Thursday, January 14, 2010

এসিআইয়ের বার্ষিক বিক্রয় ও বিপণন সম্মেলন অনুষ্ঠিত

এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালসের দিনব্যাপী বার্ষিক বিক্রয় ও বিপণন সম্মেলন সম্প্রতি কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে কোম্পানির বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কর্মকর্তারা যোগ দেন।
সম্মেলনের উদ্বোধন করেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ দৌলা। এতে কোম্পানির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা এম মহিবুজ জামান, বিক্রয় ও বিপণন পরিচালক আবদুস সাদেক উপস্থিত ছিলেন।
আরিফ দৌলা ২০০৯ সালে সাফল্য অর্জনের জন্য কোম্পানির কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ দেন। তিনি বলেন, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস নিরলস কাজ করে যাবে।
এম মহিবুজ জামান বাজারে সর্বাধুনিক পণ্য সরবরাহে এসিআইয়ের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
সম্মেলনে কোম্পানির সাফল্য অর্জনকারী বিক্রয় প্রতিনিধিদের পুরস্কৃত করা হয়।

মন্দা নিয়ে ম্যানিলায় এডিবির বৈঠক বৃহস্পতিবার

বিশ্বমন্দা ও মন্দা-উত্তর মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত তৈরি এবং বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে কাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক এক বৈঠক বসছে ফিলিপাইনে।
‘বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজক এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এডিবির সদর দপ্তর ম্যানিলায় অনুষ্ঠেয় দুই দিনব্যাপী এ বৈঠকে বাংলাদেশসহ মন্দায় আক্রান্ত বিভিন্ন দেশ এবং উন্নত দেশগুলো অংশ নেবে।
বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকারি নীতিনির্ধারক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বেসরকারি খাতের শীর্ষ নির্বাহী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অংশ নেবেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি। বাংলাদেশ থেকে এতে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল যাচ্ছে। দলের সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান, এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার, অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফজলে কবীর এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্ম সচিব সাইফুদ্দিন আহমদ।
জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, অর্থসচিব মোহাম্মদ তারেক এবং ইআরডি সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার এ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও রাষ্ট্রীয় অন্য ব্যস্ততার কারণে তাঁরা এই বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন না।

পাঁচ মাসে কৃষি ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ

চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে ২০০৯-১০ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়কালে ব্যাংকগুলো চার হাজার ২৪৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে।
আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৩৭৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাত্ ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
পাঁচ মাসে বিতরণ করা ঋণ চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩৭ শতাংশ। এবার ১১ হাজার ৫১২ কোটি ৩০ লাখ টাকার কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে।
আলোচ্য সময়ে মোট বিতরণ করা ঋণের মধ্যে এক হাজার ৪৫২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে শস্য খাতে। আর এক হাজার আট কোটি ১৯ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন খাতে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে আরও দেখা যায় যে আলোচ্য সময়ে বকেয়া ঋণ আদায়ের পরিমাণ ছিল চার হাজার ৪৯ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেশি।
২০০৮-০৯ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়কালে দুই হাজার ২৭০ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বকেয়া কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল।
উচ্চহারে কৃষি ঋণ আদায় একদিকে নিট কৃষি ঋণ বিতরণকে কমিয়ে দিলেও এটি আবার পরবর্তী সময়ে কৃষি ঋণ বিতরণ অব্যাহত রাখতে ব্যাংকগুলোর জন্য সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

গ্রামীণ গুচ্ছ জনপদ তৈরি করতে চান অর্থমন্ত্রী

গ্রাম থেকে গরিব জনগোষ্ঠীর শহরে আসা ঠেকাতে গ্রামীণ গুচ্ছ জনপদ সৃষ্টি করতে হবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ভবিষ্যতে সরকারের নীতি নির্দেশনায় এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, গুচ্ছ জনপদে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুত্—এই তিন সেবা দিতে পারলে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তখনই শহরে আসা বন্ধ করবে দরিদ্র লোকজন।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর এলজিইডি মিলনায়তনে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘নগর দারিদ্র্যের ব্যাপকতা ও তার সমাধান’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। আলোচনায় অংশ নেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব হোসেন, সাংসদ আ ক ম মোজাম্মেল হক, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সাবেক গণপূর্তসচিব রাশিদুল হাই, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র সেলিনা হায়াত আইভি প্রমুখ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় সরকার ছোট রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও আমাদের মধ্যে অনেকেই বিকেন্দ্রীকরণ পছন্দ করেন না। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া দেশ সামনে এগোতে পারবে না।’
বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদকে গতিশীল করার তাগিদ দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এতে শহরে অবস্থিত শিল্প কারখানাগুলো গ্রামে স্থানান্তর করা যাবে। তৈরি পোশাক কারখানাও ওখানে চলে যেতে পারবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ গুচ্ছ জনপদ তৈরি করতেই হবে। কারণ বাড়তি জনসংখ্যার চাপে কৃষিজমি ক্রমেই কমছে। কৃষিজমি বাঁচিয়ে খাদ্য উত্পাদন বাড়ানো ছাড়া সামনে কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য আগামী সরকারের নীতি-নির্দেশনায় এই বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গুচ্ছ জনপদ তৈরি করে কিছু লোককে গ্রামে ফিরিয়ে নিতে পারলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি দূর হবে বলেও মনে করেন অর্থমন্ত্রী।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, নগর দারিদ্র্য রোধ করতে সরকারকে গ্রামভিত্তিক কর্মসূচি নিতে হবে। তাহলে গ্রামের দরিদ্রদের শহরে আসা বন্ধ হবে।

ভারতকে সব অশুল্ক বাধা দূর করতে হবে -সিআইআইয়ের সাবেক মহাপরিচালকের সুপারিশ



বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে ভারত সরকারকে সব ধরনের অশুল্ক বাধা অপসারণে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের (সিআইআই) সাবেক মহাপরিচালক ও প্রধান উপদেষ্টা তরুণ দাস এই আহ্বান জানিয়েছেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়ায় গতকাল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে তিনি যে ২৪ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন, তাতে অশুল্ক বাধা অপসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তরুণ দাসের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভারত ইতিমধ্যেই বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানিকে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করেছে। এখন বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের আধাশুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অশুল্ক বাধা অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁরা বলছেন যে অশুল্ক বাধার কারণে শুল্ক ছাড় পাওয়ার পরও অনেক সময় পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিভিন্ন ধরনের অশুল্ক বাধার মধ্যে আছে পণ্যের শ্রেণীকরণ জটিলতা, পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা, বিভিন্ন পণ্যে ভারতীয় বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র, ভারতীয় স্থলবন্দরে পণ্য সংরক্ষণের জন্য গুদামের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, তরুণ দাস ১৯৭৪ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত সিআইআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন। এরপর ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি সিআইআইয়ের প্রধান উপদেষ্টা (চিফ মেনটর) ছিলেন। তিনি সিআইআইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ ৪৫ বছর যুক্ত ছিলেন।
দুই দেশের মধ্যে পণ্য বহন ও স্থানান্তর সহজীকরণের জন্য স্থল সীমান্তের কাস্টমস সংলগ্ন অবকাঠামো উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এতে।
তরুণ দাসের প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র, চামড়াজাত পণ্য, পাট, কাগজজাত পণ্য, সিরামিক, সামুদ্রিক খাদ্য, সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়াতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশি পণ্য কেনার বিশেষ প্রকল্প (বাই বাংলাদেশ প্রজেক্ট) গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবে ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করার এবং এ কাজে বাছাই করা বাণিজ্য সংগঠনের সুপারিশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
২৪ দফা প্রস্তাবের মধ্যে নেপাল ও ভুটানের মতো সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশকে ট্রানজিট-সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, পণ্যের মানের ক্ষেত্রে উভয় দেশের মান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

চার মাসে বাজেট ঘাটতি ১০৮৯ কোটি টাকা -অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে গরমিল

চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে দেশে বাজেট ঘাটতি অর্থায়ন আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকারকে ব্যয় করতে হয়েছে মাত্র এক হাজার ৮৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
আর ২০০৮-০৯ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এই কাজে ব্যয় করতে হয়েছিল দুই হাজার ৮৭৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
মূলত উন্নয়ন ব্যয়ে সেভাবে গতি সঞ্চার না হওয়ায় ঘাটতি অর্থায়ন কমে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভর্তুকি কমে যাওয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে এই চার মাসে সরকার ব্যাংক থেকে কার্যত কোনো ঋণ গ্রহণ করেনি। বরং যে পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছে, তার চেয়ে বেশি ঋণ ফেরত দেওয়ায় নিট ঋণ নেতিবাচক হয়ে গেছে।
অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকার চার হাজার ৭২৪ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে নিট ঋণ হিসেবে নিয়েছিল।
অবশ্য চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সরকার ব্যাংক-বহির্ভূত উত্স থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে।
পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে এই ঋণের পরিমাণ চার হাজার ৪৩৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
আর গত অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে এর পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩৪৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
ব্যাংক-বহির্ভূত উেসর প্রায় পুরোটাই আসে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে।
আলোচ্য সময়কালে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৩৬৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৯ শতাংশ বেশি।
অবশ্য এই চার মাসে গ্রাহকেরা চার হাজার ৪৩৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা নগদায়ন করায় মূল বাবদ সরকারকে এই অর্থ ফেরত দিতে হয়েছে।
এর ফলে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৯৩০ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১৩ শতাংশ বেশি।
২০০৮-০৯ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯৫১ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে আরও দেখা যায় যে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সরকার বিদেশি ঋণ সহায়তা বাবদ মাত্র ২২৩ কোটি টাকা পেয়েছে, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৭৩ কোটি টাকা।
তবে ঘাটতি অর্থায়নের পরিসংখ্যান নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুসারে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ ৯১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে এটি ৮৯০ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক থেকে নিট তিন হাজার ১১৭ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে নিট ঋণ নেতিবাচক দুই হাজার ৫৪৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
অর্ধবার্ষিকী অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও (সিপিডি) বিষয়টি তুলে ধরেছে।
সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তার একটা নিষ্পত্তি হওয়া দরকার।
এতে আরও বলা হয়েছে, মনে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাই ঘাটতি অর্থায়নের তথ্য বিশ্লেষণে অনেক বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

ডিএসইর সূচক নির্ণয়ে নীতিমালার ব্যত্যয় হয়নি: এসইসি -সংবাদ সম্মেলনে বিকৃতির কথাও স্বীকার করা হয়েছে

শেয়ারবাজারের সূচক নির্ণয়ে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনসের (আইওএসসিও) নীতিমালার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের প্রারম্ভিক মূল্যের ভিত্তিতে সূচক নির্ধারণ পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক এই ফোরামের নীতিমালার পরিপন্থী নয়।
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গতকাল মঙ্গলবার এ দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ আহমেদ আইওএসসিওর নীতিমালায় উল্লিখিত সংশ্লিষ্ট ধারা উল্লেখ করে বলেন, ‘এই নীতিমালায় কোন দিনের মূল্যের ভিত্তিতে কোম্পানির তথ্য সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই। সংশ্লিষ্ট দেশের সিকিউরিটিজ কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর তালিকাভুক্তির মান অনুযায়ী এটি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। তাই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলে যে বক্তব্য সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে তা যথার্থ নয়।’
তবে সূচক নির্ণয়ে কিছুটা বিকৃতির (ডিসটরশন) কথা স্বীকার করে ফরহাদ আহমেদ বলেন, এর বড় কারণ, উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক শেয়ারের মূল্য এবং তালিকাভুক্তির পর বাজারমূল্যের মধ্যে সাধারণত বড় কোনো ব্যবধান থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যবধান প্রায় ক্ষেত্রেই অনেক বেশি হয়। আর এ কারণেই প্রথম দিনের পরিবর্তে দ্বিতীয় দিনের মূল্যের ভিত্তিতে সূচক নির্ণয়ের পক্ষে এসইসি।
ফরহাদ আহমেদ আরও বলেন, সূচকের মাধ্যমে যাতে বাজারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়, সে জন্য দুই স্টক এক্সচেঞ্জে একক নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণের বিষয়ে গত বছরের ২৮ মে এসইসি, ডিএসই ও সিএসইর একটি যৌথ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। এমনকি গ্রামীণফোনের লেনদেনের প্রথম দিন সূচকের পরিবর্তনের বিষয়েও বিস্তারিত জানতে চেয়ে ডিএসইকে চিঠি দিয়েছে এসইসি।
এসইসির এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও বলেন, তাই বলে সূচক ভুলভাবে নির্ণয় হচ্ছে জেনেও এসইসি বিষয়টি আমলে নেয়নি—এমন বক্তব্যও সঠিক নয়। কারণ বিষয়টি প্রথমে এসইসিরই নজরে আসে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে জানাতে বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ফরহাদ আহমেদ বলেন, দেশের দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে সূচক নির্ণয় করত। এ ক্ষেত্রে সমতা আনতে গত ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এসইসি, ডিএসই ও সিএসইর যৌথ বৈঠকে অভিন্ন পদ্ধতিতে সূচক নির্ণয়ের সিদ্ধান্ত হয়।
এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ভবিষ্যতে তালিকাভুক্ত প্রথম কোম্পানির লেনদেন থেকেই অভিন্ন সূচক নির্ণয় শুরু হবে। নতুন পদ্ধতিতে সূচক নির্ণয় হবে প্রথম দিনের সমাপনী মূল্যের ভিত্তিতে। ফরহাদ আহমেদ বলেন, গত বছরের ২৮ মে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্তে সূচক কার্যকর না করার ক্ষেত্রে কারও কোনো গাফলতি রয়েছে কি না, এসইসি তা খতিয়ে দেখছে। যদি এ ক্ষেত্রে কারও গাফলতি পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে এসইসি।

টেন্ডুলকার-দ্রাবিড়রা আসছেন আজ

চাইলে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচের পুরোটাই মাঠে বসে দেখতে পারবেন শচীন টেন্ডুলকার-রাহুল দ্রাবিড়রা। আজ দুপুর ১২টায় ঢাকায় এসে পৌঁছাচ্ছেন তাঁরা। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে খেলতে এই দুজনের সঙ্গে আরও আসছেন আরেক অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ভি ভি এস লক্ষ্মণ, ওপেনার মুরালি বিজয়, পেসার ইশান্ত শর্মা ও বাঁহাতি স্পিনার প্রজ্ঞান ওঝা। ১৭ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রামে প্রথম টেস্ট, ঢাকায় দ্বিতীয় টেস্ট শুরু ২৪ জানুয়ারি।

বাংলাদেশের আইডিয়া কাপ

আইডিয়া কাপে জয়ের মুখ দেখেনি বাংলাদেশ। তার পরও অধিনায়ক সাকিব আল হাসান দলের পারফরম্যান্সকে মূল্যায়ন করছেন ‘এক শতে আশি’ বলে! চার ম্যাচে বাংলাদেশের স্কোর ২৬০, ২৯৬, ২৪৯ ও ২৪৭—সাকিবের দাবির পেছনে বড় যুক্তি এটাই। তবে টুর্নামেন্টে এমন কিছুও করেছেন সাকিব-সতীর্থরা, ফাইনালের আগে ভারত ও শ্রীলঙ্কানদের সরিয়ে যেখানে শীর্ষে তাঁরাই।
যেমন টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ব্যাটিং গড় মাহমুদউল্লাহর। ৪ ম্যাচের ৩টিতেই অপরাজিত থেকে করেছেন ১৯৩ রান। ব্যাটিং গড়ও ১৯৩! গড় স্ট্রাইক রেটের ক্ষেত্রে শীর্ষে থাকা বীরেন্দর শেবাগের (১৫৩.৮৪) সামান্য পেছনেই আছেন নাঈম ইসলাম। তাঁর স্ট্রাইক রেট ১৫৩.৬৫। টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি তিন ছক্কা নাঈম ইসলামের। এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ২টি ছক্কাও তাঁর। ইনিংসে দুটি ছক্কা অবশ্য আছে আরও দুজনের, বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিম ও ভারতের যুবরাজ সিংয়ের। আরেকটি জায়গাতেও শীর্ষে মুশফিকুর। সাঙ্গাকারার সঙ্গে সর্বোচ্চ ৪টি ডিসমিসালের যৌথ মালিক তিনি। সাকিব কি আর এমনি এমনিই ভালো করেছেন বলে দাবি করছেন!

আফ্রিকায় ‘অঘটন’ চলছেই

এবারের আফ্রিকান নেশনস কাপটা ‘অঘটনের আসর’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সবচেয়ে বড় অঘটনটা তো টুর্নামেন্টের উদ্বোধনের ঠিক আগের দিন মাঠের বাইরেই হয়ে গেল। মাঠেও কম নাটক হচ্ছে না। উদ্বোধনী ম্যাচেই রোমাঞ্চের পসরা ছড়িয়ে ০-৪ গোলে পিছিয়ে থাকা মালি ঠিকই ৪-৪ গোলের ড্র নিয়ে ফিরেছে স্বাগতিক অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে।
টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় দিনের দুটো ম্যাচেও হয়েছে নাটক। পরশু বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে উঠে যাওয়া আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে চমকে দিয়েছে মালাউয়ি। দ্বিতীয়বারের মতো আফ্রিকান এই টুর্নামেন্টে খেলতে আসা দলটির এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এটি প্রথম জয়। ওদিকে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট আইভরিকোস্টকে গোলশূন্য ড্র করে রুখে দিয়েছে বার্কিনা ফাসো। ‘বি’ গ্রুপে পরশু ম্যাচ ছিল আরেকটি। অনেক নাটকের পর দেশে ফিরে যাওয়ায় টোগোর নামই বাদ গেছে টুর্নামেন্ট থেকে। ফলে এই গ্রুপটা এখন তিন দলের। এই তিন দলের মধ্যে দুটো দল উঠে যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে।
টোগো থাকলে ‘বি’ গ্রুপ থেকে সেরা আটে ওঠার লড়াইটা হতো ত্রিমুখী। টোগো সরে যাওয়ায় আইভরিকোস্ট আর ঘানার রাস্তা যখন পরিষ্কার দেখছিল সবাই, তখনই দিদিয়ের দ্রগবার দলকে আটকে দিয়ে বার্কিনা ফাসো মনে করিয়ে দিল, গ্রুপের লড়াইটা এখনো ত্রিমুখীই হবে।
যদিও মাঠের লড়াইটা অনেকটাই একপেশে হয়েছে। পরিষ্কার তিনটি সুযোগ মিস করেছেন বাকারি কোনে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা দ্রগবাও স্বরূপে ছিলেন না। দ্রগবা অবশ্য ম্যাচ শেষে দাবি করলেন, শুক্রবারের ওই রক্তাক্ত ঘটনাই এমন পারফরম্যান্সের জন্য দায়ী, ‘কদিন আগে যা ঘটে গেল এর পর খেলায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন।’
কাবিন্দনার শিমান্দেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে আক্ষরিক অর্থেই শুক্রবারের ছায়া ছিল। গ্যালারি ছিল প্রায় শূন্য। ছিল নিরাপত্তাকর্মীদের ব্যাপক তত্পরতা।
আইভরিকোস্ট না হয় একটা কারণ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু আর মাসকয়েক পর বিশ্বের সেরা ৩২ দলের একটির পরিচয় নিয়ে বিশ্বকাপের আসরে খেলার অপেক্ষায় থাকা আলজেরিয়ার এই পরাজয়ের ব্যাখ্যা কী? আবহাওয়া! কোচ রাবাহ সাদানে দুষলেন উষ্ণ আবহাওয়া আর আর্দ্রতাকেই।

আবারও সোনার কথা বলল বক্সিং-সাইক্লিং

দক্ষিণ এশীয় গেমস শুরু হতে আর মাত্র ১৬ দিন বাকি। অথচ বক্সিং স্টেডিয়াম এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়! মঞ্চ (রিং) করার কথা ২০ জানুয়ারি। ওদিকে ‘ভেলোড্রাম’ না থাকায় প্রস্তুতি নিয়ে অসন্তুষ্টি আছে সাইক্লিস্টদের। তবে খুলনায় ভেন্যু হওয়াতে সাইক্লিং ফেডারেশনের অন্তত ‘ভেন্যু চিন্তা’ নেই।
এসএ গেমসের দলগুলোর ধারাবাহিক দল ঘোষণা অনুষ্ঠানে কাল এসেছিল বক্সিং ও সাইক্লিং। এখানে এসে দু দলই বলল, তাদের লক্ষ্য সোনা জয়। অন্তত দুটি সোনা জয়ের কথা বলেছে বক্সিং, সাইক্লিং আশা করছে একটি।
বক্সিংয়ের প্রধান কোচ আবদুল মান্নান জানালেন, ৫৪ কেজিতে নাদিম হোসেন এবং ৬৪ কেজিতে আবদুর রহিম সোনা জেতার সামর্থ্য রাখেন। এ ছাড়া ৫১ কেজিতে ওহিদুজ্জামান এবং ৬০ কেজিতে জুয়েল আহমেদ অথবা রোকন উদ্দিন সোনা জিততে পারেন। আবদুল মান্নানের কথা, ‘আমরা যেভাবে দীর্ঘ সময় নিয়ে ট্রেনিং করাচ্ছি ছেলেদের, তাতে অন্তত দুটো সোনা আশা করতেই পারি।’
গেমসের গত আসরে খালি হাতেই ফিরেছিলেন সাইক্লিস্টরা। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হাসানের ভাষায়, ‘ওটা ছিল অংশ নেওয়ার জন্যই অংশ নেওয়া।’ তবে এবার দক্ষিণ কোরিয়ান কোচ হুয়াংলি কিম এসে গত দুই মাসে অনেক উন্নতি করেছেন বলে তাঁর দাবি। সাইক্লিংয়ের ৪টি ইভেন্টের মধ্যে পুরুষ ৮০ কিলোমিটার রোড টিম টাইম ট্রায়াল ও ১৭০ কিলোমিটার রোড মাস স্টার্টে রিপন কুমার, শামসুল হুদাকে নিয়ে বেশি আশা ফেডারেশনের। মেয়েদের ৩০ কিলোমিটার টিম ট্রায়াল ও ৫০ কিলোমিটার মাস স্টার্টে ফারহানা সুলতানা, সাথী বিশ্বাসরাও ভালো করবেন বলে আশাবাদী। নিজেদের টাইমিং নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট। স্বাগতিক হওয়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে একটা ‘চমকের’ প্রত্যাশায় আছে সাইক্লিং ফেডারেশন।

এবার অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচটি অনেক দিক থেকেই অনুসরণ করল প্রথম ম্যাচকে। শূন্য রানেই আউট বাংলাদেশের দুই ওপেনারের একজন, এরপর আরেকজনের ঝোড়ো ব্যাটিং, দ্বিতীয় উইকেটে বড় জুটি, তিন নম্বরে সৈকত আলির ফিফটি, অধিনায়ক মাহমুদুল হাসানের আরেকটি অপরাজিত ইনিংস এবং... বাংলাদেশের জয়!
আগের দিন নিউজিল্যান্ডকে ৬ উইকেটে হারানোর পর কাল ক্রাইস্টচার্চে তাদেরই তাসমান প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল।
প্রথম ম্যাচে প্রথম ওভারে আউট হয়েছিলেন ওপেনার আনামুল হক। কাল দ্বিতীয় ওভারে রানের খাতা খোলার আগে আউট অমিত মজুমদার। এরপর যথারীতি পাল্টা আক্রমণ। দ্বিতীয় উইকেটে আনামুল-সৈকতের ৮৪ রানের জুটি। সমান ৩টি করে চার ও ছয়ে ৫০ বলে ৫৮ রান করেন উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান আনামুল। আর একটি ছয় কম মেরে ৭৫ বলে ৬১ সৈকতের। পাঁচ নম্বরে নেমে অধিনায়ক মাহমুদুলের ৬৫ বলে অপরাজিত ৭৫ নির্ধারিত ৩৯ ওভারে দলকে এনে দেয় ২৩০ রানের পুঁজি।
অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ হেরে বসে প্রথম ১৩ ওভারেই। ৭৮ রানে হারিয়ে ফেলে প্রথম ৫ ব্যাটসম্যানকে। ষষ্ঠ উইকেটে জেসন ফ্লোরোস ও টিম আর্মস্ট্রংয়ের ৮০ রানের জুটি ব্যবধান কমিয়েছে মাত্র। চার উইকেট নিয়ে লেগ স্পিনার সাব্বির রহমান পূর্বাভাস দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের পেস-সহায়ক উইকেটেও কার্যকরী হতে পারেন বাংলাদেশের স্পিনাররা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৩৯ ওভারে ২৩০/৭ (মাহমুদুল ৭৫*, সৈকত ৬১, আনামুল ৫৮; ডোরান ২/২৪, রিচার্ডসন ২/৪২)।
অস্ট্রেলিয়া: ৩৮.৪ ওভারে ২১০/১০ (ফ্লোরোস ৪৬, আর্মস্ট্রং ৪১; সাব্বির ৪/৩৪, কামরুল ১/১৫, মাহমুদুল ১/২৯, শাকের ১/৩৯, রাজু ১/৪১)।

বাংলাদেশের আসল পরীক্ষার নাম তো টেস্ট

সিরিজে নিজেদের শেষ ম্যাচ সাকিব আল হাসানের উপলব্ধিটাও যেন বদলে দিল একটু। শিশিরের কারণেই হোক কিংবা বোলারদের ব্যর্থতায়, ভারতের বিপক্ষে পরশুর ম্যাচের আগ পর্যন্ত এই সিরিজের বোলিং মন ভরাতে পারেনি তাঁর। কিন্তু কাল বিসিবি অফিসে কী একটা কাজে এসে বলে গেলেন, ‘ব্যাটিং বলেন...বোলিং বলেন, আমি সবকিছুতেই সন্তুষ্ট।’
আইডিয়া কাপের শিশির-তত্ত্ব অনুযায়ী, আপনি যত ভালো বোলিংই করুন, শিশির সেটাকে ভিজিয়ে দেবেই। পরে বল করলে অবধারিতভাবে খারাপই হবে। পরশুর ম্যাচে শিশিরের সেই বাধা বাংলাদেশ বোলাররা অতিক্রম করতে পেরেছেন বলে মনে করেন সাকিব। এদিন শিশির খুব বেশি সমস্যা সৃষ্টি না করলেও অবশেষে বোলাররা তাঁদের সামর্থ্যের কিছুটা তো দেখাল—অধিনায়কের তৃপ্তি সেখানেই।
কোচ জেমি সিডন্স অবশ্য এত সহজে তৃপ্ত হতে পারছেন না। ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট কি না জানতে চাইলে আগে বলে নিচ্ছেন বোলিং আর ফিল্ডিং নিয়ে হতাশার কথা। কাল মিরপুর ইনডোরে টেস্ট সিরিজের অনুশীলন শুরুর আগে যেমন বললেন, ‘বোলিং ভালো হচ্ছে না। মাশরাফিকে ছাড়া পেস আক্রমণ আসলেই দুর্বল।’ স্পিনারদের পারফরম্যান্সেও খুব খুশি মনে হলো না তাঁকে। আকারে-ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলেন, বাংলাদেশের স্পিনাররা ভালো বল করেন কেবল স্পিন-সহায়ক উইকেটে। তবে ব্যাটিং নিয়ে যারপরনাই সন্তুষ্টই কোচ, ‘গড়ে ২৫০-এর বেশি রান করতে পারা অবশ্যই ভালো লক্ষণ। তা ছাড়া এই সিরিজে আমরা দুবার খুব বাজে শুরু করেও শেষ পর্যন্ত বড় স্কোর করতে পেরেছি, যেটা এর আগে কখনো হয়নি।’
বাংলাদেশ কোচের বিশ্বাস, ভারতের বিপক্ষে ১৭ জানুয়ারি থেকে শুরু টেস্ট সিরিজে বোলিং নিয়েও দুশ্চিন্তার কিছু থাকবে না। স্পিনই বোলিংয়ে বাংলাদেশের ভরসার জায়গা। কিন্তু ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা যে আবার স্পিনারদের পেটাতেই বেশি আরাম পান! এটুকু বলতেই ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে সিডন্স বললেন, ‘শুধু স্পিনে নয়, ওরা সবকিছুতেই ভালো। তাই বলে সুপারম্যান তো নয়। আমাদের সাকিব বিশ্বমানের স্পিনার। ও জায়গামতো বল করতে পারলে ভারতের জন্য তাই কাজটা এত সহজ হবে না।’
তবে সার্বিকভাবে টেস্ট সিরিজ নিয়ে একটু যেন চিন্তিতই মনে হলো সিডন্সকে। বাংলাদেশ সর্বশেষ টেস্ট খেলেছে প্রায় ছয় মাস আগে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। দেশের মাটিতে টেস্ট খেলেছে তারও আগে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গত জানুয়ারিতে। আবার টেস্টে ফেরা হচ্ছে বলে কিছুটা রোমাঞ্চিত কি না জানতে চাইলে পাল্টা প্রশ্ন দিয়ে উত্তর শুরু করলেন কোচ, ‘আপনি নিজে কি রোমাঞ্চিত? টেস্টে তো একটা সেশনেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে আমাদের। টেস্টে ভালো কিছু করতে হলে প্রতিটা সেশনেই ভালো খেলতে হবে।’
কথাটা মিথ্যে নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সাফল্যের পর এই ত্রিদেশীয় সিরিজটাকে বলা হচ্ছিল বাংলাদেশ দলের জন্য আসল পরীক্ষা। কিন্তু আসল পরীক্ষা যে টেস্টে, কাল সিডন্সই মনে করিয়ে দিলেন সেটা।

যারা টস জিতবে তারাই ফেবারিট

আগের ম্যাচগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, ফাইনালে টস অবশ্যই বড় একটা ব্যাপার হবে। যে দলই এখানে পরে ব্যাটিং করছে, তারাই ম্যাচ জিতছে। টস তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরশু রাতে আমাদের ম্যাচের সময় শিশির অনেক কম ছিল। ৩০ ওভার পর শিশির এসেছে। মাঠ অনেক ভালো ছিল। ফাইনালের আগে এটা খুবই ভালো লক্ষণ। কন্ডিশন ওরকম থাকলে পরে বোলিং করেও জেতা সম্ভব এখানে।
আমি বলব, ফাইনালে ভারত-শ্রীলঙ্কা দুই দলের কাউকে এগিয়ে রাখা কঠিন। দুই দলেই অনেক ভালো ভালো খেলোয়াড়। তা ছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটীয় পার্থক্য অনেক। এদিক দিয়ে ভারত-শ্রীলঙ্কা কাছাকাছি শক্তির দল। শিশির বা কন্ডিশনের ব্যাপারগুলো এই দুই দলের ম্যাচেই বেশি কাজ করবে। লক্ষ করে থাকবেন, শ্রীলঙ্কা যে ম্যাচে পরে বোলিং করেছে সে ম্যাচে ভারত তাদের কোনো সুযোগই দেয়নি। শেষ পর্যন্ত ৬ উইকেটে জিতলেও ভারত সেদিন ম্যাচটা ৮ উইকেটেও জিততে পারত। তার পরও ফাইনালে কারা এগিয়ে, সেটা বলা সহজ হবে না। আর আমরা কোনো ম্যাচে আগে বোলিং করলে হয়তো বুঝতাম কার শক্তিমত্তা বেশি, কার কম। আমার পক্ষে তাই বলা খুব কঠিন কাদের শক্তি বেশি।
তবে শুধু ব্যাটিংয়ের কথা বললে ভারত এগিয়ে। দলে অনেক ব্যাটসম্যান। আর শুধু ব্যাটসম্যানের সংখ্যা নয়, ব্যাটসম্যানদের নামগুলো দেখলেও বুঝবেন কেন ওদের ব্যাটিং এত শক্তিশালী। বিরাট কোহলিও এখন ভালো ফর্মে আছে, ভালো ব্যাটিং করছে। সত্যি বলতে কি, এই সিরিজের আগ পর্যন্তও আমি ওকে অতটা গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ও বেশ ভালো খেলোয়াড়। আর র্যাঙ্কিংয়েও ভারত এগিয়ে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার পেস আক্রমণ ভালো। দলে অনেক নতুন বোলার থাকলেও তারা মাথা খাটিয়ে বল করে। ব্যাটসম্যানদের বিপদে ফেলতে পারে। তবে ফাইনাল তো একটা মাত্র ম্যাচেরই ব্যাপার। এ দিনে যারা ভালো খেলবে, তারাই জিতবে।
ভারতে নিজেদের মধ্যে সিরিজ খেলে এসেছে দু দল। সে সিরিজে ভারত ভালোভাবে জিতলেও শ্রীলঙ্কাও ভালো ক্রিকেট খেলেছে। এই সিরিজটা জিতে তারা হয়তো চাইবে আগের সিরিজের হতাশা দূর করতে। সেদিক দিয়ে ফাইনালের মতো একটা ফাইনালই আশা করছি আমি। দু-একটা ম্যাচ বাদ দিলে এখন পর্যন্ত প্রতিটা ম্যাচেই বড় রান হয়েছে। ফাইনালে সে রকম কিছু দেখব বলে আশা করি।
আবারও বলছি, কন্ডিশন অনেক বড় ব্যাপার হবে ফাইনালে। টস আর কন্ডিশনের ওপর বলতে পারেন ম্যাচের অর্ধেকের বেশি নির্ভর করছে। ফাইনালে কে ফেবারিট বলতেই হবে? ঠিক আছে বলে দিচ্ছি—যে দল টস জিতবে, তারাই ফেবারিট!

কারা এগিয়ে

ফাইনালে কে ফেবারিট, ভারত না শ্রীলঙ্কা? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য দূর অতীতে যাওয়ার দরকার নেই। আইডিয়া কাপেই দু দলের তুলনামূলক পারফরম্যান্স তুলে ধরা হলো এখানে, যা পড়ে ফেবারিট নির্বাচনের দায়িত্ব আপনারই!

টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর করেছে ভারত—২৯৭। আর শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ রান ২৮৩। ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি রানও এক ভারতীয় ব্যাটসম্যানের—২৭৩ রান করেছেন বিরাট কোহলি। তাঁর পরেই অবশ্য আছেন শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা। তাঁর রান—২১৯।
ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ স্কোরের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে শ্রীলঙ্কা। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় চারটি ইনিংসই চার শ্রীলঙ্কানের—উপুল থারাঙ্গা (১১৮*), মাহেলা জয়াবর্ধনে (১০৮), থিলান সামারাবীরা (১০৫*) ও তিলকরত্নে দিলশান (১০৪)। টুর্নামেন্টের ৬ সেঞ্চুরির বাকি দুটি দুই ভারতীয় বিরাট কোহলি (১০২*) ও মহেন্দ্র সিং ধোনির (১০১*)।
ব্যাটিং গড়ে ভারতের চেয়ে শ্রীলঙ্কাকে এগিয়ে রেখেছেন থিলান সামারাবীরা। ব্যাটিং গড় ১৪৬.০০। ভারতের পক্ষে সবচেয়ে বেশি ব্যাটিং গড় বিরাট কোহলির ১৩৬.৫০।
সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেটের বড় দুটি ইনিংসও দুই শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানের। দুটি ইনিংসই আবার এসেছে ভারতের বিপক্ষে। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় ম্যাচে ১৫ বলে অপরাজিত ৩৬ করেন থিসারা পেরেরা, স্ট্রাইক রেট ২৪০.০০! আর ফিরতি পর্বে তিলকরত্নে দিলশান ১৭ বলে করেন ৩৩ রান। তাঁর এই ইনিংসের স্ট্রাইক রেট ১৯৪.১১।
সর্বোচ্চে ৫ উইকেট নিয়েছেন দুজন। দুজনই শ্রীলঙ্কার—থিসারা পেরেরা ও চানাকা ভেলেগেদারা। ম্যাচে ৫ উইকেট নেওয়া একমাত্র বোলারও শ্রীলঙ্কার ভেলেগেদারা।
টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রানের জুটিটিও শ্রীলঙ্কার—বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে প্রথম উইকেটে থারাঙ্গা ও সাঙ্গাকারার ২১৫ রান। ভারতের পক্ষে সর্বোচ্চ জুটি ১৫২ রানের, বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে চতুর্থ উইকেটে ধোনি ও কোহলির।

স্বাধীন হওয়ার জন্য স্কটিশ অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী -অ্যালেক্স স্যামন্ডের দাবি

স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যামন্ড বলেছেন, তাঁদের অর্থনীতি যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী।
এক সাক্ষাৎকারে স্যামন্ড বলেন, স্বাধীনতার বিষয়ে ২০১৪ সালে গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে স্কটল্যান্ডের যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তা বিদেশি বিনিয়োগ আসতে সহায়তা করেছে।
স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আর থাকবে কি না, তা নির্ধারণে আগামী বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ওই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
স্যামন্ড বলেন, ‘বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্কটল্যান্ড বিপুল সফলতা পাচ্ছে। ইউরোপের ভেতরে বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্রে আমরা সবাইকে ছাড়িয়ে গেছি।’
বিশ্লেষকদের অনেকের আশঙ্কা, স্কটল্যান্ড স্বাধীন হলে তাকে তেলশিল্পের ওপরে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে। ব্যাংকিং খাতকেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

‘যৌথ সিদ্ধান্তেই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ’

সোনিয়া গান্ধীর জোরাজুরিতে নয়, ভারতের মন্ত্রিসভার দুজন সদস্য অশ্বিনী কুমার ও পবন বানসালের পদত্যাগের ব্যাপারটি চূড়ান্ত হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও সোনিয়ার যৌথ সিদ্ধান্তে। কংগ্রেস গতকাল রোববার এ কথা বলেছে।
দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য ক্ষমতাসীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) শীর্ষ দল কংগ্রেসের প্রধান সোনিয়া গান্ধীর তরফ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে ভারতের সংবাদমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়েছে। তা নাকচ করে দিয়ে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জনার্দন দ্বিবেদী বলেন, আসল ঘটনা হলো, এ ব্যাপারে দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী ‘যৌথভাবে’ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক মহলে দ্বিবেদীর বিবৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছিল, আইনমন্ত্রীঅশ্বিনী ও রেলমন্ত্রীপবনকে প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের কাছের মানুষ হিসেবে মনে করা হতো। মূলত কংগ্রেসপ্রধানের অসন্তোষের কারণেই তাঁদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় তাঁদের বহাল রাখতে সোনিয়া কোনোভাবেই সম্মত হননি। অশ্বিনী ও পবনের কারণে সরকারের প্রতি জনমনে অসন্তোষ ছিল। বিষয়টি কংগ্রেসের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এসব সংবাদের বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি। তিনি মন্ত্রিসভার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
পবন কুমার বানসালের ভাগনে বিজয় সিংলার বিরুদ্ধে রেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য ৯০ লাখ ভারতীয় রুপি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর জের ধরে বিজেপির পক্ষ থেকে বানসালের পদত্যাগের দাবি ওঠে। অশ্বিনী কুমারকে বিদায় নিতে হয়েছে কয়লাখনি কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে।
ইউপিএ সরকারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের পদত্যাগেরও দাবি জানিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোনো ধরনের দুর্নীতিকেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি তা প্রমাণ করে।

নওয়াজের ফিরে আসা -পাকিস্তানে ঐতিহাসিক নির্বাচন ২০১৩

১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান নওয়াজ শরিফ। মোশাররফের নির্দেশে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। কয়েকটি মামলায় জড়ানো হয়েছিল তাঁকে। আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় তাঁর। পরে সৌদি আরবের সঙ্গে মোশাররফ সরকারের সমঝোতার সূত্র ধরে সপরিবারে সৌদি আরবে নির্বাসনে গেলেন।
এক দশক নির্বাসিত জীবনের পর ২০০৮ সালে আবার দেশে ফিরলেন নওয়াজ শরিফ। ভাগ্য এবার পুরোই তাঁর পক্ষে। দেশছাড়া করা মোশাররফ নিজে সাব-জেলের কড়িকাঠ গুনলেও নওয়াজ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে।
১৯৪৯ সালে লাহোরের এক বনেদি ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেন নওয়াজ। বাবার গড়ে তোলা ইস্পাত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইত্তেফাক গ্রুপের প্রধান হিসেবে ব্যবসা চালিয়েছেন সফলভাবে। রাজনীতিতেও সামনের সারিতে উঠে আসেন দ্রুত।
আশির দশকে সামরিক শাসক জিয়াউল হকের বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন নওয়াজ শরিফ। ওই সময় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৮৮ সালে জিয়াউল হক রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর নওয়াজের রাজনৈতিক জীবন নাটকীয় মোড় নেয়। ওই বছরই পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) গঠন করে তার প্রধান হন। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এর পরই ক্ষমতায় আসেন বেনজির ভুট্টো। ১৯৯৭ সালে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পর ওই বছর আবার প্রধানমন্ত্রী হন নওয়াজ। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধে। তিনি মোশাররফকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন। মোশাররফই তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর নওয়াজকে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। নওয়াজ বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে সহায়তা বন্ধ করবেন। আবার তালেবানের বিষয়ে নমনীয় মনোভাব প্রদর্শনেরও তিনি ঘোরবিরোধী। এ কারণে দেশের ভেতরের উগ্রপন্থীদের সামাল দেওয়া ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা তাঁর জন্য বেশ কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

নব্বইয়ের দশকে অলরাউন্ডার হিসেবে ক্রিকেট মাঠ কাঁপিয়েছেন। মাঠের বাইরের ঘটনার জন্যও কম আলোচিত হননি। সুদর্শন ইমরান মাঠে নামলে গ্যালারি থেকে হাজার হাজার সুন্দরী ছুড়ে দিতেন উড়ন্ত চুম্বন।
ক্রিকেটের সেই জীবন্ত কিংবদন্তি রাজনীতির খেলায়ও সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। শুরুর পথটা যদিও যথেষ্টই বন্ধুর ছিল।
ভুট্টোদের মতো কোনো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসেননি ইমরান। লাহোরের খান পরিবারে ১৯৫২ সালে জন্ম। পড়াশোনা করেছেন পাকিস্তান, ইংল্যান্ডের বোর্ডিং স্কুল ও পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ক্রিকেট থেকে বিদায় নেওয়ার পর গণমানুষের কাছে ইমরানের প্রথম যাওয়া মায়ের নামে ক্যানসার হাসপাতালের জন্য চাঁদা তুলতে গিয়ে। অনেকে বলেন, দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্নটা দানা বাঁধে তখনই। রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) গঠন করেন ১৯৯২ সালে। ২০০২ সালের নির্বাচনে মাত্র একটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। সেই তুলনায় এবার তাঁর পক্ষে ‘ভোটের সুনামি’ বয়ে গেছে। ইমরান নিজেই বলেছিলেন, গণরায়ের সুনামি পাকিস্তানের নষ্ট রাজনীতিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে পিটিআইকে ক্ষমতায় বসাবে। সে আশা পূরণ না হলেও পিটিআই যে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, সেটা নিশ্চিত।
মনে করা হচ্ছে, আন্তরিক প্রচারণা ও সাবলীল বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইমরান বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পেরেছেন। ইমরানের প্রচারণার স্লোগান ছিল—‘নয়া পাকিস্তান’। বোঝাই যাচ্ছে, তরুণদের একটি বড় অংশ এই স্লোগান গ্রহণ করেছেন। নিন্দুকদের কাছে ইমরান তালেবানের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। অনেকে নারী অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল রক্ষণশীল মুসলমান বলেও মনে করেন তাঁকে। এ ছাড়া ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে তিনি পাকিস্তানেরও যুদ্ধ বলে স্বীকার করতে নারাজ।
সম্প্রতি ইমরানের প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ বলেন, ‘রাজনীতি খেলাধুলার চেয়ে বেশি কিছু।’ প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, পাখতুনখাওয়াতে ক্ষমতাসীন এবং জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী বিরোধী অবস্থানে থাকবেন ইমরান খান। সেই মাঠে কীভাবে তিনি রাজনীতির ব্যাট চালাবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সাধারণ নির্বাচন: বিজয়ী পাকিস্তান -গতকাল সমকাল by ফারুক চৌধুরী

নওয়াজ শরিফ: তৃতীয়বার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন
শিরোনামটিতে মৌলিকতার অভাব রয়েছে। আসলে এটি একটি নির্বাচনী স্লোগান থেকে ধার করা। স্লোগানটি হলো—‘জিতেগা ভাই জিতেগা—পাকিস্তান জিতেগা’—
জোর সে বলো ‘জিতেগা’
উমিদ (আশা) সে বলো, ‘জিতেগা’
ইয়াকিন (বিশ্বাস) সে বলো, ‘জিতেগা’
আইস্তা (ধীরে) বলো, ‘জিতেগা’
পেয়ার (ভালোবাসায়) সে বলো ‘জিতেগা’
জিতেগা ভাই ‘জিতেগা’
পাকিস্তান ‘জিতেগা’।

হ্যাঁ, নির্বাচনে অনিয়ম হয়তো ঘটেছে, কারচুপি (সূক্ষ্ম কিংবা স্থূল) না হলেও তার প্রচেষ্টা হয়েছে, নির্বাচনপূর্ব সহিংসতা ঘটেছে, তার সবকিছুকে ছাড়িয়ে সত্য কথাটি হলো যে দেশটির সাড়ে ছয় দশকেরও দীর্ঘতর সময়ের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একটি নির্বাচিত সরকার অন্য একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।
প্রদেশগুলোতেও ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে অনুরূপভাবে। এই নির্বাচনে পাকিস্তানের গণতন্ত্র, হোক না তা কোথাও কোথাও ত্রুটিপূর্ণ, অবশ্যই বিজয়ী হয়েছে। অত্যুক্তি মনে হলেও আমি বিশ্বাস করি, ১১ মে, ২০১৩ সালের এই নির্বাচন একটি নতুন পাকিস্তানের জন্ম দিল।
মনে পড়ে, ২০০২ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ থেকে একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের নেতৃত্বে আমি পাকিস্তান গিয়েছিলাম। নির্বাচনের নামে এটা ছিল বাকপটু প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের প্রহসন। ৭ অক্টোবর ২০০২ সালে ইসলামাবাদের প্রেসিডেন্ট ভবনে আমি প্রেসিডেন্ট মোশাররফের কাছে দুটি প্রশ্ন রেখেছিলাম। প্রথমটি ছিল, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া আর প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা কি অবাধ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিপন্থী নয়? তাঁর উত্তর ছিল অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন যে অতীতে প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, যেমন নওয়াজ শরিফ দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি এবং সেনাধ্যক্ষ—তিনজনকেই বরখাস্ত করেছিলেন। ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতেই ছিল তাঁর সেই ব্যবস্থা।
তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, রাজনীতিবিদ, সামরিক এবং বেসামরিক ব্যক্তিদের নিয়ে তাঁর ধারণামতো একটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠন করার কি প্রয়োজন রয়েছে? আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে তিনি বলেছিলেন, এমনও তো দেশ রয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী দলের প্রধানের মধ্যে সাক্ষাৎই হয় না। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে প্রয়োজনমতো তাঁদের দেখা-সাক্ষাতের সম্ভাবনা রইবে। তাঁর কথায় কাঁটা ছিল এবং তা বিঁধেও ছিল। তাই ছিলাম নিরুত্তর। যাই হোক, পারভেজ মোশাররফ তাঁর শত নাটকীয়তা নিয়েও সে দেশের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছেন আর লাহোরের মিয়া নওয়াজ শরিফ হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। এবং তাও রেকর্ড-ভাঙা তৃতীয়বারের মতো। অন্যদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিকেও এই সেপ্টেম্বরে তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হলে দুই বা ‘টেন পার্সেন্ট’ যাই হোক না কেন, তা নিয়েই বিদায় নিতে হবে।
এই নির্বাচন পাকিস্তানের রাজনৈতিক মানচিত্রকে বদলে দিল। পাকিস্তানের জাতীয় অ্যাসেমব্লিতে ২৭২ আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন হয়। তদুপরি নারীদের জন্য ৬০টি আসন আর সংখ্যালঘুদের জন্য রয়েছিল ১০টি আসন। প্রত্যক্ষ নির্বাচনাধীন ২৭২ জাতীয় অ্যাসেমব্লি আসনের মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাবে ১৪৮, রাজধানী ইসলামাবাদে ২, সিন্ধু প্রদেশে ৬১, খাইবার পাখতুনখাওয়াতে ৩৫, বেলুচিস্তানে ১৪ এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (FATA) ১২টি আসন। এই নিবন্ধটি লেখার সময় পর্যন্ত পিএমএল (নওয়াজ শরিফ) জাতীয় অ্যাসেমব্লিতে ১২৬টি, ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ ৩৪টি, পিপিপি ৩২টি, জামায়াত-ই-ইসলামি ১২টি এবং ২৫টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। তা ছাড়া প্রাদেশিক অ্যাসেমব্লির নির্বাচনও একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর অর্থ হচ্ছে, পাঞ্জাবে রয়েছে নওয়াজ শরিফের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং তা ছাড়া অন্যান্য প্রদেশে তাঁর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফের রাজনৈতিক ‘সুনামি’ খাইবার পাখতুনখাওয়াতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ইমরান খান প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। পিপিপি সিন্ধু প্রদেশে সসম্মানে পশ্চাদ্পসরণ করেছে।
অতএব কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য নওয়াজ শরিফের অন্য কোনো দলের সাহায্যের খুব বেশি প্রয়োজন নেই। তিনি কিছু নিরপেক্ষ সদস্যের সহায়তায় অনায়াসেই কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবেন। তা ছাড়া পাঞ্জাবে তাঁর দলই প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করবে। তবে সিন্ধু, পাখতুনখাওয়া আর বেলুচিস্তান প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠন করবে যথাক্রমে পিপিপি, এমকিউএম, তেহরিক-ই-ইনসাফ ও বেলুচিস্তানের কিছু ছোট দল। অতএব কেন্দ্রের সঙ্গে এই তিনটি প্রদেশের সম্পর্কের ওপর নওয়াজ শরিফের বিশেষ নজর রাখতে হবে। আরও একটি স্পর্শকাতর বিষয় হলো, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে নওয়াজ শরিফের সম্পর্ক। প্রথাগতভাবে পিএমএলের (নওয়াজ শরিফ) সঙ্গে সামরিক বাহিনীর পারস্পরিক সমঝোতা ও শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। নির্বাচনের প্রচারণার সময় যখন ইমরান খানের ক্রিকেট বিজয়ের কথা বলা হতো, তখন নওয়াজ শরিফ দাবি করতেন যে ক্রিকেট তিনিও খেলতেন, তবে পাকিস্তানকে একটি আণবিক শক্তিতে তিনিই পরিণত করেছিলেন। কথাটিতে সত্যতা রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণাকালে নওয়াজ শরিফকে বাঘের সঙ্গে তুলনা করে তাঁর সমর্থকেরা আওয়াজ তুলত, ‘শের আয়া, শের আয়া’। তার উত্তরে ইমরান খানের সমর্থকদের প্রতিধ্বনি ছিল, ‘আয়া শের শিকারি’। কিন্তু এই বাঘশিকারি ইমরান কিন্তু লাহোরে ব্যাঘ্র বধ করতে পারেননি। তিনি বেশ ভালো ব্যবধানেই নওয়াজ শরিফের পিএমএলের একজন প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন, যদিও পাখতুনখাওয়া প্রদেশ থেকে বিপুল সংখ্যাধিক্যে তিনি জাতীয় অ্যাসেমব্লিতে নির্বাচিত হয়েছেন।
নওয়াজ শরিফের সামনে রয়েছে সমস্যার পাহাড়। বিপুল জ্বালানির সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি, তালেবান সন্ত্রাস ইত্যাদি তাঁর সমস্যার ঝুলিতে রয়েছে। তবে গত পাঁচটি বছর পাঞ্জাবে তিনি তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা শাহবাজ শরিফের সহায়তায় সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম বলে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছেন। পাঞ্জাবকে তাঁর সুশাসনের ল্যাবরেটরি বলে আখ্যায়িত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বহুমাত্রিক এবং স্পর্শকাতর। তবে বিগত বছরগুলোতে এই দুই বিষয়েই নওয়াজ শরিফ ভাবনাচিন্তার যথেষ্ট সময় পেয়েছেন এবং পরিপক্বতার সঙ্গেই সেই ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যাবলি মোকাবিলা করতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
জামায়াত-ই-ইসলামি তাদের ডজন খানেক আসন নিয়ে নওয়াজ শরিফকে পিছু টানতে পারবে বলে মনে হয় না। গত দুবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর ভুলভ্রান্তির জন্য রাজনৈতিক খেসারত তিনি দিয়েছেন। তবে এই যাত্রায় যদি ইমরান খান বিরোধী দলনেতা হিসেবে একটি শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে পাকিস্তান পার্লামেন্টে বিতর্কের মাধ্যমে অনেক সমস্যাই জনগণের সামনে উঠে আসবে। দায়িত্বশীল বিরোধী দলনেতা হিসেবে অথবা বিরোধী দলে থেকে ইমরান খান তাঁর দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারবেন। তালেবানি সন্ত্রাস সত্ত্বেও ৬০ শতাংশ ভোটার এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
চার বছর আগে ২০০৯ সালের মে মাসে আমি যখন পাকিস্তানে গিয়েছিলাম, তখন আমার বন্ধু, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও কলামিস্ট নাজিমুদ্দিন শেখ আশা প্রকাশ করেছিল যে তাঁদের ভ্রান্তি থেকে যেন আমরা শিক্ষা লাভ করি। দেশ হিসেবে আমরা সত্তর-উত্তর পাকিস্তান থেকে কোনো শিক্ষা যে লাভ করেছি সেই দাবি আমি আমার বন্ধুর কাছে করতে অক্ষম। কারণ, এ নিবন্ধটির সমাপ্তি টেনে আমার মূল সমস্যা হবে জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের এই দিনে আমার নিবন্ধটিকে নিরাপদে প্রথম আলো অফিসে পৌঁছে দেওয়া। তবে এটি একটি গৌণ সমস্যা। আমি আশা করব যে আগামী দিনগুলোতে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমরা পাকিস্তান থেকে শিক্ষা নিই। কেবল প্রতিটি দলের অংশগ্রহণেই বাংলাদেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নিয়তির পরিহাস যে পাকিস্তান তাদের এবারের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত করল আমাদের দেশ থেকে লব্ধ ‘কেয়ারটেকার’ পদ্ধতিকে অনুসরণ করে। অতএব পাকিস্তান থেকে নাই বা শিখলাম। আমরা নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলিটি নেড়ে কেন প্রত্যাশিত রাজনৈতিক আচরণ করতে পারি না? এ দেশের মানুষ যে তা চায়।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব। কলাম লেখক।
zaaf@bdmail.net

এনাম হাসপাতালের আহত সাত নারী শ্রমিক by অদিতি ফাল্গুনী

১৮ বছরের আরতি রানী দাস সাভারের এনাম হাসপাতালের সাততলায় দক্ষিণ দিকের জানালার পাশে বালিশে আধশোওয়া ছিলেন। রানা প্লাজা ধসে এই অষ্টাদশী হারিয়েছেন তাঁর ডান পা। গ্রামের বাড়ি সিলেটের হবিগঞ্জে। সাভারে বাবা-মা আর ছোট দুই বোনের সঙ্গে থাকতেন। তাঁর মা-ও একই পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। মা ইতিমধ্যেই মৃত। সাভার শ্মশানে মায়ের যখন দাহ হচ্ছে, তখন মেয়ের ডান পা থেকে সারা শরীরে গ্যাংগ্রিন ছড়ানোর ভয়ে চিকিৎসকেরা তাঁকে অস্ত্রোপচারের জন্য ওটিতে তুলছেন। আরতির বাবা রিকশাওয়ালা। জেঠতুতো দাদা আর পিসতুতো দিদি তাঁর শুশ্রূষা করছিলেন। এক বছর হয় রানী এই কারখানায় কাজ করছেন। সুইং সেকশনে কাজ করতেন তিনি। ঘটনার দিন সকাল নয়টায় তিনি যখন সাততলায় কাজ করছিলেন, তখনই তাঁর শরীরের ওপর দালান ধসে আসে। উদ্ধারকর্মীদের হাতে বাঁচার আগে তাঁর শরীর চাপা পড়েছিল দুটি লাশের নিচে।
এনাম হাসপাতালের এই ওয়ার্ডে সাতজন গুরুতর আহত নারী শ্রমিক সার দিয়ে পাশাপাশি শুয়ে ছিলেন, কারও হাত-পা কাটা, কারও বা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ নেই। গত শুক্রবার বেলা দুইটায় আমি যখন এই ওয়ার্ডে ঢুকি, দরিদ্র এই নারী শ্রমিকদের দরিদ্রতর স্বজনেরা ওয়ার্ড ভরিয়ে তুলছিলেন তাঁদের মেহনতের টাকায় কেনা, জীবনানন্দ কথিত ‘হিম, করুণ কমলালেবু’র গন্ধে। রুশ লেখক আলেক্সান্দার সোলঝেনেতসিনের দুনিয়া কাঁপানো উপন্যাস ক্যানসার ওয়ার্ড-এর কথা মনে পড়ল আমার। কৈশোর ও তারুণ্যের সন্ধিক্ষণের দিনগুলোয় ভারতের মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতালের কেবিনে-ওয়ার্ডে আমিও কাটিয়েছি আট মাস, যা সাহিত্যে রূপ দেওয়ার কথা ভেবেও খুব বেশি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে আজও লিখে উঠতে দ্বিধা হয়। কিন্তু কোন সংজ্ঞায় চিত্রায়িত করি এই ‘কবন্ধ ওয়ার্ড’? রাষ্ট্রের সুস্থ, সাতজন তরুণী পোশাকশ্রমিক, যাঁরা সপ্তাহ দুয়েক আগেও ছিলেন সচল, কর্মক্ষম? কেউ ছিলেন সদ্য বিবাহিত, কেউ শিশুসন্তানের মা, কেউ আজও অবিবাহিত ষোড়শী বা অষ্টাদশী! এই নারকীয়তার কোনো তুলনা হয় না।
আরতির উল্টো দিকের বেডে লাবণী আক্তার, বছর বাইশের সুশ্রী তরুণী। তাঁর গ্রামের বাড়ি নড়াইল। তাঁর ডান হাত কাঁধ থেকে কাটা। খুব সম্প্রতি নিজের পছন্দে বিয়ে করে সাভার চলে এসেছিলেন। অর্থনীতিতে সম্মান শ্রেণীর ছাত্রী লাবণী পড়ার খরচ চালাতে রানা প্লাজার পোশাক কারখানায় নার্স হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর আগে নার্সিংয়ের ট্রেনিং নিয়েছিলেন। রানা প্লাজার পোশাক কারখানার শ্রমিকদের হাতে নিডল ফুটে গেলে বের করে দেওয়া, সর্দি বা জ্বরের ওষুধ দেওয়ার মতো টুকটাক কাজ করতেন সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটার শিফটে। তাঁর স্বামীও পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। মাস খানেক হয় বিএ ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি চাকরি ছেড়ে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। লাবণী তাঁদের গৃহপরিচারিকার সঙ্গে থাকতেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে আটটায় অফিসে গিয়ে কাজ শুরু করার কিছুক্ষণ পর তিনি দেখেন, গোটা দালান ধসে আসছে মাথার ওপর। ভবনধসের ৩৬ ঘণ্টা পর উদ্ধারকর্মীরা তাঁকে তোলার সময় জানান, একটি হাত না কাটলে তাঁকে তোলা যাবে না। ‘আমাকে ব্যথা কমানোর ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ইনজেকশন দিতে না দিতেই হাত কাটার জন্য ব্যথা পুরোটাই পেলাম। তখন একটি সাদা কাপড় দিয়ে হাত বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। পরে হাসপাতালে এনে ব্যান্ডেজ দেওয়া হয়।’ লাবণী আক্তারের পাশে ছিলেন তাঁর মা ও মামাতো বোন। শক্ত মনের লাবণী হাসছিলেন।
লাবণী হাসলেও গোটা ওয়ার্ডের সবচেয়ে নরম মনের মেয়ে সনিয়া ভেঙে পড়েছিলেন। ১৮ বছর বয়স। গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার মধ্য দামোদরপুর। তাঁর রিকশাচালক স্বামী মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন পরম মমতায়। তাঁর একটি পা কাটা হয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে সনিয়া হাসপাতালে তাঁদের দেখতে আসা সবার হাত জড়িয়ে ধরছিলেন। আমি চলে আসার সময় উত্তর বাংলার টানে বললেন, ‘চলিয়া যাবা? আর আসিবা না?’ এ প্রশ্নের উত্তর হয় না। চলে আসতে আসতে শুনি ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছেন, ‘মোর ভুখ নাগিছে।’ তাঁর রিকশাওয়ালা স্বামী খাবার আনতে ছুটলেন।
না, লাবণীর মতো স্বামী ভাগ্য নয় ২৫ বছরের রিক্তার। দুই বছরের এক সন্তানের জননী রিক্তারও একটি হাত কাটা গেছে। রানা প্লাজায় অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। এসএসসি পর্যন্ত পড়েছেন। দুর্ঘটনার দিন চারতলায় ছিলেন। দুর্ঘটনার তিন দিনের মাথায় উদ্ধার হন। তাঁর মা এসেছেন তাঁকে দেখতে। ব্যথার বড়ি চেয়ে কাতরাচ্ছিলেন। প্রথমে কথা বলতে গিয়ে বিরক্ত হলেন। পরমুহূর্তেই ক্ষমা চাইলেন, ‘ব্যথায় ভালো লাগে না। স্বামী আসে দেখতে। একবার ভালো ব্যবহার করে, একবার খারাপ ব্যবহার করে।’ বর্ণনাহীন শঙ্কিত চোখে চেয়ে থাকেন তিনি। ওয়ার্ড ছেড়ে চলে আসার সময় দেখি, তাঁর প্রাইভেট কার চালক স্বামী তাঁকে ভাত মেখে খাওয়াচ্ছেন।
লাবণীর পাশের বেডেই এই কবন্ধ ওয়ার্ডের কনিষ্ঠতম সদস্য ১৬ বছরের আন্না। তারও ডান হাত কাঁধ থেকে কাটা। মুখ থেকে এখনো শৈশবের মায়া ঘোচেনি। রিকশাওয়ালা বাবার সংসারে উপার্জনে বাবার পাশে হাল ধরতে সংসারের বড় মেয়ে হিসেবে মাত্র চার মাস হলো সে এই কারখানায় যোগ দিয়েছিল। সাভারে বাবা-মা আর ছোট ভাইবোনের সঙ্গে সে থাকত। ১৬ বছরের এই এখনো শিশুর মতো মায়াবী চোখ-মুখের
শ্যামলা মেয়েটি একাই সবল পায়ে হেঁটে বাথরুমে গেল। তার রিকশাওয়ালা বাবা মেঝেতে বসে মেয়ের জন্য টিফিন ক্যারিয়ার খুলে ভাত-তরকারি বের করছিলেন।
৩০ বছর বয়সী ও দুই সন্তানের মা পাখি বেগম কাজ করতেন রানা প্লাজার সুইং সেকশনে। সাত-আট মাস হয় তিনি রানা প্লাজায় যোগ দিয়েছিলেন। পাখি বেগমের দুটো পা-ই কাটা। ‘আপনি কি সেই পাখি বেগম, যাঁর নাম গোটা দেশ জানে?’ আমার এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি হেসে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমিই সেই পাখি বেগম। সারা রাষ্ট্রে সবাই মোর নাম জানিছে।’ বুধবার সকাল নয়টায় যথারীতি মেশিনের পেছনে কাজ করছিলেন। তারপর কারেন্ট চলে গেল। একটু পরেই ভবন ধসে পড়ল। ‘আমার ওপর একটি ভিম পড়িছিল। আমিই উদ্ধারের লোকদের বললাম, আমার দুইটা পা কেটে হলেও বাঁচাও। তারা বলল, “তোমার স্বামী তাহলে তোমারে দেখবে না।” আমি বললাম, না দেখুক। আমার বাচ্চা দুইটার মুখ না দেখে আমি মরব না। তখন ইনজেকশন দিলেও, ইনজেকশন দিয়েই তো দুই পা কাটছে, তা-ও ব্যথা পুরাই পাইছি। পা কাটার পর রক্ত আর মানাচ্ছে না। সাদা কাপড়ে তখন কাটা দুই পা পেঁচায় আমারে নিয়া আসছে হাসপাতালে।’ পাখির পাশে সে সময় ছিলেন তাঁর বোনের মেয়ে ও ননদের স্বামী। তাঁর নিজের স্বামী মাত্রই দুই সন্তানকে নিয়ে বের হয়ে গেছেন। খুলনার মেয়ে পাখির ছোট ভাই তাঁর সব দেখাশোনা করছেন। পাখি চান তাঁর মা-বাবা মরা, বিএ পড়ুয়া ছোট ভাইকে যদি কেউ একটা চাকরি দিত!
গোটা ওয়ার্ডে যাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারিনি, তিনি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মেয়ে লাভলী। ২৫ বছরের এই নারী শ্রমিক ও তাঁর স্বামী সাভারেই থাকতেন। লাভলীর আয়ে গ্রামের বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকা তাঁর দুই ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ চলত। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করার পর লাভলীর একটি পা কাটতে হয়েছে এনাম মেডিকেলে এসে। বিষাদ ও অবসন্নতায় নিঃসাড় ঘুমাচ্ছিলেন তিনি। তাঁর শাশুড়িই তাঁর হয়ে আমার সঙ্গে কথা বললেন।
এনাম হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এ কয় দিন সংবাদপত্রে পড়া অধরচন্দ্র বিদ্যালয়ের মাঠে যাই। সেখানে আরেক অদ্ভুত দৃশ্য। জীবিত বা মৃত কোনোভাবেই স্বজনের খোঁজ বের করতে না-পারা মানুষেরা দাঁড়িয়ে বা বসে আছেন। গোপালগঞ্জ থেকে আসা এক মা বললেন, ‘আজ ১৭টা দিন এই স্কুলের মাঠেই ঘুমাই। আমার সবচেয়ে বড় মেয়ে এখানে কাজ করত। তার আয়েই সংসার চলত। লাশ না পাই, হাড় কয়টা পাইলেও বাড়িতে নিয়া গোর দিতে পারতাম।’
এনাম হাসপাতালে থাকতেই লক্ষ করছিলাম কিছু বিবেকবান সাধারণ নাগরিক এসে অসহায় লোকজনের হাতে কিছু টাকা দিচ্ছিলেন। সমাজের সর্বস্তরের বিবেকবান মানুষজনকে অনুরোধ করি, এই অসহায় সাত নারী শ্রমিকের পাশে (সিএমএইচ ও অন্য হাসপাতালে হাত-পা কাটা আরও কিছু নারী ও পুরুষ শ্রমিক আছেন) এসে দাঁড়াতে।
অদিতি ফাল্গুনী: কথাসাহিত্যিক।

বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও রাজনীতি by বদিউল আলম মজুমদার

সাভারে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি যখন ঘটে, আমি তখন মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোরে। সেখানে ১৫০ দেশের সমন্বয়ে গঠিত ‘কমিউনিটি অব ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত সপ্তম মিনিস্টারিয়াল কনফারেন্সে আমি অংশ নিচ্ছিলাম। কনফারেন্সে সারা পৃথিবী থেকে কয়েক শ ব্যক্তি অংশ নেন, যার মধ্যে ছিলেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি ও তাওয়াক্কল কারমান এবং একাধিক দেশের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূত। এ ছাড়া এতে অংশ নেন পার্লামেন্টারিয়ান, সিভিল সোসাইটি, ব্যবসায়ী, নারী ও তরুণদের প্রতিনিধিরা।
বাংলাদেশ থেকে আমিই একমাত্র এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম, যদিও চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এতে আমাদের সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ব্যাপকতা সম্পর্কে জানাজানি হতে থাকলে কনফারেন্সে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের অনেকেই আমাকে সমবেদনা জানাতে এগিয়ে আসেন। অনেকেই বলেন, হোটেল রুমে থেকে সিএনএন ও বিবিসি চ্যানেলে দুর্ঘটনার উদ্ধার কার্যক্রম দেখে তাঁরা চরমভাবে ব্যথিত। সমবেদনা জ্ঞাপনকারী ব্যক্তিদের প্রায় সবাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ভোক্তা এবং যে অমানবিক পরিবেশে এগুলো তৈরি হয় জেনে তাঁরা মর্মাহত। একজন তো হতাশার সুরে বলেই ফেললেন, তাঁর গায়ের জামাটি যে মেয়েগুলো বানিয়েছে, তারাও হয়তো মৃত বা নিখোঁজ! কয়েকজন আমার কাছে জানতে চান দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং এ ধরনের বিপর্যয় রোধে সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন: কেন সরকার উদ্ধারকাজে ব্রিটিশ সহায়তা নিল না? দায়ী ব্যক্তিরা কি চিহ্নিত হবেন? শাস্তি পাবেন? মৃত ব্যক্তিদের পরিবার-পরিজন ও আহত ব্যক্তিদের দায়ভার কে নেবে? ইত্যাদি।
সম্মেলনে একজন আমেরিকানের সঙ্গে আমার কথা হয়, যিনি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সমস্যা সম্পর্কে আমাদের অনেকের চেয়ে অনেক বেশি খোঁজখবর রাখেন, তিনি আমাকে বলেন, গত নভেম্বরের তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের পর তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে এ পর্যন্ত ছোট-বড় ৪৭টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যাতে বেশ কয়েকজন হতাহতও হয়েছে। পোশাকশিল্পে দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের মূল কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তালা দেওয়া কলাপসিবল গেট এবং হুড়োহুড়িতে শ্রমিকদের পায়ের তলায় পিষ্ট হওয়া। তাঁর আফসোস, বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ হাজার তৈরি পোশাকশিল্পে ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করলেও, যা মঙ্গোলিয়ার মোট জনসংখ্যার দেড় গুণ, সরকার শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে অনাগ্রহী। বরং কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অভিযোগ তোলা হয়। তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের সময় অনেকে চক্রান্তের অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন, এবার কেউ বিদেশি ষড়যন্ত্রের ধুয়া তোলেনি।
তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ সরকার অর্থ ব্যয় করে শিল্প পুলিশ নিয়োগ দিয়েছে শ্রমিকদের পেটানোর জন্য। কিন্তু সারা দেশের শিল্পকারখানাগুলো নজরদারির জন্য মাত্র যে ১৫০টি ইন্সপেক্টরের পদ রয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই শূন্য। এ ব্যাপারে সরকার অর্থ ব্যয় করছে না। তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য যে ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করে বাংলাদেশ অস্ত্র কিনতে পারে, কিন্তু দুর্যোগকালীন উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রস্তাবিত ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার টাকা সরকারের নেই! তাঁর আরও অভিযোগ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে তুলতে দিচ্ছেন না এবং এ প্রচেষ্টায় রত শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না, যদিও সরকার জানে কারা খুনি।
ভদ্রলোকের দাবি, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের আমেরিকান ভোক্তারা শ্রমিকদের বারবার প্রাণহানিতে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ। কিন্তু ক্রেতা কোম্পানিগুলো এর দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলোর বক্তব্য, তাঁরা কারখানাগুলোর মালিক নন এবং বাংলাদেশি মালিকদের ওপর কারখানার পরিবেশ উন্নয়নের জন্য চাপ দিলেও মালিকেরা কিছু না করলে এবং সরকার এ ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শন করলে তাঁদের তেমন কিছু করার থাকে না। আর কোম্পানিগুলো তৈরি পোশাকের জন্য বেশি দাম দিতে চাইলেও তাতে শ্রমিকেরা লাভবান হবে বলে তাঁরা আশাবাদী নন। কারণ, মালিকদের স্বার্থপরতা এবং শ্রমিকদের বঞ্চনার কথা তাঁদের জানা। মালিকেরা শুধু পণ্য বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন তা-ই নয়, তাঁরা বিভিন্নভাবে আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং করেও ঐশ্বর্যশালী হচ্ছেন, কিন্তু শ্রমিকেরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন। মালিকেরা একটার পর একটা কারখানা গড়ে তুলছেন
এবং সম্পদের অশ্লীল প্রদর্শনী দেখাচ্ছেন, কিন্তু যাদের রক্তের বিনিময়ে তাঁরা তা করছেন, সেই শ্রমিকেরা খেতে পায় না।
ভদ্রলোক বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর চরম শঙ্কার কথা আমাকে জানান। বিদেশি ক্রেতাদের বাংলাদেশি কারখানায় কোনো মালিকানা নেই বলে তাঁরা যেকোনো সময় পণ্য কেনার জন্য অন্য দেশে পাড়ি জমাতে পারেন, যার উদ্যোগ ইতিমধ্যে অনেকেই নিচ্ছেন। ক্রমাগত রাজনৈতিক হানাহানি ও সহিংসতা তা আরও ত্বরান্বিত করবে। এ ছাড়া শ্রমিকদের যে অবিশ্বাস্য পরিমাণের কম মজুরি দেওয়া হয়, তাতে তাদের জীবন নির্বাহ হয় না, ফলে পুরো শিল্পে এক ভয়াবহ ধরনের অসন্তোষ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। বস্তুত, তাঁর মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প অনেকটা বারুদের স্তূপের ওপরে দাঁড়িয়ে, যেকোনো সময় এর বিস্ফোরণ ঘটতে বাধ্য।
কনফারেন্সে অংশহণকারীদের প্রশ্নবাণের যখন মুখোমুখি হই এবং আমেরিকান ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলি, তখন বিজিএমইএর সভাপতির সাম্প্রতিক বক্তব্য আমার সামনে ভেসে ওঠে। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার খাতিরে তিনি রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির প্রচারণা বন্ধের আহ্বান জানান। উলানবাটোরে একদল বিদেশি ‘অপিনিয়নমেকারের’ সঙ্গে আলাপের অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে এটি সুস্পষ্ট, বিজিএমইএর সভাপতি চাইলেও এবং আমাদের সরকার তার সর্বশক্তি নিয়োগ করলেও এ ধরনের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক মিডিয়া এগুলো প্রচার করবেই। তৈরি পোশাকের ভোক্তারা এবং ক্রেতারা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবেনই। মানুষ হিসেবে ভোক্তারা এ ব্যাপারে একধরনের ব্যক্তিগত দায়দায়িত্ব অনুভব করেন। সভাপতি ও সরকারের এ ক্ষেত্রে করণীয় হলো, এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবসৃষ্ট ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি না ঘটলেই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, যা হওয়াও অত্যন্ত জরুরি।
ইতিহাস থেকে দেখা যায়, অনেক দেশেই প্রথমদিকে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে শ্রমিকদের ত্যাগের বিনিময়ে। কিন্তু একপর্যায়ে এসে উৎপাদকেরা নিজেদের স্বার্থেই শ্রমিকদের স্বার্থের প্রতি মনোযোগী হয়েছেন। ব্যবসার স্বার্থেই তাঁরা কিছু নিয়মকানুন গড়ে তুলেছেন এবং মেনেছেন। সরকারও তাদের করণীয় করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে সে লক্ষণ এখনো দেখা যায় না, কারণ আমাদের দেশে ব্যবসায়ের ‘রাজনীতিকীকরণ’ হয়েছে—আমাদের ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন, রাজনীতিবিদেরা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ী, ফলে রাজনীতি আজ লাভজনক ‘ব্যবসায়ে’ পরিণত হয়েছে। আমাদের সংসদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য ব্যবসায়ী, তাই রাজনীতি এখন পরিচালিত হয় বহুলাংশে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে। এসব কারণে স্বল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ ব্যবসা ভালো চলছে না, রাজনীতিও হয়ে পড়েছে রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী-আমলাদের যোগসাজশে নষ্ট ও দুর্বৃত্তায়িত।
আমাদের নষ্ট রাজনীতির মূলে রয়েছে ক্ষমতাধরদের ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতিতে যুক্ত হওয়া এবং এর আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া। বস্তুত, বাংলাদেশের দুর্নীতির একটি অন্যতম বাহন হলো ফায়দাবাজি ও দলবাজি। সোহেল রানার কথাই ধরা যাক। মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনৈক রবীন্দ্র সাহার জমি ও খাল দখল করে রানা প্লাজা গড়ে তোলা হয়। রবীন্দ্র সাহা মামলা করেও গত সরকারের আমলে প্রতিকার পাননি, কারণ রানার পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা হিসেবে বর্তমান সরকারের ফায়দা পেয়ে রানা অন্যায়ভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন এবং এমপি ও প্রশাসনের সহায়তায় তা রক্ষা করেছেন। অর্থাৎ গত এবং বর্তমান সরকারের নগ্ন ফায়দা ও দলতন্ত্রচর্চার কারণে রানা অন্যায় সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন এবং আইন ও নিয়মনীতি অমান্য এবং অপরাধ করে পার পেয়ে গেছেন। বলাবাহুল্য, আমাদের নষ্ট রাজনীতির দুষ্ট ছোবলের ফলে গত দুই দশকে এ ধরনের অসংখ্য রানা আমাদের দেশে সৃষ্টি হয়েছেন, যাঁরা এবং যাঁদের ক্ষমতাধর গডফাদাররা সারা দেশে আজ একধরনের অরাজক পরিস্থিতি গড়ে তুলছেন। প্রসঙ্গত, গত সরকারের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে জনগণ দুর্নীতি পরিহার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে বর্তমান মহাজোট সরকারকে গত নির্বাচনে মহাবিজয় উপহার দিয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অরাজক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন তো ঘটেনিই, বরং অনেক ক্ষেত্রে অবনতি ঘটেছে।
পরিশেষে, মানব উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশের সফলতা অনেককে তাক লাগিয়েছে। পোশাকশিল্পে আমাদের সমৃদ্ধি ও বিস্তৃতি অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে এখন মনে করেন যে অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের সামনে একটি অভাবনীয় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। কিন্তু আমাদের আশঙ্কা, দ্রুত ফায়দাতন্ত্র-দলতন্ত্র তথা দুর্নীতির অবসান ঘটাতে এবং ন্যায়পরায়ণতা ও আইনের শাসন তথা সুশাসন কায়েম করতে না পারলে, মানব উন্নয়নে আমাদের সফলতা অব্যাহত থাকবে না। আমরা তৈরি পোশাকশিল্পকে বাঁচাতে পারব না এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বাস্তবে রূপায়িতও হবে না। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন এড়াতে হলে জরুরি ভিত্তিতে আজ প্রয়োজন আমাদের বিরাজমান অপরাজনীতির অবসান এবং এর গুণগত মানে ব্যাপক পরিবর্তন।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

কয়লা বাদ দিলে কোন জ্বালানি -জ্বালানি by নাসরিন সিরাজ

৫/৮/২০১২-এর প্রথম আলোয় ‘কয়লা আমাদের ভবিষ্যৎ নয়, অতীত’ শিরোনামে আমার একটি অভিমত প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটিতে দেখিয়েছিলাম, কয়লা ক্ষতিকারক জ্বালানি বলে বিবেচিত হওয়ায় এবং কয়লাবিরোধী আন্দোলনকারীদের চাপের মুখে ইউরোপ ও আমেরিকায় সরকার ও ব্যাংকগুলো এই খাতে বিনিয়োগ অলাভজনক মনে করছে; সেখানে একের পর এক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হচ্ছে। লেখাটিতে কয়লার মতো বাতিল জ্বালানি নয় বরং নতুন প্রজন্মের কথা চিন্তা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বাংলাদেশের সরকার তথা জনগণ ও বিনিয়োগকারীর মন দেওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেছিলাম। বিষয়টির পক্ষে জোর দিতে আবার লিখতে বসা।
এবার আরেকটি আন্তর্জাতিক অধিবেশনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা লিখব। ‘সাউথইস্ট এশিয়ান রিনিউয়েবল এনার্জি পিপল্স অ্যাসেমব্লি’ শিরোনামে অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৯ অক্টোবর-২ নভেম্বর, ২০১২ সালে মালয়েশিয়ায়। এতে বিশ্বের ১১টি দেশের ৮০টি সংগঠনের ১৩০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। এই অধিবেশনে যোগ দিয়ে যে উপলব্ধি হয়েছে তা হচ্ছে, শুধু নতুন প্রযুক্তি কেনার ক্ষমতা তৈরি কাজের কথা নয়। দেশের জনগণকে যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো থেকে অন্ধকারে রাখা হয়, যদি নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবক হিসেবে জনগণকে সক্ষম করে তোলা না হয়, তাহলে আমাদের আসল সংকট নিরসন হবে না। বাংলাদেশ বাতিল প্রযুক্তির ক্রেতাই থেকে যাবে। লাভ আবারও যাবে মুনাফালোভীদের কাছে। সাধারণের কাছে নয়।
প্রথমে বলছি মালয়েশিয়ার কালিমাস্তান দ্বীপ অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের কথা। এই দ্বীপবাসীরা মাত্র দুই বছর ধরে তাদের গ্রামে বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে। এদের কথা শুনলে বুঝতে পারবেন ‘উন্নত বিশ্ব’ গরিব মানুষকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে গবেষণাগারের গিনিপিগ বানিয়েছে। জলস্রোত এই দ্বীপবাসীদের নতুন বিদ্যুতের উৎস। বিশাল আকারের বাঁধ তৈরি করে নদীর স্রোত আটকে বিদ্যুৎ তৈরির বিশাল প্রকল্প নয়, তারা ব্যবহার করে এনজিওগুলোর বিতরণ করা ছোট প্ল্যান্ট। গ্রামের আশপাশের ঝরনায় বসানোর উপযোগী এগুলো। ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির নেতিবাচক দিক ও প্রযুক্তি আদান-প্রদান’ বিষয়ে আলোচনায় যা উঠে এসেছে তা হচ্ছে, কাঁচা পণ্যের ব্যবসায়ীদের ফ্রিজ ব্যবহার করে পণ্য মজুত করার সুবিধা হয়েছে; ছাত্ররা রাত জেগে লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে; বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য মাকে আর মাঠে মাঠে দৌড়াতে হচ্ছে না। কারণ, বাচ্চারা খেলাধুলা ছেড়ে টেলিভিশনের সামনেই অবসর সময়ে বসে থাকে। অসুবিধা খালি একটাই। তাদের নিরবচ্ছিন্ন ও ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তি চাই। বিদ্যুৎ সরবরাহ তো সবাই-ই চায়। কিন্তু ওই এলাকার ৮০ শতাংশ লোকই শিক্ষা-দীক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।
যাঁদের সঙ্গে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছে, তাঁরা কেউ দ্বাদশ শ্রেণীর বেশি পড়েননি। এলাকাটি এতই গরিব যে কর্মসংস্থানের অভাব বলে ওই এলাকার পুরুষেরা গ্রামে প্রায় থাকেনই না, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে দিনমজুর হিসেবে অভিবাসন করেন। এখানে নতুন প্রযুক্তি এনে দিয়েছে এনজিও। সুবিধাভোগীদের প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী বানানোর প্রকল্প নেই এনজিওগুলোর। তারা কমিউনিটিকে যন্ত্র ইনস্টলমেন্ট ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দরকারি কিছু প্রশিক্ষণ দিয়েছে মাত্র। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ান ছোট ওয়াটার প্ল্যান্টের টার্বাইন বানানোর কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এনজিওগুলোর যোগাযোগ আছে। অ্যাসেমব্লিতে একজনকে উপস্থিতও দেখলাম। তিনি জেনে নিচ্ছিলেন যন্ত্র ব্যবহারে কমিউনিটির সুবিধা-অসুবিধাগুলো। যেগুলোর ভিত্তিতে যন্ত্রকে আরও উন্নত করা হবে।
অনেকে বলতে পারেন উন্নত বিশ্বের ফেলে দেওয়া প্রযুক্তি দিয়ে বা গবেষণার গিনিপিগ হিসেবে টুকটাক সাহায্য পেয়েও হয়তো অল্প অল্প করে উন্নতি করা সম্ভব। এই অধিবেশনে নারীদের অভিজ্ঞতাগুলো শোনার পর এই দাবির অসারতা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। আলোচনা থেকেই জানতে পারি, নতুন প্রযুক্তি নারীদের লিঙ্গ নির্ধারিত বৈষম্যমূলক সামাজিক ভূমিকা ও অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। কালিমাস্তান দ্বীপাঞ্চলের ওই জলবিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলো নারীরা চালান না। কমিউনিটি সম্মিলিতভাবে যেখানে প্ল্যান্টের মালিক, সেখানে কমিটিতে নারীরা অংশগ্রহণ করেন না। এমনকি আন্তর্জাতিক অধিবেশনে অংশগ্রহণের বিষয়টি ‘নারী দূরে ভ্রমণ করতে পারে না’ কিংবা ‘সংসার ও চাষের মাঠে নারীর কর্মব্যস্ততা রয়েছে’ এই অজুহাতে খারিজ হয়ে যায়। নতুন প্রযুক্তি চালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে এমনকি উদ্ভাবন থেকে নারীরা রয়েছে অনেক অনেক দূরে। কালিমাস্তানে কর্মরত একজন এনজিওকর্মী বায়োগ্যাস ব্যবহার করে উনুন জ্বালান, এ রকম কয়েকজন নারীর অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন আমাকে। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি সুবিধাভোগী নারীরা বরং এখন আগের তুলনায় বেশি অবরুদ্ধ। কারণ, সাধারণ উনুনের জ্বালানি জোগাড় করতে নারীরা আগে ঘরের বাইরে যেতে পারতেন, সেটা এখন আর তাঁরা পারছেন না। আবার, উন্নত চুলা ব্যবহারের ফলে নারীদের অবসর সময় বেড়েছে। কিন্তু তখন প্রশ্ন উঠেছে, অবসরে সোপ অপেরা দেখলে নারীর এতে কী লাভ হলো? ফিলিপাইনের যাঁর সঙ্গে কথা হলো, তিনি কাজ করেন নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত গাড়ি নিয়ে। তাঁর সংগঠন নারীদের গাড়ি চালনা ও মেরামতের কাজ শেখায়, ‘সবুজ-পরিচ্ছন্ন’ জ্বালানির গাড়ি বিক্রি করে। তিনি বলেন, যেভাবে প্রাইভেট গাড়ির চাহিদা বাড়ছে, তাতে বিকল্প জ্বালানির পাশাপাশি পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কথা না ভাবলে আমাদের আর চলবে না। অনেক লোক এক গাড়িতে চড়লেই একমাত্র বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। ফ্লাইওভার বানিয়ে প্রাইভেট গাড়ির জন্য বিকল্প রাস্তা তৈরি রাজকোষের অপচয় বলে তিনি মনে করেন।
সম্প্রতি সুন্দরবনের খুব কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আমরা জানি, বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা ও সমাজকর্মীরা কয়লাকে বাতিল করেছেন। কয়লা না, বিকল্প জ্বালানি আমাদের বের করতে হবে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে প্রতিবেশী যে মানুষগুলো, তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ‘গরিব’ বলে ‘উন্নত বিশ্বের’ পরীক্ষা-নিরীক্ষার বলি হওয়ার সুযোগ নেই। কোন জ্বালানি দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ চলবে, সেটা আমাদেরই ঠিক করতে হবে।
নাসরিন সিরাজ: নৃবিজ্ঞানী, চলচ্চিত্রনির্মাতা।

পুলিশের সদস্য নিহত -আসামি ধরার পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করুন

গত শুক্রবার রাতে গাজীপুরে আসামি ধরতে গিয়ে উত্তেজিত গ্রামবাসীর হামলায় পুলিশের একজন সদস্য নিহত ও দুজন আহত হওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিকটিই বড় হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, পুলিশ চাঁদাবাজির অভিযোগে আসামি ধরতে গিয়ে কেন গ্রামবাসীর রোষের শিকার হবে? মানুষ তো চাঁদাবাজি, মাস্তানি চায় না। সাধারণত অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষ পুলিশ ও প্রশাসনকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু গাজীপুরে কেন ব্যতিক্রম দেখা গেল?
অভিযুক্ত চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল রাজউকের একটি ঠিকাদার গ্রুপ। যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। সরকারি দলের নেতা সরকারি সংস্থার কাজের ঠিকাদারের সঙ্গে কীভাবে চাঁদাবাজির মামলায় জড়িয়ে পড়লেন, তাও খুঁজে দেখতে হবে। বস্তুত, অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের উচিত ছিল প্রশাসনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে উচিত ছিল তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা।
আর পুলিশই বা কেন রাত দেড়টায় আসামি ধরতে যায়? এর আগেও দেখা গেছে আসামি ধরার জন্য পুলিশ গভীর রাতে গ্রামে অভিযান চালায়। দিনের আলোয় কেন এসব অভিযান চালানো হয় না? এতে গ্রামবাসীর মধ্যে ভীতির সঞ্চার হওয়া তো স্বাভাবিক। এই সুযোগটিই নিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। তারা গ্রামে ডাকাত পড়েছে বলে সহজেই পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করতে পেরেছে।
তাই আসামি ধরার কৌশল ও পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। গ্রামের মানুষকে আস্থায় নিতে হবে। হঠাৎ করে ঘুমন্ত গ্রামে পুলিশি অভিযান চালানো গ্রহণযোগ্য নয়। এটা যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও বটে। বরং আগে থেকে গ্রামবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। তাহলে মানুষ আগে থেকেই জানবে যে পুলিশ কাকে, কেন ধরতে চায়।
গাজীপুরের ঘটনায় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা পুলিশের সদস্য হত্যার নিন্দা জানাই। এর সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

সংঘাতের অবসান হোক -সমঝোতার বিকল্প নেই

নির্বাচনের বছর ২০১৩ সাল প্রথম প্রান্তিকেই বেশ সংঘাতময় হয়ে উঠেছে। শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৭৮ জন। পুরো মার্চ মাস ধরেও বিক্ষিপ্ত সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ মে মাসের প্রথম সপ্তাহে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনে আরও ৫২ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি ঘটেছে অন্তত ১৩০ জন মানুষের, আহতের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।
আপাতদৃষ্টিতে এসব সহিংস ঘটনার সঙ্গে আগামী নির্বাচনের প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক প্রতীয়মান না হলেও নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতি নিয়ে বিবদমান দুই রাজনৈতিক পক্ষের মতবিরোধ ও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে অনিশ্চয়তা এসবের পেছনের সুপ্ত কারণ বলে আমাদের মনে হয়। বর্তমান সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে আসা ও দেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেলে দেশে বর্ধিত মাত্রায় যে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, তা ভেবে উদ্বেগ জাগে।
সরকারবিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিরোধের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বেশিসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি এ দেশে ঘটেনি। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার কিছু বৈশিষ্ট্য বেশ উদ্বেগজনক। যেমন: ব্যাপক পরিসরে নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে জনসাধারণের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতিসাধন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করা ও তাঁদের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেওয়া, গুজব ছড়িয়ে দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং বিপরীতক্রমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেপরোয়া শক্তি প্রয়োগ। সব মিলিয়ে হতাহতের সংখ্যা এত বেশি হয়েছে যে, দেশের পরিস্থিতিকে সংঘাত-সহিংসতাময় হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানির ব্যাপারে এ দেশের জনসাধারণ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজ তো বটেই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্বয়ং জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন উদ্বেগ প্রকাশ করে ৬ মে এক বিবৃতি দেওয়ার পর ১০ মে ঢাকা সফরে এসেছেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। এর আগে এ দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা কমনওয়েলথের মধ্যস্থতার উদ্যোগ লক্ষ করা গেছে। এবার খোদ জাতিসংঘের মহাসচিবের বিবৃতি প্রকাশ ও সহকারী মহাসচিবের সশরীরে ঢাকা চলে আসার তাৎপর্য সম্ভবত এই যে, বাংলাদেশের এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের থেকে বেশি গুরুতর। বাংলাদেশকে নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন পুরো বিশ্বসম্প্রদায়। মহাসচিব বান কি মুন যেমন তাঁর বিবৃতির প্রথমেই বাংলাদেশের সব পক্ষের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন, সহকারী মহাসচিব অস্কার তারানকোও তেমনি ঢাকায় এসে প্রথমেই বলেছেন, অব্যাহতভাবে যে সহিংসতা চলছে, তা অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। আমাদের বিবেচনায়ও এটিই এ মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার: যুক্তিহীনভাবে, অনর্থক অনেক রক্ত ইতিমধ্যে ঝরেছে, আর একটিও প্রাণহানি নয়।
কিন্তু সহিংসতা বন্ধ হতে পারে কীভাবে?
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা উভয়ের সঙ্গে বৈঠক করে বলেছেন, দুই দলের রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি। আমরাও মনে করি, দুই পক্ষের সমঝোতা ও সংলাপই সহিংসতা বন্ধ করার প্রধান উপায়।

মুরসি সম্পর্কে মন্তব্যের সময় আসেনি: মোবারক

মিসরের সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক বলেছেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। কারণ নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সামনে কঠিন দায়িত্ব।
বলা হচ্ছে, ২০১১ সালে গণবিক্ষোভের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মোবারক এই প্রথম প্রকাশ্যে কোনো সাক্ষাৎকার দিলেন। এল-ওয়াতান পত্রিকা বলেছে, হোসনি মোবারক গত শনিবার পুনর্বিচারের জন্য আদালতে গেলে একজন সাংবাদিক কৌশলে নিরাপত্তাবেষ্টনী অতিক্রম করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হন। মোবারক ওই সাংবাদিককে বলেন, দেশের দরিদ্র মানুষ এবং অর্থনীতি বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তুরস্কে বোমা হামলায় সিরিয়ার দিকে আঙুল

সীমান্তবর্তী রাইহানলি শহরে গত শনিবারের শক্তিশালী জোড়া গাড়ি বোমা হামলার জন্য তুরস্ক সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার-আল আসাদের অনুগত বাহিনীকে দায়ী করেছে। তবে সিরিয়া একে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ওই হামলায় কমপক্ষে ৪৬ জন নিহত ও কয়েক শ আহত হয়।
কোনো গোষ্ঠী এখনো হামলার দায়িত্ব স্বীকার না করলেও তুরস্ক বলেছে, তাদের বিশ্বাস—এ হামলার পেছনে সিরিয়া সরকারের হাত রয়েছে। এমনকি সিরিয়ার প্রধান বিরোধী গোষ্ঠী সিরিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিলও বাশারের অনুগত বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সিরিয়ার তথ্যমন্ত্রী ওমরান জুবি। তিনি গতকাল রোববার দামেস্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সিরিয়া কখনোই এ ধরনের কাজ করবে না।’
তুরস্কের উপপ্রধানমন্ত্রী বশির আতালাই তুর্কি একটি টেলিভিশনকে বলেন, ‘সিরিয়ার শরণার্থীরা আমাদের সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছে। আর আসাদ সরকারের অনুগত বাহিনী শরণার্থীদের লক্ষ্য করেই এই হামলা চালিয়েছে।’
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তুর্কি পুলিশ নয় ব্যক্তিকে আটক করেছে। তারা সবাই তুরস্কেরই নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো এই হামলার নিন্দা জানিয়ে তুরস্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

হোমরাচোমরাদের অনেকেই ধরাশায়ী

পাকিস্তানে এবারের নির্বাচনে বেশ কয়েকটি অঘটন ঘটেছে। পুরোনো অনেক হোমরাচোমরা যেমন ধরাশায়ী হয়েছেন, তেমনি অপ্রত্যাশিতভাবে জয়ী হয়েছেন কয়েকজন প্রার্থী।
পেশোয়ারে তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা ইমরান খানের কাছে হেরেছেন আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির (এএনপি) বড় নেতা গুলাম আহমেদ বিলোর। সবাইকে চমকে দিয়ে পিএমএল-এনের রাজা জাভেদ ইখলাস হারিয়ে দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফকে। ভোট গণনায় দেখা গেছে, এএনপির প্রধান আসফেন্দিয়ার ওয়ালি খানও নিজ এলাকা চারসাদ্দায় পিছিয়ে ছিলেন।
গত জাতীয় পরিষদে বিরোধী দলের নেতা চৌধুরী নিসার আলী খান এবার পিটিআইয়ের গুলাম সারওয়ার খানের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হয়েছেন। তবে নিসার আরেকটি আসনে পিএমএল-কিউয়ের রাজা মুহাম্মদ বাশারাতকে হারিয়ে দিয়েছেন।
রাওয়ালপিন্ডিতে পিএমএল-এনের শাকিল আওয়ানকে অনায়াসে হারিয়ে আরেকটি বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন শেখ রশিদ আহমেদ।
সাবেক মন্ত্রী ও পিপিপির বড় নেতা চৌধুরী আহমেদ মুখতার হেরে গেছেন পিএমএল-কিউয়ের চৌধুরী পারভেজ এলাহির কাছে। একইভাবে পিপিপির সাবেক তথ্যমন্ত্রী কামার জামান কাইরা পরাস্ত হয়েছেন পিএমএল-এনের প্রার্থীর কাছে। পিপিপির পাঞ্জাব প্রদেশের সভাপতি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মঞ্জুর ওয়াট্টুর মতো বড় নেতাও জিততে পারেননি। দ্য নেশন।

আসুন, সবুজ হই by আনিসুল হক

আমার মুঠোফোনটা চার্জারের তার থেকে বিচ্ছিন্ন করার সঙ্গে সঙ্গে একটা লেখা ভেসে ওঠে পর্দায়, আপনার চার্জারটা খুলে রাখুন, এতে কিছু বিদ্যুত্ অপচয় রোধ হবে। একটা চার্জার যদি মুঠোফোনের সঙ্গে যুক্ত না থাকে, কতটুকুন আর বিদ্যুত্ খরচ হবে। কিন্তু ওই অতটুকুন বিদ্যুত্ও বেশি খরচ করতে নেই। সবাই যদি একটু একটু করে বিদ্যুত্ সাশ্রয় করে, তাহলে তা একত্র হয়ে সাশ্রয়ের পরিমাণটাকে করে তুলবে বিশাল। আর বিদ্যুত্ যদি কম ব্যয় হয়, তাহলে তা জলবায়ুর ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেবে অনেকখানি। কারণ, বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে গিয়ে তেল, কয়লা যাই পোড়ানো হোক না কেন, তা বাতাসে কার্বনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, আর তাতে পৃথিবীর তাপমাত্রা একটু বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। পৃথিবীব্যাপী এখন এই এক আওয়াজ—গো গ্রিন। আরেকটু সবুজ হোন। মানে জলবায়ু ও পরিবেশের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন। প্রচারণা চলছে, গাড়ি কম চড়ুন, হাঁটুন অথবা সাইকেলে চড়ুন, সবগুলো বৈদ্যুতিক বাতি বদলে বিদ্যুত্-সাশ্রয়ী বাতি লাগান। প্রশ্ন উঠেছে, আপনি পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করবেন, নাকি কাগজের ব্যাগ। উত্তর হলো, একটাও না। এমন একটা ব্যাগ ব্যবহার করুন, যেটা বারবার ব্যবহার করা যায়, যেমন চটের ব্যাগ। কারণ, পলিথিন ব্যাগ পচে না, পরিবেশ নষ্ট করে, কিন্তু কাগজের ব্যাগও ক্ষতিকর, এটা বানানোর জন্য যেমন গাছ কাটতে হয়, জ্বালানি খরচ করতে হয়, তেমনি এটা পচনের সময় গ্রিনহাউস গ্যাস উত্পাদন করে। ঘর থেকে যখনই বের হবেন, বিদ্যুতের সু্ইচ বন্ধ করে দিন। কাগজের চিঠির বদলে ই-মেইল ব্যবহার করুন, প্রিন্ট নিতে হলে কাগজের দুই পিঠেই নিন। ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে এমন কল মেরামত করুন। বোতলের পানি না খেয়ে ফিল্টার করে পানি খান, তাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর থেকে চাপ কমবে। এই ধরনের নানা ধরনের প্রচারণা চলছে বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোয়, তারা জলবায়ু-পাপী, উন্নতিই তাদের আজন্ম পাপ, তারা তাদের পাপের ভার আর বাড়াতে চায় না।
পৃথিবীটা যে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠেছে, আর তার জন্য দায়ী বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং এ জন্য মানুষই দায়ী, এটা এখন বৈজ্ঞানিক সত্য। পৃথিবীর সব মানুষ চেষ্টা করলে এই গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ কমিয়েও দিতে পারে, তার মাধ্যমে পৃথিবীকে আবার ধীরে ধীরে শীতলও করে ফেলতে পারে। আপাতত সে সম্ভাবনা নেই। প্রথমত, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই বিষয়ে একমত হতে পারেনি। চীন এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলবায়ু দূষণকারী দেশ। দ্বিতীয় স্থানে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চীন কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর ব্যাপারে আইনগত বাধ্যবাধকতা মানতে চায় না, কারণ তাতে তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতির রাশ টেনে ধরতে হয়। চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা আর ব্রাজিল—এরা বলে, আমরা উন্নয়নশীল দেশ, কার্বন নিঃসরণ কমানোর আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে আমরা কেন যাব? আর আমেরিকা বলে, ওদের যদি বাধ্য না করা হয়, তাহলে আর আমরা কেন সেই লাগাম পরতে যাব। ফলে গত বছর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কোপেনহেগেন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন মোটের ওপর বড় কোনো অর্জন ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে।
পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হচ্ছে, তার বড় শিকারে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে অনাবৃষ্টি হবে, আবার অতিবৃষ্টি হবে, হঠাত্ অসময়ে বন্যা হবে, ঘন ঘন সাইক্লোন হবে, সমুদ্রতলের উচ্চতা বেড়ে যাবে, বাংলাদেশের অনেকাংশ ডুবে যাবে—সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা এটা স্বীকার করে নিয়েছেন।
তবে জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও ভূমিকা ভালো ছিল। চীন ও ভারত যখন একটা বিষয়ে একমত হয়, তখন বাংলাদেশের জন্য কথা বলা ছিল মুশকিল। কারণ, কথা বলতে হয় গ্রুপে গ্রুপে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সদস্য হিসেবে, আবার জি-৭৭ ও চীনের গ্রুপের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ যথোচিত ভূমিকাই পালন করেছে। বাংলাদেশ ৩৫০ পিপিএমের বেশি কার্বন ঘনত্ব নয় এবং দেড় ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়—এই দাবিতে সোচ্চার ছিল। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের তহবিল গঠন করা, তাকে সহজপ্রাপ্য করা—এই দাবিতেও কথা বলেছে। বাংলাদেশ নিজেকে উপস্থাপন করেছে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে। অভিযোজনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের এই দক্ষতা এখন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। বাংলাদেশ কিয়োটো প্রটোকলের ধারাবাহিকতার দাবি তুলেছে। শেষ পর্যন্ত ২৬টা দেশ মিলে যে কোপেনহেগেন অ্যাকর্ড দাঁড় করিয়েছে, তাতে বাংলাদেশও ছিল। সব মিলিয়ে কোপেনহেগেনে বাংলাদেশের ভূমিকা ছিল ইতিবাচক।
কিন্তু সাধারণভাবে আমাদের দেশে জলবায়ুর ব্যাপারে জনসচেতনতার এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সতর্কতার অভাব রয়ে গেছে। এই অসচেতনতা যেমন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রকাশিত হয়, তেমনি আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যেও দেখা যায়। যেমন, আমরা একটা দেশলাইয়ের কাঠি বাঁচানোর জন্য গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখি। আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়ালে সেটা গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করবে। আমরা অপ্রয়োজনে বাতি জ্বালিয়ে রাখি। আমরা প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার করার চিন্তা বিসর্জন দিয়ে ফেলেছি। অথচ কোপেনহেগেনে দেখে এলাম, ওরা ওদের বাড়ি এমনভাবে নকশা করছে, যাতে বাতি জ্বালাতে না হয়, দিনের আলো ঘরের ভেতরে ব্যবহার করা যায়।
পৃথিবীতে এত দিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল এক নম্বর জলবায়ু দূষক দেশ। তারা একটা মারাত্মক নীতি অবলম্বন করেছিল, রেলের বদলে বা রেলের সমান্তরালে সড়কপথে ও আকাশপথে যোগাযোগব্যবস্থাকে উন্নত করেছিল। এর ফলে গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গেছে। তেল পুড়ছে, কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে। এখন পৃথিবীতে আবার গাড়ির ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানোর আওয়াজ উঠেছে। কোপেনহেগেন শহরে রাস্তায় সাইকেলের লেন করে দেওয়া হয়েছে, প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও নারীপুরুষ সবাই সাইকেল চালাচ্ছে। আর আমরা ঢাকা শহর থেকে সাইকেল তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। আমাদের কোনো গণপরিবহনব্যবস্থা নেই। সম্প্রতি দিল্লি-আগ্রা-জয়পুর সড়কপথে ভ্রমণের সময় একটা দারুণ ব্যাপার লক্ষ করলাম। এই সড়কপথে কোনো দূরপাল্লার বাস নেই। তার মানে ভারতে ট্রেন যোগাযোগটা ভালো, ওরা রেলের ওপরেই দূরভ্রমণের জন্য বেশি নির্ভরশীল। আর আমরা সারা দেশ থেকে রেল তুলে দিয়ে বাস-ট্রাকের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। এটা খুবই আত্মঘাতী হচ্ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন, ঢাকার চারপাশে চারটা উপশহর গড়ে তোলা হবে। সেই উপশহরের সঙ্গে যোগাযোগটা হবে কীভাবে? বাসে আর গাড়িতে? তাহলে ঢাকার ওপর চাপ মোটেও কমবে না। আমাদের অবশ্যই রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
আর আমরা বন ধ্বংস করছি। আমাদের সমুদ্র উপকূলে গাছ নিধনের ছবি কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে ছাপা হয়েছে। আমরা দেশের সব কটা বন সাফ করে ফেলছি। অথচ আমাদের বনায়ন বাড়াতে হবে। বাতাস থেকে কার্বন ঘনত্ব কমানোর একটা উপায় হলো বনায়ন বৃদ্ধি।
আর আমাদের বায়োগ্যাস ও সৌরবিদ্যুতের কথাও ভাবতে হবে। ন্যানো গাড়ি দেশে আসছে, এটা কোনো সুখবর নয়, দুঃসংবাদ। আমাদের আকাশ-বাতাস আরও দূষিত করবে এই যান। আমরা যখন নৌকায় পাল তুলে চলতাম, তখন আমরা ছিলাম পরিবেশ ও জলবায়ুবান্ধব। এখন আমরা ইঞ্জিন নৌকায় চড়ি, বাতাস ও জল দুই-ই দূষিত করি।
আমরা ঢাকা শহরে গাড়ির সংখ্যা বাড়িয়েই চলেছি। একটা শহরে রাস্তা থাকা উচিত শতকরা ২৫ ভাগ, আমাদের আছে সাত ভাগ। আর যেসব শহরের কথা বলছি, সেসব শহরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ঢাকার মতো বিশাল নয়। তাহলে ঢাকায় কত ভাগ রাস্তা থাকা উচিত? ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধানের জন্য বহুমুখী পরিকল্পনা নিতে হবে। এর মধ্যে পাতালরেল, মনোরেল, ফ্লাইওভার, সার্কুলার রোড, জলপথ ব্যবহার—সবই করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি ভিত্তিতে দরকার প্রচুর ফুটওভারব্রিজ ও হাঁটার ফুটপাত। আমাদের হাঁটার অভ্যাস বাড়াতে হবে। আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা সড়কনির্ভর না করে রেলনির্ভর করতে হবে। এবং রেলকে বৈদ্যুতিক করতে হবে।
আসলে বলতে চাচ্ছি, আমাদের দৈনন্দিন জীবনচর্চায় পরিবেশ ও জলবায়ুর কথা সার্বক্ষণিকভাবে বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে। আমাদের শহরের রাস্তায় কখনোই যেন সকাল হয়ে যাওয়ার পর বাতি না জ্বলে। আমরা যেন টেলিভিশন বন্ধ করার জন্য রিমোটের পাশাপাশি সুইচটাও বন্ধ করি। আমরা যেন অকারণ আলোকসজ্জা না করি।
সত্য বটে, জলবায়ু কূটনীতির সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রতিযোগিতাও জড়িত। চীনের অর্থনৈতিক উন্নতির রকেটটাকে থামিয়ে দেওয়ার এ হচ্ছে পশ্চিমা কৌশল, এ অভিযোগ কেউ করতেই পারেন। ভারত বলে, আমি তো মাথাপিছু কার্বন দূষণ কম ঘটাই। জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমে গেলে ওপেক দেশগুলোর কী হবে, এটা তাদের মাথাব্যথা। এই ধরনের নানা কূটকচালের ভেতরে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—তোমাদের জন্য যা কূটনীতি-রাজনীতি, আমাদের জন্য তা জীবনমরণ সমস্যা।
জলবায়ু পরিবর্তনে কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের কোনো দায় নেই, বাংলাদেশকে কেউ কোনো বাধ্যবাধকতায় আসতে বলবেও না। তবু আমরা হতে পারি ক্লাইমেট চ্যাম্পিয়ন দেশ। আমরা নিজেদের একটা পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে গড়ে তুলে হয়ে উঠতে পারি পৃথিবীর জন্য মডেল। আমরা বলতে পারি, দেখ আমাদের সামর্থ্য সীমিত, তবু আমরা সবুজ নীতি অবলম্বন করছি।
রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা যখন বড় বড় নীতি প্রণয়ন করবেন, তখন প্রতিটা নাগরিককেও সচেতনতার প্রমাণ রাখতে হবে। ব্যবহারের পর কম্পিউটার বন্ধ করে দেওয়া বা গ্যাসের চুলা বন্ধ করা তার খুবই সাধারণ কিন্তু বড় উদাহরণ। আসলে প্রথম আলো ঠিকই বলেছে, অন্যকে বদলাতে বলার আগে দরকার আমাদের নিজেদেরই বদলানো।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক।

শেয়ারবাজারে অনিয়ম-অপরাধ

দেশের শেয়ারবাজারে নানা ধরনের অনিয়ম আর বাজার ঘিরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক তত্পরতা জোরদার হয়ে উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বারবার বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। মাঝখান থেকে কয়েকটি চক্র কৌশলে চড়া মুনাফা তুলে নিচ্ছে। কিন্তু বাজারের এসব অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। প্রথম আলোয় সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে।
প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে জানা গেছে, দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সঠিকভাবে বাজার মূল্যসূচক গণনা করছে না। যে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সূচক গণনার কথা, তাও ঠিকমতো হচ্ছে না। ফলে বাজারের শক্তিমত্তা সম্পর্কে কৃত্রিম ধারণা দেওয়া হচ্ছে। এটা অত্যন্ত বিস্ময়কর যে বছরের পর বছর ডিএসই ভুলভাবে সূচক গণনা করে আসছে, আর এসইসি তা নির্বিকারভাবে চেয়ে দেখছে। এটা শুধু অনিয়ম নয়, অপরাধও বটে। আর এই অপরাধে এসইসি ও ডিএসই সমানভাবে দায়ী। কারণ, ভুলভাবে সূচক গণনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেছে। বিনিয়োগকারীরা বাজার সম্পর্কে ভুল ধারণার শিকার হয়েছেন। এতে তাঁদের বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে।
শেষ পর্যন্ত এসইসি সঠিকভাবে সূচক গণনার জন্য স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু এ ধরনের নির্দেশ তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না এ জন্য যে এর মাধ্যমে এসইসি কার্যত একধরনের দায় সেরেছে। কেন ও কাদের কারণে এতকাল সূচক ভুলভাবে গণনা করে উপস্থাপন করা হলো, সে বিষয়ে কোনো তদন্ত করার উদ্যোগ নেয়নি এসইসি। তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সে পথে না গিয়ে ও আগের ভুল সংশোধন না করে শুধু এখন থেকে সঠিকভাবে গণনার নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এসইসির অদক্ষতাই প্রকাশ পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে বরং প্রশ্ন উঠতেই পারে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ডিএসইর ওপর যথাযথ কর্তৃত্ব স্থাপন করতে দ্বিধাগ্রস্ত কেন? অন্যদিকে ডিএসইর নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের অনিয়ম করে চলার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ১৯৯৬-এর শেয়ার কেলেঙ্কারি মামলার আসামিদের কেউ কেউ অনেক বেশি ক্ষমতাবান হয়ে বাজারে এসব অনিয়ম-অপরাধে মদদ জোগাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
আবার শেয়ারবাজার ঘিরে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে নানা ধরনের গুজব ছড়ানোর ঘটনা জোরেশোরে চলেছে। কোনো কোনো ওয়েবসাইটে সুনির্দিষ্টভাবে শেয়ারের নাম উল্লেখ করে দাম বাড়ানো-কমানোর কথা বলা হচ্ছে। কোনোটিতে শেয়ার কিনে লাভ করিয়ে দেওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। এগুলোও এসইসির নাকের ডগায় হচ্ছে। শেয়ারবাজারের সঙ্গে যখন দেশের বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে গেছে, তখন শুধু জুয়াবাজ চক্রের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকতে পারে না। সরকারের শীর্ষ পর্যায়েরও এদিকে দ্রুত মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিধিমালা

ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন যে খসড়া নির্বাচনী বিধিমালা প্রণয়ন করেছে, তা অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। এতে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়র পদপ্রার্থীদের একমঞ্চে জনসভা করা, রাজধানীতে চারটির বেশি জনসভা না করার কথা বলা হয়েছে। এসব জনসভা আয়োজনও করবে নির্বাচন কমিশন। এ ছাড়া বিধিতে আরও কিছু শর্ত রয়েছে, যেমন: নির্বাচনী পোস্টারে প্রার্থী ও প্রতীক ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার না করা, গণমাধ্যমে স্লট ভাড়া করে প্রচারণা না চালানো, সাড়ম্বরে মনোনয়নপত্র দাখিল না করা। মেয়র পদপ্রার্থীদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কাউন্সিলরদের ক্ষেত্রে বাধা নেই। তাঁরা প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে জনসভাও করতে পারবেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এসব বিধিনিষেধের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না।
নির্বাচন কমিশন আগামী মার্চের মাঝামাঝি নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তফসিল ঘোষণা হতে পারে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর সিটি করপোরেশন কোনো নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনের এ সিদ্ধান্তও সঠিক বলে আমরা মনে করি। অনেক সময় দেখা যায়, তফসিল ঘোষণার পরই মেয়র-কাউন্সিলররা প্রকল্প বাস্তবায়নে তত্পর হয়ে ওঠেন। এটি অত্যন্ত বাজে নজির।
যত দ্রুত সম্ভব, নির্বাচন কমিশনের খসড়া বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা জরুরি। কেননা, সম্ভাব্য প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলগুলো এ নিয়ে পানি ঘোলা করার চেষ্টা চালাতে পারে। সিটি করপোরেশন নির্বাচন অরাজনৈতিক হলেও তারা এটি মানতে নারাজ। এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নির্বাচন কমিশন বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, যা সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও নির্বাচন কমিশন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের যৌথ জনসভা করার প্রস্তাব দিয়েছিল, যা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতার কারণে। এবার তেমনটি হবে না এবং নির্বাচন কমিশন কোনো মহলের চাপে নতি স্বীকার করবে না বলে আমাদের প্রত্যাশা। এভাবে যৌথ জনসভা হলে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীরা যেমন একই মঞ্চ থেকে নিজ নিজ কর্মসূচি তুলে ধরতে পারবেন, তেমনি নির্বাচনী সংস্কৃতিতেও সুস্থ ধারা ফিরে আসবে।
তবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, তা যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো প্রার্থী নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে অন্যরাও সমঝে চলবেন। আইন ভাঙতে সাহস পাবেন না।
আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশন প্রস্তাবিত আচরণবিধি পালিত হলে শুধু সিটি করপোরেশন নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে না, টাকার খেলাও বন্ধ হবে। নির্বাচনী প্রচারণার নামে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা লাখ লাখ টাকা খরচ করলে নির্বাচিত হওয়ার পর স্বভাবতই তাঁরা তা সুদাসলে উসুল করতে চাইবেন। এ সুযোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা প্রয়োজন।

শিগগির মুক্তি পাচ্ছেন না আটক এলটিটিই বিদ্রোহীরা

শ্রীলঙ্কা সরকার আটক লিবারেশন টাইগারস অব তামিল ইলম (এলটিটিই) বিদ্রোহীদের শিগগিরই মুক্তি দেবে না। শ্রীলঙ্কার বিদ্যুত্ ও জ্বালানিমন্ত্রী ডব্লিউডিজে সিনিভিরত্ন বিবিসিকে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আটক ১৪ হাজার বন্দীর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী আছে।
এদিকে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার উদয় নানাইয়াককারা বলেন, গত শনিবার ৭১২ জন সাবেক এলটিটিই বিদ্রোহীকে মুক্তি দেওয়ার পর শ্রীলঙ্কার কারাগারে এখন এক হাজার ১০০ এলটিটিই বিদ্রোহী আটক রয়েছেন।
গত বছরের ২৬ জানুয়ারি শ্রীলঙ্কার সাবেক সেনা কমান্ডার জেনারেল ফনসেকা জানান, তিনি নির্বাচিত হলে এবং দোষী প্রমাণিত না হলে সন্দেহভাজন সব এলটিটিই বিদ্রোহীর মুক্তি দেবেন। শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল দ্য তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (টিএনএ) সে সময় ফনসেকাকে সমর্থন জানায়। কিন্তু এর মধ্যেই এলটিটিই বিদ্রোহীদের মুক্তি দেবেন না বলে জানালেন সিনিভিরত্ন। তিনি অভিযোগ করেন, যুদ্ধাপরাধের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শ্রীলঙ্কাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনকেও চাপে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শ্রীলঙ্কায় ২৬ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে ৭০ হাজারেরও বেশি লোক নিহত এবং অসংখ্য মানুষ গৃহহারা হয়ে পড়ে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত শনিবার জানায়, শরণার্থী শিবিরে ৮০ হাজারেরও বেশি লোক আশ্রয় নিয়েছে।

সীমান্তে ইরানের পরমাণু চুল্লি -আইএইএর কাছে বিশদ ব্যাখ্যা চেয়েছে ইরাক

ইরাকের সীমান্তের কাছে ইরান পরমাণু চুল্লি তৈরি করছে—জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক দলের এ ধরনের প্রতিবেদনের বিশদ ব্যাখ্যা চেয়েছে ইরাক সরকার।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কাছে এই ব্যাখ্যা চায় ইরাক।
ইরাকের এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, দেশটির সীমান্তে ইরান যে পরমাণু চুল্লি তৈরি করছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ইরাক আইএইএর সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেবে।

উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় পরমাণু পরীক্ষার স্থান শনাক্ত

উত্তর কোরিয়া গত বছর দ্বিতীয়বারের মতো যে স্থান থেকে পরমাণু পরীক্ষা করেছিল, সেই স্থানটি শনাক্ত করতে পেরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই বিজ্ঞানী। নতুন একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, পরমাণু পরীক্ষার ওই স্থানটি ২০০৬ সালে প্রথম পরমাণু পরীক্ষার স্থান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। খবর পিটিআইয়ের।
গত বছরের ৫ মে উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় পরমাণু পরীক্ষার স্থানটি শনাক্ত করেন নিউইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূবিদ্যার অধ্যাপক নিয়ানজিং ওয়েন ও তাঁর ছাত্র হুই লং।
যুক্তরাষ্ট্রের সিসমোলজিক্যাল সোসাইটির প্রকাশনা সিসমোলজিক্যাল রিসার্চ লেটার-এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় বিজ্ঞানীরা জানান, ২০০৯ সালের পরমাণু পরীক্ষার স্থানটি তাঁরা শনাক্ত করতে পেরেছেন। স্থানটি ২০০৬ সালের প্রথম পরমাণু পরীক্ষার স্থান থেকে ৭২৩ মিটার উত্তর ও দুই হাজার ২৩৫ মিটার পশ্চিমে অবস্থিত। বিজ্ঞানীরা জানান, উত্তর কোরিয়া আবার পরমাণু পরীক্ষার উদ্যোগ নিলে স্থানটি শনাক্তকরণে তাঁদের এ গবেষণার ফল এশিয়ার পর্যবেক্ষকদের সাহায্য করবে।
বিজ্ঞানীরা উত্তর কোরিয়ার প্রথমবারের পরমাণু পরীক্ষার ফলে সৃষ্ট ওই অঞ্চলের ভূকম্পন বিশ্লেষণ করে দ্বিতীয়বারের পরীক্ষার স্থানটি শনাক্ত করেন।

নির্যাতনের দায় থেকে অব্যাহতি পেলেন আমিরাতের এক শেখ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষমতাসীন পরিবারের সদস্য শেখ ইসা বিন জায়েদ-আল-নাহিয়ানকে নির্যাতনের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদ শাহ পুর নামের এক আফগান ব্যবসায়ীকে বেদম নির্যাতনের অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। গত ২০০৪ সালের আলোচিত ওই ঘটনা নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় চলছিল। অভিযোগের ব্যাপারে জোরদার তথ্যপ্রমাণও ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে গত রোববার আমিরাতের একটি আদালত ওই রায় দেন। ক্ষমতাসীন ওই পরিবারের বিরুদ্ধে এটাই প্রথম কোনো মামলার রায়ের ঘটনা।
শেখ ইসা হলেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট এবং আবু ধাবির আমির শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের ভাই। শেখ ইসার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ওই আফগান ব্যবসায়ীকে চাবুক ও কাঠের খণ্ড দিয়ে বেদম প্রহার করেছিলেন। ওই ব্যবসায়ীর অপরাধ ছিল তিনি শেখ পরিবারের খামারের জন্য সরবরাহ করা খাদ্যশস্য পরিমাণে কম দিয়েছিলেন। ওই নির্যাতনের ঘটনার একটি ভিডিও ধারণ করা ছিল। ওই ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন শেখ ইসারই সাবেক দুই ব্যবসায়ী অংশীদার বাসাম ও ঘাসান নাবলুসি। পরে তাঁরা ওই ভিডিও চিত্রটি এবিসি নিউজ চ্যানেলকে সরবরাহ করেন।
গত রোববার আদালত তাঁর রায়ে বলেন, শেখ ইসার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তি নেই। তিনি ওই দিনের ঘটনার জন্যও দায়ী নন। ওই দিন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দরুণ অসচেতনভাবে তিনি ওই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন।

আল-কায়েদা জঙ্গিদের মুক্তি না দিলে ফরাসি জিম্মিকে হত্যার হুমকি



আল-কায়েদার চার জঙ্গিকে আগামী ২০ দিনের মধ্যে মালির কারাগার থেকে মুক্তি না দিলে ফরাসি এক জিম্মিকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন উত্তর আফ্রিকা শাখার আল-কায়েদার নেতারা। গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের দুটি পর্যবেক্ষক সংস্থা এ কথা জানিয়েছে। খবর এএফপির।
আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব (একিউআইএম) দাবি করেছে, গত বছরের নভেম্বরে মালি থেকে তারা ফরাসি নাগরিক পিয়েরে কমেঁতকে অপহরণ করে। এর চার দিন পর প্রতিবেশী মৌরিতানিয়া থেকে তিন স্পেনীয় নাগরিককে অপহরণ করে তারা।
ইসলামিক ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এসআইটিই ইনটেলিজেন্স গ্রুপ ও ইনটেলসেন্টার জানিয়েছে, আল-কায়েদা ১০ জানুয়ারির এক বিবৃতিতে ওই হুমকি দিয়েছে।
ইনটেলসেন্টার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কয়েক মাস আগে মালিতে গ্রেপ্তার হওয়া চার জঙ্গির মুক্তির বিনিময়ে ফরাসি জিম্মি পিয়েরে কমেঁতকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুজাহিদিনরা। বিষয়টি ফ্রান্স ও মালি সরকারকে জানানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে তারা।
এতে বলা হয়, ‘দাবি আদায়ে আমরা ফ্রান্স ও মালি সরকারকে ২০ দিন সময় দিচ্ছি। তারা ব্যর্থ হলে ফরাসি ওই জিম্মির জীবনের জন্য উভয় সরকারই দায়ী থাকবে।’
গত বছর ২৫ নভেম্বর রাতে মালির উত্তরাঞ্চলের সাহেল অঞ্চলের মেনাকার একটি হোটেল থেকে ৬১ বছর বয়সী কমেঁঁতকে অপহরণ করা হয়।
মালি ও পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা জানিয়েছেন, ফরাসি ওই নাগরিক মালিতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সেখানে তিনি চাষাবাদ করতেন। উত্তর আফ্রিকা শাখা আল-কায়েদার একটি অংশ তাঁকে অপহরণ করে।
গত বছর ডিসেম্বর মাসে আল-জাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত একিউআইএমের এক দৃশ্যচিত্রে দেখানো হয়, চার ইউরোপীয় নাগরিককে আটক করেছে তারা।
গত বছর ২৯ নভেম্বর পশ্চিম আফ্রিকায় ত্রাণ কার্যক্রম বিতরণের উদ্দেশে মৌরিতানিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় জঙ্গিরা স্পেনের দুই পুরুষ ও এক নারী স্বেচ্ছাসেবককে অপহরণ করে।
স্পেনের এল মুন্ডু সংবাদপত্র গত মাসে জানিয়েছে, ওই তিনজনের মুক্তির বিনিময়ে একিউআইএম জঙ্গিরা ৭০ লাখ ডলার ও তাঁদের কয়েকজন জঙ্গির মুক্তি দাবি করেছে।

জামিনে মুক্তি পেলেন তামিল সাংবাদিক

তামিল সাংবাদিক জে এস টিসাইনাইয়াগামকে গতকাল সোমবার জামিনে মুক্তির আদেশ দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার একটি আপিল আদালত। আদালতের একজন মুখপাত্র এ কথা জানান। সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন দেওয়ার দায়ে গত বছর তাঁকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
কলম্বো থেকে প্রকাশিত নর্থ ইস্টার্ন মান্থলি ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতেন জে এস টিসাইনাইয়াগাম। আদালত তাঁকে পাসপোর্ট ও জামিন বাবদ ৫০ হাজার রুপি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

ইরাকে ৪০ হাজার আল-কায়েদাবিরোধী যোদ্ধাকে আত্তীকরণ

জাতীয় সমঝোতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আল-কায়েদাবিরোধী মিলিশিয়া গোষ্ঠী সাহওয়া (এওয়েকনিং) আন্দোলনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্যকে ইরাকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আত্তীকরণ করা হয়েছে। গত রোববার একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন জেনারেল এ কথা বলেন।
আল-কায়েদা ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ২০০৬ ও ২০০৭ সালে মার্কিন ও ইরাকি বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় ‘সান অব ইরাক’ নামে পরিচিত ওই মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সদস্যরা। গোষ্ঠীটি আল-কায়েদার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর ইরাকে সহিংসতা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়।
মেজর জেনারেল জোসেফ রেইসেন সাংবাদিকদের বলেন, ৪০ হাজারেরও বেশি সদস্যকে ইতিমধ্যেই আত্তীকরণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে গত কয়েক মাসে ৩০ হাজার জনকে সরাসরি মন্ত্রণালয়ে একীভূত করা হয়। আরও ৭৮ হাজার সদস্য আত্তীকরণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে। উল্লেখ্য, সাহওয়ার সদস্যসংখ্যা এক লাখ ১৮ হাজার।
সাহওয়ার প্রায় ১০ হাজার সদস্যকে ইরাকি নিরাপত্তাবাহিনীতে নেওয়া হয়েছে। গত অক্টোবরে সাহওয়ার নিয়ন্ত্রণ ইরাকি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়। গত বছর সাহওয়া সদস্যদের বেতন ৩০০ থেকে কমিয়ে ১০০ ডলার করা হয়। আর এ বেতন দিতেও প্রায় দেরি করা হতো। জেনারেল রেইনেস বলছেন, ওই সব বিলম্ব এখন অতীতের বিষয়।
সাহওয়ার শতকরা ২০ ভাগ সদস্যকে পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীতে একীভূত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাগদাদ। এ ছাড়া বাকি অনেক সদস্যকে সরকারি চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার।

মিসর সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ করবে ইসরায়েল

মিসর থেকে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ইসরায়েল এবার তার সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লোহিত সাগর ও গাজা উপত্যকার সীমানা ঘেঁষে দুটি ভাগে এই প্রাচীর নির্মাণ করা হবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গতকাল রোববার বলেছেন, ইসরায়েলের ইহুদি ধর্মীয় পরিচয় এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতেই অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে ২৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দেয়াল নির্মাণ করবে তাঁর দেশ। এই অবকাঠামো নির্মাণে খরচ পড়বে ২৭ কোটি মার্কিন ডলার এবং সময় লাগবে দুই বছর।
তবে নেতানিয়াহু জানান, উদ্বাস্তুদের জন্য ইসরায়েলের দরজা সব সময় খোলা থাকবে। এর মানে এই নয় যে, দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে আসা হাজার হাজার বিদেশি শ্রমিককে সে দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিসর সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার লোক ইসরায়েলে অনুপ্রবেশ করে। এর মধ্যে ইরিত্রিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি এবং এরপর ইথিওপিয়া ও সুদানের অধিবাসী রয়েছে। গত বছর মে মাস পর্যন্ত সীমানা পেরিয়ে মিসর থেকে ইসরায়েলে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টাকালে ১৭ জন ইসরায়েলের পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের তিন নম্বর ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু

দেশে ওষুধের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে গতকাল সোমবার স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ইউনিট-৩-এর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরী। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্কয়ার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান স্যামুয়েল এস চৌধুরী, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী, পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী, আনিকা চৌধুরীসহ কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের বর্তমান সুবিশাল কারখানার পাশেই এ তৃতীয় ইউনিট স্থাপিত হচ্ছে।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের তৃতীয় ইউনিটে থাকছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসুবিধা। নতুন এই ইউনিটের প্রথম ধাপের নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে। আর দ্বিতীয় ধাপের নির্মাণকাজ ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে শেষ হবে ২০১৬ সালের জুন মাসে। আনুমানিক ৫১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই ইউনিটটি ২০১৩ সালের প্রথম দিকে উত্পাদনে যেতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কালিয়াকৈরে ১০৫ বিঘা জমির ওপরে অবস্থিত বর্তমান কারখানায় জেনারেল প্রডাক্ট, সেফালোসপোরিন, ইনসুলিন ও এসভিপিও ইউনিটগুলো রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রায় ৫০ বিঘা জায়গার ওপর স্থাপিত নতুন এই কারখানার মাধ্যমে বছরে এক হাজার কোটি ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল উত্পাদন করা হবে। নতুন এই কারখানায় ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল ছাড়াও ইনজেকশন ও এলভিপি ওষুধের উত্পাদন সুবিদা থাকছে। এ ছাড়া ক্যানসারের ওষুধ ও ভ্যাকসিনের মতো বিশেষায়িত ওষুধও এ কারখানায় উত্পাদন করা হবে।
১৯৫৮ সালে পাবনায় প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে।

আরব স্বাস্থ্য প্রদর্শনী উপলক্ষে এমিরেটসের নতুন প্যাকেজ

২৫ থেকে ২৮ জানুয়ারি দুবাইয়ে অনুষ্ঠেয় আরব হেলথ এক্সিবিশন বা স্বাস্থ্য প্রদর্শনী ও কংগ্রেসে যোগ দিতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে এমিরেটস এয়ারলাইনসের ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা শাখা এমিরেটস হলিডেজ। এটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আরব হেলথ প্যাকেজ’।
এ প্যাকেজে ইকোনমি ক্লাসে ভ্রমণ ও টুইন শেয়ারিং ভিত্তিতে তিন থেকে পাঁচ তারকাবিশিষ্ট হোটেলে তিন রাত যাপন, প্রাতরাশ, দুবাই বিমানবন্দরে মিট ও অ্যাসিস্ট সেবা, এয়ারপোর্ট-হোটেল-এয়ারপোর্ট আসা-যাওয়া, সার্ভিস চার্জ ও ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এয়ারপোর্ট ট্যাক্স ও ভিসা ফি অন্তর্ভুক্ত নয়। প্যাকেজ মূল্য আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।
প্যাকেজটি বিভিন্ন ক্যাটাগরির পাঁচটি হোটেলের জন্য প্রযোজ্য। এর মধ্যে তিন তারকাবিশিষ্ট পার্ল রেসিডেন্সের সর্বনিম্ন প্যাকেজ মূল্য ৮৮৫ মার্কিন ডলার, চার তারকাবিশিষ্ট এভারির সর্বনিম্ন ৯৪৭ মার্কিন ডলার, পাঁচ তারকাবিশিষ্ট গ্র্যান্ড হায়াত হোটেল, অ্যাড্রেস দুবাই ও সাংগ্রিলার সর্বনিম্ন প্যাকেজ মূল্য যথাক্রমে এক হাজার ১৬০ মার্কিন ডলার, এক হাজার ৩৩৮ মার্কিন ডলার ও এক হাজার ৪৭১ মার্কিন ডলার।
বুকিং ও অতিরিক্ত তথ্যের জন্য ৯৮৮৫৫৭৪-৭৫ নম্বরে অথবা ekhdac@emirates.com—এ ই-মেইল ঠিকানায় যোগাযোগ করা যেতে পারে।

চার মাসে বাণিজ্যঘাটতি কমেছে

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে দেশে পণ্যবাণিজ্যে ঘাটতি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে দেশে পণ্যবাণিজ্যে ১৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তুত করা লেনদেনের ভারসাম্য সারণি অনুসারে, এই সময়কালে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৯০ কোটি ডলার আয়ের বিপরীতে পণ্য আমদানি বাবদ ৬৪৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয় হওয়ায় এ ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
আর ২০০৮-০৯ অর্থবছরের একই সময়ে পণ্যবাণিজ্যে ঘাটতি ছিল ২৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
অর্থাত্ পণ্যবাণিজ্যে ঘাটতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেক হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে আরও দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে সেবাবাণিজ্যে ঘাটতি আগের অর্থবছরের প্রথম চার মাসের ৮৮ কোটি ডলারের চেয়ে কমে হয়েছে ৫৩ কোটি ২০ লাখ ডলার।
লেনদেনের ভারসাম্য সারণি থেকে এও দেখা যায়, চার মাসে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ১২৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে।
২০০৮-০৯ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়কালে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ঘাটতি ছিল।
সার্বিক বাণিজ্যঘাটতি হ্রাস পাওয়া এবং প্রবাসী-আয়ের উচ্চপ্রবাহ চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্তাবস্থা ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
চলতি হিসাবে মূলত কোনো দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব প্রতিফলিত হয়। নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত মানে, নিয়মিত লেনদেনের ক্ষেত্রে দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৪-০৫ অর্থবছরের পর আর কোনো অর্থবছরেই বাংলাদেশকে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতির সম্মুখীন হতে হয়নি। বরং প্রতিবছরই উদ্বৃত্তাবস্থা বেড়েছে।
সর্বশেষ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে রেকর্ড ২৫৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দেয়। এটি ছিল তার আগের অর্থবছর ২০০৭-০৮-এর ৬৮ কোটি ডলারের সমপরিমাণ উদ্বৃত্তের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে আরও দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আর্থিক হিসাবে ২৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ অবশ্য ছিল ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কমে গেছে।
গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে যেখানে ৪০ কোটি ২০ লাখ ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল, সেখানে এ বছর এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে লেনদেনের ভারসাম্যে ১১৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ২২ কোটি ৯০ লাখ ডলার।