Friday, February 28, 2025

চাপে নতি স্বীকার , উইঘুরদের চীনে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করলো থাইল্যান্ড

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ৪০ জন উইঘুরকে  চীনে নির্বাসিত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে থাই কর্তৃপক্ষ। তাদের উপর সম্ভাব্য নির্যাতন এমনকি মৃত্যুরও আশঙ্কা রয়েছে।ব্যাংককের একটি আটক কেন্দ্রে ১০ বছর আটক থাকার পর বৃহস্পতিবার এই দলটিকে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে ফেরত পাঠানো  হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।চীনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং  জিনজিয়াংয়ের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উইঘুর জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য মুসলিম জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। যদিও বেইজিং সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। বিবিসিতে প্রকাশিত খবর জানাচ্ছে, ২০১৫ সালের পর এ বারই তাইল্যান্ড প্রথম উইঘুর অভিবাসীদের চিনে ফেরত পাঠাল।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের গুরুতর উদ্বেগ উত্থাপনের পর, গোটা নির্বাসন প্রক্রিয়াকে গোপনীয়তার মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।থাই মিডিয়া জানিয়েছে যে বৃহস্পতিবার ভোরে ব্যাংককের প্রধান অভিবাসন আটক কেন্দ্র থেকে বেশ কয়েকটি ট্রাক বেরিয়ে গেছে,   যেগুলোর জানালা কালো প্লাস্টিক দিয়ে বন্ধ করা ছিল ।কয়েক ঘন্টা পরে, ট্র্যাকার Flightrader24 ব্যাংকক থেকে ছেড়ে আসা চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি অনির্ধারিত ফ্লাইট দেখায়, যা  জিনজিয়াংয়ে পৌঁছায়। কতজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট ছিল না।থাই সরকার পরে বলেছে যে তারা ৪০ জন উইঘুরকে চীনে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ তাদের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আটকে রাখা ঠিক হচ্ছে না। তবে অন্য কোনও তৃতীয় দেশ তাদের গ্রহণের প্রস্তাব দেয়নি। এর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, যারা  অতীতে উইঘুরদের আশ্রয় দিয়েছে।আটজন উইঘুর থাইল্যান্ডে রয়ে গেছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন আটক থাকাকালীন অপরাধের জন্য জেল খাটছেন। সরকার আরও জানিয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী পায়েটোংটার্ন সিনাওয়াত্রাকে তার সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে উইঘুরদের চীনে ফিরিয়ে আনা হলে তাদের যথাযথ দেখাশোনা করা হবে।বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি প্রাথমিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি ।সিনাওয়াত্রা বলেন, '"বিশ্বের যেকোনো দেশকেই  আইন, আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকারের নীতি মেনে চলতে হবে। 'বেইজিং জানিয়েছে যে ৪০ জন চীনা অবৈধ অভিবাসীকে থাইল্যান্ড থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, কিন্তু তারা যে উইঘুর ছিল তা নিশ্চিত করেনি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ,' চীন ও থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ আইন ও  আন্তর্জাতিক আইন মেনেই  প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। 'ফিরে আসা দলটিতে  ৩০০ জনেরও বেশি উইঘুর ছিল   যারা ২০১৪ সালে জিনজিয়াংয়ে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসার পর থাই সীমান্তে আটক করা হয়েছিল।অনেককে তুরস্কে পাঠানো হয়েছিল, আবার অনেককে ২০১৫ সালে চীনে ফেরত পাঠানো হয়েছিল - যার ফলে সরকার এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা কান্নাভি সুয়েবসাং প্রশ্ন তোলেন - '"থাই সরকার কী করছে?উইঘুরদের নির্বাসনের মাধ্যমে নির্যাতনের মুখোমুখি করা উচিত নয়। তাদের ১১ বছর জেল খাটতে হয়েছিল। আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছি।'যে আটক কেন্দ্রে উইঘুরদের রাখা হয়েছিল   তা অস্বাস্থ্যকর এবং জনাকীর্ণ ছিল বলে জানা গেছে। পাঁচজন উইঘুর হেফাজতেই  মারা গেছেন।বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে এই গোষ্ঠীটি এখন নির্যাতন, জোরপূর্বক অন্তর্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি। সংস্থার এশিয়া পরিচালক, এলেন পিয়ারসন বলেছেন - ' থাইল্যান্ডের উইঘুর বন্দীদের চীনে স্থানান্তর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে থাইল্যান্ডের বাধ্যবাধকতার স্পষ্ট লঙ্ঘন।  ঊর্ধ্বতন থাই কর্মকর্তারা একাধিকবার প্রকাশ্যে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে এই ব্যক্তিদের হস্তান্তর করা হবে না।' এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও থাইল্যান্ডের এই নির্বাসন প্রক্রিয়ার  নিন্দা জানিয়ে বলেছেন -' যেসব দেশে উইঘুররা সুরক্ষা চান, সেইসব দেশের সরকারকে জোরপূর্বক জাতিগত উইঘুরদের চীনে ফেরত না পাঠানোর আহ্বান জানাতে হবে। "অনলাইনে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি চীনকে জিনজিয়াংয়ে প্রধানত মুসলিম উইঘুর এবং অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগ করেছেন।জাতিসংঘ বলেছে যে তারা এই নির্বাসনের জন্য "গভীরভাবে অনুতপ্ত" ।যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন যে তারা  থাইল্যান্ডের সিদ্ধান্তের সাথে একমত নয়।জিনজিয়াংয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ উইঘুর বাস করেন, যাদের বেশিরভাগই মুসলিম। এই অঞ্চলটি আনুষ্ঠানিকভাবে জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল (Xinjiang Uyghur Autonomous Region বা XUAR) নামে পরিচিত।

উইঘুররা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে, যার সাথে  তুর্কি ভাষার  সাদৃশ্য রয়েছে।  সাংস্কৃতিক ও জাতিগতভাবে মধ্য এশীয় দেশগুলির সঙ্গে এদের সাযুজ্য রয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং এই অঞ্চলে ধর্মীয় অনুশীলন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি মসজিদ ও সমাধি ধ্বংস করার অভিযোগ  রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি

mzamin

বোম্বাই মরিচ যেন ‘টাকার মেশিন’

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কুমির মারা গ্রামের মো. সোহেল হাওলাদার। ঢাকায় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ছুটিতে গ্রামে গেলে মো. জাকির হোসেন নামের এক কৃষকের পরামর্শে বোম্বাই মরিচের চাষ শুরু করেন তিনি।

ওই বছরই লাভের মুখ দেখেন সোহেল। সময়টা ছিল ২০১৮ সাল। পরে ২০২২ সালে ঢাকার চাকরি ছেড়ে গ্রামে স্থায়ী হন। নিজেকে যুক্ত করেন বাণিজ্যিকভাবে বোম্বাই মরিচ চাষে। ২০২২ সালে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ২ লাখ টাকা বিক্রি করেছিলেন তিনি। এখন পর্যন্ত তিনি লেগে আছেন বোম্বাই মরিচ উৎপাদন কাজে। তার দেখাদেখি ওই এলাকার অনেক যুবক চাকরির পেছনে না ছুটে বোম্বাই মরিচ চাষ শুরু করেছেন। ফলে শত পরিবার যুক্ত হয়ে পড়ছে বোম্বাই মরিচ উৎপাদন কাজে।

স্থানীয়ভাবে বোম্বাই মরিচ নামে পরিচিত থাকলেও দেশে নাগা মরিচ নামেই চেনে। এই বোম্বাই মরিচ চাষ করেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে এ গ্রামের শত পরিবার। কম টাকা ব্যয়ে অধিক লাভবান হওয়া যায় বলে বোম্বাই মরিচ চাষির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই এলাকার কৃষকরা টাকার মেশিন মনে করে বোম্বাই মরিচকে।

কৃষকরা জানান, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কুমিরমারা গ্রামের প্রতিটি ঘরেই একজন করে বোম্বাই মরিচ চাষি রয়েছে। সাধারণত সারা দেশে কাঁচামরিচের চাষ হলেও কুমিরমারা গ্রামে প্রচুর আধুনিক পদ্ধতিতে বোম্বাই মরিচ চাষ করা হয়। বাঁশ কিংবা লোহার পাইপ দিয়ে কাঠামো তৈরি করে তার ওপর পলিথিন শিট দিয়ে ঢেকে দেন। এ শেটের নিচে চলে মরিচ আবাদ। এতে তাদের খুব বেশি খরচ না হলেও লাভ অনেক বেশি। বর্তমানে পাইকারি বাজারে তারা প্রতি পিস বোম্বাই মরিচ ৩-৪ টাকায় বিক্রি করছেন বলে জানান এখানকার কৃষকেরা।

জানা যায়, উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কৃষকরা যে মরিচ উৎপাদন করেন, তা তাদের স্থানীয় পাখিমারা বাজারেই বিক্রি করে থাকেন। এখান থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা কিনে নিয়ে যান। নীলগঞ্জের এ বোম্বাই মরিচ ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক চাহিদাও আছে। কৃষকদের প্রতিদিনের বাজার করার টাকা বোম্বাই মরিচ বিক্রি করেই মিটিয়ে থাকেন। তারা আর্থসামাজিক পরিবর্তন করতে পেরেছেন বোম্বাই মরিচ চাষ করে। বাজারের ব্যাগে করে ১ ব্যাগ মরিচ বাজারে নিয়ে গেলে সারা সপ্তাহের প্রয়োজনীয় বাজার ক্রয় করে টাকা অতিরিক্তও থাকে। বেকার বসে না থেকে বোম্বাই মরিচ চাষ করার আহ্বান জানান এখানকার কৃষকরা।

বোম্বাই মরিচ চাষি মো. নূরে আলম হাওলাদার বলেন, এবার ১৫ শতাংশ জমিতে বোম্বাই মরিচ চাষ করছি। আমার খরচ হয়েছে ১ লাখ। এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ। আরও বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি। এটা লাভজনক। বর্ষা মৌসুমে একটা বোম্বাই মরিচ ৯ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারি।

মো. ইউনূস হাওলাদার বলেন, কম খরচে বেশি লাভবান হওয়া যায় বোম্বাই মরিচে। তবে বেশি লাভ পাই বর্ষাকালে। তখন দূর দূরান্ত থেকে পাইকাররা আমাদের কাছ থেকে মরিচ ক্রয় করে নিয়ে যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসাইন বলেন, আধুনিক কৃষির সঙ্গে নীলগঞ্জের কৃষকরা সরাসরি সম্পৃক্ত। তারা অসময়ে ফসল ফলিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। বিশেষ করে সেডের মাধ্যমে বোম্বাই মরিচ চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে উৎপাদন বেশি হয় এবং দামও বেশি পায় কৃষকরা। ২ শতক জমি থেকে ১ লাখ টাকা বিক্রি করতে পারে। আমরা সব সময় পাশে থেকে পরামর্শ দিয়ে থাকিব। 

বোম্বাই মরিচকে টাকার মেশিন মনে করে যে গ্রামের কৃষকরা। ছবি : কালবেলা
বোম্বাই মরিচকে টাকার মেশিন মনে করে যে গ্রামের কৃষকরা। ছবি : কালবেলা

আখতাররা কয়েক মাসের মধ্যেই অসম্ভবকে সম্ভব করলো: ড. আসিফ নজরুল

জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ হতে যাচ্ছে নতুন দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’। শুক্রবার বেলা তিনটায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে দলটির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন দল গঠন নিয়ে শুভকামনা জানিয়ে এদিন দুপুর ১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘নতুন সংগঠন করার কয়েক মাসের মাথায় আখতার হোসেনরা অসম্ভবকে সম্ভব করলো।’

তিনি লিখেন, ‘২০২৪ সালে ভুয়া নির্বাচনের পর খুব মন খারাপ করে থাকতাম। এমন সময় আখতার একদিন আইন বিভাগে এলো। বলে-কয়ে আমি তাকে বাড়ি থেকে ঢাকায় আনিয়ে মাস্টার্স শেষ করতে রাজি করিয়েছিলাম। কিন্তু এরপরও ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নাই তারমধ্যে। আমার গাড়ি থামিয়ে সে সালাম দিলো। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি বিরক্ত হলাম। আরো বিরক্ত হলাম যখন সে বলল, নুর-রাশেদদের দল ত্যাগ করে নতুন সংগঠন করবে! আমি বললাম-আবার নতুন দল! আর কতবার মার খেতে চাও তুমি! সে মাথা নিচু করে মৃদু হাসতে থাকে। এই অদ্ভুত হাসির কোনো মানে খুঁজে পেলাম না। বেশি কথা না বলে বাসায় চলে এলাম। কয়েকদিন পর ছাত্রলীগের হাতে তার মার খাওয়ার রক্তাক্ত ছবি দেখে দুঃখ আর হতাশায় বুক বিদীর্ণ হলো। সে কি বুঝতে পারছে না কিছু হবে না আর এসব করে! বুঝতে আমি-ই পারিনি। নতুন সংগঠন করার কয়েক মাসের মাথায় তারা এক অসম্ভবকে সম্ভব করলো। প্রবল প্রতাপশালী আর নির্মম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটালো।’

জুলাই আন্দোলনের কথা তুলে ধরে ড. আসিফ নজরুল আরো লিখেন, ‘আখতারের সংগঠনের নাহিদ হয়ে উঠলো এই গণঅভূত্থানের প্রধান নেতা। উত্তাল জুলাই-এ আমার এবং আমার মতো লক্ষ মানুষের নেতা! তারপর নাহিদের সঙ্গে কাজ করলাম নতুন সরকারে। কতবার যে সে আমাকে বিস্মিত করলো তার যোগ্যতা, বাকসংযম, ব্যক্তিত্ব আর অকল্পনীয় ম্যাচিউরিটি দিয়ে! নাহিদ থাকে আমার পাশের বাসায়। সে সরকার থেকে পদত্যাগ করার দিন গভীর রাতে তার সবুজ লনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। মায়া বড় বিচিত্র বিষয়!’

নতুন দলের প্রতি শুভ কামনা জানিয়ে এই উপদেষ্টা লিখেন, ‘আজ নাহিদ আর আখতার শুরু করছে নতুন যাত্রা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র-তারুণ্যের  প্রত্যাশা পূরণে শুরু হলো তাদের নতুন দলের অভিযাত্রা। জাতীয় নাগরিক পার্টির সবার জন্য অনেক দোয়া, শুভকামনা।’

mzamin

পাকিস্তানে রহস্যে ঘেরা এক বিমানবন্দর

সাজানো গোছানো চকচকে একটি বিমানবন্দর। রয়েছে বিলাসবহুল লাউঞ্জ, গাড়ি রাখার বিশাল পার্কিং লট। তাকলাগানো ফুড কোর্ট, রেস্ট রুম। বিলাসবহুল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর নিরাপত্তায় ঘেরা বিমানবন্দরটি যাত্রীসেবার জন্য আদর্শ এক বিমানবন্দর। বিমানবন্দরের যাত্রীধারণ ক্ষমতা চার লাখ। কিন্তু এই বিমানবন্দরের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। কারণ এই বিমানবন্দরটিতে নেই কোনো যাত্রী, উড়ে না কোনো বিমান। ফলে এক রহস্যে পরিণত হয়েছে বিমানবন্দরটি।

বিমানবন্দরটি অবস্থিত ৯০ হাজার মানুষের আবাসের একটি শহরে, যার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের কোনো সংযোগ নেই। বিদ্যুৎ নিতে হয় পাশের দেশ থেকে। আরও অবাক করার মতো বিষয়, এই শহরে নেই পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও।

এটি পাকিস্তানের গোয়াদর বিমানবন্দর। আরব সাগর সংলগ্ন বেলুচিস্তান প্রদেশের গোয়াদর জেলায় অবস্থিত এই বিমানবন্দর। গোয়াদর এলাকাটি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এখানে যেই আসে, তার ওপর কড়া নজর থাকে পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের।

পাকিস্তান-চীন সম্পর্ক বিশ্লেষকদের দাবি, এই বিমানবন্দর পাকিস্তানের স্বার্থে নয়, তৈরি হয়েছে চীনের স্বার্থে, যেন গোয়াদর আর বেলুচিস্তানে প্রবেশাধিকার পায় বেইজিং। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নির্মাণ শেষ হওয়া এ স্থাপনার আশপাশে রয়েছে দারিদ্র্যপীড়িত ও অশান্ত অঞ্চল, যা এর শানশওকতের সম্পূর্ণ বিপরীত।

আরব সাগরের কোলের শহরটিতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্বোধন করে শাহবাজ শরিফ সরকার। এর নির্মাণে যাবতীয় খরচ করেছে চীন। সেই অঙ্ক ২৪ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছে। আর্থিক দিক থেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া প্রদেশে ওই বিমানবন্দর তৈরি করেছে চিন। গোয়াদরের লোকসংখ্যা আনুমানিক ৯০ হাজার। তাদের প্রায় কারও বিমানের টিকিট কাটার মতো টাকা নেই।

গোয়াদর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্বোধনের সময়ে এটিকে শাহবাজ় সরকারের সাফল্য বলে উল্লেখ করে ইসলামাবাদ। শুধু তা-ই নয়, গোটা প্রকল্পটিকে ‘বন্ধু’ চীনের উপহার হিসাবে দেখছিল তারা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই ইস্যুতে পাল্টা বিবৃতি দেয় বেইজিং। গোয়াদর বিমানবন্দর নির্মাণের অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে জানায় তারা।

এতে পাকিস্তান জুড়ে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। এ ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন ইসলামাবাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আজিম খালিদ। তার কথায়, বিমানবন্দরের মালিকানা আছে চীনের হাতে। এর সঙ্গে পাক সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।

চীনের তহবিলে ফোর্থ গ্রেড স্টেটের এই বিমানবন্দরে বৃহত্তম যাত্রীবাহী বিমান অবতরণ করতে পারবে। তিন হাজার ৬৫৮ মিটার লম্বা, ৭৫ মিটার প্রশস্ত রানওয়ে নিয়ে এই বিমানবন্দরে কার্যক্রম চালাতে পারবে কার্গো বিমানও। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরেরে শিপমেন্ট হাব হিসেবে কাজ করবে এই বিমানবন্দর। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর, বেলুচিস্তানের সম্পদ সমৃদ্ধ এলাকায় অবস্থিত। স্বাধীনতাকামী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কারণে বরাবরই সহিংসতাপ্রবণ এই প্রদেশে। বেলুচিস্তানের জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বেলুচের সাধারণ মানুষ বরাবরই বলে আসছে, সরকারের পক্ষ থেকে তারা বৈষম্যের স্বীকার। এই বিমানবন্দরের কোনো কাজেই স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা হয়নি।

গোয়াদরের স্থানীয় একজন বলেন, 'উন্নয়ন প্রকল্প তাদের কোন কাজে আসছে না। মানুষ কাজ পাচ্ছে না। বন্দর আছে, কিন্তু কাজে আসছে না। অবকাঠামো প্রকল্পে স্থানীয়দের কাজের ব্যবস্থা করা উচিত।' এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, গোয়াদর যখন ওমানের অংশ ছিল, এখানে যাত্রীবাহী জাহাজ নোঙর করত, পরে এখান থেকে ভারতে যেত। মানুষকে না খেয়ে থাকতে হয়নি।

এখন খাবার আর পানির সংকট চরমে। পাকিস্তানের শেষ প্রান্তে আরব সাগরের উপকূলে অবস্থিত বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটায় নেই ইসলামাবাদ থেকে সরাসরি কোনো ফ্লাইট।

মূলত স্থানীয় বিদ্রোহীদের দাপাদাপির কারণেই গোয়াদরকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারছে না পাক প্রশাসন। সেখানকার নবনির্মিত বিমানবন্দরটি থেকে পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর তথা সিন্ধ প্রদেশের রাজধানী করাচিতে যাওয়ার বিমান রয়েছে। সপ্তাহে তিন দিন এই রুটে বিমান পরিষেবা চলবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। যাত্রীর অভাবে বর্তমানে এই রুটে সপ্তাহে এক দিন মিলছে পরিষেবা।

গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে বালুচিস্তানে চলছে সশস্ত্র বিদ্রোহ। অসন্তোষ দানা বাঁধার পর থেকেই দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশটির হাজার হাজার যুবককে পাক গুপ্তচরেরা গুম-খুন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সমস্ত ঘটনা সেখানকার অর্থনীতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বিমানবন্দরটির যাত্রী-আকর্ষণ হারানোর নেপথ্যে এই কারণটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

পাকিস্তানে রহস্যে ঘেরা এক বিমানবন্দর

তুরস্কের ৪০ বছরের লড়াইয়ের অবসান, পিকেকে-কে অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ

তুরস্কের বিরুদ্ধে ৪০ বছরের লড়াইয়ের অবসান ঘটাতে যাচ্ছে দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)। গোষ্ঠীটির প্রধান নেতা আব্দুল্লাহ ওকালান তার সমর্থকদের অস্ত্র ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সঙ্গে পিকেকে-কে বিলুপ্ত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, গত তিন যুগে এটি তুরস্কের সবচেয়ে বড় বিজয়।

বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) কারাবন্দি নেতা আবদুল্লাহ ওকালানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান কুর্দিপন্থি ডিইএম পার্টির একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে তিনি পিকেকে-কে অস্ত্র সমর্পনের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে তিনি কুর্দিদেরকে রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

সাক্ষাতে ওকালানের কাছে তার নির্দেশনা জানতে চান প্রতিনিধিদল। এরপর তাদের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানান কারাবন্দি নেতা। পরে ইস্তাম্বুলে এক সংবাদ সম্মেলনে এই রাজনীতিবিদরা তার সিদ্ধান্তের কথা জানান। তারা বলেন, আব্দুল্লাহ ওকালান বলেছেন, ‘আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি (কুর্দি) কংগ্রেসের অধিবেশনের ডাক দিন। রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে মিলিত হয়ে যান।’

অনুসরীদের এই কুর্দি নেতা আরও বলেছেন, যেহেতু পিকেকে-কে তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয় না। তাই তাদের পরিধি কমে এসেছে। এ কারণে অন্যান্য দলের মতো তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। সমসাময়িক কমিউনিটি অথবা দলগুলো চাপের মুখে নিজেদের বিলুপ্ত না করে স্বেচ্ছায় বিলুপ্ত হয়েছে। তিনি নির্দেশ দেন, ‘কুর্দি সব দল যেন অস্ত্র ফেলে দেয় এবং পিকেকে-কে যেন বিলুপ্ত করা হয়।’

১৯৮৪ সালে কুর্দিদের জন্য একটি জাতিগত আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পিকেকে তাদের লড়াই শুরু করে। সেই লড়ইয়ে এখন পর্যন্ত ৪০,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। পরে কুর্দিরা তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী লক্ষ্য থেকে সরে এসে দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়ায় একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং বৃহত্তর কুর্দি অধিকারের দাবি জানাতে থাকে।

পিকেকে-র সাথে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো তুরস্কে মাঝেমধ্যেই হামলা চালিয়ে আসছে। তারা গাড়ি বোমা ও অন্যান্য উপায় ব্যবহার করে তুরস্কের সেনা ও সামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা করে থাকে। তুরস্কের পাশাপাশি সিরিয়া এবং ইরাকেও এই গোষ্ঠীর সদস্যদের অবস্থান রয়েছে। দলটির প্রধান নেতার অস্ত্র ফেলে দেওয়ার নির্দেশের মাধ্যমে তুরস্কের বিরুদ্ধে কুর্দি এ দলটির চার দশকের লড়াই শেষ হচ্ছে।

৭৫ বছর বয়সী ওকালান, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ১৯৯৯ সাল থেকে ইস্তাম্বুলের কাছে ইমরালি দ্বীপে কারাবন্ধি। কারাবাস সত্ত্বেও, তিনি পিকেকে-র উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন এবং গ্রুপের নেতৃত্ব ব্যাপকভাবে তার যেকোনো আহ্বানে সাড়া দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ওকালানের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাটি গ্রুপ এবং তুর্কি রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তির জন্য একটি নতুন প্রচেষ্টার অংশ, যা অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জোট অংশীদারদের ডেভলেট বাহসেলি দ্বারা শুরু হয়েছিল। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ পরামর্শ দিয়েছিলেন, ওকালান যদি তার গ্রুপকে সহিংসতা ত্যাগ করাতে পারে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা থেকে সরে আসে তবে তাকে প্যারোল দেওয়া যেতে পারে।

ছবি : সংগৃহীত

নাহিদরা নতুন বাসা খুঁজে পাবেন? by সাজেদুল হক

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের অন্যতম চরিত্র তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তার নামে এভিনিউ। পাশেই সংসদ ভবন। গণতন্ত্রের তীর্থস্থান। এখানে গণতন্ত্রের চর্চা কতোটা হয়েছে সে প্রশ্ন আলাদা। এই সংসদ ভবনকে সামনে রেখেই আজ আত্মপ্রকাশ ঘটতে চলেছে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির। এদেশের অলিতে-গলিতে রাজনৈতিক দল। গেল ক’মাসেই জন্ম হয়েছে অন্তত ১৬টি নতুন দলের। তবুও নাহিদ ইসলামদের নেতৃত্বে অভিষিক্ত দলটি নিশ্চিতভাবেই আলাদা। কেবল এ ভূমিতে কেন, এতগুলো তরুণ কবে, কোথায় কোন দলের জন্ম দিয়েছে কে জানে!

শহীদ মিনার থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ। গেল কয়েক মাসে কতো ঘটনাই না ঘটে গেল। ওলটপালট হয়ে গেল সব। কখনো কখনো এমন হয়। সময়ের চাকা ঘোরে খুবই দ্রুত। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরশাসকের পতন। দুনিয়ায় এমন ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। আপাত মনে হবে আকস্মিক, অকস্মাৎ এক ঝড়। আদতে এ তরুণদের একটি অংশ নিজেদের তৈরি করেছে অনেকদিন ধরেই। রাজনীতি আর সমাজ নিয়ে নতুন করে ভেবেছে তারা। পড়েছে, পরামর্শ করেছে। অপেক্ষায় ছিল একটি মোক্ষম সময়ের। ইতিহাস তাদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে।

তবে ৩রা আগস্টের শহীদ মিনার আর ২৮শে ফেব্রুয়ারির মানিক মিয়া এভিনিউ এক নয়। শুধু স্থান আর সময় নয়। সেটা যে আলাদা বুঝতেই পারছেন। ভিন্নতা আসলে তার চেয়েও বেশি। নাহিদ ইসলাম। ২৬ বছরের এক তরুণ। গোয়েন্দা সংস্থার গোপন সেল ঘুরে এসেছেন। শরীরে নির্যাতনের দাগ। এসবও শেষ পর্যন্ত দমাতে পারেনি তাকে। শহীদ মিনার থেকে ডাক দেন একদফার। ঘোষণা দেন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের। সেই সমাবেশে শামিল ছিল হাসিনাবিরোধী পুরো বাংলাদেশ। বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল, শিবির, ডান, বাম, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়-এর সাধারন শিক্ষার্থী সবাই শামিল ছিলেন শহীদ মিনারে। কট্টর আওয়ামী লীগ ছাড়া রাজনীতির আর সব রং মুছে গিয়েছিল। কিন্তু ২৮শে ফেব্রুয়ারি মানিক মিয়া এভিনিউতে নাহিদ ইসলাম যখন নতুন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন- পরিস্থিতি এরইমধ্যে অনেকটা পাল্টে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সদ্য সাবেক এই উপদেষ্টা এটা বুঝতে শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ তাদের শত্রু গণ্য করে তা স্পষ্ট। অনেক ইস্যুতে বিএনপি’র সঙ্গেও তাদের বাহাস-বিতর্ক হচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে তুলনামূলক কম। কিন্তু বিএনপি বা জামায়াত কেউই তো আজ আর মানিক মিয়া এভিনিউতে থাকছে না।

জুলাই আন্দোলনের নেতাদের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে একটি ছাত্র সংগঠনের অভিষেক হয়েছে। যাত্রা শুরুর দিনই ঘটেছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। হাতাহাতি আর বিশৃঙ্খলায় জড়িয়েছেন নতুন সংগঠনের সমর্থকরা। নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল স্পষ্ট। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা হয়েছে এ অভিযোগ উঠেছে জোরেশোরে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে তাদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। পুরো বাংলাদেশে আন্দোলনের রেখাটাই পাল্টে দিয়েছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন এটাও বলা হচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক দল অভিষেকের আগেও নানা টানাপড়েন চলছে। বেগ পেতে হয়েছে নেতা নির্বাচনে। শিবিরের সাবেক দুই আলোচিত নেতা এরইমধ্যে নিজেদের নতুন দল থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। একটি রিপোর্ট বলছে, সামনের দিনে নতুন দলে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হতে পারে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ‘বাংলাদেশমুখী, মধ্যপন্থি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক দল হিসেবে। আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল অনেক। সকাল-বিকাল পার্টিরও কোনো অভাব নেই। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে এর নেতাকর্মীরা বরাবরই সমালোচিত। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার দাপট দেখানোসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে যান তারা। বহিষ্কার-আবিষ্কারের খেলা চলতে থাকে। নতুন রাজনৈতিক দলের জন্যও এটি একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। নাহিদ ইসলাম এরইমধ্যে তার একধরনের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেছেন। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা নতুন নজির। পুরো দলের ক্ষেত্রেও আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা রাখতে হবে। দল চালাতে অর্থ প্রয়োজন হয়। সেটা কে না জানে। স্বচ্ছতাই এখানে মুখ্য বিষয়।

এই তরুণরা আর পাঁচ-দশটা তরুণের মতো নয়। দুনিয়ার সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকদের অন্যতম শেখ হাসিনাকে উৎখাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। ৫ই আগস্টের আগেও যেটাকে অসম্ভব মনে হচ্ছিলো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন, প্রয়োজন নতুন রাজনীতি। এই তরুণদের হাত ধরে যদি সেটা আসে তা হবে জাতির জীবনে এক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। কিন্তু রাজনীতির পথ বরাবরই পিচ্ছিল। এখানে সফলতার সহজ-সরল কোনো পন্থা নেই। বিপ্লব বা অভ্যুত্থান এক ধরনের অস্থিরতাও তৈরি করে। পুরনো সব নিয়ম ভেঙে দেয়া কেবল মুখের কথা নয়।

ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক দেব ফেসবুকে এক লেখায় ঢাকায় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তার সাক্ষাতের বিবরণ দিয়েছেন। নাহিদের রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নেয়া প্রসঙ্গে তিনি লিখেন, ‘নাহিদ, এই  যে বিরুদ্ধবাদীর চোখ বেঁধে ফেলা, আসলে এর উল্টোপথে হাঁটা শুরু আজ থেকে। মনে পড়ছে আপনার কালশিটে। মনে পড়ছে ব্যাডমিন্টন  কোর্টে দাঁড়িয়ে আপনার স্বগতোক্তি, ভাই নতুন একটা বাসা খুঁজতে হবে। আমরা সবাই নতুন বাসা খুঁজছি, যে বাসা সবার, পক্ষের-বিপক্ষের-প্রান্তিকের, বিশ্ব জুড়ে যাদের গায়ে মনে কালশিটে আজও, তাদের সবার।’

এখন প্রশ্ন হলো নাহিদরা কি সেই বাসা খুঁজে পাবেন। যে বাসা হবে বাংলাদেশপন্থিদের, মধ্যপন্থিদের। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাংলাদেশির জন্য যেখানে ইনসাফ পাওয়া যাবে। পুরনো শৃঙ্খল ভেঙে মিলবে মুক্তি। নাহিদরা একা নন। এমন বাসা, এমন দেশ তো আসলে আমরা সবাই খুঁজছি। যদিও জানি, পথটা বড্ড কঠিন।

mzamin

পুলিশের গাড়িতে হাসপাতালে ফিরলেন আহতরা

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে বেশ কয়েকটি দাবি নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে প্রায় ত্রিশ ঘণ্টা অবস্থানের পর তাদের চিকিৎসার জন্য পুলিশের ভ্যানে করেই পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

তেজগাঁও থানার ওসি মোবারক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আন্দোলনকারীদের পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে রেখে আসছি। যেহেতু তারা চিকিৎসা চায়। তাই সরকার তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। এরপর তারা চাইলে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নেবে।

এর একদিন আগ থেকেই একইস্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন তারা। শুরুর দিকে ৩০ জনের মতো থাকলেও পরে তাদের সংখ্যা অর্ধশতাধিক হয়। আহতদের বিক্ষোভের ফলে গত বুধবার থেকেই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ভেতরে যান চলাচল বিঘ্ন ঘটে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সারাদিন থেকে মধ্য রাতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিযুক্ত ছিলেন সেখানে।

আন্দোলনকারীদের একজন গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সরকার বৈষম্য তৈরি করছে। অনেক গুলিবিদ্ধ যারা আছেন তাদের সি ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। যা স্পষ্ট আমরা বৈষম্য দেখছি। তাই আমরা দুইটি ক্যাটাগরি চাই। আমাদের এ দাবি না আদায় হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে। দাবি আদায়ের আগ পর্যন্ত আমরা এখানেই অবস্থান করবো।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এম্বুলেন্স যেতে দেয়নি আন্দোলনরতরা বিক্ষোভ চলাকালীন সময়ে দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে একটি এম্বুলেন্স আসে। এম্বুলেন্সটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রবেশ করতে যেতে চাইলে আন্দোলনকারীরা প্রবেশে বাধা দেয়। আন্দোলনকারীরা প্রধান ফটকের সামনে শুয়ে বসে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ সময় এম্বুলেন্সটি আসলেও আহতদের অবস্থানের কারণে গাড়িটি ভেতরে যেতে পারেনি।

শুরুতে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দাবি এলেও পরে তারা এক দফা দাবিতে অনড় ছিলেন। সর্বশেষ ১ দফা দাবি হলো- বৈষম্য নিরসনে আহত ব্যক্তিদের তিন ক্যাটাগরির পরিবর্তে দুটি করতে হবে।

প্রথম দিন তিন দাবিতে আন্দোলন- ক্যাটাগরি পুনর্বিবেচনা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ আন্দোলনকারীদের দাবি, আহতদের জন্য নির্ধারিত ক্যাটাগরি ৩টি থেকে কমিয়ে ২টি করা হোক। সেই সঙ্গে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

ক্যাটাগরি-এ যেসব আহতরা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন (যেমন- পঙ্গুত্ব, চোখ হারানো, গুরুতর বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ আঘাত), তাদের জন্য মাসিক ভাতা ২০ হাজার টাকা। এককালীন অনুদান: আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এই ভাতা বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান: পরিবারে দায়িত্বশীল সদস্যদের সরকারি বা আধাসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

ক্যাটাগরি-বি যেসব আহত যোদ্ধা সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন, তাদের জন্য মাসিক ভাতা ১৫ হাজার টাকা। এককালীন অনুদান: পূর্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এই ভাতা বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান: প্রশিক্ষণ ও সরকারি বা আধাসরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

mzamin

পুতিনের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যারান্টি চান স্টারমার

ইউক্রেনে পুতিনকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করেন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে সাংবাদিকদের কাছে স্টারমার বলেন, ইউক্রেনে পুনরায় পুতিনের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টির প্রয়োজন। এ বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন স্টারমার। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে বিমানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্টারমার। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র-বৃটেনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে আরও ঘনিষ্ঠ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। স্টারমার ইউক্রেনের নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দিলেও এ বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতবিরোধ স্পষ্ট হয়েছে। ইউক্রেন ইস্যুতে উভয় নেতার সুর ভিন্ন। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে বৃটেনের শান্তিরক্ষী  সৈন্য মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্টারমার। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান বৃটেনের প্রধানমন্ত্রীর বিপরীত। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ট্রাম্প সাফ বলে দিয়েছেন, তিনি ইউক্রেনকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবেন না। এরপরেও মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর জোর দিয়েছেন স্টারমার। ইউক্রেনের নিরাপত্তার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পিছিয়ে আসা কেমন রূপ লাভ করবে জানতে চাইলে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর স্বরূপ কেমন হবে বা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাকস্টপটা আসলে কেমন তা স্পষ্টতই আলোচনার বিষয়। তবে আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলবো না, শুধু এটুকু বলতে চাই ওই নীতিগুলো সম্পর্কে আমার স্পষ্ট ধারণা রয়েছে।

এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি’র এক খবরে বলা হয়েছে, ইউরোপিয়ানরা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরিত যেকোনো সৈন্যকে সমর্থন করার জন্য বিমান কভার, গোয়েন্দা তথ্য এবং রসদ সরবরাহের মতো সম্ভাব্য মার্কিন অবদানের সন্ধান করছে। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলন করবেন স্টারমার। সেখানে তিনি ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপ ও মার্কিন সম্পর্কের সেতু হিসেবে কাজ করবেন বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা।

ট্রাম্প নিয়মিতভাবে ইউরোপিয়ান দেশগুলোকে ন্যাটোর জন্য আরও বেশি অর্থ প্রদানের বিরোধিতা করে আসছেন।

স্টারমার মঙ্গলবার ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে, বৃটেনের প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০২৭ সালের মধ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। ট্রাম্প ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ওপর চাপ দেয়ার যে অঙ্গীকার করেছেন তা এড়াতে পারবেন বলে আশা করছেন স্টারমার।

mzamin

বাংলাদেশের শত্রুরা এখনো গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে

ক্ষুদ্র সংকীর্ণতা ভুলে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, প্রতিহিংসা-প্রতিশোধ নয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি বাসযোগ্য উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করি। তিনি বলেন, এখনো ফ্যাসিস্টদের দোসররা এবং বাংলাদেশের শত্রুরা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্জনকে নস্যাৎ করার জন্য গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। ইস্পাত কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দিতে হবে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।

গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল সংলগ্ন মাঠে বিএনপি’র বর্ধিত সভায় লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন খালেদা জিয়া। অনুষ্ঠানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করেন। খালেদা জিয়া যখন বক্তব্য রাখেন, তখন তার পাশেই ছিলেন তারেক রহমান। বিএনপি চেয়ারপারসনের বক্তব্য প্রচারের সময় অনুষ্ঠানস্থলে নেতাকর্মীদের মাঝে ছিল পিনপতন নীরবতা।

বিএনপি চেয়ারপারসন তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ বিশেষ করে তরুণসমাজ আজ এক ইতিবাচক গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংকীর্ণতা ভুলে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের কাজ করতে হবে।

জনগণকে সম্পৃক্ত করে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আমি যুক্তরাজ্য থেকে অসুস্থ অবস্থায় আপনাদের আহ্বান জানাতে চাই, আসুন জনগণকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে পূর্বের ন্যায় আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব প্রদানে আরও ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংহতভাবে গড়ে তুলি।

তিনি বলেন, আসুন, আমরা আগামী দিনগুলোতে শহীদ জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের আধুনিক সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করি এবং এত ত্যাগের বিনিময়ে এই অর্জনকে সুসংহত এবং ঐক্যকে আরও বেগবান করি।

খালেদা জিয়া বলেন, দীর্ঘ ছয় বছর পর নেতৃবৃন্দ আবার একসঙ্গে ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশে একত্রিত হয়েছে। সেজন্য আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া আদায় করছি। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী বিরোধী সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন এবং সম্প্রতি জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদী শাসনের নির্মম ভয়াবহ দমননীতির কারণে গণহত্যায় যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। যারা আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক সমবেদনা।

তিনি বলেন, আমি চিকিৎসার কারণে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও আমি সবসময় আপনাদের পাশেই আছি। দীর্ঘ ১৫ বছর গণতন্ত্রের জন্য, আমার মুক্তির জন্য আপনারা যে নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন এবং আমাদের অসংখ্য সহকর্মী প্রাণ দিয়েছেন, জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং প্রায় সোয়া লাখ মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়েছেন- এখনো তারা আদালতের বারান্দায় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আপনাদের শুধু দল নয়, জাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, দেশ আজ এক সংকট সময় অতিক্রম করছে। আপনাদের এবং ছাত্রদের সমন্বিত আন্দোলনের ফলে ফ্যাসিস্ট শাসকরা বিদায় নিয়েছে। একটা অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা- রাষ্ট্র মেরামতের ন্যূনতম সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য সকলের কাছে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমার অবর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং আপনাদের সকলকে নিয়ে নিরন্তর কাজ করে দলকে সুসংহত করেছেন, এজন্য আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, আপনারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।

তিনি বলেন, এমন কোনো কাজ করবেন না যাতে আপনাদের এত দিনকার সংগ্রাম আত্মত্যাগ বিফলে যায়। আমাদের সবসময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই উক্তি মনে রাখা দরকার- ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ’।

সভার মূল মঞ্চে ছিলেন- বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
সভা সঞ্চালনা করেন- যুগ্ম মহাসচিব শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও কোষাধ্যক্ষ রসিদুজ্জামান মিল্লাত।

mzamin

ত্যাগীদের মূল্যায়ন দাবি ঐক্যের বার্তা কেন্দ্রের by কিরণ শেখ ও নাজমুল হুদা

বর্ধিত সভায় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের দাবি তুলেছেন বিএনপি’র তৃণমূল নেতাকর্মীরা। সভায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। সাত বছর পর গতকাল জাতীয় সংসদের এলডি হল প্রাঙ্গণে এই সভা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ভার্চ্যুয়ালি সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সকালে শুরু হওয়া সভা মধ্যাহ্ন বিরতি দিয়ে রাত পর্যন্ত চলে। সমাপনী বক্তব্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন।

সকাল ১১টায় ‘সুদৃঢ় ঐক্য রুখে দিতে পারে সকল ষড়যন্ত্র’ স্লোগান নিয়ে এই বর্ধিত সভা উদ্বোধন করা হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সূচনা বক্তব্য রাখেন।
উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তৃণমূলের নেতাদের বক্তব্য শোনেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা তাদের বক্তব্যে হাইব্রিডদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের পদ-পদবি দেয়ার জন্য হাইকমান্ডকে পরামর্শ দেন। ৫ই আগস্টের পর নব্য নেতাকর্মীদের কারণে বিএনপি’র ত্যাগীরা ভুগছেন বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। তারা বলেন, এদের কারণে বিএনপি’র ভেতরে এখন বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। কিছু সুবিধাবাদীদের দেখা যাচ্ছে। এই সুবিধাবাদীরা ত্যাগীদের বিতাড়িত করতে চাইছে। প্রত্যেক জায়গায় হাইব্রিড ও  গ্রুপিং রয়েছে। এ ছাড়া মনোনয়নপত্র নিয়ে কোনো কোনো জায়গায় বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। জামায়াত নিয়েও কথা বলেন কয়েকজন নেতা। আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায়ে দলকে শক্ত অবস্থান নেয়ার পরামর্শ দেন কেউ কেউ। এজন্য বিভাগীয় সম্মেলন করার জন্য দলীয় হাইকমান্ডকে পরামর্শ দেন তারা।

সভায় নেতারা বলেন, মনোনয়নপত্র নিয়ে কোনো কোনো জায়গায় বিভক্তি আছে। যারা সুবিধাবাদী তারা যেন মনোনয়ন না পান সে বিষয়ে হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা। বলেন, ১৭ বছর যারা ছিলেন না তাদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। একইসঙ্গে নেতারা যোগ্য ও ত্যাগীদের নেতৃত্বে আনার জন্য পরামর্শ দেন। তাদের নিয়ে কমিটি করার জন্য হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অন্যথায় দলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তৃণমূলের নেতারা। পাশাপাশি বর্ধিত সভার মতো করে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও সভা করার পরামর্শ দেন তারা।

হবিগঞ্জের এক নেতা বলেন, বিগত দিনে যারা গর্তে লুকিয়ে ছিল, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করেছিল তাদের এখন আস্ফালন দেখা যাচ্ছে। এই সুবিধাভোগীদের কাছে ত্যাগীরা হারিয়ে গেলে পুরো বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দলের দুর্দিনে তৃণমূল বেঈমানি করেনি। যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। অথচ একশ্রেণির মৌসুমি নেতা সুবিধা নিয়ে মোটাতাজা হয়েছে। আর ত্যাগীরা হয়েছেন স্বাস্থ্যহীন। এই ত্যাগীরা দলের হাইকমান্ডের দিকে তাকিয়ে আছে।
সৈয়দপুরের আলমগীর মাতুব্বর বলেন, যারা আমাদের বাড়িঘর ভেঙে দিয়েছে। তারাই আজ বিএনপি’র প্রথম কাতারে। এই হাইব্রিড যেন বিএনপিতে না ঢুকে। তাহলে সৈয়দপুরের তিনটি আসনই বিএনপিকে আমরা উপহার দেবো।

যশোরের আসাদুজ্জামান মিন্টু বলেন, প্রত্যেক জায়গায় হাইব্রিড ও  গ্রুপিং রয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে গ্রুপিং দূর করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিতে হবে।
দিনাজপুরের আব্দুস সালাম মিলন বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলকে শক্তিশালী করতে হবে। ৫ই আগস্টের পরে বিএনপি’র ভেতরে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তাদের চিহ্নিত করতে হবে। ত্যাগীদের কোণঠাসা ও বহিষ্কার করা হচ্ছে। পদ স্থগিত করা হচ্ছে। তাদের পদ ফিরিয়ে দিতে হবে। তৃণমূলকে জাগাতে হবে, হাইব্রিডদের ঠেকাতে হবে।

নওগাঁর মহাদেবপুর এলাকার রবিউল আলম বলেন, আমরা আন্দোলন করে দলকে সংগঠিত করেছি। এখন সেটা এককভাবে দাবি করা হচ্ছে! সেটা আমরা মেনে নিতে চাই না। আর আমরা সেই নেতৃত্ব দেখতে চাই না, যারা আন্দোলন দেখলেই পালিয়ে যেতে চায়।

টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকার জাকির হোসেন সরকার বলেন, যারা গত ১৫ বছর ছিল না তারা এখন আমাদের ঘরে ঢুকে ঐক্য বিনষ্ট করতে চাচ্ছে। তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিএনপি আরও শক্তিশালী হবে।

পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক খায়রুন নাহার খানম বলেন, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি টিকে থাকতে পারবে কিনা, আমাদের প্রতিপক্ষ যে অপপ্রচার চালাচ্ছে, সেটা রোধ করার ওপর নির্ভর করছে। প্রতিপক্ষ মসজিদে বসে রাজনীতি করবে, আর আমরা অফিস ভাড়া করে রাজনীতি করবো। সুতরাং মসজিদে বসে রাজনীতি চলবে কি চলবে না- তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার হুমায়ুন কবির বলেন, জামায়াতকে মোকাবিলায় সকালে মসজিদে নামাজ পড়তে হবে। দলকে এগিয়ে নিতে হলে ত্যাগীরা পিছিয়ে থাকবে না, মৌসুমি নেতারা এগিয়ে যাবে না- এমন কৌশলে এগোতে হবে।

ভোলার মো. মফিজুর রহমান মিলন বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর বিএনপিতে কোনো সন্ত্রাসীর জায়গা হবে না। বিএনপি যাতে আওয়ামী লীগের দোসরদের জায়গা না হয়।  

জামালপুরের আতিকুর রহমান সাজু বলেন, জুলাই-আগস্টে যারা আন্দোলন করেছেন তারা আমাদেরই সন্তান। তারা আওয়ামী লীগের দোসরদের কেউ নয়। তাই ছাত্রদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে যাওয়া উচিত। আর দেশে এখন ষড়যন্ত্র চলছে। এজন্য বিএনপি’র কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগঠনকে চাঙ্গা করতে হবে। যেসব জায়গায় অঙ্গ-সংগঠনের কমিটি নেই, সেসব জায়গায় কমিটি দিতে হবে। যেসব জায়গায় বিএনপি’র কমিটি নেই, সেসব জায়গায় বিএনপির কমিটি দিতে হবে।
জামালপুরের জহিরুল ইসলাম পিন্টু বলেন, ৫ই আগস্টের পর নব্য বিএনপি হয়েছে। তাদের জন্যই বিএনপি’র এই বেহাল দশা। আর মসজিদ ও মাদ্রাসার কমিটি নিয়ে ঝগড়া হয়, এগুলো থেকে সরে আসতে হবে।  

ঠাকুরগাঁওয়ের জিয়াউল ইসলাম জিয়া বলেন, দেশে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে। সুতরাং আপনি (বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান) নিজস্ব সেল ও জরিপের মাধ্যমে মনোনয়ন দেবেন। তাকেই মনোনয়ন দেবেন যার অবস্থান সবচেয়ে ভালো হবে। আর যারা দলের ক্ষতি করবে গোপন সেল করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ নিন।   

নোয়াখালীর দেওয়ান শামসুল আরেফিন শামীম বলেন, বিগত ১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের ডেকে পাইনি, তাদেরকে দলে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে দায়িত্ব দিলে তারা দলের সঙ্গে বেঈমানি করবেন।

কুষ্টিয়ার জাহিদুল ইসলাম বিপ্লব বলেন, আমরা অনেক মামলা-হামলার স্বীকার হয়েছি। দলের দুঃসময়ে  যারা ছিলেন না, সেসব সুবিধাবাদীরা এখন বিএনপিতে ভালো জায়গায় আছেন।
নীলফামারীর মাসুদ চৌধুরী বলেন, দলের ভেতরে এখন বিশৃঙ্খলা দেখতে পাচ্ছি। কিছু সুবিধাবাদী দেখতে পাচ্ছি। এসব সুবিধাবাদীরা ত্যাগীদের বিতাড়িত করতে চায়। দলের অনেক নেতা ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এই ত্যাগীদের কথা যাতে আমরা ভুলে না যাই।

সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৪ঠা ফেব্রয়ারি রাজধানীর ‘লা মেরিডিয়ানে’ বিএনপি’র বর্ধিত সভা হয়। যেখানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বক্তব্য দেন। এর ৪ দিন পর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ৮ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার।

mzamin

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বাংলাদেশে

২০২৪ সালে বিশ্ব গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) করা বিশ্ব গণতান্ত্রিক সূচকে ২৫ ধাপ পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের আর কোনো দেশের এত বড় অবনমন হয়নি। ‘দ্য গ্লোবাল ডেমোক্রেসি ইনডেক্স: হাউ ডিড কান্ট্রিজ পারফরম ইন ২০২৪? শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা জানিয়েছে বিখ্যাত ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টের অনলাইন সংস্করণ। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গণতন্ত্রকে পুনঃনির্মাণ করা এক বিশাল কাজ। তা সত্ত্বেও আশাবাদের কারণ আছে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থনীতিকে করেছে স্থিতিশীল। এ জন্য বাংলাদেশকে ইকোনমিস্ট ২০২৪ সালে ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৬৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২৫ ধাপ পিছিয়ে অবস্থান করছে ১০০তম স্থানে। উল্লেখ্য, ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নির্বাচনের বছর ছিল ২০২৪। এ বছর বিশ্বের কমপক্ষে ৭০টি দেশের প্রায় ১৬৫ কোটি ভোটার ভোট দিয়েছেন। বিশ্বে যত ভোটার বসবাস করেন এই সংখ্যা প্রায় তার অর্ধেক। একটি বছরে এত সংখ্যক দেশে নির্বাচন হলেও তার সবটা গণতান্ত্রিক ছিল না।

এ জন্য ২০২৪ সালটা বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে। ২৭শে ফেব্রুয়ারি ইআইইউ প্রকাশিত সর্বশেষ গণতান্ত্রিক সূচক অনুযায়ী, এই সূচক নির্ধারণ শুরু হয় প্রায় দুই দশক ধরে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের সূচক সবচেয়ে খারাপ রূপ নিয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বের ১৬৭টি দেশ ও ভূখণ্ডের ওপর এই সূচক করে আসছে ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। তারা শূন্য থেকে ১০-এর ভিত্তিতে দেশগুলোকে ৫টি শ্রেণিতে ভাগ করে। তার তা হলো- নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক স্বাধীনতা। এরপর দেশগুলোকে আবার চারটি শ্রেণিতে সাজানো হয়। তা হলো- পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক দেশ, ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ, হাইব্রিড শাসকগোষ্ঠীর দেশ এবং কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠীর দেশ। এই তালিকায় টানা ১৬তম বারের মতো নরওয়ে বিশ্বের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তারা শূন্য থেকে ১০-এর মধ্যে স্কোর করেছে ৯.৮১। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড ও সুইডেন। অন্যদিকে ২০২১ সাল থেকে এই সূচকের সবচেয়ে তলানিতে রয়েছে আফগানিস্তান। তারা স্কোর করেছে মাত্র ০.২৫। বিশ্বে গণতান্ত্রিক সূচকের গড় নতুন নিম্নতম রেকর্ডে এসেছে। তা ৫.১৭। ২০১৫ সালে তা ছিল ৫.৫৫। সেখান থেকেও পতন ঘটেছে। বিশ্বের শতকরা মাত্র ৬.৬ ভাগ মানুষ এখন বসবাস করেন পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রে। দশ বছর আগে এই হার ছিল শতকরা ১২.৫।

অন্যদিকে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ মানুষ অর্থাৎ প্রতি ৫ জনের মধ্যে দু’জন বসবাস করেন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে। বৈশ্বিক নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও অনেক নির্বাচন ছিল প্রহসনের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানে নির্বাচনের দিন সহিংসতায় ভোটগ্রহণ বিঘ্নিত হয়। পাকিস্তানে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তার গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনের অল্প আগে তাকে জেলে ঢোকানো হয়। দেশটির স্কোর ৩.২৫ ছিল ২০২৩ সালে। তার অবনমন হয়ে দাঁড়িয়েছে ২.৮৪। রাশিয়াতে হয়েছে আরেকটি লজ্জার নির্বাচন। তাতে ভ্লাদিমির পুতিনকে পঞ্চমবারের মতো প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে। সূচকে তারা মাত্র দুই পয়েন্ট স্কোর করেছে। বুরকিনা ফাসো, মালি এবং কাতার সহ অন্য দেশগুলোতে নির্বাচনই বাতিল করা হয়েছে। এমনকি ইউরোপে উল্লেখযোগ্য অবনমন হয়েছে সূচক। শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে ৯টিই এই মহাদেশের। পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রের দেশ থেকে ত্রুটিপূর্ণ দেশের তালিকায় নেমে এসেছে ফ্রান্স। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে একক দল হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর জুনে আগাম নির্বাচন দেন। কিন্তু তাতে তার আস্থার অবনমন ঘটে। নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবৈধ কৌশল অবলম্বন করা হয়। নির্বাচনে অর্থের ছড়াছড়ি ছিল। এ জন্য সাংবিধানিক আদালত প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে নতুন নির্বাচন আহ্বান করে। এসব ঘটনায় রোমানিয়ার গণতান্ত্রিক ধারার অবনমন ঘটে। ওদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োল দ্রুততার সঙ্গে সামরিক আইন জারি করেন। তাতে দেশ এক মহাসংকটে ডুবে যায়। ফল হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে তিনি সামরিক আইন প্রত্যাহার করেন। এরপর দেশটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক দেশের শ্রেণি থেকে পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রয়ে গেছে ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক শ্রেণিতেই। ২০২৩ সালে তারা যে অবস্থানে ছিল তা থেকে সামান্য পিছিয়ে পড়েছে। তবে এ বছর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখে পড়তে পারে।  প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম মাসে সিভিল সার্ভিসের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছেন। একগাদা নির্বাহী আদেশ দিয়েছেন, যার আইনগত কর্তৃত্ব নিয়ে আইনগত প্রশ্ন থেকে যায়। নতুন এই নেতা কীভাবে শাসন করাকে বেছে নেন তার ওপর ২০২৫ সালে তাদের গণতান্ত্রিক সূচকের পরীক্ষা নির্ভর করবে।