Monday, February 5, 2018

যেমন কাটে যৌনকর্মীদের শেষ জীবন by পিয়াস সরকার

‘সবাই তো সুখী হতে চায়/ কেউ সুখী হয় কেউ হয় না’ মান্না দে’র গাওয়া বিখ্যাত গান। এই গানের মাধ্যমে বলা হয়েছে ‘সুখ’ এই মহামূল্যবান শব্দটি সবার কপালে জোটে না। আবার কিছু কিছু মানুষের জীবনে সুখ যেন অধরাই থেকে যায় আজীবন। এসব মানুষের জীবন শুধুই যাপনের। 
নুরজাহান বেগম, বয়স আনুমানিক ৭০ বছর। ধানমন্ডি লেকে ভিক্ষা করেন প্রায় ৭ বছর যাবৎ।
থাকেন এই লেকের রাস্তার ধারেই। আপনজনবিহীন এই মানুষটি দিন গুনছেন পরপারে যাবার। আবার নিঃস্ব মানুষটির ২ বছরের সঙ্গী হয়েছে চোখে ছানি। তার জন্ম কুড়িগ্রাম জেলার, উলিপুর উপজেলায় প্রান্তিক এক কৃষক পরিবারে। জন্মের মাত্র ছয় বছরের মাথায় মাকে হারান। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে ঠিকই কিন্তু মায়ের ভালোবাসার পরিবর্তে তার কপালে জোটে অশান্তি। নুরজাহানের কষ্ট দেখে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান খালা। এভাবে আরো কেটে যায় ৮ বছর। ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় তার। কিন্তু বিয়ের ৬ মাসের মাথায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন যৌতুকের টাকার জন্য। টাকা না পেয়ে নুরজাহানকে দালালের হাতে বিক্রি করে দেন তার স্বামী মাত্র ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে। এরপর শুধুই হাত বদলের গল্প, খদ্দের থেকে খদ্দের, দালাল থেকে দালালে। তার কোলজুড়ে জন্ম নিয়েছিল দুটি সন্তান। ছেলে সন্তানের মুখ পর্যন্ত দেখতে দেন নি তারা। মেয়ে সন্তান ২ বছর পর্যন্ত তার সঙ্গেই ছিল। তারপর নিঃসন্তান এক দম্পতির কাছে বিক্রি করে দেন দালালরা। তিনি জানান, আমার বাচ্চাটি বিক্রি করে দিলেও আমি খুশি। কারণ মেয়েটি বাবা পেয়েছে, মা পেয়েছে। এখানে থাকলে আমার মতো কপাল হতো তার। তবে, সন্তানটিকে ২ বছর বয়সে শেষ দেখেছে সে আর দেখবার সৌভাগ্য হয়নি। তার মেয়ে জীবিত আছে না মৃত তাও জানে না সে। এভাবেই চলতে থাকে তার কষ্টের জীবন। দুঃখের জীবন হলেও পেট পুরে খেতে পারতেন তিনি। কিন্তু বয়স বাড়তে থাকে। খদ্দের কমতে থাকে দিন দিন। এক সময় যখন খদ্দের শূন্য হয়ে পড়েন, তখন ১৯৯৯ সালে মাত্র দু’হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে চট্টগ্রামের যৌনপল্লী থেকে বের করে দেয়া হয়। এরপর তার জীবন কাটে চট্টগ্রাম রেলবস্তিতে। শুরু করেন চুড়ি, ফিতা বিক্রির ব্যবসা। ভালোই কাটছিলো তার নতুন পথচলা। কিন্তু আবারো বাধা, পূর্বের পেশার কারণে বস্তিতে নানান ধরনের কথার সম্মুখীন হতে হয়। উঠতি বয়সের ছেলেদের চাহিদা পূরণ না করার কারণে চুরির অপবাদ দিয়ে বের করে দেয়া হয় তাকে। এবার চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে শুরু হয় তার ভিক্ষা জীবন। ২০০৮ সালে চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়। প্রথম তিন বছর কমলাপুর রেলস্টেশনে কাটলেও এখন তিনি থাকেন ধানমন্ডি লেকে।
নিজের বোনের লাশটা পর্যন্ত দাফন করতে পারি নাই। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রায় ৫০ বছর বয়স্ক পলি খাতুন। ভিক্ষা করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। তিনি জানান, তার বড় বোনের বিয়ের তিন বছর পর দুলাভাই আমাদের পরিবারকে জানান, তার বড় বোন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন, লাশ পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের পরিবার থেকে কিছুদিন পর আমার সঙ্গে বিয়ে দেন দুলাভাইয়ের। এর বছরখানেক পর আমাকে বিক্রি করে দেন দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে। পল্লীতে গিয়ে জানতে পারি আমার মতো আমার বড় বোনকেও বিক্রি করে দেয়া হয়েছে এই পল্লীতেই। এখানেই কাটতে থাকে দুই বোনের সময়। তবে একদিন এক মাতালের আঘাতে মৃত্যু হয় আমার বড় বোনের। কোনো বিচার তো পায়নি বরং আমার বোনের লাশটা পর্যন্ত দাফন করতে পারিনি। নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয় লাশ। মোহাম্মদপুরের একটি হোটেলে সবজি কাটার কাজ করেন প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক মহিলা। তিনি জানান, ভোলায় জন্ম তার। বাড়ির উঠান থেকে তুলে নিয়ে এসে বিক্রি করে দেন ঢাকার একটি হোটেলে। চার থেকে পাঁচ দিন মুখে কাপড় বেঁধে শুধু পানি পান করিয়ে রাখা হয়। এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে চলতে থাকে তার ভয়াল জীবন। প্রায় দশ বছর থাকার পর অনেক কষ্টে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি। বাড়িতে ফিরে গেলেও পরিবার তাকে নিতে অসম্মতি জানায়। বাধ্য হয়ে আবার চলে আসেন ঢাকায়। শুরু করেন পোশাক শ্রমিকের কাজ। তার বিয়ে হয়েছে, ঘরে সন্তান আছে তিনটি।
তবে সবার কপালে এই সৌভাগ্য হয় না। অধিকাংশ মহিলার মানবেতর জীবন কাটে শেষ বয়সে। সেলিনা খাতুন জানান, আমরা যখন যৌনপল্লীতে থাকি তখন আমাদের এক ধরনের ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। যার কারণে আমাদের শরীর সুস্থ সবল থাকে। কিন্তু যখন আমাদের পল্লী থেকে বের করে দেয়া হয় তখন আমরা এমনিতেই পড়ি বিপদে আবার ট্যাবলেট না খাওয়ার ফলে ভেঙে পড়তে থাকে শরীর। তাই উপায় না থাকার কারণেই ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়াতে হয়। সেলিনা খাতুন ভিক্ষা করেন ধানমন্ডি লেকে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহমিদা আক্তার বলেন, তাদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের হরমোন সেবন করানো হয় এবং সেই সঙ্গে খাওয়ানো হয় শক্তিবর্ধক ও চেতনানাশক ওষুধ। হঠাৎ এই ওষুধগুলো বন্ধ হয়ে যাবার কারণে শরীরে পানি জমা, শক্তি কমে যাওয়া, অনিয়ন্ত্রিত হ্রদ স্পন্দন, চোখে কম দেখা, ক্ষুধা-মন্দা ইত্যাদি সমস্যার সৃষ্টি হয়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সহযোগিতা থেকে অধরাই থেকে যায় এসব আজন্ম কষ্টের জীবনের বাসিন্দাদের। এদের সকলেই জানান, খুব একটা সহযোগিতা তারা পান না। মাঝে মধ্যে সামান্য পরিমাণ সাহায্য পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্যই।

ইরাক শেষ, এবার উত্তর কোরিয়া? by শে-উং কু

ওয়াশিংটন পোস্ট ৩০ জানুয়ারি একটা বোমা ফাটিয়েছে। ওই দিন তারা বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় পরবর্তী মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়া যাঁর জন্য একরকম ঠিক হয়েই ছিল, সেই প্রভাবশালী কূটনীতিক ভিক্টর চাকে হোয়াইট হাউস ওই পদে নিতে অস্বীকার করেছে। উত্তর কোরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপকে সব সময় কট্টর সমর্থন দিয়ে আসার সুবাদে ওয়াশিংটন ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক মহলে ভিক্টর চা খুবই পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। সাবেক বুশ প্রশাসনের আমলে তিনি ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্য বামপন্থী সরকারের লোকজনের কাছে ভিক্টর চা মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে খুব আদর্শ কোনো প্রার্থী ছিলেন, এমনটা বলা যাবে না। তিনি বর্তমানে দুই কোরিয়ার সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ব্যাপারে খুব দৌড়ঝাঁপ করছেন বলে শোনা যায়। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে চা অবস্থান নিয়েছেন। আর এ কারণেই তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার চিন্তাভাবনা থেকে হোয়াইট হাউস সরে এসেছে। তার মানে, ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যে মাত্রার কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলে আসছেন, শেষ পর্যন্ত হয়তো তিনি তার চেয়ে বেশি কঠোরের দিকে যেতে পারেন। গদিতে বসার পর থেকে এ পর্যন্ত ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনকে ‘পাগলা কুকুর’, ‘পুঁচকে রকেট মানব’ থেকে শুরু করে ‘ঢ্যাপসা বামন’-কত কিছু বলেছেন! জবাবে পিয়ংইয়ংও ট্রাম্পকে ভর্ৎসনা করতে একটুও ছাড় দেয়নি। ট্রাম্প টুইটারে নানা বিদ্রূপাত্মক কথা বলার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়াকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন। তিনি উত্তর কোরিয়াকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করতে চেয়েছেন এবং পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে আলোচনাকে ‘সময় নষ্ট’ করা বলে আখ্যায়িত করেছেন। উত্তর কোরিয়ার আশপাশে যুদ্ধজাহাজ ও বোমারু বিমান মোতায়েন করে আতঙ্ক ছড়াতে চেয়েছেন। গত আগস্ট ও ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বিশাল সামরিক মহড়া দিয়েছে। ২০১৭ সালজুড়ে উত্তর কোরিয়া বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনকে আক্রমণাত্মক আচরণ করতে উসকানি দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে একটি হলো পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। উত্তর কোরিয়ার দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও এটি আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে। ট্রাম্প প্রথম দিকে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন। তবে এখন মনে হচ্ছে তিনি পরবর্তী ধাপে পা রাখতে যাচ্ছেন। গত ১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে চমকে দিয়ে কিম জং-উন ঘোষণা দেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠেয় পিয়ংচ্যাং অলিম্পিকে উত্তর কোরিয়ার একটি ক্রীড়া প্রতিনিধিদল পাঠানোর কথা তাঁরা বিবেচনা করছেন। এরপর ৯ জানুয়ারি ডি-মিলিটারাইজড জোনে এটি নিয়ে দুই কোরিয়ার প্রতিনিধিরা আলোচনা করেন এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধিরা খেলায় অংশ নেবেন বলে ঠিক হয়। তখন থেকেই কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা প্রশমনে দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আলোচনাকে ট্রাম্প মিন মিন করে ‘ভালো উদ্যোগ’ বলে অভিহিত করলেও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এই অগ্রগতির খোলাখুলি সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, উত্তর কোরিয়া তার পক্ষে প্রচারের অংশ হিসেবে অলিম্পিককে ‘ছিনতাই’ করতে চাইছে। ভিক্টর চা দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পাচ্ছেন বলে যেদিন খবর বের হয়, সেদিনই ট্রাম্প কংগ্রেসে তাঁর প্রথম স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণ দেন। সেখানে তিনি উত্তর কোরিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। ইরাকে হামলার বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় জর্জ বুশ ২০০০ সালে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে ট্রাম্পের এই ভাষণের সাযুজ্য পেয়েছেন বিশ্লেষকেরা। বুশের মতো ট্রাম্পও উত্তর কোরিয়ার সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও পুরো বিশ্বের জন্য উত্তর কোরিয়া কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে এবং যেভাবেই হোক ওই সরকারকে কেন ফেলে দিতে হবে, তা নিয়ে তিনি অনেক কথা বলেছেন। নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে বলেছে, উত্তর কোরিয়ার ওপর কীভাবে হামলা চালানো যেতে পারে, সেই পরিকল্পনা প্রতিবেদন পেন্টাগনের কাছে চেয়েছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্প সত্যি সত্যি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে বসতে পারেন, এমন আশঙ্কায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটি দিতে গড়িমসি করছে। ওয়াশিংটনের অনেকেই মনে করছেন, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যদি ধরেও নিই ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে ভয় দেখানোর জন্য সামরিক হামলার জন্য হম্বিতম্বি করছেন, আসলে হামলা চালাবেন না। কিন্তু এত দিনে তাঁর যে চারিত্রিক পরিচয় আমরা পেয়েছি, তাতে তিনি যে সত্যি সত্যি হামলা চালাবেন না, সেই ভরসায় কি থাকা যায়?
আল-জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
শে-উং কু দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজবিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘কোরিয়া এক্সপোজ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক।

প্রধান বিচারপতি বেছে নেওয়া by মিজানুর রহমান খান

নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করব যে আগামী প্রায় চার বছর তিনি বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা দৃঢ় করতে তাঁর পক্ষে সম্ভব সব রকম ব্যবস্থা নিতেই সচেষ্ট হবেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা আদালতের অবস্থাকে ডুবু ডুবু অবস্থায় নাক উঁচু করে রাখার মতো পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। গতকাল প্রধান বিচারপতির সংবর্ধনায় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মুখে উচ্চ আদালতের ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার এক উদ্বেগজনক চিত্র পেলাম। এই মলিন চিত্র বদলাতে একটি যথাযথ বিচার বিভাগীয় নেতৃত্ব দরকার। ২২তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগপর্বে আমরা আমাদের বিচার বিভাগের ইতিহাসের সব থেকে কার্যকর একটি ধ্রুপদি পদত্যাগ দেখলাম। এর আগে ২০১১ সালে দ্বিতীয়বার জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের শিকার হয়ে বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান নীরবে পদত্যাগ করেছিলেন। বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার এই প্রতিবাদী পদত্যাগ এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন সমাজ থেকে ‘ত্যাগ’ বিলুপ্ত হতে চলেছে। তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে আমরা ৪৫ বছর আগে ১৯৭৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতি শিলাত, হেগড়ে ও গ্রোভারের একযোগে পদত্যাগের ঘটনার কিছুটা তুলনা করতে পারি। আরও বেশি আদর্শস্থানীয় হতো যদি এটি ‘নীতিগত’ মহিমায় মহিমান্বিত হতো। তিনি যথার্থই লিখেছেন, অনিবার্য ব্যক্তিগত কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশে জ্যেষ্ঠতার কোনো রেওয়াজ গড়ে ওঠেনি, কারণ নীতি হিসেবে এটা সব সময় কার্যকর থাকুক, তা সংশ্লিষ্ট কুশীলবদের কেউ আন্তরিকভাবে চান বা অতীতে চেয়েছেন-এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। ইন্দিরা গান্ধী যখন আগাম জেনেছিলেন যে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংসদ বদলাতে পারে কি পারে না-সংক্রান্ত মামলায় (কেশবানন্দ ভারতী) ১৩ সদস্যের বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে তিনি পরাজয়ের স্বাদ পেতে যাচ্ছেন এবং রায় ঘোষণার নির্ধারিত তারিখের এক দিন আগে পরবর্তী প্রধান বিচারপতির নাম ঘোষণার ক্ষণ উপস্থিত, তখন তিনি সাত সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় সমর্থক ওই তিন জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে সংখ্যালঘু রায় অর্থাৎ তাঁর পক্ষে ছয় রায়দানকারীর প্রধান এ এন রায়কে প্রধান বিচারপতি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। দিনটি ভারতের বিচার বিভাগের ইতিহাসের ‘কৃষ্ণতম অধ্যায়’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে, বিতর্কিত ওই ডিঙানোর ঘটনাটি ছিল দুই বছর পরের জরুরি অবস্থা জারির পূর্বলক্ষণ।
বিচার বিভাগে জ্যেষ্ঠতার নীতি অনুসরণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো এটা জাতীয় রাজনীতির উত্তাপ ও মনোযোগের বাইরে জোরের সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়নি। আমাদের উচ্চ আদালত অবশ্য বলেছেন, ‘জ্যেষ্ঠতাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না, মেধাও দেখতে হবে।’ এর অর্থ হলো জ্যেষ্ঠতাকে জলাঞ্জলি দেওয়া যাবে না। জ্যেষ্ঠতার লঙ্ঘন আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু কী উপায়ে কখন মেধা যাচাই হবে, তার কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া শুরু করার কোনো চাহিদা সংশ্লিষ্ট মহলে নেই বললে বাড়তি বলা হবে না। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বিএনপি ঘরানার হলেও তার তরফে এ বিষয়ে যথারীতি কোনো দৃঢ় নৈতিক বিবৃতি নেই। সমিতি ক্ষীণ কণ্ঠে ঠেকায় পড়া মুখরক্ষার প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনে সমিতির সমর্থন নেই। বস্তুত এটা দলীয় ও গোষ্ঠীগতভাবে বিভক্ত সমিতির কাছে আদৌ কোনো অ্যাজেন্ডা নয়, হওয়ারও নয়। ১৯৭৩ সালে ইন্দিরার ওই স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আইনজীবী সমাজ রুখে দাঁড়িয়েছিল। সারা দেশে আইনজীবী সমিতিগুলো কর্মবিরতি করেছিল। অথচ আমাদের সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির কাছে মন্তব্য চাওয়া হলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি সাংবাদিকদের সর্বাগ্রে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে ইতিপূর্বেও জ্যেষ্ঠতার লঙ্ঘন ঘটেছে। যেন এটাও একটা বৈধতার উৎস! বিষয়টি এমন যে অতীতে যেহেতু ঘটেছে, এখন ঘটছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনে ইন্দিরা গান্ধীর ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা রিটে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। নিয়োগপত্রে রাষ্ট্রপতি গিরি সই করলেও এ জন্য তাঁকে কেউ দায়ী করেনি। কিন্তু আমরা যেন এক ভিন্ন সংসদীয় সংস্কৃতির চর্চা করছি, যেখানে ধরে নেওয়া হয় যে নিয়োগের সব দায় রাষ্ট্রপতির। প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারক নিয়োগে ভারত ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা অভিন্ন। কিন্তু বাংলাদেশে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়টিকে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। হাইকোর্ট থেকে আপিল বিভাগে নিয়োগের সময়ের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের সঙ্গে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৮৫ সালে তিনজনকে ডিঙিয়ে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও এ টি এম আফজাল, ১৯৮৯ সালে দুজনকে ডিঙিয়ে মোস্তাফা কামাল, ১৯৯৯ সালে দুজনকে ডিঙিয়ে মাহমুদূল আমীন চৌধুরী, ২০০০ সালে ওই দুজনকে আবার ডিঙিয়ে মইনুর রেজা চৌধুরী আপিল বিভাগে যাওয়ার পর সেখানকার জ্যেষ্ঠতার ক্রম বজায় রেখেই প্রত্যেকে প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। কোনো বিতর্ক ওঠেনি। কারণ, যাঁদের ডিঙিয়ে তাঁরা আপিল বিভাগে গিয়েছিলেন, তাঁরা কেউ আপিল বিভাগেই যাননি। জ্যেষ্ঠকে টপকিয়ে প্রথম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পান বিচারপতি কে এম হাসান। হাসান হাইকোর্টের বিচারক হন ১৯৯১ সালে, এর ছয় মাস পর একত্রে নিয়োগ পান মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, সৈয়দ জে আর মুদাচ্ছির হোসেন ও মো. রুহুল আমীন। আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের জানুয়ারিতে হাসান ও মোদাচ্ছিরকে টপকে (মোদাচ্ছিরের চেয়ে বয়সে রুহুল কনিষ্ঠ ছিলেন) রাব্বানী ও রুহুল আমীনকে এবং চার মাস পরে ফজলুল করিমকে আপিল বিভাগে নিয়েছিল। এই টপকানোর বৈধতা অ্যাডভোকেট এস এন গোস্বামী চ্যালেঞ্জ করলেও তা খারিজ হয়েছিল ২০০১ সালের জুনে। এর পরবর্তী জুনের আগেই বিএনপি হাসান ও মোদাচ্ছিরকে আপিল বিভাগে আনে। ২০০৩ সালের ২৩ জুনে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে তখনকার আপিল বিভাগে জ্যেষ্ঠতম ছিলেন মো. রুহুল আমীন, দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ ছিলেন ফজলুল করিম। এই দুজনই বয়সে এবং হাইকোর্টে যোগদানের দিক থেকে কে এম হাসানের কনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু আপিল বিভাগে তাঁরা দুজনেই হাসানের জ্যেষ্ঠ হিসেবে গণ্য হলেন। কারণ, আপিল বিভাগে নিয়োগ কোনো পদোন্নতি নয়, প্রতিটি নিয়োগই নতুন নিয়োগ। ফলে হাসানকে যখন ১৩ তম প্রধান বিচারপতি করা হয় তখন ওই দুজনকে ডিঙিয়ে তা করা হয়। সেই অর্থে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পথ বিএনপিই দেখিয়েছে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগে একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তা এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে নেতৃত্বটা বিচার বিভাগকেই দিতে হবে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন চ্যালেঞ্জের মামলা খারিজ করে ২০১৫ সালে আপিল বিভাগের এক রায়ে নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন লিখেছিলেন, ‘প্রধান বিচারপতি বেছে নেওয়া রাষ্ট্রপতির বিশেষ অধিকার। তিনি এককভাবে প্রধান বিচারপতি বেছে নিতে পারেন।’ অবিকল একই ধরনের সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও ঐতিহ্যের আওতায় ১৯৭৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ ধরনের কোনো পর্যবেক্ষণ দেননি। ১৯৯৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, প্রধান বিচারপতি কে হবেন, এর সঙ্গে বিচার বিভাগের নাড়ির সম্পর্ক, সর্বদা সেটা সুপ্রিম কোর্টই বলে দেবেন। আর আমাদের এখানে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা ২০১১ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে নিজেই লিখেছিলেন, প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগে বিচারক বেছে নিতে নির্বাহী বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! দুই প্রতিবেশীর সর্বোচ্চ আদালতের দৃষ্টিভঙ্গিতে কত মৌলিক তফাত!
মিজানুর রহমান খান যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো
mrkhanbd@gmail.com

ভাষার মৃত্যু ভাষার জন্ম by হাসান ফেরদৌস

ভাষার মৃত্যু হয় দুভাবে: যখন কোনো ভাষায় কথা বলার মতো কেউ আর বেঁচে না থাকে এবং যখন কোনো ভাষাভাষীর মানুষ নিজেরাই সে ভাষাকে অবহেলা করে। কথা বলার মানুষের অভাবে বাংলা ভাষার মৃত্যু হবে না, কিন্তু এই ভাষাভাষীদের অবহেলায় বাংলা ভাষার কার্যকর মৃত্যুর আশঙ্কা একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইউনেসকোর হিসাব অনুসারে, গত এক শ বছরে মৃত্যু হয়েছে এমন ভাষার সংখ্যা ২০০-এরও বেশি। বর্তমানে যে হাজার ছয়েক ভাষায় পৃথিবীর মানুষ কথা বলে, তার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ভাষা হয় আশুমৃত্যুর সম্মুখীন অথবা মৃত্যুর হুমকির মুখে রয়েছে। জাতিসংঘের এই সংস্থার প্রস্তুত ভাষার বিশ্ব মানচিত্র অনুসারে, প্রায় ২০০টি ভাষা রয়েছে, যাতে কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা ১০ জনের কম। আরও শ দুয়েক ভাষা রয়েছে, যাতে কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা ৫০ জনের বেশি নয়।
মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই জানা গেছে, পেরুর আমাজন জঙ্গলে তাউশিরো সম্প্রদায়ের একই নামের ভাষায় কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা এখন মাত্র একজন। সভ্যতার সংক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচাতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল এই জঙ্গলে, কিন্তু রোগ-শোক-জন্তুর আক্রমণে তাদের সবাই এক এক করে মারা গেছে। বেঁচে আছে শুধু একজন, সেও মারা যাবে, মৃত্যু হবে আরেকটি ভাষার। বাংলাদেশের অনেক আদিবাসী ভাষার ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই ভাগ্য অপেক্ষা করছে। দু-একটি বাদ দিলে বাংলাদেশের অধিকাংশ আদিবাসী ভাষাই বিলুপ্তির অপেক্ষায়। আশো, চিন, খাসি বা কোডার মতো ভাষা, যাতে কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা বড়জোর হাজারখানেক। তাউশিরোর মতো তাদের ভাগ্যেও অপেক্ষা করছে অবধারিত মৃত্যু। সংখ্যায় অপেক্ষাকৃত বেশি এমন আদিবাসী ভাষা, যেমন চাকমা বা গারো, তাদের ভাগ্যও খুব ভিন্ন নয়। অবশ্য কথা বলার লোক নেই বলে এসব ভাষার মৃত্যু হবে তা নয়। বাংলার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এদের পক্ষে অসম্ভব হবে। এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা রক্ষার কথা মাথায় রেখেই ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ঘোষণা করেছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সম্মিলিত চেষ্টার ফলে একটি মৃতপ্রায় ভাষাকেও বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। এই দিবসের লক্ষ্য বিশ্বের দেশগুলোকে সেই কাজে উৎসাহ জোগানো। হিব্রু ভাষার কথা আমরা জানি। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম এ ভাষাটি কীভাবে জাতীয় পুনর্জাগরণ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ফের জেগে ওঠে, সে প্রায় অবিশ্বাস্য এক গল্প। প্রায় একই রকম সমষ্টিগত উদ্যমের ফলে দুই-তিন দশকের চেষ্টায় দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি আদিবাসী ভাষা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। এসব ভাষায় কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেড়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে যে ভাষাটি, তার নাম গুয়ারানি। একসময় প্যারাগুয়ের হিস্পানিক ভাষাভাষীর শাসক দল দেশের সংখ্যাগুরু আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের কথ্য গুয়ারানি ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে থাকে, তার সঙ্গে গুয়ারানির ভাগ্যও। আশি ও নব্বইয়ের দশকে প্যারাগুয়ে একই সঙ্গে হিস্পানিক ও গুয়ারানি ভাষাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে। অর্থনৈতিকভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় হিস্পানিক ভাষাকে বাতিল করার কোনো সুযোগ ছিল না, কিন্তু স্কুলকক্ষে গুয়ারানি শেখার সুযোগ করে দেওয়ায় সব ধরনের মানুষ-শহুরে ও গ্রামীণ, ধনী ও দরিদ্র-গুয়ারানি ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। প্যারাগুয়ে এখন একটি দ্বিভাষিক দেশ, হিস্পানিক এখনো সরকারি ভাষা আর গুয়ারানি সেখানে একটি জাতীয় ভাষা। দেশের ওপরতলার মানুষেরা এখনো হিস্পানিককে তাদের পছন্দের ভাষা হিসেবেই গ্রহণ করে, তবে রাজনৈতিকভাবে গুয়ারানির গুরুত্ব বাড়ায় এই দুই ভাষার সাংস্কৃতিক বৈষম্য কমে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তার সামাজিক মর্যাদা। বাংলা ভাষার মর্যাদার যে আন্দোলন, তার সঙ্গে গুয়ারানির একটি বিচিত্র মিল রয়েছে। একসময় পাকিস্তানের শাসক দল দেশের গরিষ্ঠ জনসংখ্যার ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাকে সরকারি ও জাতীয় ভাষার স্বীকৃতির বদলে তাদের ভাষা হওয়ায় উর্দুকে সরকারি ভাষা বানানোর চেষ্টা করেছিল। এর পরিণাম কী হয়েছিল, তা আমরা জানি। প্যারাগুয়ের মতোই রাজনৈতিক চাপের মুখে তারা বাংলাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাকে সরকারি বলুন আর জাতীয় বলুন, তেমন স্বীকৃতিতে কোনো বাধা রইল না। অথচ বাস্তব সত্য এই যে কাগজে-কলমে স্বীকৃতি পেলেও বাংলা ক্রমে তার কার্যকর গুরুত্ব হারাচ্ছে ইংরেজির কাছে। ইংরেজি ভাষার যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব, বাংলার তা নেই। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা-জ্ঞান তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।
দোষটা ছেলেমেয়েদের নয়, দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার। বাংলা শিখে বড় চাকরি মেলে না, ব্যক্তিগত খাতেরমোটা বেতনের চাকরির প্রাথমিক শর্তই হলো ইংরেজি বোলচালে কে কেমন কেতাদুরস্ত। ফলে ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও অভিভাবকেরা যে যাঁর সাধ্যমতো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেই ছেলেমেয়েদের পাঠাচ্ছেন। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে এমন অসংখ্য পরিবার আছে, যেখানে ছেলেমেয়েরা বাংলার বদলে ইংরেজি বলায় অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর ফলে শুধু যে বাংলা তার প্রতিযোগিতামূলক ধার হারাচ্ছে তা-ই নয়, এর ব্যবহারিক গুরুত্বও হ্রাস পাচ্ছে। ইংরেজি হয়ে পড়েছে ‘জাতে ওঠার’ মই। প্যারাগুয়ের হিস্পানিক ও গুয়ারানির মধ্যেও ঠিক এমন একটা ঘটনাই ঘটেছে। যারা ক্ষমতায়, তাদের অধিকাংশ হিস্পানিক ভাষাতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। যারা ভালোভাবে হিস্পানিক বলতে পারে না, শহুরে এলিটদের কাছে তারা উপহাসের পাত্র। এ অবস্থা বদলাতে আদিবাসী মানুষেরা সমান গুরুত্বের সঙ্গে তাদের নিজের ভাষার পাশাপাশি হিস্পানিককেও গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্কুলে এখনো বাংলা শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। বড় বড় শহরের বাইরে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল হাতে গোনা। তা ছাড়া সেখানে বেতন অনেক বেশি, অধিকাংশেরই তা সাধ্যের বাইরে। এর ফলে ভাষাভিত্তিক একধরনের বিভাজনরেখা তৈরি হয়েছে। ভাষাকে ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে একধরনের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। আমাদের বর্তমান বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয় হিসেবে ইংরেজি পড়ানো হয় কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থাটি কার্যত এক ভাষিক। বাংলা মাতৃভাষা হওয়ায় শিক্ষার মাধ্যম এ ভাষাতেই হবে, এই প্রশ্নে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজিকে যদি এমনভাবে যুক্ত করা যেত যাতে সবাই বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও দক্ষতা অর্জন করতে পারে তাহলে এক ভাষিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আমরা দ্বিভাষিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারতাম। প্যারাগুয়ের মতো পৃথিবীর আরও অনেক দেশেই দ্বিভাষিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। একসময় ভাবা হতো, শিশুদের পক্ষে একসঙ্গে একাধিক ভাষা শিক্ষা কঠিন, তাদের মস্তিষ্কে দুটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা জায়গা নিলে জ্ঞানীয় বা কগনিটিভ সংকটের কারণ ঘটবে। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন উল্টো কথা। একই সঙ্গে দুই ভাষার অবস্থানের ফলে জ্ঞানীয় সমস্যা হবে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের নিজস্ব ‘কার্যনির্বাহী ক্ষমতা’ (এক্সিকিউটিভ ফাংশন) রয়েছে, যার মাধ্যমে সে নিজ থেকেই দুই ভাষার দ্বন্দ্ব মিটিয়ে নেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বাড়তি তৎপরতার ফলে মস্তিষ্ক অধিক সতেজ হয়, দ্বিভাষিক শিশুরা ঠিক সে কারণে একভাষিক শিশুদের চেয়ে অধিক চৌকস। আমি জানি, দ্বিভাষিকতার পক্ষে সাফাই শুনে আমার প্রগতিশীল বন্ধুরা, যাঁদের ছেলেমেয়েদের অধিকাংশই হয় ইংরেজি স্কুলে পড়ে, নয়তো বিদেশে থাকে-প্রতিবাদ করবেন। বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি বলে ইতিহাস থেকে পাঠ শোনাবেন। কিন্তু তাতে আমাদের বাস্তব সমস্যা মিটছে না। এটাই তো বাস্তব সত্য যে প্রতিযোগিতায় ইংরেজির সঙ্গে বাংলা টিকতে পারছে না, এখনো নয়। অন্যদিকে দেশে একই সঙ্গে দুই ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকায় ভাষাগত বৈষম্য বাড়ছে। এই বৈষম্য রোধের একটা পথ হতে পারে-সবার জন্য একই সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি। সন্দেহ নেই কাজটা কঠিন, সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্পদের অপ্রতুলতা। কিন্তু একে যদি সংকট বলে স্বীকার করি, তাহলে আজ হোক বা কাল, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পা বাড়াতেই হবে!
হাসান ফেরদৌস যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি

একজন কৃতী মানুষের প্রস্থান by এম ফাওজুল কবির খান

এই পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা সারা জীবন আলো ছড়ান। তাঁদেরই একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের সাবেক ডিন ও অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। সম্প্রতি তিনি প্রয়াত হয়েছেন। কৃতবিদ্য মানুষ নিজে জ্ঞানের জগতে অবদান রাখেন আর পরবর্তী প্রজন্মকে জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেন। গুগল স্কলার সার্চ করে দেখলাম, অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী তাঁর নিজের ও সহকর্মীদের সঙ্গে লেখা গবেষণাপত্র থেকে উদ্ধৃতির (সাইটেশন) সংখ্যা সর্বমোট ৪৮৭ টি। গত পাঁচ বছর তিনি অসুস্থ ছিলেন। এ সময়েও, অর্থাৎ ২০১৩ সালের পর উদ্ধৃতির সংখ্যা ১৬৯টি। কেমন শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী?
কুওরা ডটকম বলে একটি ওয়েবসাইট আছে। সেখানে যে কেউ, যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট যে কেউ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন। সেখানে একটি প্রশ্ন ছিল, বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক কারা? জবাবে প্রথমেই যে নামটি এসেছে তা হলো অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। জবাবে আরেকটি কথা উল্লেখ আছে, অধ্যাপক চৌধুরী ক্লাসে কখনোই হাজিরা নিতেন না। কিন্তু তাঁর ক্লাসে সব সময় থাকত উপচে পড়া ভিড়। একই প্রশ্ন আমি নিজেও জিজ্ঞেস করেছিলাম অধ্যাপক চৌধুরীর ছাত্র ও কিস্টোনে আমার সাবেক সহকর্মী তৌফিক ইমামকে। তাঁর সংক্ষিপ্ত জবাব, মোহাম্মদ আলী স্যার ‘বাই ফার অ্যান্ড মাইলস’। মোহাম্মদ আলী আমার ছেলেবেলার বন্ধু লিয়াকত আলী চৌধুরীর ছোট ভাই। তাঁদের বাবা মরহুম আবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন আয়কর বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বাবার সরল ও অনাড়ম্বর জীবন মোহাম্মদ আলী ও তাঁর ভাইদের জীবনে প্রতিফলিত হতে দেখেছি। কলেজে তাঁকে দেখেছি সাদা পায়জামা, সাদা শার্ট ও স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়ে পায়জামার বদলে সাধারণ প্যান্ট ছাড়া আর বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখিনি। আমি ১৯৯৮ সালে ইডকলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিই। সে সময় বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্প অর্থায়নের জন্য আমাদের বিবেচনাধীন ছিল। তাই পরামর্শের জন্য আমি মোহাম্মদ আলীর শরণাপন্ন হই। মোহাম্মদ আলীকে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি পরদিন আমাদের অফিসে হাজির হন। আমি তাঁকে উদ্দেশ্য জানালে তিনি আমাকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘বদ্দা (বড় ভাই), আমি আপনার সব কাজ করে দেব, কিন্তু কোনো টাকাপয়সা নিতে পারব না।’ আমি তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করি, এটা আমার ব্যক্তিগত কোনো কাজ নয়, তিনি টাকা নেবেন না কেন? তিনি বললেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যে টাকা পান, তা-ই তাঁর খরচ হয় না; বাড়তি টাকা দিয়ে তিনি কী করবেন? আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাই। বিদ্যুৎ-সচিব হওয়ার পর আমরা মন্ত্রণালয়ে একটি নাগরিক পরামর্শক কমিটি করি, যাতে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও অন্যান্য সুধীর সঙ্গে মোহাম্মদ আলীকেও অন্তর্ভুক্ত করি। কমিটির প্রথম সভায় মোহাম্মদ আলী কীভাবে আসবেন ভেবে সচিবের গাড়িটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে পাঠাই। চালক ফিরে এসে জানান, প্রফেসর সাহেব তাঁকে বলেছেন চলে যেতে। মোহাম্মদ আলী হেঁটে সময়মতো সভায় হাজির হন। পাঁচ বছর আগে হৃদ্ ও কর্কট রোগ একসঙ্গে তাঁর ওপর হামলে পড়ে। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে তাঁকে দেখতে যাই। সেখানে ডাক্তাররা পরামর্শ দেন অপারেশন ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় বিদেশে নিয়ে যাওয়ার। এটা জেনে আমরা অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিই। এই সংবাদ জানাজানি হতেই ইউরোপ,
উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে মোহাম্মদ আলীর ছাত্ররা অনবরত ফোন করতে থাকেন। সবার একই কথা, টাকা পাঠানোর জন্য একটা অ্যাকাউন্ট নম্বর দেন। মোহাম্মদ আলী স্যারের ছাত্ররা থাকতে চিকিৎসার টাকার অভাব হবে না। এ ছাড়া দেশে মোহাম্মদ আলীর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাই সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। আমরা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ, এখানে চিকিৎসার ঝুঁকি, অর্থ সাহায্য ইত্যাদি প্রস্তাব নিয়ে আলাপ করি। তাঁকে আমরা জানাই যে সিঙ্গাপুরে ডাক্তারের সঙ্গেও এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাঁর সম্মতি পেলেই যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হতে পারে। কিন্তু তাঁর জবাব ছিল, ‘তাঁর যা চিকিৎসা ঢাকাতেই হবে এবং তাঁর নিজস্ব সঞ্চয় থেকেই হবে। দেশের বাইরে বা অন্যের টাকায় তাঁর চিকিৎসা হবে না।’ তাঁর ইচ্ছানুযায়ী দেশেই ইউনাইটেড হাসপাতালে তাঁর অপারেশন হয়। সে সময় তাঁর ছাত্র ও সহকর্মীদের যে অনুরাগ দেখেছি, তা ভোলার নয়। পালা করে, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তাঁরা রাত-দিন স্যারের ডিউটি করেছেন। অকৃতদার মোহাম্মদ আলীর জীবনে বুয়েট ও এর ছাত্রছাত্রীরাই ছিলেন সব। কারও টাকার প্রয়োজন, মোহাম্মদ আলী স্যার আছেন। কারও থাকার জায়গা নেই, মোহাম্মদ আলী স্যারের বাসা আছে। ইউনিভার্সিটির ল্যাবে সরঞ্জাম নেই, মোহাম্মদ আলী স্যার আছেন। পড়াশোনা, চাকরিতে সাহায্যের কথা আর না-ই বললাম। তাঁর সাহায্য-সহযোগিতা শুধু ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়; সহকর্মী, বুয়েটের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, এমনকি পলাশীর বাজারের দোকানদার থেকে শুরু করে রিকশাচালক, বাজারের টোকাই ছেলেটি, কেউই বাদ পড়েনি। আজ তাই তাঁর প্রয়াণে অনেক মানুষ অশ্রু বিসর্জন করছেন। তাঁদের দাবি, কিংবদন্তিতুল্য এই মানুষটির স্মৃতি রক্ষার জন্য কিছু একটা করা হোক। বুয়েট কর্তৃপক্ষ তাঁর কর্মস্থল ‘ওল্ড একাডেমিক বিল্ডিং’টিকে তাঁর নামে নামকরণের বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে।
এম ফাওজুল কবির খান সাবেক সচিব ও অধ্যাপক

পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু ২০১৯ সালে: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, ২০১৯ সালের মার্চ মাস থেকেই পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হতে পারে। সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর আয়োজিত ভ্যাট সম্মাননা প্রদান ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।
ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভ্যাট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরস্কৃত করতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে ২০১৭ সালের ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারী ও ঢাকা জেলার কর বাহাদুর পরিবার স্বীকৃতি দেয় এনবিআর। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান।

কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন স্যামসাংয়ের উত্তরাধিকারী লি জে-ওয়াই

স্যামসাং গ্রুপের উত্তরাধিকারী লি জে-ওয়াইর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড স্থগিত করে তাকে মুক্তি দিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার একটি আদালত। দুর্নীতির দায়ে বছরখানেক আটক থাকার পর সোমবার মুক্তি পেলেন গ্রুপটির সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাকে আটক করা হয়েছিল।
-খবর বিবিসি অনলাইন। ঘুষ প্রদান ও তহবিল তছরুপের দায়ে তাকে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার একটি নিম্নআদালত। সিউলের উচ্চ আদালত ওই সাজার মেয়াদ ছয় মাস কমিয়ে আড়াই বছর করেন এবং দণ্ড স্থগিত করেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কর্পোরেট সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ৪৯ বছর বয়সী লির পক্ষে দেয়া রায় নিয়ে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক গুয়েন হাইকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন লি। ঘুষগ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে পার্ককেও ক্ষমতা হারাতে হয়েছিল।

বিরতিহীন প্রশ্নফাঁসের তালিকায় এবার ইংরেজি প্রথমপত্র

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিরতিহীনভাবে প্রশ্নফাঁসের তালিকায় বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয়পত্রের পর এবার ইংরেজি প্রথমপত্রও যুক্ত হয়েছে। সোমবার পরীক্ষা শুরুর প্রায় দুই ঘণ্টা আগে সকাল ৮টা ৪ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপে ইংরেজি প্রথমপত্রের প্রশ্নফাঁস হয়ে যায়। ফাঁস হওয়া ইংরেজি প্রথমপত্রের ‘ক’ সেটের প্রশ্নের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়া গেছে।
প্রশ্নপত্রটি হোয়াটসঅ্যাপের ‘English 1st part 2018’ নামে একটি গ্রুপ থেকে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নটি ছড়িয়ে যায়। আজ সকাল ১০টায় ইংরেজি প্রথমপত্র পরীক্ষাটি শুরু হয়ে শেষ হয় দুপুর ১টায়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ইংরেজি প্রথমপত্র প্রশ্নও ফাঁস হওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়সহ আমরাও তদারকি করছি। গত ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা প্রথমপত্রের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর পর ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে পরীক্ষা শুরুর প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র পাওয়া যায় ফেসবুকে। এদিকে প্রশ্নফাঁস ভয়ঙ্কর রূপ নেয়ায় দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট নাগরিকরা বলছেন, সরকারের এত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকতে প্রশ্নফাঁসকারীদের চিহ্নিত এবং ফাঁসের উৎস বের করতে না পারা হতাশাজনক। দিনের পর দিন প্রশ্নফাঁসের কারণে পাবলিক পরীক্ষার ওপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে গেছে। এভাবে কোনো দেশের শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না। সরকারকে এবার কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় তালগোল পাকানো, দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্রের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার দায়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগ করা উচিত। তিনি পদত্যাগ না করলে সরকারের উচিত তাকে বরখাস্ত করা।

রূপা গণধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ১২ ফেব্রুয়ারি

টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ঢাকার আইডিয়াল ল’ কলেজের শিক্ষার্থী রূপা খাতুনকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। সোমবার টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আবুল মনসুর মিয়া এ আদেশ দেন। আজ উভয় পক্ষের আইনজীবীরা আইনগত বিষয় উপস্থাপনের পর আদালত রায়ের দিন ধার্য করেন আদালত।
রোববার এ মামলায় উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। এদিন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা আসামিদের প্রত্যেককে নির্দোষ দাবি করেন এবং তাদের বেকসুর খালাস চান। এর আগে গত বুধবার আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষ। যুক্তিতর্ক কালে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, জব্দ তালিকার সাক্ষীসহ কোনো সাক্ষীই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হননি। পুলিশ ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানায়, সাক্ষীরা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছেন। প্রত্যেক আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান তারা। উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে রূপা খাতুনকে চলন্ত বাসে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্ষণ করে। এরপর তাকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে যায়। পুলিশ ছোঁয়া পরিবহনের চালক হাবিবুর, সুপারভাইজার সফর আলী এবং সহকারী শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করে। তারা সবাই এখন টাঙ্গাইল কারাগারে আছেন। ৩১ আগস্ট রূপার লাশ উত্তোলন করে তার ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

অর্থমন্ত্রীর দায় স্বীকার

২০১৭ সাল আমাদের অর্থনীতিতে ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর হিসেবে পরিচিতি পেলেও কেবল গত বছরই নয়, কয়েক বছর ধরেই টানা অনিয়ম-দুর্নীতি, ঋণ জালিয়াতি, লুটপাট গোটা ব্যাংকিং খাতকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। কিন্তু সোনালী-রূপালী-অগ্রণী-জনতা-বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকসহ প্রায় সবক’টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের অনিয়ম, এমনকি মূলধন পর্যন্ত খেয়ে ফেলার পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞসহ নানা মহলের সমালোচনা ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন মহলের দাবি রয়ে গেছে উপেক্ষিত। ফলে বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও দুর্নীতি-অনিয়মের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে সরকার, বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টদের দায় স্বীকার করে নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাই এখন ঋণখেলাপি, জালিয়াত ও ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তাকেই উদ্যোগ নিতে হবে। জানা যায়, সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার জন্য সরকার দায়ী। অনেক সময় আমরা রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ওপর চাপাচাপি করি। সোনালী ব্যাংক সবচেয়ে বড় হওয়ায় চাপাচাপিটা এর ওপর দিয়ে বেশি যায়।’ মন্ত্রীর এ দায় স্বীকারকে আমরা ইতিবাচক মনে করি। তবে দায় স্বীকার করে বসে থাকলে চলবে না, ভবিষ্যতে যেন ব্যাংকগুলোর কাজে হস্তক্ষেপ করা না হয় এবং ঋণখেলাপি ও লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক সাজার উদ্যোগ নেয়া হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ও অনিয়ম বেড়ে যাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান, এমডি ও পরিচালক নিয়োগ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়াই যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী,
তা বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর কর্মকাণ্ড থেকেই স্পষ্ট। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিভিন্ন মহলের কড়া সমালোচনার পরও আমরা ঋণখেলাপি ও ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তো দূরের কথা, এক ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে আসছি। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যেও বিষয়টি ফুটে উঠেছে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় না এনে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার খেসারত জনগণের করের অর্থ দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন জোগানের মধ্য দিয়ে দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রীর দায় স্বীকারের মধ্য দিয়ে আমরা আশাবাদী হতে চাই যে, ব্যাংকিং খাতের অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে এবার অন্তত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাত হয়ে পড়েছে গোটা অর্থনীতি তথা দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। ফলে এ খাতে অনিয়ম জেঁকে বসলে গোটা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা বলাই বাহুল্য। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে অচিরেই। এজন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নিয়ে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম দেখাশোনার জন্য একটি শক্তিশালী কমিশন, দ্রুত বিচার ও আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকিং খাতে পরিবারতন্ত্র দূরীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের শীর্ষমহল এগিয়ে এলে একটি সুশৃঙ্খল ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত প্রতিষ্ঠা করা কঠিন কিছু হবে না। খেলাপি ঋণের পেছনে মন্ত্রীর দায় স্বীকারের পর এসব উদ্যোগ না নেয়া হবে দুঃখজনক।

বইমেলা আন্তর্জাতিক রূপ পাক by মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

মহান ভাষা শহীদদের স্মরণে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। মেলার পরিধি বাংলা একাডেমির চত্বর ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অবধি বিস্তৃত করা হয়েছে বেশ আগেই। এবার মেলায় প্রকাশনী সংস্থার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মেলার পরিসর আরও বাড়ানো হয়েছে। বাংলা একাডেমির আয়োজনে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময়ব্যাপী এ গ্রন্থমেলা শুধু বইয়ের মেলা নয়, এ মেলা বাঙালির ভালোবাসা ও আবেগের মিশ্রণে প্রাণের মেলা। এ মেলাকে কেন্দ্র করে আমাদের সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটে এসেছে। বাঙালির ভাষা, সাংস্কৃতিক বোধ ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে শুরু থেকেই এ মেলা বাঙালির প্রাণের মেলায় রূপ নিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভের পর একুশের গ্রন্থমেলাও এক নতুন ধারায় প্রবেশ করেছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং অমর একুশের গ্রন্থমেলা একই সূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে। এ মাসটির জন্যই যেন পুরো একটি বছর অপেক্ষা করে দেশের বাংলা ভাষাপ্রিয় মানুষ। লেখক, প্রকাশকরাও একুশের মেলায় তাদের শ্রেষ্ঠ বইটি উপহার দিতে নিরন্তর কাজ করে যান। একুশের গ্রন্থমেলায় স্টলে স্টলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রবীণ, নবীন লেখকের নানা ধরনের বইয়ের পসরা বসে। এ মেলার মধ্য দিয়ে লেখক-পাঠক মতবিনিময় ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়।
দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তবুও স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা বায়ান্নর আত্মত্যাগের অভিযাত্রার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। বরং ধীরে ধীরে হারাতে বসেছি আমাদের বাঙালির ঐতিহ্য ও কৃষ্টি। পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণে আমাদের অর্জিত গৌরবও অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারেই যেন বেশি আগ্রহী নতুন প্রজন্ম। বাংলা গান, বাংলা চলচ্চিত্রে তাদের উৎসাহ কম। সরকারি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি দেশের অফিস, আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে। উপরন্তু কখনও কখনও বাংলা ভাষা হচ্ছে অনাদৃত, অবহেলিত। দেশজুড়ে ইংরেজি সাইনবোর্ডের ছড়াছড়ি। বিজ্ঞাপন, প্রচারপত্রে বাংলা ব্যবহারে চরম উদাসীনতা লক্ষণীয়। দেশে প্রকাশিত, মুদ্রিত বাংলা বইয়ে অসংখ্য ভুল-ভ্রান্তি ও অসঙ্গতি চোখে পড়ে। বাংলা বানানেও আজ অবধি প্রতিষ্ঠিত হয়নি একটি জাতীয় মান। তারপরও ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া গ্রন্থমেলায় হাজার হাজার মানুষের আগমন, অগণিত বাংলা বইয়ের বিকিকিনির মূল্য অনেক। বাংলা ভাষা-সাহিত্যে দেশে অনেক বিশ্বমানের লেখক থাকা সত্ত্বেও আমাদের সাহিত্য এখনও বিশ্বে তেমন সুপরিচিত নয়। তাই বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দিতে মাতৃভাষা চর্চা ও গবেষণাসহ বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলায় লিখিত ভালো বইগুলোকে বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় অনুবাদের ওপর জোর দিতে হবে। তেমনি বিদেশি বিভিন্ন উন্নতমানের বইকে বাংলায় অনুবাদের উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের একুশের গ্রন্থমেলাকে আন্তর্জাতিক বইমেলায় রূপ দিতে বিদেশি প্রকাশকদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমির বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার

মরণব্যাধি ক্যান্সার

বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি)-এর তথ্য উদ্ধৃত করে রোববারের যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখ ২২ হাজার মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়।
এই বিপুলসংখ্যক রোগীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের স্বীকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরেই থেকে যায়। অর্থ সংকটের কারণেই যে ক্যান্সারে আক্রান্ত অনেক রোগী আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। এ প্রেক্ষাপটে দেশে ক্যান্সারসহ অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসা যাতে সুলভে পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার দৈন্যদশার চিত্র নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক আলোচনা হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা মিলছে না। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেলে ক্যান্সারে আক্রান্তদের প্রায় ৫০ ভাগকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্যান্সারের চিকিৎসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ রোগে আক্রান্তদের আরোগ্য লাভের বিষয়টি যে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য অন্তত একটি ক্যান্সার হাসপাতাল থাকা প্রয়োজন। সেই হিসাবে ১৬০টি ক্যান্সার হাসপাতাল এবং ১৬শ’ বিশেষজ্ঞের চাহিদা থাকলেও আছে যথাক্রমে ১৮টি ক্যান্সার হাসপাতাল ও মাত্র দেড়শ’ বিশেষজ্ঞ। বিদ্যমান ক্যান্সার হাসপাতালের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বেশিরভাগ অকার্যকর থাকার বিষয়টিও উদ্বেগজনক। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক রোগী সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা মেডিকেল কলেজগুলোর ওপরই বিশেষভাবে নির্ভর করে।
এসব এলাকার অনেক রোগীর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্যন্ত আসার সামর্থ্যও নেই। সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেডিওথেরাপি মেশিনসহ অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতি যাতে সবসময় সচল থাকে তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ছাড়া এখনও পর্যন্ত দেশে সরকারি-বেসরকারি এ বিষয়ক কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বস্তুত ক্যান্সার চিকিৎসা রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ক্যান্সার রোগ নিরাময়ের বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

মধ্যরাতে মোরগ ডাকার রহস্য by জয়া ফারহানা

ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। আমাদের দশা হয়েছে ঘর পোড়া গরুর। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারার অন্যায় ব্যবহার এবং ব্যবহারের প্রবণতার কারণে বহু সাংবাদিকের হয়রানি দেখেছি। উদাহরণ দেয়ার প্রয়োজন দেখছি না। নাম এবং ঘটনাগুলো মনে হয় মোটামুটি সবার মুখস্থ হয়ে গেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন কি নতুন মহার্ঘ জিনিস প্রসব করল? এই আইনের সঙ্গে তো চরিত্র ও চেহারায় সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে সেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনের। এক হিসাবে একে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের সম্প্রসারণ বললেও বোধহয় খুব বাড়িয়ে বলা হয় না। এ এমন এক আইন, যেখানে অনলাইনে সদ্য আগত আনাড়ি ফেসবুকার না বুঝে বা ভুল বুঝে বা অর্ধেক বুঝে কোনো স্ট্যাটাস সমর্থনের কারণেও ফেঁসে যেতে পারেন কিংবা কেউ তাকে ফাঁসিয়ে দিতে পারেন। নিরপরাধ বহু মানুষের ভোগান্তির আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। অনেকের ধারণা প্রিন্ট মিডিয়া এই আইনের আওতাবহির্ভূত। ঠিক নয়। প্রিন্ট মিডিয়ার যে লেখাগুলো অনলাইন সংস্করণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, সেসব লেখার কোনো একটি বাক্যও যদি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতমূলক, কোনো ইজ্জতদারের ইজ্জতনাশক, মানহানিকর অথবা গুপ্তচরবৃত্তির দোষে দোষণীয় হয় তবে এ আইনের দায় থেকে প্রিন্ট মিডিয়ার লেখাও মুক্ত থাকে না। অতএব কোনো সংবাদ মাধ্যমেরই একে বরণীয় আইন ভেবে ফুরফুরে মেজাজে থাকার সুযোগ নেই।
সামরিক গর্ভে যেসব দলের জন্ম, তাদের আমলে হলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকার, যে সরকার আবার গঠন করেছে এমন দল, যে দলের ইতিহাস মানে বাংলাদেশের ইতিহাস, তাদের শাসনামলে কী করে অংশীজনদের মতামত ছাড়া সবাইকে ফাঁসাতে পারে এমন একটি আইন মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে দিল, তা কিছুতেই আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। প্রায় সব শ্রেণী-পেশার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এই আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে চূড়ান্ত রকম বাধাগ্রস্ত করবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করবে, নানামাত্রিক গবেষণার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করবে। কেউ কেউ একে মধ্যযুগের আইন হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন। এই মন্তব্যের যথার্থতাও আছে। একমাত্র মধ্য যুগেই শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে রা কাড়লে শূলে চড়তে হতো। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ একরকম ডিজিটাল শূল, যে শূলে প্রতিপক্ষকে চড়ানোর সমস্ত বন্দোবস্তই রাখা হয়েছে। প্রায় প্রত্যেক পেশাজীবী-শ্রেণী এর বিরোধিতা করেছেন। কেবল আমলারা বলছেন, এসবের কিছুই হবে না, কাউকেই শূলে চড়ানো হবে না। আমলাদের এই আশ্বাসবাণী এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে অটোমেটিক বেরিয়ে যায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর খসড়া পড়লে দেখা যাবে, সংশ্লিষ্ট মহলের ‘সদিচ্ছা’ থাকলে প্রতিপক্ষকে জব্দ করার জন্য এর চেয়ে ভালো আইন আর নেই। ৩২ ধারা নিয়ে তো সরকারসমর্থক সাংবাদিকগোষ্ঠীই লজ্জা পেয়েছেন। এত স্থূল কৌশলে যে ৫৭ ধারা আবার ফেরত আসবে, সম্ভবত তারাও তা ভাবতে পারেননি। নতুন সংযোজিত ৩২ ধারায় বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ সংস্থার অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করলে বা করতে সহায়তা করলে তিনি ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধে অপরাধী হবেন। যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা। এই ধারা কেবল সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক নয়, একই সঙ্গে তথ্য অধিকার আইনেরও পরিপন্থী। একই সঙ্গে ৩২ ধারার প্রতিটি শব্দ সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি রাখে। প্রশাসনের স্বচ্ছতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইনে কেবল কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়া সরকারের আর সব সংস্থার তথ্য পাওয়ার অধিকার সবার ছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এই অধিকার হরণ করল। হিসাব করে দেখলাম, এই আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের চারটি পত্রিকা এবং কয়েকটি চ্যানেলের পক্ষেই কেবল টিকে থাকা সম্ভব এবং বাকি সব পত্রিকা এবং চ্যানেল যদি ওই চার পত্রিকা এবং চ্যানেলকে অনুসরণ করতে পারে তাহলেই কেবল ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ নিয়ে চিন্তার কিছু থাকে না। অবশ্য সে ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর মতো কোনো আইন প্রণয়নেরও প্রয়োজন নেই। সরকারের অনেক আমলা এবং কোনো কোনো মন্ত্রী নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যেতে বলেছেন।
আশ্বস্ত করেছেন ভয়ের কিছু নেই। আমরা জানি অনেকের জন্যই ভয়ের কিছু নেই। এবং কারও জন্যই ভয়ের কিছু থাকত না যদি সংবাদ শুরু করা যেত এভাবে- ‘সংবাদ সংস্থা বাসসের মাধ্যমে পাওয়া খবর অনুযায়ী...’। সংশ্লিষ্ট মহল দাবি করেছে, কোন অপরাধে কোন ধারা প্রযোজ্য হবে এবারের আইনে তা পরিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু পরিষ্কার হয়েও হল না পরিষ্কার। আইসিটি অ্যাক্টের সঙ্গে কী এমন তফাৎ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের। পরিবর্তন দেখছি কেবল একটি জায়গাতেই। আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারায় মানহানির মামলায় শাস্তি ছিল চৌদ্দ বছর এবং তা জামিন অযোগ্য। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানহানির মামলায় সাজা কমিয়ে তিন বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড এবং জামিনযোগ্য রাখা হয়েছে। ২৮ ধারার কথাই যদি বলি, সেখানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে ১০ বছরের জেল এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। ২৯ ধারায় মানহানির শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নিয়ে গত বছর আগস্টে বিস্তর আলাপ হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সুবাদে নাসিরনগর এবং ঠাকুরপাড়া জ্বলে পুড়ে খাক হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ব্যাখ্যা কী তা আইসিটি আইনেও যেমন অস্পষ্ট ছিল, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও তেমন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন থেকে গেল। ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ গল্পটির কথা মনে পড়ে যায়। মনিব অনুকূলের শিশুপুত্র খোকাবাবুকে হারানোর খেসারত হিসেবে নিজের শিশুপুত্রকেই মনিবের ঘরে প্রতিস্থাপন করেছিল ভৃত্য রাইচরণ। প্রত্যাবর্তনের ক্ষণে মনিব অনুকূল যখন রাইচরণকে জিজ্ঞেস করল এমন বিশ্বাসঘাতকতা কেমন করে করল। রাইচরণের জবাব, বিশ্বাসঘাতক আমি নই প্রভু, বিশ্বাসঘাতক আমার ঈশ্বর, আমার অদৃষ্ট। কিন্তু আমাদের তো রাইচরণের মতো সে উপায়ও নেই। অ্যানালগের কালে না হয় অদৃষ্টকে দোষারোপ করে পার পাওয়ার উপায় ছিল। তথ্যপ্রযুক্তি আইন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনরূপে প্রত্যাবর্তনের এই ডিজিটাল যুগে তা মানানসইও হবে না। আইন-কানুনের ট্রুমা ভোলার সুযোগে আমরা বরং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের চেহারা কেমন হতে পারে তা ভেবে নিতে পারি। ধরা যাক কোনোরকম বাধাবিঘœ ছাড়া দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের ভোটে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ পাস হয়ে গেল। কেমন হবে তখন গণমাধ্যম?
পুত্রের প্রশ্ন পিতাকে। বাবা মোরগ ডাকে কেন?
কেউ মিথ্যা বললেই মোরগ ডেকে ওঠে।
তাহলে মধ্যরাতে মোরগগুলো সবচেয়ে উচ্চস্বরে ডেকে ওঠে কেন?
ওই সময় যে চ্যানেলগুলোয় টকশোগুলো শুরু হয়। আর সব পত্রিকা ছাপা হতে থাকে।
জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

মিসরের ভেতরে জঙ্গি আস্তানায় ইসরাইলের গোপন বিমান হামলা

মিসরের ভেতরে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার দিয়ে গুপ্ত হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসির অনুমোদন সাপেক্ষেই গত দুবছর ধরে অশনাক্ত ইসরাইলি বিমান দিয়ে শতাধিক হামলা চালানো হয়েছে। রোববার নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে। মার্কিন দৈনিকটির খবরে বলা হয়েছে, এই অসাধারণ সহযোগিতার মাধ্যমে দেশ দুটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিকাশের ক্ষেত্রে নতুন স্তরে পৌঁছে গেছে। তিনটি যুদ্ধ কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া বৈরিতা, বিব্রতকর শান্তি চুক্তির প্রতিপক্ষ মিসর-ইসরাইল জঙ্গিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে গোপন মিত্রে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেন, সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি চক্র ছাড়া বাকিদের কাছে সিসি এই বিমান হামলার কথা গোপন রেখেছেন। নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, মিসরের ভেতর থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় দুই প্রতিবেশী দেশই ইসরাইলের হামলার খবর গোপন রেখেছে। অথচ মিসরীয় কর্মকর্তারা ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ গণমাধ্যম ফিলিস্তিন কেন্দ্র করে ইসরাইলের শাস্তি এবং বিশ্বস্ত থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়ার কথা বলে আসছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যেন শনাক্ত না করা যায়, সে জন্য ইসরাইলের ড্রোনগুলোতে কোনো চিহ্ন রাখা হয়নি। জঙ্গিবিমান ও হেলিকপ্টার থেকে ইসরাইলের লোগো ঢেকে রাখা হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন উ. কোরিয়ার আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান

উত্তর কোরিয়া তাদের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠাচ্ছে। শীতকালীন অলিম্পিক চলাকালে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে উত্তর কোরিয়ার আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান কিম ইয়ং ন্যাম শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। দক্ষিণ কোরিয়ার একত্রীকরণ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে,
এ সময়ে তার সঙ্গে ২২ জনের একটি প্রতিনিধি দল থাকবে। গত চার বছরে দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাওয়া উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হবেন দেশটির পার্লামেন্টপ্রধান কিম ইয়ং ন্যাম। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ব্লু হাউস নামক এক কর্মকর্তা বলেন, দুই কোরিয়ার সম্পর্ক উন্নয়নে এ সফর উত্তর কোরিয়ার সদিচ্ছার প্রতিফলন ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুই কোরিয়ার ক্রীড়াবিদরা একটি পতাকার তলে সমবেত হয়ে মার্চ করবেন বলে জানা গেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পাহাড়ি অঞ্চল পিয়ংচ্যাংয়ে শুক্রবার শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি থাকবেন কিনা, তা জানা সম্ভব হয়নি।

সিঙ্গাপুরে রেডঅ্যালার্ট জারি, জঙ্গি হামলার আশঙ্কা

জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় রেডঅ্যালার্ট জারি করা হয়েছে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ দেশ সিঙ্গাপুরে। সিঙ্গাপুরকে জঙ্গি হামলা থেকে এখন পর্যন্ত মুক্ত রাখতে পেরেছে দেশটির সরকার। কিন্তু সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া ও ফিলিপাইনে নাশকতার ঘটনায় আটক জঙ্গিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরেও হামলার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
এর পর থেকে সিঙ্গাপুরেও নাশকতার আশঙ্কা করছে পুলিশ। সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সিঙ্গাপুরে ক্রমশ জঙ্গি হামলার প্রবণতা বাড়ছে। একদিকে দেশের অভ্যন্তরেই বিভিন্ন জঙ্গি কার্যকলাপের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মৌলবাদীদের সংগঠন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এর সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সংগঠনও সিঙ্গাপুরকে টার্গেট করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খবর, ১৯৯০ সাল থেকেই সিঙ্গাপুরকে জঙ্গিরা টার্গেট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর তৎপরতায় প্রতিবারই তা ভেস্তে যাচ্ছে। সম্প্রতি দক্ষিণ ফিলিপাইনের একটি পুরো শহরকে কিছু দিনের জন্য দখল করে নিয়েছিল আইএস জঙ্গিরা। তার পর থেকেই সিঙ্গাপুরে জঙ্গি হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা গেছে, আইএস ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের হামলার শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। তাই সিঙ্গাপুরের পুলিশ প্রশাসনও রেলওয়ে স্টেশন থেকে শুরু করে শপিংমল, পার্কসহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। এ ছাড়া বড় স্ক্রিনে জনগণের উদ্দেশ্যে জঙ্গি হামলা নিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। যে কোনো ধরনের সন্দেহজনক বস্তু বা ব্যক্তি দেখলে তা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছে।

দলের নারী কর্মীদের ঝাড়ু মিছিলের মুখে পিছু হটলেন মন্ত্রী

কোন্দলের জেরে নিজ দলের নারী কর্মীদের ঝাড়ু মিছিলের মুখে পিছু হটতে হয়েছে খোদ মন্ত্রীকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমানে এ ঘটনা ঘটে। আর ঘটনার শিকার হয়েছেন তৃণমূলের মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী। বর্ধমানের মঙ্গলকোটের নারী কর্মীদের অভিযোগ, এলাকায় অশান্তির জন্য দায়ী মন্ত্রী ও তার সমর্থকরা।
তারা ঝাড়ু হাতে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বিক্ষোভ করেন। পরে পুলিশি হস্তক্ষেপে অবরোধ তুলে নেন তারা। জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই মঙ্গলকোটের বিধায়ক সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী ও ব্লক সভাপতি অপূর্ব চৌধুরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। এর ধারাবাহিকতায় গত বুধবার রাতে কাশেমনগর ফুটবল ময়দানে বৈরাগ্যচাঁদের মেলায় অপূর্ব চৌধুরীর সমর্থক সাগর শেখকে মারধর করে সিদ্দিকুল্লাহ শিবিরের লোকজন। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিধায়ক শিবিরের এক সমর্থকের দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়। মারধরও করা হয় পেঙা শেখ নামে ওই সমর্থককে। এ ঘটনা কেন্দ্র করে শুক্রবার সকাল থেকেই মেলা চত্বর ছিল থমথমে। বেলা বাড়তেই বোমাবাজি শুরু হয় দুপক্ষের মধ্যে। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। শনিবার সকাল থেকে দুই গোষ্ঠীর বোমাবাজিতে ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মঙ্গলকোটের চাকদা গ্রাম। আহতও হন বেশ কয়েকজন। এদিন সকালে মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ এলাকায় পৌঁছলে স্থানীয় মহিলা তৃণমূল কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় দুপক্ষের ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ইয়ামেনে নোবেলজয়ী তাওয়াক্কুল কারমানকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার

ইয়ামেনে সৌদি জোটের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করায় সালাহ পার্টি থেকে শান্তিতে নোবেলজয়ী তায়াক্কুল কারমানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রোববারে শেষ হওয়া লন্ডনের ওয়ারউইক অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলনে কারমান বলেন, ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব ও আমিরাত ইয়ামেনে অপরিণামদর্শী হামলা চালাচ্ছে।
-খবর রয়টার্স। এর আগে তিনি টুইটারে লিখেছেন- হুতি মিলিশিয়াদের অভ্যুত্থানকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে সৌদি ও আমিরাত সানায় কুৎসিত দখলদারিত্বে মেতে উঠেছে। ইয়ামেনে তারা নোংরা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইসলাহ পার্টিকে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের ইয়ামেন শাখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সৌদি ও আমিরাত ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখছে। কিন্তু তাওয়াক্কুলের এ মন্তব্যের পর ইসলাহ পার্টি তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে এবং তাকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। ইসলাহ পার্টি তার বিবৃতিতে বলেছে, তাওয়াক্কুল কারমানের বক্তব্য দল ও দলীয় নীতির প্রতিনিধিত্ব করে না। তার কথার সঙ্গে দলীয় অবস্থানের মিল নেই। এ কারণে দলের মহাসচিব তাকে দলীয় পদ থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হুতি মিলিশিয়ারা সানা দখলের পর থেকে কারমান ইয়ামেন ত্যাগ করেন। বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি তার দল ইসলাহের নেতাদের রিয়াদের বন্দি ও দাস হিসেবে আখ্যা দেন।

রাতে অস্ত্রোপচার, দিনে পরীক্ষা দিলেন মা

রাত ১টায় অস্ত্রোপচারের (সিজার) মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেন তিনি। এর ২৪ ঘণ্টা পর গতকাল শনিবার বেলা ১টায় নবজাতককে সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষার হলে এসে স্নাতক (পাস) পরীক্ষা দিলেন ওই মা। ব্রা‏হ্মণবাড়িয়ার কসবা টি. আলী কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়া ওই মায়ের নাম রৌশনারা বেগম। পরীক্ষার্থীর পরিবার ও কলেজসূত্রে জানা গেছে, রৌশনারা উপজেলার কসবা পশ্চিম ইউনিয়নের আকছিনা গ্রামের বাসিন্দা। ২০১৬ সালে বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের সংকুচাইল গ্রামের সালাউদ্দিন সোহাগের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। রৌশনারা কসবা মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক (পাস) পরীক্ষার তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিচ্ছেন। আর মাত্র একটি পরীক্ষা বাকি আছে তাঁর। গত শুক্রবার রাতে রৌশনারার প্রসব ব্যথা উঠলে তাঁকে উপজেলার কুটি চৌমহনী সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি ছেলে হয়।
পরদিনই (গতকাল) রৌশনারা তাঁর বড় বোন ইয়াছমিন আক্তার ও মা নুরজাহান বেগমকে সঙ্গে নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নবজাতককে নিয়ে পরীক্ষা দিতে আসেন। পরীক্ষা শেষে আবারও হাসপাতালে ফিরে যান তিনি।  সরেজমিনে পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, রৌশনারা অন্য পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে পরীক্ষা দিচ্ছেন। পাশের একটি কক্ষে নবজাতকটিকে তোয়ালে দিয়ে মুড়িয়ে কোলে নিয়ে বসে আছেন রৌশনারার বড় বোন ও মা। ঘণ্টাখানেক পরপর গিয়ে নবজাতকে দেখে আসছেন মা রৌশনারা। পরীক্ষা শেষে রৌশনারা বলেন, ‘পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। নতুবা আমার জীবন থেকে একটি বছর চলে যেত। সকালেও চিন্তা করতে পারিনি পরীক্ষায় অংশ নেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসকের পরামর্শ মেনেই পরীক্ষা দিতে এসেছি।’ কক্ষ পরিদর্শক কসবা টি. আলী কলেজের ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আলমগীর উসমান ভূইয়া বলেন, ‘এটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। রৌশনারার কাছে অসুস্থতাও হার মেনেছে। প্রত্যেক মেয়ের এ ধরনের সাহস থাকা প্রয়োজন।’

পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা

পরীক্ষার হলে নকল করা ঠেকাতে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় নজরদারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায়। চলতি মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় উপজেলার ১২টি কেন্দ্রের ২০টিতে ভেন্যুতে স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। আজ রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা সদরের বাউফল ছালেহিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আরবি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা দিচ্ছে পরীক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের সবাই উত্তরপত্রে লেখায় ব্যস্ত। কেউ নকল করছে না বা উঁকি দিয়ে আরেকজনের খাতা দেখার চেষ্টা করছে না। অধ্যক্ষের কার্যালয়ে বসে মনিটরে তা তদারক করছেন পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা সহকারী পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা নাজমুন নাহার ইরানী। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার কক্ষে সিসি ক্যামেরার কারণে পরীক্ষা তদারক করা সহজ হয়েছে। নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষার্থীরাও সাবলীলভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে।’ একটু পরেই পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হন পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার্থীদের মধ্যে নকলের প্রবণতা দূর করা এবং শৃঙ্খলা রাখার জন্য সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে উপজেলার এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার সব কেন্দ্র ও ভেন্যু। বিগত পরীক্ষাগুলোতে বিভিন্ন কেন্দ্রে থেকে নকলের অভিযোগ পেতাম। এ ছাড়া কারণে-অকারণে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পরীক্ষার কেন্দ্রে ঢুকে পড়তেন; যা আমার একার পক্ষে রোধ করা সম্ভব ছিল না। তাই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সফলতাও পেয়েছি। প্রথম দিন কোনো কেন্দ্র থেকে কোনো অনিয়মের অভিযোগ আসেনি। নকল দূর করতে এটি একটি সহজ উপায়। আর এ উদ্যোগকে সফল করতে আর্থিকভাবে সহায়তা করেছে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রপ্রধান ও উপজেলা পরিষদ।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেন, যেসব শিক্ষক প্রাইভেট পড়ান, তাঁরাই পরীক্ষার সময় নকল সরবরাহে ব্যস্ত থাকতেন। এতে পরীক্ষার পরিবেশ পরিবেশ নষ্ট হতো। এ বছর পরীক্ষার কক্ষে সিসি ক্যামেরা থাকায় ওই শিক্ষকেরা পরীক্ষার কেন্দ্রের আশপাশেও আসেননি। ২০১৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষানুরাগী হিসেবে পুরস্কৃত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মজিবুর রহমান বলেন, সারা দেশে এ রকম পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মন দেবে। জেলা প্রশাসক মাছুমুর রহমান বলেন, ‘এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এ পদ্ধতিতে জেলা থেকেও আমার দপ্তর থেকে পরীক্ষা তদারকি করা সম্ভব হবে। সারা দেশের জন্য পরীক্ষাপদ্ধতির এটি একটি উদাহরণ হতে পারে।’ উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার মো. সোহেল রানা বলেন, এবার বাউফলে ৬০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চার হাজার ৮৭৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। আর দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১ হাজার ৭১৭ জন শিক্ষার্থী।
সিসি ক্যামেরার আওতায় যেসব কেন্দ্র ও ভেন্যু
বাউফল মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাউফল আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কালাইয়া হায়াতুন্নেছা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নওমালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নওমালা আবদুর রশিদ খান ডিগ্রি কলেজ, বগা ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ডা. ইয়াকুব শরীফ ডিগ্রি কলেজ, কালিশুরী এসএ ইনস্টিটিউট, কালিশুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেশবপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কেশবপুর মহাবিদ্যালয়, কনকদিয়া স্যার সলিমুল্লাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কনকদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাউফল ছালেহিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, ইঞ্জিনিয়ার ফারুক তালুকদার মহিলা ডিগ্রি কলেজ, কালাইয়া রব্বানিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, কালিশুরী ডিগ্রি কলেজ, কনকদিয়া এসএস মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ এবং পশ্চিম নওমালা নেছারিয়া আলিম মাদ্রাসা।

অনাগত রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

রাখাইনে গত বছরের আগস্টের সহিংসতার পর থেকে রোহিঙ্গা নারীরা ব্যাপক হারে মিয়ানমার সেনাবাহিনী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। নিপীড়নের শিকার এসব নারীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যকই সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েছেন। কয়েক মাসের মধ্যে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্মানোর পর তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে শঙ্কা আছে। অস্ট্রেলিয়ার দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকা লেবার-দলীয় সিনেটর লিসা সিং ও ন্যাশনালস-দলীয় এমপি অ্যান্ড্রু ব্রডের সাম্প্রতিক কক্সবাজার সফরের ওপর ভিত্তি করে এ খবর ছেপেছে। অস্ট্রেলিয়ার সিনেটর লিসা সিং ও এমপি অ্যান্ড্রু ব্রড সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরের সময় কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাঁরা শিশুবান্ধব কয়েকটি শিবিরে গিয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের আঁকা ছবি দেখে বিস্মিত হয়েছেন। লিসা সিং বলেন, শিশুদের কাঁচা হাতে আঁকা ছবিতে পোড়া বাড়ি, হেলিকপ্টার থেকে বাড়িগুলোতে গুলি ছোড়া আর গাছে ঝুলে থাকা লোকজনের লাশ জীবনের মাঝে সংঘাতের বর্ণনা দিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার দুই রাজনীতিবিদই চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে ধর্ষণের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের সম্পর্কে জেনেছেন। বিশেষ করে এর মধ্যেই যেসব নারী সন্তানসম্ভবা হয়েছেন, তাঁদের খোঁজ নিয়েছেন তাঁরা। লিসা সিং বলেন, এসব নারীর ঘরে জন্মানো শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশে এপ্রিল আর মে মাসে বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে এরই মধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরে ভূমিধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর এ সময়টায় ধর্ষণের শিকার উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক নারীর সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৬ লাখ ৮৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালের অক্টোবরের পর থেকে পরের কয়েক মাসে আরও ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। ‘সম্ভব হলে’ দুই বছরের মধ্যে প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার যে চুক্তি সই করেছে। মিয়ানমারের সংবাদ সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমার-এর এক বিশ্লেষণে বলা বলছে, রাখাইনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বহিরাগমন বিভাগের কর্মকর্তারা সেখানকার গণমাধ্যমকে বারবার বলেছেন রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সম্পর্কে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে। অথচ কী সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়েছে, তা মিয়ানমার জানায়নি। রাখাইনে ফেরার পর রোহিঙ্গাদের আদি নিবাসে ফেরার বিষয়টিও মিয়ানমার নিশ্চিত করেনি। স্থানীয় রাজনীতিবিদেরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের তাদের এলাকায় ফিরতে দেওয়া হবে না। অধিকাংশ বাড়িঘর পুড়ে যাওয়ায় রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরবে কি না, সেটা কর্তৃপক্ষও স্পষ্ট করে বলছে না। উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে ১১টি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব জায়গা এখনো বসবাসের উপযোগী নয়।

ফিলিস্তিনের প্রতি অনন্য সংহতি

পবিত্র ভূমি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা প্রায় দুই মাস হতে চলল। এ ঘোষণা নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। প্রতিবাদ জানাতে ফিলিস্তিনিরা রাজপথে বিক্ষোভে নেমেছেন। মধ্যপ্রাচ্য দিন দিন যেন পরিণত হচ্ছে উত্তপ্ত উনুনে। তবে ট্রাম্পের ওই ঘোষণার প্রতিবাদ করতে একেবারে ভিন্ন পথে হাঁটলেন এক ফিলিস্তিনি দম্পতি। গাজা উপত্যকার খান ইউনিসের বাসিন্দা নিদাল ও ইসলাম আল-সাইকলি নামের ওই দম্পতির ঘর আলো করে একসঙ্গে এসেছে তিন সন্তান। ফিলিস্তনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং ইসরায়েলের নয়, ফিলিস্তিনের রাজধানী জেরুজালেম হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরা ওই ত্রয়ীর নাম রেখেছেন জেরুজালেম, ক্যাপিটাল ও প্যালেস্টাইন। জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানী মনে করেন ফিলিস্তিনিরা। তবে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এবং দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি পাশ কাটিয়ে গত ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করেন ট্রাম্প।
ওই ঘোষণার কয়েক দিন পর ওই ত্রয়ীর জন্ম। ত্রয়ীর মধ্যে দুজন ছেলে যাদের নাম রাখা হয়েছে জেরুজালেম ও প্যালেস্টাইন। আর কন্যাশিশুটির নাম দেওয়া হয়েছে ক্যাপিটাল। ত্রয়ীর মা ইসলাম আল-সাইকলি বলেন, ‘আল্লাহকে ধন্যবাদ, আমি একসঙ্গে তিন সন্তানের মা হতে পেরে। এই কারণেই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় আমরা তাদের নাম রাখতে সক্ষম হয়েছি।’ বাবা নিদাল বলেন, ‘ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কোনো মূল্য নেই। জেরুজালেম আমাদের স্থায়ী রাজধানী।’ শিশুদের নামের ব্যাখ্যা দিতে ওই দম্পতি একটি ছবি প্রকাশ করেছেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিছানায় শিশু তিনটি সার বেঁধে ঘুমিয়ে আছে, আর তাদের পেটের ওপর রাখা হয়েছে তাদের জন্মসনদ। আর শিশুদের এক পাশে মা আর ও অন্য পাশে বাবা বসে আছেন। অনেকে মনে করেন, ট্রাম্প বিশ্বরাজনীতির আগপাছ না ভেবেই বিতর্কিত ওই সিদ্ধান্ত নেন। ফলে ফিলিস্তিনিরা তাঁর ওপর বেজায় চটেছেন। নেমেছেন প্রতিবাদী বিক্ষোভ ও ন্যায্য দাবি আদায়ের সংগ্রামে। ১৯৬৭ সালে ছয় দিন স্থায়ী আবর-ইসরায়েল যুদ্ধের পর জেরুজালেমকে দখল করে  ইসরায়েল তা নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা দেয়। তবে ইসরায়েলের এই দাবি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কখনো স্বীকৃতি দেয়নি।

‘আমি খুবই বিপজ্জনক’

পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ইমরান খানের এক আচরণে বিস্ময় প্রকাশ করেছে দেশটির সাংবাদিক সমাজ। গত শনিবার লাহোরে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ক্রিকেট থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া এই নেতা বলেছেন, ‘আমি খুবই বিপজ্জনক’।
লাহোরের শওকত খানম ক্যানসার হাসপাতালের বোর্ড অব গভর্নরের বৈঠকে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ইমরান। এ সময় লাহোর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত পিটিআইয়ের নেতা জাহাঙ্গীর তারিনের কার্যালয়েও ঢুঁ মারেন তিনি। সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একজন সাংবাদিক ইমরানকে প্রশ্ন করে বসেন, তিনি কি এনএবির (পাকিস্তানের দুর্নীতিবিরোধী সর্বোচ্চ সংস্থা) মুখোমুখি হবেন? তখন এই নেতার কাছ থেকে খুবই অপ্রত্যাশিত একটি উত্তর আসে। তিনি বলেন যে তিনি খুবই বিপজ্জনক। এরপর তিনি আর কোনো প্রশ্ন করারই সুযোগ দেননি এবং গন্তব্যের উদ্দেশে দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়েন।

ইসরায়েলের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করছে পিএলও

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ‘ছিন্ন’ করার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) দ্বারস্থ হবে পিএলও। এর আগে পিএলও গত মাসে জানিয়েছিল, রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে দেওয়া স্বীকৃতি তারা প্রত্যাহার করে নেবে। গত শনিবার সন্ধ্যায় পিএলওর নির্বাহী কমিটির দীর্ঘ বৈঠক হয়। বৈঠকের পর পিএলও জানায়, ‘অধিকৃত ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক পর্যায়...থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করার জন্য’ ফিলিস্তিন সরকারকে তারা বলেছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার খবর অনুসারে, পিএলওর নির্বাহী কমিটি আরেকটি উচ্চতর কমিটি গঠন করতে চাইছে। যার উদ্দেশ্য হবে ইসরায়েলকে দেওয়া পিএলওর স্বীকৃতি বাতিল করা। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে ধরে পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় নিজেদের রাষ্ট্র গঠন করতে চেষ্টা করে আসছে। তা জানা সত্ত্বেও একতরফাভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৬ ডিসেম্বর পবিত্র ভূমি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এতে ক্ষুব্ধ হন ফিলিস্তিনি নেতারা। ট্রাম্পের স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে ওই অঞ্চলের পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী এবং স্বাধীনতাকামী দল হামাসের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলের সেনারা। বহু হতাহতের ঘটনা ঘটছে গাজা ও পশ্চিম তীরে।
এতে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে অবস্থান পরিবর্তনে পিএলওর ওপর চাপ বেড়েছে। উদ্ভূত প্রেক্ষাপটে হয় পিএলওর নির্বাহী কমিটির ওই বৈঠক। বৈঠকের পর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে পিএলও। এতে বলা হয়, ইসরায়েলে অবৈধ বসতি স্থাপন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও ফিলিস্তিনিদের জাতিগত হত্যার বিষয়ে বিচারিক তদন্ত শুরু করতে আইসিসিকে অনুরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য, ইসরায়েলি রাজনীতিক, সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ায় আনা। ফিলিস্তিন সরকার ২০১৫ সালে আইসিসির কাছে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের নথি দাখিল করে। কিন্তু ফিলিস্তিনের অভিযোগ নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও শুরু করেনি আইসিসি। পিএলওর বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করতে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ২০ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভাষণ দেবেন। এর আগে ১৫ জানুয়ারি পশ্চিম তীরের রামাল্লায় পিএলও সেন্ট্রাল কাউন্সিলের বৈঠকে অসলো চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাহার করার হুমকি দেওয়া হয়। বৈঠকে পরামর্শ আসে, ইসরায়েল যদি ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগের সীমন্ত অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি না দেয়, যাতে পূর্ব জেরুজালেম হবে রাজধানী, তবে অসলো চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসাই হবে যথাযথ সিদ্ধান্ত। পিএলও ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত অসলো চুক্তি অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশের বেশি বেসামরিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয় এবং ফিলিস্তিনের অর্থনীতির ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে ইসরায়েলের।

একক ব্যক্তির ঋণে বৃহত্তম কেলেঙ্কারি

ভয়ংকর রকম উদারভাবে ঋণ বিতরণ করেছে জনতা ব্যাংক। এক গ্রাহককেই মাত্র ৬ বছরে তারা দিয়েছে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার ঋণ ও ঋণসুবিধা। নিয়মনীতি না মেনে এভাবে ঋণ দেওয়ায় বিপদে ব্যাংক, গ্রাহকও ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে। অর্থাৎ এক গ্রাহক ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পেতে পারেন না। দেওয়া হয়েছে মোট মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ। ব্যাংক দেখভাল করার দায়িত্ব যাদের, সরকারের নিয়োগ দেওয়া সেই পরিচালনা পর্ষদই এই বিপজ্জনক কাজটি করেছে। হল-মার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর এটিকেই পারস্পরিক যোগসাজশে সাধারণ মানুষের আমানত নিয়ে ভয়ংকর কারসাজির আরেকটি বড় উদাহরণ বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তারা বলছেন, এটি একক ঋণের বৃহত্তম কেলেঙ্কারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাতের সময় এই অর্থ দেওয়া হয়।
২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এ সময় ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলরাম পোদ্দার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক নাগিবুল ইসলাম ওরফে দীপু, টাঙ্গাইলের কালিহাতী আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী যুবলীগ নেতা আবু নাসের প্রমুখ। অনুসন্ধানেও জানা যাচ্ছে, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের এই পর্ষদের উৎসাহই ছিল বেশি। পর্ষদের সিদ্ধান্তে বারবার ঋণ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয় খেয়ালখুশিমতো। ব্যাংকের উদার আনুকূল্য পাওয়া এই গ্রাহক হচ্ছে এননটেক্স গ্রুপ। এর পেছনের মূল ব্যক্তি হচ্ছেন মো. ইউনুস (বাদল)। তিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তাঁরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট ২২ প্রতিষ্ঠানের নামে সব ঋণ নেওয়া হয়। তাঁর মূল ব্যবসা বস্ত্র উৎপাদন ও পোশাক রপ্তানি। জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে গত তিন বছর দায়িত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান। গত ৭ ডিসেম্বর তাঁর চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হয়েছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে তারা আরও ঋণ চেয়েছিল, আমি দিইনি। এ কারণে আমি তাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছি। আর ঋণের প্রায় সবই আগের চেয়ারম্যানের (আবুল বারকাত) সময় দেওয়া।’ জনতা ব্যাংকের সাবেক এবং বর্তমান কয়েকজন ব্যাংকারও একই অভিযোগ করেছেন। এমনকি যাঁরা বাংলাদেশের আর্থিক খাতের খোঁজখবর রাখেন, তাঁরাও জানেন এক গ্রাহককে এত অর্থ দেওয়ার কথা। এমনকি তাঁর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আবুল বারকাতের নামও তাঁরা বলেছেন। অধ্যাপক আবুল বারকাত প্রথম আলোকে বললেন, ‘তাঁর (ইউনুস বাদল) প্রতিষ্ঠানগুলো তো খুবই ভালো। পরিশোধেও ঠিক আছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর নথিপত্র এক ব্যক্তির নামে না। এ কারণেই এত ঋণ পেয়েছে।’ তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঋণ নেওয়া কোম্পানির অনেকগুলোই এননটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান।
বাকিগুলোও মো. ইউনুসের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। জনতা ব্যাংকের এখনকার পর্ষদের নথিতেও তাই। এ কারণেই জনতা ব্যাংক এখন এই ঋণ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। মো. ইউনুস (বাদল)-এর সঙ্গে কথা হয় গত বুধবার, প্রথম আলো কার্যালয়ে। তিনিও বলেছেন, পুরো অর্থ দিয়ে ২২টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। কারখানাগুলোর সবই আন্তর্জাতিক মানের। জনতা ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০০৪ সাল থেকে জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় প্রথম ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করে এননটেক্স গ্রুপের জুভেনিল সোয়েটার। ওই শাখার বেশি ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় ২০০৮ সালে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ঋণটি স্থানান্তর করা হয়। ২০১০ সাল থেকে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণসুবিধা নেওয়া শুরু হয়। এক ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে এত টাকা দেওয়ায় নতুন ঋণ দেওয়ার সব সামর্থ্যই এখন হারিয়ে ফেলেছে জনতা ব্যাংকের শাখাটি। এর আগে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (বর্তমানে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) শাখা থেকে ২০১১ সালের দিকে হল-মার্ক নামের গ্রুপটি বের করেছিল সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। তাতে সোনালী ব্যাংক এখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। জনতা ভবন করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ থেকে দায়িত্বে আছেন আহমেদ শাহনুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শাখার ঋণ দেওয়ার সব সীমা শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু আদায়ের পেছনে ছুটছি।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আইনে আছে, মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি এক গ্রুপকে দেওয়া যাবে না। এর বেশি ঋণ গেলে ব্যাংকের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে যায়। দেখতে হবে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে এসব অর্থায়ন হয়েছে কি না। কেন একজন গ্রাহককে এত টাকা দেওয়া হলো, পুরো বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে পারে।
যেভাবে ঋণ দিল ব্যাংক
জনতা ব্যাংকের একাধিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান শেষে জানা যায়, কোম্পানিগুলোর নামে বিভিন্ন সময়ে কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হলেও টাকা পরিশোধ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে ব্যাংক নিজেই বাধ্য হয়ে বিদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অর্থ শোধ করে দিয়েছে। পরে গ্রাহক তা পরিশোধ করেনি। এভাবে নেওয়া ঋণসুবিধার (নন-ফান্ডেড) সব অর্থই সরাসরি ঋণে (ফান্ডেড) পরিণত হয়েছে। আবার দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনার জন্য নেওয়া চলতি মূলধনও (সিসি ঋণ) ফেরত দেয়নি। ২০১৫ সালে এননটেক্স গ্রুপের ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই পুনর্গঠিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে গ্রুপটিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জনতা ব্যাংক। এ সুবিধার মানে হলো, প্রথমে শুধু কিস্তির টাকা পরিশোধ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন না দেওয়ায় বিষয়টি আটকে আছে। তবে এতে চুপ না থেকে এসব ঋণ পুনঃতফসিল করে দিয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। ২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত এমডি এস এম আমিনুর রহমান। ঋণের বড় অংশই দেওয়া হয়েছে তাঁর সময়ে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘শাখা থেকে প্রস্তাব এসেছিল, পর্ষদ বিবেচনা করে ঋণ দিয়েছে। আমার তো ঋণ দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই ছিল না।’ জনতা ভবন করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন আব্দুছ ছালাম আজাদ। এখন তিনি এই ব্যাংকেরই এমডি। ঋণের বড় অংশই তিনি শাখা ব্যবস্থাপক থাকাকালীন সময়ে সৃষ্ট। তিনিও প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁর সময়ে খুব বেশি ঋণ দেওয়া হয়নি। তবে আব্দুছ ছালাম বলেন, ঋণ কমাতে এননটেক্সকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, অন্য ব্যাংকে চলে যেতে বলা হয়েছে।
এখন উদ্বিগ্ন পর্ষদ
মূলধনের দ্বিগুণ ঋণ দেওয়ার পর ২০১৭ সালে এসে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে জনতা ব্যাংকের এখনকার পর্ষদ। পর্ষদ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দফায় দফায় গ্যালাক্সি সোয়েটারসহ এননটেক্স গ্রুপের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করতে বলে। বারবার সময় নেওয়ার পর গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্ষদের সভায় তা উত্থাপন করা হয়। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে পর্ষদ। ঋণ প্রদান ও আদায় পরিস্থিতি দেখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গত ১৭ জানুয়ারি এননটেক্সের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ঋণসহ অন্য ব্যাংকে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। মো. ইউনুস (বাদল) এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংক এখন অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। ব্যাংকের নির্দেশে ৮ প্রতিষ্ঠান অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের চেষ্টাও চলছে। আগামী জুনের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ভাই বিষয়টি দেখেছেন। তিনি ঋণ নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেননি।’
ভাগ্যবান উদ্যোক্তা
মো. ইউনুস (বাদল) একসময় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সামান্য কর্মচারী ছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এখন ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাঁর উত্থান ঘটেছে। এ সময় ব্যাংক যেমন ছিল উদারহস্ত, তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন একাধিক মন্ত্রীর। পর্ষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অনেকে তো ছিলেনই, পিছিয়ে ছিলেন না ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। এমনকি সিবিএ নেতারাও আছেন তাঁর সঙ্গে। ব্যাংক সূত্র জানায়, ঋণ পেতে পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক করে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন সিবিএ সভাপতি রফিকুল ইসলাম। ১৯৭৩ সাল থেকে জনতা ব্যাংক গণতান্ত্রিক কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ, জাতীয় শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত) সভাপতি তিনি। তাঁর নামে করা বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে নির্মিত হচ্ছে ২০১ গম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে ‘বাদল হেলিপ্যাড’। রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানালেন, ‘মসজিদ বানাতে সব মিলিয়ে ২৫০ কোটি টাকা লাগবে। ইউনুস (বাদল) সাহেব পুরো টাইলস দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে তাঁর অনুদান শতকোটি টাকা ছাড়াবে।’ তবে মো. ইউনুস (বাদল) দাবি করেন, ‘সর্বোচ্চ আড়াই কোটি টাকা দিয়েছেন। সিবিএ সভাপতি সব সময় একটু বাড়িয়ে বলেন।’ কেবল সিবিএ নেতাই নন, মো. ইউনুসের ঋণের বিষয়ে তদবির করে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন যুবলীগ নেতা, কমিশনার, একাধিক ব্যাংকার, এমনকি সাংবাদিকও। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে বলেন, একটি ব্যাংক কীভাবে পারল একজনকে ৫ হাজার কোটি টাকা দিতে। নিশ্চয়ই বড় কেউ রয়েছে এর পেছনে। এটার পেছনে কারা, তা খুঁজে বের করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তাই ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও দুদককে এ ক্ষেত্রে সক্রিয় হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কার্যক্রম আরও জোরালো করার সময় এসেছে।

রপ্তানি আদেশ ও পণ্য বিক্রি কমেছে

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (ডিআইটিএফ) গতকাল রোববার শেষ হয়েছে। ৩৫ দিনের এবারের মেলায় আগেরবারের তুলনায় রপ্তানি আদেশ ও পণ্য বিক্রি দুটোই কমেছে। যদিও মেলার আয়োজক বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দাবি, ‘মেলা অত্যন্ত সফল ও সার্থক হয়েছে’। মেলা প্রাঙ্গণে গতকাল বিকেলে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এবারের মেলায় ১ কোটি ৯৪ লাখ মার্কিন ডলার বা ১৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকার রপ্তানি আদেশ পাওয়া গেছে। আর নগদে বিক্রি হয়েছে ৮৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার পণ্য। ইপিবি গতবারের মেলার শেষ দিন সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিল, ওইবার রপ্তানি আদেশ এসেছিল ২৪৩ কোটি টাকার এবং ১১৩ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছিল। গতবারের চেয়ে রপ্তানি আদেশ কম পাওয়া গেলেও আয়োজকদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, এবার ৮৭ লাখ ডলার বা ৭১ কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ বেশি এসেছে। রপ্তানি আদেশ কমলেও বাড়িয়ে দেখানো হলো কেন, জানতে চাইলে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্য প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘এটা ঠিক রপ্তানি মেলা না, ভোগ্যপণ্যেরও মেলা। বিক্রি ও রপ্তানি আদেশের তথ্য যাদের থেকে নেওয়া হয়, হেরফের হতেই পারে। তবে ইপিবির কাছে গতবারের রপ্তানি আদেশের তথ্য হচ্ছে ১৪৩ কোটি টাকা।’     সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী আনোয়ারা আহমেদ ছিলেন। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও সদস্য লায়লা আঞ্জুমান বানু, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বাণিজ্যসচিব শুভাশীষ বসু, ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন। বাণিজ্য মেলা মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, অন্যবারের চেয়ে এবারের মেলা জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে। লাখ লাখ লোক মেলায় এসে কেনাকাটা করেছেন। ইপিবির অনেক টাকা লাভ হবে। তিনি বলেন, ‘পূর্বাচলে ৩৫ একর জায়গায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্র হচ্ছে। সেখানে সারা বছর বিভিন্ন ধরনের মেলা হবে।
আশা করছি, ২০২০ সালের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে।’ রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘চলতি বছর নির্বাচনের বছর। আমাদের মেয়াদ আছে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। তার আগের ৯০ দিনের মধ্যে যেকোনো দিন নির্বাচন হবে। কালকে দেখলাম, একটি রাজনৈতিক দল ছয়টি শর্ত দিয়েছে। এই শর্ত বাস্তবায়নযোগ্য নয়। কিন্তু নির্বাচন হবে সংবিধান অনুসারে।’ মেলায় অংশ নেওয়া ৫৮৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৪টি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন শ্রেণিতে পুরস্কার পেয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রিমিয়ার প্যাভিলিয়ন শ্রেণিতে প্রথম হয়েছে আকিজ সিরামিক, দ্বিতীয় হয়েছে যৌথভাবে মিনিস্টার হাই-টেক পার্ক, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ ও আখতার ফার্নিচারস এবং তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছে যৌথভাবে আবুল খায়ের মিল্ক প্রোডাক্টস, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও নাদিয়া ফার্নিচার। বিশেষ সম্মাননা পেয়েছে ডেলটা ইন্টেরিয়র। সাধারণ প্যাভিলিয়ন শ্রেণিতে প্রথম পুরস্কার পেয়েছে কারুপণ্য রংপুর। এ ছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছে মৌসুমি ইন্ডাস্ট্রিজ ও তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছে যমুনা ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড অটোমোবাইল। প্রিমিয়ার মিনি প্যাভিলিয়ন শ্রেণিতে প্রথম হাতিল কমপ্লেক্স, দ্বিতীয় মেটাডোর বলপেন ও বিআরবি ক্যাবলস এবং তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছে অ্যাগ্রিকালচার মার্কেটিং ও পারটেক্স ফ্যাশন। সাধারণ মিনি প্যাভিলিয়ন শ্রেণিতে প্রথম ক্রাউন সিমেন্ট, দ্বিতীয় গঙ্গা ফাউন্ড্রি ও তৃতীয় পুরস্কার পেয়েছে এনার্জিপ্যাক ও ওরিয়েন্টাল ইকো উডস। মেলার শেষ দিনে গতকাল ছিল উপচে পড়া ভিড়। তবে দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্যাভিলিয়নে পণ্য নেই, খালি। বিভিন্ন পণ্য নিয়ে মেলার ভেতরের সড়কজুড়ে বসে পড়েছে হকার। কিছু প্রতিষ্ঠান পণ্য গোছাতে শুরু করেছে। তারপরও বিকেল থেকে মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীর ঢল বাড়তে থাকে।

একুশ শতকে সম্প্রসারিত গভীর সম্পর্ক by আঁলা বেরসে

সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। বহু বছর ধরে উন্নয়ন সহযোগিতা ছিল এই সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। গুরুত্বপূর্ণ এই উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও সম্প্রসারিত করা এবং সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দুই দেশের বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার দিকে মনোযোগ ক্রমেই বাড়ছে।
আমি আশা করি, প্রথম সুইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে আমার এই সফরে দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হবে এবং এ বিষয়ে আমি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি। সুইজারল্যান্ড এবং বাংলাদেশ তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে পুনরুজ্জীবিত করছে। আমরা অতীতের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে ‘প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমরা দুদেশের বর্তমান সাদৃশ্যগুলোর দিকেও দৃষ্টি দিতে পারি, যেমন আমাদের উভয় দেশই আজ ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে থেকেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের শিকার। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অভিন্ন অঙ্গীকার। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তার বিষয়টি জরুরি। সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের জনগণ এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে সুইজারল্যান্ড বিশেষ সাধুবাদ জানাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডও এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশে দ্রুত মানবিক সহায়তা কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করেছে এবং জরুরি সহায়তার বরাদ্দ বাড়িয়েছে, যা মিয়ানমার থেকে আগত শরণার্থীদের খাদ্য ও পানীয় জলের সংস্থানে, বাসস্থান নির্মাণে এবং পয়োনিষ্কাশন সেবা দিতে ব্যয় করা হচ্ছে। দুটি সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো এবং চিকিৎসা উপকরণ দিয়ে সুইজারল্যান্ড সহায়তা করছে এবং কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী এলাকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। এই সফরে সেখানকার পরিস্থিতি আমি স্বচক্ষে দেখব বলে আশা করছি। সুইজারল্যান্ডের এই মানবিক সহায়তার ভিত্তি হলো বহু দশক ধরে চলে আসা সুইস-বাংলাদেশ পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন। স্থানীয় সরকারবিষয়ক সুইস সরকারের সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পগুলো স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে উত্সাহিত করছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানে স্থানীয় সরকারকে সহযোগিতা করছে। সুইস উন্নয়ন সহযোগিতার লক্ষ্যই হচ্ছে দরিদ্র ও দুস্থ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজ করা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন
ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে প্রশংসনীয় পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক কর্তৃক সংজ্ঞায়িত মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে আমি বাংলাদেশকে অর্জিত সফলতার জন্য অভিনন্দন জানাই এবং আমাদের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন প্রত্যাশা করি। সুইজারল্যান্ড এবং বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক দুদেশের জন্যই সুবিধাজনক, যেমন বিগত সাত বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দ্বিগুণ হয়েছে। বহুসংখ্যক সুইস কোম্পানি যারা বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, তাদের কল্যাণে সুইজারল্যান্ডের প্রযুক্তি জ্ঞান বাংলাদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সুইস এবং বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিদ্যমান শক্তিশালী সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে। সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ‘বেটার ওয়ার্ক বাংলাদেশ প্রোগ্রাম’-এ সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের শক্তিশালী বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্পের উন্নতিতে অবদান রাখছে। বাংলাদেশ থেকে সুইজারল্যান্ডে রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ আসে এ দুটি শিল্প থেকে। এই কর্মসূচির বিভিন্ন প্রশিক্ষণ সেবা বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্পকে শক্তিশালী এবং অধিক প্রযুক্তি-সক্ষম করে তুলতে সাহায্য করেছে। অন্যান্য অনেক বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে, যেমন সবুজ অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। এসব ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডের বিশেষ প্রযুক্তি জ্ঞান রয়েছে। গণতন্ত্র অধিক শক্তিশালীকরণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে সুইজারল্যান্ড উপলব্ধি করে, যা দুদেশের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নীতিতে সুইজারল্যান্ড বাংলাদেশ সরকার, সুশীল সমাজ এবং বেসরকারি সংস্থাসমূহের সঙ্গে কাজ করে যাবে।
অনুমিত দূরত্ব হ্রাস
রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক ক্রমে বাড়ছে। তা হলো সাংস্কৃতিক বিনিময়। আমি খুবই আনন্দিত যে আমার সফর এমন একটি সময়ে হচ্ছে যখন সুইস প্রো হেলভেশিয়া ফাউন্ডেশনের সম্পৃক্ততায় ঢাকা আর্ট সামিটের মতো একটি বড়মাপের আয়োজন এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে সংস্কৃতি একটি অনন্য এবং আনন্দদায়ক মাধ্যম। বিশ্বায়ন এবং যুগপৎ ডিজিটালাইজেশনের কল্যাণে এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যকার অনুমিত দূরত্ব দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ বর্তমান বিশ্বের সংকট শুধু যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মোকাবিলা করা সম্ভব। এ জন্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। এই সফরের এবং দুই দেশের পরবর্তী সম্মিলিত পদক্ষেপ নিয়ে আমি আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
আঁলা বেরসে
প্রেসিডেন্ট, সুইস কনফেডারেশন

বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ

গত ৩১ জানুয়ারির প্রথম আলোর খবর বলছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ডিসেম্বর থেকে লোকসান দেওয়া শুরু করেছে এবং ইতিমধ্যে ২৫০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এই সরকারি প্রতিষ্ঠান ২০১৪-১৫,২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ সালে যথাক্রমে ৪ হাজার ২০৮ কোটি, ৭ হাজার ৭৫৩ এবং ৪ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। বিপিসির মুনাফা হয়েছে উল্লিখিত সময়ে বিশ্ববাজারে কম দামে জ্বালানি তেল কিনে এনে দেশের বাজারে বেশি দমে বিক্রির সুবাদে। কয়েক বছর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কম ছিল, কিন্তু ডিসেম্বর থেকে তা ঊর্ধ্বমুখী। পরিবর্তনশীল বাজারমূল্যে বিশ্ববাজার থেকে কিনে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসি আবার লোকসানে! বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছিলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম অচিরেই বাড়তে পারে। তেলের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে। আমদানি তেল ও তরল গ্যাস (এলএনজি) দিয়ে সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পক্ষে সরব নীতিনির্ধারকেরা বিকল্প প্রাথমিক জ্বালানির উৎস উন্নয়নে সামান্যই মনোযোগী। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কেবল বিপিসি লোকসানের মুখে পড়েনি; বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং তার অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোও বাড়তি লোকসানের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম নিবিড়ভাবে আন্তসম্পর্কিত। তেলের দামের ওঠানামা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি তেলের ক্রমাগত মূল্যহ্রাস অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত আশাবাদ তৈরি করেছিল যে তেলের দাম শিগগির বাড়বে না। বরং মূল্য সংশোধন হলেও তা ব্যারেলপ্রতি ৪০-৫০ মার্কিন ডলারের মধ্যেই ওঠানামা করবে। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর পেট্রোলিয়াম উৎপাদক দেশগুলোর জোট ‘ওপেক’ তেলের উৎপাদন সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত জানানোর পর থেকেই জ্বালানি তেলের মূল্য ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে তেলের দাম কমতে শুরু করেছিল। ২০১৬ সালের মধ্য জানুয়ারিতে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেল প্রায় ২৮ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। এমন অবিশ্বাস্য দরপতন পূর্ববর্তী ১২ বছরেও ঘটেনি। সে সময় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চাহিদাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রে বিকল্প উৎস শেল থেকে তেল উৎপাদনে প্রাচুর্য, বড় তেল উৎপাদক ইরানের বিশ্ববাজারে প্রবেশ ইত্যাদি অনুঘটক সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন, তেলের বাজার নিকট ভবিষ্যতে খুব দ্রুত বাড়বে না। ওপেক ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে তেল উৎপাদন দিনে ১ দশমিক ২ মিলিয়ন ব্যারেল হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তা কার্যকর করে। ওপেকের বাইরের তেল উৎপাদক দেশগুলোর সঙ্গেও ওপেক দ্রুত উৎপাদন কমানোর সমঝোতা করে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ওপেক গোষ্ঠীর নেতা সৌদি বাদশাহ সালমান সদলবলে ওপেকবহির্ভূত সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক রাশিয়ায় সরকারি সফরে (অক্টোবর ২০১৭) হাজির হন এবং ওপেক ও ওপেকের বাইরের তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশগুলো নজিরবিহীন সমঝোতার মাধ্যমে তেলের উৎপাদন সীমিত করার চুক্তিকে দৃঢ় ভিত্তি দেয়।
বিশ্লেষকদের অনেকের বিশ্বাস, তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশগুলোরও চেষ্টা রয়েছে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৪০-৫০ মার্কিন ডলারে সীমিত রাখা। তেলের বাজারমূল্য ৪০-৫০ মার্কিন ডলারের মধ্যে সীমিত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘শেল’ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন বা কানাডার ‘টার স্যান্ড’ থেকে তেল উৎপাদন অলাভজনক হয়ে পড়ে। একইভাবে, তেলের বাজারমূল্য বেশি বেড়ে গেলে বিকল্প প্রযুক্তি দ্রুত বাজারে আসতে পথ পায়। বিশেষত ইউরোপ ও চীনে বৈদ্যুতিক মোটরগাড়ি যেভাবে বাজার দখল করছে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভর্তুকি সুবিধা পাচ্ছে, তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর তাতে শঙ্কা বাড়ছে। তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর ভেতরে যাঁরা ভাবতেন, জাতীয় সম্পদ মাটির নিচে রেখে দিলে ভবিষ্যতে তা কাজে লাগবে, তাঁরা এখন ক্রমেই চাপে পড়ছেন। অনেকে মনে করেন, আপাতত তেলের বাজারমূল্য আছে, সুতরাং মাটির নিচে তেল ফেলে না রেখে তাকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে কাজে লাগানো হোক। মাটির নিচে রাখলে সেই সম্পদ গুরুত্বহীন হওয়ার হুমকিতে পড়তে পারে। এই মতের অনুসারীরা আরও মনে করেন যে তেল বিক্রির নগদ অর্থ রাষ্ট্রের হাতে থাকলে তা দিয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন করা সম্ভব। উপযুক্ত অবকাঠামো ও মানবসম্পদ পরবর্তী সময়ে দেশের জন্য বহু গুণ সম্পদ সৃষ্টি করতে পারবে। সম্প্রতি মার্কিন অর্থনীতির মন্দা কাটিয়ে ওঠার খবর আসছে, চীনের বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধিসহ বিশ্বব্যাপী ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে। অপর দিকে, তেলের সরবরাহ দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে না, বরং অন্যতম তেল রপ্তানিকারক ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন কমেছে। অন্তত ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী থাকবে বলেই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমান। ফলে তেলের চাহিদা বাড়বে। যে কারণেই হোক, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রতি ব্যারেলের মূল্য ৭০ মার্কিন ডলার ছুঁয়েছে। ২০১৮ সালজুড়ে কিছু ওঠানামা হলেও দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০-৭০ মার্কিন ডলারের মধ্যেই থাকবে বলে বিনিয়োগ ব্যাংক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাক্কলন করছে। বাংলাদেশ এ বছরের এপ্রিলে ৫০ কোটি ঘনফুটের সমান তরল গ্যাস (এলএনজি) এবং ডিসেম্বর নাগাদ আরও ৫০ কোটি ঘনফুট সমপরিমাণ তরল গ্যাস আমদানি করবে। প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০১৭ সালে বিপিসি প্রায় ৫৯ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টন ডিজেল ও ৯ লাখ টন ফার্নেস অয়েল। প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহ উৎস বহুমুখী করার বিভিন্ন উদ্যোগের ঘোষণা এখনো ফলদায়ক হয়নি। দেশের প্রধান প্রাথমিক বাণিজ্যিক জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাসের নিশ্চিত মজুত দ্রুত কমছে, কিন্তু প্রত্যাশিত গতিতে অনুসন্ধানের কাজ এগোয়নি। জ্বালানি গ্যাস ও তেলের আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে পণ্য ও সেবার মূল্য। দেশে মানুষের আয় বৃদ্ধি হলেও সিংহভাগ মানুষের আয় ও ভোগবৈষম্যও দ্রুত বাড়ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তাই মানুষের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ ও আশঙ্কা বাড়ে।
ড. মুশফিকুর রহমান খনি প্রকৌশলী, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

রিজার্ভের অর্থ চুরি

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভের অর্থ চুরির দুই বছর পার হলেও বেশির ভাগ অর্থ আদায় এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে না পারা খুবই উদ্বেগজনক ঘটনা। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে (নিউইয়র্ক ফেড) রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় যাওয়া ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার ও ফিলিপাইনে যাওয়া ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার ফেরত আনা সম্ভব হয় কয়েক মাসের মধ্যেই। বাকি ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার ফেরত পাওয়া এখনো অনিশ্চিত। ফিলিপাইনের ব্যাংক আরসিবিসি ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশকে কোনো অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দায়িত্ব অস্বীকার করে তারা বলেছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলা ও অসাবধানতার’ দায় বাংলাদেশকেই নিতে হবে। চুরি হওয়া অর্থ ফিলিপাইন থেকে অন্য দেশে পাচার হয়ে গেছে। কিন্তু চুরির অর্থ যে আরসিবিসিতেই জমা হয়েছিল, সে কথা তো তারা অস্বীকার করতে পারবে না। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নিউইয়র্ক ফেড চুরির বিষয়টি আরসিবিসিকে জানানোর পরও কেন তারা অর্থ পাচার রোধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিল না? এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আমরা মনে করি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, ফিলিপাইন অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মামলা করা হবে। ঘটনার দুই বছর পার হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, অর্থ ফেরত পেতে মামলার বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে যত দ্রুত সম্ভব আরসিবিসির িবরুদ্ধে মামলা দায়ের করা। শুরু থেকেই অর্থ চুরির ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাংক ঢাক ঢাক গুড় গুড় ভাব দেখিয়ে আসছে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হলেও তা প্রকাশ পায় এক মাস পর মার্চে। এ নিয়ে তখন যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অর্থ ফেরত আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। নৈতিক দায় নিয়ে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগও করেছিলেন। রহস্য উদ্‌ঘাটনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠিত হয়, তারা যথাসময়ে তদন্ত প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। কিন্তু সরকার সেই প্রতিবেদন আজও প্রকাশ করেনি। এ কথা ঠিক যে, রিজার্ভ চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্র। কিন্তু এর সঙ্গে বাংলাদেশের কেউ জড়িত ছিল কি না অথবা ফিলিপাইনের দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের কার কতটা ‘অবহেলা বা অসাবধানতা’ ছিল, সেটি নিরূপণ করা তো জরুরি। ঘটনার এক বছর পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, সরকার বাকি অর্থ ফেরত আনার পথ খুঁজছে। এরপর আরও ৩৬৫ দিন পার হয়ে গেল। দেশবাসী কোনো সুসংবাদ পায়নি। সত্য উদ্‌ঘাটন এবং চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? বাংলাদেশ ব্যাংকের কার বা কাদের অবহেলা ও অসাবধানতায় এই ঘটনা ঘটেছে, তা জানার অধিকার দেশবাসীর আছে। ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনার দোহাই দিয়ে এত দিন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা না হলেও তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর সেটি প্রকাশ না করার কোনো যুক্তি নেই। সুতরাং সরকারকে বাস্তবতার নিরিখে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক ফেডসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও সম্পৃক্ত করতে হবে।