Thursday, February 26, 2015

না দেখা বাবার জন্য অশ্রুপাত- পিলখানা ট্র্যাজেডির ৬ বছর

শীল কড়ই গাছের চূড়ায় তখন সকালের নবীন সূর্য। মধ্য ফাল্গুনের বাতাসে রয়ে গেছে মৃদু শীতের আমেজ। বনানীর সামরিক কবরস্থানে সি্নগ্ধ দিনের এই সূচনায় মিশে ছিল বিষাদের সুর। মায়ের সঙ্গে আসা ছয় বছরের শিশু সাদাকাত গিয়ে দাঁড়াল বাবার কবরের পাশে। তার জন্মের ১১ দিন আগে বাবা মেজর মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম সরকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে নিহত হন। ছোট্ট শিশুটির কাছে তাই বাবা শুধুই একটি ছবি। তার কাছে বাবা মানে মায়ের মুখে শোনা কিছু গল্প। তবু সেই বাবার জন্য তার বুকে জমা অসীম ভালোবাসা। কবরের পাশের স্টিলের রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে সে ফুল ছড়াচ্ছিল বাবার কবরে। অদেখা বাবার জন্য চোখের কোণে চিকচিক করছিল দু'ফোঁটা অশ্রু। গতকাল বুধবার সকালে তারই মতো ব্যথাতুর হৃদয় নিয়ে পিলখানা হত্যাযজ্ঞে নিহত স্বজনদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানাতে হাজির হয়েছিলেন অনেকেই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা জানান, তাদের ক্ষতি পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়েই পূরণ হওয়ার নয়। প্রিয়জনের খুনিদের শাস্তি কার্যকর হলে হয়তো কিছুটা শান্তি পাবেন তারা।
পিলখানা হত্যাযজ্ঞের দুঃসহ স্মৃতির ষষ্ঠ বার্ষিকী ছিল গতকাল বুধবার। দিনটি স্মরণে সকাল ৯টায় বনানীর সামরিক কবরস্থানে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শুরুতেই রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বীরবিক্রম নিহতদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এর পর পরই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে শ্রদ্ধা জানান মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভঁূইয়া, নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল এম ফরিদ হাবিব, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী ও বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। তা ছাড়া জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও দলের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান।
পরে বিএনপি ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (এনডিএফ) পক্ষ থেকেও নিহতদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় নিহতদের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। তখন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা স্যালুট দেন। শেষে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। দিনটি উপলক্ষে সব সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে কোরআন খতম, আত্মার মাগফিরাত কামনা ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন ছিল।সশস্ত্র বাহিনীর আনুষ্ঠানিকতার পর অপেক্ষমাণ স্বজনরা যান প্রিয়জনের কবরের কাছে। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের কারও মা, কারও স্ত্রী, কারও সন্তান এসেছিলেন বেদনাবিধুর দিনটিতে কবর জিয়ারত করার জন্য।মেজর মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম সরকারের স্ত্রী সানজানা জোবায়দা সোনিয়া এসেছিলেন তার ছেলে সাদাকাতকে নিয়ে। তিনি সমকালকে বলেন, 'স্বজন হারানোর যন্ত্রণা তো প্রকাশ করা যায় না। সাদাকাত এখনও ছোট, তাই ভালো করে বোঝে না। তবু সে খুব বাবার অভাব বোধ করে।'
মেজর মিজানুর রহমানের বৃদ্ধ মা কোহিনূর বেগম সমকালকে বলেন, মা বেঁচে থাকতে সন্তান মারা গেলে তার কোনো সান্ত্বনা হয় না।'কর্নেল কাজী মোয়াজ্জেম হোসেনের মা মোমেনা খাতুন জানান, 'সন্তানের খুনিদের মৃত্যুদণ্ড তিনি জীবদ্দশাতেই দেখে যেতে চান।'লে. কর্নেল লুৎফর রহমান খানের কবরে হলুদ আর লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিচ্ছিল তিন ভাতিজা নেবরাজ, তানজিব ও ইশরাক। তাদের বয়স পাঁচ থেকে সাত বছর। লুৎফর রহমানের শাশুড়ি ফাতেমা রহমান জানান, অসুস্থ থাকায় তার মেয়ে আসতে পারেননি।
রায় কার্যকরে সরকার আন্তরিক :শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের রায় দ্রুত কার্যকর করতে সরকার আন্তরিক। বিদ্রোহে জড়িতদের অনেকের ফাঁসিসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। আপিল নিষ্পত্তি ও অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম শেষে দ্রুতই রায় কার্যকর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।বিদ্রোহের বিচারকাজ উন্মুক্ত করার দাবি বিএনপির :বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে ২৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে ওই ঘটনার বিচারকাজ দেশবাসীর সামনে উন্মুক্ত করারও দাবি জানিয়েছে দলটি।

ফায়ার বনাম ক্রসফায়ার by রোবায়েত ফেরদৌস

মারা যাচ্ছেন মানুষ। একদিকে মারা যাচ্ছেন পেট্রলবোমায়, আগুনে। অন্যদিকে, মারা যাচ্ছেন ক্রসফায়ারে। এ যেন ফায়ার বনাম ক্রসফায়ার। অনতিবিলম্বে ফায়ার ও ক্রসফায়ার দুটিই বন্ধ করতে হবে। আর এই পরিস্থিতির উত্তরণে একটা জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা উচিত। এ সংলাপ শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে হলে চলবে না। বড় দল, ছোট দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন সবাইকে নিয়ে এ জাতীয় সংলাপ করতে হবে। আমাদের দেশটা এখন ডেভেলপমেন্টের পর্যায়ে যাচ্ছে। অনেক দূর যাবে। এই সময়ে এই ধরনের সহিংসতা, বোমাবাজি এই ডেভেলপমেন্টের জন্য খুব নেতিবাচক হবে। কাজেই যত দ্রুত এটি সমাধান করা যাবে ততই মঙ্গল হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। এটাকে ইংরেজিতে বলে ‘টেক অব চেঞ্জ’। টেক অব চেঞ্জ হলো- বিমান উড্ডয়নের জন্য উপরে ওঠার সময়টা। এই সময়টাতে বিমানে প্রচুর ফুয়েল লাগে। এই সময় যদি বিমানটা খারাপ হয় তাহলে মুখ থুবড়ে পড়বে। আর কোনদিন উপরে উঠতে পারবে না। আমাদের ডেভেলপমেন্টটাও এখন টেক অব চেঞ্জের স্টেজে আছে। সুতরাং জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে এটাকে দ্রুত সমাধান করতে হবে। ফুয়েল দিয়ে আকাশে উঠিয়ে দিতে হবে। তাহলেই উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা থাকবে।
নোট: প্রতিক্রিয়াটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের। তিনি টক শো উপস্থাপনা করেন, কাজ করেন আদিবাসীহ আরও নানা বিষয়ে।

ইরানকে পরমানু অস্ত্র তৈরিতে বাঁধা দিচ্ছে না বিশ্বনেতারা : নেতানিয়াহু

ইরানকে পারমানবিক অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম থেকে বিরত করার প্রচেষ্টায় বিশ্বনেতারা ইস্তফা টেনেছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কিন্তু নেতানিয়াহু’র এই বক্তব্য-কে ভুল বলে আখ্যায়িত করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। পারমানবিক অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচী থেকে ইরানকে বিরত করার প্রচেষ্টায় বিশ্বনেতারা যে ইস্তফা দিয়েছেন, এই বিষয়টিকে গ্রহণ করতে সম্মত নন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বুধবারে পশ্চিম তীরে নিজের সমর্থকদের সামনে বক্তৃতা দেবার সময় নিজের এই মত তিনি তুলে ধরেন। তেহরানের পরমানু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচী ইসরায়েলের জন্য হুমকি; তাই, এটিকে বন্ধ করতে যে কোনোকিছুই তিনি করবেন বলেও জানিয়েছেন নেতানিয়াহু।
তিনি বলছেন, ইরান যদি পারমানবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ হতে চায় তাহলে এর বিপক্ষে আপত্তি জানাতে যা করা দরকার আমি এর সবই করবো। ইরানের এই কর্মসূচী আমাদের জন্যই নয়, আমার প্রতিবেশীসহ সারা দুনিয়ার জন্যই হবে বিপজ্জনক।
ইরানের পরমানু কর্মসূচী নিয়ে বিশ্বনেতারা একটি আলোচনা চালাচ্ছেন এবং কিছু শর্তে ইরানের উপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ভাবা হচ্ছে। এই আলোচনাকে ইঙ্গিত করেই এমন মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলী প্রধানমন্ত্রী। কারণ ইরানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে তিনি রাজী নন।
কিন্তু ইরান বিষয়ক আলোচনা নিয়ে মি. নেতানিয়াহু যা ভাবছেন তা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন জন কেরী। তিনি বলছেন, ইরানের পরমানু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচীর বিস্তার বন্ধ করতে আমরা ইরানের সঙ্গে যে চুক্তি করেছি এবং তাদেরকে যে সময় দিয়েছি এর ফলে ইসরায়েল এখন আগের চেয়ে আরো বেশি নিরাপদ। যদিও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এর বিরোধীতা করছেন। কিন্তু তিনি ভুল করছেন।
সূত্র : বিবিসি।

জনতার যন্ত্রণা ক্ষমতার আনন্দ by আলমগীর মহিউদ্দিন

সাধারণ মানুষ ক্ষমতার লড়াই এর গিনিপিগ নয়
প্রতিদিন খবরের কাগজে চলমান ঘটনার ছিটেফোঁটা বিবরণ প্রকাশ পাচ্ছে। এই আংশিক চিত্র অনাকাক্সিত, অসম্ভব, অবিশ্বাস্য মনে হয়। এর চেয়ে কঠিনতম ও কঠোরতম ঘটনা ঘটছে বলে দাবি মানুষের মুখে মুখে। এসব দাবি যাচাই করা কঠিন। তবে অনুভব করা যায়। একটি প্রশ্ন তাই মুখে মুখে- ‘এরপর কী?’ স্বগতোক্তিতে অনেকেই এর জবাব উচ্চারণ করছেন। বেশির ভাগই হতাশাব্যঞ্জক, কিছু কিছু উচ্চারণযোগ্য নয়। এক কথায় মানুষ যন্ত্রণাকিষ্ট, হতাশ। চিত্রটি সাধারণ। অপর চিত্রটি অসাধারণ। সে চিত্রের ধারক-বাহক ও পরিচালকেরা ক্ষমতাবান। এরা দাবি করছেন, সব ঠিক আছে। যৎসামান্য বিশৃঙ্খলা যা আছে, এক সপ্তাহে ঠিক হয়ে যাবে। অবশ্য এর মাঝে কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। আর চিত্রটি ক্রমান্বয়ে অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য হয়ে উঠছে। তাই ক্ষমতাবানেরা সুরও পাল্টাতে শুরু করেছেন। এ দু’টি চিত্র বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। এ দেশের ঊষালগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে এমন রবাহূত ঘটনাবলি। আর একইভাবে এর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। একটি বহুল ব্যবহৃত বাক্য দিয়ে এমন ঘটনাবলির বর্ণনা দেয়া হয়- ‘দেশ এখন ক্রান্তিকালের মাঝ দিয়ে চলছে।’ এ ক্রান্তিকালের শেষ নেই। গত সাড়ে চার দশক ধরে চলছে। দেশের জন্মের প্রথম তিন বছরে এমনই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। হত্যা-খুন-গুম নিত্যদিনের বিষয় হয়ে পড়লে মানুষ নীরবে সৃষ্টিকর্তার সাহায্য চাইত। মজলুমের আর্তি আকাশ-বাতাস যেন ছেয়ে যাচ্ছিল। কেউ ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করত না। উল্লেখ্য, আজকের ক্ষমতাবানদের একাংশ তখন সেই বিরোধিতার নেতৃত্ব দিয়েছিল। বর্তমানের অবস্থা বর্ণনা করে ইন্টারনেটে হাজার মন্তব্যের মাঝে রোকেয়ার মন্তব্যটি উদ্ধৃত করা যায়। তিনি লিখেছেন- ‘বাংলাদেশের অভিধান থেকে গণতন্ত্র, সততা, বিশ্বাস, মতবিনিময়, অনুভব, সহানুভূতি, আস্থা, সম্মানবোধ, স্বাধীনতা, সহনীয়তা, ক্ষমা, দয়া, নৈতিকতা, ধৈর্য, বোধশক্তিসহ মানবিক ও সামাজিক শব্দগুলো হারিয়ে গেছে।’ লেখিকা এই এক বাক্যে চমৎকারভাবে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। তাকে ধন্যবাদ জানাতে হয়।
প্রশ্ন হলো, এমনটি কেন হয়? এক কথায় এর জবাব, ক্ষমতার লড়াই। ঠিক একই ঘটনা ফ্রান্সের ইতিহাসে বিধৃত। রাজার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে এমন হত্যা-গুম-খুন ফরাসি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত শতবর্ষব্যাপী চলে। রাজা সৃষ্টি করেন গোপন বিচারকক্ষ, যার নাম ছিল ‘চেম্বার আরদঁত’। প্যারিসের বাস্তিলের (যেখানে বিপ্লবের শেষ যুদ্ধ হয়) কাছে অবস্থিত ছিল এই বিচারকক্ষ। একে ‘জ্বলন্ত কক্ষ’ বলা হতো। কারণ, মশাল দিয়ে একে আলোকিত করা হতো; কেননা আলো প্রবেশের কোনো পথ ছিল না। এখানে রাজা লুই-১ নির্বাচিত বিচারকগণ বসে নির্ধারিত রায় পড়ে শোনাতেন। রায় হতো মৃত্যু ও পোড়ানো। লুইয়ের ছেলে হেনরি ছিলেন আরো হিংসাত্মক ও নিষ্ঠুর। তখন ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্টের মধ্যে চলছিল বিরোধ। হেনরি প্রটেস্টান্টদের, বিশেষ করে ক্যালভিনিস্টদের সহ্যই করতে পারতেন না। ক্যালভিনিস্টদের নানা বদনাম দিয়ে শত শত লোককে কারাগারে নিক্ষেপ করা হতো বা পুড়িয়ে মারা হতো এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতো।
ক্যালভিনিস্টদের যে অপবাদ দেয়া হতো তা আজকের যুগের বহুল প্রচলিত শব্দগুলোর সাথে মিলে যায়। যেমন- মৌলবাদী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি।
হেনরি প্রতিপক্ষদের নির্মূল করার জন্য কয়েকটি সরকারি সংস্থার সৃষ্টি করেন। তাদের কাজ ছিল খুঁজে খুঁজে ক্যালভিনিস্টদের বের করা অথবা প্রতিপক্ষদের তেমন আখ্যা দিয়ে আটক করা এবং গুম করে ফেলা। এমনই একটি সংস্থার প্রধান ছিল গ্যাবরিয়েল মন্টগোমারি। রাজার স্কটগার্ডের প্রধান মন্টগোমারির অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ধৃত প্রতিপক্ষের ওপর নির্ধারিত বিভিন্ন অত্যাচার করে হত্যা করা এবং তা রাজা হেনরিকে নিজে জানানো। হেনরি ‘প্লেস দ্য ভোসাজে’ ঘোড়সওয়ারি বর্শা খেলা দেখতে পছন্দ করতেন। তবে কোনো না কোনো ঘোড়সওয়ারকে মরতে হতো। হেনরি আনন্দে লাফিয়ে উঠতেন। তার সাথে দর্শকেরা যোগ না দিলে তারা সরকারি বাহিনীর আক্রমণের শিকার হতো। এসব ঘটনা হয়তো মন্টগোমারিকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে ফেলে। ১৫৫৯ সালের সেই দিনের প্লেস দ্য ভোসাজের বর্শা খেলার এক ফাঁকে মন্টগোমারি তার বর্শা দিয়ে রাজা হেনরিকে বিদ্ধ করলে ফ্রান্সের নিষ্ঠুর একটি সময়ের অবসান ঘটে। এরপর ‘আরদঁত কক্ষটি’ বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু ১১৫ বছর পর সেই কক্ষটি আবার খুলে দেয়া হয় রাজা লুইস-৪ এর রাজত্বকালে। রাজা এখানে সেই একই গোপন বিচার চালাতেন- সেই একই গুম-খুন-হত্যা করে। বিচারকেরা এজলাসে বসলে রাজার তরফ থেকে নির্দেশ আসত এবং সেই মোতাবেক রায় হতো। সবক্ষেত্রে মৃত্যু। এসব মৃতদেহ একত্র করে জনসমক্ষে পুড়িয়ে ফেলা হতো- যেন কেউ রাজার বিরুদ্ধে মুখটি না খোলে। এক মার্কিন সাংবাদিক জেফরি সেন্ট কেয়ার লিখেছেন, “এই আরদঁত কক্ষে অত্যাচারের পদ্ধতিগুলো আজ সারা বিশ্বে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে অনুসৃত হচ্ছে। বিচারের রায় আগেই লেখা হচ্ছে এবং ক্ষমতাবানেরা সে রায়গুলো কার্যকর হতে দেখে আনন্দিত হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৬৭৫ ও ১৬৮২ সালের মধ্যে রাজা লুই ২১০টি গোপন বিচারে কয়েক হাজার প্রতিপক্ষকে হত্যা করেন। এরপর শুরু হয় নিরুদ্দেশ এবং পানি খাওয়ানো। এখন যাকে বলা হয় ‘ওয়াটার বর্ডিং’।”
ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশবাহিনীর সৃষ্টি হয়। অধ্যাপক স্যাম মিত্রিয়ানি (কলেজ দুপাজের ইতিহাসের অধ্যাপক) লিখেছেন, ‘পুলিশের সৃষ্টি হয়েছিল, প্রভুসমাজকে রক্ষা এবং সেবা করার জন্য। পুলিশের জন্ম অপরাধ দমনের জন্য নয়- বিশেষ করে সাধারণ মানুষ যেমনটি বোঝে। তাদের সৃষ্টি সমাজের প্রভুদের শান্তি যারা ভঙ্গ করে তাদের দমনের জন্য।’ তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে এর অনেক পরিবর্তন হয় এবং এক সময়ে নির্বাচিত পুলিশব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক বলে পরিচিত নির্বাচিত ক্ষমতাবানেরা এ ব্যবস্থা ভেঙে বর্তমান পুলিশব্যবস্থা চালু করেন। এতে ‘নির্বাচিত’ ক্ষমতাবান সংখ্যালঘিষ্ঠরা পুলিশকে ব্যাপক ব্যবহারের সুযোগ পান। এখানেই পুলিশি রাষ্ট্রের ধারণাটি জন্ম নেয় এবং বর্তমান বিশ্বে এর উপস্থিতি ব্যাপক। এই ব্যাপকতার কারণ ক্ষমতালিপ্সুু একশ্রেণীর মানুষ তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পুলিশ ও তথাকথিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সহজে ব্যবহার করতে পারে। গত ১০০ বছরে পুলিশবাহিনীকে ক্রমান্বয়ে ক্ষমতাশালী করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। ক্ষমতাসীনেরা মানুষের স্বস্তি-শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সব রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ক্ষমতাকে নিজেদের হাতে সীমাবদ্ধ করেছেন। এক দিকে জনগণ যন্ত্রণায় থাকে, অপর দিকে শাসকেরা শান্তিতে জীবন উপভোগ করেন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যামিরিটাস অধ্যাপক এডওয়ার্ড এস হারমান তার ‘টেরোরিজম ইন ফ্যাক্ট অ্যান্ড প্রোপাগান্ডা’ বইতে লিখেছেন- ‘তৃতীয় বিশ্বের ক্ষমতাবানেরা নিরাপত্তা রক্ষার নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ সব অনাচার ও অপরাধ রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের মাঝ দিয়ে করে যাচ্ছে। এবং তারা বাইরের সাহায্যে টিকে থাকে।’
আবার ক্ষমতাসীনেরা সব সময় মুনাফা খোঁজেন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে সেভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করে থাকেন। বিভিন্ন দেশে এমনকি কারাগার বেসরকারি সংস্থার কাছে সঁপে দিয়ে এই মুনাফার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কারাগারকে বেসরকারি খাতে দেয়া হয়েছে। কারেকশন করপোরেশন অব আমেরিকা (সিসিএ) অনেক কারাগার পরিচালনা করে। এর বার্ষিক মুনাফা ১৭০ কোটি ডলার। এসব বেসরকারি সংস্থা কারাগার বা বন্দীদের ব্যাপারে কোনো সংস্কারে নারাজ। কারণ, মুনাফা কমে যেতে পারে। তৃতীয় বিশ্বে পুলিশকে এ ব্যাপারে একটু অন্যভাবে ব্যবহার করা হয়। এখানে প্রতিবাদ ও সমালোচনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধ। তাই পুলিশ ও ক্ষমতাবানেরা যেকোনো প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে একত্রে মুনাফার কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনৈতিক আইন তৈরি হয় এবং প্রয়োজন অনুসারে বিচারক নির্বাচিত করা হয়- যেন এই মুনাফার কর্মকাণ্ডে ব্যত্যয় না ঘটে। এক কথায়, ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডগুলো প্রবল হয়ে ওঠে। তবে রাষ্ট্রটি ফ্যাসিবাদীতে নিমজ্জিত হয়েছে কি না তার অন্তত ১৪টি চিহ্ন থাকবে। অধ্যাপক লরেন্স ব্রিট হিটলার, মুসোলিনি, ফ্রাঙ্কো ইত্যাদির শাসন অনুসন্ধান করে এই চিহ্নগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার- ০১. সব সময় দেশপ্রেম এবং এ সম্পর্কে গান, প্রচারণা, স্লোগানে মত্ত থাকে এবং জনগণকে ব্যস্ত থাকতে বাধ্য করে; ০২. মানবাধিকার নিয়ে মাথা ঘামায় না। বৈদেশিক ও ভেতরের শত্রুর দোহাই দিয়ে জনগণের অধিকার হরণ করে; ০৩. দুর্বল গোষ্ঠীকে অন্যের দোষের বোঝা বইতে বাধ্য করে; ০৪. সামরিক বাহিনীসহ সব রাষ্ট্রীয় অস্ত্রধারীকে সবার ওপরে স্থান দেয়া হয়; ০৫. সংবাদমাধ্যমকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়; ০৬. জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বাড়াবাড়ির মাঝ দিয়ে জনগণকে এক ভীতির মধ্যে রাখা হয়; ০৭. ধর্মকে ব্যবহার করা হয় নানাভাবে; ০৮. করপোরেট শক্তি ও রাষ্ট্রীয় শক্তি এক হয়ে পড়ে; ০৯. চিন্তাবিদ ও তাদের কর্মকাণ্ডকে নিন্দা করা হয়; ১০. পুলিশকে সীমাহীন ক্ষমতা দেয়া হয় এবং অপরাধ দমনের নামে প্রচণ্ড অনাচারের রাজত্ব কায়েম করে; ১১. নির্বাচন নামমাত্র হয় এবং এমন ব্যবস্থার সৃষ্টি করা হয় যেন সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না আসে; ১২. নিজের দল ও আত্মীয়রা সর্বপ্রকার রাষ্ট্রীয় সহায়তা পায়; ১৩. কোনো গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে তার ওপর প্রচণ্ড অত্যাচার করা হয় এবং হত্যা ও গুম সাধারণ দৈনন্দিন বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। চার দিকে একটু দৃষ্টিপাত করলেই অনুভব করা যায় জনগণ ফ্যাসিস্ট আবহাওয়ায় অবস্থান করছে কি না।
হিংসাত্মক ঘটনার আবির্ভাব কেন ঘটে, এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন হানাহ্ আরেন্ডট। তার এই মৌলিক গবেষণা বিশ্বে প্রধান সূত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বলেছেন, ‘ক্ষমতা ও সন্ত্রাস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।’ তিনি বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আকার ও অবস্থান নির্ধারণ করে ক্ষমতাসীনেরা কত দিন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবে।’ ইতিহাস আলোচনা করে আরেন্ডট লিখেছেন, ‘এই ক্ষমতাসীনেরা সন্ত্রাস ব্যবহারের মাঝ দিয়ে তাদের ক্ষমতার স্থিতি রক্ষা করতে চায়। কিন্তু দেখা গেছে, যে সরকার সন্ত্রাসের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল হয় তাদের আসলে কোনো শক্তিই থাকে না। কেননা স্বৈরতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারীকে সন্ত্রাসের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।’ তার বক্তব্য অনুসারে স্বৈরাচারের পতন হয়, যখন জনগণ অনুভব করতে শুরু করে তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত অধিকার পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। সঙ্ঘাত তখন সৃষ্টি হয়। জনগণের ঐক্যের ওপর নির্ভর করে স্বৈরাচার কত সময় স্থায়ী হবে। স্বৈরাচারীরা নিজেদের সন্ত্রাসকে আইনসম্মত করার চেষ্টা করে। আর জনগণের প্রতিবাদকে রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন অপবাদে নির্মূল করার চেষ্টা করে। কেলি কার্টার জ্যাকসন তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, ‘রাজনৈতিক সন্ত্রাস সব পরিবর্তনের মূল। জনগণকে সন্ত্রাসে যোগ দিতে হয় অত্যাচারী সরকারকে উৎখাত করতে। আর সরকার সন্ত্রাস করে জনগণকে স্তব্ধ করতে।’ তিনি ফরাসি বিপ্লবকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন।
তবে গবেষকগণ দেখিয়েছেন ‘সন্ত্রাস, অসস্তি ও সামাজিক টানাপড়েন বহুলাংশে হ্রাস পেতে পারে, যদি ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক মানুষেরা নিজেদের মাঝে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকে সম্মান করে এবং ব্যক্তিগত জীবনে গণতান্ত্রিক সহনশীলতার চর্চা করে। বাংলাদেশের বর্তমানের অবস্থা এভাবে সহজেই সমাধান হতে পারে। কারণ, বর্তমান অশান্তির মূলে একদল নতুন নির্বাচন চায়। আর ক্ষমতাসীনেরা তা মানতে রাজি নন। অথচ তারা দাবি করছেন, এ মুহূর্তে নির্বাচন হলে তাদের বিজয় অবধারিত। এরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ৫২৭টি হরতালও করেছিলেন। তার ফলে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনও হয়েছিল। তাহলে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে জনগণকে যন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচাতে তাদের এত অনীহা কেন? তারা জনগণের সেবাই তো করতে চান।
এক কথায় বলা যায়, রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে শান্তি সহজেই নিশ্চিত করা সম্ভব, যদি ক্ষমতাবানেরা সবার গণতান্ত্রিক অধিকারকে স্বীকার করেন এবং নিজেরা সহনশীলতার পরিচয় দেন। দুঃখের কথা হলেও এটা সত্য, মার্কিন সংস্থা ‘এথিক্যাল কনজিউমার্স’ তাদের সবচেয়ে নিপীড়নমূলক সরকারের তালিকায় ৪১টি দেশকে গত পাঁচ বছর হলো বারবার উল্লেখ করেছে। এ তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকছে। এর অবসান হওয়া প্রয়োজন। তাই ক্ষমতাবানদের বক্তব্যের অশ্লীলতা পরিহার করতে হবে এবং স্বাধীনতার ঊষালগ্নের নেতৃবৃন্দ যেমন সবাইকে নিয়ে জাতিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তেমন চেষ্টা এখনই করতে হবে। অশান্তি, অনাচার, অত্যচার দিয়ে হয়তো সাময়িক ফল পাওয়া যায়, পরিশেষে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষতি থেকে জাতিকে বাঁচানো রাজনীতিবিদদের প্রধান দায়িত্ব। বাংলাদেশে একটি ধারণা জনগণের মাঝে দৃঢ় হয়ে পড়েছে, তা হলো- রাজনীতিবিদেরা নিজেদের ও তাদের গোষ্ঠীগুলোর সেবা করতেই ক্ষমতায় যেতে চান। ধারণাটিকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে হবে তাদের।

হুমকির মুখে টক শো আলোচকরা

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অধিকার সমর্থন করে জাতিসংঘ। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ইংরেজি পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান-কি মুনের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অধিকার যেকোন দেশের গণতন্ত্রের একটি বিরাট অংশ। ওদিকে, লন্ডন ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অব্যাহত হামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।
গত কয়েক দিনের মতো জাতিসংঘের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ২৪শে ফেব্রুয়ারিও উঠে আসে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। নিচে প্রশ্নোত্তর-পর্বের বাংলাদেশ অংশটি উপস্থাপন করা হলো :
প্রশ্ন: বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি জানতে চাই। একই সঙ্গে আমার প্রশ্ন জেফ্রে ফেল্টম্যানের শ্রীলঙ্কা সফর নিয়ে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমার কথা হলো, সেখানে দৃশ্যত সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি একটি বিবৃতি দিয়েছেন, আমার প্রশ্ন তা নিয়ে। তিনি বলেছেন, একটি প্রচারণামূলক পোস্টারের ছবি ছাপানোর কারণে দ্য ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আমি জানতে চাই, এ বিষয়ে আপনার কোন প্রতিক্রিয়া আছে কিনা অথবা আপনার কাছে অন্যকিছু আছে কিনা। আমি জানি যে, অনুরোধ জানানো হয়েছে। লোকজন গুম হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি- এ বিষয়ে অবস্থান কি?
উত্তর: আমার কাছে আপনার জন্য নতুন কোন খবর নেই। তবে অবশ্যই আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রসমূহের টিকে থাকার অধিকারকে সমর্থন করি, যা যে কোন দেশের গণতন্ত্রের জন্য বড় একটি অংশ।
হুমকির মুখে টক শো আলোচকরা: বাংলাদেশে ডজনেরও বেশি মানুষকে গুম করা হয়েছে। অনেক সাংবাদিক ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বলেছেন, হুমকির কারণে তারা কথা বলার সময় সেলফ সেন্সরশিপ চর্চা করেন।  লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তার বার্ষিক রিপোর্টে বাংলাদেশ অধ্যায়ে এসব কথা বলেছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত ঘটনার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ করা হয়েছে ওই রিপোর্ট। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ ও অন্য নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে অব্যাহতভাবে কাজ করছেন কারখানা শ্রমিকরা। এছাড়া, আপিলের কোন সুযোগ না দিয়ে অন্তত একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বিশ্বের ১৬০টি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে গতকাল প্রকাশিত হয় ওই প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, গত বছর জানুয়ারিতে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে বিজয়ী ঘোষণা করার পর থেকে তিনি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিএনপি) ও এর মিত্ররা। নির্বাচনের প্রতিবাদে বিরোধীদের বিক্ষোভের সময় শতাধিক মানুষ নিহত হন। এর মধ্যে বেশকিছু মানুষ মারা যায় পুলিশের ছোড়া  গুলিতে। তারাও এ সময় সহিংস হয়ে উঠেছিল। এসব মৃত্যুর কোনটিরই তদন্ত করা হয় নি। বিরোধী দলের সমর্থকরা বাস ও অন্য যোগাযোগ মাধ্যমে পেট্রলবোমা ছুড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এতে কমপক্ষে ৯ জন নিহত হয়। আহত হয় অনেকে। দেশে প্রচণ্ড রকম মেরুকরণ করা আবহের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রায় দিয়েছে। এসব মামলার সমর্থকরা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যেসব প্রমাণ হাজির করেছে তা যথেষ্ট শক্তিশালী কিনা তা বিবেচনা না করেই তারা তাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জোর করে গুম করে দেয়া অংশে বলা হয়, জোর করে কতজন মানুষকে গুম করে দেয়া হয়েছে তার সঠিক কোন সংখ্যা নেই। তবে কারো কারো মতে এ সংখ্যা ৮০’রও বেশি। ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে নথিভুক্ত গুমের ঘটনা ২০টি। এর মধ্যে ৯ জনকে পরে পাওয়া গেছে মৃত অবস্থায়। দীর্ঘ সময় আটক থাকার পর স্বজনদের কাছে ফিরেছেন ৬ জন। এ সময়ে তারা কোথায় ছিলেন সে বিষয়ে কেউ জানতো না। বাকি ৫ জনের ভাগ্যে কি ঘটেছে সে বিষয়ে কোন তথ্য নেই। গত বছর এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জে সাতজনকে গুম করা হয়। এরপর দেখা যায় তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়। এতে বছর শেষ নাগাদ এমন সদস্যের সংখ্যা দাঁড়ায় কমপক্ষে ১৭। ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠন করার পর এটাই ছিল এ ধরনের প্রথম পদক্ষেপ। র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে ওই তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এর মাধ্যমে আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়। তবে এ বিষয়ে জনগণের চাপ কমে এলে সরকার মামলাগুলো বাদও দিতে পারে বলে উদ্বেগ অব্যাহত আছে। এ মামলা বাদ দিলে একই রকম অন্য কোন ঘটনায় তদন্তের পরিষ্কার ইঙ্গিত মেলেনি। ফেব্রুয়ারিতে অপহরণ করা হয় আব্রাহাম লিঙ্কনকে। তাকে পরে হত্যা করা হয়। এ বিষয়ে কোন ব্যাখ্যা নেই। ওই প্রতিবেদনে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বলা হয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা ব্যবহার করে সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই ধারার অধীনে, কেউ যদি এ আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হন ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়ে থাকে ২০১৩ সালের ৬ই অক্টোবরের আগে তাহলে তাকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল দেয়া হতে পারে। ওই সময়ে, একটি সংশোধনীতে শুধু শাস্তি বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছরই করা হয় নি, একই সঙ্গে সর্বনিম্ন শাস্তি করা হয়েছে ৭ বছর। শান্তিপূর্ণ কিছু কর্মকাণ্ডকে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমালোচনা করা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের রিপোর্ট করা। ২০১৩-১৪ সময়কালের মধ্যে আইসিটির ৫৭ ধারার অধীনে কমপক্ষে চারজন ব্লগার, ফেসবুকের দু’জন ব্যবহারকারী ও মানবাধিকারবিষয়ক একটি সংগঠনের দু’কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, সুব্রত অধিকারী শুভ, মশিউর রহমান বিপ্লব ও রাসেল পারভেজ। মানবাধিকার কর্মীরা হলেন- অধিকার সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলেন। সাংবাদিক সহ মিডিয়ার এক ডজনেরও বেশি কর্মী বলেছেন, কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করায় নিরাপত্তা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো তাদেরকে হুমকি দিয়েছে। তারা সাধারণত সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ফোনে সরাসরি এই হুমকি দেয় অথবা তার সম্পাদকের মাধ্যমে ওই বার্তা পৌঁছে দেয়। অনেক সাংবাদিক ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বলেছেন, এর ফলে তাদেরকে সেলফ সেন্সরশিপ চর্চা করতে হচ্ছে। ধর্মীয় গ্রুপগুলোরও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হুমকি। কমপক্ষে ১০টি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে এসব গ্রুপ গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে যে, নির্দিষ্ট কেউ একজন সামাজিক মিডিয়াতে ইসলামের অবমাননা করেছে অথবা কর্মক্ষেত্রে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। এতে কমপক্ষে ৫ জনের ওপর হামলা হয়েছে। তার মধ্যে দু’জন নিহত হয়েছেন। মারাত্মক আহত হয়েছেন অন্যরা। নিহত দু’জন হলেন আহমেদ রাজিব ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক একেএম শফিকুল ইসলাম। এর মধ্যে শফিকুল ইসলামকে ২০১৪ সালের নভেম্বরে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। তিনি ক্লাসে ছাত্রীদের বোরকা পরাকে ইসলাম পরিপন্থি বলে আখ্যায়িত করেন। এক্ষেত্রে তার নিন্দা জানিয়েছিল যারা, তাকে তারাই হত্যা করেছে বলে অভিযোগ আছে। অ্যামনেস্টি তার রিপোর্টে বাংলাদেশে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মানবাধিকারের জন্য বিরাট উদ্বেগ। নারী অধিকারবিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলেছে, মিডিয়া রিপোর্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে- ২০১৪ সালের শুধু অক্টোবরে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৪২৩ জন নারী ও যুবতী নানা রকম সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তারা আরও বলেছে, ধর্ষিত হয়েছেন শতাধিক নারী। এর মধ্যে ১১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ৪০ জনের বেশি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর কারণ, তার পিতার পরিবার স্বামীকে বা শ্বশুরপক্ষকে যৌতুক দাবি মেটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর মধ্যে আঘাতে মারা গেছেন ১৬ জন। অভ্যন্তরীণ সহিংসতা, এসিড হামলা ও পাচারের শিকার নারীরা। নির্যাতন সম্পর্কে রিপোর্টে বলা হয়, নির্যাতন ও অন্যান্য অশোভন আচরণ ব্যাপক আকারে ছিল বাংলাদেশে। তবে এসব ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নিয়মিত নির্যাতন করে পুলিশ। এক্ষেত্রে তারা যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করে তার মধ্যে রয়েছে প্রহার, সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দেয়া, প্রজননতন্ত্রে বৈদ্যুতিক শক, কোন কোন ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তির পায়ে গুলি করা হয়। ২০১৪ সালের জানুয়ারি ও জুলাইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ৯ জনের। অভিযোগ আছে নির্যাতনের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বলা হয়েছে, কারখানা ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মান ভয়াবহ রকম নিম্নমানের। ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সাভারে ধসে পড়ে ৯ তলাবিশিষ্ট রানা প্লাজা। এতে কমপক্ষে ১১৩০ গার্মেন্ট শ্রমিক নিহত হন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০০০ শ্রমিক। পরে দেখা যায়, সেখানকার গার্মেন্ট কারখানার ম্যানেজাররা শ্রমিকদের ওই ভবনে ঘটনার দিন কাজে যেতে বাধ্য করেছিলেন। একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ২০১২ সালে। তখন তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ১১২ শ্রমিক নিহত হন। কারণ, কারখানার ম্যানেজার শ্রমিকদের বাইরে বেরুতে দেয় নি। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণের জন্য যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার সঙ্গে জড়িত সরকার, বিশ্বের বিভিন্ন ব্র্যান্ড। আইএলও দেখেছে এ উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয়। জীবিতরা এখনও লড়াই করছে অবলম্বনের জন্য। ওই রিপোর্টে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে বলা হয়, আদালত শাস্তি নিয়ে মৃত্যুদণ্ড অব্যাহত রেখেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ১১ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। সরকারপক্ষ এই আদালতের রায় নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করায় একজনকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। যেসব বন্দির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের অপেক্ষায় আছে তাদেরকে যেকোন সময় ফাঁসি দেয়া হতে পারে।

মানসিকভাবে প্রস্তুত খালেদা জিয়া by কাফি কামাল

গ্রেপ্তার, কারাবরণসহ যে কোন ধরনের পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়া। চলতি বছরের ৩রা জানুয়ারি থেকে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ দিন কাটাচ্ছেন তিনি। পড়ছেন একের পর এক প্রতিবদ্ধকতার মুখে। প্রতিদিনই পাচ্ছেন মামলা-হামলা দুঃসংবাদ। এমন প্রতিকূল সময়ে ছেলেকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান তিনি। নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তার কার্যালয়ে অবস্থানরতদের খাবার সরবরাহ করতে দিচ্ছে না পুলিশ। কিন্তু আন্দোলনের সিদ্ধান্ত থেকে একচুল নড়েননি খালেদা জিয়া। সর্বশেষ তিনি পেলেন দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবর। বিশেষ আদালত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গতকাল দুপুরে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। আইনজীবীদের কাছে খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গুলশান কার্যালয়ে ছুটে যান তার ভাই সাঈদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরীন এস্কান্দার ও শামীম এস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা। তারাই প্রথম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি জানান। কার্যালয়ে অবস্থানকারী সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবরটি স্বাভাবিকভাবে নেন খালেদা জিয়া। কার্যালয়ে অবস্থানকারী নেতারা তার কাছে যান। তিনি নেতাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা কি চিন্তিত? আমি চিন্তিত নই। রাজনীতির ইতিহাসে এমন প্রতিহিংসার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ব্যক্তিগতভাবে জেল-জুলুমও আমার কাছে নতুন কিছু নয়। কাঙ্ক্ষিত সমাধান না আসা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। চলমান আন্দোলনকে আরও জোরদার করতে হবে। আরও অনেক কষ্ট করতে হবে। আপনারা কি কষ্ট করতে পারবেন? এ সময় নেতারা হাসিমুখে তাকে সায় দেন। খালেদা জিয়া নেতা ও তার কর্মকর্তাদের সাহস ও সান্ত্বনা দেন। কিছু নির্দেশনাও দেন। দীর্ঘ পৌনে দুই মাস ধরে অমানুষিক কষ্ট সহ্য করে তার সঙ্গে অবস্থান করায় নেতা ও কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান। সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবর পেয়ে খালেদা জিয়া দেশে-বিদেশে কয়েকটি ফোন করেন। এ ছাড়া কার্যালয়ে অবস্থানকারী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমানও বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটি ফোন করেন। এদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবর পেয়ে গুলশান কার্যালয়ে ছুটে যান তার বড় বোন সেলিনা ইসলাম। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়ার সঙ্গেই অবস্থান করছেন। এদিকে চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্র জানায়, গুলশান কার্যালয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া ব্যারিকেডে অবরুদ্ধ হওয়ার গ্রেপ্তার ও কারাবরণসহ যে কোন ধরনের পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছেন খালেদা জিয়া। ৬ই ফেব্রুয়ারি দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে খালেদা জিয়া নিজেই বলেছেন, আমি সকলকে পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই- কোন অনৈতিক চাপ বা ভীতির মুখে আমি নত হবো না ইনশাআল্লাহ্‌। যে কোন পরিস্থিতি বা পরিণতির জন্য আমি তৈরি আছি। এছাড়া বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের পক্ষে দেয়া একাধিক বিবৃতিতেও খালেদা জিয়ার এ ত্যাগ-স্বীকারের অঙ্গীকার ও যে কোন পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত বলে দাবির করা হয়। উল্লেখ্য, ৩রা জানুয়ারি থেকে ২৫শে ফেব্রুয়ারি। নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ৫৩ দিন কেটে গেছে খালেদা জিয়ার। চলাফেরার সীমাবদ্ধতা, ঘুম ও বিশ্রামের অসুবিধা, যোগাযোগ বন্ধ এবং গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়েই কার্যালয়ে অবস্থান করছেন তিনি। প্রথম ১৬ দিন ছিলেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া ব্যারিকেডে অবরুদ্ধ। তারপর কার্যালয়ের অবরোধ তুলে নেয়া হলেও কৌশলগত কারণে কার্যালয় ছেড়ে যাননি তিনি। দৃশ্যত অবরোধ তুলে নেয়া হলেও তার কার্যালয় ঘিরে অব্যাহত রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা। কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে কার্যালয়ে লোকজনের যাতায়াতে। এ সময়ের মধ্যে ৫ই জানুয়ারি পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে কার্যালয় থেকে বের হবার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবন্ধকতার কারণে বের হতে পারেননি তিনি। উল্টো পুলিশের ছোড়া পেপার স্প্রেতে অসুস্থ হয়েছেন। ২৪শে জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। ছেলের শোকে যখন তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তখন অবরোধের সময়ে বাসে পেট্রল বোমা হামলা ও হত্যার ঘটনায় তাকে হুকুমের আসামি করে দায়ের করা হয়েছে অন্তত অর্ধ ডজন মামলা। কার্যালয় ঘিরে পুলিশের উপস্থিতিতেই দিনের পর দিন ঘেরাও-বিক্ষোভ-মিছিল করছে সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন, পেশাজীবী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে ৩০শে জানুয়ারি শেষ রাতে কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ, টেলিফোন, ইন্টারনেট, কেবল টিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয় সরকার। কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর খালেদা জিয়া পরিষ্কার জানিয়ে দেন যত কিছুই হোক কার্যালয় ছাড়বেন না। নানা মহলের সমালোচনার মুখে ১৯ ঘণ্টা পর তার কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ ও আশপাশের দূতাবাসগুলোর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১১দিন পর মোবাইল নেটওয়ার্ক সংযোগ দেয়া হয়। পরদিন ৩রা ফেব্রুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে। একপর্যায়ে ওই সংগঠনের মফিজুল নামে এক নেতা পিস্তল হাতে কার্যালয়ের দিকে ছুটে যান। এ সময় তিনি খালেদা জিয়াকে গুলি করার হুমকি দেন। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তাকে হুকুমের আসামি করে কুমিল্লা, পঞ্চগড়, খুলনাসহ কয়েকটি জায়গায় মামলা দায়ের করে পুলিশ। ১০ই ফেব্রুয়ারি বিকালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গুলশান কার্যালয়ে যান বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। এদিকে ১১ই ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে অবস্থানকারীদের জন্য নেয়া খাবার ভ্যানটি ফিরিয়ে দেয় পুলিশ। সেই সঙ্গে কড়াকড়ি আরোপ করা হয় কার্যালয় ঘিরে। অবশ্যই ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই কার্যালয়ের গেটে একটি টেবিল ও খাতা-কলম নিয়ে বসে স্পেশাল ব্রাঞ্চের সদস্যরা। কার্যালয়ের যাওয়ার সময় তারা নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর লিখে তারপর ঢোকার অনুমতি দেয়া হতো। ১১ই ফেব্রুয়ারি থেকে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে কোন খাবার নিতে দিচ্ছে না পুলিশ। এ সময় দিনের পর দিন দফায় দফায় খাবার ফিরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এতে খাবার সঙ্কটে পড়েন তার কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভুক্ত থাকায় একাধিক দিন উপোস থেকেছেন খালেদা জিয়া নিজেও। নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে তার কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন এবং একাধিক দিন কার্যালয়ের আশপাশে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। সবশেষে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গতকাল বিশেষ আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবরটি পান খালেদা জিয়া।

ভারতীয় সমাজের প্রাণ হচ্ছে বহুত্ববাদ by কুলদীপ নায়ার

ধরুন, ভারত চলমান ক্রিকেট বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে পাকিস্তানের কাছে হেরে গেছে। এতে জনগণের মধ্যে হতাশা ও গভীর অনুশোচনার সৃষ্টি হতো, সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটা হলে আমার মনে হয় না তারা পাকিস্তানি দর্শকদের সঙ্গে হাতাহাতি শুরু করে দিত। করাচি ও পাকিস্তানের অন্যান্য জায়গায় পাকিস্তানি সমর্থকেরা যেভাবে টিভি সেট ভেঙেছে, তারা মনে হয় তেমনটা করত না। নিঃসন্দেহে ভারতীয় সমর্থকদের মনে অবমাননা বোধের সৃষ্টি হতো। কিন্তু সেটা হয়তো শেষমেশ ঝগড়া ও মিছিলের আকারে রাস্তায় গড়াত না।
তার মানে এই নয় যে ভারতীয় সমাজ তুলনামূলকভাবে আরও পরিশীলিত। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই যে তা আরও বেশি সহনশীল ও গ্রহণমূলক। ভারত একটি বহুসাংস্কৃতিক সমাজ, সেই সমাজ নানা সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে টিকে থাকতে শিখেছে। ইন্দোনেশিয়ার পর ভারতীয় মুসলিম সমাজ দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড়, তার নিজস্ব গতি-প্রকৃতি রয়েছে। তারা হিন্দুদের শিখিয়েছে, সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে তাদের মানিয়ে নিতে হবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে হিন্দুদের মধ্যে চরমপন্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। তারা দেশটাকে হিন্দু বানাতে চায়। চরমপন্থী হিন্দু সংগঠন আরএসএস ভারতীয় সমাজকে ঠেলে হিন্দু বানাতে চাইছে, সব সময়। কিন্তু অধিকাংশ হিন্দুধর্মাবলম্বী এই সংকীর্ণতা পরিহার করেছে।
আরএসএসের রাজনৈতিক বাহু বিজেপি মনে হয় বুঝে গেছে, গেরুয়াকরণ ভারতে খুব একটা হালে পানি পাবে না। সে কারণে তারা উন্নয়নকেই মন্ত্র বানিয়েছে। এটা আবার হিন্দুত্ববাদের মুখোশও হতে পারে। তার পরও বোঝা যায়, তাদের এ বোধোদয় হয়েছে যে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
এ থেকে সম্ভবত বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কেন শেষমেশ নয়াদিল্লিতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তাঁর নীরবতা ভেঙেছেন। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সরকার বিশ্বাসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। সবারই তাঁর পছন্দ অনুসারে এবং অযাচিত চাপ ও প্রভাবে ধর্ম গ্রহণ করার অকাট্য অধিকার আছে। আমার সরকার কোনো গোষ্ঠীকে অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বা গোপনে ঘৃণা ছড়াতে দেবে না। সব ধর্মের প্রতি আমাদের সমান শ্রদ্ধা থাকবে।’ দৃশ্যত, গির্জায় হামলার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি এ কথা বলেছেন।
মোদি লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ইদানীং তাঁর দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছেন না—অভিন্ন সিভিল কোড ও সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করা, যে ধারা কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তিনি হয়তো ধর্মনিরপেক্ষ হননি। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝে গেছেন, ভারতীয় সমাজ বহুত্ববাদকে জীবনধারা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
আবার এটাও সত্য যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ভারতে নিপীড়নের শিকার হতে পারে। আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগওয়াত যখন বলেন, ‘রাম জন্মভূমি ও সেতুসমুদ্রম আমাদের জাতীয় ইস্যু। এমন ধারার আরও বিষয় তুলে আমার সবাইকে বার্তা দিতে পারি, সংঘের আসল উদ্দেশ্য কী।’ তার পরও তিনি ও সংঘ পরিবার জানে যে ভারতীয় সমাজকে পুরোপুরি ধর্মতাত্ত্বিক সমাজে রূপান্তরিত করা যাবে না। এটা জনগণের মনের বিরুদ্ধে।
তুলনামূলকভাবে পাকিস্তানি সমাজ ক্রমাগতভাবে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে। সন্দেহ নেই, দেশটি প্রতিষ্ঠিত এবং ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাষ্ট্রটির জন্মের কিছুদিন পরেই বলেছিলেন, সেখানে ধর্ম ও রাষ্ট্র এক পাত্রে মেলানো হবে না। তার পরও সত্য হচ্ছে, পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশের মতো। সিন্ধু প্রদেশে নারীদের বিয়ের জন্য জোর করে ধর্মান্তর করা হচ্ছে। আর এমন কোনো মন্দির নেই যে সেখানে হামলা করা হয়নি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৪ সালে নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হামলার ঘটনা বেড়ে গেছে। পাকিস্তান সরকার ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেনি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পাকিস্তানের জন্য ২০১৪ সালটি ‘তুমুল কোলাহলপূর্ণ’ বছর হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ওই বছর কোনো ঝামেলা ছাড়াই সেখানে উপদলীয় হামলা হয়েছে। উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সামরিক অভিযানে ১০ লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে।
উপর্যুক্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত বিবৃতিতে নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফেলিম কিনে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘পাকিস্তান সরকার তার জনগণকে রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মতো মৌলিক কাজটিই করতে পারছে না। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো ২০১৪ সালে সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ব্যাপক হারে খুন করেছে, পাকিস্তান সরকার তা থামাতে পারেনি।’
নিঃসন্দেহে ভারতের অনেক মসজিদই চরমপন্থীদের আক্রমণের মুখে পড়েছে। কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যম ও উদারপন্থীরা এর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, সরকার ও সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। সে সংখ্যাটা একদম কম নয়। ভারত ও পাকিস্তান বাদবিসংবাদ মিটিয়ে না ফেললে দুই দেশের সংখ্যালঘুরাই বিপদে পড়বে। উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক নয়াদিল্লি ইসলামাবাদের মুর্দাবাদ জানাতে কসুর করে না। ভারত সংবিধান অনুসারে পরিচালিত হলেও সেখানে মুসলমানদের পাকিস্তানি বলা হয়। সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দ্বারা ভারত পরিচালিত হয় না। পাকিস্তান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ালেই ধর্মনিরপেক্ষতায় আমাদের ইমান কমজোর হয়ে পড়ে।
কিন্তু দুই দেশেরই যে শত্রুতা মিটিয়ে ফেলা দরকার, সেই বোধের লেশমাত্র তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। পাকিস্তানের জবাব দেওয়ার ভারটা আরও বেশি, কারণ তারা হিন্দুদের নেতিবাচক রঙে দেখিয়ে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছে। পাকিস্তানের ছাত্ররা ঘৃণার ফসল, যে ঘৃণার সলতেয় তেল দিচ্ছে মিথ্যা ও অর্ধসত্য।
সাধারণভাবে ভারতীয় সমাজে তেমন কিছু নেই। তার পরও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ বিজেপি ইতিহাসকে গেরুয়া রঙে সাজাচ্ছে। সমাজ এখনো কলুষিত হয়নি। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির জয়ে দেখা গেল, ভোটারদের বর্ণপ্রথা ও ধর্মীয় মতবিশ্বাসের প্রতি ঘৃণা রয়েছে। এ ব্যাপারটার সর্বভারতীয় রূপ লাভ করা উচিত। এটা অনেকাংশে নির্ভর করছে ভারত-পাকিস্তান কীভাবে নিজেদের পার্থক্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে, তার ওপর। সংখ্যালঘুরা এটা করলে উপকৃত হবে। যত তাড়াতাড়ি তা হয়, ততই মঙ্গল।
ক্রিকেট খেলা দক্ষতার বিষয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই নির্দিষ্ট দিন একটি দল কীভাবে খেলল, তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। আয়ারল্যান্ডের কথাই ধরুন না কেন, তারা দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, খেলা তার নিজস্ব চেতনাতেই খেলা উচিত। দুটি দেশের মধ্যকার অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে এটা মেলানো উচিত নয়। খেলোয়াড়েরা এ বিষয় সম্পর্কে সচেতন বলেই মনে হয়, কিন্তু সমর্থকেরা তা নয়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

লোকসভায় জমি বিল পেশ

ভারতের লোকসভায় (মঙ্গলবার) ভূমি অধিগ্রহণ বিল পেশ করা হয়। এই বিলের প্রতিবাদে সংসদে ব্যাপক প্রতিবাদ জানায় বিরোধী দলের এমপিরা। বিল পেশ হতেই ওয়াক আউট করে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধী এমপিরা সংসদের বাইরে বিক্ষোভ দেখায়। সংসদে সরকারপক্ষ এবং বিরোধীদের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা হয়। পরে কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি এবং বিজেডি এমপিরা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। অন্যদিক, দিল্লির জন্তর মন্তরে সমাজকর্মী আন্না হাজারের নেতৃত্বে ভূমি অধিগ্রহণ বিলের প্রতিবাদে ধরনা কর্মসূচি চলছে। এদিকে, বিজেপি সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ভূমি বিল থেকে পিছু হটবে না সরকার। বিরোধীদের ভালো পরামর্শ গ্রহণ করা হবে, প্রয়োজনে সংশোধনী আনার জন্য সরকার তৈরি রয়েছে।’ রাজ্যসভায় সরকার পক্ষে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেন, ‘কংগ্রেস আমলে নেহেরুর শাসনকালে ৭০টি অধ্যাদেশ আনা হয়েছিল।’ জেডিইউ প্রেসিডেন্ট শারদ যাদব বলেন, ‘সরকার বুলডোজার দিয়ে কৃষকদের পিষে ফেলতে চাইছে।
ভারত কৃষকদের একটি দেশ। কিন্তু সরকার কারও কথা পরোয়া না করে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি কোম্পানিকে ফায়দা দেয়ার জন্য এই অধ্যাদেশ আনা হয়েছে।’ বিএসপি নেত্রী মায়াবতী বলেন, ‘এই অধ্যাদেশ কৃষকদের কল্যাণে নয়, এই বিল সে ফ কিছু বড় শিল্পপতিদের সাহায্যের জন্য আনা হয়েছে।’ কংগ্রেস নেতা আনন্দ শর্মা বলেন, ‘প্রতি ২৭ দিন অন্তর সরকার একটি অধ্যাদেশ আনছে। নেহেরুর শাসনকাল এবং বর্তমান সময়ের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।’ সরকারপক্ষে কেন্দ্রীয় সংসদবিষয়কমন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডু বলেন, ‘বিরোধিতা করতে হলে সংসদে বসে তা করুন বিরোধীরা। সরকার প্রয়োজনে আলোচনা করে সংশোধনী আনতে প্রস্তুত রয়েছে।’ মঙ্গলবার লোকসভায় জমি বিল পেশের আগে রাজ্যসভায় আলোচনার ডাক দেন ডেপুটি চেয়ারম্যান। অর্ডিন্যান্সের পক্ষে প্রশ্ন করে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেন, ‘ইউপিএ সরকারও বহু অর্ডিন্যান্স পেশ করেছিলেন। এই জমি অধিগ্রহণ অর্ডিন্যান্স সংসদকে উপেক্ষা করছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে তা সম্পূর্ণ ভুল।’ জমি বিলের বিরোধিতায় এদিন সরব হয় কংগ্রেস, তৃণমূল-কংগ্রেস, জেডিইউ, সপা, বসপাসহ একাধিক বিরোধী দল। সেখানেই প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, জমি বিল নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার পিছিয়ে যাবে না। প্রয়োজনে বিল সংশোধন করতেও প্রস্তুত। জমি বিল পেশ করাতে বিরোধীদের পাশে পেতে অধিবেশনের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘অর্ডিন্যান্স নিয়ে সরকার আলোচনা করতে রাজি রয়েছে। ভালো প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো হবে। প্রয়োজনে সংশোধনীও আনা হবে। একই সঙ্গে গরিব কৃষকদের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজও করা হবে না বলে বিরোধীদের বার্তা দিয়েছেন তিনি। আবারও একই ময়দানে আন্না-কেজরিওয়াল
ভূমি অধিগ্রহণ আইনের বিরোধিতায় আবারও একই ময়দানে বসছেন আন্না হাজারে ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ভারতের দিল্লির জন্তর মন্তরে মঙ্গলবার বিকালে ধরনায় বসছেন গুরু-শিষ্য। খবর এনডিটিভির। এর আগে সোমবার বিকালে গান্ধীবাদী মানবাধিকার কর্মী আন্না হাজারের (৭৭) সঙ্গে দেখা করেন দিল্লির নয়া মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল (৪৪)। এ সময় কেজরিওয়ালের সঙ্গে রাজ্যটির মন্ত্রী মনীষ সিসোদিয়াও ছিলেন। হাজারের ধরনায় কেজরিওয়ালের বসার খবরে সোমবার থেকেই জন্তর মন্তরে প্রচুর লোকসমাগম লক্ষ্য করা গেছে। দেশটির লোকসভায় মঙ্গলবার বিকালে নতুন ভূমি অধিগ্রহণ আইন পাসের ব্যাপারে আলোচনা হবে। কৃষক-জনতাকে উপেক্ষা করে তৈরি করা এই আইনের বিরোধিতায় নেমেছে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। ২০১১ সালে দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল আইনের দাবিতে এই জন্তর মন্তরেই ধরনায় বসেছিলেন হাজারে। সেই ধরনায় হাজারের সঙ্গে যোগ দেন সাবেক সরকারি চাকরিজীবী কেজরিওয়াল।

হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে পায়ে শিকল

(ছেলে আল–আমিনের পায়ে শিকল পরিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন মা ছালেহা বেগম l প্রথম আলো) স্বামী অনেক আগেই ছেড়ে গেছেন ছালেহা বেগমকে (৫০)। তখন থেকেই তিন ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে সংগ্রাম করছেন তিনি। মেজো ছেলে আল-আমিন (২৫) বাকপ্রতিবন্ধী। ছালেহা বেগম বাধ্য হয়ে তাই কাজ করার সময় ছেলেকে শিকল পরিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। কাজ শেষে শিকল খুলে নিয়ে যান বাড়িতে।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার ইটবাড়িয়া ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামে একটি ঝুপড়িঘরে বাস করেন ছালেহা। মেয়ে ও বড় ছেলে বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন। ছোট ছেলে ঢাকায় দিনমজুরি করেন। বর্তমানে বাকপ্রতিবন্ধী আল-আমিনকে নিয়েই তাঁর সংসার। গতকাল বুধবার সকালে পটুয়াখালী-মির্জাগঞ্জ সড়কের দুর্গাপুর এলাকায় পটুয়াখালী যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনে গিয়ে দেখা যায়, আল-আমিনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা যায়, প্রতিদিনই আধা কিলোমিটার পথ হেঁটে আসেন তাঁরা। সকালে এসে গাছের সঙ্গে এভাবেই তাঁকে বেঁধে রাখেন তাঁর মা। ওই এলাকার আবুল কাসেম জানান, ‘ছেলে ছাড়া থাকলে কোথাও চলে যায়। ওর মা কান্নাকাটি করে। খুঁজতে বের হয়। তাই এভাবে বেঁধে রাখে, যাতে কোথাও যেতে না পারে।’
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বাবুর্চির সহযোগী ছালেহা বেগম জানান, ছেলে কথা বলতে পারেন না। কিছু বোঝেনও না। তাঁকে না দেখলে পাগলের মতো আচরণ করেন। এক সপ্তাহ আগে শিকল খোলা পেয়ে চলে গিয়েছিলেন আল-আমিন। দুই দিন পর সদর হাসপাতালের সামনে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়।
বাবুর্চির সহযোগী হিসেবে কাজ করে মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা পান তিনি। তা ছাড়া এখান থেকে যে খাবার পান তা দিয়ে মা ও ছেলের চলে যায়। প্রতিদিন সকালে শিকল দিয়ে বেঁধে চলে যান কাজে, বেলা তিনটার দিকে কাজ শেষ হলে আবার ছেলেকে নিয়ে ফিরে যান।
ছালেহা বেগম জানেন না তাঁর ছেলের নাম প্রতিবন্ধীর তালিকায় উঠেছে কি না। তিনি মনে করেন, অন্তত কেউ যদি প্রতিবন্ধী ছেলের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতেন, তাহলে তাঁরা উপকৃত হতেন।

দুঃসহ বেদনার সেই দিন আজ

রাতের গভীর অন্ধকারের চেয়ে ভয়াবহ ছিল সেই ভোর। সি্নগ্ধ সকালে সুন্দর সাজানো-গোছানো সবুজ পিলখানা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। দানবের বুলেটে লুুটাপুটি খায় মানবতা। কিছুসংখ্যক উচ্ছৃঙ্খল রক্তপিপাসু জওয়ানের বুলেটে প্রাণ হারান ৫৭ সেনা কর্মকর্তা। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে ঘটে দেশের ইতিহাসে এক বিষাদময় ঘটনা। জওয়ানদের নির্মম বুলেট কেড়ে নেয় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের প্রাণ। এমন খবরে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ। গোটা দুনিয়ায় খবরের শিরোনাম হয় বাংলাদেশ। আজ সেই শোক আর বেদনার দিন।
২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন এমন ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও ২৭৭ জনকে খালাস দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ আসামির মধ্যে ১৪ জন পলাতক এবং একজন বন্দি অবস্থায় মারা গেছেন। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে কারাগারে থাকা ১৩৮ জনের পক্ষে জেল আপিল এবং রাষ্ট্রপক্ষে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের বিষয়ে হাইকোর্টে পৃথক আবেদন করা হয়। মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
গত ১৮ জানুয়ারি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় আসামিপক্ষে করা আপিল এবং রাষ্ট্রপক্ষে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের বিষয়ে হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। এরই মধ্যে নিম্ন আদালতে ১৬৪ ধারায় ৫৩৮ আসামির দেওয়া জবানবন্দি ও অভিযোগ (চার্জ) রাষ্ট্রপক্ষে হাইকোর্টে পড়ে শোনানো হয়েছে।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সমকালকে বলেন, যে গতিতে পিলখানা হত্যা মামলার আপিলের শুনানি চলছে, তাতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার আশা করছি। আইনের বিধানঅনুযায়ী আসামিরা উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ পাবেন।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। রাইফেলস সপ্তাহ ঘিরে উৎসবের আমেজ ছিল গোটা পিলখানায়। যথারীতি পিলখানার দরবার হলে বসেছিল বার্ষিক দরবার। সারা দেশ থেকে আসা বিডিআরের জওয়ান, জেসিও, এনসিওসহ বিপুলসংখ্যক সদস্যে তখন পরিপূর্ণ গোটা দরবার হল। দরবার হলের মঞ্চে ছিলেন তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমদসহ বিডিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বার্ষিক দরবার, সে এক আনন্দমুখর আলোকিত পরিবেশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাল্টে যায় পরিবেশ। বিপথগামী বিডিআর জওয়ানরা দরবার হলে ঢুকে মহাপরিচালকের সামনে তাদের নানা দাবি নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে। সিপাহি মাঈন ডিজির সামনে তাক করে বন্দুকের নল। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে এই ঘাতক গুলি চালাতে না পারলেও অপর জওয়ানরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। এতে জীবনের কোলাহল স্তব্ধ হয় ৭৪টি পরিবারের। মৃত্যু-উল্লাসে ঘাতকরা দিশেহারা। খোঁড়া হয় গণকবর। আর তাতে সেনা কর্মকর্তাদের মাটিচাপা দেওয়া হয়।
মেজর তানভীর হায়দার নূরের বাবা নূর মোহাম্মদ সমকালকে বলেন, 'দ্রুত বিচার কার্যক্রম শেষ হবে, আশা করি। কী করলে মনের ভেতরে ছেলে হারানোর শোক কমে শান্তি আসবে_ তা জানা নেই। সেই স্মৃতি মনে এলেই কষ্ট পাই। আবার তা ভুলে যেতেও পারি না।'এ ঘটনায় লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক নবজ্যোতি খিসা। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর হয়। ২০১০ সালের ১২ জুলাই পিলখানা হত্যা মামলায় ৮২৪ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেয় সিআইডি।
কর্মসূচি :আজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় বনানী সামরিক কবরস্থানে সকাল ৯টায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, বিজিবির মহাপরিচালকসহ অনেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এ ছাড়া বিএনপির একটি প্রতিনিধি দলেরও পুষ্পস্তবক অর্পণের কথা রয়েছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শহীদদের স্মরণে কাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বিজিবি সদর দপ্তরে কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

বাসা থেকে তুলে নিয়ে দশ দিনের রিমান্ডে মান্না

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে রিমান্ডে নিতে পুলিশের করা আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল তাকে আদালতে হাজির করে পুলিশের পক্ষ থেকে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। ঢাকার মহানগর হাকিম মো. মাহবুবুর রহমানের আদালত ১০ দিনের রিমান্ডই মঞ্জুর করেন। আদালতে মান্না বলেন, আমার বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সোমবার গভীর রাতে মান্নাকে তার ভাতিজির বনানীর বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আটকের ২১ ঘণ্টা পর র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুলিশে হস্তান্তর করে। এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ মান্নাকে গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেনি। মঙ্গলবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও স্বজনরা তার সাক্ষাৎ পাননি। গতকাল দুপুরের পর পুলিশ ভ্যানে করে গোয়েন্দা কার্যালয় থেকে আদালতে নেয়া হয় মান্নাকে।
মহানগর হাকিমের আদালতে তাকে হাজির করাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে আদালত পাড়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সাদা পোশাকে পুলিশের নজরদারিও ছিল আদালতপাড়ায়। নাগরিক ঐক্যের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী আদালতপাড়ায় ভিড় করেন। আদালতে মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার, মেয়ে নিলোম মান্না, বড় ভাই মোবায়দুর রহমান উপস্থিত হন। দুপুর ৩টায় একটি প্রিজনভ্যানে করে মান্নাকে আদালতে নিয়ে আসে গুলশান থানা পুলিশ। এ সময় নাগরিক ঐক্যের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। মান্না তাদের হাত নেড়ে অভিনন্দন জানান। এরপর তাকে আদালতের কাঠগড়ায় নেয়া হয়। তাকে প্রথমে বসতে না দেয়ায় আদালতের মধ্যে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এসময় মহানগর হাকিমের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তাকে বসার জন্য একটি চেয়ার দেয়া হয়। গুলশান থানার এসআই আবদুল বারেক প্যানাল কোডে ১৩১ ধারায় দায়ের করা মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু বলেন, একটি সাংবিধানিক সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে মাহমুদুর রহমান মান্না জড়িত। বর্তমানে ২০ দলীয় জোটের দেশব্যাপী যে নাশকতা চলছে তার এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মদত আছে।
শুনানিতে আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান বলেন, মাহমুদুর রহমান মান্না দেশে ও বিদেশে একটি পরিচিত নাম। বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। করলে ইতিহাসকে অস্বীকার করা হবে। তিনি আরও বলেন, মান্না নাকি সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য উসকানি দিয়েছেন। তাহলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তার বিষয়টি দেখভাল করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হলো না কেন? প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে বলছেন, সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করতে আসবে না। যেখানে প্রধানমন্ত্রী এই কথা বলেন, সেখানে মান্নার মতো সাধারণ একজন নাগারিক কি এমনবা করতে পারবেন।  আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আগে আটক করে এবং অনেক পরে অস্বীকার করে, এখন তাকে ১৩১ ধারা প্যানাল কোড অনুযায়ী আদালতে হাজির করেছে। তার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার। আসামি অসুস্থ। তার হার্ট, কিডনি ও অ্যাজমার সমস্যা আছে। তাকে রিমান্ডে নেয়া হলে তার জীবনহানির শঙ্কা আছে। তাকে জামিন দেয়া হোক। জামিন না দিলে প্রয়োজনে তাকে জেলে গেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মহানগর হাকিম মাহবুবুর রহমান এই আদেশ দেন যে, উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করা হয়েছে। তার চিকিৎসা ও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হাইকোর্টের আদেশ অনুসরণ করার কথা বলা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ১০ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করা হলো।
মান্নার বক্তব্য: আদালতের অনুমতি নিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমি অসুস্থ ব্যক্তি। বয়স ৬৫। নানা রোগে আক্রান্ত। যে অভিযোগে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা আমি অবগত নই। আমার বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরোপুরিভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। পুরোপুরিভাবে উপস্থাপন করা হলে আমি বিষয়টি জানতে পারবো। পাশাপাশি দেশবাসীও অবগত হবে। এই বক্তব্য অব্যাহতভাবে দেশের কয়েকটি চিহ্নিত মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। এর পেছনে কারা জড়িত থাকতে পারে তা দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার। এই বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আমি মিডিয়ায় বক্তব্য দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, এর আগেই আমাকে আটক করা হয়েছে। তিনি আদালতকে আরও বলেন, আমি দেশের নাগরিক। ব্যক্তিগতভাবে পরিচিতি আছে। দেশের গণতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা ছিল, এখনও আছে। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে তা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হোক। তা আমি নিজেও চাই। তিনি আরও বলেন, গত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল দেশবাসী এটি অবগত আছে। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, আমি নাকি সেনাবাহিনীকে উসকানি দেয়ার জন্য বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এটি একেবারে ডাহা মিথ্যা কথা। এই বিষয়ে কোন কথায় হয়নি। দেশে গণতান্ত্রিক  প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক এটি আমিও ব্যক্তিগতভাবে চাই এবং সেটি হবে জনমতের ভিত্তিতে। আমি নাকি বলেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশ ফেলতে হবে। কত বড় নিষ্ঠুর অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে করা হয়েছে। দেশ থেকে অনেক লোক গায়েব অর্থাৎ গুম হয়েছে। এটি তো সবার জানা। আমি বললে অপরাধ কোথায়? দেশে যে পেট্রলবোমা ও সহিংসতার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে এটির বিরুদ্ধে আমি ছিলাম ও থাকবো। আমার বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে জণগণের সামনে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়েছে। আমি রিমান্ডে বিশ্বাসী নয়। প্রয়োজনে পুলিশ আমাকে জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদ করুক। তিনি আদালতের কাছে অনুরোধ করেন যেন তার রিমান্ড বাতিল করা হয়। মান্নার বক্তব্যের সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা হট্টগোল শুরু করেন।
রিমান্ড শুনানিতে আসামি পক্ষে অ্যাডভোকেট তুহিন হাওলাদার, অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট তাপস ও অ্যাডভোকেট নূরে আলম উজ্জ্বল প্রমুখ।

ভুল পথে বিএনপি! by সোহরাব হাসান

সংসদ বাংলা অভিধান অনুযায়ী আন্দোলন শব্দের অর্থ দোলন, আলোড়ন। লক্ষ্য সিদ্ধির জন্য প্রচার, উত্তেজনা, সংঘবদ্ধ বিক্ষোভ প্রদর্শন। যে নামেই ডাকি না কেন দল হিসেবে বিএনপি কিংবা ২০-দলীয় জোট এখন আন্দোলনে আছে। কিন্তু সেই আন্দোলনের স্বরূপটি কেমন, কারা সেই আন্দোলনের নির্দেশ দিচ্ছেন, কীভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন, কারা সেই নির্দেশ পালন করছেন, সেসব মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আন্দোলন আর বিপ্লব এক নয়। বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লব দুটোই আকস্মিক ঘটে। বাংলাদেশেও এর একাধিক নজির আছে। কিন্তু গণ-আন্দোলন সৃষ্টি করতে হয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, ধাপে ধাপে। একটি স্তর পার হয়ে আরেকটি স্তরে তাকে নিয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশের বিগত আন্দোলনগুলোর দিকে তাকালে আমরা কী দেখতে পাই? বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সেই আন্দোলন পূর্ণতা পায় ১৯৫২ সালে। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনবিরোধী ছাত্র বিক্ষোভের মাধ্যমে। এরপর চৌষট্টির দাঙ্গার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, ছেষট্টির ছয় দফা, আটষট্টির আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পার হয়ে উনসত্তরে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেটি পূর্ণতা পায় এবং আইয়ুব শাহির পতন ঘটে।
স্বাধীন বাংলাদেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালের ছাত্র বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। ওই বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি মজিদ খান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে জীবন দেন জয়নাল, জাফর, দীপালি সাহাসহ অনেক শিক্ষার্থী। এরপর ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৬, ১৯৮৭, ১৯৮৮ হয়ে নব্বইয়ে আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং স্বৈরাচারী এরশাদের পতন ঘটে। সেই আন্দোলনের অগ্রসারিতে ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দল, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল এবং বামপন্থার অনুসারী পাঁচ দল। সে সময় তিন জোট মিলে দেশ শাসনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা প্রণয়ন করলেও ক্ষমতায় গিয়ে তারা সেটি ছুড়ে ফেলেছে। বর্তমানে গণতন্ত্রের যে সংকট, তার মূলেও রয়েছে তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়ন না করা এবং পরিত্যক্ত স্বৈরাচার ও রাজাকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশ শাসন।
এরশাদের পতনের পরও এ দেশে গণ-আন্দোলন হয়েছে। বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী মিলে আন্দোলন করেছে। আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী জোট বেঁধে আন্দোলন করেছে। আবার সব দল যুগপৎ আন্দোলন করেছে সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে। সেসব আন্দোলন যতই ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও আদর্শবর্জিতই হোক না কেন, জনগণের সমর্থন ও সম্পৃক্ততা ছিল। সরকারের জেল-জুলুম, হামলা-মামলা উপেক্ষা করে আন্দোলনরত দলগুলোর নেতা-কর্মীরা মাঠে তৎপর ছিলেন।
কিন্তু এবারের আন্দোলনের চেহারাটি ভিন্ন। আন্দোলনের নামে প্রায় পৌনে দুই মাস ধরে চলছে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। পেট্রলবোমার আগুনে, ককটেলের আঘাতে মারা যাচ্ছে নিরীহ মানুষ। মারা যাচ্ছে কথিত বন্দুকযুদ্ধেও। আন্দোলন আহ্বানকারীরা জনগণ দূরে থাক, দলীয় নেতা-কর্মীদেরও আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন বোধ করেননি। তাঁরা ভেবেছেন ২০১৩ সালের কায়দায় বোমা মেরে, বাস-ট্রেন জ্বালিয়ে আন্দোলন সফল করা যাবে। একটি যৌক্তিক দাবির আন্দোলন কীভাবে সন্ত্রাসের চোরাগলিতে নিক্ষিপ্ত হয়, তার প্রমাণ বিএনপি-জামায়াত জোটের লাগাতার কর্মসূচি। তাদের আন্দোলনে মানুষ উদ্বুদ্ধ ও আশ্বস্ত হওয়ার বদলে নিয়ত শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
বিএনপির তরফে যুক্তি দেখানো হয় যে সরকারের দমন-পীড়নের কারণে দলের নেতা-কর্মীরা মাঠে নামতে পারছেন না। দলীয় নেত্রীকে তাঁর অফিসে প্রায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে নেতারা আত্মগোপন অবস্থা থেকে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। তাঁদের এই অভিযোগ হয়তো অসত্য নয়। কিন্তু আমরা যখন দেখি মাঠে নামতে না দেওয়া বিএনপির কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে কিংবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংবর্ধনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে পাশাপাশি বসেন, খোশ আলাপ করেন, তখন ভাবি তাহলে কি ধরপাকড়ের বিষয়টিও বাছাই করা?
বিএনপি তার কর্মসূচিতে কেন জনগণকে সম্পৃক্ত করাতে পারেনি, সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে দলের দাবিগুলোর প্রতি আলোকপাত করা যাক। ২০০৭ সালের ‘একতরফা’ নির্বাচনের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা ডান-বাম সবাইকে এক করতে পারলেও খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগবিরোধী সবাইকে পক্ষে টানতে পারেননি। জামায়াতকে জোটে নেওয়া এবং বিএনপি আমলের বাড়াবাড়িই এর কারণ। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ২০০৭ সালের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেও প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ পার করে নির্বাচনের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথা মানুষকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া শুরু থেকেই জামায়াতকে (যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোই ওই দলটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল) নিয়ে নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি প্রতিরোধের ডাক দেন। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে শেখ হাসিনার সংলাপ প্রস্তাবও তিনি সরাসরি নাকচ করে দেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এক বছর বিএনপি জোট প্রায় নিষ্ক্রিয় থেকে হঠাৎ লাগাতার কর্মসূচি দেশবাসীর কাছে অস্বাভাবিক ঠেকেছে। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দলের অনেক নেতা-কর্মীও অবাক হয়েছেন। কেননা, এ ধরনের একটি কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে যে প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, তা বিএনপির ছিল না।
গত ৩১ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া নতুন নির্বাচনের দাবিতে যখন সাত দফা প্রস্তাব পেশ করেন, তখনো কর্মসূচি সম্পর্কে দেশবাসীকে ন্যূনতম ধারণা দেওয়া হয়নি। খালেদার প্রস্তাবগুলো ছিল যথাক্রমে এক. জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। দুই. নির্বাচন ঘোষণার আগেই প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষের সম্মতিতে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও বর্তমান আরপিও সংশোধন। তিন. নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর সম্মতিতে গঠিত’ নির্দলীয় সরকারের হাতে দায়িত্ব দেওয়া। চার. ভোটের তারিখ ঘোষণার পর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা। পাঁচ. নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগেই সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চালানোর পাশাপাশি ‘চিহ্নিত ও বিতর্কিত’ ব্যক্তিদের প্রশাসনের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা। ছয়. সব রাজবন্দীকে মুক্তি এবং রাজনৈতিক নেতাদের নামে থাকা ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ মামলা প্রত্যাহার। সাত. এ সরকারের সময়ে ‘বন্ধ করে দেওয়া’ সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশন খুলে দিতে হবে।
এসব অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এই যৌক্তিক দাবি আদায়ে যে পথ তিনি বেছে নিলেন, তা অযৌক্তিক ও জবরদস্তিমূলক। সরকার ৫ জানুয়ারি বিএনপিকে জনসভা করতে দেয়নি। তাঁকে অফিসে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। আমরা তার নিন্দা করি। তাই বলে তিনি দেশবাসীকে মাসের পর মাস অবরুদ্ধ করে রাখতে পারেন না। বিএনপির নেত্রী পর্যায়ক্রমে ধারাবাহিক কর্মসূচি আসবে বলে ঘোষণা দিলেও দেশবাসীর ওপর বিরামহীন অবরোধ চাপিয়ে দিয়েছেন।
১ জানুয়ারি প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়: খালেদা জিয়া যে এ ধরনের প্রস্তাব তুলে ধরবেন, তা দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি বড় অংশ জানতেন না। হঠাৎ এ উদ্যোগে তাঁরা কিছুটা বিস্মিত হয়েছেন। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া এ প্রস্তাব দেওয়ার আগে তা নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়।... বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘ম্যাডামের বক্তব্যে আমরা নিজেরাও কনফিউজড (বিভ্রান্ত)। উনি যেভাবে কথা বলছিলেন, এগুলো তো নির্বাচনের প্রাক্কালের কথা। নির্বাচন কি খুব কাছাকাছি সময়ে হচ্ছে? কেউই মনে করছে না যে মার্চ-এপ্রিল বা ভেরি নিয়ার ফিউচার (নিকট ভবিষ্যৎ) নির্বাচন হচ্ছে। জাতিসংঘের মতো বড় কোনো শক্তি কি নির্বাচনের ব্যবস্থা করছে? আন্তর্জাতিক বিশ্ব পরিস্থিতি তো সে কথা বলছে না।’ (প্রথম আলো, ১ জানুয়ারি ২০১৫)
বিএনপির সাত দফা প্রস্তাব ও পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে খোদ দলেই বিভ্রান্তি আছে। খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা ছাড়া কেউই কর্মসূচি সম্পর্কে জানতেন না। সে কারণেই শীর্ষ নেতৃত্ব কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দলীয় নেতা-কর্মীদের চেয়ে জামায়াতে ইসলামী ও বিদেশি সুহৃদদের ওপর বেশি ভরসা করেছেন। এমনকি তারা ভারতের মন জয় করারও চেষ্টা করেছেন। বিজেপি নেতা অমিত শাহর সঙ্গে কথিত টেলিফোন সংলাপ সেই চেষ্টারই ফল।
কয়েক দিন আগে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ হয়। দেখলাম তাঁরা আন্দোলনের গতি–প্রকৃতি নিয়ে বেশ হতাশ। একজন বললেন, দেশে এখন কোনো রাজনীতি নেই, তাই রাজনীতি নিয়ে তাঁর কথা বলারও আগ্রহ নেই। আরেকজন বললেন, দেশের পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়। জিজ্ঞেস করলাম, এর জন্য কি সরকার একাই দায়ী? তিনি উত্তরে বললেন, সরকারেরও ভুল আছে, আমাদেরও ভুল আছে। আন্দোলনের নামে যেভাবে পেট্রলবোমা ছুড়ে মেরে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, তা মেনে নিতে পারেননি এই নেতা।
লাগাতার অবরোধের শুরুতে অজ্ঞাত স্থান থেকে এলান পাঠাতেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর পাঠান সালাহ উদ্দিন আহমদ। দুজনই দলের যুগ্ম মহাসচিব। সালাহ উদ্দিন এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আজ আমরা ঘোষণা করছি, চলমান গণ-আন্দোলনে যাদের প্রাণ বিসর্জিত হচ্ছে, সরকারি বাহিনীর হাতে, তাদেরকে জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদান করা হবে, তাদের পরিবারদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন করা হবে। তাদের সবাই এই প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা।’
১৯৭১ সালে এই দেশে একটি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীরাই মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় বীর। কিন্তু সালাহ উদ্দিন সাহেবরা নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয় বীর বানাতে চাইছেন। এটি কিসের আলামত? তবে যেসব নিরীহ মানুষ বিএনপি ও জামায়াত–শিবিরের কর্মীদের ছোড়া পেট্রলবোমায় মারা গেছেন, তাঁদের সম্পর্কে কিছুই বলেননি বিএনপির এই নেতা। পেট্রলবোমার দায়ও নিতে চাইছেন না তাঁরা। কিন্তু দায় অস্বীকার করলেই কি দায়িত্ব এড়ানো যায়?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

বিশ্ব মিডিয়ায় খালেদার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ২০ দলীয় জোট নেতা খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। আরও উসকে দিতে পারে সরকারবিরোধী আন্দোলন। ইতিমধ্যে গত মাসজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ১০০’রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। রয়টার্স ছাড়াও গতকাল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে প্রতিবেদন এসেছে। বার্তা সংস্থা এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। মামলা যেসব থানায় নিবন্ধিত সেখানে আদালতের আদেশ পাঠানোর কথা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের মধ্যে রয়েছে তার প্রয়াত স্বামী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে গঠিত একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি কিনতে অবৈধ অর্থের ব্যবহার। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে চ্যারিটির নামে অবৈধভাবে ১০ লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করার অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের বক্তব্য, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সরকারপক্ষ আবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত বছর শুরুর দিকে এ দুটি অভিযোগ আনা হয় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। কিন্তু ২৪শে জানুয়ারি তিনি আদালতে পৌঁছুলে তার সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ওই সহিংসতা ছিল বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করার প্রচেষ্টা। কিন্তু জিয়া সমর্থকদের দাবি ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরাই আগে হামলা শুরু করে। গতকাল আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর বার্তা সংস্থা এএফপিকে বিএনপি মুখপাত্র শায়রুল কবির খান বলেন, আমাদের চলমান আন্দোলন দমিয়ে রাখতে এ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। কিন্তু এতে কাজ হবে না। তাদের উদ্দেশ্য ফলপ্রসূ হবে না বরং এটা আমাদের সমর্থকদের দৃঢ়তা বৃদ্ধি করবে। বিএনপির পক্ষ থেকে আদালতের এ আদেশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। তারা বলছে, এটা পূর্বপরিকল্পিত এবং সরকারের দ্বারা রচিত। এদিকে, এএফপিকে সরকার পক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেইন বলেন, আদালত থেকে আবারও জামিন নিতে ব্যর্থ হলে খালেদা জিয়া যে কোন মুহূর্তে গ্রেপ্তার হতে পারেন। প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়, জাতিসংঘ ও ঢাকার সর্ববৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়ন চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু, উভয় নেত্রী আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানানোয় মনে হচ্ছে এ অচলাবস্থা অব্যাহত থাকবে।
ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করায় দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটিতে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানুয়ারির শুরু থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা গ্রাস করেছে বাংলাদেশকে। এ জন্য সরকার ও বিরোধী দল একে অন্যকে দায়ী করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন ২০০৯ সাল থেকে। তিনি বলেছেন, অবরোধে হত্যার ঘটনায় বিচারের মুখোমুখি হতে হবে খালেদা জিয়াকে। ৬৯ বছর বয়সী বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে হত্যা মামলা। ওদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির এ পদক্ষেপে খালেদা জিয়ার সমর্থক আর সরকারপন্থিদের মধ্যকার বিরাজমান উত্তেজনা আরও উত্তাল করে তুলতে পারে। খালেদা জিয়া ছাড়াও অর্থ আত্মসাৎ মামলায় অভিযুক্ত আরও দুজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তাদের অবস্থানে অটল থেকে বলেছেন, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার এক আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদিন মেসবাহ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করাটা পক্ষপাতপুষ্ট। এটা শুধুমাত্র তাকে হয়রানি করা আর অন্যায় এক বিচারের আওতায় আনার জন্য জারি করা হয়েছে।’ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ। গত মাসে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার বিএনপি প্রতিবাদ জোরদার করেছে। গত বছর অনুষ্ঠিত যে নির্বাচন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে তা অগণতান্ত্রিক ছিল বলে বিএনপি তাদের অবস্থানে অটল রয়েছে।

সর্বস্তরে বাংলার জন্য আর কত অপেক্ষা? by মিজানুর রহমান খান

১৯ ফেব্রুয়ারির দুপুর। সচিবালয়ের ৬ নম্বর বহুতল ভবনে বাবাকোর (বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ) দপ্তর। ১৫০১ নম্বর কক্ষে নেমপ্লেট: ছামিউল বশির। নিচে লেখা বিশেষজ্ঞ। যদিও তিনি বদলি হয়ে গেছেন অনেক আগে। বহু আগে বাবাকোর নামফলক শোভা পেত, এখন নেই। সাত ঘাটের পানি খেয়ে তবে জানলাম, এটাই বাবাকোর ঘর। বিবিধ মন্ত্রণালয়ের গলি-ঘুপচির মধ্যে পাঁচখানা কক্ষ নিয়ে চলে বাবাকো। আগেই কবুল করে নিই, ভাষার মাস বলেই বাবাকোর কথা মনে পড়ল। ১৯৯৮ সালে বাবাকো এল অফিস-আদালতের সর্বস্তরে বাংলা চালু করতে। সরকারি অফিসে, অর্থাৎ প্রশাসনে বাংলার ব্যবহার হলেও গুণমানে বাড়েনি। আবার এ-ও সত্য, সরকার চালানোর বাইবেল খ্যাত রুলস অব বিজনেসে ইচ্ছে করে ইংরেজি রাখা হয়েছে। শাসনের ভাষা বাংলা। আর বিচার বিভাগ শাসনকার্যের অন্তর্গত। বাবাকোর যাবতীয় কার্যক্রমে অফিসের সঙ্গে আদালত কথাটিও আছে। অথচ উচ্চ আদালতের রায় এখনো বাংলায় লেখা হয় না।
১৯৯৯ সালের নথিমতে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনে বাবাকোর লোকবল নির্বিচারে কাটছাঁট করা হয়। একজন উপসচিবের নেতৃত্বে ২৩টি পদ ছিল। ওই বছর ১১টি পদ বিলুপ্ত করা হয়েছিল। বাবাকো গঠনের এক বছর পরে এ ঘটনা ঘটে। ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব।’ শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে উল্লিখিত ২৩ থেকে ১১ জনের বিলোপ, এখন সেই ১১-এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক বাস্তবে শূন্য।
জনপ্রশাসনের একটি উইং পর্যন্ত নয়, একটি অধিশাখার মর্যাদা বাবাকোর। তাই এর শীর্ষ কর্মকর্তা একজন উপসচিব পদমর্যাদার। কিন্তু বহাল আছেন একজন যুগ্ম সচিব। কেউ এখানে আসতে চান না। কারণ ক্ষমতা প্রয়োগের মধু নেই। নয় মাস আগে তিন বছর ওএসডি থাকা এক বিদ্যোৎসাহী কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব পদবিধারী হয়েও উপসচিবের চেয়ারে বসেছেন। উপসচিব পদমর্যাদার একমাত্র বিশেষজ্ঞ পদটিও শূন্য। মুদ্রাক্ষরিকের দুটি পদ কবে থেকে খালি, সেটা গবেষণার বিষয়। জ্যেষ্ঠ অনুবাদ কর্মকর্তার পদে যিনি আছেন, তাঁকে নিয়মিত অফিসে পাওয়া যায় না। বাবাকোর দপ্তরটি যেভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, তাতেও এর পোড়োবাড়ি দশা পরিষ্কার। জনপ্রশাসনের মূল ভবনে বাবাকোর জায়গা হয়নি। বাবাকো কি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ রাষ্ট্রের চোখের বালি হয়ে আছে?
২০০৬ সালের ২২ মে বাবাকোর জন্য যে কাজ বণ্টন করা হয়েছে, তার বয়ান লিখতে হয়েছে ১৫টা দফায়। কাজের মস্ত ফিরিস্তি। বাস্তবে তারা বঙ্গানুবাদ নয়, সব মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো আইনকানুন প্রমিতকরণের কাজটাই করে। আইন তরজমা করা সবচেয়ে দুরূহ কাজ। অথচ ১৯৯৬ সালেও প্রতি ১ হাজার আইনি শব্দ তরজমার জন্য অর্থ বিভাগ হাস্যকরভাবে ১০০ টাকা বরাদ্দ করে রেখেছে। এটা বাস্তবে অচল হলেও এর হালনাগাদও করা হয়নি। তাই কখনো যদি আদালতের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের বিষয়ে শাসকগোষ্ঠী প্রয়োজনীয়তা বোধ করে, তাহলে তা বাস্তবায়নে এই বাবাকোতে চলবে না। একে একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয়ে রূপ দিতে হবে। কিন্তু তার কোনো আলামত নেই। সুপ্রিম কোর্টের নিজের কোনো বাংলা চালুর শাখা নেই, তারই বরং বাবাকো দরকার। ১৯৫৬ সালের পর ২০১২ সালে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যখন প্রথমবারের মতো হাইকোর্ট রুলসের বাংলাদেশকরণ করলেন, তখন তা ছাপা হলো ইংরেজিতে। বাংলা তরজমার বিধান রাখা হলো বটে, কিন্তু তা কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নেই। আইন কমিশনে গিয়ে তিনি ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন বাংলা করার বিরাট কাজে হাত দিয়েছেন। কিন্তু ফৌজদারি কার্যবিধি ও দণ্ডবিধির সংসদ অনুমোদিত অনুবাদ কে কবে দেখবে, তা কারও জানা নেই।
সম্প্রতি স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজি মূলত আদালতে বাংলা প্রচলনের জন্য একটি বেসরকারি বিল জমা দিয়েছেন। ১৯৮৭ সালের আইনটিও ছিল বেসরকারি বিল। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের স্বার্থে, গণতন্ত্র সুরক্ষায় ব্যস্ত থাকা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদে কখনো সরকারিভাবে বিল আনার দরকার মনে করেনি। আর হাইকোর্ট এক রায়ে বলেছেন, ‘ওই আইন বাংলায় রায় লিখতে উচ্চ আদালতকে বাধ্য করে না।’ আইন মন্ত্রণালয় ফরাজির নতুন বিলটি বাবাকোতে পাঠিয়েছিল। বাবাকো অনাপত্তি দিয়েছে। বিলটি সংসদীয় কমিটিতে গেছে। আশা করি, এটিকে আঁতুড়ঘরে নুন খাইয়ে মারা হবে না।
ব্যক্তিগত আলাপে রুস্তম আলী ফরাজি জানালেন, ‘হাইকোর্ট ডিক্রি দিয়েছিলেন যে ’৮৭ সালের আইন সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট চাইলে ইংরেজিতেও রায় দিতে পারেন। আমি সুপ্রিম কোর্টে বাংলা চালু করতেই বিল এনেছি।’ অথচ ’৮৭ সালের আইনে ‘আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে’ লেখা আছে। গত বছরের এপ্রিলে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সাইনবোর্ড ইত্যাদি বাংলায় লেখার যে রুল জারি করেন, তাতে আদালতকেও বিবাদী করা হয়। সরকারপক্ষ একটি জবাব দাখিল করেছে। জনস্বার্থে দায়ের করা এ মামলার রুল স্থগিত হওয়ার কারণে এখনো এর রায় মেলেনি।
২০ ফেব্রুয়ারি রাতে এক নৈশভোজ অনুষ্ঠানে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাকে বললেন, ‘বাংলা প্রচলনে ইতিহাসের প্রথম বিলে আমিই সই করেছিলাম।’ তবে তাঁর ধারণা, ওই বিলে সরকারি অফিস এবং কেবল অধস্তন আদালতে বাংলা চালু করার বিধান ছিল। হাইকোর্ট এর উদ্দেশ্য ছিল না। যদিও খোদ সংবিধান বলেছে, ‘আদালত’ অর্থ অধস্তন ও সুপ্রিম কোর্ট দুটোই। পরিহাস এই যে, ১৮৯৮ সালের সিআরপিসির ৫৫৮ ধারা ও ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭(২) ধারামতে, যথাক্রমে ফৌজদারি ও দেওয়ানি আদালতে বাংলা চালু করতে দুই ছত্রের দুটি সরকারি ঘোষণার দরকার ছিল। পাকিস্তানি শাসকেরা সেই ঘোষণা দেননি। বাংলাদেশের শাসকেরাও দেননি। আইন কমিশনে থেকে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ২০১১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু তা কারও কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি। অবশ্য শুদ্ধতা ও মানের প্রশ্ন সত্ত্বেও নিম্ন আদালতে এখন বাংলার জয়জয়কার।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের অনেক ইন্দ্রিয়ই সজাগ। ১৯৭৯ সালে মন্ত্রিসভায় প্রথম অফিস-আদালতের সর্বস্তরে ব্যাপকভাবে ‘সাধু বাংলা ব্যবহারে’ সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯৬ সালে তা সমর্থিত হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ১৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব সরকারি কাজে ব্যবহৃত সব ধরনের ফরম ও স্টেশনারি কেবল বাংলায় ছাপাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। অফিস-আদালতে বাংলা চালু করতে কয়েকবার সচিব পর্যায়ে কমিটি হয়েছে। এর মধ্যে আইনসচিবকে রাখা হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার তাতে কখনো ছিলেন না। বাবাকোর পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো কিছু ইংরেজিতে মুদ্রণ করা যাবে না—এ মর্মে সরকারি মুদ্রণালয়ের ওপর একটি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। ফলে ‘ইংরেজিতে প্রণীত আইন, অধ্যাদেশ, বিধি মুদ্রণের প্রস্তাব সরকারি মুদ্রণালয়সমূহ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কথা।’
বাবাকো ম্যানুয়ালমতে, বাবাকো ‘বাংলা ভাষা ব্যবহার-সংক্রান্ত কমিটি’ ও প্রশাসনিক পরিভাষা উপকমিটিকে সার্বিক সাচিবিক সহায়তা দেবে। কিন্তু এ ধরনের কমিটি কখনো স্থায়ী কিছু নয়। বিচার বিভাগ সব সময় এর বাইরে থাকছে। অবশ্য এটাও বলা দরকার, বাবাকো সীমিত লোকবল দিয়ে ইতিমধ্যে অনেক ভালো কাজ করেছে (দেখুন, ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম পৃষ্ঠায় প্রথম আলোর প্রতিবেদন)। ১৯৮৭ সালের আইন বলেছিল, ‘এই আইনের লঙ্ঘন অসদাচরণ বলে গণ্য হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিলবিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অথচ গত ২৮ বছরে কেউ শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে জানা যায় না। কারণ, কারও শাস্তি হয়নি। ওই আইনে বলা ছিল, ‘সরকারি গেজেট দ্বারা এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিধি করতে হবে।’ ২৮ বছরেও এই বিধি তৈরি হয়নি। অনুমান করি, বিধি না থাকার কারণে কারও বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ আনাই সম্ভব হয়নি। বাবাকো সনদ বলছে, তারা ‘অফিস-আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনের সমস্যাবলি সম্পর্কে জরিপ ও মূল্যায়ন’ করবে। কিন্তু পরবর্তী আট বছরেও তারা তা করেনি। আগামী ফাল্গুনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কর্তাদের কেতাদুরস্ত লেবাস ধোপাখানায় এবং সরকারি অনুষ্ঠানমালার বর্ণাঢ্য কর্মসূচি প্রেসে পাঠানোর আগে ওই দুটি সরকারি ঘোষণাসহ এই জরিপটি সম্পন্ন ও তার ফলাফল প্রকাশ করার আহ্বান জানাই। বাবাকো, বর্তমান সরকারের গড়া আইন কমিশন, যাকে ‘শক্তিশালী, গতিশীল এবং উদ্যোগী’ করার সুপারিশ করার পর তিন বছর কেটে গেলেও কারও টনক নড়েছে বলে মনে হয় না।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে দিয়ে শেষ করি। তিনি বলেছিলেন, ‘উভয় বাংলার মুসলমান ও হিন্দুর ঐক্য অত্যন্ত শক্তিশালী করা ও দেশভাগ–পরবর্তী সীমান্তের দুপাশে ধর্মনিরেপেক্ষতার ঝান্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরাসহ উভয় বাংলার রাজনীতিতে বাংলা ভাষা সুগভীর প্রভাব ফেলেছে।’ এটা মেনে নিয়ে একটি ঘাটতির কথা যোগ করতে চাই, সেটা হলো উচ্চ আদালতের রায়। দুই বাংলার উচ্চ আদালত বাংলায় রায় লেখেননি। তাই এর প্রভাব পরিমাপ করা যাবে কীভাবে?
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

চোখের জলে পিলখানার শহীদদের স্মরণ

নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পিলখানায় শহীদ সেনাকর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের স্মরণ করা হয়েছে। ২৫শে ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ত ট্র্যাজেডির বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। গতকাল দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী শহীদ ব্যক্তিবর্গের রুহের মাগফিরাত কামনা করে পিলখানাসহ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর সকল রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বাদ ফজর খতমে কোরআন এবং বিজিবির সকল মসজিদে ও বিওপি পর্যায়ে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সকাল ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এদিকে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এদিকে আজ সকাল ১০টায় পিলখানাস্থ বিজিবি মহাপরিচালকের সচিবালয়ে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে শাহাদাত বরণকারী তৎকালীন বিডিআরের কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর মো. নুরুল ইসলামের পরিবারকে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার চেক হস্তান্তর করবেন বিজিবি মহাপরিচালক। বিকাল সাড়ে ৪টায় পিলখানায় বীরউত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এই দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক, শহীদ ব্যক্তিবর্গের নিকটাত্মীয়, পিলখানায় কর্মরত সকল অফিসার, জেসিও, অন্যান্য পদবির সৈনিক এবং বেসামরিক কর্মচারীগণ অংশগ্রহণ করবেন।
বিডিআর বিদ্রোহের বিচার প্রক্রিয়া জনগণের সামনে প্রকাশ করুন: বিএনপি
বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় চলমান বিচার প্রক্রিয়া দেশের সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. অবসরপ্রাপ্ত মাহবুবুর রহমান। গতকাল বেলা ১১টায় বিএনপির পক্ষ থেকে বনানীস্থ সামরিক করবস্থানে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় নিহতদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানোর পর তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তিনি বলেন-২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি ৫৩ জন সেনা কর্মকর্তাসহ অসংখ্য সৈনিক নিহত হওয়ায় দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ওই ঘটনায় চলমান বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা দাবি করে তিনি বলেন- কোন নিরপরাধ মানুষ যাতে সাজা পেতে না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ছয় বছর, শ্রদ্ধা–ভালোবাসায় নিহতদের স্মরণ

(বিডিআর বিদ্রোহের ষষ্ঠবার্ষিকী ছিল গতকাল ২৫ ফেব্রুয়ারি। পিলখানায় বিপথগামী জওয়ানদের হাতে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল বনানীর সামরিক কবরস্থানে আসেন স্বজনেরা। ফুল দিয়ে, কবরের মাটি স্পর্শ করে প্রিয়জনদের স্মরণ করেন তাঁরা l ছবি: প্রথম আলো) পিলখানায় বিপথগামী জওয়ানদের বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনেরা গতকাল বুধবার এসেছিলেন বনানীর সামরিক কবরস্থানে। ছিল সামরিক আনুষ্ঠানিকতা, দিবসটি পালনের অনেক কিছু। শ্রদ্ধা জানাতে আসেন রাষ্ট্রপ্রতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি। তাঁরা সবাই স্মরণ করেন পিলখানায় সংঘঠিত ছয় বছর আগের সেই নারকীয় ঘটনার।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের সময় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। এ হত্যাকাণ্ডের শিকার সেনা কর্মকর্তাদের বেশির ভাগেরই দাফন হয়েছে বনানীর সামরিক কবরস্থানে। কয়েকজনকে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। কবরস্থানে মাঝামাঝি এক সারিতে এ কর্মকর্তাদের দাফন করা হয়েছে। সবার আগে বিডিআরের মহাপরিচালক শাকিল আহমেদ ও তাঁর স্ত্রীর কবর। কবরগুলো সারি করে বাঁধানো দেওয়া হয়েছে সিরামিকের ছোট দেয়াল আর স্টিলের রেলিং দিয়ে। মাঝে কালো সিরামিক লাগানো স্মৃতিস্তম্ভ। তাতে তিন সারিতে নিহত সব কর্মকর্তা ও সদস্যের নাম লেখা। এই নামফলকের বেদিতেই সকাল থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সবাই।
সকালে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতির পক্ষে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মো. জয়নুল আবেদীন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূইয়া, নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল এম ফরিদ হাবিব ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ যৌথভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
ফুল দেওয়ার পর নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন উপস্থিত সবাই। তাঁদের স্মরণে দোয়া করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন সেনা মসজিদের ধর্মীয় শিক্ষক।
জোহরের নামাজের আগে সব সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে (গ্যারিসন-প্রধান মসজিদ) এরিয়ার তত্ত্বাবধানে এবং ঢাকা সেনানিবাসের সেনা কেন্দ্রীয় মসজিদে সদর দপ্তর লগ এরিয়ার তত্ত্বাবধানে কোরআন খতম, মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতেরও আয়োজন করা হয়। মিলাদে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নিহতের স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
বর্ডার গার্ড: বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পিলখানায় কোরআন খতম ও পিলখানার কেন্দ্রীয় মসজিদে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। বিজিবির সব ইউনিটে একই ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়।

সাবিহ উদ্দিন এবং...

বিএনপি ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় থেকে বের হয়েছেন সাবিহ উদ্দিন আহমেদ! গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি এ ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করার ৩৯ দিন পর ১১ই ফেব্রুয়ারি প্রথম কোন কূটনীতিক হিসেবে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। সেদিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গিবসনের বৈঠকে অংশ নিতে যান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ। বৈঠক শেষে গিবসন চলে যাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে গ্রেপ্তার আতঙ্কে পড়েন তারা। এমন পরিস্থিতিতে কার্যালয়ে দুদিন অবস্থান করেন সাবিহ উদ্দিন আহমেদ। এ সময় তিনি তার ব্যবসায়ী ভাইকে ফোন করে জানান, গুলশান কার্যালয়ে থাকলে মরে যাবেন। তিনি আর কোন দিন বিএনপি করবেন না। গুলশান কার্যালয় থেকে তাকে যেন বের করে নিয়ে যান। সাবিহ উদ্দিন আহমেদের এ ফোন পেয়ে তার ব্যবসায়ী ভাই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ১৩ই ফেব্রুয়ারি তাকে গুলশান কার্যালয় থেকে নিয়ে যান। এর আগে ৫ই জানুয়ারি ২০ দলীয় জোটের পূর্বঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ের বাইরে ব্যারিকেড দিয়ে অবরুদ্ধ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ১৯শে জানুয়ারি শেষরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যারিকেড তুলে নিলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যালয় ছাড়েননি খালেদা জিয়া। প্রথম থেকেই তার সঙ্গে কার্যালয়ে অবস্থান করছেন দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতাসহ কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রথম দিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে কার্যালয়ে আটকা পড়েছিলেন সাবিহ উদ্দিন আহমেদ। পরদিন তিনি কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যান। ৭ই জানুয়ারি ফের খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যান সাবিহ উদ্দিন আহমেদ। ওই দিন অবরুদ্ধ অবস্থায় খালেদা জিয়ার শারীরিক খোঁজখবর জানতে চেয়ে ফোন দেন ভারতের ক্ষমতাসীন পার্টি বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ। পরে এ ফোনালাপের বিষয়টি তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও কূটনীতিক উইংয়ের প্রধান শমসের মবিন চৌধুরীকে তার বাসায় গিয়ে অবহিত করেন। ৮ই জানুয়ারি মধ্যরাতেই বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন শমসের মবিন চৌধুরী। এ ঘটনার পর আইনশৃৃঙ্খলা বাহিনী কড়াকড়ি আরোপের পর কার্যালয়মুখী হননি তিনি। উল্লেখ্য, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ২০০৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বৃটেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন সাবেক এ আমলা। পরে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দিলে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের পর ঠাঁই পান চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কমিটিতে। এরপর তিনি দলের কূটনীতিক উইংয়ে কাজ করতেন। কূটনীতিক মহলে তার ভূমিকা নিয়ে একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়েন দলীয় মহলে। ২০১২ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভারত সফরকালে দিল্লিতে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রানজিট প্রসঙ্গে দলীয় নীতির বাইরে বক্তব্য দিয়েও তিনি সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন।

ঢাকা ছাড়ছেন শ্রমজীবী মানুষ by রোকনুজ্জামান পিয়াস

কাওরানবাজারে মালামাল ওঠা-নামার কাজ করেন নওগাঁর আবদুল আজিজ। অনেক পরিশ্রম হলেও তার জীবন ছিল স্বাচ্ছন্দ্যের। আয়-রোজগার ছিল ভালই। কোন দিন এক হাজার, কোন দিন এক হাজার ৫০০। কিন্তু বিরোধী জোটের টানা অবরোধ-হরতালে দুর্ভোগ নেমে এসেছে তার জীবনে। দৈনিক আয় এখন এসে দাঁড়িয়েছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। আবদুল আজিজ জানালেন, তার সঙ্গে কাজ করতেন আরও ১৫ জন। কাজ না থাকায় তাদের মধ্যে ১০ জন চলে গেছেন গ্রামে। আবদুল আজিজের সঙ্গীদের মতো বহু শ্রমজীবী মানুষই এখন ঢাকা ছাড়ছেন। যারা আছেন তারাও চলছেন ধারদেনা করে। এভাবে চলতে থাকলে আর কত দিন ঢাকায় থাকতে পারবেন তা নিয়েও রয়েছেন সংশয়ে। জীবনের তাগিদে পরিবার-পরিজন ফেলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাজের সন্ধানে এসেছিলেন তারা। নিম্ন আয়ের এ মানুষগুলোর অনেকের ঘুমানোর জায়গাও নেই এ শহরে। ফুটপাথ-রাস্তাঘাটেই কাটে তাদের দিনরাত। হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে রোজগারের সামান্য টাকায় চালাতে হয় সংসার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধ-হরতালে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তারা। এদের বেশির ভাগই ভূমিহীন। এলাকায় একখণ্ড ভিটেমাটির ওপর মাথাগুঁজে আছে তাদের পরিবার। এ অবস্থায় হাতছাড়া করতে হতে পারে সেই মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকুও। কিন্তু এরপর কি? এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই তাদের কারও। শ্রমজীবী মানুষ ছাড়াও ঢাকা ছাড়ছেন ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সঙ্কটে কর্মহীন হয়ে পড়া নানা পেশার মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা পলিসিতে মানুষকে শহরবিমুখ করার কথা বলা হলেও বাস্তবে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই। আর এ কারণেই এসব পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে রাজধানীতে কাজের সন্ধানে আসা ভাসমান মানুষগুলো।
ময়মনসিংহের বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান। রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার ট্রাকস্ট্যান্ডে শ্রমিকের কাজ করেন। তার আয়ের ওপরই চলে ৭ সদস্যের পরিবার। স্ত্রী ও চার সন্তান থাকে এলাকায়। বড় ছেলেকে ঢাকায় এনে একটি কারখানায় কাজ শিখতে দিয়েছেন। বাকি চার সন্তানের মধ্যে একজন মাদরাসা ও তিনজন এলাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। ভূমিহীন এ মানুষটির এলাকায় ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই নেই। মোখলেছ জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। এর আগে খরচ বাদে প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা থাকতো। আর এখন সব মিলে আয় হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এ টাকার মধ্য থেকে ব্যবস্থা করতে হয় খাওয়া-দাওয়ার। কোথায় থাকেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাকায় থাকার কোন জায়গা নেই। এখানে রাখা ট্রাকের ভেতরেই ঘুমান। তিনি বলেন, আগে নিয়মিত আয় ছিল। কিন্তু এখন সপ্তাহে তিন-চার দিন আয় করা যায়, তাও খুবই কম। দীর্ঘদিন পরিবারে টাকা পাঠাতে পারেন না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বর্তমান ধারদেনা করে চলছে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াসহ যাবতীয় খরচ। এভাবে চললে হয়তো এলাকায় গিয়ে ভিটেমাটিও বিক্রি করতে হবে। এরপর কি হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জানি না। তিনি আরও জানান, তারা প্রায় ৩০-৪০ জন একসঙ্গে কাজ করেন। আয়-ইনকাম নেই তাই ইতিমধ্যে ২০-২৫ জন ঢাকা ছেড়ে এলাকায় চলে গেছেন। সেখানে টুকটাক দিনমজুরের কাজ করছেন। কিন্তু এলাকায় তো সাময়িক কাজ। বাকি সময়টা বেকার।
কাওরানবাজারের আবদুল আজিজ আরও জানালেন, প্রতি মাসে তার ৩২০০ টাকা ঘর ভাড়া দিতে হয়। আর খাওয়া তো আছেই। গ্রামে তার স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। এদের একজন অষ্টম এবং আরেকজন দশম শ্রেণীতে পড়াশোনা করে। গ্রামে শুধু থাকার জন্য ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই নেই বলেও জানান তিনি। গত রোববার তিনি ৫ হাজার টাকা ধার করে বাড়িতে পাঠিয়েছেন। একই ধরনের কথা জানালেন রিকশাচালক উজ্জ্বল, কবির ও ট্রাকচালক রুবেল। মহাখালী এলাকায় ভাড়ার রিকশা চালান উজ্জ্বল। তিনি বলেন, ঢাকায় মানুষ তো আসছেন না। ভাড়া হবে কিভাবে? আগে যে আয় করতেন তার অর্ধেকও আয় হয় না। ভৈরবের বাসিন্দা রিকশাচালক কবির দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকেন একটি বস্তিতে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে লেখাপড়া করে। কবির জানান, তার পরিচিত অনেক রিকশাচালক বাড়ি চলে গেছেন। কিন্তু তার এলাকায় কোন জমিজমা নেই, তাছাড়া ছেলেমেয়েরা এখানে পড়ালেখা করে। তাই যত কষ্টই হোক তাকে ঢাকাতেই থাকতে হবে। গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার শাহেদ আলীও কাঁচামাল ওঠা-নামার কাজ করেন। তিনি জানান, এরই মধ্যে কাজ না পাওয়ায় ৩০-৪০ জন পরিচিত শ্রমিক ঢাকা ছেড়ে গেছেন। তিনি বলেন, লোক কম হলে আয় বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু কাজই নেই, আয় থাকবে কিভাবে? এলাকা থেকে কাঁচামাল আসছে না আগের মতো। তাই সামান্য আয়। আগে যেখানে যাবতীয় খরচ বাদে থাকতো ৫০০-৬০০ টাকা, এখন সারা রাত কাজ করে থাকে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। তিনি আরও বলেন, এ অবস্থায় প্রায় ১০ আনা শ্রমিকই চলে গেছেন। এমন চিত্র ঢাকার প্রায় সব এলাকাতেই। ফুটপাথের ব্যবসাও চলছে না। অনেকে ব্যবসা গুটিয়েও নিয়েছেন। বাস টার্মিনাল এলাকার দোকানপাটগুলোতেও বেচাবিক্রি নেই।
ঢাকার মেস বাসাগুলোও অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৮২টি। এর মধ্যে ৬০টি ঢাকা শহরে। সারা দেশের মোট ৭৫টি সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে ২৮টি ঢাকা শহরে। শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, মানের দিক থেকেও দেশের সেরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এ শহরে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় এক কোটি সাত লাখ ৭৩ হাজারের কিছু বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০ লাখ ৩০ হাজার (২৮ শতাংশ) শিক্ষার্থী ঢাকা বিভাগে। ঢাকার একটি ছাত্রী হোস্টেলের ইনচার্জের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ মাসে তাদের অধিকাংশ বাসার সিটই খালি যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী বাড়িতে গেছে তারা আর ফেরেনি। ঢাকা শহরে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৮০টির মতো বাসা রয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণে। তেজতুরী বাজার এলাকায় ছেলেদের দুটি হোস্টেল নিয়ন্ত্রণ করেন তুহিন। তিনি জানান, বর্তমান কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস না হওয়ায় অনেক ছাত্র বাড়ি চলে গেছেন। তারা আর ফিরেও আসছেন না। অনেকে বাসা ছেড়েও দিয়েছেন। ফলে বাসার মালিককে ভাড়া দেয়া নিয়েও বেশ সমস্যায় আছেন তিনি। কয়েকটি কোচিং সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর শিক্ষার্থীও কম ভর্তি হয়েছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম জানান, ঢাকা শহরে স্থায়ী, অস্থায়ী ও ভাসমান- এই তিন ক্যাটিগরির প্রায় দেড় কোটি মানুষ বাস করছেন। এদের মধ্যে ৩৬ থেকে ৪০ লাখ মানুষ ভাসমান। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষ রাজধানীতে আসছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাসমান মানুষের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের পপুলেশন পলিসিতে ভাসমান জনগোষ্ঠী নিয়ে কোন চিন্তাভাবনা নেই। এদের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানও নেই। এরা ঢাকায় আছেন মূলত কর্মসংস্থানের জন্য। তাই এমন পরিস্থিতিতে তাদের কর্মহীন হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তিনি আরও জানান, পপুলেশন পলিসিতে বলা আছে, মানুষকে শহরবিমুখ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে কার্যকর কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যদি এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হতো তাহলে রাজধানীতে ভাসমান মানুষের সংখ্যা কমতো। বিশেষ পরিস্থিতিতে তারা এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতেন না।