Saturday, June 13, 2026

আরব শাসকেরা তলেতলে যেভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে আঁতাত করে চলেছে by মুস্তাফা ফেতৌরি

গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আরব বিশ্বের প্রায় সব দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়েছে। যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, তারাও নানা সময়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছে। কিন্তু এই প্রকাশ্য নিন্দার আড়ালে বাস্তব চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন।

যেসব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে (বিশেষ করে আব্রাহাম চুক্তির স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো, পাশাপাশি জর্ডান ও মিসর), তারা তাদের মৌলিক সম্পর্কগুলো আগের মতোই বজায় রেখেছে। অর্থাৎ বাইরে যতই কঠোর ভাষা ব্যবহার হোক, ভেতরে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের কাঠামো বদলায়নি।

ফলে দেখা গেছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগ আগের মতোই চলেছে, শুধু প্রকাশ্যে কিছুটা সতর্ক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আরব বিশ্বের এসব স্বাভাবিকীকরণকারী দেশের কেউই এমন কোনো কঠোর কূটনৈতিক বা আইনি পদক্ষেপ নেয়নি, যা ইউরোপের কিছু অ-আরব দেশ পর্যন্ত নিয়েছে। এমনকি ব্রিটেনও মানবাধিকার উদ্বেগের কারণে ইসরায়েলে কিছু অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স আংশিকভাবে স্থগিত করেছে।

এর বিপরীতে আরব দেশগুলো ইসরায়েলের ওপর কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক, আইনি বা কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেনি, যা তাদের সম্পর্কের কাঠামোকে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারত।

এখানেই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়। আরব রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ফিলিস্তিনকে বারবার ‘কেন্দ্রীয় ইস্যু’ বা ‘আরব বিশ্বের প্রধান বিষয়’ বলা হয়। আরব লিগের প্রায় সব নথিতেই এই বক্তব্য নিয়মিতভাবে থাকে। এমনকি অর্থনৈতিক বা পরিবেশবিষয়ক সম্মেলনের ঘোষণাতেও একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু বাস্তবে গাজার সংকট ঘিরে সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর নীতিগত অবস্থানের কোনো মিল নেই। রাস্তায় মানুষ যতই প্রতিবাদ করুক, সরকারগুলোর নীতি অপরিবর্তিত থেকেছে।

আরব বিশ্বের গণমাধ্যমেও এই দ্বৈততা স্পষ্ট। সরকারি টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমগুলো ইসরায়েলের আগ্রাসনের সমালোচনা করে ঠিকই, তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন বা মরক্কোর মতো দেশে এই আলোচনা আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বা প্রায় অনুপস্থিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজেদের সরকারের নীতির সমালোচনা কার্যত নিষিদ্ধ।

আমি নিজেও টেলিভিশন আলোচনায় অংশ নিয়ে দেখেছি, কীভাবে এই বিষয়ে গভীর আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়। আমি একটি লিবীয় টিভি চ্যানেলকে আরব বিশ্বের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তা হয়নি। কারণ হিসেবে আমাকে জানানো হয়, চ্যানেলটি জর্ডানভিত্তিক হওয়ায় এমন আলোচনা করলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমস্যা হতে পারে। একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল তুরস্কভিত্তিক আরেকটি চ্যানেলেও।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। আরব দেশগুলোর হাতে ইসরায়েলের ওপর বিনিয়োগ প্রত্যাহার বা বাজারে প্রবেশ সীমিত করার মতো চাপ তৈরির মতো বড় অর্থনৈতিক হাতিয়ার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর কিছুই ব্যবহার করা হয়নি।

উল্টোভাবে, বাণিজ্য স্বাভাবিকভাবেই চলেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্য বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত একাই ইসরায়েলে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পধাতু, যা ইসরায়েলের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে আম্মান, কায়রো বা কাসাব্লাঙ্কার রাস্তায় যখন মানুষ প্রতিবাদে উত্তাল, তখন সরকারগুলো কার্যত বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখেছে।

এই পুরো পরিস্থিতি আরব বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। আগে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরব সরকারগুলো কিছুটা হলেও সতর্ক থাকত; কারণ, জনরোষের ভয় ছিল। কিন্তু এখন সেই সমীকরণ বদলে গেছে। আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো জনমতকে নীতিনির্ধারণ থেকে কার্যত আলাদা করে ফেলেছে।

অনেক ক্ষেত্রে এই নজরদারি প্রযুক্তি এসেছে ইসরায়েলি কোম্পানির কাছ থেকেও। ফলে একদিকে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে উন্নয়নমূলক প্রকল্প—এই দুইয়ের সমন্বয়ে সরকারগুলো জন–অসন্তোষকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রভাব ফেলতে দিচ্ছে না।

মিসর ও জর্ডানের মতো দেশে সীমিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু তা কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকে। নির্দিষ্ট এলাকায় মানুষকে ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়, যাতে তাদের আবেগ সেখানেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যখনই সেই ক্ষোভ চুক্তি বাতিল বা সীমান্ত বন্ধের দাবির মতো নীতিগত পরিবর্তনের দাবি তোলে, তখনই নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে তা দমন করে।

এর মধ্য দিয়ে বার্তাটি পরিষ্কার। তা হলো জনরোষ সহ্য করা যায়, কিন্তু তা রাষ্ট্রের কাঠামো বদলাতে পারবে না।

লিবিয়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। একসময় মুয়াম্মার গাদ্দাফির আমলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশটি সক্রিয় ছিল। কিন্তু এখন অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে দেশটি কার্যত অকার্যকর। ফলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই।

সব মিলিয়ে গাজার যুদ্ধ আরব বিশ্বের এক গভীর দ্বৈততা প্রকাশ করেছে। একদিকে প্রকাশ্য নিন্দা, অন্যদিকে সম্পর্ক ও বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ।

আরব লিগের বিবৃতিগুলো অনেক সময় এমনকি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব অবস্থানের চেয়েও বেশি কঠোর শোনায়, যা সংগঠনটির দুর্বলতাই প্রকাশ করে।

এই বাস্তবতা দেখায়, কীভাবে রাষ্ট্রগুলো জনগণের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আর একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখছে।

এই নীতি হয়তো স্বল্প মেয়াদে স্থিতিশীলতা দিচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি এক গভীর নৈতিক সংকট তৈরি করছে। কারণ, জনমত ও রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে এত বড় ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

গাজার ট্র্যাজেডি তাই শুধু যুদ্ধের গল্প নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির এক গভীর পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি—যেখানে নিন্দা আছে, কিন্তু বাস্তবে চলছে ব্যবসা; আর নৈতিকতার জায়গা দখল করছে কৌশলগত স্বার্থ।

* মুস্তাফা ফেতৌরি, লিবিয়ার একাডেমিক ও স্বাধীন সাংবাদিক। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ফ্রিডম অব দ্য প্রেস’ পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক।
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।

গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরব নেতাদের বৈঠকের পর। রিয়াদ, সৌদি আরব, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরব নেতাদের বৈঠকের পর। রিয়াদ, সৌদি আরব, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। এএফপি

ইরানের সংবাদমাধ্যমে চুক্তির ফাঁস হওয়া শর্তগুলোকে ‘ভুয়া’ বললেন ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, কী আছে প্রতিবেদনে

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সম্প্রতি একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত প্রকাশ করে। এরপরই দেশটির ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

শুক্রবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি প্রকাশিত শর্তগুলোকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘লিখিতভাবে যেসব শর্তে সম্মতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে এর কোনোই সম্পর্ক নেই।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এরা চুক্তির ক্ষেত্রে চরম অসৎ। এদের সঙ্গে সৎ উদ্দেশ্যে কোনো চুক্তি করার সুযোগ নেই।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই যুদ্ধের একটি টেকসই সমাধানের চেষ্টা চলছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের এই বিবৃতি এসেছে।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, একটি চুক্তি ‘অনুমোদন’ হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। তবে তাঁর নতুন এই বিবৃতি প্রমাণ করে, চুক্তির অগ্রগতি এখনো বেশ নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সেখানে তিনি জানান, যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের এত কাছাকাছি তাঁরা এর আগে কখনোই পৌঁছাননি।

শর্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত গণমাধ্যমগুলোকে অনুমাননির্ভর খবর প্রকাশ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান আরাগচি। ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে আরাগচির এই বার্তার একটি স্ক্রিনশটও পোস্ট করেছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন

ট্রাম্প তাঁর পোস্টে ইরানের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেননি। তবে ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা চুক্তির সাতটি ‘মূল শর্ত’ প্রকাশ করে। এর পরপরই ট্রাম্প ওই পোস্ট দেন।

এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধ সাময়িক বন্ধ রাখার একটি চুক্তি হয়েছিল। এর পর থেকে স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মূল বিষয়গুলোতেই মতবিরোধ চলছিল। ইরনার ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরান কার্যত কোনো ছাড়ই দেয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো মতৈক্য হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ৬০ দিন পর এ বিষয়ে নতুন আলোচনা শুরু হবে।

একইভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার বিষয়েও ইরান একমত হয়নি বলে এতে উল্লেখ করা হয়। প্রাথমিক চুক্তিতে কেবল ওই নৌপথে স্বাভাবিক চলাচল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি আছে। তেহরান ওমানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে বলে ইরনার প্রতিবেদনে জানানো হয়।

ইরনার প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসন ও হামলা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইরানের জব্দ করা সম্পদের একটি অংশ ছাড় দেওয়া হবে। সম্পদের বাকি অংশ ছাড়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে পরে আলোচনা হবে।

তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইরানের কোনো তহবিল ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। শুক্রবার তিনি বলেন, চুক্তির অধীনে ইরান নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলেই কেবল এই তহবিল ছাড় দেওয়া হবে।

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যেভাবেই হোক আমাদের জন্য একটি ভালো ফলাফল নিয়ে আসবেন।’

ওভাল অফিসে একটি ঘোষণাপত্রে সই করার আগে বক্তব্য দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস, ওয়াশিংটন ডিসি। ১১ জুন ২০২৬
ওভাল অফিসে একটি ঘোষণাপত্রে সই করার আগে বক্তব্য দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস, ওয়াশিংটন ডিসি। ১১ জুন ২০২৬ ছবি: এএফপি

ট্রাম্পের সমর্থক ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের বড় অংশ ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তুষ্ট

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থকদের অন্যতম প্রধান অংশ ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের প্রায় অর্ধেকই মনে করেন, ইরান যুদ্ধ ও অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে তাঁদের বোঝাপড়া বা বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানরা (প্রটেস্ট্যান্ট শাখার অন্তর্গত একটি প্রধান ও প্রভাবশালী ধর্মীয় ধারা) ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রায়ই নিজেদের নীতি ও লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করেন। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনেও এই ভোটার গোষ্ঠী ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।

৩ থেকে ৮ জুন পরিচালিত ওই জরিপে অংশ নেওয়া ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের ৫৪ শতাংশ বলেছে, ইরানে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত তাদের খ্রিষ্টধর্মের ব্যাখ্যার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিপরীতে ৪১ শতাংশ মনে করে, এটি খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একইভাবে ৫১ শতাংশ বলেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না। ৪৪ শতাংশ এর বিপরীত মত দিয়েছে।

তবে এসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও ইভানজেলিক্যালদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে এখনো বেশি। সর্বশেষ জরিপে এ গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর সমর্থন হার ৫২ শতাংশ। গত আগস্টে তা ছিল ৬১ শতাংশ। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার ৩৫ শতাংশ।

সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের বড় অংশ রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনে শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল ভোটারদের ৮১ শতাংশ ট্রাম্পকে ভোট দেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁর একটি বড় পদক্ষেপ ছিল সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীল বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা। পরে সেই আদালত গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার স্বীকৃত একটি ঐতিহাসিক রায় বাতিল করে দেন, যা বহু ইভানজেলিক্যালের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প নিয়মিত ধর্মীয় নেতাদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের কর্মস্থলে নিজেদের ধর্মীয় মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও নীতিগত কিছু পরিবর্তন এনেছেন।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স দাবি করেন, ধর্মপ্রাণ মার্কিন নাগরিকদের জন্য ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো প্রেসিডেন্ট কখনো ছিলেন না। তাঁর ভাষায়, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং গর্ভপাতবিরোধী আন্দোলনকারীদের ক্ষমা করার মাধ্যমে ট্রাম্প খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসীদের বড় অংশের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচন এগিয়ে আসছে

জরিপের ফলাফল রিপাবলিকান পার্টির জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ, মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলটিকে কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে হবে।

ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী ইভানজেলিক্যাল ভোটার স্যান্ডি মিলার বলেন, সুযোগ পেলে তিনি আর ট্রাম্পকে ভোট দিতেন না। স্যান্ডির ২৪ বছর বয়সী মেয়ের স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত সরকারি সহায়তা ট্রাম্প প্রশাসনের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতির চেয়েও তাঁর ভোটের সিদ্ধান্তে ধর্মীয় বিশ্বাস বেশি প্রভাব ফেলবে।

স্যান্ডির মতে, ট্রাম্প হয়তো খ্রিষ্টান। কিন্তু তাঁর আচরণে সেটি সব সময় প্রতিফলিত হয় না। তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না, সব সমস্যার সমাধান যুদ্ধ করে হয়। কখনো কখনো যুদ্ধ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটি অপরিহার্য ছিল কি না, আমি নিশ্চিত নই।’

স্যান্ডি বলেন, দেশের নেতারা যেন সঠিক সিদ্ধান্ত নেন, সে জন্য তিনি প্রতিদিন প্রার্থনা করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি চাই, আমাদের রাজনীতিকেরা কথা বলার চেয়ে বেশি প্রার্থনা করুন।’

জরিপে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের সক্ষমতা নিয়ে অনেক ইভানজেলিক্যাল সন্তুষ্ট নন।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে। ফলে অর্থনৈতিক বিষয়েও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে সব ইভানজেলিক্যাল ভোটার ট্রাম্পের সমালোচক নন। আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ৭৭ বছর বয়সী ভোটার কনি রিস মনে করেন, ইরানে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে বাইবেলভিত্তিক যুক্তি রয়েছে। তিনি বলেন, কোনো দেশের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। আর ইসরায়েলের অস্তিত্বকে তিনি ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের অংশ হিসেবে দেখেন।

কনি রিসের ভাষায়, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঈশ্বরের বাণীতে বর্ণিত একটি ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব রূপ। সে কারণে আমি ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সমর্থন করি।’

রয়টার্স/ইপসোসের এই জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ হাজার ৫৩১ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি : এএফপি

মাস্কের ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত টাকা, চাঁদে ২০০ বার যাতায়াতসহ তাতে আর কী কী সম্ভব

মার্কিন রকেট নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে যাত্রা শুরুর পরপরই বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা লাখ কোটিপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন ইলন মাস্ক।

মাত্র একজনের হাতে এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকতে পারে, তা একসময় ভাবাই যেত না।

গতকাল শুক্রবারের আগপর্যন্ত ‘ট্রিলিয়ন’ বা এক লাখ কোটি ডলারের এ হিসাবটি শুধু বিশ্বের গুটিকয় বড় অর্থনীতির জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) বা বিশাল ঋণের ক্ষেত্রেই শোনা যেত। এ ছাড়া গত এক দশকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কিছু কোম্পানির মোট মূল্যের ক্ষেত্রে এ সংখ্যার ব্যবহার দেখা গেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে, তারই ধারাবাহিকতায় মাস্ক এ নতুন খেতাব পেলেন।

বছর বছর বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি ব্যক্তিদের ক্লাবে নতুন সদস্য যুক্ত হচ্ছেন। আবার এ শতকোটিপতিদের মধ্যে কেউ কেউ আরও ধনী হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে নামী তারকারাও রয়েছেন। অথচ ঠিক একই সময় বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রথম কোনো ব্যক্তির ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার এ ঘটনা অনেকে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

‘এক লাখ কোটি’ বা ওয়ান ট্রিলিয়ন সংখ্যাটি মানুষের পক্ষে সহজে কল্পনা করাও কঠিন। ১ লাখ কোটি ডলার হলো ১ বিলিয়নের (১০০ কোটি) ১ হাজার গুণ বেশি। আর ১ মিলিয়নের (১০ লাখ) ১ মিলিয়ন বা ১০ লাখ গুণ বেশি। ১ ট্রিলিয়ন লিখতে ১–এর পর ১২টি শূন্য (১,০০০,০০০,০০০,০০০) দিতে হয়।

প্রসঙ্গত, ইলন মাস্কের এক লাখ কোটি (এক ট্রিলিয়ন) ডলার বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করলে তা এত বিশাল একটি অঙ্কে দাঁড়াবে, যা সাধারণ হিসাবের বাইরে। বর্তমানে (২০২৬ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী) এক মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ১২৩ টাকা। এ দর ধরে এক লাখ কোটি ডলার সমান ১২৩ লাখ কোটি (১২৩ ট্রিলিয়ন) টাকা! সহজ কথায় ও দেশীয় সংখ্যা গণনার পদ্ধতিতে এটি হলো—১২৩,০০০,০০০,০০০,০০০ টাকা।

মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল শেয়ারবাজারে স্পেসএক্সের দুর্দান্ত অভিষেকের পর মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ আসলে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি (১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে। তাঁর এ সম্পদের বেশির ভাগই রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বা স্টক হিসেবে।

এই এক লাখ কোটি ডলার দিয়ে কী কী করা সম্ভব, তা বোঝার জন্য কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

২০০ বারের বেশি চাঁদে যাওয়া ও ফিরে আসা

এক ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত বড় অঙ্কের টাকা, সেটা কল্পনা করা সত্যিই কঠিন। ঠিক যেমন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স মহাকাশ জয়ের এক বিশাল স্বপ্ন দেখছে, আর তা এখনো বাস্তব হওয়ার অনেক বাকি।

এক ট্রিলিয়ন ডলার কাগজের নোট যদি একটার পর একটা লম্বালম্বিভাবে সাজানো হয়, তবে তা প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ মাইল (প্রায় ১৫ কোটি ৬০ লাখ কিলোমিটার) পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এটি পৃথিবী থেকে চাঁদে ২০০ বারের বেশি যাতায়াতের সমান দূরত্ব। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৫ মাইল (প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার)। এ ছাড়া ডলারের নোটের ওই বিস্তৃতি পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মাইলের (প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার) দূরত্বকেও ছাড়িয়ে যাবে।

পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের জন্য ১২২ ডলার

ইউএস সেনসাস ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আজ পৃথিবীতে প্রায় ৮২০ কোটি (৮ দশমিক ২ বিলিয়ন) মানুষ বাস করছে। যদি এক ট্রিলিয়ন ডলার এ পুরো মানবগোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে প্রত্যেকে প্রায় ১২২ ডলার (প্রায় ১৫ হাজার টাকা) পাবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জিডিপির দ্বিগুণ

এক ট্রিলিয়ন ডলার হলো দক্ষিণ আফ্রিকার বার্ষিক জিডিপির দ্বিগুণের বেশি, যে দেশে ইলন মাস্ক জন্মগ্রহণ করেছেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্য ও পরিষেবার মোট উৎপাদন মূল্য প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন (৪৮ হাজার কোটি) ডলার।

আজ বিশ্বের মাত্র ২১টি দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পার করতে পেরেছে। এ তালিকায় যথাক্রমে ৩২ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার ও ২০ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সবার আগে রয়েছে, যা অন্যান্য দেশের অর্থনীতির চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ লাখ বাড়ি কেনা সম্ভব

ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব সেন্ট লুইসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া একটি মাঝারি মানের বাড়ির গড় দাম প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার ২০০ ডলার। এ হিসাবে মাস্কের এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ২৫ লাখ বাড়ি একবারে কিনে নেওয়া সম্ভব।

২৪ হাজার ৩০০ কোটি গ্যালন জ্বালানি তেল

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) হিসাবমতে, গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন জ্বালানি তেলের দাম ছিল প্রায় ৪ দশমিক ১১ ডলার। এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে এ চড়া দামেও ২৪ হাজার ৩০০ কোটি (২৪৩ বিলিয়ন) গ্যালনের বেশি তেল কেনা সম্ভব।

সহজে বোঝার জন্য বলা যায়, পুরো গত এক বছরে সব মার্কিন মিলে যত গাড়ি চালিয়েছেন, তাতে খরচ হয়েছিল মোটে ১৩ হাজার ৭০০ কোটি গ্যালন তেল। অর্থাৎ এক ট্রিলিয়ন ডলারের তেল দিয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সব গাড়ি প্রায় দুই বছর চালানো যাবে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে তেলের দাম বেশ কম ছিল। কিন্তু ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্র এতে জড়িয়ে পড়ায় তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে আগুন লাগায় দীর্ঘ চার বছর পর এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন তেলের দাম চার ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনীর চেয়ে ৭০০ বিলিয়ন ডলার এগিয়ে

ফোর্বসের তালিকায় এ মুহূর্তে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হলেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ। গতকাল দুপুরের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯ হাজার ৪০০ কোটি (২৯৪ বিলিয়ন) ডলার। এ বিশাল অঙ্কও কিন্তু এক ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে পুরো ৭০ হাজার ৬০০ কোটি (৭০৬ বিলিয়ন) ডলার কম।

পরিসংখ্যানটি আরও চমকপ্রদ করতে বলা যায়, ফোর্বসের তালিকায় মাস্কের ঠিক পেছনে থাকা পরবর্তী চার ধনীর পুরো সম্পদ যদি একসঙ্গে যোগ করা হয়, তবেই শুধু তা এক ট্রিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছাবে।

ল্যারি পেজ ছাড়া এ চারজনের অন্য তিনজন হলেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন (২৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার), অ্যামাজনের জেফ বেজোস (২৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলার) ও ওরাকলের ল্যারি এলিসন (২৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার)। এই চারজনের সম্পত্তি যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৫ ট্রিলিয়ন ডলার।

অবশ্য, শেয়ারবাজারের ওঠানামার কারণে ধনকুবেরদের এ সম্পত্তি প্রতিদিন, এমনকি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেও শত শত কোটি ডলার বদলে যেতে পারে, যেমন মাস্কের কথাই ধরা যাক, ২০২৪ সালে তাঁর সম্পত্তি ছিল ১৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, যা গত বছর বেড়ে হয়েছিল ৩৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার। আর স্পেসএক্সের আইপিও শেয়ারবাজারে আসার সুবাদে তা এখন রকেটের গতিতে বেড়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে!

ধনকুবের ইলন মাস্ক
ধনকুবের ইলন মাস্ক। ছবি: এপির ভিডিও থেকে নেওয়া ছবির স্ক্রিনশট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তির সম্ভাবনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালির কাছে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে গতকাল শুক্রবার দুপক্ষই ইঙ্গিত দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, উভয় পক্ষ একটি খসড়া চুক্তির রূপরেখা বিষয়ে একমত হয়েছে। ওয়াশিংটন দুই–এক দিনের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরের আশা করছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, চুক্তিতে এখনো কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে। তবে এ প্রাথমিক সমঝোতা দেখিয়ে দিয়েছে, চলতি সংঘাত থেকে তাঁর দেশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে আরাগচি বলেন, ‘ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে।’

এদিকে এসব মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা হরমুজ প্রণালির দিকে যাওয়া ইরানের কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র বলেছে, ড্রোনগুলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছিল।

পরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। বলেছে, জলপথটি জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা আছে।

ইরানের সংবাদ সংস্থাগুলো বলেছে, হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের সিরিক বন্দর ও কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নৌ শাখার অনুমতি ছাড়া কিছু জাহাজ জলপথটি পার হওয়ার চেষ্টা করায় তাদের সতর্ক করতে গুলি ছোড়া হয়েছিল।

প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের বন্দরের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হবে বলে আলোচনায় যুক্ত বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। সূত্রগুলো আরও বলেছে, এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। এই কর্মসূচিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, এই সমঝোতা স্মারক ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য পূরণ করবে ও আলোচনাকে ‘খুবই ভালো অবস্থানে’ নিয়ে যাবে।

তবে পশ্চিমা, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্রে ফাঁস হওয়া খসড়া প্রস্তাবে এমন কিছু শর্ত আছে, যা ইরানের পক্ষে যেতে পারে বলে মনে হচ্ছে। এ জন্য ট্রাম্প এসব প্রতিবেদনকে ভুল উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে ছোটখাটো পার্থক্য থাকলেও মোটের ওপর ইরান যেসব দাবি করেছে, তার অনেকটাই মেনে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অপর দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুধু হরমুজ প্রণালি আবার খোলার বিষয়টি ছাড়া বড় কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পাননি। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তেহরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরান ও ওমান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে।

যুদ্ধের আগে এ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আনা–নেওয়া করা হতো।

আরাগচি আরও বলেন, ‘আমাদের শক্তি সব সময় হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকবে।’

একটি পশ্চিমা সূত্র বলেছে, সম্ভবত আগামীকাল রোববারের মধ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষর হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এটি স্বাক্ষর করতে পারেন। সম্ভাব্য স্থান হিসেবে জেনেভার কথা ভাবা হচ্ছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের স্থান হিসেবে ইউরোপের নাম শোনা গেলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

চুক্তিতে কী আছে

প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ইরানের কয়েক শ কোটি ডলার জব্দকৃত অর্থ ছেড়ে দেবে এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। এর বদলে ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেবে।

চুক্তির আরেকটি বড় অংশ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে এটি সমাধান করার কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাক, তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা সরিয়ে ফেলা হোক এবং দীর্ঘ মেয়াদে কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু থাকুক।

তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরান তার ইউরেনিয়াম পুরোপুরি ধ্বংস করতে রাজি নয়, বরং তারা চায় এটি কম সমৃদ্ধ অবস্থায় রেখে দেওয়া হোক।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, ইরানের জন্য সম্ভাব্য যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর দীর্ঘদিনের কিছু কঠোর দাবি শিথিল করতে পারে।

তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান চুক্তির শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত তাদের কোনো অর্থ ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে হবে ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে। ইরান শর্ত অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া সাপেক্ষে ধাপে ধাপে সুবিধা কার্যকর হবে।

ইসরায়েল এ চুক্তিতে নেই

ইসরায়েল এ সমঝোতার অংশ নয়। আলোচনায়ও তারা সরাসরি যুক্ত ছিল না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তাঁর দেশ এই চুক্তির অংশ হবে না।

নেতানিয়াহু সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান হ্রাসের জন্য চাপ দিচ্ছে, যেন ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেছেন, এ চুক্তি লেবাননের যুদ্ধ থামাবে। ফলে ইসরায়েলকে কিছু দখলকৃত এলাকা থেকে সরে যেতে হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তারা কোনোভাবেই সেনা প্রত্যাহার করবে না। দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ইসরায়েল ভবিষ্যতে যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে নিজের মতো করে পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায়।

ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি রাস্তায় চলাচল করছেন লোকজন। সেখানে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতীকী মডেল প্রদর্শিত হচ্ছে। ১১ জুন, ২০২৬
ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি রাস্তায় চলাচল করছেন লোকজন। সেখানে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতীকী মডেল প্রদর্শিত হচ্ছে। ১১ জুন, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

সমুদ্রের মাঝে রহস্যময় ‘শীতল পিণ্ড’, বিজ্ঞানীরা হতবাক

বিশ্বজুড়ে যখন মহাসমুদ্রগুলোর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে, ঠিক তখন উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি বিশাল এলাকার পানি উল্টো শীতল হয়ে যাচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের দক্ষিণে অবস্থিত সাগরের এই অংশটিকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘কোল্ড ব্লব’ বা ‘ওয়ার্মিং হোল’।

নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এই রহস্যময় শীতল অঞ্চলটি আসলে বিশ্ব জলবায়ুর একটি বড় ধরনের মহাবিপর্যয়ের আগাম ও ভয়ঙ্কর সংকেত।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস হ্রাস পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক ছিল যে-বাতাস বা মেঘের পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে তাপ হারিয়ে এমনটা হচ্ছে, নাকি তাপ পরিবহনকারী সমুদ্রস্রোতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে এটি ঘটছে।

নতুন এই গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে, এটি মূলত সমুদ্রস্রোত দুর্বল হওয়ারই লক্ষণ, যা পৃথিবীর ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিজ্ঞানীরা জানান, আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন বা ‘অ্যামোক’ নামের এই সামুদ্রিক স্রোতব্যবস্থাটি মহাসাগরের একটি বিশাল কনভেয়ার বেল্টের মতো কাজ করে। এটি ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ পানি উত্তর গোলার্ধে নিয়ে আসে। সেখানে পানি ঠান্ডা ও ঘন হয়ে নিচে তলিয়ে যায় এবং পুনরায় দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। মানুষের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলে সাগরে প্রচুর স্বাদু পানি প্রবেশ করছে, যা এই স্রোতব্যবস্থার তাপ ও লবণের সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে ব্যাহত করছে। ফলে ‘অ্যামোক’ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

কিছু বিজ্ঞানীর আশঙ্কা, চলতি শতাব্দীর মধ্যেই এই স্রোতব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার মতো চূড়ান্ত বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে যেতে পারে।

গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, ‘অ্যামোক’ যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা বিশ্বজুড়ে বিপর্যয় ডেকে আনবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে, ইউরোপ তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও বরফের নিচে তলিয়ে যাবে এবং আফ্রিকায় মৌসুমি বায়ুর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেবে।

এই রহস্য উন্মোচনে জার্মানির পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা ও মহাসাগর বিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং গবেষণার অন্যতম লেখক স্টেফান রাহমস্টর্ফ ও তার দল স্যাটেলাইট ও বিভিন্ন যন্ত্র থেকে পাওয়া বাস্তব তথ্য এবং জলবায়ু মডেলের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তারা দেখতে পেয়েছেন, শীতলীকরণের এই প্রক্রিয়াটি কেবল সমুদ্রের উপরিভাগেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমুদ্রের গভীরেও ঘটছে, যেখানে বাতাস বা মেঘের মতো বায়ুমণ্ডলীয় উপাদানের প্রভাব খুবই কম।

অন্য কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১ হাজার বছরের মধ্যে এই স্রোতব্যবস্থাটি এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক ও বায়ুমণ্ডলীয় গবেষক রেনে ভ্যান ওয়েস্টেন এই গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, বিভিন্ন ডেটাসেটের সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল এই সিদ্ধান্তের নির্ভরযোগ্যতাকে আরো শক্তিশালী করেছে।

তবে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সমুদ্র ও জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড থর্নালি এবং যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের সিনিয়র জলবায়ু বিজ্ঞানী জোনাথন বেকার কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তাদের মতে, বাস্তব তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাপ্ত ডেটাসেটগুলোকে একদম নিখুঁত না ধরে একটি ভালো অনুমান হিসেবে দেখা উচিত।

তারা মনে করেন, এই গবেষণাটি কোল্ড ব্লবের পেছনে ‘অ্যামোক’-এর দুর্বলতার সপক্ষে বড় প্রমাণ যুক্ত করলেও, এটিই এই বিতর্কের শেষ কথা নয়।

সূত্র: সিএনএন

সমুদ্রের মাঝে রহস্যময় ‘শীতল পিণ্ড’,  বিজ্ঞানীরা হতবাক
ছবি: সিএনএন

মৃত্তিকা ও কালের কবি আল মুজাহিদী by সীমান্ত আকরাম

বিশ শতকের ষাটের দশকের একজন প্রধান কবি আল মুজাহিদী (১ জানুয়ারি, ১৯৪৩)। সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব এবং আত্মদর্শন ভাবনা তার কাব্যবোধকে প্রাতিস্বিক করেছে। মৃত্তিকা, মানুষ ও দেশের প্রতি গভীরতম মমত্ববোধ, ঐতিহ্য-কেন্দ্রিকতা, নিসর্গ ও নারীর প্রতি ঐকান্তিক সংবেদনশীলতা তার কবিতার শরীর ও আত্মা গঠন করেছে। কায়িক ও আত্মিক শক্তি-সামর্থ্য অর্জিত না হলে একজন সৃষ্টিশীল লেখক মাঝপথেই নিঃশেষিত হয়ে যেতে পারেন বলে কবি মন্তব্য করেন। এ মন্তব্য তার আত্মিক সমুৎকর্ষের এবং সৃষ্টিশীলতার প্রাতিস্বিক চ্যালেঞ্জের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ, উদ্ভিদ, গাছপালা, গুল্মলতা, বিহঙ্গরাজি প্রভৃতি সৃষ্টিকুল মৃত্তিকার উৎস থেকে আসা এবং মাটিতেই সেগুলো প্রত্যাবর্তিত হবে—এ বুদ্ধিবৃত্তিক বিজ্ঞানসম্মত তাত্ত্বিকতায় তিনি বিশ্বাস করেন বলে মাটির প্রতি তার অগাধ মমতা। মৃত্তিকা ও স্বদেশের প্রতি গভীরতম আকর্ষণবোধ কবিকে তার কাব্যবোধের স্বাতন্ত্র্যে উপনীত করেছে। যেকোনো শিল্পীর দর্শন মূলত মৃত্তিকা ও মানবকে কেন্দ্র করেই বিনির্মিত হয়। কবি আল মুজাহিদীর কবিতার দর্শন মৃত্তিকানির্ভর বলেই তাকে মৃত্তিকার কবি বলে অভিহিত করা হয়।

তার পিতা আবদুল হালিম জামালী নাট্যকার, নাট্য প্রযোজক এবং কুশীলব ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেছেন। উল্লেখ্য, তার পিতার নাট্যচর্চা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে তার অংশগ্রহণ, মুজাহিদীকে যথাক্রমে সাহিত্যচর্চা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভাবিত করেছে বলেই আমাদের মনে হয়। বহুরৈখিক সাহিত্য আঙ্গিকের প্রতি আকর্ষণবোধ আল মুজাহিদী অন্তঃশীলভাবে তার পৈতৃক সাহিত্যচর্চাসূত্রে লাভ করে থাকতে পারেন। তার পিতৃরক্তেই শুধু সাহিত্যচর্চা ছিল না; তার মা সাখিনা খানও গীত-রচয়িতা এবং সমাজসেবিকা ছিলেন। তার মা নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার চর্চাই শুধু করেননি; সে সমস্ত জ্ঞানের প্রচারও তিনি করেছেন। আল মুজাহিদী তার শিল্পবোধের নৈতিক পরিশীলন তার মাতৃরক্তসূত্রে জন্মগতভাবেই লাভ করেছেন বলে মনে করা যায়।

আল মুজাহিদী ষাটের দশকের স্বৈরাচারী সামরিক শাসক আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে ভূমিকা পালন করতে গিয়ে ছয়বার কারাবরণ করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকই শুধু নন; তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্বও। আন্তর্জাতিক ফোরামে বাঙালির গেরিলা যুদ্ধতত্ত্বের তিনি একজন ব্যাখ্যাতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিকতার ব্যাখ্যাকারও তিনি।

কবি আল মুজাহিদীর সাহিত্যশৈলী মূলত ষাটের দশকের আধুনিক কাব্যধারার সঙ্গে লোকায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তার লেখার ভাষা যেমন সংবেদনশীল, তেমনই তার ভাবনার জগৎ অত্যন্ত গভীর ও বিশ্বজনীন। সমাজবিজ্ঞানে তার ভালো দখল থাকার কারণে নৃতাত্ত্বিক, পৌরাণিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহ্যিক উপাদানকে তিনি অবলীলায় কাব্যের শিল্পনৈপুণ্যের সঙ্গে সাজাতে সমর্থ হয়েছেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান তার কবিতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘কবি আল মুজাহিদী প্রাচীন গ্রিক কাব্যের মৃত্তিকা বোধের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’। নামটিতে বোঝা যায় গ্রিক জীবনদর্শন তাকে কত প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। এ কাব্যগ্রন্থে তিনি চাঁদকে ছুঁয়ে দেখেছেন, নক্ষত্রকে স্পর্শ করেছেন এবং নীহারিকাপুঞ্জকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কখনো মৃত্তিকাকে ভুলতে পারেননি।’

মৃত্তিকাই কবির বোধের জায়গায় আশ্রিত ও ভাবনায় প্রোথিত। তিনি একটি কবিতায় বলেছিলেন—

‘আমরা পৃথিবীর প্রথম বৃক্ষের নীচে সান্ধ্য মানব-মানবী।’

এ পঙ্‌ক্তিতে প্রকৃতি, সময় এবং অস্তিত্বের একটি গভীর কাব্যিক ছোঁয়া রয়েছে। ‘পৃথিবীর প্রথম বৃক্ষ’ যেন আমাদের আদি উৎস, প্রকৃতি এবং ইতিহাসের প্রতীক। আর ‘সান্ধ্য মানব-মানবী’ বলতে হয়তো গোধূলি লগ্নে প্রকৃতির মাঝে আশ্রিত, চিন্তাশীল বা দার্শনিক মানবসত্তাকে বোঝানো হয়েছে।

অন্য একটি কবিতায় তিনি বলেছেন—

‘কৃষ্ণ গূঢ় অন্ধকারে জন্মাক মানুষ

পবিত্র আগুন

দেখো, পৃথিবী কেমন উর্বর ধ্বংসহীন

দেখো মৃত্তিকার ভালোবাসা কেমন প্রোজ্জ্বল,

ধ্বংসহীন-নারী

তুমি চলে এসো স্বর্ণমৃত্তিকার দেশে দ্রাবিড় বাংলায়, নারী।

অন্য একটি কবিতায় তিনি বলেছেন—

‘পৃথিবীর জনপদ-জোর আমার অস্তিত্ব’

অপর একটি কবিতায় বলেছেন—

‘প্রাণবন্ত করে তোল পৃথিবীর

প্রত্নবিম্ব : পোড়া বাড়ি।’

আদিম মৃত্তিকা দিয়ে এ পৃথিবী গড়া হয়েছিল গৌড় নগরীর সোনালি তোরণ এবং সভ্যতার চিলেকোঠা। তিনি কখনো নক্ষত্রের স্তূপে বসবাস করার কথা বললেও চূড়ান্তভাবে বলেছেন যে, মৃত্তিকায় ফিরে আসেন। কবি তার কাব্যগ্রন্থ ‘মৃত্তিকা, অতি মৃত্তিকা’, আর এ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার নাম সুমৃত্তিকা। কবিতাটির শুরুতে তিনি বলেছেন—

‘সুমৃত্তিকা, জানো পৃথিবীর সব থেকে বেশি দরকার

সুশীতল হাওয়ার

তুমি খুলে দেবে খিল সেই ঝরোকার?’

এ কাব্যগ্রন্থের সর্বশেষ কবিতায় মৃত্তিকাকে আবেদন জানিয়েছেন যেন সে চিরকালীন সংগীতের স্তবক উপহার দেয়। কেননা, সে হচ্ছে গোটা মানবজাতির অস্তিত্বের স্পন্দন। কবি তার শেষ আবেদন জানিয়েছেন—

‘তুমি গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব স্পন্দন

আমি আজ তোমার কাছেই ফিরে আসি

পদ্মা-মেঘনা-যমুনাবিধৌত পলল ভূমিতে

তুমিই আমার

আমি তোমার অখণ্ড গতির

মহাকাব্য।’

রোমান্টিক আত্মনিমজ্জন, তীব্র সমাজচেতনা, গ্রিক মিথোলজির ব্যবহার এবং মাটির কাছাকাছি থাকা—এই চার উপাদানের মিশ্রণই হলো আল মুজাহিদীর নিজস্ব লিখনশৈলী। আল মুজাহিদীর সাহিত্যশৈলীর কতিপয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে—

ক. গ্রিক জীবনদর্শন ও মৃত্তিকাবোধ : আল মুজাহিদীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’ নামটিতেই প্রাচীন গ্রিক জীবন-দর্শনের প্রভাব স্পষ্ট। তিনি তার কবিতায় মহাজাগতিক উপাদান (চাঁদ, নক্ষত্র, নীহারিকাপুঞ্জ) ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও সবসময় নিজের মাটির কাছে ফিরে এসেছেন। আদিম মৃত্তিকা বা আদি মাটি দিয়ে গড়া এই পৃথিবী এবং মানবসভ্যতার আদি রূপকে তিনি তার কবিতার মূল উপজীব্য করেছেন।

খ. লোকায়ত ঐতিহ্য ও স্বভূমি-চেতনা : তিনি মূলত স্বভূমি, স্বদেশ এবং সমতটের লোকায়ত ঐতিহ্যের বন্দনায় আত্মমগ্ন এক কবি। বাংলার চিরন্তন লোকজ রূপকল্প, লোকগাথা এবং গ্রামীণ জীবনধারা তার কবিতার ছত্রে ছত্রে নতুনভাবে নান্দনিকতায় রূপ পেয়েছে।

গ. সমকালীন বাস্তবতা ও বিশ্ববীক্ষা : আল মুজাহিদী একাধারে একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সমাজসচেতন কবি। তাই তার লেখার শৈলীতে সমকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ এবং সমাজবিকাশের রূপরেখা ফুটে ওঠে। ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’র মতো কাব্যে তিনি কেবল বাংলার কবি থাকেননি, বরং বিশ্বমানবতার বিপর্যয় ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।

ঘ. ভাষাভঙ্গি এবং অন্তর্লোকের অনুভূতি : তার কবিতার ভাষা সাধারণত সহজ, সাবলীল এবং সংবেদনশীল। তিনি মানুষের অন্তর্লোকের অনুভূতি, আত্মঅনুসন্ধান, প্রেম, ব্যক্তিগত মনস্তাপ এবং তীব্র সামাজিক প্রতিবাদকে একই সুতোয় বাঁধতে পারতেন।

কবি আল মুজাহিদীর কবিতায় সময় ও কাল কেবল ঘড়ির কাঁটার পরিমাপ নয়; বরং তা ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মানবসভ্যতার আদি-অন্তের এক প্রগাঢ় প্রকাশ। তিনি সময়কে দেখেছেন একজন ইতিহাস-সচেতন রাজনৈতিক যোদ্ধা এবং বিশ্বনাগরিকের দৃষ্টিতে। তার কবিতায় সময় ও কালের বহুমাত্রিক রূপ আমরা দেখতে পাই—

ক. ষাটের দশকের উত্তাল কাল ও রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত : কবি আল মুজাহিদী নিজেই তার কবিতার একটি সময়কালকে ‘ফেরারি সময়’ বলে উল্লেখ করেছেন। ষাটের দশকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, রাজবন্দি হওয়া এবং রাজনৈতিক ফেরারি জীবনের অস্থিরতা তার কবিতায় তীব্রভাবে মূর্ত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার কাব্যিক সময়ের একটি বড় কেন্দ্রবিন্দু। যুদ্ধ, হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ এবং স্বাধীনতার রক্তিম লগ্নকে তিনি তার কবিতায় যন্ত্রণাদগ্ধ কিন্তু আশাবাদী এক কালখণ্ড হিসেবে ধারণ করেছেন।

খ. ইতিহাস ও সভ্যতার কালানুক্রম : তিনি বর্তমান সময়কে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। গ্রিক মিথোলজি ও বাংলার প্রাচীন লোকঐতিহ্যের কালকে তিনি বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার কবিতায় ‘পিতৃপুরুষের ফসিল’ বা ‘শতাব্দীর ঝরাপাতা’র মতো শব্দবন্ধের মাধ্যমে অতীতকাল বর্তমানের সমান্তরালে এসে দাঁড়ায়। তিনি সভ্যতার উত্থান ও পতনের বিশাল কালখণ্ডকে কবিতার ফ্রেমে বন্দি করতে ভালোবাসেন।

গ. বৈশ্বিক সময় ও যুদ্ধবিদ্ধ কাল : কবি কেবল নিজ দেশের গণ্ডিতে আটকে থাকেননি; আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমকালীন রক্তঝরা সংঘাত ও যুদ্ধবিদ্ধ সময়কে তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেছেন। ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’ কাব্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই অভিশপ্ত কাল এবং তার পরবর্তী বৈশ্বিক ক্ষতকে তিনি মানব ইতিহাসের এক অন্ধকারতম সময় হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

ঘ. আদিম বা শাশ্বত কাল : আল মুজাহিদী প্রায়ই মানুষকে মহাবিশ্বের প্রথম সৃষ্টিলগ্নে নিয়ে যান। কবি বর্তমানের যান্ত্রিক কাল ছেড়ে মানুষকে এক আদিম, শাশ্বত ও পবিত্র প্রাকৃতিক সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করান। মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবন, প্রতিটি মুহূর্তের নিঃশ্বাস এবং তার বিপরীতে প্রকৃতির অনন্তকাল ধরে বয়ে চলার দ্বন্দ্ব তার দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।

ঙ. ভবিষ্যৎ ও আশাবাদের কাল : ধ্বংস, যুদ্ধ আর ক্ষয়িষ্ণু সময়ের বিবরণ দিলেও আল মুজাহিদীর কালচেতনা শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক। তিনি বিশ্বাস করেন, অন্ধকার সময়ের বুক চিরে একদিন নতুন ভোর আসবে, যা পৃথিবীকে আবার উর্বর ও বাসযোগ্য করে তুলবে।

বলা যায়, আল মুজাহিদীর কবিতায় সময় ও কাল হলো এক চিরপ্রবাহমান নদীর মতো, যা একাধারে অতীতে আদিম মাটির কাছে ফিরে যায়, বর্তমানে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে দগ্ধ হয় এবং ভবিষ্যতে একটি সুন্দর ও মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়।

কবি আল মুজাহিদীর কালজয়ী দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’ এবং ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’-র কবিতা ও পঙ্‌ক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার ‘সময় ও কালচেতনা’ আরো গভীরভাবে অনুধাবন করা যায়। তিনি ‘হেমলকের পেয়ালা’ (১৯৮৪) কাব্যগ্রন্থে সময়কে দেখেছেন এক আদিম, মহাজাগতিক এবং চিরন্তন প্রেক্ষাপটে। গ্রিক দর্শনে সক্রেটিসের হেমলক পানের অনুষঙ্গকে তিনি মানুষের শাশ্বত সত্য অনুসন্ধান এবং সময়ের নির্মমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

‘আমরা যেন পৃথিবীর প্রথম বৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আদিম মানব-মানবী,

যেখানে আধুনিক সভ্যতার কৃত্রিম ঘড়ি এখনো এসে পৌঁছায়নি।’

এখানে ‘সময়’ কোনো ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের এক অবিচ্ছেদ্য শাশ্বত বন্ধন। কবি ক্ষণস্থায়ী বর্তমানের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে এক অনন্ত ও আদিম সময়ের আশ্রয় খোঁজেন।

‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’ কাব্যগ্রন্থে আল মুজাহিদীর কালচেতনা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। এখানে সময় কোনো শান্ত বা আদিম রূপ নয়, বরং তা মানবইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এবং রক্তক্ষয়ী এক আধুনিক ক্রান্তিকাল। ১৯৪৫ সালের পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের সময়কালকে তিনি কবিতার ফ্রেমে জীবন্ত করেছেন।

‘যে সময়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছিল আগুনের বৃষ্টি,

স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল হিরোশিমা ও নাগাসাকির সমস্ত সৃষ্টি।’

এখানে কবি দেখিয়েছেন, কীভাবে বিজ্ঞানের আগ্রাসন মানুষের স্বাভাবিক ‘সময়’ বা জীবনকে এক নিমেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। এখানে তিনি সমকালীন সময়ের যুদ্ধোন্মাদনার বিরুদ্ধে এক তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন।

আল মুজাহিদী একাধারে ইতিহাসের প্রাচীন পাতায় এবং সমকালের জ্বলন্ত বাস্তবতায়—উভয় কালেই সমানভাবে বিচরণ করতে পারতেন। ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’ এবং ‘যুদ্ধ নাস্তি’ কাব্যগ্রন্থে তার ‘সময় ও কালচেতনা’ আরো ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’ কাব্যে কবি সময়কে পরিমাপ করেছেন বাংলার ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং পোড়ামাটির শিল্পের (টেরাকোটা) দীর্ঘস্থায়িত্বের মধ্য দিয়ে। ‘ধ্রুপদ’ (শাস্ত্রীয় বা ক্ল্যাসিক) এবং ‘টেরাকোটা’ (লোকজ শিল্প)—এই দুইয়ের মিলনে তিনি এমন এক কালখণ্ড তৈরি করেছেন, যা হাজার বছরের প্রাচীন।

‘টেরাকোটার অবয়বে জমা হয়ে আছে শতাব্দীর ধুলো,

ধ্রুপদি সুরে জেগে ওঠে আমাদের অতীত দিনগুলো।’

এখানে সময় স্থবির নয়। পোড়ামাটির ফলকে যেভাবে ইতিহাস হাজার বছর ধরে জীবন্ত থাকে, কবি তার কবিতায় বাংলার লোকজীবন ও ঐতিহ্যকে সেই চিরন্তন কালের রূপ দিতে চেয়েছেন।

‘যুদ্ধ নাস্তি’ কাব্যে আল মুজাহিদীর সময়চেতনা ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত। সমকালীন যুদ্ধবিদ্ধ অস্থির কালকে পেছনে ফেলে তিনি এক শান্তিময় ও যুদ্ধহীন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কালখণ্ড বিনির্মাণ করতে চান। কবি হিংসা ও হানাহানির সময়কাল পার হয়ে এক নতুন ভোরের প্রত্যাশা করেন। তিনি লিখেছেন—

‘অস্ত্রের গর্জন থেমে যাক, মুছে যাক রক্তের দাগ,

পৃথিবীতে আসুক এবার এক শান্তির অনুরাগ।’

এখানে কবি বর্তমানের সংঘাতময় সময়কে অস্বীকার করে এক মানবিক ও অহিংস ভবিষ্যৎ কালের আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই সময়চেতনা অত্যন্ত আশাবাদী এবং বিশ্বজনীন।

কবি আল মুজাহিদী বাংলা কাব্যসাহিত্যে প্রাচীন গ্রিক জীবনদর্শন, ইতিহাসচেতনা এবং মাটির গভীর মমত্ববোধকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তিনি শুধু মাটির গভীর অনুরাগীই নন, বরং বাংলা সাহিত্যে একজন অন্যতম প্রধান কাল ও সমাজসচেতন বিশ্ববীক্ষণের কবি। তিনি তার সুদীর্ঘ কাব্যযাত্রায় সময়, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিশ্বরাজনীতির সমকালীন প্রেক্ষাপটকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কবিতায় ধারণ করেছেন।

বাংলা কবিতার প্রাগ্রসর পাঠকদের কাছে আল মুজাহিদীর কবিতা আনন্দের পাঠ হয়ে ওঠে। কবিতার ঐতিহ্যকে অনন্যপূর্বতায় সংস্থাপিত করার এক সুদক্ষ কারুকার তিনি। কবিতায় তার স্বভূমি-স্বদেশ প্রবলভাবে মূর্ত; মানবসম্প্রীতির সমুজ্জ্বল সম্ভাষে স্ফূর্ত। তার কবিতা সহজ-সম্ভোগে অধিকার করে নেয় পাঠকের হৃদয়। শিল্পে পুরাণ, মৃত্তিকা ও জীবনের মর্মভূমে প্রোথিত শেকড়সন্ধানী পুরুষ। প্রাতিস্বিক চেতনাভাষ্যে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে তার কবিতার প্রতিটি ছত্র। ধ্রুপদি ব্যঞ্জনা এবং ভাষার প্রগাঢ় স্বকীয়তায় প্রদীপ্ত আল মুজাহিদীর কবিতাপৃথিবী।

মৃত্তিকা ও কালের কবি আল মুজাহিদী

ইরান ইস্যুতে নিজের সঙ্গেই প্রতারণা ট্রাম্পের

বাস্তবতার বাইরে ভিন্ন বয়ান তৈরি করতে সিদ্ধহস্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত আড়াই মাস ধরে ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যা মূলত বাস্তবতাকে আড়াল করে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়ার শামিল।

ট্রাম্প প্রতিনিয়ত দাবি করছেন, ইরান চুক্তি করার জন্য মরিয়া হয়ে আছে এবং সে চুক্তি খুব দ্রুত সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। এ আলোচনার অজুহাতে তিনি তেহরানকে বারবার ছাড় দিয়েছেন, নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শিথিল করেছেন এবং ইরানের বিভিন্ন উসকানি ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাকে হালকা করে দেখিয়েছেন।

এমনকি বৃহস্পতিবারও ইরানের খারগ দ্বীপ দখলের হুঁশিয়ারি দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় হামলা থেকে পিছিয়ে এসে ট্রাম্প আলোচনার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন।

তবে সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের এই অনীহা প্রকাশ পাওয়ায় ইরান এর পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে। ট্রাম্পের এমন অবস্থান কেবল যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটকেই দীর্ঘায়িত করছে। এর ফলে পরিস্থিতি ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে, যা ইরানের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি ইরানের হামলায় আমেরিকান সেনাবাহিনীর একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পরও ট্রাম্পকে বেশ অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একে ‘বড় কোনো বিষয় নয়’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, ‘তবুও আমেরিকার এ হামলার জবাব দেওয়া প্রয়োজন।’

বৃহস্পতিবারও তিনি একদিকে খারগ দ্বীপ দখলের মতো কঠোর সামরিক অভিযানের কথা বলেন, যার জন্য স্থল সেনা পাঠানো এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি ছিল। কিন্তু এর কয়েক মিনিট পরেই ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সুর নরম করে বলেন, ‘আমেরিকার জনগণের এই মুহূর্তে যুদ্ধের মতো কোনো মানসিকতা নেই।’

একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে সেনা পাঠাতে চাই না। তবে আমি চাইলে ছোট একটি দল পাঠিয়ে পুরো জায়গা দখল করতে পারতাম।’

এর আগে গত ৭ এপ্রিল ট্রাম্প তড়িঘড়ি করে একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, যার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল ‘হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ এবং অবিলম্বে খুলে দেওয়া’। ইরান সে শর্ত পূরণ না করলেও ট্রাম্পের প্রশাসন বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।

এছাড়া গত ৩ ও ৪ জুন দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মতো ইরানের জিম্মি সংকটের মতো কোনো জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে চান না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই নমনীয়তা এবং নিজের পরিকল্পনা আগেভাগেই প্রকাশ করে দেওয়ার বিষয়টি ইরানকে চুক্তির ক্ষেত্রে আরো সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে সময় পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, যা আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। ফলে ট্রাম্পকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑতিনি কি পুনরায় পুরোদমে যুদ্ধে জড়াবেন, নাকি রাজনৈতিক চাপ সামলাতে একটি দুর্বল চুক্তি মেনে নিয়ে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি টানবেন। -সিএনএনের বিশ্লেষণ

সমঝোতা স্মারক সব রণাঙ্গনেই যুদ্ধের অবসান ঘটাবে: আরাগচি

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনো কোনো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়নি। প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ অবসানের ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

আরাগচি বলেন, এই সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালি ও ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তিনি বলেন, আলোচকেরা সমঝোতা স্মারকের খসড়া বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করেছেন। পারমাণবিক ইস্যুতে তেহরান ওয়াশিংটনের দাবি প্রত্যাখ্যান করায় বিষয়টি দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে।

এই চুক্তিতে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা লেবাননকে কখনো একা ছেড়ে দেব না।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সুরক্ষা জোরদার করছে ইরান
উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত সুরক্ষিত করার প্রচেষ্টা জোরদার করেছে ইরান। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ কথা জানায় সিএনএন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরান মজুতের কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন করেছে এবং যেসব স্থাপনায় এই উপাদান মজুত আছে বলে মনে করা হয়, সেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত করার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে বলা হয়, ইরান সুড়ঙ্গগুলো ভরাট করে দিয়েছে এবং কিছু প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন স্থাপন করেছে। এর ফলে ইউরেনিয়াম মজুতে প্রবেশ করা এক মাস আগের তুলনায় ‘অনেক বেশি কঠিন, বিপজ্জনক ও সময়সাপেক্ষ’ হয়ে উঠেছে। এদিকে, মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, ইরানের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে মজুত রাখা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জোরপূর্বক জব্দ করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ স্থল অভিযানের প্রস্তুতি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

হোয়াটসঅ্যাপ আসার আগে মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য অ্যাপ বানিয়েছিলাম

জেরক্স ও আইবিএমে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। ছিলেন সৌদি আরবের কিং ফাহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞানের শিক্ষক। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে অসুবিধা হয় বলে নিজেই একটি অ্যাপ তৈরি করতে গিয়ে যে আনন্দময় অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল, সেটাই পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ সালেহ উদ্দিন আহমদ

তখন হোয়াটসঅ্যাপ ছিল না। বাইরে থেকে বাংলাদেশে টেলিফোন করাটা ছিল এক বিরাট ঝক্কি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায়ই সময়ে অসময়ে আমাকে বাংলাদেশে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হতো। টেলিফোন করার দু-একটা অ্যাপ আমার আইফোনে ছিল, কিন্তু সেগুলো ছিল খুব বাজে।

হঠাৎ লাইন কেটে যেত, ক্রেডিট কার্ড থেকে বেশি পয়সা কেটে নিতো। একসময় মনে হলো নিজেই একটা টেলিফোন অ্যাপ বানাই না কেন। যেহেতু আইফোন ব্যবহার করি, তাই নিয়েই শুরু করলাম।

কিছুদিন পড়াশোনা করে বুঝলাম, কাজটা সহজ নয়। আর বেশ সময়সাপেক্ষ। ভয়েসওভার টেলিফোন (ভিওআইপি) অ্যাপ্লিকেশন এমনিতেই বেশ জটিল ধরনের অ্যাপ। আর আমরা যেসব প্ল্যাটফর্মে কাজ করি, সেগুলো কতগুলো নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড ও প্রচলিত প্রটোকল মেনে চলে।

কিন্তু স্টিভ জব আপেলের জন্য সবকিছু নিজস্ব ধারায় করে গেছেন। আপেল তাদের প্ল্যাটফর্মে সব কিছুতে এখনো নিজেদের তৈরি কাস্টম মেনে চলে। তবু কাজ শুরু করলাম, দেখা যাক কতটুকু যাওয়া যায়!

অ্যাপের নাম দিলাম ‘কলকরো’

প্রথমে স্ক্রিনের কাজ, যেমন ডায়াল প্যাড ও বিভিন্ন আইকন। যুক্তরাষ্ট্রে এসব গ্রাফিকসের কাজ খুব ব্যয়বহুল। ঠিক করলাম, বাইরের ফ্রিলান্সার দিয়ে করাব। ইন্টারনেটে ফ্রিলান্সারদের ভালো কিছু প্ল্যাটফর্ম আছে। আমার পছন্দ ‘আপওয়ার্ক’। কী কী লাগবে তার বিবরণ দিয়ে একটা ‘প্রয়োজন’ পোস্ট করলাম।

দুই দিনের মধ্যেই সারা দুনিয়ার গ্রাফিকস ডিজাইনার হাজির! দুজনকে বাছাই করে কয়েক দিন ধরে তাঁদের সঙ্গে আমার প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে কথা বললাম। দুজনের মধ্যে ইউক্রেনের ডিজাইনার ছিলেন ব্যয়বহুল।

তাঁকে বাদ দিয়ে ভারতীয় একজন ডিজাইনারকে নিয়োগ দিলাম। এখানে বলে রাখি, ফ্রিলান্সারের পারিশ্রমিক ও টাকাকড়ির লেনদেন সব আপওয়ার্ক ব্যবহার করে করা হয় এবং একটা অংশ তারা কমিশন হিসেবে কেটে নেয়।

গ্রাফিকস ডিজাইন এমন কাজ যে একবারে তৃপ্ত হওয়া যায় না, বারবার আরও ভালো করার চেষ্টা চলতে থাকে। একসময় ডিজাইন শেষ হলো। স্ক্রিন লে–আউট ডিজাইনও বেশ কষ্টসাধ্য। পরের ধাপগুলো ছিল রুটিন—আপেল এপিআই ব্যবহার করে ব্যাকগ্রাউন্ড সার্ভিসগুলো তৈরি করে ব্যবহারকারী ও ব্যাকগ্রাউন্ড সার্ভিসের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি।

ব্যাকগ্রাউন্ড সার্ভিসগুলো ডিজাইন করতেও কিছু পর্যায়ে হোঁচট খেতে হয়েছিল। একেকবার মনে হতো, ‘বাদ দাও, কী দরকার মাথাটা নষ্ট করে!’ কিন্তু কাজগুলো এত কৌতূহলোদ্দীপক ছিল যে বাদ দিয়েও আবার শুরু করেছি বারবার। আসলে উৎসাহ আর সংকল্প না থাকলে কোনো কাজই ভালোভাবে সম্পন্ন করা যায় না।

নেপথ্য সার্ভিসগুলো রান করার জন্য অ্যামাজন ক্লাউড থেকে সার্ভার ভাড়া করতে হয়েছিল। ফোনকলের ইতিহাস, হিসাবে-নিকাশ এবং ডাটাবেজের জন্য একটা ভিন্ন সার্ভার ভাড়া নিতে হয়েছিল। অনেক বিষয়েই কোনো পূর্বধারণা আমার ছিল না, কাজ করতে করতে শিখেছি। আর সময় লেগেছিল বেশ। কারণ, বেশির ভাগ আমাকে শুধু রাতেই কাজ করতে হতো।

একসময় অ্যাপটা তৈরি হয়ে গেল। অ্যাপটার নাম দিলাম ‘কলকরো’। আপেল টেস্ট টুলস ব্যবহার করে নিশ্চিত হলাম, সব কিছু ভালোভাবেই কাজ করছে। একটা বাণিজ্যিক টেলিফোন অ্যাপ্লিকেশনের জন্য যা যা দরকার, সেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আমাকে যোগ করতে হয়েছিল।

এগুলো ছাড়া আপেল টেস্ট টিম অ্যাপস্টোরের ছাড়পত্র দেবে না। এগুলোর মধ্যে ছিল ক্রেডিট কার্ড ইন্টারফেস, যা দিয়ে ব্যবহারকারী টাকা জমা রাখতে পারতেন, দেশে দেশে ফোন করার চার্জ, সহজ ‘ইউজার ইন্টারফেস’—এসব কিছু নিয়েই টেস্ট টিমের সঙ্গে বারবার কাজ করতে হয়েছিল।

প্রথম কলটা মাকে করলাম

‘কলকরো’ যেদিন ছাড়পত্র পেল এবং আপেল অ্যাপস্টোরে আপলোড হলো, সেদিনই আমি একটা ই–মেইল পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপটা ডাউনলোড করে প্রথম কলটা মাকে করলাম। সেই আনন্দের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়!

নিজের কাজে ফোন করা ছাড়া অ্যাপটা আর কোনো কাজে লাগবে—এমন কোনো ভাবনা প্রথমে আমার ছিল না। আস্তে আস্তে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে জানালাম। অনেকেই অ্যাপস্টোর থেকে ডাউনলোড করে ব্যবহার করা শুরু করলেন। সমস্যা হলো অনেকেই তো অ্যান্ড্রয়েড সেট ব্যবহার করেন, আইফোনের অ্যাপ সেগুলোতে কাজ করে না।

অ্যাপটা তাই অ্যান্ড্রয়েডে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিলাম। অ্যান্ড্রয়েডে কাজ করা সহজতর ছিল। কারণ, অ্যান্ড্রয়েড টুলসগুলো স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী নির্মিত এবং সব ইন্টারফেস ‘জাভা’ প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে লেখা। এ ছাড়া আগেরটার গ্রাফিকসসহ অনেক লজিক বা অ্যালগরিদম আমি পুনর্ব্যবহার করতে পেরেছিলাম। তাই রূপান্তরটা সহজ ছিল।

আস্তে আস্তে আপেল অ্যাপস্টোর ও গুগল প্লে স্টোরে সার্চ করে অনেকে অ্যাপটা ব্যবহার করতে শুরু করলেন। আমিও মজা পেয়ে গেলাম। আরও ব্যবহারকারী বাড়ানোর আশায় নিউইয়র্কের বাংলা পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপন দিলাম।

‘কলকরো’ দুই বছরের মতো কার্যকর ছিল। এর মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ কিনে নিল ফেসবুক। ২০১৬ সালের দিকে তারা ফ্রি টেলিফোন সার্ভিস চালু করল। পয়সা দিয়ে কে আর ফোন সার্ভিস ব্যবহার করবে? একসময় কলকরো বন্ধ করে দিয়ে নিজেও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার শুরু করলাম।

কলকরোর স্বল্পায়ুর জন্য আমার কোনো দুঃখ বা পরিতাপ নেই। অ্যাপটা দিয়ে টাকাকড়ি বানানোর কোনো পরিকল্পনাও আমার ছিল না। কাজটা করেছিলাম অনেকটা শখের বশে। অনেক সময় ব্যয় করেছি, কিছু টাকাকড়িও খরচ হয়েছে। কিন্তু পুরা বিনিয়োগই আমি কড়ায়–গন্ডায় ফেরত পেয়েছি। কাজটা চলাকালীন এবং শেষ করে যে আনন্দ আমি পেয়েছি, কোনো কিছু দিয়েই তা পরিমাপ করা যাবে না।
https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-11%2Fi1pr0fom%2FDUCSU1.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
হোয়াটসঅ্যাপ আসার আগে মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য ‘কলকরো’ নামের এক অ্যাপ বানিয়েছিলেন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ সালেহ উদ্দিন আহমদ। সালেহ উদ্দিন আহমদ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন (বাঁ থেকে প্রথম) ছবি: সালেহ উদ্দিন আহমদের সৌজন্যে

২০২৬ সালের সবচেয়ে নিরাপদ ৫ দেশ

বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় সংঘাত চলছে এবং টানা ১২ বছর ধরে বৈশ্বিক শান্তি পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।

গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ৯৯টি দেশে শান্তির পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতির মাঝেও কয়েকটি দেশ তাদের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। ১৬৩টি দেশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সূচকে সহিংসতার হার, সামরিক ব্যয় এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো ২৩টি সূচক বিবেচনা করা হয়েছে।

চলুন তাহলে জেনে নিই, ২০২৬ সালের বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শীর্ষ ৫টি দেশের জীবনযাত্রা কেমন—

১. আইসল্যান্ড: শান্তির অবিচল প্রতীক

২০০৮ সাল থেকে টানা ১৯ বছর ধরে আইসল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশের শীর্ষস্থান দখল করে আছে। এখানকার অধিবাসীদের কাছে শান্তি কেবল একটি নীতি নয়, বরং এটি তাদের সচেতন সামাজিক পছন্দের প্রতিফলন। নারী-পুরুষের সমান অধিকার, শক্তিশালী জনসেবা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি প্রতিশ্রুতি দেশটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পর্যটকদের জন্য আইসল্যান্ডের ১২০টিরও বেশি ভূ-তাপীয় পুলে স্নান করা এবং এখানকার শান্ত প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া হতে পারে প্রশান্তির সেরা মাধ্য।

২. নিউজিল্যান্ড: প্রকৃতির কোলে নিরাপদ জীবন

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা দেশটিকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করেছে। এখানকার মানুষ অত্যন্ত সহজ-সরল এবং পরষ্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কঠোর বন্দুক আইন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে এখানে অপরাধের হার অনেক কম। পাহাড়, সমুদ্র আর বনের সান্নিধ্য নিউজিল্যান্ডের জীবনযাত্রাকে করে তুলেছে কোলাহলমুক্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ।

৩. সুইজারল্যান্ড: নিরপেক্ষতা ও আস্থার দেশ


২০২৬ সালের সূচকে সুইজারল্যান্ড তৃতীয় স্থানে উন্নীত হয়েছে। দেশটির দীর্ঘকালীন সামরিক নিরপেক্ষতা এবং নিম্ন অপরাধ হার একে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশে পরিণত করেছে। সুইজারল্যান্ডে মানুষের মধ্যে সামাজিক বিশ্বাসের গভীরতা এতটাই যে, হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ বা ক্রেডিট কার্ড অপরিচিত মানুষের মাধ্যমেই অনায়াসে ফেরত পাওয়া যায়। কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের চমৎকার ভারসাম্য এবং চার ভাষার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মাঝে সমঝোতার মাধ্যমেই এখানে শান্তি টিকে থাকে।

৪. স্লোভেনিয়া: শীর্ষ পাঁচে নবাগত এবারই প্রথম

স্লোভেনিয়া বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি নিরাপদ দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। সামরিক খাতে কম ব্যয় এবং উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা দেশটিকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। স্লোভেনিয়ার মানুষ প্রকৃতিপ্রেমী এবং তারা পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করে। এখানকার মানুষের আতিথেয়তা এবং সপ্তাহান্তে হাইকিং বা সাইকেল চালানোর সংস্কৃতি জীবনকে করে তোলে আনন্দময়।

৫. আয়ারল্যান্ড: ঐতিহ্যে মিশে থাকা আতিথেয়তা

তালিকায় পঞ্চম স্থানে থাকা আয়ারল্যান্ড তার নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে অংশ না নেওয়ার জন্য সুপরিচিত। দেশটির সংস্কৃতিতে ‘ব্রেহন আইন’ (Brehon laws)-এর প্রভাব আজও বিদ্যমান, যা আগন্তুকদের আশ্রয় ও খাবার দেওয়ার শিক্ষা দেয়। আটলান্টিকের পাড়ে প্রকৃতির মনোরম পরিবেশ, বই আর গানের মেলবন্ধনে আইরিশরা এক শান্তিময় জীবন যাপন করে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি 

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি তরুণ নিহত

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মুজিব আলী (২০) নামের বাংলাদেশি এক তরুণ নিহত হয়েছেন। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম সীমান্তে ভারতের অভ্যন্তরে এ ঘটনা ঘটে।

দত্তগ্রাম সীমান্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৪৬ ব্যাটালিয়নের আওতায় পড়েছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ওই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বিএসএফ নিহত মুজিবের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে নিয়ে গেছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর তারা লাশ হস্তান্তর করবে বলে জানিয়েছে।

নিহত মুজিব আলী একই এলাকার বাসিন্দা মৃত অজিব উল্লাহর ছেলে। শরীফপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জয়নুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, নিহত মুজিব চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন বলে জানা গেছে।

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দত্তগ্রাম সীমান্তে মনু নদ দেশের সীমানা ভাগ করে দিয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে দত্তগ্রামের বাসিন্দা মুজিবসহ ছয়-ছয়জন বাংলাদেশি মনু নদ পার হয়ে সীমান্তের ১৮৫২ ও ১৮৫৩ নম্বর মূল সীমান্তখুঁটির মাঝখান দিয়ে ভারতে ঢুকে পড়েন। সেখানে বিএসএফের টহলদল তাঁদের দেখে বাধা দেয়। একপর্যায়ে টহলদলের সদস্যরা গুলি চালালে মুজিব ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁর সহযোগীরা দ্রুত সটকে পড়েন। এ দিকে গুলির শব্দ পেয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা বিস্তারিত জানান।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ফাইল ছবি

পরিচয় থাকার পরও ‘বেওয়ারিশ’ দুলালী, রেখে গেলেন অনেক প্রশ্ন by মানসুরা হোসাইন

মা জানতেন না, তাঁর হারিয়ে যাওয়া মেয়ে রাজধানীর কোনো এক ফুটপাতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। ভাই জানতেন না, শেষবিদায়ের আগেই বোনকে বেওয়ারিশ হিসেবে কবর দেওয়া হবে। আর যে নারী নাম ভুলে গিয়ে নিজেকে ‘দুলালী’ বলতেন, তিনি হয়তো জানতেন না—তাঁর চিকিৎসার জন্য এক যুবক এক এক করে আটটি হাসপাতাল ঘুরেছেন, প্ল্যাকার্ড হাতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পরিচয় মিললেও বাঁচানো যায়নি দুলালীকে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে স্বামীর ঘর ছেড়ে এসেছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখন থেকেই পরিবারের কাছে তিনি নিখোঁজ। মানসিক ভারসাম্যহীনতায় হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজের আসল নাম—শামীমা নাসরিন জাহান। আর ঘর হারিয়ে ঠাঁই হয়েছিল রাজধানীর মিরপুরের একটি ফুটপাতে। অবহেলা, ক্ষুধা ও অসুস্থতায় মৃত্যু হয় তাঁর। পরে তাঁর লাশ দাফন করা হয় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুলালী রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের দায়বদ্ধতা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে গেছেন। মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো বা নতুন করে ভাবার বিষয়টি এখন সামনে এসেছে।

আট হাসপাতাল ঘুরে ঠাঁই হলো রাস্তার পাশে

গত ২২ মে সকালে মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের ৬০ ফিট সড়কের পাশে শামীমাকে দেখতে পান সমাজসেবামূলক সংগঠন হিরোজ ফর অলের ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মুছা করিম (রিপন)। হাড় জিরজিরে শামীমা কিছু খেতে পারছিলেন না।

চিকিৎসার জন্য দুজন নারী ভিক্ষুকের সহায়তায় শামীমাকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান মুছা করিম। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ আটটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে ভর্তি করা হয়নি, কোথাও অভিভাবক চাওয়া হয়েছে, কোথাও বলা হয়েছে রোগী সামলানো কঠিন। এ কারণে তাঁর স্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি।

মুছা করিম প্রথম আলোকে বলেন, কেরানীগঞ্জ থেকে কাজীপাড়ার এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করার পরও দুলালীকে রাখা যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, রোগী রুমে থাকতে চাইছেন না এবং পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই মানসিক হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের নিরাময় ক্লিনিকে নেওয়া হলে এনআইডি ও আইনগত অভিভাবক না থাকায় ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন শেল্টার হোমেও চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ৮ নম্বর হাসপাতাল হিসেবে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের সুপারম্যাক্স হেলথকেয়ার লিমিটেডে চিকিৎসা শুরু হলেও সেখানেও তাঁকে রাখা হয়নি।

শেষ পর্যন্ত অসহায় হয়ে ২৪ মে ধানমন্ডির একটি রাস্তার পাশে দুলালীকে রেখে আসতে বাধ্য হন মুছা করিম। একটি হোটেলে টাকা দিয়ে তাঁর জন্য তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে যান তিনি।

এক প্ল্যাকার্ডে বদলে গেল দৃশ্য

দুলালীদের মতো মানুষ কেন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা পাবেন না, তা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার উদ্যোগ নেন মুছা করিম। ২৭ মে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে তিনি একাই দাঁড়ান একটি প্ল্যাকার্ড হাতে। তাতে ইংরেজিতে লেখা ছিল— ‘নো হেলথ উইথআউট মেন্টাল হেলথ।’ আর বাংলায় লেখা ছিল— ‘দুলালীকে বাঁচাতে চাই, দুলালী কেন চিকিৎসা পাচ্ছে না, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাব চাই।’

এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারের সহায়তায় ২৯ মে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় দুলালীকে। জিয়া উদ্দিন হায়দার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে হাসপাতালে দুলালীকে দেখতেও গিয়েছিলেন।

কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে দুলালীর। পরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) নেওয়া হয়। ৩১ মে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।

মৃত্যুর পর মিলল পরিচয়, তবু দাফন ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে

জীবিত অবস্থায় কেউ জানতেন না তিনি কে। মৃত্যুর পর অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাঁর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে পরিচয়। তাঁর নাম দুলালী নয়, শামীমা নাসরিন জাহান। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার সিদ্ধকাঠি গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। শামীমার বাবার বাড়ির ইউনিয়নের নাম মোল্লারহাট। বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব একদম কাছে না হলেও খুব দূরেও না। যশোরের কেশবপুরেও তাঁর আরেকটি ঠিকানা পাওয়া যায়।

নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে শামীমার স্বামীরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়েও কাউকে খুঁজে পায়নি। এ কারণে ৩ জুন রায়েরবাজার কবরস্থানে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

এর দুদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর দেখে ৫ জুন ছুটে আসেন তাঁর ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা। ৭ জুন মেয়ের কবর দেখতে ঢাকায় আসেন মা।

‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পারলাম না’

শামীমার বড় ভাই মিজানুর রহমান ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে শামীমা ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি নলছিটি ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছিলেন। বাবা আবদুল খালেক ২০১৭ সালে মারা গেছেন।

মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন থেকেই শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে কারও কোনো ক্ষতি করতেন না। একা থাকতে পছন্দ করতেন। এর আগেও বিভিন্ন সময় বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। কখনো কোনো মাজারে পাওয়া যেত, আবার কখনো নিজেই চলে আসতেন। তাঁর স্বামী আলাদা বাসা ভাড়া করে তাঁকে রাখতেন।

তাঁর নাম দুলালী ছিল কি না জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, না; এমন কোনো নাম ছিল না। হয়তো তাঁর বোন নিজে থেকেই এ নাম বলেছিলেন।

আক্ষেপ নিয়ে শামীমার বড় ভাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পেলাম না, দাফন করতে পারলাম না। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হলো। এ কষ্ট সারা জীবন থাকবে। আমরা মুছা ভাই ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁরা না থাকলে আমাদের বোনটা ফুটপাতেই মরে পরে থাকত।’

স্বামীর নীরবতা

শামীমার স্বামী শহিদুল ইসলাম হাওলাদার নিজেও একজন পুলিশ সদস্য। বর্তমানে তিনি বরগুনার আমতলি থানায় পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শামীমা নিখোঁজ হওয়ার পর স্ত্রীকে খুঁজে পেতে তিনি থানায় জিডি করা বা অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করেননি বলে অভিযোগ করছেন শামীমার বাবার বাড়ির সদস্যরা।

স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় জিডি না করার বিষয়টি স্বীকার করে শহিদুল ইসলাম হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে শামীমার তথ্য জানতে জানতে তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়ে গেছে।’

শামীমার কখনো চিকিৎসা করিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে শহীদুল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ও আমাকে সহ্য করতে পারত না। তাই চিকিৎসা করানোর জন্য শাশুড়িকে বলেছিলাম। তবে সন্তান না হওয়ার সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেছি।’

স্ত্রীর মরদেহ আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত নেবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে শহিদুল বলেন, ‘এত দিনে মরদেহ নষ্ট হয়ে গেছে। আবার কবর খোঁড়াখুঁড়ি করতে গেলে লাশ থেকে গন্ধ বের হবে, সবাই বিরক্ত হবে। অনেক ঝামেলাও করতে হবে।’

প্রশ্নের মুখে পুলিশি অনুসন্ধান

৩১ মে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি যশোরের কেশবপুর ও ঝালকাঠির নলছিটি থানায় বেতার বার্তা পাঠিয়ে দুলালী ওরফে শামীমা নাসরিন জাহানের তথ্য জানাতে বলেন। তবে ১ জুন নলছিটি থানা জানায়, স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে শামীমা নাসরিন জাহান নামে কাউকে খুঁজে পাননি এএসআই আনিসুর রহমান।

কেশবপুর থানা থেকেও একই বার্তা আসে বলে জানিয়েছেন মুছা করিম।

তবে পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর নলছিটি থানায় শামীমাকে নিখোঁজ দেখিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তাঁর মা মোসা. মনোয়ারা বেগম। ৪৫ বছর বয়সী নাসরীন জাহানের (শামীমা বাদ ছিল) স্বামী শহিদুল ইসলাম বাবুলসহ অন্যান্য তথ্য উল্লেখ করা ছিল।

এই দম্পতি আনুমানিক ২৪ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন, বিবাহিত জীবনে সন্তান হয়নি। শামীমা মাঝেমধ্যেই স্বামীর বাড়ি থেকে মায়ের বাড়ি চলে আসতেন, কারও সঙ্গে মিশতেন না, মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না—এসব তথ্যও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জিডির আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শামীমা ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কেনাকাটার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। এলাকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, দীর্ঘদিন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর থানায় জিডি করা হলো। শ্যামলা, লম্বায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, কালো বোরকা গায়ে শামীমা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তা–ও উল্লেখ ছিল।

নলছিটি থানার তৎকালীন ওসি মো. আ. সালাম এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এএসআই সনজীব কুমার পাহলানকে দায়িত্বও দিয়েছিলেন।

কিন্তু শামীমার মৃত্যুর পর পুলিশ পরিচয় শনাক্ত করলেও সেই জিডির সূত্র ধরে পরিবারকে খুঁজে বের করা যায়নি।

শামীমার ভাই মিজানুর বলেন, তাঁর মা আর ভাই নলছিটি থানার একদম কাছেই একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। পুলিশ ভালোভাবে চেষ্টা করলে তাঁদের খুঁজে পেতেন।

নলছিটি থানার বর্তমান ওসি আরিফুল আলম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দুজন কর্মকর্তা সারাদিন এলাকায় গিয়ে পরিবারটিকে খুঁজেছেন, কিন্তু কেউ তাঁদের চিনতে পারেননি। থানার অনলাইন জিডির তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিল না।

শামীমার মৃত্যুর পর থেকে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফনসহ বিষয়টি দেখভাল করেছেন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিডি থাকার পরও পরিবারকে খুঁজে না পাওয়া দুঃখজনক এবং এ দায় নলছিটি থানা এড়াতে পারে না।’

এসআই সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, পরিবারের সদস্যরা এখনো চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় কবর থেকে লাশ তুলে আবার দাফন করতে পারেন। শামীমার মৃত্যুসনদে ‘দুলালী’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সনদ শামীমার মা এবং তাঁর স্বামী দুজনই চাচ্ছেন। কাকে দেওয়া হবে, তা সুরাহা হয়নি। তাই সনদটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।

দুলালী বা শামীমা যে প্রশ্ন রেখে গেলেন


জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮-১৯) বলছে, দেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ১৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এসব ব্যক্তির ৯২ শতাংশ চিকিৎসা নেন না। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতি, বাংলাদেশ ২০২২ বলছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় বেশি ভোগেন। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ।

২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইনে মানসিক রোগী ভর্তির জন্য এনআইডির বাধ্যবাধকতা নেই। বরং অভিভাবক, আত্মীয় বা ঠিকানাবিহীন মানসিক রোগীদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির মাধ্যমে নিকটস্থ সরকারি মানসিক হাসপাতালের প্রধানের কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে শুরুতে শামীমাকে হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসছে।

তবে পাবনা মানসিক হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে রোগী ভর্তিতে এনআইডি, নাগরিকত্ব সনদ, জন্মনিবন্ধন, ছবি, রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের উপস্থিতি ও অভিভাবকের এনআইডিসহ বিভিন্ন নথি চাওয়া হয়। অভিভাবকহীন রোগীদের আদালতের নির্দেশে ভর্তি করা হয়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক রোগী হারিয়ে গেলে, পালিয়ে গেলে, আত্মহত্যা বা সহিংসতার চেষ্টা করলে কিংবা অভিভাবক রোগীকে নিতে অস্বীকৃতি জানালে আইনগত প্রক্রিয়ায় এনআইডি ও ছবি প্রয়োজন হয়। এ কারণে ভর্তির সময় রোগীর ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়। তবে অভিভাবকহীন গুরুতর মানসিক রোগীরা জরুরি বিভাগ বা আউটডোরে এলে তাঁদের পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তির সময় মা–বাবা বা অভিভাবকের ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়।

তবে এ বিষয়ে বিকল্প আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ মনোচিকিৎসকদের নিয়ে সভা করার পরিকল্পনা আছে জানিয়েছেন সাইফুন নাহার।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিন্নমূল মানুষ হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাবেন না—এটা হতে পারে না। এটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি ত্রুটি। দুলালীর মৃত্যু রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারব্যবস্থার অনেকগুলো দিক সামনে এনেছে।

জিয়াউদ্দিন হায়দার আরও বলেন, এই নারী কেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন, পরিবারের সদস্যরা তখন কোন দায়িত্ব পালন করলেন, তা দেখতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সব মিলে আইনের কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন করতে হবে, তা দেখতে হবে।

মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখনো জানা যায়নি তিনি শামীমা নাসরিন জাহান
মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখনো জানা যায়নি তিনি শামীমা নাসরিন জাহান। ছবি: মুছা করিমের সৌজন্যে

ইরানি অভিবাসীদের মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র

কয়েকজন ইরানিসহ আরও কিছু অভিবাসীকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। সহিংসতা ও দারিদ্র্যে জর্জরিত আফ্রিকার দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন আইনজীবী ও বিষয়টি সম্পর্কে জানেন, এমন একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

এই তালিকায় এমন দুজন নারী রয়েছেন, যাঁরা ইরানে ফেরত গেলে নির্যাতন ও নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাঁদের আইনজীবী এমিলি ট্রোসল জানান, এই দুজনের একজন ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান, অন্যজন গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকর্মী।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে আফ্রিকার দেশটি তথাকথিত ‘তৃতীয় দেশ’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্বাসিতদের গ্রহণ করতে সম্প্রতি সম্মত হয়েছে।

ট্রোসল বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পরপরই এই দুই নারীকে আটক করা হয়। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের আবেদন করেন এবং একটি মার্কিন অভিবাসন আদালত থেকে ‘উইথহোল্ডিং অব রিমুভাল’ নামে একধরনের সুরক্ষা পান।

এই সুরক্ষা পাওয়ার অর্থ হলো, আদালত মনে করেছেন, ইরানে ফেরত গেলে তাঁদের নিপীড়ন বা নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশের বেশি।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তির অধীনে প্রথম ফ্লাইটে প্রায় ২০ জনকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে নেওয়া হবে। তাঁদের মধ্যে সিরিয়া ও আফগানিস্তানের নাগরিকও রয়েছেন। দুই আইনজীবী জানান, ফ্লাইটটি বৃহস্পতিবার (গতকাল) ছাড়ার কথা ছিল।

রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে পালিয়ে আসা এবং একই ধরনের সুরক্ষা পাওয়া একজন তুর্কি নাগরিকও এই ফ্লাইটে থাকতে পারেন, এমন তথ্য জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী। এই আইনজীবী নিজের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

তৃতীয় দেশে নির্বাসন চুক্তি

ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রতিবেশী দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (যেখানে এখন ইবোলার প্রকোপ চলছে) মতো দেশগুলোর সঙ্গে ‘তৃতীয় দেশে’ নির্বাসন চুক্তি করেছে। এমন সব অভিবাসীকে এসব দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাঁদের আইনি জটিলতার কারণে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।

ওয়াশিংটন এসব চুক্তি আইনসম্মত বলে দাবি করছে। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজীবীরা বলছেন, চুক্তির বিস্তারিত দিক এখনো অস্পষ্ট এবং অনেক নির্বাসিত ব্যক্তিকে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশেই ফেরত যেতে হতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল একযোগে ইরানে হামলা শুরু করে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনা চলছে।

ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান লিগ্যাল ডিফেন্স ফান্ডের ভারপ্রাপ্ত আইনি পরিচালক আলী রাহনামা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানি জনগণকে স্বাধীনতা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এমন একটি সময়ে সেই একই শাসনব্যবস্থা থেকে পালিয়ে আসা ইরানি আশ্রয়প্রার্থীদের তারা মৃত্যুর মুখে ঠেলে পাঠাচ্ছে।’

চুক্তির অধীনে নির্বাসিত হতে পারেন ‘শত শত’ মানুষ

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত উল্লিখিত মার্কিন কর্মকর্তা জানান, নির্বাসিত ব্যক্তিদের মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুইয়ের বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে রাখা হবে এবং তাঁদের অবিলম্বে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে না। এই চুক্তির অধীনে পর্যায়ক্রমে শত শত অভিবাসীকে নির্বাসিত করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র সুরক্ষা (হোমল্যান্ড সিকিউরিটি) দপ্তর গত সপ্তাহে জানায়, নির্বাসিত ব্যক্তিদের পাঠানোর ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক মুখপাত্র বলেন, মধ্য আফ্রিকান সরকারের অনুরোধে বাঙ্গুইয়ে পাঠানো অভিবাসীদের সেখানে ‘পৌঁছানোর পর মানবিক সহায়তা’ দেবে সংস্থাটি। তবে নির্বাসন প্রক্রিয়ায় আইওএম জড়িত নয় এবং স্বেচ্ছাভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে এই সহায়তা দেওয়া হবে।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ বছর আইওএমকে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার বরাদ্দ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে দেশটি বারবার অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে দেশটির ৫৫ লাখ মানুষের বেশির ভাগ এখনো দরিদ্র অবস্থার মধ্যে বসবাস করছেন।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ফস্তিন-আরশঞ্জ তুয়াদেরা গত বছর কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। অন্য গোষ্ঠীগুলো রুশ ভাড়াটে সেনা, রুয়ান্ডার সেনা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মোকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব বিদেশি ভাড়াটে বাহিনীকে তুয়াদেরা সরকারকে সহায়তার জন্য মোতায়েন করা হয়েছিল।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুই শহরের একটি অংশের দৃশ্য। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সাল
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুই শহরের একটি অংশের দৃশ্য। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সাল। ছবি: রয়টার্স

তরুণদের ফ্যাশন জগতে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন ক্লাব by ছিদরাতুল মুনতাহা

ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ভবিষ্যতের ফ্যাশন ডিজাইনারদের সংযোগ তৈরি করতে কাজ করে চলেছে দেশের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন ক্লাব। সম্প্রতি বুটেক্স ও বিইউএফটি-এর ফ্যাশন ক্লাবের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফ্যাশন শো।

বুটেক্স ফ্যাশন সোসাইটি

২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ফ্যাশন শো দিয়ে শুরু হয় বুটেক্স ফ্যাশন সোসাইটির যাত্রা। ভবিষ্যতের ফ্যাশন ডিজাইনারদের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিতেই ক্লাবটির সূচনা হয়েছিল। যেখানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা কাজে লাগাতে পারবেন নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর সৃজনশীতলতা।

দুই বছরের মাথায় তাঁরা এখন বাংলাদেশের ক্যাম্পাসভিত্তিক সবচেয়ে বড় ফ্যাশন প্রতিযোগিতার সহ-আয়োজক। প্রায় দুই মাসের দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান ‘জেনরা’র সহযোগিতায় ‘জেনরা ফ্যাশন অডিসি ২০২৫’ শীর্ষক সেই আয়োজনই হয়ে গেল গত ২২ অক্টোবর। আয়োজনের থিম ছিল ‘ট্রেডিশন অব টুমরো’।

বাংলার ঐতিহ্যকে কীভাবে আধুনিক ফ্যাশনে পরিণত করা যায়, কীভাবে দুটি ধারার মেলবন্ধন ঘটানো যায়, সেটিই ছিল লক্ষ্য। উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা আফজাল হোসেনসহ খ্যাতিমান ফ্যাশন ডিজাইনাররা।

শুধু ফ্যাশন শো নয়, সারা বছরই সোসাইটির কোনো না কোনো কার্যক্রম চলতে থাকে। ফ্যাশন অলংকরণ, ড্রেস মেকিং, নকশা প্রতিযোগিতাসহ ক্যারিয়ার গ্রুমিং ও মেন্টরশিপ প্রোগ্রামেরও আয়োজন করে থাকে তারা। নিয়মিত ল্যাবওয়ার্কের অংশ হিসেবে আয়োজন করে প্যাটার্ন ড্রাফটিং, এমব্রয়ডারি মাস্টারিং, সারফেস অর্নামেন্টেশন ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন কর্মশালা।

আবার টেকসই ডিজাইন, ট্রেন্ড বিশ্লেষণ, উপস্থাপন কৌশল ও পোর্টফলিও উন্নয়ন বিষয়ে বিভিন্ন সেশনেরও আয়োজন করে তারা। শিক্ষকদের পাশাপাশি টেক্সটাইল জগতের অভিজ্ঞ লোকেরা সেখানে যুক্ত থাকেন। কারণ, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির কাজ শুধু পোশাক তৈরিই না, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। আইডিয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন সৃজনশীলতা।

বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্ম নিজেকে যাতে একাত্ম করতে পারে, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পগুলোকে আধুনিক উপায়ে হাজির করছে বুটেক্স ফ্যাশন ক্লাব। জামদানি, নকশিকাঁথা, মসলিন, হ্যান্ডলুম ও রিকশাচিত্র নিয়ে বেশকিছু ফিউশনধর্মী কাজও ক্লাবটি করেছে।

বুটেক্স ফ্যাশন সোসাইটির বর্তমান চিফ সুদীপ্ত বনিক বলেন, ‘আমরা যা পরি, তা আমাদের মানসিক অবস্থা, আত্মবিশ্বাস ও দুর্বলতাকে প্রকাশ করে। কারও জন্য পোশাক নিজেকে আত্মপ্রকাশ করার মাধ্যম, কারও জন্য কমফোর্ট জোন, আবার কারও জন্য হতে পারে আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার উপায়। আমরা নিজেকে যেভাবে দেখি, ফ্যাশনের মাধ্যমে সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলি। এক কথায়, আমাদের চিন্তাভাবনাই আমাদের পোশাকে ফুটে ওঠে।’

দেশের ফ্যাশনকে আরও সমৃদ্ধ করতে কাজ করে যাচ্ছে এই ক্লাব। কয়েক বছর পর ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে স্টুডেন্ট প্ল্যাটফর্মের কথা উঠলে যেন বুটেক্স ফ্যাশন সোসাইটির নাম সবার আগে থাকে, এটাই তাদের চাওয়া।

বিইউএফটি ফ্যাশন ক্লাব

ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ তৈরি এবং তাঁদের প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ করে দিতেই ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট যাত্রা শুরু করে বিইউএফটি ফ্যাশন ক্লাব। ছোট পরিসরে শুরু করলেও ক্লাবটির লক্ষ্য ছিল বিশাল। বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থীরা যাতে তাঁদের সৃষ্টিশীল চিন্তা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা উন্নত করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে বিইউএফটি ফ্যাশন ক্লাব।

বিইউএফটি ফ্যাশন ক্লাবের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ফ্যাশন শো ও রানওয়ে ইভেন্ট, কর্মশালা ও ট্রেনিং সেশন, ফটোগ্রাফি ও স্টাইলিং এক্সিবিশন, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং সেমিনার, আন্তবিশ্ববিদ্যালয় সহযোগী প্রকল্প ইত্যাদি। ক্লাবটির কার্যক্রম এখন আর শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ড, ডিজাইনার, ফটোগ্রাফার এবং ইভেন্ট অর্গানাইজারদের সঙ্গেও নিয়মিত কাজ করছে তারা।

সম্প্রতি বিইউএফটি ফ্যাশন ক্লাব, যেমন একটি ফ্যাশন শোতে ‘র নেশন’-এর কিছু ডিজাইন উপস্থাপন করে। ডিজাইন, মডেলিং এবং প্রোডাকশন টিমের সমন্বয়ে এটি ছিল পেশাদার মানের একটি ফ্যাশন শো। এভাবে অন্যান্য ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি নেটওয়ার্কিং করার সুযোগ পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিটি আয়োজন শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছেন।

শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ফ্যাশন প্রোডাকশন, ইভেন্ট প্ল্যানিং, টিমওয়ার্ক, মিডিয়া কমিউনিকেশন এবং প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিংয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয় এই ক্লাব। ক্লাবটিতে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট টিম, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া টিম, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং টিম সক্রিয়ভাবে কাজ করে। এসব টিমের সদস্যরা এই সেক্টরগুলোতে কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।

ক্লাবের বর্তমান সহসভাপতি নাইম চৌধুরী বলেন, ‘নিজস্ব ডিজাইন, থিম ও সৃজনশীল ধারণা তৈরিতে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয় ক্লাব। প্রতিটি প্রজেক্ট বা ইভেন্টে শিক্ষার্থীরাই মূল পরিকল্পনা ও কনসেপ্ট তৈরি করে, পরে দলগতভাবে যা উন্নত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মেন্টররা এসব কার্যক্রমে নিয়মিত দিকনির্দেশনা, কারিগরি পরামর্শ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সহায়তা দেন। তাঁদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা ফেব্রিক নির্বাচন থেকে শুরু করে কালার থিওরি, গার্মেন্ট কনস্ট্রাকশন, প্রেজেন্টেশন ও স্টাইলিং—সবকিছুতেই পেশাদার মানের কাজ করতে শেখে।’

ভবিষতে বৃহত্তর আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ফ্যাশন সপ্তাহ, কর্মশালা এবং টেকসই ফ্যাশন নিয়ে কাজ করতে চায় বিইউএফটি ফ্যাশন ক্লাব।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-15%2Fx7r6869q%2FButex-2.JPG?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গত ২২ অক্টোবর ২০২৫ আয়োজন করা হয় ‘জেনরা ফ্যাশন অডিসি ২০২৫’ ছবি: বুটেক্স ফ্যাশন সোসাইটির সৌজন্যে

‘অন্ধকারে’ নেতানিয়াহু, জানতেন না কিছুই

ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও হামলা স্থগিত করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান গোপন আলোচনার বিষয়ে নেতানিয়াহু অনেকটাই অন্ধকারে ছিলেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি তথ্য জানার চেষ্টা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিত্র সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এখন দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এক সময় যারা সমন্বিতভাবে এই সংঘাতে জড়িয়েছিল, এখন তাদের লক্ষ্য ও স্বার্থ ভিন্ন পথে এগোচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্রুত সংঘাতের সমাপ্তি চান, বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপের কারণে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু চলতি বছরই নির্বাচনী চাপের মুখে রয়েছেন এবং যুদ্ধ শুরুর সময় যে লক্ষ্যগুলো তিনি নির্ধারণ করেছিলেন, সেগুলো পূরণ করাই এখন তার প্রধান অগ্রাধিকার।

ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ জানান, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি খসড়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইরানে পূর্বনির্ধারিত হামলা ও বোমাবর্ষণ বাতিল করেছেন।

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানসহ কয়েকটি দেশ এই আলোচনায় নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার আগে ট্রাম্প নেতানিয়াহু, কাতারের আমির এবং অন্যান্য আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী রোববার জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে।

ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ নয় ইসরাইল। তবে তারা জানিয়েছে, সম্ভাব্য চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ধ্বংস, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধের বিষয়গুলো থাকা উচিত- এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইস্যুতে দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্য এখন ভিন্ন দিকে যাচ্ছে। ট্রাম্প দ্রুত একটি সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাত শেষ করতে চান, যেখানে ইসরাইল দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপ বজায় রেখে ইরান ও তার সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই মতপার্থক্যের কারণে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে।

অভ্যন্তরীণ চাপ ও রাজনৈতিক হিসাব যুক্তরাষ্ট্রে
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বৃদ্ধির সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প, যা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে ইসরাইলে হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতে এখনো পূর্ণ বিজয় না পাওয়ায় সমালোচনার মুখে রয়েছেন নেতানিয়াহু।
গাজা, লেবানন এবং ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা তার সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কেও টানাপোড়েন
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একটি ফোনালাপে তিনি নেতানিয়াহুকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন এবং লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ জানান।

অ্যাক্সিওসের সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্প এক পর্যায়ে নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় প্রশ্ন করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তার কৌশল নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই নেতার সম্পর্ক এখন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একদিকে কৌশলগত জোট বজায় রাখার চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ- দুই পক্ষকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করছে।

জনমত জরিপ অনুযায়ী, ইসরাইলের একটি বড় অংশ এখনো যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পক্ষে, তবে সরকারের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছে।
সব মিলিয়ে ইরান সংকট ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্ক নতুন করে টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে।

‘অন্ধকারে’ নেতানিয়াহু, জানতেন না কিছুই