Sunday, March 31, 2019

শিল্পমেলায় ওয়ালটন পণ্যের প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় শিল্পমেলায় ওয়ালটনের স্টল পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি ওয়ালটনের তৈরি বিশ্বমানের ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রিক্যাল এবং প্রযুক্তিপণ্য দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। দেশেই এসব পণ্যের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং রপ্তানিতে ওয়ালটনের সাহসী উদ্যেগের তিনি প্রশংসা করেন।
রোববার (৩১ মার্চ) থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হয়েছে ৭ দিন ব্যাপী প্রথম জাতীয় শিল্পমেলা। সকালে মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর তিনি মেলায় অংশ নেয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল পরিদর্শন করেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, সচিব আবদুল হামিদ, এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দীনসহ অন্যরা।
ওয়ালটনের স্টলে এসে প্রধানমন্ত্রী দেশে তৈরি আন্তর্জাতিকমানের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, রাইস কুকারসহ বিভিন্ন হোম অ্যাপ্লায়েন্স দেখে ওয়ালটনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বাংলাদেশে তৈরি কম্প্রেসর রপ্তানি হচ্ছে জেনে তিনি খুবই আনন্দিত হন। অত্যন্ত স্বল্পদামে মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, হোম অ্যাপ্লায়েন্সসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য বাজারে ছাড়ায় তিনি ওয়ালটনের প্রশংসা করেন।
এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি প্রধানমন্ত্রীকে জানান ওয়ালটন দেশেই আন্তর্জাতিকমানের এলিভেটর বা লিফট উৎপাদন করছে। এতে প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন। ওয়ালটনের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর শরীফ হারুনুর রশিদ ছনি প্রধানমন্ত্রী এবং তার সঙ্গীদের বিভিন্ন পণ্য সম্পর্কে অবহিত করেন।
ওয়ালটনের স্টল পরিদর্শনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নীতিসহায়তার কারণে দেশেই উচ্চ-প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনের সাহস দেখিয়েছে ওয়ালটন। এসব পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের প্রতিটি প্রান্তে সাশ্রয়ী মূল্যে বিভিন্ন উন্নতমানের পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে ওয়ালটন। যাতে মানুষের জীবনমান অনেক উন্নত ও আধুনিক হয়েছে। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে ওয়ালটনের তৈরি পণ্য।
উল্লেখ্য, শিল্প মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে জাতীয় শিল্পমেলা চলবে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত। মেলায় প্রায় ৩০০টি দেশীয় প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যসহ সবচেয়ে বড় স্টল নিয়ে অংশ নিয়েছে ওয়ালটন। যেখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে ওয়ালটন ফ্রিজ, এসি, টিভি, কম্প্রেসর, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, লিফট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সলিউশনস, হোম অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্সসহ বিভিন্ন পণ্য। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য মেলা উন্মুক্ত থাকবে।

প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পেল স্লোভাকিয়া

স্লোভাকিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন আইনজীবী ও দুর্নীতিবিরোধী প্রচারক জুজানা কাপুতোভা। আর এর মাধ্যমে দেশটির ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হলেন তিনি। বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
৪৫ বছর বয়সী জুজানার তেমন কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই। আইনজীবী হিসেবেই তাঁর পরিচিতি বেশি। অন্যদিকে নির্বাচনে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন সার-এসডি দলের মারোস সেফকোভিচ ঝানু রাজনীতিবিদ। তিনি ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। নির্বাচনে ৫৮ শতাংশ ভোট পান জুজানা। মারোস পান ৪২ শতাংশ ভোট।
তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেজ ​​কিস্কা পাঁচ বছরের মেয়াদের প্রেসিডেন্ট পদের লড়াইতে দ্বিতীয়বারের মতো দাঁড়াননি।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্লোভাকিয়ার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জ্যান কুসিয়াক ও তাঁর বাগ্‌দত্তা মার্টিনা কুসনিরোভাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই সাংবাদিক রাজনীতিবিদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছিলেন। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়ে দেশটিতে। ওই বিক্ষোভে মন্ত্রিসভার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে আগাম নির্বাচনের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা। এরপরই নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা ভাবেন জুজানা কাপুতোভা।
জুজানা কাপুতোভার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। তিনি দুই সন্তানের মা। দীর্ঘদিন ধরেই সমকামী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গর্ভপাতের ওপর স্লোভাকিয়ার নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছেন তিনি। জুজানার দল লিবারেল প্রগ্রেসিভ স্লোভাকিয়া পার্টির এর আগে পার্লামেন্টে কোনো আসন পায়নি।

সংসদ নির্বাচনে এ তৎপরতা কেন দেখা যায়নি? -মাহবুব তালুকদারের প্রশ্ন

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, অনেকে বলেন, উপজেলা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনে অনিয়মের কারণে বিভিন্ন কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বন্ধ করা এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িত পুলিশ ও অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সংসদ নির্বাচনের সময় ইসির এই তৎপরতা দেখা যায়নি কেন?
আজ শনিবার উপজেলা নির্বাচনের চতুর্থ পর্বের ভোট গ্রহণ শেষে কমিশনার মাহবুব তালুকদার এই কথা বলেন।
নির্বাচন ভবনে নিজ কক্ষে সাংবাদিকদের মাহবুব তালুকদার আরও বলেন, উপজেলা নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। যেসব কারণে আমরা ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছি, তার কারণ খুঁজে বের করা আবশ্যক। এ অবস্থায় ভোটারদের ওপর দায় চাপানো ঠিক নয়। গত দুই বছরে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তা নিয়ে ইসির আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। ওই সব নির্বাচনে যেসব ভুলভ্রান্তি হয়েছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করা দরকার।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপজেলা পরিষদের স্বায়ত্তশাসন নেই উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, সাংসদদের হাত থেকে উপজেলা পরিষদকে মুক্ত করা না হলে এর নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু ও ত্রুটিমুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। তবে এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই নির্বাচন। কিন্তু ভোটদানে ভোটারদের অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিষয়টি গণতন্ত্রের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নামান্তর। কিন্তু আমরা গণতন্ত্রের শোকযাত্রায় শামিল হতে চাই না। রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখতে হবে।’
মাহবুব তালুকদারের মতে, সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচনের দায়িত্ব পুরোপুরি ইসির হাতে ন্যস্ত করা উচিত। তিনি বলেন, রিমোটের মাধ্যমে নির্বাচনকে কন্ট্রোল করা হলে নির্বাচনব্যবস্থা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে, যা গণতন্ত্রের জন্য কাম্য নয়। এ জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অপরিহার্য। নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ রাখা হলে রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের অনীহা অবশ্যই দূর হবে।

ভারতের হাতে এ কোন নতুন অস্ত্র?

মহাকাশ শক্তিতে আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনের পরে এখন ভারতকেই সবচেয়ে শক্তিশালী বলে মনে করা হচ্ছে। নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ গতকাল বুধবার দিয়েছে দেশটি। মহাকাশে অ্যান্টি–স্যাটেলাইট মিসাইল নামে অতি উন্নত প্রযুক্তির একটি অস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানোর দাবি করেছে ভারত। খুব কম দেশের কাছেই এই অভিনব অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু এই অ্যান্টি–স্যাটেলাইট মিসাইল আসলে কী? কেন এটি এত দুর্লভ? আসুন, জেনে নিই নতুন এই অস্ত্র সম্পর্কে।
অ্যান্টি স্যাটেলাইট মিসাইল কী?
আধুনিক সমরাস্ত্রের এই যুগে লড়াই কেবল যুদ্ধের ময়দানে চলে না, হয় প্রযুক্তিগত দিকেও। স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ দিয়ে এক পক্ষ ক্রমাগত নজর রাখে অন্য পক্ষের ওপর। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে যার কাছে বেশি তথ্য থাকে সেই এগিয়ে যায় অনেকটা। শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট ধ্বংস করে দিতে পারলে তাই যুদ্ধের আগেই অনেকটা বাড়তি সুবিধা এনে দেয়। আর অ্যান্টি–স্যাটেলাইট মিসাইল ঠিক এই কাজটিই করে। শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট ধ্বংস করে দেওয়া বা তাদের যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত করাই এই অস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য। এ ছাড়া প্রতিপক্ষের ব্যালিস্টিক মিসাইল মাঝপথে আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে এই অস্ত্রের। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন বলছে, বুধবার সফলভাবে মিসাইল নিক্ষেপের মাধ্যমে অন্য দেশগুলোর স্যাটেলাইটকে একপ্রকার হুমকির মুখেই ফেলে দিয়েছে ভারত।
গত মাসেই পাকিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছিল ভারত। চীনা ও রুশ রকেট ব্যবহার করে মহাকাশে বেশ কয়েকটি স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করেছে পাকিস্তান। তবে ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে পাকিস্তান নয়, বরং ভারতের এই নতুন অস্ত্র নিয়ে বেশি চিন্তিত হবে চীন। কেবল ২০১৮ সালেই ১২টির মতো স্যাটেলাইট স্থাপন করেছে চীন।
ভারতের ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের জ্যেষ্ঠ সদস্য অজয় লেলে বলেছেন, ‘ভারতকে অ্যান্টি–স্যাটেলাইট মিসাইল তৈরি করতেই হতো। কারণ চীন আরও এক যুগ আগে ২০০৭ সালেই এই মিসাইল তৈরি করে ফেলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই অস্ত্রের মাধ্যমে পুরো উপমহাদেশের কাছে একটি বার্তা পাঠাচ্ছে ভারত। ভারত জানাতে চাইছে, মহাকাশে যুদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র আমাদের আছে।’
এই অস্ত্র কার কার হাতে আছে?
প্রথম দেশ হিসেবে অ্যান্টি–স্যাটেলাইট মিসাইল উৎক্ষেপণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেটি ১৯৫৯ সালের ঘটনা। ওই সময় এই প্রযুক্তি ছিল একেবারেই নতুন ও দুর্লভ। ‘বোল্ড ওরিয়ন’ নামের সেই মিসাইলটি একটি বোমা থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এক্সপ্লোরার–৬ নামের একটি কৃত্রিম উপগ্রহের একদম কাছ ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছিল ক্ষেপণাস্ত্রটি। বলা হয়ে থাকে, ‘এক্সপ্লোরার–৬’কে লক্ষ্য করে নিখুঁতভাবে মিসাইলটি নিক্ষেপ করা হলে স্যাটেলাইটটি নিশ্চিতভাবেই ধ্বংস হয়ে যেত।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নও আমেরিকার চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে ছিল না। গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে এমন ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এরপর ১৯৮৫ সালে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান থেকে এএসএম-১৩৫ নামে একটি অ্যান্টি–স্যাটেলাইট মিসাইল উৎক্ষেপণ করে আমেরিকা। মিসাইলটি আমেরিকারই ‘সোলউইন্ড পি৭৮-১’ নামের একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছিল।
এরপর প্রায় দুই দশক আর কোনো অ্যান্টি–স্যাটেলাইট মিসাইল উৎক্ষেপণের ঘটনা ঘটেনি। ২০০৭ সালে আমেরিকা ও রাশিয়ার পাশে নাম লেখায় চীন। বিশ্বের মাত্র তৃতীয় দেশ হিসেবে মহাকাশে অ্যান্টি–স্যাটেলাইট মিসাইল ছোড়ে দেশটি। একটি পুরোনো আবহাওয়া স্যাটেলাইট ধ্বংস করে নিজেদের মহাকাশ শক্তিমত্তার জানান দেয় বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি। মহাকাশের টেকসই ও শান্তিপ্রিয় ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কাজ করা একটি সংস্থা সিকিউর ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশনের মতে, চীনের এই অস্ত্র পরীক্ষা মহাকাশে পৃথিবীর কক্ষপথে সবচেয়ে বেশি বর্জ্য উৎপন্ন করেছে। চীনের এই অস্ত্র নিক্ষেপের পরে পৃথিবীর চারপাশে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি আবর্জনা পাওয়া গিয়েছিল।
চীনের অস্ত্র নিক্ষেপের পরের বছর যুক্তরাষ্ট্র ফের আরেকটি মিসাইল নিক্ষেপ করে। ওই ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য ছিল গুপ্তচরবৃত্তির কাজে নিয়োজিত একটি কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস করা।
মিশন শক্তি কী?
হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে তা মহাকাশে ৩০০ কিলোমিটার দূরে থাকা একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছে। এমনটাই দাবি করছে ভারত।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে ভারত। যে স্যাটেলাইট ধ্বংস করা হয়েছে সেটির অবস্থান ছিল ‘লো আর্থ অরবিটে’। সাধারণত দুই হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হয় এমন কৃত্রিম উপগ্রহ। এগুলো ভূমিতে চলা কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই কৃত্রিম উপগ্রহ দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তির কাজ করা যায়। অর্থাৎ অ্যান্টি-স্যাটেলাইট মিসাইল দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে ব্যবহার করা শত্রুপক্ষের এ ধরনের যেকোনো কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস করার সক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে ভারত।
অবশ্য এখনো পর্যন্ত কোনো দেশ অন্যের বিরুদ্ধে এই অস্ত্র ব্যবহার করেনি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, অ্যান্টি-স্যাটেলাইট মিসাইলের পরীক্ষা করে মূলত অন্যান্য দেশকে সাবধান করে দিতে চায় শক্তিধর দেশগুলো। নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।

রিজিক পুড়ে ছাই: গুলশানে ডিএনসিসি মার্কেটে আগুনে পুড়লো ২১১ দোকান by মারুফ কিবরিয়া

by মারুফ কিবরিয়া, জিয়া চৌধুরী ও পিয়াস সরকারঃ সবুজ শাক-সবজি পুড়ে কালো ছাই, অঙ্গার হয়েছে ভুট্টার মোচা থেকে জ্যান্ত মাছও। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গলে ধাতব নানা তৈজসপত্রও ধারণ করেছে বিবর্ণ রূপ। শুধু কি মালামাল? আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কাঁচাবাজার ও কিচেন মার্কেটের ২১১ দোকান মালিকের স্বপ্নও। শনিবার ভোর পৌনে ছয়টার দিকে মার্কেটটিতে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট গিয়ে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিচেন মার্কেটের পাশের গুলশান শপিং সেন্টারের বেশ কয়েকটি দোকানও। তবে, আগুনে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও পুড়ে গেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল। এর আগে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছিল মার্কেটটি।
ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, ধার-কর্জ করে ব্যবসায়ীরা গত দুই বছরে ফের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন।
এরমধ্যেই আবার আগুনের হানায় তাদের সামনে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর পথটিও রুদ্ধ হয়ে গেল। আগুনে প্রাণহানি না হলেও  বেঁচে থাকার সম্বল পুড়ে যাওয়ায় সেখানে অনেক ব্যবসায়ীকে ডুকরে কাঁদতে দেখা যায়। পোড়া দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ চোখের পানি ফেলেছেন নীরবে। ডিএনসিসির নিয়ন্ত্রণে থাকা টিনশেড মার্কেটটির একেবারে পুরোটাই এখন ধ্বংসস্তূপ। অথচ ২০১৭ সালের ৩রা জানুয়ারি আগুন লাগার পর আবারো কেন এমন আগুন লাগলো সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থারগুলোর গাফিলতি ও পর্যাপ্ত অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকারও অভিযোগ করেছেন তারা। সেবার আগুন লাগার পর গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় চালানো এক জরিপে ডিএনসিসি মার্কেটকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবন হিসেবে চিহ্নিত করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। গতকাল সরজমিন সেখানে গিয়ে দেখা যায় আগুনে কম ক্ষতি হওয়া বিভিন্ন মালামাল সরাতে ব্যস্ত ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিরা। ব্যবসায়ীদের বাইরেও অনেকে মার্কেট থেকে এসব পণ্য সরিয়ে সামনে নিলামে তোলেন। আশেপাশের অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষজন কিনে নেন তৈজসপত্রসহ গৃহস্থালি নানা পণ্য।
গতকাল বিকাল পর্যন্ত অন্তত ১০০ জন ব্যবসায়ী তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে তথ্য দিয়েছেন। সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বেশির ভাগ দোকানে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার মালামাল ছিল বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন। এ ছাড়া, অনেক বড় দোকান ও একাধিক দোকান মালিক ব্যবসায়ীর ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে যায়। আবার কয়েকজন ব্যবসায়ীর দোকানে কোটি টাকার উপরে মালামাল ছিল বলে জানিয়েছেন। আগুনে সবমিলিয়ে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা। সরজমিন মার্কেটটি ঘুরে দেখা যায় উত্তর পাশের সামনের দিকের দোকানগুলোর কাঠামো কিছুটা ঠিক থাকলেও ভেতরের সব মালামাল পুড়ে গেছে। সামনে থাকা গুলশান শপিং সেন্টারের দক্ষিণ পাশের বেশ কয়েকটি দোকানও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দোকানগুলোর সামনের দিকে থাকা মালামাল পুড়ে গেলেও ভেতরে তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। মার্কেটের ভেতরে গেলে চোখে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞ, কোনো দোকানের কাঠামো নেই। আগুনে সব ভেঙে পড়েছে। শুধু ছাদের কয়েকটি টিন আছে, সেগুলোও আগুনে বেঁকে তামাটে বর্ণ নিয়েছে। মার্কেটের মাঝের একটি দোকান থেকে মূলত আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে জানান কয়েকজন ব্যবসায়ী।
শাহীন জেনারেল স্টোরে অন্যতম স্বত্বাধিকারী আকাশ মানবজমিনকে জানান তার দোকানে প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। এগুলোর বেশির ভাগই ছিল খাদ্যপণ্য, গুঁড়োদুধ ও মুদি সামগ্রী। তিনি বলেন, মাঝের সারির ‘শাহীন পান বিতান’ নামে একটি দোকান থেকে আগুন ছড়িয়েছে। শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শাহীন পান বিতানের সামনে গিয়ে দেখা যায় আগুনে পুরো দোকান ছারখার। আশেপাশের কয়েকটি দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। মার্কেটের দক্ষিণ দিকে থাকা কাঁচাবাজারও আগুন থেকে রেহাই পায়নি। এখানকার ৩০টি দোকানের ফল, সবজি, মাছ ও ডিম আগুনে পুড়ে যায়। খুব ভোরে আগুন লাগায় কাঁচাবাজার ছাড়া আর অন্য অংশের ব্যবসায়ীরা মার্কেটে ছিলেন না। ভোরবেলা কাঁচাবাজার নিয়ে এসে সকাল থেকে কেনাকাটা করতে হয় বলে কয়েকজন দোকানি রাতে সেখানে থাকেন। তবে আগুন লাগার পর তারা নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। এদের একজন লিটন জানান, তিনি মার্কেটটিতে সবজির দোকান চালাতেন। অন্য সব দোকানিদের মতো তিনিও কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এখানে ব্যবসা করতেন।
আগুনে সব পুড়ে যাওয়ায় তার পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না বলেও জানান তিনি। অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাদের হতাশা ও ক্ষোভের কথা টের পাওয়া যায়। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা ও গাফিলতির কারণে দোকান মালিক সমিতি এবং সিটি করপোরেশনকে দায়ী করেন তারা। আবুল কালাম আজাদ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ধারদেনা করে এখানে একটা দোকানে বিনিয়োগ করি। নিয়মিত সব ট্যাক্স, খাজনাও দেই। তবে আমাদের নিরাপত্তার কথা কেন চিন্তা করা হয় না। পরিবার-স্বজনদের নিয়ে এখন পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে একজনের জোর কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। কাছে গিয়ে দেখা গেল এক ব্যবসায়ী টুলে বসে কিছুক্ষণ পর পর ডুকরে কেঁদে উঠছেন। তার সঙ্গে থাকা একজন নারী বারবার তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। কথা বলে জানা গেল, মোহাম্মদ ইউসুফ নামে এ ব্যবসায়ীর ছয়টি দোকান পুরোপুরি পুড়ে গেছে। একটি দোকান নিজের হলেও বাকি পাঁচটি দোকান ভাড়ায় চালাতেন ইউসুফ। যেখানে কাজ করতেন ১১ জন।
শুক্রবার রাত সাড়ে দশটার দিকে দোকান বন্ধ করে বাড্ডার বাসায় যান। তখনো সবকিছু ঠিকঠাকই রেখে গিয়েছিলেন। শনিবার সকালে আবার এসে দোকান খোলার কথা ছিল। অথচ শনিবার ভোরবেলা লাগা আগুনে তার ছয়টি দোকানই পুড়ে যায়। এসব দোকানে প্রায় কোটি টাকার মালামাল ছিল বলে দাবি তার। তবে শুধু এবারই নয় ২০১৭ সালের ৩রা জানুয়ারি ডিএনসিসি মার্কেটের ভয়াবহ আগুনেও প্রায় আড়াই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল ইউসুফ ও তার দুই ভাইয়ের। তার বড় ভাইয়েরা ১৯৯২ সাল থেকে এখানে ব্যবসা করলেও তিনি ২০০০ সালে তাদের সঙ্গে ব্যবসায় যোগ দেন। ২০১৭ সালের আগুনের পর আবার নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিলেও এবারের আগুনের পর কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন তার উত্তর জানা নেই ইউসুফের কাছে। তবে, দ্রুত সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দোকানগুলো পুনঃনির্মাণ করে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান অশ্রুসজল নয়নে। ডিএনসিসি কাঁচাবাজার ও কিচেন মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি দীন মোহাম্মদ ও আবুল কাশেম জানান, দ্রুত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হবে।
এদিকে, ২০১৭ সালে গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের পর ঢাকার স্থাপনাগুলোর অগ্নিঝুঁকি নিরূপণ করে ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিদুর্ঘটনা রোধের সক্ষমতা যাচাইয়ে ভবনগুলোর ভূগর্ভস্থ জলাধারের ধারণক্ষমতা, অবস্থানকারীর সংখ্যা, প্রবেশদ্বারের প্রশস্ততা, ধোঁয়া ও তাপ শনাক্তকরণ যন্ত্রের উপস্থিতি, মেঝের আয়তন, জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি ও প্রয়োজনীয় লিফটের উপস্থিতি বিবেচনায় নেয়া হয়। এর ভিত্তিতে ভবনগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। আর অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলার অধিক প্রস্তুতি আছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘সন্তোষজনক’ বলে চিহ্নিত করে দেয় সংস্থাটি। ফায়ার সার্ভিসের মূল্যায়নে গুলশান, বনানী ও বারিধারার বাণিজ্যিক ভবনগুলোর মধ্যে ৪৬টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে দ্রুত সময়ে অগ্নি ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে সংস্থাটি। যার মধ্যে গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটটিকেও অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভবন ও প্রতিষ্ঠান মালিকদের একাধিকবার চিঠিও দেয় ফায়ার সার্ভিস। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই সেগুলো কার্যকর করেনি।

চকবাজার ট্র্যাজেডি: সংসার আর চলছে না by মরিয়ম চম্পা

পুরান ঢাকায় আগের বাসায় খুঁজে পাওয়া যায়নি চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত হাফেজ কাওসারের স্ত্রী ও যমজ সন্তানদের। মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে কান্নাজড়িত কন্ঠে কাওসারের স্ত্রী নুশরাত জাহান মুক্তা বলেন, ওইখানে বাসাভাড়া অনেক বেশি। এত টাকা ভাড়া দিতে না পেরে দুই সন্তান ও তাদের নানীকে নিয়ে বর্তমানে কামরাঙ্গীরচরে একটি বাসাভাড়া নিয়েছি। যমজ বাচ্চাদের প্রয়োজনীয় খাবার দিতে পারছি না। সন্তানদের নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে আমার। দৈনিক কম হলেও ৫শ টাকা খরচ হয়। এত টাকা আমি কোথায় পাবো। মাঝে মাঝে বলি যে, ‘ওর আব্বুকে না হয় আল্লাহ নিয়ে গেছে।
এখন আমরা তিনজন মইরা গেলে ভালো হয়’। এছাড়া আমার কাছে আর কোনো রাস্তা নাই। বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশন ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হাবিবুর রহমান জুয়েল বাচ্চাদের দায়িত্ব নেয়ার কথা বলে দুই দফায় ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। বলেছেন, তিনি তার সাধ্যানুযায়ী সাহায্য করবেন। শ্বশুরবাড়ির লোকজনও কোনো খোঁজখবর নিচ্ছে না। বাচ্চা দুটো নিয়ে বেঁচে আছি না কি মরে গেছি খোঁজ নেয়ার এমন কেউ নেই।
তিনি বলেন, আমাদের কেমন সময় যাচ্ছে জানেন? খুব খারাপ। মাঝে ওরা দুই ভাইবোন খুব অসুস্থ ছিল। মেয়ে মেহেজাবিন সারাহ ছেলে জামিল আহমেদ সাফির থেকে মাত্র ৭ মিনিটের বড়। ১ বছর বয়সী দুই শিশুকে আমি কীভাবে মানুষ করবো, ওদের নিয়ে কোথায় থাকবো, কী খাওয়াবো কিছুই জানিনা। বাবুদের নিয়ে আমি ঢাকায় এসেছি অথচ শ্বশুর বাড়ির কেউ আজ পর্যন্ত বলেনি ৫০০ টাকা দিলাম ওদের জন্য খরচ করো। আমার স্বামী কাওসার প্রথম যখন ফার্মেসি ব্যবসা শুরু করে তখন তার বাবার বাড়ি থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য পায়নি। বন্ধুদের থেকে টাকা ধার করে ব্যবসা শুরু করে। পরবর্তীকালে আমার বাবার বাড়ি থেকে কিছু টাকা এনে ব্যবসার কাজে সাহায্য করি। ওর বাবা বলেছিল, আর কিছুদিন পরেই তো আমার পড়ালেখা শেষ হবে। আর ব্যবসাটাও দাঁড়িয়ে যাবে। তখন সবার পাওনা টাকা শোধ করে দেবো। ওর আব্বুর এখনো ৯ লাখ টাকা দেনা আছে। এই টাকা আমি কীভাবে পরিশোধ করবো জানিনা।
আমি মহিলা মাদরাসা থেকে দাওরা পরীক্ষা দেবো। ৮ই এপ্রিল আমার পরীক্ষা। চার ভাইয়ের মধ্যে কাওসার ছিল তৃতীয়। কুমিল্লায় কাওসারের বাবা মো. খলিলুর রহমানের ফার্মেসি ব্যবসা আছে। আমার দেবর ভাসুররা যদি বলতেন যে দুই বাচ্চাকে নিয়ে এখানে সেখানে দৌড়াদৌড়ি না করে আমাদের সাথে থাকো। দুই বাচ্চার দায়িত্ব আমরা দুই ভাই নিলাম। এটা বললে হয়তো স্বামীকে মাটি দিয়ে ৫ দিনের মাথায় দুটি নিষ্পাপ ও অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে ঢাকা আসতে হতো না। আমার আপনজনরা আমাকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছে। এখন দুটি বাবুকে নিয়ে আমার রাস্তায় যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। জমিজমা কিংবা ব্যাংকে টাকা কোনো কিছুই আমার নেই। শ্বশুরবাড়িতেও তেমন কোনো জায়গা-জমি নেই। ওর বাবার অংশে শুধু একটি রুম রয়েছে। ২০১৫ সালের ২১শে আগস্ট পারিবারিকভাবে কাওসারের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। কাওসার মুক্তার চাচাতো ভাইয়ের বন্ধু ছিল। মুক্তার বাবার বাড়ি ব্রাক্ষণবাড়িয়া। আট ভাই বোনের মধ্যে বোনদের সবার ছোট সে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১ মাস আগে দুই বাচ্চাকে অনুদান দেয়ার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কিছুই পাইনি। আমার কিছু লাগবে না। দুটি বাবুকে যদি একটু সাহায্য করা হয় আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিরদিন ঋণী থাকবো। ওদেরকে নিয়ে আমি খুব বিপদে আছি। খুব কষ্টের মধ্যে দিনগুলো যাচ্ছে।
অনুদান পাওয়ার আশায় এখনো আছি। সামনে আমার পরীক্ষা। কবে পরীক্ষার শেষ হবে আর কবেই বা সার্টিফিকেট হাতে পাবো ও চাকরির আবেদন করবো। মাঝের এই দিনগুলো কীভাবে দুই বাচ্চাকে নিয়ে পার করবো? বাচ্চাদের এবং আমার খাবার খরচ কীভাবে যোগাবো সেই রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। প্রথম দিকে ৫শ, ১ হাজার টাকা দিয়ে অনেকে সাহায্য করেছে। সেই টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা চুড়িহাট্টার বাসা ভাড়া দিয়েছি। বাকি যে সামান্য কিছু টাকা আছে, সেটা দিয়ে এখন চলছি। মাঝে বাচ্চাদের বাবার এক বন্ধু এসে বাজার করে দিয়ে গেছে। কেউ যদি আমার বাচ্চা দুটির স্থায়ী দায়িত্ব নিতেন, তাহলে হয়তো চিন্তামুক্ত থাকতাম। উল্লেখ্য, ২০শে ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী কাওসার আহমেদ নিহত হন। কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ছেলে কাওসার। চকবাজার এলাকার আল মদিনা ফার্মেসি নামে একটি ওষুধের দোকান ছিল তার। লেখাপড়ার পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষে বড় চাকরি করবেন। সেই স্বপ্ন আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে তার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় হয়েছিলেন ১৭তম।

গাজায় ৪ ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনারা

গাজায় ইসরাইলি সেনারা গুলি করে তিন টিনেজ সহ কমপক্ষে ৪ জনকে হত্যা করেছে। শনিবার ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ নামে বার্ষিক প্রতিবাদ বিক্ষোভে ইসরাইল-গাজা সীমান্তে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। এ সময় তাদের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ইসরাইলি ট্যাঙ্ক ও সেনাবাহিনী। ইসরাইলি সেনারা তাদের ওপর সরাসরি গুলি, রাবার বুলেট ছোড়ে। ছোড়ে কাঁদানে গ্যাস। এতে ১৭ বছর বয়সী তিনজন কিশোর নিহত হয়েছে। নিহত হয়েছেন এক যুবক। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০৭ জন ফিলিস্তিনি।
এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
গাজার দক্ষিণে খান ইউনূস এলাকায় বুকে গুলিবিদ্ধ হন তামের আবি আল খায়ের। হাসপাতালে নেয়া হলে তিনি মারা যান। দ্বিতীয় জন মারা যান গাজা শহরের পূর্বে। তার নাম আদম আমারা। তৃতীয় কিশোর বেলাল আল নাজ্জারকে ইসরাইলি সেনারা গুলি করে হত্যা করে। ওদিকে মূল বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাতভর যে প্রতিবাদ চলতে থাকে, তাতে অংশ নিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী তরুণ মোহাম্মদ জিহাদ সাদ। তাকেও হত্যা করেছে ইসরাইলিরা।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় থেকে যে ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের সহিংসতার মধ্য দিয়ে উৎখাত করা হয়েছে সেই ভূমির অধিকার ফেরত পাওয়ার দাবিতে প্রতি বছর এমন বিক্ষোভ করেন ফিলিস্তিনিরা। এ বিক্ষোভের নাম দেয়া হয়েছে ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’। এ ছাড়া গাজায় ১২ বছর ধরে অবরোধ করে রেখেছে মিশর। ইসরাইল ও মিশরের এসব দখলদারিত্বের অবসানও দাবি করছেন তারা।
বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী যুবক ইউসেফ জিয়াদা। তার মুখ ছিল ফিলিস্তিনের পতাকার রঙে রাঙানো। তিনি বলেছেন, যদি আমরা মারাও যাই তবুও আমরা সীমান্ত পর্যন্ত অগ্রসর হতেই থাকবো। আমরা পিছু ফিরে যাবো না। আমাদের ভূমি ফেরত চাই।
ওদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলছে, তুমুল বৃষ্টি সত্ত্বেও তাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি। তাদেরকে সীমান্ত বেড়া থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তবে কেউ কেউ ইটপাটকেল ছুড়েছে। অবকাঠামোতে ব্যবহার করেছে বিস্ফোরক ডিভাইস, টায়ারে আগুন দিয়েছে। তাই দাঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে তারা মানসম্মত উপায় অবলম্বন করে গুলি করেছে।
গাজায় একটি থিংক ট্যাংকে কাজ করেন ৩৪ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী মোহাম্মদ রিদওয়ান। তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের ওই বিক্ষোভ ছিল শান্তিপূর্ণ। শনিবার মানুষের যে ঢল নেমেছিল তাতে প্রমাণ হয় যে, আমাদের এসব জনগণ তাদের ভূমির আইনগত অধিকার ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত পিছু হটবে না। ২৬ বছর বয়সী অধিকারকর্মী বাহা আবু শাম্মাল বলেন, ইসরাইল ও গাজাকে আলাদা করা সীমান্ত বেড়া থেকে অনেকটা দূরেই বিক্ষোভ করছিলেন তারা। কিন্তু তাদের দিকে কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে ইসরাইলি সেনারা। এতে তাদের শ্বাসরোধ হয়ে মরার মতো অবস্থা হয়েছিল।
বিগত সময়ে ইসরাইল-গাজা সীমান্ত ব্যাপক বিক্ষোভের স্থান হয়ে উঠেছে। এখানে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। কমপক্ষে ২৬০ জন ফিলিস্তিনিকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে। ইসরাইলি স্নাইপা ফায়ারে বেশির ভাগ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৭ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। অধিকার বিষয়ক গ্রুপ সেভ দ্য চিলড্রেন বলেছে, নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ৫০টি শিশু রয়েছে। আরো ২১ টি শিশুর বিভিন্ন অঙ্গহানী হয়েছে। বহু সংখ্যক শিশু স্থায়ীভাবে বিকলাঙ্গ হয়েছে। এ কথা বলেছেন সেভ দ্য চিলড্রেনের আঞ্চলিক পরিচালক জেরেমি স্টোনার। ফিলিস্তিনি শিশুদের মারা যাওয়ার খবরে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

কঠিন সমীকরণ নিয়ে তুর্কি নির্বাচনে এরদোগান

প্রায় আট কোটি জনসংখ্যার দেশ তুরস্কে রোববার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। যেখানে ভোট দিবেন প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি ভোটার। সংসদের নিবন্ধিত পাঁচটি দল ছাড়াও আরও সাতটি দল লড়ছে এ নির্বাচনে। এবারের ভোটের লড়াইয়ে জয়ের জন্য ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দলগুলো এক রকম জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করছে। ছোট ছোট দল থাকলেও নির্বাচনের মাঠ মূলত ক্ষমতাসীন ও বিরোধী জোটের লড়াইয়ে বিভক্ত।
ক্ষমতাসীন জোটে রয়েছে সরকারি দল একে পার্টি এবং কট্টর জাতীয়তাবাদী দল এমএইচপি। অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল সেক্যুলারিস্ট সিএইচপি জোটের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ডানপন্থী আই পি বা সু পার্টি। দেশের বড় বড় সিটি কর্পোরেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ শহরে পার্টিগুলো সম্পূর্ণ জোটবদ্ধ হয়ে তাদের প্রার্থী দিয়েছে। যদিও কোথাও কোথাও বড় দলগুলো আবার জোটের শরিকদের সমর্থনে নিজের প্রার্থীকেও তুলে নিয়েছে। এবারের লড়াইটা মূলত সিটি মেয়র, পৌর কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান, গ্রাম মেম্বারসহ নানা পদের প্রার্থী নির্বাচনের জন্য। তবে রাজনৈতিক দলগুলো সম্পূর্ণ সংসদ নির্বাচনের আদলে তাদের প্রচারণা চালাচ্ছে।
এদিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান ও দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান এরই মধ্যে নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে চষে বেড়িয়েছেন গোটা দেশ। প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিনটি নির্বাচনি জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। নিজের প্রার্থীর পক্ষে ভোট টানতে ব্যবহার করেছেন সব ধরনের কৌশল। কখনো ধর্মীয় অনুভূতি আবার কখনওবা পশ্চিমাদের তুলো ধুনো করা; তার প্রচারণায় বাদ যায়নি কোনো দিকই।
এমনকি নির্বাচনি সভায় বড় পর্দায় নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলার ভিডিও দেখিয়ে ভোট চেয়েছেন তিনি। তবে কম যায়নি বিরোধী দলগুলোও। তারাও সরকারকে এক রকম ঘায়েল করার জন্য নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। যদিও এই প্রচারণার দিক থেকে ক্ষমতাসীনরাই এক রকম এগিয়ে আছে। কেননা মূলধারার প্রচার মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সমান তালে দলগুলো নিজেদের প্রচার চালাচ্ছে। তাছাড়া এরদোগান প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুবাদে তার প্রতিটি বক্তব্যই সরাসরি প্রচার হয় সকল মূলধারার গণমাধ্যমে। যা বিরোধী দলের নেতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইস্তানবুল, ইজমি, আঙ্কারার মতো বড় বড় সিটি কর্পোরেশনগুলোতে ক্ষমতাসীন একে পার্টি তাদের হেভি ওয়েট প্রার্থীদেরকে দিয়েছে। এর মধ্যে যেমন, ইস্তানবুলের প্রার্থী তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম, আঙ্কারার প্রার্থী সাবেক পরিবেশ ও শহর পরিকল্পনা মন্ত্রী মেহমেত ওজহাসেকি এবং ইজমির থেকে লড়ছেন দেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী নিহাত জেইবেকচি। অপরদিকে বিরোধী জোটগুলো অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত প্রার্থী নিয়েই এবারের নির্বাচনে লড়াই করছে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দাকে পুঁজি করে দেশের বিরোধীরা তাদের প্রচারণা চালাচ্ছে। গত বছর আগস্ট মাস থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্ব দেশে অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। সরকার নানা প্রতিশ্ৰুতি দিয়েও সেই অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি করতে পারেনি। ধীরে ধীরে এর প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যেও পড়তে শুরু করে। যদিও তুরস্ক এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যে কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনমত সরকারের এই অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তবে সরকারের দাবি, নির্বাচনের পর তুরস্কের অর্থনীতি আরও ভালো হবে। যা দীর্ঘ সময় যাবত চলবে। তবে খুব শীঘ্রই এই দুরবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বলে দাবি বিশ্লেষকদের। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি।

‘রাস্তায় রাস্তায় নগ্ন নারী তাই...’

‘রাস্তায় রাস্তায় নগ্ন নারী’ তাই নিজের দেশ অস্ট্রেলিয়া ফিরতে চান না আইএস যোদ্ধা নারী জানাই সফর। তার রয়েছে দুই বছর বয়সী একটি ছেলে। তিনি বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার রাস্তায় নগ্ন নারী চলাচল করে। তাই তিনি চান না তার ছেলে এসব নারীকে দেখে দেখে বড় হোক। এ খবর দিয়েছে বৃটেনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ।
জানাই সফর (২৪) ২০১৫ সালে আইএসে যোগ দিতে পাড়ি জমান সিরিয়ায়। সেখানে আইএস পরাজিত হওয়ার পরে বর্তমানে তিনি অবস্থান করছেন উত্তরাঞ্চলে একটি শরণার্থী শিবিরে। বৃটিশ নাগরিকত্ব হারানো আইএস বধু শামীমা বেগম ও আইরিশ লিসা স্মিথ যেমন নিজের দেশে ফিরতে চান, তাদের মতো তিনি নিজের দেশে ফিরতে চান না।
দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি দ্য অস্ট্রেলিয়ান পত্রিকাকে বলেছেন, যে দেশের রাস্তায় নগ্ন নারীরা হাঁটে সেখান থেকে দূরে সরে আসার জন্য আমি আইএসে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি চাই না আমার ছেলে সেখানে বেড়ে উঠুক। সিরিয়া আসার জন্য আমার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। আইএসের অধীনে জীবন কাটানোতেও আমার অনুশোচনা নেই।
উল্লেখ্য, এক কাজিনকে সঙ্গে নিয়ে সিরিয়ায় পাড়ি জমান জানাই সফর। ওই কাজিনকে তিনি শুধু আয়লাম হিসেবে অভিহিত করেছেন। বলেছেন, অনলাইনে বিভিন্ন তথ্যের ওপর পড়াশোনা করার পর দু’জনে আইএসে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তারপর পরিবারের সদস্যদের না জানিয়ে বেরিয়ে পড়েন সিরিয়ার উদ্দেশে। এই দুই যুবতী পৌঁছে যান সিরিয়ার রাকায়। সেখানে তারা বিয়ে করেন আইএসের দুই যোদ্ধাকে। এই রাকায় ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত খেলাফত কায়েম করে আইএস। এরপরই তাদের পতন হয়। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ান একটি ফ্লাইটে বোমা হামলা ষড়যন্ত্রে আইএসের যেসব কমান্ডার জড়িত, ধারণা করা হয় তাদের সঙ্গে এই দুই বোনের সম্পর্ক আছে। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জানাই সফর। তিনি স্বীকার করেছেন ওই রকম বোমার মালিক তিনিও। তবে আইএসের সবার কাছে এমন বোমা ছিল বলে তার দাবি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে হামলা হয় আইএসের বিরুদ্ধে। এ সময় কাজিন আয়লামকে সঙ্গে নিয়ে রাকা থেকে পালান জানাই সফর। কিন্তু ধরা পড়ে যান কুর্দি কর্মকর্তাদের হাতে। তাদের স্থান হয় শরণার্থী শিবিরে।

নিজ দলে বিদ্রোহের মুখে তেরেসা মে: অনিশ্চয়তায় বৃটেন! ক্ষমতাসীন দলে বিভক্তি!

ব্রেক্সিট নিয়ে কঠিন সমস্যায় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। একদিকে বিরোধী দল। অন্যদিকে নিজের দলের ভিতর বিদ্রোহ। তিনি কোনোভাবেই সামনে এগুতে পারছেন না। একের পর এক বাধা আসছে তার সামনে। ব্রেক্সিট চুক্তিতে সমর্থনের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের আগেই পদত্যাগ করার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও পাস করাতে পারেন নি ওই চুক্তি। এখন চতুর্থ ও চূড়ান্ত দফায় তিনি ওই চুক্তি পার্লামেন্টে তুলতে চাইছেন। এবার কি ঘটবে তা বলা মুশকিল।
তবে তিনি যে পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছেন তার অর্থ হলো বৃটেন একটি আগাম নির্বাচনের দিকে ধাবিত হবে। ফলে তার কনজার্ভেটিভ পার্টির অনেক এমপি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেন, যার জন্য আগাম নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায় বৃটেন, তাহলে তারা তার সেই উদ্যোগের বিরুদ্ধে ভোট দেবেন।
এর ফলে কনজার্ভেটিভ দলের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্কতা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এমন হলে ব্রেক্সিট নিয়ে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হবে। তাই যদি হয়, অর্থাৎ সমর্থন আদায়ের বিনিময়ে তেরেসা মে যদি আগাম পদত্যাগ করেন, তাহলে বৃটেন আগাম নির্বাচনের দিকে যাবে। তিনি যেন তা করতে না পারেন সে জন্য তার বিরুদ্ধে এমপিদের অবস্থানের অর্থই হলো, তারা তার চূড়ান্ত দফা ব্রেক্সিট চুক্তির পক্ষে ভোট দেবেন না। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের মধ্যে যে ধস দেখা দিয়েছে তা স্পষ্ট হয়েছে মন্ত্রীপরিষদে। কারণ, মন্ত্রীপরিষদের অনেকে সতর্কতা দিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের নেতৃত্বে একটি নির্বাচনের যাওয়ার বিরুদ্ধে সিরিয়াস প্রচারণা চালাবেন কনজার্ভেটিভ দলের এমিপরা। ব্রেক্সিট চুক্তির বিনিময়ে পদত্যাগের ঘোষণা, অর্থাৎ আগাম নির্বাচনের ইঙ্গিত দেয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে ব্রেক্সিটপন্থি এবং ব্রেক্সিট বিরোধী উভয় শিবিরে। তিনি যে দিকেই যান না কেন, তাকে সে জন্য হাউস অব কমন্সে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে। কিন্তু তার নিজ কনজার্ভেটিভের এমপিরা বিদ্রোহ করবেন বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন। ফলে তাদের বিদ্রোহে তার এমন প্রচেষ্টা হাউস অব কমন্সে আটকে যাবে এটা স্পষ্ট। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালান ডানকান বলেছেন, ব্রেক্সিট ইস্যুর সমাধান হওয়ার আগে যদি একটি সাধারণ নির্বাচন হয় তাহলে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে। পালামেন্ট যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তার ওপর আরেকটি গণভোট দাবি করছেন কনজার্ভেটিভ দলের এমপি অ্যান্টোনিটে স্যান্ডব্যাচ। তিনি বলেছেন, সাধারণ নির্বাচন আহ্বান করা হলে তার বিরোধিতা করবেন তিনি। তার ভাষায়, সমস্যা সমাধানের উত্তর জাতীয় নির্বাচন নয়। আমি এ বিষয়ের বিরুদ্ধে ভোট দেবো। পার্লামেন্টে আমাদেরকে উপায় খুঁজে বের করতে হবে। তারপর তা নিশ্চিত করার জন্য জনগণের কাছে গণভোটে দিতে হবে।
ইউরোপিয়ান রিসার্চ গ্রুপ-এর সদস্য ও ব্রেক্সিটপন্থি এমপি মার্ক ফ্রাঁসোয়া বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র অধীনে একটি নির্বাচনে কনজার্ভেটিভ দলের এমপিরা সমর্থন দেবেন এমন সুযোগ নেই। অবশ্যই তারা এমন ইস্যুতে ভোট দেবেন না। এটা করতে হলে তেরেসা মে’কে সুপার মেজরিটি দেখাতে হবে।
ওদিকে নতুন সপ্তাহ বৃটেনের রাজনীতিতে ঝঞ্ঝাময় থাকবে। এ সময়ে তেরেসা মের নেতৃত্ব নিয়ে টানাহেঁচড়া হতে পারে। তাকে সরিয়ে দেয়া হলে অথবা তিনি পদত্যাগ করলে তার পদে কে বসবেন তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রস্তুতি নিয়েছেন। এক্ষেত্রে যা ঘটতে পারে তাহলো:
১.    নতুন সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যদি তেরেসা মে একটি স্থায়ী কাস্টমস ইউনিয়ন অনুমোদন করতে রাজি হন তাহলে ব্রেক্সিটপন্থি মন্ত্রীরা পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন।
২.     আম্বার রাডের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি নতুন উদারপন্থি কনজার্ভেটিভ গ্রুপ। একটি নতুন নেতৃত্বের অধীনে দল যাতে অধিক ডানপন্থি অবস্থান নিতে না পারে তা থামানোর জন্য তারা সংগঠিত হচ্ছেন।
৩.    পার্লামেন্টে যে প্রস্তাবই পাস হোক না কেন তা গণভোটে দেয়ার জন্য দাবির প্রতি সমর্থন দিতে পারেন অধিক সংখ্যক কনজার্ভেটিভ দলের সদস্য।
এমন অবস্থায় বৃটেনে আগামী একটি সপ্তাহে কি ঘটবে তা কেউ আগেভাগেই পূর্বাভাস করতে পারছেন না। তবে এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী একটি সফট ব্রেক্সিট বা নমনীয় ব্রেক্সিট অনুমোদন করাতে আরেকটি উদ্যোগ নিতে পারেন। ইউরোপিয় ইউনিয়নের সঙ্গে বৃটেনের সদস্যপদ ধরে রাখা দীর্ঘায়িত না করতে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের কাছে চিঠি লিখেছেন কমপক্ষে ১০০ কনজার্ভেটিভ দলের এমপি।

নিমিষেই পুড়ে ছাই: ৬ বছরের কষ্টের টাকায় দোকান

ছয় বছর দুবাই ছিলেন শাহ জামান। প্রবাস জীবন ছেড়ে দেশে ফেরেন। জীবিকার তাগিদে মাত্র দুই মাস আগেই শুরু করেন গুলশান-১ ডিএনসিসি মার্কেটে ব্যবসা। নতুন করে স্বপ্ন দেখা। এই ব্যবসায়ই ছিল তার একমাত্র অবলম্বন। স্ত্রী- সন্তান নিয়ে নতুন করে বাঁচার সব স্বপ্ন মুহূর্তেই যেন শেষ হয়ে গেল শাহ জামানের। গতকাল ভোরে গুলশান-১ ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন তিনি।
শাহ জামান বলেন, কাঁচাবাজারের ৯১ নম্বর দোকানটি ছিল আমার।
ভোরবেলা আগুনের খবর শুনেই বাড্ডা কুমিল্লাপাড়ার বাসা থেকে দৌড়ে চলে আসি। এসে দেখি সব শেষ। ছয় বছর দুবাইয়ে থাকার পর দেশে এসে কিছু করতে চেয়েছিলাম। এই দোকানটি নিয়েছিলাম। দুই মাস হলো সবে ব্যবসা শুরু করি। এই দোকান দিয়েই মনে করেছি পরিবারের মানুষগুলো নিয়ে বাঁচবো। কিন্তু এই আগুন আমার সব শেষ করে দিয়েছে। এক মুহূর্তেই সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দোকানের ভেতর ২৫ লাখ টাকার মালামাল ছিল। কিছুই বাদ নেই। সব পুড়ে গেছে। আমি পথে বসে গেছি। আরেকটা সবজির দোকান ছিল। গতকাল (গত শুক্রবার) দেশের বাইরে থেকে এক লাখ টাকার মাশরুম আনিয়েছি। সেটাও পুড়ে গেছে। এখন যে কি নিয়ে থাকবো! কি করবো কিছুই ভাবতে পারছি না।
দীর্ঘদিন ধরে গুলশানে ব্যবসা করে আসছিলেন মো. ইউসুফ চৌধুরী। অগ্নিকাণ্ডে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কাঁচাবাজারের পাশাপাশি গুলশান শপিং সেন্টারের একাংশও পুড়ে যায়। সেখানেই তৃতীয় তলার ১২৯ ও ১৩০ নম্বর দোকান দুটি ইউসুফ চৌধুরীর। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে দুটোই পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, একবারে যা ছিল দোকানের ভেতর সবটাই পুড়ে গেছে। কিছুই বাকি নাই। কালকেও  নতুন মালামাল উঠাইসি। ৬০ লাখ টাকার পণ্য ছিল। এক আগুন নিয়ে গেছে। পথে বসে গেলাম। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল এই দোকানের উপর। আর কিছুই তো করি না। এত বছর ধরে এক ব্যবসায় করে আসছি। এখন কবে আবার এই দোকান নতুন করে চালু করবো। টাকাই বা কই পাবো!
১৭ বছর ধরে শিশুদের পণ্যের ব্যবসা করছেন মো. নুরুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী। গুলশান শপিং সেন্টারেই একটি দোকানের পজেশন ভাড়া নিয়ে তিনি ব্যবসা চালাচ্ছিলেন। দোকানে ২ কোটি টাকারও বেশি পণ্য ছিল বলে দাবি করেন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমার এই ব্যবসাটাই ছিল সম্বল। সংসারের সব খরচ এখান থেকেই ব্যয় করতে হতো। কিন্তু এই আগুন আমাকে শেষ করে দিলো। কিচ্ছু নাই ভেতরে। এমন একটা সময় আগুন লাগলো কিছু বের করতে পারি নাই। শুধু আমি না। এই মার্কেটে এত দোকানের মালিক সবাই নিঃস্ব হয়ে গেছে।
ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারের নিত্যপণ্যের একটি দোকান নিয়ে ব্যবসা করতেন আরেক জন- নুরুল ইসলাম। গতকাল আগুনের ঘটনায় তারও স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাঁচার একমাত্র অবলম্বন ছিল তার দোকানটি। কিন্তু এখন সব হারিয়ে নিঃস্ব নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সবজি কাঁচামালের এই ব্যবসা দিয়েই আমার পরিবার চলতো। স্বপ্ন ছিল ব্যবসাটা আরো বড় করবো। কিন্তু আমি একদম রাস্তায় বসে গেছি। কিছুই নেই হাতে। ত্রিশ লাখ টাকার মালামাল ছিল। সব পুড়ে গেছে।
শুক্রবারই ৮ লাখ টাকার মাল নিয়েছি। দোকানে ৫০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। এখন কিছুই নাই। চালের বস্তা যে কয়টা ছিল সব পুড়ে গেছে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া মুদি দোকান নিয়ে এমনটাই বলছিলেন ফখরুল ইসলাম। পাঁচ বছর আগে কাঁচাবাজারের ভেতর ব্যবসা শুরু করেন তিনি। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ঢাকার বাড্ডায় বসবাস করেন। মুদির ওই দোকান থেকেই পরিবারের ভরণপোষণ চালাতেন ফখরুল। তিনি বলেন, দিন দুপুরে আগুনটা লাগলে কিছু মালামাল বের করে আনতে পারতাম। এখন আমার কি হবে? কার কাছে যাবো? এই ক্ষতি আমার পূরণ করবে কে? এতগুলো টাকা আমাকে কে  দেবে!
মসলা ও বেবি ফুডের দুটি দোকানের মালিক ছিলেন আবুল হোসেন। রাতেই দোকান বন্ধ করে যান কালাচাঁদপুরের বাসায়। ভোরবেলায় পাশের দোকানের মালিক ফোন দিয়ে জানালেন মার্কেটে আগুনের খবর। এসে দেখেন দুই দোকানের একটিও নেই। মসলা পুড়ে গেছে, ছাই হয়ে গেছে বেবি ফুডের সব পণ্য। আবুল হোসেন বলেন, কিছুই বের করে আনতে পারিনি। দুই দোকানে ১ কোটি টাকারও বেশি মালামাল ছিল। সব শেষ হয়ে গেছে। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো। মাস শেষে ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ দেবো কীভাবে। ছেলেটা পড়ে নর্থ সাউথে। মেয়েটাও ডাক্তারি পড়ে। এত খরচ আমি পাবো কই। ওদের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।   
আগুনে সব পুড়ে গেলেও ফজলে এলাহীর দোকানের কয়েকটি সয়াবিন তেলের গ্যালন টিকে ছিল। আগুন নেভার পর সেগুলো বের করে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন, ৭০ লাখ টাকার মালামাল দুই দোকানে বোঝাই ছিল। সব পুড়ে গেছে। শুধু বাকি ছিল তেলের কয়েকটা গ্যালন। এগুলোই দোকানের ভেতর থেকে বের করতে পারছি। আর কিছুই নাই। পথের ভিখেরী  হয়ে গেলাম। আর কিছুই রইলো না।
গুলশান-১ ডিএনসিসি মার্কেটের ওই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানির মধ্যে কাঁচামালের আরেক ব্যবসায়ী ফারুক। দোকানের ভেতর ছিল ২৫ লাখ টাকার পণ্য। এখন কিছুই নেই তার। ফারুক মানবজমিনকে বলেন, এক দোকানের উপরই আমি চলতাম। মাছ- মাংসসহ সব মাল একেবারে শেষ। কিছুই নাই। ফ্রিজটাই পুড়ে গেছে। আমি শেষ হয়ে গেছি। বৌ-বাচ্চা নিয়ে এখন না খেয়ে মরতে হবে।

হেলে পড়েছে এফ আর টাওয়ার, ঝুঁকিতে সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

আগুন লাগা রাজধানীর বনানীর বহুতল ভবন এফআর টাওয়ার হেলে পড়েছে। কলাম ও স্ল্যাব  ভেঙে গেছে। যা সংস্কার করতে সময় লাগবে তিন মাস। আজ বেলা ১১টার দিকে বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি ভবনটি পরিদর্শন শেষে এ তথ্য জানান। বিশষজ্ঞরা বলছেন, সংস্কারের আগে ভবনটি ব্যবহার করা যাবে না। এদিকে হেলে যাওয়ায় ঝুঁকিতে রয়েছে পাশের ভবন এ আর টাওয়ারে অবিস্থিত সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীরাও ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
পরিদর্শনের পর তদন্ত কমিটি সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
এ সময় তারা বলেন, ভবনটিতে ফায়ার এক্সিট ছিল নামমাত্র। কার্যকরও ছিল না।  তদন্ত কমিটির সদস্য ও বুয়েটের শিক্ষক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও ফায়ার সেফটি কোড অনুযায়ী সংস্কার ছাড়া এফআর টাওয়ার ব্যবহার করা যাবে না। ভবনে কলাম ও স্ল্যাব ভেঙেছে এবং এটি কিছুটা হেলেও পড়েছে। এই ভবন সংস্কারে কমপক্ষে তিন মাস লাগবে।
তিন মাস লাগার কারণ ব্যাখ্যা করে বুয়েটের শিক্ষক বলেন, ভবনে জরুরি নির্গমন পথ ছিল খুবই অপ্রশস্ত। কেবল একটি ফ্লোরে ফায়ার ডোর ছিল। আরও বেশ কিছু জায়গায় ত্রুটি রয়েছে ভবনটিতে। এগুলো সংশোধন ছাড়া ভবনটি ব্যবহার করা যাবে না।
ভবনে জরুরি নির্গমনের পথ ছিল না জানিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ও বুয়েটের শিক্ষক অধ্যাপক রাকিব আহসান বলেন, পরিদর্শনের সময় আমরা দেখেছি যে, ভবনে জরুরি নির্গমন পথটি কোনো  কোনো জায়গায় বন্ধ ছিল।
১৮ তলা ভবনটি ২৩ তলা করায় তা কতটা ঝুঁকি তৈরি করেছে সেটি খতিয়ে দেখতে ইট ও কংক্রিট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সদস্য ও রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল লতিফ হেলালী।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিজাত এলাকার এ টাওয়ারটিতে আগুন লাগে। এতে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ২৬ জন। ৭০ জনের  বেশি মানুষ আহত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপক, রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী ও সচিব (উন্নয়ন) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রয়েছেন। এই কমিটি তিন দিনের মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেবে।

সাড়ে ১১ হাজার ভবন ঝুঁকিতে by সাদ্দাম হোসাইন

বহুতল ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা।
অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নেই বনানীর এফ আর টাওয়ারের।
ফায়ার সার্ভিস জানুয়ারিতে নোটিশ দিয়েও সাড়া পায়নি।

বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র বা অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এর কোনোটিই ছিল না বনানীর এফ আর টাওয়ারের। গত জানুয়ারি মাসেও এই ভবন কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি। গত বৃহস্পতিবার এই ভবনেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ২৫ জন।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, নোটিশ দেওয়া ছাড়া তাদের আর কিছু করার নেই। আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)।
শুধু এফ আর টাওয়ারই নয়, ঢাকা মহানগরীর অন্তত সাড়ে ১১ হাজার বহুতল ভবন এমন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা–সংক্রান্ত ফায়ার সার্ভিসের কোনো ছাড়পত্র বা অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার (ফায়ার সেফটি প্ল্যান) অনুমোদন নেই। রাজউক ও ফায়ার সার্ভিস থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে ২০০৩ সালে অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ নামে একটি আইন করে সরকার। এই আইন অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে বহুতল ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিস থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে। মূলত ভবনের সামনে সড়কের প্রশস্ততা, নকশা অনুসারে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা, ভবন থেকে বের হওয়ার বিকল্প পথ, কাছাকাছি পানির সংস্থান, গাড়ি ঢুকতে পারবে কি না—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে ছাড়পত্রটি দেয় ফায়ার সার্ভিস। তারপর এই ছাড়পত্র দেখিয়ে রাজউক থেকে ভবনের নকশার অনুমোদন নিতে হয়। এরপর ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করতে হয়। নির্মাণকাজ আংশিক বা পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর ভবনটি ব্যবহারের জন্য আবার রাজউকের কাছ থেকে বসবাস বা ব্যবহারের সনদ নিতে হয়। এই সনদ দেওয়ার সময় আগে জমা দেওয়া নকশা অনুযায়ী ভবনটি নির্মিত হয়েছে কি না, তা দেখে রাজউক।
কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করে না রাজউক। ফলে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই নির্মিত হয় বহুতল ভবন।
রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে করা এক জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর এলাকায় সাততলা বা তার চেয়ে উঁচু ভবন আছে ১৬ হাজার ৯৩০টি। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাত্র ৫ হাজার ২৪টি ভবন ফায়ার সার্ভিস থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে। অর্থাৎ ১১ হাজার ৯০৬টি ভবনের অগ্নিপ্রতিরোধের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে পালন করা হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়া এত ভবন নির্মাণ হয় কীভাবে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ওয়্যারহাউস অ্যান্ড ফায়ার প্রিভেনশন) ওহিদুল ইসলাম বলেন, ফায়ার সার্ভিসের আইন অনুযায়ী ছয়তলার ওপর যেকোনো ভবনই বহুতল। আর রাজউকের আইন অনুযায়ী, ১০ তলা থেকে বহুতল ভবন। দুই আইনের এমন সাংঘর্ষিক অবস্থার কারণে ১০ তলার নিচের বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র চায় না রাজউক। ফলে এই ভবনগুলো অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই গড়ে উঠছে। দুই আইনের এই সাংঘর্ষিক অবস্থার অবসান দরকার বলে মত দেন তিনি।
অন্যদিকে ২০০৩ সালের আগে যে ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে ভবনমালিক আবেদন করলে ফায়ার সার্ভিস থেকে সরেজমিনে ভবনটি পরিদর্শন করে অগ্নিনিরাপত্তায় কী কী ব্যবস্থা রাখতে হবে, তার একটি পরামর্শ দেওয়া হয়।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল মাত্র ২৮০টি ভবনকে অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এগুলোর সবই অবশ্য শিল্পকারখানার জন্য।
রাজউক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বনানীর এফ আর টাওয়ারটির নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। ফলে এই ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু পরে অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। তারা সেটা করেনি। এ ব্যাপারে ভবন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এফ আর টাওয়ারে অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা না থাকায় গত ডিসেম্বরে ভবন কর্তৃপক্ষকে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তারা আসেনি। এরপর জানুয়ারিতে নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও ভবন কর্তৃপক্ষ কিছু করেনি।
এর আগে ২০১৭ সালে ঢাকা মহানগরীতে মোট ৩ হাজার ৭৮৬টি বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, আবাসিক হোটেল পরিদর্শন করেছিল ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৯টি ভবনই ছিল অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ২ হাজার ৫৮৮টি ভবন ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এরপর প্রতিটি ভবন কর্তৃপক্ষকে অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নোটিশ দেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।
জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী আমাদের বিচারিক ক্ষমতা নেই, নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেটও নেই। তাই নোটিশ দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার থাকে না। ভবনমালিক নোটিশ অনুযায়ী কাজ না করলে তা রাজউককেও জানানো হয়। এরপর রাজউককেই ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
অধিদপ্তরটির আরেক পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজের মতে, ভবনে ব্যবহার বা বসবাসের সনদ দেয় রাজউক। তাই কোনো ভবনে অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা আছে কি না, তা রাজউককেই দেখতে হবে।
কিন্তু রাজউক থেকে পাওয়া তথ্যে ভবনমালিকদের বসবাস বা ব্যবহার সনদ নেওয়ার খুবই হতাশাজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে প্রায় ৪০ হাজার ভবন তৈরি হয়েছে। অথচ বসবাস বা ব্যবহার সনদ নিয়েছে মাত্র ১৬২টি ভবন।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রাজউক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, ‘এখন এ বিষয়ে কাজ করার সময় এসেছে। আমরা বহুতল ভবনে অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করব।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ও নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, বসবাস বা ব্যবহার সনদ নেওয়া নিশ্চিত করতে পারলে বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের এমন ঝুঁকির সৃষ্টি হতো না। তিনি বলেন, এই সনদ পাঁচ বছর অন্তর নবায়ন করতে হয়। নবায়নের সময় ভবন নির্মাণের আগে জমা দেওয়া নকশা ও ভবনের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হয়। গরমিল পাওয়া গেলে বা অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে রাজউক সেই ভবন উচ্ছেদ কিংবা পুরো ভবনই পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু রাজউক আদৌ জননিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেয় বলে মনে হয় না।

বৃটেনে এবার নিষিদ্ধ সেই শামীমার স্বামী

বহুল আলোচিত আইএস বধু বলে পরিচিত শামীমা বেগমের জিহাদী স্বামী, আইএস যোদ্ধা ইয়াগো রিডিজক’কে নিষিদ্ধ করেছে বৃটেন। তাকে বৃটেনের জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার নাম উঠেছে বর্জনের তালিকায়। অর্থাৎ বৃটেনে যারা প্রবেশ করতে পারবেন বা থাকতে পারবেন তাদের নামের মধ্যে তার নাম থাকবে না। শামীমা বেগমের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ। বৃটিশ একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে এ খবর দেয়া হয়েছে।
শামীমা বেগম বৃটেনে জন্মগ্রহণকারী বৃটিশ নাগরিক। তিনি ২০১৫ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে পালিয়ে চলে যান সিরিয়ায়।
সেখানে গিয়ে যোগ দেন জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসে। বিয়ে করেন ডাচ নাগরিক ইয়াগো রিডিজক’কে। এরপর জন্ম হয় তাদের তিনটি সন্তান। তারা সবাই মারা গেছে। সর্বশেষ সন্তান জন্ম নেয় এ বছরে কিছুদিন আগে। তার আগেই শামীমা বৃটেনে ফেরার অনুমতি চান। তার দাবি, তার সন্তানের জন্য তাকে বৃটেনে ফিরতে দেয়া উচিত। কিন্তু একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়ার কয়েক দিন পরে বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার ঘোষণা দেন। শামীমার ছেলের নাম রাখা হয় জেরাহ। বৃটিশ আইন অনুযায়ী, বৃটিশ নাগরিক মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়ায় সেও বৃটিশ বলে স্বীকৃত হয়। কিন্তু জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই নিউমোনিয়ায় মারা যায় শামীমার সেই ছেলেটিও। এমন অবস্থায় শামীমাকে নিয়ে নিজের দেশ নেদারল্যান্ডে ফেরার প্রত্যয় ঘোষণা করেন ইয়াগো রিডিজক। কিন্তু সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দেয়ার কারণে সেখানে গত জুলাই মাসে অনুপস্থিতিতে তাকে ৬ মাসের জেল দেয়া হয়েছে।
বর্তমানে ইয়াগো রিডিজক অবস্থান করছেন সিরিয়ায় একটি জেলে। তার সঙ্গে ওই জেলের ওই সেলে অবস্থান করছেন আরো ২০ জন আইএস যোদ্ধা। অন্যদিকে শামীমা রয়েছেন একটি শরণার্থী শিবিরে। শামীমার স্বামীকে বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ নিষিদ্ধ করাকে শনিবার দিবাগত রাতে খুবই ভাল খবর বলে আখ্যায়িত করেছেন কনজার্ভেটিভ দলের এমপি ফিলিপ হলোবোন। তিনি বলেছেন, আমাদের এ বিষয়ে আরো নজর দেয়া উচিত। এমন হাজার হাজার আইএস যোদ্ধা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইউরোপে ফিরবে। এতে হুমকি দেখা দেবে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের অক্টোবরে নেদারল্যান্ডের আর্নহেম থেকে সিরিয়ায় পাড়ি জমায় শামীমার স্বামী ইয়াগো। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব লন্ডনের বাসা থেকে পালান শামীমা। তিনি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের আহমেদ আলীর মেয়ে। তবে কোনোদিন তিনি বাংলাদেশ সফরে আসেন নি। তার কাছে বাংলাদেশী কোনো পাসপোর্টও নেই বলে দাবি শামীমার। তিনি সিরিয়া পৌঁছার মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে বিয়ে করেন ইয়াগোকে। তিনি শনিবার দ্য টাইমসকে দেয়া সাক্ষাতকারে শামীমাকে একজন যথার্থ স্ত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শামীমা তার সন্তানদের হারিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে আছেন। এ সম্পর্কে ইয়াগো বলেছেন, আমাদের এসব সন্তানকে আমরা খুব ভালবাসি। তারা নেই, এটা এক বিভীষিকা। এটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের বিষয়।

একজন বিজ্ঞানী সামাদের কথা by চার্লি মিশেল

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের আবদুস সামাদ অপর একজনকে তার জীবনের বন্ধু করেছিলেন। তার  নিকটতম প্রতিবেশী হলেন শাজু শাহজাহান। এই দুই বন্ধু প্রতিদিন একসঙ্গে ১৮ কিমি যাতায়াত করে স্কুলে যেতেন।
এর ফলে তারা কথা বলার অনেক সুযোগ পেয়েছেন। খেলার জন্য অনেক সময় দিয়েছেন তারা। স্কুলে পড়ার সময় তারা ক্লাসে একসঙ্গে বসেছেন। এবং বাড়ি ফিরে ঘরের কাছাকাছি মসজিদে তারা কোরআন পড়ছেন।
দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তারা ছিলেন অবিচ্ছেদ্য। জীবন চলার পথ অবশ্য একসময় তাদের ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়।
সামাদ ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয়ে গৎ পশু বিজ্ঞান অধ্যয়ন করেছে; শাহজাহান কয়েক ঘণ্টা দূরে ঢাকায় প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন।
তদুপরি তারা ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছিলেন। উভয়ই কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন।
সামাদ নিউজিল্যান্ডে পড়াশোনা করার জন্য একটি বৃত্তি পান।
তিনি লিঙ্কন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি নিউজিল্যান্ডকে ভালোবাসতেন। তাই তিনি অবসরে গিয়ে নিউজিল্যান্ডেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাস্তবে যা তিনি ২০১২ সালে করেছিলেন।
শাহজাহান ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে চলে যান, যেখানে তিনি থাকেন।
শাহজাহান তার সেরা বন্ধু সামাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন গত কয়েক বছর হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের সময় পার্থক্য ছিল। আর সেটা তাদের জন্য অসুবিধাজনক মনে হতো। শাজাহান বলেন, ৬০ বছর আগের বন্ধুত্বের সুবাদে তারা একে অপরের জীবনের বিষয়ে আপ টু ডেট থাকছিলেন।
কয়েক সপ্তাহ আগে, তিনি খবরটি শুনেছেন। ক্রাইস্টচার্চে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের মধ্যে ৬৬ বছর বয়সী আবদুস সামাদ ছিলেন। আল নূর মসজিদে তিনি প্রার্থনারত ছিলেন।
‘এটা এক সপ্তাহের বেশি হয়েছে এবং আমি এখনও কাঁদছি,’ শাহজাহান ক্লিভল্যান্ড থেকে বলেছিলেন।
‘তিনি সবচেয়ে সৎ মানুষদের অন্যতম।’
এই হামলার শিকার হওয়া বেশিরভাগ লোকজনের স্বজনরা নিউজিল্যান্ড থেকে দীর্ঘ দূরত্বে বসবাস করেন, সারা বিশ্ব জুড়ে মানুষ তাদের প্রাণহানির জন্য শোক প্রকাশ করে চলছে।
আবদুস সামাদ বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ড উভয় দেশের মানুষকে শোকাতুর করেছেন। কানাডার পূর্ব প্রান্তের নোভা স্কটিয়া থেকে ওহাইয়ো, সোলোন অঞ্চলের সহকর্মী ও বন্ধুরা শোক প্রকাশ করছেন।
বাংলাদেশের গ্রামে, যেখানে সামাদের পরিবার আছে, স্থানীয়রা তার সম্মানে একটি মানববন্ধন করেছে। পরের সপ্তাহে আরো বড় সমাবেশ হবে তার স্মরণে।
শাহজাহান বলেন, সবাই তাকে পছন্দ করতো।
‘আপনি সেখানে যেকোনো লোককে জিজ্ঞাসা করতে পারেন এবং সবাই তার নাম জানেন।’
তার জীবন কঠিন পরিস্থিতিতে শুরু হয়েছিল, কিন্তু সামাদ ছিলেন একজন বুদ্ধিজীবী, যিনি নিজের সম্ভাবনা আরো বাড়াতে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন।
তার তিন ভাইবোন, যাদের মধ্যে একজন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশে পরিণত হয়।
তিনি যে গ্রামে বড় হয়েছিলেন, সেটি ভারতের উত্তর সীমান্তের কাছে কুড়িগ্রাম জেলার মধুরহিলা নামে পরিচিত। গ্রামে পানি সরবরাহ ছিল না। এবং অধিকাংশ বাসিন্দার সামান্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল, শাহজাহান মন্তব্য করেন।
কিন্তু সামাদ বুদ্ধিমান এবং অধ্যবসায়ী ছিল। তিনি একটি আত্মাহুতি হিসেবে শিক্ষাকে দেখেছিলেন। যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, তখন তিনি তার গ্রামেই থাকতেন, যদিও যাতায়াতে অনেক সময় লেগে যেত।
পরিবারটির ক্রাইস্টচার্চের বাড়িতে বসে সামাদের ছেলে তারিক মুহাম্মদ বলেন, ‘বাবা অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন।’
‘তিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। তবে আপনি যদি তার সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে আপনি কখনো জানতে পারবেন না যে, তিনি অত্যন্ত শিক্ষিত ছিলেন।’
ক্রাইস্টচার্চে তাকে পিএইচডি দেয়ার সময় সামাদ ছিলেন এক ডজন বা তারও বেশি মুসলিমের মধ্যে একজন, যারা আল নূর মসজিদ নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন, আর যেখানে তিন দশক পরে তাকে হত্যা করা হলো।
যদিও তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন, কিন্তু তিনি সব সময় নিউজিল্যান্ডে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। তার পরিবার ২০০৪ সালে ফিরে আসে, কিন্তু তিনি তার নাতিদের পড়াশোনায় সাহায্য করার জন্য বাংলাদেশে থাকতেন।
তিনি সর্বদা নিউজিল্যান্ড সম্পর্কে কথা বলেন, বলেন, তার বড় ছেলে তোহা মুহাম্মদ, যিনি বাংলাদেশে থাকেন।
‘তিনি এই দেশকে ভালোবাসা দিতে ফিরে এসেছিলেন,’ তোহা অশ্রু চেপে মন্তব্য করেন।
‘এখানকার মানুষ বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ, আপনার একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আছে, প্রতিষ্ঠানগুলি ভালো। তিনি তাই এই দেশকে পছন্দ করতেন।’
সামাদ ২০১২ সালে স্থায়ীভাবে ক্রাইস্টচার্চে চলে যান।
তিনি যখন তা করেন, তখন তিনি আল নূর মসজিদের মুয়াজ্জিন হন। যিনি প্রার্থনা করার আহ্বান পাঠ করেন। তিনি মসজিদটিতে পাঁচবার যেতেন। এবং চেষ্টা করতেন মুসল্লিরা সবার আগে তার কণ্ঠ শুনতে পান।
‘তার দুই জায়গা ছিল, বাড়ি ও মসজিদ,’ তোহা বলেন।
‘এটাই তার জীবন ছিল।’
নিউজিল্যান্ডে তার প্রাথমিক ফোকাস ছিল তিনি স্থানীয় মুসলিম সমপ্রদায়ের নেতা। যেখানে তিনি একটি কমিউনিটি সংগঠক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। সমপ্রদায়ের অনেকেই আপদে-বিপদে একজন বড় ভাই সামাদের কাছে ছুটে আসতেন।
বিশেষ করে, তিনি নও মুসলমানদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। ইসলামের নীতিগুলো সঠিকভাবে যাতে তারা শিখেন, সেটা তিনি নিশ্চিত করতে ব্যাকুল থাকতেন।
তারিক বলেন, ‘যদি আপনি একজন নতুন মুসলমান হন এবং আপনি খারাপ শিক্ষা পান তবে আপনি চরমপন্থি হতে পারেন।’
‘ইসলামে বর্ণিত সহানুভূতি ও সমবেদনা সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করার বিষয় তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
প্রথমদিকে, বিদেশি প্রচার মাধ্যম ভুলভাবে জানায় যে, মসজিদের শুটিংয়ে সামাদের স্ত্রীও নিহত হয়েছেন। এবং তাদের ছেলে তারিক নিখোঁজ।
উভয়ই সামাদের সঙ্গে মসজিদে যেতেন। কিন্তু তারা সেইদিন অসুস্থতার কারণে যাননি।
শুটিংয়ের পর বিশৃঙ্খলা ঘটেছে, অনেক পরিবারের মতো সামাদের প্রিয়জনরা চিন্তিত ছিলেন। তাই সামাদ মারা গিয়েছিল কিনা তা খুঁজে বের করতে তারা সংগ্রাম করেছে। রোববার পর্যন্ত জানা যায়নি যে তিনি মৃতদের মধ্যে ছিলেন। মৃতদেহ শনাক্ত করতেও সময় লেগেছে।
তারেক বলেন, ‘তিনি শান্ত, প্রেমময় মানুষ ছিলেন।’
‘এ কারণে তার এমন মৃত্যু এত কঠিন হয়ে আমাদের বুকে বাজছে। যে এত শান্ত-প্রেমময়, বিনম্র, যিনি সব সময় শান্তি শিখিয়েছেন ... তার এমন অকাল তিরোধান, এটা গ্রহণ করা খুব কঠিন।’
তোহা মাত্র গত সপ্তাহেই তার পরিবারকে সাহায্য করার জন্য বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন, তিনি এখনো তার বাবার মৃত্যু মেনে নেননি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য তিনি হিরো, অনুপ্রেরণা, পিতা, সবকিছুই ছিলেন। জ্যেষ্ঠপুত্র হওয়ার কারণে আমার সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে ভাইদের মতো কিছুটা অনুভব করতাম।’
‘এটা আমাদের সকলের জন্য এক দুঃসহ বোঝা। আমি এখনো এটি গ্রহণ করতে পারছি না- আমি বুঝতে পারছি না কেন তাকে এবং তাদেরকে হত্যা করা হলো?’
কয়েক বছর আগে, সামাদ তার স্ত্রী ও তার জ্যেষ্ঠপুত্রকে বলেছিলেন যে, ‘তিনি যেখানেই মারা যান, সেখানেই তাকে যেন দাফন করা হয়, সেটা হোক বাংলাদেশ বা নিউজিল্যান্ড।’
তার ইচ্ছানুসারে গত শুক্রবার অন্যান্য কয়েকজন ভিকটিমের মতো তাকেও লিনউড কবরস্থানে দাফন করা হয়।
বিশ্বের অন্য দিকে, ওহাইয়োতে সোলন নামক একটি শহরে, কয়েকশ’ মানুষ ক্রাইস্টচার্চ হত্যার শিকারদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য জড়ো হয়েছিল।
শাজু শাহজাহান মাইক্রোফোনটি গ্রহণ করেন এবং তার সেরা বন্ধু সম্পর্কে কথা বলেন। সামাদ গ্রামীণ বাংলাদেশে বড় হয়েছিলেন, কিন্তু নিউজিল্যান্ডের একটি মসজিদে তার জীবনের আলো নিভে গেল।
ক্লিভল্যান্ড জিউশ সংবাদমাধ্যমকে শাহজাহান সাজু বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে ড. সামাদের সঙ্গে বড় হয়েছিলাম।’
‘তিনি মেধাবী, দয়ালু, ধার্মিক এবং চাপা স্বভাবের এক নিরহঙ্কারী ব্যক্তি ছিলেন।’
[নিউজিল্যান্ডের স্টাফডটকো-এর সৌজন্যে, প্রকাশিত]

ভেবেছিলাম যদি একটি মানুষকেও বাঁচানো যায় -বনানীর হিরো একজন নাঈম by শুভ্র দেব

চারদিকে বাঁচাও বাঁচাও আর্তি। সড়কে মানুষের আহাজারি। ফায়ার সার্ভিসের লোকজনের প্রাণপণ চেষ্টা। কিন্তু সবাই অসহায়। বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুন ডালপালা ছড়াচ্ছে। ধোঁয়াও আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে গোটা ভবন। এ ধোঁয়ার রেশ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশে। কেউ কেউ হাত নেড়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন।
কেউবা উপর থেকে প্রাণ বাঁচাতে লাফ দিচ্ছে নিচে। চোখের সামনে উপর থেকে লাফিয়ে পড়ছে বাঁচার জন্য। কিন্তু বাঁচা যে তার হলো না। হাজারো মানুষের চোখের সামনে ছটফট করতে করতে মারা গেল। এ দৃশ্য দেখে সবাই কেঁদে ওঠে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন লম্বা পাইপ দিয়ে পানি দিচ্ছে। সময় যাচ্ছে গড়িয়ে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসছে না। লম্বা পাইপের এক জায়গায় ছিদ্র। তা দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়। একটু পানিও সে সময় মহামূল্যবান। একটুও পানিও যেন বৃথা না যায়। আগুন নেভাতে যেন সাহায্য করে। তাইতো চোখের সামনে এ পানি অপচয় দেখে স্থির থাকতে পারেনি ছোট্ট নাঈম। পলিথিন পেঁচিয়ে সেখানে পা দিয়ে ঠেসে ধরে। চোখে মুখে তার অন্যরকম অভিব্যক্তি। তাইতো নাঈমের ছবি এখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। সে এখন মানবতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। গোটা দেশে সে এখন এক হিরো। ভালোবাসার হিরো। মানবতার হিরো। মনকে নাড়িয়ে দেয়ার হিরো। ওই মুহূর্তে তার এ কাজ এফআর ভবনে আটকে পড়াদের বাঁচানোর। আটকে পড়াদের আকুতি তার মনকে ছুঁয়ে গেছে। তাইতো ছোট্ট নাঈম তার সেরাটা দিয়ে এ চেষ্টা।
নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই হিরোর নাম মো. নাঈম ইসলাম। বনানীর অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে সে সবার হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে। আট বছর বয়সী এই বালক মায়ের সঙ্গেই থাকে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে। তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের বানারিপাড়া উপজেলায়। ছোট বেলা থেকেই সে ঢাকায় থাকে। তার বাবা রুহুল আমীন ডাব বিক্রেতা ও মা নাজমা বেগম বাসা বাড়িতে রান্নার কাজ করেন। দুই ভাই বোনের মধ্যে সে বড়। নাঈম বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের আনন্দ স্কুলের পঞ্চশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। আর তার সাত বছর বয়সী বোন কাজল চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে অনেক দিন ধরে আলাদা থাকেন। অন্যের বাসায় কাজ করে তার মা যা আয় করেন তা দিয়েই চলে সংসার।
শুক্রবার অনেক খোঁজাখুুঁজির পর সকাল ১১টার দিকে দেখা মিলে নাঈমের। ওইদিন কি হয়েছিল জানতে চাইলে নাঈম বলে, অনেক মানুষ পুড়ে মরে গেছে। অনেক মানুষ বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল কিন্তু তাদের বাঁচানো যায়নি। ভেবেছিলাম সবাই সুস্থভাবে ঘরে ফিরে যাবে তা আর হয়নি। বাঁচার জন্য অনেকে উপর থেকে লাফ দিয়েছে। শুনেছি তারাও মরে গেছে। চোখের সামনে এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য আর কখনই দেখিনি। অগ্নিকাণ্ডের খবর কিভাবে তার কাছে পৌঁছায় এমন প্রশ্নে নাঈম জানায়, শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত তার স্কুলে যেতে হয়। ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার স্কুল ছুটির পর সে বাসায় যায়। স্কুলের কাপড় খোলার আগেই তার মা তাকে জানান বনানীতে আগুন লেগেছে তাই টিভি চালানোর জন্য। টিভি চালানোর পর সে আগুন লাগার খবর পায়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে দৌড়ে চলে আসে বনানী। 
নাঈম বলে, ঘটনাস্থলে আসার পর দেখি হাজার হাজার মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছে। আমার অবস্থান ছিল আরএফ ভবনের পেছনের অংশে। চারদিক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নেয়ার উপায় ছিল না। বাতাসে ভেসে আসছে শুধু পোড়া গন্ধ। আগুন লাগা ভবনের উপরে নিচে কান্না আর চিৎকারের শব্দ। ভবনের উপর তলা থেকে মানুষ বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছিল। তাদের বাঁচার আকুতি দেখে মনে হচ্ছিল কিছু একটা করি। কিন্তু কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মানুষের চাপাচাপির মধ্যে দাঁড়াতেও পারছিলাম না। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা একদিকে আগুন নেভানোর চেষ্টা আর অন্যদিকে ভবনের মধ্যে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন। অন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যখন আমি আগুনের তাণ্ডব দেখছিলাম তখন আমার পায়ের পাশে ফায়ার সার্ভিসের একটি পানির পাইপ ছিল। ওই পাইপ লিক হয়ে পানি বের হয়ে যাচ্ছিল। তাই প্রথমে আমি হাত দিয়ে ওই পাইপ চেপে ধরেছিলাম। কিন্তু আমার ছোট হাত দিয়ে পানি আটকাতে পারছিলাম না। পরে একটি পলিথিন সংগ্রহ করে সেটি দিয়ে পাইপ পেঁচিয়ে পা দিয়ে চাপ দিয়ে ধরি। ভেবেছিলাম এক ফোঁটা পানিও যাতে নষ্ট না হয়। এক ফোঁটা পানি আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ করে যেন কাউকে জীবিত রাখে। নাঈম বলে, পাইপ চাপ দিয়ে ধরে শুধু সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছিলাম। ভেবেছিলাম যদি একটি মানুষকে অন্তত বাঁচানো যায়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি সেখানে ছিলাম। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বাসায় ফিরে গেছি।
তবে নিজের ভাইরাল হওয়া ছবি সম্পর্কে কিছুই জানতো না বলে জানিয়েছে নাঈম। অথচ ঘটনার পর পরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাইপ চেপে ধরা নাঈমের ছবি ভাইরাল হয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষ ভালোবেসে তার ছবি ছড়িয়ে দিয়েছে নেট দুনিয়ায়। ঘটনাস্থলে অনেকেই যখন সেলফি ও ভিডিও করা নিয়ে ব্যস্ত। তখন মানবিক এই কাজের জন্য সে গোটা দেশের সব মহলের মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। অনেকেই বলেছেন, নাঈম ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে দিয়েছে। ভাইরাল হওয়া ছবির প্রসঙ্গে নাঈম বলে, বনানীর আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হওয়ার পর আমি বাসায় যাই। তখন বস্তির মালিকের ভাগ্নে মেহেদি তার মোবাইলে একটি ছবি দেখিয়ে বলে আমার ছবি ফেসবুকে আসছে। তিনি আরো জানান, সেই ছবি লাখ লাখ মানুষ দেখতেছে। মানবিক ওই কাজ করার জন্য সবাই আমাকে বাহবা দিচ্ছে। নাঈম বলে, আমি জানি না কে আমার ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়েছে। ছবি দেখে প্রথম আমার খুব ভয় লেগেছিল। যদি কিছু হয় এই ভেবে। পরে সবাই যখন আমাকে বললো আমার এই কাজটির জন্য সবাই আমার প্রশংসা করছে তখন আর ভয় করেনি।
লেখাপড়ার পাশাপাশি নাঈমের সময় কাটে খেলাধুলা ও পুলিশের সঙ্গে। তার স্বপ্ন লেখাপড়া করে বড় পুলিশ অফিসার হয়ে জনগণের সেবা করা। পুলিশের সঙ্গে মেলামেশাটাও তার অনেক দিনের। গুলশান-১ ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। গত তিন বছর ধরে সে ওই ট্রাফিক বক্সে আসা যাওয়া করে। গুলশান এলাকার ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক ইকবাল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, নাঈমকে আমরা অনেক আগে থেকেই চিনি। আমাদের সঙ্গে প্রায়ই সময় কাটায়। আমরা যা খাই সে তা খায়। অনেক সময় দেখা যায়, সে নিজে থেকে আমাদের গাড়ি পরিষ্কার করে দেয়। দোকান থেকে কিছু আনার কথা বললে এনে দেয়। আবার পরিচিত যে কেউ কোনো কাজের জন্য বাসা বাড়িতে যাওয়ার কথা বললে চলে যায়। ইকবাল হোসেন বলেন, নাঈম অনেক মিশুক প্রকৃতির।
এজন্য সবাই তাকে ভালোবাসে। তার মা নাজমা বেগমও আমাদের এখানে আসেন। তিনি আমাদের বলে দিয়েছেন আমরা কেউ যেন তাকে টাকা পয়সা না দেই। শুধু যেন লেখাপড়া করে এই উৎসাহ দেই। এরপর থেকে আমরা তাকে লেখাপড়ার কথাই বলি। আর বনানীর অগ্নিকাণ্ডের দিন সে যে কাজ করেছে এটা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার এমন মানবিক কাজের জন্য ধন্যবান নয় ভালোবাসাই দেয়া যায়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাঈমের মানবিক কাজ ও লেখাপড়া করে পুলিশ অফিসার হওয়ার ইচ্ছার কথা জেনে তার দায়িত্ব নিয়েছেন এক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। ওমর ফারুক সামি নামের ওই প্রবাসীর বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জে। তিনি নাঈমকে পাঁচ হাজার ডলার ও লেখাপড়ার যাবতীয় খরচের দায়িত্ব নিয়েছেন। গতকাল এই প্রবাসী জানান, তিনি নাঈমের কাজে খুবই খুশি হয়েছেন। তিনি জেনেছেন সে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করছে। তার স্বপ্ন পুলিশ অফিসার হওয়া। তাই তার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য তিনি এ দায়িত্ব নিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে পাঁচ হাজার ডলার তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে।

যুদ্ধে জড়াবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন?

খুব বেশি দিন আগেও চীনের উত্থানকে হুমকি হিসেবে দেখা হতো না। মনে করা হতো, উঠতি এই অর্থনীতি বরং উদারনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়েই চলবে। কিন্তু আগের সেই ধারণা এখন ভেঙে গেছে। চীনকে এখন আর শুধু উঠতি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। চীনকে বরং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবেই দেখছেন অনেকে। আশঙ্কা রয়েছে, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্ব গড়াতে পারে যুদ্ধ পর্যন্তও!
বিবিসির এক প্রতিবেদনে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলফার সেন্টারের অধ্যাপক গ্রাহাম এলিসন বলছেন, একটি উঠতি শক্তির প্রতিষ্ঠিত কোনো শক্তির জন্য হুমকি হয়ে ওঠার বিষয়টিকে বলা হয় ‘থুকিডাইডিসের ফাঁদ’। থুকিডাইডিস ছিলেন এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে হওয়া পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের সময়কার একজন ইতিহাসবিদ। দীর্ঘ ৫০০ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে এলিসন দেখেছেন, অন্তত ১৬ বার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে উঠতি শক্তি ও প্রতিষ্ঠিত শক্তি মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ১২ বারই তাদের দ্বন্দ্ব যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
প্রাচীন গ্রিক সাম্রাজ্যে এথেন্স যেমন স্পার্টার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে জার্মানি যেমন ব্রিটেনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, চীনও তেমনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলিসনের ভাষায়, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বই বর্তমানে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক উপাদান’।
তবে এলিসনের সঙ্গে সবাই একমত নন। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ওশান রিসার্চের অধ্যাপক ও চীনের অন্যতম খ্যাতিমান নৌ-বিশ্লেষক হু বো বলেছেন, ‘আমার মনে হয় দুই পক্ষের ক্ষমতার যে ভারসাম্য, সেটি থুকিডাইডিসের তত্ত্বকে সমর্থন করে না।’ যদিও চীনের উত্থান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ, কিন্তু তার পরও চীনের সামগ্রিক শক্তিমত্তাকে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনাযোগ্য বলে মনে করেন না তিনি।
কিন্তু এই যে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থা, সেটিই তাদের যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। উপরন্তু চীনের নৌবাহিনীর বর্তমান যে কাঠামো, সেটি বিশ্বের যেকোনো দেশের নৌবাহিনীর চেয়ে কোনো অংশেই কম শক্তিশালী নয়। মার্কিন নেভাল ওয়ার কলেজের কৌশলবিদ্যা বিষয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু এরিকসনও একমত এই বিষয়ে। তিনি বলছেন, ‘চীনের বর্তমান নৌকাঠামো শুধু আজকের প্রেক্ষাপটেই নয়, বরং ইতিহাসের যেকোনো সময়ের সঙ্গে তুলনা করলেও আকর্ষণীয় বলতে হবে।’
দুই পক্ষের মধ্যে এমন দ্বন্দ্ব চলা অবস্থায় চীন চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র যেন সংকটের সময় সহজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। যদি চীন তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন সেখানে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। বরং চীন চায় আমেরিকাকে সমুদ্র উপকূলে অপেক্ষারত অবস্থায় রাখতে।
দুই দেশের এমন কূটনৈতিক অবস্থানের পেছনে নেতাদের ব্যক্তিত্বের অবদানও রয়েছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের এশিয়া স্টাডিজ বিভাগের পরিচালক এলিজাবেথ ইকোনমি বলেছেন, চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং হলেন এমন একজন পরিবর্তনকামী নেতা, যিনি কিনা বৈশ্বিক পর্যায়ে চীনের অবস্থানকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান।
একইভাবে আমেরিকাও তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। রাশিয়ার পাশাপাশি চীনকেও তারা ‘শুদ্ধিবাদী’ শক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন চীনকে তাদের সমপর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করছে।
অনেকে আশঙ্কা করছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হতে পারে। তবে বিংশ শতাব্দীর মার্কিন-সোভিয়েত স্নায়ুযুদ্ধের সঙ্গে এই স্নায়ুযুদ্ধের একটি বড় পার্থক্য হলো, আমেরিকা ও চীনের অর্থনীতি একে-অন্যের সঙ্গে বেশ গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এই বিষয়ই তাদের দ্বন্দ্বকে নতুন এক মাত্রা দিচ্ছে। এ যুদ্ধ বরং রূপ নিতে পারে প্রযুক্তিগত কর্তৃত্ব বিস্তারের যুদ্ধে।
আপাতত এই প্রযুক্তিগত দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে আছে চীনা টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি হুয়াওয়ে। ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ নেটওয়ার্কে হুয়াওয়ের কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি হুয়াওয়ের ওপর অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে নিজেদের মিত্রদের ওপরও চাপ দিচ্ছে তারা।
এ থেকে একটি বিষয় অন্তত পরিষ্কার, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত বিষয়ে প্রাধান্য বিস্তার করতে চলেছে চীনই। আর প্রযুক্তিগত উন্নতির ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন।
দুই পরাশক্তি এখন কৌশলগত দিক থেকে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। হয় তারা উদ্বেগজনক পরিস্থিতিকে জিইয়ে রাখবে, আর নয়তো পুরোপুরি সাংঘর্ষিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বে। সময়েই এর উত্তর মিলবে।

প্রিয়াঙ্কা নির্ভার, মোদির হুংকার by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

অর্ধেক উত্তর প্রদেশের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি এই প্রথম। এই প্রথম কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় দলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। কিন্তু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এত বড় গুরুদায়িত্ব প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মনে তেমন কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি। তাই হয়তো এমন হাসিঠাট্টার মধ্যে কংগ্রেসের হয়ে প্রচারাভিযান তিনি চালিয়ে যেতে পারছেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেন বৃষস্কন্ধ। দলের সব দায় যেন তাঁর একারই। এবারের ভোট তাই ‘মোদি বনাম অন্যরা’। লড়াইয়ের অভিমুখও তিনি ঘুরিয়ে দিয়েছেন পশ্চিমের প্রতিবেশীর দিকে। এই নির্বাচনী যুদ্ধের থিম তাঁর কাছে দেশপ্রেম বনাম দেশদ্রোহ।
আমেথি-রায়বেরিলির জনপদ প্রিয়াঙ্কার কাছে অতি চেনা আঙিনা। ভোটের আগে সেই আঙিনায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ তিনি আগেও করেছেন। এবার তার পরিধি বেড়েছে। লক্ষ্ণৌ থেকে বারানসি পর্যন্ত রাজ্যের ৪২টা লোকসভা কেন্দ্রে প্রচারের দায়িত্ব তাঁর। শুরু করেন তিন দিন ধরে বারানসি সফর দিয়ে। নদীপথে সেই ভ্রমণে তাঁর লক্ষ্য ছিল মাঝি-মাল্লা ও অতি সাধারণ মানুষজনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন। তারপর ফিরে গেছেন আমেথি-রায়বেরিলিতে। এরপর তাঁর গন্তব্য অযোধ্যা। হাসিঠাট্টার সঙ্গে চলছে তাঁর জনসম্পর্ক।
এই যেমন বুধবার রাতে আমেথি থেকে রায়বেরিলি যাওয়ার সময় দেখা গেল তার প্রথম ঝলক। উত্তর ভারতের বহু বছরের প্রথা, বড় দাঁড়িপাল্লার একদিকে প্রার্থীকে বসিয়ে অন্য পাল্লায় কখনো মিষ্টি, কখনোবা পিতল-কাঁসা-রুপার বাসন ওজন করা হয়। ওজন করা মিষ্টি বিতরণ করা হয় দলীয় কর্মী ও গ্রামবাসীর মধ্যে। বাসন বিক্রি করে সেই টাকা দেওয়া হয় দলীয় তহবিলে। বুধবার রাতে প্রিয়াঙ্কার জন্যও অপেক্ষায় ছিল ফুল-পাতায় মোড়া ওই রকমই এক দাঁড়িপাল্লা ও ডাঁই করা মিষ্টি।
প্রিয়াঙ্কা কিন্তু চমৎকার এড়িয়ে গেলেন সেই প্রথা। ওজনের কাছে দাঁড়িয়ে সহাস্যে দলীয় কর্মীদের কাছে জানতে চাইলেন তাঁর ওজন কি ১০০ কেজি? হাসতে হাসতে কাছে থাকা স্থানীয় নেতাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা কি মনে করেন আমার ওজন এক কুইন্টালেরও বেশি?’ উত্তর শুনে হাসিতে ফেটে পড়া প্রিয়াঙ্কাকে দেখে স্থানীয় নেতারা ঘাড় নাড়তে শুরু করেন। প্রিয়াঙ্কা সেই ফাঁকে স্থানীয় এক নেতাকে ‘আপনি বসে পড়ুন’ বলে এগিয়ে যান।
পরের দিন গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁর দুটি মন্তব্য অন্য এক রাজনৈতিক জল্পনা উসকে দেয়। রায়বেরিলি সফরের সময় স্থানীয় কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কেউ কেউ দাবি জানান, প্রিয়াঙ্কাই যেন রায়বেরিলি থেকে ভোটে দাঁড়ান। সোনিয়া গান্ধীর নাম রায়বেরিলি থেকে ইতিমধ্যেই ঘোষিত। কিন্তু এখনো তিনি রায়বেরিলি আসতে পারেননি নানা কারণে। প্রিয়াঙ্কা দলীয় নেতা-কর্মীদের সেই কথা জানালে কেউ কেউ তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেন। উত্তরে হাসিমুখে প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘বারানসি থেকে নয় কেন?’
বারানসি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী কেন্দ্র। সাত দফার ভোটের শেষ পর্ব ১৯ মে, সেদিন সেখানে ভোট। বারানসির জন্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার অনেক সময় রয়েছে। অন্য দলের প্রার্থীদের নামও ঘোষণা হয়নি। প্রিয়াঙ্কার হাসিমুখের মন্তব্য অন্য রকমের জল্পনার জন্ম দিল।
প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে কংগ্রেস যখন সরকারের পাঁচ বছরের ‘সার্বিক ব্যর্থতা’, চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি, কৃষি-সমস্যা, নোট বাতিল, জিএসটি, রাফাল দুর্নীতি ও কাছের শিল্পপতিদের তোষণের অভিযোগ তুলে ধরছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রচারে তখন উঠে আসছে এক দৃঢ় সরকার, যে সরকার পাকিস্তানকে মুখের ওপর জবাব দিয়ে দেয়। সরকার নিশ্চিত করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। গত বুধবার পশ্চিম উত্তর প্রদেশের মিরাট এবং গতকাল বৃহস্পতিবার ওডিশায় নির্বাচনী জনসভায় মোদি দেশের নিরাপত্তার বিষয়টিই বড় করে তুলে ধরেন। ওডিশার কোরাপুটে তিনি টেনে আনেন পাকিস্তানের বালাকোটে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিতে বিমান হানার বিষয়টি। বিরোধীদের কটাক্ষ করে তিনি বলেন, বিমান হানার এক মাস পরও পাকিস্তান সেখানে লাশ গুনছে, অথচ বিরোধীরা তার প্রমাণ চাইছে। তারা ‘মিশন শক্তি’ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
পাঁচ বছর আগে নরেন্দ্র মোদির স্লোগান ছিল ‘আচ্ছে দিন’। পাঁচ বছর পর সেই স্লোগানের নামগন্ধও উচ্চারিত হচ্ছে না। এবারের লড়াই ‘দেশপ্রেম বনাম দেশদ্রোহ’-এর। প্রধানমন্ত্রীর দুদিনের নির্বাচনী প্রচার সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
মোদিকে একহাত নিলেন প্রিয়াঙ্কা
কদিন আগেই নির্বাচনে দাঁড়ানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন। এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করে বসলেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। প্রধানমন্ত্রীর পুরো বিশ্বে ঘোরার সময় আছে, কিন্তু নিজ আসনের গ্রামে যাওয়ার সময় নেই, এমন মন্তব্য করেছেন প্রিয়াঙ্কা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে জানা যায়, আজ শুক্রবার উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা। সেখানেই মোদির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘বারানসিতে গিয়ে আমি জানতে পারলাম, গত পাঁচ বছরে প্রধানমন্ত্রী একবারের জন্যও তাঁর নির্বাচনী এলাকার একটি গ্রামেও যাননি। এটা শুনে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছি। তিনি আমেরিকায় গিয়েছেন, জাপানে গিয়েছেন, চীনে গিয়েছেন, পুরো বিশ্বেই গিয়েছেন। কিন্তু যাঁরা তাঁকে ভোট দিলেন, তাঁদের সঙ্গে একবার দেখা করার সময় হয়নি তাঁর। দেশের বাকি মানুষের কথা তো ছেড়েই দিলাম, নিজ আসনের মানুষদের জন্যও তিনি কিছুই করেননি।’
মোদির পাশাপাশি বিজেপি সরকারকেও একহাত নিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, ‘এটি হেলাফেলা করার মতো কোনো বিষয় নয়, এটি একটি বড় ইস্যু। এর মধ্য দিয়ে সরকারের উদ্দেশ্যই পরিষ্কার হয়। এই সরকার ধনীদের আরও ধনী করতে ব্যস্ত, গরিবদের সাহায্য করার ব্যাপারে কোনো নজর নেই তাদের।’
বর্তমান সরকার ‘জনতাবিরোধী’ ও ‘কৃষকবিরোধী’ সরকার—এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি। জনগণের উদ্দেশে প্রিয়াঙ্কা আরও বলেছেন, ‘আপনারা কাকে আপনাদের মূল্যবান ভোট দিয়েছেন, সেটি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখার সময় এসে গেছে।’
তিন দিনের নির্বাচনী প্রচারণার সফরের শেষ দিনে আজ উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা ও ফৈজাবাদে গিয়েছিলেন ৪৭ বছর বয়সী প্রিয়াঙ্কা। ২০০৯ সালের নির্বাচনে ফৈজাবাদে জয় আদায় করে নিয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু ২০১৪ তে বিজেপির কাছে ফৈজাবাদসহ উত্তর প্রদেশের সব কটি আসনই হারায় তারা। এবার তাই উত্তর প্রদেশকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে কংগ্রেস।

বন্ধ হচ্ছে না বোমা মেশিন দিয়ে অবৈধ পাথর উত্তোলন by সাবিবুর রহমান সাবিব

মাটির নিচে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হওয়ার জন্য ভূমিধস ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বেড়ে চললেও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ড্রিল ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন। এসব মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করে ইতিমধ্যে কেউ কেউ কোটিপতি ও কেউ কেউ লাখপতি হলেও অনেক এলাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার কিছু এলাকা ও তেঁতুলিয়া উপজেলার বহু এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ মিটার গভীর হাজার হাজার গর্তের সৃষ্টির পাশাপাশি উন্মুক্ত ও অপরিকল্পিতভাবে পাথর তোলার জন্য শত শত একর জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে। সহজে অর্থবিত্তশালী হওয়ার জন্য মেশিন মালিক ও অন্য সংশ্লিষ্টরা পরিবেশ ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠার কারণে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রকৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি এরই মধ্যে করতোয়া, ডাহুকসহ কয়েকটি নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এক শ্রেণির অর্থলোভী ও সুযোগ সন্ধানী লোকজন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও পাথর বালু সমিতির কিছু নেতাকর্মীর সহযোগিতায় ৩৫ থেকে ৪০ হর্সের ড্রেজার ও বোমা মেশিন বিভিন্ন নদী, নদী তীরবর্তী এলাকা, সমতল খাসজমি ও ফসলি জমিসহ পুকুরে বসিয়ে পাথর তুলছে। তেঁতুলিয়া উপজেলার কিছু এলাকায় বিশেষ করে ডাহুক, সাও ও করতোয়া নদীর বুক চিরে রাত ১১টা থেকে সকাল পর্যন্ত এমনকি কখনো দিনদুপুরেও চলছে প্রায় ৩০০ ড্রিল ড্রেজার ও বোমা মেশিন। ভজনপুর থেকে শুরু করে কালিয়ামনি, জয়গুণজোত, ঝালেঙ্গীগছ, শিবচন্ডি, ধান শুকা, পীরের ডাঙ্গা, আঠারো খাড়ি, শিয়াল খাওয়া, শুকানী ইত্যাদি এলাকা এমনকি ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত করতোয়া ও সাও নদীতে পাথর তোলা হচ্ছে। নিচু এলাকা ছাড়াও সিপাহীপাড়ার লিচুবাগান, ভদ্রেশ্বর, ফকিরহাট, গোলান্দিগছ, গণাগছ, ঘগার খাল, কুকুরমুহা, শান্তিনগর, কীর্তনপাড়া প্রভৃতি সীমান্ত এলাকার সমতল ভূমি থেকেও ড্রেজার দিয়ে পাথর তোলা হচ্ছে।
অথচ সীমান্ত এলাকার দুই কিলোমিটারের মধ্যে সকল প্রকার পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নিকটস্থ বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা তাতে কোনো বাধা দিচ্ছেন না বলে এলাকার লোকজন অভিযোগ করে জানিয়েছে সারারাত উচ্চ শব্দে ড্রেজার চলার জন্য ওইসব এলাকার দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষেরা ঘুমাতে পারছে না। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে ড্রিল ড্রেজার মেশিন দিয়ে মাটির গভীর থেকে পাথর উত্তোলন করায় তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাটির নিচে হাজার হাজার গর্ত তৈরি হয়েছে। ডাহুক, করতোয়াসহ কিছু নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ভূমিকম্পে ভূমিধস ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, এভাবে পাথর উত্তোলনে জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। ওই জমিতে দীর্ঘদিন কোনো ফসল হবে না এমনকি বন্যায়ও তলিয়ে যেতে পারে এলাকাগুলো। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সময়ে সদর উপজেলার মীরগড়, সাতমেরা ও জিয়াবাড়ি এলাকায় বেশকিছু ড্রিল ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হয়। এখনো কাকপাড়া, ভেলকুপাড়া ও প্রধানপাড়া এলাকার কয়েকটি স্থানে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র মতে, এক সময় যারা ড্রেজারের শ্রমিক ছিল তারাই এখন ড্রেজার মেশিনের মালিক। এদের পেছনে মূল ইন্ধনদাতা ও সিন্ডিকেটের মূল হোতা ভজনপুর এলাকার আবু বক্কর, গণাগছ এলাকার এসারুল ইসলাম ও শালবাহান এলাকার শেখ ফরিদ। এরা এখন কোটিপতি। অন্য সুবিধাভোগীরা হয়েছে লাখপতি। মেশিন চালুর আগে সন্ধ্যার পর ড্রেজার মালিকদের পুলিশের পক্ষে সবুজ সংকেত দেয়া হয়। স্থানীয় লাইনম্যানরা পুলিশসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করতে প্রতি রাতে মেশিনপ্রতি নেয় ৮ হাজার টাকা। সে হিসেবে ৩০০ মেশিন থেকে এক রাতে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এ টাকা পরদিন সুবিধাভোগীদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়া হয়। বক্কর নামের এক সিন্ডিকেট নেতা নিজেই ছিল পাথর শ্রমিক। এখন সে কোটিপতি। তার রয়েছে আলিসান বাড়ি। এছাড়াও পাঁচটি ট্রাক্টর, নিজস্ব ওয়ার্কশপ ছাড়াও রয়েছে নামে বেনামে কয়েক কোটি টাকার জমি। ১০০টির বেশি ড্রেজারে তার শেয়ার রয়েছে। এখন সে নিজেই পরিচালনা করছে কোটি কোটি টাকার পাথর ব্যবসা। এসারুল এক সময় দিন মজুরের কাজ করতো। দুটি ট্রাক্টর, জমি, পাথরের ব্যবসাসহ এখন সে প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক। আর শেখ ফরিদও আগে ছিল শ্রমিক।
এভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকসহ নানাভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ করে আসছে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনসহ স্থানীয় মানুষ। প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান, মানববন্ধন, প্রতিবাদী নাটক মঞ্চস্থ, সড়ক অবরোধ, ফেসবুকে প্রতিবাদসহ নানাভাবে প্রতিবাদ হয়েছে। তবুও বন্ধ হচ্ছিল না। এরপর গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্থানীয় তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘জাগ্রত তেঁতুলিয়া’র উদ্যোগে ড্রেজার মেশিন বিরোধী ব্যাপক প্রতিবাদ চলে। এক পর্যায়ে তারা তেঁতুলিয়া চৌরাস্তায় সম্মিলিত প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয়। তখন নড়েচড়ে উঠে পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু পরে তৎপরতা ঝিমিয়ে পড়ে।
জেলা পাথর বালু ব্যবসায়ী যৌথ ফেডারেশনের সভাপতি হাসিবুল হক প্রধান বলেন, আমরা ড্রেজার ও বোমা মেশিন বিরোধী। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ড্রেজার ও বোমা মেশিনের সঙ্গে যারা জড়িত ও সুবিধাভোগীদের নামের তালিকা করে সম্প্রতি তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল ফেরদৌস তালিকা পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তালিকাটি অসম্পূর্ণ। তালিকায় ড্রেজার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের নাম দেয়া হয়নি। চুনোপুটিদের নাম দেয়া হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

উচ্ছেদের পর পানি আসছে তুরাগ চ্যানেলে

দখল উচ্ছেদের পর খননকাজ শুরুর মাস না পেরোতেই পানি ওঠা শুরু হয়েছে তুরাগ নদের চ্যানেলে। মোহাম্মদপুর এলাকায় আমিন মোমিন হাউজিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান তুরাগের চ্যানেলটি ভরাট করে আবাসন গড়ে তুলেছিল। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বলছে, আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যেই চ্যানেলটির খননকাজ পুরোপুরি শেষ হবে। আর মে মাসে তা উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তখন আগের রূপে ফিরবে এই চ্যানেল।
ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গত ২৯ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম দফায় অভিযান চালায় বিআইডব্লিউটিএ। প্রথম দফায় চালানো অভিযানের শেষ দিনে অবৈধভাবে গড়ে তোলা আমিন মোমিন হাউজিংয়ের সব স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয় দফার অভিযানে ৬ মার্চ থেকে সেখানে খননকাজ শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ।
গত  শুক্রবার সরেজমিনে দেখা গেছে, খননকাজ শেষ না হলেও ওই চ্যানেলের কয়েকটি স্থানে পানি ওঠা শুরু হয়েছে। ছোট-বড় ১২টি এক্সকাভেটর দিয়ে সেখানে খনন করা হচ্ছে। খননকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা জানালেন, দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই খননের কাজ হচ্ছে। খননকাজ শুরুর পর সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
খনন শুরুর পর এই কাজের সার্বিক তদারক করছেন বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ও ঢাকা নদীবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২ হাজার ৮০০ মিটার দীর্ঘ এবং ২৫০ মিটার চওড়া এলাকাজুড়ে খননকাজ চলছে। পুরোটা চ্যানেল খনন করতে হলে আট লাখ ঘনমিটার মাটি তুলতে হবে। গত ২৩ দিনের খননে ৩০ ভাগ কাজ শেষে হয়েছে।
এপ্রিলের মধ্যে খনন শেষ করার পরিকল্পনা বিআইডব্লিউটিএর। আসন্ন বর্ষায় এই চ্যানেল দিয়ে নৌযান চলাচল করতে পারবে বলে সংস্থাটি আশাবাদী। তাঁরা বলছেন, দুই দিন আগে নৌসচিব আবদুস সামাদ চ্যানেল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। চ্যানেলটিকে নৌ পর্যটনের একটি বিশেষ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ঢাকা শহরের চারদিকের নদ-নদীর ভরাট অংশ অপসারণের জন্য আরও ড্রেজার ও বেসরকারি এক্সকাভেটর নিয়োজিতকরণের জন্য তিনি বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে
বেসরকারি এক্সকাভেটর দিয়ে এত দিন আমিন মোমিন হাউজিংয়ের ভরাট করা অংশ খনন করছিল বিআইডব্লিউটিএ। এবার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার দিয়ে সেখানে পুরোদমে কাজ শুরু করতে চাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা আরিফ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আজ শনিবার থেকে মোহাম্মদপুর এলাকার তুরাগতীরে আমিন মোমিন হাউজিংয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ড্রেজার দিয়ে খননকাজ শুরু হবে। এ জন্য তুরাগের ওই পথ হয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। তিনি বলেন, এই নৌপথে বালুবাহী নৌযান চলাচল করে।
আরিফ উদ্দিন বলেন, ইতিমধ্যে নৌযান চলাচলে বিধিনিষেধের বিষয়টি জরুরি নৌ বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যত দিন খননকাজ চলবে, তত দিন এই পথ হয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা বন্ধ থাকবে।
এদিকে উচ্ছেদ অভিযানে ভেঙে ফেলা ভবনগুলোর ইট, বালু ও সুরকি সরানোর কাজও শুরু করেছে বিআইডব্লিউটিএ। গতকাল মিরপুর বড় বাজার এলাকা থেকে এই কাজ শুরু হয়েছে।

Saturday, March 30, 2019

কুমিল্লা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন: প্রস্তুত প্রশাসন, ‘রাতে ভোট’ চান না কেউ

কাল রোববার সকাল থেকে কুমিল্লার সাতটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট নেওয়া শুরু হবে। ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা বিরাজ করছে। তবে সুষ্ঠুভাবে ভোট নেওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বিএনপি এবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জন করছে। এ কারণে এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের মধ্যে হবে মূল লড়াই। দলীয় প্রার্থীদের বিপরীতে রয়েছেন একই দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা। তাঁরা বলছেন, সুষ্ঠু ভোট হলে তাঁরাই জয়ী হবেন। আর দলীয় প্রার্থীদের আশা, উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বেগবান করতে মানুষ নৌকা প্রতীকেই ভোট দেবেন।
আগের রাতে ব্যালট বাক্স যাতে না ভরা হয়, সে নিরাপত্তা চান আওয়ামী লীগের দলীয় ও বিদ্রোহী উভয় প্রার্থীরাই। ভোটের দিন স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকবে—এমন আশাও তাঁদের।
তিতাসে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পারভেজ হোসেন সরকার বলেন, বহিরাগত সন্ত্রাসী, আগের রাতে ভোট কাটাকাটি ঠেকানো ও ভোটকেন্দ্রে ভোটারের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা (বুড়িচং, হোমনা, চান্দিনা ও মুরাদনগর উপজেলা) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টরা সকালে গিয়ে ব্যালট পেপার ও বাক্স যাচাই করতে পারবেন। রাতের বেলায় ভোট হলে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হবে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, কাল বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, মুরাদনগর, চান্দিনা, তিতাস, হোমনা ও মেঘনা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট নেওয়া হবে। এ সাতটি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ২৪ জন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২৯ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২২ জনসহ ৭৫ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। এতে ৪৮৭ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ৩ হাজার ২১৫ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও ৬ হাজার ৪৩০ জন পোলিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, অস্ত্রধারী আনসার, নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম রয়েছেন।
সাতটি উপজেলায় ৪৮৭টি ভোটকেন্দ্রে ভোটার ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৪ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৭ লাখ ৩৪৪ জন ও নারী ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮০ জন। ৪৮৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রার্থীরা।
বুড়িচং উপজেলা পরিষদে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আবুল হাসেম খান বলেন, ‘ভারেল্লা উত্তর, ভারেল্লা দক্ষিণ, ময়নামতি ও মোকাম ইউনিয়নে প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে হবে। ব্যালট পেপার ও বাক্স ভোটের আগের রাত থেকেই হেফাজতে রাখতে হবে।’
ওই সাত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ভোট নেওয়া হবে। এর মধ্যে মেঘনা উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ৫ জনসহ মোট প্রার্থী ১৫ জন, মুরাদনগরে চেয়ারম্যান পদে ৪ জনসহ ১৪ জন, বুড়িচংয়ে চেয়ারম্যান পদে ৩ জনসহ ১২ জন, তিতাসে চেয়ারম্যান পদে ২ জনসহ ১০ জন ও হোমনায় চেয়ারম্যান পদে ৬ জনসহ ১০ জন, ব্রাহ্মণপাড়ায় চেয়ারম্যান পদে ২ জনসহ ৮ জন ও চান্দিনায় চেয়ারম্যান পদে ২ জনসহ ৬ জন প্রার্থী রয়েছেন।
মেঘনায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুস সালাম ও মো. তাজুল ইসলাম বলেন, তাঁরা নির্বাচনে প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব চান না। প্রভাবমুক্ত নির্বাচন চান না। ভোটাররা যাঁকে ভোট দেবেন তিনি জয়ী হলে অসুবিধা নেই।
ব্রাহ্মণপাড়ার বিদ্রোহী প্রার্থী মুহাম্মদ আবু তাহের বলেন, নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে নিয়ে মিছিল–মিটিংয়ে থাকা মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী কলেজের তিন প্রভাষককে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা পদে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সরাতে হবে। সিল দিয়ে জাল ভোট মেরে একতরফা নির্বাচন ঠেকাতে হবে।
চান্দিনায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি ও তাঁদের সন্তানদের অযাচিত প্রভাব ভোটের দিন দেখতে চাই না।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও রিটার্নিং কর্মকর্তা (তিতাস, মেঘনা ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা) কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনগণের তথা ভোটারদের সন্তুষ্টি ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা ভোটকেন্দ্রে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। মানুষ শান্তিতে ভোট দিতে পারবেন। গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনের বাড়তি নজরদারি রয়েছে।’

মানবপাচার চক্র: ভানুয়াতুতে ১০১ বাংলাদেশির দুর্বিষহ জীবন by দীন ইসলাম

প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতু গিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন ১০১ জন বাংলাদেশি। এদের মধ্যে ১৮ বছরের কম দুইজন রয়েছেন। বাংলাদেশিরা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন না। পাশাপাশি পাচ্ছেন না ভালো চিকিৎসা সেবা। এজন্য জীবন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন তারা। দেশে কবে ফিরতে পারবেন এটাও জানেন না। মূলত ভালো বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ওই দেশটিতে কাজের আশায় নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। কাজ দূরে থাক, এখন ওই বাংলাদেশিদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে ভানুয়াতু সরকার।
বিষয়টি সম্পর্কে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ জেনেছে।
এ বিষয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটিতে আটক বাংলাদেশি হারুন অর রশীদ এর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি দেয়ার নামে দালালরা ১৫-২০ লাখ টাকা করে নেয়। এরপর ভারত, সিঙ্গাপুর ও ফিজি হয়ে দ্বীপরাষ্ট্রটিতে নিয়ে আটকে রেখে পালিয়ে গেছে দালালরা। গত দুই বছরে এরকম ১০১ জন অভিবাসী প্রত্যাশী অস্ট্রেলিয়ার নিকটবর্তী দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুতে আটকা পড়েছেন। আপাতত তাদের পোর্ট ভিলার তিনটি বাড়িতে রাখা হয়েছে। ভানুয়াতু সরকার তাদের খাবারের ব্যবস্থা করছেন।
জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা আইওএমের হয়ে ভানুয়াতু হিউম্যান রাইটস কোয়ালিশন নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এই বাংলাদেশিদের সহায়তা দিচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি, ভানুয়াতু ও অস্ট্রেলিয়াতে ভালো চাকরি দেবার নামে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন ভানুয়াতুতে আটক আছেন তারা। হারুন অর রশিদ নামে আটকা পড়া একজন বাংলাদেশি মুঠোফোনে মানবজমিনকে বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা হবে এই আশ্বাসে আমি আত্মীয়স্বজন এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ভানুয়াতু আসি। এখন দেশে ফিরে যেতে হলে সেই ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই। আমরা যদি এখানে থাকার সুযোগ পাই, কোনো কাজ আমরা পাব না। আবার দেশে ফিরে গেলে কী হবে, সেটাও ভাবতে পারছি না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভানুয়াতুতে শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া চার বাংলাদেশি মানবপাচারকারীকে আটক করেছে ভানুয়াতু কর্তৃপক্ষ? আটককৃতদের আদালতে হাজির করার প্রক্রিয়া চলছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১০১ জনের তথ্য চেয়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)- এর মাধ্যমে ভানুয়াতু সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এখনও পর্যন্ত সরকার ১০১ জন সম্পর্কে কোনো তথ্য পায়নি। আইওএম সূত্রে জানা গেছে, আটকে থাকা বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দেশটির আদালতের নির্দেশের অপেক্ষায় আছে ভানুয়াতু সরকার। আদালতের সিদ্ধান্তের আগ পর্যন্ত ওই ১০১ বাংলাদেশিকে ভানুয়াতু সরকারের দেয়া খাবার আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সঙ্গে নিয়ে সেখানেই দিন কাটাতে হবে। কারণ ওই মানবপাচার মামলায় তাদের সবাইকে সাক্ষী করা হয়েছে। সেখানে তাদের কাজের সুযোগও দেয়া হচ্ছে না। মানবপাচারের মামলা আগামী মাসে ভানুয়াতুর আদালতে উঠবে। আদালতের নির্দেশনা পেলেই বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করবেন তারা। পাচারকৃতদের সূত্রে জানা গেছে, তারা টাঙ্গাইল ও বরিশাল অঞ্চলের একটি পাচারচক্রের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন? এ চক্রটি চাকরি দেবার নাম করে তাদের ভারত, সিঙ্গাপুর ও ফিজি হয়ে ভানুয়াতুতে নিয়ে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১০১ জন বাংলাদেশিকে পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চার বাংলাদেশিকে ২০১৮ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তার করেছে ভানুয়াতু সরকার। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দুই জন ভানুয়াতুতে মিস্টার প্রাইস নামে একটি গৃহস্থালী ও আসবাবপত্রের কোম্পানি চালাতেন। এদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে জানানো হয়, ভানুয়াতুতে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই? তবে গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার মাধ্যমে তারা আটকে থাকা এ বাংলাদেশিদের বিষয়ে জানতে পেরেছেন বলে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অফিসিয়ালি কাজ শুরু হলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশের দূতাবাস।

ঢাকার রাস্তায় ছোট্ট সুপারম্যান -আনন্দবাজারের প্রতিবেদন

পরনে নীল পোশাক, গলায় বাঁধা লাল স্কার্ফ উড়ছে পিছনে। যেন সুপারম্যান হাজির ঢাকার রাস্তায়। বনানীর জতুগৃহ এফ আর টাওয়ারে লাগা আগুনের লেলিহান শিখার সঙ্গে দমকলের কর্মীরা যখন লড়ছেন, জলের পাইপের লিক বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বসে ছিলেন সুপারম্যান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে লাগা আগুন ২৫টি প্রাণ নিয়ে নিয়ন্ত্রণে এসেছে সন্ধ্যা পেরোতেই। দমকল, পুলিশ তো ছিলই, ছিলেন সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সদস্যরাও। কিন্তু সাধারণ মানুষও যে পিছিয়ে ছিলেন না, সেই ছবি রাতেই ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। ছোট্ট একটি ছেলে এক দলা প্লাস্টিক নিয়ে লিক বন্ধ করতে বসে রয়েছে দমকলের জলের পাইপের ওপরে। সেই ছবিই কার্টুনে ফিরে আসে, ছোট্ট ছেলেটি যেন সুপারম্যান!তবে ঢাকার সুপারম্যান যে নেহাতই ছোট্ট, বয়স বড়জোর ১০ কি ১১! ফেসবুকে প্রথম তার পরিচয় জানান বনানীতে দায়িত্বে থাকা পুলিশের সার্জেন্ট সোহেল রানা— ‘আরে এ যে নাইম!’ জানিয়েছেন, ছেলেটি থাকে কড়াইল বস্তিতে। মাঝে মাঝে এসে আলাপ জমায় পুলিশ বক্সে।
তার বাবা অন্য কোথাও বিয়ে করে সংসার করছে। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। মামি খেতে দিলে খেতে পায়, না হলে জোটে না। এর মধ্যেও বস্তির আনন্দ স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, কারণ বড় হয়ে সে পুলিশ হতে চায়। সার্জেন্ট লিখেছেন, ‘আমরা তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিই। আমার সঙ্গে থাকতে ভালবাসে সে। তার দুঃখের কথা বলে। ছোট্ট ছেলে, কিন্তু বড় সুন্দর কথা বলে নাইম।’
গত কাল দুপুরে ৩২ নম্বরের এফ আর টাওয়ারে আগুন ছড়িয়ে পড়তে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। নাইমও বসে থাকেনি। লম্বা পাইপ এঁকে বেঁকে যে জল নিয়ে আসছে, দমকলের কর্মীরা তা ছড়িয়ে আগুন নেভাতে চেষ্টা করছেন। তেমনই একটা পাইপে একটা ফুটো দেখতে পেয়ে প্রথমে হাতে করে চেপে ধরে নাইম। তাতেও জল বেরিয়ে আসছে দেখে শুয়ে পড়ে সেটা বুকে চেপে ধরে। সেই সময়ে কিছু প্লাস্টিক এনে দেয় কেউ। তা দিয়েই অদম্য জেদে লিক বন্ধ করে বসেছিল ছোট্ট ছেলেটি। টানা কয়েক ঘণ্টা।শুক্রবার সকাল হতেই খোঁজ পড়ে নাইমের। পুলিশ গিয়ে নিয়ে আসে তাকে। মুখে লাজুক হাসি নিয়ে বলে, ‘‘আমি মানুষের সাহায্য করেছি। মানুষের উপকার করার চেষ্টা করেছি।’’ যেন— এ আর কী! সে দিন অনেক মানুষই কিন্তু ঘটনাস্থলে ভিড় জমিয়েছিলেন মোবাইলে ছবি আর নিজস্বী তুলতে। সে ভিড় সরাতে হিমশিম খেয়েছে দমকল আর পুলিশ। তার ছবি যে ভাইরাল হয়েছে, নাইম কি জানে? ঘাড় নেড়ে সে বলে, ‘‘হ, আমি শুনসি। আমারে অনেকে কইসে!’’ লাজুক কণ্ঠেই নাইম পাশে দাঁড়ানো সার্জেন্ট রানাকে দেখিয়ে জানিয়েছে, ‘‘আমি বড় হয়ে এই স্যরের মতো হইতে চাই। পুলিশ হইতে চাই। পুলিশ হইলে মানুষের সাহায্য করা যাইব!’’
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা