Sunday, December 20, 2009

মহাসাগরে ভেঙে গেছে দ্বীপের সমান এক হিমশৈল!

দক্ষিণ মহাসাগরে দ্বীপের সমান একটি ‘দৈত্যাকার’ হিমশৈল ভেঙে কয়েক শ টুকরো হয়ে এখন তা অস্ট্রেলীয় উপকূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অ্যান্টার্কটিকা থেকে ধেয়ে আসা ওই হিমশৈলের আকার ১৪০ বর্গকিলোমিটার। ৯ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল থেকে হিমশৈলটিকে এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এ অবস্থায় ওই এলাকায় জাহাজ চলাচলে সতর্কতা জারি করেছিল অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যান্টার্কটিক ডিভিশনের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ নিল ইয়ং নাসার উপগ্রহচিত্র এবং ইউরোপীয় মহাকাশ এজেন্সির সহায়তায় বি-১৭-বি নামের ওই হিমশৈল শনাক্ত করেন। নিল বলেন, যখন অ্যান্টার্কটিকা থেকে হিমশৈলটি বিচ্ছিন্ন হয়, তখন এর আকৃতি ছিল ৪০০ বর্গকিলোমিটার, আর উচ্চতা ছিল ৪০ মিটার। এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে দক্ষিণ মহাসাগরের দিকে চলে আসে।
নিল আরও বলেন, হিমশৈলটির অনেকটা ভেঙে ও গলে গেছে। ওই হিমশৈলের শত শত খণ্ড মহাসাগরের কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। একসময় হিমশৈলটি পুরোপুরি গলে যাবে। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণেই এমনটা ঘটছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অস্ত্র কিনতে আফিম উত্পাদন বাড়িয়েছে মিয়ানমারের বিদ্রোহীরা -জাতিসংঘের প্রতিবেদন

সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য হামলা থেকে নিজেদের রক্ষায় অস্ত্র কেনার জন্য আফিমের উত্পাদন বাড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জাতিগত গোষ্ঠীগুলো। গতকাল সোমবার জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি) থেকে বলা হয়, মিয়ানমারে পর পর তৃতীয় বছরের মতো আফিম উত্পাদন বেড়েছে। চলতি বছর উত্পাদন বেড়েছে শতকরা ১১ ভাগ। মিয়ানমারের মোট আফিমের শতকরা ৯৫ ভাগই উত্পাদিত হয় শান প্রদেশে। আফিম উত্পাদনের ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের পরই মিয়ানমারের অবস্থান।
ইউএনওডিসির নির্বাহী পরিচালক অ্যান্টোনিও মারিয়া কস্তা বলেন, মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা আফিমের বাজারের ওপর প্রভাব ফেলছে। কয়েকটি জাতিগত গোষ্ঠী অস্ত্র কেনার জন্য মাদক বিক্রি করছে। যাতে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য আফিমের মজুদ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করছে।
কয়েক মাস ধরে শান প্রদেশে বিপুল উপস্থিতি বজায় রেখেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সেখানে প্রায়ই বিদ্রোহী মিলিশিয়ারা সেনাবাহিনীর হামলার শিকার হয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সেনা উপস্থিতি শান প্রদেশে দীর্ঘায়িত হতে পারে। এর ফলে প্রতিবেশী চীনে শরণার্থী সংকটের সৃষ্টি হতে পারে।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা চায়, জাতিগত গোষ্ঠীগুলো যেন দেশটির আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেয়। স্থানীয় মিলিশিয়াদের অস্ত্র সমর্পণ করে সরকারি সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। নতুবা তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

পরমাণু বোমা তৈরির চেষ্টা করছে ইরান -গোয়েন্দা দলিলের তথ্য

পরমাণু বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় একটি উপাদানের চূড়ান্ত পরীক্ষার কাজ করছে ইরান। গোপনীয় গোয়েন্দা দলিল থেকে এ তথ্য জানা গেছে। গতকাল সোমবার গোয়েন্দা নথির বরাত দিয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক টাইমস পত্রিকা জানিয়েছে, ইরান চার বছরের মধ্যে একটি ‘নিউট্রন ইনিশিয়েটর’ (পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য যে অংশটি কাজ করে) পরীক্ষা করার লক্ষ্যে কাজ করছে। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওই গোপন দলিল ২০০৭ সালে তৈরি।
একটি এশীয় গোয়েন্দা সংস্থাও গত সপ্তাহে নিশ্চিত করে বলেছে, তাদের বিশ্বাস, ইরান ২০০৭ সাল থেকে একটি ‘নিউট্রন ইনিশিয়েটর’ পরীক্ষা করার জন্য কাজ শুরু করেছে। এ ব্যাপারে গোপন নথিতে বলা হয়েছে, এই পরীক্ষার জন্য তেহরান নিউট্রন উত্স হিসেবে ‘ইউরেনিয়াম ডিউটেরাইড’ ব্যবহার করছে। বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচিতে এই যন্ত্রটির কোনো প্রয়োজন নেই।
যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে গোপন এসব দলিল হাতে পেয়েছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, এসব নথি সংস্থার হাতেও পৌঁছেছে। ইরানের এই কর্মসূচির ব্যাপারে ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রেসিডেন্ট ডেভিড অলব্রাইট বলেন, ‘ইরান দাবি করছে তার পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে, কিন্তু সেখানে এর কোনো বেসামরিক ব্যবহার দেখা যাচ্ছে না।

জলবায়ু সম্মেলনকে ব্যর্থ হিসেবে ঘোষণা করলেন রাউল কাস্ত্রো

কোপেনহেগেনে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনকে ব্যর্থ হিসেবে ঘোষণা করেছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, এ বিষয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবনের জন্য তিনি লাতিন আমেরিকার বামপন্থী নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত রোববার হাভানায় বামপন্থী বাণিজ্য জোট ‘বলিভারিয়ান অলটারনেটিভ ফর দ্য আমেরিকাস’-এর দুই দিনের এক সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
রাউল কাস্ত্রো বলেন, ‘যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কোপেনহেগেনে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কিন্তু ইতিমধ্যেই আমরা জেনে গেছি, সেখানে কোনো চুক্তি হচ্ছে না। তার পরিবর্তে বিশ্ব শুধু একটি রাজনৈতিক বিবৃতির জন্য অপেক্ষা করতে পারে।’ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি কিউবা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নিজস্ব পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য হাভানায় সমবেত হয়েছেন নয় জাতির ওই বাণিজ্য জোটের নেতারা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ ওই বাণিজ্য জোটটি গঠন করেন।

মৃত্যুদণ্ড এড়াতে এফবিআইকে তথ্য সরবরাহ করছেন হেডলি

ভারতের মুম্বাইয়ে ২৬/১১ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ডেভিড কোলম্যান হেডলি মৃত্যুদণ্ড এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাকে (এফবিআই) তথ্য সরবরাহ করছেন। মার্কিন তদন্ত কর্মকর্তারা এ কথা বলেছেন।
হেডলিকে (৪৯) ৩ অক্টোবর এফবিআই গ্রেপ্তার করে। সংস্থাটি ইতিমধ্যে তাঁকে মুম্বাই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। গত বছর ২৬ নভেম্বরের ওই হামলায় ছয় মার্কিন নাগরিকসহ ১৬৬ জন নিহত হন। হেডলিকে হয়তো সারা জীবন কারাগারে কাটাতে হতে পারে। এমনকি তাঁকে মৃত্যুদণ্ডেও দণ্ডিত করা হতে পারে। ফিলাডেলফিয়ার এক তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিন্তু এখন এফবিআইকে তথ্য সরবরাহ করে হেডলি মৃত্যুদণ্ড এড়াতে পারেন।
এর আগে ফেডারেল আইনজীবীদের অন্তত দুবার তথ্য সরবরাহ করেন হেডলি। এ জন্য তাঁর শাস্তির মেয়াদ কমিয়ে আনা হয়। এবার হেডলি এফবিআইকে তথ্য সরবরাহ করে এড়াতে পারেন মৃত্যুদণ্ড।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হেডলি তাঁদের কাছে স্বীকার করেছেন যে পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবার প্রধানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ২৬/১১ ঘটনায় লস্কর-ই-তাইয়েবার কয়েকজন নেতা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তাও জড়িত ছিলেন বলে স্বীকার করেন হেডলি।

প্রিন্স উইলিয়ামের হাতে দাপ্তরিক কাজের দায়িত্ব হস্তান্তর!

ব্রিটিশ রানি এলিজাবেথ তাঁর কিছু দাপ্তরিক কাজের দায়িত্ব নাতি প্রিন্স উইলিয়ামের হাতে হস্তান্তর করতে যাচ্ছেন। উইলিয়াম রাজা হয়ে একদিন পুরোপুরি দায়িত্ব নেবেন, এরই প্রস্তুতি হিসেবে রানি ওই আগাম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজপরিবারের গোপন একটি দলিল স্থানীয় দ্য মেইল পত্রিকার হস্তগত হয়। ওই দলিল থেকেই গোপনীয় এ সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়। খবর এনডিটিভির।
ব্রিটিশ রানি তাঁর ২৭ বছর বয়সী নাতি উইলিয়ামকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন—এমন একটি খবর নিয়ে কয়েক মাস ধরে স্থানীয় গণমাধ্যমে গুঞ্জন চলছিল। কিন্তু রাজপরিবার থেকে ওই খবরের সত্যতা বারবার নাকচ করে দেওয়া হচ্ছিল। এরই মধ্যে দ্য মেইল এ খবর ফাঁস করল।
গোপনীয় ওই দলিলের ভাষ্যমতে, ৮৩ বছর বয়সী রানি এলিজাবেথ ও তাঁর ৮৮ বছর বয়সী স্বামী প্রিন্স ফিলিপ তাঁদের দায়িত্বভার বা চাপ কমাতে ওই পরিকল্পনা করেছেন। এ পরিকল্পনা এখন অনেক দূর এগিয়েও গেছে।
রানির এমন সিদ্ধান্তের কারণে একটি গুঞ্জন এখন আরও ডালপালা মেলবে। ওই গুঞ্জনটি হলো, ছেলে প্রিন্স চার্লসের চেয়ে নাতি উইলিয়ামকেই রানি বেশি বিশ্বাস করেন।
প্রিন্স চার্লস ও তাঁর দুই ছেলের জন্য নতুন আর্থিক ব্যবস্থাপনাসংবলিত ওই নির্দেশনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন চ্যান্সেলর অ্যালিস্টার ডার্লিংয়ের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা। ওই বিবরণীর মূল অংশ কাটাছেঁড়া ও কিছু অংশ মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু দ্য মেইল-এর কাছে কাটাছেঁড়া ছাড়া কপিটিই এসেছে। ফলে এটা এখন নিশ্চিত, রানি উইলিয়ামকেই এখন ব্রিটেনের ছায়ারাজা হিসেবে প্রস্তুত করছেন। ৮৩ বছর বয়সী রানি মাঝেমধ্যে বলে থাকেন, তিনি রাজকার্যের কিছু দায়িত্ব থেকে মুক্তি চা

লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব চান সোয়ার্জনিগার -জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলা

জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর আরনল্ড সোয়ার্জনিগার। গতকাল সোমবার ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি এ আহ্বান জানান। সোয়ার্জনিগার কোপেনহেগেনে জাতিসংঘের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেবেন। খবর এএফপির।
আরনল্ড সোয়ার্জনিগার ওই সাক্ষাত্কারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এ আন্দোলনের পেছনে শক্তি জোগায়, তাহলে সেটা গোটা বিশ্বের জন্য ভালো হবে।
সোয়ার্জনিগার বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার ব্যাপারে মার্কিন কংগ্রেসের সমর্থন নিশ্চিত করতে ওবামার প্রচেষ্টার প্রতি তিনি সমর্থন দেবেন।
তবে সোয়ার্জনিগার এ কথাও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর একটি বৈশ্বিক কাঠামো দাঁড় করাতে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে সেটা হবে ‘অবিশ্বাস্য’। তিনি বলেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় জ্বালানির ২০ শতাংশ পাবে নবায়নযোগ্য উত্স থেকে।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর বলেন, ‘আমাদের সূর্য ও বায়ু রয়েছে। এমনকি এখন আপনি শৈবাল থেকেও তেল পাচ্ছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় সবুজ বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রেরই এ রকম নেতৃত্বশীল ভূমিকা দরকার।’
ক্যালিফোর্নিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অঙ্গরাজ্য, যেটি তার গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। রিপাবলিকান দলের গভর্নর সোয়ার্জনিগার ২০০৬ সালে এ-সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক বিলে সই করেন। এ পদক্ষেপের কারণে তত্কালীন বুশ প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
ক্ষমতা নেই ওবামার: যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ব্যাপারে শূন্য প্রতিশ্রুতি নিয়ে কোপেনহেগেনের জলবায়ু সম্মেলনে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। গত রোববার একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন আইনপ্রণেতা এ কথা বলেন।
রিপাবলিকান সিনেটর জেমস ইনহোফ ফক্স নিউজকে বলেন, তাঁর এটা করার ক্ষমতা নেই। অন্য দেশের জনগণ সেটা উপলব্ধি করতে পারছে না। তিনি বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে ২০০৫ সালের মাত্রার চেয়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ১৭ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সক্ষম হবেন না বারাক ওবামা। এ ব্যাপারে কংগ্রেসের প্রয়োজনীয় আইনগত সমর্থন পাবেন না তিনি।
ইনহোফ বলেন, প্রতিশ্রুতি দিতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নেই বা তা পারেন না—এই বার্তাই বাকি ১৯১টি দেশের জনগণকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ওবামা কোপেনহেগেন যাচ্ছেন।

অন্ধ্র প্রদেশের বিধানসভার অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি -তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের সিদ্ধান্ত

ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যের বিধানসভার অধিবেশন গতকাল সোমবার অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করা হয়েছে। অধিবেশন শুরু হওয়ার পরপরই বিধায়কেরা হট্টগোল শুরু করেন। এক পক্ষ স্লোগান দেয় অখণ্ড অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্য টিকিয়ে রাখার দাবিতে, আরেক পক্ষ আলাদা তেলেঙ্গানা রাজ্যের পক্ষে। এমন পরিস্থিতিতে বিধানসভার স্পিকার এন কিরণ কুমার রেড্ডি অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। শীতকালীন এ অধিবেশন ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলার কথা ছিল।
আলাদা তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এরই মধ্যে বিধানসভার ১৪০ জন সদস্য পদত্যাগ করেছেন। গতকাল অধিবেশন শুরু হওয়ার পর বিধায়কেরা হট্টগোল শুরু করলে রাজ্যের আইনসভাবিষয়ক মন্ত্রী ডি প্রসাদা রাও অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করার একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সে অনুযায়ী অধিবেশন মুলতবি করেন স্পিকার। প্রসাদা রাও বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অধিবেশন আর চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই অধিবেশন মুলতবি করার প্রস্তাব দিই আমি।’
এদিকে তেলেঙ্গানা বিতর্ক নিয়ে অন্ধ্র প্রদেশের বিজয়াওয়াদা আসনের কংগ্রেস দলীয় পার্লামেন্ট সদস্য এল রাজাগোপালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, হায়দরাবাদের রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। অখণ্ড অন্ধ্র প্রদেশ টিকিয়ে রাখার দাবিতে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করার কথা ছিল রাজাগোপালের। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে পাহাড়ি শরিফ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে থানার সামনে রাজাগোপালের সমর্থকেরা অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন। থানায় রাজাগোপাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি জানি না, পুলিশ আমাকে কেন আটক করেছে। আমি মুখ্যমন্ত্রী ও বিধায়কদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলাম।’ পুলিশ জানিয়েছে, অনশন কর্মসূচি পালনের জন্য রাজাগোপালকে অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এদিকে তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের সমর্থক তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি (টিআরএস) অভিযোগ করেছে, রাজাগোপাল বিজয়াওয়াদা থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য হায়দরাবাদে তাঁর সমর্থকদের ডেকেছেন। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ গতকাল হায়দরাবাদের হোটেলগুলোয় তল্লাশি চালায়। পাশাপাশি বিজয়াওয়াদা থেকে আসা গাড়িগুলোতেও তল্লাশি চালানো হয়। এদিকে অখণ্ড অন্ধ্র প্রদেশ টিকিয়ে রাখার দাবিতে রয়ালাসিমা ও উপকূলীয় এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। কুরনুল শহরের কয়েক শ নারী এ দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেছেন। সহিংসতার আশঙ্কায় ভারতীয় ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ বিশাখাপত্তমে আগামী শুক্রবার অনুষ্ঠেয় ভারত-শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট ম্যাচটি পার্শ্ববর্তী নাগপুরে স্থানান্তর করেছে। বিবিসি, এএফপি।
১৭টি নতুন রাজ্য গঠনের দাবি: আমাদের কলকাতা প্রতিনিধি জানান, তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের সিদ্ধান্তের জের ধরে ভারতের নয়টি রাজ্য ভেঙে আরও অন্তত ১৭টি নতুন রাজ্য গঠনের দাবি উঠেছে। আর এ নিয়ে কয়েকটি অঞ্চলে আন্দোলনও শুরু হয়েছে। ভারতে এখন ২৮টি রাজ্য এবং সাতটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে। সর্বশেষ ২০০২ সালে উত্তর প্রদেশ ভেঙে গঠিত হয় উত্তরাখন্ড রাজ্য। এরপর নতুন রাজ্য গঠনের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু গত বুধবার কেন্দ্রীয় সরকার অন্ধ্র প্রদেশ ভেঙে আলাদা তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পর আবারও শুরু হয় আলাদা রাজ্য গঠনের আন্দোলন। এখন ভারতের ১২টি রাজ্য ভেঙে অন্তত ১৭টি নতুন আলাদা রাজ্য গঠনের দাবি উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে দার্জিলিং জেলা ও সন্নিহিত অঞ্চল নিয়ে গোর্খাল্যান্ড রাজ্য এবং পশ্চিমবঙ্গের ছয়টি জেলা ও আসামের ১৫টি জেলা নিয়ে কামতাপুর বা গ্রেটার কোচবিহার রাজ্য গঠনের দাবি উঠেছে। অন্যদিকে উত্তর প্রদেশ ভেঙে পূর্বাঞ্চল, বুন্দেলখন্ড ও পশ্চিমাঞ্চল নামের আরও তিনটি রাজ্য গঠনের দাবি উঠেছে। রাজস্থান ভেঙে মরু প্রদেশ রাজ্য গঠনের দাবিও এখন তীব্র হয়েছে। দাবি উঠেছে, মহারাষ্ট্র ভেঙে আলাদা বিদর্ভ রাজ্য গঠনের। আসাম ভেঙে বোরোল্যান্ড ও দিমারাজি রাজ্য গঠনের জন্য নতুন করে শুরু হয়েছে আন্দোলন। দাবি উঠেছে, গুজরাট ভেঙে সৌরাষ্ট্র রাজ্য, জম্মু-কাশ্মীর ভেঙে জম্মু রাজ্য, তামিলনাড়ু ভেঙে দক্ষিণের জেলা নিয়ে মাদুরাই রাজ্য, মধ্য প্রদেশ ভেঙে বিন্ধ্যাচল রাজ্য, পাঞ্জাব ভেঙে পেপসু রাজ্য, কর্ণাটক ভেঙে মহীশুর রাজ্য এবং উড়িষ্যা ভেঙে আরও দুটি পৃথক রাজ্য কলিঙ্গ ও কোশল রাজ্য গঠনের।
বিবিসি জানিয়েছে, গোর্খাল্যান্ড রাজ্য গঠনের দাবিতে দার্জিলিংয়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা (জিজেএম) আহূত চার দিনের ধর্মঘট পালিত হচ্ছে। এতে পর্যটন এলাকাটির জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কয়েক শ গোর্খা স্বেচ্ছাসেবক আলাদা রাজ্য গঠনের দাবিতে অনশন শুরু করেছেন। তবে ভারতীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি ইতিমধ্যে আলাদা গোর্খাল্যান্ড রাজ্য গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।

রাজধানীতে ছয় দিনব্যাপী আসবাবপত্র মেলা শুরু

‘আমার দেশ আমার আশা, দেশীয় ফার্নিচারে সাজাবো বাসা’ স্লোগানে বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির (বিএফআইওএ) উদ্যোগে এবং ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টারের (ডিটিসি) ব্যবস্থাপনায় সপ্তম জাতীয় ফার্নিচার মেলা শুরু হয়েছে।
ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল সোমবার এ মেলার উদ্বোধন করেন মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি বীর প্রতীক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আরেক মুক্তিযোদ্ধা ও ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী।
ফার্নিচার মালিক সমিতির এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
তারামন বিবি সবাইকে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে দেশীয় আসবাব কেনার আহ্বান জানান।
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলেন, ‘বহির্বিশ্বে আন্তর্জাতিক মানের আসবাবপত্রের চেয়ে আমরা পিছিয়ে নেই। আমরা বিশ্বের দরবারে উন্নতমানের আসবাবপত্র উপহার দিতে পারছি। তাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির চেয়ারম্যান কে এম আখতারুজ্জামান। তিনি ফার্নিচার শিল্পকে আধুনিকায়ন করার জন্য ফার্নিচার ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়ে বলেন, তিন থেকে ছয় মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে যে কেউ ফার্নিচার শিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। বিদেশেও এ শিল্পের শ্রমবাজার রয়েছে। এ ছাড়া বহির্বিশ্বে প্রচুর ফার্নিচার রপ্তানি করে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানে সমিতির মহাসচিব সেলিম এইচ রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইলিয়াস সরকার, কোষাধ্যক্ষ ও মেলা কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ উল্লাহ, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান খান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান শাহাব উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
এ মেলার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশীয় আসবাবপত্রের প্রচার এবং স্থানীয় ও বিদেশি ক্রেতাদের বাংলাদেশ আসবাবপত্রের গুণগত মান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অবহিত করা।
মেলায় ৭০টি প্রতিষ্ঠান ১৫০টি স্টলে বিভিন্ন আধুনিক ডিজাইনের আসবাবপত্র প্রদর্শন করছে। ছয় দিনব্যাপী এ মেলা চলবে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবারও প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য এ মেলা উন্মুক্ত থাকবে।

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থ-সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে নেদারল্যান্ড



নেদারল্যান্ড সরকার তার বেসরকারি খাত উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষি বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থ-সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে আবেদন করলে অতি অল্প সময়ের মধ্যে এসব অর্থ ছাড় করা হবে।
গতকাল সোমবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও ঢাকায় নেদারল্যান্ড দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বাণিজ্য-সহায়তা’বিষয়ক এক সেমিনারে নেদারল্যান্ড দূতাবাসের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।
রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে আয়োজিত এই সেমিনারে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন ডিসিসিআইয়ের সভাপতি জাফর ওসমান। অনুষ্ঠানে ঢাকায় নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত আলফোনজ জে এ জে এম জি হেন্নেকেনস সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দি নেদারল্যান্ডস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যান্ড কো-অপারেশনের (ইভিডি) কর্মকর্তা পল সুনমেকার। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ডিসিসিআইয়ের নবনির্বাচিত সভাপতি আবুল কাশেম খান (সেজাদ)।
নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘নেদারল্যান্ড সরকার তার বেসরকারি খাত উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের মতো বিভিন্ন স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বেসরকারি খাতকে আর্থিক ও পরামর্শসহায়তা দিয়ে থাকে।’
রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে অর্থসহায়তা পাওয়ার জন্য আবেদন করার আহ্বান জানান।
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নেদারল্যান্ড সরকারের এ ধরনের সহায়তা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বড় ধরনের সহায়তা করবে।’ তিনি নেদারল্যান্ড সরকারের সহায়তাপুষ্ট পুরোনো প্রকল্পে সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন প্রকল্পে সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
মাহবুবুর রহমান নেদারল্যান্ড সরকারের দেওয়া আর্থিক সহায়তা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
জাফর ওসমান বলেন, নেদারল্যান্ড সরকারের বেসরকারি খাত উন্নয়ন কর্মসূচি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উন্নয়ন ও জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প নেদারল্যান্ড ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যৌথ বিনিয়োগে শিল্প স্থাপন করতে সহায়তা করবে।
মূল প্রবন্ধে পল সুনমেকার বলেন, নেদারল্যান্ড সরকার মূলত বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কর্মসূচি (পিএসআই), ম্যাচ মেকিং ফ্যাসিলিটি ও অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির (বা অরিয়ো কর্মসূচি) মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বেসরকারি খাতকে সহায়তা করে থাকে।
পল সুনমেকার জানান, পিএসআই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত লাখ ইউরো সহায়তা দেওয়া হয়। এ জন্য নেদারল্যান্ডের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে শিল্প স্থাপন করতে হবে। ম্যাচ মেকিং ফ্যাসিলিটির আওতায় নেদারল্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে শিল্প স্থাপনের জন্য কোনো পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া হলে অর্থসহায়তা পাওয়া যাবে।
অবশ্য অরিয়ো কর্মসূচিতে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ২০ লাখ ইউরো থেকে ছয় কোটি ইউরো সহায়তা পাওয়া যাবে। এ জন্য বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান নেদারল্যান্ড বা অন্য যেকোনো দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বিনিয়োগ করলে অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয়ের ৫০ শতাংশ সহায়তা করা হয়।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির আয় ও মুনাফা বেড়েছে

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ২২তম বার্ষিক সাধারণ সভা সম্প্রতি ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় জানানো হয়, আরপিজিসিএল ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সিএনজি, এলপিজি, পেট্রল ও ডিজেল বিক্রিসহ অন্যান্য খাতে ২৯৫২৫ দশমিক ৬৮ লাখ টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮০ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। আলোচ্য অর্থবছরে কোম্পানি ৯৮ দশমিক ৮২ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করে, যা আগের বছরের চেয়ে ৬৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি।
আরপিজিসিএলের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবদুল মালেকের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. হোসেন মনসুর ও সংস্থার পরিচালকেরা এবং আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজম উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বলা হয়, আলোচ্য অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ২৩৫টি নতুন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও ২০টি রূপান্তর কারখানা স্থাপনসহ ৩১ হাজার ৬০৯টি গাড়ি সিএনজি জ্বালানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সভায় আরও জানানো হয়, জ্বালানি আমদানি খাতে বর্তমানে সরকারের প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার ২৮৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।

শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতা বাড়াতে চেষ্টা চালাবে বাংলাদেশ -সিউলে আপটা মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক কাল

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপটা) ৩৫তম স্থায়ী কমিটির সভা গতকাল সোমবার শেষ হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর এ সভা শুরু হয়।
আগামীকাল বুধবার একই জায়গায় অনুষ্ঠিত হবে আপটা মন্ত্রী পর্যায়ের কাউন্সিলের তৃতীয় সভা।
এতে যোগ দিতে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল গতকাল সোমবার ঢাকা ত্যাগ করেছে। চার সদস্যের প্রতিনিধিদলের অন্যরা হলেন দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম, ট্যারিফ কমিশনের যুগ্ম প্রধান মোস্তফা আবিদ খান এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব দেলোয়ার হোসেন।
জানা গেছে, আপটা মন্ত্রী পর্যায়ের কাউন্সিলে সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক হ্রাস বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হবে। এ জন্য বাংলাদেশি পণ্যের একটি তালিকাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর আগে শুল্ক হ্রাসের দরকষাকষির ব্যাপারে তিনটি পর্ব সম্পন্ন হয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, আপটা স্থায়ী কমিটি বাণিজ্য উদারীকরণসংক্রান্ত দরকষাকষির জন্য কারিগরি পর্যায়ে কাজ করলেও চুক্তি বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের সার্বিক কাজ করে থাকে মন্ত্রী পর্যায়ের কাউন্সিল। এ কাউন্সিলকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।
আপটার আওতায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশ বেশ কিছু পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাচ্ছে। তবে এই সুবিধার আওতা আরও বাড়ানোর জন্য বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোর চেষ্টা চালানো হবে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, কোরিয়া ও লাও পিডিআর নিয়ে ১৯৭৫ সালে ব্যাংকক এগ্রিমেন্ট নামে আঞ্চলিক জোট গঠিত হয়। পরে থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন জোট থেকে বেরিয়ে গেলে ২০০১ সালে নতুন করে যুক্ত হয় চীন। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, কোরিয়া, লাও পিডিআর—এই ছয় দেশ নিয়ে ২০০৫ সালে পুনর্গঠিত হয় আঞ্চলিক জোট আপটা।
জানা যায়, আপটা কাউন্সিল শেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রী ১৬ ডিসেম্বর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ রোড শোতে অংশ নেবেন।
বাংলাদেশ থাই চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আমন্ত্রণে বাণিজ্যমন্ত্রী এতে যোগ দিচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি তুলে ধরবেন এবং বাংলাদেশি পণ্য থাইল্যান্ডে রপ্তানির সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব দেবেন।
২০ ডিসেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রীর দেশের ফেরার কথা রয়েছে।

বিজয় দিবসের খেলা

বক্সিং: মুহাম্মদ আলী বক্সিং স্টেডিয়াম এখনো নির্মাণাধীন, এবার তাই বিজয় দিবস বক্সিং প্রতিযোগিতা হবে বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে। আগামীকাল জুনিয়র গ্রুপে ৫টি ও সিনিয়র গ্রুপে ৯টি ওজন শ্রেণীতে খেলবে এসএ গেমসের ক্যাম্পে থাকা জাতীয় দল ও ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থার খেলোয়াড়েরা।—ক্রীড়া প্রতিবেদক
খো খো: খো খো ফেডারেশনের সাবেক সহসভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা মেসবাহ উদ্দিন সাবুর স্মরণে আগামীকাল হবে বিজয় দিবস খো খো। সাভার আলহাজ জাফর বেপারী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অংশ নিচ্ছে দয়াগঞ্জ বর্ণালী সংঘ, সতীর্থ ক্লাব, সিংনা সংঘ, ওল্ড আইডিয়ালস অ্যাসোসিয়েশন, মনোয়ার স্মৃতি সংসদ এবং ঘোড়াপি ক্রীড়াচক্র।

আত্মসমর্পণের সময় তামিল গেরিলাদের হত্যা করা হয়েছিল -সাবেক সেনাপ্রধান ফনসেকা বললেন

শ্রীলঙ্কার সাবেক সেনাপ্রধান শরত্ ফনসেকা বলেছেন, আত্মসমর্পণের সময় তামিল গেরিলা নেতাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। ওই সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোটাভায়া রাজাপক্ষে পরাজিত গেরিলা নেতাদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফনসেকার ওই মন্তব্য গতকাল রোববার স্থানীয় দ্য সানডে লিডার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ফনসেকা দেশের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এএফপি।
ফনসেকা অভিযোগ করেন, গত মে মাসে লিবারেশন অব তামিল টাইগার ইলমের (এলটিটিই) পরাজয় ঘটে। এর আগমুহূর্তে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের ভাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোটাভায়া রাজাপক্ষে সেনাদের নির্দেশ দেন, যেন তামিল গেরিলাদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে না নেওয়া হয়।
সানডে লিডারকে ফনসেকা বলেন, বিদেশি মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে তামিল গেরিলা নেতারা সাদা পতাকা উড়িয়ে সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই সময় গোটাভায়া সেনাবাহিনীর ৫৮ নম্বর ডিভিশনের কমান্ডারকে নির্দেশ দেন, আত্মসমর্পণের সময় গেরিলা নেতাদের যেন হত্যা করা হয়।
ফনসেকার নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে ফনসেকা গত মাসে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং সামনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দেন।

পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে পৃথক রাজ্য গড়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু

আন্দোলনের মুখে ভারতে পৃথক তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র গড়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর একই দাবিতে পশ্চিমবঙ্গও ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে পৃথক রাজ্য গড়ার দাবিতে দার্জিলিংয়ে জনমুক্তি মোর্চার নেতারা শুক্রবার থেকে অনশন শুরু করেছেন। মোর্চা আরও ঘোষণা দিয়েছে, আজ সোমবার থেকে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে শুরু হচ্ছে চার দিনের দার্জিলিং বন্ধ্।
দার্জিলিং-সমস্যা সমাধানের জন্য ২১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় সরকার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক বসছে। এ বৈঠকের আগে মোর্চার বন্ধ্ ঘোষণায় উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় সরকার।
অন্ধ্র প্রদেশের তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি বা টিআরএসের প্রধান কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের ১১ দিনের আমরণ অনশনের জেরে কেন্দ্রীয় সরকার গত বুধবার পৃথক তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র গড়ার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা ঘোষণা করে। এর পরই পশ্চিমবঙ্গ উত্তপ্ত হতে শুরু করে।
পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম ভেঙে পৃথক কামতাপুর বা গ্রেটার কোচবিহার রাজ্য গঠনের দাবিতে গত শনিবার থেকে কোচবিহারের দিনহাটার প্রান্তিক বাজারে আমরণ অনশন শুরু করে ‘সেপারেট স্টেট ডিমান্ড কমিটি’ বা এসএসডিসি। কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নয়টি রাজনৈতিক দল। শনিবার এ অনশনে যোগ দিয়েছেন ১৩ জন। এর মধ্যে ১১ জন গ্রেটার কোচবিহার ডেমোক্রেটিক পার্টির এবং দুজন কামতাপুরী পিপলস পার্টি বা কেপিপির। কমিটির দাবি, পশ্চিমবঙ্গের ছয়টি জেলা এবং আসামের ১৫টি জেলা নিয়ে গড়তে হবে পৃথক কামতাপুর বা গ্রেটার কোচবিহার রাজ্য।
কংগ্রেস সরকারের পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের ঘোষণায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে খোদ অন্ধ্রপ্রদেশ কংগ্রেসের মধ্যেই। এরই মধ্যে দলের অনেক বিধায়ক পদত্যাগ করেছেন। অন্ধ্রপ্রদেশের দ্বিতীয় বৃহত্ দল তেলেগু দেশম ও প্রজারাজ্যম পার্টির অনেক বিধায়কও পদত্যাগ করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে পৃথক রাজ্য গড়ার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা ও কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে কোনো নতুন রাজ্য নয়। বামফ্রন্ট, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপিও চাইছে না, পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে নতুন কোনো রাজ্য হোক।

শান্তি আলোচনা শুরু করতে রাজি উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র

কোরীয় যুদ্ধের ভেঙে পড়া সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তির জায়গায় একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য নতুন করে চারপক্ষীয় আলোচনা শুরু করতে রাজি হয়েছে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ এ কথা জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে ইয়োনহাপ জানিয়েছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিফেন বসওয়ার্থ উত্তর কোরিয়া সফরের পর দুই দেশ শান্তি আলোচনা শুরু করতে রাজি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণ কোরিয়ার এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, উত্তর কোরিয়াই বিষয়টি চারপক্ষীয় আলোচনা-কাঠামোর আওতায় আলোচনা করার অনুরোধ জানায়।

কিয়োটো চুক্তির সংশোধনীর বিরোধিতা করেছে ভারত

কোপেনহেগেনে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে কিয়োটো চুক্তির কোনো সংশোধনীর ব্যাপারে বিরোধিতা করেছে ভারত। সম্মেলনে ১৯৯৭ সালে প্রণীত কিয়োটো চুক্তির পরিধি বাড়িয়ে সেখানে আরও বাধ্যবাধকতা যুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র দ্বীপদেশ টুভ্যালু কিয়োটো চুক্তির সঙ্গে আরও একটি চুক্তি যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিল নতুন একটি চুক্তির পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে।
সম্মেলনে ভারতীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব বিজয় শর্মা বলেন, ‘সম্মেলন সফল করাই আমাদের উদ্দেশ্য। ইতিমধ্যে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নের ওপরই মূলত আলোকপাত করা হচ্ছে।’ এদিকে নতুন একটি চুক্তির পক্ষে সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করতে কোপেনহেগেন জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের সভাপতি কোনি হেডেগার্ডের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন টুভ্যালুর প্রতিনিধি ইয়ান ফ্রে।
নতুন চুক্তির ব্যাপারে সমর্থন জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশ ভারত, চীন ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন তেলসমৃদ্ধ দেশ এর বিরোধিতা করছে। প্রস্তাবিত নতুন চুক্তিতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি ভারত ও চীনের মতো বড় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করার কথা বলা হয়েছে।

শেনঝেনের ‘ইমেজ অ্যাম্বাসেডর’ হলেন ওবামার সত্ভাই

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সত্ভাই মার্ক ওকোথ ওবামা এনদেসানজোকে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বাণিজ্যিক নগর শেনঝেনের ‘ইমেজ অ্যাম্বাসেডর’ করা হয়েছে। অনাথ ছেলেমেয়েদের বিনা পারিশ্রমিকে পিয়ানো শেখানোর মতো সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এনদেসানজোকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে গতকাল রোববার এ কথা বলা হয়। খবর এএফপি ও রয়টার্স অনলাইনের।
দ্য বেইজিং নিউজ ও দ্য গুয়ানঝু ডেইলির খবরে বলা হয়, শেনঝেনে গত শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে ‘ইমেজ অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে এনদেসানজোর নাম ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া একই অনুষ্ঠানে এনদেসানজোকে ‘পাঁচতারকা স্বেচ্ছাসেবক’ পুরস্কারও দেওয়া হয়।
ওবামা এনদেসানজো ২০০২ সাল থেকে শেনঝেন শহরে বসবাস করছেন। সেখানেই তাঁর ব্যবসাবাণিজ্য। তিনি একজন ভালো পিয়ানোবাদকও। এই শহরের অনাথ ছেলেমেয়েদের তিনি বিনা পারিশ্রমিকে পিয়ানো শেখান। চীনে গত বছরের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তহবিল গঠনের লক্ষ্যে এ বছরের প্রথম দিকে তিনি একটি কনসার্টও করেন। সমাজসেবামূলক এসব কর্মকাণ্ডের জন্য স্থানীয় শেনঝেন ইয়ুথ লিগ নামের সংগঠন তাঁকে ওই সম্মানে ভূষিত করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার বাবার তৃতীয় স্ত্রীর ঘরে জন্ম নেন মার্ক এনদেসানজো। এত দিন নিভৃতচারী মার্ক গণমাধ্যমের আলোর বাইরে ছিলেন। ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে সবার আলোচনায় আসতে থাকেন। এরই মধ্যে গত মাসে ওবামার চীন সফরের সময় ওবামার সঙ্গে মার্ক ও তাঁর সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর সংক্ষিপ্ত অথচ আবেগঘন সাক্ষাত্ হয়। সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে মার্ক ওই সাক্ষাত্কারের মধুর স্মৃতি রোমন্থন করেন।

দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে অভিযান শেষ, সেনাদের নতুন লক্ষ্য ওরাকজাই

পাকিস্তানের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সর্বাত্মক অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা গত শনিবার এ কথা বলেছেন। তবে এ অভিযানে সেনাবাহিনী সফল হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে তাঁরা কিছু বলেননি। সেনাবাহিনী এখন জঙ্গিদের নতুন ঘাঁটি উত্তর ওয়াজিরিস্তানের ওরাকজাইয়ে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি জানিয়েছেন। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ডন অনলাইনের।
আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে চালানো অভিযান ছিল গত কয়েক বছরের মধ্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় অভিযান। এতে ৩০ হাজার সেনা অংশ নেয়। তবে এই অভিযানে সেনাবাহিনীর লক্ষ্য পূরণ হয়েছে কি না, এ ব্যাপারে সামরিক কর্মকর্তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইউসুফ রাজা গিলানি শনিবার লাহোরে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে সেনাবাহিনীর অভিযান শেষ। এখন আমরা আরেকটি উপজাতীয় এলাকা ওরাকজাইয়ে অভিযান চালানোর কথা ভাবছি।’
সেনাবাহিনী জানায়, দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে মধ্য অক্টোবর থেকে শুরু জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ৫৮৯ জন জঙ্গি ও ৭৯ জন সেনাসদস্য মারা গেছেন। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, এই অভিযান শুরুর পর অনেক জঙ্গি দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান ছেড়ে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের ওরাকজাইয়ে এবং কুররাম উপজাতীয় এলাকায় পালিয়ে গেছে।
ওরাকজাই পাকিস্তানভিত্তিক তালেবান নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদের ঘাঁটি বলে পরিচিত। এ ছাড়া আল-কায়েদা ও অন্য জঙ্গিগোষ্ঠীরও শক্ত ঘাঁটি এই উপজাতীয় অঞ্চলটি।
প্রধানমন্ত্রী গিলানি আরও বলেন, ‘উত্তর ওয়াজিরিস্তানে শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছাতে আমরা প্রথমে ওরাকজাইয়ের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা করব। কিন্তু এই চেষ্টা ব্যর্থ হলে সেখানে অভিযান চালাতে সরকার প্রস্তুত।’

অন্ধ্রপ্রদেশে রাজনৈতিক সংকট তীব্র রাষ্ট্রপতির শাসন জারির আশঙ্কা -তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের সিদ্ধান্ত

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের তেলেঙ্গানা অঞ্চলকে আলাদা রাজ্য হিসেবে গঠনের সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই রাজ্যে রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়েছে। বিবিসি জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল রোববার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কে রোসাইয়াহর কাছে রয়ালাসিমা ও উপকূলীয় এলাকার ২০ জন মন্ত্রী পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত শনিবার তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির (টিআরএস) প্রধান কে চন্দ্র শেখর রাও একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর নতুন রাজ্য গঠন করা হলে হায়দরাবাদ হবে এর রাজধানী। তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রের যৌথ রাজধানী হিসেবে হায়দরাবাদকে গড়ে তোলার সম্ভাবনা নাকচ করেন তিনি।
তেলেঙ্গানাকে আলাদা রাজ্য হিসেবে গঠন করার দাবিতে চন্দ্র শেখর রাও অনশন শুরু করেন। তাঁর ১১ দিনের অনশনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকার দাবি মেনে নিয়ে ২৯তম রাজ্য হিসেবে তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠন প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং অখণ্ড অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য টিকিয়ে রাখার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে রয়ালাসিমা ও উপকূলীয় এলাকার অধিবাসীরা।
এদিকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, তাঁরা চান কেন্দ্র এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিক। এ ব্যাপারে রাজ্যের পৌর প্রশাসনবিষয়কমন্ত্রী রামনারায়ণ রেড্ডি বলেন, ‘আমরা অখণ্ড অন্ধ্রপ্রদেশ চাই। রাজ্যের বিভক্তি কারও স্বার্থ রক্ষা করবে না।’ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করবেন কি না, জানতে চাইলে সরাসরি উত্তর না দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী রোসাইয়াহ বলেন, ‘একটি সংকট তৈরি হয়েছে। তবে আমি আশাবাদী, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এ সংকট সমাধান করতে পারবে।’ রাজ্যের মন্ত্রিসভার ৩৪ জন সদস্যের মধ্যে ১৩ জন তেলেঙ্গানা অঞ্চলের। মুখ্যমন্ত্রীসহ বাকি ২১ জন রয়ালাসিমা ও অন্ধ্র উপকূলীয় এলাকার। এরই মধ্যে অন্ধ্রের বিধানসভার ২৯৪ জন সদস্যের মধ্যে ১৪০ জন পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কংগ্রেস দলীয় বিধায়ক ৭৯ জন।
ওদিকে রাজনৈতিক সংকট সামাল দিতে পদত্যাগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী রোসাইয়াহ। কিন্তু কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব তাঁর ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে রাজ্যের ২০ জন মন্ত্রী পদত্যাগ করলে সেখানে কোনো সরকার থাকবে না। আর এতে অন্ধ্রপ্রদেশে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে রয়ালাসিমা ও উপকূলীয় অঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকালও এসব এলাকায় বাস চলাচল বন্ধ ছিল। স্কুল, প্রশাসনিক দপ্তর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ ছিল। তেলেঙ্গানা ইস্যুতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কয়েকটি নতুন রাজ্য গঠনের দাবিও মাথাচাড়া দিচ্ছে।
উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী প্রদেশটির পূর্বাঞ্চলকে নিয়ে একটি পৃথক ‘পূর্বাঞ্চল’ রাজ্য গঠনের দাবি জানিয়ে গতকাল প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে একটি চিঠি দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তৃতীয়বারের মতো তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিলেন।

উত্তরা ইপিজেডে চীনা কোম্পানির দুই কোটি ডলার বিনিয়োগ

চীনা কোম্পানি এভারগ্রিন প্রোডাক্টস ফ্যাক্টরি (বিডি) লিমিটেড উত্তরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় উইগ ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা স্থাপন করবে।
সম্পূর্ণ বিদেশি এই কোম্পানি ২০ দশমিক ১৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে উইগ এবং এ সংক্রান্ত অন্য পণ্যসামগ্রী উত্পাদন ও রপ্তানি করবে। এ কোম্পানিতে পাঁচ হাজার ১৭ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ ব্যাপারে সম্প্রতি ঢাকায় বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও এভারগ্রিন প্রোডাক্টসের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. মোয়েজ্জদ্দীন আহমেদ এবং মেসার্স এভারগ্রিন প্রোডাক্টসের পরিচালক চেন চি ওয়াই আলফ্রেড নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ লিজ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ খান, সদস্য (প্রকৌশল) এম মাহবুব-উল-আলম, সদস্য (অর্থ) এ কে এম মাহবুবুর রহমান, সচিব মো. শওকত নবী, মহাব্যবস্থাপক (বিনিয়োগ উন্নয়ন) এ জেড এম আজিজুর রহমান প্রমুখ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীতে ইলেকট্রনিক পণ্যের শোরুম খুলেছে রহিমআফরোজ

রহিমআফরোজ সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডে তার প্রথম মাল্টি ব্র্যান্ড ইলেকট্রনিকস শোরুম ‘ইউরেকা’ খুলেছে।
শোরুমটির উদ্বোধন করেন জয়নাব মঈন। এ সময় রহিমআফরোজ গ্রুপের চেয়ারম্যান আফরোজ রহিম, মহাপরিচালক ফিরোজ রহিম, উপমহাপরিচালক মুহাম্মদ ইসমাইল, পরিচালক নিয়াজ রহিম, মুদাসসির এম মঈন ও মুনাওয়ার এম মঈন; প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা পারভেজ সাইফুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক ও ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ের প্রধান ইয়ামিন শরীফ চৌধুরীসহ রহিমআফরোজ এবং অন্যান্য কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইউরেকা উদ্বোধনের মাধ্যমে রহিমআফরোজ কনজ্যুমার ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি পণ্য বিপণনের কার্যক্রম শুরু করল। প্রাথমিকভাবে ইউরেকায় দাইউ ব্র্যান্ডের এলসিডি টিভি, সিআরটি টিভি, এসি, রেফ্রিজারেটর, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ও ওয়াশিং মেশিনের পাশাপাশি জিই কনজ্যুমার লাইটিং হ্যাগার ব্র্যান্ডের ইলেকট্রিক্যাল পণ্য এবং রহিমআফরোজ আইপিএস, ইউপিএস, ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার ইত্যাদি বাজারজাত করবে। ক্রমান্বয়ে অন্যান্য জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ইউরেকার পণ্যসম্ভারে যুক্ত হবে।

সোনালী ব্যাংক ও মাইডাস ফাইন্যান্স ঋণচুক্তি করেছে

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের সহযোগিতা ও নতুন উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করার লক্ষ্যে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের সঙ্গে সম্প্রতি মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেডের একটি ঋণচুক্তি হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী এসএমই খাতকে আরও উন্নত ও গতিশীল করতে ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে সোনালী ব্যাংক মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের অনুকূলে ৩০ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করেছে।
সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এ চৌধুরী, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফকরুল ইসলাম, প্রদীপ কুমার দত্ত ও মোস্তাক আহমেদ, মহাব্যবস্থাপক করবী মুজিব ও উপমহাব্যবস্থাপক আবদুল লতিফ এবং মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) শফিক-উল-আজম ও কোম্পানি সচিব মো. দীন ইসলাম মিঞা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে দেশে নতুন শিল্পোদ্যাক্তা সৃষ্টি ও তাদের উত্সাহ প্রদান এবং এসএমই খাতের সমৃদ্ধি ও প্রসারের মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়।

শ্রমিক উত্সবের চূড়ান্ত মঞ্চ মহড়া সম্পন্ন

বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) আয়োজিত শ্রমিক উত্সবের চূড়ান্ত মঞ্চ-মহড়া গতকাল রোববার নারায়ণগঞ্জের আলী আহাম্মদ চুনকা পৌর মিলনায়তনে সম্পন্ন হয়েছে।
বিকেএমইএর উদ্যোগে ১৮ ডিসেম্বর শুক্রবার শহরের ইসদাইরে অবস্থিত ওসমানী স্টেডিয়ামে এই শ্রমিক উত্সব ২০০৯ অনুষ্ঠিত হবে।
উত্সব কমিটির আহ্বায়ক ফজেল শামীম এহসান জানান, গত ১৭ জুন থেকে শ্রমিক উত্সবের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। রোববার চূড়ান্ত মহড়ার মাধ্যমে ২০০ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। মূল অনুষ্ঠান একটানা সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলবে। উত্সবে আনুমানিক এক লাখ শ্রমিক অংশ নেবেন।
মডেল ডি ক্যাপিটালের শ্রমিক শাহনাজ বিকেএমইএর শ্রমিক উত্সবের কথা জানতে পেরে গান শেখার জন্য স্থানীয় একটি গানের স্কুলে ভর্তি হন। মডেল ডি ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদু্জ্জামান এ ব্যাপারে তাঁকে উত্সাহ দিয়েছেন।
এ ছাড়া এই উত্সবে অংশ নিতে ফকির অ্যাপারেলসের শ্রমিক সেন্টু ও আনোয়ারা ফেব্রিকসের সুমি নাচের স্কুলে ভর্তি হন।

পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিকভাবে কমলার চাষ শুরু by শহীদুল ইসলাম

পঞ্চগড় জেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দার্জিলিং ভ্যারাইটির কমলার চাষ শুরু হয়েছে। এমনকি বসতবাড়িতেও ইতিমধ্যে কমলার চাষ হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে এ জেলায় বাণিজ্যিক ও বসতবাড়ির বাগানগুলোতে কমলার ফলন শুরু হবে এবং ২০১৩ সালের পর স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাইরের দেশেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, জেলার বোদা উপজেলার সর্দারপাড়া গ্রামের অচিন্ত্য কারকুন, বেতবাড়ীর আছিরউদ্দিন আহাম্মদ, সদর উপজেলার বলেয়াপাড়ার আবদুল গফ্ফার চৌধুরী, কাহারপাড়ার জিতেন্দ্রনাথ, বড়ভিটার সালাউদ্দিন, চছপাড়ার মহিরউদ্দিন, বড়বাড়ীর কাক্কা প্রধান, তেঁতুলিয়া উপজেলার সিপাইপাড়ার আবদুর রহমান ও জেলা শহরের কামাতপাড়ার আবদুল জলিলের বাগানে ইতিমধ্যে সুস্বাদু কমলা ধরেছে। একই কথা জানালেন আরও প্রায় অর্ধশত কমলাচাষি। তাঁদের বাগানে এখন গাছপ্রতি ২০০ থেকে হাজার পর্যন্ত কমলার ফলন হচ্ছে।
কৃমি মন্ত্রণালয় ২০০৩ সালে সারা দেশে কমলা চাষের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মহাপরিচালক শহীদুল ইসলামকে প্রধান করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এই টাস্কফোর্স পঞ্চগড় জেলা সদর, তেঁতুলিয়া, বোদা ও আটোয়ারী উপজেলার মাটি ও জলবায়ু কমলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী বলে প্রতিবেদন পেশ করে।
জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কমলা উন্নয়ন প্রকল্প প্রায় দেড় হাজার চাষিকে প্রশিক্ষণ, মানসম্মত চারা সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত সুবিধা প্রদান করে। এতে কমলার চাষাবাদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে চারটি উপজেলায় ১০৪ হেক্টর জমিতে অন্তত ৯৩টি কমলার বাগান গড়ে উঠেছে। এসব বাগানে ৩৫ হাজার চারা রোপণ করা হয়। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন বসতবাড়ির আশপাশে রোপণ করা হয় আরও ৩৫ হাজার কমলার চারা।
বর্তমানে পঞ্চগড় জেলায় প্রতিবছর ২০ মেট্রিক টন কমলা উত্পাদিত হয়। কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের পঞ্চগড়ের উদ্যান উন্নয়ন কর্মকর্তা অসীম কুমার পাল প্রথম আলোকে বলেন, ২০১১ সালের মধ্যে পঞ্চগড় জেলার ২০০ হেক্টর জমি কমলা চাষের আওতায় আসবে। আর ২০১১ সালে জেলায় ৫০০ মেট্রিক টন কমলা উত্পাদিত হবে। প্রতিবছর ফলনের পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকবে।

জলবায়ু পরিবর্তন -রাজনীতিবিদেরা যা বুঝছেন না by সলিমুল হক

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমি বহু বছর থেকে কাজ করে আসছি। প্রথমে গবেষক হিসেবে আমার দেশ বাংলাদেশে, পরে আন্তর্জাতিক স্তরে। আফ্রিকার ঊষর অঞ্চলে, হিমালয় পর্বতে এবং এশিয়ার বদ্বীপগুলোর বিপুল বিস্তৃত নিম্নভূমিতে কীভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে, তা আমি চাক্ষুষ করেছি। বছরের পর বছর আমি জাতিসংঘের নিষ্ফল জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনও দেখেছি। এগুলো কোনো অবদানই রাখতে পারেনি, কারণ আলোচকেরা আগামী প্রজন্মকে সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বদলে সংকীর্ণ জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতেই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন।
যাঁরা বলেন, জলবায়ু বদলাচ্ছে না, তাঁদের বেশির ভাগই বিভিন্নভাবে পরিবেশদূষণকারী কলকারখানার সঙ্গে জড়িত। তাঁদের সঙ্গে আমি মৌখিকভাবে বহু তর্ক করেছি। জীবনে তাঁরা সেসব গ্রামীণ বা শহুরে বসতিগুলোতে পা রাখেননি, যেখানে এরই মধ্যে জলবায়ু বিপর্যয়ের ছাপ ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এসব জায়গায় এলে তাঁরা হয়তো বুঝতে পারতেন, যেসব মানুষ এই বৈশ্বিক হুমকি সৃষ্টির জন্য বিন্দুমাত্রও দায়ী নয়, তাদের কী রকম খেসারত দিতে হচ্ছে। এর জন্য দায়ী ওই সব অস্বীকারকারী মানুষের চিন্তাভাবনা ও কার্যকলাপ।
জলবায়ু সম্মেলন চলতে থাকা কোপেনহেগেনের এই ডিসেম্বরে, আমরা আমাদের চরম বিন্দুতে পৌঁছে গেছি। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, আগামী সময় কোপেনহেগেনকে মনে রাখবে। তবে তা ১৮ ডিসেম্বর সেখানে বিশ্বনেতাদের বৈঠকের সিদ্ধান্তের জন্য নয়, মনে রাখবে এই ১২ ডিসেম্বরে সেখানে যা ঘটল, তার জন্য। এদিন লাখো মানুষ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জোরদার ও উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি নেওয়ার দাবিতে রাস্তাঘাট দখল করে নিয়েছিল।
এটাই সেই দিন, যেদিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন মত-পথ ও পেশার মানুষ পৃথিবীকে রক্ষার দায়ভার তথাকথিত নেতাদের হাত থেকে নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল। আজ জলবায়ু সম্মেলনের শেষ দিনে আমাদের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরা যে ‘চুক্তি’ বা ‘বিধিবিধান’-ই প্রণয়ন করুন না কেন, ইতিহাসের লিখন যারা লিখছে, তারা হলো সেই বিশ্বজনতা। যেসব নেতা দেয়ালে দেয়ালে লেখা ইতিহাসের সেই লিখন পড়তে পারবেন, তাঁরা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আর যাঁরা সেই লিখন উপেক্ষা করবেন, ইতিহাসের ঢেউ তাঁদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। গত শনিবারই ছিল সেই দিন, যেদিন বিশ্বের বিরাট একটি অংশের মানুষ সত্যিকার একটি বৈশ্বিক হুমকির বিরুদ্ধে একযোগে উঠে দাঁড়িয়েছিল। যদিও আজ হয়তো হতাশ হতে হবে (গত সপ্তাহের রাজনৈতিক কূটকচাল সত্ত্বেও আমি কিছুটা আশাবাদী, খুবই দুর্বল একটি চুক্তি হয়তো হবে), কিন্তু এরই মধ্যে ইতিহাসের স্রোত খাত বদলে ফেলেছে। একে আর ফেরানো যাবে না।
আজ আমরা যা-ই অর্জন করি না কেন, আমরা এক অপরিবর্তনীয় পথে যাত্রা শুরু করেছি। এই বুঝ যাঁরা বুঝছেন, তাঁরা আসবেন জনগণের সব থেকে কম প্রত্যাশিত অংশ থেকে। যাঁদের চোখ খোলা আছে, তাঁদের জন্য একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ধরুন, ক্ষুদ্র দ্বীপ মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের কথা। তাঁরাই আগামী দিনের নেতা।
কয়েক মাসের মধ্যে জলবায়ু বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সত্যিকারের লড়াই চালাতে আমি ফিরে আসব আমার দেশ বাংলাদেশে। আমার লড়াই হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় খারাপ কিংবা দুর্বল নীতির বিরুদ্ধে। আগামী বছরগুলোতে আমার আশা একটাই, পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু উদ্ভাবনাময় ও অদম্য মানুষের দেশ বাংলাদেশ যেন পৃথিবী বিখ্যাত ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পৃথিবীর সব থেকে ‘সক্ষম’ দেশে পরিণত হয়।
আমি দেশে ফিরে যাচ্ছি বাংলাদেশে নতুন একটি জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার চিন্তা নিয়ে। এর মাধ্যমে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকি মোকাবিলায় সরকার, নাগরিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাসম্পর্কিত মানুষজন এবং সাংবাদিকসহ উন্নয়নশীল দেশ থেকে আসা আরও অনেকের সক্ষমতা বাড়ানো ও প্রশিক্ষণের জন্য কাজ করব। এই নতুন প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা নতুন দুনিয়ায় টিকে থাকার কৌশলের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবে এবং চালাবে জ্ঞানের আদান-প্রদান। প্রাথমিকভাবে আমাদের কাজ অনুন্নত দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন বিষয়ে হলেও উন্নত শিল্পায়িত দেশগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে পারে, সে বিষয়েও পরিকল্পনা তৈরি করছি। পরিহাস এই যে, দুনিয়ার বেশির ভাগ দরিদ্র দেশের মতোই ধনী দেশগুলোও এখনো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পরিকল্পনা তৈরি করেনি।
আমি ফিরছি জলবায়ুর লড়াইয়ের ময়দানের একেবারে সামনের সারিতে, যেখানে এরই মধ্যে মানুষ লড়তে শুরু করেছে। আমি বাংলাদেশে ফিরছি এই আকাঙ্ক্ষা ও আশাবাদী মনোভাব নিয়ে, বিশ্বমানবতা আমাদের সবার জীবনের আশ্রয় এই পৃথিবীকে বিপন্নতা মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ নিতে সক্ষম। আমি জানি, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ আমার এই আশার সহযাত্রী।
ব্রিটেনের গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।
সলিমুল হক: লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ক্লাইমেট চেঞ্জ গ্রুপের প্রধান এবং আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যানেলের (আইপিসিসি) সদস্য।

টিভি: বিনোদন ও পাবলিক সার্ভিসের মধ্যে সমন্বয় by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

সরকার কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই নতুন ১০টি টিভি চ্যানেলের অনুমোদন দিয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়। যেমনটি করেছিল বিএনপি-জামায়াত সরকার। এটা আমাদের দূষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সরকার তথা প্রশাসনের আরও নানা ক্ষেত্রে আমরা বিএনপির সরকারের সমালোচিত পদক্ষেপগুলো বর্তমান সরকারের আমলেও দেখতে পাচ্ছি। অনেকে মনে করেন, বিএনপি খুব খারাপ দল আর আওয়ামী লীগ ভালো। তারা সরকারের কার্যক্রমে এসব অভিন্ন উপাদান দেখতে পায় না। আসলে সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বড় দুটি দল একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। রাজনীতিসচেতন মহল যত শিগগির এটা উপলব্ধি করতে পারবে, ততই দেশের মঙ্গল। সরকারি প্রশাসন পরিচালনায় নীতি-নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সুশাসন সোনার হরিণ হয়েই থাকবে।
নতুন ১০টি টিভি চ্যানেলের অনুমোদনে সরকারের একচোখা নীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালিত টেলিভিশন ও বেতারের স্বায়ত্তশাসন প্রদানে নীরবতা অবলম্বন সরকারের ‘দলকানা’ মিডিয়া-নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। অনেকে আওয়ামী লীগ সরকারের এই আচরণে অবাক হলেও আমি হইনি। কারণ, আমার কাছে বড় দুটি দল হলো দূষিত রাজনীতির প্রতিনিধি। তাই সরকার পরিচালনায় উনিশ-বিশ তারতম্য ঘটলেও মূল নীতিমালা মোটামুটি একই। সেই নীতিমালা কী? ‘নির্বাচনে জিততে পারলে সবকিছু আমার দখলে থাকবে।’ নতুন টিভি চ্যানেল অনুমোদনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, কয়েকটি লাইসেন্স পাওয়া টিভি চ্যানেলের উদ্যোক্তা এখন টাকা লগ্নিকারী খুঁজছেন। কী আশ্চর্য ব্যাপার! আমরা তো জানি, এসব লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতাও একটা প্রধান বিবেচনার বিষয় হয়ে থাকে। তাহলে তাঁদের ক্ষেত্রে কি তা দেখা হয়নি? শুধু দলীয় চেহারা দেখেই তাঁদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে? যদি তা হয়ে থাকে, তাহলে আরও একটা অন্যায় হয়েছে। অবশ্য সংবাদপত্রের প্রতিবেদন যে সত্য, তা হলফ করে বলা শক্ত। আজকাল বহু মিথ্যা, ভুল বা আধাসত্য প্রতিবেদন সংবাদপত্রে ছাপা হয়ে থাকে। যা-ই হোক, আশা করি যাঁরা টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স পেয়েছেন, তাঁরা নিজের টাকায় হোক বা অন্যের টাকায় হোক, শিগগিরই তাঁদের চ্যানেল চালু করতে পারবেন।
নতুন টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রসঙ্গে আরেকটু আলোচনা করতে চাই। প্রথমত. দলীয় বিবেচনায় নয়, যোগ্যতার কারণেই টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়া উচিত। এটা নিয়ে কারও দ্বিমতের অবকাশ নেই। এর সঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয় সরকার বিবেচনা করতে পারে। যেমন: ১. সরকার কি কয়েক বছর অন্তর নতুন আবেদনকারীকে টিভি লাইসেন্স দিয়েই যাবে? অন্তত নতুন সরকার এলেই কি একপ্রস্থ টিভি লাইসেন্স দিতে হবে? এটা কি সংবিধানের নির্দেশনা? আমাদের বিজ্ঞাপন বাজার, সামাজিক চাহিদা ইত্যাদি কিছুই কি সরকারের বিবেচনায় আসতে পারে না? মুক্তবাজার অর্থনীতির তাগিদে কি সরকার সবকিছু অবাধে অনুমোদন দিতে পারে?
২. এ ক্ষেত্রে সামাজিক চাহিদা কি সরকারের অগ্রাধিকার হতে পারে না? শিক্ষা চ্যানেল, উন্নয়ন চ্যানেল, স্বাস্থ্য চ্যানেল, ক্রীড়া চ্যানেল, শিশুতোষ চ্যানেল ইত্যাদি চালু হলে সমাজে এক বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে। এ ধরনের চ্যানেল যাঁরা চালু করতে চাইবেন, তাঁদের নানা রকম সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া যায়। যেমন: যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর মুক্তি, প্রথম পাঁচ বছর আয়কর থেকে মুক্তি, বিদেশি অনুদান নেওয়ার সুযোগ ইত্যাদি।
সম্প্রতি লাইসেন্স পাওয়া ব্যক্তিরা যদি সরকারের কাছে আবেদন করে জানান যে তাঁরা বিনোদননির্ভর চ্যানেল না করে ‘বিশেষ চ্যানেল’ করবেন। আমার প্রস্তাব: সরকার যেন তাঁদের নানা আর্থিক প্রণোদনা দেয়। বাংলাদেশে বিনোদন চ্যানেলের আর চাহিদা আছে বলে মনে হয় না। একটা সফল বিনোদন চ্যানেল পরিচালনায় যত প্রতিভাবান ও কুশলী ব্যক্তির প্রয়োজন, বাংলাদেশ এখনো তা সৃষ্টি করতে পারেনি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে (খবর, টক শো) টিভি চ্যানেল পরিচালনার অভিপ্রায় থাকলে সেটা অবশ্য ভিন্ন কথা। তাঁদের টাকার বা লোকের অভাব কোনো দিনই হবে না। আর অনুষ্ঠানে মানের তোয়াক্কা না করলে তো কথাই নেই। তাঁকে আর পায় কে! বর্তমানে চালু কয়েকটি টিভি চ্যানেল সে রকম কোনো কিছু তোয়াক্কা না করেই চলছে। তাঁরা যা দেখাচ্ছেন, সেটাই নাকি সেরা!! এ রকম আত্মতৃপ্তিতে নিমজ্জিত থাকতে পারলে অনেক সুখ! অনুষ্ঠানের মান বৃদ্ধির দুশ্চিন্তা বহন করতে হয় না।
৩. নতুন টিভি লাইসেন্স যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা যদি ‘ফিফটি-ফিফটি’ নীতিতেও আসেন, তাহলেও সরকার তাঁদের সীমিত প্রণোদনা দিতে পারে। যেমন, তাঁরা যদি অঙ্গীকার করেন যে বেলা দুইটা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সময়ের ৫০ ভাগ সময় আমরা টার্গেট দর্শকের জন্য বিশেষ ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করব, তাহলে তাঁদেরও পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিংয়ের সীমিত সরকারি সহায়তা দেওয়া যায়। এমনকি সরকারের বিভিন্ন বিভাগ উপযুক্ত টিভি অনুষ্ঠান তৈরি করেও প্রচারের জন্য দিতে পারে।
প্রথমত. এটা একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত। সরকারকে আগে এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারপর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে এর বিস্তারিত নীতি প্রণয়ন করতে হবে। এই ‘ফিফটি-ফিফটি’ নীতি এ জন্য প্রয়োজন যে আমাদের দেশে শতভাগ ‘শিক্ষা’ বা ‘উন্নয়ন’ চ্যানেল করলে তা প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞাপন বা স্পন্সর পাবে বলে মনে হয় না। বিজ্ঞাপনদাতাদের সেই উদারতা এখনো সৃষ্টি হয়নি। কাজেই টিভি চ্যানেলকে তথাকথিত বিনোদন অনুষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতেই হবে। সেটা যেন প্রাইম টাইমের শুধু ৫০ ভাগ হয়, সেটাই এখন দেখা দরকার। এখানে আমি ‘প্রাইম টাইমের’ ওপর জোর দিচ্ছি। কারণ, রাত ১২টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত যত উন্নয়নের অনুষ্ঠানই দেখানো হোক, টার্গেট দর্শকের তা কোনো কাজে আসবে না। কাজেই প্রচারের সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের কোনো নীতি বা ব্যবস্থাপনায় না গেলে আমরা পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিংয়ের স্বাদ পাব বলে মনে হয় না। প্রাইভেট টিভি-মালিকের পক্ষে একটি সম্পূর্ণ অবিনোদন চ্যানেল পরিচালনা করা সংগত কারণেই সম্ভব হবে না। অথচ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের জন্য দরকার নানা রকম পাবলিক সার্ভিস টিভি চ্যানেল। বিনোদন ও পাবলিক সার্ভিসের মধ্যে একটা সমন্বয় ঘটানো ছাড়া এর কোনো সমাধান দেখি না। এবং এ ধরনের সমন্বয় ঘটাতে হলে সরকারকে নানা রকম আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে। এ ছাড়া এ রকম মিশ্র টিভি চ্যানেলের কথা ভাবাও যাবে না। বেসরকারি খাতে প্রায় সবাই প্রধানত মুনাফা ও অংশত রাজনৈতিক, সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য টিভি চ্যানেল দিয়েছেন। টিভি চ্যানেল পরিচালনা একটি ব্যয়বহুল ব্যবসা। একমাত্র সস্তা বিনোদন অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই সেই ব্যয় তুলে আনা সম্ভব। সরকার যদি আর্থিক প্রণোদনা না দেয়, তাহলে কারও পক্ষেই পরিকল্পিতভাবে ও প্রতিদিন বড় একটা সময় জুড়ে পাবলিক সার্ভিসের টিভি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা সম্ভব হবে না।
আরেকটা উপায় ছিল ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’ (বিটিভি)। বিটিভির একটা দ্বিতীয় চ্যানেল দর্শকের এই অভাব কিছুটা দূর করতে পারত। কিন্তু শুধু একটা চ্যানেল হলে একচেটিয়াত্বের আশঙ্কা থাকে। তদুপরি বিটিভি টেরিস্ট্রিয়াল হিসেবেও একচেটিয়াত্ব ভোগ করছে। সেটাও সরকারের পক্ষে খুব অনৈতিক কাজ হচ্ছে। বর্তমানে বিটিভি যেভাবে তথ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি দলের প্রভাবে পরিচালিত হয়, তাতে একই পদ্ধতিতে দ্বিতীয় চ্যানেল চালু না হলেই ভালো। (ভিক্ষা চাই না কুত্তা সামলান!) তবে বিটিভি যদি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হতো, বিশেষজ্ঞ বোর্ডের কাছে তার জবাবদিহি থাকত, বোর্ড স্বাধীনভাবে বিটিভির আয়-ব্যয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারত, তাহলে বিটিভির পক্ষে অনেক কিছু করা সম্ভব হতো। আমার এখন আর মনে হয় না, বড় দুই দলের শাসনকালে বিটিভির চরিত্রে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব। ঢাকার দলকানা সাংস্কৃতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীরাও বিটিভির এই পরিণতি নীরবে মেনে নিয়েছেন। এখন আর এ ব্যাপারে তাঁদের কোনো কণ্ঠ শোনা যায় না। দূষিত রাজনীতির এটাও একটা লক্ষণ। সংস্কৃতি, শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তি মহলে স্বাধীন কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়। ক্রমে ক্রমে অনেককেই নতজানু হতে হয় ক্ষমতার কাছে। কাজেই বিটিভির ওপর ভরসা করার কোনো সুযোগ আর নেই। এখন নতুন টিভি চ্যানেলগুলো নিয়েই ভাবার কিছু সুযোগ রয়েছে; যদি সরকার পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিংয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

জলবায়ু পরিবর্তন -ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বে আরও বন্ধু চাই by হানিফ মাহমুদ

তথ্যপ্রযুক্তির পবিত্র স্থান বলে ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের সিলিকন ভ্যালিকে। বছরের একটি রাত এই স্থানের সেরা রাত। সেরাতে দেওয়া হয় বিশ্বমানবতা পুরস্কার ও তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবনে যাঁরা বিশেষ অবদান রেখেছেন, তাঁদের বিশেষ সম্মাননা। সিলিকন ভ্যালির টেক জাদুঘরের ‘ম্যাকহেনরি কনভেনশন’ সেন্টারে এ অনুষ্ঠানে সমাবেশ ঘটে বিশ্বের ধনী ও মেধাবী লোকদের। গত ১৯ নভেম্বর হয়ে গেল এ বছরের অপেক্ষার সেই দিনটি। সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও নোবেলজয়ী আল গোরকে দেওয়া হলো ‘বিশ্বমানবতা পুরস্কার, ২০০৯’। ধরিত্রীকে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে বাঁচাতে তিনি যে নিরলসভাবে এক দশক ধরে কাজ করছেন, তার স্বীকৃতিস্বরূপ দেওয়া হলো এই পুরস্কার।
বিশ্বের সব ধনী ও মেধাবী লোকের এ সমাবেশে বক্তৃতায় আল গোর শুরু করলেন দক্ষিণ এশিয়ার একটি নিম্ন আয়ের দেশ বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিপদের কথা দিয়ে। জানালেন, সমুদ্রের পানির উচ্চতা একটু বাড়লেই বাংলাদেশ কীভাবে তলিয়ে যাবে। ইতিমধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার জন্য জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা—দুটোরই প্রভাব বেড়েছে। জলোচ্ছ্বাস আরও শক্তি নিয়ে আঘাত হানছে। বড় বন্যা আরও কম বিরতি দিয়ে আসছে। নদীর পলি দিয়ে তৈরি এ ব-দ্বীপের মানুষের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আগে ২০ বছর পর পর জীবন-জীবিকা গোছাতে হতো। আর এখন চার-পাঁচ বছর পরপরই তেমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তারা। তৈরি হচ্ছে লাখ লাখ বাস্তুহারা মানুষ।
বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম এই মানুষটির সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কোনো যোগাযোগ আছে এমন তথ্য কখনোই পাওয়া যায়নি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি যে সোচ্চার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, তার জোরালো দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে আসছে বাংলাদেশের নাম।
এর দুই মাস আগে ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ওয়াশিংটনে মিলিত হন। সেখানে নানা বিষয় নিয়ে উভয়ের মধ্যে কথা হয়। তাঁদের বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনের একটি হুবহু অনুলিপি প্রকাশ করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, যা বর্তমানে বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটেও পাওয়া যায়। হিলারি ক্লিনটন তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি, নারীর ক্ষমতায়ন, ক্ষুদ্রঋণ—এসব বিষয়ে প্রশংসা করেন। তবে বাংলাদেশ যে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে আছে, সে বিষয়ে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছুই বলেননি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বলেছেন তাঁর বক্তব্যের শেষ অংশে। তাঁর বক্তব্যের বেশির ভাগ অংশজুড়েই ছিল বর্তমান সরকারের ভিশন-২০২১ এবং বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্রের আরও অধিক সহায়তা কামনা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথি থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে দুই দেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ যে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে আছে, তা তেমন একটা আলোচিত হয়নি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ফলাফল মোকাবিলায় ক্ষতিপূরণ আদায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোরালো সমর্থন দরকার। প্রয়োজন আল গোর ও ক্লিনটন পরিবারের শতভাগ সমর্থন। তাঁরা বাংলাদেশের মানুষের বার্তাবাহক হয়ে উঠতে পারেন।
বাংলাদেশের মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু এসব গুণী লোকের সঙ্গে সরকারের কাজকর্মের সেতুবন্ধে বেশ কিছু দুর্বলতা ইতিমধ্যে দৃশ্যমান।
পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ফরেন পলিসির ২০০৯ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ১০০ চিন্তাবিদের একটি তালিকা করেছে। এই তালিকায় আছেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে (আইন সভায়) আইন পাস করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য স্বর্ণপদক দেওয়া হচ্ছে তাঁকে। গত এপ্রিলে মার্কিন সিনেটর রিচার্ড ডারবিন বিশ্ব-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এক বীরসেনা হিসেবে বাংলাদেশের কৃতী সন্তান মুহাম্মদ ইউনূসকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মার্কিন সিনেটে বিল উত্থাপন করেন। তিনি তাঁর প্রস্তাবের পক্ষে পেয়ে যান ৭০ জন পৃষ্ঠপোষক সিনেটর। গত ১৩ অক্টোবর প্রস্তাবটি সিনেটে কোনো রকম বিরোধিতা ছাড়াই পাস হয়েছে। এখন হাউসে অনুমোদনের পর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন, যা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কোনো বাঙালির এমন সম্মান এই প্রথম এবং বিরল।
অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ আদায়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দূতকে অনেকটা দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অতিপরিচিত এই মানুষটির ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও নিয়মিত যোগাযোগ আছে আল গোর, ক্লিনটন পরিবার, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, স্পেনের রানি সোফিয়া ও ব্রিটেনের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে। ক্ষুদ্রঋণসহ গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে সমাজের নানা অংশে ভিন্নমত বা নেতিবাচক ধারণা থাকতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ রকম গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি বাংলাদেশে আর দ্বিতীয়টি নেই। সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর শক্তি যোগ হলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও সরবভাবে টের পাওয়া যেত।
গত মে মাসে বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশন ও জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপি জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে একটি যৌথ সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাত কোটি লোক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আক্রান্ত হবে। সাড়ে তিন কোটি মানুষ হবে উদ্বাস্তু। জলবায়ুতে উষ্ণতার কারণে যদি সমুদ্রের উচ্চতা ৪৫ সেন্টিমিটার বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যাবে। বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাসে যদি শস্যের ৫০ ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে একই পরিমাণে দরিদ্রের হার বাড়বে। এমনকি বাংলাদেশ তার মোট দেশজ উত্পাদনের ১২ শতাংশ হারাতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশ কোপেনহেগেন সম্মেলনে এক হাজার কোটি ডলার বা ৬৯ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। বাংলাদেশের যুক্তি হলো, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্র দশমিক ২ ভাগ বাংলাদেশ করে থাকে। অথচ কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ুর যে পরিবর্তন, তার অন্যতম ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। উন্নত দেশগুলো বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী, আর বাংলাদেশ দায়ী না হয়েও এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে।
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুরু থেকেই এ ব্যাপারে সোচ্চার। প্রধানমন্ত্রী নিজে সার্বক্ষণিক বিষয়টি তদারক করছেন। কোপেনহেগেন সম্মেলনে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার ব্যাপারে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার জোরালো দাবিও তৈরি করা হয়েছে। তবে সরকারের এসব উদ্যোগ এখনো বিশ্ব নাগরিক সমাজে জোরালো আবেদন তৈরি করতে পারেনি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে কোপেনহেগেন সম্মেলনকে কেন্দ্র করে রীতিমতো হইচই শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো তেমনভাবে আলোচিত হচ্ছে না। অথচ একটু সক্রিয় হলেই শেখ হাসিনার তত্পরতা বিবিসি, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট-এ আলোচিত হতে পারত। হয়তো তিনি বিশ্বের সব জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ল্যারি কিং লাইভ, বিবিসির হার্ড টক বা অপরাহ্ উইনফ্রে শোতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ববাসীর সঙ্গে সেতু তৈরি করতে পারতেন। পরিণত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তথ্য যে শক্তি এবং তার বড় আকারে প্রচারণা যে বিশ্ব-জনমতের গতিপথ পাল্টে দেয়, তা আর নতুন করে বলার নেই।
সরকার চাইলেই ১০ কোটি ডলারের একটি তহবিল তৈরি করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য দুই বছর মেয়াদি একটি কর্মকৌশল তৈরি করতে পারত। একই সঙ্গে আল গোর, ক্লিনটন পরিবার ও মুহাম্মদ ইউনূসের মতো মিত্রশক্তিকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগিয়ে কোপেনহেগেন সম্মেলনের আগেই জোরালো কূটনৈতিক তত্পরতা দেখাতে পারত।
এতে হাজার কোটি ডলার নয়, জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী এক দশকে আরও বেশি সহায়তা পাওয়া যেত।
হানিফ মাহমুদ: সাংবাদিক।

মুসলিম ঐতিহ্যময় হিজরি সাল by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ইসলামের ইতিহাসে চান্দ্রবর্ষের আরবি সাল গণনার সূচনা হয়। হিজরি নববর্ষ পৃথিবীর ১৫০ কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আবেগ-অনুভূতি ও ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান, সর্বোপরি ইবাদত-বন্দেগির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। হিজরি সাল ইসলামের একটি মৌলিক ও গৌরবোজ্জ্বল দিক এবং মুসলমানদের অশেষ ঐতিহ্যের অবদানে অতি পবিত্র, মহিমান্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়ায় বিশ্বের সর্বত্র সমানভাবে সমাদৃত। কালের আবর্তনে ঘটমান সব ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে আল্লাহ তাআলা মানুষকে উপদেশ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে সেসব দিবসের কথা বলা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন সমপ্রদায়, জাতি-গোষ্ঠীর জয়-পরাজয় ও উত্থান-পতনের বহুবিধ ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা মানবজাতির জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। এ সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তাদেরকে আল্লাহর দিবসগুলোর দ্বারা উপদেশ দাও। নিশ্চয়ই এতে চরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য শিক্ষা রয়েছে।’ (সুরা ইবরাহীম, আয়াত-৫)
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাহাবায়ে কিরামের পরামর্শক্রমে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে হিজরি সালের প্রথম প্রচলন শুরু হয়। এর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কার্যাবলিসহ যাবতীয় চিঠি ও কাগজপত্রে নির্দিষ্ট কোনো সাল-তারিখ ব্যবহূত হয়নি। এ সময় ইসলামি সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটতে থাকলে এর প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হতে লাগল। বিভিন্ন দিক থেকে এ ব্যাপারে মতামত ও পরামর্শ আসতে থাকল। বর্ণিত আছে যে ইরাকের কুফা নগরের গভর্নর হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) একদা খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে প্রেরিত পত্রে লিখে পাঠালেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার পক্ষ থেকে বিভিন্ন নির্দেশসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনেক চিঠিপত্র আমাদের কাছে আসে। এতে অনেক জরুরি বিষয় থাকে। কিন্তু সেই চিঠিগুলোতে কোনো সাল, তারিখের উল্লেখ থাকে না। ফলে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আইনকানুন প্রয়োগে অনেক সময় সমস্যা সৃষ্টি হয়। আমরা বুঝতে পারি না যে পত্রটি কখন লেখা, কখন পাঠানো হলো, আমাদের কাছে পৌঁছাতে কত দিন লাগল? পত্রে বর্ণিত রাষ্ট্রীয় ফরমানটি কোন্ দিন থেকে কার্যকর হবে? কাজেই পত্রে কোনো তারিখ উল্লেখ থাকলে ভালো হয়।’
দূরদর্শী খলিফা হজরত ওমর (রা.) পত্রটি হাতে পেয়ে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করলেন এবং এর প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুধাবন করলেন। তিনি কালবিলম্ব না করে হজরত ওসমান (রা.) এবং হজরত আলী (রা.)সহ শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কিরামদের নিয়ে একটি পরামর্শসভার আহ্বান করলেন। আলোচ্য বিষয় ‘গণনা ও তারিখ’ কখন থেকে শুরু করা হবে। বিষয়ের গুরুত্ব ও তাত্পর্য তুলে ধরে সবার মতামত জানতে চাইলেন। সবাই খোলামনে নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করলেন। বিশিষ্ট সাহাবিদের কেউ কেউ বললেন, রাসুলে করিম (সা.)-এর জন্মতারিখ থেকে সূচনা ধরে সাল-তারিখ নির্ধারণ করা হোক। কেউ বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল থেকে শুরু ধরা হোক। কেউ বললেন, নবুওয়্যাত প্রাপ্তির সময় থেকে আরম্ভ হোক। সবাই নিজ নিজ বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরলেন। প্রাচীনকাল থেকে আরব দেশে চাঁদের হিসাবে আরবি মাসের প্রচলন থাকলেও তখন হিজরি সালের প্রবর্তন হয়নি। তত্কালীন আরবে সর্বশেষ সংঘটিত উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা থেকে তারা দিন-রাতের হিসাব করত। ইসলামের আবির্ভাবের আগে তাদের হিসাবের সূচনা ছিল ‘আমুল ফিল’-এর ঘটনা স্মরণে হস্তী বর্ষের প্রচলন। তাই সাহাবায়ে কিরাম ঐতিহাসিক বড় ঘটনাকে সূচনা ধরে অভিমত ব্যক্ত করলেন।
হজরত ওমর (রা.) সুদীর্ঘ পর্যালোচনার পর সবার কথা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে শুনে একটি সংক্ষিপ্ত নীতিনির্ধারণী ভাষণ দিলেন। বক্তব্যে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মকাল থেকে ধরলে খ্রিষ্টানদের সাদৃশ্য হয়ে যায়, কারণ তারা হজরত ঈসা (আ.)-এর জন্মতারিখ থেকে তাদের তারিখ গণনা করে; নবীজির ইন্তেকাল থেকে ধরলে বিচ্ছেদের শোককে স্থায়ীভাবে ধারণ হয়ে যায়, কেননা তাঁর জীবনাবসান মুমিনের কাছে একটি দুঃখের সংবাদ; আবার নবুওয়্যাত প্রাপ্তি থেকে ধরলে বিষয়টি শুধুু আধ্যাত্মিক হয়ে যায় প্রভৃতি যুক্তি উপস্থাপন করে হিজরত থেকে চান্দ্রবর্ষের সূচনা ধরার নতুন প্রস্তাব পেশ করলেন। কেননা হিজরতের মাধ্যমে ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের মধ্য দিয়ে এক নতুন বিজয়ের সূচনা হয়েছিল। বিজ্ঞ খলিফার এই নব চিন্তাধারার পাণ্ডিত্যময় ও যুক্তিপূর্ণ ভাষণ উপস্থিত সবার মনঃপূত হলো। সবাই একবাক্যে তাঁর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাকে বিনাবাক্যব্যয়ে সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন করলেন।
এমনিভাবে সূচনা হলো নতুন আরবি তারিখ হিজরি নববর্ষ। যদিও মহানবী (সা.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, যেহেতু তাঁর প্রস্তুতি এবং আকাবার শেষ বায়আতের পর তিনি হিজরতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রথম যে চাঁদটি উদিত হয়েছিল তা ছিল মহররম মাসের। অন্য সাহাবিদের হিজরত মহররম থেকে শুরু হয়েছিল তাই হিজরি সালের প্রথম মাস মহররম থেকে ধরা হলো। ইসলামে কোনো দিবস বা রজনীকে বাহ্যিক আয়োজনে উদ্যাপন করার বিধান নেই যেমন সত্য, তেমনি ইসলামের বিধান বা ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্বহীন বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। ইবাদতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় আরবি তারিখ ও সালের হিসাব স্মরণ রাখা উচিত। কালের বিবর্তনে সময়ের এ যোগ-বিয়োগ, পালাবদল চিরন্তন, শাশ্বত, চির বাস্তব। সুতরাং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতিটি ঐতিহাসিক দিন-রাত্রি, মাস ও বছর মুসলমানদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আর মানুষের মধ্যে এ দিনগুলোর পর্যায়ক্রমে আমি আবর্তন ঘটাই।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত-১৪০)
যদিও হিজরতের সময়কাল থেকে হিজরি সাল বা চান্দ্রবর্ষ গণনা আরম্ভ হয়, কিন্তু এ পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে চান্দ্রমাসের গণনা শুরু হয়েছে। আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই সৃষ্টিকর্তার বিধানে মাসের সংখ্যা বারো (১২)। আবার দিবা-রাত্রি মিলে ২৪ ঘণ্টার এক দিনে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ আদায় করার হুকুম অনেক আয়াতের মাধ্যমেই বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে মাস গণনায় মাস ১২টি, তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত, এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার কোরো না।’ (সুরা আত তাওবা, আয়াত-৩৬)
সৃষ্টির আদিকাল থেকেই চান্দ্রমাসের হিসাব মহান আল্লাহর গণনায় রয়েছে। যুগ যুগ ধরে মানুষ চান্দ্রমাসের হিসাব করে চলেছে। প্রাচীনকাল থেকে পূর্ববর্তী সব নবীর শরিয়তে ১২ চান্দ্রমাসকে এক বছর গণনা করা হতো এবং তন্মধ্যে জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব—এ পবিত্র চারটি মাসকে বরকতময় ও সম্মানিত মনে করা হতো। এ মাসগুলোকে ‘আশ-শাহরুল হারাম’ বা অলঙ্ঘনীয় পবিত্র মাস বলা হতে। এই চার মাসে যেকোনো ইবাদতের সওয়াব অনেক বৃদ্ধি পায়। তেমনি এ সময়ে পাপাচার করলে তার পরিণাম এবং শাস্তিও কঠোরভাবে ভোগ করতে হয়। পূর্ববর্তী শরিয়তসমূহে এ মাসগুলোতে সব ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মারামারি ও খুনোখুনি নিষিদ্ধ ছিল।
বর্তমানে মুসলিম উম্মাহয় চাঁদের হিসাবে সারা বিশ্বে মহররমে আশুরা, সফরে আখেরি চাহার শোম্বা, রবিউল আউয়ালে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), রজবে শবে মিরাজ, শাবানে শবে বরাত, মাহে রমজানে মাসব্যাপী রোজা, জুমাতুল বিদা ও শবে কদর, শাওয়ালে ঈদুল ফিতর, জিলহজ মাসে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম হজ, ঈদুল আজহা ও কোরবানিসহ অনেক বিধিবদ্ধ ইবাদত-বন্দেগি ও ধর্মীয় অনুশাসন যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হওয়ায় হিজরি সালের গুরুত্ব প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানের অন্তস্থলজুড়ে সমানভাবে বিশেষ মর্যাদায় সমাসীন রয়েছে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়

ক্ষতিপূরণ আদায়ে নিরবচ্ছিন্ন উদ্যোগ জরুরি -জলবায়ু সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে যেসব কথা বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তরফ থেকে সেগুলো যথার্থ। শিল্পোন্নত দেশগুলোর কৃতকর্মের ফলে আমাদের নানা অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘন ঘন বিপর্যস্ত হওয়া, এমনকি বিরাট অংশজুড়ে সাগরে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার প্রতিকার আমরা তো বিশ্বসমাজের কাছেই চাইব।
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এর প্রতিবেশগত নেতিবাচক কিছু ফলাফলের কথা তুলে ধরেছেন। বিশেষত মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকা হারানোর ফলে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, শহরাঞ্চলে জনগোষ্ঠীর ঘনীভবন, এ থেকে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি এবং সবকিছু মিলিয়ে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে এগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, উন্নয়ন তহবিল থেকে অর্থ চলে যাচ্ছে এদের পুনর্বাসনের খাতে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ৪০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ১৮ শতাংশ সাগরে তলিয়ে যাবে, দুই কোটি মানুষ হয়ে পড়বে জলবায়ু উদ্বাস্তু, জীবিকা হারাবে চার কোটি মানুষ। সুতরাং ‘জলবায়ু ক্ষতিপূরণমূলক আর্থিক সহায়তা আমাদের দিতে হবে’—এমন দাবি উত্থাপন করার উত্কৃষ্ট স্থান জলবায়ু সম্মেলনই বটে। প্রধানমন্ত্রী সেখানে তাঁর ভাষণে শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতি তাদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির দেড় শতাংশ অভিযোজন তহবিলে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে (মোস্ট ভালনারেবল কান্ট্রিজ—এমভিসি) এমন দেশগুলোর জন্য একটি তহবিল গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ এমন দেশগুলোর তালিকায় থাকবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকটি ছিল দ্বিপক্ষীয়; এবং বহুপক্ষীয় সম্মেলনের সমান্তরালে এ রকম দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও বোঝাপড়াকেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। জাতিসংঘের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহল তো বটেই, যুক্তরাজ্যের মতো দেশও আলাদাভাবে আমাদের জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে নানাভাবে সহযোগিতা দিতে পারে। এমন দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে যেসব তহবিলের প্রস্তাব উঠছে, ভবিষ্যতে যেসব তহবিল গঠিত হবে, সেগুলো ভুক্তভোগী দেশগুলোর মধ্যে বণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক শিকার হওয়ার বিষয়টিই বিবেচ্য নয়; মনে রাখা দরকার আমাদের জনসংখ্যার বিষয়টিও। আসলে তহবিল বণ্টনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার অনুপাতই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য। কারণ, ক্ষতির শিকার হচ্ছে মূলত মানুষ।
মূলত শিল্পোন্নত এবং সাম্প্রতিককালে বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির দেশগুলোর গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে পৃথিবী নামের গ্রহটি যে পরিবেশগত হুমকির মুখে পড়েছে, তার বড় ক্ষতির শিকার বাংলাদেশ—এটা যেমন সত্য, তেমনই আরও অনেক দেশ এবং জনগোষ্ঠী, চূড়ান্ত বিচারে গোটা মানবজাতিকেই এর নেতিবাচক প্রভাবের ফলে ভুগতে হবে। তাই বাংলাদেশের তরফে ন্যায্য ক্ষতিপূরণমূলক তহবিল আদায়ের বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে এনে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির হার কমানোর বৈশ্বিক আন্দোলনে আমাদের শরিক হওয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশের তরফে সেই দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর আছে। এটা অব্যাহত থাকলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

আবাসিক এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকবে কেন -যানজট নিরসন by এ এইচ এম জেহাদুল করিম

গত চার-পাঁচ বছরে আমাদের দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অতি দ্রুত বেড়েছে। উচ্চশিক্ষার এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু এবং শেষ হওয়ার সময় এক অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে এসব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান কম না হলেও দেশের ৫১টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪২টিই ঢাকায় অবস্থিত। এগুলোর বেশির ভাগই গড়ে উঠেছে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও উত্তরার আশপাশের বড় রাস্তা ও আবাসিক এলাকাগুলো ঘিরে। এসব এলাকায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে বাস্তব কারণ অবশ্য রয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি অনেক বেশি হওয়ায় ধনী পরিবারের সদস্যরাই সেখানে বেশি ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। তাই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা-প্রতিষ্ঠাতারা স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্যিক ও বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো বেছে নিয়েছে বলে আমাদের ধারণা।
কিন্তু প্রথম থেকেই এ ব্যাপারে লাগামহীন অনুমতি দেওয়ার বেলায় সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা করেনি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখন এসব একযোগে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সরকার আবাসিক এলাকা থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরিয়ে নেওয়ার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা ফলপ্রসূ হয়নি। কিন্তু আগের এই আদেশ নতুনভাবে কার্যকর করতে সচেষ্ট হওয়া উচিত বর্তমান সরকারের। বস্তুত অগণিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যত বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় বাড়ি ভাড়া করে চলার কথা নয়। কেননা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নিজস্ব ভবনে এবং নির্দিষ্ট জমির ওপরই তাদের বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার কথা। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কখনোই সেই আইন মেনে চলেনি।
তবে স্থান পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যই প্রযোজ্য হতে হবে; ছোট ছেলেমেয়েদের স্কুলের বিষয়ে এটি বাধ্যতামূলক না হলেই ভালো হয়। যানজট এড়াতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সবার জন্য প্রযোজ্য স্কুলবাস ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া যায়। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে নিজস্ব পরিবহন ব্যবহার করতে দিলে অহেতুক রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ে। অথচ একটি স্কুলবাসে একসঙ্গে ৫০ থেকে ৫২ জন শিক্ষার্থী স্কুলে যেতে পারে। শ্রেণী-মর্যাদার দিক থেকেও এটি প্রশংসনীয়, কেননা এতে ধনী-দরিদ্র সর্বস্তরের ছেলেমেয়ে একই পরিবহন ব্যবহার করে স্কুলে যাতায়াত করার কারণে নিজেদের মধ্যে শ্রেণীবৈষম্যের বোধ কমে এক ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করার জন্য ঢাকাকেই তীর্থস্থান হিসেবে গণ্য করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। শ্রীলঙ্কাতে ইউজিসির মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে আঞ্চলিক ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র ভর্তির অনুমোদন করা হয়। এতে ‘মেট্রোপলিটন ক্যাপিট্যাল সিটি’র ওপর অহেতুক জনচাপ ও পরিবেশগত সমস্যার সৃষ্টি হয় না। আমাদের দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতেও বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার অনুমোদন দেওয়া যায়। এবং এতে ঢাকার ব্যস্ততা কমবে, এটি একটি যানজটমুক্ত শহর হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ঢাকায় অবস্থিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ‘শিক্ষা অঞ্চল’ গড়ে তোলা যায় এবং সেই উদ্দেশ্যে কিছু কিছু এলাকাকে নির্দিষ্টও করে দেওয়া যায়। সম্ভবত ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি ও নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি অচিরেই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাস চালু করতে যাচ্ছে। অনুরূপভাবে, আরও দু-চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নবপরিকল্পিত পূর্বাচল প্রকল্প অঞ্চল নির্দিষ্ট করা যায়। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার ঢাকা শহরসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় কিছু জমি অধিগ্রহণ করে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্দিষ্ট করে দিতে পারে। সম্পূর্ণভাবে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে বিশ্ববিদ্যালয় করতে চাইলে, সেগুলোকে গাজীপুর বা দূরবর্তী কোনো স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়। পাশাপাশি এরই মধ্যে ঢাকার যানজট সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। ট্রাফিক পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য রাস্তাঘাটসম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট আইনের বাস্তবায়নসহ ‘প্ল্যানড্ ট্রাফিক রুলস’ প্রণয়ন করতে হবে। তাতে নগরবাসী ও ছাত্রছাত্রীদের দূর এলাকায় যাতায়াতসংক্রান্ত সময়ের দীর্ঘসূত্রতাও কমবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস সময়সূচি একই হওয়ার কারণেও ঢাকার রাস্তাঘাটগুলোতে বিশেষ বিশেষ সময়ে প্রচণ্ড যানজটের সৃষ্টি হয়। এই সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তনের জন্য এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিভিন্ন মাধ্যমে অনুরোধ করা হয়েছিল এবং তখনই স্কুল শুরুর সময় এগিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু হয়। অতি সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের এক সভায় এটি গৃহীত হয়। এ ছাড়া ২০০৮ সালের দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকায় অবস্থিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সকাল সাড়ে সাতটায় ক্লাস শুরুর আদেশ জারি করা হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা-কর্তৃপক্ষ অবশ্য তখন সেই সিদ্ধান্তে কিছুটা নমনীয় হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দু-একজন উপাচার্য তখন এই মর্মে প্রতিবাদ করেছেন যে তাঁদের ছেলেমেয়েরা এত ভোরে ক্লাস করায় অভ্যস্ত নয়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অতি প্রত্যুষে তাদের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ক্লাস শুরু করে। অনেক দেশের উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজন এখানে আছে বলে মনে করি না; তবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় মালয়েশিয়ায় আমি দেখেছি যে আমাদের ঘুম ভাঙার আগেই ভোর সাতটার মধ্যে স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের প্রস্তুত করে স্কুলবাসে উঠে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সকাল আটটায় ক্লাস শুরু হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নকালে প্রচণ্ড তুষারপাতের মধ্যেও আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের সকাল সাতটার মধ্যে স্কুলবাসে তুলে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে গিয়েছি। এমন প্রতিকূল ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও সেখানে অতি ভোরে শুরু হওয়া স্কুল-সময়সীমার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে দেখিনি, বরং ওই দেশের ছেলেমেয়েরা নির্দ্বিধায় সেই বরফস্নাত ভোরেই যথারীতি তাদের ক্লাসে উপস্থিত হয়ে যেত।
যা হোক, আমাদের দেশে আমরা অতি প্রত্যুষেই ঘুম থেকে উঠতে অভ্যস্ত। ঐতিহ্যিকভাবেই, আমরা গ্রামের মানুষ রাতে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি এবং অতি ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম শুরু করি। বলতে দ্বিধা নেই, এই বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাই মেনে চলছে পাশ্চাত্য জগত্ এবং পৃথিবীর অনেক দেশ। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকা এবং দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা আমাদের দেশে এক ধরনের ‘শহুরে ফ্যাশন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরাও আমাদের ছেলেমেয়েদের তথাকথিত এই শহুরে সিস্টেমের সঙ্গে চলতে অভ্যস্ত করে ফেলেছি। সেই কারণে শুধু ট্রাফিক-জ্যাম কমানোর জন্যই যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোতে সকালে ক্লাস শুরু করা প্রয়োজন, তা নয়; বরং আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে বংশপরম্পরায় পালিত অথচ যৌক্তিক এসব ‘প্রচলিত রীতির’ সঙ্গে মানিয়ে চলার শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োজন। তাই নির্দ্বিধায় বলা চলে, সকাল সাড়ে সাতটায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্লাস শুরু করার সরকারি সিদ্ধান্তটি সামগ্রিকভাবে এবং আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের দৈহিক ও নৈতিক শিক্ষার বিবেচনায় যথার্থ হয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু কিছু স্কুল ও কলেজ সরকারি আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর করেছে। অন্যদেরও উচিত সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করা।
এ এইচ এম জেহাদুল করিম: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং সাবেক উপাচার্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

নামকরণ ও নাম কর্তনের রাজনীতি -দলীয়করণ by সোহরাব হাসান

নামে কী-ই বা এসে যায়? তার পরও পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান সরকারও নামবদলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় এসেছিল দিনবদলের স্লোগান দিয়ে। সরকারের মেয়াদ এক বছর পার হতে চললেও জনগণের ভাগ্য কিংবা দিনবদলের কোনো লক্ষণ নেই। গত এক বছরে বিদ্যুত্ উত্পাদন তেমন বাড়েনি, বিনিয়োগে মন্দাও কাটেনি। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় দলীয়করণের ভূত চেপে বসেছে। এসব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তবে গত এক বছরে সরকার দুটি কাজ বেশ নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। এক. ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়া, দুই. সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নামবদল। বিদ্যুত্সাশ্রয়ের কারণ দেখিয়ে গ্রীষ্মকালে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সবাই মেনে নিয়েছিল। কেউ আপত্তি করেনি। শীতকালে এসেও ঘড়ির কাঁটা একই স্থানে রাখার কোনো যুক্তি নেই। এতে স্কুলগামী শিশুদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, অফিসযাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে—এই সহজ সত্যটি সরকার স্বীকার করছে না। ভাবটা এমন, ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে আনলেই বিদ্যুত্-সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারকে জনগণের মনের কথাটি বুঝতে হয়। অতীতে কোনো সরকার বোঝেনি। এ সরকারও বুঝতে চাইছে না।
সরকারি প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার নামকরণের সঙ্গে আমজনতার তেমন সম্পর্ক নেই। তবে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় নেতাদের নাম যুক্ত হলে তারা খুশি হয়। নতুন প্রজন্মও ইতিহাস জানতে পারে। পৃথিবীর সব দেশেই বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম জাতীয় নেতাদের নামে রাখার চল আছে। সে বিবেচনায় দেশের স্টেডিয়াম ও বিমানবন্দরের নাম ইতিহাসে বরণীয় কোনো ব্যক্তির নামে রাখার মধ্যে আপত্তির কিছু দেখছি না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা সবকিছু নিজেদের নামে করে নিতে চায়; আর অন্য দলের নাম কর্তনে মরিয়া হয়ে ওঠে।
সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়, জোট সরকারের আমলে যেসব প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম বদল করা হয়েছিল, সেগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের যুক্তি হলো, জোট সরকার গায়ের জোরে নাম বদলে ফেলেছিল। জোট আমলে প্রতিষ্ঠিত স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের পছন্দসই নাম তারা দিতে পারত। দিয়েছেও। কিন্তু আগের সরকারের গড়া প্রতিষ্ঠানের নাম তারা পাল্টাবে কেন? কোন যুক্তিতে তারা ঢাকার বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার কিংবা চট্টগ্রামের এম এ হান্নান বিমানবন্দরের নাম পাল্টাল? অন্যের দেওয়া নাম বদল করার অধিকার তাদের নেই। সেই যুক্তিতে মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্তে কেউ আপত্তি করবেন না। কিন্তু বর্তমান সরকারও যদি একইভাবে নাম বদল করে, সেটি মেনে নেওয়া যায় না। ২৭ বছর ধরে যে বিমানবন্দরটি জিয়াউর রহমানের নামে পরিচিত হয়ে আসছে, এখন সেটি বদলানোর প্রয়োজন হলো কেন? সরকারি বার্তা সংস্থার খবর অনুযায়ী, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি হজরত শাহজালাল (র.)-এর নামে রাখার ব্যাপারে মন্ত্রিসভা মতৈক্যে পৌঁছেছে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে হবে বলে মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শেষোক্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। আপত্তি হলো জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জিয়ার নাম কর্তন করার সিদ্ধান্তে। জোট সরকার যখন চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে এম এ হান্নানের নাম বদলে হজরত শাহ আমানত (র.)-এর নাম যুক্ত করেছিল তখনো আমরা প্রতিবাদ করেছি। আওয়ামী লীগের ভাষায়, ‘বিএনপি সাম্প্রদায়িক দল এবং তারা মৌলপন্থীদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে।’ এখন দেখছি, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আওয়ামী লীগও একই কাজ করতে যাচ্ছে। তারাও বিমানবন্দরে জিয়ার নাম বদলে হজরত শাহজালাল (র.)-এর নাম বসাতে চাইছে। অর্থাত্ ‘সাম্প্রদায়িক’ বিএনপি ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আওয়ামী লীগ দলীয় স্বার্থে ধর্ম ও ধর্মীয় নেতার নাম ব্যবহার করছে।
এর মাধ্যমে সরকার বিএনপির হাতে একটি মোক্ষম ইস্যু এনে দিল। এ মুহূর্তে রাজপথ গরম করার মতো তেমন ইস্যু বিএনপির হাতে নেই। ভারতবিরোধী স্লোগান এখন আর জনগণ গ্রহণ করছে না।
যে সরকার নিজে কিছু করতে পারছে না, সেই সরকারই নামবদলের মাধ্যমে ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ী করতে চায়। আমরা মনে করি এটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যা চলে আসছে সেই পাকিস্তান আমল থেকে। ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও সড়কের নাম বদলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি শাসকেরা। স্বাধীনতার পর আমরা পাকিস্তান আমলের প্রায় সব নাম নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি। ইতিহাসে যাঁর যে ভূমিকা আছে, তাঁকে স্বীকার করা কিংবা স্মরণ করার মধ্যে অগৌরবের কিছু নেই। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের অন্যতম নায়ক সার্জেন্ট জহুরুল হকের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসের নাম রাখা হয়েছে। এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু সেটি উর্দু ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ইকবালের নাম বাদ দিয়ে কেন? সার্জেন্ট জহুরুল হকের নামে নতুন কোনো হল করাই শোভনীয় হতো।
সরকারি স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণের দলীয়করণ যেমন কাম্য নয়, তেমনি ইতিহাস নির্মাতাদেরও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার নিন্দনীয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো দলের নন, সমগ্র জাতির। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে তাঁর নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হবে, অন্য দল ক্ষমতায় এলে সে নাম মুছে ফেলা হবে—এই অপসংস্কৃতি থেকে দেশবাসী মুক্তি চায়।
ভারতে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে আদর্শ ও নীতির পার্থক্য অনেক। অটল বিহারি বাজপেয়িসহ বিজেপির অনেক নেতাই ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার কঠোর সমালোচক। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তাঁরা ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দর বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম মুছে ফেলেননি। কংগ্রেস রাজনীতির আরেক সমালোচক সিপিএমের প্রধান নেতা জ্যোতি বসু কলকাতার যে বাড়িতে থাকেন, তার নাম ‘ইন্দিরা ভবন’। এতে জ্যোতি বসু যদি আদর্শচ্যুত না হয়ে থাকেন, তাহলে আওয়ামী লীগের নেতারা জিয়ার নামকে এত ভয় পাচ্ছেন কেন?
সব ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর তুলনাও ঠিক নয়। জিয়ার নামে দেশের প্রধান বিমানবন্দরের নাম হলেই তিনি দেশের প্রধান নেতা হয়ে যাবেন না। গতবারও আওয়ামী লীগ সরকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামবদলের উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় যে কথাটি বলেছিলাম, এবারও তা সরকারের নীতিনির্ধারকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। দেশের একটি বিমানবন্দর জিয়ার নামে থাকলে ক্ষতি কী? বাংলাদেশ জুড়েই তো বঙ্গবন্ধুর নাম আছে। কারও নাম কেটে বঙ্গবন্ধু বা অন্য কারও নাম বসালেই তাঁর মাহাত্ম্য বাড়ে না, বরং ক্ষমতাসীনদের দীনতাই প্রকাশ পায়।
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে নামকরণের এই মহামারি ছিল না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু নিজের নামে বড় কোনো প্রতিষ্ঠান করেছেন, সে নজির নেই। বরং তিনি পূর্বসূরি শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নামে রাজধানীর উত্তরাংশের নাম রেখেছিলেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে ঢাকার সবচেয়ে বড় উদ্যান এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নামে সবচেয়ে বড় সড়কের নাম রেখেছিলেন। জিয়াউর রহমানও নামের কাঙাল ছিলেন বলে জানা নেই। উত্তরসূরিদের রাজনৈতিক দীনতা ও ব্যক্তিস্বার্থবাদিতা আড়াল করতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও জিয়ার নাম ধার করতে হচ্ছে।
নামবদল কিংবা কর্তনে কোনো দলই পিছিয়ে নেই। আওয়ামী লীগ আমলে যেসব প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের নেতাদের নামে করা হয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেসব নাম কর্তন করে। আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে বিএনপি নেতাদের নাম মুছে ফেলছে। নামবদলের মহড়ায় বাদ পড়েনি চীনের অর্থায়নে নির্মিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রও। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ সম্মেলন কেন্দ্রের কাজ শুরু হলেও শেষ হয় বিএনপির আমলে। আওয়ামী লীগ ঠিক করেছিল, এর নাম হবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র। বিএনপি এসে রাখে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের আগে বঙ্গবন্ধুর নাম জুড়ে দেয়। এর প্রয়োজন ছিল কি? যে দেশটি অর্থায়ন করেছে, সেই দেশটি নতুন নামকরণকেই বা কীভাবে নিয়েছে?
আমাদের জাতীয় ইতিহাসে নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রধান চরিত্র; কিন্তু একমাত্র চরিত্র নন। তাঁর সঙ্গে এবং সময়ে আরও জাতীয় যে নেতারা ছিলেন, সরকার তাঁদের নামে কেন কিছু করছে না? আমাদের ইতিহাস নির্মাণে মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদের অবদানও কম নয়। একটি সড়ক বা হকি স্টেডিয়ামের সঙ্গে তাঁদের নাম যুক্ত করাই কি যথেষ্ট?
সোহরাব হাসান: সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

বাংলাদেশকে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে- জলবায়ু রাজনীতি by আহমেদ স্বপন মাহমুদজ

জলবায়ু পরিবর্তন যেহেতু এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা, তা সমাধান বা মোকাবিলার জন্যও প্রয়োজন যথেষ্ট প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা। সদিচ্ছার অভাব ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞার অভাব লক্ষণীয়। এর পেছনে ধনী দেশগুলোর খামখেয়ালিপনা, বহুজাতিক কোম্পানির মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের লোভ আর মুক্তবাজার অর্থনীতি ও পুঁজিতান্ত্রিক উন্নয়নব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়। কলকারখানা, যানবাহনসহ সব ধরনের জ্বালানিনির্ভর যন্ত্র থেকে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্যাস নিঃসরিত হচ্ছে। এসব গ্যাস পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে বন উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে পরিবেশও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। কারখানাজাত কৃষি ও শিল্পায়ন থেকে নিঃসরিত মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণও বেড়ে গেছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য দায়ী। উত্তরের উন্নত দেশগুলো একসময় দক্ষিণের সম্পদ ও মানুষকে ব্যবহার করে ধনী হয়েছে। উন্নত দেশগুলোর এই শোষণ, সম্পদ লুণ্ঠন, জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মূল কারণ। কেননা গত দুই দশকে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, উত্পাদনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং উন্নত দেশগুলোর জনগণের জীবনযাত্রার মান এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গোটা দুনিয়ায় ভোগবাদের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে মানবজাতির বিরাট অংশ ক্ষুধা, দারিদ্র্য তথা মানবেতর জীবনযাপন করছে।
গত ৫০ বছরে তাপমাত্রা বেড়েছে দ্বিগুণ। আগামী দশকে এই তাপমাত্রা আরও বাড়বে। পৃথিবীর জলবায়ুতে ছয় লাখ ৫০ হাজার বছর আগে যে তাপমাত্রা ছিল, এখন তা অনেক গুণ বেশি। ১৯৯০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বের উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি পেয়েছে ৭০ ভাগ। জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি সমস্যা, যেখানে একজন ব্যক্তি বা একক রাষ্ট্রপ্রচেষ্টায় কিছু করা সম্ভব নয়। কাজেই দরিদ্র জনগোষ্ঠী যে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে, তা নিরসনে বৈশ্বিক পদক্ষেপ ও দায়দায়িত্ব নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০১২ সালের পরের অবস্থা আরও সংকটময় হয়ে উঠবে। উন্নত দেশগুলো জাতিসংঘের ইউএনএফসিসিসির সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমাতে ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে আগ্রহ কম দেখাচ্ছে। বরং উন্নত দেশগুলো একটি নতুন চুক্তি করতে চায়, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোও কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমাতে বাধ্য থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনে কার্বন বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সুবিধা মুনাফা তৈরি ও মূলত দরিদ্র্য দেশগুলোকে উন্নত দেশের ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে।
উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে ছোট দ্বীপদেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এসব জাতি-রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পৃথিবীর জনসংখ্যার বড় একটা অংশ প্রাকৃতিক সম্পদ, জলবায়ু এবং সর্বোপরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সনদ ‘কিয়োটো প্রটোকলে’ দরিদ্র ও ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর কথা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। এই সনদে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিকর প্রভাব, জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। এতে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব এবং সম্পদের ওপর মানুষের অধিকারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। বরং জ্বালানি সম্পদের বাজারজাতকরণ এবং সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা সৃষ্টির জন্য যারা দায়ী বা যাদের দায়দায়িত্ব রয়েছে, সে বিষয়টি অবহেলিত হয়েছে। কার্বন-বাণিজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোর আগ্রাসন বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে কার্বন নির্গমনের ক্ষেত্র প্রসারিত করা হয়েছে। উন্নত দেশগুলো সহযোগিতার নামে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাদের ব্যবসা প্রসারের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।
বিশ্বের প্রতি ৪৫ জনের মধ্যে একজন এবং বাংলাদেশের প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হবে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৫ শতাংশের বাস এখানে। আমাদের কার্বন নির্গমনের হার দশমিক ২, সেখানে ১৯৯০ থেকে ২০০৬ সালে শুধু আমেরিকার কার্বন নির্গমন বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭ ভাগ। কার্বন নির্গমনে আমাদের অবদান খুবই নগণ্য, অথচ আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। সমুদ্রের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। সবচেয়ে কম পরিমাণে কার্বন নির্গমনকারী, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উচিত সমঝোতার ক্ষেত্রে দৃঢ় ও শক্ত অবস্থানে থাকা। প্রয়োজন রাজনৈতিক দৃঢ়তা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও আলোচনার সামর্থ্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত সভায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণে নানা ধরনের বক্তব্য ও তহবিল গঠনের দাবি জানাচ্ছেন। এ পদক্ষেপ ইতিবাচক নিঃসন্দেহে, কিন্তু বৃহত্তর উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য ছাড়া লক্ষ্য অর্জন দুরূহ। আন্তর্জাতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে দরকষাকষির দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে অভ্যন্তরীণ মতৈক্যও দরকার। অনেক সময়, যেসব বিশেষজ্ঞজন বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁরা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন না নিজেদের মধ্যে। বরং নিজেদের মতানৈক্য দাবিদাওয়াকে দুর্বল করে দেয়। আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, যেসব দাবিদাওয়া তুলে ধরা হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, সেগুলো দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের জনগণের সঙ্গে সব সময় আলোচনা করা হয় না। উল্লেখ্য, জলবায়ু ইস্যুতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, এমনকি নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধ নেই। ফলে এমন জাতীয় একটি ইস্যুতে প্রয়োজন আরও বেশি মনোযোগ ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি।
বাংলাদেশকে অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন) ও কার্বন নিরসনের (মিটিগেশন) জন্য তহবিল গঠনের দাবির পাশাপাশি উন্নত দেশগুলো যাতে কার্বন নির্গমন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির নিচে রাখে, সে বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। কার্বন-বাণিজ্য ও প্রযুক্তি হস্তান্তর (টেকনোলজি ট্রান্সফার) উপযোগী প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থপ্রতিষ্ঠানগুলোর (বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্প ও ভূমিকার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
সম্প্রতি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের নিয়ে সমুদ্রের পাঁচ মিটার পানির নিচে উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের প্রতিবাদ হিসেবে বৈঠক করেছেন। ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় উত্তরের দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ১৭ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় এভারেস্টে নেপালের প্রায় ২৪ জন মন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। নেপালকন্যা হিমালয়ের বরফ আশঙ্কাজনক হারে গলছে। এর ফলে নেপালের জনগোষ্ঠী ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে পড়বে। এর প্রভাব কেবল নেপালে পড়বে তা নয়, এর ফলে এশিয়ার বড় একটা অংশ শুষ্ক হয়ে পড়বে। বলিভিয়াসহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ পরিষ্কার রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে নিজস্ব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশের কেবল দাবি উত্থাপন নয়, এমন কর্মসূচি গ্রহণ আবশ্যক, যা সারা দুনিয়ায় প্রভাব ফেলতে সক্ষম। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কৌশল অপরিহার্য।
বাংলাদেশের দাবির মুখে ‘মাল্টি ডোনার ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এর তদারকের জন্য বিশ্বব্যাংককে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেই কদু সেই লাউয়ের অবস্থা। বিশ্বব্যাংককে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী মনে করা হয় (ক্লাইমেট ক্রিমিনাল), অথচ তহবিল ব্যবস্থাপনা তার দায়িত্বে। কিন্তু ট্রাস্ট ফান্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাংলাদেশের নিজস্ব রীতিনীতি ও দেশীয় মালিকানাকে অবজ্ঞার শামিল। এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এ ধরনের তহবিল পরিচালনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা আরও জোরালো হওয়া অত্যন্ত জরুরি। না হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের নামে টাকা আসবে, টাকা ব্যয় হবে, কেউ কেউ আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে; কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যারা প্রকৃতপক্ষে ভুক্তভোগী, তাদের কোনো উপকারে আসবে না। সমতা ও ন্যায়বিচারের দাবিতে বিষয়টি সরকারি এমনকি বেসরকারি মনোযোগেরও দাবি রাখে।
আহমেদ স্বপন মাহমুদ: আহ্বায়ক, ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন অন ক্লাইমেট রিফিউজিস রাইটস।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি দ্বন্দ্ব নিরসনের পথ -প্রতিক্রিয়া by মতলুব আনাম

৫ ডিসেম্বর ২০০৯ প্রথম আলোয় এম এম আকাশের ‘আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি: দ্বন্দ্ব নিরসনের পথ কী?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। লেখক প্রথমে আধুনিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করে বলেছেন, উন্নত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে বর্তমানে একটি দ্বিদলীয় ব্যবস্থাই প্রধান ধরন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাঁর মতে, এসব রাষ্ট্রে দুটি দলই মৌলিক ধনতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারী হয়েও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে বিভক্ত। একটি দল নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় গেলে অন্য দলটি প্রধান বিরোধী দলের ভূূমিকায় থাকে। বাংলাদেশে প্রধান বিরোধী দল বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করে না। ক্ষমতায় যেতে না পারলে তারা কারণে-অকারণে ১৯৯১ সালে স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার পর থেকেই সংসদ বর্জন করে চলেছে। তারা নির্বাচিত সরকারকে টেনে-হিঁচড়ে ক্ষমতা থেকে নামাতে পাঁচ বছর ব্যস্ত থাকে। সরকারও বিরোধী দলের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করতেই পাঁচটি বছর ব্যয় করে। দেশে উন্নয়নের কাজ হয় না।
এম এম আকাশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায় হিসেবে দুটি সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এক. সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শক্তিগুলো থেকে মুক্ত হয়ে দেশে একটি ভদ্র দ্বিদলীয় বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। দুই. জামায়াত ও স্বৈরাচারের বিচ্ছিন্নতা এবং পরাজয়ের কারণে বিএনপির শক্তিহানি, ক্রমবিলুপ্তি ও খণ্ডায়ন। তাঁর মতে, তখন দেশে একমাত্র দক্ষিণপন্থী দল হবে আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেরই কোনো না কোনো দল। অসংখ্য পরস্পরবিরোধী শক্তির টালমাটাল ক্রিয়া-বিক্রিয়ার মাধ্যমে আবার বিশৃঙ্খলাও ফিরে আসতে পারে। বিশৃঙ্খলার কথাটা তাঁর সম্ভবত মনে হয়েছে এক-এগারোর পরবর্তী সার্বিক বিশৃঙ্খলা দেখে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্ব নিরসনের উপায় খোঁজার আগে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলো কেন, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া নাম করার মতো আর কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। যে কয়টা রাজনৈতিক দল ছিল, সেগুলো ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে ভোটে প্রায় নিঃশেষ হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সব ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। তারপর ১৯৭৫ সালে একমাত্র রাজনৈতিক জাতীয় দল, ‘বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ গঠিত হলো। রাজনীতি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জানানো হলো, রাজনীতি করতে হলে জাতীয় দলের সদস্য হতে হবে। বাকশালের গঠনতন্ত্রের ষষ্ঠ ধারার ১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘সদস্যপদ দানের ক্ষমতা জাতীয় দলের চেয়ারম্যানের উপর ন্যস্ত থাকিবে।’ জাতীয় দলের সদস্য হতে না পারলে চাকরি বা সংসদ সদস্যপদ থাকবে না।
এমন ঘোলাটে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একদল অসন্তুষ্ট সেনাসদস্য কর্তৃক বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। জাতীয় দল বিলীন হয়ে যায়। আওয়ামী লীগেরই নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর মন্ত্রিসভার সব সদস্যই বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি সংসদও ভাঙেননি। তিনি সম্ভবত সংসদকেই ক্ষমতার উত্স করতে চেয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর সাহায্যে ক্ষমতা দখল করলেও তিনি যতদিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, ততদিন চেষ্টা করেছেন, যাতে আওয়ামী লীগ তাঁকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ ক্ষণকালের জন্য ক্ষমতা দখল করে আওয়ামী-সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ ভেঙে দেন। ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তিনি যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন তাঁর কোনো রাজনৈতিক বেশ ছিল না। দেশব্যাপী ছিল বিশৃঙ্খলা। খন্দকার মোশতাকের সামরিক আইন জারি করার ফলে সব রাজনৈতিক দল বাতিল হয়ে যায়। তাই জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে দলবিধি অর্ডিন্যান্স জারি করে সরকারের কাছ থেকে দল গঠনের অনুমোদন নেওয়ার ঘোষণা দেন। জিয়া চেয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ তাঁকে দলে গ্রহণ করুক।
বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর স্বভাবতই আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের সংকট ছিল। সম্ভবত জিয়া নেতৃত্বের সেই শূন্যপদ লাভে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাঁকে দলে নেয়নি। অনেকেই মনে করেন, সে সময় আওয়ামী লীগ জিয়াকে গ্রহণ করলে বিএনপির জন্ম হতো না এবং পরবর্তী সময়ে দলটি আওয়ামী লীগবিরোধী বিরাট শক্তিতে পরিণত হতো না। আওয়ামী লীগে জায়গা না পেয়ে জিয়া প্রথমে বিচারপতি সাত্তারের মাধ্যমে জাগদল এবং পরে ১৯৭৮ সালের ৩১ আগস্ট নিজ নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। জেনারেল জিয়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব স্থায়ী করার জন্যই সম্ভবত শেখ হাসিনাকে ১৯৮১ সালে দেশে আসার অনুমতি দেন। তবে তাঁর সঙ্গে রাজনীতি করা তাঁর হয়ে ওঠেনি। শেখ হাসিনা দেশে এলেন, আর ওই মাসেই জেনারেল জিয়া চট্টগ্রামে ক্ষমতালোভী একদল সেনাসদস্য কর্তৃক নিহত হলেন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য এম এম আকাশের প্রথম উপায় হিসেবে উপস্থাপিত সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শক্তিমুক্ত একটি ভদ্র দ্বিদলীয় বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। মহাজোটে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উপস্থিতিই তার প্রমাণ। দ্বিতীয় উপায় তথা জামায়াত ও স্বৈরাচারের বিচ্ছিন্নতা ও পরাজয়ের কারণে বিএনপির শক্তিহানি ক্রমবিলুপ্তি ও খণ্ডায়ন—তার সম্ভাবনাও কম। বিএনপির সদ্যসমাপ্ত পঞ্চম কাউন্সিলে বিপুল জন-উপস্থিতিই এর প্রমাণ। বর্তমানের মহাজোটে স্বৈরাচার আরও বেশি করে ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার জন্য এখন হুমকিও দিচ্ছেন। সর্বশেষ হুমকি হচ্ছে, ক্ষমতা না পেলে আগামী জানুয়ারি থেকে ভিন্ন পথ ও মত অবলম্বন করার ঘোষণা। ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল জামায়াতে ইসলামী। এবারের নির্বাচনে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করেছিল। এ দেশে ভোটের রাজনীতি চলছে। জামায়াতের ভোটের জন্য বড় দুই দল সর্বদাই তাদের সমর্থন চায়। অপর দল যাতে জামায়াতের সমর্থন নিতে না পারে, সে জন্য আগেভাগেই জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করে। মন্ত্রিত্বও দেয়।
বর্তমানে জাতীয়তাবাদী শক্তি অনেক দলে-উপদলে বিভক্ত। এম এম আকাশের ধারণা মতো বিএনপির যদি ক্রমবিলুপ্তি ঘটে এবং সে জায়গা যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনো অপেক্ষাকৃত রেডিক্যাল রাজনৈতিক দল নেয়, তবে এর অর্থ হবে, আওয়ামী লীগে ভাঙন। সে সম্ভাবনা খুব কম। দুই দলের দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য হাসিনা-খালেদার সদিচ্ছাই যথেষ্ট। জনগণ জানে, বাংলাদেশের উন্নতি এই দুই দলের মধ্যে মিলনেই সম্ভব। দুই দলের সমঝোতাই স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছ থেকে মুক্তির উপায়।
মতলুব আনাম: রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড -দ্রুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সবারই কাম্য। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে একটি কার্যকর উপায় হিসেবে মনে করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার এই ব্যবস্থাটিকে বাঁচিয়ে রাখবে, তা কেউ আশা করেনি। এখন তাদের মনোভাব থেকে স্পষ্ট, তারা এ ব্যবস্থার অবসান ঘটানোকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে। তারা কেন নির্বাচনী ওয়াদা ভঙ্গ করল, সেই সমালোচনায় বিরোধী দলকে তেমন সোচ্চার দেখা যাচ্ছে না। সেদিক থেকে এই প্রশ্নে যেন একটি রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
এই পটভূমিতে হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ সম্প্রতি র্যাবের ওপর একটি রুল জারি করেন। মাদারীপুরে র্যাবের সঙ্গে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে দুই ভাই নিহত হলে আদালত সুয়োমটো রুল দেন। আদালত শুনানিকালে সংগতভাবেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য উল্লেখ করেন। বর্তমান সরকার এ ক্ষেত্রে যে ডিগবাজি দেখাল, তা ছিল খুবই দুর্ভাগ্যজনক ও অনভিপ্রেত। কিন্তু একই সঙ্গে এ ঘটনা সমস্যার গভীরতার দিকেই ইঙ্গিতবহ। আদালত যেমনটা মন্তব্য করেছেন—র্যাবের ভেতরের বিচ্ছিন্ন কতিপয় দুষ্ট লোকের (ব্ল্যাকশিপ) কাজ। তাদের শাস্তি দিলেই এর বিলোপ ঘটবে। আমরা অবশ্যই দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি চাই। প্রচলিত আইনে ব্যক্তিগত দায়দায়িত্ব অবশ্যই নির্ধারণ হওয়া আবশ্যক।
২০০৪ সালে র্যাব সৃষ্টির পর এ পর্যন্ত এক হাজার ৫৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। অধিকাংশ ঘটনা সম্পর্কে এই বাহিনীর ভাষ্য ছিল অভিন্ন। এটা অব্যাহতভাবে চলছে, যা চলতে পারে না। তবে বিষয়টি সম্ভবত এমনও নয়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো শুধুই ‘কতিপয় দুষ্টের’ কারসাজি। এটা স্পষ্টতই রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা ও সীমাবদ্ধতা এবং দুর্নীতিগ্রস্ততার চিত্রও তুলে ধরে।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহুসংখ্যক দাগি সন্ত্রাসীকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা ছিল। প্রচলিত বিচারব্যবস্থাকে তারা ফাঁকি দিতে সক্ষম হচ্ছিল। বহু দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা বারবার অবশ্য বলে আসছি, কোনো যুক্তি দিয়েই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে যুক্তিগ্রাহ্য করা যাবে না। এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আর সে জন্য অবশ্যই মন্ত্রিসভাকে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পুলিশ বিভাগের সংস্কার, স্বাধীন অপরাধ তদন্ত ও প্রসিকিউশন কাঠামো তৈরি এবং অধস্তন ও উচ্চ আদালত ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নেরও কোনো বিকল্প আমরা দেখি না। যে সংস্থার যা দায়িত্ব ও এখতিয়ার, তা তাদের পালন করতে হবে।