Tuesday, March 22, 2016

উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ by হায়দার আকবর খান রনো

সর্বমানবের কল্যাণের জন্য উন্নয়ন যে দরকার, এ কথা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবেন না। আর আধুনিক যুগে বিদ্যুৎ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। এমনকি বিশ শতকের গোড়ার দিকে যখন সারা বিশ্বে বিদ্যুতের প্রচলন এতটা হয়নি, তখনই নতুন শোষণহীন সমাজব্যবস্থার প্রবর্তক লেনিন কমিউনিজমকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে—সোভিয়েত প্লাস ইলেকট্রিসিটি। সোভিয়েত ছিল শ্রমিকশ্রেণির নতুন ধরনের সমাজব্যবস্থা। কিন্তু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। পার্থিব উন্নয়নও দরকার। সে জন্য দরকার বিদ্যুৎ।
কিন্তু যে কথাটি এখন এসেছে, এমনকি সেই এক শ বছর আগেও কমবেশি এসেছিল, তা হলো উন্নয়ন কি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে? মানবজীবনের অস্তিত্বের জন্য যে প্রাকৃতিক পরিবেশ একান্তভাবেই প্রয়োজনীয়, তাকে ধ্বংস করে কি প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে?
গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে সোভিয়েত সরকার বিদ্যুৎ, ভারী শিল্প তথা উন্নয়নের যে বিশাল কর্মকাণ্ড হাতে নিয়েছিল, তার তুলনা এখনো ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। অনেক সোভিয়েতবিরোধী লেখক বলছেন, তখনকার সোভিয়েত সরকার ব্যাপকভাবে পরিবেশ ধ্বংস করেছিল। কথাটা সত্য নয়। এ কথা ঠিক যে তখনো আজকের মতো পরিবেশসচেতনতা তৈরি হয়নি। কিন্তু সেই সময় বনাঞ্চল, জলস্রোত ইত্যাদি রক্ষার জন্য সোভিয়েত সরকারের যে ধরনের তাগিদ ছিল, তা তখনকার পৃথিবীতে অন্য কোথাও দেখা যাবে না। ২০১০ সালে মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক স্টিফেন ব্রেইন ‘স্তালিনের পরিবেশবাদিতা’ শীর্ষক এক গবেষণা নিবন্ধে দেখিয়েছেন, স্তালিন প্রশাসন বড় ও ভারী শিল্পের ওপর জোর দিলেও পরিবেশ রক্ষার চিন্তাটাও একই সঙ্গে ছিল। সে জন্য বন বিভাগের দায়িত্ব শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে বন শ্রমিকদের ইউনিয়নের ওপর দেওয়া হয়েছিল।
বরং অন্যদিকে দেখা যায় যে সমাজতন্ত্রীদের আদি তাত্ত্বিক গুরু ও দার্শনিক কার্ল মার্ক্স অভিযোগ করেছেন যে পুঁজিপতিরা কেবল মুনাফার লালসায় প্রকৃতির ধ্বংসসাধন করে থাকে। মার্ক্সের বিখ্যাত রচনা পুঁজি গ্রন্থে (প্রথম খণ্ডে) বলা হয়েছে, ‘পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রযুক্তির বিকাশ ঘটায় এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে যুক্ত করে...(কিন্তু) ধ্বংস করে সকল সম্পদের আদি উৎস—মাটি ও শ্রমিককে।’ তিনি মাটি ধ্বংসের বিষয়টিও উল্লেখ করছেন।
আমরা এখনো দেখছি, তাৎক্ষণিক মুনাফা ও সর্বোচ্চ মুনাফার তাগিদে করপোরেট পঁুজি প্রকৃতিকে কীভাবে ধ্বংস করছে, যা মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে। অতীত ইতিহাস এবং বিশ্ব পরিসর ছেড়ে আসা যাক বর্তমান সময়ে এবং বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। আমরা দেখেছি কীভাবে কিছু দুর্বৃত্তের লোভ ও দখলদারি মনোবৃত্তির কারণে নদী দখল হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক জলাশয় (অথবা স্থায়ীভাবে জলমগ্ন থাকছে বিস্তীর্ণ জনপদ) দূষিত হচ্ছে বাতাস, মাটি, পানি। এসব বিষয় রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে। সেসব বিষয় নিয়েও আপাতত আলোচনায় যাচ্ছি না। আজকের বিষয়বস্তু সুন্দরবনের গা ঘেঁষে রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প।
এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছে। কয়েকটি বামপন্থী দল প্রতিবাদ হিসেবে ১০ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা থেকে রামপাল অভিমুখে লংমার্চ করেছে। তাদের দাবি, তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প রামপাল থেকে সরাও, কারণ সুন্দরবন ধ্বংস হবে। ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ নামে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী পরিবেশবাদী ও সমাজকর্মীর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি সংগঠন। তঁাদেরও একই দাবি।
সুন্দরবনের গা ঘেঁষে রামপালে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা পিডিবি ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সব রকম ন্যায্য প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করেই সরকার এই প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। এর প্রাথমিক পুঁজির ১৫ শতাংশ করে দেবে ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিটি ও বাংলাদেশের পিডিবি (মোট ৩০ শতাংশ)। বাকিটা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহ করা হবে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, তার বড় অংশ আসবে ভারত থেকে চড়া হারে সুদে ঋণ আকারে। সুদের হার হবে ১৪ শতাংশ। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি ও সরবরাহকারীর কাজও পাবে ভারতের বিভিন্ন কোম্পানি। যাই হোক, আমরা এখানে অর্থনৈতিক লাভ-লোকসানের চেয়ে বেশি করে দেখব পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি।
রামপালের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মিত হবে সুন্দরবনের একেবারেই গা ঘেঁষে ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে। বাফার জোন ধরলে এই দূরত্ব আরও কম হবে। একই ভারতীয় কোম্পানি পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চেয়েছিল। ভারত সরকার অনুমতি দেয়নি। ভারতের ‘তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন-সংক্রান্ত গাইডলাইন ১৯৮৭’, ভারতের ‘ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২’ এবং ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘পরিবেশ সমীক্ষা (ইআইএ) গাইডলাইন ম্যানুয়াল ২০১০’ অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য, জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান, জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি এলাকার ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ নির্মাণ করা যাবে না। একই কারণে ভারত সরকার তামিলনাড়ু, কর্ণাটক ও মধ্যপ্রদেশে এ ধরনের তিনটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেয়নি। ভারতের এনটিপিটি সুন্দরবনের গা ঘেঁষে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছে জেনে পরিবেশসচেতন নরওয়ে সরকার ২০১৪ সালেই ওই কোম্পানির জন্য দেয় ৪৩০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।
শুধু রামপালই নয়। ওরিয়ন নামে একটি দেশীয় কোম্পানি সুন্দরবনের আরও কাছে অনুরূপ আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ করতে চলেছে, যেখান থেকে ৬৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বলে জানানো হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূলবর্তী বাঁশখালী উপজেলায় একটি ঘনবসতি এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কাজ চলছে। এতে জনবসতি উচ্ছেদ হবে। পরিবেশও দূষিত হবে। সেখানকার মানুষ প্রতিবাদ-সংগ্রাম গড়ে তুলেছে। কিন্তু তা নীতিনির্ধারকের কানে প্রবেশ করছে না।
আবার মূল প্রশ্নে ফিরে আসি। তাহলে কি আমাদের বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নয়। দ্বিতীয়ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিকল্প কি নেই? অবশ্যই আছে। বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞরা, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা বলছেন আছে। দুটো প্রশ্নই বিবেচনা করা যাক।
সরকার বলছে, রামপালে এমন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হবে যাতে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কথাটা সত্য নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আধুনিক প্রযুক্তি বড়জোর ১০ শতাংশ ক্ষতি কমাতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে সিলেটের সিমেন্ট কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন দিয়েছে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় যে ছাই ছিটকে পড়বে তা সিমেন্ট তৈরির কাজে ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাই প্রোডাক্ট হিসেবে যদি সিমেন্ট পাওয়া যায়, সে তো ভালো কথা। কিন্তু ছাই দিয়ে সিমেন্ট করা গেলেও তা সুন্দরবনের গাছ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য যে মারাত্মক ক্ষতিকর হবে, সে কথা কি ভুলে যেতে হবে?
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সবচেয়ে বেশি দূষিত বর্জ্য তৈরি করে। পরিবেশকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। কয়লা থেকে উদ্গিরণ হয় কার্বন-ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোড্রাইড, সালফার-ডাই অক্সাইড ইত্যাদি যা গাছপালা, জীবজন্তুকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কার্বন-ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে এক শ বছর টিকে থাকে এবং তা ভূ–প্রকৃতিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে। এখন যদিও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিশ্বে কয়লাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, তবু উন্নত বিশ্বে কয়লা থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। শিল্পোন্নত জার্মানিতে বাতাসের গতির ওপর নির্ভরশীল ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রচলন খুব বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। এ কথা সত্য যে পাশ্চাত্যের করপোরেট পুঁজিই সর্বোচ্চ মুনাফার লোভে পরিবেশ বিনষ্ট করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও সত্য যে সেই দেশের মানুষও অধিক পরিবেশসচেতন হয়ে উঠেছে। ইউরোপ, আমেরিকায় এমনকি ভারতেও কিছুতেই জনগণ সুন্দরবনের মতো বন ঘেঁষে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প হতে দিত না।
পরিবেশবাদীরা নিশ্চিত যে এই প্রকল্প সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে। কয়লার ছাই ও ধোঁয়ায় গাছপালা, জীবজন্তুর ক্ষতি হবে। নদীর পানি দূষিত হবে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যাবে। আমাদের ভুললে চলবে না যে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে জাহাজডুবিতে নদীর পানি কী পরিমাণ দূষিত হয়েছিল। বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বাইরে থেকে জাহাজে করে কয়লা আসবে। সেই কয়লা কি নদীতে পড়বে না? ২০১৪ সালের মতো দুর্ঘটনা কি আরও হতে পারে না? এত ঝুঁকি নিয়ে রামপালে বা মংলায় বিদ্যুৎ প্রকল্প না করে দূরে কোথাও করলে অসুবিধা কী? হয়তো পরিবহন খরচ বাড়বে।
খরচ বাঁচানোর জন্য, কোম্পানির লাভের জন্য কি সুন্দরবন তথা পরিবেশের এত বড় ক্ষতিসাধন করতে হবে? হায়রে মুনাফা! মার্ক্স যথার্থই বলেছিলেন, পুঁজিপতিরা ৩ শতাংশ হারে মুনাফার সন্ধান পেলে এমন কাজ করতে বিরত হবে না, যে কাজে তার ফাঁসি হওয়ার আশঙ্কা পর্যন্ত থাকে! (পুঁজি প্রথম খণ্ড)।
দ্বিতীয়ত কয়লার বিকল্প কি নেই? বাংলাদেশ সরকারের পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক এনার্জি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতউল্লাহ্ বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যে কয়লার বিকল্প আছে। এবং সেগুলো তাঁর মতে ‘টেকসই ও সাশ্রয়ী’। অন্যদিকে রামপালের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নানা পদার্থ সৃষ্টি হবে। কয়লা থেকে আর্সেনিক দ্বারা ভূমি ও জলে আর্সেনিক দূষণ বৃদ্ধি পাবে এবং ‘বাংলাদেশ অচিরেই পরিবেশদূষণকারী দেশ হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত হবে।’
এত বড় সর্বনাশ কেন আমরা করব? সরকারেরও এভাবে জেদ ধরে থাকা কি উচিত হবে? বিকল্প যখন আছে, তখন সেই চেষ্টা করা হোক। সুন্দরবন বা লোকালয় থেকে দূরে কোথাও বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হোক।
এখনো সময় আছে। সরকারের প্রতি আহ্বান রইল, জনমত ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত নিয়ে বিকল্প বিদ্যুৎ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। বিদ্যুৎ অবশ্যই চাই, কিন্তু পরিবেশ ও মনুষ্য জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নয়। পরিবেশবান্ধব এনার্জি ও বিদ্যুৎ তৈরির জন্য যখন উপায় আছে, তখন সেটাই গ্রহণ করা হোক।
হায়দার আকবর খান রনো: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

বিএনপি বদলাবে কি? by সোহরাব হাসান

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্লোগান নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আজ। দলটির বয়স ৩৭ বছর। গঠনতন্ত্রে আছে প্রতি তিন বছর পর কাউন্সিল বা জাতীয় সম্মেলন হবে। সে ক্ষেত্রে ১২টি কাউন্সিল হওয়ার কথা। হতে যাচ্ছে ষষ্ঠতম। অর্থাৎ গঠনতন্ত্রের বিধান অর্ধেক মেনে চলেছে বিএনপি। এর আগের সম্মেলন হয়েছে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে। বিএনপির নেতারা বিলম্বিত কাউন্সিলের জন্য বর্তমান বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশের দোহাই দেন। কিন্তু অনুকূল পরিবেশ অর্থাৎ বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেও তঁারা নিয়মিত সম্মেলন করেছে, এ রকম নজির নেই। প্রকৃতপক্ষে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলে না। চলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের খেয়ালখুশিমতো। তাঁরা যখন চাইবেন তখন কাউন্সিল হবে, না চাইলে হবে না। আবার কাউন্সিল করলেও তার পূর্বশর্ত মানা হয় না।
এবারের কাউন্সিল নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল, তা আর এখন নেই। বিএনপির নেতাদের আশঙ্কা ছিল সরকার কাউন্সিল করতে দেবে না। প্রথমেই সমস্যা দেখা দেয় জায়গা নিয়ে। বিএনপি কাউন্সিলের স্থান হিসেবে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিলেও প্রথমে সরকার কোনোটিতে সায় দেয়নি। পূর্ত বিভাগ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল; কিন্তু পুলিশের অনুমতি মেলেনি। এরপর সরকার যখন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের অনুমোদন দিল, বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হলো, সেখানে স্থানসংকুলান হবে না। সবশেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একাংশ ব্যবহারের অনুমতিও মিলল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যত অদ্ভুত ঘটনা আছে, তার একটি হলো বিরোধী দলের কাউন্সিল নিয়ে সরকারের টালবাহানা। আওয়ামী লীগের স্থলে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও ব্যতিক্রম হতো না। তবে এত হতাশার মধ্যে আশার খবর, বিএনপির কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমরা আশা করতে পারি, তাঁরা না গেলেও প্রতিনিধি পাঠাবেন। অনুরূপ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলেও বিএনপির প্রতিনিধি আসবেন। এটাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
.
যেকোনো দলে জাতীয় কাউন্সিল করার আগে সাংগঠনিক জেলার এবং জেলার কাউন্সিলের আগে উপজেলার কাউন্সিল করার যে বিধান আছে, সেটি কোনো দলই মানে না। বিএনপিও মানেনি। জাতীয় সম্মেলনের আগে অধিকাংশ জেলায় তারা সম্মেলন করেনি অথবা করতে পারেনি। কোনো কোনো জেলায় দেড়-দুই দশকের পুরোনো কমিটি আছে। তাহলে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে কীভাবে? আবার দু-একটি জেলায় সম্মেলন হলেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেই কেন্দ্রীয় নেতারা দায়িত্ব শেষ করেছেন। কয়েক দিন আগে পূর্ব সীমান্তের একটি জেলা শহরে গেলে সেখানকার বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের জিজ্ঞেস করি, দলের কাউন্সিলে যাঁরা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাঁদের কীভাবে বাছাই করলেন? জবাবে একজন বললেন, ‘দলের নেতা-কর্মীরা যেখানে প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশই করতে পারছেন না, সেখানে জেলা-উপজেলা সম্মেলন কীভাবে করব।’ তাহলে এর সমাধান কী? আগের কমিটির নেতা-কর্মীরাই প্রতিনিধিত্ব করবেন। বেশির ভাগ জেলার চিত্রই এক। এমনকি কাউন্সিলের আগে বিএনপি খোদ ঢাকা মহানগরেও সম্মেলন বা কমিটি করতে পারেনি। মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে গঠিত আহ্বায়ক কমিটিও নিষ্ক্রিয়। তাঁর ভাগ্য জেলখানা ও জামিনের মাঝখানে দুলছে। প্রশ্ন হলো, এসব নিষ্ক্রিয় কমিটির প্রতিনিধিদের নিয়ে বিএনপির যে জাতীয় কাউন্সিল হতে যাচ্ছে, তা দলকে কতটা উজ্জীবিত করবে?
সর্বশেষ ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলন হয়েছিল। সেবার খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন পুনর্নির্বাচিত এবং তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এবার সম্মেলনের আগেই খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন ও তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি কোনো পদে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কাউন্সিলররা সব ক্ষমতা দলীয় চেয়ারপারসনের ওপর ন্যস্ত করে চলে যাবেন। এবারের কাউন্সিলে একটি পরিবর্তন আশা করা যায়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হবেন। কিন্তু দলীয় প্রধানের ইচ্ছা অনুযায়ী এক ব্যক্তি এক পদ নিয়ম মানা কঠিন হবে। দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা শ্রমিক, কৃষক ও মহিলা দলেরও দায়িত্বে আছেন। কেউ কেউ একই সঙ্গে জেলা কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কমিটির আকার বাড়ল কি কমল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিষ্ক্রিয় নেতারা সক্রিয় হবেন কি না? দল নতুন কর্মপন্থা ও কৌশল নিতে পারবে কি না?
৩.
বিএনপি এবার সম্মেলনের প্রতিপাদ্য করেছে ‘মুক্ত করবই গণতন্ত্র’। অর্থাৎ তাদের মতে দেশের গণতন্ত্র এখন অবরুদ্ধ। বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগও একই ধরনের প্রতিপাদ্য ঠিক করেছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকা কোনো রাজনৈতিক শক্তিই দলীয় কাঠামোয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হয়নি। গঠনতন্ত্রের সঙ্গে কার্যক্রমের মিল কদাচিৎ ঘটে। আর বিএনপির গঠনতন্ত্রটাই এমনভাবে করা যে সব ক্ষমতা দলীয় প্রধানের ওপর ন্যস্ত। দলীয় গণতন্ত্রের আরেক রূপ দেখলাম সদ্য অনুষ্ঠিত জাসদের সম্মেলনে। দলটি জঙ্গিবাদ ও আগুন-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বুলন্দ আওয়াজ তুললেও একটি কমিটি গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি এবার সম্মেলনের আগেই দলীয় চেয়ারপারসন ও জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীই পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ তাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন। তাঁরাই বাছাই করবেন অন্যান্য পদের নেতাদের। তাতে কেউ পদোন্নতি পাবেন, কারও পদাবনতি হবে।
৪.
একটি দল তো কেবল সাংগঠনিক কাঠামো ঠিক করতেই কাউন্সিল করে না। কাউন্সিল করে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক মত ও পথ তথা কর্মপন্থাও ঠিক করতে। সেখানে সাধারণ সম্পাদক ছয় বছরের দলীয় কাজের রিপোর্ট পেশ করবেন। এবং তার ওপর কাউন্সিলররা আলোচনা করে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করবেন। অতীতের কাজে কোনো ভুলত্রুটি হলে কাউন্সিলে সেটি সংশোধন হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সমস্যা হলো তারা কেউ ভুল স্বীকার করে না। আর ভুল স্বীকার না করলে সংশোধনেরও প্রশ্ন আসে না। বিগত কাউন্সিলে বিএনপি তাদের আগের শাসনামলের ভুলগুলো স্বীকার করেনি। এবারের সম্মেলনে গত ছয় বছরের কার্যক্রমের চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
কাউন্সিলে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বিএনপির শক্ত অবস্থানের ঘোষণা আসতে পারে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছে। বিএনপির নেতারা আগে থেকেই বলে আসছিলেন যে মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তারা কৌশলগত জোট বাঁধলেও দুই দলের রাজনীতি ভিন্ন। জামায়াত ধর্মীয় ধ্যানধারণায় পুষ্ট একটি দল। আর বিএনপি জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু ২০১২-১৫ পরিসরে দলের গৃহীত কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রেই জঙ্গিবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক হয়ে পড়েছিল। বিএনপির নেতারা বলার চেষ্টা করছেন যে, সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যেসব সহিংসতা হয়েছে, তা তাঁদের কর্মীরা করেনি। জামায়াত–শিবির করেছে। বিএনপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জামায়াত–শিবির সহিংসতা করলে তার দায় কীভাবে তাঁরা এড়াবেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি যে জঙ্গিবাদ তোষণ নীতি নেয়, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দলটিকে প্রায় বন্ধুহীন করে ফেলে। এতে কেবল প্রতিবেশী ভারতই বৈরী হয়নি; বিরাগভাজন হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোও। এমনকি যে চীনের সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্ব বাংলাদেশে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটিয়েছিল, সেই চীনও বিএনপির বর্তমান রাজনীতিকে সুনজরে দেখছে না। ২০০৮ সালের পর নির্বাচনের বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান না করে সব দায় ‘ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের’ ওপর চাপিয়ে দিয়ে বিএনপির পার পাওয়ার চেষ্টা সফল হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। মনে রাখা প্রয়োজন, বিএনপির ভুল নীতিই এক–এগারোকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
ডান দিকে ঝুঁকে পড়া মধ্যপন্থী এই দলটি বহুধারার সমন্বয়ে গঠিত হলেও সাবেক বামরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। ফলে দৌরাত্ম্য বেড়েছে ডানদের। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন কিংবা ২০১৫ সালে তিন মাসব্যাপী হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দেওয়ার সময় সাধারণ মানুষ তো বটেই দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মনোভাবও জানার চেষ্টা করেননি শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের বৃহত্তর অংশই মনে করে ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত ছিল। সে সময়ে লন্ডন থেকে পাঠানো চরমপত্রগুলো যে দলকে হঠকারী পথে ধাবিত করেছে, সে কথাও বলার অপেক্ষা রাখে না।
৫.
বিএনপি সূচনা থেকে যে নেতিবাচক রাজনীতি করে আসছে, সেটি হলো আওয়ামী লীগ বিরোধিতা। আওয়ামী লীগ যেহেতু বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলে, সেহেতু তারা সোনার পাথরবাটির মতো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আবিষ্কার করেছে। আওয়ামী লীগ যেহেতু ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, সেহেতু তাকে বর্জন করতে হবে। এটাই বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন। গেল শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে সেই দর্শন রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে তা সম্ভব নয়। এখন বিএনপিকে জনগণের সমর্থন পেতে হলে জনগণের মৌলিক সমস্যাকে নিয়েই রাজনীতি করতে হবে। কাউন্সিলকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো বিএনপি বদলাবে কি? বদলানো মানে স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ধারণ করা; বদলানো মানে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া।
বদলানো মানে দলের সর্বস্তরে গণতন্ত্রের অনুশীলন। বদলানো মানে অতীত নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো। বদলানো মানে প্রত্যাদেশের অপেক্ষায় না থেকে বাস্তবতার আলোকে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ। বদলানো মানে দলে তারুণ্যকে স্বাগত জানানো। গণমানুষের সপক্ষে কর্মসূচি নেওয়া। আর সেটি যে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী কোনো শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে সম্ভব নয়, সে কথাও হলফ করে বলা যায়।
আজকের কাউন্সিলই নির্ধারণ করবে বিএনপি নেতৃত্ব কোন পথে যাবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

কেন সিরিয়া ছাড়লেন পুতিন by জোনাথন স্টিল

ভ্লাদিমির পুতিন যে সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিলেন, তাতে হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে বাশার পর্যন্ত সবারই আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেছে। ধারণামতো অনেকেই এ নিয়ে অসূয়ক মন্তব্য করেছেন, স্বাধীন সামরিক বিশ্লেষক আলেক্সান্ডার গোল্টস বলেছেন, ‘কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে এটি দারুণ।’ আবার সাবেক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পি জে ক্রাউলি বলেছেন, পুতিন সিরিয়ায় নাক গলিয়ে ‘ইতিবাচক যা নেওয়ার নিয়ে নিয়েছেন।’ কিন্তু এ ব্যাপারে আরও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
পুতিন আসলে বাশারকে বলছেন, বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পাঁচ বছর পর তাঁর জেনেভা আলোচনা নিয়ে আন্তরিকভাবে চিন্তা করা উচিত, আর শেষমেশ তাঁর আপসে আসা উচিত। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বাশারের ভবিষ্যৎ নিয়ে জেনেভায় আলোচনা করা যাবে না, এ কথায় রাশিয়া কুপিত হবে। সম্ভবত পুতিন এই পরিপ্রেক্ষিতেই হঠাৎ করে রুশ সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন।
যদিও রাশিয়ার যুদ্ধবিমানগুলো সিরিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে, ক্রেমলিনের কঠোর বার্তা হচ্ছে, বাশার সামরিক বিজয়ের জন্য রুশদের ওপর নির্ভর করতে পারেন না। তাঁকে রাজনৈতিক সমাধানে আসতে হবে।
পশ্চিমা রাজনীতিকেরা প্রায়ই দাবি করেন, রাশিয়া সব সময় বাশারকে বাঁচাতে তৎপর, কিন্তু কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, এর বিপরীত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। রাশিয়া সিরিয়ায় আক্রমণ শুরু করার পর মস্কোয় গত শরতে বাশার ও পুতিনের মধ্যে যে বৈঠক হলো, তখন দেখা গেল, পুতিন গণবিবৃতি দেওয়ার সময় ক্যামেরার সামনে বারবার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য ‘সিরীয় জনগণের’ প্রশংসা করছেন। তিনি কখনোই ব্যক্তিগতভাবে বাশারের প্রশংসা করেননি।
পুতিন এ কথাও জোর দিয়ে বলেছেন যে তাঁর সামরিক হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য হচ্ছে, শান্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। তিনি বাশারকে বলেছেন, আমরা আপনাকে পরাজয় ও অপসারণ রুখতে পারি, কিন্তু আপনি এটা আশা করতে পারেন না যে আমরা আপনাকে চিরকাল ক্ষমতায় রাখব।
এরপর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী সিরিয়ার সমস্যা নিরসনে ভিয়েনায় বৈঠক করল, তখনো পরিষ্কারভাবে এ বার্তা দেওয়া হয়েছে। রাশিয়া সিরিয়ার সংকটকে ‘গৃহযুদ্ধ’ হিসেবে দেখে, যেটা বাশার ও তাঁর কর্মকর্তারা কখনো নকল করেননি। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছিলেন, এটা ‘রীতিসিদ্ধ সশস্ত্র বিরোধিতা’। বাশারের শব্দায়ন থেকে এর পার্থক্য বেশ বড়ই। সিরীয় প্রেসিডেন্ট এই সংগ্রামকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশ যদি জিহাদিদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে চায়, তাহলে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
বড় কিছুর অংশীদারত্ব পাওয়ার লক্ষ্যেই পুতিন সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছিলেন। তিনি রাশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে ঢুকিয়েছেন রুশরা এর কোনোটিই করবে না। তারা বাস্তবতা দেখেছে, সেটা হলো এই দ্বন্দ্বটা মূলত গৃহযুদ্ধ, যদিও এর অনেকটাই বাইরের শক্তিগুলো ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। লাভরভ ফ্রি সিরিয়ান আর্মির সদস্যদের আলোচনার জন্য মস্কোয় ডেকেছেন। ক্রেমলিন অন্যান্য বাশারবিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গেও কথা বলেছে, যেমন সিরীয় কুর্দি গোষ্ঠী, যারা ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধে সবচেয়ে ভালো করেছে। তারা সবেমাত্র মস্কোয় কার্যালয় খুলেছে।
শুরু থেকেই পুতিন এটা পরিষ্কার করে আসছেন যে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের লক্ষ্য কিন্তু উন্মুক্ত নয়। তিনি যে যুদ্ধটা ছয় মাসেরও কম সময়ে নামিয়ে আনলেন, এই সিদ্ধান্তটা তিনি সম্ভবত সামরিক উপদেষ্টাদের সংযমী মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নিয়েছেন। এই যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অনেক হইচই হয়েছে। সিরিয়ার উন্নত মানের বিমান আছে, তারা ব্যারেল বোমা ফেলার ব্যাপারে অব্যাহতি পেয়েছে। বাইরের দুনিয়ার ধারণা হলো, এই যুদ্ধে যত মানুষ মারা গেছে, তার ৯০ ভাগই বেসামরিক। সিরিয়ার সুশীল সমাজ ও অ-ইসলামি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এ কথা ক্রমাগত বলে যাচ্ছে।
তারা এখনো এই অলীক কল্পনার জগতে বাস করছে যে যুদ্ধের মানবিক সংকটের ব্যাপারটা বারবার প্রচার করা হলে পশ্চিম সামরিক শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসবে, ২০১১ সালে তারা যেমন লিবিয়ার বেলায় করেছিল।
কথা হচ্ছে, লাখ লাখ সিরীয় বেসামরিক মানুষের দুর্গতির ব্যাপারটা খাটো করা যাবে না তা ঠিক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার আছে: রেকর্ড থেকে দেখা যায়, সিরিয়ায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা মোট মৃত্যুর অর্ধেকেরও কম। এ বছরের প্রথম মাসের কথাই বিবেচনা করুন, যখন রুশ ও সিরীয় বিমান হামলা তুঙ্গে ছিল। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরীয় অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস ২০১৬ অনুসারে জানুয়ারি মাসে সেখানে ৪ হাজার ৬৮০ জন মানুষ মারা গেছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ ছিল বেসামরিক মানুষ, সরকারি বাহিনী ও সরকারপন্থী রক্ষীবাহিনী ও ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সেসের ১ হাজার ৪৮৭ জন সেনা মারা গেছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৮০ জন অ-সিরীয় জিহাদি ও ৬০৩ জন বাশারবিরোধী যোদ্ধা মারা গেছে।
এই তথ্যের মধ্যে আলোর দিশা পাওয়া যায়। এই মন্ত্র সব সময় জপ করা হচ্ছে যে, ‘বাশার নিজের মানুষকে হত্যা করছেন’, তারা এ-ও বলছেন, বাশারবিরোধীরাও নিজের ভাইবোনদের হত্যা করছেন। এটা একটা ধ্রুপদি গৃহযুদ্ধ, যেখানে বন্দুকধারীরাই বেসামরিক মানুষের চেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছে। রুশরা সেটা দেখে শিক্ষা নিয়েছে। রুশদের বিমান হামলার সহায়তা নিয়ে বাশার বিদ্রোহী-অধ্যুষিত আলেপ্পোর একটি অংশ পুনর্দখল করতে পেরেছে। আর ডিসেম্বর ও জানুয়ারির একটা সময় মনে হয়েছিল, তারা পুরো শহরটাই দখল করে নিতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ হয়নি। সরকারি বাহিনী অনেক রক্তক্ষয় করেও সফল হতে পারেনি।
পুতিন বাশারকে বলেছেন, ‘আমরা আপনাকে নতুন জীবন দিয়েছি। আমরা লাতাকিয়া ও ইদলিবের আশপাশের এলাকা আপনার দখলে এনে দিয়েছি, আলেপ্পোর আশপাশে আপনাকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছি। মার্কিন ও তাদের তাঁবেদারদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি করে দিয়েছি। এখন আপনার পালা, নিজ দেশের আইনসম্মত বিরোধী দলের সঙ্গে আপনাকে সমঝোতায় আসতে হবে।’
বড় কিছুর অংশীদারত্ব পাওয়ার লক্ষ্যেই পুতিন সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছিলেন। তিনি রাশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে ঢুকিয়েছেন। এখানকার কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আর শেষমেশ বলটা দামেস্কের কোর্টে ঠেলে দিয়েছেন।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া; অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
জোনাথন স্টিল: দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট।

জালিয়াতির উৎসব by সাজেদুল হক

যেন এক দূরের তারা। মানুষ শত চেষ্টা করেও তার কাছে যেতে পারছে না। না অন্য কিছুর কথা নয়। বলছি ভোটের কথাই।
এ ভোটের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে বাংলাদেশের মানুষ। পাকিস্তানি বর্বর শাসকদের কাছ থেকে আমরা ৭০ এর নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায় করে নিয়েছিলাম। যে নির্বাচনে জনগন বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ভোট কালিমামুক্ত ছিল না। জিয়া-এরশাদের জমানায় ‘হ্যা’ ‘না’ ভোটের মতো আজগুবি ভোটের সাক্ষী হয়েছে এ দেশের জনগন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদই সর্বপ্রথম বাংলাদেশের মানুষকে শান্তিপূর্ণ ভোট দেয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। ১৫ই ফেব্রুয়ারির গায়েবি ভোট বাদ দিলে ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনও মোটাদাগে অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশ আবার ফিরে যায় ভোটের কলঙ্কজনক অধ্যায়ে। শাসক নির্বাচনের জন্য কারও ভোটের প্রয়োজন হয়নি। যায় দিন ভালো যায়- বহু পুরনো বাংলা প্রবাদ। বাংলাদেশ এখন সে প্রবাদের যুগে বাস করছে। ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনে প্রধান বিরোধী শক্তিগুলো অংশ নেয়নি। যে কারণে জবরদস্তির চিত্র পরিষ্কার ছিল না। ছিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার জয় জয়কার। কিন্তু এরপরের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে অংশ নিচ্ছে বিএনপি এবং অন্য দলগুলো। দলীয় প্রতীকে হওয়া এসব নির্বাচন এখন পরিণত হয়েছে জোর যার মুল্লুক তার টাইপের নির্বাচনে। এবং সবাই জানেন জোরটা এখন কার। যাদের জোর আছে তারাই নির্বাচনে জয়ী হচ্ছেন। ভোট এখন পরিণত হয়েছে নিছক আনুষ্ঠানিকতায়। বেশিরভাগ কাজ হয়ে যাচ্ছে আগেই। ভোটের দিন ভোটাররা কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। তাদের হয়ে ‘বালকেরা’ ভোট দিয়ে দিচ্ছেন। যারা একটু প্রতিবাদী হওয়ার চেষ্টা করছেন নিজ দলের হলেও রেহাই নেই তাদের। কারও ঠাঁই হচ্ছে কারাগারে। কেউ হামলার শিকার হচ্ছেন।
মঙ্গলবার সকাল থেকেও যথারীতি একইধরনের খবর পাওয়া গেছে। ইউপি নির্বাচনে সকাল সকালই কায়েম হয়েছে দখলের রাজত্ব। এ যেন ভোট জালিয়াতির উৎসব। ঘটেছে নানারকম ঘটনা। গুলির শিকার হয়েছেন নির্বাচনি কর্মকর্তারাও। কোথাও কোথাও ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়েছে রাতেই। যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে সেখানে কিছুটা ঝামেলা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ এলাকায় জাল ভোট চলেছে নির্বিঘেœ। ভোটের ফলাফল কি তা ভোট শুরুর পরপরই নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ ভোটের আগের দিন নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ভোটের পরে তিনি কি বলবেন তা অনুমান করা যায়। তিনি হয়তো বলবেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। কাজী রকিব তা বললে মিথ্যা হবে না। কারণ এটা সত্য বাংলাদেশে এখন, ভোট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ভোটার থেকে। ব্যালটের ওপর নিজের অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন জনতা।

বিএনপি কেন করেন? by মশিউল আলম

সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। ১০টায়, ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে যখন বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের উদ্বোধন হওয়ার কথা, তখনো মেঘেরা ছায়া দিচ্ছিল। কিন্তু কাউন্সিলে যোগ দিতে সারা দেশ থেকে এত নেতা-কর্মী এসে জড়ো হয়েছেন যে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের দুটো গেটের সামনে ও আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে ঘামের গন্ধে। প্রাচীরঘেরা স্থাপনাটির ভেতরে সাজানো প্যান্ডেলে ঢোকার জন্য ডেলিগেট, কাউন্সিলর ও সাধারণ কর্মীদের মধ্যে প্রবল হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি, চিৎকার।
শাহবাগের মোড় থেকে মৎস্য ভবনের মোড় পর্যন্ত সড়কে সাধারণ যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। গলায় ডেলিগেট ও কাউন্সিলরের কার্ড ঝুলিয়ে, কাউন্সিল উপলক্ষে কোনো নেতার সৌজন্যে তৈরি টি-শার্ট পরে, কিংবা এসব ছাড়াই অজস্র নেতা-কর্মীর পদচারণে মুখর পুরো এলাকা। শিশুপার্কের সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পশ্চিম পাশের প্রাচীরের পাশ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে প্রচুর নেতা-কর্মীর সমাগম। কাউন্সিলের আপ্যায়ন উপকমিটির এক সদস্য বললেন, তাঁরা ৩০ হাজার মানুষের খাবারের বন্দোবস্ত করেছেন। ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন প্রায় ১০ হাজার।
মাদারীপুরের কালকিনি থেকে এসেছেন উপজেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক বি এম রেজাউল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে পান-সিগারেটের এক দোকানের পাশে গল্প করছিলেন কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁদের কথাবার্তায় কাউন্সিলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ। কাউন্সিলের জন্য সরকার সুপরিসর কোনো জায়গা দেয়নি বলে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘স্বৈরাচার’ সরকারের প্রতি ক্ষোভ। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তাঁদের আলাপের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। জানতে চাইলাম, এই কাউন্সিল থেকে তাঁরা কী আশা করছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের কথাবার্তায় বক্তৃতার ঢঙ এসে গেল। এসএসসি পাস পরিবহন ব্যবসায়ী বি এম রেজাউল বললেন, ‘এই কাউন্সিলে আমরা নতুন দিকনির্দেশনা পাব। ম্যাডাম বলবেন, কীভাবে আন্দোলন করতে হবে, কেমন করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে।’ আমি তাঁকে ভাই সম্বোধন করে বললাম, ‘একটু মনের কথা বলেন। আন্দোলন করার সামর্থ্য কি আপনাদের আসলেই আছে?’ রেজাউল পাল্টা আমাকেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বিএনপি শেষ হয়ে গেছে?’ বললাম, ‘আপনারা যে বলছেন এই সরকার স্বৈরাচারী, ফ্যাসিস্ট, তাহলে এত বড় দল হিসেবে আপনারা কী করছেন?’
‘কী করব, বলেন? আমার বিরুদ্ধে পাঁচটা মিথ্যা মামলা। অ্যারেস্ট হইছি তিনবার। লাখ টাকা খরচ হইছে জামিন পাইতে। কখন আবার অ্যারেস্ট করে নিয়ে যায় তার ঠিক নাই।’ পাশ থেকে শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা যুবদলের সভাপতি নাসিরউদ্দিন বলে উঠলেন, ‘এই সরকার হলো মামলা আর হামলার সরকার।’
‘তাহলে আপনারা কী করবেন? এই সরকারকে হঠাবেন কীভাবে?’
‘আল্লাহ ভরসা। এভাবে চিরদিন চলবে না।’
আল্লাহর ওপর ভরসার কথা উচ্চারিত হলো আরও বেশ কয়েকজনের মুখে। ‘এইভাবে চিরদিন চলবে না’—এমন মরিয়া আশাবাদের বিপরীতে অবশ্য দমন-পীড়নে কোণঠাসা অবস্থার কথাই শোনা গেল বেশি। যাঁর সঙ্গেই কথা বলি, তিনিই বলেন ‘মিথ্যা মামলা’ আর পুলিশি হয়রানির কথা। গোবিন্দগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি ফারুক আহমেদ বললেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আছে ১৯টা। গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনবার, শরীরে পুলিশি নির্যাতনের চিহ্ন দেখাতে চাইলেন; বললেন, জামিন পেতে খরচ করতে হয়েছে অস্বাভাবিক অঙ্কের টাকা। মুন্সিগঞ্জের কুমারভোগ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মজিবর রহমান খান লাবলু বললেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আছে আটটা, ২০ দিন জেল খেটেছেন, পুলিশি রিমান্ড এড়াতে পেরেছেন সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ করে। লৌহজংয়ের জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের এক নেত্রী বললেন, ‘আমার বিরুদ্ধে পাঁচটা মামলা। আমি বলে বাস পোড়াইছি, মারামারি করছি, কারেন্টের তার ছিঁড়ছি।’ তাঁর পাশ থেকে আরেক নেত্রী বলে উঠলেন, ‘বইয়া রইছি সরার্দি উদ্যানে, মামলা হইতে পারে আমি মাওয়া ঘাটে মারামারি করছি!’
‘এত মামলা আর এত হয়রানি সত্ত্বেও আপনারা বিএনপি করেন কেন?’ আমার এ প্রশ্নের উত্তরে এক যুবক বলে উঠলেন, ‘গণতন্ত্র মুক্ত করার পরে আর করুম না।’ অন্যরা হো হো করে হেসে উঠলেন। আরেকজন বললেন, ‘আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র সিন্দুকে ভইরা তালা মাইরা রাখছে। আমরা ওই তালা ভাঙ্গুম।’
‘কীভাবে ভাঙবেন? আপনারা তো দৌড়ে দিশা পাচ্ছেন না!’ আমার এ প্রশ্নের উত্তরে আরেকজন বললেন, ‘দেখেন, কেমনে কী হয়! অয়েট করেন!’
সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে যে বিএনপি প্রবল আন্দোলন করেছিল, সেই দল আজ আওয়ামী লীগের হাতে পর্যুদস্ত কেন, কেন তারা আন্দোলন সংগঠিত করতে পারছে না—এই প্রশ্ন অনেককে করেছি। উত্তরে প্রায় সকলেই বলেছেন, মিছিল বের করলেই যদি গুলি খেয়ে মরতে হয়, তাহলে আন্দোলন করা কঠিন। লৌহজংয়ের এক নেতা অবশ্য বললেন, বিএনপির কিছু বয়স্ক নেতার জন্য আন্দোলন হচ্ছে না, কারণ এই নেতারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগসাজশ করে চলছেন। গোবিন্দগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন পাতা বললেন, বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জামায়াতের কুপরামর্শে বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিরাট ভুল করেছে। জোটের কারণে বিএনপির বক্তব্য স্পষ্টভাবে জনগণের কাছে পৌঁছায়নি।
জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার ফলে বিএনপির খুব ক্ষতি হয়েছে, জামায়াতের অনেক কর্মী বিএনপি ও ছাত্রদলের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন—এমন কথাও বললেন অনেকে।
খালেদা জিয়ার বয়স হয়েছে, বিএনপির নেতৃত্বে এখন তারেক রহমানকে প্রয়োজন—এই মত ব্যক্ত করলেন পাঁচজন। একজন ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একদমই অসম্ভব হলে বিএনপির হাল ধরবেন তাঁর স্ত্রী জোবাইদা রহমান। তাঁর মতে, তখন বিএনপি ভীষণ ‘চাঙা’ হবে। এঁরা সবাই আমাকে তাঁদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
জেলা পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বললেন, এই কাউন্সিল বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। টাকার বিনিময়ে (৮ লাখ থেকে ১২ লাখ পর্যন্ত) ও তদবিরের জোরে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়া যদি বন্ধ না হয়, যদি তাঁর ভাষায় ‘ত্যাগী ও পরিশ্রমী’ নেতারা কমিটিতে স্থান না পান, তাহলে বিএনপি আরও ক্ষয়িষ্ণু দলে পরিণত হবে। কারণ, ক্ষমতাসীন সরকারের সাত-আট বছরের দমন-পীড়নে বিএনপির সক্রিয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলা করার জন্য তৃণমূল পর্যায়ে ‘ত্যাগী ও পরিশ্রমী’ নেতাদের প্রয়োজন, টাকাওয়ালা ও তদবিরবাজ নেতাদের দিয়ে সেটা হবে না।
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

ভাঙনের মুখে রিপাবলিকান পার্টি!

কোটিপতি ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় নির্বাচন ক্রমশ অনিবার্য হয়ে ওঠায় রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁকে কীভাবে ঠেকানো যায়, সেই প্রশ্নে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। এ পর্যন্ত যতগুলো জনমত জরিপ হয়েছে, তার প্রতিটিতে সম্ভাব্য ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ট্রাম্পকে সহজেই পরাস্ত করছেন। তার চেয়েও ভয়ের কথা, জনমত জরিপ অনুসারে, ট্রাম্প দলীয় প্রার্থী হলে নভেম্বরের নির্বাচনে অনেক রিপাবলিকান সমর্থক ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। ফলে সিনেটে রিপাবলিকানদের বর্তমান যে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা ফসকে যেতে পারে। সিনেটে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের দরকার চারটি অতিরিক্ত আসন। দলীয় নিয়ম অনুসারে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য বাছাইপর্বের নির্বাচনে একজন প্রার্থীর কমপক্ষে ১ হাজার ২৩৭ জন ডেলিগেটের সমর্থন প্রয়োজন। প্রায় অর্ধেক প্রাইমারি ভোটের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ৬৭৩ ডেলিগেট নিয়ে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর টেড ক্রুজের চেয়ে ২৬৩ ডেলিগেটে এগিয়ে আছেন। কাঙ্ক্ষিত ১ হাজার ২৩৭ নম্বরে পৌঁছাতে হলে ট্রাম্পকে অবশিষ্ট প্রাইমারিতে নির্ধারিত ডেলিগেটের ৫৫ শতাংশ দখল করতে হবে। ক্রুজের প্রয়োজন পড়বে ৮০ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রার্থী গভর্নর কেইসিকের ১১২ শতাংশ। যদি কেউ নির্ধারিত সংখ্যক ডেলিগেটের সমর্থন জোগাতে ব্যর্থ হন, তাহলে জুলাই মাসে দলীয় কনভেনশনে ভোটাভুটিতে প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে হবে। কোনো কোনো রক্ষণশীল কৌশলবিদ মনে করছেন, সেখানেই ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো সর্বসম্মত প্রার্থী নির্বাচন সম্ভব হবে।
দলীয় নিয়ম অনুসারে, প্রথম ব্যালটের পর ডেলিগেটরা তাঁদের ইচ্ছামতো যেকোনো প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারেন। পার্টির কোনো কোনো নেতা মনে করেন, টেবিলের নিচে আপসরফার মাধ্যমে তেমন কোনো প্রার্থী মনোনয়ন সম্ভব। তবে এর ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে—এমন ভয়ের কথাও তাঁরা স্বীকার করেছেন। গত কয়েক দিনে ওয়াশিংটন ও ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান নেতৃত্ব ও দাতাদের ভিন্ন ভিন্ন বৈঠকে এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। অজ্ঞাতনামা সূত্র উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের বৈঠকে ট্রাম্পের বিকল্প হিসেবে একাধিক নাম বিবেচিত হয়। এঁদের একজন নেব্রাস্কার সিনেটর বেন সাসে। তবে সাসে নিজে এক তাৎক্ষণিক বিবৃতিতে আগ্রহী নন বলে জানিয়েছেন। ফ্লোরিডার পাম বিচে অনুষ্ঠিত আরেক গোপন বৈঠকে রিপাবলিকান দাতারা স্পিকার রায়ানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। রাজনৈতিক ওয়েব পত্রিকা ‘পলিটিকো’ একাধিক সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, দাতাদের অনুরোধ সত্ত্বেও স্পিকার রায়ান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগ্রহী নন। তাঁর আপত্তির মুখে কোনো কোনো দাতা হয় ক্রুজ অথবা জন কেইসিকের পেছনে জোট বাঁধার প্রস্তাব রাখেন। ট্রাম্পের প্রার্থিতার প্রতিও কোনো কোনো দাতা সমর্থনে প্রস্তুত বলে ‘পলিটিকো’ জানায়।

নতুন সরকারে কোনো পদ নিচ্ছেন না সু চি

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি নতুন সরকারে কোনো পদে থাকছেন না। নিজের দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) প্রধান হিসেবেই নতুন সরকারকে ‘নিয়ন্ত্রণ করবেন’ সু চি। এনএলডির এক জ্যেষ্ঠ নেতা এ কথা বলেছেন। গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মিয়ানমারের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে এনএলডি বিপুল বিজয় পায়। তবে সামরিক বাহিনীর তৈরি সংবিধানে তাঁকে লক্ষ্য করে রাখা বাধ্যবাধকতার জন্য সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। সু চির স্বামী ও দুই ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক। মিয়ানমারের সংবিধান অনুসারে, কারও স্বামী-স্ত্রী বা সন্তান বিদেশি হলে তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। এনএলডির মুখপাত্র জ মিন্ট মং বলেন, ‘সরকারে কোনো পদ নেওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় এমন অনেক সদস্যই আছেন যাঁরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। কিন্তু তাঁরা কখনো মন্ত্রী হন না।’ এনএলডির এ নেতা বলেন, মিয়ানমারেও একই অবস্থা। সু চি দলের নেতৃত্ব দেবেন।
সেই অর্থে তিনি সরকারেরও নেতৃত্ব দেবেন।’ এনএলডির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে অনেকেই সু চির ভূমিকাকে ভারতের কংগ্রেস দলের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর ভূমিকার সঙ্গে তুলনা করেন। ভারতের সাবেক মনমোহন সিং সরকারের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ ছিল সোনিয়ার। গত সপ্তাহে এনএলডির সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্য দলের নেতা থিন কিউকে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন। ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর মিয়ানমার পায় প্রথম বেসামরিক প্রেসিডেন্ট। নভেম্বরের নির্বাচনের প্রচারাভিযানে সু চি এটা স্পষ্ট করেন যে, প্রেসিডেন্ট হতে পারেন আর না পারেন; তিনিই দেশের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন। তিনি ‘প্রেসিডেন্টের ওপরে’ থাকবেন, এমন কথাও বলেন সু চি। নির্বাচনের পর সেনাবাহিনীর অনমনীয় মনোভাবের কারণে সংবিধান সংশোধন সম্ভব না হওয়ায় সু চিরও প্রেসিডেন্ট হওয়া হয়নি। একপর্যায়ে এমন কথাও আলোচিত হয়েছিল যে, তিনি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন।