Showing posts with label মিজানুর রহমান. Show all posts
Showing posts with label মিজানুর রহমান. Show all posts

Sunday, January 25, 2026

তিস্তা প্রকল্পে সমঝোতার ইঙ্গিত সমীক্ষা চালাচ্ছে চীন by মিজানুর রহমান

তিস্তা নদীর পানির হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে গেছে হাসিনা আমলেই। তবে ওই নদীকে বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে সরকারের তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগে আগে থেকেই আগ্রহী ছিল চীন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বেইজিং এতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। কিন্তু তখন প্রস্তাবটি বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। কারণ দিল্লি ছিল সক্রিয়। তারা তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগের কৌশলী প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিল। যা অগ্রাহ্য করার মতো অবস্থানে ছিলেন না শেখ হাসিনা। কিন্তু ৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর প্রেক্ষাপট পাল্টে গেছে। হাসিনা সরকারের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে দিল্লির প্রভাবও কমেছে। তিস্তায় বহুমাত্রিক প্রকল্প গ্রহণে একতরফাভাবেই চীনের দিকে অগ্রসর হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় উৎসাহী হয়েছে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে কাজ করছে। যদিও এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন অন্ধকারে।

দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বেইজিংয়ের সঙ্গে। আলোচনার ফোকাল পয়েন্টে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালে একাধিকবার এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে মন্ত্রণালয় এবং চীনা দূতাবাসের মধ্যে। প্রকল্পটির কারিগরি দিক খতিয়ে দেখেছেন চীনা বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে চুক্তি বা সমেঝাতার জন্য একের পর এক সম্ভাব্য তারিখও হয়েছে। যদিও তা আর চূড়ান্ত হয়নি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চীনের তরফে প্রকল্পটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এই সমীক্ষা শেষ হলে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হবে। আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই চুক্তির সম্ভাবনা নেই। তবে সমীক্ষা শেষ হলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো অবস্থায় রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এ বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মানবজমিনকে বলেন, তিস্তা চুক্তি ১২ই ফেব্রুয়ারির আগে হবে না, তবে হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা আমাদের কাগজপত্র সব জমা দিয়েছি। এখন তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এটা একটা জটিল প্রকল্প। আমরা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এটা হচ্ছে না কারণ তাদের সমীক্ষা শেষ করার পর যদি সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করে তারপরও এক মাস লাগবে। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মতি, দুই দেশ থেকে কারা যাবে, কোথায় সাইন হবে এমন নানা বিষয় আছে। এখনো যেহেতু সমীক্ষার ওপরে ওরা কনক্লুসিভ হয় নাই। ব্যাংকের রিভিউ, টেকনিক্যাল সাইডের রিভিউও চলছে। চায়না ফুললি কমিটেড। আবার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে মনে হয় বিষয়টি আছে। তারাও আশাবাদী যে চুক্তিটা হয়ে যাবে। তারা কমিটেড আর আমরা আমাদের কাজ করে দিয়েছি।

ওদিকে গত ১৯শে জানুয়ারি তিস্তা নদী এলাকা পরিদর্শন করেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গাজীর ঘাট এলাকা পরিদর্শনকালে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত তার সঙ্গে ছিলেন। তিস্তা নদী পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন উপদেষ্টা। বলেন, আমরা আজ এখানে এসেছি মূলত কাজের অগ্রগতি দেখতে ও আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে। রাষ্ট্রদূত মহোদয় নিজেই এসেছেন, যা প্রমাণ করে চীন এই প্রকল্প নিয়ে কতোটা আন্তরিক। তারা প্রকল্প যাচাই-বাছাই করছে। আমরা কোনো তড়িঘড়ি করে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। বরং একটি টেকসই সমাধান খুঁজছি। আশা করি, শিগগিরই আমরা চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবো। পানি সম্পদ উপদেষ্টা বলেন, প্রকল্পটা করার ব্যাপারে চীন ও বাংলাদেশ সরকার উভয়ই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রকল্পটা অনেক বেশি জটিল হওয়ায় তিনটা জিনিস আমাদের দেখতে হচ্ছে- বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ ও একইসঙ্গে সেচ। ফলে এগুলো সঠিকভাবে যাচাই করার জন্য চীন একটু সময় নিচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে হতাশা না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমি আবারো আপনাদের বলছি, হতাশা ছড়িয়েন না। হতাশা ছড়িয়ে লাভ নেই তো কোনো। বরং আশার কথা, একজন রাষ্ট্রদূত এসেছেন, আমি এসেছি। নিশ্চয়ই এখানে আশার বড় বেশি জায়গা আছে বলেই আমরা এসেছি। আমরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই নদী খনন ও পাড় বাঁধার কাজটা করতে চাই, যাতে আপনাদের আর ঘরবাড়ি হারাতে না হয়। পরিদর্শনকালে বন, পরিবেশ ও পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথমে তিস্তা সড়ক সেতুতে যান।

সেখানে তাকে প্রকল্পের নকশা দেখান প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরে তিনি, চীনের রাষ্ট্রদূতসহ তিস্তা রেলসেতুর কাছে নৌকায় ঘোরেন। পরে কাউনিয়ার বালাপাড়া ইউনিয়নে গাজীর ঘাটে নদীভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। উল্লেখ্য, প্রতিনিধিদলের প্রাক্কলন মতে, ১০ বছর মেয়াদে ওই প্রকল্পে ব্যয় হবে ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ৫ বছরে সেচ, ভাঙন রোধ, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ গুরুত্ব পাবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার একটি খসড়া চীন সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। রিভারাইন পিপলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর তিস্তার ভাঙন ও প্লাবণে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন উত্তরের ৫ জেলার বাসিন্দা। এ ছাড়াও বাস্তুভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরুর আশা করেছিল চীনের ডিরেক্টর অব দ্য পলিটিক্যাল সেকশন জং জিং। তার নেতৃত্বে চীনা প্রতিনিধিদল বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনসহ নদীপাড়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৪ সাল থেকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি আরও কমে যায়, ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আর বর্ষাকালে তিস্তায় প্রবাহিত হয় তিন থেকে চার লাখ ঘনফুট পানি। সব কপাট খুলে দেয়া হয়। দ্রুত বেগে নেমে আসা তিস্তার পানিতে উত্তরের পাঁচ জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। ভাঙনের পাশাপাশি ব্যাপক ফসলি জমি ক্ষতির মুখে পড়ে। তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানির মতে, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে অববাহিকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছি।

বিগত আওয়ামী সরকার তিস্তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছিল, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তাতে তিস্তাপাড়ের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে তিস্তা নদীকে ঘিরে চীনের প্রস্তাবিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের আগে এ অঞ্চলের নদী ও প্রকৃতিকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন পরিবেশ ও নদী রক্ষা আন্দোলনের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চড়া সুদের বিদেশি ঋণে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে নদী শাসনের যে কারিগরি নকশা করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে নদী আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাপা’র সহ-সভাপতি ও জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণা বিভাগের সাবেক প্রধান নজরুল ইসলামের মতে, তিস্তা উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী এবং সারা দেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী। এই নদী আজ সংকটাপন্ন। এই সংকটের মূল কারণ দু’টি। একটি হচ্ছে ভারত এই নদীর পানি সরিয়ে নিচ্ছে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে বাংলাদেশে আর তেমন পানি আসে না। বিগত সরকার তিস্তা নিয়ে বহু আশা দেখিয়েছে উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, ভারতের সঙ্গে এই বুঝি একটা চুক্তি হলো। চুক্তি হলেই এই সমস্যার সমাধান হবে। ওটা ছিল একটা মরীচিকা।

কারণ আমরা জানি ভারতের সঙ্গে গঙ্গা নিয়ে চুক্তি হয়েছে ১৯৯৬ সালে। কিন্তু তাতে এই শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের গঙ্গা অথবা পদ্মায় সামান্যতম পানি বৃদ্ধিও ঘটেনি। চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, সেখানে বহু প্রশ্ন অমীমাংসিত। এই প্রকল্পে বলা হচ্ছে যে তিস্তা নদীকে প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংকুচিত করবে। এই রকম মারাত্মকভাবে সংকুচিত করলে শীতকালের প্রবাহ না হয় ধরা যাবে। কিন্তু বর্ষাকালে যে বিশাল প্রবাহ আসে অথবা হরকা বন্যা বা যে প্রবাহ আসে, সেটা কীভাবে এই নদী ধারণ করবে? তার উত্তর কি?’ যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামানের মতে নদীভাঙনের সমাধান হচ্ছে, ভাঙনের কারণ কী, এটা আমাদের বুঝতে হবে। কারণ হচ্ছে বর্ষাকালে অধিক পানি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভারত আমাদের দিকে ঠেলে দেয়। জাতিসংঘ নদী প্রবাহ আইনে বাংলাদেশকে সই করতে হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) এই বৈশ্বিক সমন্বয়ক বলেন, এ আইনে সই করে নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। দরকার হলে আমাদের যে উন্নয়ন সহযোগী, অর্থাৎ যারা ভারতেও কাজ করে বাংলাদেশেও কাজ করে যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ হতে পারে। এ রকম সংগঠনের সহযোগিতায় ও মধ্যস্থতায় আমাদের এই পানির সমস্যার সমাধানটা করতে হবে।

mzamin

Tuesday, June 17, 2025

ঝুঁকিতে বাংলাদেশের তেহরান মিশন by মিজানুর রহমান

ইরানে কর্মরত বাংলাদেশিরা মোটামুটি নিরাপদ। তবে ইসরাইলি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু তথা টার্গেটের মধ্যে পড়ে গেছে তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের চ্যান্সারি কমপ্লেক্স। অন্তর্বর্তী সরকারের বিবেচনায় পাঠানো দূতাবাসের একটি রিপোর্ট হাতে পেয়েছে মানবজমিন। রিপোর্টে বলা হয়- বাংলাদেশ মিশন বিল্ডিংয়ের এক কিলোমিটারের মধ্যে ইরানের একটি পরমাণু কেন্দ্রসহ কমপক্ষে দু’টি সংবেদশনশীল স্থাপনা রয়েছে, যাতে হামলার ক্রমাগত চেষ্টা করে যাচ্ছে ইসরাইল। ফলে বাংলাদেশ মিশন, আশপাশে বসবাসরত কূটনীতিক-স্টাফ এবং তাদের পরিবারের জীবন ও সম্পদ ঝুঁকিতে। তারা এক সেকেন্ডের জন্যও নিরাপদ নয়। সম্ভাব্য হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আতঙ্কের মধ্য দিনাতিপাতকারী ওই সব কূটনীতিক ও স্টাফদের পরিবারকে শহরের ৩০-৪০ কিলোমিটার বাইরে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই মিশনে কর্মরতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে বলে রাতে ওই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তেহরানের বাইরে উপযুক্ত নিরাপদ আবাসস্থল খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন তেহরানের বাংলাদশ মিশনের পদস্থ এক কর্মকর্তা।

সেগুনবাগিচা এবং তেহরান মিশন জানিয়েছে- দেশটিতে থাকা প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশির প্রায় সকলে এখন পর্যন্ত মোটামুটি নিরাপদে রয়েছেন। কারণ তাদের প্রায় সবাই তেহরানের বাইরে চলে গেছেন। ইসরাইল তেহরানকে টার্গেট করেছে এবং স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোকে নিখুঁত নিশানা করা হয়েছে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, ইসরাইল সেনাবাহিনী তেহরান খালি করার ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে এটাকে তারা বৈরুত বানাবে। তেহরান মিশন বিল্ডিংয়ের কাছাকাছি একটি ভবনে বাংলাদেশি একজন কর্মকর্তা পরিবার নিয়ে থাকেন। মাল্টিস্টোরেজ ওই বিল্ডিংয়ে ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ২৩টি ফ্ল্যাট এরই মধ্যে খালি হয়ে গেছে। কেবলমাত্র ওই বাংলাদেশির পরিবার এখনো রয়েছেন বলে জানান ওই বাংলাদেশি কূটনীতিক। তবে তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব তাকে পরিবারসহ শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। ইরান পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে জানিয়ে সেগুনবাগিচা বলছে- প্রয়োজনে দূতাবাসের কার্যক্রমও অন্যত্র স্থানান্তর করার চিন্তাভাবনা চলছে। তেহরান মিশনের পাঠানো অপর এক রিপোর্টের বরাতে সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা মানবজমিনকে বলেন- রিপোর্ট যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে চ্যান্সেরি কমপ্লেক্স মোটেও নিরাপদ নয়। ওই ভবনের এক কিলোমিটারের মধ্যে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের অবস্থান। তাছাড়া সেখানে আরও একটি সংবেদনশীল অবকাঠামো রয়েছে। যা ইসরাইলি হামলার সম্ভাব্য টার্গেট। গত ক’দিনে এসব ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, তেহরানের প্রধান দুটি আইটি সেন্টারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেন্টারটি বাংলাদেশ চ্যান্সেরির খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ওই অবকাঠামোতেও যেকোনো সময় হামলার আশঙ্কা রয়েছে।

তেহরান থেকে বাংলাদেশিদের সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা: এদিকে ইরানে থাকা  কোনো বাংলাদেশি ঝুঁকিতে পড়লে তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এমনটাই জানিয়েছে সেগুনবাগিচা। বলা হয়েছে- ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রের বড় একটি লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে তেহরান এবং সেখানেই বাংলাদেশ দূতাবাসের অবস্থান। এ ছাড়া কিছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী তেহরানে অবস্থান করছেন। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রদূত, দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাদের পরিবারসহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের তেহরানের বাইরে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজনে তাদের তৃতীয় দেশে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে নিরাপত্তা। তেহরানে থাকা বিপজ্জনক হলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়াই সঙ্গত। তিনি বলেন, তেহরানের অবস্থা বুঝে দূতাবাস এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। উল্লেখ্য, ইরানে বাংলাদেশ দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত, দুজন কর্মকর্তা, পাঁচজন কর্মচারী এবং তাদের পরিবারসহ প্রায় ৪০ জন রয়েছেন। রেডিও তেহরানে আট জন বাংলাদেশি ও তাদের পরিবারসহ রয়েছেন ২৭ জন। তেহরানে শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় ১০ থেকে ১২ জন। পেশাজীবী আছেন প্রায় ১০ জন। এ ছাড়া ২৮ জন বাংলাদেশির গত ১৩ই জুন দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা আটকা পড়েছেন। সব মিলিয়ে তেহরানে শতাধিক বাংলাদেশি রয়েছেন বলে রিপোর্ট পেয়েছে ঢাকা। ইরানের অন্যান্য জায়গায় প্রায় ৬০০ বাংলাদেশি আছেন, তারা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সে দেশে বসবাস করছেন। সেখানে বিয়ে করে তারা স্থায়ী হয়েছেন। এর বাইরে আরও প্রায় ৮০০ বাংলাদেশি ১০ বছরের বেশি সময় ধরে অবৈধভাবে ইরানে অবস্থান করে বিভিন্ন সেক্টরে চাকরিতে নিয়োজিত আছেন। প্রায় ২০০-এর মতো শিক্ষার্থী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন। এ ছাড়া মানব পাচারের ট্রানজিট দেশ হিসেবে ইরানে সবসময় ৩০০ থেকে ৫০০ বাংলাদেশি অবস্থান করেন অন্য দেশে পাচার হওয়ার অপেক্ষায়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। উল্লেখ্য, সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য হটলাইন সেবা চালু করা হয়েছে। রোববার ইরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে  বলা হয়, ইরানে বসবাসরত সব বাংলাদেশি নাগরিকের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য দূতাবাস ইমারজেন্সি হটলাইন স্থাপন করেছে। এ ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে ইরানে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের + ৯৮৯৯০৮৫৭৭৩৬৮ ও + ৯৮৯১২২০৬৫৭৪৫ নম্বরে (হোয়াটসঅ্যাপ সহ) যোগাযোগ করতে পারেন।

mzamin

Wednesday, May 14, 2025

হ-য-ব-র-ল সেগুনবাগিচা, বিদায়ের মুডে পররাষ্ট্র সচিব by মিজানুর রহমান

পররাষ্ট্র সচিব পদে পরিবর্তন আসছে। অস্বাভাবিক বিদায় পাচ্ছেন বর্তমান সচিব মো. জসীম উদ্দিন। সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অত্যাসন্ন পরিবর্তনের বিষয়টি মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন। জানিয়েছেন, ৮ মাসে তালগোল পাকিয়ে ফেলা পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দীনকে পরিবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় চলতি মাসের শুরুতে। গুরুত্বপূর্ণ ওই রদবদল বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মৌখিক নির্দেশনা বজ্রপাতের মতো এসে পড়ে সেগুনবাগিচায়। মুহূর্তেই তা ছড়ায় এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিংয়ে। যার প্রভাব পড়ে অধস্তনদের সেটআপে। অন্তর্বর্তী সরকারের আচমকা এমন সিদ্ধান্ত স্বভাবতই ব্যথিত করে মিস্টার জসীম উদ্দিনকে। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে তিনি এমন প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করেন। পেশাগত জীবনের একেবারে শেষ লগ্নে তিনি বিষয়টির সম্মানজনক সুরাহা চেয়েছেন বলে জানা গেছে। তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন- পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানাজানির পর থেকে ‘মনমরা’ অবস্থায় রয়েছেন জসীম উদ্দিন। তিনি মন্ত্রণালয়ে অফিস করছেন অনেকটা ‘না করার’ মতো। গত সপ্তাহে এবং চলতি সপ্তাহের খোলা দুইদিন সোম ও মঙ্গলবার কারও সঙ্গে তিনি তেমন দেখা-সাক্ষাৎ করেননি। বৈঠকাদিতেও খুব একটা অংশ নেননি বরং তিনি উপযুক্ত প্রতিনিধি পাঠাচ্ছেন। সচিবের নির্লিপ্ততার প্রভাব পড়ছে মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য রুটিন কার্যক্রমে। যা রীতিমতো হ-য-ব-র-ল অবস্থা দেখা দিয়েছে গোটা সেগুনবাগিচায়। উদাহরণ হিসেবে এক কর্মকর্তা বলেন, চারদিনের সফরে আগামী ২৮শে মে জাপানে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের। সেই সফরের প্রস্তুতিমূলক আলোচনা ও দ্বিপক্ষীয় অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী ১৫ই মে টোকিওতে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক (ফরেন অফিস কনসালটেশন বা এফওসি) নির্ধারিত ছিল। এর নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের। কিন্তু সচিব নিজে যেতে পারছেন না বলে এফওসিই স্থগিত করে দেন! যা নিয়ে দুই সরকারের সম্পর্ক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। অবশ্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের হস্তক্ষেপে স্থগিতের চিঠি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন সেই বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নজরুল ইসলামকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অবশ্য তাৎক্ষণিক পররাষ্ট্র সচিবের পরিবর্তে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকীকে সেই বৈঠকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল বৈঠকটি পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে না হয়ে প্রধান উপদেষ্টার সফরের প্রস্তুতিমূলক সভা হবে।

ওয়াকিবহাল সূত্রের দাবি উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেয়া অর্থাৎ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, পররাষ্ট্র সচিবের মর্যাদা এবং কূটনীতিক জসীম উদ্দিনের ক্যারিয়ার- সব কিছুর মধ্যে একটি সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। এ নিয়ে ৩টি বিকল্প প্রস্তাব আলোচনার টেবিলে রয়েছে। এক পররাষ্ট্র সচিব নিজের সম্মান রক্ষায় ছুটিতে যাবেন। দুই. তাকে একটি দেশে রাষ্ট্রদূত পদে পদায়ন করা হবে। ৩. রাষ্ট্রদূত পদে পদায়নের আগ পর্যন্ত তিনি ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টরের দায়িত্ব পালন করবেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বর্তমানে বার্লিনে রয়েছেন। আগামী ১৬ই মে দেশে ফিরবেন তিনি। তারপর সরকারের অ্যাকশন দৃশ্যমান হবে বলে ধারণা মিলেছে। উল্লেখ্য, অনেক সিনিয়রকে ডিঙ্গিয়ে মো. জসীম উদ্দিনকে গত সেপ্টেম্বরে পররাষ্ট্র সচিব পদে নিয়োগ দেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তাকে অনেকটা নীরবেই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর প্রদেয় ওই নিয়োগে বিএনপি কানেকশনকে কাজে লাগিয়েছিল তার সুহৃদরা। অনেকটা নিঃশব্দে গত বছরের ৮ই সেপ্টেম্বর মো. জসীম উদ্দিনের নাম নতুন পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে জুড়ে দেয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে। তখনো সাইটে তার নিয়োগ সংক্রান্ত অফিস আদেশের কপি যুক্ত হয়নি। স্মরণ করা যায়, আগামী বছরের ১২ই ডিসেম্বর তার অবসরোত্তর ছুটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার আগে তিনি চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তার আগে কাতার এবং গ্রিসে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পাালন করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের ত্রয়োদশ ব্যাচের কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন নয়াদিল্লি, টোকিও, ওয়াশিংটন ডিসি এবং ইসলামাবাদে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অনুবিভাগের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন তিনি। কনস্যুলার পরিষেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনায় রাষ্ট্রদূত জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে এথেন্সের বাংলাদেশ দূতাবাস ২০১৮ সালে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে জনপ্রশাসন পুরস্কারও পায়। পুরো বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য পররাষ্ট্র সচিবের অ্যাপয়েনমেন্ট চাওয়া হয়। সন্ধ্যায় তার দপ্তরে দীর্ঘ অপেক্ষা করেন ওই প্রতিবেদক। কিন্তু বিদায়ের প্রস্তুতিতে থাকার কারণে সচিব কথা বলতে রাজি নয় বলে জানান তার দপ্তরের পরিচালক।

mzamin

Monday, April 28, 2025

সারা দেশে পাথর কোয়ারি খুললো, সিলেটে বন্ধ, রহস্য কী? by মিজানুর রহমান

সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সিলেটকে বাদ দিয়ে সারা দেশের পাথর কোয়ারিগুলো খুলে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরিবেশ বিপর্যয়ের অজুহাতে প্রায় ৮ বছর পাথর উত্তোলন বন্ধ রেখে আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়েছে কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকার। ৫ই আগস্টের পর থেকে পাথর রাজ্য সিলেটসহ দেশের ৫১টি কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছিল। তবে অতীতের ধারাবাহিকতায় তা বন্ধ রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছিলেন পরিবেশবাদীরা। মুখোমুখি বা পাল্টাপাল্টি ওই অবস্থায় উভয় দিক বিবেচনায় গতকাল একটি গ্রহণযোগ্য উপায় খুঁজতে বৈঠকে বসেছিল এ সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ। পাথর/সিলিকাবালু, নুড়ি পাথর/সাদা মাটি কোয়ারিসমূহের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাটি হয় হাইব্রিড ফরমেটে। কেন্দ্র ছিল জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সভাকক্ষ ১২১। সভায় ফিজিক্যালি উপসি'ত থেকে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান উপসি'ত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কোয়ারি থাকা জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরের প্রতিনিধিরা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। সভায় খোলাসা করে বলা হয়, হাসিনা সরকার পরিবেশ রক্ষার নামে ৮ বছর ধরে কোয়ারিগুলো বন্ধ করে রাখলেও এক সেকেন্ডের জন্য পাথর লুট বন্ধ হয়নি। এতে শাসক দলের মদদপুষ্ট অসাধু নেতাকর্মীরা উপকৃত হয়েছে, কিন্তু  সরকার বছরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর কোয়ারিগুলোর নিয়ন্ত্রণে হাত বদল হয়েছে। আগে এটি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের শেল্টারে পাথর লুট হতো। যার বখরা পেতো আওয়ামী প্রশাসন। ৫ই আগস্টের পর কিছু দিন বন্ধ থাকলেও এখন কোয়ারিগুলো থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন তথা লুটপাট অব্যাহত রয়েছে সমান গতিতে। এই লুটপাটে এখন ‘বহুদলীয়’ সিন্ডিকেট। যার মধ্যস্থতা করছে কোথাও বিএনপি নেতা, কোথাও সমন্বয়ক পরিচয়ধারী আবার কোথাও বা জামায়াত। পুনর্গঠিত সিন্ডিকেটে সামাজিক, ব্যবসায়িক এবং শ্রমিক পরিচয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী যুক্ত রয়েছে। এ অবস্থায় মাঠ প্রশাসন তথা বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের বক্তব্য ছিল হাজার হাজার কোটি টাকার পাথর লুট বন্ধ করতে প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। যদিও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযান শেষে স্থানচ্যুত হওয়ার আগেই ফের লুট শুরু  হয় এমন মন্তব্য করে এক কর্মকর্তা বলেন, সীমিত পরিসরে কোয়ারি খুলে না দিলে লুট পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। এ সময় বিজিবি’র টহল বাড়ানোর কথাও ওঠে। যার যৌক্তিকতা নিয়ে খোদ সভাতে প্রশ্ন ওঠে।

বলা হয়, বিজিবি’র কাজ সীমান্ত রক্ষা। পাথর লুট ঠেকানো নয়। পুলিশ লুট হওয়া পাথর পরিবহন বন্ধে উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু  সেটি খুব একটি দৃশ্যমান নয়; বরং প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযানে গতকালও একজন পুলিশ সদস্যকে পাথর লুটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ক্লোজ করা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সনাতন পদ্ধতিতে উত্তোলনের অনুমতি প্রদানের পক্ষে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। বলেন, সিস্টেমেটিক ইজারা দিলে অন্তত ইজারাদারকে জবাবদিহির মধ্যে রেখে অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষা করে তার মাধ্যমে পাথর উত্তোলন করানো সম্ভব। এতে লুট ঠেকানো এবং রাজস্ব দু’টিই মিলতো। তারা ইসিএভুক্ত এবং মামলার আওতায় না থাকা দেশের সব কোয়ারি খুলে দেয়ার অনুরোধ জানান। মাঠের কর্মকর্তারা বলেন, ইজারা দিলে নির্ধারিত ইজারাদার পাথর তুলবে। এখন যে যার শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে দিনে রাতে পাথর তুলছে, লুট করছে। কোথাও কোনো শৃঙ্খলা নেই। এটি চলতে পারে না। কোয়ারি বন্ধ থাকায় এ খাতে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ বাড়ছে। পাথর লুটকে কেন্দ্র করে নব্য সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ সংঘাত-রাহাজানি তথা অঞ্চল ভেদে অস্থিতিশীলতা চরম আকার ধারণের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু না, এ নিয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে হাঁটেনি উপদেষ্টা পরিষদ। মাঠ প্রশাসনের রিপোর্ট তথা বক্তব্যকে আমলে না নিয়ে তারা নিজেদের মতো করে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন! যা নিয়ে সভাতেই প্রশ্ন উঠে। বিশেষ করে পাথরের রাজ্য সিলেটের কোয়ারিগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত রহস্যের জন্ম দিয়েছে। সরকারের হাজার কোটি টাকার রাজস্বের ক্ষতি তো বটেই, এ নিয়ে শান্ত সিলেট উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সভায় এও বলা হয়, ২০২২-২৩ সালে সিলেট অঞ্চলের ভয়াবহ বন্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখায় নদীগুলোর পানি প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়াকে চিহ্নিত করা হয়।

সে সময় বলা হয়, নদীগুলোতে পাথর স্তূপের কারণে মৎস্য প্রজননও ঝুঁকিতে। সিলেট চেম্বার অব কমার্সের একাধিক সেমিনারে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের সুযোগ উন্মুক্তকরণের জোর দাবি জানানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শেখ হাসিনার সরকারের পথ ধরে পাথর রাজ্য সিলেটকে বাদ দেয়ার বিষয় জানতে চাইলে সভায় উপসি'ত একজন কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশের গেজেটভুক্ত পাথর কোয়ারি, সিলিকাবালু কোয়ারি, নুড়িপাথর, সাদা মাটি উত্তোলনসহ অন্যান্য সকল কোয়ারির ইজারার পক্ষেই বলেছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কিন্তু  উপদেষ্টা পরিষদের ৩ সদস্যের মধ্যে এ নিয়ে বিভাজন দেখা দেয়। সিলেটের কোয়ারিগুলো উন্মুক্তকরণে কোনো অবস্থাতেই একজন উপদেষ্টা রাজি হননি। বরং তিনি পরিবেশ রক্ষায় আরও কঠোর হতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। এক কর্মকর্তা বলেন, ২০১২ সালে জাফলংয়ের পিয়াইন নদীসহ ১৫ কিলোমিটার পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে ইসিএভুক্ত এলাকা জাফলং এবং মামলা থাকায় শারপিনটিলা থেকে পাথর উত্তোলনের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সবাই অবগত। কিন্তু  সিলেটের বাকি কোয়ারিগুলো কেন এখনো বন্ধ? তা নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় প্রশ্ন ওঠে। তবে কোনো সদুত্তর মেলেনি। এ বিষয়ে সভার সভাপতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে দেখা করে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য চায় মানবজমিন। কিন্তু  তিনি কথা বলতে রাজি হননি। বরং রেফার করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের কাছে। সচিবের দপ্তরে সন্ধ্যা অবধি অপেক্ষা, পিএস এর মাধ্যমে দফায় দফায় বার্তা পাঠানো বিশেষ করে উপদেষ্টার রেফারেন্স দেয়া হলেও সচিব কথা বলতে রাজি হননি। 

mzamin

Friday, April 11, 2025

পররাষ্ট্রমন্ত্রী-সচিব আসছেন: পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন মোড় by মিজানুর রহমান

৫৪ বছরে এই প্রথম এতটা নাটকীয় মোড় নিয়েছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক। প্রায় ‘ডিপ ফ্রিজে’ চলে যাওয়া সম্পর্কটি এখন কেবল ‘স্বাভাবিক’ বা ‘সচল’ই নয়, বরং এতে দৃশ্যমান রূপান্তর ঘটতে চলেছে! সম্পর্কের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর নিষ্পত্তি-চেষ্টার পাশাপাশি কিছু নতুনত্ব আনতে উভয়ের আগ্রহ রয়েছে- এমনটাই দাবি পেশাদার কূটনীতিকদের। তবে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক, গবেষক এবং বিশ্লেষকরা বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেন। যা বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। সেগুনবাগিচা এটা নিশ্চিত করেছে যে, নতুন বাস্তবতায় পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে বোঝাপাড়া করতে চাইছে বাংলাদেশ। চলতি মাসে ঢাকায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিবের সফর হবে। প্রায় এক যুগ বিরতির পর ৬ষ্ঠ ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) বা রাজনৈতিক সংলাপ হবে দুই দেশের মধ্যে। ২০১০ সালে সর্বশেষ ইসলামাবাদে ৫ম এফওসি হয়েছিল। আসন্ন ঢাকা সংলাপে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণ হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে ডেইলি পাকিস্তান। তাদের রিপোর্ট মতে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমেনা বেলুচ এতে দেশটির প্রতিনিধিত্ব করবেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে দু’দেশের সম্পর্ক দৃঢ় করার প্রস্তাব। সেইসঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি যৌথ কমিশন পুনর্বহালের বিষয়টি তুলতে পারে পাকিস্তান। এদিকে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চলতি মাসেই বাংলাদেশ সফর করছেন, এটা নিশ্চিত করেছে সেগুনবাগিচা। কিন্তু তার সফরের দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি বলে দাবি করেছেন সফর প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। পাকিস্তানি সংবাদ মাধ্যম অবশ্য সফরের সম্ভাব্য তারিখ তুলে ধরছে। তাদের রিপোর্ট মতে, আগামী ২২-২৪শে এপ্রিল পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করবেন। তার এ সফরকে বাণিজ্য, কূটনীতিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা গভীর করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে ইসলামাবাদ। ডেইলি পাকিস্তানের রিপোর্টের ফাইন্ডিংস হচ্ছে- ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশের ওপর থেকে ভারতের প্রভাব হ্রাস করে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি করে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে চাইছে। বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করতে চাইছে। যা বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। স্মরণ করা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরালো করতে পাকিস্তান আগ্রহী- এমন বার্তা দিয়ে গেছেন সদ্য ঢাকা সফরকারী পাকিস্তানের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিষয়ক অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি ঢাকায় দেশটির হাইকশিনার হিসেবে ক’বছর আগে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এবারে ভিন্ন  অ্যাসাইনমেন্টে আসা মিস্টার সিদ্দিকী পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উভয়পক্ষ দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে পরামর্শমূলক বৈঠক ও যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের সভা অনুষ্ঠানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠক ২০১০ সালে আর অর্থমন্ত্রী পর্যায়ের অর্থনৈতিক কমিশনের সর্বশেষ বৈঠক হয় ২০০৫ সালে। ইমরান সিদ্দিকী এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের বিষয়েও আলোচনা করে গেছেন। তিনি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে লেখা ইসহাক দারের একটি চিঠিও পররাষ্ট্র সচিবের কাছে হস্তান্তর করেন। উভয়পক্ষ সার্ক, ওআইসি ও ডি-৮ কাঠামোর আওতায় আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করে। ২০১২ সালে পাকিস্তানের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানী খারের ঢাকা সফরের পর ইমরান সিদ্দিকী সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা যিনি ঢাকা সফর করেন।

শীতল সম্পর্কে উষ্ণতা আসে যেভাবে:
আগস্টে রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অভিনন্দন জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। এক মাসের মাথায় (সেপ্টেম্বরে) নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে দু’জনের মধ্যে বৈঠক হয়। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান শীতল সম্পর্ক অবসান হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল সেই মিটিং! এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মূল্যায়ন হচ্ছে- ‘গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক তলানিতে চলে যায়। অনেকের ধারণা, ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্কের কারণেই পাকিস্তানকে গুরুত্ব দেয়নি বাংলাদেশ। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নতি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আগামীতে যারা সরকারে আসবেন, তারাও পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখবেন- সেটি ধারণা করা যায়।’ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জনের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিষয়টি। এ বিষয়ে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, ক্ষতিপূরণ, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পদের ভাগাভাগি, আটকেপড়া বিহারিদের পুনর্বাসনসহ অমীমাংসিত অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। এগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন।’

সম্পর্ক উন্নয়নে যেসব উদ্যোগ দৃশ্যমান: গত বছরের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের করাচি থেকে কন্টেইনারবাহী একটি জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে, যে সুযোগ আগে ছিল না। আওয়ামী শাসনামলে অবৈধ অস্ত্রসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্যের প্রবেশ বন্ধে পাকিস্তান থেকে আসা কন্টেইনারগুলো শতভাগ পরীক্ষার ব্যবস্থা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) এর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন মনে করেন- বিদায়ী সরকারের আমলে পাকিস্তান থেকে আসা কন্টেইনারগুলো শতভাগ পরীক্ষা করার যে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তা সঠিক ছিল না। গত ডিসেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশি ভিসা প্রাপ্তি সহজ করার নির্দেশ দেয়। আগে পাকিস্তানি নাগরিক এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত উন্নত দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রদানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনাপত্তিপত্র লাগতো। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, বাংলাদেশিদের জন্য পাকিস্তানের ভিসার চার্জ লাগবে না। ৮ মাসে দু’টি বৈশ্বিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের দেখা হয়েছে। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল এসএম কামরুল হাসান ইসলামাবাদ সফর করেন এবং সেখানে তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় চেম্বার অব কমার্স ও ইন্ডাস্ট্রিজের (এফপিসিসিআই) একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে গেছে। এটা ছিল এক দশকে পাকিস্তানের কোনো উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলের প্রথম ঢাকা সফর। প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের কর্মকর্তা ও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গেছে। সফরকালে পাকিস্তান-বাংলাদেশ যৌথ ব্যবসায়িক কাউন্সিল গঠনের জন্য একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়। পাকিস্তানের প্রতিনিধিদল দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আহ্বান জানায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বছরে মাত্র ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে। জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রাক্কলন মতে, বাণিজ্য বিধি-নিষেধ পুরোপুরি দূর হলে এক বছরের মধ্যে দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব। তাদের রিপোর্ট মতে, চট্টগ্রাম ও করাচির মধ্যে মেরিটাইম রুটের সম্ভাবনা অবারিত। যা ৫২ বছর ধরে ব্যবহার হয়নি। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা যেতে পারে, যা ২০১৮ সালের পর থেকে বন্ধ।

’৭১-এর সংবেদনশীলতা এবং...
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময়ে পাকিস্তান বাহিনীর বর্বরতা- বরাবরই দেশটির সঙ্গে সম্পর্কে সংবেদনশীল বিষয়। ইতিহাস বিবেচনায় এ নিয়ে আলোচনা, রাজনীতি কম হয়নি। তবে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে আওয়ামী আমলে, বিশেষত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রশ্নবিদ্ধ বিচারের প্রেক্ষাপটে। বর্তমান বাস্তবতায় কি বাংলাদেশের কূটনীতিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসবে? পাকিস্তানের তরফে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ কতোটা? সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশেরই বা লাভ কী? অথবা সমস্যার জায়গাগুলো কী? এ নিয়ে একাধিক বিশ্লেষণ রয়েছে বিবিসি বাংলার। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মুমতাজ যেহরা বালোচ বিবিসির সঙ্গে আলাপে দাবি করেন বাংলাদেশের ব্যাপারে পাকিস্তান সবসময়ই শ্রদ্ধাশীল, ইতিবাচক ও গঠনমূলক অবস্থানকে আগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে কিছু সমস্যা হয়েছে, কিন্তু তা অতিক্রম করার ইচ্ছায় তাদের কোনো ঘাটতি ছিল না। বিবিসি’র রিপোর্টে সম্পর্কোন্নয়নে তাদের আগ্রহের বেশ কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেই রিপোর্টে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে উদ্ধৃত করা হয়। সেখানে মিস্টার হোসেন বলেন, গত ক’বছর ধরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল যাচ্ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচিত মুখ লেখক ফাহাম আবদুস সালাম মনে করেন গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের সরকার ভারতের চোখে পাকিস্তানকে দেখেছে এবং ১৯৭১ সালকে ঘিরে বিভাজনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটা সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। অস্ট্রেলিয়া থেকে বিবিসি’র সঙ্গে কথা বলেন লেখক ফাহাম আবদুস সালাম। তার মতে, ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে অনেক পুরানো একটা সমপ্রীতির জায়গা ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে এসে সেটা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের পেছনে ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমকে 'ঘৃণার সংস্কৃতি' প্রচারের জন্য দায়ী করেন মি. সালাম। হাসিনার পতনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘিরে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে উদ্বেগ দেখা গেছে। বাংলাদেশ পরবর্তী আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে পরিণত হবে কিনা? এমন আলোচনাও উঠেছে।

ক্ষমা প্রসঙ্গ: বাংলাদেশে অনেকদিন ধরেই একটি আলোচিত বিষয় ১৯৭১ সালের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা। এ নিয়ে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একাধিকবার কথা বললেও আনুষ্ঠানিকভাবে সেটা করা হয়নি। এখন কি সেই ক্ষমা চাওয়ার মতো পদক্ষেপ নেয়া হবে? সে প্রসঙ্গে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মিস বালোচ মনে করেন ১৯৭১ সালের ‘বেদনাদায়ক’ ইতিহাস দুই দেশই বহন করে আসছে। তার দাবি এই সমস্যার সমাধান ১৯৭৪ সালে দুই দেশের নেতারা করে গেছেন। এ সংক্রান্ত চুক্তিও হয়েছে। ১৯৭১-এর প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে পদ থেকে সরে যেতে হয়েছিল (২০শে ডিসেম্বর ১৯৭১)। তার বিদায়ের পর ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো, যিনি ’৭০-এর নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানে জয়ী হয়েছিলেন, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমানের জয় নিয়ে টানাপড়েনে ক্ষমতা হস্তান্তর স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালের তিক্ততা পেছনে ফেলে আন্তর্জাতিক মহলের চেষ্টায় '৭৪ সালে দুই দেশের নেতা-ই অপর দেশে সফর করেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪-এ পাকিস্তানের লাহোরে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজিয়ে, তোপধ্বনি এবং গার্ড অব অনার দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। এর আগের দিন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। সে বছর জুন মাসে মি. ভুট্টো বাংলাদেশ সফর করেন। ঢাকায় মি. ভুট্টো বলেছিলেন, “যা হয়েছে তা নিয়ে অন্তর থেকে অনুতপ্ত হতে বা তওবা করতে দেরি হয়ে যায়নি। পাকিস্তানের মানুষ আপনাদের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানায়। তারা এবং পাকিস্তানের সরকার বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে স্বীকার করে এবং শ্রদ্ধা জানায়।” '৭৪-এর এপ্রিলের বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিবরণে রয়েছে যে, জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশের জনগণকে অনুরোধ করেছেন যেন তারা তাদের (পাকিস্তানকে) ক্ষমা করে দেন এবং অতীতের কথা ভুলে গিয়ে সামনে এগিয়ে যান। শেখ মুজিবুর রহমানের তরফেও অতীত ভুলে নতুন সূচনা করার এবং “ক্ষমার নিদর্শন হিসেবে বিচার না চালানোর” সিদ্ধান্তের কথার উল্লেখ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি আর্কাইভ প্রতিবেদনে। দুই নেতার সে সময়কার দূরদর্শিতা সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন মিস বালোচ।

mzamin

Thursday, April 10, 2025

ইইউ’র সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে ঢাকা by মিজানুর রহমান

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)’র সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে বাংলাদেশ। প্রায় ২৫ বছর আগে ইউরোপের ২৭ রাষ্ট্রের ওই জোটের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি সই করেছিল ঢাকা, যা ছিল মূলত উন্নয়ন সহযোগিতা-কেন্দ্রিক। এবার সেই সহযোগিতাকে পরের ধাপে অর্থাৎ রাজনৈতিক পর্যায়ে উত্তরণের লক্ষ্যে অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) সই করতে যাচ্ছে দুই পক্ষ। চুক্তিটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ব্রাসেলসে আজ  থেকে শুরু হচ্ছে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্র বলছে, দর কষাকষি শেষ করে আগামী দেড় বছরের মধ্যে চুক্তিটি সইয়ের জন্য চূড়ান্ত হতে পারে। অর্থাৎ চুক্তির সম্ভাব্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২০২৬ সালের জুনে। সেগুনবাগিচার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- প্রস্তাবিত চুক্তিটির আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকবে। ফলে চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে ইইউ’র সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের বিষয়ে সহযোগিতার একটি রূপরেখা প্রতিষ্ঠা হবে। ব্রাসেলসে আজ থেকে পিসিএ নিয়ে শুরু হওয়া দু’দিনব্যপী আনুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয়ে কর্মকর্তারা জানান, হাইব্রিড ফরমেটে আলোচনাটি হবে। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) মো. নজরুল ইসলাম। ইইউ’র পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন সদর দপ্তরের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা পামপোলিনি।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ) মো. নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ইইউ’র সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার রাজনৈতিক উত্তরণ ঘটবে পিসিএ-সইয়ের মাধ্যমে। ফলে রূপরেখা চুক্তিটি সই হলে গণতন্ত্র, সুশাসন, নিরাপত্তা, মানবাধিকারের পাশাপাশি অর্থনীতি এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগের মতো নানা ইস্যুতে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।

তিনি জানান, দর কষাকষি শেষ করে আগামী বছরের জুনে চুক্তিটি সইয়ের জন্য চূড়ান্ত করার ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ইইউ’র সঙ্গে পিসিএ সই করবে।

পিসিএ এবং এর গুরুত্ব:
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওয়েবসাইটে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী পিসিএ হলো আইনগত বাধ্যতামূলক চুক্তি যা ইইউ এবং একটি অংশীদার দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি রূপরেখা প্রতিষ্ঠা করে।

অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে ইইউ অংশীদার দেশগুলোতে রাজনৈতিক সংলাপ, শান্তি ও নিরাপত্তা, সুশাসন ও মানবাধিকার, বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং আর্থিক সহযোগিতাসহ বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ এই সহযোগিতার পরিধিতে রয়েছে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমর্থন করা। একটি শক্তিশালী মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং ব্যবসা ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশের বিকাশ নিশ্চিত করা। নানা ক্ষেত্রে বাণিজ্য সম্পর্ক এবং সহযোগিতা জোরদার করা।

পিসিএর উপাদান: চুক্তির আওতায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, শ্রম অধিকার, সংযুক্তি, প্রতিরক্ষা, অন্তর্জাল নিরাপত্তা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জ্বালানি, মৎস্য, দক্ষ অভিবাসন, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে সহযোগিতা, কৃষিসহ প্রায় ৩৫টি বিষয় রয়েছে।  

পিসিএ নিয়ে গত বছরের নভেম্বরে  ঢাকায় প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। এবার মূল আলোচনা শুরু হবে। ইইউ’র সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা চুক্তি ভবিষ্যতে প্রতিস্থাপন হবে পিসিএ চুক্তির মাধ্যমে।

প্রসঙ্গত ২০০১ সালে ইইউ’র সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। সেই চুক্তিতে অর্থনীতি, উন্নয়ন, সুশাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

রাজনৈতিক উত্তরণের আকাঙ্ক্ষায়
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্কের বিস্তৃতির  লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ২৫শে অক্টোবর নতুন করে ইইউ-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। ব্রাসেলসে ওই অনুষ্ঠানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন উপস্থিত ছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে  অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির প্রথম দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় পিসিএ চুক্তির আলোচনা স্থগিত করেছিল ইইউ। পরবর্তীতে ইইউ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে পিসিএ সই করার সিদ্ধান্ত নিলে নভেম্বরে ঢাকায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল।

mzamin

Saturday, April 5, 2025

ইউনূস-মোদি বৈঠকে নতুন ইস্যু হাসিনা by মিজানুর রহমান

টার্গেটই ছিল সম্পর্কে টানাপড়েন দূরীকরণ তথা আস্থা-বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার দ্বার খোলা। কিন্তু না, পারস্পরিক উদ্বেগ আদান-প্রদানেই বৈঠকটি শেষ হলো! বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যকার যেকোনো বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকের চেষ্টা চলছে গত সেপ্টেম্বর থেকে। ব্যাংককে বিমসটেক সামিটে  উভয়ের দেখা হবে এটি ছিল নিশ্চিত। কিন্তু তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক নিয়ে ছিল চরম অনিশ্চয়তা। ভারতীয় মিডিয়া ছিল ক্রিটিক্যাল। কিন্তু ঢাকা ও দিল্লির কূটনীতিকরা ছিলেন আশাবাদী। তারা ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছিলেন। বলছিলেন বৈঠকটি হওয়া উচিত এবং হবেও। এ নিয়ে যে উভয়ের প্রস্তুতি ছিল সেটি বৈঠকের ছবি এবং ভিডিওতে দৃশ্যমান। ৮ই আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর শুক্রবারই প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইড লাইনে উভয় দেশের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে প্রায় ৪০ মিনিট আলোচনা করলেন তারা। দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কে নানা ইস্যু থাকে, এটি আছেও। কিন্তু সেই বৈঠকে মুখ্য আলোচ্য হয়ে উঠে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি। বিচারের জন্য বাংলাদেশ তাকে ফেরত চাইবে এমনটা অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু এর জবাবে ভারত কী বলেছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। আলোচনায় বিষয়টি যে গুরুত্ব পেয়েছে তা নিশ্চিত করেছেন দিল্লির বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ইউনূস-মোদি বৈঠকে সুনির্দিষ্টভাবে কী আলোচনা হয়েছে তা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত খোলাসা করেনি কোনো পক্ষই। তবে ওয়াকিবহাল সূত্র বলছে, হাসিনার ফেরতের বিষয়টি মুখ্য আলোচ্য হয়ে ওঠায় অন্য অনেক ইস্যুতে ফোকাস কমেছে। হাসিনাকে ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে আগেই আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠানো হয়। প্রত্যর্পণ নিয়ে দিল্লি ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে।

বৈঠক বিষয়ে ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি ব্রিফ করেন। সেখানো ইতিবাচক অনেক কথা আছে। কিন্তু ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউনূস-মোদি বৈঠক  নিয়ে যে বার্তা প্রচার করেছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে তাদের উদ্বেগকেই ফোকাস করা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত ওই বার্তার সার কথা হলো- প্রথমত, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক চায় ভারত। ড. ইউনূসের সঙ্গে আলাপে সেই আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছেন মোদি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি ‘চরমপন্থার উত্থান চেষ্টা’ রোধ। বাংলাদেশে চরমপন্থার উত্থান ঘটতে পারে- এটি দেশটির মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটি বেশ কিছু দিন ধরে বলে আসছে। এবারই প্রথম ভারতের বিদেশ মন্ত্রক তা ঠেকানোর কথা বললো এবং তা তাদের ডকুমেন্টে রাখলো। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রথমবারের মতো আলোচনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক খারাপ হয়, এমন বক্তব্য পরিহার করার আহ্বান জানান। নরেন্দ্র মোদি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে ভারত এমন এক গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চায় যেখানে নির্বাচনের একটি ভূমিকা রয়েছে। ব্যাংককের সাংরিলা হোটেলে ইউনূস-মোদি বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি এমনটা জানান। দিল্লির বিদেশ মন্ত্রকের বার্তা এবং বিদেশ সচিবের সংবাদ ব্রিফিংয়ে আগামী দিনে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরীয় ওই জোটকে এগিয়ে নিতে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করবে তাতে সমর্থন-সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম রয়টার্স, বিবিসি এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি, ইকোনমিক টাইমস, হিন্দুস্তান টাইমসের অনলাইন ভার্সনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় ইউনূস-মোদি বৈঠকের রিপোর্ট যথাযথ গুরুত্বে স্থান পেয়েছে। সেসব রিপোর্টে দিল্লির বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রিকে উদ্ধৃত করা হয়। সেসব রিপোর্টে সম্পর্কে প্রভাব ফেলে এমন অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলতে ঢাকার প্রতি দিল্লির পরামর্শের কথা তুলে ধরা হয়। তাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন স্পর্শকাতর ইস্যু যেমন সেভেন সিস্টার্স এবং সীমান্ত সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সর্বশেষ চীন সফরে সেভেন সিস্টার্স নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। যা নিয়ে ভারত জুড়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের তরফে অবশ্য বলা হয়েছে ড. ইউনূস সৎ উদ্দেশ্যে ওই বক্তব্য দিয়েছেন, যার ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চলছে।

ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের পর মোদির টুইট: এদিকে ব্যাংককে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের পর টুইট করেন নরেন্দ্র মোদি। ছবিযুক্ত টুইটে মোদি লিখেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জনাব মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। বাংলাদেশের সঙ্গে একটি গঠনমূলক ও জনকেন্দ্রিক সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত। গণতন্ত্রে জোর দিয়ে বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে মোদি লিখেন, আমি বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছি। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা রোধের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য আমাদের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। প্রতিবেশী দুই দেশের নেতার ওই প্রথম বৈঠকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

হাসিনাকে ফেরত, তার উস্কানিমূলক বক্তব্য বন্ধের দাবি: ইউনূস-মোদি বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। মিস্টার আলম বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট যতগুলো ইস্যু আছে, তার সবক’টি নিয়ে কথা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা আমাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সবক’টি বিষয় আলোচনায় তুলেছেন। আলোচনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারতে বসে তিনি যেসব উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন সে প্রসঙ্গ, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, গঙ্গার পানি চুক্তির নবায়ন, তিস্তা চুক্তির প্রসঙ্গ এসেছে। দুই শীর্ষ নেতার আলোচনা ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ হয়েছে।’ স্মরণ করা যায়, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আগে গত বৃহস্পতিবার বিমসটেক নেতাদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির দেখা হয়। নৈশভোজে একই টেবিলে তারা পাশাপাশি বসেছেন, করেছেন কুশলবিনিময়। সম্মেলনের আয়োজক থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা এই নৈশভোজের আয়োজন করেন। বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার সকালে ব্যাংকক পৌঁছান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস। এই সম্মেলনে বিমসটেকের পরবর্তী সভাপতির দায়িত্ব ইতিমধ্যে নিয়েছে বাংলাদেশ।

mzamin

Sunday, March 30, 2025

রমজানে জেগে থাকে সিলেট by মিজানুর রহমান

পুণ্যভূমি সিলেট। আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ওই শহর নিয়ে রয়েছে নানা মিথ। মুসলিম অধ্যুষিত সিলেটে পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস যথাযথ ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়। রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় দেশের অন্য অনেক শহরে দিনের বেলা হোটেল রেস্তরাঁ বন্ধে জোরজবরদস্তির খবর মিলে। কিন্তু সিলেটে এটি হয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের খানাপিনার জন্য যেটুকু খোলা থাকে তাতে কেউ কখনো প্রতিবন্ধকতা দূরে থাক ফিরেও তাকায় না। রমজানের রাতে সিলেট শহরটি জেগে থাকে। ব্যবসা-বণিজ্যের জন্য নয় বরং ইবাদত বন্দেগেী, জিকির-আজকারের জন্য। সিলেটের সবক’টি মসজিদে রাতভর ইবাদতে কাটান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষজন। তারা ডেভিল তথা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিজের নফ্‌স বা আত্মাকে বাঁচাতে আল্লাহ্‌র দরবারে ধরনা দেন। আদালত ছাড়া শহরের অন্যত্র সকালে লোকজনের ভিড় তেমন হয়না বললেই চলে। তবে হ্যাঁ, ইফতার থেকে সেহ্‌রি অবধি অন্যরকম এক সিলেট।

বাইরে থেকে সিলেট অঞ্চলে ঢুকলেই আচমকা শীতল বাতাস মনে প্রশান্তির ছোঁয়া এনে দেয়। এ নিয়ে অনেক মিথ আছে। বোদ্ধারা নানা ব্যাখ্যা দেন। পাশেই ভারতের ডাউকি। বিস্তীর্ণ পাহাড়। ওখান থেকে ধেয়ে আসা শীতল সিলেটের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। শুধু কী তাই- রমজানের শুরুতেই সিলেট নগরে পা দিয়েই আন্দাজ করা গেল ভিন্নতার। ইবাদতের একটি শহর। গোটা রাতই জেগে থাকে সিলেট নগরী। মসজিদে মসজিদে চলে ইবাদত। যার সমাপ্তি ঘটে ফজরে নামাজের মধ্য দিয়ে। নগরীর প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজার থেকে হাঁটার রাস্তা নাইওরপুল। রাত তখন একটা। পয়েন্টের পাশে নাইওরপুল জামে মসজিদ। ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। শুধু শব্দ বললে ভুল হবে, রীতিমতো আর্তনাদ। কয়েক শ’ মুসল্লি জামাতবদ্ধ হয়ে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করছেন। মধুর সুরে হচ্ছে কোরআন তিলাওয়াত। নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন মুসল্লিরা। যারাই নাইওর মসজিদের সামন দিয়ে যাচ্ছেন কান্নার শব্দ শুনছেন। মসজিদের ভেতরে ঢুকতেই আবেগী পরিবেশ। আলো-আঁধার ঘেরা মসজিদের ইবাদতরত মুসল্লিরা কেউ কারও দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। নামাজ শেষ করে ইমাম সাহেব বসলেন। শুরু হলো জিকির পর্ব। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে জিকির আজকার চলে। মুসল্লিরা প্রাণখোলা ইবাদতে মশগুল। জিকিরের ফাঁকে ফাঁকে চলে নবী (সা.) শানে দরূদপাঠ, তাওবা-ইস্তেগফার। জীবনের সব ভুলত্রুটি স্মরণ করে ইমাম সাহেবের সঙ্গে সবাই তওবা করেন। এ পর্ব শেষ হতেই শুরু হয় মোনাজাত। প্রায় ২০ মিনিটব্যাপী চলা মোনাজাতে শুধু কান্না আর কান্না। নাইওরপুল জামে মসজিদের এই ইবাদত- বন্দেগীর খবর জানেন গোটা সিলেটবাসী। সময় পেলে অনেকেই ঢুঁ মারেন মসজিদে। রমজানের শুরু থেকে প্রতিরাতে এই রুটিন। দূর-দূরান্ত থেকে পরহেজগার মুসল্লিরা এসে শামিল হন। হাজী ইসমাইল হোসেন। নগরের কুমারপাড়ার বাসিন্দা। সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত। করোনাকাল ছাড়া জীবদ্দশায় প্রতিটি রমজানেই তিনি এ মসজিদে এসে ইবাদত করেন।

মানবজমিনকে জানালেন- এ মসজিদের ইবাদতে তৃপ্তি মেলে। মহান আল্লাহ্‌র কাছে মুসল্লিরা নিজেদের সব উজাড় করে দিয়ে ইবাদতে মশগুল হতে পারেন। এটি অন্যরকম এক আবেগ। বলে বুঝানো যাবে না। তিনি জানান- রমজানে সিলেট শহর সহ আশপাশের এলাকার মানুষ এই মসজিদে ইবাদতে এসে শরিক হন। রাত পৌনে একটা থেকে শুরু হয় দলবদ্ধ ইবাদত পর্ব। ভোররাত পর্যন্ত চলে। এবার অনেকেই এ মসজিদে এতেকাফরত। সিলেট শহরের জিরো পয়েন্টের অদূরে ওলিকুল শিরোমনি হযরত শাহ্‌জালাল (র.) এর দরগাহ্‌। সিলেটের স্থানীয় অনেক মানুষ এটিকে ‘বাদশার বাড়ি’ বলে ডাকেন। আবেগপূর্ণ বন্দেগীর তীর্থ স্থান। রমজানের শুরু থেকে নগর এবং নগরের বাইরের গন্তব্যস্থল থাকে দরগাহ। বিশেষ করে তারাবির নামাজ পড়তে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন মানুষ। তারাবির নামাজে সবচেয়ে বেশি মুসল্লি হয় দরগাহে। তারাবিহতে বিশেষ আকর্ষণ প্রধান ইমাম হাফেজ মাওলানা আসজাদ আহমদ। তার তিলাওয়াত শুনে শুনে নামাজে শরিক হতে অনেক মুসল্লিই আসেন। মধুর কণ্ঠের তিলাওয়াতে তারাবির সময় গোটা দরগাহ এলাকায় পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। ওল্ডহাম বিএনপি’র সভাপতি ও বৃটেনের ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন এবার রমজানের শুরু থেকেই সিলেটে। থাকছেন দরগাহ এলাকায়। প্রতিদিনই তারাবির নামাজে শরিক হন। জানালেন; মক্কা-মদিনার সঙ্গে অন্য কোথাওর তুলনা হয় না। সিলেটের সেই পবিত্র নগরীর ঘ্রাণ পাই, নামাজ পড়ে প্রশান্তি পাই।

এ কারণে রমজানে দেশে থাকলে সিলেটে বিশেষত দরগাহে এসে নামাজ পড়ি। ইফতার ও সেহ্‌রিতে দরগাহে এলাহী কাণ্ড। কয়েকশ’ মানুষের ইফতার ও সেহ্‌রির আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে ইফতারে অনেকেই এসে শরিক হন। গরিব-দুঃখী যেই হোন না কেন কোথাও ইফতার না পেলে দরগাহে মিলবে। ব্যক্তি বা সংস্থার উদ্যোগে ইফতারে শরিক হওয়ার রীতিও রয়েছে। এজন্য অনেকেরই পক্ষ থেকে ইফতারের আয়োজন হয়ে থাকে। ৩৬০ আউলিয়ার শহর সিলেট। গোটা শহরজুড়েই মাজার আর মাজার। সড়কের মধ্যখানেও মাজার। রাতভর এসব মাজারে চলে ইবাদত-বন্দেগী। স্থানীয় অনেকেই আসেন মাজার জিয়ারতে। ইতিহাস বেত্তাদের ভাষ্য মতে, প্রায় ৭০০ বছর ধরে এই রেওয়াজ রয়েছে সিলেটে। স্থানীয়দের মতে; সিলেট হচ্ছে- আদবের শহর। এখানে ৩৬০ আউলিয়া শুয়ে রয়েছেন। বেয়াদবি চলবে না। ফলে আদব রেখেই চলতে হয় সিলেটের মানুষকে। মিথ আছে এই শহরে ধর্মীয় ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির পরিণতি হয় ভয়ঙ্কর! ৩৬০ আউলিয়া আসার প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছিলেন গাজী বুরহান উদ্দিন (রহ.)। শহরের পূর্বপাশে তার মাজার। পাশে বিশাল মাদ্রাসা। রাতভর ইবাদত-বন্দেগী চলে মাদ্রাসা ও মসজিদে। মাদ্রাসার মুহতামিম শায়েখ নাসির উদ্দীন দরগাহ ইমামসাব হুজুরের ছাত্র। এখন তিনি নিজেই বয়োবৃদ্ধ। জানালেন- সিলেটের মানুষ ধর্মপ্রাণ। রাতভর ইবাদত- বন্দেগীতেই কাটান। এই রেওয়াজ পূর্ব-পুরুষদের আমল থেকে। দিন দিন মানুষ আরও ধর্মপ্রাণ হচ্ছে। তিনি বলেন- পবিত্র শহর সিলেটের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এখানকার আলেম- উলামাদের অবদান অনেক বেশি। তাদের মেহনতের কারণেই সিলেট তার ধর্মীয় গতিপথ ঠিক রেখেছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে। আউলিয়ার শহরের পাশাপাশি সিলেট আলেম-উলামাদের শহর। তাদের সিলসিলাও আলাদা। তবে আক্বিদাগত তেমন পার্থক্য নেই। এ কারণে আলেমদের মধ্যে ঐক্য রয়েছে।

সকাল হলে সিলেটের মাদ্রাসা-মসজিদ থেকে ভেসে আসে কোরআন শিক্ষার সুর। মাদ্রাসার ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে রমজান মাস জুড়ে সহি-শুদ্ধ কোরআন পড়ার তালিম দেয়া হয়। নাইওরপুল মসজিদে রাত ৩ টায় তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে চোখ মুছতে মুছতে বের হচ্ছেন  মুসল্লিরা। গতকাল গভীর রজনীতে কথা হয় এক মুসল্লির সঙ্গে। তিনি জানান- আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ আর মাফি পেতে নীরবে প্রতিদিন আসি।  নামাজ পড়ে  ইমাম ও খতিব নাজিম উদ্দিন কাসেমী সাহেব দোয়ায় অংশ নেই। আমার মনে হয় যেন আল্লাহ্‌ আমার ফরিয়াদ শুনছেন। আশা করি ক্ষমা করবেন। নয়াসড়ক মসজিদে প্রতিবছর আগমন করেন আওলাদে রাসূল (সা:) আরশাদ মদনী (র:)। তিনি তাহাজ্জুদের জামাত পড়ান। সেখানে নামাজ পড়তে আসেন সমগ্র সিলেট বিভাগ থেকে মুসল্লিরা। এই নয়াসড়ক পয়েন্ট এখন মাদানি চত্বর নামে নামকরণ  করা হয়েছে। ইবাদত পিপাসুদের অনেকে এক মসজিদ থেকে অন্য মসজিদে ছুটে যান একটু প্রশান্তি আর আল্লাহ্‌র প্রিয় বান্দাদের সহবতের আশায়। তাহাজ্জুদে আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ করার আশায় পরেহজগার সাদাসিধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ লক্ষ্মণীয়। নগরীর বন্দরবাজার জেলরোডস্থ শাহ্‌ আবু তুরাব মসজিদও সারা রাত ইবাদতের একটি কেন্দ্র। সেখানে হযরত আব্দুল্লাহ (র:) হরিপুরীর সাহেবজাদা মাওলানা হেলাল আহমদ ও শায়খুল হাদিস আব্দুল কাদির বাগরখালী নসীহত পেশ করেন। তাহাজ্জুদের নামাজে ইমামতি করেন- মসজিদের পেশ ইমাম মো. আবদুস শহীদ। ওই মসজিদে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাধারণ মুসল্লিরা নামাজ আদায় ও ইবাদত-বন্দেগী করেন।

অনেক মুসল্লি জানান-  আধ্যাত্মিক সিলেটের এই আমলের প্রথা বাপ- দাদার মুখে শুনে এসেছেন। আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভই একমাত্র প্রত্যাশা আগত মুসল্লিদের। ইসলামের দাওয়াত আর ধর্মীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে প্রাচীন শ্রীহট্টে আগমন ঘটে দরবেশ ও আউলিয়া হযরত শাহ্‌জালাল (র:)-এর। এই দরবেশের সঙ্গে আসেন হযরত শাহ্‌পরাণ (র:)সহ ৩৬০ আউলিয়া। এখানে সূফি-সাধকরা ইসলামের পতাকা উড়ান। গোটা অঞ্চলে হয় ইসলামের প্রচার। সিলেটেই শায়িত আছেন তারা। তার পথ ধরে ইসলামের মহান বাণী প্রচার করছেন শায়খে বরুনা,  ইদ্রিস লক্ষ্মীপুরীর মতো শায়খরা। তাদের নসীহত শুনেন ইবাদত-পিপাসু মুসল্লিরা। তরুণ প্রজন্মও হাঁটছে সেই পথ ধরে। সিলেটের বুজুর্গ ও অলিদের এই ত্যাগ যুগ যুগ থেকে সিলেটবাসী কদর করে আসছে। রমজানের পবিত্র মহিমায় আধ্যাত্মিক সিলেট যেন সত্যিই একখণ্ড পুণ্যভূমি।

Thursday, March 27, 2025

আনোয়ারুজ্জামানের দেশত্যাগ নিয়ে সিলেটের রাজনীতিতে নিঃশব্দ উত্তেজনা by মিজানুর রহমান

সিলেটের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী কীভাবে দেশ ছাড়লেন তা নিয়ে অন্তহীন গুজব সিলেট জুড়েই। যদিও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী নিজেই এক ভিডিও বার্তায় কীভাবে লন্ডন পৌঁছেছেন তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। এরপরও সিলেটের রাজনীতিতে এ নিয়ে মুখরোচক নানা কথা চাউর হয়ে আছে। বলা হচ্ছে- সাবেক সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী তাকে পালাতে সহায়তা করেছেন। এ নিয়ে আরিফুল হক চৌধুরীর মুখোমুখি হয়েছিল মানবজমিন। তিনি বলেছেন, এসব কথা সত্য নয়, স্রেফ প্রপাগান্ডা। 

এর আগে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী লন্ডনে মানবজমিনকে জানিয়েছিলেন, ৫ই আগস্ট সরকার পতনের দিনেই তিনি সিলেট সেনানিবাসে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে ১৪ই আগস্ট বের হন। ১৭ই আগস্ট লন্ডনে পৌঁছান।

আনোয়ারুজ্জামান নিজেই বিষয়টি পরিষ্কার করলেও তার দেশত্যাগ নিয়ে নিঃশব্দ উত্তেজনা আছে সিলেটে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তার পালানোর সঙ্গে নেতাদের নাম ছড়িয়ে মুখরোচক আলোচনাও ছড়ানো হয় রাজনীতির মাঠে। এই আলোচনার মধ্যে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নামও আসে।

এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে আরিফুল হক চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, বাস্তবতা হলো আনোয়ারুজ্জামান নিজেই ফেসবুকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত পোস্ট করেছেন। তিনি কীভাবে দেশ ছেড়েছেন? তা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজের মুখে  বলেছেন কীভাবে সেনাবাহিনীর সহায়তায় চট্টগ্রামে গেছেন। সেখান থেকে কীভাবে নির্বিঘ্নে ফ্লাইটে উঠলেন। সবই বলেছেন।
শুধু তাই নয়, এজন্য তিনি সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট অফিসারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাকে সহায়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তার নিজের বয়ানেই সব অস্পষ্টতা দূর হয়ে গেছে। তারপরও তারা আমাকে দোষারোপ করে। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, যারা মেয়র বানানোর জন্য আনোয়ারুজ্জামানকে লন্ডন থেকে নিয়ে এসেছে, তার পক্ষে সভা করেছেন। তার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছেন। জয়ের জন্য ক্যাম্পেইন করেছেন তারা আজ বিএনপি নেতাদের আশ্রয়ে। তারা আমাদের দল করে না, ভিন্ন দলের। কিন্তু তারা যখন লন্ডন থেকে আসেন তখন আমাদের নেতাদের বাসায় উঠেন। সেই কর্নার থেকেই আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা। আমাকে কীভাবে  ধ্বংস করতে চায়। এ জন্যই এসব প্রচার প্রপাগান্ডা। যারা আনোয়ারুজ্জামানকে মেয়র বানানোর জন্য দিনরাত খাটলো, সভা-সমাবেশ সফল করতে পরিশ্রম করলো তারাই এখন প্রপাগান্ডা করে আমি নাকি তাকে সীমান্ত পার করে দিয়েছি!

৫ই আগস্টের পর থেকে পলাতক কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল এবং কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সরওয়ার হোসেনের সহায়-সম্পত্তি এবং ব্যবসা বিএনপি নেতাদের দখলে যাওয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি যথাযথভাবে বিষয়গুলো খোঁজ নেইনি এখনো। তবে এমনটা সত্য হলে তা খুবই দুঃখজনক। কারণ আমাদের বুঝতে হবে তারা জাতির ওপর কতোটা নির্যাতন নিষ্পেষণ চালিয়েছে। তাদের অত্যাচারের শিকার আমরাও। আরিফুল হক চৌধুরী স্বীকার করেন যে, সিলেটে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা তাদের বিশাল সম্পত্তি রক্ষার জন্য বিএনপি নেতাদের কাছে তাদের ব্যবসা ট্রান্সফার করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু কিছু ঘটনার জ্বলন্ত প্রমাণ আছে। একদম পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে আছে।

সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিএনপি’র দায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৭ বছর পর নতুন এক পরিস্থিতি। ৫ই আগস্টের পর পুলিশের মনোবল খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তারা অগোছালো ছিল এবং দায়িত্ব পালন করছিল ঢিমেতালে। সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে কিছু দুষ্কৃতকারী। এ সময় (রাতারাতি) কিছু হাত পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে, এটা সত্য।  আগে যারা খেয়েছে তারা পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য গ্রুপ সেটা দখলে নিয়েছে। এদেরকে তো রাজনীতিবিদ বলা যায় না।  এরা কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির নাম ব্যবহার করে কাজটি করেছে।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার কথা স্মরণ করে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এসব বন্ধে সেন্ট্রালি আমাদের ব্রিফ করা হয়েছে। সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রফেসর ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ নিয়ে কথা বলেছেন।

আরিফ বলেন, সিলেট বিভাগের সব দায়িত্বশীলকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি বলেন, আজকে আপনি যেসব বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করলেন তা নিরসনে আমরা কাজ করছি দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা মতে। মানুষের মাঝে যেন আমাদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিয়ে কোনো আতঙ্ক না থাকে সেটি নিশ্চিত করতে আমাদের দু’দিন আগেই ব্রিফ করে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যারা এসব অপকর্ম করছে তারা যত শক্তিশালীই হোক তাদের ছাড়া হবে না। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রথমে আমাদের বলা হয়েছে দলের হাইকমান্ডের বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে। আমাদের দলের সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান স্পষ্ট। কোনোভাবেই দল এদের (দুষ্কৃতকারী, ডেভিল) দায়ভার নিবে না। আমাদের এই অনুরোধ, আহ্বানে তারা যদি কর্ণপাত না করে তবে অবশ্যই দলের হাইকমান্ড তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিবে। শুধু দল থেকে বহিষ্কারই নয়, প্রয়োজনে আমরা তাদের ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করবো। প্রশাসনকেও এ বিষয়ে কঠিন পদক্ষেপ নিতে আমরা অনুরোধ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, যার অপরাধ যতটুকু তাকে ততটুকু শাস্তি পেতে হবে। কেউ তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে তিনিও সমান অপরাধী, আশ্রয়দাতা। আরিফ বলেন, আমি যদি কাউকে রক্ষা করি আমাকে দল শাস্তি দিক। এতে কোনো ধরনের রাখঢাক বা বিচলিত হওয়ার দরকার নাই।

তিনি বলেন, এই সেই সিলেট। আত্মাধ্যিক নগরী। এখানে রাজনীতি-সমাজনীতি সব কিছুতেই এক ধরনের সহনশীলতা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য। আওয়ামী জমানার শেষ সময়ে এসে সিলেটের সেই ঐতিহ্যকে নষ্ট করা হলো। এটা পরিকল্পিত। এর নেপথ্যে কোন কোন আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন তা সিলেটবাসী জানেন। সেই নেতাদের অনুসারীদের অনেকে এখন চট করে আমাদের দলে ভিড়তে শুরু করেছে! আমরা যাদের চিহ্নিত করতে পারছি, তাদের বের করে দিচ্ছি। আমাদের সকলকেই সজাগ থাকতে হবে নাগরিকদের শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে। এতে রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিদের ভূমিকা রাখতে হবে। দেশ এবং দলের মঙ্গল চাইলে অবশ্যই আমাদের ক্ষুদ্র মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। বিএনপি চেয়ারম্যানের আদেশ-নির্দেশ পালনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, মানুষকে আমাদের আস্থায় নিতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনগণ যেন স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে আমাদের ভূমিকা রাখতে হবে। অতীতে কি হয়েছে তা বাদ। পাড়া-মহল্লায় গ্রুপ করে আড্ডার দৃশ্য আমরা আর সিলেটে দেখতে চাই না।

mzamin

Monday, March 24, 2025

সিলেটের ম্যাজিক ম্যান by মিজানুর রহমান

সরকার পরিবর্তন হলে চাপে পড়েন। থাকেন দৌড়ের উপরে। তবে অজানা এক জাদুর বলে দ্রুত সব আয়ত্তে নিয়ে নেন। যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার অদ্ভুত এক ক্যারিশমা তার। অনেকে তাকে বলেন, ‘ম্যাজিক ম্যান’, কেউ বলে ম্যানেজ ম্যান। সব সরকারের আমলে একই হাল। প্রথমে বিপাকে কিন্তু শেষ পর্যন্ত অজেয়-অপ্রতিরোধ্য। আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে জুয়া-যাত্রা এবং ক্যাসিনোর মতো সামাজিক অপরাধে জাহাঙ্গীর আলমের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বহু পুরনো। সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেপ্তার এবং জেল খেটেছেন অনেক বার। সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়েছেন কিন্তু রাজনীতির রং বদলে নিজস্ব অপরাধের সাম্রাজ্যে এখনো আছেন বহাল তবিয়তে!

শেখঘাট-কাজিরবাজার তথা সিলেট জুড়ে তার অপরাধের নেটওয়ার্ক। বিতর্কিত জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী জমানায় কাউন্সিলর ভাইয়ের কল্যাণে ছিলেন দলটির নেতৃত্বের আসনে। অবশ্য তার পদ-পদবির প্রয়োজন পড়েনি। সেই সময়ে অনেকদিন ছিলেন কমিউনিটি পুলিশের সভাপতির দায়িত্বে। ৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের খোলস পাল্টে এবার ফের তিনি বিএনপি’র রাজনীতিতে। যুক্তি তার জিনে নাকি জাতীয়তাবাদ। সব কিছুকে পেছনে ফেলে দুই দশক আগে ওয়ার্ড বিএনপি’র সেক্রেটারি পরিচয়ে জাহাঙ্গীর এবার বাগিয়ে নিয়েছেন মহানগর বিএনপি’র সহ-সভাপতির পদ! আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জাহাঙ্গীরের টিকি ছুঁতে পারে না- এমনটা ভুল। সঠিক হচ্ছে তাকে বেশিদিন আটকে বা অপরাধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। ছলে-বলে, কলে-কৌশলে তিনি নিজের অপরাধ-রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেন। তার আগে তিনি ক্ষমতাসীনদের  ম্যানেজ করেন। বহুরূপী জাহাঙ্গীর আলম তার অপকর্ম আড়াল করতে প্রায়শই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন সিলেট সদর মৎস্য আড়তদার কল্যাণ সমবায় সমিতিকে। তিনি ওই সমিতির সাধারণ সম্পাদক। জনশ্রুতি আছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেই থাকুক কাজির বাজারের গদি জাহাঙ্গীরের।

সিলেট সদর মৎস্য আড়তদার কল্যাণ সমিতির দায়িত্বশীল একাধিক প্রতিনিধি সম্প্রতি মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে বলেন, জাহাঙ্গীর আলম সমিতির বারবার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে অনেক রিপোর্ট হয়েছে। আমরা বাধ্য হয়ে প্রতিবাদ করেছি। এক প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি আমাদের সমিতির জন্য ভালো, টাকা পয়সাও খরচ করেন। পারিবারিকভাবে তাদের সঙ্গে অনেকের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এ কারণে তার ভাই কাউন্সিলর সিকান্দর আলীকে নিয়েও অনেক রিপোর্ট হয়েছে। বাধ্য হয়ে আমরা প্রতিবাদ করেছি। সমিতির এক সিনিয়র নেতা বলেন- ‘কাজিরবাজারের মাছ বাজারটি ঐতিহ্যবাহী। সোয়া শ’ বছরের পুরনো। এতে অনেকের চোখ। এ জন্য ক’দিন পরপর বাজারে অভিযান হয়। জুয়ার বোর্ডেই বেশি অভিযান হয়। সব সরকারের আমলে জাহাঙ্গীরের আস্তানায় অভিযান হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজারের নিয়ন্ত্রণ জাহাঙ্গীর পরিবারেরই হাতে। ব্যবসায়ীরা জানান, বাজার অন্যত্র সরিয়ে নিতে বহু চেষ্টা হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিজ করার সময়। জাহাঙ্গীর আলম এবং তার পরিবার বাজার এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় সরব ছিলেন। এজন্য অপকর্ম করলেও ব্যবসায়ীরা তা মেনে নেন। এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে তার অর্জিত সম্পদ অবৈধ নয়। কিন্তু তার অন্য অনেক ধান্দা আছে, বদনামও আছে। তার কামাই রোজগার কতোটা ‘হালাল’ তা নিয়ে আমাদের মনেও খটকা আছে। কিন্তু কে এ নিয়ে কথা বলবে? তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে আমরা কিছুই না!’

শেখঘাটের নিয়ন্ত্রক জাহাঙ্গীর গং: হযরত শাহজালাল (রহ.) এর পুণ্যস্মৃতি বিজড়িত শাহজালাল ঘাট তথা শেখঘাট। এটি সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যার সঙ্গে নগরীসহ গোটা সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। সুরমা নদীর তীরবর্তী শেখঘাটের পাশে ইটাখলা, ভাঙ্গাটিকর, কুয়ারপাড়, সওদাগরটিলা। বৃহত্তর শেখঘাট সিলেট সিটি করপোরেশনের ১২ নং ওয়ার্ডভুক্ত। সরকারি ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত তথ্য অনুযায়ী শেখঘাট এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা বেশ ভালো। শেখঘাট পঞ্চায়েতের মৃত মো. শহিদ উল্লাহ’র সন্তান জাহাঙ্গীর আলম। হজ করার পর তার নামের আগে হাজী বসিয়েছেন নিজেই। শুভেচ্ছা-৪১৭, শেখঘাট এই ঠিকানায় তার বর্তমান বসবাস। জাহাঙ্গীরের বড় ভাই সাবেক সিটি কাউন্সিলর সিকান্দর আলী। তিনি বৈষম্যবিরোধী  ছাত্র আন্দোলন চলাকালে তার এলাকা তো বটেই, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ঠেকাতে অকুস্থল মদিনা মার্কেট পর্যন্ত সামাল দিয়েছেন। সেখানে অন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তার তৎপরতার দালিলিক প্রমাণ হতে এসেছে মানবজমিনের। সূত্র মতে, শেখঘাটে আওয়ামী বিরোধী মানুষই বেশি। জাহাঙ্গীর পরিবার সেই ব্লকেই ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষমতা প্রলম্বিত হওয়ায় তারা তর সইতে পারেনি। আধিপত্য বিস্তারে তারা এক পর্যায়ে গোটা পরিবারই আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। তাদের পরিবারে অন্তত ৬ জনের পদ-পদবি থাকার তথ্য মিলেছে। জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই সিলেট মহানগর যুবলীগ নেতা মো. রেদওয়ান আহমদ বাপ্পিকে গত ২৪শে সেপ্টেম্বর আটক করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। তখন মিডিয়া ব্রিফিংয়ে র‍্যাব-৯ এর তরফে জানানো হয়- ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে বিস্ফোরক আইনে আদালতে মামলা রয়েছে তার। আসামি বাপ্পী দীর্ঘ সময় পলাতক ছিলেন। গোয়েন্দা তৎপরতা ও অভিযানে ধরা পড়েছেন। ওদিকে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে খুন, দুর্নীতি, নদী ও সমতলের জায়গা দখল এবং চাঁদাবাজির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এটা করে তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পত্তি অর্জন করেছেন। তবে জুয়া আর অনৈতিক কর্মকাণ্ড তার নেশা। ঘুরে ফিরে সব সময় সরকারি দলে থাকা জাহাঙ্গীর পরিবারের অন্যরাও ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে গড়ে তুলেছে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। স্মরণ করা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে ২০০৩ সালে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ পরিচালিত হয়। তখন সিলেটে জাহাঙ্গীর এবং দুষ্টচক্রকে গ্রেপ্তারে নগরীর কাজিরবাজারসহ শেখঘাট এলাকায় যৌথ বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালায়। সে সময় নদীপথে নৌকা নিয়ে পালিয়ে যায় জাহাঙ্গীর বাহিনী। এরপর অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাবস্থায় আর এলাকায় ফিরতে পারেনি। পলাতক ছিল। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের শেষ সময়ে জাহাঙ্গীর এলাকায় ফিরেন। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ফের দৌড়ের ওপর থাকে জাহাঙ্গীর বাহিনী। এলাকায় জমি দখলসহ বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে যৌথ বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে তারা গাঢাকা দেয়। এ অবস্থায় ছিল দীর্ঘদিন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরও কিছুদিন এলাকার বাইরে ছিল জাহাঙ্গীর বাহিনী। কিন্তু না ২০১১ সালে কাউন্সিলর সিকান্দর আলী সব ‘ভাও’ করে নেন। তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেন। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু হয় তাদের। ছোট ভাই জাহাঙ্গীর ও আরেক ছোট ভাই সন্ত্রাসী আছকিরের নেতৃত্বে তখন জায়গা দখল শুরু হয়ে গেছে। বিপত্তি ঘটে দিনমজুর লাকী মিয়াকে প্রহারে। সে নিহত হলে ৩ ভাই ফেঁসে যান। লাকি হত্যাকাণ্ডে উত্তাল হয়ে উঠে সিলেট। বাধ্য হয়ে পুলিশ চার্জশিট দেয় ৩ ভাইয়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু না হত্যা মামলাটি সিকান্দর-জাহাঙ্গীর- আছকির ধামা চাপা দিতে সক্ষম হন আওয়ামী যোগসাজশে।

জুয়ার বোর্ডসহ গ্রেপ্তার, কীন ব্রিজের নিচে প্রকাশ্য আদালতে সাজা জাহাঙ্গীরের: ২০১৭ সালে জুয়ার বোর্ডসহ প্রথম গ্রেপ্তার হন জাহাঙ্গীর। দীর্ঘদিন জেল খাটেন। জেল থেকে বেরিয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। প্রকাশ্যে জুয়ার আসর জমালেও এলাকার কাউন্সিলর সিকান্দর আলী ও জাহাঙ্গীরের ভয়ে তখন কেউ প্রতিবাদ করেননি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে কাজিরবাজারে জাহাঙ্গীর আলমের জুয়ার বোর্ডে অভিযান হয়। তখন জাহাঙ্গীর আলমহ বেশ ক’জন জুয়াড়িকে আটক করে পুলিশ। পরে কীন ব্রিজের নিচে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের এক বছর কারাদণ্ড দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি পুনরায় কুকর্মে জড়ান। ২০১৯ সালের ২৭শে জুন, বৃহস্পতিবার। জাহাঙ্গীরের জুয়ার বোর্ডে সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ। সেটি ছিল ওই সময়ে সিলেটে জুয়া-ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সফল অপারেশন। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, জাহাঙ্গীর আলমের জুয়ার বোর্ডে অভিযান চালিয়ে সেদিন একসঙ্গে ২২ জনকে আটক করে পুলিশ। সন্ধ্যাকালীন সেই অভিযানের নেতৃত্বে ছিল সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। জব্দ করা হয় জুয়া খেলার সরঞ্জামাদি। কিন্তু জাহাঙ্গীর থামেননি। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি তার জুয়া বাণিজ্য আরও বাড়িয়ে তুলেন। জেলা জুড়ে ‘ওয়ানটেন’ নামক জুয়ার আসর ছড়িয়ে দেন। তার শেখঘাটের আস্তানা তখন আরও জমজমাট হয়। অভিযোগ আছে- ক’বছর আগে নগরীর ঐতিহ্যবাহী বন্দরবাজারে অবস্থিত জালাল বাজার নামীয় একটি মৎস্য বাজারে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন জাহাঙ্গীর। বাজার কমিটি  আদালতের দ্বারস্থ হয়। জাহাঙ্গীরসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে একটি চাঁদাবাজির মামলা করা হয়। যার নং ৪৩/৬৭৩। ঘটনার তারিখ: ১১/০৮/২০২১ইং। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। অভিযোগ আছে- সিলেটের কাজিরবাজারে জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে এবং ভাঙ্গাটিকরপাড়ায় তার ছোট ভাই আছকির আলীর নেতৃত্বে অবৈধ সিলং তীর নামক জুয়াও চলে। যা অনেক খেটে খাওয়া ও অসহায় গরিব মানুষকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।  জাহাঙ্গীরের তীর কাউন্টারে খেলতে গিয়ে অত্র এলাকার মতিন মিয়ার মিলের একজন কর্মচারী সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই (সর্বকনিষ্ঠ) যুবলীগ নেতা রেদওয়ান আহমদ বাপ্পী’র নামে নগরীর কাজিরবাজার থেকে শেখঘাট পর্যন্ত মেইন রোডে থাকা ট্রাক এবং বিভিন্ন মিল-কারখানা থেকে মাসোহারা  আদায়ের অভিযোগ ছিল।  বর্তমানে এটা হাতবদল হয়েছে। জাহাঙ্গীর তার লোক দিয়ে ছোট ভাই’র চাঁদার লাইন ঠিক রেখেছেন বলে জানা গেছে। তার তত্ত্বাবধানে তৈরি হওয়া কাজিরবাজার জামে মসজিদের পেছনে দক্ষিণ পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় এখনো গরুর খামার রয়েছে। বর্তমানে এটি তার আরেক সহোদর আঙ্গুর আলী ও সহযোগী যুবদল নেতা আমিনুল ইসলাম তুহিন দেখভাল করেন। যার ফলে মসজিদের আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দুর্গন্ধের কারণে মসজিদে আগত মুসল্লিদের নামাজ পড়তে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। অভিযোগ আছে জাহাঙ্গীর-আছকির সহোদর সিন্ডিকেট বর্তমানে ভারত থেকে অবৈধ উপায়ে আসা চিনির কারবারে যুক্ত।  কাজিরবাজার ব্রিজ দিয়ে পারাপার হওয়া চোরাই মালবাহী ট্রাক যারই হোক না কেন কাজিরবাজার এলাকায় ঢুকলেই ওই সিন্ডিকেটকে চাঁদা দিতে হয়। জাহাঙ্গীর পরিবারের জুনিয়র কয়েকজন মিলে অত্র এলাকায় কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছে। তাদের যন্ত্রণায় সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। বর্তমান ছাত্রলীগ ১২ নং ওয়ার্ড শাখার দায়িত্বে রয়েছে- সিয়াম আহমদ সিতাব (ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, ১২নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ), পিতা-সাবেক কাউন্সিলর সিকান্দর আলী, মেহরাজ জাহাঙ্গীর জয় (সহ সভাপতি, ১২ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ), পিতা-জাহাঙ্গীর আলম, মিরাজ আহমদ সিজান (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ১২ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ), পিতা- সাবেক কাউন্সিলর সিকান্দর আলী, বিজয় (১২ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ নেতা), পিতা-জাহাঙ্গীর আলম। অভিযোগ আছে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা কাউন্সিলর সিকান্দর আলী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপিতে জায়গা করার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে সিলেট মহানগর বিএনপি’র এক নেতা বলেন, আমরাও তার নতুন তৎপরতা দেখছি। তিনি পরিস্থিতির কারণে আওয়ামী লীগে গেছেন বলে প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমরা দলের হাইকমান্ডের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত আশা করি।

ক্যাসিনো থেকেই বেশির ভাগ সম্পদ গড়েছেন জাহাঙ্গীর: ২০১৫ সালের দিকে সিলেটে ক্যাসিনো শুরু করেন জাহাঙ্গীর। চলে ২০১৯ সাল অবধি। ঢাকায় ক্যাসিনো সম্রাটের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর সব গুটিয়ে নেন। তার পরিবারের সদস্যরাও নানাভাবে ক্যাসিনোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ থেকেই তারা বেশির ভাগ সম্পদ গড়েছেন। শেখঘাটে তারা ৪ তলার যে ভবনে থাকেন সেটি দখল করা। এ ছাড়া নগরীতে আরও অন্তত ৮টি বাড়ি রয়েছে জাহাঙ্গীর পরিবারের। আছে একটি লাঠিয়াল বাহিনী। দামি দামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের একাধিক গাড়িতে (এলিয়ন, প্রাডো, রেভ ফোর, সিআরবি) চড়েন তারা।

জাহাঙ্গীর যা বলেছেন: দল বদল, জুয়া, ক্যাসিনোসহ উপরোল্লিখিত বিস্তর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম গত রাতে মানবজমিনকে বলেন, আমি ৮৫ সাল থেকে বিএনপি’র রাজনীতি করি। ছাত্রদল করেছি, যুবদল করেছি, এখন বিএনপি’র মহানগরের সহ-সভাপতি এবং ১২নং ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি হিসেবে আছি। আওয়ামী লীগের গত ১৫ বছরে আমার এলাকার অনেকে দল ছেড়ে গেলেও আমি বিএনপিতেই ছিলাম। আমি রাস্তা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছি বার বার বিএনপি করার কারণে। কিন্তু পুলিশ আমাকে রাজনৈতিক মামলা না দিয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গে জুয়ার মামলায় চালান দিয়েছে। আমি জীবনে কোনো দিন জুয়া খেলিনি, জুয়ার বোর্ড বসাইনি। ক্যাসিনো কি জিনিস আমি চিনি  না। আমার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা অনুসন্ধান করুক, যদি কোথাও জমি দখল, জুয়া, ক্যাসিনোর সম্পৃক্ততা প্রমাণ হয় তাহলে আমি এক কোটি টাকা পুরস্কার দেবো।

mzamin

Thursday, March 13, 2025

সিলেটের রহস্যময়ী কে এই হেলেন? by মিজানুর রহমান

হেলেন আহমেদ। সিলেটে বহুল আলোচিত একটি নাম। সামরিক-বেসামরিক সরকার, অন্তর্বর্তী বা কেয়ারটেকার- সব আমলেই কম-বেশি ক্ষমতাধর তিনি! আয়েশি জীবনের অধিকারী মিজ আহমেদ বেশ পরিপাটি। ক্ষমতাকেই সবচেয়ে বেশি এনজয় করেন। এটাই তার একমাত্র নেশা, এতে বাড়তি ফিল পান তিনি। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে খেলেন, তাদের সঙ্গে টক্কর দিতেও পছন্দ করেন। যেকোনো মূল্যে বাজি জিতার চেষ্টা করেন কৈশোর থেকে। অবশ্য তিনি জিতেছেনও।

হেলেনের ‘সমাজসেবা’ নিয়ে তার সুহৃদরা উচ্ছ্বসিত। তার প্রতি তাদের ভালোবাসা অন্ধ। বিশ্ববিখ্যাত সমাজ হিতৈষী নারী হেলেন কেলারের সঙ্গে তাকে মেলানোর চেষ্টা করেন প্রবাসী অন্ধ ভক্তরা। বলে রাখা ভালো হেলেন কেলার ছিলেন ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ জীবনভর দুনিয়াকে যা দিয়েছেন তা অতুলনীয়।

হেলেন আহমেদের সমালোচকদের ভাষ্য ঠিক উল্টো। তারা সাহিত্যে বহুল চর্চিত ৩ রহস্যময়ী হেলেন, বনলতা আর মোনালিসার প্রতিচ্ছবি দেখেন মিজ আহমেদের মাঝে। তাদের মতে, হেলেনের গোটা জীবনটাই রহস্যেঘেরা। সিলেটের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ধনাঢ্য পিতার একমাত্র সন্তানের সঙ্গে প্রেম-বিয়ে, অল্প বয়সে বিধবা হওয়া, পরবর্তীতে শ্বশুর এবং প্রয়াত স্বামীর সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, দীর্ঘ সময় সংসার গণ্ডির মধ্যে না থাকা, বর্তমান পার্টনার এডভোকেট মিছবাহুল ইসলাম কয়েছ (আগের ম্যানেজার)-এর সঙ্গে তার সম্পর্কের রসায়ন- সব কিছুতেই অস্পষ্টতা। অভিযোগ আছে, কেবলমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনকে ব্যবহার করেছেন বহুরূপী হেলেন। মোমেনের ওপর তার যে প্রভাব ছিল তাতে তিনি সিলেটের বৃহত্তর কল্যাণে সরকার থেকে অনেক কিছু আদায় করতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি সে পথে হাঁটেননি। বরং বিশ্বস্ততার সুযোগে মন্ত্রীপত্নী ‘লেডি ফরেন মিনিস্টার’ সেলিনা মোমেনের ক্যাশিয়ার হয়ে উঠেন হেলেন।  তারা দু'জন মিলে গড়ে তোলেন দুর্নীতির শক্ত সিন্ডিকেট। তারা প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিশেষ করে বিভিন্ন বিভাগের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার, পিআইও, সাব-রেজিস্ট্রার, এসিল্যান্ড, পুলিশ প্রশাসন থেকে বখরা আদায় করতে গিয়ে সিলেটের সহজ-সরল মানুষকে নানাভাবে ঠকিয়েছেন। এলাকার উন্নয়ন দূর কি বাত। হেলেন আহমেদ প্রশাসনের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন মন্ত্রী এবং তার সহধর্মিণীর ক্ষমতার অদৃশ্য হাতের ইশারায়। বিষয়টি এমন ছিল- হেলেনের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া বা তার সিন্ডিকেটের বাইরের কেউ কখনো ড. মোমেনের কাছে ঘেঁষতে পারতেন না। সেটা অফিস বা বাসা যেখানেই হোক। তিনি চাইলে ডিসি/এসপি, হর্তা-কর্তা তো বটেই খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনকে হাজির করতে পারতেন তার সিলেটের দৌলতখানায়। তার কথার অবাধ্য হওয়ার খেসারত দিতে হয়েছে তৎকালীন অনেক অফিসারকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ড. মোমেনকে দিয়ে সিলেটের ডিআইজিকে স্ট্যান্ডরিলিজ করিয়ে নিজের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছিলেন হেলেন। অবশ্য ঢাকা-সিলেট ফোর লেনের কাজ নিয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের সঙ্গে টেক্কায় টিকতে পারেন নি। এই একবারই সম্ভবত প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জে হেরেছেন হেলেন!

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক হেলেনের রাজনীতির পাঠশালায় যাওয়া হয়নি কোনোদিন। কিন্তু তার কাছে অসহায় তৃণমূল থেকে উঠে আসা সিলেটের নারী নেত্রীরা। সেলিনা মোমেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জেরে সিনিয়রদের টপকে তিনি সিলেট জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান পদ বাগিয়ে নেন। তাছাড়া মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, জাতীয় মহিলা সংস্থাসহ নারীদের সব সংগঠনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন হেলেন। তিনি যাকে চাইতেন তাকে চেয়ার দিতেন। অপছন্দ হলে ছুড়ে মারতেন আস্তাকুঁড়ে। হেলেন ক্ষমতার গরমে হেন অপকর্ম নেই যা করেননি। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনেও তিনি মাঠে ছিলেন অস্ত্রধারীদের সঙ্গে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেননি। ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানের পর কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন ঢাকায়। নির্ভরযোগ্য সূত্র মানবজমিনকে এটা নিশ্চিত করেছে যে, পুরনো এক বন্ধুর হাত ধরে হেলেন পরবর্তীতে নির্বিঘ্নে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হয়েছেন। বর্তমানে সন্তানদের সঙ্গে তিনি লন্ডনে রয়েছেন।

চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজ যেখানে...
সিলেটের মানুষের মুখে মুখে হেলেনের কীর্তি। শেখ মুজিব পরিবারের ঘনিষ্ঠ বৃটেন আওয়ামী লীগ নেতা ছমরু মিয়ার মেয়ে হেলেন। জগন্নাথপুর নিবাসী হেলেন বরাবরই সুশ্রী। আধুনিক চিন্তা-চেতনার ওই তরুণী বিয়ে করেন সিলেটের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মাসুদ আহমদ রুহেলকে। রুহেলের পিতা শহরের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিন আহমদ। রুহেল জিন্দাবাজারের ব্যবসায়ী। জাতীয় পার্টি করতেন। এরশাদ জমানায় জাতীয় পার্টির সিলেট বিভাগীয় শীর্ষ নেতা মুকিত খানের ঘনিষ্ঠজন। সেই সুবাদে রুহেল ছিলেন অন্যতম শক্তিধর। ঘনিষ্ঠজনদের মতে; সুন্দরী বউ হেলেনের উচ্চাকাক্সক্ষার সঙ্গে নিজেকে খাপ-খাওয়াতে আকাশে উড়তে চেয়েছিলেন রুহেল। শহরতলীর এয়ারপোর্ট রুটে তার বাবার নামে বন্ধকী সম্পত্তিতে গড়ে তুলেন আহমদ হাউজিং। তাছাড়া জিন্দাবাজারের জল্লারপাড়ে গড়ে তুলেন বহুতল মার্কেট, সঙ্গে হোটেল। নাম দেন ‘দ্য লাস্ট ডেইজ অব রাজ’। তার সম্পত্তি (জমি-জিয়ারত) নিয়ে ঝামেলা ছিল অনেক। এ নিয়ে রুহেল ছিলেন প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায়। যার প্রেক্ষিতে অকালেই মারা যান তিনি।

স্বামীর মৃত্যুর পর পিতার পরিচয়ে ‘সিঙ্গেল মাদার’ হিসেবে সিলেটে এবং লন্ডনে খানিকটা  স্ট্র্যাগল লাইফ শুরু হয় হেলেনের। অবশ্য কষ্ট বেশিদিন করতে হয়নি। তার বাবার অনেক বন্ধু তাকে আশ্রয় দেন, পাশে দাঁড়ান। ততক্ষণে তার নিজেরও অনেক বন্ধু জোগাড় হয়ে যায়। যার প্রেক্ষিতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তিনি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হন। বহুল আলোচিত ওয়ান ইলেভেন তার জীবনে আশীর্বাদ নিয়ে আসে। সেই সময়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন তার নিকটাত্মীয় ফখরুদ্দিন আহমদ। তার ক্ষমতায় তিনি ক্ষমতাধর হয়ে উঠেন সিলেটে। আগে থেকে জমি-জিরাত নিয়ে চলা দ্বন্দ্বে অনেকেই তখন আপস করেন ফখরুদ্দিন আহমদের ভাগ্নিখ্যাত হেলেনের সঙ্গে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে আর ঠেকায় কে? অবশ্য সেই সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত তাকে খুব একটা পাত্তা দিতেন না। হেলেনের সুবর্ণ যুগ শুরু হয়  মুহিতের শেষ সময়ে এসে তার বদলে সহোদর ড. মোমেনের সিলেটের রাজনীতিতে পদার্পণের পর। জাদুর বলে মোমেন পত্নী সেলিনা মোমেনকে বশীভূত করে নেন রহস্যময়ী হেলেন। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়ায় সেলিনা মোমেন আর হেলেন হয়ে উঠেন হরিহর আত্মা। নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার পর মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলে হেলেনকে আর পেছনে ফেরে তাকাতে হয়নি। ৫ই আগস্ট পর্যন্ত সিলেটের রাজনীতিতে মোমেনই ছিলেন সব। যদিও তিনি ২০২৪ এর ডামি নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। বলাবলি আছে মোমেন মন্ত্রী বা এমপি হলেও তার সহধর্মিণী ছিলেন তারও উপরে। সেখানে হেলেনের অবস্থান ছিল ‘ছায়া মন্ত্রী’।

হেলেন অনুপস্থিত, তবে আছেন সিলেটের সামাজিক আড্ডা-আলোচনায়
মার্কিন কবি এডগার অ্যালান পো’র ‘টু হেলেন’ কবিতাটি শুধু উনিশ শতকের তরুণদের নয়, বুড়ো হাড়েও প্রেমের স্পন্দন জাগাতো। অ্যালান পো’র ‘টু হেলেন’ পাঠে প্রভাবিত হয়ে নাকি জীবনানন্দ দাস ‘বনলতা সেন’ লিখেছেন! সাহিত্য-সমালোচকদের মতে, জীবনানন্দ হেলেনের প্রেমে পড়ে বনলতাকে নায়িকা বানিয়েছেন। বনলতা সেন নামের কেউ নাকি আদতে ছিলেন না জীবনানন্দ দাশের জীবনে। তবে সিলেটের রাজনীতি, অর্থনীতি তথা সমাজে হেলেন আহমেদের অস্তিত্ব বিদ্যমান নানা কারণে। যদিও অনেকদিন ধরে তিনি সিলেটে ফিজিক্যালি অনুপস্থিত। হেলেনের প্রেম, বিয়ে এবং মন্ত্রী পরিবারের ঘনিষ্ঠতা প্রসঙ্গে এক আড্ডায় কথা হচ্ছিলো। সেখানে ছিলেন অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রভিন্সের সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজের বাংলা বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপক। তিনি বারবার অ্যালান পো’র ‘টু হেলেন’ কবিতাকে উদ্ধৃত করছিলেন।

মন্ত্রী মোমেনকে খুশি করতে তার নামে ফাউন্ডেশন ও জমি দান:
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ হেলেন। তিনি তার খুশির প্রকাশ করেছেন তার নামে একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তোলে। মোমেন পত্নীকে চেয়ারম্যান আর নিজে সেক্রেটারি হয়ে ওই ফাউন্ডেশন গড়েছেন। তাতে একটি জমিও দান করেছেন। অবশ্য সেটার বিনিময়ে তিনি ওই প্লটের আশপাশে থাকা জমিগুলোর শ্রেণি পরিবর্তনে সক্ষম হয়েছেন। যা তাকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করেছে। চতুর হেলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেনের স্ত্রী সেলিনা মোমেনের নামে ২০ শতক জমি লিখে দেয়ার পরই ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন বড়শালা এলাকাস্থ সেই জমিগুলোর শ্রেণি পাল্টে যায়। হেলেন-সেলিনার জাদুর ছোঁয়ায় ৬০ বছর ধরে কাগজপত্রে থাকা ৭৮৬ শতক ‘টিলা’ শ্রেণির জায়গা মাত্র ২৭ দিনেই হয়ে যায় ‘ভিটা’ ও ‘বাড়ি’। ২০২১ সালের আগস্টে ঘটনাটি ঘটলেও তা পরবর্তীতে জানাজানি হয়।

হেলেনের সঙ্গে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা প্রসঙ্গে যা বললেন মোমেন:
হেলেনের সঙ্গে ড. মোমেন পরিবারের ঘনিষ্ঠতা বিষয়ে জানতে চেয়ে বার্তা পাঠানো হয় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের বিবেচনায়। সেই সঙ্গে তার কাছ থেকে হেলেনের নতুন হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটি যোগাড় করার চেষ্টা হয়। (হেলেনের বাংলাদেশের নাম্বারগুলো এখন আর ব্যবহৃত হচ্ছে না)। দীর্ঘ জবাবে ইংরেজিতে ড. মোমেন যা বললেন তার সারবেত্তা এরকম- “হেলেন সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা ছিল না। আমি যখন বাংলাদেশে ফিরে আসি তখন তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমাকে বলা হয় যে, তার বাবা ’৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে বৃটেনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং একজন ধনী ব্যক্তি। তার বাবা এবং তার প্রয়াত স্বামীর কাছ থেকে তিনি প্রচুর সম্পদ পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তার স্বামী ছিলেন তার ধনী বাবার (শ্বশুরের) একমাত্র পুত্র। ৬০-এর দশকে তার শ্বশুর বেশির ভাগই জমিদারি সম্পত্তি কেনার পেছনে বিনিয়োগ করেন। তাই তিনি তার বাবার কাছ থেকে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে তার প্রয়াত স্বামী এবং প্রয়াত শ্বশুর উভয়ের কাছ থেকে বিপুল সম্পত্তি পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে।
হেলেনের সঙ্গে এখন কোনো যোগাযোগ নেই। তার নম্বর নেই জানিয়ে ড. মোমেন লিখেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে না পারার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
পরে পৃথক বার্তায় ড. মোমেন তার ফাউন্ডেশনে হেলেনের জমি দান  বিষয়ে লিখেন- ফাউন্ডেশনকে জমি দানের পরই হেলেন আলোচনায় আসেন। যেহেতু সেখানে আমার নাম ছিল, তাই মিডিয়া তাতে কালিমা লেপনের চেষ্টা করেছে।
হেলেনের স্বামী মোমেন ফাউন্ডেশনের প্লটের কাছে একটি 'হিল টপ' বাড়ি তৈরি করেছেন জানিয়ে ড. মোমেন দাবি করেন ফাউন্ডেশনকে যে জমি দান করেছেন হেলেন, তা সেই 'হিল টপ' বাড়ির নিচে অবস্থিত। সেখানে জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা পাহাড় কাটা হয়নি।

mzamin

Tuesday, March 11, 2025

সিলেটের পথে পথে টর্চার সেল by মিজানুর রহমান

এতটা নির্দয় ও নিষ্ঠুর কখনো ছিল না সিলেট। আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত জালালাবাদ অঞ্চলের সামাজিক এবং রাজনৈতিক সম্প্রীতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। পতিত আওয়ামী শাসনের শেষক’টি বছর ছিল ভয়ঙ্কর। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে সিলেটের রাজনীতি ‘বিষাক্ত’ রূপ নেয়। ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতার আসনে আমৃত্যু থাকবেন’- এমন ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে নেতাকর্মীদের মাঝে। সিলেটে গ্রুপিং-লবিং তথা রাজনৈতিক পোলারাইজেশন ঘটে তখনই।

রাজনৈতিক কর্মীদের বাইপাস করে নিজ নিজ বলয় শক্ত করতে ডেভিল বা খারাপ লোকদের কাছে টানতে শুরু করেন সিনিয়র গ্রুপ লিডাররা। বিষয়টি এমন ছিল- ‘যাই করো, তোমরা শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকো।’ ওই সময় হাইকমান্ড থেকে চাপিয়ে দেয়া অনেককে নেতা হিসেবে মানতে হয় সিলেটের স্থানীয় রাজনীতিকদের। যদিও এ নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ছিল ৫ই আগস্ট তাদের পতনের দিন পর্যন্ত। আরোপিত এবং মাঠের নেতাদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার সুযোগ কাজে লাগায় বিভিন্ন উপ-গ্রুপের আশ্রয়ে থাকা অপরাধী চক্র। তারা নেতাদের পেছনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ঠিক রেখে শেষ পর্যন্ত নিজেদের আখের গুছিয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, মানুষকে হয়রানি, বাড়িঘর নির্মাণে চাঁদাবাজি, চোরাকারবার, পরিবহন, ফুটপাথ থেকে চাঁদা আদায়, টেন্ডারবাজিসহ হেন কাজ নেই যা তারা করেনি। এতে কোথাও কেউ বাধ সাধলে লেগে যেত দ্বন্দ্ব। তাদের ধরে এনে টর্চার সেলে চলতো বর্বর নির্যাতন। সেই বর্বরতা থেকে নারীরাও রক্ষা পায়নি।
রিপোর্ট বলছে, প্রত্যেক গ্রুপেরই ছিল একাধিক টর্চার সেল। তারা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, কোনো কোনো টর্চার সেল ছিল ওপেন সিক্রেট। দিনের আলোতেই ভিন্নমত এবং তাদের অপরাধের পথে প্রতিবন্ধকদের ধরে এনে নৃশংস নির্যাতন করা হতো। গ্রুপিং রাজনীতির কারণে প্রত্যেক গ্রুপ লিডার ঘটনা-দুর্ঘটনার বিষয়ে অবহিত হতেন, কখনো কখনো আটকদের উদ্ধারে হস্তক্ষেপ করতেন। কিন্তু তারা তা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি। ফলে পথে পথে ওপেন সিক্রেট এসব টর্চার সেলে দিনের পর দিন বহু মানুষ বর্বরতার চরম শিকার হয়েছেন।

মেজরটিলা টেক্সটাইল মিল এলাকার এক নারী প্রত্যক্ষদর্শীর (আঞ্চলিক ভাষায়) বয়ান ছিল  এমন “আমি এখনো রাতে ঘুমাইতে পারি না ভাই। ঘুমের ঘোরে ওউ পুয়াটার কান্না হুনি। পুয়াটায় বারবার চিৎকার করে কইছলো আমারে গুল্লি করি মারিলা, তবুও পিঠাইছনা। আধ-মরা করে পুয়াটারে ফার্মেসির বেঞ্চে শুয়াইলো কাফিরর বাচ্ছারা। আমি বেটি মানুষ, তবুও মনে হইছে হাসপাতাল নিয়া যাই’।

ভিকটিম ছেলেটা মেজরটিলা এলাকার বাইরের (বহিরাগত) ছিল এমন দাবি করে ওই গৃহবধূ জানান, তারা পরবর্তীতে তাকে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। কেবল ধরে এনে নির্যাতন নয়, স্থানীয়দেরও নানাভাবে ডিস্টার্ব করতো ওরা। ভয়ে কেউ কাউকে মুখ খুলতো না, উদ্ধার দূরে থাক। সাধারণরা তাদের পাশ দিয়ে যেতেও সাহস করতেন না। প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া তথ্য মতে কেবল মেজরটিলা, শাহপরান এলাকা নয়, সিলেটে পথে পথে ছিল অন্তত অর্ধশত টর্চার সেল। এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হল ছিল একেকটি মিনি ক্যান্টনমেন্ট। অস্ত্র-গোলাবারুদ সবই মজুত থাকতো হলগুলোতে। সেখানে আয়নাঘরের অস্তিত্বও ছিল।  পরিত্যক্ত ঘর বা সিঁড়ির গোড়ায় থাকা রুমে ছাত্রদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করতো ছাত্রনেতা নামধারী ডেভিলরা। সিলেটের ক্যাম্পাসগুলোতে আটকে রেখে ধর্ষণ ও নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক এবং শারীরিক টর্চারের অনেক প্রমাণ পেয়েছে প্রশাসন।

রিপোর্ট বলছে, ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণকারী ছাত্রলীগের গ্রুপের সঙ্গে না থাকলে, গ্যাং লিডারদের সালাম না দিলে বা বিরোধী মতাবলম্বী হলেই তাদের  শাস্তি ছিল অবধারিত। বর্বর এসব নির্যাতনে অনেকে পরবর্তীতে মারা গেছেন। কেউ পঙ্গুত্ববরণ বা অসুস্থতা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। ৫ই আগস্টের পর সিলেটে টর্চার সেলগুলো থেকে লাঠি, হকিস্টিক, ক্রিকেট স্ট্যাম্প, চেইন, লোহার রড ছাড়াও ইলেকট্রিক শক দেয়ার মতো ভয়ঙ্কর নির্যাতন-সামগ্রী উদ্ধার করেছে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা।

গ্রুপভিত্তিক টর্চার সেল, নিয়ন্ত্রকদের যত কীর্তি: সিলেটে আওয়ামী লীগের একটি বড় গ্রুপ হচ্ছে তেলিহাওর। যে গ্রুপের মূল নেতা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান। তার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন দু’টি টর্চার সেলে চলতো নির্যাতনের স্টিম রোলার। নাসির গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুজেল তালুকদার ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা তানভীর আহমদ ছিল ওই দুই সেলের নিয়ন্ত্রক। আখালিয়া বিডিআর স্কুলের পেছনে সুজেল ও তানভীরের দখল করা বাড়িতে ছিল একটি টর্চার সেলের অবস্থান। ওই সেলকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকাকে অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে তারা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, খোদ হাসিনা আমলেই অস্ত্র, মাদকসহ গ্রেপ্তার হয় সুজেল-তানভীর।

নাসির গ্রুপের আরেকটি টর্চার সেল ছিল জেলা যুবলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি সেলিম উদ্দিনের এলাকা সাদাটিকরে। ওই সেল পরিচালনা করতো যুবলীগ নেতা আব্দুল হাই, অলিউর রহমান, দুলাল আহমদ ও জুয়েল খান। এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাখতে গিয়ে সেলিম উদ্দিনের বাসার গলিতে নিয়ে অনেককে মারধর করা হতো।

সিলেটের নাম্বার ওয়ান ডেভিল খ্যাত রঞ্জিত সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল অন্তত ১০টি টর্চার সেল। টিলাগড়ের গোপালটিলাস্থ রঞ্জিতের বাসার গলিতে ছিল একটা সেল। এটি পরিচালনা করতো রঞ্জিতের নিকটাত্মীয়  ছাত্রলীগ নেতা রাজিব সরকার। গোপালটিলার বাসিন্দারা জানিয়েছেন- সন্ধ্যা হলে ভয়ে ওই গলি দিয়ে তারা যাতায়াত করতেন না। প্রায় সময় গলি থেকে তারা চিৎকার শুনতেন। এ সেলের নিয়ন্ত্রকদের তালিকায় রঞ্জিতের ভাগ্নে মিঠু তালুকদারের নামও রয়েছে।

মেজরটিলা ওয়ান ব্যাংকের বিল্ডিংয়ের পেছনের অংশ ছিল সিলেটের আলোচিত টর্চার সেল। এ সেলের নিয়ন্ত্রক ছিল রঞ্জিতের সেকেন্ড ইন কমান্ড ওই এলাকার অপরাধের মূল হোতা কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম। তার সঙ্গে ছিল জেলা যুবলীগের অর্থ সম্পাদক কামরুল ইসলাম, তার ভাই জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম ও ওয়ান ব্যাংক বিল্ডিংয়ের মালিক কাইয়ূম চৌধুরী। ওই টর্চার সেলে প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ জনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। বহুতল ওই বিল্ডিংয়েই ছিল আগ্নেয়াস্ত্রের গোডাউন। জমি কিনতে আসা প্রবাসী, পরিবহন শ্রমিক, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতন করা হতো ওই সেলে। মেজরটিলার সিদ্দিক প্লাজার নিয়ন্ত্রক ছিল কাউন্সিলর রুহেল, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আমির আলী, যুবলীগ নেতা রুমন আহমদ, যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ আলী ওরফে অস্ত্র আলী। মেজরটিলা বাজারের ব্যবসায়ী, টমটম চালক, সিএনজি চালক, ভাসমান হকারদের সেখানে এনে নির্যাতন করা হতো। শাহপরান হাসপাতালের পাশে ছিল জাহাঙ্গীরের ভাগ্নে ও আলোচিত ছাত্রলীগ ক্যাডার হাবিবুর রহমান পংকির টর্চার সেল। তার ভাই ছাত্রলীগ ক্যাডার মুজিবুর রহমান রুহিতের টর্চার সেল ছিএ খাদিম চৌমুহনা সংলগ্ন ছড়ার সঙ্গে যুক্ত একটি আন্ডারগ্রাউন্ডে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- ওই টর্চার সেলে চিনি বহনকারী ট্রাকের চালকদের মারধর করা হতো। স্থানীয়দের কেউ কেউ ওই সেলকে আয়নাঘরও বলতেন। ৫ই আগস্টে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ওই টর্চার সেল থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও ভারত থেকে আসা চোরাই পণ্য চা পাতা, চিনি, কসমেটিক্স উদ্ধার করেছে। শাহপরান মাজার গেটের ঠিক উল্টোদিকে প্রত্যাশা কমপ্লেক্স। এর পেছনে আরেকটি টর্চার সেল ছিল পংকি ও রুহিতের সহোদর মিজানুর রহমান রকির। শাহপরান বাজারের ব্যবসায়ী, এলাকার প্রবাসীরা চাঁদা না দিলে তাদের ওই টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। রাতে চলতো অসামাজিক কাজও। ৫ই আগস্টের পর গা ঢাকা দিয়েছিল দুর্ধর্ষ ওই ছাত্রলীগ ক্যাডার। শ্বাসরুদ্ধকর এক অবস্থা থেকে মোটামুটি মুক্তি পেয়েছিল শাহপরান এলাকা। কিন্তু ৬ মাসের ব্যবধানে তারা ফের আতঙ্কিত। রকি এখন ছাত্রদল পরিচয়ে প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করছে জানিয়ে এক ব্যবসায়ী বলেন, স্থানীয় এক ছেলেকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের কারণে রকির সঙ্গে এলাকাবাসীর দ্বন্দ্ব হয়। পাশের মৎস্যজীবী দু’টি গ্রামের মানুষের ওপর নানাভাবে অত্যাচার করতো তারা। প্রায়ই মৎস্য ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে যেতো। এ নিয়ে বিচার সালিশ হয়েছে বহুবার, কিন্তু কাজ হয়নি। এক পর্যায়ে গোটা গ্রামবাসী রকি, পংকি, তার বাবা রাজা মিয়া এবং মামা কমিশনার জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আতঙ্কিত ওই ব্যবসায়ী মানবজমিন প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে বলেন, ৫ই আগস্টের আগে রকিরা ছিল আওয়ামী লীগ। এখন ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছে সে নাকি বিএনপি।রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, আমরা তাদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে চাই।

চিনি চোরাচালানে ভাগ বসাতে বিসিকে টর্চার সেল:
বিসিক শিল্প নগরী এলাকায় ছাত্রলীগ ক্যাডার আহমদ সাজন এবং সুরমা গেইটে হাসান আহমদ আরও দুটি টর্চার সেল গড়ে তুলে। সিলেট-তামাবিল রুটের চলাচলকারী চিনি চোরাচালানে ব্যবহৃত ট্রাকের চালকদের বন্দি রাখা হতো ওই দুটি টর্চার সেলে। প্রায় সময় চিনি লুট করে দু'টি সেলে রাখা হতো। ৫ই আগস্ট স্থানীয়রা হাসানের বাড়ি ও মোটরসাইকেলের দোকানে আগুন দেয়। সেই সঙ্গে তার টর্চার সেলও গুঁড়িয়ে দেয়। দাসপাড়ায় ডেভিল রঞ্জিত সরকারের ঘনিষ্ঠ সিনিয়র সাইফুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠান সাইফুল এন্টারপ্রাইজের পেছনকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতো। বর্তমানে সাইফুল পলাতক। এ ছাড়া এমসি কলেজে ছাত্রলীগ সভাপতি দেলোয়ার হোসেন রাহী, সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি রুহেল দুটি টর্চার সেল চালাতো। স্থানীয়  কামরুল ও সাবেক ছাত্রনেতা দেবাংশু দাস মিঠুর নেতৃত্বে এমসি কলেজ হোস্টেলে আরেকটি টর্চার সেল ছিল। ডেভিল রঞ্জিত সরকারের নিয়ন্ত্রিত ছাত্রলীগ ক্যাডাররা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আরও দুটি টর্চার সেল গড়ে তুলেছিল। ডেথ জোন খ্যাত টিলাগড়ের এক সময়ের অধিপতি মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ। হাসিনা সরকারের পতনের বহু আগে থেকেই তার গ্রুপের শক্তি কমতে থাকে। তারপরও নিভু নিভু আলোতে নিজের গ্রুপটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন পারিবারিকভাবে প্রভাবশালী কমিশনার আজাদ। তার গ্রুপের নেতাদেরও একটি টর্চার সেল ছিল।

বালুচরে মসজিদ সংলগ্ন চৌরাস্তায় সবচেয়ে বড় টর্চার সেল নিয়ন্ত্রণ করতো আলোচিত কাউন্সিলর ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপু। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে তার গ্রুপের অনুসারীরা ওই এলাকায় মহড়া দিতো।  সম্প্রসারিত সিটি হওয়ায় বালুচরে তখন অনেকে বাসাবাড়ি করছে। বিভিন্ন নামে তাদের চাঁদার জন্য বাধ্য করতো নিপু, রাজি না হলে ধরে এনে সেলে রেখে নির্যাতন করতো। দু'বছর আগে নিপু গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা আরিফ আহমদকে কুপিয়ে খুন করে। এ ঘটনায় নিপুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। এতে তার গ্রুপের ১০ ক্যাডারসহ তাকে জেলে যেতে হয়।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমানের কাছের লোক টিলাগড়ের আলোচিত হেরোইন সম্রাট কবির ওরফে হেরোইন কবিরের টর্চার সেল ছিল পূর্ব শাপলাবাগে। দেশ কাঁপানো জঙ্গি নেতা শায়খ আব্দুর রহমানের এক সময়ের আস্তানা পূর্ব শাপলাবাগ। সূর্যদীঘল বাড়ি খ্যাত সেই আস্তানা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিশপ্ত সূর্যদীঘল বাড়ির পাশেই  হেরোইন কবিরের আস্তানা। স্থানীয়রা জানান, এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে প্রতিবাদী বা প্রতিপক্ষের লোকজনকে ধরে নিয়ে কবির তার সেলে রেখে নির্যাতন করতো। হাসিনা সরকারের প্রথমদিকে হেরোইন ও ইয়াবার অন্যতম প্রধান হাট ছিল পূর্ব শাপলাবাগ।

বাগবাড়ি থেকে রিকাবীবাজার বিধান গ্রুপের ৩ টর্চার সেল:
সিলেটের আলোচিত ক্যাডার ও নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক বিধান কুমার সাহার নেতৃত্বে নগরীর বাগবাড়ির আখড়া মন্দির, মনিকা সিনেমা হলের সামনে এবং রিকাবীবাজার স্টেডিয়াম এলাকায় তিনটি টর্চার সেল ছিল। বাগবাড়ি আখড়া মন্দির সেলের নিয়ন্ত্রণ করতো বিধানের নিকট আত্মীয়  মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক বিদ্যুৎ ভূষণ দেব। সঙ্গে যুবলীগ নেতা বিপ্লব দাশ, শিবু দাশ, গোবিন্দ দাশ, সৌমিত্র সেন, টিপু দত্ত পুরকায়স্থসহ জেলার ছাত্রলীগের দুর্ধর্ষ ক্যাডাররা। ওই সেলের নানা কাহিনী এখন মানুষের মুখে মুখে। মদিনা মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকরা তাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রিকাবীবাজার ছিল তার অন্যতম টর্চার সেল। পুরাতন একটি ভবন দখলে নিয়ে সেখানে এটি গড়ে তোলা হয়। এ সেলের নিয়ন্ত্রক বিধানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী জেলা যুবলীগ সম্পাদক শামীম ওরফে সীমান্তিক শামীমের বন্ধু জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি হাসান আহমদ চৌধুরী, মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অরুন দেবনাথ সাগর, জেলা যুবলীগের সদস্য খালেদ আহমদ, সুহেল ওরফে বোঙ্গা সুহেল, মদন মোহন কলেজের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মিফতাহুল হোসেন লিমন। ওসমানী মেডিকেল এলাকায় মনিকা সিনেমা হলের সামনে একটি দোকানে টর্চার সেল চালাতো বিধান গ্রুপের নেতা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি  ছাত্রলীগ প্রেসিডেন্ট সাগর হোসাইন। সঙ্গে ছিল ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আলী আহমদ। পরবর্তীতে সাগর গ্রুপ বদলায়। সে নগরের আসাদ গ্রুপের নেতা হিসেবে ওই টর্চার সেলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। মহানগর

ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমএইচ ইলিয়াস দিনার দরগাহ গেইট এলাকায় একটি টর্চার সেল নিয়ন্ত্রণ করতো। বিশেষ করে সিলেট, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট থেকে আসা চোরাই চিনির ট্রাক চালকদের ওই সেলে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। সিলেটের আলোচিত ক্যাডার পীযূষ ছিল ভয়ঙ্কর। প্রকাশ্য অস্ত্র হাতে সে একাধিকবার নগরীতে মহড়া দিয়ে আলোচনায় আসে। জল্লারপাড় ওয়াকওয়ে ও দাড়িয়াপাড়াস্থ পাঁচভাই রেস্টুরেন্টের গলিতে দু'টি টর্চার সেল ছিল তার। এ সেল দু'টি পরিচালনা করতো মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাস অনিক, আকাশ সহ কয়েকজন দুর্ধর্ষ ক্যাডার। এ দুটি টর্চার সেল নিয়ে অতিষ্ঠ ছিলেন জিন্দাবাজারবাসী। দুটি টর্চার সেলের নানা ঘটনা বিভিন্ন সময় নগরে আলোচিত হয়েছে। এক সময় পীযূষ নগরের মাছুদিঘীরপাড়ের প্রবেশমুখের উল্টোপাশে জমি দখল করে টর্চার সেল গড়ে তুলে। ওই এলাকা থেকে পীযূষ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান জমিটির নিয়ন্ত্রণ নিলে পীযূষের বাহিনী আস্তানা পরিবর্তন করে।

পীরমহল্লার মূর্তিমান আতঙ্ক আফতাবের টর্চার সেল এবং...:
সিলেট মহানগরীর সুবিদবাজার এলাকার অপরাধ রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ছিল সাবেক কাউন্সিলর নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আপ্তাব হোসেন খানের। তার নেতৃত্বে তিনটি আলোচিত টর্চার সেল ছিল। জমি দখলে বাধা কিংবা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই ওইসব সেলে এনে টর্চার করা হতো নিরীহ লোকজনকে। এর মধ্যে আলোচিত টর্চার সেল ছিল আপ্তাবের পীরমহল্লা এলাকায় দখল করা একটি বাড়ি। প্রকাশ্য দিনদুপুরে ওই বাড়িতে নিয়ে লোকজনকে নির্যাতন করা হতো। এ নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ এয়ারপোর্ট থানায় দায়ের করা হলেও পুলিশের কোনো অ্যাকশন ছিল না।  পীর মহল্লার টর্চার সেল নিয়ন্ত্রণে ছিল আপ্তাবের ভাই আমির হোসেন, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম সুমন, অর্থ সম্পাদক শাহনূর আহমদ, ক্যাডার রুহিন, ফয়সল আহমদ, সায়মন্ড। আপ্তাবের অন্যতম সহযোগী কুখ্যাত ক্যাডার বাবুল হোসেন ওরফে পাঙ্গাশ নিয়ন্ত্রণ করতো বাদাম বাগিচার টর্চার সেল। ওই এলাকার কলোনির বাসিন্দা, ভাসমান হকার, রিকশা ও টমটম চালকরা চাঁদা না দিলে পাঙ্গাশ তার টর্চার সেলে ধরে এনে নির্যাতন করতো। বনখলাপাড়ার শেষ প্রান্তে ছিল আরেকটি টর্চার সেল।

ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রুবেল আহমদ ও মঞ্জুর আহমদ ওই সেলে লোকজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করতো। আম্বরখানা পয়েন্ট সংলগ্ন হোটেল হিমেলের ছাদে একটি টর্চার সেল ছিল। এ সেলের নিয়ন্ত্রক ছিল ছাত্রলীগ সম্পাদক রাহেল সিরাজ। ওই টর্চার সেলে এক ব্যবসায়ীকে মারধরের ঘটনায় সিরাজের সহযোগী সাদ্দাম গ্রেপ্তার হয়েছিল। ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক রাহেল সিরাজের নিয়ন্ত্রণে ছিল বড়বাজার ও সাপ্লাই এলাকার আরও দুটি টর্চার সেল। বড়বাজার এলাকায় দু’বছর আগে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন বিএনপি নেতা আ ফ ম কামাল। জনশ্রুতি আছে; রাহেল সিরাজের সহযোগী সশস্ত্র ক্যাডাররা আ ফ ম কামালকে খুন করে। এ ঘটনায় সন্ত্রাসী রাজু সহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়। সাপ্লাই গলির মুখে রাহেল সিরাজের টর্চার সেল নিয়ন্ত্রণ করতো গোয়াইনঘাট উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুফিয়ান আহমদ সহ কয়েকজন। রাহেলের ভাই রুমেল সিরাজ ও জৈন্তাপুরের আলমগীর হোসেনেরও ওই সেলে নিয়ন্ত্রণ ছিলো। 

mzamin

Sunday, March 9, 2025

বদনজর ডেভিলদের: টাকার খনি পূর্ব সিলেট by মিজানুর রহমান

সরকার বদল হলেই ডেভিল বদলায়। সামরিক-বেসামরিক সব সরকারের আমলে একই হাল। স্থানীয় কিছু আছে ‘পার্মানেন্ট পাওয়ার পার্টি’। তারা সব আমলে সক্রিয়। পথ-ঘাট চেনার কারণে বহিরাগত রাজনৈতিক ডেভিলদের কাছে তারা অপরিহার্য। তাদের নিজের কোনো পুঁজি খাটাতে হয় না। তাদের অবস্থা লাসভেগাস, সিঙ্গাপুর কিংবা হংককের ক্যাসিনোতে থাকা পার্মানেন্ট জুয়াড়িদের মতো। যারা নিজের অর্থে খেলে না। তবে তারা সার্টিফিকেট বা কার্ডধারী জুয়াড়ি। দামি ক্যাসিনোতে কোটি কোটি ডলার তাদের কার্ডেই ট্রানজেকশন হয়। রেকর্ডে তারা ক্যাসিনোর একেকজন সম্রাট। চোরাচালান রাজ্য পূর্ব সিলেটেও এমন অনেক জুয়াড়ি আছে।

সরকার বদল হওয়ার পর ওই জুয়াড়িরাই নতুনদের পথ দেখায়। তাদের অর্থকড়ি তেমন খরচ হয় না। ঢাকা বা সিলেট থেকে যাওয়া নতুন ডেভিলদের নিয়ে তারা টাকার খেলায় মেতে ওঠেন। পাথর-বালু লুট, চিনি চোরাচালান, স্বর্ণ পাচার, মাদক আমদানি কোথায় নেই তারা। সিলেট-তামাবিল সড়কের দু’পাশের জনপদকে পূর্ব সিলেট ধরা হয়। সেই সড়ক ঠেকছে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে থাকা শহর ডাউকি, শিলংয়ে। পূর্ব সিলেট প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। এখানেই দেশের প্রথম গ্যাস ক্ষেত্র হরিপুর। গোটা অঞ্চল টাকার খনি। যার অন্যতম জাফলং। সেখানকার দিনের মায়াবি পরিবেশ রাতে ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। কাঁচা টাকা নিয়ে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে জড়ো হন। দামি গাড়িতে চড়া সেই মাফিয়াদের টাকার কাছে স্থানীয়রা অসহায়। পূর্ব সিলেট পাথর লুট আর চোরাচালানের এক স্বর্গরাজ্য। ২০০৯ সাল, মহাজোট সরকারের তখন শুরু। পরিচিত-অপরিচিত সব ক্ষমতার চোখ আটকে যায় প্রকৃতি কন্যায়। সিলেট আওয়ামী লীগের এমন কোনো নেতা নেই জাফলংয়ে যার চোখ পড়েনি। গত ১৫ বছর ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিল জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রঞ্জিত সরকার, বিধান কুমার সাহা ও নাসির উদ্দিন খানের। পেছনে ছিলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। তিনি ছিলেন পর্দার অন্তরালের আসল খেলোয়াড়। স্থানীয় সংসদ সদস্য ইমরান আহমদের শক্তিমত্তার জেরে জাফলং শাসনে সর্বপ্রথম মাঠে নামেন জৈন্তাপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলোচিত লিয়াকত আলী। তিনি এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। শুরু থেকেই তার দাপট। সঙ্গে মাঠে ছিলেন সিলেটের রঞ্জিত বলয়ের নেতা আনোয়ার হোসেন আনু, বাবলু বখত, যুবলীগ নেতা কালা মালেক, জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক রাজা, আব্দুল আলিম ওরফে কালা আলিম, পূর্ব জাফলং ছাত্রলীগ সম্পাদক সাব্বির হোসনে সাজন। শুরুর দু’বছরে জাফলং থেকে লুট হয় হাজার কোটি টাকার পাথর। পরবর্তীতে লিয়াকত গ্রুপকে সরিয়ে জাফলংয়ের নিয়ন্ত্রণে নেয় আলোচিত লেবু চেয়ারম্যান পরিবার। আচমকা নেতৃত্বে আসেন গোয়াইনঘাট কলেজের অধ্যক্ষ ও এমপি ইমরান আহমদের আরেক আস্থাভাজন ফজলুল হক। তার সিন্ডিকেটের প্রধান ছিলেন ইমরান হোসেন সুমন ওরফে জামাই সুমন, ছাতকী আলাউদ্দিন, বিশ্বনাথী ফয়জুল, ট্রাক শ্রমিক নেতা সমেদসহ কয়েকজন। প্রায় ১৩ বছর জাফলং শাসন করে তারা। প্রতি বছর তারা বালু লুট করলেও ইসিএভুক্ত এলাকা হওয়ার কারণে শেষ সময়ে এসে তেমন পাথর লুট করতে পারেনি। তবে ওই সময়েও হাজার কোটি টাকার অন্য সম্পদ লুট হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর এখন ভিন্ন পরিবেশ। পূর্বের ডেভিলরা পালিয়েছে। নতুনরা জায়গা করে নিয়েছে। জাফলংয়ের গডফাদার এখন জেলা বিএনপি’র বহিষ্কৃত যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম শাহপরান এবং বহিষ্কৃত কোষাধ্যক্ষ সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ আলম স্বপন। তারা নতুন হওয়ায় পুরনো ডেভিলদের দেখানো পথে হাঁটছেন। তাদের নেতৃত্বে সিন্ডিকেটে রয়েছে পুরনো ডেভিল আনোয়ার হোসেন ওরফে পানামা আনু, জুবের আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা লন্ডনী কামাল, ট্রাক শ্রমিক নেতা সমেদ, আমজাদ বক্স, ছাত্রদল নেতা সোহেল আহমদ, আজগর, আকবর, যুবদল নেতা আবুল কাশেম। নেপথ্যে থেকে কাজ করছে জাফলংয়ের কুখ্যাত লুটেরা হেনরী লামিন। পিয়াইন নদীর ওপারে খাসিয়া পল্লীতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে যুবদল নেতা স্ট্যালিন খাসিয়া। জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুর রশিদ চেয়ারম্যান গত দু’মাস ধরে জাফলংয়ের কোয়ারিতে অবস্থান নিয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট মতে; জাফলংয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকলেও কোয়ারি থেকে ইতোমধ্যে কয়েকশ’ কোটি টাকার বালু ও পাথর লুট হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত ওই লুটতরাজ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করলেও লুটপাট বন্ধ হচ্ছে না। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, জাফলং তছনছ হয়ে গেছে। পাথর লুটের রীতিমতো মহোৎসব চলছে। অভিযানে বারকি শ্রমিক এবং শ্যালো মেশিন শ্রমিকদের ধরপাকড় করা হলেও মূলহোতারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। জাফলং বাঁচাতে স্থানীয়রা মাঠে। গত শুক্রবার রাতেও পাথর লুট বিরুদ্ধে এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে শনিবার উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বের টাস্কফোর্সের সাঁড়াশি অভিযান হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শ্রমিক হয়রানি না করে যেন প্রকৃত হোতা অর্থাৎ রাজনৈতিক ডেভিলদের ধরা হয়।

স্মরণ করা যায়, জাফলংয়ে বালু লুটে ৫ই আগস্টের পূর্বে নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগ নেতা ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান, সুভাষ দাশ, যুবলীগ নেতা রাসেল আহমদ, সরওয়ার আহমদ পালিয়েছে। সিলেটের নাম্বার ওয়ান ডেভিলখ্যাত রঞ্জিতের অনুসারী ছিলো তারা। জাফলং চোরাচালানের নিরাপদ রুটও। বিশেষ করে সোনাটিলা, আমসত্বপুর, তামাবিল, মিনার টিলা, জিরো পয়েন্টসহ কয়েকটি এলাকা চোরাচালানের জন্য গোটা রাতই জেগে থাকে। পূর্বে চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ করতো পূর্ব জাফলংয়ের মেম্বার আব্দুল মান্নান, নাজিম উদ্দিন, চশমা শামীমসহ কয়েকজন। তাদের নেতৃত্বে ছিল ইমরান হোসেন সুমন ওরফে জামাই সুমন। বর্তমানে জামাই সুমন পালিয়ে গেলেও মান্নান মেম্বারের নেতৃত্বে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার চোরাকারবার অব্যাহত রয়েছে। ছাত্র-জনতার ক্ষোভের আগুনে পুড়েছে জামাই সুমনের বাড়ি ও মসলা ফ্যাক্টরি। জেলা যুবদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেম নতুন করে এই সিন্ডিকেটে যোগ দিয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এখন স্বপন গ্রুপের সঙ্গে কাশের গ্রুপের দ্বন্দ্ব চলছে। কয়েক দফা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়েছে।

টাকার উড়ে তামাবিল স্থলবন্দরে
গোয়াইনঘাটের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হচ্ছে তামাবিল স্থলবন্দর। টাকা উড়ে এ বন্দরে। সাবেক এমপি ও মন্ত্রী ইমরান আহমদের ছত্রচ্ছায়ায় তামাবিলের মূল নেতৃত্ব ছিল জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম লিয়াকত আলী। ৫ই আগস্টের  পর থেকে পার্শ্ববর্তী ভারতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে সে। এ বন্দরে লিয়াকতের অন্যতম সহযোগী হচ্ছে- ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন, ফারুক আহমদ, সাবেক অধ্যক্ষ ফজলুল হক, সারোয়ার হোসেন ছেদু, রফিকুল ইসলাম শাহপরান, শাহ আলম স্বপন, জাকির আহমদ ওরফে আর্মি জাকির, ইসমাইল হোসেন, ইলিয়াস উদ্দিন লিপু, আব্দুল করিম। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- তামাবিল বন্দরে লেবার হেন্ডেলিংয়ের শতকোটি টাকা লুটে নিয়েছে ওই চক্র। লেবার হেন্ডেলিংয়ে টাকা নিলেও কোনো সেবা দেয়া হতো না। ফলে সব টাকাই লিয়াকত-জালাল সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে। জনশ্রুতি আছে; জালাল-লিয়াকত জৈন্তাপুরের কেয়ামত। গণ অভ্যুত্থ্যানের পর বিএনপি’র বহিষ্কৃৃত নেতা রফিকুল ইসলাম শাহপরান তার ক্যাডার বাহিনী ব্যবহার করে তামাবিল বন্দরের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত নেতা জয়নাল আবেদীন, এডভোকেট আহাদসহ কয়েকজনকে নিয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদও গঠন করা হয়। বিতর্কের মুখে জয়নাল আবেদীন তামাবিল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সেখানে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন জৈন্তাপুরের ইউপি চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি নেতা ফখরুল ইসলাম। তামাবিল বন্দরের অনিয়মের নানা অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদকের কর্মকর্তারা সরজমিন তদন্ত করেন। ওই তদন্তে লেবার হেন্ডেলিংয়ে দুর্নীতির সত্যতা পায় দুদক।

চোরাচালানের হেডকোয়ার্টার হরিপুর
চোরাচালান আগেও ছিলো এখনো আছে। তবে করোনাকালে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। নিয়মিত বাণিজ্যও তখন মুখ থুবড়ে পড়ে। কিন্তু নিউ নরমাল করোনা পরিস্থিতিতে সিলেট সীমান্তে চোরাচালান অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। বানের পানির মতো নামতে থাকে চিনি। শুরুতে চিনি চোরাচালান নিয়ে পুলিশের কড়াকড়ি ছিল। স্থানীয় ছিচকে চোরাকারবারির সঙ্গে যোগসাজশে এটি মূলত রাজধানীতে সাপ্লাই হতো। ওই রুট দিয়ে যাতায়াতকারী চিনি চোরাচালানে যুক্ত ট্রাকগুলো রঞ্জিত সিন্ডিকেটকে চাঁদা না দিয়ে শাহপরান বাইপাস বা টিলাগড় পাড় হতে পারতো না। অবশ্য পরবর্তীতে তামাবিল-সিলেট তথা ঢাকা পর্যন্ত রুটে প্রভাবশালী চিনি চোরাচালান বৃহত্তর সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের মতে, এক রাতে হরিপুর থেকে শ শ ট্রাকে করে শত কোটি টাকা পর্যন্ত চিনি চোরাচালান হতো। তার সঙ্গে ছিল মহিষ ও গরু চোরাচালান, শাড়ি, প্রসাধনীসহ নানা ধরনের পণ্য। হরিপুরের স্থানীয় সিন্ডিকেট চোরাচালানের নিয়ন্ত্রক। আওয়ামী লীগ শাসনামলে হরিপুরের মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুর রশিদ চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ দলীয় ইউপি চেয়ারম্যান রফিক আহমদ ও বোঙারী প্রধান আবুল হোসেন। মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে ছাত্রলীগ কর্মী আলমগীর হোসেন রায়হান ও স্থানীয় ছাত্রদল নেতা শাহীন আহমদের। গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটের অর্ধশতাধিক সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে স্রোতের মতো আসা চোরাই পণ্যের গুদামজাত হয় হরিপুরে। সেখান থেকে প্রতিদিন ২শ’ থেকে ৩শ’ ট্রাক ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রওয়ানা দিতো। ওপেন সিক্রেট এই চোরাচালানে শেল্টার ছিল পুলিশেরও। সিলেটের সাবেক এসপি (ছাত্র আন্দোলন চলাকালে যাত্রাবাড়ী অঞ্চলের র‌্যাবের কমান্ডিং অফিসার) ফরিদ উদ্দিন ও সিলেট জেলার ডিবি ইন্সপেক্টর রেফায়েত চৌধুরী এখান থেকে দু’হাতে টাকা কামিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকে তারা দু’জনই সিলেট থেকে বদলি হয়ে চলে যান। হরিপুর থেকে টিলাগড় পর্যন্ত চোরাই লাইনের নিয়ন্ত্রণ ছিল সিলেটের ডন রঞ্জিতের সহযোগী কাউন্সিলর ও জেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি নাজমুল ইসলামের। তাদের নেতৃত্বে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বড় একটি অংশ যুক্ত হয়ে প্রকাশ্যই চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন হরিপুরে চোরাকারবারির কয়েকশ’ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর হরিপুরের চোরাই রাজ্যের সেই রমরমা ভাব নেই। সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে এখন পণ্য আসা কমেছে। যেটুকু চোরাই পণ্য আসছে তার নিয়ন্ত্রকের হাত বদল হয়েছে। নতুনদের দখলে এখন হরিপুর। রিপোর্ট বলছে, পণ্য সংগ্রহে হুন্ডির মাধ্যমে শ’ শ’ কোটি টাকা পাচায় হয় ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যে।

এসপি’র বক্তব্য:
৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান দেশের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন নিয়েছে। কিন্তু পূর্ব সিলেটের চোরাচালান এবং পাথর-বালু লুট বন্ধ হয়নি। এজন্য পুলিশের নিস্ক্রিয়তার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন করে বদলি হয়ে আসা পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার কথা বলা হচ্ছে। এসব অভিযোগ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের বক্তব্য হচ্ছে সীমান্ত চোরাচালান ঠেকানো পুলিশের কাজ নয়। উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে দেদারসে ভারতীয় পণ্য এবং মাদক ঢুকছে স্বীকার করে মানবজমিনকে তিনি বলেন- জরুরি হয়ে গেছে ওই এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ। পুলিশের নিস্ক্রিয়তার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন- চোরাচালান পরিবহন বন্ধে সড়কে পুলিশ যথেষ্ট সক্রিয় রয়েছে। কোয়ারি থেকে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকার কারণে অনেকে চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে বলে স্বীকার করেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন- গোটা জেলায় প্রায় সব পুলিশ নতুন। এসপি অফিসে খাতাপত্রও নতুন। এ অবস্থায় কাজ বুঝে নবাগত পুলিশ সদস্যরা অল্পদিনের মধ্যেই অপরাধ বন্ধে তৎপর বলে দাবি করেন তিনি। চোরাচালান বিষয়ে এসপি’র মূল্যায়ন হচ্ছে একটি চক্র বংশপরম্পরায় সীমান্তে এ অপরাধ অব্যাহত রেখেছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে অপরাধ বা পাপবোধ নেই।

mzamin