Friday, September 20, 2019

জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে ঢাকার রাজপথেও শিশুরা by শাহনাজ পারভীন

বাংলাদেশে রাজধানী ঢাকায় তিন হাজারের মতো শিক্ষার্থী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বড়দের জোরালো ভূমিকা রাখার দাবি নিয়ে একটি মিছিলে অংশ নিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সুইডিশ কিশোরী অ্যাক্টিভিস্ট গ্রেটা থুনবার্গের ডাকে সংহতি জানিয়ে আজ শুক্রবার বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ শিশু 'ক্লাইমেট স্ট্রাইক' বা 'জলবায়ু ধর্মঘট' নামের এই আয়োজনে অংশ নিচ্ছে।
শিশুরা একদিন স্কুলে না গিয়ে বরং রাস্তায় জড়ো হয়েছে জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে।

কী বলছেন তারা?

সকালে ঢাকার প্রায় ৩৫টি স্কুল থেকে নানান রঙের পোশাক পরা কিশোর-কিশোরীরা সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জড়ো হয়।
সেভ দ্য চিলড্রেনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই র‍্যালিতে তারা জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে স্লোগান দিতে থাকে। তাদের হাতে ছিল নানা বক্তব্য লেখা প্ল্যাকার্ড।
শিক্ষার্থীদের স্লোগানের মূল কথা: "ক্লাইমেট জাস্টিস।"
শিক্ষার্থীদের স্লোগানের মূল কথা: ক্লাইমেট জাস্টিস
তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব এখনই পৃথিবীর মানুষের উপরে পড়ছে, ঝড়-বন্যা-দাবানল-খরা যেভাবে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে, সেগুলো ভবিষ্যতে আরও বিপর্যয়কর হয়ে উঠবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আজকের শিশুরাই। সেকারণে নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় বড়দের প্রতি আহবান জানিয়েছেন এই ছেলেমেয়েরা।
মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মারজানা আক্তার পলি বলছেন, "বড়রা এই যে গাছপালা কেটে কলকারখানা আর বাসস্থান বানাচ্ছে, তাদের দোষের কারণে আমাদের ভুগতে হবে। আমরা সমাজে টিকতে পারবো না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও টিকে থাকতে পারবে না।"

পথে নামলেন কেন

শিশুরা বলছেন, বড়রা অনেক ভুল করেছে এবং এখনো ভুল করেই যাচ্ছে। যার ফল হল, জলবায়ু পরিবর্তের কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
শিশুদের হাতে ছিলে নানা বক্তব্যবাহী প্ল্যাকার্ড
মিরপুরে বিসিআইসি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারিয়া ফায়জা কণিকা বলছেন, "আমরাই পরবর্তী প্রজন্ম যারা ভবিষ্যতে থাকবো। পরিবেশের যা অবস্থা, সেটা আমাদেরকেই সহ্য করতে হবে। তাই নিজেদের ভালোর জন্য আমাদেরকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।"
তিনি আরও বলছেন, "বড়রা আমাদের কথা ভাবছেন না এবং তারা স্বার্থপরের মতো আচরণ করছেন।"

কী করতে পারবে শিশুরা?

জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্বনেতারা আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে বসছেন কিন্তু অনেক গুরুতর বিষয়েই তারা একমত হতে পারছেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ প্যারিস চুক্তি থেকে সরে গেছে। তাহলে এই শিশুদের কথা কে কতটা শুনবেন?
এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে গ্রেটা থুনবার্গের কথা উল্লেখ করছিলেন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউশন অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী মিজান ইসলাম।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তারা বড়দের প্রতি আহবান জানিয়েছেন
তিনি বলছেন, "গ্রেটা থুনবার্গের জন্য আজকে আমরা সবাই এখানে এসেছি। হয়তো আমি আপনাকে বললে আপনি কিছু পরিবর্তন করবেন না। কিন্তু আমরা সবাই যদি বলি তাহলে আপনি নিশ্চয়ই চিন্তা করবেন যে এখন আমার পরিবর্তন হওয়ার সময় আসছে।"

গ্রেটা থুনবার্গের কথা

১৬ বছর বয়সী সুইডেনের গ্রেটা থুনবার্গ প্রথম জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গত বছর থেকে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন।
প্রতি শুক্রবার তিনি সুইডেনের পার্লামেন্টের বাইরে "স্কুল স্ট্রাইক ফর দ্য ক্লাইমেট" কথাটি লিখে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে বসে থাকতেন।
এ থেকেই তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠেন।
তারই ডাকে আজ বিশ্বের নানা দেশে লক্ষ লক্ষ শিশু এই "ক্লাইমেট স্ট্রাইক" আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন।
শুধু নিউ ইয়র্ক শহরেই দশ লাখেরও বেশি শিশুকে স্কুল বাদ দিয়ে এই আয়োজনে অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
গ্রেটা থুনবার্গ নিজেও নিউ ইয়র্কের সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন।
জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে ঢাকার রাজপথে সোচ্চার শিশুরা।

চাঁদাবাজি-দুর্নীতি: দায় কি শুধু ছাত্রলীগ-যুবলীগের? by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশে চাঁদাবাজির অভিযোগে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরানোর পর এখন যুবলীগের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ নিয়ে অনেক দেরিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে সহযোগী সংগঠনগুলোর ব্যাপারে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, তাদের দলের সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলে এবং সহযোগী সংগঠনগুলোতে জবাবদিহিতার জন্য কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
তবে নানা অভিযোগ নিয়ে পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক অবস্থায় এসেছে, সেজন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ব্যর্থতা আছে কিনা বা এর দায় কার ওপর বর্তায়-এসব প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
আওয়ামী লীগের আরেক সহযোগী সংগঠন যুবলীগের একজন নেতা জানিয়েছেন, তাদের সংগঠনেরও ঢাকা নগরীর দু'জন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি সহ বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সেজন্য অভিযুক্ত দু'জনের বক্তব্য শুনতে তাদের ডেকেছে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের অনেক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ বা সরকারকে বিব্রত করেছে। তবে এবার চরম বিপদজনক পরিস্থিতি হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী নিজে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকে বলছেন।
দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি'র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলছিলেন, চাঁদাবাজিসহ গুরুতর নানা অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে অনেক বিলম্ব করা হলো।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "এত সময় লাগলো কেন এই বিষয়টাকে চিহ্নিত করতে এবং এটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে? আমি আশা করবো যে, শুধু প্রধানমন্ত্রী একা নন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যারা আছেন, তারা প্রত্যেকে এই কথাটা ভাববেন যে, এপর্যন্ত কত ক্ষতি হয়েছে- সেই ক্ষতির জন্য তারা একটু অনুতপ্ত বোধ করেন কিনা?"
রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার পিছনে বড় অভিযোগ ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বড় অংকের চাঁদা দাবি করা।
যুবলীগের ঢাকার দু'জন নেতার বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের কথা তুলে ধরছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা বলেছেন, এবার এসব অভিযোগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী পেয়েছেন এবং তিনি দলীয় ফোরামে ক্ষোভ প্রকাশের পর ব্যবস্থা নেয়ার প্রশ্ন এসেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলেছেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ই নানা অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু সেগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য চেষ্টা সেভাবে দৃশ্যমান ছিল না বলে তাদের মনে হয়েছে।আর সেকারণে বিশ্লেষকরা মনে করেন, পরিস্থিতি খারাপ অবস্থায় পৌঁছানোর পিছনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলছিলেন, সবকিছু এককেন্দ্রিক হওয়ার কারণে পরিস্থিতি এমন হয়েছে।
"এটিতো একদিনে তৈরি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটাকে সাধুবাদ জানাই। তবে এমন পদক্ষেপ ১০ বছর আগে থেকে নেয়া হলে হয়তো এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।"
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমাদের সমস্যা হচ্ছে, এখন সবকিছু প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে হয়। জবাবদিহির বিষয়টা প্রত্যেক পর্যায়ে থাকতে হবে। সেই পর্যায়গুলো অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই যদি সব দায়িত্ব দেয়া হয়, এত কাজের ভিতর সবতো তাঁর দেখা সম্ভব নয়।"
মিস্টার ইসলাম আরও বলেছেন, "এগুলো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠিকভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ করতে পারতেন।কিন্তু কেউ সেরকম হস্তক্ষেপ করতে সাহস পান না।সবার ধারণা, যদি একারণে বা কোন কারণে প্রধানমন্ত্রী বিরাগভাজন হয়ে যান।এখনতো দেখা যাচ্ছে, কাজটি প্রধানমন্ত্রী করলেন। সেটি অনেক আগে আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও করতে পারতেন।"
তবে পরিস্থিতি নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এবং দায়ভারের ইস্যুতে এসব বক্তব্য মানতে রাজি নন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ।
তিনি বলছিলেন, "ছাত্রলীগের অতীতে যে দু'একটা ছোটখাটো ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ছোটখাটো মারামারি ঘটনা। সেগুলোকে শক্তভাবেই শাসন করা হতো। কিন্তু এই শিষ্টাচার বহির্ভূত এধরণের অভিযোগ আগে কখনও আসেনি। এবং নানান শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।"
তিনি বলেন, "আওয়ামী লীগ অভিভাবক হিসাবে কখনই ছাত্রলীগ বা যুবলীগের কোন ধরণের অন্যায়ে সমর্থন করেনি।তারা শাসন করেছে। শাসনের মাত্রাটা হয়তো ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।আমরা কখনও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেইনি।"
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, এখন কঠোর যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে সাময়িকভাবে সমালোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত মানুষ ইতিবাচক হিসেবে নেবে।
শোভন-রাব্বানী সরে যেতে বাধ্য হয়েছে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে, নতুন নেতারা ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন

ছাত্রলীগের পর যুবলীগকে ধরেছি, কাউকে ছাড়া হবে না: শেখ হাসিনা

ফুলেল শুভেচ্ছায় ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, "ছাত্রলীগের পর যুবলীগকে ধরেছি। সমাজের সব অসঙ্গতি দূর করব। অপরাধ, অনাচার রোধে যা যা করার করা হবে। যাকে যাকে ধরা দরকার, তাদের ধরা হবে। জানি, কাজটা কঠিন, বাধা আসবেই, কিন্তু জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ফেরাতে যা করা লাগে সরকার তা করবে।”

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমবারের মতো ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান জাহিদ তুষার সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমি কষ্ট করে সব কিছু  করছি দেশের জন্য, দেশের উন্নয়ন করছি, এর ওপর কালিমা আসুক সেটা আমি কোনোভাবে হতে দেবো না। আমি কাউকেই ছাড়ব না। যদি কেউ বাধা দেয় কাউকে ছাড়া হবে না।”

ক্যাসিনোতে যেসব বিদেশি কাজ করছে তাদের যারা এনেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাসিনোর সঙ্গে যারা জড়িত বিদেশি, তারা আসলো কিভাবে, তারা ভিসা পেল কিভাবে, তাদের বেতন দেওয়া হয় কিভাবে, ক্রেডিট কার্ডে না ক্যাশে। কে ভিসা দিয়ে আনল সমস্ত কিছু তদন্ত করা হচ্ছে। সবই ধরা হবে।”

ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, "কোনও নালিশ শুনতে চাই না। নিজেদের ইমেজ বাড়াতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। ছাত্রদলের মতো আচরণ করা যাবে না।"

ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতি ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, “ক্ষমতা সো আপ করা, ছাত্র নেতাদের কাছ থেকে আশা করি না। ছাত্র নেতাদের বিনয়ী থাকতে হবে। যত উপরে উঠবে তত বিনয়ী হতে হবে। মোটরসাইকেল নিয়ে চলতে হবে, প্রোটোকল নিয়ে চলতে হবে, ক্ষমতার সাথে চলতে হবে, এগুলো করা যাবে না। এগুলো করলে সাময়িক ভাবে কিছু টাকা পয়সা হবে কিন্তু হারিয়ে যাবে। সেটা হবে দুঃখজনক। এটা আমি তোমাদের কাছে চাই না।”

ছাত্রলীগকে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সংগঠনকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। সিদ্ধান্ত আলোচনার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে নিতে হবে। যাতে সংগঠন আরও শক্তিশালী হয়।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিএনপির ছাত্র সংগঠন ২০০১ এর পরে ক্ষমতায় এসে যা করেছে, বা এরও আগে যা করেছে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সেই রকম আচরণ করা যাবে না। সত্যিকারের নীতি আদর্শ রাজনীতি করলে সংগঠন একটা ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। তাহলে মানুষের আস্থা বিশ্বাস ছাত্রলীগের ওপর অনেক বাড়বে। এটা না করে যদি ওদের (বিএনপি) আচারণ করা হয় তাহলে আমাদের অবস্থাও তাদের মত হবে। ছাত্রলীগের প্রতি যদি মানুষে আস্থা-বিশ্বাস না থাকে তাহলে বিএনপি, ছাত্রদল যা করে গেছে সেই একই ধরনের কাজ হবে।”

সৌজন্য সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) আল-নাহিয়ান খান জয়; সহ-সভাপতি তানজিল ভূঁইয়া তানভীর, রেজাউল করিম সুমন, সোহান খান, আরিফিন সিদ্দিক সুজন, আতিকুর রহমান খান ও কাসফিয়া ইরা; সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত ) লেখক ভট্টাচার্য; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরী, আরিফুজ্জামান আল ইমরান, শামস-ই- নোমান, মো. শাকিল ভূইয়া, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহম্মেদ ও বেনজীর হোসেন নিশি; সাংগঠনিক সম্পাদক সাবরিনা ইতি, মামুন বিন সাত্তার ও সাজ্জাদ হোসেন। এছাড়া ছাত্রলীগ ঢাবি শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন; ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি মো. ইব্রাহিম হোসেন ও মো. সাইদুর রহমান হৃদয় এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি মো. মেহেদী হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মো. জুবায়ের আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

ইয়েমেনি ড্রোনের কাছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরাজিত

মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা
আমেরিকা ও সৌদি সামরিক বাহিনী এবং তাদের উন্নত প্রযুক্তির বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক কখনো ইয়েমেনে ড্রোন গুলোকে শনাক্ত করতে পারে নি। এ ধরনের ড্রোন দিয়েই গত শনিবার সকালে সৌদি আরবের সর্ববৃহৎ স্থাপনা আরামকোর ওপর হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী।

ইয়েমেনিদের এই ড্রোন হামলার পর একথা প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, সৌদি সরকার ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পেছনে যে শত শত কোটি ডলার খরচ করেছে তা নিতান্তই ব্যর্থ হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বর্তমানে সৌদি আরব সফরে রয়েছেন এবং তিনি সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ বৈঠকে ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের জবাব দেয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে পম্পেও স্বীকার করেছেন যে, আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইয়েমেনের হুতি সমর্থিত সেনাবাহিনীর হামলা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

মাইক পম্পেওকে প্রশ্ন করা হয়েছিল প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ইয়েমেনের ড্রোন হামলা বন্ধ করতে পারছে না তাহলে সৌদি আরব জুড়ে এ ব্যবস্থা মোতায়েনের কি প্রয়োজন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সম্পদগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই যাতে এই ধরনের হামলা আর সফল হতে না পারে। একই সঙ্গে তিনি ইয়েমেনে ড্রোন হামলার ব্যাপকতা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। পম্পেও বলেন, এই ধরনের ভয়াবহ ও ব্যাপক হামলা তিনি এর আগে কখনো দেখেন নি।

সৌদি আরব আমেরিকার কাছ থেকে বহুসংখ্যক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ব্যাটারি কিনেছে যার অর্থ দাঁড়ায় যে, সৌদি আরব শত্রুর যেকোনো বিমান এবং স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর তা ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, আমেরিকার অস্ত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রেইথন প্রতিটি ব্যাটারির দাম সৌদি আরবের কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলার রেখেছে।
ইয়েমেনের কাসেফ ড্রোন

এনআরসি নিয়ে অমিত শাহকে কী বললেন মমতা? by শুভজ্যোতি ঘোষ

দিল্লিতে মুখোমুখি অমিত শাহ ও মমতা
ভারতের আসামে যাদের নাম এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ পড়েছে, তাদের নাম ফের তালিকায় ঢোকানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে লিখিত দাবি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
এদিন দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র সঙ্গে দেখা করে তিনি আরও জানান, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু করা নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে আজ কোনও কথা হয়নি ঠিকই - কিন্তু তার সরকার রাজ্যে কিছুতেই এনআরসি চালু করতে দেবে না।
বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য বলছে রাজ্য সরকার কী বলছে তাতে কিছু যায় আসে না - গোটা দেশের স্বার্থেই আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গেও নাগরিক তালিকা তৈরি করা হবে।
একজন বলছেন পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশেই এবার এনআরসি চালু হবে, অন্যজনের হুমকি কিছুতেই পশ্চিমবঙ্গে নাগরিক তালিকা করতে দেব না।
সেই দুজন, যথাক্রমে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রথম কোনও সরকারি বৈঠক হয়েছে আজ (বৃহস্পতিবার) দিল্লিতে।
নর্থ ব্লকে সেই বৈঠক শেষে মিস ব্যানার্জি বলেন, "আসামে যেভাবে এনআরসি থেকে উনিশ লক্ষ লোকের নাম বাদ পড়েছে আমি একটা চিঠি দিয়ে ওনাকে বলেছি এটা মোটেও ঠিক হয়নি।"
"এদের মধ্যে অনেক বাঙালির নাম বাদ গেছে। বাংলাভাষীরা যেমন বাদ পড়েছেন, হিন্দিভাষী বা গোর্খারাও বাদ পড়েছেন। হিন্দুরাও আছেন, মুসলিমরাও আছেন।"
"এমন কী অসমিয়া অনেক লোকের নাম পর্যন্ত তালিকায় নেই।"
"কাজেই আমরা মনে করি এই লিস্টটা ভুলে ভরা। মন্ত্রীকে আমরা বলেছি যাদের নাম তালিকায় নেই তাদের নাম সেখানে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হোক - কারণ এই ভারতীয়রা একটা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে!"
তবে তার নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু করা নিয়ে আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কোনও কথা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে পাশাপাশি মিস ব্যানার্জি একথাও বলতে ভোলেননি, "আমাদের অবস্থান তো সবারই জানা - যে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি-র কোনও প্রয়োজন নেই। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও একই কথা বলছেন।"
"আমাদের বক্তব্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন দিয়ে শুনেছেন, বিষয়টা দেখবেনও বলেছেন।"
মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে বৈঠকের পর অমিত শাহর মন্ত্রণালয় অবশ্য তা নিয়ে কোনও বিবৃতি জারি করেনি, ওই বৈঠকের আলোচনা নিয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনও বক্তব্যও মেলেনি।
তবে বিজেপির দাবি, এই বৈঠকের পরও এনআরসি নিয়ে তাদের অবস্থান বিন্দুমাত্র পাল্টাবে না।
পশ্চিমবঙ্গে দলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভারতী ঘোষ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমাদের বক্তব্য খুব পরিষ্কার - এদেশের কোনও বৈধ নাগরিকের সঙ্গে অন্যায় করা হবে না, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে না কিংবা নতুন আশ্রয়ও তাদের খুঁজতে হবে না।"
"এমন কী, প্রধানমন্ত্রী ও অমিত শাহ বারবার বলছেন বিদেশ থেকে আসা হিন্দুদের আমরা শরণার্থীর মর্যাদা দিই, তারাও এদেশে থাকতে পারবেন।"
তাহলে কি এনআরসি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আমলই দিচ্ছে না?
ভারতী ঘোষের জবাব, "মমতা ব্যানার্জি কী বললেন তা নিয়ে বিজেপি বিন্দুমাত্র ভাবিত নয়। দেশের জন্য কোনটা ভাল তা সবাই জানে, আমরা সেটাই করব।"
"এই মমতা ব্যানার্জিই ২০০৪ সালে রাজ্যে এনআরসি চেয়ে পার্লামেন্টে হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, স্পিকারের দিকে একতাড়া কাগজ ছুঁড়ে মেরেছিলেন।"
"আর আজ রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য তিনি এনআরসি রুখতে চান। আসলে তিনি একজন চরম সুবিধাবাদী।"
মমতা ব্যানার্জি এদিন বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত আছে বলেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার বৈঠক খুব জরুরি।
বিজেপি আবার সেই সীমান্তের দিকে আঙুল তুলেই বলছে - সেই পথে যারা অনুপ্রবেশ করছেন তাদের নিয়ে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি বন্ধ করতেই পশ্চিমবঙ্গে অবিলম্বে এনআরসি চালু হবে।
পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি-র বিরুদ্ধে কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে পদযাত্রা। ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আপনারা এতদিন আঙ্গুল চুষছিলেন? -আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যুবলীগ চেয়ারম্যান

যুবলীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাসিনো সম্রাজ্যে অভিযানের বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী। শৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি বলছেন ৬০টি ক্যাসিনো আছে, আপনারা ৬০ জনে কি এত দিন আঙুল চুষছিলেন? তাহলে যে ৬০ জায়গায় এই ক্যাসিনো, সেই ৬০ জায়গার থানাকে অ্যারেস্ট করা হোক। সেই ৬০ থানার যে র‌্যাব ছিল, তাদের অ্যারেস্ট করা হোক।’ আমাকে এ্যারেস্ট করবেন। করেন। আমি রাজনীতি করি। আপনি এরেস্ট করবেন, আমি বসে থাকবো না। আপনাকেও এরেস্ট হতে হবে। কারণ আপনি প্রশ্রয় দিয়েছেন। বুধবার বিকালে মিরপুর দারুস সালামে স্থানীয় যুবলীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতা ও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। বুধবার বিকাল থেকে যুবলীগ নেতার মালিকানাধীন ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। অভিযানে বিপুল ক্যাসিনো সামগ্রি, মাদক ও নগদ অর্থ উদ্ধার ও দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। ওই অভিযান চলাকালেই যুবলীগ চেয়ারম্যান অভিযানের বিষয়ে এমন বক্তব্য দেন। এ দিন রাতে গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ক্যাসিনো রাজা বলে খ্যাত যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণে সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

যুবলীগের ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও রেকর্ডে শোনা যায়, ওমর ফারুক  চৌধুরী বলেন, ‘অপরাধ করলে শাস্তির ব্যবস্থা হবে। প্রশ্ন হলো, এখন কেন অ্যারেস্ট হবে। অতীতে হলো না কেন, আপনি তো সবই জানতেন। আপনি কি জানতেন না? নাকি সহায়তা দিয়েছিলেন। সে প্রশ্নগুলো আমরা এখন তুলব। আমি অপরাধী, আপনি কী করেছিলেন? আপনি কে, আমাকে আঙুল তুলছেন?

তিনি বলেন, আপনি সাংবাদিক বলতে হবে ক্যাসিনোগুলো কোথায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরা ঘাস খেয়ে ছিলেন? প্রশ্ন আমার এখানে। যে সংগঠনটি সবচাইতে সংগঠিত, আপনি নিশ্চই রাষ্ট্র নায়ক শেখ হাসিনার সভা দেখেছেন, শৃঙ্খলা কাকে বলে? এই সংগঠনটি দেখিয়েছে। প্রথম থেকে শেষ অব্দি এই সংগঠনটি ছিলো। যেটি আমাদের ঘোষণায় ছিলো শ্রেষ্ঠ সংগঠন।

গোয়েন্দারা যদি এতই তৎপর হয় তাহলে এতদিন কি করেছিলো। পত্রপত্রিকা যদি আপনি এতো তথ্য জানেন , তথ্যগুলো এতদিন তুলে আনেননি কেন? আমি কেনো জানলাম না? আমরা কেনো জানলাম না? ওহ আপনি অতীতে জানতেন? লুকিয়ে রেখেছিলেন? কেনো?  ব্যবস্থা সেদিন থেকেও যদি নিতেন। আমি আমার ব্যর্থতা অস্বীকার করছি  না, নিশ্চয়ই আছে। আমার প্রতিটি কর্মের জন্য হাততালি পাবো, আর আমার দুষ্কর্মের জন্য নিগৃহিত হবো না এটা হয় না। প্রশ্ন আমার এখানে। হঠাৎ করে কেনো জেগে ওঠলেন? কারণটা কি? এটা কি বিরাজনীতিকরণ নীতিতে আসছেন? দলকে পঙ্গু করার কোনো ষড়যন্ত্রে আসছেন? নিস্ক্রিয় করার ষড়যন্ত্রে আসছেন? প্রমাণ দেখান ত্রুটি আমার আছে, ত্রুটি কি আপনার নাই? আমি সমালোচনা করতে বসিনি। আমি আমার স্বচ্ছতা প্রমাণ  করতে চাচ্ছি। আমার ট্রাইবুনাল আছে, অভিযোগকারীর অভিযোগ যদি সত্য হয় তাহলে ব্যবস্থা গ্রহণ করি। অভিযোগ যদি ফৌজদারী অপরাধ হয়, তাহলে আমরা থানায় চিঠি দিয়ে জানাই। অপরাধ করলে শাস্তি ব্যবস্থা হবে। কিন্তু প্রশ্নটি হচ্ছে কেনো এখন এরেষ্ট হবে? অতীতে হলো না কেনো? সবই জানতেন। আপনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আপনি কি জানতেন না? না আপনার সহায়তা ছিলো? প্রশ্নগুলো এখন আমরা তুলবো। আমি অপরাধী, আপনি কি করেছিলেন? আপনি কে? আপনি আমাকে আঙ্গুল তুলছেন আপনি কে? আপনি এতদিন তাহলে প্রশ্রয় দিয়েছেন কেন? এটার মধ্যে কি ব্যবস্থাপনা ছিলো সেটা আমাকে জানতে হবে। আমি রাজনীতি করি আমার রাজনীতির সাথে ম্যানেজমেন্ট থাকবে। আমি সঠিক আমি তা বলছি না। আমার ভুলত্রুটি অবশ্যই আছে। ভুলত্রুটি গুলো চিহ্নিত হচ্ছে। আমার জন্য এটা সুখবর। আমার যে শ্রেষ্ঠ সংগঠনটি ছিলো সেটি নিয়েই তো কথা হচ্ছে। হতেই পারে। যে কাজ বেশী করবে তার ভুলও হবে। আপনি আমাকে দেখেন,  সোহরাওয়ার্দী সয়লাব করা কি এটা সম্ভব ছিলো? একমাত্র সংগঠন ছিলো বলে। সংগঠন মানেই তো আন্দোলন, আন্দোল সংগঠন। আন্দোলন মানে কর্মসূচি। আন্দোলন মানে বিরোধীদল গেলে রাজপথে লড়াই করি আমরা, পুলিশের নির্মম প্রহারকে বরণ করি বলেই জনগণ ভাবে ইয়েস আমরাই নেতা।

তিনি বলেন, সরকারি দলে থাকলে কি করতে হয়? আন্দোলন সংগঠন অর্থাৎ কর্মসূচি থাকতে হবে। কর্মসূচিটা কি স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসার কর্মর্সূচি আছে রুটিন আছে। এমপি সাহেবের রুটিন আছে, মন্ত্রী সাহেবের রুটিন আছে। অফিসার্স সাহেবের রুটিন আছে, ব্যবসায়িক সাংবাদিক, সাহিত্যিক। দলের বেলায় নাই কেন? শুধু দিবস পালন? আমরা সেই কর্মসূচিগুলো প্রণয়ন করেছি। এবং দক্ষিন যুবলীগ সবচাইতে সফল সংগঠন।

বিবিসিকে যা বলেছেন ওমর ফারুক চৌধুরী: ওদিকে গতকাল বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ওমর ফারুক চৌধুরী র‍্যাবের অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশাসনিক পদক্ষেপ। ফলে এটিকে তিনি শুভ উদ্যোগ হিসেবে দেখেন। কিন্তু র‍্যাবের অভিযানের বিরুদ্ধে তার বক্তব্যের যে ভিডিও যা ভাইরাল হয়েছে, সেই বক্তব্য থেকে তিনি এখন সরে আসছেন কিনা? এমন প্রশ্ন করা হলে তখন তিনি বলেছেন, এখনও তার সেই প্রশ্ন রয়েছে যে, এতদিন কেন অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়নি। ‘একই কথাইতো। আমি অন্যায় করেছি, তাতে এতদিন পর ব্যবস্থা কেন? সেটা যদি অঙ্কুরেই এই ব্যবস্থাগুলো নেয়া হতো, নিশ্চয়ই আজকে আপনি এসব প্রশ্ন করতেন না।’ যুবলীগ নেতা মি: চৌধুরী এখন নিজের ব্যর্থতার কথাও বলছেন। তার বক্তব্য হচ্ছে, অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনা বা জুয়ার সাথে যুবলীগের অনেক নেতা জড়িত বলে যে সব অভিযোগ এসেছে, এসব বিষয় তার জানা ছিল না। এখন সংবাদ মাধ্যমে খবর আসার পর তিনি বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনেছেন বলে দাবি করেন। ‘ব্যর্থতা প্রথমে আমার আসবে। আমি অন্যের সমালোচনা কেন করবো? এটি আমার ব্যর্থতা। যেহেতু আমি যুবলীগের চেয়ারম্যান। ফলে বিষয়গুলো কেন আমার অজানা ছিল? আমার নিশ্চয়ই সম্পৃক্ততা ছিল, তা নাহলে এই কাজগুলো হলো ক্যামনে? এখন নিজেকে নিয়ে তিনি এমন প্রশ্ন করেন। ব্যর্থতা বা দায় যদি নিজের ঘাড়ে নেন, তাহলে যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করবেন কিনা-এমন প্রশ্নে তিনি তার পদে বহাল থাকার কথাই তুলে ধরেছেন। ‘ব্যর্থতা মানেই কি পদত্যাগ করা? সমস্যা থাকবেই। এখন ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করার সুযোগ এসেছে।’ ‘আমি এসবের পিছনে আরও কারা জড়িত, তার বিস্তারিত আমি জানার চেষ্টা করবো। এগুলো চিহ্নিত করে আমি কিভাবে সমস্যা সমাধান করবো, সেই উপায় এখন আমি দেখবো।’ অবৈধ ক্যাসিনো চালানো এবং চাঁদাবাজিসহ অনেক অভিযোগের ভারে যুবলীগ যে ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে, সেটা আওয়ামী লীগ এবং সরকারকে বিব্রত করে কিনা- এই প্রশ্ন অবশ্য তিনি মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। তবে আমার বা যুবলীগের সৃজনশীল যে কাজগুলো আছে, সেগুলোকেতো আপনারা স্বীকৃতি দেন না।

কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন দুই মার্কিন এমপি

ইলহান ওমর ও অ্যান্টনি জি ব্রাউন
কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উপত্যকায় নিষেধাজ্ঞা অপসারণের জন্য ভারত সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন মার্কিন এক এমপি। কংগ্রেস সদস্য অ্যান্টনি জি ব্রাউন বলেছেন, ‘কাশ্মীরে সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়ে আমি খুব উদ্বিগ্ন। অঞ্চলটিকে সামরিকীকরণে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যাতে একটি ভুলের ফলে বিধ্বংসী পরিণতি ঘটতে পারে!’ ব্রাউন শক্তিশালী ‘হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটি’র ভাইস-চেয়ারম্যান। 

তিনি বলেন, কাশ্মীরে বাক-স্বাধীনতা, জনগণের জমায়েত ও তাদের চলাফেরার উপরে বিধিনিষেধ রয়েছে যা উদ্বেগজনক! তাঁর দাবি, এসব অধিকারকে অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে হবে। তিনি বলেন, 'আমি ভারত ও পাকিস্তান সরকারকে সংযমী থাকার অনুরোধ করছি এবং তাদেরকে আমেরিকার সাথে একসঙ্গে উত্তেজনা কমাতে আলোচনার টেবিলে আসার আহ্বান করছি।'

ব্রাউন বলেন, তিনি ওই মানবিক সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজতে কংগ্রেসে তাঁর সহযোগীদের সাথে এবং প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবেন।

অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসের নারী সদস্য ইলহান ওমর টুইট করেছেন, 'ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কাশ্মীরের সমস্ত যোগাযোগের চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে যা ৪০ দিনেরও বেশি সময় হয়ে গেছে। আমি একটি চিঠি লিখে ভারত সরকারকে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করার আহ্বান জানিয়েছি। এছাড়াও ভারত ও পাকিস্তান সরকারের কাছে এই অঞ্চলে স্বাধীন, নিরপেক্ষ তদন্তের অনুমতি দেওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছি।'

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য আগেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সংবিধানের ৩৭০ ধারা প্রদত্ত জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এই অঞ্চলে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ ছড়াতে বাধা দেয়ার জন্য উপত্যকায় বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে বলেও ভারত জানিয়েছে।

এরআগে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য প্রমীলা জয়পাল এবং অপর এক এমপি সেদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পেওকে অনুরোধ করেছিলেন ভারতকে অবিলম্বে জম্মু ও কাশ্মীরে মিডিয়াতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে রাজি করানোর জন্য।

ক্যাসিনো গডফাদারদের তালিকা ধরে অভিযান by রুদ্র মিজান

রাজধানীতে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনাকারী গডফাদারদের বিরুদ্ধে তালিকা ধরে অভিযান শুরু করছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। বুধবার থেকে র‌্যাব এ অভিযান শুরু করে। এদিন অন্তত চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালানো হয়। র‌্যাব সূত্র জানায়, ক্যাসিনো পরিচালনা করেন এমন ব্যক্তিদের তালিকা করা হয়েছে। এখন পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ডিএমপিও ক্যাসিনো ও জুয়ার আসর বিরোধী অভিযান জোরদার করবে। সূত্র জানায় রাজধানীতে বড় ধরণের অন্তত একশো ক্যাসিনো বা জুয়ার আসর রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬০টি রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারা ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। র‌্যাবের অনুসন্ধান সূত্র জানায়, রাজধানীর বহুতল ভবনের ছাদগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে ক্যাসিনো। রাত হলেই জমে উঠে ক্যাসিনোগুলো। দেশের বিভিন্ন এলাকার ধনাঢ্য জুয়ারিরা ভিড় করেন সেখানে। জুয়ারিদের পাশে বসে সঙ্গ দেন সুন্দরী তরুণীরা। তাদের অনেকে মডেল, অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত। এ্যালকোহল পান করে বুঁদ হয়ে থাকেন নেশায়।

স্বল্পবসনা এসব তরুণীরদের সেবা, খাবার, মদ সবকিছু মিলিয়ে ঢাকার বুকে এক ভিন্ন জগত রচনা করেছেন ক্যাসিনো মালিকরা। ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। বৈধ-অবৈধ অস্ত্র, গার্ড নিয়ে চলাফেরা করেন তারা। ঢাকার অর্ধশতাধিক ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন দুই শতাধিক ব্যবসায়ী। এই তালিকা এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। ওই তালিকা ধরে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার আগে দীর্ঘদিন দাপটের সঙ্গে চলছিলো জুয়া। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরেই শুরু হয়েছে সাঁড়াশি অভিযান। ইতিমধ্যে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। আতঙ্কে রয়েছেন তার সহযোগীরাও। এরমধ্যেই ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিএমপি) শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ক্যাসিনোতে র‌্যাব অভিযান শুরু করেছে, পুলিশও করবে। জুয়ার বোর্ড ও ক্যাসিনোর তালিকা করা শুরু হয়েছে। ঢাকায় ক্যাসিনো মালিক ও এর সঙ্গে জড়িতরা যত প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, রাজধানীতে জুয়ার আসর বসতে দেয়া হবে না। কোথাও অবৈধ জুয়ার আড্ডা, ক্যাসিনো চলতে  দেয়া হবে না। এসব জুয়ার বোর্ড, ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কঠোর হবে। পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ যদি ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

র‌্যাবের অভিযানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে ক্যাসিনো মালিকদের মধ্যে। ক্যাসিনো বন্ধ করে আত্মগোপনে রয়েছে জড়িতরা।
বুধবার রাত থেকে ঢাকার মোট চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র?্যাব। অভিযান চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। এর মধ্যে মতিঝিলের ইয়াংমেন্স ক্লাব থেকে ২৪ লাখ ২৯ হাজার নগদ টাকাসহ ১৪২ জনকে আটক করা হয়। বনানীর আহম্মেদ টাওয়ারে অবস্থিত গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামক ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে কাউকে না পেয়ে সেটি সিলগালা করা হয়। মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ১০ লাখ ২৭ হাজার টাকা, ২০ হাজার ৫০০ জাল টাকাসহ ক্যাসিনোটি গুড়িয়ে দেয়া হয়। গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬০০ টাকা জব্দ করা হয়। এসব অভিযানে আটক ১৮২ জনের মধ্যে ৩১ জনকে এক বছর করে এবং বাকিদের ৬ মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন র?্যাবের দু’জন ম্যাজিস্ট্রেট।

খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকায় কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে এক লাখ টাকা নেন তিনি। এসব ক্লাবে সকাল ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত ক্যাসিনো বসে। চলে মদ ও নারীর আড্ডা।

ক্যাসিনো রাজা খালেদের উত্থান যেভাবে by শুভ্র দেব

এলাকায় তিনি বড় ভাই নামেই পরিচিত। বাবা ছিলেন রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা হলেও বাবার চাকরির সুবাদে বেড়ে উঠেছেন শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে। একসময় জড়িয়ে পড়েন নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। ভারতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের নির্দেশে খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, কমলাপুর এলাকার বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনা থেকে চাঁদা উঠাতেন। মানিককে ধরিয়ে দেবার জন্য সরকার পুরষ্কার ঘোষণা করার পর পালিয়ে ভারতে চলে যায়। ভারতে বসেই সে এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করত। খালেদ চাঁদাবাজি করে টাকা তুলে সেই টাকার একটি অংশ ভারতে মানিকের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। সরকার পরিবর্তনের পর রং পাল্টান খালেদ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পর যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেন। ২০১৩ সালে তিনি অনেক নেতাকর্মী নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যুবলীগে যোগ দেন। যুবলীগের মহানগর কাউন্সিলে তিনি সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পেয়ে যান। আলোচনা আছে পদটি পেতে তিনি বড় অংকের অর্থ ব্যয় করেন। ২০১৪ সালে যুবলীগ নেতা মিল্কি হত্যাকাণ্ডের পর ক্রসফায়ারে নিহত হন ঘাতক আরেক নেতা তারেক। এর পর যুবলীগের প্রভাবশালী এক নেতার ছত্রছায়ায় খালেদ শক্তিশালী হতে থাকেন। ক্ষমতার অপ্রব্যবহার করে ছোট বড় অনেক নেতাকে শহর ছাড়া করতে শুরু করেন। তার ভয়ে দেশ ছেড়েছেন কেউ কেউ। বুধবার রাতে ক্যাসিনো রাজা বলে খ্যাত খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার গ্রেপ্তারের পর তাকে নিয়ে আলোচনা এখন দেশজুড়ে। যেই রেল কলোনীতে তার বেড়ে উঠা সেখানেও তাকে নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। মতিঝিল, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও এলাকার ত্রাস এই নেতার বিষয়ে এখন সবাই কথা বলছেন প্রকাশ্যে। ওইসব এলাকায় দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্ম হতো তার নেতৃত্বে। অস্ত্র ও দেহরক্ষী নিয়ে তিনি চলাফেরা করতেন। গতকাল পুরো এলাকা ঘুরে তার সম্পর্কে পাওয়া গেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাফর আহমেদ খোকনের সঙ্গে এক সময় যোগাযোগ বন্ধ করে দেন খালেদ। পরে তিনি খিলগাঁও এলাকার আরেক পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে  তুলে। জিসানের সহযোগীতা নিয়ে তিনি চাঁদাবাজির পাশাপাশি টেন্ডারবাজিতে নাম লেখান। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে শুরু করে রেলভবন, গণপূর্ত, ক্রীড়া পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, ওয়াসার বিভিন্ন জোনের টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। সেখানকার টাকার ভাগ চলে যেত জিসানের কাছে। কিছুদিন পর জিসানের সঙ্গে টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্ধ সৃষ্টি হয় খালেদের। তারপর জিসানের কাছ থেকেও সরে আসেন খালেদ। জিসানের ক্যাডার বাহিনীকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ধরিয়ে দেন। এককভাবে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ নেন খালেদ। এরপর থেকে জিসান-খালেদ দ্বন্ধ চরম আকার ধারন করে। খালেদের ওপর ক্ষোভ বাড়তে থাকে জিসানের। খালেদ তখন থেকে বিশাল ক্যাডার বাহিনীর প্রটোকল নিয়ে চলাফেরা করেন। তার সঙ্গে অস্ত্রধারী কিছু ক্যাডার থাকেন। গোয়েন্দাসূত্রগুলো বলছে, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে বিদেশে বসে জিসান খালেদকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

গত জুলাই মাসে গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম ঢাকার খিলগাঁর সিপাহীবাগ এলাকা থেকে ফয়সাল নামের এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকার ফাইভ স্টার নিবাসের আট তলায় অভিযান চালিয়ে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি একে-২২ রাইফেল, চারটি বিদেশী অস্ত্র ও ১টি রিভলবার উদ্ধার করে। গোয়েন্দা পুলিশ তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারে তারা সবাই শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ক্যাডার বাহিনী। যুবলীগের এক শীর্ষ নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্য জিসানই এই অস্ত্রগুলো তাদেরকে সরবরাহ করেছে। ওই নেতার সঙ্গে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি নিয়ে দ্বন্ধ চলছে জিসানের। এদিকে খালেদ জিসানের কাছ থেকে দুরে সরে এসে সখ্যতা গড়ে তুলেন থাইল্যান্ডে থাকা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে। তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকায় দুজনে মিলে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেন। সূত্র বলছে, তারা দুজনে মিলে ব্যাংককে একটি টু স্টার মানের হোটেল করেছেন। এছাড়া ফ্ল্যাট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। কুয়ালালামপুরে অভিজাত সুপারমল প্যাভিলিয়নে এগার কোটি টাকা দিয়ে অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন। স্কটল্যান্ডে বাড়ি কিনেছেন। অনুসন্ধানে জানাগেছে, রাজধানীর খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, কমলাপুর, মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টন, মেরাদিয়া, বনশ্রী, রামপুরা, মুগদা এলাকার সবকিছুই খালেদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এসব এলাকায় কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই খালেদ ছাড়া কেউ নিতে পারত না। সবকিছুতেই তার হস্তক্ষেপ থাকত। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে বলেছে, এসব এলাকায় খোদ আওয়ামী লীগের নেতাদের আধিপত্য বিস্তার করার সুযোগ ছিল না।

এছাড়া ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ, শ্রমিকলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। সবার কাছে খালেদ বড় ভাই নামে পরিচিত। সিটি কর্পোরেশনের কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে অবৈধভাবে মাছের বাজার, ফুটপাতে হকার বসিয়ে চাঁদাবাজি। রেলওয়ের জমি দখল করে ৯০টি দোকান নির্মান, খিলগাঁও কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি সবই খালেদ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে চাঁদা তোলার কাজ তিনি নিজে করতেন না। করতেন তার অধীনস্থ নেতাকর্মীরাই। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের টিকেট কালোবাজারিতে খালেদের হাত আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্টেশনের সামনে সিটি করপোরেশনের একটি পাবলিক টয়লেট দখল করে তিনি বাস কাউন্টার বানিয়ে শ্যামলী পরিবহণের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। খিলগাঁও বাজারের পেছনে মুক্তিযোদ্ধা চিত্ত বিনোদন ক্লাবে জুয়ার আসর বসাতেন। এই ক্লাবেরও হর্তাকর্তা তিনি। এলাকায় কেউ ভবন নির্মাণ করতে চাইলে তাকে আগে খুশি করতে হত। তা না হলে ভবন নির্মাণে বাধা প্রদান করত খালেদের ক্যাডার বাহিনী। মতিঝিল, ফকিরাপুল, গুলিস্তান, হলিডে মার্কেটের হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে তার লোকজন। কেউ চাঁদা দিতে অপারগতা জানালে কমলাপুর রেলস্টেশনের উল্টোপাশে ইস্টার্ন কমলাপুর টাওয়ারের টর্চার সেলে তাকে নিয়ে যেতেন। সেখানে ওই ব্যক্তির উপর চলত নির্যাতন। বুধবার র‌্যাবের একটি অভিযানিক টিম খালেদের টর্চার সেলে অভিযান চালিয়েছে।

র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, খালেদ মাহমুদ ভূইয়াকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অনেক গোপন তথ্য দিয়েছেন। খালেদ ও যুবলীগের আরেক শীর্ষ নেতা মিলেই ক্যাসিনোর রমরমা বাণিজ্য করতেন। অন্তত ১৭টি ক্যাসিনো তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এসব ক্যাসিনোয় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য হত। এসব টাকার ভাগ তারা পুলিশ থেকে শুরু করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ওয়ার্ড কমিশনার, কথিত সাংবাদিক ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দিতেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট জোনের ডিসি, এসিরা পেতেন। এমনকি ক্যাসিনো চালানোর বিষয়টি ডিএমপি পুলিশ সদরদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা জানতেন বলে দাবি করেছেন খালেদ। ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে নেতাদের মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে গাড়ি পর্যন্ত উপহার দিতে হয়। র‌্যাবসূত্র বলছে, ক্যাসিনো ক্লাবগুলোতে চেয়ারম্যান হিসাবে একজন সংসদ সদস্যকে সামনে রাখা হয়। যদিও ক্লাবে তাদের আনাগোনা তেমন একটা থাকে না। মতিঝিল, পল্টন ও ফকিরাপুল এলাকায় গড়ে উঠা অধিংকাশ ক্লাব একজন কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা খালেদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দুটি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন ওই কাউন্সিলর। বাকিগুলো খালেদই করেন। আবার এই দুজনকে নিয়ন্ত্রণ করেন দক্ষিণ যুবলীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা। সরজমিন গতকাল শাহজাহানপুর রেল কলোনি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক শতাধিক অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। অবৈধভাবে গড়ে তোলা এসব স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ ছিল যুবলীগ নেতা খালেদের হাতে। এসব স্থাপনা ভাড়া দিয়ে তিনি প্রতি মাসে হাতিয়ে নিতেন অর্ধশত কোটি টাকা। এছাড়া রেলওয়ের স্টাফদের জন্য বরাদ্দকৃত পাকা ভবনের দখলও এই নেতা করতেন। সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ে স্টাফদের কাছ থেকে এককালীন টাকায় এসব কোয়ার্টার কিনে নেয়া হয়েছে। এখন বহিরাগতদের কাছে ভাড়া দেয়া হয়েছে। খিলগাঁও কাঁচাবাজার মার্কেটের পাশে রেলওয়ের জমি দখল করে ৯০টি দোকান কোঠা  তৈরি করেছেন। এসব দোকান থেকে বরাদ্ধের নামে টাকা নিয়েছেন। এসব দোকানের ব্যবসায়ীরা এখন বিপাকে পড়েছেন।

কারন রেলওয়ে এই অবৈধ মার্কেট ভেঙ্গে দিবে। তাই ব্যবসায়ীরা তাদের অগ্রিম টাকা না পাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন। সুচনা ডেকোরেটার্সের মালিক কাওসার বলেন, খুব বিপদে আছি। এসব জুলুমবাজদের কাছ থেকে সৃষ্টিকর্তা রক্ষা করুক। পুরো এলাকাটাকে জিম্মি করে রেখেছিল। সব কিছুই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই এলাকায় আওয়ামী লীগের কোনো অস্তিত্ব নেই। সবই একজন। তার ওপরে কথা বলার কেউ নেই। এখানে রেলওয়ের কর্মচারিদের জন্য তিনটি ক্লাব ছিল। প্রত্যেকটি ক্লাব খালেদ ও তার ক্যাডার বাহিনীরা দখল করেছে। রেলওয়েরে কর্মচারিদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। এই ক্যাডার বাহিনীর অত্যাচারে সবাই অতিষ্ঠ। আমি ডেকোরেটার্সের ব্যবসা করি। কোনো অনুষ্ঠানে তারা মালামাল নিয়ে ব্যবহার করে টাকা দিতে চায় না।

চার ক্যাসিনো সিলগালা: র‌্যাব জানিয়েছে বুধবার তারা ঢাকার চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়েছে। এসব ক্যাসিনোয় অভিযান চালিয়ে নগদ টাকা, ডলাল, বিদেশী মদ, নেশাজাতীয় দ্রব্য, ক্যাসিনো পরিচালনার সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়েছে। ফকিরাপুলের ইয়াংমেনস ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ২৪ লাখ ২৯ হাজার টাকাসহ ১৪২ জনকে আটক করা হয়। আটককৃতদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত। বনানীর আহম্মেদ টাওয়ারে অবস্থিত গোল্ডর ঢাকা বাংলাদেশ ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে কাউকে না পেয়ে সেটি সিলগালা করে দেয় র‌্যাব। মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লবে অভিযান চালিয়ে ১০ লাখ ২৭৮ হাজার টাকা, ২০ হাজার ৫০০ জাল টাকাসহ ক্যাসিনোটি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে ৪ রাখ ৯৮ হাজার ৬০০ টাকাসহ ক্যাসিনো পরিচালনা ও খেলার অভিযোগে ৪০ জনকে আটক করা হয়।

খালেদের বিরুদ্ধে তিন মামলা: এদিকে  র‌্যাব  খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে গুলশান থানায় হস্তান্তর করে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করেছে। অস্ত্র, মাদক ও মানিলন্ডারিং আইনে এ মামলাগুলো করা হয়। এসব মামলায় সাত দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড চেয়ে গতকাল খালেদকে আদালতে হাজির করেছেন গুলশান থানার পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম। আদালত শুনানি শেষে অস্ত্র ও মাদক মামলায় ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এছাড়া মাদক আইনে মতিঝিল থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর আগে বুধবার রাতে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে গুলশানের বাসা থেকে যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে অস্ত্রসহ আটক করে র‌্যাব। গ্রেপ্তারের সময় তার বাসা থেকে একটি শর্টগান, দুটি পিস্তল, শর্টগানের ৫৭ রাউন্ড গুলি ও ৭.৬৫ এএম এর ৫৩ রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়। এছাড়া ৫৮৫ পিস ইয়াবা, ১০ লাখের বেশি নগদ টাকা ও সাত লাখের মত বিভিন্ন দেশের মুদ্রা জব্দ করা হয়।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি: করণীয় সম্পর্কে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সংসদীয় কমিটির সর্বশেষ সভায় বেশ কিছু সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ৬ষ্ঠ বৈঠকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেছেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে এখন গণমাধ্যম বিশেষ সহায়তা দিচ্ছে। এজন্য মানুষ আগের চেয়ে বেশি নির্যাতনের কথা জানতে পারছে।

কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি এমপি বলেন, নারীদের সচলতা বৃদ্ধি, কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, আধুনিকতার ছোঁয়া, তথ্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ইত্যাদি কারণে কিছু সমস্যা ও সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে মন্ত্রণালয়কে আরও বেশি মনোনিবেশ করতে হবে। তাছাড়া, শিশুদের সুরক্ষার ব্যাপারে অবশ্যই অভিভাবকদের অধিকতর মনোযোগী হতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী নারী ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক আমেনা বেগম রেডিও তেহরানকে বলেন, নারী ও শিশু সুরকক্ষার জন্য প্রাথমিকভাবে পরিবার থেকেই সতর্কতা থাকতে হবে। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ব্যাপারে সতর্কতামূলক পরামর্শ বা শিক্ষা প্রদান করতে হবে এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আর রাষ্ট্রকে অবশ্যই এ ব্যাপারে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

এর আগে সংসদীয় কমিটির সভায় কমিটির সদস্য বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির এমপি লুৎফুন নেসা খান বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়েই চলছে, যা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দুই বছরের শিশুও নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রতি মহল্লায় কিশোর গ্যাং সৃষ্টি হচ্ছে। তারা চুরি, খুনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বড় বড় মাস্তান এবং সন্ত্রাসী এদের ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যৌন উত্তেজক ভায়াগ্রা ও মাদক সেবনকারীদের নিজেদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় নানা অপরাধ ঘটিয়ে চলছে।

লুৎফুন নেসা খান আরো উল্লেখ করেন, সামাজিক আনাচার প্রতিকারে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের অনেক কর্মসূচি রয়েছে। বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন কমিটি রয়েছে। কিন্তু তারপরও নারী ও শিশুতের প্রতি সহিংসতা বন্ধ নেই। তিনি এর প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তীব্র সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপারে কমিটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রস্তাব করেন।

এ প্রসঙ্গে সংসদীয় কমিটির সর্বশেষ সভায় বেশ কিছু সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের করণীয় নির্ধারণ করে নাগরিক ও  স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তাছাড়া, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কার্যকর সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এ সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মেহের আফরোজ চুমকি এমপি

ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচারনাকারীদের জবাব by সুমাইয়া ঘানুশি

সুমাইয়া ঘানুশি
আমি যতবার পেয়েছি মাত্র এক পেনি করে, আমাকে বলা হলো ‘যত গণ্ডগোলের গোড়া হচ্ছে ধর্ম। নয়তো এত দিনে একজন ধনী মহিলা হয়ে যেতে পারতাম। যদি (বিটল গ্রুপের সঙ্গীতশিল্পী) জন লেননের মতো আমাদেরও থাকত ধর্মহীন পৃথিবী, তাহলে কোনো যুদ্ধবিগ্রহ, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত থাকত না। তখন প্রত্যেকে ভালোবাসতো তার প্রতিবেশীকে। যদি কেবল ধর্মগুরু, মোল্লা মৌলভি, পুরুত-পাদ্রির। ঠিক হয়ে যেত, এক নিমিষেই দুনিয়ার সব সমস্যার হয়ে যেত সুরাহা।’

সন্দেহ নেই, আমাদের চার পাশে যত সঙ্কট ও সঙ্ঘাত, তার অনেকগুলোর পেছনে ধর্মেরও একটা ভূমিকা রয়েছে। তবে প্রায় সময়ে দেখা যায়, এগুলোর কারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক হলেও নাম নেয়া হচ্ছে ধর্মের এবং ধর্মীয় মাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে কথা বলার জন্য।
এর দৃষ্টান্ত উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং মধ্যপ্রাচ্য। যেসব সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর মাঝে দা-কুমড়ো সম্পর্ক, তাদের মাঝে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ আছে। যেমন ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলমান। দেখা গেছে, তারা ধর্মবিশ্বাসের কারণে বিপদে পড়েনি। তাদের দুঃখ-দুর্দশার মূল কারণটা রাজনৈতিক; যদিও তারা ধর্মের আবরণের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখে এবং ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে।
ইহলৌকিক নানা কারণে যে উত্তাপ-উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, দেখা যায় ধর্মরূপী আয়নাতে। ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভাজন আনে এটা বলা হলে বাস্তব সমস্যা বিশ্লেষণে মোটেও সহায়ক হবে না। আসলে এ কথা বলে সঙ্কটের ব্যাপারে ভাসাভাসা দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়, কিন্তু সঙ্কটের গভীরে যাওয়া হয় না মূল কারণ উদঘাটনের জন্য।

ইরাকের কথাই ধরুন না। সেখানে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সম্প্রদায়গত রক্তপাত ঘটে চলেছে। সুন্নি আর শিয়ারা পরস্পরকে খুন করছে। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে বহু লোক। ইরাকের সুন্নি অধ্যুষিত এলাকায় যাওয়া উচিত হবে না যদি আপনার নামটা ঘটনাক্রমে ‘হাসান’ হয়ে থাকে। আর যদি হঠাৎ পথ হারিয়ে সদর সিটিতে চলে যান এবং কেউ আপনাকে ‘ওমর’ নামে ডাকে, তা হলে রাস্তার কোনায় গলা কাটা অবস্থায় আপনার জীবনাবসানের আশঙ্কাই বেশি।

কিন্তু এ পর্যন্ত বলেই থেমে গেলে চলবে না। আমাদের কিছু কঠিন প্রশ্ন করতে হবে, যেগুলো আমরা সাধারণত করি না। যেমন ইরাকের সুন্নি ও শিয়ারা এখন একে অন্যকে হত্যা করছে। কয়েক বছর আগেও এটা তারা করত না। কারণটা কী? আগে তারা সহাবস্থান করতে পারত, এখন তা অসম্ভব বলে কেন মনে করছে? ইরাকের প্রতিটি গোত্র ও পরিবারে সুন্নি ও শিয়া দুটোই রয়েছে। তারা পরস্পর মেলামেশা করতেন; তাদের মধ্যে হতো বিয়েশাদি। তারা শুধু পাশাপাশিই নয়, একই ছাদের নিচে বাস করতেন। একই বিছানায় পর্যন্ত শুতেন। এমনকি সাদ্দামের স্বৈরাচারী আমলেও এটা ছিল বাস্তবতা। সে সময় পর্যন্ত শত শত বছর ধরে ইরাক ছিল বিশ্বের সর্বাধিক বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ একটি অঞ্চল। এখানে বাস করত নানা ধর্ম, গোত্র, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের মানুষেরা। একই দেশে শান্তিপূর্ণভাবে থাকত মুসলমান, খ্রিষ্টান, সার্বিয়ান, ইয়াজিদি, সুন্নি, শিয়া, কুর্দ, তুর্কম্যান।

এটা আগের ইরাক; আজকের ইরাক নয়। ইঙ্গ-মার্কিন দখলদারি আর ব্রেমারের অস্থায়ী কর্তৃপক্ষের কারণে ইরাকের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। এর জায়গা দখল করে নিয়েছে ধর্মীয়-নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীভিত্তিক বিভাজন। অখণ্ড জাতীয় পরিচিতি ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে; অভিন্ন পরিচয় নেই আর অবশিষ্ট। শুধু সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীগত পরিচিতিই আছে বাকি। নৈরাজ্যের মাঝে প্রতিটি গ্রুপ সবকিছু দখল করে নিতে চাইল; অন্যদের করতে চাইল সবকিছু থেকে বঞ্চিত। নতুন ইরাকে নিরাপত্তাবাহিনী ও পুলিশকে সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে গঠন করে আগুনে ঘি ঢেলে দেয়া হয়েছে। এতে একটি গোষ্ঠীকে এমন সব সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করা হলো যা তারা পরে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করার জন্য ব্যবহার করবে।এমন এক পরিস্থিতির জন্য মুসলমানেরা শিয়া বা সুন্নি হওয়া দায়ী নয়। দায়টা বর্তায় বুশ-ব্লেয়ার-ব্রেমারের ওপর।

ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম কিংবা ইসলাম কোনোটাই মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের জন্য দায়ী নয়। ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিরা তাদের অবস্থানকে যুক্তিযুক্ত হিসেবে দেখাতে ধর্মীয় প্রতীক ও প্রসঙ্গ আনছে। বিরোধপূর্ণ স্থানটি উভয়ের কাছে পবিত্র। তবে সত্য হলো, প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হলেও মসজিদ, গির্জা বা অন্য কোনো উপাসনালয় এ সঙ্কটের কারণ নয়। প্রথম কথা হলো, ফিলিস্তিন সঙ্কটের সূচনা ভূমিকে কেন্দ্র করে। বঞ্চনা, বসতি, দখলদারি এবং মুক্তির দৃঢ়প্রত্যয় প্রভৃতি বিষয় এই ইস্যুর মূল কথা। ফিলিস্তিন সঙ্কটের ক্ষেত্রে সম্পর্কটা ইহুদি বনাম মুসলিম/খ্রিষ্টান যতটা, তার চেয়ে বেশি দখলদার ও বঞ্চিতের সম্পর্ক। কুরআন কিংবা ওল্ড টেস্টামেন্ট নয়, ‘বালফোর ঘোষণা’ এবং এ অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর অনুসৃত অপকৌশল এই দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক নাটকের জন্মদাতা ও গতিপথ নির্দেশক।

সমাজ ও রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত আন্দোলন ও ঘটনাবলির ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় নিরিখে। এটা যে সঙ্কটের প্রতি অগভীর দৃষ্টিভঙ্গি, সে ব্যাপারে আরো বহু নজির তুলে ধরা যায়। ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপের Reformation থেকে একবিংশ শতকের ইসলামিক মৌলবাদ পর্যন্ত এ কথা প্রযোজ্য। ধর্ম মানুষের সব গুণের যেমন কারণ নয়, তেমনি সব মন্দের মূলও নয়। উত্তম পরিস্থিতি ও শর্তাবলি উত্তম কিছুর জন্ম দেয়। ধর্মের বেলায়ও তা বলা যায়। তাই বাস্তবতার মন্দ দিকগুলো রূপ বদলিয়ে ‘মন্দ ধর্ম’ তৈরি করে। নৈরাজ্যকবলিত, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সঙ্কটে পরিপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য আজ লালন ও পুষ্ট করছে আলকায়েদা ও আইসিসের মতো চরম সহিংস মতাদর্শ।
মানুষ ও সমাজ নিছক সাদা কাগজ নয়। তারা শক্তিশালী সাংস্কৃতিক, প্রতীকী ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহন করে থাকে। এর মধ্য দিয়েই পারস্পরিক যোগাযোগ এবং বাস্তবতাকে অর্থপূর্ণ করার কাজ চলে। শান্তি ও যুদ্ধ দুই সময়েই মূল্যবোধের দ্বারস্থ হতে হয় অনিবার্যভাবে। সঙ্ঘাত ও গোলযোগের সময় এর প্রয়োজন অধিক। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও জাতীয় পরিচিতির জাগরণ, সক্রিয়তা ও তীব্রতা ঘটে থাকে।

মার্কস বলেছেন, ‘ধর্ম হচ্ছে এমন এক বিভ্রান্তি যা বাস্তবে অতিরিক্ত বিদ্যমান।’ তার উক্তিটি ঠিক নয়। ধর্ম হলো, ব্যক্তি ও সমষ্টির স্মৃতিসম্ভার ও চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধর্মের মাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতাকে অর্থবহ এবং কর্মকাণ্ডকে যুক্তিযুক্ত করা হয়। শান্তি ও স্থিতির সময়ে ধর্ম সবার অগোচরে নীরবে ভূমিকা পালন করে যায়। অন্য দিকে সঙ্কট ও অস্থিতিশীলতার মাঝে ধর্ম হয়ে ওঠে সরব ও দৃশ্যমান, এমনকি কখনো বা বিস্ফোরিত হয়। বৈশিষ্ট্যগতভাবে শতভাগ শান্তিপূর্ণ বা আগ্রাসী নয় কোনো ধর্ম। যেমন- খ্রিষ্টধর্ম সাত্বিকতা ও পারলৌকিকতায় প্রেরণা দিয়েছিল। আবার ষোড়শ শতাব্দীতে দ্বন্দ্ব-বিভেদ এবং ক্রুসেডের মতো ধর্মযুদ্ধের আগুনও জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
বাস্তবতাকে নিছক ধারণা দিয়ে এবং গৎবাঁধা দৃষ্টিতে না দেখাই উচিত। মানুষ তার মাথা দিয়ে নয়, পা দিয়ে হাঁটে।

>>>লেখিকা : তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ।
ভাষান্তর : মোহাম্মদ আবু জাফর

কাশ্মীর স্বাভাবিক হলে ফারুক আব্দুল্লাহকে আটকে রাখা হয়েছে কেন?

ফারুক আবদুল্লাহ
ভারতের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী কপিল সিব্বল কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, কাশ্মীরের পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক হয় তাহলে ফারুক আব্দুল্লাহকে আটকে রাখা হয়েছে কেন? গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি ওই মন্তব্য করেছেন। জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ডা. ফারুক আব্দুল্লাহ এমপিকে সম্প্রতি কঠোর জননিরাপত্তা আইনে আটক করা হয়েছে।   

কেন্দ্রীয় সরকারকে টার্গেট করে আজ কপিল সিব্বল বলেন, ‘কিছুদিন আগে বিজেপি জানিয়েছিল, জম্মু-কাশ্মীরের ৯২ শতাংশ মানুষই সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক। এরপরে অমিত শাহ সংসদে জানান, ফারুক আবদুল্লাহকে আটকও করা হয়নি বা গ্রেফতারও করা হয়নি। মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে যখন আর কোনও উদ্বেগ নেই, তখন কেন ফারুককে আটক করা হল? সেটা কি সুপ্রিম কোর্টে ভাইকোর আবেদনের প্রেক্ষিতেই?’

ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রধান ফারুক আবদুল্লাহকে ‘অবৈধভাবে আটক’ করে রাখা হয়েছে, অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন তামিলনাড়ুর এমডিএমকে নেতা ভাইকো। তাঁর অভিযোগ, গত ৫ আগস্ট থেকে শ্রীনগরে নিজ বাসায় গৃহবন্দি রয়েছেন ফারুক।

এ প্রসঙ্গে ভাইকো তাঁর আবেদনে বলেছেন, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবৈধভাবে ফারুক আবদুল্লাহকে আটকে রাখা হয়েছে। সরকার তাঁর সাংবিধানিক ও ব্যক্তিগত অধিকার এবং বাক্‌স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা করছে।

গত সোমবার ওই অভিযোগের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টে এমডিএমকে নেতা ভাইকোর আইনজীবী বলেন, ফারুক আবদুল্লাহ বাড়ি থেকে বেরোতে পারছেন না। তাঁর সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করছে সরকার।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে পাল্টা সাফাইতে বলা হয়, আবদুল্লাহর আত্মীয় নন ভাইকো। একপ্রকার আইন লঙ্ঘন করেই জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর মুক্তির জন্য আবেদন করেছেন তিনি।

যদিও প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের নেতৃত্বাধীন, বিচারপতি এস এ বোবদে ও বিচারপতি এস এ নাজিরের সমন্বিত বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকার ও জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসনকে এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ওই আবেদনের পরবর্তী শুনানি হবে।

জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ডা. ফারুক আব্দুল্লাহকে সম্প্রতি কঠোর জননিরাপত্তা আইনকে আটক করা হয়েছে। ওই আইনে আদালতে কোনও শুনানি ছাড়াই কোনও ব্যক্তিকে দু’বছর পর্যন্ত আটক রাখা যায়।

এদিকে, ন্যাশনাল কনফারেন্সের সিনিয়র নেতা মুহাম্মাদ আকবর লোন এমপি বলেছেন,  জননিরাপত্তা আইনের আওতায় ফারুক আব্দুল্লাহকে আটক রাখা অত্যন্ত নিন্দনীয়। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের ওই পদক্ষেপ কোনওভাবেই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। আমরা সরকারের সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করব। আমরা তার মুক্তির জন্য সমস্ত সাংবিধানিক ও আইনি পথ অবলম্বন করব। কাশ্মীরি জনতাকে দমন করা হচ্ছে ও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও মুহাম্মাদ আকবর লোন এমপি অভিযোগ করেন।
কপিল সিব্বল ও মুহাম্মাদ আকবর লোন এমপি

পর্যটনবান্ধব দেশের র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে স্পেন

ইউরোপের দেশ স্পেনে তিন হাজার মাইলেরও বেশি সৈকত আর ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ৪৮টি স্থান আছে। ভ্রমণপিপাসুদের এসবই তো চাই! তাই ভ্রমণ ও পর্যটনে সেরা দেশের তালিকায় শীর্ষে আছে স্পেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০১৯ সালের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কম্পিটিটিভ রিপোর্টে এই তথ্য বেরিয়েছে।
বার্সেলোনায় অবস্থিত লা সাগরাদা ফ্যামিলিয়া অট্টালিকা, মাদ্রিদের বিখ্যাত প্রাডো শিল্প জাদুঘর ও উপকূলীয় শহর কস্তা দেল সোলের সৈকতসহ অনেক কিছুর সুবাদে বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের অনায়াসে আকর্ষণ করে স্পেন।
বার্সেলোনা
র‌্যাংকিংয়ে দুই নম্বরে আছে ইউরোপের আরেক দেশ ফ্রান্স। তিনে স্থান পেয়েছে জার্মানি। শীর্ষ দশে এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে চার নম্বরে আছে জাপান। পাঁচ থেকে দশ নম্বরে রয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, কানাডা ও সুইজারল্যান্ড।
গত বছরের শীর্ষ দশে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। যেমন, যুক্তরাজ্য পাঁচ থেকে নেমে গেছে ছয়ে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের দৃষ্টিতে ২০১৯ সালে বিশ্বে বসবাসের সবচয়ে উপযুক্ত শহর নির্বাচিত হওয়া ভিয়েনার দেশ অস্ট্রিয়া আছে ১১ নম্বরে।
ফ্রান্সের প্যারিস
এবারের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের আলোচনার টেবিলে পর্যটনের চারটি দিক গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো হলো প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ, বিমান পরিবহন পরিকাঠামো, জাতীয় ভ্রমণ ও পর্যটন নীতি এবং উপযুক্ত পরিবেশ (নিরাপত্তা থেকে শুরু করে শ্রমবাজারের স্বাস্থ্যবিধি)। সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক এই সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিশ্বের অভিজাত ব্যক্তিদের একত্রিত করে থাকে।
বিমান পরিবহন অবকাঠামো, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি, বাসস্থান, টাকার মান ও স্থিতিশীল ভ্রমণের সুযোগসহ ৯০টি মানদণ্ড বিবেচনা করে ১৪০ দেশের র‌্যাংকিং করা হয়েছে। তালিকার একেবারের তলানিতে আছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেন। এরপর আছে যথাক্রমে চাঁদ, লাইবেরিয়া, বুরুন্ডি, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মরিটানিয়া, অ্যাঙ্গোলা, হাইতি, বুরকিনা ফাসো ও সিয়েরা লিওন। সবচেয়ে অনিরাপদ দেশের তালিকায় ওপরে আছে এল সালভাদর, নাইজেরিয়া ও ইয়েমেন।
জাপানের মাউন্ট ফুজি
নিরাপত্তার দিক দিয়ে ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও ওমান নিরাপদ দেশের খেতাব পেয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে এগিয়ে মেক্সিকো। মানবসম্পদ ও শ্রমবাজারে সবার ওপরে আমেরিকা। বিমান পরিবহন অবকাঠামোতে কানাডার নিচে সবাই।
২০১৯ সালের শীর্ষ ১০ পর্যটনবান্ধব দেশ
১. স্পেন
২. ফ্রান্স
৩. জার্মানি
৪. জাপান
৫. যুক্তরাষ্ট্র
৬. যুক্তরাজ্য
৭. অস্ট্রেলিয়া
৮. ইতালি
৯. কানাডা
১০. সুইজারল্যান্ড
কানাডার টরন্টো
>>>সূত্র: সিএনএন ট্রাভেল

আধুনিক দাসত্ব: যুক্তরাজ্যে সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যদের সাজা

যে আটজনের সাজা হয়েছে
যুক্তরাজ্যে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের আটজন সদস্যকে সাজা দিয়েছে দেশটির আদালত।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা প্রায় ৪০০ ব্যক্তিকে দাসত্বে বাধ্য করেছে।
বলা হচ্ছে এটি যুক্তরাজ্যের আধুনিক যুগের সবচাইতে বড় দাসত্বের ঘটনা।
যে অভিযোগে বিচার হল
সংঘবদ্ধ এই চক্রটি মূলত পোল্যান্ড থেকে আসা ব্যক্তিদের নানা ভাবে ধোঁকা দিয়ে কাজ ও ভাল জীবনের লোভ দেখিয়ে পশ্চিম মিডল্যান্ড এলাকায় নিয়ে আসতো।
কিন্তু তাদের কাজের নামে দাসের মতো রাখা হতো। তাদের কখনো কখনো ১৪ ঘণ্টা পর্যন্তও কাজ করানো হতো অথচ কোন পারিশ্রমিক দেয়া হতো না।
তাদেরকে যেসব ঘরে আটকে রাখা হতো তার কিছু ছবি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।
যাতে দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ পরিবেশে তাদের থাকতে দেয়া হতো।
ইঁদুরের সাথে একসাথে সেসব ঘরে তাদের থাকতে হতো। ভালো চাকরীর বদলে খুব নিম্ন মানের কাজে খাটানো হতো।
পুলিশ বলছে, সাজা প্রাপ্তরা নিজেরাও পোল্যান্ডের বংশোদ্ভূত। এমন দুটি পোলিশ পরিবারের আটজন সদস্যকে আলাদা দুটি মামলায় বিচার করা হয়েছে।
যেখানে তাদের মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাদের তিন থেকে এগারো বছরের সাজা দেয়া হয়েছে।
যেভাবে বিষয়টি প্রকাশিত হল
২০১৫ সালে বন্দি দশা থেকে দুইজন পালিয়ে যাওয়ার পরই ওই চক্রের সদস্যদের তৎপরতা প্রকাশ হয়ে পড়ে।
ওই দুইজন পালিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে কাজ করে 'হোপ ফর জাস্টিস' নামে একটি দাতব্য সংস্থার কাছে নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে। এর পরই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।
এই চক্রের শিকার একজন মিরোস্লো লেহম্যান এর আগে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তার দুর্দশার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, "যে ঘরে আমাদের রাখা হতো সেটিতে ঘর গরম করার কোন ব্যবস্থা ছিল না। কোন গরম পানির ব্যবস্থা ছিল না। জানালার ফুটো দিয়ে সারাক্ষণ কনকনে বাতাস ঘরে ঢুকতো।"
হুমকি ও মারধোর করে নিয়ন্ত্রণ
এই চক্রটিতে ছিল পাঁচজন পুরুষ ও তিনজন নারী।
তাদের শিকার ছিল তাদের নিজেদেরই দেশ পোল্যান্ডের ঘরবাড়িহীন ছিন্নমূল মানুষ, সাবেক কারাবন্দী এবং নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা।
তাদের শুরুতে বাসে করে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসা হতো।
তাদের মূলত আবর্জনা পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং করার প্রতিষ্ঠানে অথবা খামারে কাজ করানো হতো।
সেখান থেকে যে পারিশ্রমিক দেয়া হতো সেটি নেয়ার জন্য তাদের ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলানো হতো।
কিন্তু ওই চক্রই সেই অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণে থাকতো এবং নিজেরা পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া অর্থ ভাগাভাগি করে নিয়ে নিত।
চক্রের সদস্যরা বেন্টলীর মতো দামি গাড়িও ব্যাবহার করতো।
২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই চক্রের সদস্যরা কুড়ি লাখ পাউন্ডের মতো অর্থের মালিক হয়েছে।
কেউ কাজ করতে না চাইলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হতো, মারধোর করা হতো, পোল্যান্ডে তাদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেয়া হতো।
খুন করার আগে নিজের কবর নিজেকেই খুড়তে হবে এমন ভয় দেখিয়েও তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতো এই চক্র।
যেভাবে কাজ করতো চক্রটি
চক্রের এক একজন ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালন করতো। একজন পোল্যান্ড থেকে তাদের শিকার খুঁজে আনার দায়িত্বে ছিল।
একজনের দায়িত্ব ছিল তাদের শুভেচ্ছা জানানো।
নারীদের একজন তাদের সাথে শুরুতে খুব অমায়িক ব্যবহার করতো এবং শুরুর দিকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে সহায়তা করতো।
অপর একজন তাদের যুক্তরাজ্যে বেকারদের জন্য চাকরী দেয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠানে নাম লেখাতেও সাহায্য করতো।
ব্যাংকে গিয়ে অ্যাকাউন্টের অর্থ তোলার সময় বন্দিদের সাথে করে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের অর্থ নিয়ে নেয়া হতো।
সেই ব্যাংকের বিষয়াদি দেখভাল করার জন্য যিনি ছিলেন তাকে পুলিশ বর্ণনা করেছে 'খুব পরিশীলিত ও মার্জিতভাবে' নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে এমন কেউ।
কারোর চিকিৎসা দরকার হলে সেটিও পেতেন না এসব লোকেরা । বন্দিদশায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
এরকম ভয়াবহ নোংরা পরিবেশে তাদের আটকে রাখা হতো

মশা কাহিনি ও ডেঙ্গু প্রসঙ্গ

মশা সম্পর্কে আমাদের কিছু ভুল ধারণা আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, মশা বেঁচে থাকার জন্য আমাদের রক্ত খায়। আসলে রক্ত মশার খাবার নয়। তারা বিভিন্ন ফলমূল থেকে বেঁচে থাকার জন্য জুস হিসেবে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। রক্ত শুধু নারী মশাদের ডিম পাড়ার জন্য প্রয়োজন হয়।
মশা বর্তমান সময়ে একটি আলোচিত প্রসঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হঠাৎ করে এডিস মশার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় অসংখ্য মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে ভুগছে, এমনকি বেশকিছু মানুষের মৃত্যুও হয়েছে এ কারণে। সাধারণত মশার বাড়াবাড়ি আমরা শীতকালে লক্ষ করি। কিন্তু এ সময়ে কীভাবে এডিস মশার প্রকোপ বেড়ে গেল, তা সংশ্লিষ্ট সবাইকে সত্যিই চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। একটি ছোট্ট জীব কীভাবে মহাশক্তিশালী মানুষের মৃত্যুর কারণে পরিণত হতে পারে, তা কি ভাবনার বিষয় নয়? এখানে কি আমাদের জন্য কোনো শিক্ষা আছে?
কোরআনে মশা সম্পর্কে বিশেষ কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ নিঃসন্দেহে মশা বা তদূর্ধ্ব বস্তু দ্বারা উপমা পেশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। বস্তুত যারা মোমিন তারা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে যে, তাদের পালনকর্তা কর্তৃক উপস্থাপিত এ উপমা সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সঠিক। আর যারা কাফের তারা বলে এরূপ উপমা উপস্থাপনে আল্লাহর মতলবই বা কী ছিল? এ দ্বারা আল্লাহ তায়ালা অনেককে বিপথগামী করেন, আবার অনেককে সঠিক পথও প্রদর্শন করেন। তিনি অনুরূপ উপমা দ্বারা অসৎ ব্যক্তিবর্গ ভিন্ন কাউকেও বিপথগামী করেন না।’ (সূরা বাকারা : ২৬)।
এ আয়াতে সাতটি বিষয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমনÑ ১. মশা সৃষ্টির মধ্যেও মানুষের জন্য আল্লাহর নিদর্শন রয়েছে। ২. মশার চেয়েও ক্ষুদ্র সৃষ্টি রয়েছে। ৩. বিশ্বাসীরাই কোরআনে বর্ণিত বিষয়গুলো সত্য-সঠিক হিসেবে বিশ্বাস স্থাপন করে। ৪. অবিশ্বাসীরা কোনো কিছুতেই আল্লাহর নিদর্শন বুঝতে পারে না। ৫. এ রকম নিদর্শনও মানুষের জন্য সঠিক পথের দিশা হতে পারে। ৬. আবার অনেককে বিপথগামী করতে পারে। ৭. অসৎ ব্যক্তিদের আল্লাহ কখনও সঠিক পথে নেন না।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লক্ষ করলেও আমরা আশ্চর্য হব এটা জেনে যে, কোরআন যে তথ্য প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে মানবজাতিকে দিয়েছিল, তা আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত হওয়ায় শুধু কোরআনের বিশুদ্ধতা নয়; বরং কোরআন যে একটি জীবন্ত মোজেজা, তা-ও বিবেচিত হচ্ছে। এ আয়াতে তিনটি বৈজ্ঞানিক বিষয়কে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে বলে এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। যথা :
১. প্রথমত, গঠনগত কারণে মশার সৃষ্টি অন্য যে কোনো প্রাণী থেকে অনন্য, এমনকি অন্যান্য উড়ন্ত পতঙ্গ থেকেও অনেকগুলো কারণে ভিন্ন।
২. দ্বিতীয়ত, কোরআনে ব্যবহৃত শব্দ ‘বাউদাহ’ মূলত স্ত্রীবাচক শব্দ, যা নারী মশাকে বোঝায়। আধুনিক বিজ্ঞান এরই মধ্যে এটি প্রমাণ করেছে যে, শুধু স্ত্রী মশাই মানুষের রক্ত খায়। রক্ত খায় তারা তাদের ডিমে নিউট্রিশনের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য।
৩. তৃতীয়ত, মশার চেয়েও ভিন্ন পতঙ্গ রয়েছে, যারা তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বা তাদের থেকে রক্ত খায়। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, ১৯২২ সালে প্রথম বিজ্ঞানী এফ ডব্লিউ এডওয়ার্ডস তার গবেষণাপত্রে দাবি করেন, দক্ষিণ এশিয়ার মালয় অঞ্চলে এমন এক ধরনের পতঙ্গ পাওয়া গেছে, যা মশা থেকেই রক্ত খায়। তিনি এ প্রাণীটির নাম দিয়েছেন কুলিকোইডস এনোফেলিস। (দেখুন : সায়েন্টিফিক আমেরিকা, মস্কিউটস হেভ ফ্লাইং, ব্লাড সাকিং প্যারাসাইট অব দিয়ার ওন, ২০১৪)।
মশা সম্পর্কে আমাদের কিছু ভুল ধারণা আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, মশা বেঁচে থাকার জন্য আমাদের রক্ত খায়। আসলে রক্ত মশার খাবার নয়। তারা বিভিন্ন ফলমূল থেকে বেঁচে থাকার জন্য জুস হিসেবে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। রক্ত শুধু নারী মশাদের ডিম পাড়ার জন্য প্রয়োজন হয় এবং এটি তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস মাত্র। কিন্তু এ রক্ত সংগ্রহ করার সময় তাদের দ্বারা বাহিত বিভিন্ন রকমের জীবাণু আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। ফলে আমাদের বিভিন্ন রকম অসুখ হয়। অর্থাৎ স্ত্রী মশারাই আমাদের মশাবাহিত রোগের মূল কারণ।
মশার কথা আল্লাহ কেন কোরআনে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তার কিছু অন্তর্নিহিত কারণ বুঝতে আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের সহায়তা করেছে। মশার আচরণ, প্রকৃতি ও গঠনগত দিক থেকে বেশকিছু তথ্য তারা আবিষ্কার করেছেন, যা সত্যিই সচেতন যে কাউকে ভাবনায় ফেলে দেবে। এর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলোÑ ১. প্রায় ২ হাজার ৭০০ প্রজাতির মশা রয়েছে। ২. মশার একশরও বেশি চোখ রয়েছে। ৩. মশার মুখে ৪৮টা দাঁত রয়েছে। ৪. একটি মশার তিনটি পূর্ণ হার্ট (হৃদযন্ত্র) রয়েছে। ৫. মশার নাকে ছয়টি পৃথক ছুরি রয়েছে এবং প্রত্যেকটি ছুরির পৃথক ব্যবহার তারা করে থাকে। ৬. মশার শরীরে ডিজিটাল এক্সরে মেশিন আছে, যা রাতের আঁধারে মানুষের চামড়াকে শনাক্ত করার কাজে লাগায়। ৭. প্রত্যেক মশার নিজস্বভাবে এনেসথেশিয়া দেওয়ার জন্য একধরনের ভ্যাকসিন আছে, যা মানুষের শরীরে তাদের হুল ফোটানোর মাধ্যমে রক্ত নেওয়ার সময় ব্যবহার করে সেই জায়গাটাকে অবশ করে নেয়, যাতে রক্ত নিলেও কোনো ব্যথা না পাই আমরা। ৮. রক্ত পরীক্ষা করার বিশেষ ব্যবস্থা এদের আছে। কারণ এরা সব ধরনের রক্ত পছন্দ করে না। ৯. পূর্ণিমার সময় মশা প্রায় ৫০০ গুণ বেশি কামড়ায়। ১০. মশা ওড়ার সময় সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ বার তাদের পাখা নাড়ায়। ১১. বিশ্বব্যাপী মানুষের মৃত্যুর জন্য সব প্রাণীর মধ্যে মশাই বেশি দায়ী। ১২. ১৮ ফুট দূর থেকে তাদের টার্গেট ঠিক করতে পারে। ১৩. পুরুষের চেয়ে নারী মশারা বেশিদিন বাঁচে। ১৪. মশার মতো আরও একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ আছে, যা মশা থেকেই রক্ত সংগ্রহ করে।
যদিও আধুনিক বিজ্ঞান মশা সম্পর্কে অনেক তথ্যই আমাদের দিয়েছে; তবু আমরা বলব, আরও অনেক তথ্যই অজানা রয়ে গেছে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক বিজ্ঞান হিমশিম খাচ্ছে। কার্যকরী উপায় বের হওয়ার আগেই প্রাণ হারাতে হচ্ছে শক্তিমান এ মানবজাতির অনেককেই। তাই ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান হয়তো সেগুলোকেও আমাদের জানিয়ে দেবে।
আচ্ছা এতকিছু জানার পরও কি মনে হচ্ছে মশার মধ্যে কোনো নিদর্শন নেই? আমরা কি এখনও খুঁজে পাচ্ছি না মশার মাঝে আল্লাহর মহত্ত্ব, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা? যদি না পেয়ে থাকেন তাহলে আরও একটা আয়াতকে স্মরণ করিয়ে দিই আপনাদের। আল্লাহ ঘোষণা করছেন, ‘হে মানব সম্প্রদায়, একটি উপমা বর্ণনা করা হলো, অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোন। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা কর, তারা কখনও একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু ছিনিয়ে নেয়; তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না। প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, উভয়েই শক্তিহীন।’ (সূরা হজ : ৭৩)।
আয়াতে আল্লাহর ক্ষমতা, কর্তৃত্ব সম্পর্কে শুধু নয়; বরং আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবার অক্ষমতার কথা প্রকাশ করা হয়েছে। আর আল্লাহর ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৃষ্টির মধ্যেও এমনভাবে নিহিত রয়েছে, যা করার ক্ষমতা কারও তো নেই-ই; বরং সেসব বিষয়ের চিন্তা আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে।
মশা নিয়ে কোরআনের আরও একটি গল্প মনে করিয়ে দিতে চাই। মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.) এর সময়ের রাজার নাম ছিল নমরুদ। সে নিজেকে এতটাই উচ্চতায় ভাবত যে, সৃষ্টিকর্তা হিসেবেও দাবি করেছিল। জন্ম, মৃত্যু, খাদ্যের জোগান সবকিছু তার ক্ষমতার মধ্যে বলেও দাবি করেছিল। তার সঙ্গে নবী ইবরাহিম (আ.) এর একটি কথোপকথন আল্লাহ তায়ালা কোরআনে উল্লেখ করেছেন। (দেখুন : সূরা বাকারা : ২৫৮)। এ নমরুদের সেনাবাহিনীকে শেষ করে দেওয়া হয়েছিল অসংখ্য মশা দ্বারা। আর ছোট্ট এ মশা প্রবেশ করেছিল নমরুদের নাকের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছিল সৃষ্টিকর্তা দাবি করা এ পাপিষ্ঠের একটি মশার কারণে।
কোরআনের এ গল্পটি আমাদের স্মরণ করে দেয় মশার ক্ষমতা এবং এর ব্যবহারের উদ্দেশ্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে যেমন আমাদের পরীক্ষা করার নিমিত্তে হতে পারে, তেমনি আমাদের পাপের শাস্তিও হতে পারে। নমরুদের বেলায়ও তাই হয়েছিল।
একটু খেয়াল করলে দেখতে পাব কী হচ্ছে বর্তমান পৃথিবীতে? কী পরিস্থিতি পার করছি আমরা। জীবন সেখানে অনিরাপদ হয়েছে বিভিন্ন কারণে। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ সেখানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা, পাপের প্রসারতা, মদ ও মাদকদ্রব্যের ব্যাপকতা, হারামকে হালাল মনে করার প্রবণতা, দুর্নীতি বৃদ্ধি, ন্যায়বিচারের উপেক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি অনীহাসহ অন্যান্য কারণ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী হতে পারে। আল্লাহই জানেন প্রকৃত রহস্য, উদ্দেশ্য। তবু হঠাৎ করে আমাদের দেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি এবং এরই মধ্যে কিছু প্রাণহানি কিন্তু আমাদের অনেক কিছু জানিয়ে দেয়। অন্যান্য কার্যকরী পদক্ষেপের পাশাপাশি আল্লাহর রহমত ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আশু কোনো পথ দেখছি না। আমাদের প্রত্যেকের উচিত সৃষ্টিকর্তা যার ক্ষমতা শুধু অসীম নয়; বরং সবকিছুতে তাঁর কর্তৃত্ব সমাসীন, চিরস্থায়ী তার কাছেই জীবনের সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা প্রয়োজন। প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) একটি দোয়া আমাদের শিখিয়েছেন। তারই ভাষায়Ñ ‘আউযু বি কালিমাতিল্লাহি তাম্মাতি মিন শারির মা খালাক্বা।’ (অর্থ : আল্লাহর পূর্ণ কালিমার বিনিময়ে তাঁর সৃষ্টির সব অনিষ্ট থেকে পরিত্রাণ চাচ্ছি)। (দেখুন : সুনানু আবি দাউদ : ৩৮৯৮ এবং ৩৮৯৯)। আল্লাহ আমাদের সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন!

ওবিওআর ভারতের জন্য একটি ‘লাভজনক প্রস্তাবনা’, ভারতীয় চীন-বিশেষজ্ঞের অভিমত by সুবীর ভৌমিক

ভারতের মিডিয়া ব্যারন এবং চীন-বিশেষজ্ঞ রাঘব বাহলের নতুন চমৎকার একটি বই ‘সুপার সেঞ্চুরি’তে সুপারিশ করা হয়েছে যাতে তার দেশ চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) পদক্ষেপের সাথে যুক্ত হয়।

‘সুপার সেঞ্চুরি’ ভারতের বিভিন্ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য দীর্ঘ প্রেসক্রিপশানের একটি তালিকাই শুধু নয়, বরং সমসাময়িক এশিয়া ও বিশ্বে ভারতের অবস্থানকে সংহত করার একটা রোডম্যাপও বটে।

বাহল বলেন, “বেইজিংয়ের ওবিওআর ইনিশিয়েটিভের ডিজাইন করা হয়েছে ইউরেশিয়ায় চীনের বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বাড়ানোর কথা মাথায় রেখে। এটা ভারতের জন্যও একটা অর্জন হতে পারে। অথচ দিল্লী চীনের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে অনেক বেশি সন্দিহান ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে”।

তিনি স্বীকার করেন যে, ওবিওআরের অন্যতম প্রধান রুট চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (সিপিইসি) ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় কারণ এটা পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের উপর দিয়ে গেছে, যেটাকে ভারত নিজেদের দাবি করে।

কিন্তু বাহল যুক্তি দেন যে, এশিয়া ইনফ্রাসট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) নীতিমালায় এ বিষয়টির সমাধান রয়েছে। এতে ওবিওআরের কোন প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশেষভাবে বলা হয়েছে যে, বিবাদমান এলাকাগুলোতে কোন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সেখানকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ওই প্রকল্পের ব্যাপারে অনুমোদন দিতে হবে।

বাহল বলেন, “তাছাড়া, বেইজিং নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ভারতের অংশগ্রহণের বদলে তারা কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত রয়েছে, যেটা এই পদক্ষেপকে অনেকখানি চাঙ্গা করবে”। তিনি বলেন, ভারতের উচিত চীনকে ‘বন্ধুপ্রতীম শত্রু’ বিবেচনা করা: “যখনই সম্ভব তাদের আলীঙ্গন করা উচিত, প্রয়োজনে এড়িয়ে চলা উচিত এবং একান্ত বাধ্য হলেই কেবল পাল্টা আঘাত করা উচিত”।

বাহল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট করার অর্থ এই নয় যে, আমাদেরকে চীন থেকে দূরে থাকতে হবে। ঠিক তার উল্টা, বহুপাক্ষিকতার উদ্দেশ্যই হলো একপক্ষের সাথে গাঁটছাড়া না বেঁধে বিভিন্ন পক্ষের সাথে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে লেনদেন করা”। তিনি আরও বলেন, “তাছাড়া আমরা চাইলেও চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারবো না”।

বাহল তার আগের বইয়ে চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধির মধ্যে পারস্পরিক তুলনা করেছিলেন। তিনি বলেন যে, এশিয়ার বৃহৎ এই দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কটা আরও ‘গভীর ও পরিপক্ক’ হয়েছে।

বাহল বলেন, “প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ শীর্ষ পর্যায়ে কূটনীতিক বিনিময় প্রায় নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই নেতার মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সম্পর্ক রয়েছে। চীনের নেতা ভারতের নেতার প্রতি প্রশংসাসূচক আচরণ দেখিয়েছেন, কারণ পররাষ্ট্র নীতির ব্যাপারে মোদির নীতি কিছুটা আগ্রাসী হলেও সেটা স্বচ্ছ”।

তিনি যুক্তি দেখান যে, চীন ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের বেষ্টনি থেকে বের করে নিয়ে আসতে চায় কারণ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক জোটের ব্যাপারে তারা উদ্বিগ্ন, তা সেটা যদি ন্যাটোর মতো না-ও হয়। তাছাড়া চীনের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন অন্যান্য আসিয়ান দেশগুলোরও এই জোটে যোগ দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা বাজার বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ভারতের বিশাল বাজারে প্রবেশের জন্য গভীরভাবে আগ্রহী চীন।

বাহল বলেন, বেশ কতগুলো ইস্যুতে ভারত আর চীন একই জায়গায় রয়েছে।

বাহল বলেন, “পশ্চিমা শক্তির কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে সাম্প্রতিককালে উদিত অর্থনীতি হিসেবে ভারত ও চীনের উভয়েরই ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে একটা অভিন্ন হতাশা রয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক অর্থনীতিকে একটা রূপ দিয়েছে। এটার কারণে এআইআইবি এবং ব্রিকস নিউ ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের মতো বিকল্প প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে, যেগুলো উদীয়মান দেশগুলোর টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে”।

“আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিন্ন জায়গাটি হলো অর্থনীতি”।

বাহল বলেন, “চীনের ধীরগতি ভারতের সাথে সম্পর্ককে মজবুত করেছে এবং ভারত এখন শুধু স্টিল, সিমেন্ট আর এ ধরনের পণ্যের বিকল্প বাজারই হয়ে ওঠেনি বরং বিচলিত দেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের আকর্ষণীয় বিকল্পও হয়ে উঠেছে”। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, শুধু ২০১৫ সালেই ভারতে চীনের বিনিয়োগ ছয়গুণ বেড়েছে।

বাহল বলেন, “আর সেটা একটা শুরু মাত্র কারণ নতুন চুক্তির কারণে উচ্চগতির রেললাইন, স্মার্ট সিটি, যৌথ প্রযুক্তি পার্কসহ বড় ধরনের সহযোগিতামূলক প্রকল্পের পথ উন্মুক্ত হচ্ছে”। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, সিপিইসির নাম পরিবর্তনে চীনের প্রস্তাবটি এবং জম্মু ও কাশ্মীর, নাথু লা পাস বা নেপালের ভেতর দিয়ে বিকল্প করিডোর নির্মাণের বিষয়টি ভারতের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত যাতে ওবিওআরের ব্যাপারে নিজেদের উদ্বেগগুলোর মীমাংসা করা যায়।

বাহল লিখেছেন, “ওবিওআর ভারতের নেতৃত্বের জন্য আরেকটি সুযোগ, এবং চীনা মূলধনের বন্যার মধ্যে প্রবেশের আরেকটি পথ। ওবিওআর ছাড়া আমরা ক্রমশ সংযুক্ত হয়ে ওঠা এশিয়াতে আবদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো; এর মাধ্যমে ভারত তার ভয়াবহ অবকাঠামোকে মেরামত করে নিতে পারবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চীন ও দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ব্যাবসার দিগন্ত উন্মোচন করতে পারবে”।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাক চক্রবর্তীর সাথে একমত পোষণ করেন তিনি, যিনি বলেছেন যে, ভারতে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়লে এখানে চীনের স্বার্থ দ্বিগুণ বাড়বে এবং সে ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কখনও অস্থিতিশীল করতে চাইবে না চীন।

বাহল বলেন, “আমার কাছে এই কথাটা খুবই যুক্তিযুক্ত এবং অন্যান্য ভারতীয়ের মতো আমি চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়েও উদ্বিগ্ন নই”।

বাহলের যুক্তি হলো, সস্তা চীনা পণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভোক্তাদের সুবিধা হয়েছে কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এটা ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে সৃজনশীল হতে বাধ্য করেছে।

তিনি বলেন, “চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতিটাকে ভারত নিজেদের সুবিধায় কাজে লাগাতে পারে, এটাকে অর্থনৈতিক কূটনীতির অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগাতে পারে, যাতে আরও সুবিধাজনক বাণিজ্য চুক্তি করা যায়”।

পর্তুগিজ রাজনীতিবিদ ও চীনা বিশেষজ্ঞ ব্রুনো মাকায়েস তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড: অ্যা নিউ চাইনিজ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বইয়ে যুক্তি দিয়েছেন যে, ওবিওআরের সাফল্যের জন্য এতে ভারতের অংশগ্রহণ জরুরি।

বহু ভারতীয় বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন যে, পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো ইস্যুতে ভারত ও চীন একসাথে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং মার্কিন বাণিজ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও তারা একত্র হতে পারে, যেটা তাদের উভয়েরই ক্ষতি করছে।

ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপের রনবীর সমাদার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে একটা বাজার হিসেবে দেখে, মূলত অস্ত্রের বাজার, এবং তারা চায় চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহার করতে অথচ ভারতের স্বার্থকে তারা গুরুত্বের সাথে দেখবে না। তাই, আমেরিকার হাতের পুতুল হওয়ার কোন দরকার নেই ভারতের। কাশ্মীর নিয়ে ট্রাম্পের যে দুরভিসন্ধী, সেটা আমেরিকার প্রতারণার একটা জ্বলন্ত উদাহরণ”।

মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: ইতিহাস কী বলে by মাহফুজার রহমান

একেবারেই মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার অনুমোদন দেওয়ার পরও হামলা চালানোর মাত্র ১০ মিনিট আগে তা স্থগিত করেন। এর আগে আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করে ইরান। যদিও ওয়াশিংটন বলছে, তার ড্রোন আন্তর্জাতিক আকাশসীমার মধ্যেই ছিল।
এরপর থেকেই চলছে দুই পক্ষের বাগ্‌যুদ্ধ। ট্রাম্প বলছেন, ‘ড্রোন ভূপাতিত করে ইরান বড় ভুল করেছে।’ পাল্টা ইরানের জেনারেল বলছেন, ‘ইরানে গোলা পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আগুন জ্বলবে।’ এই বাদানুবাদের মধ্যে ইরানের সমরাস্ত্র-ব্যবস্থায় সাইবার হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর কী হবে—সময় হলেই তা জানা যাবে। তবে এই দুই দেশের সম্পর্কের অতীতটা কেমন? চলুন দেখে নেওয়া যাক—
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানের বিশাল তেলসম্পদের ওপর নজর পরে তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন ব্লক ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্লক মরিয়া হয়ে ওঠে সেই তেলের জন্য। দুই ব্লকের গোয়েন্দারা তৎপর হয়। এরই মধ্যে ক্ষমতায় আসেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইরানের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচিত মোসাদ্দেক দেশটির তেলশিল্প জাতীয়করণ করার পক্ষে ছিলেন। এটা পছন্দ হয়নি যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের। পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে ১৯৫৩ সালে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সফল হয় সিআইএ-এমআই৬। এর মাধ্যমে ইরানে ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয় মার্কিনপন্থী বলে পরিচিত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলো ইরানের তেলশিল্পে ঢোকার অবাধ সুযোগ পায়। প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার অভ্যুত্থানে কলকাঠি নাড়ার কথা ২০০০ সালে স্বীকার করেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট।
ইঙ্গ-মার্কিন বন্ধু পাহলভি
পাহলভির সঙ্গে সম্পর্কটা ভালোই যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করে। ১৯৬৮ সালে ইরান পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতেও (এনপিটি) স্বাক্ষর করে। এর দুই বছর পর থেকে দেশটি বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক কর্মসূচি চালানোর অনুমতি পায়। পাহলভি ইরানে ‘সাদা বিপ্লবের’ সূচনা করেছিলেন। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংস্কার এবং দেশকে পাশ্চাত্য ধারার আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে নিতে থাকেন। এ কারণে দেশটির প্রভাবশালী শিয়া নেতাদের সমর্থন হারান তিনি। দেশটির কর্মজীবীশ্রেণিও তাঁর প্রতি নাখোশ হয়। এ সময়টায় রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের কঠোর হাতে দমন করেন পাহলভি। ইরানের সরকারি হিসাবে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে দেশটির কারাগারগুলোয় ২২০০ রাজনৈতিক বন্দী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের মদদে ইসলামপন্থী ও সেক্যুলার—দুই পক্ষের ওর নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছিলেন পাহলভি। একপর্যায়ে পাহলভির বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। ইসলামপন্থী ও সেক্যুলার পক্ষের কয়েক মাসের টানা আন্দোলনে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে পতন ঘটে পাহলভির। শুধু পতনই নয়, ১৬ জানুয়ারি ইরান ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তিনি।
ওমান সাগরে তেলবাহী ট্যাংকার হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান এই হামলা চালিয়েছে। যদিও ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ছবি: এএফপি
পাহলভির ইরান ছেড়ে পালানোর দুই সপ্তাহ পর নির্বাসন থেকে দেশে ইরানে ফেরেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। এরপর এক গণভোটে ১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিল ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার পদে আসীন হন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। ওই বছরের ৪ নভেম্বর তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ঢুকে কর্মীদের জিম্মি করা হয়। জিম্মিকারীরা পাহলভিকে ইরানের হাতে তুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাতে থাকে।
তিক্ততার ইতিহাস
এরপর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক মূলত তিক্ততার ইতিহাস। মার্কিন দূতাবাসে এই জিম্মিদশা চলে ৪৪৪ দিন। এই পরিস্থিতিতে ১৯৮০ সালে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে থাকা ইরানের সব সম্পদ জব্দ করে ও সব ধরনের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের নির্দেশেও জিম্মি উদ্ধার অভিযান ব্যর্থ হয়। মার্কিন হেলিকপ্টার ধূলিঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে আটজন মার্কিন নিহত হন। ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি জিমি কার্টার পদত্যাগ করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দূতাবাস থেকে ৫২ জন জিম্মিকে মুক্তি দেয় ইরান।
ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক (বাঁয়ে), তাঁর পতনে ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয় ইঙ্গ-মার্কিন মদদপুষ্ট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি।
১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় যুক্ত করে। এর মধ্যেই ইরানের সঙ্গে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের গোপন যোগসাজশের খবর প্রকাশ হয়। ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে রিগ্যান প্রশাসন গোপনে অস্ত্র বিক্রি করে। সেই অস্ত্র বিক্রির অর্থ নিকারাগুয়ায় কমিউনিস্টবিরোধী কন্ট্রাবিদ্রোহীদের কাছে পাঠানো হয়। রিগ্যান প্রশাসন বলে, লেবাননে কট্টরপন্থী সংগঠন হিজবুল্লাহর হাতে জিম্মি সাত আমেরিকানকে মুক্ত করতে তেহরানের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়ে তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হয়। এই খবর প্রকাশে ওই সময় বিপাকে পড়েন প্রেসিডেন্ট রিগ্যান।
ইরানে মার্কিন দূতাবাসে ঢুকে পড়ে তরুণেরা। জিম্মি করা হয় অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে। ৪৪৪ দিন পরে এই জিম্মিদশার অবসান ঘটে। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৮ সালে ভয়ংকর ঘটনা ঘটায়। ইরানের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তারা। এতে উড়োজাহাজের ২৯০ আরোহীর সবাই নিহত হন। পরে ওয়াশিংটন দাবি করে, ভুল করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এয়ারবাস এ-৩০০ মডেলের উড়োজাহাজটিকে যুদ্ধবিমান ভেবে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে মার্কিনবাহিনী। ওই উড়োজাহাজটি ইরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত যাচ্ছিল।
আর্ক শহরে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা (২০১১)। ছবি: এএফপি
আমেরিকা ২০০০ সালের দিকে অভিযোগ তোলে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ২০০২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জজ ডাব্লিউ বুশ ইরান, ইরাক ও উত্তর কোরিয়াকে ‘শয়তানের অক্ষ’ বলে আখ্যা দেন। ওই বছরই বুশ প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ তোলে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ইরানের সরকারবিরোধী নির্বাসিত একটি পক্ষ দাবি করে, ইরান দুটি পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এর একটি নাতাৎজ এলাকায়—যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট রয়েছে। অন্য স্থাপনাটি আর্ক এলাকায়; এখানে ভারী পানি উৎপাদনে পারমাণবিক চুল্লি বসানো হয়েছে।
বরফ গলার শুরু
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সাপে-নেউলে সম্পর্কে নতুন দিগন্ত দেখা দেয় ২০০৬ সালে। যাকে বলা যায় কাছে আসার গল্প! ওই বছর ওয়াশিংটন ঘোষণা দেয়, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি থেকে সরে এলে তেহরানের সঙ্গে বহুজাতিক আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ২০০৭ সালে মে মাসে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানুচের মোত্তাকি মিসরে এক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি পরস্পরের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে মার্কিন গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়, ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছে। পরে তা স্থগিত করেছে। ২০০৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনায় বসতে ইরানের প্রতি আনুষ্ঠানিক বার্তা পাঠান।
বারাক ওবামা (বাঁয়ে) ও হাসান রুহানি। তিন দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রথম দুই শীর্ষ নেতা, যাঁরা প্রথমবারের মতো টেলিফোনে কথা বলেন। ছবি: এএফপি
সেই ধারাবাহিকতায় পরের বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার হাত বাড়ানো থাকবে, যদি তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে। ওবামা প্রশাসন তেহরানকে এই কর্মসূচি থেকে সরে আসতে প্রভাবিত করতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানান। ২০১২ সালে ইরানের সঙ্গে গোপনে আলোচনা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৩ সালে সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়। দুই পক্ষের আলোচনার কেন্দ্রে থাকে ইরানের পারমাণবিক ইস্যু। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বারাক ওবামা। বিগত তিন দশকের মধ্যে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে এটা সরাসরি কথা বলার ঘটনা এটাই প্রথম। ২৩ নভেম্বর ইরানের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে পৌঁছায় ছয় বিশ্বশক্তি (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ও জাতিসংঘ)। চুক্তি অনুযায়ী ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসবে। বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালে ইরান ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে পৌঁছায়। ২০১৬ সালে তেহরানের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ওয়াশিংটন।
সব ভেস্তে দিলেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় এসে সব ওলট-পালট করে দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নির্বাচনী প্রচারণাতে বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে ইরানের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে সরে আসবেন। তাই করলেন। গত বছরের মে মাসে ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেন। ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন—৪ নভেম্বর থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইরানের কাছ থেকে তেল আমদানি করা দেশগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। এদিকে এর প্রতিক্রিয়া ইরানও নতুন করে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করার ঘোষণা দেয়। তবে সঙ্গে এ ঘোষণাও দেয়, পশ্চিমা দেশগুলো ওয়াশিংটনকে তেহরানের ওপর অবরোধ আরোপ থেকে বিরত রাখলে, তেহরান বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে।
ফের মুখোমুখি
ট্রাম্প ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। রণতরি পাঠানোর পাশাপাশি যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করে ওয়াশিংটন। এর মধ্যে গত মে ও জুন মাসে উপসাগরীয় অঞ্চলে ছয়টি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও তেহরান সব সময় এই অভিযোগ নাকচ করে আসছে। এ বিষয় নিয়ে কথার লড়াই চলতে থাকে দুই পক্ষের মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে ২০ জুন ইরান জানায়, আকাশসীমা লঙ্ঘন করায় তারা গুলি করে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। পরে বিষয়টি স্বীকারও করে যুক্তরাষ্ট্র। সঙ্গে অভিযোগ করে, এর আগের সপ্তাহেও ইরান মার্কিন একটি ড্রোনকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার পর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা সামরিক হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে যা ২১ জুন প্রকাশ করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। হামলার যখন সব প্রস্তুতি সম্পন্ন, ১০ মিনিট পরেই হামলা চালানো হবে—এমন সময় সেই হামলা থামানোর নির্দেশ দেন ট্রাম্প। ওই খবর প্রকাশের পর ট্রাম্প নিজেই টুইট করে বলেন, ‘প্রতিশোধ নেওয়ার দিকেই আমরা ঝুঁকেছিলাম। হামলার ১০ মিনিট আগে আমি তা থামাই। ড্রোন ভূপাতিত করার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। হামলার জন্য আমার তাড়া নেই।’
আকাশসীমা লঙ্ঘন করার অভিযোগে মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করে ইরান। ইরানের টেলিভিশনে সেটির ধ্বংসাবশেষ দেখানো হয়। ছবি: এএফপি