Wednesday, February 25, 2015

সশস্ত্র বাহিনীকে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে মামলা : ১০ দিনের রিমান্ডে মান্না, আদালতে যা বললেন মান্না

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বিদ্রোহে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা মামলায় নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার মহানগর হাকিম মো. মাহবুবুর রহমানের আদালতে গুলশান থানার এসআই আবদুল বারিকের আবেদনের প্রেক্ষিতে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে তাকে বিধি ‍অনুযায়ী চিকিৎসা সেবা দেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে সোমবার মধ্যরাতে তুলে নিয়ে যাওয়ার ২১ ঘণ্টা পর থানায় হস্তান্তর করা হয় মান্নাকে। গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে র‌্যাব সদস্যরা তাকে গুলশান থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বিদ্রোহে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। এ মামলায় মান্না ছাড়াও অজ্ঞাতনামা একজনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, মান্নার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৩১ ধারায় মামলা করা হয়েছে। এসআই সোহেল রানা মামলাটির বাদী। মামলায় গতকাল সন্ধ্যায় মান্নাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। গত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে বনানীর একটি বাসা থেকে মান্নাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয়ে একটি দল তাকে নিয়ে যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। পরিবারের লোকজন গতকাল দিনভর খোঁজ করেও জানতে পারেননি, তিনি কোথায় ছিলেন, কেমন ছিলেন।
দিনভর মান্নার খোঁজ পাওয়া না গেলেও রাত সাড়ে ১০টার দিকে আভাস পাওয়া যায় যে তাঁকে রাতের যেকোনো সময় থানায় হস্তান্তর করা হবে। শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এদিকে পুলিশের রমনা, মতিঝিল ও গুলশান বিভাগের ১১ থানায় মান্নার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, নাশকতা, লাশ ফেলাসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগে পুলিশ ২৪টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। আর পরিবারের পক্ষ থেকে মান্নাকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে বনানী থানায় একটি জিডি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকা এবং অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে মান্নার কথোপকথন নিয়ে গত সোমবার আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরপর রাত সাড়ে তিনটার দিকে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মন্ত্রী ও সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা গতকাল পৃথক অনুষ্ঠানে মান্নাকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি তোলেন। আর বিএনপি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্যসহ কয়েকটি সংগঠন মান্নার খোঁজ না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।
এর আগে মান্নার স্বজনেরা জানান, ভাতিজির বনানীর বাসা থেকে সোমবার রাত সাড়ে তিনটায় নিয়ে যাওয়া হলেও গতকাল রাত পর্যন্ত তাঁরা মান্নার কোনো খবর জানেন না। মান্নাকে উদ্ধারে তাঁরা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ ঘটনায় বনানী থানায় জিডি করেছেন মান্নার ভাবি বেগম সুলতানা। বনানী থানায় করা সুলতানার জিডিতে বলা হয়, রাতে কলাবাগানের বাসা থেকে মান্না তাঁর ভাতিজি শাহানামা শারমিনের বনানীর বাসায় যান। রাত সাড়ে তিনটার দিকে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে সাদাপোশাকের পাঁচ-ছয়জন লোক ওই বাসার সামনে গিয়ে নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দেন। বাসার লোকজন সকাল না হওয়া পর্যন্ত দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানান। আগত ব্যক্তিরা বলেন, ‘আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না।’ পরে দরজা ভেঙে ফেলার হুমকি দিলে একপর‌্যায়ে দরজা খুলে দেওয়া হয়। এরপর ভেতরে ঢুকে মান্নাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান তাঁরা।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মান্নার সঙ্গে খোকা ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির কথোপকথনে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করা ও রাষ্ট্রদ্রোহের আভাস রয়েছে। এতে সেনাবাহিনীতে বিভেদ সৃষ্টিরও উসকানি ছিল।
নাগরিক ঐক্যের দাবি: গতকাল সকালে সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক ঐক্যের পক্ষ থেকে মান্নার মুক্তি দাবি করা হয়। এই সম্মেলনে মাহমুদুর রহমানের বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল।
নিউইয়র্কে অবস্থানরত বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকা এবং এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির সঙ্গে দুটি টেলিফোন কথোপকথন ইন্টারনেটে প্রকাশিত হওয়ার পর নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য এই সংবাদ সম্মেলনের আহ্বান করেন মান্না।
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা ইফতেখার আহমেদ লিখিত বক্তব্যে বলেন, মান্নাকে ডিবি পুলিশ বনানীতে তাঁর আত্মীয়ের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু পুলিশ আটকের কথা অস্বীকার করছে।
বিএনপির প্রতিক্রিয়া: গতকাল এক বিবৃতিতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সাদাপোশাকধারী সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই মান্নাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে বক্তব্য দেওয়ায় আমরা বিস্মিত হয়েছি। যে প্রক্রিয়ায় দেশের এই পর্যায়ের একজন নাগরিককে তুলে নেওয়া হলো, তাতে রাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার এবং বেঁচে থাকার অধিকারের কোনো গ্যারান্টি অবশিষ্ট রইল না।’
আদালতে যা বললেন মান্না
আদালতে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, আমি অসুস্থ ব্যক্তি। আমার বয়স ৬৪ বছর। যে অভিযোগে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে বিষয়ে আমি বলতে চাই, আমার বক্তব্য একপেশে করা হয়েছে। বাকি অংশটুকু বাদ দেয়া হয়েছে। বাকি অংশ পেলে বুঝতে পারবো, আসলে সরকার আমার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ এনেছে। আমাকে যদি জিজ্ঞাসাবাদই করতে হয় তবে যেন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আদালত যদি আমাকে ১/২ ঘণ্টা টিভিতে বলার সুযোগ দেন তবে আমি বলতে পারব আমি কি বলেছি। একজন পুলিশ কর্মকর্তা তা বুঝতে পারেন না। সেজন্য দেশবাসীর জানা উচিত আমি কি বলেছি।
মান্না বলেন, আমি গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমর্থন করি। তবে সহিংসতা পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যা সমর্থন করি না। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের কথা বলেছি তবে হত্যা বা সহিংসতার কথা বলেনি। গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলতে যা বুঝায় তাই আমি সমর্থন করি।
যে প্রবাসীর ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে, সেই প্রবাসী ব্যক্তি কে সরকার তার নাম সংগ্রহ করেনি। যা একপেশে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীর যে কর্মকর্তাদের কথা বলা হয়েছে তাদের নামও সরকার উল্লেখ করেনি। আসলে সবকিছুই একপেশে হয়েছে। আমি কোনো সেনা, নৌ বা বিমান বাহিনীর কর্মকর্তার সাথে কথা বলিনি। তিনি বলেন, তবে গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অগণতান্ত্রিক। যা দেশী-বিদেশী সবাই জানে। এ বক্তব্য দেয়ায় ক্ষোভে দু:খে ফেটে পড়েন সরকার দলীয় আইনজীবীরা। সেজন্য তারা তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারপরও মান্না তার কথা বলা বন্ধ করেননি। মান্না আরো বলেন, আমি সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র লিপ্ত নই। কোনো বাহিনীকে উস্কানী দেইনি। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ, শান্তির কথা বলি।
মাহমুদুর রহমান মান্নকে বেলা ৩টা ১৫ মিনিটের সময় আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী আদালতে গারদখানায় নিয়ে আসে। তখন আদালতে ব্যাপক সংখ্যক আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা তাকে করতালির মাধ্যমে অভিবাদন জানান। তারা বলতে থাকেন, মান্না তোমার ভয় নাই, আমরা আছি তোমার সাথে।
বেলা ৩ টা ১৮ মিনিটের সময কোর্ট গারদ (হাজত) থেকে আদালতে হাজির করা হলে সরকারপন্থী আইনজীবীরা তাকে বসতে দিতে রাজি ছিল না। তখন আইনজীবীরা আদালতে তার বসার বিষয়ে অনুমতি চাইলে আদালত বেঞ্চ থেকে কাঠগড়ার একটি টুল দেন বসার জন্য। তখন মান্না ওই টুলে আর বসেননি।সার্বক্ষণিক মান্না কাঠগড়ায় পাঞ্জাবী পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকেন।

বিচারপতি টিএইচ খানের বাসা ঘিরে পুলিশ

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি টিএইচ খানের বাসা ঘিরে অবস্থান করছে পুলিশ। বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনীজীবী ও দলের গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর আইনী বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য বিকালে পৌনে ৫টায় বিচারপতি টিএইচ খানের মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের বাসায় যান দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা ও আইনজীবী। এর কিছুক্ষন পর বাসাটি ঘেরাও করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা। টিএইচ খানের বাসার লোকজন জানায়, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কর্মীদের কেউ কেউ দেয়ার টপকে বাসার আঙিনায় ও ছাদে উঠে পড়ে। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পুলিশ বাসার চারপাশে অবস্থান নেয়। আওয়ামী লীগ-যুবলীগের বেশ কিছু কর্মীও বাসার চারপাশে অবস্থান করছে। টিএইচ খানের বাসায় বৈঠকে নেয়া আইনজীবীদের মধ্যে রয়েছেন- বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, এডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, এডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী প্রমুখ। সন্ধ্যার পর থেকে বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরা সে বাসায় অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন।

ছয় বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলার বিচার by নুরুজ্জামান লাবু

আজ ২৫শে ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ বিডিআর বিদ্রোহের ৬ বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু এখনও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলার বিচার। বর্তমানে বিশেষ বেসামরিক আদালতে বিস্ফোরক মামলাটি চলমান রয়েছে। এ মামলায় আসামির সংখ্যা ৮৩৪ জন। এ পর্যন্ত এই মামলার ৩০ কার্যদিবসে ২৭ জন সাক্ষী দিয়েছেন। মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১০ই মার্চ। তবে ইতিমধ্যে মর্মান্তিক এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৯ হাজার সদস্যকে সাজাসহ চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আর লঘুদণ্ড পাওয়া ৮ হাজার সদস্যকে চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছে। হত্যা মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে ২৬২ জনকে সাজা দেয়া হয়। বিশেষ আদালতের হত্যা মামলা এবং অধিনায়কের সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে এসব সাজার রায় হলেও বিশেষ বেসামরিক আদালতে বিস্ফোরক মামলা এখনও চলমান রয়েছে। এদিকে বিভীষিকাময় এই ঘটনার ৬ বছর পরে বাহিনীতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন বিজিবি’র শীর্ষ কর্মকর্তারা।
২০০৯ সালের এই দিনে তখনকার বাংলাদেশ রাইফেলস-বিডিআরের বিপথগামী সদস্যরা বিদ্রোহ করে। এ সময় তারা ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিদ্রোহীদের হাতে বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, তার স্ত্রী, বাসার কাজের মেয়ে ও বেড়াতে আসা আত্মীয়রাও নিহত হন।
বিজিবি সূত্র জানায়, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় অভিযুক্তসহ ১৭ হাজার ৩১১ (বিডিআর সদস্য ও বেসামরিক ব্যক্তি) জনকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তাদের মধ্যে ৬ হাজার ৪১ জনকে বিশেষ আদালত ও ১১ হাজার ২৬৫ জনকে অধিনায়ক সামারি কোর্টের মাধ্যমে বিচার করা হয়। আসামিদের মধ্যে ৯ হাজার ১৯ জনকে বিভিন্ন সাজাসহ চাকরিচ্যুত করা হয়। বাকি ৮ হাজার ২৮৭ জন সরাসরি বিদ্রোহে সম্পৃক্ত না থাকায় তাদের লঘুদণ্ড (তীব্র ভর্ৎসনা, বেতন কর্তন, ডিমোশন ইত্যাদি) দিয়ে চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছে। আর হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ৮৫০ জনের ১৫২ জনকে ফাঁসি, ২৬০ জনকে যাবজ্জীবন ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। এছাড়া, ২০ জন আসামি পলাতক রয়েছে। পলাতক আসামিদের ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এদিকে পিলখানা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডসহ অন্যান্য দণ্ডপ্রাপ্তদের বিষয়ে আপিলের জন্য প্রধান বিচারপতি কর্তৃক সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে।
বিজিবি মহাপরিচালক আজিজ আহমেদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ঐ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ইতিমধ্যে বিচারের রায় হয়েছে। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্সে শুনানি চলছে। গত দুই বছর ধরে তিনি এ বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই বিদ্রোহে যারা জড়িত ছিলেন তাদের সাজা হয়েছে। যারা জড়িত নয় তারা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিজিবি পুনর্গঠনের ব্যাপারে তিনি বলেন, বিজিবি’র গোয়েন্দা শাখার দুর্বলতার দিকগুলোকে পুনর্গঠন করা হয়েছে। বিজিবি পুনর্গঠনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তার সবকিছুই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিজিবি সদস্যদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে তিনি বলেন, বিষয়টি জাতিসংঘ সদর দপ্তরকে অনুরোধ করা হয়েছে। যদি কখনও কোন দেশে শান্তিরক্ষার জন্য সীমান্ত বাহিনী প্রয়োজন হয়, তবে তারা বাংলাদেশের বিজিবি’র কাছে চাহিদাপত্র পাঠাবে।
বিজিবি সূত্র আরও জানায়, ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিজিবি’র জনবল ছিল ৪৪ হাজার। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার। গঠন করা হয়েছে ৪টি রিজিওনাল হেডকোয়ার্টার্স ও ৪টি সেক্টর হেডকোয়ার্টার্স। বিজিবি পরিচালিত স্কুল, কলেজে সেকশন বৃদ্ধির মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন বিজিবি’র যে কোন সদস্য সুপারিশ করলেই তাদের সন্তানকে এসব স্কুলে ভর্তি করা হচ্ছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে ২৫ ভাগ ঝুঁকি ভাতা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেখানে ৩০ ভাগ ঝুঁকি ভাতা (সীমান্ত ভাতা) দেয়া হচ্ছে। শতভাগ রেশন সুবিধাও দেয়া হচ্ছে। আগে বিজিবি সদস্যদের সন্তানদের ২২ বছর পর্যন্ত রেশন সুবিধা দেয়া হতো। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ বছরে। এছাড়া প্রতিবন্ধী সন্তানদের চাকরির মেয়াদের পুরো সময় রেশন সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
কর্মসূচি: বেদনাবিধুর এ দিবসটি পালনের লক্ষ্যে বিজিবি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনও নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দিনের কর্মসূচি অনুুযায়ী শহীদ ব্যক্তিবর্গের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশে পিলখানাসহ বিজিবি’র সব রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বাদ ফজর খতমে কোরআন এবং বিজিবি’র সব মসজিদে এবং বিওপি পর্যায়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সকাল ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে  প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধানগণ (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও বিজিবি মহাপরিচালক (একত্রে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টায় পিলখানার বীরউত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে (সাবেক দরবার হল) শহীদ ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি’র পক্ষ থেকেও কর্মসূচি পালন করা হবে বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী, বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্ন

জাতিসংঘের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ফের বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক ২৩শে ফেব্রুয়ারি নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নে বলেন, শান্তিরক্ষী মিশনগুলোতে একটি রিভিউ প্রক্রিয়া রয়েছে। যার মধ্য দিয়ে এসব ইউনিটসমূহকে যেতে হয়। প্রশ্নোত্তর আকারে ওই ব্রিফিং তুলে ধরা হলো :
প্রশ্ন: ওকে। আমি শুক্রবারে আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। এখন আমি তা আপনার কাছ থেকে আদায় করার চেষ্টা করছি। এর সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী ব্যবহারের প্রশ্ন জড়িত। এই বিষয়টি সাধারণভাবে নয়, অত্যন্ত নির্দিষ্টভাবে। মূলত একটি তালিকা পাওয়া গেছে।
মুখপাত্র: যদি কোন মেইল পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে আমি তা পেলে বাধিত হব। হ্যাঁ। আপনি যা বলছিলেন বলুন-
প্রশ্ন: যাকে ২০১৩ সালের ম্যাসাকার (নির্বিচারে হত্যা) বলা হয়ে থাকে, যাতে নির্দিষ্ট কমান্ডারগণ অংশ নিয়েছিলেন। আর সে কারণেই মি. তারানকোকে সেখানে যেতে হয়েছিল এবং আমি অনুমান করার চেষ্টা করছি যে, যেহেতু নামগুলো প্রকাশিত হয়েছে এবং তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম আইসিসি (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট)’র বরাবরে দাখিল করা আবেদনে উল্লিখিত হয়েছে, যদিও আমি জানি না যে, সেটা আইসিসি ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছে কি করেনি। কিন্তু অত্যন্ত নির্দিষ্ট বিষয় হচ্ছে, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি বর্ষণের যে ডকুমেন্টেশন রয়েছে তার ভিত্তিতে জাতিসংঘ কি ধরনের রিভিউ করেছে এবং এমওএনইউএসসিও (ইউনাইটেড নেশনস অর্গানাইজেশন স্ট্যাবিলাইজেশন মিশন) এটি শান্তিরক্ষী মিশনগুলোতে প্রেরণ করেছে।
মুখপাত্র: আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে একটি রিভিউ প্রক্রিয়া রয়েছে যার মধ্য দিয়ে এসব ইউনিটসমূহকে যেতে হয়। আর সেই প্রক্রিয়ায় ডিপিকেও (ডিপার্টমেন্ট অব পিসকিপিং অপারেশনস) এবং স্বাগতিক দেশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এবং এটাই হলো প্রক্রিয়া। আমার আর কিছু বলার নেই, আপনি বলুন।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ে সেক্রেটারিয়েটের (জাতিসংঘ সচিবালয়) ঘোষিত আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে আপনি কি ডিপিকেও-এর কোন বিবৃতির বিষয়ে ধারণা দিতে পারেন যে, এ পর্যন্ত দেশে প্রেরিত কনটিনজেন্টের ব্যাপারে কি ধরনের রিভিউ করা হয়েছে?
মুখপাত্র: আমি মনে করি রিভিউ করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু আমি যদি এ বিষয়ে অন্য কিছু জানতে পারি, তাহলে আমি আপনাকে তা জানিয়ে দেব।

অমর্ত্য সেনের বক্তৃতা

বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সোমবার রাজধানীর কৃষিবিদ মিলনায়তন ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক প্রগতি শীর্ষক যে উন্মুক্ত বক্তৃতা দিয়েছেন, তা কিছু বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবনার উদ্রেক ঘটায়। তার বক্তব্যের সার কথাটি হল, মানবিক প্রগতি ছাড়া অর্থনৈতিক প্রগতি অর্জন কঠিন। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ দুটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, আবার কখনও তা দ্বান্দ্বিকও হতে পারে। তবে উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে মানবিক প্রগতির বিষয়টি বিবেচনায় না নিলে থেমে যেতে পারে অর্থনৈতিক অগ্রগতি। বস্তুত অমর্ত্য সেনের এ কথার মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল গোটা সমাজে পৌঁছে দেয়ার প্রয়োজনীয়তাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। একটি দেশের অর্থনীতির সূচকগুলো ওপরের দিকে থাকতে পারে; কিন্তু শুধু এটিই জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নতির নিশ্চয়তা দেয় না। সর্বস্তরের মানুষ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল তখনই পেতে পারে, যখন সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং কমে যাবে বৈষম্য। এতে দারিদ্র্যও হ্রাস পাবে। এটিই মানবিক প্রগতির মূল কথা।
আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাই। এজন্য চাই ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্প্রসারণ। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। এ প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেন বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, এটিই স্বাভাবিক। এতে বেসরকারি খাত সমৃদ্ধ হবে। বাড়বে সরকারের রাজস্ব। কিন্তু এক্ষেত্রে মানবিক উন্নয়নের দিকে সরকারের নজর না থাকলে এর বাণিজ্যিকীকরণ ঘটবে। এর ফলে বেড়ে যাবে সেবার মূল্য, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সেবা খাতগুলো গণমানুষের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হবে। ধনীরা সেবা পেলেও বঞ্চিত হবে দরিদ্র মানুষ। অর্থাৎ অর্থনীতির উন্নতি হলেও এতে গণমানুষের উন্নতি হবে না। যে উন্নতির সুফল পাবে সর্বস্তরের মানুষ, সেটিই মানবিক প্রগতি। এটি নিশ্চিত করতে হবে সরকারি উদ্যোগে। এজন্য বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে একটি গ্রহণযোগ্য উপায় খুঁজে বের করতে হবে। একটি রাষ্ট্রের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য জনগণের যে সন্তুষ্টির প্রয়োজন, মানবিক প্রগতি অর্জনের মাধ্যমে তা নিশ্চিত হতে পারে।
অমর্ত্য সেনের এ জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যগুলো আমাদের অনুধাবন করতে হবে। তিনি অবশ্য বলেছেন, মানবিক প্রগতি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। নারী উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। তবে এ নিয়ে আÍতৃপ্তির সুযোগ নেই। আমাদের সমাজে আয় ও সম্পদের বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। উন্নতির সুফল ভোগ করে মুষ্টিমেয় মানুষ। এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা জরুরি।
অমর্ত্য সেন গণতন্ত্রের নানা দিক ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও বক্তব্য রেখেছেন। এক্ষেত্রে তার একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রে আলোচনা না করলে কোনো কিছু বদলানো সম্ভব হয় না। এ আলোচনার জায়গাটা ভারতবর্ষজুড়েই সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এ বাস্তবতায় বিদ্যমান গণতন্ত্রে যেটুকু মঙ্গলজনক তা গ্রহণ করে কীভাবে এ গণতন্ত্রকে আরও উন্নত করা যায় তার জন্য বিতর্কের সুযোগ কিংবা পরস্পরের আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে চালিয়ে যেতে হবে উন্নয়ন। আমরা আশা করব, অর্মত্য সেনের এসব বক্তব্যের সারমর্ম অনুধাবনে সচেষ্ট হবেন সবাই। অর্থাৎ গণমানুষের সার্বিক মঙ্গলের মধ্যেই নিহিত আছে প্রকৃত উন্নয়ন। মুষ্টিমেয় মানুষের উন্নতি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নতি নয়।

ফোনালাপে তোলপাড় by শেখ মামুনূর রশীদ

আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার দুটি টেলিফোন কথোপকথন ফাঁসের পর দেশব্যাপী তোলপাড় চলছে। ‘জেনারেলদের সঙ্গে বৈঠকে আগ্রহী মান্না’ এবং ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশ চান মান্না’ শিরোনামে দুটি অডিওবার্তা ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন তিনি। মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে পাড়ার চায়ের দোকান- সর্বত্রই চলছে মান্নার ফোনালাপ নিয়েই তর্ক-বিতর্ক। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও বিষয়টি চাঙ্গা রেখেছে। তবে এ বিষয়ে খোদ মাহমুদুর রহমান মান্নার বক্তব্য হচ্ছে, তার ফোনালাপ সত্য। তিনি গ্রেফতার আতংকে ভুগছেন।
সোমবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা এবং একজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনের অংশে তার বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি স্রেফ একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। কথোপকথন ফাঁস হওয়ায় তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘আপাতত’ আÍগোপনে থাকার পথ বেছে নিয়েছেন। মাহমুদুর রহমান মান্নার এই ফোনালাপকে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। তারা অবিলম্বে তাকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলত সাজা দেয়ার দাবি করেন।
ফাঁস হওয়া বক্তব্যের কারণে সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও অফিসার্স ফেডারেশন তাকে গ্রেফতারের দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা মান্নার শিক্ষাগত সব সনদ বাতিলের দাবি করেন। এদিন সন্ধ্যায় বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে তুলোধুনো করেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। এছাড়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে মান্নাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে। একই সঙ্গে তাকে দেখা মাত্র গণধোলাই দেয়ার জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেয়া হয়। নাগরিক ঐক্যের পূর্বনির্ধারতি কর্মসূচি সোমবার শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়। কর্মসূচি উপলক্ষে দলের নেতাকর্মীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমবেত হলে পুলিশ পাহারার মধ্যেই নেতাদের ছাড়াই কর্মীরা মিছিল করেন। শান্তি ও সংলাপের দাবিতে সোমবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে গণমিছিল করার কর্মসূচি ছিল নাগরিক ঐক্যের।
সেনা হস্তক্ষেপ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশ ফেলার কথোপকথন ফাঁস হওয়ার ঘটনাকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন মন্ত্রিসভার সদস্যদের অনেকেই। তারা অবিলম্বে মান্নাকে গ্রেফতারের দাবি তোলেন। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্যরা ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ তার আগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও কথা বলেন। তারা বলেন, মাহমুদুর রহমান মান্না একেক সময় একেক দল করেছেন। কখনও জাসদ, কখনও বাসদ, এরপর আওয়ামী লীগ- এভাবে দল বদল করেছেন। তার কোনো চরিত্র নেই। এ নিয়ে হাস্যরসও হয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে। একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বলেন, মাহমুদুর রহমান মান্নার বড় ভাই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। জামায়াতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ করতেন তার বড় ভাই। ঘটনাচক্রে হয়তো মাহমুদুর রহমান মান্না জাসদে যোগ দিয়েছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে মান্নার সাম্প্রতিক তৎপরতার পেছনে জামায়াতের যোগসূত্র আছে।
মন্ত্রীদের ক্ষোভের কথা শোনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘কথোপকথনের যেসব তথ্য ফাঁস হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে, তারা একটা ষড়যন্ত্র নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। এখন আপনারাই চিন্তা করেন, ভেবে দেখেন, কী করা যায়? ক্যাবিনেটের আলোচনা সবই তো গণমাধ্যমে চলে যায়।’
সোমবার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে নাগরিক ঐক্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু ড. কামাল হোসেন কর্মসূচিতে আসেননি। এছাড়া মাহমুদুর রহমান মান্না উপস্থিত থাকতে না পারায় শেষ মুহূর্তে পূর্বঘোষিত গণমিছিল করা থেকে সরে আসেন নাগরিক ঐক্যের নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা। নাগরিক ঐক্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি (মাহমুদুর রহমান মান্না) অসুস্থ। তাই কর্মসূচিতে যোগ দিতে পারেননি। নাগরিক ঐক্যের এ কর্মসূচিকে ঘিরে পুলিশ দিনভর বেশ তৎপর ছিল। তোপখানা রোডের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও জাতীয় প্রেস ক্লাব সর্বত্র অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাগরিক ঐক্যের একজন শীর্ষ নেতা জানান, গ্রেফতার হতে পারেন- এমন ভাবনা থেকেই মূলত কর্মসূচিতে অংশ নেননি মাহমুদুর রহমান মান্না। এদিকে মাহমুদুর রহমান মান্নার কথোপকথনের বিষয়টি নিয়ে সরকার আরেকটি জজ মিয়া নাটক সাজানোর চেষ্টা করছে বলে দাবি করেছেন নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এসএম আকরাম হোসেন। পূর্বঘোষিত গণমিছিলের কর্মসূচি স্থগিত করে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। এসএম আকরাম বলেন, মাহমুদুর রহমান মান্নার নামে যে অডিও টেপ ইন্টারনেটে ছাড়া হয়েছে তা সত্য নয়। মান্না এ ধরনের কথা বলতে পারে না। জনগণকে বিভ্রান্ত করতেই এটা করা হয়েছে।
ফোনালাপ নিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। বিষয়টি নিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না নিজেও বিব্রতবোধ করছেন বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন। সোমবার তিনি বলেন, সামগ্রিক বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে আজ সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছেন। বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৃতীয় তলার মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। মাহমুদুর রহমান মান্না যুগান্তরের কাছে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা এবং একজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়টি স্বীকার করে দাবি করেছেন, তার বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, বিষয়টি স্রেফ একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে না পেরে সরকার তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। মাহমুদুর রহমান মান্না এ সময় আরও বলেন, তিনি গ্রেফতার আতংকে ভুগছেন।
ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপের কথোপকথনে সংলাপ না করলে প্রয়োজনে সেনা হস্তক্ষেপে ভূমিকা রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন মাহমুদুর রহমান মান্না। অজ্ঞাত এক ব্যক্তির কাছে টেলিফোন করে তিনি এ আগ্রহ প্রকাশ করেন। অজ্ঞাত পরিচয়ের ওই ব্যক্তি নিজেকে এক-এগারোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে দাবি করেন। অডিও ক্লিপের কথোপকথনে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশিত হয়।
জানতে চাইলে সোমবার এ প্রসঙ্গে টেলিফোনে মাহমুদুর রহমান মান্না যুগান্তরকে বলেন, ‘কবে কখন কার সঙ্গে এমন কথা হয়েছে তা মনে করতে পারছি না। তবে এটা ঠিক আমি গত কিছুদিন ধরেই বলে আসছি- চলমান সংকট নিরসন না হলে আবারও দেশে এক-এগারোর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে, আমি দেশে সেনা শাসন চাই। কিংবা অসাংবিধানিক শাসন চাই।’ তিনি আরও বলেন, মনে রাখতে হবে এক-এগারোর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল দুই দলের জেদাজেদির কারণে। এজন্য সাধারণ মানুষ দায়ী নয়। ভবিষ্যতেও যদি দেশে এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে এর জন্য দায়ী থাকবে দুই বড় দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। আমি নই।’
সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা সম্পর্কে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘একজন নাগরিক হিসেবে সবার সঙ্গেই আমার আলোচনার সুযোগ রয়েছে। সেনাবাহিনীর কোনো কোনো কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হলে, আমি তাদের সঙ্গে কথা বলব কিনা সে সম্পর্কে জানতে চাইলে, আমি বলেছি- হ্যাঁ কথা বলতে রাজি আছি। আমি রাজনীতি করি। তাই সবার সঙ্গেই আমাকে কথা বলতে হয়। এটা থেকে এক-এগারো বা সামরিক কু’এর ষড়যন্ত্রের আবিষ্কার হয় কীভাবে? যেখানে এ রকম কোনো বৈঠকই হয়নি। তাই এ নিয়ে অপব্যাখ্যার কোনো সুযোগ নেই।’
বেশ কিছুদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থানরত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে কথোপকথনে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশ চাওয়ার বিষয় নিয়েও যুগান্তরের প্রশ্নের জবাব দেন মাহমুদুর রহমান মান্না। ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপে মাহমুদুর রহমান মান্না সাদেক হোসেন খোকাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কথা বলতে শোনা গেছে।
বিএনপি-জামায়াত জোটের চলমান আন্দোলন নিয়ে দুই নেতার দীর্ঘ কথোপকথন রয়েছে ওই টেপে। এ বিষয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না যুগান্তরকে বলেন, ‘সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে আমার মাঝে মধ্যেই কথা হয়। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তিনিই আমাকে ফোন করেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানতে চান। আমিও আমার মতামত তার সঙ্গে শেয়ার করি। লাশ ফেলার প্রসঙ্গটি অবান্তর।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে আলাপচারিতায় অনেক প্রসঙ্গই এসেছে। আমি তাকে বলেছি, গণতন্ত্রের দাবিতে আমি আন্দোলন সমর্থন করি। সহিংসতা সমর্থন করি না। এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ব্যাপকভাবে জনগণকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা উচিত। সহিংসতা বর্জন করা উচিত।’
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমি সাদেক হোসেন খোকাকে বলেছি আন্দোলন-সংগ্রামে এখনও ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এ জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত ও বিস্তৃত করতে হবে। এটা করতে গিয়ে যদি পুলিশ বা সন্ত্রাসী হামলায় দুই চারজনের জীবনও যায় কিছু করার নেই।’ তিনি বলেন, ‘এমনিতেই তো প্রতিদিন মানুষ মরছে। কেউ পুড়িয়ে মানুষ মারছে। কেউ ক্রসফায়ারের নামে মানুষ মারছে। রোববার রাতেও ক্রসফায়ারের নামে চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। আমার এ বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে বোঝানোর চেষ্টা চলছে যে, যেন আমিই লাশ চাই। আমি তাকে (সাদেক হোসেন খোকা) লাশ ফেলতে বলছি।’
এক-এগারো পরবর্তী সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পান আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না। নির্বাচনের পর দলীয় পদ হারিয়ে গত মহাজোট সরকারের সময়ে তিনি নাগরিক ঐক্য নামে একটি সামাজিক সংগঠন গঠন করেন। সম্প্রতি তিনি ড. কামাল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতিতে বিকল্প শক্তির উত্থানে গণফোরাম, সিপিবি, বাসদ, জেএসডিসহ সমমনা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিয়ে যুগপৎভাবে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সংলাপে বসাতে সুশীল সমাজের উদ্যোগের পেছনেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
মান্নাকে গ্রেফতারের দাবি ঢাবি শিক্ষক সমিতি : মাহমুদুর রহমান মান্নার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশ ফেলার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। সোমবার পৃথক বিবৃতিতে তারা এ দাবি জানান। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বিবৃতিতে বলেন, মাহমুদুর রহমান মান্না রাজনীতির নামে দেশ, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রবিরোধী গভীর ষড়যন্ত্রে মত্ত রয়েছেন।
আরেক বিবৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ আলী আকবর এবং সাধারণ সম্পাদক মো. রমিজ উদ্দিন অবিলম্বে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এ সময় তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশ ফেলার ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান। এছাড়াও একই দাবি জানিয়েছেন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স ফেডারেশনের সভাপতি মো. কামাল উদ্দীন ও মহাসচিব সৈয়দ আলী আকবর।

সঙ্কট সমাধানের উপায় by আনু মুহাম্মদ

এ এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। একদিকে পেট্রলবোমা হামলা ও ককটেল নিক্ষেপ অন্যদিকে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার, ক্রসফায়ার নানা নামে সরাসরি গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। চারদিকে ভয়ঙ্কর নিরাপত্তাহীনতা। শ্বাসরুদ্ধকর এই সময়ে আমরা গণতন্ত্র থেকে অনেক দূরে।
এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হলে তিনটি কাজ করতে হবে। ১. সরকারকে ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার বন্ধ করতে হবে। হামলা-গ্রেপ্তার-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। সভা-সমাবেশের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সবাই যেন অবাধে মত প্রকাশ করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। ২. বিরোধী জোটকে হরতাল-অবরোধ স্থগিত করতে হবে। সহিংসতা থেকে দূরে থাকতে হবে। সভা-সমাবেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ফিরতে হবে। ৩. যুদ্ধাপরাধী, লুটেরাদের বাদ দিয়ে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলেও এ জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। এ তিনটি কাজ করা গেলে আমরা বর্তমান সঙ্কট থেকে বের হতে পারবো। এক্ষেত্রে সংলাপেরও প্রয়োজন হবে না। বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানোই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। না হয় আত্মঘাতী পরিস্থিতি কারও জন্যই ভালো হবে না। এখন আওয়ামী লীগের লোকও কিন্তু ক্রসফায়ারে মারা যাচ্ছে। এ লড়াই আওয়ামী লীগ-বিএনপি কারও জন্যই সুখকর হবে না।
নোট: প্রতিক্রিয়াটি দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব।

লাশ ফেলার কথা ডাঁহা মিথ্যা -সাদেক হোসেন খোকা by মনির হায়দার

চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা বলেছেন, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে তার কথোপকথনের যে অডিও ক্লিপ প্রকাশিত হয়েছে, তা সত্য। তবে তাতে কোথাও লাশ ফেলা নিয়ে কোন কথা হয়নি, অডিও ক্লিপসেও সে রকম কোন কথাই নেই। কিন্তু সরকারি দলের এক শ্রেণীর মিথ্যাবাদী নেতা ও প্রচার-সন্ত্রাসী নিজেরাই এ রকম একটি কথা বানিয়ে এখন গোয়েবলসীয় কায়দায় সেটির প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন, যা ডাহা মিথ্যা।
মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ঢাকার সাবেক এই মেয়র বলেন, বিদেশে অবস্থান করলেও নিজ দল বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সিভিল সোসাইটির উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ এবং সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার নিয়মিতই রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথাবার্তা হয়। মান্নার সঙ্গে আলোচনাও সে রকমই নিতান্তই দু’জন রাজনীতিকের অতি সাধারণ আলোচনা। কিন্তু বর্তমান অবৈধ সরকার আমাদের স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে সেই কথোপকথন রেকর্ড করে শতভাগ মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়ানোর মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।
সাদেক হোসেন খোকা বলেন, মাহমুদুর রহমান মান্না এদেশে উড়ে এসে জুড়ে বসা কোন রাজনীতিক নন। তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র রাজনীতিক, যিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের জিএস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। তিনি একাধারে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনীতিক, জনপ্রিয় সুবক্তা, খ্যাতিমান লেখক এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকল জাতীয় ইস্যুতে একজন সোচ্চার নাগরিক। আওয়ামী লীগের জনবিচ্ছিন্ন ও সুবিধাবাদী রাজনীতির সঙ্গে একাত্ম হতে না পেরে তিনি সম্পূর্ণ নিজের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের যোগ্যতা বলে একটি কার্যকর নাগরিক উদ্যোগ গড়ে তুলতে সক্ষম হন। দেশে চলমান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সংগ্রামের একজন অগ্রসৈনিক হিসেবে আমরা যার যার স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে যুগপৎ লড়াইয়ে রয়েছি। সুতরাং তার সঙ্গে আমার টেলিফোনে আলাপ-আলোচনা মোটেই কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়। এই আলোচনা নিয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডা সৃষ্টিকারীরা নিছক অসুস্থ মানসিকতার অধিকারী গণদুশমন ব্যতীত কিছুই নয়।
বিএনপির এই প্রভাবশালী নেতা মানবজমিনকে আরও বলেন, মান্নার সঙ্গে আমার আলোচনায় মূলত অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন-লড়াইয়ের বিভিন্ন কর্মকৌশল ও গতি-প্রকৃতি নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। সেখানে আন্দোলনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আঙ্গিনায় সমপ্রসারিত করার যৌক্তিক প্রসঙ্গটিই তিনি উত্থাপন করেছেন এবং আমরা উভয়ে সে ব্যাপারে বাস্তব পরিস্থিতির চিত্রটি নিয়ে আলোচনা করেছি। এ কথা কে না জানে যে, বায়ান্ন সালের মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং এ জাতির সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের মূল প্রাণকেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় মুক্তবুদ্ধি চর্চার পীঠস্থান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয় এবারই প্রথম তার দীর্ঘকালের ঐতিহ্য হারিয়ে সম্পূর্ণরূপে একটি দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় বসার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আঙ্গিনা থেকে সব রকম ভিন্নমতের চর্চাকে জোরপূর্বক নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। এটি এখন নিতান্তই আওয়ামী লীগ দলীয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দলবাজির এক অভয়ারণ্য। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদতে সরকার সমর্থকরা ঐতিহ্যবাহী এই ক্যাম্পাস ও হলগুলো জবরদখল করে রেখেছে। ভিন্নমতের কোন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি সেখানে সহ্য করা হচ্ছে না। কেবলমাত্র ভিন্নমতের সমর্থক হওয়ার কারণে সেখানে অনেকের ছাত্রত্ব বাতিলের নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দলবাজ উপাচার্য বিদ্যমান আইনকানুন ও সকল রীতি-রেওয়াজ উপেক্ষা করে তার প্রতিটি পদক্ষেপ ও বক্তব্যের মাধ্যমে  দীর্ঘকালের সুনামধারী প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যত আওয়ামী লীগের একটি শাখা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। এই পরিস্থিতিতে জনগণের চলমান স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন-লড়াইকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আঙ্গিনায় সমপ্রসারিত করার প্রসঙ্গটিই মান্না ও আমার আলোচনায় উঠে আসে।
সাদেক হোসেন খোকা বলেন, বর্তমান সময়ের নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, বর্তমান অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারের নিয়োজিত ঘাতকদের পেট্রলবোমা ও গুলিতে নিরীহ-নিরপরাধ মানুষ, এমনকি শিশু-কিশোররাও অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছে। এই পটভূমিতে সামপ্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীনদের সশস্ত্র ক্যাডারদের একচ্ছত্র আখড়ায় পরিণত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলন বিস্তৃত করতে গেলে সে জন্য কি ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে, আমাদের আলোচনায় মান্না কেবলমাত্র সেই কথাটিই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। খুনের নেশায় উন্মত্ত এই জালিম সরকার জনগণের আন্দোলনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আঙ্গিনায় সমপ্রসারিত হওয়ার চেষ্টা প্রতিরোধে যে কোন ধরনের মানবতাবিরোধী হিংস্রতার পথ বেছে নিতে পারেন বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মান্না।
তিনি বলেন, আমাদের সকলেরই পরিষ্কার মনে আছে যে, আওয়ামী জোটের নেত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময় এক প্রকাশ্য জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ‘একটা লাশের বদলে দশটা লাশ চাই’। তাঁর এই ভয়ঙ্কর ঘোষণাকে সেদিন যারা সামান্যতম অপরাধ হিসেবেও বিবেচনা করেনি, সেসব প্রচার-সন্ত্রাসীরাই আজ একটি বানোয়াট অভিযোগের ধুয়া তুলে মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো স্বনামখ্যাত ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিকের চরিত্র হননের ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তথা সরকারের প্রত্যক্ষ উসকানিতে তাদের দলীয় সন্ত্রাসীরা ঐতিহ্যবাহী ডাকসু ভবন থেকে মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো প্রতিষ্ঠানতুল্য ছাত্রনেতার নাম মুছে ফেলা ও কতিপয় দলান্ধ শিক্ষক মান্নার সনদ বাতিলের জিগির তুলেছে। এসবের মধ্য দিয়ে তারা প্রকৃতপক্ষে শান্তিপ্রিয় জনগণের এই দেশে প্রতিহিংসা ও অসহিষ্ণুতার এক চরম দৃষ্টান্ত স্থাপনের আত্মঘাতী পথই বেছে নিয়েছে। সাদেক হোসেন খোকা তাঁর সঙ্গে কথোপকথনকে ঘিরে সব রকম বিকৃত ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা থামিয়ে অবিলম্বে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান।
সরকার ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টায় লিপ্ত
মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে কথোপকথনকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক আলাপ দাবি করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা বলেছেন, এই আলাপকে ঘিরে পলায়নপর অবৈধ সরকারের মন্ত্রী ও এমপিরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের নির্লজ্জ অপচেষ্টায় লিপ্ত। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই মিথ্যা অভিযোগের ধুয়া তুলে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে সন্ত্রাসী কায়দায় তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে বন্দি করে রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে খোকা বলেন, তীব্র জনরোষের ভয়ে আতঙ্কিত সরকার স্বউদ্যোগে নানারকম বায়বীয় অভিযোগ সৃষ্টি করে চলমান আন্দোলন-লড়াইকে দমনের নীল নকশা বাস্তবায়নের পথ বেছে নিয়েছে। আমি স্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাই যে, মাহমুদুর রহমান মান্না একজন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব এবং সুপরিচিত রাজনীতিবিদ। তার সঙ্গে আমার সাম্প্রতিক টেলিফোন কথোপকথনের বিষয়টি চলমান আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ও কর্মকৌশল নিয়ে অতি স্বাভাবিক আলোচনা। এখানে সরকারের প্রচার সন্ত্রাসীদের ভাষায় ‘লাশ ফেলে দেয়ার’ কোন কথা হয়নি। সাদেক হোসেন খোকা বলেন, দেশবাসীর খুব ভাল করেই জানা আছে যে, আজকের বিনা ভোটের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেত্রী থাকাকালে প্রকাশ্য জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, একটা লাশের বদলে দশটা লাশ চাই। আজকে তার দলের লোকেরাই একটি বানোয়াট অভিযোগ তুলে মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো একজন পরিচ্ছন্ন ও সজ্জন রাজনীতিককে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকারে পরিণত করতে উদ্যত হয়েছে। সাদেক হোসেন খোকা বলেন, আমাদের আলোচনায় খুব পরিষ্কারভাবেই যে বিষয়টি এসেছে, তা হলো বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু পরবর্তীকালের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং এই জাতির সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় মুক্তবুদ্ধি চর্চার পীঠস্থান। কিন্তু ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে বিগত কয়েক বছরে ঐতিহ্যবাহী এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণ একটি দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। এখানে ভিন্নমতের চর্চাকে আজকাল রীতিমত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় সরকার সমর্থিতরা বিরোধী দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের কোন সদস্যকেই সেখানে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। শুধুমাত্র ভিন্নমতের সমর্থক হওয়ার কারণে অনেকের ছাত্রত্ব বাতিলের ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে চলমান গণআন্দোলনকে বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় সম্প্রসারিত করার যৌক্তিক প্রসঙ্গটিই আমার সঙ্গে আলোচনায় উত্থাপন করেন মান্না। বিবৃতিতে খোকা বলেন, একথা কে না জানে যে, বর্তমান অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে দেশে প্রতিদিন কত নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে? সেখানে সাম্প্রতিককালে ক্ষমতাসীনদের সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন করতে গেলে কি ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে, আমার সঙ্গে আলোচনায় মান্না কেবলমাত্র সেই কথাটিই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ বর্তমান সরকারের খুনের নেশা তার অজানা নয়। বিবৃতিতে খোকা বলেন, রাজনৈতিক প্রয়োজনে শুধু মাহমুদুর রহমান মান্না নয়, নিজ দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন দলের অনেক নেতা, নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সিনিয়র সাংবাদিকদের অনেকের সঙ্গেই রাজনৈতিক বিষয়ে আমার নিয়মিত আলোচনা হয়। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা ছাড়াও ব্যক্তিগত কিছু শেখা বা জানার আকাঙ্ক্ষা থেকেও কথা বলি। কিন্তু মান্নার সঙ্গে এই অতি সাধারণ আলোচনায় সরকারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। বিবৃতিতে খোকা মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ সব রাজবন্দির মুক্তি ও জবরদখল ভূমিকা থেকে সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানান।

কুড়ি ঘণ্টা কোথায় ছিলেন মান্না?

বাংলাদেশে নাগরিক ঐক্য নামে একটি দলের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বাসা থেকে নিখোঁজ হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টারও বেশী সময় পরে এসে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করার কথা স্বীকার করেছে।
মি. রহমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার দাবী করা হয়, সোমবার গভীর রাতে তাকে সাদা পোশাকের পুলিশ বনানীর একটি বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়।
কিন্তু এদিন সারাদিনই পুলিশের তরফ থেকে তাকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়।
অবশ্য বুধবার সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশ একটি সংবাদ সম্মেলন করে বলছে, মঙ্গলবার মাঝরাতে ধানমন্ডির একটি রেস্তোরা থেকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব।
পরে গুলশান থানায় একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কিন্তু এর প্রায় কুড়ি ঘণ্টা আগে মি. রহমানকে তুলে নেবার যে অভিযোগ তার পরিবার করছে, সেই কুড়ি ঘণ্টা তিনি কোথায় ছিলেন, সেই প্রশ্নের জবাব এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে বিবিসির শাহনাজ পারভীন এই প্রশ্নটি তুললে পুলিশের মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম বলেন, সেটার জবাব আমরা দিতে পারবো না। রেকর্ড বলছে তাকে গত রাত বারোটায় আটক করা হয়েছে। এর আগের খবর জানিনা।
মি. ইসলাম আরও বলেন, তার নিখোঁজ হবার ব্যাপারে তার পরিবারের তরফ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। সেটার তদন্ত করার পরই বলা যাবে তিনি কোথায় ছিলেন।
সেনা উসকানির মামলা:
র‍্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান বিবিসিকে বলেছেন, মাহমুদুর রহমান মান্নার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দণ্ডবিধির ১৩১ ধারায় একটি মামলা ছিল। সেই মামলার আওতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দণ্ডবিধির ১৩১ ধারাটিতে বলা হয়েছে, বিদ্রোহে সাহায্য, প্ররোচনা বা কোন সৈন্য, নাবিক বা বৈমানিককে কর্তব্য হতে বিপথগামী করার চেষ্টা করা।
পুলিশ বলছে, আজই মি. রহমানকে আদালতে হাজির করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
মি. রহমানের দল নাগরিক ঐক্য বাংলাদেশে বিবদমান প্রধান দুই দলকে সংলাপে বসানোর আহ্বান জানিয়েছিল এবং এই মর্মে আন্দোলন করছিল।
এরই এক পর্যায়ে মি. রহমানের কিছু টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হয়, যাতে তিনি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করবার ষড়যন্ত্র করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এই কথোপকথন ফাঁস হবার পরদিনই তাকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বলে তার পরিবার অভিযোগ করে।

সানার বাইরে আলোচনা চান মনসুর হাদী

ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু আল-মনসুর হাদী রাজধানী সানার বাইরের কোনো স্থানে দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়েছেন। জাতিসংঘ দূত জামাল বেনোমার তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, হাদী সানায় অব্যাহতভাবে চলমান আলোচনার ব্যাপারে আপত্তি প্রকাশ করেছেন। হাদীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার পর বেনোমার এ কথা বলেন। তিনি বলেন, উভয়পক্ষের সম্মতিতে কোনো নিরাপদ স্থানে আলোচনা করার অনুরোধ জানিয়েছেন পশ্চিমাপন্থী নেতা হাদী। শিয়া হুথি মিলিশিয়ারা বর্তমানে রাজধানী নিয়ন্ত্রণ করছে। হাদীকে মিলিশিয়ারা গৃহবন্দি করে রেখেছিল। তবে তিনি শনিবার সানা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের এডেন নগরীতে পালিয়ে যান।
ইয়েমেনে মারাত্মক সংকট সমাধানের লক্ষ্যে রাজনৈতিক পালাবদল প্রক্রিয়া ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আলোচনার অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন হাদী। তিনি হুথি সৈন্য প্রত্যাহার ও একতরফা পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকার দাবি জানিয়ে ১৬ ফেব্র“য়ারি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। মিলিশিয়ারা হাদীকে স্থলাভিষিক্ত করতে ‘প্রেসিডেন্ট পরিষদ’ গঠন করেছে। গত সেপ্টেম্বরে বিদ্রোহী শিয়া মুসলিম গোষ্ঠী হুথির যোদ্ধারা রাজধানী দখল করে নেয়। এক মাস আগে তারা প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ দখল করে প্রেসিডেন্ট আব্দ-রাব্বু মনসুর হাদী ও তার সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে। কয়েক বছর ধরে চলা তীব্র রাজনৈতিক সংকটের পর আঞ্চলিক, রাজনৈতিক, গোষ্ঠীগত ও সম্প্রদায়গত হানাহানিতে বিভক্ত হয়ে পড়া ইয়েমেন এখন পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারী দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ইয়েমেনের পরিস্থিতি সৌদি আরবের জন্যও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবার সানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর হাদী প্রথমবারের মতো বিবৃতি দেন। তিনি হুথির রাজধানী দখলকে ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাদের সব কর্মকাণ্ড ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেন। এএফপি।

মোদি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আন্না হাজারে

ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে ভারত সরকারের জারি করা একটি অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামবেন ভারতের আলোচিত সামাজিক আন্দোলনকারী আন্না হাজারে। অধ্যাদেশকে ‘কৃষকবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরে দুই দিনের এক প্রতিবাদের আয়োজন করতে যাচ্ছেন। এতে যোগ দিচ্ছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এনডিটিভিকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বিজেপি সরকার ঘোষিত অধ্যাদেশটিকে কৃষকদের স্বার্থবিরোধী অধ্যাদেশ বলে চিহ্নিত করেছেন আন্না। একটি কৃষিপ্রধান দেশের প্রত্যেক মানুষের একত্র হয়ে এই অধ্যাদেশের প্রতিবাদ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। কেজরিওয়াল দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী, কোনো সাধারণ নাগরিকের মতো করে তাকে দেখা যায় না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। সবাই যদি রাজি হয় তাহলে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেজরিওয়ালকে প্রতিবাদ মঞ্চে স্বাগত জানাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে এই ধরনের পরিস্থিতিগুলো কাজে লাগাতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী প্রতিবাদস্থলে এসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসতে চাইলে তা করতে পারবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। আন্নার ভাষায় এই অর্ডিন্যান্স এক কথায় ‘কৃষকবিরোধী’। তিনি সরকারের কাছে এই অর্ডিন্যান্স প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। এর সঙ্গেই জানিয়েছেন এই অর্ডিন্যান্স সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করলে রামলীলা ময়দানে বৃহত্তর প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলবেন তিনি। ‘ইন্ডিয়া আগেনস্ট কোরাপশন’ আন্দোলনের জনক জানিয়েছেন কৃষক মারা এই অর্ডিন্যান্সের বদলে কেন্দ্র সরকারের উচিত এ দেশের কৃষকদের দুরবস্থা দূরীকরণে সচেষ্ট হওয়া। হরিয়ানার পালওয়াল থেকে শুক্রবার পদযাত্রা শুরু করেছিলেন এক দল কৃষক। সোমবার যন্তর মন্তরে আন্নার অবস্থান মঞ্চে যোগদান করেছেন তারা। জমি অধিগ্রহণ অ্যাক্ট, ২০১৩ অনুযায়ী পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে শর্তাধীনভাবে ৭০% ক্ষেত্রে জমির মালিকের অনুমতি বাধ্যতামূলক। নয়া এই অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, পাঁচটি ক্ষেত্র- শিল্প করিডর, পিপিপি প্রজেক্ট, গ্রামীণ পরিকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও আয়ত্তের মধ্যে আবাসন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে আর প্রয়োজনীয় নয় জমি মালিকের সম্মতি।

সরকারের লক্ষ্য সবার উন্নয়ন

ভারতের সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি সোমবার বেলা ১১টায় সংসদের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে এই অধিবেশনের সূচনা করেন। প্রণব তার ভাষণে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ অর্থাৎ ‘সবার সঙ্গে, সবার উন্নয়ন’ তার সরকারের উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করেন। গরিব মানুষের উন্নয়নে তার সরকার দায়বদ্ধ বলে তার ভাষণে জানান।
প্রণব মুখার্জি জানান, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। দেশের সব স্কুলে শৌচালয়ের ব্যবস্থা করা হবে, জমি অধিগ্রহণ আইনে চাষীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নারীদের নিরাপত্তা, ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ তফশিলি জাতি-উপজাতি, সংখ্যালঘুদের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। বাজেট অধিবেশনের আগে রোববার সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় দিল্লিতে। বাজেট অধিবেশন যাতে শান্তিপূর্ণভাবে চলে সেজন্য সরকার পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে বিরোধীদের প্রতি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই বৈঠকে উপস্থিত থেকে বিরোধীদের প্রতি আশ্বাস দিয়েছেন, তাদের পক্ষ থেকে তোলা সব বিষয় নিয়ে সংসদে আলোচনা করা হবে। সংসদবিষয়ক মন্ত্রী এম ভেঙ্কাইয়া নাইডু বিরোধী দলের সহযোগিতা পেতে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে তার সহযোগিতা কামনা করেছেন। সরকারের জারি করা বিভিন্ন অর্ডিন্যান্সকে আইনে পরিণত করতে রাজ্যসভায় তাদের সহযোগিতা বিশেষ প্রয়োজন। কারণ রাজ্যসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। বিরোধীরাই এখানে শক্তিশালী। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পরে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কি প্রতিক্রিয়া আসে সেটিই এখন দেখার। কারণ, বিরোধীরা বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারকে বিপাকে ফেলতে তৈরি হয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বিরোধীদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা জারি রয়েছে।

মমতার সফরে কী পেল বাংলাদেশ? by আলী ইমাম মজুমদার

তিন দিনের সফরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সফরকালে তাঁর মধ্যে লক্ষ করা গেছে আবেগ আর উচ্ছ্বাস। পাশাপাশি প্রত্যাশা। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেসব বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে, তার মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি আর ছিটমহল বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ। ছিটমহল বিনিময়সংক্রান্ত চুক্তিটিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আর তিস্তা চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট মূলত পশ্চিমবঙ্গ। এ দুটি অনিষ্পন্ন বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। এর পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সফর ও তাঁর বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয়।
উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, ভারত আমাদের নিকট প্রতিবেশী। স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রধান মিত্র। আর পশ্চিমবঙ্গ ওই স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় আমাদের ৮০ লাখ শরণার্থীকে সাদরে আশ্রয় দিয়েছিল। ভাগাভাগি করে নিয়েছিল আমাদের সুখ-দুঃখ।
২০১১ সালে ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরকালে এ দুটি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে মালামাল পরিবহনসংক্রান্ত একটি ট্রানজিট চুক্তিও সম্পন্ন হবে। তাঁর সফরসঙ্গী হওয়ার কথা পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীরা। ভারত সরকারের ‘হোমওয়ার্কের’ ঘাটতি কিংবা বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক অক্ষমতা যেটাই হোক, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আসেননি। তদুপরি তিনি তিস্তার পানি বণ্টন এবং ছিটমহল বিনিময়সংক্রান্ত চুক্তিরও বিরোধিতা করতে থাকেন। ফলে পানি বণ্টন ও ট্রানজিট চুক্তি হয়নি। ছিটমহল বিনিময়সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। তখনকার ভারত সরকার ছিটমহল বিনিময় চুক্তিটি কার্যকর করার জন্য ভারতীয় সংবিধানে একটি সংশোধনী আনতে রাজ্যসভায় শুধু একটি বিল উপস্থাপন করে।
উল্লেখ্য, এতদবিষয়ক মূল চুক্তিটি ১৯৭৪ সালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বাংলাদেশ সে বছরই এ বিষয়ে সংবিধান সংশোধন করে নিয়েছে। ভারতে আজও বিষয়টি অপেক্ষমাণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সফরে এসে জানান, সংসদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনে তা পাস হবে। এই বিলের প্রশ্নে তাঁর ইতিবাচক ভূমিকা সম্পর্কেও তিনি বাংলাদেশের জনগণকে আশ্বস্ত করতে সচেষ্ট ছিলেন। এ বিষয়ে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকেও ইতিবাচক মনে হচ্ছে। অন্য দেশের সীমারেখার মাঝে কতগুলো অপ্রবেশ্য ছিটমহল নামকাওয়াস্তে মালিকানায় রেখে আমরা সেখানকার বসবাসকারীদের দুর্ভোগই দীর্ঘায়িত করছি। ছিটমহল প্রশ্নে তাঁর আগের ভূমিকা পরিবর্তনের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানাতে হয়।
এরপর আসছে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি। দেশের খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনাকালে তিনি এ বিষয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন। সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁর প্রতি আস্থা রাখতে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালেও তিনি জানিয়েছেন, উভয় দেশের স্বার্থরক্ষা করে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিটিও শিগগিরই স্বাক্ষরিত হবে। তিনি তাঁকে নিরুদ্বেগ থাকার জন্যও পরামর্শ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে তিনি তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে ছিলেন অনমনীয়। এবার তাঁর বক্তব্য ভিন্নরূপ। স্মরণে রাখা দরকার, বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী তিস্তা পানির অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে। এখানে লক্ষ করার বিষয়, যেদিন তিনি এ দেশে আসেন, সেদিন তিস্তার পানিপ্রবাহ ছিল ১৬৫ কিউসেক। স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। নৌকাও চলে না। গত কয়েক বছর এই সময়ে ৩০০ থেকে ৪০০ কিউসেক পানি পাওয়া যেত। অথচ সেচসহ অন্য সব কাজের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন সাড়ে তিন হাজার কিউসেক। বাংলাদেশ সফরকালে যদি কিছুটা বাড়তি পানি ছাড়তে তিনি নির্দেশ দিয়ে আসতেন, সেটা তাঁর আশ্বাসকে আরও অর্থবহ করত। তাঁকে বিশ্বাস করার আবেদনও হতো আরও জোরদার। পানি ছাড়তে তো আর চুক্তি লাগে না।
নদীমাতৃক দেশটির অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে নদীর ভূমিকা ব্যাপক। ঠিক তেমনি তিস্তারও। অবশ্য এ ভূমিকা বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের। ভারতের সিকিম রাজ্যের হিমালয় পর্বতমালার এক হিমবাহ এর উৎস। দুই দেশ মিলিয়ে তিস্তার দৈর্ঘ্য ৩০৯ কিলোমিটার। বাংলাদেশে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি ব্রহ্মপুত্রে মিলেছে। গোটা দেশটির ১৪ শতাংশ ফসলি জমি এর পলিবাহিত। প্রায় এক কোটি লোক নদীটির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। দেশের শতকরা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করছে তিস্তার ওপর। ১৯৮৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণের আগ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে এর প্রবাহ থাকত পাঁচ হাজার কিউসেকের অধিক। আর এখন? ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে। বর্ষায় বাঁধ খুলে দেওয়া হয়। বন্যা আর নদীভাঙনের পুরো তোড় সামলাতে হয় বাংলাদেশের তিস্তাপারের মানুষকে।
একটি আন্তর্জাতিক নদীর পানির ওপর অধিকার এর অববাহিকার সব দেশের। আবার এর পানিপ্রবাহের ন্যূনতম ২০ শতাংশ নদীতেই রাখতে হয় চূড়ান্ত গতিপথ পর্যন্ত। নাব্যতা, নদীতে বসবাসরত প্রাণী ও তৃণতলার জীবনধারণের জন্য এই পানি দরকার। এটাকে বাদ দিয়েই নদীর পানি ভাগ করতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে নেমে আসা পানি ধরে রেখে বিভিন্ন সংযোগ খালের মাধ্যমে সেচ দেওয়ার বিশাল একটি কার্যক্রম নিয়েছিল বাংলাদেশ। এর সুফলও মিলেছে। কিন্তু গত দু-তিন বছরে এক-চতুর্থাংশ জমিতেও সেচের পানি দেওয়া যায়নি। যেটুকু দেওয়া গেছে তা-ও অনিয়মিত। আর নদীর ভাগে কিছুই থাকেনি। এভাবে তিস্তা আর তিস্তাপারের মানুষ আজ বিপন্ন। তারা নদীর পানির ওপর তাদের ন্যায্য হিস্যা চায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত দিন বলে এসেছিলেন যে তাঁর রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে সেচের জন্য তিস্তার পানি দরকার। সেই প্রয়োজন মিটিয়ে ভাগাভাগির প্রশ্ন আসবে। পানি তাদের যতই দরকার হোক, আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে ভাগাভাগি করে নিতে হবে। এখন তিনি বলছেন তাঁর ওপর আস্থা রাখতে। বলছেন, উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করে পানি বণ্টন চুক্তি হবে।
এই বক্তব্যকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এখনকার বক্তব্য তাঁর আগের অবস্থান থেকে কতটা দূরে, তা ধরে নেওয়া খুব কঠিন। তাঁর রয়েছে একটি নির্বাচকমণ্ডলী। তিস্তার পানি নিয়ে গত কয়েক বছর তাদের মধ্যে তিনি আশাবাদ জাগিয়ে তুলেছেন। গজলডোবায় প্রাপ্ত প্রায় সব পানি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সেই অঞ্চলের সেচকাজে। সেখানে পানিপ্রবাহ বাড়াতে হলে সিকিম সরকার এবং কার্যত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের শক্ত ভূমিকা দরকার। সিকিমে অনেকগুলো পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানি ধরে রাখার পরিমাণকে নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত করার আবশ্যকতা রয়েছে। সিকিম একটি জনবিরল রাজ্য। বিদ্যুতের চাহিদাও সেই রাজ্যে খুবই কম। উৎপাদিত হচ্ছে অন্য রাজ্যের প্রয়োজনে। সেখানে আন্তদেশীয় ন্যায়নীতির খাতিরে এমন কিছু একটা করা সংগত বলে বিবেচিত হবে।
আলোচনা করা প্রাসঙ্গিক যে ২০০৯-এ মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ভারতকে একতরফা বেশ কিছু সুবিধা দিয়েছে। সেগুলো যৌক্তিক। এমনকি কোনো স্থায়ী চুক্তি ছাড়াই ত্রিপুরায় মালামাল যাচ্ছে বাংলাদেশের মধ্য দিয়েই। নৌ প্রটোকলের মাধ্যমে যাচ্ছে আসামে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছেন। আমরা অতীত ভুলে তাঁকে আপন করে সাদর সংবর্ধনা দিয়েছি। তবে ২০১১ সালে তাঁর জন্য যা সহজ ছিল, এখন তা কতটা সহজ হবে বোঝা মুশকিল। তখন বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছিলেন। ন্যায়নীতির ভিত্তিতে একটি সমঝোতায় তাঁর রাজ্যবাসীকে মানিয়ে নেওয়া অনেক সহজ ছিল বলে অনেকে মনে করেন।
২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচন সামনে রেখে এখন তিনি কতটা করতে পারবেন, সে বিষয়ে সংশয়বাদী কেউ কেউ। তিনি তাঁর ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। আমরা না হয় রাখলাম। তবে বিষয়টি জরুরি। যুগ যুগ পরীক্ষা-নিরীক্ষার নয়। সেই আস্থার ভিত জোরদার করতে একটি নদী ও নদীপারের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখাতে তাঁর প্রচেষ্টার দিকে সবার দৃষ্টি।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান অনুসরণ করে সশস্ত্র বাহিনীকে এগিয়ে যেতে হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে সশস্ত্র বাহিনীকে এ আদর্শ সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি  বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। বিশ্ব শান্তি রক্ষা এবং সকল প্রকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এ আদর্শকে সামনে রেখে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে এগিয়ে যেতে হবে। গতকাল মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে সামরিক বাহিনী কমান্ড ও স্টাফ কলেজের ২০১৪-’১৫ কোর্সে স্নাতক ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানে একথা বলেন। অনুষ্ঠানে সামরিক বাহিনী কমান্ড ও স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল সাজ্জাদুল হক স্বাগত বক্তৃতা দেন।
মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, কূটনীতিক এবং পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সশস্ত্র বাহিনীকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূর্ত প্রতীক হিসেবে অভিহিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্য যা যা করা দরকার আমরা সবই করবো। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে প্রথম সরকারের মেয়াদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৪ সালের ডিফেন্স পলিসির অনুসরণে সশস্ত্র বাহিনীর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে অনেকগুলো ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়। সদ্য সমাপ্ত বিগত সরকারের মেয়াদে ফোর্সেস গোল-২০৩০ এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে বহু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। এবারও সরকার গঠনের পর উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সম্পদ সীমিত। আর এ সীমিত সম্পদ দিয়েই আমরা একটি যুগোপযোগী, দক্ষ ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে চাই। এ লক্ষ্য অর্জনে উন্নত প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সকল দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাসী। আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূলমন্ত্র হচ্ছে- সমমর্যাদার ভিত্তিতে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব- কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ তিনি বলেন, ‘মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সুমহান দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমাদের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক মোকাবিলা, অবকাঠামো নির্মাণ, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও অন্যান্য জাতি গঠনমূলক কাজে প্রশংসনীয় অবদান রাখছেন। শেখ হাসিনা বলেন, শুধু দেশেই নয়, বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসা ও সুনাম অর্জন করেছেন। তারা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি রক্ষা, গণতন্ত্রে উত্তরণ, সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনাসহ পুনর্গঠন কার্যক্রমে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাদের সাফল্যে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন নতুন পরিবর্তনের ফলে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা ও দায়িত্বে নতুন মাত্রা ও বহুমাত্রিকতা যোগ হয়েছে। সময়ের এ চাহিদা পূরণে স্টাফ কলেজের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব আরোপের কথা উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী সফলভাবে কোর্স সম্পন্নের জন্য স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, পিএসসি ডিগ্রি সশস্ত্র বাহিনীর যে কোন অফিসারের জন্যই গৌরবের বিষয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ২০১৪-২০১৫ কোর্সের স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্তদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন। এই কোর্সে মোট ২১৪ কর্মকর্তা স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১২০, নৌবাহিনী ২৩ ও বিমান বাহিনীর ১৯ জন এবং চীন, মিশর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কুয়েত, লাইবেরিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইন, কোরিয়া, সৌদি আরব, সিয়েরা লিয়ন, শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া, তুরস্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাম্বিয়ার ৫২ জন কর্মকর্তা রয়েছেন।

পিলখানার শহীদগণের প্রতি শ্রদ্ধা by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

১৩ এপ্রিল ১৬৯৯ হচ্ছে শিখ ধর্মের অন্যতম পবিত্র ব্যক্তিত্ব গুরু গেবিন্দ সিং কর্তৃক খালসা-পান্থ প্রতিষ্ঠার দিন। একই ১৩ এপ্রিল, প্রতি বছর পাঞ্জাবি-নববর্ষ উপলক্ষে পবিত্র বৈশাখী ছুটির দিন হিসেবে শিখ ধর্মাবলম্বীরা পালন করতেন। ওই ধারাবাহিকতায় ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল তারিখেও সাধারণ মানুষের একটি মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। স্থান আনুমানিক ২২৫ মিটার দীর্ঘ ও ১৮০ মিটার প্রস্থ একটি দেয়ালঘেরা শূন্য বাগান যার নাম ছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ, অমৃতসর নগরী, পাঞ্জাব রাজ্য, ব্রিটিশ ভারত। ওই দিন শত শত নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যা করা হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার আর ই এইচ ডায়ারের (ভিন্ন পরিচিতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ার) হুকুমে। ১৯৫১ সালে ভারত সরকার একটি আইন পাস করে এবং ওই আইনের অনুসরণে ওই জালিয়ানওয়ালাবাগে একটি স্মৃতিসৌধ বা মনুমেন্ট নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯১৯ সালের নিহতদের স্মরণে। ওই আমলের সরকারি ইনকোয়ারি মোতাবেক নিহতের সংখ্যা ছিল ৩৭৯; নাগরিকদের ইনকোয়ারি মোতাবেক নিহত ছিল এক হাজারের অধিক। ব্রিগেডিয়ার ডায়ার কোনো দিন অনুতপ্ত হননি। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে এইরূপ গল্প ফেঁদেছিলেন : ওই পার্কে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মিটিং হচ্ছে দেখে তিনি আন্দোলনকারীদের দমন করার জন্য অস্ত্র থেকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এই কলামটি শুরু করেছি একটি লোমহর্ষক নির্দয় ঘটনার বিবরণ দিয়ে। ২৫ ফেব্রয়ারি ২০০৯ তারিখে ঢাকা মহানগরীর পিলখানায় অনুরূপ একটি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার সাথে মিল এবং অমিল দুইটাই আছে। ওই সময় বিডিআর-সপ্তাহ চলছিল। এ উপলে একাধিক অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবগুলোতে থাকেননি। বিডিআর সপ্তাহ উপলে সারা দেশ থেকে বিডিআরের সব জ্যেষ্ঠ অফিসার একত্র হয়েছিলেন সপরিবারে। ২৫ ফেব্র“য়ারি সকালবেলা, পিলখানায় অবস্থিত বিডিআরের বিখ্যাত দরবার হলে ডাইরেক্টর জেনারেল মহোদয়ের দরবার অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। অর্থাৎ সব অফিসার এবং জেসিও আর সৈনিক একখানে সম্মিলিত থাকবে। অর্থাৎ রূপক অর্থে : একটি খাঁচার মধ্যেই সব মুরগি অথবা একটি মাটির হাঁড়ির মধ্যেই সব ডিম। অতএব ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য একটি মোম সময়। পিলখানায় নিহতদের (অর্থাৎ শহীদদের) সংখ্যা সঠিকভাবে আবিষ্কার হয়েছে কিন্তু হত্যাকারীর নাম-ধাম সুস্পষ্টভাবে দেশবাসীর সামনে উপস্থাপিত হয়নি। তাই ধোঁয়াশা বিদ্যমান। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালেও পিলখানায় একটি বিদ্রোহ হয়েছিল। ৭২-এর বিদ্রোহ এত লোমহর্ষক ছিল না। তাই কিছুটা প্রেক্ষাপট বর্ণনাসহ পিলখানার ২০০৯ সালের ঘটনার স্মরণ করছি। সর্বাগ্রে সামরিক ও বেসামরিক তথা সব শহীদ অফিসার, জেসিও, সৈনিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাচ্ছি। ওই দিনের ঘটনাবলি সম্বন্ধে, বিবিধ প্রকারের সংপ্তি রচনা, শহীদদের নামের তালিকা, মূল্যায়নমূলক রচনা, ছবি, শোকবার্তা ইত্যাদি অনেক জায়গায় লিপিবদ্ধ বা সংরক্ষিত আছে। একটি তাৎক্ষণিক রেফারেন্স বা লিংক এখানে দিলাম আগ্রহীদের জন্য। http://www.goodnewsbd.com/bdr এই লিংকের বক্তব্যগুলো নভেম্বর ২০১৩-এর পরে আপডেট বা যোগ-বিয়োগ করা হয়নি। করা না হলেও মূল বক্তব্য বা তথ্যের চেতনা একই।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বহুলাংশেই যুগপৎ বর্তমান ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং বর্তমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামোর আদলে গঠিত। এই মুহূর্তে পৃথিবীর যেসব দেশ কোনো-না-কোনো কালে যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেন বা ইংল্যান্ডের উপনিবেশ ছিল, তাদের সবার সম্মিলিত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংগঠনের নাম ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অব নেশনস। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখ পাকিস্তান ও ভারতকে ইংল্যান্ডের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা দেয়া হয়। ওই দু’টি দিনের আগে ভারতীয় উপমহাদেশে তথা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় যেই সেনাবাহিনী ছিল সেটি ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি। সেই ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির জনবল এবং স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যথাসম্ভব পরিকল্পিতভাবে ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অগোছালো ব্যবস্থাপনা ল করা গেলেও সামগ্রিকভাবে ওই সম্পদ বণ্টন নিয়ে কোনো যুদ্ধ হয়নি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনীর পরিত্যক্ত স্থাবর ও অস্থাবর সব সম্পদ নিয়েই যাত্রা শুরু।
নবীন বাংলাদেশের নবীন সেনাবাহিনী নিজের নিয়মে এগিয়ে যায়। পাকিস্তান আমল থেকে প্রচলিত অনেক রেওয়াজ ও ঘটনার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ধারণ করতে শুরু করে। এ রকম অন্যতম একটি রেওয়াজ ছিল সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর (অথবা অপর ভাষায় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী) কমান্ড এবং কন্ট্রোল তথা নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাবাহিনীর অফিসারদের ব্যবহার করা। প্রতিরা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসাররাকে ডেপুটেশন বা প্রেষণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিডিআরে কর্তব্য পালনের জন্য পাঠানো হতো। পাকিস্তান আমলে যেমন, বাংলাদেশ আমলেও, দেশের ভৌগোলিক নিরাপত্তার জন্য প্রতিরার প্রথম ধাপ ছিল বিডিআর। সেই বিডিআর যেন সেনাবাহিনীর সাথে মিলেমিশে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অবদান রাখতে পারে, তার জন্যই অপরিহার্য ছিল যে, বিডিআরের কমান্ড সেনাবাহিনীর কমিশনড অফিসারদের ওপর ন্যস্ত থাকবে। আজকাল মোবাইল ফোনের যুগ, নেটওয়ার্ক ও ফ্রিকোয়েন্সি নামক শব্দ দুটি মোটামুটিভাবে শিক্ষিত সবার কাছে অতি পরিচিত। এটি শুধু টেলিযোগ বা বেতার যন্ত্রের যোগাযোগের জন্য প্রযোজ্য নয়, মনের চিন্তাশক্তি ও সেই চিন্তা প্রকাশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিডিআরের কমান্ড যদি এমন কোনো প্রকৃতির অফিসারের ওপর ন্যস্ত হয় যাদের লেখাপড়া বা প্রশিণ এবং পেশাগত চিন্তা সেনাবাহিনী থেকে ভিন্ন, তাহলে বাংলাদেশের বৃহত্তর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ক ও ফ্রিকোয়েন্সি মিলবে না। এটা বাস্তবতা হলেও এর বিরুদ্ধে একটি মহল সব সময় দুশ্চিন্তায় থেকেছে।
১৯৭২-৭৩ সালে একাধিকবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বিডিআরকে সীমান্তে চোরাচালান রোধ এবং অনুরূপ কর্মে নিয়োজিত করা হয়। সেই সময়ের ঘটনাবলি ইতিহাস সাী দেয় যে, কর্তব্যে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর অফিসার ও বিডিআরের সেনা অফিসাররা অসুবিধায় পড়তেন তখনকার আমলের সরকারি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে। বাগে আনতে না পেরে একাধিক সেনা অফিসারকে সেই সময় বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছিল। অতঃপর তৎকালীন সরকার একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরিকল্পনাটি ছিল যে, বিডিআরের জন্য আলাদা একটি ক্যাডার সৃষ্টি করা হবে। এই মর্মে অফিসারও গ্রহণ করা হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ের বাংলাদেশের ইতিহাস যদি পাঠক, (যদি পাঠকের বয়সে কুলায়) নিজের স্মৃতিতে আনেন তাহলে খেয়াল করবেন যে, জাতীয় রক্ষীবাহিনী নামক একটি নতুন আধা সরকারি বাহিনীও সরকারের পূর্ণাঙ্গ পৃষ্ঠপোষকতায় অতি দ্রুত কলেবরে বৃদ্ধি হচ্ছিল। অফিসিয়ালি নয়, কিন্তু মানসিকভাবে এবং চিন্তা-চেতনায়, রক্ষীবাহিনীকে সেনাবাহিনীর প্রতিযোগী এবং ভবিষ্যতের বিকল্প মনে করা হতো। রক্ষীবাহিনীতে সর্বোচ্চপর্যায়ে শুধু চারজন সেনাবাহিনীর অফিসার ছিলেন, বাকি ১০০-এর বেশি অফিসারই ছিলেন রক্ষীবাহিনীর নিজস্ব ক্যাডার। অর্থাৎ ওই আমলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব ও সংহতি বহুমুখী আক্রমণের শিকার হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে অনেক নিবিড় প্রচেষ্টার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারকে কোনোমতে বোঝানো সম্ভব হয়েছিল যে, বিডিআরের জন্য নিজস্ব অফিসার-ক্যাডার সৃষ্টি করা একটি মারাত্মক ক্ষতিকারক তথা আত্মঘাতী পদপে ছিল।
২৫-২৬ ফেব্র“য়ারি ২০০৯ সাল পিলখানা বিডিআর সদর দফতরের নারকীয় ঘটনাটি পুরো জাতির জন্য এক শোকাবহ দিন। কারণ ছয় বছর আগে ফেব্র“য়ারিতে পিলখানায় বাংলাদেশের ইতিহাসের তথা পৃথিবীর সামরিক ইতিহাসে একটি অন্যতম জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। সেই হত্যাকাণ্ডের ফলে নৃশংসভাবে নিহত হন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অত্যন্ত মেধাবী তরুণ বা মধ্যবয়সী ৫৭ জন কর্মকর্তা। ঘটনাটি এ দেশের মানুষের চোখের সামনে এখনো ভেসে আছে। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিল ওই আমলের বিডিআরের কিছু সংখ্যক ষড়যন্ত্রকারী জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ সৈনিক। দেশের ভেতরের বা বাইরের প্ররোচনাদাতা বা উৎসাহদাতা অবশ্যই ছিল বলে আমি বিশ্বাস করি, কিন্তু তাদের পরিচয় আজো উন্মোচিত হয়নি। ওই ষড়যন্ত্রের রহস্য ও নেপথ্য কাহিনী উদঘাটন হওয়া এবং জাতির সামনে উপস্থাপিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটির ধারাবাহিকতায় আরো অনেকবার চেষ্টা করা হয়েছে, অফিসারদের বিরুদ্ধে কিছু করার তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করার। কুচক্রীরা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে তেমন কিছু করতে না পারলেও ২০০৯ সালে এসে বিডিআরে সেই ঘটনাটি ঘটাতে সম হয়। বিডিআরের সাধারণ সৈনিকদের কেউ-না-কেউ মন্দ উদ্দেশ্যে প্ররোচিত ও উৎসাহিত করেছে যে, সেনাবাহিনীর অফিসারদের মারতে হবে। যারা তখন বিডিআরের কিছু সদস্যকে এই অপকর্মে অনুপ্রাণিত করেছে, তারা দেশী শক্তি নাকি বিদেশী শক্তি, তা নিশ্চিত করে বলার মতো প্রমাণ এখনো আমাদের হাতে আসেনি। কিন্তু তাই বলে এটা প্রমাণিত হয় না যে, কোনো অপশক্তি এর পেছনে ছিল না। বাংলাদেশের নিরাপত্তার স্বার্থে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত করার স্বার্থে, সামরিক বাহিনীর মনোবল ও ইজ্জত রক্ষার স্বার্থে এ ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতেই হবে।
একই সাথে এই হত্যাকাণ্ডটিকে জাতীয়ভাবে উপযুক্ত মূল্যায়ন করা দরকার। এমন শোকের দিন এই জাতির সামনে খুব কমই এসেছে। এ জন্য আমাদের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব, একটি আহ্বান, একটি দাবি হচ্ছে দিবসটিকে জাতীয়ভাবে শোকদিবস পালনের ঘোষণা করা হোক। যেহেতু এই দিন জাতির গর্বিত সন্তান সেনাবাহিনীর ৫৭ জন অফিসারকে হারিয়েছি, তাই সেই দিনটিকে আমরা মনে রাখতে চাই। তার জন্যই এই দিনটিকে জাতীয় শোকদিবস ঘোষণা করে, জাতীয়ভাবে পতাকা অর্ধনমিত রাখার আবেদন করছি; এর জন্য সরকারি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে জাতীয়ভাবে সরকারি ভাষ্য দেয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে; এ বিষয়টি গুরুত্বসহ তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমের প্রতিও আহ্বান জানাই। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং সব পত্রপত্রিকায় এ প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনারও আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা যদি বারবার স্মরণ করি, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারি, তাহলে অতীতের ভুলভ্রান্তিগুলো ধরা পড়বে এবং এতে আগামী প্রজন্ম এ ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পারবে। আমাদের উদ্দেশ্য শোককে শক্তিতে পরিণত করা।
এমন কিছু কাজ আছে যেখানে সব দলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হয় দেশের কথা ভেবে। পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ড তেমনই একটা বিষয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ঘটনার প্রথম দিক থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে কিছু দায়িত্বহীন কথাবার্তা বের হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও জাতীয় সংসদের ভাষণে বলেছিলেন, সেনাবাহিনীকে নিয়ে ‘খেলনেওয়ালারাই’ নাকি পিলখানা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এই খেলনেওয়ালারাই বলতে তিনি কোন দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন সেই কথাটিরই ব্যাখ্যা কোনো দিন পাওয়া যায়নি। জঙ্গি তৎপরতার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণের কথাও লাগাতারভাবে এবং জোরেশোরেই বলেছিলেন তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী। এই সরকার যদি এ প্রসঙ্গে নিজেদের অবস্থান বা বক্তব্য পরিষ্কার না করে তাহলে আগামীতে কেউ-না-কেউ করবেই।
বিডিআরের নাম বদলে রাখা হয়েছে বিজিবি। শুধু নাম বদলালেই কি কলঙ্ক মুছে যাবে? স্মৃতি মুছে যাবে? কষ্ট মুছে যাবে? প্রকৃত সত্য সারা জীবন চেপে রাখা যায় না, সুতরাং প্রকৃত রহস্য উন্মোচন হওয়া জরুরি কোনো ব্যক্তির স্বার্থে নয়, দেশের স্বার্থে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে, সেনাবাহিনীর সদস্যদের মনোবল বাড়ার স্বার্থে। কাজটি যত দ্রুত হবে ততই মঙ্গল।
এই ঘটনা বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর জন্য বা এমনকি আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর জন্য একাধিক কঠিন প্রশ্নের উদ্রেককারী একটি ইতিহাসের মাইলফলক। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ৩০ বা ৩১ তারিখ পিলখানার ময়দানে বিদ্রোহ হয়েছিল যেটাকে চূড়ান্ত শান্তিপূর্ণ পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু নিজে পিলখানায় গিয়েছিলেন। আজ থেকে ১২/১৩ বছর আগে বাংলাদেশ আনসার বাহিনী বিদ্রোহ করেছিল। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু কিছু ক্ষুদ্র অংশ বিদ্রোহ করেছিল বগুড়া এবং ঢাকায় আর তাদের সশস্ত্রভাবে দমন করা হয়েছিল। ১৯৮১ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম অংশ তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মনজুর বীর উত্তম-এর নেতৃত্বে; এই বিদ্রোহ দমনের জন্য সশস্ত্র পদক্ষেপের ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হলেও, নেয়ার আগেই বিদ্রোহ দমিত হয়। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল সেটি হচ্ছে, বিদ্রোহ দমনের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা কী? জান, মাল ও সম্মানের মধ্যে কোনটি কতটুকু ত্যাগ করে সমস্যার সমাধান করতে হবে?
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে বাংলাদেশ সরকার যেই নিয়মে বিষয়টিকে নাড়া-চাড়া করেছেন বা ব্যবস্থাপনা করেছেন, সেটা সম্বন্ধে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ওই আমলের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানরা কোথায় ছিলেন, কতক্ষণ ছিলেন, কী কী নির্দেশ পেয়েছিলেন, কী কী নির্দেশ প্রদান করেছিলেন ইত্যাদি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জাতির জন্য ভালো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিদ্রোহীদের প্রতিনিধির সাথে আলোচনায় বসেছিলেন এটা যেমন সত্য, তেমনই এটাও বাস্তবতা যে, ওই আলোচনার প্রেক্ষাপট, কর্মপদ্ধতি, ফলাফল ইত্যাদি শতভাগ স্পষ্ট নয়। যা হোক না কেন, ওই দিনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে কোনো কার্পণ্য, এই জাতি করেনি এবং ইনশাল্লাহ করবেও না।
লেখক : গবেষক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান

ফলাফলশূন্য খেলায় নেমেছেন রাজনীতিকরা by রেহমান সোবহান

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ডাকা সাম্প্রতিক অবরোধ আর হরতাল চলাকালে অগ্নিসংযোগ, হামলার শিকার ব্যক্তিরা যেভাবে ভয়াবহ জখম হয়েছেন আর মৃত্যুর সংখ্যা যেভাবে বেড়ে চলেছে তা ন্যায়সঙ্গতভাবেই উদ্বেগ ও ক্ষোভের উদ্রেক করেছে। ক্ষোভ আর উদ্বেগ শুধু ক্ষমতাসীন দলের মধ্য থেকে নয় বরং তা এসেছে পুরো দেশ থেকে।
হতাহতের শিকার বেশির ভাগই নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ। বাস্তবতার কারণে তাদের বাধ্য হয়েই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে হয়েছে। বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশুরা, কেননা জ্বলন্ত গাড়ি থেকে দ্রুত বের হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের পেছনে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিরাজমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে কোন সম্পৃক্ততা নেই এমন বেসামরিক মানুষকে ব্যাপক হারে টার্গেট করার যে কোন রাজনৈতিক আন্দোলনের কৌশল অমানবিক, অনৈতিক, এবং রাজনৈতিকভাবে অফলপ্রসূ।
এমন কৌশল একটি দলের প্রতি জন-অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে, যারা কিনা জনগণের কিছুটা সহানুভূতি পেতে পারতো। কেননা এখন পর্যন্ত সরকারি দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে তারাই। রাজনৈতিক একটি দল যখন এমন কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল, যাতে তাদের ওপর দমন পীড়নকারী নানা এজেন্ট প্রধানত আক্রান্ত হওয়ার বাইরে থেকে যায় আর অসহায় বেসামরিক মানুষদের টার্গেট হতে হয়, তাতে রাজনৈতিক নির্বুদ্ধিতা প্রতিফলিত হয়। একইভাবে প্রতিফলিত হয় সাংগঠনিক দুর্বলতা।
বিরাজমান সহিংস পরিস্থিতি আর স্থিতিহীনতার মধ্যে দোষারোপ করার খেলার যথার্থতা সামান্যই। আমাদের গভীরভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক সমাজে উভয় পক্ষে এমন মানুষের অভাব নেই, যারা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর কর্মকাণ্ড আর উদ্দেশ্যকে সম্ভাব্য সব থেকে মন্দ রূপ দেয়।
তাদের নানা মন্তব্য আর কর্মকাণ্ডে প্রতীয়মান হয় যে, ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে বিরোধী হিসেবে সক্রিয় থাকতে কোন প্রকার রাজনৈতিক সুযোগ দেয়ার পরিবর্তে তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে এবং এমনকি বলপ্রয়োগ করে গুঁড়িয়ে দিতে চায়। একই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা পোষণ করেন তা নয় বরং তাদের বুদ্ধিজীবী সহযাত্রীরাও অধিকরতর বল প্রয়োগের অনড় দাবিতে রাজনীতিবিদদের তুলনায় আগ্রাসী প্রতিভাত হন।
পক্ষান্তরে, প্রতিপক্ষকে উৎখাত করা তো দূরে থাক মোকাবিলার করতে সমর্থ এমনটা সামান্যই প্রদর্শন করতে পেরেছে বিরোধী দল। অসর্মথতার এ বোধ বিরোধীদেরকে বিক্ষিপ্ত এবং বাছবিচারহীন সহিংস কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে প্ররোচিত করেছে; যা সরকারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাধ্য করা বা বিরোধীদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের কাছাকাছি আনার তুলনায় নিরপরাধ প্রাণের বলিতে পর্যবসিত হচ্ছে।
অগণতান্ত্রিক শক্তির হস্তক্ষেপে বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি ব্যতীত এমন চর্চা থেকে বিএনপি কি অর্জনের আশা করছে তা স্পষ্ট নয়। যেমনটা হয়েছিল ১/১১ এ। যেহেতু এমন একটি উদ্যোগ অফলপ্রসূ বলে প্রতীয়মান হয়েছে ২০১৪’র জানুয়ারি নির্বাচনের সময় পর্যন্ত; এটা পরিষ্কার নয়, কেন আজ এতে অপেক্ষাকৃত ইতিবাচক ফল আসতে পারে। এমন সম্ভাবনাবিহীন পরিবেশের মধ্যে কেউ কি গঠনমূলক সুপারিশের প্রস্তাব করার প্রত্যাশা করতে পারেন, যাতে কোন পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ বিন্দুমাত্র মনোযোগ দেবে? এমন সম্ভাবনা অতীতে একবার এসেছিল ১৯৯৫-৯৬ সালে। সেবার অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইস্যুতে একই রকম মুখোমুখি অবস্থান জাতীয় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। ১৯৯৫ সালে এখন বিস্মৃত ৫ জনের একটি দলে’র একজন সদস্য হিসেবে দুই নেত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক মধ্যস্থতা করার উদ্যোগে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। এফবিসিসিআই ও এমসিসিআইসহ নাগরিক সমাজের বড় একটি জোটের উদ্যোগে ওই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। প্রকৃত জি-৫ এর চার জন- ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ, প্রধান বিচারপতি কামালুদ্দিন হুসেইন, রাষ্ট্রদূত ফখরুদ্দিন আহমেদ ও সিনিয়র সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। হতাশার ওই উদ্যোগের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি আমি।
জি-৫ এর উদ্যোগে যতটুকু অগ্রগতি হয়েছিল তার পেছনে যে বিষয়টি কাজ করেছিল তাহলো উভয় নেত্রী তখন কোন প্রকার সমঝোতার বিষয়ে বিরূপ ছিলেন না। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সম্পূর্ণ বিপরীত, তখন জি-৫কে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তারা দুজনই আমাদেরকে কয়েক দফা ধৈর্যের সহিত লম্বা শুনানি দিয়েছিলেন। আমাদের উদ্যোগ সফলতার কাছাকাছি এসেছিল কিন্তু একটি মাত্র ইস্যুতে তা থমকে যায়। বেগম খালেদা জিয়ার জোর দাবি ছিল যে, উভয় দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে হবে তিনি ব্যতীত বিএনপি’র কোন এমপিকে। সে সময় যেটা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। শেখ হাসিনা তার দাবিতে অনড় ছিলেন যে, সরকারপ্রধানকে হতে হবে নির্দলীয় কোন ব্যক্তি যাকে এ উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে সংসদে নির্বাচিত করা যেতে পারে। খালেদা জিয়া দাবি করেছিলেন, তার অবস্থানের ভিত্তি ছিল সংবিধান রক্ষার প্রয়োজনীয়তা। পক্ষান্তরে শেখ হাসিনা যুক্তি প্রদর্শন করেছিলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দ্বারা নির্বাচন পরিচালিত হওয়ার স্বার্থে সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে এবং করা উচিত। আজ, দুই নেত্রী তাদের আসন এবং যুক্তি উভয়ই অদল-বদল করেছেন। জি-৫ এর মতো বা উন্নততর উদ্যোগ গ্রহণে নাগরিক সমাজের প্রচেষ্টাগুলো সাংঘাতিকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ঘটনার মুখ্য চরিত্রদের মধ্যকার ব্যবধান যে প্রায় সেতুবন্ধনের অযোগ্য গহ্বরে বিস্তৃত হয়েছে সেই বোধের দ্বারা। দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপে উৎসাহিত করতে কতিপয় বিশিষ্ট নাগরিকদের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ক্ষমতাসীন দলের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে প্রতিয়মান হয়। বরং, নাগরিকদের উদ্যোগ বিদ্যমান বিষাক্ত পরিবেশের মধ্য থেকে সাহসিকতাপূর্ণ এক প্রশংসনীয় পদক্ষেপের প্রতীক। এটা এখন পর্যন্ত চরম লজ্জাজনক ও অরুচিকর কটূক্তিমূলক মন্তব্য উসকে দিয়েছে। শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন জোটের মাথা-মোটা উপাদানদের কাছ থেকে সেগুলো এসেছে তা নয়। এমনকি সরকারের কতিপয় অধিকতর পরিপক্ব সদস্যদের কাছ থেকেও এমন মন্তব্য এসেছে, যারা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ভাল’ আর ‘মন্দের’ মধ্যে সংলাপের কোন সুযোগ নেই।
সম্ভবত তাদের কাছে ১৯৭১-এর মার্চে বঙ্গবন্ধু আর ইয়াহিয়ার মধ্যকার সংলাপের কথা বিস্মৃত হয়েছে। অথবা, ইয়াসির আরাফাত আর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার সংলাপ বা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় কিসিঞ্জার এবং লি যাক থো’র সংলাপ। অথবা, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান তালেবানদের মধ্যকার সংলাপ যা সংযুক্ত আরব আমিরাতে গোপনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
বিএনপির সামনে যেসব পথ
বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলা আর অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান ক্ষতির আলোকে গভীরতর সঙ্কটের ঘূর্ণাবর্তে নিম্নমুখী অধঃপতন প্রতিহত করতে কি করা যেতে পারে? দুই মুখ্য চরিত্রের কাছে কিসব পথ খোলা আছে সেগুলো পর্যালোচনা করা যাক।
গত নয় বছর ধরে, সরকারি দমন-পীড়নের মুখে ছিল বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য রাজনৈতিক সুযোগ এতটাই সঙ্কীর্ণ হয়ে এসেছে, যেখানে তারা বাংলাদেশের রাজধানীতে জনসমাবেশও করতে পারছে না। দলটির নেতাদের চলাচলের স্বাধীনতা নিয়মিত বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। আর তাদের সিনিয়ার নেতাদের নিয়মিত কারারুদ্ধ করা হয়েছে।
এমন একটি পরিস্থিতি বিরোধীদের রাজনৈতিক সুযোগকে মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ করে দেয় এবং এটা গণতন্ত্রের সার্বিক মূল্যবোধের পরিপন্থি। আইন প্রয়োগকারী সংখ্যাগুলোর ম্যাজিক্যাল ক্ষমতার আপাত প্রয়োগ তাদেরকে অসুবিধাজনক বিরোধী নেতাদের অদৃশ্য করে ফেলার সুযোগ করে দেয়; জীবন থেকে না হলেও অন্তত জনগণের দৃষ্টি থেকে। আমরা যে আইনের শাসনের মধ্যে বাস করি এটা তার সামান্যই প্রমাণ বহন করে।
এমন বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে বিরোধীদল কোনভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যখন তাদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছিল, তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভাগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জিততে সক্ষম হয়।
তাদের রাজনৈতিক সক্ষমতার এই বোধ প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্যে প্রদর্শিত হয়। এটা অধিকতর মানবকল্যাণ ভিত্তিক রাজনৈতিক কৌশল পরিকল্পনা প্রণয়নে বিএনপিকে উৎসাহিত করা উচিত ছিল। যৌক্তিকভাবে তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে সম্ভাব্য সকল পর্যায়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেয়া।
এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশজুড়ে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তাদেরকে করে দিতো। একইসঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগও আকর্ষণ করতে পারতো। যার দ্বারা নিজেদের রাজনৈতিক সামর্থ্য ও বার্তা প্রদর্শন করতে পারতো।
জানুয়ারি নির্বাচনের আগ দিয়ে বিরোধীদের কাছে প্রস্তাবিত সকল সুযোগ গ্রহণ করা উচিত ছিল। এর মধ্যে ছিল, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকারে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দেয়ার প্রস্তাব। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হতো এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। তবুও, জানুয়ারি নির্বাচনে বিএনপির নিজেদের সাংগঠনিক সীমবদ্ধতার আলোকে, এটা নেয়ার মতো একটা ঝুঁকি ছিল।
এমন একটি সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যর্থতা থেকে বিএনপির রাজনৈতিক ভুল প্রতিফলিত হয়। আর বিশেষ করে ঢাকা ও লন্ডনে ছড়িয়ে পড়া দলটির দ্বৈত নেতৃত্ব এখন পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
বিএনপির এ ভুল হিসাব যে বিষয়টির ওপর ভিত্তি করে এসেছে তাহলো- তাদের সাংগঠনিক ও রাজপথে লড়াইয়ের ক্ষমতার অতিমূল্যায়ন এবং রাজপথের যেকোন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সদিচ্ছা ও সামর্থ্যকে খাটো করে দেখা।
খালেদা জিয়ার সন্তান আরাফাতের করুণ ও অকাল মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী সমবেদনা জানানোর চেষ্টা করেছিলেন। ওই ঘটনা দ্বৈত নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা বিএনপির রাজনৈতিক শূন্যতার সাম্প্রতিক প্রকাশ চরম ব্যর্থতা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বন্ধ দরজার সামনে অপেক্ষমাণ রাখাটা শুধু সাংস্কৃতিক চৈতন্যহীনতার নয় একইসঙ্গে দুর্ব্যবহারের প্রতিফলন। এছাড়া বিএনপির সিনিয়র নেতৃত্বের বিশৃঙ্খলা উঠে এসেছে যারা বন্ধ দরজার পেছনে দ্বিধান্বিত ছিলেন। এদিকে জনগণের উপহাসের শিকার হয়েছে দল।
বর্তমান রাজপথের সহিংসতা ৬ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলছে। এতে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যে আওয়ামী লীগের স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে ফেলবে তেমন কোন ইঙ্গিত নেই বললেই চলে। সহিংসতা ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশজুড়ে নিরপরাধ মানুষ হুমকিতে রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগকারীদের পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ বা দমন করতে পারছে কি না সে বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য কোন তথ্যপ্রমাণ নেই। এর ফলে দিনের পর দিন সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আতঙ্কে আছে সাধারণ মানুষ। নিরুপায় হয়ে এসব মানুষ শান্তি প্রত্যাশা করছে। রাজনৈতিক এই চলমান লড়াইকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের জন্য আরও ভয়ানক শত্রুদের উৎসাহিত করতে পারে বিদ্যমান রাজনৈতিক সঙ্কট। এর মাধ্যমে তারা তাদের অশুভ লক্ষ্য অর্জনের দিকে আরও এগিয়ে যাবে। রাজনীতিতে এমন কোন ঘটনা ঘটলে তা শুধু সঙ্কটকে স্থায়ী রূপই দেবে না, একই সঙ্গে তা আরও চরম আকার ধারণ করলে অগণতান্ত্রিক শক্তিগুলো পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করার চিন্তা করতে পারে। আমাদের শাসকগোষ্ঠী বা বিরোধী দল- কেউই নিশ্চিত নন যে, এমন হস্তক্ষেপ কোথায় গিয়ে শেষ হবে। রাজপথের সহিংসতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কমই সফল করছে। এ অবস্থায় বিএনপিকে অস্থায়ী ভিত্তিতে তাদের আন্দোলন স্থগিত রাখার জন্য পরামর্শ দেয়াই ভাল হবে। যাতে সঙ্কট সমাধানের জন্য একটি সংলাপের পথ তৈরি হয়। তার পরও শাসকরা যদি কোন সাড়া না দেয়, তখন বিএনপি তাদের আন্দোলন আবার শুরু করতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের সেই আন্দোলন হওয়া উচিত আরও শান্তিপূর্ণ উপায়ে, যা থেকে তারা জনগণের সমর্থন না পেলেও যাতে সহানুভূতি পেতে পারেন।
আওয়ামী লীগের সামনে যেসব পথ
বিরোধীদের পক্ষ থেকে শান্তি খোঁজার জন্য যে আহ্বান তাতে সরকার কতটুকু পুনর্জাগরণে সাড়া দেবে অথবা এতে তাদের রাজপথের চ্যালেঞ্জকে ম্লান হয়ে যাওয়া হিসেবে দেখা হবে কি না তা পরিষ্কার নয়। এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন জোট তাদের কথা বলে দিয়েছে যে, তারা আইনশৃঙ্খলা সমস্যা চমৎকারভাবে মোকাবিলা করছে, যেখানে সহিংসতা শিগগিরই নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং বিরোধীদের নিশ্চল করে দেয়া যাবে। বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সূচনা ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারিতে। সেই রাজনৈতিক সমস্যার উৎস থেকে শাসকগোষ্ঠী দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে বলেই মনে হয়। গত এক বছর ধরে শাসকরা নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখেছে। ওই নির্বাচনের আগে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, জানুয়ারির ওই নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠার জন্য তারা অধিক অংশগ্রহণমূলক মধ্যবর্তী একটি নির্বাচন দেবে। ১০ম জাতীয় সংসদের ওই নির্বাচন ছিল ত্রুটিপূর্ণ, এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সবাই পূর্ণাঙ্গভাবে ওয়াকিবহাল। এতে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ফলে, বর্তমান ১০ম সংসদের শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদের বেশির ভাগের পক্ষে একটি ভোটও পড়েনি। বাস্তবে যদি আমরা ধরে নিই নির্বাচন কমিশন বাকি ১৪৭টি আসনে ভোটের যে হিসাব দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে ভোট পড়েছে শতকরা ৪০ ভাগ। কার্যত বর্তমান সংসদ মোট ভোটের শতকরা ১৮ ভাগ ভোটারের সমর্থন আদায় করেছে। কিন্তু ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তাতে ভোট পড়েছিল শতকরা ৮৪ ভাগ। আওয়ামী লীগ ৬৫ বছর বয়সী একটি ঐতিহাসিক দল। প্রথমে পাকিস্তান পরে ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। তারাই বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ছাড়া এক বছরের বেশি রাষ্ট্রীয় সব ক্ষমতা ব্যবহার করছে। আওয়ামী লীগের জন্য এটি একটি অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উৎসাহমূলক নেতৃত্বের মাধ্যমে গণতন্ত্রের জন্য যে লড়াই চলছিল তা দৃশ্যত দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। তা থেকে রক্তপাতের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে তুঙ্গে তুলে দেয়। এসব আন্দোলনের সময়, বিভিন্ন রকমের কর্মকর্তা- নাশকতাকারী, দুর্বৃত্ত চক্র, সন্ত্রাসী ও বিশ্বাসঘাতকরা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিন্দা জানিয়েছিল। ৬ দফা আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে মুখের ভাষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের হুমকি দিয়েছিলেন আইয়ুব খান। বাংলাদেশে গণহত্যা চালানোর জন্য অস্ত্র ব্যবহার করেছিল ইয়াহিয়া খান। জিয়া ও এরশাদ, এমনকি খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন তারাও ওই একই রকম আগ্রাসী ভাষা ব্যবহার করেছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের বিরুদ্ধে এসব ভাষা ও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন ব্যবহার করা হয়েছিল। যে সঙ্কটের মূলে রয়েছে রাজনীতি তা সমাধানের জন্য আওয়ামী লীগ যদি সেই ব্যর্থ অস্ত্র ব্যবহার করে তাহলে তাদের উচিত তাদের নিজস্ব ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া। ক্ষমতাসীন জোট এখন নির্বাচনে তাদের ম্যান্ডেটের বৈধতার কাছে আশ্রয় নিতে পারে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় বিএনপির নির্বুদ্ধিতার বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। বিএনপি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা যে ব্যর্থ হয়েছে তা এরই মধ্যে আমরা বুঝতে পেরেছি। পছন্দ-অপছন্দের বাইরে এসে এতে এখনও দেখা যায় কার্যত ২০১৪ সালের নির্বাচনে শতকরা ৮২ ভাগ মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে নেতৃত্ব দানকারী একটি দল। তাদের ঐতিহাসিক রীতির সঙ্গে এ ঘটনা মিলানো যায় না। পরিষ্কার নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছাড়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার তাদের যে প্রবণতা তা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেই। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য তাদের যে অসংখ্য নেতাকর্মী ও তাদের মহান নেতা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি অবমাননা করা হয়। দিন শেষে বলা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের অবাধ ম্যান্ডেট ছাড়া কোন শাসকগোষ্ঠীর সামনে যেসব  চ্যালেঞ্জ আসে তা তারা রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে, বিভিন্ন সময়ে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের কারারুদ্ধ করে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত দমিয়ে রাখা যায় না। কোন শাসকগোষ্ঠী তার ক্ষমতার মেয়াদে এমন দমনপীড়নমূলক শাসন চালালে তা শুধু ওই শাসকগোষ্ঠীর চরিত্রের পরিবর্তনই করে না, পাশাপাশি তারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখতে বাধ্য হয়।
আওয়ামী লীগ যদি তার নিজেকে পিছলে পড়ে যেতে পারে এমন একটি পাহাড়ের ঢালে নিয়ে যায়, যা তাদের উত্তরাধিকারের রাজনীতি থেকে দূরে, তখন গণতন্ত্র নিজে বিপন্ন হবে। তাতে শাসকগোষ্ঠীর টিকে থাকা ক্রমবর্ধমান হারে নির্ভর করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দমনমূলক শক্তির ওপর। এমন নির্ভরতা প্রচলিত ধারায় ওইসব শক্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাদের ইতিহাসজুড়ে গণতন্ত্রের বাইরের ক্ষয়িষ্ণু শক্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জ  করেছে, তারাই ওইসব শক্তির কাছে শেষতক জিম্মি হয়ে পড়ে। এ প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে ফিরতে পারে অগণতান্ত্রিক শাসন। এর ফলে অগণতান্ত্রিক শাসনে প্রত্যাবর্তন করতে পারে দেশ। এ ধরনের শাসনের মূল চ্যালেঞ্জ হলো- অন্য অগণতান্তিক শক্তির রয়েছে সহিংসতা প্রতিরোধ ও ছড়িয়ে দেয়া, দু’ধরনের ক্ষমতাই।
জাতির জনকের কন্যা, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে শুধু বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট প্রতিষ্ঠা করতে হবে তা-ই নয়, একই সঙ্গে যেখানে তিনি বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে দেখতে চান সেখান নিয়ে যাওয়ার এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। দিন বদল নিয়ে তার যে এজেন্ডা তা বেশ অনুধাবনযোগ্য । এতে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি স্থিতিশীলতা দিয়েছে; তা কঠোর শ্রমজীবী, গতিশীল উদ্যোক্তা শ্রেণী, বিদেশে অভিবাসী পাঠানোর আমাদের যে রোমাঞ্চ রয়েছে, অর্থনীতিতে নারীদের ভূমিকা বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে দেশে দারিদ্র্য হ্রাস ও মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলোতে উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মানে এরই মধ্যে অগ্রগতি হয়েছে। গত ছয় বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতি যখন মন্দা মোকাবিলা করছে তখন আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ও বৈদেশিক আয়ের পরিমাণ উৎসাহব্যঞ্জক। প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের গণহত্যায় সহায়তাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করার বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ উদ্যোগে তিনি পেয়েছেন জনগণের সমর্থন। এ অবস্থায়, তার পরিবর্তনের এজেন্ডা বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্জিত রাজনৈতিক পুঁজি ব্যবহার ও অধিক ফলপ্রসূ মানসম্মত নেতৃত্ব প্রদর্শন করা উচিত। এর জন্য প্রয়োজন অধিক শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও প্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবেশ, যা জাতিকে সহিংসতার অন্ধকার সুড়ঙ্গ, যেখানে তারা আটকরা পড়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে। আরও একবার উত্তেজনা (টেনশন) ছাড়া ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। রাজপথের সহিংসতা অথবা রাষ্ট্রীয় ক্ষয়িষ্ণু শক্তির ওপর নির্ভর করার চেয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের প্রত্যাশিত জীবনমানের ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এতে শেষ পর্যন্ত যে ফল হবে, তা অবশ্যই হবে একটি রাজনৈতিক সমাধান। এতে অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে সুষ্ঠুভাবে গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট অর্জনের মাধ্যমে তা করতে হবে।
কিভাবে এমন যথাযথ রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছা যায় তা অনুধাবন করা যায় শুধু সমঝোতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেটা হবে বোঝাপড়ার প্রতিজ্ঞা। এক পক্ষ সেরা শক্তিগুলো মোতায়েন করার মাধ্যমে তার সব উদ্দেশ্য সফল করার চেয়ে সবাইকে নিয়ে সমঝোতা করার ওপর ভিত্তি করেই গণতান্ত্রিক রাজনীতি গড়ে উঠেছে।
সুশীল সমাজের ভূমিকা?
দুই দলই স্বীকার করবে যে, দেশের স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে- এই বিশ্বাসে উপরের এই আলোচনা। দুঃখজনক হলো রাজনীতিকরা  যে খেলার ফল শূন্য (জিরো সাম) এমন এক খেলায় মেতেছেন। তারা সমঝোতার মাধ্যমে এই সংঘাতের সমাধান চান বলে মোটেও মনে হচ্ছে না। যেহেতু রাজপথে চলমান সহিংসতা জনগণের মনে সবচেয়ে বেশি ভীতি সৃষ্টি করেছে তাই বিএনপিকে অস্থিরতা স্থগিত করে ও অগ্নিসংযোগ থেকে বিরত থেকে প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে এগুতে হবে। ক্ষমতাসীন জোটের শীর্ষ নেতারা যেহেতু অধিক আগ্রাসী ভঙ্গিতে বিএনপি নেতাদের দিকে বাক্য ছুড়ে মারছেন তাতে বিএনপি নেতারা এই প্রথম পদক্ষেপ নেবে বলে ইঙ্গিত মিলছে না। ক্ষমতাসীনরা বিএনপিকে নকআউট করে দিতে চায় বলেই দৃশ্যত মনে হচ্ছে। চলমান এই রাজনৈতিক সহিংসতায় চূড়ান্ত বিজয় আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। শেষ প্রান্তেও আলোর দেখা নেই এমন এক সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছে জাতি।
এই যখন অচলাবস্থা তখন সুশীল সমাজের কি কোন ভূমিকা আছে, তারা তো দলীয় পক্ষপাতিত্বে বিভক্ত? যারা তাদেরকে পক্ষপাতহীন বলে বিশ্বাস করেন তারা তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। ৯/১১ এর সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ অভিযোগ করেছিলেন ‘যারা আমার সঙ্গে নেই তারা অবশ্যই আমার বিরোধী’। সুশীল সমাজের ওই অংশের বিরুদ্ধে মেরুকরণের এই অভিযোগ করা হয়। ১৯৯৫ সালে জি-৫ বৈঠকে দুই নেতাকে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তার কোন সাড়া পাওয়া যায় নি। তাই সুশীল সমাজ সম্প্রতি যে উদ্যোগ নিয়েছে তার ভবিষ্যৎ নেই বললেই চলে। তাই বলে জনগণ যখন তাদের ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগের জন্য একজন অবতার খুঁজবে তখন কিছুই করার থাকবে না- এমনটা ইঙ্গিত দেয় না। ঢাকাভিত্তিক সুশীল সমাজের উদ্যোগ যদি কোন কাজে আসে তাতে দেশের অন্যান্য নাগরিক গ্রুপ, যারা রাজনৈতিক উদ্বেগ ও সমাধানের জন্য প্রকাশ্যে কণ্ঠ সোচ্চার করবেন, তাদের পক্ষ থেকে একই রকম সাড়া পাওয়া প্রয়োজন হবে। যদি এ উদ্যোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে তাহলে তা রাজনৈতিক জোটগুলোকে অধিক শান্তিপূর্ণ একটি সমঝোতায় আসার জন্য অনুঘটকের কাজ করবে। এই রকম সম্ভাবনা এখনও অনুমানমূলক।
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অধিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে সুশীল সমাজের গ্রুপগুলোর থাকতে হবে সমালোচনা সহ্য করার জন্য মোটা চামড়ার চেয়েও বেশি কিছু। এতে দীর্ঘ সময় ও শক্তি প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে। আজ যাদেরকে নিয়ে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ তার মধ্যে আছেন সব সময় রাজনীতিতে সক্রিয় নন (পার্ট টাইম), নিম্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। তাদের জন্য এটা হতে পারে অধিক চ্যালেঞ্জিং কাজ।
নোট: প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের লেখাটি ইংরেজি থেকে অনূদিত। লেখাটি ২০শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত  হয়

২১ ঘণ্টা পর মান্নাকে ডিবিতে হস্তান্তর

দিনভর নাটকীয়তার পর রাতে নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে র‌্যাব। রাতে গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়েছে। ১৩১ ধারায় দায়ের করা মামলায় সেনা উস্কানির অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি দায়ের করেন গুলশান থানার অপারেশন অফিসার সোহেল রানা। এদিকে রাতে মান্নাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হলেও তার সাক্ষাৎ পাননি স্বজনরা। এমনকি গণমাধ্যমের কর্মীরাও তাকে দেখতে পাননি। সূত্র জানায়, থানায় হস্তান্তরের কথা বলা হলেও তাকে সরাসরি গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেয়া হয়। তাকে কখন কোথা থেকে আটক করা হয়েছে এ বিষয়ে র‌্যাব বা পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাত দুইটা পর্যন্ত গোয়েন্দা কার্যালয়ের ফটকে মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার ও মেয়ে অবস্থান করছিলেন। মেহের নিগার জানান, গণমাধ্যমে খবর দেখে প্রথমে থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে জানতে পারি ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে। এখানে এসে যোগাযোগ করেছিলাম। কেউ কিছু বলতে পারেনি। পরে তারা আবার গুলশান থানায় যান। রাত আড়াইটা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করেন। এদিকে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, মান্নাকে আজ আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করা হবে।
সোমবার গভীর রাতে ডিবি পরিচয়ে রাজধানীর বনানীর এক আত্মীয়ের বাসা থেকে তুলে নেয়া হয় মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। গতকাল মধ্যরাত পর্যন্ত তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মান্নাকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও। আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মান্নার সন্ধান চেয়ে বনানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তার ভাইয়ের স্ত্রী। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও মান্না নিখোঁজ বলে খবর প্রকাশ হয়। মান্নার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, রাতে ভাতিজির বাসা থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে একটি সাদা রঙের গাড়িতে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, মান্নাকে পুলিশ আটক করেনি। তাকে অন্য কোন সংস্থা আটক করেছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিএনপির এক নেতা ও অজ্ঞাত এক ব্যক্তির সঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্নার ফোনালাপের রেকর্ড প্রচারের পর থেকে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া আসে। অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে অন্তত ৩০টি জিডি করা হয়। তাকে গণধোলাই দেয়ার হুমকি দেয় ছাত্রলীগ। এছাড়া মান্নাকে গ্রেপ্তারের দাবি উঠে সংসদ ও মন্ত্রিসভায়। ফোনালাপের বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে সংবাদ সম্মেলন করার ঘোষণা দিলেও তার আগেই তাকে বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল বেলা সাড়ে ১২টার দিকে থানায় এ ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ১০৮১) করতে যান মাহমুদুর রহমান মান্নার মেজো ভাই মোবায়েদুর রহমানের স্ত্রী বেগম সুলতানা। সঙ্গে মান্নার ভাতিজি শাহনামা শারমিনও ছিলেন। জিডির অভিযোগে বেগম সুলতানা বলেন, রাত ১১টার দিকে মান্না তার মেয়ে শাহনামা শারমিনের বনানীর ১৭/এ রোডের ১২ নম্বর বাসায় আসেন। রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে অজ্ঞাতনামা কয়েক ব্যক্তি নিজেদের সাদা পোশাকের পুলিশ পরিচয় দিয়ে দরজায় নক করে এবং দরজা খুলতে বলে। তারা দাবি করেন, বাসায় মাহমুদুর রহমান মান্না আছেন এবং তাকে বের হয়ে আসতে বলেন। তখন আমার মেয়ের জামাই মোহাম্মদ আলী রুমি তাদের সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। কিন্তু ডিবি পরিচয়ধারীরা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না বলে জানান। প্রয়োজনে তারা দরজা ভেঙ্গে প্রবেশ করার হুমকি দিলে রুমি দরজা খুলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ৪-৫ জন লোক ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। মান্না বেডরুম থেকে বের হয়ে এলে ঘরে প্রবেশকারীরা মান্নাকে তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। এরপর মান্না তাদের সঙ্গে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে উঠেন। মাইক্রোবাসটি পশ্চিমে বনানী মসজিদের দিকে চলে যায়। বেগম সুলতানা আরও বলেন, ভোর রাত পৌনে ৫টার দিকে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের স্ক্রল দেখে আমরা নিশ্চিত হই যে মান্না ডিবি পুলিশের হেফাজতে আছেন। কিন্তু সকাল ৯টার দিকে টিভি চ্যানেলের স্ক্রলের মাধ্যমে জানতে পারি মান্নার আটকের বিষয়টি ডিবি পুলিশ অস্বীকার করেছে। এরপর আমরা বিভিন্ন জায়গায় তার সন্ধানে যাই। দ্রুত তার প্রকৃত অবস্থান জানতে ও উদ্ধারের জন্য আমরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি লিপিবদ্ধ করি।
মান্নার বড় ভাইয়ের মেয়ে শাহনামা শারমিন জানান, সোমবার রাত ১১টার দিকে মাহমুদুর রহমান মান্না তার বাসায় যান। রাতে তার সঙ্গে তেমন কোন কথা হয়নি। কিছুক্ষণ টেলিভিশন দেখে ও চা খেয়ে তিনি ঘুমিয়ে যান। রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাদা পোশাকধারী পুলিশ পরিচয়ে তাকে আটক করতে আসে। কিন্তু ওই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা তাদের নাম বলেনি। তার স্বামী রুমি মান্নার সঙ্গে যেতে চাইলে ডিবি পুলিশ পরিচয়দানকারীরা অস্বীকৃতি জানায়। তারা বলে, মান্নার সঙ্গে কেউ গেলে তার সমস্যা হবে।
মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার বলেন, সিভিল ড্রেসে আসা লোকজন তাকে (মান্নাকে) জোর করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। তিনি কোথায় আছেন আমরা জানতে চাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক করলে আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় যাব। তিনি বলেন, মান্নাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় ডিবি পরিচয়ধারীরা কোন পরোয়ানা দেখাতে পারেনি। মান্নার ভাই মোবায়দুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘বনানীর মতো একটি এলাকা থেকে মান্নার মতো একজনকে কীভাবে নিয়ে যাওয়া হলো, এটা বিস্ময়ের ব্যাপার।’ তিনি বলেন, প্রথমে তারা ভেবেছিলেন মান্নাকে ডিবি পুলিশ নিয়ে গেছে। তারা একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে। তাই তাদের শঙ্কা ছিল না। কিন্তু যখন তারা সকালে টেলিভিশনে দেখতে পেলেন পুলিশ বলছে, ডিবি মান্নাকে নেয়নি। তখন সতর্ক হয়ে থানায় জিডি করেছেন বলে তিনি জানান।
‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে’: এদিকে সকাল ১১টার দিকে মাহমুদুর রহমান মান্নার বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ ও তার সন্ধানের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে নাগরিক ঐক্য। মান্নাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই আটক করেছে বলে দাবি করেন নাগরিক ঐক্যের নেতারা। এজন্য দলটির পক্ষ থেকে অতি শিগগিরই  আইনের আশ্রয় নেয়া হবে বলে জানানো হয়। গতকাল  দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৃতীয় তলায় নাগরিক ঐক্যের পক্ষে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইফতেখার আহমেদ বাবু। বাবু বলেন, মান্নাকে আটক ও পরে অস্বীকার করার ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। উনি রাষ্ট্রদ্রোহী কিছু করে থাকলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হোক। কিন্তু এভাবে আটক ও পরে অস্বীকারের ঘটনায় আমরা চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। তিনি আরও বলেন, টেলিফোনে কি কথোপকথন হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। মান্না নিজেও অস্বীকার করেননি। এই বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে উনার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করা হয়েছে। যার যার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মান্নার বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইফতেখার আহমেদ বলেন, আমরা খুব খুশি হতাম যদি সরকার উনাকে আটক না করে তার বক্তব্য খণ্ডনের সুযোগ করে দিত। কিন্তু সরকার তা না করে আরও ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে। একজন নাগরিক সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাষ্ট্র নিয়ে কথা বলতে পারে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে বাবু বলেন, সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্যদের সঙ্গে তো আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রতিদিনই কথা বলছে। রাজনীতির প্রয়োজনে সবার সঙ্গে কথা বলা দরকার। এখানে উনি রাষ্ট্রদ্রোহী কিছু বলেননি। এর সঙ্গে এক-এগারোর বা অন্য কোন  ষড়যন্ত্রের আবিষ্কার দূরভিসন্ধিমূলক। বাবু আরও বলেন, উনি অন্যায় করলে আপনাদের সামনে প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিতেন না। উনার মধ্যে সৎ সাহস ছিল বলেই, উনি প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিলেন। উনি একজন বিশিষ্ট নাগরিক। উনাকে কেন অন্ধকারে রাখা হচ্ছে। উনার পরিবারসহ আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। তিনি আরও বলেন, আমরা সবসময় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে। এ লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। এ সময় কারও চরিত্র হননের উদ্দেশ্য সঙ্কটকে ঘনীভূত করা। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জিন্নুর রহমান চৌধুরী দিপু, আতিকুর রহমান আতিক, আবু বকর সিদ্দিক, গাজী শফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
মান্নাকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি বিএনপির
মাহমুদুর রহমান মান্নাকে অবিলম্বে তার পরিবারের কাছে ফেরত দেয়ার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ এ দাবি জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, বরেণ্য নাগরিক, ডাকসু’র সাবেক ভিপি ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক  মাহমুদুর রহমান মান্নাকে সোমবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে  সাদা পোশাকধারী সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়নি মর্মে বক্তব্য দেয়ায় আমরা বিস্মিত হয়েছি। যে প্রক্রিয়ায় দেশের এই পর্যায়ের একজন নাগরিককে তুলে নেয়া হলো তাতে রাষ্ট্রের কোন নাগরিকের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার এবং বেঁচে থাকার অধিকারের কোন গ্যারান্টি অবশিষ্ট রইল না। আমরা সাংবিধানিক, মৌলিক ও মানবাধিকারকে চূড়ান্ত লঙ্ঘন করে সরকারি বাহিনীর এহেন ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। অবিলম্বে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে তার পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাচ্ছি। ভবিষ্যতে সরকারকে এ জাতীয় ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্যও আহবান জানাচ্ছি।