Friday, March 27, 2015

‘সুষ্ঠু পরিবেশ হলে নির্বাচনে যাবে বিএনপি’

আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজ করলে বিএনপি যাবে বলে জানিয়েছেন শত নাগরিক-এর আহ্বায়ক প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমেদ। শুক্রবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে শত নাগরিকের একটি প্রতিনিধি দলের প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে এ কথা জানান তিনি। এমাজউদ্দীন আহমেদ বলেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। সরকার ও নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপির মনোভাব ইতিবাচক। যা আমরা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেও সেই বিষয় লক্ষ্য করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ভিসি বলেছেন, গতকাল আমরা নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলাম,  সে বিষয়ে কথা বলতেই বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করি।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। পরিবেশ যদি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ইতিবাচক মনে হয় তাহলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে। এর দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তবে নির্বাচনে যাওয়ার না যাওয়ার বিষয়টি দলীয় ফোরামে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়াও চান দেশের মানুষ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক। এমাজউদ্দীন বলেন, গতকাল ইসির সাথে সাক্ষাৎ করে আমরা বলেছি যারা অভিযুক্ত তাদের যেন আদালত জামিন দেয়। তবে আমরা ইসির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করছি না। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেনÑ সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, ঢাবির সাবেক প্রো-ভিসি আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার, ডক্টর এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব)-এর যুগ্ম সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফাহিমা নাসরীন মুন্নী।

ছাত্রলীগ সম্পদ না আপদ? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

কোনো সভা-সমাবেশে সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী হাজির হলে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হন। কেননা, এতে তাঁদের আয়োজন এবং এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, বক্তব্য প্রচারিত হওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি যেন উল্টো। সাংবাদিকদের ব্যাপারে তাদের মারমুখী মনোভাব ও আচরণের প্রকাশ ঘটছে বারবার। এতে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা বিব্রত হচ্ছেন, সাংবাদিকদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করছেন, দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন, কিন্তু এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারছেন না কিছুতেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—ছাত্রলীগের এই উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের লাগাম কার হাতে?
১১ মার্চ ২০-দলীয় জোটের সহিংসতার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে লালদীঘির ময়দানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের উদ্যোগে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এই কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলার শিকার হন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের আট সাংবাদিক। সামান্য বচসাকে কেন্দ্র করে এই সাংবাদিকদের কিল-ঘুষি-লাথি মারা থেকে শুরু করে মূল্যবান প্রচার সরঞ্জাম ভেঙে ফেলা পর্যন্ত সব অপকর্মই তারা করেছে মঞ্চে উপবিষ্ট নেতাদের চোখের সামনে। নেতারা কেউ কেউ মঞ্চ থেকে চিৎকার-চেঁচামেচি করেও তাদের বিরত রাখতে পারেননি।
ওবায়দুল কাদের এ ঘটনায় ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন সাংবাদিকদের কাছে। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরউদ্দিন এই উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সাংবাদিকেরা সেদিনের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও আলোকচিত্র সরবরাহ করার পরও এই কদিনে আইনগত বা সাংগঠনিক কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।
সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিউজে) বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। সর্বশেষ ১৬ মার্চ পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে সেখানে আকস্মিকভাবে উপস্থিত হন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপাতি মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে অবিলম্বে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, পুলিশ আন্তরিক, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশ কমিশনারের কথিত ‘আন্তরিকতা’ নিয়ে সংশয় জাগে।
সম্প্রতি নগরের চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ও মুহসীন কলেজে ১৪ ঘণ্টার অভিযান চালিয়ে পুলিশ একে ২২ রাইফেল, থ্রি নট থ্রি বন্দুক, রকেট ফ্লেয়ারসহ প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করেছে। সেখান থেকে ‘শিবির কর্মী’ সন্দেহে গ্রেপ্তার হয় ৭২ জন ছাত্র। এ রকম বড় অভিযান চালানোর মতো সক্ষমতা রয়েছে যে বাহিনীর, তারা স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ পাওয়া সত্ত্বেও সাংবাদিক নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগ কর্মীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে না পারলে ‘আন্তরিকতা’ প্রশ্নবিদ্ধ হবেই।
মহিউদ্দিন চৌধুরী দলের উচ্ছৃঙ্খল এই কর্মীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানালেও তাঁর ওমরাহ্ পালন শেষে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে সংবর্ধনার নামে ছাত্রলীগের কর্মীরা বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকা ও কয়েক কিলোমিটার সড়কপথে যে অরাজক পরিস্থিতি ও জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করেছিল, তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি।
ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি কী বা কেমন, এটা জানার জন্য খুব দূরে যাওয়ার দরকার নেই। সার্চ ইঞ্জিন গুগলে ক্লিক করলেই ভেসে ওঠে রামদা বা কিরিচ হাতে ছুটে যাওয়া কিছু যুবকের ছবি, কাউকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করছে—এমন কিছু তরুণের হিংস্র অবয়ব। শিক্ষাঙ্গনকে অশান্ত করে তুলছে, লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে প্রতিপক্ষ গ্রুপের কর্মীকে, উত্ত্যক্ত করছে কোনো মেয়েকে—এ ধরনের অসংখ্য ছবির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বা ইতিবাচক আন্দোলন-সংগ্রামের ছবি।
শুধু চট্টগ্রামেই ককটেল ফাটিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, রাস্তায় নেমে নির্বিচারে গাড়ি ভাঙচুর, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষসহ গত দুই সপ্তাহের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে সারা দেশে ছাত্রলীগের বর্তমান অবস্থার একটি সামগ্রিক চিত্র যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সিটি কলেজে নিজেদের দলের কর্মীকেই হাতের আঙুল ও রগ কেটে দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছে তারা। লোহাগাড়ায় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে শোভাযাত্রায় সংঘর্ষে জড়িয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে নয়জন, আশঙ্কাজনক অবস্থায় পাঁচজনকে পাঠানো হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
দলের যখন এই অবস্থা, তখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি বদিউজ্জামান ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ও মুহসীন কলেজে শিবিরের অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা প্রসঙ্গে অদ্ভুত এক মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, শিবিরের এই অস্ত্র মজুতের পেছনে বামপন্থী শিক্ষকদের সহযোগিতা আছে। মনে পড়ে, চট্টগ্রাম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শেখর দস্তিদারকে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ‘শিবির দস্তিদার’ নামে অভিহিত করেছিলেন সাবেক সাংসদ নুরুল ইসলাম বিএসসি। এককালের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শেখর দস্তিদার মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের সৈনিক ছিলেন। অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনিই শিবিরনিয়ন্ত্রিত এই কলেজে মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এক সাংসদ তাঁকে ‘শিবির’ বলে চিহ্নিত করতে দ্বিধা করেননি।
বদিউজ্জামানকে স্মরণ করতে বলি, এই কলেজে শিবিরের হাতে যেমন প্রাণ দিয়েছিলেন ছাত্রলীগ নেতা তোবারক, তেমনি ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শাহাদাতকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করেছিল শিবির কর্মীরাই। তাঁর না জানার কথা নয়, চট্টগ্রাম কলেজে অস্ত্র উদ্ধার ও শিবির কর্মীদের আটক করার পর শিবিরের মহানগর আইটি সম্পাদক নাজমুস সাকিবকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের কাছে তদবির করেছেন কক্সবাজার অঞ্চলের আওয়ামী লীগদলীয় একজন সাংসদ। শিবির কর্মীদের ছাড়িয়ে নিতে মহানগর আওয়ামী লীগের স্বাক্ষরযুক্ত সনদ নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছে ছাত্রলীগের কর্মীরাই। সরষের ভেতর ভূত থাকলে সেই ভূত না তাড়িয়ে অন্যকে দোষারোপ করা শূন্যে তরবারি ঘোরানোরই নামান্তর।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

সমৃদ্ধ হলো গুগলের বাংলা অনুবাদ

রাজধানীর বিসিসি ভবনের সামনে গতকাল সকালে তরু​ণ–তরুণীদের
অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশে ‘বাংলার জন্য চার লাখ’ কার্যক্রম শুরু হয়
উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের ৪৫তম স্বাধীনতা দিবসে বিশ্বখ্যাত সার্চইঞ্জিন গুগলের যান্ত্রিক অনুবাদ সেবায় চার লাখ বাংলা শব্দ-শব্দাংশ যোগ করা। আর গতকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশের ৮১টি স্থানে এ কাজটিই করেছেন চার হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক। এ ছাড়া দেশে ও বিদেশে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবেই এতে যুক্ত হন। ফলে এক দিনেই চার লাখের বেশি শব্দ-শব্দাংশ যোগ হয়েছে গুগলের বাংলা অনুবাদ সেবায়। গুগল ডেভেলপার্স গ্রুপ (জিডিজি) বাংলার উদ্যোগে এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ ও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) আয়োজনে ‘বাংলার জন্য চার লাখ’ নামের এ কার্যক্রমের শুরু হয় সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিসিসি ভবনে।
বিকেলে বিসিসি ভবনে সমাপনী অনুষ্ঠানে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ বলেন, ‘আজকের এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা আরও একবার প্রমাণিত হলো।’
উৎসবের আমেজে সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চলে এ শব্দযোগ কর্মসূচি। বিসিসি ল্যাব ও পুরো ভবনজুড়ে থাকা তারহীন ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্বেচ্ছাসেবীরা শব্দ যোগ করেন। একই দৃশ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বর, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ আয়োজনে সহযোগিতা করে বিশ্ববিদ্যালয়টির আইটি সোসাইটি ও বিজ্ঞান সোসাইটি। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ল্যাবে শব্দযোগের কাজে অংশ নেন প্রায় এক হাজার স্বেচ্ছাসেবী।
ঢাকার বাইরে আয়োজন ছিল চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুরে হাজি দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
এ ছাড়া বিসিসির ছয়টি বিভাগীয় কার্যালয়, যশোর প্রেসক্লাব, বগুড়া সাতমাথা, কুষ্টিয়া পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্থানে শব্দযোগের এ কর্মসূচি চলে। সারা দেশে এই কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক, হিমু পরিবহনসহ বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
এ কার্যক্রমে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল বেশি। তবে সব বয়সীরাই এতে অংশ নেন। বিসিসি ল্যাবে মিরপুর থেকে আসা ৪৪ বছর বয়সী ফয়জুন্নেছা হক বলেন, ‘আগে বাংলা শব্দের ইংরেজি কিংবা ইংরেজি শব্দের বাংলা অর্থ জানার মাধ্যম অভিধান, নয়তো শিক্ষক। এখন সেটা গুগল অনুবাদেই সম্ভব। আর গুগলে বাংলা অনুবাদ সেবা সমৃদ্ধ করতে সবারই অবদান রাখা উচিত।’
আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সিফাত আহমেদ বলেন, ‘গুগল অনুবাদে বাংলা শব্দ-সংক্রান্ত ভুলগুলো শুধরে দেওয়ার জন্য কাজ করছি।’ ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্রী সাবরিনা আক্তার বলেন, ‘মাতৃভাষার জন্য কিছু করছি, এটা একটা দারুণ অনুভূতি। ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিস্তৃতি বাড়ছে, পরিচিতি বাড়ছে—এটাও অনেক বড় পাওয়া।’
সকালে বেলুন উড়িয়ে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিসিসির নির্বাহী পরিচালক এস এম আশরাফুল ইসলাম। গতকাল চার লাখের বেশি বাংলা শব্দ-শব্দাংশ যুক্ত হয়েছে বলে ধারণা করছেন আয়োজক ও স্বেচ্ছাসেবীরা।
বাংলাদেশে গুগলের কান্ট্রি ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালট্যান্ট খান মো. আনোয়ারুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গুগল অনুবাদে কত শব্দ-শব্দাংশ যুক্ত হলো তা আজ (শুক্রবার) জানা যাবে। যাঁরা এক হাজারের বেশি শব্দ যোগ করবেন, তাঁদের প্রত্যেককে গুগল অনুবাদ দলের পক্ষ থেকে ডিজিটাল সম্মাননা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি শব্দ যোগকারী সিঙ্গাপুরে গুগল অফিস পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন।’
গুগল অনুবাদে বাংলা শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হলে গুগলের মাধ্যমেই ৯০টি ভাষার বাংলা অনুবাদ পড়া যাবে বলে জানালেন জিডিজি বাংলার প্রধান উপদেষ্টা মুনির হাসান।
গুগল ট্রান্সলেটে বাংলা অনুবাদের সুবিধা থাকলেও এটি আগে তেমন সমৃদ্ধ ছিল না। গুগলের বাংলা ভাষাভিত্তিক ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ ‘জিডিজি বাংলা’ গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে বাংলা অনুবাদ সেবা সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়। এতে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি শব্দ-শব্দাংশ যোগ হয়েছে। জিডিজি বাংলার কমিউনিটি ব্যবস্থাপক জাবেদ সুলতান বলেন, ‘এটা চলমান প্রক্রিয়া। যে কেউ যেকোনো সময় এই অনুবাদ সেবায় বাংলার জন্য অবদান রাখতে পারেন।’
আগ্রহী যে কেউ https://translate.google.com/ community ঠিকানার ওয়েবসাইটে গিয়ে গুগল অনুবাদে বাংলা শব্দ যোগ করতে বা বাক্য গঠন, সংশোধন করতে পারবেন।

‘ফিরে পাবো কখনও ভাবিনি’ -হেলাল-আনোয়ারের বাড়িতে আনন্দের বন্যা

বাংলাদেশীদের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে দেশটিতে। কোন পক্ষই তাদের শত্রু মনে করে না। এ কারণে উদ্বেগ থাকলেও বিশ্বাস ছিল হয়তো তাদের ফেরত দেবে অপহরণকারীরা। লিবিয়ার একটি তেলক্ষেত্র থেকে অপহরণের শিকার হেলাল উদ্দিন ও আনোয়ার হোসেন উদ্ধার হওয়ার পর দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল শহিদুল হক বুধবার এভাবেই তার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন। বলেন, তাদের উদ্ধার করতে গত ১৮ দিনের প্রায় প্রতিদিনই কার্যক্রম চালানো হয়েছে। একাধিক সোর্স কাজে লাগিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এসব সোর্সই তাদের মুক্ত করতে সহযোগিতা করেছে। তাদের মুক্ত হওয়ার সংবাদটাও সোর্সের মাধ্যমেই পাওয়া গেছে। এদিকে গত ১৮ দিন ধরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে কেটেছে অপহৃতদের পরিবারের। ফিরে পাবেন- এ আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন স্বজনরা। আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার মধ্যরাতে তাদের উদ্ধার হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর স্বস্তি ফিরে এসেছে পরিবারে। ত্রিপোলিস্থ বাংলাদেশী দূতাবাস থেকে হেলাল উদ্দিনের পরিবারে ফোন করে উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এর আগে ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লিবিয়ার বন্দিদশা থেকে ফোন করে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন হেলাল উদ্দিন। আর আনোয়ার হোসেনের লিবিয়া প্রবাসী শ্যালক মাহমুদের মাধ্যমে গতকাল সকালে তার মুক্তির খবর পান স্বজনরা।
গত ৬ই মার্চ জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের দক্ষিণ গজারিয়া গ্রামের হেলাল উদ্দিন ও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার আনোয়ার হোসেনকে ত্রিপোলি থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে আল ঘানি নামে একটি তেলক্ষেত্র থেকে অপহরণ করে একটি অস্ত্রধারী গ্রুপ। তাদের সঙ্গে আটক হন আরও ৪ জন ফিলিপিনো, ১ জন অস্ট্রিয়া ও একজন ঘানার নাগরিক।
রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল শহিদুল হক গতকাল দুপুরে ফোনে বলেন, অপহৃতরা উদ্ধার হওয়ার পর ত্রিপোলি থেকে ৭০০ কিলোমিটার পূর্বে সিরত হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তিনি বলেন, তাদের ওপর নির্যাতন চালানো না হলেও খাবার দিয়েছে কম। এ কারণে তারা বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। অপহৃতরা যে অস্ট্রিয়ান কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন সেই কোম্পানি তাদের পাসপোর্ট নিয়ে ত্রিপোলিতে ফেরত আনতে গাড়ি পাঠিয়েছে। তারা সেখানে পৌঁছালে তাদের সঙ্গে কথা হবে বলেও জানান তিনি।
উদ্ধারের ব্যাপারে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, তাদের উদ্ধারে প্রায় প্রতিদিনই আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত ছিলো। লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত ফোন ও মেইলে যোগাযোগ করা হয়েছে। সাহায্য চাওয়া হয় রেডক্রিসেন্টের। এছাড়া, একাধিক সোর্সের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ করা হয়েছে। অপহরণ হওয়ার পরপরই চারটি দেশের (বাংলাদেশ, অস্ট্রিয়া, ফিলিপাইন ও চেক প্রজাতন্ত্র) সমন্বয়ে একটি ক্রাইসিস কমিটি গঠন করা হয়। ক্রাইসিস কমিটি ও সোর্সগুলোর মধ্যে নিয়মিত তথ্য আদান প্রদান হয়েছে। গত ১৩ তারিখে এই গ্রুপের সভা হয়েছিল তিউনিশিয়ায়। এই গ্রুপটিই সার্বক্ষণিকভাবে সোর্সগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিল। সোর্সই গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোর ৫টার দিকে এই ক্রাইসিস কমিটিকে তাদের উদ্ধার হওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে। তিনি বলেন, তিনটি সোর্স থেকে আমরা তাদের উদ্ধার হওয়ার খবর পাচ্ছি। তাদের মোবাইল দিয়েই কথা বলেছেন তারা। রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, আমাদের বিশ্বাস ছিলো, অপহরণকারীরা বাংলাদেশীদের ছেড়ে দেবে। কারণ এদেশে তাদের বেশ সুনাম রয়েছে। সব পক্ষই তাদের ভাল মনে করেন। তাছাড়া, মুসলিমদের তারা সাধারণত ধরে না। তিনি জানান, ঘটনার পর ওই কোম্পানিতে কাজ করা অন্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আটক করার পর অপহরণকারীরা মুসলিমদেরকে হাত তুলতে বলেছিলো। এ সময় এক সুদানি হাত তুললে ছেড়ে দেয়। কিন্তু আমাদের দুইজন সে সময় হাত না তোলায় তাদের নিয়ে যায়। তবে কারা তাদের আটক করেছিল সে ব্যাপারে এখনও কিছু জানা যায়নি বলেও শহিদুল হক জানান।
এদিকে লিবিয়ার অস্ত্রধারীদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর তাদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। হেলাল উদ্দিনের বোন জহুরা বেগম জানান, ভাইকে আর কখন পাবো ভাবিনি। সবাই বলে জঙ্গিদের হাতে ধরা পড়লে কেউ বাঁচে না। উদ্ধারের সংবাদ পেয়ে সবার মুখে হাসি ফুটেছে। তিনি বলেন- এখন আমাদের দাবি, সরকার যেন আমার ভাইকে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
অপরদিকে ১৮ দিন পর জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় মুক্তির খবরে আনন্দ ও স্বস্তি ফিরে এসেছে আনোয়ার হোসেনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর গয়েছপুরেও। বুধবার সকালে তার শ্যালক লিবিয়া প্রবাসী মাহমুদ মোবাইল ফোনে এ খবর জানালে পরিবারের লোকজন শুকরিয়া আদায় করেন। খবর পৌঁছার পর থেকেই বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন ও আশেপাশের এলাকাবাসী ভিড় জমাচ্ছেন। এর আগে, মঙ্গলবার রাত ১২টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনোয়ার হোসেনের মুক্তির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের ফার্স্ট সেক্রেটারি মোজাম্মেল হোসেন ই-মেইলে তার শ্যালক মাহমুদকে নিশ্চিত করেন। গত ৪ঠা মার্চ থেকে তার স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে সর্বশেষ কথা হয়। এরপর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এখন নিরাপদে দ্রুত ফিরবেন এমনটাই আশা করছেন স্বজনরা। উল্লেখ্য, দেশটিতে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন। নিরাপত্তাহীনতার কারণে বর্তমানে সেখানে কর্মী পাঠানো বন্ধ রেখেছে সরকার।

ভারতের আদালত যেখানে পথ দেখাল! by কামাল আহমেদ

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের কারণে ২৪ মার্চ, মঙ্গলবারকে অনেকে দেশটির জন্য একটি নতুন দিনের সূচনা বলে অভিহিত করেছেন। আমি অবশ্য তার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে বলতে চাই যে এটি বিশ্বব্যাপী মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য একটি উজ্জ্বল দিন। কথাটি এভাবে বলতে চাওয়ার কারণ একটাই, তা হলো, এই উপমহাদেশের সব কটি দেশেই ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আচারবিধির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তা ছাড়া যাঁরাই মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের কাছে ভারতের আইনের ছাত্রী, শ্রেয়া সিংঘালের আইনি লড়াইয়ের সাফল্য এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
যে আইনি লড়াইয়ে শ্রেয়া বিজয়ী হলেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬(ক) ধারা। ২০০৯ সালে তৈরি আইনটির ওই ধারার অধীনে শ্রেয়া নিজে কখনো ভোগান্তির শিকার হননি। কিন্তু, ভারতে বেশ কয়েকটি ঘটনায় কলেজছাত্রী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পর্যন্ত অনেকেই ওই কালো আইনের শিকার হয়ে জেল খেটেছেন। আইনের ওই ধারায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় আপত্তিকর মন্তব্য প্রকাশের জন্য তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ওই আইনেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কার্টুন ফেসবুকে প্রকাশের দায়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বিকেশ মুখোপাধ্যায়কে জেলে যেতে হয়েছে। অবশ্য, কলকাতার হাইকোর্টের নির্দেশে রাজ্য সরকারকে এ জন্য আগেই তাঁকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। মুম্বাইতে একটি উগ্রপন্থী হিন্দু গোষ্ঠী, শিবসেনার একজন নেতা বালঠাকরের মৃত্যুতে দুই দিন ধরে সবকিছু বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিষয়ে ফেসবুকে সমালোচনা করার জন্য ২০১২ সালে দুই তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের দুজনের মধ্যে একজনের অপরাধ ছিল অন্যজনের মন্তব্যটি পছন্দ করা (লাইক দেওয়া)।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬(ক) ধারা অসাংবিধানিক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথে একটি বাধা। আদালত আরও বলেছেন যে জনগণের জানার (তথ্য পাওয়ার) অধিকার এই ধারায় প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী রায়টি ২০০ পৃষ্ঠার এবং তাতে অনলাইনে সেন্সরশিপ সম্পর্কে আরও কিছু বিষয়ে দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে (গার্ডিয়ান, ২৪ মার্চ ২০১৫)। ভারতের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তবে শিবসেনা তাদের ভাষায় ইন্টারনেটের ‘অপব্যবহার’ বন্ধের জন্য এই আইনটি রেখে দেওয়ার পক্ষে। সরকারপক্ষের আইনজীবীরা অবশ্য আদালতে স্বীকার করে নেন যে পুলিশ আইনটির অপপ্রয়োগ করেছে। আইনটি যাঁরা করেছিলেন, সেই কংগ্রেসের এক নেতা, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী, মনীষ তেওয়ারি বলেছেন যে আইনটি ‘নিপীড়নের হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়েছিল’।
বিশ্বব্যাপী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিশেষ করে গণমাধ্যম এবং ইন্টারনেটে সরকারি ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের মাত্রা বিবেচনায় একটি সূচক প্রকাশ করে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ফ্রিডম হাউস। ফ্রিডম হাউসের মূল্যায়নে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের নিরিখে ভারত হচ্ছে সেই গোত্রভুক্ত, যেসব দেশ আংশিক স্বাধীন। বাংলাদেশের অবস্থানও ওই একই গোত্রে। তবে সংখ্যামান বা পয়েন্টের দিক থেকে ভারতের পয়েন্ট আড়াই আর বাংলাদেশের অবস্থা চার। গত বছর বাংলাদেশের পয়েন্ট ছিল সাড়ে তিন, কিন্তু এ বছরের প্রথম তিন মাসেই তা নেমে গেছে (ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৫, ফ্রিডম হাউস)। পয়েন্ট যত কম, দেশটির নাগরিেকরা তত বেশি স্বাধীন।
ফ্রিডম হাউসের মূল্যায়নে বাংলাদেশের পরিস্থিতিটা যে ভারতের চেয়ে খারাপ, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের রচিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনের যে সংশোধিত রূপ আওয়ামী লীগ ও তার ডান (জাতীয় পার্টি) এবং বামপন্থী (ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ) শরিকেরা ২০১৩ সালে করেছে, তা এই আইনকে আরও বেশি নিবর্তনমূলক কালো আইনে রূপান্তরিত করেছে। [ভারতের আইনের ৬৬(ক) ধারার অনুরূপ ধারাটি বাংলাদেশে ৫৭ ধারা হিসেবে পরিচিত] জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তরুণ শিক্ষক অস্ট্রেলিয়ায় বসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি তীক্ষ্ণ সমালোচনা করে ফেসবুকে মন্তব্য করেছিলেন, তাঁকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সাজা দিয়ে তাঁর নির্বাসন স্থায়ী করে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষককেও ফেসবুকে একই ধরনের মন্তব্যের জন্য একইভাবে জেলের ভাত খেতে হয়েছে। এমনকি, যেদিন ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এই যুগান্তকারী রায় হয়, সেদিনও সিরাজগঞ্জে এক কিশোরের বিরুদ্ধে একই ধরনের অপরাধের জন্য একটি মামলা হয়েছে। ফেসবুকে সরকারপ্রধান বা অন্য রাজনীতিকদের নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করা, কার্টুন প্রকাশ এবং বিরূপ মন্তব্যের জন্য আরও কতজনকে এ ধরনের সাজা ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে, তার কোনো নির্ভুল হিসাব পাওয়া যায় না। তবে, তথ্য অধিকার ও বাক্স্বাধীনতা বিষয়ে কাজ করে এমন একটি বৈশ্বিক সংগঠন, আর্টিকেল নাইন্টিন–এর বাংলাদেশ শাখার হিসাব অনুযায়ী শুধু ২০১৪ সালেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনে অন্তত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ফেসবুকের বাইরে বিরোধী মতের রাজনীতিবিদ এম কে আনোয়ার রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে এই আইনে গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন এবং মামলা এখনো বিচারাধীন। একইভাবে একুশে টিভির স্বত্বাধিকারী এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় এই তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এবং পরে অভিযোগ আনা হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের। আইনটির অপব্যবহারের তালিকা বেশ দীর্ঘই বলতে হবে।
ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের উদ্ভাবক, ব্রিটেনের স্যার টিম বার্নার্স লি ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থায় অবাধ স্বাধীনতার অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর মতে, ওই স্বাধীনতা নেট ব্যবহারকারীর একটি মৌলিক মানবাধিকার এবং সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো এখন গণতন্ত্রের আবশ্যিক হাতিয়ার। আমাদের মন্ত্রীরা যদি দয়া করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন কিংবা বিরোধী নেতা মিলিব্যান্ডের ফেসবুক ও টুইটার অ্যাকাউন্টগুলোয় একটু চোখ বুলিয়ে নেন, তাহলে দেখতে পাবেন, প্রতিদিন তাঁদের স্বদেশি নাগরিকেরা ওই নেতাদের কীভাবে তুলাধোনা করছেন, এমনকি গালিও দিচ্ছেন। কিন্তু ওই সমালোচনাকে যদি তাঁরা অপরাধ গণ্য করতেন, তাহলে তাঁদের কারাগারগুলোয় আর অন্য কোনো অপরাধীর ঠাঁই হতো না। কংগ্রেস নেতা মনীষ তেওয়ারির মতো বিরোধী দলে যাওয়ার পর নিজেদের করা আইনের অপব্যবহারের জন্য মাথার চুল ছেঁড়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং, কালো বিধানগুলো বাতিল করাই সহজ। অবশ্য, চাইলে পরে আদালতও বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে পারে।
কেননা, বছর দুয়েক ধরে আমাদের হাইকোর্টেও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা একটি মামলা সরকারের জবাবের অপেক্ষায় পড়ে আছে। মানবাধিকার সংগঠন, বাংলাদেশ িলগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)–এর নথিতে দেখা যায় যে, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফেসবুকে একটি ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের কারণে সরকার তা বন্ধ করে দিলে আরাফাত হোসেন খান নামে একজন নাগরিক তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেছিলেন। ওই রিটে কোেনা অন্তর্বর্তী আদেশ না হলেও ৫৭ ধারাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তার কারণ দর্শানোর জন্য সরকারের প্রতি আদেশ জারি হয়েছিল।
সরকার এখনো ওই রুলের কোনো জবাব দেয়নি এবং মামলাটিও আর এগোয়নি। সে কারণেই প্রশ্ন জাগে, ভারতবাসীর মতো কপাল কি আমাদের হবে?
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান হামলা শুরু

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করেছে সৌদি আরব এবং তার আরব মিত্ররা। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত এ ঘোষণা দিয়েছেন। সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদেল আল জুবাইর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলসহ (জিসিসি) ১০টি দেশ বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৭টা থেকে সানায় বিমান হামলা শুরু করে। সৌদি আরব বলেছে, মিসর ও পাকিস্তানসহ পাঁচটি মুসলিম দেশ ইয়েমেনে শিয়া হুথি বিদ্রোহীদের দমনে উপসাগরীয় নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে অংশ নিতে আগ্রহী। উল্লেখ্য, হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের বেশিরভাগ অংশের দখল নিয়েছে। সৌদির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ বৃহস্পতিবার জানায়, জর্ডান,
মরক্কো ও সুদানও বিদ্রোহীবিরোধী অভিযানে অংশ নেয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। ইয়েমেনে ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে পুনর্বহালের জন্য এ হামলা চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী ইয়েমেনের বন্দরে না ভিড়তে বিদেশী জাহাজকে সতর্ক করে দিয়েছে। এছাড়া ইয়েমেনের আকাশসীমাকে ‘নিয়ন্ত্রিত স্থান’ ঘোষণা করা হয়েছে। এ হামলার মাধ্যমে সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ শুরু করল বলে মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে সানায় সৌদি ও তার মিত্র দেশগুলোর বিমান হামলায় ২০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৩৩ জন আহত হয়েছে বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। সৌদি রাজকীয় বাহিনীসহ তার পারস্য উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর ১০০টি জঙ্গি বিমান বৃহস্পতিবার রাত থেকে ইয়েমেনে হামলা চালায়। অন্যদিকে সৌদি সরকার ইয়েমেনে বিমান হামলা চালানোর পর প্রয়োজন হলে স্থল অভিযানও শুরু করতে পারে বলে একটি সৌদি সূত্র আভাস দিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌদি আরবের নিরাপত্তাবিষয়ক ওই সূত্র জানায়, ‘সম্ভবত স্থল হামলার প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, ইয়েমেনে সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য কেবল আকাশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে না। সৌদি সরকার ও তার দশটি মিত্র সরকার ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন হামলায় অংশ নিয়েছে। আরব আমিরাতের ৩০টি, কুয়েতের ১৫টি ও মরক্কোর ৬টি জঙ্গি বিমান এ হামলায় শরিক হয়েছে এবং এ হামলায় মিসর ও পাকিস্তানের যুদ্ধজাহাজও অংশ নিয়েছে।’ সৌদি আরবের বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যসহ মোট দেড় লাখ সৌদি সেনা ইয়েমেনবিরোধী এ হামলায় অংশ নিয়েছে। এদিকে, ইয়েমেনে হামলায় সৌদি আরবকে অস্ত্রপাতি সরবরাহ (লজিস্টিক সাপোর্ট)
ও গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সানার হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে রিয়াদের সামরিক অভিযানে আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থনে ওয়াশিংটন এগিয়ে এসেছে বলে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়। বুধবার মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র বেরনাদেত মিহান এক বিবৃতিতে বলেন, উপসাগরীয় জোট (জিসিসি) নেতৃত্বাধীন সামরিক অপারেশনে অস্ত্রপাতি ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অনুমোদন দিয়েছেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এ সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে না। বরং সৌদি আরব ও জিসিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে। মিহান বলেন, আমরা হুথিদের আহ্বান জানাচ্ছি, তারা সামরিক কার্যক্রম ছেড়ে রাজনৈতিক সংলাপের জন্য সমঝোতার পথে আসুক। এদিকে, ইয়েমেনের পদচ্যুত প্রেসিডেন্ট আব্দো রাব্বো মানসুর হাদি পালিয়ে ওমানে গেছেন। গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মানসুর হাদির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে।

বিমানটি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন কো-পাইলট

ফ্রান্সের আল্পসে মঙ্গলবার বিধ্বস্ত হওয়া জার্মান বিমানের কো-পাইলটই বিমানটি বিধ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। ফরাসি কর্মকর্তারা এ কথা জানিয়েছেন। ফ্রান্সে মার্সাইয়ে শহরের কৌঁসুলি বিরিস হোবা বিমানটির ‘ব্ল্যাকবক্স’ ভয়েস রেকর্ডারের তথ্য তুলে ধরে বলেন, কো-পাইলট ককপিটে ছিলেন একা। বিমানের ককপিট থেকে পাইলট বেরিয়ে যাওয়ার পর কো-পাইলট ইচ্ছাকৃতভাবেই বিমান নিচের দিকে নামাতে থাকেন। তিনি পাইলটকে ভেতরেও ঢুকতে দেননি। পাইলটকে বাইরে রেখে কো-পাইলট একটি সুইচ টিপে বিমানের পতন ঘটান। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান ওই কৌঁসুলি। তিনি বলেন, পাইলট ভেতরে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। ককপিটে তখন ছিল পিনপতন নিস্তব্ধতা। ২৮ বছর বয়সী কো-পাইলট আন্দ্রিয়াজ লুবিজ বিমান ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। সাংবাদিকদের কৌঁসুলি হোবা বলেন,
‘আমরা পাইলটকে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য কো-পাইলটকে অনুরোধ জানাতে শুনেছি। আর ঠিক সে সময়ই একটি আসন পেছনের দিকে সরানো এবং দরজা বন্ধ করার শব্দ পাওয়া গেছে।’ ‘ওই মুহূর্তে কো-পাইলট নিজে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। তিনি একা ছিলেন। আর তখনই কো-পাইলট বিমানটিকে নিচে নামানোর জন্য ফ্লাইট মনিটরিং সিস্টেমের সুইচ টিপেন। উচ্চতা নিয়ন্ত্রণের এ কাজটি কেবল ইচ্ছাকৃতই করা যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা হতে পারে এটি যে, কো-পাইলট স্বেচ্ছায়ই ক্যাপ্টেনকে না ঢুকতে দেয়ার জন্য দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন। বিমানকে নিচে নামানোর জন্য সুইচও টিপেছিলেন। কি কারণে তিনি এটা করেছেন তা আমরা এখনও জানি না। তবে মনে হয় বিমানটি ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলেন তিনি।’ বিমান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সংকেত মেলেনি জানিয়ে কৌঁসুলি বলেন, কো-পাইলটের সঙ্গে উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসীদের কোনো যোগসাজশ আছে কিনা তা তারা জানেন না। তবে জার্মান কর্তৃপক্ষ কো-পাইলট সম্পর্কে পরবর্তীকালে আরও তথ্য জানাবে। মঙ্গলবার ফ্রান্সের আল্পস পর্বতে জার্মান এয়ারবাস এ৩২০ বিমানটি ১৫০ জন আরোহী নিয়ে বিধ্বস্ত হয়।

৭শ বছরের পুরনো কোরআন লুট

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের থেকে সাতশ’ বছরের পুরনো একটি কোরআন শরিফ লুট হয়েছে বলে এনডিটিভি জানিয়েছে। এটি রক্ষিত ছিল রাজ্যের বেয়াওয়ার শহরের বাসিন্দা জয়দেবপ্রসাদ শর্মার কাছে। ২০১১ সালে এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি উপহার পেয়েছিলেন এ মূল্যবান গ্রন্থটি। এরপর থেকে নিজ বাড়িতে এটি সযতেœ রক্ষা করছিলেন তিনি। মঙ্গলবার রাতে দুই ব্যক্তি এসে ওই ধর্মীয় গ্রন্থটি দেখতে চান।
এদের মধ্যে একজন তার পূর্বপরিচিত হওয়ায় তার মনে কোনো সন্দেহ আসেনি। তিনি খোলা মনেই কোরআন বের করে তাদের দেখতে দেন। এ সময় দু’জনের একজন আগ্নেয়াস্ত্র বের করে তার বুকে লক্ষ্য তাক করে। তখন বাইরে থেকে আরও দু’জন লোক এসে কোরআনটি তুলে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। এ সম্পর্কে জয়দেব বলেন, ‘এটি ছিল একটি বিশেষ কোরআন। সোনা আর নীলকান্ত মণি দিয়ে ক্যালিওগ্রাফি করা ছিল এর প্রতিটি অক্ষর।’ তিনি মনে করছেন, ‘এ মূল্যবান পাথরগুলোর কারণেই এ পুস্তকটি ছিনতাই করা হয়েছে।’

এরদোগানের সমকামী ব্যঙ্গচিত্রে কার্টুনিস্টের জেল

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানকে নিয়ে কার্টুন আঁকার দায়ে জেল-জরিমানা হয়েছে দেশটির দুই কার্টুন শিল্পীর। ইস্তাম্বুলের একটি আদালত কার্টুনিস্ট বাহাদুর বারুতিকে প্রায় ২ হাজার ৭শ’ ডলার জরিমানা ও ১১ মাসের জেল এবং অপর কার্টুনিস্ট ওজায়ের আয়দোগানকে ২০ দিনের জেল দিয়েছেন। তারা ‘পেঙ্গুইন’ নামে একটি ব্যঙ্গ পত্রিকায় ২০১৪ সালে একটি কার্টুন এঁকেছিলেন। যাতে দেখা যায়, এরদোগান প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রবেশ করছেন। তার মাথা ‘টাক’।
তাকে ‘শুকনো’ অভ্যর্থনা জানানো হয়। এরদোগানের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমরা অন্তত একজন সাংবাদিককে কতল করতে পারতাম।’ পেঙ্গুইন জানায়, দেশটির একজন নাগরিক এ কার্টুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। কার্টুনে এরদোগাকে ‘টাক মাথা’ দেখানো হয়েছে, যা তুরস্কের আঞ্চলিক গালি যার অর্থ দাঁড়ায় ‘সমকামী’- এমন অভিযোগ করেন সেই ব্যক্তি। এর আগে ২০০৫ সালে এরদোগান পেঙ্গুইনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করেছিলেন।

কোহলির উইকেটটাই সেরা

বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন বিতর্ককে সঙ্গী করে। ফিরে এলেন হিরো হয়ে। পেসার রুবেল হোসেন বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিতে চান। এক ওভারে ছয়টি বলই ইয়র্কার দেয়ার লক্ষ্য তার। কাল বাগেরহাট গেছেন। জ্যোতির্ময় মণ্ডলকে দিয়েছেন সাক্ষাৎকার-
প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়ায় কোনো চ্যালেঞ্জ নিয়ে গিয়েছিলেন?
রুবেল : বিশ্বকাপে খেলতে পারা অনেক বড় ব্যাপার। বড় মঞ্চে ভালো খেলার একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। জানতাম অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন পেসারদের জন্য সহায়ক হবে। কিন্তু যা ভেবেছিলাম ঠিক ততটা অনুকূল কন্ডিশন ছিল না। তারপরও ভালো বল করতে পেরেছি। তাতেই খুশি। ভালো করতে হবে, এটা আমার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ ছিল।
প্রশ্ন : অস্ট্রেলিয়া যাওয়া নিয়ে অনিশ্চিয়তা ছিল, চাপ নিয়েই গিয়েছিলেন। এত দ্রুত সামলালেন কীভাবে?
রুবেল : বাইরে যা হোক, মাথার মধ্যে আমার ক্রিকেটই ছিল। ক্রিকেটই আমার ধ্যান-জ্ঞান, স্বপ্ন। আমাকে নিয়ে একটা সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু খেলার সময় আমার মাথায় সেগুলো ছিল না। বিশ্বকাপে দেশের হয়ে একটা ম্যাচ জেতানোর স্বপ্ন ছিল। ম্যাচে জেতালাম। তাতেই বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে গেল। আমি নিজেই বিস্মিত। আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রশ্ন : ডেথ ওভার বোলিংয়ে আপনি কী বিশ্বের সেরা?
রুবেল : হাহাহা। ডেথ ওভার নিয়ে আমি অনেক কাজ করেছি। ডেথ ওভারে একজন বোলার ডেথ হতে পারে, আবার হিরোও হয়ে যেতে পারে। আমার শক্তির জায়গা হল ইয়র্কার এবং জোরে বল করা। কিন্তু মনে হয় এখনও আমি পরিপূর্ণ হতে পারিনি। এখন চারটি ইয়র্কার দিতে চাইলে দুটি বা তিনটি হয়। যেদিন এক ওভারে ছয়টা ইয়র্কার দিতে পারব, সেদিনই মনে করব পেরেছি।
প্রশ্ন : আপনি এখন হিরো। কেমন উপভোগ করছেন?
রুবেল : হাহাহা...। হিরো! এমনটা কখনও ভাবিনি। আমি যা করেছি, শুধু দলের জন্য। দলের জন্য কিছু করতে চেয়েছি। পেরেছি কিনা, আপনারা ভালো বলতে পারবেন।
প্রশ্ন : ক্যারিয়ারে ছয়বার চার বা তারচেয়ে বেশি উইকেট পেয়েছেন। কোন্টাকে সবচেয়ে এগিয়ে রাখবেন?
রুবেল : নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আমার ছয় উইকেট আছে। তাদের বিপক্ষে কাইল মিলসকে আউট করার পর বাংলাওয়াশ নামটা চালু হয়েছিল। আরও কয়েকটা স্মরণীয় বোলিং রয়েছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই দুই উইকেট না পেলে হয়তো বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারত না। ওই ওভারটাই আমার ক্যারিয়ারের সেরা।
প্রশ্ন : বিশ্বকাপে কার বিপক্ষে বল করাটা কঠিন মনে হয়েছে?
রুবেল : আমি কাউকে ওভাবে নির্বাচন করতে পারিনি। ভালো বল করতে সবার বিপক্ষেই সহজ মনে হয়।
প্রশ্ন : ব্রড ও অ্যান্ডারসনকে আউট করা বল দুটোকেই কি ক্যারিয়ারের সেরা বল বলবেন?
রুবেল : যদি সেরা দুটি নির্বাচন করতে বলেন, তাহলে নিশ্চয়ই আমি ওই দুটি বলকে বেছে নেব। তবে এটা সম্ভব হয়েছে রিভার্স সুইংয়ের কারণে। এ ছাড়া নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের তিনটি বলও আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রশ্ন : বিশ্বকাপে আট উইকেটের মধ্যে কাকে আউট করে আপনি তৃপ্ত?
রুবেল : (হেসে) আসলে ঘুরেফিরে ওই দুটি উইকেটের কথাই আসে। কিন্তু বিরাট কোহলির উইকেটটাই আমার কাছে সেরা।
প্রশ্ন : ছোটবেলা আর আপনার এখনকার জীবনের মধ্যে অনেক পার্থক্য। জীবনে আরও বড় হলেও কোন জিনিসটা কখনও ভুলবেন না?
রুবেল : আসলে ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট ভালোবাসলেও স্বপ্ন দেখিনি আমি জাতীয় দলের হয়ে খেলছি। হয়তো স্কুল ফাঁকি দিয়ে অনেক খ্যাপ খেলেছি। কিন্তু পেসার হান্টের কথা আমি কখনও ভুলব না। এটাই আমার জীবন বদলে দিয়েছে। তবে প্রথমবার ৭১ মাইল গতিতে বল করার পর ব্যর্থ হই। সেই ব্যর্থতার পর আমি দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিতে চাইনি। কিন্তু কয়েকজন বন্ধু ও বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় পেসার হান্টে নাম লেখাই। পরে সবকিছু স্বপ্নের মতোই হয়েছে। আর এখন যখন ১৬ কোটি মানুষ ‘রুবেল, রুবেল’ বলে চিৎকার করে, তখন মনে হয় আমাকে, আরও ভালো কিছু করতে হবে।
প্রশ্ন : নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আপনার দুই ওভার বাকি ছিল। নিজের কাছে কী মনে হয়েছে আপনি বল করলে ওই ম্যাচটি বাংলাদেশ জিততে পারত?
রুবেল : না, তেমনটা মনে হয়নি। কারণ ওই সময়ে অধিনায়কই ম্যাচের অবস্থা ভালো বুঝতে পারেন।
প্রশ্ন : ক্যারিয়ারে এ পর্যন্ত আসতে কোন কাজটা আপনার কাছে কঠিন মনে হয়েছে?
রুবেল : ওরকম কখনো কিছু মনে হয়নি।
প্রশ্ন : মিরপুরে আর মেলবোর্নে বল করার মধ্যে পার্থক্য কী?
রুবেল : বাংলাদেশের উইকেটে পেসারদের খুব কমই সহায়তা করে। এই উইকেটে খেলতে খেলতে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে এখান থেকেই আমাদের সাফল্য বের করার চেষ্টা করতে হয়। মেলবোর্নের উইকেটও ফ্লাট ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের তুলনায় কম। মাঠ বড়। সেখানে বোলিং করার সময় একটু আলাদা অনুভূতি কাজ করেছে। ছোটবেলা থেকেই তো জানি অস্ট্রেলিয়ায় বাউন্সি উইকেট হয়। ওখানকার উইকেটে ভালো জায়গায় বল করলে সফলতা মেলে।
প্রশ্ন : এখন অনেক তরুণী আপনাকে বিয়ে করতে উতলা। মনের মতো কাউকে পেয়েছেন?
রুবেল : (হেসে) এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না।
প্রশ্ন : বিয়ে নিয়ে কিছু ভাবছেন?
রুবেল : বিয়ে নিয়ে এখনই ভাবছি না।
প্রশ্ন : সামনের সিরিজগুলো নিয়ে পরিকল্পনা কী?
রুবেল : সামনে আমাদের বড় দলগুলোর সঙ্গে খেলতে হবে। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ আমাদের জন্য অন্যরকম চ্যালেঞ্জ। তাদের সঙ্গে আমাদের সাফল্য কম। আর বিশ্বকাপে আমাদের পারফরম্যান্সে অন্য দলগুলোও বাংলাদেশকে আলাদাভাবে ভাবছে। সবাই জানে, বাংলাদেশ এখন আর আগের দল নেই। এ জন্য আমাদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আমরা সামনের সিরিজগুলোতে ভালো করব।
প্রশ্ন : আপনার পারফরম্যান্সে মাশরাফির ভূমিকা কতটুকু ছিল?
রুবেল : পেস বোলার অধিনায়ক হলে অন্য পেসারদের জন্য সুবিধা হয়। কারণ তিনি বুঝতে পারেন অন্যদের কোথায় সমস্যা হচ্ছে। পেসারদের সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকে। সেভাবে পরামর্শও দিতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন মাশরাফি।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের সমর্থকদের উদ্দেশে কী বলবেন?
রুবেল : মানুষের ভালোবাসা আর সমর্থনের জোরে আমি খারাপ সময় পার করে এসেছি। সেই সময়ে চিনতে পেরেছি, কারা আমাকে সমর্থন করেন। আমি সত্যিই মুগ্ধ, মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন দেখে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কথা বলব বিশেষ করে। বিসিবি আমাকে যে সমর্থন দিয়েছে, তার প্রতিদান দেয়া সম্ভব নয়। আমার বিপদের সময় পাশে থেকেছেন সবাই, সেই সঙ্গে আমাকে এতকিছুর পরও বিশ্বকাপে নিয়ে গেছেন। আমি সবার কাছে দোয়া চাইব, যেন সুস্থ থাকতে পারি। সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারি।

গুঞ্জন শুনি

স্বামী হিসেবে অভিনেতা সিদ্ধার্থ মালহোত্রা যোগ্য- এমন কথা কিছুদিন আগেও মিডিয়ায় জোর দিয়ে বলেছেন বলিউডের হালের আলোচিত তারকা আলিয়া ভাট। সিদ্ধার্থের সঙ্গে তার প্রেম নিয়ে কানাঘুষাও কম হয়নি। কিন্তু জল ঘোলা করার পর হঠাৎ করেই আড়ালে চলে গেলেন দুজন। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে আলিয়া কিংবা সিদ্ধার্থ কেউই মুখ খুলতে চাইছেন না।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আলিয়া বলেন, সিদ্ধার্থকে নিয়ে এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্যে যেতে চান না তিনি। এদিকে আলিয়ার ঘনিষ্টরা বলছেন, সিদ্ধার্থের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভাঙন ধরেছে। যে কারণে এখন দুজন দুজনকে এড়িয়ে চলছেন। এদিকে সিদ্ধার্থ আলিয়ার সঙ্গে সম্প্রতি একটি ছবির প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছেন। গুঞ্জন রয়েছে, এর প্রধান কারণ নাকি এ মহেশ ভাট কন্যাই। তার সঙ্গে নতুন কোনো ছবিতে কাজ করার ইচ্ছে নেই সিদ্ধার্থের।

ভবিষ্যৎ ভয়ংকর!

স্টিভ ওজনিয়াক
মানুষের জন্য ভয়াল ও খারাপ ভবিষ্যৎই নাকি অপেক্ষা করে আছে। কারণ, ভবিষ্যতে মানুষের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেবে কম্পিউটার। কৃত্রিম বুদ্ধিমান যন্ত্রগুলো মানুষের জন্য অশুভ হয়ে দাঁড়াবে। এ আশঙ্কাই প্রকাশ করেছেন প্রকৌশল জগতের বিখ্যাত ব্যক্তি অ্যাপল গুরু খ্যাত স্টিভ ওজনিয়াক।
স্টিভ জবস ও স্টিভ ওজনিয়াক মিলে সত্তরের দশকে গড়ে তুলেছিলেন অ্যাপল। ১৯৮০ সালে অ্যাপল ছেড়ে দেন ওজনিয়াক। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনার চেয়ে প্রকৌশল নিয়ে কাজ করতেই বেশি ভালো লাগে তাঁর। এর পর থেকে নানা স্টার্টআপ বা উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ও দাতব্য কাজে ব্যস্ত আছেন তিনি। তিনি অ্যাপলে একজন সম্মানসূচক কর্মকর্তার পদে রয়েছেন এবং বাৎসরিক বৃত্তি দেন।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কৃত্রিম বুদ্ধিমান কম্পিউটার নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্টিভ ওজনিয়াক। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘নিঃসন্দেহে মানুষকে ছাপিয়ে যাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমান কম্পিউটার। এতে মানুষের ভবিষ্যৎ হবে ভীতিকর ও খুবই খারাপ।’
স্টিভ ওজনিয়াক বলেন, ‘শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্র সফটওয়্যারের মধ্যে মানুষের মতো সৃজনশীল ও শক্তিমত্তা সৃষ্টি করবে যা গবেষকেদের জন্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। স্টিফেন হকিং কিংবা এলন মাস্কের মতো মানুষও কৃত্রিম বুদ্ধিমানদের নিয়ে তাঁদের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। আমিও তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে একমত যে, মানুষের ভবিষ্যৎ ভীতিকর। আমাদের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য যদি আমরা এ ধরনের যন্ত্র বানাতে থাকি, সেই যন্ত্রগুলো আমাদের চেয়ে দ্রুত চিন্তা করবে এবং ধীরগতির মানুষের কাছ থেকে মুক্ত হয়ে নিজেরাই দক্ষতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান চালানো শুরু করবে।’

স্টিভ ওজনিয়াক আরও বলেন, ‘আমরা কী প্রভু থাকব নাকি গৃহপালিত পশুতে পরিণত হব বা আমাদের পিঁপড়ার মতো পিষে মারা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। আমি যখন ভাবি, ভবিষ্যতে আমি এই স্মার্ট মেশিনগুলোর কাছে গৃহপালিত পশুর মতো আচরণ পাচ্ছি তখন আমি আমার পোষা কুকুরটির প্রতি নিঃসন্দেহে আরও ভালো আচরণ করব।’
এর আগে বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং কৃত্রিম বুদ্ধিমানরা মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হবে বলে আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন।
বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শুরুর ধাপটি কতটা কার্যকর তার প্রমাণ রেখেছে। পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমান যন্ত্র তৈরি করতে মানব প্রজাতি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যাবে।’
এলন মাস্কও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

আল্পসেই শেষ শিক্ষা সফর!

চোখে পানি, হাতে ফুল আর মোমবাতি নিয়ে জার্মানির জোসেফ কোয়িং জিমনাসিয়াম হাইস্কুল প্রাঙ্গণে হাজির হয়েছে শোকস্তব্ধ কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীরা। একে অপরকে জড়িয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। তাদেরই ১৬ জন বন্ধু হারিয়ে গেছে চিরতরে।
এই স্কুলের টেনথ গ্রেডের ওই শিক্ষার্থীরা স্কুল ট্রিপে স্পেন যাচ্ছিল। পথে আল্পসেই শেষ হয়েছে জীবনসফর। জার্মানউইংসের বিধ্বস্ত এ-৩২০ ফ্লাইটে নিহত ১৫০ জনের মধ্যে তারাও ছিল। বুধবার তোলা ছবি ডেইলি মেইল

তোমায় ছাড়া কীভাবে বাঁচি?

সিঙ্গাপুরের প্রয়াত নেতা লি কুয়ান ইউ’র মরদেহ বুধবার পার্লামেন্ট ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আগ পর্যন্ত মরদেহটি এখানেই থাকবে বলে জানা গেছে। জাতির জনকের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ সেখানে ভিড় করেছেন বলে বিবিসি জানিয়েছে। বুধবার সকালে একটি সেনা শকটে করে মরদেহটি তার সরকারি বাসভবন থেকে পার্লামেন্টে বয়ে আনা হয়।
প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। এ সময় ‘উই লাভ ইউ, লি কুয়ান ইউ’ বলে শোকার্ত ধ্বনি ওঠে। শ্রদ্ধা জানাতে আসা ব্যাংক নির্বাহী ঝাং উই জি বলেন, এ এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। আমার সারা জীবনে এমনটি দেখিনি। দুই নাতিসহ ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছেন তামিলসেলভি (৭৭)। তিনি বলেন, লি কুয়ান আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন। আমরা বস্তিতে থাকতাম। আমার স্বামী ছিল বাস ড্রাইভার। এখন আমার তিন সন্তান ভালো চাকরি করে। সবারই সুন্দর বাড়ি আছে। হায় লি কুয়ান, তোমায় ছাড়া কীভাবে বাঁচব?
এদিকে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী এবং লি’য়ের ছেলে লি সিয়েন লুং প্রয়াত নেতার নামে একটি নতুন অর্কিড ফুলের নামকরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। নাম দেয়া হয়েছে আরান্ডা লি কুয়ান ইউ। মরদেহের সঙ্গে পার্লামেন্ট ভবনে ওই ফুলটিকেও রাখা হয়েছে। আধুনিক সিঙ্গাপুরের স্থপতি হিসেবে লি কুয়ান ইউ সোমবার ৯১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রোববার তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এএফপি।

যে কারণে মোদির না আসাই ভালো by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

বাংলাদেশ প্রতিদিনের শুরু থেকে প্রিয় নঈম নিজাম যেমন জড়িত, ঠিক তেমনি আমিও শুরু থেকেই লিখে চলেছি। দু-একবার মনে হয়েছে এ পত্রিকায় আর না লেখাই উচিত। একবার কোনো লেখা না ছাপার কারণে কয়েক মাসের জন্য বন্ধ রেখেছিলাম। নিয়মিত লিখলেই যে পত্রিকা কারও পক্ষে যাবে তা নয়, স্বার্থহানি হলে পক্ষে থাকে না- এটা পাঠকদের বোঝানো যায় না। রাজনীতি, মিটিং-মিছিল করি তাই কোনো কোনো পত্রিকায় প্রায়ই খবর ছাপা হয়। বাংলাদেশ প্রতিদিনে সে খবর কেউ খুঁজে না পেলেই প্রশ্ন করে, কী ব্যাপার প্রতিদিনে খবর নেই কেন? সাপ্তাহিক লেখা আর আমাদের কর্মকাণ্ডের খবর এক জিনিস নয়- এটা অনেককে বোঝানো যায় না। মঙ্গলবারে দু-এক সপ্তাহ নিয়মিত না লিখলে দু-চারশ পাঠক তো কমবে। কিন্তু তারপরেও কেন তারা আমাদের খবর ছাপে না বা গুরুত্ব দেয় না তা আমি জানব কী করে? গত ৪২ দিন মতিঝিলের ফুটপাতে আছি। কোনো দিন নাই যে কোনো না কোনো পত্র-পত্রিকা, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় খবর বের হয়নি। কেউ ছোট কেউ বড় কোনো না কোনো আকারে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনও করেছে, হয়তো অন্যদের চেয়ে কম করেছে। কিন্তু ৮ মার্চ অবস্থানের ৪০ দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ ও নেতা-কর্মীরা বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত যে অমূল্য মতামত দিয়েছে যা অনেক পত্রিকায় গুরুত্বের সঙ্গে ছেপেছে। অথচ বাংলাদেশ প্রতিদিনে সে খবর স্থান পায়নি। কতজনের কত প্রশ্ন, কিন্তু জবাব দিতে পারি না।
দু-কথা লিখতে চেয়েছিলাম এক স্বনামধন্য সাংবাদিক ও টকশো উপস্থাপক বা উপস্থাপিকা মুন্নী সাহা সম্পর্কে। আমরা কুয়োর ব্যাঙ জাহাজের খবর রাখি না, কার খোটার জোর কত তাও জানি না। জীবনে কত সাংবাদিক দেখেছি, ভারতের প্রখ্যাত কলামিস্ট খুশবন্ত সিং, কুলদীপ নায়ার, সম্পাদক রাজেন্দ্র সারীন, হিরণ্ময় কার্লেকার, আনন্দ বাজারের বরুণ সেনগুপ্ত, অভীক সরকার, তার বাবা অশোক সরকার, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ওপর গবেষক প্রবীণ সাংবাদিক-সাহিত্যিক অমিতাভ চক্রবর্তী, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদা শংকর রায়, মনোজ বোস, প্রবোধ কুমার সান্যাল, সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত। আমাদের দেশের কত কত বিখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় উঠাবসা, কত উপস্থাপককে চিনি জানি। কিন্তু মুন্নী সাহার মতো কড়কড়ে কণ্ঠের রাগঢাক না করা কোনো উপস্থাপক দেখিনি। একদিন তিনি জনাব হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে বলেছিলেন, আপনাকে তো লোকে বিশ্ব বেহায়া বলে। একটা রাজনৈতিক নেতাকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষিপ্ত লোকজন কত কথাই তো বলে। শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীনের বলা আর কোনো অনুষ্ঠান উপস্থাপকের সরাসরি বিব্রতকর অশ্লীল কথা বলা এক কথা নয়। কিন্তু তাকে বুঝাবে কে? খেয়াল নেই, কয়েক মাস আগে সরাসরি প্রচারে তার এক ক্যামেরাম্যান আমার বাসায় গিয়েছিল। সে অনুষ্ঠানে সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন। তিনি বিএনপির এক ইফতার মাহফিলে যাওয়ায় মুন্নী সাহা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি তো তাদের ইফতার মাহফিলের শিরোমণি, মধ্যমণি ছিলেন। আপনি বিএনপি সম্পর্কে বলুন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক কম করে আমার থেকে ১০-১২ বছরের বড়। আমরাও খুব সংযত হয়ে তার সঙ্গে কথা বলি। অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমাকে সংযুক্ত করলে বলেছিলাম, মুন্নী সাহা আপনি কি জানেন, শিরোমণি আর মধ্যমণির আভিধানিক পার্থক্য কি? দুষ্টের শিরোমণি আর ভালোবাসার অাঁধার মধ্যমণি জানি না তার বোধোদয় হবে কিনা। কিছু দিন আগে কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীককে প্রসঙ্গ ছাড়াই বলে বসেছিলেন, আপনি তো ওয়ানম্যান পার্টি। ক্ষুব্ধ জেনারেল ইবরাহিম প্রতিবাদ করেছিলেন, অনুষ্ঠান থেকে চলে যেতে চেয়েছিলেন। মুন্নী সাহা তার বক্তব্য প্রত্যাহার করায় সে যাত্রায় বেঁচে যান। জাতির শ্রেষ্ঠ গৌরব একজন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে কতখানি সম্মান করা উচিত সে বোধও খুব একটা নেই। শুনেছি, অনেককেই তিনি তাচ্ছিল্য করে এটা ওটা বলেন, কেন বলেন, কীভাবে বলেন- এসবের কোথায় অন্তর্নিহিত শক্তি কিছুই জানি না। যে চ্যানেলের তিনি সর্বেসর্বা, তার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান একটা ভালো পরিবারের সন্তান ও জনাব ফিরোজ কবির অসাধারণ সজ্জন ব্যক্তি। তার ভাই সরকার কবির উদ্দিন রেডিও পাকিস্তান এবং টিভিতে খবর পড়তেন। অমন নামকরা খবর পাঠক আমাদের দেশে খুব বেশি ছিল না। ঢাকা রেডিওতে ২৫ শে মার্চ রাতের শেষ খবর পড়তে গিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তান রেডিওতে আমার জীবনের শেষ খবর পড়া হলো। যদিও এসব ত্যাগী মানুষের কোনো কোনো কথায় স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠার ঘটনাকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা হয় না। তবু তারা আছেন, তাদের এসব ঐতিহাসিক ভূমিকা জাতির হৃদয়পটে থাকবে চিরদিন। রাজনীতি করা মানুষ তাই বর্তমান ঘটনা প্রবাহের চাপে অনেক কিছু করতে চাইলেও করতে পারি না, লিখতে চাইলেও লিখতে পারি না। আজ ভারতের বিস্ময় জাগানো রাজনীতিবিদ, প্রায় ৩২-৩৩ বছর পর একক দল নিয়ে ক্ষমতায় আসার প্রাণপুরুষ শ্রী নরেন্দ্র দামাদোর দাস মোদির বাংলাদেশ সফরের বিষয় দু-চার কথা আলোচনা করি।
প্রায় সবাই জানেন, মহান ভারতের অনেক নেতা-নেত্রীর সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। সেক্ষেত্রে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি, জনতা পার্টি, ভারতীয় জনতা পার্টি ও আরও অনেক দলের সঙ্গে কমবেশি উঠাবসা ছিল, এখনো যতটা সম্ভব চিঠিপত্র এবং দূরালাপনের মাধ্যমে যোগাযোগ আছে। গত বছর যখন ভারতের লোকসভার নির্বাচন হয়, নির্বাচনের আগে ভারতের অনেক পণ্ডিতের ধারণা ছিল অবশ্যই বিজেপি লোকসভায় বেশি সিট পাবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। কারণ সরকার গঠন করতে যেহেতু অন্য দলের সমর্থন লাগবে, সেহেতু তারা গুজরাটের দাঙ্গার অভিযোগে অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদিকে সমর্থন করবে না। তাই বিজেপির সরকার হলেও শ্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হবেন না। তাদের যুক্তি খুব একটা ফেলনা ছিল না। এ নিয়ে ভারতীয় অনেক কূটনীতিকও আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন। কিন্তু কেন যেন আমার সব সময় মনে হয়েছে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনের দিন ১৫ আগেও বিজেপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ উচ্চ পর্যায়ের একজন ঢাকায় এসেছিলেন। তার ধারণাও তেমনই ছিল। যেহেতু আমার সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছিল তাই তাকে আমি আমার মতো জানিয়েছিলাম। সেই কবে ভারতীয় একক দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রায় লুপ্তির পথে ছিল যেটা আবার ফিরে এসেছে। তবে ইলেকশনের আগে কথা উঠেছিল যে কোনো নারী নেতৃত্বে ভারতে মিলঝুল সরকার হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামিল নাড়ুর জয়ললিতা, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতি এরা মিলে শতাধিক সিট পেলে তাদের মধ্যে কেউ একজন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু কেন যেন আমার তেমন মনে হয়নি। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেস খুবই ভালো করেছিল। ৪২ আসনের ৩৮ আসন পেয়েছিল তারা। ২টি কংগ্রেস, ১টি বিজেপি, ১টি সিপিএম। অন্যদিকে তামিলনাড়ুর ৩৯ সিটের মধ্যে ৩৭টি পেয়েছিলেন জয়ললিতা। কিন্তু উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর দল লোকসভায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি। সোয়াশ বছরের প্রবীণ দল কংগ্রেসের সিট নেমেছে ৫০ এর নিচে। পৃথিবীর এক আশ্চর্য ঘটনা। শ্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম লোকসভায় প্রবেশ করে এক অসাধারণ বক্তব্য দিয়েছিলেন। কারণ ওর আগে তিনি কখনো লোকসভার সদস্য ছিলেন না। লোকসভায় প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই নেতা হয়েছেন। তাই তিনি বলেছিলেন, আমি এখানে সম্পূর্ণ নতুন। কিছুই জানি না। ভুল হলে প্রবীণরা ক্ষমা করবেন। আপনাদের কাছ থেকে জেনেশুনে আস্তে আস্তে আমি শিখে নেব। সেই সময়টুকু আপনারা আমাকে দেবেন। গত সেপ্টেম্বরে ভারতের নেতা হিসেবে নরেন্দ্র মোদি প্রথম জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে দেওয়া এক সম্বর্ধনায় প্রায় ২৪ হাজার লোকের মধ্যে এমন এক অসাধারণ বক্তব্য দিয়েছিলেন যা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। একপর্যায়ে তিনি এও বলেছিলেন, 'ম্যায়নে চা বেস্তা বেস্তা ইহাতক পৌঁছ গিয়া। হাম পিছে নেহি দেখ্তা, হাম সিধা দেখ্তা।' শ্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে প্রায় ১৮-২০ বছরের প্রবীণ আমার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী সেই আমেরিকাতেই ১৪-১৫ জনের সামনে এক বক্তৃতা করে জীবনের সব কিছু খুইয়েছেন। মুসলমান হিসেবে তাকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছিলাম। তার জন্যও আমাকে নিদারুণ গালাগাল করেছেন। তা করুন, বড় ভাই হিসেবে জন্মেছেন, গালাগাল বা তিরস্কার করার তার জন্মগত অধিকার। তাই এসব নিয়ে কিছু ভাবি না। সারা জীবন আওয়ামী লীগ করেছেন। আওয়ামী লীগ তাকে ত্যাগ করেছে। মুসলমান হিসেবে তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তার জন্য এখনো আমি আমার জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করব না।
গত আগস্টে ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতির এডিশনাল সেক্রেটারি প্রদ্যুৎ গুহের একমাত্র ছেলের বিয়ে ছিল। আমি যখন ভারতে নির্বাসনে তখন প্রদ্যুৎ গুহ পশ্চিমবঙ্গ যুব কংগ্রেসের জনপ্রিয় সভাপতি ছিলেন। অনেক বছর মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জির সঙ্গে আছেন। বাঘা দা বলতে অজ্ঞান। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার কারণে আগস্ট মাসে কোনো অনুষ্ঠানে যাই নাই। ৩ বা ৪ আগস্ট ছিল প্রদ্যুৎ গুহের ছেলের বিয়ে। সেখানে থাকা-খাওয়া সব ব্যবস্থা তারাই করেছিলেন। কিন্তু তারপরও তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকতে পারিনি। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানুষ মানুষের কতটা আপন হতে পারে তা শর্মিলা বকশী মিলুকে না দেখলে বোঝা যায় না। আগে দিলি্লর এয়ারপোর্ট পালামে ছিল। এখন হারিয়ানার গোরগাওয়ে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। তার পাশেই মিলুর বিশাল ফ্ল্যাট বাড়ি। মিলু বাপ-মায়ের এক সন্তান। একই ভবনের একতলা নিচে মিলুর মা ড. অরুণা চক্রবর্তী থাকেন। সেটাও ৪-৫ হাজার স্কয়ার ফুটের বাড়ি। আমার ছোট ভাইয়েরা কয়েকবার লটবহর নিয়ে মিলুর বাড়িতে থেকেছে। তাই এবার শক্ত করে ধরেছিল, দাদা তোমাকে এবার আমাদের বাড়িতে থাকতে হবে। মেয়েটাকে না করতে পারিনি। তাই সরকারি গাড়িতেই ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সে যে কি অসাধারণ যত্ন করেছে বলতে পারব না। শরীয়তপুরের ডিঙ্গামানিক মিলুর পূর্ব পুরুষের বাড়ি। ওর ইচ্ছে ওর বাপ-দাদার ভিটায় একবার সে যাবে। আজ ১৫-২০ বছর ধরে বলছি, যখন খুশি এসে ঘুরে যা। মাঝে একবার এসেছিল। কিন্তু সময় হয়নি। এক ছেলে এক মেয়ে স্বামী নিয়ে ছোট সংসার। কলেজে পড়িয়ে সময় পায় না। মজার ব্যাপার, যখন ওর বাড়িতে ছিলাম, আসার আগের দিন ছিল ভাইফোঁটা। ১৮ বছর আগে পাকিস্তান থেকে আসা কমর মহসীনের গুজরাটে বিয়ে হয়। তাকে গুজরাটের গভর্নর শ্রী স্বরূপ সিং বিদায়ের সময় তার মেয়ে পরিচয় দিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে ভাই বানিয়ে এসেছিলেন।
সেই থেকে সে প্রতি বছর তাকে ভাইফোঁটা দেয়। সেবারও সে ফোঁটা দেবে কিনা বা দিতে পারবেন কিনা- এ নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনা চলছিল। ৮ আগস্ট ছিল সেই শুভ দিন। আমি ছিলাম মিলুর গোরগাওয়ের বাড়িতে। হিসেব করে দেখলাম ১৮ বছর ধরে এক মুসলমান বোন হিন্দু ভাই নরেন্দ্র মোদিকে ভাইফোঁটা দিচ্ছে আর ৩৬ বছর ধরে এক হিন্দু বোন মিলু তার মুসলমান ভাই কাদের সিদ্দিকীকে ভাইফোঁটা দিয়ে চলেছে। কি আশ্চর্য মিল। আগের দিন নরেন্দ্র মোদি নেপাল সফরে ছিলেন। ঢাকায় ফিরে খবর পেয়েছিলাম শ্রী নরেন্দ্র মোদি তার মুসলমান বোনের ভাইফোঁটা ঠিকই নিয়েছেন। সত্যিই তিনি এক আশ্চর্য মানুষ। একেবারে নিজের দক্ষতা যোগ্যতায় এতদূর এসেছেন। তাই আমাদের দেশ সফরে এসে সাধারণ মানুষের কোনো ভালোবাসা পাবেন না। বরং বিনা ভোটে জবরদখলকারী সরকারের আহ্বানে এসে বিব্রতকর অবস্থায় পড়লে তা হবে আমাদের জন্য মর্মবেদনার কারণ।
তার পূর্ববতী সরকারের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং অবৈধ কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে এ সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। এই অপ্রিয় সরকার দেশ চালাতে সম্পূর্ণই ব্যর্থ। তাদের আহ্বানে বা আমন্ত্রণে বিপুল ভোটে নির্বাচিত একজন মহান নেতার আমাদের দেশে আসা উচিত না। বিশেষ করে আমাদের স্বাধীনতার জন্যে যে দেশের ১৪ হাজার বীর সেনার রক্ত আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। আমরা সেই দেশের নেতাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ১৬ কোটি মানুষ দুই হাত প্রসারিত করে উন্মুখ হয়ে আছি। তাই আমরা আশা করি, আমাদের উষ্ণ বুক তার সানি্নধ্য থেকে বঞ্চিত হবে না। আমরা ১৬ কোটি জনগণ তাকে হৃদয়ের সমগ্র উত্তাপ দিয়ে গ্রহণ করতে চাই- এ জন্য একটি জনপ্রিয় নির্বাচিত সরকারের আমন্ত্রণের অপেক্ষায় তাকে থাকতেই হবে। এই সরকারের দেশের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই শ্রী মোদির সফরে কেউ যদি রাস্তায় নেমে নিন্দাবাদ জানায় আমরা মুখ দেখাতে পারব না, বড় লজ্জায় পড়ব। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আশা করব ভারতের একজন সফল নেতা আমার দেশবাসীকে তেমন লজ্জায় ফেলবেন না।
লেখক : রাজনীতিক।

‘বাংলাদেশ পরিস্থিতির ব্যাপারে আমরা সজাগ রয়েছি’

বাংলাদেশের রাজনীতিকরাই চলমান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছাতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সহায়তা পরিকল্পনার ওপর শুনানিতে অংশ নেয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন কূটনীতিক। এক প্রশ্নের জবাবে বিসওয়াল বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতির ব্যাপারে আমরা সজাগ রয়েছি। আশা করছি পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে শিগগিরই রাজনীতিকরা শান্তিপূর্ণ সমাধানে উপনীত হবেন।’ বাংলাদেশে গণতন্ত্র এগিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়ে প্রত্যাশিত উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে রাজনৈতিক স্থিতির বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ‘সাব-কমিটি অন এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ আয়োজিত শুনানিতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন নিশা দেশাই বিসওয়াল এবং ইউএস এইডের এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর সহকারী প্রশাসক জোনাথন স্টিভার্স। সভাপতিত্ব করেন সাব-কমিটির চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান ম্যাট সালমন। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনও শুনানির সময় উপস্থিত ছিলেন।
২১৭২ র‌্যাবার্ন হাউজ অফিস ভবনে অনুষ্ঠিত শুনানিতে অংশ নেন সাব-কমিটির সদস্য গ্রেস মেং, ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান ব্র্যাড শারমেন, এমি বেরা, ওহাইয়োর স্টিভ শ্যাবট ও জেফ ডানকান। বিসওয়াল তার বক্তব্যে লেখক ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে যেসব মৌলিক অধিকার রয়েছে তার চর্চা করছিলেন মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ, কিন্তু তা সহ্য হয়নি ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের। ‘অভিজিত হত্যায় জড়িতদের তদন্তে সহায়তা করছে এফবিআই। ঘাতকদের বিচারে সোপর্দ করতে আমরা বদ্ধপরিকর।’ গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন লেখক অভিজিৎ রায়। এ সময় চাপাতির আঘাতে তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও আহত হন। চাপাতির কোপে একটি আঙুল হারানো বন্য যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন। মাথায়ও জখম রয়েছে তার। অভিজিৎ ও বন্যা দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এ ঘটনার তদন্তে সহায়তা দিতে এফবিআইয়ের একটি দল ঢাকায় এসে হামলার স্থান পরিদর্শন ও আলামত সংগ্রহ করেছে। শুনানিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। গণতন্ত্রের কাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে আরও অবদান রাখতে পারে তা নিয়ে কথা বলেন কংগ্রেস সদস্যরা। ২০১৬ অর্থবছরে ইউএসএইড দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সহায়তার জন্য যে প্রস্তাব করেছে সে ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাবে ‘সাব-কমিটি অন এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কিভাবে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে কাজ করছে এবং এ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষিত হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখবে এ কমিটি। একই সঙ্গে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানে প্রত্যাশা অনুযায়ী মানবাধিকার উন্নয়ন হচ্ছে কি না তাও পর্যালোচনা করা হবে।

বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচনের আহ্বান বৃটিশ এমপিদের

দ্রুত অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ১০ বৃটিশ এমপি একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছেন বৃটিশ পার্লামেন্টে। এতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমেদকে গুম করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পার্লামেন্টের ‘আরলি ডে মোশন’ নামের কর্মসূচির আওতায় এ প্রস্তাবটি জমা দেয়া হয়েছে। এতে স্বাক্ষর করেছেন রক্ষণশীল দলের পিটার বটমলি ও বব ব্লাকম্যান, লিবারেল ডেমক্রেটস দলের জুলিয়ান হাপারট ও বব রাসেল, লেবার পার্টির জন ম্যাকডোনেল ও লিজ ম্যাকইনস, সোশাল ডেমক্রেটিক দলের মার্ক ডারকান, রেসপেক্ট দলের জর্জ গ্যালাওয়ে, ডেমক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির জিম শ্যানন ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট এমপি মাইক হ্যানকক। বৃটিশ পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।  এতে ওই ১০ এমপি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। বিশেষ করে জোর দেয়া হয় গুম হয়ে যাওয়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদের প্রসঙ্গ। ২৩শে মার্চ এ প্রস্তাবটি জমা দেয়া হয়েছে। বৃটিশ পার্লামেন্টের প্রকাশিত তথ্যমতে ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ আরও অনেক গুমের ঘটনা ঘটেছে। এতে বাংলাদেশে অবাধ ও উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিসরের অভাবের বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অবসান ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতেরও আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, ২০১২ সালে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে জোরপূর্বক গুম করা হয়, যার অবস্থান এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয় নি। বিরোধী দলের সদস্যদের জোরপূর্বক গুমের তদন্তে ব্যর্থতার ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) সম্প্রতি এমন একটি মন্তব্যও তুলে ধরা হয়। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে র‌্যাবের বিরুদ্ধে বার বার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠছে। তাই বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিতে হবে। চাপ দিতে হবে দ্রুততার সঙ্গে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য। চাপ দিতে হবে যাতে জোরপূর্বক গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়, বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়। উল্লেখ্য, এ বছর বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েক দফায় বৃটিশ পার্লামেন্টে আলোচনা হয়েছে। তাতে বার বারই একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নতুন নির্বাচনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংকট উত্তরণে তারা জাতিসংঘের সম্পৃক্ততাকেও সমর্থন করেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে চিঠি লিখেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান-কি মুন। এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানায় বৃটেন। গত ৯ই মার্চ বৃটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে শুনানি হয়। সেখানে বাংলাদেশে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততাকে অব্যাহতভাবে উৎসাহিত করে যুক্তরাজ্য- এমন মন্তব্য করেন লর্ড ব্যারোনেস অ্যানিলে। ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো পদে থাকা লর্ড অ্যাভাবুরির এক প্রশ্নের জবাবে ব্যারোনেস অ্যানিলে ওই মন্তব্য করেন। তিনি তখন বলেন, দেশব্যাপী সহিংসতা ও উত্তেজনার অবসানে সব দলকে একে অন্যের ওপর আস্থা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লর্ড অ্যাভাবুরি ২৩শে ফেব্রুয়ারি তার কাছে জানতে চান, জাতিসংঘ মহাসচিব বান-কি মুনের কাছে যুক্তরাজ্য সরকার বাংলাদেশ ইস্যুতে একটি প্রস্তাব দেবে কিনা, যাতে বলা হবে বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ দিতে জাতিসংঘের মহাসচিব বান-কি মুনকে আমন্ত্রণ জানাতে বলা হবে কিনা, যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো একটি সমঝোতায় পৌঁছতে পারে। তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূর হয়। ব্যারোনেস অ্যানিলে তার প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে জাতিসংঘের মহাসচিব বান-কি মুন চিঠি লিখেছেন। এ খবর পেয়েছি আমরা। এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

পশ্চিমবঙ্গে সন্ন্যাসিনী ধর্ষণে প্রতিবাদ কি রাজনৈতিক by জয়ন্ত ঘোষাল

অনেক দিন পর পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলার প্রত্যন্ত এক এলাকায় গেলাম। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রানাঘাট গিয়েছিলাম, যেখানে এক বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনীর উপর অমানবিক অত্যাচার হয়েছে বলে অভিযোগ। রাজধানী দিল্লিতে বসে রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিকে সব সময় জানা যায় না। স্পর্শ করা যায় না। অতীতে কখনও প্রণব মুখোপাধ্যায়, কখনও অজিত পাঁজা, কখনও বা বরকত গনিখান চৌধুরী অথবা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির মতো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ঘুরেছি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গেও গিয়েছি অনেক জায়গায়। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের জেলা সফর নতুন নয়। প্রফুল্ল সেন যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনিও তার গাড়িতে করে সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে জেলা সফরে যেতেন। তাদের সঙ্গে তাস খেলতেন। গান শুনতেন। কিন্তু, রানাঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার এ বারের সফর অটলবিহারী বাজপেয়ী-লালকৃষ্ণ আদবানির সঙ্গে অতীতের সফরের অভিজ্ঞতাকেও ছাপিয়ে গেল। রানাঘাটের ওই এলাকাটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত। যদিও এই গ্রামে ২৫ ডিসেম্বর যে ভাবে বড়দিন পালিত হয়, ঠিক সে ভাবে দুর্গাপুজোও হয়। জাতীয় সড়ক ধরে রানাঘাটে ঢোকার মুখে মমতা প্রথম দেখেন, সার সার লরি দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, এখানে কোনও রেলগেট আছে। কিন্তু, পরে তিনি জানতে পারেন, একটি মিছিল সেখান দিয়ে যাবে বলে সমস্ত লরি আটকে দেওয়া হয়েছে। লরিগুলির গন্তব্য ভিন্ রাজ্য। মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি জানতে পেরে বেজায় অসন্তুষ্ট হন। প্রশ্ন তোলেন, কেন এগুলিকে আটকে রাখা হবে? তার পর পুলিশকে বকতে বকতে নিজেই গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করেন। তখনও কিন্তু বিক্ষোভের কোনও আভাস ছিল না। মমতা প্রথমে স্কুলটি পরিদর্শন করলেন। তার পর গেলেন হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে দেখা করলেন সেই নির্যাতিতা সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে। হাসপাতালে বৈঠক করলেন বিশপদের সঙ্গে। এমনকী, রোম থেকে আসা পাদরি প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করলেন তিনি।  বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বললেন। এ বার ফেরার সময় হঠাৎই দেখা গেল মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আটকে দেওয়া হল। মুখ্যমন্ত্রী যে হেতু কোনও কনভয় ব্যবহার করেন না, তাই সে ভাবে পুলিশের কোনও কর্ডন ছিল না। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেক অল্পবয়সী ছাত্রছাত্রী যেমন ছিল, তেমনই অনেক মহিলাও ছিলেন। তারা স্লোগান দিতে লাগলেন, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আর কিছু লোক স্লোগান দিলেন, ‘সিবিআই তদন্ত চাই।’ পাদরিরা এসে বললেন, ম্যাডাম, আপনি এখান থেকে চলে যান। আর জেলা পুলিশের কর্তারাও বললেন, আপনি বেরিয়ে যান। বিক্ষোভে মাত্র দু’-চার জন রয়েছেন, তাদের সরিয়ে দেব আমরা। কিন্তু মমতা তখন ধনুকভাঙা পণ করলেন। গাড়িতে রাখা মাইক নিয়ে বললেন, “আন্দোলন থেকে উঠে এসেছি আমি। পুলিশের সাহায্য নিয়ে আমি বেরিয়ে যাব না। থাকতে হলে থাকব। সারা রাত থাকব। সিপিএম ও বিজেপি যৌথ ভাবে এই বিক্ষোভ করছে। আমি সরছি না এখান থেকে।” তখন পাদরিরা পড়ে গেলেন ফ্যাসাদে। তারা মমতার কাছে এসে ক্ষমা চাইছেন, আমরা দুঃখিত, আমরা এটা নিয়ে রাজনীতি করতে চাইছি না। উল্টো যে প্রধান পাদরি ছিলেন, তিনি মমতারই গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে হাতে মাইক নিয়ে ঘোষণা করলেন, আপনারা শান্তিপূর্ণ ভাবে মিছিল করছিলেন। শান্তিপূর্ণ ভাবে যে ভাবে শুরু হয়েছিল, সে ভাবেই শেষ হওয়া উচিত। আপনারা সরে যান। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা গেলেন না। পাদরিরা মমতাকে জানালেন, ঠিক ছিল কোনও দলের নয়, সমস্ত সাধারণ মানুষ হাতে মোমবাতি নিয়ে মিছিল করবেন। সকলে চেতনাসভা করবে। আর দোষীদের শাস্তির দাবি জানাবে। এরই মধ্যে স্থানীয় বিধায়ক, জেলা পরিষদের সভাপতিও এসে গিয়েছেন। উত্তেজনা তখন এমন জায়গায় পৌঁছায়, মনে হচ্ছিল বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তৃণমূলের মারামারি শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু, মমতা গাড়িচালককে উল্টো বললেন,  স্টার্ট বন্ধ করে দিতে। গাড়ির স্টার্ট চালু থাকলে বরং মনে হতে পারে, আমি চলে যাব। কিন্তু পাদরিদের অনুরোধের পরেও ভিড় কিছুতেই সরছে না। তখন মমতা তৃণমূলের কর্মীদেরই শান্ত করার চেষ্টা করলেন। মাইকে ঘোষণা করলেন, আমি চাইছি না বিক্ষোভকারীদের প্ররোচনায় কেউ পা দিক। তোমরা মারামারি কোরো না। পুলিশকেও বললেন, লাঠিচার্জ করবেন না। তাতেও পরিস্থিতি শান্ত না হওয়ায় পাদরিরাই বললেন, আমরা তা হলে চলে যাচ্ছি চেতনাসভায়। তারা চলে যাওয়ার পর মমতা গাড়ি স্টার্ট দিলেন। কিন্তু বিক্ষোভ তখনও চলছিল। মমতা শিবিরের আপাত ভাবে মনে হচ্ছে, সূর্যকান্ত মিশ্র সেখানে ঘুরে এসেছেন। বিজেপিও এটি নিয়ে রাজনীতি করছে। বিজেপি ও সিপিএম উভয়ে এটিকে রাজনৈতিক চাল হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু, মমতা তার পাল্টা স্লোগান তুললেন, বিজেপি-সিপিএম গো ব্যাক। মমতা দেখিয়ে দিলেন, লড়াকু মমতা এখনও মরে যায়নি। বুঝিয়ে দিলেন, বিরোধীরা রাজনীতি করলেও এটি আসলে একটি মানবিক বিষয়। সিপিএমের জমানাতেও এ ধরনের ঘটনা আমি প্রচুর দেখেছি। বানতলার ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সেই সময় মমতা রাইটার্সে এসেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ করেন। রানাঘাট থেকে কলকাতায় ফেরার পথে মাঝে একটি জায়গায় গাড়ি থামল। হরিণঘাটা। সেখানে মোহনপুর ফাঁড়িতে গেলেন মমতা। গিয়ে দেখলেন তিনটি ছেলে বন্দি। মমতাকে দেখেই তারা কাঁদতে শুরু করে। তারা বলে, ডানকুনি থেকে এসে লাল পতাকা উড়িয়েছিল বলে তাদের ধরে রাখা হয়েছে। কিন্তু পুলিশের মতে, ভিড়ের মধ্যে তারা উত্তেজনা ছড়াচ্ছিল। মমতা শুনে ছেলেগুলিকে বললেন, লাল পতাকা নিয়ে দুষ্টুমি করেছ, সেটা কিছু নয়। কিন্তু প্ররোচনা দিয়েছ কেন? ছেলেগুলি বলল, তারা পরীক্ষা দিতে এসেছিল। এর পর মমতা থানার ইন-চার্জকে ওদের ছেড়ে দিতে বললেন। ছাড়া পাওয়ার পর মমতা তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা খেয়েছো? ওরা বলে, না। মমতা তার পর এক হাজার টাকা ওদের হাতে দিয়ে বললেন, পেট ভরে খেয়ে নাও। আর অন্য কোনও দলের প্ররোচনায় পড়ো না। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে রানাঘাট সফরে এসে কিন্তু একটি বিষয় মনে হচ্ছে, কোথায় পশ্চিমবঙ্গ উন্নয়নের পথে যাবে, ভবিষ্যত্ গড়ার কাজে নিযুক্ত হবে! কিন্তু, কলকাতা ফিরতে ফিরতে মনের মধ্যে প্রশ্ন উঠল, এই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ কী? স্কুল থেকেই কি বিক্ষোভের প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে? তা হলে তাদের পড়াশোনা, জীবনের অন্যান্য অগ্রাধিকারের কী হবে? সিপিএম জমানায় গোটা রাজ্যে যা হয়েছে, এই জমানাতেও একই জিনিস হচ্ছে। গোটা রাজ্য যেন আগ্নেয়গিরি হয়ে রয়েছে। যে কোনও ঘটনা ঘটুক, সেটি আর অরাজনৈতিক ভাবে দেখা হয় না। হয় সেটি তৃণমূলের, না হয় বিজেপি-র বা সিপিএমের। অন্য রাজ্যে সাম্প্রদায়িক বা জাতপাতের মেরুকরণ দেখি। পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির মেরুকরণ। বস্তুত, এই মমতাই এক দিন বিরোধী নেত্রী হিসেবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছেন। সেই ক্ষোভকে পরিণত করেছেন রাজনৈতিক বিক্ষোভে। রাজনৈতিক পালাবদল ঘটিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু, মমতা ক্ষমতায় আসার তিন বছর পরে স্বাভাবিক ভাবেই শাসক দলকে ঘিরে ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম হয়েছে। নানা জায়গায় নানা কারণে বিক্ষোভ দানা বাঁধছে। আর এখন এর ফয়দা তুলতে সচেষ্ট হচ্ছে সিপিএম এবং বিজেপি। এক বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনীর উপরে নৃশংস অত্যাচারের ঘটনার পরে যে বিক্ষোভ ক্রমেই ঝড়ের আকার নিচ্ছে তা নিঃসন্দেহে মমতার বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু, অতীতের মতো এই জমানাতেও বিরোধীরা এই নাগরিক বিক্ষোভে রাজনীতির রং লাগাতে সচেষ্ট। এই পরিস্থিতি দেখে অনেকে বলতেই পারেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কিন্তু এতে আখেরে পশ্চিমবঙ্গের কী হচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গ কোথায় যাচ্ছে? এই পরিস্থিতির কি বদল হবে না? এর থেকে সত্যিই কি মুক্তি নেই? এটা ভাবতে ভাবতেই ফিরলাম কলকাতায়। জয়ন্ত ঘোষাল: নয়া দিল্লি ব্যুরো চিফ, আনন্দবাজার পত্রিকা

একাত্তর, যেভাবে শুরু by হাসান ফেরদৌস

সালমান রুশদি তাঁর শেইম উপন্যাসে পাকিস্তানকে বর্ণনা করেছেন ‘আ কান্ট্রি নট সাফিশিয়েন্টলি ইমাজিন্ড’। তাঁর কথায়, দেশটি বানানো হয়েছিল জোড়াতালি দিয়ে। যে ভূমিখণ্ড নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান, তার নেতারা জন্মেছিলেন সে দেশের বাইরে। স্বাধীনতার পর দেশটি বরাবর লড়াই করেছে ইতিহাসের দুই ধারার সঙ্গে—একদিকে ওপর থেকে আরোপিত ইতিহাস, অন্যদিকে যুগ যুগ ধরে চলে আসা ইতিহাস। দেশটির বিভিন্ন অংশের সম্পর্কও বরাবর ছিল বিরোধপূর্ণ। রুশদি লিখেছেন, এ এমন এক দেশ, যার নির্মাণের পেছনের
স্বপ্ন ছিল অসম্পূর্ণ। হয়তো দেশটা এমন, যা নিয়ে যথেষ্ট কল্পনাই ছিল না।
রুশদি ঠিকই ধরেছেন। স্বাধীনতার জন্য চাই মনের মধ্যে একটা স্বপ্ন, যে স্বপ্ন অবলম্বন করে দেশের মানুষ বৈরী শক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে নামে। যার যা আছে, তা-ই নিয়ে চলে সে লড়াই। পাকিস্তানের জন্মকে ‘অসম্পূর্ণ স্বপ্নের প্রকাশ’ বলা হলেও একই কথা বলা যাবে না তার পূর্বাংশকে নিয়ে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, সেখানে পাকিস্তানের কোনো ঠাঁই ছিল না। মাত্র ২৪ বছর লেগেছিল ভিন্ন সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে।
বস্তুত, একটি ভিন্ন, স্বতন্ত্র দেশের কথা পাকিস্তানের পূর্বাংশের মানুষ নিজেদের মনে এঁকে নেয় দেশভাগের আগেই। ১৯৪৭ সালের জুন মাসে, অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির দুই মাস আগে গণ-আজাদী লীগ এক ইশতেহার প্রকাশ করে স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে এভাবে:
‘রাজনৈতিক স্বাধীনতার মূল্যই নাই, যদি স্বাধীনতা জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়ন না করে।...আমরা স্থির করিয়াছি, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আমরা সংগ্রাম চালাইয়া যাইতে থাকিব।’
অন্য কথায়, পাকিস্তান গঠনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান হয়তো একটি নতুন পতাকা পাবে, কিন্তু দেশের মানুষের পরাধীনতা দূর হবে না। রাজনৈতিক স্বাধীনতা যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সম্প্রসারণ, এই মার্কসীয় তত্ত্বটি গণ-আজাদী লীগের নেতা-কর্মীদের জানা থাক বা না থাক, তাঁরা ঠিকই বুঝেছিলেন, যে মধ্যস্বত্বভোগী অর্থনৈতিক কাঠামো পাকিস্তানের জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তাতে বাঙালির মুক্তি আসবে না। দেশভাগের এক বছর না পেরোতেই ভাষার প্রশ্নে যে আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে, বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্ণয়ের সেই লড়াইয়েও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটি প্রচ্ছন্ন ছিল। বাংলার বদলে উর্দু চাপানোর চেষ্টা হবে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধিকার গলা টিপে মেরে ফেলা—এ কথা প্রথম সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। দেশভাগ হতে না হতেই তিনি লিখলেন, ‘...বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দি ভাষা গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতার নামান্তর হইবে।...ইহা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতি বহির্গতও বটে।’
সে কথা আরও খোলামেলাভাবে প্রকাশ করেন ড. এনামুল হক। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে এক নিবন্ধে তিনি যুক্তি দেখালেন, বাঙালির ওপর উর্দু চাপিয়ে দিলে শুধু যে তার সাংস্কৃতিক মৃত্যু হবে তা-ই নয়, তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মৃত্যুও ঘটবে। ‘এই রাষ্ট্রীয় ভাষার সূত্র ধরিয়া শাসন, ব্যবসা, বাণিজ্য ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান হইবে উত্তর ভারতীয় ও পশ্চিম পাকিস্তানি উর্দুওয়ালাদের শাসন ও শোষণের ক্ষেত্র, যেমন ভারত ছিল ইংরেজি রাষ্ট্রভাষার সূত্রে ইংরেজদের শাসন ও শোষণের ক্ষেত্র।’
অন্য কথায়, পাকিস্তান নামের দেশটি শুধু নামে নতুন হবে, কিন্তু বাস্তব অর্থে বাঙালির ওপর ঔপনিবেশিক শাসনের কোনো পরিবর্তনই হবে না। পরিবর্তন আসবে শুধু ক্ষমতার হাতবদলের মাধ্যমে, যেদিন বাঙালি নিজেই নিজের ভাগ্যবিধাতা হবে। পূর্বাংশের নেতারা স্বাধীনতার এই চেতনাটি খুব সুপরিকল্পিতভাবে প্রোথিত করতে সক্ষম হন দেশভাগের একদম গোড়া থেকে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনেরও আগে থেকে। তবে ভাষা আন্দোলন যে তাকে একটি মজবুত গাঁথুনির ওপর বসায়, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের কাছে স্বাধীনতার প্রশ্ন কিছুটা বিমূর্ত মনে হওয়া ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু ভাষার মতো নিত্যদিনের একটি বিষয় যখন সামনে এসে দাঁড়াল, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর কোনো বাধা থাকল না।
ভাষা আন্দোলনের একটি জনপ্রিয় চরিত্র ছিল। ভাষার দাবিটির সারার্থ দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সহজ ছিল, কারণ এর সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের রুটি-রুজির প্রশ্ন। তাদের সন্তান–সন্ততির কর্মসংস্থানের প্রশ্ন। সে জন্য এই আন্দোলন শুধু শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে সীমিত থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছিল দেশজুড়ে। ঠিক সে কারণে এই আন্দোলনের অগ্রবাহিনী হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিলেন ছাত্ররা।
পরবর্তী ইতিহাস আমাদের জানা। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী বিজয় ছিল বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের প্রথম সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। যে কথাটা এত দিন মনের মধ্যে গোপনে বেজে চলেছিল, যুক্তফ্রন্টের অভাবনীয় বিজয়ের ফলে এবার তা সরব হওয়ার সুযোগ পেল। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ঘোষণা করেন, তিনি (পূর্ব পাকিস্তানের) স্বাধীনতার পক্ষপাতী। ২২ মে করাচিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে ফজলুল হক জানান, মন্ত্রিসভা গঠনের পর যে প্রশ্নটি সর্বাগ্রে আলোচিত হবে, তা হলো পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা। কত দ্রুত স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হবে, সে বিষয়ে তার কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা নেই। ‘তবে আমার মন্ত্রিসভার জন্য অন্যতম প্রধান কাজই হবে স্বাধীনতার বিষয়টি বিবেচনা করা।’
হতে পারে স্বাধীনতা ও স্বাধিকার—এ দুটি বিষয় গুলিয়ে ফেলেছিলেন হক সাহেব, যে কারণে ক্ষমতা গ্রহণের তিন মাসের মাথায় পাকিস্তান সরকার তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে মুসলিম লিগকে ভোট না দিয়ে বিচ্ছিন্নতাপন্থী একটি জোটের পক্ষে ভোট দেন, তা থেকেই স্পষ্ট, নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষেই তাঁরা রায় দিয়েছিলেন।
সে ঘটনার মাত্র ১৬ বছর পর অনুষ্ঠিত হয় আরেক ঐতিহাসিক নির্বাচন। তাতে দেশের মানুষ এমন একজন নেতার পক্ষে তাঁদের রায় ঘোষণা করেন, কয়েক মাস আগেও যাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল দেশভাগের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। তার পরের ঘটনা তো আমাদের সবারই জানা।
না, অপরিকল্পিত আকস্মিকতার ফলে স্বাধীনতা আসেনি বাংলাদেশের। পাকিস্তান হয়তো পর্যাপ্ত স্বপ্ন ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সৃষ্টি ছিল মুক্তিপাগল এক জাতিগোষ্ঠীর স্বপ্ন ও সাধনার ফসল।
নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিবেদক।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর: মৌখিক ইতিহাসের অনন্য সংগ্রহশালা by একরামুল হুদা

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। আজ থেকে ৪৩ বছর আগের ঘটনা। সে সময় যাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন তাঁদের অনেকেই নেই। মানুষের জন্ম মৃত্যুর বাস্তবতায় একসময় আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রত্যক্ষদর্শীও। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মকে জানতে হবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গৌরবের সে ইতিহাস। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রেখে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গড়ে তুলেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি বিশাল সংগ্রহ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আছে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিত প্রায় ২৩ হাজারের মতো ঘটনার একটি সংগ্রহ। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এসব ঘটনা। তাই এগুলোকে বলা হচ্ছে ‘ওরাল হিস্ট্রি’ বা মৌখিক ইতিহাস। ওরাল হিস্ট্রি হলো যেকোনো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অডিও, ভিডিও, কাগজে লিখে, কম্পিউটারে বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে সংরক্ষণ করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বলেন, ইতিহাস রচনায় মৌখিক ইতিহাস বা ওরাল হিস্ট্রি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্থানীয়ভাবে যে মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করছে সেগুলো প্রত্যেক এলাকার আঞ্চলিক ইতিহাস হয়ে উঠছে। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এ আঞ্চলিক ইতিহাস।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা থেকে মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহের এ কাজটি প্রথম বাংলা একাডেমি শুরু করে বলে জানান ইতিহাস গবেষক আফসান চৌধুরী। তিনি বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমি এ কাজটি করে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের ৭ম খণ্ডে বাংলা একাডেমির এসব সংগ্রহ লিপিবদ্ধ করা আছে। তিনি জানান, এরপর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের ইতিহাস সংগ্রহের কোনো কাজ না হলেও ব্যক্তিগতভাবে কিছু কাজ হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের শিক্ষা কর্মসূচির প্রকল্প সমন্বয়কারী রণজিত কুমার বিশ্বাস জানান, ২০০৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রমের মাধ্যমে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৫৫টি জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগৃহীত হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে ঢাকায় অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিভিন্ন জিনিস প্রদর্শন করে। প্রদর্শনীর পর স্কুল শিক্ষার্থীদের বলা হয়, বাড়ির বা আশপাশের যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁদের কাছ থেকে সে সময়ের বিভিন্ন ঘটনা শুনে তা লিখে একজন শিক্ষকের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠাতে। লিখিত ঘটনার মধ্যে বর্ণনাকারীর নাম, বয়স ও মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবদান উল্লেখ থাকে। হাতে লেখা এসব ঘটনা পাওয়ার পর তা যাচাই বাছাই করা হয়। সত্যতা নির্ণয় করা হয় বিভিন্ন মাধ্যমের সাহায্যে। এরপর সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়। সাধারণত তিনভাবে ঘটনাগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়, হাতে লেখা কপি, কম্পিউটার কম্পোজ এবং বই আকারে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগৃহীত মৌখিক ইতিহাসগুলো দিয়ে এ পর্যন্ত তিনটি বই প্রকাশ করা হয়েছে।
রণজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, সংরক্ষণের এ পদ্ধতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ওই ব্যক্তি, স্কুলশিক্ষক ও শিক্ষার্থী—এ তিন প্রজন্মকে একই সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তিনি বলেন, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পৌঁছানো ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষকদের সাহায্য করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এগুলোকে সরাসরি ইতিহাস না বলে আমরা ইতিহাসের উপকরণ বলে গণ্য করছি।
প্রায় ২৩ হাজার মৌখিক ইতিহাসের সংগ্রহশালা নিঃসন্দেহে একটি বড় সংগ্রহ। এটা স্বীকার করলেন জর্জিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ‘ওরাল হিস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের’ নির্বাহী পরিচালক ক্লিফ কুন। এ বিষয়ে ই মেইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কোনো একটি একক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এটি অনেক বড় একটি সংগ্রহ। বিশ্বের এ ধরনের অন্যান্য সংগ্রহের মধ্যে নিঃসন্দেহে এটি বড় সংগ্রহের তালিকার প্রথম দিকেই থাকবে।’

ছাব্বিশে মার্চ রাজনৈতিক সদাচারে প্রেরণা জোগাক by আহমদ রফিক

ছাব্বিশে মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে চিহ্নিত। মূলত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বাঙালিবিরোধী অভিযান এবং ঢাকায় সেই রাতে সূচিত গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় স্বাধীনতার আহ্বান নিয়ে ছাব্বিশে মার্চ দিনটির আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে উঠে আসা। এর পর থেকে দিনটির উদ্যাপন স্বাধীনতা দিবস হিসেবে। তবে নানা ঘটনার সুবাদে গোটা মার্চ মাসটি স্বাধীনতার মাস হিসেবে রাজনীতি-সংস্কৃতিসেবী বাঙালির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
মার্চের সেই উদ্যাপন এ বছর আনেকটাই ব্যাহত হয়েছে রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতার কারণে। বিগত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে বিএনপি জোট ঘোষিত ‘শান্তিপূর্ণ অবরোধ ও হরতালের’ নামে যে সহিংসতা, নাশকতা ও প্রতিদিন পেট্রলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারার রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা স্বাধীনতার মাসটিকেও ছাড় দেয়নি। ছাড় দেয়নি পরীক্ষার্থীদেরও।
এই ‘শান্তিপূর্ণ’ হরতালের বৈশিষ্ট্য এক কথায় সহিংসতা ও নাশকতা, অবাঞ্ছিত মৃত্যু, অগ্নিদগ্ধ মানুষের যন্ত্রণা। স্বভাবতই হরতালের কয়েক দিন পরই দেখা গেল মানুষ হরতালের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। তারা প্রাত্যহিক প্রয়োজনের টানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। রাস্তায় রকমারি যানবাহন চলছে। ঢাকার রাজপথে বহুল দৃষ্ট যানজট। এক কথায় মানুষ হরতাল প্রত্যাখ্যান করছে। সরকার কঠোরভাবে নাশকতা মোকাবিলার চেষ্টা চালাচ্ছে পুরোপুরি সফল না হওয়া সত্ত্বেও। মোদ্দা কথাটি হচ্ছে, সরকারের অনড় অবস্থানের কারণে দুই মাসের লাগাতার হরতাল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থই বলা চলে।
তবু স্বীকার করতে হয়, সারা দেশে এক ভয়াবহ অস্থিরতা বিরাজ করছে। মানুষ যথারীতি কাজ করছে ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে। দূরপাল্লার বাস-ট্রাক চলছে নাশকতার ভয়ে অনেক সতর্কতা নিয়ে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলছে রেলগাড়িও। নাশকতা ও মৃত্যুর ঘটনা কমে এলেও তা বন্ধ হয়নি। কিন্তু সরকার সমঝোতার পথে হাঁটতে নারাজ। অন্যদিকে বিএনপি জোটের কর্মসূচিও অব্যাহত রয়েছে।
এমন এক অস্বাভাবিক অবস্থায় বিএনপি নেত্রীর সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণায় মানুষ আশা করেছিল যে হরতাল-অবরোধের যন্ত্রণা থেকে হয়তো মুক্তি পাওয়া যাবে, নতুন কোনো নমনীয় কর্মসূচির ঘোষণা আসবে। কিন্তু না, মানুষকে হতাশ করে নেত্রীর ঘোষণা: হরতাল-অবরোধ চলছে, চলবে। এমনকি সংবাদ সম্মেলনে যথারীতি সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ দেননি তিনি। তাঁর বক্তব্যে নমনীয়তার সুর থাকলেও সরকারি দলের নীতি ও অবস্থানে কোনো পরিবর্তন ঘটতে দেখা যাচ্ছে না।
ফলে জাতীয় জীবনে অনিশ্চিত অস্থিরতা সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে ঘিরে। স্বভাবতই তা স্পর্শ করছে কমবেশি সব শ্রেণির মানুষকে। করছে শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী থেকে শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের। শেষোক্ত শ্রেণি তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়েছে সরকার ও বিএনপি জোটের প্রতি অবস্থা স্বাভাবিক করার আবেদন জানিয়ে। কিন্তু সংকট থেকে মুক্তির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এমন এক পরিস্থিতিতে সংকট নিরসনে দলীয় বুদ্ধিজীবীদের উদাসীনতা আমাদের অবাক করে। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে দেশের শিক্ষিত শ্রেণি দ্বিদলীয় আনুগত্যের অন্ধতায় বাধা পড়ে গেছে। এমনকি এলিট শ্রেণিও, দেশ ও জাতির স্বার্থে যাদের নিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবস্থানে থাকার কথা। তাদের মেধা, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় রাজনীতির সঠিক দিকনির্দেশ করার কথা। যে ক্ষুদ্রসংখ্যক মানুষ নিরপেক্ষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, তাঁদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হচ্ছে না। দেশ একটি তামসিক জড়ত্বের মধ্যে সময় পার করছে। এর বিরুদ্ধে মানুষ রুখে দাঁড়ানোর আগ্রহ বোধ করছে না। এ অবস্থা সমাজের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
দুই
অবস্থা বিচারে মনে হচ্ছে হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি চলতেই থাকবে, যদিও হরতাল তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ হরতাল ডাকা দলের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠবে, একসময় হয়তো তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবে। আওয়ামী লীগ কি সেই দিনটির অপেক্ষা করছে, যখন ব্যর্থ হরতালে বিএনপির জনসমর্থনের ভিতটি নড়বড়ে হয়ে যাবে?
হয়তো এমন বিবেচনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক কেউ কেউ মনে করেন, বিরাজমান পরিস্থিতিতে বিএনপির উচিত অর্থহীন হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করে জনস্বার্থমূলক কর্মসূচির বাস্তব অবস্থান গ্রহণ করা, যা জনসমর্থন আকর্ষণ করতে পারে। এই মুহূর্তে যে কারণে হোক মানুষ কারও ক্ষমতা দখল বা কারও ক্ষমতা রক্ষার রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ বোধ করছে না। মানুষ নিজ স্বার্থের বিষয়টি ভালো রকমই বোঝে। সেদিক থেকে বিচার করলে এই মুহূর্তে বিএনপি ভুল রাজনীতির বাসে চেপে বসেছে। এ পথে তার জনভিত্তি মজবুত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে বর্তমানে নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য যে বার্তা নিয়ে আসছে, তা–ও খুব মঙ্গলদায়ক নয়। সামাজিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের বড় আপদ সমাজবিরোধী দুর্বৃত্তশক্তি ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদী অপশক্তির বিস্ফোরক তৎপরতার অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ বৃদ্ধি। ওরা ঘোলা পানিতে শিকার করতে দক্ষ। আর স্থানীয় ধর্মীয় জঙ্গিবাদের আন্তর্জাতিক সমর্থনের বিষয়টি কারও অজানা নয়।
এই অবাঞ্ছিত চাপ যদি যথেষ্ট শক্তিমান হয়ে ওঠে, তবে তা ক্ষমতাহীন দলের জন্য অশুভ ঘণ্টাই বাজাবে। এবং তা শুধু বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই নয়, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্যও বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সামাজিক অপরাধ খুন-খারাবির প্রবলতা সমাজে যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে, তার যোগফল অপশক্তির পক্ষেই যাওয়ার কথা, সরকার ও তার আইনশৃঙ্খলার পক্ষে নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক অবস্থা গুম, খুন, নারী নির্যাতন, শিশু হত্যা এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর অপরাধপ্রবণতা সামাজিক নৈরাজ্যের দিকেই হাঁটতে শুরু করেছে। কে বলতে পারে মৌলবাদী জঙ্গি শক্তি এ সুযোগ নেবে না? সম্প্রতি গোয়েন্দা সূত্রের এক খবরে প্রকাশ যে কট্টর শক্তিমান জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো নাকি জাতীয় স্থাপনায় আঘাত হানার পরিকল্পনা করছে। অনুকূল পরিবেশে তেমন কিছু ঘটানোর সামর্থ্য তাদের রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমানে শক্তিমান জঙ্গিগোষ্ঠীর সংখ্যা নেহাত কম নয়।
পরিস্থিতির সার্বিক বিবেচনায় ক্ষমতাসীন দলের আত্মতৃপ্তির বড় একটা সুযোগ নেই। বড় কোনো ধ্বংসাত্মক ঘটনার আগে জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি দরকার রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে কঠোর সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে। তবে সেই ব্যবস্থা যেন গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে লঙ্ঘন না করে।
অস্বীকারের উপায় নেই যে বর্তমান সংকট ব্যক্তি ও দলবিশেষের ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নিলেও এর চরিত্র রাজনৈতিক। তাই সমস্যা বা সংকট সমাধানের পথটাও রাজনৈতিক। এ সত্য বিবদমান উভয় পক্ষকে স্বীকার করে নিয়েই এগোতে হবে। এবং সামাজিক অস্থিরতার নিরসন ঘটাতে ক্ষমতাসীন সরকার দায়বদ্ধ। তবে সেই দায় অস্থিরতার স্রষ্টা দলও অস্বীকার করতে পারে না।
এ অবস্থায় উভয় পক্ষকেই সমাজ ও জনস্বার্থের বিবেচনা মাথায় রেখে সমঝোতা বা মীমাংসার উপায় খুঁজতে হবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে এটা তাদের দায়বদ্ধতা। পদক্ষেপ একই সঙ্গে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে হারজিতের কোনো প্রশ্ন নেই। যে অবরোধ-হরতাল ও তজ্জনিত সাধারণ মৃত্যুর সূচনা ঘটিয়েছে বিএনপি জোট, তার রাজনৈতিক দায় স্বীকার করে দায়মুক্তির রাজনৈতিক পথ ধরে এগোনোর কোনো বিকল্প তার হাতে নেই। এর বড় কারণ, তার কর্মসূচির ব্যর্থতা।
আমাদের বিবেচনায় বিএনপিকে তাই জনবিরোধী হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করে জাতীয় স্বার্থ ও জনস্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সমঝোতার পদক্ষেপ নিতে হবে, জেদ এ ক্ষেত্রে ক্ষতিকরই হবে। পাশাপাশি সরকারপক্ষের উচিত বিএনপিকে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের অনুমতি দিয়ে সংকটের বরফ গলতে সাহায্য করা। প্রয়োজনে সম্ভাব্য নাশকতা রোধে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এভাবে সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটাতে না পারলে সামাজিক অস্থিরতা ও নাশকতার অবসান ঘটবে না। জাতীয় অর্থনীতি ক্রমেই বিপর্যস্ত হতে থাকবে, যা কোনো পক্ষের কাম্য হওয়ার কথা নয়।
আমাদের রাজনীতির একটি বড় সমস্যা সদাচারের অভাব। যেমন বক্তব্যে, তেমনি আচরণে। গণতান্ত্রিক সদাচারে এক পা এগিয়ে যাওয়া তাদের কাছে হার বলে মনে হয়। এ ক্ষেত্রে বিদেশি উদাহরণ তাদের বোধোদয় ঘটায় না। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনমনীয় জেদ ও অনড় অবস্থানের পক্ষে যুক্তি নেই। তাতে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।
এসব কথা মাথায় রেখে জাতীয় জীবনের তাৎপর্যপূর্ণ দিন ছাব্বিশে মার্চকে রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় অর্থবহ করে তুলতে রাজনৈতিক দলগুলোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এটা উপলক্ষ। আমাদের প্রত্যাশা, ছাব্বিশে মার্চ বিবদমান দলগুলোকে সদাচারের স্বাদেশিকতায় উদ্বুদ্ধ করে সংকটের অবসান ঘটাক। সমঝোতা শুরু হোক সিটি নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।
আহমদ রফিক: প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র গবেষক।