Sunday, March 29, 2020

মাংসপেশিতে টান পড়লে কী করবেন by সানজানা চৌধুরী

Add caption
মাংসপেশিতে টান পড়া বা শরীরের কোন অংশ মচকানো বেশ সাধারণ একটি সমস্যা। যাকে বিশেষজ্ঞের ভাষায় মাসল পুল, মাসল সোরনেস, স্ট্রেইন, স্প্রেইন, ক্র্যাম্প, স্প্যাজম ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে।

মাসল পুল কেন হয়, কাদের হয়:

মাংসপেশিতে অতিরিক্ত টান খেলে বা টিস্যু ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে এমনটা হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন ফিজিওথেরাপিস্ট ড. আফরোজা সুলতানা।
এতে শরীরের ওই অংশটিতে ভীষণ ব্যথা হয়। ল্যাকটিক অ্যাসিড নি:সরণের জন্য জ্বালাপোড়া করে। এ কারণে মাংসপেশি নাড়াচাড়া করা যায়না।
মাসল পুলের প্রধান কয়েকটি কারণ হল:
১. শরীরের যেকোনো একটি মাংসপেশি অনেকক্ষণ ধরে ব্যবহৃত হলে।
২. ব্যায়াম, খেলাধুলা বা যেকোনো শারীরিক কসরতের আগে ওয়ার্মআপ বা শরীর গরম না করলে।
৩. পেশী ক্লান্ত থাকা অবস্থায় আকস্মিক নড়াচড়া করলে।
৪. হঠাৎ অতিরিক্ত ভারী কিছু ওঠালে।
৫. পেশীর অতিরিক্ত ও অনুপযুক্ত ব্যবহার।
৬. মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা।
৭. অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস বিশেষ করে পানি কম খেলে এবং শরীরে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের অভাব দেখা দিলে মাংসপেশিতে টান পড়তে পারে।
যারা অতিরিক্ত শারীরিক কসরত করে থাকেন যেমন অ্যাথলেটরা মাসল পুলের সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।
যারা দীর্ঘসময় ধরে কম্পিউটারের সামনে কিংবা চেয়ারে বসে কাজ করেন কিংবা লম্বা সময় যানবাহন চালান, তাদের কাঁধ, ঘাড়, পিঠের মাংসপেশিতে টান পড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

কখন বুঝবেন মাসল পুল হয়েছে:

১ যদি পেশীতে অনেক ব্যথা হয়। পেশী অনেক দুর্বল হয়ে যায়।
২. আঘাতপ্রাপ্ত জায়গাটি যদি ফুলে ওঠে বা লালচে দাগ পড়ে যায়।
৩. যদি আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে স্বাভাবিক ওজন নিতে কষ্ট হয়।
৪. মাংসপেশি আপনা আপনি অনেক শক্ত হয়ে পড়লে।

মাসল পুল হলে কি করবেন:

ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার তথ্য মতে, মাংসপেশিতে টান খাওয়ার প্রথম কয়েকদিন চারটি ধাপে এর চিকিৎসা করতে হবে। যাকে সংক্ষেপে রাইস থেরাপি বলা হয়। এর মাধ্যমে ব্যথা অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়।
রাইস থেরাপির ৪টি ধাপ হল: রেস্ট, আইস, কমপ্রেশন ও এলিভেট।
১. রেস্ট বা বিশ্রাম: সব ধরণের শারীরিক ব্যায়াম বা ক্রিয়াকলাপ বন্ধ রাখতে হবে। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে কখনও কোন ওজন নেয়া যাবেনা।
২. আইস বা বরফ - আঘাতের স্থানে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর ২০ মিনিটের জন্য বরফের ব্যাগ দিয়ে রাখুন।
৩. কমপ্রেশন সংকোচন - আঘাতপ্রাপ্ত স্থানটির নাড়াচাড়া নিয়ন্ত্রণে একটি ব্যান্ডেজ দিয়ে মুড়িয়ে নিতে হবে।
৪. এলিভেট বা উঁচু করা - অর্থাৎ আঘাতের স্থানটি যতটা সম্ভব বালিশের উপরে উঠিয়ে রাখতে হবে।
মাংসপেশির ফুলে ওঠা প্রতিরোধে কোন অবস্থাতেই আঘাত পাওয়ার প্রথম কয়েকদিন ওই স্থানে গরম সেক দেয়া বা গরম পানি দেয়া এড়িয়ে যেতে হবে।
এছাড়া আঘাতের স্থানে কোন অবস্থাতেই মালিশ করা যাবেনা।
যখন আপনি ক্ষতস্থানটি স্বাভাবিকভাবে নাড়াচাড়া করতে পারবেন। খুব একটা বেশি ব্যথা নেই। তখন আস্তে আস্তে স্বাভাবিক কাজ করার চেষ্টা করুন। নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করুন যাতে জয়েন্ট বা পেশী শক্ত না হয়ে যায়।

চিকিৎসা:

মাংস পেশিতে টান পড়লে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত বলে মনে করেন ডা.আফরোজা সুলতানা।
বিশেষ করে, মাংসপেশিতে অতিরিক্ত ব্যথা হলে, ব্যথায় জ্বর উঠে গেলে, কয়েকদিন পরও সেই ব্যথা না কমলে, মাংসপেশির ফুলে ওঠা না কমলে বা বাড়লে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, মাথা ঘুরতে থাকলে, শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে কাঁপতে থাকলে বিশেষজ্ঞের কাছে নিতে কোন অবস্থাতেই দেরী করা যাবেনা।
মাসল পুল হওয়ার পর পেশির ওই অংশ যদি টান টান করতে গিয়ে ব্যথা পান, তাহলে সেই চেষ্টা আর করা যাবেনা। এতে পরিস্থিতি হিতে বিপরীত হতে পারে বলে জানান মিসেস সুলতানা।
অনেক সময় মচকানোর এই প্রভাব সাত দিন থেকে শুরু করে ছয়মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনও হতে পারে বলেও তিনি জানান।
প্রাথমিক অবস্থায় ক্ষতস্থানে তাৎক্ষণিক ব্যথা কমানোর জন্য এনেস্থেটিক ক্রিম, জেল বা স্প্রে ব্যবহার করা হয়।
পরিস্থিতি স্বাপেক্ষে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হতে পারে।
এরপর বিভিন্ন মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে মাসল পুলের কারণ ও মাত্রা জানার চেষ্টা করেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রথমত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য অর্থাৎ সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মাত্রা ঠিক আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করা হয়।
সেখানে সমস্যা থাকলে রোগীকে বিশ্রামের পাশাপাশি ডাবের পানি, স্যালাইন, কিশমিশ এবং মিনারেলস জাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।
এছাড়া আলট্রাসাউন্ড ইমেজিং এক ধরণের শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে সারা শরীরের পেশী, রগ, লিগামেন্ট, স্নায়ু এবং জয়েন্টগুলির ছবি ধারণ করে থাকে ।
এটি মূলত পেশিতে আচমকা টান খাওয়া, মচকানো টিস্যু ছিঁড়ে যাওয়া, স্নায়ুতে বাধা, বাত বা পেশী সংক্রান্ত অন্যান্য যেকোনো সমস্যা নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
অনেক সময় চিকিৎসকরা আক্রান্ত স্থান বিশেষভাবে ব্যান্ডেজ করে ক্রাচ নিয়ে চলার কথাও বলে থাকেন।
ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে দ্রুত এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ফিটনেস সেন্টারে ফিজিওথেরাপি দেয়া হয়ে থাকে।

মাসল পুল এড়াতে কি করবেন:

১. যেকোনো শারীরিক কসরতের আগে বা ভারী কিছু তোলার আগে অবশ্যই ওয়ার্মআপ করে মাংসপেশিগুলোকে সচল করে নিতে হবে।
২. নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।
৩. দীর্ঘক্ষণ না বসে, ৪০ মিনিট বা এক ঘণ্টা পর পর কয়েক মিনিট কিছুক্ষণ পায়চারি করতে হবে।
৪. প্রচুর পানি পান করতে হবে।
>>>বিবিসি নিউজ বাংলার স্বাস্থ্য সিরিজের এটি তৃতীয় পর্ব।
রাইস থেরাপির ৪টি ধাপে মাসল পুলের ব্যথা থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়া যায়

Friday, March 27, 2020

লাল কাঁকড়ার দেশে by মোস্তাফিজুর রহমান সজীব

সমুদ্র। শব্দটি মনে হলেই নোনা জলের বড় বড় ঢেউ আছড়ে পরে মনের ভেতর। যেন ঢেউয়ের পানি নেমে যাবার সময় সাথে নিয়ে যায় ব্যস্ত জীবনের সব ক্লান্তি। বেশ আগে থেকেই পহেলা বৈশাখের ছুটি ঢাকার বাইরে কাটানো নিয়ে পরিকল্পনা আঁটছিলাম আমরা অনেকে মিলে। ভিন্ন ভিন্ন ক্যারিয়ারের মানুষ এক সাথে হলে যা হয়। সময়ে সময়ে পরিকল্পনার বদল। কখনো চা বাগান তো কখনো পাহাড়। এভাবেই শেষমেশ গন্তব্য বিশাল সমুদ্র সাগর কন্যা কুয়াকাটা।
ছোট বড় মিলিয়ে আমরা মোট আট জনের দল। এর মাঝে দু’জনের বয়স মাত্র চার ছুঁই ছুঁই করছে। বাসে করে ঢাকা থেকে কুয়াকাটার দীর্ঘ যাত্রায় তাই কনিষ্ঠ দুই সদস্যকে নিয়ে যে কিছুটা দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম না তা কিন্তু নয়। তবে এটুকু বলতে পারি ট্যুর শেষে সব থেকে বেশি প্রাপ্তিও ছিল কনিষ্ঠ দুই জনার। 
কুয়াকাটায় আমার এর আগেও যাওয়া হয়েছে। তাই গতবারের অনেক অপূর্ণতাকে এবার পূর্ণতায় রূপ দিতে কুয়াকাটাকে নিয়ে আমার আগ্রহ বরং একটু বেশিই ছিল। কক্সবাজারের চাইতে কেন যেন কুয়াকাটা আমার কাছে একটু আলাদা। শহর বলতে সাগর পাড়ের বেড়িবাঁধের কোল ঘেঁষা জনপদ। এখানেই পর্যটকদের থাকার জন্য ছোট-বড় আবাসিক হোটেলগুলোর ভির। ঢাকা থেকে বাসে করে আসতে পথে দুই জায়গায় ফেরিতে প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় নষ্ট হবার কারণে কিছুটা দেরিতেই পৌঁছাই আমরা। হোটেল বুকিং যেহেতু ঢাকা থেকেই দেয়া ছিল বাস থেকে নেমে প্রথম গন্তব্য তাই হোটেল রুম।
আগেই বলেছি কক্সবাজারের থেকে কুয়াকাটা আমার কাছে একটু আলাদা। কক্সবাজারে বিশাল সমুদ্রের পাশে বিশাল বিশাল অট্টালিকা আর হাজার হাজার মানুষের মাঝে যেন দু’দ- অবসর পাওয়া খুব কষ্ট। অন্যদিকে কুয়াকাটা এখনো অনেকটা অবসরের জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুক উজার করে। আছে প্রকৃতি, আছে নদীর মোহনা, আছে লাল কাঁকড়ার দল, আছে প্রাকৃতিক বনভূমি লেবুর চর, ঝাউ বন, আর উপকূলীয় ফাতারার বনের হাতছানি। ফলে সমুদ্র ছাড়াও কুয়াকাটার রয়েছে নানান  বৈচিত্র্য। এখানে আপনি সমুদ্রকে একপাশে রেখে আনমনে হেঁটে চলে যেতে পারবেন প্রকৃতির কাছাকাছি। বিরক্ত করার যেন কেউ নেই।
প্রথম দিন যেহেতু পৌঁছাতেই আমাদের প্রায় দুপুর তাই হোটেলে যে যার রুম বুঝে নিয়েই বেড়িয়ে পরি পেটকে শান্ত করার জন্য। খাওয়া শেষ হতে দেরি সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পরতে যেন দেরি হয়নি আমাদের। যাত্রার সব ক্লান্তি সমুদ্রকে দিয়ে যখন আমরা হালকা তখন দিন প্রায় শেষের পথে। পূর্ব পরিচিত স্থানীয় গাইড সালেহর পরামর্শে তাই ফ্রেশ হয়েই সূর্যাস্ত দেখার জন্য বেড়িয়ে পড়ি সব্বাই মিলে। গন্তব্য তিন নদীর মোহনা, ৮-১০ মিনিটের এই পথ যেতে হবে মোটরসাইকেলে। যদিও কুয়াকাটায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য এই মোটরসাইকেলের কোনো বিকল্প নেই। সমুদ্রকে বাঁ-পাশে রেখে আমারা ছুটে চলেছি পশ্চিম দিকে। সূর্য ততক্ষণে সমুদ্রে ডুব দেই দেই করছে। তিন নদীর মোহনায় পৌঁছেই আমরা সূর্যকে তার সব আলোকছটা নিয়ে সমুদ্রে ডুব দিতে দেখলাম। এ এক অদ্ভুত সময়। মানুষ বলতে ছিলাম শুধুই আমাদের দল। সবার মধ্যেই কেমন যেন এক অদ্ভুত নীরবতা। কানে শুধু শো শো বাতাসের শব্দ। এর মাঝেই দলের একটি অংশ আবার নদীতে চলা এক নৌকায় ওঠে কিছুটা নৌকা ভ্রমণ সেরে নিলো। সূর্য তার নতুন গন্তব্যে ফিরে গেলে আমরাও ফেরার পথ ধরলাম, গন্তব্য কুয়াকাটার প্রধান সৈকত।
ফিরতে ফিরতে চারপাশে অন্ধকার নেমে এসেছে। সমুদ্রে জোয়ার শুরু হয়ে গেছে। মোটরসাইকেল ছুটে চলছে আপন গতিতে। হঠাৎ লাইটের আলোতে আবিষ্কার করলাম সাগর পাড়ের বালু থেকে বেড়িয়ে আসছে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া। ছোটাছুটি করছে এদিক সেদিক। কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেলাম আমরা, কাঁকড়া দেখব বলে। যেদিকে তাকাই শুধুই কাঁকড়ার দল। একটু কাছে যেতেই দৌড়ে গর্তে ঢুকে যাচ্ছিল। কিছুটা সময় লাল কাঁকড়ার সাথে খেলা শেষে আবার ছুটে চলা। সমুদ্রকে এবার ডান পাশে রেখে ছুটছে আমাদের মোটরসাইকেলগুলো। প্রচ- বাতাসের শব্দে কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়। জোয়ারের পানি বাড়তে থাকায় মাঝে মাঝেই পানি দিয়ে ছুটে চলছিলাম আমরা। সৈকতে ফিরতে দেখি কুয়াকাটার আরেক রূপ, রাতের কুয়াকাটা। ছোট ছোট দোকানগুলোতে আলো জ্বলজ্বল করছে। পর্যটকেরা ব্যস্ত সামুদ্রিক মাছ ভাজা খাওয়াতে। দেরি না করে আমরাও নাম লেখাই সেই দলে।
এখন দেশের যেকোনো সমুদ্র সৈকতের বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে সামুদ্রিক মাছ ভেজে খাওয়া। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ১০ থেকে ১৫টি দোকান বাহারি সামুদ্রিক মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছে। টুনা, লাক্ষা, কোরাল, রূপ চাঁদা, কাঁকড়া, স্কুইড, লইটকাসহ আরো নাম না জানা বাহারি মাছ। পছন্দসই মাছের অর্ডার দিয়ে সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে ডাবের পানিতে গলা ভেজানোর আহ কি সুখ! 
আমরা সাধারণত কোথাও ঘুরতে গেলে সেখানে পাওয়া লোকাল খাবারের প্রতি বেশি আকর্ষণ বোধ করি। ফলে কুয়াকাটার তরমুজ, নির্ভেজাল কলা ইতিমধ্যেই আমরা রুমে নিয়ে জড়ো করেছি। আজকে আমাদের দ্বিতীয় দিন, আগের দিনের ক্লান্তিতে আজ একটু অলসতা দিয়ে শুরু করতে চেয়েছি। ফলে সকালে কোনো পরিকল্পনা রাখিনি আমরা। আগের রাতে মাছ ভাজা খাওয়াকে আজকে আরো বড় আকার দেয়ার ইচ্ছা থেকেই চলে যাই স্থানীয় মাছের পাইকারি বাজারে। সেখান থেকে পছন্দসই মাছ কিনে বুঝিয়ে দেই গাইড সালেহর হাতে। এরপর সময় শুধুই দল বেঁধে সমুদ্রের পানিতে নিজেদের উজাড় করে দেয়া।
বিকেল পর্যন্ত বিশ্রাম নিয়ে আমরা বেড়িয়ে পরি একটা দীর্ঘ সময়ের যাত্রায়। এবার গন্তব্য কুয়াকাটার সৈকত ধরে পূর্ব দিকে। সমুদ্রকে ডানে রেখে আমরা ছুটে চলেছি লাল কাঁকড়ার চর হয়ে মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধ বিহারের দিকে। রোদ নেই বললেই চলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কেওড়া বনের মাথার উপর দিয়ে সূর্য হারিয়ে গেল অজানা ঠিকানায়। আমরা যখন মিশ্রীপাড়ায় পৌঁছাই ততক্ষণে চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে, বিহারের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে বিশেষভাবে অনুরোধ করে আমাদের জন্য বিহারের দরজা আবার খোলা হয়। শত বছর আগে গড়া ৩২ ফুট উচু এই বৌদ্ধ মূর্তিটি একসময় উপমহাদেশের সব থেকে বড় বৌদ্ধ মূর্তি ছিল। যা তৎকালীন সময়ে রাখাইন অধিবাসী মিশ্রী তালুকদার তৈরি করেন। ফলে কালের পরিক্রমায় তার নামেই এই এলাকার নামকরণ হয় মিশ্রীপাড়া হিসেবে।
মিশ্রীপাড়ার বিহার দর্শন শেষে স্থানীয় রাখাইন মার্কেটে কিছুটা সময় ঘুরে ফিরে আসি কুয়াকাটা সৈকতে। সমুদ্রের পাড়ে বসে চলতে থাকে আড্ডা। স্থানীয় এক শিল্পীর কণ্ঠে গান আড্ডায় নতুন মাত্রা যোগ করে। একসময় কথা হয় কুয়াকাটা থেকে ৪০ কি.মি গভীর সমুদ্রে ‘চর বিজয়’ এর আবিষ্কারের সাথে যারা জড়িত ছিলেন তাদের সাথে। ভাবতেই শিহরিত হচ্ছিলাম আমরা। যে চরের হাজার হাজার গাঙচিল মানুষ দেখলে না কি মোটেও ভয় পায় না। ভয়ে উড়ে পালায় না। আরো রয়েছে হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার বাস। এভাবেই সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাসে আড্ডায় আড্ডায় সময় গড়িয়ে যেতে থাকে। এরই মাঝে দলের কেউ কেউ আবার ব্যস্ত হয়ে যায় টুকটাক কেনাকাটায়। এমন সময় হঠাৎ প্রচ- ঝড়ো বাতাসে সেদিনের মতো আড্ডা ফেলে হোটেলে ফিরে আসতে হয় আমাদের।
তৃতীয় দিন, পহেলা বৈশাখ। পরিকল্পনা ছিল মেয়েরা একরকম শাড়ি আর ছেলেরা একরকম পাঞ্জাবি পরার। কিন্তু প্রচ- গরমে আর সে পথে হাঁটা হয়নি আমাদের। তবে গরম যতই থাক সমুদ্রে নামা কি আর আটকে থাকে? ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করতে করতে কখন যে দুপুর গড়িয়েছে সেদিকে আমাদের খেয়াল ছিল না। সালেহ যখন আমাদের মনে করিয়ে দেয় তখন পেটজুড়ে ক্ষুধার রাজ্য। তার পরামর্শেই সবাই মিলে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবারের জন্য চলে যাই লেবুর বনে। যাবার আগেই ফোন করে সালেহ দুপুরের খাবারের সব বন্দোবস্ত করে রাখে। মোটরসাইকেল করে যেতে মিনিট পাঁচেক সময়। পৌঁছে দেখি ভাত, ডাল, লক্ষা মাছের ভর্তা আর সাথে রূপচাঁদা ফ্রাই। জীবনে সুখের মানে একেকজনের কাছে একেক রকম। যেমন আমার কাছে এই এক বেলা খাবারের সময়টুকু ছিল একরকম অনন্য সুখের। ভাবতে পারেন সমুদ্র পাশে বাঁশের খুঁটিতে কোনো রকমে দেয়া চাটাইয়ের ছাউনির নিচে বসে আপনি ভাত খাচ্ছেন। পাশেই জোড়া খালেই মাছ ধরার অলস নৌকা, পায়ের নিচে সমুদ্র সমান বালু, সামনে সমুদ্রের ঢেউ আর সদা ব্যস্ত হোটেলের মালিক কাম বাবুর্চির সব সুস্বাদু টাটকা খাবার।
খাওয়া শেষে সবার তৃপ্তিই বলে দেয় আমরা যা ইট বালুর শহরে খুঁজে ফিরি তা আসলেই রয়ে গেছে এই নড়বড়ে বাঁশের চাটাইয়ের নিচে সরলতায়। আমাদের খাওয়া শেষ হতে হতেই সূর্য নিজেকে আড়াল করার সব প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে। ফলে আবার ছুটে যাই তিন নদীর মোহনার কাছাকাছি ঝাউ বনের পাশে। প্রথম দিনের চাইতে আজকে হাতে কিছুটা বেশি সময় থাকায় সবাই মিলে হারিয়ে যাই সূর্যের সাথে সাথে। কেউ কেউ আবার সমুদ্রের পানিতে পা ভিজিয়ে প্রাণ জুড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। আনন্দ আর ভালো লাগার পাশাপাশি কেমন যেন একটা বিষাদের ছোঁয়া ছিল সবার মধ্যে। এটাই ছিল এবারের কুয়াকাটায় আমাদের শেষ সূর্যাস্ত।
সবাই মিলে কুয়াকাটার প্রধান সৈকতে ফিরে এসে আগের দিনের কিনে রাখা সামুদ্রিক মাছের ফ্রাইয়ের প্রস্তুতি নেই। এর পাশাপাশি একদল ব্যস্ত হয়ে পরে সমুদ্রের পাশে বসে আড্ডা দিতে। আড্ডায় আড্ডায় সময় গড়িয়ে যে কখন রাত ১১টা বেজে গেছে তা যেন কারোই মনে ছিল না। একসময় রাতের আঁধারে আছড়ে পরা সমুদ্রের বিশাল ঢেউগুলো বুকে নিয়ে সবাই রুমে ফিরে আসি। এবার ফেরার পালা। পরের দিন সকালের বাসে বরিশাল হয়ে লঞ্চে ঢাকায় ফেরা। ফিরতে হবে সেই কোলাহল পূর্ণ শহুরে জীবনে। যেখানে চাইলেই সমুদ্রকে পাশে নিয়ে হেঁটে যাওয়া যাবে না কিছুটা সময়। হয়তো এখানেই সমুদ্র সবার থেকে আলাদা। এর মায়া যেন শেষ হবার নয়। বারবার হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে।

Wednesday, March 25, 2020

ঐতিহাসিক অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়ার কিছু নজির

স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ আর ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিসের কাছে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট চিঠি লিখেছেন এমন আহবান জানিয়ে যে তারা যেন আমেরিকার দুই মহাদেশ দখল করার সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমা চান। অনেক অনেক বছর আগে ঘটা কোন ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতে এই প্রথম অবশ্য কোন দেশ কিংবা কোন জনগোষ্ঠীকে আহবান জানানো হয়নি।
দৃষ্টি ফেরানো যাক কোন দেশ কখন এবং কেন এমনভাবে ক্ষমা চেয়েছিল।
দাসপ্রথা এবং জাতিগত পৃথকীকরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমা প্রার্থনা
দাসপ্রথার বিষয়ে দুটো সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দুঃখ প্রকাশ করেছিল - ২০০৮ সালে প্রতিনিধি পরিষদে একবার এবং ২০০৯ সালে সিনেটে আরেকবার।
কংগ্রেসের এই দুটো কক্ষই মার্কিন জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে আফ্রিকান আমেরিকানদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে তাদের এবং তাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে দাসপ্রথা ও এর পরবর্তীতে দশকের পর দশক ধরে চলা পৃথকীকরণ নীতির আওতায় যে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, তার জন্য।
এই ক্ষমা প্রার্থণার ঘটনায় খুব সামান্যই বিরোধীতা হয়েছে। তবে কংগ্রেসের দুটো কক্ষ কেবল একটি মাত্র সিদ্ধান্ত প্রস্তাবে একমত হতে পারেনি - অর্থাৎ ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি কিছু দ্বিমতকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সিনেটের প্রস্তাবে এমন একটি ধারা উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে যে দাসপ্রথা এবং জাতিগত পৃথকীকরণের কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাইতে ব্যবহার করা যাবে না।
তবে এটির বিরোধীতা করেছেন প্রতিনিধি পরিষদের কংগ্রেসনাল ব্ল্যাক ককাসের কিছু সদস্য, যারা ক্রীতদাসদের উত্তরাধিকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
ওই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক ওবামা। তিনি কংগ্রেসের ক্ষমা প্রার্থণাকে স্বাগত জানিয়েছেন, কিন্তু দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কখনোই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আহবান জানাননি।
ওবামার পরিবারের সঙ্গে দাসপ্রথার ইতিহাসের সংযোগ রয়েছে। তার শ্বেতাঙ্গ মায়ের পরিবারের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে তাদের দাসের মালিকানা ও দাস - এই দুইয়ের সঙ্গেই সংশ্লিষ্টতা ছিলো। অন্যদিকে তার কৃষ্ণাঙ্গ পিতা দাসপ্রথা শেষ হওয়ার অনেক পরে আমেরিকায় আসেন। ফলে এটি প্রমাণ করে যে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বেশ জটিল একটি ব্যাপার।
সুতরাং ক্ষতিপূরণ যদি দেওয়া হয়, তাহলে কে তা দেবে আর কেই-বা পাবে?
ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টির সাথে ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও আসা উচিত - এই ধারণার কারণে অনেক নেতাই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
আয়ারল্যান্ডের দুর্ভিক্ষে ব্রিটেনের ভূমিকা
আইরিশ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছিল ১৮৪৫ সালে। এর ১৫০ বছর পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বলেছিলেন: ‘সে সময় যারা লন্ডন থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করছিলেন, তারা আসলে সুশাসন দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।’
ওই দুর্ভিক্ষে ১০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো, আর দেশত্যাগ করেছিলো ২০ লক্ষ আইরিশ। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, দেশটিতে তখন আলু উৎপাদনে ধস নামলেও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট খাদ্য আমদানীতে চালু থাকা বিধিনিষেধ তুলে নিতে দেরি করে।
টনি ব্লেয়ারের ১৯৯৭ সালে দেওয়া বক্তব্য এমন একটি সময় আসে যখন ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছিল। ১৯২২ সাল পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের অংশ ছিলো, তবে উত্তর আয়ারল্যান্ড নিয়ে দুটো দেশের মধ্যে সম্পর্ক পরে চরম তিক্ততায় গড়ায়।
সমস্যা সমাধানে দেশ দুটো এরপর 'গুড ফ্রাইডে চুক্তি' করে। সমালোচকরা অবশ্য বলছেন যে ব্লেয়ারের কথাগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ, আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা হিসেবে নেয়া যায় না।
যদিও দুর্ভিক্ষের কারণে আয়ারল্যান্ডকে কখনোই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, তবে ব্রিটেন সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত কিছু মানুষকে অর্থ দিয়েছে।
এদিকে, ১৯৫০-এর দশকে কেনিয়ার মওমও বিদ্রোহের সময় যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, ব্রিটিশ সরকার ২০১৩ সালে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। তাদের জন্য আড়াই কোটি মার্কিন ডলারের একটি ক্ষতিপূরণ প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়।
হলোকাস্টের জন্য পশ্চিম জার্মানির ক্ষতিপূরণ
অন্যদের তুলনায় এক্ষেত্রে পশ্চিম জার্মানি বেশ দ্রুতই পদক্ষেপ নিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই নাৎসী জার্মানির কৃতকর্মের জন্য পশ্চিম জার্মানি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজী হয়। ১৯৫১ সালে চ্যান্সেলর কনরাড অ্যাডিনয়ের বলেন: ‘জার্মান জনগণের নামে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না এমন অপরাধ ঘটনো হয়েছে, যা নৈতিক ও বস্তুগত খেসারত দেয়ার দাবী রাখে।’
ইসরায়েল রাষ্ট্র ও হলোকস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের অর্থ দেওয়া শুরু হয় ১৯৫৩ সালে। সব মিলিয়ে দেয়া হয়েছে ৭,০০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশী। তবে হলোকস্টের শিকার অনেকে ক্ষতিপূরণের বিষয়টিতে আপত্তি জানিয়েছেন।
বিরোধীরা বিশ্বাস করেন, পশ্চিম জার্মানীর কাছ থেকে ইসরায়েলের অর্থ নেয়ার বিষয়টি অপরাধের জন্য নাৎসীদের ক্ষমা করে দেওয়ার সামিল।
ইহুদি শরণার্থীদের ইউরোপ থেকে ইসরায়েলে পুনর্বাসিত করার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেশটিকে অর্থ দেওয়া হয়েছিল। ওই অর্থের একটি অংশ প্রথম দিকে ইসরায়েলকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিলো।
দুঃখিত বলার সংগ্রাম
অন্য অনেক দেশ অবশ্য এতোটা দৃঢ়সংকল্প হতে পারেনি। জাপান যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিভিন্ন আর্থিক প্যাকেজ সম্বলিত চুক্তি সই করেছে, তারপরও নিকট প্রতিবেশী এই দুটো দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের প্রায়ই অবনতি ঘটে।
জাপান যুদ্ধের সময় ‘আগ্রাসী’ ছিলো কি-না, সেই ব্যাপারটিতে স্পষ্ট কোন বক্তব্য না দেয়ার কারণে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। শিনজো আবে এমন একটি মন্দির পরিদর্শন করেছেন এবং সেখানে অর্ঘ্য পাঠিয়েছেন, যেটি আরও কিছু বিষয়ের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদেরও সম্মানিত করে।
তবে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার ওইসব নারীদের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে রাজী হয়েছেন, যাদেরকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানী সেনারা যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করেছে।
আরও অনেক রাজনীতিবিদদের মতো আবে পরস্পরবিরোধী দাবীর মধ্যে সমতা আনতে বেগ পাচ্ছেন, যেখানে দেশের মধ্যে জাতীয়তাবাদী অনুভূতির বিষয়টির দিকে খেয়াল রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে আবার ভালো সম্পর্ক রাখতে হচ্ছে বিশ্বনেতাদের সঙ্গেও।
দাস প্রথার জন্য আফ্রিকানদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র - ছবি : সংগৃহীত

যেসব মায়েরা নিজ সন্তান হত্যা করেন

নিজেরই গর্ভজাত সন্তানকে হত্যার দায়ে রাশিয়াতে প্রতিবছর বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন কয়েক ডজন মা।
সন্তান হত্যাকারীদের এই তালিকায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন গৃহিণী থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সফল ব্যবস্থাপকও।
সন্তানকে খুন করবার এই ঘটনা কেবল রাশিয়াতেই ঘটছে না, অ্যামেরিকাতেও প্রতি চার জনের একজন মা নিজের সন্তানকে মেরে ফেলতে চায় বলে জানাচ্ছে মনোবিজ্ঞানীরা।
২০১৪ সালের এক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, অ্যামেরিকায় গত ৩২ বছরে যত খুন হয়েছে তার মোট ১৫ শতাংশই মূলত মায়ের হাতে শিশু সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা।
ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিসের তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে ২১ বছরে মোট ১১ হাজার শিশু অভিভাবকদের হাতে নিহত হয়েছে।
গড়ে এই মৃত্যুর সংখ্যা বছরে ৩৪০টিরও বেশি।
কিন্তু রাশিয়ার চিত্রটা যেনো আরো কঠিন।
রাশিয়ায় টিকে থাকতে গেলে অনেক শক্ত ও অনমনীয় মনোভাবের হতে হয়।
ফলে কেউ সেখানে তার মানসিক স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে আরেকজনের সাথে সহজে কথা বলতে চায় না।
শিশু হত্যার এই কাহিনীগুলো মূলত দেখাচ্ছে যে, সন্তান জন্ম দেয়ার পরপরই অনেক মা সন্তান জন্মদান পরবর্তী বিষন্নতায় আক্রান্ত হয়। কিন্তু পরিবারের নিকটজনেরা অনেকক্ষেত্রেই এই বিষণ্নতাকে চিহ্নিত করতে পারেন না। ফলে ঘটে দুঃখজনক পরিণতি।

যত ট্যাবু

মায়েরা কেন তাদের সন্তানদের খুন করেন সেই বিষয়ে রাশিয়ান নারীদের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছেন বিবিসির সাংবাদিক ওলিসা গেরাসিমেঙ্কো ও স্ভেত্লানা রেইটার।
তাদের অনুসন্ধান থেকেই জানা যায়, মাতৃত্বকে যেভাবে মহিমান্বিত করে দেখানো হয় সেই ভাবনায় বদল আনা দরকার।

আলোয়না

আলোয়না পেশায় একজন অর্থনীতিবিদ। পিয়ত্রকে বিয়ে করে সুখী দাম্পত্য কাটানোর সময় সন্তান আগমনের খবরে তারা দু'জনেই খুব উৎফুল্ল ছিল।
জন্মের আগেই শিশুর জন্য পোশাক-আশাক কেনা শুরু করেন তারা। শুধু তাই নয়, মাতৃত্ব ও শিশুর নানা বিষয়ে জানতে যোগ দেন প্রাক-প্রসবকালীন কিছু ক্লাসে।
কিন্তু জন্মদানের পর মায়ের মানসিক সমস্যা কী কী হতে পারে - তা নিয়ে ক্লাসে কেউ কথা বলেনি।
জন্মদানের পর আলোয়না ইনসমনিয়াতে আক্রান্ত হয় এবং সব মিলিয়ে তাল সামলাতে হিমশিম খেতে থাকে।
এই পরিস্থিতিই ধীরে ধীরে মনোরোগ হিসেবে দেখা দেয় এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে ওষুধ সেবন শুরু করেন তিনি।
একদিন পিয়ত্র বাড়ি ফিরে দেখে তাদের সাত মাসের শিশুটি পানিতে ডুবে মারা গেছে।
আর আলোয়নাকে পাওয়া যায় মস্কো শহরের সন্নিকটে একটি লেকের ধারে।
পরবর্তীতে জানা যায়, নিজের সন্তানকে পানিতে ডুবিয়ে মারার পর আলোয়না নিজেও ডুবে মরতে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকেন।
এখন তার বিচার কার্যক্রম চলছে।
রাশিয়ার অপরাধবিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, নিজের সন্তানকে মেরে ফেলার আগে অন্তত ৮০ ভাগ নারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং মাথাব্যাথা, ঘুমহীনতা ও অনিয়মিত মাসিকের ব্যপারে পরামর্শ নেন।

এই নারীরা কারা?

রাশিয়ার এটি একটি ট্যাবু। রাশিয়ান আইনে শিশু হত্যার বিষয়টি ট্যাবু-ক্রাইম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
২০১৮ সালে এমন ৩৩টি ঘটনার বিচার চলেছে।
তবে অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, যে পরিমাণ ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ায় বাস্তবে তা ঘটে অন্তত ৮ গুণ বেশি।
ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিস্ট মার্গারিটা কাচেভা জানান, নিজের সন্তানকে মেরে ফেলেছে - এমন অন্তত তিন-চারজন প্রতিমাসেই তাদের হাসপাতালে আসে।
বিবিসি যে মায়ের ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখেছে সেখানে হিসাবরক্ষক, শিক্ষক, বেকার নারী, সমাজকল্যাণ বিশেষজ্ঞ, রেস্টুরেন্টের কর্মী থেকে শুরু করে আরো নানা পেশার অন্তত ৩০জন নারী রয়েছে।
অনেক নারী যারা তাদের সন্তানদের খুন করেছে তাদের স্বামী, সংসার, বাড়ি ও চাকরি রয়েছে এবং তারা কোন প্রকার নেশাতেও আসক্ত নয়।
ডাক্তাররা বলেন, সন্তান জন্মদানের পরে, সুপ্ত মনোরোগ সহসাই বেড়ে যেতে পারে।
যে নারী গভীর বিষন্নতায় আক্রান্ত তার দৈনন্দিন কাজে-কর্মে যে এটি সবসময় প্রকাশিত হয় তেমন নয়। কিন্তু গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও মেনোপজের ঘটনায় তা হঠাৎই মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
আন্না নামের ৩৮ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষকেরো রয়েছে এরকম আরেক কাহিনী।
আন্না তার সন্তানকে বালিশ চাপা দিয়ে মারতে চেয়েছিল।
পরে শিশুটিকে কোনমতে উদ্ধার করা হয় আর আন্নাকে পাঠানো হয় হাসপাতালে। সেখানেই ধরা পড়ে যে, আন্না ক্রনিক স্কিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত।
ড. কাচেভা বলেন, মনোরোগে আক্রান্ত হয়ে যে নারী তার সন্তানকে হত্যা করেছে তাকে যে দেখেই পাগল মনে হবে এমন নয়। বরং ঘটনাটি ঘটার আগ পর্যন্ত সে স্বাভাবিক জীবনই কাটাতে পারে।
যেমন ২১ বছর বয়সী আরিনা। নিজের শিশুকে বুকে নিয়ে সে নয়তলা থেকে লাফিয়ে পড়েছিল।
লাফিয়ে পড়ার পরেও অবিশ্বাস্যভাবে তারা দু'জনেই বেঁচে যায়। পুলিশ তাদের উদ্ধার করার পর আরিনাকে হাসপাতালে পাঠানোর হলে তারও স্কিজোফ্রেনিয়া ধরা পড়ে।
অ্যামেরিকার মত রাশিয়াতেও আদালত দোষী মায়েদের নানান ধরণের শাস্তি দিয়ে থাকে। বিশেষত, হত্যাকারী মা যদি পাগল বলে প্রমাণিত না হয় তাহলে তার সাজা হতে পারে দীর্ঘ কারাবাস।
বলা হচ্ছে, যে নারীরা সন্তানদের খুন করছে তারা নিজেরাও নিজেদের শৈশবে কোন না কোন ভাবে নিগৃহীত ছিলেন।
রাশিয়ান এক গবেষণা বলছে, হত্যাকারী মায়েদের মধ্যে অন্তত ৮০ ভাগই দরিদ্র পরিবারে বড় হয়েছেন এবং অন্তত ৮৫ ভাগই বিবাহিত জীবনে দ্বন্দ্ব ও কলহে জড়িত।
গবেষকরা বলছেন, মিথ্য বলা, তর্ক করা, ঝগড়া করা এবং অ্যালকোহলে আসক্তির সাথে পরবর্তীতে শিশু হত্যার সম্পর্ক রয়েছে।
আর নিজের বাবা-মায়ের সাথে যাদের সম্পর্ক জটিলতাপূর্ণ, তারাও পরবর্তীতে শিশুর প্রতি আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে।
হত্যাকারী মায়েদের অধিকাংশই আসলে আবেগীয়, যৌন ও শারীরিকভাবে কোন না কোনভাবে নির্যাতিত।
অবশ্য অনেক আইনজীবী সন্তান হত্যাকারী মায়েদের পক্ষে মামলা নিতে চান না।
৩৩ বছর বয়সী তাতিয়ানা। সে নিজেও ওইসব হন্তারক মায়েদের তিরস্কার করতো। কিন্তু নিজে মা হবার পর তার দুনিয়াটাই একদিন বদলে গেলো।
তার মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা দিলো এবং সে নিজেও নিজের সন্তানকে মেরে ফেলার কথা ভাবতো। ফলে, এই সংকট থেকে বাঁচতে সে একদিন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়।

প্রতিরোধ

এই সব হত্যাকাণ্ড বন্ধের অন্যতম উপায় হিসেবে গর্ভধারণ নিরুৎসাহিত করা হয়।
পাশাপশি রাশিয়ান ও পশ্চিমা ডাক্তারেরা মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে, বিশেষ করে, সন্তান জন্মদান পরবর্তী বিষণ্নতা নিয়ে মনোযোগী হবার পরামর্শ দিয়েছেন।
ড. মার্গারিটা কাচায়েভা বলেছেন, রাশিয়ায় নারীদের সংকটকালীর ব্যবস্থার জন্য সেন্টার রয়েছে। কিন্তু সেগুলোও আধ-খালি পড়ে থাকে।
কারণ রাশিয়ান নারীরা মনে করে যে, তার মানসিক সমস্যা নিয়ে কথা বললে হয়তো সন্তানকে তাদের থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হবে।

Tuesday, March 24, 2020

তিন সাগরের রানি কন্যাকুমারী by সজল জাহিদ

সাগরের কোলে বিবেকানন্দ রক
বছর দুয়েক আগে কাশ্মীর আর লাদাখ ঘুরে আসার পর থেকেই একটা সুপ্ত ইচ্ছা মনের মধ্যে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল—ভারতের উত্তর প্রান্ত তো ঘুরে দেখা হলো বেশ ভালোভাবে, এবার দক্ষিণ প্রান্ত। কারণ, শিমলা-মানালি, উত্তরাখণ্ডের নৈনিতাল-মুশৌরি-গঙ্গোত্রীসহ উত্তরের নানা জায়গায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। দক্ষিণ অদর্শনে অতৃপ্ত থাকব কেন? যদিও একবার ভারতের দক্ষিণে গোয়া-কেরালা যাওয়া হয়েছে, কিন্তু একদম দক্ষিণের বিন্দু কন্যাকুমারী দেখার বড় ইচ্ছা ছিল মনে মনে।
তিনটি কারণে কন্যাকুমারী দেখার তীব্র ইচ্ছা মনের মধ্যে। এক. এটি ভারতের শেষ বিন্দু বা মূল ভূখণ্ডের শেষ প্রান্ত। দুই. এখানে বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর আর ভারত মহাসাগরের মহামিলনে নীল জলরাশির এক রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চ থাকে সব সময়। তিন. এখানে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম চিন্তাবিদ এবং গুরু স্বামী বিবেকানন্দের নামাঙ্কিত ‘বিবেকানন্দ রক’। মনে হলো বাঙালির স্মৃতিধন্য নীল জলরাশিতে ডুবসাঁতার কাটার আনন্দে রোমাঞ্চিত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করাটা ঠিক হবে না।
হুট করে এই ঈদের ছুটিতে পারিবারিক প্রয়োজনে চিকিৎসার জন্য যেতে হয়েছিল চেন্নাইয়ে। তখন থেকেই কন্যাকুমারী দর্শনের তীব্র ইচ্ছা মনে জেগেছিল। তিন দিনের বিরতি পেয়েই ঝটপট ব্যাগপত্র গুছিয়ে চলে গেলাম চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনে। কিন্তু মাকড়সার জালের মতো বিস্তৃত ভারতীয় ট্রেনের ততোধিক জটিল নিয়মকানুনের জন্য টিকিট পাওয়া গেল না।
তিন সমুদ্রের সঙ্গম ও বিবেকানন্দ রক
কিন্তু ওই যে গোঁ, সেটি আর থামানো গেল না! শেষ চেষ্টা হিসেবে চলে গেলাম চেন্নাই সেন্ট্রাল থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের কোইমবেটু বাসস্ট্যান্ডে। চেন্নাই থেকে দূরপাল্লার সব সরকারি আর বেসরকারি বাস এ স্ট্যান্ড থেকেই ছেড়ে যায়।
বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সরকারি ননএসি বাসের টিকিট পেয়ে গেলাম। টিকিট করে ঝটপট হোটেলে ফিরে এসে একটু ফ্রেশ হয়ে ব্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম চেন্নাই থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরের কন্যাকুমারী যাওয়ার ননএসি বাসের উদ্দেশে। মনে মনে কিছুটা ভয়, শঙ্কা ছিল ঠিকই। কারণ, একটানা এত লম্বা বাসভ্রমণ এর আগে কখনোই করা হয়নি। দীর্ঘ ১৩ ঘণ্টার ননএসি বাস জার্নি, তাও জুনের এই ভয়াবহ গরমে! শেষ পর্যন্ত মনে অদম্য সাহস নিয়ে উঠেই পড়লাম বাসে। গরমে, ঘামে, জ্যামে, ঝিরঝিরে বাতাসে, আঁধার রাতে কত যে অচেনা শহর-বন্দর-গ্রামের পথ পেরিয়ে, পথের মাঝে তিন থেকে চারটি বিরতি দিয়ে বেলা ১১টায় পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত সেই ছোট্ট শহরে, দুই সাগর আর এক মহাসাগর—তিন বিশাল জলরাশির মহামিলনস্থল স্বপ্নের সেই কন্যাকুমারীতে।

বাস যখন কন্যাকুমারীর শেষ পথে চলতে শুরু করেছিল তখন থেকেই সমুদ্র সমুদ্র একটা পুলক অনুভব করছিলাম চারপাশের প্রকৃতি দেখে। পথের দুধারে সারি সারি নারকেলগাছ, সামুদ্রিক বাতাসে যারা সারাক্ষণ নেচে বেড়াচ্ছে আপন মনে, মাতাল বাতাসে। উইন্ড মিলের বিশাল বিশাল পাখাগুলো জানিয়ে দিচ্ছিল কাছেই মহাসমুদ্রের মহামিলন। হু হু বাতাসের তোড়ে শেষ পথটুকু বাস যেন উড়ে উড়ে চলছিল! বাস থেকে নেমে, একটি মনের মতো হোটেল খুঁজে সেখানে ব্যাগপত্র রেখে, একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম দীর্ঘতম বাসভ্রমণের ধকল কাটিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে।
উত্তাল নীল জলরাশি, মহাসমুদ্রের মহামিলন, কয়েক মানুষের চেয়েও উঁচু উঁচু ঢেউয়ের আছড়ে পড়া, সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বিবেকানন্দ রক, নতুন গড়ে ওঠা বিশাল মূর্তি, মহাসাগরের মাঝে ঢেউয়ের দোলায় ভেসে চলা রঙিন বোট, মাছ ধরার ট্রলার, শত মানুষের ভিড়, ঝকঝকে আকাশে সাদা মেঘেদের উড়ে যাওয়া, চারপাশে সবুজের নাচন, উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো মাতাল বাতাস—সবকিছুই উপভোগ করা যাচ্ছিল আমার রুমের কাচের জানালা দিয়ে। কোনো সরাইখানার এমন অপূর্ব, অপার্থিব আর মোহময় কক্ষে এই জীবনে খুব কমই থেকেছি। ইচ্ছে হচ্ছিল রুমের উন্মুক্ত বেলকনিতে বসে কাটিয়ে দিই এ বেলাটুকু। কিন্তু মন তখন দুভাগে বিভক্ত। একটা মন চাইছে মহাসাগর থেকে আসা ঝিরঝিরে বাতাস গায়ে মেখে বেলকনিতে বসে নীল জলরাশি দেখতে দেখতে অলস সময় কাটাতে, আর মনের অন্য অংশ চাইছে একছুটে শেষ বিন্দুতে গিয়ে দাঁড়িয়ে মহাসাগরের মহামিলন দেখতে। তর্কযুদ্ধে জয় হলো বাঙালি জেদের।
একদম নতুন কাপড় পরে পথ ধরলাম অনেক দিনের লালিত স্বপ্নের সীমানা ছুঁতে—কন্যাকুমারীর শেষ বিন্দু, ভারতের শেষ ভূখণ্ড স্পর্শ করে, মহাসমুদ্রের উত্তাল জলরাশির মহামিলনে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে স্বপ্ন পূরণের শিহরণে পুলকিত হতে।
বিবেকানন্দ রক ছাড়িয়ে নীল জলের হাতছানি
আমার হোটেল থেকে কন্যাকুমারীর শেষ বিন্দুতে যেতে সময় লাগল প্রায় ১০ মিনিট। কারণ অনেকটা পথ পেরিয়ে, ঘুরে ঘুরে যেতে হয় সেখানে। তখন বিকেল গড়িয়ে পড়ছে কন্যাকুমারীর নীল জলে। শেষ বিকেলের মায়াময় আলো গায়ে মেখে কন্যাকুমারীর শেষ বিন্দুতে, বিশাল বিশাল পাথরে ঘিরে রাখা প্রাচীরে গিয়ে দাঁড়ালাম। সে বড় বিস্ময়কর অনুভূতি। এখানে, এই মহাসমুদ্রের উত্তাল জলরাশির মধ্যে অনন্তকাল ধরে দুটি দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বিস্ময়কর পাথরখণ্ডের একটিতে বসে একদিন ধ্যান করেছিলেন বিবেকানন্দ নামের এক বাঙালি! ঝোড়ো বাতাসে উড়ে যেতে ইচ্ছে করাই তখন সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত। আমি দাঁড়িয়ে থাকি শেষ বিকেলের নরম আলো গায়ে মেখে। আমাকে ছুঁয়ে যায় প্রাগৈতিহাসিক নোনা বাতাস। আমি তখন স্বামীজিকে খুঁজে ফিরি সেই বিস্ময় পাথরের ওপরে গড়ে তোলা বিবেকানন্দ মেমোরিয়ালের উপাসনালয়ে, লাইব্রেরিতে, ধর্মীয় আচারের নানা রকম আয়োজনে। ধীরলয়ে অস্তাচলে যায় দিনমণি। আমাকে ফিরতে হয় সরাইখানায়।
১৮৯২ খ্রি, স্বামী বিবেকানন্দ এখানে তপস্যা করেছিলেন
কন্যাকুমারী তামিলনাড়ু রাজ্যের নাগোড়কৈল জেলার একটি ছোট্ট শহর। মহাসমুদ্রের তীর ঘেঁষে এখানে রয়েছে অনেক হোটেল, মোটেল, পর্যটনকেন্দ্র, বাসস্ট্যান্ড, ভীষণ নান্দনিক একটি রেলওয়ে স্টেশন। আর রয়েছে নানা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাসের সম্ভার পুরো কন্যাকুমারীর উপকূল ঘিরে। মাছ, ডাব, নানা রকম সামুদ্রিক খাবারসহ, দেশি–বিদেশি পর্যটকদের জন্য সব রকমের খাবার আর বিনোদনের সব আয়োজন আছে এখানে। ৫০০ থেকে ১৫ হাজার রুপিতে প্রতিদিন থাকতে পারবেন যেকেউ।
কন্যাকুমারী যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে প্লেনে ভারতের দক্ষিণ প্রান্তের সর্বশেষ বিমানবন্দর ত্রিভুন্নাপুরামে উড়ে যাওয়া। যেখান থেকে কন্যাকুমারী পথের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। এরপরের উপায় হলো কলকাতা থেকে কন্যাকুমারী ট্রেন। সাপ্তাহিক দুটি ট্রেন ছাড়ে কলকাতা থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত। সময় লাগে ৪২ থেকে ৪৫ ঘণ্টা। এ ছাড়া চেন্নাই হয়েও কম সময়ে ট্রেন আর বাসে করে যাওয়া যায় কন্যাকুমারী। ভ্রমণপিপাসুদের একবার হলেও ঘুরে আসা উচিত ভারতের দক্ষিণের শেষ প্রান্ত কন্যাকুমারী থেকে।
ছবি: লেখক

যেসব খাবার খেলে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়

অনাগত সন্তানের মা হওয়ার স্বাদটাই আলাদা। তবে প্রথমবার মা হওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে জানতে হবে অনেক কিছুই। আপনি জানেন কি প্রথম প্রেগন্যান্সিতে মিসক্যারেজ বা গর্ভপাতের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে? শারীরিক জটিলতার বাইরে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা হয়ে থাকে অনভিজ্ঞতার কারণে। জেনে নিন গর্ভপাত এড়াতে কোন কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন।
১) বার্লি- বার্লির অনেক ভাল গুণ থাকলেও গর্ভাবস্থার প্রথম অবস্থায় বার্লি খেলে মিসক্যারেজ হয়ে যেতে পারে।
২) কাঁচা পেঁপে- প্রেগন্যান্সির প্রথম তিন মাস অবশ্যই কাঁচা পেঁপে সেদ্ধ, রান্নায় পেঁপে বা পেঁপের চাটনি খাওয়া এড়িয়ে চলুন। পরের দিকেও পেঁপে খেলে গর্ভপাত না হলেও রক্তপাত হতে পারে।
৩) অপাস্তুরিত দুধ- স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে না খেলে সব থেকে বেশি ব্যাকটেরিয়া দুধ থেকেই ছড়ায়। সব সময়ই দুধ ভাল করে ফুটিয়ে খাওয়া উচিত্। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় অপাস্তুরিত দুধ গর্ভপাত পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।
৪) কাঁকড়া, চিংড়ি- গর্ভাবস্থায় কাঁকড়া, চিংড়ি অথবা খোলসওয়ালা সি ফুড খাওয়া একেবারে ছেড়ে দিন। এই ধরনের খাবার থেকে অ্যালার্জি হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
৫) কচ্ছপের মাংস- কচ্ছপ খাওয়া বেআইনি হলেও এখনও অনেকেই খান। গর্ভাবস্থায় কিন্তু কচ্ছপ খুবই বিপজ্জনক হতে পারে।
৬) কাঁচা ডিম- অনেকে ডিম কাঁচা খান। যদি আপনার এই অভ্যাস থাকে তাহলে প্রেগন্যান্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা ত্যাগ করুন। হাফ বয়েল বা ডিমের পোচ খেলেও বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। ডিম সেদ্ধ বা ভাজি করে খান।
৭) প্রসেসড মিট- প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়া কখনই ভাল না। ক্যানসারও ডেকে আনতে পারে এই খাবার। গর্ভাবস্থায় তাই একেবারেই এড়িয়ে চলুন।
৮) আধোয়া সবজি- শরীর সুস্থ রাখতে সবুজ শাক-সবজি খাওয়া যেমন জরুরি, তেমনই আধোয়া শাক-সবজি থেকে হতে পারে মিসক্যারেজ। বিশেষ করে যে ধরনের সবজি কাঁচা খাওয়া হয় যেমন টম্যাটো, শশা, পেঁয়াজ, গাজর, কাঁচালঙ্কা, লেবু সেগুলো খাওয়ার আগে অবশ্যই ভাল করে ধুয়ে নেবেন। না ধুলে সবজি শরীরে বিষাক্ত জীবাণু ছড়ায় যা গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি করে।
৯) আনারস- গর্ভাবস্থায় সবচেয়ে ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে আনারস। প্রথম তিন মাসে আনারস, আনারসের চাটনি খেলে গর্ভপাত হওয়ার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়। গর্ভবতীদের মধ্যে আনারস খেয়ে ডায়েরিয়া বা অ্যালার্জি হওয়ার উদাহরণও দেখা যায় প্রচুর।

Sunday, March 22, 2020

মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর পাঁচটি ভবিষ্যত ‘সুপার ফুড’

বিভিন্ন সময় গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল খাবারের কারণেই প্রতি বছর এক কোটিরও বেশি মানুষ মারা যায় পৃথিবীতে। আবার স্বাস্থ্যবান থাকা আর একই সাথে পৃথিবীকে রক্ষা করা এই দুই কাজ একসঙ্গে করতে পারাও একটি দুরুহ কাজ বলে রায় দিয়েছেন অনেক বিজ্ঞানী।
নতুন এক রিপোর্ট বলছে, শ্যাওলার মত কিছু জলজ উদ্ভিদ, ক্যাকটাস আর প্রাচীন শস্যদানা হতে পারে ভবিষ্যতের ‘সুপার ফুড’। মানে যেগুলো একই সাথে স্বাস্থ্যকর, আবার পৃথিবীকেও রক্ষা করবে ধ্বংস হয়ে যাবার হাত থেকে।
এ রিপোর্টে ৫০টি তথাকথিত 'সুপার ফুডে'র তালিকা করা হয়েছে, এর মধ্যে কোনগুলো ভবিষ্যতের মেন্যুতে থাকবে?
মোরিঙ্গা
মোরিঙ্গা গাছকে প্রায়শঃ 'যাদুর গাছ' বলে ডাকা হয়। এটি দ্রুত বাড়ে এবং খরা বা মরুতে অনায়াসে টিকে থাকতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে এই গাছের বিভিন্ন অংশ আয়ুর্বেদিক ওষুধ বানানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।
পাতা জাতীয় এই গাছের ফলন বছরে অন্তত সাত বার তোলা যায়। এতে ভিটামিন 'এ' ও 'সি' রয়েছে, এছাড়া ক্যালসিয়াম ও পটাসিয়াম রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। ফিলিপিন্স ও ইন্দোনেশিয়াতে এখনই গাছ প্রচুর চাষ করা হয়। এখন স্যুপ বা কারি জাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ড্রামস্টিক বানানোর কাজেও ব্যবহার হয় এই গাছ।
ওয়াকামি
জাপানি এই শৈবাল দীর্ঘদিন ধরেই খাবার হিসেবে প্রচলিত ও সমাদৃত। সমুদ্রের পাড়ের কৃষকরা বিশেষ উপলক্ষে এই খাবার খায় এবং এর ওপর কর দেয়। বর্তমানে জাপানের বাইরে ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনাতেও এর চাষ হচ্ছে। সারা বছর এর ফলন হয় এবং সার ও কীটনাশক ছাড়াই এটি চাষ করা যায়।
শুকনো ওয়াকামি নোনা স্বাদের এবং এতে আয়োডিন ও প্রচুর ওমেগা থ্রি রয়েছে, বিশেষ করে যারা প্রাণীজ প্রোটিন কম খান তাদের জন্য এটি ভীষণ উপকারী। এটি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ ঠেকানোর এক ধরণের প্রক্রিয়া রয়েছে এর মধ্যে।
ক্যাকটাস
ফ্যাকাসে হয় না এমন জাতের এক ক্যাকটাসও থাকবে ভবিষ্যতের 'সুপার ফুডে'র তালিকায়। মেক্সিকোতে এটি খুবই প্রচলিত খাবার। এর কাঁটাযুক্ত পাতা ও ফল কাঁচা খাওয়া যায়। আবার রান্না করে কিংবা জ্যাম বা জেলী বানিয়েও খাওয়া যায়। সাধারণত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপে হয় এই ক্যাকটাস।
এই ক্যাকটাসের বিশেষত্ব হচ্ছে এতে 'টাইপ টু ডায়াবেটিস' কমানোর উপাদান আছে। এটি শরীরে জমা বাড়তি চর্বি কমিয়ে দেয়। তবে এই ক্যাকটাস ওজন কমাতে পারে এমন তথ্য এখনও প্রমাণিত হয়নি। এই ক্যাকটাস হ্যাংওভার কাটাতেও সাহায্য করে।
তবে, অনেকের আবার এই ক্যাকটাস পেটে সহ্য হয় না। কারো-কারো ডায়রিয়া, বামি ভাব এবং তলপেট ফেঁপে থাকা এমন উপসর্গ দেখা যায়।
ফোনিও
এই প্রাচীন আফ্রিকান শস্যদানা বাদামের মত স্বাদের জন্য জনপ্রিয়, বিশেষত মালির বামবারা জনগোষ্ঠীর খুব প্রিয় খাবার এটি। ৫০০০ বছর আগে এটি মিসরে চাষ করা হতো। মরুতে জন্মায় এ উদ্ভিদ, সাদা ও কালো দুই ধরণের ফোনিও পাওয়া যায় বাজারে।
স্বাদে কিছুটা এশিয়ার শস্যদানা কাউনের মত এই খাবার চালের মত ব্যবহার করা হয়। এমনকি এ থেকে বিয়ারও বানানো যায়। এতে প্রচুর আয়রন, জিঙ্ক এবং ম্যাগনেসিয়াম আছে।
বামবারা
মটরশুটি জাতীয় এই খাবারের স্বাদ কিছুটা কম এবং তৈলাক্ত চীনাবাদামের মত। এটি খারাপ জাতের মাটিতেও ফলানো যায়। আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী এই শস্যদানা এখন থাইল্যান্ড আর মালয়েশিয়ার কোন কোন অঞ্চলেও উৎপাদন করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা একে পরিপূর্ণ খাবার আখ্যা দিয়েছেন ইতোমধ্যে। এটি সিদ্ধ করে, ভেজে বা রোস্ট করে খাওয়া যায়। আফ্রিকায় এটি দিয়ে স্যুপ রান্না হয়। এতে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে, নতুন রক্ত পরিবাহী শিরা তৈরিতে সাহায্য করে। এটি মানুষের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধকারী ক্ষমতা শক্তিশালী করে। সূত্র : বিবিসি।

‘৮৪,০০০ ধাঁধাঁ’: এশিয়ার সবচেয়ে বড় পরিচয়হীনদের গোরস্থান by কাসিম সাঈদ

৪০ বছর বয়সী নাদিম বালুচ কুয়া থেকে বালতিতে পানি তুলে একটা পাত্রে ভরলেন। মধ্যদিনের তাপদাহের মধ্যে পাখিদের তৃষ্ণা মিটবে ওই পানিতে। খাঁ খাঁ চারপাশটাতে নজর বুলান তিনি। বাতাস বয়ে যায়, ধুলোয় ঢাকা পড়ে মাথার চুল আর গোফ। ৮৪ হাজারেরও বেশি কবরের এক গোরস্তানে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। এখানে যাদের কবর, তাদের পরিচয় নেই কোন, শুধু একটা নাম্বার দেয়া আছে। এই সব কবরগুলো নাদিম আর বাবার হাতে তৈরি। অজানা মৃতদেহের জন্য কবর খুঁড়েন নাদিম।
করাচির উপকণ্ঠে মোওয়াচ গোথের কাছি এধি কবরস্থানে নাদিম একা একাই কোনরকমে তৈরি একটা ঘরে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কাটিয়ে দিচ্ছেন।
প্রতিটি কবরে কাঠের একটি টুকরো দিয়ে চিহ্ন দেয়া। ওটাই কবরের ফলক। প্রতিটি কাঠের টুকরায় তিনটা করে চিহ্ন: উপরে কবরের নাম্বার, কবর দেয়ার দিন আর একটি সিরিয়াল নাম্বার। ৮৪ হাজার কবরের মধ্যে কিছু সিমেন্টে বাধানো কবর চোখে পড়বে। এগুলো হলো তাদের যাদের ছবি দেখে কবর দেয়ার সময় তাদের চিহ্নিত করতে পেরেছে পরিবারের সদস্যরা। এগুলোতে কাঠের বদলে সিমেন্টের ফলক দেয়া। আর সাথে রয়েছে নিহতের নাম।
নাদিম বললেন, ‘এগুলো ৮৪ হাজার পরিচয়হীন মৃতদেহ নয়, এগুলো ৮৪ হাজার ধাঁধাঁ’।
“বিগত তিন দশক ধরে কাজ করছি আমি এখানে।যখন ছোট ছিলাম, বাবার সাথে তখন এখানে আসতাম। প্রতি বছর এখানে কবরের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু করাচির আর দশটা কবরস্থানের মতো ধর্মীয় দিনগুলোতে বা পবিত্র অনুষ্ঠানে এখানে কেউ আসে না”।
নাদিম জানান, তিনি টুকরো টুকরো মৃতদেহ, পুলিশের এনকাউন্টারে নিহত সন্ত্রাসী এবং যারা পুড়ে মারা যান – যাদের পরিচয় উদ্ধার করা যায় না – এ রকম বহু মানুষের জন্য কবর খুঁড়েছেন তিনি।
তিনি বললেন, “সাধারণত তিন ফুট গভীর, দুই ফুট চওড়া এবং ছয় ফুট লম্বা কবর খুঁড়ি আমি। কিন্তু যখনই কোন পানিতে ডুবে মরা ব্যক্তির লাশ আসে, আমাদেরকে কবর আরও চওড়া করতে হয়, কারণ শরীরগুলো ফুলে থাকে”।
হাজার হাজার কবরের মধ্যে আলাদাভাবে দাঁড়িয়ে আছে কাঠের একটা ক্রুশ। বোঝা যাচ্ছে নিহত ব্যক্তিটি ছিল খ্রিস্টান। তার পরিবার আলাদাভাবে কিছু করতে চায়নি, তাই শুধু কাঠের একটা ক্রুশ বসিয়ে দিয়ে গেছে।
প্রয়াত আব্দুস সাত্তার এধির ছেলে এবং এধি ফাউন্ডেশানের প্রধান ফয়সাল এধি বলেন, “পরিচয়হীন মৃতদেহ কবর দেয়ার ক্ষেত্রে ধর্ম কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। ধর্মের ভিত্তিতে আমরা কবর আলাদা করি না। আমরা সবাই মানুষ আর অন্তত মৃত্যুর পর কোন বৈষম্য থাকা উচিত নয়”।
এধি বলেন, “বালদিয়া কারখানায় আগুন লেগে যারা মারা গিয়েছিল, তাদের কবর দিয়েছি আমরা। এনকাউন্টারে নিহত কথিত সন্ত্রাসীদের কবর দিই আমরা। এদের কারো কারো মৃতদেহ চিহ্নিত করা সম্ভব ছিল, কিন্তু তাদের পরিবারের কেউই এগিয়ে আসেনি কারণ পুলিশি ঝামেলার ভয় পাচ্ছিল তারা”।
এধি বললেন, “নব্বইয়ের দশকের করাচি অপারেশান এবং ২০১৩ সালে আমরা বহু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন মৃতদেহ পেয়েছি। তাদের পরিবারের সদস্যরা সম্ভবত তাদের মৃত্যু সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল এবং কেউই সেগুলোর পরিচয় চিহ্নিত করতে আসেনি। আমরা তাদের এখানে কবর দিয়েছি”।
মাওয়াচ গোথ কবরস্থানে করাচির ৮৪ হাজারেরও বেশি পুরুষ আর নারীর গল্পের কবর হয়েছে, বিদেহী আত্মা যেখানে এখনও পরিচয় খুঁজে ফেরে। জন্মের সময় তাদের নাম দেয়া হয়েছিল, কিন্তু এখন মাটির নিচে নামহীন ঘুমিয়ে আছে তারা।

“শার্লক হোমস” যখন ক্রিকেটার! by হাসনাইন মো: আকিফ

মে মাসের ২২ তারিখ আমাদের সবার প্রিয় লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন “শার্লক হোমস”-এর জনক।
স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, “ক্রাইম ফিকশন”-এর চিন্তাধারাই যিনি পাল্টে দিয়েছিলেন বিখ্যাত শার্লক হোমস চরিত্রের মাধ্যমে। ১৮৮৭ সালে “A Study in Scarlet” উপন্যাসের মাধ্যমে জন্ম নেয় গোয়েন্দা শার্লক হোমস।
শার্লক হোমস একটি কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র এই কথা এখনো অনেকেই বিশ্বাস করেন না। কেউ কেউ বলেন স্যার আর্থার কোনান ডয়েল নিজেই শার্লক হোমস। তাদের দুইজনের চরিত্রের ভেতর অসম্ভব মিল। দুইজনের কাজের ধরন, কোকেন আসক্তি, গভীর রাতে বেহালা নিয়ে বসে পড়া! নিজের ব্যক্তিজীবনের প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন শার্লক হোমস চরিত্রে আর পেশাগত জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন হোমসের ঘনিষ্ঠ সহচর ডা. ওয়াটসনের মাধ্যমে। বর্তমানে শার্লক হোমসের রচনাসমগ্র স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডসহ বিশ্বের প্রায় ২৩ দেশের গোয়েন্দা ট্রেনিং স্কুলের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত।
আমি শার্লক হোমস রচনাসমগ্র প্রথম পড়েছিলাম ক্লাস ফোর অথবা ফাইভে! স্বাভাবিক, বেশিরভাগ রহস্যই বুঝিনি তখন। পরে আরো অনেকবার পড়েছি স্কুল এবং কলেজে উঠে। এতো অসাধারণ!
ক্রিকেট ব্যাট হাতে কিশোর আর্থার
স্যার কোনান ডয়েল ছিলেন পেশায় ডাক্তার, পরে হয়েছিলেন বিখ্যাত রহস্য উপন্যাস লেখক, শখের আইনজীবী হিসেবে লন্ডনের আদালতে দুটি কেস লড়ে জিতেছেন ১৯০৮ সালে। ছিলেন “পোর্টসমাউথ ফুটবল এসোসিয়েশন ক্লাব”-এর গোলকিপার, সাসেক্সের একটি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন গলফ, আর্কিটেকচারের উপরেও জ্ঞান ছিলো, নকশা করেছিলেন বেশ কয়েকটি বাগানবাড়ির। কিন্তু যেটা অনেকেই জানেন না, স্যার কোনান ডয়েল একজন ক্রিকেটারও ছিলেন!
১৮৯৯-১৯০৭ সালের ভেতর ঐতিহ্যবাহী মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাব অর্থাৎ ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর এমসিসির হয়ে দশটি প্রথম শ্রেনীর ম্যাচ খেলেছিলেন। প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে তার সর্বোচ্চ রান ৪৩। ওকেশনাল বোলার ছিলেন, ক্যারিয়ারে একটিই মাত্র উইকেট পেয়েছিলেন, সেটা কার জানেন? বিখ্যাত ক্রিকেটার, ক্রিকেটের “খ্যাঁপাটে বুড়ো” ক্রিকেটের অমর চরিত্র আরেক ডাক্তার ডব্লিউ. জে. গ্রেসের!
শার্লক হোমসের আস্তানা, 221-B বেকার স্ট্রিট লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের একদম কাছেই। যদিও বাস্তবে এইরকম কোন ঠিকানা ছিলো না, কিন্তু বেকার স্ট্রিট নামে একটা জায়গা ছিলো একসময়। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে ওই ঠিকানায় প্রচুর চিঠি আসে প্রতিদিন। বেশিরভাগ চিঠিতে বিভিন্ন রহস্য সমাধানের অনুরোধ থাকে। অবশ্য চিঠির উত্তরে ভক্তদের জানানো হয় “শার্লক হোমস বর্তমানে অবসর গ্রহণ করায় কেসটি নিতে পারছেন না”।
শিল্পীর তুলিতে ক্রিকেট মাঠে স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
ব্যক্তিজীবনে বহুগুনে গুণান্বিত স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের অনবদ্য সৃষ্টি শার্লক হোমসের জনপ্রিয় কিছু উক্তি শেয়ার করলাম।
“It is an old maxim of mine that when you have excluded the impossible, whatever remains, however improbable, must be the truth.’
“I never guess. It is a shocking habit,—destructive to the logical faculty.”
“You see, but you do not observe. The distinction is clear.”
“The world is full of obvious things which nobody by any chance ever observes.”
“They say that genius is an infinite capacity for taking pains,’ he remarked with a smile. ‘It’s a very bad definition, but it does apply to detective work.”
“It is a capital mistake to theorize before one has data. Insensibly one begins to twist facts to suit theories, instead of theories to suit facts.”
“You know my method. It is founded upon the observation of trifles.”
“My name is Sherlock Holmes. It is my business to know what other people don’t know.”
“I think that you know me well enough, Watson, to understand that I am by no means a nervous man. At the same time, it is stupidity rather than courage to refuse to recognize danger when it is close upon you.”
“I confess that I have been blind as a mole, but it is better to learn wisdom late than never to learn it at all.”
“When a doctor does go wrong, he is the first of criminals. He has the nerve and he has the knowledge.”
“I think that there are certain crimes which the law cannot touch, and which therefore, to some extent, justify private revenge.”
“I listen to their story, they listen to my comments, and then I pocket my fee.”
শার্লক হোমস পড়ার পর নিজে শার্লক হোমস হতে চায়নি এমন একটা বাচ্চাও মনেহয় পাওয়া যাবে না, আমিও ব্যতিক্রম ছিলাম না।
স্যার ডয়েলকে জন্মদিনের বিলম্বিত শুভেচ্ছা।

Friday, March 20, 2020

রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের ইতিকথা

রাশিয়ার ইতিহাসের কথা চিন্তা করলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের কথা, যেখানে বিপ্লবীরা একনায়ক স্বৈরাচারী জার সরকারের পতন ঘটিয়ে সমাজতন্ত্রের পত্তন করে। আমাদের মধ্যে এই জার সম্পর্কে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ জানেন যে জার ছিল একজন ব্যক্তি, আবার যারা আর একটু ভাল জানে তাদের আবার অনেকেই জানে না জার সাম্রাজ্যের পেছনের ইতিহাস। আর গতানুগতিক ধারার  ইতিহাসেও শেষের কয়েকজন ছাড়া বাকিদের বর্ণনা তেমনটা নাই বললেই চলে। আজকের পর্বে পাঠকদের জার সাম্রাজ্যের আদ্যোপান্ত জানানোর জন্যই এই আয়োজন।
সুপ্রিয় পাঠক চলুন তাহলে যাওয়া যাক মুল আলোচনায়-প্রায় ত্রয়োদশ শতকের গোঁড়ার দিক হতেই রাশিয়ান অঞ্চলে মঙ্গোলদের দৌরত্ব বেড়ে যায়। মঙ্গোল সম্রাট বাতু খানের হাতে রাশিয়ান শাসক তাদের গুরুত্বপূর্ন অঞ্চল হারায়। ফলে তাদের ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে, একপর্যায়ে তাদের নিজস্ব প্রভাবাধীন অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পরে। তাদের একের পর এক শাসক পরিবর্তন হয় কিন্ত তাদের অবস্থার কোন উন্নতি হয় নি। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে গ্র্যান্ড ডিউক ইভান তাতারদের বিতাড়িত করে এবং রাশিয়ার সীমানা সম্প্রসারিত করে। তার পরবর্তী সময়ে ১৫০৩ সালে ক্ষমতায় আসেন ভ্যাসেল ৩। তার সময়ে মস্কো আয়তন ও ক্ষমতায় আরো প্রভাবশালী হয়ে উঠে। তারপর ১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় আসেন তার ছেলে তৃতীয় ইভান আর এই ইভানই প্রবর্তন করেন জার সাম্রাজ্যের। ‘জার’ শব্দের বাংলা অর্থ হল সম্রাট। ১৫৪৭ সালে তৃতীয় ইভান নিজেকে জার (সম্রাট) হিসেবে ঘোষণা করেন। তার পরবর্তী সময়ের শাসকগণ তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে জার উপাধি গ্রহণ করে ফলে তাদের শাসক বংশই ইতিহাসে জার হিসেবে জায়গা দখল করে নেয়।
জারদের প্রতিষ্ঠাতা ইভান
জারদের প্রতিষ্ঠাতা ইভান 
জারদের ক্ষমতায় আসার পটভূমি
জারদের প্রতিষ্ঠাতা তৃতীয় ইভান ক্ষমতা গ্রহণের পর রাজ্য সীমা সম্প্রসারণে মননিবেশ করেন। তিনি মঙ্গোলদের অধিকৃত অঞ্চলে মস্কোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি রণকৌশলের মাধ্যমে সুইডিশ ও পলিশদের পরাজিত করেন। এবং মস্কোকে আধুনিক করে গড়ে তোলেন। তিনি ১৫৮১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পূর্বে সাইবেরিয়া ও ইউরোপে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে যান। তার পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসেন ফিউডর। এবং তার ক্ষমতার স্থায়িত্বকাল হয় ১৫৯৮ পর্যন্ত। ফিউডর ততটা সফল শাসক ছিলেন না। তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন ১ম বরিস তিনিও অপেক্ষাকৃত দুর্বল শাসক ছিলেন। তিনি ১৬০৫ সালে মৃত্যুবরণ করলে ক্ষমতায় আসেন তার নাবালক পুত্র ২য় ফিউডর। কিন্ত তাকে দুর্বৃত্তরা হত্যা করলে জার সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পরে। উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় আসেন ২য় দীমিত্রী । কিন্ত তিনিও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন পরিস্থিতি মোকাবেলায়। ফলে সমগ্র রাশিয়া জুরে ছড়িয়ে পরে অর্থনৈতিক মন্দা, দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট, সর্বত্র ছড়িয়ে পরে হানাহানি, মারামারি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও নানা ধরনের রোগ, এর উপরে আবার পার্শ্ববর্তী শাসকদের আক্রমণ, ফলে পরিস্থিতি চলে শাসকের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। এরকম পরিস্থিতিতে প্রিন্স পুজারস্কি ও কোজমানিনের নেতৃত্বে ১৬১২ সালে গড়ে উঠে জাতীয় ঐক্য। এবং পলিশ সৈন্যদের দমন করেন।
তার পরবর্তীতে রুশরা সকল জাতির মতামতের ভিত্তিতে নতুন শাসক নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, রাশিয়া ছিল তখন বহু জাতি-ধর্মের মানুষের মিশ্রিত রাষ্ট্র। তাই সকল জাতির মতামতের ভিত্তিতে ১৬১৩ সালে শাসক হিসেবে নির্বাচিত হন রোমানব বংশের ১৬ বছর বয়সী তরুণ মিখাঈল রোমানব। আর এই রোমানবরাই ১৬১৩-১৯১৭ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩০৪ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
জারদের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা মিখাঈল।
জারদের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা মিখাঈল
মিখাঈল রোমানব (১৬১৩-৪৫)
মিখাঈল রোমানব বা ১ম মিখাইল ১৬১৩ সালে নির্বাচিতভাবে প্রথম জার হিসেবে শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি রাশিয়ার সামগ্রিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। পোল্যান্ডসহ অন্যান্য শত্রু রাষ্ট্রের সাথে বিরোধের মীমাংসা করেন। সেনাবাহিনীকে সুসংহত করেন, সেনাবাহিনীকে কয়েকটি ডিভিশনে ভাগ করেন ও পদবি নির্ধারণ করেন। শাসন ব্যবস্থাকে আরো সুসংহত করার জন্য তিনি সমগ্র রাষ্ট্রকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করেন। এবং সেখানে শাসক নিয়োগ করেন। প্রশাসন পরিচালনার জন্য আমলাদের নিয়োগ দান করেন। সর্বোপরি তিনি একজন দক্ষ প্রশাসক ও শাসক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। এই মহান শাসক ১৬৪৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
আলেক্সিস (১৬৪৫-৭৬)
১ম মিখাঈলেরর মৃত্যুর পর তার পুত্র ১ম আলেক্সিস ক্ষমতায় আসেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পর কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ রদবদল করেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পর সুবর্নয়া ইলজানিয়া নামে একটি আইন প্রণয়ন করেন যার ফলে তৎকালীন ৮০% কৃষক ভূমি দাসে পরিণত হয়। আর এই অবস্থা চলে বংশানুক্রমিক অর্থাৎ দাসের ছেলে দাস হবে। কেউ চাইলেও তার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারত না। তারা সকল প্রকার মানবিক অধিকার বঞ্চিত ছিল। আলেক্সিসের এই অবৈধ আইনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এই হীন ব্যবস্থার পক্ষে খ্রিষ্টান চার্চরা তাদের অবস্থান গ্রহণ করেন। ফলে এটি সমাজ স্বীকৃতি পেয়ে যায়। এবং শুরু হয় জারদের অমানুষিক শাসনের পালা যা পরবর্তী ২০০ বছর পর্যন্ত বজায় থাকে। আলেক্সিস পলিশ ও লিথুনিয়ার বিরুদ্ধে জয় লাভ করলে রাশিয়ার প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। তাই রাশিয়া ইউক্রেন দখল করে নেয়। আলেক্সিসের অপশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দিলে তিনি তা কঠোর হস্তে দমন করেন। এবং বিদ্রোহীদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ১৬৭৬ সালে আলেক্সিস মৃত্যু বরন করেন।
আলেক্সিস পরবর্তী দুর্বল শাসকগণ (১৬৭৬-৮৯)
আলেক্সিসের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন তৃতীয় ফিউডার। তিনি ১৬৭৬ থেকে ১৬৮২ সাল পর্যন্ত শাসন করে মাত্র ১৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার সময়ে সাম্রাজ্যে বিদ্রোহ দেখা দিলে তিনি তা কঠোর হস্তে দমন করেন।
তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন তার বোন সোফিয়া। সোফিয়া তার অপর দুই ভাই পঞ্চম ইভান ও ১ম পিটারের সহায়তায় শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তার সময়ে দীর্ঘ দিনের বিরোধী শক্তি পলিশ ও লিথুনিয়াদের সাথে শান্তি চুক্তি করা হয়। এবং তুর্কি বিরোধী জোটে যোগদানসহ চীনের সাথে পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি হয়। সোফিয়ার শাসন ক্ষমতা ১৬৮৯ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
প্রথম পিটার
প্রথম পিটার
প্রথম পিটার (১৬৮২-১৭২১)  
মূলত তার বোন সোফিয়ার সাথে সাথেই পিটারের শাসন কাল শুরু হয়। কারণ দুইজন দুই অঞ্চলের দায়িত্বে থাকলেও সোফিয়ার সকল কাজেই পিটার সাহায্য করতেন। কিন্ত ১৬৮৯ সালের পর সরাসরি সকল ক্ষমতার একক কেন্দ্র হন পিটার। তিনি ইউরোপের পক্ষ নিয়ে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তিনি রাশিয়াকে ইউরোপীয় ভাবধারায় নিয়ে আসেন। তার সময়ে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও স্থাপত্য কলার ব্যাপক প্রসার লাভ করে। এবং ইউরোপের সাথে পাল্লা দিয়ে শিল্পকারখানার উন্নয়ন করেন। পোশাক পরিচ্ছদের ব্যাপারেও তিনি উদার নীতি গ্রহণ করেন। তার সময়ে নৌবাহিনীর উত্থান ও আধুনিকায়ন সূচিত হয়। তার সময়ে ২য় নার্ভার যুদ্ধ সংঘটিত হয় ও তাতে রাশিয়ানরা জয়লাভ করে। পিটার তার নামানুসারে তার রাজধানী সেন্ট পিটাসবার্গে স্থাপন করেন। এবং সেখানে বড় বড় প্রাসাদ নির্মাণ করেন যা তাকে অনন্য মর্যাদা দান করেছে। সর্বোপরি পিটার এ অঞ্চলের অন্যতম শক্তিধর শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭২১ সালে সে নিজেকে “পিটার দ্যা গ্রেট” ও জাতীর পিতা হিসেবে ঘোষণা করেন। পিটার দ্যা গ্রেট ১৭২৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
পিটারের পরবর্তী শাসকগণ (১৭২৫-১৮০১)
পিটারের পরবর্তী শাসকগণ ছিলেন অপেক্ষাকৃত দুর্বল তাদের সময় বড় ধরনের কোন পরিবর্তন সূচিত হয়নি। পিটারের পর ক্ষমতায় আসেন তার স্ত্রী ১ম ক্যাথরিন । ক্যাথরিন বেশীদিন ক্ষমতা ভোগ করতে পারেন নি। তিনি ১৭২৫-২৭ পর্যন্ত মাত্র ২বছর ক্ষমতায় ছিলেন।
তার পর ক্ষমতায় আসেন তার পুত্র ২য় পিটার। পিটারও খুব বেশি সফল ছিলেন না। তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ফলে তার শাসনকাল দীর্ঘ হয়নি। তিনি মাত্র ৩ বছর ক্ষমতায় আসীন ছিলেন। অর্থাৎ ১৭৩০ সালে তিনি ক্ষমতা থকে অপসারিত হন।
তার পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসেন তার চাচাতো বোন এনা। এনা ১৭৩০-১৭৪০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি তার জার্মান প্রেমিক দ্বারা প্রভাবিত হন। এবং রাশিয়াকে ইউরোপীয় ভাবধারায় এগিয়ে নেয়ার জন্য ব্রতী হন। তার সময়ে রাশিয়ান প্রশাসন ড্যানিশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পরে।
এনার পর ১৭৪০ সালে ক্ষমতায় আসেন ৬ষ্ঠ ইভান। কিন্ত তিনি সিংহাসন সুসংহত করতে পারেন নি। মাত্র ১ বছর ক্ষমতায় থেকে ১৭৪১ সালে তার মেয়ের হাতে নিহত ও ক্ষমতাচ্যুত হন।
ইভানের পর ক্ষমতায় আসেন এলিজাবেথ। তার ছিল বেশ কয়েকজন যুবক প্রেমিক তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একজন দক্ষ শাসক। তার সময়ে ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার সাথে রাশিয়ার জোট গড়ে উঠে। তিনি প্রুয়েশিয়ার সাথে দীর্ঘ সাত বছর যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তার সময়ে সেন্ট পিটারসবার্গের বিখ্যাত উইন্টার প্যালেসের কাজ সমাপ্ত হয়। ১৭৬২ সালে তিনি পিটারসবার্গে মৃত্যুবরণ করেন।
এলিজাবেথের পর ক্ষমতায় আসেন ২য় ক্যাথরিন। তিনি ১৭৬২-৯৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার ক্ষমতায় আসার পূর্বে তার স্বামী অল্প কিছুদিন ক্ষমতায় ছিলেন।
১ম পিটারের পরবর্তীতে রাশিয়ার সিংহাসন দীর্ঘদিন ধরে ঐরকম যোগ্য শাসকের অভাব বোধ করছিল। আর সেই শূন্যতা পূরণ করার জন্যই আবির্ভাব হয় ২য় ক্যাথরিনের। ক্যাথরিনও পিটারের মতই “দ্যা গ্রেট” উপাধি ধারণ করেন। তিনি ছিলেন ফ্রেঞ্চের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তিনি ক্ষমতায় আরোহণের পর ১ম পিটারের অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নেয়ার অগ্রপথিক হিসেবে কাজ করেন। তার সময়ে প্রদেশগুলোর উপর কেন্দ্রের শক্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। রাশিয়ার সীমানা পূর্ব ইউরোপ থেকে মধ্যে ইউরোপ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। সর্বোপরি সমগ্র ইউরোপে প্রভাবশালী একজন শাসক হিসেবে তার নাম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তার সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানে ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। বিশেষ করে চিত্রকলা ও স্থাপত্য শিল্পে প্রভুত্ব উন্নতি সাধিত হয়। তার সময়ে রাশিয়ায় প্রথম জাদুঘর স্থাপিত হয়। কিন্ত ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব হলে তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এবং উদারনীতির শাসন প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন। ১৭৯৬ সালের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রজারঞ্জক বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেন। তিনি দাসদের প্রতি কিছু নরম নীতি গ্রহন করেন। এই মহীয়সী শাসক ১৭৯৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
২য় ক্যাথরিনের পর ক্ষমতায় আসেন তার পুত্র ১ম পল। পল ছিলেন সামরিক নিয়মকানুনে অতিমাত্রায় আচ্ছন্ন। তাই তিনি তার মায়ের সকল কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা শুরু করে দেন। তার নেতৃত্বে রাশিয়া যোগ দেয় ইউরোপীয় জোটে এবং ফরাসি বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্ত এই যুদ্ধে রাশিয়ান বাহিনী পরাস্ত হয়। ১৮০১ সালে তিনি দুর্বৃত্তদের হাতে তার প্রাসাদেই নিহত হন।
প্রথম আলেকজান্ডার (১৮০১-২৫) 
পলের পর ক্ষমতায় আসেন তার ২৩ বছর বয়সী পুত্র ১ম আলেকজান্ডার। আলেকজান্ডার তার প্রপিতামাহী ক্যাথরিনকে তার শাসনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। এবং আধুনিক রাশিয়া গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আগাতে থাকে। তার উপদেষ্টা হিসেবে মেধাবী মিখাঈলকে নিয়োগ করা হয় এবং তার নেতৃত্বে রাশিয়ার অর্থনীতি পুনর্ঘটিত হয় ও উদারনৈতিক সংবিধান প্রণয়ন করা হয়।
এসময়ে ফ্রান্সে নেপোলিয়নের আবির্ভাব হয়। ফলে নেপোলিয়ন রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জরিয়ে পরে। নেপোলিয়ন রাশিয়ার বন্ধু রাষ্ট্র অষ্ট্রিয়া ও ফিনল্যান্ড আক্রমণ করে। কিন্ত ১৮০৭ সালে উভয়ের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্থাপিত হয়। তার মধ্যবর্তী সময়ে রাশিয়া সুইডেন ও ফিনল্যান্ড আক্রমণ করে। ফলে নেপোলিয়নও ১৮১২ সালে পুনরায় রাশিয়াকে আক্রমণ করে। এতে ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে রাশিয়া পরাজিত হয় কিন্ত তার সেনাবাহিনী অক্ষত থাকে। নেপোলিয়ন ব্রিটেন ও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রদের দ্বারা পরাজিত হলে রাশিয়াও শত্রু মুক্ত হয়। ফলে রাশিয়া আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। তাই রাশিয়া পোল্যান্ড, লিথুনিয়া, চেচনিয়া, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া দখল করে নেয়। এবং এ অঞ্চল হতে অটোমানদের বিতাড়িত করে। ফলে সমগ্র ককেশাস অঞ্চলে রাশিয়ার একক আধিপত্য গড়ে উঠে। সর্বোপরি রাশিয়ার প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। ১৮২৫ সালে আলেকজান্ডার মৃত্যুবরণ করলে তার শাসনাবসান হয়।
প্রথম আলেকজেন্ডার
প্রথম আলেকজেন্ডার।
প্রথম নিকোলাস (১৮২৫-৫৫)
প্রথম আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর ১৮২৫ সালে ক্ষমতায় আসেন তার ভাই প্রথম নিকোলাস। তার ক্ষমতা আরোহণকালে রাশিয়া ছিল ইউরোপীয় ভাবধারায় প্রতিষ্ঠিত ও সুসংঘটিত সেনাবাহিনী সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্র। যেসকল সেনাবাহিনী নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তাদের প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশী। ফলে এসকল সেনাবাহিনী ১ম নিকোলাস কে সহজভাবে মেনে নেয়নি। সুতরাং তারা সিক্রেট সোসাইটির মাধ্যমে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ও সেনাঅভ্যূত্থান করে। নিকোলাস তা কঠোর হস্তে দমন করেন। এবং নেতৃত্বদানকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেন ও বাকিদের নির্বাসন দেয়া হয়। তিনি রাষ্ট্রীয় মূলনীতিকে তিনটি স্লোগানে আবদ্ধ করেন যথা– “অর্থোডক্স,একনায়কতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ”। সুতরাং তিনি রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠা করেন- চার্চ, জার ও রাশিয়ান জাতীয়তাবাদের উপর।
ককেশাস সীমান্ত সমস্যা নিয়ে পার্সিয়ানদের সাথে সমস্যা দেখা দিলে রাশিয়ার সাথে তুর্কি অটোমানরা জরিয়ে যায়। কারণ তখন পার্সিয়া অটোমানদের অধীনে ছিল। এ যুদ্ধের ফলে পার্সিয়া তার বৃহৎ সীমানা হারায় ও জরিমানা দিতে হয়। তার সময়েই রাশিয়ান সমর্থনে গ্রিস স্বাধীনতা লাভ করে। ১৮৫৪ সালে খ্রিষ্টান নেতৃত্ব হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে রাশিয়া পুনরায় অটোমানদের সাথে বিরোধে জরিয়ে পরে। রাশিয়া অন্যায়ভাবে মালদাবিয়া ও ওলেসিয়া দখল করে নেয় যা ছিল অটোমানদের অধীনে। ফলে রাশিয়া ও তুর্কিদের মধ্যে সংঘটিত হয় ক্রিমিয়ার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সহায়তায় রাশিয়া জয় লাভ করে ও তুর্কিরা পরাজয় বরন করে অধিকৃত অঞ্চল ছেড়ে দেয়। তার সময়ে রেল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ হয়। ১৮৫৫ সালে তার মৃত্যু হলে নিকোলাসের শাসনাবসান হয়।
দ্বিতীয় আলেকজান্ডার (১৮৫৫-৮১)
১ম নিকোলাসের মৃত্যুর পর ১৮৫৫ সালে ক্ষমতায় আসেন দ্বিতীয় আলেকজান্ডার। তিনি ক্ষমতায় আসর পর শাসনকার্য শুরু করেন অত্যন্ত চমকপ্রদভাবে। ১ম নিকোলাসের দ্বারা নির্বাসিত ডিসেম্বিষ্ট বিদ্রোহীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনেন ও অন্যান্য বন্দিদের মুক্ত করে দেন। আলেকজান্ডারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল সার্ফ প্রথা বাতিল করা। তার পূর্ববর্তী সময়ে রাশিয়ার ৬০ ভাগের বেশি মানুষ ছিল সার্ফ। অর্থাৎ তাদের নূন্যতম মানবিক অধিকারও ছিল না। সার্ফরা ছিল তার মনিবের আজ্ঞাবহ। সার্ফ প্রথার উচ্ছেদ করার সাথে জমির উপর থেকে জমিদারদের দখলদারিত্বেরও অবসান হয়। কৃষকদের ঋণ দেয়া হয় যাতে তারা জমি ক্রয় করতে পারে। তিনি প্রদেশ গুলোতে প্রতিনিধিত্বমুলক শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করেন। যদিও তার এই সার্ফ প্রথা বাতিল ও অন্যান্য সংস্কারের মধ্যে কিছু ত্রুটি ছিল। কিন্ত এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় তার উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত অর্থেই জনকল্যাণকার। ১৮৮১ সালে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।
তৃতীয় আলেকজান্ডার (১৮৮১-৯৪)
২য় আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর ১৮৮১ সালে ক্ষমতায় আসেন ৩য় আলেকজান্ডার। ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রতিক্রিয়াশীল নীতি গ্রহণ করেন। তার পিতা যেহেতু নিলিষ্টদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। তাই তিনি নিলিষ্টদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন এবং তাদের বন্দি করেন। নিলিষ্টরা ছিল শিক্ষিত উদারপন্থী ও সংস্কারমনা তারা জারদের পতন ও তৎস্থলে উদারনৈতিক শাসকের জন্য লড়াই করছিল। আলেকজান্ডার শিক্ষাব্যবস্থাকে অতিমাত্রায় সরকারী করন করেন। কৃষকদের জোর পূর্বক সামন্তপ্রভূদের হয়ে কাজ করতে বাধ্য করেন। এবং সংবাদপত্রের উপর নজরদারি আরোপ করেন। তার সময়ে বাণিজ্যে ও রেল ব্যবস্থার কিছু উন্নতি হয়। তিনি অতিমাত্রায় রুশিকরণ নীতি গ্রহণ করেন। অন্যজাতির বিরুদ্ধে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেন। ফলে জনগণ বিদ্রোহী হয়ে যান। এবং এলাকা ভিত্তিক সমিতি গড়ে তোলেন। ফলে ধীরে ধীরে নিবিষ্টরা সংঘটিত হয়ে যায়। ১৮৯৪ সালে ৩য় আলেকজান্ডার এই নিলিষ্টদের হাতেই নিহত হন।
২য় নিকোলাস
২য় নিকোলাস
দ্বিতীয় নিকোলাস (১৮৯৪-১৯১৭)
১৮৯৪ সালে ৩য় আলেকজান্ডারের পর ক্ষমতায় আসেন ২য় নিকোলাস। তিনি ছিলেন অপেক্ষাকৃত দুর্বল শাসক তাই তিনি তার স্ত্রী জারিনা ও রাজপুতিন নামে একজন উপদেষ্টার উপর নির্ভরশীল হয়ে পরেন। তিনিও ছিলেন রক্ষণশীল ও রুশীকরণ নীতির ধারক ফলে অন্যান্য জাতি বিদ্রোহী হয়ে পরে। তার সময়ে রাশিয়ান সমাজ ছিল অতি মাত্রায় সমস্যাপূর্ন কারণ অভিজাত শ্রেণীরাই সর্বময় ক্ষমতার মালিক ছিলেন। ২য় আলেকজান্ডারের সময়ে সার্ফ প্রথার উচ্ছেদ করলেও মীর নামক গ্রাম সমিতির জন্য তা ত্রুটিপূর্ন থেকে যায়। ফলে ২য় নিকোলাসের সময় তা আরো তীব্র আকার ধারণ করে। অন্যদিকে শিল্প সমাজের উত্থান হওয়ায় শ্রমিক শ্রেণী সেখানেও বঞ্চনার স্বীকার হয়। ফলে সর্বত্র বিদ্রোহ দানা বাধে।
১৯০৫ সালে রুশ-জাপান যুদ্ধে রুশরা পরাজিত হলে নিকোলাসের দুর্বলতা সামনে চলে আসে। এবং রাজ্যের সর্বত্র অভাব অনটন, দুর্দশা দেখা দিলে ১১ মার্চ শ্রমিক-কৃষক শ্রেণী ফাদার গ্যাপনের নেতৃত্বে জারের উইন্টার প্যালেসের দিকে অগ্রসর হন। তাদের এ শোভাযাত্রায় সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে হাজার হাজার লোক নিহত হয়। ইতিহাসে এইদিনটি “ব্লাডি সানডে” পরিচিত। ফলে নিকোলাস অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পরেন। তাই ১৯০৬ সালে প্রথম ডুমার অধিবেশন আহবান করেন। ফলে ডুমায় সীমিত পরিসরে জনপ্রতিনিধি যায়। এবং সেখানে তারা সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ পায়। কিন্ত প্রধান সমস্যা ছিল এটি যে সেখানকার অধিকাংশ প্রতিনিধিই ছিল জারের আজ্ঞাবহ।
১৯১৪ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া তাতে যোগদান করে। কিন্ত জার্মানির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে ব্যাপক সৈনিকের প্রাণহানি ব্যতীত রাশিয়া কোন সফলতা লাভ করতে পারেনি। অপরদিকে জার্মানিতে দেখা দেয় চরম দুঃখ-দুর্দশা খাদ্য সংকট ও শ্রমিক অসন্তোষ ফলে বিদ্রোহ দানা বাধে। তাই ১১ ই মার্চ ১৯১৭ ব্লাডি সানডের ১২তম দিবসে হাজার হাজার কৃষক-শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসে। ফলে শুরু হয় জায়গায় জায়গায় খণ্ডযুদ্ধ। জার তার সেনাবাহিনীকে বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে নির্দেশ দিলে তারা জারের কথা অমান্য করে বিপ্লবীদের পক্ষ গ্রহণ করে। ফলে জার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। এবং বিপ্লবীরা ক্ষমতা দখল করে।
আর এভাবেই পতন হয় দীর্ঘকালের শাসনকারী জার সাম্রাজ্যের। বিপ্লবীদের মধ্যে হতে প্রতিনিধি নিয়ে ঘটিত হয় ডুমা প্রশাসন। তারা মাত্র কয়েকমাস শাসন পরিচালনা করেন। তারপরই সূচিত হয় অক্টোবরের মহান সেই বলশেভিক বিপ্লব। যার মধ্যদিয়ে রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজতন্ত্র।
তথ্যসুত্রঃ
১. http://missinglink.ucsf.edu/lm/russia_guide/historyofrussia.htm
২. http://familypedia.wikia.com/wiki/List_of_Russian_rulers
৩. https://www.youtube.com/watch?v=w0Wmc8C0Eq0

নির্যাতিত তাতারদের জন্য কে কথা বলবে?

বিশ্বজুড়ে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর নির্যাতন একুশ শতকের অন্যতম মানবাধিকার বিপর্যয়। চীনে উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকারকে কঠিনভাবে দমন করছে দেশটির সরকার। উইঘুরদের একটি অংশকে জোরপূর্বক কথিত পুনঃশিক্ষা কেন্দ্রে আটকে রাখা হয়েছে। আবার মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমরা দেশটির সেনাবাহিনী দ্বারা ভয়াবহ নির্যাতনের মাথায় পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। মুসলিমদের এসব জাতিগোষ্ঠীর ওপরে যে নির্যাতন চলছে তা বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। তবে এখনো এমন একটি জাতি রয়েছে যাদেরকে জাতিগতভাবে নিধন করা হচ্ছে। অথচ তাদের বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই। বিশ্বের সেদিকে কোনো নজরও নেই। জাতিটি হচ্ছে ক্রিমিয়ার তাতার মুসলিমরা।
৫ বছর আগে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকে ক্রিমিয়ার প্রায় আড়াই লাখ তাতারদের ওপর নেমে এসেছে ভয়াবহ দুর্যোগ। তাদেরকে কাজ, ভাষা ও সংবাদপত্রের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তবে এটিই ক্রিমিয়ার তাতারদের ওপর নির্যাতনের প্রথম ঘটনা নয়। তাতার জাতি মূলত তুরস্ক থেকে এখানে এসেছে। গত এক শতাব্দী ধরে তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য জোরপূর্বক ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে রুশ শাসনে তাদেরকে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
ক্রিমিয়া দ্বীপে তাতাররা প্রথমে বাস করতে শুরু করেন ১৩ শতকে। তখন থেকেই বারবার তাতারদের ওপর বিভিন্ন গোষ্ঠী হামলা চালাতে থাকে। তবে এর পেছনে তাদের সংস্কৃতি বা ধর্ম কোনো কারণ ছিল না। তাদের কাছে ব্যাপক পরিমাণ পানির উৎস থাকায় তাদেরকে টার্গেট করা হয়। ক্রিমিয়া পুরোপুরিভাবে পানি দিয়ে ঘেরা। এর চারদিকে রয়েছে কৃষ্ণসাগর (ব্ল্যাক সি) ও আজভ সাগর। তাই সমুদ্রে সরাসরি প্রবেশের ইচ্ছে থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ক্রিমিয়ার দিকে ক্ষুধার্থ চোখ ছিল রাশিয়ার।
সমস্যার সূচনা হয় ১৭৭০ সালে। সে সময় ক্যাথেরিন দ্যা গ্রেটের নেতৃত্বে ক্রিমিয়া দখল করে রাশিয়া। ক্রিমিয়া তখন অটোমান বা ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল।  দখলের পর ক্রিমিয়ার প্রধান বন্দরগুলো ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে যায় রাশিয়া। সেখানে রাজনৈতিক অনেক পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্রিমিয়ার শাসক তাতার খানকে উচ্ছেদ করে রুশ গভর্নরের হাতে শাসন ছেড়ে দেয়া। ক্যাথেরিন রুশ নাগরিকদের এই দ্বীপে এসে স্থায়ী আবাস গড়ার ব্যবস্থা করে দেন। ফলে প্রথমবারের মতো ক্রিমিয়া থেকে উচ্ছেদ হতে শুরু করেন তাতাররা। দ্বীপটির ৮৫ ভাগই ছিল তাতার জাতির।  ১৭৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিমিয়াকে নিজের অন্তর্ভুক্ত করে রাশিয়া। ফলে ৮ থেকে ১০ হাজার তাতারকে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্য কোথাও পালিয়ে যেতে হয়।
১৮৫৩ সালে রাশিয়া তার সাম্রাজ্য আরো বড় করার পরিকল্পনা নেয়। ফলে রুশদের থামাতে ওসমানীয়রা সৈন্য মোতায়েন শুরু করে। পরবর্তী দুই বছরে বৃটেন, ফ্রান্স ও সার্ডিনিয়া ওসমানীয়দের সঙ্গে যোগ দেয়। ইতিহাসে এটিই ক্রিমিয়া যুদ্ধ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছে। এ যুদ্ধেই ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল একজন কিংবদন্তিতে পরিণত হন। এ যুদ্ধে রাশিয়া পরাজিত হয় এবং তাদের ক্ষোভ গিয়ে পড়ে তাতারদের ওপর। তৎকালীন জার সরকার তাতারদের অভিযুক্ত করে তুর্কিদের সাহায্য করার জন্য। শাস্তি হিসেবে তাতারদের ওপর রুশ ভাষা বাধ্যতামূলক করা হয়। সড়কের নাম বদলে রুশ নাম দেয়া হয়। দ্যা ক্রিমিয়ান তাতারস বই থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, রুশ অত্যাচারে ১৮৫০ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে মাত্র ১০ বছরেই ক্রিমিয়ায় তাতারদের সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৯৪ হাজারে নেমে আসে। বাকিরা একান্ত বাধ্য হয়ে তখন থেকে গিয়েছিল। তাতাররা রুশ শাসকদের বিশ্বাস করতো না।
এর ১ শতাব্দী পর আরো একজন রুশ শাসকের দৃষ্টি পড়লো ক্রিমিয়ার ওপর। সমাজতন্ত্র রাশিয়ার ভাগ্য পরিবর্তন করলেও তাতারদের জন্য তা দুর্ভোগই ডেকে এনেছিল। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সুপ্রিম লিডার জোসেফ স্তালিন তাতার বুদ্ধিজীবীদের সরিয়ে দিতে শুরু করলেন। এই বুদ্ধিজীবী সমপ্রদায় তাতারদের হারানো ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট ছিল। ১৯২৭ সালে স্তালিন এদেরকে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আলাদা করে ৪০ হাজার তাতারকে তিনি সাইবেরিয়ায় পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন।
আজ থেকে ৭৫ বছর আগের এই মাসেই এর শুরু হয়েছিল। ২য় বিশ্বযুদ্ধে তাতাররা নাৎসি বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল। জার্মানরা স্বাধীনতা দেয়ার লোভ দেখিয়ে তাতার মুসলিমদের দলে ভেড়ায়। হাজার হাজার তাতার সোভিয়েট রেড আর্মির বিরুদ্ধে নাৎসিদের হয়ে যুদ্ধ করে। ফলে ১৯৪৪ সালের ১৮ই মে স্তালিন আবারো তাতারদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং ক্রিমিয়ার সমুদ্র বন্দরগুলোর  নিয়ন্ত্রণ নেয়ার নির্দেশ দেন। স্তালিন তাতারদের ক্রিমিয়া থেকে সরিয়ে মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানে সরিয়ে দিতে শুরু করেন। অসুখ ও না খেয়ে এদের মধ্যে অর্ধেক মারা গিয়েছিল পথেই। তবে কয়েক হাজার তাতার ইউরোপ ও তুরস্কে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
১৯৫৪ সালে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ ইউক্রেনকে ক্রিমিয়া উপহার দেন। এরপর ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে তাতাররা ক্রিমিয়ায় ফিরতে শুরু করে। তবে ততদিনে ক্রিমিয়ার বেশির ভাগ এলাকা রুশদের দ্বারা জনাকীর্ণ হয়ে গেছে। তারপরেও পুনরায় হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে তাতাররা মেজলিস নামে নিজেদের রাজনৈতিক দল গঠন করে।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্রিমিয়ায় হামলা চালায় রাশিয়া। ইউক্রেন থেকে উপদ্বীপটির আংশিক দখল নিয়ে নেয়। ওই বছরই মার্চ মাসে ক্রিমিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করতে একটি গণভোটের আয়োজন করে রুশ সরকার- হয়তো ইউক্রেনের সঙ্গে থাকবে বা রাশিয়ান ফেডারেশনের অংশ হয়ে থাকবে। এই গণভোটের পর থেকেই তাতারদের ওপর রুশদের হয়রানি বেড়ে যায়। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুসারে, ওই গণভোট ছিল রুশদের অবৈধ ও সহিংস হামলা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো বিষয়। তাতাররা ওই গণভোটের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। গ্রেপ্তার করা হয় বহু তাতার অধিকারকর্মী ও সাংবাদিককে। কেউ কেউ চিরদিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে যান। আর কেউ কেউ প্রাণ হারান।
নিখোঁজ হওয়া সাংবাদিকদের একজন ছিলেন রেশাত আমেতভ। তিনি রুশ অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন। তাকে ক্রিমিয়ার রাজধানী সিমফারোপলের কাউন্সিল অব মিনিস্টারস ভবনের সামনে থেকে অপহরণ করা হয়। দুই সপ্তাহ পর তার নির্যাতিত লাশ খুঁজে পাওয়া যায়। আজ অবধি তার হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হয়নি।
রুশ অধিগ্রহণের বছরগুলোতে তাতার পত্রিকা, রেডিও ও টিভি স্টেশনগুলোয় ভাঙচুর চালানো হয়। ক্রিমিয়ার ভাষাভিত্তিক সব পাঠদান নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে ক্রিমীয় তাতার নেতা ও মেজলিস প্রধান মোস্তফা ঝেমিলেভ বিদেশ সফর শেষে ক্রিমিয়ায় প্রবেশ করতে চাইলে তাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এরপর থেকে নির্বাসনে রয়েছেন তিনি। ২০১৬ সালের এপ্রিলে রুশরা মেজলিসকে বিপজ্জনক ও চরমপন্থি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করে নিষিদ্ধ করে। এরপর থেকে অগণিত তাতারকে সন্ত্রাসবাদ সমর্থনের অভিযোগে বা মুসলিম দলের সদস্য থাকায় গ্রেপ্তার করেছে রুশরা।
গত ডিসেম্বরে ঝেমিলেভ নিউ ইয়র্কস্থ আমেরিকান এসোসিয়েশন অব ক্রিমিয়ান তাতারে সফর করেন। সেখানে নির্বাসিত তাতারদের উদ্দেশে বলেন, ক্রিমিয়ার অবস্থা শোচনীয়। তিনি আরো জানান, সেখানে বাসরত তাতারদের পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্য নিয়ে তিনি শঙ্কিত। রুশরা তাদের ভুল বোঝাচ্ছে ও তাতার সংস্কৃতি, ভাষা, ইসলাম ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। গত বছর রুশরা বিগ খান মসজিদ নতুন করে সাজিয়েছে। পুরনো টাইলস ও কাঠের কাজ সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তাতাররা জানিয়েছে যে, তারা ক্রিমিয়ায় বাসরত তাদের পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা সেখানে প্রতিনিয়ত নিপীড়িত হচ্ছে। অনেকের চাকরি চলে গেছে। তারা বেকার হয়ে জীবনযাপন করছে, নতুন চাকরি পাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা রুশ প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার ভয়ে তাতারদের কাজে নিয়োগ দিচ্ছে না। তাতারদের ব্যবসা ও বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। কখনো কখনো বাজেয়াপ্ত করে নেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিমিয়ায় মানবাধিকার দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে। রুশ ফেডারেশন কর্তৃপক্ষ ফোর্থ জেনেভা কনভেনশন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করে ক্রিমিয়ার নাগরিকদের ওপর ক্রমাগতভাবে তাদের আইন চাপিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে ক্রিমিয়ায় তাতারদের সংখ্যা ফের ২ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। কিন্তু আঠারো শতকে যেখানে তারা ছিল উপদ্বীপটির মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ, সেখানে আজ তারা কেবল ১২ শতাংশ।
জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ), ন্যাটো ও তুরস্ক ক্রিমিয়ায় রুশ অধিগ্রহণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ও উপদ্বীপটিকে রাশিয়ার অংশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ন্যাটো ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের অংশ ঘোষণা করেছে। গত বছর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন রুশদের ক্রিমিয়া থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব পাস করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ অবৈধ অধিগ্রহণের দায়ে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের কোনোটিই পর্যাপ্ত নয়। রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু কেউ কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি,  রুশদের জোরপূর্বক প্রত্যাহার তো দূরের কথা। উপরন্তু, রুশ কর্তৃক ক্রিমিয় তাতারদের সংস্কৃতি ও জাতিগত নিধনের ধীর প্রক্রিয়া রুখতেও কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো, পশ্চিমারা ও তাদের মানবাধিকার নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো নীরব ভূমিকাই পালন করেছে। তারা ক্রিমিয়া ও ক্রিমিয়ার তাতারদের বর্জন করেছে।
(এলমিরা বেরাসিল লিখিত প্রতিবেদনের সমপাদিত ভাবানুবাদ।)

আকাশে ভারতের চেয়ে এগিয়ে পাকিস্তান

ভারতীয় বিমানবাহিনী গত ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের বালাকোটের সন্ত্রাসী শিবিরে একটি সাহসী সফল হামলা চালাতে পারে; তবে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে।
সম্প্রতি ভারতের দ্য প্রিন্ট অনলাইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে পাকিস্তানের বিমানসেনারা।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভয়াবহ আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা ৪০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় দুই দেশের বিমানসেনাদের পক্ষ থেকে দাবি করে বলা হয়, তারা একে অপরের বিমান গুলি করে মাটিতে নামিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে এও বলা হয় যে পাকিস্তানের বালাকোটে জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে এসেছে ভারতের বিমানবাহিনীর সেনারা। যদিও এ হামলার পর হতাহত মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক চলছে এখনো। এমন সময় এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো।
যুদ্ধবিমান ও পাইলটে পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে ভারত
সামরিক শক্তিতে পাকিস্তানের চেয়ে ভারত অনেক এগিয়ে আছে বলে দেশটির নেতারা বলে বেড়ান। কিন্তু সম্প্রতি ভারতের দ্য প্রিন্ট পত্রিকা জানিয়েছে অন্য রকম তথ্য। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রিন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বিমানবাহিনী পাকিস্তানের চেয়ে লোকবলে পিছিয়ে আছে। ভারতের বিমানবাহিনীতে বর্তমানে প্রতিটি বিমানের জন্য পাইলটের সংখ্যা মাত্র দেড়জন করে। সেখানে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীতে এ সংখ্যা আড়াইজন করে। এখানে পিছিয়ে আছে ভারত।
যুদ্ধে এগিয়ে থাকবে পাকিস্তান
পাইলটের লোকবলের সংখ্যায় এগিয়ে থাকার পর দিনে ও রাতের যুদ্ধে এগিয়ে থাকবে ভারতের অন্যতম প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে দিনে ও রাতে যুদ্ধ হলে ভালো অবস্থায় থাকবে পাকিস্তান। বিমানের পাইলট কম থাকায় চাপে থাকবে ভারতের বিমানবাহিনীর সেনাসদস্যরা। কারণ, যুদ্ধের কাজ চালাতে ভারতের পাইলটদের ক্লান্তি চলে আসবে। আর সংখ্যায় বেশি হওয়ায় উড্ডয়নের বেশি সুযোগ পাবেন পাকিস্তানের পাইলটেরা।
ভারতে বোমাবর্ষণ অনুশীলনের যথেষ্ট সুযোগ নেই
ভারতের ওয়েস্টার্ন এয়ার কমান্ড পাকিস্তান ও আংশিকভাবে চীনের আকাশপথের ওপরে নজরদারি চালায়। এদের একটিও ‘ফায়ারিং রেঞ্জ’ নেই, যা দ্বারা যুদ্ধের সময়ে শত্রুর আস্তানায় বা নিশানার ওপর বোমা ফেলার অনুশীলন করা যায়।
সামরিক শক্তিতে পাকিস্তানের চেয়ে ভারত অনেক এগিয়ে আছে—দেশটির রাজনৈতিক নেতারা বললেও এক প্রতিবেদনে এর উল্টোটাই বলা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের বিমানসেনারা ‘সিমুলেশন’ বা কম্পিউটারে নকল যুদ্ধক্ষেত্রে বোতাম টিপে বোমা ফেলার অনুশীলন করেন, যা কখনো সত্যিকারের অনুশীলনের বিকল্প নয় বলে স্বীকার করেছে বিমানসেনাদের একটি সূত্র।
উচ্চতায় সমস্যা
চীনের সঙ্গে উত্তরে ও পূর্বে ভারতের যে সীমানা আছে, সেখানকার সমস্যা উচ্চতা। তবে উচ্চতায় বোমাবর্ষণ করার অনুশীলনের বিমান নেই ভারতের বিমানবাহিনীর। এর ফলে যুদ্ধ বাধলে কতটা সাফল্য তারা পাবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে ভারতের সামরিক বিশ্লেষকদের। ভারতের বিমানসেনাদের অনুমোদিত স্কোয়াড্রন শক্তি হচ্ছে ৪২। আর অফিসারদের সংখ্যা ১২ হাজার ৫০০। একেকটি স্কোয়াড্রনে ১৬ থেকে ২০টি যুদ্ধবিমান আছে। যদিও প্রতিবছর গড়ে মাত্র ২ শতাংশ হারে অনুমোদিত অফিসারের সংখ্যা কমেছে।
দীর্ঘদিন ধরে এই অভাব চলতে থাকায় এখন সমস্যা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া এখন মিগের বদলে দুই আসনবিশিষ্ট এসইউ ৩০ এমকেই বিমান ভারতের বহরে যোগ হয়েছে। আর এতে ভারতের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আরও বেশি পাইলটের। সেখানেই লোকবলের অভাব ভারত বুঝতে পারছে বলে প্রিন্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জেনেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের কাছ থেকে নানা অস্ত্র কেনে ভারত। ছবি: সংগৃহীত