Friday, November 28, 2025

হংকংয়ে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু বেড়ে ৭৫, কেন এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ল

হংকংয়ের বেশ কয়েকটি সুউচ্চ ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৬০ বছরের মধ্যে শহরটিতে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। খবর অনুযায়ী, এ ঘটনায় ২৭০ জনের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। হাজার হাজার বাসিন্দাকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এখনো বেশ কয়েকটি ভবনে আগুন জ্বলছে। ঘন ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে চীনা ভূখণ্ডের আকাশসীমা ছেয়ে ফেলেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আগুনের ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এ ঘটনায় হতাহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে ‘দায়িত্ব পালনকালে নিহত একজন ফায়ার ফাইটারও’ রয়েছেন।

আগুন লাগার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এ পর্যন্ত যা জানা গেল, সেটা দেখে নেওয়া যাক।

কোথায় এবং কখন আগুন লাগে

বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ২টা ৫১ মিনিটে হংকংয়ের তাই পো এলাকায় বৃহৎ আবাসন কমপ্লেক্স ওয়াং ফুক কোর্টে আগুন লাগে।

ওয়াং ফুক কোর্ট ৩১ তলা উচ্চতার আটটি ভবন নিয়ে গঠিত। তাই পো এলাকার কাউন্সিলর মুই সিউ-ফাং বিবিসি চায়নিজকে জানিয়েছেন, এর মধ্যে সাতটি ব্লক আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

১৯৮৩ সালে নির্মিত এসব ভবনে সংস্কারকাজ চলাকালে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।

তাই পো হলো হংকংয়ের উত্তর অংশে অবস্থিত একটি আবাসিক এলাকা, যা মূল চীনের শেনজেন শহরের কাছাকাছি।

২০২১ সালের সরকারি শুমারি অনুযায়ী, এই কমপ্লেক্সে ১ হাজার ৯৮৪টি অ্যাপার্টমেন্টে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ বাসিন্দা বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ৬৫ বা এর বেশি।

আগুন লাগার কারণ কী

আগুন লাগার কারণ অজানা। তবে হংকংয়ের নিরাপত্তা সচিব বৃহস্পতিবার ভোরে জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, আগুন অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ছড়িয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ভবনের বাইরে জালযুক্ত কাপড় এবং প্লাস্টিকের শিট পাওয়া গেছে—যার কোনোটিই অগ্নিপ্রতিরোধী বলে মনে হচ্ছে না।

ভবনের জানালায় স্টাইরোফোমও পাওয়া গেছে। পুলিশ বলেছে, এসব নির্মাণসামগ্রীর কারণেই আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫২ থেকে ৬৮ বছর বয়সী তিন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন একটি নির্মাণ সংস্থার পরিচালক এবং অন্যজন প্রকৌশল পরামর্শদাতা।

পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, তদন্তকারীরা নির্মাণ সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা খতিয়ে দেখছেন। মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের এমন বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে কোম্পানির কর্মকর্তারা দায়িত্বে গুরুতরভাবে অবহেলা করেছেন। এর ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।’

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, ভবনের ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি।

অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা কতটুকু

হংকংয়ে কমপক্ষে ৬৩ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এটিকে লেভেল ফাইভ অ্যালার্মে (সর্বোচ্চ স্তর) শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

খবর পাওয়ার ৪০ মিনিটের মধ্যে এই অগ্নিকাণ্ডকে লেভেল ফোর অ্যালার্ম ঘোষণা করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটে স্তরটি আবারও বাড়ানো হয়।

স্থানীয় গণমাধ্যম এর আগে জানিয়েছিল, ভবনের ভেতরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার হোসগুলো উঁচু স্তরে পৌঁছাতে পারছিল না।

অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবার উপপরিচালক ডেরেক আর্মস্ট্রং চ্যান গণমাধ্যমকে বলেন, আগুনের তীব্র তাপের কারণে ফায়ার ফাইটাররা উদ্ধার অভিযান চালাতে ভবনের ভেতরে ঢুকতে পারছিলেন না।

ঘটনাস্থলে ৭৬৭ জন ফায়ার ফাইটার, ১২৮টি ফায়ার ইঞ্জিন, ৫৭টি অ্যাম্বুলেন্স এবং প্রায় ৪০০ পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছিল।

ক্ষতিগ্রস্তদের সম্পর্কে কী জানা যায়

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৭ বছর বয়সী অগ্নিনির্বাপণকর্মী হো ওয়াই-হো রয়েছেন, যিনি শা টিন ফায়ার স্টেশনে ৯ বছর ধরে কাজ করছিলেন।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ওয়াই–হোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং প্রায় আধা ঘণ্টা পর তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

হংকং ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, অন্তত আরও একজন অগ্নিনির্বাপণকর্মী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যরা লাউডস্পিকার ব্যবহার করে বাসিন্দাদের তাঁদের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পেতে সহায়তা করছেন।

কী কারণে আগুনের তীব্রতা বেড়েছে

ওয়াং ফুক কোর্টের ভবনগুলো বাঁশের মাচা এবং সবুজ নির্মাণ জাল দিয়ে ছাদ পর্যন্ত ঢাকা ছিল। কারণ, সেখানে সংস্কারকাজ চলছিল।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশ দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার জন্য সংস্কারকাজে ব্যবহৃত জাল, প্লাস্টিকের শিট ও স্টাইরোফোমের মতো উপকরণকে দায়ী করেছে।

নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না মনিটরের চেয়ারম্যান জেসন পুন সংবাদমাধ্যম ইনিশিয়াম মিডিয়াকে বলেছেন, আগুনের কারণ যা–ই হোক না কেন, ভবনের বাইরে সঠিক জাল ব্যবহার করা আগুন ছড়ানো রোধে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি যোগ করেন, নিম্নমানের জাল দ্রুত আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে।

আরেক প্রকৌশলী বলেন, তাঁর বিশ্বাস, হংকংজুড়ে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বেশির ভাগ জালই অগ্নিপ্রতিরোধক উপাদান দিয়ে তৈরি নয়।

এ ছাড়া মাচার ওপর প্রায়ই কার্ডবোর্ড, ধ্বংসাবশেষ এবং পেইন্ট থিনার পাওয়া যায়, যা শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গে মিলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে।

অগ্নিনিরাপত্তাবিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ আগে বলেছিলেন, সংস্কারকাজে ব্যবহৃত বাঁশের মাচা আগুনকে আরও বাড়িয়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সরকার নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাঁশের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে ধাতব মাচা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে চাইছিল।

হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জিয়াং লিমিং উল্লেখ করেন, ওয়াং ফুক কোর্টের ভবনগুলো ছিল ‘তুলনামূলকভাবে পুরোনো’। তাই ‘জানালার কাচগুলো ততটা অগ্নিপ্রতিরোধী নয়’।

লিমিং আরও বলেন, আধুনিক ভবনে ডবল পেনের কাচের জানালা থাকে। কিন্তু এর জন্য সম্ভবত তারা শুধু একক পেনের কাচ ব্যবহার করেছিল, যা আগুনের তাপে খুব সহজে ভেঙে যেতে পারে এবং আগুন তখন বাইরের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-27%2Fygvvsnvk%2Fhongkong.JPG?rect=0%2C1%2C5500%2C3667&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ২৭ নভেম্বর ২০২৫, হংকং। ছবি: রয়টার্স

মামদানি পারলেও নাহিদরা কেন পারছেন না? by নুরুল হুদা সাকিব ও ইকরামুল হক রিয়ন

মাত্র এক বছরের প্রচারণায় নিউইয়র্ক শহর কাঁপিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আলোড়ন তুলেছেন জোহরান মামদানি। ৩৪ বছর বয়স্ক এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নেতা উগান্ডায় জন্ম নেওয়া মুসলিম। নিউইয়র্কের শত বছরের ইতিহাসে তিনি সর্বকনিষ্ঠ এবং প্রথম মুসলিম মেয়র।

মামদানিকে মোকাবেলা করতে হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ধনকুবের সহযোগীদের বিপরীতমুখী অবস্থান, নেতিবাচক মিডিয়া ন্যারেটিভ আর নানা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকূলতা। এসবের মাঝে অ্যান্ড্রু কুমোর মতো প্রভাবশালী ও ঝানু রাজনীতিবিদকে হারানোটা ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার মতো।

নিউইয়র্কের কর্মজীবী বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে জীবনঘনিষ্ঠ সমস্যা ছিল জীবনযাত্রার খরচ জোগানো। মামদানি তাঁর নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছিলেন এ সমস্যাটিকে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘোরা ও ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে নাগরিকদের সমস্যা জানা, নির্বাচনী প্রচারণায় সেগুলোকে উল্লেখ করাসহ নিজের ব্যক্তিজীবনের স্বচ্ছতা তুলে ধরে মামদানি এই জয় ছিনিয়ে এনেছেন। তাঁর এই জয় প্রমাণ করে বিদ্যমান ব্যবস্থার বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও জোট করতে পারলে তরুণদের পক্ষে প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে জনসমর্থন আদায় করা সম্ভব।

২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী সরকার পতনে নেতৃত্ব দেওয়া নাহিদ ইসলামদের হাত ধরে দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়েছে। ১৪০০-এর অধিক শহীদ আর অসংখ্য আহত ব্যক্তির নেতা নাহিদ ইসলামরা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন। আমাদেরও দেখাচ্ছেন। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পার হলেও, বিএনপি ও জামায়াতের দ্বিমেরুর বাইরে তাঁদের তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠা নিয়ে সংশয় দৃশ্যমান। বিভিন্ন সময়ে করা নানান সংস্থার জরিপে তাঁদের কমতে থাকা জনসমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর নাহিদদের সহযোদ্ধাদের হাত ধরে প্রথমে লিয়াজোঁ কমিটি ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ ও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এনসিপিকে মনে করা হচ্ছিল আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারুণ্যের স্বপ্নের সারথি। কিন্তু বিভিন্ন সময় এনসিপির কিছু নেতা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁরা সেগুলোকে অস্বীকার করলেও অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা নেননি। ফলে অভিযোগগুলো প্রমাণিত না হলেও সেগুলো নাগরিকদের কাছে তাঁদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকেই তাঁদের বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মুদ্রার অপর পিঠ বলছেন, যেখানে ক্ষমতা আর দুর্নীতি হাত ধরে চলে।

নাহিদরা শুরু থেকে তাঁদের লক্ষ্য হিসেবে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ এর কথা বললেও সাধারণ নাগরিকরা সেই ধারণার সঙ্গে পরিচিত নন। নাহিদরা তাঁদের এই সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার কোনো রূপরেখাও পরিষ্কার করে উত্থাপন করতে পারেননি। তাঁরা কী চায়, কেন এবং কীভাবে চায়, সেটার স্পষ্ট কোনো ধারণা নাগরিকেরা এখনো পায়নি।

অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শকে একটি ‘কোর থিম’-হিসেবে নাগরিকদের সামনে উত্থাপন করেছে, নাহিদরা সেখানে ব্যর্থ হয়েছেন।

বিএনপির বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কিংবা জামায়াতের ইসলামি রাজনীতি মানুষের কাছে যতটা সহজভাবে প্রতীয়মান হয়, নাহিদদের বাংলাদেশপন্থা ততটা হয় না। রাজনীতি তো জনগণের জন্য। জনগণের কাছে আধিপত্যবাদবিরোধী, আদর্শ-উত্তর, সেকেন্ড রিপাবলিকের ধারণা পরিষ্কার না হলে তারা নতুন মেরুকরণেও আগ্রহী হবে না। এ ক্ষেত্রে মামদানি বেশ সফল। তিনি খুবই স্বল্প সময়ে তাঁর ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট আদর্শকে কেবল প্রচারই করেননি, বরং সেটাকে নাগরিকদের কাছে সহজবোধ্য ও জীবনঘনিষ্ঠ করে উত্থাপন করে তাদের সমর্থনও আদায় করে নিয়েছেন।

গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে ৩ জন ছাত্র প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে নাহিদ ইসলাম পরবর্তী সময়ে পদত্যাগ করে এনসিপির হাল ধরেছেন। তিনিসহ বাকি দুজন ছাত্র প্রতিনিধি যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দিয়েছিলেন, সেগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন তা অস্পষ্ট। বিশেষত গণমাধ্যম এবং জনপ্রশাসনে ফ্যাসিবাদী আমলের কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে ছাত্র উপদেষ্টাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁরাও নানা সময় স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার বিষয়ে অভিযোগ তুললেও দায়িত্ব ছাড়েননি। ফলে তাঁদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দায়িত্ব ছাড়ার পর নাহিদ ইসলাম তাঁর কার্যক্রম কিংবা সাফল্যের কোনো প্রতিবেদন নাগরিকদের সামনে উত্থাপন করেননি। অন্য দুজন করবেন কি না, তা-ও অনিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে মামদানি বেশ ভিন্ন। তিনি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির মেম্বার হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন, নাগরিকদের কাছে তা স্পষ্ট করেছেন এবং জনসমর্থন আদায়ে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজেও লাগিয়েছেন।

সামনের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো আসন বণ্টন ও প্রচারণা শুরু করেছে। ইতিমধ্যে জামায়াত প্রায় ৩০০ আসন এবং বিএনপি ২৩৭ আসনের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করছে। এনসিপি এখানে অনেকখানি পিছিয়ে আছে। তাদের সব নেতার এখনো আসন নির্ধারিত হয়নি। এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদে থাকা দুজন ছাত্র প্রতিনিধি কোন আসন থেকে নির্বাচন করবেন, আদৌ নির্বাচন করবেন কি না কিংবা করলেও সেটা এনসিপি থেকে করবেন কি না, সেটাও এখনো স্পষ্ট না। এ ছাড়া প্রচারণা শুরু করলেও তাঁদের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

মামদানি তাঁর প্রায় ১ লাখো স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে ১০ লাখের বেশি ভোটারের দ্বারে কড়া নেড়েছেন। নতুন আদর্শ প্রচারে এটি অপরিহার্য এবং বেশ কার্যকর। তবে সময় ও লোকবল বিবেচনায় এনসিপি এটা কতটুকু করতে পারবে বলা মুশকিল। বাড়ি বাড়ি না গিয়ে শুধু পথসভা আর জনসংযোগ করে ভোটার আকৃষ্ট করা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশ কঠিন। এনসিপির কয়েকজন প্রার্থী সে পথে হাঁটলেও বেশির ভাগই এ বিষয়ে এখনো নিষ্ক্রিয়। প্রান্তিক জনতার শক্ত সমর্থন না থাকলে এভাবে প্রচারণা করাও মুশকিল।

এ ক্ষেত্রে তাঁরা মামদানির মতো অনলাইন প্রচারনাকে গুরুত্ব দিতে পারেন। মামদানি ফেসবুক, এক্স, টিকটকের মতো জনপ্রিয় ডিজিটাল মিডিয়া সাইটগুলো ব্যবহার করে তাঁর ভোটারদের বৃহৎ অংশের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়েছেন। কেবল একটা টিকটক ভিডিও থেকেই তিনি ২ দশমিক ৫ লাখো ডলার তহবিল উত্তোলন করেছেন।

তবে নিউইয়র্কের প্রেক্ষাপটে এই কাজ যতটা সহজ, বাংলাদেশে ততটা সহজ হবে না। পরিবর্তনকামী যে জনগোষ্ঠীকে নাহিদদের ভোটার হিসেবে ধরা হচ্ছে, তাদের একটা বড় অংশ শহুরে এবং জেন-জি। এদের কাছে ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার করে পৌঁছানো তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু বাংলাদেশে নিউইয়র্কের চেয়ে ডিজিটাল লিটারেসি অনেক কম। জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশ ডিজিটাল বলয়ের বাইরে অবস্থান করায় এবং ডিজিটাল মিডিয়াকে রাজনৈতিক সচেতনতার কাজে না লাগানোয় শুধু অনলাইন প্রচারণায় সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

নির্বাচনের খরচ জোগাতেও ভুগতে হতে পারে এনসিপিকে। মামদানি তাঁর নির্বাচনী ব্যয়ের একটা বড় অংশ গণচাঁদা থেকে পেলেও বাংলাদেশে এই পদ্ধতি এখনো জনপ্রিয় না। খরচ জোগাড় করতে গিয়ে তাঁরা কোনো অনৈতিক পন্থা নিচ্ছেন কি না, সেদিকেও সবার কড়া নজর থাকবে। তাঁরা কীভাবে এই খরচ জোগাড় করেন ও ব্যয় করেন, সেটা ভোটারদের অন্যতম আগ্রহের জায়গা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলের সমার্থক হচ্ছে তার প্রতীক। ভোটাররা বিএনপি বা জামায়াতের প্রার্থীকে না চিনলেও ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লা প্রতীক চেনে। কিন্তু নাহিদদের নিবন্ধন আর প্রতীক নিয়ে দীর্ঘ জটিলতা জনসাধারণের কাছে তাদের পরিচিত করার পথে অনেকখানি পিছিয়ে দিয়েছে।

আগামী নির্বাচনে জোটসঙ্গীদের সবাইকে নিজস্ব দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে করতে হবে। ফলে জোট কিংবা একক, যেভাবেই নাহিদরা নির্বাচন করুন না কেন, শাপলা কলি প্রতীককে জনগণের কাছে পরিচিত করানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে এই কাজে যেখানে মামদানি পেয়েছেন বছরের বেশি সময়, নাহিদদের তা করে দেখাতে হবে মাত্র ৪ মাসে।

এ ছাড়া নাহিদরা যাদেরকে নিজেদের মূল ভোটার হিসেবে বিবেচনা করছেন, সেই তরুণ ভোটারদের মাঝেও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে কি না, সেটা ভাববার অবকাশ রয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে গণ-অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা নাহিদদের সহযোদ্ধাদের ছাত্রসংগঠন ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ’ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের প্যানেলে নির্বাচন করেছে। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমর্থন না পেয়ে বাকি দুটিতে তারা কোনো প্যালেনও দেয়নি। সম্প্রতি তারা সংগঠনের নামও পরিবর্তন করেছে। তাদের সমর্থন হারানোর এই বাস্তবতা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা দ্বারা পরিচালিত জরিপে ফুটে উঠেছে।

এ বছরের জুলাইয়ে সানেম-এর জরিপে যেখানে এনসিপির প্রতি ১৬ শতাংশ জনসমর্থন দেখা গিয়েছিল, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে তা ২-৫ শতাংশে ঠেকেছে। অথচ মার্চে এনসিপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক মোট ভোটের ৩০-৩৫ শতাংশ পেয়ে বিরোধী দলে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন।

এই অবনমনের পেছনে কিছু দৃশ্যমান কারণও রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে নাহিদদের দূরত্ব ক্রমাগত বেড়েছে। এর পেছনে গণ-অভ্যুত্থানের অংশীদারত্ব এককভাবে নিজেদের কাছে রাখার প্রবণতাকে কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এর পেছনে অন্যদের রাজনৈতিক স্বার্থবাদিতা থাকলেও নাহিদরা পুরোপুরি দায় এড়াতে পারেন না। যেই অপরায়ণের রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁদের দৃঢ় অবস্থান ছিল, জাতীয় নাগরিক কমিটি থাকাকালীন তাঁদের বিরুদ্ধে সেই অপরায়ণের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক ভিন্ন আদর্শের কারণে অন্যদের মাইনাস করার এই অভিযোগ তাঁদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে কালিমা লাগিয়েছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি নাহিদদের কাছের কয়েকজন গণ-অভ্যুত্থানের নেতাকে অনলাইনে একে অপরের প্রতি বিষোদ্‌গার করতে দেখা গেছে। একে অপরকে ব্যক্তিগত স্বার্থে দলীয় ক্ষমতা ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের জন্য দায়ী করেছেন। দলীয় পরিসরে জবাবদিহি না করে গণপরিসরে পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি বাংলাদেশের প্রথাগত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নতুন বন্দোবস্তের উদ্দেশ্য তো ছিল পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভেঙে নতুন সংস্কৃতি নির্মাণ করা। ফলে নতুন মোড়কে পুরোনো রাজনীতি ভোটের মাঠে ফিরছে কি না, ভোটারদের সেটা ভাববার অবকাশ রয়েছে।

* নুরুল হুদা সাকিব, সভাপতি ও অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
* মো. ইকরামুল হক রিয়ন, প্রভাষক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
- মতামত লেখকদের নিজস্ব

নিউইয়র্ক সিটির সদ্য নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতৃবৃন্দ
নিউইয়র্ক সিটির সদ্য নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতৃবৃন্দ। ছবি: এএফপি ও প্রথম আলো

সন্তানদের নিয়ে দ্বন্দ্ব, গ্রেপ্তার আতঙ্কে দুবাইয়ের শাসক পরিবারের সাবেক বউ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে শাসক পরিবারের এক সদস্যের সাবেক স্ত্রী জয়নাব জাভাদলি গ্রেপ্তার হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সাবেক স্বামী শেখ সাঈদ বিন মাকতুম বিন রশিদ আল মাকতুম তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় পুলিশের কাছে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করার পর এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগে বলা হয়েছে, জয়নাব তাঁদের তিন মেয়েকে অপহরণ করেছেন।

শেখ সাঈদ বিন মাকতুম বিন রশিদ আল মাকতুম দুবাইয়ের শাসকের ভাইয়ের ছেলে। ২০১৯ সালে জয়নাব জাভাদলির সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। এর পর থেকেই শিশুসন্তানদের নিজেদের হেফাজতে রাখা নিয়ে সাবেক স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ চলছে।

গত কয়েক সপ্তাহে এই বিরোধ তীব্র রূপ নিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সন্তানেরা কখনো মায়ের কাছে আবার কখনো বাবার কাছে ছিল। দুজনই একে অপরের বিরুদ্ধে সন্তানদের অপহরণের অভিযোগ এনেছেন।

সবশেষ বিরোধের ঘটনাটি অনলাইনে এসে সরাসরি অভিযোগ করার কারণে জয়নাবকে সাইবার অপরাধের অভিযোগেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

জয়নাব বলেছেন, তিনি ঝুঁকি নিয়েই কাজটি করেছিলেন।

ব্রিটিশ আইনজীবী ডেভিড হেই-কে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় জয়নাব বলেন, ‘আমি জানতাম, এটি আমার শেষ সুযোগ। কারণ, তাঁরা আর আমাকে তাদের দেখার সুযোগ দেবেন না। আমি সত্যিই ধরে নিয়েছিলাম যে এটি আমার শেষ সুযোগ। তাই আমি সরাসরি অনলাইনে এসে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলাম।’

জয়নাব জাভাদলি তাঁর দুবাইয়ের বাড়ি থেকে ভিডিও বার্তাটি দিয়েছেন। বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ মেয়েরা বাবার সঙ্গে থাকার পর তিনি তাদের ফেরত নিয়ে এসেছেন।

জয়নাবের দাবি, ২০২২ সালে দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের সঙ্গে এক চুক্তির মাধ্যমে তিনি সন্তানদের নিজের হেফাজতে রাখার অনুমতি পেয়েছিলেন। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, সন্তানেরা ১৮ বছর পর্যন্ত তাঁর হেফাজতে থাকবে এবং তাদের জন্য একটি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে। মেয়েদের স্কুলের খরচ বহন করবেন তাদের বাবা।

আইনজীবী ডেভিড হেই বলেছেন, এসবের বিনিময়ে জয়নাবকে কিছু কাগজে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। এসব কাগজে উল্লেখ করা ছিল—তিনি তাঁর পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আর কোনো কথা বলবেন না এবং কোনো কিছু আর সরাসরি সম্প্রচার করবেন না।

পরে আদালত সন্তানদের শেখ সাঈদের হেফাজতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। তবে জয়নাব জাভাদলি বলেন, তাঁর মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন, এতে দুবাইয়ের শাসকের সঙ্গে করা চুক্তির ওপর প্রভাব পড়বে না।

দুই মাস আগে পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি বজায় ছিল।

তবে হঠাৎ একদিন সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাতের সময় জয়নাব একটি বার্তা পান। দুবাই পুলিশের মাধ্যমে সাবেক স্বামীর বার্তাটি তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল। বার্তায় বলা হয়, সন্তানেরা সেদিন তাঁর (জয়নাব) সঙ্গে যাবে না। তিনি যেন অপেক্ষা না করেন।

এরপর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সন্তানদের সঙ্গে জয়নাবের আর যোগাযোগ হয়নি। অবশেষে তাঁকে শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রে তিন ঘণ্টার জন্য সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। ৮ নভেম্বর তিনি তাঁর গাড়িচালককে নিয়ে সেখানে যান। জয়নাব দাবি করেন, সুরক্ষাকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে তিনি দেখেন তাঁর সন্তানেরা সেখানে নেই।

জয়নাব যখন ভবন থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন দেখেন সন্তানেরা তাঁর দিকে ছুটে আসছে।

সন্তানেরা চিৎকার করে বলছিল, ‘মা, আমাদের এখান থেকে নিয়ে যাও!’

জয়নাব তাঁর গাড়িচালককে বলেছিলেন, দরজা বন্ধ করে বাড়ি নিয়ে যেতে। তবে তাঁর অভিযোগ, সাবেক স্বামীর কর্মীরা তাঁদের পথ আটকে দিয়েছিল। তখনই তিনি লাইভস্ট্রিম খুলে সাহায্যের আবেদন জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানতেন, এতে আমিরাত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্বাক্ষর করা চুক্তি ভঙ্গের ঝুঁকি রয়েছে এবং গ্রেপ্তারও হতে পারেন। এরপরও তাঁর মনে হয়েছে, এটাই একমাত্র পথ।

জয়নাব তখন থেকে শিশুসন্তানদের সঙ্গে বাড়িতেই অবস্থান করছেন। তিনি বলেছেন, গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে বাইরে যেতে সাহস পাননি। তাঁর তিন মেয়ের বয়স—নয়, সাত ও ছয়।

মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকজন আমিরাতি কর্মকর্তার সঙ্গে বিবিসি যোগাযোগ করেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে আদালতের নথিপত্র দেখে শেখ সাঈদের মনোভাব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

সর্বশেষ নথিতে ৮ নভেম্বরের ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, জয়নাব তাঁর চালকের সহায়তায় শিশুদের জোর করে তাঁর গাড়িতে উঠিয়েছিলেন এবং তাঁদের অপহরণ করেছিলেন। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করার মধ্য দিয়ে জয়নাব তাঁর সাবেক স্বামীর মানহানির পাশাপাশি রাষ্ট্রের অবমাননা এবং রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

দুবাইয়ের শাসকের ভাইয়ের ছেলে শেখ সাঈদ বিন মাকতুম বিন রশিদ আল মাকতুমের সাবেক স্ত্রী জয়নাব জাভাদলি
দুবাইয়ের শাসকের ভাইয়ের ছেলে শেখ সাঈদ বিন মাকতুম বিন রশিদ আল মাকতুমের সাবেক স্ত্রী জয়নাব জাভাদলি। ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

শেখ হাসিনার রাজনীতি কেন এতটা বিধ্বংসী হয়ে উঠেছিল by সালেহ উদ্দিন আহমদ

বর্তমান পরিবেশে শেখ হাসিনা সম্বন্ধে খুব মৃদুভাবে সত্য উচ্চারণ করতে হলে বলা যায়, তিনি একজন পরাজিত ও বিতাড়িত রাজনীতিবিদ। কিন্তু মৃদু উচ্চারণে এখন কেউ তাঁর নাম উচ্চারণ করেন না। তাঁকে নিয়ে যেসব বিশেষণ এখন শোনা যায় তা হলো—প্রতিশোধপরায়ণ, স্বৈরাচারী, আক্রমণাত্মক, হিংসাপরায়ণ এবং মারাত্মক একগুঁয়ে।

বাংলাদেশে তাঁর নামে ভালো বিশেষণ যোগ করার লোকেরও অভাব নেই। তবে তাঁরা বর্তমান পরিবেশে চুপ থাকছেন। রাজনীতিবিদ পিতার ঘরে জন্ম নিলেও বাবার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত হাসিনার পরিচয় ছিল একজন গৃহবধূ ও পরমাণুবিজ্ঞানীর স্ত্রী। আমরা শেখ হাসিনার রাজনীতি জীবনের কিছু প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে বুঝতে চেষ্টা করব, কেন তিনি দিনে দিনে আরও বেপরোয়া ও বিধ্বংসী হয়ে উঠেছিলেন।

মুজিব পরিবার হত্যা

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপরিবারে পরিবারের হত্যাকান্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনা তাঁর বাবা-মা ও তিন ভাইকে হারান। তিনি ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা তখন ছিলেন বিদেশে। স্বাভাবিকভাবে এই একটা ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে তাঁর জীবনকে সুনির্দিষ্ট ছকে বেঁধে ফেলে। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু ঘটনা যোগ হয়ে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।

শেখ হাসিনা যখন রাজনীতিতে যোগ দেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৪ বছর। তখনই তিনি তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছিলেন। তিনি অনেককেই তখন তাঁর প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছার কথা বলেছেনও। হাসিনা বলেছেন, রাজনীতিতে আসার তাঁর প্রাথমিক প্রেরণা ছিল তাঁর ‘বাবার হত্যার বিচার চাওয়া এবং বিচার করা’।

সাধারণত যাঁরা পারিবারিক ট্র্যাজেডি নিয়ে আচ্ছন্ন থাকেন, তাঁরা পরিবারের বাইরে অন্য কাউকে সহজে বিশ্বাস করেন না। এই অবিশ্বাসের মূল কারণ হলো, অন্যরা তো তাঁর মতো ভিকটিম বা ভুক্তভোগী নন। তাই যাঁরা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এনেছিলেন, সেই ড. কামাল হোসেন ও আবদুর রাজ্জাকের মতো নেতারা দ্রুতই শেখ হাসিনার আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

প্রকৃতপক্ষে পুরোনো কোনো আওয়ামী লীগ নেতাই কখনো শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ছিলেন না, যদিও অনেকেই দলে স্থান পেয়েছিলেন। হাসিনার দারুণ ক্ষোভ ছিল, তাঁর পিতার হত্যার পর কেন এই নেতারা রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ করেননি। অন্যদিকে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। হাসিনাকে তাঁদের নাম কখনো উচ্চারণ করতে শোনা যায়নি। যেকোনো আনন্দ ও বিপদের সময় তিনি তাঁর ছোট বোন রেহানাকে তাঁর কাছে রাখতেন।

এক ঘরে দুই পির

শুধু শেখ মুজিবই নন, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আরেকজন জনপ্রিয় নেতা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শরিক হলেন আরেক শোকাতুর পরিবারের প্রতিনিধি। তিনি বেগম খালেদা জিয়া। প্রেসিডেন্ট জিয়াকে যাঁরা হত্যা করেছিলেন বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাঁরা বিভিন্নভাবে চরম শাস্তি পেয়েছিলেন।

বেগম জিয়ার মধ্যে তাই রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার মধ্যে প্রতিশোধের কোনো উপকরণ ছিল না। তাঁর মূল বাধ্যবাধকতা ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষা করা। জিয়ার মৃত্যুর পর এম এ মতিন, জামাল উদ্দিন আহমেদ ও শাহ আজিজুর রহমানের উপদলীয় কোন্দলে বিএনপি একটি অকেজো রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল।

এই দুই পরিবারের প্রতিনিধি দুই ব্যক্তিগত কারণে রাজনীতিতে নামলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময়ে। তাঁরা একটা সাধারণ লক্ষ্য নিয়ে সখ্য গড়ে তুললেন। সেই লক্ষ্য হলো—এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা, যদিও দুজনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। এরশাদের রাজত্ব শেষে পরের দশক ছিল এই দুই নেত্রীর নিজেদের ক্ষমতা দৃঢ়করণের সময় এবং কে কাকে কোণঠাসা করে ক্ষমতা থেকে সরাতে বা দূরে রাখতে পারবেন, সেই প্রতিযোগিতার।

কয়েকবার দুই নেত্রীর মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হলো। একদল ক্ষমতায় গেলে অন্য দল সংসদ বয়কট করতেন। মূলত সহাবস্থানের পরিবর্তে এই দুই দলের একে অন্যকে অস্বীকার করার রাজনীতি দেশে এক অস্বাস্থ্যকর রাজনীতির উত্থান ঘটাল।

স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক

আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, দুই দলের শীর্ষে ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দুই অগ্রগামী সৈনিক। তাঁদের মৃত্যুর পর এই দুই দলেরই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা না করে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ ছিল। তার পরিবর্তে দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক নতুন বিতর্ক—কে প্রথম ঘোষণা করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা?

শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণা ও জিয়াউর রহমানের কালুরঘাট বেতারের ভাষণকে কেন্দ্র করে দুই দলই দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল। শেখ হাসিনা বিএনপির এই উদ্যোগে খুঁজে পেলেন স্বাধীনতাসংগ্রামে শেখ মুজিবের অবদানকে অবনমন করার নতুন ষড়যন্ত্র। বিএনপির বিরুদ্ধে তাঁর আক্রমণ আরও ধারালো হয়ে ওঠে। কখনো কখনো বেগম জিয়ার ওপর হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রমণ অশালীনতার পর্যায়ে উঠেছিল।

আওয়ামী লীগ প্রথম দিকে জিয়াউর রহমানকে একজন ভালো সেক্টর কমান্ডার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আসছিল। কিন্তু যখন বিএনপি তাঁকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ দাবি করে শেখ মুজিবের বিপরীতে দাঁড় করল, হাসিনার দল তখন জিয়ার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে নানা প্রশ্ন শুরু করল। বলা হলো, জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের চর এবং তিনি যুদ্ধের সময় নিষ্ক্রিয় ছিলেন।

হাসিনা ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ নিয়ে বিএনপির দাবিতে দারুণ ক্রুদ্ধ ছিলেন। অনেক পর্যবেক্ষক বলবেন, হাসিনার মানসিক জগতে এই একটি উপকরণ নানাভাবে অনেক বিষক্রিয়া ছড়িয়েছে।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সভায় শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা হলো। নিহত হলেন আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদক আইভি রহমানসহ অনেকে। বেগম জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী। হাসিনা সরাসরি বিএনপিকে দায়ী করলেন এই হামলার জন্য। বিএনপি শাসনামলের গ্রেনেড হামলার ঘটনা নতুন জ্বালানি ঢালল শেখ হাসিনার পিতামাতা হত্যার প্রতিশোধের আগুনে।

ওয়ান ইলেভেন সরকারের নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের মানুষ দেখল এক নতুন হাসিনাকে। ধীরে ধীরে সেই হাসিনা আরও বেপরোয়া, আরও আত্মবিশ্বাসী এবং কুক্ষিগত ক্ষমতার ধারক হয়ে ওঠেন। এই ১৫ বছরের শাসনকালে বলা যায় তিনি ক্রমান্বয়ে তাঁর বিরোধীদের নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার সব চেষ্টা চালিয়েছেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলায় চেক অনিয়মের অভিযোগে হাসিনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে গৃহবন্দী রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছিলেন যে, বেগম জিয়া গ্রেনেড হামলায় তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে অনুকম্পা দেখিয়ে জেলে রাখার বদলে গৃহবন্দী রাখার ব্যবস্থা করেছেন।

বিরোধীদের যেকোনো উপায়ে কোণঠাসা করে রাখাকে হাসিনা আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে দেখতেন। তিনি তাঁর আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতির জন্য বঙ্গবন্ধু হত্যা ও তাঁর ওপর গ্রেনেড হামলাকে সচেতনভাবেই যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতেন। শেখ হাসিনা মনে করতেন, তাঁর পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার জন্য প্রতিপক্ষরা সব সময় সচেষ্ট। তাই তিনি ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন’ পাস করিয়েছিলেন ২০০৯ সালে।

যেকোনো উপায়ে হাসিনা ক্ষমতা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। যাঁদের তিনি তাঁর শত্রু মনে করতেন কিংবা যাঁদের তিনি দেশের জন্য ‘ক্ষতিকর’ মনে করতেন, তাঁদের রাজনীতি নিশ্চিহ্ন বা সীমিত করাকে তিনি তাঁর অধিকার মনে করতেন। শেখ হাসিনার বিগত দিনের বক্তৃতা-বিবৃতি খুঁজে দেখলে একটা জিনিস পরিষ্কার হবে। সেটি হলো, তিনি ভাবতেন, তাঁর ও তাঁর পরিবারের প্রতি দারুণ অবিচার করা হয়েছে এবং সেগুলোর প্রতিবিধান করা তাঁর দায়িত্ব ও অধিকার।

অনেকেই মনে করেন, পারিবারিক ট্র্যাজেডিগুলোর জন্য তিনি দারুণভাবে মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। হাসিনা নিজের নামের চেয়েও তাঁর বাবার নামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাকে অগ্রাধিকার দিতেন। হাসিনা মনে করতেন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে তিনি বঙ্গবন্ধুর ‘লিগ্যাসি’ ও অর্জন দেশে সম্পূর্ণভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে যেতে পারবেন। তিনি দেশের প্রতিটি বড় সরকারি উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর নাম জুড়ে দিতেন এবং যত্রতত্র বঙ্গবন্ধুর স্ট্যাচু বসিয়ে জনগণকে তাঁর কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চেষ্টা করতেন।

হাসিনার ‘অতি চেষ্টা’ সফল হয়নি বরং হিতে বিপরীত হয়েছে। এখন আমরা এই দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঠিকানা মুছে ফেলার জন্য কিছু লোককে বুলডোজার নিয়ে ৩২ নম্বর রোডে ঘোরাফেরা করতে দেখছি।

আর শেখ হাসিনা? হয়তো ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়েই তাঁকে বাকি জীবন দেশের বাইরে কাটাতে হবে।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-25%2F2hhb5xef%2Fsheikhhasina-cartoon.jpg?rect=18%2C0%2C737%2C491&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

কড়াইল বস্তিতে কেন বারবার আগুন? by ফাহিমা আক্তার সুমি ও মোহাম্মদ রায়হান

বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে। এতে সহায় সম্বলহারা হন নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়। আগুনের কারণ এবং ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশও দেয় কমিটি। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়মিতই হচ্ছে। বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসে এই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের নানা কারণ। এর মধ্যে দুর্বল অবকাঠামো, অবৈধ গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগকে অগ্নিকাণ্ডের বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়। সেখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের অসচেতনতাকে আগুনের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। আবার বারবার এসকল আগুনের পেছনে নাশকতাকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। ফায়ার সার্ভিস বলছে, কড়াইল বস্তিতে পূর্বের অগ্নি দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরবর্তী তদন্তে বেশির ভাগ সময়ই  দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে অগ্নি দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে।

এসব বস্তিতে অসংখ্য বিদ্যুতের সংযোগ অবৈধভাবে টানা থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেগুলো আবার থাকে পুরনো তারের। আবার সেই চোরাই সংযোগে হিটারও চালানো হয়। থাকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। দাহ্য বস্তুতে বৈধ-অবৈধ অনেক কিছুই থাকে এই বস্তিতে। যার কারণে ঘনঘন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর মহাখালী কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দেড় হাজারের মতো ঘর-বাড়ি ও মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে নিঃস্ব হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। শেষ আশ্রয়স্থলটুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত পেরিয়ে দিনভর অবস্থান করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার। ঘরের ছাই ও পোড়া টিনের স্তূপের মধ্যে খুঁজে ফেরেন তাদের শেষ সম্বলটুকু। আগুন লাগার ঘটনার পরে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের চেষ্টায় দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা পর বুধবার সকালে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহত ও প্রাণহানি ঘটেনি। কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগুন ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। আগুন লাগার পরপর বস্তির বিভিন্ন ঘরে থাকা রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার একের পর এক বিস্ফোরিত হতে শুরু করে। এতে দ্রুত আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে চলতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে এই বস্তিতে লাগা আগুনে পুড়ে যায় অসংখ্য ঘর। গত বছরের ২৪শে মার্চ ও ১৮ই ডিসেম্বরেও আগুনে পুড়ে কড়াইল বস্তির অংশ বিশেষ। প্রায় নব্বই একর জায়গার ওপর ১০ হাজারের মতো ঘর রয়েছে এই বস্তিতে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার খবর পাওয়ার ৩৫ মিনিট পর তিনটি স্টেশনের ইউনিট সেখানে পৌঁছায়। ঢাকার যানজটই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। বড় গাড়িগুলো সরু রাস্তায় ঢুকতে পারেনি। বাধ্য হয়ে দূর থেকে পাইপ টেনে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়েছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আগুন ‘ডেভেলপমেন্ট স্টেজে’ পৌঁছে যায়। যত্রতত্র বিদ্যুতের তার এবং বাসায় থাকা গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে আগুনের উৎস তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি বলেন, প্রতি বছরই কড়াইল বস্তিতে ফায়ার সার্ভিস মহড়া আয়োজন করে। কিছুদিন আগেই সর্বশেষ মহড়া করা হয়েছিল। সে জন্য দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে; না হলে আরও দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারতো। পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়ি, ওয়াসা এবং পাশের ড্রেনের পানি ব্যবহার করা হয়েছে। তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বস্তিতে বিভিন্নভাবে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, কোন আন্দোলন সংগ্রামের সময় কিংবা পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা থাকে। কড়াইল বস্তিতে তো এর আগে বহুবার আগুনের ঘটনা ঘটেছে সেই সময়গুলো কখন? আমরা দেখি অধিকাংশ সময় হলো আন্দোলনের সংগ্রামের সময়। কিংবা আন্দোলন পরবর্তী অবস্থায় নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করার সূত্র ধরে বস্তি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা কিংবা নানা জায়গাতে নানা ভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আর আমাদের এখানে তো প্রান্তিক বা সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত মানুষকে পুঁজি করে রাজনীতি তো বহু হয়েছে আরও হবে। যদি ত্রুটি থাকে বা কোনো ধরনের সতর্কতার ঘাটতি থাকে সেটা কীভাবে সংশোধন করা যায় সেক্ষেত্রে সরকার ব্যবস্থা নিবে সেটা আমরা প্রত্যাশা করি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার মানবজমিনকে বলেন, কড়াইল বস্তির মঙ্গলবারের অগ্নি দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে বিধায় সে বিষয়ে এখনই কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে কড়াইল বস্তির আগের অগ্নি দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরবর্তী তদন্তে বেশির ভাগ সময়ই দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক থেকে অগ্নি দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। তিনি বলেন, বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার জন্য মূল ঝুঁকিগুলো হলো; অসাবধানতা, অনিরাপদ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ ও ব্যবহার, বিড়ি-সিগারেট, মশার কয়েল ও খোলা বাতির ব্যবহার।

নিঃস্ব দেড় হাজার পরিবার
মোসাম্মৎ বানু। একদিন আগেও ঘর-সংসার, আসবাবপত্র সবই ছিল তার। মঙ্গলবার মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুন সব কেড়ে নিয়েছে তার। শুধু একটি পাটি আর ভর দিয়ে হাঁটা লাঠিই এখন অবলম্বন এই সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধার। তাই গতকাল দুপুরে তার ওই পোড়া ঘরের মেঝেতে বসে বিলাপ করছিলেন মোসাম্মৎ বানু। অশ্রুসিক্ত হয়ে বারংবার বলছিলেন-কিচ্ছু নেই ঘরে, আমার ঘরে কিচ্ছু নেই। আমি কোথায় যাবো? কী খাবো? মানুষের তো ছেলে আছে। মেয়ে আছে। স্বামী আছে। আয়-রোজগারের লোক আছে, আমার তো ছেলেমেয়ে, স্বামী কেউ তো নেই? আমাকে কে জায়গা দিবে? আল্লাহ আমারে কেন উঠায় নেয় না! আমি এখন নতুন ঘর কোথায় পাবো? সারা জীবন ধরে যা দুই-এক টাকা জমা করেছিলাম তাও আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।  

মোসাম্মৎ বানু মানবজমিনকে বলেন, আমার চোখে সমস্যা, অপারেশন করা হয়েছে। এর আগে স্ট্রোক হয়েছে আমার। লাঠি ছাড়া এখন আর চলাফেরা করতে পারি না। মঙ্গলবার বস্তিতে দাউ দাউ করে আগুন লাগার পরও একা ঘর থেকে বের হতে পারিনি। দুই জনে ধরে আমাকে আগুন লাগা ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। এর আগে ২০০৪ সালে যখন আমাদের বস্তিতে আগুন লাগে তখনো একই রকম পরিস্থিতি হয়েছিল। ২০১৭ সালেও আগুনে ঘর পুড়েছে আমার। এই নিয়ে তিনবার। তিনি বলেন, আগে তো দশ জনের কাছ থেকে হাত পেতে নিয়ে এসে কোনো রকমে চলেছি কিন্তু এবার আমি কি করবো!

মোসাম্মদ বানুর মতোই কড়াইল বস্তির অন্তত ১৫ শ’ পরিবারের ঘর আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এদের বেশির ভাগই পরনের কাপড় ছাড়া ঘর থেকে কিছুই নিয়ে বের হতে পারেননি। তাই ঘর পোড়া ছাইয়ের মধ্যে গতকাল অনেক মানুষকে তন্য তন্য করে খুঁজতে দেখা যায় জীবনের শেষ সম্বল, যদি কিছু মেলে। কিছু মানুষকে আবার আগুনে পোড়া ঘরের টিন, ধাতব বস্তু, লোহা- লক্কড় জড়ো করে ভাঙাড়ির কাছে বিক্রি করতে দেখা গেছে। আর সেগুলো পোড়া স্তূপের পাশেই বসে ছিলেন ফাতেমা আক্তার। মলিন মুখ, হাত দিয়ে চোয়ালে ঠেস দিয়ে বসে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছেন। কাছে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাতেমা বলে ওঠেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমার ঘর, দোকান, সব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই দোকান দিয়ে আমাদের সংসার চলতো। এখন কিচ্ছু নেই। আমার যত পুঁজি ছিল সব এই দোকানে ঢেলেছিলাম, কিছুই রইলো না। ফাতেমা আক্তারের ঋণের টাকা দিয়ে বানানো দোকান পরিচালনাকারী তার স্বামী শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, আমাদের দোকান, বাসা থেকে একটু দূরে ছিল। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অসুস্থ। তাই দুজন মিলেই ভাগে দোকানটা চালাইতাম। মঙ্গলবার যখন আগুন লাগে তখন আমরা বাড়িতে ছিলাম। আগুন লাগার সময় বাইরের চিল্লাচিল্লি শুনে বাইরে এসে দেখি- আমাদের ঘরের চালে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চারদিকে আগুন আর আগুন। প্রথমে ঘর থেকে মালপত্র বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনি। এরপর দোকানের কথা মনে পড়তেই দৌড়ে দোকানের এদিকে আসি। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। কোনোভাবেই দোকানটাকে বাঁচাতে পারিনি।
এখন শুধুমাত্র মোবাইল ফোনটা আর দু’জনের গায়ের কাপড় ছাড়া কিচ্ছু নেই আমাদের। বাসার আসবাবপত্র, থালা-বাসন, টাকা-পয়সা, স্বর্ণ সব পুড়ে গেছে। দোকান ছাড়া আমাদের কোনো আলাদা আয়ের কোনো উৎস নেই যে, তাই করে খাবো। এখন এই পৃথিবীতে আল্লাহ্‌ই আমাদের একমাত্র ভরসা।
১৯৯৩ সালে বরগুনা থেকে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে চাকরি নেন মো. জসিম। ওঠেন কড়াইল বস্তিতে। কয়েক বছর চাকরি করার পর নিজেই থাকার ঘরের পাশে পাঁচটি সেলাই মেশিন কিনে শিশুদের পোশাক তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। মঙ্গলাবারের কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুন তারও ব্যবসা ধ্বংস করে দিয়েছে। জসিম বলেন- আগুন যখন লাগে তখন আমি, আমার স্ত্রী, ছেলের বউ, নাতিসহ আমরা পাঁচজন বের হয়ে গেছি। সম্বল ছিল আমার সেলাইয়ের মেশিনগুলো। এই আগুন আমার সব পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার সবগুলো সেলাই মেশিই পুড়ে শেষ।

ফাতেমা, জসিমদের মতো কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুনে সর্বস্ব খুইয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে শত শত মানুষ। বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, কড়াইল বস্তির প্রবেশমুখগুলোতে শত শত মানুষ ভিড় করেছে। সকলের চোখে- মুখে হতাশার ছাপ। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠন, এনজিওসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা তাদের সাধ্যমতো ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করছেন। কেউ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, কেউ পানি বিতরণ করছেন, কেউবা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় কড়াইল বস্তিতে লাগা ভয়াভহ আগুনের কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ৫ সদস্যের কমিটির সভাপতি ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ ও সদস্য সচিব ফায়ার সার্ভিস ঢাকার  পিএফএম’র সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান। কমিটির সদস্যরা হলেন- ফায়ার সার্ভিস ঢাকা জোন ০২-এর উপ-সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা,  ফায়ার সার্ভিসের তেজগাঁও স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার, মো. নাজিম উদ্দিন সরকার এবং ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা ২৩-এর ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মো. সোহরাব হোসেন।

mzamin