Showing posts with label এম আবদুল হাফিজ. Show all posts
Showing posts with label এম আবদুল হাফিজ. Show all posts

Thursday, July 16, 2015

দুর্ভোগ নতুন কিছু নয় by এম আবদুল হাফিজ

এমন দুর্ভোগের কথা প্রতি ঈদেই শুনে আসছি। শুনে আসছি ঈদ আসার অনেক আগে থেকেই সরকার ও প্রশাসনের গালভরা প্রতিশ্রুতি যে এবারের রমজান ও ঈদে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ও অতিরিক্ত মুনাফায় রোজা সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্যের বিক্রি হতে দেয়া হবে না। ভেজাল খাদ্যের বিক্রি কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তাছাড়াও ঈদ ভ্রমণের নিষ্কণ্টক ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিশ্রুতির ইত্যাকার ফুলঝুরির সঙ্গে আমরা প্রতিবারই পরিচিত।
কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে ও অভিজ্ঞতার আলোকে ওসব শুধু কথার কথা। বলতে হয় তাই বলা। কর্তা ব্যক্তিরা যারা এসব প্রতিশ্রুতির বিস্তার করেন তারাও জানেন যে তাদের ওইসব প্রতিশ্রুতি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তবু সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে সম্ভবত তারা ওইসব কথা বলে থাকেন। মন্ত্রী, এমপি বা দলীয় হেভিওয়েট যারা প্রতিশ্রুতি দেয়ার ক্ষমতা রাখেন তাদের অনেকেই জনদুর্ভোগের স্বরূপটাই জানেন না। সাধারণ মানুষকে উৎসবে-পার্বণে কতটা দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের সে অভিজ্ঞতাও নেই। এদের অনেকেই পুরো রামাদানেই ইফতার পার্টি নামক বিশেষ ভোজে আপ্যায়িত হয়ে থাকে না। সেই নির্ভেজাল ভোজের মাজেজা তাদের জানা থাকার কথা নয়।
তবে রামাদান বাজার বা সেখানে বিক্রীত পণ্যের মান ও মূল্য যে একেবারে মনিটরিং করা হয় না তা বলা যাবে না। আমাদের দেশে অন্তত দায়সারা লোক দেখানো একটা মনিটরিং প্রতিটি এমন উৎসবের মৌসুমে করা হয়ে থাকে। আখেরে তার ফলাফল শূন্য। তা নাহলে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ব্রাজিল থেকে আমদানি করা পচা পোকাধরা গম যা অন্য কোনো দেশে হয়তো পশু খাদ্য হিসেবেও বিকাবে না তাকেও রীতিমতো মানব খাদ্য হিসেবে চালিয়ে দেয়ার সাহস হয় সংশ্লিষ্ট আমলাদের। এ দেশেই শুধু তা সম্ভব।
আমরা অত্যন্ত সচেতন জাতি হলেও কিছুটা হার মেনে বা কষ্ট স্বীকার করেও সব কিছুতে কুরুক্ষেত্র বাধাতে চাই না। ঘুষ-ঘাস দিয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে কোনো ছ্যাকড়া বাসে আধমরা পরিবার নিয়ে ঈদের নামাজ রাস্তায়ই সেরে জীর্ণশীর্ণ বাস্তুভিটায় পৌঁছতে পারলেই আমাদের মুখের হাসি চওড়া হয়ে আসে। ভুলে যাই দীর্ঘ যাত্রাপথের ঝক্কি-ঝামেলার কথা। মনে করি যে বৌ-বাচ্চা নিয়ে নির্ঝামেলায় ঈদ করতে যাওয়া একটি বিশেষ শ্রেণীর একচেটিয়া। আমাদের এই-ই তো যথেষ্ট যে আমরা সমুদ্র জয় করেছি, স্থল সীমান্তের একটি সুরাহা করে ছিটমহল অদলবদল করার পদক্ষেপ নিয়েছি। উপরন্তু ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়েছি।
আমরা সামান্যই উপলব্ধি করি যত যা-ই করি না কেন দেশবাসীর মধ্যকার পারস্পরিক বৈষম্য দুস্তর পারাবার সম। আমাদের এই বৈষম্য ঘোচাতে না পারলে ঈদই হোক বা পূজাপার্বণ এক শ্রেণী চিরকালই দুর্ভোগ নতুন কিছু নয়ভেজালই খাবে। বোকার মতো অধিক মূল্যে খাদ্য সামগ্রী কিনবে, উৎসবে-পার্বণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ করবে। আমরা দেশ স্বাধীন করার মধ্য দিয়েই এই বৈষম্য ঘোচাতে চেয়েছিলাম। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এজেন্ডায় এক পর্যায়ে সমাজতন্ত্র যুক্ত হয়েছিল এবং স্বাধীন বাংলার চার মূলনীতির অন্যতম সমাজতন্ত্র ছিল অতঃপর কোথায় যেন কি হয়ে গেল। সমাজতান্ত্রিক জীবনের ধ্যান-ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়ে কিছু মানুষ কল্পনাতীতভাবে ধনবান হতে থাকল। এরা মূলত ভণ্ড ব্যবসায়ী যারা সরকারি আনুকূল্যে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলল। তাদের সঙ্গে একই সরকারি আনুকূল্যে ঠিকাদারী, ইজারাদারী, সাপ্লায়ার্সের কাজ বাগিয়ে রাতারাতিই আনুকূল্য প্রাপ্তরা হাজার টাকার মালিক।
সমাজের তলানিতে যাদের স্থান সেই সুবিধা ও সুযোগ বঞ্চিতরা যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে গেল। আমরা যত মধ্যম আয়ের দেশ হই না কেন, মাথাপিছু আয় যতই বৃদ্ধি পাক এবং উন্নয়নের মহাসড়কে সামনে এগোই অর্থনৈতিক ও তার ফলে সামাজিক বিভাজনটা থেকেই যাচ্ছে; বিভাজনের কোন পাশে আপনার অবস্থান তার ওপর নির্ভর করবে যে আপনার ঈদ উদযাপনটা কেমন হবে।
স্বাভাবিক নিয়মেই সব কিছুতেই অগ্রাধিকার থাকবে ক্ষমতাবান ও ধনবানদের জন্য। তাদের প্রয়োজন আকণ্ঠ মিটবার পর যে ছিটেফোঁটা অবশিষ্ট থাকে সেটাই বণ্টন হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসীর জন্য। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে তবু কর্তৃপক্ষ আমাদের কথা চিন্তা করেই কিছু সুবচন ছড়ান, আশার আলো জ্বালান। কিন্তু বাস্তবে ওটাই হবে যা অতীতেও হয়েছে।
অবাক হয়ে ভাবি এত অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশে এহেন অব্যবস্থা থাকবে কেন, পর্যাপ্ত রেলবগি বা নিরাপদ জলযানেরই অপ্রতুলতা থাকবে কেন। বছরের পর বছর ধরে বিনিয়োগ নেই কেন, দেশেই কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থান হয় না কেন? জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তারা মানব পাচারকারীদের প্ররোচনার শিকার হয় কেন?
প্রতিশ্রুতি, প্রলোভন বা প্ররোচনা কি তাহলে একটি ট্রাডিশন যা সমানে চলছে এবং তারই একটি অংশ ঈদ পার্বণে অন্তহীন জনদুর্ভোগ যা শুরু হয় একটি সাবলীল উৎসব উদযাপন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দিয়ে। আর মাত্র দিন দশেক বাকি। এই দিনগুলোও কেটে যাবে। তারপর কে মনে রাখবে কোন অপ্রাপ্তির কথা? দুর্ভোগের দুঃসহ স্মৃতি অন্তরে পুষে রাখা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে অনাগত ভবিষ্যতের জন্যও এই ট্রাডিশন বহাল থাকবে।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলামিস্ট। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনাপ্রধান

Friday, July 10, 2015

পথের কাঁটা অপসারণ করেই এগোতে হবে by এম আবদুল হাফিজ

দেশের উন্নতি বা অগ্রগতি যে ব্যক্তি, মহল বা সরকারের উদ্যোগ বা প্রচেষ্টায়ই তা হোক, যে কোনো দেশপ্রেমিক ও দেশের মঙ্গলাকাক্সক্ষী নাগরিকেরই তাতে উল্লসিত হওয়ার কথা এবং সাধ্যানুসারে সেই প্রচেষ্টায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে শামিল হওয়া দরকার। এই নিবন্ধনকারও দেশমাতৃকার নতুন নতুন গৌরবে বিভূষিত হওয়াতে অনির্বচনীয় পুলক এবং শিহরণ অনুভব করে। আমার মনে হয় এই অনুভূতি সার্বজনীন। সংযুক্ত পাকিস্তানের আমলে খেলায় বিশেষ করে ক্রিকেট, গলফ বা পোলোর মতো অভিজাত ও আন্তর্জাতিক খেলার ভুবনটি পাঞ্জাবি পাঠানদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই ভূখণ্ডের মানুষদের খেলার জগতে ইচ্ছাকৃত বর্জনে আমরা সংযত কারণেই ব্যথিত হয়েছি এবং হীনম্মন্যতায় ভুগেছি। অথচ ক্রিকেটপ্রীতি ও নৈপুণ্য আমাদের আয়ত্তের বাইরে ছিল না। কিন্তু সেই ক্রিকেট কদাচিৎ আমাদের প্রবেশাধিকার ছিল।
পাকিস্তানের অন্যান্য খেলায়ও যখন জাতীয় দল সংগঠিত হতো সেগুলোতেও সংযুক্ত পাকিস্তানের পড়ন্ত বেলায়ও বাঙালিরা অচ্ছুত ও আনাড়িই বিবেচিত হয়ে এসেছে সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। তবে নিখিল পাকিস্তান সামরিক দলগুলোর প্রতিযোগিতায় কিছু কিছু বাঙালির ছিটেফোঁটা অন্তর্র্ভুক্তি দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের কাউকে এমনকি সাঁতার প্রতিযোগিতায়ই খুব একটা দেখা  যেত না। অথচ সেই পঞ্চাশের দশকেই ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সে সময়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিলেন। বর্তমান ক্রীড়াবান্ধব সরকার ক্রীড়া জগতে আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধ্যত্ব ঘুচিয়েছে। আগে যাদের দেশের পশ্চিমাংশেই ক্রিকেট খেলতে বা দেখতে যাওয়াটাই স্বপ্নবৎ ছিল তারা এখন কয়েকটি মহাদেশে পরিব্যাপ্ত ক্রিকেট বিশ্ব চষে বেড়াচ্ছেন। বিশ্বে ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশি অভিবাসীদের বদৌলতে তাদের প্রণোদনা দিতে সুদূর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা ইংল্যান্ডে তাদের দর্শকের অভাব নেই। এদিকে ঢাকাও আর ক্রীড়ামোদীদের নিষিদ্ধ গন্তব্য নয়। বিশ্বের নামি-দামি ক্রিকেট তারকাদের এখন এ দেশে পদচারণা। কিছুদিন আগেই পাকিস্তান ও ভারতের ক্রিকেটাররা খেলে যাওয়ার পর এখন সদলবলে এলো দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বায়িত বিশ্বে প্রত্যেক দেশকেই এখন একটি ব্র্যান্ড হিসেবে বিপণনের বিষয় আছে। সেই কাজটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয় খেলোয়াড়দের মাধ্যমে। আনন্দের বিষয় এই যে, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। অথচ কয়েক যুগ পূর্বেই আমরা তালি বাজানোর দলভুক্ত ছিলাম। পাকিস্তান, ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কানদের ক্রিকেট দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে পছন্দের দলটিকে চিয়ার আপ করতাম।
সে অবস্থা পাল্টে গেছে। কখনো কখনো বিদেশে গিয়ে হোমসিক হয়ে স্বদেশের খবর জানতে উদগ্রীব হই। রাজ্যের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঘেঁটে ঘুঁটে যখনই কোনো সুবেশ চৌকস উপস্থাপক বা পথের কাঁটা অপসারণ করেই এগোতে হবেউপস্থাপিকাকে দেখি বুঝতে পারি এটা অবশ্যই বাংলাদেশের চ্যানেল। পাকিস্তান আমলে আমাদের সর্বোত্তম পরিধেয় ছিল পাজামা ও হাফশার্ট। কলেজে পড়ার সময়েও অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে দেখেছি রোগা-পটকা নগ্নপদ। এখন সে অবস্থা নেই। বুঝতে বাকি থাকে না যে দেশ অনেকটাই এগিয়েছে। আর আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের তো কথাই নেই। এখন তো এ শিল্প অনেক বেশি অগ্রসর। সেই সিকি শতাব্দী পূর্বে নব্বইয়ের দশকে আমি সুইজারল্যান্ডের বার্নভিত্তিক সুইস পিস ফাউন্ডেশনে একটি পরিবেশ গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিলাম। প্রকল্প প্রধান ও তার সেক্রেটারি (পরে স্ত্রী) ম্যারেনের জন্য প্রকল্পের সমন্বয় সভাগুলোর সময়ে কিছু গিফট নিয়ে যেতাম। আমাদের গার্মেন্টস শিল্প তখনো এখনকার মতো বিকশিত হয়নি। তাই তখন একমাত্র ভরসা ছিল আড়ং সামগ্রী, আমার সামান্য আড়ং উপহার সামগ্রীতেই তারা কি যে উচ্ছ্বসিত হতেন। বুঝিয়ে বলতে পারব না। এই আমার দেশ এবং সূচি শিল্পের কদর। আমার এক সন্তান কানাডার নাগরিক। তাকে ও পরিবারকে দেখতে গড়পরতা বছরে একবার সে দেশে যেতে হয়। ফিরে আসলে স্বজন-বন্ধুরা হাপিত্যেস তাকিয়ে থাকত যে কি এনেছি ওদের জন্য ওদেশ থেকে। আমাদের দেশে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রথমবার কিছু কাপড় চোপড় এনেছিলাম। মুখে না বললেও বুঝেছি যে আমার আনা বিদেশি মাল ওদের পছন্দ হয়নি। বরং কানাডায় বসবাসরত আমার সন্তান আমাকে পই পই বুঝিয়েছে যে ওখানে যাই কিনি না কেন সেগুলো অবশ্যই বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি এ বড়জোর চীনা বা তাইওয়ানিজ। বরং আর্মি ওদের জন্য ঢাকা থেকে যাই নিয়ে গিয়েছি, সেগুলোই ওদের পছন্দ। অভিজ্ঞতাই বুঝেছি যে বাংলাদেশে প্রস্তুত গার্মেন্টস ছাড়াও চামরাজাত জিনিস, যেমন জুতা, বেল্ট, ব্যাগ ইত্যাদি অনেক উন্নতমানের।
আজকের বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা খাদ্যের জোগান। স্বাধীনতার প্রাক্কালে আমরা সাত কোটি মানুষ ছিলাম এ দেশে। সাত কোটি মানুষ নিয়েই সে সময়ে আমরা একটি খাদ্য ঘাটতি দেশ অস্তিত্বে এনেছিলাম। ভাবতে অবাক লাগে কোন জাদু বলে ষোলো কোটি মানুষের এখনকার বাংলাদেশ থেকে আমরা খাদ্য রফতানি করি। মনে হয় যেন মহান আল্লাহ তার বারাকাহ এ দেশকে উজাড় করে দিয়েছেন। তাই বলে বাংলাদেশ সমস্যা বিবজিত নয়। আইনশৃঙ্খলার সমস্যা বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বাধিক প্রকট সমস্যা এখন। দেশ রয়েছে নৈতিকতা অবক্ষয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে যেখানে মাদক ও মানবপাচার একই সমান্তরালে অগ্রসরমান। আরো আছে দুর্নীতির সংক্রামক বিস্তার এবং হাজার কোটি টাকার এলিট শ্রেণীর সহাবস্থানে বস্তিবাসী হতদরিদ্ররা। আছে আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। আছে মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যে অপহরণ, বাছবিচারহীন যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ। আরো আছে ক্রমবর্ধমান বিচারবহির্ভূত এবং পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু।
আমরা কি নানাবিধ অপরাধ ও অবক্ষয়ের মোকাবিলা করতে পারি না। যারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে ধাপে ধাপে উন্নয়নের সোপান বেয়ে একটি উচ্চতায় পৌঁছবার উদ্দেশ্যে সামনে ধাবমান তারা অবশ্যই সংকট উন্নয়নের পথ জানেন। আমরা সঙ্গত কারণেই আশাবাদী হতে চাই, থাকতে চাই। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতির সড়ক এখন অনেক প্রশস্ত।
লেখক : সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলামিস্ট। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনাপ্রধান

Tuesday, June 30, 2015

ক্রান্তিকালের কিছু কথা by এম আবদুল হাফিজ

যে কোনো একটি দেশের টিকে থাকা ও অগ্রগতির জন্য অনেক পূর্বশর্ত থাকে। সেগুলোর মধ্যে আমার দৃষ্টিতে অগ্রাধিকার পায় রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা, গ্রহণযোগ্য আইনশৃঙ্খলা ও অনুভবযোগ্য নৈতিক মান। জানি না স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশে আদৌ কি কোনো সময়ে এসবের সমাহার ঘটেছিল? অবশ্য স্বাধীনতাত্তোর প্রতিটি শাসকচক্রের অনুমানে অন্তত তার আমলে তা ঘটেছিল এবং শাসকচক্রটি যথেচ্ছাচারে লিপ্ত হয়েছিল। ট্রাজেডি যে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বয়ং তার অভেদ্যতায় বিশ্বাস করেছিলেন তার শাসনের এক বিপজ্জনক চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে যখনো পর্যন্ত এ দেশকে ঘিরে দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অবসান ঘটেনি। তাকে জীবন দিয়ে তার ভুল না হলেও অসতর্কতার মাশুল পরিশোধ করতে হয়েছিল। অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, সেনা অসন্তোষ ও রক্তপাত পটভূমিকায় এক মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের দৃশ্যপট দখলের মধ্য দিয়ে নাটকের আপাতত পরিসমাপ্তি ঘটলেও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে একাধিক ডাইমেনশনযুক্ত হওয়া ছাড়াও তার বিস্তৃতি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। সবাই ভাবতে শুরু করেন যে, বাংলাদেশের তিনিই দাতা ও ভাগ্য বিধাতা। ক্ষমতার লাগাম সৃষ্টিতে ধারণ অমুক বা তমুক ব্যক্তিরা গোষ্ঠীর কায়েমি অধিকার। এমন পরস্পরবিরোধী দাবির সহজ নিষ্পত্তি নেই বলে এ দেশে স্থান করে নেয় শক্তির এক প্রকার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। তার সঙ্গে যুক্ত হয় ষড়যন্ত্র, অবিশ্বাস এবং পেশিশক্তির প্রয়োগ।
এমনই এক প্রতিযোগিতা ও বিতর্কের ধারাবাহিকতায় জেনারেল মনজুরও খামোকা একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান করেন। ক্ষমতা, বৈভব এবং পদমর্যাদা যদি উদ্দেশ্য হয় তার মতো যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তা দেশ কালের সীমানা পেরিয়ে যে কোথাও তা হাসিল করতে পারতেন এবং একটি ঈর্ষণীয় উচ্চতায় আরোহন করতে পারতেন। দূর এবং নিকটে থেকে আমি তাকে যেটুকু দেখেছি তা আমার মধ্যে এই বিশ্বাসের উৎপত্তি ঘটিয়েছিল। একাত্তরের শুরুতে আশা-নিরাশার দোলাচলে শিয়ালকোটে আমরা এক গুচ্ছ বাঙালি কর্মকর্তা। যতই দিন গড়াচ্ছিল বাড়ছিল উত্তেজনা। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেনি যে, একুশ পিএসএ’র আন্ডার অফিসার, বিদেশের স্টাফ কলেজ থেকে সদ্য ফেরত মনজুর সামরিক পেশাই যার প্যাশন, তিনি তাদের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ হতে পারেন। স্ত্রী-পরিবারসহ গ্যারিশনের প্রেসটিজিয়াস চাবিন্দা কলোনিতে তার নিবাস। কেউ অবাক হয়নি মনজুর যখন সামরিকভাবে বিবেচিত শিয়ালকোটে অবস্থিত ১৪ (প্যারা) ব্রিগেডের সম্ভবত সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিএস পদে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। রাজনীতিবিমুখ, ছাপোষা এবং মধ্যবিত্ত মানসিকতার এই কর্মকর্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ কোনো দুঃসাহসিক পদক্ষেপের নায়ক ভাবা কঠিন ছিল।
ক্রান্তিকালের কিছু কথাপাকিস্তানের টপ ক্লাশের চক্ষু ছানাবড়া যখন আগস্টের এক ভোরে চারদিক থেকে ম্যাসেজ আসতে থাকল যে বিএস সাহেব কো মিলনেহি রহ্যা হ্যায়। অফিসে পৌঁছেই দেখলাম গোটা কতক চপারের ওড়াউড়ি। ঊর্ধ্বতন এক অফিসারের সঙ্গে এক পর্যায়ে মনজুরের বাংলোয় গেলাম যেখানে পূর্বেও বহুবার গিয়েছি। আমার সঙ্গী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বুঝলেন কিনা জানি না আমি মুহূর্তেই আচ করতে পারলাম যে বিহঙ্গ উড়াল দিয়েছে। পূর্বের রাতে তারই কমান্ডারের বিদেশ গমন উপলক্ষে নৈশভোজ দিয়েছিল। প্রচুর হৈহুল্লোড়ের মধ্যে দেশের তৎকালীন নাজুক অবস্থার কথা কারো মনে আসেনি। পূর্ব রাতের অনুষ্ঠানে ব্যবহƒত কোনো কিছুই গোছানো হয়নি। শুধু সব বাড়ি জুড়ে সবকিছু ছিমছাম পড়ে আছে। গ্যারেজে বিদেশ থেকে আনা গাড়ি, ওয়ারড্রোবে থরে থরে সাজানো শাড়ি অলংকার, যত্রতত্র পড়ে আছে মনজুরের শখের ইলেকট্রনিক সব সামগ্রী। শুধু গৃহের বাসিন্দারাই নেই। দুর্গম পথে সীমান্ত পার হওয়ার পথে মনজুরের সঙ্গী পুরো পরিবার-আর্দালী এবং মাত্র ক’মাসের নবজাতক।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পূর্বে ইতোমধ্যেই সেনাপ্রধান ছিলেন। যেহেতু তিনি ফুলটাইম রাজনীতিক হয়েই দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন, তিনি তার সেনাপ্রধানের পদটি তার প্রেসিডেন্সির রক্ষাকবচ হিসেবে রাখতে চাননি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে যেটি একটি প্রবণতা হিসেবে দেখা যায়। সেনাবাহিনীর বেশ কিছু সেনাপ্রধান হওয়ার যোগ্য কর্মকর্তা থাকলেও জেনারেল জিয়ার নজরে পড়েন তার কোনো গুণের জন্য নয়। জিয়া সম্ভবত ভেবেছিলেন যে এরশাদের মতো একজন সেনাপ্রধান থাকলে তার ক্ষমতায় তিনি সম্ভবত ভাগ বসাবেন না। কিন্তু তার অনুমান ভুল ছিল। এরশাদ সাহেব ক্ষমতার লোভ সংবরণ করেনি।
মঞ্জুর অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার কারণ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়ার গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা। তবে সব অভ্যুত্থানই সফল হবে এমন কোনো কথা নেই। মনজুর এরশাদের পথ না আগলালেও মনজুরকে নিয়ে এরশাদের স্বস্তি ছিল না। জিয়া হত্যার তদন্ত কমিশনে আমি একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য ছিলাম। সে জন্যই আঁচ করা সম্ভব হয়েছিল যে মনজুরের হত্যাটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না। এখনো যদি মনজুর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয় এ দেশের এক ক্রান্তিকালের ক্ষমতাকে ঘিরে আবর্তিত অনেক বিষয়ই স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ আছে। সুযোগ আছে দেশের রাজনীতিকে একটি সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার।
লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস ও কলামিস্ট। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Saturday, June 20, 2015

ব্রেটনউড থেকে ডাভোস by এম আবদুল হাফিজ

‘এখন শতকরা এক ভাগ শীর্ষ ধনীর হাতে সব বিশ্ববাসীর অর্জিত সম্পদেরও অধিক সম্পদ।’ ব্রিটেনভিত্তিক চ্যারিটি সংগঠন ‘অক্সফাম’ তাদের এই গবেষণালব্ধ তথ্য সুইস স্কি রেসোর্ট’ ডাভোসে চলমান বিশ্ব ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক অধিবেশনকে জানিয়ে সেখানকার সবাইকে অবাক করেছে। কিন্তু এই অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী প্রায় দেড়শ’ দেশের অবিশ্বাস্য ধনী রাষ্ট্রনায়ক, শিল্পপতি, ব্যবসা- প্রতিষ্ঠানের মালিক, সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্যে নতুন ধারার জন্মদাতা নোবেল লরিয়েট ও জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন পরিবর্তনের সূচনাকারী সেলিব্রিটিরা এবং তাবৎ ব্র্যান্ড ও ফ্যাশন গুরুরা এই তথ্যে অবাক হননি। কেননা তারাই তো প্রকারান্তরে এসব প্রবণতার নেপথ্যে সক্রিয় থাকেন এবং তাদের অবদানের জন্য যা কিছু পাওয়ার তা তারা পেতে থাকেন। এক কথা তারাই এর বেনিফিসিয়ারি।
বিষয়টি বুঝতে একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ব্রিটেন ও তার কিছু পর ইউরোপের অন্যান্য দেশে শিল্প বিপ্লব ঘটলে এবং মুনাফাভিত্তিক পুঁজিবাদের উত্থান হলে তারই সমান্তরালে তা ‘জীবন ব্যবস্থা’ হিসেবে সমাজতন্ত্রকে উসকে দেয়। শুরু হয় উভয়ের মধ্যে একটি অসম প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় ধনতান্ত্রিক বিশ্ব অনেকটা এগিয়ে তার অন্তর্নিহিত শোষণে সমাজতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান মানবিক আবেদন ধনতন্ত্রকে ঘিরে যে জীবন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তার প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিংশ শতাব্দীতে দুটি প্রলয়ঙ্করী বিশ্বযুদ্ধে যদিও আলোচ্য দুই মতাদর্শের স্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি এবং তা নেহায়েত ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর বাজার সম্প্রসারণে ও  প্রভাববলয় বিস্তৃত করতেই সংঘটিত হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ ভাগে এসে মিত্র শক্তি যা মূলত ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক উভয় শিবিরের সমন্বয়ে সংগঠিত হয়েছিল উত্তর শিবিরের অভিন্ন শত্রু হিটলারের দুর্দমনীয় প্রতিপত্তি লিপ্সাকে মোকাবিলায় তাতে ঘটনাচক্রে উভয় শিবিরের দেশগুলোর ‘জাতীয় স্বার্থের’ সংঘাতে চিড় ধরে এবং তারা পরস্পরকে অবিশ্বাস করতে শুরু করে।
জার্মানির নাৎসি নেতা এডলফ হিটলারের থার্ডবাইখের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত হলেও এই দুর্ধর্ষ নেতা মতাদর্শে কম ধনতান্ত্রিক ছিলেন না এবং তার দেশও ছিল শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশগুলোর অন্যতম। তবু ধনতান্ত্রিক বিশ্বের সঙ্গে তার বিরোধ বাধে তার শক্তির অনুপাতে বিশ্ব ব্যবস্থায় তার স্থান নিরূপণ করার দাবি করলে। কিন্তু মিত্র শক্তির অন্তর্গত একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মিত্র শক্তির ধনতান্ত্রিক অংশের সঙ্গে সংঘর্ষ ছিল মতাদর্শগত। তাই মিত্র শক্তির নেতারা ভবিষ্যৎ বিশ্বের রূপরেখা প্রণয়ন করতে সোভিয়েত নেতা স্তালিনের চোখে ধুলো দিয়ে যুদ্ধ সমাপ্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পূর্বেই গোপনে আটলান্টিকের ওপারে পাড়ি জমান। আমেরিকার অঙ্গরাজ্য নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউডে রচিত হয় আগামী দিনের বিশ্ব ব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থাপত্র, যা বাস্তবায়নের জন্য সব আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে অস্তিত্বে না আসলেও সেগুলোরও সব খুঁটিনাটি ব্যবস্থাপত্রে সংযোজিত হয়েছিল। সুচিন্তিতভাবে ব্রেটেনউডে প্রণীত ব্যবস্থাপত্রে বিশ্বব্যাংক বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, বিশ্বায়ন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ক্রমে ক্রমে পরবর্তীতে সেগুলোর অস্তিত্বে আসাও আমরা দেখেছি। ব্রেটনউডেই সম্ভবত আজকে এতদিন পর আমরা যে ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখছি, হাজার কোটি টাকার এলিট শ্রেণী এবং তার গা ঘেঁষেই দেখছি সমাজের তলানিতে আন্ডারডগ ও ছিন্নমূলদের অবস্থান তার ব্যবস্থাও ব্রেটনউডে স্থিরিকৃত হয়েছিল।
ডাভোসে শীর্ষ ধনীদের বিলাসবহুল পুনর্মিলনী এবং ধনতান্ত্রিক বিশ্বকে আপন মর্যাদায় স্থায়িত্ব দেয়ার কৌশল প্রণয়নে ব্রেটনউড মডেলকেই অনুসরণ করা হয়। আমার জানা মতে ডাভোসে অংশগ্রহণকারী একমাত্র সম্ভবত আমাদের দেশের একটি রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের ফসল অস্বাভাবিক ও অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। তিনি সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে ওই সেলিব্রেটি সম্মেলনে গিয়েছিলেন এবং হামিদ কারজাই প্রমুখদের সঙ্গে কাঁধ ঘেঁষাঘেঁষি করেছিলেন। হায়রে সমাজতন্ত্র যাকে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা আন্দোলনের ছাত্র সমাজের চাপে সমাজতন্ত্রের দাবি সংবলিত এগোরো দফা গ্রহণ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির সঙ্গে সংবিধানে স্থান পেয়েছিল। এখন হাজার কোটি টাকার সুপার রিচদের দাপটে সমাজতন্ত্র এ দেশে নির্বাসিত।
তবু সমাজতন্ত্রের বাতি আজো ধিকি ধিকি জ্বলছে সুদূর লাতিন আমেরিকায় ‘সোশ্যাল ফোরামের’ ব্যানারে।  ব্রেটনউডের কাছে সোভিয়েতরা হার মানলেও বিশ্বের কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষ এখনো আশায় বুক বাঁধে এবং সোশ্যাল ফোরামে সংঘবদ্ধ হয় এশিয়ায়, আফ্রিকায় এবং লাতিন আমেরিকায়। তারাও দেখে তারা বলিভিয়ায়, হুগো শ্যাভেজ, চে গুয়েভারা ও ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দেশে।
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলামিস্ট। সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমারের হতবুদ্ধিকর আচরণ by এম আবদুল হাফিজ

২০০৯ সালে হংকংয়ে মিয়ানমারের তৎকালীন কনসাল জেনারেল স্থানীয় গণমাধ্যমে এবং চীনে কর্তব্যরত মিয়ানমারের কূটনীতিকদের বরাবর একটি চিঠি পাঠান। এতে তার (কনসাল জেনারেলের) মিয়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে উদ্বেগের কথা ছিল। সে সময় মিয়ানমারের এই সুবিধাবঞ্চিত, নির্যাতিত এবং এমনকি নাগরিকত্ববিহীন দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা নামক মুসলিম জাতি-গোষ্ঠীর অনাহার-অর্ধাহারে নৌকায় দেশান্তরে আশ্রয় গ্রহণের সংবাদ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল।
হংকংয়ে মিয়ানমারের কূটনৈতিক প্রতিনিধি ইয়েমিন্ট আউং তখন এই বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো সহমর্মিতা সৃষ্টি থেকে স্থানীয়দের বিরত রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি এমনকি তার বর্ণবাদী মনোভাব প্রকাশেও পিছ পা হননি। রোহিঙ্গাদের স্বরূপ উদ্ঘাটনে তাদের সম্পর্কে আলোচ্য কূটনীতিকের বক্তব্য ছিল বেদনাদায়ক। তার ভাষায় রোহিঙ্গারা ‘রাক্ষুস সুলভ এক কুৎসিত জীব।’ তাদের চর্মবর্ণ এবং পেলবতা মিয়ানমারের অন্য অধিবাসীদের অনুরূপ নয়। সুতরাং তারা মিয়ানমারিজ বলে অভিহিত হতে পারে না। তারা কোনো এক সময় কোনোভাবে মিয়ানমারে অনাধিকার প্রবেশ করে থাকবে। তাই তাদের দেশের নাগরিক অধিকার দেয়া যায় না।
এরপর প্রায় অর্ধযুগ কেটে গেছে। মিয়ানমারের রাজনীতিতেও এসেছে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন। মিয়ানমার আর আগের মতো রাজনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় নেই। সামরিক জান্তা দীর্ঘদিন পর দেশে নামকাওয়াস্তে হলেও গণতন্ত্রের কিছু প্রতীকী প্রত্যাবর্তনে সম্মতি দিয়েছে। দীর্ঘ গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে গণতন্ত্রপন্থি নোবেল বিজয়ী অং সান সুচিকে। কিন্তু রোহিঙ্গা যে মানবেতর দুরবস্থায় ছিল তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো তারা রাষ্ট্রহীন অবহেলিত জনগোষ্ঠী। জাতিসংঘের দৃষ্টিতে ‘রোহিঙ্গারা বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক নিগৃহীত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।’
এদের সংখ্যা আনুমানিক ১৩ লাখ যাদের অধিকাংশই মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ, যা দেশের পশ্চিম প্রান্তে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন সেখানেই বাস করে এবং জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর নিরন্তর প্রচেষ্টায় থাকে। রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেয়ার জন্য জাতিসংঘের সাম্প্রতিক আহ্বান মিয়ানমার সরকারের বৈরিতায় কোনো ফল বয়ে আনতে পারেনি। বরং ক্রুদ্ধ রোহিঙ্গাবিরোধী মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশজুড়ে। সরকারের ইতোপূর্বে রোহিঙ্গাদের যে কিছু অস্থায়ী সুযোগ-সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা ছিল, সেগুলোও বাতিল করতে দাবি উঠেছে নতুন করে। একটি বিশ্বজনীন ধারণা যে, বৌদ্ধরা অহিংসাবাদী ধর্মের ধারক। সেই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে মিয়ানমারের কট্টর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই ঘূর্ণায়মান রোহিঙ্গাবিরোধী অসন্তোষের বার্তাবাহক। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের একটি অংশ রোহিঙ্গাদের অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী বলে অভিহিত করে। যদিও যুগ যুগ ধরে রোহিঙ্গাদের পূর্বপুরুষরা মিয়ানমারেই বসবাস করে এসেছে।
রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমারের হতবুদ্ধিকর আচরণঅশ্বিন ভিরায়ু নামের এক বৌদ্ধ ধর্মগুরু উগ্রজাতীয়তার দোষে দুষ্ট, যার বক্তব্যের কুখ্যাতি আছে তিনি দুর্ভাগ্যক্রমে ‘টাইমস’-এর মতো পত্রিকার আন্তর্জাতিক সংরক্ষণের প্রচ্ছেদে স্থান লাভ করেন। ঞরসবং তাকে ‘ঞযব ঋধপব ড়ভ ইঁফযরংঃ ঞবৎৎড়ৎ’ বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ভিরায়ু নিজেও নিজকে মিয়ানমারের বিন লাদেন বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন এবং উন্মত্ত রেটোরিকে মিয়ানমারের মুসলিমদের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে। এই যখন মুসলমানদের অবস্থা, সেই তাদের একটি ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর ভাগ্যলিপি কী হতে পারে। তবু এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাল ছাড়ার কোনো অবকাশ নেই। রোহিঙ্গা এপিসডের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো রোহিঙ্গাদের অমানবিক মানবাধিকার লঙ্ঘনে একদার গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নেত্রীর নীরবতা। অথচ অং সান সু চির চরম দুর্দিনে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে গোটা বিশ্বের মুসলমান দেশগুলোও তার মুক্তির দাবি জানিয়েছিল। রোহিঙ্গারা ক্রমেই বিতারিত হচ্ছে মিয়ানমার থেকে। তারা নানা রকম জীবন বৈরী আচরণের শিকার হচ্ছে এবং ক্রমেই বিপন্ন-বিপর্যস্তদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। জীবিকার তাগিদে তারা শরণার্থী শিবিরে থেকেও বেছে নিচ্ছে ভয়ঙ্কর সব পিচ্ছিল পথ। বর্তমান সময়ে মানবপাচারের যেসব চিত্র ক্রম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পাশাপাশি বহুবিধ প্রশ্ন দাঁড় করাচ্ছে এবং বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃতদের মধ্যে তাদের অংশটা কম নয়। আবার তাদের অনেকেই এ দেশে নানাভাবে নাগরিকত্বও নিয়ে নিয়েছে এমন অভিযোগও আছে। আগেই লিখেছি ইতোমধ্যে মিয়ানমারের কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু মিয়ানমারের ইতিবাচক পরিবর্তনের স্পর্শ রোহিঙ্গারা পায়নি। তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও শাসক শ্রেণীর পাল্টায়নি। অং সান সুচির চরম দুর্দিনে যারা তার পাশে দাঁড়িয়েছিল তিনিও তাদের জন্য তেমন কোনোই অবদান রাখতে পারছেন না। তিনিও এ ক্ষেত্রে বড় বিস্ময়করভাবে নীরব। রোহিঙ্গাদের জীবনে এমন করুণ পরিণতির ব্যাপারে বিশ্ব বিবেকের সাড়াও তেমন জোরদার নয়। এমতাবস্থায় তাদের চূড়ান্ত পরিণতি কী এটি বড় একটি প্রশ্ন হয়েই আছে।
লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস ও কলামিস্ট। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Wednesday, July 23, 2014

বিএনপি কি রাজনীতির মূল মঞ্চে ফিরতে পারবে? by এম. আবদুল হাফিজ

দেশের রাজনীতিতে এক সময়ের চমক সৃষ্টিকারী বিএনপি এখন আর তার আগের অবস্থানে নেই। দলটি এখন বড়জোর একটি বড় রাজনৈতিক সংগঠন। এখন তার আর অন্য কোনো পরিচিতি নেই- না সরকারে, না বিরোধী দলে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি কি আবার জাতীয় রাজনীতিতে তার গৌরবের স্থানটি পুনরুদ্ধার করতে পারবে? অনেকে ঢালাওভাবে বলে থাকেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপির আজকের এ দুরবস্থা হতো না। কথাটি বিতর্ক সাপেক্ষ। ক্ষমতাসীনদের দুরভিসন্ধিমূলক নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি হয়তো বেশ কিছু আসনে জয়লাভ করত। কিন্তু সরকার গঠনের মতো আসন সংখ্যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটই পেত। কারণ আওয়ামী লীগকে জেতানোর পরিকল্পনা নিয়েই সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। ক্ষমতাসীন সরকারের হাতে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা এবং একটি আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন গঠন- এসবই একটি পকিল্পিত ছকেই সম্পন্ন হয়েছিল। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার জন্য আওয়ামী এক সময় প্রাণপাত করেছিল, ইতিমধ্যেই তার অপমৃত্যু ঘটেছিল।
এ প্রেক্ষাপটে আপসহীন বলে পরিচিত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তার তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে অনড় থেকে নির্বাচনে গেলেন না। গেলে কী হতো এবং না গিয়ে কী হয়েছে, সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং তার নির্বাচনে না যাওয়ার কী খেসারত দিচ্ছে বিএনপি, তা তো দেশবাসীই দেখছে। মামলা-মোকদ্দমায় ফেঁসে থাকা দলের শত শত নেতাকর্মী গ্রেফতার ও নির্যাতনের ভয়ে যেখানে প্রকাশ্যেই আসতে পারছেন না, সেখানে আপসহীন নেত্রীর আন্দোলনের হুংকার হয়তো হাস্যকর মনে হবে। তবে আমার বিশ্বাস, গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার একটি অদৃশ্য চালিকাশক্তি আছে। তা না হলে আড়াই হাজার বছর ধরে নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে গণতন্ত্র কীভাবে আজও টিকে আছে? এই বাংলাদেশেই আগেও গণতন্ত্রে পচন ধরেছিল এবং জাতির জনককে তা পরিহার করে উদ্ভট মতবাদের এক একদলীয় বাকশাল প্রবর্তন করতে হয়েছিল। শাসন কাজে অনভিজ্ঞ বঙ্গবন্ধু কোনো কূলকিনারা না করতে পেরে ক্ষমতার কর্তৃত্বকে কুক্ষিগত করতেই বাকশালের পথে পা বাড়িয়েছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। তার পরিণতি আমরা সবাই জানি।
আজকের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আওয়ামী লীগের অবস্থা পঁচাত্তরের ট্রাজেডির পর ছিল আরও করুণ। বঙ্গবন্ধুর জীবিত দুই কন্যা তখন ভারতের আশ্রয়ে। সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত এবং তেহাত্তরের নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত অনেক জাঁদরেল নেতা তখন অবশিষ্ট থাকলেও পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের গোলকধাঁধা কেটে গেলে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনর্বহাল হলে আলোচ্য আওয়ামী লীগ নেতারা পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে খাপ খাওয়াতে অক্ষমতা দেখিয়েছেন; উপরন্তু তখন তারা আন্তঃউপদলীয় কোন্দলে লিপ্ত। প্রায় আধা ডজন আওয়ামী লীগ নেতার নামের ব্র্যাকেটবন্দি উপদলগুলো রাজনীতি নয়, কাদা ছোড়াছুড়িতেই তখন ব্যস্ত।
নব্বইয়ের দশকে দেশ সামরিক শাসনমুক্ত হওয়ার পর ক্ষমতাসীন অধিক আÍবিশ্বাসী খালেদা জিয়া যখন রাজনীতির অঙ্গনে কিছু ভুল পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন, শুধু তখনই ক্ষমতার দরদালান থেকে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর প্রকাশ্য জনসভায় সদাচরণের কিরা-কসম খেয়ে এরশাদের ওপর ভর দিয়ে কোনোমতে ক্ষমতায় ফেরে।
পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক আনুগত্যের পর জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন এবং সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের লাগাম টেনে ধরেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতাপশালী আওয়ামী লীগ তখন রাজনীতির এক প্রান্তিক অবস্থানে। এরপরই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল আÍপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা অক্ষুণ্ন রেখেই বলছি, জিয়ার মাত্র অল্প কবছরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ তো বটেই, সারা মুসলিম বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাদের ভাগ্যাকাশে এক সোনালি অরুণোদয় দেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দৃশ্যপটে আবির্ভূত বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের জনক এই নেতাকে আমি এর আগে আমার দুই দশকের চাকরি জীবনে দেখিনি। অথচ তিনি ছিলেন আমার নিজ জেলা বগুড়ার আমার গাবতলী থানারই সন্তান।
প্রশংসা ও প্রচারবিমুখ এ নেতাকে প্রথম দেখি যশোর সেনানিবাসে। সেনাসদরে এ স্পষ্টভাষী রাজনীতিবিমুখ মেজর জেনারেল জিয়া তখন তারই জুনিয়র মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর অধীনে আর্মির ডেপুটি চিফ। সেনাবাহিনীর মূল স্রোত থেকে এ মেধাবী কর্মকর্তাকে সরিয়ে রাখতেই এ ব্যবস্থা। ডেপুটি চিফ হিসেবে তার দৃশ্যমান একটি কাজই দেখেছি- তা হল দেশের ক্যাডেট কলেজগুলোর তদারকি। সেই সুবাদেই তিনি তখন যশোর হয়ে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে যেতেন। ৫৫নং পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর আমি কখনও কখনও তাকে বিমানবন্দর থেকে সেনানিবাসে এনেছি।
একপর্যায়ে জিয়া যখন সেনাপ্রধান হলেন, দেশের ভবিষ্যৎ সেনাবাহিনীর রূপরেখা নিয়ে কম্বাইন্ড আর্মস স্কুলে (বর্তমানে বিলুপ্ত) তিনি একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানে বেশ কিছু জেনারেলের সান্নিধ্যে এসেছি, কিন্তু আমাকে স্বীকার করতেই হবে, জিয়া প্রদত্ত যশোরের ভাষণটি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তবু জিয়ার কঠোর প্রকৃতি, স্বল্পভাষী স্বভাব ও গাম্ভীর্য আমার কদাচিত ভালো লেগেছে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে তার বৃহত্তর কর্মপরিসরে চলে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্ব না দিলেও তিনি আলবৎ জানতেন ভারতসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের স্পর্শকাতরতা, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে আমাদের বিশেষ সম্পর্কের কথা।
সত্যি কথা বলতে কী, জিয়া শাসনের মেয়াদে একটি আধুনিক, সম্মুখ দৃষ্টি ও কর্মতৎপর বাংলাদেশের অবয়ব অস্তিত্বে আসতে থাকে। আওয়ামী লীগ তখনও রাজনৈতিকভাবে অগোছালো এবং পঁচাত্তরের জের ধরে বিমূঢ়। নানা স্তরে বিভক্ত জিয়া শাসনামলেই অস্তিত্বে এলো বিএনপি। অনেক আওয়ামী লীগ নেতা সে সময় বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। আরও অধিক দলছুট আওয়ামীরা যোগ দিয়েছিলেন এরশাদের দলে। আমি নিশ্চিত, এ দেশে যদি আর নতুন কোনো ক্ষমতাসীন দলের উদ্ভব ঘটে, আওয়ামীরাই তার নেতানেত্রী ও কর্মীবাহিনীর জোগান দেবে।
রাজনীতিতে উত্থান-পতন আছে। এ দেশেও আমরা তা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সীমাবদ্ধ দেখেছি। আরেকটি অপ্রিয় সত্য এ দেশ সম্পর্কে প্রযোজ্য। ক্ষমতার পালাবদল এ দেশে কদাচিত মসৃণ হয়েছে। বৈধভাবে সাংবিধানিক পথেই ক্ষমতার মসনদে একবার আসীন হলে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার প্রতি আসক্তি এত বেড়ে যায় যে, তখন তাদের প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি ওঠে। এই ঝাঁকুনিটিই হল আন্দোলন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই সেটা করেছে। তবে এ কাজটিতে আওয়ামী লীগ অনেক বেশি পারদর্শী। ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের অস্তিত্বের বেশির ভাগ সময় জুড়ে ছিল আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, শিক্ষা-সংস্কৃতির আন্দোলন, ছয় দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ। আন্দোলনের কলাকৌশল দলটির নখদর্পণে। অষ্টম সংসদের মেয়াদের গোটা সময় জুড়ে-এক-এগারো সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত- আওয়ামী আন্দোলনের মাঝে জীবনপণ আন্দোলনের নমুনা আমরা দেখেছি। তখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। এখন আওয়ামী লীগের মতো আন্দোলন গড়ে তোলা এবং তা প্রতিহত করার আওয়ামী শক্তির সামনে বিএনপির সরকার পতনের হুমকি একেবারেই শূন্যগর্ভ।
বিএনপি ও তার নেতৃত্বের রাজনীতি করার প্যাটার্ন সম্পূর্ণ আলাদা। আন্দোলন কোনো দিনই বিএনপির বৈশিষ্ট্যসূচক গুণ ছিল না, এখনও নেই। তাছাড়া অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর আওয়ামী লীগের শক্তি ও অভিজ্ঞতা বেড়েছে। তেমনিভাবে অনেক প্রতিকূলতা, দুর্বল নেতৃত্ব ও রাজশক্তির দাপটে বিএনপি আগের চেয়ে অনেক চুপসানো। তবে শেষমেশ এ দেশের রাজনীতিতে উভয় দলের টিকে থাকার স্বার্থে যৌক্তিক পথ অবলম্বন করতে হবে।
দুর্বলরা সব সময়ই অহেতুক উত্তেজনা ও আতংকে ভোগে। বিএনপিকে সেটা কাটিয়ে উঠতে অনেক কথাই বলতে হবে। কিন্তু উভয়ের মধ্যে সৃষ্ট সংকটের জট খোলার চাবিকাঠি আওয়ামী লীগের হাতে। একটি বিতর্কিত নির্বাচনে জিতে দলটির উচ্চাশা ও ক্ষমতার আসক্তি অনেক বেড়ে গেছে। তবে অগ্রজ রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে অবশ্যই বুঝতে হবে, এভাবে চিরদিন চলতে পারে না। এটা অবশ্যই গণতন্ত্র নয়। অথচ তার সাময়িক রাজনৈতিক বিপথগমন (Political aberration) বাদ দিলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আজীবন স্বপ্নই ছিল গণতন্ত্র। ভিন্নমত, ভিন্নপথ ও সেগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা তো গণতন্ত্রেরই দীক্ষা। তাই তার চর্চা এবং নির্বিঘ্ন ভোটাধিকার ক্ষমতাসীনদেরই নিশ্চিত করতে হবে।
আন্দোলন করে বিএনপি সরকারের পতন ঘটাবে এটি প্রলাপোক্তি। তাই বলে ক্ষমতাসীনরাও পরিতৃপ্ত হয়ে বসে থাকতে পারে না। রাজনৈতিক প্রলয় যদি একটা ঘটেই, উভয়ের কেউই তা থেকে অক্ষত থাকবে না।
এম আবদুল হাফিজ : রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লষক

Friday, July 12, 2013

বিপজ্জনক সড়ক by এম আবদুল হাফিজ

রাজনীতির চলমান ডামাডোলের মধ্যে প্রসঙ্গটি প্রায় হারিয়েই গেছে। অতীতে মাঝে মধ্যেই এ নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক নতুন মাত্রা নিয়ে হাজির হতো উদ্বিগ্ন এ দেশের মানুষের কাছে, যারা রাজপথে বা মহাসড়কে নগ্নভাবে নিরাপত্তাহীন।

Wednesday, July 10, 2013

বহে কাল নিরবধি-গণতন্ত্রের দুঃসময় by এম আবদুল হাফিজ

দেশে এ মুহূর্তে একটি ভয়াবহ সংকট বিরাজ করছে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে 'কার অধীনে কিভাবে দশম সংসদের নির্বাচন হবে'- এমন প্রশ্নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব চিহ্নিত করা হলেও সামষ্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে তা এ দেশের গণতন্ত্রের সংকট বলেই প্রতীয়মান হয়।

Wednesday, July 3, 2013

বহে কাল নিরবধি-শুভবুদ্ধির জয় হোক by এম আবদুল হাফিজ

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আওয়ামী লীগের ক্ষয়িষ্ণু জনপ্রিয়তা, যার একাধিক উপসর্গ এখন দৃশ্যমান। আমরা যাঁরা অহরহ নানা ধরনের 'পাবলিকের' সঙ্গে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় মিশি কিংবা আমাদের মধ্যে যাঁদের মিশতে হয় এবং যাঁদের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ শুধু বাসি হলেই ফলে,

Thursday, June 20, 2013

বহে কাল নিরবধি-পরিহাসের আইন by এম আবদুল হাফিজ

সম্প্রতি সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধিত হয়ে সংসদে পাস হয়েছে। এটা জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষার্থে বিধায় জনগণের কল্যাণে করা হয়েছে বলে সরকারপক্ষ আইনটির সাফাই গেয়েছে; কালো আইন আখ্যা দিয়ে বিরোধিতা করে বিরোধী দল আইনটি কণ্ঠভোটে গৃহীত হওয়ার সময় ওয়াকআউট করেছে।

Saturday, June 1, 2013

অভিনন্দন সমকাল by এম আবদুল হাফিজ

ঊনবিংশ শতাব্দীর স্কটিশ ইতিহাসবিদ টমাস কার্লাইলের বিখ্যাত একটি উক্তি অনুযায়ী সংবাদমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ এস্টেট। অন্যগুলো নৃপতি স্বয়ং এবং পার্লামেন্টের দুটি কক্ষ। এই ব্যাখ্যা পূর্বেও আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট জেফারসন কর্তৃক স্বীকৃত।

Saturday, May 11, 2013

ঝড় উঠেছে বৈরী বাতাস by এম আবদুল হাফিজ

আমাদের অতীত কখনও সংকটমুক্ত বা সমস্যা-বিবর্জিত ছিল না। একটি রক্তস্নাত স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বে এনেছিল বিশ্বের অন্যতম হতদরিদ্র দেশ হিসেবে। যেদিকেই তাকাই আমাদের জন্য প্রীত হওয়ার মতো ইতিবাচক কিছুই নেই। আছে শুধু রোগ-শোক, ক্ষুধা, জরা, মন্বন্তর এবং একটি মারাত্মক বৈরী জলবায়ুর অশনিসংকেত।

Sunday, February 3, 2013

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ-অস্ত্র না অ্যালবাট্রস! by এম আবদুল হাফিজ

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার জন্য নিয়মিত পেশাদার সামরিক বাহিনীর ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে আওয়ামী নেতৃত্ব যখন জাতীয় রক্ষীবাহিনী নামক একটি দলীয় বাহিনী সৃষ্টি করে, তখনই বোঝা গিয়েছিল যে আজকের আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে অস্ত্র সজ্জিত করার পেছনে কতটা আন্তরিক।

বহে কাল নিরবধি-বহুরূপী বর্ণচোরা ধর্মব্যবসায়ীরা by এম আবদুল হাফিজ

২০০৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের এক আলোচনা সভায় মূল নিবন্ধের তিনজন আলোচকের অন্যতমরূপে আমি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। আওয়ামী লীগ-সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে আমি আমার অনুজপ্রতিম জেনারেল মুস্তাফিজের সঙ্গে পরামর্শ করতাম।

Sunday, January 20, 2013

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ-ঘরে-বাইরে আপদ by এম আবদুল হাফিজ

নিবিড় নিরাপত্তাবোধ নিয়ে নিজ বাসভূমে সহজাত মনস্তাত্তি্বক স্বস্তিতে বাস করার আনন্দ কবেই উবে গেছে এ দেশে গুম, নিখোঁজ বা অপহরণের উপসর্গের মধ্য দিয়ে। এই শব্দমালার সঙ্গে আমরা প্রথম পরিচিত হই পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী ভূমিকায়।

Saturday, January 5, 2013

বর্ষবরণ by এম আবদুল হাফিজ

মাত্র ক'দিন আগে চরম উন্মাদনার মধ্য দিয়ে জীর্ণ-পুরনোকে ঝেড়ে ফেলে ২০১৩ সালের বর্ষবরণ হলো। অন্তত গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সেইভাবেই কালের এই পরিবর্তনকে উপস্থাপন করেছে।

Tuesday, January 1, 2013

নিঃসঙ্গ বলদর্পী এক আমেরিকা by এম আবদুল হাফিজ

যুক্তরাষ্ট্র নিজকে বিশ্ব মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন আখ্যায়িত করে; কিন্তু তার অন্যের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার নীতি ও প্রবণতা তাবৎ বিশ্বে যা নিখুঁতভাবে নিয়ে এসেছে তা শুধুই ধ্বংস, দুর্ভোগ, স্বেচ্ছাচার এবং নৈরাজ্য।

Saturday, December 29, 2012

ডেমাক্লিসের তরবারি! by এম আবদুল হাফিজ

অহর্নিশ ঝোলানো ডেমাক্লিসের তরবারি ঝুলে থাকে আমাদের গর্দানের ওপর আতঙ্ক ও অস্বস্তির মিশ্রণে। টানাপড়েনের সংসার যৎসামান্য পেনশনের টাকায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে। মাসওয়ারি খরচার হিসাবে কোনো তারতম্যের সুযোগ নেই।

Thursday, December 27, 2012

সম্ভাব্য সংকটের মুখে কিছু দেশচিন্তা by এম আবদুল হাফিজ

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন মহাজোট তার মেয়াদের চার-পঞ্চমাংশ সময় সম্প্রতি অতিক্রম করেছে। যদিও তাদের আগামী নির্বাচনের কাউন্টডাউন অনেক আগেই শুরু হয়েছে।

Saturday, December 22, 2012

মেগালোম্যানিয়া! by এম আবদুল হাফিজ

আমার এক অতি প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিভিন্ন মহল থেকে বিতর্কিত হতে দেখে আমি দুঃখ পাই। ডক্টর আলমগীরকে অত্যন্ত কাছে থেকে দেখেছি এবং পরিবারগতভাবে তার সঙ্গে কিছু সুখস্মৃতিবিজড়িত হয়ে আছে। এক-এগারোর পর তিনি শুধু গ্রেফতারই নয়, নির্যাতিত হয়েছিলেন।