Saturday, September 14, 2024

প্রথম কর্মসূচি ঘোষণা করল জাতীয় নাগরিক কমিটি

সম্প্রতি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক কমিটি প্রথম কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দলের পেশ করা আট দফা বাস্তবায়নে সারা দেশে জনসংযোগ কার্যক্রম শুরু করবেন দলের আহ্বায়করা।

শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রথম অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসির আব্দুল্লাহ।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা বলেন, আমরা রাজনৈতিক দল নই, তবে আমাদের উদ্যোগ রাজনৈতিক। গত জুলাইয়ে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে সেখানে হাজারের কাছাকাছি ছাত্র-জনতা শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। তাদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সে জন্য জাতীয় নাগরিক কমিটির আত্মপ্রকাশ।

লিখিত বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন বলেন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী সরকারের হাত থেকে মুক্ত হয়। জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পরিণত হয় সারা দেশের জনগণের মুক্তির আন্দোলনে। ছাত্র-জনতার কাছে পরাজিত হয় ফ্যাসিস্ট শক্তি। এই আন্দোলনে হাজারের কাছাকাছি মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাদের এই সাহসী আত্মত্যাগই বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, আমরা আমাদের স্বাধীনতার ৫৩ বছর পার করছি। কিন্তু এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টের যে, এতদিন পরও আমাদের মধ্যে কোনো ইস্যুতেই জাতীয় ঐক্য নেই। সবকিছু নিয়েই আমরা দ্বিধা-বিভক্ত। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো প্রাথমিক রাষ্ট্রীয় কাজও এখানে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর সুযোগ নেয় বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। এ কারণে স্বাধীনতার এত দিন পরও আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। পাঁচ বছর পর পর ক্ষমতা হস্তান্তর হবে কী প্রক্রিয়ায় তা নিয়েই এতদিনে কোনো ঐক্যে পৌঁছানো যায়নি। আমাদের এই নাগরিক কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, জনগণসহ সব রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে বাংলাদেশ পুনর্গঠনে জাতীয় ঐক্য তৈরি করা।

জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়েছে কিন্তু ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার এখনো বিলোপ হয়নি। ফ্যাসিবাদ একটি সরকার নয়। এটি একটা ব্যবস্থা, যা বিভিন্ন আইন, প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক চর্চার মাধ্যমে টিকে থাকে। আমরা সেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ চাই। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে নতুন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরিতে কাজ করবে নাগরিক কমিটি। এমন একটি বন্দোবস্ত আমরা তৈরি করতে চাই, যাতে সামনের দিনে কোনো সরকারপ্রধানকে শেখ হাসিনার মতো পালিয়ে যেতে না হয়।

ঘোষিত আট দফা বাস্তবায়নে অচিরেই নাগরিক কমিটি সারা দেশে জনসংযোগ কার্যক্রম শুরু করবে জানিয়ে আত্মপ্রকাশের আট দফা তুলে ধরে জাতীয় নাগরিক কমিটি। এগুলো হলো- ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হওয়া সামষ্টিক অভিপ্রায় ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমুন্নত রাখা; ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা; রাষ্ট্রের জরুরি সংস্কার ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা ও জবাবদিহির পরিসর তৈরি করা; বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে আলোচনা, মতবিনিময় ও গণমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে সর্বস্তরের জনতাকে সংহত করার লক্ষ্যে কাজ করা; দেশের সর্বস্তরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে সংহত করে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সমুন্নত করে রাখার লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদী কাঠামো ও শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা; জনস্বার্থের পক্ষে নীতিনির্ধারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক সংলাপের আয়োজন করা; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিনির্ধারণী প্রস্তাবনা তৈরি ও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পদক্ষপে নেওয়া; গণপরিষদ গঠন করে গণভোটের মাধ্যমে নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান তৈরির জন্য গণআলোচনার আয়োজন করা।

শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে প্রথম কর্মসূচি ঘোষণা করেন জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা। ছবি : সংগৃহীত
শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে প্রথম কর্মসূচি ঘোষণা করেন জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা। ছবি : সংগৃহীত

বন্যার্তদের ত্রাণ সহায়তার খরচ নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহর নতুন পোস্ট

বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ সহায়তার অর্থ খরচের বিষয়ে নতুন পোস্ট করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ।

শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ সংক্রান্ত নতুন পোস্ট করেন তিনি।

ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, গত ৪ সেপ্টেম্বরের প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে আমাদের টিএসসির ত্রাণ কর্মসূচির আয় ও ব্যয়ের হিসাব জানানো হয়েছিল। ব্যয় বাদে বাকি টাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক শাখা, ইসলামী ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, একজন নারী শিক্ষার্থী ও একজন ছাত্রের নামে বিশেষভাবে একাউন্ট খোলা হয়েছে, যেখানে শুধু এই তিনজনের সম্মিলিত সিগনেচারের মাধ্যমে টাকা হস্তান্তর করা সম্ভব। এখন পর্যন্ত ওই একাউন্ট থেকে কোনো টাকা হস্তান্তর করা হয়নি।

তিনি বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আমরা ত্রাণ কার্যক্রমের আয় ও ব্যয়ের ওপর একটি অডিট করছি এবং আগামী কয়েকদিনের মধ্যে অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে, ইনশাআল্লাহ। আমরা সবসময় গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণে আগ্রহী।

তিনি আরও বলেন, কোনো বিশেষ ভুলবুঝাবুঝি থাকলে অনুগ্রহ করে তা নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরুন, যাতে আমাদের কাজ আরও কার্যকরী হতে পারে। আগামীর বাংলাদেশ হোক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মডেল।

এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গত ৪ সেপ্টেম্বর জানানো হয়, বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ, রান্না করা খাবার, ওষুধ ও মেডিকেল সেবাসহ বিভিন্ন সহযোগিতার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগ্রহকৃত অর্থের পরিমাণ ১১ কোটি ১০ লাখ ১৩ হাজার ৫৬৯ টাকা। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ ১২ হাজার ৭৯৪ টাকা। অবশিষ্ট রয়েছে ৯ কোটি ৩৫ লাখ ৭৭৫ টাকা। এ ছাড়া প্ল্যাটফর্মটি বন্যাদুর্গত এলাকায় গত ২২ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৯১ ট্রাক ত্রাণ পাঠিয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২২ আগস্ট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, ডাকসু এবং সেন্ট্রাল ফিল্ডে গণত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় শুকনো খাবারের বদলে ভারী খাবারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ আগস্ট থেকে গণরান্না কর্মসূচি শুরু হয়, যার মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্গম অঞ্চলে চাল-ডালের প্যাকেজ পাঠানো হয়। বৃহৎ কর্মযজ্ঞে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০-এর অধিক স্বেচ্ছাসেবী দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। গত ২২ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৯১ ট্রাক ত্রাণ বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোতে পাঠানো হয়। বেসরকারি এবং বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারের মাধ্যমেও দুর্গম অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হয়।

ব্যয়ের ব্যাপারে বলা হয়, গত ২২ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গণত্রাণ এবং গণরান্না কর্মসূচি বাবদ খরচ ১ কোটি ৭৫ লাখ ১২ হাজার ৭৯৪ টাকা। অবশিষ্ট অর্থের বিষয়ে জানানো হয়, ফান্ডে বর্তমানে রয়েছে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এই টাকা সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত জনতা এবং সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে। এই অর্থ আগামীতে বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই অর্থ কীভাবে এবং কাদের মাধ্যমে ব্যবহৃত হলে সর্বোচ্চ মানুষের উপকার হবে, সেই বিষয়ে স্থানীয় এবং বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার পরামর্শ আহ্বান করা হয়েছে। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই এই অর্থগুলো ব্যবহার করা হবে। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। ছবি : সংগৃহীত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। ছবি : সংগৃহীত

সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার প্রতিবাদে কল্যাণ ফ্রন্টের মানববন্ধন

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফের গুলিতে স্বর্ণা দাস এবং জয়ন্ত সিংহকে হত্যার প্রতিবাদে যশোরে মানববন্ধন করেছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের জেলা শাখার নেতারা। শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) যশোর প্রেস ক্লাবের সামনে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব নির্মল কুমার বিটের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের যশোর জেলা শাখার নেতা অ্যাডভোকেট সুদীপ্ত কুমার ঘোষের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট যশোর জেলা শাখার নেতা অসীম কুমার, মানিক সাহা, বিষ্ণুপদ সাহা প্রমুখ। কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন যশোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, শিক্ষক নেতা অধ্যাপক অলোক ঘোষ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা আমির ফয়সাল প্রমুখ নেতারা।

কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী একের পর এক গুলি চালিয়ে নিরীহ বাংলাদেশিদের হত্যা করছে। বিএসএফের এই নৃশংস ও নির্বিচারে হত্যা গণহত্যার শামিল। পৃথিবীর সব দেশে সীমান্ত আছে, কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশ সীমান্ত তার ব্যতিক্রম। যেখানে প্রতিনিয়ত প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী একের পর এক নিরীহ বাংলাদেশিদের হত্যা করে। অথচ আমেরিকা-মেক্সিকো, ভারত-চীন কিংবা ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও এমন হত্যার কোনো ঘটনা ঘটে না। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় বাহিনী একের পর এক নিরীহ বাংলাদেশিকে নৃশংসভাবে হত্যা করেই চলেছে। এ পর্যন্ত তাদের হাতে কয়েক হাজার নিরীহ বাংলাদেশি নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন। সীমান্ত হত্যার বিষয়টি তাদের কাছে সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বক্তারা ভারতকে সীমান্তে হত্যা বন্ধ কিংবা এই জাতীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। সীমান্তে যদি এই নৃশংস হত্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তার জন্য ভারতকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা। 

সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট। ছবি : কালবেলা
সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট। ছবি : কালবেলা

রাশিয়ার নিরাপত্তা প্রধানের সঙ্গে কিমের বৈঠক

রাশিয়ার নিরাপত্তা প্রধান সের্গেই শোইগুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন। রুশ নিরাপত্তা প্রধানের পিয়ংইয়ং সফরকালে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। শনিবার এই বৈঠকের কথা জানিয়েছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কেসিএনএ।

রাশিয়া ৩০ মাসেরও বেশি সময় ধরে ইউক্রেনে হামলা অব্যাহত রেখেছে। পশ্চিমাদের থেকে পাওয়া সমরাস্ত্রে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় টান পড়েছে রুশ অস্ত্র ভান্ডারেও।

এ অবস্থায় বিভিন্ন দেশ থেকে গোলাবারুদ পাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মস্কো। তারই অংশ হিসেবে পিয়ংইয়ং সফরে এসেছেন শোইগু। তিনি এমন এক সময় এই সফরে আসলেন যখন পশ্চিমাবিশ্ব মস্কোতে অস্ত্র পাঠানোর জন্য পিয়ংইয়ংকে অভিযুক্ত করছে।

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত জুন মাসে উত্তর কোরিয়া সফর করেন এবং দেশটির সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছে, দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সংলাপকে আরও জোরদার এবং পারস্পরিক নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষায় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির জন্য সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে।

গণমাধ্যম আরও জানায়, কিম নিশ্চিত করেছেন, জুন মাসে তারা স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে ডিপিআরকে সরকার রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা এবং সাহায্য আরও জোরদার করবে।

রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদও তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, কিমের সঙ্গে শোইগুর বৈঠক প্রতিরক্ষা চুক্তির ‘বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে’।

শোইগু গত মে মাসে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করার পর রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হন। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে আসছেন, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনে মোতায়েন করা হয়েছে।

রাশিয়ার নিরাপত্তা প্রধান সের্গেই শোইগুর সঙ্গে উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সাক্ষাৎ। ছবি : সংগৃহীত
রাশিয়ার নিরাপত্তা প্রধান সের্গেই শোইগুর সঙ্গে উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সাক্ষাৎ। ছবি : সংগৃহীত


নিজের পারফিউম ব্র্যান্ডের নাম ‘ডিভোর্স’, রহস্য কী?

সদ্য তালাক হয়েছে তার। আর এই তালাকের পরই করে বসলেন এক অদ্ভুত কাজ। খুলে বসলেন নিজের পারফিউম ব্র্যান্ড। আর এর নামকরণ করলেন ডিভোর্স! এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আলোচনায় এসেছে দুবাইয়ের শাসক ও আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুমের মেয়ে মাহরা।

জানা যায়, চলতি বছরের ১৮ জুলাই নিজের স্বামী মানা আল মাকতুমকে ইনস্টাগ্রামে তালাক দিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় চলে আসেন রাজকুমারী মাহরা।

ওই পোস্টে তিনি তার স্বামীকে নিয়ে জানান, তার স্বামী যেহেতু অন্যদের নিয়ে ব্যস্ত তাই তিনি তার স্বামীর বিরুদ্ধে ডিভোর্স ঘোষণা দিচ্ছেন। এ সময় তিনি নিজেকে ‘সাবেক স্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় দেন।

তালাক দেওয়ার পর স্বামীর সঙ্গে ইনস্টাগ্রামে যত ছবি ছিল তার সবগুলোই মুছে ফেলতে দেখা যায় মাহরাকে। আর এরপরই সদ্য জন্ম দেওয়া মেয়ে ও নিজের ব্র্যান্ড নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।

দুবাইয়ের রাজকুমারী এরপরই একটি ছবি প্রকাশ করেন যেখানে তাকে একটি কালো বোতলে নিজের পারফিউমের ব্র্যান্ডিং করতে দেখা যায়।

এর আগেও বেশ কিছু তারকাদের তাদের নিজ নিজ পারফিউম ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করে সাফল্য পেতে দেখা যায়। সদ্য-স্বাধীন প্রিন্সেস মাহরা একই রকম সাফল্য পাবে কি না তা এখন দেখার বিষয়।

‘ডিভোর্স’ ব্র্যান্ডের পারফিউম হাতে রাজকুমারী মাহরা। ছবি : সংগৃহীত
‘ডিভোর্স’ ব্র্যান্ডের পারফিউম হাতে রাজকুমারী মাহরা। ছবি : সংগৃহীত



সেদিন যে রিপোর্ট প্রকাশ করা যায়নি -মানবজমিন

‘ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক’। এই শিরোনামে ২০২১ সনে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা। সেই রিপোর্ট নিয়ে তোলপাড় হয় তামাম দুনিয়ায়। বাংলাদেশে তখন গণমাধ্যম ছিল নিয়ন্ত্রিত। তাই কোনো কাগজই এটার বিস্তারিত ছাপার সাহস পায়নি । সরকারের তরফে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এসব আজগুবি প্রচারণা। পরবর্তীতে আল জাজিরার রিপোর্টটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। যদিও কাতার সরকারের কাছে বাংলাদেশের তরফে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। সুইডেনভিত্তিক গণমাধ্যম নেত্র নিউজ ২০২১-এর ৩রা ফেব্রুয়ারি এই রিপোর্ট বাংলায় প্রকাশের পর জানাজানি হয়ে যায় সারা দেশেই। সেদিন আমরা এই রিপোর্টটি প্রকাশ করতে পারিনি। পাঠকদের কৌতূহলের কথা ভেবে নেত্র নিউজের বরাতে রিপোর্টটি প্রকাশ করছি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও তার পলাতক ভাইদেরকে কেন্দ্র করে সরকারের ভেতরে ব্যাপক রাজনৈতিক ও আর্থিক দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে আল জাজিরার ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিটের তৈরি একটি বিস্ফোরক তথ্যচিত্রে। এসবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকারও দাবি করা হয়েছে।
১ ফেব্রুয়ারি প্রচারিত তথ্যচিত্রে দেখা যায়, হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া ভাই হারিস আহমেদকে সাজা এড়াতে সাহায্য করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। এজন্য তিনি নথিপত্র জাল করা ও ভুয়া পরিচয় তৈরি করে দিয়েছেন। জাল নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে ভুয়া জন্মসনদ, শিক্ষা ও বৈবাহিক সনদপত্র। এর ফলে পুলিশের “মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল”দের তালিকায় থাকা হারিস বিনা বাধায় “মোহাম্মদ হাসান” নামে ভুয়া পাসপোর্টে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ করতে পারছেন। পাশাপাশি, হাঙ্গেরি ও ফ্রান্সে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও খুলেছেন।
তথ্যচিত্রে দেখা যায় সেনাপ্রধান তার আরেক পলাতক ভাই আনিস আহমেদের সাথেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলেন। হারিসের মতো তিনিও ওই হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে পলাতক আছেন। আনিস বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বসবাস করছেন।

২০১৯ সালে এই তিন ভাইকেই একত্রে মালয়েশিয়ায় আনিসের বাসায় দেখা গেছে। এছাড়া কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনেও এক সন্ধ্যায় ছিলেন তারা। এর ফলে এই দুই পলাতক ভাইকে গোপন রাখার ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনও কতটা জড়িত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আল জাজিরার অনুসন্ধানী দলের করা গোপন ভিডিওতে আরও দেখা যায় বেশ কয়েকটি অসাধু আর্থিক চুক্তিতে জড়িত রয়েছেন হারিস আহমেদ। তিনি নিজের সেনাপ্রধান ভাইয়ের অবস্থানকে ব্যবহার করে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন লোভনীয় চুক্তি হাতিয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগেও মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠার সুযোগ খুঁজছিলেন। তথ্যচিত্রে আহমেদ ভাইদেরকে “ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অপরাধী পরিবার” হিসেবে আখ্যা দেয় আল জাজিরা। একজন বিশেষজ্ঞ এই পরিবারের কর্মকাণ্ডকে “সংঘবদ্ধ অপরাধ সিন্ডিকেটের” সঙ্গে তুলনা করেন।
অনুসন্ধানী তথ্যচিত্রে হারিসকে আল জাজিরা “পালিয়ে বেড়ানো এক খুনি” হিসেবে বর্ণনা করে। অপর একজন ব্যক্তি তাকে “ঠাণ্ডা মাথার অপরাধী… সাইকোপ্যাথ” হিসেবে উল্লেখ করেন। হারিস নিজেই দাবি করেন যে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার কর্মকাণ্ডে সমর্থন রয়েছে খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। গোপনে ধারণকৃত ভিডিওতে তিনি বলেন, “এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বইলা দিছে যে, ‘যদি হারিস সেখানে কিছু করতে চায়, করুক। আমরা তাকে সাহায্য করমু।’”
গোপন ভিডিওতে দেখা যায় বাংলাদেশে নিজেদেরকে কতটা ক্ষমতাধর মনে করেন আহমেদ ভাইরা। হারিসকে যখন একজন জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কবে মন্ত্রী হবেন, হারিস জবাবে বলেন, “মন্ত্রী অইয়া কী করমু? মন্ত্রীগো তো নাচাই আমরা।”
তথ্যচিত্রে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয় যে আহমেদ পরিবারের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পর্ক শুরু আশির দশকের শেষ দিক থেকে। তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী হাসিনাকে তারা নিরাপত্তা দিতেন। হারিস নিজে ছিলেন হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী।
হাসিনার সঙ্গে আজিজ ও তার ভাইদের সম্পর্ক কড়া আনুগত্যের। আজিজ নিজেই ২০১৪ ও ২০১৮ সালে বিজিবি প্রধান ও সেনাপ্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নির্বাচন জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিনিময়ে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে আজিজের আরেক ভাই জোসেফের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি, তার অপর পলাতক ভাইদের কর্মকাণ্ড নিয়ে চুপ থাকেন তিনি।

ফিরে দেখা: আহমেদ পরিবার ও আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সম্পর্ক

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক : বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তার তৎকালীন দেহরক্ষী হারিস আহমেদ। ছবিটি প্রায় ২৫ বছর আগের।

আশি ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে জেনারেল আজিজ আহমেদের তিন ভাই, অর্থাৎ হারিস, জোসেফ ও আনিস ছিলেন মোহাম্মদপুরের একটি অপরাধী চক্রের অংশ। চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা দেওয়াই ছিল তাদের আয়ের উৎস। আশির দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা জোট বাধেন আওয়ামী লীগের সাথে। তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে তারা নিরাপত্তা দিতেন। হারিস আহমেদ হয়ে উঠেন শেখ হাসিনার দেহরক্ষী। হাসিনা নিজেই পরে প্রধানমন্ত্রী হন।
গোপনে ধারণকৃত এক ফোনালাপে জেনারেল আজিজ আহমেদ এক সহকর্মীকে ব্যাখ্যা করেন যে তার ভাইয়েরা শেখ হাসিনা ও তার দলের জন্য কী করেছেন। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ যখন হইলো জাতীয় পার্টির সময়ে সবচেয়ে খারাপ সময় যাচ্ছিল, যখন তারা তাদের কেন্দ্রীয় অফিসে বসতে পারতো না, তখন কিন্তু [আমার ভাইয়েরা ছিল দলের প্রধান শক্তি]। কেন্দ্রীয় নেতারা আইসা আমার ছোট ভাইয়ের অফিসে বইসা তারা পার্টির প্রোগ্রাম ঘোষণা করতো। তারা অন্য যায়গায় নিরাপদ মনে করতো না।”

ফোনালাপে আজিজ বলেন, তার ভাইদের অবদানের কথা হাসিনা খুব ভালোভাবেই অবগত। দলের অন্য নেতাদের চেয়েও তাদেরকে সুনজরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। আজিজ ওই ফোনালাপে দলীয় নেতাদের সাথে হাসিনার একটি কথোপকথনকে তুলে ধরেন: “দেখো, ওর ভাইরা কে, আমার থেকে বেশি তোমরা জান না। কোথায় ছিলা যখন আমার বাড়িতে গ্রেনেড হামলা করে? আমার বাড়িতে এরকম করে, কোথায় ছিলা তোমরা? এই চীফের ভাইরা আমার আশেপাশে ছিল। তারা ছিল আমার মেইন চালিকাশক্তি। তোমরা কোথায় ছিলা তখন?”

১৯৯৬ সালের হত্যাকাণ্ড

১৯৯৬ সালের মে মাসে নির্বাচনের এক মাস আগে মোহাম্মদপুরে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা নামে এক ব্যক্তি খুন হন। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে মোস্তফা একজন মেজিস্ট্রেটকে স্বাক্ষ্য দেন যে, আজিজের ৩ ভাই অর্থাৎ জোসেফ, হারিস ও আনিস তাকে গুলি করে। এরপরই ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের নির্বাচনে হেরে গেলে ২০০৪ সালে এই হত্যাকাণ্ডের রায় আসে। ওই বিচারে তিনজনই দোষী সাব্যস্ত হয়। জোসেফ মৃত্যুদণ্ড পান। হারিস ও আনিস পান যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আনিস প্রথমে জামিন পেলেও পরে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ব্যর্থ হন। এরপর থেকে তিনি পলাতক। হারিস কখনই আটক হননি। তিনি শুরু থেকেই পলাতক।

হারিসের ভুয়া পরিচয়

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক : ভুয়া নামে হারিস আহমেদের পাসপোর্ট।

২০১৪ সালে আজিজ আহমেদ ছিলেন বিজিবি প্রধান। তখন তিনি হাঙ্গেরিতে বসবাসরত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর শরণাপন্ন হন। “সামি” নামে ওই ব্যবসায়ীর কাছে তিনি ভারতে বসবাসরত নিজের ভাইয়ের জন্য হাঙ্গেরিতে ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এরপর সামির কাছে “মোহাম্মদ হাসান” নামে এক ব্যক্তির জন্মসনদ, শিক্ষা ও বৈবাহিক সনদ, জাতীয় পরিচয় পত্র ও পাসপোর্টের অনুলিপি পাঠানো হয়।
এই নথিপত্র পাঠানো হয় আজিজের সরকারি কার্যালয় থেকে। এগুলোর মধ্যে কিছু নথিতে স্বাক্ষর রয়েছে মেজর সুজাউল হক ও ব্রিগেডিয়ার হাসনাত নামে দুই সেনা কর্মকর্তার। এই দুইজনই আজিজ আহমেদের অধীনে বিজিবিতে কাজ করেছেন। আরেক বিজিবি কর্মকর্তা মেজর সামি রশিদও আজিজের পক্ষে ইমেইল পাঠান। ওই ইমেইলের কপিতে সংযুক্ত ছিলেন আজিজ আহমেদও। তথ্যচিত্রে প্রমাণ করা হয় যে, এই সবক’টি নথিই ভুয়া। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, আজিজই নিজের অধস্থন কর্মকর্তাদের এই অপরাধে সম্পৃক্ত করেছেন।

হাঙ্গেরি ও ফ্রান্সে হারিসের ব্যবসা

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক : হাঙ্গেরিতে ভাই হারিস আহমেদের দোকান ঘুরে দেখেছেন জেনারেল আজিজ আহমেদ।

মোহাম্মদ হাসান নাম ধারণ করে হারিস আহমেদ ২০১৫ সালে হাঙ্গেরিতে পৌঁছান। সেখানে তিনি একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। “বে অব বেঙ্গল” নামে প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি, তার স্ত্রী, মেয়ে ও মেয়ের জামাই পরিচালক হন। এই “বে অব বেঙ্গলে”র ছিল একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
এদের একটি নিভেয়ু ফ্যাশন নামে একটি কাপড়ের দোকান। তথ্যচিত্রে দেখানো হয় ২০১৬ সালে আজিজ নিজেই সেখানে ঘুরতে যান। এরপর টেইলরভিল ক্যাটারিং নামে আরেকটি কোম্পানি কিনে “বে অব বেঙ্গল”। বেঙ্গল হোস্টেল নামে একটি হোটেল ও গুলাশ রেস্ট্যুরেন্ট নামে একটি রেস্তোরাঁও কিনে কোম্পানিটি। হারিস তখন একটি অনিবন্ধিত মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসাও শুরু করেন।
এরপর ফ্রান্সেও একাধিক বিনিয়োগ করেন হারিস। নিজের ভুয়া নামে তিনি পিএইচপিবি হোল্ডিং নামে একটি কোম্পানি কিনেন, যেখানে তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ২০১৮ সালে একটি আইটি কোম্পানিতে শেয়ার কিনেন তিনি। এছাড়া মোবাইল ফোন বিক্রি ও আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের একটি প্রতিষ্ঠানও কিনেন তিনি। মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে চারটি কোম্পানিতে শেয়ার কিনেন হারিস। এর মধ্যে রিয়েছে স্নিগ্ধা নামে একটি ফাস্টফুডের দোকান, টিপিটিওয়াই নামে খুচরা পণ্যের দোকান, ও ইনফো বে অব বেঙ্গল নামে একটি কোম্পানি। এছাড়া বে অব বেঙ্গলের নামে নিউ মুমতাজ নামে একটি রেস্তোরাঁও ছিল।

এসব কোম্পানির বিষয়ে গ্রাহাম ব্যারো নামে একজন আর্থিক অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, “অপরাধের চিন্তা নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো হয়েছে বলে যথেষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তারা আসলে এমন সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছে যেখানে নগদ লেনদেন হয় অনেক বেশি, যেমন, হোটেল-রেঁস্তোরা। একে বলা হয় “কো-মিংলিং’ অর্থাৎ নোংরা টাকাকে ভালো টাকার সাথে মেশানো, যেন আপনি বলতে না পারেন কোনটা কী।”
ব্যারো বলেন, ঘটনাপ্রবাহ ও ব্যবসার ধরণ থেকে ইঙ্গিত মিলে যে, অর্থপাচারের সঙ্গে এটি অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। তিনি আরও বলেন, “কোম্পানিগুলোর গঠন, ধরণ, বিচরণক্ষেত্র, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও যেই ধরণের কাজে এই ব্যক্তি (হারিস) সম্পৃক্ত, তা থেকে ইঙ্গিত মিলে যে, এখানে তার উদ্দেশ্য হলো সিস্টেমের ভেতর কালো টাকা ঢুকিয়ে সাদা টাকা হিসেবে বের করে আনা।”
তথ্যচিত্রে আরও দেখানো হ্য যে, হারিস ফ্রান্সের প্যারিসের উপকণ্ঠে তিনটি বাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এদের একটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫ লাখ ডলার বা ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ব্যারো বলেন, এই ধরণের বাড়ি মূলত কালো টাকা জমা করার জায়গা।

নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে আজিজের পরিকল্পনা

তথ্যচিত্রে জেনারেল আজিজ দাবি করেন যে, তিনি নিজেও ব্যবসায়িক সুযোগ খুঁজছেন। পাশাপাশি নিজেও বাংলাদেশ থেকে অর্থ এনে “বে অব বেঙ্গল” কোম্পানিতে যুক্ত হবেন। একটি ইমেইলে তিনি সামিকে বলছেন, “আপনি ছোট বিনিয়োগের জন্য আমাকে প্রস্তাব পাঠাতে পারেন, আমি বিবেচনা করবো। তবে অবসরের আগ পর্যন্ত আমি সম্ভবত বে অব বেঙ্গলের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারবো না। আমার ইচ্ছা বে অব বেঙ্গলের পরিচালক হওয়ার।”
এরপর পৃথক এক ইমেইলে তিনি বলেন, “আসলে আমার চিন্তা হচ্ছে যে, অবসরের পর আমি বিশ্বের যেকোনো জায়গায় যখন ইচ্ছা ঘুরে বেড়াতে পারবো, বিশেষ করে ইউরোপে।”

আজিজের হুমকি

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক: হুমকি দিয়ে জেনারেল আজিজ আহমেদের ইমেইল।

“হাসান”কে সাহায্য করার পর শিগগিরই সামি বুঝতে পারলেন যে হাসানের আসল নাম হলো হারিস আহমেদ, যিনি কিনা একজন পলাতক খুনি। সামি বলেন, “আমার মনে হলো আমি এই লোককে একটি নিরাপদ দেশে আনার কাজে ব্যবহৃত হয়েছি। আমার সহায়তায় এই লোক এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য দাঁড় করেছে। আমার মনে হলো যে, হারিস ও জেনারেল আজিজ আমাকে ব্যবহার করেছে। ভাবলাম পুলিশকে জানাই, কিন্তু আমি নিজের জীবন নিয়েও চিন্তিত ছিলাম।”
এরপর আজিজ আহমেদ তাকে বেশ কয়েকটি হুমকি দিয়ে ইমেইল পাঠান। একটিতে বলা হয়, “আমার ভাইকে যদি ফেরত আসতে হয়, তার জন্য যারা দায়ী, তাদেরকে আফসোস করতে হবে। নিজের জীবনকে তারা অভিশাপ দেবে, আমি কথা দিলাম।”
এই ঘটনার পরই সামি গোপনে আল জাজিরাকে সহায়তা করতে লাগলেন।

দুর্নীতির বিষয়ে আলোচনা

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক : গোপন ভিডিওতে হারিস আহমেদ।

এদিকে হাঙ্গেরিতে অনেক ব্যবসাই ধসে পড়লো। সামি জানান, হারিস আসলে ব্যবসায়ী নন। তিনি তার অর্থ অন্যভাবে আয় করেন। দালাল হিসেবে বাংলাদেশে বিভিন্ন চুক্তি (বিশেষ করে সরকারি দরপত্র) পাইয়ে দেওয়ার কাজ করেন তিনি।
সামির করা গোপন ভিডিওতে হারিসকে দেখা যায় বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে। যেমন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হাঙ্গেরির তৈরি বুলেট সরবরাহে সামির সহায়তা চান তিনি। তিনি বলেন, “আমি তো প্রোপার ওয়েতে যাইতে পারি না। আমি তো হের [আজিজের] ভাই…আমি যেহেতু ওনার ভাই, আমি কোনো জায়গায় শো অমু না। আপনে শো ওইবেন। আমি কে পরিচয় দিবেন না। দেহেন না, ক্যামনে পয়সা দিই আমনেরে। আমনে খাইবেন, আমি খামু, এইটা তো অটোমেটিকই। অন্য কিছু না। ডাইরেক্ট চইলা যাইবো পয়সা।”
এরপর হাঙ্গেরিতে একটি ব্যবসায়িক চুক্তির বিষয়ে জানতে পারেন হারিস, যেটি তিনি আগে জানতেন না। তিনি তখন বলেন, “আমি যদি আটকায়ে না দিতে পারছি, আমগো কাছে যদি না আইছে দৌড়াইয়া, তাইলে আমার নাম হারিস না। আমি আর্মির লগে কথা কইতাছি।”
এরপর তিনি বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআইতে কর্মরত একজনকে কল দেন এবং তাকে বলেন, “আপনেরে বলছিলাম না যে ইউরোপে কিছু হইলে, বা হাঙ্গেরি? আরে একটু ভিড়াইয়া দেন। বাকিটা আমি দেহি।”
ওই ফোনালাপের পর সামিকে আরও তথ্য দেন হারিস, “আমি তো জানি, হাঙ্গেরিতে কিছু হইলে, যদি আমার টাচে না আসে, ওই ব্যাডা কোনো কিছুই করতে পারবো না। এই পর্যন্ত নেয়ই নাই। যদি কোনো এক ব্যাডা নিয়া থাকে, আমারে যদি প্রমাণ দেখাইতারেন, কানডা কাইট্টা এক্কারে কুত্তারে খাওয়াইলামু, কুত্তার গলায় দিয়া দিমু।”
হারিস আরও স্বীকার করেন যে, তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি বাণিজ্যের একটি চক্রে জড়িত। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, “পুলিশ বদলির জন্য কত টাকার হাতবদল হয়?” তিনি জবাবে বলেন, “এয়ারপোর্ট থানার ওসি মিনিমাম ৫-১০ কোটি টাকা। ট্রান্সফারের টাকাটা খায় হইলো হোম মিনিস্টার, আইজি, পুলিশ কমিশনার। এই তিনজন। মনে করেন ৫ কোটি টাকার কনট্রাক্ট করলেন, ৩ কোটি দিয়া ২ কোটি টাকা আমার। এটাই কমন। বুঝছেন? এই হইলো কাহিনী।”

হারিসের অর্থের উৎস

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক : হারিসের হিসাবরক্ষক ইউসুফ আলী।

তথ্যচিত্রে ইউসুফ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন সামি, যা গোপনে রেকর্ড করা হয়। ইউসুফ হলেন হারিসের হিসাবরক্ষক। তিনি হাঙ্গেরিতে হারিসের মানি-এক্সচেঞ্জের ব্যবসা চালান। হারিস কীভাবে অর্থবিত্তের মালিক হলেন সেই বিষয়ে ইউসুফ আরও তথ্য দেন। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় হারিসের ব্যবসার বিষয়ে, তিনি বলেন, “এগুলা মিনিস্ট্রি-লেভেলের কাজ বা সরকারি লেভেলের কোনো ধান্ধা। আপনার তো মামু লাগবে নয়তো মামুর জোর লাগবে।”
হারিসের কোম্পানি বে অব বেঙ্গল ২০১৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের বিজিবি প্রধানকে সরাসরি একটি প্রস্তাব পাঠায়। আর তখন বিজিবি প্রধান ছিলেন খোদ আজিজ। সেখানে সামরিক বাহিনীর বিছানাপত্র পাঠানোর একটি প্রস্তাবের কথা উল্লেখ ছিল। চিঠিতে স্বাক্ষর ছিল “মোহাম্মদ হাসান” অর্থাৎ হারিসের।
তার হিসাবরক্ষক ইউসুফ আরও বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নমিনেশন পেতে অনেকেই হারিসকে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। “গত ইলেকশনে তো আমার সামনে দেখছি কতজনে ধান্দার জন্য ওনারে বলছে, ‘ভাই আমারে একটা নমিনেশন দিয়া দেন, আমি ৫ কোটি টাকা দেব।’” তিনি আরও বলেন, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অর্থের বিনিময়ে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন চুক্তি পাইয়ে দেন মানুষকে। “হাসান… আমি ক্লিয়ারলি বলতে পারবো না, তবে মিনিমাম ৩০-৪০ কোটি টাকা কামাই নিছে গত কয়েক দিনে।”

হোটেল বিনিয়োগের জন্য মধ্যস্থতাকারীর কাজ

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক : “আর সেনাপ্রধান ওনার ভাই”।

আল জাজিরা এরপর নিজেই ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীর ছদ্মাবরণে হারিসের কাছে লোক পাঠায়। এই বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে একটি হোটেলে কয়েক মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চান। দুই পক্ষের মধ্যে একটি ভিডিও মিটিং হয়। হারিসের সাথে তখন মোহাম্মদ রহমান নামে কানাডা-ভিত্তিক এক ব্যবসায়ী যোগ দেন। আলোচনার এক পর্যায়ে রহমান বলেন, হারিস “উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখেন। সরকারের সাথে সম্পৃক্ত, বিশেষ করে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সাথেও।” হারিস এরপর বলেন, বাংলাদেশে ওই হোটেল প্রকল্পে ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীরা যা বিনিয়োগ করবেন, তার “২০% কমিশন” তিনি চান। তার পক্ষে মোহাম্মদ রহমান বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন, “হারিস তার বড় ভাইয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠাবেন। আমরা এরপর আপনাদের কাছে যাব। প্রয়োজনে লন্ডনে অবস্থিত আমাদের হাইকমিশনকেও আমরা জানাবো। হাইকমিশনের লোকজনও আসবে যেন একে দেখতে আসল কিছু মনে হয়। এরপর তিনি ওই প্রস্তাব আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের কাছে নিয়ে যাবেন। এতে করে বিষয়টি আরও পাকাপোক্ত দেখাবে। এরপর তার [হারিস] কোম্পানি বাংলাদেশে আপনার পরামর্শক হিসেবে কাজ করবে।”
রহমান আরও বলেন, “মূলত, তার বড় ভাই এখন দেশ চালাচ্ছে, কারণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশ চালানোর কাজ সেনাপ্রধানকে দিয়ে রেখেছেন। আর সেনাপ্রধান ওনার [হারিস] ভাই।”

হত্যার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ভাইদের ক্ষমা
তথ্যচিত্রে জেনারেল আজিজের টেলিফোন আলাপের আরও কিছু অংশ শোনানো হয়। তিনি সেখানে জানান, সেনাপ্রধান হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তাকে জানান যে, তার ভাইয়ের (জোসেফ) মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। আজিজকে বলতে শোনা যায়, “আমাকে মহামান্য [প্রধানমন্ত্রী] নিজে বলেছে যে, আমি চিন্তা করছি যে, [আর কোনো বিকল্প নাই] এটা ছাড়া। এই যে আমাদের ভাইকে বিভিন্ন জিনিস করছে, এটা কিন্তু ওনার পরিকল্পনা অনুযায়ী যে, তার [সেনাপ্রধান] হওয়ার আগে [তার ভাইদের[ এগুলো ক্লিয়ার করতে হবে। উনি নিজে [প্রধানমন্ত্রী] এগুলো আমার সাথে আলোচনা কইরা গ্যাছে গা।”
২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি জোসেফকে ক্ষমা মঞ্জুর করেন।

 র‍্যাব ও পুলিশকে ব্যবহার করেন হারিস

ওরা প্রধান মন্ত্রীর লোক : বেনজীর আহমেদের সাথে তোফায়েল আহমেদ জোসেফ।

গোপন ক্যামেরায় হারিস স্বীকার করেন যে তিনি র্যাব ও পুলিশকে নিজের ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করেন। পুলিশের প্রধান ও র্যাবের সাবেক প্রধান বেনজির আহমেদের কথাও তিনি এক্ষেত্রে উল্লেখ করেন।
“বেনজির আছে, র্যাব আছে, সব আছে। ওগো দিয়াই তো কাম করাইতেছি। আমার গুন্ডা অইলো র্যাব অহন। আমার আর গুন্ডা লাগে না তো, আমার তো এইডিই [র্যাব] গুন্ডা। কাউরে উডাই লইয়া আও, কাউরে ধরো…ওরাও খায়, আমিও খাই। ডাইরেক্ট কথা!”
পুলিশের বিষয়ে হারিস বলেন, “পুলিশই তো আমগো এহন গুন্ডা। গুন্ডা আর লাগে না তো। যার পুলিশ লাইন আছে, যার প্রশাসন আছে, সেই এহন গুন্ডা।”
প্রতিদ্বন্দ্বী সেলিম প্রধানকে র্যাব দিয়ে আটক করানোর গল্পও তিনি জানান। তিনি বলেন, “ওর একটা গার্লফ্রেন্ড আছিল। গার্লফ্রেন্ডরে ফিট করছি। গার্লফ্রেন্ডই ইনফরমেশন দিছে। মোবাইল ট্র্যাকিং করাইছি।”
হারিস গোপন ক্যামেরার সামনে আরও বলেন, “ওরে [সেলিম প্রধান] আমি প্লেনের থেকে নামাইয়া ধরাইছি। ওরে আমি ব্যাংককে ফোন করছি ওর নাম্বার পাইয়া। আমি কই *, তোরে পাইলে মাইরালামু। কিন্তু তোরে মারমুনা কিল্লাইগা জানস, মাইরা লাইলে তো তুই বুঝবি না কষ্টডা।”

র‍্যাব ও হাবিবুর রহমান মিজানের গ্রেপ্তার

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক : ৱ্যাবের হাতে আটক হাবিবুর রহমান মিজান।

আল জাজিরার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্রে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়, ২০১৯ সালে মোহাম্মদপুরের স্থানীয় রাজনীতিক হাবিবুর রহমান মিজানকে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে র্যাব গ্রেপ্তার করেছিল মূলত হারিস ও তার ভাই সেনাপ্রধান আজিজের কারণে। সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মিজান মূলত মোস্তফার ভাই। ১৯৯৬ সালে এই মোস্তফাকে খুন করার দায়েই আজিজের তিন ভাই দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। তথ্যচিত্রে মিজানের ভাতুষ্পুত্র বলেন, তাদের পরিবারকে সাজা দিতে আজিজ র্যাবকে ব্যবহার করছেন। তার বক্তব্য, জ্যেষ্ঠ র্যাব কর্মকর্তারা মূলত সামরিক বাহিনী থেকে আসা। আর তাদের ওপর সেনাপ্রধানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে তার যেকোনো কথাই তারা শুনে।

আহমেদ পরিবার ও রাষ্ট্রপতি

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক : বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাথে বিয়ের অনুষ্ঠানে জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পলাতক খুনী হারিস আহমেদ।

২০২০ সালের শুরুর দিকে জেনারেল আজিজের বড় ছেলে বিয়ে করেন। তখন বেশ বড়সড় করে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বিয়ের ভিডিওতে দেখা যায় যে সেখানে আজিজের ৩ ভাইই উপস্থিত। অথচ, তারা আইনের চোখে পলাতক।
শুধু তা-ই নয়, জোসেফের সাজা যেই রাষ্ট্রপতি মওকুফ করেছিলেন, সেই রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও একই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন।

ইসরায়েলি নজরদারি যন্ত্র ক্রয়

ওরা প্রধানমন্ত্রীর লোক : ইসরায়েলি কোম্পানির নজরদারির যন্ত্র কিনেছে বাংলাদেশ।

তথ্যচিত্রে দেখানো হয় যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইরিশ এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ইসরায়েলি নজরদারির যন্ত্র কিনছে। অথচ, ইসরায়েলকে বাংলাদেশ স্বীকৃতিই দেয় না। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে কাজ করা খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান প্রাইভেসি ইন্টারন্যাশনালের এলিয়ট বেন্ডিনেলি ওই তথ্যচিত্রে উপস্থিত হন। তিনি সেখানে ব্যাখ্যা করে জানান যে, ইসরায়েলি ওই যন্ত্রের মাধ্যমে ২০০-৩০০ মোবাইল ফোনে নজরদারি করা যাবে। তার ভাষ্য, “আপনি আপনার ফোনে যা করছেন, অর্থাৎ টেক্সট মেসেজ বা ফোনকল বা যেসব ওয়েবসাইটে আপনি যাচ্ছেন, তার তথ্য এই যন্ত্র দিয়ে পাওয়া সম্ভব…এই বিশেষ মডেলটি মানুষের যোগাযোগ পালটে দিতেও সক্ষম। অর্থাৎ এর মাধ্যমে আপনার এসএমএস বার্তা পরিবর্তন করে দেওয়া যাবে। মানুষের পরিচয় পর্যন্ত নকল করা যাবে।”
এই চুক্তির অধীনে পিকসিক্স নামক ইসরায়েলি ওই কোম্পানি ও বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী একটি “নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট” বা তথ্য প্রকাশ না করার বাধ্যতামূলক চুক্তিতে সই করে।

প্রতিক্রিয়া
আল জাজিরার তথ্যচিত্রটি প্রকাশ প্রচারিত হওয়ার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিবৃতি জারি করা হয়। বিবৃতিতে প্রতিবেদনকে “মিথ্যা ও মানহানিকর” উল্লেখ করে বলা হয়, “এই প্রতিবেদন একগুচ্ছ বিভ্রান্তিকর শ্লেষ আর বক্রোক্তি ছাড়া কিছুই নয়, যা আসলে চরমপন্থী গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কুখ্যাত ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার।”
এছাড়া আন্তবাহিনী জনযোগাযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে জারি হওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, “দেশের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাগণের বিভিন্ন দাপ্তরিক, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত কার্যক্রমের ভিডিও ক্লিপ ও ছবি চাতূর্যের সাথে সম্পাদনা এবং অডিও সংযোজন করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে৷” এতে বলা আরও বলা হয়, “প্রতিবেদনে মন্তব্যকারীরা হলেন ডেভিড বার্গম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে একজন অভিযুক্ত; প্রতিবেদনে সামি নামে চিত্রায়িত জুলকারনাইন সায়ের খান সাবেক ক্যাডেট, মাদকাসক্তির জন্য যিনি বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমি থেকে বহিষ্কৃত এবং কুখ্যাত নেত্র নিউজের চিফ এডিটর তাসনিম খলিল। অসৎ উদ্দেশ্য এবং কায়েমী স্বার্থের এসব ব্যক্তিদের যোগসূত্র তাদের অতীত কর্মকান্ডের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।” ইসরায়েল থেকে ইন্টারনেট বা মোবাইল নজরদারির সরঞ্জাম ক্রয়ের অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করে আইএসপিআর জানিয়েছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যবহারের জন্য হাঙ্গেরি থেকে ওই যন্ত্র কেনা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের মধ্যে একমাত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সরাসরি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বুধবার দুপুরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “প্রতিবেদনটি তথ্যভিত্তিক নয়। এটা হলুদ সাংবাদিকতা… এগুলো সাংবাদিকতার নর্মসের ভেতরে পড়ে না” এবং এতে “দেশবিরোধী একটি ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি এই প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ না করলেও, ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে বলেন, “দেশে-বিদেশে নানাভাবে নানা অপপ্রচার চালানোর প্রচেষ্টা চলছে।” এছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এই তথ্যচিত্রটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

যে প্রশ্ন বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের by জি এম রাজিব হোসেন

ভয়ঙ্কর ও লোমহর্ষক যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, সেখানে দেখা গেছে ইকবাল নামের পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, “গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা, একটাই যায় স্যার, বাকিটি যায় না। এটাই হলো স্যার সবচেয়ে আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।” ইকবালের এ বর্ণনা শুনছেন পুলিশ প্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারও। ৪৩ সেকেন্ডের এ ভিডিও ক্লিপটি পুলিশের বর্বরতার একটা অকাট্য প্রমাণ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে ১৯৩৭ সালে সারাবিশ্বের মানুষ একটি লোমহর্ষক প্রতিযোগিতার কথা জানতে পারেন। এটির নাম ছিল- “শত মানুষ হত্যার প্রতিযোগিতা”। জাপানের দু’টি পত্রিকায় এ সংক্রান্ত দু’টি খবর বের হয়। যার মাধ্যমে চীনে আগ্রাসনের সময় তৎকালীন জাপানি বাহিনীর বর্বরতার চিত্র কিছুটা অনুধাবন করেছিল বিশ্ব। চীনের নানচিং যাওয়ার পথে জাপানের রাজকীয় বাহিনী ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় যা ইতিহাসে ‘নানচিং হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিত। এ হত্যাকাণ্ড চালানোর সময় জাপানের দুই সেনা কর্মকর্তা তোশিয়াকি মুকাই ও তশুয়োশি নোদা একটি মাত্র তরবারি দিয়ে দ্রুততম সময়ে একশ’ মানুষ হত্যার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। উভয় কর্মকর্তা তাদের এ লক্ষ্য ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে কে বিজয়ী হয়েছিলেন তা জানা যায়নি। মানুষ হত্যার মতো নির্মম একটা ঘটনাকে এখানে ওই দুই কর্মকর্তা যেন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডকে তারা নিজেদের খেয়াল খুশির বিষয়ে পরিণত করেছিলেন। একশ’ হত্যাকাণ্ডের লক্ষ্য পূরণে তারা সামনে যাকে পেয়েছেন তাকে তরবারি দিয়ে শিরচ্ছেদ করেছেন। সাধারণত যুদ্ধের সময় এ ধরনের বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং এ ধরনের হত্যাকাণ্ড একটি জাতির ওপর আরেকটি জাতি দ্বারা সংঘটিত হয়। যেমনটা হয়েছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা।

কিন্তু সম্প্রতি শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনরত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা যে ভয়াবহ তাণ্ডব ও হত্যাযজ্ঞ চালায় তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর ঘটেনি। এ সময় প্রতিদিন নিরাপরাধ মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আধুনিক অস্ত্র নিয়ে মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা করেছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেছে। স্নাইপার ব্যবহার করা হয়েছে। সবকিছুতেই যেন একটা উৎসব উৎসব ভাব। ঠিক যেন জাপানি ওই দুই সেনা কর্মকর্তার হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু এখানে পার্থক্য একটাই। জাপানিরা ওই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল চীনাদের ওপর। কিন্তু বাংলাদেশে নিজ দেশের নিরীহ জনতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একটি নির্দিষ্ট দলের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কতিপয় অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তাদের গুলিবর্ষণের নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়েছেন সাধারণ অনেক পুলিশ সদস্য। অবশ্য অনেক পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্য আওয়ামী লীগের প্রতি অতি দায়বদ্ধতার অজুহাতে নিজেও অতি উৎসাহী হয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছেন। এক্ষেত্রে একেকজন যেন অন্যজনের চেয়ে মানুষ হত্যায় অনন্য হয়ে উঠেন। যেন প্রতিযোগিতা চলছিল কে কতো জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিওচিত্রে হত্যাকাণ্ড চালানোর সময় তাদের মধ্যে এক ধরনের নায়কোচিত ভাব ও তাদের চোখেমুখে স্বস্তির অভিব্যক্তিও দেখা গেছে- যেটা মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

ঘটনা এক: স্পট রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে সারা দেশের মতো আন্দোলনকারীরা ১৬ই জুলাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের একটি রাস্তায় সমবেত হয়ে অন্যান্য দিনের মতো বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনাও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এ সময় ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাইদকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায় পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার আগে তিনি বুক চিতিয়ে দুইহাত দুইদিকে প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় তিনি নিরস্ত্র ছিলেন। তার অবস্থান স্পষ্টতই প্রমাণ করছিল যে তিনি কোনোভাবেই পুলিশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিলেন না। তারপরও তাকে হত্যা করা হলো।

ভিডিওটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হয় যে কমপক্ষে দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা শটগান দিয়ে রাস্তার অপর পাশ থেকে সরাসরি সাইদকে গুলি করেন। স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে মানবাধিকার সংগঠনটি জানায়, গুলিবর্ষণের সময় পুলিশ কর্মকর্তা ও সাইদের মধ্যে দুরত্ব ছিল মাত্র ১৫ মিটার। এমনকি সাইদ পুলিশের জন্য স্পষ্টত কোনো হুমকিই ছিল না।

ঘটনা দুই: সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও লোমহর্ষক যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, সেখানে দেখা গেছে ইকবাল নামের পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, “গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা, একটাই যায় স্যার, বাকিটি যায় না। এটাই হলো স্যার সবচেয়ে আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।” ইকবালের এ বর্ণনা শুনছেন পুলিশ প্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারও। ৪৩ সেকেন্ডের এ ভিডিও ক্লিপটি পুলিশের বর্বরতার একটা অকাট্য প্রমাণ।

ঘটনা তিন: ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কতোটা বর্বর ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিল তার আরও একটি প্রমাণ ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। এতে দেখা যায় তরুণদের গুলি করে হত্যার পর লাশ ভ্যানের ওপর স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার থানা রোডের গলিতে। গুলিতে নিহত সাত ছাত্রের লাশ একটি ভ্যানের ওপর তুলে একটি ব্যানার দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। পরবর্তীতে লাশগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

ঘটনা চার: ৫ই আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘মার্চ টু ঢাকা’  কর্মসূচির অংশ হিসেবে কয়েক হাজার মানুষ রাজধানীর চাঁনখারপুল হয়ে শাহবাগে আসার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আগে থেকে অবস্থান নিয়ে থাকা সশস্ত্র একদল পুলিশ তাদের ওপর হামলা করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছাত্রদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ছুড়ছিল, কেউ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করছিল আবার কেউ রাবার বুলেট ছুড়ছিল। কিন্তু এই টিমে আরও কয়েকজনের হাতে চাইনিজ রাইফেল ছিল। আরটিভি’র একটি ভিডিওতে তাদেরকে বন্দুকের ভিতরে তাজা গুলি লোড করে সাধারণ মানুষের দিকে ছুড়তে দেখা যায়। ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার নির্দেশে তারা নিরস্ত্র নিজ দেশের মানুষের ওপর গুলি ছুড়ছিল। গুলিতে কেউ মারা পড়লে তাদের চোখে মুখে যেন শান্তির আভা ফুটে উঠছিল। মনে হচ্ছিল নিজ দেশের নিরাপরাধ মানুষ হত্যা যেন কতো আনন্দের।

হত্যাকাণ্ডের প্রত্যেকটি ঘটনায় একেকজন যেন অন্যজনের চেয়ে ছিল সুনিপুণ। তাইতো বাসার ছাদে বাবার কোলে থাকা শিশু রিয়াকে নিখুঁত নিশানা বানিয়েছেন হয়তো কোন স্নাইপার। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে লাশের পর লাশ ফেলেছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। অর্ধমৃত এক তরুণকে পুলিশের সাঁজোয়া যান থেকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। অনেককে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করে রক্তের হোলিখেলা করেছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররাও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সারা দেশে লাশের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও বিক্ষোভ প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা চালিয়ে সারা দেশে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছেন।
শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করা অপরাধ নয়, বরং এটা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৭নং অনুচ্ছেদে দেশের প্রত্যেকটা নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতার কথা বলা আছে। উল্লেখ আছে, “জনশৃঙ্খলা বা জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে।’ ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২০নং ধারায় প্রত্যেকেরই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশগ্রহণের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এ ঘোষণাপত্রের ৩০টি ধারার মধ্যে ১৯নং ধারায়ও বলা হয়েছে-প্রত্যেকেরই মতামত পোষণ ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তাদের সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করা তো দূরের কথা বরং বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে শতশত মানুষের প্রাণ গেছে এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। পুলিশ এক্ষেত্রে তাদের নীতিবাক্য শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও প্রগতি অনুসরণ তো করেইনি, বরং ভক্ষকের অবস্থান নিয়েছে।
আওয়ামী ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার এ অভ্যুত্থান অহিংস ও সহিংস মিলে চলেছে মোট ২৬ দিন। এত অল্প সময়ে এত রক্ত দেশের মানুষ আগে কখনো দেখেননি। সম্প্রতি ঢাকার এক অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, “এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও এত অল্প সময়ে এত লোক মারা যাননি। স্বাধীনতার পূর্বে ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে মাত্র ৬১ জন মারা গেছেন। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময় ১২ জন মারা গেছেন। শ্রীলঙ্কায় যে আন্দোলন হয়েছে তাতে মাত্র ৭ জন মারা গেছেন। বেলারুশে বিখ্যাত আন্দোলনে মাত্র এক ডজন লোক মারা গেছেন। পাকিস্তানে ইমরান খানের সঙ্গে শাহবাজের যে দ্বন্দ্ব হয়েছে তাতে ১২ জন মারা গেছেন।”

অথচ শুধু শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর উৎসাহী উচ্ছৃঙ্খল কিছু সদস্যদের প্রত্যক্ষ মদতে কতো মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে তার সঠিক হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। প্রথম আলোর ৪ঠা আগস্টের এক প্রতিবেদনে ওই সময় পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৭৫৭। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এক প্রতিবেদনে সারা দেশে ৮১৯ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে।
গত ১৬ই আগস্ট জাতিসংঘের প্রাথমিক রিপোর্টে মৃতের সংখ্যা ৬৫০ জন উল্লেখ করে অভিযোগ করেছে যে আন্দোলন দমন করতে বিচার বহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ শান্তিপূর্ণ সমাবেশে কঠোর বিধিনিষেধের মতো গুরুতর মানবাধিকার লংঘন করেছে নিরাপত্তা বাহিনী (মানবজমিন)।

নিরাপত্তা বাহিনীর প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে মানুষের জানমাল রক্ষা করা। কিন্তু তারা কী তা করেছিল? কেন তারা সেদিন মানুষের পাশে না থেকে ফ্যাসিস্টদের পক্ষ নিয়েছিল? কেন তারা মানুষ হত্যার নোংরা খেলায় মেতে উঠেছিল? এ প্রশ্ন আমার মতো বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।

mzamin

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, কোন পথে হাঁটবে দিল্লি?

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে কড়া আলোচনা অব্যাহত থাকলেও নীতি-নির্ধারকদের দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন আকার দিতে পথ খুঁজে বের করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ১৩ই সেপ্টেম্বর দ্য উইক ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটা সত্য যে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (এনই) অন্যান্য দেশের তুলনায় একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এর প্রভাব গুরুত্ব বহন করে। এক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর আলোচনাটি প্রাসঙ্গিক।

সম্প্রতি গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন দিয়ে এ আলোচনা শুরু করা যাক। আলোচনাকে বাস্তবতার মধ্যে রাখতে কিছু বিদেশি তত্ত্বকে এড়িয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে যে অভ্যুত্থান হয়েছে তা কি কোনো ডানপন্থি বা ইসলামপন্থি প্রতিবাদ ছিল, যার মাধ্যমে ছাত্রদের প্রতিবাদকে ঢেকে রাখা হবে? বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বুঝা যায় ছাত্রদের বিক্ষোভ ছিল হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে। যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সরকারি চাকরিতে এই কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। তারা এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূর করার আওয়াজ তুলেছিলেন।

তবে এই কথা সমানভাবে সত্য যে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোও যোগ দিয়েছিল। এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন ভেবে দেখতে হবে যে, সাময়িক বা সার্বিক প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন একটি দেশে শাসকের বিরুদ্ধে যখন বিক্ষোভ চলে সেখানে কী বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ স্বাভাবিক নয়? আসলে, এটা যুক্তিসঙ্গত যে, রাজনীতির সারমর্মই হলো সমাজের বিক্ষুব্ধ অংশগুলোর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করা। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বা তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিবাদের ঢেউ জাগাটাই স্বাভাবিক।

ভারতীয় গণমাধ্যমও দাবি করে আসছে যে, শেখ হাসিনাকে বিক্ষোভ মোকাবিলায় কার্যকর সহায়তা করতে ব্যর্থ হয়েছে ভারত। একটি বিষয়ে সামপ্রতিক সময়ের বাংলাদেশি সামাজিক-রাজনৈতিক দৃশ্যপটের প্রশংসা করতে হবে। বিক্ষোভের আগেও যেমন বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাব বেশ স্পষ্ট ছিল। ঠিক তেমনি এখনো বাংলাদেশে একই অবস্থা বিরাজ করছে। যখন ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক ঘটনায় সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ভারতের বহিরাগত গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করা হয় তখন বুঝতে হবে সে বাংলাদেশে ভারত-বিরোধিতা কতটা প্রকট। এটাও সত্য যে, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা এই ভারত-বিরোধী আখ্যান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালানো হলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক নীতিও বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারত-বিরোধিতার জন্য সমানভাবে কাজ করেছে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে, প্রতিবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাবেক সরকারকে সহায়তা করার জন্য ভারত মূল্যবান কিছু করতে পারতো।
ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েই বুঝতে পেরেছে যে, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে স্বতন্ত্র সম্পর্কের উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। যদিও উভয়পক্ষের রাজনীতিবিদ এবং গণমাধ্যম তাদের বক্তব্য অব্যাহত রেখেছে। তবে স্থিতিশীলতার জন্য দু’দেশের কূটনীতিক এবং নীতি-নির্ধারকদের সম্পর্ককে নতুন আকার দেয়ার জন্য পথ খুঁজে বের করতে হবে। এটি করতে গিয়ে, ভারতকে চারটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা সমপ্রতি সোসাইটি টু হারমোনাইজ অ্যাস্পিরেশন ফর রেসপনসিবল এনগেজমেন্ট’র (এসএইচএআরই) বিশ্লেষণে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রথম সমস্যা হচ্ছে, শেখ হাসিনাকে যদি দিল্লি যতদিন খুশি ভারতে থাকার অনুমতি দেয় তাহলে নিঃসন্দেহে তা ঢাকার বর্তমান সরকার এবং বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের বিরক্তির কারণ হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা করতে না চাইলেও, শান্তি ও নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে অর্জিত হতে পারে না- তা দেখানোর জন্য বহু উদাহরণ রয়েছে। তদুপরি, ভারত-বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার মূল ভিত্তি যখন উভয় দেশের সম্পৃক্ততা, তখন ভারতকে মনে রাখতে হবে যে, তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য ভারত-বিরোধী উপাদানগুলো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। সর্বশেষ, যখন দিল্লি ঢাকার সঙ্গে একটি জাতীয় নীতি অনুসরণ করবে সেটা যেন আগরতলা, আইজল, দিসপুর এবং শিলংকে কেন্দ্র করে নেয়া হয়।

এখন ভারতীয় গণমাধ্যম এবং রাজনীতিবিদরা যদি গলাবাজি বন্ধ করে তাহলে সেটা নিজ দেশের জন্য একটি মহান সেবা হতে পারে। এক্ষেত্রে এই পরিস্থিতিতে সঠিক নীতির জন্য বিকল্প বাস্তবিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা জারি রাখতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন বাঁক উপলব্ধিই এখন ভারত-বিরোধিতা সমাধানের সঠিক জবাব। দিল্লি ঢাকার সঙ্গে তার সম্পর্ক করতে চাইলে গণভবন বা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার রাজনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে সম্পর্ক করলে চলবে না। এক্ষেত্রে দিল্লিকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে।

mzamin

পদ্মার দুর্গম চরে বিল্লালের রাজত্ব টর্চারসেলে চলতো নির্যাতন by রিপন আনসারী

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার পদ্মার দুর্গম  চরের একটি ইউনিয়ন আজিমনগর। আওয়ামী লীগের জামানায় ত্রাসের রাজত্বের রাজা ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল  হোসেন। তার হাতেই জিম্মি ছিল নিরীহ চরবাসী। জমি দখল, চাঁদাবাজি, সালিশ বাণিজ্য এবং সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ টর্চারসেল বানিয়ে  চালানো হতো নির্যাতন। তার হুকুমই ছিল সেখানকার আইন। শুধু নিরীহ মানুষজনই নয়, বিএনপি’র নাম শুনলেই তেলে-বেগুনি জ্বলে উঠতেন তিনিসহ তার বাহিনীর লোকজন। বিএনপি অধ্যুষিত এই চর থেকে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছেন। ইউনিয়নের সাবেক দু’বারের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি হান্নান মৃধাকেও দীর্ঘদিন চরে প্রবেশ করতে দেয়নি বিল্লাল ও তার বাহিনী। তাছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান একজন সদস্য বিএনপি ঘরানার হওয়ায় তাকে আড়াই বছরে ইউনিয়ন পরিষদের আঙিনায় ঢুকতে দেয়নি। চেয়ারম্যানের হাতিয়ার হিসেবে যাদের নাম সরাসরি উঠে এসেছে তাদের মধ্যে তার ছোট ভাই ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মোশারফ হোসেন, আলমগীর মেম্বার, তারাব আলী মেম্বার, এনায়েত ফকির মেম্বার, মতিয়ার ও আতিরের নাম। তাছাড়া চরে মাদক সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে তাদের নাম উঠে এসেছে। আজিমনগর ইউনিয়নটি পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চলে হওয়ায় হবিরামপুর উপজেলা সদর থেকে প্রশাসনিক লোকজনের বেশির ভাগ সময়ই কার্যত পা পড়ে না। ফলে চেয়ারম্যান বাহিনীর একক আধিপত্য বিস্তার করে আসলেও সেটা দেখার কেউ নেই বলে অভিযোগ চরবাসির।

সরজমিন মানবজমিনের অনুসন্ধানে এমন চিত্র পাওয়া গেল আজিমনগর ইউনিয়নে। চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন ও তার বাহিনীর  নির্যাতন ও অপকর্মের রাজসাক্ষী হিসেবে মানবজমিনের কাছে তুলে ধরেন স্বয়ং তার পরিষদের একজন গ্রাম পুলিশ শেখ মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান বিলাল হোসেন ও তার বাহিনী চরে এমন কোনো অপকর্ম নেই যে করেনি। আমি তার অপকর্মের প্রত্যক্ষদর্শী। আমাকে দিয়েও অনেক অন্যায় অবিচার কাজ করিয়েছেন। বাড়িতে একটি টর্চার সেল বানিয়ে তার অবাধ্য চরাঞ্চলের নিরীহ মানুষজনকে শারীরিক প্রহার করা হতো। আমি সবই নিজ চোখে দেখেছি কিন্তু ভয়ে কিছু বলতে পারিনি। তিনি বলেন, প্রকল্পের ঘর দেয়ার নাম করে মানুষজনের কাছ থেকে ৪০-৫০ হাজার  টাকা  নিয়েছে আমি সেটার রাজসাক্ষী। তাছাড়া ভূমি দেয়ার কথা বলে ৩০০ মানুষের কাছে ১০ হাজার করে টাকা নিয়েও কাউকে জমি দেয়নি।  ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের মাধ্যমে সেই টাকাগুলো নিয়েছে। সেখান থেকে সচিব ভাগ পেয়েছে। তার কাছে সেই তালিকা এখনো রয়েছে। চোখের সামনে তার এই অপকর্ম দেখে আমি চাকরি করবো না বলে তাকে জানিয়ে দিই। তখন চেয়ারম্যান ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে বলে, ‘তুই করবি না, তোর বাপে চাকরি করবে’। পরে আমার দুই মাসের বেতন আটকে দেয়া হয়। উপজেলার নাজিমুদ্দীন স্যারকে বলে আমাকে চাকরি থেকে বাদ দেন। সরকার পতনের পর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আমাকে ডেকে বলে, ‘তোমার চাকরি কেউ খায়নি।’

আজিমনগর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর শিকদারের ক্ষোভের শেষ নেই। তার অপরাধ সে বিএনপি করে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, গত ইউপি নির্বাচনে এলাকার জনগণ আমাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু গত আড়াই বছরে একদিনও আমাকে ইউনিয়ন পরিষদে ঢুকতে দেয়নি চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন ও তার লোকজন। যার কারণে আমার ওয়ার্ডের জনগণের জন্য আমি কিছুই করতে পারিনি। তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে আমার জায়গা জমি দখল করে নিয়েছে। আমার জমিতে আবাদ করা ৩০০ মণ ভুট্টা লুট করেছে। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে এভারেজে আমি ৮ বছরও বাড়িতে থাকতে পারিনি। কয়েকটি মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাকে বাড়িছাড়া করেছে। ভূমি দখল থেকে শুরু করে মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেয়া, নির্যাতনসহ এমন কোনো কাজ নেই যা বিল্লাল চেয়ারম্যান ও তার লোকজন করেনি। চেয়ারম্যানের ভাই মোশারফ হোসেন এলাকার নিরীহ মানুষের শত শত বিঘা জমি দখল করেছে। ভূমিহীনদের কাছ থেকে জায়গা জমির কাগজ করে দেয়ার কথা বলে ১০ হাজার ২০০ টাকা করে প্রায় ৬০০ জনের কাছ থেকে নিয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বাবদ একেকজনের কাছ থেকে ৭০-৮০ হাজার করে টাকা লুটে নিয়েছে। চেয়ারম্যানের প্রধান ক্যাডার বাহিনীদের মধ্যে তার ভাই মোশাররফ, আতি মতি, আতোর আলীসহ আরও অনেকে। এনায়েতপুর গ্রামের বৃদ্ধ লাল মিয়া বলেন, বছর তিনেক আগে চেয়ারম্যান তার লোকজন দিয়ে আমার ছয় বিঘা জমি দখল করে নিয়েছে। প্রশাসনের কাছে গিয়েও কোনো বিচার পাইনি। আমার মতো এলাকার অনেক মানুষকেই সে অত্যাচার করেছে। এলাকার মহিলারাও তার ভয়ে বাড়ির বাইরে বের হতে সাহস পেত না। রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা সোবহান খান।

৩০ বছর ধরে তিনি তার জায়গা জমিতে বসবাস করছিলেন। বিল্লাল চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর আমার জমিতে তার চোখ পড়ে। মাস তিনেক আগে আমাকে হুমকি দেয়। বলেন, ‘জমিতে থাকতে হলে তোকে ৬ লাখ টাকা দিতে হবে। তা না হলে রাতারাতির মধ্যে বাড়িঘর ভেঙে তোকে চলে যেতে হবে।’ পড়ে বাধ্য হয়ে ৫ লাখ টাকা বিল্লাল চেয়ারম্যানের হাতে তুলে দিই। যুবক সোহেল রানা মানবজমিনকে বলেন, বিল্লাল হোসেনের বাবা ছিলেন একজন সামান্য ইউপি সদস্য। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পদ-পদবি ভাগিয়ে নিয়ে নেয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মারধর ও হামলা চালিয়ে এলাকা থেকে বিতাড়িত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর আগে তাদের গ্রামে তেমন অস্তিত্ব ছিল না। চেয়ারম্যান হওয়ার পর সে এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। চরের ভেতর বিলাসবহুল ৩ তলা বাড়ি। বাবার নামে রেকর্ডভুক্ত কোনো সম্পত্তি না থাকলেও তারা ১০-২০ হাজার মণ ভুট্টা পায়। রয়েছে বড় বড় ছয়টি গাড়ি। ঢাকার কেরানীগঞ্জে ২০ কাঠা জমির উপর ছয় তলাবিশিষ্ট ভবন রয়েছে। তিনি বলেন, চেয়ারম্যানের ছোট ভাই মোশারফ হোসেন স্থানীয় যুবলীগের সভাপতি।  তিনি ও তার লোকজন এলাকার মাদকের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এলাকার অনেক পরিবারের সন্তান মাদকে আক্রান্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। শিকারীপুরের সৌদি প্রবাসী আলহাজ মোল্লা বলেন, ২০২১ সালে আমার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের দাওয়াত করায় বিল্লাল চেয়ারম্যানের লোকজন আমার বাড়িতে ঢুকে হামলা চালিয়ে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়।

এরপর আমাকে চৌকিদার দিয়ে ধরে তার বাড়িতে নিয়ে আয়নাঘরের মতো একটি রুমে নিয়ে ইচ্ছেমতো মারধর করে। চেয়ারম্যান নিজে এবং তার বাহিনীরা মারতে মারতে আমাকে অচেতন করে ফেলে। পরে আমার আত্মীয়স্বজন উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল নিয়ে যায়। আমার মতো এলাকার যারা বিএনপি করে তাদের ধরে মারধর করতো। এলাকার মোহাম্মদ আলী বলেন, আমি একজন ব্যবসায়ী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালি থানা, মানিকগঞ্জ সদর থানা, হরিরামপুর, সাটুরিয়া ও সিংগাইরসহ বিভিন্ন থানায় এ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধশত মামলা দিয়েছে। রাজনৈতিক, চাঁদাবাজিসহ এমন কোনো মামলা নেই যেটা বিল্লাল চেয়ারম্যান ও তার লোকজন দেয়নি। গত ১৫ বছরে হামলা মামলা দিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি করা হয়েছে। কৃষক সেকেন খাঁ বলেন, জমি দেয়ার কথা বলে চেয়ারম্যানের নির্দেশে এনায়েত মেম্বার আমার কাছ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে। অল্প কিছু জমি দিলেও কথা অনুযায়ী বাকি জমি দেয়নি। এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি হান্নান মৃধা মানবজমিনকে বলেন, আমি পরপর দু’বার চেয়ারম্যান ছিলাম আজিমনগর ইউনিয়নে। জবরদখল করে বিল্লাল চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই ইউনিয়নে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে। এলাকার মানুষের স্বাধীনতা ও শান্তি সবটুকুই কেড়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমি আমার এলাকায় ঢুকতে পারিনি। চেয়ারম্যান ও তার লোকজন আমাকে ঢুকতে দেয়নি। তাছাড়া বিএনপি’র নাম শুনলেই অত্যাচার নির্যাতন করতো। চরে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে একটি বাহিনী তৈরি করেছিল। টর্চারসেল বানিয়ে সেখানে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। এখনো চরে তার লোকজন প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। তাছাড়া সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর খানও বর্তমান বিল্লাল চেয়ারম্যানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চরে অশান্তি সৃষ্টি করছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহরিয়ার রহমান মানবজমিনকে বলেন, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ শোনার পর আমরা এসিল্যান্ড এবং কৃষি কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছিলাম। আশ্রয়ণ প্রকল্পের কয়েকটি ঘরে সার এবং ভুট্টা পাওয়া গেছে। সেগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য বলা হয়েছে। তাছাড়া ভূমি দেয়ার অধিকার চেয়ারম্যানের নেই। মানুষজন যদি কোনো টাকা পয়সা দিয়ে থাকে তা যদি প্রমাণিত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম রয়েছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইউনিয়নটি  দুর্গম চরাঞ্চল হাওয়ায় সেখানে যাওয়া আসায় এক ধরনের সমস্যা। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় প্রশাসনিকভাবে সেখানে তেমন কোনো তৎপরতাও চালানো সম্ভব হয় না। চরে একটি পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থাকলেও সেটি এখনো চালু হয়নি।

mzamin

শ্রমিকরাও বৈষম্যের শিকার তাদের দিকেও তাকাতে হবে by নাজমুস সাকিব

বৈষম্য। এক শব্দের আন্দোলন। অহিংস কিন্তু শ্রমিক-মধ্যবিত্তসহ সর্বস্তরের মানুষ নাড়ির টান অনুভব করলো। ডাক দিলো ছাত্ররা, রাজপথে মুহুর্মুহু স্লোগান, নেমে আসলো অভিভাবকরাও। কেঁপে ওঠে ১৬ বছরের জুলুমশাহীর মসনদ। রাজাকারের বাচ্চা, নাতি অভিধা। বিভাজনের কার্ড। সব ব্যর্থ। শেষমেশ অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ। পৃষ্ঠ প্রদর্শনের বদলে আবু সাঈদের বুক পেতে দেয়া, অবিশ্বাস্য গুলির নজির। সাহসের সঞ্চারণ, সরকার পতনের সূত্রপাত। সরকার প্রধান দিগ্বিদিক। হেলিকপ্টার থেকে গুলি, বাসা বাড়িতেও গুলি, মাছুম বাচ্চারাও বাদ গেল না। মরবোই যখন তাহলে রাজপথেই মরি। যার যত বঞ্চনা, সবাই সবই রাজপথে উগরে দিলো। পুলিশ মেরে ঝুলিয়ে দিলো, পুলিশ স্টেশন জ্বালিয়ে দিলো। পুলিশ ডিমোরালাইজড। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তো শ্রমিক-কৃষকের সন্তান, ছাত্ররা ভাই-বোন, কীভাবে তারা নিরপরাধ ভাই-বোনদের বুকে গুলি চালাবে আর পাশে না থেকে উপায়ই বা কী? অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড সিংহভাগ নেতাকর্মীদের পাশে পেলো না... মার খাওয়ার ভয়ে কিংবা প্রতিরোধ করার ন্যায্যতা না পেয়ে। ফলে গুণ্ডা-মাস্তান লেলিয়েও বাঁচতে পারলো না। কিন্তু লাশ ফেললো হাজারের ওপরে, গুরুতর  আহত ২০ হাজারের ওপরে, কারও হাত নাই, পা নাই, চোখ নাই। লাগলে আরও লাখ খানেক লাশ ফেলতো গদি রক্ষার্থে। কিন্তু লাখে লাখে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা ঢাকার রাজপথ দখল হাসিনা রানীর কপালে পতনের সিল মেরে দিলো। হারার উপক্রম রাজাদের মতো সে পলায়ন করলো। ছাত্র-শ্রমিক জনতার গণঅভ্যুত্থান সফল হলো।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সামনের সারির নেতৃত্ব এবং বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ শ্রমিকদের বিপুল অংশগ্রহণের বিষয়টা উল্লেখ করলেন বার বার। সর্বশেষ ১১ই সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এই অভ্যুত্থানকে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার বিপ্লব হিসেবে মূল্যায়ন করেন। এটা অনস্বীকার্য বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশার শেষ নাই। তারপর ড. ইউনূস হাল ধরাতে এবং সরকারে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়াতে, যদিও ছাত্র প্রতিনিধিত্বের মাত্রা খুবই কম, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। কিন্তু সরকার সবে হাল ধরেছে এক মাস হলো। অর্থনীতির ত্রাহী অবস্থা করে রেখেছিল বিগত সরকার, প্রতিবাদ করলেই গুম, খুন, জেল। ফলে এখনো কিছুটা এলোমেলো অবস্থা।

বৈষম্য। শব্দটাতেই আবার ফেরত আসি। আমরা শুধু রপ্তানির ডলার দেশে ঢুকতে দেখি, বাংলাদেশ আরএমজি সেক্টরে বিশ্বে দ্বিতীয় হওয়া দেখি। কিন্তু যাদের হাড় ভাঙা খাটুনিতে, রক্তশূন্য করা পরিশ্রমে, পুষ্টিশূন্য কঙ্কালের শ্রমিক ভাই-বোনদের কি দেখি? দেখি কি তাদের মানবেতর জীবনযাপন, সূর্যের আলো দেখতে না পাওয়া, দিন-রাত একাকার হয়ে যাওয়া? করোনা হোক কিংবা যেকোনো দুর্যোগ, তাদের মেশিন চালানো কি বন্ধ থাকে? আমরা দেখি কি একটি সুন্দর জীবনের জন্য গ্রাম থেকে ফ্যাক্টরিতে আসা লোকজন শ্রমিকরা তাদের জীবন হারিয়ে ফেলে দুমুঠো ভাতের থালায়? আমরা দেখি কি বিশ্রাম বলতে কোনো শব্দ তাদের ডিকশনারিতে আছে কিনা? আমরা দেখি কি মালিকদের খাঁচায় তারা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি কিংবা তাজরিন অগ্নিকাণ্ডে লাশের স্তূপ হয়ে থাকেন। এতকিছুর পরও তারা ভদ্দরলোকের ভাষায় কয় টাকা বেতন পায় যেটা আসলে মজুরি। গার্মেন্টস শ্রমিকরা আসলে চোখে লাগার মতো বৈষম্যের শিকার।

পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১৯৮৪ সালে প্রথম ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছিল তৎকালীন সরকার, ৬২৭ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ৯৩০ টাকা, ২০০৬ সালে ১০৬২ টাকা ৫০ পয়সা, ২০১০ সালে ৩০০০ টাকা, ২০১৩ সালে ৫৩০০ টাকা, ২০১৮ সালে ৮০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় যা কার্যকরের ঘোষণা হয় ২০১৯। সর্বশেষ চরম আন্দোলনের মুখে বিগত সরকার ২০২৩ সালের ১লা ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি বোর্ড চালু করে এবং ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে ১২৫০০ টাকা। এখানে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। সেটা হলো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে প্রায় ৫০ ভাগের উপরে কাজ করে নতুন শ্রমিক যাদেরকে শিক্ষানবিশ শ্রমিক বলা হয়। মজুরি বোর্ডে কিংবা শ্রম আইনে শিক্ষানবিশ সময়কাল ৩ মাস বলা হলেও বাস্তবে তা মানা হয় না, দেখা যায় বছরের পর বছর তারা শিক্ষানবিশ থেকে যাচ্ছেন। শিক্ষানবিশ শ্রমিকের মজুরি হলো সর্বসাকুল্যে ৯৮৭৫ টাকা।

শ্রমিকদের মজুরি ফিগারে বাড়লেও প্রকৃত মজুরি কমেই চলেছে মূল্যস্ফীতির কারণে। ৪০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিকের সঙ্গে আরও লাখ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত এ কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে শ্রমিকরা অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে যা ড. ইউনূসও গুরুত্বের সঙ্গে জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। আবার ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও রাস্তায় নামতে বাধ্য হয় গার্মেন্টস শ্রমিকরা। তবে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কোনো মতেই না। তবে এখানে কোনো মহল উস্কানি দিচ্ছে বলে চাউর হয়েছে। ষড়যন্ত্র চলছে।

তবে গার্মেন্টস শ্রমিকরা বিগত ১৬ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট রেজিমের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে থেকেছে প্রতিনিয়ত তার অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া নিয়ে, ছাত্রদের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন করে। প্রায় প্রতি মাসেই আন্দোলন করতে হয়েছে শুধু মাসের বেতনটা ঠিকমতো না পাওয়াতে। গার্মেন্টস শ্রমিকরা আন্দোলন তুঙ্গে নিলেই দালাল ট্রেড ইউনিয়নগুলো পিঠে ছুরি মারে, বিশ্বাসঘাতকতা করে, যেমনটা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার ছাত্রদের আন্দোলনে করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সফল হয় নাই। ছাত্রদের কোটা সংস্কারের আন্দোলন তো মূলত চাকরি পাওয়ার আন্দোলন তথা পেটের আন্দোলন, শ্রমিকদের আন্দোলনও তাই।

শ্রম উপদেষ্টা বলেছেন শ্রমিকদের কাছ থেকে সম্মিলিত দাবি-দাওয়া দফা পাচ্ছেন না তারা। কথা হচ্ছে আপনারা যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তখন কিন্তু বারেবারে আপনাদের দফা পাল্টেছে, সমন্বয়হীনতাও দেখা দিয়েছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের নানান চাপে, অত্যাচারে। শ্রমিক আন্দোলনেও তা-ই হচ্ছে। কয়েকদিন আগে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শ্রমিকদের ২৫টি দাবি চিহ্নিত করে যার মধ্যে আছে- প্রতি মাসের ৭ তারিখে মজুরি, বার্ষিক ১০ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট, অর্জিত ছুটির টাকা মাসের ১৮ থেকে ২২ তারিখের মধ্যে পরিশোধ, চলতি সেপ্টেম্বর থেকে টিফিন বিল ৫০ টাকা, শিফটের জন্য নাইট বিল ১৫০ টাকা ও দুপুরের খাবার বিল টাকা ৪০ টাকা করা; রোজার সময় ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হলে ৫০ টাকা ইফতার বিল দেয়া; পরবর্তী বছর থেকে পয়লা বৈশাখের ছুটি দেয়া; বার্ষিক উৎসব ছুটি ১৪ দিন করা; ঈদের ছুটি ১১ দিন করা;  কারখানাগুলোয় ৭০ শতাংশ পুরুষ কর্মী নিয়োগ দেয়া; কেউ অনুপস্থিত থাকলে চাকরি থেকে বাদ না দেয়া।

দাবির মধ্যে আরও আছে- ছুটি পাস হলে হাজিরা বোনাস পুরোপুরি এক হাজার টাকা করে দেয়া; মাতৃত্বকালীন ছুটির সম্পূর্ণ টাকা ছুটি শুরুর আগেই পরিশোধ করা; শুক্রবার বা কোনো বন্ধের দিন কাজ করলে ওভারটাইমের দ্বিগুণ টাকা পরিশোধ করা; পাঁচ বছরের বেশি চাকরি করে কেউ রিজাইন করলে প্রতি বছরের জন্য এক মাসের মূল বেতন দেয়া; শ্রমিকদের দাবি আদায়ে যারা আন্দোলন করছেন, তাদের বহিষ্কার না করা। সরকারকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে-মালিক শ্রমিকের মধ্যে কখনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সম্ভব নয়। এখানে দরকার পেশাগত সম্পর্ক। সরকারের নেয়া পদক্ষেপ অনেকটা ইতিবাচক কিন্তু যথেষ্ট নয়। এরমধ্যে সমকাল পত্রিকা ১৩ই সেপ্টেম্বর রিপোর্ট ছেপেছে- মালিকরা আরও যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি চান এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে নাকি মোবাইল কোর্ট বসিয়ে ‘বিশৃঙ্খলাকারীদের’ সাজা দিবেন। খুবই উদ্বেগের খবর এবং অদূরদর্শী পদক্ষেপও বটে। ছাত্র প্রতিনিধি শ্রম উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদকে বলবো- আপনি যেটা বলেছেন শ্রমিকদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান মিটিং করবেন এটাই কার্যকরী পদক্ষেপ, আপনাদের মধ্যে বিপ্লবী স্পিরিট রয়েছে যেটা আমলাদের মধ্যে নাই, তাদের কথায় তেমন একটা কান দিবেন না। আপনাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা যে পথে হেঁটেছে সেই পথে হাঁটবেন না, আলোচনার দুয়ার খোলা বলে তাদেরকে আহ্বান না জানিয়ে আপনি নিজেই তাদের কাছে যান। দেখবেন সহজ হয়ে গেছে। শ্রমিকরা বিপ্লবী শক্তি, ছাত্র-শ্রমিকের একতা গড়ুন, দেশ গড়ার কাজে লাগান। যেখানে গার্মেন্টস মালিকরা পালিয়ে গেছে, সেখানে আপাতত হলেও সরকারি উদ্যোগে ম্যানেজমেন্ট ঠিক করুন, শ্রমিকদের ম্যানেজমেন্টে রাখুন। মনে রাখবেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও দুষ্কৃতকারী ঢুকেছে, কোমলমতি ছাত্ররা এসব করতে পারে না বলে আপনাদের বিভক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখনো সরকারি আমলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী, মালিকপক্ষ একই সুরে বিবৃতি দিচ্ছে। আন্দোলনে শুধু শ্রমিকরা থাকে না, শ্রমিকদের রিজিকের সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের রিজিকও জড়িত থাকে, বাসা ভাড়া, দোকান, বাজার ইত্যাদি, তারাও আন্দোলনে যুক্ত থাকতেই পারে যেমনটা ছাত্র আন্দোলনে সর্বস্তরের জনতা ছিল কারণ একেকজনের একেক রকম স্বার্থ ছিল। কিছু আসলেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী পাণ্ডা থাকতেই পারে, আছেও, কাউকে কাউকে ধরতেও সমর্থ হয়েছেন কিন্তু তাদেরকে সুযোগ দিবেন কেন?
লেখক: আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
mzamin

শ্রমিক ইউনিয়নের মত ছাড়া কেনিয়া বিমানবন্দরের ইজারা আদানি গ্রুপ পাবে না

ভারতের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আদানি গ্রুপকে ৩০ বছরের জন্য কেনিয়ার প্রধান বিমানবন্দর ইজারা দেওয়ার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে গত বুধবার দিনব্যাপী বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে আদানি গ্রুপের কাছে বিমানবন্দরটির ইজারা দেওয়া হবে, এমন আশ্বাসের পর শ্রমিকেরা বিক্ষোভ প্রত্যাহার করে নেন। শ্রমিক ইউনিয়নের এক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির জোমো কেনিয়াত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (জেকেআইএ) শ্রমিকেরা মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরের দিন বুধবার সারা দিন বিক্ষোভ চলে। শ্রমিকদের দাবি, বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য ১৮৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের বিনিময়ে জেকেআইএ ৩০ বছরের জন্য আদানি গ্রুপের কাছে ইজারা দেওয়া যাবে না। কারণ, এতে শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হতে পারে।

বিক্ষোভ প্রত্যাহার প্রসঙ্গে কেনিয়ার সেন্ট্রাল অর্গানাইজেশন অব ট্রেড ইউনিয়নের মহাসচিব ফ্রান্সিস অ্যাটওলি জানান, আদানি গ্রুপের প্রস্তাবের নথিপত্র ১০ দিনের মধ্যে পুনর্বিবেচনা করতে সরকার ও কেনিয়া অ্যাভিয়েশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন সম্মত হয়েছে। আদানির সঙ্গে চুক্তি–সংক্রান্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার জন্য ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সম্মতি লাগবে।

এই বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মন্তব্য করতে সম্মত হয়নি আদানি গ্রুপ।
শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবারের মধ্যে কেনিয়ার প্রধান বিমানবন্দরটিতে কয়েক শ ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্ব হয়। পরবর্তী সময়ে কেনিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, বিমান চলাচল পুরোমাত্রায় শুরু হয়েছে; কিন্তু পরিবর্তিত ফ্লাইটের তথ্য জানতে টার্মিনালের বাইরে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিক্ষোভ চলাকালে কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (জেকেআইএ) দৃশ্য। কেনিয়ার রাজধানীতে, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪
বিক্ষোভ চলাকালে কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (জেকেআইএ) দৃশ্য। কেনিয়ার রাজধানীতে, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ছবি : রয়টার্স

আনু মুহাম্মদের বিশেষ সাক্ষাৎকার: বৈষম্য সৃষ্টিকারী রাজনীতি বন্ধ করতে হবে

আনু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন ও আধিপত্যবিরোধী তত্ত্বচর্চা ও লড়াইয়ে সক্রিয় তিনি। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসহ যে কোনো ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন সব সময়। ছিলেন তেল-গ্যাস-খর‌্যসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব। বাংলাদেশে মার্কসীয় অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি সংক্রান্ত আলোচনায় তিনি সবচেয়ে পরিচিত লেখক। সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, মানুষের অধিকারসহ নানা বিষয় নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেন।

কালবেলা: জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আমাদের কী বার্তা দেয়?

আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার এই গণঅভ্যুত্থানের একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি দীর্ঘ সময় ধরে যেভাবে জনগণকে নির্যাতন করেছে, যেভাবে জনগণকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে, যেভাবে স্বৈরাচারী মনোভাব প্রকাশ করেছে— তাতে মানুষ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ধরে দেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে গেছে, জাতীয় স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি করেছে, মেগা প্রকল্পের নামে ভয়ংকর সব দুর্নীতি করেছে এবং বিভিন্নভাবে দখলবাজি ও নানা উপায়ে মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সীমাহীন অত্যাচার চালিয়েছে। মানুষ বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাতে তারা কর্ণপাত না করে লুটপাট করে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর সেভাবে আস্থা রাখতে পারেনি। তাই রাজনৈতিক দলের ব্যানারে বৃহদাকার তেমন কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। কিন্তু আন্দোলন কোনো না কোনোভাবে ছিল। বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক আন্দোলন হয়েছে, একাধিক বড় বড় ছাত্র আন্দোলন হয়েছে। হাসিনা সরকারের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে লেখালেখি হয়েছে। হামলা, হুমকি, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনসহ বিভিন্ন আইনের ভয় মাথায় নিয়েই প্রতিবাদ হয়েছে। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদ করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেও প্রতিবাদ উঠেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনও সাধারণ একটি আন্দোলন ছিল। এটা ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকারের আন্দোলন। সরকারের পক্ষে এটা মেনে নেওয়া মোটেই কঠিন বিষয় ছিল না। কিন্তু সরকার তার স্বৈরতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব এবং জনগণকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার অভ্যাস থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মানতে অস্বীকার করে। সরকার শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। সরকার একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নানা টালবাহানা এবং বল প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে। কিন্তু বল প্রয়োগের ফলে ছাত্রদের এই আন্দোলন স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠে এবং ব্যাপক আকার ধারণ করে। পহেলা জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করেছে। পাশাপাশি শিক্ষকরাও সরকারের সর্বজনীন পেনশন স্কিম থেকে তাদের বাদ দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল। এ দুই জায়গাতেই সরকারি দলের অনেক লোকজন অংশগ্রহণ করে। যে শিক্ষকরা সারাক্ষণ সরকারের তোষামদি করতে ব্যস্ত থাকত তারাও আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে কর্মবিরতিতে যায়। একই সঙ্গে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগের অনেক কর্মীও অংশগ্রহণ করে। কারণ ছাত্রলীগের কিছু সুবিধাভোগী থাকলেও বাকিদের চাকরি প্রয়োজন ছিল। তাদের জীবিকা দরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের লুণ্ঠনমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেনি। তাই জীবিকার কথা চিন্তা করে অনেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশে মূলত চারটি দল স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষমতায় বা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশে বড় কোনো আন্দোলন তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যানারে হওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তেমনটা ঘটেনি। কারণ দেশের গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর গায়ে অনেক কলঙ্ক রয়েছে। তাদের অতীত ইতিহাস এবং রেকর্ড মানুষ ভোলেনি। আমরা দেখেছি এই আন্দোলনটা কিভাবে রাজনীতির ব্যানারের বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সাধারণ জনগণের ভেতর থেকে উঠে এসেছে। এই গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে বৃহৎ আন্দোলনের জন্য রাজনৈতিক দল আবশ্যকীয় না। জনগণ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেও একটি ব্যাপক আন্দোলন তৈরি হতে পারে।

এই আন্দোলন থেকে আমাদের শিক্ষা হলো, কোনো অন্যায় চিরদিন চলতে পারে না। একটা দীর্ঘ অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে যখন মানুষ জেগে ওঠে এবং বিদ্রোহ করে তখন সেটা অপ্রতিরোধ্য হয়।

কালবেলা: আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ কখন ঘটতে থাকে এবং কেন ঘটে?

আনু মুহাম্মদ: মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের সামনে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না। তাছাড়া এটা ছিল একটা ন্যায্য আন্দোলন। তাই দল-মত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল এই আন্দোলনে। প্রথমে তারা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করেনি শুধু তাদের দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু সরকার তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তাদের উপর আক্রমণ করা শুরু করে, সেটা জনগণ গ্রহণ করতে পারেনি। প্রথমত, জনগণের মধ্যে আগে থেকেই ক্ষোভ ছিল তারপর শিক্ষার্থীদের ন্যায্য এই আন্দোলনে নৃশংসভাবে হামলা- সবমিলে জনগণ মাঠে নেমে আসে। সেখানে শ্রমিক, কৃষকের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। আন্দোলনে সরকার যত নৃশংসতা বাড়াতে থাকে আন্দোলনে জনগণের সমর্থন এবং সম্পৃক্ততা তত বাড়তে থাকে। মানুষ সরকারি বাহিনী ও তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের আক্রমণকে সম্পূর্ণ তুচ্ছ জ্ঞান করে দৃঢ়তার সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসে।

শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনের সূত্রপাত করলেও এক সময় এই আন্দোলন হয়ে ওঠে গণমানুষের। শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংবাদিক, শিল্পী, আইনজীবী নির্বিশেষে এই আন্দোলন হয়ে ওঠে সবার। আন্দোলনে একদিকে গণমানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে অন্যদিকে সরকারকে দেখা যায় আক্রমণাত্মক। ৪ আগস্ট আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তেও সরকারের মধ্যে কোনো অনুতাপ দেখা যায়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিনও বলেছিলেন, এই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করছে তারা সবাই সন্ত্রাসী, তাদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শেখ হাসিনা সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর নৃশংসতা আরও বাড়াবে।

২ আগস্ট দ্রোহযাত্রার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের দাবিটা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। এরপর সরকারের পতন ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। কারণ সরকারের বল প্রয়োগের সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করা আর সম্ভব ছিল না। গুলি করে মানুষ মেরে তাদের পক্ষে আর টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। একদিকে পুলিশ ও সরকারি দলের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলি চালানো অব্যাহত রাখে, অপরদিকে ছাত্র-জনতার মিছিলে মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অবশেষে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালানোর মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

কালবেলা: গণআন্দোলন সফল হওয়ার পর এখন রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি উঠছে। এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কি বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণমানুষের একটি আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। তারা একটি পরিবর্তন চান- এজন্য তারা রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছেন। মানুষ বলছে, আমরা আর আগের মতো অবস্থা চাই না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির যে শাসনকাল মানুষ এখনো মনে রেখেছে সেই ধরনের শাসন মানুষ আর দেখতে চায় না। তরুণ শিক্ষার্থীদের আঁকা দেওয়ালের গ্রাফিতিগুলোতে বলছে, আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই - যেখানে কোনো নিপীড়ন থাকবে না, কোনো বৈষম্য থাকবে না।

বৈষম্যহীন কথাটির ক্ষেত্র অনেক বড়। এই বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে একটা দেশকে অগ্রসর হতে গেলে তার রাজনীতি খুবই স্পষ্ট হতে হবে। রাজনীতির লক্ষ্য এবং কর্মসূচি স্পষ্ট হতে হবে। আমরা এখন পর্যন্ত সেটা দেখিনি। মানুষের মধ্যে সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে সেটা কোন দিকে যাবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। রাজনৈতিক দলগুলো বৈষম্যহীনতার কথা বলছে কিন্তু বৈষম্যেরই রাজনীতি করছে। যদি এমনটাও ঘটে যে, ভিন্নমতের ওপর হামলা হচ্ছে তাহলে সেটাও এই সম্পূর্ণ বৈষম্যহীনতার আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। যত দ্রুত রাজনীতির লক্ষ্য এবং কর্মসূচি স্পষ্ট হবে ততই ভালো।

আমরা জানি স্বৈরাচারী সরকারের নানা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ছিল। একটা সুবিধাভোগী শ্রেণি ছিল যারা খুব দ্রুত অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছে। এছাড়াও নানারকমের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ছিল যাদের সরকার নানাভাবে সুবিধা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তির নানা রকম স্বার্থ এখানে যুক্ত। ফলে এসব সুবিধাভোগী এবং আন্তর্জাতিক শক্তির নানা রকমের প্রচেষ্টা ছিল এই দেশকে নিজেদের স্বার্থের দিকে নিয়ে যাওয়ার। বাংলাদেশ যদি জনগণের হাতে আসে তাহলে তারা কেউ খুশি হয় না। তারা সবাই চাইবে তাদের পালিত বা তাদের সুবিধা দেবে এমন কোনো গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা থাকুক। এই চেষ্টা এখনো দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার একটি বড় দায়িত্ব নিয়েছে এবং তাদের সামনে বিরাট পরীক্ষা। এই গণঅভ্যুত্থান থেকে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, গুরু দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়মুক্তির কোনো সুযোগ নেই।

কালবেলা: আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং সাহসী ভূমিকা দেখেছি। তাদের এমন ব্যাপক অংশগ্রহণকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আনু মুহাম্মদ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমাদের প্রায় সবার সাধারণ ধারণা যে, এখানে শুধু উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই পড়ালেখা করে। কিন্তু এ ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়। আমি এমন অনেক পরিবারকে চিনি যারা ঋণ করে এবং পরিবারের সম্পত্তি বিক্রি করে সন্তানকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়াচ্ছেন। শিক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে মানুষ সর্বোচ্চ করার চেষ্টা করে। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে পরিবারের অন্য সদস্যরা রক্ত বিক্রি করে হলেও তার চিকিৎসা করার চেষ্টা করে। তেমনি সন্তানের লেখাপড়ায় একজন অতি দরিদ্র ব্যক্তিও তার সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশে গত এক দশকে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। একজন দরিদ্র পিতাও মনে করছেন শিক্ষার উপর ভর করে তার সন্তান যেন দারিদ্র্যের দুষ্টু চক্র থেকে বের হতে পারে।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন অনুপাতে যথেষ্ট আসন নেই। এ কারণে কষ্ট করে হলেও অভিভাবকরা সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ করে দিতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করাচ্ছেন। উচ্চবিত্ত শ্রেণির সন্তানরা দেশে লেখাপড়া করে না। তারা সন্তানদের বিদেশে লেখাপড়া করতে পাঠায় এবং তাদের এ দেশে কোনো চাকরিও দরকার নেই। কিন্তু এই দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জীবিকার প্রয়োজন।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা আন্দোলনের শুরু থেকেই সমর্থন জুগিয়েছে। তারা যখন দেখছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এভাবে আক্রান্ত হচ্ছে তখন তারা ঘরে বসে থাকতে পারেনি। তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং রাস্তায় নেমেছে। আমাকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেছে, যখন পুলিশ আমাদের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালালো আমার সামনে ছয়জন শিক্ষার্থী মারা গেল। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছি কিন্তু আমি সেখান থেকে সরতে পারিনি। কারণ আমার মনে হয়েছে, অন্যদের রেখে আমি এখান থেকে সরে যেতে পারব না।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল যে, মানুষের মধ্যে এক ধরনের আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়েছে। এই সময়টাতে মানুষ তার বিবেক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল এবং তাদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ সামনে ছিল না। প্রত্যেকে চিন্তা করছিল যাতে সবাই নিরাপদ থাকে এবং সবাইকে রক্ষা করা যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা যখন পুলিশের সঙ্গে পেরে উঠছে না, মার খাচ্ছে তখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। তারাও যখন রাস্তায় মার খাচ্ছে তখন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসে। দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী তার মাকে চিঠি লিখে যাচ্ছে, আমি আর ঘরে থাকতে পারছি না, আমি মিছিলে যাচ্ছি।

আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতন ও নৃশংসতা সমাজের সব মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে দিয়েছে। এটাই ছিল এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা।

কালবেলা: অনেকেই অভিযোগ করতেন, এই জেনারেশন সমাজের কোথায় কি হচ্ছে সেটা নিয়ে সচেতন নয়। তারা শুধু সোশ্যাল মিডিয়া ও নিজেদের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু তারা সে ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আনু মুহাম্মদ: তরুণদের সম্পর্কে বড়রা সবসময়ই একটু ভুল ধারণা করে। বড়োরা সব সময় বলে, তরুণরা অবক্ষয়ের শিকার। এমন প্রবণতা সব সময়ই ছিল, সব জেনারেশনেই ছিল। আমরা জানি শিশু, কিশোর এবং তরুণদের মধ্যে সংবেদনশীলতা অনেক বেশি থাকে। তাদের মধ্যে মায়া-মমতা ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা বেশি থাকে। তরুণরা অনেক বেশি মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে সত্যি, তারা শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে থাকে বিষয়টি তেমন নয়। মোবাইলে আরো অনেক কিছুই দেখা যায় ও করা যায়। দেশের এবং বিদেশের সব খবরাখবরও মোবাইলেই রাখা যায়। ফলে আমাদের তরুণরা টেকনিক্যালি সক্ষম ও দক্ষ হচ্ছে। এই জেনারেশনটি কমিউনিকেশনের দিক থেকে এবং তথ্য সংগ্রহের দিক থেকে অনেক বেশি দক্ষ। বিষয়টা এমন যে, যখন সে ব্যক্তিগত জগতে থাকে তখন সে এক রকম আর যখন সমাজের মধ্যে কোনো নড়াচড়া হয় তখন সে দ্রুত তার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়। এখানে টেকনোলজির বড় ভূমিকা রয়েছে।

কালবেলা: রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি উঠছে। অনেকে সংবিধান সংস্কারের কথাও বলছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই?

আনু মুহাম্মদ: বাংলাদেশে জাতিবিদ্বেষ, ধর্মীয় বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য, সম্পদ বন্টনের বৈষম্যসহ নানা রকম বৈষম্য রয়েছে। এই সব কিছু থেকে বের হতে হলে একটা কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। আমরা একটি ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছি যেটাকে পুঁজিবাদ বলে। আর এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৈষম্য একটি অনিবার্য পরিণতি। এখানে কিছু লোকের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং তারাই রাষ্ট্র চালাচ্ছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে পুলিশ, বল প্রয়োগকারী সংস্থা ও আইনগত কাঠামো। ফলে আমরা যদি বৈষম্যহীন এবং সর্বজনীন বাংলাদেশ করতে চাই তাহলে এসব সমস্যাকে নির্দিষ্ট করতে হবে। এ দায়-দায়িত্ব এতটাই বেশি যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়।

শুধু সংবিধান পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। কারণ সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতা চলে না। বরং ক্ষমতা অনুযায়ী সংবিধান তৈরি হয়। সংবিধান অনেক বেশি স্বৈরতান্ত্রিক বা সাম্প্রদায়িক তার মূল কারণ সিস্টেম বা ব্যবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক এবং সাম্প্রদায়িক। আমরা যে রাষ্ট্রের মেরামতের কথা শুনছি সেখানে সংবিধান একটি অংশমাত্র। আমাদের প্রয়োজন সামগ্রিক কাঠামোর সংস্কার। যেমন, দেশের শিক্ষা কি বাণিজ্যিক থাকবে নাকি সর্বজনীন হবে? দেশের চিকিৎসা বাণিজ্যিকীকরণ হবে নাকি সবার অধিকারে আসবে? পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কি সবার হবে নাকি কিছু মানুষ প্রাইভেট ট্রান্সপোর্ট দিয়ে সারা ঢাকা শহরের রাস্তা দখল করে রাখবে আর অন্যরা বাসে ঝুলবে? মোটকথা পাবলিক ইন্টারেস্ট অর্থাৎ সর্বজনের স্বার্থকে সামনে নিয়ে যে রাজনীতি তার শক্তি বৃদ্ধির উপর নির্ভর করে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ হবে।

সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। আর এর জন্য সরকারের একটি সংবিধান সংশোধন কমিশন গঠন করা উচিত। সেখানে বিশেষজ্ঞরা দেখবেন যে কোন কোন জায়গায় বৈষম্য এবং নিপীড়নের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। সেগুলো থেকে মুক্ত একটি সংবিধান তৈরির জন্য তারা সুপারিশ করবেন। বৈষম্যহীন সংবিধান প্রস্তাব করে সেটা জনমতের জন্যও ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে।

দেশের সম্পদের মালিকানা ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ আমাদের দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত পুরোপুরি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অথচ এগুলোর মালিক বাংলাদেশের মানুষ। এগুলো রাষ্ট্রের নীতি-কৌশলগত বিষয়। এভাবে বিভিন্ন সেক্টরে যে প্রশ্নগুলো রয়েছে তার উত্তর খুঁজতে হবে। সেই উত্তরগুলোকে জনগণের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক সত্যি হিসেবে দাঁড় করাতে হবে।

কালবেলা: রাজনৈতিক দলগুলো কী বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রস্তুত বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ: বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো একদমই প্রস্তুত নয়। প্রতিটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের একটি শক্তি প্রকাশিত হয়। জনগণের সংগঠিত শক্তি যখন দুর্বল হয় তখন রাজনৈতিক দল, সামরিক বাহিনী কিংবা আমলাতন্ত্র আবার তাদের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। এজন্য জনগণের মধ্য থেকে যে শক্তি বা আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয় সেটা ধরে রাখাই বড় কাজ। যারা জনগণের সেই শক্তির পক্ষে এবং যারা মনে করেন বৈষম্যহীন বাংলাদেশ তৈরি করা প্রয়োজন তারা আপাতদৃষ্টিতে যতই ছোট হোক তারা যদি এই শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয় এবং একত্র হয় তাহলে ক্রমাগত সমাজের মধ্যে একটি মতাদর্শিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এটি একটি সংগ্রামের বিষয়। বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা সহজে ছাড়বে না। সুতরাং তাদের মোকাবিলা করা এবং তাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য জনগণের শক্তিকে দাঁড় করানো প্রয়োজন। জনগণের সেই শক্তিকে দাঁড় করানোর জন্য অব্যাহত চেষ্টা এবং লড়াই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের যে গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে সেটা জনগণের শক্তিকে একটি কাঠামো দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই জনগণের শক্তি আমাদের জন্য একটি বড় অবলম্বন। একই রকম আরেকটা অবলম্বন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমরা সব সময়, অন্যায়, নিপীড়ন ও স্বৈরাচারের বিরোধিতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ থেকে প্রেরণা খুঁজি। ফলে সেই শক্তির সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের এই শক্তি যুক্ত করতে হবে। আমি আশা করি অবশ্যই এমনটা ঘটবে। বাংলাদেশের মানুষ বৈষম্যবিহীন একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণে একট্টা হয়ে দাঁড়াবে। 

আনু মুহাম্মদ। ছবি : সংগৃহীত

শেরপুরে বিয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তালাক

শেরপুরে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে বিবাহ বিচ্ছেদের হার। গত এক বছরে যতগুলো বিয়ে নিবন্ধন করা হয়েছে সেই হিসেবে অপরদিকে ৪৪ শতাংশ বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় বিচ্ছেদে নারীরাই বেশি আগ্রহী বলে জানা গেছে।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যখন চরমভাবে বিরোধ দেখা দেয়, মিলেমিশে শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন যখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, তখন মধুর সম্পর্ক তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের মাধ্যমে ছিন্ন করা হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিবাহ বিচ্ছেদের পেছনে বড় কারণগুলো হলো দাম্পত্যজীবনে বনিবনার অভাব, যৌতুক, বাল্যবিবাহ এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। তবে শেরপুরে ডিভোর্সের মধ্যে শিক্ষিত লোকের সংখ্যাই বেশি। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা কিছুটা কম। তবে পরিবারের অমতে লুকিয়ে করা প্রেম ঘটিত বিয়ে ভাঙার হার অনেক বেশি। যে সব প্রেমের বিয়ে পরিবারের সদস্যদের সম্মতিক্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে সেগুলো ভাঙার হার খুব কম।

এ ছাড়াও জেলায় কিছু কিছু পরিবারে দীর্ঘ দিন সন্তান না হওয়ার ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ হলেও পরিমাণে আগের তুলনায় কমেছে। জেলার বিভিন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়নে দায়িত্বরত কাজী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে উঠে আসে এই চিত্র।

শেরপুর জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ১ বছরে শেরপুরে বিবাহ বিচ্ছেদ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১ বছরে জেলায় মোট বিবাহ নিবন্ধন হয়েছে ৮হাজার ৭২০টি। এর মধ্যে শেরপুর সদর উপজেলার ২ হাজার ৫৮৯টি, নকলা উপজেলায় ৯৮৯টি, নালিতাবাড়ি উপজেলায় ২ হাজার ৩৮৬টি, শ্রীবরদী উপজেলায় ১ হাজার ৭১৩টি ও ঝিনাইগাতী উপজেলা ১ হাজার ৪৩ টি। ঠিক এই একই সময়ে তালাক নিবন্ধন‌‌‌ হয়েছে ৩ হাজার ৮৪৪টি। যা মোট বিবাহ নিবন্ধনের ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে শেরপুর সদর উপজেলায় ১ হাজার ৯১টি, নকলা উপজেলায় ৫১১টি, নালিতাবাড়ি উপজেলায় ৯২১টি, শ্রীবরদী উপজেলায় ৮৯৫টি ও ঝিনাইগাতী উপজেলায় ৪২৬টি।

আনুপাতিক হারে জেলার শ্রীবরদী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে যা ৫২.২৫ শতাংশ এবং সবচেয়ে কম বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে নালিতাবাড়ি উপজেলায় যা ৩৮.৬০ শতাংশ। তবে বিয়ে যত ধুমধামের মধ্যে দিয়ে হয় তালাক সেভাবে সম্পন্ন হয় না। তালাক প্রক্রিয়া অনেক পরিবার অতি গোপনে সম্পন্ন করায় অনেক তালাক নিবন্ধনের আওতায় আসে না। তাই সংশ্লিষ্টদের ধারণা প্রকৃত বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা আরও বেশি হবে।

জেলার বেশ কয়েকজন কাজীর সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, আগে তালাকের প্রধানতম কারণ ছিল দারিদ্রতা বা পারিবারিক ব্যয় বহনের অক্ষমতা। সেইসঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়ির দ্বন্দ্বের জের ধরে পারিবারিক অশান্তি শেষে তালাক। এ ছাড়াও নানা কলহ-বিবাদের জেরে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর শারীরিক নির্যাতনের ফলে। এ সমস্যাগুলো যেসব এলাকায় অভাব-দারিদ্র্য বেশি সেসব এলাকায় বেশি হতো।

অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের দরিদ্র বাবা-মার সন্তান লালন-পালনের সক্ষমতা কম থাকায় মেয়ে সন্তান একটু বড় হলেই বিয়ে দিয়ে দিত। তুলনামূলক অনেক বেশি বয়সের স্বামীর ঘর করতে না পারায় হতো তালাক। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় অনুশাসন কমে গিয়ে নৈতিক অবক্ষয় বেড়ে যাওয়া অবাধ তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপনের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় তালাক বেশি হচ্ছে।

আধুনিক যুগে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রেম যতটাই বেশি, বিচ্ছেদও ঠিক ততটাই। সবচেয়ে বেশি বিবাহ বিচ্ছেদ হয় ভালোবাসার অভাব ও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে। বর্তমানে সম্পর্কের দুজনেই দুজনের ভুল ধরতে ব্যস্ত। শোধরাতে নয়। তাই সব শেষে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার রাস্তায় হাঁটেন তারা।

শেরপুর পৌরসভার কাজি আবুজর আল আমিন বলেন, আমি প্রতিদিনই বিয়ের নিবন্ধন করি। আবার তালাক নিবন্ধনও করি। আমি বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর স্বামী ও স্ত্রী উভয় পক্ষকে কাবিননামার বিষয়বস্তু ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়ে দুই পক্ষকে নকল প্রদান করি। আগে তাকাল রেজিস্ট্রেশন কম হতো, এখন অনেক বেড়েছে। যা খুবই দুঃখজনক ও আশঙ্কাজনক। আমার দেখায় শিক্ষিতরা তালাকে সব চেয়ে এগিয়ে। আগে ছেলেদের পক্ষ থেকে তালাক বেশি হতো। এখন মেয়েদের পক্ষ থেকে তালাক বেশি হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েদের অতিরিক্ত জেদের কারণে তালাক হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জেলার শ্রীবরদী উপজেলার প্রবীণ শিক্ষক মৌলভি নুরুল ইসলাম বলেন, আমি একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে অবসরে আছি। আমার স্ত্রী স্বাস্থ্য বিভাগে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। আমাদের সংসারে দুই ছেলে দুই মেয়ে। বর্তমানে আমার দুই ছেলে এবং দুই মেয়ের উভয় পক্ষের নাতিদেরও সন্তান হয়ে গেছে। তারাও এখন স্কুলে পড়ে। আমি বড় বাবা হয়ে গেছি। আমার ৫০ বছরের অধিক সময়ের দাম্পত্য জীবনে কোনো কলহের সৃষ্টি হয়নি। কারণ হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা। আমাদের একসঙ্গে চলার দীর্ঘ সময় পারস্পরিক বিশ্বাস, পারস্পরিক সম্পর্ক, একে অপরের হক সম্পর্কে সচেতনতা, বিনয় ও ছাড়ের মানসিকতা ছিল। এরপর আমার স্ত্রী ও মেয়েদের পর্দা রক্ষা করা, পর পুরুষ কিংবা পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক ও মেলামেশা থেকে বিরত থেকেছি।

এ ছাড়াও তিনি বলেন, আমরা যেহেতু দুজনই চাকরি করতাম তখন ছেলে-মেয়েদের দেখাশোনা ও পড়াশোনা সমস্যা হতো। তবুও দায়িত্ব বণ্টন করে চাকরি সংসার এগিয়ে নিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছি। কখনো মতের অমিল হলে বুঝিয়ে সমাধান করেছি। নিজেরা সমাধান না করতে পারলে মুরুব্বিদের সহযোগিতা নিয়েছি। বৈবাহিক জীবনে ছোটখাট অমিল থাকবেই সেটা মানিয়ে নিয়ে চলতে হবে।

এ ব্যাপারে জেলার সবচেয়ে বড় ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া সিদ্দিকীয়া তেরাবাজার মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা সিদ্দিক আহমাদ কালবেলাকে বলেন, ডিভোর্সের ফলে দুজনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অন্য জীবনগুলোও সমস্যায় পড়ে। এটা সামাজিক বন্ধনকে শিথিল করে দেয়, যা মুসলিম সমাজের জন্য খুবই দুঃখজনক ও আশঙ্কাজনক। ইসলামে ডিভোর্সের প্রতি নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় হালাল হচ্ছে তালাক।’ সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০১৮।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ সহজলভ্য হওয়ায় বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়াচ্ছে নারী-পুরুষ। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের কুফলগুলোর মধ্যে এটি একটি। তবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে জীবন পরিচালনার করলে কখনোই কোনো মানুষ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়াবে না। কোনো সুযোগই নেই। প্রতিটি ধর্মেই এই মর্মবাণীগুলোই আছে। তিনি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে কথা হয় শেরপুরের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলমগীর কিবরিয়া কামরুলের সঙ্গে। তিনি আক্ষেপ নিয়েই বলেন, বিবাহবিচ্ছেদ দিন দিন বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ, ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সিরিয়াল, পরকীয়া, অপরিণত বয়সে বিয়ে, পারিবারিক বন্ধনে দূরত্ব সৃষ্টির পাশাপাশি মানুষের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া।

তালাকের মূল কারণ অনুসন্ধানে কথা হয় কুড়িকাহনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ খান নুন এর সঙ্গে। তিনি কালবেলাকে বলেন, বর্তমান সময়ে মানুষের ধৈর্য ক্ষমতা একেবারে কমে গেছে। ছোট ছোট কারণেই সংসারে বিবাদ তৈরি হচ্ছে। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। এটা পারিবারিক শিক্ষার একটি অংশ। আমরা আমাদের সন্তানকে অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা দিলেও নৈতিক শিক্ষা দিচ্ছি না। সেই সঙ্গে ধর্মীয় অনুশাসনে আমাদের সন্তানরা শিক্ষা পাচ্ছে না। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রতিদিনই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে। এমন কোনো দিন নেই যেদিন ইউনিয়ন পরিষদে পারিবারিক আদালতে এমন সালিশ আমাদের করতে হচ্ছেনা। বিবাহ বিচ্ছেদে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর এবং স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব-কর্তব্য এবং শ্রদ্ধাবোধ থাকাটা জরুরি যা এখনকার প্রজন্মের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কমে গেছে।

এ ব্যাপারে শেরপুর জেলা রেজিস্টার কৃষিবিদ মো. নূর নেওয়াজ কোলবেলাকে বলেন, আমরা শুধু বিবাহ রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করি। হোক সেটা বিবাহ অথবা তালাক। আমাদের এর বাইরে আর কোনো কাজ নেই। তবে প্রত্যেক কাজীই বিবাহ নিবন্ধনের সময় স্বামী এবং স্ত্রীর হক ও দ্বায়িত্ব কর্তব্যসমূহ উভয়কেই জানিয়ে দেয়। যেন তারা তাদের দাম্পত্য জীবনে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। এ ছাড়াও বিয়ে সম্পন্ন করে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলারও পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রতীকী ছবি

ন্যাটোকে পুতিনের হুমকি

পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোকে আবারও হুমকি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট  ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার অর্থ হচ্ছে ন্যাটো এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। এ খবর দিয়েছে জার্মানভিত্তিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে। এতে বলা হয়, শুক্রবার মার্কিন ও বৃটেনের শীর্ষ নেতারা সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। রাশিয়ার ভূখণ্ডে পশ্চিমা অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে অনেক আগে থেকেই ন্যাটোকে সতর্ক করে আসছেন পুতিন।

২০২২ সালে ইউক্রেনের উপর হামলা শুরুর পর থেকেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পশ্চিমা বিশ্বের উদ্দেশ্যে একাধিক হুমকি দিয়েছেন। ইউক্রেনের জন্য কোনো বিশেষ অস্ত্র বা সামরিক সহায়তার সম্ভাবনা দেখা দিলেই তিনি সরাসরি ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক সংঘাত সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। তাতে কিছুটা কাজও হয়েছে। কিছু পশ্চিমা নেতা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখিয়ে সহায়তায় বিলম্ব করেছেন অথবা অস্ত্র সরবরাহ করেও সেটির প্রয়োগের উপর কিছু শর্ত বসিয়েছেন। এবার ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ছাড়পত্র চাইতে রুশ প্রেসিডেন্ট আবার তার ‘লাল সীমা’ নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পুতিন বৃহস্পতিবার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে বলেন, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ইউক্রেনকে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে হামলার সবুজ সংকেত দিলে রাশিয়া সেই পদক্ষেপকে ন্যাটোর যুদ্ধে প্রবেশ হিসেবে গণ্য করবে। সেক্ষেত্রে হুমকি অনুযায়ী রাশিয়া উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ওয়াশিংটনে তাদের আলোচনায় ইউক্রেনের অনুরোধ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একাধিক সংবাদ মাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী এই দুই দেশ ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরো স্বাধীনতা দিতে চলেছে। তবে বাইডেন ও স্টারমার সম্ভবত সরাসরি এমন ঘোষণা দেয়া থেকে বিরত থাকবেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা এপি-কে জানিয়েছেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদোমির জেলেনস্কি চাইছেন, রাশিয়ার যে সব সামরিক ঘাঁটি থেকে ইউক্রেনের উপর আকাশপথে হামলা চালানো হচ্ছে, তার দেশ সেগুলির উপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর ‘ন্যায্য’ অধিকার প্রয়োগ করার ছাড়পত্র পাক। আসন্ন শীতকালের আগে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর উপর আবার হামলা শুরে করে দেওয়ায় জেলেনস্কি দ্রুত পাল্টা হামলা চালাতে চাইছেন। সেইসঙ্গে তিনি রাশিয়ায় হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে দূর পাল্লার আরো অস্ত্র পাঠানোর অনুরোধ করছেন। তবে ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে রাশিয়া তার গ্লাইড বোমা নিক্ষেপ করে যে হামলা চালাচ্ছে, সেই মার্কিন মিসাইল সেই ঘাঁটির নাগাল পাবে না বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন গত সপ্তাহে বলেন, ইউক্রেনকে দূর পাল্লার অস্ত্র প্রণালী দিলেই যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো বড় সাফল্য আশা করা যাবে না। তিনি মনে করিয়ে দেন, ইউক্রেন ইতোমধ্যেই নিজস্ব অস্ত্র ও ড্রোন প্রয়োগ করে রাশিয়ায় হামলা চালাতে পারছে।

mzamin

সরজমিন গুলিস্তান: মার্কেটে দখলদারি, ফুটপাথে স্বস্তি by সুদীপ অধিকারী

রাজধানীর গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের জাকের প্লাজা, নগর প্লাজা, সিটি প্লাজা, ঢাকা ট্রেড সেন্টার উত্তর, ঢাকা ট্রেড সেন্টার দক্ষিণ, পোড়া মার্কেটের মালিক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এসব মার্কেট দখল করে বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি চলেছে। আগে এই চাঁদার টাকা উঠাতেন আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা। কিন্তু গত ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে এই মার্কেটগুলো দখলে নেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে বিএনপি নামধারীরা। তবে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন হকাররা। গত ৫ই আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত কাউকে চাঁদা দেয়া ছাড়াই নির্বিঘ্নে নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন গুলিস্তানের এই ফুটপাথের দোকানিরা।

সরজমিন গুলিস্তান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জাকের প্লাজা, নগর প্লাজা ও সিটি প্লাজার সমন্বয়ে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট। এর মধ্যে দুই যুগের বেশি সময় ধরে জাকের প্লাজার নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন ফিরোজ আলম নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি আগে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দিতেন। এখন বিএনপি’র কর্মীদের সহায়তায় মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। আর ট্রেড সেন্টার উত্তর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন মোজাম্মেল মজু ও সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা। নাজমুল হুদা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য। সভাপতি মোজাম্মেল মজুও আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দিতেন। আর ট্রেড সেন্টার দক্ষিণের সভাপতি ছিলেন হুমায়ুন কবির মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। তারা দুজন সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তবে ৫ই আগস্টের পর বিএনপি পরিচয় দিয়ে মার্কেট সমিতির দখল নেন আব্দুল বাসেত, আক্তার হোসেন রানা ও মীর আল মামুন। যদিও এতদিন মীর আল মামুনকে আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে সবাই চিনতেন। এখন তারা মার্কেট সমিতির কার্যালয়ে নিয়মিত বসছেন। দোকানিরা জানান,  ট্রেড সেন্টার উত্তর ও দক্ষিণের চতুর্থ তলায় দোকান মালিক সমিতির কার্যালয়ে বাসেত, রানা ও মামুন একেক দিন একেক জন যান। অনেকের অভিযোগ তারা মার্কেটের চারপাশে হকার বসিয়েও দোকান ভাড়ার নামে চাঁদাবাজি করছেন। অপরদিকে অভিযোগ উঠেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও আত্মগোপনে থেকে গুলিস্তানের নিয়ন্ত্রণ করছেন ৩৩নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর আউয়াল হোসেন। এখনো তার বাহিনী দিয়ে জাকের সুপার মার্কেটেসহ গুলিস্তানের কিছু কিছু মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন তিনি। বিদ্যুৎ বিল, গার্ড বিল, পানির বিল ও ফুটপাথে দোকান বসিয়ে অবৈধ চাঁদা আদায় করছে আউয়ালের লোকজন।  রাসেল, শরীফসহ মার্কেটের বেশকিছু দোকানি বলেন, ২২ সালের ৩রা মার্চ যুবলীগ নেতা আউয়াল তার লোকজন নিয়ে মার্কেটের নির্বাচিত সভাপতিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপুর্যপরি কুপিয়ে মার্কেট থেকে বের করে দিয়ে অবৈধভাবে মার্কেট মালিক সমিতির কার্যালয় দখল করে। শেখ হাসিনার পতনের পর গত ৬ই আগস্ট মার্কেটের সেই সাবেক সভাপতি ফিরোজ ও কমিটির অন্যান্যরা তাদের নিজ নিজ ব্যবসা দেখার জন্য মার্কেটে প্রবেশ করলে আউয়ালের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য তাজুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, জুবায়ের আহমেদ, মোহাম্মাদ মাসুম, শাহিনরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এরপর গত ১০ই আগস্ট দোকান মালিক সমতির কার্যালয়ে আবারো হামলা চালায় আউয়ালের লোকজন। মোস্তাক আহমেদ নামে মার্কেটটির এক ব্যবসায়ী বলেন, এই মার্কেটের ৪৫১ জন দোকান মালিক ও দুই হাজার কর্মচারী চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। আমরা সাধারণ ব্যবসায়ী, আমরা স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে চাই। চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে চাই না। ব্যবসায়ী মো. কামরুল বলেন, নির্যাতনের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতে রাজি হয় না। মার্কেটের বিদ্যুৎ বিল, গার্ড বিল, পানির বিলের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় ও অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধের আহ্বান জানাই।

এদিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর চাঁদা না দিয়েই ফুটপাথে ব্যবসা করছেন গুলিস্তানের ১০-১২ হাজার হকার। তারা এখন আর কাউকেই নিজেদের উপার্জনের টাকার ভাগ দিবেন না বলে একট্টা হয়েছেন। সরজমিন দেখা গেছে, জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে বায়তুল মোকাররমের সামনে হয়ে চলে যাওয়া বঙ্গবন্ধু এভিনিউ সড়ক ও পীর ইয়ামেনী মার্কেটের সামনে হয়ে যাওয়া বঙ্গবন্ধু সড়কের দুই পাশের ফুটপাথের পুরোটা জুড়েই বিভিন্ন জামা-কাপড়ের দোকান। গুলিস্তান বাসস্ট্যান্ড থেকে পাতাল মার্কেটের পাশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু চত্বরের দিকে যেতে ফুটপাথের ওপর ছাউনি দিয়ে দুই পাশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে স্থায়ী দোকান। মানুষ চলাচলের ফুটপাথে তৈরি হওয়া এসব অস্থায়ী দোকানগুলো বছরের পর বছর ধরে রূপ নিয়েছে স্থায়ী দোকানে। আর বঙ্গবন্ধু চত্বরের পেছন থেকে শুরু করে গোলাপ শাহ্‌ মাজার পর্যন্ত গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্সের সামনের পুরো রাস্তা জুড়েও রয়েছে একাধিক হকারি দোকান। এসবের মধ্যে জুতা-স্যান্ডেল ও বাচ্চাদের জামা-কাপড়ই বেশি। এসব দোকান থেকে আগে দিনে দুইশো থেকে তিনশো টাকা করে চাঁদা আদায় করা হতো। গুলিস্তান বাসস্ট্যান্ড থেকে পাতাল মার্কেটের দিকে যেতেও রাস্তার পাশ দিয়ে রয়েছে অসংখ্য জামা-কাপড়ের দোকান। আর গুলিস্তান স্কয়ার থেকে গোলাপ শাহ্‌ মাজার পর্যন্ত পুরো রাস্তা জুড়েই শত শত জুতা-স্যান্ডেল, জামা-কাপড়, ব্যাগ, ছাতাসহ শত শত দোকান। স্টেডিয়ামের চারপাশ, বাইতুল মোকাররম মসজিদের সামনে-পেছনে, জিপিও’র সামনের ফুটপাথসহ পুরো এলাকা জুড়েই রয়েছে কয়েক হাজার ভাসমান দোকান। এসব দোকানের আকার ও সময়ভেদে প্রতিদিন লাইনম্যানের মাধ্যমে ৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হতো। চাঁদার হার গড়ে ২০০ টাকা করে হলে প্রতিদিন ২০ লাখ টাকার উপরে চাঁদা আদায় করতো আওয়ামী লীগ সমর্থীতরা। কিন্তু এখন চাঁদা দেয়া লাগছে না এসব ব্যবসায়ীদের। জোবায়ের নামে এক হকার বলেন, আগে চাঁদা ছাড়া আমরা ব্যবসা করতে পারতাম না। গত ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর আর কেউ চাঁদা নিতে আসেনি।  এখনো পর্যন্ত চাঁদা দেয়া ছাড়াই ব্যবসা করছি। চাঁদার অতিরিক্ত টাকা না দেয়ায় আমরা এখন অনেক ভালো আছি। ব্যবসা করে কয়টা লাভের মুখও দেখছি। আব্দুল ওহাব নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, আন্দোলনে আমাদের অনেক ভাই মারা গেছে। তাই আমরাও সকলে এক হয়েছি। কাউকেই আমরা আর চাঁদা দিবো না। চাঁদার টাকা চাইতে আসলেই তার বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেয়া হবে। চাঁদাবাজদের আইনের হাতে তুলে দেয়া হবে। পারভেজ নামে আরেক ব্যবসায়ি বলেন, অর্ন্তবর্তী সরকার থাকায় এখন পর্যন্ত কাওকে চাঁদা দেয়া লাগছে না। তবে কতোদিন এই পরিস্থিতি থাকবে জানি না।

অপরদিকে পীর ইয়ামেনী মার্কেট থেকে গোলাপ শাহ্‌ মসজিদের দুই পাশের ফুটপাথ থেকে দেড় মাস আগেও চাঁদা তুলতেন তসলিম নামের স্থানীয় এক লাইনম্যান। গোলাপ শাহ্‌ মসজিদ থেকে শুরু করে নগরভবন হয়ে টিএন্ডটির দক্ষিণ পর্যন্ত ফুটপাথ থেকে চাঁদা তোলার দায়িত্ব ছিলো আমীরের। ঢাকা ট্রেড সেন্টারের পশ্চিম পাশ হয়ে হানিফ ফ্লাইওভার পর্যন্ত ফুটপাথে চাঁদা নিতেন বিমল, হান্নান এবং মিন্টু। আর মতিঝিল আইডিয়াল, রূপালী ব্যাংক, জীবন বীমা, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জীবন বীমার মাঝের সড়কে আগে চাঁদা আদায় করতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী নাসির ওরফে ফেন্সি নাসির। বাংলাদেশ ব্যাংকের উত্তর পাশে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত দোকান প্রতি দৈনিক ৩০০ টাকা করে চাঁদা তুলতেন হারুন, মকবুল ও দেলোয়ার।  এ ছাড়া বামপন্থি নেতা আবুল হোসেনের শেল্টারে অ্যালিকো (আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি) ভবনের সামনের ফুটপাথ থেকে লাইনম্যান ছাদেককে দিয়ে চাঁদা নিতো ইসলামী হকার্স শ্রমিক আন্দোলনের নেতা আবুল কালাম ওরফে জুয়েল এবং মান্নান। সোনালী ব্যাংকের সামনের সড়ক নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন  জাতীয় শ্রমিক লীগের মতিঝিল থানা কমিটির কিছু নেতা। জনতা ব্যাংকের সামনের শতাধিক দোকান থেকে চাঁদা তুলতেন ফারুক। ব্যাংক পাড়ার বক চত্বরের দোকান থেকে চাঁদা তুলতেন শ্রমিক লীগের নুরুল ইসলাম। জীবন বীমার প্রধান কার্যালয় আর ডিআইটি মসজিদের সামনে থেকে চাঁদা তুলতেন কালা কাশেম, দুলাল আর রহমান। পুরানা পল্টন মোড় থেকে আজাদ প্রোডাক্টের সামনে হয়ে দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত দোকানের চাঁদা তুলতেন আবুল হোসেন। দৈনিক বাংলা থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত চাঁদা তুলতেন পুলিশের সোর্স সাকিব ও খোকন মজুমদার। মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে আরামবাগ হয়ে আইডিয়াল স্কুল পর্যন্ত অংশে চাঁদা নিতেন পুলিশের সোর্স সাইফুল মোল্লা, শিবলু, আক্তার, যুবলীগ নেতা সাগর, যুবলীগ নেতা সনি। তবে গত ৫ই আগস্ট থেকে চাঁদার টাকা নিতে এদের কাওকেই দেখা যায়নি। মাঝে কিছুদিন কয়েকজন নিজেদেরকে বিএনপিপন্থি পরিচয় দিয়ে চাঁদার কথা বললেও তাতে পাত্তা দেয়নি ব্যবসায়ীরা। এখন পর্যন্ত চাঁদা ছাড়াই ব্যবসা করছেন এসব ফুটপাথের দোনানিরা।
mzamin