Showing posts with label ব্রাহ্মণবাড়িয়া. Show all posts
Showing posts with label ব্রাহ্মণবাড়িয়া. Show all posts

Sunday, February 15, 2026

আমি একা এমপি হইনি, আমার পাঁচ লাখ ভোটার এমপি হয়েছেন -সাক্ষাৎকারে রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রুমিন ফারহানা ৩৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। পরে দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর বিপরীতে বিএনপি সমর্থন দিয়েছিল মিত্র দলের এক প্রার্থীকে। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর গ্রামে নিজ বাসায় প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন আলোচিত এই নারী প্রার্থী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভংকর কর্মকারবদর উদ্দিন

প্রথম আলো: শুরুতেই এই বিজয়ের বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই।

রুমিন ফারহানা: প্রথমেই আমি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আমাকে মাঠে টিকে থাকার শক্তি ও সাহস দিয়েছেন। আমার এলাকার নেতা–কর্মী ও আসনের প্রত্যেক ভোটারের প্রতি আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁরা আমাকে সাহস দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন এবং পাশে থেকেছেন। তাঁরা অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন; শ্রম দিয়েছেন। একেকজন কর্মী কতটা কষ্ট করেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দিনের পর দিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন। অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাননি। এই জয় আমার একার নয়, এটি আমার নেতা–কর্মীদের জয়। এমনকি যাঁরা আমাকে ভোট দেননি, কঠোর সমালোচনা করেছেন বা অশোভন ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তাঁদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। কারণ, তাঁদের আচরণ অনেক সাধারণ মানুষকে আমার পক্ষে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার আসনের প্রায় পাঁচ লাখ ভোটারের প্রত্যেকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
প্রথম আলো: ভোট নিয়ে আপনার সন্তুষ্টি কতটা?

রুমিন ফারহানা: আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা ছাড়া এই এলাকায় সুষ্ঠু ভোট সম্ভব হতো না। প্রশাসন পুরোপুরি আমার বিপক্ষে ছিল। প্রশাসন যেকোনো মূল্যে বিএনপির জোটের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করেছে। শুরু থেকেই প্রশাসন আমার সঙ্গে বৈষম্যমূলক, অবমাননাকর আচরণ করেছে। বিএনপির নেতা–কর্মীরা সমানে আইন ভঙ্গ করলেও প্রশাসন চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। প্রশাসন কানা–বোবা হয়ে ছিল। তবে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকায় না থাকলে আমি ভোট করতে পারতাম না। পুলিশও সহযোগিতা করেছে। যেখানেই অনিয়ম হয়েছে, আমি সেনাবাহিনীকে জানিয়েছি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছে। কেউ আমার কাছে কোনো অনৈতিক সুবিধা দাবি করেনি, আমিও কাউকে কিছু দিইনি।
প্রথম আলো: আপনি বিএনপির রাজনীতি করতেন। দল মনোনয়ন না দেওয়ায় স্বতন্ত্র নির্বাচন করলেন। ধানের শীষে নির্বাচন না করায় ভোটের মাঠে কি কোনো প্রভাব পড়েছিল?

রুমিন ফারহানা: নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তার কারণ, গত ১৮ মাসে বিএনপি যা করেছে, আমি যদি তাদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতাম, সেই কর্মকাণ্ডের দায় আংশিকভাবে আমার ওপরও আসত। তবে আমি ওই সময় প্রকাশ্যে অনেক বিষয়ে সমালোচনা করেছি। ফলে দল মনোনয়ন না দেওয়াটা আমার জন্য এক অর্থে আশীর্বাদই হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত কাজ, পারিবারিক ঐতিহ্য ও এলাকার মানুষের আস্থা—এসব মিলিয়েই আমি জয় পেয়েছি। বিএনপির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকাটা আমার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে বলেই মনে করি।

প্রথম আলো: নির্বাচনের সময় আপনাকে ও আপনার সহযোগীদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে দল ফেরাতে চাইলে আপনার অবস্থান কী হবে?

রুমিন ফারহানা: এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে কিছু ভাবিনি। সময়ই সিদ্ধান্ত দেবে।
প্রথম আলো: আপনার জয়ে নারী ভোটারদের ভূমিকা কতটা ছিল?

রুমিন ফারহানা: নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল। অনেকে বলছেন, স্বামী হয়তো অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন, তবে স্ত্রী বলেছেন, তিনি আমাকে ভোট দেবেন। আমি নারী ভোটারদের আশ্বাস দিয়েছি, তাঁরা সহজে আমার কাছে আসতে পারবেন; নিজেদের সমস্যা জানাতে পারবেন এবং আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াব, যা অন্য অনেক প্রার্থীর পক্ষে কঠিন। নারীরা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। বলা যায়, তাঁদের একচেটিয়া সমর্থন আমি পেয়েছি। তাই তাঁদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতাও অনেক বেশি।
প্রথম আলো: ভোটের প্রচারণায় আপনি অনেক সাধারণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে যদি বলেন...

রুমিন ফারহানা: গত দুই সপ্তাহে আমার এলাকায় ৪০-৫০টি কর্মসূচি হয়েছে। সপ্তাহে দু-তিনটিও হয়েছে। একটি টাকাও নেতা–কর্মীরা আমার কাছ থেকে নেননি। নির্বাচনের সময় দরিদ্র মানুষ এক হাজার টাকা এনে দিয়েছেন। মধ্যবিত্তরা এক-দুই লাখ টাকা দিয়েছেন। অনেক প্রান্তিক মানুষ তাঁদের এক বছরের সঞ্চয় এনে দিয়েছেন। আমি নিতে চাইনি, তবু তাঁরা জোর করে দিয়েছেন। এ কারণে আমি বলি, আমি একা এমপি হইনি, আমার পাঁচ লাখ ভোটার এমপি হয়েছেন।
প্রথম আলো: সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার কাজের তালিকায় অগ্রাধিকার কী থাকবে?

রুমিন ফারহানা: আমার প্রথম অগ্রাধিকার অবকাঠামো, বিশেষ করে রাস্তাঘাট। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। আমাদের এখানে গ্যাসক্ষেত্র আছে, কিন্তু অনেকের ঘরে গ্যাস নেই। আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ গ্যাস পাবে, এটা নিশ্চিত করতে চাই। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মন্দির-মসজিদসহ শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন করতে চাই। আশুগঞ্জ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে গ্যাস, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও বন্দর আছে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে চাই, যাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
প্রথম আলো: সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা সদরকে পৌরসভা করার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাবে?

রুমিন ফারহানা: অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাই।
প্রথম আলো: এবারের সংসদেও নারী প্রতিনিধিত্ব কম থাকছে। নারীর অধিকার ও সম–অধিকার নিয়ে আপনি কতটা সোচ্চার থাকবেন?

রুমিন ফারহানা: আমি অবশ্যই সোচ্চার থাকব। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে কারও অধিকার কেউ কাউকে এনে দেয় না, অর্জন করে নিতে হয়। ধরুন, আমাকে তো দল মনোনয়ন দেয়নি। দল কি জানত না, আমার এলাকায় আমার কী অবস্থান? আর যদি না জেনে থাকে, সেটা দলের ব্যর্থতা। কিন্তু দল মনোনয়ন দেয়নি। আমাকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছে আল্লাহ্‌র ওপর ভরসা করে; মানুষের ওপর ভরসা করে। বিএনপি নারীদের বিষয়ে খুব সম–অধিকারের কথা বলে। আমরা তো দলে এ কারণেই গিয়েছিলাম যে নারী হিসেবে আমি বৈষম্যের শিকার হবে না। তারা কেন ৩ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেয়? বিএনপিতে নারীদের এই অবস্থান জানলে আমি কখনোই বিএনপি করতাম না।
প্রথম আলো: জাতীয় সংসদে আপনি স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে থাকবেন। সরকারি দলে থাকলে কি সুবিধা বেশি হতো?

রুমিন ফারহানা: আমি তা মনে করি না। বরাদ্দ সবার জন্য সমান। সততার সঙ্গে কাজ করতে চাইলে স্বতন্ত্র হিসেবেও সম্ভব। কেউ যদি অযথা বাধা দেন, তার জবাব জনগণ দেবে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
রুমিন ফারহানা: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

রুমিন ফারহানা
রুমিন ফারহানা

Thursday, February 12, 2026

নিজের তিন কর্মীকে বিনা দোষে আটকের অভিযোগ রুমিন ফারহানার

নিজের দুই কর্মীকে বিনা দোষে আটকের অভিযোগ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িযা-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, নয়টি ভোটকেন্দ্রে তাঁর এজেন্টদের বের করে দেওয়ার হয়েছে।

আজ সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে শাহবাজপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রুমিন ফারহানা নিজের ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের এসব অভিযোগ করেন।

ভোট কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে রুমিন ফারহানা বলেন, ভোট শুরু হয়েছে দুই ঘণ্টা হয়েছে। সারা দিনের ভোট বাকি। ফলে এখনই বলা যাবে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমার তিনজন কর্মীকে বিনা দোষে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া নয়টি ভোটকেন্দ্রে আমার এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আমি পুলিশ আর্মি ও প্রশাসনকে জানিয়েছি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল রাত ১ টার পর আশুগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও পূর্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র থেকে আনোয়ার হোসেন মৃধা ও নূর আলমকে আটক করে পুলিশ। আর গত রাতে আশুগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের সোহাগপুর আছিয়া সফিউদ্দীন আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র থেকে যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা নাছির মুন্সিকে আটক করে পুলিশ। তারা তিনজন রুমিন ফারহানার পক্ষের কর্মী।

জানতে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মনজুর কাদের ভূইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ভোট কেন্দ্রে নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের আটক করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ৯ জন প্রার্থী থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আটজন। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা ও বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের মধ্যে। জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধা গত রোববার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

ভোট দিচ্ছেন  রুমিন ফারহানা
ভোট দিচ্ছেন রুমিন ফারহানা। ছবি: প্রথম আলো

Monday, January 26, 2026

‘জাল ভোট ও কারচুপি প্রতিরোধে কেন্দ্রের পাহারায় থাকবেন’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের একাংশ) স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, হাঁস হলো সমৃদ্ধির প্রতীক। ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতীক। হাঁস নতুন শান্তির প্রতীক। তাই এইবারের ভোটটা হবে হাঁস মার্কায়। সরকারকে আমরা আয়কর দেই; যাতে সরকার আমাদের উন্নয়নমূলক কাজগুলো করেন। বিনামূল্যে আমরা যাতে স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারি। তাই সরকারে যেই আসুক না কেন আমি একজন স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী হিসেবে সেই সরকারকে বাধ্য করবো যাতে আমার এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পায়। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের (ফতেহপুর, পরমানন্দপুর, হরিপুর, বড়ুইচাড়া, ষাটবাড়িয়া) বাসিন্দাদের আয়োজিত প্রথম নির্বাচনী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, স্কুল কলেজ মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মসজিদ মন্দির ধর্মীয় উপাসনালয়ের উন্নয়নে শুধু সরকারি বরাদ্দ নয়। আমার নিজস্ব উদ্যোগে এই অবেহেলিত জনপদকে বিশেষ সুবিধা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া তথা সরাইল আশুগঞ্জের এই অবস্থা কেন। আমি যদি বলি আমাদের এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিক্ষা-দীক্ষা সংস্কৃতি ইতিহাস ঐতিহ্য রাজনীতি সর্বদিকে বাংলাদেশের টপ জেলার মধ্যে একটি। তারপরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমন দুর্দশা কেন? আমি তো অন্তত স্বতন্ত্র হই আর যা-ই হই এই দুর্দশা মেনে নেবো না। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পরও আমাদের এই এলাকা আদৌ আলোর মুখ দেখেনি। আমাকে একটিবার সুযোগ দেন। নতুন করে জাগরণের লক্ষ্যে এইবারের ভোটটা আমার হাঁস মার্কায়-ই হবে। ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন এক বোন বলেছেন, হাঁস পালনে দ্রুত বংশ বৃদ্ধি পায়। ডিমও দেয়। ভালো আয়ও করা যায়। আমার মা-বোন যেন ঘরে বসেই সংসারের কিছু খরচ রোজগার করে দিতে পারেন। অবসর সময়ে সেই প্রশিক্ষণ আমরা দেয়ার ব্যবস্থা করবো, ইনশাআল্লাহ্‌। এলাকার উন্নয়ন ও রাস্তাঘাট সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচাইতে অবহেলিত দুই উপজেলা সরাইল ও আশুগঞ্জ। সরাইলের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত হচ্ছে এই পাঁচ গ্রাম। আজকে দেড়/দুই ঘণ্টা গাড়িতে নৌকায় ২০ মিনিট তারপর আধা ঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট আবার সিএনজিতে। তাহলে আমার প্রিয় ভাই বাবা চাচা মা চাচি ও বোনেরা এখান থেকে কীভাবে যাতায়াত করেন? আমি আজকে আমার প্রথম নির্বাচনী সভা থেকে ওয়াদা করছি- এমপি হতে পারলে ভূঁইশ্বর থেকে পরমানন্দপুর পর্যন্ত পাকা রাস্তা ও ব্রিজ করে দেবো। এখানকার ভাইয়েরা তাদের কোটি টাকা মূল্যের ভোট দিয়ে এমপি মন্ত্রী বানায়। তারা হয়তো তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। আমাকে স্থানীয় একজন মুরুব্বি বললেন, একটা স্কুল ও কলেজ হয়েছে। কিন্তু স্কুল কলেজে কাজ আটকে থাকলে তো হবে না। এটা যদি একটি দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এলাকা হয়, তাহলে মানুষ কীভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া পাবে? কী করে আধুনিক জীবনযাত্রার ছোঁয়া পাবে। এর আগে রুমিন ফারহানা একই ইউনিয়নের কালিশিমুল গ্রামে এক সংক্ষিপ্ত নির্বাচনী সভায় হাঁস মার্কা বিষয়ে বলেন, ‘এই মার্কা উপর থেকে কোনো ওহি নাজিল হয়ে হঠাৎ কইরা একজন অজানা মানুষকে বসাইয়া দেয়ার মার্কা নয়। এই মার্কা এমন একজন মানুষের মার্কা, যাকে গত ১৫ বছর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনারা লড়াই করতে দেখেছেন। যখন আপনাদের ভোট চুরি হয়ে গেছে। তখন হাঁস মার্কার প্রার্থী একা হয়েও দাঁড়িয়ে সংসদে প্রতিবাদ করেছে। ৫৫ বছর আপনারা ভোট দিয়েছেন ঠিকই।

কিন্তু এলাকার কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাঁস মার্কা হলো সেই পরিবর্তন সূচনা করার মার্কা। হাঁস মার্কা সাধারণ মানুষের মার্কা। কোনো দলের নয়, জনগণের মার্কা। অন্যায়ের বিরুদ্ধের মার্কা। হাঁস মার্কা দুর্নীতির বিরুদ্ধের মার্কা।’ তিনি সভায় উপস্থিত গ্রামবাসীকে অনুরোধ করে বলেন, আপনাদের ৩৩০০ ভোটের মধ্যে যেন ৩ হাজার ভোট কাস্ট হয়। আর সেই ৩ হাজার ভোটই যেন হাঁস মার্কায় হয়। আমার এলাকার সাধারণ ভোটার দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের মার্কা হাঁস। আপনার নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে, এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে, পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে এই মার্কায় ভোট দেবেন। এটি চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, জায়গা দখল বাণিজ্য ও অবৈধভাবে বালু বাণিজ্য প্রতিরোধের মার্কা। মনে রাখবেন আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি একটা জাল ভোটও যেন কেউ দিতে না পারে। একটি কেন্দ্রেও যেন কোনো ধরনের কারচুপি না হয়। আপনারা সবাই ভোটের পাহারায় থাকবেন।

mzamin

Sunday, January 25, 2026

আমি স্বতন্ত্র হই আর যা-ই হই, এই দুর্দশা মেনে নেব না: রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা বলেছেন, ‘আমি বাংলাদেশের সব বিভাগেই গেছি। সেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া দেখছি। তাহলে আমার সরাইল-আশুগঞ্জের এই অবস্থা কেন? কেন এই দুর্দশা? আমি স্বতন্ত্র হই আর যা-ই হই, এই দুর্দশা মেনে নেব না। আপনারা দৃশ্যমান একটা পরিবর্তন লক্ষ করবেন।’

শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম পরমানন্দপুরে নির্বাচনী জনসভায় এসব কথা বলেন রুমিন ফারহানা।

রুমিন ফারহানা ‘হাঁস’ প্রতীক পাওয়ার পর আজ শুক্রবার সরাইল উপজেলার পরমানন্দপুর গ্রামে প্রথম নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন। সেখানে জনসভায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যদি আমাকে আপনাদের উসিলায় এমপি করেন, যে-ই সরকারে আসুক না কেন, আমি একজন স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে সরকারকে বাধ্য করব এই এলাকার উন্নয়ন করার জন্য। স্কুল–কলেজ–মাদ্রাসা, মন্দির–মসজিদের উন্নয়নের জন্য কেবল সরকারি বরাদ্দ নয়, আমি আমার নিজস্ব উদ্যোগে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যেন এই অবহেলিত জনপদের উন্নয়ন হয়।’

রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আজকে এই পাঁচ গাঁও (পরমানন্দপুর, বরইচারা, ফতেহপুর, হরিপুর ও ষাটবাড়িয়া) থেকে আমার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হচ্ছে। আমরা জানি, সরাইল-আশুগঞ্জ উপজেলা দুটো বাংলাদেশের মধ্যে সবচাইতে অবহেলিত উপজেলা। আমি বলেছি, এই দুই উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত এলাকা কোনটি। আমাকে বলা হলো—এই পাঁচ গাঁও। আমি আজকে দেড়–দুই ঘণ্টা গাড়িতে যাত্রা করছি, ২০ মিনিট নৌকায় যাত্রা করছি। তারপর ৪৫ মিনিট থেকে প্রায় এক ঘণ্টা অটোরিকশায় যাত্রা করছি, তা–ও আবার বালুর রাস্তা। সমাবেশে আইসা আমি বলি, মা-বইনেরা যেমন ভর্তা বানায়, আমি সে রকম ভর্তা হইয়া গেছি। তাইলে আমার মা-বোন-ভাইয়েরা, তারা কী করে চলাচল করে?’

এলাকার উন্নয়নের অঙ্গীকার করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি আজকে আমার প্রথম নির্বাচনী জনসভা থেকে ওয়াদা করছি, ভূইশ্বর থেকে পরমানন্দপুর সড়কে একটা ব্রিজ করে দেওয়া আমার নির্বাচনী ওয়াদা। শুধু ব্রিজ নয়, আমাদের পাকা রাস্তাও হইতে হবে। এই এলাকাটা যদি দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এলাকা হয়, তাহলে মানুষ কীভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া পাবে? মানুষ কী করে আধুনিক জীবনযাত্রার ছোঁয়া পাবে? আমি আমার প্রথম নির্বাচনী জনসভা থেকে আশ্বস্ত করছি, এখানে (পাঁচ গ্রামে) সেতু ও পাকা রাস্তার ব্যবস্থা করব।’

ভোটারদের উদ্দেশে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘হাঁস হইল সমৃদ্ধির প্রতীক, হাঁস হইল ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতীক, হাঁস হইল নতুন শান্তির প্রতীক। সুতরাং এইবারের ভোটটা হাঁস মার্কায় হবে। আপনারা একটিবার সুযোগ দিন। এইবারে ভোটটা আমার হাঁস মার্কায় চাই।’

নির্বাচনী জনসভায় সভাপতিত্ব করেন পাকশিমুল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড শাখা বিএনপির সভাপতি সিরাজ খান। উপস্থিত ছিলেন সরাইল উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আইয়ুব হোসেন সরদার, উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হোসেন মিয়া, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক উসমান খাঁন, উপজেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল বারেক প্রমুখ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের পরমানন্দপুর গ্রামের মসজিদসংলগ্ন মাঠে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের পরমানন্দপুর গ্রামের মসজিদসংলগ্ন মাঠে। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, January 18, 2026

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে রুমিন ফারহানা, ‘দিস ইজ দ্য লাস্ট টাইম, আই ওয়ার্নিং ইউ’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগর একাংশ) আসনে উঠান বৈঠকে বাধা দেওয়ার জেরে আচরণবিধি প্রতিপালনে নিয়োজিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানার বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বিকেলে সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের ইসলামাবাদ (গুগদ) গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জুয়েল মিয়া নামের রুমিন ফারহানার এক অনুসারী জরিমানার টাকা পরিশোধ করেন।

উপজেলা প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, আজ বিকেলে ইসলামাবাদ গ্রামে উঠান বৈঠক করছিলেন রুমিন ফারহানা। তিনি বক্তব্য রাখার একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে সেখানে হাজির হন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার হাসান খান । এ সময় রুমিন ফারহানা বৈঠকস্থলের পাশে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্দেশে রুমিন ফারহানাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি পারলে থামাই দেন। আজকে আপনাকে ভদ্রতার সঙ্গে বলছি। নেক্সট টাইম কিন্তু ভদ্রতা দেখাব না।’ এ সময় পাশে থাকা এক ব্যক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘আপনাদের তারা বুইড়া আঙুল দেখায়, আপনারা কিছুই করতে পারেন না।’ এ সময় রুমিন ফারহানা বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে বলেন, ‘আপনাদের তারা এই রকম দেখায়।’

এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে বলতে শোনা যায়, ‘কে এমন করে?’ প্রত্যুত্তরে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘খোঁজ নেন, প্রশাসনে বইসা আছেন। আমি যদি না বলি, এখান থেকে বাইর হইতে পারবেন না। এক্সকিউজ মি স্যার, দিস ইজ দ্য লাস্ট টাইম, আই ওয়ার্নিং ইউ।’ তখন ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘আচরণবিধি ভঙ্গ হলে আমাদের তো আসতে হবেই।’ উত্তরে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘সব জায়গাতেই হচ্ছে। আপনারা কিছুই করতে পারেন না।’ এ সময় রুমিন ফারহানার অনুসারীরা ‘ঠিক, ঠিক’ বলে চিৎকার করতে থাকেন।

আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান ও উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আলমগীর খাঁর বিরুদ্ধে ১৩ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আচরণবিধি ভঙ্গের লিখিত অভিযোগ দেন রুমিন ফারহানা। এর পরদিন হাবিবুর রহমান এক সমাবেশে ওই অভিযোগকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখান।

রুমিন ফারহানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার প্রতিপক্ষের জোটের প্রার্থী ও তার লোকজন প্রতিদিন স্টেজ করে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে আইন ভঙ্গ করছে। আমাকে আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক টিস্যু পেপার বলছে, নর্তকী বলছে। আমি অভিযোগ দিয়েছি। এর উত্তরে তারা বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাচ্ছে, আমি বিষয়টি ম্যাজিস্ট্রেটকে স্যার সম্বোধন করে বলেছি। তারা (প্রশাসন) আমার প্রতিটি উঠান বৈঠকে আইনের অপপ্রয়োগ করছে। আমি একটি হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করি, কোনো স্টেজ করি না। এতে প্রতিদিন বাধা দিচ্ছে, জরিমানা করছে। আজ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। এর আগেও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। কিন্তু তাদের কোনো বাধা দিচ্ছে না।’

সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আবু বকর সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আচরণবিধি ভঙ্গ করায় তাঁকে (রুমিন ফারহানা) অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আইন সবার জন্য সমান। আমরা আশা করি, সবাই আইন মেনে চলবেন। ওনার যদি অভিযোগ থাকে, তবে উনি অভিযোগ দিতে পারেন।’

সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হতে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে ছিলেন। কিন্তু আসনটিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে জোটের প্রার্থী করা হয়েছে। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে রুমিন ফারহানার বাগবিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে রুমিন ফারহানার বাগবিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

দূষণ আগরতলায়, ভুগছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া by মোস্তফা ইউসুফ ও শাহাদৎ হোসেন

* যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে গত মার্চে দূষণ বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
* দূষণের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় জনজীবনে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। রাজ্যটির রাজধানী আগরতলায় শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্যে সেখানকার নদী ও খাল দূষণের শিকার হচ্ছে। সেই দূষিত পানি আসছে বাংলাদেশে। ভুগছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ।

১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ আখাউড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের পাশ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে কালন্দি খাল। সেই খাল দিয়ে আসছে কুচকুচে কালো পানি। আশপাশে তীব্র দুর্গন্ধ। চিকিৎসক ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিনের এ দূষণে ত্বক ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ১৫ গ্রামের মানুষ।

সব মিলিয়ে পাঁচটি খাল ও দুটি নদী দূষণের শিকার হচ্ছে। সেগুলো হলো কালন্দি, মরা গাঙ, কাটা খাল, কালিকাপুর ও গঙ্গাসাগর খাল এবং হাওড়া ও জাজী নদী।

দূষণ নতুন নয়, তিন দশক ধরে চলছে। এ বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে দূষণ বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশকে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

২০২০ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি কমিটি প্রথমবারের মতো এসব খাল ও নদীর পানি পরীক্ষা করে দূষণের প্রমাণ পায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভরা বর্ষাতেও সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ অংশের খালগুলোতে দূষণ ছিল মাত্রাতিরিক্ত। দূষণের প্রভাব তিতাস নদ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কমিটির প্রতিবেদনে দূষণ বন্ধে ভারতীয় অংশে বর্জ্য পরিশোধনাগার (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বসানোর ব্যবস্থা নিতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করার সুপারিশ করা হয়। সর্বশেষ পরিবেশ অধিদপ্তর গত এপ্রিলেও পানি পরীক্ষা করে। সেখানেও দূষণ পাওয়া যায়।

২০২০ সালের কমিটির প্রধান ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক ফাহমিদা খানম। তিনি এখন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২০ সালের অক্টোবরে আমরা প্রথম সীমান্তবর্তী খাল ও নদীর পানির নমুনা পরীক্ষা করে মানমাত্রা–বহির্ভূত দূষণ পাই। তখন আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছিলাম।’

ফাহমিদা বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে তখন যৌথ নদী কমিশনকে এসব দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলি। তারা নিয়মিত বিষয়টি কমিশনের বৈঠকে উত্থাপন করে আসছে। সর্বশেষ ফলাফল কী, সেটা যৌথ নদী কমিশন ভালো বলতে পারবে।’

জানতে চাইলে যৌথ নদী কমিশনের পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর ধরে যৌথ নদী কমিশনের সভায় দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতকে বলা হচ্ছে। প্রতিবারই ভারত দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

মোহাম্মদ আবু সাঈদ আরও বলেন, সর্বশেষ এ বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের সভায় ভারত জানিয়েছে, দূষণ বন্ধে আগরতলা শহরে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এটি নির্মাণাধীন। কাজ শেষে বাংলাদেশ থেকে একটা দলের সেটি পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

দূষণের চিত্র

পানিতে জলজ প্রাণী ও অণুজীবের শ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদান হলো দ্রবীভূত অক্সিজেন। প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) দরকার অন্তত ৫ মিলিগ্রাম।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এ বছরের এপ্রিলের পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৭টি জায়গা থেকে নেওয়া নমুনার ৬টিতেই দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক কম পাওয়া গেছে। ৫টিতে পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৬১ থেকে ১ দশমিক ২০ মিলিগ্রামের মধ্যে। একটি জায়গায় এ হার ছিল ৪ দশমিক ১৫ মিলিগ্রাম। গ্রহণযোগ্য মানমাত্রায় পাওয়া গেছে একটি জায়গায়।

পানিতে জৈব দূষণ কতটা, তা মাপার সূচক হচ্ছে বিওডি (বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড)। এটির গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা হলো প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৬ মিলিগ্রাম। সাতটি নমুনার সব কটিতেই গ্রহণযোগ্য মাত্রার বেশি পাওয়া গেছে। পরিমাণ ৮ থেকে ২৭ মিলিগ্রাম।

দূষণের মাত্রা পরীক্ষার আরেকটি সূচক হলো সিওডি (কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড)। পানিতে সিওডি থাকতে হয় প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৫০ মিলিগ্রাম। সাতটি নমুনার মধ্যে একটিতে সিওডি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় পাওয়া গেছে। ছয়টিতে পাওয়া গেছে বেশি, ৫২ থেকে ১১৬ মিলিগ্রাম।

আখাউড়া প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্লাবের আহ্বায়ক রুবেল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ভারত থেকে দূষিত পানি আসছে। বিগত তিন দশকে দূষণ বেড়েছে।

স্বাস্থ্যের ক্ষতি, সম্পদের ক্ষতি

দূষণের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় জনজীবনে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিমেল খান প্রথম আলোকে বলেন, আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে দূষিত ও রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত পানি আসছে। এতে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও চর্মরোগ হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া ওই পানিতে থাকা রাসায়নিকের কারণে ক্যানসারের মতো রোগ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষাক্ত মাছ ও সবজি খাচ্ছি। স্বাস্থ্যের সব ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সীমান্তবর্তী ১৫টি গ্রামে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে দূষিত পানি দিয়ে ধানের চাষ হয়। উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নে ধানি জমি বেশি। মোগড়া ইউনিয়ন ও আখাউড়া পৌরসভারও কিছু জমি আছে।

উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের সাহেবনগর গ্রামের কৃষক মুসা ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার লোকজন জ্বর, পাতলা পায়খানা, চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। কারও কারও পায়ে ঘা দেখা দিচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আখাউড়া উপজেলা কার্যালয় থেকে জানা যায়, উপজেলায় ৪ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে আমন, ৫ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ও ২১০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়। উপজেলায় চাষযোগ্য ৬ হাজার ৬৬৬ হেক্টর জমি রয়েছে। কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১৬ হাজার।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা কত একর জমি এ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে তথ্য দিতে পারেননি।

মাছ চাষের জন্য আখাউড়া উপজেলা সুপরিচিত। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বছরে ৫ হাজার টনের বেশি মাছ উৎপাদিত হয়। সেখানে ১ হাজার ৪৩০ জন মৎস্যজীবী ও ৩ হাজার ৫৫৭ জন মাছচাষি রয়েছেন।

উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ভারত থেকে আসা কালো বিষাক্ত পানি মাছের জন্য খুব ক্ষতিকারক। এই পানিতে অক্সিজেন থাকে না, পরিমাণ প্রায় শূন্য। এই পানিতে বিষাক্ত গ্যাস ও অ্যামোনিয়া থাকে বলে মাছ বাঁচে না। উপজেলার খালগুলোতে কোনো মাছ নেই।

‘কোনো সুরাহা হয়নি’

ভারত থেকে আসা দূষিত বায়ু বাংলাদেশের বায়ুদূষণের একটি বড় কারণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। যদিও এই বায়ুদূষণ ঠেকানো কঠিন। তবে আগরতলায় দূষণ বন্ধ করতে পারলে বাংলাদেশে পানিদূষণ কমানো যায়।

নদী ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক পানি আইন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, যৌথ নদী কমিশন শুধু গঙ্গার পানি ও তিস্তার পানি নিয়ে আলোচনা করে না, দুই দেশের অভিন্ন সব নদী নিয়ে আলোচনা করে। যৌথ নদী কমিশনে বিভিন্ন পর্যায়ের সভায় দুই দেশের প্রকৌশলীরা এ বিষয়টি (দূষণের) তুলতে পারেন।

আইনুন নিশাত বলেন, আগরতলা হয়ে যে বর্জ্যটা আসে, সেখানে প্রচুর ময়লা পানি ও পলিথিন থাকে। এগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ভারতকে বহু অভিযোগ (কমপ্লেন) করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-28%2Ftvsirltt%2F28122025-cm-16.jpg?rect=59%2C0%2C1778%2C1185&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসছে কলকারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত বিষাক্ত পানি। গত বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন পুলিশ চেকপোস্ট-সংলগ্ন উত্তর পাশের খালে। ছবি: শাহাদৎ হোসেন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসন: কিছু কেন্দ্রে ভোট আগের রাতে করে ফেলার পরিকল্পনা হচ্ছে: রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির বহিষ্কৃত আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমার কানে এসেছে, সরাইলের কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোট কারচুপির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ভোট আগের রাতে করে ফেলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কেন্দ্র বন্ধ করে সিলানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। আপনারা আমার আত্মীয়, আপনারা আমার ভাই। ভোটকেন্দ্র আপনারা পাহারা দেবেন।’

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরাইল উপজেলা সদরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে কর্মী–সমর্থকদের উদ্যোগে আয়োজিত এক উঠান বৈঠকে রুমিন ফারহানা এ কথা বলেন।

রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আল্লাহ যদি আপনাদের ভোটে আমাকে সরাইল–আশুগঞ্জের এমপি নির্বাচিত করেন, সরাইল–আশুগঞ্জে আমি পৌরসভা করার উদ্যোগ গ্রহণ করব। শুধু তা–ই নয়, আমি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সবার জন্য ভালো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করব। এলাকার রাস্তাঘাট, স্কুল–কলেজ, মসজিদ–মাদ্রাসার উন্নয়ন করব ইনশা আল্লাহ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় না দিয়ে অন্যখানে যেতে দেব না। যদি করতে না পারি, পাঁচ বছর পর আপনারা আমাকে আর ভোট দিয়েন না।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, ‘অনেকে বলেন, স্বতন্ত্র এমপি হলে আপনি কীভাবে উন্নয়ন করবেন? আমি বলি, স্বতন্ত্র হই আর যা–ই হই। ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা কিন্তু আমাদের আছে। সুতরাং সরকারের কাছে যদি আমার এলাকার মানুষের ন্যায্য দাবি নিয়া যাই, আর সরকার যদি সেইটা না শোনে, তবে ঢাকা–সিলেট হাইওয়ে সড়কের আশুগঞ্জ থেকে বুধন্তি পর্যন্ত (৩৪ কিলোমিটার) বন্ধ করে দেব।’

ভোটারদের উদ্দেশে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমার অসুস্থ মাকে ঢাকায় আল্লাহর হাওলা করে রেখে আসছি। আপনারা যদি আমারে ফিরাইয়া দেন, তবে আমার আর যাওয়ার জায়গা নাই। আমি আপনাদের দিকে তাকাইয়ে দলের ডাক শুনি নাই। আমি আপনাদের দিকে তাকাইয়ে ঢাকা শহরের আরাম–আয়েশের জীবন ফালাইয়ে এইখানে আসছি। আপনারা যদি আমাকে আপনাদের কাছে টেনে না নেন, আমার চারপাশে আর কিচ্ছু থাকবে না। আগামী ১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা আমার ভোটের আমানতকারী হবেন। আমার ভোটের জিম্মা আমি আপনাদের হাতে দিলাম।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। রুমিন ফারহানা এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

উঠান বৈঠকে কথা বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সরাইল উপজেলা সদরের আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে
উঠান বৈঠকে কথা বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরাইল উপজেলা সদরের আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। ছবি: প্রথম আলো

Tuesday, January 13, 2026

দলের পদ গেলেও এলাকার মানুষ আমাকে ছেড়ে যায় নাই: রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির বহিষ্কৃত আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা বলেছেন, ‘আমার দলের পদ চলে গেলেও আমার এলাকার মানুষ তো আমাকে ছেড়ে চলে যায় নাই।’

আজ সোমবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শাখাইতি গ্রামে এক উঠান বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমাকে যখন দল মনোনয়ন দেয়নি, তখন অনেকেই আমাকে বলেছেন, আপনি তো সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে পারতেন, আপনি তো উচ্চকক্ষেও যেতে পারতেন। আপনি কেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হইলেন? দল যদি ক্ষমতায় যায়, আপনার তো অনেক ভালো অবস্থা হইতে পারত। এসব ছেড়ে কেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন? আমি বললাম, এলাকার মানুষের কষ্ট, পরিশ্রম, তাঁদের অর্থ ব্যয়, তাঁদের ভালোবাসা ও আমার প্রতি তাঁদের বিশ্বাস আমাকে আজকে এত দূর নিয়ে আসছে।’

বিএনপি থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আজকে দল নেই বলে আমি আমার মানুষদের ফালাই দিয়ে চলে যাব—আমি সেইটা করব না। এই কারণেই দলে আমার পদ গেছে। আমি বলেছি, পদ গেছে ঠিক আছে, আমার মানুষ তো আছে। দল যদি জোটকেও দেয়, আমার মানুষের ভালোবাসা তো আমাকে ঘিরে রাখছে। সুতরাং আপনারা যতক্ষণ আমার পাশে আছেন, পৃথিবীর কোনো শক্তি নাই ইনশা আল্লাহ আমাকে আমার লক্ষ্য থেকে সরাই দেয়। আমার লক্ষ্য হচ্ছে, অবহেলিত সরাইল-আশুগঞ্জ উপজেলা দুটিকে মডেল উপজেলা করা।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, ‘আপনাদের বাপ-দাদাদের ভোটে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আমার বাবা (ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদ) স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে এই আসন থেকে জয় পেয়েছিলেন। কিন্তু আমার বাবাকে কাজ করতে দেওয়া হয় নাই। আমার বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। আমি বিজয়ী হয়ে আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। রুমিন ফারহানা এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-12%2Ffbeu5apm%2FWhatsApp-Image-2026-01-12-at-8.43.39-PM.jpeg?rect=108%2C0%2C900%2C600&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
উঠান বৈঠকে বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ সোমবার বিকেলে সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের শাখাইতি গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো

Friday, January 9, 2026

'এটা আমার নতুন অধ্যায়ের সূচনা'- বহিষ্কারের আদেশের পর বললেন রুমিন ফারহানা

বহিষ্কারের ঘটনা স্বাভাবিক হলেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনই দল থেকে বহিষ্কারের আদেশ আসা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন রুমিন ফারহানা, তবে এটাও বলেছেন, "এটা আমার জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা"।

তবে যেহেতু স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন, তাই বহিষ্কারের ঘটনা ঘটবে জানতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মঙ্গলবার ভোরে খালেদা জিয়া মারা যান। পরে সকাল এগারোটায় বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির এক বৈঠকে মিজ ফারহানাসহ নয়জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরে গতকালই বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় মিজ ফারহানাসহ নয় জনকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মিজ ফারহানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বহিষ্কার আদেশ এসছে এটা স্বাভাবিক। এটাতো হবেই। তবে উনি যেদিন চলে গেলেন সেদিনই বহিষ্কার আদেশ আসাটা, এটাকে আমি বলবো যে, এটা আল্লাহর একটা ইশারাও বটে।"

"যিনি আমাকে এনেছিলেন, যার ছায়ায় আমি ছিলাম, তিনি যেদিন চলে গেলেন, বিএনপির সাথে আমার যাত্রাও সেদিনই শেষ হলো," বলেন তিনি।

শোকের দিনে স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন

বাবা অলি আহাদ মারা যাওয়ার পর ২০১২ সালে রাজনীতিতে হাতেখড়ি পেশায় আইনজীবী মিজ ফারহানার। বাবা রাজনীতিবিদ হলেও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না।

ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহালের দাবিতে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করছিলো। সে সময় বিএনপির আন্তর্জাতিক কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে পথচলা শুরু করেছেন মিজ ফারহানা।

পরবর্তী সময় মিজ ফারহানাকে বিএনপির পক্ষে গণমাধ্যমে বেশ সরব হয়ে উঠতে দেখা গেছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির মনোনীত সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য রুমিন ফারহানার সংসদে একটি বক্তব্য নিয়ে মূলত ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মিজ ফারহানা তার বক্তব্যের শুরুতেই যখন বলেন যে, এই সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, তখন সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা ব্যাপক শোরগোল শুরু করেন।

ওই সময় নানা ইস্যুতে সংসদ অধিবেশনে মন্তব্যের কারণে রুমিন ফারহানা আলোচনায় ছিলেন। একপর্যায়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউটও করেন তিনিসহ বিএনপির এমপিরা।

মিজ ফারহানা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার 'আহ্বানে, অভিভাবকত্বে এবং ছায়ায়' গত ১৭ বছর বিএনপির সাথে ছিলেন।

অনেক সময়ই বয়স এবং অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও খালেদা জিয়া তাকে দলে অনেক বড় বড় কাজ দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনেই বিএনপির বৈঠক করে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, "সাধারণত বাঙালি সংস্কৃতি বলেন বা পশ্চিমা সংস্কৃতিই বলেন, মৃত্যুর একটা ভাবগাম্ভীর্য আছে। এরকম দিন আমরা সাধারণত কোনো রকম সিদ্ধান্তে যাই না"।

"খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিন, যেখানে রাষ্ট্রীয় শোক... সেদিন দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং হওয়া, বহিষ্কার আদেশ আসা... আমি জানি না, বাংলাদেশের মানুষ এটাকে কীভাবে নেবে," বলেন সদ্য বহিষ্কৃত এই বিএনপি নেত্রী।

এই বহিষ্কার আদেশই বিএনপির সাথে মিজ ফারহানার 'যাত্রা শেষের ক্লিয়ার ইনডিকেশন' বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির যে রাজনীতি তাতে তার অবস্থান কোথায়? এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিনি।

জীবনে ' নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা '

দলীয় সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই গত ১০ বছর ধরে ব্রাক্ষণবাড়িয়া - ২ আসনে নির্বাচনের জন্য রাজনীতি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন বলে দাবি করেন মিজ ফারহানা।

এর আগে, ওই আসনে ২০১৮ সালে বিএনপি নেতা উকিল আব্দুস সাত্তার নির্বাচন করেছিলেন।

পরে ২০২৩ সালে মি. সাত্তার দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

সে সময় ওই আসনে নির্বাচন করতে দলের হাই কমান্ড নির্দেশ দিয়েছিল বলে দাবি করেন রুমিন ফারহানা।

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ওই আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের এক নেতাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।

পরে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন মিজ ফারহানা।

"আমি গত ১০ বছর ধরেই কাজ করছিলাম। এখন হঠাৎ করে জুনায়েদ আল হাবিব জোটের প্রার্থী আসাটা আমার জন্য একটু বিস্ময়কর ছিলো," বলেন তিনি।

বিএনপি মঙ্গলবার যে নয় জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানায় তাদের প্রত্যেকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন।

তবে, বিএনপিতে দলীয় রাজনীতির সমাপ্তি হলেও মিজ ফারহানা এটিকে তার জীবনে 'নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা' বলে মনে করেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কতটুকু সাড়া পাবেন এমন প্রশ্নে জানান, এলাকার মানুষের চাওয়ার প্রেক্ষিতেই একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

"রাজনীতিতে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া এগুলো একেকটা ঘটনা। কিন্তু রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা অনেক বড় একটা ব্যাপার। আমি একজন রাজনীতিবিদ হতে চাইছি," বলেন মিজ ফারহানা।

রুমিন ফারহানা

Tuesday, December 30, 2025

মনোনয়নপত্র দাখিল করে রুমিন ফারহানা বললেন, ‘এই ভোট হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা।

আজ সোমবার দুপুরের পর রুমিন ফারহানা নিজে উপস্থিত হয়ে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবুবকর সরকারের কাছে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

মনোনয়নপত্র দাখিলের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের বোঝার বাইরে। আল্লাহর এই পরিকল্পনায় আমার বাবা ৭৩ সালে আওয়ামী লীগের জোয়ারের বিপক্ষে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন। রাব্বুল আলামিনের কী অদ্ভুত পরিকল্পনা! ২০২৬ সালে এসে ধানের শীষের জোয়ারের বিপক্ষে আমাকে স্বতন্ত্র লড়াই করতে হচ্ছে। আল্লাহর পরিকল্পনা ও তাঁর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া মানুষের বোঝার বাইরে।’

এরপর সমর্থদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আপনারা যে মার্কা চান, সেই মার্কাই আমার, আপনারা কী মার্কা চান?’ উত্তরে অনুসারীরা বলে ওঠেন, ‘হাঁস’, ‘হাঁস’।

সরাইল-আশুগঞ্জ উপজেলাকে বাংলাদেশের অবহেলিত দুটি উপজেলা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা প্রশ্ন তোলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সরাইল-আশুগঞ্জের অবস্থা বেহাল কেন? কেন কোনো সংসদ সদস্য এই বেহাল অবস্থার পরিবর্তন আনল না? সরাইল-আশুগঞ্জের মানুষ কেন তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পাইল না?’

বিএনপিকে ইঙ্গিত করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এবার সময় আসছে পরিবর্তনের। এই ভোট হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই ভোট হবে জুলুমের বিপক্ষে। এই ভোট হবে ১৭ বছর যেই মহিলা মাঠে ছিল, তার পক্ষে। এই ভোট হবে যখন আপনারা মামলা–হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তখন যে মানুষ আপনাদের পক্ষে সংসদে এবং সংসদের বাইরে কথা বলেছে, এই ভোট হবে তার পক্ষে।’

এর আগে গত বুধবার রুমিন ফারহানার পক্ষে সরাইলের ইউএনওর কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলী হোসেন। আজ মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় রুমিন ফারহার সঙ্গে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হোসেন মিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক উসমান খাঁ ও উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আইয়ুব হোসেনসহ কয়েক শ অনুসারী।

রুমিন ফারহানার মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবকারী হয়েছেন শাহবাজপুর ইউনিয়ন বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মোশাররফ হোসেন আর সমর্থনকারী হয়েছেন প্রচার সম্পাদক জোনায়েদ খান।

আজ বেলা দুইটার দিকে রুমিন ফারহানা উপজেলা সদরে উপস্থিত হন। এ সময় তাঁর শত শত অনুসারী, নেতা–কর্মী মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনে সরাইল উপজেলা সদরে উপস্থিত হন।

ধানের শীষের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটি বিএনপির সমঝোতার মাধ্যমে শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ছেড়ে দিয়েছে। এ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি বর্তমানে সরাইল, আশুগঞ্জ এবং বিজয়নগর উপজেলার চান্দুরা ও বুধন্তী ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। রুমিন ফারহানার পৈত্রিক বাড়ি বুধন্তী ইউনিয়নে। বর্তমানে তিনি সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা।
আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-29%2Fu9e2furt%2FBBariaDH12562025122920251229142651.jpg?rect=451%2C0%2C3444%2C2296&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেন রুমিন ফারহানা। সোবার দুপুর আড়াই দিকে তোলা ছবি। ছবি: প্রথম আলো

Saturday, December 27, 2025

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: বাপের পথেই হাঁটছেন বেটি by মাহবুব খান বাবুল

বর্তমান সময়ে নানা কারণে আলোচিত এক আসনের নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের একাংশ)। আর সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন বিএনপি’র সাবেক মহিলা এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও গুরুত্বপূর্ণ টকশো ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। কারণ বিএনপি’র অন্যতম শরিক জমিয়তে ওলামা ইসলামের প্রার্থীকে আসনটি ছেড়ে দেয়ার পরও সেখানে শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন তিনি। দলের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণাকে উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। সঙ্গে রয়েছেন ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের বিভিন্ন কমিটির নেতৃবৃন্দ। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি বিজয়নগর উপজেলা বুধন্তি ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে দাদা, দাদিসহ স্বজনদের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু করেছেন। সবশেষে প্রয়াত পিতা অলি আহাদের পথেই হাঁটতে শুরু করেছেন রুমিন ফারহানা। তার পিতাও ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ নির্বাচন করেছিলেন।

রুমিন ফারহানার পিতা ভাষাসৈনিক অলি আহাদ। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ‘গাভী’ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা তাহের উদ্দিন ঠাকুরের  সঙ্গে। রুমিন ফারহানার দাবি, ওই নির্বাচনে অলি আহাদ প্রায় ৪০ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর তাহের উদ্দিন ঠাকুর পেয়েছিলেন ২৮ হাজার ভোট। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তথা আওয়ামী লীগ তখন ওই ফলাফলকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। কৌশলে শেখ মুজিব তখন ফলাফলটা স্থানীয়ভাবে ঘোষণা না দিয়ে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। পরের দিন ঢাকা থেকে ফলাফল উল্টিয়ে তাহের উদ্দিনকে ৪০ হাজার ভোট দেখিয়ে জয়ী ঘোষণা করা হয়। আর ২৮ হাজার ভোট দেখিয়ে অলি আহাদকে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ঘোষণা করা হয়। ভাষাসৈনিক অলি আহাদের স্বপ্নকে গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কবর দেয়া হয়েছিল। পিতার সেই দুঃখ ব্যথা ও বেদনার ইতিহাস পরবর্তী সময়ে রুমিন ফারহানা জানেন।

কষ্টের সেই ইতিহাস বুকে ধারণ করেই রাজনীতির মাঠে হাটিহাটি পা পা করে চলছিলেন রুমিন। চড়াই উৎরাই ও নানা প্রতিকূলতা পার করে বিএনপিতে রুমিন ফারহানা একটি অবস্থান করে নেন। নিজের মেধা যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা দ্বারা বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকের পদ পান। দলের জন্য মাঠে ময়দানে রাজপথে ও টিভি টকশোতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। সরকারের দমনপীড়ন, জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেও দলের জন্য থামেনি তার লড়াই সংগ্রাম। পিতার ও নিজের জন্মভূমির মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। স্বপ্ন দেখছিলেন এমপি নির্বাচিত হয়ে নিজের এলাকায় প্রয়াত পিতার ইচ্ছেগুলো পূরণ করার। সেই লক্ষ্যে গত দেড় যুগ আগ থেকেই তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে কাজ শুরু করেন। বাসা ভাড়া নিয়ে নির্বাচনী এলাকার মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকেন। নিয়মিতভাবে দলীয় কর্মসূচি, সভা-সেমিনার, উঠান বৈঠক ও গণসংযোগ করতে থাকেন। নির্বাচনী এলাকার নারী-পুরুষের কাছে হয়ে উঠেন প্রিয়ভাজন।

এক যুগেরও অধিক সময় চষে বেড়ানো ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিতে থাকেন। দলীয় নেতাকর্মীরাও আশাবাদী ছিলেন দল এই আসনে তাকেই মনোনীত করবেন। কিন্তু জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে গণেশ উল্টে গেল। শতভাগ নিশ্চিত ধানের শীষের এই আসনে জোটের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি চারিদিকে চাউর হতে লাগলো। মন ভেঙে চুপসে গেলেন স্থানীয় বিএনপি ও দলটির অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মন খারাপ করেননি রুমিন ফারহানা। তিনি বলতে থাকেন, জনগণের ইচ্ছার বাস্তবায়ন করতে এই আসনে আমি নির্বাচন করবোই। উনার এমন সব ইশারা ইঙ্গিতেই সমর্থকরা বুঝেছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার দিকে এগুচ্ছেন তিনি। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় বিএনপি জমিয়তের মাওলানা জুনাঈদ আল হাবিবকে এই আসনে তাদের জোটের প্রার্থী ঘোষণা দেন। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি তিনি। উনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের অষ্টগ্রামের বাসিন্দা। গত সোমবার তার পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতীক খেজুরগাছ। এরপর গত বুধবার রুমিন ফারহানার পক্ষে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুবকর সরকারের কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলী হোসেন।

রুমিন ফারহানা মানবজমিনকে বলেন, গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দাদা-দাদিসহ স্বজনদের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছি। গত ১৭টি বছর মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করেছি। অনিয়ম অন্যায় অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। দেশের ও নির্বাচনী এলাকার মানুষের দোয়া চাই। আমার নির্বাচনী কার্যক্রম চলবে। তিনি নির্বাচনী এলাকার মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন, ১৭ বছর কে বা কারা তাদের হয়ে সব জায়গায় কথা বলেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে তারা সেই জবাব দিবেন। মনোনয়নে আমার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। দাবি ছিল আমার একটাই, সেখানে জোটের প্রার্থী দিয়েন না। কিন্তু সেই দাবি বা আকুতির স্থান তাদের কাছে হয়নি। আল্লাহর রহমতে ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ আমাকে অসম্মানের জবাব দেবেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমার প্রতীক হতে পারে হাঁস।

https://mzamin.com/uploads/news/main/196028_bramonbiariya%202.webp

Thursday, December 25, 2025

দাদা-দাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করলেন রুমিন ফারহানা

দাদা-দাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগর একাংশ) আসনে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছেন দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা।

বৃহস্পতিবার বিকেলে বিজয়নগর উপজেলার বুধন্তি ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে দাদা-দাদির কবর জিয়ারত করে তিনি নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেন। রুমিন ফারহানার দাদা-দাদি ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা হলেও তিনি সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের বাসিন্দা।

গত বুধবার রুমিন ফারহানার পক্ষে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু বকর সরকারের কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলী হোসেন।

সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। তাঁর পক্ষে গত সোমবার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি দলীয় প্রতীক খেজুরগাছ নিয়ে নির্বাচন করবেন। তিনি জেলা সদরের অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের অষ্টগ্রামের বাসিন্দা।

রুমিন ফারহানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আজকে গ্রামের বাড়িতে দাদা-দাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করলাম। আমি ১৭ বছর অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। ১৭ বছর দেশের মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়াই করেছি। আমি এলাকার এবং দেশের মানুষের দোয়া চাই। আমি নির্বাচন চালিয়ে যাব।’

রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘আমার এলাকার মানুষের প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা ভোটের মাধ্যমে জবাব দেবে, ১৭ বছর কারা তাদের পক্ষ হয়ে কথা বলেছে। তারা ভোটের মাধ্যমে জবাব দেবে, আমার প্রতি অন্যায় হয়েছে।...তাদের একটাই দাবি ছিল, জোট দিয়েন না। কিন্তু সেই আকুতি গ্রাহ্য করা হয় নাই। আমাকে ভোটের মাধ্যমে মানুষ সেই অসম্মানের জবাব দেবে।’ তিনি বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমার প্রতীক হাঁস হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’

১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন রুমিন ফারহানার বাবা ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদ। রুমিন ফারহানা দাবি করেন, ‘ওই নির্বাচনে আবার বাবা বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু পরের দিন এখান থেকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল নৌকার প্রার্থী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে।’

বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে দাদা- দাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছেন রুমিন ফারহানা। বৃহস্পতিবার বিকেলে
বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে দাদা- দাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছেন রুমিন ফারহানা। বৃহস্পতিবার বিকেলে। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, December 24, 2025

রুমিন ফারহানাও মাঠে থাকবেন

দলের মনোনয়ন বিমুখ হলেও নির্বাচনে লড়বেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার আংশিক) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে আজ বা কাল মনোনয়ন ফরম নেবেন। গতকাল দুপুরে বিএনপি ওই আসনে জোটের প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনিও নির্বাচনে থাকছেন বলে নিশ্চিত করেন। বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবকে আসনটি ছেড়ে দিয়েছে। ঢাকার গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জোটের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীরা যেসব আসনে নির্বাচন করবেন, বিএনপি সেসব আসনে কোনো প্রার্থী দেবে না। এ সময় তিনি জনগণকে খেজুর গাছ প্রতীকে ভোট দিয়ে ধানের শীষকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। এরপরই দলের মনোনয়ন না পেলেও নির্বাচন করার কথা বলেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে আমি নির্বাচন করবো। আগামীকাল (আজ) অথবা পরশু (কাল) আমার পক্ষে মনোনয়ন ফরম নেয়া হবে। তিনি বলেন, এত বড় দল (বিএনপি) তাদের ভালো-মন্দ দেখতে হয়। যেহেতু জমিয়তে উলামায়ের সঙ্গে তারা জোট করেছে আসন না দিলে কেমন করে জোট হবে! দল বাধ্য হয়ে তাদের আসন দিয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে বহিষ্কার, বিএনপি’র এমন বার্তা সম্পর্কে রুমিন ফারহানা বলেন, যদি ব্যবস্থা নেয়ার হয় দল অবশ্যই ব্যবস্থা নিবে। আমি তো আসলে বাধা দিতে পারবো না।  ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় ছিলেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। দলের মনোনয়ন তিনিই পাবেন, এটাও তার সমর্থকরা নিশ্চিত ধরে নেন। বিএনপি গত ৩রা নভেম্বর ২৩৭ আসনে তাদের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। ওই তালিকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে কারও নাম ঘোষণা করা হয়নি। অবশ্য আগে থেকেই আলোচনা ছিল আসনটি জোটের জুনায়েদ আল হাবীবকে ছেড়ে দেবে বিএনপি। তারপরও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা নির্বাচনী এলাকায় তার গণসংযোগ অব্যাহত রাখেন। বিভিন্ন সভা সমাবেশে দলের মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার আভাস-ইঙ্গিত দেন। গত ২০শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নির্বাচনী এলাকা সরাইলে দলীয় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, তার বাবা ১৯৭৩ সালে জনগণের ভোটে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্বতন্ত্র হলেও তখন জনগণ ভুল করেনি। কিন্তু আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তার বাবাকে জিততে দেননি। ‘আমি জানি না বাপের মতো বেটিরও কপাল আছে কিনা। বাপ স্বতন্ত্র, বেটিও স্বতন্ত্র।’
mzamin

Tuesday, July 8, 2025

ময়নার জন্য কাঁদছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া by জাবেদ রহিম বিজন ও মাহবুব খান বাবুল

এমন নৃশংস, পৈশাচিক ঘটনা শাহবাজপুরের ইতিহাসে আর ঘটেনি। হতবাক গ্রামের মানুষ। গোটা গ্রামই স্তব্ধ। কে এই পাষণ্ড? তার মুখ দেখতেই উদগ্রীব সবাই। তবে এখনো পুলিশ চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার কূলকিনারা করতে পারেনি। পৈশাচিক নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ছোট্ট শিশু ময়নাকে। মসজিদে পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই বর্বর এ হত্যার ঘটনা নিয়ে আলোচনা সবার মধ্যে। এ ঘটনায় কাঁদছে গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

নিষ্পাপ এক শিশুকে কেন এভাবে হত্যা। কারা জড়িত এই হত্যাকাণ্ডে?  সোমবার আসরের পর শাহবাজপুর খেলার মাঠে শিশু ময়নার নামাজে জানাজা হয়। এতে যোগ দেয় হাজার হাজার মানুষ। তাদের সবাই চান হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার। শাহবাজপুরের সাবেক ইউপি সদস্য, বিশিষ্ট সালিশকারক এ কে এম বাবুল হক বলেন-এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা শাহবাজপুরের ইতিহাসে নেই। আমরা সাংঘাতিকভাবে ব্যথিত। খুনিদের খুঁজে বের করে ফাঁসির ব্যবস্থা করতে হবে। এটাই আমাদের সবার দাবি।  

ঘটনা  রোববারের। এদিন সকালে ভয়ঙ্কর খবরে ঘুম ভাঙে শাহবাজপুরের মানুষের। নয় বছর বয়সী শিশু ময়নার লাশ পাওয়া যায় বাড়ির পাশের মসজিদের দ্বিতীয় তলায়। শনিবার বিকাল থেকেই সে ছিল নিখোঁজ। ময়না শাহবাজপুরের ছন্দু মিয়া পাড়ার বাহরাইন প্রবাসী আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে। সে লতিফ মোস্তারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় নূরানী বিভাগে পড়তো। নিহতের পরিবার জানায়, শনিবার দুপুরে ময়না বাড়ি থেকে খেলাধুলা করার জন্য বের হয়। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।  

ময়নাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তার মায়ের। সেই স্বপ্ন এমন নৃশংস বর্বরতম কাণ্ডের মাধ্যমে মিইয়ে যাবে তা ভাবেননি কখনো। ঘটনার পর থেকে ময়নার মা ও পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে কাঁপছে আকাশ বাতাস। এমন নিষ্ঠুর ঘটনায় স্তব্ধ তার নিজ গ্রাম সরাইলের শাহবাজপুরসহ গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। সহমর্মিতা ও সান্ত্বনা জানাতে ময়নাদের বাড়িতে ছুটে যাচ্ছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের লোকজন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনী, পুলিশ বিভাগসহ প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের লোকজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ন্যক্কারজনক এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ বিচারের দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয় ও প্রবাসীরা। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে গেছেন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনকে। গতকাল ময়নার মা লিপি আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে সরাইল থানায় হত্যা মামলা করেছেন।

সরজমিন অনুসন্ধানে পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, শাহবাজপুর গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ড ছন্দু মিয়া পাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক মিয়া। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাহরাইন প্রবাসী। ৩ মেয়ে ও ১ ছেলের মধ্যে ময়না তৃতীয়। সন্তানদের সুখ-শান্তির জন্যই পরিবার ফেলে প্রবাসে জীবনযাপন করছেন রাজ্জাক। সুশ্রী সদা হাস্যোজ্জ্বল মায়মুনা জাহান ময়নাকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের। পড়ালেখায় মেধাবী হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে খুবই আদরের ছিল ময়না। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ময়না বাড়ির পাশের মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগেও পড়াশুনা করতো। শনিবার বিকালে ময়না খেলতে বেরিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত আর বাড়ি ফিরেনি।  যেখানে সন্ধ্যার পরই প্রাইভেট পড়তে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। সেখানে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাচ্ছে বাড়ি ফিরছে না। ময়নার মা সহ পরিবারের সকলেই চারদিকে খুঁজতে থাকে। আশপাশসহ দূর-দূরান্তের স্বজনদের বাড়িতেও সন্ধান মিলেনি ময়নার। অস্থিরতা বাড়তে থাকে ময়নার মা’র। গভীর রাত পর্যন্ত ময়নার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। রাত ১টার দিকে সরাইল থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন  ময়নার মা। রাতে ঠিকমতো ঘুমাননি কেউই। পরের দিন   রোববার ভোরে তাদের বাড়ি থেকে ১০ গজ দূরে হাবলীপাড়া মসজিদের মক্তবে পড়তে যায় শিশুরা। তারা মসজিদের দ্বিতীয়তলায় ময়নাকে পড়ে থাকতে দেখে ভয় পায়। বিষয়টি হুজুরকে জানায়। ইমাম সাহেব ময়নাদের বাড়িতে গিয়ে ময়নার মাকে বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে থাকা লাশের খবর দেন। সকলে মসজিদে এসে দেখেন দ্বিতীয়তলায় খাটিয়ার সঙ্গে বাঁধা ও গলায় পরনের সেলোয়ার দিয়ে ফাঁস লাগানো অবস্থায় উপুর হয়ে পড়ে আছে শিশু ময়নার নিথর দেহ। রক্তাক্ত মুখসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লালচে ও কালো দাগ। বাম পাশের গালের মাংস দেখা যায়। ময়নার মা পরিবার ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে সেখানকার পরিবেশ। শোকে কষ্টে নির্বাক ও স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা গ্রাম। সকলেই ধারণা করতে থাকেন শিশু ময়নার ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের পর গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করেছে পাষণ্ডরা। ময়নার লাশ এক নজর দেখার জন্য গ্রাম, উপজেলা ও জেলা থেকে হাজার হাজার লোক ওই বাড়িতে ভিড় করেন। তারা এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। যাতে আর কেউ কোনোদিন শিশুর স্বপ্ন নষ্ট করার সাহস না পায়।’ পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি নিয়ে যায়। সেই সঙ্গে ওই মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ থানায় নিয়ে যান। ময়নার মা লিপি আক্তারসহ পরিবারের ধারণা, শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলায় সেলোয়ার পেছিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে পাষণ্ডরা। ময়না হত্যার বিচার দাবি করে মামলাটিতে শেষ পর্যন্ত বিনা ফিতে আইনি সহায়তা দিয়ে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন সরাইল উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নুরুজ্জামান লস্কর তপু।   

থামছে না আহাজারি: নিহত ময়নার মা পরিবার ও স্বজনদের আহাজারি থামছে না। বুক ছাপড়িয়ে সর্বক্ষণ বিলাপ করছেন ময়নার মা লিপি আক্তার। সন্তানের অগণিত স্মৃতিচারণ করে চিৎকার করছেন। পৈশাচিক নির্যাতন ও হত্যার সময় সন্তানের কষ্টের কথা বলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন। হত্যা ও নির্যাতনকারীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে উনার চোখের সামনে ফাঁসি দেয়ার দাবি করছেন প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে।

সর্বমহলে বিচারের দাবি: স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সহমর্মিতা জানাতে আসছেন ময়নাদের বাড়িতে। সকলেই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ বিচারের দাবি করছেন। ফেসবুকে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ময়নার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বিচার দাবি করছেন।

কাঁদছে শিক্ষক ও সহপাঠীরা: ময়নার নির্মম মৃত্যুতে কাঁদছেন লতিফ মোস্তারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী ময়নার এমন মৃত্যু তারা কখনো কল্পনাও করেননি। প্রতিদিনের ক্লাসের সাথীর আকস্মিক বর্বর মৃত্যুতে শোকে কাতর হয়ে পড়েছে সহপাঠীরা। ময়নার কথা জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে হোজাইফ মিয়া, আসিফা নুজহাত ও মো. নিশাত মিয়া। তারা বলেন, কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

মাদকের বিস্তৃতিকেই দায়ী করছেন অনেকে: ময়না হত্যাসহ গ্রাম এলাকায় চুরি, ছিনতাই আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয় উল্লেখ করেন অনেকেই। শাহবাজপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাজিব আহমেদ রাজ্জি বলেন, ময়নার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তার পিতা- মাতাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষাই খুঁজে পাচ্ছি না। আমাদের চারদিকে মাদক বিস্তৃতির ভয়াবহতা এমন সব কাণ্ডের জন্য অনেকটা দায়ী। আমার সন্তান দিনে রাতে কখন কোথায় যায়? কি করে? বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্কুলে গেল কিনা? সন্ধ্যার পর বাইরে কেন? এসব বিষয়ের জবাবদিহিতা নেয়া সকল অভিভাবকের দায়িত্ব। আমরা কি সেটা করছি?

জানাজায় মানুষের ঢল: ময়নার জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। পিতার জন্য ১২ ঘণ্টা বিলম্বে ময়নার জানাজা হয়েছে। পিতা আব্দুর রাজ্জাক বাহরাইন থেকে আসছেন। এরপর জানাজা হয়েছে। গতকাল সোমবার বাদ আসর শাহবাজপুর খেলার মাঠে ময়নার জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। জানাজায় অংশগ্রহণকারী সহস্রাধিক লোকের চোখেই ছিল অশ্রু।

ময়নার পিতা আব্দুর রাজ্জাক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার কলিজার টুকরা বুকের ধন যারা কেড়ে নিয়েছে তাদের সর্বোচ্চ বিচার চাই। পুলিশসহ সকল বাহিনীর কাছে আমার অনুরোধ দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করুন। এমন জঘন্য অপরাধীরা যেন কোনো ভাবেই রেহাই না পায়। তাদের ফাঁসি হলে আমার ময়নার আত্মা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।   

ময়নার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোসা. লায়লা বেগম বলেন, ময়না অত্যন্ত মেধাবী ছিল। আগামীতে বৃত্তির জন্য তাকে প্রস্তুত করতে ছিলাম। একজন মেধাবী শিশু শিক্ষার্থী যদি এমন পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়। তবে আর মেধাবী বের হবে না। দেশ হয়ে যাবে মেধাশূন্য। পরিবার হারিয়েছে তাদের সন্তান। আর দেশ হারিয়েছেন ভবিষ্যৎ অমূল্য সম্পদ। এভাবে আর কতো ময়নাকে ইজ্জত ও প্রাণ দিতে হবে। আমরা দ্রুত ময়না হত্যার সর্বোচ্চ বিচার চাই। সরাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোরশেদুল আলম চৌধুরী বলেন, ইমাম- মুয়াজ্জিনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্তও চলছে। মামলাটির তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই বলা যাবে না। সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসাইন বলেন, বিষয়টি লোমহর্ষক, মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। পুলিশ বিভাগসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে খুবই গুরুত্বসহকারে কাজ করছেন। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অপরাধীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন। 
mzamin

Wednesday, March 19, 2025

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত: চোরাচালানিদের স্বর্গরাজ্য by জাবেদ রহিম বিজন

চোরাচালানিদের স্বর্গ হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী ৩ উপজেলা কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর। এসব উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পথে মাদকদ্রব্য, কসমেটিকস,  মোবাইল ডিসপ্লে, শাড়ি-থ্রি-পিস আসছে দেদার। সবচেয়ে বেশি আসছে গাঁজা। সীমান্তের কোনো কোনো পয়েন্ট দিয়ে রোজ দেড়-দু’কোটি টাকার গাঁজা আসছে বলে তথ্য মিলেছে। যা এখান থেকে যাচ্ছে দেশের বিভিন্নস্থানে। চোরাচালানিরা গাঁজা পাচারে সড়ক পথের পাশাপাশি মালবাহী ট্রেনও ব্যবহার করছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের সীমান্তবর্তী কসবার বিভিন্ন স্থানে রাতে মালবাহী ট্রেন থামিয়ে এসব মাদকদ্রব্য উঠানোর অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি আখাউড়ায় একটি মালবাহী ট্রেনে অভিযান চালিয়ে ৫৭ কেজি গাঁজা উদ্ধার করেছে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ট্রেনের বগির নিচে বিশেষ কায়দায় রাখা হয় গাঁজার প্যাকেট। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও  ট্রেনে করে মাদক পাচারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

আখাউড়া রেলজংশনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি মালবাহী ট্রেনে গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি রাতে অভিযান চালায় জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি রেইডিং টিম। ৬০১ নম্বর ট্রেনটির ৯৪০২৯ এবং ৯৪০৩২ নম্বর ওয়াগন (বগি) ঘিরে চলে অভিযান। এরমধ্যে ইঞ্জিনের ঠিক পেছনের ৯৪০২৯ নম্বর ওয়াগন তল্লাশি করে ওয়াগনের নিচে লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে আটকানো ২টি সিনথেটিক বস্তার ভেতর থেকে ১ কেজির পলিথিন প্যাকেটে থাকা মোট ৩৯ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, কসবার সালদা নদী ও মন্দভাগ স্টেশনের মাঝামাঝি প্রায়ই মালবাহী ট্রেন থামিয়ে গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উঠানো হয় বলে খবর পাচ্ছিলাম আমরা। এই অভিযানটির আগে আরও ৪ বার মালবাহী ট্রেনে করে মাদক পাচার হওয়ার তথ্য আসে আমাদের কাছে। এই খবরের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।
অভিযান সংশ্লিষ্টরা জানান, অভিযানে ট্রেনের চালক, গার্ড, স্টেশন মাস্টার এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কারও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ট্রেনটি জংশনে পৌঁছার পরই চালকরা গাড়ি থেকে নেমে রেস্ট রুমে চলে যান। তাদের অনেক ডাকাডাকি করে সেখানে আনা যায়নি। স্টেশন মাস্টারকে ডাকার ৩ ঘণ্টা পর সেখানে আসেন। তিনি বলেন, ওরাতো (চালক) ট্রেন হস্তান্তর করে চলে গেছে। ওরা কেন আসবে। আপনারা তাদের কাছে যান। মাদক পেয়ে থাকলে ট্রেন জব্দ করে নিয়ে  যেতে বলেন স্টেশন মাস্টার।

ট্রেনটির গার্ড মো. ফরিদ উদ্দিন (৬৮) অভিযানের সময় উপস্থিত থাকলেও এসব মাদকদ্রব্য কোত্থেকে উঠানো হয়েছে, কারা উঠিয়েছে- এব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। ট্রেনটি আখাউড়ায় আসার আগে হাওয়া চলে যাওয়ার কারণে কোথাও কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েছিল বলে জানানো হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, গাঁজার প্যাকেট যেভাবে ট্রেনের বগির নিচে রাখা ছিল  সেগুলো উদ্ধার করতে তাদের কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছে। কয়েক মিনিট ট্রেন থামার সুযোগে এসব মাদকদ্রব্য এভাবে লোড করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় ট্রেন দাঁড় করিয়ে রেখেই মাদকদ্রব্যগুলো উঠানো হয় বলে আমাদের ধারণা।  
এ ঘটনায় জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক নজরুল ইসলাম গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি আখাউড়া রেলওয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর গত ১০ই মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এনিয়ে  আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্র জানায়,  জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম সভায় বিষয়টি উত্থাপন করলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দিদারুল আলম বলেন, রেলপথ মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে যে তাদের দু’জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা মাদক পরিবহনের সঙ্গে জড়িত। তাদেরকে আমরা ছেড়ে দিতে পারি না। পরবর্তীতে এমন হলে রেগুলার মামলা না হলে মোবাইল কোর্ট করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত করে স্পটে সাজা দিতে হবে।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ট্রেনটির ২ জন চালকের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করেছেন। তারা হচ্ছেন মো. আবু তালহা (৪১) ও মুহাম্মদ গোলাম শাহরিয়ার (৪৫)। জিডিতে লোকো মাস্টার মো. আবু তালহা ও গার্ড মো. ফরিদ উদ্দিনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এদিকে গত কয়েক মাস ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী ৩ উপজেলায় চোরাচালানিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তথ্য মিলেছে শুধু কসবার কাইয়ুমপুর ইউনিয়নের চকবস্তা, কালতা, দিঘীরপাড়, চাটুয়াখলা ও রাউৎখলা সীমান্তপথে প্রতি রাতে দেড়শ’ থেকে আড়াশ’ কেজি গাঁজা আসছে। এ ছাড়াও মদ-বিয়ার, ইয়াবা,  ফেনসিডিলের পাশাপাশি শাড়ি, থ্রি-পিস, কসমেটিকস, মোবাইল ডিসপ্লে, চিনিসহ অন্যান্য মালামালও নামছে  জেলার সীমান্ত এলাকার নানা পথে। তবে সবচেয়ে বেশি আসছে গাঁজা। সড়কপথে বিভিন্ন গাড়িতে এবং মালবাহী ট্রেনে করে মাদকসহ অন্যান্য চোরাচালানি পণ্য ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পরিবহন করা হচ্ছে। কাইয়ুমপুরের চকবস্তা সীমান্ত পথে দিনদুপরে চোরাচালানি পণ্য নামানো হচ্ছে। এখানে আলোচিত এক চোরাচালানি। তার ১২৪ জন শ্রমিক চোরাচালানি পণ্য নামানোর কাজে নিয়োজিত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ বিভিন্ন সংস্থাকে ম্যানেজ করেই চলছে রমরমা এ চোরাচালান বাণিজ্য। লাইন ক্লিয়ার রাখতে চোরাচালানিদের বাজেট কয়েক কোটি টাকা। যা যাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের পকেটে। 

mzamin

Saturday, December 7, 2024

বাড়িছাড়া বৃদ্ধ মা-বাবা

“আমার ছেলেরা মাইরা আধামরা কইরা লাইছে। কুত্তারে তো এইভাবে মারে না। যেভাবে আমারে মারছে। ছাতনার (পাঁজরের) আড্ডি ভাইঙ্গা লাইছে। ঘুষি দিয়া দাঁত ভাঙ্গছে। এহন কোনো রকমে হাঁটতে পারছি। হউর (শ্বশুর) বাড়ির লোক আইন্না ঘরবাড়ি কুবাই লাইছে।”

এভাবেই নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের কোড্ডা গ্রামের হোসেন মিয়া (৮৫)। নিজের ছেলের হাতে নির্যাতিত হয়ে গত প্রায় ৩ মাস ধরে বাড়িছাড়া তিনি। তার  স্ত্রী আয়েশা বেগমও (৬৫) মারধরের শিকার হয়েছেন ছেলে আর ছেলের বউয়ের হাতে। তাদের ঘরে তালা দেয়ায় বাড়ি যেতে পারছেন না। থাকছেন অন্যত্র আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। ছেলে রাশেদ মিয়া আর তার স্ত্রীর দখলে এখন ওই বৃদ্ধের ঘরবাড়ি।
গত ১৭ই অক্টোবর জেলার পুলিশ সুপারের কাছে বাড়িতে  ফেরার আবেদন করেন হোসেন মিয়ার স্ত্রী আয়েশা বেগম। ওই আবেদনে এলাকার উচ্ছৃঙ্খল লোকদের নিয়ে তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করার অভিযোগ করা হয় রাশেদের বিরুদ্ধে। এর আগে ওই ছেলের বিরুদ্ধে আয়েশা বেগম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন। এই মামলায় গত ৩০শে সেপ্টেম্বর জেলে যায় রাশেদ। ওইদিনই রাশেদের স্ত্রীর ভাই পাশ্বর্বর্তী ঘাটিয়ারা গ্রামের রায়হান মোল্লা কোড্ডা গ্রামের ফিরোজ মিয়া, নিয়ামত উল্লাহ, দুল্লুক মিয়া, সোহাগ মিয়া, রেজ্জেক মিয়া, সাচ্চু মিয়া, মনির মিয়া, রহমত আলী, মিরাজ মিয়া, বিশাল,  রোকসানা বেগমসহ আরও কয়েকজন বৃদ্ধ আয়েশা বেগম ও তার স্বামীকে মারধর করে ঘর থেকে বের করে দেয়। বাড়ি ফিরলে প্রাণে মারা হতে পারে, এই আশঙ্কা তাদের। হোসেন মিয়া জানান, তার সম্পত্তির ৩ ভাগের মধ্যে ২ ভাগই বড় ছেলে রাশেদকে লিখে দিয়েছেন। সম্পদ পেতে সে অত্যাচার করতো। জমি লিখে দেয়ার পাশাপাশি তখন তাকে একটি ঘরও দেয়া হয়। বিদেশ থেকে সে যে স্বর্ণালংকার এনেছিল তাও নিয়ে গেছে। এরপর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ঘর উঠিয়ে বসবাস করতে থাকে। এখন আবার বাড়িতে ফিরে এসে বাড়ির ভাগ চায়। বাদবাকি সম্পত্তি আমি আমার স্ত্রী, বাকি ৫ সন্তানের নামে লিখে দেই। ভাগে ১০/১১শতক করে পেয়েছে তারা। এ কারণেই আমাকে অত্যাচার করছে।
রাশেদের ছোট ভাই মালয়েশিয়া প্রবাসী এরশাদ মিয়া জানান, পিতার নামে থাকা জমিজমার জম্যে ৪১ শতাংশ জায়গা ২০০৮ সালে তার বড় ভাই রাশেদ মিয়ার নামে লিখে দিয়েছেন তার পিতা। এরপর এ বছরের মার্চে বাকি ৬১ শতাংশ ৭৫ পয়েন্ট জায়গা তার মা ও ৫ ভাইবোনের নামে লিখে দেন। এরমধ্যে বাড়ির জায়গাও রয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে ৫ মাস আগে দেশে এসেও ৩ মাস ধরে বাড়িতে উঠতে পারছেন না বলে জানান।
গত ৫ই ডিসেম্বর কোড্ডা গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় গিয়ে হোসেন মিয়ার বসতঘর তালাবদ্ধ দেখা গেছে। বাড়িতে রাশেদের স্ত্রী রোকসানা রয়েছে। রোকসানা বেগমের দাবি সব সম্পদ তার স্বামীর। তবে দলিল রাশেদের বাপ-মার নামে। চুরি করে সে অন্য ছেলেদের নামে দলিল করে দিয়েছে। রোকসানা তার ঘরবাড়ি কুপানোর এবং ছেলেমেয়েদের মারধোর করার উল্টো অভিযোগ করেন।
এ ঘটনায় গ্রামের দক্ষিণপাড়ার সর্দার-মাতব্বররা রাশেদের পক্ষ নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। মাঞ্জু খলিফা নামের তাদের এক প্রতিবেশী বলেন, বাপই ছেলেরে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরিয়ে এনে বাড়িতে থাকতে দেন। বাকি ৩ ছেলের নামে সম্পত্তি দলিল করে দেয়া, পরে বাবার বড় ছেলের জেলে যাওয়া নিয়ে মারামারি। পুলিশ তাদের বাড়িতে দিয়ে গেছে। ঘরের তালা খুলে দিয়ে বলেছেন আপনাদের সঙ্গে অন্য কেউ মারামারি করলে আমাদের জানাবেন। তবে কেন তারা বাড়িতে থাকতে পারছে না, তা বলতে পারবো না। সদর মডেল থানার ওসি মোজাফফর হোসেন জানান, আমার জানামতে এরকম দুটো ঘটনা আছে। বাসায় উঠিয়ে দিয়ে আসার পর পরবর্তী কোন ঘটনা ঘটে থাকলে তা আমাদের জানা নেই। জানতে পারলে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি। 

mzamin

Sunday, November 17, 2024

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরাও আসামির তালিকায়: মামলার স্টিয়ারিং কার হাতে? by জাবেদ রহিম বিজন

মামলা করছে না বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতে ইসলাম। এই দাবি দলগুলোর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নেতাদের। তারা এ ব্যাপারে কাউকে মদতও দিচ্ছেন না। বরং ঢালাও মামলায় বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ফাঁসানো হচ্ছে বলে তথ্য দেন তারা নিজেরাই। তাহলে কারা করছে এসব মামলা, কী তাদের উদ্দেশ্যে?  মামলার স্টেয়ারিং কার হাতে? এরই মধ্যে ব্যাপক মামলা বাণিজ্যের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বিএনপি’র দায়িত্বশীল এক নেতা জানান-জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ইত্যাদি নানা বিরোধের বদলা নিতে অনেককে মামলায় আসামি করা হচ্ছে। যা থেকে তাদের দলের নেতাকর্মীরাও পরিত্রাণ পাচ্ছেন না।

সরাইলের অরুয়াইল ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহ মিরান মামলা খেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এখন। তার পুরো পরিবার বিএনপি’র সমর্থক। তার ভাই যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এসব জানিয়ে মিরান বলেন-তারপরও আমি মামলার আসামি। আমার অপরাধ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমি অ্যাকটিভ ছিলাম। আমাদের স্কুলের একটি জায়গা আওয়ামী লীগের লোকজন দখল করে রেখেছিল। ৫ই আগস্টের পর আমি এ নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম। দুইজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাও এই জায়গা দখলে জড়িত ছিল। তাদের বিষয়ে মন্ত্রণালয়, ডিসি ও ইউএনও অফিসে স্মারকলিপি দিয়েছিলাম। এ কারণে আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। ইতিপূর্বে আমার পরিবারের কেউ মামলায় পড়েনি। আমি এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আতঙ্কের মধ্যে আছি। মিরান আরও জানান- তার এলাকাতেই আরও অনেক নিরপরাধ লোক মামলার আসামি হয়েছে।

বিজয়নগরের পাহাড়পুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল হককে মামলা ছাড়াই ১৫/২০ দিন আগে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে মামলায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এরপরই আতঙ্কে এলাকা ছাড়া হন ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কামরুল, ৫নং ওয়ার্ডের রফিকুল ইসলাম, ৮নং ওয়ার্ডের সিরাজ মিয়াসহ ইউনিয়নের আরও কয়েকজন ইউপি সদস্য। কে কাকে ইশারা দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেয় সেই আতঙ্কে আছেন এখন ওই এলাকার সবাই। ওই ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য জানান- মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে বা আসামি থেকে নাম কাটানোর কথা বলে টাকা দাবি করা হচ্ছে। এসব কারা করছে তা সবাই জানে। কিন্তু ভয়ে মুখ খুলেন না।
জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মোবারক হোসেন জানান-মামলায় তাদের ১২ কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। বলেন, আমরা যেখানে ১৭ বছর নির্যাতনের শিকার হলাম। আমাদের আবার মামলা দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে আমি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। ইতিমধ্যে আখাউড়ায় আমাদের গ্রাম কমিটির এক অর্থ সম্পাদককে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী কোনো মামলা-মোকদ্দমা করেনি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের নামেই মামলা করা হোক। সাধারণ জনগণের নামে হয়রানিমূলক মামলা যেন না করা হয়।

হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি জাকারিয়া খান জানান- হেফাজতে ইসলাম কোনো মামলা করছে না। যারা মারা গেছেন তাদের ফ্যামিলি মামলা করছেন।  

জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব সিরাজুল ইসলাম জানান- ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২১ সালে স্বৈরাচার সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়ে যারা নিহত হয়েছেন তাদের স্বজনরা তৎকালীন সময়ে কোনো মামলা করতে পারেননি। সরকার তাদের বিভিন্নভাবে বাধা দিয়ে রেখেছিল। সরকারের পতনের পর এখন তারা নিজ নিজ দায়িত্বে এসব মামলা করছে। ওই তিনটি সালে যেসব ঘটনা ঘটেছে এর সঙ্গে বিএনপি’র কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। বিএনপি এখন পর্যন্ত কোনো মামলা করেনি। তবে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে আলাপ-আলোচনা করে মামলা করতে পারেন। যেসব মামলা হয়েছে এতে তার দলের কেউ আসামি হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে জানান, দলের পদধারী কেউ আসামি হয়েছেন- এমন তথ্য তার জানা নেই। মামলার শিকার হয়ে সাধারণ লোকজন হয়রানি বা  ভোগান্তির শিকার হোক- তা আমরা চাই না।

জেলার রাজনৈতিক দলের নেতারা মামলা-মোকদ্দমার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও হয়রানির শিকার মানুষজন মামলা খেয়ে তাদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন পরিত্রাণ পেতে।   

উল্লেখ্য, ৫ই আগস্টের পর জেলার বিভিন্ন থানায় রাজনৈতিক মামলা হয়েছে ২৯টি। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে ১৯২৯ জনকে। প্রত্যেক মামলায় আরও এক-দেড়শ’ জন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে। এছাড়া আদালতেও হয়েছে বেশ কয়েকটি মামলা।

Saturday, November 16, 2024

মামলা নিয়ে কী হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়

মামলা হচ্ছে। আড়াইশ’, সাড়ে তিনশ’ কিংবা ৫-৭’শ জনের নামে। মুখে মুখে এই খবর। পাশাপাশি মামলার ড্রাফট কপি ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য কোনো অনলাইন মাধ্যমে। এরপরই আসে মামলা থেকে নাম বাদ দিতে টাকার প্রস্তাব। রফাদফা হলেই মুক্তি। প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে বাণিজ্যের সুবিধার্থে প্রাথমিকভাবে বিত্তশালীদের নাম দিয়ে সাজানো হয় মামলার খসড়ার আসামি তালিকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মামলা বাণিজ্যের এই অভিযোগ এখন ব্যাপক আলোচিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বিস্ত্তর লেখালেখি হচ্ছে। পুলিশ বলছে, মামলা বাণিজ্যের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও দেয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে পাওয়া হিসাবে ৫ই আগস্টের পর জেলার বিভিন্ন থানায় রাজনৈতিক মামলা হয়েছে ২৯টি। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে ১৯২৯ জনকে। প্রত্যেক মামলায় আরও এক-দেড়শো জন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে। এ ছাড়া আদালতেও হয়েছে বেশ কয়েকটি মামলা। থানায় হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে সদর মডেল থানায় ১৩টি। অন্য থানার মধ্যে আখাউড়ায় ৫টি, আশুগঞ্জে ৪টি, নবীনগরে ২টি এবং সরাইল, নাসিরনগর, বাঞ্ছারামপুর, কসবা ও বিজয়নগর থানায় ১টি করে মামলা হয়েছে। এসব মামলার বেশির ভাগই হত্যার অভিযোগে করা।

শহরের দক্ষিণ মোড়াইলের ওষুধ ব্যবসায়ী মো. মোবারক হোসেনকে বাদী বানিয়ে তৈরি করা একটি মামলার এজাহারের খসড়া কপি গত মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ায়। এ বিষয়ে গত ৩১শে অক্টোবর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন মোবারক। যাতে তাকে বাদী দেখিয়ে মামলার ভুয়া এজাহার তৈরি করে হোয়াটসঅ্যাপ-ফেসবুকে দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। মোবারক হোসেন জানান, মামলার কপি ভাইরাল হওয়ার পরই তার ছোট ভাই মোকাররম হোসেন রবিন ফোন করে মামলার বিষয়টি সত্য কিনা তার কাছে জানতে চান। আমি কোনো কিছু জানি না বলে তাকে জানাই এবং নিরাপত্তার জন্যে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এটি কেন করা হয়েছে তা বুঝতে পারছি না। শত্রুতামূলক কেউ করে থাকতে পারে।

গত ২৮শে অক্টোবর সাড়ে ৩’শ জনের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। এরআগে থেকেই অনলাইনে ভেসে বেড়াচ্ছিল এই মামলার কপি। নাম প্রকাশ না করে এক ব্যবসায়ী জানান-তিনি ওই মামলার ৫ রকম আসামি তালিকা পেয়েছেন। দেখা গেছে একটিতে কারও নাম আছে, অন্যটিতে নেই। আসামিদের নামও আগে পিছে করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল যুক্তরাজ্য শাখার সদস্য সচিব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয়তাবাদী ফোরাম ইউকে’র আহ্বায়ক শাহ মোহাম্মদ ইব্রাহিম মিয়া বলেন, এই মামলাটি হওয়ার ৩ দিন আগে অনলাইনে ৩০০ জনের নামে মামলা হচ্ছে মর্মে একটি এজাহারের কপি পাই। আমার ছোট ভাই শাহ মোহাম্মদ ইয়াছিন মামলার কপিটা হোয়াটসঅ্যাপে আমাকে পাঠায়। পরে দেখলাম থানায় রেকর্ডকৃত মামলায় আমার দুই ভাই ইয়াছিন ও কাওসারের নাম যথাক্রমে ২৯ ও ৩০ নম্বরে রয়েছে। অথচ আমার পুরো পরিবার বিএনপি’র রাজনীতিতে যুক্ত। মামলার কপি পাওয়ার পরই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। জেলা শহরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা ইব্রাহিম আরও বলেন, এই শহরে কে আওয়ামী লীগ আর কে বিএনপি-এটা চিহ্নিত। যেসব মামলা হচ্ছে, আমার জানামতে, আসামিদের ২০ ভাগও ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। সম্প্রতি আরও একটি মামলা ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেঞ্জারে ঘুরছে। সেইসঙ্গে বাণিজ্যের কথাবার্তাও হচ্ছে। আলোচনা আছে শহরের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে দুটি মামলা থেকে তার নাম বাদ দেয়ার জন্যে ২৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়। আরেক জনের কাছে ১৫ লাখ টাকা। মামলা থেকে বাঁচতে কেউ কেউ ২/৩ লাখ টাকা করে দিয়েছেন এমন তথ্যও চাউর আছে। নাম কাটার জন্যে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়েও অনেকের কাছে টাকা চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে জেলা শহর থেকে গ্রামের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত এক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ নিয়ে ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না।

মামলা বাণিজ্য চরমে ওঠার পর গত ২৯শে অক্টোবর সদর মডেল থানা পুলিশ একটি সতর্ক বিজ্ঞপ্তি দেয়। থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- সমপ্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে কতিপয় ব্যক্তি কম্পিউটার টাইপের মাধ্যমে ২০০/৩০০ বা তার অধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখপূর্বক মামলার অভিযোগ/এজাহার লিখে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। মামলায় তাদের নাম ডুকিয়ে দেয়া ও মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে টাকা-পয়সা আদায়সহ জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এরূপ এজাহার বা অভিযোগ দেখে কেউ আতঙ্কিত বা ভয় পেয়ে কোনো প্রকার টাকা পয়সা লেনদেন না করার জন্যে সতর্ক করার পাশাপাশি এমন এজাহার বা অভিযোগ দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়।

মামলা বাণিজ্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। জেলা হেফাজত ইসলাম নেতা মুফতি জাকারিয়া খান বলেন-যারা মামলার নামে ফায়দা হাসিল করছে তাদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়। জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন বলেন, ৫ই আগস্টের পর আমরা সুন্দর পরিবেশেই বসবাস করছিলাম। এখন দেখা যাচ্ছে মামলাকে পুঁজি করে বাণিজ্য করছে। এটা দুঃখজনক। একজন ব্যক্তি হত্যা হয়েছে বা কোনো ঘটনার শিকার হয়েছে। এখানে ৩৫০ জন, আড়াইশো বা ৫’শ লোক আসামি হওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান মামুন বলেন-মামলা ফাইল হওয়ার আগে অনলাইনে দিয়ে বা লিস্ট দেখিয়ে যে বাণিজ্য করা হচ্ছে তা অনৈতিক। এনিয়ে আমি খুবই বিব্রত। এ ধরনের হয়রানির শিকার কেউ হোক আমি চাই না। যারা এটা করছে এদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইদানিংকালে কিছু মামলার কপি ঘুরে ফিরে বিভিন্ন আইডিতে পোস্ট করা হচ্ছে। এসব কপি ফেসবুকে দিয়ে কেউ কেউ  ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে। এতে বিএনপি জড়িত নয়। আমি নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই, কিছু মানুষ মামলা বাণিজ্যের জন্যে কারও কারও নাম লিস্ট করে পোস্ট করছে। এ নিয়ে অনেক মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আমি ওসি এবং পুলিশ সুপারকে বিষয়টি অবগত করে অনুরোধ করেছি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।  

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাবেদুর রহমান বলেন, বিষয়টি জানার পর থেকে আমরা বিভিন্ন জায়গায় রেইড দিয়েছি। আমি ওসিকে বলেছি যেহেতু টাইপ হয়, কম্পিউটার আকারে অনলাইনে যাচ্ছে সেজন্যে কম্পিউটারের দোকানগুলোতে রেইড দিতে বলেছি। এজন্যে আমাদের কম্পিউটার এক্সপার্টদের নিয়ে যেতে বলেছি। তারা গিয়ে কম্পিউটারে সার্চ করে দেখবে। তাদের সেইভ ফাইলে এ ধরনের কোনো কিছু আছে কিনা। বাজার কেন্দ্রিক আমরা কিছু পাইনি। পরবর্তী সন্দেহ কোর্টভিত্তিক। এজাহার লেখার জন্যে অভিজ্ঞতার দরকার পড়ে। যারা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারা। আমরা ওই জায়গায় হাত দেবো। আমরা এ নিয়ে গোপনে কাজ করছি। যেই হোক এটা অন্যায় জিনিস। এটাকে অবশ্যই নির্বৃত্ত করতে হবে। আমি এটা করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। যে জড়িত থাকবে তাকে ছাড় দেবো না। 

mzamin

Sunday, November 3, 2024

হাসপাতালের ১০ কোটি টাকার কাজ ফেলে লাপাত্তা ঠিকাদার by মাহবুব খান বাবুল

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় ৫০ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১০ কোটি টাকা মূল্যের নির্মাণাধীন ৬ তলা ভবনের কাজ ফেলে লাপাত্তা হয়ে গেছে ঠিকাদার। ২০২২ সালের শেষের দিকে ক্ষমতার প্রভাবে দাপট দেখিয়ে যেনতেনভাবে ঠিকাদার কাজটি শুরু করেছিল। শুরু থেকেই খুবই ধীরগতিতে নিয়ম অনিয়মের মধ্যেই চলছিল কাজটি। ঠিকাদারের ইচ্ছায় মাঝে মধ্যে কাজ চললেও গত ৫ই আগস্টের পর থেকে একেবারেই বন্ধ রয়েছে। দেখা মিলছে না ঠিকাদার/প্রতিনিধি বা কাজের লোকদের। ওদিকে ভবন না হওয়ায় জায়গার অভাবে প্রশাসনিক ও গর্ভবতী মহিলাদের কক্ষে ফ্লোরে ও কাঠের তৈরি বেঞ্চেই দিন-রাত পার করছেন ভর্তিকৃত রোগীরা। এদের মধ্যে রয়েছে ডায়রিয়ার রোগীও। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, মেয়াদ শেষ হলেও এখনো বাকি ৭৫ ভাগ কাজ। চরম দুর্ভোগ আর কষ্টে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা।

সরজমিন অনুসন্ধান, হাসপাতাল ও ভুক্তভোগী রোগী সূত্র জানায়, ২০২২ সালে সমগ্র বাংলাদেশের ন্যায় সরাইল হাসপাতালেরও ৬ তলা ফাউন্ডেশনের সাড়ে তিন তলাবিশিষ্ট একটি বিশাল ভবন ও অন্যান্য কিছু স্থাপনা নির্মাণের বরাদ্দ অনুমোদন হয়। টেন্ডারে বিট করে ৩০ ভাগ লেসে কাজটি পান   ‘অংকুর ট্রেডার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে কাজ শুরু করেন তারা। ৬তলা ফাউন্ডেশনের ভবন নির্মাণের শুরুতেই অনিয়ম আর ধীরগতি অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। ক্ষমতাসীন দলের পাওয়ারফুল লোক পেছনে থাকায় স্থানীয়দের কোনো ধরনের অভিযোগকেই পাত্তা দেননি ঠিকাদার। যেনতেনভাবে ইচ্ছেমতোই করে আসছেন কাজ। কাজের সময়সীমা ছিল ১৮ মাস। প্রায় ৭-৮ মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে কাজের সময়সীমা। এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র ২৫ ভাগ। গত ৫ই আগস্টের পর কাজ ফেলে সটকে পড়েছেন ঠিকাদার ও কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নির্মাণ শ্রমিকরা। তিন মাস চলে গেছে কিন্তু আসছেন না তারা। অযত্নে অবহেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে রডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মালামাল। অনেক জায়গায় রডগুলোতে মরিচা ধরে ফেলেছে। পাশের প্রশাসনিক ভবনে সাময়িক সময়ের জন্য সকল শাখা স্থানান্তরিত করলে এখন দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সিট বসানো হয়েছে সিজারের পর গর্ভবতী মহিলাদের অবস্থানের কক্ষেও। ভর্তিকৃত রোগীদের গিজগিজ আর গরমে ছটফটানি দেখলে চোখে জল এসে যায়। গিজগিজ করেও জায়গা হচ্ছে না। ফলে অনেক রোগীকে থাকতে হচ্ছে ফ্লোরে। কেউ থাকছেন কাঠের তৈরি বড় বেঞ্চে। অল্প জায়গায় অধিক রোগী হওয়ায় ভবন জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। তার ওপর বিদ্যুৎ সমস্যায় অনেক রোগী হয়ে আরও অসুস্থ পড়ছেন। জায়গার অভাবে গোটা সরাইলের ৯টি ইউনিয়নের নারী-পুরুষ ও শিশু রোগীরা  সীমাহীন দুর্ভোগ ও কষ্টে সময় পার করছেন। সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. নোমান মিয়া কাজে দীর্ঘসূত্রিতার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গত তিন মাস ধরে কাজ বন্ধ। ঠিকাদারও আসছেন না। ওদিকে জায়গার অভাবে রোগীরা প্রচুর কষ্ট করছেন। আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে স্বাস্থ্যসেবাটা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। ভবনটির কাজ শেষ হয়ে গেলে এখানকার রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা শতভাগ নিশ্চিত হতো।  ঠিকাদার মো. জুয়েল বলেন, এসি সাহেব বন্ধ রাখতে বলেছেন। সরকার পরিবর্তনের ফলে শুধু সরাইল নয়, সারা বাংলাদেশেই ২৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এটা খুব বড় প্রকল্প। এটা আমার লসের কাজ। তারপরও করতে চাচ্ছি। আমার লোকজন বসা। চিফ ইঞ্জিনিয়ার দৌড়াদৌড়ি করছেন। এই প্রকল্পটি আবারো একনেকে পাঠিয়েছেন। অনুমোদন হলেই কাজ শুরু করবো। 

mzamin

Wednesday, September 18, 2024

কসবাতেও ছিলেন একজন বিদ্যুৎমন্ত্রী by জাবেদ রহিম বিজন

নিজেকে বিদ্যুৎমন্ত্রী হিসেবেই পরিচয় দিতেন কসবার পানিয়ারুপ গ্রামের মো. বাবুল মিয়া। দেশের মন্ত্রী আনিসুল হকও গ্রামের বাড়িতে এলে বিদ্যুৎমন্ত্রী কই বলেই শুধাতেন তাকে। আর পায় কে বাবুলকে। এখন অবশ্য আত্মগোপনে এই মন্ত্রী। উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পরিচালক  হওয়ার সুবাদে বাবুল তার রাজত্বে পরিণত করেন ওই বিদ্যুৎ সমিতিকে। তিনি যা বলেছেন বিদ্যুৎ অফিসে তাই করেছেন। তাকে ম্যানেজ না করে কেউ কোনো কাজ করতে পারেনি। টাকা  দিলেই হয়েছে কাজ। তা না হলে বসেনি খুঁটি, মিলেনি সংযোগ-মিটার কোনোকিছুই। বিদ্যুতের ঠিকাদারি কাজও ছিল তার কব্জায়। খুবলে খেয়েছেন বাবুল কসবার বিদ্যুৎ সেক্টরকে। চাহিদামতো টাকা না পাওয়ায় নিজের গ্রামের একটি মসজিদের খুঁটি পরিবর্তনের কাজ ফেলে রাখেন ১১ বছর। যা সরকার পরিবর্তনের পর এক সপ্তাহেই হয়েছে।

পানিয়ারুপ গ্রামের কাজী আমিন বলেন, তিনি ছিলেন বিদ্যুতের পরিচালক। সেখানে যত কাজ ছিল তার মাধ্যমেই করতে হতো। টাকা না দিলে কাজ হয়নি। তাকে টাকা না দেয়ার কারণে গ্রামের একটি মসজিদের খুঁটি ১১বছর পরিবর্তন হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর যা এক সপ্তাহে হয়েছে। নোয়াগাঁও পশ্চিমপাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদের ওপর দিয়ে বিদ্যুতের তার টানা ছিল। সেজন্য মসজিদ দোতলা করা যাচ্ছিল না। আমরা আবেদন করে বাবুলের মাধ্যমে সেটি সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। বাবুল মসজিদ কমিটিকে বলেন- খুঁটি একটি নয়, ৩টি পরিবর্তন করতে হবে। এজন্যে আরও টাকা লাগবে। দেড়লাখ টাকা দাবি করেন। এখন ৪০ হাজার টাকা দিয়ে এক খুঁটি সরিয়েছি, সময়ও লেগেছে এক সপ্তাহ। একই গ্রামের মো. জুলহাস বলেন- গ্রামের মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছিল তাকে নিয়ে। সেখানে শুনেছি এক লোকের কাছ থেকে মিটার দেবে বলে ২ লাখ টাকা নিয়েছে।

নামপ্রকাশ না করার অনুরোধে কসবা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাবেক এক পরিচালক বলেন-পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, ব্যবসা-বাণিজ্য তথা ঠিকাদারিতে জড়িত বা কোনো সময় এখানে চাকরি করতেন এমন কেউ ডাইরেক্টর হতে পারবে না বলেই নিয়ম। কিন্তু বাবুল সে নিয়ম ভেঙেই পরিচালক হয়েছেন। মন্ত্রীর  দোহায় দিয়ে আইন মানেনি। নির্বাচন ছাড়া বিনা ভোটে পরিচালক হন একাধিকবার। আগে এখানে খুঁটির ব্যবসা, দালালি করতো সে। এরপর কর্মকর্তাদের বদলির ভয় দেখিয়ে ফায়দা নিয়েছে। কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। আমি যখন ডাইরেক্টর তখন সে একদিন অফিসে বলেছে, ‘উনিতো ডাইরেক্টর, আমি উপমন্ত্রী’। এরপর আমি আর  সেখানে থাকিনি। সাবেক এক নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে বাবুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলেও জানান ওই পরিচালক। তার বদলি ঠেকিয়ে পদোন্নতির ব্যবস্থা করে ফায়দা নিয়েছেন তিনি।

কসবা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপ-মহাব্যবস্থাপক  মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বাবুল গত ৪ বছর ধরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন কাজে তার সুপারিশ থাকতো। আবাসিকের, শিল্প সংযোগের সুপারিশ করেছেন। কত কাজেই তো সুপারিশ করেছেন। এখানে কি কাজ হয়েছে বা কারা এই কাজ করেছেন, সেটি আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া হেড অফিস থেকেই বলতে পারবে। এখান থেকে কোনো টেন্ডার হয় না, ওয়ার্ক অর্ডারও হয় না। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১২৬ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন হয়েছে এই উপজেলায়। সংযোগ হয়েছে ৮২৯৭ টি।

তবে এই ক’বছরে ওই উপজেলায় কি কাজ হয়েছে সে তথ্য পেতে গিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. মকবুল হোসেন জানান, নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ লাইন নির্মাণ, অফিস ও সাবস্টেশন ভবন নির্মাণসহ সব সিভিল কাজ হয় সিলেট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে। সিলেট জোনে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ ১২টি সমিতি রয়েছে। সিলেটে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ নিয়াজ মুহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, একবছর হয় তিনি এখানে এসেছেন। আগে সেখানে কি কাজ হয়েছে তার জানা নেই। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কাজের তথ্য তার কাছে নেই, জিএম অফিসে আছে বলে জানান। আবারো মহাব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তার কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপকের (টেকনিক্যাল) সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য নিতে বলেন।  রোববার ঘাটুরায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিসে গিয়ে ডিজিএম টেকনিক্যাল আবু সায়ীমকে পাওয়া যায়নি। ফোন করলে তিনি আশুগঞ্জে রয়েছেন এবং তাকে এ ধরনের তথ্য দিতে বলা হয়নি বলেও জানান। গতকাল মঙ্গলবার আবারো তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তথ্য দেয়ার ব্যাপারে তাকে কিছু বলা হয়নি বলেই জানান। পরে আবার ফোন করে জানান, এক জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ারকে তথ্য দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এর আগে মহাব্যবস্থাপক জানান-২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ হয়েছিল। তখন অনেক টাকার কাজ হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী, বর্তমানে ঢাকায় পরিচালক হিসেবে কর্মরত আলতাফ হোসেন বলেন, বাবুল মাঝে-মধ্যে সমিতির অফিসে আসতো সেই হিসেবে চিনতাম। সে গ্রামের একটা লোক তাকে দিয়ে আমার কী কাজ হবে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে চিনতেন না বলেও জানান তিনি।  সম্প্রতি কসবা শহরের স্টেশন থেকে টি আলীর বাড়ির মোড় পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণ করে ডিভাইডারের কাজ হয়। এ জন্যে বিদ্যুতের খুঁটি সড়কের ওপর থেকে সরিয়ে নিতে এক-দেড় কোটি টাকা খরচ হয়। কিন্তু এই তথ্যও মিলেনি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।  বিদ্যুতের কাজের পাশাপাশি উপজেলায় বেশকয়েকটি সরকারি অফিস ভবন নির্মাণ কাজের ঠিকাদারিও করেছেন বাবুল। সরকার পতনের পরই পালিয়েছেন এলাকা ছেড়ে। পানিয়ারুপে তার বড়সড় একটি পাকা বাড়ি, অনেক সহায়-সম্পদ ছাড়াও ঢাকার টঙ্গীতে জায়গা রয়েছে। তার ২ সন্তান প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা করছে। এসব তথ্য জানিয়েছেন এলাকার মানুষ।

mzamin