Saturday, January 10, 2015

ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে ২০ গাড়ি ভাঙচুর, আগুন- ‘হরতাল-অবরোধে পরিবহন খাত অচল হয়ে পড়েছে’ বগুড়ায় আহত ট্রাক চালকের মৃত্যু

হরতাল-অবরোধের মতো নেতিবাচক কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে আইনের আশ্রয় নেয়ার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের একটি সমঝোতা ও সমাধানের পথ বের হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সমঝোতার কোন উদ্যোগ নেয়া হবে না জানিয়েছেন তিনি। শনিবার মতিঝিলে ফেডারেশন ভবনে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। কাজী আকরাম উদ্দিন বলেন, হরতাল, অবরোধের কারণে তিনটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো হলো পরিবহন, উৎপাদন ও পর্যটন। অবরোধ, হরতালের কারণে পরিবহন খাত অচল হয়ে গেছে। দুই লাখের বেশি বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান অচল হয়ে আছে। ২০ লাখের বেশি পরিবহন শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এই খাতে দৈনিক ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কক্সবাজারে ২০০ থেকে ৩০০ হোটেলে মন্দা ভাব দেখা দিয়েছে। হোটেলে কোনো লোকজন নেই। অবরোধ ও হরতালের কারণে দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে থাকে আর ক্ষতির সিংহভাগই ব্যবসায়ীদের। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সহসভাপতি মোনওয়ারা হাকিম আলী ও হেলাল উদ্দিন অন্যন্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে ২০ গাড়ি ভাঙচুর, আগুন
ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর মহিপাল এলাকায় কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপ ভ্যানে আগুন দিয়েছে অবরোধকারীরা। এসময় মহাসড়কে চলাচলকারী ছোট-বড় অন্তত ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, শনিবার সন্ধ্যায় মহাসড়কের মহিপাল হাইওয়ে থানার পাশে প্রায় ৩০-৩৫ জনের অবরোধকারী হঠাৎ সড়কে ইটের টুকরো ফেলে অবরোধ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পরে তারা পেট্রোল ঢেলে একটি কাভার্ড ভ্যান ও একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। এসময় অবরোধকারীদের ধাওয়ায় দুটি কাভার্ডভ্যান মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ৪জন আহত হয়। ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল হক জানান, মহাসড়কে পুলিশ ও র‌্যাবের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
বগুড়ায় আহত ট্রাক চালকের মৃত্যু
বগুড়ায় পিকেটারদের ইটের আঘাতে আহত ট্রাক চালক ইমাদুর রহমান রাজু (৩৫) মারা গেছেন। শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। রাজু নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার জুমাইয়া নগর গ্রামের মাদু প্রামানিকের ছেলে। রাজুর স্ত্রী আসমা বেগম জানান, শনিবার ভোরে নীলফামারী থেকে তার স্বামী ট্রাকবোঝাই করে আলু নিয়ে যাচ্ছিলেন। বগুড়ার মহস্থানগরে ইট ভাটার সামনে পৌঁছলে পিকেটারদের হামলার শিকার হন তিনি। এসময় তার মাথায় ইটের আঘাত লাগে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে সন্ধ্যায় রাজু মারা যান। তাদের পরিবারে তানিয়া আক্তার নামে ৮ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীকে সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ

দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে প্রাথমিকভাবে সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দিয়েছে অরাজনৈতিক এ সংগঠনটি। আজ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘সংলাপ ও সমঝোতা জরুরি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ তাগিদ দেয়া হয়। এতে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সামনের দিনগুলোতে আমরা একটি অকার্যকর রাষ্ট্র, এমনকি গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারি। এ অবস্থায়  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সংলাপে বসার জন্য নাগরিক সমাজ অনুরোধ জানাচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীকেই প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে হবে বলে সুজন মনে করে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সুজন সম্পাদক বলেন, গণমাধ্যমের ওপর সরকারের ‘অলিখিত নিয়ন্ত্রণ’ মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই। সরকার যা করছে আশা করি তা থেকে বিরত থাকবে। এভাবে চলতে থাকলে দেশে কথা বলার আর লোক অবশিষ্ট থাকবে না। সংবাদ সম্মেলনে সুজন নির্বাহী সদস্য ড. তোফায়েল আহমেদ, কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

‘সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’ -রিজভী, কুলাউড়ায় বাসে অগ্নিসংযোগ , মহাখালীতে প্রাইভেটকারে আগুন

নেতাকর্মীদের সতর্ক থেকে সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বে থাকা দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আজ গুলশানের একটি বাসায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি দমন ও রক্তাক্ত করে আরও মানুষ হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার প্রশাসন রদবদলের পদক্ষেপ নিয়েছে। অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রিজভী বলেন, সরকার বিভিন্ন স্থানে নিজেরা নাশকতা তৈরি করছে, এই ব্যাপারে সবাইকে সর্তক থাকতে হবে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অবশ্যই সরকারকে এই মুহূর্তে পদত্যাগ করে স্বচ্ছ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রিজভী বলেন, তার এই বক্তব্য বাতাসে অট্টালিকা নির্মাণের মতো। তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তার সামনে বিষাক্ত পেপার স্প্রে ছোড়া হয়েছে। ফটকে তালা ঝুলিয়ে আবার খোলা হচ্ছে। প্রতিদিন সরকার এভাবে নাটক করছে। এ থেকে বোঝা যায়, তাদের কোন কাজই সঠিক নয়। খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রেসিডেন্ট অমিত শাহর ফোনালাপের ব্যাপারে তিনি বলেন, তিনি (অমিত শাহ) টেলিফোন করে বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার খোঁজ-খবর নিয়েছেন, তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার নিন্দা জানিয়েছেন। এ নিয়ে সরকার নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, বিজেপি প্রধান বেগম জিয়াকে টেলিফোন করেছিলেন। এটাই সত্যি। জনগণকে বুঝতে আওয়ামী লীগ যা বলে সত্য হলো তার বিপরীত।
কুলাউড়ায় বাসে অগ্নিসংযোগ
কুলাউড়ার ব্রাহ্মণবাজার এলাকার ঢুলিপাড়া নামক স্থানে একটি বাস ভাঙচুরের পর তাতে আগুন দিয়েছে অবরোধকারীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার সকাল ৯ টার দিকে কুলাউড়া থেকে ছেড়ে আসা মৌলভীবাজারগামী  যাত্রীবাহী একটি  মিনিবাস ( সিলেট- জ - ০৪-০০১৩ ) ঢুলিপাড়া নামক স্থানে পৌঁছলে হঠাৎ মোটরসাইকেল যোগে ১০ থেকে ১২ জন পিকেটার গাড়িতে হামলা চালায়। এসময় বাসের যাত্রীরা ভয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। পরে দাড়িয়ে থাকা গাড়িতে পেট্টল ছিটিয়ে অগ্নিসংযোগ করে পালিয়ে যায়  অবরোধকারীরা। তবে এ ঘটনায় কেন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অমল কুমার ধর জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই অবরোধকারী পালিযে যায়। সবধরণের নাশকতা এড়াতে পুলিশ সর্তক রয়েছে বলে জানান তিনি।
মহাখালীতে প্রাইভেটকারে আগুন
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের অনির্দিষ্টকালের চলমান অবরোধের পঞ্চম দিনে রাজধানীতে গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দিয়েছে শিবিরকর্মীরা। শনিবার সকাল ১০ টায় মহাখালী ফ্লাইওভারের জাহাঙ্গীর গেট মুখে শিবির কর্মীরা ইট পাটকেল ও লাঠি সোটা নিয়ে রাজপথ অবরোধ করে। একপর্যায়ে শিবিরকর্মীরা গাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। এসময় তারা অন্তত ১০টি গাড়ি ভাঙচুর ও একটি প্রাইভেটকারে আগুন দেয়। এসময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে নেতৃত্ব দেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের শিবির নেতা মুজাহিদ হোসাইন অপু ও হাসান আল বান্না।

সিরাজগঞ্জে ত্রিমুখী সংঘর্ষে আহত ২০, রোববার হরতাল

সিরাজগঞ্জে বিএনপি পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষে অন্তত ২০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এসময় জেলা বিএনপি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করে সরকার সমর্থকরা। এ ঘটনায় পর শহরের কয়েকটি স্থানেও বিচ্ছিন্নভাবে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবাদে রোববার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে স্থানীয় বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির সভাপতি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু অভিযোগ করে বলেন, শাস্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলি ও পুলিশের সহায়তা ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরা জেলা বিএনপি কার্যালয় ভাঙচুর করার প্রতিবাদে ২০ দলীয় জোটের পক্ষে রোববার সিরাজগঞ্জ জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হবে। এর আগে সকালে লাঠিসোটা নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ের সামনে জমায়েত হয়ে মিছিল বের করার চেষ্টা করে। সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তাদের লক্ষ্য করে বিএনপি নেতাকর্মীরা ১০ থেকে ১৫টি হাত বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে বাধা দিতে গেলে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ জেসি রোড, হেলালী রোড, আই, আই কলেজ রোড এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ছাত্র ও যুবলীগের নোতকর্মীরাও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এসময় পুলিশের উপস্থিতিতেই তারা ইবি রোডস্থ বিএনপি কার্যালয়ে ঢুকে টেবিল-চেয়ার ভাঙচুর ও বিভিন্ন পোস্টার ছিড়ে ফেলে। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে শহরের রেলওয়ে কলোনী ও সয়াধানগড়া সওজ অফিস এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীরা জমায়েত হয়ে মারপিট ও ভাঙচুর চালালে পুলিশ গিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করে।  সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুল ইসলাম জানান, প্রায় দেড় শতাধিক রাবার বুলেট-শর্টগানের গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এসময় ঘটনাস্থল থেকে ৩জনকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি বিজিবি টহল চলছে। এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আবু মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া জানান, শহরের সেবা ইনস্টিটিউট চত্বরে শহীদ এম, মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর টেলি কনফারেন্স চলছিল। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামসহ ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বিএনপি কর্মীরা সেখানে হামলা চালানোর চেষ্টা করে। পরিস্থিতি পুলিশের নাগালের বাইরে গেলে সে সময় আমাদের কর্মীরা তাদের ধাওয়া দিয়ে প্রতিহত করেছে।

‘মেডিকেল কলেজ থেকে যেন রোগী মারার ডাক্তার বের না হয়’

মেডিকেল কলেজগুলোর শিক্ষার মান যেন ভালো হয় সে বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নজর দেয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মেডিকেল কলেজগুলো যেন মানসম্মত হয়, সেখান থেকে যেন রোগী মারার ডাক্তার বের না হয়। ডাক্তার হওয়া মানে পয়সা কামানো নয়, মানুষের সেবাই সবচেয়ে বড় কথা। আজ সারাদেশে ১১টি মেডিকেল কলেজে শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বহু আগেই এদেশের মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হতো। স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষ যেন ভালোভাবে বাঁচতে পারেন, না খেয়ে রোগে শোকে কষ্ট না পায় সেজন্য বর্তমান সরকার কাজ করছে। চিকিৎসা সেবা মানুষের মৌলিক অধিকার, চিকিৎসা না পেয়ে রোগে-শোকে কষ্ট পেয়ে মানুষ মারা যাবে এটা হতে পারে না। জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা কম, তাদের ওপর চাপ অনেক বেশি। এজন্য মেডিকেল কলেজের প্রয়োজন আগামীতে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ প্রতিটি বিভাগে ১টি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ সময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ১১টি মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধন করা কলেজগুলোর মধ্যে ৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও ৫টি সেনা সদর দপ্তরের অধীনে আর্মি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। নতুন এসব মেডিকেল কলেজগুলো হলো- টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, জামালপুর, পটুয়াখালী ও রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ। এছাড়া ঢাকা, যশোর, রংপুর, বগুড়া ও কুমিল্লা সেনানিবাসে হচ্ছে আর্মি মেডিকেল কলেজগুলো।

রাঙামাটিতে সংঘর্ষে আহত ১৫, ১৪৪ ধারা জারি

রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ উদ্বোধনের দিনে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সঙ্গে সরকার সমর্থকদের সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। শনিবার সকালে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগ-যুবলীগের শতাধিক নেতাকর্মী শহরের হ্যাপীর মোড় থেকে পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আগে থেকেই রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়া পিসিপি কর্মীরা তাদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। ধাওয়া খেয়ে হ্যাপীর মোড়ে ফিরে আসা ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে মেডিকেল কলেজ সমর্থক অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে পিসিপি কর্মীদের ধাওয়া দেয়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এসময় পিসিপি কর্মীরা ইসলামী ব্যাংক, হ্যাপীর মোড় মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেটে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পাল্টা জবাব হিসেবে ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরাও শেভরন ক্লিনিক, টেলিটক কাস্টমার কেয়ার ভাঙচুর করে। উভয় পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে এসএটিভির সাংবাদিক মো. সোলায়মা, আরটিভির ইয়াছিন রানা এবং ইন্ডিপিন্ডেন্ট পত্রিকার আনোয়ার হোসেন আহত হন। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষনিকভাবে শহরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে জেলা প্রশাসন।

অষ্টম দিনের মতো অবরুদ্ধ খালেদা

অষ্টম দিনের মতো রাজধানীর গুলশানে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ আছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আজ শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কেউ দেখা করতে যাননি। আগের মতোই ওই কার্যালয়ের সামনের রাস্তাটির এক পাশে একটি জলকামান, অন্য পাশে পুলিশের দুটি ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বাসার মূল ফটকে ১০ জন নারী পুলিশ অবস্থান নিয়ে আছেন। ফটকের দুই পাশে পাহারা দিচ্ছে পুলিশের বেশ কিছু সদস্য। গত ৩ জানুয়ারি রাতে পুলিশ এই কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা দেয়। একই সঙ্গে কার্যালয়ের সামনে বিপুল পুলিশ মোতায়েন এবং রাস্তায় ইট, বালু ও মাটিভর্তি ১১টি ট্রাক দিয়ে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ৫ জানুয়ারি বের হওয়ার চেষ্টা করলে পেপার স্প্রে ছোড়ে পুলিশ। এর পর থেকে খালেদা জিয়া কার্যালয়েই আছেন। গতকাল শুক্রবার সকালে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের মূল ফটকের তালা পুলিশ আবার খুলে দেয়। কিন্তু কার্যালয় থেকে বের হওয়ার অবস্থা নেই। এর আগে বৃহস্পতিবারও দিনের বেলায় ফটকের তালা খুলে দিয়ে রাতে আবার তালা দেয় পুলিশ।
বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত গুলশানের ৮৬ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাড়িটির সামনে ও ডান পাশে দুটি ফটক আছে। দুই ফটকের সামনে ও রাস্তায় পুলিশের প্রায় ১০০ জন নারী ও পুরুষ সদস্য এখনো পাহারায় আছেন। ৩ জানুয়ারি রাত থেকেই সেখানে পার্কিং করা অবস্থায় আছে পুলিশের দুটি পিকআপ ভ্যান, দুটি জিপ ও চারটি মাইক্রোবাস। পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাবকেও গতকাল দুপুরে এ সড়কে টহল দিতে দেখা গেছে। গতকাল পর্যন্ত পুলিশের অনুমতি নিয়ে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। আবার অনেকে যেতে না পেরে ফটক থেকে ফিরে গেছেন। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, তাদের কাছে খবর ছিল ৫ জানুয়ারি সমাবেশ করার লক্ষ্যে খালেদা জিয়া ৩ জানুয়ারি রাতেই নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাবেন। সমাবেশ করতে পারলে নেতা-কর্মীদের নিয়ে নয়াপল্টনে অবস্থান নিতে পারেন বলেও গোয়েন্দা তথ্য ছিল। এ কারণে দুই দিন আগেই খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখার কৌশল নেওয়া হয়।

শার্লি এব্দো – উসকানি দেয়াটাই যাদের ঐতিহ্য -ডয়েচে ভেলে

কাজ করতে করতেই কালাশনিকভে ঝাঁঝরা হলেন বিখ্যাত ফরাসি ব্যঙ্গাত্মক পত্রিকা শার্লি এব্দো-র সাংবাদিকরা৷ কিন্তু কেন শার্লি এব্দো আবার সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য? কী তাদের কাজ? কেনই বা বার বার হামলার শিকার হচ্ছে তারা?  সাপ্তাহিক পত্রিকা শার্লি এব্দো৷ তাই সপ্তাহের একটি দিন তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ৷ সেই বিশেষ দিন, বুধবারকেই টার্গেট করেছিল সন্ত্রাসীরা৷ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলাকারীদের মুখ ঢাকা ছিল, হাতে কালাশনিকভ ছাড়াও ছিল রকেট লঞ্চার৷ আল্লাহ-র নাম নিয়ে চিৎকার করতে করতে তারা বলেছিল: পয়গম্বরের হয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছি আমরা৷
কী এমন ছাপিয়েছিল শার্লি এব্দো?
কোনো মুসলমান যদি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হন, তাহলে কেমন হবে দেশের পরিস্থিতি? – এটাই হলো বিতর্কিত ফরাসি লেখক মিশেল উলেবেক-এর সাম্প্রতিকতম উপন্যাসের কাহিনি৷ আর সেটা যে স্যাটায়ারে ভরপুর একটা গল্প – তা বলাই বাহুল্য৷ এখন এই উলেবেককেই তাদের সর্বাধুনিক সংস্করণের প্রচ্ছদ হিসেবে বেছে নিয়েছিল বাম ভাবধারায় বিশ্বাসী পত্রিকাটি৷ আর তাতেই যত সমস্যা!
এটা অবশ্য প্রথম নয়৷ এর আগেও বহুবার হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন ছেপেছে শার্লি এব্দো এবং সেজন্য একাধিকবার হুমকির মুখেও পড়েছে তারা৷ ২০০৬ সালে ডেনমার্কের ইলান্ড্স পোস্টেন পত্রিকায় হজরত মোহাম্মদের যে সব ব্যঙ্গচিত্র বেরিয়েছিল, তা সে সময়েই ছাপিয়েছিল ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফরাসি এই ব্যঙ্গ-পত্রিকা৷ বলা বাহুল্য, সেই ব্যঙ্গচিত্রগুলো গোটা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ ও উষ্মার সৃষ্টি করে৷ চলে বিক্ষোভ, বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত দেশে ডেনমার্ক ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের দূতাবাসের ওপর হামলা৷ এমনকি ২০১১ সালে প্যারিসে শার্লি এব্দো-র দপ্তরে বোমাও ছোঁড়া হয়৷ তা সত্ত্বেও কিন্তু পত্রিকাটি হজরত মোহাম্মদ এবং ইসলামকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও ছবি ছাপানো বন্ধ করেনি: বিশেষ করে তাদের শরিয়া সংস্করণটিতে সম্পাদকের নাম দেওয়া হয়েছিল প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ৷
ইসলামবিরোধী না বাকস্বাধীনতার সপক্ষে?
মুসলমান, অমুসলমান অনেকের কাছেই এ ধরণের লেখা ইসলামবিরোধী মনে হতে পারে৷ অনেকে হয়ত ব্যঙ্গাত্মক লেখার রসাস্বাদনে পটু নন, সক্ষমও নন৷ তবে এ পত্রিকাটি কিন্তু বরাবরই ধর্ম, সাধু-সন্ত, ঈশ্বর-আল্লাহকে নিয়ে রসিকতা করে আসছে, দিচ্ছে উসকানি৷ কারণ এখানেই স্যাটায়ারের মজা, এটাই যে তাদের ঐতিহ্য৷ অবশ্য শুধু ইসলাম নিয়ে কটাক্ষ নয়, একাধিকবার পোপকে নিয়েও ঠাট্টা-মশকরা করেছে শার্লি এব্দো, ক্যাথলিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়েছে বিরোধে৷ কিন্তু প্রতিবারই মামলায় জিতেছে তারা৷ ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা পোপকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টায় রুষ্ট হতে পারেন, কিন্তু শেষমেষ সেটা তাঁরা মেনে নেন৷ মুক্ত, গণতান্ত্রিক সমাজ এবং সরকারও এর বিপক্ষে যেতে পারে না৷ কিন্তু এবার একটা অনুরূপ অপরাধের জন্যই প্রাণ হারালেন শার্লি এব্দো-র প্রধান সম্পাদক স্টেফান শাবনিয়ের এবং জর্জে ভলিনস্কি, বের্বা ভের্লাক ও জঁ কাবুর মতো প্রতিভাধর কার্টুনিস্ট৷
আর তাই শার্লি এব্দো-র পত্রিকা অফিসে হামলার ধিক্কার জানিয়েছে, জানাচ্ছে অগুন্তি মানুষ৷ ফরাসি হ্যাশট্যাগ #জেসুইশার্লি, অর্থাৎ আইঅ্যামশার্লি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে৷ফ্রান্সের বেন পোয়েল লিখেছেন, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের নিস্তব্ধ করা যায়নি৷ ফ্রান্সের শার্লি এব্দো অনেকটা জার্মানির অন্যতম স্যাটায়ার পত্রিকা টিটানিক-এর মতো৷ তাই জার্মানিও দাঁড়িয়েছে তার পাশে৷ আইনজীবী এবং সাংবাদিক ডানিয়েল মার্টিনসন #এব্দো ব্যবহার করে যুক্তিসঙ্গত কারণেই লিখেছেন, বাকস্বাধীনতা, স্যাটায়ার এবং মুক্ত সমাজের জন্য এ ছিল একটা কালো দিন৷

শ্রীলঙ্কার নির্বাচনে জয় দেখতে পাচ্ছেন দুই প্রার্থীই

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে ১৯৫ কিলোমিটার দূরের
শহর তাঙ্গালার একটি কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি। এএফপি
শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোট দিয়েছেন ভোটাররা। ভয়ভীতি দেখানোর খবর বেরোনোর পর ভোট কম পড়বে বলে অনুমান করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। গতকালের নির্বাচনে বরং বেশ কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। খবর এএফপি, বিবিসি ও রয়টার্সের। শ্রীলঙ্কার এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের (৬৯) বাঁচা-মরার লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে এ নির্বাচনকে। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১৯ প্রার্থী। ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী আচরণ, দুর্নীতি এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার জন্য ক্রমশ রাজাপক্ষের জনসমর্থনে ভাটা পড়ে। নির্বাচনের অল্প দিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাইথ্রিপালা সিরিসেনা (৬৩) পক্ষ ত্যাগ করে বিরোধী জোটের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নামার পর দৃশ্যপট পুরোই পাল্টে যায়।
রাজাপক্ষে গতকাল নিজের ভোটটি ব্যালটবাক্সে ফেলার পর বলেছেন, একটি ‘প্রশ্নাতীত জয়’-এর ব্যাপারে তিনি আত্মবিশ্বাসী। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ থাকবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। জয়ের ব্যাপারে উচ্চাশা ব্যক্ত করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সিরিসেনাও। একটি কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমি জয় দেখতে পাচ্ছি। সবখানেই আমাদের পক্ষে সমর্থন রয়েছে।’ জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হলে ‘নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। প্রাথমিক তথ্যে ভোট পড়ার হার কমবেশি ৭৫ শতাংশ হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সংখ্যালঘু তামিল-অধ্যুষিত উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে ভোটারদের উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এসব এলাকার মানুষ অতীতে জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও এবার সেখানকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি। এটাই রাজাপক্ষের জন্য মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার ‘লৌহমানব’ হিসেবে পরিচিত রাজাপক্ষে গত নভেম্বরে যখন আগাম নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন তাঁর তৃতীয় মেয়াদে জয়ী হওয়ার বিষয়টি সময়ের ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল। কয়েক দশকের তামিল বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দেওয়ার কৃতিত্বের দাবিদার হিসেবে রাজাপক্ষের সেটা প্রাপ্য বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছিল। নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাম্পেইন ফর ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশনস’-এর প্রধান কারথি থেনাকুন বলেন, ‘আমরা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ভেতরে ভোট দেওয়ায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখতে পেয়েছি।’

যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত

রিয়াদ মনসুর
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সদস্যপদের জন্য আবেদন করে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়েছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, শুল্ক হিসেবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রাপ্য ১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার তারা সময়মতো হস্তান্তর করবে না। এর ফলে বিকল্প অর্থের ব্যবস্থা না হলে জানুয়ারি মাসে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়াই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য হয়তো সম্ভব হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের বার্ষিক অনুদান আটকে দেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। এর ফলে যে অর্থনৈতিক চাপের সৃষ্টি হবে, তার প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা আছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষ এর কর্তৃত্বও হারাতে পারে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও দমে যাচ্ছে না ফিলিস্তিনিরা। মঙ্গলবার প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর সে প্রত্যয়ই ব্যক্ত করলেন। মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তাঁরা প্রস্তুত। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অর্থনৈতিক শাস্তির পথে যাবে না। শুল্ক বাবদ সংগৃহীত অর্থ হস্তান্তরে ইসরায়েলের অস্বীকৃতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত মনসুর বলেন, ‘এই অর্থ আমাদের, তা প্রদানে অস্বীকার করে ইসরায়েল আরেকটি বেআইনি কাজ করছে।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সদস্যপদ প্রসঙ্গে মনসুর জানান, প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তারা আইসিসির কাছে আবেদন ১৩ জুন ২০১৪ থেকে কার্যকর করার অনুরোধ করেছে। এতে করে গাজায় ইসরায়েলের গত বছরের হামলাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারবেন আদালত। জাতিসংঘ মহাসচিব জানিয়েছেন, আইসিসিতে ফিলিস্তিনের সদস্যপদ আগামী ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। একই সময় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ আরও ১৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগদানে সক্ষম হবে। রাষ্ট্রদূত মনসুর বলেন, ‘আমরা যা করেছি তা শুধু সভ্য ও আইনসম্মতই নয়, তা সম্পূর্ণ আমাদের এখতিয়ারের ভেতর। আইসিসিতে আমাদের সদস্যপদের উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার প্রার্থনা। জবাবে তারা আমাদের শাস্তি দিতে চায়। এটা অভাবনীয়। আমাদের বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা ঠেকাতে উদ্যোগী হবে।’ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দুই বছর ধরেই জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভের পাশাপাশি আইসিসিতে অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন ছাড়া পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন সম্ভব নয়। বিকল্প হিসেবে ২০১২ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ‘পর্যবেক্ষক সদস্য’ হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। তখন থেকেই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলে আসছিল, শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি না হলে তারা আইসিসিতে যোগ দেবে এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য ইসরায়েলকে এই আদালতের কাঠগড়ায় আনতে চেষ্টা করবে।
বিশেষ করে ইউরোপের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের সাম্প্রতিক সমর্থনে নৈতিকভাবে বলীয়ান হয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এখন আইসিসির মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই কূটনৈতিক কৌশলের সুফল পাওয়ার আগে তাদের আপাতত নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হবে। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা লিখেছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষই চায়, ইসরায়েলি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জেরে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ুক। কারণ, সে ক্ষেত্রে একসময় আব্বাস সরকারের পতন হবে। দখলদার রাষ্ট্র হিসেবে সব দায়দায়িত্ব বর্তাবে ইসরায়েলের ওপর। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সত্যি সত্যি এই রকম কোনো রণকৌশল অনুসরণ করছে কি না জানতে চাওয়া হলে রাষ্ট্রদূত মনসুর নেতিবাচক জবাব দেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, ইসরায়েলের ‘অবৈধ কার্যকলাপ’ অব্যাহত থাকলে তেমন পরিস্থিতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নিজে তার সীমান্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে না। তার সীমানায় সব আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েল। শুল্ক বাবদ তার সব উপার্জনও আসে ইসরায়েলি হাত ঘুরে। ইসরায়েলের অর্থনৈতিক অবরোধের জেরে আব্বাস সরকারের পতন হলে তার দায়িত্ব নিতে রাজি নয় ফিলিস্তিনিরা। রাষ্ট্রদূত মনসুর বললেন, ‘যদি তেমন অবস্থার সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের দোষারোপ করা হবে অযৌক্তিক। ... অধিকৃত অঞ্চলের অধিবাসীরা যদি অনাহার ও রোগভোগের সম্মুখীন হয়, দখলদার হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনে জবাবদিহি করতে হবে ইসরায়েলকে।’ ইসরায়েলি দখলের অবসান ও ২০১৭ সালের মধ্যে পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে গত সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিষদে তোলা প্রস্তাবটি ন্যূনতম নয়টি সমর্থনসূচক ভোট না পাওয়ায় নাকচ হয়ে যায়। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ইঙ্গিত করেছেন, তাঁরা একই প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে বারবার উত্থাপন করবেন। তাঁর কথায়, ‘আমরা ক্লান্ত হব না, হাল ছেড়ে দেব না।’ এই রণকৌশল কতটা কার্যকর হবে—এ প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত মনসুর বলেন, সব সম্ভাব্য পথই তাঁরা অনুসরণ করবেন। জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদের চেষ্টাও অব্যাহত রাখবেন। তিনি স্মরণ করেন, বাংলাদেশও প্রথম চেষ্টায় জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জন করেনি। চীনের ভেটোর কারণে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

কার্টুনিস্ট–লেখকদের নিন্দা ও উদ্বেগ

ফ্রান্সের শার্লি এবদো সাময়িকীর অফিসে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কার্টুনিস্ট ও লেখকেরা বাক্স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তবে ইসলামসংক্রান্ত বিতর্কিত লেখার জন্য লুকিয়ে আছেন বা পুলিশি নিরাপত্তায় থাকেন, এমন লেখকেরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। খবর রয়টার্সের। শার্লি এবদোর কার্যালয়ে বুধবারের হামলায় পুলিশ, সাংবাদিক, শিল্পীসহ ১২ জন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ফ্রান্সের প্রথম সারির কয়েকজন কার্টুনিস্ট রয়েছেন। তাঁদের প্রাণনাশের হুমকি ছিল। প্রাণনাশের হুমকি আছে এমন আরেকজন কার্টুনিস্ট সুইডেনের লার্স ভিকস। তিনি বলেন, ‘যখন আপনার মত প্রকাশের অধিকার থাকে না, তখন কে সাহস করবে সবকিছু প্রকাশ করার?’ নরওয়েজীয় প্রকাশক উইলিয়াম নাইগার্ড বলেন, ‘স্বেচ্ছা আরোপিত বিধিনিষেধ একটা ভয়ংকর বিষয়।’
তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দাবি করেন। লেখক-কার্টুনিস্টদের মতো হলিউডের অভিনেতা ও কলাকুশলীরাও ফ্রান্সের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন। একাধিকবার ইসলামের জন্য অবমাননাকর বিষয় প্রকাশের জন্য বিতর্কিত হয়েছিল ব্যঙ্গধর্মী পত্রিকা শার্লি এবদো। পত্রিকাটি ২০০৬ সালে ডেনিশ এক পত্রিকায় প্রকাশিত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি ব্যঙ্গচিত্র পুনর্মুদ্রণ করে বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়। এ নিয়ে মুসলিম বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ২০১২ সালেও তারা মহানবী (সা.)-এর অবমাননাকর ছবি ছাপে। এ ছাড়া পত্রিকাটির সর্বশেষ একটি টুইটে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নেতা আবু বকর আল-বাগদাদির ব্যঙ্গচিত্র প্রচার করা হয়।

লাখো মানুষের প্রতিবাদ মিছিল

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে একটি ব্যঙ্গ সাপ্তাহিক কার্যালয়ে ইসলামপন্থী বন্দুকধারীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বৃহস্পতিবার নিহতদের স্মরণে দেশজুড়ে লক্ষাধিক মানুষ সমবেত হয়ে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন নগরীতে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছেন। ইন্টারনেটে ব্যাপক হারে ‘আই অ্যাম শার্লি’ (আমিই শার্লি) লিখে হ্যাশ ট্যাগযুক্ত করে নিহতদের জন্য শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ সাতজনকে আটক করেছে। অভিযুক্ত তিনজনের মধ্যে সন্দেহভাজন কনিষ্ঠ হামলাকারী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। বুধবারের ওই ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়। খবর এএফপি, বিবিসি ও ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের। ফ্রান্সে বৃহস্পতিবার জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ। বুধবার সন্ধ্যায় টেলিভিশনে দেয়া এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি এ ঘোষণা দেন। পাশাপাশি বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত দেশটিতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকার ঘোষণাও দেয়া হয়। ভাষণে ওলান্দ বলেন, ‘এই নারী ও পুরুষরা তাদের সেই বিশ্বাসের জন্য প্রাণ দিয়েছেন যা ফ্রান্সে ছিল, আর তা হচ্ছে স্বাধীনতা। আজ তারাই আমাদের বীর।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে ঐক্য। কোনোকিছুই আমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারবে না, কোনোকিছু আমাদের থামাতে পারবে না এবং কোনোকিছুই আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।’ বুধবার কালাশনিকভ রাইফেল ও রকেট লঞ্চার নিয়ে মুখোশ ও কালো পোশাক পরা তিন ব্যক্তি হামলা চালায়। এতে পত্রিকাটির অন্যতম প্রধান সম্পাদক স্তেফান শার্বনেয়ার, তিন ব্যঙ্গ-চিত্রশিল্পী উয়োলিন্স্কি, তিনু ও কাবু এবং পুলিশ সদস্যসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। পুলিশের সন্দেহের তালিকা অনুসারে ওই হামলায় অংশ নেয়া ব্যক্তিরা হল দুই ভাই সাঈদ কোউয়াচি (৩৪) ও শরিফ কোউয়াচি (৩২) এবং হামিদ মুরাদ (১৮)। এর মধ্যে হামলায় অংশ নেয়া সন্দেহভাজন কনিষ্ঠ ব্যক্তি মুরাদ উত্তর ফ্রান্সের শার্লেভিল মেজিরেস পুলিশ স্টেশনে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। পুলিশ বাকি দু’জন সন্ত্রাসী সাঈদ কোউয়াচি ও শরিফ কোউয়াচির ছবি প্রকাশ করেছে।
তাদের গ্রেফতারে এখন বিভিন্ন জায়গায় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তাদের দু’জনের কাছে অস্ত্র রয়েছে এবং তারা বিপজ্জনক বলে পুলিশ জানিয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার বিক্ষুব্ধ জনতা ঘটনাস্থল থেকে মাত্র আধা মাইলখানেক দূরত্বে অবস্থিত প্লেস দ্য লা রিপাবলিকে ঢুকে পড়ে। পুলিশ জানায়, প্যারিসে কমপক্ষে ৩৫ হাজার মানুষ নিহতদের স্মরণে এক প্রার্থনা সভায় মিলিত হন। লিওন ও তুলুস নগরীতে প্রায় ১০ হাজার লোক জড়ো হয়। বিশ্বনেতাদের নিন্দা, ইউরোপজুড়ে সতর্কতা : ফ্রান্সের কার্টুন পত্রিকায় হামলার নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বনেতারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, এ ঘটনা কাপুরুষ শয়তানের কাজ। সন্ত্রাসীরা মুক্ত গণমাধ্যমকে ভয় পায়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে এটাকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন বলে অভিহিত করেছে। পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, এই নৃশংসতার কোনোভাবে ন্যায্যতা দেয়া যায় না। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি তার গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দের কাছে পাঠানো এক শোক বার্তায় রানি ও তার স্বামী এ ঘটনায় হতাহতদের জন্য শোক প্রকাশ ও প্রার্থনা করেন। এদিকে ইউরোপজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছে।

বিজেপি নেতার বক্তব্য প্রসঙ্গে by ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কেন্দ্রীয় নেতা তথাগত রায়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে গেছে। তারা কয়েকটি সভা ও অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং বক্তব্য দিয়েছেন। ড. মাহবুব উল্লাহ ৬ জানুয়ারি যুগান্তরে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ২ জানুয়ারি বেদান্ত সংস্কৃত মঞ্চের সভায় বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন এবং নিজ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তার এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তথাগত রায়ের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে মনে করি। এ বিষয়ে সঠিক তথ্যটি সবার অবহিত হওয়া প্রয়োজন। মঞ্চের আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথাগত রায় যা বলেছেন তার সারাংশ হল- আমি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে এটা বলতে পারি না, তবে বাংলাদেশের বিষয়টা ভিন্ন, আপনাদের বোঝার জন্য বলছি। ভারত সরকার আওয়ামী লীগ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। ভারত সরকার উপলব্ধি করেছে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার চেয়ে ভালো কোনো সরকার হতে পারে না। এখানকার হিন্দুদের জন্যও এর চেয়ে ভালো সরকার কি হতে পারে? আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো সরকারের ওপর ভরসা করা যায়? যদি অন্যদের ওপর ভরসা করা না যায়, তাহলে পুরো সমর্থন আওয়ামী লীগকে দিন। বাংলাদেশের পাওনা ভারত বুঝিয়ে দেবে। তিস্তা চুক্তি হবে ও স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হবে- এটি নিশ্চিত করেই বলতে পারি। তিনি পরিসংখ্যান উল্লেখ করে এও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার বেড়ে গেছে।
ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, ৫ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পালন করেছে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে পালন করেছে। দেশে বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। তার অভিমত, তথাগত রায়ের যুক্তিতে বোঝা যায়, ভারত সরকার আওয়ামী লীগ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে এবং হিন্দু ধর্মীয় লোকদের প্রকাশ্যে এ সরকারকে সমর্থন জানানোর আহ্বান জানিয়েছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কী হতে পারে? তার বক্তব্য অনুযায়ী, তথাগত রায়ের বক্তব্যে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির পরিষ্কার উসকানি বিদ্যমান। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু প্রশ্নটি অবান্তর। এ কথাটি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া একাধিকবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তার দৃষ্টিতে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে আমরা সবাই বাংলাদেশী। তথাগত রায়ের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অন্য দেশের চেয়ে আলাদা। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দাদাগিরি সুবিদিত। বাংলাদেশের সৎ আকাক্সক্ষা ও শুভেচ্ছা ভারতের বৃহৎ প্রতিবেশীসুলভ দাম্ভিকতার ফলে এগোতে পারে না। পৃথিবীর অনেক দেশেরই বৃহৎ প্রতিবেশী থাকে। তবে বাংলাদেশ যে বৃহৎ রাষ্ট্রকে প্রতিবেশী হিসেবে পেয়েছে, তার আচরণ অন্য যে কোনো বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আচরণকে ম্লান করে দেবে। তিনি সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের কথা তুলে ধরেছেন, পানি সমস্যার বিষয় উল্লেখ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা সম্পর্কে তথাগত রায় বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি নির্বাচনের সময় ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ভারতীয় কংগ্রেসের ভরাডুবির পর বিএনপিকে আশ্বস্তবোধ করতে দেখা গেছে। বিএনপি দ্রুত গতিতে মোদির বিজয়কে অভিনন্দিত করেছে।
ড. মাহবুব উল্লাহ অভিমত ব্যক্ত করেছেন- ভারত একটি সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র। পাশাপাশি বলেছেন, বর্তমান ভারত সরকার বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করছে তা তিনি জানেন না। তবে মোদি যদি বাংলাদেশ সফরে এসে এ সুযোগে সেরকম একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য জনচক্ষুর আড়ালেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাগাদা দেন, তাহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার পথে সেটি হবে একটি শুভ উদ্যোগ। নরেন্দ্র মোদির সরকার নিশ্চয়ই তার কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে অবগত আছেন, বাংলাদেশে গত ছয় বছরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা খুব শান্তিতে দিনাতিপাত করতে পারেননি। তাদের মন্দির-বিগ্রহ ধ্বংস করা হয়েছে। এসব ঘটেছে কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তির লোভের ফলে। ক্ষমতাসীন দল এদের কতটা নিবৃত করতে পেরেছে সেটিও দেখার বিষয়।
বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারত ও বাংলাদেশ পরস্পরের প্রতিবেশী দেশ এবং বিশ্বস্ত বন্ধু। আমাদের প্রতিটি গণআন্দোলনে ভারত নৈতিক সমর্থন দিয়েছে এবং উন্নয়ন-অগ্রগতিতে সহযোগিতা করছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত সর্বাত্মকভাবে আমাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। দলমত নির্বিশেষে ভারতবাসী এগিয়ে এসেছেন।
বিজেপির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি তৎকালীন বিরোধী দলের অন্যতম নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সর্বদয়নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ ৭১-এর সেপ্টেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দিল্লিতে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ভারত শরণার্থীদের আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে লাখ লাখ বাঙালির সঙ্গে হাজার হাজার মিত্র বাহিনীর সৈন্যও মৃত্যুবরণ করেছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুততম সময়ে ১৯৭২ সালের মার্চে মিত্র বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এ ধরনের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গণপরিষদ ১৯৭২ সালে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করে, যা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত। স্থলসীমান্ত চুক্তি, গঙ্গার পানির ব্যাপারে অস্থায়ী সমঝোতা ও অন্যান্য চুক্তিও সম্পাদিত হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাতিল ও অন্যান্য নীতিমালাকে অকার্যকর করে ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক বিভেদগামী শক্তিকে পুনর্বাসিত করা হয়। বিএনপি এ ধারাকে ধারণ করেই রাজনীতি করতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু দলে দলে দেশত্যাগ করতে থাকে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলতে থাকে এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অব্যাহত থাকে। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার ভারত সফরের সময় সমঝোতা স্মারকে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে অভিবাসী বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ভারতের কংগ্রেসি-অকংগ্রেসি সব সরকার ও দলই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও ক্রান্তিলগ্নে নৈতিক সমর্থনসহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের বিষয়ে তাদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে বিজেপি নেতার বক্তব্য যথাযথ বলে মনে করি। প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও ভারত নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার প্রতি সমর্থন দিয়েছে। নির্বাচনের পর সরকারকে শুধু ভারত নয়, রাশিয়া ও চীনও সমর্থন দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও জাপান এ সরকারকে মেনে নিয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা এবং শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগ ও বক্তব্যে আশা করা যায়, শিগগিরই তিস্তা চুক্তি হবে এবং সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হবে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও সংযোগ ও সহযোগিতা এগিয়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমুদ্রসীমাও নির্ধারিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ড. মাহবুব উল্লাহ একদিকে হস্তক্ষেপের কথা বলছেন, অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য তাগাদা দেয়ারও অনুরোধ জানাচ্ছেন। এটা দ্বৈতনীতি (ডাবল স্ট্যান্ডার্ড) নয় কি? প্রসঙ্গত, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা নজরুল ইসলাম খান ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতকে তার ভাষায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন। ভারত বৃহৎ প্রতিবেশী ও শক্তিশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সীমান্তসহ অন্যান্য সমস্যা প্রায় সমাধান করেছে এবং দেশগুলোর অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সামরিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সহযোগিতা করছে। সেক্ষেত্রে ভারতকে সম্প্রসারণবাদী আখ্যা দেয়া কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। আসুন শান্তি, গণতন্ত্র ও অগ্রগতির পথে আমরা সবাই এগিয়ে যাই।
ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক রাষ্ট্রদূত

এ ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতিতে সবাই অসহায় থাকতে পারি না by মইনুল হোসেন

পুলিশকে যদি স্বাধীন ভূমিকা পালন করার সুযোগ দেয়া হতো কেবল তখনই এ কথা বলা সম্ভব হতো যে, গত ৫ জানুয়ারি বিএনপিকে জনসভা করতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেয়া হয়নি। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে পুলিশকেই সভা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তাহলে একে পুলিশি শক্তির অপব্যবহার হিসেবে দেখা যেত না। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা বিভাগের কাছে তথ্য রয়েছে যে, অবরোধ আন্দোলনে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্য তাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। সংঘর্ষ শুরুই হয়েছে পুলিশকে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করতে গিয়ে। পুলিশের দায়িত্ব সভা-সমাবেশ বন্ধ করা নয়, সভা-সমাবেশের আইন-শৃংখলা রক্ষা করা। এভাবেই পুলিশ গণতান্ত্রিক দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।
সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা থেকেই আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। ওইদিন (৫ জানুয়ারি) বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করতে দেখা গেছে এবং তারা বিএনপি নেতাকর্মীদের ক্ষিপ্রগতিতে গ্রেফতার করেছে। সবচেয়ে খারাপ হয়েছে দলটির শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে পুলিশ বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ রাখা। সরকার জনসমর্থন হারিয়ে কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সেটাই প্রকটরূপে জনসম্মুখে ধরা পড়েছে। এমনকি পুলিশের বেষ্টনীও তাদের কাছে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়নি। তাই সরকারকে দরজায় তালা দিয়ে ইট-বালু ভর্তি ট্রাক জড়ো করে পথ অবরোধ করতে হয়েছে যাতে বেগম খালেদা জিয়া বেরিয়ে জনসভায় না যেতে পারেন। তাকে লক্ষ করে মরিচের গুঁড়া ছিটানো হয়েছে। ভেবে কষ্ট হয়, রাজনীতির নামে আর কত নোংরামি দেখতে হবে আমাদের!
অনেক আগে থেকেই সরকারের মন্ত্রীরা এবং তাদের লোকেরা এ ধরনের পরিকল্পনার কথা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে আসছিলেন এবং তারা বলছিলেন যে, বিএনপি নেতাকর্মীদের রাস্তায় বেরোতে দেয়া হবে না। তারা নিজেদের ভয়ভীতি ও আতংকের বিষয়টিও পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন এ ইঙ্গিত দিয়ে যে, তাদের মধ্যে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার বেপরোয়া সংকল্প কাজ করছে। আর তাই সংলাপ ও নির্বাচনের ব্যাপারে সরকার তীব্র অনীহা দেখিয়ে যাচ্ছে। বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হল জনগণের ভোটের স্বাধীনতা। তাই এভাবে নির্বাচন না দিয়ে শুধু দল বা ব্যক্তির বাক স্বাধীনতা হরণ করা হচ্ছে না, সমগ্র জনগণের বাক স্বাধীনতা অস্বীকার করা হচ্ছে।
অবাধ নির্বাচনের প্রশ্নে জনগণকে মোকাবেলা করার অনিচ্ছা থেকে সরকার তার প্রিয় বক্তব্যই রেখে চলেছে- নতুন করে নির্বাচনও হবে না, সংলাপও হবে না। জনগণের ভোট ও জনমতের তোয়াক্কা না করেই তারা ক্ষমতায় থাকবে। এ ধরনের ভাষা পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে তো চলার কথা নয়।
গণতন্ত্রের যে সংজ্ঞাই দেয়া হোক না কেন, অবাধ নির্বাচন এড়িয়ে এবং বিরোধীদের কোনো সভা-সমাবেশ করতে না দিয়ে গণতন্ত্র চর্চার কথা বলা কারও মুখে মানায় না। এটা করার অর্থ আসলে সংঘাত-সংঘর্ষকে আমন্ত্রণ জানানো। এ কারণেই আমরা বেদনার্ত হয়ে এ কথা বলতে বাধ্য হয়েছি যে, আমাদের কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই- যে নেতৃত্ব দেশকে বিচার বিবেচনা সহকারে শান্তিপূর্ণ পথে পরিচালনা করতে সক্ষম।
জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, পুলিশি ক্ষমতার রাজনৈতিক ব্যবহার এবং সরকারের গণতান্ত্রিক বৈধতার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাবলীকে কোনোভাবেই উদ্ভূত সংকট থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। সর্বস্তরে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট জনগণ হৃষ্টচিত্তে মেনে নেবে- এ কথা ভাবার কোনো কারণ দেখি না। এ দেশের জনগণের সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস জানতে হবে। তারা নানা ধরনের শোষণ ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, জীবন দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কেবল বিএনপির মধ্যে সীমাবদ্ধ এটিও ভুল ধারণা। অধিকারহারা জনগণের দুঃসহ জীবনের কথা অস্বীকার করার নয়।
বিএনপিকে নির্মূল করতে পারলেই বর্তমান সরকার জনগণের কাছে ন্যায্য অথবা অধিকতর গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে এটাও সত্য নয়। সরকারের পক্ষে যদি সম্ভব হয় তবে এমন চিন্তা বদলে ফেলাই ভালো হবে।
নিরপেক্ষ নির্বাচনের আতংকে তো তাদেরই ভোগার কথা, যাদের জনগণের ওপর আস্থা নেই। জনগণের ওপর সরকারের আস্থা থাকলে তারা তো অবাধ নির্বাচন দিয়ে তা প্রমাণ করতে পারেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আওয়ামী লীগ তার গৌরবোজ্জ্বল গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের কথা ভুলে জনগণের ভোটে অবিশ্বাসী দলে পরিণত হয়েছে। ন্যায়-অন্যায়ের তোয়াক্কা না করে একশ্রেণীর
রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী জনগণের শাসনের পরিবর্তে দলনেত্রীকে গোষ্ঠীবিশেষের স্থায়ী শাসনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
জনগণের ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করার পরিবর্তে পুলিশি শক্তির ওপর নির্ভরতা সরকারের দুটি দুর্বলতাকে প্রকট করে তুলেছে। প্রথমত, জনসমর্থনের ব্যাপারে সরকারের নিজের আত্মবিশ্বাসের অভাব। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিকভাবে সমস্যা মোকাবেলার যোগ্যতা দেখাতে অপারগতা। বিএনপির জনসভা অনুষ্ঠানের ফল কী হয় সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করারও ধৈর্য ছিল না সরকারের। ফলে সরকার এটাই প্রমাণ করল- সে জনগণকে ও জনসমাবেশকে কত ভয় পায়।
অন্যদিকে বিএনপির ত্রুটি হচ্ছে, দলটি কোনো পরিষ্কার গণতান্ত্রিক বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারছে না। ঘুরেফিরে একই রাজনীতিতে বৃত্তবন্দি থাকা গণতান্ত্রিক রাজনীতি হতে পারে না। তাদের আন্দোলনে জনগণের ক্ষোভও যুক্ত হচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু দলীয় লোকদেরসহ অন্যদের নিয়ে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা করতে পারছে না বিএনপি।
বাস্তবতা হল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালাক্রমে ক্ষমতায় যাওয়ার নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্রের চর্চা করতে গিয়ে গণতন্ত্রের আজ মরণ দশা। গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের পবিত্রতা নেই। উভয় দল মিলেই আইনের শাসন পঙ্গু করেছে। পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। তাই বিএনপির আন্দোলন ক্ষমতা দখলের দলীয় সংগ্রাম হিসেবেই চিত্রিত হচ্ছে। এ কথার অর্থ এই নয় যে, ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির সহজে অবসান হবে।
যারা ক্ষমতায় আছেন তারা নিজেদের জনপ্রিয় দাবি করছেন, কিন্তু নির্বাচনের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত নন। বিরোধী দলকে দাবিয়ে রাখতে কত পুলিশের দরকার হচ্ছে সেটা কোনো বিষয় নয়। আসলে তারা সংকট উত্তরণের কোনো যুক্তিসঙ্গত পথ খুঁজতে চাইছেন না এবং প্রকারান্তরে নিজেদের নিজেরাই প্রতারিত করছেন।
সরকারের পেছনে জনসমর্থন না থাকাটা যে কোনো সরকারের জন্য মারাত্মক দুর্বলতা। বর্তমান সরকার নির্বাচনী বৈধতা দাবি করে থাকে; কিন্তু বাস্তবে সে বৈধতা তার নেই। সংঘবদ্ধ কিছু অতিলোভী লোকের সরকার নড়বড়ে ভিত্তির সরকার না হয়ে পারে না। এ রকম সরকারকে সর্বদা অনিশ্চয়তার ভয়ে থাকতে হয়-কখন কী হয় এ আশংকায়।
অথচ সবাই মিলে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সবার জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজটি অধিকতর সহজ। তবে এটুকু বুঝতে হবে যে, দলতন্ত্র চালিয়ে যাওয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে। এ ধরনের অবাস্তব চেষ্টা সংঘাত-সংঘর্ষ আর রক্তপাতকেই দীর্ঘায়িত করবে। জাতি যখন অশুভ ভবিষ্যতের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন যারা ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় তাদেরও অসহায় থাকতে হবে এটা মেনে নেয়া যায় না। সবাই মিলেই তো জনগণ।
কথায় কথায় মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকারদের বিষয়টিকে টেনে এনে সমস্যা সমাধানের বিপক্ষে কাজ করার সুযোগ নেই। কারণ চলমান আন্দোলন জনগণের সার্বভৌম অধিকার সম্পর্কিত আন্দোলন- জনগণের ভোটের অধিকার। কারা কোন ধরনের রাজাকার বা মুক্তিযোদ্ধা জনগণই তা নির্ধারণের মালিক। এটা কোনো ব্যক্তির খেয়ালখুশির ব্যাপার নয়।
আমরা তো দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন ও গণতন্ত্র চর্চা দেখে আসছি। আজ আমাদের অবস্থান যার যেখানেই হোক না কেন, দলীয় সম্পৃক্ততা থাকুক বা না-ই থাকুক, সবাইকে এটা উপলব্ধি করতে হবে যে, গণতন্ত্র তথা জনগণের শাসন বিনির্মাণের কাজটি দলীয় ব্যাপার নয়, এটা জাতীয় দায়িত্ব এবং সেই দায়িত্ব পালনে আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় শক্তি জনগণেরই শক্তি। এই শক্তির অপব্যবহার কাম্য নয়।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

বন্দিত্ব থেকে বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত by তোফায়েল আহমেদ

এখনও আমার স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করে ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎপ্রার্থী হাবীব আলীর কথা। ২২ ফেব্র“য়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং একই তারিখে ইরান ও তুরস্কের সরকারদ্বয়ও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এর পরদিন অর্থাৎ ২৩ ফেব্র“য়ারি ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা যাত্রা করেছিলাম লাহোরের উদ্দেশে। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিতে এসেছিলেন কুয়েতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এসেছিলেন লেবাননের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ওআইসির ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল, তিউনিসিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আলজেরিয়ার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল আজিজ বুতাফ্লিকা। এ পাঁচজন এসেছিলেন আলজেরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুয়ারে বুমেদীনের বিশেষ বিমান নিয়ে। লাহোর বিমানবন্দরে আমাদের অভ্যর্থনা জানান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট চৌধুরী ফজলে এলাহী এবং প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। সেখানে বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রেজেন্টেশন লাইনে যারা দণ্ডায়মান ছিলেন বঙ্গবন্ধু তাদের সবার সঙ্গে করমর্দন করলেও টিক্কা খানের সঙ্গে করমর্দন করেননি। কারণ টিক্কা খানের হাত শহীদের রক্তে রঞ্জিত ছিল।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে যাওয়ার সময় লাহোরে রাস্তার দুই পাশে লাখ লাখ লোক দাঁড়িয়েছিল। তারা বঙ্গবন্ধুকে লক্ষ্য করে স্লোগান তুলেছিল, ‘জীয়ে মুজিব, জীয়ে মুজিব’ অর্থাৎ মুজিব জিন্দাবাদ, মুজিব জিন্দাবাদ। বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। বঙ্গবন্ধু যখন অতিথিশালায় পৌঁছলেন, তখন সেখানে স্যুট-টাই পরিহিত ছোটখাটো একজন ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গন করেন। বঙ্গবন্ধুও পরমাদরে তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলেন, ‘হাবীব আলী, ইউ আর হেয়ার।’ জানতে পারলাম লোকটির নাম হাবীব আলী। বঙ্গবন্ধু যখন মিয়ানওয়ালী কারাগারে বন্দি তখন তিনি ছিলেন সেই কারাগারের প্রিজন গভর্নর। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপের পর তিনি আমাদের কক্ষে আসেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু মিয়ানওয়ালী কারাগারে কীভাবে জীবনযাপন করেছেন, কীভাবে তিনি মুক্তিলাভ করেছেন- সবিস্তারে তার বর্ণনা দেন। গভীর শ্রদ্ধায় স্মৃতি তর্পণ করে একটানা বলে যান মিয়ানওয়ালী কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বঙ্গবন্ধুর নয় মাস চৌদ্দ দিনের কঠিন কারাজীবনের কথা। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আগের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি আমাদের বলেছিলেন- ‘‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের ১০ দিন পর ২৬ ডিসেম্বর রাতে মুজিবকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশের পরপরই একটা ট্রাক নিয়ে মিয়ানওয়ালী কারাগারের দিকে যাই। কারা ফটক খুলে তার সেলের কাছে গিয়ে দেখি তিনি একটা কম্বল জড়িয়ে বিছানার ওপর ঢুলছেন। এমন সময় সেখানে যারা কয়েদি ছিল তারা শেখ মুজিবকে ফিসফিস করে বলছিল যে, ‘ওরা এসেছে।’ মুজিবও ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি মাথানত করব না।’ তার আগে মিয়ানওয়ালী কারাগারেই সেলের সামনে একটা কবর খনন করা হয়েছিল। শেখ মুজিব যখন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এটা কী?’ তখন তাকে বলা হয়েছিল যে, ‘যুদ্ধ চলছে, এটা বাংকার। শেল্টার নেয়ার জন্য।’ আসলে ছিল কবর। মুজিবকে একজন কয়েদি বলছিল, ‘আসলে এটা কবর। আপনি যদি আজ বের হন আপনাকে মেরে এখানে কবর দেয়া হবে।’ তখন মুজিব আমাকে বলেছিল, ‘কবরকে আমি ভয় পাই না। আমি তো জানি ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু আমি জানি আমার বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে এবং আমি এও জানি, যে বাংলার দামাল ছেলেরা হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে, সেই বাঙালি জাতিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ সেদিন তিনি মিনতি করে বলেছিলেন, ‘আমাকে হত্যা করে এই কবরে না, এই লাশটি আমার বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও। যে বাংলার আলো-বাতাসে আমি বর্ধিত হয়েছি- সেই বাংলার মাটিতে আমি চিরনিদ্রায় শায়িত থাকতে চাই।’
যা হোক, ওইদিন ২৬ তারিখে আমি ট্রাকে করে মুজিবকে নেয়ার জন্য মিয়ানওয়ালী কারাগারে আসি। কারণ, এরই মধ্যে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। ক্ষমতা হস্তান্তরকালে ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে প্রার্থনা করেছিল, ‘আমার ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে শেখ মুজিবকে হত্যা করার অনুমতি দাও। আমি আমার জীবনে যদি কোনো ভুল করে থাকি তা হল শেখ মুজিবকে ফাঁসি কাষ্ঠে না ঝোলানো।’ তখন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো আমার কাছে এই মর্মে জরুরি বার্তা প্রেরণ করেন যে, ‘শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে দ্রুত নিরাপদ কোনো স্থানে সরিয়ে ফেলা হোক।’ তখন আমি মুজিবকে মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে ট্রাক নিয়ে কারা ফটকে আসি এবং সেলের মধ্যে গিয়ে শেখ মুজিবকে আমার সঙ্গে যেতে অনুরোধ করি। কিন্তু তিনি আমাকে বাধা দেন। তখন আমি তাকে বলি, ‘শেখ, আমি আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি আপনাকে এখান থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে এসেছি। কারণ, এখানে কমান্ডো আসতে পারে। তারা আপনাকে হত্যা করবে। আমার ওপর আপনি আস্থা রাখুন।’
তারপর মুজিবকে ট্রাকে তুলে, ট্রাকের মধ্যে লুকিয়ে, আমার চশমা ব্যারাজ নামক বাড়িতে নিয়ে যাই। সেখানে গিয়েই তিনি একটা টেলিফোন করতে চান। মুজিব আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি কি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারি?’ তখন আমি তাকে বলেছিলাম, ‘না, আমার একমাত্র কাজ হল আপনার জীবন রক্ষা করা। আপনি টেলিফোন করতে পারবেন না।’ তখন তিনি বললেন, ‘আমি কি খবরের কাগজ পড়তে পারি?’ আমার উত্তর ছিল, ‘না।’ এরপর বললেন, ‘আমি কি এক কাপ চা পেতে পারি?’ তখন তাকে এক কাপ চা দেয়া হয়। আমার বাড়িতে তিনি দুই দিন থাকেন। দিন দুই পর শেখ মুজিবকে নিয়ে যাই শাহুল্যা নামক স্থানে, যেটা একসময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রেস্ট হাউস ছিল। পিন্ডি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে এ শাহুল্যাতে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। ভুট্টো যখন আসেন তখন একজন কর্নেল এসে মুজিবকে বলেছিল, ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসবে।’ তারপর সেখানে ভুট্টো এলেন এবং মুজিবকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘নাউ আই অ্যাম দ্য প্রেসিডেন্ট অব পাকিস্তান অ্যান্ড চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।’ তারপরই শেখ মুজিবের প্রশ্ন ছিল, ‘ভুট্টো, টেল মি ফার্স্ট, হোয়েদার আই অ্যাম এ ফ্রিম্যান অর প্রিজনার।’ তখন ভুট্টো উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নাইদার ইউ আর এ প্রিজনার, নর ইউ আর এ ফ্রিম্যান।’ তখন শেখ মুজিব বললেন, ‘ইন দ্যাট কেইস আই উইল নট টক টু ইউ।’ তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো বলতে বাধ্য হলেন, ‘ইউ আর এ ফ্রিম্যান।’ এরপর শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তারপর তিনি অনেক রকমের প্রস্তাব দিলেন। কীভাবে একটা কনফেডারেশন করা যায়, কীভাবে একসঙ্গে থাকা যায়, ইত্যাদি। কিন্তু শেখ মুজিব কোনো কথাই বললেন না। চুপ করে থেকে শুধু বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আমার প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে না পারব, ততক্ষণ আমার পক্ষে কিছুই বলা সম্ভবপর নয়।’ এরপর শেখ মুজিবকে একটা যৌথ ইশতেহার দেয়া হয়েছিল স্বাক্ষর করার জন্য। মুজিব সেটাও প্রত্যাখ্যান করলেন। পরিশেষে শেখ মুজিব বললেন, ‘আমি কি এখন দেশে যেতে পারি?’ ভুট্টো বললেন, ‘হ্যাঁ, যেতে পারেন। কিন্তু কীভাবে যাবেন? পাকিস্তানের পিআইএ ভারতের ওপর দিয়ে যায় না।’ তখন মুজিব বললেন, ‘সেক্ষেত্রে আমি লন্ডন হয়ে যাব।’ এরপর ৮ জানুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পেয়ে পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন।’’
কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি লাভ এবং ভুট্টোর সঙ্গে কথোপকথনের স্মৃতিচারণ শেষে হাবীব আলী আমাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা বাঙালিরা গর্বিত ও মহাসৌভাগ্যবান যে, শেখ মুজিবের মতো একজন নেতা তোমরা পেয়েছ।’ সেদিন হাবীব আলীর স্মৃতিকথা ও মন্তব্য শুনে বিস্মিত হইনি; কিন্তু গর্বে বুক ভরে উঠেছিল। আমরা তো জানতাম আমাদের নেতার ইস্পাত-কঠিন দৃঢ় সংকল্পের কথা।
প্রতি বছর যখন আমাদের জীবনে ১০ জানুয়ারি ফিরে আসে, তখন জাতির জনককে ঘিরে কত কথা হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে। কারণ ১০ জানুয়ারি বাঙালি জাতির জীবনে চিরস্মরণীয় এক অনন্য ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭২-এর এই দিনটিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করেছিল। যদিও ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়েছিল; কিন্তু বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশে বিজয়ের পরিপূর্ণ স্বাদ পায়নি। পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠের নারকীয় বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বের নিপীড়িত-মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম মুখপাত্র বঙ্গবন্ধু মুজিব জানুয়ারির ৮ তারিখে পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছান। বঙ্গবন্ধুর লন্ডন আগমনের সংবাদ শোনামাত্র জামুরকাই নামক অবকাশ যাপন কেন্দ্রে ছুটিতে থাকা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হিথ ছুটে আসেন ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে অবস্থিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এবং ব্রিটিশ রীতি-ঐতিহ্য অনুযায়ী সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বাগত জানান।
পরদিন ৯ জানুয়ারি লন্ডনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু একটি বিবৃতি প্রদান করেন। ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলার মুক্তি সংগ্রামে স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এ মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখন আমি রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন ও সহযোগিতা দানের জন্য ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে আমি ধন্যবাদ জানাই। স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব সত্য। এদেশকে বিশ্বের স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশ অবিলম্বে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য অনুরোধ জানাবে।’ পরিশেষে তিনি বলেন, ‘আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।’ তিনি জনগণের কাছে ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ সময়ের বন্দি জীবনের নিঃসঙ্গতা তাকে কাবু করতে পারেনি। জনগণের আরাধ্য প্রিয় নেতা তার মানস জগতে জনতার সাহচর্য লালন করেছেন প্রতিনিয়তই।
যেদিন, ৮ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সংবাদ জানলাম, সেদিন এক অনির্বচনীয় আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল সারা দেশে। মানুষের যে কী আনন্দ তা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়। সমগ্র দেশবাসী অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে কখন প্রিয় নেতা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করবেন। অবশেষে পরমাকাক্সিক্ষত সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি এলো। সেদিন ছিল সোমবার। সকাল থেকেই লাখ লাখ মানুষ ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে দশদিক মুখরিত করে মিছিল নিয়ে বিমানবন্দর অভিমুখে যাচ্ছে। কোটি কোটি হৃদয় রুদ্ধবাক মুহূর্ত গুনছে, প্রতি নিঃশ্বাসে অধীর আগ্রহে কালক্ষেপণ করছে- কখন, কখন আসবেন প্রিয় নেতা? কী দিয়ে তারা বরণ করে নেবে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে, বাঙালির হৃদয়ের শ্রেষ্ঠ গর্বকে। রণক্লান্ত যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধা, শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সংগ্রামী জনতা, অশ্র“ভারাক্রান্ত চোখে সন্তানহারা জননী, স্বামীহারা পত্নী, পিতৃহারা পুত্র-কন্যা সব দুঃখকে জয় করে স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যথা ভুলে গর্বোদ্ধত মস্তকে সবাই অধীর আগ্রহে আজ অপেক্ষমাণ দু’হাত বাড়িয়ে জাতির জনককে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করার জন্য।
ঢাকায় যখন সাজসাজ রব, তখন সকাল থেকে দিল্লির রাজপথ ধরে হাজার হাজার মানুষের মিছিল পালাম বিমানবন্দর ও প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দিল্লির জনসাধারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে এক অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান রাষ্ট্রপতি শ্রী ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ও সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা। ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট জেটটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অবতরণ করলে তার সম্মানে ২১ বার তোপধ্বনি করা হয়। ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ তাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন।
দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট বিমানটি ঢাকার আকাশ সীমায় দেখা দিতেই জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। দুপুর ১-৫১ মিনিটে বিমানটি অবতরণ করে। বিমানে সিঁড়ি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্য নেতারা, আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ছুটে যাই নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে। আমার হাতে ছিল পুষ্পমাল্য। জাতির জনককে মাল্যভূষিত করার সঙ্গে সঙ্গেই তার সংযমের সব বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনতার মহাসমুদ্রের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তার চোখে তখন স্বজন হারানোর বেদনা-ভারাক্রান্ত অশ্র“র নদী, আর জ্যোতির্ময় দ্যুতি ছড়ানো মুখাবয়বজুড়ে বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি। বিমানের সিঁড়ি বেয়ে জাতির জনক তার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি সম্মান জানানো হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদর্শন করে। মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু সালাম গ্রহণ করেন।
রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার জন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপেক্ষমাণ ট্রাকে উঠে রওনা দিই। সুদৃশ্য তোরণ, স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দিয়ে সজ্জিত রাজপথের দুই পাশে দাঁড়ানো জনসমুদ্র পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যখন ময়দানে পৌঁছলাম তখন বিকাল সাড়ে ৪টা। অর্থাৎ বিমানবন্দর থেকে ময়দান পর্যন্ত আসতে সময় লেগেছে ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট। নেতাকে নিয়ে যখন ময়দানে প্রবেশ করি, কোনো দিকে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। আবালবৃদ্ধবনিতার মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠে ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে চতুর্দিকে তাকালেন এবং রুমালে চোখ মুছে চিরাচরিত ভঙ্গিতে ‘ভায়েরা আমার’ বলে উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দেশে নিবেদন করলেন তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা। হৃদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে আবেগঘন ভাষায় বললেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘ভায়েরা, তোমাদের একদিন বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আজকে আমি বলি, আজকে আমাদের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঘরে ঘরে কাজ করে যেতে হবে। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। আমার বাংলায় আজ বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লাখ লোক মারা গেছে। আপনারাই জীবন দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে, এটাই ছিল আমার সাধনা।’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বলেন, ‘গত পঁচিশে মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এদেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। বিশ্বকে মানব ইতিহাসের জঘন্যতম কুকীর্তির তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এসব কুকীর্তির বিচার করতে হবে।’ বিশ্বের সব রাষ্ট্র ও জাতিসংঘের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘আমি বিশ্বের সব মুক্ত দেশকে অনুরোধ জানাই, আপনারা অবিলম্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন। জাতিসংঘেরও উচিত অবিলম্বে বাংলাদেশকে আসন দিয়ে তার ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণ
করা।’ পরিশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা
থেকে উদ্ধৃত করে তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।’
কী অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কোচিত বক্তৃতা! রাষ্ট্রের আশু করণীয় কী হবে, তা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত, ইঙ্গিতবহ অথচ তাৎপর্যপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বক্তৃতা দিলেন বঙ্গবন্ধু। লাখ লাখ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে এবং পরম পরিতৃপ্ত হয়েছে এই ভেবে যে, আজ থেকে আমরা প্রকৃতই স্বাধীন। সভামঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু ধানমণ্ডির ১৮নং বাড়িতে গেলেন। যেখানে পরিবারের সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। সেই বাড়ির সামনে আরেকটি বাড়ি তখন তার জন্য রাখা হয়েছিল। কেননা ধানমণ্ডির ৩২নং বাসভবনটি শত্র“বাহিনী এমনভাবে তছনছ করে দিয়েছিল যে তা বসবাসের অনুপযুক্ত ছিল। ১১ জানুয়ারি প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ১২ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন এবং আবু সাইদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করলেন। ১৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আমাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তার রাজনৈতিক সচিব করেন। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় গণতন্ত্র।
আজ জাতির জনকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অবিস্মরণীয় এই ঐতিহাসিক দিনটিতে কেবলই মনে পড়ে সাতই মার্চের ভাষণের শেষাংশ- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ রাজনৈতিক মুক্তি আমাদের অর্জিত হয়েছে। আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, সংবিধান, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র পেয়েছি। কিন্তু জাতির জনকের স্বপ্নের শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে আর তার ভালোবাসার হতদরিদ্র দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি আজও অর্জন করতে না পারলেও আমরা সেই লক্ষ্য পরিপূরণে এগিয়ে চলেছি। আন্তর্জাতিক জরিপকারী বিভিন্ন সংস্থার মতে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির অধিকাংশ সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি এক কথায় বিস্ময়কর। যদিও আমরা এখনও স্বল্পোন্নত, তথাপি আমরা জনসাধারণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমাদের আশাবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘রূপকল্প’ অনুযায়ী ২০২১ সালে আমরা মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরিত হব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত সরকার অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সক্ষম হবে।
তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য; বাণিজ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

‘বিপ্লবী’ তরুণ যেভাবে প্রেসিডেন্ট

বীর সেনানীর ঘরে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই আচরণও ছিল আর দশটা ছেলের চেয়ে আলাদা। যেমন মৃদুভাষী, তেমনই মিশুক। আদর্শের ব্যাপারে আপসহীন। পরিচিতজনেরা বলাবলি করতেন, ভবিষ্যতে ছেলেটা বড় কিছু একটা হবে। তাদের কথা বাস্তবে পরিণত হলো আজ। গত বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে জয়ী হয়ে শ্রীলঙ্কার সপ্তম প্রেসিডেন্ট হয়েছেন মাইথ্রিপালা সিরিসেনা (৬৩)। তাঁর পুরো নাম পালেওয়াত্তি গামারালালাজে মাইথ্রিপালা ইয়াপা সিরিসেনা। জন্ম ১৯৫১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর, মধ্য-উত্তর শ্রীলঙ্কার পোলোনারুয়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বাবা অ্যালবার্ট সিরিসেনা ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-ফেরত বীর সেনা। ছোটবেলা থেকেই সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল সিরিসেনার। মাত্র ১৬ বছর বয়সে গ্রাম থেকে অচেনা রাজধানী কলম্বোতে গিয়ে যোগ দেন সমাজতন্ত্রীদের সরকারবিরোধী আন্দোলনে। রাজনীতিতে সেটাই হাতেখড়ি। এরপর উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
১৯৬৭ সালে সিরিসেনা যোগ দেন প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) যুব শাখায়। তিন বছর পর মাত্র ২০ বছর বয়সে তাঁকে সরকারবিরোধী ‘বিপ্লবে’ নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে দুই বছর কারাগারে থাকতে হয়। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে।
১৯৮১ সালে এসএলএফপির পলিটব্যুরোতে যোগদানের মধ্য দিয়ে সিরিসেনার রাজনৈতিক উত্থান শুরু। ১৯৮৯ সালে দলটির টিকিট নিয়ে নিজ এলাকা থেকে নির্বাচন করে পার্লামেন্ট সদস্য হন তিনি। এরপর বিভিন্ন সময়ে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং বিভিন্ন সরকারের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের অধীনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন।
সিরিসেনা খুব ডাকসাইটে মন্ত্রী ছিলেন, বিষয়টি তেমন নয়। তবে কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সবাই তাঁকে পছন্দ করতেন। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও সিরিসেনার সাবেক সহকর্মী অস্টিন ফার্নান্দো সেভাবেই তুলে ধরলেন তাঁকে। সিরিসেনাকে ‘নম্র-ভদ্র ও মৃদুভাষী রাজনীতিক’ হিসেবে বর্ণনা করে ফার্নান্দো বলেন, ‘তিনি এমন একজন পছন্দ হওয়ার মতো মানুষ, যিনি সহজেই অন্যের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠতে পারেন।’
কৃষক পরিবার থেকে এসেছেন সিরিসেনা। বাবা অ্যালবার্ট সিরিসেনা সেনাসদস্য হলেও বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফিরে কৃষিকাজেই মন দেন। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের মতো তিনিও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহিল জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। দুজনই বৌদ্ধধর্মের অনুসারী।
সূত্র: এএফপি ও বিবিসি

টানা অবরোধে কোমর ভাঙছে কৃষকের- বিপাকে ব্যবসায়ীরাও

(ক্রেতার অপেক্ষায় কৃষকেরা। গত বৃহস্পতিবার বগুড়ার মহাস্থানগড় হাট থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো) ‘আইজ ১৮ টাকা দরে কাঁচা মরিচ বেচল্যাম। অথচ অবরোধ না থাকলি এর দাম হইতো ২৮ টাকার থ্যা ৩০ টাকা। অবরোধ আমাগরে কোমর ভাইঙ্যা দিত্যাছে।’ এ বক্তব্য পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার শহীদনগর গ্রামের মরিচচাষি মন্টু মিয়ার। সাঁথিয়ায় প্রচুর সবজি ও মরিচ চাষ হয় এবং সেখান থেকে যায় ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে। তবে মরিচের দামের উল্টো চিত্র নীলফামারীতে। শহরের বড় বাজারের কাঁচামাল বিক্রেতা নাজমুল হোসেন জানান, কাঁচা মরিচ কদিন আগেও ১৬-১৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন ২৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অবরোধের কারণে বাইরের জেলা থেকে মরিচ না আসায় দাম বেড়ে গেছে। বিরোধী জোটের ডাকা অবরোধ এবং এর আগে আরও দুই দিন সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন থাকায় এর চরম প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। শীতের সবজিসহ অন্যান্য কাঁচা পণ্য এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পৌঁছাতে না পারায় দাম কমে গেছে অনেক। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। আর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ীরাও। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা উত্তরাঞ্চলের দুগ্ধখামারিদের। অরোধের কারণে ঢাকায় পাঠাতে না পারায় সিরাজগঞ্জে দুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছে মিল্ক ভিটা। ফলে সেখানে ৫০ টাকার দুধ বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৩০ টাকা লিটার দরে। একই অবস্থা বগুড়ার ধুনট ও শেরপুরে।
সবজির ক্রেতা নেই: বৃহস্পতিবার পাবনার সাঁথিয়ার অন্যতম পাইকারি সবজির হাট করমজা হাটে গিয়ে দেখা যায়, এক জায়গায় স্তূপাকারে পড়ে আছে পেঁয়াজকলি (পেঁয়াজের ফুল)। ছবি তুলতে গেলে এগিয়ে আসেন সবজি ব্যবসায়ী সাহাদাত। তিনি জানান, ক্রেতা না পাওয়ায় এগুলো ফেলে গেছেন কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীরা। হাটের আরেক পাশে ফুলকপি নিয়ে মুখ ভার করে বসেছিলেন শাহজাদপুর উপজেলার তালগাছি গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হোসেন। তিনি জানান, অবরোধের আগেও এই হাটে আট থেকে দশ টাকা কেজি দরে ফুলকপি বিক্রি করেছেন। এখন বিক্রি হচ্ছে চার থেকে সাড়ে চার টাকা কেজিতে।
করমজা হাটের কাঁচামালের আড়ত আজমির ভান্ডারের মালিক ফজলুর রহমান জানান, অবরোধের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রামে কোনো সবজিই পাঠানো যাচ্ছে না। ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, কাঁচা মরিচসহ সব ধরনের সবজির দাম অর্ধেকে নেমে গেছে। তিনি বলেন, এতে শুধু কৃষকেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, ব্যবসায়ীদেরও লোকসান হচ্ছে।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার আলুচাষি আলম হোসেন জানান, অবরোধের আগে যে আলু খেত থেকে পাইকােররা ১২ থেকে ১৪ টাকা দরে কিনে নিয়ে গেছেন, এখন সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে পাঁচ থেকে ছয় টাকা কেজি দরে। শহরের বড় বাজারের সবজি ব্যবসায়ী নাজমুল হোসেন বলেন, ‘এ জেলা থেকে যেসব কাঁচামাল বাইরে যায়, তার দাম কমেছে আর যেসব মাল বাইরে থেকে এখানে আসে তার দাম বেড়েছে।’ দেশের সবচেয়ে বেশি শীতকালীন টমেটো চাষ হয় রাজশাহীর গোদাগাড়িতে। উপজেলার পিরিজপুর গ্রামের চাষি গোলাম রসুল জানান, গত রোববার তিনি প্রতি মণ পাকা টমেটো বিক্রি করেছেন ৩৬০ টাকা। গতকাল সেই টমেটো বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা মণ দরে। দাম এত কমল কেন জানতে চাইলে নাটোর থেকে গোদাগাড়িতে টমেটো কিনতে আসা ব্যবসায়ী শাহজাহান আলী বলেন, ‘গোদাগাড়ি থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রাক ভাড়া লাগত ২৫ হাজার টাকা। অবরোধের কারণে সেই ভাড়া গিয়ে ঠেকেছে ৬০ হাজার। এর পরও ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না, চালকেরা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামতে চাইছেন না। ফলে আগের দামে টমেটো কিনলে ট্রাকভাড়া মিটিয়ে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হবে।’
দুধের দাম অর্ধেক: সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও পার্শ্ববর্তী পাবনা জেলা থেকে খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে মিল্ক ভিটা, ব্র্যাক, প্রাণ, আকিজ ও অ্যামোসহ প্রায় দশটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ লিটার দুধ কেনে তারা। কিন্তু অবরোধের কারণে ঢাকায় পাঠাতে না পারায় দুধ কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা লিটারের দুধ বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। ওই এলাকার দুধের প্রায় অর্ধেক কেনে মিল্ক ভিটা। প্রতিষ্ঠানটির বাঘাবাড়ি কারখানার ব্যবস্থাপক মো. ইদ্রিস আলী জানান, সংগ্রহ করা দুধের বেশির ভাগই ঢাকায় পাঠানো হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে ঢাকায় পাঠানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে কেবল গত বুধবার পুলিশ পাহারায় চার গাড়ি (৪২ হাজার লিটার) দুধ ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ কারণে তাঁরা দুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। বগুড়ার ধুনট ও শেরপুর বাজারেও বৃহস্পতিবার দুধ বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকা লিটার দরে। অবরোধের আগে দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা।
কমেছে ধানের দামও: বগুড়া ও পাবনায় ধানের দামও কমে গেছে। ধান ও চাল বাইরে পাঠাতে না পারায় ওই সব এলাকার ধানচাতালগুলোও বন্ধ হতে বসেছে। কাজ না থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন চাতালশ্রমিকেরা। বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে ধানের দাম কমেছে মণপ্রতি ৪০ টাকা। উপজেলার কোলগ্রামের কৃষক খয়বর আলী বলেন, ‘এবার আমন ধানের ফলন হয়েছিল ভালো। আমরা খেটে খাওয়া কৃষকেরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু গত কয়েক দিনে ধানের বাজার মণপ্রতি ৩০-৪০ টাকা করে কমে গেছে। রবিশস্য খেতে সার ও কীটনাশক দেওয়া এবং ঋণের টাকা শোধ করার জন্য বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। পাবনার ঈশ্বরদীর ধান-চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক সাদেক আলী বিশ্বাস বলেন, উপজেলার অধিকাংশ চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। অবরোধ প্রত্যাহার না হলে দু-এক দিনের মধ্যে সব চাতাল বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন চাতালশ্রমিকেরা। প্রায় ১২ হাজার শ্রমিকের কাজ নেই। চাতালশ্রমিক মুছলিমা খাতুন বলেন, ‘অবরোধের কারণে বুধবার থেকে চাতাল বন্ধ। মালিক কাজে যেতে নিষেধ করেছেন। ফলে হাজিরাও (পারিশ্রমিক) পাব না।’
{প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, ঈশ্বরদী ও বেড়া (পাবনা), দুপচাঁচিয়া, শেরপুর ও ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি}

মাতৃক্রোড় by জয়দীপ দে

জিপিএসের প্রয়োজন ছিল না, তিন রাস্তার মাথার ওপর দাঁড়ানো সেগুনগাছটাই নির্দেশ করে দিত তার অবস্থান। কলোনির ভেতরে ঢোকার বা বেরোবার মুখে একবার তার সঙ্গে দেখা হতো। সেই দর্শন অনিবার্য। তার পরও তা এড়ানোর জন্য হাজারো ফন্দি-ফিকির চলত আমাদের। ও একবার নৌকার ছইয়ের মতো ঘরটার ভেতরে ঢুকলে, এক নিঃশ্বাসে পেরিয়ে যেতাম সেগুনগাছের সীমানাটুকুন। তখনই পেছন থেকে ডাক পড়ত, ও বাজান কুনায় যওর... ইস্কুলোর ঘণ্টা হইচ্ছে নি...। মনে মনে উত্তর করতাম, স্কুলের ঘণ্টা দিয়ে তোমার কাজ কী? তুমি রাস্তায় বসে বসে ‘ও ভাই দু-গা টিঁয়া সাইয্য করি যান’ বলো। কিন্তু উত্তর করার সাহস হতো না। এমনকি পেছন ফেরারও। বরং এক দৌড়ে মিশে যেতাম লোকারণ্যে।
লেংড়ি ছিল আমাদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক। এ রকম একটা শয়তানকে কলোনির মুখে থাকতে দেওয়ার অর্থ কী, সেটাই ঘুরপাক খেত আমাদের মাথায়। প্রশ্নের উত্তর আমরা পেতাম না, উল্টো আরও কিছু ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হতো আমাদের ছোট ছোট বুকগুলোর ভেতর। ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নে’, নইলে লেংড়ি এলে পালানোর শক্তি পাবি না।’
চোখ দুটো গোল গোল করে ভাতের লোকমা ভরা হাতটা নাচাতে নাচাতে মা বলত। সেই ভয়ে অরুচিকর খাবারগুলো দিব্যি গলা বেয়ে নেমে যেত পাকস্থলীতে। আমরা মনে মনে ভাবতাম, বড়োরাই বুঝি এই লেংড়িকে পুষছে আমাদের শায়েস্তা করার জন্য। তার ভয়ে আমরা যেন সব সময় লক্ষ্মটি হয়ে থাকি। এত ভয়, এত উদ্বেগের পরও তাকে নিয়ে ছিল আমাদের রাজ্যের কৌতূহল। খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে দেখতাম ওকে। একহারা গড়নের এক মহিলা। গায়ের রং একসময় হয়তো ফরসা ছিল, পরে রোদে-জলে মজে গেছে। সব সময় ছোট্ট একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে থাকে সেগুনগাছটার নিচে। হাঁটে একটা পা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে। পরনে নোংরা পাটের শাড়ি। লোকজন দেখলে টিনের থালাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘ও ভাই দু-গা টিঁয়া সাইয্য করি যান’। আমাদের মতো ছোট্ট বাচ্চাদের পেলে সুর পাল্টে যায়। আদুরে গলায় কাছে ডাকে। কিন্তু আমরা ভুলেও সাড়া দিই না তার ডাকে। সাড়া দিলেই বিপদ। কলোনির মা-খালাদের ভাষ্য, লেংড়ি নাকি বাচ্চা কেনাবেচার ব্যবসা করে। অনেকেই তার কাছ থেকে বাচ্চা কিনে নিয়ে পালে।
২. এই বাচ্চা-চোর লেংড়িকে দেখে দেখেই আমাদের বড়ো হওয়া। কিন্তু ওর কোলের বাচ্চাটা কোনো দিন বড়ো হয় না। ছোট্ট একটা দুগ্ধপোষ্য বাচ্চা সব সময় তার বুকের ওমে লেগে থাকে। তখনো এসব বুঝে ওঠার বয়স হয়নি। যেমন বয়স হয়নি ‘লেংড়ির বাচ্চা’ গালিটার অর্থ বোঝার। খেলার মাঠে একটা কিছু হলেই কলোনির একটা বাচ্চা আরেকটা বাচ্চাকে লেংড়ির বাচ্চা বলে গালি দিত। এই গালির ব্যুৎপত্তি আমাদের জানা ছিল না। অনুমান, কারও মা-বাবার দাম্পত্য কলহ থেকে ফসকে গেছে শব্দটা। কিন্তু গালিটা যে খুব অপমানের, সেটা বুঝতে কষ্ট হতো না। এই গালি নিয়ে খুনোখুনির মতো দশা হয়ে যেত। পাড়ার মা-খালারা প্রায় ফিসফিস করে বলত, সাইফুল সাহেবের পোলাটা দেখছেন, একেবারে মা-বাবার মতো হয়নি... আরেকজন কৌতূহলী চোখ মেলে বলত, হবে কেমনে, বাচ্চাটা তো লেংড়ির কাছ থেকে— আমাদের দেখে তারা স্মাগলারদের মতো টুপ করে কথা গিলে ফেলত। আমি বা আমরা অবাক হই, লেংড়ি এত বাচ্চা পায় কই! নিশ্চয়ই এর-ওর বাচ্চা চুরি করে এনে বেচে দেয়। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসত। লেংড়ির রোদে পোড়া মুখটার সঙ্গে হরর ছবির ডাইনিদের মুখের অদ্ভুত সাদৃশ ভেসে উঠত মনের পর্দায়। ভয়ের চোটে রাতে চোখের পাতাটা পর্যন্ত নামতে চাইত না।
৩. লেংড়ির স্বামীটা সারা দিন ছইয়ের তলায় বসে রান্নাবাটি খেলত। অল্প অল্প ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকত তাদের ছোট্ট ডেরাটা। কাছে গেলে ভাতের বলক দেওয়ার শব্দ শোনা যেত। সেই রান্নার ধোঁয়া, ভাতের বলক আমাদের মনে রহস্যের ইন্দ্রজাল বুনে দিত। মন চাইত, গিয়ে দেখি কী হয় ডাইনির আস্তানায়। কিন্তু সেই সেগুন গাছ, লেংড়ির পোষা লেঠেলের মতো বড়ো বড়ো সবুজ পাতা নাড়িয়ে চোখ পাকাত। শোঁ শোঁ শব্দ আসত দূরের পাহাড়গুলো থেকে। কী জানি, ডাইনিটা এই বুঝি উড়ে এসে ছোঁ মারবে আমাদের পিঠে! নিয়ে যাবে অচিন কোনো দেশে। বিক্রি করে দেবে সেখানকার নিঃসন্তান কোনো বাবা-মায়ের কাছে। কোনো দিন আর ফেরা হবে না এত দিনের পরিচিত গৃহকোণে। মা-বাবার মুখটা স্মরণ করে অবোধ কান্নায় ভেঙে পড়ি। দূর থেকে দেখি, হলদে হলদে দাঁতগুলো বের করে হাসছে লেংড়ি। নোংরা পুঁটলির ভেতর থেকে হাত বের করে ইশারায় ডাকছে আমাকে। চোখ-মুখ বন্ধ করে খিঁচিয়ে একটা দৌড় লাগাই। মায়ের উষ্ণ বুকে মাথা গুঁজে কাঁদি। এর মধ্যেই দেখা গেল লেংড়ি অন্যরূপে হাজির—ছোট্ট একটা করগেটেড বক্সের ওপর গোটা চারেক বৈয়াম সাজিয়ে রেখেছে। তাতে আটানা দামের নাবিস্কো লজেন্স আর গ্লুকোজ বিস্কিট। কাঠি লজেন্স ছিল কি না মনে নেই। আমরা অবাক হয়ে দেখি লেংড়ি দোকান পেতে বসেছে। কিন্তু কে কিনবে তার বিস্কিট-লজেন্স। বাচ্চারা তো ভয়েই তার পাশ ঘেঁষে না। তাই তার পুরোনো পেশাটি ছাড়ল না সে। দোকানে বসে বসেই সে ঘ্যান ঘ্যান করে বলত, ‘ও ভাই দু-গা টিঁয়া সাইয্য করি যান’। এভাবে তার পুরোনো পেশা আর নতুন পাতানো ব্যবসা চলতে লাগল সমান্তরাল।
৪. জাদুটা লজেন্সের না বিস্কিটের মনে নেই। ছোট্ট বাচ্চারা ভয়ের কাটা সরিয়ে আসতে লাগল সেগুনগাছটার গোড়ায়। দিনে দু-চারটা লজেন্স বিক্রি হতে শুরু করল লেংড়ির দোকান থেকে। মা-খালারা এ নিয়ে ভীষণ-উদ্বিগ্ন, সাবধান ওর কাছে যাবি না, যদি নিয়ে পালায় বুঝবি— অমৃতের আকর্ষণে অনেক বড়ো ঝুঁকিও তুচ্ছ হয়ে যায়। আমাদের ক্ষেত্রে সেটাই হতে লাগল। হ্যাংলার মতো গিয়ে আমরা দাঁড়াই তার ছোট্ট পসরাটার সামনে। বুকের সব শক্তি ছেড়ে দিয়ে লেংড়ির কোলের বাচ্চাটা যেন কাঁদে। বাচ্চা সামলাতে সামলাতে আমাদের দিকে তাকায় লেংড়ি। ছাতা-পড়া মুখ উজ্জ্বল করে হেসে ওঠে, ও বাজান লজেন্স নিবা— মনের ভেতরে ভয় দাগ কাটে, ওর লজেন্সে কোনো মন্ত্র পড়া নেই তো! এ তার বাচ্চা চুরির কোনো বাহানা নয় তো? ভয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। উল্টো ঘুরেই ছুট লাগাই। অন্যদের দেখাদেখি একসময় ভয় ভেঙে যায়। আটানায় পাওয়া লজেন্সে লেংড়ি আসলে অমৃত পুরে দিয়েছে। দিনে এক দুইবার ওর দোকানে গিয়ে লজেন্স কিনি। লেংড়ির যতটা না লজেন্স বিক্রির আগ্রহ তার চেয়ে বেশি কথা বলার।
ও বাজান তোঁয়ার নাম কিও...
কোনায় থাহো...
আইজ কি দি ভাইত খাইছো...
রাজ্যের সব প্রশ্ন তার। বিরক্তিতে এড়িয়ে যাই।
৫. আস্তে আস্তে লেংড়ির কথার ফাঁদে পড়ে যাই আমরা। রাজ্যের সব গল্প তার জানা। কোথাকার কোন সোনাগাজি, মহীপাল কিংবা কমলাপুর সদরঘাট...সব সে প্রায়-নিশ্চল পা খানা টেনে টেনে ঘুরে বেড়িয়েছে। সে সেসব গল্প আমাদের বলে। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনি। নোংরা বসনের ছাতা-পড়া মুখের লেংড়িকে আর ডাইনি লাগে না। ভালোই মনে হয়। মনে হয় তার বুকটাও আমাদের মা-খালাদের মতো মমতা দিয়ে গড়া। কেন যেন লেংড়ি আমাকে একটু বেশিই স্নেহ করত। দুটো চাইলে তিনটে লজেন্স ধরিয়ে দিত। ‘আর আটানা তো নাই’ বললে সস্নেহে মাথায় হাত রেখে বলত, লাগবে না। গ্রীষ্ম কিংবা শরতের ছুটি পেলে ঘণ্টা কে ঘণ্টা বসে থাকতাম লেংড়ির দোকানের পাশে। লেংড়ি কোথা থেকে যেন চুরি করে আনা পেয়ারা আমার হাতে দিয়ে খেতে বলত। প্রথম প্রথম সংকোচ হতো, তারপর চেয়ে নিয়ে খেতাম। মা এসব দেখলে বাসায় নিয়ে দু-গালে চটাস চটাস লাগাত। আর অগ্নিগর্ভ মুখ করে বলত, সাবধান ওদিকে যাবি না, লোকে খারাপ বলবে। লেংড়ির সঙ্গে কথা হতো রাজ্যের সব বিষয় নিয়ে। এর মধ্যে এক দিন দেখা গেল তার দোকান বন্ধ। ছইয়ের ভেতরেও কেউ নেই। দিন দুয়েক পর লেংড়ি ফিরল ছোট্ট একটা ইঁদুরের বাচ্চার মতো শিশুকে কোলে নিয়ে। আর আগেরটা হামাগুড়ি দিচ্ছে মাটিতে।
৬. দুপুরে ঘুম পাড়ানো ছিল মায়ের জন্য এক যুদ্ধ। দুপুরে না ঘুমালে রাতে পড়তে বসলে ঝিমুবি, এই অজুহাতে মা ধরেবেঁধে শুইয়ে দিত বিছানায়। ঘুমের ভান করে শুইয়ে থাকতাম। মা রান্না ঘরের কাজ সেরে যেই একটু বিছানায় মাথা দিত, এই সুযোগে ছুট লাগাতাম। বাইরে এসে দেখতাম কেউ নেই পথেঘাটে। মাঠটাও শূন্য। ঝিম ঝিম করছে চারিধার। গুটি গুটি পায়ে হাজির হতাম লেংড়ির ডেরায়। কী বাজান, ঘুম আয় ন— মাথা নাড়াই। লেংড়ি তার নানার পোষা জিনটার গল্প বলে। তার কোলের বাচ্চাটা কিছুক্ষণ কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ে। নিঃশব্দ চরাচর। আমি ডুবে যাই লেংড়ির গল্পের জগতে। তার কিছু কথা, কিছু বুঝি কিছু বুঝি না। তবে অবোধ্যটা বোধ্য হয়ে ওঠে তার কথকী ঢঙের কারণে। অজান্তেই কখন মাথাটা রাখি তার কোলে। চারদিকে যেন স্বপ্নের প্রজাপতি ওড়ে। জিন, পাখাওলা ঘোড়া—বোরাক, সোলেমান বাদশা...সবাই এসে ঘিরে ধরে আমাকে। ভুলে যাই কোনো কালে এ কলোনিতে ছিলাম আমি। কারখানার সিটিতে বোরাক, জিন কিংবা সোলেমান বাদশা সবাই ভয়ে পালায়। দলে দলে লোকজন ফিরতে থাকে কারখানা থেকে। লেংড়ি নড়েচড়ে বসে। টিনের থালাটা সামনে টেনে নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করে বলতে লাগে, ‘ও ভাই দু-গা টিঁয়া সাইয্য করি যান’। কেউ তেমন একটা পয়সাকড়ি দেয় না। তাই বলে লেংড়িও থামায় না তার সংগীতচর্চা । মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ায় তার সামনে। দুটো আটানার কয়েন ছুড়ে দিয়ে বলল, ইসমাইল সাবরে মনে আছে। জে। উনি পাঠাইছেন তোমার কাছে। বুইচচি সার। কিন্তু এহন তো বাইচ্চা অইত ন।
এইটা না দাও, পেটের টা দাও...
এর পরের কথোপকথন আর আমার কানে ঢোকেনি। স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইলাম কোলের বাচ্চাটির দিকে।
৭. সব গল্পের শেষ আছে। আমাদের লেংড়ির গল্পও শেষের দিকে। একবার হইচই পড়ল পাড়ায়। এ কলোনির ওমুকের ছেলে সে কলোনির তমুকের ছেলে উধাও। সাপ্তা খানেকের জন্য আমাদের স্কুলে যাওয়াই বন্ধ হয়ে গেল। মেঘনা না যমুনা কোনো এক নদীর ওপর সেতু তোলা হবে। সে জন্য ছোট ছোট বাচ্চাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এদের নাকি ছুড়ে দেওয়া হবে নদীর বুকে। এতে নাকি তৃপ্ত হবে নদী। অনুমতি দেবে ব্রিজ করার। তাই এই ছেলে ধরার তোড়জোড়। ভয়ে সিঁটিয়ে যাই আমরা। ওয়েলফেয়ার কমিটির মিটিং বসে। আলোচনা হয় এই ছেলে ধরা নিয়ে। সবাই একমত, অনেক হয়েছে, আর লেংড়িকে বাড়তে দেওয়া যায় না। তার সঙ্গে ওই ছেলেধরাদের যোগাযোগ অনেক দিনের। সে এর-ওর জন্য বাচ্চা জুটিয়ে দেয়। কানেকশন না থাকলে কোত্থেকে পায় এই বাচ্চাগুলো। এখন যে বাচ্চারা উধাও হয়ে যাচ্ছে এর পেছনে যে ওর হাত নেই, তারই বা গ্যারান্টি কী। পরের দিন ছিল শুক্রবার। সকালে সবাই জড়ো হলো সেগুনগাছের তলায়। সবাই বলতে সবাই বড়, ছোট, মেজো—সবাই। আমরাও গেলাম আমাদের বাবাদের পিছু পিছু। ওয়েলফেয়ার কমিটির সভাপতি গড়নের দিক দিয়ে যেন ছোটখাটো একটা মাংসের কনটেইনার। প্রথম হুংকারটা এল তার কণ্ঠ থেকে, অনেক দিন তো থাকলা এইবার বিদায় হও।
কিললাই! আঁই কিইচ্চি (করেছি)?
কইছি যাইবা, যাও—
চারদিকে শোরগোল শুরু হলো। কেউ উদ্যত হলো মার দিতে। কেউ গাল ছুড়ল লেংড়িকে। পুলিশের ভয়ও দেখানো হলো। লেংড়ি নাছোড়। সুরে সুরে কাঁদতে লাগল, আঁই যাইতান ন, আঁরে মারি হালাইলেও যাইতান ন...
কিসের জন্য তুই যাবি না, কী আছে তোর এই খানে?
আঁর পোলাপাইন... ইগুনরে দেখি আঁর বুক জুড়ায়। আঁরে মারি হালাইলেও আঁই যাইতান ন... কলোনির ভদ্রলোকেরা থতমত খেয়ে যান। পরস্পর পরস্পরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি শুরু করেন।

আদিবাসী ছাত্রনেতা নিজ ঘরে খুন- রাজশাহী ও তানোরে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সভা

রাজশাহীর তানোর উপজেলার ময়েনপুর গ্রামে বাবলু হেমব্রম (২৩) নামের এক সাঁওতাল যুবককে গত বৃহস্পতিবার রাতে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত বাবলু হেমব্রম এবার রাজশাহী কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন। তিনি সান্তাল স্টুডেন্ট ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর বাবার নাম মহেশ্বর হেমব্রম। গতকাল শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থলে মরদেহের সুরতহাল প্রস্তুতকারী মুন্ডুমালা পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. হুমায়ন প্রথম আলোকে বলেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর কাটা গলাটা কেবল চামড়ার সঙ্গে আটকে ছিল। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাবলু হেমব্রমের বাড়ির সামনে আদিবাসী নেতা-নেত্রীসহ শতাধিক আদিবাসী নারী-পুরুষের ভিড়। বাড়িতে ঢুকেই দেখা যায়, ডুকরে কাঁদছেন বাবুলর মা শান্তি টুডু। কাঁদতে কাঁদতে তিনি পুলিশের উদ্দেশে বলছেন, ‘হামার একটাই বিটা, লিয়া যাইতে দিব না। কাটাছিঁড়া করতে দিব না।’
বাবলুর বাবা মহেশ্বর হেমব্রম প্রথম আলোকে জানান, বৃহস্পতিবার রাত দুইটার দিকে মানুষের আওয়াজে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। দরজা খুলে দেখতে পান ছেলের ঘরের দরজা খোলা। এগিয়ে এসে বাইরের বাড়ির দরজা খোলা দেখে মনে করেন চোরে তাঁর গরু নিয়ে গেছে। চিৎকার করতে থাকেন। ছেলের ঘরে ঢুকে দেখতে পান ছেলে চৌকির পরিবর্তে মেঝেতে পড়ে রয়েছেন। ডেকে কোনো সাড়া না পেয়ে মাথা নাড়াতে গিয়ে বুঝতে পারেন, গলা প্রায় সম্পূর্ণই কাটা। মহেশ্বর হেমব্রম জানান, তিনি ভেবেই কূলকিনারা পাচ্ছেন না যে তাঁর এমন শান্ত ও নরম স্বভাবের ছেলে, যার কারও সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না, তাঁকে কেউ এমন নির্মমভাবে জবাই করে হত্যা করতে পারে। ছেলের মৃত্যুতে তাঁর সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
ক্ষোভ-প্রতিবাদ-কর্মসূচি: নিহত বাবলু হেমব্রমের বাড়ির সামনে উপস্থিত কয়েক শ নারী-পুরুষ সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সভা করেন। এতে বক্তব্য দেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন ও রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি বিলম রাজোয়ার। তাঁরা বলেন, দেশে যখনই গোলযোগপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়, তখনই আদিবাসীদের ওপর হামলা হয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে ভূমিদস্যু বা কোনো স্বার্থান্বেষী মহল। তাঁরা এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানান এবং অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচারের মুখোমুিখ করার দাবি জানান। সভা থেকে আজ শনিবার বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন এবং রোববার রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে রাজশাহীর জিরো পয়েন্টে বিক্ষোভ মিছিল, পথ সমাবেশ ও মানববন্ধন করে আদিবাসী ছাত্র পরিষদ। এখানে বক্তব্য দেন আদিবাসী নেতা রবীন্দ্রনাথ সরেন, রাজকুমার শাওঁ, ছাত্রনেতা সুবাস হেমব্রম, উজিত মুন্ডা, বাংলাদেশের ওয়ার্কর্স পার্টির নেতা লিয়াকত আলী, ছাত্র মৈত্রীর নেতা মতিউর রহমান প্রমুখ। গতকাল সান্তাল স্টুডেন্টস ইউনিয়নের পক্ষ থেকে রাজশাহী প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানানো হয়। সান্তাল স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক সমর মাইকেল সরেন বলেন, তাঁরা আজ শনিবার রাজশাহী নগরের সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সব সংগঠনকে নিয়ে একটি মানববন্ধনের আয়োজন করেছেন।

বিলুপ্তপ্রায় ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার

(নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে এখনো জেলেরা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরছেন। ছবিটি সম্প্রতি তোলা l প্রথম আলো) গলার রশির টানে পানিতে নামে ওরা। জেলেরা নৌকা থেকে রশি ধরে রাখেন আর ওরা মাছদের তাড়া করে জেলেদের জালে আনে। এরপর এই মাছ হাটে বিক্রি করেন তাঁরা। বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী ভোঁদড় দিয়ে এভাবেই এখনো মাছ ধরছে নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের গোয়ালবাড়ি গ্রামের প্রায় ৩০টি পরিবার। অথচ ভোঁদড় সংরক্ষণে নেই কোনো উদ্যোগ। গোয়ালবাড়ি গ্রামে অন্তত ২০০ জেলে পরিবারের বাস। ওই ৩০টি পরিবারের পাশাপাশি ইউনিয়নের রতডাঙ্গা ও পঙ্কবিলা গ্রামের আরও কয়েকটি জেলে পরিবার একইভাবে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। গোয়ালবাড়িসহ তিনটি গ্রামের জেলেরা জানান, ভোঁদড় (আঞ্চলিক ভাষায় ধাড়িয়া বা ধেড়ে) পানিতে নেমে মাছ শিকার করে খেতে পছন্দ করে। প্রতিটি জেলেনৌকার এক প্রান্তে ভোঁদড়ের জন্য আলাদা করে খাঁচা বানানো থাকে। মাছ ধরার সময় খাঁচার ডালা খুলে দেওয়া হয়। জেলেরা নৌকায় বাঁধা জাল নদীতে ফেলে ভোঁদড় ছেড়ে দেন। এ সময় লাঠির সঙ্গে এদের শরীর এমনভাবে বাঁধা থাকে, যাতে ছুটে যেতে না পারে। নৌকা নদীর তীরে আসতে থাকে আর ভোঁদড়ের তাড়া খেয়ে মাছগুলো জেলেদের জালে এসে ধরা পড়ে। প্রতিটি ভোঁদড় বছরে সাত থেকে আটবার বাচ্চা দেয়। অন্তত ১০ বছর পর্যন্ত এরা বেঁচে থাকে। পূর্ণবয়স্ক একেকটি ভোঁদড় ৭ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
পঙ্কবিলা গ্রামের গুরুপদ বিশ্বাস বলেন, প্রতিবছরই অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসের বেশি সময় ধরে তাঁরা ১০ থেকে ১২টি নৌকা আর দুই থেকে চারটি ভোঁদড় নিয়ে নদীপথে পাড়ি জমান। মাছ ধরেন আর ঘাটে ঘাটে বিক্রি করেন। বছরের এই সময়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে প্রায় সারা বছর সংসার চালান। গোয়ালবাড়ি গ্রামের মৎস্যজীবী শচীন বিশ্বাস জানান, বংশপরম্পরায় ভোঁদড় দিয়ে তাঁরা মাছ ধরে আসছেন। রতডাঙ্গা গ্রামের পাগল চান বিশ্বাস জানান, নদীতে বেশি পানি থাকলে সুন্দরবন পর্যন্ত মাছ ধরতে যান। এখন জলদস্যুদের ভয়ে সুন্দরবন না গিয়ে চিত্রা নদীর পাশের মধুমতী, আড়িয়াল খাঁ পাড়ি দিয়ে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও ফরিদপুর চলে যান। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হরিপদ মণ্ডল জানান, ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরা জেলেদের পেশা হলেও বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণী সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কিন্তু এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আলাদা কোনো নীতিমালা বা বরাদ্দ না থাকায় কোনো কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। সমাজ উন্নয়নকর্মী ও পরিবেশবিদ কাজী হাফিজ জানান, আগের মতো এখন আর তেমন ভোঁদড় দেখা যায় না। ২০১২ সালের ১২ জুলাই বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা-সম্পর্কিত ৩০ নম্বর আইন পাস হয়েছে। এই আইন পাসের ১৮০ দিনের মধ্যে কোনো ব্যক্তির কাছে সংগৃহীত ও সংরক্ষিত কোনো বন্য প্রাণী থাকলে সেগুলো নিবন্ধন করাতে হবে। আইনে নিবন্ধনের কথা উল্লেখ থাকলেও সংরক্ষণের তেমন জোর দেওয়া হয়নি।
কাজী হাফিজ বলেন, ‘আমি মনে করি, সরকারের সময়োপযোগী এ আইনে বিলুপ্তপ্রায় ভোঁদড় সংরক্ষণের জন্য অভয়াশ্রম সৃষ্টির কথা উল্লেখ থাকা জরুরি ছিল। যেসব অঞ্চলে জেলেদের জীবিকার জন্য বংশপরম্পরায় মাছ ধরার কৌশল হিসেবে ভোঁদড় ব্যবহার করে আসছে, তাঁদের দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় এনে বিলুপ্তপ্রায় এসব প্রাণী সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

কনটেইনারের স্তূপ চট্টগ্রামে- ভোগ্যপণ্যের বাজারে ধস ক্ষতি ১২০০ কোটি by মহিউদ্দীন জুয়েল

হরতাল, অবরোধে ধস নেমে এসেছে দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। গত ৪ দিনের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এখানে ক্ষতি হয়েছে ১২০০ কোটি টাকা। কেবল তাই নয়, বন্দরের অভ্যন্তরে ২৫০০ কন্টেইনার পণ্য নিয়ে আটকা পড়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছেন একাধিক ব্যসায়ী নেতা। তারা বলেছেন, এভাবে অবরুদ্ধ পরিস্থিতি চলতে থাকলে তাদের পক্ষে ব্যবসা করা সম্ভব হবে না। কেননা, ইতিমধ্যে বিদেশের বিভিন্ন কোম্পানির কাছে পরিস্থিতির কারণে নেতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়েছে। যা একসময় বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করবে বলে তাদের ধারণা। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য খালাস ও সরবরাহ করতে না পারায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। সরজমিনে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন তাদের গড়ে ৪০০ কোটি টাকা লেনদেন হয় ভোগ্যপণ্য বিক্রি করে। এর মধ্যে বেশির ভাগই বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বড় ধরনের পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে। যারা নগদ ও চেকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করে ট্রাকবোঝাই করে পণ্যগুলো নিয়ে যায় দূরদূরান্তে। গত কয়েক দিনের অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই ভোগ্যপণ্যের বাজার থেকে কোন গাড়ি চট্টগ্রাম ছেড়ে যেতে পারেনি। যদিও সরকার থেকে পুলিশ প্রহরায় গাড়ি চালানোর ব্যাপারে আশ্বাস দেয়া হয়েছে কিন্তু তাতেও আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান একাধিক ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী নেতারা জানান, বিদেশ থেকে পণ্য নিয়ে জাহাজ ভিড়লেও তা অবরোধের কারণে খালাস হচ্ছে না। ফলে কন্টেইনার জমে থাকার কারণে বাজারে পণ্যের সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। এতে করে দামের ওপরও প্রভাব পড়ছে। যথাসময়ে এসব পণ্য পৌঁছে দিতে না পারায় ক্ষতির মাশুল দিতে হচ্ছে তাদের। বন্দরের অভ্যন্তরে পণ্য খালাস হলেও দূরের গুদামে পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে গত কয়েক দিন ধরে চট্টগ্রাম থেকে বাইরে পণ্য নিয়ে কোন পরিবহন যাচ্ছে না। একই সঙ্গে মহাসড়কে জ্বালাও, পোড়াও এর আশঙ্কায় কোন গাড়িও বন্দর নগরীতে আসছে না। অবরোধের কারণে বেড়ে গেছে ট্রাক, লরি ও কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহনের ভাড়া। হরতাল ছাড়া স্বাভাবিক সময়ে সীমান্ত এলাকা থেকে দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০০০ ট্রাক প্রবেশ করে আসে দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। বিশেষ করে পিয়াজ, আদা, রসুনসহ কয়েক ধরনের পণ্য সরাসরি আমদানি হয় সড়কপথে। অবরোধের কারণে পিয়াজ পচনশীল হওয়ায় এগুলোর সরবরাহ নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন বড় ব্যসায়ীরা। একই সঙ্গে আদার গুণগতমান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকে তাই ক্ষতি পোষানোর দুশ্চিন্তা করছেন। ৩ দিন আগে যে পিয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়, গতকাল  তা প্রতি কেজি ৪৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এভাবে চলতে থাকলেও অন্য পণ্যগুলোর দামও বেড়ে যাবে বলে সচেতন ব্যবসায়ীদের ধারণা। জানতে চাইলে হরতাল অবরোধে ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করেন চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগির আহমদ। তিনি বলেন, অবরোধের কারণে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে দিন ৩০০ কোটি টাকা। অথচ অন্যসময়ে ১০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয় এখানে। সীমান্ত দিয়ে ব্যবসায়ীরা পণ্য নিয়ে আসতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ যদি কোন নাশকতা হয় তাহলে তার দায়ভার নেবে কে। খাতুনগঞ্জের পিয়াজের আড়তদার মোহাম্মদ হানিফ বলেন, আমরা দুশ্চিন্তায় রয়েছি। জানিনা এভাবে কতদিন চলবে। অনেক পণ্য পচে যেতে শুরু করেছে। মাল নিয়ে দেশের দূরদূরান্ত থেকে কেউ আসতে চাইছে না। তারা বলেছে রাস্তায় নাকি আগুন দিয়ে গাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। এই অবস্থায় ক্ষতি ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছি না। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি সূত্র জানায়, বিদেশ থেকে আসা ভোগ্যপণ্যের আড়াই হাজার কন্টেইনার আটকা পড়ে রয়েছে সেখানে। এসব কন্টেইনারের সব ক‘টিতেই ভোগ্যপণ্যসহ নানান প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক জিনিসপত্র রয়েছে। ব্যবসায়ীরা এসব কন্টেইনার ছাড়িয়ে নিতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। গতকাল সকালে বন্দরের ভেতরে গিয়ে দেখা যায় সেখানে পণ্যবাহী ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যানের দীর্ঘ লাইন। বাইরে বসে আছেন অন্তত কয়েকশ’ ব্যবসায়ী।

বরিশাল বিসিক শিল্পনগর- মন্ত্রীদের আশ্বাসে বন্দী উন্নয়ন

২০১০ সালে বরিশাল বিসিক শিল্প নগরের উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। চার বছর পর একই আশ্বাস দিয়েছেন বর্তমান শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তবুও এর উন্নয়ন বলতে কিছু হয়নি। এমন আশ্বাসের মধ্য দিয়েই বরিশাল বিসিক পার করেছে ৫৬ বছর। বরিশাল বিসিক শিল্প নগরের কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, বিসিক প্রতিষ্ঠার পর এর উন্নয়নে কোনো বরাদ্দ আসেনি। কিছুদিন আগে ১২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তা দিয়ে জরাজীর্ণ বিসিক ভবনের ছাদ ও দুটি পুকুরপাড় সংস্কার করা হয়েছে। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় চুরি হচ্ছে লাইনের তার ও অন্যান্য সরঞ্জাম। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রধান সড়ক বাদে বিসিক এলাকার অধিকাংশ সড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী। বিসিক ভবনটিও জরাজীর্ণ। গ্যাস নেই। বিদ্যুৎব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। সন্ধ্যার পর অধিকাংশ এলাকা থাকে অন্ধকারে। নেই কোনো সীমানাপ্রাচীর। রয়েছে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের উৎপাত। এসব কারণে বরাদ্দ নেওয়ার পরও খালি পড়ে রয়েছে অধিকাংশ প্লট। অধিকাংশ সময়ই সেখানে গরু-ছাগল চরে বেড়ায়।
শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া ২০১০ সালের ২৪ নভেম্বর পরিদর্শনে এসে বিসিককে আধুনিকায়নের আশ্বাস দেন। ওই সময় তিনি বলেন, বরিশাল বিসিকের আধুনিকায়নে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরের মধ্যে অবকাঠামো, প্রাচীর, সড়ক, নর্দমা ও বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করা হবে। চার বছরেও মন্ত্রীর ওই আশ্বাসের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। এমন বাস্তবতায় বর্তমান শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুও শোনালেন আশ্বাসের বাণী। গত ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে বরিশাল বিসিক এলাকা পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই বিসিকের সব সমস্যা সমাধান করা হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিকের কয়েকজন ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, বিসিকের উন্নয়নে শুধু মন্ত্রীদের আশ্বাসই পাওয়া গেছে। বাস্তবে উন্নয়নে কোনো উদ্যোগ নেই। সে কারণে নতুন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না। নামমাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বরিশাল বিসিক শিল্প নগর চলছে।
বরিশাল বিসিক সূত্র জানায়, ১৯৬০ সালের ৯ জানুয়ারি ১৩১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩০ দশমিক ৬১ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে বরিশাল বিসিক শিল্প নগর। মোট সম্পত্তির ৯৯ দশমিক ৯৫ একর ভূমিতে প্লট করা হয়েছে। বাকি সম্পত্তিতে বিসিক ভবন, সড়ক ও নর্দমার জন্য রাখা হয়। ৪৬৩টি প্লটের মধ্যে ৩৩০টি উন্নত, ১৩৩টি অনুন্নত প্লট। ৩৩৯টি প্লট বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উন্নত ও অনুন্নত মিলে মোট ৪৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে। চালু হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেছে ২২টি প্রতিষ্ঠান।
বিসিকের শিল্প উদ্যোক্তা অনন্যা ফুডস ও ফ্লাওয়ার মিলের মালিক শামসুদ্দিন আলম অভিযোগ করেন, বিসিকের মূল সমস্যা কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা। এ ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা, সড়কের খারাপ অবস্থা ও নিরাপত্তার অভাবে উদ্যোক্তারা বিসিকের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক নগেন্দ্রনাথ পাল বলেন, আগে শিল্পমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি ছিল মৌখিক। এর কারণে বরাদ্দ আসেনি। এবার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিসিকের অনুন্নত ৩০ একরসহ সব রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, ড্রেন-কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। আগে এর উন্নয়ন না হলেও গত চার বছর ধরে বিসিক এগোচ্ছে। বর্তমানে ২৮ লাখ টাকায় বিসিক ভবন ও আশপাশের কিছু কাজ করা হচ্ছে।

সাত দিন ধরে অবরুদ্ধ খালেদা জিয়া

সাত দিন ধরে গুলশানে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ আছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ৩ জানুয়ারি রাতে পুলিশ এই কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা দেয়। একই সঙ্গে কার্যালয়ের সামনে বিপুল পুলিশ মোতায়েন এবং রাস্তায় ইট, বালু ও মাটিভর্তি ১১টি ট্রাক দিয়ে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ৫ জানুয়ারি বের হওয়ার চেষ্টা করলে পেপার স্প্রে ছোড়ে পুলিশ। এর পর থেকে তিনি কার্যালয়েই আছেন। এর আগে ৫ জানুয়ারি ‘একতরফা’ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তিতে যেকোনো মূল্যে রাজধানীতে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। একই দিন আওয়ামী লীগও সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পুলিশ রাজধানীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বিএনপির নেতারা মনে করছেন, খালেদা জিয়া যাতে কোনো সভা-সমাবেশে যোগ দিতে না পারেন, সে জন্য তাঁকে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এরপর সেখানে নেতা-কর্মীদের যাতায়াতেও পুলিশ কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। গত সাত দিনে পুলিশের অনুমতি নিয়ে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। আবার অনেকে যেতে না পেরে ফটক থেকে ফিরে গেছেন।
অবশ্য খালেদা জিয়ার অবরুদ্ধ হওয়ার পরদিন ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘...উনি তো বন্দী নয়। ইচ্ছা করলে উনি উনার বাসায় এখনই যেতে পারেন।’ এর পরদিন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ নন। তাঁকে আটকও করা হয়নি। পুলিশ যদি মনে করে তিনি নিরাপদ, তাহলে তিনি বাসায় যেতে পারেন। গতকাল শুক্রবার সকালে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের মূল ফটকের তালা পুলিশ আবার খুলে দেয়। কিন্তু কার্যালয় থেকে বের হওয়ার অবস্থা নেই। সোমবার রাতে ইট-বালু ও মাটির ট্রাকগুলো সরিয়ে নেওয়া হলেও একটি জলকামান ও দুটি প্রিজন ভ্যান দিয়ে এখনো রাস্তা আটকানো আছে। এর আগে বৃহস্পতিবারও দিনের বেলায় ফটকের তালা খুলে দিয়ে রাতে আবার তালা দেয় পুলিশ। বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত গুলশানের ৮৬ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাড়িটির সামনে ও ডান পাশে দুটি ফটক আছে। দুই ফটকের সামনে ও রাস্তায় পুলিশের প্রায় ১০০ জন নারী ও পুরুষ সদস্য এখনো পাহারায় আছেন। ৩ জানুয়ারি রাত থেকেই সেখানে পার্কিং করা অবস্থায় আছে পুলিশের দুটি পিকআপ ভ্যান, দুটি জিপ ও চারটি মাইক্রোবাস। পুলিশের পাশাপাশি র্যাবকেও গতকাল দুপুরে এ সড়কে টহল দিতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার একটাই বক্তব্য, কোনো রাজনৈতিক নেতার ওপর এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা যুক্তিসংগত নয়।’
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, তাদের কাছে খবর ছিল ৫ জানুয়ারি সমাবেশ করার লক্ষ্যে খালেদা জিয়া ৩ জানুয়ারি রাতেই নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাবেন। সমাবেশ করতে পারলে নেতা-কর্মীদের নিয়ে নয়াপল্টনে অবস্থান নিতে পারেন বলেও গোয়েন্দা তথ্য ছিল। এ কারণে দুই দিন আগেই খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখার কৌশল নেওয়া হয়। বিএনপির নেতাদের দাবি, ৩ জানুয়ারি রাত সাড়ে আটটায় খালেদা জিয়া গুলশানের কার্যালয়ে আসেন। এর মধ্যে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থানরত দলের নেতা রুহুল কবির রিজভী ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েন। তাঁকে দেখতে খালেদা জিয়া নয়াপল্টনে যেতে চেয়েছিলেন। এরই মধ্যে রাত নয়টার দিকে পুলিশ গিয়ে তাঁর কার্যালয় ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। রাত ১১টার দিকে খালেদা জিয়া কার্যালয় থেকে বের হতে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তার মাধ্যমে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খালেদা জিয়াকে বাসা পর্যন্ত যেতে দেওয়া হবে। এ সময় তাঁর গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশের দুটি করে চারটি গাড়ি থাকবে। এটা জেনে তিনি আর বের হওয়ার চেষ্টা করেননি।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন একজন চিকিৎসকসহ এমন কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেন, ৫ জানুয়ারি বিকেলে খালেদা জিয়া কার্যালয় থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁকে লক্ষ্য করে যে পেপার স্প্রে ছোড়ে, তাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মরিচের মতো ঝাঁজালো এই রাসায়নিকের প্রতিক্রিয়ায় খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
অবশ্য এই অসুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম দাবি করেন, খালেদা জিয়া অসুস্থতার ভান করেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয় সূত্র জানায়, খালেদা জিয়াসহ প্রায় ৫০ জন ওই কার্যালয়ে আছেন। এঁদের মধ্যে আছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরীন সুলতানা, দলের নেতা বিলকিস জাহান, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আবদুল কাইয়ুম, প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, মাহবুবুল আলম ডিউ, মিডিয়া উইংয়ের দুই সদস্য শায়রুল কবির খান, শামসুদ্দীন দিদার, খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা সমন্বয়ক আবদুল মজিদসহ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দলের ৩৫ জন সদস্য। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার বাসার গৃহকর্মী কুলসুমসহ কার্যালয়ের কর্মচারীরাও আছেন। কার্যালয় সূত্র জানায়, ৩ জানুয়ারি অবরুদ্ধ হওয়ার রাতে খালেদা জিয়ার জন্য তাঁর বাসা থেকে একটি খাট ও ম্যাট্রেস আনা হয়। এ ছাড়া ওই কার্যালয়ে শীতবস্ত্র হিসেবে বিতরণের জন্য থাকা কম্বল বিছিয়ে নিরাপত্তা দলের সদস্যসহ অন্যরা ঘুমাচ্ছেন।
কার্যালয় সূত্র জানায়, এ কার্যালয়ে চা ছাড়া আর কোনো রান্নাবান্না হয় না। অবরুদ্ধ হওয়ার প্রথম দিন খালেদা জিয়ার জন্য গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেল থেকে খাবার আনা হয়। এর পরদিন থেকে খালেদা জিয়ার খাবারসহ প্রতিদিন আরও ১০-১৫ জনের খাবার রান্না করে পাঠান তারেক রহমানের স্ত্রীর বড় বোন শাহীনা খান। অন্যদের খাবার-দাবার সরবরাহ করছেন দলের নেতারা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, এমন একজন রাজনৈতিক নেতাকে অবরুদ্ধ করে রেখে সরকার প্রতিপক্ষকে দমন ও নিপীড়নের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাঁর মতে, ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে সরকারের এ ধরনের নিপীড়ন খুবই অমানবিক ও অগণতান্ত্রিক।
গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার ৭ দিন
কার্যালয় ঘিরে আছে পুলিশ। প্রধান ফটকে তালা। সামনের দুই পাশের রাস্তাতেই পুলিশের গাড়ি ও জলকামান
৩ জানুয়ারি
কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার প্রবেশ, পুলিশের অবস্থান
৪ জানুয়ারি
অনুমতি না পেলেও ৫ জানু. সমাবেশের ঘোষণা
৫ জানুয়ারি
অবরোধের ডাক, ১১টি ট্রাক রেখে প্রতিবন্ধকতা
৬ জানুয়ারি
আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা
৭ জানুয়ারি
খালেদা জিয়া অসুস্থ, দাবি তাঁর প্রেস সচিবের
৮ জানুয়ারি
বিকেলে তালা খুলে সন্ধ্যায় আবারও তালা।
৯ জানুয়ারি
পুলিশের পাহারা অব্যাহত

খালেদা জিয়া সম্পর্কে তাঁরা যা বললেন
প্রধানমন্ত্রী
উনি তো বন্দী নয়। ইচ্ছা করলে এখনই যেতে পারেন
ত্রাণমন্ত্রী
ইট ও বালুর ট্রাক তাঁর বাড়ি সংস্কারের জন্য এনে রেখেছেন
তথ্যমন্ত্রী
ওনাকে উসকানি থেকে বিরত করেছি
ত্রাণমন্ত্রী
খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় অবরুদ্ধ
স্বাস্থ্যমন্ত্রী
অসুস্থতার ভান করে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন
হানিফ
খালেদা জিয়া দেশবাসীর মধ্যে উত্তেজনা ছড়াচ্ছেন