Saturday, January 19, 2019

‘চোর মেশিন’ ইভিএম বন্ধ করার দাবি

ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনকে চোর মেশিন অখ্যায়িত করে এই মেশিনকে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ। শনিবার কলকাতায় ব্রিগেড ময়দানের মহাসমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এই মেশিনের মাধ্যমে কারচুপি করা হয়। তাই এই ইভিএম বন্ধ করার জন্য সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের একযোগে নির্বাচন কমিশনের কাছে এবং প্রেসিডেন্টের কাছে দরবার করা উচিত।  পাশাপাশি তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ব্যালট পেপার পুরোপুরি ফিরিয়ে নিয়ে আসার দাবি করেছেন। শনিবারের মহাসমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ফারুক আবদুল্লাহ ও তার পুত্র ওমর আবদুল্লাহ সহ ২২টি বিরোধী দলের নেতারা। এই সমাবেশের মঞ্চ থেকেই বিজেপিকে হঠানোর ডাক দেওয়া হয়েছে। সভায় বক্তব্য রাখতে উঠে নরেন্দ্র মোদী পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করার পাশাপাশি কাশ্মীরের পরিস্থিতিকে জটিল করার জন্য  বিজেপিকেই দায়ী করেছেন ফারুক আবদুল্লাহ। এই অবস্থায় কেন্দ্র থেকে নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপিকে সরানোটাই সকলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি এই লক্ষ্য পূরণের জন্য সকল অবিজেপি নেতাদের আত্মত্যাগ করার কথাও বলেন তিনি।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পাশে কেউ নেই

সদ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে ঘিরে নেই কোনো কোলাহল। নেই নেতাকর্মীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি। মন্ত্রিত্ববিহীন মুহিত গতকাল সিলেটে আসেন। কিন্তু তাকে রিসিভ করতে যাওয়া ব্যক্তিদের ভিড়ে নেই সেই পরিচিত সুবিধাভোগী মুখগুলো।
আব্দুল মাল আবদুল মুহিত দীর্ঘ ১০ বছর অর্থমন্ত্রী ছিলেন  । এই সময়ে তিনি সপ্তাহে একবার হলেও সিলেটে আসতেন। তার আসার খবরে ভিড় লেগে যেত ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। দলীয় নেতাকর্মীরা ভিড় করতেন ভিআইপি লাউঞ্জের সামনে।
সিলেট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, আত্মীয়স্বজনরা তাকে বিমান থেকে নামার পরপরই বরণ করতেন। কিন্তু সেই দৃশ্যপট এখন পাল্টে গেছে।
অর্থমন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর গতকাল তিনি প্রথম সিলেটে আসলেন। বেলা পৌনে দুটার দিকে নভোএয়ারের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকা থেকে সিলেটে পৌঁছেন। এ সময় ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাকে একটি হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিআইপি লাউঞ্জে নিয়ে আসেন। এ সময় তার সঙ্গে কেবল এপিএস জনি ছিলেন। আর কাউকে দেখা যায়নি। তাকে রিসিভ করতে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাননি সেই পরিচিত মুখগুলো। যারা দীর্ঘ ১০ বছর সিলেটে সঙ্গ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রীকে।
তবে তার ঘনিষ্ঠজন বলে খ্যাত সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মাহিউদ্দিন আহমদ সেলিম সাবেক মন্ত্রী মুহিতকে ভিআইপি লাউঞ্জে রিসিভ করেন। এরপর মুহিত ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি যান সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। সেখানে বিসিবি প্রধানের সঙ্গে বসে নিজ দল সিলেট সিক্সার্সের খেলা উপভোগ করেন।

১২শ বছরের পুরনো ক্যালিগ্রাফি নিয়ে চীনে কেন ক্ষোভ

তাইওয়ানের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম একটি বিরল ক্যালিগ্রাফি জাপানের টোকিওর ন্যাশনাল মিউজিয়ামে ধার দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতেই ভীষণ আক্রোশ তৈরি হয়েছে চীনে ।
নথিপত্র অনুযায়ী এটা দেখে মনে হচ্ছে এটা সরাসরি সংস্কৃতির আদান-প্রদান। 'রিকুইয়াম টু মাই নেফিউ' নামে ক্যালিগ্রাফিটি এঁকেছিলেন ইয়ান ঝেনকিং নামে একজন যাকে মনে করা হয় চীনের একজন মহান ক্যালিগ্রাফার।
তিনি বেঁচে ছিলেন ৭০৯ থেকে ৭৮৫ এডির মধ্যেকার সময়ে। ভাইয়ের ছেলে মারা যাওয়ার পর ইয়ান ঝেনকিং লিখেছিলেন এই ক্যালিগ্রাফি।
চাইনিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকং এর একজন অধ্যাপক টং কাম টাং বিবিসি কে তার সম্পর্কে বলেছেন "তিনি চীনের খুব সুপরিচিত একটা নাম"।
"যখন একজন অল্প বয়সে চীনের শিল্প সম্পর্কে পড়াশোনা করে তখনই সে তাঁর (ইয়ান ঝেনকিং) সম্পর্কে জানতে পারে"।
মি. টং বলেন এই মাস্টারপিসটি ইয়ান ঝেনকিং একটা খসড়া আকারে করেন।
এই শিল্পকর্মটি কয়েকশ বছর ধরে চীন সংরক্ষণ করে রেখেছিল। ১৯৪০ সালে তাইওয়ান অন্যান্য শিল্পকর্মের সাথে এটিও নিয়ে যায়।
সেই থেকে তাইওয়ানের ন্যাশনাল প্যালেস মিউজিয়াম অত্যন্ত নিরাপত্তার সাথে এটা সংরক্ষণ করে রেখেছে। তবে এটা দ্বিতীয়বারের মত বিদেশে নেয়া হয়েছে।
এটি প্রথম বার ১৯৯৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল গ্যালারি অব আর্টে নেয়া হয়। তারপর থেকেই এটা তাইওয়ানে রয়েছে। এখন এই ক্যালিগ্রাফিটি টোকিওর এক শিল্প প্রদর্শনীতে দেখানো হচ্ছে।
এদিকে এই খবরে চীনের সোশ্যাল মিডিয়া সাইট ওয়েবো তে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
অনেকে প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার পর্যন্ত "Requiem to My Nephew" ২৬০ মিলিয়নের বেশি বার পড়া হয়েছে ওয়েবো তে। অনেকেই জাপান এবং চীনের যুদ্ধের সময়কার ইতিহাস, সেই সাথে জাপান কীভাবে চীনের অংশ দখল করেছিল সে প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। যেটা চীনের জন্য এখনো অনেক সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে দেখেন অনেকে।
একজন লিখেছেন "তাইওয়ান কি ভুলে গেছে জাপান আমাদের সাথে কি করেছিল? তারা কি জানে নানজিঙ গণহত্যা কি?
১৯৩৭ সালে জাপানের সৈন্যরা চীনের পূর্বের শহরে হামলা করে। চীন বলে, তিন লক্ষের মত মানুষ গণহত্যার শিকার হয়। আবার জাপান পুরো বিষয়টা অস্বীকার করে, তাদের দাবী কোন হত্যাকাণ্ডই ঘটেনি।
ক্ষোভের পেছনে রাজনৈতিক কারণ?
এটা পরিষ্কার যে বেশির ভাগ মানুষ রাগ প্রকাশ করেছেন তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের অধ্যাপক ইয়ান চং বলেছেন "১৯৩০ থেকে ৪০ দশকের সময়ে চীনের বিভিন্ন অংশ জাপান যে ধরণের নৃশংস অভিযান চালায় সেটা এখনো প্রকটভাবে চীনের মানুষের মনে গেঁথে আছে। চীন ক্রমাগতভাবে সেই স্মৃতিকে টেনে নিয়ে আসছে"।
তাইওয়ানের নিজস্ব সরকারি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রয়েছে। ১৯৪৯ থেকে তারা স্বাধীন দেশের মত কার্যকলাপ পরিচালনা করে থাকে।
যদিও চীন মনে করে এই দ্বীপটি চীনের একটি অংশ এবং একদিন তা চীনের সাথে একত্রিত হবে। এই মাসের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং তাইওয়ানকে আহ্বান জানিয়েছিলেন- তাইওয়ান একদিন চীনের সাথে যে অবশ্যই একত্রিত হবে সেটা মেনে নিতে।
সূত্রঃ বিবিসি

দমনপীড়নের আতঙ্কে সিয়ানের মুসলিমরা

চীনের শানশি প্রদেশের রাজধানী সিয়ান। এই শহরের অধিবাসী ১ কোটির কাছাকাছি। কোটি পূর্ণ হলে শহরটি ‘মেগাসিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত হবে। সপ্তম শতাব্দীতে এই সিয়ান অঞ্চলে মুসলিমরা বসতি গড়তে শুরু করে। ট্যাং রাজবংশের আমলে চ্যাংগান নামে পরিচিত এই শহরে মুসলিম ব্যবসায়ীদের প্রথম আগমন ঘটে। তাদের অনেকে চীনা হান নারীদের বিয়ে করে এখানেই বসবাস শুরু করেন। এদের বংশধররা হুই নামে পরিচিতি পেয়েছে, যা চীনের ৫৬টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর একটি। সিয়ানের মোট মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যা ৬৫ হাজারের মতো।
এদের বেশিরভাগই সিয়ানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিতি মুসলিম কোয়ার্টারে বাস করেন। সিয়ানে তাদের জীবন দৃশ্যত বেশ ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছে। তারা বিভিন্ন হালাল খাবার তৈরি করে থাকেন। এসব খাবারের খোঁজে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকদের আগমন ঘটে। এরাই মুসলিমদের তৈরি হালাল খাবারের প্রধান ক্রেতা। হালাল খাবার ছাড়াও এখানকার স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবারের বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি রয়েছে। এছাড়া চীনের ঐতিহ্যবাহী উপহারসামগ্রীও পর্যটকদের সিয়ানে টেনে আনে। রমরমা ব্যবসা থেকে উপার্জিত জীবিকা দিয়ে সিয়ানের মুসলিমদের জীবন ভালোভাবে কাটলেও তাদের মনে দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্ক কাজ করছে। কেননা চীনের বিভিন্ন অংশে মুসলিমদের সঙ্গে কী ঘটছে তা এখানকার অধিবাসীদের অজানা নয়।
বিশেষ করে, সিয়ান থেকে হাজারেরও বেশি মাইল দূরে জিনজিয়াং প্রদেশে সন্ত্রাস-বিরোধী অভিযানের নামে মুসলিমদের ওপর যে অত্যাচার করা হচ্ছে, তা এখানকার মুসলিমদেরকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। নাম গোপন রাখার শর্তে চীনের একজন হুই মুসলিম বলেন, ‘জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি আপনারা জানেন। সিয়ানে আমরা এমন পরিস্থিতি চাই না।’
১৯৬০ সালে মাও সেতুংয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় চীনে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন নিষিদ্ধ করা হয়। মসজিদগুলোকে কারখানা, প্রশাসনিক ভবন বা কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তরিত করা হয়। ১৪ শতাব্দীতে তৈরি সিয়ানের ‘গ্রেট মস্ক’ স্টিল তৈরির কারখানায় রূপান্তরিত হয়। আর ৩০০ বছরের পুরনো বেই গুয়াংজি স্ট্রিট মসজিদ পরিণত হয় শহরের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কেন্দ্রে। সিয়ানের অধিবাসীরা দেং জিয়াও পিংয়ের অর্থনৈতিক উদার-নীতিকে সাধুবাদ জানান। কেননা এর অধীনে মুসলিমদের জন্য কোয়ার্টার তৈরি করা হয়।
তবে সিয়ানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী মুসলিমদের আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে তুলেছে। পূর্বে মুসলিম কোয়ার্টারের সদর দরজায় চীনা ও আরবি হরফে নাম লেখা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তা সরিয়ে শুধু চীনা বর্ণে লেখা হয়েছে। সিয়ান শহরের বৃহত্তম মসজিদের একজন কমিটি মেম্বার বলেন, মসজিদে চীনের পতাকা উত্তোলনের জন্য একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে তাকে অনুরোধ করেছিলেন সরকার দলীয় কর্মকর্তারা। তবে তিনি এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে মসজিদে একটি পতাকা স্থাপন করতে রাজি হন। পরে সেখানে কয়েকটি দলীয় পোস্টারও টানানো হয়। এছাড়া তাকে মুসলিম শিশুদের গ্রীষ্মকালীন স্কুল বন্ধ করে দিতে বলা হয়েছিল। এই স্কুলে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হয়। স্কুল বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ তাকে ‘জিনজিয়াংয়ের সন্ত্রাসীদের’ (মুসলিম) অবস্থা স্মরণ করিয়ে সতর্কও করেছে।
সম্প্রতি চীনের ওয়েইজু অঞ্চলের গ্র্যান্ড মসজিদ ধ্বংসের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এই খবরে সিয়ানের মুসলিমরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। সরাসরি এখনো তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিলেও তাদের প্রতিটা ক্ষণ এখন আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কে কাটে। যদিও চীনের সংবিধানে সব ধর্মের স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেয়া হয়েছে। সিয়ানের মসজিদ কমিটির এক সদস্য বলেন, আমি মনে করি এসব নির্দেশ কেন্দ্রীয় সরকার থেকে আসেনি। এগুলো স্থানীয় কিছু কর্মকর্তার কাজ। সিয়ানসির রাস্তায় খাবার বিক্রেতা আয়শা মা মুসলিমদের বিষয়ে নেতিবাচক প্রচারণার বিষয়ে সতর্ক করেন। বলেন, তাদের বিশ্বাস করা উচিত না। এখানে আমরা হুই জনগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণভাবে জীবন কাটাচ্ছি। এর চেয়ে ভালো জীবন আর হয় না।
(গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে)

কফির চেয়েও কম দামে বাড়ি!

ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ সিসিলিতে ছোট থেকে মাঝারি বেশ কিছু বাড়ি বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব বাড়ির দাম শুনলে যে কারও চক্ষু চড়কগাছ হবে! এক কাপ কফি খেতে যে অর্থ খরচ করতে হবে, তার থেকেও কম দামে পেয়ে যাবেন একেকটা আস্ত বাড়ি! প্রতিটি বাড়ির মূল্য মাত্র ১ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯৬ টাকা)। সিসিলির সাম্বুকা নগর প্রশাসন এই বিজ্ঞাপন দিয়েছে। দেশি-বিদেশি যে কারও জন্যও এই অফার প্রযোজ্য বলে জানিয়েছে তারা।
পাহাড়ের ওপর নিরিবিলি শহর সাম্বুকা। এখান থেকে দেখা যায় ভূমধ্যসাগরের অপরূপ দৃশ্য। এখানকার বাড়িগুলোর জানালা দিয়েই কাছের সৈকতগুলো দেখা যায়। এই মনোরম শহরে বাড়ি পানির দামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এসব বাড়ি কিনে কেউ পানিতে পড়বেন না নিশ্চিত! খোদ সাম্বুকা নগর প্রশাসনই গ্যারান্টি দিয়েছে এর। এটি আসলে প্রতীকী মূল্য। বাড়িগুলো একেকটা ৪০ থেকে ১৫০ বর্গমিটারের (প্রায় ৪৩০ থেকে ১ হাজার ৬১৪ বর্গফুট)। এত কম দরে বাড়িগুলো বিক্রির চিন্তা এসেছে মূলত শহরটিকে আবার জমজমাট করার লক্ষ্যে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, ইতালির আরও অনেক গ্রামের মতোই এই এলাকাও ক্রমে জনশূন্য হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বড় বড় শহরে গিয়ে থিতু হচ্ছেন।
তবে এ ধরনের প্রস্তাবে বাড়ি বিক্রির লোভনীয় বিজ্ঞাপন এর আগেও দেওয়া হয়েছে অনেক গ্রামে। আর তা ইতালিতেই। এবারের অফার সেসব বিজ্ঞাপনের চেয়ে আলাদা বলে দাবি করেছে সাম্বুকার নগর কর্তৃপক্ষ। শহরটির ডেপুটি মেয়র ও পর্যটনবিষয়ক কাউন্সিলর জুজেপ্পে কাচোপ্পো বলেন, ‘এই বাড়িগুলো বর্তমানে নগর প্রশাসনের মালিকানায় রয়েছে। আমরা বাড়ি বিক্রির মধ্যস্বত্বভোগী কোনো পক্ষ নই যে, বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে কোনো মিথ্যা তৈরি করব। এখানে প্রতারণার কোনো ঝুঁকি নেই। আপনি ওই বাড়ি কিনতে চান, তো সঙ্গে সঙ্গেই তা হাতে পেয়ে যাবেন।’
তবে এসব বাড়ি কিনতে একটি ছোট্ট শর্ত জুড়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ক্রেতাকে একটি বাড়ি কেনামাত্রই তা ঘষেমেজে ঝকঝকে করে তুলতে হবে। তা করতে হবে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করেই। এর জন্য তিন বছর পাবেন ক্রেতা। সংস্কারের জন্য ন্যূনতম ব্যয় ১৫ হাজার ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকা) থেকে শুরু। নিরাপত্তা আমানত হিসেবে ফেরতযোগ্য ৫ হাজার ইউরো (৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা) জমা রাখতে হবে শুরুতে। সংস্কারকাজ শেষ হলেই সেটি ফেরত দেওয়া হবে ক্রেতাকে। কাচোপ্পো জোর দিয়ে বলেন, ক্রেতা হতাশ হবেন না, গ্যারান্টি।
প্রাচীন গ্রিক আমলে শহরটি স্থাপিত হলেও সাম্বুকা বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে দশম শতাব্দীতে মুসলিম শাসনের সময়কালে। শহরটির নামকরণের সঙ্গে আমির আল জাবুতের নাম জড়িত। ২০১৬ সালে সাম্বুকা ইতালির সবচেয়ে সুন্দর শহরগুলোর প্রতিযোগিতায় অন্যতম মনোনীত শহর হয়েছিল।

যেভাবে বাংলাদেশি অভিবাসীরা বদলে দিয়েছেন ইতালির বালারো বাজার

সিসিলি দ্বীপের বালারো অঞ্চল বহু বছর ধরেই অবহেলিত ছিল। ইতালির পালার্মো শহরের অন্তর্ভুক্ত এ জায়গাটিতে তুলনামূলক দরিদ্রদের বসবাস। ১৯৯০-এর পর থেকে সেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিবাসীর বসতি গড়ে উঠেছে। যাদের বেশিরভাগই দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে স্থানান্তরিত হয়েছে। পালার্মো শহরের প্রধান বাজারের নাম বালারো, যা সিসিলিয়ান মাফিয়াদের কাছে অনেকটা স্বর্গরাজ্যের মতো। বাজারের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সেখানে যাতায়াত আছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে মাফিয়াদের কর্তৃত্ব মেনে চলতে হতো। তাদের আর্থিক চাহিদাও পূরণ করা লাগতো সেখানকার অধিবাসীদের। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে এই দৃশ্যপটে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে।
বালারোর স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের অধিকারের প্রতি সচেতন হয়ে উঠেছে। যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পিছপা হন না তারা। এখন সেখানে কমে এসেছে মাফিয়া দলের দৌরাত্ম্য। বরং তাদেরকে কোর্ট দেখিয়েছে বালারোবাসী। আর এই পরিবর্তনের  পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন ১০ বাংলাদেশি অভিবাসী।
২০১৬ সালের এপ্রিলের এক বিকালে বালারো বাজারে গাম্বিয়ান অভিবাসী ইউসুফা সুসোর মাথায় গুলি করেন স্থানীয় মাফিয়া ইমানুয়েল রুবিনো। সকালের দিকে তাদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়। এর রেশ ধরেই বিকালে গুলির ঘটনা ঘটে। বুলেট সুসোর মস্তিষ্কে আঘাত করে। কোমায় যেতে হয় তাকে। এই ঘটনায় বালারো বাজারের দোকানিরা ফুঁসে ওঠে। অভিবাসী দোকানিরা মাফিয়াদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। এই প্রতিবাদের নেতৃত্বে ছিলেন ১০ বাংলাদেশি অভিবাসী। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় তিউনিসিয়া, গাম্বিয়া ও নাইজেরিয়ার অভিবাসীরা। মাফিয়াদের ক্রোধের শিকার হওয়ার ভয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে বালারোবাসী নীরব ছিলেন, তারাই প্রতিবাদী বাংলাদেশি অভিবাসীদের ছোঁয়ায় পুরোপুরি বদলে যান। মাফিয়াদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়ে তাদেরকে বার্তা দেন, ‘কোর্টে দেখে নেবো তোমাদের’। মামলার কার্যক্রম শুরু হতে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিলম্ব হলেও অবশেষে এর প্রক্রিয়া শুরু হয়। আটক করা হয় সুসোর ওপর হামলাকারী মাফিয়া রুবিনোকে। মামলায় রুবিনো ছাড়াও বালারোবাসীদেরও পর নির্যাতনকারী অন্য মাফিয়াদেরকে আসামি করা হয়েছে। গত নভেম্বরে ওই মামলায় হত্যা প্রচেষ্টার দায়ে রুবিনোর ১২ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। রুবিনোর ভাই গিসেপ্পেও এ মামলার আসামি ছিল। কিন্তু তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। এই একটি মামলা বালারোর দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এখন সেখানকার অন্য অভিবাসীরাও কর্তৃপক্ষের কাছে সেখানকার নিরাপত্তা জোরদারের দাবি তুলেছে। একসময় তাদের মধ্যে যে আতঙ্ক কাজ করতো, তা এখন শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
১৯৯০ সালের দিকে অভিবাসীরা বালারো অঞ্চলে বসবাস করতে শুরু করে। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্ততে এসব অভিবাসীরা আগমন করলেও এদের কারণে এখন বালারোর পরিস্থিতিই বদলে গেছে। এই বাজারের দোকানিদের বেশিরভাগই অভিবাসী। আহমেদ নামের এক বাংলাদেশি অভিবাসী জানান, তিনি ২০ বছর ধরে সিসিলি দ্বীপে বাস করেন। দুই পুত্র ও সিসিলিতে জন্ম নেয়া এক কন্যার পিতা আহমেদ ২০১৩ সালে বালারোতে ব্যবসা শুরু করেন।
দোকান থেকে এক কিলোমিটার দূরে একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। অভিবাসী হয়ে আসার পর দক্ষিণ সিসিলিতে পর্যটন মৌসুমে কাজ করে যে পুঁজি সঞ্চয় করেছিলেন, বালারো বাজারের ব্যবসায় তা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু এরপরই তাকে মাফিয়াদের বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হয়। স্থানীয় বাঙালি সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল তপু বালারো বাজারের অবস্থা তুলে ধরেন এভাবে- বালারোতে থাকতে হলে আপনাকে স্থানীয় মাফিয়া বসদের খুশি রাখতে হবে। তা না হলে তারা আপনার দোকান লুট করে নিয়ে যাবে। টার্গেটে পরিণত হওয়ার ভয়ে অনেক দোকানি এসব মাফিয়াদের ‘প্রটেকশন মানি’ও দিয়ে থাকেন। এই এলাকায় যারা কাজ করেন, তারা কখনো মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন- এমনটি প্রকাশ হলেই তাদের দোকান লুট হয়ে যায়। মানুষ এ ঝামেলায় জড়াতে চায় না। তাই তারা নীরব থাকে।
ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ সিসিলি। এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এদের মধ্যে পৌনে দুই লাখের মতো অভিবাসী রয়েছে। বিপুল সংখ্যক আফ্রিকান অভিবাসী থাকলেও সিসিলিতে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও চীনের অভিবাসীও কম না। বেশিরভাগ অভিবাসীরা পাইকারি, খুচরা বেচাকেনা ও গৃহস্থালি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
অনেক বাঙালি অভিবাসী রাস্তার পাশে মোবাইলের কভারসহ বিভিন্ন সস্তা পণ্য বিক্রি করেন। পর্যটন মৌসুমে তাদের ব্যবসা বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। এসব ব্যবসায়ীরাও হরহামেশাই মাফিয়াদের উৎপাতের শিকার হন। মাফিয়াদের বিরুদ্ধে এসব ব্যবসায়ীদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার জন্য ২০০৪ সালে সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ‘আদ্দিপিজ্জো’ নামে একটি মাফিয়া-বিরোধী সংগঠন গড়ে তোলেন। এর সদস্য এডোয়ার্ডো জাফুতো বলেন, আগে স্থানীয়রা পুলিশের কাছে মাফিয়াদের বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করতো। এক্ষেত্রে একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো যে, দোকানিরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে যেতেন দল বেঁধে। জাফুতো বলেন, মজার বিষয় হলো, রুখে দাঁড়ানো এই কাজের নেতৃত্বে পালার্মোর স্থানীয়দের কেউ ছিলেন না। এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষেরা। যা হোক, মাফিয়াদের বিরুদ্ধে সোচ্চার এসব ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হতো। তপু বলেন, প্রতিবাদে নেতৃত্বদানকারী এসব বাঙালিদের দোকানের তালায় সুপারগ্লু লাগানো হতো। মাফিয়ারা সংশ্লিষ্ট দোকানিকে পর্যবেক্ষণ করছে, এটা ছিল তার প্রাথমিক সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করলে তাদের  দোকানে হামলা করা হতো, মালামাল লুট করা হতো।
সূর্যাস্তের পর রাতের পালার্মোর দৃশ্যপট আবার ভিন্ন। শহরের প্রধান রাস্তাগুলোর পাশে বাঙালি হকাররা ঠেলাগাড়িতে বিভিন্ন পণ্য ফেরি করে বিক্রি করেন। এমনই এক বিক্রেতা মোহাম্মদ মিয়া। দিনে ইতালিয়ান পরিবারগুলোতে ক্লিনারের কাজ করেন তিনি। আর সন্ধ্যার পর ফেরি করে বিভিন্ন ইলেক্ট্রিক পণ্য বিক্রি করেন। তিনিও মাফিয়াদের হুমকির শিকার হয়েছেন।  এ বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেও কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পুলিশ তার অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়নি। তাই, নির্যাতনের শিকার এমন আরো বিক্রেতাদের নিয়ে তিনি নিজেই নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিয়েছেন। কেউ মাফিয়াদের হুমকি বা নির্যাতনের শিকার হলে সবাইকে জানিয়ে দেন। পরে একজোট হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তারা।  মোহাম্মদ মিয়ার মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে সিসিলির জীবন হলো সংগ্রামের। জীবিকা নির্বাহের মতো উপার্জন করতেও তাদের হিমশিম খেতে হয়। তারপরেও মাফিয়াদের হুমকি ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগ উপেক্ষা করে তারা মূলধারার সিসিলিয়ান সমাজে জায়গা করে নিতে শুরু করেছেন। যদিও এ প্রক্রিয়া এগোচ্ছে অনেক ধীরগতিতে। এরই মধ্যে তাদের কেউ কেউ আবার পরম আরাধ্য ইতালির নাগরিকত্ব বা বৈধ কাগজপত্র  পেয়ে যান।
সিসিলির বাঙালি রাজনীতিবিদ সুমি ডালিয়া আক্তার প্রথমবারের মতো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও রেঞ্জির দল ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতি করেন। সুমি বলেন, বালারোতে মাফিয়াদের প্রত্যাখ্যান করে বিদেশি হিসেবে আমাদের সাহস দেখিয়েছি। এর মাধ্যমে বাঙালিরা দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা পালার্মোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। 
(সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে)

এবার চাকরি নিয়েই টানাটানি by গোলাম মর্তুজা ও অরূপ রায়

  • • শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মজুরিকাঠামো সমন্বয়।
  • • আন্দোলনরত শ্রমিকেরা চাকরি নিয়ে টানাটানিতে।
  • • ছাঁটাই ও মামলার প্রতিবাদে শ্রমিকেরা মাঠে নামবেন।
শ্রমিকদের এক সপ্তাহের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মজুরিকাঠামো সমন্বয় করা হয়েছে। অনেক শ্রমিক এখন কাজেও ফিরেছেন। কিন্তু আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সাভার-আশুলিয়া এলাকার শ্রমিকেরা চাকরি নিয়ে টানাটানিতে পড়েছেন। তাঁরা গ্রেপ্তার-আতঙ্কে রয়েছেন।
এর মধ্যেই বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষ চুরি, ভাঙচুর, মারধর, কারখানার ক্ষতি করা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিককে আসামি করে মামলা করেছে। পুলিশ ২০ জন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করেছে। সব মিলিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে শঙ্কা, অস্বস্তি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, মামলায় নাম উল্লেখ করা হয়—এমন শ্রমিকদের প্রায় সবাই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিক রয়েছেন। ছাঁটাই ও মামলার প্রতিবাদে তাঁরা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আক্তার।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকার, মালিক ও শ্রমিকদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো নিরীহ শ্রমিককে হয়রানি করা যাবে না। শুধু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই বিশৃঙ্খলায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নেওয়া যাবে। সেই নির্দেশনা মেনেই কয়েকটি কারখানা মামলা করেছে। কোনো নিরীহ শ্রমিককে হয়রানি করা হচ্ছে না। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে কোনো শ্রমিক কিংবা শ্রমিকনেতা আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। বিষয়টি আমার জানা নেই।’
ইতিমধ্যে আশুলিয়া থানায় আটটি এবং সাভার থানায় দুটি মামলা হয়েছে। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিজাউল হক গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় তাঁর থানায় দায়ের হওয়া আটটি মামলায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও কয়েকটি মামলা প্রক্রিয়াধীন, রাতে এগুলো হতে পারে। আর সাভার থানার পুলিশ জানিয়েছে, এই থানার দুটি মামলায় তারা আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গতকাল জামগড়া এলাকায় কথা হয় খুশি বেগমসহ কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে। তাঁদের পরিচিত কয়েকজন পুরুষ সহকর্মী মামলার আসামি হয়েছেন। তাঁরা কারখানায় আসছেন না। তাঁরা মামলার বিষয়ে তদবির করার জন্য এখন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মো. ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, চাকরিচ্যুত হয়ে তাঁদের কাছে বিপুল শ্রমিক আসছেন। এফএনএফ অ্যাপারেলস, আল গাউসিয়া গার্মেন্টস, নিট এশিয়া, ডনলিয়ন ১ ও ২, হলিউড গার্মেন্টস, এফজিএস ডেনিম, কেআরএফ গার্মেন্টস থেকে চাকরিচ্যুত শ্রমিকেরা যোগাযোগ করছেন। তাঁরা মামলারও ভয় পাচ্ছেন। আরেকটা ভয় হচ্ছে, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের নাম ‘অনলাইনে’ দিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ তাঁদের নামগুলো পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর একটা বিশেষ সার্ভারে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে। এরপর ওই সব শ্রমিককে আর কোনো কারখানাই কাজে নেবে না।
বিপ্লবী গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শ্রমিক ফোরামের আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম বলেন, সাভারের উলাইল এলাকার কয়েকটি কারখানায় তাঁদের বেশ কিছু সদস্য মামলার আসামি হয়েছেন, চাকরিও হারিয়েছেন। ওই সব শ্রমিকের জন্য সংগঠনের নেতারা এখন আদালতে দৌড়াচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, চাকরিচ্যুত শ্রমিকেরা অন্য কারখানায় কাজ খোঁজা শুরু করেছেন। তবে অতীতে দেখা গেছে, এভাবে চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের একটা অংশকে পেশা বদলাতে হয়েছে।
মামলায় এলাকাছাড়া
স্থানীয় বাড়ির মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলার পর গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেক শ্রমিক এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
আশুলিয়া থানা সূত্রে জানা গেছে, ৮ জানুয়ারি চারাবাগ নিটিং অ্যান্ড ডাইং নামের একটি কারখানার নিরাপত্তা কর্মকর্তা আবদুস সালাম ৫৫ জনের নাম উল্লেখ করে ৩৫৫ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে কারখানায় ভাঙচুরসহ পাঁচ লাখ টাকার তৈরি পোশাক চুরির অভিযোগে মামলা করেন।
আশুলিয়ার বাড়ইপাড়া এলাকার মাহমদ ফ্যাশনসের ২৯ জন শ্রমিকের নাম উল্লেখ করে ৫৪ জনের বিরুদ্ধে ৯ জানুয়ারি মামলা হয়। মামলায় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের মারধর, তৈরি পোশাক চুরিসহ হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। একই দিন কাঠগড়া এলাকার অরবিট অ্যাপারেলসের ৫০ জন অজ্ঞাতনামা শ্রমিকের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে মামলা হয়।
১০ জানুয়ারি কাঠগড়া এলাকার এ আর জিন্স প্রোডিউসার নামের একটি পোশাক কারখানার ৬১ জন শ্রমিকের নাম উল্লেখ করে ৩১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলায় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের মারধর, ভাঙচুর ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ আনা হয়। একই দিন নরসিংহপুরের নিট এশিয়া নামের একটি পোশাক কারখানার ৫০ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা হয়।
সাভার থানায় ১৩ জানুয়ারি ২৫ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরও ১৬৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে জে কে গ্রুপ। মামলায় মারধর, চুরি ও ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে ৮ জানুয়ারি শিল্প পুলিশ অজ্ঞাতনামা দেড় হাজার শ্রমিকের বিরুদ্ধে সাভার থানায় মামলা করেছে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, যাঁরা অপরাধ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই মামলা হচ্ছে। কোনো নিরীহ শ্রমিক যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।
গতকাল কাঠগড়া এলাকার এ আর জিন্স প্রোডিউসারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার সামনে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ১৭২ জন শ্রমিকের তালিকা টাঙানো। এখানকার কয়েকজন শ্রমিক বলেন, সাভার ও আশুলিয়ার অন্য সব কারখানার শ্রমিকদের মতো মজুরিকাঠামোর পরিবর্তনের দাবিতে তাঁরাও কাজ না করে কারখানা থেকে বের হয়েছিলেন। তাঁরা কারখানা ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ বা কাউকে মারধর করেননি। এরপরও তাঁদের গণহারে বরখাস্ত করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অর্ধেকের নামেই মামলা হয়েছে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে।
জানতে চাইলে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিরীহ শ্রমিকেরা যেন ছাঁটাই এবং হয়রানির শিকার না হন, বিষয়টি গত মঙ্গলবারের বৈঠকে আমরা বারবার বলেছি। নিরীহ শ্রমিকদের ছাঁটাই ও গ্রেপ্তার করা হলে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে কষ্ট থেকে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলা, ছাঁটাই ও পুলিশের ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের হয়তো সাময়িকভাবে দমানো যায়। তবে ভবিষ্যতের জন্য এসব ভালো না। তা ছাড়া এককভাবে শ্রমিকদের দোষ দিয়ে লাভ হবে না। সরকারের কাছে অনুরোধ, মালিকদের কোথায় গাফিলতি আছে, সেটিও খুঁজে বের করা দরকার। কারণ পোশাকশিল্প বড় হলেও খাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিপক্ব হয়ে ওঠেননি।’

মামলা করে অখ্যাত ভারতীয় কোম্পানির ক্যাপসুল কিনতে বাধ্য করা হয়েছে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

ভারতীয় কোম্পানির সরবরাহ করা ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. মুরাদ হাসান। গতকাল দুপুরে কিশোরগঞ্জের সার্কিট হাউজে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের (দ্বিতীয় রাউন্ড) জন্য সরবরাহ করা ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের নমুনা পর্যবেক্ষণের সময় সাংবাদিকদের এই কথা জানান তিনি। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, মামলা করে ভারতীয় একটি অখ্যাত কোম্পানির কাছ থেকে নিম্নমানের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাপসুল কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। সরবরাহ করা ক্যাপসুল কৌটার সঙ্গে  লেগে আছে, আলাদা করা যাচ্ছে না।
ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতীয় কোম্পানিটির কোনো সুনাম নেই। মামলা করে তারা আমাদের এ ক্যাপসুল কিনতে বাধ্য করেছে।
তাদের সরবরাহ করা লাল ক্যাপসুল নিয়ে কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেন এ রকম হলো পরীক্ষার পর তা বলা যাবে।
তবে দেশের কোম্পানি থেকে কেনা সবুজ রঙের ট্যাবলেটে কোনো সমস্যা নেই। প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. মুরাদ হাসান বলেন, নিম্নমানের এই ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের কারণে শিশুদের যেন কোনো সমস্যা না হয়, এজন্য আপাতত এ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। তবে শিগগিরই ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন শুরু হবে। এ সময় জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তরফদার মো. আক্তার জামিল, কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের উপ-পরিচালক রাজিয়া সুলতানা, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এমএ আফজল, জেলা স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. দীন মোহাম্মদ, জেলা বিএমএ সভাপতি ডা. মাহবুব ইকবাল, সাধারণ সম্পাদক ডা. এমএ ওয়াহাব প্রমুখ ছাড়াও জেলা প্রশাসন ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে আজ শনিবার সারা দেশে ২ কোটির উপরে শিশুকে এই ক্যাপসুল খাওয়ানোর কথা ছিল। এই ঘটনা তদন্তে দু’টি পৃথক কমিটি গঠন করেছে সরকার। শিশুদের এই ক্যাপসুল খাওয়ানোর বিষয়ে সরকার কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। তবে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য আনা ক্যাপসুল দিয়েই এই রাউন্ড দ্রুত সারা হবে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। এগুলোর মেয়াদ আগামী ২০২১ সাল পর্যন্ত। মহাপরিচালক নিজে পরিস্থিতি দেখার জন্য গতকাল গাজীপুরের দু’টি কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শনে যান। সেখানে একটি ক্লিনিকে সরবরাহকৃত ক্যাপসুলে কোনো সমস্যা দেখতে পাননি। এই ওষুধগুলো আলাদা আলাদা থাকার কথা। কিন্তু অপর ক্লিনিকে ওষুধের কৌটা খুললে দেখা যায় ২০/২৫টি ক্যাপসুল এক সঙ্গে লাগানো। তিনি জানান, মাঠ পর্যায়ের কোথাও কোথাও থেকে তাদের কাছে খবর আসে ক্যাপসুল একসঙ্গে লেগে থাকার। এ জন্য কর্মকর্তারা আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি। তাই ক্যাপসুল খাওয়ানো আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে অধিদপ্তর। এই কমিটিকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। ক্যাপসুল পরীক্ষা করার পর বলা যাবে এর মান খারাপ ছিল কি না। এই ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও অপর  একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই ক্যাম্পেইন আগামী ২৬শে জানুয়ারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি। এই বিষয়ে আগামীকাল রোবরার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বৈঠক করা হবে। স্থগিত হওয়া ভিটামিন এ ক্যাপসুল দু’মাস আগেই সরবরাহ করা হয়। এগুলো ওষুধ প্রশাসনের অধীন জাতীয় ল্যাবরোটরিতে পরীক্ষা করানো হয়েছে বলে  ডিজি উল্লেখ করেন।
সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে ভিটামিন এ-ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিটামিন এ-ক্যাপসুল পাঠানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মী ও কর্মকর্তারা ক্যাপসুলের মান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তারা ঘটনাটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানান। এরপর গত বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের শিশুদের ভিটামিন এ-ক্যাপসুল খাওয়ানোর কথা ছিল। স্থায়ী টিকা কেন্দ্র ছাড়াও বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, ব্রিজের টোল প্লাজা, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে ও ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রে শিশুদের ভিটামিন-এ খাওয়ানোর কথা।
মূলত রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করার জন্য ১৯৯৪ সাল থেকে দেশের শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন এই ক্যাপসুল খাওয়ানোর ফলে রাতকানা রোগের প্রকোপ অনেক কমে গেছে। এই কর্মসূচিতে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী সব শিশুদের ১টি করে নীল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে ১টি করে লাল রঙের ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কথা। ভিটামিন ‘এ’ দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে; রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমায়। ভিটামিন ‘এ’র অভাবে রাতকানাসহ চোখের অন্যান্য রোগ এবং রক্তশূন্যতাও হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাপসুল কেনার কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। প্রথমে একটি দেশি ওষুধ কোম্পানি সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছিল। ওই কার্যাদেশের বিরুদ্ধে আদালতে যায় একটি বিদেশি কোম্পানি। আদালত ওই বিদেশি কোম্পানিকে সরবরাহের কাজ দেয়ার নির্দেশ দেন। অ্যাজটেক নামে ভারতীয় কোম্পানি এরপর থেকে লাল রঙের এ ক্যাপসুল সরবরাহ করে আসছে।

বাধাগ্রস্থ হচ্ছে মেয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশ

মেয়েদের জীবনে ঋতু বা মাসিক একটি প্রাকৃতিক এবং স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু পরিষ্কার পানি, উপযুক্ত স্যানিটেশন সুবিধা এবং আনুষঙ্গিক স্বাস্থ্যবান্ধব সুযোগ-সুবিধার অভাব মাসিক স্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তুলছে। বিশেষ করে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ না থাকায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এমতাবস্থায় মাসিক সম্পর্কিত যথাযথ তথ্য ও জ্ঞানপ্রাপ্তি, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাসম্বলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা করার সামর্থ্য অর্জন জরুরী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রজনন ও যৌনস্বাস্থ্য, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং জীবনদক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জাতীয় কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ‘ঋতু’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করছে ইউনিসেফ, ব্রাক, ওয়াটারএইড, আইসিডিডিআরবি, বিএনপিএসসহ ৩৫টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্লাটফরম। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে সিমাভির সহায়তায় পরিচালিত ‘ঋতু’ প্রকল্পটি যৌথভাবে বিএনপিএস, ডরপ, রেড অরেঞ্জ, টিএনও এবং এমএইচএম বাস্তবায়ন করছে। ওই প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালে নেত্রকোনা জেলায় মাসিক স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ক বেজলাইন সার্ভে করা হয়। যেখানে জেলার ১৪৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪ হাজার ৪৬ জন মেয়েশিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।
ওই সার্ভে প্রতিবেদন অনুযায়ী, টয়লেটের ভেতরে বা কাছাকাছি সাবান-পানির কোনো ব্যবস্থা না থাকা, নিরাপদ পানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ না থাকা, টয়লেটের দরজা, ছিটকিনি, তালা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য প্রাচীর ঠিকমতো না থাকা, টয়লেট পরিচ্ছন্নতার টেকসই ব্যবস্থার অভাব, পর্যাপ্ত আলো না থাকা, ঢাকনাযুক্ত কন্টেইনার, মাসিকের উপকরণ  অপসারণের টেকসই ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে ৭৫ শতাংশ মেয়েশিক্ষার্থী মাসিকের সময় স্কুলের টয়লেটে যায় না। আর ৫৩ শতাংশ মেয়েশিক্ষার্থী মাসিকের সময় কমপক্ষে ৩ দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। আর ৯১ শতাংশ মেয়েশিক্ষার্থী মাসিকের সময় অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করে। মাত্র ৩৬ শতাংশ মেয়ে প্রথম মাসিকের আগে স্বাস্থ্যবিধি জানে। এ প্রসঙ্গে বিএনপিএস’র নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, মাসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য সঠিক ও ব্যাপক তথ্যের সম্প্রসারণ এবং মাসিক অনুকূল সেবা প্রদানমূলক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষা এবং গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বইয়ে বয়ঃসন্ধিকাল, ঋতুস্রাব, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়গুলো থাকলেও সেখানে তথ্যের অপর্যাপ্ততা ও যুক্তিসিদ্ধ বিন্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এমনকি মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। তাই পাঠ্যক্রম পুনর্বিন্যাস এবং পাঠ্যপুস্তকে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও যৌনশিক্ষা বিষয়ক পাঠ যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া বিদ্যমান পাঠ্যপুস্তক অনুসরণ করে পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে, সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো থেকে পরীক্ষায় প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এবিষয়ে স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ইসরাত জাহান ইলা বলেন, মাসিক স্বাস্থ্য যেহেতু যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যেরই একটি অংশ। তাই মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিককে স্বাস্থ্যসম্মত ও ইতিবাচক হিসেবে দেখার পরিবেশ পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে এটি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে মেয়েশিশু প্রথম মাসিকসহ মাসিককালে সকল নারী তাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সহযোগিতা পায়। এছাড়া মাসিকের বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থাপনা যেন কিশোরী ও নারীদের সামাজিক বা সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাধাগ্রস্থ না করে, সে বিষয়টিকেও গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ: দুই নারীকে নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ আদালতের

কনকদুর্গা ও বিন্দুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার কেরালা সরকারকে এই নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের বেঞ্চ। তবে ঋতুমতী নারীদের প্রবেশের পর শবরীমালা মন্দিরের পুরোহিতেরা যাতে মন্দিরের গর্ভগৃহ ও বিগ্রহ পরিশোধন না করেন, সেই আবেদনে সর্বোচ্চ আদালত কান দেননি।
কেরালার পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় শবরীমালা মন্দির। প্রথা অনুযায়ী ওই মন্দিরে ঋতুমতী নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। কেরালা হাইকোর্টও ওই মর্মে রায় দিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীরা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারতেন না। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘিরে শুরু হয়েছে এক ধর্মীয় ও সামাজিক সংকট।
কনকদুর্গা ও বিন্দু রাষ্ট্রীয় সহায়তায় মন্দিরে প্রবেশ ও বিগ্রহ দর্শন করেন। সে জন্য কনকদুর্গা নিজের শাশুড়ির হাতে নিগৃহীতও হন। সার্বিক নিরাপত্তার দাবিতে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে সর্বোচ্চ আদালত শুক্রবার রাজ্য সরকারকে তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
দুই নারীর অন্য আবেদনটি অবশ্য সর্বোচ্চ আদালত গ্রাহ্য করেননি। তাঁদের দাবি ছিল, ঋতুমতী নারীদের মন্দির প্রবেশের পর পুরোহিতেরা প্রতিবার মন্দিরের গর্ভগৃহ ও বিগ্রহ পরিশোধন করেন। সেই সময় মন্দির সর্বসাধারণের জন্য বন্ধও করে দেওয়া হয়। এই প্রথা নারী ভক্তদের সম্মানহানিকরই শুধু নয়, সংবিধানপরিপন্থীও।
শুনানির সময় কেরালা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের রায়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৫১ জন ঋতুমতী নারী শবরীমালায় আয়াপ্পা দর্শন করেছেন। রাজ্য সরকার ইচ্ছুক নারীদের সব রকমের সহায়তা করেছে। নিরাপত্তাও দিয়েছে।
রাজ্য সরকার সব ধরনের নিরাপত্তা দিতে রাজি হয়েছে। মন্দির ঘুরে আসা নারীরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে অথবা সামাজিকভাবে অত্যাচারিত বা নিগৃহীত হলে রাজ্য সরকার আইনত ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য থাকবে।

বিপর্যয় ঠেকাতে খাদ্যাভ্যাস বদলান

মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে খাদ্যাভ্যাস আমূল বদলাতে হবে। বর্তমান খাদ্যাভ্যাসের কারণে লাখো মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। স্বাস্থ্যকর খাবারের উৎপাদনও দিন দিন কমে যাচ্ছে। ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে এক হাজার কোটিতে। এখনকার খাদ্যাভ্যাস বজায় থাকলে পৃথিবী সে সেময় এত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার উৎপাদন করতে পারবে না। চিকিৎসাশাস্ত্রবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’–এ বৃহস্পতিবার এ–সংক্রান্ত নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
‘ল্যানসেট’–এ প্রায় ৩৬ জন গবেষকের দল বলছে, খাদ্যাভাসের দিক দিয়ে দুনিয়াজুড়েই বড় ধরনের বদল আনতে হবে। শর্করা ও লাল মাংস খাওয়ার পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। শাকসবজি, ফলমূল ও বাদামের পরিমাণ বাড়াতে হবে দ্বিগুণ।
ল্যানসেট কমিশনের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন অ্যান্ড পলিসির শিক্ষক টিম ল্যাং এএফপিকে বলেন, ‘আমরা বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে আছি। এখন ১০০ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত। আর ২০০ কোটি মানুষ অস্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত। এতে স্থূলতা, হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস বাড়ছে।
গ্লোবাল ডিজিজ বার্ডন রিপোর্ট বলছে, প্রতিবছর অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে ১ হাজার ১০০ কোটির বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বেড়ে যাওয়া, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাওয়া, বিশুদ্ধ পানি ও কৃষিজমি কমে যাওয়ার কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যব্যবস্থায় বদল এসছে।
পটসডেম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক ও ‘ল্যানসেট’–এর সহলেখক জোহান রকস্টর্ম বলেন, ‘পারিপার্শ্বিক অবস্থা বদলে যাওয়ায় ২০৫০ সালে এক হাজার কোটি মানুষের খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের স্বাস্থ্যকর খাবার, পরিবেশের ওপর কম প্রভাব ফেলবে—এমন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’
গবেষণা নিবন্ধের অন্যতম সহলেখক ও যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টিম ল্যাং বলছেন, ধনী দেশগুলোতে মাংস এবং মাংসজাতীয় খাবার কমাতে হবে। এর বদলে শাকসবজির চাষ বাড়াতে হবে। এশিয়ার দেশগুলোতেও মাংস ও দুধজাতীয় খাবারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পক্ষে তিনি।
টিম ল্যাংয়ের মতে, স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য একজন দিনে ২৫০০ ক্যালোরি নিতে পারবেন। এর মানে এমন না যে মাংস একেবারেই খাওয়া যাবে না। তবে একজন দিনে ৭ গ্রাম মাংস খেতে পারবেন। একটি হ্যামবার্গারে ১২৫ থেকে ১৫০ গ্রাম মাংস থাকে। তাই এ ধরনের খাবারগুলো এড়িয়ে যাওয়া ভালো। জেনে রাখা ভালো, স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর গরুর মাংস।
কোন খাবার কতটা খাবেন?
‘ল্যানসেট’ বলছে, স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে খাদ্যাভাসে খুব বেশি কিছু বদলানোর দরকার নেই। প্রয়োজনীয় ২৫০০ ক্যালোরি কীভাবে নেওয়া যেতে পারে তার তালিকা দিয়েছে ‘ল্যানসেট’।
একনজরে দেখে নেওয়া যাক সেটি।
শাকসবজি ৩০০ গ্রাম
ফল ২০০ গ্রাম
শ্বেতসারযুক্ত সবজি (যেমন আলু) ৫০ গ্রাম
অসম্পৃক্ত তেল (জলপাই, সয়াবিন, রাই সরিষা, সূর্যমুখী, বাদাম তেল) ৪০ গ্রাম
চিনি ৩১ গ্রাম
দুধ বা দুগ্ধজাতীয় খাবার ২৫০ গ্রাম
শুকনো শিম, মসুর অথবা মটর ডাল ৫০ গ্রাম
খাদ্যশস্য যেমন (চাল, গম ভুট্টা) ২৩২ গ্রাম
হাঁস–মুরগির মাংস ২৯ গ্রাম
মাছ ২৮ গ্রাম
ডিম ১৩ গ্রাম (দেড়টি থেকে দুটি ডিম)
চিনাবাদাম ২৫ গ্রাম
সয়াজাত খাদ্য ২৫ গ্রাম
গরু বা ভেড়ার মাংস ১৪ গ্রাম
চর্বিজাতীয় খাবার ৫ গ্রাম
পাম তেল ৬.৮ গ্রাম

নীচু জাত বলে... by অমর সাহা

জানকি সিংহনিয়া গিয়েছিলেন কুয়ো থেকে পানি তুলতে। কুয়োর মধ্যে বালতিও ফেলেছিলেন তিনি। হঠাৎ কী হলো, কুয়োর পাশে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন, জ্ঞান হারালেন। সেই জ্ঞান আর ফিরল না। চলে গেলেন না–ফেরার দেশে।
ভারতের ওডিশা রাজ্যের ঝাড়সুখুদা জেলার ছোট্ট গ্রাম কারপাবাহালে গত বুধবার ১৭ বছরের এক ছেলে রেখে মারা যান জানকি (৫০)। মায়ের মৃত্যুতে শোকের চেয়ে তাঁর সৎকারের চিন্তায় দিশেহারা ছেলে সরোজ সিংহনিয়া। আগে থেকেই নীচু জাতের বলে জানকিকে একরকম একঘরে করে রেখেছিল গ্রামের মানুষ। মৃত্যুর পরও যেন জাত ভুলতে পারল না তারা। সৎকারে এগিয়ে এল না কেউ। উপায় না দেখে কাপড়ে মুড়ে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে মায়ের লাশ সরোজ নিয়ে তুলল সাইকেলে। সাইকেল চালিয়ে ৪-৫ কিলোমিটার দূরের ছাড়িয়া জঙ্গলে গিয়ে মায়ের সৎকার করল সে।
ওডিশার লিপসাপলি গ্রামের নীচু জাতের মনু সিংহনিয়াকে বিয়ের পর থেকেই জাতের ভেদাভেদে পড়ে যান জানকি সিংহনিয়া। দলিত বলে গ্রামে বিধিনিষেধের অন্ত ছিল না। একসময় স্বামীর মৃত্যু হলে সন্তান নিয়ে কঠিন পরীক্ষায় পড়েন জানকি। কোনো রকমে চলতে থাকে জীবন। তাই বলে মায়ের মৃত্যুর পরও যে কেউ এগিয়ে আসবে না তা যেন ভাবতে পারেনি সরোজ। এমনকি মৃতদেহও কেউ ছোঁয়নি। দেখতেও আসেনি কেউ। এই ঘটনা যেন এক ধাক্কায় অনেকটাই বড় করে দিয়েছে তাকে। পরে সে একাই নিয়ে নেয় মায়ের সৎকারের ভার।
সরোজের এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় দানা মাঝির কথা। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে যক্ষ্মা রোগে মারা যান দানা মাঝির স্ত্রী। হাসপাতালে মারা গেলেও মরদেহ নিজের বাড়িতে অর্থের অভাবে নিয়ে আসতে পারছিলেন না দানা। অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে সাহায্যও করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উপায় না দেখে সেই মৃতদেহ বেঁধে মাথায় করে দীর্ঘ ১০ কিলোমিটার পথ বয়ে নিয়ে আসেন দানা মাঝি। পাশে পাশে হাঁটতে থাকে তাঁদের একরত্তি মেয়েটি। সেই দৃশ্য দেখে স্থানীয় মানুষজন মৃতদেহ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে। ঘটনাটি সেদিন দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছিল।

সময় বৃদ্ধি নাকি চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদ?

ব্রেক্সিটের অচলাবস্থা নিরসনে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের বৈঠকের পর এখন দুটি সম্ভাবনা নিয়ে বেশ জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে—বিচ্ছেদের সময় পিছিয়ে কাঙ্ক্ষিত সমাধান খোঁজার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে; নাকি আগামী ২৯ মার্চ নির্ধারিত দিনে চুক্তি ছাড়াই বিচ্ছেদ কার্যকর হয়ে যাবে।
দীর্ঘ আড়াই বছরের চেষ্টার পর গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। কিন্তু গত মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সেই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার কারণে ব্রেক্সিট নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দুই দফায় আস্থা ভোটে পার পাওয়া প্রধানমন্ত্রী মে ব্রেক্সিট সংকটের সমাধান খুঁজতে চুক্তি প্রত্যাখ্যানকারীদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করছেন।
বৈঠকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এসএনপি), প্লাইড কামরি এবং গ্রিন পার্টির নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে বিচ্ছেদের সময়সীমা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। এসব দল ব্রেক্সিট নিয়ে পুনরায় গণভোটের পক্ষে। তারা অনেকটা একই সূরে বলেছে, ২৯ মার্চের মধ্যে ব্রেক্সিটের কাঙ্ক্ষিত সমাধান খোঁজা সম্ভব হবে না। তাই আগে বিচ্ছেদের সময়সীমা স্থগিত বা বৃদ্ধি করা উচিত। অন্যথায় চুক্তি ছাড়াই ইইউ থেকে ছিটকে পড়ার পরিণাম দেশের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে।
এদিকে বিরোধীদলীয় নেতা জেরেমি করবিন তাঁর শর্তে অটল থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে যাননি। তিনি চুক্তিহীন বিচ্ছেদের সম্ভাবনার কথা বাতিল করার শর্ত দিয়েছিলেন। সংসদেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতা চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের বিপক্ষে।
কিন্তু গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তিনি ইইউর কাস্টমস ইউনিয়নে থাকা কিংবা পুনরায় গণভোট আয়োজনের বিষয়টিও প্রয়োজনীয় মনে করেছেন না।’
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা জেরেমি করবিনকে লেখা এক চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইইউর সঙ্গে নির্ধারিত আলোচনার শর্ত অনুযায়ী চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কেননা ওই শর্তে বলা হয়েছে, চুক্তি সম্পাদনে ব্যর্থ হলেও ২৯ মার্চ বিচ্ছেদ কার্যকর হবে।
এ ছাড়া বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজ দলের কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এদের মধ্যে ছিলেন প্রভাবশালী রাজনীতিক ওয়েন পিটারসন, ইয়ান ডানকান স্মিথ, ডেভিড ডেভিস, মার্ক ফ্র্যানকোইস ও স্টিভ বেকার। বৈঠক হয় সরকারের শরিক দল ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) নেতা অ্যারলেন ফোস্টারের সঙ্গেও। এঁরা সবাই ব্রেক্সিটপন্থী। কিন্তু সরকারের সম্পাদিত ব্রেক্সিট চুক্তির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। আয়ারল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে বিতর্কিত ধারা বাদ দিলে তাঁরা চুক্তিতে সমর্থন দেবেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এরা আবার ব্রেক্সিটের সময়সীমা বাড়ানোরও বিরোধী।
তবে ক্ষমতাসীন দলের ব্রেক্সিট-বিরোধী এমপি নিক বোলস বলেছেন, বিচ্ছেদের সময় বাড়ানোর জন্য তিনি সংসদে বিল উত্থাপন করেছেন। তিনি দাবি করেন, ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সাংসদদের ক্ষমতা খর্ব করতে চাইলে মন্ত্রিসভা থেকে অন্তত ২০ জনের পদত্যাগের ঘটনা ঘটবে।
আগামী সোমবার সংসদে বিকল্প ব্রেক্সিট চুক্তি উত্থাপন করবেন থেরেসা মে। সাংসদরা এতে সংশোধনী প্রস্তাব আনতে পারবেন। এসব সংশোধনী প্রস্তাব থেকে সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করবে। এরপর ২৯ জানুয়ারি চূড়ান্ত বিকল্প প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের প্রস্তুতি বাবদ সরকার যে অর্থ বরাদ্দ রেখেছে, তার ২০ শতাংশ ইতিমধ্যে খরচ করেছে সরকারি দপ্তরগুলো। শুল্ক ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সরকারি দফাগুলোর কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী গেভিন উইলিয়ামসন বলেছেন, চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় সাড়ে তিন হাজার সেনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে ইইউ সদস্যভুক্ত বাকি দেশগুলোও চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করেছে। বৃহস্পতিবার ফ্রান্স সরকার জানিয়েছে, তারা অতিরিক্ত ৬০০ কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে।
নতুন কোনো সমঝোতা না হলে মাত্র ৬৯ দিন পরই ইইউ থেকে ছিটকে পড়বে যুক্তরাজ্য।