Tuesday, March 19, 2019

হেরে চলা শ্যামবাবুর ২৯তম লড়াই

পেশায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। নাম শ্যামবাবু সুবুধি। বয়স ৮৪ বছর। থাকেন ভারতের ওডিশা রাজ্যের গঞ্জাম জেলায়। ৬২ বছর ধরে তিনি বিভিন্ন নির্বাচনে লড়ছেন। জিতেননি কোনো দিন। হেরেই যাচ্ছেন। তবু নির্বাচনী ময়দান ছাড়েননি। একসময় বিবিসি তাঁকে ‘ওয়ার্ল্ড বিগেস্ট লুজার’ তকমাও দেয়। ৮৪ বছরের এই ‘তরুণ’ এবার ২৯ তমবারের মতো নির্বাচনে লড়ছেন।
১৯৫৭ সাল থেকে শ্যামবাবু রয়েছেন নির্বাচনী ময়দানে। প্রথমবার লড়েছিলেন হিঞ্জিলি বিধানসভা আসন থেকে। ওই বছর তিনি প্রথম লড়েন রাজ্যের এক সাবেক মন্ত্রী বৃন্দাবন নায়েকের বিরুদ্ধে, নির্দল প্রার্থী হিসেবে। এতে তিনি হেরে যান।
পরবর্তী সময় শ্যামবাবু যতবার লড়েছেন, ততবারই লড়েছেন নির্দল প্রার্থী হিসেবে। টিকিট কাটেননি কোনো রাজনৈতিক দলের।
এবারও শ্যামবাবু লড়ছেন সেই নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে। লোকসভা নির্বাচনে ওডিশার গঞ্জাম জেলার দুটি আসনে লড়ছেন তিনি। একটি আসন আসকা, অন্যটি বেহরামপুর।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, লোকসভায় শ্যামবাবু প্রথম প্রার্থী হন ১৯৬২ সালে। এরপর তিনি বহু নির্বাচনে লড়েছেন। বলেছেন, এবারও লোকসভায় লড়বেন।
নির্বাচনে লড়ার ব্যাপারে শ্যামবাবু সব সময় পরিবারের সহযোগিতা পেয়েছেন। স্ত্রী তাঁর পাশে থেকেছেন। তিনি পাশে পেয়ে এসেছেন তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে।
ছেলে-মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। স্ত্রী প্রয়াত হয়েছেন গত বছর।
এবারও ক্ষান্ত হননি শ্যামবাবু। যথারীতি নির্বাচনী ময়দানে নেমে পড়েছেন তিনি। অর্থসহ নানাভাবে তাঁকে সাহায্য করছেন তাঁর হিতাকাঙ্ক্ষীরা।
শ্যামবাবু বলেছেন, ‘আমি নিশ্চিত, অন্তত একবার আমি নির্বাচনে জয়ী হব।’
সেই জয় এবারও হতে পারে বলে আশাবাদী শ্যামবাবু।
শ্যামবাবু সাংবাদিকদের বলেন, ইতিমধ্যে তিনি লড়েছেন ওডিশার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিজু পট্টনায়েক, জে বি পট্টনায়েক, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামচন্দ্র রথ, চন্দ্রশেখর সাহুসহ অনেকের বিরুদ্ধে। এই তালিকায় আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসীমা রাও।
শ্যামবাবু জানিয়েছেন, এখনো তিনি তাঁর চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখেন। রোগী দেখার আয়ের একটি অংশ তিনি ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য জমা করে রাখেন। তা ছাড়া প্রতিবছরই তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা নির্বাচনী খরচ নির্বাহের জন্য তাঁকে আর্থিক অনুদান দিয়ে থাকেন।
শ্যামবাবু বলেন, ‘নির্বাচন থেকে আমাকে বিরত রাখার জন্য পরিবার কখনো আপত্তি করেনি। সারা জীবন আমাকে সহযোগিতা করে এসেছেন আমার প্রয়াত স্ত্রী। যত দিন আমার শরীর ভোটে দাঁড়াতে অনুমতি দেবে, তত দিন আমি লড়ে যাব। আমার বিশ্বাস, একদিন আমি জিতব। এবারও সেই জয় আসতে পারে আমার ভাগ্যে।’

'৯৩% ' ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ পাওয়ার দাবি -বিবিসি বাংলা

ঢাকার ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ বিক্রি করা হয় বলে তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলছে এটি 'বাস্তবতা বিবর্জিত' তথ্য।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলছে, গত ছয় মাসে সংস্থার নিয়মিত বাজার অভিযানে যেসব ফার্মেসি বা ঔষধ বিক্রির দোকান পরিদর্শন করা হয়েছে তাতে ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতেই তারা মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ পেয়েছেন।
অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বিবিসি বাংলাকে বলেন, তিনি নিজেসহ কয়েকজন কর্মকর্তা মনিটরিং টিমগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন।
"প্রতিদিন আমাদের তিনটি টিম বাজার পরিদর্শনে গিয়েছি। গত ছয় মাসের চিত্র এটি যে যেসব এলাকায় আমরা কাজ করেছি বিশেষ করে ফার্মেসিগুলোকে সেখানে প্রায় প্রতিটিতেই কিছু না কিছু মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ আমরা পেয়েছি। আর এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।"
মিস্টার শাহরিয়ার বলেন, বিষয়টি নিয়ে তারা এখন ঔষধ ব্যবসায়ী অর্থাৎ ফার্মেসি মালিকদের সাথে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
"আসলে বিষয়টি বোঝানো গেলে এ সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। অনেক জায়গাতেই মালিকরা সহায়তা করছেন। থানা ও জেলা পর্যায়েও কর্মকর্তাদের ব্যবসায়ী বা মালিকদের সাথে সরাসরি কাজ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।"
মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ: কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে ভোক্তা অধিকার?
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের হিসেবে, দেশে ফার্মেসির সংখ্যা এক লাখ ২৪ হাজারের মতো। তবে এসব লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত হয় কয়েক হাজার ফার্মেসি।
সাধারণত ফার্মেসীকে লাইসেন্স দেয়া বা কোনো অনিয়ম পেলে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা আছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের।
মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলছেন, অভিযানের সময় মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ পাওয়া গেলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কারাদণ্ড দেয়া ছাড়া আর সব পদক্ষেপই নিতে পারেন।
"সব ধরণের জরিমানা ছাড়াও প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের জন্য আমরা (ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর)কে বলতে পারি আইন অনুযায়ী। সাম্প্রতিক সময়ে একটি ফার্মেসী আমরা তাৎক্ষনিক বন্ধও করে দিয়েছি।"
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ই মার্চ তারা শাহজাহানপুর ও ধানমন্ডিতে দুটি ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ পেয়ে জরিমানা করেছেন ৫০ হাজার টাকা করে।
বনানীতে একটি ফার্মেসিকেও জরিমানা করা হয়েছে গত ১১ই মার্চ।
আবার ১২ই মার্চ ক্ষিলক্ষেতের একটি ফার্মেসি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
এর বাইরেও শ্যামলী,মুগদাসহ আরও কয়েকটি এলাকায় নিয়মিত অভিযানে বেশ কিছু ফার্মেসিকে জরিমানা করা হয়েছে।
মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলছেন, "এমনও হয়েছে যে একটি ফার্মেসিতে ঢুকেই ঔষধ রাখার বাক্সে হাত দিয়েই পেয়েছি মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ।"
"কিন্তু তাদের সেটি নিয়ে কোনো বোধোদয়ই নেই। আমরা এখন তাদের বোঝানোরও চেষ্টা করছি যে এটি ভয়াবহ অন্যায় ও অসৎ চর্চা।"
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর যা বলছে
সাধারণত ফার্মেসিকে ব্যবসার লাইসেন্স দেয়া বা কোনো অনিয়ম পেলে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা আছে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের।
অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, যে ফার্মেসিতে বড় সমস্যা হলো ফার্মাসিস্ট রাখা হয়না।
"তবে পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। ব্যবসায়ীরাও আমাদের সহায়তা করছেন।"
তিনি বলেন, "ভোক্তা অধিকার থেকে যে তথ্য এসেছে সেটি বাস্তবতা বিবর্জিত। কিছু দোকানে এমন অনিয়ম হতে পারে সেটি ২/৩ শতাংশের বেশি হবেনা।"
"নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। স্টোর ম্যানেজমেন্ট বিশেষ করে কোনো ধরণের ঔষধ কিভাবে রাখতে হবে।"
তিনি জানান: "আবার কোনো ঔষধের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কোম্পানি সেগুলো বদলে নতুন ঔষধ দেবে-এটিও নিশ্চিত করা হয়েছে"।
মি. রহমান বলেন, বাজারে এখন ৪০/৪৫ হাজার ঔষধের আইটেম আছে এবং বাজারে গিয়ে দশটি ঔষধ চাইলে সেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ পাওয়া কঠিনই হবে।
"তবে রেগুলার ফার্মাসিস্ট রাখা, মেডিসিন শপের কার্যক্রম নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত আলোচনা করছি। কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে।"
তিনি দাবি করেন, "এসব কিছু নিয়ে এখন ফার্মেসিগুলোতে আমরা নিয়মিত অনেক সময় দিচ্ছি। ফলে পরিস্থিতির অনেক উন্নত হয়েছে।"
স্যাম্পল ঔষধ আর আন-রেজিস্টার্ড ঔষধ
অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলছেন, বাজারে নতুন উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্যাম্পল হিসেবে দেয়া ঔষধগুলো দোকানে চলে আসা।
"বিভিন্ন কোম্পানি তাদের উৎপাদিত ঔষধ চিকিৎসকদের দিয়ে থাকেন। এগুলোতে অনেক সময় মেয়াদ উল্লেখই থাকেনা।"
"কিভাবে যেনো এসব ঔষধ ফার্মেসিতে চলে আসছে। যেগুলো বিক্রেতারা গছিয়ে দিচ্ছেন ক্রেতাকে।"
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এটি অনৈতিক যদি কেউ ইচ্ছে করে স্যাম্পল ঔষধ রাখেন ও বিক্রি করেন।
তিনি বলেন, বাজারে ঔষধের ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো আন-রেজিস্টার্ড ঔষধ।
"সাধারণত চোরাইপথে বা লাগেজে করে অনেক ঔষধ এনে বাজারে বিক্রি করেন কম দামে। এগুলোতে মেয়াদ সম্পর্কিত তথ্যই থাকেনা।
কারণ এগুলো বৈধ পথে আসেনা। এগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তবে ব্যবসায়ীরা ক্রমশ এসব বিষয়ে সচেতন হচ্ছেন। আর আমরা কাউন্সেলিং করাচ্ছি প্রতিনিয়ত"।
মডেল ফার্মেসি
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মি. রহমান বলছেন, নির্ভেজাল ঔষধ বিক্রি নিশ্চিত করতে তারা মডেল ফার্মেসি করছেন বিভিন্ন এলাকায়।
ঢাকাসহ সারাদেশে পর্যায়ক্রমে দু'হাজারের বেশি মডেল ফার্মেসি হবে এবং প্রয়োজনে এ সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলছেন ফার্মাসিস্ট রাখা, ক্রেতাদের ঔষধ ভালো করে বুঝিয়ে দেয়া, যথাযথভাবে ঔষধ সংরক্ষণসহ ক্রেতা স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই মডেল ফার্মেসি হচ্ছে। যেগুলোতে ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন দুটি ক্যাটাগরির মডেল ফার্মেসি হচ্ছে যার একটি হচ্ছে ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে আর অন্য ক্যাটাগরির ফার্মেসি হবে থানা ও জেলা পর্যায়ে।

‘হামলাকারীর প্রতি ক্ষোভ নেই’

পনের বছর বয়সী মেয়ে শিফার সামনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ফরিদ আহমেদ। তিনি নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত সিলেটের হুসনা আরা ফরিদের স্বামী। তার চোখে সেদিনের ভয়াবহতার দৃশ্য। বাসায়  ফিরে তিনি যখন মেয়ে শিফার মুখোমুখি হন তার কাছে লুকাতে পারেননি কিছুই। তাকে বলতে হয়েছে সব। তখনই শিফা তার কাছে প্রশ্ন ছুড়েছে- তুমি কি বলতে চাইছো আমার মা নেই আর? তার এ প্রশ্ন শুনে অঝোরে কাঁদেন ফরিদ আহমেদ। মেয়ের প্রশ্নের উত্তরে বলেন- না নেই। কিন্তু এখন থেকে আমিই তোমার মাম।
আমরা একসঙ্গে সব প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়াবো। এরপর থেকে নিজের বুকে শোক চাপা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি শক্তিশালী থাকার। কারণ, আমি যদি ভেঙে পড়ি তাহলে অন্যদেরও একই দশা হবে।
তার ভাষায়- আমি সবাইকে বলেছি, প্রয়োজন হলে কাঁদো। কিন্তু এই কান্নাকে বা আবেগকে তোমার মন ভেঙে দিতে দিও না। সেই থেকে আমি সবার সঙ্গে শুধু কথা বলছি আর বলছি। তাদেরকে বুঝাচ্ছি, যুক্তি দেখাচ্ছি কেন ইতিবাচক থাকা উচিত। তাদেরকে বলেছি, হোসনে আরা লাখ লাখ মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। মেয়েকে বলেছি, এটাই স্মরণে, স্মৃতিতে রাখতে হবে। এটা স্মরণ করে কান্নার চেয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবে।
হামলাকারীর প্রতি তার কোনো ক্ষোভ নেই। বলেছেন, ক্ষোভ ও যুদ্ধ কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। তাই তিনি হামলাকারীকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। বরং তিনি হামলাকারীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, সেই একজন মানুষ। আমার একজন ভাই। তাই তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
স্ত্রী হুসনা ও মেয়ের ছবি হাতে নিয়ে হুইল চেয়ারে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। হুসনাকে নিয়ে তিনি গর্ব করেন। তিনি বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের জন্য একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন। মসজিদে বাচ্চাদের পড়াতেন। ফরিদ আহমেদ বলেন, তিনি অন্য মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য কাজ করে গেছেন। শেষ কাজটিও তাই করে গেলেন। হামলার সময় তিনি মসজিদের ভিতরের অনেক মানুষকে রক্ষা করেছেন। তারপর আমার কাছে আসছিলেন। ওই সময়ই তাকে গুলি করা হয় পিছন থেকে।
ফরিদ আহমেদ নিউজিল্যান্ডে গিয়েছেন ১৯৮৮ সালে। ৬ বছর আগে মদ্যপ এক গাড়িচালক তাকে আঘাত করায় তিনি এখন প্যারালাইজড। চলাফেরা করেন হুইলচেয়ারে। আর হুসনা নিউজিল্যান্ডে গিয়েছেন ১৯৯৪ সালে। যেদিন নিউজিল্যান্ডে পৌঁছেন হুসনা সেদিনই তারা অকল্যান্ডে বিয়ে করেন। এরপর চলে যান নেলসনে। শুধু বাংলাদেশী এই দম্পতির ওপর নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে ফরিদ আহমেদ হামলার সময়কার সব ঘটনা খুলে বলেছেন।
তিনি বলেন, অকস্মাৎ আল নূর মসজিদের ভিতরে ঝড়ের গতিতে প্রবেশ করলো একজন অস্ত্রধারী। এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করলো। এ সময় হুসনা নারী ও শিশুদের নিরাপদ করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তিনি আর্তনাদ করে বলতে লাগলেন আপনাদের বাচ্চাদের ধরে এই পথে বেরিয়ে যান।
তাদেরকে নিরাপদ করে মসজিদের ভিতরে হুইলচেয়ারে বসা ফরিদ আহমেদকে রক্ষা করতে ফিরছিলেন হুসনা। ঠিক তখনই তার পিছন থেকে গুলি করা হয়। এ সম্পর্কে ফরিদ আহমেদ বলেন, সে এক ভয়াবহ দৃশ্য। আমি শুধু রক্ত দেখতে পাচ্ছিলাম চারদিকে। আহত মানুষ আর্তনাদ করছে। দেখি শুধু মৃত দেহ। অন্যরা বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন মসজিদ থেকে। ফলে পিছন দিকের বের হওয়ার গেটে ছিল ভীষণ ভিড়। একবার আমি সিদ্ধান্ত নিই সেখানে গিয়ে চেষ্টা করে দেখি। বাইরে চলে যাই। আমি সুযোগটা নিইও। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে ধীরে। জানি যেকোনো সময় পিছন থেকে মাথায় গুলি করে আমাকে মেরে ফেলতে পারে।
ফরিদ আহমেদ তখন অন্য একটি রুমে। তিনি সেখান থেকে দেখতে পাচ্ছিলেন নারী ও শিশুরা বেরিয়ে যাচ্ছে। মসজিদের অন্য পাশে তখন তার স্ত্রী মরে পড়ে আছেন এ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। ফরিদ আহমেদ বলেন, অস্ত্রধারীকে দেখতে পাই নি। তবে তার কথা বা শব্দ শুনতে পেয়েছি। শুনতে পেলাম কয়েক সেকেন্ডের জন্য গুলি থেমে গেল। আবার শুরু হলো। সম্ভবত এ সময়ে সে তার বন্দুকে ম্যাগাজিন প্রবেশ করিয়েছে।
ফরিদ আহমেদের ওপর দিয়ে অনেকে দৌড়ে লাফিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকেন। তারা মসজিদের দরজায় আঘাত করতে লাগলেন। সাহায্য চেয়ে চিৎকার করতে লাগলেন। ফরিদ আহমেদ বলেন, আমার এক বন্ধু আমাকে ফোন করলেন। তিনি কাঁদছিলেন তখন। বললেন, আমি তোমাকে ফেলে এসেছি। তাকে বললাম, যেটা করেছো বুদ্ধিমানের কাজ করেছো। আমি তো হুইলচেয়ারে। তোমাদের মতো দেয়াল টপকে যেতে পারতাম না। ১০ মিনিটের মতো কেটে গেল। বন্ধ হলো গুলি। মনে হলো হামলাকারীর কাজ শেষ। এ সময় আমি এবং অন্যরা ভিতরের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রথমেই নারীদের চেক করা শুরু করি। চারদিকে দেখি মৃতদেহ। সবাইকে পিছনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতিটি মৃতদেহ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিউ মূল রুমটিতে যাওয়ার। সেখানে সব জায়গায় পড়ে আছে বুলেটের শেল।
ওই মসজিদটির সিনিয়র একজন সদস্য ফরিদ আহমেদ। প্রায় তিন বছর তিনি এখানে বয়ান দিয়েছেন। ফলে মসজিদে যারা যান তাদের প্রায় সবাইকে তিনি চেনেন। ফরিদ আহমেদ বলেন, আমি একজন পুরুষকে আর্তনাদ করতে দেখলাম। তিনি সাহায্য চাইছেন। দেখলাম তার শরীরের ওপর পড়ে আছে দুটি মৃতদেহ। তিনি আমাকে অনুরোধ করছেন তা সরিয়ে তাকে নিঃশ্বাস নিতে সাহায্য করতে।
সেখানেই তাকে থেমে যেতে হয়। কারণ, ওই রুমটি ভরা মৃতদেহে। তার ভিতর দিয়ে তিনি হুইল চেয়ার চালিয়ে অগ্রসর হতে পারছিলেন না। বলেন, ইথিওপিয়ার একজন মানুষ আমাকে ডাকলেন। সাহায্য চাইলেন। বললেন, নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। একজনকে দেখলাম এমনভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন, তা দেখে মনে হলো শিগগিরই তিনি মারা যাবেন। দুজন মানুষকে জীবিত পড়ে থাকতে দেখি। এর মধ্যে একজন বাংলাদেশি। তাকে আমি চিনি। এদিনই দুই সন্তান ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে সন্ধ্যায় বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। তিনি আমাকে দেখলেন এবং বললেন- আমি শেষ হয়ে গিয়েছি। ফিলিস্তিনি একজনকে দেখলাম রক্ত ঝরছে তার শরীর থেকে। সবাই সাহায্য চাইছেন।

ভোটারশূন্য: ভোটের সেই একই চিত্র

উপজেলা নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপেও সেই আগের চিত্রই দেখা গেছে। কম ভোটার উপস্থিতি, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ এসেছে বিভিন্ন এলাকা থেকে। অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করেন ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই। আওয়ামী লীগ  মনোনীত প্রার্থীরাও নির্বাচন বর্জন করেছেন কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেয়ার অভিযোগে। এদিকে প্রথম ধাপের চেয়ে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে আরো কম ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায়। কোনো কোনো কেন্দ্রে সারা দিনে হাতেগোনা কয়েকটি ভোট পড়েছে। ওইসব কেন্দ্রে ভোটশূন্য কক্ষও ছিল।
এদিকে রাঙামাটিতে ভোটের সরঞ্জাম নিয়ে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রিজাইডিং অফিসারসহ অন্তত ছয় জন নিহত হয়েছে। গুলিতে আহত হয়েছেন আরো কয়েকজন।
নির্বাচন কমিশন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছে। বগুড়ার গাবতলীতে ভোটের আগের রাতেই বাক্স ভর্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অভিযোগে ভোট বর্জন করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এ উপজেলার ভোট কেন্দ্রগুলো দিনভর ভোটার শূন্য ছিল। মৌলভীবাজার পৌর শহরের কাশিনাথ আলাউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের দুটি ভোট কক্ষে কোনো ভোটই পড়েনি। এ জেলার রাজনগর উপজেলায় অনিয়ম, কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেয়ার অভিযোগে ভোট বর্জন করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. আছকির খান। রাঙামাটিতে অনিয়মের অভিযোগে তিন উপজেলার পাঁচ স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেন। সিলেটের উপজেলাগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। তবে পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। এ ধাপে ৮টি ভোট কেন্দ্র অনিয়ম ও ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ১১৬ উপজেলার ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। সোমবার ভোট শেষে এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। দ্বিতীয় ধাপে ১১৬ উপজেলায় ভোট হয়।
ইসি সচিব জানান, এ ধাপের ৭০৩৯ কেন্দ্রের মধ্যে আটটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করার তথ্য দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। বাকি সবখানে কোনো অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায় নি। দ্বিতীয় ধাপে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। এ ধাপে অধিকাংশ এলাকায় ভোটার উপস্থিতি ব্যাপক ছিল বলে তথ্য পেয়েছি। কোথাও কোথাও কম উপস্থিতি ছিল। তবে “সব মিলিয়ে প্রথম ধাপের (৪৩%) চেয়ে বেশি ভোটের হার হবে আশা করি” বলেন হেলালুদ্দীন আহমদ। এবার উপজেলার ভোট হচ্ছে পাঁচ ধাপে। এর মধ্যে প্রথম ধাপের ভোট শেষ হয় ১০ই মার্চ। নানা অনিয়মের কারণে সেদিন ২৮টি কেন্দ্রে ভোট বন্ধ করা হয়; গ্রেপ্তার করা হয় অন্তত তিনজন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাকে। তারপরও প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণকে ‘মোটামুটি শান্তিপূর্ণ’ বলেছে নির্বাচন কমিশন।
দলীয় প্রতীকে এই প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হলেও বিএনপিসহ বেশির ভাগ দলের বর্জনের কারণে প্রথম দফার ভোটে লড়াইয়ের আমেজ দেখা যায়নি। সেদিন ভোট পড়ে ৪৩ শতাংশ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় প্রথম ধাপে ২৮ জন ও দ্বিতীয় ধাপে ৪৮ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হন।
ইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৪শে মার্চ তৃতীয় ধাপে, ৩১শে মার্চ চতুর্থ ধাপের উপজেলাগুলোতে হবে ভোট। পঞ্চম ও শেষ ধাপের ভোট হবে ১৮ই জুন।

মুসলিম ও হিন্দু পরিবারের চির বন্ধন

একটি মুসলিম ও একটি হিন্দু পরিবারের মধ্যে চিরদিনের এক বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে ভারতে। একটি পরিবার বিহারের। অন্যটি থানের। থানের পরিবারটি হলো নাদিম (৫১) এবং তার স্ত্রী নাজরিন প্যাটেল (৪৫)-এর। বিহারের পরিবারটির পুুরুষ রামস্বার্থ যাদব (৫৩) ও তার স্ত্রী সত্যদেবী (৪৫) কে নিয়ে। নাদিম ও রামস্বার্থ যাদবের কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কোথাও কিডনি যোগাড় করতে পারছিলেন না তারা। এ অবস্থায় দুটি পরিবারের দুই নারী নাজরিন ও সত্যদেবী এগিয়ে এলেন।
তারা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। ব্যস, একজন অন্যজনের স্বামীকে কিডনি দিতে রাজি হলেন। ফলে মুসলিম পরিবারের স্ত্রী নাজরিন প্যাটেলের কিডনি লাগিয়ে দেয়া হলো রামস্বার্থ যাদবের দেহে। আর হিন্দু নারী সত্যদেবীর কিডনি লাগিয়ে দেয়া হলো নাদিমের শরীরে। এরপর দু’জনের স্বামীই সুস্থ আছেন। তারা ভাল হয়ে উঠেছেন। আর এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে হিন্দু-মুসলিমের এক সম্প্রীতির বন্ধন। এ খবর দিয়েছে অনলাইনটাইমস অব ইন্ডিয়া।
ছয় মাস আগে নিরোলজিস্ট ডা. হিমেল শাহ তাদেরকে কিডনি প্রতিস্থাপনে রাজি করান। ওই সময় থেকে তারা সব আইনি বাধা একসঙ্গে কাটিয়ে উঠতে থাকেন। আর শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে সেই কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ১৪ই মার্চ সাইফি হাসপাতালে অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, এই দুটি পরিবারের কর্তাদের কিডনি রোগ ধরা পড়ে। বলা হয়, কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। তখন মাথায় হাত ওঠে তাদের। তারা কিডনি খুঁজতে থাকেন। কারো কাছে পান না কিডনি। ওদিকে রোগিদের অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যেতে থাকে। এ অবস্থায় সাইফি হাসপাতালের নিউরোলজির বিভাগের প্রধান ডা. হিমেল শাহ এগিয়ে আসেন। তিনি পরিবার দুটির সঙ্গে কিডনি প্রতিস্থাপনের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, রামস্বার্থের রক্তের গ্রুপ এ। অন্যদিকে নাজরিনের রক্তের গ্রুপও এ। আবার নাদিমের রক্তের গ্রুপ বি। রামস্বার্থের স্ত্রী সত্যদেবীর রক্তের গ্রুপও বি। ফলে ডা. হিমের প্রস্তাব দেন যদি দু’জন নারী তাদের কিডনি একজন অন্যজনের স্বামীকে দান করেন তাহলে তারা বেঁচে উঠতে পারেন। এমন আলোচনার পর এক মাস কেটে যায়। দুটি পরিবারের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলতে থাকে। অবশেষে তারা রাজি হয়ে যান। রামস্বার্থের ছেলে সঞ্জয় বলেছে, আমার পিতার ডায়ালাইসিস চলছিল। তবু গত দুটি বছর তিনি প্রচন্ড বেদনা নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। তাকে বাঁচানোর একটিই পথ ছিল কিডনি প্রতিস্থাপন। তাই জীবন ও মৃত্যুরে ক্ষেত্রে ধর্ম এখানে কোনো বাধা মনে হয় নি আমাদের কাছে। তিনি বলেন, তার পিতার চিকিৎসার জন্য আত্মীয়রা অর্থ সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু কেউ একজনও কিডনি দিতে রাজি হয় নি। নাজরিন আন্টিকে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করা যাবে না।
তিনি বলেন নাদিম আঙ্কেলকে তার ডায়ালাইসিস সেন্টার ভুবনেশ্বরে স্থানান্তরিত করতে বলি। সেখানেই নাজরিন ও সত্যদেবীর মধ্যে কথাবার্তা হয়। তারা কিডনি প্রতিস্থাপনে রাজি হয়ে যান। এ জন্য প্রয়োজন হয় কাগপত্র তৈরি করা। বেশ কিছু সময় লাগে থাকে। এর মধ্য দিয়ে তারা একে অন্যের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যান।

সন্তানের মুখ দেখা হলো না ফারুকের

অসময়ে বাবার মৃত্যুতে পরিবারের হাল ধরেছিল ওমর ফারুক। সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে পাড়ি জমান সুদূর নিউজিল্যান্ডে। ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন হয়। নাগরিকত্ব পেয়ে যান সেখানে। দেশে এসে ধুমধাম করে বিয়ে করেন। আবার ফিরে যান চলতি বছরের ১৮ই জানুয়ারি। কিন্তু প্রবাসে থাকলেও তার মনটা পড়ে ছিল পরিবারের কাছে। সময় পেলেই মা-বোন ও স্ত্রীর খোঁজ নিতেন।
স্ত্রীকে সতর্ক করতেন যেন সাবধানে থাকে। অনাগত সন্তান যেন মাতৃগর্ভে নিরাপদে থাকে। নানা চিন্তা। স্ত্রী সানজিদা জাহান নেহার সঙ্গে আগত সন্তানকে নিয়ে কতই না স্বপ্ন দেখেন ফারুক। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটেও স্ত্রী নেহার সঙ্গে কথা বলেন ওমর ফারুক। স্ত্রীর খোঁজ নিয়ে তাকে সাবধানে চলাফেরা এবং নিজের প্রতি খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন। সেই সঙ্গে অসুস্থ মায়ের যতœ নিতে ও ছোট বোনকে দেখে রাখার কথা বলেন। কিন্তু কে জানতো এটাই ফারুকের সঙ্গে নেহার শেষ কথা হবে। তার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন দুঃসংবাদ দরজায় কড়া নাড়ছে। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের একটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় গুলিবিদ্ধ হন ওমর ফারুক। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার রাতে তিনি মারা যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেন নিহতের খালুশ্বশুর ও বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল। অন্ধকার নেমে আসে ফারুকের সুখের পরিবারে।
ওমর ফারুকের পরিবারে শোকের মাতম চলছে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ফারুকের মা রহিমা খাতুন পাগলপ্রায়। বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। অনেকটা বাকরুদ্ধ ওমর ফারুকের তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সানজিদা জাহান নেহা। তার অনাগত সন্তান জন্ম নেয়ার আগেই পিতৃহারা হলো। আত্মীয়-স্বজনরা সান্ত¡না দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে আহাজারি ছাপিয়ে এখন অপেক্ষা ওমর ফারুকের লাশ কবে কখন দেশে আসবে।
নিহত ফারুকের পারিবারিক তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জের বন্দরের রাজবাড়ি এলাকার মৃত আবদুর রহমানের ৪ ছেলেমেয়ের মধ্যে ওমর ফারুক (৩৫) তৃতীয়। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন এখনো অবিবাহিত। সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৫ সালে নিউজিল্যান্ডে যান ওমর ফারুক। সেই দেশে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ছুটিতে দেশে এসে ২০১৭ সালের ২৯শে ডিসেম্বর সানজিদা জামান নেহাকে বিয়ে করেন ফারুক। এরপর সবশেষ গত বছরের ১৬ই নভেম্বর দেশে এসে চলতি বছরের ১৮ই জানুয়ারি নিউজিল্যান্ড যান ফারুক।
ফারুকের স্ত্রী সানজিদা জামান নেহা বলেন, সর্বশেষ বাংলাদেশ সময় গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত এবং নিউজিল্যান্ড সময় সকাল ৮টায় ফারুক তাকে ফোন করে তার ও পরিবার সদস্যদের খোঁজখবর নেন। সেই সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিজের শরীরের প্রতি বিশেষ যতœ নেয়ার কথা বলেন। এটাই ছিল ফারুকের সঙ্গে নেহার শেষ কথোপকথন।
নেহার খালাতো ভাই রেজানুর রহমান রুপন জানান, টেলিভিশনে নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে জুমার নামাজের পর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ব্যাপক হতাহতের খবর পেয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি। এবং সেখানে ফোন করে ওমর ফারুকের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করি। তার রুম মেটের কাছ থেকে জানতে পারি লাঞ্চ ব্রেকের পর ফারুক মসজিদে জামার নামাজ পড়তে যায়। এরপর কি হয়েছে তার কোনো খোঁজ দিতে পারেনি সে। এক পর্যায়ে বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের স্পোর্টস রিপোর্টার ওমর ফারুকের রুম মেটের কাছ থেকে ওমর ফারুকের পাসপোর্ট নিয়ে টিভিতে শো করেন। তখন রাত ১১টার দিকে আমি ওই টেলিভিশন চ্যানেলের অফিস বারিধারা যাই। ওই অফিস থেকে আমাকে নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের কনসুলারের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। সেখান থেকে আমাকে জানানো হয় ওমর ফারুক আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছে। এক পর্যায়ে ওই টেলিভিশনের নিউজিল্যান্ডে থাকা তাদের স্পোর্টস রিপোর্টারের মাধ্যমে জানতে পারি ওমর ফারুক মারা গেছেন।
রুপন আরো জানান, এখন ওমর ফারুকের লাশ দেশে আনার জন্য আমরা স্থানীয় এমপির মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি।

বিপন্ন নদীর কান্না by সোয়েল রানা

১৪ মার্চ বিশ্ব নদীকৃত্য দিবস। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালী থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে বগুড়ার সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলা হয়ে শেরপুর উপজেলার খানপুরে গেছে বাঙ্গালী নদী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বাঙ্গালী নদীর এই অংশ ১১২ দশমিক ৫ কিলোমিটার। নদীটি কোথাও কোথাও শুকিয়ে গেছে। কোথাও সামান্য পানি প্রবাহ আছে। এভাবেই বিপন্ন নদী বাঙ্গালীর কান্না ছড়িয়ে পড়ছে।
শুকিয়ে গেছে বাঙ্গালী নদী। সেই নদীতে বয়ে চলছে জেলেদের নৌকা।
এক সময় এখান দিয়ে বড় নৌকা চলত। আর এখন পানি এত কমেছে যে হেঁটে পার হওয়া যায়।
বছরজুড়ে বাঙ্গালী নদী তার পানি ও প্রতিবেশে আশপাশের বাসিন্দাদের জীবন সচ্ছল রাখে। তবে সেই নদী মরে যাচ্ছে।
বিভিন্ন স্থানে বাঙ্গালী নদীর পানি শুকিয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে চরের মতো জায়গা।
সেতু থেকে দেখা বিপন্ন বাঙ্গালী নদী। 
একটু পানি আছে এমন স্থানে গোসল করে বাড়ি ফিরছে দুই শিশু।
বাঙ্গালী নদীর পানি এতটাই কমে গেছে যে ভ্যান ঠেলে পণ্য পারাপার করা যায়। 
পানি কমে যাওয়া বাঙ্গালী নদীতে মাছ শিকারে যাচ্ছেন দুই জেলে।
অল্প পানিতে মাছ ধরার আশায় নৌকা নিয়ে বের হয়েছেন জেলেরা।