Showing posts with label সামাজ. Show all posts
Showing posts with label সামাজ. Show all posts

Thursday, May 19, 2011

জাপানি বালক, তোমাকে স্যালুট by শেখ আবদুস সালাম

স্পেনের রাজা জুয়ান কার্লোস এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিককে সম্মানসূচক অ্যাওয়ার্ড ‘কমান্ডার অব দি অর্ডার অব দ্য সিভিল মেরিট’-এ ভূষিত করেছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত উপাচার্যের বাংলোয় এসে এক অনাড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে আরেফিন সিদ্দিকের কাছে অ্যাওয়ার্ডটির পদক এবং সাইটেশন হস্তান্তর করেন। এই অ্যাওয়ার্ডটি যতটা গৌরবের ব্যক্তি আরেফিন সিদ্দিকের, ততটা গৌরবান্বিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই। অধ্যাপক আরেফিনকে এটি প্রদান করা হয়েছে ‘সিভিক ভারচ্যু’ প্রমোট করায় তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। আরেফিন সিদ্দিককে আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন।
পত্রপত্রিকায় যখন দেখি, কোনো বেতনহীন প্রাথমিক বা মাদ্রাসাশিক্ষকের করুণ জীবনকাহিনি দেখে কোনো ফেরিওয়ালা তাঁকে সাহায্যের জন্য অর্থদানে এগিয়ে আসেন কিংবা লাখ টাকাসহ ব্যাগ ফেলে কোনো রিকশা কিংবা অটোরিকশার আরোহী চলে গেছেন এবং ওই রিকশাওয়ালা বা অটোরিকশার চালক তাঁকে খুঁজে বের করে টাকাসহ তাঁর ব্যাগটি বাড়িতে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে এসেছেন অথবা আগুনে পুড়ে মা-বাবা-ভাইবোন এবং সর্বস্ব হারানো এতিম মেয়েদের নিজেকে মা গণ্য করে এবং মায়ের দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের ঘর সাজিয়ে দিয়েছেন, তখন স্বভাবতই আমাদের মন থেকে অমলিনতার ছাপ ক্ষণিকের জন্য হলেও বিদূরিত হয় এবং আমরা সিভিক ভারচ্যুর এক বিরল অস্তিত্বের সন্ধান পাই।
আমি ‘সিভিক ভারচ্যু’ কী, এর অস্তিত্ব ও পরিধি-পরিসর এবং পরিচর্যার জায়গাটি কোথায়, সেসব প্রশ্নের অনুসন্ধান এবং উত্তর পাওয়ার বিষয়টি খুঁজতে চেষ্টা করি। গত ২২ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেনের মুখে এক গল্প শুনতে পাই। সুখ-বেদনা এবং একজন জাপানি বালককে নিয়ে এই গল্প খানিক সময়ের জন্য আমাকে রীতিমতো হতভম্ব করে দেয়; ওই জাপানি বালকটির প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় মাথা নুইয়ে দেয়। পাঠকদের সেই গল্পটি জানানোর জন্যই এই লেখা। আনোয়ার হোসেন এ ঘটনাটি জেনেছেন তাঁদের গ্রুপের একটি ওয়েবসাইট থেকে। এটি আমাকে ই-মেইল করে পাঠান তিনি। এই মেইলটি ভিয়েতনামি বংশোদ্ভূত জাপানে এক ইমিগ্রান্ট পুলিশ সদস্য পাঠিয়েছেন তাঁর এক ভিয়েতনামি বন্ধুকে। ১৯ এপ্রিল তা ছাপা হয়েছে নিউ আমেরিকা মিডিয়ায়। আমি এই ই-মেইলটি বয়ান করতে চাই।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জাপানি সুনামির কথা আমরা সবাই অবগত রয়েছি। জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সার্বিক ধ্বংসের মধ্য দিয়ে উঠে আসা একালের পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ দেশ। অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ঐতিহ্য, মানবিকতা, সিভিক ভারচ্যুর চর্চা—সবকিছুর জন্য অনুকরণীয় জাতি হিসেবে জাপানের অবস্থান অনেক ওপরে। সাম্প্রতিক সুনামি-পরবর্তী সময়ও জাপানের মানুষ এসব গুণ থেকে একবিন্দুও বিচ্যুত হয়নি। এ সময়ে জাপানের সুনামি আঘাতপ্রাপ্ত এলাকায় মানুষকে আমরা অসহায় দেখেছি, কিন্তু বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও মানবিক অবস্থান থেকে সরে আসতে দেখিনি। দরিদ্র বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নির্মাণে সাহায্যের অঙ্গীকার থেকেও তারা সরে যায়নি। যাবে কীভাবে? কারণ, জাপানের মানুষের মূল্যবোধ, সিভিক ভারচ্যুর চর্চা অসীম মনোনিবেশে প্রোথিত রয়েছে তাদের মনের গভীরে; মিশে গেছে জেনারেশনের মধ্যে নির্মিত এক মানবিক আত্মার মর্মমূলে। আমরা জানি, সুনামি-পরবর্তী জাপানে ফুকুশিমায় এখন দুর্গত ও পীড়িত মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য, কাপড়, পানি ইত্যাদি সংগ্রহ করতে হচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে। পারমাণবিক চুল্লি দুর্ঘটনার ২৫ মাইল দূরে একটি স্কুল প্রাঙ্গণে সেদিন একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান দুর্গত ব্যক্তিদের লাইনে দাঁড়িয়ে আয়োজন করেছিল খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির। সেদিন জাপানের একটি নয় বছরের বালক দাঁড়িয়েছিল এই খাবার সংগ্রহের লাইনে। খাবার ছিল সীমিত; কিন্তু লাইন ছিল দীর্ঘ। এই বালক একজন স্কুলছাত্র। সে দাঁড়িয়েছিল ওই লাইনের একেবারে শেষের দিকে। খাদ্য বিতরণের লাইন ঠিক রাখার কাজে নিয়োজিত ভিয়েতনামি বংশোদ্ভূত ওই ইমিগ্রান্ট পুলিশ সদস্য হঠাৎ বালকটিকে দেখতে পান। লাইনের শেষভাগে দাঁড়িয়ে বালকটি খাবার পাওয়ার অনিশ্চয়তা জেনেও খাবার বিতরণ পয়েন্টে জড়ো করা খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকে। গায়ে শীত নিবারণের জন্য পরিধেয় বস্ত্র খুবই কম; একটি মাত্র টি-শার্ট এবং পায়ে দুটি মোজা। ক্ষুধা এবং শীত দুটোই তাকে পেয়ে বসেছে। হঠাৎ পুলিশ সদস্য বালকটির কাছে গিয়ে তার সম্পর্কে জানতে চাওয়ায় বালকটি জানাল, সুনামির সময় স্কুল ব্যালকনির তৃতীয় তলায় দাঁড়িয়ে সে দেখতে পেয়েছিল তার বাবা তাকে স্কুল থেকে নেওয়ার জন্য গাড়ি চালিয়ে রাস্তা থেকে স্কুলের দিকে ঢুকছেন। ছেলেটির বাবা ওই স্কুলের কাছেই একটি কারখানায় কাজ করতেন। অকস্মাৎ ছেলেটি প্রত্যক্ষ করল, তাদের গাড়িটি অন্যান্য গাড়ির সঙ্গে পানির টানে সাগরের দিকে ভেসে গেল। তারপর তার বাবা আর তাকে নিতে আসেননি...। ছেলেটি তার পরিবার সম্পর্কে জানাল যে তারা সমুদ্রপারে বিচ এলাকায় একটি সুন্দর বাড়িতে থাকত। মা, বাবা, সে এবং এক বোন। সুনামির পর বাড়িটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। মা ও বোনেরও কোনো খোঁজ নেই। ঘটনা শুনে পুলিশ সদস্য প্রায় বাক্রুদ্ধ। দুরবস্থা জেনে ওই পুলিশ সদস্য তাঁর নিজের গায়ের জ্যাকেটটি খুলে বালকটিকে পরিয়ে দিলেন। জ্যাকেটটি পরিয়ে দেওয়ার সময় পুলিশ সদস্যের কাছে থাকা তাঁর নিজের খাবারের প্যাকেটটি একপর্যায়ে বালকটির পায়ের কাছে পড়ে যায়। বালকটি তখন খাবারের প্যাকেটটির দিকে তাকিয়ে থাকে। এ অবস্থায় পুলিশ সদস্য প্যাকেটটি হাতে তুলে সেটি বালকটিকে নিতে বলেন। বালকটি প্যাকেটটি নিয়ে সোজা হেঁটে একেবারে খাবারের লাইনের শেষ প্রান্তে খাবার বণ্টন পয়েন্টে গিয়ে তা সেখানে রেখে আসে এবং পুনরায় লাইনে নিজ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। পুলিশ সদস্য বালকটির কাছে সে এমনটি করল কেন তা জানতে চাইলেন। জবাবে বালকটি জানায়, ‘আমি দেখেছি, এখানে আমার চেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা অনেক; যদি আমি খাবারের প্যাকেটটি ওখানে রাখি, তাহলে তারা খাবার সমভাবে বণ্টন করে নেবে।’ বালকটির এই অভাবনীয় বক্তব্য শুনে পুলিশ সদস্য কেঁদে ফেলেন। তাঁর ভাষায়, ‘এ কথা শোনার পর আমি কান্না ঢাকতে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে ঘুরে দাঁড়ালাম।’
আসুন, আমরা সবাই মিলে জাপানি এই বালককে স্যালুট জানাই। তোমাকে কোটি কোটি স্যালুট হে জাপানি বালক! জয় হোক মানবতার, জয় হোক ‘সিভিক ভারচ্যু’ মুভমেন্টের।
ড. শেখ আবদুস সালাম: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
salam@univdhaka.edu

Monday, April 18, 2011

ব্যক্তি, বিচ্ছিন্নতা ও ফেসবুক by জুনান নাশিত

সেদিন আমার এক আত্মীয় ভদ্রলোক বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন, ‘টিভি, মোবাইলের অত্যাচারেই বাঁচা দায়, তার ওপর ফেসবুক! ছেলেমেয়ে দুটো যে ওতে কী পায় বুঝি না! কেবল ফেসবুক নিয়ে সময় কাটায়।’ আমি ওনার কথায় একটু বিব্রত হলাম। কারণ, আমি নিজেও একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী। এ তো গেল আমার আত্মীয় ভদ্রলোকের কথা। অফিসে, আড্ডায়ও ফেসবুক ভালো কি মন্দ এ নিয়ে মুখর তর্কে মেতে উঠতে দেখি অনেককেই। এসব কারণে আমার মতো যে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—জাগা স্বাভাবিক—সত্যিই কি ফেসবুক আমাদের জীবনে আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে? ফেসবুক কি কেবল আমাদের মূল্যবান সময়ই ধ্বংস করছে?
বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের জীবন যে এক-একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, এ কথায় কারও সম্ভবত দ্বিমত থাকার কথা নয়। বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে। মানুষ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে পরিবার থেকে। বিচ্ছিন্ন হচ্ছে সমাজ থেকে, এমনকি নিজের সত্তা থেকেও। যৌথ পরিবারপ্রথা ভেঙে পড়ছে। বাড়ছে নিউক্লিয়ার পরিবার। বিকল্প পরিবারের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বিচ্ছিন্নতা নানা ধরনে এবং নানা কারণে আমাদের গ্রাস করছে। বিচ্ছিন্নতা থেকে জন্ম নিচ্ছে হতাশা। বাড়ছে জীবনবিমুখতা। আর জীবনবিরোধিতা সহজেই নানা ধরনের ব্যক্তিক ও সামাজিক অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নতা আমাদের আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপরও করে তুলছে। তৈরি করছে দূরত্ব। আর দূরত্ব তৈরি করছে অনান্তরিকতা। আন্তরিকতাহীন মানুষ বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেয় অতি সহজে। এতে করে বাড়ে হিংস্রতা। বাড়ে হানাহানি। হানাহানি নতুন করে বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। মানুষ ডুবে যায় নৈঃসঙ্গের অন্ধকার ভুবনে। নিঃসঙ্গ মানুষ ক্ষয়ে যায় অনবরত। ক্ষয়িষ্ণু জীবন তাকে খণ্ডিত চেতনায় ডুবিয়ে দেয়। সে তখন আর মহত্ত্বকে বড় কিছু ভাবতে পারে না। ক্ষুদ্রত্বের সীমাকেই জীবন ও গন্তব্য বলে ভেবে নেয়। আর এ ক্ষুদ্রত্বের সীমা বাড়িয়ে দেয় সীমাহীন দ্বিধাবিভক্তি; পথ ও মতের পার্থক্যকে করে প্রসারিত। তাই একক বিশ্বে মানুষ আজ শতধাবিভক্ত। যদিও পৃথিবী আজ অনেক বেশি একক ও অবিচ্ছিন্ন, কিন্তু মানুষ বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত হয়েছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
আমাদের জীবনে আছে হরেক রকম ব্যস্ততা। কি সকাল কি সন্ধ্যা, সময়ের সঙ্গে তাল রেখে আমাদের ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে হয়। জীবন ও জীবিকার তাগিদে পিষ্ট হতে হতে আমরা ভুলতে বসি বন্ধুর মুখ। আতিথেয়তার কোমল সম্ভাষণে মনকে সিক্ত করার মতো ফুরসত আজ আমাদের কতটুকু আছে? এ বাস্তবতায় আমি আমার নিজের কাছে করা নিজের প্রশ্নের সহজ সমাধান খুঁজি। বলতে দ্বিধা নেই, সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ফেসবুক আমাদের বিচ্ছিন্ন জীবনপ্রবাহকে কিছুটা হলেও অবিচ্ছিন্নতার সূত্রে গাঁথতে সমর্থ হয়েছে। এ কথায় আমার ওই আত্মীয় ভদ্রলোকটির মতো অনেকেই হয়তো আঁতকে উঠবেন, আমি জানি। কিন্তু তাঁদের আশ্বস্ত করে বলতে পারি, আসলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।
উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে হু হু করে। দিন দিনই তা বাড়ছে। অগণিত লোক আজ মোবাইল ফোনের গ্রাহক। এরও কি নেতিবাচক দিক নেই? আছে। তা সত্ত্বেও মানুষ এর ভালো দিকটিই গ্রহণ করেছে। তেমনি ক্রমবিচ্ছিন্ন মানুষ ফেসবুককেও সঙ্গী করে নিতে দ্বিধা করছে না। যদিও এ দেশে এর প্রসার এখনো ততটা নয়, কিন্তু এর ব্যবহার বাড়ছে। বিশ্বে এখন ৫০ কোটির বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেই ব্যবহারকারীর এ সংখ্যা ৭০ শতাংশ। ফেসবুকে যারা সক্রিয়, তাদের ২০ কোটি মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে ফেসবুক ব্যবহার করে। সুতরাং, বাংলাদেশেও এর ব্যবহারের বিস্তৃতি ঘটবে নিঃসন্দেহে।
যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক টুইটারসহ অন্যান্য যেকোনো মাধ্যমের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। মাধ্যমটি যত জনপ্রিয়, তত এর সমালোচনাকারীর সংখ্যাও। পক্ষে যেমন মত পাওয়া যাবে ঢের, তেমনি বিপক্ষে বলার লোকেরও অভাব নেই। অনেকেই বলেন, ফেসবুক দাম্পত্য জীবন থেকে শুরু করে নানা সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু এ দোষে কি কেবল ফেসবুকই দুষ্ট? সব প্রযুক্তিরই যেমন ভালো দিক রয়েছে, তেমনি রয়েছে মন্দ দিক। ভালো-মন্দের বিষয়টি নির্ভর করে এর ব্যবহারকারীর ওপর। কে কেমন করে ব্যবহার করছে, তার ওপর। আর কোনো কিছু ব্যবহারে যে সচেতনতা বাঞ্ছনীয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তাই বলে ঢালাওভাবে ফেসবুকের বিরোধিতা করে কী লাভ? আমরা অন্ধ হলেই কি আর প্রলয় বন্ধ থাকবে?
আধুনিক জীবনে দ্রুত ও সহজলভ্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফেসবুক অনন্যসাধারণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। বহু দূরের কোনো বন্ধু কিংবা আত্মীয়ের সঙ্গে মুহূর্তে আমরা যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছি। আমরা সম্পর্কসূত্রে গ্রথিত হচ্ছি। আনন্দ, দুঃখ, বেদনা একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করার সুযোগ পাচ্ছি; জীবনে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিংবা দীর্ঘদিনের যোগাযোগহীনতায় যে বন্ধুটিকে আমরা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি, তাকেও ফেসবুকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হতে পারছি। নিরাশার দোলাচলে দুলতে থাকা এ জীবনে এটা খুব একটা কম পাওয়া বলে আমার মনে হয় না। এ ছাড়া ইদানীং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ফেসবুকের ইতিবাচক ব্যবহারের খবর আমরা হামেশাই পাচ্ছি। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মধ্যপ্রাচ্যের গণবিপ্লব এবং জাপানের ভূমিকম্প ও সুনামির কথা; যেখানে দুর্যোগ-দুুর্বিপাকে মানুষ ফেসবুককে আশার আলো হিসেবে ব্যবহার করছে। আমি আগেই বলেছি, যেকোনো বিষয়েরই ভালো ও মন্দ দিক রয়েছে। কিন্তু আমরা কেন মন্দের কথা ভেবে ফেসবুকের ভালো দিকটা অবজ্ঞা করব? কেন নিজেদের বঞ্চিত করব প্রযুক্তির আধুনিক সিঁড়িতে পা রাখার সুবর্ণ সুযোগ থেকে?
জুনান নাশিত: কবি ও সাংবাদিক।
nashit_junan@yahoo.com

Monday, December 13, 2010

আসুন, আমরা গর্বিত নাগরিক হই ব্য সালমা খান



প্রথম আলো বিগত এক যুগ ধরে শুধু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন নয়, সেই সঙ্গে মানবিক চিন্তা বিকাশে ও উন্নত সমাজ বিনির্মাণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে, যা সুশীল সমাজে প্রশংসিত হয়েছে। দশম বছর পূর্তিতে ‘বদলে যাও বদলে দাও’ স্লোগানের পর এ বছর এক যুগ পূর্তিতে প্রথম আলো আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে হূদয় নিঙড়ানো এক অঙ্গীকারে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়েছে, ‘আসুন, মায়ের মতো দেশকে ভালো বাসি।’
প্রতিটি জাতিই দেশকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করে, যে ভাষাতেই হোক, দেশমাতৃকার চরণে সবাই বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা ঠেকায়। কিন্তু দেশকে মায়ের মতো ভালোবাসা যদি অতি স্বাভাবিক ও সপ্রতিভ হয়, তাহলে দেশে দেশে আজকে এত হানাহানি, শোষণ, দুর্নীতি ও বঞ্চনা কেন? কটা দেশে শান্তি ও সমতা, মানবিক বোধ ও সুশাসন বিরাজ করছে?
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ দেশের জন্য কম ত্যাগ করেনি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন, ভাষাসংগ্রাম থেকে স্বাধীনতাসংগ্রাম—সবকিছুর পটভূমি ছিল দেশকে ভালোবাসার গভীর চেতনাবোধে। তা সত্ত্বেও স্বাধীনতার ৪০ বছর পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের মধ্যে এত হাতাশা কেন? সরকারি পরিসংখ্যান মোতাবেক মাথাপিছু আয় বাড়ছে, আর বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দারিদ্র্য। দুর্নীতি আর অপশাসনে আমরা এগিয়ে চলেছি পাগলা ঘোড়ার গতিতে, নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমবর্ধমান। এ সবকিছুর সঙ্গে রাজনীতির সাংঘর্ষিক রূপান্তর গণতন্ত্রকে করে তুলেছে বিপন্ন। অথচ এমন তো হওয়ার কথা নয়, কী অপার সম্ভাবনার দেশ আমাদের, যাকে নিয়ে আমাদের স্বপ্নের আর প্রত্যাশার শেষ নেই, যাকে আমরা মায়ের মতো ভালোবাসতে চাই।
আমার ধারণায় দেশকে ভালোবাসার প্রধান শর্ত হলো দেশের জন্য গর্ববোধ করা। দেশ আমাদের যতটুকু দিতে পেরেছে বিনম্র শ্রদ্ধার তা গ্রহণ করে দেশকে নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা পূরণের সংগ্রামে নিজেকে আন্তরিকভাবে উৎসর্গ করা। স্বাধীনতার ৪০ বছরের খতিয়ানে যেমন রয়েছে আমাদের অপ্রাপ্তির হতাশা, তেমনি রয়েছে উজ্জ্বল অর্জন। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশ্বের ১৬৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১২৯। সেই সঙ্গে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে, নারীশিক্ষার অগ্রগতিতে এবং গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধিতে আমরা ভারতসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশকে পেছনে ফেলে এসেছি। সামান্য স্বার্থত্যাগ দেশের জন্য অপার ভালোবাসা আর অসীম গর্ববোধ থাকলে এই উপাদানগুলোই আমাদের নিয়ে যেতে পারে আকাঙ্ক্ষিত সামষ্টিক উন্নয়নের পথে, প্রত্যাশা পূরণের নবদিগন্তে।
তাহলে আমাদের সমস্যাটা কোথায়—আমরা কি দেশকে মায়ের মতো ভালোবাসতে পারিনি? আমার মনে হয়, দেশকে আমরা অনেকেই মায়ের মতো ভালোবাসি ঠিকই, কিন্তু দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে গর্বিত অহংবোধ আমাদের মধ্যে আজও সৃষ্টি হয়নি। ইন্দোনেশিয়ায় থাকাকালে এমন অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, যারা ঘরের ভেতর বাঙালিপনার আবেগে ভরপুর। কিন্তু বাইরে বেরোলে নিজেকে বাংলাদেশি বলে পরিচয় না দিয়ে ‘ভারতীয়’ পরিচয় দেয় এই অজুহাতে যে বাংলাদেশকে অনেকে চেনে না। কী চরম হীনম্মন্যতা!
এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ একটি সংবাদ উল্লেখ্য। এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও দেশের পতাকাখচিত ট্র্যাকস্যুট, জার্সি, প্যান্ট ও ব্লেজার দেওয়া হয়েছে। অথচ খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মধ্যে গেমসের পোশাক পরার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা গেছে এবং কাবাডি কোচ ও ক্রিকেটাররাও গেমসের পোশাক পরে খুব একটা বের হননি। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের মধ্যেও গেমসের পোশাক পরা নিয়ে ছিল অনীহা। কিন্তু ভারতীয় ক্রীড়াবিদেরা সর্বক্ষণ দেশের পতাকাখচিত পোশাক পরেন। ভারতীয় মহিলা কাবাডি দলের কোচ সুনীল বলেন, ‘এ পোশাক আমার গর্বের। গেমসের পোশাক দিয়ে দেশের পরিচয় তুলে ধরতে পারি।’ (আমাদের সময় ১৩.১১.১০)
আসলে মাকে ভালোবাসা অনেক সহজ। কারণ, মা শুধু দিয়ে যায়, বিনিময়ে মাকে কিছু দিতে হয় না। মাকে আমরা সহজাতভাবে, বিনা প্রচেষ্টায়, বিনা ত্যাগে ভালোবাসি, মা ততটা দায়িত্বপ্রসূত নয়, যতটা আবেগপ্রসূত। তাই দেখা যায়, চরম দুর্নীতিবাজ, শঠ ও জনস্বার্থবিরোধী লোকেরাও মাকে ভালোবাসতে কার্পণ্য বোধ করে না। কিন্তু দেশকে ভালোবাসতে হলে দেশের অসংখ্য অদেখা-অচেনা মানুষের ন্যায্যতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে, স্বার্থপরতা ত্যাগের বিনিময়ে একজন বাংলাদেশি হওয়ার অহংকারবোধ নিয়ে ভালোবাসতে হবে।
জন্মলগ্ন থেকেই আমরা জানি বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ। শুধু বাংলাদেশে জন্মানোর আত্মপরিচয়ের অহংকারবোধ থেকেই আমরা কঠিন যাত্রাপথ পরিক্রম করে এত দূর এসেছি। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে সবাইকে নিয়ে সুখী-সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে হলে একদিকে দেশের মূল সমস্যা এবং অন্যদিকে দেশকে নিয়ে আমাদের অহংকারের প্রতীকগুলো আবিষ্কার করতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো ঘোচানোর দায়িত্ব সবাইকে ভাগ করে নিতে হবে। যার যার স্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করলেও উন্নত অর্থনীতি ও বিকশিত সমাজ গঠনের সংগ্রামটা হতে হবে সমষ্টিগতভাবে, যে সক্ষমতার পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব বর্তাবে সরকারের ওপর। একটা বৈষম্যহীন গর্বিত জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোই ছিল আমাদের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। এ স্বপ্ন সফল করতে হলে দেশের প্রত্যেক নাগরিক, বিশেষ করে তরুণদের কাছে উন্মোচিত করে দিতে হবে সুযোগের দুয়ার। একদিকে যেমন তারুণ্যের অপচয় রোধে চাই সৃজনশীল পরিকল্পনা, অন্যদিকে দেখতে হবে তারা যাতে বেকারত্বের ঘেরাটোপে না পড়ে। এক বিরাট জনসংখ্যা নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সর্ব প্রথম জনসংখ্যা-বিস্ফোরণকে প্রধান জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। স্বল্প আয়তনের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দৃঢ়সংকল্প ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশে বেকারত্ব বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা দেশজ উৎপাদিত দ্রব্যের বাজার না পেয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যর্থ হচ্ছেন। সীমিত সম্পদে প্রস্তুতকৃত পণ্যের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বাজার সংকুচিত হচ্ছে আর সেই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আমদানি বাড়ছে। এমনকি আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও আমাদের রয়েছে বিরাট বাণিজ্য ঘাটতি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র তিন কোটি ৩০ লাখ ডলার। বিপরীতে ভারত থেকে পণ্য আমদানি হয়েছে ৪০০ কোটি ডলারের। বহির্বাণিজ্য নীতি ও শুল্ক ছাড়াও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য প্রধান অন্তরায় ছিল দেশীয় পণ্যের প্রতি জনগণের অনাগ্রহ। গত দুই ঈদের বাজারে তাই ঢাকার গুলশান থেকে গাউছিয়া, এমনকি মফস্বলের ছোট বাজারগুলোও ছিল বিদেশি পণ্যে উপচে পড়া। অনেক দোকানিকে গর্বের সঙ্গে বলতে শুনেছি, ‘আমরা কোনো দেশীয় জিনিস দোকানে রাখি না।’
এখনো আমাদের শপিং মলগুলোতে গেলে অনায়াসে মনে করা যাবে যে আমরা বিদেশে কোথাও শপিং করছি। এ রকম দৃশ্য কি আমাদের প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রে দেখা যাবে? আমাদের আশপাশের সব দেশই তাদের শিল্প সংরক্ষণ নীতিতে দৃঢ় এবং সেই সঙ্গে দেখা যায় তাদের জনগণ অধিক গর্ববোধ করে নিজের দেশের পণ্য ব্যবহার করতে। দেশজ সংস্কৃতি ও বিনোদন চাহিদার ক্ষেত্রেও অনেক সময় উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ ধরনের আচরণ দেখা যায়, আমরা যার প্রতিবাদ করি না। অন্য দেশের সাধারণ মানের নাম না-জানা শিল্পীদের কোটি টাকা দিয়ে মনোরঞ্জনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, অথচ দেশের অনেক প্রতিভা অর্থাভাবে দারিদ্র্যের গহ্বরে হারিয়ে যায়। সেদিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি না। এসবই দেশ নিয়ে আমাদের গর্ব ও অহংকারবোধের অভাব। নিজের কানা ছেলেকে ভালোবাসব, কিন্তু আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখব, পাছে কেউ দেখে ফেলে—এ রকম মনোভাব থেকে মুক্তি পেতে হবে। বিশ্বায়নের যুগে অবশ্যই জানালাগুলো খুলে দেব মুক্ত বাতাস সঞ্চালনের জন্য, তবে সিংহ দুয়ার আগলে রাখব দেশের গর্বিত প্রহরী হিসেবে। আসুন, আমরা দেশের গর্বিত নাগরিক হই, স্বাধীনতার মাসে এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।
সালমা খান: অর্থনীতিবিদ, নারীনেত্রী।

Tuesday, June 8, 2010

রেল কেন উপেক্ষিত by হানিফ মাহমুদ

সামাজিক সেবা ও লাভজনক কোম্পানি হিসেবে টিকে থাকার মধ্যে এক সফল সমন্বয় করেছে ভারতীয় রেল। এই সাফল্য এসেছে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাড়িয়ে। যে যাত্রীবাহী ট্রেন আগে আটশ যাত্রী বহন করত, এখন তা দুই হাজার। আর এতেই খরচ কমে গেছে ৪৫ ভাগ। ফলে কোনো ভাড়া না বাড়িয়েই যাত্রীদের জন্য সেবা বেড়েছে।
যেসব নিম্ন আয়ের মানুষ নিয়মিত ট্রেনে বিলাসবহুল কামরায় ভ্রমণ করতে পারে না, তাদের জন্য চালু হয়েছে ‘গরিব রথ’। এই ট্রেনে আছে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত কামরা থেকে আরামদায়ক আসন। এভাবেই বিগত এক দশকে প্রতিবেশী ভারতে যোগাযোগব্যবস্থায় রেলের একটি বিপ্লবী পরিবর্তন ঘটে গেছে। সরকারনিয়ন্ত্রিত একসময়ের লোকসানী রেল এখন বিপুল মুনাফার একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রায় ১৬ লাখ লোক কাজ করেন। উড়োজাহাজে চড়ার সুখ না পেলেও ভারতের দুই কোটি মানুষ প্রতিদিন চলছে ভারতের প্রায় ১১ হাজার ট্রেনে। এই রেলব্যবস্থায় প্রতিদিন ১৫ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে, যা ভারতীয় রেলওয়ে উদ্যোক্তাদের অন্যান্য পরিবহনের তুলনায় অনেকটা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দিয়েছে।
কিন্তু যেকোনো দেশের উন্নয়নে অত্যাবশ্যকীয় এই অবকাঠামোতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। যেসব পথ চালু ছিল নব্বইয়ের দশকে তার অনেকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। নতুন কোনো কোচ এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত না হওয়ার কারণে ক্রমেই সাধারণ ভ্রমণকারীদের কাছে রেল অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে।
অতীতে বিরোধিতা করলেও নৌপথ ছোট হয়ে পড়া এবং সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে ২০০৫ সালের দিকে উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশে রেল উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ দিতে থাকে। বিগত জোট সরকারের আমলে উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহে বাংলাদেশ রেলওয়েকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং বিভিন্ন স্থানে রেললাইন স্থাপন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনে ডবল ট্রাকে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০১১ সালের মধ্যে মোট ৯২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় ছয় হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক(এডিবি), বিশ্বব্যাংক এবং জাইকা অধিকাংশ অর্থ জোগান দিতে রাজি হয়। কিন্তু এসব অর্থ বিনিয়োগে উন্নয়নের সহযোগীরা শর্ত জুড়ে দেয়। সরকার তাদের সংস্কার প্রস্তাবে প্রাথমিকভাবে রাজিও হয়। রেলওয়ের এই সংস্কারপ্রক্রিয়া তদারকির জন্য যোগাযোগসচিবকে চেয়ারম্যান এবং অর্থসচিবকে কো-চেয়ারম্যান করে আন্তমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক ডজন বৈঠক করেছে কিন্তু সংস্কার পরিকল্পনা অনুমোদনের ব্যাপারে কিছুই হয়নি।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেলওয়ে থেকে সংস্কারের প্রস্তাবটি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বর্তমান কাঠামো ভেঙে সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানায় একটি বোর্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়েকে কয়েকটি বিভাগ বা ‘লাইন অব বিজনেস’-এ (এলওবি) রূপান্তরের কথা আছে খসড়া সংস্কার প্রস্তাবে। খসড়া সংস্কার প্রস্তাবে পুরো রেলওয়েকে আটটি এলওবিতে ভাগ করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন এবং রেলওয়ের ভূমি ব্যবহার—এ তিনটিকে আয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর ব্যয় করা হবে পরিচালন, অবকাঠামো, রোলিং স্টক (ইঞ্জিন-কোচ), করপোরেট সার্ভিস, অর্থ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে। প্রতিটি বিভাগ নিজ নিজ কাজের জন্য জবাবদিহি করবে। সংস্কারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যোগাযোগমন্ত্রীর অধীনে রেলওয়ের জন্য আট সদস্যবিশিষ্ট একটি স্বাধীন বোর্ড গঠনেরও সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু সংস্কার হলে মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা খর্ব হবে—এই আশঙ্কায় এই সংক্রান্ত ফাইলটি ঝুলে গেছে বলে একটি সুত্রে জানা গেছে।
শুধু ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার নয়, রেলওয়ের সেবা সম্প্রসারণ ও যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর জন্য নেওয়া প্রকল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কাগজে-কলমে রেলওয়েতে বর্তমানে ৩৪টি প্রকল্প চালু রয়েছে। এর মধ্যে কিছু চুক্তি হয়েছে, কিন্তু কাজ শুরু হয়নি। কিছু প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে কিন্তু অগ্রগতি শূন্য। বেশ কিছু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০১১ সালে কিন্তু প্রকৃত বাস্তবায়ন ২-৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে রেলের সেবা উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি রেলের যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের জন্য ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ এবং ৬০টি ব্রডগেজ কোচ মেরামত/পুনর্বাসনে ১২৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এক বছর পাঁচ মাস পার হতে চলেছে, বাস্তব অগ্রগতি শূন্য। বাকি ছয় মাসে ২৬০টি কোচের সংস্কারকাজ কীভাবে হবে, এর উত্তর কেউ জানে না।
আরো কয়েকটি উদাহরন দেওয়া যাক। রেল ট্রানজিটের ব্যাপারে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সরকার। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে সীমান্ত এলাকার—এ ধরনের রেললাইনের মেরামতকাজ দুই বছর ধরে ঝুলে আছে। রাজশাহী-রোহানপুর সীমান্ত এবং আমনুরা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখায় ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রেললাইনের উন্নয়ন প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয় আড়াই বছর আগে। বাস্তবায়নের জন্য সময় আছে আর এক বছর তিন মাস। বাস্তব অগ্রগতি মাত্র এক শতাংশ। চারবার দরপত্র বাতিল হয়েছে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী জেলা শহর নারায়ণগঞ্জের মধ্যে রেলযোগাযোগ-ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় তিন বছর আগে। ৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্পটির ঠিকাদার ঠিক করতে রেলওয়ে সময় নিয়েছে দুই বছর। গত বছর অক্টোবরে ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত হলেও এখন পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়নি। টঙ্গী থেকে ভৈরববাজার পর্যন্ত দুই লাইন করার উদ্যোগও একই ভাবে ঝুলে আছে। প্রায় ৭২৫ কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন হয় ২০০৬ সালের ১ জুলাই। এরপর প্রায় চার বছর সময় পার হতে চলেছে, কিন্তু বাস্তবে প্রকল্পের তেমন কোনো কাজ শুরু হয়নি।
অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ২০০২-০৩ থেকে ২০০৬-০৭ পর্যন্ত তাদের দশম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রেল উন্নয়নে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি রুপি (ভারতীয় মুদ্রা) ব্যয় করেছে। আর ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত একাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তাদের ব্যয়ের পরিকল্পনা দুই লাখ ৫১ হাজার কোটি রুপি। নতুন রেলমন্ত্রী ভারতে ২০২০ সালের মধ্যে ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার গতিবেগের ট্রেন চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। এভাবেই ভারত ধাপে ধাপে রেলের উন্নয়ন ঘটিয়ে চলেছে। অথচ অত্যাবশ্যকীয় এই অবকাঠামো উন্নয়নে স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকার অবহেলা দেখিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের দেশ যেখানে সমাজের একটি বড় অংশ মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন, এদের অর্থনীতির মূল স্রোতের আওতায় নিয়ে আসতে রেল একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য এ এম এম সফিউল্লাহর সঙ্গে কথা হচ্ছিল এ প্রসঙ্গে। তিনি বললেন, রেলওয়ে অগ্রাধিকার বা পরিকল্পনা প্রণয়নে যত এগিয়ে, বাস্তবায়নে ততটা পিছিয়ে থাকে। এ জন্যই ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া রেলওয়ের বড় ধরনের উন্নতি হয়নি, বরং রেলপথ কমেছে। রেলওয়ের উন্নয়নে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, সেগুলোর উন্নয়ন একদিন পিছিয়ে যাওয়া দেশের উন্নয়নও কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার মতো।
কম খরচে, পরিবেশবান্ধব উপায়ে একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করতে পারে রেল। বাংলাদেশের মত জনবহুল ও প্রায় সমতল একটি দেশে গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবহন ব্যবস্থাটি কেন উপেক্ষিত তা সত্যিই এক বড় প্রশ্ন। ভারতের অভিজ্ঞতা কী আমাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না?
হানিফ মাহমুদ: সাংবাদিক।

Wednesday, December 2, 2009

নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে সমাজকে এগিয়ে নিতে হবে -মা এখন অভিভাবক

একটি শিশুর জন্ম, প্রতিপালনসহ সব ক্ষেত্রেই মায়ের ভূমিকা মুখ্য হলেও রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন আর সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে আমাদের সমাজে মায়ের অবস্থান এখনো প্রান্তিক। মা তথা নারীর প্রান্তিক এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথে বড় ধরনের অগ্রগতির খবর পাওয়া গেল সরকারের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তে: ‘অভিভাবক হিসেবে শুধু মায়ের নাম দিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করার পক্ষে মত দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।’ একটি সন্তানের মা-বাবা হিসেবে দুজনই একই মর্যাদায় অভিভাবকত্ব পাওয়ার দাবিদার। পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোয় এ উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে বড় ধরনের অগ্রগতি বলেই আমরা মনে করি।
শুধু মায়ের নাম ব্যবহার করলে ফরম অপূর্ণ বিবেচিত হবে কেন জানতে চেয়ে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও নারীপক্ষ হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত। এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে মায়ের অভিভাবকত্ব নিশ্চিত হলো। কিন্তু জীবনের অন্য ক্ষেত্রে? হাইকোর্ট এই রুল জারির সময় পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, কেবল এসএসসি বা এইচএসসির কথা না বলে সব পর্যায়ের শিক্ষা ও চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে এই দাবি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু সরকার শুধু এসএসসি ও এইচএসসির কথাই ঘোষণায় বলেছে। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত হবে, শিক্ষা ও চাকরিসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে বাবার সমান্তরালে অভিভাবক হিসেবে মায়ের অধিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করা।
মা ও নারীদের ব্যাপারে নানা নীতিবাক্য সমাজে প্রচলিত থাকলেও সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এখনো মায়ের অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর মূল কারণ সমাজে মেয়েশিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। আজকের মেয়েশিশুই আগামীকালের মা। সুতরাং তার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ প্রত্যাশিত। পরিবার থেকেই এ বৈষম্য অবসানের উদ্যোগ নিতে হবে।
সমাজের অর্ধেক অংশকে অনগ্রসর রেখে একটি দেশ কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে অগ্রসর হতে পারে না। আমরা চাই, শিক্ষা এবং সামাজিক জীবনাচরণের সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত হোক।