Tuesday, October 7, 2025

পৃথিবী ঘুমায় গাজার মানুষ মুখোমুখি হয় বিশ্বাসঘাতক দখলদারের by দোহা খালুত

আমাদের রাত বড় দীর্ঘ। এই রাতে আমরা সান্ত্বনা দিই লোনা স্মৃতিগুলোকে। পার হই এক অনন্ত আকাক্সক্ষার পথ- যার তীব্রতা কখনো ম্লান হয় না। দিনে আমরা ছুটে বেড়াই নানা সমস্যার পেছনে- যা শুরু হয় এক গ্লাস পানি থেকে, শেষ হয় ক্লান্তির সঙ্গে মেশানো এক টুকরো রুটিতে। ভাববার সময় নেই- আমি কে? এখানে এসে পড়লাম কীভাবে? এই দিনগুলো টিকে থাকতে আমাকে আর কতো কিছু হারাতে হবে? অতীতটাও তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবে। তাই যা সময় বাকি আছে, তা আমরা স্মৃতিচারণে ব্যয় করি- ভয়ে, যদি সেগুলোও মুছে যায়।

আমরা প্রশ্নের এক অবিরাম স্রোতের পিছু ছুটি, তারপর ঘুমিয়ে পড়ি মাথায় ঘূর্ণায়মান অগণিত প্রশ্ন নিয়ে- উত্তর খোঁজার ব্যর্থ প্রচেষ্টায়।
কীভাবে এত প্রশ্ন জমে গেল?

৭ই অক্টোবর, ২০২৩। এই দিনেই গাজাবাসীর চারপাশে প্রশ্নের অবরোধ শুরু হয়। যেদিকেই তাকায়, একগুঁয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলে থাকে। কেউ কিছুই বুঝতে পারে না, আটকে থাকে সকাল সাড়ে ছয়ের ঘড়ির কাঁটায়- একই দুই প্রশ্নে: ‘কী হচ্ছে?’ ‘এর পরিণতি কী হবে?’
পরদিন সকালে দখলদার বাহিনী নিজেদের উত্তর পাঠায়- অচেনা অস্ত্রের গর্জনে, ঘরবাড়ি ধ্বংসের নীতিতে, আর অমানবিক বক্তব্যে, যা আমাদের ভয়ে স্তব্ধ করে দেয়। যখন সামান্য বিদ্যুৎ থাকতো, টেলিভিশনের সামনে বসে আমরা ব্রেকিং নিউজের লাল ফিতা পরতাম, নিজেদের মধ্যে বলতাম-‘ওখানে আমাদের কে আছে?’
আর ‘ওখানে’ বলতে বোঝানো হতো সেই জায়গা, যেখান থেকে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘বোমা হামলার শিকার।’

কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য আমরা নাম ধরে প্রার্থনা করতাম। খবরের বন্যা চারদিকে। তারই মাঝে একদম খুব কাছে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র সব নীরবতা ভেঙে দেয়। শরীর অবশ লাগে। মনে হয় দুঃস্বপ্ন দেখছি- চোখ খুললেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু চেতনা ফিরে পেলে শোনা যায় কম্পমান কণ্ঠস্বর-
‘তুমি বেঁচে আছো? তোমার বোন আর ভাই তোমার সঙ্গে আছে?’
কথা বের হয় না। গলা শুকিয়ে যায়। এক অকল্পনীয় ভয় তোমাকে গিলে নেয়।
একই দৃশ্য, একের পর এক দিন।
সাতদিন ধরে একই প্রশ্ন, একই ভয়, একই নিঃশব্দ ডাক।
ভাবতে শুরু করো- সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছো। কিন্তু না- শত্রুর হাতে এখনো অজানা অনেক দৃশ্যপট বাকি।
এসব প্রশ্ন কীভাবে জমা হলো

১৩ই অক্টোবরের সকাল। গাজাবাসী জেগে উঠলেন এক ‘নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিতে মোড়া’ বাস্তুচ্যুতির নির্দেশনায়। দখলদার বাহিনীর অফিসিয়াল ঘোষণায় বলা হলো- উত্তর গাজার বাসিন্দারা যেন ‘নিরাপদ দক্ষিণে’ চলে যায়। কারণ উত্তরে ‘ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্র’।
তখন প্রতিটি ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো একটাই প্রশ্ন: ‘কোথায় যাবো?’
যাদের আত্মীয় ছিল দক্ষিণে, তারা দেরি না করে রওনা দিলো। যাদের কেউ ছিল না, তারা সামান্য জিনিস, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যেদিকে বাতাস, সেদিকেই চললো। রাস্তায় ভাঙা ঘরের টুকরো বহন করা গাড়ির ভিড়ে মানুষের মুখে লেখা ছিল ভয়- আর কাঁধে ছিল প্রশ্নের ভার। অনেকেই হাঁটতে হাঁটতে দক্ষিণে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল শুধু হালকা কাপড় আর মনের ভেতর ঘরবাড়ির স্মৃতি- যার জন্য প্রতি রাতে কাঁদেন তারা।
শিশুরা জিজ্ঞেস করতো- ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
তাদের প্রশ্নে অভিভাবকরা জড়িয়ে ধরতেন। কিন্তু উত্তর দিতেন না।
‘নিরাপদ’ দক্ষিণের অনিরাপদ কাহিনী:
দক্ষিণে এসে নতুন সব কষ্টের গল্প শুরু হয়। অনেক মা তাদের সন্তানকে বুকে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু স্বামী বা অন্য কোনো সন্তান নেই সঙ্গে। তারা অস্থায়ী তাঁবু গেঁড়ে বসবাস শুরু করেন। পরিষ্কার রাখেন। জিনিসপত্র সাজান যেন ঘরের মতো লাগে। আর প্রতিদিন দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন কোনো চেনা কণ্ঠের জন্য।
ইখলাস, বয়স ৪২। স্বামী ও চার সন্তান নিয়ে আশ্রয়শিবিরে থাকেন। তার চোখে একটাই প্রশ্ন- ‘আমার ছেলে মুহাম্মদ এখন কেমন আছে?’
সে রয়ে গেছে উত্তর গাজায়। নেটওয়ার্ক পেলে একটুখানি খবর আসে, তাতে কাঁপে মা-ছেলের মন। এমন হাজারো মা- খালি চোখে, ঝুলন্ত হৃদয়ে বেঁচে আছেন।
৬০ বছর বয়সী ফায়জা উত্তর গাজা ছেড়ে যাননি। প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা করে সন্তানদের নিয়ে ঘর থেকে ঘরে পালিয়েছেন। তার একমাত্র ছেলেকে গ্রেপ্তার করে নিখোঁজ করা হয়। ৪০ দিনেরও বেশি কোনো খোঁজ নেই।

স্বামী নিহত হয়েছেন। ছেলে মুক্তি পেলেও তাকে দক্ষিণে পাঠিয়ে দেয়া হয় মায়ের নাগালের বাইরে। এখন তিনি একা, সঙ্গী শুধু বিষাদ আর অশান্ত চিন্তা।
শুরুকের বয়স ২৫। কিন্তু মুখে শৈশবের কোমলতা এখন নিঃশেষ। তাঁবুর দরজায় বসে থাকেন সারাক্ষণ, কোলে শিশু, চোখে অশ্রু। এক বছর তিন মাসের বিবাহিত জীবন তার। এরপরই স্বামী নিহত হয়েছেন। তাদের ঘর, হাসি, শিশুর কান্না- সবই এখন শুধু স্মৃতি। মা বলেন-  মেয়ে বোধহয় পাগল হয়ে গেছে। প্রতিদিন অপেক্ষা করেন স্বামীর ফেরার জন্য, শিশুকে দেখাবে বলে। এটা কি আশা, নাকি উন্মাদনা?
কোনো উত্তরই যথেষ্ট নয়: এই দীর্ঘ রাতে, জমে থাকা প্রশ্নগুলো ভেঙে পড়ে আমাদের ওপর। প্রতিটি ছবিতে, প্রতিটি স্মৃতিতে ফিরে আসে এক প্রশ্ন- ‘আমাদের ঘর কি আবার হাসবে? আগের দিনগুলো কি ফিরে আসবে?’ উত্তর জানা নেই। তবু আশার প্রতারণায় বিশ্বাস করি- হয়তো ফিরবে। মন জ্বালিয়ে দেয় নতুন প্রশ্ন- এই যুদ্ধ কতোদিন চলবে? আমরা কি আজীবন এমনই থাকবো? এই চিন্তা দূর করতে আমরা হাসাহাসি করি- ‘ফিরে গেলে আবার দেখা হবে।’ কেউ মজা করে যোগ করে- ‘যদি কখনো ফিরি।’
সবাই থেমে যায়।
বাঁচা এখন একমাত্র লক্ষ্য।
এই যুদ্ধ আমরা বেছে নিইনি- তবু এরই শিকার। আমরা ভালোবাসি আমাদের জমি, ঘর, কাজ, রাস্তাঘাটের অভিযান। বঞ্চনার অভিজ্ঞতা আবার সহ্য করা যায় না। ‘কখন? কার সঙ্গে? কোথায়?’- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেলে মুক্তি নেই। আর তখনই মাথায় আসে এক ভারী প্রশ্ন- ‘বিশ্ব কি আমাদের দেখে?’
কোনো উত্তরই যথার্থ লাগে না।
যদি দেখে, তবে কোথায় তারা? আর যদি না দেখে, তবে তারা করছে কী?
সময় গড়িয়ে যায়- চার ঋতু কেটে গেছে। আমরা এখন এমন এক জায়গায়, যা আমাদের চেনে না, আমরাও যাকে চিনি না। শরৎ আসে, শীত যায়, বসন্ত পেরিয়ে যায়- কিন্তু আমরা এখনো অপরিচিত এক জীবনে বন্দি। প্রতি মাসে ভাবি, আরেক মাস টিকবো তো? তারপর সেই মাস আসে- আর যুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। প্রতিদিন একই প্রশ্ন, একই ব্যথা- ‘গাজাবাসী কীভাবে এত কষ্ট সহ্য করে?’ ভয়, ক্ষুধা, বিয়োগ- সবই তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। তবু পরের দিনের সূর্য যেন আবারো ধুয়ে দেয় আগের দিনের দুঃখ। এই সহনশীলতা হৃদয়ের অভাব নয়- বরং অবিরাম বেদনা মানুষকে শক্ত করে তোলে, অনুভূতি চেপে রাখতে শেখায়।
বেঁচে থাকা এখানে এক যুদ্ধ- সকালের তাপ থেকে শুরু, রাতে ঠাণ্ডায় শেষ। বিশ্ব জানে এর সামান্যই- কিছু ছবি, কিছু ভিডিও, কিছু আর্তনাদ। তারা ভাবে- আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ভাবতে চায়, আমাদের দৃঢ়তা নাকি এক ‘নায়কোচিত’ কাহিনী। এভাবেই তারা নিজের অপরাধবোধ ধুয়ে ফেলে। কখনো কিছু সহায়তা আসে, আবার থেমে যায়। বিশ্ব তখন শোনে আমাদের মৃত্যুর গল্প- কখনো বিস্ময়ে, কখনো আপত্তিতে। আর যখন পৃথিবী ঘুমায়, গাজার মানুষ তখন মুখোমুখি হয় এক বিশ্বাসঘাতক দখলদারের- আর জেগে থাকে সেই এক প্রশ্ন নিয়ে- ‘আমরা কতোটা একা?’

(দোহা খালুত গাজার কবি ও শিক্ষক। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আশবাহ’ প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালে। তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি ও ইনস্টিটিউট ফর আইডিয়াজ অ্যান্ড ইমাজিনেশনের যৌথ উদ্যোগে প্যারিসের রিড হল-এ শিল্পী আবাসনের জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি আগ্রাসনে রাফাহ সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে যেতে পারেননি। বর্তমানে তিনি গাজার মধ্যাঞ্চল দেইর আল-বালাহ-তে অবস্থান করছেন, সেখান থেকেই নিজের লেখা বিশ্বে পাঠাচ্ছেন। তার মূল লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন হাইথাম আল ওয়ারডানি।  লেটারস ফ্রম গাজা- বই থেকে) লেখক: দোহা খালুত অনুবাদ: মোহাম্মদ আবুল হোসেন
https://mzamin.com/uploads/news/main/183495_3.webp

নেতানিয়াহুর এই কথা কি সত্যি by সাইফুল সামিন

হাজার হাজার ফিলিস্তিনির রক্ত যাঁর হাতে, তাঁর আবার ‘মান-অপমান’। তবু জাতিসংঘের মতো বিশ্বমঞ্চ বলে কথা।

বক্তৃতামঞ্চে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উঠতেই প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা গণহারে ওয়াকআউট করেন। অধিবেশনকক্ষ প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়।

‘গাজার কসাই’ নামে কুখ্যাতি পাওয়া নেতানিয়াহু শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। মাথা ইতিউতি করেন। যেন কিছুই হয়নি—এমনটা বোঝাতে চাইলেন তিনি। তবে তা সত্ত্বেও তাঁর অস্বস্তি চাপা থাকে না।

ভরা মজলিশে এমন ‘অপমান’ ঢাকতে কী করতে হয়, তা ধূর্ত রাজনীতিক নেতানিয়াহুর চেয়ে আর কারও ভালো জানার কথা নয়।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সৃষ্ট এমন পরিস্থিতির মধ্যে ভাষণ দেন নেতানিয়াহু। তিনি তাঁর ভাষণে বলেন, ‘অনেক বিশ্বনেতা প্রকাশ্যে আমাদের নিন্দা করেন, আবার তাঁরাই গোপনে আমাদের ধন্যবাদ জানান।’

এখন প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহুর এই কথা কি সত্যি?

নেতানিয়াহু যে দাবিটি করলেন, তার পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ হাজির করেননি। আবার ঠিক কোন কোন বিশ্বনেতা এমন দ্বিচারী আচরণ করেন, তাও তিনি বলেননি।

নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে।

প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নেতানিয়াহুর। অপমান ঢাকার কৌশল তাঁর ঢের জানা। যাঁরা গণহারে ওয়াকআউট করেছেন, তাঁদের নিশানা করে পাল্টা আঘাত হানতে এমন কথা বলে থাকতে পারেন নেতানিয়াহু।

সে ক্ষেত্রে অনেকটা ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’ হলো।

এক. ওয়াকআউট করা নেতাদের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করা গেল। রটিয়ে দেওয়া গেল, ওয়াকআউট আসলে লোকদেখানো। ওয়াকআউটকারীরা গোপনে ঠিকই ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। শুধু যোগাযোগই রাখেন না, গোপনে বাহবাও দেন। অর্থাৎ, গাজায় হামলাসহ অন্যান্য ইসরায়েলি পদক্ষেপকে তাঁরা গোপনে সমর্থন করেন।

দুই. নেতানিয়াহু নিজের অপমান সহজেই ঢাকতে পারলেন। গণহারে প্রতিবাদী ওয়াকআউটের প্রসঙ্গ ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে নেতানিয়াহুর বিতর্কিত বক্তব্য।

নেতানিয়াহুর এমন কৌশল অবশ্য নতুন নয়। তিনি তাঁর সমালোচক, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, এমনকি ‘প্রতিকূল’ বিচারপতিদের মোকাবিলায় এভাবে আক্রমণ করে থাকেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় কৌশলী বাগ্মিতা (রেটোরিক) ব্যবহার করে বিরোধীদের প্রশ্নবিদ্ধ করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর দেওয়া একাধিক ভাষণ বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা। এসব বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, ন্যারেটিভ (বয়ান) নির্মাণ, নিজের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠন, দর্শক প্রভাবিত করা, জনমত নিয়ন্ত্রণ, বিভাজন তৈরির মতো উদ্দেশ্যে নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে কৌশলী শব্দ, বাক্য, প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করেছেন।

শুধু তা-ই নয়, নেতানিয়াহু ঘরে-বাইরে দেওয়া বক্তৃতায় দেদার ডাহা মিথ্যা বলে থাকেন। এর মধ্যে ফিলিস্তিন ইস্যু অন্যতম।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা চলছে। এই হামলার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর ২০২৫)।

দুই বছরে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি। গাজার লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গাজা উপত্যকা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।

গত মাসের মাঝামাঝি প্রকাশিত জাতিসংঘের এক স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নিধন চালাচ্ছে ইসরায়েল। এর জন্য নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দায়ী করা হয়।

গাজায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায়, রক্তনদী বয়ে যাওয়ায় খোদ মিত্র দেশগুলোও এখন ইসরায়েলের সমালোচনায় সরব। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডার মতো প্রভাবশালী দেশ। এসব ঘটনায় বৈশ্বিকভাবে চাপে আছেন নেতানিয়াহু। এই চাপ উপেক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর নানান কৌশলের মধ্যে আছে বাগ্মিতার ব্যবহার।

তবে জাতিসংঘে নেতানিয়াহু যে দাবিটি করেছেন, সেটিকে কেবল বাগ্মিতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে পর্দার আড়ালে, খুব গোপনে অনেক কিছুই ঘটে, যেগুলো সাধারণত প্রকাশ পায় না। ফলে নেতানিয়াহুর দাবিটিকে পুরোপুরি নাকচ করাও কঠিন।

এই যেমন সম্প্রতি চ্যানেল ৪-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চলমান জাতিগত নিধন অভিযানের মধ্যে গত আগস্টে যুক্তরাজ্য থেকে ইসরায়েলে ১ লাখ ১০ হাজার বুলেট সরবরাহ করা হয়েছে। একই মাসে ইসরায়েলে পাঠানো অন্যান্য চালানের মধ্যে ছিল ট্যাংকের যন্ত্রাংশ, শটগান বা রাইফেলের যন্ত্রাংশ, ক্ষেপণাস্ত্র, বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ।

অথচ এই যুক্তরাজ্যই গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার প্রকাশ্যে সমালোচনা করে আসছে। আর দেশটি গত ২১ সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঘোষণা দিয়েছিল, তারা ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানির ২৯টি লাইসেন্স স্থগিত করেছে। কারণ, এসব অস্ত্র আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনে ব্যবহৃত হতে পারে। সে সময় যুক্তরাজ্য সরকার বলেছিল, তারা গাজায় বর্তমান সংঘাতে ব্যবহৃত হয় এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছে যায় এমন পণ্যের বিক্রি আটকে দিচ্ছে।

তবে এটাও আবার ঠিক, যুক্তরাজ্যে এখনো প্রায় ৩৫০টি লাইসেন্স সক্রিয় রয়েছে। যার মধ্যে ১৬০টির বেশি ‘সামরিক’ লাইসেন্স হিসেবে তালিকাভুক্ত।

গাজা যুদ্ধ বন্ধে গত ২৯ সেপ্টেম্বর নেতানিয়াহুকে পাশে রেখে ২০ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কার্যত ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষার চাতুর্যপূর্ণ এই পরিকল্পনাটিকে তাড়াহুড়া করে অনুমোদন দিয়েছে মুসলিমবিশ্বের বেশ কিছু প্রভাবশালী দেশ।

সম্প্রতি মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইতিহাসবিদ ও ফিলিস্তিনবিষয়ক গ্রন্থপ্রণেতা হাসান বোখারি মুসলিম দেশগুলোর এই পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনের প্রতি বিরাট বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

হাসান বোখারির মতে, এই বিশ্বাসঘাতকতা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এ পরিকল্পনাকে সমর্থন দিয়ে মুসলিম দেশগুলো ফিলিস্তিনিদের আগ্রাসী ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল ও তার গণহত্যাকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে।

প্রকাশ্যে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে অস্ত্র বিক্রি, গোয়েন্দা সহায়তা, বাণিজ্যিক চুক্তি বজায় রাখা কিংবা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থনকে এক অর্থে ‘গোপন ধন্যবাদ’ হিসেবেই দেখা যেতে পারে। জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু সম্ভবত এই ‘ধন্যবাদের’ কথাই বলেছেন।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, মিডল ইস্ট মনিটর, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউইয়র্কার, ফোর্বস, রয়টার্স।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি দিয়ে বানানো পোস্টার। পোস্টারে তাঁর সম্পর্কে লেখা আছে—‘সন্ত্রাসী, গণহত্যাকারী, ধর্ষক’। গাজা যুদ্ধের বিরোধিতা করে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ৪ অক্টোবর স্পেনের মাদ্রিদে আয়োজিত বিক্ষোভে
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি দিয়ে বানানো পোস্টার। পোস্টারে তাঁর সম্পর্কে লেখা আছে—‘সন্ত্রাসী, গণহত্যাকারী, ধর্ষক’। গাজা যুদ্ধের বিরোধিতা করে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ৪ অক্টোবর স্পেনের মাদ্রিদে আয়োজিত বিক্ষোভে। ছবি: এএফপি

নেতানিয়াহুর গাজা দখলের পথে সামান্য বাধা by আবেদ আবু শাহাদা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সোমবার যে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তার পুরো পটভূমি বিশ্লেষণ করা ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। সেখানে তাঁরা গাজায় গণহত্যা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।

নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের এক সম্মেলনের এক সপ্তাহ পর এ ঘোষণা এসেছে। সেই সম্মেলনে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের উদ্যোগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব ওঠে। একই সময় ইসরায়েলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও বর্জনের ঢেউও তীব্র হয়।

এতে ইসরায়েলের ভেতরেও যুদ্ধবিরোধী সমালোচনা বাড়তে শুরু করেছে। কারণ, তারা এখন শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয় পাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গাজায় গণহত্যার কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি স্থগিত করার কথা ভাবছে। এটি সেই ভয়কে আরও জোরদার করেছে।

এ অবস্থায় নেতানিয়াহু এখন বড় এক সংকটে আছেন। একদিকে তিনি একজন নিও–লিবারেল রাজনীতিক হিসেবে জানেন, ইসরায়েল পশ্চিমা শক্তি ও মুক্তবাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাই আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া কতটা ক্ষতিকর, তা তিনি ভালোভাবেই বোঝেন।

অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সামনে এসেছে ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে উচ্ছেদ করার এক ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’। জায়নবাদী স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইসরায়েলের দক্ষিণপন্থী সমাজের মধ্যে এখন এই ‘সুযোগ’ নেওয়ার বিষয়ে ব্যাপক সমর্থন আছে।

ফলে নেতানিয়াহুর সামনে এখন কঠিন দ্বিধা। তিনি পশ্চিমের সঙ্গে সমঝোতা করে আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা ধরে রাখবেন, নাকি দেশের ভেতরের শক্ত পৃষ্ঠপোষক-শিবিরকে সন্তুষ্ট করার জন্য সেই উচ্ছেদমুখী নীতিকে এগিয়ে নেবেন? তিনি দুদিকেই সমানভাবে আগ্রহ ও চাপে আছেন। তাই তাঁকে খুব সাবধানে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তবে সব মিলিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যাবে, ট্রাম্পের ‘২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা’ বাস্তবে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের লক্ষ্য, অর্থাৎ গাজাকে ফিলিস্তিনিশূন্য করার পথে খুব বড় কোনো বাধা হবে না।

নেতানিয়াহু জানেন, তাঁর দক্ষিণপন্থী সরকারের স্বপ্ন হলো গাজার সব ফিলিস্তিনিকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে পশ্চিম তীর থেকেও তাদের উচ্ছেদের নজির তৈরি করা। একই সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন, গাজার গণহত্যা নিয়ে ট্রাম্প দেশ-বিদেশে চাপের মুখে আছেন, তাই তাঁকেও কিছু ‘রাজনৈতিক ফলাফল’ দিতে হবে।

এই সপ্তাহে যে ‘২০ দফা পরিকল্পনা’ প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে নতুন কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক আলোচক ব্রেট ম্যাকগার্কের মতে, এটি মূলত গত জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের অনুলিপি, যেটি মার্চে ইসরায়েল নিজেই ভেঙে দিয়েছিল।

পার্থক্য শুধু এই যে এবার সেটিকে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সমর্থন দিয়ে মোড়ানো হয়েছে। কিন্তু আরবদের সেই সমর্থন ছিল শর্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ শুধু তখনই তারা রাজি, যদি শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

ট্রাম্প এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার যে গাজা প্রশাসনের পরিকল্পনা দিয়েছেন, সেটি নাকি অস্থায়ী ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে গাজাকে ধীরে ধীরে পশ্চিম তীরের সঙ্গে একীভূত করার কথা বলা হয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ট্রাম্প যে পরিকল্পনা সাধারণভাবে দেখিয়েছেন, সেটি আগেই আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে যে খসড়া আলোচনা করা হয়েছিল, তার সঙ্গে মেলে না। অর্থাৎ পরিকল্পনার প্রকৃত খসড়া এবং ট্রাম্প যা প্রদর্শন করেছেন, দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে এ তথ্য গোপন করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, গাজায় না হামাস, না ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ—কেউই শাসন করতে পারবে না।

আগামী বছর ইসরায়েলে নির্বাচন। তাই নেতানিয়াহু এখন সময়কে নিজের অনুকূলে নিতেই ব্যস্ত। এ জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখার জন্য সবকিছু করতে রাজি। এমনকি গত মাসে দোহায় ইসরায়েলি হামলার পর ট্রাম্পের কথামতো তিনি কাতারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন, যদিও তাঁর ভোটাররা এটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন।

নেতানিয়াহু বুঝতে পেরেছেন, এখন ইসরায়েলসহ বৈশ্বিক দক্ষিণপন্থীরা মূলধারার সংবাদমাধ্যম নয়, বরং বিকল্প প্ল্যাটফর্ম থেকে খবর নেয়। সেখানে তাঁর অযৌক্তিক বক্তব্যের প্রতিবাদ করার মতো সাংবাদিক কেউ থাকেন না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রস্তাবটি নেতানিয়াহু বহু মাস আগেই গ্রহণ করতে পারতেন। তাতে হাজার হাজার নিরপরাধ ফিলিস্তিনি নিহত হতো না, বরং আরও জীবিত বন্দী মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকত। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ, তাঁর লক্ষ্য সব সময় একটাই থেকেছে—গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা।

* আবেদ আবু শাহাদা, ফিলিস্তিনি রাজনীতিক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

বিভুরঞ্জন সরকার যে প্রশ্নগুলো রেখে গেলেন by নাদিম মাহমুদ

বর্ষীয়ান কলামিস্ট ও সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর তাঁর লাশ মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহটির নিশ্চয়ই সৎকার হয়েছে বা হবে; কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি যে একগুচ্ছ প্রশ্ন আমাদের জন্য রেখে গেছেন, এই সমাজ ও রাষ্ট্রের মুখে ছুড়ে দেওয়া সেই প্রশ্নগুলোর সৎকার কে করবে?

সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার পাঁচ দশক ধরে দুহাত ভরে লিখে গিয়েছিলেন। তাঁর সর্বশেষ লেখাটি এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছেন, তা আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে, আশঙ্কার পথ তৈরি করছে।

বিভুরঞ্জন সরকার গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। যেদিন তিনি নিখোঁজ হন, সেদিন (২১ আগস্ট) ভোর পাঁচটায় সিদ্ধেশ্বরী থেকে ‘খোলা চিঠি’ আকারে তাঁর সর্বশেষ লেখাটি লিখেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে। তাঁর সেই লেখা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিলেও তাঁর বিদায়ে আমাদের ‘ভঙ্গুর সাংবাদিকতা’ একখণ্ড প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করে গেছে, যা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি বলে মনে করছি।

বিভুরঞ্জন মৃত্যুর আগপর্যন্ত ছিলেন আজকের পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখে পরিচিত পাওয়া এই সাংবাদিকের শেষ জীবনে যে ধকল গেছে, তা বুঝতে হলে তাঁর খোলা চিঠিকে আমাদের পড়তেই হবে। সেই চিঠিতে তিনি এমন কিছু বিষয়ের আলোকপাত করে গেছেন, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলোচনায় হয়তো আমাদের আগামীর বিভুরঞ্জন সরকারদের বাঁচাতে সাহায্য করবে।

বিভুরঞ্জন সরকারকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন; কিংবা তাঁর পেশাদারি সম্পর্কে জানেন, তাঁদের কাছে তিনি ছিলেন একজন সজ্জন ও ন্যায়নিষ্ঠ সাংবাদিক, যিনি কিনা তাঁর চোখে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতির বিষয়ে ক্রমাগত লিখেছেন; কিন্তু দিন শেষে, তিনি নিজেই নানা অসংগতির সঙ্গে বসবাস করে গেছেন, নিজের নীতির সঙ্গে আপসের সাহস না দেখালেও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাঁকে নানা সময় বিচলিত করে রেখেছিল, যা তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে। একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকদের প্রাত্যহিক জীবন কী ধরনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা তাঁর পাঁচ দশকের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় তুলে ধরেছেন বর্ষীয়ান এই কলামিস্ট।

বিভুরঞ্জন সরকার তাঁর সেই আলোচিত খোলা চিঠিতে লিখছেন, ‘আমি লিখেছি সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, দেশের পক্ষে; কিন্তু আজ যখন নিজের জীবনকে দেখি, অনুভব করি সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়। আমার পেশা আমাকে শিখিয়েছে, সত্য প্রকাশ করা মানে সাহসের সঙ্গে ঝুঁকি নেওয়ার নাম।’

আর এই ঝুঁকি নিয়ে আমাদের দেশের হাজারো সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশ করে আসছেন। কেউ পারছেন, আবার কেউ ঘুণে ধরা সিস্টেমের সঙ্গে আপস করে নিয়েছেন। শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সৎ সাংবাদিকতা করা কেবল দুরূহ নয়, জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও বটে।

গণমাধ্যমগুলো মালিকপক্ষের বুকপকেট থেকে বের হতে পারছেন না। ফলে তাঁবেদারি কিংবা তুষ্ট করার সাংবাদিকতায় বেশি চর্চিত হচ্ছে। শাসকদের বিরুদ্ধে গেলে শাসকেরা লাল চোখ দেখান পত্রিকার মালিকদের বা সম্পাদকদের। এই চর্চা কয়েক বছর ধরে চলে আসার পরিপ্রেক্ষিতে ‘নিয়ন্ত্রিত সাংবাদিকতা’ কিংবা সীমাবদ্ধ প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমগুলো কাভার করতে বাধ্য হচ্ছে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, যাঁরা এই ‘বনসাই জার্নালিজম’ করতে পারেন না, তাঁদের বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে।

ফলে সংবাদমাধ্যমগুলোই চাচ্ছে না আমাদের সাংবাদিকেরা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করুক। এর মূল কারণ হচ্ছে, সরকার কিংবা ক্ষমতাশালী অংশের বিরুদ্ধে গিয়ে সাংবাদিকতা করতে গেলে যে চাপ আসবে, তা সহ্য করার সক্ষমতা সব গণমাধ্যমের থাকে না। বিজ্ঞাপন হারানোর ভয় থেকে শুরু করে করপোরেট হাউসগুলোর মালিকপক্ষের ব্যবসার কথা বিবেচনা করে একধরনের আপসের সম্পাদকীয় নীতিমালা করতে হচ্ছে। ফলে পাঠকেরা অনেক সময় ডিপ জার্নালিজম দেখার সুযোগ পান না।

অভিযোগ আছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হতো, তাতে ভয়ের সংস্কৃতি চর্চা হয়েছে; কিন্তু গণ-অভুত্থানের পর আমরা এই অভিযোগ থেকে সংবাদমাধ্যমগুলোকে দূরে রাখতে পারিনি। তাঁর প্রমাণ মেলে প্রয়াত সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের লেখায়। তিনি বলছেন, গত বছর সরকার পরিবর্তনের পর গণমাধ্যমের অবস্থা আরও কাহিল হয়েছে। মন খুলে সমালোচনা করার কথা প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন; কিন্তু তাঁর প্রেস বিভাগ তো মনখোলা নয়। মিডিয়ার যাঁরা নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন, তাঁরা সবাই আতঙ্কে থাকেন সব সময়। কখন না কোনো খবর বা লেখার জন্য ফোন আসে। তুলে নিতে হয় লেখা বা খবর!

এমন অভিযোগ আমরা ঢাকার অনেক সাংবাদিকের মুখে শুনছি। সর্বশেষ বিভুরঞ্জন সরকার যে অভিযোগ তুলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চিত্র অঙ্কন করে গেছেন, তা সত্যিই বেদনাদায়ক। সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা না থাকলে দেশে কখনোই গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরবে না, বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমকে শক্তিশালী করার চেষ্টা না থাকলে কোনো ঐকমত্য কিংবা সংস্কার বিফলে যাবে।

সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় এই পেশায় এসে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কয়েক দশক ধরে এমন প্রবণতা আমরা লক্ষ্য করছি। অনেক তারকা সাংবাদিক এসে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাটুকু করার যখন চেষ্টা করে দিন শেষে আর্থিক দৈন্যের শিকার হন, তখন স্বভাবত এই পেশাকে তাঁরা ‘গুডবাই’ জানিয়ে তুলনামূলক বেশি বেতনের চাকরি লুফে নিচ্ছেন। ফলে সাংবাদিকতায় মেধাবীদের যে বিচরণ, তা কমতে শুরু করেছে। বিভুরঞ্জন সরকার তাঁর সেই খোলা চিঠিতে এমনই এক অভিযোগ করে গেছেন। তিনি লিখেছেন, আজকের সময়ে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ অন্য রূপ। অনেকেই সুবিধা, স্বার্থ, সামাজিক মর্যাদা বা আর্থিক স্বার্থের জন্য সত্যকে আড়াল করে লেখেন।

আর এসব করতে গিয়ে ক্ষতির শিকার তিনি কিংবা তাঁর পরিবার। বাবার লেখালেখির প্রভাব গিয়ে পড়ে সন্তানদের শিক্ষালয়ে বা পেশায়। বিভুরঞ্জনের ক্ষেত্রে সেটি হয়েছে বলে তিনি  অভিযোগ করে গেছেন, যা আমাদের অবাক করেছে। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর সততা। এই সততাকে আড়াল করলে সাংবাদিকের যে অবয়ব আসে বড়ই বেমানান। এই পেশার মানুষগুলোকে আমরা মুখে মুখে ‘মহান পেশা’ দাবি করে পিঠ চাপড়ালেও দিন শেষে একজন সৎ সাংবাদিকের আর্থিক সচ্ছলতা অনেকটাই বিভুরঞ্জনের মতো।

৫০ বছর সাংবাদিকতা করার পর ঢাকার বুকে যদি কোন মাথা গোঁজার নিজের জায়গা না থাকে, মাস শেষে যদি অন্যের কাছে ধার-দেনা করতে হয়, তাহলে এই পেশা আদৌ কোনো ‘হেলদি’ পেশা হতে পারে না।

এই শহরে হাজারো সাংবাদিক আছেন। পেটের দায়ে তাঁরা সীমাহীন পরিশ্রম করে টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছেন; কিন্তু একসময় এসে তাঁদের অনেকের উপলব্ধি হয়, মাস শেষে তিনি যে বেতন পাচ্ছেন এই শহরের রিকশাচালকেরা তার চেয়ে বেশি আয় করেন। নিজের স্ত্রী-সন্তানদের ঠিকমতো খাবার জোগাড় করতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়। এসব যাতনা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই ‘সুবিধাবাদী’র খাতায় নাম লেখান। সরকারকে খুশি করার জন্য সাংবাদিকতার পকেটে ঢোকে অ্যাক্টিভিজম। আর এসব করে অনেকেই আর্থিক সচ্ছলতা গড়েন, গাড়ি-বাড়ি করেন।

এই সংখ্যা কেবলই মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কপালে জুটলেও বিভুরঞ্জনদের ক্যাটাগরি অনেকটাই প্রশস্ত। চাকরি করে আর্থিক নিরাপত্তা না পাওয়া সাংবাদিকেরা ‘অনিয়ম ও নানা ধরনের তদবিরে’ জড়িয়ে পড়ে সাংবাদিকতার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছেন। প্লট, বিদেশভ্রমণ থেকে শুরু করে নানান সুবিধাপ্রাপ্ত এসব সাংবাদিকের কাছে সততার বড়াই করে এগিয়ে চলা বিভুরঞ্জনরা পরাজিত হন।

এসব জীবন্ত অভিজ্ঞতা দেখার পর কোন ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে আর্থিক টানাপোড়েনের পেশাকে গ্রহণ করতে চাইবে? এই যে এত এত গণমাধ্যম আমাদের, কই এসব সংবাদমাধ্যম কি সাহস দিয়ে বলতে পারছে, আসুন আমরা একটি শক্তিশালী নীতিমালা করি, যেখানে থাকবে সাংবাদিকদের আর্থিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা?

হ্যাঁ, সাংবাদিকদের বেতনকাঠামোর জন্য ওয়েজ বোর্ড আছে; কিন্তু দীর্ঘদিন নবায়ন না হওয়া কিংবা সেই ওয়েজ বোর্ড অনুসরণ না করা সংবাদপত্রগুলো দিনের পর দিন প্রতারণা করে যাচ্ছে, মালিকপক্ষ বেতন নিয়ে তাইরেনাইরে করছে, তার হিসাব কয়জন কষে? পেশাদারি বজায় রেখে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করার অভিপ্রায় যে নেই, তা নয়; কিছু সংবাদমাধ্যম সেই নীতিমালা অনুসরণ করে। তবে সেটি হাতে গোনা।

আমাদের শত শত গণমাধ্যমের প্রয়োজন নেই। এক ডজন গণমাধ্যম যদি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চাটুকু করে, সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন দেয়, অন্যান্য পেশার মতো তাঁদের সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে আমরা এভাবে বিভুরঞ্জনদের হারাতাম না।

সাংবাদিকতায় বিভুরঞ্জনদের না রাখতে পারার দায় অবশ্যই আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর রয়েছে। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে না পারা বিভুরঞ্জনরা এই পৃথিবীকে বিদায় জানালেও আগামীর বিভুরঞ্জনদের এই পেশায় ধরে রাখতে হলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে সংস্কার করতেই হবে।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোকে যদি সরকার গুরুত্ব দিত, তাহলে অন্তত গণ-অভ্যুত্থানে মুক্ত গণমাধ্যমের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা হলে পূরণ হতো। বিভুরঞ্জন আমাদের দেখিয়ে দিলেন, তোমরা যদি ন্যায়ের পথে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে চাও, তাহলে এই পেশায় সুস্থতা নিয়ে চিন্তা করো। আমরা চাই, ভবিষ্যতে কোনো বিভুরঞ্জন সরকার এ রকম খোলা চিঠি না লেখেন।

* ড. নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nadim. ru@gmail. com
- (মতামত লেখকের নিজস্ব)

বিভুরঞ্জন সরকার
বিভুরঞ্জন সরকার। ছবি : সংগৃহীত

যে মার্কিন জেনারেল একদিন গ্রেপ্তার করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে এক মঞ্চে বসে সাক্ষাৎকার দিলেন আল-শারা

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরে একটি রাজনৈতিক ফোরামে সাক্ষাৎকার দিতে গত সোমবার মঞ্চে ওঠেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এবং অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন চার তারকা জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস। তাঁরা স্বীকার করেন, এভাবে আবার পরস্পরের মুখোমুখি হওয়া তাঁদের দুজনের জন্যই খানিকটা অস্বাভাবিক।

গত বছর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাশার আল আসাদকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন আহমেদ আল-শারা। ডিসেম্বরের ওই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের ৫০ বছরের শাসনকালের অবসান হয়। এ বছর জানুয়ারিতে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন বিদ্রোহী নেতা আল-শারা।

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল পেট্রাউস। তাঁর ওই বাহিনীই আল-শারাকে ২০০৬ সালে গ্রেপ্তার করে ২০১১ সাল পর্যন্ত কারাবন্দী করে রেখেছিল। আল-শারা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার কারণে সে সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

পরে পেট্রাউস যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আসাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে ২০১২ সালে আল-শারা আল-নুসরা ফ্রন্ট নামে একটি বাহিনী গড়ে তোলেন। চার বছর পর আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন তিনি।

তার এক বছর পরে আল-নুসরা সিরিয়ায় আসাদ সরকারবিরোধী অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলিত হয়ে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নামে একটি দল গঠন করেন। এ দলের নেতৃত্বও থাকে আহমেদ আল-শারার হাতে।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদার সঙ্গে অতীত সম্পর্কের কারণে হায়াত তাহরির আল-শামকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে ওয়াশিংটন আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার প্রতি নরম অবস্থান থেকে ওই ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেয়।

যুক্তরাষ্ট্র আল-শারাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এক কোটি মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। গত বছর ডিসেম্বরের শেষের দিকে ওই ঘোষণাও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

সময় ও স্থানের তাৎপর্য

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে রোববার নিউইয়র্কে পৌঁছান আহমেদ আল-শারা। প্রায় ছয় দশকের মধ্যে তিনিই প্রথম কোনো সিরীয় রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন।

সেখানে প্রেসিডেন্ট আল-শারা এবং তাঁর বিশাল প্রতিনিধিদল বিভিন্ন বৈঠক করছেন। তাঁরা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও বৈঠক করেন। সোমবার সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে একাধিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আল-শারা।

সেদিন আল–শারা সাবেক সেনা কর্মকর্তা পেট্রাউসের সঙ্গে ২০২৫ সালের ‘কনকর্ডিয়া অ্যানুয়াল সামিটে’ অংশ নেন। এটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত একটি বৈশ্বিক ফোরাম।

এই সম্মেলনে বিশ্বনেতারা, ব্যবসায়িক নেতারা ও এনজিও প্রতিনিধিরা মিলিত হন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।

আল-শারার ‘ভক্ত’ পেট্রাউস

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল পেট্রাউস একই মঞ্চে আল-শারার সঙ্গে তাঁর জুটিকে খানিকটা অস্বাভাবিক বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে এই মঞ্চ ব্যবহার করে তিনি আহমেদ আল-শারার প্রশংসাও করেন।

দর্শকদের লক্ষ্য করে পেট্রাউস বলেন, ‘বিদ্রোহী নেতা থেকে তাঁর রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে ওঠার এই যাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ঘটা অন্যতম নাটকীয় রাজনৈতিক রূপান্তর।’

বাশার আল-আসাদ পালিয়ে যাওয়ার পর সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময়ই দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটিতে গণতন্ত্র ফিরেয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন আল-শারা। নিজের প্রতিশ্রুতি রাখতে অক্টোবরে দেশটিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন তিনি।

গত সোমবার সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে আল-শারার শারীরিক অবস্থা নিয়ে পেট্রাউস উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আল-শারাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি পর্যাপ্ত ঘুমের সময় পান কি না।

মার্কিন এই অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল বলেন, আল-শারার অনেক ভক্ত আছেন এবং তাদের মধ্যে তিনিও একজন।

পেট্রাউসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ইতিহাস জানতে চাওয়া হলে মুখে হাসি টেনে আল-শারা বলেন, ‘একসময় আমরা যুদ্ধ করতাম, আর এখন আমরা সংলাপে প্রবেশ করেছি।’

আল–শারা আরও বলেন, ‘যাঁরা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁরা শান্তির গুরুত্ব বোঝেন। আমরা যেমন অতীতকে আজকের নিয়ম অনুযায়ী বিচার করতে পারি না, তেমনি আজকের ঘটনাকেও অতীতের নিয়ম অনুযায়ী বিচার করতে পারি না।’

আল-কায়েদার একজন কমান্ডার হিসেবে তাঁর সময় কেমন ছিল, এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আল-শারা বলেন, ‘হয়তো আগে কিছু ভুল হয়েছিল।’

আল–শারা বলেন, তবে এখন তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিরীয় জনগণ এবং এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করা।

আল–শারা বলেন, ‘সেই লক্ষ্যে করা অঙ্গীকারই আজ আমাদের এখানে (নিউইয়র্ক) নিয়ে এসেছে। আমরা সহকর্মী ও বন্ধুদের মধ্যে বসে আছি।’

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এবং অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস নিউইয়র্ক সিটির টাইমস স্কয়ারের শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত কনকর্ডিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের মঞ্চে উপস্থিত হন। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এবং অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস নিউইয়র্ক সিটির টাইমস স্কয়ারের শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত কনকর্ডিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের মঞ্চে উপস্থিত হন। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

ট্রাম্পের প্রস্তাবে হামাসের সম্মতির পরও ১০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলো ইসরাইল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবে হামাস সম্মতি দিলেও ইসরাইলি বাহিনীর আগ্রাসন বন্ধ হয়নি। শুক্রবার পর থেকে এ পর্যন্ত ১০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে দখলদাররা। এ খবর দিয়েছে মিডল ইস্ট আই। এতে বলা হয়েছে, সপ্তাহান্তে গাজায় ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক এলাকা, শরণার্থী শিবির ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রও রয়েছে।  গাজা সিটির বাসিন্দারা আল জালা ও অন্য এলাকার বাড়িগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছেন। গাজা ভিত্তিক সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, শনি ও রোববারে কমপক্ষে ৯৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। সোমবার আরও সাতজনকে হত্যা করেছে দখলদাররা। ইসরাইলি বাহিনী সপ্তাহান্তে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। সোমবার গ্রিক অর্থোডক্স স্কুলে হামলা চালানো হয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছে। এছাড়া খান ইউনিসে একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে। একই দিনে অপুষ্টিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও এক ফিলিস্তিনি। এ নিয়ে উপত্যকাটিতে অপুষ্টিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬০ জনে।
গাজার সমর্থনে নেদারল্যান্ডে আড়াই লাখ মানুষের বিক্ষোভ
ইসরাইল ইস্যুতে কঠোর হওয়ার জন্য ডাচ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জনতা। এ জন্য রোববার আমস্টারডামে কমপক্ষে আড়াই লাখ মানুষ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করে। তারা গাজায় গণহত্যার সঙ্গে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডাচ নিউজ। তারা বলেন, ডাচ সরকার পদক্ষেপ না নেয়ার মধ্য দিয়ে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে। এ জন্য বিক্ষোভকারীরা এদিন লাল পোশাক পরে অংশ নেন। মিউজিয়ামপ্লেইন এবং এর আশপাশের এলাকা বিক্ষোভকারীতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
তাদের হাতে ছিল ফিলিস্তিনি পতাকা ও প্লাকার্ড। বিক্ষোভ শুরুর কমপক্ষে আড়াই ঘন্টা পরে তারা মিউজিয়ামপ্লেইন ত্যাগ করেন। সেখান থেকে ভন্ডেলপার্কগামী সড়ক ধরে বিক্ষোভ অগ্রসর হতে থাকে। বিক্ষোভকারী ডেবোরা ডাচ নিউজকে বলেন, মনে করি না যে এককভাবে আমি কোনো কিছু করতে পারবো। কিন্তু যখন সবাই একত্রিত হন, বিশাল একটি গ্রুপে পরিণত হয়। তখন বিশ্ব দেখতে পায় বহু মানুষ আসলেই বিষয়টি নিয়ে ভাবছে। অনেক পরিবারের সদস্যরা তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে যোগ দেন বিক্ষোভে। তাদের হাতে ছিল ফিলিস্তিনের ছোট ছোট পতাকা। তারা লাল স্কার্ফ ও রেইনকোট পরিহিত প্রবীণ দম্পতিদের পাশাপাশি হেঁটে যেতে থাকে। তরুণ বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল বাসায় তৈরি প্লাকার্ড। তাতে লেখা- ‘নো পিস উইদাউট জাস্টিস’। অর্থাৎ ন্যায়বিচার ছাড়া কোনোদিন শান্তি আসে না।
বিক্ষোভের সময় ভবনগুলোর মধ্যে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ ধ্বনি প্রতিধ্বনি তোলে। ব্যস্ত মার্কেটগুলো থেকে জনতা জানালায় দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ দর্শন করে। একজন তরুণের টি-শার্টে লেখা ছিল- ‘১৬,৩৮২ জন শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে’। একজন বালিকা একটি কালো প্লাকার্ড বহন করছিল। তাতে লেখা- আপনার নীরবতাই হলো সহিংসতা, নিজেকে শিক্ষিত করে তুলুন। অন্য এক বিক্ষোভকারী বলেন, ইসরাইলে বড় মাত্রায় বিনিয়োগকারী নেদারল্যান্ডস। তাদের কাছে আমরা একটি বার্তা পাঠাতে পারি যে, আসলেই এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। সম্প্রচার মাধ্যম এনওএসের মতে, এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন ইহুদি সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি গ্রুপ।
তারা এর মধ্য দিয়ে এটাই বুঝাতে চান যে, ইসরাইলি নীতি পুরো ইহুদি সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি নয়। ডাচ রেল অপারেটর এনএস বলেছে, আমস্টারডামে আগত মানুষের চলাচল ঠিক করতে তাদেরকে ট্রেনে বগি বাড়াতে হয়েছে। সেখানে মেট্রো সার্ভিসও বাড়ানো হয়। তবে ট্রাম সার্ভিস ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। উল্লেখ্য, এই প্রতিবাদ বিক্ষোভ আয়োজন করে কমপক্ষে ১৩০টি গ্রুপ। এর মধ্যে আছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, অক্সফাম নোভিব, প্যাক্ট এবং দ্য রাইটস ফোরাম।
https://mzamin.com/uploads/news/main/183422_Lima-5.webp

আমেরিকার কাছে শেষ দুর্গও হারাচ্ছে ইরান? by জাসিম আল-আজ্জাউই

গত দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্রদের নেটওয়ার্ক বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের পতন হয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতি করেছে। এখন অস্ত্র সমর্পণের চাপের মুখে পড়েছে হিজবুল্লাহ।

ইয়েমেনে মার্কিন বাহিনী ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে অবকাঠামো ও বেসামরিক এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে যে বাধা তৈরি করছিল, সেখান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের এক হামলায় নিহত হয়েছেন হুতি প্রধানমন্ত্রী আহমেদ আল-রাহাওয়িসহ কয়েকজন মন্ত্রী।

ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা একসময় ভীতিকর বলে পরিচিতি পেলেও এখন সেই শক্তি নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এখন ইরাকের ক্ষেত্রেও মনে হচ্ছে ইরানের প্রভাব টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে। পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) মধ্যে ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য ইরাক সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে। পিএমএফ শিয়াদের আধিপত্যে গতি আধা সামরিক বাহিনীগুলোর একটি জোট।

যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে পিএমএফকে ইরাকি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করতে। কিন্তু এই দাবি পূরণ যেমন কঠিন, আবার ঝুঁকিপূর্ণও। যদি সেটি অর্জন করা যায়, তাহলে ইরাকের রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হতে পারে।

পিএমএফের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের মধ্যেই ইরাকের একটি বড় সংকট লুকিয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষের চাপ সামলাতে গিয়ে ইরাককে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করে চলতে হচ্ছে।

২০১৪ সালে আইএসআইএল (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক ও লেভান্ত) উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এসব আধা সামরিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। ইরাকে নিরাপত্তাশূন্যতার সরাসরি ফল ছিল এই উত্থান। ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকি সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। নতুন করে গড়ে তোলা বাহিনীর না ছিল মনোবল, না ছিল প্রস্তুতি।

আইএসআইএলের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে যেখানে ইরাকের নিয়মিত সেনাবাহিনী ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে পিএমএফ সফল হয়েছিল; কিন্তু সময়ের সঙ্গে পিএমএফের অনেক সদস্যকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য কাছে টেনে নিয়েছিল।

বর্তমানে পিএমএফ ইরাকের ব্যাপক প্রভাবশালী। এই জোটে এমন গোষ্ঠী আছে যারা সত্যিই ইরাকি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে চায়, আবার এমন কট্টরপন্থী গোষ্ঠীও আছে যারা প্রশ্নহীনভাবে ইরানের প্রতি অনুগত।

একদিকে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-সুদানির ওপর আধা সামরিক গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বিলুপ্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে নিজের জোট সরকারের ভেতরে তিনি ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়ছেন। তার কারণ হলো তাঁর জোটে পিএমএফের প্রতি নিরেট সমর্থন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত সমাধানটি হলো পিএমএফের যেসব গোষ্ঠী ইউনিট নিয়মিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত হতে রাজি, তাদের সেনাবাহিনীতে সম্পৃক্ত করা এবং আধা সামরিক নেতাদের ক্ষমতা থেকে সরানো। এটি কোনো সাধারণ পরিবর্তন নয়; বরং ইরাকের নিরাপত্তাকাঠামোর খোলনলচে বদলে ফেলা।

এর বিপরীতে ইরাকের কিছু আইনপ্রণেতা এমন আইন প্রণয়নের চেষ্টা করেছেন, যাতে পিএমএফ স্থায়ী ও স্বাধীন সামরিক বাহিনী হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

গত মার্চে ইরাকের পার্লামেন্টে উত্থাপিত একটি বিলে পিএমএফকে অস্থায়ী থেকে স্থায়ী বাহিনীতে উন্নীত করার প্রস্তাব তোলা হয়। বাহিনীটির নিজস্ব বাজেট, কমান্ড কাঠামো ও সামরিক একাডেমি থাকার প্রস্তাব তোলা হয়। এমনকি পিএমএফ কমান্ডারদের মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়। এই বিল ওয়াশিংটনের চোখে ইরাক সরকারের ভেতরে ইরানি প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার শামিল।

মার্কিন চাপ এখনকার মতো পার্লামেন্ট থেকে বিলটি প্রত্যাহার করাতে সফল হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এ রকম আইন পাস হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরাক সম্পর্ক পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে; এর মধ্যে সম্ভবত নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সম্প্রতি ইরাকের ওপর ওয়াশিংটন যে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই হুঁশিয়ারির গুরুত্ব বেড়ে গেছে।

মার্কিন চাপে জুন মাসে পিএমএফ–যোদ্ধাদের বেতন বিতরণ ব্যাহত হয়। ইরাকের রাষ্ট্রায়ত্ত আল-রাফিদাইন ব্যাংক ইলেকট্রনিক লেনদেনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেনি।
আল-রাফিদাইন ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান মার্কিন আইনপ্রণেতারা। ২০২২ সালের এক দুর্নীতির ঘটনায় ২৫০ কোটি ডলার রাষ্ট্রীয় তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। সেই কেলেঙ্কারিতে পিএমএফ-ঘনিষ্ঠদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল।

পিএমএফ বর্তমান অবস্থায় থাকবে কি না, এই প্রশ্ন এখন আর বাগদাদে আলোচনার বিষয় নয়। এই প্রশ্নের জবাব ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। একটি ইরানপন্থী সমান্তরাল বাহিনীকে ইরাকি রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে জায়গা দেওয়ার কারণে আল-সুদানি প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছেন।

এখন ইরাক যে পথে এগোচ্ছে, সেটি স্পষ্ট। ইরানের মিত্রদের প্রভাবিত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে ভরা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন মার্কিন চাপে মৌলিক রূপান্তরের মুখোমুখি। তেহরানের শেষ বড় আঞ্চলিক ঘাঁটি এখন অবরুদ্ধ। ওয়াশিংটন ফলাফলকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দিতে চাইছে না।

আল-সুদানি শেষ পর্যন্ত মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন। এর কারণ হলো তার কাছে কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। পিএমএফের যে অংশটি তেহরান থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে রাজি হবে, তারা ইরাকের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে একীভূত হবে। আর যারা সেটি করতে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে এবং অর্থসংস্থান বন্ধ করা হবে। এটি এখন আর ‘যদি কিন্তু’র মধ্যে সীমিত নেই।

কিন্তু এর ঝুঁকিও অনেক। ইরানের প্রতি অনুগত আধা সামরিক গোষ্ঠী সহিংস প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। ইরান যদিও এখন আঞ্চলিকভাবে দুর্বল, তবুও ইরাকজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির সক্ষমতা দেশটির আছে।

ফলে ২০০৬ সালের সহিংসতার বিভীষিকা আবারও জেগে উঠতে পারে, আর যুদ্ধক্লান্ত ইরাক আবারও গৃহযুদ্ধের পথে হাঁটা শুরু করতে পারে। তবে ইরাকি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই ঝড় সামাল দিতে পারে, তাহলে এটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্রের পথে এগোনোর সুযোগ তৈরি হবে। ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকে ইরাকি রাষ্ট্রে সেটি দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত।

* জাসিম আল-আজ্জাউই, বিশ্লেষক ও সাংবাদিক
- আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-01%2Fyy1srscz%2Freuters.JPG?rect=0%2C1%2C567%2C378&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পিএমএফের সদস্যরা বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভের সময় একটি বড় পোস্টারে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনাটি ২০২১ সালের। ছবি : রয়টার্স