Saturday, April 4, 2015

বিদ্যুতের যন্ত্রণা, পানির কষ্ট by অরূপ দত্ত

গুলিস্তান–যাত্রাবাড়ী উড়ালসড়কের নিচে বিভাজকের খোপে যথেচ্ছ
ব্যবহার। শেরেবাংলা স্কুলের সামনে থেকে তোলা ছবি l হাসান রাজা
সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি। সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল বিদ্যুৎ। বাতাস-বৃষ্টি থেমে গেল আধা ঘণ্টার মধ্যেই। কিন্তু বিদ্যুৎ এল প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর। এর আধা ঘণ্টা পর আবারও গেল বিদ্যুৎ। এল বেলা সোয়া দুইটায়। এরপর বেলা সাড়ে তিনটায় গিয়ে এল সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে।
আবার ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বিদ্যুৎ গেল, এল ভোর পাঁচটায়। গত বুধবার দিন-রাতে বিদ্যুৎ-যন্ত্রণার চিত্র এভাবে তুলে ধরলেন রাজধানীর অভয় দাস লেনের ১৩ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা আবুল কাশেম ও তাঁর পরিবার। গতকাল শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। এই পরিবারের প্রতিবেশী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ঝুমুর দেবনাথ বললেন, ঝড়-বৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎ যেতেই পারে। কিন্তু তাঁদের এলাকায় কোনো কারণ ছাড়াই দিনে তিন-চারবার বিদ্যুৎ যায়। বিদ্যুৎ না থাকলে পানিও থাকে না। হাটখোলার একটি মনিহারি দোকানের মালিক আবদুস সবুর বলেন, কয়েক দিন আগে সংসদে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এখন ২৪ ঘণ্টায় এক সেকেন্ডের জন্যও লোডশেডিং হয় না। তাহলে তাঁদের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে চারবার বিদ্যুৎ যাওয়াকে কী বলবেন, লোডশেডিং নাকি ভুতুড়ে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট? অভয় দাস লেন ও হাটখোলা পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডে আরও আছে কে এম দাস লেন, রামকৃষ্ণ মিশন রোডের একাংশ, পেয়াদাপাড়া, জয়কালী মন্দির, ফোল্ডার স্ট্রিট, ভগবতী ব্যানার্জি রোডসহ আশপাশ। বিদ্যুৎ নিয়ে অভিযোগ এই ওয়ার্ডের প্রায় সব বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীর।
ওয়ার্ডবাসী বলেন, কখনো ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ, কখনো ওভার ভোল্টেজের কারণে তো বিদ্যুৎ যায়ই, এখন যায় কারণে-অকারণে। বুধবার সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা সাপ্তাহিক বাজারের মাছ-মাংস নষ্ট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করলেন পেয়াদাপাড়ার বাসিন্দা সোহাগী বেগম। শুধু বিদ্যুতের ভোগান্তি নয়; পানির কষ্ট, আবর্জনা, রাস্তায় খানাখন্দ, জলাবদ্ধতা, যানজট—সবই আছে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে।
বিশুদ্ধ পানির জন্য ছোটাছুটি: গতকাল সকাল ১০টার দিকে কে এম দাস লেনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের হাতে কলস বা জারিকেন। কথা বলে জানা গেল, তাঁরা ছুটছেন স্বামীবাগ ও গোলাপবাগ পানির পাম্প থেকে পানি আনতে। তাঁদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ কামরুল ইসলাম বললেন, এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অভাব। বাসায় লাইনে ওয়াসার যে পানি আসে, তা পান করা তো দূরের কথা, ব্যবহারেরও অনুপযোগী।
হুমায়ুন সাহেবের গেট এলাকার বাসিন্দা রাশিদুল ইসলাম সরকারি ব্যাংকের কর্মচারী। শুক্রবার ছুটির দিনে তিনি সাধারণত বিশ্রাম নেন। কিন্তু তাঁর হাতেও দেখা গেল বড় দুটি জার। বললেন, বিশ্রাম নেওয়ার উপায় নেই। পানির কষ্ট বড় কষ্ট। রামকৃষ্ণ মিশন রোড, পেয়াদাপাড়ায়ও পানির কষ্ট। রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ৮/২-এ নম্বর বাড়ির প্রহরী আবদুল লতিফ দুঃখ করে বলেন, তাঁর চাকরি পাহারা দেওয়ার। কিন্তু এখন আসল চাকরি, সব ফ্ল্যাটমালিকের জন্য বালুর মাঠের ওয়াসার পাম্পে গিয়ে বিশুদ্ধ পানি আনা। তবে গতকাল সকাল থেকে পাম্পের পানিতেও গন্ধ। মালিকেরা পানি বদলে আনতে বলেছেন। বালুর মাঠের পাম্পে গিয়ে জানা যায়, পানি পরিশোধনের জন্য বেশি ওষুধ দেওয়ার কারণে এমন গন্ধ।
ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ) এ বি এম কামরুল আলম চৌধুরী বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা বেশি হওয়ায় শোধনে সমস্যা হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য ক্লোরিন বেশি দিতে হচ্ছে। তবে এতে পানির ক্ষতি হয় না।
উড়ালসড়কের নিচে ভাগাড়, গর্ত: মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়কের (গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী) বেশ কিছু অংশ ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। গতকাল বিকেল চারটার দিকে জয়কালী মন্দির থেকে রাজধানী সুপার মার্কেট পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, উড়ালসড়কের নিচে বিভাজকের (মিডিয়াম) ওপর আবর্জনার ভাগাড়।
শেরেবাংলা স্কুল ও কলেজ এলাকার টায়ারের দোকানি ওসমান গনি বলেন, উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় ধুলাবালি আর কাদামাটির ভোগান্তি সহ্য করেছেন। এখন সহ্য করতে হচ্ছে আবর্জনার গন্ধ। অপর দোকানি মিল্লাত হোসেন বলেন, ওয়ারী, হাটখোলা ও আশপাশের এলাকার অনেকেই উড়ালসড়কের নিচের অংশকে আবর্জনা ফেলার জায়গা বানিয়ে নিয়েছেন। প্রতিদিন এখানে যানজটও হয়। দেখা যায়, জয়কালী মন্দিরের কাছে উড়ালসড়কের নিচে ও পেয়াদাপাড়ায় রাস্তায় খানাখন্দ। জয়কালী মন্দিরের কাছে একটি বড় গর্ত রয়েছে। যেখানে রিকশা-অটোরিকশা উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এলাকাটি সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর আঞ্চলিক কার্যালয়ের অধীন। এই অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাশেমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, উড়ালসড়কের নিচের বিভাজন অংশ দেখার দায়িত্ব তাঁদের নয়। তার পরও এলাকাবাসীকে আবর্জনা না ফেলার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে রাস্তার গর্ত শিগগির মেরামত করা হবে।

ভারত বিদ্বেষ নয়, আত্মমর্যাদাবোধের লেখা by গোলাম মোর্তোজা

পশু চোরাচালানের বিরুদ্ধে বিএসএফ নজরদারি বাড়ানোয় সম্প্রতি বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। আপনারা এই নজরদারি আরও বাড়ান, যাতে পশু চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং বাংলাদেশে মাংসের দাম ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে বাংলাদেশের মানুষ গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেবে। রাজনাথ সিং, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী
১.     চোরাচালান মানে কিন্তু এই নয় যে, ভারত থেকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা গরু চুরি করে আনে। ভারতে গরু উৎপাদন হয় প্রচুর, সেই তুলনায় চাহিদা খুবই কম। ভারতের খামাড়িরা বাংলাদেশের বাজারের কারণেই গরু পালন করেন। ভারতের ব্যবসায়ীরা সেই গরু খামাড়ি মালিকদের থেকে কেনে। সীমান্ত অঞ্চলে হাট বসে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ভারতের ব্যবসায়ীদের থেকে গরু কেনে। যেহেতু বৈধ উপায়ে গরু আসার নিয়ম নেই, তাই বিএসএফ -বিজেপিকে ঘুষ দিয়ে ব্যবসায়ীরা গরু সীমান্ত অতিক্রম করায়। নাম -চোরাচালান  হলেও কেনা -বেচা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গরু বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশের মানুষ গরুর মাংস খেতে পারে, ভারতের খামাড়ি ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়। ভারতের ব্যবসায়ী বা আবাদকারী কৃষক বা খামাড়িরা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
২.   ভারত সরকার যদি মনে করে এভাবে নয়, বৈধ আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে গরু যাবে -তাতে দোষের কিছু নেই। দূ দেশ আলোচনা করে তা ঠিক করতে পারে। তা না করে, বাংলাদেশের মানুষ যাতে গরুর মাংস খেতে না পারে -এটা কোন ধরণের বন্ধুসুলভ কথা বা আচরণ? বাংলাদেশের মানুষ কী খাবে, কী খাবে না -একান্তভাবেই সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। বাংলাদেশের মানুষ মাংস -পেঁয়াজ থেকে শুরু করে যা কিছু খায়, অর্থ দিয়ে কিনে খায়, ভারতের করুণায় কিছু খায় না, পায় না, চায়ও না। তাহলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এত বড় জেহাদ কেন? ছোট দেশ তাই?
ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ ছোট দেশ, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ কিন্তু গরীব দেশ নয়।
৩.  আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বা পররাষ্ট্র মন্ত্রী কী আশুগঞ্জ বন্দর -সীমান্ত পরিদর্শনে গিয়ে বলবেন, মানবিক বা অন্য কোনো কারণে নদী বা সড়ক পথে, খাদ্য বা অন্য কোনো সামগ্রী ত্রিপুরায় ঠুকবে না? বলবেন, ত্রিপুরা তথা সেভেন সিস্টার্সের ভারতীয়রা খাদ্য কষ্টে ভূগুক, বিদ্যুৎ কষ্টে পড়ুক? বলা উচিত নয়, এমনটা করাও ঠিক নয়। বিনা শুল্কে নয়, শুল্কের বিনিময়ে ভারতকে এই সুবিধা দেয়াই উচিত।
কিন্তু ভারত সরকারের অনায্য দাদাগিরির জবাব দেয়ার জন্যে হলেও, বাংলাদেশকে একবার সাহস দেখানো দরকার।
৪.  যারা মনে করেন বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মনে রাখা দরকার সব দেশই কম -বেশি অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের প্রধান খাদ্য চাল দরকার না হলেও কিছু পরিমান ভারত থেকে আসে। পেঁয়াজ -ডাল -পোষাক-বাস, গাড়ি আসে। এর কোনোটিই কিন্তু অপরিহার্য নয় যে ভারত থেকেই আমদানি করতে হবে। বিকল্প অনেক পথ এখন আছে। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশের কাছে অর্থ আছে। সুতরাং ভারতের দাদাগিরিকে বাংলাদেশ চাইলে খুব সহজেই না করতে পারে। ভারতের মানুষ বাংলাদেশে কাজ করে, বাংলাদেশের মানুষ ভারতে কাজ করে না। ভারত যেসব দেশ থেকে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করে, সেই তালিকায় বাংলাদেশের স্থান পঞ্চম। ভারতের সঙ্গে দর কষাকষির অনেক উপাদান বাংলাদেশের হাতে আছে।
৫.  ভারতের সঙ্গে বৈরিতার পক্ষে আমি নই, সব সময় সব রকম সুসম্পর্কের পক্ষে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভারতের হাতে তুলে দেয়া, বাংলাদেশে অবস্থানের সুযোগ না দেয়ার নীতিকে পুরোপুরি সমর্থন করি। তবে আত্মমর্যাদাবোধ প্রশ্নে মাঝেমধ্যে সাহস দেখানোর পক্ষে। সাহস দেখাতে না পারলে, ভারতের এমন কথা আচরণ আরও তীব্র হবে। সীমান্তে বাংলাদেশের মানুষ হত্যা চলতেই থাকবে। যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
গোলাম মোর্তোজা। সম্পাদক সাপ্তাহিক। লেখাটি তার ফেসুবক আইডি থেকে নেয়া।

সম্পাদিত পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি প্রাথমিকভাবে সম্পাদিত পরমাণু চুক্তি মেনে চলার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ক্ষমতাধর ৬ রাষ্ট্রের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার ইরানের পরমাণু ইস্যুতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যতোদিন দেশগুলো এ চুক্তির শর্তসমূহ মেনে চলবে, ইরানও তার উল্টো পথে হাঁটবে না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে হাসান রুহানি বলেন, বিশ্বের দেশগুলোর অবশ্যই জানা উচিত যে, ঠকানোর কোন উদ্দেশ্য নেই আমাদের। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রসমূহ যদি ‘একদিন ভিন্ন পথ অনুসরণের সিদ্ধান্ত নেয়’, সেক্ষেত্রে ইরানের সামনে অন্য উপায় থাকবে। তিনি বলেন, যদি অপর পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ  করে, ইরানও তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। রুহানি জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব এখন ইরানের নিজ ভূখ-ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারকে মেনে নিয়েছে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কারও জন্য হুমকি নয়। হাসান রুহানি বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও আমাদের সব পরমাণু প্রযুক্তি কেবলই ইরানের উন্নতির জন্য। তিনি আরও বলেন,  ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও প্রযুক্তি আঞ্চলিক কোন দেশ বা বিশ্বের বিরুদ্ধে নয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী, ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরে আসতে হবে। ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চলার ফলস্বরূপ দেশটির ওপর চাপানো অবরোধসমূহ প্রত্যাহার করা হবে। এর আগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরান ওই অঞ্চল বিশেষ করে ইসরাইলের জন্য মারাত্মক হুমকি। হোয়াইট হাউস অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেছে, ইরানের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো এমন কোন চুক্তি স্বাক্ষর করবে না, যা ইসরাইলের জন্য হুমকির কারণ হবে। রুহানি বলেছেন, চুক্তিটি ইঙ্গি দিচ্ছে, ইরান বিশ্বের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়তে পারে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল বলে পুনর্ব্যক্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ইরান কখনও ‘দ্বিমুখী ছিল না’। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানির সঙ্গে যে আগামীতে কোন চূড়ান্ত চুক্তিতে উপনীত হওয়ার বিষয়টিকে তিনি সম্মানের চোখেই দেখবেন। প্রাথমিক চুক্তি সম্পাদনের দিনটিকে ইরানের জন্য ‘ঐতিহাসিক’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রুহানি বলেন, কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্বের সঙ্গে হয় আমাদের লড়াইয়ে নামা উচিত বা বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রসমূহের কাছে আত্মসমর্পণ করা উচিত। আমরা বলি, এটা তার কোনটাই নয়। তৃতীয় একটি পথ রয়েছে। আমরা বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি।

নির্বাচনের এখনও সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয়নি

আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের এখনও সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন শত নাগরিকের আহ্বায়ক প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ। বলেছেন, এখনও দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ আছেন। বিভিন্ন জায়গায় বিরোধী নেতাকর্মীদের পুলিশ হয়রানি করছে। অবিলম্বে বিরোধী প্রার্থীদের প্রচারণার জন্য সমান সুযোগ দেয়ার আহ্বান তিনি। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘জিয়া কল্যাণ পরিষদ’ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ভিসি বলেন, চরম দুঃসময়েও খালেদা জিয়া সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে সায় দিয়েছেন। এ নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে আনার মাধ্যমে সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করতে হবে। সিটি নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগের জন্য বিএনপি নেতাদের দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেরও সমালোচনা করে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে বক্তব্যে বলেছেন, তিনি সমতল বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। তার বক্তব্যের উত্তরে বলবো- একজন ভোটার যখন নিজের ইচ্ছেমতো নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন, একজন প্রার্থী যখন নির্বিঘ্নে ভোটারদের কাছে যেতে পারবেন, সভা-সমাবেশ করতে পারবেন সেটা হবে নির্বাচনের সমতল মাঠ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে কোন এলাকায় কোন প্রার্থীকে বাধা না দেয়। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার অনৈতিক ও জনসমর্থনহীন। গণতন্ত্রের পক্ষের প্রার্থীদের পক্ষে শত নাগরিক কমিটির লোকরা ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে যাবে। শুধু শত নাগরিক কমিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের গণতন্ত্রকামী সব পক্ষকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। চট্টগ্রামে ৫০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি হয়েছে, ঢাকায় প্রয়োজনে এক হাজার এক সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করতে হবে। এ নির্বাচন সরকারবিরোধী আন্দোলনের সুযোগ বলেও মন্তব্য করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে তিন সিটি করপোরেশনকে নিজের দখলে আনতে হবে। বিজয় নিশ্চিত করতে না পারলে সামনে আরও ভুগতে হবে। কোথাও কোন অন্যায় চিহ্নিত হলে তা সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। তরুণদের এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। জিয়া কল্যাণ পরিষদের আহ্বায়ক রাহিজা খানম ঝুনুর সভাপতিত্বে সিটি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও বিএনপির সহযোগী সংগঠনের নেতারা আলোচনায় অংশ নেন।

বিমান বিধ্বস্ত: প্রশিক্ষণার্থী পাইলটদের ঢাকায় তলব কার্যক্রম বন্ধ

রাজশাহীর শাহ মখদুম  বিমানবন্দরে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত শেষ হয়েছে। গত তিন দিন রাজশাহীতে অবস্থান করে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন তদন্ত কমিটির প্রধান সিভিল অ্যাভিয়েশনের সিনিয়র ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর ক্যাপ্টেন এইচ এম আক্তার খান। গতকাল দুপুরে তদন্ত শেষে তিনি ঢাকায় ফেরেন। প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে আগামীকাল চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। চার সদস্যের তদন্ত কমিটির অন্যরা হলেন ডা. আবদুল খালেক, লুৎফুল কবির ও আতাউল্লাহ হাশমি। এদিকে রাজশাহীতে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির প্রশিক্ষণ বিধ্বস্ত হয়ে তামান্না রহমান হৃদি নামে প্রশিক্ষণার্থী পাইলট নিহত হওয়ার পর রাজশাহীর সব ট্রেইনি পাইলটকে ঢাকায় তলব করা হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থী পাইলট নিহতের ঘটনায় অন্যান্য পাইলটদের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করেই ফ্লাইং কার্যক্রম বন্ধ করাসহ তাদের ঢাকায় ডাকা হয়েছে বলে একাডেমির একটি সূত্র জানিয়েছে। গত বুধবার দুপুর ২টায় রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে এ দুর্ঘটনার পর সাময়িকভাবে সব বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে প্রশিক্ষণার্থী সব পাইলটকে ঢাকায় ডেকে নেয়া হয়। এতে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির উড্ডয়ন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
গতকাল সকালে তদন্ত কমিটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুপুরে বিমানটি উড্ডয়নের আড়াই থেকে তিন মিনিটের মাথায় পাইলট বিমানবন্দর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে জরুরি অবতরণের কথা বলেন। বিমানবন্দর অপারেটর জরুরি অবতরণের জন্য সবুজসংকেত দেয়ার পরই প্রশিক্ষণ বিমানটি অবতরণের চেষ্টা করে। তবে বিমানের কি ধরনের ত্রুটি ছিল বিমানবন্দর স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে সে সম্পর্কে কোন কথা হয়নি। বিমানবন্দরের স্টেশন মাস্টার ও পাইলট শাহেদ কামালের কথোপকথনের অডিও বার্তা সংগ্রহ করেছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রধান সিভিল এভিয়েশনের সিনিয়র ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর ক্যাপ্টেন এইচ এম আক্তার খান হতাহত সম্পর্কে জানান, প্রশিক্ষণ বিমানের দুই পাখায় ৫৯ লিটার করে ৯৮ লিটার জ্বালানি ছিল। বিমানটি রানওয়েতে ডান দিকে প্রথমে আঘাত করে। এ সময় বিমানের বাম পাখা আকাশের দিকে উঁচু হয়ে যায়। এরপর ওই পাখার সব জ্বালানি তেল বিমানের মধ্যে থাকা পাইলট ও প্রশিক্ষণার্থী পাইলটের ওপর পড়ে। এর ফলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আগুন ধরে যায় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দুটি কারণে আগুন লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। বিমানের ভেতরে স্পার্ক থেকে অথবা বিমান রানওয়েতে আছড়ে পড়ার সময় ঘর্ষণে আগুন লাগতে পারে। তবে কি কারণে এ দুর্ঘটনা তা তদন্ত শেষ না করে বলা কঠিন বলে তিনি জানান। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামীকাল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তারা তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবেন।
প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ সেসনা-১৫২ সম্পর্কে এইচ এম আক্তার খান বলেন, দুনিয়াব্যাপী এ জাতীয় উড়োজাহাজ দিয়েই পাইলট তৈরি করা হয়। এসব উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি। এর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। আর তার প্রশিক্ষক লে. কর্নেল (অব.) শাহেদ কামাল খুবই দক্ষ। তার পাঁচ হাজার ঘণ্টা প্রশিক্ষণ উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই বছর ধরে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরটি ব্যবহার করে আসছে। রাজশাহীতে তাদের যে দুটি প্রশিক্ষণ বিমান রয়েছে সেগুলো ভাড়া করা। তাদের উড্ডয়ন (ব্যবহারিক) ক্লাসগুলো রাজশাহীতে হয়। তবে ফ্লাইং একাডেমির তত্ত্বীয় সব ক্লাস ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিচালিত হয়।

আইনেও প্রার্থিতা ফেরত পাওয়ার সুযোগ আছে by সিরাজুস সালেকিন

প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টুর। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর থেকেই তিনি রয়েছেন আলোচনার শীর্ষে। তার মনোনয়নপত্রে সমর্থনকারী ব্যক্তি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভোটার নন- এ কারণ দেখিয়ে আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তিনি।
স্থানীয় সরকার আইনের একটি ধারায় মিন্টু প্রার্থিতা ফিরে পেতে পারেন বলে মনে করছেন তার আইনজীবীরা। এ ক্ষেত্রে আশাবাদী হয়ে উঠেছে বিএনপিও। যদিও পুরো বিষয়টিই নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের স্বদিচ্ছার ওপর। স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালা (সিটি করপোরেশন) ২০১০-এর ১৪এর (আ) অনুসারে ‘রিটার্নিং অফিসার গুরুতর নহে এইরূপ কোন ত্রুটির কারণে কোন মনোনয়নপত্র বাতিল করিবেন না এবং অনুরূপ ত্রুটি অবিলম্বে সংশোধন করিবার জন্য সুযোগ প্রদান করিতে পারিবেন।’
শুধু সমর্থনকারীর ‘অযোগ্যতার’ কারণে প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়টিকে লঘু অপরাধ বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। আপিল কর্তৃপক্ষের বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে মিন্টুর প্রার্থিতা। নতুন করে একজন বৈধ ব্যক্তি মিন্টুকে সমর্থন দিলে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা মানবজমিনকে বলেন, রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব ছিল এটা বাতিল ঘোষণা করা। কারণ সুস্পষ্টভাবে আইনে আছে। তবে রিটার্নিং অফিসার যদি কোন ভুল করে থাকেন সেজন্য আপিলের ব্যবস্থা আছে। আপিল কর্তৃপক্ষ চাইলে প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে পারেন। আইনের সমপ্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ পরিচয়ের কারণে কাউকে যদি হয়রানি করা হয় কিংবা কাউকে সুবিধা দেয়া হয় তবে তা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
এ ঘটনায় রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বিধিমালা অনুসারে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সমাধানের সুযোগ ছিল। ঢাকা উত্তর সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহ আলমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কোন কমেন্ট করবো না। এটা কি কারণে বাতিল হয়েছে তা সবাই জানে। তারা আপিল করেছেন। আপিলের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাফসিরুল আউয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। আপিলের মাধ্যমে তার বাবা প্রার্থিতা ফিরে পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা দক্ষিণের একজন নির্বাচনী কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের ভুল সংশোধন যোগ্য। ছোটখাটো ও সংশোধনযোগ্য ভুলের ক্ষেত্রে প্রার্থী, প্রস্তাবক ও সমর্থকদের তাৎক্ষণিক সংশোধনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে তাদের বেশির ভাগই ছিলেন ঋণখেলাপি বা ঋণের নিশ্চয়তা দানকারী এবং মামলার আসামি।
এ প্রসঙ্গে আবদুল আউয়াল মিন্টুর আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন মানবজমিনকে বলেন, মিন্টু সাহেব প্রার্থী হিসেবে যোগ্য। যে ভুল হয়েছে তা নগণ্য। এখানে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল বিষয়টি সংশোধনে সহায়তা করার। আশা করছি আপিলে মিন্টু সাহেব প্রার্থিতা ফিরে পাবেন। আপিলে হারলে উচ্চ আদালতে যাবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে খোকন বলেন, আমরা এ ধরনের কোন চিন্তাই করছি না। কারণ আমরা বিশ্বাস করি আপিলের মাধ্যমেই আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রার্থিতা ফিরে পাবেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহ আলম গত বুধবার বিএনপি সমর্থিত সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। সমর্থনকারী ব্যক্তি আবদুর রাজ্জাক সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ভোটার না হওয়ায় তিনি এ সিদ্ধান্ত দেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মিন্টুর ভুল সংশোধন ও উপেক্ষাযোগ্য। এটি লঘু পাপে গুরু দণ্ডের শামিল। প্রার্থিতা ফিরে পেতে মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার জিল্লার রহমানের কাছে আপিল করা হয়। আজ বিকাল ৪টায় আপিল শুনানির কথা রয়েছে। আবদুল আউয়াল মিন্টুর পক্ষে তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন উপস্থিত থাকবেন।

সিটি নির্বাচনে স্বস্তি, তারপর? by আবুল মোমেন

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম মহানগর—এই তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতিতে স্বাভাবিকতা এবং সমাজে স্বস্তি ফিরবে কি না, এ প্রশ্ন সবার মনে। আন্দোলন ও দাবি আদায়ের অংশ হিসেবেই বিএনপি নির্বাচনে আসছে। এটি যে শুভ চিন্তা, তা মানতে হবে। নিকট অতীতে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা পাঁচ-পাঁচটি সিটি মেয়র নির্বাচনে বড় ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাদের নিশ্চয় বয়কট ও নেতিবাচক রাজনীতি থেকে সরে আসতে অনুপ্রাণিত করেছে। এবার যেকোনো রকম ইতিবাচকতাকে স্বাগত জানাবে জনগণ। আসন্ন এই তিনটি স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে বলার সময় এখনো আসেনি। আমরা বরং নির্বাচনগুলোকে ঘিরে রাজনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে কি না, তা দেখতে পারি। মানুষ ব্যগ্রভাবে সেটাই চায়।
সত্যিই জনগণ দীর্ঘ প্রায় তিন মাসের আন্দোলন নিয়ে আতঙ্কিত ও হতাশ। আন্দোলনের ধরন থেকে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি এ-ও মনে হয়েছে যে সাধারণ মানুষের জন্য তাদের দরদ নেই। আন্দোলনের ভয়ংকর দুঃসহ যন্ত্রণাময় ধকল তারাই তো ভোগ করেছে। মানুষ শারীরিকভাবে আক্রান্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই আত্মরক্ষার কথাই আগে ভাবে, তাদের পক্ষে সংগঠিত প্রতিবাদে নামার উদ্দীপনা থাকার কথা নয়। বরং চরম দুর্ভোগের সময় তারা কাউকে পাশে চায়, কারও সাহায্য চায়। বিএনপি সেটা করেনি। ফলে এ আন্দোলন তাদের বিপক্ষেই গেছে এবং যাচ্ছে।
জনগণের এই মনোভাবে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার মতো অত সরল নয় পরিস্থিতি। সাম্প্রতিক কালে বিএনপির পরিচিত দুজন নেতার গুম বা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। সাম্প্রতিককালে আরও মানুষ গুম ও নিখোঁজ হয়েছেন। এসব ঘটনা ভুক্তভোগী পরিবারকে যে যন্ত্রণায় ঠেলে দেয়, তা আগুনে পোড়া পরিবারের যন্ত্রণার মতোই। তা ছাড়া, এ রকম ঘটনা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনে চাপা আতঙ্ক, গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে, যার প্রভাব হয় দীর্ঘমেয়াদি। নির্বাচনে মানুষের এই অসংগঠিত নীরব আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে নীরবেই।
সরকার ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে দুর্বল করে ফেলার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বলে মনে হয়। এ রকম কৌশল জেনারেল জিয়াও নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন তো দূরের কথা, দুর্বল করাও সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন আন্দোলন চালিয়ে একুশ বছর পর দলটি ক্ষমতায় ফিরেছিল। এর আগে পাকিস্তান আমলে আমরা দেখেছি, জনপ্রিয় আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান মুসলিম লীগ কেবল ক্ষমতাই হারায়নি, এই প্রদেশ থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কোনো দল নিশ্চিহ্ন হয়, কোনোটি হয় না। তখনকার বিশ্বে, বিশেষত উপনিবেশমুক্ত দেশে দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক দর্শন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব একদিকে দলকে জনগণের ভেতরে সাংগঠনিকভাবে শক্ত ভিত্তি দিতে পেরেছিল আর অন্যদিকে উদীয়মান শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দর্শনগুলো গ্রহণ করেছিল। এখানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় মেলে। তিনি বুক চিতিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর সাহস, আত্মমর্যাদাবোধ, দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা বঙ্গবন্ধুকে সবার চেয়ে এগিয়ে রেখেছিল এবং শেষ পর্যন্ত এক মহানায়কে রূপান্তরিত করেছিল।
বিপরীতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ মুসলিম লীগের নেতারা ছিলেন জনগণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্কবিহীন অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের, বিশেষত বাংলার মুসলমানদের মনের কথা বলে দলটি অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। সহজেই জনসমর্থন পেয়ে নেতারা আর দলের সাংগঠনিক ভিত্তি ও বিকাশের বিষয় নিয়ে ভাবেননি, কাজ করেননি। এই হলো ক্ষমতা গ্রহণ ও ভোগের জন্য তৈরি দল।
১৯৭৫–এর শেষ ভাগে আকস্মিকভাবে ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমানকেও রাজনৈতিক দল গঠন করতে হয়েছিল। তখন তিনি একদিকে ক্ষমতার জবরদস্তি চালিয়ে সামরিক-বেসামরিক অস্থিরতা দমন করেছেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি দাঁড় করাতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত পাকিস্তানি অর্থাৎ মুসলিম জাতীয়তার রাজনীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে বিএনপি ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। তবে পরবর্তী শাসক জেনারেল এরশাদ কেবল ক্ষমতা গ্রহণের ধরন ও ধারাবাহিকতায় নয়, রাজনৈতিক মতাদর্শেও তাঁর উত্তরসূরিই ছিলেন। তা সত্ত্বেও স্বৈরাচারবিরোধী গণতন্ত্রের আন্দোলনের সূত্রে, অনেকটা আন্দোলনের মাঠপর্যায়ে মুখ্য দল আওয়ামী লীগের সহযোগিতাতেই বিএনপি টিকেও গেল। শুধু টিকে নয়, ১৯৯১-এ গণতন্ত্রে উত্তরণের পরে প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকারও গঠন করল। এ পর্যন্ত এই দলের অগ্রযাত্রা বিবেচনা করে বলা যায় যে বাংলাদেশে মুসলিম লীগ ধারার রাজনীতির ভিত্তি যথেষ্ট ব্যাপক। এমন হতেও পারে, সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে প্রবল সরকারি চাপে ক্ষমতার বাইরে দীর্ঘদিন টিকতে পারবে না এই দলও। কিন্তু তাই বলে এই মতাদর্শের সমর্থক-ভোটার কমবে না। বিএনপি না পারলে অন্য নামে তারা সংগঠিত হবে। সমর্থকদের চাহিদা ও প্রণোদনা তো থাকবেই।
ফলে মানতে হবে আওয়ামী লীগসহ যারা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র বা জনকল্যাণমূলক অর্থনীতির আদর্শে দেশ চালাতে চায়, তারা জনগণের মধ্যে এর মতাদর্শিক ভিত্তিটা দাঁড় করাতে পারেনি। দেখা গেছে, অত্যন্ত সস্তা স্লোগান দিয়ে বিপক্ষ দল ভোটারদের টানতে পেরেছে। এর মধ্যে প্রধান ছিল ধর্মনিরপেক্ষ দল ক্ষমতায় এলে ধর্ম থাকবে না এবং সেই সূত্রে দেশ ভারতের কুক্ষিগত হয়ে পড়বে—এমন প্রচারণা। এখনো অনেক মানুষ এসব কথা বিশ্বাস করে। এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সোজাসাপ্টা কৌশল নিয়েছে—তারা নেতা-কর্মীদের ধর্মচর্চাকে দৃশ্যমান করেছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে, রাজনীতিতে ইসলাম ধর্মের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ দলের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি পাল্টে ধর্মভিত্তিক রূপ দাঁড় করিয়েছে। হয়তো এসব কৌশল ভোটের রাজনীতিতে কাজ দিয়েছে। কিন্তু এতে সমাজের প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে, এ ধরনের উদ্যোগগুলো ব্যাহত হয়েছে, সমাজের স্বাভাবিক উদার মানবিক বাতাবরণ দুর্বল হয়েছে। আমরা লক্ষ করলে দেখব, রাজনীতি ও রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ থাকলেও পশ্চিমের উন্নত দেশের কোথাও ধর্মহীনতার প্রকোপ নেই, সেসব দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কেউই নিজের ধর্মীয় পরিচয় বাদ দেয় না, গির্জায় যাতায়াতেও কমতি নেই, ধর্মীয় পর্বগুলোও ঠিকঠাক পালিত হয়। এমনকি অভিবাসী বা ধর্মান্তরিত মানুষও তাদের নিজ নিজ ধর্ম ঠিকঠাকমতোই পালন করে থাকে। বরং দুঃখের সঙ্গে বলতে হবে, সেসব সমাজে সাধারণ মানুষের নীতিবোধ ও মূল্যবোধ আমাদের চেয়ে ভালো। আমরা কোনোভাবে মিথ্যাচার, কপটতা, প্রতারণা, দুর্নীতি থেকে মুক্ত হতে পারছি না। ধর্মের দোহাই দিয়েও পারছি না।
আমি পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী ভূমিকা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ও সচেতন। তৃতীয় বিশ্বের ওপর তাদের শোষণ-নির্যাতনের কথাও আমরা জানি। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া আক্রমণের এবং প্যালেস্টাইন নিয়ে তাদের অসদুদ্দেশ্যও গোপন নেই। আপাতত আমি একটি দেশের সমাজজীবন কীভাবে আলোকিত, উন্নত, স্থিতিশীল ও নাগরিকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ করে গড়ে তোলা যায়, সেদিকেই দৃষ্টি দিচ্ছি। আমরা যেন বহিঃসম্পর্ক ও স্বদেশীয় স্বার্থ সংরক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের বিষয়গুলো গুলিয়ে ফেলছি। ধর্ম বা মাতৃভাষা দুটিই মানুষের শক্তিশালী সাংস্কৃতিক উপাদান। দুটিই রক্ষা ও চর্চা করে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক নাগরিক হওয়া সম্ভব। কারণ, যুগে যুগে সব সমাজেই দেখা গেছে যে অধিকাংশ মানুষই ধর্মভীরু এবং নিজ ধর্ম পালনে উৎসাহী। একই কারণে মাতৃভাষায় সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাও রুদ্ধ করা সম্ভব নয়।
বাস্তবতার আলোকেই ইংরেজি ভাষাকে যেমন গুরুত্ব দিতে হয়েছে, মাদ্রাসায়ও এ ভাষা চালু করতে হয়েছে, বিজ্ঞান-গণিত শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়েছে; তেমনি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সব ধর্ম, সব মতাদর্শের জন্য সমসুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার বা আতঙ্কিত হওয়ার কিংবা বিতর্ক সৃষ্টির কোনো মানে নেই। সরকার নয়, সমাজই সমাজকে পাল্টায়।
আমরা বহু বছর গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি, বহু বছর ধরে গণতান্ত্রিক শাসনের চর্চাও করেছি। কিন্তু সে কেবল নির্বাচন ও সরকার বদলেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, সমাজের বা সমাজমানসের গণতন্ত্রায়ণের কাজ হয়নি। তাই এত বছর ধরে গণতন্ত্রের চর্চা হলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। প্রায় দুই শ বছর ধরে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকলেও যুক্তি, বিচারবোধ, বিবেকবোধ ইত্যাদিতে উন্নত এমন সমাজ তৈরি করতে পারছি না, যেখানে আত্মবিশ্বাসী, আত্মমর্যাদাশীল আলোকিত মানুষ তৈরি হবে। বহুমতের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল সমাজ গড়ে উঠবে।
রাজনৈতিক দলগুলো যদি কেবল নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতা লাভের সংক্ষিপ্ত অর্জন নিয়ে মশগুল থাকে এবং এর জন্য যেকোনো পথ অবলম্বন করতে দ্বিধা না করে—যেমন রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, ক্ষমতা বিস্তারে অস্ত্র ও অবৈধ অর্থের ব্যবহার—তাহলে সমাজের উত্তরণ ঘটবে না। বাহ্যত আধুনিক নগরায়ণ ও পোশাকি নাগরিকতা তৈরি হবে, কিন্তু তা হবে ময়ূরপুচ্ছ, ভেতরে মধ্যযুগীয় চিন্তা, সামন্ত সংস্কৃতি ঠিকই বহাল থাকবে। তাই আসন্ন মেয়র নির্বাচন নিয়ে যদি শান্তি-স্থিতি কিছুটা আসে, তা-ও হবে সাময়িক। আমাদের অপরিণত সমাজকে পরিণত পরিশুদ্ধ করে তুলতে একযোগে শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। সে কাজ বাদ রেখে কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন করে বেশি দূর যাওয়া যাবে না।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

গীতা প্রতিযোগিতায় জয়ী মুসলিম ছাত্রী

ভারতের মুম্বাইয়ের বাসিন্দা ১২ বছরের বালিকা মরিয়ম সিদ্দিকী। ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী সে। ক্লাসে সেরাদের একজনও। সে একজন মুসলিম বালিকা হলেও হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ ভগবত গীতার ওপর তার দখল হিন্দু ছেলেমেয়েদের চেয়েও বেশি!
তাইতো গীতার ওপর এক প্রতিযোগিতায় বাঘা বাঘা হিন্দু পণ্ডিতদের ছেলেমেয়েদের পেছনে ফেলে প্রথম স্থান দখল করেছে মরিয়ম। ১৯৫ স্কুলের ৪৫০০ প্রতিযোগীকে হারিয়ে সেরা হয় সে। গীতা চ্যাম্পিয়নস লীগ কনটেস্টে নামের ওই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আন্তর্জাতিক সোসাইটি ফর কৃষ্ণা কনসাসনেস (ইস্ককম)।

পোশাক পরিবর্তনে গিয়ে গোপন ক্যামেরার শিকার ভারতের শিক্ষামন্ত্রী

স্মৃতি ইরানি (৩৯)। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও মানবসম্পদ মন্ত্রী। শুরু থেকেই তার পিছে লেগে আছে বিতর্ক ও গুঞ্জন। আবারও তিনি আলোচনায় এলেন। তবে এবার তিনি গোপন ক্যামেরার শিকার হয়েছেন। গোয়ার সমুদ্র সৈকতে ছুটি কাটাচ্ছেন স্মৃতি ইরানি। সেখানে জনপ্রিয় পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ফ্যাবিন্ডিয়ার একটি আউটলেটে গিয়েছিলেন। পোশাক পছন্দ করার পর তা শরীরের সঙ্গে মানায় কিনা, তা দেখার জন্য ট্রায়াল রুমে যান। ট্রায়াল রুমে পোশাক পরিবর্তনের সময় হঠাৎ নজরে পড়ে ‘গোপন ক্যামেরা’। তাৎক্ষণিক চিৎকার দিয়ে উঠেন ইরানি এবং স্বামী ব্যবসায়ী জুবিন ইরানকে ডাকেন। এরপর কালবিলম্ব না করে স্মৃতি ইরানি আইনের আশ্রয় নেন। গোয়ার বিধানসভার সদস্য বিজেপি নেতা মাইকেল লোবোকে বিষয়টি জানানোর পর স্থানীয় থানায় অভিযোগ দাখিল করেন লোবো।
এনডিটিভিকে লোবো বলেন, ‘স্মৃতি ইরানি পোশাক কেনার জন্য ট্রায়াল রুমে গিয়ে তা ঠিকঠাক মানাচ্ছে কিনা, তা দেখে নেন। সে সময় আগে থেকে লুকানো গোপন ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধারণ করা হয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে তিনি তার স্বামী জুবিন ইরানিকে জানান। পরে আমাকে জানান।’ স্মৃতি ইরানি নিজেই গোপন ক্যামেরাটি চিহ্নিত করেন। ট্রায়াল রুমের ডানকোণে এমনভাবে সেটি লাগানো রয়েছে, যা সহজে কেউ দেখতে পারবে না, বুঝতেও পারবেও না। কিন্তু তা স্মৃতি ইরানির চোখ এড়ায়নি। বিধায়ক লোবো জানান, তিনি খবর দিলে পুলিশ এসে ফ্যাবিন্ডিয়ার আউটলেটে তল্লাশি চালিয়ে ক্যামেরাটি উদ্ধার করে। ওই আউটলেটের ম্যানেজারের কক্ষের একটি কম্পিউটার থেকে গোপন ক্যামেরাটি পরিচালনা করা হয়। তিনি আরও বলেন, পরে ভিডিও চেক করে পুরো ঘটনা ধারণের দৃশ্য দেখতে পেয়েছি। কেউ এটা ধারণ করে দেখে থাকেন। পুলিশ জানায়, চার মাস আগে ক্যামেরাটি স্থাপন করা হয়। ক্রেতাদের ট্রায়ালের অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ আছে এটিতে। তবে স্মৃতি ইরানি যখন আউটলেটে যান তখন ম্যানেজার অফিসে ছিলেন না। টাইমস অব ইন্ডিয়া

আজমল-জুনায়েদকে নিয়ে আসছে পাকিস্তান

অবৈধ বোলিং অ্যাকশনের জন্য নিষিদ্ধ ছিলেন। খেলা হয়নি বিশ্বকাপেও। বাংলাদেশ সফর দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরছেন সাঈদ আজমল। তিন ফরম্যাটেই তাকে রেখে শুক্রবার পাকিস্তান দল ঘোষণা করা হয়। আজমলের মতো তিনটি স্কোয়াডেই ফিরেছেন অলরাউন্ডার মোহাম্মদ হাফিজও। তিনিও বিশ্বকাপে খেলেননি। কোনো দলেই জায়গা হয়নি ওপেনার উমর আকমলের। অপর ওপেনার আহমেদ শেহজাদ জায়গা পেয়েছেন শুধু টি ২০ দলে। সফরে একটিমাত্র টি ২০ ম্যাচ খেলবে পাকিস্তান। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) নতুন প্রধান নির্বাচক হারুন রশিদ দল ঘোষণা করার সময় বলেন, ‘বাংলাদেশ সফরের জন্য দল নির্বাচনের সময় খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স বিবেচনায় আনা হয়েছে।’
আজমলের মতো পেসার জুনায়েদ খানও ফিরেছেন। উমর গুল শুধু একমাত্র টি ২০ ম্যাচে খেলবেন। আর ইউনুস খান শুধু টেস্টে। বাংলাদেশ সফরে ভিন্ন তিন অধিনায়ক নিয়ে আসছে পাকিস্তান দল। ওয়ানডেতে নতুন অধিনায়ক আজহার আলীর ডেপুটি হিসেবে থাকবেন সরফরাজ আহমেদ। টেস্ট ও টি ২০-তে যথারীতি অধিনায়ক মিসবাহ ও আফ্রিদি। বোলিং অ্যাকশনে ত্রুটি থাকায় বিশ্বকাপে পাকিস্তানের হয়ে খেলতে পারেননি সাঈদ আজমল ও মোহাম্মদ হাফিজ। আর ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েন জুনায়েদ খান। অন্যদিকে বিশ্বকাপের প্রাথমিক দলে থাকলেও চূড়ান্ত দলে জায়গা হয়নি ফাওয়াদ আলমের।
বাংলাদেশ সফরে পাকিস্তান
টেস্ট দল : বাবর আজম, মোহাম্মদ হাফিজ, সামি আসলাম, মিসবাহ-উল-হক (অধিনায়ক), আসাদ শফিক, আজহার আলী, ইউনুস খান, হারিস সোহেল, সাঈদ আজমল, ইয়াসির শাহ, জুলফিকার বাবর, সরফরাজ আহমেদ, ওয়াহাব রিয়াজ, জুনায়েদ খান, সোহেল খান ও রাহাত আলী।
ওয়ানডে দল : সামি আসলাম, সরফরাজ আহমেদ, মোহাম্মদ হাফিজ, আসাদ শফিক, ফাওয়াদ আলম, আজহার আলী (অধিনায়ক), মোহাম্মদ রিজওয়ান, হারিস সোহেল, সোহেব মাকসুদ, সাঈদ আজমল, ইয়াসির শাহ, ওয়াহাব রিয়াজ, রাহাত আলী, এহসান আদিল ও সোহেল খান।
টি ২০ দল : আহমেদ শেহজাদ, সরফরাজ আহমেদ, মোহাম্মদ হাফিজ, মুস্তার আহমেদ, সোহেব মাকসুদ, হারিস সোহেল, মোহাম্মদ রিজওয়ান, সাঈদ আজমল, শহীদ আফ্রিদি (অধিনায়ক), সোহেল তানভির, সাদ নাসিম, ওয়াহাব রিয়াজ, সোহেল খান, উমর গুল ও জুনায়েদ খান। ওয়েবসাইট।

মঞ্চ হল অভিনয়ের আদর্শ জায়গা

*এখন ব্যস্ততা কী নিয়ে?
**বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটকের কাজ চলছে। আরও দুটো নাটকে অভিনয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছে। একজন মায়াবতী ও দহন নাটক দুটো প্রচার হচ্ছে। পাশাপাশি ঈদের নাটকের কাজ নিয়েও ব্যস্ততা যাচ্ছে।
*প্রচারের অপেক্ষায় কী কী রয়েছে?
**এখন প্রচারের অপেক্ষায় আছে আলভী আহমেদের ‘শূন্য থেকে শুরু’ ও বাশার জর্জিসের ‘উজান গাঙের নাইয়া-২’ ধারাবাহিক দুটি।
*আপনি তো মঞ্চের শিল্পী। ওখানে কি সময় দিচ্ছেন?
**মঞ্চে নিয়মিত কাজ করছিলাম কিছুদিন আগেও। কিন্তু বর্তমানে ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় আপাতত সময় দিতে পারছি না। আসলে মঞ্চ হল অভিনয়ের আদর্শ জায়গা। একজন দক্ষ অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য মঞ্চের কোনো বিকল্প নেই।
*এখন তো অনেকেই অভিনয়ে এসেছেন মঞ্চে কাজ না করেই। তাদের ক্ষেত্রে কী করণীয়?
**এখন যারা অভিনয়ে আসছেন তাদের বেশিরভাগই মডেলিং থেকে। তারা যেহেতু চলেই এসেছেন সেক্ষেত্রে তাদের উচিত হবে ভালোভাবে অভিনয়টা রপ্ত করে যাওয়া।
*মনপুরা চলচ্চিত্র দিয়েই আলোচনায় এসেছেন। এরপর আর বড় পর্দায় আসার কোনো খবর নেই কেন?
**নতুন কিছু ছবিতে অভিনয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হল আমার ছেলেকে নিয়ে। ও এখনও অনেক ছোট। তাই ঢাকার বাইরে কোনো শুটিং হলে যেতে পারছি না। ছেলেটি আরেকটু বড় হলে আশা করছি সব আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে। সাদিয়া ন্যান্সি

এশিয়ায় গণতন্ত্রের বিচার by ইউরিকো কোইকি

বাংলাদেশ সরকার ও বিচার
এশিয়ার ক্রমবর্ধমান গণতন্ত্রের পরীক্ষার সময় এটা। আক্ষরিক অর্থে এ পরীক্ষা হচ্ছে আদালতে। এ অঞ্চলে ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন অথবা হতে যাচ্ছেন এমন জাতীয় বড় বড় দলের নেতাদের তালিকা ভীষণভাবে বেড়ে যাচ্ছে। তাতে এটা ভাবা যুক্তিসঙ্গত যে, এ দেশগুলোতে আদতে গণতন্ত্রই টিকে থাকবে কিনা!  সম্ভবত সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে হত্যার অভিযোগ। এক বছরেরও কম সময় আগে ক্ষমতা হারিয়েছেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে প্রকিসিউশন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তার সরকারের অধীনে কয়লাখনি প্রকল্প বেসরকারি খাতে দেয়া নিয়ে ওই অভিযোগ। থাইল্যান্ডে গণতান্ত্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন ইংলাক শিনাওয়াত্রা। কিন্তু একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। ধান বা চাল সংগ্রহ খাতে ভর্তুকি দেয়ার ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি এ অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বলাৎকারের। ১৯৫৮ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে মালয়েশিয়া। তার পর প্রথমবার ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড মালয়’জ ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)-এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে বিরোধীরা। ঠিক তখনই আনোয়ারের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে তাকে ৫ বছরের জন্য জেল দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৫ বছরের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ তিনি। মালয় পার্লামেন্টে পিতার বিরুদ্ধে বিচারের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন করায় আনোয়ার ইব্রাহিমের মেয়েকে আটক করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। মালয় পার্লামেন্টে ডানপন্থি হিসেবে তিনি নির্বাচিত একজন এমপি। অবশ্যই এসব রাজনৈতিক মামলার প্রতিটির অরিজিন বা উৎস ভিন্ন। এসব মামলার প্রতিটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে এর ভিন্নতার মাপকাঠিতে। প্রশ্ন রয়েছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে। প্রতিটি দেশের ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক স্বার্থে এতে কি প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। মনমোহন সিংকে ভারতের প্রসিকিউটররা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এটা হতে পারে সবথেকে বাজে এবং উদ্বেগ সৃষ্টিকারী মামলা। কারণ, ভারতে রয়েছে দৃঢ় গণতন্ত্র। এর বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ঈর্ষণীয়। মনমোহনের অধিকার নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে তার যে সমর্থক আছেন তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এমন হতে পারে তার বিরুদ্ধে মামলাটি হতে পারে বিরোধী দল কংগ্রেসকে কিছুটা অবদমিত করার রাজনৈতিক খেলার অংশ। বস্তুত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজনৈতিকভাবে এতটাই চতুর যে, তিনি দলীয় সুবিধা অর্জনের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে তদন্তে হস্তক্ষেপও করবেন না। দুঃখজনকভাবে সত্য যে, অন্য মামলাগুলোতে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত হওয়ার কোন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ মুসলিম গণতান্ত্রিক দেশ বাংলাদেশ। এ দেশটিতে নানা ঐতিহাসিক রেকর্ড আছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলা, তাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হতে পারে। সেটা হতে পারে শুধু তখনই, যদি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে কাজ করার জন্য উদগ্রিব হয়ে থাকেন। বাংলাদেশে দু’নেত্রীর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। তারা কিংবদন্তিতুল্য। দু’জনের প্রত্যেকে  প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দু’জনই আদালতকে ব্যবহার করেছেন প্রতিপক্ষকে ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্য, এর ফলে কি ক্ষতি হতে পারে সেটা দৃশ্যতই চিন্তাভাবনা না করে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগের কারণে এরই মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। যদি প্রকৃতপক্ষে একটি বিচার কার্যক্রম শুরু হয় তাতে ভয়াবহ জন-অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। এতে শেখ হাসিনার শাসনের অধীনে দেশটি যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে তা বিপদগ্রস্ত হবে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়বদ্ধ এমন সরকারি প্রসিকিউটররা এ মামলাটি নিয়ে অগ্রসরমাণ। থাইল্যান্ডে শিনাওয়াত্রার বিচার অত্যাসন্ন। মালয়েশিয়ায় আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে বারবার যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তাতে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতায় যথেষ্ট ঘাটতি থাকবে। থাইল্যান্ডে ইংলাক শিনাওয়াত্রা ও তার ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রা- দুজনই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ২০০৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন থাকসিন শিনাওয়াত্রা। তারা ১৫ বছর থাইল্যান্ডের ক্ষমতায় ছিলেন। তাদের নির্বাচনী ক্ষমতার ইতি ঘটাতে দেশটির জেনারেলরা এবার ইংলাক শিনাওয়াত্রাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন- এটা একেবারে পরিষ্কার। ফলে জেনারেলরা ও ব্যাংককের অভিজাত শ্রেণীর মিত্ররা দৃশ্যত এখন সময়টাকে পাল্টে দেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইংলাকের বিরুদ্ধে অত্যাসন্ন যে বিচার সেটা একটা সংকেত। সংকেত দেয়া হবে যে, থাকসিনদের জনপ্রিয়তা থাইল্যান্ডের ‘ম্যানেজড’ গণতন্ত্রের কাছে হারিয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে থাকসিনপন্থি শক্তিগুলো নিষ্ক্রিয়। তবে তাতে থাইল্যান্ডের গণতন্ত্রকে চিরদিনের জন্য সামরিক বাহিনী দমিয়ে রাখতে পারবে বা অধিকার বঞ্চিত রাখতে পারবে- এমনটা কারও  ভাবা উচিত নয়। দুঃখজনক হলো, মালয়েশিয়াও খুব তাড়াতাড়ি একই রকম সহিংস প্রতিবাদের মুখে পড়তে পারে। এতে তাদের অর্থনীতির অবনমন ঘটবে। এই অর্থনৈতিক পতন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে থাইল্যান্ডকে আঁকড়ে ধরেছে। মালয়েশিয়ার প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার বিচার হওয়া উচিত এমন ধারণাই দিচ্ছে ইউএনএমও। এটা পরিষ্কার যে, এতে বোঝানো হচ্ছে কোন প্রকৃত গণতন্ত্র নেই। যেখানে থাকবে আইনের শাসন। এমন সব প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে তা কোন নিরপেক্ষ আদালত গ্রহণ করতে পারে না। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও দীর্ঘদিনের নেতা লি কুয়ান ইউ এ মাসে মারা গেছেন। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক নেতারা ও এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলো মাঝে মাঝেই তাকে অনুসরণের কথা বলেন, যদিও দেশ দুটি লির দেখানো পথে হাঁটে নি। হ্যাঁ, লি যে ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন তাতে তিনি ৩১ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। ফৌজদারি আদালত নয়, তিনি ব্যবহার করেছিলেন দেওয়ানি আদালত। এই আদালতের মাধ্যমে তিনি তার বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। পৃষ্ঠপোষকতার উপরে ধী শক্তি এটা নিশ্চিত করেছিলেন লি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। সুশাসনের জন্য দ্রুত সংহতকরণের জন্য এই ফর্মুলাই হলো ভিত্তি। এর অধীনে সম্ভ্রান্তদের একচেটিয়া ক্ষমতাকে কঠোর মানদণ্ডে সীমিত করে। কারও প্রতিপক্ষকে ফৌজদারি আদালতে তোলা হলে তাতে দৃশ্যত একই রকম ফল বয়ে আনবে না।
ইউরিকো কোইকি
জাপানের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী
ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা
(ইউরিকো কোইকি জাপানের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তিনি জাপানের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির জেনারেল কাউন্সিলের চেয়ারওমেন ছিলেন। বর্তমানে তিনি ন্যাশনাল ডায়েট-এর একজন সদস্য)
(অনলাইন প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

দুধারি তলোয়ার by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

ঝুঁকে হাঁটছিল লোকটা, বোঝা যায় বেশ খানিকটা দূর থেকে হেঁটে আসছে, শুধু আমাদের বিল্ডিংটার কাছে এসে একবার থমকে দাঁড়াল, তাকাল ওপর দিকে। আমাদের ছয়তলার বারান্দার দিকেই যে তাকাল সেটা নিশ্চিত। আমি তো জানালার ভেতর থেকে তাকিয়ে আছি, আমাকে দেখতে পায়নি। চেহারায় একটু হতাশা ফুটে উঠল কি না, সেটা এত দূর থেকে বুঝব কী করে? এমনকি এত দূর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দও তো শোনার কথা নয়। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, আবার চোখ নামিয়ে সেই একই রকম মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে গেল। দীর্ঘদেহী মানুষটার পিঠ থেকে মাথার দিকটা সামনে ঝুঁকে কেমন বাঁকা হয়ে আছে, দেখে হু হু করে ওঠে বুক। মাঝেমধ্যেই এ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখি, কোথায় যায়, এদিকে কোথায় যাবে? হয়তো শুধু এই বিল্ডিংটার দিকে, এই বারান্দাটার দিকে একবার তাকাবে বলেই কি আসে, কে জানে?...এত ভালোবাসত আমাকে, এত ভালোবাসত...।
কী রকম?
এসব কি আর উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়, যেমন ধরো আমি বাথরুমে ঢুকছি গোসলের জন্য, বলল, এক মিনিট দাঁড়াও, তারপর সে নিজে ঢুকে আগে শাওয়ারের গরম–ঠান্ডা দুটো ট্যাপই ছেড়ে দিয়ে বারবার হাত দিয়ে পরখ করে দেখত দুই রকম পানি মিলেমিশে কুসুমগরম হলো কি না, নিশ্চিত হয়ে তারপর বলত, এবার যাও। আচ্ছা আমি কি ছোট মেয়ে, আমি কি মিশিয়ে নিতে পারি না? এ রকমই, রান্না করতে গিয়ে কখন এক ফোঁটা গরম তেলের ছিটা লাগল হাতে, ব্যস, আহা-উহু শুরু হয়ে গেল—এটা লাগাও, ওটা লাগাও...পারলে আমার ওই হাতটা সারা দিন ধরেই রাখে হাতে। লোকটা তো পাগল!
ওভাবে বলো না। হয়তো পাগলই...স্বাভাবিক একটা মানুষ এভাবে ভালোবাসতে পারে? আমাদের দোতলা বাড়িটার পেছনে একটা জংলামতো জায়গা ছিল, আমাদের সীমানা দেয়ালের বাইরে, আগাছায় ভর্তি, শুধু শরৎকালে কী করে কাশফুলে ভরে যেত পুরো জংলাটা। আমার সকালটা ভালো হয়ে যেত পেছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে। ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি...’ আমি তো এক-আধটু গাইতে পারতাম, শরতের নির্মেঘ আকাশ, কখনো থোকা থোকা সাদা মেঘ আকাশজুড়ে, কখনো হালকা নীল দূর দিগন্ত পর্যন্ত, মন ভালো হয়ে যেত। একদিন বলল, এত ভালো লাগে? ব্যস, পরদিন অর্ধেক কাশবন আমার ঘরে। কাকে দিয়ে গোছা গোছা কাশফুলের গাছ কাটিয়ে এনেছে। আমার ঘরে-বারান্দায়, ফুলদানিতে, মাটির মটকায়—সর্বত্র কাশ আর কাশ। কী করে বোঝাই, জংলায় কাশফুল সুন্দর, ঘরে এলে জঞ্জাল,...হালকা নীল আকাশটা তো ধরে বেঁধে ঘরে আনা যায় না...। পারলে সেটাও নিয়ে আসত হয়তো...হা হা হা। আনতই তো। সাদা পাড়ের হালকা নীল একটা মণিপুরী শাড়ি কিনে এনেছিল পরদিন, সে শাড়ি পরে কাশফুলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে হলো, কত ছবি...।
এসব মিস করো এখন?
মিথ্যা বলব না, করি। ভালোবাসার সঙ্গে একটু পাগলামি না মিশলে ভালোবাসা হয় বলো? জগদ্বিখ্যাত লাভ-ফিকশনগুলো দেখো, সেখানে অনেক অসংগতি, অনেক পাগলামি...সত্যি বলছি মিস করি।
তোমাদের সমস্যাটা শুরু হয়েছিল কখন, কীভাবে?
শুরু তো হয়েছিল শুরু থেকেই। দেশের বাইরে ছিল দীর্ঘদিন, নিউইয়র্কে, ভালো চাকরিও করত। দেশে এসেছিল অল্প কয়েক দিনের জন্য। আমি তখন একটা বেসরকারি ফার্মে চাকরি করতাম, সেই ফার্মের চিফ এক্সিকিউটিভ তার পূর্বপরিচিত, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসে আমাকে দেখল। দেখে তার মনে হয়েছিল, এই মেয়েটাকেই সে খুঁজছে এত দিন ধরে, যাকে এত দিন ধরে খুঁজছে, কেন সেই মেয়েটা আমিই, তার অনেক কারণ ব্যাখ্যা করেছিল, সেই বিস্তারিত বিবরণে যাব না, শুধু বলি এ রকম একটি মেয়ের সঙ্গে বাকি জীবন কাটানোর সুযোগ পেলে নিউইয়র্কের জীবন ঘোড়ার ঘাস কাটার মতোই অর্থহীন মনে হয়েছিল তার কাছে। ঘোড়ার ঘাস কাটা নেহাত অর্থহীন কাজ না, পৃথিবীতে এই প্রাণীটিকেও বাঁচিয়ে রাখার দরকার আছে, হা হা হা...। ঠাট্টা কোরো না। কয়েক দিনের মধ্যেই আমার বস ঘটকালি শুরু করলেন। আমার প্রায় নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার এই প্রস্তাবকে দুর্লভ মনে করেছিল, আর এমন স্মার্ট দীর্ঘদেহী সুদর্শন মানুষটাকে আমারও ভালো না লাগার কোনো কারণ তো ছিল না। বিয়ে হয়ে গেল।
শুরুর কথাটা কী যেন বলছিলে?
হ্যাঁ, শুরু থেকেই সন্দেহ করতে শুরু করল আমাকে। প্রথম তিরটা আমার বসের দিকে, অথচ তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রে তিনিই আমার বিয়ের যাবতীয় দূতিয়ালি করলেন। বলল, ‘রাকিব সাহেবের সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা কেমন?’ বললাম, কেন, ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে তাঁর সাব-অডিনেটের যেমন থাকে, সে রকম। এবার প্রশ্ন, ‘তোমার কী মনে হয় না লোকটা তোমাকে একটু এক্সট্রা ফেবার করেন?’ কী জানি ঠিক ওইভাবে তো ভাবিনি, হতে পারে, বাড়তি একটু স্নেহ আছে বলেই হয়তো তোমার সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যাপারে উদ্যোগ নিলেন। আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘রাকিব সাহেব লোকটা অসাধারণ, দেশি একটা কোম্পানি এত সুন্দর রান করাচ্ছেন, লাভজনক তো বটেই, ডিসিপ্লিন বা অন্য সবকিছু বিবেচনা করলে রীতিমতো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, কিন্তু এত সাফল্য নিয়েও রাকিব বিনয়ী, মার্জিত রুচির ভদ্রলোক।’ বললাম, ঠিকই বলেছ। এই একটা অসাধারণ গুণ ছিল ওর, মানুষের ভালো ব্যাপারটা, সাফল্যের জায়গাটা শনাক্ত করতে পারে। হঠাৎ জানতে চাইল, ‘এ রকম একটা লোক রাকিব, তাঁকে তোমার ভালো লাগেনি?’ বললাম, মানে? ‘মানে এ রকম একটা লোকের প্রতি দুর্বলতা জন্মাল না, প্রেমে পড়লে না ওর?’ কী জবাব দেব, ভাবো এ রকম একটা অদ্ভুত প্রশ্ন বিয়ের মাত্র ১৫-১৬ দিনের মাথায় নিজের স্ত্রীকে কেউ করতে পারে?
তারপর?
বললাম, না, এ রকম ভাবনা আমার মাথায় আসেনি, তা ছাড়া এ রকমই যদি হতো আমি তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হব কেন? কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে কী যেন ভেবেছিল একবার, তারপর বলল, ‘আচ্ছা, ব্যাপারটা তো এ রকমও হতে পারে, আমার সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়াটা রাকিবের একটা চাল, তিনি নিজে বিবাহিত মানুষ, বউ-বাচ্চা আছে, আমার সঙ্গে তোমার বিয়ে করিয়ে দিলে কোনো সামাজিক সমস্যা তৈরি হলো না, নিরাপদে প্রেম চালিয়ে গেল তোমার সঙ্গে...।’ বিশ্বাস করো, আমি হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে, মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত মানুষটার সামনে বসে আছি আমি। এরপর দুই দিন অফিসে যাইনি, তৃতীয় দিন গিয়েছিলাম রেজিগনেশন লেটার হাতে নিয়ে। ব্যস, মামলা ডিসমিস। না, মামলা আর ডিসমিস হলো কই? সন্দেহের বাতিকটা গেল না। আমার এক কাজিন ছিল, ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে অনার্সে পড়তাম আমরা। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, মেট্রিক-ইন্টারমিডিয়েটে স্ট্যান্ড করা ছাত্র, কিন্তু কী এক অজানা কারণে মাস্টার্স পরীক্ষা দিল না। চাকরি-বাকরি নেই, বেকার ঘুরছে। মাঝেমধ্যে আমার বাসায় আসত, তবে আত্মসম্মানবোধ টনটনে, টাকাপয়সা চাইত না, গল্পসল্প করে কখনো দুপুরে খেয়ে যেত। পরের দিকে আমার চেয়েও বেশি আড্ডা দিত আশিকের সঙ্গে। হঠাৎ একদিন ওর প্রসঙ্গ তুলল, ‘তোমার এই কাজিন কিন্তু এক্সট্রা অর্ডিনারি একটা ছেলে, এ রকম গুড হিউম্যান বিয়িং জীবনে কম দেখেছি আমি। আচ্ছা, ওকে কি ভালোবাসো তুমি?’ বললাম, কেন, এ কথা মনে হলো কেন তোমার?
বলল, ‘এমন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, জীবনে কত কিছু করার কথা ছিল, কিছুই হলো না...মন খারাপ হয়ে যায় না? মনে হয় না কত যদু-মধু কত কী করে ফেলল...ওর মতো একটা ছেলে...সিমপ্যাথি...মানে একধরনের করুণা থেকেও তো মানুষের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়...।’ বললাম, আমারই হয়তো দুর্ভাগ্য সে রকম কিছু জন্মায়নি। কিন্তু বিশ্বাস করানো গেল না, শেষে একদিন ফোনে কাজিনকে বললাম, তুই আর আমার বাসায় আসিস না, মিলন। ও তো শুনে আকাশ থেকে পড়ে, ‘আমি তো আজকাল আর তোর কাছে যাই না রে, আশিক ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দিতে যাই, তোর হাজব্যান্ডটা এত ইন্টারেস্টিং লোক...।’ ভাবো! দুজনই পরস্পরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, মাঝখানে আমি দুলছি হাওয়া-লাগা জানালার পর্দার মতো। একটু কঠিন করেই বলে দিলাম, তবু আসিস না তুই, না আসাই ভালো। কী বুঝল কে জানে, মিলন আর আসেনি কখনো। একজন সাইকিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যেতে পারতে। গিয়েছিলাম, কাজ হয়নি, এই রোগের বোধ হয় নিরাময় নেই। এরপর অন্তত আরও তিনজনকে নিয়ে সন্দেহ করেছে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা কী জানো, ওই তিনজনেরই ভালো দিকগুলো কী নিপুণভাবে শনাক্ত করেছে...সাধারণ একটা মানুষকে অসাধারণ করে তোলার এই ক্ষমতা সত্যি বিস্ময়কর! কোনো দিন কোনো মানুষের নিন্দা করতে দেখলাম না এই মানুষটাকে। আমিও তো এ রকম জীবনটা মেনে নিতেই শুরু করেছিলাম। কিন্তু সর্বনাশ হয়ে গেল তোমার ব্যাপারে এসে।
কী রকম?
আমার শ্বশুরের দোতলা বাড়িটা তো একটু পুরোনো আদলের, একদিন বললাম, এটা রেনোভেট করা দরকার। মুখ থেকে কথাটা পড়েছে কি পড়েনি, টাকাপয়সার তো অভাব ছিল না, নেমে পড়ল কাজে, দেশের সবচেয়ে ভালো আর্কিটেক্টকে দিয়ে কাজটা করাতে হবে। পুরোনো বাড়ি, কেন এত নামী আর্কিটেক্ট দরকার বা সে রকম কেউ রাজিই-বা হবেন কেন, এসব কথা ওকে বুঝিয়ে লাভ নেই। ঠিকই তোমাকে ধরে বেঁধে নিয়ে এল, তুমিই-বা কী করে রাজি হয়েছিলে জানি না।
আমি রাজি না হলে হয়তো পরের ইতিহাসটা অন্য রকম হতো।
হ্যাঁ, ইতিহাসটা সত্যি অন্য রকম হতো। মনে আছে, তুমি প্রথম যেদিন এলে খুব বৃষ্টি ছিল, গাড়ি থেকে নেমে ঘরের দরজা পর্যন্ত ছুটে আসতেই ভিজে একসা হয়েছিলে...।
হ্যাঁ, তুমি একটা তোয়ালে এনে দিয়েছিলে। প্রথম দেখায় প্রেম বলে একটা কথা চালু আছে...এসব কথায় অবশ্য বিশ্বাস করার বয়স নয় আমার। কিন্তু তোমাকে প্রথমবার দেখেই চমকে উঠেছিলাম বা মুগ্ধ হয়েছিলাম, এ কথা অস্বীকার করব না।
সেটা তোমার চোখের দিকে না তাকিয়েও টের পেয়েছিলাম, মেয়েদের সামনে-পেছনে মাছির মতো ছটা চোখ থাকে জানো তো? তা ছাড়া নতুন তো নয়, প্লিজ বড়াই করছি ভেবো না, ছেলেরা যে একটু মুগ্ধতার দৃষ্টি নিয়েই তাকায় আমার দিকে, সেটা কম বয়স থেকেই বুঝতে শিখেছি। তুমিও তেমন হেলাফেলার কেউ না, দেশজোড়া নাম তোমার...দেখতে শুনতেও..., তবে সত্যি কথা হচ্ছে, তোমার দিকে আলাদা করে তাকানোর কোনো ভাবনাই আসেনি মনে। তোমাকে আলাদা করে চেনাল আশিকই।
কেমন?
তোমার করা নকশায় আমাদের পুরোনো বাড়ির আদলটাই পাল্টে গেল। বাইরে থেকে দেখে কে বলবে এই বাড়ির বয়স চল্লিশের ওপর। সামনের পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে একবার বাড়িটার দিকে ঘুরে তাকায়নি এমন লোক পাওয়া যাবে না। ইন্টেরিয়রটাও তুমিই করে দিয়েছিলে...অসাধারণ! স্বপ্নের বাড়ি বলে না, তুমি সত্যি একটা স্বপ্নের বাড়ি তৈরি করে দিয়েছিলে। কিন্তু সেই বাড়িটাতে শেষ পর্যন্ত তুমি আমাকে থাকতে দিলে না...।
আমি দিলাম না?
পুরোপুরি দায়ী করব না, তোমার দায় আংশিক। তোমার সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব গড়ে উঠল আশিকের। একদিন আড্ডা দিতে দিতে তুমি বলেছিলে, লিভিং রুমের দেয়ালে একটা পেইন্টিং ঝোলানো দরকার। তোমার কথা তো তখন বেদবাক্য, এককথায় রাজি হয়ে গেল সে। কোন শিল্পীর চিত্রকর্ম সংগ্রহ করা হবে, কোত্থেকে সংগ্রহ করা হবে—এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। তুমিই হঠাৎ প্রস্তাব দিয়ে বসলে, ভাবির একটা পোর্ট্রেট করলে কেমন হয়। লাফিয়ে উঠেছিল লোকটা, গুড আইডিয়া, যত টাকা লাগে, ওর একটা পোর্ট্রেট আপনি করিয়ে দিন। মনে আছে, আমি কী রকম আপত্তি করেছিলাম? কিন্তু তোমরা দুজন কেউই আমলে নিলে না সেই আপত্তি। আমার একটা ফটোগ্রাফ চেয়ে নিয়ে গিয়েছিলে তুমি। কদিন পর আমার প্রতিকৃতির একটা তেলচিত্র নিয়ে তুমি হাজির। তুমি তো স্থপতি, ছবিও আঁকতে পারো জানতাম না দুজনের কেউই। নিজের এমন সুন্দর তেলচিত্র দেখে সত্যি মুগ্ধ হয়েছিলাম, কিন্তু উচ্ছ্বাসটা আড়াল করেছিলাম সেদিন। কিন্তু আশিক তো পাগল, আনন্দে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিল সে। লিভিংরুমে ঝোলানো হয়েছিল ছবিটা, নিশ্চয় এখনো ওখানেই আছে।
কী করে জানলে যে এখনো আছে?
আমি তো লোকটাকে চিনি...।
হুম্। সর্বনাশের কথা বলছিলে...কীভাবে সর্বনাশটা হলো তোমার?
এর পর থেকে তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ লোকটা, এবং যথারীতি সেই সন্দেহ, আমি তোমার প্রেমে পড়েছি কি না, এমন একটা অসাধারণ মানুষের প্রেমে না পড়া কী সম্ভব...ইত্যাদি। তারপর একদিন বলল, তুমি যে আমার প্রেমে পড়েছ, এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। কেন? তরুণ আর্কিটেক্ট, দেশজোড়া তার পরিচিতি, সে আমার মতো বিবাহিত নারীর প্রেমে পড়বে কেন? এসব কোনো প্রশ্ন বা যুক্তি তার মনে ধরে না, সে যেন নিশ্চিত তুমি আমার প্রেমে পড়েছ, প্রেমে না পড়লে একটা মেয়ের এমন নিখুঁত ছবি আঁকা যায় না, এ ছবি ফটোগ্রাফের চেয়ে জীবন্ত...। ধীরে ধীরে আমার প্রতিরোধ ভেঙে যাচ্ছিল। লোকটার ভালোবাসার অত্যাচারটা হয়তো আমি আর নিতে পারছিলাম না। একটা শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল হয়তো। তোমার দিক থেকে আগ্রহটাও টের পাচ্ছিলাম, আর যতবার লিভিংরুমে ওই ছবিটা দেখি, ততবারই নিজেকে ছাপিয়ে তোমার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল আমার।
হা হা হা, এইভাবেই তাহলে সর্বনাশটা ঘটে গেল। কিন্তু আশিককে কি ভুলতে পেরেছ তুমি?
জানি শুনতে ভালো লাগবে না তোমার, তবু স্বীকার করি, না, এ রকম একটা পাগলকে ভোলা যায় না। একবার আমার গলব্লাডারে একটা পাথর ধরা পড়ল, ছোট্ট অপারেশন করাতে হবে। আমাকে অপারেশন রুমে নিয়ে যাওয়ার সময় ডাক্তারের হাত ধরে ছোট্ট শিশুর মতো এমন হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল...ডাক্তার-নার্স সবাই অবাক!
সত্যিই অদ্ভুত লোক।
অদ্ভুত। আমরা তো আসলে একধরনের সো-কল্ড স্বাভাবিক জীবনের মধ্যেই বাস করি, তাই মানুষের স্বাভবিক আচরণগুলো ভুলে যাওয়া যায়, পাগলামি ভোলা যায় না। একবার আমার জন্মদিনে পতেঙ্গার নেভাল বিচে সারা রাত কাটালাম আমরা, প্রচণ্ড ঠান্ডার রাত...শীতে জবুথবু, আমার কোলে মাথা রেখে আধশোয়া হয়ে ছিল, নদী-সমুদ্রের মোহনায় কী রকম যেন অপার্থিব হয়ে উঠেছিল সেই রাত। আরেকবার দার্জিলিংয়ের টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখব বলে শেষরাত থেকে অপেক্ষা করে থাকা; হঠাৎ দেখি হিমালয়ের সাদা বরফচূড়ায় ভোরের সূর্য এসে লাল রং ঢেলে দিল। শৈশবে বরফকুঁচির ওপর লাল স্যাকারিন দেওয়া একধরনের আইসক্রিম পাওয়া যেত মনে আছে? অনেকটা সে রকম। সাদা বরফে যেই সূর্যোদয়ের প্রথম স্পর্শ পড়ল, ঠিক তখনই গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিয়ে একটা চুম্বন করল ঠোঁটে...।
লোকটাকে তো কখনো ভুলতে পারবে না তুমি! আমার ধারণা, এখনো আমার চেয়ে ওকে বেশি ভালোবাসো তুমি।
সন্দেহ করছ?
না, ঈর্ষা হচ্ছে।
ঈর্ষা ভালো, সন্দেহ কোরো না।
এখন তোমার কোনো যোগাযোগ নেই ওর সঙ্গে?
তুমি কিন্তু সন্দেহ করছ।
এই যে লোকটা প্রায়ই আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, তুমি বলছ আড়াল থেকে তাকে দেখো, তুমি কখনো দাঁড়াওনি বারান্দায় গিয়ে? ইশারায়ও কথা হয়নি কখনো?
তুমি কিন্তু সত্যি সন্দেহ করছ।
কোনো দিন যদি দেখা না হয়, তাহলে লোকটা দিনের পর দিন কী আশায় হেঁটে যায় এই রাস্তা দিয়ে? এমন কি হতে পারে না, তোমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেই একটা নির্দিষ্ট সময়ে এই পথ দিয়ে হেঁটে যায় আশিক, যখন আমি বাড়িতে থাকি না।
তুমি সত্যি সন্দেহ করছ আমাকে?
একই শহরে থেকে তোমাদের কোনো যোগাযোগই নেই, এ কথা বিশ্বাস হচ্ছে না...।
সন্দেহ কোরো না, সন্দেহ দুধারি তলোয়ার যেতেও কাটে, আসতেও কাটে।

'সিভিল সমাজ প্রায় ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে' - সাক্ষাৎকারে : আকবর আলি খান by শানজিদ অর্ণব

ড. আকবর আলি খানের জন্ম ১৯৪৪ সালে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে ১৯৬৪ সালে স্নাতক ও ১৯৬৫ সালে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭১ সালে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগের উপসচিবের পদে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। ১৯৭৭ ও ১৯৭৯ সালে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে যথাক্রমে এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বসহ বিভিন্ন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০২ থেকে ২০০৫ সময়কালে তিনি বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার পক্ষে বিশ্বব্যাংকে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিশ্বব্যাংক থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর গভর্নমেন্ট স্টাডিজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তিনি একজন উপদেষ্টা হলেও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে পদত্যাগ করেন। 'পরার্থপরতার অর্থনীতি', 'Discovery of Bangladesh', 'আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি' তার প্রণীত উল্লেখযোগ্য বই। দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট, নাগরিক সমাজ, প্রশাসনের রাজনীতিকীকরণ, নিজের লেখালেখি প্রভৃতি বিভিন্নমুখী বিষয়ে কথা বলেছেন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শানজিদ অর্ণব
আলোকিত বাংলাদেশ : বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট কতটা গভীর বলে মনে করেন? এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন কি?
আকবর আলি খান : সঙ্কট অবশ্যই গভীর। কারণ এ সঙ্কট শুধু আজকের সৃষ্টি নয়, তিন দশক ধরে এ সঙ্কট বিরাজ করছে। বর্তমানে এটা গভীরতর হয়েছে। মনে হয় না অদূর ভবিষ্যতে এ সঙ্কট সমাধানের খুব বেশি সম্ভাবনা আছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সবাই শঙ্কিত এবং আমরা চাই যে, বাংলাদেশের স্বার্থে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেন আমরা গড়ে তুলতে পারি যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকশিত হতে পারে।
প্রশ্ন : আমরা জানি যে, আপনি 'উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ' নামের একটি ১৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সদস্য...
আকবর : নাম কী আছে সেটা আমি জানি না। আমি একটা কমিটির সদস্য ছিলাম।
প্রশ্ন : সদস্য ছিলেন মানে, এখন কি আর নেই?
আকবর : মানে এখনও আছি; কিন্তু ওটা তো আর এখন কোনো কাজ করছে না।
প্রশ্ন : কমিটির প্রধান সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা মার্চ মাসের শুরুর দিকে বলেছিলেন, চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে কমিটির পক্ষ থেকে একটি ফর্মুলা প্রকাশ করা হবে। এ ফর্মুলা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?
আকবর : আমি কোনো ফর্মুলা সম্পর্কে অবগত নই। আমি এ বিষয়ে যেটা বলতে পারি যে, আমরা চলমান সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা যারা একত্রিত হয়েছিলাম তাদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক পদে যাব না। আমার কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নেই। আমরা চাই, এ সমস্যাটা সমাধান হোক। সেটা তুলে ধরার জন্যই আমি তাদের সঙ্গে একত্রিত হয়েছিলাম। আমাদের নিজস্ব কোনো ফর্মুলা নেই। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যদি আমাদের সমর্থন চায় তাহলে হয়তো আমরা তাদের সহায়তা করতে পারি। তারা যদি নিজেরা সমাধান বের করতে পারে সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে।
প্রশ্ন : ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনকে কীভাবে দেখছেন?
আকবর : নির্বাচন তো সবসময়ই ভালো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ৭ বছর দেরি হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির অঙ্গে পরিণত হয় এবং ৭ বছর পর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা চাই নির্বাচন হোক এবং যথাসময়ে নির্বাচন হোক। যথাসময়ে নির্বাচন হলে জনসাধারণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী সংস্কার চাইলেও নির্বাচনী ব্যবস্থার যে ত্রুটি আছে সেটা তুলে ধরার জন্য নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত। নির্বাচন থেকে দূরে থাকলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যে ত্রুটিগুলো আছে সেগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমি মনে করি, নির্বাচন হলে সব দলেরই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত। কিন্তু নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে সেটাও তুলে ধরা উচিত। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হলে ফল মেনে নেয়ার মতো মানসিক শক্তি থাকা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : সরকারি দল বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে তাদের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগের কথা বলে। একই আহ্বান জানিয়েছে কিছু বিদেশি সংস্থাও। অন্যদিকে দেশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও আছে বিভিন্ন মহল থেকে। এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
আকবর : জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে সরকার যেসব অভিযোগ এনেছে সেগুলো সত্য হলে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা উচিত। জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার বেশ কয়েকটি বক্তব্যে আমি স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করবে না অথচ বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগের যে উপদেশ দিচ্ছে তার মধ্যে রাজনীতি ছাড়া আমি আর কোনো উদ্দেশ্য দেখি না। সরকার যদি এর সত্যিকার সমাধান করতে চায় তাহলে সরাসরি জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এরপরও যদি বিএনপি তাদের সঙ্গে জোট বাঁধে তাহলে সরকার তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। বিষয়টা সম্পূর্ণভাবে একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশ্ন : স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অরাজনৈতিক নির্বাচন বলা হয়...
আকবর : আমি মনে করি বাংলাদেশে এমন কিছু নেই যেটা রাজনীতির বাইরে। সর্বগ্রাসী রাজনীতি বাংলাদেশের সবকিছু গ্রাস করে বসে আছে। আপনি যদিও বলেন যে, স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থাকা উচিত নয়; কিন্তু বাস্তবে এগুলো সবই রাজনৈতিক দলগুলো দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। শুধু এখানে নয়, যখন শিক্ষক পরিষদের নির্বাচন হয় সেখানেও রাজনীতি, যখন আইনজ্ঞদের সমিতির নির্বাচন হয় সেখানেও রাজনীতি, যখন চিকিৎসকদের প্যানেলের নির্বাচন হয় সেখানেও রাজনীতি। বাংলাদেশের সব জায়গায় রাজনীতি আছে।
প্রশ্ন : আপনি বললেন যে, সর্বগ্রাসী রাজনীতি বাংলাদেশের সবকিছু গ্রাস করে বসে আছে। এ অবস্থা দেশের ভবিষ্যৎকে কীভাবে প্রভাবিত করবে?
আকবর : এটা তো ভবিষ্যৎ নয়, এটা আমাদের অতীতকেও কালিমালিপ্ত করেছে। বর্তমানকেও দুঃসহ করে তুলেছে এবং ভবিষ্যতেও এর প্রভাব খারাপ হবে। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে যেটা হয়েছে সেটা হলো সিভিল সমাজকে রাজনীতিকরণ করে প্রায় ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। সিভিল সমাজ একটা দেশে কেন থাকে? রাষ্ট্র যখন খুব বেশি ক্ষমতার অধিকারী হয় তখন সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করার জন্য সিভিল সমাজগুলো বিভিন্ন পেশা বা অন্যান্য ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে যেটা হয়েছে যে, যত পেশাভিত্তিক সংগঠন আছে সেগুলো সবই রাজনৈতিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। এরা বর্তমানে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। অথচ পাকিস্তান আমলে এমনকি বাংলাদেশেও আশির দশকে এরা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এখন তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে, তাই তাদের কোনো শক্তি নেই।
প্রশ্ন : একটি অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকার সময় প্রশাসনকে দলীয়করণ করে। আপনি কি মনে করেন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর কারণে বা চাপে প্রশাসনের দলীয়করণ হয় নাকি প্রশাসনের শীর্ষে যারা থাকেন তারাও রাজনৈতিক দলের প্রভাব বলয়ে থাকতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন?
আকবর : দুইটিই আছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা মুখ্য। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যখন দেখেন যে, রাজনীতিকরণ করলে তাদের লাভ হবে তখন তারাও এর অংশীদার হওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে আমরা এমন এক পর্যায়ে এসেছি যে, এখন বাংলাদেশে ভালো লোকদের দুষ্ট লোকরা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বর্তমানে প্রশাসনে রাজনীতিকীকরণ প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার পথে। অতীতে যে সরকার ছিল তারাও একই পদ্ধতিতে রাজনীতিকীকরণ করেছে। এর ফলে প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে।
প্রশ্ন : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বর্তমান সরকার নিজেদের সফল মনে করে। আপনিও কি তাই মনে করেন?
আকবর : সরকার যেটা বলে সেটা এক অর্থে ঠিক আবার অন্য অর্থে ঠিক নয়। ঠিক এই অর্থে যে, বাংলাদেশের অথনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে। ১৯৭০ সালের তুলনায় যদি আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকাই তাহলে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক উন্নতি শুধু আওয়ামী লীগ সরকার করেনি, বিএনপি সরকারও করেছে। দেখা যাবে, এক সরকারের পরে যারা আসে তারা আরও ভালো করে, এরপর যারা আসে তারা আরও ভালো করে। এটা হলো একটা দিক। আরেকটা দিক হলো যত উন্নতিই আমরা করে থাকি না কেন, বিশ্বের দেশগুলোর অগ্রগতি আরও অনেক বেশি ঈর্ষণীয়। এর ফলে আমাদের অগ্রগতি বিশ্বের অগ্রগতির তুলনায় যথেষ্ট সন্তোষজনক নয়। আমাদের আরও অনেক সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক মানে যদি আমরা দারিদ্র্যসীমা বিচার করি তাহলে বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে। কিন্তু জাতীয় যে দারিদ্র্যসীমা সেটার হিসাবে আমাদের এখানে দারিদ্র্যসীমা ২৫ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। কাজেই এ ধরনের সংখ্যায় অনেক হেরফের আছে। সামগ্রিকভাবে আমার বক্তব্য হলো, আন্তর্জাতিক মানে আমাদের আরও অনেক এগোনোর অবকাশ রয়েছে।
প্রশ্ন : আপনার 'ডিসকভারি অব বাংলাদেশ' বইয়ে বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রসারের কারণ নিয়ে আলোচনা করেছেন। আজকের দিনে এসে দেখা যাচ্ছে, এদেশে ইসলামী চরমপন্থার এক ধরনের বিকাশ হচ্ছে। এ দুই পরিস্থিতি সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।
আকবর : অনেক মানুষ প্রশ্ন করে থাকেন যে, এদেশের মানুষ কেন মুসলমান হয়েছে? আমার মনে হয়, ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে সেই প্রশ্নটা সবচেয়ে বড় নয়। প্রথম কথা হলো, তৎকালে ভারতে ধর্ম পরিবর্তন করার স্বাধীনতা ছিল কিনা। আমার কথা হলো, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের গ্রাম প্রশাসনের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদের এমন একটা সংমিশ্রণ ছিল যে সেখানে লোকের পক্ষে ধর্মান্তরকরণের কোনো সুযোগই ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশে খুব বেশি শক্তিশালী গ্রাম প্রশাসন ছিল না। সেজন্য এখানকার লোকের পক্ষে ধর্মান্তরকরণ সম্ভব হয়েছে। শুধু মুসলিম আমলেই নয়, এর আগে হিন্দু আমলেও বিভিন্ন সহজিয়া মতবাদ প্রাধান্য লাভ করেছে। ব্রাহ্মণ্যবাদ এখানে কখনও প্রাধান্য লাভ করেনি। বৌদ্ধরা এখানে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে যারা মুসলমান হয়েছে তারা জেনেশুনে মুসলমান হয়েছে। কারণ তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ছিল এবং তারা সেই অধিকার প্রয়োগ করেছে। যারা এখানে হিন্দু ছিলেন তারাও জেনেশুনে হিন্দু ছিলেন। এখানে কারও ওপর ধর্ম চাপিয়ে দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ তাদের হৃদয়ের ডাক অনুসারে ধর্মের চর্চা করেছে। এ কারণে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ভারতের জনসংখ্যা থেকে ধর্মীয় দিক থেকে বিভিন্ন। এর মূল ভিত্তি বাঙালির মানবতাবাদ। 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই' এটা বাঙালি মুসলমান-হিন্দু সবাই বিশ্বাস করে। এই মানবতাবাদ কখনও উগ্রপন্থী মৌলবাদী ছিল না। উগ্রপন্থী মৌলবাদ কিন্তু আজকের সৃষ্টি। মাদরাসা শিক্ষিত ছাত্ররা উগ্রপন্থী মৌলবাদী নয়। উগ্রপন্থী মৌলবাদী হলো পশ্চিমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরা। সুতরাং আজকের মৌলবাদের ভিত্তির সঙ্গে আমাদের ইতিহাসের যে ধারা তার কোনো মিল নেই। কিন্তু এর প্রভাব সব দেশেই পড়ছে এবং বাংলাদেশেও পড়বে। কারণ বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ সেটাই মূর্ত হচ্ছে উগ্রবাদী ধারায়। এ সমস্যা বাংলাদেশের পক্ষে আলাদা করে সমাধান করা সম্ভব নয়। সামগ্রিক বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতেই এ সমস্যার সমাধান হবে।
প্রশ্ন : এখন কী নিয়ে লেখালেখি করছেন?
আকবর : বাংলাদেশের গণপ্রশাসনের ওপর আমার একটি বই খুব শিগগির বের হবে। বইটির নাম "গ্রেশামস ল সিনড্রম অ্যান্ড বিয়ন্ড"। বইটির বক্তব্য হচ্ছে বাংলাদেশে গ্রেশামস ল'-এর মতো একটি ব্যাধি কাজ করছে। গ্রেশামস ল' অর্থনীতিতে বলে যে, খারাপ টাকা ভালো টাকাকে তাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের প্রশাসনেও বর্তমানে খারাপ লোকরা ভালো লোকদের তাড়িয়ে দিচ্ছে এবং এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে আমি বাংলাদেশের প্রশাসনে বিভিন্ন সমস্যা বিশ্লেষণ করেছি এই সাড়ে ৩০০ পাতার বইয়ে। আমার মনে হয়, বইটি এক-দেড় মাসের মধ্যে প্রকাশিত হবে।
প্রশ্ন : আত্মজীবনী লিখবেন কি?
আকবর : আত্মজীবনী লিখব, তবে সবশেষে লিখতে চাই। যাতে আমি মারা যাওয়ার পর প্রকাশ হয়। জীবদ্দশায় সত্য কথা বলার অনেক কষ্ট আছে।
প্রশ্ন : আমাদের সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আকবর : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

একদিকে গ্যাসের ঘাটতি, অন্যদিকে অপচয় by অরুণ কর্মকার

দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। উৎপাদিত হচ্ছে গড়ে ২৫০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি ৫০ কোটি ঘনফুট। এ অবস্থায়ও দৈনিক প্রায় ৪০ কোটি ঘনফুট (মোট উৎপাদনের ১৬ শতাংশ) গ্যাস অপচয় হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক, বাণিজ্যিক—সব ক্ষেত্রেই হচ্ছে অপচয়। ঘাটতির কারণে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৪০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট। সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সার কারখানা বন্ধ রাখতে হয়। কিন্তু অপচয় কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
পেট্রোবাংলার সূত্র এবং বেসরকারি গবেষকেরা বলেন, পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানার অদক্ষ যন্ত্রপাতি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সেকেলে প্রযুক্তির বয়লার এ অপচয়ের প্রধান কারণ। এ ছাড়া আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতেও বিপুল পরিমাণ গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। তাঁরা বলেন, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ, সার ও শিল্পপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, যন্ত্রপাতির দক্ষতা বাড়ানো হলে তাতে সর্বোচ্চ ২১০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস লাগার কথা নয়। অর্থাৎ বর্তমানে চাহিদার তুলনায় দেশে দৈনিক গ্যাসের যে ঘাটতি রয়েছে, অপচয় বন্ধ করে তার প্রায় সবটাই পূরণ করা সম্ভব।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জ্বালানি দক্ষতা (এনার্জি এফিশিয়েন্সি) বিষয়ের গবেষক ইজাজ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি অপচয়ের বিষয়টি দীর্ঘদিন একেবারেই অবহেলিত ছিল। যুগের পর যুগ অদক্ষ যন্ত্রপাতি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের অপচয় করা হয়েছে। এখন জ্বালানি-সংকট দেখা দেওয়ায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কিছু কাজও শুরু হয়েছে। বেসরকারি খাতের অল্প কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জ্বালানির দক্ষ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেছে। সরকারও তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
তিতাসের জরিপ: দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি একটি জরিপ করে দেখেছে, তাদের বিতরণ এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পুরোনো প্রযুক্তির বয়লার নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে দৈনিক ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। এই রূপান্তরে ব্যয়ও বেশি নয়। এ ছাড়া আবাসিক গ্রাহকদের চুলা উন্নত প্রযুক্তির করা হলে এবং রাস্তা থেকে রান্নাঘরে গ্যাস সরবরাহের লাইন যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে প্রতিদিন গ্যাস সাশ্রয় হবে ১০ কোটি ঘনফুট। এ কাজেও ব্যয় হবে সামান্য।
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন দেশে উৎপাদিত মোট গ্যাসের ১২ শতাংশ (৩০ কোটি ঘনফুট) ব্যবহৃত হচ্ছে আবাসিক খাতে। আর শুধু তিতাসের এলাকায় প্রতিদিন ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের অপচয় হচ্ছে।
তিতাস অবশ্য শিল্পে উন্নত প্রযুক্তির বয়লার ও উন্নত চুলার ব্যবহার উৎসাহিত করে গ্যাস সাশ্রয়ের উদ্যোগ কয়েক বছর আগেই নিয়েছে। কিন্তু এখনো এতে উল্লেখযোগ্য ফল মেলেনি। সম্প্রতি হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পগ্রাহক তাঁদের বয়লার ও যন্ত্রপাতি জ্বালানি-সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে তিতাস সূত্র জানায়।
বিদ্যুতে অপচয়: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, দেশে এখন গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা ছয় হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এসব কেন্দ্রের জ্বালানি দক্ষতা (ফুয়েল এফিশিয়েন্সি) ৩৫ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু এখন উন্নত প্রযুক্তির গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি দক্ষতা ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ। পুরোনো কেন্দ্রগুলোর প্রযুক্তি পরিবর্তন করা হলে এখনকার তুলনায় প্রায় অর্ধেক জ্বালানি ব্যবহার করে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
এ ব্যাপারে সরকারি সূত্রগুলো জানায়, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে অনেক কম থাকায় এবং অর্থসংকটের কারণে পুরোনো কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে প্রযুক্তি পরিবর্তনের সুযোগ কখনো পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, আশির দশকে চীনের ঋণে চট্টগ্রামের রাউজানে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার সময়ও কেন নতুন প্রযুক্তি নেওয়া হলো না। তখন তো আর পুরোনো কেন্দ্র বন্ধ রেখে করার প্রশ্ন ছিল না। আসলে সরকার জ্বালানি দক্ষতার বিষয়টিকে কখনো তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
পিডিবি সূত্র জানায়, তাদের প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর জ্বালানি দক্ষতা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। এই কেন্দ্রগুলোতে যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে এখনকার তুলনায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারে। সে জন্য ওই কেন্দ্রগুলো নবায়নের জন্য বিপুল অর্থ দরকার। তবে সেই অর্থের পরিমাণ অপচয় হওয়া জ্বালানির তুলনায় অনেক কম।
বিদ্যুতের আরেকটি বড় অপচয়ের ক্ষেত্র ক্যাপটিভ পাওয়ার (বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন)। এ ক্ষেত্রে কম দামে গ্যাস দেওয়া হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা ক্ষেত্রবিশেষে ২০ শতাংশের কম।
সারেও অপচয়: ইউরিয়া সার কারখানাগুলোতেও জ্বালানির অপচয় ব্যাপক। কর্ণফুলী সার কারখানা (কাফকো) বিদেশি বিনিয়োগে স্থাপিত একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। এ কারখানায় এক মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনে গ্যাস লাগে ২৪ হাজার ঘনফুট। অপর দিকে সরকারি কারখানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ যমুনা সার কারখানায় এক টন ইউরিয়া উৎপাদনে গ্যাস লাগে ৩২ হাজার ঘনফুট। চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানায় লাগে ৪২ হাজার; ঘোড়াশালের জিয়া ও পলাশ সার কারখানায় লাগে যথাক্রমে ৪৩ ও ৪৯ হাজার ঘনফুট। আশুগঞ্জের সার কারখানায় লাগে ৭৩ হাজার ঘনফুট। ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় লাগত ৮২ হাজার ঘনফুট। এটি বন্ধ করে নতুন শাহজালাল সার কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে।
অধ্যাপক ইজাজ বলেন, কারখানাগুলোর প্রযুক্তি পরিবর্তন করে এ অপচয় বন্ধ করা যায়। কাফকোর মতো প্রতিষ্ঠানকে তা করতেই হয়। কারণ, তাদের তো আন্তর্জাতিক দামে গ্যাস কিনতে হয়। দেশের কারখানাগুলো কম দামে গ্যাস পায়। ফলে জ্বালানির অপচয় নিয়ে তাদের এবং সরকারের মাথাব্যথা কম।
সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এই ক্ষতি সরকারি খাতই বেশি করছে। সরকার কারখানাগুলোর আধুনিকায়নে বিনিয়োগ না করায় এ ক্ষতি হচ্ছে। আবার এ ক্ষতির কারণেই সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে নতুন বিনিয়োগ করার মতো অর্থ আসছে না।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শিল্পের বয়লার ও পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর একটি কার্যক্রম নেওয়া হয়েছিল। কিছু কাজও হয়েছিল। তবে সময়স্বল্পতায় তা বেশি দূর এগোয়নি।

দিনে গড়ে ১৫ খুন by নুরুজ্জামান লাবু

সারা দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বেড়েই চলছে খুনের ঘটনা। পারিবারিক ও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন খুনের ঘটনা ঘটছে, তেমনি রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়েও প্রতিপক্ষকে খুন করা হচ্ছে নির্মমভাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ব্যস্ত থাকায় সুযোগ নিচ্ছে সন্ত্রাসীরাও। সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৫ জন খুন হচ্ছেন। পাল্টেছে খুনের ধরনও। আগের চাইতে আরও বেশি নির্মমতা দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সন্ত্রাসীরা সুযোগ নিচ্ছে। এছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক বন্ধনেও চিড় ধরেছে। অর্থনৈতিক কারণেও ঘটছে খুনের ঘটনা। এ সবের মূল কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হওয়া। অপরাধ করে পার পাওয়া যায় বা অর্থ দিয়ে সব ‘ম্যানেজ’ করার সংস্কৃতি চালু হওয়ায় মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েই চলছে। এর প্রতিকার করতে হলে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নূরুল হুদা বলেন, সমাজে অস্থিরতা থাকলে খুন-খারাবি বাড়ে। এর অন্যকোন কারণ নেই। আর বেশির ভাগ খুন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হয় বলে আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তা ঠেকানোর সুযোগ নেই। তবে যেটি করতে হবে তা হলো, খুনের তদন্ত সঠিক ও দ্রুততম সময়ে করে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কয়েকটি নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উপ-পরিচালক সীতাংশু শেখর বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায় এক দুর্বৃত্ত। শীতাংশুর স্ত্রী কৃষ্ণা কাবেরী মণ্ডলকে পিটিয়ে হত্যার পর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলে। এ ঘটনায় ওই দম্পতির দুই মেয়েও আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর একদিন আগেই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন দক্ষিণ বেগুনবাড়ী এলাকায় ওয়াসিকুর রহমান বাবু নামে এক ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলাকারীরা বাবুর মাথায় চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। যাতে তার চেহারাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া গত মঙ্গলবার সকালে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় নিজ বাসায় সূর্যি বেগম (৭৫) ও মাফিয়া বেগম (৫০) নামে মা-মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তাদের দুজনের মাথাসহ শরীরজুড়ে অসংখ্য ধারালো অস্ত্রের গুরুতর জখম ছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে হাসপাতালে নেয়ার আগেই তারা মারা যান বলে জানিয়েছে স্থানীয় থানার পুলিশ। ২৯শে মার্চ টাঙ্গাইলের গোপালপুরে এক পাষণ্ড ছেলে তার বৃদ্ধা মাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। গত ২৪শে মার্চ রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে নিজ বাসায় খুন হন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুসের বৃদ্ধা স্ত্রী রওশন আরা বেগম ও গৃহকর্মী কল্পনা। মাত্র দশ হাজার টাকা চেয়ে না পেয়ে বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে রওশন আরা বেগমকে গলা কেটে হত্যা করে সাঈদ নামে ওই বাসার গৃহকর্মীর ছেলে। হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য দেখে ফেলায় ঘাতক সাঈদ তার আপন বোন কল্পনাকেও গলা কেটে হত্যা করে। এর আগে গত ১০ই মার্চ রাজধানীর ফকিরাপুলে সুমি নামে এক তরুণীকে হত্যার পর সাত টুকরা করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। এছাড়া নিহত তরুণীর পরিচয় যেন শনাক্ত না হয় এজন্য তার মাথা ও মুখমণ্ডল পুড়িয়ে চেহারা বিকৃত করা হয়। ১১ই মার্চ সিলেটে আবু সাঈদ নামে নয় বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রকে অপহরণের পর শ্বাসরোধ করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় পরে এক পুলিশ সদস্যেরও জড়িত থাকার প্রমাণ পায় তদন্তকারীরা। এছাড়া একদিন আগে ৯ মার্চ বনানীতে বাসের ভেতর ফেলে যাওয়া একটি ট্রাভেল ব্যাগের ভেতর থেকে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত মাসের ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’র পাশে শ’ শ’ মানুষের সামনেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ব্লগার ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ড. অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায় দুর্বৃত্তরা। এতে অভিজিৎ রায় মারা গেলেও প্রাণে বেঁচে যান বন্যা। বিষয়টি নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ক্রমশ লোপ পাচ্ছে। চিড় ধরছে সামাজিক বন্ধনেও। মানুষ হয়ে উঠছে ভোগবাদী। কমছে মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ। এ কারণে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে একে-অপরকে নৃশংসভাবে খুন করতেও দ্বিধা করছে না। স্বামীর হাতে স্ত্রী কিংবা স্ত্রীর হাতে স্বামী যেমন খুন হচ্ছেন, তেমনি বাবা-মা খুন করছেন নিজের সন্তানকে আবার সন্তানের হাতেও খুন হতে হচ্ছে মা-বাবাকে। ভাইয়ের হাতে ভাই আর আত্মীয়ের হাতে আত্মীয় খুন হওয়ার ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্যরা। খুনের ধরনও দিনকে দিন পাল্টে যাচ্ছে। অপেক্ষাকৃত নৃশংস খুনের ঘটনা বেড়েই চলছে। হত্যার পর লাশ টুকরো করে ফেলা বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা এবং গলা কেটে হত্যার সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সামাজিক অস্থিরতার কারণে মানুষ এমন নৃশংস হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে সমাজে অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়। সমাজে ভারসাম্য বজায় না থাকলে যারা বঞ্চিত তাদের মধ্যে ‘ক্রুয়েলটি’ বেড়ে যায়। এজন্য সমাজে ভারসাম্য বজায় রাখাটা খুবই জরুরি। তিনি বলেন, আইন ও বিচার ব্যবস্থা এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে খুনের মতো বড় অপরাধ করে কেউ আইনের ফাঁক-ফোকর গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, খুনের ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। খুন করে কেউ একজন পার হয়ে যাওয়া মানে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। তাকে দেখে অন্যরা উৎসাহিত হয়ে থাকে। এছাড়া বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় দরে বিচারকার্য চলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য বা স্বজনেরাও একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসী বা দুর্বৃত্তরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক ও পারিবারিক কারণে নৃশংস খুনের সংখ্যা বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ছে। একমাত্র আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই এসব খুন-খারাবি ঠেকানো সম্ভব। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, খুনের ঘটনার পরও দায়ী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতা আর অর্থ দিয়ে ‘ম্যানেজে’র মাধ্যমে পার পেয়ে যাচ্ছে। এ রকম একটি ঘটনাও ঘটলে সেটি অন্যদের মধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। অন্যরা উৎসাহিত হয় যে, খুন করেও ‘শক্ত খুঁটি’ থাকলে পার পাওয়া যায়। এজন্য অপরাধ বিশেষজ্ঞরা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার ৯৭৫ জন খুন হয়েছেন। শুধু চলতি বছরের গত তিন মাসে সারা দেশে আরও অন্তত হাজার খানেক খুনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সালে সারা দেশে ৩ হাজার ৯৮৮ জন, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৯৬৬ জন, ২০১২ সালে ৪ হাজার ১১৪ জন, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৩৯৩ জন ও ২০১৪ সালে ৪ হাজার ৫১৪ জন খুন হয়েছেন। এই হিসাবে সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৪-১৫ জন খুন হচ্ছেন। ডিএমপির হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচবছরে রাজধানী ঢাকাতেই খুন হয়েছেন ১ হাজার ৪২৪ জন। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই খুনের সংখ্যা অর্ধশতক পেরিয়ে গেছে। পুলিশের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে খুন-খারাবির ঘটনা ঠেকানোর চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু পারিবারিক কলহের জের ধরে সংগঠিত হওয়া খুন ঠেকাতে হলে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। এছাড়া আসামিদের গ্রেপ্তারের পর দ্রুত বিচারকার্য শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সিটি নির্বাচনে আচরণবিধি- মন্ত্রীর অসংযমী কথাবার্তা দুঃখজনক

বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে অনেক সময় সরকারদলীয় প্রভাবশালী নেতাদের বাড়াবাড়ি বিশেষ করে বাক-অসংযম লক্ষ করা যায়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্দোলনের নিউক্লিয়াস হিসেবে পরিচিত মাগুরার উপনির্বাচন থেকে সাম্প্রতিক কালের গাজীপুরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মন্ত্রীদের তৎপরতা বিধিলঙ্ঘনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সরকারে যাঁরা আছেন, তাঁদের কাছ থেকে অধিকতর দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ প্রত্যাশিত। কিন্তু এর বিপরীত ঘটলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের যে পূর্বশর্ত, তা ব্যাহত হতে বাধ্য।
গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন মনে করেন, ‘তিনটি সিটি করপোরেশনে অবশ্যই যেকোনো প্রকারে হোক আমাদের জিততে হবে।’ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনটি আইনগতভাবে দলীয় ভিত্তিতে যে অনুষ্ঠিত হয় না, তার কতিপয় উদ্দেশ্য রয়েছে। কিন্তু দায়িত্বশীল কোনো মন্ত্রী যখন ‘যেকোনো প্রকারে’ জয়লাভ করার মতো প্রগলভ উক্তি করেন, তখন তা প্রশাসনে ও সমাজে ভুল বার্তা পৌঁছায়। এটি সুস্পষ্টভাবে আচরণবিধির লঙ্ঘন।
সবার মনে রাখা উচিত, গভীরতর রাজনৈতিক সংকটকালে বিএনপির প্রচ্ছন্ন অংশগ্রহণে তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন হচ্ছে। এখানে প্রথাগতভাবে বিদেশি পর্যবেক্ষক না থাকলেও নানা কারণে এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগের কেন্দ্রে আসতে পারে।
দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠান ও তার ফলাফল বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব মহলই আশা করবে, এই নির্বাচনের পরিবেশ যেন ক্ষমতাসীন দলের অতি উৎসাহীদের বাড়াবাড়ির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের সরাসরি প্রভাব নেই। এমনকি প্রভাব থাকলেও মন্ত্রীর মুখে ‘যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে জিততে হবে’ উক্তি মানায় না। ভোটারদের প্রতি ন্যূনতম আস্থা থাকলে কেউ এ ধরনের দায়িত্বহীন উক্তি করতে পারেন না।
নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে এ বিষয়ে আগেভাগেই কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। তাদের তরফে সরকারের প্রভাবশালীদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করা হলে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ঐতিহাসিক সমঝোতা- ইরান ছাড় দেবে, পশ্চিমারা তুলে নেবে অবরোধ

মতৈক্য হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে যাচ্ছেন ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক
প্রধান ফেদেরিকা মগেরিনি (ডান থেকে) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ
জারিফ। বাঁয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি l ছবি: রয়টার্স
অবশেষে ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে তেহরান ও ছয় বিশ্বশক্তি। সুইজারল্যান্ডের লুজান শহরে আট দিন ধরে আলোচনার পর গতকাল বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা সমঝোতার বার্তা দিলেন। বার্তায় জানানো হলো, ইরান ছাড় দেবে, পশ্চিমারা তুলে নেবে অবরোধ। খবর এএফপি ও বিবিসির।
এ সমঝোতার আওতায় ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশটি সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা ১৯ হাজার থেকে কমিয়ে ছয় হাজারে নিয়ে আসবে। নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুত কমিয়ে আনবে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকেরা ইরানের সেন্ট্রিফিউজ ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামোগুলো পর্যবেক্ষণ করবে। স্থাপনাগুলো নিয়মিতভাবে পরিদর্শন করতে পারবে আইএইএ। ইরান মারকাজি প্রদেশের রাজধানী আরাকে ভারী পানির চুল্লির নকশার পরিবর্তন করবে, যাতে দেশটি আর অস্ত্র তৈরির পর্যায়ের প্লুটোনিয়াম তৈরি করতে না পারে।
এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে পশ্চিমাদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে শিথিল করা হবে। পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইরানের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেগুলো ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হবে।
যেভাবে ঘোষণা এল: লুজানে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রূপরেখা চুক্তির বিষয়ে মতৈক্যের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে ছয় বিশ্বশক্তির পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মগেরিনি ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ উপস্থিত ছিলেন।
জারিফকে পাশে রেখে মগেরিনি ঘোষণা করেন, অবশেষে ‘চূড়ান্ত পদক্ষেপ’ অর্জন সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মূল বিষয়গুলোর সমাধানে যৌথভাবে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। আলোচকেরা এখন এই কর্মপরিকল্পনার খসড়া বিষয়বস্তুর জন্য কাজ শুরু করবেন।
এর আগে খুদে বার্তা লেখার ওয়েবসাইট টুইটারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফ জানান, ‘সমাধান পাওয়া গেছে। শিগগিরই খসড়া প্রস্তুতের কাজ শুরু হবে।’
জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক টুইটার বার্তায় বলেছে, ‘রূপরেখা চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত মতৈক্যে পৌঁছা গেছে।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি টুইটার বার্তায় লিখেছেন, আজ অনেক বড় একটি দিন...চূড়ান্ত চুক্তির জন্য শিগগিরই কাজে ফিরতে হবে।
তবে ইসরায়েলি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু টুইটার বার্তায় ঘোষণা করেছেন, ‘যেকোনো চুক্তিই হোক, সেখানে অবশ্যই ইরানের পারমাণবিক সামর্থ্য কমাতে হবে এবং সন্ত্রাসবাদ ও সব ধরনের আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে।
প্রেসিডেন্ট ওবামা এই রূপরেখা চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক সমঝোতা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ইরান যদি প্রতারণা করে, বিশ্ববাসী তা জানবে। ওবামা বলেন, চুক্তিতে পৌঁছানোর সমঝোতা শুধু বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নয়, ‘নজিরবিহীন সত্যাসত্য নির্ধারণ’ করেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রূপরেখা চুক্তিকে ‘চমৎকার চুক্তি’ বলে অভিহিত করেন। ওবামা এই চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলি নেতা নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন দুই পক্ষের মতৈক্যকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।
ইরানের ঘোর শত্রু ইসরায়েলসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ অভিযোগ করছিল, তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করার জন্য ওই কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। তবে এই অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে তেহরান বলছে, শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারই দেশটির এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য। ওই পারমাণবিক কর্মসূচিতে ঘিরে ইরানের ওপর একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছিল পশ্চিমা দেশগুলো।
বরফ গলা শুরু: ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ক্ষমতায় আসার পর পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করার বার্তা দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন। ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো টেলিফোনে দুই নেতা কথা বলেন।
ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের প্রেসিডেন্টের মধ্যে ওটাই ছিল প্রথম সরাসরি আলাপের ঘটনা। এর ধারাবাহিকতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার বিষয়টি উঠে আসে।
সমঝোতার প্রক্রিয়া: ২০১৩ সালেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির (জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য ও জার্মানি) আলোচনা শুরু হয়। ইরানের কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে অবরোধ শিথিল করার প্রস্তাব ওঠে। বিষয়টি নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে আগে কয়েক দফা সময়সীমা ঘোষণা করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ৩১ মার্চের মধ্যে একটি রূপরেখা চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। তবে দুই দফায় এক দিন করে সময় বাড়ানো হয়। শেষ দিনে দুই পক্ষ রূপরেখা চুক্তিতে পৌঁছার কথা জানাল। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৩০ জুনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা। যেখানে কোন পক্ষ কী করবে, তার বিশদ বর্ণনা দেওয়ার কথা রয়েছে।

শ্রেয়া সিঙ্ঘালের লড়াই by শানজিদ অর্ণব

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শ্রেয়া সিঙ্ঘাল। ২৪ বছর বয়সী এ তরুণী ভারতে অনলাইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন। শ্রেয়ার করা পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সুপ্রিমকোর্ট সম্প্রতি দেশটির তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বহুল বিতর্কিত ৬৬(এ) ধারাটিকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছে। পিটিশনটির নাম ছিল ‘শ্রেয়া সিঙ্ঘাল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’। আদালত ৬৬(এ) ধারাটিকে অসাংবিধানিক এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী বলে মত দিয়েছেন। এ ধারা অনুযায়ী ইন্টারনেটে কোনো ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত মতামতকে পুলিশ ‘অপমানজনক’ বা ‘বিদ্বেষমূলক’ হিসেবে গণ্য করে মতামতদানকারীকে গ্রেফতার করতে পারে। এ ধারায় দোষী ব্যক্তির তিন বছরের কারাদন্ড হতে পারে। এ আইনের আওতায় এরই মধ্যে ভারতে অনেকে গ্রেফতার ও দন্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন।
২০১২ সালে শ্রেয়া যখন পিটিশনটি দাখিল করেন তখন তার বয়স ২১। ঘটনার শুরু মায়ের সঙ্গে শ্রেয়ার রাতের খাবার খাওয়ার সময় এক আড্ডায়। শ্রেয়ার মা মানালি সিঙ্ঘাল সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী। সেই আড্ডায় শ্রেয়া মায়ের কাছে জানতে পারেন, শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল থ্যাকারের মৃত্যুর পর মুম্বাই শহর অচল হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে পোস্ট দেয়া বা কোনো ‘আক্রমণাত্মক’ পোস্টে লাইক দেয়ার অপরাধে দুই মেয়েকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শ্রেয়ার মতে, এটিই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। আইনের আগ্রহী ছাত্রী হিসেবে শ্রেয়া সেই অভিযুক্ত দুই মেয়ের স্ট্যাটাস এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যবেক্ষণ করেন। পর্যবেক্ষণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে শ্রেয়া বলেন, ‘আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে কেউই এভাবে গ্রেফতার হতে পারেন। মা বললেন, আমি কেন এ বিষয়ে কিছু করছি না।’ এরপর দুই দিনের মধ্যে শ্রেয়া এবং তার সহযোগীর আইনজীবীরা মিলে পিটিশনের খসড়া তৈরি করে আদালতে দাখিল করেন। পুরো বিষয়টিকে পারিবারিক চেহারা না দেয়ার জন্য তিনি আইনজীবী হিসেবে নিজের মাকে ব্যবহার করেননি। এ কাজে পরিচিত-অপরিচিত সবার কাছ থেকেই সমর্থন পেয়েছেন তিনি। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শ্রেয়া বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল এ কাজ আমি শুধু গ্রেফতারকৃতদের জন্য নয়, বরং সবার জন্যই করছি। এ বৈচিত্র্যময় দেশে আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বেশি করে দরকার।’ নিজের পড়াশোনা শেষ হতে আরও দেড় বছর সময় বাকি আছে। শ্রেয়া এ সময়টাতে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট আইন নিয়ে পড়াশোনা এবং কাজ করতে ইচ্ছুক।
আমি শ্রেয়া সিঙ্ঘাল কেন ৬৬(এ) ধারাকে চ্যালেঞ্জ করেছি? তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০১০-এর ৬৬(এ) ধারাটিকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১২ সালে আমি পিটিশন দায়ের করেছিলাম। সে সময় মহারাষ্ট্রে দুজন তরুণীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের গ্রেফতারের কারণ জেনে আমি বেশ ধাক্কা খেয়েছিলাম। তার চেয়েও বড় ধাক্কা খেলাম, যে আইনে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল অর্থাৎ ৬৬(এ) ধারাটি পড়ে। ৬৬(এ) ধারাটির অপব্যবহারের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ ও পন্ডিচেরিতেও অনেকে গ্রেফতার হলেন। আমার মনে হলো আইনের এ অপব্যবহার রোধ করতে কাউকে কিছু করতে হবে।
৬৬(এ) ধারা ইন্টারনেটে মানুষের কণ্ঠরোধ করে রেখেছিল। পাঠক কোনো বিষয়কে ‘বিরক্তিকর’ বা ‘ভীতিকর’ মনে করে বিষয়টি ইন্টারনেটে আপলোড করলে আইন দিয়ে সেটিকে আপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করার আশঙ্কা ছিল। ৬৬(এ) ধারা ছিল আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার পরিপন্থী।
বর্তমানে সুপ্রিমকোর্ট এ মৌলিক অধিকারকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আজকের দিনের মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় সমাজ বৈচিত্র্যময়। এদেশে ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গের মানুষ বাস করেন এবং তাদের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। এ মতভিন্নতা হচ্ছে আমাদের সমাজের যোগসূত্র। আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের এটাই মূল বিষয়।
বেশিরভাগ ভারতীয় নাগরিকের স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ আছে। ফলে তারা ইন্টারনেটের সঙ্গেও যুক্ত। ইন্টারনেট সবচেয়ে বেশি সহজলভ্য এবং বিস্তৃত যোগাযোগ মাধ্যম। বিভিন্ন মত ও চিন্তা প্রকাশে ইন্টারনেট ব্যবহৃত হচ্ছে। একই কথা বা মত ইন্টারনেটে না বলে যদি মিডিয়ায় (সংবাদপত্র, টেলিভিশন ইত্যাদি) প্রকাশ হতো তাহলে সেটা আইনি সমস্যায় পড়ত না। এ হচ্ছে ৬৬(এ) ধারার কাজ। নিজেকে প্রকাশ করার জন্য ইন্টারনেট খুবই জনপ্রিয় মাধ্যম। আর এ নিজস্ব মতপ্রকাশ আমাদের অধিকার যা অবশ্যই লালন এবং রক্ষা করতে হবে।
হাফিংটন পোস্ট এবং এনডিটিভি অবলম্বনে