Tuesday, June 9, 2026

পাশ্চাত্যের সামরিক বাজারে তুরস্কের আধিপত্য

দুই দশকের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ফলে তুরস্ক বিদেশী অস্ত্রনির্ভর দেশ থেকে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও ড্রোন রফতানিকারকে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বাড়তি নিরাপত্তা চাহিদার সুযোগ নিয়ে তুরস্ক এখন প্রতিরক্ষা বাজারে নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করছে।

একসময় বিদেশী অস্ত্র নির্মাতাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল তুরস্ক দু’দশকের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের ড্রোনসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের একটি প্রধান রফতানিকারক দেশে রূপান্তর করেছে।

বর্তমানে দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের কিছু অংশসহ প্রায় ৪০টি দেশে অস্ত্র সরবরাহ করছে। বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত সশস্ত্র ড্রোনের প্রায় ৬৫ শতাংশই এখন জোগান দিচ্ছে দেশটি।

পাশ্চাত্যের দেশগুলো এখন নতুন করে নিজেদের সামরিক শক্তি সাজাচ্ছে। নিরাপত্তা জোটগুলো পুনর্গঠিত হচ্ছে। ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে, পাশ্চাত্যের প্রতিরক্ষা বাজারে তুরস্ক নিজের অবস্থান আরো দৃঢ় করতে চাইছে।

ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের পর তাদের নিরাপত্তা নির্ভরতা পুনর্বিবেচনা করছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। পরিবর্তিত এমন পরিস্থিতিতে অনেক ন্যাটো মিত্র তুরস্ককে কেবল তাদের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের একটি সামরিক দুর্গ হিসেবেই দেখছে না, বরং একটি সম্ভাব্য শিল্প অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করছে।

ইউক্রেনীয় বাহিনীর ব্যবহৃত উচ্চ-প্রোফাইল সশস্ত্র ড্রোনসহ তুর্কি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি ২০২১ সাল থেকে তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। গত বছর এই রফতানির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আর তুরস্কের মোট রফতানির প্রায় ৩ দশমিক৭ শতাংশই হলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি।

পাশাপাশি, এই একই সময়ে ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি প্রায় চার গুণ বেড়ে ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি বাইকার, টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ এবং আরকা ডিফেন্স ও কালের মতো ছোট সংস্থাগুলোর পরিপক্বতা প্রকাশ করে। টেকসই রাষ্ট্রীয় সমর্থন, নমনীয় সরবরাহ চেইন এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবস্থা পরিবর্তনের ইচ্ছার কারণে তুর্কি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বাজারে প্রবেশ করতে পেরেছে। এর তুলনায় পাশ্চাত্যের সরবরাহকারীরা সক্ষমতার ঘাটতির সাথে দীর্ঘ ক্রয় প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয় ক্রেতাদের।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, আগামী দু’বছরে তারা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা তাদের ঋণ পরিশোধ এবং আরো উন্নয়নের জন্য অর্থ জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব তৈরি করবে।

উত্তরে ইউক্রেন এবং দক্ষিণ-পূর্বে ইরানের মতো দুটি বড় সঙ্ঘাতের মাঝখানে থাকা তুরস্কের নিজস্ব নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। তাদের বিমান প্রতিরক্ষা, জেট এবং ট্যাংকের ইঞ্জিনের ঘাটতিগুলো বাণিজ্য ও প্রযুক্তি চুক্তির মাধ্যমে পূরণ করা যেতে পারে।

সূত্র : জেরুসালেম পোস্ট

তুরস্কে তৈরি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইলদিরিমহানের পাশে দেশটির পরিবহন ও অবকাঠামো মন্ত্রী আবদুলকাদির উরালোগলু
তুরস্কে তৈরি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইলদিরিমহানের পাশে দেশটির পরিবহন ও অবকাঠামো মন্ত্রী আবদুলকাদির উরালোগলু। সংগৃহীত

ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ভয়াবহ নির্যাতন

ইসরাইলের বিভিন্ন কারাগারে আটক ফিলিস্তিনিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

ইসরাইলি কারাগারে এমন নির্যাতনের শিকার হওয়া মুহাম্মদ আল-বাকরি তেমনি একজন। তাকে যে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়েছিল সেই দিনটির কথা তিনি কোনোভাবেই ভুলতে পারছেন না। দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল, রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের ছুটির সময়।

বাকরি জানান, এই ঘটনার এক মাস আগে ইসরায়েলি সেনাদের হাতে তিনি গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে গাজার এই সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর, নির্যাতন, হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছিল।

আল-বাকরি বলেন, তাকে আরও সাতজন বন্দির সঙ্গে রাখা হয়েছিল। তাদের সবাইকে বিবস্ত্র করে, চোখে পট্টি বেঁধে ও হাতে হাতকড়া পরানো হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাপড় খুলে ফেলার পর ধর্ষণ করা হয়েছিল। আমরা আল্লাহ বলে চিৎকার করছিলাম, কিন্তু তারা শুধু হাসছিল আর আমাদের ভিডিও করছিল।

গাজার এই সরকারি কর্মকর্তা বলেন, বন্দিদের যৌন নির্যাতনের সময় ইসরাইলি রক্ষীরা কুকুরও ব্যবহার করত। তিনি বলেন, কুকুরগুলো কর্মকর্তাদের নির্দেশেই আমাদের আক্রমণ করছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-বাকরি তাদের মধ্যে একজন, যারা আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র ‘বডিস অব এভিডেন্স: ইসরাইল’স ডার্কেস্ট ওয়েপন’ এর জন্য নিজেদের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
এই প্রামাণ্যচিত্রে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত বলে অভিযোগ ওঠা ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো তদন্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারকদের পর্যবেক্ষণ, জাতিসংঘের বিভিন্ন অনুসন্ধান এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনের জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেস্কা আলবানেজের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি বাহিনীর যৌন সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আকার ধারণ করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

মানবাধিকার সংস্থা প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস এবং ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরসহ বিভিন্ন সংস্থা ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাক্ষ্য নথিভুক্ত করেছে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে ইসরাইলি সেনারা কুকুর ব্যবহার করে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো সহিংসতা চালিয়েছে।

ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়- এগুলো কয়েক দশক পুরোনো। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের হামলার পর গাজায় গণহত্যা যুদ্ধ শুরু করে ইসরাইল যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে।

২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইল কর্তৃক যৌন সহিংসতা, প্রজনন-সংক্রান্ত সহিংসতা এবং অন্যান্য লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ‘পদ্ধতিগত’ ব্যবহার সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ভয়াবহ নির্যাতন

২০২৫ সালে যুদ্ধে নিহত হয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্র-জড়িত সংঘাতের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা ও প্রাণহানির ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়ের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রকাশিত অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বার্ষিক ‘কনফ্লিক্ট ট্রেন্ডস’ নামের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর বিশ্বে অন্তত একটি রাষ্ট্র জড়িত ছিল এমন ৬৫টি সংঘাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাতও ৮০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এ ধরনের সংঘাত দ্বিগুণ হয়ে আটটিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষ, আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা, কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত বিরোধ, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান।

প্রতিবেদনটির গবেষক সিরি আস রুস্তাদ বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইতিবাচক কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত আমি পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা হলেও আশাবাদী দিক বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু এবার সংখ্যাগুলো সত্যিই বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল ছিল স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তৃতীয় সর্বাধিক প্রাণঘাতী বছর। গত বছর যুদ্ধ ও সংঘর্ষে সরাসরি প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৬ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বেসামরিক নাগরিকদের সরাসরি লক্ষ্য করে চালানো হামলায়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ হাজার ২০০।

বেসামরিক প্রাণহানির এই বড় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে সুদানের সংঘাতকে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে চলমান যুদ্ধে দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহরে অবরোধ ও গণহত্যার ঘটনায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর কেবল ১৯৯৪ ও ২০২১ সালে এর চেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা এবং ২০২১ সালে ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চলের যুদ্ধ সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনার জন্য দায়ী ছিল।

রুস্তাদ বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে একসঙ্গে একাধিক বড় যুদ্ধ ও সংঘাত চলতে দেখা যাচ্ছে। একটি সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শুরু হচ্ছে। বিশ্ব কোনো বিরতি পাচ্ছে না। আগের সময়ের সঙ্গে এটাই বড় পার্থক্য। এখন বৈশ্বিক সংঘাতের উচ্চমাত্রার তীব্রতা প্রায় অব্যাহতভাবে চলছে।

উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন উপসালা কনফ্লিক্ট ডাটা প্রোগ্রামের তথ্যের ভিত্তিতে পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি সংঘাতকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছে, রাষ্ট্র-জড়িত সংঘাত, অ-রাষ্ট্রীয় সংঘাত এবং বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে একতরফা সহিংসতা।

রাষ্ট্র-জড়িত সংঘাতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল ছিল আফ্রিকা, যেখানে ২৯টি সংঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর রয়েছে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা মহাদেশ ও ইউরোপ।

রুস্তাদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দেশগুলোর একটি হলো ইসরায়েল। গাজা, সিরিয়া, লেবানন, ইরান এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সংঘাতে ইসরায়েলের সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দিকেও ইঙ্গিত করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয়, বাণিজ্যিক বাধাও বেড়েছে।

রুস্তাদ বলেন, সহযোগিতার পথ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকরভাবে কাজ করছে না। বিশ্ব আরও বেশি মেরুকৃত হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

সূত্র : এএফপি 

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে ফিলিস্তিনিরা। ছবি : সংগৃহীত
গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে ফিলিস্তিনিরা। ছবি : সংগৃহীত

নতুন কিছু করার অঙ্গীকার শি-কিমের

দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেছেন শি জিনপিং ও কিম জং উন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ বৈঠকে দুই নেতা কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। আর এ জন্য নতুন সিদ্ধান্ত নিতেও তারা একমত।

মঙ্গলবার কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি জানায়, সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শি জিনপিং দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে উভয় নেতা ঘনিষ্ঠ কৌশলগত যোগাযোগ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।

কিম জং উন বলেন, চীন ও উত্তর কোরিয়ার বন্ধুত্ব বজায় রাখা তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কৌশলগত কাজ। তিনি শি জিনপিংকে সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, চলতি বছরে প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে উত্তর কোরিয়াকে বেছে নেওয়া পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি বড় ধরনের সমর্থনের বার্তা বহন করে।

বৈঠকে কিম আবারও বেইজিংয়ের এক চীন নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। এই নীতির আওতায় চীন তাইওয়ানকে তার অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়েও আলোচনা করেন দুই নেতা। উভয় পক্ষ নিজেদের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় কৌশলগত সমন্বয় আরও জোরদারের ব্যাপারে বিস্তৃত ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে কেসিএনএ।

অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, শি জিনপিং বাণিজ্য, কৃষি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে চীনের আগ্রহের কথা তুলে ধরেছেন। 

একসঙ্গে শি ও কিম। ছবি : সংগৃহীত
একসঙ্গে শি ও কিম। ছবি : সংগৃহীত

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের হীরা বিজয়ের চুক্তিপত্র by আহমদ ফাহমি

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এই চুক্তিপত্র খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এবং হীরার অধিবাসীদের মনোনীত প্রতিনিধি ও গোত্রপ্রধান আদির দুই ছেলে আদি ও আমর, আমর ইবনে আবদুল মাসিহ, ইয়াস ইবনে কাবিসা ও হাইরি ইবনে আকালের মধ্যে সম্পাদিত হলো। হীরার অধিবাসীরা এ চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন এবং উল্লিখিত প্রতিনিধিদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেদের পক্ষে ক্ষমতা অর্পণ করেছেন।

চুক্তির শর্তাবলি নিচে উল্লেখ করা হলো

১. হীরার অধিবাসীরা প্রতিবছর ১ লাখ ৯০ হাজার দিরহাম দেবেন। এ অর্থ তাদের পক্ষ থেকে পার্থিব নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিনিময়ে জিজিয়া হিসেবে আদায় করা হবে।

২. তাদের সন্ন্যাসী ও যাজকরাও এ জিজিয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকবেন; তবে যে ব্যক্তি পার্থিব সম্পদ ও উপার্জনের অধিকারী নয়, সংসার জীবন পরিত্যাগ করে ধর্মসাধনায় নিবিষ্ট রয়েছে, সে এই দায় থেকে অব্যাহতি পাবে।

৩. যে ব্যক্তি দুনিয়ায় উপার্জনে সামর্থ্যহীন এবং সংসারত্যাগী অথবা ভ্রমণরত সন্ন্যাসী হিসেবে পার্থিব জীবন বর্জন করেছে, সে জিজিয়া দিতে বাধ্য থাকবে না।

৪. মুসলিম পক্ষ তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যত দিন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে না, তত দিন তাদের ওপর এ অর্থ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কার্যকর হবে না।

৫. তবে তারা যদি কোনো কাজ বা বক্তব্যের মাধ্যমে চুক্তিভঙ্গ বা বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে তাদের প্রদত্ত নিরাপত্তা ও অঙ্গীকার (জিম্মা) বাতিল বলে গণ্য হবে এবং মুসলিম পক্ষ এই দায় থেকে মুক্ত থাকবে।

এই চুক্তিপত্র হিজরি ১২ সনের রবিউল আউয়াল মাসে লিখিত হলো এবং এর লিখিত দলিল তাদের (হীরাবাসীর) কাছে হস্তান্তর করা হলো।

(সূত্র : তারিখে তাবারি, অখণ্ড সংস্করণ, পৃষ্ঠা : ৫৪০)

আরবি থেকে অনুবাদ : আহমদ ফাহমি

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের হীরা বিজয়ের চুক্তিপত্র

নৌপ্রযুক্তিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান by মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নৌপ্রযুক্তির বিকাশ এক অনন্য মাইলফলক। সমুদ্রপথের আবিষ্কার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিস্তার, সামরিক শক্তির প্রসার এবং ভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নৌপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব জাতি সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করেছে, তারাই বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যযুগীয় মুসলিম সভ্যতা ছিল বিশ্বের অন্যতম অগ্রসর সামুদ্রিক শক্তি।

মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতা নৌপ্রযুক্তিকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় সামুদ্রিক শক্তির বিকাশেও গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষত আরব ও পারস্যের মুসলিম নাবিক, ভূগোলবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা জাহাজ নির্মাণ, সমুদ্রপথ নির্ধারণ, দিকনির্ণয় এবং মানচিত্রবিদ্যায় অসাধারণ অবদান রাখেন। তাদের উদ্ভাবিত বা উন্নতকৃত বিভিন্ন নৌযন্ত্র, যেমন চৌম্বকীয় কম্পাস, অ্যাস্ট্রোলেব ও সামুদ্রিক মানচিত্র দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রাকে নিরাপদ ও কার্যকর করে তোলে।

সমুদ্রপথে মুসলিমদের আধিপত্য

সপ্তম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী সামুদ্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। মুসলিম নাবিকরা পূর্ব আফ্রিকা, ভারত, মালয় উপদ্বীপ এবং চীন পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তাদের এই সাফল্যের পেছনে ছিল উন্নত নৌ-জ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক দিকনির্ণয় পদ্ধতি এবং দক্ষ জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি। ইতিহাসবিদ George F. Hourani তার ‘Arab Seafaring in the Indian Ocean’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন— ‘আরব নাবিকরা উন্নত নৌদক্ষতা ও দিকনির্ণয় জ্ঞানের মাধ্যমে শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।’

মুসলিম সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল উন্নত জাহাজ নির্মাণ শিল্প। আরবরা ‘ধাও’ (Dhow) নামক বিশেষ পালতোলা জাহাজ নির্মাণ করেছিল, যা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। এই জাহাজে ব্যবহৃত ত্রিভুজাকার ‘লাতিন পাল’ (Lateen Sail) জাহাজকে বাতাসের বিপরীত দিকেও চলতে সক্ষম করত। ফলে মুসলিম নাবিকরা সহজেই দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে পারতেন। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় জাহাজ প্রযুক্তিতেও এই পাল ব্যবস্থার গভীর প্রভাব পড়ে। ঐতিহাসিক লিন Lynn White Jr. বলেন— ‘আরবদের উন্নত লাতিন পাল ভূমধ্যসাগরীয় নৌচালনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।’

নৌ-দিকনির্ণয়ের ক্ষেত্রেও মুসলিমদের অবদান ছিল অসামান্য। মুসলিম নাবিকরা চৌম্বকীয় কম্পাস, নক্ষত্র মানচিত্র, অ্যাস্ট্রোলেব এবং সামুদ্রিক চার্ট ব্যবহার করে সমুদ্রপথ নির্ধারণ করতেন। বিশেষত অ্যাস্ট্রোলেবের উন্নয়নে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই যন্ত্রের মাধ্যমে সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করে সমুদ্রযাত্রার দিক নির্ধারণ করা সম্ভব হতো। মুসলিম নাবিকরা রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করে অক্ষাংশ নির্ধারণে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, যা সে সময়ের জন্য অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

মানচিত্রবিদ্যা ও ভূগোলচর্চা

মুসলিম ভূগোলবিদ ও মানচিত্রবিদদের অবদানও নৌপ্রযুক্তির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল-ইদ্রিসি, ইবনে মাজিদ, আল-বিরুনি এবং ইয়াকুত আল-হামাভির মতো মুসলিম পণ্ডিতরা সমুদ্রপথ, উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপ, বন্দর ও বাণিজ্যিক রুটসমূহের বিস্তারিত বিবরণ-সংবলিত মানচিত্র ও দিকনির্দেশিকা তৈরি করেছিলেন। তাদের রচিত গ্রন্থসমূহ শুধু ভৌগোলিক তথ্যের ভান্ডারই ছিল না; বরং তা নাবিকদের জন্য কার্যকর নৌ-নির্দেশিকা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

দ্বাদশ শতকে আল-ইদ্রিসি রচিত বিশ্বমানচিত্র (Tabula Rogeriana) সে সময়কার সবচেয়ে উন্নত ভূগোলভিত্তিক নৌমানচিত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। সিসিলির রাজা দ্বিতীয় রজারের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই মানচিত্রে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে চিত্রিত হয়েছিল। এতে সমুদ্রপথ, নদী, পর্বত, বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর যে নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায়, তা মধ্যযুগীয় ভূগোলবিদ্যার এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।

সামরিক নৌশক্তি ও সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ

মুসলিমদের নৌপ্রযুক্তিগত উৎকর্ষ শুধু বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সামরিক ক্ষেত্রেও এর ব্যাপক প্রভাব ছিল। আব্বাসীয় ও ফাতেমীয় খিলাফতের সময়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে ওঠে, যা ভূমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন শক্তির মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুসলিম নৌবাহিনী উন্নত যুদ্ধজাহাজ, অগ্নিনিক্ষেপকারী অস্ত্র এবং কৌশলগত সমুদ্রঘাঁটি ব্যবহার করত। ফলে বহু শতাব্দী ধরে মুসলিমরা সমুদ্রপথে শক্তিশালী আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

বিশেষত উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে মুসলিম নৌবাহিনী শুধু প্রতিরক্ষামূলক শক্তি হিসেবেই নয়, বরং সাম্রাজ্য বিস্তার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে। সিরিয়া, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার উপকূলে বৃহৎ নৌঘাঁটি নির্মাণ করা হয়, যেখানে যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত, অস্ত্র সংরক্ষণ এবং নৌসেনাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। মুসলিম শাসকরা বুঝতে পেরেছিলেন, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। তাই তারা নৌবাহিনীকে রাষ্ট্রশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত করেন।

ইউরোপীয় নৌ-অভিযানে মুসলিম প্রভাব

ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও সামুদ্রিক অভিযানের পেছনেও মুসলিম নৌপ্রযুক্তির গভীর প্রভাব ছিল। ক্রুসেড, আন্দালুসিয়া ও সিসিলির মাধ্যমে ইউরোপীয়রা মুসলিমদের কাছ থেকে জাহাজ নির্মাণ, মানচিত্রবিদ্যা, কম্পাস ব্যবহার এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক নৌ-দিকনির্ণয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। পরবর্তীকালে ভাস্কো দা গামা ও কলম্বাসের মতো ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, তার অনেকাংশই মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছেছিল।

নৌপ্রযুক্তির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, মুসলিম সভ্যতা শুধু সমুদ্রযাত্রায় দক্ষ ছিল না; বরং তারা নৌপ্রযুক্তিকে বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল। জাহাজ নির্মাণ, চৌম্বকীয় কম্পাসের ব্যবহার, জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক দিকনির্ণয়, মানচিত্রবিদ্যা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে মুসলিমদের অবদান ছিল যুগান্তকারী। তাদের উদ্ভাবিত ও উন্নতকৃত প্রযুক্তি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা নিরাপদ, নির্ভুল ও কার্যকর করে তোলে। বিশেষত আরব ও পারস্যের নাবিকরা ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যে নৌ-জ্ঞান ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা মধ্যযুগীয় বিশ্বের সামুদ্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নৌপ্রযুক্তিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান

খলিফা আবু বকরের শাসনকালে পারস্যের হীরা নগরী বিজয় by মাহমুদ আহমাদ

উল্লাইসের যুদ্ধ শেষ করে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ আমগেশিয়ার দিকে অগ্রসর হলেন। তার আকস্মিক আগমনের কারণে সেখানকার অধিবাসীরা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেল না। তারা নগরী ত্যাগ করে সাওয়াদে (ইরাকের উর্বর কৃষি-অঞ্চল) ছড়িয়ে পড়ল। সে সময় থেকেই তাদের আখক্ষেত ও বাগানগুলো সাওয়াদের কৃষিভূমির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

খালেদ আমগেশিয়া এবং তার আওতাভুক্ত সব স্থাপনা ধ্বংস করার নির্দেশ দিলেন। আমগেশিয়া হীরার মতোই একটি সমৃদ্ধ নগর ছিল। ফুরাত বাদাকলির (ফোরাতের শাখা নদী বা বাদাকলি খাল) একটি শাখা এসে এখানে শেষ হয়েছে। উল্লাইস ছিল আমগেশিয়ার একটি সীমান্ত প্রতিরক্ষাকেন্দ্র। মুসলমানরা সেখানে বিপুল গনিমত লাভ করল। এত পরিমাণ সম্পদ তারা আগে কখনো পায়নি।

জাতুস-সালাসিল থেকে আমগেশিয়া পর্যন্ত যত অভিযানে মুসলমানরা অংশ নিয়েছে, তার মধ্যে আমগেশিয়ার প্রাপ্ত গনিমতের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদত্ত পুরস্কারের বাইরেও প্রতিজন অশ্বারোহী যোদ্ধা ১ হাজার ৫০০ দিরহাম পেয়েছিল।

আমগেশিয়া বিজয়ের সংবাদ মদিনায় পৌঁছালে খলিফা আবু বকর (রা.) কুরাইশদের উদ্দেশে বলেছিলেন—‘কুরাইশগোত্রের লোকরা শোনো! তোমাদের বীর সিংহ আরেক সিংহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং তার গুহায় তাকে পরাস্ত করেছে। নারীরা কি আর খালিদের মতো কাউকে জন্ম দিতে পারবে?’

ফোরাত বাদাকলির মোহনা অবরোধ

কিসরার যুগ থেকে আজাজবে ছিলেন হীরার মারজুবান (সীমান্তপ্রধান)। সেকালে সম্রাটের অনুমতি ছাড়া কোনো সীমান্তপ্রধান অন্যকে সাহায্য করতে পারতেন না। তিনি উচ্চমর্যাদার অধিকারী ছিলেন; তার টুপির মূল্যই ছিল ৫০ হাজার দিরহাম।

খালেদ ইবনে ওয়ালিদ যখন আমগেশিয়া ধ্বংস করে ফেললেন। সেখানকার অধিবাসীরা গ্রামাঞ্চলের দেহকানদের (স্থানীয় ভূস্বামী বা জমিদার) কাছে আশ্রয় নিল। আজাজবে তখন বুঝতে পারলেন, তাকেও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাই তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।

আজাজবে অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে ছেলেকে পাঠালেন, তারপর নিজেও বের হয়ে হীরার বাইরে শিবির স্থাপন করলেন। তিনি ছেলেকে ফোরাত নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

অন্যদিকে খালেদ ইবনে ওয়ালিদও আমগেশিয়া থেকে হীরার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। গনিমত ও ভারী মালপত্র নৌকায় বোঝাই করে নদীপথে পাঠালেন। সামনে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ দেখা গেল, পানিস্বল্পতার কারণে নৌকাগুলো আটকে যাচ্ছে। এতে মুসলমানরা বিচলিত হয়ে পড়লেন। নৌকার মাঝিরা বললেন—‘পারসিকরা নদীর গতিপথ বদলে দিয়েছে। পানি অন্য পথে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর মুখ আবার খুলে দেওয়া না হলে এখানে পানি আসবে না।’

মুসলিম সেনাপতি অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে দ্রুত আজাজবের ছেলের মোকাবিলা করার জন্য এগিয়ে গেলেন। আতিক নদীর মোহনায় তার অশ্বারোহী বাহিনীর একাংশ শত্রুদের মুখোমুখি হলো। আজাজবের সৈন্যরা তখন সম্পূর্ণ নির্ভার ছিল; এমন সময়ে মুসলিমদের আকস্মিক আক্রমণের কথা তারা কল্পনাও করেনি। মুসলিম সেনাবাহিনী সেখানে তাদের পরাজিত করলেন। তারপর বিলম্ব না করে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। সংবাদ পৌঁছার আগেই তারা আজাজবের ছেলে ও তার সৈন্যদের কাছে ফোরাত বাদাকলির মোহনায় উপস্থিত হলেন। সেখানে দুই বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হলো। পারসিক বাহিনী পরাজিত হলো। এরপর নদীর বাঁধ খুলে দেওয়া হলো এবং পানি ফোরাত দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করল।

হীরা শহর অবরোধ

ফোরাত মোহনায় আজাজবের ছেলেকে পরাজিত করার পর খালেদ হীরার দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি বিচ্ছিন্ন বাহিনীকে সমবেত করলেন এবং খাওয়ারনাক ও নাজাফের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নিলেন।

খালেদ যখন খাওয়ারনাকে পৌঁছালেন, তার আগেই আজাজবে যুদ্ধ না করে ফোরাত পার হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তার এই পলায়নের প্রধান কারণ ছিল (পারস্য সম্রাট তৃতীয়) আরদাশীরের মৃত্যু এবং তার ছেলের পরাজয়ের সংবাদ। আলগারবিয়্যাইন ও সাদা দুর্গের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল তার শিবির।

খালেদের সৈন্যরা খাওয়ারনাকে এসে সমবেত হলো। তিনি এগিয়ে গিয়ে আজাজবের পরিত্যক্ত শিবিরে অবস্থান নিলেন। এদিকে হীরার অধিবাসীরা আত্মরক্ষার জন্য বিভিন্ন দুর্গে আশ্রয় নিল।

সেনাপতি খালেদ মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে শহরে প্রবেশ করলেন এবং প্রত্যেক দুর্গ অবরোধের জন্য একজন কমান্ডার নিয়োগ দিলেন। সাদা দুর্গের (আলকাসরুল আসওয়াদ) নেতা ছিলেন ইয়াস ইবনে কুবাইসা, জিরার ইবনে আজওয়ার এই দুর্গ অবরোধ করলেন। আদি ইবনে আদি ইবাদি ছিলেন আদাসিয়্যিন দুর্গের নেতা। এই দুর্গ অবরোধ করলেন জিরার ইবনে খাত্তাব। মাজিন গোত্রের দুর্গের নেতৃত্বে ছিলেন ইবনে আকালের হাতে। এই দুর্গ অবরোধ করেছিলেন জিরার ইবনে মুকাররিন। ইবনে বুকাইলা দুর্গের অবরোধ করেছিলেন মুসান্না ইবনে হারিসা। এখানকার নেতা ছিলেন আমর ইবনে আবদুল মাসিহ।

কমান্ডাররা সবাইকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং আত্মসমর্পণের জন্য এক দিনের সময় দিলেন। কিন্তু হীরাবাসী আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করল। তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় রইল। ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ল।

খালেদ ইবনে ওয়ালিদ সেনাপতিদের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনারা প্রথমে তাদের ইসলামের দাওয়াত দেবেন। যদি তারা দাওয়াত গ্রহণ করে, তাহলে ভালো। আর যদি প্রত্যাখ্যান করে, তবে তাদের এক দিনের সময় দেবেন। শত্রুকে আপনাদের অবস্থা জানার সুযোগ দেবেন না, তাহলে আপনাদের দুর্বলতার সুযোগ তারা নেওয়ার চেষ্টা করবে। বরং দ্রুত তাদের মোকাবিলা করবেন। মুসলিমদের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে বিরত রাখবেন না।’

অবকাশের সময় সমাপ্ত হওয়ার পর সর্বপ্রথম যুদ্ধ শুরু করেন জিরার ইবনে আজওয়ার, তিনি সাদা দুর্গ অবরোধের দায়িত্বে ছিলেন। (অবকাশ শেষ হওয়ার) পরদিন সকালে দুর্গের প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘তোমাদের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে : ইসলাম গ্রহণ, জিজিয়া প্রদান অথবা যুদ্ধ।’

তারা যুদ্ধকেই বেছে নিল এবং উচ্চ স্বরে চিৎকার করে বলল, ‘তোমাদের বিরুদ্ধে খাজাজিফ (মোড়ামাটির তৈরি নিক্ষেপযোগ্য গোলা) প্রস্তুত আছে!’

কমান্ডার জিরার সৈনিকদের বললেন, ‘তোমরা একটু সরে তাদের নিক্ষেপিত গোলার সীমানার বাইরে দাঁড়াও। তাতে গোলার আঘাত থেকে বাঁচতে পারবে। দেখি তারা কী বোঝাতে চায়।’

অল্পক্ষণের মধ্যেই দুর্গের দেয়ালে লোকজনে ভরে গেল। তারা ঝুড়িভর্তি খাজাজিফ নিক্ষেপ করতে লাগল। এগুলো ছিল পোড়ামাটির তৈরি গোলাকার শক্ত ঢেলা।

জিরার তখন নির্দেশ দিলেন, ‘তাদের ওপর তীর বর্ষণ করো।’ মুসলমানরা এগিয়ে গিয়ে তীর নিক্ষেপ করলে দুর্গপ্রাচীর শূন্য হয়ে গেল। এভাবে তারা আক্রমণ চালিয়ে গেলেন।

পারসিকদের সন্ধি-প্রস্তাব

অন্য সেনাপতিরাও অবরোধ করে রাখা দুর্গের বিরুদ্ধে একই কৌশল অবলম্বন করলেন। তারা আশপাশের বাড়িঘর ও ছোট ছোট আশ্রম-উপাসনালয় দখল করলেন এবং বহু লোককে হত্যা করলেন। তখন যাজক ও সন্ন্যাসীরা চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, ‘হে দুর্গবাসী! তোমাদের একগুঁয়েমির কারণেই আমরা নিহত হচ্ছি!’

অবশেষে আর কোনো উপায় না দেখে দুর্গের লোকরা মুসলিমদের ডেকে বললেন, ‘আরবের লোকরা, শোনো! তোমাদের দেওয়া তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে একটা আমরা গ্রহণ করতে রাজি। আমাদের তোমাদের নেতার কাছে নিয়ে চলো এবং যুদ্ধ বন্ধ করো।’

তখন ইয়াস ইবনে কাবিসা ভাইকে নিয়ে জিরার ইবনে আজওয়ারের কাছে এলেন। আদি ইবনে আদি ও জায়েদ ইবনে আদি গেলেন জিরার ইবনে খাত্তাবের কাছে। আর আমর ইবনে আবদুল মাসিহ ও ইবনে আকালের একজন গেলেন দিরার ইবন মুকাররিনের কাছে, অন্যজন মুসান্না ইবনে হারিসার কাছে। সবশেষে তাদের সবাইকে সেনাপতি খালেদের কাছে পাঠানো হলো। মুসলিম বাহিনী নিজ নিজ অবস্থানে অবিচল রইল।

প্রথমে সন্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করেন আমর ইবনে আবদুল মাসিহ। তিনি ইবনে বুকাইলা নামে পরিচিত ছিলেন। সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের জন্য দুর্গের নেতারা তাকে এবং তাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে একজন বিশ্বস্ত প্রতিনিধিকে খালিদের কাছে পাঠালেন। খালেদ দুর্গের সব প্রতিনিধির সঙ্গে আলাদাভাবে অন্যদের উপস্থিতি ছাড়া আলোচনা করলেন। তিনি প্রথমে আদি ও তার সঙ্গীদের দিয়ে আলোচনা শুরু করেন।

তিনি তাদের বললেন, ‘ধিক তোমাদের! তোমরা কি আরব নও? যদি আরব হও, তবে আরবদের বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগ কী? আর যদি অনারব হও, তবে ন্যায় ও ইনসাফের বিরুদ্ধে তোমাদের আপত্তি কী?’

আদি বললেন, ‘আমাদের মধ্যে কেউ বিশুদ্ধ আরব (عرب عاربة), কেউ আবার আরবায়িত আরব (عرب متعربة)।’

খালেদ বললেন, ‘তোমরা যেমন বলছো তেমন যদি হতে, তবে আমাদের বিরোধিতা করতে না এবং আমাদের দাওয়াতকে অপছন্দ করতে না।’

আদি উত্তর দিলেন, ‘আমরা যা বলছি তার প্রমাণ হলো—আরবি ভাষা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো ভাষা নেই।

খালেদ বললেন, ‘তুমি সত্য বলেছ।’

এরপর তিনি বললেন, ‘তোমাদের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে। আমাদের দ্বীনে প্রবেশ করবে। তাহলে তোমরা হিজরত করো বা নিজ ভূমিতেই অবস্থান করো, উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের ও তোমাদের অধিকার এবং দায়িত্ব সমান হয়ে যাবে। জিজিয়া দেবে। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের মোকাবিলার জন্য এমন এক জাতিকে নিয়ে এসেছি, তোমাদের জীবনকে যতটা ভালোবাসো, তার চেয়েও মৃত্যুকে তারা বেশি ভালোবাসে।’

আদি বললেন, ‘আমরা আপনাকে জিজিয়া দেব।’

খালেদ বললেন, ‘ধিক তোমাদের! কুফর হলো এক বিভ্রান্তিকর মরুভূমি। যে এ পথে চলে, সে আরবদের সবচেয়ে নির্বোধ ব্যক্তি। তার সামনে যদি দুজন পথপ্রদর্শক আসে—একজন আরব এবং অন্যজন অনারব আর সে আরবকে ছেড়ে অনারবকে অনুসরণ করে, তবে তার চেয়ে নির্বোধ আর কেউ হতে পারে না!’

অবশেষে বার্ষিক ১ লাখ ৯০ হাজার দিরহামের বিনিময়ে সন্ধিচুক্তি হলো। অন্যরাও তাদের অনুসরণ করলেন। তারা খালেদকে বিভিন্ন উপঢৌকনও দিলেন। খালেদ বিজয়ের সংবাদ এবং উপহারগুলো খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

‘তিনি খালেদকে পত্রে নির্দেশ দিলেন : ‘তারা যে উপহার-উপঢৌকন পেশ করেছে, তা তাদের জিজিয়ার হিসেবে সমন্বয় করো, যদি তা আগে থেকেই জিজিয়ার অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে। এরপর তাদের ওপর যা বাকি থাকে, তা আদায় করে নাও এবং সেই অর্থে তোমার সৈন্যদের প্রয়োজন পূরণ করো ও তাদের শক্তি বৃদ্ধি করো।’

(সূত্র : তারিখে তাবারি, অখণ্ড সংস্করণ, পৃষ্ঠা : ৫৩৮-৫৩৯)

(আরবি থেকে অনুবাদ : মাহমুদ আহমাদ)

খলিফা আবু বকরের শাসনকালে পারস্যের হীরা নগরী বিজয়

হাদি হত্যা ও সাংস্কৃতিক লড়াই by কাকন রেজা

শরীফ ওসমান হাদিকে কাল্ট বানাতে যারা চেয়েছেন, তারা হাদিবিরোধী। ইনকিলাব মঞ্চ শুধু চেয়েছে হাদি হত্যার বিচার। জাবের হাদিকে পির হিসেবে দাবি করেননি; করেননি আসাদ ও ঝুমাও। হাদির মাজার বানাতে চায়নি কেউ। হাদির কবর মানুষ জিয়ারত করতে গেছে ভালোবাসা থেকে। আজও যায় সেই ভালোবাসা থেকেই। কিন্তু হাদি হত্যার বিচার চাওয়াকে যারা ভিন্ন নাম দিতে চেয়েছে, তারা মূলত ফ্যাসিজমের শিক্ষা থেকে তা চেয়েছে। ‘তাকে একটা খারাপ নাম দিয়ে দাও’—এটাই সেই শিক্ষা। তারা হাদির খারাপ নাম দিতে চেয়েছে।

এখন অনেকে বলছেন, হাদি-ব্যবসার ইতি ঘটেছে। মানুষ এখন হাদির নামে রাস্তায় বের হচ্ছে না। এটাও সেই ফ্যাসিজমের বয়ান। ফ্যাসিজমকালে মানুষ যখন দেখত, বিচার হচ্ছে না, আটকে গেছে, তখন তারা চুপ করে থাকত; আর বিচার না হওয়ার ক্ষোভটা বুকের ভেতর পুষে রাখত। এখনো তাই। একই কারণে তারা চুপ। সেই চুপ থাকা ক্ষোভ থেকেই চব্বিশের জুলাই শেষ হয়েছিল ছত্রিশ দিনে।

কাল্টের প্রধান মন্ত্র হলো ভয়। মানুষকে ধর্মের নামে, মতবাদের নামে ও ক্ষমতার দম্ভে ভয় দেখানো, যা করেছিল ফ্যাসিজম। ফ্যাসিজমের ধর্ম ছিল ‘চেতনা’। চেতনা’র নামে মানুষকে ভীত করে রেখেছিল। ভয়টাকে দারুণভাবে অ্যামপিফ্লাই করেছিল ফ্যাসিস্টরা। সেই চেতনার খারাপ নাম ছিল ‘রাজাকার’। মানুষকে সেই নামে ডেকে তাকে হত্যাযোগ্য করে তোলা হতো এবং শারীরিক, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিকভাবে তাকে হত্যা করা হতো।

বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমও খারাপ নাম দেওয়ার কাজটা করছে। এই কাজটা করছে তারা ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশে গণমাধ্যমে দুটি গ্রুপ রয়েছে; একটার নেতৃত্বে এক ব্যবসায়ী গ্রুপ, আরেকটার নেতৃত্বেও তাই—‘কেউ কারে নাহি ছাড়ে, সমানে সমান।’ উল্টোদিকে দুটো কাল্টের মিল আবার ওই এক জায়গাতেই। তাদের কাল্টের তীর্থ সীমান্তের ওপারে। তাদের সব সাপোর্ট সেখান থেকেই। তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করলেও খারাপ নাম দেওয়ার বেলায় তারা এক গুরুর অনুসারী। একটা গ্রুপ একটু আর্টিস্টিক ওয়েতে তাদের কাজ-কারবার চালায়; আরেক গ্রুপ আর্টের ধারও ধারে না। ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ জাতীয় অবস্থা।

এদের ফ্রেমিংয়ের ধরনটা অনেকটা এ রকম—ধরেন, কেউ একজন এনজিও কিংবা এমএলএম, অর্থাৎ মাল্টি-লেভেল মার্কেটিংয়ের নামে অথবা বিদেশে পাঠানোর কথা বলে মানুষের টাকা আত্মসাৎ করল। তাকে যখন পাওনাদাররা ধরবে, তখন হবে ফ্রেমিং। সেই বাটপাড় যদি চেতনাপন্থি কেউ হন, তাহলে খবরের শিরোনাম হবে—‘ব্যবসায়ীকে আটকে চাঁদা আদায়,’ কিংবা ‘সালিশের নামে ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মব’! এই হলো ফ্রেমিং। অর্থাৎ ভালো কাজকেও ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে বিতর্কিত করা যায়। যৌক্তিক সালিশকেও, কিংবা বিক্ষোভকেও মব বানিয়ে দেওয়া যায়। এমন উদাহরণ অসংখ্য রয়েছে।

একইভাবে কালচারাল ফ্রন্ট রয়েছে কাল্টের অনুসারীদের। তারা মানুষের মৃত্যুতে কাঁদেন না, কাঁদেন গাছের মৃত্যুতে। তারা মানুষ পোড়ানোর ব্যথায় কাতর হন না, হন ভবন পোড়ানোর ব্যথায়। এমন ইতরদের দেখা পাবেন অহরহ। কালচারাল এই ফ্রন্ট মূলত স্টেজ তৈরির কাজ করে কাল্ট প্রসারে। যারা ‘চেতনা’ ছড়ানোর কাজ করেন, তারাও গণমাধ্যমের মতন ফ্রেমিং করেন। যেমন মানুষ পোড়ানোর বিষয়টিকে আড়াল করতে তারা স্টেজে হাজির করেন ভবন পোড়ানোর শোকগাথা। তারা সেই ভবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তৈরি করেন। সেই গুরুত্বকে নানা নাটকের মাধ্যমে তারা স্টেজে প্রদর্শন করেন। এমন অসংখ্য নট-নটী দৃশ্যমান এখন। এরাও অসম্ভব নির্লজ্জ। হাদি হত্যার বিচার চাওয়ার ব্যাপারে বিরোধিতাপ্রবণ এই কালচারাল কাল্ট। হাদি যাদের বলতেন, কালচারাল ফ্যাসিস্ট, তারা অগ্রগামী। হাদি ছিলেন মূলত এই কালচারাল কাল্টের জন্য বিপজ্জনক। এই কালচারাল কাল্টটি চেতনার নামে বিষ-বটিকা খাওয়াচ্ছিল জাতিকে। হাদি তাতে বাদ সেধেছিলেন। এর ফলে তাদের ক্ষোভ গিয়ে পড়েছিল হাদির ওপর। ইনকিলাব মঞ্চের ওপর রাগ সে কারণেই। কারণ ইনকিলাব মঞ্চ হলো সেই বিষ তথা ভেনমের অ্যান্টি-ভেনম।

হাদি হত্যার বিচার চাওয়ার ধরন নিয়ে অনেকের আপত্তি রয়েছে। কেউ একে বাড়াবাড়ি কিংবা রাজনৈতিক চাল বলছেন। কিন্তু হাদি হত্যার বিচার চাওয়া ইনকিলাব মঞ্চের আলাপে কোনো রাজনৈতিক চাল ধরা পড়েনি। খুব সীমিত ক্ষমতা নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চ সীমাহীন কাজ করেছে। তারা শুধু হাদি হত্যার বিচার চায়নি, আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিকে মূলধারায় প্রতিস্থাপনের কাজ করেছে। ঈদ মিছিল, ঘুড়ি উৎসব—এসবেরই ধারাবাহিকতা। যারা হাদি হত্যার বিচার প্রার্থনাকে খারাপ নাম দিতে চান, তারা কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিকে মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার কোনো পদক্ষেপই নেননি। প্রকাশ্যে তো নয়ই। তারা প্রকারান্তরে সেই কালচারাল কাল্ট তথা ফ্যাসিস্টদের আলাপেই সায় দিয়ে গেছেন নিজেদের অজান্তে। কালচারাল কাল্ট সেজন্যই অন্যের ধর্মীয় কালচারকে আমাদের মূলধারার কালচার বলে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চালিয়েছে। সেই প্রয়াস এখনো চলমান।

ঈদুল আজহা গেল। কই গত বছরের মতন আনন্দপূর্ণ ঈদ মিছিল? কোথায় সেই ঈদ উৎসবের মুখরতা? বরং উল্টো ঈদের বিরোধিতা রয়েছে মৌনস্বরে। আগে যেমন পশুহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলা হতো। ঈদ এলেই একদল পশুপ্রেমীর দেখা মিলত। যারা বনের পশু নয়, মনের পশু কোরবানির কথা বলত বিফ কাবাব খেতে খেতে, বিফ কাবাবের সঙ্গে থাকত দামি কোনো মদিরা—সেই ছাগলগুলো এবারও একই কথা বলেছে, যা গত ঈদুল আজহায় বলতে সাহস পায়নি। এখানেই হাদি প্রাসঙ্গিক; হাদির কালচারাল ফাইট প্রাসঙ্গিক। জানি, কেউ কেউ হাদিকে ঈর্ষা করেন। ঈর্ষা করার কারণ, মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা একটা তরুণ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণের তরুণ তুর্কি হয়ে উঠবেন, এটা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ঈর্ষা সেখান থেকেই। একই কারণে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল তার সমসাময়িক অন্যদের ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন।

বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবীদের সেই একই ঈর্ষাজনিত কারণে মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না অনেকেরই। সব দলেই অনেক বৃদ্ধ আছেন, যারা তরুণদের কাছে সাহসে, যুক্তিতে ও বুদ্ধিতে হেরে গিয়েও জিতে যেতে চাইছেন রাজনৈতিক চালে। এটা যে ভুল চাল, যা তারা বুঝতে পারবেন কিছুদিন পরেই। পরবর্তী সময়ে জেনারেশন জেড এবং জেনারেশন আলফা যখন দেশের ভার হাতে তুলে নেবে, তখন এই বৃদ্ধরা এবং তাদের চিন্তা সত্যিকার অর্থেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। জানি, আমাকেও এখন কেউ কেউ খারাপ নাম দিতে চাইবেন সেই ফ্যাসিস্ট কাল্টের শেখানো মতে। তারপরেও বলে যাই, এর আগেও বলেছিলাম—একটুও ভুল হয়নি, ফ্যাসিস্টদের বিদায় নিতে হয়েছে। যেভাবে ধারণা করেছিলাম, বলেছিলাম, সেভাবেই নিতে হয়েছে। আবার বলছি, লিখে রাখতে পারেন, ভীতু বৃদ্ধরা আগামী ইতিহাসের কাছে নিশ্চিত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন; হয়ে উঠবেন এ সময়ের খলনায়ক।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

হাদি হত্যা ও সাংস্কৃতিক লড়াই

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ : নৈতিক বিপর্যয় ও আত্মজিজ্ঞাসা by আবদুল লতিফ মাসুম

রামিসার বয়স ছিল মাত্র সাত। দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছোট্ট শিক্ষার্থী। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু ১৯ মের সেই সকালটি আর ১০টি সাধারণ সকালের মতো ছিল না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি ছোট্ট মেয়ের জীবন থেমে গেল নির্মমতার এক ভয়াবহ অন্ধকারে। পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পড়ে থাকা একটি ছোট্ট জুতো, উদ্বিগ্ন মায়ের বারবার দরজায় কড়া নাড়া, তারপর দরজা ভেঙে উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত মরদেহ—এসব শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো সমাজের মানবিক মুখচ্ছবিকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

রামিসা আজ আর নেই। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে, যেগুলোর উত্তর না খুঁজলে এই সমাজের ভবিষ্যৎ আরো অন্ধকার হয়ে উঠবে। কারণ এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। বরং এটি এমন এক ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতার অংশ, যেখানে শিশু, নারী ও দুর্বল মানুষ প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক কয়েক মাসের ঘটনাগুলো দেখলেই সেই ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজশাহীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, গাইবান্ধায় কিশোরীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ, পিরোজপুরে ফুল কুড়াতে যাওয়া শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতন, চুয়াডাঙ্গায় পুত্রবধূ ধর্ষণের অভিযোগ, নাটোরে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ, চট্টগ্রামে শিশু ধর্ষণচেষ্টা, হবিগঞ্জে এসএসসি পরীক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু—যেন প্রতিদিনের সংবাদে পরিণত হয়েছে মানবিক বিপর্যয়ের নতুন নতুন অধ্যায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—সমাজ ধীরে ধীরে এই সহিংসতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরো স্পষ্ট করে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে ৪ মাসেই অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৬-এ। ধর্ষণের ঘটনা এক মাসে প্রায় ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি ভাঙা শৈশব, এক মায়ের কান্না, এক বাবার অসহায়তা।

প্রশ্ন হলো—কেন এমন হচ্ছে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন সহিংসতা অনেকটা ‘প্যান্ডেমিক’ বা মহামারি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটি শুধু কিছু অপরাধীর ব্যক্তিগত বিকৃতি নয়; বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক, নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের ফল।

প্রথম এবং সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বহু বছর ধরে সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে—ক্ষমতা, অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। যখন মানুষ দেখে বড় অপরাধেরও দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার হয় না, তখন অপরাধীর মনে ভয় কমে যায়। ধীরে ধীরে সমাজে অপরাধ যেন ঝুঁকিহীন এক ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়।

বাংলাদেশের বহু আলোচিত মামলার ইতিহাস সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে। ১৯৯৫ সালের ইয়াসমিন হত্যা মামলার বিচার শেষ হতে লেগেছিল প্রায় ৯ বছর। শাজনীন তাসনিম রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার ও সাজা কার্যকর হতে সময় লেগেছে১৮ বছরের বেশি। তনু হত্যাকাণ্ডের এক দশক পেরিয়ে গেলেও বিচার এখনো ঝুলে আছে। শিশু আছিয়া হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ড হলেও আপিল প্রক্রিয়ায় তা আটকে আছে। অনেক ক্ষেত্রেই চার্জশিট দাখিল করতেই মাসের পর মাস কেটে যায়।

এই দীর্ঘসূত্রতা সমাজে ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। কারণ অপরাধীরা বুঝতে শেখে—বিচার যত দেরি হবে, ততই বাঁচার সুযোগ বাড়বে।

রামিসা হত্যাকাণ্ডে দ্রুত বিচার হওয়ায় দেশজুড়ে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়েছে। মাত্র ২০ দিনের মধ্যে তদন্ত, বিচার ও রায়—এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—প্রতিটি মামলাতেই কি একই গতি থাকবে? নাকি শুধু আলোচিত ঘটনাগুলোই দ্রুত বিচার পাবে আর বাকিগুলো আবার বছরের পর বছর ফাইলের নিচে চাপা পড়ে থাকবে?

শুধু বিচারহীনতা নয়, সামাজিক ও মানসিক অস্থিরতাও এই সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দীর্ঘদিনের হতাশা মানুষের ভেতরে জমা করছে ক্ষোভ ও অস্থিরতা। যখন সমাজে সহনশীলতা কমে যায়, তখন মানুষ ছোট ছোট বিষয়েও হিংস্র হয়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা এখন এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সহিংসতা ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সংবাদে খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন ও গণপিটুনি—এত বেশি দেখা যাচ্ছে যে মানুষের অনুভূতিশক্তি কমে যাচ্ছে। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ডিসেনসিটাইজেশন’। অর্থাৎ, বারবার সহিংসতা দেখতে দেখতে মানুষ মানসিকভাবে অসাড় হয়ে পড়ে।

আরেকটি বড় কারণ হলো নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার সংকট।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞান দিচ্ছে, কিন্তু মূল্যবোধ তৈরি করতে পারছে না। পরিবারে সন্তানদের ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের ভেতর বড় হওয়া নতুন প্রজন্মের একটি অংশ সহিংসতা, বিদ্বেষ ও বিকৃত যৌনতার নানা কনটেন্টের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। অথচ পরিবারে যৌনতা, শরীর সচেতনতা বা নিরাপদ স্পর্শ নিয়ে কোনো স্বাস্থ্যকর আলোচনা নেই।

শিশুদের শেখানো হয় বড়দের সম্মান করতে, কিন্তু শেখানো হয় না—নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হতে, অস্বস্তিকর স্পর্শের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে, কিংবা ভয় পেলেও কথা বলতে।

ফলে অপরাধীরা শিশুদের সহজ শিকার হিসেবে বেছে নেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়; বরং পরিচিত মানুষ। প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি—এমন মানুষের বিরুদ্ধেই বারবার অভিযোগ উঠছে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ‘গ্রুমিং বিহেভিয়ার’। অর্থাৎ, অপরাধী প্রথমে বিশ্বাস অর্জন করে, নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে, তারপর সেই বিশ্বাসকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

এই বাস্তবতা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। শিশু শুধু রাস্তায় নয়, অনেক সময় নিজের পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ নয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—শুধুই কঠোর শাস্তি কি সমাধান?

অনেকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, ক্রসফায়ার বা কঠোর শাস্তির দাবি তুলছেন। জনরোষের মুহূর্তে এসব দাবি আবেগের জায়গা থেকে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শাস্তি অপরিহার্য হলেও একে একমাত্র সমাধান ভাবলে ভুল হবে। কারণ অপরাধ জন্ম নেয় সমাজের গভীর অসুস্থতা থেকে। সেই অসুস্থতার চিকিৎসা না করলে শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থা।

প্রথমত, বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত, কার্যকর ও নিরপেক্ষ করতে হবে। তদন্ত থেকে আপিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং প্রশিক্ষিত তদন্ত টিম প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে আবার সন্তানদের প্রথম নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করতে হবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের খোলামেলা সম্পর্ক জরুরি। সন্তান যেন ভয় ছাড়া নিজের অভিজ্ঞতা বলতে পারে, সেই পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, স্কুলে বয়সভিত্তিক নিরাপত্তা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা দরকার। শিশুদের শেখাতে হবে—তাদের শরীর তাদের নিজের এবং ‘না’ বলার অধিকার তাদের আছে।

চতুর্থত, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তব মানবিক মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। ধর্ম যদি মানুষকে মানবিক না করে, তবে সেই ধর্মচর্চা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না।

পঞ্চমত, অনলাইনে সহিংসতা, পর্নোগ্রাফি ও বিকৃত কনটেন্টের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কারণ ডিজিটাল সহিংসতা বাস্তব সহিংসতাকেও প্রভাবিত করছে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের আবার মানুষ হতে হবে।

কারণ প্রতি ঘরে ঘরে পুলিশ দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতি ঘরে ঘরে মূল্যবোধ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রতিটি পরিবারে মানবিকতা শেখানো সম্ভব। প্রতিটি শিশুকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়া সম্ভব। প্রতিটি ছেলেকে শেখানো সম্ভব—নারী বা শিশু কোনো বস্তু নয়; তারা পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ।

রামিসার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। আইন তার কাজ করেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—এরপর কী?

পরবর্তী রামিসাকে কি আমরা রক্ষা করতে পারব?

এই প্রশ্নের উত্তর আদালত একা দিতে পারবে না। রাষ্ট্র একা দিতে পারবে না। এই উত্তর দিতে হবে পরিবারকে, সমাজকে, শিক্ষাব্যবস্থাকে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে, গণমাধ্যমকে—আমাদের সবাইকে।

কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু সেতু, উড়ালসড়ক বা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে মাপা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন মাপা হয় সেই দেশের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কতটা নিরাপদ—তা দিয়ে।

একটি সাত বছরের শিশু যদি নিরাপদে স্কুলে যেতে না পারে, যদি নিজের বাড়ির পাশেও নিরাপদ না থাকে, তবে সেই সমাজের উন্নয়ন আসলে কতটা বাস্তব?

রামিসা আর ফিরবে না। আছিয়া ফিরবে না। তনু ফিরবে না। কিন্তু তাদের মৃত্যু যদি আমাদের বিবেক না জাগায়, তবে এই সমাজ আরো অন্ধকারের দিকে যাবে।

এখন সময় এসেছে শুধু ক্ষোভ দেখানোর নয়; বদলে যাওয়ার।

কারণ রামিসা শুধু একটি পরিবারের সন্তান ছিল না। রামিসা আমাদের সবার মেয়ে।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ : নৈতিক বিপর্যয় ও আত্মজিজ্ঞাসা

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রে ব্যয় রেকর্ড বেড়েছে: গবেষণা

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যয় গত বছর রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো তাদের মজুতাগার থেকে আরও বেশি ওয়ারহেড (ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র) সক্রিয় উৎক্ষেপণব্যবস্থায় স্থানান্তর করেছে। বিশেষজ্ঞরা আজ মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন।

পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপে কাজ করা আন্তর্জাতিক জোট ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার ওয়েপনস (আইক্যান) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, গত বছর পারমাণবিক অস্ত্রধারী ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে তাদের অস্ত্রাগারের পেছনে প্রায় ১১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি।

আইক্যানের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, ‘আমরা এখন নতুন একটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারপ্রান্তে আছি।’

গতকাল সোমবার স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) পৃথক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যাপক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পারমাণবিক ঝুঁকি বাড়ছে। একই উদ্বেগ জানিয়েছে আইক্যানও।

উভয় গবেষণায় বলা হয়, বিভিন্ন দেশ তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আধুনিক করছে এবং আরও বেশি অস্ত্র মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ কারণেই ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

আইক্যানের কর্মসূচি পরিচালক ও সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনের সহলেখক সুসি স্নাইডার বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের এ সম্প্রসারণ উদ্বেগজনক। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে গেলে, আমি আতঙ্কিত।’

ঝুঁকি ও উত্থান

সিপ্রির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা কয়েক দশক ধরে কমছে। চলতি বছরের শুরুতে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৮৭–তে। তবে একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে।

সিপ্রির পরিচালক করিম হাগাগ এএফপিকে বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমলেও পারমাণবিক বিপদ ও ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে।’ তিনি বলেন, কৌশলগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়া ও পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা উদ্বেগের বড় কারণ।

সিপ্রির পূর্বাভাস, আগামী বছরগুলোয় বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আবারও বাড়তে পারে। কারণ, পুরোনো অস্ত্র ধ্বংস করার গতি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের গতি বাড়ছে।

বর্তমানে বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের প্রায় ৮৩ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে। দুই দেশের কাছে ৫ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে।

সিপ্রির হিসাব অনুযায়ী, চীন অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সম্প্রসারণ করছে। বর্তমানে দেশটির কাছে প্রায় ৬২০টি ওয়ারহেড রয়েছে।

করিম হাগাগ বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চীনকে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করছে।’

আইক্যানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পাশাপাশি ব্রিটেন, ফ্রান্স, ভারত, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তান—সব পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ তাদের অস্ত্রভান্ডারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

গত বছর এ ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বেশি ব্যয় করেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

আইক্যানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে ৬ হাজার ৯২০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ২৪০ কোটি ডলার বেশি।

ব্যয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরই রয়েছে চীন। দেশটি গত বছর প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এরপর রয়েছে ব্রিটেন, যার ব্যয় ১ হাজার ২৬০ কোটি ডলার। রাশিয়া ব্যয় করেছে প্রায় ৯৫০ কোটি ডলার।

গত পাঁচ বছরে এ ৯টি দেশ সম্মিলিতভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের পেছনে ৪৭ হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়বে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে তাকিয়ে আইক্যান বলেছে, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র আগামী শতাব্দীতেও পারমাণবিক অস্ত্রব্যবস্থা উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে। অন্য দেশগুলোও দীর্ঘস্থায়ী নতুন অস্ত্রব্যবস্থা চালু করছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত নতুন ‘সেন্টিনেল’ আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ২১০০ সালের পরও সক্রিয় থাকতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির প্লুটোনিয়াম উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বর্তমান ওয়ারহেডগুলো ২১২০ সাল পর্যন্ত কার্যকর রাখা সম্ভব হবে। এ জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে।

গবেষকদের ধারণা, শুধু ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র খাতে ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

গবেষকেরা বলছেন, এমন এক সময়ে এ বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম তহবিল সংকটে ভুগছে। তাঁদের হিসাবে, গত বছর পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে এক দিনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে ২০ লাখের বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল।

সুসি স্নাইডার বলেন, নিজেদের জনগণের জন্য সহায়তা বা স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ ব্যয় না করে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো এমন অস্ত্রভান্ডারে বিনিয়োগ করছে, যা ব্যবহার করলে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হবে—এ কথা তারাও জানে।

ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে
ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় থাকা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ৭৪৫–এ পৌঁছেছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরানের সঙ্গে আবার যুদ্ধে জড়ালে তোমাকে একাই লড়তে হবে, আমরা নেই: নেতানিয়াহুকে হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

ইরানে আবারও হামলা চালালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সম্পূর্ণ একা লড়াই করতে হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গত রোববার রাতে ইরান–ইসরায়েল নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ার পর গতকাল সোমবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপে এবং পরে ‘অ্যাক্সিওস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই কড়া বার্তা দেন।

গত এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় এ সংঘাতের (রোববার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত চলা পাল্টাপাল্টি হামলা) পর ইসরায়েল ও ইরান তাদের হামলা সাময়িক বন্ধ করতে সম্মত হয়। এর পরপরই ট্রাম্পের এ মন্তব্য সামনে এল।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্পের অসন্তোষ ক্রমাগত বাড়ছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প উভয় পক্ষকে অবিলম্বে ‘গোলাগুলি’ বন্ধের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘চূড়ান্ত আলোচনা’ এগিয়ে যাবে, যদি না এতে কোনো ‘অজ্ঞতা বা বোকামি’ বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে হামলা বন্ধ করতে বলেছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন, তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিণতি সম্পর্কে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি বলেছি, বিবি, সাবধান হওয়া ভালো, অন্যথায় খুব শিগগিরই তুমি একা হয়ে পড়বে (একা লড়তে হবে)।’

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী বিমান হামলার জেরে রোববার এ নতুন উত্তেজনার (ইরান–ইসরায়েল হামলা) সূত্রপাত হয়। লেবাননে চলমান হামলার প্রেক্ষাপটে উত্তর ইসরায়েল লক্ষ্য করে একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। ইসরায়েলও পাল্টা হামলা চালায় ইরানে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো শান্তিচুক্তি লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের ওপর আংশিক নির্ভরশীল বলে তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে।

জানা গেছে, রোববার সন্ধ্যায় ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ফোন করেন এবং ওই হামলার পাল্টা জবাব না দেওয়ার অনুরোধ জানান। তবে সে অনুরোধ উপেক্ষা করে গতকাল ভোরের দিকে ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল।

ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় আঘাত হানে। এরপর ইরানও ইসরায়েলের হাইফায় একই রকম কারখানা ও দুটি বিমান ঘাঁটি নিশানা করে। অবশ্য ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশই অধিকৃত পশ্চিম তীরের আকাশে ধ্বংস করা হয় বলে দাবি করে ইসরায়েল।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা হালকা করে দেখানোর চেষ্টা ইসরায়েলের

দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি হামলা ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ‘ইরান যুদ্ধ’ বন্ধে ট্রাম্প চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরপর গত ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাধ্যমে ইরান যুদ্ধ আপাতত থামলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে থেমে থেমে উত্তেজনা ও সংঘাত চলছেই।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, ‘আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা তা প্রয়োগ করছি।’

নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘এ মুহূর্তে রণাঙ্গনের আগুণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কারণ, তেহরানের “সন্ত্রাসী” সরকারের ওপর আমরা আঘাত হানার পর তারা আমাদের ওপর হামলা বন্ধ করেছে।’ পাশাপাশি তিনি হুঁশিয়ারি দেন, ‘ইরান যদি আবার আমাদের ওপর হামলা চালানোর ভুল করে, তবে আমরা পূর্ণ শক্তি দিয়ে তার জবাব দেব।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নেতাদের মধ্যে উত্তেজনার খবরকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ফক্স নিউজ’কে তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে প্রিয়জনদের মধ্যেও একটু-আধটু ঝগড়া হয়।’

লেইটার বলেন, নেতানিয়াহু ট্রাম্পের অনুরোধে ‘পরিস্থিতি শান্ত করার’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ঠিকই, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টও ‘খুব ভালো করে’ বোঝেন যে ইসরায়েল নিজের দেশে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত কোনো জবাব না দিয়ে মুখ বুজে সহ্য করতে পারে না।

উত্তেজনার জন্য ওয়াশিংটনকে দায়ী করল ইরান

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এ উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য সরাসরি ওয়াশিংটনকে দায়ী করে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এর জন্য সরাসরি দায়ী। তারা যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম পক্ষ। তাই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আটক, ইসরায়েলের দক্ষিণ লেবাননে হামলা বা অন্য যেকোনো ঘটনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা হলে, এই অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য যুক্তরাষ্ট্রই সরাসরি দায়ী থাকবে।’

এদিকে ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চালানো এ অভিযানটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘নাসর’ বা ‘বিজয়’। এ অভিযান ‘শক্তিশালী ইরানের এক নতুন স্তরের প্রতিরোধ সক্ষমতা’ প্রদর্শন করেছে। এর ফলে ইসরায়েল ‘আরও একবার যুদ্ধবিরতির জন্য ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়েছে’ বলেও তিনি দাবি করেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এএফপি ফাইল ছবি

নিজ দল রিপাবলিকানদের প্রতিরোধের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প, কেন তাঁরা তাঁর ওপর ‘বিরক্ত’

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজের দলের ভেতরেই ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মুখে পড়ছেন। কংগ্রেসের যেসব রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এতদিন তাঁর বিরুদ্ধে যেতে দ্বিধা করতেন, এখন তাঁরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন।

সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকানদের একাধিক সদস্য গত সপ্তাহেই ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের সমালোচনা করেছেন। হোয়াইট হাউসের বলরুমের সঙ্গে যুক্ত ১০০ কোটি ডলারের তহবিল প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাঁর ১৮০ কোটি ডলারের ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন’ (অস্ত্রায়ণবিরোধী) তহবিল থেকে তাঁকে পিছু হটতে বাধ্য করেছেন এবং অভ্যন্তরীণ গুপ্তচরবৃত্তিসংক্রান্ত তাঁর আইনকে আটকে দিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া এবং রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল পাস করেছেন রিপাবলিকান–দলীয় সদস্যরা, যাতে প্রেসিডেন্ট ভেটো (বাতিল) দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় পক্ষই অবশ্য এখনই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বাস্তব কোনো বিদ্রোহ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে। তবে রিপাবলিকানদের একটি অংশের কর্মকাণ্ড তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ইঙ্গিত দিচ্ছে—যার মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও আছেন, যাঁদের ট্রাম্প নিজে দল থেকে বের করে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এটি এখন থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

রিপাবলিকান সিনেটর টম টিলিস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তথাকথিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’-এর বিরোধিতা করার পর গত বছর সিনেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। টিম বলেন, ‘আমার মনে হয়, নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, জনপ্রতিনিধিরা সেভাবেই ভোট দেবেন, যেভাবে তাঁদের এলাকার ভোটাররা চান।’

ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য এ ধারণাকে মূলত উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, পুরো দল বড় বড় ইস্যুতে তাঁর বিরোধিতা করতে প্রস্তুত—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান বলেন, ‘যাঁরা তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন, তাঁদের ট্রাম্প নিজেই সরিয়ে দিয়েছিলেন। এটি আসলে দলের ওপর তাঁর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণকেই প্রমাণ করে।’

ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান মাঝে মাঝে ট্রাম্পের সমর্থিত উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা রিপাবলিকানদের এই ভিন্নমতকে ‘নির্বাচনী বছরের রাজনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, সব সদস্য প্রতিটি ইস্যুতে রাজনৈতিক খেসারত দিতে রাজি হতে চাইবেন না।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেল জ্যাকসন বলেন, ‘গণমাধ্যম ও ডেমোক্র্যাটরা যখন অস্তিত্বহীন বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তখন আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এজেন্ডা পূরণ করতে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার অপেক্ষায় আছি।’

ট্রাম্পকে প্রতিহত করার প্রবণতা

বছরের পর বছর ধরে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা বিতর্কিত মন্ত্রীদের সমর্থন দিয়ে, তাঁর নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ না দেখিয়ে এবং ক্রমবর্ধমান ঘাটতি ও কম আয়ের মার্কিনদের জন্য ‘মেডিকেইড’ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে কাটছাঁট নিয়ে মনে দ্বিধা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের মূল আইনগুলোকে সমর্থন করে তাঁর প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য দেখিয়েছেন।

আইনপ্রণেতা ও সহকারীরা বলছেন, ট্রাম্প যখন রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি এবং জন কর্নিনের পুনর্নির্বাচনের বিরোধিতা করেন এবং ভুল সময়ে নেওয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের এজেন্ডাকে ঝুঁকিতে ফেলেন, তখন থেকেই ক্ষোভ ও অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের মেমোরিয়াল ডে ছুটির ঠিক আগে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। তখন ট্রাম্প কর্নিনের পুনর্নির্বাচনের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাঁর ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন’ তহবিলের ঘোষণা দেন। ফলে সিনেটের রিপাবলিকান সদস্যরা ৭ হাজার কোটি ডলারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ-সংক্রান্ত অর্থায়ন বিলটি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিতে বাধ্য হন। তাঁরা ক্ষোভ ও হতাশার মধ্যে ওয়াশিংটন ছেড়ে ছুটিতে চলে যান।

সিনেটের এক রিপাবলিকান সহকারী বলেন, ‘সেটি ছিল সব খারাপ ঘটনার একসঙ্গে ঘটে যাওয়ার মতো বিষয়।’

অবশেষে সিনেট শুক্রবার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ বিলটি পাস করে এবং রিপাবলিকানরা এই তহবিল ব্লক করতে ডেমোক্র্যাটদের আনা একটি সংশোধনীর বিরুদ্ধে ভোট দেয়। যদিও কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এই অর্থ ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটলে দাঙ্গা লাগানো ব্যক্তি এবং ট্রাম্পের অন্যান্য রাজনৈতিক মিত্রদের সহায়তায় ব্যবহার করা হতে পারে।

রিপাবলিকানদের প্রধান প্রধান নেতার আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প তুলসী গ্যাবার্ডের জায়গায় তাঁর বিশ্বস্ত বিল পুলটেকে অস্থায়ী জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক (ডিএনআই) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।

সিনেটর মিচ ম্যাককনেল স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি পুলটেকে স্থায়ী ডিএনআই হিসেবে সমর্থন দেবেন না। তিনি বলেন, আইনের নিয়ম অনুযায়ী মনোনীত ব্যক্তির ব্যাপক অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন। এই যোগ্যতা পূরণে ব্যর্থ কোনো মনোনীত ব্যক্তি আমার ভোট পাবেন না।’

মনোনয়ন নিয়ে আসন্ন লড়াই

কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধ পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের ট্রাম্পের এই বিরোধিতা এ পর্যন্ত বেশির ভাগই প্রতীকী ছিল।

নির্বাচনী ঝুঁকিতে থাকা তিন রিপাবলিকান সিনেটর—সুসান কলিন্স, জন হাস্টেড এবং ড্যান সুলিভান—বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন’ তহবিল নিষিদ্ধ করতে ডেমোক্র্যাটদের একটি প্রস্তাবে যোগ দিয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি। পাশাপাশি তহবিলটি বন্ধ করতে রিপাবলিকানদের আরও দুটি চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

আইনপ্রণেতারা যখন ভোট দিচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্পের মিত্র রিপাবলিকান সিনেটর জিম ব্যাঙ্কস বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটি হলো সীমান্তকে সুরক্ষিত করা এবং আইসিই–কে (আইইস নামে পরিচিত) অর্থায়নের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শীর্ষ এজেন্ডা পাস করা। এই মুহূর্তে যা ঘটছে, তা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমাদের সংহতি প্রকাশ করে।’

ট্রাম্পের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে তাঁর সাবেক আইনজীবী টড ব্লানচকে স্থায়ী মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে মনোনীত করার বিষয়টি, যা সিনেটে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এর প্রথম ধাপ হবে সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটি, যেখানে ট্রাম্পের রোষানলে পড়া জন কর্নিনও রয়েছেন। কর্নিন জানিয়েছেন, তাঁর সমর্থন নির্ভর করবে ব্লানচ কিছু প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেন, তার ওপর।

কর্নিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আইনজীবী নন। আমি নিশ্চিত হতে চাই, তিনি এই পার্থক্যটি বোঝেন এবং আইন যাতে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়, সে বিষয়ে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে স্টেট অব দ্য ইউনিয়নের ভাষণ দিয়ে ক্যাপিটলের হাউস চেম্বারে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ওয়াশিংটন
কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে স্টেট অব দ্য ইউনিয়নের ভাষণ দিয়ে ক্যাপিটলের হাউস চেম্বারে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ওয়াশিংটন। ছবি: রয়টার্স

নেতানিয়াহুকে থামাতে চান ট্রাম্প, সম্পর্ক যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় নেই

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরতে ও ক্ষেপণাস্ত্রশিল্প ধ্বংস করতে একসঙ্গে যুদ্ধে নেমেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো সংগঠনের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা এবং দেশটিতে সরকার পতনের পরিবেশ তৈরি করাও। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর ১০০ দিন পার হওয়ার পর গত রোববার ইরানবিরোধী সেই মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজবুল্লাহর লাগাতার হামলায় ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল এখন বিপর্যস্ত। এর জবাবে বৈরুতে হিজবুল্লাহর ঘাঁটি দাহিয়েহ এলাকায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। তবে এ হামলা ছিল মূলত নামমাত্র বা লোকদেখানো। বলা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের আপত্তি থাকলেও তাদের আগে থেকে কিছু না জানিয়েই এ অভিযান চালায় ইসরায়েল।

ইরান আগে থেকেই পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিল। সে অনুযায়ী তারা ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে প্রায় ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে হামলার মুখে ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা আবারও প্রাণভয়ে ‘বোম্ব শেল্টারে’ আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

ইরানের এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাল্টা ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ার প্রস্তুতি নেয় ইসরায়েল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ প্রস্তুতির কথা জানান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলকে এ সিদ্ধান্ত আবারও ভেবে দেখার নির্দেশ দেন।

এমনকি নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নিজের প্রিয় ইসরায়েলি সাংবাদিক বারাক রাভিদকে বলেন, ইসরায়েলের এখন আর পাল্টা হামলা চালানো উচিত হবে না। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এখনই বিবিকে (নেতানিয়াহু) কল করছি। তাঁকে বলব, তিনি যেন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেন।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘উভয় পক্ষই যথেষ্ট করেছে। ইসরায়েল যেমন হামলা চালিয়েছে, ইরানও তার জবাব দিয়েছে। আমাদের এখন আর নতুন কোনো সংঘাতের প্রয়োজন নেই।’

নেতানিয়াহুই তাঁকে ও যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধে টেনে এনেছেন—এমন দাবি ট্রাম্প বারবার অস্বীকার করে আসছেন। তবে তিনি এখন এটা স্পষ্ট করেছেন যে পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ছাড়াই শুরু করা এ সামরিক অভিযান তিনি দ্রুত শেষ করতে চান। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটিও এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়নি।

ট্রাম্প এখনো জোর দিচ্ছেন যে ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তেমন শর্তের জন্যই তিনি অপেক্ষা করছেন। তবে তাঁর প্রক্রিয়াধীন সমঝোতা স্মারকের ফাঁস হওয়া খসড়ায় তেমন কোনো নিশ্চয়তা দেখা যায়নি। এখন ট্রাম্পের প্রধান অগ্রাধিকার হলো হরমুজ প্রণালিটি আবারও নিরাপদভাবে খুলে দেওয়া। এর মাধ্যমে তেহরানের তৈরি করা বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট প্রশমিত চান তিনি।

ইরান যখন ইসরায়েলের উত্তরে হামলা চালাচ্ছিল, তখনো ট্রাম্প দাবি করছিলেন যে তিনি একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি আছেন। একগুঁয়ে ও প্রতারক হিসেবে পরিচিত এই শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি বলব, আগামী সপ্তাহের সোম, মঙ্গল বা বুধবারের মধ্যেই একটি চুক্তি সই হতে পারত।’ বিরক্তি প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, ‘এর মধ্যেই আবার এখন এসব (পাল্টাপাল্টি হামলা) ঘটছে।’

ট্রাম্পের ‘পাল্টা হামলা না করার’ এ নির্দেশ নেতানিয়াহুকে এক চরম দোটানায় ফেলে। তিনি চাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ নির্দেশ মেনে নিয়ে হামলা থেকে বিরত থাকতে পারতেন। তবে এতে বিজয়োল্লাসে মত্ত তেহরানের সামনে ইসরায়েলের প্রতিরোধক্ষমতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যের কাছে ইসরায়েলকে একটি দুর্বল দেশ হিসেবে পরিচিতি দেবে এবং দেশটির সার্বভৌমত্বকেও ক্ষুণ্ন করবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এমন পদক্ষেপ নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভিত্তিকেও নড়বড়ে করে দিতে পারে।

অন্যদিকে নেতানিয়াহু চাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অমান্য করতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হওয়া প্রায় নিশ্চিত। আর সেই লড়াইয়ে ইসরায়েলকে সম্ভবত একেবারেই একা হয়ে পড়তে হতে পারে।

এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইরান কি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী হয়ে উঠেছে যে তারা এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত চাল চালবে, যিনি স্পষ্টভাবে একটি সমঝোতা চাইছেন? অর্থাৎ ইরান কি ট্রাম্পকে এতটাই হতাশ করতে পারে, যা তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সেই সামরিক অভিযান পুনরুজ্জীবিত করতে বাধ্য করবে, যা না করার জন্য তিনি নেতানিয়াহুকে নির্দেশ দিয়েছিলেন?

অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ড বলছে, ইরান এমন ভুল করার মতো বোকা নয়। তারা আসলে অনেক চতুর। ফলে পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে এক প্রতারক ইরানের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অনেকটা অনুনয় করছেন। আর এর মাঝখানে পড়ে গেছে ইসরায়েল।

গত রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া অন্য এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে যদি কোনো চুক্তি না হয়, তবে তিনি হয়তো বাকি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা করবেন। অথবা বর্তমানে যে অবরোধ চলছে, সেটি বজায় রাখবেন।

তবে একটি বিষয়ে ট্রাম্পকে নিশ্চিত মনে হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে যে ধরনের চুক্তিই তিনি করবেন, নেতানিয়াহুকে তা মেনে নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিবির (নেতানিয়াহু) সামনে আসলে কোনো বিকল্প থাকবে না। সব সিদ্ধান্ত আমিই নিই।’

তবে ইরানে নয়, সেখানে ট্রাম্পের সেই নিয়ন্ত্রণ নেই।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

কচি খন্দকারের নাটক সিনেমায় মোশাররফ করিম

প্রকাশ ১৫ নভেম্বর ২০২৫ঃ এর আগে কচি খন্দকারের পরিচালনায় এফডিসি, ইয়েস বস নো বস, ভূগোল, বাঙ্গি টিভিসহ প্রায় সব নাটকেই অভিনয় করেছিলেন মোশাররফ করিম। কিন্তু এবার ছিল ব্যতিক্রম। কারণ, এই নির্মাতা ও অভিনেতার ‘তেল ছাড়া পরোটা’ ধারাবাহিকে নেই মোশাররফ করিম। তবে মোশাররফকে না পেয়ে হাল ছাড়েননি। এবার মোশাররফকে নিয়ে একসঙ্গে দুটি খবর দিলেন কচি খন্দকার।

এই অভিনেতা জানান, তাঁর পরিচালিত ধারাবাহিকই নয়, একটি সিনেমাতেও অভিনয় করতে যাচ্ছেন মোশাররফ করিম। গত বৃহস্পতিবারে সেসবই চূড়ান্ত করেছেন। কচি খন্দকার বলেন, ‘আমার নাটকে সব সময়ই মোশাররফ থাকেন। এবার তাঁর ব্যস্ততায় আমরা শুরুতে মোশাররফ করিমকে পাইনি। তবে তাঁর অংশের গল্প রেডি করে রেখেছিলাম। আমার নাটকের ১০০ পর্বের পরে যোগ দেবেন মোশাররফ। সেভাবে চমক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে গল্প।’

এর আগেও তাঁদের দেখা গিয়েছিল কমেডি গল্পে। যার মধ্য দিয়ে সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ‘মোশাররফ করিমদের দেখা যাবে তেল কোম্পানির মালিকানা হারিয়ে সংগ্রাম করা এক চরিত্রে। মূলত তেল কোম্পানি থেকে তাঁর অংশ দখল হয়ে যায়। দর্শক শুরুতেই দেখবেন হাটে হাটে মোশাররফ করিমকে তেল বিক্রি করতে। সব মিলিয়ে চরিত্রটি বেশ মজার। মোশাররফ চরিত্রটি নিজেও অনেক পছন্দ করেছেন।’ শিগগির নাটকটির শুটিংয়ে অংশ নেবেন এই অভিনেতা।

এদিকে বেশ কয়েক বছর ধরে ক্যারিয়ারে প্রথম সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দিচ্ছেন কচি। কিন্তু বেশ কিছু জটিলতায় সিনেমার কাজ শুরু করতে পারছিলেন না। তিনি জানালেন, এবার আর পেছনে ফিরতে চান না। সেটা নাকি সম্ভবও না। ইতিমধ্যে সিনেমাটির শুটিংয়ের শিডিউল চূড়ান্ত করছেন। এই অভিনেতা ও নির্মাতা বলেন, ‘আমরা একসঙ্গেই নাটক ও সিনেমার শিডিউল নিয়ে কথা বলেছি। সেভাবেই সব লক করা। আমাদের ইচ্ছা আগামী এপ্রিল মাসে সিনেমার শুটিং শুরু করা। সেভাবেই সবকিছু প্রস্তুত হচ্ছে।’

ইতিমধ্যে সিনেমার গল্প, চিত্রনাট্যও করে ফেলেছেন। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ঘিরেই সিনেমার গল্প। এই সিনেমার নাম মাই ডিয়ার ফুটবল। সিনেমায় কী ধরনের গল্পে অভিনয় করবেন জানতে চাইলে কচি খন্দকার বলেন, ‘সিনেমার গল্প বহুদিন ধরেই ভাবা। তবে সেটা এখনোই বলতে চাইনি। এটুকু বলব, এমন কনসেপ্টে আমি নাটক বানাইনি। এই গল্পটি সিনেমার জন্য আরও প্রায় এক দশক আগে ভেবেছি। সেখানে মোশাররফ দুর্দান্ত একটি চরিত্রে অভিনয় করবেন। আরও অনেক সারপ্রাইজ আছে। সেগুলো এখনই বলতে চাই না। আমরা সংবাদ সম্মেলন করেই সব জানাব।’

একসঙ্গে কচি খন্দকারের নাটক সিনেমায় যুক্ত হলেন মোশাররফ করিম
একসঙ্গে কচি খন্দকারের নাটক সিনেমায় যুক্ত হলেন মোশাররফ করিম। ছবি: ফেসবুক থেকে

৪ বছর পর ফিরছেন শ্রীকান্ত তিওয়ারি, ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’–এ এবার কী চমক থাকবে

প্রকাশ ১৫ নভেম্বর ২০২৫ঃ- রাজ ও ডিকের সিরিজ ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ মুক্তির পরেই চমকে দিয়েছিল। অ্যাকশন তো বটেই; হাস্যরস, ড্রামার মিশেলে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর সিরিজটি দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায়। সিরিজের একাধিক দৃশ্য, চরিত্র নিয়ে তৈরি হতে থাকে মিম। রিলস আর শর্টসে ঘুরেফিরে আসে সিরিজটির বিভিন্ন দৃশ্য। দীর্ঘ চার বছর পর আসছে ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’-এর তৃতীয় মৌসুম। কী থাকছে এবারের মৌসুমে? সিরিজের শ্রীকান্ত তিওয়ারি চরিত্র দিয়ে নতুন করে সাধারণ দর্শকের মধ্যে জনপ্রিয়তা পান মনোজ বাজপেয়ী। তাঁকেইবা নতুন কিস্তিতে কীভাবে দেখা যাবে?

মান ধরে রাখতেই চার বছর
অনেক সিনেমাপ্রেমী অভিযোগ করছিলেন, ‘দ্য ফ্যামিল ম্যান’ নতুন মৌসুমের জন্য বেশি সময় নিয়ে ফেলেছে। তবে চলচ্চিত্রবিষয়ক মার্কিন গণমাধ্যম ভ্যারাইটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিরিজটির সহস্রষ্টা রাজ নিদিমোরু বলেন, ‘আমরা তাড়াহুড়া করতে চাইনি। যদি মান ঠিক না থাকে, তাহলে বানানোরই দরকার নেই। ভালো কিছু সময় নিয়েই হয়।’ সহনির্মাতা ডিকে যোগ করেন, ‘একটা মৌসুম তৈরি করতেই প্রায় দুই বছর লেগে যায়—এক বছর লেখায়, আরেক বছর নির্মাণে।’

মনোজ বাজপেয়ীর নতুন শ্রীকান্ত
মনোজ বাজপেয়ী আবারও ফিরছেন শ্রীকান্ত তিওয়ারির ভূমিকায়—একজন সাধারণ পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ, যাঁর গোপন পরিচয় একজন ইন্টেলিজেন্স অফিসার। তবে অভিনেতার ভাষায়, ‘অনেকে ভাবে, দুটো মৌসুম করে ফেলেছি, তাই তৃতীয়টা সহজ হবে। কিন্তু একেবারেই না। সময় বদলে গেছে, শ্রীকান্ত বদলে গেছে, তার প্রতিপক্ষও আলাদা। এবার সে আগের মতো শীর্ষে নেই। কী হয়েছে তাঁর সঙ্গে, সেটা মুক্তির পরেই দর্শকেরা দেখতে পারবেন।’

নতুন শত্রু নতুন পটভূমি
এই মৌসুমে দেখা যাবে দুই নতুন প্রতিপক্ষকে—রুকমা (জয়দীপ আহলাওয়াত) ও মীরা (নিমরাত কৌর)। গল্পের পটভূমি বিস্তৃত হয়েছে মুম্বাই থেকে নাগাল্যান্ড পর্যন্ত। লেখক-পরিচালক সুমন কুমারের ভাষায়, ‘ভারত এক দেশ, কিন্তু অনেক পৃথিবী। এবার আমরা উত্তর-পূর্ব ভারতের গল্পে যাচ্ছি।’ সিরিজের প্রথম মৌসুম তৈরি হয়েছিল কাশ্মীর ও পাকিস্তানের পটভূমিতে, দ্বিতীয়টিতে দেখা গেছে চেন্নাইয়ের গল্প।

দলের আত্মবিশ্বাস
প্রাইম ভিডিও ইন্ডিয়ার অরিজিনাল কনটেন্ট প্রধান নিকিল মাধোক বলেন, ‘ভালো একটা সিজন বানাতে তিন-চার বছর লেগে যায়। কারণ, এটি একাধিক সিনেমা বানানোর সমান পরিশ্রমের কাজ। আমরা গতি নয়, মানকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।’ শারিব হাশমি (জে কে তালপাড়ে) বলেন, ‘এই চরিত্রে ফিরে আসা মানে বাড়ি ফিরে আসা।’ প্রিয়ামণি (সুচিত্রা তিওয়ারি) বলেন, ‘মনোজদা আর পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করলে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে ঘটে।’ অভিনেত্রী সীমানা বিশ্বাস জানান, ‘রাজনীতিনির্ভর চরিত্রটা খুব টেকনিক্যাল, কিন্তু তার ভেতরেও মানবিকতা আছে।’

নির্মাতাদের দৃষ্টিভঙ্গি
লেখক সুমন কুমার বলেন, ‘আমরা দর্শকসংক্রান্ত হিসাব করে গল্প বানাই না। গল্পই আমাদের বেছে নেয়।’ সংলাপ–লেখক সুমিত অরোরা যোগ করেন, ‘সময়ের ভাষা আর আবেগের সঙ্গে যুক্ত থাকা সবচেয়ে জরুরি।’
এই সিরিজে শ্রীকান্তের মেয়ে ধৃতি চরিত্রে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন আশলেশা ঠাকুর। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় মৌসুমে ধৃতি অপহৃত হয়েছিল—সেটা করতে গিয়ে আমি সেটে কেঁদে ফেলেছিলাম। তখন বুঝেছিলাম, চরিত্রকে সেটেই রেখে যেতে হয়।’

চতুর্থ মৌসুম আসবে
‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’-এর তৃতীয় মৌসুম মুক্তির আগেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে চতুর্থটি নিয়ে। আদৌ কি চতুর্থ মৌসুম আসবে? ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ৪’ নিয়ে যে ভাবছেন, সেটা স্বীকার করেছেন প্রাইম ভিডিওর নিকিল মাধোক। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, ‘আগে তৃতীয় সিজনটা সবাই ভালোবাসুক। এরপরই ভাবব পরেরটা।’ সিরিজটির সহস্রষ্টা রাজ বলেন, ‘তৃতীয় মৌসুম দেখলেই এ প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।’
ভ্যারাইটি অবলম্বনে

‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ৩’–এর দৃশ্যে মনোজ বাজপেয়ী। এক্স থেকে
‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ৩’–এর দৃশ্যে মনোজ বাজপেয়ী। এক্স থেকে