Monday, March 23, 2026

রাশিয়ার স্বার্থের খেলায় ইরান কি কেবলই একটি ঘুঁটি by কারাম নামা

ইরানের নেতৃত্ব ও জনগণের কাছে ভ্লাদিমির পুতিন যে নওরোজ বা নববর্ষের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন, যুদ্ধের এই আবহে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব একটি মৌসুমি পোস্টকার্ডের চেয়ে বেশি কিছু নয়। ক্রেমলিন থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে পুতিন ইরানের নববর্ষ উপলক্ষে মোজতবা খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

কিন্তু মস্কোর কৌশলগত মানসিকতা সম্পর্কে যাঁদের ন্যূনতম ধারণা আছে, তাঁরা জানেন যে পুতিন কারোর জন্যই রাজনৈতিক অশ্রু বিসর্জন দেন না। তিনি খামেনি, বাশার আল আসাদ কিংবা নিকোলা মাদুরোর মতো নেতাদের মিত্র হিসেবে দেখেন না, বরং দেখেন এমন এক সম্পদ হিসেবে, যাকে প্রয়োজনে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলা যায়।

তেহরান ও মস্কোর মধ্যে বহুল প্রচারিত ‘কৌশলগত অংশীদারত্বের’ মধ্যে কোনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। এমনকি বিপদের সময় রক্ষার কোনো গ্যারান্টিও এখানে নেই। আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে রাশিয়া কখনোই কারও বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল না। রাষ্ট্র হিসেবে তারা অন্যদের অংশীদার মনে না করে কেবল সাময়িক সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে।

এমনকি ইরানের ভেতরেও কর্মকর্তারা নিভৃতে স্বীকার করেন যে ১৯৭৯ সালে শাহর পতনের পর ইরান এখন যে ভয়াবহ সংকটে রয়েছে, সেখানে মস্কোর কাছ থেকে কার্যত কোনো অর্থবহ সহায়তা তারা পায়নি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকান ঐতিহাসিক স্টিফেন কোটকিন লিখেছেন যে পুতিন জোট গঠন করেন না। তিনি কেবল প্রভাব বিস্তারের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, যার মেয়াদ তখনই শেষ হয়ে যায়, যখন তা রক্ষার ব্যয় রাশিয়ার স্বার্থের চেয়ে বেড়ে যায়।

এই একটি বাক্যই রাশিয়ার সব কর্মকাণ্ড ব্যাখ্যা করে। রাশিয়া কখনো অন্য কোনো মিত্রের জন্য যুদ্ধে জড়ায় না। রাশিয়া কেবল নিজের জন্যই যুদ্ধে অংশ নেয়। যেহেতু মস্কো ইরানের এই পরিস্থিতিকে কোনো মিত্রতার বদলে বরং দর-কষাকষির ঘুঁটি হিসেবে দেখছে, তাই সম্প্রতি তারা ওয়াশিংটনের কাছে এক চাঞ্চল্যকর প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

মস্কো জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবে রাশিয়াও ইরানকে গোয়েন্দা সহযোগিতা দেওয়া বন্ধ করবে। ওয়াশিংটন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে মস্কো আবার তার পুরোনো ভূমিকায় ফিরে আসে। সেটি হলো দর্শকের ভূমিকা—যে কেবল দর-কষাকষি করতে জানে, কিন্তু রক্ষা করতে জানে না।

ইতিহাস এর প্রমাণে ভরপুর। সাদ্দাম হোসেন যখন আক্রান্ত হন তখন মস্কো সেই আক্রমণের বিরুদ্ধে সামান্যতম আপত্তিও তোলেনি। অথচ দশকের পর দশক তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এটি কোনো অনুগত মিত্রের আচরণ নয়; বরং এমন এক রাষ্ট্রের আচরণ, যারা অন্যদের কেবল আয়ের উৎস হিসেবে দেখে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা সিরিয়ার বাশার আল আসাদের ক্ষেত্রেও দেখেছি।

এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি কার্যত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট নন; বরং মস্কোর একজন রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে বাস করছেন। তাঁর নিজ দেশে আজ রাশিয়ার প্রভাব থাকলেও আসাদের নিজের কর্তৃত্ব বলতে কিছু নেই। যে মিত্রকে শেষ পর্যন্ত মস্কোয় আশ্রিত হয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে, তার করুণ পরিণতি দেখলেই বোঝা যায় ইরানের ভবিষ্যৎ আসলে কী হতে চলেছে।

রুশ রাজনৈতিক ইতিহাস এ ধরনের অনেক উদাহরণে সমৃদ্ধ। আলজেরিয়ার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হোয়ারি বুমেদিন একবার সোভিয়েত নেতাদের সরাসরি বলেছিলেন যে তাঁরা আলজেরীয়দের উটপালক হিসেবে মনে করেন, নিচু দৃষ্টিতে দেখেন এবং নিজেদের স্বার্থেই তাঁদের সাহায্য করেন। বুমেদিনের এই বক্তব্য অতিরঞ্জিত ছিল না, বরং মস্কোর সম্পর্কের আসল চরিত্রটিই সেখানে ফুটে উঠেছিল। রাশিয়ার এই সম্পর্ক কেবল একতরফা, লেনদেনভিত্তিক এবং এতে আস্থার কোনো ছিটেফোঁটা নেই।

পুতিন যখন আজ ইরানকে আবেগঘন বার্তা পাঠান, সেটি আসলে কোনো রাজনৈতিক সমর্থন কিংবা সামরিক প্রতিশ্রুতির অংশ নয়। এটি কেবল একটি প্রতীকী বাক্য, যা ইরানকে কোনো হামলা থেকে সুরক্ষা দেবে না। রাশিয়ার কাছে ইরান এমন এক ঘুঁটি, যাকে যেকোনো মুহূর্তে বিসর্জন দেওয়া যায়। মস্কোর কাছে তেহরান কেবল পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দরাদরির এক মাধ্যম। স্বার্থে আঘাত লাগলে এই ঘুঁটি যেকোনো সময় তারা বাতিল করে দিতে পারে।

পুতিনের এই নওরোজ শুভেচ্ছা তাই কোনো গভীর রাজনৈতিক বার্তার চেয়ে বেশি মৌসুমি শিষ্টাচার। এটি ইরানকে নিরাপত্তা দেয় না এবং রাশিয়ার শত্রুদেরও আতঙ্কিত করে না। যুদ্ধের সময় যে শব্দের কোনো প্রতিফলন কাজ বা অ্যাকশনে নেই, তার কোনো মূল্য নেই। ইরান আজ চারপাশ থেকে আক্রান্ত হওয়ার সময় খুব ভালোভাবেই জানে যে মস্কো কখনোই তাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়াবে না। ইতিহাসের শিক্ষাই হলো, রাশিয়ার কোনো বন্ধু নেই, আছে শুধু স্বার্থ। আর স্বার্থ কখনোই দুর্বলের পক্ষে থাকে না।

* কারাম নামা, ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

গত  গছর ১৫ আগস্ট রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলাস্কা বৈঠকে মিলিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন
গত গছর ১৫ আগস্ট রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলাস্কা বৈঠকে মিলিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স


যেভাবে একের পর এক পরাজয় আড়াল করছেন ট্রাম্প by জেফরি সোনেনফেল্ড ও স্টিভেন তিয়ান ইয়েল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনোভাবেই, কোনো যুক্তির সামনে পরাজয় স্বীকার করেন না। গত সপ্তাহেই দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ২০ কোটি ডলার দাবি থেকে ট্রাম্প সরে এসেছেন। চলমান আলোচনায় তিনি যে সুবিধাজনক অবস্থানে নেই, তা স্পষ্ট হয়ে উঠতেই তিনি আবারও আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ফিরে যান।

গভীর রাতে ট্রুথ সোশ্যালে একের পর এক পোস্ট করে হার্ভার্ডের কাছে ১০০ কোটি ডলার দাবি তোলেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে দাবি করেন, ভবিষ্যতে হার্ভার্ডের সঙ্গে তাঁর আর কোনো সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছা নেই।

এতে কারও বিস্মিত হওয়ার কথা নয়। কারণ, এই আচরণ ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের স্বভাবেরই প্রতিফলন। তিনি পরাজয় অস্বীকার করেন আগেভাগে সম্পর্ক ছিন্ন করার মাধ্যমে। অর্থাৎ আপনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করার আগেই আমি আপনাকে প্রত্যাখ্যান করছি। আপনি আমাকে ছেড়ে যাচ্ছেন না, আমিই আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি।

হার্ভার্ডের কাছে ২০০ কোটি ডলার দাবির বিষয়টি কোনো দান বা সাধারণ অনুদানের প্রসঙ্গ ছিল না। এটি ছিল রাজনৈতিক ও আইনি চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে উত্থাপিত একধরনের আর্থিক সমঝোতা দাবি।

ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ তোলে যে হার্ভার্ডসহ কিছু শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইহুদিবিদ্বেষ, রাজনৈতিক পক্ষপাত ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বিক্ষোভ হয়, তা কেন্দ্র করে কংগ্রেসে শুনানি, তহবিল পর্যালোচনা এবং ফেডারেল অর্থায়ন স্থগিতের হুমকি তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন ইঙ্গিত দেয় যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি নির্দিষ্ট নীতিগত পরিবর্তন না আনে, তবে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত, তহবিল বন্ধ কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই চাপের মধ্যেই হার্ভার্ডের সঙ্গে আলোচনায় বড় অঙ্কের আর্থিক সমঝোতার দাবি সামনে আসে।

গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পস টেন কমান্ডমেন্টস বইয়ে লেখকেরা দেখিয়েছেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের ১০টি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে। এই পূর্বনির্ধারিত আচরণগত ধারা বুঝতে পারলে বোঝা যায়, কীভাবে তিনি ক্ষমতার খেলায় নিজের পছন্দের অস্ত্রগুলো ব্যবহার করেন। তার একটি হলো পরাজয়কে আগেভাগে অস্বীকার করা।

ট্রাম্প অন্যের প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারেন না। তাঁর দৃষ্টিতে তিনিই সব সময় সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রক। কেউ যদি দ্বিধা প্রকাশ করে, সমালোচনা করে কিংবা সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্প দ্রুত দাবি করেন যে সিদ্ধান্তটি তাঁরই। এরপর প্রায়ই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অযোগ্য বা গুরুত্বহীন হিসেবে উপস্থাপন করেন। হার্ভার্ড যখন ইঙ্গিত দিল যে তারা কম টাকার প্রস্তাব মেনে নেবে না, তখন ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া অনুমান করা কঠিন ছিল না। তিনি পরিস্থিতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন, যেন তিনিই হার্ভার্ডকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এর আগেও এমন বহু ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ২০১৭ সালে গোল্ডেন স্টেট ওয়ারিয়র্স এনবিএ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর হোয়াইট হাউসে যাওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে। পরে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনিই দলটিকে আমন্ত্রণ বাতিল করেছিলেন।

ওয়ারিয়র্সের কোচ স্টিভ কের তখন মন্তব্য করেন, তারা আমাদের ছেড়ে যাওয়ার আগেই তিনি যেন তাদের ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। একই বছর শার্লটসভিলে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের সমাবেশ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদে বড় বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা তাঁর ব্যবসায়িক উপদেষ্টা পরিষদ থেকে সরে দাঁড়ান। ট্রাম্প তখন দাবি করেন, তিনিই উদারভাবে পরিষদ ভেঙে দিয়েছেন।

এ বছর হোয়াইট হাউসে তেল কোম্পানির প্রধানদের এক বৈঠকে এক্সনমবিলের প্রধান নির্বাহী ড্যারেন উডস ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে ট্রাম্প দ্রুত পাল্টা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এক্সনকে হয়তো তিনি বাইরে রাখবেন, কারণ তাদের প্রতিক্রিয়া তাঁর পছন্দ হয়নি।

এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়, যখন তাঁর অধীন কেউ চাকরি ছাড়তে চান। ২০২৫ সালের শুরুতে সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মিশেল কিং সংবেদনশীল নথিতে প্রবেশাধিকার দেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে পদত্যাগ করেন। ট্রাম্প তখন বলেন, কাউকে বরখাস্ত করলে তারা সাধারণত বলে পদত্যাগ করেছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, কিংকে আসলে বরখাস্ত করা হয়েছে। অথচ তিনি ৩০ বছর ধরে সংস্থাটিতে কাজ করেছেন এবং প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন।

২০১৮ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে পদত্যাগপত্র দিলে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি ম্যাটিসকে নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগেই সরিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি তাঁর নিজের চিফ অব স্টাফও এ বর্ণনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। কিন্তু তথ্যের চেয়ে নিজের বয়ান প্রতিষ্ঠাই ট্রাম্পের কাছে মুখ্য।

সবচেয়ে বড় উদাহরণ, ২০২০ সালের নির্বাচনে তাঁর পরাজয়। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও তিনি ফলাফল অস্বীকার করেন। এর আগেই ২০২০ সালের আগস্টে তিনি বলেছিলেন, একমাত্র উপায় যেভাবে তিনি হারতে পারেন, তা হলো নির্বাচন কারচুপি হলে। অর্থাৎ পরাজয়ের সম্ভাবনাকেও আগেভাগে অস্বীকার করে রাখা।

এইভাবে ট্রাম্প একধরনের চিরন্তন অস্বীকারের রাজনীতি গড়ে তুলেছেন। তাঁর জগতে তিনি কখনো প্রত্যাখ্যাত নন, বরং সর্বদা প্রত্যাখ্যানকারী। শিশুদের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত আছে, হেড হলে আমি জিতব, টেল হলেও তুমি হারবে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক দর্শন যেন অনেকটা সে রকমই।

* জেফরি সোনেনফেল্ড, ইয়েল স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের লেস্টার ক্রাউন অধ্যাপক।
* স্টিভেন তিয়ান ইয়েল, চিফ এক্সিকিউটিভ লিডারশিপ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক।
- টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-10%2F1vaisljp%2FQatar-1.jpg?rect=184%2C0%2C1215%2C810&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরানের ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম সুরক্ষিত করার যে পরিকল্পনা মার্কিনিদের by জুলিয়ান বোর্গার

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনঃ ট্রাম্প প্রশাসন বিশেষ বাহিনীকে ইরানে পাঠানোর কথা ভাবছে, যাতে তারা দেশটির অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সুরক্ষিত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই ইউরেনিয়াম দিয়ে কমপক্ষে ১০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। ইরানকে বোমা তৈরির ক্ষমতা অর্জন থেকে বাধা দেয়াকে ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি বলা হয়েছে এবং ৪৪০ কেজি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সবচেয়ে বড় পারমাণবিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এটি তুলনামূলকভাবে সহজে অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়ামে পরিণত করা যেতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসকে বলেছেন, ‘মানুষকে যেতে হবে এবং এটা আনতে হবে।’ রুবিও আরও বিস্তারিত জানাননি। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলি রিপোর্টে উভয় দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে কিভাবে বিশেষ বাহিনী এমন মিশন সম্পাদন করতে পারে। তবে পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, জটিলতা এবং ঝুঁকি যথেষ্ট বেশি।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি সোমবার বলেছেন, জাতিসংঘের নজরদারি সংস্থা বিশ্বাস করে যে ইরানের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের ২০০ কেজি ইসফাহান শহরের বাইরে নিউক্লিয়ার কমপ্লেক্সের গভীর সুড়ঙ্গগুলিতে আছে। তিনি যোগ করেন যে, নাতানজের আরেকটি নিউক্লিয়ার কেন্দ্রে আরও একটি ‘পরিমাণ’ একই মানের ইউরেনিয়াম আছে। সেখানে ইরানীরা নতুন শক্তিশালী এবং গভীরভাবে সুবিধা তৈরি করেছে- যার নাম কুহ-ই কলাং গাজ লা, পশ্চিমা বিশ্লেষকদের কাছে পরিচিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামে।

অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড আকারে আছে, যা কক্ষ তাপমাত্রায় কঠিন। কিন্তু তাপ দিলে গ্যাসে পরিণত হয়। ফলে এটি আরও সমৃদ্ধ করা যায়। এটি ধাতব ক্যানিস্টারে সংরক্ষিত, প্রতিটি প্রায় স্কুবা ডাইভিং ট্যাঙ্কের আকারের, গভীর শ্যাফটে রাখা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বিশেষ বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে শত্রু পরিবেশ থেকে নিউক্লিয়ার উপকরণ বের করার মিশনের প্রশিক্ষণ পেয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধারণ ও সরানোর জন্য মোবাইল ইউরেনিয়াম ফ্যাসিলিটি নামে সরঞ্জাম তৈরি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞ এবং তাদের রক্ষা করার জন্য বাহিনী সহ এটি পাঠানো অন্তত দুইটি অবস্থানে বড় ধরনের মাটির অপারেশন জড়িত হবে, যা ইরানের অভ্যন্তরে এবং গভীরে। মডার্নারি ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের নিউক্লিয়ার সম্প্রসারণ বিশেষজ্ঞ জেফ্রি লুইস বলেন, এটা কঠিন হবে। এটা ভালভাবে রক্ষা করা হয়েছে এবং বড় ও ভারী। তাই আপনি কেবল প্রবেশ করে তুলে নিতে পারবেন না।

লুইস বলেন, একটি সি-১৭ (সেনা পরিবহন বিমান) মরুভূমিতে ল্যান্ড করবে এবং আপনি সিকিউরিটি পেরিমিটার তৈরি করবেন, ক্রেনগুলো উড়ে যাবে? অথবা আপনি ভেতরে গিয়ে এটাকে উড়িয়ে দেবেন এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি করবেন? সবগুলো বিকল্প আমার কাছে ফ্যান্টাসি মনে হচ্ছে।

শনিবার এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, ডনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেন এটি চ্যালেঞ্জিং। বলেছেন, এমন অপারেশন এখনই অবিলম্বে ঘটছে না। তিনি বলেন, ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনী এতটা দুর্বল না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন সেনা পাঠানো হবে না। তিনি নিউক্লিয়ার উপকরণ সুরক্ষার জন্য মাটির গভীরে অপারেশনকে বাদ দেননি। তবে বলেছেন এটি যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে হতে পারে। তিনি বলেন, কখনও হয়তো আমরা এটা করব। এখন আমরা এটা অনুসরণ করছি না। হয়তো পরে করব।

প্রশাসনের সমালোচকরা বিস্মিত যে ইউরেনিয়াম সুরক্ষার মিশন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। ডেমোক্রেট কংগ্রেসম্যান বিল ফোস্টার বলেন, তিনি গোপনীয় ব্রিফিং থেকে বের হয়ে শুনেছেন যে ইরানের নিউক্লিয়ার ক্ষমতা মোকাবেলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ফোস্টার বলেন, ইরানের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ প্রশাসনের প্রধান ফোকাস হওয়া উচিত। স্পষ্টতই তা হচ্ছে না।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের নিউক্লিয়ার পলিসি বিশ্লেষক ম্যাথিউ বন বলেন, এ ধরনের সামরিক অপারেশন শুরু করা এবং নিউক্লিয়ার বিপদকে যথার্থ হিসেবে দেখানো, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি অংশের জন্য পরিকল্পনা না থাকা হতাশাজনক। স্পষ্টত, ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে কিছু করা উচিত। এটি ইরানের সম্ভাব্য নিউক্লিয়ার অস্ত্র ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তিনি বলেন, সেরা সমাধান হলো যুদ্ধের পর একটি চুক্তি যার মাধ্যমে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো হবে। এমন সমাধান যুক্তরাষ্ট্র-ইরানি আলোচনার মাধ্যমে ওমানের মধ্যস্থতায় হচ্ছে, যা ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা চালানোর সময় চলছিল।
ইউরেনিয়াম ইরানের সহযোগিতা ছাড়া স্থানান্তর করা, লঘু করা বা সেখানে ধ্বংস করা- সবই বড় সমস্যা সৃষ্টি করবে। বন বলেন, এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল সাইটের ঘনিষ্ঠ নজরদারিতে নির্ভর করছে যাতে ক্যানিস্টারগুলো সরানো না হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কী করতে হবে তা নির্ধারণ করছে।

ইসরাইলের রেইচম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ মেইর জাভেদানফার বলেন, যতক্ষণ এটি ইরানে থাকে, পরিকল্পনা হলো কেউ যদি এর কাছে আসে, তারা নিহত হবে। সেটাই বর্তমান কৌশল। তিনি যোগ করেন যে নজরদারি কৌশল ফুলপ্রুফ নয়।
যদি তারা ইউরেনিয়াম আড়াল করতে সক্ষম হয়, তখনও ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বেঁচে থাকা সদস্যরা বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হবে যদি তারা ‘বোমার জন্য প্রতিযোগিতা’ করার চেষ্টা করে। অতিরিক্ত সমৃদ্ধকরণ, অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়ামকে ধাতুতে পরিণত করা, আকার দেয়া, বিস্ফোরক ডিভাইস তৈরি করা এবং মিসাইল বা অন্যান্য সবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা- থিওরিটিক্যালি কয়েক মাসে করা যেতে পারে। কিন্তু চিহ্নিতকরণ ছাড়া তা করা অত্যন্ত কঠিন।

বাইডেন প্রশাসনে ইরান নিয়ে বিশেষ দূত রবার্ট মালি বলেন, এই হল সেই সমস্যার মুখোমুখি যা বছরের পর বছর ইরানি শাসকগোষ্ঠী দেখেছে। তিনি বলেছেন, সমস্যা সবসময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত- যখন আপনি সিদ্ধান্ত নেন এবং বোমা অর্জন করেন, এটি সর্বোচ্চ বিপজ্জনক জোন। যদি শনাক্ত হয়, আপনি প্রায় নিশ্চিতভাবে বোমা হামলার শিকার হবেন এবং এই সমস্যা এখনও দূর হয়নি। তিনি বলেন, আমি বলছি না এটি অসম্ভব, তবে এটি খুবই বিপজ্জনক জুয়া হবে।
(অনলাইন গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ)

ইরানের ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম সুরক্ষিত করার যে পরিকল্পনা মার্কিনিদের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতছাড়া হতে পারে ইরান যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণঃ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিকে স্তম্ভিত করে দিলেও দেশটিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের খুব একটা লক্ষণ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এই যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনগুলোতে এই লড়াইয়ের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের হাতে ছিল—এ বিষয়ে খুব কম মানুষেরই সন্দেহ ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি অনেকটা অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মহসেন রেজায়ি গত রোববার বলেছেন, ‘কীভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি হবে, সেটা ঠিক করব আমরা।’ তিনি পারস্য উপসাগর থেকে ওয়াশিংটনের বাহিনী প্রত্যাহার এবং হামলার ফলে সৃষ্ট সব ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। তিন সপ্তাহ আগেও তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কণ্ঠে এমন আত্মবিশ্বাস পাওয়া অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।

ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। এরপর মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো ইরানে অবাধে কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে তাদের সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। তাদের একমাত্র উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ছিল নিজেদের বাহিনীর ভুলে হওয়া কিছু ঘটনা।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের জবাবে ইরান ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যাপক আক্রমণ চালায়, যার বেশির ভাগই ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রুখে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত ইরানি হামলায় ইসরায়েলে ১২ জন নিহত হয়েছেন, যা গত বছরের স্বল্পস্থায়ী সংঘাতের তুলনায় অনেক কম।

উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তু হলেও তাদের অবকাঠামো রক্ষা করতে পেরেছে। যদিও তাদের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ ফসকানোর নেপথ্যে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রতিদিন ইরানে হামলা চালিয়ে তাদের প্রচলিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেও যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সময় দিলেও সম্প্রতি জানিয়েছেন, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার মাধ্যমেই এই যুদ্ধের অবসান হবে।

তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের অজান্তেই তার পরিকল্পনার চেয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে আটকা পড়ছে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়ে থাকে। এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী করেছে। ফলে এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছে।

জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক ড্যানি ওরবাখ অবশ্য মনে করেন, এখনো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রই যুদ্ধের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করছে। তাঁর মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ–ব্যবস্থা শেষ হয়ে আসায় তেহরান বাধ্য হয়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে এটি কোনোভাবে থামানো যায়।

অন্যদিকে কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক পিটার নিউম্যান ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। আমার মনে হয়, এখন নিয়ন্ত্রণ ইরানিদের হাতে।’

ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক জোট গঠনের আহ্বান জানালেও এখনো কোনো দেশ তাতে সাড়া দেয়নি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, শত শত ট্যাংকার পাহারা দেওয়া বিশাল সামরিক সম্পদের ব্যাপার এবং তার পরেও জাহাজ চলাচলের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। কারণ, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা বিস্ফোরক বোঝাই ছোট নৌকাই ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তেহরানকেই নিতে হবে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আশা করেছিল, তার কোনো লক্ষণ বর্তমানে নেই।

নিউম্যান যোগ করেন, ‘ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারলেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করা যায়নি। সেখানকার শাসনব্যবস্থা দুর্বল মনে হলেও স্থিতিশীল।’

লেবানন ফ্রন্টেও হিজবুল্লাহ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি শক্তি প্রদর্শন করছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় সেখানে ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেও হিজবুল্লাহর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।

অবশ্য বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইসরায়েলের বিশাল সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সামনে হিজবুল্লাহর মূল লক্ষ্য এখন শুধুই টিকে থাকা।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নোঙর করে আছে এলপিজি গ্যাসবাহী একটি ট্যাংকার
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নোঙর করে আছে এলপিজি গ্যাসবাহী একটি ট্যাংকার। ছবি: রয়টার্স

খোলা আকাশের নিচে ইফতার ও সাহ্‌রি

সামাজিক মাধ্যম খুললেই দেখা যায়, খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টানিয়ে নিবু নিবু হলদে আলোয় ইফতার বা সাহ্রির ছবি। আগারগাঁওয়ের এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে চলছে এ আয়োজন। বন্ধুবান্ধব ও পরিবার–পরিজন নিয়ে মেট্রোরেলে করে ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে এখানে আসা যায়।

রমজানে বেজক্যাম্পে

এই ইফতার আয়োজন দেখতে একদিন নিজেই গিয়ে এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে হাজির হই। ইফতারের কিছুটা আগে আগে বেজক্যাম্পে ঢুকেই দেখি গমগম করছে চারদিক। উন্মুক্ত পরিবেশে ইফতারে অংশ নিতে অনেকে পরিবারের ছোটদের নিয়ে এসেছেন। তাঁদের সামনেই তৈরি হচ্ছে জিলাপি, বেগুনি ও পেঁয়াজু।

এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামজিদ সিদ্দিক বলেন, ‘বেশ ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।’

পরিবার–পরিজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে বা অফিসের করপোরেট মিটিং সারতে আসতে পারেন। একসঙ্গে ৩০০ থেকে ৩৫০ অতিথিকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা এখানে রয়েছে। রমজান মাসে এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে ইফতারির বুফের মূল্য ১ হাজার ২৯৯ টাকা আর ১ হাজার ৩৯৯ টাকায় পেয়ে যাবেন সাহ্‌রি। করপোরেট ইফতারি বক্স ৯৯৯ টাকায় শুরু। এখানে রয়েছে পার্কিং সুবিধা এবং নামাজের জন্য আলাদা জায়গা। এখানে আসতে আগে থেকে বুকিং দিতে হবে।

রোজার সময় দুপুর ১২টা থেকেই খোলা থাকে ক্যাম্প। ইফতারের আগে বা পরে অতিথিরা উপভোগ করতে পারেন বিভিন্ন মজাদার কার্যক্রম। রয়েছে লুডু, দাবা, সাউন্ড হিলিং, কুশিকাটার কাজ ও অরিগ্যামির মতো মানসিক প্রশান্তিদায়ক কাজ।

উত্তরা থেকে সপরিবার ইফতার করতে এসেছেন তাওয়াফ। তাঁর সঙ্গে কথা হলো, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক দিন ধরেই দেখছি। আজ সুযোগ হলো। খোলা আকাশের নিচে ইফতারির সঙ্গে প্রকৃতিপাঠ ও বিনোদন। অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা পাচ্ছি।’

ঢাকাবাসীর নতুন গন্তব্য

তামজিদ সিদ্দিক বলেন, ‘এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পের মূল লক্ষ্য মানুষকে আবার প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারায় উদ্বুদ্ধ করা। এখানে মানুষ অন্যান্য রেস্টুরেন্টের মতো কেবল খাওয়াদাওয়া করতে আসেন না; বরং নানাধর্মী অ্যাডভেঞ্চার ও রোমাঞ্চকর কার্যক্রমে অংশ নেন, নতুন কিছু শেখেন, প্রিয়জনদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটান। আমাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে এক ছাদের নিচে নানা ধরনের কার্যক্রম আপনি করতে পারবেন। যেমন দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠা, জিপলাইন, তিরন্দাজি, কাদামাটির রাস্তায় ট্রেইল অথবা বিভিন্ন ধরনের বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

শিশুদের জন্য আছে শিল্পচর্চার ক্লাস, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-গণিতভিত্তিক কার্যক্রম, আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ ও লেগো জোন।’ তাই পরিবার নিয়ে সময় ভালো কাটবে। শহুরে ব্যস্ততার মধ্যেও যে প্রকৃতির কাছে ফেরা যায়, এয়ারফোর্স বেজক্যাম্প সেটারই এক উদাহরণ। 

এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে করা যাবে ইফতার আর সাহ্‌রি
এয়ারফোর্স বেজক্যাম্পে করা যাবে ইফতার আর সাহ্‌রি। ছবি: সংগৃহীত

বৃটেনে চোখের চিকিৎসায় যুগান্তকারী উদ্ভাবন, প্রায় অন্ধ হওয়া চোখে অপারেশন ছাড়া ফিরিয়ে আনা হলো দৃষ্টিশক্তি

চোখের রোগ হাইপোটনি-তে আক্রান্ত রোগীদের দৃষ্টিশক্তি অপারেশন ছাড়া ফিরিয়ে এনেছেন লন্ডনের মুরফিল্ডস আই হাসপাতালের একদল চিকিৎসক। অপারেশন ছাড়া শুধু ইনজেক্শনের মাধ্যমে চোখের ''হাইপোটনি '' রোগের চিকিৎসা পাওয়া প্রথম রোগী ৪৭ বছর বয়সী নিকি গাই এখন সম্পূর্ণ দেখতে পাচ্ছেন।   

হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, যে কাজটি একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছিল, সেটিই তারা করে দেখিয়েছেন। বিরল কিন্তু মারাত্মক চোখের রোগ হাইপোটনি-তে আক্রান্ত রোগীদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা এবং অন্তত রোগটির অগ্রগতি প্রতিরোধে তারা সফল হয়েছেন।

লন্ডনের মুরফিল্ডস আই হাসপাতাল এখন বিশ্বের প্রথম চিকিৎসাকেন্দ্র, যেখানে এই রোগের জন্য আলাদা চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। একটি পাইলট গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষামূলক এই চিকিৎসা দেয়া ৮ জন রোগীর মধ্যে ৭ জনের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এই চিকিৎসা পাওয়া প্রথম রোগী ৪৭ বছর বয়সী নিকি গাই। তিনি তার অভিজ্ঞতা বিবিসির সঙ্গে শেয়ার করেছেন। নিকি বলেন, ফলাফল ছিল “অবিশ্বাস্য” এটি তার জীবনই বদলে দিয়েছে। তিনি আবার তার সন্তানের বেড়ে ওঠা দেখতে পারছেন।
চিকিৎসার আগে তার অবস্থা ছিল এমন যে, তিনি শুধু আঙুল গুনতে পারতেন এবং সবকিছু ঝাপসা দেখাত। এখন তিনি আবার স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি পরীক্ষার চার্টে থাকা অক্ষরও পড়তে পারেন। নিকি জানান, তিনি আইনগতভাবে গাড়ি চালানোর যোগ্যতা অর্জনের মাত্র এক লাইনের দূরত্বে আছেন যা আগের তুলনায় বিশাল পরিবর্তন। এর আগে তিনি আংশিক দৃষ্টিহীন ছিলেন। কাছের কোনো কিছু দেখতে হলে আতস কাচ ব্যবহার করতে হতো এবং ঘরের ভেতর বা বাইরে চলাফেরার সময় স্মৃতির ওপর নির্ভর করতে হতো। নিকি বলেন, তিনি একসময় ভেবেছিলেন জীবনের বাকি সময়টা হয়তো এভাবেই কাটবে দৃষ্টি থাকবে না, কখনো গাড়ি চালাতে পারবেন না। সে বাস্তবতাও তিনি মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন, কারণ তিনি এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিলেন, যেখান থেকে আর কোনো আশা দেখছিলেন না।

হাইপোটনি রোগে চোখের ভেতরের চাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। এর ফলে চোখের গঠন ভেঙে পড়তে শুরু করে। সাধারণত চোখের ভেতরের জেলির মতো পদার্থ ঠিকমতো তৈরি না হলে, আঘাত লাগলে বা প্রদাহের পর এমনটি হতে পারে। কখনো কখনো এটি চোখের অস্ত্রোপচার বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও দেখা দেয়। চিকিৎসা না হলে রোগী সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আগে চিকিৎসকেরা চোখের চাপ বাড়াতে সিলিকন অয়েল ব্যবহার করতেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো বিষাক্ত হতে পারে এবং দৃষ্টিশক্তি খুব একটা ফেরাতে পারে না। এমনকি চোখের পেছনের দৃষ্টি-সংক্রান্ত কোষগুলো কার্যকর থাকলেও সিলিকন অয়েলের কারণে দৃষ্টি ঝাপসাই থেকে যায়।

এই সমস্যার সমাধানে মুরফিল্ডসের চিকিৎসকেরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তারা ব্যবহার করেন স্বচ্ছ, জলভিত্তিক ও কম খরচের একটি উপাদান হাইড্রক্সিপ্রোপাইল মিথাইলসেলুলোজ (HPMC)। এটি আগে থেকেই কিছু চোখের অস্ত্রোপচারে ব্যবহার হয়ে আসছিল। তবে এবার এটিকে একবারের জন্য নয়, বরং নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতির অংশ হিসেবে চোখে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়।
নিকি জানান, ২০১৭ সালে তার ছেলের জন্মের পরপরই তার ডান চোখে প্রচুর সিলিকন অয়েল দেওয়া হয়েছিল। হাইপোটনির কারণে চোখটি স্বাভাবিক আকার হারিয়ে কাগজের মতো ভেঙে পড়েছিল। সেই চিকিৎসা খুব একটা কাজে আসেনি। কয়েক বছর পর একই সমস্যা তার বাম চোখেও দেখা দেয়।

নিকি বলেন, যখন বাম চোখের দৃষ্টি হারাতে শুরু করল, তখন ভাবলাম কিছু একটা করতেই হবে। হাল ছাড়তে চাইনি।
নিকির চিকিৎসক ও সার্জন হারিট কুশিন বলেন, তারা দুজন মিলে নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানান, একমাত্র কার্যকর চোখে এমন একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা প্রয়োগ করা তাদের জন্য বড় ঝুঁকি ছিল। কারণ, যদি ব্যর্থ হতো, রোগী সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়তেন।
তিনি আরও বলেন, এটি মূলত একটি পাইলট প্রকল্প ছিল। কিন্তু যেসব রোগী দুই চোখেই দৃষ্টিহীন হয়ে সারাজীবন অন্ধত্ব নিয়ে বাঁচতে বাধ্য হতেন, তাদের জন্য এই চিকিৎসা যে এত অসাধারণ ফল দেবে তা তারা নিজেরাও কল্পনা করেননি। 

ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন ভ্যান্স, তবে কি ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব

গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় টিভি অনুষ্ঠান সানডে শোতে উপস্থিত হয়েছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সেখানে তিনি ওই অভিযানকে সফল হিসেবে তুলে ধরেন। ভ্যান্স ওই অভিযান নিয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে এক মিনিটের কম সময়ের মধ্যে চারবার তাঁর মুখ থেকে ‘অবিশ্বাস্য’ বা ‘অবিশ্বাস্যভাবে’ শব্দটি উচ্চারিত হয়।

ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিতে অভিযান চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কঠোরভাবে সে অভিযানকে বৈধ হিসেবে সমর্থন করেছিলেন। তবে এবার ইরানে হামলার দুই সপ্তাহ হয়ে যাওয়ার পরও ভ্যান্সকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য সমর্থন দিতে দেখা যায়নি।

গত শুক্রবার নর্থ ক্যারোলাইনায় এক সংবাদকর্মী ভ্যান্সের কাছে জানতে চান, তিনি ট্রাম্পকে যুদ্ধের শুরুর দিকে এবং খুব সম্প্রতি কী পরামর্শ দিয়েছেন? ভ্যান্সের উত্তরটি ছিল দীর্ঘ, তবে যুদ্ধ সম্পর্কে নিজের ব্যক্তিগত মত প্রকাশ তিনি এড়িয়ে যান।

ভ্যান্স বলেন, ‘আমি আপনাদের হতাশ করতে চাই না। কিন্তু আমি এখানে এসে, ঈশ্বর ও সবার সামনে বলব না যে সেই গোপন কক্ষে ঠিক কী বলেছিলাম।’

ইরানে হামলার সময় ট্রাম্প একটি পর্যবেক্ষণ কক্ষে বসে পুরো ঘটনাটি দেখেছিলেন, এই কক্ষকে সিচুয়েশন রুম বলা হয়ে থাকে।

ভ্যান্স বলতে থাকেন, ‘এর একটি কারণ হলো আমি জেলে যেতে চাই না। আরেকটি কারণ হলো, আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে তাঁর পরামর্শদাতাদের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া জরুরি, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই পরামর্শদাতারা তাঁদের কথা মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না করেন।’

এ এক অদ্ভুত উত্তর। তবে এর মধ্য দিয়ে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে ভ্যান্স এই বিষয়ে নিজেকে কীভাবে এড়াচ্ছেন।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ভ্যান্সের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্তব্যগুলো হলো, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে নিশ্চয়তা দেওয়া।

ইরান যুদ্ধকে ভ্যান্স যে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ্য সমর্থন দেননি, তা শুরু থেকেই চোখে পড়ছিল। এখন তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ভ্যান্স শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধে জড়ানোর বিরুদ্ধে বলেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে ট্রাম্প সেনা অভিযানকে সমর্থন করছেন, তখন তিনি অবস্থান বদল করেন এবং প্রেসিডেন্টকে দ্রুত ও কঠোর হামলা চালাতে উৎসাহিত করেন।

ভ্যান্সের আগের মন্তব্যগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি অন্য দেশের ওপর হস্তক্ষেপ না করাকে সমর্থন করেন।

সিনেটর থাকাকালে ২০২৩ সালে ভ্যান্স একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলেন। সেখানে তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে ট্রাম্পকে মোটাদাগে সফল প্রেসিডেন্ট বলা যায়, কারণ তিনি যুদ্ধে জড়াননি। ২০২৪ সালে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়। এতে অনেক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হবে।

২০২০ সালে ট্রাম্প যখন এক ইরানি কমান্ডারকে হত্যার আদেশ দেন, তখনো যুদ্ধের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন ভ্যান্স। এ ছাড়া গত বছর ‘সিগন্যাল গেট’ নামে আলোচিত ব্যক্তিগত বার্তাগুলোতে দেখা গেছে, তিনি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে অনীহ ছিলেন।

কিন্তু ভ্যান্স এখন ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প সাধারণত চান ভাইস প্রেসিডেন্টসহ চারপাশের মানুষেরা তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য দেখাক। এমন অবস্থায় ভ্যান্সকে প্রকাশ্যে মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে দেখা গেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচকেরা এটিকে রাজনীতির খেলা হিসেবে দেখবেন। তাঁরা বলবেন, ভ্যান্স ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছেন। তবে তাঁর এই দূরত্ব বজায় রাখার আচরণ রাজনৈতিকভাবে অসুবিধা তৈরি করতে পারে।

গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর ভ্যান্স দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত দুই সপ্তাহে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা কথা বলছেন না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে মাত্র আটটি পোস্ট করা হয়েছে।

তবে উল্লেখজনক বিষয় হলো, ভ্যান্স সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার কম করছেন।

জেডি ভ্যান্সের ব্যক্তিগত ও সরকারি অ্যাকাউন্টে করা পোস্টগুলোর মধ্যে কিছু ইরান সংক্রান্ত ছিল। এগুলো ছিল মূলত নিহত সেনাদের খবর বা ট্রাম্পের মন্তব্য শেয়ার করা সংক্রান্ত পোস্ট। তিনি ইরান সম্পর্কে ফক্স নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারও পোস্ট করেছেন। তবে ২ মার্চের ওই সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তু ইরান হলেও ভ্যান্স মূলত যুদ্ধ সম্পর্কে নিজের ব্যক্তিগত মতামত এড়িয়ে গেছেন।

ভ্যান্স বারবার ট্রাম্প কী ভাবছেন বা কী করছেন, সেটাই বলেছেন। যেমন ‘প্রেসিডেন্ট দেখছেন’, ‘প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন’, ‘প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত হতে চেয়েছেন’, ‘প্রেসিডেন্ট খুব স্পষ্ট’, ‘প্রেসিডেন্ট শুধু চাইছেন’ এমন সব কথা।

এক দিক থেকে এটি ভ্যান্সের কাজেরই অংশ। কারণ, তাঁকে প্রেসিডেন্টের মতামতই তুলে ধরতে হয়। কিন্তু জুনে তাঁর অবস্থান এমন ছিল না। তখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর হামলার পর তিনি অনেক বেশি নিজের ব্যক্তিগত মত ও মনোভাব নিয়ে কথা বলেছিলেন।

এবার ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফক্স টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স আশ্বাস দেন, এই যুদ্ধ ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো কয়েক দশক ধরে চলবে না।

এর বাইরে তিনি ইরান নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই মন্তব্য করেছেন। গত সোমবার ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ফায়ার ফাইটারস–এর এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি শুধু সংক্ষেপে নিহত সেনাসদস্যদের কথা উল্লেখ করেছেন। আর শুক্রবার নর্থ ক্যারোলাইনায় দেওয়া তাঁর বক্তৃতার বড় অংশজুড়ে ছিল অর্থনীতি।

ভ্যান্সের বিষয়ে ট্রাম্প ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। দুজনের কেউই খুব জোর দিয়ে অস্বীকার করেননি যে ভ্যান্সের অবস্থান প্রেসিডেন্টের থেকে কিছুটা আলাদা।

গত সোমবার ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয় তাঁর সঙ্গে ভ্যান্সের কোনো মতভেদ আছে কি না। তিনি উত্তর দেন, ‘আমি তেমনটা মনে করি না। না। না। আমাদের মধ্যে এ বিষয়ে বেশ ভালো বোঝাপড়া আছে।’

কিন্তু এরপর তিনি ইঙ্গিত দেন যে কিছুটা পার্থক্য আছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলব, চিন্তাভাবনার জায়গা থেকে তিনি আমার থেকে একটু ভিন্ন। আমি মনে করি তিনি হয়তো এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে কম উৎসাহী ছিলেন, কিন্তু মোটেও অনিচ্ছুক ছিলেন না।’

শুক্রবার হেগসেথের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ভ্যান্স ও ট্রাম্পের মধ্যে কোনো ‘বিভাজন’ আছে কি না। তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেছেন।

হেগসেথ বলেন, প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি ভাইস প্রেসিডেন্ট এই দলের একজন অসাধারণ সদস্য ও নেতা। এই দল ট্রাম্পকে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব করে। হেগসেথের দাবি, ভ্যান্স এ দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেন।

দর্শনগত বা রাজনৈতিক যেকোনো কারণেই হোক না কেন, ভ্যান্স এখন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধের গুঞ্জন সম্পর্কে সাংবাদিকদের কিছুই বলেননি। এতে বোঝা যায়, তিনি বিষয়টিকে পুরোপুরি সমর্থন করছেন। ট্রাম্প প্রশাসনও তাঁকে দূরে থাকার সুযোগ দিচ্ছে।

কিন্তু দেখতে হবে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অবস্থান কত দিন ধরে রাখতে পারেন তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি