Thursday, May 18, 2023

কোষ্ঠকাঠিন্য চিরতরে দূর করতে যেসব খাবার খাবেন

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে ভালোভাবে জীবনযাপন করাটাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই প্রায় নিয়মিত কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষেরা। গর্ভবতী নারীদেরও এটা একটা সমস্যা। কোষ্ঠকাঠিন্যের ভয়ে তারা অনেক কিছুই খেতে ভয় পান। কোনটা খেলে যে স্বস্তি পাবেন, আর কোনটা খেলে কষ্ট চরমে উঠবে, বুঝতে পারেন না।
কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণঃ
১. আঁশজাতীয় খাবার এবং শাকসবজি ও ফলমূল কম খেলে;
২. পানি কম খেলে;
৩. দুশ্চিন্তা করলে;
৪. কায়িক পরিশ্রম, হাঁটা-চলা কিংবা ব্যায়াম একেবারেই না করলে;
৫. অন্ত্রনালীতে ক্যান্সার হলে;
৬. ডায়াবেটিস হলে;
৭. মস্তিষ্কে টিউমার হলে এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে;
৮. অনেক দিন বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে বিছানায় শুয়ে থাকলে;
৯. বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবন, যেমনঃ
ক. ব্যথার ওষুধ;
খ. উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ;
গ. গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ;
ঘ. খিঁচুনির ওষুধ এবং
ঙ. যেসব ওষুধের মধ্যে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও অ্যালুমিনিয়ামজাতীয় খনিজ পদার্থ থাকে। তা ছাড়া স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার জন্যও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এর মধ্যে কাঁপুনিজনিত অসুখ, স্নায়ু রজ্জু আঘাতপ্রাপ্ত হলে, কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ও থাইরয়েডের সমস্যা উল্লেখযোগ্য।
কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণঃ
১. শক্ত পায়খানা হওয়া;
২. পায়খানা করতে অধিক সময় লাগা;
৩. পায়খানা করতে অধিক চাপের দরকার হওয়া;
৪. অধিক সময় ধরে পায়খানা করার পরও পূর্ণতা না আসা;
৫.মলদ্বারের আশপাশে ও তলপেটে ব্যথার অনুভব করা এবং
৬. আঙুল কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে পায়খানা বের করা।
কোষ্ঠকাঠিন্য চিকিৎসা না করা হলে যে সমস্যা হতে পারে
১. পায়খানা ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে;
২. পাইলস;
৩. এনালফিশার;
৪. রেকটাল প্রোলাপস বা মলদ্বার বাইরে বের হয়ে যেতে পারে;
৫. মানসিকভাবে রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা থাকে;
৬. প্রস্রাব বন্ধ হতে পারে;
৭. খাদ্যনালীতে প্যাঁচ লেগে পেট ফুলে যেতে পারে;
৮. খাদ্যনালীতে আলসার বা ছিদ্র হয়ে যেতে পারে এবং
৯. কোষ্ঠকাঠিন্য যদি কোলন ক্যান্সার এবং মস্তিষ্কে টিউমারের জন্য হয় এবং সময়মতো চিকিৎসা করা না হয় তবে অকালমৃত্যু হতে পারে।
কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় যারা ভুগছেন, তারা যে ধরনের খাবার এড়িয়ে চলতে পারেন: * দুধ: দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার (যেমন: পনির, আইসক্রিম ইত্যাদি) কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়াতে পারে অনেকের। এ ধরনের খাবারে আঁশের পরিমাণ কম। ছোট শিশু যারা শুধু কৌটার দুধ খায়, তাদের এ সমস্যা বেশি। তবে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় দুধ থাকা উচিত। টক দই হজমে সহায়ক।
* মাংস: লাল মাংসে (গরু ও খাসির) চর্বি বেশি থাকে। এটা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। এই খাবার অন্ত্রে অনেকক্ষণ থাকে। মাংসের সঙ্গে পাতে যেন প্রচুর সবজি ও সালাদ থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
* চিপস: স্ন্যাকস বা নাশতা হিসেবে পটেটো চিপসজাতীয় খাবার ভালো নয়। এগুলো কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়িয়ে দেবে।
* হিমায়িত খাবার: সংরক্ষিত বা প্রক্রিয়াজাত খাবারে পানি শুকিয়ে ফেলা হয় ও লবণ বেশি থাকে। ফলে এ ধরনের খাবারে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়বে।
* বেকারি পণ্য: বেকারি পণ্য যেমনবিস্কুট, ক্র্যাকার্স, ডোনাট, পেস্ট্রিজাতীয় খাবারে চর্বি বেশি, জলীয় অংশ কম, আঁশও কম। এর ফলে যাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে, তাঁদের জন্য এগুলো বর্জনীয়। ফল খাওয়াটা তাঁদের জন্য ভালো।
* কাঁচকলা: কাঁচকলা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, এটা ঠিক। তবে পাকা কলায় যথেষ্ট আঁশ আছে। তাই ওটা খাওয়া যাবে।
* ভাজাপোড়া: ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, বিস্কুটের গুঁড়া ও ব্রেড ক্রাম্বে ভাজা যত খাবার আছে, সেগুলো অন্ত্রের চলন কমিয়ে দেয় ও কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়ায়।
কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে কিছু খাবার
কলা কলাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অনেক সাহায্য করে থাকে। তাছাড়া কলা পটাশিয়াম বৃহদান্ত্র ও ক্ষুদ্রান্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুতরাং কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর করতে কলার অবদান অপরিসিম।
কফি কফি একটি জনপ্রিয় পানীয়। এটা আজকাল সবাই খেয়ে থাকে। যখন শরীর থেকে ঘুমের ভাব কাটানোর দরকার হয় তখন বেশিরভাগ মানুষ কফি পান করেন, কিন্তু এটা অন্যান্য কারণেও উপকারি। কারো কারো ক্ষেত্রে এই কফি পেট নরম করতে সাহায্য করে থাকে। তবে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে গিয়ে অতিরিক্ত কফি পান করে বসবেন না যেন, এতে ডায়রিয়া হয়ে যেতে পারে। ২-৩ কাপের বেশি পান না করাই ভালো।
পানি এটা তো বলার প্রয়োজন নেই পানি আমাদের দেহের জন্য কতটা উপকার। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় শরীর যথেষ্ট পানি না পাওয়ার কারণে তৈরি হচ্ছে কোষ্ঠকাঠিন্য। এ কারণে যথেষ্ট পানি পান করতে হবে। বিশেষ করে আপনি যখন ব্যায়াম করবেন বা বাইরে অনেকটা সময় গরমে কাটাবেন, তখন পানি বিশেষভাবে জরুরী।
কমলা উচ্চমাত্রার ফাইবার সমৃদ্ধ কমলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে একটি বা দুটি কমলা খাওয়া অভ্যাস কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করবে। জুস নয়। বরং আস্ত কমলা ফলটাকেই খাওয়ার চেষ্টা করবেন। এতে যে ফাইবার থাকে। তা আপনাকে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করবে শুধু তা নয় সাথে পুরাপুরি সারাতেও সম্ভাব করবে। এটা ২০০৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে কমলায় থাকা নারিনজেনিন নামের একটি উপাদান কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অনেক সহায়ক।
পপকর্ন অনেকে পপকর্ন খাবার এতটা নাও পছন্দ করতে পারে। কিন্তু পপকর্ন যে কতটা স্বাস্থ্যকর খাবার তা আমাদের জানা প্রয়োজন। আর পপকর্নে যে ফাইবার থাকে তার কারনে খাদ্য তালিকায় পপকর্ন রাখা উচিত। এই ফাইবারের কারণে আপনার দেহের অনেক সাহায্য করতে পারে। তবে সাবধান, মাখনে ভরা ফ্যাটি পপকর্ন খাবেন না। দরকার হলে বাড়িতেই তৈরি করে নিতে পারেন একদম সাধারণ পপকর্ন। পপকর্নে থাকা ফাইবার উপাদান কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অনেক উপকারি।
লাল চাল যদিও আমাদের সাদা চাল খাওয়ার অভ্যাস কিন্তু প্রতি কাপ লাল চালে থাকে ৩.৫ গ্রাম ফাইবার। এ ছাড়াও এটি সাধারণ সাদা চালের চাইতে বেশি পুষ্টিকর। আরো খেতে পারেন বিভিন্ন হোল গ্রেইন। বিশেষ করে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে লাল চালের ভূমিকা অনেক বেশি।
পালং শাক
সবজি হিসেবে পালং আমাদের অনেক পছন্দের। এক কাপ সেদ্ধ পালং শাকেই থাকে চার গ্রাম ফাইবার। এছাড়াও থাকে ১৫০ মিলিগ্রামের বেশি ম্যাগনেসিয়াম, যা কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। সুতরাং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে পালং শাকের ভূমিকা অপরিসীম।
টকদই কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে টকদইয়ের তো তুলনায় নেই। টকদইয়ের প্রোবায়োটিক গুণাগুণ আপনার হজমের সমস্যাকে দূর করতে অনেকাংশে সাহায্য করে। এমনকি নিয়মিত টকদই খেলে আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য হবার সম্ভাবনা থাকবেই না।
ইসুপগুলের ভুষি ইসুপগুলের ভুষি পানির সাথে মিশিয়ে খেলে যে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমাধান হয় এটা প্রায় সবাই জানেন। তবে খেতে হবে নিয়ম মতো। অনেকেই ইসুপগুলের ভুষি পানিতে ভিজিয়ে রাখেন এবং পরে খান। এতে আসলে উপকার হয় না। বরং পানিতে দিয়ে সাথে সাথেই খেয়ে ফেলতে হবে। আবার অনেক ইসবগুল বা ভূসি ১ গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে চিনি বা গুড়সহ নিয়মিত খালি পেটে সেবন করলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হবে এই কথাও বলে থাকে গ্রামে-গঞ্জে দীর্ঘকাল ধরে। একথা সত্যি ইসুপগুলের ভুষি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অনেক উপকার।
আপেল আপেলের গুনাগুন তো আমরা কমবেশি জানি। আপেলের খোসার মধ্যে রয়েছে স্যলুবল এবং ইনস্যলুবল ফাইবার যা খাবার হজমের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকরী। এছাড়াও আপেলের প্যাক্টিন নিশ্চিত করে পরিপাকতন্ত্রের সঠিক কর্মক্ষমতা। সবচাইতে ভালো ফলাফল পেতে প্রতিদিন খালি পেটে অন্তত ১ টি আপেল খেতে হবে। সুতরাং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে আপেলের উপকারিতা অনেক।
গাজর গাজর একটি সুস্বাদু সবজি। এই সবজিটি কাঁচাও খাওয়া যায় এবং রান্না করেও খাওয়া যায়। এই অত্যন্ত সুস্বাদু সবজিটি প্রক্রিতিক ডায়াটেরি ফাইবারের বেশ ভালো উৎস। মাত্র আধা ইঞ্চির ৭ খণ্ড গাজরে রয়েছে প্রায় ১.২ গ্রাম ফাইবার। প্রতিদিন গাজর খাওয়ার অভ্যাস কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাকে দূরে রাখবে চিরকাল। তাই কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে গাজর খাওয়ার অভ্যাস করার দরকার।
শসা শসার বেশীরভাগ অংশই পানি দিয়ে তৈরি, আর শসার ডায়াটেরি ফাইবার শসাকে করে তোলে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যার মহৌষধ। দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও দূর করতে সক্ষম নিয়মিত শসা খাওয়ার অভ্যাস থেকে।
কাঠবাদামের তেল কাঠবাদামের তেল কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর করতে বিশেষভাবে কার্যকরী। কাঠবাদামের ল্যাক্সাটিভ ইফেক্ট হজম ত্বরান্বিত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। প্রতিদিন রাতে ১ গ্লাস দুধে ২ টেবিল চামচ কাঠবাদামের তেল মিশিয়ে পান করলে সমস্যার দ্রুত সমাধান পাওয়া সম্ভব।
পাকা বরই আবার অনেকে পাকা বরই কে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য ব্যবহার করে থাকে। এই মিষ্টি পাকা বরই চটকে খোসা ও বীজ ফেলে অথবা ছেঁকে অল্প পানি মিশিয়ে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের উপশম হয়।
বেলের সরবত বেলের সরবতও অনেক উপকারী। ৩০-৩৫ গ্রাম পাকা বেলের শাঁস প্রতিবারে ১ গ্লাস পানিতে শরবত তৈরী করে দিনে ২ বার সেবন করতে হবে। এভাবে কমপক্ষে ৫-১০ দিন বেলের সরবত পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যাবে।
বুচকি দানা বুচকি দানাও উপকারী। ২ গ্রাম পাতা চূর্ণ রাতে ঘুমানোর সময় গরম পানি অথবা দুধসহ সেবন করতে হবে। খারাপ লাগলে দই খেতে হবে।
ঘরোয়া উপায় কোষ্ঠকাঠিন্য বেশ অস্বস্তিকর একটি সমস্যা। পেট ফোলাভাব, বমি বমি ভাব, বাথরুম করতে অসুবিধা ইত্যাদি সমস্যা হয় এ সময়। সমস্যা হলে তো চিকিৎসকের কাছে যাবেনই, তবে ঘরে তৈরি একটি পানীয় খেয়ে দেখতে পারেন। কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে এই পানীয়। জেনে নিন ৩টি আয়ুর্বেদিক উপায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অব্যর্থ।
এই পানীয় তৈরি করতে লাগবে তিনটি উপাদান অ্যাপেল সিডার ভিনেগার, মধু ও পানি। অ্যাপেল সিডার ভিনেগারে রয়েছে অ্যাসিটোব্যাকটার নামের একটি ভালো ব্যাকটেরিয়া। এটি খাবারকে ভাঙতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমতে সহায়ক হয়। তবে এর জন্য কাঁচা ও অপরিশোধিত অ্যাপেল সিডার ভিনেগার প্রয়োজন। কাঁচা মধুর মধ্যে থাকা উপাদান ইউজেনল কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে কাজ করে। এই পানীয় বানানোর জন্য এক গ্লাস গরম পানি নিতে হবে। এর মধ্যে দুই টেবিল চামচ কাঁচা অ্যাপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে। এর মধ্যে দুই টেবিল চামচ কাঁচা মধু দিতে হবে। একে ভালো নাড়তে হবে। মধুকে ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ে সকালে বা দিনের যেকোনো সময় এটি পান করতে হবে।
প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে একটি খোসাসহ পুরো আপেল খাবেন। এছাড়া রাতে ঘুমাতে যাবার আগে এক কাপ কুসুম গরম পানি পান করতে হবে। এটা হজমে সহায়তা করবে এবং কোষ্ঠবদ্ধতা দূর করবে।
সারা রাত বড় ১টি সাদা এলাচ এক কাপ গরম দুধে ভিজিয়ে রাখতে হবে । সকালবেলা এই এলাচটি থেঁতো করে দুধসহ খেতে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাটি যদি ভয়াবহ রকমের বেশি হয় তাহলে সকাল ও রাতে একইভাবে দুধসহ এলাচ খেতে হবে।
কিসমিস ও গরম দুধ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে কিসমিস ও গরম দুধের অনেক উপকার। ১০/১২টি কিসমিস নিয়ে তার মধ্যে বিচি থাকলে ছাড়িয়ে ফেলতে হবে। এরপর ১গ্লাস দুধে কিসমিস দিয়ে ১চিমটি দারুচিনির গুড়া ভালভাবে ফুটিয়ে নিতে হবে। এভাবে টানা ৩দিন দুধ পান করতে হবে। তাহলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
ত্রিফলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ত্রিফলা কার্যকরী। ত্রিফলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। এছাড়া এটি হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ও বদহজম জনিত সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। ১চা চামচ ত্রিফলা পাউডার ১গ্লাস গরম পানিতে বা গরম দুধে ভালভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। রাতে ঘুমানোর আগে তা নিয়মিত পান করতে হবে। এতে করে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
তিলবীজ তিল বীজ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ক্ষেত্রে অনেক উপকার করে থাকে। তিল বীজ গুড়া করে আটা বা ময়দার সাথে মিশিয়ে রুটি তৈরি করে খেতে পারেন। এতে করে দেহে ফাইবারের অভাব পূরণ হবে। সাথে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যাবে।

মানবজীবনে ট্র্যাজেডি by মোজাফফর হোসেন

মৃত্যুর আগ পর্যন্তু মানুষের বেঁচে থাকাকে বলা হয় মানবজীবন। জগতের শ্রেষ্ঠ জীবন মানবজীবন। অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষ এ জন্য আলাদা যে, তাদের সুখ ও দুঃখ ভোগ করার একটা ভিন্নরকমের অনুভূতি রয়েছে। চরম সুখে মানুষ পুলকিত হতে পারে আবার কঠিন দুঃখে মানুষ মুষরে পড়তে পারে। যার যার মতো করে মানুষ সুখী হয় আবার এই মানুষই যার যার মতো করে দুঃখ ভোগ করে। এই বৈশিষ্ট্যই মানবজীবনকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে রেখেছে। কিছু মানুষ রয়েছে যারা সারা জীবনই সুখ ভোগ করতে পারে আর কিছু মানুষ রয়েছে সারা জীবনই দুঃখ-কষ্টে বেঁচে থাকেন। কোনো মানুষের জীবনে কোনো একসময় সুখ ধরা দিতে পারে আবার দুঃখও তেমনি করে হঠাৎ জীবনের দরজায় কড়া নাড়তে পারে। সুখ ও দুঃখ এভাবেই নিজ নিজ গন্তব্য ঠিক করে নিয়ে আবর্তিত হতে থাকে। সুখ কী আর দুঃখইবা কাকে বলে এ নিয়েও বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ছোট ছোট সুখ এবং ছোট ছোট দুঃখের কোনো সংজ্ঞা দেয়া যায় না। এগুলো আপেক্ষিক। বড় বড় দুঃখের সংজ্ঞা না হলেও সেসব দুঃখকে দেখা যায়। ছোট ছোট সুখ; ছোট ছোট দুঃখ প্রায় সব মানুষের মধ্যেই কমবেশি অবস্থান করে। কিন্তু বড় বড় সুখ ও বড় বড় দুঃখ বাসা বাঁধতে পারে বড় বড় মানুষের জীবনে। মহৎ ব্যক্তিত্বের সুখ ও দুঃখ আস্বাদনের মাত্রা সাধারণ মানুষের তুলনায় ভিন্নতর হয়ে থাকে। জীবনবোধের অনুভূতি যত গভীর হয় সুখ ও দুঃখ বোধের পরিমাণও ততই গভীর হতে পারে। পাহাড়কে নিশ্চিহ্ন করতে বড় শক্তির প্রয়োজন পড়ে। সেরকম বীর ও মহৎপ্রাণ মানুষকে নিশ্চিহ্ন করতে বড় দুঃখ লাগে। অর্থাৎ বড় দুঃখের জন্য বড় মানুষ এবং বড় সুখের জন্যও বড় মানুষের দরকার পড়ে। যেমন বড় সুখ ধরা দিতে পারে রাজা-বাদশাদের জীবনে এবং বড় দুঃখগুলো তাদের জীবনে প্রবেশ করার পথ খুঁজতে থাকে। বড় মানুষের জীবনে যখন বড় সুখ ধরা দেয় তখন সেই সুখকে বলা হয় সাফল্য। আবার এই সফল জীবনে যখন ধরা পড়ে বড় দুঃখ তখন সেই দুঃখভোগকে বলা হয় ট্র্যাজেডি।
দুঃখ কমবেশি অধিকাংশ মানুষের জীবনেই ঘটে থাকে। সেই দুঃখ যখন ভয়াবহ রূপে মানব জীবনে অনুপ্রবেশ করে তখন মানুষ শিউরে ওঠেন; বিহবল হয়ে পড়েন দুঃখ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। নানান কৌশল অবলম্বন করেও যখন দুঃখকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হন তখন মানবজীবনকে ভোগ করতে হয় দুঃখের করুণ পরিণতি। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হতে থাকেন; ধীরে ধীরে দুঃখ সাগরের অতলগহ্বরে তলিয়ে যেতে যেতে একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়েন। দুঃখের শুরু থেকে ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হওয়া পর্যন্তু যে অসহ্য যন্ত্রণা ও নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট তিলে তিলে ভোগ করতে গিয়ে মানব মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয় সেই অপ্রত্যাশিত অনুভূতিই হলো ট্র্যাজেডি। এরিস্টটলের মতে, ট্র্যাজেডি হলো অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বহির্দ্বন্দ্বে পরাভূত মানবজীবনের করুণ কাহিনী। অর্থাৎ মানুষের দুঃখময় জীবনের করুণ পরিণতি বা ইতিবৃত্তকেই বলা হয় ট্র্যাজেডি। মানবজীবনে ট্র্যাজেডি সৃষ্টি হয় তখনই যখন কোনো শক্তিমান এবং প্রবল ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ অন্তর্ঘাত ও বহির্ঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে করুণ পরিণতি ভোগ করে। এই আঘাত যেকোনো স্থান থেকে আসতে পারে। হতে পারে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, মা-বাবা কিংবা আপনজন অথবা প্রিয়জনের কাছ থেকে। হতে পারে নিজের কোনো ভুলের কারণে অথবা পারিপার্শ্বিক কোনো ঘটনার জন্য কিংবা অদৃষ্টের প্রভাবেও মানবজীবন তিলে তিলে বিনষ্ট হতে পারে।
দুঃখ মানবজীবনে কীভাবে বাসা বাঁধতে পারে এবং সেই দুঃখে মানুষ কীভাবে ট্র্যাজিক চরিত্রে উপনীত হতে থাকে তার দৃষ্টান্ত সাহিত্যের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে। বলা হয় সাহিত্য হলো মানবজীবনের আয়না। সাহিত্যের মাধ্যমে মানবজীবনের ট্র্যাজেডিকে অবলোকন করতে হলে নাট্যসাহিত্যকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। একমাত্র নাটকই পারে ট্র্যাজিক চরিত্রকে পরিপূর্ণরূপে বিকশিত করতে। ট্র্যাজেডি নাটকের রূপরেখা দিতে গিয়ে এরিস্টটল বলেন, Tragedy, then, is an imitation of an action that is serious, complete, and of a certain magnitude;in language embellished with each kind of artistic ornament, the several kinds being found in separate parts of the play; in the form of action, not of narrative; through pity and fear effecting the proper purgation of these emotions. তাই ট্র্যাজেডিকে স্পষ্ট করে তুলতে পারে নাটক। মানবজীবনে ট্র্যাজিডি কিভাবে ঘনীভূত হতে থাকে সেটা স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে পরিবেশন করতে হলে নাটকের বিকল্প আশা করা যায় না। সেজন্যে ট্যাজেডিকে বুঝতে ও বুঝাতে নাটকের শরণাপন্ন হতে হয়। ট্র্যাজিডির স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিস (খ্রি.পূ ৪৯৬-৪০৬) রচনা করেছিলেন ‘দি কিং ইডিপাস’ নাটক। ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬ খ্রি.) রচনা করেছিলেন ‘হ্যামলেট; ম্যাকবেথ’ এবং নরওয়েতে জন্ম নেয়া হেনরিক ইবসেন (১৮২৮-১৯০৬) রচনা করেছিলেন ‘আ ডলস্ হাউজ’।
মানুষ নানাভাবে ট্র্যাজেডির শিকার হতে পারেন। সফোক্লিসের ধারণা মতে, মানুষ নিয়তির ক্রীড়নক। দৈবশক্তির প্রভাবে মানবজীবনে দুঃখের প্রবেশ ঘটতে পারে। তিনি তার নাটক দি কিং ইডিপাসে দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, মানুষ নিয়তির বাইরে একধাপও এগোতে পারেন না। মানুষের অদৃষ্টে যা লেখা রয়েছে তা যেকোনোভাবে ঘটবেই। ‘ইডিপাস’ নাটকের কাহিনীও সেদিকেই অগ্রসর হয়েছে। ইডিপাস রাজা হয়েছেন ঠিকই কিন্তু যখন তিনি জানতে পেরেছেন; যে রাজাকে হত্যা করে তিনি রাজ্যের অধিপতি হয়েছেন সেই রাজা ছিলেন তারই জন্মদাতা পিতা আর যে রানী তার সংসার করছেন তিনিই হলেন ইডিপাসের মা। এই সত্য জানার কারণে ইডিপাসের মধ্যে এক ধরনের ঘৃণা, দুঃখ, কষ্ট, ক্ষোভ ও হতাশার উদ্রেগ ঘটে। ধীরে ধীরে ইডিপাসের জীবনে নেমে আসে কঠিন দুর্যোগ। রাজ্যসিংহাসনচ্যুত হয়ে ইডিপাস নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে থাকেন এবং আত্মগ্লানিতে ভুগতে ভুগতে ইডিপাস একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যান। নিয়তিকে উপেক্ষা করার লক্ষ্যে ইডিপাসের জন্মের পরপরই তার বাবা ইডিপাসকে হত্যার উদ্দেশ্যে মেষপালক ভৃত্যের হাতে তুলে দেন; কিন্তু মেষপালক ইডিপাসকে হত্যা না করে ভিন্ন রাজ্যের শিকারিদের কাছে হস্তান্তর করেন। ইডিপাসের বেঁচে যাওয়ার কারণে দৈববাণীকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা সম্ভব হয়নি আর নিয়তিও ইডিপাসের পিছু ছাড়েনি।
শেক্সপিয়রের ধারণা মতে, মানবজীবনে ট্র্যাজেডি শুধু গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো নিয়তির প্রভাবে ঘটে না; অন্যভাবেও ঘটতে পারে। মানুষ তার নিজের কোনো একটি ভুল বা চারিত্রিক দুর্বলতা সৃষ্টিকরত ট্র্যাজেডির শিকার হতে পারেন। এই মন্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে শেক্সপিয়র তার নাটকের চরিত্র ও ঘটনা গ্রহণ করেছিলেন ইতিহাস থেকে। ইতিহাসের বিখ্যাত চরিত্রগুলোর দুর্বল কোনো বৈশিষ্ট্যের কোটর গলিয়ে ছোট্ট একটি ভুল ঢুকে পড়লে তা ধীরে ধীরে মহীরুহে পরিণত হতে থাকে। সেই ছোট্ট ভুল চরিত্রটিকে পরে ভেতর ও বাহির থেকে তছনছ করে তোলে। নৌকার ক্ষুদ্র একটি ছিদ্র বেয়ে পানি উঠতে উঠতে একসময় সমগ্র নৌকাটিকে যেভাবে নিমজ্জিত করে ফেলে ঠিক তেমনিভাবে একটি ভুল একটি চরিত্রের অনায়াসে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। শেক্সপিয়র তার ওথেলো ও ম্যাকবেথ নাটকে সে অবস্থার রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। ম্যাকবেথ নাটকে দেখা গেছে রাজা ডানকানের রাজ্যে জাতীয় বীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ম্যাকবেথ। তিনি ছিলেন প্রধান সেনাপতি। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারেন একমাত্র প্রধান সেনাপতি বীর ম্যাকবেথ। দেশ রক্ষা করার সব কৃতিত্বই তার। কিন্তু রাজ্যের যাবতীয় সুনাম ও সুবিধা ভোগ করেন রাজা ডানকান। এটি লেডি ম্যাকবেথের ভালো ঠেকল না। লেডি ম্যাকবেথ ভাবল তার স্বামী রাজ্যের প্রধান সেনাপতি এবং জাতীয় বীর। রাজা ডানকানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া তার পক্ষে ক্ষণিকের ব্যাপার। লেডি ম্যাকবেথ আরো ভাবল যদি রাজা ডানকানকে রাজ্যক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া যায় তাহলে খুব সহজেই ম্যাকবেথ রাজা হতে পারবেন আর তিনি হবেন রানী। রানী হওয়ার স্বপ্ন লেডি ম্যাকবেথকে পেয়ে বসল। ডানকানকে হত্যা করতে সে প্রতিনিয়ত স্বামী ম্যাকবেথকে প্ররোচিত করতে লাগলেন। স্ত্রী অনুরক্ত ম্যাকবেথ স্ত্রীর রানী হওয়ার সাধ পূরণ করতে নিরস্ত্র রাজা ডানকানকে হত্যা করে রাজ্যভার গ্রহণ করলেন। কিন্তু বিবেকের কাছে পরাজিত হলেন ম্যাকবেথ। প্রতি রাতে ডানকানের প্রেতাত্মা ম্যাকবেথকে ধিক্কার জানাতে লাগলেন। বিবেকের দংশনে ম্যাকবেথ রাজ্যক্ষমতা ত্যাগ করলেন। ভাবলেন স্ত্রীর কথা শুনে যে ভুল তিনি করলেন তা ক্ষমার অযোগ্য; এ অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয় না। ম্যাকবেথ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। একসময় আত্মহত্যা করে মুক্তি খুঁজলেন। নাটকে লেডি ম্যাকবেথের অবৈধভাবে গ্রণী হওয়ার বাসনা সেনাপতি ম্যাকবেথকে নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে ফেলে ধ্বংস করেছে।
গ্রিক নিয়তি ও শেক্সপিয়রের চারিত্রিক দুর্বলতা ব্যতিরেকেও মানবজীবন যে ট্র্যাজেডি আক্রান্ত হতে পারে তার পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করেছেন ইবসেন। নরওয়ে নাট্যকার হেনরিক ইবসেন তার ‘আ ডল হাউজ’ নাটকে সফোক্লিস ও শেক্সপিয়রের ধারণা ছাড়াও ট্র্যাজেডি সঙ্ঘটিত হওয়ার উপায় দেখিয়েছেন। হেনরিক ইবসেন ছিলেন সমকালীন সমাজ ও সমসাময়িক মানবজীবনের বিশ্লেষক। তিনি দেখালেন পারিপার্শ্বিক একটি ঘটনা কীভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ট্র্যাজেডিতে রূপান্তরিত করতে পারে। তার ‘আ ডল হাউজ’ নাটকের নোরা চরিত্রটি সে ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছে। দ্বন্দ্ব আর সঙ্ঘাতের মধ্য দিয়ে সংসার বেশি দিন টেকে না। নোরার জীবনেও তাই ঘটেছিল। স্বামী, সন্তান ত্যাগ করে পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীতে নোরা মুক্তির আশায় বেরিয়ে পড়েছিল। এতে সমাজের তির্যক দৃষ্টি এসে পড়েছে তার ওপর। তাকে কটাক্ষ্য সহ্য করতে হয়েছে। উপর্যুপরি কটাক্ষ্যের কারণে নোরা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে উঠেছেন। এতে যে দুঃখ তিনি পেয়েছেন তা ট্র্যাজেডির কোনো অংশে কম নয়। সমাজ তাকে পাগল বলেছে।
স্বামী সন্তান সংসারের মায়া ত্যাগ করে একজন নারী যখন অজানাকে জানার উদ্দেশ্যে সংসার ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য হন তখন কতটা ক্ষত তাকে বিচলিত করে তুলতে পারে তা অনুধাবনের বিষয়। এরকম একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলাকে হেনরিক ইবসেন ট্র্যাজেডির কোনো অংশে কম বলে মনে করেন না।

মৃত্যু উপত্যকা: কাশ্মিরের তরুণ ও দুরন্ত দল by ফাহাদ শাহ

তখন ভোর পৌনে ছয়টা। হাজার হাজার মানুষ ছুটছে কম্বলে ঢাকা লাশবাসী একটি খাটিয়ার পেছনে। কেউ পুস্প বর্ষণ করছে লাশের ওপর। খাটিয়ায় করে হিজবুল মুজাহিদিন নেতা বুরহান মুজাফ্ফর ওয়ানির লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল দাফনের জন্য।
২০১৬ সালের ৯ জুলাই সকাল সাড়ে নয়টার দিকে যখন ওয়ানির লাশের জানাজা হচ্ছিল তখনো জানাজার মাঠের দিকে ছুটে আসছিলো হাজার হাজার মানুষ। দুপুর নাগাদ কমব্যাট পোশাকে সজ্জিত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত একদল তরুণকে জনতার সমুদ্রে অবস্থান নিতে দেখা যায়।
শ্রীনগরের ৪২ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তিরল গ্রামে ওয়ানি ছিলো মাত্র ২১ বছরের এক তরুণ। ভারত শাসিত কাশ্মিরে সশস্ত্র স্বাধীনতাকামী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন নেতা ওয়ানি ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক দিতে সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন। তার ছবি ও শানিত বক্তব্যগুলো সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে। ছবিগুলোতে দেখা যায় কোরআন সামনে আর কালাশনিকভ রাইফেল পাশে নিয়ে সহযোদ্ধ পরিবেষ্টিত ওয়ানি ক্যামেরার সামনে বসে আছেন। সেখান থেকে তিনি ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ এবং তরুণ কাশ্মিরিদের অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। সামাজিক গণমাধ্যমে ওয়ানির ডাক তাকে তরুণদের আইকনে পরিণত করে। প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দিতে এগিয়ে আসে নতুন নতুন তরুণ।
ওয়ানি’র জীবনযাত্রাও তার অনুসারিদের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। অথচ একসময় সে ছিলো তিরলের অন্যসব শিশুর মতোই সাধারণ এক শিশু। ছোটদের মতো পথে ঘাটে খেলা করতো। ২০১০ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য তাকে, তার ভাই খালিদ ও আরো তিনজন পথচারিকে অহেতুক মারধর করে। ওই বছরই বিদ্রোহীদের দলে যোগ দেয় সে। তখন সে মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক বালক।
কাশ্মিরিদের সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এটা নিত্যনৈমিত্তিক আচরণ। শুধু ২০১০ সালেই নিরাপত্তা বাহিনী ১২০ বেসামরিক কাশ্মিরিকে গুলি করে মেরেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচারে কাশ্মিরি তরুণরা আজ অতিষ্ঠ। একদিকে ভারতপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত, অন্যদিকে স্বাধীনতাপন্থী দলগুলোর জোট হুরিয়াত কনফারেন্সের আগের সেই বলিষ্ঠতা ও ঐক্য নেই।
এতদিন কাশ্মিরের বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর প্রতিও জনসমর্থন ছিলো কম। কারণ সেগুলোর বেশিরভাগ যোদ্ধা ছিলো উপত্যকার বাইরে থেকে আসা। এর অনেকগুলোর ঘাঁটি পাাকিস্তানে। নয়াদিল্লি ও পাকিস্তান দু’দেশই তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দাবার ছকে কাশ্মিরকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
এই সমস্যার একটি সমাধান খুঁজে পেয়েছিলো ওয়ানি ও তার সহযোদ্ধারা। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা ও সরকারি স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করা। ২০১৩ সাল শেষ হওয়ার আগেই একজন ভয়ংকর ও নির্ভিক যোদ্ধা হিসেবে ওয়ানির নাম কাশ্মিরবাসীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ বছর বয়সে সে কাশ্মিরের আজাদি আন্দোলনের প্রতীক বা ‘পোস্টার বয়’-এ পরিণত হয়। রাজ্যের তরুণদের কাছে সে হয়ে ওঠে প্রতিরোধ আন্দোলনের কাক্সিক্ষত মুখ।
ওয়ানির বিদ্রোহ জীবনকাল ছিলো ছয় বছর। এসময় সে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও প্রতিরোধ দর্শনের অনুরক্ত হয়ে ওঠে।
২০১৬ সালের ৮ জুলাই বিকেলে ভারতীয় সেনারা তাকে গুলি করে হত্যা করে। সরকার সেদিন কাশ্মিরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। এমনকি মোবাইল ফোনের যোগাযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু এতে ওয়ানির মৃত্যু ও জানাজার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায়নি। কাশ্মিরের বিভিন্ন শহর, নগর ও গ্রামে বিক্ষোভ শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ওই দিন আরো ১৬ কাশ্মিরি জীবন দেয়।
ওয়ানি’র মৃত্যুর পরের দিনগুলোতে বিক্ষোভ ও মৃত্যুর মিছিল আরো দীর্ঘ হয়। কাশ্মিরের মানবাধিকার গ্রুপ ‘জম্মু-কাশ্মির কোয়ালিশন অফ সিভিল সোসাইটি’র এক হিসাবে বলা হয়, ২০১৬ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ১৪৫ বেসামরিক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে। আরো ১৫ হাজারের মতো মানুষ আহত হয়েছে। এদের মধ্যে এমন ১০০০ আছে ভারতীয় বাহিনীর পেলেট-বুলেটের ঘায়ে যাদের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।
সহিংসতা শুধু বিক্ষোভে জায়গাগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মানবাধিকার গ্রুপটির হিসাব মতে গত বছর ১৩৮ বিদ্রোহী ও ১০০ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও নিহত হয়। তবে, ভারত সরকারের হিসাবে বিদ্রোহী নিহতের সংখ্যা ১৬৫। যা বিগত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ওয়ানির মৃত্যু উপত্যকার চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তরুণ কাশ্মিরিরা এখন আর প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদিদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করতে ভয় পায় না। তারা বলে, এই বিচ্ছিন্নতাবাদিরাই আমাদের হিরো।
তরুণ বিচ্ছিন্নতাবাদিরা আজ প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করে। হাতে কালাশনিকভ রাইফেল। তারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে জনগণকে স্বাগত জানায়। প্রকাশ্যে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছে। রাতের বেলা গ্রামে গিয়ে থাকতেও ভয় পাচ্ছে না।
বিচ্ছিন্নতাবাদি আছে জানার পরও তাদের পাকরাও করতে ভারতীয় বাহিনীর পক্ষে কোথাও অভিযান চালানো দুরুহ হয়ে উঠেছে। সেনা অভিযান শুরু হলে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তারা বিদ্রোহীদের পক্ষে স্লোগান দেয়, তাদেরকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। বিদ্রোহীদের সহায়তার জন্য তরুণরা একটি নিজস্ব গোয়েন্দা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এর ফলে বিদ্রোহীরা নিরাপদে চলাফেরা করার সুযোগ পাচ্ছে।
ওয়ানির পর আরো বেশ কয়েকজন স্বাধীনতাকামীকে হত্যা করেছে ভারতীয় সেনারা। প্রতিটি হত্যার পর উপত্যকা আগের চেয়ে আরো বেশি উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রতিটি তরুণ কাশ্মিরির অন্তর এখন স্বাধীনতাকামী হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পরিপুষ্ট।
[লেখক একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, লেখাটি ‘দি হেরাল্ড’ পত্রিকার জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে]
কাশ্মিরের পুলওয়ামা জেলায় গাছে চড়ে হিজবুল মুজহিদিন নেতার দাফন দেখছে মানুষ