন-প্রবীণের মিশ্রণে। কয়েক ছেলের মধ্যে এক ছেলের সঙ্গে আমার বসবাস। আমার এক নবীন নাতি আছে সেই সংসারে। আমার নাতি-নাতনীর সংখ্যা ৯। একজন ছাড়া সবারই অবস্থান দূরে। কাজেই একজনের সঙ্গেই আমার ওঠাবসা, গল্পগুজব, এমনকি খেলাধুলাও। নাতিটি টিভির খুব ভক্ত। বিশেষ করে কার্টুন ছবির। কার্টুন নিয়ে সে বেশ সময় কাটাতে অভ্যস্ত। একদিন তার সঙ্গে আমার কথোপকথন হচ্ছিল। হঠাৎ করেই শিশুসুলভ মনে জিজ্ঞেস করল- আচ্ছা দাদু, টিভির ভেতর কি ঢোকা যায়? হ্যাঁ, ঢোকা যায়। কেমন করে ঢোকা যায়? ঢাকায় টিভির অফিস আছে। সেখানে গিয়ে যোগাযোগ করতে হয়। ছোট বাচ্চারাও কি ঢুকতে পারবে? হ্যাঁ ঢুকতে পারবে। আমাকে কি ঢুকিয়ে দিতে পারবে? হ্যাঁ, পারব। কখন পারবে? তোমার স্কুল যখন ছুটি হবে। টিভিতে ঢুকলে কি আবার বের হওয়া যাবে? হ্যাঁ, বের হওয়া যাবে। ঢোকার পর যদি বের হওয়া যায়, তাহলে কি আমাকে একবার ঢুকিয়ে দেবে? তাকে পুরো নিরাশ না করে বললাম, পরবর্তী সময়ে যখন ঢাকা যাব, তখন চেষ্টা করে দেখব। সে খুব আশ্বস্ত হয়ে সান্ত্বনার সঙ্গে বলল, আচ্ছা।
অন্য একদিন আমি ও আমার নাতি রিকশায় ব্রিজ দিয়ে করতোয়া নদী পার হচ্ছিলাম। নিচে পানি দেখে নাতি বলল, নিচে পানি কেন? বললাম, ওটা বগুড়ার করতোয়া নদী। এত ছোট নদী কেন? যমুনা নদীর মতো বড় ও বেশি পানি নেই কেন? (ইতিপূর্বে বাসে যমুনা ব্রিজ পার হয়ে তার ঢাকায় যাতায়াতের অভিজ্ঞতা হয়েছে)। বললাম, নদী মরে গেছে। নদী কেমন করে মরে? বললাম, পানি নাই, তাই মরে গেছে। পানি থাকে কেন? বললাম, অনেক কারণেই পানি থাকে না। এই নদীতে মাছ পাওয়া যায়? বললাম, পাওয়া যায়। মাছ ধরা যাবে? বললাম, ধরা যাবে। কেমন করে ধরা যাবে? বললাম, বড়শি দিয়ে। আমাকে বড়শি কিনে দেবে? বললাম, দেব। আমি ওই বড়শি দিয়ে অনেক মাছ ধরব। মাছ ধরে কী করবে? রান্না করে মজা করে খাব। কাকে কাকে দেবে? তোমাকে, বুবুকে, মাকে, বাবাকে (আমাদের বাসায় ওই ক’জনই লোক)। তার শেষের জবাবটাই বেশি বিবেচ্য। কারণ তাতে স্বার্থপরতার কোনো গন্ধ নেই। সবার সঙ্গে ভাগাভাগিতে সে বিশ্বাসী। এটা উদার মনের পরিচায়ক।
বড় হয়ে যদি তার ভেতর শেষোক্ত গুণটি বজায় থাকে, তাহলে নবীন-প্রবীণে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। তাদের সহাবস্থান হবে প্রকৃতই মধুর ও শান্তিময়। আমরা সবাই নবীন ও প্রবীণের এমন শান্তিময় জীবনই প্রত্যাশা করি। আমরা পাশ্চাত্যের নবীন-প্রবীণের মতো হতে চাই না। আমরা প্রাচ্যের নবীন-প্রবীণ হতে চাই- আমরা তা-ই আছি, তা-ই থাকব। আমাদের নবীন-প্রবীণের এই মজবুত বন্ধনটি চির অটুট থাকুক। আমরা একে অপরের পরিপূরক হই এবং হওয়ার চেষ্টা করি।
আমরা ইসলামের ইতিহাস থেকে জানতে পারি, এক নবীন নিজের অতি প্রিয় জীবন উৎসর্গ করে এক প্রবীণকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সহায়তা করেছিলেন। তার নাম হজরত ইসমাইল (আঃ)। হজরত ইসমাইল (আঃ)-এর মতো নবীন ঘরে ঘরে জন্ম লাভ করুক।
ডা. মোঃ নজরুল ইসলাম আখন্দ : চিকিৎসক ও প্রাবন্ধিক
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গণতন্ত্র সুরক্ষার দায়িত্ব by একেএম শাহ নাওয়াজ

ইউরোপের ইতিহাস থেকে উদাহরণ নেয়া যেতে পারে। দেশের বিপর্যস্ত প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে চাইছিল, তখন বোধকরি আঠারো শতকের ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজারা দেশের অস্থিরতার লাগাম টেনে ধরার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এনলাইটেন্ড ডেসপটিজম (বুদ্ধিদীপ্ত স্বৈরাচার) বা বেনেভোলেন্ট ডেসপটিজম (কল্যাণকামী স্বৈরাচার বা একনায়কতন্ত্র)। নানা দল-মতের চিন্তার স্বাধীনতা যখন সুবিধাবাদ আর নৈরাজ্যকে উসকে দিচ্ছিল, তখন অনন্যোপায় রাজারা শক্তহাতে স্বৈরাচারী শাসন প্রবর্তন করেছিলেন। কোনো মানবিক দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেননি। ফলে দেশ আবার অন্ধকার থেকে আলোয় চলে আসে। অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়। শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। প্রশাসন আবার একটি শক্ত ভিত পেয়ে যায়। স্বৈরাচার হয়েও তাই বিশ্বনন্দিত হয়েছেন রাশিয়ার দ্বিতীয় ক্যাথরিন, প্র“শিয়ার দ্বিতীয় ফ্রেডারিক, রোমান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় জোসেফ, স্পেনের তৃতীয় চার্লস, ফ্রান্সের প্রথম নেপোলিয়ন প্রমুখ। ইউরোপের বুদ্ধিদীপ্ত স্বৈরাচার জনপ্রিয়তা পেলেও বাকশাল নিজের ভেতর আত্মগোপনকারী আওয়ামী লীগকে অনেকটাই জনবিচ্ছিন্ন করে দেয়। আর অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা শক্তি লুফে নেয় এই সুবিধাটিই। এই সূত্রেই ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনাটি ঘটে। সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। যারা বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল তারা নিশ্চয়ই মেধাবী! বলা ভালো ‘ইভিল জিনিয়াস’। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগকে পঙ্গু করার জন্য এবং বঙ্গবন্ধু-উত্তর আওয়ামী মেধা নিঃশেষ করার জন্য ‘সাফল্যের সঙ্গে’ জেলহত্যা সম্পন্ন করা হয়। এবার রাজনীতির মাঠে ছুড়ে ফেলে দেয় প্রায় রাজনৈতিক পঙ্গু আওয়ামী লীগকে। পঁচাত্তর পরবর্তী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের রাজনৈতিক অদক্ষতা স্পষ্ট হতে থাকে। দেশ তখন নানা মত-পথে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি, ডান-বাম, মধ্যপন্থা প্রভৃতি ইস্যু তো আছেই- এছাড়া ছাত্র-শিক্ষক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী সব সামাজিক শক্তিও বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। আর এর মোকাবেলায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দূরদর্শী চিন্তা করতে পারেনি সে সময়ের আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। এই ব্যর্থতার সুবিধা পুরোটাই নিতে পেরেছিলেন জিয়াউর রহমান। জাতীয়তাবাদী স্লোগানে নানা মত-পথের মানুষকে নিয়ে বিএনপির জন্ম দিয়েছিলেন তিনি।
এসব ইতিহাস এখন আর নতুন করে মনে করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। তারপরও মনে করিয়ে দিতে হয়। যাতে রাজনীতিকরা সম্বিত ফিরে পান। আত্মসমালোচনা ছাড়া শুদ্ধ হওয়া কঠিন। কারণ আমরা অসহায়ভাবে দেখছি, গণতান্ত্রিক ধারায় নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দিতে পেশিশক্তি আর অর্থশক্তিকেই যেন প্রতিনিয়ত গ্রহণ করছেন আমাদের রাজনীতিকরা। এই অবস্থা থেকে আমাদের রাজনীতি বেরোতে পারছে না। গণতান্ত্রিক আচরণ অপসৃত হতে থাকে দলগুলোর আচরণ থেকে। গণতন্ত্র চর্চার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেকে তৈরি করেছিল জন্মলগ্ন থেকে। সেই দলের এ সময়ের নেতানেত্রীর আচরণে গণতন্ত্র ফিকে হয়ে যেতে থাকে। একটি রাজনৈতিক দলের পরিচিতি, এর চালিকাশক্তি দলের রাজনৈতিক আদর্শ। বিশেষ স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই আদর্শই যদি আপসকামিতার বেড়াজালে বন্দি হয়ে যায়, তাহলে দলের ভালো বলে কিছু থাকে না। দলকে নতুন করে দাঁড়াতে হলে ওই আদর্শকে সামনে নিয়েই দাঁড়াতে হয়।
আমাদের এমন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এখন আদর্শেরই বড় অভাব। দৃশ্যমান আদর্শ একটিই, তা হচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়া। ক্ষমতার রাজনীতিকরা এতটাই জনসেবক যে জনগণ কোনো পক্ষের সেবা না চাইলেও যে কোনো পন্থায় তারা সেবা করবেনই। তাই মসনদ দখলে এত কৌশল। রাজনৈতিক দলগুলো স্বাভাবিকভাবে তাদের রাজনৈতিক আচরণ দেখাতে পারছে না। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজ দলকে শক্তিমান করতে প্রয়োজন দল সুসংগঠিত রাখা। আর এপথে প্রয়োজন দলের ভেতর গণতান্ত্রিক আচরণ বজায় রাখা। কিন্তু যখন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সাধারণ মানুষকে রাজনীতিকরা জিম্মি করেন, জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি করে সুবিধার ফসল নিজ ঘরে নিতে চান, তখন বিশ্বাস করতে মন চায় না তারা গণতন্ত্রের পথে হাঁটবেন।
বিএনপির কথাই যদি বলি, দলটির ভেতর আদর্শ যদি বজায় থাকত তবে দলের সংহতি রক্ষা প্রধান কর্তব্য হতো। গেল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের ঝড় এবং বিগত নির্বাচনে মুখ থুবড়ে পড়ার পর দলকে সুসংগঠিত করার দিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি ছিল। তারেক জিয়া তরুণ অনুসারীদের সংগঠিত করার একটি চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নিজেদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ায় পরবর্তী ঝড় সব উল্টে দেয়। সার্বিকভাবে বিএনপি ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার উদগ্র আগ্রহ যতটা দেখিয়েছে, তার সিকিভাগ আগ্রহও দেখায়নি সারাদেশে দলকে সুসংগঠিত করার দিকে। দল সুসংগঠিত করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা করা। কিন্তু সে পথ না মাড়িয়ে কতটা সহজ পথে ক্ষমতাসীন হওয়া যায় সে পথেই হাঁটতে চেয়েছে। তাই নিজ সাংগঠনিক দুর্বলতার অভাব মেটাতে চেয়েছে জামায়াত-হেফাজতের মতো মৌলবাদী দলগুলোর পেশিশক্তিকে ধারণ করে। বিএনপির জোট আঠারো দলে রূপান্তরিত হয়ে কী অর্জন করতে পেরেছে তা বিএনপি বুঝবে, তবে এখানে যে আভিজাত্যের সম্মিলন ঘটেছে তা বলা যাবে না। দলগুলো এমন যে পরীক্ষায় এই আঠারো দলের নাম বলতে বললে অধিকাংশ পরীক্ষার্থী ডাহা ফেল করবে। তার মধ্যে নামসর্বস্ব কয়েকটি দল আছে যাদের দলীয়প্রধানদের নাম অনেকে জানেন। তাদের কেউ দীর্ঘদিন রাজনীতি করার কারণে পরিচিত। কেউ আবার পত্রিকায় কলাম লিখে পরিচিত। তারা একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা। তবে স্খলনটি এমন হয়েছে যে, জীবনের শেষ ধাপে এসে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধার উজ্জ্বল পোশাকটি অবলীলায় খুলে ফেলে জোটবন্ধু জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে প্রতিদিন মুসাফা করছেন। বিএনপির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে জামায়াত ও হেফাজতের জয়গান গাইছেন। এসব সম্ভব হচ্ছে গণতান্ত্রিক আচরণ ও শিক্ষা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে।
আওয়ামী লীগের নেতারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। কিন্তু বলতেই হবে এ যুগের আওয়ামী লীগ নেতানেত্রীরা বিভ্রান্তির চোরাবালিতে, কেবল নিমজ্জিতই হচ্ছেন। ক্ষমতান্ধ না থেকে গণতান্ত্রিক রীতি পদ্ধতিতে দেশজুড়ে দলকে সংগঠিত করার প্রয়াস গত দু-তিন দশকে নেয়া হয়েছে কেউ বলতে পারবেন না। দলের ভেতর গণতান্ত্রিক আচরণের কোনো প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় না। ফলে বিএনপি-আওয়ামী লীগ সব দলের ভেতরের ছবি অভিন্ন। তাই সরকার পরিচালনায় যে দল যখন আসীন হয় তখন একইভাবে উপেক্ষিত হয় জনগণ। দলীয় সন্ত্রাসের বাড়বাড়ন্ত হয়। প্রশাসনিক দুর্নীতি শাখা-প্রশাখা মেলে। সব দলের সরকার পরিচালকরা একই ছন্দে মার্চপাস্ট করেন।
এমন মরচে ধরা রাজনৈতিক অবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্রমে দুর্বল করে দিচ্ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য সুখকর সংবাদ নয়। আমরা যত আলোচনা-সমালোচনা করি না কেন, দেশে যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সুরক্ষা করতে হয় তবে তা করার মুখ্য দায়িত্ব পালন করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। এখন দলগুলোর নেতানেত্রীদের যে চরিত্র, তাতে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তারপরও যেহেতু আমরা অনন্যোপায় তাই এই রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের দিকে তাকিয়েই আশায় বুক বাঁধতে হয়। এ কারণে প্রত্যাশা করব আমাদের রাজনীতিকদের ভেতর থেকে দেশপ্রেমের প্রণোদনা উৎসারিত হবে। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ ও ক্ষমতার লোভ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
About: S.M Azizul Hakim Hero
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ by মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

ইংরেজি ‘গভর্ন্যান্স শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘কুবেরনাও’ থেকে উদ্ধৃত। এর মানে ‘চালনা’। প্লেটো এটি রূপক অর্থে প্রথম ব্যবহার করেন। শব্দটি গ্রিক থেকে ল্যাটিনে এবং ল্যাটিন থেকে বিশ্বের বহু ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। শব্দটি প্রিজম বা ত্রিপার্শ্ব কাচের মতো বহু বর্ণের সমাহার। প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের কাল থেকে সরকার ও প্রশাসন পরিচালনাই গভর্ন্যাস। এর অর্থ গভর্ন্যান্স সরকার ও প্রশাসনের উভয়ের চেয়ে ব্যাপকতর। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি প্রসঙ্গে অনুচ্ছেদ ৮(২)-এ বলা হয়েছে, ‘এই ভাগে বর্ণিত নীতিসমূহ বাংলাদেশ-পরিচালনার মূল সূত্র হইবে। আইন প্রণয়নকালে রাষ্ট্র তাহা প্রয়োগ করিবেন, এই সংবিধান ও বাংলাদেশের অন্যান্য আইনের ব্যাখ্যাদানের ক্ষেত্রে তাহা নির্দেশক হইবে এবং তাহা রাষ্ট্র ও নাগরিকের কার্যের ভিত্তি হইবে। তবে এসব নীতি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য হইবে না।’
আফ্রিকার নিম্ন সাহারা অঞ্চলের উন্নয়ন সম্পর্কে রিপোর্ট দিতে গিয়ে ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংক প্রথম গভর্ন্যান্স সম্পর্কে একটা পর্যালোচনা করে। সেই প্রতিবেদনের দলিলে সুপরিচালনকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারি খাতের ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি, উন্নয়নের জন্য একটি আইনি কাঠামো, তথ্য পরিবেশন ও স্বচ্ছতাকে সুপরিচালনের চারটি মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অপর পক্ষে সরকারি ও ব্যক্তিগত খাতের মধ্যে পার্থক্য রক্ষা করার অপারগতা, যার ফলে ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি সম্পদের ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হয়নি, উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে পূর্বানুমানযোগ্য আইনি ব্যবস্থা ও পরিচালন প্রতিষ্ঠার অভাবে অত্যধিক নিয়ন্ত্রণবিধির দরুন বাজারের স্বাভাবিক গতিক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি, সম্পদের অপব্যবহার এবং অস্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ পদ্ধতিকে কুপরিচালন বা কুশাসনের কারণ হিসেবে সেই দলিলে শনাক্ত করা হয়।
১৯৯২ সালে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) সুপরিচালন সম্পর্কে এই থিসিস গ্রহণ করে উন্নয়নে শরিকানা, গণতন্ত্রের ও বহুদলীয় সমাজের পরিপোষণ, স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক, সুষ্ঠু ও কার্যকর জাতীয় সরকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, স্বাধীন যোগাযোগের মাধ্যম এবং সংবাদ বিকিরণ, দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতা এবং অত্যধিক সামরিক ব্যয়ের সংকোচনের কথা সুপারিশ করে।
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১১ বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে আমি বলি, ‘আমাদের রাষ্ট্রচিন্তা অতি সাম্প্রতিক কালের। অনস্বীকার্য, তার অনেকখানি পশ্চিমা ভাবধারায় প্রভাবান্বিত। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে তার অ-আ-ক-খ আমরা কিছু আয়ত্ত করেছি। পরাধীন পরিবেশে সেই অনুশীলন ছিল খণ্ডিত, কিছুটা প্রতিবন্ধকতাদুষ্ট। পশ্চিমা সভ্যতার মোকাবিলা করতে গিয়ে আত্মমর্যাদায় তাড়িত হয়ে আমরা বলেছি, পুরাকালে আমাদের দেশেও গণতন্ত্র ও নির্বাচন ছিল। ঠিক হুবহু হবস, রুশো বা লক-এর মতো না হলেও ব্রাহ্মণ্য পুরাণে ও বৌদ্ধ জাতকে প্রায় অনুরূপ সমান চুক্তির একটা নির্দশন আমরা আবিষ্কার করার প্রয়াস পেয়েছি। পৌরাণিক তত্ত্বে দেখি, মাৎস্যন্যায়ে উত্ত্যক্ত মানুষের প্রার্থনায় দেবতারা মনুকে রাজা করে পাঠালেন। ঠিক হলো, রাজা ধর্ম রক্ষা করবেন এবং প্রজারা তাঁকে ষষ্ঠাংশ কর দেবে। বৌদ্ধ মতের সঙ্গে এ তত্ত্বের তেমন ফারাক নেই। স্বর্ণযুগের অবসানে সমাজের অবক্ষয়রোধে ‘প্রকৃতি’কুল সবাই মিলে একজনকে রাজা নির্বাচিত করল এবং তাঁর ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য প্রজা এক-ষষ্ঠাংশ কর দিতে রাজি হলো। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ‘প্রকৃতি’ কর্তৃক রাজা গোপালের নির্বাচিত হওয়ার কথা প্রশস্তিকারেরা রচনা করেছেন। উভয় তত্ত্বে রাষ্ট্রের আগে সমাজ ছিল এবং রাষ্ট্রের পরও সমাজ বড় হয়ে থাকল। রাজার আসা-যাওয়ার মধ্যে সমাজ ছিল মানুষের একমত্র আশ্রয়স্থল। অন্যদিকে আমাদের বাচনিক ঐতিহ্যে, বচন-প্রবচনে বাঁধনকর্ষণ ও বাধ্যকরণের যত প্রবাদবাক্যের প্রাদুর্ভাব দেখি, তাতে মনে হয় সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রশক্তিকে মাকিয়াভেলির দৃষ্টিতেই দেখে এসেছে বহুকাল ধরে। আমাদের তরুণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সম্মুখে এখন ছোট ও বড় অনেক কাজ। বিশ্বের জ্ঞান-ভান্ডারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় এখনো অত্যন্ত সীমিত।’
ওই সম্মেলনে আমি আর বলি, ‘মানবেতিহাসের বৃহদংশ, প্রায় চতুর্পঞ্চাংশ স্বৈরশাসনের ইতিহাস। স্বাভাবিকভাবে তাই, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বা শক্তিকেন্দ্রকে ঘিরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চিন্তা-ভাবনা বিবর্তিত হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে, সেই অ্যারিস্টটলের যুগ থেকে। তার আগে মানুষের মনে রাষ্ট্র বিষয়ে প্রশ্ন ওঠেনি এমন নয়। তবে লেখনীরীতিতে প্রচলনের অভাবে সেই চিন্তা-চেতনার রীতিবদ্ধ রূপ গড়ে ওঠেনি।’
একটা স্বৈরশাসনের পতনের অব্যবহিত পরেই গণতন্ত্র আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে দাঁড়াবে, এমন কোনো কথা নেই। স্বৈরশাসনের অবসান বহির্দেশীয়, অভ্যন্তরীণ বা উভয়ের কারণে ঘটতে পারে। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে যে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয় এবং স্বীকৃতি বিধিবদ্ধতার মধ্যে যেভাবে ক্ষমতার হস্তান্তরণ ঘটে, সেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারীদের বৈধতা সম্পর্কে কোনো মৌলিক প্রশ্ন ওঠে না, নির্বাচনী উত্তেজনা থাকলেও বিস্ফোরণের আকস্মিকতা থাকে না। একটা স্বৈরশাসনের অবসানের পর হয় পুরোনো গণতান্ত্রিক কাঠামোর পুনরুদ্ধার বা সংস্কার বা একেবারে নবপর্যায়ে আমূল পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে। যখন কোনো অভ্যুত্থান রাষ্ট্রমূলে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সাংবিধানিকতার ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে, তখন অনেক সময় সব কেঁচোগণ্ডূষ করে নতুন পথে হাঁটার প্রয়োজন হয়।
সমাজে রাজনীতিকরণ প্রয়োজন রয়েছে, এ ব্যাপারে তেমন মতদ্বৈধ নেই। আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ইত্যাদি সরকারি কর্মকাণ্ড যদি প্রশাসনে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এখতিয়ারে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেখানে হাওয়া-বাতাস বন্ধ ও রুদ্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে সমাজের সর্বস্তরে যদি রাজনীতিকরণ হয় এবং রাজনীতিকরণের নামে প্রশাসনের সর্বমুখী হস্তক্ষেপ ঘটে, তখন যেসব সংস্থার স্বাস্থ্যের কারণে স্বায়ত্তশাসিত থাকা উচিত, তাদের নাভিশ্বাস উঠবে।
কোনো দেশের সরকার যতই সহস্রচক্ষু-উৎকর্ণ হোক না কেন, প্রজার সব সুখ-দুঃখের কথা তার কর্ণে প্রবেশ করবে না। রাজনীতিকেরাই প্রজাতন্ত্রের প্রজার অপরিহার্য যথার্থ প্রতিনিধি। সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধি কেবল একটি নির্বাচনকেন্দ্রের অধিবাসীদের প্রতিনিধি নন, তিনি সারা দেশের প্রতিনিধি। তিনি রাজনৈতিক দলের নিয়মকানুন মেনে তাঁর কর্তব্য পালন করলে তাঁর কর্মকাণ্ডে কোনো বাধা দেওয়া সম্পূর্ণ অবিধেয় হবে এবং গণতন্ত্র তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, অনেক দল কেবল ব্যক্তিপরিচয়ে অস্তিমান। গরচল ও অচল দলগুলো কেবল জোটের শরিক হিসেবে বেঁচে থাকে। সমাজে কেষ্টবিষ্টু হতে হবে দলে থাকা বা দল করা ভালো এমন একটা হিসাবি মন কাজ করছে মনে হয়।
আমাদের দেশে দরিদ্র দিশেহারা মানুষের কাছে রাষ্ট্র হচ্ছে বাপ-মা। মানুষ কল্যাণকর রাষ্ট্রের কথা ভাবে। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে যেসব মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, সে লক্ষ্য আমাদের আয়ত্তের বাইরে হলেও সে আমাদের স্বপ্ন। সে স্বপ্নের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আমরা কিন্তু বেসরকারীকরণের প্রমোদে মন ঢেলে দিয়েছি। নিছক মুনাফাকেন্দ্রিক শিক্ষায়তন, রোগ নিদান-নিরাময়কেন্দ্র ও যোগাযোগের ব্যবস্থাগুলো অনিয়ন্ত্রিত রেখে দিয়েছি। আজ দেশের কেবল্-মোবাইল-ইন্টারনেট প্রযুক্তি কাদের সুবিধার জন্য বেহিসাব স্বেচ্ছাধিকার ভোগ করছে? নিয়ন্ত্রণের ভার জটিল ও ব্যয়বহুল বলে অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ আমলা তাঁর তদারকি করতে পারছেন না। সরকার তার নিয়ামকের দায়িত্ব পালনে যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তা ভয়াবহ।
উপনিবেশ-বিমুক্ত প্রতিটি দেশে আজ ব্যাপক দুর্নীতির প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। দুই হাজার বছরেরও আগে কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে মন্তব্য করেন, জলে চলাফেরা করার সময় মাছ জল খাচ্ছে কি না যেমন নিরূপণ করা সম্ভব নয়, সরকারে কর্মরত সরকারি কর্মচারী নিজেদের জন্য অর্থ গ্রহণ করছেন কি না, তেমনি নিরূপণ করা যায় না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি আজ সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশের প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির ব্যাপকতা উপনিবেশ-বিমুক্ত দেশগুলোর উন্নয়নে আজ সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। আইনের জাল ছিঁড়ে বড় মাছগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে, কেবল ছোট মাছেরা কখনোসখনো ধরা পড়ছে। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের বিচার করা বড়ই কঠিন। অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি দলের লোক হলে প্রভাব বিস্তারের ফলে আইনের গতি শ্লথ বা একেবারেই রুদ্ধ হয়ে যায়। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি বিরোধী দলের হয়, তাহলে সাফাই গাওয়া হয় রাজনৈতিক হয়রানির জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রুজু করা হয়েছে।
আজকাল প্রায়ই টেকসই উন্নতির কথা শুনতে পাওয়া যায়। এই আকর্ষণীয় স্লোগানের পঞ্চাশ রকম অর্থ করা হয়েছিল কয়েক বছর আগে। ইতিমধ্যে শব্দের ব্যঞ্জনা আরও বেড়ে থাকতে পারে। টেকসই উন্নতির উদ্দেশ্য কেবল উৎপাদন, ভোগ এবং কাঁচামালের সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধান নয়, এর সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার বা ন্যায়ের যে সম্পর্ক রয়েছে, সে উৎকণ্ঠা-উদ্বেগ কি আমাদের জীবৎকালের দিকে লক্ষ রেখেই সীমিত থাকবে? আমাদের বংশধরদের প্রতি আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই? আমরা যেভাবে পৃথিবী ও পরিবেশকে পেয়েছিলাম, তার উন্নতি যদি করতে নাও পারি, তাহলে ঠিক সে অবস্থায় আমাদের উত্তরাধিকারীর জন্য রেখে যাওয়াই তো হবে আমাদের কর্তব্য।
যেকোনো সংঘবদ্ধতায় বা পেশায় আমরা জড়িত হই না কেন, যে পরিবেশে আমরা শ্বাসপ্রশ্বাস নিই, যে সমাজে আমরা বাস করি এবং যে অর্থনীতিতে আমরা জীবিকার সন্ধান করি, তাদের যথাযথ গুরুত্বদানের ব্যাপারে আমাদের সামান্য হলেও কিছু উদ্বেগ থাকা উচিত।
‘প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ’—সংবিধানের এই কথাগুলো বলতে ভাবাবেগে আমাদের গলা বুজে আসে। কিন্তু কাজকর্মে জনগণকে আমরা কাছে ভিড়তে দিই না। জনগণকে কোনো দলই যে ধর্তব্যের মধ্যে নেয় না এবং বিশ্বাস করে না, তার সহজতর প্রমাণ—আজও দেশে সংবিধান প্রদর্শিত পথে স্থানীয় সরকার গঠিত হলো না।
দি ইকোনমিস্ট পত্রিকার বিশেষ বিভাগ ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক ২০১০ সালের গণতন্ত্রের সূচকের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, জনগণের স্বাধীনতা, সরকারের কর্মপদ্ধতি, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি—এই পাঁচটি বিষয় বিবেচনা করে বলা হয়, পূর্ণ গণতন্ত্র রয়েছে ২৬টি দেশে। এ ক্ষেত্রে নরওয়ের স্থান শীর্ষে। সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে গণতন্ত্রচর্চায় অবনতি ঘটেছে। ৫৩টি ত্রুটিযুক্ত গণতন্ত্রের মধ্যে ভারত একটি। বাংলাদেশের অবস্থান রয়েছে তৃতীয় শ্রেণীতে, সংকর শাসনব্যবস্থার দেশগুলোর মধ্যে। তবে ভরসার কথা, যেখানে বহু উন্নয়নশীল দেশ গণতন্ত্রের সূচকে পিছিয়ে পড়েছে, সেখানে বাংলাদেশ আট ধাপ এগিয়ে বর্তমানে ৮৩তম স্থানে আছে।
আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ ৯৩তম অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে ক্ষুদ্রতর আরও ১০১টি রাষ্ট্র রয়েছে—দাবি করার সময় জনসংখ্যার বড়াই করা যায়। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশে ১৬ কোটি লোকের প্রাণাচ্ছাদন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শান্তি-শৃঙ্খলার প্রয়োজন সে এক এলাহি ব্যাপার। সরকারের অদক্ষতার কথা বলে সেই বিরাট দায়িত্বকে যেমন খাটো করা যায় না, তেমনি রাষ্ট্র ক্ষুদ্র হোক, ধনী বা দরিদ্র হোক সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা ও তার ক্ষমতায়ন রাষ্ট্রের ওজনে যেন মাপা হয়, আজ পৃথিবীর সব দিশেহারা মানুষ সেই আশাই করে।
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির একাডেমিক কনফারেন্সে প্রধান অতিথির বক্তব্য
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা। সাবেক প্রধান বিচারপতি।
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1372)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ▼ 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...