Showing posts with label প্রকৃতি. Show all posts
Showing posts with label প্রকৃতি. Show all posts

Sunday, July 29, 2018

বৃষ্টির ঘ্রাণ কেন ভালো লাগে আমাদের?

সম্প্রতি জানা গেছে, দীর্ঘ সময় শুষ্ক আবহাওয়ার পর বৃষ্টির পরমুহুর্তে সৃষ্ট ঘ্রাণ বিভিন্ন কারণে মানুষের স্নায়ুতে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরী করে।
এই ভালো লাগার পেছনে রাসায়নিক বিক্রিয়াঘটিত বেশকিছু কারণ রয়েছে।
ব্যাকটেরিয়া, গাছপালা বা বিদ্যুত চমকানো - সবকিছুই বৃষ্টির সময়কার ভেজা মাটি ও নির্মল বাতাসের মনোরম সৌরভের অনুভূতি তৈরী করার পেছনে ভূমিকা রাখে।
ইংরেজিতে 'পেট্রিকোর' নামের এই সুঘ্রাণের উৎসের সন্ধানে বহুদিন ধরেই গবেষণা চালাচ্ছেন বৈজ্ঞানিকরা। ভেজা মাটি
১৯৬০ সালে দু'জন অস্ট্রেলিয় গবেষক প্রথম এই নামকরণ করেন। বৃষ্টি যখন প্রথম শুষ্ক মাটি স্পর্শ করে তখন আমরা যে উষ্ণ, সোঁদা গন্ধ পাই তা ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয় বলে জানান তারা।
যুক্তরাজ্যের জন ইনস সেন্টারের আণবিক জীবাণুবিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক মার্ক বাটনার বলেন, "মাটিতে এই ব্যাকটেরিয়া প্রচুর পরিমাণে আছে।"
বিবিসিকে তিনি বলেন, "আপনি যখন মাটির সোঁদা গন্ধ পান তখন আসলে বিশেষ একধরণের ব্যাকটেরিয়ার তৈরী করা অণু গন্ধ পান আপন।"
জিওসমিন নামের ঐ অণু স্ট্রেপটোমাইস দিয়ে তৈরী হয়, যা সাধারণত উর্বর মাটিতে উপস্থিত থাকে। বৃষ্টির পানির ফোঁটা মাটি স্পর্শ করলে মাটিতে উপস্থিত জিওসমিন বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৃষ্টির পর আরো অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।
অধ্যাপক বাটনার বলেন, "অনেক প্রাণীই এই গন্ধের বিষয়ে সংবেদনশীল হলেও মানুষ এ সম্পর্কে অতিরিক্ত অনুভূতিশীল।"
এই গন্ধকে 'পেট্রিকোর' নাম দেয়া দু'জন গবেষক ইসাবেল বেয়ার আর আর.জি. থমাস ১৯৬০ সালে জানতে পারেন যে সেসময় ভারতের উত্তর প্রদেশে এই ঘ্রাণ আহরণ করে সুগন্ধি হিসেবে বিক্রি করা হতো 'মাটি কা আত্তর' নামে।
বর্তমানে সুগন্ধি তৈরীর কাঁচামাল হিসেবে জিওসমিনের ব্যবহার বাড়ছে।
তবে জিওসমিনের গন্ধ ভালবাসলেও, অনেকেই কিন্তু এর স্বাদ অপছন্দ করেন।
মানুষের জন্য এটি ক্ষতিকর না হলেও পানিতে বা ওয়াইনে সামান্য পরিমাণ জিওসমিনের উপস্থিতিও সহ্য করতে পারেন না অনেকেই। ডেনমার্কের আলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেপ্পে নিয়েলসেন বলেন, "স্বাভাবিকভাবে প্রকৃতিতে যে মাত্রায় পাওয়া যায়, সেই পরিমাণ জিওসমিন মানুষের জন্য ক্ষতিকর না হলেও মানুষ কেন এর স্বাদ পছন্দ করে না সেসম্পর্কে এখনো কিছু জানি না আমরা।"
পেট্রিকোর:পরিভাষা
নেচার জার্নালে প্রকাশিত হওয়া বৈজ্ঞানিক ইসাবেল জয় বেয়ার ও রিচার্ড থমাসের ১৯৬৪ সালের প্রবন্ধ "ন্যাচার অব আর্গিলেশাস ওডর"এ প্রথমবার এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
গ্রীক শব্দ 'পেত্রোস' ও 'ইকোর' থেকে উদ্ভূত হয়েছে এই শব্দ। পেত্রোস অর্থ 'পাথর' আর ইকোর অর্থ 'ঈশ্বরের শিরায় প্রবাহিত তরল।'
গাছ
বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে অধ্যাপক নিয়েলসেন বলেন জিওসমিন তারপিনের সাথেও সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক গাছে উদ্ধৃত সুঘ্রাণের উৎস তারপিন।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল বোটানি গার্ডেনসের গবেষণা প্রধান ফিলিপ স্টিভেনসনের মতে বৃষ্টির কারণে এসব সুবাস প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। গাছে উপস্থিত যেসব রাসায়নিক সুগন্ধ তৈরী করে সেগুলো অনেকসময় পাতার মধ্যে তৈরী হয় এবং বৃষ্টির কারণে এগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ফলে বায়ুতে নির্গত হয়।"
মি. নিয়েলসেন বিবিসিকে বলেন, "শুকনা ভেষজ গুড়া করলে যেমন তার ঘ্রাণ বৃদ্ধি পায়, তেমনি দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমের পর বৃষ্টি হলে গাছের শুকিয়ে যাওয়া অংশগুলো থেকে নতুনভাবে সুবাস তৈরী হয়।"
অতিরিক্ত শুষ্কতার ফলে গাছের অভ্যন্তরীন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার গতি ধীর হয়ে পড়ে। বৃষ্টির সময় গাছ নতুন সজীবতা পায় এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃতিতে সুঘ্রাণ ছড়ায়। বজ্রপাত
বৃষ্টির সময় সুঘ্রাণ তৈরীর পেছনে বজ্রপাতেরও ভূমিকা রয়েছে।
বিদ্যুত চমকানোর কারণে বায়ুমন্ডলে বৈদ্যুতিক আবেশ তৈরী হওয়ায় প্রকৃতিতে ওজোন গ্যাসের একধরণের গন্ধ প্রতীয়মান হয়।
মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যারিবেথ স্টোলযেনবার্গ বলেন, "বিদ্যুৎ চমকানোর পাশাপাশি ঝড় এবং বিশেষত বৃষ্টির কারণে বাতাস পরিষ্কার হয়। যার ফলে বৃষ্টি পরবর্তী সুঘ্রাণও সহজে ছড়িয়ে পড়ে।"
সূত্রঃ বিবিসি

Saturday, January 20, 2018

সারা মাসে সূর্যের দেখা ৬ মিনিট

প্রায় এক মাস সূর্য ছাড়াই কাটিয়েছে রাশিয়ানরা। বছরের শেষ মাস এমনিতেই রাশিয়ায় ‘সবচেয়ে অন্ধকার’ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এ সময় রাশিয়ার আকাশে সূর্য থাকে না বললেই চলে। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বর মাস রেকর্ড গড়েছে। মেঘের দয়া হওয়ায় রাশিয়া পুরো ডিসেম্বরে সূর্যের আলো দেখেছে মাত্র ছয় মিনিট। সাইক্লোনের প্রভাবে মেঘ সূর্যকে ঢেকে দিয়েছিল। খবর বিবিসির। এর আগে ২০০০ সালের ডিসেম্বরে ৩ ঘণ্টা সূর্যের আলো দেখেছিল রাশিয়া। চলতি মৌসুমে রাশিয়ায় ঠাণ্ডাও পড়েছে ভয়াবহ মাত্রায়। পূর্বাঞ্চলের ইয়াকুতিয়া শহর সবচেয়ে বেশি ঠাণ্ডার রেকর্ড করেছে।
তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৬০ ডিগ্রিরও কম। মস্কো থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার পূর্ব দিকের এ অঞ্চলটিতে অবশ্য এমনিতেই ঠাণ্ডার প্রকোপ বেশি হয়। গত সপ্তাহেও রাশিয়ার এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৫০ ডিগ্রির মতো। কিন্তু তারপরও এবারের তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিক বলছেন আবহাওয়াবিদরা। শীতের সময়ে সাধারণত এ অঞ্চলের অধিবাসীরা ঘর থেকে বের হন না। বন্ধ থাকে স্কুল-কলেজ। সাধারণত সতর্কতার অংশ হিসেবে এমন ঠাণ্ডায় মদ্যপান থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। কারণ মদ্যপানজনিত কারণে শরীরের তাপমাত্রা আরও কমে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। শরীরে রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে গরম বা ঢিলেঢালা কাপড় পরেন তারা। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে দেয়া হয় নানা সতর্কতা। যেমন- বাতাস এড়িয়ে চলুন, বাচ্চাদের কিছুক্ষণ পরপর উষ্ণ স্থানে আনা।

Wednesday, February 10, 2016

কুয়াশা-রোদের লুকোচুরি

বিদায়বেলায় মাঘ মাস যেন প্রকৃতির সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদ, কখনোবা কুয়াশা। গতকাল মঙ্গলবার ছিটেফোঁটা বৃষ্টি। আজ বুধবার ভোররাত থেকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় পুরো দেশ। এর সঙ্গে ছিল হিমেল বাতাস। কিন্তু সকাল ১০টার পর নীলাকাশে হাসি দিয়ে ওঠে রোদ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, শীতের শেষে প্রকৃতির রূপ এমনই হয়। দিন যত যাবে, শীত সরিয়ে গরমের মাত্রা আরও বাড়তে থাকবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দুদিনে রাজধানী ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে প্রায় ২ মিলিমিটার। তবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টির মাত্রা ছিল তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা জেলায় বৃষ্টি হয়েছে ৭১ মিলিমিটার।
বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা কমে গেছে, এর সঙ্গে কুয়াশাও পড়ছে।
আজ সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয় রাজশাহীতে, ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল পটুয়াখালীতে, ২৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকায় গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৭ দশমিক ৫ এবং আজ সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল বিভাগে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এ সময় বৃষ্টি হলে সাধারণত কুয়াশা পড়ে। গত দুদিনের বৃষ্টির কারণেই আজ সকালে এই কুয়াশা পড়েছে। কুয়াশার মাত্রা ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বেশি ছিল

Sunday, February 7, 2016

গাছ থেকে পড়ছে কাক, তারপর মরছে

গাছ থেকে পড়ে যাচ্ছে কাক, কিছুক্ষণ পরই মারা যাচ্ছে। এক সপ্তাহে রাজশাহী নগরে এভাবে শতাধিক কাকের মৃত্যু হয়েছে। আর অধিক সংখ্যক কাক মারা গেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে। বিষয়টিতে লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকার একটি বিশেষজ্ঞ দল এসে অসুস্থ ও মরা কাকের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের গাছগুলোতে অনেক কাক থাকে। স্থানীয় লোকজন জানান, গত মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ এসব গাছ থেকে কাক মাটিতে পড়তে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেশকিছু কাক মারাও যায়। এ ছাড়া নগরের শালবাগান, উপশহর ও সাহেববাজার এলাকার রাস্তার ধারে বেশ কিছু কাক মরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টা আমিও শুনেছি। তবে ঠিক কী কারণে কাক মারা যাচ্ছে, আমার জানা নেই।’ মানুষের ওপর প্রভাব পড়বে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা মানুষের জন্য খারাপ কি না, পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে বলা যাচ্ছে না।’
রাজশাহী নগরের লক্ষ্মীপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারুক হোসেন বলেন, বিভিন্ন জায়গায় কাক মরে পড়ে থাকতে দেখে ভয় হচ্ছে। হয়তো কোনো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কাকের মৃত্যু হচ্ছে। এখন এর থেকে মানুষের কোনো ক্ষতি হয় কি না, তা নিয়ে সতর্ক হওয়া দরকার।
এদিকে কাকের মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গতকাল শুক্রবার ঢাকা থেকে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) একটি বিশেষজ্ঞ দল এসেছিল। দলের সদস্যরা নগরের বিভিন্ন জায়গা থেকে অসুস্থ ও মৃত কাকের লালা, রক্ত ও মল সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। যোগাযোগ করা হলে এই দলের কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

Sunday, December 27, 2015

একমাত্র প্যাপিরাসগাছের মৃত্যু by মোকারম হোসেন

ঢাকায় বলধা গার্ডেনের বিরল সংগ্রহ একমাত্র প্যাপিরাসগাছটি এখন আর নেই। দুর্লভ এই গাছটি দীর্ঘদিন ধরে বলধা গার্ডেনের সাইকিতে সংরক্ষিত ছিল। এ বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে কনকসুধার ছবি তুলতে গিয়ে জানতে পারি প্যাপিরাসগাছটি নেই। সাইকিতে ঢোকার পর ডান দিকে রোজক্যাকটাসের পাশে টবের ভেতরেই ছিল গাছটি। জানামতে, দেশে আর কোনো প্যাপিরাসগাছ নেই। আমাদের অবহেলায় একটি উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্ত হলো। কারণ জানতে চাইলে বাগানের কর্মীরা জানান, এ বছর অতিবৃষ্টিতে বাগানের ভেতর জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বৃষ্টির পানির সঙ্গে পয়োনিষ্কাশন নালার ময়লা গাছের গোড়ায় জমে থাকায় গাছটির মৃত্যু হয়েছে। ধারণা করা হয়, বাগান তৈরির সূচনা পর্বেই বৃক্ষপ্রেমিক জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায় প্যাপিরাসগাছটি এখানে নিয়ে আসেন।
দেশের প্রকৃতিপ্রেমিক লেখক ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বলধা গার্ডেন সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই বাগানের চারপাশে অনেক সুউচ্চ স্থাপনা তৈরি হওয়ায় সেখানকার উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি বর্ষায় নিয়মিত জলাবদ্ধতার কারণেও প্রতিবছর অনেক গাছপালার মৃত্যু হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে এখানকার বিলুপ্ত গাছের তালিকা প্রতিনিয়তই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই এই বাগান ধ্বংস হবে। দেশের উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও নিসর্গীদের মতে, মূল গাছগুলো অক্ষত রেখে চারা–কলমের মাধ্যমে বাগানের গাছগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে বলধা গার্ডেনের আদলে আরেকটি বাগান তৈরি করা উচিত। তাহলে বাগানটি নিশ্চিত বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। হারিয়ে যাবে না প্যাপিরাসের মতো দুষ্প্রাপ্য গাছগুলো। শুধু উল্লিখিত গাছটিই নয়, বাগানে এমন আরও অনেক গাছ রয়েছে, যার দ্বিতীয়টি কোথাও সংরক্ষিত নেই। এ ধরনের কোনো একটি গাছ বাগান থেকে হারিয়ে যাওয়া মানে সারা দেশ থেকেই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।
এখানকার বিলুপ্ত গাছের তালিকা প্রতিনিয়তই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই এই বাগান ধ্বংস হবে প্যাপিরাস (Cyperus papyrus) মূলত প্রাচীন লেখার উপকরণ। প্যাপিরাসের বাকলে লেখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তবে প্রাচীন লেখার আরেক উপকরণ ভূর্জপত্রের গাছটি এখনো বাগানের সাইকি অংশে বেঁচে আছে। প্রাচীন মিসরীয়রা প্যাপিরাসের কাণ্ড থেকে একধরনের কাগজ তৈরি করত। একাধিক গাছের সংগৃহীত বিভিন্ন অংশ জোড়া দিয়ে একটি পরিপূর্ণ লেখার উপকরণ বানানো হতো। প্যাপিরাসগাছ এক থেকে চার মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কাণ্ড খুব নরম এবং গোড়ার দিকে মানুষের হাতের কবজির মতো মোটা। মোথা বেশ শক্ত। মোথা থেকে গজানো নতুন চারা লালচে বাদামি রঙের আবরণে ঢাকা থাকে। মাথার দিকে পাতার ভারে কাণ্ড অনেকটা নুয়ে পড়ে। গাছের পাতা দেখতে কোঁকড়ানো খসখসে চুলের মতো। পাতা ছোট, মূল শক্ত। মিসরীয়রা প্যাপিরাসগাছের সরু লম্বা ডাঁটি দিয়ে মাদুর ও নৌকার পাল তৈরি করত। কাণ্ডের ভেতরের মজ্জা শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করত। ইথিওপিয়া ও নীল নদের উজানে এখনো প্যাপিরাসগাছ দেখা যায়। সাধারণত ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এ গাছ ভালো থাকে। গ্রীষ্মের শেষ ভাগে ফুল ফোটে। জলার ধার অথবা অল্প পানির জলাভূমি পছন্দ। বীজ ও মোথাকন্দ থেকে বংশবৃদ্ধি।
বলধা গার্ডেনের হতশ্রী রূপ দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে বাগানটি লোকবল ও অর্থ–সংকটে ভুগছে। বাগানের সর্বত্র অযত্নের ছাপ। সংরক্ষিত সাইকি অংশের পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। স্বল্পসংখ্যক মালি নিয়ে শুধু গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। চারপাশের উঁচু দালানে প্রায় ঢাকা পড়েছে বাগানটি। দিনের আলোয়ও পেছনের দিকটা বেশ অন্ধকার। সিবিলি অংশে সারা দিনই দর্শনার্থীদের ভিড়। এই দর্শনার্থীরা মূলত অন্য মতলবে এখানে আসেন। প্রশ্ন হলো, বলধা গার্ডেনের মতো এমন স্পর্শকাতর একটি স্থাপনা কেন টিকিটের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হলো! তবু যাঁরা এখানে বেড়াতে আসেন, তাঁরা যদি সত্যিকার অর্থে বৃক্ষের সমঝদার হতেন, তাহলে কোনো প্রশ্ন ছিল না। উপরন্তু, নিত্যদিনের এই অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত উদ্যানের বিপন্ন গাছগুলোর মৃত্যুকেই শুধু ত্বরান্বিত করছে। এই বাগানের অর্জিত অর্থ ছাড়া কি বন বিভাগের চলছিল না? আবার এখানকার অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলেও বাগান রক্ষণাবেক্ষণে তার সিকি ভাগও ব্যয় হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, অচিরেই এসব আত্মঘাতী কাজের সমাপ্তি ঘটবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাগানটি বাঁচিয়ে রাখতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক। সাধারণ সম্পাদক: তরুপল্লব
tarupallab@gmail. com

Friday, October 30, 2015

মানুষের বন্দিশালায় পাখিদের আশ্রয় by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

থাকে ওরা কারাগারে, তবে বন্দী নয়। সকালে বাইরে বেরোয়, বিকেলে ফেরে। ওদেরই কূজনে মুখরিত কারাগার। পায়ে ওদের শিকল পরাবে কে?
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের গাছে গাছে এখন অসংখ্য পাখি। সবই শামুকখোল। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পাখিরা শেষ পর্যন্ত কারাগারকেই বেছে নিয়েছে। এখানে তাদের ধরার কেউ নেই। বিরক্ত করারও কেউ নেই। গত তিন-চার বছরে কারাগারের গাছগুলোতে এই পাখির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সংখ্যা বাড়তে বাড়তে তারা কারাগারের বাইরের কয়েকটি গাছেও ছড়িয়ে পড়েছে।
কারাগারের বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরের গাছে পাখিদের এই মাতামাতি অনায়াসে দেখা যায়। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের পূর্ব পাশে রয়েছে কারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে কারাগারের ভেতরে কয়েকটি রেইনট্রিগাছের চূড়া চোখে পড়ে। তাকালে গাছে কোনো পাতা দেখা যাবে না, দেখা যাবে পাখি আর পাখি। মনের আনন্দে ওদের অকারণ ওড়াউড়ি বেশ উপভোগ্য।
কারা বিদ্যালয়ের সামনে একটি তেঁতুলগাছ, একটি মেহগনিসহ বেশ কয়েকটি গাছে একইভাবে বসে আছে পাখি। তাকালে আর চোখ ফেরানো যায় না। ছবির মতো মনে হয়। একসঙ্গে এত পাখি খুব কমই দেখা যায়।
২৩ অক্টোবর সকালে এই কারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পাখি দেখছিলেন রাজশাহী শহরের কবি আমিনা আনসারী। তিনি বলেন, ‘চারদিকে যেভাবে পাখিদের নিরাপদ আবাস ধ্বংস করা হচ্ছে, তাতে পাখিরা দাঁড়ানোর জায়গা পাচ্ছে না। মানুষের অত্যাচারে এলাকা ছেড়ে পালাতে পালাতে পাখিরা শেষ পর্যন্ত মানুষের বন্দিশালায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। কী মিরাকল! মানুষ যেখানে বন্দী, পাখি সেখানে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। তারা সেখানে নিরাপদ। এই দৃশ্য দেখে আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিত।’
পাখি দেখছিলেন নগরের ছোটবনগ্রাম ইউসেপ স্কুলের শিক্ষক মাসুদ রানা। তিনি বললেন, শহরের যান্ত্রিক সভ্যতার মধ্যেও পাখিরা ঠিকই তাদের নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে বের করেছে। শহরের মধ্যে এ রকম নজরকাড়া দৃশ্য আর নেই। তিনি বলেন, পাখিদের সুবিধার্থে কারা বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা উচিত। বিদ্যালয়ের পেছনে কারাগারের জমিতে কাজ করছিলেন একজন দিনমজুর। তিনি বললেন, চার বছর ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন। তিনি খেয়াল করেছেন, জুন মাসের দিকে এই পাখিরা আসে।
জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, কারাগারের ভেতর যে এলাকায় আগে গোয়ালঘর ছিল—মহিষ পোষা হতো, এখন সেখানে কেঁচো সার ও মাশরুম চাষ করা হয়। ওপরে চালা রয়েছে। সেখানে বন্দীদের চলাফেরা কম। প্রয়োজনে যখন তাঁরা যান, তখন ছাতা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, এইটুকু অসুবিধা তারা পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ের স্বার্থে মেনে নিয়েছেন। তা ছাড়া বন্দীদেরও নির্দেশ দেওয়া রয়েছে—কেউ তাদের বিরক্ত করবে না। গত বছরের চেয়ে এবার আরও বেশি পাখি এসেছে এখানে। সন্ধ্যার আগে সব পাখি যখন গাছে এসে বসে, তখন পরিবেশটা আরও দর্শনীয় হয়ে ওঠে বলে জানালেন এই জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক।
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে ও বাইরের গাছগুলোয় ঠাঁই নিয়েছে শামুকখোল পাখি l ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, September 23, 2015

পাখি- সবুজ হাঁড়িচাঁচা by আ ন ম আমিনুর রহমান

কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়ি এলাকায় সেগুনগাছে
বসে আছে সবুজ হাঁড়িচাঁচা। ছবিটি ২০১৪
সালের ২৫ জানুয়ারি তোলা l লেখক
দুর্লভ দুটি সবুজ পাখির সন্ধানে ছিলাম বহুদিন। দুটি পাখির একটি, নীল দাড়ি সুইচোরা (Blue-bearded Bee-eater), যাকে নিয়ে এর আগে লিখেছি। কাজেই আজকে দ্বিতীয়টির পালা, যে কিনা আরও আকর্ষণীয়। ‘জু এনিমেল মেডিসিন’ বিষয়ে বহিঃপরীক্ষক হিসেবে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম জানুয়ারি ২০১৪-এ। চার দিনের ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষে ২৪ জানুয়ারি ভোরে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশে রওনা হলাম ছাত্র ইয়াছিনকে নিয়ে। সে যাত্রায় প্রকৃতিবিষয়ক আলোকচিত্রী মিজানুর রহমানও ঢাকা থেকে গিয়ে শামিল হলেন। মোট পাঁচজনের টিম নিয়ে প্রথম দিন রাস্তার পাশে ও ছড়ায় তিন-তিনবার নীল দাড়ি সুইচোরার দেখা পেলাম।
দ্বিতীয় দিন দুপুরের খাবার ছেড়ে ব্যাঙছড়ি বিটে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই বাচ্চাসহ চার-চারটি কাও ধনেশের দেখা পেলাম। ওদের পেছন ছুটতে ছুটতে একসময় মারমা পাড়ায় চলে এলাম। ঘড়িতে যখন ৪টা বেজে ৫০ মিনিট, ঠিক তখন একটি সিংহরাজকে (Greater Racket-tailed Drongo) নিশানসহ লম্বা লেজ নিয়ে উড়ে যেতে দেখলাম। কাজেই ওর ছবি তোলার জন্য পিছু নিলাম। ওর পেছনে সাত-আট মিনিট ছোটার পর হঠাৎ সবুজ কিছু একটাকে ডান পাশের ঘন বন থেকে বাঁ পাশের সেগুনবাগানের একটি গাছে গিয়ে বসতে দেখলাম। ক্যামেরায় চোখ রাখতেই মন আনন্দে নেচে উঠল। কিন্তু ছবি তোলার জন্য মাত্র এক মিনিট সময় পেলাম। ৪টা ৫৯ মিনিটে এক টিপে মোট পাঁচটি ক্লিক করলাম। এরপর পাখি উড়াল দিল।
এতক্ষণ আকর্ষণীয় যে পাখিটির কথা বললাম, তা এ দেশে দুর্লভ পাখি সবুজ হাঁড়িচাঁচা (Common Green Magpie)। সোনা থালা নামেও এটি পরিচিত। করভিডি অর্থাৎ কাক-হাঁড়িচাঁচা পরিবারভুক্ত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Cissa chinensis।
সবুজ হাঁড়িচাঁচা আকারে হাঁড়িচাঁচার চেয়ে ছোট। লেজ লম্বা। দেহের দৈর্ঘ্য ৩৭-৩৯ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১২০-১৩৩ গ্রাম। মাথা ও পিঠ পাতা-সবুজ, কখনো কখনো নীলচে-সবুজও হতে পারে। লেজের ওপরটা নীলচে-সবুজ। বুক-পেট-লেজ টিয়ে-সবুজ। চোখ থেকে ঘাড় পর্যন্ত কাজল রেখাটি বেশ চওড়া। এ কারণেই মাথার সবুজ ঝুঁটিটি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। ডানার প্রান্ত ও মধ্য পালক তামাটে-খয়েরি এবং ডানার গোড়া ও লেজের আগার পালক সাদা। চোখ টকটকে লাল। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল প্রবাল-লাল। মজবুত ও শক্ত ঠোঁটটিও প্রবাল-লাল। পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে একই রকম। মাথার ঝুঁটি কালচে-বাদামি ও লেজের নিচটা সাদা।
সবুজ হাঁড়িচাঁচা বড় পাতাওয়ালা ঘন বনের বাসিন্দা। তবে সহজে চোখে পড়ে না। মূলত চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা এরা। জামালপুর ও শেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় পাতাঝরা বনে কদাচ দেখা মেলে। পাহাড়ি ছড়ার পাশে, গিরিখাতে একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। গাছের ডালে ও পাতার আড়ালে লুকিয়ে খাবার খোঁজে। টিকটিকি, গিরগিটি, ব্যাঙ, কীটপতঙ্গ, সাপ, পাখির ডিম-বাচ্চা খায়। মরা প্রাণীর মাংসও খেতে পারে। বেশ সাহসী ও জেদি পাখি। অন্যের খাবার ছিনিয়ে নিতেও বেশ পটু। সচরাচর উচ্চস্বরে ডাকাডাকি ও চেঁচামেচি করে। তবে মিষ্টি স্বরেও ডাকতে পারে। ‘পিপ-পিপ, ক্লি-হুয়ি-ও’ স্বরে ডাকে।
এপ্রিল-মে প্রজননকাল। গাছের শিকড়, পাতা, কাঠিকুঠি ও শেওলা দিয়ে ঘন বনের গাছে পাতার আড়ালে বাটির মতো বাসা বানায়। বাসায় চার থেকে ছয়টি ডিম পাড়ে।

Thursday, September 17, 2015

পশ্চিমবঙ্গে ৩,০০০ গাছ পরিচয়পত্র পেলো

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি জেলার কন্যাগর পৌরসভার গাছগুলো এবার তাদের পরিচয় পেলো। বিশ্বে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় নিয়ে নানা পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছে, তখন এ ধরনের উদ্যোগ ভারতে এটাই প্রথম। হুগলি জেলার কন্যাগরে বায়ুম-ল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডকে টেনে নিয়ে বা শোষণের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে পারে, এমন ২৮টি প্রজাতির গাছকে শনাক্ত করা হয়েছিল। এরপর ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিলো কর্তৃপক্ষ। এ প্রজাতিগুলোর প্রায় ৩,০০০ গাছের জন্য পরিচয়পত্র ইস্যু করা হয়। ওই পরিচয়পত্রে গাছগুলোর সাধারণ নাম, বৈজ্ঞানিক নাম, ভৌগোলিক অবস্থান এবং গাছগুলো কি পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে, সে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আইএএনএস। এ উদ্যোগ সবুজ বাসযোগ্য পৃথিবীর তাৎপর্য তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে সাহায্যক করবে। মানুষ আরও সচেতন হবে। কন্যাগর পৌরসভার চেয়ারম্যা বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায় বলছিলেন, গাছগুলোর সঙ্গে তাদের পরিচয়পত্রগুলো ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে শিশুরা প্রতিটি প্রজাতির গাছের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি ধারণা পাবে। যতোগুলোতে সম্ভব, আমরা ততোগুলো গাছে এভাবে পরিচয়পত্র লাগিয়ে দেবো। বিজ্ঞানী অভিজিত মিত্র প্রকল্পটির নেতৃত্বে রয়েছেন। এ প্রকল্পটি সম্প্রসারণের মাধ্যমে অন্য প্রজাতির গাছগুলোকেও শনাক্ত করা হবে। বাপ্পাদিত্য বলছিলেন, এ অঞ্চলে সাধারণভাবে নিম, কৃষ্ণচূড়া, পিপুল জাতীয় গাছ বেশি দেখা যায়। তিনি জানান, ভারতে এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ এটি। চেয়ারম্যান আরও জানান, এ প্রজাতির গাছগুলোর ওপর একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে এবং অচিরেই এটি অনলাইনে আপলোড করা হবে।

Saturday, August 15, 2015

ভালোবাসার ফুল ফুটছে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে by ইফতেখার মাহমুদ

দুর্লভ আমাজন লিলি ফুটতে শুরু করেছে জাতীয় উদ্ভিদ
উদ্যানে। ছবিটি গত বৃহস্পতিবার তোলা -সাজিদ হোসেন
দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশেই এই ফুলটি ভালোবাসার প্রতীক। প্রেমিকাকে ভালোবাসা জানাতে বা বিয়ের অনুষ্ঠানে স্ত্রীকে উপহার হিসেবে আমাজান লিলি দেওয়া হয়।
ছিল তারা ব্রাজিলের আমাজান নদীতে। গত শতকের ষাটের দশকে আসে এই বঙ্গে। আজ অবধি আছে তারা। তবে সংখ্যায় অল্প। নাম তাদের আমাজান লিলি। ষাট থেকে নব্বই দশকে দেশের অনেক স্থানেই তাদের ভাসানো হয়েছিল। মানে তাদের চারা রোপণ হয়েছিল অনেক এলাকার জলকাদায়। কিন্তু কোনো এক অভিমানে বা যন্ত্রণায় তারা বাঁচেনি। এখন আছে শুধু পুরোনো ঢাকার ওয়ারীর বলধা গার্ডেন ও মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। গত সপ্তাহে মিরপুরের জাতীয় উদ্যানের বিশাল সবুজ থালার আকৃতির পাতার সন্নিবেশে আমাজান লিলি ফুটতে শুরু করেছে।
মিরপুর জাতীয় উদ্যানের আমাজান লিলি ফুলের চৌবাচ্চাটির সামনে প্রতিদিনই প্রকৃতিপ্রেমীরা একনজর দেখতে আসেন। অল্প অল্প করে ফুটতে থাকা ওই ফুল দেখাটাই অনেকের কাছে আনন্দের। গত মাসের টানা বৃষ্টির পরশে আমাজান লিলির পাতাগুলোও এবার আরও গাঢ় সবুজ হয়ে উঠেছে। ফুলটির শুভ্রতাও যেন অন্য বছরের চেয়ে বেশি। গত বৃহস্পতিবার শাপলা-জাতীয় ওই ফুলটি দেখতে গেলে হাসিমুখে জানান জাতীয় উদ্যানের মালি আবদুল মালেক।
কবে, কী করে, সুদূর ব্রাজিল থেকে জাতীয় উদ্যানে এই ফুল এল—সেই ইতিহাস জানতে চাইলে নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা জানালেন, ষাটের দশকে বরিশালের এক প্রকৃতিপ্রেমী ডা. এম আহমেদ দক্ষিণ আমেরিকার কোনো এক দেশ থেকে এই ফুলের চারা নিয়ে আসেন। বরিশাল শহরে তাঁর বাড়ির পুকুরে ওই ফুল রোপণ করেন তিনি। ১৯৬৪ সালে বলধা গার্ডেন কর্তৃপক্ষকে কিছু চারা দেন তিনি। বলধা গার্ডেন থেকে ১৯৯৪ সালে মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ওই চারা নিয়ে আসা হয়।
ডা. এম আহমেদ চেয়েছিলেন শাপলা ও পদ্ম ফুলের মতো আমাজান লিলিতে ভরে যাক বাংলাদেশের পুকুর, বিল, ঝিল, হাওর-বাঁওড়। কিন্তু তাতে বাদ সাধে খোদ বাংলার প্রকৃতি। দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়ায় প্রতিবেশ আমাজান লিলির জন্য উপযোগী। আমাজান লিলির জন্য স্বচ্ছ পানির নিরবচ্ছিন্ন ধারা থাকতে হয়। শীতকালে মাঝারি শীত ও প্রচণ্ড খরতাপের গ্রীষ্ম না হলে আমাজন লিলি বাঁচে না। বাংলাদেশে স্বচ্ছ পানির জলাভূমি এমনিতেই কম। যা আছে তা-ও যেভাবে দূষিত হয়ে যাচ্ছে, তাতে দেশি ফুল ও উদ্ভিদেরই প্রাণ যাওয়ার উপক্রম। সুদূরের অতিথি আমাজান লিলি আর কীভাবে বাঁচবে এখানে।
রাজধানীর শিশুপার্কের পুকুরে, রমনা উদ্যানের লেকে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক পুকুরে আমাজান লিলির চারা রোপণ করা হয়। শেরপুর, নওগাঁ, ময়মনসিংহেও এই ফুলের চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু কোনোটাই টেকেনি। রাজধানীর বলদা গার্ডেনের আমাজান লিলিগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নেই। চারপাশে আলো-বাতাস আটকে বহুতল ভবন নির্মাণ হওয়ায় সেখানে আমাজান লিলিগুলো কত দিন টিকবে, তা নিয়ে প্রকৃতিবিদদের রয়েছে সংশয়।
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের সাবেক প্রধান উদ্ভিদবিদ শামসুল হক জানালেন, আমাজান লিলি ভারী বর্ষণমুখর বর্ষায় ফুটে। তাই জুলাই-আগস্টে এর প্রস্ফুটন শুরু হয়। নভেম্বরে তাপমাত্রা ও বৃষ্টি কমে গেলে এর বিশাল পাতাগুলো মরতে থাকে। ফুলও ঝরতে থাকে। ফেব্রুয়ারিতে পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে সেখানে এর বীজ পড়ে থাকে। কাদার মধ্যে থাকা অবস্থায় তাপমাত্রা টানা ৩৪ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাতে অঙ্কুরোদ্গম হয়। পরের বছর আবারও মে-জুনে বৃষ্টি বাড়লে এর পাতা বড় হতে থাকে এবং ফুল ফোটে।
দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশেই এই ফুলটি ভালোবাসার প্রতীক। প্রেমিকাকে ভালোবাসা জানাতে বা বিয়ের অনুষ্ঠানে স্ত্রীকে উপহার হিসেবে আমাজান লিলি দেওয়া হয়। পেরুর অধিবাসীরা বিশ্বাস করে, আমাজান লিলি ফুলের বীজ প্রাণশক্তিবর্ধক। সেখানে আমাজান লিলির বীজ ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

Saturday, June 20, 2015

চোখধাঁধানো আলতাপরি by আ ন ম আমিনুর রহমান

পুরুষ আলতাপরি। ২০১৩ সালের ১৫ মার্চ কালেঙ্গা
অভয়ারণ্য থেকে লেখকের তোলা ছবি
ওদের দুজনকে প্রথম দেখি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। চোখধাঁধানো রূপে মন ভরে গিয়েছিল, মনোমুগ্ধ হয়ে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম জানি না। তবে প্রথম দর্শনে ওদের রূপ-জৌলুশে মুগ্ধ হয়ে ক্যামেরাতেই ক্লিক করতে ভুলে গিয়েছিলাম! সেবার সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণী চিকিৎসার ছাত্রদের ব্যবহারিক পরীক্ষা নিয়ে ফেরার পথে মৌলভীবাজারের বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী ও ফরেস্ট রেঞ্জার প্রয়াত মুনির আহমেদ খানের সঙ্গে দেখা করতে ভুলিনি। তাঁর সঙ্গে ২০১১ সালের ৮ এপ্রিল লাউয়াছড়া গিয়ে বর্ণিল ওই দম্পতির সঙ্গে দেখা। আজ মুনির আহমেদ নেই, কিন্তু তাঁর সঙ্গে তোলা ওদের ছবিগুলো রয়ে গেছে।
এর দুবছর পর ২০১৩ সালের ১৫ মার্চ কালেঙ্গা বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে আবার দেখা হলো এই দম্পতির সঙ্গে। আর এরও ঠিক এক বছর পর অর্থাৎ ১৫ মার্চ ২০১৪-এ সুন্দরবনে আবার দেখা। একটি আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রতিবারই ওদের দর্শনে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার কারণে ভালো ছবি তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। তবে এতে দুঃখ নেই। কারণ, ওদের দিকে তাকিয়ে থাকার সুখ ও আনন্দের মূল্য ছবি তোলার চেয়েও ঢের বেশি।
রূপ-লাবণ্যে ভরপুর অনিন্দ্যসুন্দর যে পাখি দম্পতির কথা এতক্ষণ বললাম, ওরা এ দেশের দুর্লভ প্রজাতির পাখি আলতাপরি (Scarlet Minivet)। রাঙাবউ, সিঁদুরে সহেলি, সিঁদুরে-লাল সাত সহেলি বা সিঁদুরে সাত সাইলি নামেও পরিচিত। এই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Pericrocotus flammeus।
আলতাপরি ছোট আকারের পাখি। লম্বায় মাত্র ২২ সেমি ও ওজন ২৬ গ্রাম। পুরুষটির বুক, পেট ও লেজের তলা আলতা লাল। মাথা, গলা, পিঠ ও লেজের উপরিভাগ চকচকে কালো। কালচে ডানায় দুটি আলতা লাল পট্টি। কোমর আলতা লাল। পুরুষ ও স্ত্রী পাখির রঙে বেশ পার্থক্য দেখা যায়। তবে প্রথম দর্শনে স্ত্রী পাখিটিকে দেখতে পুরোপুরি হলদে বলেই মনে হবে। স্ত্রী পাখির কপাল, গলা, বুক, পেট ও লেজের তলা হলুদ। মাথা, পিঠ ও লেজে ওপরটা কালচে ধূসর। ডানা কালচে ধূসর এবং তাতে দুটি হলুদ পট্টি রয়েছে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই চোখ বাদামি আর ঠোঁট কালো। পা, পায়ের পাতা এবং আঙুলও কালো।
মূলত পাহাড়-টিলাময় বনজঙ্গল ও সুন্দরবনে এদের আবাস। এরা বন ও চষা জমিতে বিচরণ করে। সচরাচর জোড়ায় এবং কখনো বা ঝাঁকে দেখা যায়। শুঁয়োপোকা ও বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ এদের প্রধান খাদ্য। খাবারের সন্ধানে এরা গাছের ডাল থেকে ডালে ঘুরে বেড়ায় আর কীটপতঙ্গ শিকার করে। ‘টিউয়ি-টিউয়ি’ করে বেশ মধুর স্বরে বারবার ডাকতে থাকে।
এরা ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে প্রজনন করে। গাছের সরু শাখায় লতা, শিকড়, লাইকেন, মাকড়সার জাল প্রভৃতি দিয়ে গোলাকার ছিমছাম বাসা তৈরি করে। বাসা তৈরি হলে তাতে দু-চারটি নীল-সবুজ রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ১৩ থেকে ১৯ দিনে। মা-বাবা দুজনে মিলেমিশেই বাচ্চাদের খাইয়ে-দাইয়ে বড় করে তোলে। এরপর একদিন এরা কচি ডানায় ভর করে নীল আকাশে উড়াল দেয়।

ফুল- ক্লেমেটিস by সৌরভ মাহমুদ

অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার বাসার টবের লতায় ফুটেছে ক্লেমেটিস
মে মাসের প্রথম সপ্তাহের শুক্রবার মুঠোফোনে কল, শ্রদ্ধেয় দ্বিজেন শর্মা অপর প্রান্ত থেকে বললেন, ‘কাল সকালেই আমার বাসায় চলে আয়। বারান্দার টবে লাগানো লতায় সাদা রঙের ফুল ফুটেছে, তোকে এ ফুলের গল্প বলব।’ কথা শুনে ভাবলাম, ফুলটিকে এর আগে কোথাও দেখিনি হয়তো। হ্যাঁ, ভাবনাটা পরবর্তী সময়ে সঠিকই হলো। পরদিন কিছুটা বৃষ্টিমাখা সকাল। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই পৌঁছালাম তাঁর সিদ্ধেশ্বরীর বাসায়। এরপরই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। বৃষ্টি থামার পর ফুলের দর্শন পেলাম। একজন উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপকের কাছ থেকে হাতে কলমে জ্ঞান অর্জন!
লতানো গাছের প্রতিটি শাখায় সবুজ পাতার সঙ্গে সাদা রঙের ফুলের থোকা। প্রতিটি ফুলে চারটি পাপড়ি এবং অসংখ্য পুংকেশর। ফুল সুগন্ধী, তবে ঘ্রাণের তীব্রতা কম। এই লতা প্রকৃতিতে এর আগে দেখিনি, তবে এই লতার অন্য এক প্রজাতির ফুলের ছবি দেখেছি। সেটি হলো Clematis gouriana, আমাদের দেশে সিলেট, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় জন্মে।
ফুল দর্শনের পর শ্রদ্ধেয় দ্বিজেন শর্মা জানালেন, কয়েক বছর আগে তিনি ঢাকার উত্তরার এক নার্সারির টবে ফুলভর্তি মোটা একটি লতার গাছ দেখেছিলেন। পরে কেনার জন্য দোকানিকে দাম জিজ্ঞেস করলে তিনি চড়া দাম হাঁকান। অগত্যা সেদিন আর তাঁর লতাটি কেনা হলো না। গত বছর বৃক্ষমেলায় গিয়ে তিনি এ লতার অনেক ছোট চারা দেখতে পান এবং একটি চারা কিনে এনে বাসায় লাগান। এ বছরের গ্রীষ্মে লতায় ফুল ধরে।
এ লতার বৈজ্ঞানিক নাম Clematis flammula। পরিবার Ranunculaceae। ইংরেজি নাম Sweet-scented virgin’s bower। কোনো বাংলা নাম জানা যায়নি। আমাদের দেশে অনেক গাছপালার বাংলা নামকরণ করা হয়নি।
এ লতার ফুল আকর্ষণীয়, সে জন্য ব্যাপকভাবে শোভাবর্ধনকারী হিসেবে লাগানো হয় বাড়ির বাগানে। বাংলাদেশে সম্ভবত সে কারণেই কেউ নিয়ে এসেছেন। আমাদের দেশের নার্সারিমালিকেরা নিজেরাও নানা ফুলের আগমন ঘটিয়েছেন আমাদের দেশে। গত ৬ মে বনানীর ১১ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির দেয়ালে এই ফুলের একটি ঝাড় দেখেছি। আলো-ছায়াময় পরিবেশে এ লতা বেড়ে ওঠে। বছরে একবার পাতা ঝরে এবং একবারই ফুল ধরে। ফুল ফোটে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এবং থাকে বর্ষা অবধি। এ লতার পাতা চকচকে সবুজ এবং ১.৫-২.৫ সেন্টিমিটার লম্বা। মাচা, বাড়ির দেয়াল কিংবা মাটিতে বেড়ে ওঠে। দক্ষিণ ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকার প্রজাতি। ফুলের সৌন্দর্যের কারণে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। বাহারি লতা হিসেবে এটি বাড়ির বাগানে, টবে লাগানো যেতে পারে।

Thursday, June 18, 2015

‘মরুর গোলাপ’ বাংলাদেশে by আনোয়ার হোসেন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে অ্যাডেনিয়াম l প্রথম আলো
‘প্রাকৃতিক বনসাই’ আর ‘মরুর গোলাপ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া অ্যাডেনিয়ামের সঙ্গে পরিচয় ঘটলে এর প্রেমে না পড়ে আপনার উপায় নেই। এমন মন্তব্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারের সহকারী উদ্যান উন্নয়ন কর্মকর্তা, অ্যাডেনিয়াম-প্রেমিক শাহীন সালেহ্উদ্দীনের। তাঁর হাত ধরেই কয়েক বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারে আগমন ঘটেছে অ্যাডেনিয়ামের। এর ব্যাপক পরিচিতি না থাকলেও একদিকে মনোরম ফুল, অন্যদিকে প্রাকৃতিক বনসাই—এমন সমন্বয়ের কারণে ক্রমেই অ্যাডেনিয়াম-প্রেমিকের সংখ্যা বাড়ছে। শাহীন সালেহ্উদ্দীন জানান, অ্যাডেনিয়ামের আদি মাতৃভূমি দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার মরুভূমি। এপোচাইনেসি পরিবারভুক্ত গাছটি বাংলাদেশে সাধারণত শীতের পর থেকে শীতের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অবিরাম ফুল দিয়ে থাকে। ফুলের রং সাধারণত গোলাপি থেকে লাল ও সাদা বর্ণের। অ্যাডেনিয়ামগাছটি খুবই খরা-সহনশীল। এটি কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখায় প্রচুর পরিমাণ পানি ধারণ করে রাখতে পারে, যা খুব অল্প বৃষ্টিপাত ও খরার সময় ব্যবহার করে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে পারে। এর বৈশিষ্ট্য ও এর বাহ্যিক গঠনপ্রকৃতি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং প্রাকৃতিকভাবেই এটি বনসাই প্রকৃতির বলে খরাপ্রবণ এলাকায় টবে চাষ করার জন্য খুবই উপযুক্ত একটি গাছ। সাত-আট দিন পর টবে অল্প কিছু পানি দেওয়া ছাড়া আর তেমন পরিচর্যা লাগে না। একটি গাছ বাঁচতে পারে ৫০-৬০ বছর থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত। এ প্রসঙ্গে শাহীন সালেহ্উদ্দীন বলেন, আপনার লাগানো একটি অ্যাডেনিয়াম স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে দু-এক প্রজন্মের কাছে। কলকাতার ফুলবিজ্ঞানী সুবিল চন্দ্র দে তাঁর ফুলের চাষ বইয়ে এ ফুলের নাম দিয়েছেন ‘কিন্নরী’। তিনি বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ফুলটি সমতল বাংলায় যেকোনো মাটিতে সহজেই চাষ করা যায়। এটি টবে চাষের জন্য উপযুক্ত।
শাহীন সালেহ্উদ্দীন বলেন, ‘এ উদ্ভিদটি সাধারণত আমরা মরুভূমির গোলাপ বলে জানি, যা Adenium obesum, কিন্তু পুরো ল্যাটিন নাম Adenium obesum var obesum। পুরোনো তথ্যে এই মরুভূমির গোলাপটি Adenium arabicum নামে পরিচিত। অ্যাডেনিয়াম নামটি আরবিতে ওডাইন, যার অর্থ অ্যাডেন অর্থাৎ ইয়েমেনের পূর্ব নাম।
অ্যাডেনিয়ামের আদি মাতৃভূমি দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার মরুভূমি, সুদান, কেনিয়া, সেনেগালের পশ্চিমাঞ্চল, ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ছাড়া উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবেই শ্রীলঙ্কাতেও আছে। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ হচ্ছে থাইল্যান্ডে—এ ফুলের কদর ও সৌন্দর্যের কারণে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ফিলিপাইন, জাপান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও কানাডাতেও এর চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর চাষ শুরু হয়েছে, তবে সব জায়গায় নয়। রাজশাহী শহরে ও হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে কিছুসংখ্যক চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছড়িয়েছে।

Monday, June 1, 2015

পাখির নাম ষষ্ঠিনী by শরীফ খান

সেই ষষ্ঠিনী পাখিটি l ছবি: লেখক
৪০ বছর পরে দেখলাম এ রকম আশ্চর্য দৃশ্যটি—এক জোড়া পাতিশিয়াল অর্ধভুক্ত একটি মহিষের বাচ্চা প্রাণপণে টেনে নিয়ে তুলে ফেলতে চাইছে একটা ঝোপের ভেতরে। পাঁচটি শকুন গোগ্রাসে খেয়ে নিচ্ছে মাংস—দুই পক্ষের মধ্যে একটা টানাটানির প্রতিযোগিতাও চলছে, শিয়াল দুটি চাইছে মড়িটা ঝোপের ভেতরে নিয়ে আরামসে খাবে, শকুনরা তা নিতে দেবে না।
দৃশ্যটি দেখলাম এপ্রিলের (২০১৫) দ্বিতীয় সপ্তাহে। গ্রামে ছিলাম। কেউ একজন এসে খবর দিল—খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার একটা গ্রামে ছয়-সাতটি শকুন সে গাছে বসে থাকতে দেখেছে, সঙ্গে একটা মোরগশকুনও আছে। মাথায় আমার চক্কর। মরা পশর নদ থেকে কয়েক কিলোমিটার মাত্র এদিকে—ওই তল্লাটেই সর্বশেষ একটি মোরগশকুন দেখেছিলাম আমরা ১৯৭৮ সালের এক হেমন্ত সকালে। অতএব, মোটেও দেরি না করে দুটি মোটরসাইকেলে চড়ে চারজন আমরা তখনই রওনা হলাম। নির্দিষ্ট গ্রাম পর্যন্ত মোটরসাইকেল গেল না। অতএব, হাঁটা। না, সে গাছে শকুন নেই। ঘণ্টা দুয়েক ঘোরাঘুরি করে হতাশ হলাম। বেলা পড়ে আসছে। ফেরার পথেই দেখলাম ৪০ বছর আগে দেখা দৃশ্যের একটা খণ্ডাংশ। চোখ জুড়িয়ে গেল, মনপ্রাণ ভরে গেল একটা অনাবিল আনন্দে। হয়তোবা ওই শকুনগুলোই। কিন্তু মোরগশকুন বা রাজশকুন কই!
ফিরতি পথ ধরলাম। ছোট একটা বিল যখন পাশ কাটিয়ে আসছি আমরা, তখন একটা জায়গায় জনা কয়েক শিশু-কিশোরকে দেখলাম—যাদের হাতে পাখি। বাবুই-চড়ুই হবে ভেবেও এগোলাম আমরা। ওদের হাতে দুটো ষষ্ঠিনী পাখি, একটি বই পাখি ও একটি ভুতুমে চ্যাগা। ছোট জাল পেতে আটকিয়েছে ওরা। বাড়ি নিয়ে মাংস খাবে। আমরা ওদেরকে বার্ড ফ্লুর ভয় দিলাম। ওদের মতো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে (বাচ্চা) এই পাখিদের বাসায় আছে, মাকে না পেলে বাচ্চাদের কী হবে, ওদের যদি বাবা-মা না থাকে, তাহলে কেমন কষ্ট হবে—ইত্যাকার বোঝানোর পরে ওরা পাখিগুলো আমাদের হাতে দিয়েই দিল। বার্ড ফ্লুর ভয়ে একটি ছেলে তাড়াতাড়ি পাখি দিতে গিয়ে একটি ষষ্ঠিনীকে উড়িয়েই দিল।
ষষ্ঠিনী! এই নামটি আমি জীবনে প্রথম শুনলাম। ফকিরহাট-চিতলমারী-মোল্লাহাটের বেশ কজন বয়সী মানুষও আমাকে ষষ্ঠিনী নামটি বললেন। এক ব্রাহ্মণ তো ব্যাখ্যাই দিয়ে ফেললেন এক কাপ চায়ের বিনিময়ে, এই পাখিটির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় খুবই প্রবল-প্রখর। যেসব মা সন্তানের জন্য খুবই কষ্ট করেন, সন্তানদের দেখেশুনে রাখেন সতর্কভাবে—এরাই ষষ্ঠিনী। তা ছাড়া ‘সাষ্টাঙ্গ প্রণাম’ বলে যে কথাটি প্রচলিত আছে, এই পাখি নাকি তাই করে। অন্য কজন বললেন, শারদীয় দুর্গাপূজার শুরুতে দেবীকে ধরাধামে আগমনের আমন্ত্রণ জানিয়ে বেল বা অশ্বত্থতলায় যে ষষ্ঠীপূজার আয়োজন করা হয়, তখন এই পাখিকে দেখা যায়। এভাবেও হতে পারে নামটা, কিংবা জামাইষষ্ঠীর সঙ্গেও কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। সত্যি-মিথ্যা যা-ই হোক, বিষয়টি দারুণ উপভোগ্য হলো আমার কাছে।
ষষ্ঠিনীর কেতাবি নাম মাঠচড়াই। ইংরেজি নাম Tawny pipit। বৈজ্ঞানিক নাম Anthus campestris। মোট মাপ ১৬ সেন্টিমিটার। শুধু লেজটাই ৭ সেন্টিমিটার। ছোট পাখি। শুকনো মাঠে, নদীর ঘাটে, পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে দ্রুত বেগে হেঁটে হেঁটে খাবার খায়। মূল খাদ্য ছোট ছোট পোকা-পতঙ্গ-কীট ও নানান ধরনের বীজ। তাল-খেজুরের রস পান করে, সুযোগ পেলে বড় বড় ফুলের রেণু-মধুও খায়। কর্মচঞ্চল-চতুর-বুদ্ধিমান ও কুশলী পাখি। সমগোত্রীয় অন্য পাখিদের সঙ্গে দলেও চরে। কণ্ঠস্বর মিষ্টি-সুরেলা, মোলায়েম-ধাতব। রাতের আশ্রয় নেয় এরা শেওড়াগাছ-আখখেত, পানের বরজসহ অন্যান্য ঘন পাতাওয়ালা গাছে।
একনজরে বালু-মাটি আর বাদামি বড় ছোপওয়ালা পিঠ ও লেজের উপরিভাগটা, বুক-পেট মেটে-ধূসর-ফিকে। লেজের প্রান্তের পালক মেটে-সাদাটে। চোখের ওপর দিয়ে ঘাড়ের দিকে চওড়া সাদাটে একটা টান বয়ে গেছে। বুজানো অবস্থায় দুই ডানার প্রান্তদেশে ছয়টি কালো ঝুঁটি দেখা যায়। ঠোঁট হলুদাভ ধূসর। পা হলুদাভ। আমাদের দেশে পরিযায়ী পাখি এরা। ওজন হবে ১৫-২০ গ্রাম। তবু চড়ে যায় রান্নার হাঁড়িতে! তাহলে বড়দের অবস্থাটা কী?

Thursday, May 28, 2015

শালবনের কফিনে শেষ পেরেক by মোকারম হোসেন

গাছকাটা ও পাচারসহ বনভূমি দখলবাজির কারণে শালবন ধ্বংস
কিছুদিন আগে শালবন সম্পর্কে একজন প্রকৃতি গবেষকের মন্তব্য ছিল এ রকম—সংকটাপন্ন কোনো রোগীকে যেমন আইসিইউতে রেখে তার স্বজনেরা বাইরে উদ্বিগ্ন সময় কাটায় এবং কিছুক্ষণ পরপরই চিকিৎসকের কাছে তার পরিস্থিতি জানতে চায়, শালবনের অবস্থা এখন অনেকটা সে রকমই। বাস্তবেও আমাদের একসময়ের রাজসিক শালবন এখন আইসিইউতে। আর গাছপালার কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী চিন্তিত ভঙ্গিতে বাইরে পায়চারি করছেন। বন বিভাগ হয়তো যেকোনো সময় এমন একটি ঘোষণাও দিতে পারে যে দেশে এখন আর শালবন বলতে কিছু নেই। যদি এমন কিছু ঘটেও তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, শালবন এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে ঠেকেছে। ১৯৮৭ সালের দিকে বন বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় বনের ভেতর বিদেশি গাছ লাগানো আরেকটি আত্মঘাতী কাজ। শালবনকে নতুনভাবে জেগে ওঠার সুযোগ না দিয়ে কৃত্রিমভাবে বন তৈরির চেষ্টা খুবই হাস্যকর ও হঠকারী উদ্যোগ। একসময় আয়তনের দিক থেকে দেশের সমতল অঞ্চলে সম্ভবত শালবনই সবচেয়ে বড় ছিল। এমনকি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভারত পর্যন্ত ছিল এর বিস্তৃতি। নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা গ্রন্থে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা জানিয়েছেন, ‘ভারতের ডুয়ার্স থেকে মেঘালয়ের গারো পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত শালবন গোটা বরেন্দ্র অঞ্চল হয়ে ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।... প্লিয়োস্টিন যুগের ২ লক্ষ বছর আগে শেষ ভূমিকম্পে সৃষ্ট লালমাটির আত্মজ এই শালবন খুবই প্রাচীন।’
জীবনে প্রথম কয়েকটি শালগাছ দেখি কুমিল্লার ময়নামতির শালবন বিহারে। সেখান থেকে ফেরার পর অনেকবার ভেবেছি, বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি শালগাছ এখানে কোথা থেকে এল। পরে অবশ্য এই প্রশ্নের জবাব পেয়েছি। ময়নামতির গাছগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ভৌগোলিক বিবর্তন, বেদখল প্রক্রিয়া এবং অপরিকল্পিত বসতি সারা দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শালবনকে নিশ্চিহ্ন করেছে। ময়নামতির পর অসংখ্যবার গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও দিনাজপুরের শালবনগুলো দেখেছি। যতবারই দেখেছি ততবারই কোনো না কোনো পরিবর্তন লক্ষ করেছি। প্রায় নিঃশেষ, ক্ষয়িষ্ণু বন নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বনের ভেতর কোথাও আরণ্যক নিবিড়তা নেই। বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা অল্পবয়সী গাছগুলোর গোড়া একেবারেই সাফসুতরো। মানুষের পদপিষ্ট লতাগুল্মগুলো মৃত্যুর প্রহর গুনছে। বনে আশ্রিত প্রাণিকুল ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়েছে।
মাস খানেক আগে গাজীপুরের হাতিয়াবিবি এলাকায় আরণ্যকে বেড়াতে গিয়ে নিজের চোখে যে দৃশ্য দেখেছি, তা বর্বরোচিত ও জঘন্য। আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় শালগাছগুলো আগুনে দগ্ধ। বনের ভেতরে এই দৃশ্য আরও বীভৎস। যতই হাঁটতে থাকি ততই হতাশায় আচ্ছন্ন হই। শালবনের এমন ঝলসানো চেহারা দেখলে যে কারোরই মন খারাপ হবে। আগুনে শুধু শালগাছই নয়, বনের যাবতীয় প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে। শালবনে কেন আগুন লাগানো হয়েছে, স্থানীয় সূত্র থেকে এই প্রশ্নের একাধিক উত্তর পাওয়া যায়। যার অন্যতম হলো জ্যান্ত গাছ পুড়িয়ে লাকড়ি বানিয়ে সংগ্রহ করা। এই প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় সুবিধা শালবন দখল করা। গাছ পুড়ে যতই বনের আয়তন সংকুচিত হবে, ততই দখল করতে সুবিধা। বর্তমানে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও নতুন নতুন কৌশল। স্থানীয় বাসিন্দারা বনের কিনারায় অগভীর অংশে পালিত বৃক্ষ রোপণ করে পরবর্তী সময়ে জায়গাটি নিজেদের বলে দাবি করে। তাদের যুক্তি, শিল্পপতিরা যদি বন দখল করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না!
শালবন নিয়ে নৈরাজ্যের যেন আর শেষ নেই। এসব দেখারও যেন কেউ নেই। কাগজ-কলমে বন বিভাগ শালবনের অভিভাবক হলেও তারা যে বন রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ, সে কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। অথচ আমরা কেউ কি একবারও ভেবেছি, শালবন ধ্বংস হওয়া মানে দেশের একটি অন্যতম প্রাণভান্ডারের বিলুপ্তি ঘটা। কারণ, শালবন আমাদের দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেম। শালবন মানে শুধু শালগাছই নয়, অসংখ্য লতাগুল্ম, অন্যান্য বৃক্ষ ও বিচিত্র প্রাণীদের আবাসও এখানে। গবেষকদের মতে, এই বনে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্মের বসবাস। আমাদের একমাত্র বুনো রঙ্গন, বুনো কুল, কুম্ভি, উলটচণ্ডাল, গোয়ালিয়া লতাসহ আরও অনেক কন্দজ ও পরজীবী এখানে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। একজন বৃক্ষপ্রেমী বা গবেষক যদি প্রতি মাসে একবার শালবনে যান, তাহলে প্রতিবারই তাঁর জন্য অপেক্ষা করবে কোনো না কোনো নতুন কিছু। বছরজুড়ে থাকে বিচিত্র ফুল, ফল, লতাগুল্ম, কন্দজ আর তৃণ নিয়ে অফুরন্ত প্রাণবৈচিত্র্যের সমাহার। টিকে থাকা যৎসামান্য এই শালবনকে এখন তৃতীয় প্রজন্মের বন মনে করা হয়।
শালবন বিলুপ্ত হলে শুধু যে প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হবে তা নয়, বনের ওপর নির্ভরশীল অনেকগুলো নৃ-গোষ্ঠীও বিপন্ন হবে। বর্তমানে যদিও তারা বনের ওপর নির্ভরশীল নয়, তবু বহিরাগতদের চাপে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হওয়ার আশঙ্কা তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রায় বিশ বছর আগে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা গ্রন্থে শালবনের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, সেখানেও নিঃশেষিত বনের কথা আছে। আছে বনজীবী মানুষের হাহাকারের কথা। বিশ বছর পর এই চিত্র আরও চূড়ান্ত হয়েছে মাত্র।
২০১০ সালের ৪ মার্চ প্রথম আলোয় ‘জাতীয় বৃক্ষ, পুষ্প উৎসব ও অন্যান্য’ শিরোনামে একটি লেখা লিখি। তাতে শালগাছকে আমাদের জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণা করার প্রস্তাব করি। কারণ, দারু মূল্য, পাতার আকৃতি, বংশবৃদ্ধির কৌশল—সবকিছুতেই এরা অনন্য। শালকে জাতীয় বৃক্ষ করা হলে দুটি কাজ হতো। প্রথমত, শাল সম্পর্কে মানুষ নতুন করে জানতে আগ্রহী হতো; দ্বিতীয়ত, গাছটি কিছুটা হলেও রক্ষা পেত। আমরা কি পারি না দেশের অবশিষ্ট বনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে? আমার বিশ্বাস, দেশের অধিকাংশ মানুষই বন দখল করতে চায় না। আমরা যদি একটু সচেতন হই তাহলে মুষ্টিমেয় দখলকারীরা দাঁড়তেই সাহস পাবে না।
মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক। সাধারণ সম্পাদক: তরুপল্লব
tarupallab@gmail.com

Wednesday, May 27, 2015

পামিরার পাখিরা আর ফিরবে না!

২০০২ সাল থেকে ‘নর্দান বলড আইবিস’ (উত্তরের টেকো আইবিস) নামের এ বিরল প্রজাতিকে পামিরার একটি প্রজনন কেন্দ্রে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা পামিরা দখল করার পর পাখিগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গত সপ্তাহে লড়াই শুরু হওয়ার পর সংরক্ষণে রাখা পাখিকে রেখে দ্বাররক্ষীরা পালিয়ে গেলে এরপর পাখিগুলোর কি হয়েছে তা আর জানা যায়নি। নিরুদ্দেশ অপর একটি পাখির সংবাদ প্রদানের জন্য ১ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছেন কর্মকর্তারা।
লেবাননে প্রকৃতি সংরক্ষণ সমিতি বলেছে, জেনোবিয়া নামের একটি স্ত্রী-পাখির খোঁজ পাওয়া এখন খুবই জরুরি। এ প্রজাতির পাখিরা শীতকালে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে এবং ইথিওপিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। জোনেবিয়াই এ প্রজাতির একমাত্র পাখি যে ইথিওপিয়া যাওয়ার সেই রাস্তাটি চেনে এবং তাকে ছাড়া অন্য বন্দি পাখিগুলোকে ছাড়া সম্ভব হবে না। পাখি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাখিগুলোকে ছাড়ানো সম্ভব না হলে সিরিয়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশে তারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ‘সংস্কৃতি এবং প্রকৃতি হাতে হাত ধরে চলে। যুদ্ধ হয়তো বন্ধ হবে, কিন্তু এ প্রজাতিকে বিলুপ্তি থেকে কেউ ফিরিয়ে আনতে পারবে না’ বলেন প্রকৃতি সংরক্ষণ সমিতির প্রধান আসাদ সেরহাল।
আইবিস পাখি মধ্যপ্রাচ্যের গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলে আজ থেকে ১৮ লাখ বছর আগে থেকে বসবাস করে আসছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষের আধিপত্যের কারণে এ প্রজাতির পাখি এখন বিলুপ্তপ্রায়। মধ্যপ্রাচ্যের মরুসীমায় সিরিয়ার পামিরাতেই এখন পর্যন্ত টিকে ছিল মাত্র চারটি পাখি। তাদের জন্য তৈরি করা হয় একটি ছোট্ট প্রজনন কেন্দ্র। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে পামিরার আকাশে কয়েকটি আইবিস পাখি উড়তে দেখা যায়। তারপর তাদের মধ্যে চারটিকে ধরে প্রজনন কেন্দ্রে রাখা হয়। কিন্তু প্রায় ১০ বছর হয়ে গেল মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে মুক্ত আইবিসের আর দেখা মেলেনি। বিবিসি।

Monday, May 25, 2015

নাম দেয়া হল গাজীপুরের অচিন বৃক্ষের by ইকবাল আহমদ সরকার

গাজীপুরের কালীয়াকৈরে আড়াইশ’ বছরের পুরানো বিরল প্রজাতির একটি গাছ অচিন বৃক্ষ নামেই চেনা- জানা ছিল সবার কাছে। অবশেষে ঘটা করে এর নাম দেয়া হলো। এর নাম রাখা হলো তিত বট। বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ (ইপ্যাক ফাউন্ডেশন) ওই পুরনো গাছটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দীর্ঘদিন ধরে পর্যালোচনার পর তিত বট নাম দিয়েছে। বিশাল আকারের গাছটির ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিয়েছে মানুষ। শীতল করেছে প্রান। কিন্তু স্থানীয়রা ওই বলতে পারেননি গাছটির নাম।
বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের আমন্ত্রণে ইপ্যাক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গত শনিবার জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বাঁশতলী গ্রামের অচিন গাছটির নিচে নামকরণ নিয়ে এক সভার আয়োজন করা হয়। এতে গাছটির তিত বট নাম ঘোষণা করেন ইপ্যাক ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ড. আখতারুজ্জামান চৌধুরী। গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Ficus virens var sublanceolata  ইংরেজি নাম White fig। বিশেজ্ঞগণ জানান, বিরল প্রজাতির তিত বট বা সাদা পাকুর নামের এধরনের গাছ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় দেখা যায়। বাংলাদেশেও এটি বিরল। এ জাতের গাছ কালিয়াকৈরের বাশতলি গ্রাম ছাড়া দেশের অন্য কোথাও আছে কি না, এখনো এমন কোনো তথ্য পায়নি বলে জানায় ইপ্যাক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাগণ।

Saturday, May 23, 2015

অচিন বৃক্ষ নাম পেল ‘সাদা পাকুড়’

বাঁশতলী গ্রামের প্রাচীন গাছটির ছায়াতলে গতকাল এর
নামকরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় l ছবি: প্রথম আলো
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাঁশতলী গ্রামের অচিন গাছটি ‘সাদা পাকুড়’। বৃক্ষ গবেষকেরা গতকাল শুক্রবার ওই গাছটির এ নাম দিয়েছেন। নামকরণ উপলক্ষে গতকাল বাঁশতলী গ্রামে আলোচনা সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটি।
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গ্রামের আলেফ মিয়ার বাড়ির সামনে প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর ওই গাছটিতে ছোট সাদা রঙের ফল ধরে। সব সময় ছায়া থাকায় গ্রামের মানুষ একটু প্রশান্তির খোঁজে ওই গাছের নিচে ছুটে আসে। কিন্তু গাছটির নাম কেউ জানত না। তাই তো গাছটি ‘না-চিন গাছ’ বা ‘অচিন গাছ’ নামেই পরিচিত ছিল।
গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘আমার বয়স ৬০ বছর। জন্মের পর থেকেই গাছটিকে এমন বড়ই দেখে আসছি। আমার বাবা-চাচারাও এমন বড়ই দেখেছেন। তবে কেউ নাম জানতেন না।’
গবেষক ও বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণ ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আখতারুজ্জামান চৌধুরী জানান, গাছটির নামকরণ করা হয়েছে ‘সাদা পাকুড়’। এটি অতি বৃহৎ পত্র ঝরা বৃক্ষ। গাছটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতে দেখা যায়। বাংলাদেশে বিরল। দেশের আর কোথাও এ রকম গাছ আছে কি না, এখনো জানা যায়নি।

Monday, May 11, 2015

দেশে পরিযায়ী পাখি বাড়ছে by ফারজানা হালিম

ভূতিহাঁস। টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে
গত জানুয়ারি মাসে তোলা ছবি l সীমান্ত দীপু
দেশে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা বাড়ছে। তবে একসময়ে পরিযায়ী পাখির অন্যতম আবাসস্থল বাইক্কার বিলে কমে গেছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন ফর নেচার (আইইউসিএন) ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের শুমারির প্রাথমিক তেথ্য এ চিত্র পাওয়া গেছে।
আইইউসিএন ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দেশের পাঁচটি স্থানে এই শুমারি করে। শুমারিতে ওই পাঁচ স্থানে ১ লাখ ১২ হাজার পরিযায়ী পাখি পাওয়া গেছে। শুমারিটি করা হয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওর, দোমার চর, হাকালুকি হাওর, বাইক্কা বিল ও সোনাদিয়া দ্বীপে।
বিদেশ থেকে আসা পাখিকে বলা হয় পরিযায়ী পাখি। সুদূর সাইবেরিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে উষ্ণতার খোঁজে বেরিয়ে পড়া এই পাখিরা হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে বাংলাদেশেও আসে।
পরিযায়ী পাখি শুমারির তত্ত্বাবধায়ক ইনাম আল হক গতকাল শুক্রবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, আজ শনিবার বিশ্বজুড়ে পরিযায়ী পাখি দিবস পালিত হবে। দিবসের মূল বক্তব্য হলো: পাখিবান্ধব জ্বালানি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালনে ব্যবহৃত তার, টারবাইন, সোলার প্যানেল, বায়ুচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্রে লেগে অনেক পাখি মারা যায়। তাই এমনভাবে এসব বসাতে হবে যাতে পাখির কোনো ক্ষতি না হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষ প্রয়োগ করে পাখি হত্যাও পরিযায়ী পাখির জন্য বড় হুমকি। এসব বিষয়ে খেয়াল রাখলে দেশে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা বাড়বে।
আইইউসিএন ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের শুমারি অনুযায়ী, ২০১৩ সালে প্রায় ৮০ হাজার ও ২০১৪ সালে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৫ হাজার। তিন বছর ধরে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর এলাকায় পাখি আসা বেড়েছে। তবে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে পরিযায়ী পাখির অন্যতম আবাসস্থল ছিল মৌলভীবাজারের বাইক্কার বিল। ২০১১ সালে ওই বিলে মাছ ধরার নামে জীববৈচিত্র্য ও পাখির আবাসস্থল ধ্বংস করা হয়। এ বছর বাইক্কার বিলে মাত্র ৪১৯টি পাখি দেখা গেছে।
মূলত হাওড় অঞ্চলে পরিযায়ী পাখির সমাগম হয় বেশি। এ ছাড়া উপকূলেও পরিযায়ী পাখির ভিড় হয়। শীতকালে আনাগোনা সবচেয়ে বেশি হলেও বছরের অন্য সময়েও এসে থাকে।
শুমারি অনুযায়ী, টাঙ্গুয়ার হাওরে বরাবরের মতো এ বছরেও পাখির সমাগম সবচেয়ে বেশি, মোট ৫২ হাজার ২৯৯টি। তবে প্রজাতির ভিন্নতা বেশি দেখা গেছে হাকালুকি হাওরে। ৬৮ প্রজাতির ২১ হাজার ৮০১টি পরিযায়ী পাখি আসে হাকালুকিতে। টাঙ্গুয়ার হাওরে দেখা গেছে ৪৩ প্রজাতির। এ ছাড়া দোমার চরে ২১ প্রজাতির ১২ হাজার ২৬৭টি এবং সোনাদিয়া দ্বীপে ৩৭ প্রজাতির ২ হাজার ৩২৩টি পাখি গণনা করা হয়েছে। বাইক্কার বিলে মাত্র ৪১৯টি পাখি এলেও প্রজাতি দেখা গেছে ৩০টি।
টাঙ্গুয়ার হাওর পরিযায়ী পাখির জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান। এই জলাশয়টিকে জাতিসংঘের রামসার কর্তৃপক্ষ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে ২০০০ সালে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পর থেকে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা বেড়েছে। ২০০২-২০০৫ সাল পর্যন্ত পরিযায়ী পাখির সংখ্যা ছিল ১ লাখ। টাঙ্গুয়ার হাওরে এ বছর সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে পাতি কুট পাখির। ওই হাওরে ১৭ হাজার ৬৮৭টি-ই ছিল পাতি কুট পাখি। পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লালঝুঁটি ভূতিহাঁস।
দোমার চরে পাখির সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ছোট ধুলজিরিয়া, সেখানে এই পাখি ৫ হাজার দেখা গেছে। বড় ধুলজিরিয়া, কালা লেজ জৌরালি প্রভৃতি পরিযায়ী পাখির সরব উপস্থিতি আছে সেখানে।
হাকালুকি হাওরে বেশি দেখা গেছে এশীয় শামুকখোল পাখি। এ ছাড়া আছে পিয়াং হাঁস, মরচে রং ভূতিহাঁস। তবে এগুলো বাংলাদেশে সুলভ পরিযায়ী পাখি। বাইক্কার বিলে দুর্লভ বন বাটান পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। এ ছাড়া নিয়মিত আসে পাতি সরালি, মরচে রং ভূতিহাঁস।
সোনাদিয়া দ্বীপের ৯২০টি ছোট ধুলজিরিয়া ও ২৫০টি বড় ধুলজিরিয়া পাখির দেখা মিলেছে। এ ছাড়া এখানে বিশ্বব্যাপী সংকটাপন্ন নয়টি চামচ ঠুঁটো বাটানেরও দেখা মিলেছে। দেখা পাওয়া গেছে বিশ্বজুড়ে বিপন্ন ছয়টি নর্ডম্যান সবুজ পা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা ফিরোজের মতে, দেশে কয়েক বছর ধরেই পরিযায়ী পাখির ব্যাপারে জনসচেতনতা বেড়েছে। আগে এসব পাখি শিকার করে বিক্রি করা হতো। এখন তা কমেছে। এদের আবাসস্থলগুলো রক্ষা করা গেলে অনেক পাখিই এখানে থেকে যেত।

Tuesday, May 5, 2015

রং লেগেছে ডালে ডালে by আশীষ-উর-রহমান

কৃষ্ণচূড়া। হাতিরঝিল লেকের পাড় থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
বিদায় নিয়েছে শিমুল-পলাশ। তবে প্রকৃতি থেকে তাদের রঙের ছটা একেবারে মুছে যায়নি। বসন্তের সেই রক্তিম রেশ ধরে রেখেছে গ্রীষ্মের কৃষ্ণচূড়া। খররোদে তপ্ত দিনে এই ব্যতিব্যস্ত মহানগরের পথে পথে ঘন সবুজ পত্রপুঞ্জের ভেতর উজ্জ্বল হয়ে আছে লাল কৃষ্ণচূড়ার গুচ্ছ। রং লেগেছে কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে।
শহরকে পুষ্পশোভিত করে তুলতে কৃষ্ণচূড়া অনন্য। চৈতালি হাওয়ার ঝাপটায় পাতা ঝরে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার শাখা গ্রীষ্মের শুরু থেকেই যখন অজস্র ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, প্রখর রোদের দীপ্তিতে তখন তার এই বিপুল বর্ণবৈভব চোখে প্রায় ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। দিনে দিনে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলের চারপাশ দিয়ে উদ্গত সবুজ পাতারা ফুলগুলোকে যেন সযতনে রচিত স্তবকে পরিণত করে তোলে। চলতি পথে আপনা থেকেই তার দিকে দৃষ্টি যায়। অনাবিল আনন্দের অনুভূতি মনকে প্রশান্ত করে।
ঢাকার পথে ফুলের শোভা বেশি চোখে পড়ে এই গ্রীষ্মেই। প্রধান ভূমিকা কৃষ্ণচূড়ার। জাতীয় সংসদ এলাকায় বিজয় সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোড, রমনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পুরোনো এলিফ্যান্ট রোড, বেইলি রোড, হাতিরঝিল, কাকরাইলের কৃষ্ণচূড়ার সারি লাবণ্যময় করে রেখেছে পরিবেশ। এ ছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন পথের পাশে, দপ্তর প্রাঙ্গণে বা কোনো পুরোনো বাড়ির উঠানের কোণ থেকেও কৃষ্ণচূড়ার রঙিন উচ্ছ্বাস ব্যস্ত পথিকের দৃষ্টি ছুঁয়ে যায়। তাতে মন স্নিগ্ধতার স্পর্শ পায়। আবার কারও হয়তো মনে পড়বে কবি শামসুর রাহমানের সেই অমর কাব্যপঙ্ক্তি, ‘আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে/ কেমন নিবিড় হ’য়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা/ একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়-ফুল নয়, ওরা/ শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।/ একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রঙ।’
কেবল আনন্দানুভূতির সঙ্গেই নয়, কৃষ্ণচূড়া কখন যেন জড়িয়ে গেছে আমাদের চেতনার অনুষঙ্গে। ফুলটিকে তাই বিদেশি বলে ভাবতেই বরং বিস্ময় জাগে। তবে সত্যি যে কৃষ্ণচূড়ার জন্ম এখানে হয়নি। তার আদি নিবাস সুদূর মাদাগাস্কারে। দ্বিজেন শর্মা তাঁর শ্যামলী নিসর্গতে লিখেছেন, জন্মভূমি মাদাগাস্কার থেকে ১৮২৪ সালে তার পর্যটন শুরু। প্রথমে মুরিটাস, সেখান থেকে রানির দেশ ইংল্যান্ড হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে তার পরিচয় ‘ডেলোনিক্স রিজিয়া’।
আদি বাস যেখানেই হোক, বহু বছর থেকে কৃষ্ণচূড়া আমাদের দেশে বেশ যত্নেই লালিত-পালিত হচ্ছে। সে যেমন তার অনন্য রূপমাধুরী দিয়ে মানুষের মন ভরিয়ে দিয়েছে, তেমনি মানুষও তাকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছে। স্থান দিয়েছে কাব্যে, হৃদয়ে। তাই কৃষ্ণচূড়াকে আর পর বলে মনে হয় না। আসলে ভালোবাসাই দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয় চিরকাল, আপন করে তোলে অপরকে; সেই যে রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন, ‘দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু, পরকে করিলে ভাই’। সুদূর থেকে নিকটে আসা কৃষ্ণচূড়া তোমার রূপমাধুরীতে বাংলার তপ্ত গ্রীষ্মকে রাঙিয়ে দাও অনন্তদিন।

শিঙ্গেল প্যাঁচার দুটি ছানা by শরীফ খান

ডাকাতিয়া কালবৈশাখী এল মাঝরাতের পরে, চরাচর কাঁপিয়ে-দাপিয়ে চলে গেল ভোরবেলায়। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল শিলাবৃষ্টি—এই দুটির সম্মিলনে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলের খেতসহ গাছপালা ভেঙে-উপড়ে পড়ে। উড়ে যায় পাখিদের ঘরবাড়িও, উড়ে যায় উড়তে না শেখা পাখির ছানারাও।
ঝড় যখন চলে গেল, থেমে গেল শিলাবৃষ্টি, তখন বাড়ির আঙিনায় ছেলেপুলেদের হই-হুল্লোড় শুনে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে এলেন মীর ইকরামুল হাসান নামক তরুণ মানুষটি। চারটি শিঙ্গেল প্যাঁচার ছানা নিয়ে কাড়াকাড়ি লাগিয়েছে ওরা, গত রাতের প্রবল ঝড়ের তোড়ে আঙিনার বয়সী রয়নাগাছ থেকেই পড়েছে ওরা, গাছে বড়সড় খোঁড়ল আছে একটা। ইকরামুল ধমক মারতে মারতে তেড়ে গেলেন ওদের দিকে, ততক্ষণে অপেক্ষাকৃত বড় ছানা দুটির দফারফা হয়ে গেছে। ও দুটিকে হাতে নিয়েই ছেলেপুলেরা দৌড়ে পগার পার। বাকি দুটি ছানাকে দুহাতে তুলে নিয়ে বুকের কাছে আনলেন পাখিপ্রেমী ওই তরুণ। ভয়ে কাঁপছে ওরা থিরথির করে। বুক ঢিপঢিপ। চোখ বুজে আছে ভয়ে।
ইকরামুল ওই সময়েই মুঠোফোনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানালেন বিস্তারিত, চাইলেন ছানা দুটিকে বাঁচিয়ে রাখার পরামর্শ। ছবি তুলে পাঠালেন। এ ব্যাপারে আমার কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা আছে। ঢাকার ৪০ বছরের জীবনে ঢাকা শহর ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ৭৭ বার লক্ষ্মীপ্যাঁচার ছানাদের খবর আমার কাছে এসেছে, যার অধিকাংশই সদ্য উড়তে শেখা আনাড়ি কিশোর পাখি। হয়তো কাকের কবলে পড়ে নাস্তানাবুদ হয়েছে, আহত হয়ে ওড়ার শক্তিই হারিয়েছে সাময়িকভাবে, না হয় পড়েছে মানুষের কবলে। সব ক্ষেত্রেই আমি পরামর্শ দিয়েছি শুধু চেলা-পুঁটি-মলা-ঢেলা মাছ খাওয়াতে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিতে, আর অবশ্যই দিনের বেলায় যথাসম্ভব ঘরের অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় রাখতে। রাতে রাখতে বলেছি খোলা ছাদে, গাছের ডালে। হ্যাঁ, ৭২ বারই সফলতা মিলেছে। কিন্তু ইকরামুল হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি পেয়েছেন শিঙ্গেল প্যাঁচার দুটি ছানা। হ্যাঁ, গত প্রায় চার সপ্তাহে ছানা দুটি পেটপুরে মাছ খেয়েছে, বেড়ে উঠেছে এবং ইকরামুল আশা করছেন আগামী দুই-পাঁচ দিনের ভেতর উড়তে পারবে ওরা। উড়িয়ে দিয়েই ছুটি-শান্তি ইকরামুলের। ঝড়েÿক্ষতিগ্রস্ত হওয়া একটি হলদে বউ পাখির বাসার দুটি ছানা ছেলেপুলেরা নিয়ে যাচ্ছিল, ও দুটিও উদ্ধার করে লালন-পালন করছেন তিনি। আহারে হলুদ রঙের ছানা দুটি!
শিঙ্গেল প্যাঁচারা বাসা করে গাছের খোঁড়লে-কোটরে। ডিম পাড়ে দুই-তিনটি। ছানা হয় ২৫-৩০ দিনে। নিশাচর ও ক্যামোফ্লেজ রঙের। প্রধান খাদ্য গেছো ইঁদুর, নেংটি ইঁদুর, তক্ষকের ছোট বাচ্চা, লাউডগা সাপের বাচ্চা, ছোট ব্যাঙ ও টুনটুনি জাতীয় ছোট পাখিদের ডিম-ছানা ও পোকা-পতঙ্গ। গেছো ইঁদুরেরা মানুষের লাউ-কুমড়া-শিমসহ গাছফসলের মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই, শিঙ্গেল প্যাঁচারা কৃষকের বন্ধু।
ঘন বন-বাগান, বিশেষ করে বাঁশমহাল বা বাঁশঝাড় ওদের অতি প্রিয় আবাসস্থল। বাঁশ-কঞ্চি ও পাতার রঙের সঙ্গে ওদের রং মিলেমিশে এমনইভাবে ক্যামোফ্লেজ হয়ে যায় যে ওদের দেখতে পাওয়াই দুষ্কর। ওরাও সেটা জানে ভালোভাবে। খুব কাছে গিয়ে ওদের খপ করে ধরে ফেলাও সম্ভব।
ইকরামুল ছানা দুটিকে পান গত ৭ এপ্রিল ভোরে। হলদে বউয়ের ছানা দুটি বাড়িতে আনেন ১১ এপ্রিল। ৬ এপ্রিল দিনগত মাঝরাতের পরই প্রচণ্ড কালবৈশাখী ও শিলাপাতে মাগুরার পাশের জেলা ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ছোট মৌকুড়ি ও পাথরবাড়ে গ্রামের বাঁশঝাড় ও আশপাশের বাগানে আশ্রয় নেওয়া প্রায় পাঁচ হাজার পাখি মারা পড়েছিল, যার অধিকাংশই ছিল শালিক প্রজাতির। ওই ৭ এপ্রিলের ঝড়েই শিঙ্গেল প্যাঁচার ছানা চারটি রয়নাগাছ থেকে পড়েছিল ইকরামুলের বাড়ির আঙিনায়। বাড়িটি মাগুরা শহরেই, পুলিশ সুপারের বাসভবনের পাশেই।
শিঙ্গেল প্যাঁচার ইংরেজি নাম Collared scops owl. বৈজ্ঞানিক নাম otus bakkmoena. এরা নিমপ্যাঁচা নামেও পরিচিত। এই প্যাঁচাদের মাথার দুপাশে দর্শনীয় পালক-শিং আছে। ছাই-বাদামি আর হালকা হলুদাভ রঙের পাখি। পা-ঠোঁটও হলুদাভ। এদের কণ্ঠস্বরটা জোরালো, ডাকটা ভুতুড়ে ভয়ংকর। হুউট-হুট, হুউট! হঠাৎ ডেকে মানুষের পিলে চমকে দেয়। বিখ্যাত বাঘ শিকারি জিম করবেটের ভাষায়, যেন বা কোনো মৃতের আত্মা কবর ফুঁড়ে উঠে এসে দেহটার সন্ধান করছে, বেঁচে ওঠার জন্য করুণভাবে মিনতি জানাচ্ছে কারও কাছে।