Saturday, July 19, 2014

রানা প্লাজা-তহবিল আছে ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে না by আলী ইদরিস

এক বছর তিন মাস পূর্বে ১৪ই এপ্রিল ২০১৩ তারিখে সংঘটিত দেশের পোশাক শিল্পের সবচে’ বড় ও সবচে’ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১,১৩৬ জন মারা যায় এবং প্রায় ৩,০০০ শ্রমিক আংশিক বা চিরতরে পঙ্গু হয়। এ দুর্ঘটনা দেশের তথা পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এ বদনাম ঘুচাতে  যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দোষীদের বিচার সম্পন্ন করে এবং মৃত ও আহতদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা উচিত ছিল। কিন্তু আজ ১৫ মাস পার হতে চললো এখনও বিচার শেষ হয়নি। মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি, ভাগ্যবান শিল্পপতি রানাকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দেয়া হয়েছিল। মিডিয়া ও সুশীল সমাজের হৈচৈ দেখে অবশেষে রানার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন কতদিনে বিচার শেষ হয় সেটা দেখার বিষয়। রানা প্লাজা ধসে দোষীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। প্রথমত দেশের তথা সর্ববৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা, দ্বিতীয়ত দোষীদের শাস্তি হলে পোশাক শিল্পের মালিকরা শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও সতর্ক হতো। তৃতীয়ত, মৃতের জন্য  সন্তান হারা মা, স্বামী হারা স্ত্রী, স্ত্রীহারা স্বামী, সহোদর ও আত্মীয়দের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হতো। ক্ষতিপূরণ প্রদানে বিলম্বের জন্য এ দুর্ঘটনার ভুক্তভোগীরা অর্থাভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। আইএলও নেতৃত্বাধীন রানা প্লাজা এরেঞ্জম্যান্ট কো-অরডিনেশন কমিটির তহবিলে ১৪১ কোটি টাকা এ যাবত জমা পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে জনসাধারণের দানকৃত ১২৭ কোটি থেকে ২২ কোটি খরচ করার পর ১০৫ কোটি টাকা জমা আছে। এদিকে বৃটিশ সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী ২৯ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে ট্রাস্ট ফান্ডে ক্ষতিপূরণ জমা দেয়ার কথা থাকলেও ১৬ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান কোন অর্থ দেয়নি, বাকিরা ৪ঠা জুলাই পর্যন্ত ১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার অর্থাৎ ১৪১.৬ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। ক্রেতাদের মধ্যে একমাত্র আয়ারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান প্রাইমার্ক ৬৩৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিককে ৯ মাসের বেতন দিয়েছে এবং রানা প্লাজার দ্বিতীয় তলার নিউ ওয়েভ বটম শ্রমিকদের জন্য ৯০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ জমা দিয়েছে। মোট ক্ষতিপূরণের জন্য প্রয়োজন নাকি ৩২০ কোটি টাকা। কো-অর্ডিনেশন কমিটির তহবিলে ১৪১ কোটি ও প্রধানমন্ত্রীর তহিবলে ১০৫ কোটি ও ট্রাস্ট ফান্ডে জমা ১৪১.৬ কোটির মোট যোগফল দাড়ায় ৩৮৭ কোটি টাকা। তাহলে আমার অংক কষায় ভুল না হয়ে থাকলে ফান্ডের অভাব নেই। প্রধানমন্ত্রীর তহবিল বাদ দিলে এখানে কাজ করছে আরও চারটি কমিটি, আইএলওর নেতৃত্বাধীন কো-অর্ডিনেশন কমিটি, রানা প্ল্লাজা ডনরস ট্রাস্ট ফান্ড, সাভার সেনানিবাসে রানা প্লাজা ক্লেইমস এডমিনিস্ট্রেশন কমিটি এবং মাননীয় হাইকোর্ট কর্তৃক গঠিত উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি যারা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। শেষোক্ত কমিটিতে আবার উপ-কমিটিও আছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সাভার ক্যান্টনম্যান্টের ক্লেইমস এডমিনিস্ট্রেশন কমিটির কাজ এখনও অনেক বাকি। হতাহত ও নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনরা এখানে গিয়ে নির্দিষ্ট ক্লেইম ফরম পূরণ করেন যা প্রাথমিকভাবে যাচাই করে উত্তরাধিকারী বা স্বজনের নামে একটি ব্যাংক হিসাব  খুলে দেয়া হয়। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২,৭৬৩ জন হতাহতের স্বজনদের ক্লেইম ফরম পূরণ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ৬৬০ জন নিহত। তাহলে নিহতের মধ্যে আরও বাকি আছে ৪৭৬ জন এবং আহত, পঙ্গুদের মধ্যে বাকি আছে অনুমানিক আরও ৯০০ জন। ১৫ মাসে যদি এতটুকু কাজ হয়ে থাকে তাহলে অবশিষ্ট কাজ কবে শেষ হবে, সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। দাবি ফরম পূরণ করে প্রকৃত দাবিদারদের তালিকা তৈরির কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালিকায় উল্লিখিত মৃত, আহত, পঙ্গু ও নিখোঁজ শ্রমিকদের শ্রেণীওয়ারী সংখ্যার উপর ভিত্তি করেই বিদ্যমান তহবিল বরাদ্দ ও বিতরণ করা উচিত। এ তালিকাই যদি চূড়ান্ত করা না হলো, তাহলে ক্ষতিপূরণের হার, পরিমাণ ইত্যাদি নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। অনেক মৃত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের অশিক্ষিত স্বজনরা হয়তো ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয়। তাই তারা সেনানিবাসের কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফরম পূরণ করতে পারছে না। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত নিয়োগকর্তা, বিজিএমইএ উদ্ধারকারী সেনাবাহিনী, দমকল বিভাগ, আশপাশের বাড়িওয়ালা, এদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য ঠিকানায় সার্ভে টিম পাঠিয়ে মৃত ও নিখোঁজদের স্বজনদের নাম-ঠিকানা বের করা। নইলে অশনাক্ত মৃত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের উত্তরাধিকারীরা ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হবে। এদের খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্ব। এ ব্যাপারে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে বিজ্ঞাপন দেয়া উচিত। দাবিদারদের তালিকা চূড়ান্ত কারাটাই এখন প্রধান ও একমাত্র কাজ বলে আমি মনে করি। এরপরই সব কমিটির সুপারিশ নিয়ে একসঙ্গে বসে বিদ্যমান তহবিলের পরিমাণ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের হার নির্ধারণ করা উচিত। ভবিষ্যতে আরও তহবিল আসতে পারে, সেটা ক্রেতাদের কাছ থেকে হোক বা বিচারকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর দোষীদের কাছ থেকে হোক। সেটার জন্য অপেক্ষা না করে বিদ্যমান তহবিল থেকে নির্ধারিত হারে অতি সত্বর ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত স্বজনরা যারা তিন বেলা আহারের জন্য হতাহত শ্রমিকদের আয়ের ওপর নির্ভর করতো, তাদের উপোস করা বন্ধ হবে।

খেলা এবং খেলা by ড. মাহফুজ পারভেজ

রক্তে শিহরণ জাগানো বিশ্বকাপ ফুটবলের তীব্র উন্মাদনার মধ্যে রক্তের খেলা চলছে ফিলিস্তিনের গাজায়। ফুটবল খেলা শেষ হলেও রক্তের খেলা বন্ধ হয়নি। বরং অস্ত্র বিরতির জন্য আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে ইসরাইল উলটো গাজায় বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর নিজেদের বোমা হামলার পরিধি আরও বাড়িেেয়ছ। দফায় দফায় হামলায় অকাতরে মরছে শ’ শ’ ফিলিস্তিনি মুসলমান। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ইসরাইলি স্থল অভিযানে প্রায় ১৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে রক্তের খেলা আর মাঠের খেলার মধ্যে পার্থক্য করতে পারছে না অনেক মানুষই। মানবিক বোধ ভোঁতা হয়ে যাওয়ায় নেশার মতো খেলায় মেতে আছে অনেক আসক্ত। আসক্ত বললাম এজন্য যে, আগ্রহ যখন মাত্রা ছাড়ায়, তখন সেটা আসক্তিই বটে। খেলার জন্য মরে যাওয়া, দলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে জখম হওয়া, রাত-দিন দলের জন্য উন্মাদ হওয়া আসক্তি বৈকি। যে সব দেশকে সমর্থন করতে জার্সি গায়ে দিয়ে বা বিশাল বিশাল পতাকা উড়ানো হয়েছে, সেসব দেশ নিজেরাও এত আদিখ্যেতা করে বলে মনে হয় না। এই অন্ধ অনুসরণ ও উল্লম্ফনের পরিণতি কোথায় কে জানে?
বাংলাদেশে আবেগ ও উত্তেজনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নেশা ধরিয়ে দেয়া এক অতি সহজ ব্যাপার। রাজনীতি থেকে খেলা বা গুজবে এদেশে মানুষ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ঘরে ভাত নেই, পরনে কাপড় নেই, তবু ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা মাথায় পাগড়ির মতো বেঁধে পথে পথে নাচছে, এমন লোকের অভাব এদেশে নেই। এমনই হলো এদেশের অবস্থা। খেলার উত্তেজনায় দেশের বাইরে গাজায় কি হলো বা আমাদের নিজের দেশ সমুদ্রসীমায় কি পেলো বা হারালো, দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে কি হলো, সেসবও জানার ফুরসত নেই কারও। প্রয়োজনও নেই অনেকের। এমনই এক দেশদর্শিতায় চলছে সবাই।

সমাজবিজ্ঞানীরা হয়ত গবেষণা করে অতি-আবেগ, অতি-উগ্রতার ব্যাখ্যা করতে পারবেন। বলতে পারবেন, কেন এদেশের মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজ আবেগ ও উত্তেজনার নেশায় মাতাল হয়ে ওঠে। যুক্তি ও আবেগের মধ্যে বিরাট ফারাক এদেশে সব সময়ই দেখা যাচ্ছে। ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’, এ তত্ত্ব এদেশে মানা হয় না। এদেশে মানা হয়, লাফ দিয়ে আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ার তত্ত্ব। সমাজে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, সংস্কৃতিতে দাপাদাপি-ঝাঁপাঝাঁপির দিন চলছে। যে যার মতো বাহাদুরি, নর্দন-কুর্দন করেই মাত করছে সবাইকে আর পাচ্ছে বাহবাও। যে লোকটি নিরন্নকে আহার দিচ্ছে, এদেশে তার কথা কেউ বলে না, কিন্তু যে এক মাইল লম্বা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা তৈরি করেছে, তাকে নিয়ে লম্ফঝম্পের শেষ নেই।
আসলে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের চিন্তা-চেতনা-দর্শনের জায়গাটুকু ক্রমেই ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। এক সময় বুঝে বা না বুঝে সমাজতন্ত্রের বৈপ্লবিক লাল মরীচিকার পেছনে এদেশের তরুণদের ছোটানো হয়েছে। তারপর ধাওয়া করা হয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদের পেছনে। এখন পশ্চিমা সমাজের নানা লারে-লাম্পা মার্কা কোকাকোলা সংস্কৃতি আর ব্যক্তিগত ভোগবাদের পেছনে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে তরুণ-তরুণীদের। ইউরোপ, আমেরিকা আর ভারতের দোকানদাররা কনজিউমারিজমের ধাক্কায় বেসামাল করে ফেলেছে তরুণ, উঠতি বয়সী, স্বল্পশিক্ষিত তরুণ-তরুণীকে। বাংলাদেশে এরাই সংখ্যায় বেশি। এরাই এখন সমাজ ও সংস্কৃতির নিয়ামক। পুরাতন প্রথা, প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ ভেঙে চলাই তাদের নিয়ম। এটা ঠিক যে, যে কোন দেশ বা সমাজের জন্য তরুণ-তরুণীরাই প্রধান শক্তি। এরাই সমাজ ও প্রগতির বাহন। কিন্তু এরা যদি কেবল ভোগ ও উৎসবে মগ্ন থাকে, তাহলে দেশের স্বার্থ দেখবে কে? দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের কবল থেকে সমাজ ও মানুষকে বাঁচাবে কে? নতুন প্রজন্মকে কেবলমাত্র ব্যবসা প্রশাসন আর নানা উৎসবের জালে আটকে ফেললে ধর্ম, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ ইত্যাদি সম্পর্কে অজ্ঞ রাখা হলে একদিকে মাঠের খেলা আর অন্যদিকে রক্তের খেলা চলতেই থাকবে আর আমরা আসল খেলাটি ধরতে বা বুঝতেই পারব না। যে রক্ত গাজায়, ফিলিস্তিনে, ইরাকে, সিরিয়ায়, আফগানিস্তানে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, সে রক্ত ভাসিয়ে দিচ্ছে বিশ্বের গণতন্ত্রকে, মুসলিম জাতিসত্তাকে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রশ্নে বা মুসলমানদের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চারও হওয়া যাচ্ছে না প্রতিপক্ষের মৌলবাদ, যুদ্ধাপরাধী ইত্যাদি চাপিয়ে দেয়া মিথ্যা আরোপ ও অপপ্রচারের কারণে। এখানেও অন্ধ আবেগ আর উগ্রতার বিজয় এবং যুক্তির পরাজয়। কোথাও আইন, যুক্তি, সাক্ষ্য, তথ্য, উপাত্ত ইত্যাদি সম্পর্কে কাউকেই অবহিত করা যাচ্ছে না। দেখবো না, শুনবো না বলে অন্ধ ও বধির আবেগে ঘাড় শক্ত করে রেখেছে অনেকেই। অতএব বিশ্বকাপের খেলা আর রক্তের খেলার প্রবল বিপরীতমুখী বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি যে, পুরো দুনিয়া এবং আমাদের আশপাশ ভেসে যাচ্ছে আবেগে। আবেগ আর যুক্তির লড়াইয়ে খুব কম মানুষই যুক্তি, সত্য, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারছেন। সবাই গা ভাসিয়ে দিচ্ছে চলতি হাওয়ার মাতাল উন্মাদনায়। এরই অন্য নাম গড্ডালিকা প্রবাহ। দুঃখের বিষয়, অতি-উচ্চস্তরের নেতা-নেত্রীরা হামেলিনের বংশীবাদকের মতো যে উত্তেজনা আর আবেগের মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাতে যুক্তি, বুদ্ধি, আইন ও বিবেকের স্থান নেই বললেই চলে। ফলে রক্তের খেলা আর মাঠের খেলার পার্থক্য করতে পারছে না মানুষ। মাঠের খেলা দেখে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বের মাটি ভিজে যাচ্ছে রক্তে। বিপদ দ্রুত ঘনিয়ে আসতে থাকছে আমাদের দিকেও। অতএব, খেলা শুধু খেলা নয়, ভাবারও বিষয়।

আমরা যাবো কোথায়? by শামীমুল হক

ঘরে থাকবো? চারদিকে বিল্ডিং বানানোর যন্ত্রের শব্দ কান স্তব্ধ করে দিচ্ছে। যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছে মন। গড় গড় শব্দে শুতে গেলে ঘুম আসে না। রোজার দিনে কি আর করা? বাইরে যাবেন? এ-ও কি সম্ভব? যানজটে কেটে যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ৫ মিনিটের পথ যেতে লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। ট্রাফিক পুলিশ কি আছে? নাহ! আছে। তবে তারাও যানজটে কাহিল। হাত আর নড়ছে না। মুখের বাঁশি আর বাজছে না। বেচারা ট্রাফিক পুলিশ অগত্যা দেখেও না দেখার ভান করে রাস্তার পাশে গিয়ে আশ্রয় নেয়। মানুষ রাগে ক্ষোভে ট্রাফিক বেটার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করছে। ট্রাফিক পুলিশেরই বা দোষ কোথায়? আমরাই-বা কতটুকু সুশৃঙ্খল? উল্টোপথে গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে ভিআইপি রোডে বসানো হয়েছিল গাড়ির চাকা ফুটো হয়ে যাওয়ার যন্ত্র। এক সপ্তাহও কাটেনি। যন্ত্র উধাও। আমরা চলছি উল্টো পথে। সোজা পথে তো আর চলা যাচ্ছে না। তাহলে কোথায় আছে শৃঙ্খলা? হাসপাতালে যাবেন? সেখানেও একই অবস্থা। বেডে জায়গা হয়নি তো ফ্লোরে, ফ্লোরে জায়গা হয়নি তো কি হয়েছে। বারান্দা তো আছে। সেখানেও জায়গা নেই। তাহলে? কিচ্ছু করার নেই- মানুষ চলাচলের পথে বিছানা ফেলে শুইয়ে দেন রোগীকে। ডাক্তার আসুক আর না আসুক ঠাঁই হয়ে গেল। সুখের আশায় নদীর তীরে গিয়ে একটু ঘুরে এলে কেমন হয়? দখিনা বাতাসে মনকে রাঙিয়ে আসা যাবে। কিন্তু সেখানে একি দেখছি। তীরে দাঁড়াতেই পানির পচা গন্ধ। পানির রঙ বদলে কালচে হয়ে গেছে। কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য আর রাজধানীর সুয়ারেজ লাইন গিয়ে মিশেছে বুুড়িগঙ্গা নদীতে। তাই বুড়িগঙ্গার পানি এখন আর পানি নেই। ওই পানি এখন বিষ। তাহলে কি করা? রাজধানীর পাশের এক কালে যে নদীর পানি পান করে মানুষ তৃপ্ত হতো, দেশ-বিদেশে যে নদীর পানি সুখ্যাতি পেয়েছিল, শীতল পানি আর শান্ত লক্ষ্মী বলে যে নদীর নাম দেয়া হয়েছিল শীতলক্ষ্যা- সেই নদীর তীরে যাবেন? সেখানে গিয়েও দুঃখ পাবেন। কারণ শীতলক্ষ্যা এখন আর শীতলক্ষ্যা নেই। শীতলক্ষ্যার পানি এখন খাওয়া তো দূরের কথা ছুঁলেই হাত জ্বালাপোড়া করে। লাশের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে শীতলক্ষ্যা। প্রতিদিনই নদীতে ভেসে উঠছে লাশ। সর্বশেষ দেশব্যাপী আলোচিত নারায়ণগঞ্জের ৭ হত্যাকাণ্ড শীতলক্ষ্যাই তুলে আনে সবার সামনে। ঘাতকরা লাশগুলো ইট বেঁধে ডুবিয়ে দিয়েছিল পানিতে। কিন্তু শীতলক্ষ্যা নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে বেইমানি করেনি। লাশ তার পেটে রাখেনি। ভাসিয়ে দিয়েছে। মানুষ হতবাক হয়েছে নির্মমতা দেখে। তাহলে দেশের কোথাও কি শান্তির জায়গা নেই? কেন! কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত ঘুরে আসতে পারেন যে কেউ। না সেখানেও ঘাতক হাঁ করে বসে আছে। ক’দিন পর পরই সাগর ভাসিয়ে নিচ্ছে অনেক স্বপ্নকে। শুধুমাত্র চরম উদাসীনতায় একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। তারপরও কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বিপজ্জনক স্থান চিহ্নিত করে সেখানে না যাওয়ার কোন নোটিশও দিচ্ছে না। কাজেই সাগরও ভয়ানক। যে কোন সময় হতে পারে মৃত্যুগহ্বর। তাহলে? নিরাপদ কোথায়? মায়ের কোল? না সেখানেও আজকাল নিরাপদ নয় শিশু। সন্ত্রাসী, ঘাতক চক্র, হাসপাতালের দালাল চক্রও রক্তচক্ষু দিয়ে তাকিয়ে আছে। মা-ও তার সন্তানকে রক্ষা করতে পারছে না। কান্নাই হয় মায়ের সম্বল। মানুষ জন্মের সময়ই মৃত্যুকে সঙ্গী করে নিয়ে আসে। কিন্তু অকাল মৃত্যু, ঘাতকের হাতে মৃত্যু, নৃশংস ও নির্মম মৃত্যু কোন মানুষই কামনা করে না। তবে কেন সমাজে এসব ঘটনা ঘটছে? নিরাপত্তা দেয়া যাদের দায়িত্ব সেই থানা পুলিশও এখন আরেক আজরাইল হয়ে দেখা দেয় কারও কারও জীবনে। কথায় বলে বাঘে ছুঁলে এক ঘা, পুলিশে ছুঁলে আঠার ঘা। তবে দুয়েকজন ভাল পুলিশ যে নেই তা নয়। তাদের কারণেই হয়তো এখনও পুলিশ বিভাগের প্রতি কারও কারও আস্থা রয়েছে। তবে বেশির ভাগ মানুষের পুলিশ নিয়ে অভিজ্ঞতা বড় নির্মম। ধর্ষক পুলিশ, খুনি পুলিশ, ডাকাত পুলিশ, চোর পুলিশ, ছিনতাইকারী পুলিশও দেখেছি আমরা। আর বারবার পুলিশ বিভাগ লজ্জিত হয়েছে। তারপরও পুলিশ বিভাগ কি পেরেছে তাদের মাঝে শুদ্ধতা ফিরিয়ে আনতে? রমজান মাসে এই যে এত বাহারি খাবার খাচ্ছে রোজাদাররা- এর কয়টি বিশুদ্ধ খাবার? এমনিতেই সব ফলমূলে দেয়া হচ্ছে ফরমালিন। মাছ খাবেন সেখানেও একই অবস্থা। ফরমালিনযুক্ত খাবার খেতে খেতে মানুষের গোটা শরীরই ফরমালিন হয়ে গেছে। বাজেট অধিবেশনে দাঁড়িয়ে বিরোধীনেত্রী বেগম রওশন এরশাদ বলেছেন, যে পানি আমরা খাচ্ছি সেখানেও ভেজাল। এই ভেজাল খাবার খেতে খেতে এমন হবে যে এক সময় লাশও পচবে না। কারণ মানুষের গোটা শরীরই হয়ে গেছে ফরমালিনে আক্রান্ত। যেমন অতিরিক্ত নেশাখোরদের নাকি সাপে কামরালেও বিষ ধরে না। কারণ তাদের গোটা শরীর নেশার বিষে বিষাক্ত হয়ে পড়ে। যে বিষ সাপের বিষের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তাহলে দাঁড়ালো কি? কোথাও শান্তি নেই। কি ঘরে, কি বাইরে। খাবারেও বিষ। আসলে মানুষ গোটা দেশটাকেই বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। কৃষক এখন আর প্রাকৃতিক সার ব্যবহার করে না। গোবর, ছাই বাদ দিয়ে অতিরিক্ত সার ও পোকা মারার বিষ ব্যবহার করছে। এক সময় ভাবা হতো, গ্রামে উৎপাদিত শাক-সবজি, ফলমূল, মাছ বিষমুক্ত। হাল আমলে তা-ও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এ অবস্থা হলে আমরা যাবো কোথায়? এখন আন্দোলনে নামা প্রয়োজন বিষমুক্ত সমাজ গঠনে। এ আন্দোলনে নিজের প্রয়োজনেই শরিক হবেন সবাই।

কোহলির ৪২ দিনের ডেটিং সঙ্গী হলেন আনুশকা শর্মা

নায়িকা আনুশকা শর্মার সঙ্গে ভারতের তরুণ ক্রিকেটার বিরাট কোহলির ডেটিং নিয়ে অনেক কথাই শোনা গেছে এযাবৎ। এবার কোহলি তার ৪২ দিনের ইংল্যান্ড সফরে সঙ্গী হিসেবে নিয়ে গেছেন আনুশকাকেও। সব শুটিং বাতিল করে আনুশকা এখন বিরাটের পাশে। ভারতীয় ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। এমনিতেই ভারতীয় দল বিদেশ সফরে গেলে তাদের সঙ্গে স্ত্রীদেরও যেতে দেয়া হয় না। কিন্তু এবার স্ত্রী পুত্র ছাড়াও বান্ধবীকেও ক্রিকেটারদের সঙ্গে যাওয়ার খবরে বেশ কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিজয়, তেজেন্দ্র পূজারা, গৌতম গম্ভীরদের স্ত্রী সন্তানরা ছাড়াও এবার বিরাট কোহলির সঙ্গী হয়েছেন বান্ধবী আনুশকা। এই মুহূর্তে নটিংহামের হোটেলে রয়েছেন দু’জনে। অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, আনুশকাকে বান্ধবী হিসেবে সঙ্গে করে নেয়ার আগে কোহলি ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড তথা বিসিসিআই’র অনুমতি নিয়েছেন। ভারতীয় দল ৫ টেস্টের সিরিজ খেলতে ইংল্যান্ড সফরে গেছে। ৪২ দিন তারা সেখানকার বিভিন্ন শহরে খেলবেন। তবে আনুশকাকে বান্ধবী হিসেবে কোহলির সঙ্গী করা নিয়েই প্রবল আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, বিসিসিআই এতোটা সাহসী হয়ে উঠল কী করে? অন্যদিকে বলিউডেও আনুশকার এই অভিসার নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সবকিছু বাতিল করে আনুশকার ইংল্যান্ড যাওয়া কি প্রমাণ করছে কোহলির সঙ্গে তার সম্পর্ক একটি মাত্রা পেতে চলেছে?

চলে যাওয়া মানে ভুলে যাওয়া নয় by সাজেদুল হক

সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি পরিণত হয়েছিলেন জীবনশিল্পীতে। সমালোচনার বান উপেক্ষা করে লিখে গেছেন অবিরাম। দুঃসময়েও গেয়েছেন জীবনের জয়গান। সব সময় বিশ্বাস স্থাপন করেছেন মানুষের অসীম ক্ষমতার প্রতি। অন্ধকার তার লেখায় সেভাবে আসেনি। তিনি ছিলেন আলোর পূজারি। যা তাকে এনে দেয় বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের খেতাব। চাঁদনি রাতে চন্দ্রকারিগরের কাছে যেতে চেয়েছিলেন হুমায়ূন। যদিও বাংলার সবুজ শ্যামল মাটি থেকে বহুদূরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু এসে নিয়ে যায় তাকে। ক্যালেন্ডারে ১৯শে জুলাই ২০১২। সে সময় পুরো বাংলাদেশই যেন শোকে কাতর হয়ে পড়েছিল। এক সাহিত্যিকের জন্য পুরো জাতি-রাষ্ট্রের এভাবে শোকাতুর হয়ে পড়া ছিল একেবারেই অভিনব। একটি কফিনের পাশে বাংলাদেশ- সংবাদপত্রের সে শিরোনাম ভোলার নয়। যেন মৃত্যুও তাকে মহিমান্বিত করেছিল। নুহাশ পল্লীর শ্যামল বুকে ঠাঁই হয় হুমায়ূন আহমেদের। মৃত্যুকালে মানুষ হুমায়ূন আহমেদের বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর আর লেখক হুমায়ূন বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরই সমবয়সী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলে যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের এক নতুন অধ্যায়ের। নন্দিত নরকের লেখক এরপর এগিয়ে যান ক্রমান্বয়ে। পাঠকপ্রিয়তায় একে একে পিছনে ফেলেন সব রথী-মহারথীকে। তিনি যেন রূপকথার সে রাজপুত্র- যখন যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। ৩২৩টির বেশি গ্রন্থে হুমায়ূন বয়ান করেছেন মধ্যবিত্ত বাঙালি সুখ-দুঃখ, হাসি আর আনন্দ-বেদনার কাহিনী। বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের কাহিনী, কখনও কখনও গ্রামের গল্প আর মুক্তিযুদ্ধ বারবার ফিরে এসেছে তার লেখায়। মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক হুমায়ূনের লেখায়ও ধর্মও উপেক্ষিত ছিল না। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বহু বাণি খুঁজে পাওয়া যাবে তার লেখায়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পিতার সন্তান জোছনা আর জননীর গল্প লিখে শোধ করেছেন মাতৃভূমির ঋণ। মৃত্যুরও বহু আগে একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বারবার তার একটি কথাই মনে হয় সুযোগ পেলে জন্মভূমির ঋণ শোধের বয়ান লিখবেন তিনি। বাদশা নামদার, মাতাল হাওয়া আর দেয়ালে বাঙালির ভুলে যাওয়া ইতিহাস তিনি সামনে নিয়ে আসেন। নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয়তায় ছাড়িয়ে যান কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকেও। বাকের ভাইয়ের স্রষ্টা চীরদিনই বেঁচে থাকবেন। নাটকের একটি চরিত্রকে বাঁচানোর জন্য রাজপথে মিছিল বের করেছেন মানুষ- সে বিস্ময়কর দৃশ্য কে-ই বা ভুলতে পারবেন। সিনেমা নির্মাণে হাত দিয়েও সফলতার দেখা পান হুমায়ূন। বাঙালি মধ্যবিত্তকে আবার সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনেন তিনি। ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে বিতর্কও ছিল। বিশেষ করে গুলতেকিনের সঙ্গে বিচ্ছেদ আর শাওনের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা হয় তার। মহত্ত্ব সম্পর্কে উইলিয়াম শেকসপিয়ারের বিখ্যাত উক্তি- কেউ মহান হয়ে জন্ম নেয়, কেউ মহত্ত্ব অর্জন করে আর কারও ওপর মহত্ত্ব আরোপ করা হয়। হুমায়ূন আহমেদ কি মহান লেখক ছিলেন? না কি তিনি শুধুই জনপ্রিয় লেখক। এ নিয়ে হয়তো বিতর্ক চলতেই থাকবে। হুমায়ূনের জীবদ্দশাতেও অবশ্য এ প্রশ্ন  ছিল। অনেক প-িতরাই রায় দিয়েছিলেন- হুমায়ূন আহমেদের লেখা টিকবে না। যদিও জীবদ্দশাতে লেখা টিকে থাকাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন হুমায়ূন। পরম করুণাময়ের কাছে এর বেশি কিছু চাননি তিনি। লেখক হিসেবে নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ কৌতুক করে লিখেছেন, ‘এডগার এলেন পো কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, একজন বড় লেখক হতে হলে কী লাগে? তিনি জবাব দিলেন, একটা বড় ডাস্টবিন লাগে। লেখা নামক যেসব আবর্জনা তৈরি হবে তা ফেলে দেয়ার জন্য। লেখকরা ক্রমাগত আবর্জনা তৈরি করেন। নিজেরা তা বুঝতে পারেন না। একজীবনে আমি কি পরিমাণ আবর্জনা তৈরি করেছি ভেবেই শঙ্কিত বোধ করছি।’ একথা সত্য মহাকালের উঁইপোকা এরই মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের লেখায় দাঁত বসাতে শুরু করেছে। কিন্তু এ সত্য অস্বীকার করার জো নেই, হুমায়ূনের বহু লেখারই কাল উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মহাত্মা জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মতো মানুষও হুমায়ূন আহমেদের লেখায় মুগ্ধ ছিলেন। চন্দ্র কারিগরের কাছে কেমন আছেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি কি সত্যি হারিয়ে গেছেন। না মিসির আলী, হিমু, রূপা, শুভ্রের বেশে জোছনা রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তার প্রিয় বাংলাদেশে। ভক্তরা গভীর জোছনা অথবা তীব্র রোদে খুঁজে বেড়ায় তাদের প্রিয় মানুষটিকে। নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে। প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন।
>>গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত। ছবি: মাসুদ রানা, প্রথম আলো, গাজীপুর

নিজের যৌনাঙ্গ কর্তন ও নিজেকে ‘ঈশ্বর’ দাবি

র‌্যাপ সংগীতজ্ঞ আন্দ্রে জনসন ভয়াবহ এক কাণ্ড ঘটিয়ে সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে, আত্মহত্যার চেষ্টার সময় তিনি নিজের গোপনাঙ্গ নিজ হাতে কর্তন করেছেন। এরপর লস অ্যাঞ্জেলেসের যে ভবনে তিনি থাকেন, সেখান থেকে নিচে লাফিয়ে পড়েছেন। তবে বেঁচে গেছেন। এখানেই শেষ নয়। তিনি নিজেকে ঈশ্বর দাবি করে ইন্টারনেটে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। অবশ্য, ওই র‌্যাপার বলছিলেন, তিনি আত্মহত্যা করতে চাননি। শুধু বিশেষ অঙ্গটিই কেটে ফেলতে চেয়েছিলেন। তার মনে হচ্ছিল, এটাই সব সমস্যার মূল ছিল। আন্দ্রে জনসনের বদ্ধমূল ধারণা, যৌনতা শুধুই মরণশীলদের জন্য। তার দাবি তিনি ‘ঈশ্বর’। এ খবর দিয়েছে অনলাইন মিড-ডে। সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইটগুলোতে সবচেয়ে ঝড় তুলেছে এ খবর। জনসন অবশ্য স্বীকার করেছেন, এ ঘটনার সময় তিনি মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন। তবে তিনি যা করছিলেন, তা সম্পূর্ণ সচেতনভাবেই করেছেন বলে মন্তব্য করেন। স্টেজে সাধারণ তিনি ক্রাইস্ট বেয়ারার নামে পারফর্ম করেন এবং তার ব্যান্ড নর্থস্টার উ-ট্যাং ক্ল্যানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তিনি বলছিলেন, তিনি যে নিজেকে ঈশ্বর মনে করেন সে সম্পর্কে আগে কোন কথা বলেননি, কারণ মানুষ তাকে পাগল বা উন্মাদ মনে করতো। কিন্তু, এখন নিজেকে তিনি জীবিত ও প্রাণবন্ত অনুভব করছেন। সেখানে যৌনাঙ্গ থাকা বা না থাকাটা কোন বিষয়ই নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি চিন্তার এমন একটি স্তরে বাস করছেন, যেখানে বিশ্বাসের ভিত্তিটা একটু বেশিই বেশ দৃঢ়।

গাজায় নিহতের সংখ্যা ৩০০ পেরিয়েছে

ফিলিস্তিন-শাসিত গাজায় আজ শনিবার ইসরায়েলের নতুন করে শুরু হওয়া বিমান হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছে। এই নিয়ে গত ১২ দিনে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৩০০ পেরিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুদ্ধবিরতিতে উভয় পক্ষকে রাজি করাতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আজ ওই অঞ্চলে সফরে যাচ্ছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন।
গাজায় ইসরায়েলের প্রায় একতরফা হামলা আজ দ্বাদশ দিনে গড়িয়েছে। ভোরে খান ইউনিস শহরে একটি মসজিদের বাইরে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে সাতজন নিহত হয়। এরপর গাজায় আরও হামলা হয়। এতে চারজন নিহত হয়।
আজকের ঘটনা নিয়ে গত ১২ দিনে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৩০৭ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছে দুই সহস্রাধিক ফিলিস্তিনি। হতাহত ব্যক্তিদের অধিকাংশ বেসামরিক নাগরিক। তাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে।
অপর দিকে চলমান সংঘাতে এ পর্যন্ত দুজন ইসরায়েলি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েকজন।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে গতকাল শুক্রবার বলা হয়েছে, চলমান সহিংসতা বন্ধে উভয় পক্ষকে একটি সমঝোতায় আনার লক্ষ্যে সংস্থাটির মহাসচিব বান কি মুন আজ ওই অঞ্চল সফরে যাচ্ছেন।
নিজেকে রক্ষার ব্যাপারে ইসরায়েলের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তবে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এড়াতে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

গাজা উপত্যকায় গতকাল আবার স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। যুদ্ধবিমান ও সামরিক হেলিকপ্টারের সহায়তা নিয়ে স্থলবাহিনীর ওই অভিযানে গতকালও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। প্রাণ বাঁচাতে গাজার বাসিন্দারা বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন।

এর আগে ১৩ জুলাই দিবাগত রাত থেকে প্রথম গাজায় স্থল অভিযান শুরু করেছিল ইসরায়েলি নৌ কমান্ডোরা। এক দিন পরই ওই স্থল হামলা স্থগিত করা হয়েছিল।

হামাস হুঁশিয়ারি করে বলেছে, এ আগ্রাসনের জন্য ইসরায়েলকে চড়া মূল্য দিতে হবে। ইসরায়েলি হামলার জবাবে তারা গাজা থেকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে রকেট ছুড়ছে।

ইসরায়েল বলছে, গতকাল এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। তবে কোথায় ও কীভাবে নিহত হয়েছেন, তা সুনির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।

৮ জুলাই থেকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলার সূত্রপাত ইসরায়েলি তিন কিশোরকে সম্প্রতি অপহরণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। হামাসই ওই ঘটনা ঘটায় বলে মনে করে ইসরায়েল। তবে হামাস তা অস্বীকার করে। পরে ফিলিস্তিনি এক কিশোরকে একইভাবে হত্যা ও অপহরণের পর উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এরপর গাজা থেকে রকেট ছোড়া হচ্ছে—এমন দাবি তুলে ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ শুরু করে ইসরায়েল।

এর আগে ২০১২ সালের নভেম্বরে গাজায় অভিযান চালায় ইসরায়েল। তখন আট দিনের মাথায় মিসরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।

ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে ফিলিস্তিনের দুই অংশ পশ্চিম তীর ও গাজা ২০০৭ সালের আগস্টে চলে যায় দুটি দলের নিয়ন্ত্রণে। সেই থেকে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে ফাতাহ পশ্চিম তীরে ও খালেদ মেশালের নেতৃত্বে হামাস গাজা শাসন করছিল। এই অবস্থায় গত এপ্রিলে দুই দলের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। সে অনুযায়ী নতুন করে নির্বাচনের পর চলতি বছরের শেষ নাগাদ একটি জাতীয় সরকার গঠনের কথা। কিন্তু হামাস-ফাতাহর চুক্তিকে ভালোভাবে নেয়নি ইসরায়েল। তাদের মতে, হামাস একটি জঙ্গি সংগঠন। হামাস-ফাতাহ জাতীয় ঐক্যের সরকার হলে সেই সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় যাবে না বলে জানিয়ে দেয় ইসরায়েল।

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের শুরু। এর পর থেকে নিয়মিত রক্ত ঝরলেও আজও তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের স্বাধীন সত্তা মেনে নিতে রাজি নয় ইসরায়েল।

‘তারা গুপ্তচর পরিবহন করছিল’

মালয়েশিয়ান বিমান ভূপাতিত করার কিছুক্ষণ পর ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ তিনটি টেলি-সংলাপ প্রকাশ করেছে। ইউক্রেন বলছে, এই টেলি কথোপকথন তিনটি রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রাশিয়া সমর্থিত ইউক্রেনের বিচ্ছিনতাবাদী নেতাদের এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিজেদের কথোপকথন। তারা এই টেলি-সংলাপে একটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার পরিকল্পনা করছিলেন 

। ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ রাশিয়ান ভাষার এই টেলি-সংলাপ তিনটি ইউটিউবে প্রকাশ করেছে। বিবিসি’র প্রতিবেদনে এই ফোনালাপের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এগুলোর যথার্থতা সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কথোপকথন তিনটির বক্তব্য নিচে হুবহু উদ্ধৃত করা হলো। ইউক্রেন কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রথম টেলি-সংলাপটি ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আইগর বেজলার ও রাশিয়ার সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা কর্নেল ভ্যাসিলিন গেরানিন।
বেজলার: খনির লোকেদের (বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ছদ্ম নাম) একটি গ্রুপ একটু আগে একটি বিমান ভূপাতিত করেছে। সেটি ইয়েনাকিয়েভোর পেছনে বিধ্বস্ত হয়েছে।
কর্নেল গেরানিন: বিমান চালক। বিমান চালকেরা কোথায়?
বেজলার: খুঁজে দেখতে ও ছবি তুলতে মানুষ পাঠানো হয়েছে। ওখানে কেবল ধোঁয়া।
কর্নেল গেরানিন: কত মিনিট আগে?
বেজলার: প্রায় ৩০ মিনিট আগে।

দ্বিতীয় ফোনালাপে দুজন ব্যক্তির প্রথম জনকে ‘গ্রিক’ বলে সম্বোধন করা হয়। অপরজনকে বলা হচ্ছিল ‘মেজর’।
গ্রিক: হ্যাঁ, মেজর।
মেজর: চেরনুখিনোর ছেলেরা বিমানটা ভূপতিত করেছে।
গ্রিক: কে ভূপতিত করেছে?
মেজর: চেরনুখিনো রোডব্লক থেকে করা হয়েছে। কসাকরা চেরনুখিনোতে আছে।
গ্রিক: বলুন মেজর।
মেজর: পেরত্রোপাভলোভস্কায়ার কয়লা খনির কাছে আকাশেই বিমানটি আংশিক ভেঙে পড়েছে। প্রথম
নিহত কাউকে খুঁজে পাওয়া গেছে। একজন বেসামরিক ব্যক্তির লাশ।
গ্রিক: সেখানে কি পেলেন আপনারা?
মেজর: মূলত এটা ছিল একটি শতভাগ বেসামরিক বিমান।
গ্রিক: সেখানে কি অনেক মানুষ আছে?
মেজর: ধ্বংসাবশেষ খোলা জায়গায় পড়েছে।
গ্রিক: কি ধরনের বিমান সেটি?
মেজর: আমি এখনও এটি বের করিনি। কারণ আমি এখনও মূল ধ্বংসাবশেষের কাছে যাইনি। আমি শুধু খুঁজছি কোথায় প্রথম হতাহতদের শরীর পড়েছিল।
গ্রিক: কোন অস্ত্র আছে ওখানে?
মেজর: একেবারেই নেই। বেসামরিক মানুষের জিনিসপত্র। কিছু ওষুধপত্র, তোয়ালে, টয়লেট পেপার, ইত্যাদি।
গ্রিক: কোন কাগজপত্র?
মেজর: হ্যাঁ। একজন ইন্দোনেশিয়ান ছাত্রের। থম্পসন বিশ্ববিদ্যালয়ের।

তৃতীয় ফোনালাপে একজন যোদ্ধার সঙ্গে কথা বলছিলেন নিকোলাই কোজিতসিন নামের একজন কসাক সামরিক নেতা।
যোদ্ধা: স্লেঝনোয়-তোরেজ এলাকায় বিধ্বস্ত হয়েছে বিমানটি। এটা একটি বেসামরিক বিমান। গ্রাবোভোর কাছেই এটি পড়েছে। এখানে বহু নারী ও শিশুর লাশ পড়ে আছে। কসাকরা সব কিছু দেখছে। টিভি’তে বলা হচ্ছে, এটা ইউক্রেনের এএন-২৬ পরিবহন বিমান। কিন্তু ওরা বলছে এটার গায়ে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স লেখা ছিল। এটা ইউক্রেনের ভেতর কি করছিল?
নিকোলাই কোজিতসিন:  এর মানে হলো, তারা গুপ্তচর পরিবহন করছিল। তাদের ওড়া উচিত হয়নি।
এখানে একটি যুদ্ধ চলছে।

যাহা জয় বাংলা তাহাই জিন্দাবাদ!

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যে কোনো বিষয়েই একমত হতে পারে না, তা আবারও প্রমাণিত হলো সম্প্রতি সমুদ্রসীমা নিয়ে হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে দেওয়া রায়ের বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ায়। এই রায়কে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের বিরাট বিজয় বলে অভিহিত করলেও বিএনপি বলেছে, ব্যাপক পরাজয়। বিএনপির নেতারা বলতে চাইছেন যে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে বাংলাদেশ ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার পেলেও বাকি ছয় হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথায়, কীভাবে দেওয়া হলো, রায়ের আগ পর্যন্ত বিএনপির নেতারা সেই ছয় হাজার ১৩৫ কিলোমিটার উদ্ধারে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার ব্যাখ্যা নেই। বঙ্গোপসাগরের এই সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি কিন্তু দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে হয়নি। হয়েছে আন্তর্জাতিক আদালতে। শেখ হাসিনার আগের সরকারই আদালতে গিয়েছিল। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ না থাকায় ভারতও তা মেনে নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভারতের কাছে বাংলাদেশের পরাজয় কীভাবে হলো, বিএনপির নেতারা তা বুঝিয়ে দিলে উপকৃত হতাম। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের সময়ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম প্রথমে অভিনন্দন জানিয়ে পরে তা ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।
একেই বলে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম গতকাল এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বিএনপির এই সংকীর্ণ মনোভাবকে বিকারগ্রস্ত রাজনীতি বলে অভিহিত করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের রাজনীতি ক্রমেই বিকারগ্রস্ততার দিকে যাচ্ছে। এদিকে সরকারি দলের নেতারাও কম যান না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে সমুদ্র বিজয় হতো কি না সন্দেহ। এ পর্যন্ত না হয় মানা গেল। কিন্তু তিনি যখন বিএনপির নেতাদের সমালোচনার জবাবে তাঁদের দক্ষিণ তালপট্টি খুঁজে দেখার পরামর্শ দেন, তখনই খটকা লাগে। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে ১৯৮০ সালের পর বাংলাদেশের কোনো মানচিত্রে দক্ষিণ তালপট্টির অস্তিত্ব নেই। ১৯৮০ সালে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। এরপর এরশাদ ক্ষমতায় আসেন। মানলাম, তাঁরা মানচিত্রে দক্ষিণ তালপট্টি না রেখে কবিরাহ গুনাহ করেছে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেই গুনাহকে লাঘব করার কোনো উদ্যোগ নিল না কেন? দক্ষিণ তালপট্টির অস্তিত্ব নেই—আদালতে বাংলাদেশ এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছিল। আর ভারতের চেষ্টা ছিল দক্ষিণ তালপট্টি আছে, সেটা দেখানো। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ লিখেছেন, ভারতের প্রয়াস সফল হলে বঙ্গোপসাগরে তাদের সীমানা আরও বাড়ত। দ্বীপের চারপাশের কিছু এলাকারও মালিকানা পেত তারা। ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে দক্ষিণ তালপট্টি বা অন্য কোনো দ্বীপ জেগে উঠলে তার মালিকানা নিয়েও বিরোধ দেখা দিতে পারে। তাই দক্ষিণ তালপট্টি নেই ভেবে ক্ষমতাসীনদের আহ্লাদিত হওয়ার কারণ নেই।
২. প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তাঁর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘রাজনীতির একটি পক্ষ এখনো স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। মনে-প্রাণে পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে চায়। যারা জয় বাংলা বলতে লজ্জা পায়, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তারা পাকিস্তানের এজেন্ট। তাদের সেখানেই চলে যাওয়া উচিত। (সমকাল, ১২ জুলাই ২০১৪)। কারও নাম উল্লেখ না করলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বিএনপিকে উদ্দেশ করেই তিনি এসব কথা বলেছেন। কোনো দলের নীতি ও আদর্শের সমালোচনা করা আর সেই দলকে পাকিস্তানের বা অন্য কোনো দেশের এজেন্ট বানানো এক কথা নয়। এখন বিএনপি বা তার সহযোগী কোনো দল ক্ষমতায় নেই। সজীব ওয়াজেদ যে দলের সদস্যপদ নিয়েছেন, সেই আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আছে মহাপ্রতাপ নিয়ে। অতএব, যাঁরা বিদেশি এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশের ও জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কাজ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বটা সরকারেরই। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও যারা মনে-প্রাণে পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে চায়, তাদের ঠিকানা তো হওয়া উচিত জেলখানা। কিন্তু সরকার এ পর্যন্ত এই অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে বলে জানা নেই। সজীব ওয়াজেদ জিন্দাবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেছেন, এটি যেহেতু উর্দু শব্দ (আসলে এটি ফারসি শব্দ), সেহেতু বাংলাদেশে চলতে পারে না এবং যারা জিন্দাবাদ বলবে, তাদের পাকিস্তানেই চলে যাওয়া উচিত। তাঁর এই যুক্তি মেনে নিলে বাংলা ভাষাকেই নতুন করে লিখতে হবে। বহু বিদেশি শব্দের সমাহারে হাজার বছর ধরে বাংলা ভাষার ভিত তৈরি হয়েছে। উর্দু শব্দ বলে যদি জিন্দাবাদ পরিত্যাজ্য হয়, তাহলে ‘আওয়ামী’ শব্দটি কেন হবে না?
এটিও উর্দু শব্দ। ‘আওয়াম’ শব্দের অর্থ গণ বা জনগণ। সেই ‘আওয়াম’ থেকেই আওয়ামী লীগ নামের দলটির সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৪৯ সালে (প্রথমে নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ)। নামের অপরাংশ ‘লীগ’ও নেওয়া হয়েছে ইংরেজি থেকে। আওয়ামী লীগের পুরো নামে কোথাও ‘বাংলা’ নেই বলে কি আমরা এটিকে বিদেশি দল হিসেবে চিহ্নিত করব? একেবারেই না। যেকোনো দলকে বিচার করতে হবে কাজ দিয়ে। কোন দলের নাম উর্দুতে হলো আর কোন দল হিন্দি স্লোগান ব্যবহার করল, সেসব দিয়ে নয়। তা ছাড়া, আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ ত্যাগ করেছে, এ কথাও পুরো সত্য নয়। সংবিধানে জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ শব্দটি যেমন আওয়ামী লীগ সাদরে গ্রহণ করেছে, তেমনি জিন্দাবাদও, তবে বাংলা অনুবাদ করে। বিএনপি বা অন্য আরও অনেক দল যেমন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে, তেমনি আওয়ামী লীগ এটিকে বাংলা তরজমা করে নিয়েছে: ‘বাংলাদেশ চিরজীবী হোক’। আওয়ামী লীগের সব নেতা জয় বাংলার পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ চিরজীবী হোক’ বলে বক্তব্য শেষ করেন। দোষ শব্দ বা ভাষার নয়। দোষ হলো আমরা সেই শব্দ বা ভাষাকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি। ইনকিলাব একসময় উপমহাদেশে বিপ্লবীদের স্লোগান ছিল। বাংলাদেশের একজন রাজাকার নেতা সেই নাম ব্যবহার করে পত্রিকা বের করে মানুষের শুভবোধ ও চিন্তার বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়েছেন বলে ইনকিলাব শব্দটি বাতিল হয়ে যেতে পারে না। তেমনি জিন্দাবাদও।
৩. বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, পঞ্চাশের দশক থেকেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু জয় বাংলা স্লোগানটি প্রথম উচ্চারিত হয় ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মধুর ক্যানটিনে ছাত্রলীগের এক কর্মিসভায়। এরপর এটি তরুণদের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি প্রধান রণধ্বনিতে রূপান্তরিত হলেও সব মুক্তিযোদ্ধা এই স্লোগান দেননি। অনেকে সমাজ বিপ্লবের পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন। তাহলে জয় বাংলা স্লোগান না দেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদেরও কি এখন পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে হবে? একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের মধ্যে জয় বাংলা বা জিন্দাবাদ নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিল না। বিতর্ক হয়েছে স্বাধীনতার পরে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ও তার আগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জয় বাংলা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক স্লোগান। নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিপীড়িতের, সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে অধিকারবঞ্চিতদের স্লোগান। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই স্লোগানের চরিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে, এক নেতা আরেক নেতার বিরুদ্ধে এই স্লোগান কাজে লাগান। মুক্তিযুদ্ধের সময় যাঁরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছিলেন, তাঁদের একাংশ যেমন স্বাধীনতার পর এই স্লোগানকে বর্জন করে, তেমনি যাঁরা সে সময় জয় বাংলা স্লোগান দিতেন না, আওয়ামী লীগে এসে এখন সেই স্লোগান রপ্ত করেছেন। বর্তমান মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্য আছেন, যাঁরা এখনো জয় বাংলা বলেন না, তাই বলে কি তাঁরা মনে-প্রাণে পাকিস্তানি হয়ে গেছেন? জয় বাংলা স্লোগানের উদ্যোক্তা ছাত্রলীগ স্বাধীনতার পর বিভক্ত হয়ে পড়লে একাংশ আর এই স্লোগান ব্যবহার করে না। আজও না।
তাদেরও কি পাকিস্তানে চলে যেতে হবে? সত্য যে জয় বাংলা মুক্তিযুদ্ধের প্রধান রণধ্বনি স্লোগান ছিল। আবার এও অসত্য নয় যে, এই স্লোগান দিয়ে অনেক অপকর্মও সাধিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের ক্ষমতাসীন অংশটি এই জয় বাংলা স্লোগান দিয়েই ডাকসুর ব্যালট বাক্স হাইজ্যাক করেছিল। ১৯৭৪ সালে মুহসীন হলে সাত খুনের হোতারাও এই স্লোগান দিয়েছিল। পরবর্তীকালে এই স্লোগান অনেক দুষ্কৃতকারীর কণ্ঠেও শোনা গেছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, বর্তমানে সারা দেশে ছাত্রলীগের নামে যে খুনোখুনি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে, তা করছে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের অনুপ্রবেশকারীরা। তারা কেউই আগের জিন্দাবাদ বা ইসলামি শাসন কায়েমের স্লোগান দিচ্ছে না। জয় বাংলা বলেই এসব করছে। যে স্লোগান একাত্তরের প্রধান (একমাত্র নয়) রণধ্বনি ছিল, সেটি এখন একটি রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। তাই সবাইকে জোর করে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়ানোর চেষ্টা ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলেই মনে করি। আর জিন্দাবাদ স্লোগান যাঁরা দিচ্ছেন, তাঁরাও এটিকে অন্যায্যভাবে জয় বাংলার বিপরীতে ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে মুসলমানি জোশ আবিষ্কার করছেন। কিন্তু অভিধান অনুযায়ী জিন্দা মানে বেঁচে থাকা, জয়ী হওয়া। সেদিক থেকে জিন্দাবাদ ও জয় বাংলার মধ্যে বড় ফারাক দেখি না। ফারাকটি করেছে স্বার্থবাদী ও সংকীর্ণ রাজনীতি। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবহির্ভূত কোনো দলই এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এমনকি নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধিরাও নন। একজন ইতিমধ্যে পরীক্ষায় ফেল করেছেন। আরেকজন বাছাই পরীক্ষায় আছেন। দেখা যাক কী করেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.ne
t

ইউক্রেনের আকাশ বয়কট

২৯৫ জন যাত্রী নিয়ে ইউক্রেনের দনেস্ক শহরে এমএইচ-১৭ ভেঙে পড়ার পেছনে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে নাশকতার তত্ত্ব। রুশপন্থী বিদ্রোহীরাই ক্ষেপণাস্ত্র হেনে বিমানটি নামিয়েছে বলে অভিযোগ এনেছে ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। উঠেছে জঙ্গি নাশকতার দাবি। এ অবস্থায় হিংসাকবলিত অঞ্চল এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিভিন্ন দেশ। ইউক্রেনের আকাশপথে বিমান চালানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিল এয়ারইন্ডিয়া, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, লুফথানসা, এয়ার ফ্রান্স, এরোলফট ও ট্রান্সাএরো (রাশিয়া), টার্কিশ এয়ারলাইন্স, ডেল্টা, আলিতালিয়া (ইতালি)। একই পদক্ষেপ নিয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রতিটি বিমান সংস্থা। এদিকে পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু অঞ্চলের আকাশে বিমান চলাচলে ঝুঁকির বিষয়ে কয়েক মাস আগেই বৈমানিকদের সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি সংস্থা।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইউক্রেনের আকাশসীমায় উড্ডয়নের ব্যাপারে দেশটির বিমান পরিবহন কোম্পানিগুলোর বিশেষ সতর্কতা জারি করে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া ইউক্রেন থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সিমফেরোপোলসহ আরও কিছু এলাকার ওপর দিয়ে উড্ডয়ন থেকে বিরত থাকতে বলা হয় তাদের। ২৩ এপ্রিলের ওই বিশেষ বার্তায়, ২০১৫ সালে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ওই সতর্কতা বহাল থাকবে বলে বলা হয়। যাত্রীর পাঠানো শেষ ভিডিও : ইউক্রেনে বিধ্বস্ত মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের বিমানটির শেষ দৃশ্য ধারণ করেছিলেন ৩০ বছর বয়সী এক যুবক। বিমানটি আমস্টারডাম থেকে ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে ১৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিও দৃশ্য ধারণ করেছিলেন মোঃ আলী মোঃ সেলিম। শনিবার মালয়েশীয় ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদপত্র দ্য স্টার অনলাইন এক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজের ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে আপলোড করা সেলিমের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, যাত্রীরা মাথার ওপরের কম্পার্টমেন্টে নিজেদের ব্যাগপত্র রাখছেন। ইনস্টাগ্রাম ভিডিওর যে ক্যাপশন লেখা হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে, দৃশ্য ধারণকারী যুবক বিমানে করে দেশে ফেরা নিয়ে নিজের অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। ক্যাপশনে লেখা আছে, বিসমিল্লাহ... কিছুটা নার্ভাস লাগছে। ওই ভিডিওটি এখন ইউটিউব এবং ফেসবুকসহ সামাজিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি ঘোষণা ভেসে আসছিল,
সম্ভবত তা পাইলটের কণ্ঠ হবে। যাত্রী উঠানো ও মাল বোঝাই করার শেষপর্যায়ে রয়েছি আমরা। আবারও বলছি, অনুগ্রহ করে সবার মোবাইল ফোনগুলো বন্ধ করে নিন। এর পরই ভিডিও দৃশ্যটি শেষ হয়ে যায়।মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এমএইচ-১৭ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ২৯৮ আরোহীর সবাই নিহত হওয়ায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার দিনটিকে শোকের দিন ও চলতি বছরকে মালয়েশিয়ার জন্য শোকের বছর হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাজাক। তিনি দিনটিকে একটি শোকাবহ দিন এবং ২০১৪ সালকে মালয়েশিয়ার জন্য একটি শোকতপ্ত বছর হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি এ দুর্ঘটনার পূর্ণ তদন্ত প্রত্যাশা করে বলেন, এ ঘটনার তদন্তকে কোনোভাবেই বিপথে যেতে দেয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আন্তর্জাতিক বেসামরিক উড্ডয়ন সংস্থা বিমানটির যাত্রাপথকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ঘোষণা করেছিল। এছাড়া বিমানটি থেকে কোনো বিপদ সংকেতও আসেনি। তার দেশ এ মুহূর্তে শোকাবহ এ ঘটনার সঠিক কারণ উদ্ধার করতে না পারলেও, অচিরেই উদঘাটিত হবে, এবারের বিমানটির ভাগ্যে কি ঘটেছে। শোনা যাচ্ছে, প্রতিপক্ষের বিমান ভেবে ইউক্রেনীয় সরকারি বাহিনী কিংবা সশস্ত্র রুশপন্থী- এ দুই পক্ষের কোনো এক পক্ষ ওটাকে উদ্দেশ্য করে বিস্ফোরক ছুড়েছে। যে কারণে কোনো ধরনের যান্ত্রিক ত্র“টির রেকর্ডবিহীন বিমানটি ইউক্রেন সীমান্তে বিধ্বস্ত হয়েছে।

হঠাৎ অবসরে লাম

চাইলে আরও পাঁচ বছর দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে হুট করেই কাল আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে দিলেন জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ফিলিপ লাম। বয়স মাত্র ৩০। কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নপূরণের পর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার অযথা দীর্ঘায়িত করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন লাম। নিজেই অনুভব করেছেন এভাবে মাথা উঁচু করে অবসর নেয়ার সুযোগ হয়তো কখনোই আর আসবে না। তবে জার্মানি অধ্যায়ের সমাপ্তি টানলেও বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন লাম। তার নেতৃত্বেই দুই যুগের শিরোপাখরা ঘুচিয়ে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে লাতিন আমেরিকার মাটিতে বিশ্বকাপ জিতেছে জার্মানি।
লামের অবসরের ঘোষণাটি আসে জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএফবি) মাধ্যমেই। ডিএফবির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে লাম বলেছেন, ‘ব্রাজিলের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানতে পেরে আমি খুশি ও গর্বিত।’ অবসরের পোকা তার মাথায় ঢুকেছিল গত মৌসুমেই। তবে বিশ্বকাপ জিততে না পারলে ঘোষণাটা এত দ্রুত আসত না। মারাকানা জয়ের পরদিনই কোচ জোয়াচিম লোকে সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দিয়েছিলেন বায়ার্ন ডিফেন্ডার। কাল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর জার্মান দৈনিক বিল্ডকে তিনি জানিয়েছেন, ‘আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্তের কথা সোমবারই লো’কে জানিয়ে দিয়েছি। আসলে গত মৌসুম থেকেই এটা আমার মাথায় ছিল। বিশ্বকাপ জেতায় সবকিছু একবিন্দুতে মিলে গেছে। আজ (শুক্রবার) সকালে বিএফবি প্রেসিডেন্ট উলফগ্যাং নিয়ার্সবাচকে ফোনে সবকিছু জানিয়েছি।’
অবসরের সিদ্ধান্ত থেকে লামকে ফেরানো যাবে না বুঝতে পেরে সেই পথে পা বাড়াননি উলফগ্যাং, ‘সকালে আমাকে ফোন করে তার পদক্ষেপের কথা জানায় ফিলিপ। খুব দ্রুতই বুঝতে পারি অবসরের সিদ্ধান্ত থেকে তাকে ফেরানোর চেষ্টা করে কোনো লাভ হবে না। জাতীয় দলের হয়ে দশ বছর শুধু একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়ই ছিল না, একজন আদর্শ রোল মডেলও সে। সবকিছুর জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই।’ দশ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে জার্মানির হয়ে ১১৩ ম্যাচে পাঁচ গোল করেছেন লাম। ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুলব্যাক ভাবা হয় তাকে। খেলতে পারেন মাঝমাঠেও। ২০০৪ সালের ফেব্র“য়ারিতে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর দেশের হয়ে তিনটি ইউরো ও তিনটি বিশ্বকাপে খেলেছেন। মাইকেল বালাক ইনজুরিতে পড়ার পর ২০১০ বিশ্বকাপে তার হাতে নেতৃত্ব তুলে দেন লো। টানা চার বছর সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। লামের শূন্যতা পূরণ করা কঠিনই হবে জার্মানির জন্য। ওয়েবসাইট।

কেনাকাটা করাই হল ঈদের বাড়তি আনন্দ

*বর্তমানে কী কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
**সামনে ঈদ, তাই ঈদের কাজ নিয়েই বেশি ব্যস্ত আছি। অভিনয়ের পাশাপাশি নাচের অনুষ্ঠানও করছি। তবে সারা দিন রোজা থেকে অভিনয় করা খুব কষ্টের। তারপর ভালোভাবে সব কাজ করার চেষ্টা করছি।
*নাচের অনুষ্ঠানে প্রাধান্য কী থাকবে?
**নাচের ক্ষেত্রে ভালোবাসার জায়গাটা একটু বেশিই। তবে অধিক্য নেই। এবার ঈদে নাচ নিয়ে আমার বাংলাভিশনে একক অনুষ্ঠান থাকবে। মোট ছয়টি নাচ নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হব। আর রোজার কারণে বাইরের অনুষ্ঠানে নাচ করছি না।
*ধারাবাহিকেই আপনাকে বেশি দেখা যায়। এখন কোন কোন ধারাবাহিক প্রচার চলছে?
**চোরকাঁটা, ক্ষণিকালয়, নিঃসঙ্গ পানকৌড়ি, মামলাবাজ, চেয়ারম্যান বাড়িসহ একাধিক ধারাবাহিক প্রচার হচ্ছে। এছাড়া প্রচারের অপেক্ষায় আছে ‘প্রেমের ১৪৪ ধারা’।
*চলমান ধারাবাহিকের পরও ঈদের নাটকের জন্য সিডিউল দিচ্ছেন কীভাবে?
**অভিনয় জীবন হতে হবে সুশৃংখল। সবসময় নিয়ম মেনে চললে ঝামেলা কম হয়। ধারাবাহিক নাটকের সিডিউলের পর যে সময় থাকছে, তা সঠিকভাবে ব্যবহার করছি আসন্ন ঈদের কাজের জন্য। একটু কষ্ট হলেও ঈদের জন্য কাজ করতে পেরে মজা পাচ্ছি।
*বিজ্ঞাপনে অনুপস্থিত বেশি কেন?
**অভিনয়ের ব্যস্ততা শেষ করে পারছি না। বিজ্ঞাপন হল দর্শকদের কাছে যাওয়ার একটি ভালো মাধ্যম। কিন্তু ভালো পণ্যের বিজ্ঞাপন করতে চাই। ভালো পণ্যের প্রস্তাব আসলে বিবেচনা করব।
*ঈদে ব্যক্তিগত কেনাকাটা কতদূর...
**এখনও কেনাকাটা শুরু করিনি। ঈদের বাড়তি আনন্দ হল কেনাকাটা। কিন্তু শুটিংয়ের জন্য একটু ঝামেলা হচ্ছে। আশা করছি দু’চার দিনের মধ্যে ঝামেলা কাটাতে পারব। এবারের ঈদে বাড়ির সবাইকে কিছু না কিছু উপহার দেয়ার ইচ্ছা আছে। বিএম ইমরান

স্কুল হামলায় দায়ী আইএসআই

পেশোয়ারের অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থান আর্মি পাবলিক স্কুলে জঙ্গি হামলায় ১৩০ জনের বেশি শিশু নিহত হওয়ার পেছনে স্বয়ং পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী নিজেই দায়ী বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে এসব জঙ্গিদের ব্যবহার করতে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতো বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। এবার সেই ভ্রান্তনীতিই নিজেদের জন্য কার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের পোষা সাপ নিজের শরীরেই ছোবল দিয়েছে।
ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান তার বিশ্লেষণে এমন কথাই বলেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হেরাতের ভারতীয় দূতাবাসে জঙ্গি হামলার পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে কাবুল ও দিল্লি দূতাবাসকে বলা হয়েছিল এ ঘটনায় পাকিস্তান ভিত্তিক লস্কর-ই তৈয়বাহ দায়ী। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে ভারতের নবনির্বাচিত মোদি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এ আক্রমণ চালানো হয়েছে। হামলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার এ ঘটনায় পরোক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। ২০০৮ সালে লস্কর-ই তৈয়বাহই ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে হামলা চালিয়েছিল। এতে অন্তত ১৭০ জন নিহত হয়। মার্কিন নথিপত্র ও আদালত কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, হামলাকারীরা করাচি থেকে নৌকায় করে ভারতে গিয়েছিল। এ ঘটনায়ও জঙ্গিদের সঙ্গে আইএসআইয়ের সুক্ষ্ম যোগাযোগ রক্ষা হয়েছিল। ভারতের প্রকাশ্যে এ ধরনের অভিযোগ অবশ্য পাকিস্তান বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে,
আফগান তালেবান ও হক্কানি নেটওয়ার্কের সঙ্গে আইএসআই যোগাযোগ রক্ষা করে। গত এপ্রিলে আফগানিস্তানে ন্যাটো ফোর্সের কমান্ডার জোসেফ ডানফোর্ড বলেন, হক্কানি নেটওয়ার্কের সঙ্গে আইএসআইয়ের যোগাযোগ রক্ষার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া পাক গোয়েন্দারা কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে লড়াইরত বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপকেও উস্কানি দিয়ে থাকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মঙ্গলবার পেশোয়ারে হামলার জন্য আইএসআইয়ের জঙ্গি কানেকশনই দায়ী। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের পর তালেবানরা পাকিস্তানে পালিয়ে গেলে দেশটির নীতিনির্ধারকরা তাদের জায়গা দিয়েছিল। ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত যুদ্ধ ও আফগানিস্তানে ভারতীয় প্রভাব খর্ব করতে পাক গোয়েন্দারা তাদের মদদ দেয়ার মতো বিপজ্জনক নীতি নিয়েছিল। ২০০১ সালেই তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তান সফর করে বলেছিলেন, প্রতিবেশীকে শায়েস্তা করতে সাপকে নিজের পিঠে জায়গা দেয়া খুব খারাপ হবে। এই সময়ে এসে টিটিপি বোধ হয় সেই সুযোগটাই নিল।

স্নায়ুযুদ্ধের শত্রুর সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব আমেরিকার

স্নায়ুযুদ্ধের শত্রুতা ভুলে আবার বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কিউবা-আমেরিকা সম্পর্কে আরেকটি নতুন যুগের সূচনা হল। দীর্ঘদিনের শত্রু দেশ কিউবার সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বুধবার মধ্যরাতে হোয়াইট হাউস থেকে দেয়া ঘোষণায় ওবামা বলেন, আজ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার জনগণের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বদলে ফেলবে। এই পরিবর্তনের ফলে কিউবার জনগণের মধ্যে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে এবং আরও অনেক সুযোগ তৈরি হবে। কিউবাকে একঘরে করার যে কৌশল নেয়া হয়েছিল তা ছিল অনমনীয় ও অকার্যকর। তিনি বলেছেন, দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর আবার ওয়াশিংটন তা স্থাপন করবে। ১৯৬১ সালে হাভানায় বন্ধ করে দেয়া দূতাবাস আগামী মাসে পুনরায় খোলার চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মন্তব্য করেছেন। তিনি আরও বলেন, কিউবার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ সেকেলে ছিল এবং এই পরিবর্তন ৫০ বছরে কিউবার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির খুব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ওবামা জানান, দু’দেশের মধ্যে মুদ্রার বিনিময়ও চালু এবং মার্কিন ব্যবসায়ীদের জন্য কিউবায় পণ্য রফতানির সুযোগ সহজ হবে। এদিকে, কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ত্রো এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন। কিউবার প্রেসিডেন্ট তার দেশের ওপর থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার একই সময়ে ওয়াশিংটনে ওবামার ভাষণের সময় কিউবায় জাতীয় টেলিভিশন ভাষণে রাউল কাস্ত্রো বলেন, কিউবা অনেকদিন ধরে যে চেষ্টা করছিল, এই পরিবর্তন তার সামান্য কিছু, আমরা কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে প্রধান সমস্যাগুলো মিটে গেছে। পাঁচ দশক ধরে চলা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তার দেশের মানবিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার সময় এসেছে এখন। ভাষণে তিনি বলেন, ‘জাতীয় সার্বভৌম, গণতন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় রাজি কিউবা। আমাদের মধ্যে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সভ্য পদ্ধতিতে একসঙ্গে বসবাস করার উপায় আমাদের শিখতে হবে।
আর এ নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।’ এর আগে ক্যাস্ত্রো ও ওবামা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ব্যাপারে একমত হন। মঙ্গলবার দুই প্রেসিডেন্ট ৪৫ মিনিটের বেশি সময় ধরে ফোনালাপ করেন। ১৯৫৯ সালে কিউবা বিপ্লবের পর দু’দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এই প্রথম সরাসরি কথা বললেন। ভ্যাটিকান সিটিতে কানাডার প্রতিনিধি ও পোপ ফ্রান্সিসের ১৮ মাসের গোপন আলোচনার ভিত্তিতে নতুন করে এ বন্ধুত্বে সূচনা হয়। পোপ এ সম্পর্ককে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন। তবে এই নিষেধাজ্ঞা কেবল রিপাবলিকানদের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের অনুমোদন পেলেই তুলে নেয়া সম্ভব। রিপাবলিকানরা যথারীতি এর বিরোধিতা জানিয়েছে। ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর এবং ২০১৬ সালের নির্বাচনের একজন সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জেব বুশ এই ঘোষণার পর একে বারাক ওবামার ‘ভুল পররাষ্ট্রনীতির প্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছেন। এদিকে, দুই রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা আসার কিছু আগেই পাঁচ বছর আগে কিউবায় আটক হওয়া মার্কিন একজন ঠিকাদার অ্যালান গ্রস দেশে ফিরে এসেছেন।এছাড়া ২০ বছর ধরে কারা ভোগ করছিলেন আমেরিকার এমন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকেও মুক্তি দিয়েছে হাভানা। এর বিপরীতে ওয়াশিংটন তিনজন হাই-প্রোফাইল কিউবান বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে, যারা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। বিবিসি, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সভ্য পদ্ধতিতে একসঙ্গে বসবাস করার উপায় আমাদের শিখতে হবে পাঁচ দশক ধরে চলা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে রাউল ক্যাস্ত্রো এই পরিবর্তনে কিউবার জনগণের মধ্যে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে দু’দেশের মধ্যে মুদ্রার বিনিময় এবং মার্কিন ব্যবসায়ীদের জন্য কিউবায় পণ্য রফতানির সুযোগ সহজ হবে বারাক ওবামা

এখনও কৃষ্ণাঙ্গ বিড়ম্বনার শিকার ওবামা পরিবার

ছয় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওবামা। কিন্তু আজও কৃষ্ণাঙ্গ বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাকে। যুক্তরাষ্ট্রের শেকড়ে প্রথিত এ বর্ণবৈষম্য থেকে বাদ পড়েননি ফার্স্টলেডিও। বুধবার পিপল ম্যাগাজিনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সে অভিজ্ঞতাই তুলে ধরলেন ওবামা-মিশেল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে হোটেলবয় ভেবে কফির অর্ডার দিয়েছিলেন একজন শ্বেতাঙ্গ। ওবামা বলেছেন, শুধু গায়ের রং কালো হওয়ার কারণেই তার সঙ্গে এ আচরণ করা হয়েছে। বুধবার পিপল ম্যাগাজিনের সঙ্গে একান্ত ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। খবর দ্য ইনডিপেন্ডেন্টের। ওবামা বলেন, আমাকে ভুল করে ওয়েটার ভাবা হয়েছিল। ঘটনাটা ওবামার প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগের।
তিনি বলেন, ‘আমার বয়সী কোনো কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ নেই যে পেশাদার। যে হোটেল থেকে বেরিয়ে তার অপেক্ষমাণ গাড়ির কাছে আসে না। কেউ তার হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেয় না।’ বারাক ওবামার স্ত্রী ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামা বলেন, তিনিও কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে এ ধরনের বিব্রতকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। কোনো শপিংমলে গেলে ভুল করে কেউ মিশেলকেই শেল্ফ থেকে জিনিস দেখাতে বলে। তিনি বলেন, ‘লোকজন ভুলে যায় যে, আমরা ছয় বছর ধরে হোয়াইট হাউসে থাকছি।’ মিশেল বলেন, প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তার কৃষ্ণাঙ্গ স্বামী ওবামা শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলে বসবাস করতেন। ট্যাক্সি ক্যাব নিয়ে ওবামা অনেক বিব্রতকর অভিজ্ঞতা মিশেলের সঙ্গে শেয়ার করেছেন। ওবামা বলেন, বর্ণবৈষম্য কিছুটা কমেছে। কিন্তু এখনও অনেক পথ হাঁটতে হবে।

নাঈম শায়নার সেলফি ম্যানিয়া

নিজের ছবি নিজে তোলাকেই সেলফি বলে। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রথমবার এমনি এক ছবি তোলার পর থেকে সারা বিশ্বে এটি এখন ম্যানিয়ায় পরিণত হয়েছে। বাস্তব জীবনে তো বটেই, নাটকেও শুরু হয়েছে এ ম্যানিয়া। সম্প্রতি নাঈম ও শায়নাও সেলফি ম্যানিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। আরেফিন আলম পরিচালিত ‘সেলফি ম্যানিয়া’ নামের একটি নাটকে তাদের সেলফি তুলতে দেখা যাবে।
মূলত এ ছবি তোলা নিয়ে নাটকের গল্প আবর্তিত হয়েছে। নাটকটিতে অভিনয় প্রসঙ্গে নাঈম বলেন, ‘এ সময়ের গল্প, তাই কাজ করতে বেশ ভালো লেগেছে। শায়নার সঙ্গে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি কাজ করেছি। তার সঙ্গে আমার কাজের বোঝাপড়াটাও বেশ ভালো হয়েছে। আশা করি আমাদের নতুন কাজটি ভালো লাগবে দর্শকের।’ শায়না আমিন বলেন, ‘আমি এবং নাঈম ভাই যে ক’টি কাজ করেছি প্রতিটিতেই সাড়া পেয়েছি প্রচুর। আশা করছি সেলফি ম্যানিয়া’তেও আগের মতোই সাড়া পাব।’ শিগগিরই নাটকটি একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হবে বলে নির্মাতা জানান।

ব্যথিত, ক্ষুব্ধ বিশ্ব সমাজ

অশ্রুসিক্ত আতিকা আবদুল রহমান। বিধ্বস্ত মালয়েশিয়া
এয়ারলাইনসের বৈমানিক ওয়ান আমরানের ভাগনি
তিনি। গতকাল কুয়ালালামপুর থেকে তোলা ছবি।
মাত্র চার মাস আগে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়। সেই শোক হালকা হতে না হতেই আরেক শোকের হানা। এবারও সেই মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসেরই উড়োজাহাজ। এবার উড়োজাহাজটিকে গুলি বা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় স্বজন হারানো দেশগুলো যেমন শোকে কাতর হয়েছে, তেমনি সম্ভাব্য এই ভয়ংকর অপরাধের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়েছে বিশ্বসমাজ। মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইট এমএইচ১৭ গত বৃহস্পতিবার নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডাম থেকে কুয়ালালামপুরে ফেরার পথে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের একটি গ্রামের কাছে বিধ্বস্ত হয়ে ২৯৮ আরোহীর সবাই মারা যান। রয়টার্স, বিবিসি ও এএফপি। উড়োজাহাজটির যাত্রী হিসেবে ছিলেন মালয়েশিয়ার নাগরিক নুর সাজনা সালেহ। ৩১ বছর বয়সী এই নারীর বাবা সালেহ শামসুদ্দিন মালয়েশিয়ার একটি টেলিভিশনকে বলেন, ‘আমরা জানি, অনেকেই মারা গেছেন। তবু আমরা আশা করছি, সে বেঁচে আছে... কোনো প্রকারে সে নিরাপদ আছে এবং বাড়ি ফিরে আসবে।’ যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত ডাচ নাগরিক নিনিক ইউরিয়ানি। ৫৬ বছর বয়সী ওই নারী আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করতে জাকার্তায় যাচ্ছিলেন। তাঁর বোন অ্যানি নুরাহেনি বলেন, ‘আমার মাকে এ খবর বলতে পারছি না।
তিনি খুবই দুর্বল। এ খবর তিনি সইতে পারবেন না।’ আরোহীদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক ছিলেন ১২ জন। দেশটির প্রেসিডেন্ট সুসিলো বামবাং বলেছেন, যদি উড়োজাহাজটিকে সামরিক অস্ত্র ব্যবহার করে ভূপাতিত করা হয়ে থাকে, তবে সেটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তদন্ত করে দোষীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। অস্ট্রেলিয়াও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চায়। দেশটির ২৮ নাগরিক ওই উড়োজাহাজে ছিলেন। অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোট নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ শনিবার দেশের সরকারি ভবনগুলোতে পতাকা অর্ধনমিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রও ঘটনার তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও তাঁর শীর্ষ কমর্কতাদের একটি বৈঠকে ডেকেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘কিছু লোক ভেবেছিল ইউক্রেনের কিছুই করার নেই। কিন্তু এখন তারা নিজেদের ভুলগুলো খুঁজে বের করছে।’ দলনিরপেক্ষ বিশ্লেষকেরা বলছেন, মালয়েশিয়ান বিমান ট্র্যাজেডি ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংঘর্ষের বিষয়টিকে বিশ্বের নজরে আনবে। এদিকে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং ব্যক্তিগত ফেসবুক পাতায় বলেন, উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার খবরে তিনি শোকাহত, ব্যথিত। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রজাক বলেন, ‘এটা একটা মর্মান্তিক দিন। মালয়েশিয়ার জন্য এ বছরটিই মর্মান্তিক বছরে পরিণত হয়েছে।’

প্রিয় মাদিবার জন্মদিনে পরিচ্ছন্নতার আয়োজন

ম্যান্ডেলার জন্মদিনে গুগলের ডুডল
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার ৯৬তম জন্মদিন গতকাল শুক্রবার দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। একই সঙ্গে কাল আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেলা দিবসও পালিত হয়। তাঁর সম্মানে ২০০৯ সালে জাতিসংঘ এই দিনটিকে ম্যান্ডেলা দিবস ঘোষণা করে। খবর স্কাইনিউজ ও বিবিসির। ৯৫ বছর বয়সে গত ডিসেম্বরে মারা যান ম্যান্ডেলা। মৃত্যুর পর এটাই তাঁর প্রথম জন্মদিন। তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় গতকাল দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীর আবেগ-উচ্ছ্বাসটা একটু বেশিই ছিল। দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা।
তিনি বলেন, প্রিয় মাদিবার প্রতি সম্মান জানাতেই এই অভিযান। ম্যান্ডেলার নামে ভালো কাজ করার একটি উদ্যোগ ২০০৯ সালে জোহানেসবার্গ থেকে শুরু হয়। চলতি বছর সেই কাজের পরিধি ছড়িয়ে পড়ে ১২৬টি দেশে। ওই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গতকাল ম্যান্ডেলা দিবসে সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে নিজেদের ভালো কাজের ছবি প্রকাশ করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ম্যান্ডেলার জন্মদিনের অনুষ্ঠান হয়েছে ফ্রান্সের প্যারিস, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও গ্লাসগো ও অস্ট্রেলিয়ার এডিনবরাসহ বিশ্বের বড় বড় শহরে। চীনে ম্যান্ডেলার জীবন নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী হয়। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ম্যান্ডেলার স্বাক্ষরযুক্ত কিছু জিনিসপত্রের নিলামের আয়োজন করা হয়। নিলাম থেকে পাওয়া অর্থ দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা হবে। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নেলসন ম্যান্ডেলা। ১৯৯৯ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।

মোদির পথ বদল

নরেন্দ্র মোদি
ব্রাজিলে ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বহনকারী এয়ার ইন্ডিয়া-ওয়ানের উড়োজাহাজটি নির্ধারিত গমনপথের বদলে অন্য পথ দিয়ে দেশে ফিরেছে। গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার পর মোদির উড়োজাহাজের পথ পরিবর্তন করা হয়।গতকাল শুক্রবার এক টুইটার বার্তায় মোদি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার এমএইচ-১৭ উড়োজাহাজের নিহত যাত্রীদের পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। এই ভীষণ শোকের মুহূর্তে আমরা তাদের পাশে আছি।’ এনডিটিভি।

সামরিক অভিযানে ভেস্তে গেল চতুর্থ বিয়ের স্বপ্ন

নিজের কয়েকটি সন্তানের সঙ্গে গুলজার খান l এএফপি
তিন স্ত্রী আর ৩৬ সন্তান নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল তাঁর। আরেকটি বিয়ের খায়েশ পূরণের জন্য অর্থ সঞ্চয়ও করেছিলেন ৫৪ বছর বয়সী গুলজার খান।কিন্তু উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পাকিস্তানি সেনাঅভিযানে সব এলোমেলো হয়ে গেছে।খবর এএফপির। তালেবানসহ অন্য জঙ্গিদের দীর্ঘদিনের ঘাঁটি উচ্ছেদের লক্ষ্যে সেনাবাহিনী ওই অভিযান চালায়।তার আগে স্থানীয় লাখো মানুষকে বাড়িঘর ছাড়তে হয়েছে। শাওয়া গ্রামে ৩৫ কক্ষের একটি বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনিসহ পরিবারের প্রায় ১০০ জন সদস্যকে নিয়ে থাকতেন গুলজার। কিন্তু অভিযানের আগে সেখান থেকে গোটা পরিবারকে বান্নু এলাকায় সাময়িক–ভাবে স্থানান্তর করতে গিয়ে খরচ হয়ে গেছে তাঁর চতুর্থ বিয়ের লক্ষ্যে সঞ্চিত অর্থ। তবে আবার সঞ্চয় শুরু করে দিয়েছেন।আর আশা করছেন, অভিযান শিগগিরই শেষ হবে।
ইসলামি আইনে একজন পুরুষের চারটি বিয়ের বৈধতা রয়েছে। পাকিস্তানের অত্যন্ত রক্ষণশীল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বড় পরিবারগুলোয় সেই প্রথা মেনে চলা হয়। গুলজারের স্ত্রীরা গড়ে এক ডজন করে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর সন্তান নিতে অনাগ্রহী। তিনি বলেন, ‘তিন স্ত্রীই এখন আমাকে এড়িয়ে চলে। তারা আর সন্তান চায় না। তাই আমি চতুর্থ বিয়ে করতে চাই। তারা আমাকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। কিন্তু আমি আরও সন্তান চাই।’ ১৭ বছর বয়সে গুলজার প্রথম বিয়ে করেন ১৪ বছর বয়সী চাচাতো বোন শাওয়াকে। তাঁদের আট ছেলে ও চার মেয়ে রয়েছে। প্রথম বিয়ের আট বছর পর ১৭ বছর বয়সী আরেক তরুণীকে বউ করেন গুলজার। বান্নু এলাকায় ১৭ কক্ষের একটি বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছে গুলজারের বিশাল পরিবার। তিনি ১৯৭৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে ট্যাক্সিচালকের কাজ করেন। তিনি তৃতীয় বিয়ে করেন নিজের ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীকে। স্থানীয় একটি বিরোধের জেরে গুলজারের ভাই নিহত হন।

‘ইসরায়েল বিশ্বসম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে’

বিল ক্লিনটন
বিশ্বসম্প্রদায় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার বিষয়ে ইসরায়েলকে সতর্ক করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় উপর্যুপরি ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য করলেন তিনি। খবর এএফপির। বিল ক্লিনটন বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। গত বুধবার তিনি ভারতের সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভিকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। বিল ক্লিনটন বলেন, একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতিতে ইসরায়েল নিজেকে বিশ্বসম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এটা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জন্য ভালো কিছু নয়। স্বল্প বা মধ্যমেয়াদে হামাস ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনি বেসামরিক লোকদের হত্যা করতে বাধ্য করার মাধ্যমে দেশটিকে সাধারণ মানুষের কাছে ভীতিকর করে তুলছে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ক্লিনটন বলেন, হামাস একটি কৌশল নিয়েছে। সেটি হলো, তারা তাদের বেসামরিক লোকদের হত্যা করতে ইসরায়েলকে বাধ্য করবে, যাতে করে বাকি বিশ্ব ইসরায়েলের নিন্দায় সরব হয়। আবার ইসরায়েল রকেট হামলার মুখে হাত গুটিয়ে বসেও থাকতে পারবে না। ঐতিহাসিক ক্যাম্প ডেভিড শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন। বর্তমান সংকট নিরসনে তিনি একটি কার্যকর সংলাপে বসতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানান। ক্লিনটন বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুই পারেন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একটি নিবিড় শান্তিচুক্তি করতে। তাঁর এটা করা উচিত।’ সেটা করলে শতকরা ৬০ ভাগ ইসরায়েলিই নেতানিয়াহুকে সমর্থন করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ওবামাকে বিষ মাখানো চিঠি পাঠানোর দায়ে অভিনেত্রীর কারাদণ্ড

শ্যানন গেস রিচার্ডসন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং নিউইয়র্কের মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গকে বিষ মাখানো চিঠি পাঠানোর অপরাধে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অভিনেত্রী শ্যানন গেস রিচার্ডসনকে গত বুধবার ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রেসিডেন্ট ও মেয়রকে রাইসিন (অতিমাত্রায় বিষাক্ত প্রোটিন) মাখানো চিঠি পাঠানোর অভিযোগ স্বীকার করেন। খবর সিএনএনের। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী কারাদণ্ড ভোগ করার পাশাপাশি শ্যানন তিন লাখ ৬৭ হাজার মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করবেন।
টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেন শ্যানন। অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য বিষাক্ত পদার্থ বহনের দায়ে তাঁর সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু তিনি গত ডিসেম্বরে ওই অভিযোগ স্বীকার করায় সাজা ১৮ বছরে সীমিত রাখা হয়। টেক্সাসের নিউ বোস্টনের বাসিন্দা শ্যানন অনলাইনে রাইসিনের বিভিন্ন উপাদান কেনেন এবং সেগুলো খামে ভরে লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের শ্রেভপোর্ট থেকে ডাকযোগে প্রেসিডেন্ট বরাবর পাঠান। ওবামা ও ব্লুমবার্গ ছাড়াও মার্ক গ্লেজের (অবৈধ অস্ত্রবিরোধী মেয়রদের সংগঠনের নেতা) ঠিকানায় বিষাক্ত চিঠি পাঠান শ্যানন।

যুদ্ধবিরতির সময়ও হামলা থামেনি

পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির কয়েক মিনিট আগে গতকাল
ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলায় নিহত হয়েছেন স্বজন।
তাঁর মরদেহ দাফনের সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে
গাজার এই শিশুটি (ডানে)। অন্য শিশুটি
হয়তো বুঝতেই পারছে না, প্রিয়জনকে
শেষবিদায় জানাতে হচ্ছে তাকেও। এএফপি
ইসরায়েল ও গাজার মধ্যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির সময়ও হামলা থামেনি। দুই পক্ষই হামলার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে। এদিকে মিসরের মধ্যস্থতায় কায়রো আলোচনায় সমন্বিত যুদ্ধবিরতির খবর নাকচ করে দিয়েছে দুই পক্ষই। ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবিগদর লিবারম্যান বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির খবর সঠিক নয়।’ অন্যদিকে হামাস বলছে, কোনো যুদ্ধবিরতি হয়নি। তবে মিসরে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার খবর বেরিয়েছিল, ইসরায়েল ও গাজা সমন্বিত যুদ্ধবিরতিতে ‘সম্মত’ হয়েছে। মিসরের মধ্যস্থতায় কায়রোতে আলোচনা শেষে ওই যুদ্ধবিরতি হয় বলে ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন।
খবর এএফপি, রয়টার্স, বিবিসি ও আল-জাজিরার। এর আগে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনের আহ্বানে গতকাল পাঁচ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইসরায়েল ও হামাস।৭ জুলাই থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় গতকাল পর্যন্ত ১০ দিনে ২২৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত এক হাজার ৭০০ জন। প্রতিবেশী মিসরের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ গতকাল কায়রোয় আলোচনায় বসে। আলোচনার একপর্যায়ে ইসরায়েলি একজন কর্মকর্তা যুদ্ধবিরতিতে ‘সম্মত’ হওয়ার খবর জানান।ওই কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে। কাল (আজ শুক্রবার) থেকে তা কার্যকর হবে।’ তবে রয়টার্সের খবরেই বলা হয়, মিসরে ইসরায়েলের শুধু জ্যেষ্ঠ নেতারা যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইসরায়েলি শীর্ষ নেতারা যুদ্ধবিরতির বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। কিন্তু গাজায় ক্ষমতাসীন হামাস ওই খবর অস্বীকার করে। হামাস জানায়, কায়রোর আলোচনায় এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে যুদ্ধবিরতির আলোচনা এগিয়ে চলছে। মিসরের আলোচনায় অংশ নেয়নি হামাস। ওই আলোচনায় যোগ দেওয়া ফিলিস্তিনি সংগঠন ফাতাহর প্রতিনিধি আজ্জা আল-আহমাদ আল-জাজিরা টেলিভিশনকে বলেন, কায়রোর আলোচনায় যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মতৈক্য হয়নি, তবে আলোচনা চলছে।
সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। পাঁচ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি: গাজার বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের সুযোগ দিতে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় দুই পক্ষ। ইসরায়েল এটিকে ‘মানবিক যুদ্ধবিরতি’ বলছে৷ গাজায় জাতিসংঘের ত্রাণ পরিচালনা কার্যক্রমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সংক্ষিপ্ত এই যুদ্ধবিরতি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাঁদের জরুরি কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। এই কার্যক্রমের মুখপাত্র ক্রিস গানেস বলেন, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে খাদ্য ও পানি সরবরাহ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গাজার বাসিন্দারা সংক্ষিপ্ত এই যুদ্ধবিরতির সময় নিত্যপণ্য সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করেন। এ সময় গাজার প্রধান সড়কগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হয়। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকরের দুই ঘণ্টার মধ্যেই গাজা থেকে ইসরায়েল লক্ষ্য করে অন্তত তিনটি রকেট ছোড়া হয়েছে। পাল্টা অভিযোগে হামাস বলেছে, যুদ্ধবিরতির সময় গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফায় মর্টার শেল নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েল-হামাস সংক্ষিপ্ত এই যুদ্ধবিরতি গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় শুরু হয়ে বিকেল তিনটায় শেষ হয়। এর মধ্যেই মিসর থেকে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধবিরতিতে ‘সম্মত’ হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকরের মিনিট কয়েক আগেই গাজার দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলায় তিন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হন। ফিলিস্তিনের জরুরি সার্ভিসের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরা গতকাল জানান, ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলায় তিনজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি চারজন গুরুতর আহত হন। হামলায় ইসরায়েলের ছয়টি ট্যাংক অংশ নেয়। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৭ জুলাই ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামে গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। ওই অভিযানে গতকাল পর্যন্ত ২২৭ ফিলিস্তিনি নিহত হন। আহত হন অন্তত এক হাজার ৭০০ জন। এঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। যুদ্ধবিরতির জন্য সব উপায় ব্যবহার করা হবে: ওবামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত বুধবার হোয়াইট হাউসে বলেন, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান সহিংসতার অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র তার সব কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও সম্পর্ক ব্যবহার করবে। দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির জন্য মিসরের প্রচেষ্টাকে ওয়াশিংটন সমর্থন করে উল্লেখ করে ওবামা বলেন, কার্যকর যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে তার অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। ওই অংশীদারদের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ রেখে চলছে হোয়াইট হাউস। ওবামা বলেন, গাজা থেকে ছোড়া রকেট হামলা থেকে নিজেকে রক্ষা করার অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে। কিন্তু গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির বিষয়টিও দুঃখজনক।

অদেখা হুমায়ূন আহমেদ by নাসির আলী মামুন

তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। এমন ঘরানার সাহিত্যিক, যিনি ছোটগল্প লিখে আলোড়ন তুলেছেন, উপন্যাস দিয়ে মোহগ্রস্ত করেছেন পাঠকদের। সৃজনশীলতার প্রায়
সব শাখায় পাঠক ও দর্শকদের নিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়েছেন।
২০১২ সালের ১৯ জুলাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অন্তরালে।
মনে পড়ে, তাঁর ৪৮তম জন্মদিনকে সামনে রেখে আমি একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেটি প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছিল। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি শিওর, একদিন ক্যানসারমুক্ত পৃথিবী হবে।’ আরেকবার বলেছিলেন, ‘যেদিন ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কার হবে, সেদিন পৃথিবীর সমস্ত জনগণ একসঙ্গে উল্লাস করবে।’

২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে নুহাশপল্লীতে এসেছিলেন কলকাতার সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সেদিন সুইমিংপুলের পাশে দুই কিংবদন্তির উপস্থিতি এবং সিগারেট ধরানোর দৃশ্য আমার ক্যামেরায় বন্দী হয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলছিলেন, তিনি আর সিগারেট ধরাবেন না। কারণ, এতে ক্যানসারের ঝঁুকি বাড়ে। পাশে বসা হুমায়ূন বললেন, সিগারেট খেলে যদি ক্যানসার হয়, যারা খায় না, তাদের কেন হয়? এ নিয়ে কথা-চালাচালি শেষ না হতেই ফুলপ্যান্ট পরে পানিতে নেমে পড়লেন হুমায়ূন। আর যাঁরা উপস্থিত ছিলেন একে একে প্রায় সবাই পানিতে নেমে পড়লেন। সুনীল উদোম গায়ে পায়জামা পরে সুইমিংপুলে সাঁতরালেন, সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ। এমন বিরল দৃশ্য ভুলি কী করে!
মৃত্যুর কদিন আগে, ৯ মে ২০১২, তাঁর নিউইয়র্কের ভাড়া বাড়িতে দেখা করতে গিয়ে অন্য আরেক মানুষকে পেলাম। ফুলহাতা লাল চেক শার্ট। মাথায় পশ্চিমা ঘরানার হ্যাট। বাড়ির সামনে তাঁর ছবি তুললাম আমি। ক্যানসারে ক্ষতবিক্ষত মানুষটির ফুর্তি এতটুকুও কমেনি। হ্যাট খুললে দেখি মাথায় চুল নেই, শরীর কম্পমান। কোথাও বসলে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কথা বলছেন অনর্গল। মনে হলো, তাঁর কঠিন কিছু হয়নি। তিনি আবার সেরে উঠবেন ঠিকঠাক।
ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তিনি ঢাকায় এলেন। চলে গেলেন তাঁর ঠিকানায় নুহাশপল্লীতে। সবাইকে সময় দিয়েছেন তিনি। এর আগেও বেশ কয়েকবার নুহাশপল্লীতে তাঁর ছবি তুলতে গেছি। কিন্তু সেদিনটা ছিল অন্য রকম। সেদিন কেন যেন মনে হলো তাঁর হাতে লাগানো ফুল লতাপাতা—সবাই তাঁকে দেখছে, স্পর্শ করতে চাইছে। তিনিও সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে সমর্পণ করে দিচ্ছেন। আমার ক্যামেরায় তিনি প্রিয় গাছ ও ফুলগুলোর সঙ্গে ছবি তুললেন। সুইমিংপুলের পাশে সিমেন্টের হাঁ করা অতিকায় মুখোশের ভেতর দিয়ে অনর্গল পানি ঝরছে। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলে দিতে অনুরোধ করলেন।
তারপর দেখা হয়েছে ধানমন্ডির দখিন হাওয়ার বাসায়। প্রতিটি মুহূর্তের ছবি তুলেছি আর ভেবেছি। তিনি যে হারিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সংকেত যেন আমি আমার ক্যামেরায় অনুধাবন করতে পারছিলাম। এখন আর মাতম করলেও ফির পাব না তাঁকে। শুধু গভীর মমতায় তাঁর আলোকচিত্রগুলো আঁকড়ে আছি। আমি যেদিন থাকব না সেদিন কি হবে ছবিগুলোর?

মূল্যস্ফীতির ভুল বার্তাসমূহ by আবুল বাসার

মূল্যস্ফীতি নিয়ে গত অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকার বেশ আশাবাদ শুনিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও তার মুদ্রানীতিতে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। মুদ্রানীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনেক সময় প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই দুটির যেকোনো একটিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হয়। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে, যা ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার সরকারি আশাবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত অর্থবছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আগের বছরের তুলনায় কমেনি, বরং বেড়েছে।
প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী গত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, একজন মানুষ আর আগের বছর যে মানের জীবনযাপন করত, সেই একই মানের জীবনযাপন করতে গত অর্থবছর তাকে ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০১২-১৩ অর্থবছরে তার আগের অর্থবছরে যাপিত জীবনমান ধরে রাখার জন্য ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
তবে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিষয়ে কিছুটা কৃতিত্বের বৈধ দাবিদার। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখা, যা তারা করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতিকে শুধু সংখ্যার হিসাব দিয়ে বিচার করা ঠিক হয় না, তার ধরনটির ওপরও আলোকপাত করতে হয়। প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে দেখা যায়, গত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির মূল নিয়ামক ছিল খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ হলেও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সেটা ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা তার আগের বছরে ছিল ৫ দশমিক ২২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করার সময় অনুমান করে নেওয়া হয় যে খাদ্যের ওপর ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ আমাদের মোট ব্যয়ের ৫৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। যদি কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ তার মোট ব্যয়ের অংশ হিসাবে তার চেয়ে অধিক হয়, তাহলে সেই পরিবারকে গত বছরে যাপিত জীবনমান অটুট রাখার জন্য গত বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
যারা সাধারণত তাদের মোট ব্যয়ের বড় অংশ খাদ্যসামগ্রীতে ব্যয় করে, তারা মূলত স্বল্প আয়ের মানুষ। তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জাতীয় আয়-প্রবৃদ্ধির সুবিধাবঞ্চিত থেকে যায়। তাই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের কম হলেও উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের জীবনে ব্যয়ের বোঝা আনুপাতিক হারে অনেক বেশি বেড়ে যাবে। অর্থাৎ গত বছরের মূল্যস্ফীতির যা ধরন, তাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর তার প্রভাবটা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি পড়েছে। অংশীদারিমূলক উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা উদ্বেগের বিষয়।
আবার দেখা যাচ্ছে, শহুরে এলাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি, প্রায় ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এর অর্থ হলো, শহরসমূহে যেসব কর্মজীবী স্বল্প আয়ের মানুষ বাস করছে, যারা তাদের আয়ের একটা বড় অংশ খরচ করে খাদ্যসামগ্রীতে, তাদের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখা গত অর্থবছরে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশের শিল্প খাতের যতটুকু প্রসার হয়েছে, তার পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক ছিল নিম্ন মজুরি। আর এই নিম্ন মজুরিভিত্তিক শিল্পায়ন হুমকির মুখে পড়বে যদি শহর এলাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি গত বছরের মতো বাড়তেই থাকে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমানো না গেলে শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হবে।
মূল্যস্ফীতিকে সরকার তার লক্ষ্য মোতাবেক সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখতে পারলেও মূল্যস্ফীতির যে প্রকৃতি গত অর্থবছরে পরিলক্ষিত হয়েছে, তা অর্থনীতির জন্য সামগ্রিকভাবে অশুভ পরিণতির ইঙ্গিত বহন করে। আশি বা নব্বইয়ের দশকে নিম্ন মজুরি প্রদান করেই যে হারে গ্রামীণ এলাকা থেকে, বিশেষ করে কৃষি খাত থেকে শ্রমিক এনে শহুরে এলাকায় শিল্প খাতে নিয়োগ করা যেত, সেটা এখন সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এমনটিই ঘটে দুনিয়াব্যাপী। তার ওপর খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যোগ হয় তাহলে শিল্পায়ন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। গত অর্থবছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে যেভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে শহর এলাকায়, তা বাংলাদেশের শিল্পায়নের স্বার্থে একটি গুরুতর সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। সামগ্রিক উন্নয়নের খাতিরে এই সতর্কবার্তাকে সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গেই নেওয়া উচিত।
খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি অনেক কমে এসেছে। গত অর্থবছরে তা ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। আপাতদৃষ্টিতে এটি শুভকর। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিষয়টি আসলে ভালোর চেয়ে খারাপের ইঙ্গিতই বেশি বহন করছে। অর্থাৎ খাদ্যবহির্ভূত চাহিদা আগের বছরের তুলনায় কম হারে বাড়া। গত অর্থবছরে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমার পেছনে মূল কারণটা হলো চাহিদার নিম্নমুখী প্রবণতা, যার সঙ্গে সম্পৃক্ত মূল কারণ হলো মানুষের ব্যয়ক্ষমতার অপ্রতুলতা।
আমাদের প্রবৃদ্ধি গত অর্থবছরে ৬ শতাংশ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবতা হলো মানুষের ব্যয়ক্ষমতা অন্যান্য বছরের তুলনায় একই হারে বাড়েনি। মানুষ একই হারে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ক্রয় করেনি। আর সে জন্যই খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে চাহিদার এ রকম হ্রাস মূল্যস্ফীতিকে কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নের চাকাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য মোটেও ভালো নয়। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—এ রকম আত্মতুষ্টিতে না থেকে বরং সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা না বাড়ার কারণগুলো কী কী। এগুলো দূরীকরণ ছাড়া অর্থনীতির চাকা সামনে এগোবে না।
প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির উপাত্ত অনুযায়ী শহর এবং গ্রামাঞ্চলে খাদ্য এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এক রকম নয়। গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেশি এবং শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশি। এর পেছনে মূল কারণ হলো সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বিপণনব্যবস্থার অদক্ষতা। গ্রামে উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য আসতে আসতে দাম বেড়ে যায়, আর শহরে উৎপাদিত শিল্পজ পণ্য গ্রামাঞ্চলে যেতে যেতে দাম বেড়ে যায়। বিদ্যমান উপাত্ত অনুযায়ী এই দাম বাড়ার পরিমাণ অস্বাভাবিক বেশি। এসব দুর্বলতা এবং অদক্ষতা দূর না করে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যাবে না।
আবুল বাসার: গবেষক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), সাবেক অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক।
abasher@bids.org.bd

নরেন্দ্র মোদির ভণ্ডামি by শশী থারুর

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমর্থকেরা বলে থাকেন, ভারতের সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিপুল বিজয়ের কারণ হচ্ছে, দলটি কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।মোদি কি ভোটারদের সব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন?
হ্যাঁ, ব্যাপক শোরগোল তৈরি করা হয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারণায় দাবি করা হয়, মোদি ইউপিএ সরকারের ‘বাজে শাসন’ ও ‘পক্ষাঘাতগ্রস্ত নীতি’র বদলে মৌলিকভাবে ভিন্ন টাটকা নীতি প্রণয়ন করবেন­, যার ভিত্তি হবে করপোরেট ‘গুজরাটের উন্নয়ন মডেল’। এর মাধ্যমে তিনি নাকি ভারতের খোলনলচে বদলে ফেলবেন, ইউপিএ সরকারের নিঃশেষিত ও অকার্যকর নীতি ছুড়ে ফেলে কোটি কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত করবেন। তাঁর বিজয়ের পর বিজেপির সমর্থকেরা ডুগডুগি বাজিয়ে বলছেন, ‘ভালো দিন আসছে।’
মোদির জনসংযোগ দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, বিজেপি ইউপিএ জোটের নরম ও আপসকামী নীতির অবসান ঘটাবে। ইউপিএ সরকার যেসব কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, মোদি সেসব গ্রহণের কথা দিয়েছেন। মানে, তিনি ভারতের ‘দানশীল’ ও ভর্তুকির সংস্কৃতি পরিহার করে সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান করবেন। তিনি হলফ করে বলেছেন, ভারতের জনগণের এখন কর্মসংস্থান প্রয়োজন, ভিক্ষা নয়।
কথা হচ্ছে, মোদির ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এসব দাবির অসাড়তা প্রমাণিত হয়ে গেছে। ইউপিএ সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার একটি বড় নজির হচ্ছে চিনির মূল্য নির্ধারণের নীতি। মনে করা হয়, ইউপিএ জোটের প্রভাবশালী আখ সমবায়ীরা সরকারকে অতিমূল্য নির্ধারণে এবং আখচাষিদের মন্দ ঋণ অবলোপনে বাধ্য করেছে। এর ফলে নাকি অতি উৎপাদন হয়েছে।
কিন্তু এই প্রথা তুলে দেওয়ার বদলে মোদির সরকার চিনি রপ্তানিতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়েছে, বাস্তবে যার উল্টোটা হওয়ার কথা। মোদি সরকার চিনি আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দেশি চিনির সঙ্গে বিদেশি চিনির প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমিয়েছে এবং পেট্রলের সঙ্গে আখভিত্তিক ইথানল মেশানো বাধ্যতামূলক করেছে। তাঁর এই প্রণোদনার কারণ খোঁজা খুব কঠিন কোনো ব্যাপার নয়: ভারতের সর্বাধিক আখ উৎপাদনকারী প্রদেশ মহারাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন, যাতে আগামী রাজ্যসভা নির্বাচনে সেখানে ভালো করা যায়।
এই লক্ষ্য থেকে আরেকটি ব্যাপার পরিষ্কার, এটা বিজেপির নীতিগত অবস্থানের বিরুদ্ধাচরণ। ইউপিএ সরকারের সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন, ট্রেনের যাত্রী ও মালামাল বহনের ভাড়া অত্যন্ত কম হওয়াটা আসলে সরকারের কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অক্ষমতারই নামান্তর। এতে নাকি রেলগাড়ি ও লাইনের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হয়নি এবং রেলের সম্প্রসারণ ও সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব হয়নি।
ক্ষমতায় আসার পরপরই মোদি সরকার ভাড়া বৃদ্ধি কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়, যদিও তারা বারবার বলেছে, তারা শুধু আগের একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। তারপর গণরোষের মুখে পড়লে উপশহরগুলোতে যাতায়াতকারী কমিউটার ট্রেনের মাসিক পাসের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়, এই পাসে উল্লেখযোগ্য হারে ছাড় দেওয়া হয়। মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকার ভোট বাগাতে এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
আর একটি অজনপ্রিয় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মোদি আরও দুর্বল অবস্থান নিয়েছেন: জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি। ভারতের বাজারে তেলের মূল্য বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে দেশীয় তেল ও গ্যাস উত্তোলকদের আরও তেল ও গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে বিনিয়োগে সক্ষম করার উদ্দেশ্যে ইউপিএ সরকার গত ১ এপ্রিল থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করেছিল। শেষ পর্যন্ত রেলের ভাড়ার মতো এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারও মোদির ওপর বর্তায়। এ ক্ষেত্রে যা করণীয় ছিল, তা না করে মোদি আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া স্থগিত করেছেন, আবার পূর্বসূরিদের ওপরও দোষ দেওয়া হয়েছে।
বিজেপি সরকার আজ পর্যন্ত যা যা করেছে, তার ছত্রে ছত্রে রয়েছে এই ভণ্ডামি। বিজেপি সরকার ভারত-মার্কিন পরমাণু–সহায়তা চুক্তির বিরোধিতা করলেও মোদি ভারতকেন্দ্রিক ‘অ্যাডিশনাল প্রটোকল’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক পরমাণু এজেন্সিগুলো ভারতের বেসামরিক পরমাণু স্থাপনাগুলোতে অবাধ প্রবেশাধিকার পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উল্লিখিত সামরিক চুক্তিটি ছিল ইউপিএ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় সাফল্য। তদুপরি, মোদি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে আলোচনারও বিরোধিতা করেছেন। এর ফলে ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় অভিযুক্তদের বিচার ও শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়, যদিও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। এ হামলায় ১৬৪ জন মারা যায়, আহত হয় ৩০০ জনেরও বেশি। তার পরও নওয়াজ শরিফ মোদির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, দুই নেতা একে অপরকে উপহারও দিয়েছেন। ভেবে দেখুন, কী খেল দেখালেন মোদি।
মোদি সরকার ইউপিএ সরকারের প্রস্তাবিত গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স নীতি গ্রহণ করেছে। অথচ বিজেপির নেতৃত্বাধীন রাজ্যগুলোর বিরোধিতার কারণে এটা স্থগিত হয়ে গিয়েছিল, মোদির গুজরাটও এর মধ্যে আছে। এর ফলে সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা জোরদার হবে, মোদি এর বিরোধিতা করে বলেছিলেন, এটা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থায় ফাটল ধরাবে।
মোদি তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই যেসব নীতি পরিহারে উচ্চকণ্ঠ হয়েছিলেন, বিজেপির সমর্থকেরা ইতিমধ্যে এগুলোর সমালোচনা শুরু করেছেন। ভারতীয় জনগণ বিস্ময়ে দেখছে, মোদি পরিবর্তনের কথা বলে বাস্তবে ইউপিএ সরকারের নীতিগুলোই একে একে গ্রহণ করছেন। ইউপিএ সরকারের অংশীদার হিসেবে বলছি, এসব কাণ্ড দেখে কিন্তু খুব খারাপ লাগছে না।

ইংরেজি থেকে অনূদিত: স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
শশী থারুর: ভারতের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী।

অধিকারহারা নারী by সালমা খান

দেশের সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশের নারীর ব্যাপক অবদান; বিশেষত, মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্জনের মূল চালিকাশক্তি নারী। এটি প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্যপীড়িত ও সম্পদবঞ্চিত জনগণের সিংহভাগ নারী, তা আবারও প্রতীয়মান হলো সাম্প্রতিক এক গবেষণাতথ্যে। এতে দেখা গেছে, দেশের ৭০ শতাংশ নারীর কোনো সম্পদ নেই। নারী-পুরুষনির্বিশেষে সাংবিধানিক ক্ষমতার নিশ্চয়তা সত্ত্বেও পারিবারিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সম–অধিকার আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিদ্যমান বৈষম্য সামলে নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পারিবারিক সম্পদ উত্তরাধিকারের হার নারী-পুরুষের একই হওয়ার কথা। কারণ, যখনই একজন পুরুষ কিছু উত্তরাধিকার করেন, তার একটি অংশ নারীরও প্রাপ্য—অর্থাৎ, সম্পদের পরিমাপে ব্যতিক্রম হলেও হার একই হওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সমাজে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপকতা ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যার কারণে নারী বঞ্চিত হচ্ছেন অর্থনৈতিক ন্যায্যতা থেকে।
ভাইয়ের অনুকূলে প্রাপ্য সম্পত্তি ত্যাগ করার, পারিবারিক চাপ এবং লিঙ্গনির্বিশেষে সম্পদে সম–অধিকারের আইনি দুর্বলতার কারণে ঘরে-বাইরে সমান অথবা ক্ষেত্রবিশেষে অধিক শ্রমদান করেও নারীর অর্থনৈতিক ভিত্তি সামগ্রিকভাবে পুরুষের তুলনায় অনেক দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন ও স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় প্রতীয়মান হয়, সম্পত্তিহীনতার ব্যাপারটি ওতপ্রোতভাবে নারী উদ্যোক্তা ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে প্রবেশের সঙ্গে জড়িত। পারিবারিকভাবে দুর্বল অবস্থান নারীর জন্য অর্থনৈতিক ন্যায্যতা সৃষ্টিতে প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করে।
১৯৯৫ সালে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে গৃহীত বেইজিং ঘোষণায় পরিবারে নারীর সমান অধিকার না পাওয়াকে নারীর বঞ্চনা ও দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা আজও বিদ্যমান। যেহেতু নারী সন্তান ও পরিবারের কল্যাণকে পুরুষের তুলনায় অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন, তাই দারিদ্র্য পুরুষের তুলনায় নারীর জীবনে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে, যা অর্থনৈতিক সুযোগে প্রবেশগম্যতার ক্ষেত্রে নারীর জন্য অধিক সমস্যার সৃষ্টি করে।
উল্লিখিত গবেষণায়ও দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ নারী শ্রমিক পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে প্রায় অর্ধেক মজুরি পেয়ে থাকেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় লিঙ্গভিত্তিক মজুরিবৈষম্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে নেতিবাচক। বাংলাদেশের দরিদ্র নারীদের সিংহভাগ, যাঁরা গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত, তাঁদের জন্য নিম্নতম মজুরি ও কর্মঘণ্টা আজও নির্ধারিত হয়নি। অর্থনৈতিক সুযোগে নারীর প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণ, নারী উদ্যোক্তার প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা এবং মজুরিবৈষম্য দূর করতে হলে পরিবারের সদস্য হিসেবে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পরিবর্তন আনা অতি জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, সম্পদহীনতার সঙ্গে নারীর নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও জড়িত।
সালমা খান: অর্থনীতিবিদ, নারীনেত্রী।

যাহা জয় বাংলা তাহাই জিন্দাবাদ! by সোহরাব হাসান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যে কোনো বিষয়েই একমত হতে পারে না, তা আবারও প্রমাণিত হলো সম্প্রতি সমুদ্রসীমা নিয়ে হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে দেওয়া রায়ের বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ায়। এই রায়কে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের বিরাট বিজয় বলে অভিহিত করলেও বিএনপি বলেছে, ব্যাপক পরাজয়। বিএনপির নেতারা বলতে চাইছেন যে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে বাংলাদেশ ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার পেলেও বাকি ছয় হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথায়, কীভাবে দেওয়া হলো, রায়ের আগ পর্যন্ত বিএনপির নেতারা সেই ছয় হাজার ১৩৫ কিলোমিটার উদ্ধারে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার ব্যাখ্যা নেই।

বঙ্গোপসাগরের এই সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি কিন্তু দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে হয়নি। হয়েছে আন্তর্জাতিক আদালতে। শেখ হাসিনার আগের সরকারই আদালতে গিয়েছিল। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ না থাকায় ভারতও তা মেনে নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভারতের কাছে বাংলাদেশের পরাজয় কীভাবে হলো, বিএনপির নেতারা তা বুঝিয়ে দিলে উপকৃত হতাম। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের সময়ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম প্রথমে অভিনন্দন জানিয়ে পরে তা ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। একেই বলে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম গতকাল এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বিএনপির এই সংকীর্ণ মনোভাবকে বিকারগ্রস্ত রাজনীতি বলে অভিহিত করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের রাজনীতি ক্রমেই বিকারগ্রস্ততার দিকে যাচ্ছে।
এদিকে সরকারি দলের নেতারাও কম যান না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে সমুদ্র বিজয় হতো কি না সন্দেহ। এ পর্যন্ত না হয় মানা গেল। কিন্তু তিনি যখন বিএনপির নেতাদের সমালোচনার জবাবে তাঁদের দক্ষিণ তালপট্টি খুঁজে দেখার পরামর্শ দেন, তখনই খটকা লাগে। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে ১৯৮০ সালের পর বাংলাদেশের কোনো মানচিত্রে দক্ষিণ তালপট্টির অস্তিত্ব নেই। ১৯৮০ সালে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। এরপর এরশাদ ক্ষমতায় আসেন। মানলাম, তাঁরা মানচিত্রে দক্ষিণ তালপট্টি না রেখে কবিরাহ গুনাহ করেছে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেই গুনাহকে লাঘব করার কোনো উদ্যোগ নিল না কেন? দক্ষিণ তালপট্টির অস্তিত্ব নেই—আদালতে বাংলাদেশ এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছিল। আর ভারতের চেষ্টা ছিল দক্ষিণ তালপট্টি আছে, সেটা দেখানো। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ লিখেছেন, ভারতের প্রয়াস সফল হলে বঙ্গোপসাগরে তাদের সীমানা আরও বাড়ত। দ্বীপের চারপাশের কিছু এলাকারও মালিকানা পেত তারা। ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে দক্ষিণ তালপট্টি বা অন্য কোনো দ্বীপ জেগে উঠলে তার মালিকানা নিয়েও বিরোধ দেখা দিতে পারে। তাই দক্ষিণ তালপট্টি নেই ভেবে ক্ষমতাসীনদের আহ্লাদিত হওয়ার কারণ নেই।
২.
প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তাঁর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘রাজনীতির একটি পক্ষ এখনো স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। মনে-প্রাণে পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে চায়। যারা জয় বাংলা বলতে লজ্জা পায়, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তারা পাকিস্তানের এজেন্ট। তাদের সেখানেই চলে যাওয়া উচিত। (সমকাল, ১২ জুলাই ২০১৪)।
কারও নাম উল্লেখ না করলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বিএনপিকে উদ্দেশ করেই তিনি এসব কথা বলেছেন। কোনো দলের নীতি ও আদর্শের সমালোচনা করা আর সেই দলকে পাকিস্তানের বা অন্য কোনো দেশের এজেন্ট বানানো এক কথা নয়। এখন বিএনপি বা তার সহযোগী কোনো দল ক্ষমতায় নেই। সজীব ওয়াজেদ যে দলের সদস্যপদ নিয়েছেন, সেই আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আছে মহাপ্রতাপ নিয়ে। অতএব, যাঁরা বিদেশি এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশের ও জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কাজ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বটা সরকারেরই। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও যারা মনে-প্রাণে পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে চায়, তাদের ঠিকানা তো হওয়া উচিত জেলখানা। কিন্তু সরকার এ পর্যন্ত এই অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে বলে জানা নেই।
সজীব ওয়াজেদ জিন্দাবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেছেন, এটি যেহেতু উর্দু শব্দ (আসলে এটি ফারসি শব্দ), সেহেতু বাংলাদেশে চলতে পারে না এবং যারা জিন্দাবাদ বলবে, তাদের পাকিস্তানেই চলে যাওয়া উচিত। তাঁর এই যুক্তি মেনে নিলে বাংলা ভাষাকেই নতুন করে লিখতে হবে। বহু বিদেশি শব্দের সমাহারে হাজার বছর ধরে বাংলা ভাষার ভিত তৈরি হয়েছে। উর্দু শব্দ বলে যদি জিন্দাবাদ পরিত্যাজ্য হয়, তাহলে ‘আওয়ামী’ শব্দটি কেন হবে না? এটিও উর্দু শব্দ। ‘আওয়াম’ শব্দের অর্থ গণ বা জনগণ। সেই ‘আওয়াম’ থেকেই আওয়ামী লীগ নামের দলটির সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৪৯ সালে (প্রথমে নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ)। নামের অপরাংশ ‘লীগ’ও নেওয়া হয়েছে ইংরেজি থেকে। আওয়ামী লীগের পুরো নামে কোথাও ‘বাংলা’ নেই বলে কি আমরা এটিকে বিদেশি দল হিসেবে চিহ্নিত করব? একেবারেই না। যেকোনো দলকে বিচার করতে হবে কাজ দিয়ে। কোন দলের নাম উর্দুতে হলো আর কোন দল হিন্দি স্লোগান ব্যবহার করল, সেসব দিয়ে নয়। তা ছাড়া, আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ ত্যাগ করেছে, এ কথাও পুরো সত্য নয়। সংবিধানে জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ শব্দটি যেমন আওয়ামী লীগ সাদরে গ্রহণ করেছে, তেমনি জিন্দাবাদও, তবে বাংলা অনুবাদ করে। বিএনপি বা অন্য আরও অনেক দল যেমন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে, তেমনি আওয়ামী লীগ এটিকে বাংলা তরজমা করে নিয়েছে: ‘বাংলাদেশ চিরজীবী হোক’। আওয়ামী লীগের সব নেতা জয় বাংলার পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ চিরজীবী হোক’ বলে বক্তব্য শেষ করেন।
দোষ শব্দ বা ভাষার নয়। দোষ হলো আমরা সেই শব্দ বা ভাষাকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি। ইনকিলাব একসময় উপমহাদেশে বিপ্লবীদের স্লোগান ছিল। বাংলাদেশের একজন রাজাকার নেতা সেই নাম ব্যবহার করে পত্রিকা বের করে মানুষের শুভবোধ ও চিন্তার বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়েছেন বলে ইনকিলাব শব্দটি বাতিল হয়ে যেতে পারে না। তেমনি জিন্দাবাদও।
৩.
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, পঞ্চাশের দশক থেকেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু জয় বাংলা স্লোগানটি প্রথম উচ্চারিত হয় ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মধুর ক্যানটিনে ছাত্রলীগের এক কর্মিসভায়। এরপর এটি তরুণদের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি প্রধান রণধ্বনিতে রূপান্তরিত হলেও সব মুক্তিযোদ্ধা এই স্লোগান দেননি। অনেকে সমাজ বিপ্লবের পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন। তাহলে জয় বাংলা স্লোগান না দেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদেরও কি এখন পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে হবে? একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের মধ্যে জয় বাংলা বা জিন্দাবাদ নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিল না। বিতর্ক হয়েছে স্বাধীনতার পরে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ও তার আগে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জয় বাংলা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক স্লোগান। নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিপীড়িতের, সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে অধিকারবঞ্চিতদের স্লোগান। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই স্লোগানের চরিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে, এক নেতা আরেক নেতার বিরুদ্ধে এই স্লোগান কাজে লাগান। মুক্তিযুদ্ধের সময় যাঁরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছিলেন, তাঁদের একাংশ যেমন স্বাধীনতার পর এই স্লোগানকে বর্জন করে, তেমনি যাঁরা সে সময় জয় বাংলা স্লোগান দিতেন না, আওয়ামী লীগে এসে এখন সেই স্লোগান রপ্ত করেছেন। বর্তমান মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্য আছেন, যাঁরা এখনো জয় বাংলা বলেন না, তাই বলে কি তাঁরা মনে-প্রাণে পাকিস্তানি হয়ে গেছেন? জয় বাংলা স্লোগানের উদ্যোক্তা ছাত্রলীগ স্বাধীনতার পর বিভক্ত হয়ে পড়লে একাংশ আর এই স্লোগান ব্যবহার করে না। আজও না। তাদেরও কি পাকিস্তানে চলে যেতে হবে?
সত্য যে জয় বাংলা মুক্তিযুদ্ধের প্রধান রণধ্বনি স্লোগান ছিল। আবার এও অসত্য নয় যে, এই স্লোগান দিয়ে অনেক অপকর্মও সাধিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের ক্ষমতাসীন অংশটি এই জয় বাংলা স্লোগান দিয়েই ডাকসুর ব্যালট বাক্স হাইজ্যাক করেছিল। ১৯৭৪ সালে মুহসীন হলে সাত খুনের হোতারাও এই স্লোগান দিয়েছিল। পরবর্তীকালে এই স্লোগান অনেক দুষ্কৃতকারীর কণ্ঠেও শোনা গেছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, বর্তমানে সারা দেশে ছাত্রলীগের নামে যে খুনোখুনি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে, তা করছে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের অনুপ্রবেশকারীরা। তারা কেউই আগের জিন্দাবাদ বা ইসলামি শাসন কায়েমের স্লোগান দিচ্ছে না। জয় বাংলা বলেই এসব করছে। যে স্লোগান একাত্তরের প্রধান (একমাত্র নয়) রণধ্বনি ছিল, সেটি এখন একটি রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। তাই সবাইকে জোর করে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়ানোর চেষ্টা ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ বলেই মনে করি।
আর জিন্দাবাদ স্লোগান যাঁরা দিচ্ছেন, তাঁরাও এটিকে অন্যায্যভাবে জয় বাংলার বিপরীতে ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে মুসলমানি জোশ আবিষ্কার করছেন। কিন্তু অভিধান অনুযায়ী জিন্দা মানে বেঁচে থাকা, জয়ী হওয়া। সেদিক থেকে জিন্দাবাদ ও জয় বাংলার মধ্যে বড় ফারাক দেখি না। ফারাকটি করেছে স্বার্থবাদী ও সংকীর্ণ রাজনীতি। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবহির্ভূত কোনো দলই এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এমনকি নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধিরাও নন। একজন ইতিমধ্যে পরীক্ষায় ফেল করেছেন। আরেকজন বাছাই পরীক্ষায় আছেন। দেখা যাক কী করেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net