Monday, August 17, 2009

তবু শুভ শরত্ by আশরাফুলহক

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা—
নবীন ধানের মঞ্জুরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা\
এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,
এসো নির্মল নীলপথে।
—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজকের আকাশ সুনীল হয়তো বা, হয়তো বা তার বুকে ভেসে বেড়ানো মেঘগুলো আজও শাদা, যেমন থাকার কথা শরতে। কিন্তু ধোঁয়া আর ধুলোয় ভরা বায়ুমণ্ডলের ওপারের আকাশ যেমন নগরবাসীর চোখে নীল নয়, তেমনি মেঘও শাদা নয়। আর এই শহরে ধানক্ষেত নেই যে তাতে রৌদ্রছায়া লুকোচুরি খেলা করবে। তাই শরত্ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা—/নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই—লুকোচুরি খেলা\’ অপূর্ব এই কথাগুলো যদি কোনো নগরবাসীকে দোলা না দেয়, তাহলে দোষ দেওয়া যাবে না। তবে হূদয়ের তাগিদে কিংবা অভ্যাবসত এই কথাগুলোয় অনেকের মতো আজও আমার মন দোলে, যেমন দুলতো শৈশবে, যখন গ্রামে ছিলাম। সেখানকার শরতে সুনীল আকাশে তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়ায়। ঝিরঝির বাতাস, সবুজ ধানক্ষেত, কখনো একপশলা বৃষ্টি, মুহূর্তেই আবার মেঘমুক্ত আকাশ। আকাশ নীলে মন হারিয়ে জেগে ওঠে মন। কিন্তু এই নগরে ‘মন হারিয়ে জেগে ওঠা মন’-এর শরত্ আসে না। এখানে কাশফুল নেই, শিউলি-সুরভি রাত বা শিউলি-কুড়ানো সকাল নেই। তবে প্রকৃতি শরতের কথা না বললেও ক্যালেন্ডারের দিন-তারিখ বলছে, আজ শরতের প্রথম দিন। তাই সবাইকে—‘শুভ শরত্’। বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুর মধ্যে শরতের রূপের স্নিগ্ধতা সবচেয়ে বেশি। উত্তপ্ত গ্রীষ্ম আর বৃষ্টি-কাদায় মাখামাখি বর্ষার পর শরত্ যেন নিয়ে আসে অনাবিল প্রশান্তি। কবির ভাষায়—
স্নেহ হাসি শরত্ আসে
পূর্ণিমা মালিকা
সকল বন আকুল করে
শুভ্র শেফালিকা।
এমন স্নেহ হাসির অনাবিল শরত্ এই নগরে আসে না। অবশ্য বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব সব জায়গায়ই কম-বেশি পড়েছে। ঋতুচক্রের ধারাই পাল্টে গেছে। আর এবার তো বসন্ত থেকেই প্রচণ্ড তাপে পুড়ে যাচ্ছে দেশ, বর্ষায়ও মাটি তেমন সিক্ত হলো না। সেখানে শরত্ কী বয়ে আনবে বোঝা দায়। বোধকরি সামনে রুক্ষশ্রী শরত্ দাঁড়িয়ে! শরতের বর্তমান রূপ বড্ড জ্বালাধরা। আর রাজধানীর শরত্-চিত্র সে না বলাই ভালো।
তবুও শরত্কাল। যাকে নিয়ে কবি-সাহিত্যিকদের হাজারো কল্পনা, হাজারো সৃষ্টি। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ যতভাবে শরেক উপস্থাপন করেছেন—তাঁর গানে, কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, নিবন্ধে ও চিঠিতে; তাতে মুগ্ধ মন-প্রাণ। ফলে এই নাগরিক ব্যস্ততায়ও শরেক স্বাগত জানাতেই হয়। যদিও এই যান্ত্রিক নগরে প্রকৃতির রূপ উপভোগ করা দুষ্কর। ক্যালেন্ডারে দিন-তারিখ না গুনে বোঝাই মুশকিল কখন কোন ঋতু। এখানে বাতাসে বিষ, আকাশে...আকাশ কোথা পাই! এখানকার বাড়িগুলোয় বারান্দা নেই, থাকলেও সেখানে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা যায় না। দেখা যায় অন্য কোনো বাড়ির দেয়াল। পথে নেমেও শান্তি নেই, যান আর জনজটের চাপে প্রাণ ওষ্ঠাগত।
শরতের পরিচয় বহনকারী দুটি ফুল—শিউলি আর কাশ। নতুন প্রজন্ম এদের দেখেছে ছবিতে বা টিভিতে। তা ছাড়া উপায় কী? শিউলির টুকটাক দেখা পাওয়া গেলেও কাশফুল তো হারিয়েই গেছে, কদাচ নদীর চরে এর দেখা মেলে। এই বৃষ্টি, এই রোদ, অতঃপর আকাশজুড়ে বর্ণিল রংধনু—শরতের চিরায়ত এই রূপটি দেখার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনি, কিন্তু দেখা মেলে না। তবে একটি ব্যাপার থেকে নগরবাসী মোটেও বঞ্চিত হয় না। আর তা হচ্ছে ভাদ্রের তালপাকা ভ্যাপসা গরম। তালপাকা গরম থেকে বঞ্চিত না হলেও তালের বিভিন্ন রকম পিঠা-পায়েশ থেকে অধিকাংশ নগরবাসী ঠিকই বঞ্চিত।
যা-ই হোক এই শরত্কালকে ঘিরে কিছু সংস্কার এখনো মেনে চলে গ্রামের মানুষ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মানুষ ভাদ্রের প্রথম ১৩ দিন নতুন বউকে শ্বশুরবাড়ি থাকতে দেয় না, ‘টের্যা’ (আঞ্চলিক শব্দ, ‘অশুভ’ ১৩ থেকে এ শব্দের উত্পত্তি) কাটিয়ে আসার জন্য বাপেরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারা এই সময়টুকুকে অশুভ মনে করে। আবার ভাদ্রের পূর্ণিমাকে নষ্ট পূর্ণিমা মনে করা হয়। অন্যদিকে আশ্বিনের পূর্ণিমা বছরের সবচেয়ে শুভ ও সুন্দর পূর্ণিমা হিসেবে আখ্যায়িত। এই পূর্ণিমাকে ‘কোজাগর’ বলা হয়। শারদীয় এই পূর্ণিমায় হিন্দু সম্প্রদায় লক্ষ্মীপূজা পালন করে। শরতের চাঁদকে বলা হয়শরদিন্দু।
একসময় আশ্বিনেই একটু একটু ঠান্ডা অনুভূত হতো। গ্রামের বাড়িতে প্রবীণদের বলতে শুনেছি, ‘আশ্বিন, গা করে শিনশিন’। এখন সেই সব কথা শোনা যায় না, সেই সব কথার সঙ্গে কিছু মেলেও না। মানুষ নিজের আরাম-আয়েশের জন্য ক্রমাগত কার্বন ডাই-অক্সাইড উত্পাদন করে আর গাছপালা কেটে প্রকৃতিকে বদলে দিয়েছে।
তবুও শরত্ এসেছে। ঢাকায় না হোক, ঢাকার বাইরে কোথাও কোথাও নিশ্চয়ই এই শরত্ নিয়ে এসেছে সুনীল আকাশ, শ্যামল কানন, শিউলি-সৌরভ এমনি আরও কত শত প্রাকৃতিক উপহার। তাই নাগরিক ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে কয়েকটা দিন বের করে সেই সব সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে নির্জন গ্রামের পথ ধরুন, যেখানে নদীর তীরে কাশফুল আছে, যেখানে প্রকৃতি আপনি এসে ছোঁয়া দিয়ে যায়।
aurka.dhaka@gmail.com

কারও কারও জন্য সুখবর -জলবায়ু পরিবর্তন by মুশফিকুর রহমান

বিশ্বের উষ্ণায়নে আমরা যত উদ্বিগ্ন, পৃথিবীর সবাই নিশ্চয়ই তেমন নয়। ধরা যাক বিশাল গ্রিনল্যান্ডের কথা। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর ও উত্তর মেরু অঞ্চলের বিশাল দ্বীপদেশ গ্রিনল্যান্ড। আয়তনে ফ্রান্সের প্রায় চার গুণ কিন্তু জনসংখ্যা সব মিলিয়ে মাত্র ৫৬ হাজার। সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডে কয়েকটি সাড়াজাগানো ঘটনা ঘটেছে। ১৮৯৩ সালে এক খ্যাপা ডাচ উদ্ভিদবিদ যে চারটি পাইনগাছ গ্রিনল্যান্ডে লাগিয়েছিলেন (গ্রিনল্যান্ডের প্রাচীনতম পাইনগাছ), দীর্ঘ নিদ্রার পর সেসব পাইনশীর্ষে নতুন সবুজ কুঁড়ি ফুটে বেরোচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের মানুষের দৃষ্টিতে এ যেন পাইনগুলোর নতুন জীবনলাভ। বিষয়টি বুঝতে বিবেচনায় নিতে হবে যে গ্রিনল্যান্ডে পাইনজাতীয় বৃক্ষের সাকল্যে মাত্র নয়টি লাগানো বন রয়েছে। আলুসহ আমদানি করা সবজি ছাড়া গ্রিনল্যান্ডবাসীর সবুজ সতেজ সবজি খাওয়ার অভিজ্ঞতা তেমন হয় না। কিন্তু পৃথিবী উষ্ণ হয়ে ওঠায় সচরাচর সবজির খামারগুলোও বদলে যেতে শুরু করেছে। সম্প্রতি স্থানীয়ভাবে চাষ করা আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি দোকানে এই প্রথম বিক্রির জন্য এসেছে। আটটি কৃষিখামার বাণিজ্যিকভাবে আলুর চাষ শুরু করেছে। পাঁচটি খামার অন্যান্য সবজির চাষে হাত দিয়েছে। কেউ কেউ বাড়ির সংলগ্ন বাগানে অল্প কিছু স্ট্রবেরি ফলাতে পেরে ভীষণ খুশি।
কেনেথ হোয়েগ নামের মুখ্য কৃষি উপদেষ্টা আশাবাদ প্রকাশ করেছেন যে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল যেহেতু উষ্ণ হয়ে উঠছে, সুতরাং সে অঞ্চল সবজির ক্ষেত ও সবুজ বনে ভরে না ওঠার কোনো কারণ তিনি দেখেন না। গ্রিনল্যান্ডের ৮০ শতাংশ জায়গাজুড়েই পুরু সাদা বরফের আচ্ছাদন। সেখানে সামান্য কয়েক ধররের কৃষিখামার বা সবুজ সবজির ক্ষেত বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিতবহ। কেবল পুরোনো পাইনগাছে নতুন কুঁড়ি ফোটার অভাবিত ঘটনাই নয়, গ্রিনল্যান্ডের সন্নিহিত সাগরে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পানির কড মাছের আনাগোনাও চোখে পড়ছে। ১০ বছর আগেও সেখানে মধ্য মে থেকে মধ্য সেপ্টেম্বরের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ সময়কাল এখন প্রায় তিন সপ্তাহ প্রলম্বিত হয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের ৫১টি ভেড়ার খামারের মালিক খুশি—তাঁদের ভেড়াগুলো মাঠে কয়েক দিন বেশি সময় চড়তে পারছে।
শিকারের অভাবে গত ১০ বছরে আট হাজার শিকারির মধ্যে টিকে থাকা মাত্র দুই হাজার গ্রিনল্যান্ডীয় শিকারি খুবই উদ্বিগ্ন—তাদের শিকারগুলো ক্রমেই দুর্গম মেরু অঞ্চলে সরে যাচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে কৃষির সম্ভাবনার চিহ্নগুলো তাদের জন্য বিরাট পাওয়া বৈকি।
কেবল গ্রিনল্যান্ড একা নয়, কানাডা, রাশিয়াসহ উত্তরের অনেক দেশেই এখন অনেক নতুন সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। দীর্ঘ সমুদ্রপথ সংক্ষিপ্ত করে রুশ নাবিকেরা উত্তর মেরু দিয়ে জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের ভ্রমণের সম্ভাবনা সক্রিয়ভাবেই বিবেচনা করছেন।
গ্রিনল্যান্ডের অর্থ ও পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী অ্যালেকা হ্যামন্ড কৃষিতে স্বনির্ভরতার স্বপ্নই কেবল দেখেননি; বরফ গলে যাওয়া দ্রুততর হওয়ায় ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ডে জলবিদ্যুত্ উত্পাদন, তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আহরণের বর্ধিত সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। এরই মধ্যে গ্রিনল্যান্ড মার্কিন কোম্পানি অ্যালকোয়ার সঙ্গে এক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এই সমঝোতার অধীনে অ্যালকোয়া সেখানে অ্যালুমিনিয়াম উত্পাদন কারখানা স্থাপন করবে এবং গ্রিনল্যান্ডের বিশাল জলসম্পদ ব্যবহার করবে। মন্ত্রী আশাবাদী, আবহাওয়ার উষ্ণায়নে যে নতুন সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে, তাতে বরফের দেশ গ্রিনল্যান্ডে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়বে এবং ডেনমার্কের বার্ষিক ৬০০ মিলিয়ন ডলারের (গ্রিনল্যান্ডের বার্ষিক বাজেটের অর্ধেক) সাহায্যের ওপর নির্ভরতা কমবে।
কেবল গ্রিনল্যান্ড একাই নয়, বিশ্বের উষ্ণায়নে মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থানের দেশগুলোতেও কৃষির জন্য ইতিবাচক পরিবেশ বাড়বে। কেউ কেউ তো বরফঢাকা দেশগুলোকে অবকাশযাপনকেন্দ্রের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠার ভাবনায় বেশ আমোদিত হয়ে উঠছেন। উত্তরের বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল মঙ্গোলিয়া, কানাডা ও উত্তর ইউরোপের দেশগুলো সেই সুদিনের জন্য এখন থেকেই বিভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করছে।
কিন্তু পৃথিবী উষ্ণ হয়ে উঠলে সমগ্র পরিবেশে যে পরিবর্তনগুলো অবধারিত হয়ে উঠবে, তা পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হবে। বিজ্ঞানীদের অনেকে স্পষ্টই মনে করেন, অল্প কিছু মানুষের জন্য অর্থনৈতিক লাভ বয়ে আনলেও বৃৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্যই তা হবে বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে ২০৩০ নাগাদ পৃথিবীর উষ্ণায়নের ফলে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করবে। এরই মধ্যে বিশ্বের উষ্ণায়ন ৩২৫ মিলিয়ন মানুষের জীবনে মারাত্মক প্রভাব স্পষ্ট করছে। আগামী ২০ বছরে পৃথিবীর প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ মানবিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কেবল বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত প্রভাবে। সূত্র মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরে প্রায় ৩৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হবে।
আগামী ডিসেম্বরে কোপেনহেগেনে জলবায়ু নিয়ে বিশ্ব সম্মেলন হবে। সেখানে বর্তমান সময়ে মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রজ্ঞানির্ভর চুক্তিতে উপনীত হতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষের আশা যে প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় রেখে কার্যকর, ন্যায়সংগত ও মেনে চলার বাধ্যবাধকতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, যাতে এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষ এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জনগোষ্ঠীর গরিব অঞ্চলগুলোর স্বার্থ সংরক্ষিত হয়।
বর্তমানে যতটা ধারণা করা সম্ভব তা থেকে দেখা যায়, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বছরে অন্তত ৭০ মিলিয়ন মানুষ বন্যায়, আট মিলিয়ন মানুষ খরায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তা ছাড়া দেশের আট শতাংশ নিম্নাঞ্চল স্থানীয়ভাবে জলমগ্ন হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধিতে উপকূল ও প্লাবনভূমি অঞ্চলের আরও ব্যাপক অঞ্চল আংশিক ও দীর্ঘ বন্যার কবলে ডুবে থাকবে। আবহাওয়ার এলোমেলো আচরণ আরও স্পষ্ট হবে এবং ব্যাপক অঞ্চলে লবণাক্ত জলের প্রকোপ বাড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিতে বাংলাদেশে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, বনাঞ্চলের দ্রুত সংকোচন ও পানীয় জলের ব্যাপক সংকট মোকাবিলায় যে বিপুল সম্পদের দরকার হবে, তা বিবেচনায় নিলেই বোঝা যায়, বিশ্বে এ সংকট মোকাবিলায় কত বিলিয়ন ডলার বাড়তি সম্পদের সংস্থান প্রয়োজন। চাইলেই তা যথেষ্ট পাওয়া যাবে না এবং আবার ঠিক সবার ভাগ্যে তা ন্যায্য হিস্যা হিসেবে আপনা থেকেই আসবে না। এ জন্য যেমন দেশের ভেতরে হোমওয়ার্ক, লক্ষ্যনির্দিষ্ট মানসম্মত গবেষণা প্রয়োজন; একইভাবে বিশ্বপরিসরে কূটনৈতিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার নেগোসিয়েশনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। তাহলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন আলোচনার অধীনে বিভিন্ন সহায়তা ও দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক আলোচনা বৈঠকগুলোতে জাতির প্রয়োজনের প্রতিশ্রুতিগুলো আদায় করা সম্ভব হবে।
মুশফিকুর রহমান: খনি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিষয়ক লেখক।

দুনিয়ার এ কী হলো -ন্যায় ও ইতিহাস by এদুয়ার্দো গালিয়ানো

কিছু প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে মাছির মতো ভনভন করছে, সেগুলো নিয়ে আপনাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করতে চাই। দুনিয়া থেকে কি ন্যায়বিচার উধাও হয়ে গেছে?
জর্জ বুশের দিকে জুতা ছুড়ে মেরেছিল ইরাকের যে সাহসী লোকটি তার তিন বছরের কারাবাসের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু তাঁকে একটি মেডেল উপহার দেওয়াই কি উচিত ছিল না? কে সন্ত্রাসী—জুতা নিক্ষেপকারী, নাকি যার গায়ে তা লেগেছে সে? সেই পেশাদার খুনিই কি আসল সন্ত্রাসী নয় যে মিথ্যা অজুহাতে ইরাকে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, ভয়াবহ গণহত্যা করেছে এবং আইন পাস করে নির্যাতনের হুকুম দিয়েছে?
কে অপরাধী—মেক্সিকোর আতেনকো, চিলির মাপুচে, গুয়াতেমালার কেকচি আদিবাসী আর ব্রাজিলের ভূমিহীনেরা? নিজেদের জমির হক প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করার অপরাধে যাদের সন্ত্রাসবাদী বলে দোষা হচ্ছে? যদি মাটি পবিত্র হয়ে থাকে তবে আইন যা বলে বলুক, সেই ভূমিপুত্ররাও পবিত্র নয় কি?
মার্কিন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের চোখে সোমালিয়া হলো বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। কে আসল জলদস্যু? সেসব ক্ষুধার্ত মানুষ, যারা জাহাজে হামলা চালায় তারা? নাকি বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে এক আক্রমণে দুনিয়াকে দেউলিয়া করে দেওয়া ওয়ালস্ট্রিটের ফটকাবাজরা? আজ তাদেরই দেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ! এসব ব্যাংকডাকাতদের কেন এত বড় ইনাম দেওয়া হচ্ছে? ন্যায়বিচারের দেবী কি তাহলে একচোখা? বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী করপোরেশন ওয়াল মার্ট ট্রেড ইউনিয়নকে নিষিদ্ধ করেছে। ম্যাগডোনাল্ডও তা-ই। কীভাবে এসব কোম্পানি আইনের পরোয়া না করে যা খুশি তা করে যেতে পারে? কারণ, আজকের দুনিয়ায় কাজের থেকে অকাজের দাম বেশি, আবর্জনার থেকে কম দাম শ্রমিকের অধিকারের।
কে তাহলে সত্ আর কে খলনায়ক? আন্তর্জাতিক আইন যদি থাকবেই, তাহলে কেন শক্তিমানদের কৃতকর্মের কোনো বিচার কখনো হয় না? মানুষ হত্যায় সেরা কসাইদের কেন কখনো জেলে পোরা হয় না। এর কারণ হলো, জেলখানার চাবি যে তাদেরই হাতে!
জাতিসংঘে কিসের জোরে পাঁচটি রাষ্ট্রের ভেটো-ক্ষমতা অলঙ্ঘনীয়? তাদের এই ক্ষমতা কি ঈশ্বরের দান? যুদ্ধ যাদের ব্যবসা, তাদের হাতে কি আপনি শান্তিরক্ষার ভার দেবেন? বিশ্বের সর্বোচ্চ অস্ত্র বানানো দেশগুলোর হাতেই থাকবে বিশ্বশান্তির দায়িত্ব, এটা কেমন বিধান? যারা মাদক চোরাচালানের হোতা, তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে আমরা সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধাচরণ করি?
দুনিয়ার স্বেচ্ছাচারী মোড়লেরা যখন এতই হত্যাপ্রেমী, তখন কেন আমরা প্রার্থনা করি তারা যাতে সামাজিক অবিচার ছেড়ে ভালো হয়ে যায়? এটা কি সেই দুনিয়া নয়, যেখানে প্রতি মিনিটে সামরিক খাতে ২১০ কোটি টাকা নষ্ট হয় অথচ সামান্য অসুখে বা না খেয়ে প্রতি মিনিটে মারা যায় ১৫টি শিশু? কার বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অস্ত্র শাণ দিয়ে চলেছে? তাদের নিশানায় কী: মানুষের দারিদ্র্য, না দরিদ্র মানুষ?
যারা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে মাতম করতে ওস্তাদ, তারা কেন বাজারিপনার বিরুদ্ধে তাদের মনের ঝাল মেটায় না, যে বাজারি মূল্যবোধ প্রতিমুহূর্তে জননিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করছে? একটানা বর্ষিত হওয়া বোমার মতো বিজ্ঞাপনগুলো কি মানুষকে অপরাধী হতে ডাক দেয় না? এই বোমাবর্ষণের শব্দে কোটি কোটি বেকার বা সামান্য মজুরি পাওয়া তরুণরা আর কিছু শুনতে পারে না। তাদের শেখানো হয় এই মিথ্যা যে, ‘কিছু একটা হওয়া=কিছু একটা পাওয়া’। শেখায় গাড়ি বা ব্র্যান্ডের জুতার মালিক হওয়াই জীবনের একমাত্র মানে। তারা বলতে থাকে, কেন কেন কেন, না কিনলে তুমি তো কিছুই না। তাই কি? মানুষ মানে কি তাহলে জুতা, গাড়ি, ব্র্যান্ড; আমি নিজে কি তাহলে কিছুই না, নাথিং?
হত্যাকারীর পাশাপাশি কেন হত্যাকাণ্ডেরই মৃত্যুদণ্ড হয় না? আজকের দুনিয়ার সব আয়োজনই তো হত্যার জন্য সংগঠিত। অস্ত্র কোম্পানি ও মিলিটারি-চক্র হত্যার কারখানা বসিয়ে রেখেছে। সত্য নয় কি যে এর জন্যই আমাদের যাবতীয় সম্পদ ও শক্তির বেশির ভাগই খরচ হয়ে যাচ্ছে? তারপরও দুনিয়ার প্রভুরা কেবল অন্যের সন্ত্রাসকেই নিন্দা জানায়, কিন্তু নিজেরা করলে নাম হয় ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’। আর কি বিশ্বাস করা যায় যে মানুষ আশাবাদী প্রাণী? বিশ্বে আমরাই একমাত্র জীব যারা ঠান্ডা মাথায় বিনা প্রয়োজনে অন্য মানুষকে হত্যা করেও খুশি থাকি। আমরা এমন ধ্বংসশক্তি অর্জন করেছি বানিয়েছি এমন প্রযুক্তি, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আমাদের এই সাধের গ্রহটি সব অধিবাসীসমেত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে!
ভয় জাগিয়ে রেখেই টিকে আছে এই প্রযুক্তি। শত্রুর ভয়ের জুজু দেখিয়েই সেনা ও পুলিশের নামে বিপুল সম্পদ ওড়ানো হয়। কেন আমরা এই ভয়ের রাজত্বকে চিরবিদায় দিতে পারি না? এভাবেই পেশাদার আতঙ্কবাজদের অপশাসন থেকে বেরিয়ে আসার যোগ্যতা হবে আমাদের। এই ভয়ের বীজ বপনকারীরা আমাদের ছুড়ে ফেলে একাকিত্বের মধ্যে। এক জাতি অন্য জাতিকে, এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে ভয় করতে করতে একা হয়ে যায়। তারা শেখায় এই দুনিয়া হলো কুকুর কুকুরের মাংস খাওয়া দুনিয়া। শেখায় যে প্রতিবেশীর কাছ থেকেই নাকি আসবে বিপদ। দিনরাত সতর্ক করে যে বাচ্চার দোলনার নিচেই নাকি রয়েছে ‘জঙ্গি-বোমা’। বলে, ওই তরুণটি দেখতে নিরীহ হলেও কিন্তু সন্ত্রাসী, ওই ভালো মানুষ প্রতিবেশিনী নাকি নিশ্চিতভাবে আমার মধ্যে সোয়াইন ফ্লুর ভাইরাস ঢুকিয়ে দেবে।
এই ওল্টানো দুনিয়ায় অতি সাধারণ ভালো কাজকেও ভয়ঙ্কর বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। যখন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস তাঁর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীদের লজ্জার হাত থেকে, বঞ্চনার হাত থেকে বাঁচাতে দেশ পুনর্গঠনে নামলেন, সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি করা হলো চরমাতঙ্ক। যারা বর্ণবাদী, যারা বংশপরম্পরায় মনে করে দেশের সহায়-সম্পদ কেবল তাদেরই জন্য, তাদের অবশ্যই আতঙ্কিত হওয়ার আছে। যখন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট কোরেয়া তাঁর দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অবৈধ ঋণ শোধ করতে অস্বীকার করলেন, সুদি প্রতিষ্ঠানগুলো কেঁপে উঠল। এ রকম দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য ইকুয়েডরকে চরম শাস্তি দেওয়া হবে বলে শাঁসানোও হলো। যখন আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও লুটেরা রাজনীতিবিদদের সর্বদাই প্রশ্রয় দিয়ে যায়, যখন তাদের শাসন টেকানোর জন্য জনগণের নামে ঋণ নেওয়া হয়, তখনই কি আমরা সেই চরম শাস্তি বরণ করে নিইনি? তখনই কি ঠিক হয়নি যে, ধনীদের ভোগবিলাস চালানোয় ঋণের জোয়াল টানবে সাধারণ মানুষ? এই ঋণ যে অবৈধ, তা কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়।
কাণ্ডজ্ঞান আর ন্যায়বিচার পরস্পর সম্পর্কিত। কাণ্ডজ্ঞান বলে, যে দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি মাদকাসক্ত, সেই দেশের কী অধিকার রয়েছে অন্য দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর?
আজ অনেকেরই মন খারাপ। কারণ আর্থিক মন্দার কারণে গাড়ি বিক্রি কমে গেছে। কারও যদি সামান্য কাণ্ডজ্ঞান থাকে তো তিনি বুঝবেন এটা একটা খুশির খবর। কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন যে গাড়ির সংখ্যা কমা মানে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার কম হওয়া, পৃথিবীর ধমনিতে কিছুটা কম বিষ মিশ্রিত হওয়া। অস্বীকার করা অসম্ভব যে এর ফলে পায়ে হাঁটা মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং তারা আরও বেশি দিন বাঁচবে।
লুইস ক্যারলের এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের কাহিনীতে রানি অ্যালিসকে বোঝান যে আয়নামহলের রূপকথার রাজ্যে ন্যায়বিচার আছে:
‘সেখানে রাজদূত আছেন একজন। শাস্তি হিসেবে তিনি এখন কয়েদখানায় বন্দী: তবে বিচার শুরু হবে আগামী বুধবারে: এবং এটা নিশ্চিত যে সবার শেষেই হবে অপরাধের বিচার।’
এল সালভাদরের প্রধান পুরোহিত অস্কার আর্নুলফো রোমেরো দেখলেন যে আইন হলো সাপের মতো, কেবল খালি পায়ের মানুষদেরই কামড়ায়। তিনি মারা যান গুলিতে আহত হয়ে। তাঁর অপরাধ একটাই; তিনি বলেছিলেন, তাঁর দেশে গরিবেরা আজন্ম বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের শিকার।
সেই এল সালভাদরে এখন গরিবদের দল ক্ষমতায়। এক দিক থেকে গত নির্বাচনের ফল আর্চবিশপ রোমেরোসহ তাঁর মতো হাজার হাজার মানুষের প্রতি জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি, যারা অবিচারের রাজ্যে নায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বিসর্জন করে লড়ে গেছে।
কখনো কখনো ইতিহাসের কাহিনী মর্মান্তিকভাবে থেমে যায়, কিন্তু ইতিহাস কখনো ফুরায় না। সে যখন বলে বিদায়, তার মানে সে বলছে: আমি আবার আসব।
(কাউন্টার পাঞ্চ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ)
এদুয়ার্দো গালিয়ানো: উরুগুয়ের সাহিত্যিক-সাংবাদিক, ল্যাটিন আমেরিকার জনপ্রিয় লেখক। তাঁর বিখ্যাত বই ওপেন ভেইনস অব ল্যাটিন আমেরিকা। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ এই বইটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে উপহার দিলে বইটি আন্তর্জাতিক বিক্রি তালিকার শীর্ষে উঠে যায়।

চালকের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ট্রাফিক-ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করতে হবে -মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গত তিন দিনে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ২১ জনের। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফেনীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাস খাদে পড়ে গেলে ১৪ জন, শুক্রবার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মাইক্রোবাস-বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন এবং শনিবার দাউদকান্দিতে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। তিনটি দুর্ঘটনাই ঘটেছে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। এর আগেও এই মহাসড়কে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আমাদের চোখে পড়েনি।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার অন্যান্য দেশের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণাকেন্দ্রের হিসাবমতে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। উদ্বেগজনক এ সংখ্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা খুবই বেশি। অনেক চালক দক্ষতা অর্জন করার আগেই ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে নিয়মিত গাড়ি চালাচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বললেই চলে। প্রশিক্ষণবিহীন অদক্ষ চালক যেকোনো সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক-ব্যবস্থার গলদগুলো দূর করা জরুরি। ট্রাফিক পুলিশদের নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। হাইওয়ে পুলিশ নামমাত্র থাকলেও তাদের তত্পরতা চোখে পড়ে না। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশের তত্পরতা ও দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। হাইওয়ে পুলিশের মাধ্যমে বিভিন্ন মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তল্লাশি চৌকি বসানো দরকার। আমরা আশা করব, যোগাযোগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
বাড়তি জনসংখ্যার কারণে ক্রমাগতভাবে সড়কপথের ওপর চাপ বাড়ছে। বাড়ছে দুর্ঘটনা ও যানজট। সড়কপথের চাপ কমাতে রেল যোগাযোগকে শক্তিশালী করার দিকেও সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদন পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতে পারে -প্রাথমিক পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষা

গত সপ্তাহে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শিক্ষাবর্ষ শেষে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে সারা দেশে একযোগে নেওয়া হবে সমাপনী পরীক্ষা। অর্থাত্ শিক্ষার্থীরা প্রথম পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি হবে দশম নয়, পঞ্চম শ্রেণীতে। গত বুধবার প্রথম আলোয় এ সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সন্দেহ নেই, সিদ্ধান্তটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এমন সিদ্ধান্তে চূড়ান্তভাবে পৌঁছার আগে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন মহলে পর্যাপ্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের প্রয়োজন ছিল। তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে আমাদের জানা নেই। তবে এই নতুন ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হবে বলে মনে হয়, যদি তা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। প্রথমত, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণমান, যা নিরূপণের ব্যবস্থা বর্তমানে অনুপস্থিত, তা নিরূপিত হতে পারে এই সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির ব্যবস্থা করা যায়, আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষার ঝক্কি-ঝামেলা দূর হবে তাতে। তা ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আরও ভালোভাবে শিক্ষাদানের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে, এই চিন্তা থেকে যে সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের মধ্য দিয়ে তাদেরও একটা মূল্যায়ন হবে; শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে নয়, আরও ভালো করার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হবে। তৃতীয়ত, বর্তমানে যে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু আছে, এর প্রয়োজন আর থাকবে না। সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই বৃত্তি দেওয়া হবে, যে ব্যবস্থা চালু আছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। এতে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ পঞ্চম শ্রেণীর সব শিক্ষার্থীর প্রতি সমান মনোযোগ দিতে বাধ্য হবে। এখন পঞ্চম শ্রেণীর মাত্র ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়, বিদ্যালয়গুলো তাদের প্রতিই বেশি মনোযোগী থাকে, বাকি ৬০ শতাংশ, অর্থাত্ সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীই অবহেলার শিকার হয়। এ বৈষম্য দূর হবে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় সমাপনী পরীক্ষাব্যবস্থা চালু হলে।
তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ বছরই নতুন ব্যবস্থার বাস্তবায়ন শুরু করবে। এটা ইতিমধ্যে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা প্রশাসনকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। লক্ষ করার বিষয়, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশজুড়ে একযোগে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আগস্টের প্রায় মাঝামাঝি। অর্থাত্ হাতে আছে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস সময়। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষাকেন্দ্র নির্বাচন, একযোগে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফলের পদ্ধতি নির্ধারণ, তা প্রকাশ করাসহ আনুষঙ্গিক অনেক বিষয়ে যে একটি বিশদ ও সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন, তা তৈরি করা হয়নি। মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হয়েছে, নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে, সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, তিন মাসের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করা সম্ভব।
কিন্তু আমাদের সংশয়, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যেন সব লেজেগোবরে হয়ে না যায়। এত চটজলদি এই ব্যবস্থা চালু করা কতটা জরুরি এবং তা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। তা ছাড়া যুগোপযোগী করে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়া ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর নির্ধারিত হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। তাই আমাদের মনে হয়, প্রাথমিক পর্যায়ের সমাপনী পাবলিক পরীক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনে তাড়াহুড়ো না করে জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদন পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয়।

‘সেনা শাসন’ প্রত্যাহার ও সেটেলারদের সম্মানজনক পুনর্বাসন করতে হবে by এ কে এম জাকারিয়া

পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার জন্ম ১৯৪২ সালে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির নানিয়ারচর থানার মহাপুরং গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে এম এ পাস করার পর তিনি তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। এরপর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি জড়িয়ে পড়েন। একসময় চলে আসেন নেতৃত্বে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য জনসংহতি সমিতির পক্ষে সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করে প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন তিনি। বর্তমানে এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রথম আলো : পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কিছু অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পসহ এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার এবং সে অনুযায়ী কাজ চলছে, বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
সন্তু লারমা : সাধারণভাবে এই উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে কিছু অস্থায়ী ক্যাম্প ছাড়া পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহার বলতে যা বোঝায় তেমন কিছু হচ্ছে না। চুক্তি অনুযায়ী সব অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করার কথা। সরকার বলেছে, চুক্তির পরপর বেশ কিছু অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, কিন্তু আমাদের কাছে এর প্রয়োজনীয় তথ্য নেই। বর্তমানে যে প্রত্যাহার করা হচ্ছে সে ব্যাপারেও আমরা তেমন কিছু জানি না। নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঠিক করে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।
প্রথম আলো : আপনি পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। আপনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের ব্যাপারে কিছু জানানো হয়নি?
সন্তু লারমা : আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। আমরা পত্র-পত্রিকায় কিছু অস্থায়ী ক্যাম্পসহ সেনা প্রত্যাহারের খবর দেখেছি। কীভাবে ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হচ্ছে, সে ব্যাপারেও আমরা কিছু জানি না। কারণ ক্যাম্প প্রত্যাহারের আগে জমিটি কার, তা চিহ্নিত করে হেডম্যানের মাধ্যমে মূল মালিককে ফেরত দেওয়া প্রয়োজন। মূল মালিক না পাওয়া গেলে জেলা পরিষদের কাছে জমি হস্তান্তর করা প্রয়োজন। এ ধরনের প্রক্রিয়া মেনে ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের এ ব্যাপারে কিছু জানানো হচ্ছে না।
প্রথম আলো : কিন্তু ক্যাম্প তো প্রত্যাহার করা হচ্ছে। কোন দিন কোন ক্যাম্প গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে, পত্র-পত্রিকায় সে খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
সন্তু লারমা : দেখুন, ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প বা এক ব্রিগেড সেনা হয়তো প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সেনামুক্ত থাকছে। যে সেনা ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে, সে অঞ্চলগুলো অন্য ব্রিগেডের আওতায় চলে আসবে। আসল কথা হচ্ছে, অপারেশন উত্তরণের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সেনা শাসন চলছে, এর অবসান ঘটাতে হবে। আর তা করলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কারণ চুক্তির পর এই অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সেনা উপস্থিতি ও সেনা নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর প্রায় ১১ বছর চলে গেলেও সেনা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আগের মতোই রয়ে গেছে। অপারেশন উত্তরণের অবসান না হওয়া পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রথম আলো : কিন্তু সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হলে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে বিভিন্ন মহলের।
সন্তু লারমা : পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রায় ১১ বছর পার হয়ে গেছে। এখন আর আগের পরিস্থিতি নেই। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য অঞ্চলকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা রয়েছে। সে জন্য কি সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে? যারা এ ধরনের কথা বলে তারা বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তা কথা বলে থাকে। তারা পার্বত্য অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি বজায় রাখার স্বার্থে বিভিন্ন গোষ্ঠী সৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই তারা সক্রিয় রয়েছে।
প্রথম আলো : কারা এ ধরনের কাজ করছে?
সন্তু লারমা : দেখুন, ইউপিডিএফ নামের একটি সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা অপকর্ম ঘটিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চুক্তির বিরোধিতাকারী এই শক্তিকে একটি বিশেষ মহল সৃষ্টি করেছে, যারা পার্বত্য অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে। ইউপিডিএফ পার্বত্য অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে কার্যত সেখানে খুন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করেছে। এ পর্যন্ত তারা শতাধিক লোককে হত্যা করেছে। পার্বত্য অঞ্চলে বিদেশিদের অপহরণের সঙ্গেও তারা জড়িত ছিল। সেনাবাহিনী সেখানে রয়েছে কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আমরা দেখিনি। ফলে সেনা উপস্থিতি যে তাদের কার্যক্রম দমাতে পারছে তা নয়। আসল কথা হচ্ছে, এ ধরনের অপশক্তিকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে হবে। সেটা করলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
প্রথম আলো : মানে সেনা নিয়ন্ত্রণ ও সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউপিডিএফের কার্যক্রমও বন্ধ করতে বলছেন আপনি?
সন্তু লারমা : পার্বত্য অঞ্চলে ইউপিডিএফের সন্ত্রাস ছাড়া আর কোনো সন্ত্রাস নেই। তাদের সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ হয়ে লোকজন আত্মরক্ষার্থে নানা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই সন্ত্রাস ছাড়া পার্বত্য অঞ্চল ঢাকার চেয়েও শান্তিপূর্ণ। আমার প্রশ্ন, যারা এ ধরনের অপকর্ম করে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সেনা উপস্থিতি বা অন্য কোনো উদ্যোগ কিছুই কাজে দেবে না। তাদের তত্পরতার সুযোগে বরং একটি মহল পার্বত্য অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।
প্রথম আলো : পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বর্তমানে কিছু অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প ও এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহারের যে কার্যক্রম চলছে, এর বিরোধিতা করছে সেখানকার বাঙালি সেটেলাররা। তাদের আশঙ্কা, এতে তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তারা তাদের ওপর হামলার আশঙ্কা করছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
সন্তু লারমা : সেটেলারদের সরকার এখানে এনে জোর করে বসিয়েছে। এই সেটেলারদের কোনো দোষ নেই। যেসব জায়গায় তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে সেগুলো পাহাড়িদের জমি। পার্বত্য চট্টগ্রামে খাসজমি বলে কিছু নেই। সেখানকার ভূমিব্যবস্থ্যা দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে আলাদা। কোনো মৌজায় যারা বসবাস করে তারা যৌথভাবে সেখানকার জমির মালিক। তাই বাইরে থেকে যাদের নিয়ে জোর করে বসানো হয়েছে, তা পাহাড়িদের জায়গা দখল করেই বসানো হয়েছে। আমরা মনে করি, সেটেলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। এখন সেনা প্রত্যাহারের ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে পার্বত্য চুক্তির বিরোধিতাকারী শক্তি কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলে সেনা উপস্থিতির পক্ষে তা কাজে লাগানো হতে পারে। এ ধরনের ঘটনা অতীতে অনেক ঘটানো হয়েছে। সামনেও ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রথম আলো : পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের বাইরে অনেক স্থায়ী বাঙালি বাসিন্দাও রয়েছে।
সন্তু লারমা : স্থায়ী বাসিন্দাদের ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই। তারা বৈধভাবেই সেখানে রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে সেটেলার বাঙালিদের নিয়ে। পাহাড়িদের জমিতে তাদের বসানো হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেহেতু খাসজমির কোনো ব্যাপার নেই, তাই জরিপ করা হলে দেখা যাবে সেটেলাররা অবৈধভাবে পাহাড়িদের জমিতে বসবাস করছে। তাই তাদের সরে যেতেই হবে।
প্রথম আলো : কিন্তু সেটেলারদের সরিয়ে নেওয়ার কাজটি খুব সহজ নয়। বিকল্প জমির ব্যবস্থা করা এবং এ জন্য প্রচুর অর্থেরও প্রয়োজন পড়বে।
সন্তু লারমা : আমরা মনে করি না যে কাজটি খুব জটিল। দেশে অনেক খাসজমি রয়েছে, যেখানে তাদের সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা যেতে পারে। আর অর্থের যে বিষয়টি বললেন তার উত্তরে বলতে চাই, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্বত্য চুক্তির পর সেখান থেকে সেটেলারদের সরিয়ে পুনর্বাসনের পুরো খরচ দিতে রাজি ছিল। সরকার তখন বলেছিল যে প্রয়োজনে নিজের অর্থেই কাজটি করা হবে। আমি মনে করি না যে অর্থ এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হবে। সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো : আপনি পার্বত্য অঞ্চলে ইউপিডিএফের নানা তত্পরতার কথা বললেন। কিন্তু আপনার সংগঠন জনসংহতি সমিতিতেও বিভক্তির কথা শোনা যাচ্ছে। সম্প্রতি রাঙামাটিতে কথা প্রসঙ্গে এক পাহাড়ি জানালেন, জনসংহতি সমিতির দুই পক্ষ ও ইউপিডিএফ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। আপনার মন্তব্য কী?
সন্তু লারমা : জনসংহতি সমিতিতে কোনো বিভক্তি নেই। নানা ইস্যুতে ভিন্ন মত থাকতেই পারে। বিগত জরুরি অবস্থার সময় পার্বত্য অঞ্চলে কার্যত বিভীষিকার পরিস্থিতি বিরাজ করেছিল। একদিকে অপারেশন উত্তরণের নামে সেনা শাসন, অন্যদিকে জরুরি অবস্থা। ওই সময় পার্বত্য অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে এমন শক্তির সঙ্গে দালালি করে জনসংহতি সমিতির কিছু সদস্য নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। সেটাকেই হয়তো কেউ কেউ বিভক্তি হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন, যা সঠিক নয়। ২০০৬ সালে দলের যে কংগ্রেস হয়েছে সে অনুযায়ী সংগঠন চলছে। আগে পাঁচ বছর পর কংগ্রেস হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান গঠনতন্ত্রে তিন বছর পর কংগ্রেস আয়োজনের বিধান করা হয়েছে। সে অনুযায়ী এ বছর নতুন কংগ্রেস হবে। দল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে।
প্রথম আলো : বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি করেছিল। আবার ক্ষমতায় আসার পর সরকারের তরফ থেকে কিছু উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সন্তু লারমা : বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। সরকারের আওয়ামী লীগের বাইরেও কয়েকটি দল রয়েছে। বলা হয় মহাজোট সরকার। আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেছে, চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি পরিবীক্ষন ও বাস্তবায়ন কমিটি হয়েছে, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান আদিবাসী থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কিছু কাজ হয়েছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক কিছু হচ্ছে বলেই মনে হয়। কিন্তু কার্যকর অগ্রগ্রতি হয়েছে এমন বলা যাবে না। যেমন—ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কমিশনের কোনো দপ্তর নেই, লোকবল নেই। তাহলে কীভাবে চলবে? শুধু নিয়োগ দিলে তো চলবে না।
প্রথম আলো : সরকারের কাছ থেকে এখনই করা প্রয়োজন—এমন কী ধরনের উদ্যোগ আশা করছেন?
সন্তু লারমা : পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলায় জেলা পরিষদ ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ হয়েছে। কিন্তু এগুলোর কোনো কার্যবিধিমালা নেই। আমি মনে করি, বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে এই পরিষদগুলোর কার্যবিধিমালা চূড়ান্ত করা।
প্রথম আলো : কিছু অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার, বর্তমান সরকারের নেওয়া কিছু পদক্ষেপ—সবকিছু মিলিয়ে আপনি কি আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু দেখছেন?
সন্তু লারমা : আগেই বলেছি, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো আমি ইতিবাচক বলে মনে করি। কিন্তু পাহাড়ে শান্তি নিশ্চিত করার জন্য যে বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই তা সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমত, ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর নামে সেনা শাসন প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেটেলারদের সন্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। এবং তৃতীয়ত, ইউপিডিএফের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। সরকার যদি এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে শুরু করে তবে নিশ্চয় আশাবাদী হওয়ার মতো ঘটনা ঘটবে।

দুনিয়ার এ কী হলো- ন্যায় ও ইতিহাস by এদুয়ার্দো গালিয়ানো

কিছু প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে মাছির মতো ভনভন করছে, সেগুলো নিয়ে আপনাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করতে চাই। দুনিয়া থেকে কি ন্যায়বিচার উধাও হয়ে গেছে?
জর্জ বুশের দিকে জুতা ছুড়ে মেরেছিল ইরাকের যে সাহসী লোকটি তার তিন বছরের কারাবাসের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু তাঁকে একটি মেডেল উপহার দেওয়াই কি উচিত ছিল না? কে সন্ত্রাসী—জুতা নিক্ষেপকারী, নাকি যার গায়ে তা লেগেছে সে? সেই পেশাদার খুনিই কি আসল সন্ত্রাসী নয় যে মিথ্যা অজুহাতে ইরাকে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, ভয়াবহ গণহত্যা করেছে এবং আইন পাস করে নির্যাতনের হুকুম দিয়েছে?
কে অপরাধী—মেক্সিকোর আতেনকো, চিলির মাপুচে, গুয়াতেমালার কেকচি আদিবাসী আর ব্রাজিলের ভূমিহীনেরা? নিজেদের জমির হক প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করার অপরাধে যাদের সন্ত্রাসবাদী বলে দোষা হচ্ছে? যদি মাটি পবিত্র হয়ে থাকে তবে আইন যা বলে বলুক, সেই ভূমিপুত্ররাও পবিত্র নয় কি?
মার্কিন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের চোখে সোমালিয়া হলো বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। কে আসল জলদস্যু? সেসব ক্ষুধার্ত মানুষ, যারা জাহাজে হামলা চালায় তারা? নাকি বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে এক আক্রমণে দুনিয়াকে দেউলিয়া করে দেওয়া ওয়ালস্ট্রিটের ফটকাবাজরা? আজ তাদেরই দেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ! এসব ব্যাংকডাকাতদের কেন এত বড় ইনাম দেওয়া হচ্ছে? ন্যায়বিচারের দেবী কি তাহলে একচোখা? বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী করপোরেশন ওয়াল মার্ট ট্রেড ইউনিয়নকে নিষিদ্ধ করেছে। ম্যাগডোনাল্ডও তা-ই। কীভাবে এসব কোম্পানি আইনের পরোয়া না করে যা খুশি তা করে যেতে পারে? কারণ, আজকের দুনিয়ায় কাজের থেকে অকাজের দাম বেশি, আবর্জনার থেকে কম দাম শ্রমিকের অধিকারের।
কে তাহলে সত্ আর কে খলনায়ক? আন্তর্জাতিক আইন যদি থাকবেই, তাহলে কেন শক্তিমানদের কৃতকর্মের কোনো বিচার কখনো হয় না? মানুষ হত্যায় সেরা কসাইদের কেন কখনো জেলে পোরা হয় না। এর কারণ হলো, জেলখানার চাবি যে তাদেরই হাতে!
জাতিসংঘে কিসের জোরে পাঁচটি রাষ্ট্রের ভেটো-ক্ষমতা অলঙ্ঘনীয়? তাদের এই ক্ষমতা কি ঈশ্বরের দান? যুদ্ধ যাদের ব্যবসা, তাদের হাতে কি আপনি শান্তিরক্ষার ভার দেবেন? বিশ্বের সর্বোচ্চ অস্ত্র বানানো দেশগুলোর হাতেই থাকবে বিশ্বশান্তির দায়িত্ব, এটা কেমন বিধান? যারা মাদক চোরাচালানের হোতা, তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে আমরা সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধাচরণ করি?
দুনিয়ার স্বেচ্ছাচারী মোড়লেরা যখন এতই হত্যাপ্রেমী, তখন কেন আমরা প্রার্থনা করি তারা যাতে সামাজিক অবিচার ছেড়ে ভালো হয়ে যায়? এটা কি সেই দুনিয়া নয়, যেখানে প্রতি মিনিটে সামরিক খাতে ২১০ কোটি টাকা নষ্ট হয় অথচ সামান্য অসুখে বা না খেয়ে প্রতি মিনিটে মারা যায় ১৫টি শিশু? কার বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অস্ত্র শাণ দিয়ে চলেছে? তাদের নিশানায় কী: মানুষের দারিদ্র্য, না দরিদ্র মানুষ?
যারা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে মাতম করতে ওস্তাদ, তারা কেন বাজারিপনার বিরুদ্ধে তাদের মনের ঝাল মেটায় না, যে বাজারি মূল্যবোধ প্রতিমুহূর্তে জননিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করছে? একটানা বর্ষিত হওয়া বোমার মতো বিজ্ঞাপনগুলো কি মানুষকে অপরাধী হতে ডাক দেয় না? এই বোমাবর্ষণের শব্দে কোটি কোটি বেকার বা সামান্য মজুরি পাওয়া তরুণরা আর কিছু শুনতে পারে না। তাদের শেখানো হয় এই মিথ্যা যে, ‘কিছু একটা হওয়া=কিছু একটা পাওয়া’। শেখায় গাড়ি বা ব্র্যান্ডের জুতার মালিক হওয়াই জীবনের একমাত্র মানে। তারা বলতে থাকে, কেন কেন কেন, না কিনলে তুমি তো কিছুই না। তাই কি? মানুষ মানে কি তাহলে জুতা, গাড়ি, ব্র্যান্ড; আমি নিজে কি তাহলে কিছুই না, নাথিং?
হত্যাকারীর পাশাপাশি কেন হত্যাকাণ্ডেরই মৃত্যুদণ্ড হয় না? আজকের দুনিয়ার সব আয়োজনই তো হত্যার জন্য সংগঠিত। অস্ত্র কোম্পানি ও মিলিটারি-চক্র হত্যার কারখানা বসিয়ে রেখেছে। সত্য নয় কি যে এর জন্যই আমাদের যাবতীয় সম্পদ ও শক্তির বেশির ভাগই খরচ হয়ে যাচ্ছে? তারপরও দুনিয়ার প্রভুরা কেবল অন্যের সন্ত্রাসকেই নিন্দা জানায়, কিন্তু নিজেরা করলে নাম হয় ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’। আর কি বিশ্বাস করা যায় যে মানুষ আশাবাদী প্রাণী? বিশ্বে আমরাই একমাত্র জীব যারা ঠান্ডা মাথায় বিনা প্রয়োজনে অন্য মানুষকে হত্যা করেও খুশি থাকি। আমরা এমন ধ্বংসশক্তি অর্জন করেছি বানিয়েছি এমন প্রযুক্তি, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আমাদের এই সাধের গ্রহটি সব অধিবাসীসমেত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে!
ভয় জাগিয়ে রেখেই টিকে আছে এই প্রযুক্তি। শত্রুর ভয়ের জুজু দেখিয়েই সেনা ও পুলিশের নামে বিপুল সম্পদ ওড়ানো হয়। কেন আমরা এই ভয়ের রাজত্বকে চিরবিদায় দিতে পারি না? এভাবেই পেশাদার আতঙ্কবাজদের অপশাসন থেকে বেরিয়ে আসার যোগ্যতা হবে আমাদের। এই ভয়ের বীজ বপনকারীরা আমাদের ছুড়ে ফেলে একাকিত্বের মধ্যে। এক জাতি অন্য জাতিকে, এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে ভয় করতে করতে একা হয়ে যায়। তারা শেখায় এই দুনিয়া হলো কুকুর কুকুরের মাংস খাওয়া দুনিয়া। শেখায় যে প্রতিবেশীর কাছ থেকেই নাকি আসবে বিপদ। দিনরাত সতর্ক করে যে বাচ্চার দোলনার নিচেই নাকি রয়েছে ‘জঙ্গি-বোমা’। বলে, ওই তরুণটি দেখতে নিরীহ হলেও কিন্তু সন্ত্রাসী, ওই ভালো মানুষ প্রতিবেশিনী নাকি নিশ্চিতভাবে আমার মধ্যে সোয়াইন ফ্লুর ভাইরাস ঢুকিয়ে দেবে।
এই ওল্টানো দুনিয়ায় অতি সাধারণ ভালো কাজকেও ভয়ঙ্কর বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। যখন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস তাঁর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীদের লজ্জার হাত থেকে, বঞ্চনার হাত থেকে বাঁচাতে দেশ পুনর্গঠনে নামলেন, সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি করা হলো চরমাতঙ্ক। যারা বর্ণবাদী, যারা বংশপরম্পরায় মনে করে দেশের সহায়-সম্পদ কেবল তাদেরই জন্য, তাদের অবশ্যই আতঙ্কিত হওয়ার আছে। যখন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট কোরেয়া তাঁর দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অবৈধ ঋণ শোধ করতে অস্বীকার করলেন, সুদি প্রতিষ্ঠানগুলো কেঁপে উঠল। এ রকম দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য ইকুয়েডরকে চরম শাস্তি দেওয়া হবে বলে শাঁসানোও হলো। যখন আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও লুটেরা রাজনীতিবিদদের সর্বদাই প্রশ্রয় দিয়ে যায়, যখন তাদের শাসন টেকানোর জন্য জনগণের নামে ঋণ নেওয়া হয়, তখনই কি আমরা সেই চরম শাস্তি বরণ করে নিইনি? তখনই কি ঠিক হয়নি যে, ধনীদের ভোগবিলাস চালানোয় ঋণের জোয়াল টানবে সাধারণ মানুষ? এই ঋণ যে অবৈধ, তা কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়।
কাণ্ডজ্ঞান আর ন্যায়বিচার পরস্পর সম্পর্কিত। কাণ্ডজ্ঞান বলে, যে দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি মাদকাসক্ত, সেই দেশের কী অধিকার রয়েছে অন্য দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর?
আজ অনেকেরই মন খারাপ। কারণ আর্থিক মন্দার কারণে গাড়ি বিক্রি কমে গেছে। কারও যদি সামান্য কাণ্ডজ্ঞান থাকে তো তিনি বুঝবেন এটা একটা খুশির খবর। কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন যে গাড়ির সংখ্যা কমা মানে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার কম হওয়া, পৃথিবীর ধমনিতে কিছুটা কম বিষ মিশ্রিত হওয়া। অস্বীকার করা অসম্ভব যে এর ফলে পায়ে হাঁটা মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং তারা আরও বেশি দিন বাঁচবে।
লুইস ক্যারলের এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের কাহিনীতে রানি অ্যালিসকে বোঝান যে আয়নামহলের রূপকথার রাজ্যে ন্যায়বিচার আছে:
‘সেখানে রাজদূত আছেন একজন। শাস্তি হিসেবে তিনি এখন কয়েদখানায় বন্দী: তবে বিচার শুরু হবে আগামী বুধবারে: এবং এটা নিশ্চিত যে সবার শেষেই হবে অপরাধের বিচার।’
এল সালভাদরের প্রধান পুরোহিত অস্কার আর্নুলফো রোমেরো দেখলেন যে আইন হলো সাপের মতো, কেবল খালি পায়ের মানুষদেরই কামড়ায়। তিনি মারা যান গুলিতে আহত হয়ে। তাঁর অপরাধ একটাই; তিনি বলেছিলেন, তাঁর দেশে গরিবেরা আজন্ম বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের শিকার।
সেই এল সালভাদরে এখন গরিবদের দল ক্ষমতায়। এক দিক থেকে গত নির্বাচনের ফল আর্চবিশপ রোমেরোসহ তাঁর মতো হাজার হাজার মানুষের প্রতি জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি, যারা অবিচারের রাজ্যে নায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বিসর্জন করে লড়ে গেছে।
কখনো কখনো ইতিহাসের কাহিনী মর্মান্তিকভাবে থেমে যায়, কিন্তু ইতিহাস কখনো ফুরায় না। সে যখন বলে বিদায়, তার মানে সে বলছে: আমি আবার আসব।
(কাউন্টার পাঞ্চ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ)
এদুয়ার্দো গালিয়ানো: উরুগুয়ের সাহিত্যিক-সাংবাদিক, ল্যাটিন আমেরিকার জনপ্রিয় লেখক। তাঁর বিখ্যাত বই ওপেন ভেইনস অব ল্যাটিন আমেরিকা। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ এই বইটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে উপহার দিলে বইটি আন্তর্জাতিক বিক্রি তালিকার শীর্ষে উঠে যায়।

চালকের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ট্রাফিক-ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করতে হবে

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গত তিন দিনে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ২১ জনের। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফেনীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাস খাদে পড়ে গেলে ১৪ জন, শুক্রবার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মাইক্রোবাস-বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন এবং শনিবার দাউদকান্দিতে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। তিনটি দুর্ঘটনাই ঘটেছে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। এর আগেও এই মহাসড়কে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আমাদের চোখে পড়েনি।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার অন্যান্য দেশের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণাকেন্দ্রের হিসাবমতে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। উদ্বেগজনক এ সংখ্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা খুবই বেশি। অনেক চালক দক্ষতা অর্জন করার আগেই ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে নিয়মিত গাড়ি চালাচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বললেই চলে। প্রশিক্ষণবিহীন অদক্ষ চালক যেকোনো সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক-ব্যবস্থার গলদগুলো দূর করা জরুরি। ট্রাফিক পুলিশদের নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। হাইওয়ে পুলিশ নামমাত্র থাকলেও তাদের তত্পরতা চোখে পড়ে না। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশের তত্পরতা ও দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। হাইওয়ে পুলিশের মাধ্যমে বিভিন্ন মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তল্লাশি চৌকি বসানো দরকার। আমরা আশা করব, যোগাযোগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
বাড়তি জনসংখ্যার কারণে ক্রমাগতভাবে সড়কপথের ওপর চাপ বাড়ছে। বাড়ছে দুর্ঘটনা ও যানজট। সড়কপথের চাপ কমাতে রেল যোগাযোগকে শক্তিশালী করার দিকেও সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদন পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতে পারে- প্রাথমিক পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষা

গত সপ্তাহে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শিক্ষাবর্ষ শেষে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে সারা দেশে একযোগে নেওয়া হবে সমাপনী পরীক্ষা। অর্থাত্ শিক্ষার্থীরা প্রথম পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি হবে দশম নয়, পঞ্চম শ্রেণীতে। গত বুধবার প্রথম আলোয় এ সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সন্দেহ নেই, সিদ্ধান্তটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এমন সিদ্ধান্তে চূড়ান্তভাবে পৌঁছার আগে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন মহলে পর্যাপ্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের প্রয়োজন ছিল। তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে আমাদের জানা নেই। তবে এই নতুন ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হবে বলে মনে হয়, যদি তা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। প্রথমত, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণমান, যা নিরূপণের ব্যবস্থা বর্তমানে অনুপস্থিত, তা নিরূপিত হতে পারে এই সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির ব্যবস্থা করা যায়, আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষার ঝক্কি-ঝামেলা দূর হবে তাতে। তা ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আরও ভালোভাবে শিক্ষাদানের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে, এই চিন্তা থেকে যে সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের মধ্য দিয়ে তাদেরও একটা মূল্যায়ন হবে; শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে নয়, আরও ভালো করার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হবে। তৃতীয়ত, বর্তমানে যে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু আছে, এর প্রয়োজন আর থাকবে না। সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই বৃত্তি দেওয়া হবে, যে ব্যবস্থা চালু আছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। এতে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ পঞ্চম শ্রেণীর সব শিক্ষার্থীর প্রতি সমান মনোযোগ দিতে বাধ্য হবে। এখন পঞ্চম শ্রেণীর মাত্র ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়, বিদ্যালয়গুলো তাদের প্রতিই বেশি মনোযোগী থাকে, বাকি ৬০ শতাংশ, অর্থাত্ সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীই অবহেলার শিকার হয়। এ বৈষম্য দূর হবে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় সমাপনী পরীক্ষাব্যবস্থা চালু হলে।
তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ বছরই নতুন ব্যবস্থার বাস্তবায়ন শুরু করবে। এটা ইতিমধ্যে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা প্রশাসনকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। লক্ষ করার বিষয়, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশজুড়ে একযোগে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আগস্টের প্রায় মাঝামাঝি। অর্থাত্ হাতে আছে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস সময়। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষাকেন্দ্র নির্বাচন, একযোগে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফলের পদ্ধতি নির্ধারণ, তা প্রকাশ করাসহ আনুষঙ্গিক অনেক বিষয়ে যে একটি বিশদ ও সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন, তা তৈরি করা হয়নি। মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হয়েছে, নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে, সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, তিন মাসের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করা সম্ভব।
কিন্তু আমাদের সংশয়, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যেন সব লেজেগোবরে হয়ে না যায়। এত চটজলদি এই ব্যবস্থা চালু করা কতটা জরুরি এবং তা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। তা ছাড়া যুগোপযোগী করে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়া ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর নির্ধারিত হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। তাই আমাদের মনে হয়, প্রাথমিক পর্যায়ের সমাপনী পাবলিক পরীক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনে তাড়াহুড়ো না করে জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদন পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয়।

আল-মেগরাহিকে মুক্তি না দিতে স্কটল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ

লকারবি বোমা হামলার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত লিবীয় নাগরিক আল-মেগরাহিকে মুক্তি না দিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন স্কটল্যান্ডের বিচারমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোরালোভাবে বলেছেন, স্কটল্যান্ডের কারাগারেই আল-মেগরাহির শাস্তি ভোগ করা উচিত।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আল-মেগরাহিকে মুক্তি না দিতে স্কটল্যান্ড কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ দেয়। আল-মেগরাহি ব্রিটিশ কারাগারে বন্দী রয়েছেন।
প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত আল-মেগরাহি। স্কটল্যান্ড রাজ্যের বিচারমন্ত্রী কেনি ম্যাকআসকিল আগামী সপ্তাহে তাঁর মুক্তির ঘোষণা দিতে পারেন। এ খবরের পর থেকেই মার্কিন কর্তারা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছেন।
১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকারবি গ্রামের আকাশে একটি যাত্রীবাহী বিমানে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ২৭০ জন আরোহী মারা যায়। এদের অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থী। তারা ইউরোপে পড়াশোনা করত। বড়দিনের ছুটি কাটাতে দেশে ফিরছিল।
ওই ঘটনায় নেদারল্যান্ডসের আন্তর্জাতিক আদালতে স্কটল্যান্ডের আইনে আল-মেগরাহির বিচার হয়। হেগের আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। সাজার ২৭ বছর পর তাঁর মুক্তির বিষয়টি বৈধ হওয়ার কথা।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আফ্রিকা সফর শেষে গত শুক্রবার দেশে ফিরেই হিলারি ক্লিনটন স্কটল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী কেনি ম্যাকআসকিলকে ফোন করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফিলিপ ক্রাউলি বলেছেন, ‘আল-মেগরাহির কারাবাসের পেছনে অনেক যৌক্তিক কারণ রয়েছে। আমরা সব সময় ন্যায়বিচারের পক্ষে। আমরা লকারবি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে এ ঘটনার পেছনে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি দাড় করানোর জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ।’ ক্রাউলি আরও বলেছেন, আল-মেগরাহির বিচার হয়েছে। তাঁর উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। তিনি দোষী। তিনি শাস্তি ভোগ করছেন। আমরা মনে করি, তাঁকে কারাবন্দী করেই রাখা উচিত।’
লিবিয়া সরকার ব্রিটেনের সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী আল-মেগরাহিকে তাঁর দেশে ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ করেছে। স্কটল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী লিবীয় সরকারের এ অনুরোধ বিবেচনা করছে।
এদিকে স্কটল্যান্ড সরকার বলেছে, আল-মেগরাহির ভবিষ্যতের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ব্যাপারে স্কটল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী বলেছেন, লকারবি বোমা হামলার দায় থেকে মুক্তি পেতে আল-মেগরাহির আপিল খারিজ করে দিতে তাঁর ওপর কোনো প্রকার চাপ নেই।
বর্তমানে লিবিয়া সফররত মার্কিন সিনেটরদের চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বিষয়টি নিয়ে ত্রিপলী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে। ওই দলের সদস্য রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন ম্যাককেইন বলেছেন, মার্কিন আইনপ্রণেতারা চান না যে, আল-মেগরাহি মুক্তি পাক।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সংকটপূর্ণ দেশ পাকিস্তান: অ্যাডমিরাল মুলেন

মার্কিন চেয়ারম্যান অব দ্য চিফ অব স্টাফ অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘ক্রিটিক্যাল’ (সংকটপূর্ণ) দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর তাই ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারি স্থাপন করতে আগ্রহী বলে জানান তিনি। গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে একটি অনুষ্ঠানে অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন এ কথা বলেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। মাইক মুলেন জানান, ১৯৯০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ১২ বছর ইসলামাবাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দূরত্ব ওই বিশ্বাস ঘাটতির জন্য দায়ী। এখন তাঁরা তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
দুই দেশের মধ্যে বিশেষ করে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার কথা উল্লেখ করে মার্কিন সেনা কর্মকর্তা জানান, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কারণে সাম্প্রতিক সময়ে নিজ দেশের জনগণের মধ্যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এক বছর আগে দেশটির সেনাবাহিনীর জনপ্রিয়তা ছিল মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ, এখন বেড়ে ৮০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। তিনি আরও জানান, সম্পর্ক দৃঢ় করার লক্ষ্যে তিনি প্রায়ই পাকিস্তান সফর করছেন। সেখানে তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গত এক বছরে বেশ কয়েকবার পাকিস্তানে গেছেন এই মার্কিন অ্যাডমিরাল।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিকে নাটকীয় পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করে অ্যাডমিরাল মুলেন বলেন, এতে সামরিক বাহিনীর পক্ষে লড়াই চালানো সহজতর হবে এবং জনগণের কাছেও তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে। তবে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের গুরুত্বও উল্লেখ করেন তিনি। মুলেন আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য তাত্পর্যপূর্ণ এবং ভারত হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করে পাকিস্তান।
আফগানিস্তানের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে মাইক মুলেন বলেন, ‘তারা একটি সার্বভৌম দেশ। সেখানে আল-কায়েদার নেতা অবস্থান করছেন। তাই আমি মনে করি, আফগান-মার্কিন সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ এবং এই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়া দরকার। এই সম্পর্কোন্নয়ন শুধু সামরিক বাহিনীর মধ্যে হলেই চলবে না, এর পরিধি আরও বাড়াতে হবে।’ খবর পিটিআইয়ের।

ভারতে সোয়াইন ফ্লুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৭

বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খানকে গতকাল শনিবার সকালে প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রেখেছিলেন নিউইয়র্ক বিমানবন্দরের অভিবাসন পুলিশের (ইমিগ্রেশন) কর্মকর্তারা। নামের সঙ্গে ‘খান’ শব্দটি যুক্ত থাকায় তাঁকে এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। পরে ভারতের ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের সাংসদ রাজীব শুক্লার হস্তক্ষেপে তিনিমুক্তি পান।
ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আয়োজিত দক্ষিণ এশীয়দের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যান শাহরুখ খান। নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে নেমে অনাকাঙ্ক্ষিত ওই পরিস্থিতির মুখে পড়েন তিনি। অভিবাসন পুলিশের কম্পিউটারে তাঁর নাম ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এ বিপত্তির শুরু। যুক্তরাষ্ট্রে আসার কারণ সম্পর্কে তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। এ সময় কিং খানের ব্যাগেও তল্লাশি চালানো হয়। তাঁকে প্রায় এক ঘণ্টা কোথাও ফোন করতে দেওয়া হয়নি। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
শাহরুখ খান বলেন, ‘কর্মকর্তাদের আমার পরিচয় দিয়ে বলি, সম্প্রতি একটি সিনেমার শুটিং করতেও এ দেশে এসেছিলাম। অনেক কর্মকর্তা আমার কথা বিশ্বাস করলেও কেউ কেউ তাঁদের অবস্থানে অনড় ছিলেন। দক্ষিণ এশীয়দের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসার কথাও তাঁদের জানাই। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।’
খবর পেয়ে শাহরুখ খানকে মুক্ত করেন কংগ্রেসের সাংসদ রাজীব শুক্লা।

নামের আগে ‘খান’ থাকায় দুই ঘণ্টা আটকে থাকলেন শাহরুখ

বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খানকে গতকাল শনিবার সকালে প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রেখেছিলেন নিউইয়র্ক বিমানবন্দরের অভিবাসন পুলিশের (ইমিগ্রেশন) কর্মকর্তারা। নামের সঙ্গে ‘খান’ শব্দটি যুক্ত থাকায় তাঁকে এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। পরে ভারতের ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের সাংসদ রাজীব শুক্লার হস্তক্ষেপে তিনিমুক্তি পান।
ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আয়োজিত দক্ষিণ এশীয়দের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যান শাহরুখ খান। নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে নেমে অনাকাঙ্ক্ষিত ওই পরিস্থিতির মুখে পড়েন তিনি। অভিবাসন পুলিশের কম্পিউটারে তাঁর নাম ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এ বিপত্তির শুরু। যুক্তরাষ্ট্রে আসার কারণ সম্পর্কে তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। এ সময় কিং খানের ব্যাগেও তল্লাশি চালানো হয়। তাঁকে প্রায় এক ঘণ্টা কোথাও ফোন করতে দেওয়া হয়নি। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
শাহরুখ খান বলেন, ‘কর্মকর্তাদের আমার পরিচয় দিয়ে বলি, সম্প্রতি একটি সিনেমার শুটিং করতেও এ দেশে এসেছিলাম। অনেক কর্মকর্তা আমার কথা বিশ্বাস করলেও কেউ কেউ তাঁদের অবস্থানে অনড় ছিলেন। দক্ষিণ এশীয়দের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসার কথাও তাঁদের জানাই। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।’
খবর পেয়ে শাহরুখ খানকে মুক্ত করেন কংগ্রেসের সাংসদ রাজীব শুক্লা।

জিন্নাহকে নিয়ে ফের তোলপাড় বিজেপিতে

বিজেপির নেতা যশবন্ত সিংয়ের লেখা একটি বইকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জাতীয়তাবদী দলের (বিজেপি) মধ্যে আবারও বিভেদ দেখা দিয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যাপারে আগের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বিজেপি জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপক্ষে তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। কিন্তু যশবন্ত সিংয়ের লেখা বইয়ে ভারত ভাগের জন্য কংগ্রেস ও জওহরলাল নেহেরুর ভূমিকাকেও দায়ী করা হয়েছে। এ নিয়ে দলের মধ্যে পাঁচ বছর পর আবারও বিভাজন স্পষ্ট হলো।
বিজেপির মুখপাত্র প্রকাশ জাভেদকার বলেছেন, ২০০৫ সালের ১০ জুন জিন্নাহর ব্যাপারে গৃহীত প্রস্তাব থেকে বিজেপি সরে আসেনি। যশবন্ত সিংয়ের লেখা জিন্নাহ: ইন্ডিয়া-পার্টিশন-ইনডিপেন্ডেন্স বইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ কথা বলেছেন। যশবন্ত সিং তাঁর বইয়ে ভারত ভাগের জন্য কংগ্রেস এবং জওহরলাল নেহেরুকেও অনেকটা দায়ী করেছেন।
যশবন্ত সিংয়ের বইয়ে জিন্নাহকে নিয়ে লেখা বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রকাশ জাভেদকার বলেন, তিনি এখন পর্যন্ত বইটি পড়েননি।
বিজেপি ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এল কে আদভানি ২০০৫ সালে পাকিস্তান সফর করেন। সে সময় তিনি জিন্নাহর প্রশংসা করেন। এতে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর করাচি সফরের পর একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেখানে তিনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রশংসা করেন এবং তাঁকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হিসেবে অভিহিত করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিজেপি জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে।
যাই হোক, বিজেপি প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য ৮২ বছর বয়স্ক আদভানির ওপর চাপ দিন দিন বাড়ছে। গত ১০ আগস্ট হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভগবাতের সঙ্গে আদভানি দেখা করেন। সে সময় মোহন ভগবাত আদভানিকে বিজেপি-প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন।
এদিকে কিছু দিন আগে একটি গণমাধ্যমে আদভানি বলেছেন, ‘আমি ভারতীয় জনগণের জন্য রাজনীতি করি। আমি তার পুরস্কারও পেয়েছি। আমি তাদের ইচ্ছার বাইরে কোনো কিছু করি না।’ এ সময় লোকসভার বিরোধীদলীয় উপনেতা সুষমা সরাজ তাঁর পাশেই ছিলেন। তিনি বলেছেন, আদভানি পাঁচ বছরের জন্য বিজেপি প্রধানের পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে লোকসভা নির্বাচনের পরপরই আদভানি সক্রিয়রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছিলেন।

ভারতের ৬৩তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন

দেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়েছে। ৬৩তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, ভারতীয়দের নিজেদের ওপর অপরিমেয় আস্থা রয়েছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশটি ‘নতুন গৌরব’-এর পথে। এদিকে ভারতীয়দের স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানী দিল্লির লালকেল্লায় দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, মুম্বাইয়ের সন্ত্রাসী হামলার মতো জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে ভারত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। গত নভেম্বরে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে ইসলামি জঙ্গিদের হামলায় কমপক্ষে ১৬৬ জন নিহত হয়।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, ‘মুম্বাই হামলার পর আমাদের সরকার বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা হয়েছে।’
বুলেট প্রুপ কাচে ঘেরা মঞ্চ থেকে দেওয়া ভাষণে মনমোহন সিং বলেন, ‘ভারতের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে আমরা সফল হব।’
নিজেদের ওপর আস্থার কথা ব্যক্ত করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। নিজেদের ওপর আমাদের আস্থা রয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে। আমাদের গণতন্ত্র গোটা বিশ্বের জন্য উদাহরণ। আমরা অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তরুণদের ওপর আমাদের আস্থা রয়েছে। আমি নিশ্চিত, তারা আমাদের দেশকে নতুন গৌরবের দিকে নিয়ে যাবে।’
প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও নয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।’
পাকিস্তানের নাম উল্লেখ না করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আবারও বলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করতে চায় ভারত। গত কয়েক বছরের মধ্যে সম্ভবত এই প্রথম নিজের ভাষণে সরাসরি পাকিস্তানের নাম নেননি মনমোহন সিং। তবে তাঁর ভাষণে দক্ষিণ এশিয়া, সন্ত্রাসবাদ ও জম্মু-কাশ্মীর প্রসঙ্গ উঠে আসে। শাসনপদ্ধতির উন্নয়নে জম্মু-কাশ্মীর সরকারকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী।
মনমোহন সিং বলেন, অন্যান্য দেশের সঙ্গে একত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবিলা করতে চায় ভারত।
মাওবাদী বিদ্রোহ দমনেরও অঙ্গীকার করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। মনমোহন সিং বলেন, যারা ভাবছে বন্দুকের জোরে শাসন করতে পারবে, তারা ভারতীয় গণতন্ত্রের শক্তিকে খাটো করে দেখছে।
হিলারির শুভেচ্ছা: ভারতের স্বাধীনতা দিবসে ভারতীয়দের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। দুই দেশের মধ্যে শক্ত অংশীদারি গড়ে তোলার জন্য ভারতের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় হিলারি এ কথা বলেন।
নিজের সাম্প্রতিক ভারত সফরের কথা উল্লেখ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতীয় জনগণের হূদয়ের উষ্ণতা ও প্রাণশক্তি সরাসরি অনুভব করেছেন তিনি।

কালিয়াকৈরে গ্যাসের সংকটে কারখানায় উত্পাদন ব্যাহত, শিল্পমালিকেরা হতাশ by মাসুদ রানা

গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে কালিয়াকৈর উপজেলা হয়ে যমুনা সেতু পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার শিল্প-কারখানাগুলোতে বিদ্যুতের পাশাপাশি হঠাত্ করে গ্যাসের সংকটও দেখা দিয়েছে। এতে শিল্প-কারখানার মালিকেরা হতাশায় ভুগছেন। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, গ্যাসের সংকট বা গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানায় প্রতিনিয়ত উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্প-মালিকেরা জানান, প্রায় সব ধরনের সুবিধা থাকার ফলেই এই এলাকায় ওষুধ, জুতা, কোমলপানীয়, পাট, স্পিনিং, সোয়েটারসহ বহু তৈরি পোশাক-কারখানা গড়ে উঠলেও এখন বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সংকটে তাঁরা সমস্যায় পড়েছেন।
এদিকে তিতাস গ্যাসের গাজীপুর শাখার উপমহাব্যবস্থাপক নওশাদ ইসলাম প্রথম আলোর কাছে বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় টঙ্গী, গাজীপুর ও কালিয়াকৈর এলাকায় গ্যাসের চাপ কম রয়েছে।
উপজেলার সফিপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কারখানার মালিক ও কর্মকর্তাদের সবাই প্রায় একই সুরে অভিযোগ করেন যে দুই সপ্তাহ ধরে তাঁদের কারখানাগুলোয় বেলা ১১টা থেকে গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে এবং তা টানা বিকেল চারটা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। যে কারণে কারখানার বেশির ভাগ মেশিনই বন্ধ রাখতে হয়। তাই উত্পাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কম হচ্ছে এবং তাঁরা ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না।
এ অবস্থায় রপ্তানিমুখী শিল্পমালিকেরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে কারখানা বন্ধ হওয়া, হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে যাওয়া এবং নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠার সম্ভাবনা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বলে জানান।
সফিপুরের মালেক স্পিনিং কারখানার নির্বাহী পরিচালক হাসান আহাম্মেদ জানান, গত জানুয়ারি থেকে গ্যাসের চাপ কমতে থাকে এবং দিনদিন তা প্রকট আকার ধারণ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুর সদর উপজেলার কোনাবাড়ী এলাকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিসিক শিল্প নগরীর কল-কারখানাগুলো। এ ছাড়া তেলিরচালা এলাকার সেজাদ সোয়াটার অ্যান্ড স্পিনিং, পূর্বানী গ্রুপ, হাইড্রো অক্সাইড লিমিটেড, মৌচাক এলাকার লিবাস টেক্সটাইল লিমিটেড, মোশাইদ, এম এস গ্রুপ, সফিপুর এলাকার যমুনা গ্রুপের শামীম কম্পোজিট মিলস লিমিটেড, শামীম স্পিনিং, মালেক স্পিনিং, রহিম টেক্সটাইল, ময়জুদ্দিন স্পিনিং, অ্যাপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং, পল্লী বিদ্যুত্ এলাকার স্টার লিং, আয়মন টেক্সটাইল, ডংবাং লিমিটেড, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড, বাড়ইপাড়া এলাকার বিডি হেচং লিমিটেডসহ আরও স্পিনিং কারখানার মালিকেরা তিতাস গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
তিতাস গ্যাসের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী খালিদ হাসান প্রথম আলোকে জানান, বিদ্যুত্ উত্পাদনে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি করায় এসব এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। যার প্রভাব পড়ছে মিল-কারখানাগুলোর ওপর। তবে কবে নাগাদ এর সমাধান হবে, তাও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ঢাকায় পাঁচটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করবে জ্যাক ট্রেড ফেয়ারস

জ্যাক ট্রেড ফেয়ারস অ্যান্ড এক্সিবিশনস প্রাইভেট লিমিটেড আগামী ২৯ অক্টোবর থেকে চার দিনব্যাপী পাঁচটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করবে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে এসব প্রদর্শনী।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি তানভিরুল হক ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি এসব প্রদর্শনীর দাপ্তরিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। প্রদর্শনীগুলো হচ্ছে—নির্মাণ ও আবাসিক প্রযুক্তি প্রদর্শনী-জ্যাক ঢাকা বিল্ড, জ্যাক পাওয়ার ও লাইটিং প্রযুক্তি প্রদর্শনী, জ্যাক সোলার এনার্জি এক্সপো, নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি প্রদর্শনী এবং জ্যাক ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপো।
অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি আনিসুল হক, ইতালি-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হাকিম আলী, রিনিউএবল এনার্জি সোসাইটির মহাব্যবস্থাপক জহর জাওয়াল, বাংলাদেশ সোলার এনার্জি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহীম, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) নির্বাহী পরিচালক ইসলাম শরীফ, জার্মান টেকনিক্যাল করপোরেশনের (জিটিজেড) উপদেষ্টা খুরশিদ-উল-ইসলাম ও প্রকল্প সমন্বয়কারী ইরিচ ওটো গম, রহিমআফরোজ রিনিউএবল এনার্জি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার মিজবা মঈন এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানটির মিডিয়া ও বিপণন পরিচালক রাশেদুল হক উপস্থিত ছিলেন।
এবারও এসব প্রদর্শনীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে থাকবে রিহ্যাব।

কুমিল্লা বিসিক শিল্পনগরে ৩২টি কারখানা এখন বাসাবাড়ি

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কুমিল্লা শিল্পনগরের ৩২টি কারখানায় বাসাবাড়ি করে থাকছে লোকজন। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি কারখানাকে বাড়ি হিসেবে ভাড়াও দিয়েছেন কোনো কোনো মালিক।
বিসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, বছরের পর বছর ধরে নোটিশ দিয়েও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপের কারণে ওই সব ভাড়াটিয়াকে সরানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বিসিক কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিকদের নিয়ে বৈঠক করে একটি কমিটি গঠন করেছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
বিসিক শিল্পনগর সূত্রে জানা গেছে, ষাটের দশকে ৫৪ দশমিক ৩৫ একর জায়গা নিয়ে এই শিল্পনগর গড়ে ওঠে। এখানকার ১৪৯টি প্লটের মধ্যে ১১টি বন্ধ ও ৩২টিতে বাসাবাড়ি করা হয়েছে। বাকি প্লটগুলোতে অবশ্য কারখানা করে উত্পাদন কর্মকাণ্ড চলছে।
যেসব কারখানায় বাসাবাড়ি রয়েছে সেগুলো হলো মেসার্স শাহজাহান এন্টারপ্রাইজ, হক ল্যাবরেটরিজ ইউনানী, পদ্মা আর্মি প্রডাক্টস ইন্ডাস্ট্রিজ, আলম অ্যান্ড কোং, হাবিব বেডিং, পপুলার ফুড প্রডাক্টস ইন্ডাস্ট্রিজ, শ্যামলী এন্টারপ্রাইজ, তালুকদার এন্টারপ্রাইজ, বেঙ্গল ফুড অ্যান্ড এলাইড, রূপসী ইন্ডাস্ট্রিজ, নাহার ফুড প্রডাক্টস, নিপ্পন ফুড প্রডাক্টস, স্টার চিঁড়া মিল, ন্যাশনাল ফ্লাওয়ার অ্যান্ড আটা মিল, কুমিল্লা গ্রিজ মিলিং ইন্ডাস্ট্রিজ, জেনারেল এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং, আল-আমিন আটা মিল, ফেয়ার অ্যান্ড আরিফ ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ, এশিয়া ফুড প্রডাক্টস ইন্ডাস্ট্রিজ, দি হেলথ ফার্মা ইউনানী, সামাদ অ্যান্ড সন্স, রহমান এন্টারপ্রাইজ, খাদি টেক্সটাইল, ময়নামতী ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং, রূপালী অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কস, খাজা টেক্সটাইল মিলস, আয়শা পেপার বোর্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, শিল্পালয় অ্যান্ড কোং, বাংলাদেশ অ্যালুমিনিয়াম, মিনা প্লাস্টিক, মনির কুটির শিল্প ও মেসার্স সালমা টেক্সটাইল।
যেসব মালিক কারখানাকে বাসা হিসেবে ভাড়া দিয়েছেন তাঁদের বেশ কয়েকজন অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁদের কারখানায় কম-বেশি কাজ হচ্ছে। সেখানে শ্রমিকেরা থাকছে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আবাসন সুবিধা না দিলে তারা কাজে আসবে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা তাদের দিনের পর দিন নোটিশ দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। এর ওপর জোর করেও উচ্ছেদ করা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে গত কয়েক দিন আগে সভাও করেছি। ওই সভায় একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্যরা তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবেদন দেবেন।’

প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে সিলেটে এসইজেড স্থাপন-প্রক্রিয়া থমকে আছে

সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে সিলেটে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন-প্রক্রিয়াটি থমকে আছে। এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সিলেটে এক মতবিনিময় সভায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এ অভিযোগ তুলেছেন।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একটি অধ্যাদেশ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শিগগির জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে।
গত শুক্রবার সিলেটে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা নিরসনকল্পে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের কারিগরি সহায়তায় সিলেট নগরের একটি রেস্তোরাঁয় অনুষ্ঠিত এ সভায় সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসংক্রান্ত টাস্কফোর্স’ সদস্যরা এবং অর্থ ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ফজলুর রহমান। এতে বক্তব্য দেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব এম এমদাদুল হক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপ-অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রফিকুল ইসলাম, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব ফরহাদ সিদ্দিকী, সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদ মিসবাহ ও প্রবাসী বিনিয়োগকারী ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধি কয়সর আহমেদ।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূর, যুক্তরাজ্য সরকারের শিক্ষাবিষয়ক দপ্তরের পরিচালক জামালউদ্দিন, সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি এম এ রাজ্জাক চৌধুরী, সাবেক পরিচালক হাজি মো. জামাল উদ্দিন, প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমদ, ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সংগ্রাম সিংহ, দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি কর্মকর্তা শেখ ইকবাল হোসেন ও জাফর ইকবাল।

দৈনিক গড় লেনদেন ৭১৪ কোটি টাকার

জন্মাষ্টমীর ছুটির কারণে গত সপ্তাহে দেশের শেয়ারবাজারে লেনদেন এক দিন কম হয়েছে। তাই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মোট লেনদেন আগের সপ্তাহের চেয়ে কমেছে।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট দুই হাজার ৮৫৯ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের চেয়ে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে ডিএসইতে মোট তিন হাজার ২১৭ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল।
তবে মোট লেনদেন কমলেও গত সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন আগের সপ্তাহের চেয়ে বেড়েছে।
গত সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন ৭১৪ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা তার আগের সপ্তাহের চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন ৬৪৩ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এক দিন ছুটি না থাকলে গত সপ্তাহের মোট লেনদেনের পরিমাণ আগের সপ্তাহের মোট পরিমাণকে ছাড়িয়ে যেত। কারণ হিসেবে তাঁরা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার নিয়ে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝির অবসান হওয়ায় বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে। ফলে তাঁদের অংশগ্রহণও বাড়তে শুরু করেছে।
বাজার পরিস্থিতি: গত সপ্তাহে বাজারে লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূচকও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিএসইতে গত সপ্তাহে সাধারণ মূল্যসূচক আগের সপ্তাহের চেয়ে প্রায় ৪৬ পয়েন্ট বেড়ে তিন হাজার ছাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকেরা অবশ্য এটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তাঁদের মতে, মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে যদি সূচক বাড়ে, তাহলে আতঙ্কের কিছু নেই।
ডিএসইতে গত সপ্তাহে তালিকাভুক্ত ৩০১টি কোম্পানির শেয়ারের মধ্যে দাম বেড়েছে ১৮৮টির। কমেছে ৫২টির দাম। দুটি কোম্পানির দাম অপরিবর্তিত ছিল। আর ৫৯টি কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন হয়নি।
দাম বাড়ায় শীর্ষ ১০: গত সপ্তাহে ডিএসইতে দাম বাড়ার তালিকায় থাকা শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলো—হাক্কানি পাল্প অ্যান্ড পেপার, কোহিনূর কেমিক্যালস, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস, ডেল্টা স্পিনার্স, আরামিট, সায়হাম টেক্সটাইল, মিথুন নিটিং, মেঘনা সিমেন্ট, গাল্ফ ফুডস ও ন্যাশনাল পলিমার।
দাম কমায় শীর্ষ ১০: ডিএসইতে দাম কমার দিক থেকে ১০ শীর্ষ কোম্পানি ছিল—স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, সোনালী আঁশ, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, পদ্মা সিমেন্ট, বিচ হ্যাচারি, বিডিকম অনলাইন, মেঘনা শ্রিম্প, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, সাভার রিফ্যাক্টরিজ ও অ্যাপেক্স ফুড।
লেনদেনে শীর্ষ ১০: গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলো—বেক্সটেক্স লিমিটেড, বেক্সিমকো লিমিটেড, তিতাস গ্যাস, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, যমুনা অয়েল, এসিআই লিমিটেড, এইমস ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।

বিশ্বের শীর্ষ ১০ অর্থনীতির ছয়টি মন্দা থেকে বেরিয়ে এসেছে! by আসজাদুল কিবরিয়া

বিশ্বমন্দার দীর্ঘ সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখা যাচ্ছে। এ ধারণা জোরালো হয়েছে গত বৃহস্পতিবার অনেকটা নাটকীয়ভাবেই জার্মানি ও ফ্রান্স প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসার ঘোষণা দেওয়ায়।
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দুই দেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার হয়েছে দশমিক ৩০ শতাংশ। এর ফলে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ অর্থনীতির চারটি দেশই মন্দার চক্র থেকে বেরিয়ে এল। গতকাল দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
এ ছাড়া সপ্তাহ শেষে আরও বেশ কিছু অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য প্রকাশ হওয়ায় ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে বিশ্বের শীর্ষ ১০ অর্থনীতির ছয়টি দেশই আর মন্দার মধ্যে নেই বলে মনে করা হচ্ছে।
সিঙ্গাপুর থেকে গত বৃহস্পতিবার বিশ্ব অর্থনীতি বিষয়ে যে আস্থাসূচক (ব্লুমবার্গ প্রফেশনাল গ্লোবাল কনফিডেন্স ইনডেক্স) প্রকাশ করা হয়েছে, তা ২২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
আগস্ট মাসে এই সূচক হয়েছে ৫৮ দশমিক ১২, যা জুলাই মাসে ছিল ৩৯ দশমিক ১৩। এর মানে হলো এখন বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদীদের পাল্লাটাই ভারী।
শীর্ষ ১০ অর্থনীতির মধ্যে চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় কম হলেও এখন তা যথেষ্ট গতিময়তা পেয়েছে। জাপানও মন্দা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, জার্মানি ও ফ্রান্স দুই দেশই টানা চার প্রান্তিক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির চক্রে থাকার পর প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্র দেখল।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও মন্দা থেকে বেরিয়ে আসার বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিয়েছে বলে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ নীতিনির্ধারণী সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে।
আবার জুন মাস শেষে আমেরিকার বাণিজ্য-ঘাটতি হ্রাস পেয়ে দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর গত জুনে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৪৯০ কোটি ডলার। এএফপি এ খবর পরিবেশন করেছে।
তবে আমেরিকা এখনো মন্দার মধ্যেই রয়ে গেছে। আর গত শুক্রবারই খবর এসেছে যে আলবামাভিত্তিক কলোনিয়াল ব্যাংকগ্রুপ দেউলিয়া হয়ে গেছে। দুই হাজার ৫০০ কোটি ডলারের সম্পদ ও ৩৪৬টি শাখাসংবলিত এই ব্যাংকটি ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকপতনের সবচেয়ে বড় ঘটনা।
এএফপি জানিয়েছে, ২০০৫ ও ২০০৭ সালে আমেরিকায় কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়নি। ২০০৭ সালে তিনটি ব্যাংকের পতন ঘটে। কিন্তু ২০০৮ সালে ২৫টি ব্যাংকে লালবাতি জ্বলার মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে।
আমেরিকার ফেডারেল ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশন অবশ্য কলোনিয়ালের দুই হাজার কোটি ডলারের আমানত ও দুই হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্পদ নর্থ ক্যারোলাইনাভিত্তিক ব্যাংক বিবিঅ্যান্ডটির কাছে বিক্রির অনুমতি দিয়েছে।
এই পাঁচটি দেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে মোট জিডিপির (পিপিপি হিসেবে) ৪৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে।
ইউরো অঞ্চলেও জিডিপি জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে যেখানে আড়াই শতাংশ হারে সংকুচিত হয়েছিল, সেখানে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এই সংকোচনের হার কমে দশমিক ১০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ইতিবাচক দিকে যাওয়ারই আভাস দিচ্ছে।
অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলের প্রবৃদ্ধিও আলোচ্য প্রান্তিকে দেড় শতাংশ হারে বেড়েছে। দেশটির প্রধান শেয়ারবাজার সর্বশেষ কার্যদিবসে ৫৭ শতাংশ বেড়েছে।
সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাজ্য ও দশম বৃহত্তম অর্থনীতি ইতালি এখনো মন্দার রাহুগ্রাসে রয়ে গেছে।

প্রক্রিয়া শুরুর ১১ বছর পর দেশে চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইন হচ্ছে by ফখরুল ইসলাম

প্রক্রিয়া শুরুর ১১ বছর পর দেশে চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইন হতে যাচ্ছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ সভায় এ আইনের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। আইনটি পাস হলে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টদের মতো আলাদা সনদ পাবেন কোম্পানি সচিব বা ব্যবস্থাপকেরা।
জানা যায়, ব্যবসায়-বাণিজ্যে উন্নত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা কোম্পানির সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কোম্পানি সচিব বা ব্যবস্থাপকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে এ পদটি অবহেলিত। পেশাগতভাবে দক্ষ নন এমন লোকেরা এ পদে চাকরি করছেন, যা সুশাসনের অন্তরায়।
এসব বিবেচনা থেকে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অ্যান্ড ম্যানেজারস অব বাংলাদেশ (আইসিএসএমবি) আগেরবারের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৯৯৮ সালে চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইনের প্রয়োজনীয়তার দিক তুলে ধরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব দেয়।
এর পর কয়েক দফা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েও আটকে যায় প্রস্তাবিত এ আইন। অবশ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের জুনে এ আইনের গেজেটও প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু নানা অজুহাতে একে আর কার্যকর হতে দেওয়া হয়নি।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ সভায় চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইন-২০০৯ অনুমোদিত হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, শিগগির তা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ভেটিং শেষে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে জাতীয় সংসদে।
জানা গেছে, ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ২৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে গঠন করা হয় আইসিএসএমবি। নির্বাচিত ১৫ সদস্যের কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়ে আসছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা অর্থাত্ কোম্পানি সচিব বা ব্যবস্থাপকদের পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের সনদ দেওয়া। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা আইন না থাকায় এমন সনদ দিতে পারছিল না আইসিএসএমবি।
এ কারণেই আইসিএসএমবি ১৯৯৮ সালে চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইনের প্রস্তাব জমা দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু ‘দি বাংলাদেশ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অর্ডার-১৯৭০’ ও ‘দি কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অধ্যাদেশ-১৯৭৭’-এর সঙ্গে স্বার্থের দ্বন্দ্ব হওয়ার আশঙ্কা থেকে দীর্ঘদিন তা আটকে রাখা হয়।
শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালের মার্চে উল্লিখিত দুই আইনের সঙ্গে প্রস্তাবিত চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই বলে মতামত দেয় আইন মন্ত্রণালয়।
এরপর প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অধ্যাদেশ-২০০৭-এর সঙ্গে চার্টার্ড সেক্রেটারিজ বিল-২০০৬-এর সম্ভাব্য অসংগতি পরীক্ষা করা হয়। এতেও স্বার্থের বিরোধ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারা বাদ পড়ায় ওই বিলের সংশোধনীর প্রস্তাব করে আইসিএসএমবি।
সূত্র জানায়, আইসিএসএমবির ওই প্রস্তাবের পর ২০০৮ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় প্রস্তাবিত অধ্যাদেশটি অনুমোদিত হয় এবং ওই বছরেরই জুনে আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত হয় এর গেজেট।
কিন্তু এই অধ্যাদেশের বেশ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে। সেগুলো দূর করে একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর আবারও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ।
সূত্রমতে, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি আবারও অধ্যাদেশটির সংশোধিত গেজেট প্রকাশের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু ৬ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিন থাকায় এতে আইন উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আর ১৪ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয় বিষয়টি বিল আকারে সংসদে উপস্থাপনের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়।

চোখের জলে বিদায়

জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম অধ্যায়ের নেপথ্য নায়ক তিনি। তিন বছরের দায়িত্বকালে রুশ প্রিমিয়ার লিগে প্রথম শিরোপার পাশাপাশি দলকে এনে দিয়েছিলেন ২০০৮ উয়েফা কাপের শিরোপা। বিদায়বেলায় তাই চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না ডিক অ্যাডভোকাট। অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানালেন স্মৃতিবিজড়িত ক্লাবকে। রুশ লিগে দলের সাম্প্রতিক বাজে পারফরম্যান্সের জন্য গত ১০ আগস্ট সেন্ট পিটার্সবার্গ বরখাস্ত করেছে ৬১ বছর বয়সী এই ডাচকে। অ্যাডভোকাট নিজেই অবশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন মৌসুম শেষে ক্লাব ছেড়ে দায়িত্ব নেবেন বেলজিয়াম জাতীয় দলের। খেলোয়াড়দের ট্রান্সফার নিয়ে ক্লাব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এর মূল্য দিতে হলো তাঁকে চাকরি হারিয়ে। সহকারী কোচ আনাতোলি দেভিয়ভ আপাতত দায়িত্ব নিলেও শোনা যাচ্ছে সাবেক ইন্টার মিলান কোচ রবার্তো মানচিনি নিতে পারেন রুশ ক্লাবটির দায়িত্ব।

নাতির নামে দিব্যি

বিতর্ক যেন ছাড়তেই চায় না তাঁকে। একটার পর একটা বিতর্ক লেগেই আছে ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে ঘিরে। বলিভিয়া-লজ্জা গেল। শেষ হলো আর্জেন্টিনার কোচের চাকরি ছাড়তে চাওয়ার গুজবও। ব্রাজিলের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচের ভেন্যু পরিবর্তন-বিতর্ক শেষে ম্যারাডোনাকে নিয়ে আবার নতুন বিতর্ক। বিষয় গঞ্জালো হিগুয়েইন।
রিয়াল মাদ্রিদে গত মৌসুমটা দারুণ খেলেছেন ২১ বছর বয়সী হিগুয়েইন। ৪২ ম্যাচে ২৪ গোল করেছেন, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৯টি। এর পরও ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা দলে ডাক পড়েনি। ম্যারাডোনার এই হিগুয়েইন-উপেক্ষায় কেউ কেউ রং চড়াতে শুরু করেছেন। অনেকেই বলছেন, ম্যারাডোনা গাব্রিয়েল হেইঞ্জের কথা শুনে হিগুয়েইনকে উপেক্ষা করছেন। হেইঞ্জের সঙ্গে হিগুয়েইনের সম্পর্ক বেশ শীতল।
ম্যারাডোনা অবশ্য এই কান-কথা উড়িয়েই দিয়েছেন। বিষয়টা যে এ রকম কিছু নয়, সেটা বোঝাতে প্রিয় নাতির নামে দিব্যিও করেছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি, ‘আমি আমার নাতি বেঞ্জামিনের নামে দিব্যি করছি, আমি এবং হেইঞ্জ এ নিয়ে কখনো আলাপই করিনি। যেদিন আমার মনে হবে পিপাকে (হিগুয়েইন) দলে দরকার, সেদিন আমি ওকে ঠিকই নিয়ে নেব। আর এখন ওকে দলে নেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। মিলিতো আছে, লিসান্দ্রো (লোপেজ) আর লাভেজ্জিও তো আছে।’
ম্যারাডোনার হিগুয়েইন-প্রয়োজনীয়তা এখন নাও হতে পারে, কিন্তু হিগুয়েইন ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন! হিগুয়েইনের বাবা আর্জেন্টাইন ফুটবলার ছিলেন। পরে ফ্রান্সে গিয়ে বসবাস। হিগুয়েইনের জন্মও ফ্রান্সে। সেই সুবাদে তিনি আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের দ্বৈত নাগরিক। ফ্রান্স কোচ রেমন্ড ডমেনেখ তাঁকে ফ্রান্স দলে খেলার জন্য অনেক আগেই বলেছেন। কিন্তু মনের মধ্যে আর্জেন্টিনার পতাকা আঁকা বলে ডমেনেখের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন হিগুয়েইন। তাই বলে ম্যারাডোনা এভাবে উপেক্ষা করবেন তাঁকে! ওয়েবসাইট।

সৌরভের বিশ্বাস ইচ্ছা পূরণ হবে টেন্ডুলকারের

দুজনের ওপেনিং জুটিটা হয়েছিল দুর্দান্ত। শচীন-সৌরভের সেই জুটি ভেঙেছে আগেই। সৌরভ গাঙ্গুলী তো এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেরই বিগত এক অধ্যায়। শচীন টেন্ডুলকারের চেয়ে সাত বছর পর অভিষেক হলেও সৌরভ বিদায় নিয়েছেন আগেই। শুধু তা-ই নয়, সাবেক এই ভারতীয় অধিনায়ক মনে করেন, আরও অনেক বছর খেলার সামর্থ্য আছে টেন্ডুলকারের।
‘সত্যি বলতে কি, ও আমার চেয়ে অনেক বড় মাপের খেলোয়াড়। নিজের বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্তটা ওর নিজেরই নেওয়ার অধিকার আছে। ব্রায়ান লারা আর ও-ই সম্ভবত বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান। যত দিন ওর খেলতে ইচ্ছে করে, তত দিনই ও খেলে যেতে পারবে। এবং আমি নিশ্চিত, শেষ পর্যন্ত ও ধারাবাহিকভাবে রান করে যাবে’—বলেছেন সৌরভ।
সম্ভাব্য অবসর নিয়ে আলোচনাটা আবার উসকে দিয়েছেন খোদ টেন্ডুলকারই। কিছুদিন আগে উইজডেন সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে টেন্ডুলকার জানিয়েছেন, দুটো অতৃপ্ত ইচ্ছা পূরণ হলেই কেবল অবসরের কথা ভাববেন: এক. টেস্টে ১৫ হাজার রান। দুই. ২০১১ বিশ্বকাপ জয়।
প্রথম ইচ্ছা পূরণের জন্য টেন্ডুলকারের দরকার আর ২২২৭ রান। আর দ্বিতীয় ইচ্ছা থেকে দুই বছর। সৌরভ মনে করেন, দুটো ইচ্ছাই পূরণ করা সম্ভব টেন্ডুলকারের পক্ষে, ‘কেন নয়? ও যদি ফিট থাকে, নিজের শরীরের দেখভাল করে, তাহলে রান সে পেতেই থাকবে। শুধু নিজের ফিটনেসের দিকে ওকে নজর রাখতে হবে। তা হলে ও দলের জন্য সম্পদ হয়েই থাকবে।’
বয়সে মাত্র সাত মাসের বড় সৌরভ। টেন্ডুলকার যদি খেলে যেতে পারেন, তাহলে তাঁর একসময়ের জুটি সৌরভ কেন অবসর নিয়ে নিলেন? ‘হ্যাঁ, আমরা টপ-অর্ডারে জুটি বেঁধে অনেক রান করেছি। জুটিটা বেশ উপভোগও করেছি। কিন্তু অবসর যখন নিয়েই ফেলেছি, এ নিয়ে আর কোনো অনুতাপ নেই। সেও তো একটা সময়ে এসে সিদ্ধান্তটি নেবে।’
অবসরটা সৌরভের কাছে এখন স্রেফ অতীত। যেমন অতীত কলকাতা নাইট রাইডার্স দলে জন বুকানন। সম্প্রতি কেকেআরের ব্যর্থতার জন্য অস্ট্রেলীয় কোচ সৌরভের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়েছেন ক্লোজ ম্যাচগুলো জিততে না পারায়। পাল্টা জবাব কিন্তু সৌরভ দিলেন না, ‘কেকেআরে আমাদের কাছে বুকানন স্রেফ অতীত।’ ভারতের সাবেক কোচ জন রাইটের কেকেআরের কোচ হওয়ার বিরাট সম্ভাবনা। সাবেক নিউজিল্যান্ড ওপেনার নিজেও এই দায়িত্ব পেতে ভীষণ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ওয়েবসাইট।

লারা এবার কোচের ভূমিকায়?

যখন মেজাজে থাকতেন, মনে হতো ব্যাট করে যাবেন অনন্তকাল ধরে। আবার মাঝেমধ্যেই হাঁপিয়ে উঠতেন, ক্রিকেটকে মনে হতো বিরক্তিকর। অসম্ভব প্রতিভাবান কিন্তু খামখেয়ালি—এই চরিত্রের আদর্শ উদাহরণ ছিলেন যেন ব্রায়ান লারা। ক্রিকেট থেকে অবসরের পর গত বছর দুয়েক মাঠের কাছে খুব একটা ঘেঁষতে দেখা যায়নি তাঁকে। তবে জন্মভূমি যখন লড়তে নামছে বিশ্বমঞ্চে, তখন আর দূরে থাকতে পারলেন না। অক্টোবরের চ্যাম্পিয়নস লিগ ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের একমাত্র প্রতিনিধি ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর (টিঅ্যান্ডটি) কোচ হিসেবে দেখা যেতে পারে ‘প্রিন্স অব ত্রিনিদাদ’কে।
কিছুই অবশ্য চূড়ান্ত হয়নি, পুরো প্রক্রিয়াটাই রয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে টিঅ্যান্ডটি বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা যে হয়েছে, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো এক্সপ্রেস পত্রিকাকে এটা জানিয়েছেন লারা নিজেই, ‘আমাকে সরাসরি প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, তবে কোচ হওয়ার ব্যাপারে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমাদের একটা মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে যে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর ক্রিকেট ব্রায়ান লারার কাছ থেকে কী চায়। আমরা আঞ্চলিক টুর্নামেন্ট খেলতে অভ্যস্ত, এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলব। আমাদের জানতে হবে উইকেটগুলোর আচরণ কেমন হবে।’ ব্যাটসম্যান লারাকেও হয়তো এই টুর্নামেন্টে দেখা যেত, তবে নিয়মের বাধ্যবাধ্যকতায় তা আর হচ্ছে না। চ্যাম্পিয়নস লিগের বাইলজে আছে ঘরোয়া লিগে খেলা দলটিকেই খেলাতে হবে। ‘রেকর্ডের বরপুত্র’ অবশ্য কোচের ভূমিকার প্রতিও দারুণ আগ্রহী, ‘আমি আসলে এখনো নিশ্চিত নই আমার ভূমিকা কী হবে। তারা (বোর্ড) যদি মনে করে আমি দলের জন্য সম্পদ হতে পারি, তাহলে দায়িত্বটা আমি লুফে নেব।’
টেস্ট ও প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ইনিংসের মালিক লারা ১৩১ টেস্টে ৩৪ সেঞ্চুরিতে রান করেছেন ১১,৯৫৩। ২৯৯ ওয়ানডেতে রান ১০৪০৫, সেঞ্চুরি ১৯টি। ক্রিকেটে সেঞ্চুরি, ডাবল সেঞ্চুরি, ট্রিপল সেঞ্চুরি, কুয়াড্রুপল সেঞ্চুরি (৪০০ রান) ও কুইন্টাপল সেঞ্চুরির (৫০০ রান) স্বাদ পাওয়া একমাত্র ব্যাটসম্যান লারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান ঘরের মাটিতে ২০০৭ বিশ্বকাপ দিয়ে। এরপর অবশ্য তিনি কয়েকটি ম্যাচ খেলেছেন আইসিএলে। ওয়েবসাইট।

টিপাইমুখে বাঁধ -সম্মিলিত নারীসমাজের একটি প্রতিবাদী সফর by ফরিদা আখতার

ভারতের টিপাইমুখে প্রস্তাবিত যে প্রকল্প হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে বাংলাদেশে সংগত কারণেই প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। আমরা যারা নারী-আন্দোলন করি, নারীর ওপর সকল প্রকার সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাই, আমরা আজ চুপ করে থাকতে পারছি না। তাই সম্মিলিত নারীসমাজ ১১ আগস্ট ঢাকা থেকে ট্রেনযোগে সিলেট হয়ে জকিগঞ্জে ২০ জন সদস্য নিয়ে একটি প্রতিবাদী সফর করে এসেছে। আমি ওই ২০ জনের একজন ছিলাম। আজ তাই কিছু কথা বলতে চাই।
প্রথমেই বলি ঢাকায় কমলাপুর স্টেশনের কথা। আমরা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমাদের সহকর্মীরা কমলাপুর রেলস্টেশনে যে যাত্রী আসছে ও যাচ্ছে, তাদের হাতে লিফলেট ধরিয়ে দিলেন। লাল রঙের ব্যানার নিয়ে এতজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন দেখে উত্সুক জনগণ দাঁড়িয়ে গেল। কেউ এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল। যখন জানতে পারল যে আমরা সিলেট যাচ্ছি এবং জকিগঞ্জে যাব, বেশ খুশি হলো। বুঝলাম সবার মনেই উত্কণ্ঠা আছে, কিন্তু প্রতিবাদ জানানোর জায়গা সবার হয়তো নেই। তবে এমনও হয়েছে, কয়েকজন যুবক আমাদের কিছু জিজ্ঞেস না করে নিজেরাই বলছে, অ্যাই, টিপাইমুখ কী রে? অর্থাত্ তরুণরা অনেকেই হয়তো এ বিষয় জানে না কিংবা তাদের জানানোর মতো কোনো ফোরাম নেই। এ বিষয়টি আমাদের চিন্তিত করেছে। ট্রেনে ওঠার আগে আমাদের মেয়েরা অনেক স্লোগান দিল, মানুষ জড়ো হয়ে গেল এবং আমাদের প্রতি একধরনের সংহতি প্রকাশ করল। আমরা তারপর ট্রেনে উঠে গেলাম এবং ভোরে সিলেট এসে পৌঁছালাম।
সকাল থেকে বৃষ্টি। তবু আমাদের জকিগঞ্জে যেতেই হবে। তিনটি মাইক্রোবাসে করে আমরা প্রথমে অমলশিদ গেলাম। এখানে বিডিআর ক্যাম্প আছে। সিলেটে যারা আমাদের জকিগঞ্জ যেতে সহায়তা করেছে, তাদেরই পরামর্শে আমরা বরাক নদ থেকে যেটা সুরমা ও কুশিয়ারার উত্সস্থল, ঠিক সেই জায়গাটা দেখতে গিয়েছিলাম। হালকা বৃষ্টি ছিল, তবুও গাড়ি থেকে নেমে আমরা ঠিক নদীর পারে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওপারে ভারতের কাঁটা তাঁরের বেড়া দেখা যাচ্ছে। বেড়ার ঠিক পরেই নদীতে একটি জিহ্বার মতো চর জেগেছে। স্থানীয় লোকজন জানাল, এই চর ভারত দখল করে রেখেছে। সেখানে বাংলাদেশের মানুষকে যেতে দেয় না। সীমান্ত আইনি ভাষায় এটাকে ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’ বলা হচ্ছে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই। নো ম্যান্স ল্যান্ড তাহলে তো ভারতেরও নয়। তবুও ভারতই এটার ওপর দখলদারি। অদ্ভুত কাণ্ড!
জিহ্বা চরটি বেশ কিছুক্ষণ দেখলাম। সুরমা-কুশিয়ারার অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য দেখা ভুলে গিয়ে মনে হচ্ছিল এটুকু চর জাগছে তাতেই যদি আমাদের দখল নিয়ে এত সমস্যা হয়, তাহলে বরাক নদের পানি প্রবাহ বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত হলে সুরমা-কুশিয়ারার পানি কি আমাদের থাকবে? ‘জিহ্বা চর’ যেন প্রতীকী অর্থে প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের লিপসা প্রকাশ করছে। টিপাইমুখে বাঁধ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আজ আমাদের এই ছোট জিহ্বা চরের সমাধানও করে ফেলা উচিত নয় কি? কারণ, এটাই আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, আমাদের পানিসম্পদকে কেন্দ্র করে ভারতে কোনো প্রকল্প হলে সেটার ফলাফল কী হতে পারে। স্থানীয় খুব সাধারণ দু-একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করলাম—আচ্ছা, ওপারে বাঁধ হলে আপনাদের কি ভালো হবে? ‘না, কেমন করে ভালো হবে? আমাদের পানি তো থাকবে না।’ এর চেয়ে বেশি কথার প্রয়োজন নেই। বিশেষজ্ঞরাও যা বলবেন তারও সারমর্ম এই কথাই। সাধারণ মানুষের জীবনের উপলব্ধির চেয়ে বড় কথা আর কী হতে পারে?
অমলশিদ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে জকিগঞ্জ। কিন্তু যাওয়ার পথে দেখা গেল একটি ব্রিজ ভাঙা। আমাদের গাড়ি কিছুতেই যেতে পারবে না, তাই টেম্পু নিতে হলো। এতজন মহিলা একসঙ্গে কোথায় যাচ্ছে? একটু যেন কৌতূহলের বিষয় ছিল সবার মধ্যে। আমাদের সঙ্গে ফটোগ্রাফার এবং স্থানীয়ভাবে সব আয়োজন করার জন্য যে কয়েকজন পুরুষ ছিলেন, তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় কম। কাজেই মহিলারাই চোখে পড়ার মতো ছিল। আর যাকেই বলছি আমরা ঢাকা থেকে এসেছি টিপাইমুখে বাঁধের ব্যাপারে এ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করতে, সংহতি প্রকাশ করতে—তারাই আমাদের স্বাগত জানিয়েছে।
জকিগঞ্জে পৌঁছানোর পর বৃষ্টি থেমেছে, তবে যেকোনো সময় হতে পারে এমন ভাব। আমরা প্রথমে একটি ডাকবাংলোয় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় করলাম। সেখানকার স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষিকা স্কুল থেকেই চলে এলেন আমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। তাঁর প্রথম কথা ছিল—এ অঞ্চলের মানুষ টিপাইমুখে বাঁধ হোক এটা চায় না। এর ক্ষতি সম্পর্কে তারা বোঝে। তা ছাড়া ভারতের কিছু আচরণ এ অঞ্চলের মানুষকে আহত করেছে। দুই বছর আগে বিএসএফ মর্টার ছুড়ে মেরেছিল, তাতে একটি স্কুলছাত্র মারা গিয়েছিল, এ কথাটি তারা ভোলেনি। এখন ভারত আবার সুরমা-কুশিয়ারার পানি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে! স্থানীয় সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের প্রতিনিধিদের কথা ছিল একটাই—আমাদের জীববৈচিত্র্য নষ্ট হবে, এটা আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই টিপাইমুখে বাঁধ হোক, প্রকল্প যা-ই হোক, একে প্রতিহত করতেই হবে। তবে এটাও ঠিক, এ মুহূর্তে এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ নেই।
সম্মিলিত নারীসমাজের নেত্রীদের দেখে এবং টিপাইমুখে বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে জকিগঞ্জ এসেছেন এবং স্থানীয় জনগণের প্রতি সংগতি প্রকাশ করতে এসেছেন শুনে তাঁরা খুব খুশি হলেন। বললেন, এতজন নারীনেত্রী একসঙ্গে জকিগঞ্জের মানুষ দেখেনি।
সভা শেষ করে আমরা ব্যানার নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে যখন বাজারে পৌঁছালাম, অনেক মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে গেল। আমাদের পক্ষ থেকে সুলতানা আখতার রুবী বক্তব্য দিলেন। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনল, ব্যানার লেখা এবং ফেস্টুনের লেখাগুলো খুঁটিয়ে পড়ল। দোতালা বাড়িঘর, দোকানের বারান্দায় দাঁড়িয়েও লোকজন আমাদের দেখছিল। তাদের চোখে-মুখে সমর্থন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাচ্ছিল। আমরা যতবার তাদের দিকে তাকাই, মনে হচ্ছিল এরাই তো হবে প্রথম ভুক্তভোগী। তাদের কথা শোনার মানুষ কই?
জকিগঞ্জ থেকে সিলেট যেতে প্রায় ৮০ কিলোমিটার রাস্তা পার হতে হয়। দেখলাম রাস্তার দুইধারে মাঠে বিস্তর পানি, সেখানে অসংখ্য হাঁস, বক দেখলাম। অপূর্ব! মাছ ধরার জন্য জাল পেতে বসে আছে জেলে। রাস্তায় গাড়ি চালাতে গেলে ছাগল-গরুর জন্য গাড়ির গতি কমাতেই হবে। অর্থাত্ এলাকার মানুষ ছাগল-গরু পালছে। এদের খাদ্যের অভাব নেই। এসবই আছে পানি আছে বলেই। পানি না থাকলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা বলতে কিছু থাকবে না। তখন তাদের চলে আসতে হবে শহরে, ঢাকার বস্তিতে।
টিপাইমুখে বাঁধ বিদ্যুত্ প্রকল্প হবে না সেচ প্রকল্প, নাকি ড্যাম হবে সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের পানিসম্পদের ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণের বিষয়। যে প্রকল্পই হোক না কেন, আমরা পানির জন্য প্রকৃতির ওপর নয়, ভারতের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হবো। এটা কিছুতেই গ্রহণ করা যেতে পারে না। সিলেটে একটি মতবিনিময় সভা হলো, সেখানেও সবার এক কথা—এটা আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। এটাও বলা হলো, হাজার কোটি টাকা খরচ করে ভারত বাংলাদেশের উপকার করার জন্য এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে এ কথা কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে না। সিলেটের একটি রিকশাওয়ালাও বোঝে টিপাইমুখ বাঁধ কত ক্ষতি করবে। কাজেই বিশেষজ্ঞরা বললেই টিপাইমুখ বাঁধ ভালো, আর তাঁরা খারাপ বললেই খারাপ—এমন একটি অবস্থায় নিজেদের বেঁধে রাখার দরকার নেই। নিজেদের চোখ-কান খোলা রেখে জনগণের জীবন-জীবিকার বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করুন। সবই বুঝতে পারবেন। সিলেটে আন্দোলন হচ্ছে; রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সকল পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রয়োজন শুধু সমন্বিতভাবে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে আন্দোলন করার। যে কথা সবাই বলার চেষ্টা করেছে, এ আন্দোলন হওয়া উচিত জনগণের। টিপাইমুখ বাঁধের বিষয়টি দলীয়করণ করা হলে তারা জনগণের বিরুদ্ধে কাজ করবে। কারণ, এই দলাদলিতে মূল বিষয়টি হারিয়ে যাবে।
ঢাকায় বসে টিপাইমুখে বাঁধ নিয়ে লিখতে বসে সেই মানুষগুলোর চেহারা আমার চোখে ভাসছে। এরা কোনো দোষ করেনি, কিন্তু আজ যদি আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারি, তাহলে হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষকে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত করব। জাতীয় সংসদের সংসদীয় একটি দল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে ভারতে ঘুরে এসে বলেছে, তারা আশ্বস্ত হয়েছে। আমরা সম্মিলিত নারীসমাজের একটি দল অমলশিদ ও জকিগঞ্জ ঘুরে এসে বলছি, আমাদের উত্কণ্ঠা, আতঙ্ক ও উদ্বিগ্নতা আরও হাজার গুণ বেড়েছে। আবদুর রাজ্জাক যে কথা ঢাকায় বসে বলছেন, সে কথা তিনি জকিগঞ্জে ঘুরে এসে বলুন না। এখানে যেতে হেলিকপ্টার লাগবে না। সোজা গাড়িতেই যেতে পারবেন। ভারত আশ্বস্ত করেছে তাদেরই স্বার্থে, আপনার কাজটি আপনি করুন। ভারতের আশ্বাস নিয়ে নয়, জনগণের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলে দেখুন। সবচেয়ে বড় কথা, এটা আশ্বস্ত হওয়ার বিষয় নয়, জনগণকে বর্তমান ও ভবিষ্যত্ বিপদ থেকে রক্ষা করার বিষয়। আমরা বুঝেছি, সেই কাজটি ক্ষমতাসীন কোনো দল করবে না, করতে হবে আমদেরই। তাই সম্মিলিত নারীসমাজ আজ মাঠে নেমেছে।
ফরিদা আখতার: নারী আন্দোলনের নেত্রী।

জলবায়ু পরিবর্তন -কারও কারও জন্য সুখবর by মুশফিকুর রহমান

বিশ্বের উষ্ণায়নে আমরা যত উদ্বিগ্ন, পৃথিবীর সবাই নিশ্চয়ই তেমন নয়। ধরা যাক বিশাল গ্রিনল্যান্ডের কথা। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর ও উত্তর মেরু অঞ্চলের বিশাল দ্বীপদেশ গ্রিনল্যান্ড। আয়তনে ফ্রান্সের প্রায় চার গুণ কিন্তু জনসংখ্যা সব মিলিয়ে মাত্র ৫৬ হাজার। সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডে কয়েকটি সাড়াজাগানো ঘটনা ঘটেছে। ১৮৯৩ সালে এক খ্যাপা ডাচ উদ্ভিদবিদ যে চারটি পাইনগাছ গ্রিনল্যান্ডে লাগিয়েছিলেন (গ্রিনল্যান্ডের প্রাচীনতম পাইনগাছ), দীর্ঘ নিদ্রার পর সেসব পাইনশীর্ষে নতুন সবুজ কুঁড়ি ফুটে বেরোচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের মানুষের দৃষ্টিতে এ যেন পাইনগুলোর নতুন জীবনলাভ। বিষয়টি বুঝতে বিবেচনায় নিতে হবে যে গ্রিনল্যান্ডে পাইনজাতীয় বৃক্ষের সাকল্যে মাত্র নয়টি লাগানো বন রয়েছে। আলুসহ আমদানি করা সবজি ছাড়া গ্রিনল্যান্ডবাসীর সবুজ সতেজ সবজি খাওয়ার অভিজ্ঞতা তেমন হয় না। কিন্তু পৃথিবী উষ্ণ হয়ে ওঠায় সচরাচর সবজির খামারগুলোও বদলে যেতে শুরু করেছে। সম্প্রতি স্থানীয়ভাবে চাষ করা আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি দোকানে এই প্রথম বিক্রির জন্য এসেছে। আটটি কৃষিখামার বাণিজ্যিকভাবে আলুর চাষ শুরু করেছে। পাঁচটি খামার অন্যান্য সবজির চাষে হাত দিয়েছে। কেউ কেউ বাড়ির সংলগ্ন বাগানে অল্প কিছু স্ট্রবেরি ফলাতে পেরে ভীষণ খুশি।
কেনেথ হোয়েগ নামের মুখ্য কৃষি উপদেষ্টা আশাবাদ প্রকাশ করেছেন যে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল যেহেতু উষ্ণ হয়ে উঠছে, সুতরাং সে অঞ্চল সবজির ক্ষেত ও সবুজ বনে ভরে না ওঠার কোনো কারণ তিনি দেখেন না। গ্রিনল্যান্ডের ৮০ শতাংশ জায়গাজুড়েই পুরু সাদা বরফের আচ্ছাদন। সেখানে সামান্য কয়েক ধররের কৃষিখামার বা সবুজ সবজির ক্ষেত বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিতবহ। কেবল পুরোনো পাইনগাছে নতুন কুঁড়ি ফোটার অভাবিত ঘটনাই নয়, গ্রিনল্যান্ডের সন্নিহিত সাগরে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পানির কড মাছের আনাগোনাও চোখে পড়ছে। ১০ বছর আগেও সেখানে মধ্য মে থেকে মধ্য সেপ্টেম্বরের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ সময়কাল এখন প্রায় তিন সপ্তাহ প্রলম্বিত হয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের ৫১টি ভেড়ার খামারের মালিক খুশি—তাঁদের ভেড়াগুলো মাঠে কয়েক দিন বেশি সময় চড়তে পারছে।
শিকারের অভাবে গত ১০ বছরে আট হাজার শিকারির মধ্যে টিকে থাকা মাত্র দুই হাজার গ্রিনল্যান্ডীয় শিকারি খুবই উদ্বিগ্ন—তাদের শিকারগুলো ক্রমেই দুর্গম মেরু অঞ্চলে সরে যাচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণে কৃষির সম্ভাবনার চিহ্নগুলো তাদের জন্য বিরাট পাওয়া বৈকি।
কেবল গ্রিনল্যান্ড একা নয়, কানাডা, রাশিয়াসহ উত্তরের অনেক দেশেই এখন অনেক নতুন সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। দীর্ঘ সমুদ্রপথ সংক্ষিপ্ত করে রুশ নাবিকেরা উত্তর মেরু দিয়ে জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের ভ্রমণের সম্ভাবনা সক্রিয়ভাবেই বিবেচনা করছেন।
গ্রিনল্যান্ডের অর্থ ও পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী অ্যালেকা হ্যামন্ড কৃষিতে স্বনির্ভরতার স্বপ্নই কেবল দেখেননি; বরফ গলে যাওয়া দ্রুততর হওয়ায় ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ডে জলবিদ্যুত্ উত্পাদন, তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আহরণের বর্ধিত সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। এরই মধ্যে গ্রিনল্যান্ড মার্কিন কোম্পানি অ্যালকোয়ার সঙ্গে এক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এই সমঝোতার অধীনে অ্যালকোয়া সেখানে অ্যালুমিনিয়াম উত্পাদন কারখানা স্থাপন করবে এবং গ্রিনল্যান্ডের বিশাল জলসম্পদ ব্যবহার করবে। মন্ত্রী আশাবাদী, আবহাওয়ার উষ্ণায়নে যে নতুন সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে, তাতে বরফের দেশ গ্রিনল্যান্ডে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়বে এবং ডেনমার্কের বার্ষিক ৬০০ মিলিয়ন ডলারের (গ্রিনল্যান্ডের বার্ষিক বাজেটের অর্ধেক) সাহায্যের ওপর নির্ভরতা কমবে।
কেবল গ্রিনল্যান্ড একাই নয়, বিশ্বের উষ্ণায়নে মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থানের দেশগুলোতেও কৃষির জন্য ইতিবাচক পরিবেশ বাড়বে। কেউ কেউ তো বরফঢাকা দেশগুলোকে অবকাশযাপনকেন্দ্রের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠার ভাবনায় বেশ আমোদিত হয়ে উঠছেন। উত্তরের বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল মঙ্গোলিয়া, কানাডা ও উত্তর ইউরোপের দেশগুলো সেই সুদিনের জন্য এখন থেকেই বিভিন্ন পরিকল্পনা তৈরি করছে।
কিন্তু পৃথিবী উষ্ণ হয়ে উঠলে সমগ্র পরিবেশে যে পরিবর্তনগুলো অবধারিত হয়ে উঠবে, তা পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হবে। বিজ্ঞানীদের অনেকে স্পষ্টই মনে করেন, অল্প কিছু মানুষের জন্য অর্থনৈতিক লাভ বয়ে আনলেও বৃৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্যই তা হবে বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে ২০৩০ নাগাদ পৃথিবীর উষ্ণায়নের ফলে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করবে। এরই মধ্যে বিশ্বের উষ্ণায়ন ৩২৫ মিলিয়ন মানুষের জীবনে মারাত্মক প্রভাব স্পষ্ট করছে। আগামী ২০ বছরে পৃথিবীর প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ মানবিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কেবল বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত প্রভাবে। সূত্র মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরে প্রায় ৩৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হবে।
আগামী ডিসেম্বরে কোপেনহেগেনে জলবায়ু নিয়ে বিশ্ব সম্মেলন হবে। সেখানে বর্তমান সময়ে মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রজ্ঞানির্ভর চুক্তিতে উপনীত হতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষের আশা যে প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় রেখে কার্যকর, ন্যায়সংগত ও মেনে চলার বাধ্যবাধকতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, যাতে এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষ এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জনগোষ্ঠীর গরিব অঞ্চলগুলোর স্বার্থ সংরক্ষিত হয়।
বর্তমানে যতটা ধারণা করা সম্ভব তা থেকে দেখা যায়, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বছরে অন্তত ৭০ মিলিয়ন মানুষ বন্যায়, আট মিলিয়ন মানুষ খরায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তা ছাড়া দেশের আট শতাংশ নিম্নাঞ্চল স্থানীয়ভাবে জলমগ্ন হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধিতে উপকূল ও প্লাবনভূমি অঞ্চলের আরও ব্যাপক অঞ্চল আংশিক ও দীর্ঘ বন্যার কবলে ডুবে থাকবে। আবহাওয়ার এলোমেলো আচরণ আরও স্পষ্ট হবে এবং ব্যাপক অঞ্চলে লবণাক্ত জলের প্রকোপ বাড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিতে বাংলাদেশে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, বনাঞ্চলের দ্রুত সংকোচন ও পানীয় জলের ব্যাপক সংকট মোকাবিলায় যে বিপুল সম্পদের দরকার হবে, তা বিবেচনায় নিলেই বোঝা যায়, বিশ্বে এ সংকট মোকাবিলায় কত বিলিয়ন ডলার বাড়তি সম্পদের সংস্থান প্রয়োজন। চাইলেই তা যথেষ্ট পাওয়া যাবে না এবং আবার ঠিক সবার ভাগ্যে তা ন্যায্য হিস্যা হিসেবে আপনা থেকেই আসবে না। এ জন্য যেমন দেশের ভেতরে হোমওয়ার্ক, লক্ষ্যনির্দিষ্ট মানসম্মত গবেষণা প্রয়োজন; একইভাবে বিশ্বপরিসরে কূটনৈতিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার নেগোসিয়েশনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। তাহলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন আলোচনার অধীনে বিভিন্ন সহায়তা ও দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক আলোচনা বৈঠকগুলোতে জাতির প্রয়োজনের প্রতিশ্রুতিগুলো আদায় করা সম্ভব হবে।
মুশফিকুর রহমান: খনি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিষয়ক লেখক।

ন্যায় ও ইতিহাস -দুনিয়ার এ কী হলো by এদুয়ার্দো গালিয়ানো

কিছু প্রশ্ন আমার মাথার মধ্যে মাছির মতো ভনভন করছে, সেগুলো নিয়ে আপনাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করতে চাই। দুনিয়া থেকে কি ন্যায়বিচার উধাও হয়ে গেছে?
জর্জ বুশের দিকে জুতা ছুড়ে মেরেছিল ইরাকের যে সাহসী লোকটি তার তিন বছরের কারাবাসের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু তাঁকে একটি মেডেল উপহার দেওয়াই কি উচিত ছিল না? কে সন্ত্রাসী—জুতা নিক্ষেপকারী, নাকি যার গায়ে তা লেগেছে সে? সেই পেশাদার খুনিই কি আসল সন্ত্রাসী নয় যে মিথ্যা অজুহাতে ইরাকে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, ভয়াবহ গণহত্যা করেছে এবং আইন পাস করে নির্যাতনের হুকুম দিয়েছে?
কে অপরাধী—মেক্সিকোর আতেনকো, চিলির মাপুচে, গুয়াতেমালার কেকচি আদিবাসী আর ব্রাজিলের ভূমিহীনেরা? নিজেদের জমির হক প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করার অপরাধে যাদের সন্ত্রাসবাদী বলে দোষা হচ্ছে? যদি মাটি পবিত্র হয়ে থাকে তবে আইন যা বলে বলুক, সেই ভূমিপুত্ররাও পবিত্র নয় কি?
মার্কিন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের চোখে সোমালিয়া হলো বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। কে আসল জলদস্যু? সেসব ক্ষুধার্ত মানুষ, যারা জাহাজে হামলা চালায় তারা? নাকি বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে এক আক্রমণে দুনিয়াকে দেউলিয়া করে দেওয়া ওয়ালস্ট্রিটের ফটকাবাজরা? আজ তাদেরই দেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ! এসব ব্যাংকডাকাতদের কেন এত বড় ইনাম দেওয়া হচ্ছে? ন্যায়বিচারের দেবী কি তাহলে একচোখা? বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী করপোরেশন ওয়াল মার্ট ট্রেড ইউনিয়নকে নিষিদ্ধ করেছে। ম্যাগডোনাল্ডও তা-ই। কীভাবে এসব কোম্পানি আইনের পরোয়া না করে যা খুশি তা করে যেতে পারে? কারণ, আজকের দুনিয়ায় কাজের থেকে অকাজের দাম বেশি, আবর্জনার থেকে কম দাম শ্রমিকের অধিকারের।
কে তাহলে সত্ আর কে খলনায়ক? আন্তর্জাতিক আইন যদি থাকবেই, তাহলে কেন শক্তিমানদের কৃতকর্মের কোনো বিচার কখনো হয় না? মানুষ হত্যায় সেরা কসাইদের কেন কখনো জেলে পোরা হয় না। এর কারণ হলো, জেলখানার চাবি যে তাদেরই হাতে!
জাতিসংঘে কিসের জোরে পাঁচটি রাষ্ট্রের ভেটো-ক্ষমতা অলঙ্ঘনীয়? তাদের এই ক্ষমতা কি ঈশ্বরের দান? যুদ্ধ যাদের ব্যবসা, তাদের হাতে কি আপনি শান্তিরক্ষার ভার দেবেন? বিশ্বের সর্বোচ্চ অস্ত্র বানানো দেশগুলোর হাতেই থাকবে বিশ্বশান্তির দায়িত্ব, এটা কেমন বিধান? যারা মাদক চোরাচালানের হোতা, তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে আমরা সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধাচরণ করি?
দুনিয়ার স্বেচ্ছাচারী মোড়লেরা যখন এতই হত্যাপ্রেমী, তখন কেন আমরা প্রার্থনা করি তারা যাতে সামাজিক অবিচার ছেড়ে ভালো হয়ে যায়? এটা কি সেই দুনিয়া নয়, যেখানে প্রতি মিনিটে সামরিক খাতে ২১০ কোটি টাকা নষ্ট হয় অথচ সামান্য অসুখে বা না খেয়ে প্রতি মিনিটে মারা যায় ১৫টি শিশু? কার বিরুদ্ধে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অস্ত্র শাণ দিয়ে চলেছে? তাদের নিশানায় কী: মানুষের দারিদ্র্য, না দরিদ্র মানুষ?
যারা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে মাতম করতে ওস্তাদ, তারা কেন বাজারিপনার বিরুদ্ধে তাদের মনের ঝাল মেটায় না, যে বাজারি মূল্যবোধ প্রতিমুহূর্তে জননিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করছে? একটানা বর্ষিত হওয়া বোমার মতো বিজ্ঞাপনগুলো কি মানুষকে অপরাধী হতে ডাক দেয় না? এই বোমাবর্ষণের শব্দে কোটি কোটি বেকার বা সামান্য মজুরি পাওয়া তরুণরা আর কিছু শুনতে পারে না। তাদের শেখানো হয় এই মিথ্যা যে, ‘কিছু একটা হওয়া=কিছু একটা পাওয়া’। শেখায় গাড়ি বা ব্র্যান্ডের জুতার মালিক হওয়াই জীবনের একমাত্র মানে। তারা বলতে থাকে, কেন কেন কেন, না কিনলে তুমি তো কিছুই না। তাই কি? মানুষ মানে কি তাহলে জুতা, গাড়ি, ব্র্যান্ড; আমি নিজে কি তাহলে কিছুই না, নাথিং?
হত্যাকারীর পাশাপাশি কেন হত্যাকাণ্ডেরই মৃত্যুদণ্ড হয় না? আজকের দুনিয়ার সব আয়োজনই তো হত্যার জন্য সংগঠিত। অস্ত্র কোম্পানি ও মিলিটারি-চক্র হত্যার কারখানা বসিয়ে রেখেছে। সত্য নয় কি যে এর জন্যই আমাদের যাবতীয় সম্পদ ও শক্তির বেশির ভাগই খরচ হয়ে যাচ্ছে? তারপরও দুনিয়ার প্রভুরা কেবল অন্যের সন্ত্রাসকেই নিন্দা জানায়, কিন্তু নিজেরা করলে নাম হয় ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’। আর কি বিশ্বাস করা যায় যে মানুষ আশাবাদী প্রাণী? বিশ্বে আমরাই একমাত্র জীব যারা ঠান্ডা মাথায় বিনা প্রয়োজনে অন্য মানুষকে হত্যা করেও খুশি থাকি। আমরা এমন ধ্বংসশক্তি অর্জন করেছি বানিয়েছি এমন প্রযুক্তি, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আমাদের এই সাধের গ্রহটি সব অধিবাসীসমেত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে!
ভয় জাগিয়ে রেখেই টিকে আছে এই প্রযুক্তি। শত্রুর ভয়ের জুজু দেখিয়েই সেনা ও পুলিশের নামে বিপুল সম্পদ ওড়ানো হয়। কেন আমরা এই ভয়ের রাজত্বকে চিরবিদায় দিতে পারি না? এভাবেই পেশাদার আতঙ্কবাজদের অপশাসন থেকে বেরিয়ে আসার যোগ্যতা হবে আমাদের। এই ভয়ের বীজ বপনকারীরা আমাদের ছুড়ে ফেলে একাকিত্বের মধ্যে। এক জাতি অন্য জাতিকে, এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে ভয় করতে করতে একা হয়ে যায়। তারা শেখায় এই দুনিয়া হলো কুকুর কুকুরের মাংস খাওয়া দুনিয়া। শেখায় যে প্রতিবেশীর কাছ থেকেই নাকি আসবে বিপদ। দিনরাত সতর্ক করে যে বাচ্চার দোলনার নিচেই নাকি রয়েছে ‘জঙ্গি-বোমা’। বলে, ওই তরুণটি দেখতে নিরীহ হলেও কিন্তু সন্ত্রাসী, ওই ভালো মানুষ প্রতিবেশিনী নাকি নিশ্চিতভাবে আমার মধ্যে সোয়াইন ফ্লুর ভাইরাস ঢুকিয়ে দেবে।
এই ওল্টানো দুনিয়ায় অতি সাধারণ ভালো কাজকেও ভয়ঙ্কর বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। যখন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস তাঁর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসীদের লজ্জার হাত থেকে, বঞ্চনার হাত থেকে বাঁচাতে দেশ পুনর্গঠনে নামলেন, সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি করা হলো চরমাতঙ্ক। যারা বর্ণবাদী, যারা বংশপরম্পরায় মনে করে দেশের সহায়-সম্পদ কেবল তাদেরই জন্য, তাদের অবশ্যই আতঙ্কিত হওয়ার আছে। যখন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট কোরেয়া তাঁর দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অবৈধ ঋণ শোধ করতে অস্বীকার করলেন, সুদি প্রতিষ্ঠানগুলো কেঁপে উঠল। এ রকম দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য ইকুয়েডরকে চরম শাস্তি দেওয়া হবে বলে শাঁসানোও হলো। যখন আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও লুটেরা রাজনীতিবিদদের সর্বদাই প্রশ্রয় দিয়ে যায়, যখন তাদের শাসন টেকানোর জন্য জনগণের নামে ঋণ নেওয়া হয়, তখনই কি আমরা সেই চরম শাস্তি বরণ করে নিইনি? তখনই কি ঠিক হয়নি যে, ধনীদের ভোগবিলাস চালানোয় ঋণের জোয়াল টানবে সাধারণ মানুষ? এই ঋণ যে অবৈধ, তা কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়।
কাণ্ডজ্ঞান আর ন্যায়বিচার পরস্পর সম্পর্কিত। কাণ্ডজ্ঞান বলে, যে দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি মাদকাসক্ত, সেই দেশের কী অধিকার রয়েছে অন্য দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর?
আজ অনেকেরই মন খারাপ। কারণ আর্থিক মন্দার কারণে গাড়ি বিক্রি কমে গেছে। কারও যদি সামান্য কাণ্ডজ্ঞান থাকে তো তিনি বুঝবেন এটা একটা খুশির খবর। কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন যে গাড়ির সংখ্যা কমা মানে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার কম হওয়া, পৃথিবীর ধমনিতে কিছুটা কম বিষ মিশ্রিত হওয়া। অস্বীকার করা অসম্ভব যে এর ফলে পায়ে হাঁটা মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং তারা আরও বেশি দিন বাঁচবে।
লুইস ক্যারলের এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের কাহিনীতে রানি অ্যালিসকে বোঝান যে আয়নামহলের রূপকথার রাজ্যে ন্যায়বিচার আছে:
‘সেখানে রাজদূত আছেন একজন। শাস্তি হিসেবে তিনি এখন কয়েদখানায় বন্দী: তবে বিচার শুরু হবে আগামী বুধবারে: এবং এটা নিশ্চিত যে সবার শেষেই হবে অপরাধের বিচার।’
এল সালভাদরের প্রধান পুরোহিত অস্কার আর্নুলফো রোমেরো দেখলেন যে আইন হলো সাপের মতো, কেবল খালি পায়ের মানুষদেরই কামড়ায়। তিনি মারা যান গুলিতে আহত হয়ে। তাঁর অপরাধ একটাই; তিনি বলেছিলেন, তাঁর দেশে গরিবেরা আজন্ম বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের শিকার।
সেই এল সালভাদরে এখন গরিবদের দল ক্ষমতায়। এক দিক থেকে গত নির্বাচনের ফল আর্চবিশপ রোমেরোসহ তাঁর মতো হাজার হাজার মানুষের প্রতি জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি, যারা অবিচারের রাজ্যে নায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বিসর্জন করে লড়ে গেছে।
কখনো কখনো ইতিহাসের কাহিনী মর্মান্তিকভাবে থেমে যায়, কিন্তু ইতিহাস কখনো ফুরায় না। সে যখন বলে বিদায়, তার মানে সে বলছে: আমি আবার আসব।
(কাউন্টার পাঞ্চ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ)
এদুয়ার্দো গালিয়ানো: উরুগুয়ের সাহিত্যিক-সাংবাদিক, ল্যাটিন আমেরিকার জনপ্রিয় লেখক। তাঁর বিখ্যাত বই ওপেন ভেইনস অব ল্যাটিন আমেরিকা। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ এই বইটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে উপহার দিলে বইটি আন্তর্জাতিক বিক্রি তালিকার শীর্ষে উঠে যায়।

মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা -চালকের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ট্রাফিক-ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করতে হবে

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গত তিন দিনে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ২১ জনের। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফেনীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাস খাদে পড়ে গেলে ১৪ জন, শুক্রবার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মাইক্রোবাস-বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন এবং শনিবার দাউদকান্দিতে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। তিনটি দুর্ঘটনাই ঘটেছে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। এর আগেও এই মহাসড়কে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আমাদের চোখে পড়েনি।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার অন্যান্য দেশের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণাকেন্দ্রের হিসাবমতে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। উদ্বেগজনক এ সংখ্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা খুবই বেশি। অনেক চালক দক্ষতা অর্জন করার আগেই ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে নিয়মিত গাড়ি চালাচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বললেই চলে। প্রশিক্ষণবিহীন অদক্ষ চালক যেকোনো সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক-ব্যবস্থার গলদগুলো দূর করা জরুরি। ট্রাফিক পুলিশদের নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। হাইওয়ে পুলিশ নামমাত্র থাকলেও তাদের তত্পরতা চোখে পড়ে না। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশের তত্পরতা ও দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। হাইওয়ে পুলিশের মাধ্যমে বিভিন্ন মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তল্লাশি চৌকি বসানো দরকার। আমরা আশা করব, যোগাযোগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
বাড়তি জনসংখ্যার কারণে ক্রমাগতভাবে সড়কপথের ওপর চাপ বাড়ছে। বাড়ছে দুর্ঘটনা ও যানজট। সড়কপথের চাপ কমাতে রেল যোগাযোগকে শক্তিশালী করার দিকেও সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে পাবলিক পরীক্ষা -জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদন পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতে পারে

গত সপ্তাহে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শিক্ষাবর্ষ শেষে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে সারা দেশে একযোগে নেওয়া হবে সমাপনী পরীক্ষা। অর্থাত্ শিক্ষার্থীরা প্রথম পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি হবে দশম নয়, পঞ্চম শ্রেণীতে। গত বুধবার প্রথম আলোয় এ সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সন্দেহ নেই, সিদ্ধান্তটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এমন সিদ্ধান্তে চূড়ান্তভাবে পৌঁছার আগে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন মহলে পর্যাপ্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের প্রয়োজন ছিল। তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে আমাদের জানা নেই। তবে এই নতুন ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হবে বলে মনে হয়, যদি তা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। প্রথমত, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণমান, যা নিরূপণের ব্যবস্থা বর্তমানে অনুপস্থিত, তা নিরূপিত হতে পারে এই সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির ব্যবস্থা করা যায়, আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষার ঝক্কি-ঝামেলা দূর হবে তাতে। তা ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আরও ভালোভাবে শিক্ষাদানের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে, এই চিন্তা থেকে যে সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের মধ্য দিয়ে তাদেরও একটা মূল্যায়ন হবে; শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে নয়, আরও ভালো করার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হবে। তৃতীয়ত, বর্তমানে যে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু আছে, এর প্রয়োজন আর থাকবে না। সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই বৃত্তি দেওয়া হবে, যে ব্যবস্থা চালু আছে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। এতে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ পঞ্চম শ্রেণীর সব শিক্ষার্থীর প্রতি সমান মনোযোগ দিতে বাধ্য হবে। এখন পঞ্চম শ্রেণীর মাত্র ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়, বিদ্যালয়গুলো তাদের প্রতিই বেশি মনোযোগী থাকে, বাকি ৬০ শতাংশ, অর্থাত্ সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীই অবহেলার শিকার হয়। এ বৈষম্য দূর হবে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় সমাপনী পরীক্ষাব্যবস্থা চালু হলে।
তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ বছরই নতুন ব্যবস্থার বাস্তবায়ন শুরু করবে। এটা ইতিমধ্যে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা প্রশাসনকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। লক্ষ করার বিষয়, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশজুড়ে একযোগে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আগস্টের প্রায় মাঝামাঝি। অর্থাত্ হাতে আছে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস সময়। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষাকেন্দ্র নির্বাচন, একযোগে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফলের পদ্ধতি নির্ধারণ, তা প্রকাশ করাসহ আনুষঙ্গিক অনেক বিষয়ে যে একটি বিশদ ও সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন, তা তৈরি করা হয়নি। মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হয়েছে, নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে, সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, তিন মাসের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করা সম্ভব।
কিন্তু আমাদের সংশয়, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যেন সব লেজেগোবরে হয়ে না যায়। এত চটজলদি এই ব্যবস্থা চালু করা কতটা জরুরি এবং তা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। তা ছাড়া যুগোপযোগী করে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়া ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর নির্ধারিত হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। তাই আমাদের মনে হয়, প্রাথমিক পর্যায়ের সমাপনী পাবলিক পরীক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনে তাড়াহুড়ো না করে জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদন পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয়।