Thursday, March 15, 2018

অবসানেও ফুরোয় না যে জীবন

স্টিফেন হকিং, নিজের অদম্য ইচ্ছা আর বুদ্ধিমত্তায় বারবার যেন মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে বেঁচে থাকা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। হার না মানার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রতীক ও অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন এই মহাকাশ বিজ্ঞানী। ৭৬ বছর বয়সে মারা যাওয়া এই বিজ্ঞানীর একটা ছবিই সবার সামনে যেন ভেসে ওঠে। হুইলচেয়ারে বসে একপাশে মাথা নোয়ানো। তবে এই হুইলচেয়ার বাধা হয়নি। তার মস্তিষ্ক ঠিকই চষে বেরিয়েছে মহাবিশ্ব। কৃষ্ণগহ্বরের অতল থেকে খুঁজে বের করেছেন তথ্য, বিলিয়েছেন পৃথিবীতে।
দীর্ঘদিন যাবত মোটরনিউরন ডিজিজের সঙ্গে লড়াই করে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত এবং সুপরিচিত একজন বিজ্ঞানী স্টিভেন হকিং। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, হকিং ছিলেন রসবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ, বিজ্ঞানের একজন জনপ্রিয় দূত এবং তিনি সব সময় নিশ্চিত করতেন যেন তার কাজ সাধারণ মানুষেরা সহজে বুঝতে পারেন। তিনি ‍বলতেন, জীবনে যদি আনন্দ না থাকে তবে সেই জীবন অর্থহীন।
তার লেখা বই 'এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম' অনেকটা ধারণার বাইরে বেস্ট সেলার বা সবচেয়ে বিক্রিত বইয়ে পরিণত হয়। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এই বইটি বিক্রি হয়েছে এক কোটিরও বেশি। জীবদ্দশায় তিনি বেশ কিছু টেলিভিশন প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন এবং তার কৃত্রিম কণ্ঠস্বরে কথা বলেছেন।
হকিংয়ের বেড়ে ওঠা
১৯৪২ সালে ৮ই জানুয়ারি অক্সফোর্ডে জন্মগ্রহণ করেন স্টিভেন উইলিয়াম হকিং। তার বাবা ছিলেন একজন জীববিজ্ঞানের গবেষক। জার্মানি বোমার আঘাত থেকে বাঁচতে স্টিভেন হকিং ও তার মাকে নিয়ে  জন্য লন্ডনে পালিয়ে যান তিনি।
এরপর লন্ডন এবং সেন্ট অ্যালবানসেই বেড়ে ওঠেন হকিং। তিনি অক্সফোর্ডে পদার্থবিদ্যার ওপর প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রি অর্জন করে কেমব্রিজে কসমোলজির উপর স্নাতকোত্তর গবেষণা করেন। কেমব্রিজে গবেষণা করার সময় তার মোটর নিউরন রোগ ধরা পরে যেটা তাকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে অচল করে দেয়। ১৯৬৪ সালে যখন তিনি তার প্রথম স্ত্রী জেনকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন চিকিৎসকরা বলে দেন তিনি বড়জোর দুই থেকে তিন বছর বাঁচবেন। এরপর কেটে গেছে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়। ঠিকই সকল পূর্বাভাসকে মিথ্যা প্রমাণ করে বেঁচে ছিলেন তিনি। খুঁজে বের করেছেন মানবজাতির কাছে অনেক অজানা তথ্য।
হকিংয়ের রোগটি যতটা দ্রুত ছড়ানোর আশঙ্কা করা হচ্ছিল তার চেয়ে কম গতিতে ছড়ায়।
১৯৮৮ সালে প্রকাশ হয় তার বই 'এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম'। বইটির এক কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়। সেবছরই তার এমন অবস্থা হয় যে তাকে শুধু কৃত্রিম উপায়েই কথা বলতে হতো। স্বাভাবিক বাকশক্তিও হারিয়ে ফেলেন তিনি।
তারকাখ্যাতি
কৃষ্ণগহ্বর কিভাবে শক্তিক্ষয় করতে করতে শূন্যে মিলিয়ে যায় তাই তুলে ধরেন স্টিভেন হকিং।পরবর্তীতে এটি পরিচিতি পায় হকিং বিকিরণ নামে। গাণিতিক হিসেব এবং পরীক্ষা ছাড়া বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয় তুলে ধরার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে তিনি বিশেষভাবে পরিচিতি পান।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে তাকে ‘নাম্বার ওয়ান সেলেব্রিটি সাইন্টিস্ট’ বলে উল্লেখ করা হয়। অনেক মানুষ তার বক্তৃতা শোনার জন্য জড়ো হতেন।
তবে তার "থিওরি অফ এভরিথিং" বা "সবকিছুর তত্ত্ব" মানুষকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে- যাতে তিনি ধারণা দেন যে মহাবিশ্ব কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যেই বিবর্তিত হয়। এই তত্ত্ব নিয়ে পরবর্তীতে সিনেমাও তৈরি হয় হলিউডে। ২০১৪ সালে স্টিফেন হকিংয়ের জীবন নিয়ে তৈরি হয় 'থিওরি অফ এভরিথিং' চলচ্চিত্র। জেন হকিংয়ের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয় চলচ্চিত্রটি।
‘এই মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে হলো- এমন সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এসব নিয়ম’, তিনি বলেন, ‘কবে এর শেষ হবে? কীভাবে শেষ হবে? এসবের উত্তর যদি আমরা জানতে পারি, তাহলে আমরা আসলেই ঈশ্বরের মন বুঝতে পারবো।’
হলিউড ছাড়াও ছোট পর্দাতেও তাকে নিয়ে কাজ চলেছে। বিখ্যাত মার্কিন কার্টুন সিম্পসনেও তার তারকা খ্যাতির চিহ্ন দেখা যায়- সিম্পসনের একটি পর্বে দেখানো হয় যে তিনি একটি পানশালায় কার্টুনটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হোমারের সাথে মদ্যপান করছেন এবং মহাবিশ্ব ডোনাট আকৃতির, হোমারের এমন একটি ধারণা চুরি করার চেষ্টা করছেন।
এছাড়াও তাকে বিবিসির জনপ্রিয় কমেডি সিরিজ রেড ডোয়ার্ফ, মার্কিন সিরিজ স্টার ট্রেক: নেক্সট জেনারেশন এবং বিগ ব্যাং থিওরির কয়েকটি পর্বে দেখা যায় স্টিফেন হকিং চরিত্রকে।
তার ভঙ্গুর শারীরিক অবস্থা সত্ত্বেও তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লুকেসিয়ান অধ্যাপক হিসেবে তার কাজ চালিয়ে যান এবং ২০০১ সালে তার দ্বিতীয় বই- ‘ইউনিভার্স ইন এ নাটশেল’ প্রকাশিত হয়।

শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত জীবন
স্টিফেন হকিংয়ের বিশ্বাস, তার অসুস্থতা কিছুটা হলেও তার জন্য উপকারও বয়ে এনেছে। তিনি বলেছিলেন, অসুস্থ হবার আগে তিনি জীবন নিয়ে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন।
অবশ্য তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই তাকে অন্যদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। তিনি প্রায়সময়ই তার প্রথম প্রথম স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা বলতেন, যিনি ২০ বছরেরও বেশি তার দেখাশোনা করেছেন। যদিও তিনি যখন তার একজন নার্সের জন্য প্রথম স্ত্রীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেন তখন তার বন্ধু এবং আত্মীয়-স্বজনরা বেশ অবাক হয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে তিনি তার সাবেক নার্সকে বিয়ে করেন। হকিংয়ের তিন সন্তান রয়েছেন।
২০০০ সাল নাগাদ আঘাতের কারণে তিনি বেশ কয়েকবার কেমব্রিজের একটি হাসপাতালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন। ঐসময় একটি অভিযোগ আসে যে তিনি কয়েক বছর যাবত নানাভাবে মৌখিক এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করে।
তবে তিনি ছিলেন বেশ খেয়ালী। তার হুইলচেয়ারটিই তিনি প্রায়সময় বেপড়োয়াভাবে চালাতেন এবং হকিং বারবার বলেন যে, তার এসব আঘাত কোন নির্যাতনের কারণে হয়নি। পরে বিষয়টি নিয়ে পুলিশও আর আগায়নি।
জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কোয়ান্টাম অভিকর্ষ নিয়ে কাজ করে গেছেন হকিং। তবে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতেই যেন এসেছিলেন তিনি। এ ব্রিফ হিস্টোরি অব টাইমের সাফল্যের পর আবারও লেখা শুরু করেন তিনি।
তবে স্বাভাবিকভাবেই হকিংয়ের জীবনযাপন খুবই ব্যয়বহুল ছিল। তাকে কোনও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেও আয়োজকদের নিতে হতো বাড়তি ব্যবস্থা। তবে তার কথা শুনতে জড়ো হতো অনেক মানুষ।
২০০৭ সালে তিনি প্রথম চলৎশক্তিহীন ব্যক্তি হিসেবে একটি বিশেষ বিমানে ওজনশূন্যতার অভিজ্ঞতা নেন। মানুষকে মহাকাশ ভ্রমণে উৎসাহ দেয়ার জন্যই তিনি এটি করেছেন বলে জানান।এই হুইলচেয়ারে করেই হকিং ঘুরে বেরিয়েছেন সারাবিশ্বে। শূন্যে ছিলেন, উত্তরমেরু পরিদর্শনে গিয়েছেন। নেমে গেছেন খনির মধ্যেও। সেখানে দেখা করেছেন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে।
দিনে দিনে তার লেকচারেও এসেছে ভিন্নতা। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তার বক্তৃতা হয়ে উঠতো আরও প্রাণবন্ত। কৃত্রিম উপায়ে যোগাযোগ করলেও সবকিছু থাকতো তার নিয়ন্ত্রণে। তার পরবর্তী বই দ্য ইলাস্ট্রেটেডপ ব্রিফ হিস্টোরি অব টাইম ও ইউনিভার্স ইন এ নাটশেলেও দেখা গিয়েছিল উন্নত গ্রাফিকস।
২০০৭ সালে নিজের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে লিখেছিলেন বাচ্চাদের জন্য মহাকাশবিষয়ক বই জর্জস সিক্রেট কি টু ইউনিভার্স।

অর্জন
তার জীবনে অসংখ্য অর্জন রয়েছে। ৩২ বছর বয়সেই রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৬ সালে পান সর্বোচ্চ সম্মাননা কোপলি মেডেল। এছাড়া ১৯৭৯ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান চেয়ার অব ন্যাচারাল ফিলোসফিতে বসার যোগ্যতা অর্জন করেন। স্যার আইজ্যাক নিউটনের পর ৩০০ বছরের মধ্যে তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
হকিংয়ের শিক্ষার্থীরাও পরবর্তীতে অনেক সাফল্য পেয়েছে। তবে এই অবস্থাতেও শিক্ষার্থীদের শাসন করতেন তিনি। অনেকসময় তাদের পায়ের ওপর হুইলচেয়ারও তুলে দিতেন। তবে শিক্ষার্থীরা তার ক্লাস করার জন্য উন্মুখ থাকতেন।

উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা: দাবি মিয়ানমারের

মিয়ানমারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইউ অং হ্লা তুন
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এবার নতুন প্রচারণায় নেমেছে মিয়ানমার। দেশটি বলছে, রাখাইনে কোনও গণহত্যা বা জাতিগত নিধনযজ্ঞ সংঘটিত হয়নি। রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের ঘরবাড়ি, গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। এসবের পর ‘উন্নত জীবনের আশায়’ তারা বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইউ অং হ্লা তুন সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছেন। অন্যদিকে, নেপিদো’তে এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ কমিটির সমন্বয়ক ইউ অং তুন থেত বলেছেন, ‘আমাদের দেশে জাতিগত নিধনযজ্ঞ বা গণহত্যার মতো কোনও ঘটনা ঘটেনি। আমরা সে রকম কিছু করিনি। অভিযোগ করা খুবই সহজ কাজ।’ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে রহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমার সরকারের চালানো প্রপাগান্ডার বিষয়টি উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করার বিষয়টির পাশাপাশি ২০১২ সালে ফিরিয়ে নেওয়া রোহিঙ্গাদের এখনও ‘ট্রানজিট সেন্টারে রেখে দেওয়া’, প্রায় সাত লাখের মধ্যে মাত্র আট হাজার জনের প্রত্যাবাসনে রাজি হওয়া এবং ওই ৮ হাজারের মধ্যে মাত্র ৩০০ জনকে রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও উঠে এসেছে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন করে জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় সাত লাখ মানুষ। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দাবি, নিরাপত্তাবাহিনীর চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার জবাব দিতেই তারা ওই অভিযান চালিয়েছিল। তাদের অভিযানে খুন, ধর্ষণ ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটার কথা অস্বীকার করছে দেশটি। তবে ১৩ মার্চ ২০১৮ তারিখে ঢাকায় এক  সংবাদ সম্মেলনে গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ পরামর্শক আদাম দিয়েং বলেন, ‘এটি পরিষ্কার যে মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, অত্যাচার করা হয়েছে, ধর্ষণ করা হয়েছে। তাদের জীবিত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। সবই করা হয়েছে তাদের পরিচয়ের জন্য।’
জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার কাজে লিপ্ত ছিল, এমনটা মনে করার যৌক্তিক কারণ আছে। আর তা যদি প্রমাণ করা যায় তাহলে তা গণহত্যার অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে। অথচ এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মাটিতে মাথা গুঁজে রয়েছে।’ অন্যদিকে মিয়ানমারের দাবি, রোহিঙ্গারা নিজেরাই তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। সেনাবাহিনীর বহু নির্যাতন ও ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেলেও তা অস্বীকার করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। মিয়ানমারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইউ অং হ্লা তুন বুধবার বলেছেন, বাংলাদেশে যে এতো রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে তার জন্য কিছুটা হলেও ‘বাঙালি সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তারা গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি চৌকিতে হামলা করেছিল। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইউ অং হ্লা তুনের ভাষায়, ‘তৃণমূল থেকে পাওয়া খবর থেকে জানা গেছে, সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর বেশির ভাগ রোহিঙ্গা ভয়ে পালিয়েছে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কায়। আবার অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে উন্নত জীবন যাপনের আশায় মিয়ানমার ছেড়েছে।’
সোমবার জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কাছে মিয়ানমারেরে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর চলতে থাকা নিপীড়নের বিষয়ে উত্থাপিত প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমারের কর্মকর্তারা। জাতিসংঘে প্রতিবেদন উপস্থাপন করার সময়ে মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত বিশেষ দূত ইয়াংহি লি বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো নিপীড়ন গণহত্যার চূড়ান্ত নিদর্শন। ব্যক্তি ও পুরো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানোর আদেশ যারা দিয়েছে আর যারা তা বাস্তবায়ন করেছে তাদের সবার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। উল্লেখ্য, জাতিসংঘে মিয়ানমারের দূত হিন লিন, এই বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে ইয়াংহি লিকে চাকরীচ্যুত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
আবার গত সোমবার অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পোড়া রোহিঙ্গা গ্রামের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলার জন্য দায়ী করেছে মিয়ানমার সরকারকে। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, ‘মানবতা বিরোধী অপরাধের’ প্রমাণ নষ্ট করতেই মিয়ানমার সরকার ওই কাজ করছে। উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবি দেখে অ্যামেনেস্টি জানতে পেরেছে, রোহিঙ্গাদের পুড়িয়ে দেওয়া  গ্রামগুলোর স্থানে নতুন সেনা ছাউনি বানাচ্ছে মিয়ানমার। পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো এমন ৩০০ রোহিঙ্গা গ্রামের তালিকা করেছে, গত আগস্টের আক্রমণের পর যে গ্রামগুলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলোর ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ইউ অং তুন থেত বুধবার নেপিডোতে এক সংবাদ সম্মেলনে  বলেছেন, ‘আমারা জমি পরিষ্কার করছি যাতে উদ্বাস্তুদের জন্য কিছু নির্মাণ করা যায়।’
উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশের সরকারই  রোহিঙ্গাদের স্বেছায় প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে গত মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের কাছে মাত্র ৮ হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যেতে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। অথচ বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ। বুধবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ মিন্ট থু বলেছেন, বাংলাদেশের তৈরি করা প্রত্যাবাসন তালিকায় জরুরি যেসব তথ্য অনুপস্থিত, রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করতে সেগুলো দরকার। তাই মিয়ানমার ৮ হাজার ৩২ জন আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ৩৭৪ জনকে রোহিঙ্গা হিসেবে প্রত্যয়ন করেছে। তাদের যেকোনও সময় মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারার কথা। অথচ প্রত্যাবাসনের জন্য বেশ কয়েকটি পূর্ব নির্ধারিত দিন পার হয়ে গেলেও কাজের কাজ হয়নি কিছুই।
যারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে, তাদেরকে প্রথমে ডিসমাল ট্রানজিট সেন্টারে রাখা হবে। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা এই শিবিরগুলোকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জেলখানার সঙ্গে তুলনা করেছে। মিয়ানমার সরকারের একজন মুখপাত্র ইউ যাও হাতে বুধবার বলেছেন, প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের এক মাসের মতো ওইসব শিবিরে থাকতে হবে। তারপর তারা তাদের বাড়িতে যেতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা এটাই, ২০১২ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ভেতর যে ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসিত করা হয়েছিল, তাদেরকে মিয়ানমার এখনও জেলখানার মতো ওই ডিসমাল ট্রানজিট সেন্টারগুলোতে আটকে রেখেছে। ২০১৮ সালে এসেও মিয়ানমার বলছে, ‘তাদেরকে তাদের আসল জায়গায় ফেরত পাঠাবার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।’ জাতিসংঘ এখনও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী নয়। গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ দূত দিয়েং বলেছেন, এখনিই যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হয় তাহলে তাদের ওপর আবার সহিংসতা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার ভাষ্য, ‘রোহিঙ্গাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা আর কোনও মানুষের ক্ষেত্রে হওয়াটা কাম্য নয়। আমরা আর তাদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে পারি না।’

যে কারণে ডিম উৎপাদন করে লোকসানের কবলে খামারিরা by শফিকুল ইসলাম

মুরগির ডিমের দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের কবলে পড়েছেন ডিম উৎপাদনকারী খামারিরা। শীতের মৌসুম শেষ হওয়ায় ডিমের চাহিদা কমেছে। অন্যদিকে একই সময়ে ডিমের উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ডিমের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি। ফলে ডিমের দাম কমছে আশঙ্কাজনক হারে। এদিকে, একইসঙ্গে কমেছে মুরগির মাংসের দামও। তবে মুরগির বাচ্চার দাম কমেনি। আগের মতোই উচ্চ দামে কিনতে হচ্ছে মুরগির খাবার ও ওষুধ। মুরগির খামারে শ্রমিকের মজুরিও বরং বেড়েছে। আর সে কারণেই লোকসান গুনতে হচ্ছে ডিম উৎপাদনকারী খামারিদের।
খামারিরা বলছেন, এই মুহূর্তে মুরগি পালনের আনুষাঙ্গিক ব্যয় কমাতে না পারলে লোকসান ঠেকাতে খামার বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনও রাস্তা খোলা থাকবে না তাদের সামনে। ডিম ও মাংসের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাচ্চা ও ওষুধের দাম কমলে ক্ষতি হতো না বলে মনে করছেন তারা। কিন্তু ডিম উৎপাদনকারী মুরগির একদিনের বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারি মালিকরা সিন্ডিকেট করে বেশি দামে বাচ্চা বিক্রি করছে বলে অভিযোগ করছেন তারা।
খামারিদের দাবি, এই মূহূর্তে একদিনের বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারি মালিকদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। তা না পারলে এই লোকসান ঠেকানো সম্ভব নয়। একইসঙ্গে কমাতে হবে মুরগির খাবার ও ওষুধের দামও। বিদ্যমান লোকসান ঠেকাতে ব্যাংক ঋণের সুদে রেয়াতও চেয়েছেন ডিম উৎপাদনকারী খামারিরা।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খুচরা বাজারে এখন প্রতি হালি ফার্মের মুরগির ডিম (লাল) বিক্রি হচ্ছে ২৪ টাকায়। আর এক ডজন লাল ফার্মের লাল ডিমের দাম ৭০ টাকা। কয়েকদিন আগেও  প্রতিডজন মুরগির ডিম বিক্রি হয়েছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়।
জানতে চাইলে ডিম উৎপাদনকারী খামার মালিক আবু নাসের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আবহাওয়া ভালো থাকায় মুরগির রোগবালাই কম। তাই উৎপাদন ভালো হচ্ছে। কয়েকদিন ধরেই দেশের সব খামারেই ডিমের উৎপাদন বেশ ভালো।’
পর্যাপ্ত উৎপাদন ও চাহিদা কমে যাওয়ায় ডিমের দাম পাচ্ছেন না বলে অনেকটাই হতাশা জানিয়েছেন আবু নাসের। তিনি বলেন, ‘আমরা তো এরই মধ্যে লোকসানের মুখে পড়েছি। মুরগির ওষুধ ও খাবারের দাম কমেনি, কিন্তু দাম কমেছে ডিমের। সঙ্গে ব্রয়লার মুরগি ও লেয়ার মুরগির দামও কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে খামারিরা বাঁচবে কিভাবে?’
রাজধানীর কাওরান বাজারের ডিম ব্যবসায়ী আরিফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এক ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা দরে। যাত্রাবাড়ী আড়তে গত সপ্তাহে একশ পিস ডিমের দাম ছিল ৪৮৫ টাকা। শুক্রবার তা নেমে আসে ৪৬৫ টাকায়। অন্যদিকে, মাস দেড়েক আগেও প্রতি একশ ডিমের দাম ছিল ৫৪০ থেকে ৫৫০ টাকা। ব্যবসায়ীরা জানান, দাম কমার বড় কারণ সরবরাহ বেশি।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবে, দেশে ছয় বছর আগে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন ছিল ৫৭৪ কোটি পিস। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় আড়াই গুণ। এই অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৪৯৬ কোটি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালে প্রতি হালি ডিমের গড় দাম ছিল ২৮ টাকা। ২০১৬ সালে এসে এর দাম দাঁড়ায় ৩৪ টাকায়। ২০১৭ সালে আবার তা কমে ৩২ টাকায় নামে। এখন বাজারে প্রতি হালি ডিমের দাম ২৪ টাকা।
খামারিরা জানিয়েছেন, লোকসানের কারণে বাচ্চার চাহিদা কমে যাওয়ায় বাচ্চা ফোটানোর জন্য প্রতিটি হ্যাচিং ডিম আগে যেখানে বিক্রি হতো ১৪ টাকায়, এখন সেই ডিম বিক্রি হচ্ছে মাত্র আট টাকায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পোল্ট্রি খামারিদের সংগঠনের কর্মকর্তা আবু জাফর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডিমের মূল্য, বাচ্চা ফোটানোর খরচ, বিনিয়োগের লাভসহ একটি ডিম থেকে একটি মুরগির বাচ্চার উৎপাদন খরচ ২৪ থেকে ৩০ টাকা। কিন্তু চাহিদার বিপরীতে অতিরিক্ত ডিম উৎপাদন হওয়ায় খামারিরা বর্তমানে বাজারে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। ফলে তাদের দুঃখ হতাশা ও ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।
কৃষির উপখাত পোল্ট্রি-ডেইরি তথা প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে সরকারের আচরণ বিমাতাসুলভ উল্লেখ করে আবু জাফর বলেন, ‘খামারিদেরক্ষোভ প্রশমনে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অতিরিক্ত উৎপাদিত ডিম ও মাংস রফতানির অনুমতি দিতে হবে।’ এ ছাড়া, অবৈধ পথে ডিম ও মুরগির বাচ্চা প্রবেশ ঠেকানো ও খামারিদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্যও তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানান।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য ও পাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। খামারিরা যেন লোকসানের মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে সরকার সচেতন রয়েছে। পরিস্থিতি এমন থাকবে না।’ শিগগিরই এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।

ইরানকে মোকাবিলায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির হুমকি সৌদি যুবরাজের

ইরানকে মোকাবিলায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির হুমকি দিয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল সিবিএস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। আগামী শনিবার সাক্ষাৎকারটি প্রচারের কথা রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার চ্যানেলটিতে এর চুম্বক অংশ দেখানো হয়।
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো নেতা বা অনানুষ্ঠানিক সরকার প্রধান মনে করা হয়। সিবিএস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব কোনও পারমাণবিক বোমা অর্জন করতে চায় না। তবে ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, তাহলে আমরাও যত দ্রুত সম্ভব তার অনুসরণ করবো।’
আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার লড়াই নতুন নয়। বরং এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে দুই দেশ কার্যত এক ধরনের ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত। ১৯৭৯ সালে ইরানে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরানকে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে সৌদি আরব। এরমধ্যেই তুরস্ক ও কাতারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে রিয়াদ। ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে সৌদি জোট। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এ অঞ্চলে সৌদি আরবের ক্ষমতাবলয় এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ নিয়ে দেশটির অস্বস্তি পরিষ্কার হয়েছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে।
এ মাসের গোড়ার দিকে মিসর সফরকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি তুরস্ককে অশুভ ত্রিভুজের অংশ বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, তুরস্ক, ইরান ও কট্টর ইসলামপন্থী দলগুলো নিয়ে একটি অশুভ ত্রিভুজ তৈরি হয়েছে। তুরস্কের বিরুদ্ধে শত বছর আগে পতন হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য বা ইসলামি খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টারও অভিযোগ করেন সৌদি যুবরাজ।
মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ কাতারকে নিয়েও উপহাস করেন সৌদি সিংহাসনের এই পরবর্তী উত্তরাধিকারী। তিনি বলেন, উপসাগরীয় এই দেশটি কায়রোর একটি সড়কের চেয়েও ক্ষুদ্র। তবে দেশটির সঙ্গে সৌদি জোটের বিবাদ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এ সময় তিনি ৬০ বছর আগে কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করেন।
সৌদি যুবরাজ বলেন, আয়তনে ছোট হওয়ায় কাতারের সঙ্গে বিবাদের প্রতিক্রিয়াও খুব বেশি হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে তুরস্ক। সৌদি জোটের কাতারবিরোধী অবরোধ বলতে গেলে প্রায় একাই অকার্যকর করে দিয়েছে আঙ্কারা। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস এবং মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে এরদোয়ান সরকারের সম্পর্ক নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে রিয়াদের। তুর্কি-ইরান সম্পর্ককেও ভালো চোখে দেখে না সৌদি আরব। এর বাইরে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বও যেন সৌদি আরবের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে তুরস্ক। অন্যদিকে পুরনো শত্রু ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা নিয়েও অস্বস্তি রয়েছে সৌদি আরবের। সব মিলিয়ে এই দুই দেশের প্রতি সৌদি সরকারের পুঞ্জিভূত ক্ষোভই যেন বিষোদগারে রূপ নিলো সৌদি যুবরাজের কণ্ঠে।

পালিয়ে বিয়ে করতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার

কুড়িগ্রামে পালিয়ে বিয়ে করতে গিয়ে এক কলেজ ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। গতকাল বুধবার রাত ৮টার দিকে প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে বখাটেদের খপ্পড়ে পড়ে গণধর্ষণের শিকার হয় সে। এসময় তাকে ৮/৯জন যুবক পালাক্রমে ধর্ষণ করে। গভীররাতে পুলিশ খবর পেয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে কাঁঠালবাড়ির হরিশ^র কালেয়া গ্রামের মাসুদ রানা (২৪), হৃদয় হাসান সুমন (১৮) ও তারপদ (২০) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ ও ছাত্রীর দেয়া তথ্যমতে, তার প্রেমিক কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মোগলবাসা ইউনিয়নের বাঞ্ছারাম গ্রামের অটোচালক রহমান আলীর পুত্র কামরুল ইসলামের (২২) সাথে পালিয়ে বিয়ে করে ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সে মোতাবেক সারাদিন কলেজ করার পর সে বিকেলে মেলায় সময় কাটিয়ে প্রেমিকের কথামতো রাত সোয়া ৮টার দিকে সদরের কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের দাশেরহাট বাজারের পাশে একটি পরিত্যক্ত পেট্রোল পাম্পে অবস্থান নেয়। প্রেমিক কামরুলের কুড়িগ্রাম শহর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামি বাসে চড়ে তার কাছে আসার কথা ছিল। মেয়েটিকে সেখানে ব্যাগসহ একাই অবস্থান করতে দেখে পূর্ব থেকে অনুসরণ করা তিনটি মোটর সাইকেলে ৬জন যুবক মেয়েটিকে জোড় করে তুলে নেয়। পরে তাকে পাশর্^বর্তী ফাঁকা মাঠে নিয়ে গিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ করার পর ধর্ষকরা মোবাইলে তাদের বন্ধু স্বপন, পলাশ, মুকুল, লাইজুসহ আরো ৮/৯জনকে ডেকে আনে। ঘটনার পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মেয়েটি। রাত ২টার দিকে জ্ঞান ফিরে পেয়ে বিধ্বস্ত অবস্থায় মেয়েটি কোনক্রমে রাস্তার পাশে আসলে স্থানীয়রা দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ এসে মেয়েটিকে উদ্ধার করে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। মেয়েটি শহরের কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজে এইচএসসি মানবিক বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্রী এবং তার বাড়ি একই ইউনিয়নের নিধিরাম গ্রামে।
মেয়েটির চিকিৎসার ব্যাপারে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, তাৎক্ষণিকভাবে মেয়েটিকে নিবিঢ়ভাবে চিকিৎসাধীনে রাখা হয়েছে। মানসিকভাবে যাতে ভেঙে না পড়ে সে বিষয়টি মাথায় রেখে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) রওশন কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এ ব্যাপারে ৩জনের নাম উল্লেখ করে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। রাতেই অভিযুক্ত মাসুদ রানা, হৃদয় হাসান সুমন ও তারপদকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। জড়িত অন্যান্যদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

রণবীরের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যা বললেন আলিয়া

তিনি নাকি রণবীর কাপুরের সঙ্গে ডেট করছেন! কয়েকমাস আগেই রণবীরের নতুন গার্লফ্রেন্ড হিসেবে শোনা গিয়েছিল তার নাম। তিনি আলিয়া ভাট। সত্যিই কি তাই?  এবার এই রিলেশনশিপ নিয়ে মুখ খুললেন স্বয়ং আলিয়া। রণবীরের ওপর তার ক্রাশ দীর্ঘদিনের। এ কথা ঘনিষ্ঠ মহলে আগেই জানিয়েছিলেন আলিয়া। এতদিনে সেই ক্রাশের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করার সুযোগ পাচ্ছেন নায়িকা। সৌজন্যে অয়ন মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘ব্রহ্মাস্ত্র’। সেখানেই দেখা যাবে এই জুটির অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি। এই ছবির শুটিং শুরু হওয়ার পর নতুন করে আলিয়া-রণবীরের অফস্ক্রিন কেমিস্ট্রি নিয়েও জল্পনা শুরু হয়। তা হলে, যা শোনা যাচ্ছে তা কি ঠিক? সত্যিই কি রণবীরের সঙ্গে প্রেম করছেন তিনি? সম্প্রতি এ বিষয়ে আলিয়া বলেন, এ সব খবর পড়ে আমি নিজেই কনফিউসড হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি চুপ করে থাকাই সবচেয়ে ভাল উত্তর। এমন তো নয় যে আমি ব্যক্তিগত জীবন শুরু করব না। শুরু করবই। কিন্তু সেটা ব্যক্তিগতই...। লোকে যা খুশি বলতে পারেন। এই গল্পগুলো আমাকে খুব একটা এফেক্ট করে না। আমি শুধু চাইব লোকে যেন বিশ্বাস না করেন, যে আলিয়া আসলে এ সবই করছে।

রাশিয়ার পরবর্তী টার্গেট হতে পারে নিউ ইয়র্ক: সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্রের

লন্ডনে পক্ষত্যাগী সাবেক রুশ কূটনীতিককে বিষ প্রয়োগের ঘটনায় রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এ ঘটনায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগে হত্যাচেষ্টায় দেশটির পরবর্তী টার্গেট হতে পারে নিউ ইয়র্ক। বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি অধিবেশনে তিনি এ মন্তব্য করেন। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
রাসায়নিক প্রয়োগে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান নিকি হ্যালি। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে বিশ্বনেতারা ব্যর্থ হলে রাসায়নিক অস্ত্রের প্রয়োগ কেবল যুক্তরাজ্যের সলসবেরিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিউ ইয়র্ক কিংবা নিরাপত্তা পরিষদের যে কোনও সদস্য দেশের যে কোনও নগরীতে এই অস্ত্র প্রয়োগ করা হতে পারে।
এর আগে পক্ষত্যাগী রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার মেয়ে ইউলিয়ার ওপর লন্ডনে রাসায়নিক হামলার দায়ে ১৪ মার্চ যুক্তরাজ্যে নিয়োজিত ২৩ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কারের ঘোষণা দেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে দেওয়া বক্তব্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এ ঘোষণা দেন।
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত পক্ষত্যাগী সাবেক রুশ গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার মেয়েকে বিষ প্রয়োগে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় এর আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দায়ী করেন থেরেসা মে। পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য এ ঘটনাকে হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করছে। যদি তারা (রাশিয়া) কোনও যুক্তি দেখাতে না পারে তাহলে একে রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা হিসেবে দেখা হবে।
থেরেসা মে বলেন, এটি হয়তো আমাদের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সরাসরি হামলা। অথবা দেশটির সরকার নিজের সামরিক বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে মঙ্গলবার মধ্যরাতের মধ্যে মস্কোকে এই ঘটনার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে সময় বেঁধে দিয়েছিলেন থেরেসা মে। কিন্তু রুশ কর্তৃপক্ষ তাতে কর্ণপাত না করায় যুক্তরাজ্যে দায়িত্বরত ২৩ রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, তার দেশও শিগগিরই ব্রিটিশ কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে একই ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান।
স্পুটনিক থেকে সের্গেই ল্যাভরভের কাছে জানতে চাওয়া হয়, রাশিয়াও ব্রিটিশ কূটনীতিকদের বহিষ্কার করবে কিনা? উত্তরে তিনি বলেন, অবশ্যই। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি শিগগিরই এটা করা হবে।
বিষ প্রয়োগের ঘটনায় রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের অভিযোগকে কাণ্ডজ্ঞানহীন হিসেবে আখ্যায়িত করেন সের্গেই ল্যাভরভ।
এর আগে লন্ডনের রুশ দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রুশ কূটনীতিকদের বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের যে ক্ষতি হলো তার দায় যুক্তরাজ্যকেই বহন করতে হবে। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার ইয়াকোভেঙ্কো’ও এ ঘটনায় যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
গত ৪ মার্চ সালসবেরি শহরের একটি বিপণিকেন্দ্রের বেঞ্চে সের্গেই স্ক্রিপাল এবং তার ৩৩ বছরের কন্যা ইউলিয়াকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে এ ঘটনায় ব্যবহৃত নার্ভ এজেন্টের সন্ধান পায় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। কন্যাকে নিয়ে সের্গেই স্ক্রিপাল যেখানে দুপুরের খাবার খেয়েছিলেন- জিজ্জি নামের সলসবেরির ওই পিজার দোকানেই তার স্নায়ুকে আঘাতকারী এই নার্ভ এজেন্টের খোঁজ মিলেছে। অন্তত পাঁচটি স্থানে ফরেনসিক তদন্ত চালানোর পর পিজার দোকানে এর সন্ধান মিলে।
জিজ্জিতে দুপুরের খাবারের অন্তত দুঘণ্টা পর সাবেক ওই রুশ গুপ্তচর ও তার মেয়েকে অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় কাছের একটি পার্ক থেকে উদ্ধার করা হয়। তাদের উদ্ধারে যাওয়া একজন পুলিশ কর্মকর্তাও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সের্গেই স্ক্রিপাল এবং তার মেয়ে ইউলিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উল্লেখ্য, নার্ভ এজেন্ট হচ্ছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক, যা স্নায়ুতন্ত্রকে বিকল বা অকার্যকর করে দিতে পারে। এতে দৈহিক কর্মক্ষমতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

মার্চেই ভেঙে দেয়া হবে মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট

মার্চেই অর্থাৎ এ মাসেই ভেঙে দেয়া হতে পারে মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট। এরপরেই নির্বাচন দেয়া হতে পারে। মালয়েশিয়ার অনলাইন স্টার পত্রিকাকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে কবে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেয়া হতে পারে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানানো হয় নি। কোন সূত্র থেকে এ তথ্য পেয়েছে পত্রিকাটি তারও উল্লেখ করে নি। এতে বলা হয়, আগামী ২৮ বা ২৯ বা ৩০ শে মার্চ পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেয়া হতে পারে। সেটা হলে আগস্টের মধ্যে সেখানে নির্বাচন হবে। তবে মে মাসের প্রথমার্ধেই সেখানে নির্বাচন পরিচালনার জন্য আসতে পারে নতুন সরকার। এই সরকার কি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাকি অন্য নামে ডাকা হবে তাও উল্লেখ করা হয নি ওই রিপোর্টে। তবে বলা হয়েছে, এপ্রিলের শেষ বা মে মাসের শুরুতে হতে পারে নতুন নির্বাচন। ওই নির্বাচনে কে আসবেন রাষ্ট্রক্ষমতায় সেদিকে তাকিয়ে দিন গণনা শুরু করেছেন মালয়েশিয়ানরা ও দেশি বিদেশী পর্যবেক্ষকরা। কারণ, নির্বাচনের মাঠে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নেমে পড়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ। এ সপ্তাহে নাজিব রাজাক বলেছেন, নির্বাচনে বিজয়ের ব্যাপারে তিনি আস্থাশীল। তিনি আরো বলেছেন, এপ্রিলের দিকে হতে পারে ওই নির্বাচন। নাজিব রাজাক সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৪ শে জুন। কিন্তু তার সরকারের বিরুদ্ধে রয়েছে মারাত্মক দুর্নীতির অভিযোগ। তার মধ্যে অন্যতম রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ’ (১এমডিবি) দুর্নীতি। এই তহবিলের অর্থ নাজিব রাজাকের ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্টে হস্তান্তরের অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগ নিয়ে মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক চিত্র পাল্টো গেছে। ১৯৫৭ সালে বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে মালয়েশিয়া। তার পর থেকে সেখানে ক্ষমতা ধরে রাখে। এই ধারা এবার হুমকিতে পড়তে পারে বলে বলা হচ্ছে। কারণ, নাজিব রাজাকের সামনে দাঁড়িয়ে গেছেন মাহাথির মোহাম্মদ। যার নাম উচ্চারণ করলেই পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ তাকে চেনেন। মালয়েশিয়ার মানুষ তাকে কুর্নিশ করেন। তিনি বিরোধীদের নির্বাচনী জোট গড়ে তুলেছেন। তিনিউ বর্তমানে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিলেন। তার ধাক্কার সামনে নাজিব রাজাক কি টিকে থাকতে পারবেন! সময়ই দেবে এ প্রশ্নের উত্তর।

যে পথে রচিত হলো মহারাষ্ট্রের কৃষকদের অনন্য ইতিহাস by রমজান আলী


৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ সোচ্চার হয়েছিল দাবির লড়াইয়ে
১৩ দফা দাবি নিয়ে কৃষকরা জেগে উঠেছিল রক্তিম আভার মতো। তাদের পা থেকে ঝরা রক্তের ছোপ রাঙিয়ে দিয়ে গেছে নাসিক থেকে মুম্বাই-এর সুদীর্ঘ ১৮০ কিলোমিটার পথ।  ‘রুশ বিপ্লব’ এবং এর পরবর্তী সময়ের নেতৃত্বকে আদর্শ মেনে মিছিলে আদিবাসী নারী-পুরুষেরা ধ্বনি তুলেছেন ‘আমিই লেনিন কিংবা আমিই স্ট্যালিন’ বলে। তবে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস অসহযোগের প্রেরণাকেই তারা রেখেছিলেন হৃদয়ে। অভাবনীয় অদম্য প্রতিরোধের শক্তিকে সঙ্গী করে তারা হেঁটেছেন দাবি আদায়ের মিছিলে। বুঝতে চেয়েছেন অপরের বেদনা। চাকচিক্যের মুম্বাই শহরের অগণিত মানুষ তাই পৃষ্পবৃষ্টিতে সাদর অভ্যার্থনা জানায় তাদের। তৃষ্ণা আর অভূক্ত জীবনের ধারাবাহিকতা ঘোচে ছাত্রদের তুলে দেওয়া জল কিংবা বিস্কুটের প্যাকেটে। এলিট পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী সংবাদমাধ্যমগুলোও তাই বদলে যায় মুহূর্তেই। কালেভদ্রে সেখানে জায়গা পাওয়া কৃষকরা হয়ে ওঠে প্রধান খবর। এক পর্যায়ে সব দাবি মানতে বাধ্য হয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার।
কোনও ভাঙচুর সহিসতা রক্তপাত নেই, অথচ কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয় তাদের সমস্ত দাবি মেনে নিতে। কী করে এমন অনন্য ইতিহাস রচনা করলেন মহারাষ্ট্রের কৃষকরা? ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,  আন্দোলনকারীদের বিপন্নতার গভীরতা, আন্দোলনের অহিংস ও সুসংগঠিত প্রকৃতি এবং অন্য মানুষদের বিপন্নতার প্রতি আন্দোলনরত কৃষকদের দৃর্দান্ত মনযোগই ছিল এই বিজয়ের নেপথ্য কারণ।
দাবি আদায়ের লড়াইয়ে নারী-পুরুষ হেঁটেছেন পরস্পরের সহযাত্রী হয়ে

সারাবিশ্বেই কৃষকরা বিপন্ন। তবে ভারতে এই বিপন্নতা অন্য অনেকের চেয়েই গভীর। ক্ষুদ্র কৃষকেরা সেখানে বাস করছেন দুর্যোগের কিনারায়। মহারাষ্ট্র সেই বিপন্নতার এক জীবন্ত দলিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র খড়া, বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা, করপোরেট বাজার ব্যবস্থার উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে টিকতে না পারায় সেখানে আত্মহত্যা যেন এক রাজ্যটিতে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি কৃষক দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেছেন। রাজ্য সরকার এ সংকট নিরসনের কয়েক দফা সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে তা তেমন কোনও কাজে আসেনি। গত বছরের জুন মাসেও কৃষকরা ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার পর তাদের অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করা হয়নি।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) সঙ্গে যুক্ত অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভা (এআইকেএস) দেশটির অন্যতম বড় ও প্রভাবশালী কৃষক সংগঠন। মুম্বাইয়ের উদ্দেশে এই লং মার্চের সংগঠকও এই এআইকেএস। সংগঠনের সভাপতি ড. অশোক ধবল বলেন, ‘এই আন্দোলন ‍কৃষকদের সঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রতারণার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।’ তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, ‘শুধু রাজ্য সরকারের ওপর দায় চাপানো বাদ দিয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন জাতীয় সরকারকেও বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করতে হবে।’
কৃষকদের দাবির কেন্দ্রে ছিল, কৃষকদের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ ঋণ মওকুফ করা, বনাঞ্চলে থাকা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী তাদের দখলকৃত জমির ওপর বৈধ অধিকার সুরক্ষায় ২০০৬ সালে প্রণীত বন অধিকার আইনের বাস্তবায়ন এবং এস সোয়ামিনাঠান কমিশনের ২০০৬ সালের প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন। ওই সুপারিশমালায় জমির মালিকানায় ভারসাম্য আনা, কৃষিপণ্যের নায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও কৃষক পরিবারকে একটি স্থিতিশীল জীবীকার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
আত্মহত্যা যেন মহারাষ্ট্রের কৃষকদের জন্য উৎসব

সোমবার দুপুরে অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভার ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের সঙ্গে দেখা করেন।ভারতের সেচমন্ত্রী গিরিশ মহাজন বলেন, সরকার তাদের সব দাবি পূরণ করতে রাজি হয়েছে।বৈঠকটিকে কৃষকরা তাদের বিজয় হিসেবে দেখছেন।
অতীতে এমন শৃঙ্খলাপরায়ণ ও সমাজের অন্যান্যদের অসুবিধার কথা মাথায় রেখে নিজেদের দাবি আদায়ের লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদাহরণ খুব একটা নেই৷ দেশজুড়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে৷ তাই পরীক্ষার্থীদের যাতে অসুবিধা না হয়, সে জন্য দিনের বেলায় পথ দখল না করে আজাদ ময়দানে রাত কাটান কৃষকরা৷ তারপর সারারাত ধরে পথ হাঁটা৷ গরিব, নিপীড়িত কৃষকদের এই সামাজিক চেতনা দেখে অভিভুত মুম্বইবাসীও৷ রক্তঝরা পা-‌গুলোর সেবাযত্ন করতে এগিয়ে এলো অর্ধেক মুম্বই৷
সে এক অদ্ভুত দৃশ্য৷ আইআইটি বম্বের ছাত্ররা সেখানে আন্দোলনকারী কৃষকদের জন্য খাবার দাবার নিয়ে হাজির হলেন৷ কৃষকদের জন্য জুতো নিয়ে হাজির হয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন৷
মুম্বাইয়ের লঙ মার্চে নিজে অংশ নিয়েছিলেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক পি সাইনাথ বলছেন, সব কিছু তুচ্ছ করে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেন কৃষকরা। চারপাশের মানুষকে কৃষক সমাজের মন্ত্রণার হদিশ দিলেন। এতেই তাদের আবেগের গভীরতা ধরা পড়ে। ধরা যায় তাদের বিপন্নতাও। এদিকে আবার আন্দোলনকারী কৃষকদের পাশে সব রকম ভাবে দাঁড়িয়েছে মুম্বাইবাসী।
বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে অনন্য ইতিহাস রচনা করলেন কৃষকরা

বিশিষ্ট সাংবাদিক ভোলানাথ ঘোড়ই মনে করছেন, ‘‌‘মহারাষ্ট্রের লং-‌মার্চ ‌সারা পৃথিবীকে আন্দোলন শিখিয়ে দিলো৷ খুব সম্প্রতি ভারতে কিছুটা রাজনৈতিক পথ পরিবর্তন হয়েছে৷ তারপর বামপন্থা ধ্বংস হয়ে গেল, মন একটা প্রচার চলছিল৷ অন্যদিকে, গত কয়েক বছর ধরে অতি ডানপন্থি শক্তি অর্থবলের সঙ্গে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের প্রচেষ্টা চলছে৷ কিন্তু প্রমাণ হয়ে গেল, প্রকৃত ক্ষিদের আন্দোলন হলে সাম্প্রদায়িকতা বানের জলের মতো ভেসে যায়৷'‌'

ক্রিমিয়াকে কখনোই ফেরত দিতে হবে না: পুতিন

আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে বুধবার
ক্রিমিয়া সফর করেন ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রিমিয়াবাসী
এবারই প্রথমবারের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট
নির্বাচনে ভোট দেবেন। ছবি: রয়টার্স
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যে কারণে ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের কাছে ফেরত দিতে হবে। আর তা কোনো দিনই সম্ভব নয়। লাখো জনতার ভাগ্য আমাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’ রাশিয়ার জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক আন্দ্রেই কান্দ্রাশোভের পরিচালনায় নির্মিত নতুন একটি তথ্যচিত্রে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পুতিন এ কথা বলেন। ২০১৪ সালের মার্চে এক গণভোটের মাধ্যমে কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী ক্রিমিয়া রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। ওই ভোটে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে বেশির ভাগ ভোট পড়ে। মস্কো বরাবরই বলে আসছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের গঠনতন্ত্র মেনে নিয়েই রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়া যুক্ত হয়। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপের একীভূত হওয়াকে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে পশ্চিমা জোট। অন্যদিকে, ইউক্রেনের পার্লামেন্ট উপদ্বীপের পদমর্যাদা পরিবর্তনের হুমকি দিচ্ছে। রুশ সাংবাদিক আন্দ্রেই কান্দ্রাশোভ এর আগেও ক্রিমিয়া নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। ২০১৫ সালে তাঁর নির্মিত ‘ক্রিমিয়া-ঘরে ফিরে আসা’ ছবিটি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। এবার নতুন ছবি নিয়ে আবারও তিনি মুখোমুখি হয়েছেন পুতিনের। আন্দ্রেই কান্দ্রাশোভ পুতিনের কাছে জানতে চান, ‘যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়, যে কারণে আপনি ক্রিমিয়া ও সেভাস্তোপোলকে কি ফেরত দেবেন?’
পুতিন বলেন, ‘আপনি খেপেছেন? ওই ধরনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না।’ পুতিন বলেন, ‘যেসব ঘটনা ক্রিমিয়াকে মস্কোর সঙ্গে যুক্ত করেছে, মস্কো চাইলে ওই ঘটনায় নিজেকে জড়াতে পারত। তা ছাড়া দ্বীপের লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য আমাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, যাদের ওপর আজ বিভিন্ন দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।’ মস্কো টাইমসের খবরে জানানো হয়, আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে বুধবার ক্রিমিয়া সফর করেন ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রিমিয়ার মানুষ এবারই প্রথমবারের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেবেন। রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়ার যুক্ত হওয়ার চার বছর পূর্তি উপলক্ষে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেন তিনি। এর আগে রাশিয়া ও ক্রিমিয়ার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে নির্মাণাধীন সেতু ও সিমফেরোপোল বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল ঘুরে দেখেন পুতিন। স্থানীয় লোকজন ওই সেতুকে ‘পুতিন সেতু’ হিসেবে নামকরণ করেছে। ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ওই সেতু ইউরোপের দীর্ঘতম সেতু হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে।

চতুর্থ মেয়াদে চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল

চতুর্থবারের মতো জার্মানির চ্যান্সেলর নির্বাচিত হয়েছেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল। জোট গঠন নিয়ে প্রায় ছয় মাস অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার পর অবশেষে দেশটির সর্বোচ্চ পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। আজ বুধবার জার্মান পার্লামেন্টের এক অধিবেশনে ম্যার্কেলকে চ্যান্সেলর হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশের চ্যান্সেলর হিসেবে এটিই তাঁর সর্বশেষ মেয়াদ। জার্মানির পার্লামেন্টের নাম রাইখস্ট্যাগ। এএফপির খবরে বলা হয়েছে, বার্লিনে রাইখস্ট্যাগের অধিবেশনে ম্যার্কেলের পক্ষে পড়ে ৩৬৪ ভোট। আর বিপক্ষে পড়েছে ২১৫ ভোট। পরে দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাংক ওয়াল্টার স্টেইনমেয়ার তাঁকে চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেন। বুন্দেসটাগে একটি সাদা রঙের ব্লেজার পরে উপস্থিত হয়েছিলেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল। তিনি বলেন, ‘আমি ভোটের ফলাফল গ্রহণ করছি।’ এরপরই বুন্দেসটাগে উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে ম্যার্কেলকে স্বাগত জানান। এ সময় ম্যার্কেলের স্বামী ও ৮৯ বছর বয়সী মা উপস্থিত ছিলেন। জার্মানিতে সম্প্রতি একটি ডানপন্থী দল বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এই দলটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় দুর্বল হয়ে পড়েছিল প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। এতে ম্যার্কেলের আর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া হয়নি। চ্যান্সেলর হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসডিপি) সঙ্গে জোট গঠন করতে হয় ম্যার্কেলকে। তবে এই জোটে থাকা দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া খুব ভালো নয়। অনেকে ধারণা করছেন, জোট ভেঙে যেতে পারে এবং দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হতে পারে।

কিংবদন্তির বিদায় by মহিবুল হাসান

কাকতালীয়ই বলতে হয়। এক কিংবদন্তি পদার্থবিদ গ্যালিলিও গ্যালিলির মৃত্যুর ঠিক তিনশ’ বছর পর ১৯৪২ সালের ৪ জানুয়ারি জন্ম হয়েছিল তার। আর মৃত্যু হল আরেক কিংবদন্তি পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিনের দিন- ১৪ মার্চ। তিনি নিজেও আরেক কিংবদন্তি পদার্থবিদ- স্টিফেন হকিং। যৌবনেই মটর নিউরন ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ায় চিকিৎসকরা বলে দিয়েছিলেন, আর মাত্র দু’বছর আয়ু। কিন্তু তিনি বেঁচে রইলেন। বেঁচে রইলেন বলেই বিশ্ব পেল এক মহান বিজ্ঞানী। তাকে বিশ্বের সমকালীন তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পদার্থবিজ্ঞানে হকিংয়ের দুটি অবদানের কথা সবচেয়ে বেশি স্বীকৃত। প্রথম জীবনে সতীর্থ রজার পেনরাজের সঙ্গে মিলে সাধারণ আপেক্ষিকতায় সিংগুলারিটি সংক্রান্ত তত্ত্ব। হকিং প্রথম অনিশ্চয়তার তত্ত্ব ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তে প্রয়োগ করে দেখান যে, ব্ল্যাক হোল থেকে বিকিরিত হচ্ছে কণা প্রবাহ। এই বিকরণ এখন হকিং বিকিরণ নামে অভিহিত। আলবার্ট আইনস্টাইনের পর আর কোনো বিজ্ঞানী বিশ্বজোড়া এত জনপ্রিয়তা পাননি। তার জীবন নিয়ে সিনেমা পর্যন্ত হয়েছে। তবে যে বই তাকে জনপ্রিয়তার শিখরে তুলেছিল তা হল ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’। বইটির জনপ্রিয়তা অতীতের সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এ বইয়ের শুধু ইংরেজি ভার্সনই বিক্রি হয়েছে কোটির ওপর। টানা পাঁচ বছরেরও বেশি লন্ডন সানডে টাইমসের বেস্টসেলার তালিকায় থেকেছে এ বই। অনুবাদ হয়েছে বাংলাসহ বহু ভাষায়। বিজ্ঞানে হকিংয়ের আগ্রহ ছিল সহজাত। বাবার ইচ্ছা ছিল হকিং যেন তার মতো ডাক্তার হয়। কিন্তু হকিং গণিত পড়ার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন। তবে যেহেতু সেখানে গণিতের কোর্স পড়ানো হতো না, সেজন্য তিনি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করেন। সে সময় তার আগ্রহের বিষয় ছিল তাপগতিবিদ্যা, আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। তিনি কেমব্রিজে আসার পরপরই দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হন। এ কারণে তার দেহের প্রায় পুরো মাংসপেশী ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসে। কেমব্রিজে প্রথম দুই বছর তার কাজ তেমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছিল না। কিন্তু রোগের প্রকোপ কিছুটা কমলে হকিং তার সুপারভাইজার ডেনিশ উইলিয়ামের সাহায্য নিয়ে পিএইচডি অভিসন্দর্ভের কাজে এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৭৪ সালে হকিং রয়াল সোসাইটির অন্যতম কনিষ্ঠ ফেলো নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর অবসর নিলেও তিনি কেমব্রিজের গনভিলি ও কেয়াস কলেজের ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন। শারীরিকভাবে ভীষণরকম অচল হওয়া সত্ত্বেও বহু বছর যাবৎ তিনি তার গবেষণা কার্যক্রম সাফল্যের সঙ্গে চালিয়ে গেছেন। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অবসান ঘটল একটি বহুল আলোচিত অধ্যায়ের। তবে পৃথিবী তাকে মনে রাখবে বিজ্ঞান গবেষণায় তার অসামান্য অবদানের জন্য।
মহিবুল হাসান : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়াদির লেখক

কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের সাক্ষাৎ করা উচিত by বিল রিচার্ডসন ও মিকি বার্গম্যান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন সাক্ষাতের পরিকল্পনা করছেন- এ খবর প্রথমে একটি কূটনৈতিক ভূমিকম্প মনে হয়েছে। কিন্তু ঘোষণাটির একদিনেরও কম সময়ের পরই সাক্ষাৎটি ঘটার জন্য কী কী বাধা দূর করতে হতে পারে, তার পরস্পরবিরোধী বিবৃতি পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মাঝে সম্ভাব্য প্রথম বৈঠক হওয়ার মূল পয়েন্ট- ওয়াশিংটনের দাবি পিয়ংইয়ংকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে এবং পিয়ংইংয়ের দাবি ওয়াশিংটনকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সেনা সরিয়ে নিতে হবে, কয়েক বছরের মধ্যে দু’পক্ষের পারস্পরিক এসব দাবিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কোনো পক্ষই নিজেদের দাবি থেকে সরে এসে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে না। কিন্তু যে কোনোভাবেই হোক, কিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে ট্রাম্পকে। একটি মূল্যবান চুক্তি হতে পারে- এমন ভাবনা দুই নেতাকেই উৎসাহিত করতে পারে। পিয়ংচাং অলিম্পিকের আগে ও পরে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন প্রতিপক্ষ কিমকে নিজেদের মিত্রের পক্ষে দাঁড়ানোর যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা মূল্যবান বিষয় হিসেবেই বিবেচ্য। উত্তর কোরিয়ার হাতে বন্দি তিন মার্কিন নাগরিককে মুক্তির জন্য চাপ দিতে এটি একটি ভালো সুযোগ। একইসঙ্গে শিরোনাম থেকে ধূসর হয়ে যাওয়া ইস্যু- কোরিয়া যুদ্ধে নিহত আমাদের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনার জন্য কয়েক দশকের প্রচেষ্টাকে আবারও আলোচনায় আনার বড় সুযোগ হতে পারে এটি। অবশ্য, প্রেসিডেন্ট যদি সেভাবে অগ্রসর হন, তবে কঠিন একটি কূটনৈতিক প্রকল্পের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিষয়টিকে তার মূল্যায়ন করতে হবে; নিজের অতিরঞ্জিত ফটোসেশন হিসেবে নয়। এক বছরের মাত্র কিছু বেশি সময়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প এবং আমাদের দক্ষিণ কোরীয় মিত্র কূটনৈতিক রোলার কোস্টারের ওপর আমাদের চড়িয়েছেন- আগস্ট মাসে ট্রাম্পের উসকানিমূলক বক্তব্য থেকে অক্টোবর মাসে কিমকে ‘ক্ষুদ্র রকেট মানব’ বলে টুইট, ফেব্রুয়ারিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতের উত্তর কোরীয় প্রস্তাব (দক্ষিণ কোরিয়ার মাধ্যমে) এবং ট্রাম্পের তা গ্রহণ। তিনি আমাদের বিশ্বাস করাচ্ছেন যে, তিনি বরাবর এমন থ্রিডি দাবা খেলছেন, যা চাল চেলেও কেউ কল্পনা করতে পারবে না। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার নেতারা সবসময় এমন একটি প্রার্থনা করে আসছেন- তাদের নেতা এবং একজন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট মুখোমুখি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। কিমকে এখন নিশ্চিতভাবে সাহসী বলুন এবং ট্রাম্পকে দিন শক্তি ও সাহসের ক্রেডিট; কিন্তু এটি উত্তর কোরিয়ার মূল দরকষাকষিকে পাল্টে ফেলবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বর্তমানে তিনি যে পথে আছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উচিত হবে না জ্বালাময়ী বিবৃতি দিয়ে এবং অপরিপক্ব বুক চাপড়ে প্রক্রিয়াটিকে লাইনচ্যুৎ করা। তার প্রয়োজন একটি অভিজ্ঞ ও আন্তরিক আলোচক দল, যাতে থাকবে তার একান্ত বৃত্তের বাইরের বিশেষজ্ঞরাও। ট্রাম্প নিজেকে অতুলনীয় একজন আলোচক ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কল্পনা করেন। কিন্তু হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা থেকে আমরা তাকে বলতে পারি, উত্তর কোরিয়ার আলোচক ও মধ্যস্থতাকারীরা খুবই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ও উচ্চমাত্রার খোঁজখবর নিয়ে আসবেন। কথার মাঝে আপনি যদি একটি বাজে
শব্দও ব্যবহার করেন, আলোচনায় বড় ধরনের মোড় ঘুরে যেতে পারে। প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্কতা খুবই প্রয়োজন। ১৯৯০-এর দশকে আমাদেরই একজন (তখনকার কংগ্রেস সদস্য রিচার্ডসন) ছিলেন বেসরকারি দূত, তার প্রতিনিধি দল উত্তর কোরিয়ার প্রতিপক্ষকে আলোচনায় ফেরাতে উৎসাহী করার জন্য অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আলোচনার সময় শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে খাদ্য সহায়তার একটি অতিরিক্ত প্রস্তাব দেয়। উত্তর কোরিয়ানরা জনসমক্ষে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, তাদের খাদ্য সহায়তার দরকার নেই। যদিও পরে নীরবে তা গ্রহণ করে তারা। দেখানোর জন্য তারা তৎক্ষণাৎ আলোচনা শুরু করেন; কিন্তু তাতে আন্তরিকতা ছিল না। শেষ পর্যন্ত তখন কোনোকিছুই হয়নি এবং অচলাবস্থার জন্য তারা আমাদেরই দায়ী করেছিল। এটি উত্তর কোরিয়ার ছলনার একটি সাধারণ রূপ। ২০১৬ সালে পিয়ংইয়ংয়ে অটো ওয়ার্মবিয়ারের পরিবারের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকালে আমাদের অন্য একজন- বার্গম্যান অটোকে বাসায় নেয়ার একটি প্রস্তাবে কোরীয় প্রতিপক্ষের কাছ থেকে একেবারে মুখের ওপর ‘না’ শুনেছেন। কিছুক্ষণ পরই অনানুষ্ঠানিক কথোপকথনের সময় তার প্রতিপক্ষের একজন বলেন, ‘কোরিয়ায় একটি প্রবাদ আছে, একটি গাছ কাটার জন্য ১০০ কোপ দিতে হয়’। উত্তর কোরিয়ানরা ধৈর্য ও ধীরস্থিরতার সঙ্গে দরকষাকষি করে। বিষয়টি ট্রাম্পকে মাথায় রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া চুক্তির পরিকল্পনা অপরিবর্তনীয় ও সম্পূর্ণ জটিল রয়ে গেছে। কিম জং উন তার সঙ্গে চোরের ওপর বাটপারি করেছেন- ট্রাম্প যদি এমনটি দেখতে না চান তবে তাকে বাস্তবভিত্তিক লক্ষ্য ও কৌশল নিয়ে ধীরস্থিরভাবে ও যত্নসহকারে হাতুড়ি মারতে হবে। যাতে করে ভালোভাবে যাচাই করে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছা যায়। তিনি এটি করার আগে যে বিষয়গুলো আমাদের বিবেচনা করতে হবে সেগুলো হল- প্রথমত, ট্রাম্পকে নতুন ‘গাজর ও লাঠি’ তৈরি করতে হবে। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তিনি লাঠি দিয়েছেন এবং দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মুখোমুখি বৈঠকের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভালো গাজরও দেখিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ হুকাবি স্যান্ডার্স শুক্রবার বলেছেন, ট্রাম্প একেবারে ‘জিরো ছাড়’ দিয়েছেন; কিন্তু সাক্ষাতের জন্য একমত হওয়া একটি ছাড়। যতক্ষণ কিমকে এই বসন্তে গলফ খেলার জন্য আমন্ত্রণ করা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ট্রাম্পকে ছাড়ের গাজর ঝুলিয়ে রাখতে হবে উত্তর কোরিয়ার নেতার সামনে। দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পকে এটা বুঝতে হবে যে, উত্তর কোরিয়ানরা নিজেদের পরমাণু অস্ত্রহীন করার প্রস্তাব দিচ্ছে না। তাদের এবং তাদের প্রশাসন পরিবর্তনের মাঝে একমাত্র জিনিস হিসেবে নিজেদের অস্ত্রের সক্ষমতাকেই বিবেচনা করে তারা। তারা নিজেদের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিচ্ছে; কিন্তু নিজেদের অস্ত্রাগারকে অস্ত্রশূন্য করার বিষয় ভাবছে না কোরিয়ানরা। এটিই কয়েকদিন থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত তাদের অবস্থান এবং ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি পর্যালোচনার ট্রাম্পের লক্ষ্য উত্তর কোরিয়ার অবস্থানকে কেবল দৃঢ়ই করেছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হল যদি আমেরিকানরা একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেও ফেলে, আমরা তাতে আশ্বস্ত হতে পারি না। ফলে আমাদের সব পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করা বিচক্ষণতার কাজ হবে না। তৃতীয়ত, ট্রাম্পকে অবশ্যই স্পষ্ট হতে হবে যে, উত্তর কোরিয়ানরা এখন পর্যন্ত যা চায় তা হল, যে কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে কোরীয় উপদ্বীপ থেকে আমাদের ৩৮ হাজার সেনা সরিয়ে নেয়া। বৈরিতা ১৯৫৩ সালেই কোরিয়া যুদ্ধের বিরতির মধ্য দিয়ে শেষ হতে পারত; কিন্তু টেকনিক্যালি যুদ্ধই তো শেষ হয়নি এবং উত্তর কোরিয়ার মানুষ ভুলে যায়নি ওই যুদ্ধে ৪০ লাখের বেশি কোরিয়ান নিহত হয়েছেন। আমাদের জন্য উত্তর কোরিয়া হল বিশ্বের অনেকগুলো ফোকাল পয়েন্টের একটি। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার বেলায় আমরাই একমাত্র তাদের লক্ষ্যবস্তু এবং তাদের নিরাপত্তা কৌশলে মূল বিষয় হিসেবে থেকে গেছি আমরা। যে চুক্তিটি এখন আলোচনার টেবিলে আছে এবং অনেক সময় ধরে পড়ে আছে তা হল- উত্তর কোরিয়া তাদের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প স্থগিত করবে এবং স্বীকৃত প্রশাসনের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে তা প্রত্যায়িত হবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেবে, অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ শিথিল করবে এবং স্বাভাবিকভাবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঘোষণা দিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করবে। যে কোনো চুক্তিতে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও জাপানের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে উত্তর কোরিয়া ওই তিন দেশ থেকে পিয়ংইয়ংয়ে খাবার, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সরবরাহের বিনিময়ে। ট্রাম্প যা চাচ্ছেন তার সবকিছু এটি নয়; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তা তুলনামূলক ভালো। নিশ্চিতভাবে এটি সম্ভাব্য একটি সরাসরি যুদ্ধ থেকে আমাদের পেছনে সরিয়ে নিতে পারে। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বৃহস্পতিবার উত্তর কোরিয়ার নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি তারা ট্রাম্পকে নিয়ে ‘খেলতে চান’ তা হবে ‘আপনাদের প্রশাসনের শেষ পরিণতি’। কিন্তু প্রত্যেকেরই শেষ লক্ষ্য সামরিক পথ, যা কিনা একটি মারাত্মক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। ট্রাম্প নিয়মিতভাবে পেছন দিক থেকে খোঁচা মেরে আসছেন। উত্তর কোরিয়ানদের ক্ষেত্রে এটি একটি বাজে কাজ। তাকে সচেতন হতে হবে, এতে আমেরিকার নিরাপত্তার বিষয় কতটুকু আছে তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। নিজের ভালো ইমেজ তৈরির বিষয়ে তাকে কম মনোযোগী হতে হবে।
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম
বিল রিচার্ডসন : নিউ মেক্সিকোর সাবেক গভর্নর এবং জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূত
মিকি বার্গম্যান : রিচার্ডসন সেন্টার ফর গ্লোবাল এনগেজমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট

কতটা নিশ্চিত হচ্ছে গ্রাহক স্বার্থ?

প্রতি বছরের মতো এবারও ১৫ মার্চ বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হচ্ছে। এবার বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য হল : ‘ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ’। বর্তমান সরকার দেশকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত করার জন্য নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলোর অন্যতম হল তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং একইসঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে উপকরণ, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও সেবা সহজলভ্য, দাম সহনীয় রাখা এবং সেবার মান নিশ্চিত করা। তথ্যপ্রযুক্তি সেবার উন্নয়নে যোগাযোগ ও সেবাগুলো জনগণের কাছে অতি দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে এবং মানুষের হাতের নাগালে চলে আসছে। এ কারণে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, বিশেষ করে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ছাড়া বর্তমান আধুনিক সভ্যতার যুগে মানুষের জীবনযাত্রা প্রায় অচল। আর ডিজিটাল প্রযুক্তির উপকরণ এখন আমাদের জীবনধারার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এর ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রেও ক্রেতা তথা ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এদিকে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। ভোক্তা অধিকার অবশ্যই মানবাধিকার। কারণ ভোক্তা অধিকারের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকা ও বেঁচে থাকার সম্পর্ক নিবিড়, যদিও দেশে ভোক্তা অধিকারের বিষয়ে এখনও সেভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মুনাফাখোর, মজুদদার, সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে; নকল, ভেজাল ও মানহীন পণ্যের দৌরাত্ম্যে নাগরিক জীবন আজ অতিষ্ঠ, সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এক্ষেত্রে ভূলুণ্ঠিত। ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়ায় ইচ্ছামতো। জনগণকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা নিজেদের পকেটস্থ করে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভোক্তারা বরাবরই পণ্য ও সেবা উভয় ক্ষেত্রেই অন্যায্যতার শিকার। ভোক্তারা অসচেতন ও অসংগঠিত হওয়ায়, স্বার্থ সংরক্ষণে শক্তিশালী ভোক্তা সংগঠন এবং আইনে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার না থাকায় প্রবঞ্চনার হার প্রতিনিয়তই বাড়ছে। সেজন্যই বাংলাদেশের ভোক্তাদের বলা হয়ে থাকে হেল্পলেস কনজিউমার বা অসহায় ক্রেতা-ভোক্তা। বিভিন্ন দেশে ভোক্তারাই পণ্যের নিয়ামক। কারণ ভোক্তারা পণ্যটি ব্যবহার করলেই উৎপাদক ও বিক্রেতারা লাভবান হবেন। সে কারণে উন্নত দেশগুলোতে ভোক্তাদের ‘সম্রাট’ উপাধি প্রদান করা হলেও আমাদের দেশে পরিস্থিতি তার উল্টো, বরং ব্যবসায়ীরাই নির্ধারণ করেন ভোক্তারা কোন পণ্যটি হজম করবেন। আবার দাম নির্ধারণেও ব্যবসায়ীদের ভূমিকাই মুখ্য। ভোক্তারা এখানে অনেকটাই হাতের পুতুল। ভোক্তাদের প্রতি সুবিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন সরকার, রাজনৈতিক দল, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও সেবাদান প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তা স্বার্থকে অধিকতর গুরুত্ব দেবে। অন্যদিকে ভোক্তা স্বার্থসংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত হবে। এছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, সেবা সার্ভিস, বিশেষ করে ইন্টারনেট সার্ভিসের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। পণ্য ও সেবার মান ঠিক রাখতে তাৎক্ষণিক প্রতিকারের জন্য হটলাইন সার্ভিস চালু করতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ সম্পর্কে ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
এস এম নাজের হোসাইন : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

নদী খননের নামে লুটপাট

বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদীর পানি ভারতীয় অংশে প্রত্যাহার করে নেয়ায় বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় নদী বাঁচাতে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও ব্যাপক দুর্নীতির কারণে নদীগুলো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে না। বস্তুত নদী খননের নামে সরকারি অর্থ লুটপাটের উৎসব চলছে। এ লুটপাটের ভয়াবহ এক চিত্র বুধবার যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বাংলাদেশে পদ্মার পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা সমস্যা বাড়তে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে শুষ্ক মৌসুমে গড়াইয়ে পানি প্রবাহ ধরে রাখতে দু’দফা খনন করা হয়। এ নদী খনন বাবদ দুই দফায় হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হলেও এর কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। পদ্মার প্রধান শাখা নদী গড়াইয়ের বুকে মাইলের পর মাইল সৃষ্টি হয়েছে বালুচর। দেশে নদী ও খাল খননে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি বহুল আলোচিত। দুর্নীতিবাজরা অভিনব কায়দায় দুর্নীতি করে পার পাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। হাজার কোটি টাকা খরচ করার পরও গড়াই কেন প্রাণ ফিরে পেল না, তা অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
নদী ও খাল খননের নামে যাতে সরকারি অর্থ লুটপাট না হয় এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা সমস্যা আগামীতে তীব্র আকার ধারণ করবে। এ প্রেক্ষাপটে দেশের সব নদীর পানি প্রবাহ যাতে স্বাভাবিক থাকে সেজন্য করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। অভিন্ন নদীর পানি ভারতীয় অংশে প্রত্যাহার করে নেয়া অব্যাহত থাকলে দেশের নদীগুলো একের পর এক মরে যাবে। তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পানি প্রবাহ যাতে স্বাভাবিক থাকে সেজন্য দিল্লির সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ভারত সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাকে জানিয়েছেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে রাজি করাতে নয়াদিল্লির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমরা আশা করব তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে দিল্লি আরও আন্তরিকভাবে কাজ করে যাবে যাতে অতি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হয়। দেশে নদী ও খাল খননে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। তাই দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই। খননকৃত নদী ব্যবস্থাপনায় যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে খননে সুফল মিলবে না, এটা স্পষ্ট।

রোহিঙ্গাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ

রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা ও তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়াসহ সব ধরনের আন্তর্জাতিক অপরাধ করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য এসব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করা হয়েছে, প্রমাণিত হলে যা হবে গণহত্যা- জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং মহাসচিবের গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডামা ডাইয়েং এসব কথা বলেছেন। তার সঙ্গে একমত হয়ে বলা যায়, কেবল ধর্মের ভিন্নতার কারণে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূলের সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছে মিয়ানমার এবং এখনও তাদের সে চক্রান্ত অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকার সংস্থা ও প্রভাবশালী দেশগুলো যদি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ঘৃণ্য এ চক্রান্ত বন্ধে এখনও এগিয়ে না আসে, তবে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জাতিটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার দায় এড়াতে পারবে না তারা। যে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে যদি দায়ীকে বিচারের মুখোমুখি করা না হয়, তবে দ্বিগুণ উৎসাহে তারা অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে, এটাই স্বাভাবিক। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে। কাজেই আর বিলম্ব না করে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানসহ কফি আনান কমিশনের সুপারিশের আলোকে সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের নিজেদের বাস্তুভিটায় ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্যই নয়, ভবিষ্যতে কোনো দেশ যেন এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার সাহস না পায়, তা নিশ্চিত করার জন্যও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দাঁড় করানোসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক, কথিত সন্ত্রাসের অজুহাতে মিয়ানমার যখন রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার খেলায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ঘরের ভেতরে রেখে তালা মেরে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং গোটা গ্রাম পুড়িয়ে দেয়,
তখনও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জুজু তুলে তাদের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে দুই প্রতিবেশী দেশ- চীন ও ভারত। ফলে মিয়ানমার বিশ্বের অন্যান্য দেশের চাপকে আমলে না নিয়ে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো গল্প ফেঁদেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সর্বশেষ জাতিসংঘ মহাসচিবের গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক উপদেষ্টার বক্তব্যের পর চীন, ভারত ও রাশিয়ার উচিত হবে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখা। নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এবং রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির পেছনে কোনো ধরনের দায় না থাকার পরও দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্ববাসীকে মনে রাখতে হবে, একটি দেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে এ বোঝা টানা সম্ভব নয়। অ্যাডামা ডাইয়েংয়ের মতো আমাদেরও বিশ্বাস, সময়মতো বিশ্ববাসী কঠোর হলে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন বন্ধ করা যেত। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বর্তমান সময়েও কিছু দেশ বাণিজ্যিক স্বার্থকে মানবতার ওপর স্থান দিচ্ছে। অতীতের অবস্থান থেকে সরে এসে জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী সংস্থা ও দেশগুলো গণহত্যার মতো অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহিতা এবং রোহিঙ্গাদের সব ধরনের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে তাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিলে তবেই তারা মানবতার পক্ষে আছে বলা যাবে, অন্যথায় নয়।

রাজনীতিবিদ নির্বাহীরা যেভাবে ব্যবস্থাপনার কলাকৌশল রপ্ত করতে পারেন by ড. সা’দত হুসাইন

রাজনীতিবিদরা মানুষ নিয়ে কাজ করেন। মানুষের ভোটেই তারা নির্বাচিত হন। ফলত নির্বাহী পদে অধিষ্ঠিত হন। নির্বাহী পদে নির্বাচিত হওয়ার আগে তাদের দায়-দায়িত্ব এক ধরনের থাকে। নির্বাচিত ব্যক্তি হিসেবে নির্বাহী পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাদের কাজের ধারা, দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা বদলে যায়। এ সময় তাদের মূল কাজ হয় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক রয়েছে, যেমন- কর্মী ব্যবস্থাপনা, সাধারণ ব্যবস্থাপনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা, জনসংযোগ ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি ভোটার ব্যবস্থাপনা।
এসব কিছুর প্রতি একজন নির্বাহীকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়, উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হয়। নির্বাচিত নির্বাহীদের মধ্যে এক বিরাট অংশ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কাজে প্রশিক্ষিত বা অভিজ্ঞ থাকেন না। ফলে এসব বিষয়ে তাদের অনেক ঘাটতি থেকে যায়। নির্বাহী পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সময়-সুযোগের অভাব এবং অহমিকা বোধের কারণে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তারা কোনো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন না বা করতে চান না। ফলে দেখা যায়, প্রশাসনিক কাজে তারা অনেক ভুল করেন এবং অনেক সমস্যার সম্মুখীন হন। দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠলে তারা ঠিকমতো জবাবদিহি করতে পারেন না। সবচেয়ে বড় অসুবিধা হয় সম্পদ ও হিসাব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। এ এলাকায় তাদের এমন মারাত্মক ঘাটতি থাকে যে তাদের কার্যাবলী অডিটর বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে অনৈতিক, নিয়মবহির্ভূত ও দুর্নীতিযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। নিজে বড় রকমের অন্যায় বা দুর্নীতি না করলেও তত্ত্বাবধানের ব্যর্থতা তাদের বিপাকে ফেলে। অডিটর অথবা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (Regulatory Authority) বুঝতে চায় না যে, কোনো কোনো নির্বাহী ন্যূনতম অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই স্বপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনি তার বুদ্ধি-বিবেচনা এবং কিছুটা মর্জি অনুযায়ী সরল বিশ্বাসে অনেক কাজ করেছেন। তাদের মতে এসব কাজ হিসাব-নিকাশের রীতি-পদ্ধতি এবং ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত বিধি-নিষেধের পরিপন্থী। সুতরাং তাদেরকে আইন-কানুনের আওতায় এনে জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। সুশাসন বা সু-ব্যবস্থাপনার কলাকৌশল আপনাআপনি রপ্ত করা যায় না। এর জন্য প্রাসঙ্গিক লোকজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর প্রণীত বইপত্র পড়তে হয় এবং এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। একজন রাজনীতিবিদ নির্বাহীকেও ধারাবাহিকভাবে তার কাজ শিখতে হয়। যেমন- যে সংগঠনের তিনি প্রধান নির্বাহী হয়েছেন সে সংগঠনের কাঠামো, এ সংগঠনের সঙ্গে উপর, নিচ ও পাশের সংগঠনের সম্পর্কের সমীকরণ, সংগঠনের আওতায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কাজকর্ম সম্পাদনের রীতিনীতি তাকে ভালোভাবে জানতে হয়। নির্বাচিত নির্বাহী ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, ক্রীড়া পরিষদ, সরকার কিংবা মন্ত্রণালয় যে কোনো সংগঠনের প্রধান হোন না কেন, উপরোক্ত বক্তব্য সবার জন্য প্রযোজ্য। এ অঞ্চলে অনুসৃত পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি মূলত আইনপ্রণেতা (Law maker) হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি দেশের প্রধান নির্বাহী (Executive) বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারেন। আবার যদি তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য অর্থাৎ মন্ত্রী হন, তখন তিনি তার মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী রূপে পরিণত হন। এ উভয় ক্ষেত্রেই প্রধান নির্বাহী হিসেবে তাদের বহু সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ের নানা রীতি-পদ্ধতি জড়িত থাকে। তাদের প্রত্যেককে সরকারের সামগ্রিক সাংগঠনিক কাঠামো, মন্ত্রণালয়ের কাঠামো ও কার্যাবলী সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হয়। সরকারি কাজ সম্পাদনের রীতি-পদ্ধতি, কাজ সম্পাদনে নিয়োজিত নির্বাহীদের দায়িত্বাবলী, তাদের সাধারণ ও বিশেষায়িত পরিচয় (Profile) সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হয়। তার আওতাধীন সংগঠনের কোন্ কাজ কোন্ স্তরের নির্বাহী অনুমোদন করবে, কোন্টি অনুমোদনের জন্য তার কাছে আসবে আবার কোন্ কাজ অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা ফোরামে যাবে- এ সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। তার এ ধারণাও থাকতে হবে কোন্ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় (Inter Ministerial) অথবা আন্তঃসাংগঠনিক আলোচনার প্রয়োজন। এটি না জানা থাকলে তার মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অসম্পূর্ণ বা অকার্যকর হিসেবে ঊর্ধ্বতন স্তরে নাকচ হবে। সরকারি সংস্থার আচরণ, রীতি, রাষ্ট্রাচার, মর্যাদার ক্রমমান বিষয়ে তার গ্রহণযোগ্য স্তরের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় বিভিন্ন সভা-সমিতিতে তিনি বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন। এসব বিষয়ে আন্দাজ করে কিংবা শুধু বুদ্ধি-বিবেচনা বলে কাজ চালানো যায় না। একইভাবে কর্মী ব্যবস্থাপনার মূল রীতি-পদ্ধতিও তাকে জানতে হবে। নির্বাহী ও কর্মীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব আইন-কানুন ও বিধি-বিধান রয়েছে তার আলোকেই তাকে কর্মী-শৃঙ্খলা বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে আবেগতাড়িত হয়ে বিধি-বিধানবহির্ভূত কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না অথবা ন্যূনতম শারীরিক শক্তিও প্রয়োগ করা যাবে না। তার সহায়ক যেসব পদস্থ নির্বাহী রয়েছেন তাদের এবং প্রয়োজনবোধে সহকর্মীদের বুদ্ধি-পরামর্শ নিয়ে আইন-কানুনের আওতায় ঠাণ্ডা মাথায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় সংগঠনে অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। নির্বাচিত নির্বাহীরা শপথ গ্রহণ কিংবা অন্য কোনো প্রশাসনিক পদ্ধতিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেকটা ঘটা করে নিজ আসনে অধিষ্ঠিত হন। ফুলের তোড়া, মাল্যদান এবং অভিনন্দন বর্ষণের পালা শেষ হওয়ার পর অফিসের কাজ শুরু করেন নির্বাচিত নির্বাহী। চলে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের পালা। কখনও প্রশাসন থেকে অন্তত কতিপয় ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হয়।
অথবা উঁচু স্তরের নির্বাহী হলে কয়েকজন একান্ত সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নির্বাহী নিজে পছন্দ করে নিয়োগের ব্যবস্থা করে নেন। তারাই মূলত নথিপত্র নির্বাহীর কাছে উপস্থাপন করেন। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ কিছু কর্মকর্তা নিজেরা এসে প্রাসঙ্গিক নথি উপস্থাপন করেন। পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই এমন নির্বাহী সহায়ক কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নথিতে স্বাক্ষর করে সিদ্ধান্ত দেন। সাধারণত কেউ তাকে অফিসের পরিচালনা সম্পর্কে কোনো উপদেশ-পরামর্শ দেন না। ব্যতিক্রমী দু’-একজন ছাড়া কোনো নির্বাহী এ ধরনের পরামর্শ চান না। নথির পর নথি আসতে থাকে। নির্বাহী স্বাক্ষর করে যান। অথবা কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নথিতে প্রশ্ন রাখেন বা ভিন্নতর আদেশ দেন। দু’ক্ষেত্রেই তিনি নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধি-বিবেচনা খরচ করার সুযোগ পান না বললেই চলে, যদিও সিদ্ধান্তের জন্য পুরো দায়-দায়িত্ব তাকে বহন করতে হয়। কারণ নথিতে স্বাক্ষরের মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এরপর যে বিষয়টি তাকে মোকাবেলা করতে হয় তা হল তার প্রাপ্যতা ও অধিকার (Entitlement)। নির্বাচিত নির্বাহীদের প্রায়শই জানা থাকে না তারা কী ধরনের ক্ষমতার অধিকারী, কী সব আসবাবপত্র, সরঞ্জামাদি তারা পাবেন, কী তার সীমাবদ্ধতা। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় তাকে একান্ত সচিব এবং সংগঠনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতদঞ্চলে এরা সাধারণত তাঁবেদার, মোসাহেব চরিত্রের হয়ে থাকেন। নির্বাচিত নির্বাহী সতর্ক, সচেতন না থাকলে কর্মকর্তারা তাকে বিভ্রান্তমূলক তথ্য দিয়ে বেআইনি চাহিদা প্রদানে উৎসাহিত করবেন। তারা বলবেন, এত হাজার কিংবা এত লাখ লোক ভোট দিয়ে তাকে নির্বাচিত করেছে। অতএব তিনি যা ইচ্ছা চাইতে পারেন, এতে আইন-কানুন, বিধি-বিধানের সীমাবদ্ধতা মানার প্রয়োজন নেই। বিধি-নিষেধ সাধারণ মানের কর্মকর্তাদের জন্য। তার মতো নির্বাচিত ব্যক্তিকে এসব দিয়ে আটকিয়ে রাখা যাবে না। তিনি তার ইচ্ছামতো জিনিসপত্র চাইতে পারেন এবং ইচ্ছামতো কাজ করতে পারেন। অথচ প্রকৃত বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন, নির্বাহী নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত যা-ই হোন না কেন, তাকে আইন ও বিধি-বিধানের আওতায় কাজ করতে হবে। প্রতিটি কাজের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। সে জবাবদিহি শুধু ভোটারের কাছে নয়, তা হবে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের কাছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। ক্ষমতায় থাকাকালে নানা কৌশলে এদের এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও ক্ষমতা হারানোর পর এ প্রতিষ্ঠানগুলো চারদিক থেকে তাকে আঁকড়ে ধরবে। তখন তাকে একাই জবাবদিহি করতে হবে। কু-বুদ্ধি দেয়া সহায়ক কর্মকর্তারা সুযোগ বুঝে সটকে পড়বেন অথবা নির্র্র্লজ্জভাবে বিপক্ষে অবস্থান নেবেন। তদারকি (Supervision) ও পরিবীক্ষণ (Monitoring) একজন নির্বাহী তথা সংগঠনের প্রধান নির্বাহীর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নির্বাহী সব কাজ নিজে করেন না। তিনি নির্দেশ দেন। অন্যরা সে নির্দেশ অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করেন। নিয়মিত তত্ত্বাবধান ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে প্রধান নির্বাহীকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার নির্দেশ যথাযথভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে। তত্ত্বাবধান ও মনিটরিংকে কার্যকর রূপ দেয়ার কিছু পদ্ধতি ও কৌশল রয়েছে। শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ কৌশল রপ্ত করা যায়। পদস্থ কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে প্রধান নির্বাহীকে সহায়তা করতে পারেন। সে সহায়তা আদায় করতে হলে প্রধান নির্বাহীকে তদারকি ও মনিটরিংয়ের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে চলনসই ধারণা অর্জন করতে হবে। অন্যথায় দেখা যাবে তার আওতাধীন নির্বাহীরা নিজেদের মর্জিমাফিক কাজ করছেন। প্রধান নির্বাহীর নির্দেশ ঠিকমতো পালিত হচ্ছে না। যে কাজ তিনি করতে চেয়েছিলেন, নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও সে কাজ সম্পন্ন হয়নি অথবা বিকৃত অবয়বে তা সম্পন্ন হয়েছে, যা চরম হতাশাব্যঞ্জক। তদারকি ও মনিটরিং সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকলে এরূপ হতাশাজনক অবস্থার উদ্ভব হয় না। সংগঠনের চালিকাশক্তি হচ্ছে বাজেট এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা (কর্মসূচি)। এ দুই বিষয়ের ওপর সংগঠনের প্রধান নির্বাহীর মোটামুটি ধারণা থাকতে হবে। দুটি বিষয়ই সংখ্যা বা অঙ্কভিত্তিক, যে সম্পর্কে অনেক রাজনীতিবিদ নির্বাহীর আশৈশব লালিত ভয় রয়েছে।
এ ভয় থেকে তাদের সহজে উত্তরণের পথ কেউ বাতলে দেয়নি। একজন প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ চালাতে গেলে সংখ্যা ও অঙ্ক ভীতি তাদের কাটিয়ে উঠতে হবে। বাজেট এবং উন্নয়ন প্রকল্পের মৌলিক কাঠামো, এর শৃঙ্খলা, অনুমোদন, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং সম্পর্কে তার কাজ চালানোর মতো ধারণা থাকতে হবে। সহজ প্রশিক্ষণ বা অবহিতকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে এ ধারণা অর্জন করা যেতে পারে। ধারণা অর্জন করা ছাড়া তিনি কাজ চালাতে পারবেন না। পদে পদে হোঁচট খাবেন। সহায়ক কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। সঠিক তত্ত্বাবধানের অনুপস্থিতিতে এমনসব ভুল-ভ্রান্তি এবং দুর্বল সিদ্ধান্ত ভিড় জমাতে পারে, যা পরবর্তীকালে তাকে বিপাকে ফেলতে পারে। বাজেট এবং উন্নয়ন পরিকল্পনাকে কোনোভাবেই একজন প্রধান নির্বাহীর অবহেলা করা সমীচীন হবে না। ব্যবস্থাপনার কিছু মৌলিক কলাকৌশল একজন নির্বাহী তথা প্রধান নির্বাহীকে অবশ্যই জানতে হবে। রাজনীতিবিদ কিংবা অ-রাজনীতিবিদ নির্বিশেষে সবার জন্য এ সত্য প্রযোজ্য। প্রধান নির্বাহীর আশপাশে লোকজন তাকে এই বলে বোঝাতে চেষ্টা করবেন যে, পদ-পদবির মাহাত্ম্যে তিনি সবকিছু জেনে যাবেন, সব সমস্যা উতরে যাবেন। তারা গৎবাঁধা প্রবাদ বলবেন, 'Chair makes a man fit'। কিন্তু এটি বড়জোর আংশিক সত্য। বাস্তবিকপক্ষে তা অসত্য। একজন প্রধান নির্বাহীর জন্য সত্য কথা হচ্ছে, প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই, প্রশিক্ষণ গ্রহণের কোনো বয়স নেই। একজন লোক প্রয়োজনমতো সারাজীবনই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারেন।
ড. সা’দত হুসাইন: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

ডিজিটাল বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আমাদের অধিকার

মানুষ বেঁচে থাকার জন্য যে জিনিসটি প্রয়োজন তা হলো খাদ্য। পানি থেকে শুরু করে রোগ নিরাময়ের ওষুধ, প্রতিটি উপাদান মানুষের জীবনকে দীর্ঘদিন বাঁচতে সাহায্য করে। এই খাবারগুলো যেমন মানুষকে রোগপ্রতিরোধ থেকে সাহায্য করে আবার ঠিক এই খাবারের কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটায়। ডিজিটাল বাংলাদেশে বর্তমানে নিরাপদ খাদ্য কথাটা শুধু কাগজ-কলমে রয়ে গেছে। খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল এমনকি মেয়াদ শেষে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রসাধনীসামগ্রীতে ভেজাল নিয়ে ১৬ কোটি মানুষের দেশে আমাদের বসবাস। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে রাতের খাবার পর্যন্ত যদি হিসাব করা হয় মনে হয় নিরাপদ খাদ্য পাওয়া সোনার হরিণের মতো। বাজারে যাবেন মাছ কিনতে সেখানে ফরমালিন, যাবেন মসলা কিনতে সেখানে ভেজাল, যাবেন তেল কিনতে ঠিক সেখানেও একই রকম। এবার আসেন একটা ব্রেড কিনব সেখানেও ভেজাল, দুধ থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল। রাস্তার ফুচকা কিংবা ঝালমুড়ি বাদই দিলাম। মহান আল্লাহ কাছে আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে শোকর করা উচিত যে, আমরা বেঁচে আছি। মাঝেমধ্যে পত্রিকা কিংবা টিভিতে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ আদালত সেখানে জেল-জরিমানা করেন। প্রিয় পাঠক আপনারা ব্যাপারটি যত সহজ মনে করেন তা কিন্তু নয়। মানুষের যৌবন, জীবন, রোগ এমনকি মৃত্যু ঘটায় এই খাদ্য, তার ওপর যদি নতুন করে শুরু হয় ভেজাল ডাক্তার তাহলে এই ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে আমরা যাব কোথায়? এই ভেজাল জীবন নিয়ে কি করছে আমাদের সরকার তার দিকে একটু দেখি, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ পাস করে অক্টোবর ২০১৩ সালে। এর দুই বছর পর ২০১৫ সালে সরকার বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি নামক একটা প্রতিষ্ঠান শুরু করে।
এ প্রতিষ্ঠান ২০১২ সাল পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম ঘোষণা করেন। সেগুলো হচ্ছে সভা, কর্মশালা, সেমিনার এবং নিরাপদ খাদ্য দিবস পালন।সরকারের এই ডিজিটাল যুগে ২০১৮ সালে এসে প্রতিষ্ঠানের সরকারি ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা গেলো সাত পাতার ওয়েবসাইট ছাড়া আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নেই। আমি আশ্চর্য হলাম সরকারি এই সাইটে গিয়ে যে, ভিশন, অবজেক্টিভ, রেসপনসিবিলিটি, এনফোর্সমেন্ট, কনজ্যুমার ফার্স্ট, ফুড বিজনেস, টেকনোলজি পাতাগুলো এখনো আন্ডার কনস্ট্রাকশন। তাহলে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের সেফটি কে দেবে? অন্তত সরকার এই দায়িত্ব সঠিকভাবে নেবে। হাজারো সমস্যার মধ্যে আছে আমাদের দেশের মানুষ। বাজার থেকে নিজের শ্রমের টাকা খরচ করে যদি বিষ খেতে হয় তাহলে সেই উন্নয়ন দিয়ে আমরা কি করব? দেশের সরকারি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ওয়েবসাইট চার বছর থেকে আন্ডার কনস্ট্রাকশন। সরকার ব্যস্ত রাজনীতি নিয়ে, মিডিয়া ব্যস্ত সরকার উন্নয়নের মহাসড়ক নিয়ে। আর আমরা সাধারণ মানুষ ব্যস্ত বেঁচে থাকার তাগিদে, নতুন প্রজন্ম ব্যস্ত ফেসবুক আর ইউটিউবে। মশার কামড় খাব আমরা সাধারণ মানুষ, পুলিশের পিটুনিও আমাদের পিঠে আর ভেজাল খাবারটা আমাদের পেটে।প্রসঙ্গটা আমার ভিন্ন শুধু রেফারেন্স হিসেবে আমি এই তথ্য উপস্থাপন করলাম। আমি এখানে খাদ্য সুরক্ষার একটি নমুনা তুলে ধরলাম। ফুড স্ট্যান্ডার্ড পরিচালনা করতে হয় কতগুলো ডিপার্টমেন্টের যৌথ সহযোগিতায় কিন্তু মূল দায়িত্বে থাকে ফুড সেফটি অথরিটির কাছে। যাদের প্রধান কাজ হচ্ছে, ফুড পলিসি, রেগুলেশন, ইন্সপেক্ট এবং ফুড স্যাম্পল পরীক্ষা।শুধু পরিদর্শন করা হয় স্থানীয় সরকার অথবা সিটি কাউন্সিলের হেলথ এবং পরিবেশ কর্মকর্তার মাধ্যমে। সেই কর্মকর্তার ক্ষমতা থাকে যে কোনো সময়ে ফুড প্রসেসিং এরিয়া, রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে এবং পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান রেগুলার পরিদর্শন করা। ফুড সেফটি স্ট্যান্ডার্ড না থাকলে সে দোকান অথবা ফ্যাক্টরি সঙ্গে সঙ্গে সিলগালা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মালিক পক্ষককে জরিমানা করা ছাড়াও কিছু নিয়মকানুন দেয়া হয়। যার প্রথম প্রতিটি ফুড প্রসেসিং শপ, ফেক্টরি, রেস্টুরেন্ট কিংবা হোটেলে একজন ফুড সেফটি সুপারভাইজার থাকবে যিনি সরকারের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ট্রেনিং এবং পরীক্ষা দিয়ে সেই সার্টিফিকেট নেবেন। তার দায়িত্ব থাকবে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত। ফুড কালার, কর্মীদের পার্সোনাল হাইজিনি, ড্রেস কোড, ফুড প্রসেসিং এরিয়া পেইন্ট, হাত ধোয়ার আলাদা বেসিন, গরম পানি, ফুড থার্মোমিটার, ফ্রিজের তাপমাত্রা, তাজা মাছ-মাংস এবং রান্না করা ফুড আলাদাভাবে রাখাসহ নিয়মমতো ফ্লাই স্প্রে করার সব কাগজপত্র সব সময় আপডেট রাখতে হবে। আমাদের সরকার এইখানে বর্ণিত কাজগুলো করছে বলে আমার মনে হয় না। আপনি যদি খাদ্যে নিরাপদ দিতে না পারেন তাহলে নিরাপদ খাদ্য দিবস পালনের দিবস বা গোলটেবিল বৈঠক করে কিভাবে সুরক্ষা দেবেন? একটা প্রতিষ্ঠান নিজেই জানে না কিভাবে ফুড সেফটি পুরো ধাপগুলো করতে হয়। তারা শুধু ব্যস্ত প্রেস রিলিজ, সভা কিংবা সেমিনার নিয়ে। আমাদের সরকার অনেক সাফল্য আছে। দেশ উন্নতি হচ্ছে, ইন্টারনেট এখন গ্রামে, ঢাকা শহরে বড় বড় উড়ালসেতু কিন্তু জনগণকে খোয়াচ্ছেন ভেজাল খাদ্য, তার দায়িত্বও সরকারকে নিতে হবে। ভুক্তভোগী মানুষকে প্রতিকার করতে হবে। সরকারকে খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টোলারেন্স নীতি নিতে হবে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য হচ্ছে একমাত্র সম্বল। আমরা চাই না আর কোনো মানুষ অন্তত এই ডিজিটাল যুগে খাদ্যে ভেজাল খেয়ে বেঁচে থাকুক। এটা আমাদের নাগরিক অধিকার।
[লেখক: রাশেদ শ্রাবন, প্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক। ফুড সেফটি সুপারভাইজার, ডিপার্টমেন্ট অব প্রাইমারি ইন্ডাস্ট্রি ফুড অথরিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস সরকার, অস্ট্রেলিয়া।]

ডিজিটাল বাজারে সবচেয়ে ভোগান্তিতে ভোক্তারা by মহিউদ্দীন আহমেদ

আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস পালিত হতে যাচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘‘ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থায় অধিকতর স্বচছতা ও ন্যয্যতা নিশ্চিত করণ”। ভোক্তা অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। যা কিনা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬ থেকে ৪৭(ক) এ নিশ্চিত করা আছে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার আইন পাশ করে। যেখানে খাদ্য, চিকিৎসা, পণ্য, ঔষধ ও সেবা খাতের ভোক্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল খাতের গ্রাহকদের সেবা খাতে অন্তর্ভূক্ত করা হলেও এ খাতে ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইনটি ডিজিটাল বান্ধব না হওয়ায় এ খাতের ভোক্তরা বর্তমানে সবচাইতে ভোগান্তি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব যখন প্রযুক্তি বান্ধব তখন সরকারও ২০০৮ সালে ভিশন-২০২১ ঘোষণা করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে কাজ শরু করে। টেলিকম খাতে গ্রাহক প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ৮ কোটি ৩৮ লাখ,মোবাইল ব্যাংকিং এর গ্রাহক প্রায় ৬ কোটি। ই-কমার্সের ব্যবসা প্রায় ৭শত কোটি, ই-টিকেটিং, ই-বিলিং, ই-স্বাস্থ্য, ই-কৃষি, ই-বুক, ই-পেপার, ই-সার্ভিস, অনলাইন ব্যাংকি, পরিবহনে উবার, পাঠাওসহ প্রযুক্তি খাতে অসংখ্য এ্যাপস চালু আছে। যার মাধ্যমে দেশের জনগণ ডিজিটাল সেবা পাচ্ছে।
আর এসবই হচ্ছে গুগল সার্চ ইঞ্জিন, সোস্যাল মিডিয়া, ই-মেইলও বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে। বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৫০ ভাগ জনগণই প্রযুক্তির সেবা নিচ্ছে। ১৯৯৫ সালেও এ খাতে ভোক্তা ছিল একভাগ। বর্তমানে জীবন জীবিকার সবকিছুই ডিজিটাল নির্ভর হয়ে পড়েছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে এ খাতে প্রতারণা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকা রিজার্ভ চুরি, সাইবারক্রাইম, পর্নগ্রাফি, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, মোবাইল ব্যাংকিং এর প্রতারণা, হ্যাকিং, ই-কমার্সের পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতারণা, টেলিকম খাতে উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট ও কলরেট, কলড্রপ, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ধর্মীয় অপপ্রচারের নামে দাঙ্গা হামলাসহ বিভিন্ন নৈরাজ্য চলছে। জি-২০ সামিট ২০১৭ তে জার্মান প্রেসিডেন্ট নিজেই এ খাতের ভোক্তা স্বার্থ নিশ্চিত করার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় এবারের ভোক্তা অধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য। ই-কমার্সের বাজারসহ ডিজিটাল বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য আজ অবধি কোন ধরণের নীতিমালা তৈরী করা হয় নাই। যদি দ্রুত এ খাতের ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য আইন ও নীতিমালা তৈরিসহ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে গতিশীল না করা হবে ততদিন এ খাতের গ্রাহকরা প্রতারিচত হতে থাকবে।
মহিউদ্দীন আহমেদ, সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন।

বিমান দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কী by রাইসুল সৌরভ

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী একটি খেলার মাঠে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনা ১৯৮৪ সালের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধরনের বেসামরিক যাত্রীবাহী বিমান দুর্ঘটনা বলে বিবেচিত হচ্ছে। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন এবং যে স্বল্পসংখ্যক ভাগ্যবান প্রাণে বেঁচে গেছেন তাদের অধিকাংশই মারাত্মক আহত অবস্থায় নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত স্বভাবতই জটিল প্রক্রিয়া এবং ঠিক কী কারণে এ দুর্ঘটনা সংঘটিত হল তা যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত বলা যাবে না। এ দুর্ঘটনার পেছনে পাইলট, ইউএস-বাংলা বিমান কর্তৃপক্ষ, ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, বিমানটির মূল তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানসহ এক বা একাধিক পক্ষ দায়ী থাকতে পারে। যদিও উড়োজাহাজ পরিবহন ব্যবস্থায় বহু পক্ষ জড়িত থাকে এবং দুর্ঘটনার পেছনে প্রত্যেক পক্ষের স্বতন্ত্র দায় থাকতে পারে; তবে সে দায় নির্ধারণ করাও বেশ জটিল প্রক্রিয়া। তথাপি কঠোর দায়-নীতির আওতায় এ ঘটনায় যেই জড়িত থাকুক না কেন, দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জন্য সাধারণত বিমান পরিবহন সংস্থাকেই আন্তর্জাতিকভাবে দায়ী করা হয়ে থাকে। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা অন্য আট-দশটা দুর্ঘটনা থেকে ভিন্ন। কারণ এর রয়েছে বিভিন্ন মাত্রা, যেমন অন বোর্ড দুর্ঘটনা, অফ বোর্ড দুর্ঘটনা, লাগেজ হারিয়ে যাওয়া, বিমান দুর্ঘটনার কারণে কারও সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এ ছাড়া ফ্লাইটটি অভ্যন্তরীণ নাকি আন্তর্জাতিক ছিল ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ক্ষতিপূরণের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হয়।
তবে নেপাল ট্রাজেডির মতো সরাসরি বিমানাভ্যন্তরে থাকাকালীন দুর্ঘটনার কারণে কোনো যাত্রী আহত বা নিহত হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পরিবার বিমান পরিবহন কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রাখে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, টিকিট ক্রয় করার সময় বিমান পরিবহন সংস্থা বা ট্রাভেল এজেন্ট কর্তৃক প্রদত্ত টিকিটে যে শর্তই উল্লেখ থাকুক না কেন, দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে তা কাউকে বঞ্চিত করতে পারে না। ১৯৯৯ সালের আগে পৃথিবীব্যাপী বেসামরিক বিমান পরিবহন ওয়ারশ কনভেনশন দ্বারা পরিচালিত হতো। কিন্তু ১৯৯৯ সালের পর থেকে মন্ট্রিল কনভেনশনের মাধ্যমে মৃত্যু, জখম, ব্যাগ হারানো, কার্গোতে বিলম্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এবং যাত্রীদের ওয়ারশ কনভেনশনের চেয়ে অধিক সুরক্ষা ও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। মন্ট্রিল কনভেনশনে বাংলাদেশ ২০০৩ সালে স্বাক্ষর করলেও এ কনভেনশনে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন দিতে এখনও পর্যন্ত নতুন করে কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এ কনভেনশনের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিমানে মৃত্যু বা শারীরিক আঘাতের জন্য ক্যারিয়ারকে শুধু তখনই দায়ী করা যাবে যদি দুর্ঘটনাটি বিমান চলার সময় বা বিমানে আরোহণ বা অবতরণ করার সময় সংঘটিত হয়। দুর্ঘটনা বলতে এ কনভেনশনে যাত্রীর আওতাবহির্ভূত কোনো অপ্রত্যাশিত বা অস্বাভাবিক ঘটনা বোঝাবে (এয়ার ফ্রান্স বনাম সেক, ১৯৮৫, ৪৭০ ইউএস ৩৯২)। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইউএস-বাংলার দুর্ঘটনাটি যাত্রীদের তরফ থেকে কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই বিমানাভ্যন্তরে সংঘটিত হয়েছে। সুতরাং মন্ট্রিল কনভেনশনের অধীনে তারা সবাই ক্ষতিপূরণ দাবি করার অধিকার রাখেন। উল্লিখিত কনভেনশনের ২১ অনুচ্ছেদ অনুসারে, মৃত্যু অথবা প্রতি যাত্রীর শারীরিক জখমের দরুন বিমানের দায়িত্ব সর্বোচ্চ ১, ১৩, ১০০ এসডিআর পর্যন্ত। এসডিআরের মান হিসাব বিভিন্ন দেশের ভোক্তা মূল্যসূচক বৃদ্ধি বা হ্রাসের বার্ষিক হারের গড় পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নির্ধারণ করে এবং প্রতি পাঁচ বছর পরপর এটি পুনর্নির্ধারণ করে। যার ফলে একই বিমান দুর্ঘটনায় বিভিন্ন দেশের নাগরিক বিভিন্ন পরিমাণ ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।
মন্ট্রিল কনভেনশন অনুযায়ী আইএমএফের সদস্য নয়, এমন রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিপূরণের সীমা নির্ধারণ করা আছে। তাই মন্ট্রিয়েল কনভেনশনের অধীন এ দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত প্রত্যেক বাংলাদেশি বা তার পরিবার সর্বোচ্চ ১,৭৪,০০০ মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি টাকারও বেশি) পেতে পারেন; যদিও জীবনের মূল্য টাকার অংকে হিসাব করা কারও দ্বারাই সম্ভব নয়। উপরন্তু, দুর্ঘটনার শিকার কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবার এ পরিমাণের চেয়ে বেশিও দাবি করতে পারেন, যদি তিনি বা তার পরিবার মনে করেন তাদের যে ক্ষতির পরিমাণ তা এ অংকের ক্ষতিপূরণে যথেষ্ট নয়। তবে সেক্ষেত্রে বিমান পরিবহন সংস্থা অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে আদালতে যেতে পারে এবং তারা যদি প্রমাণ করতে পারে যে মৃত্যু বা আহত হওয়ার কারণ বিমান সংস্থা বা তাদের কর্মী বা এজেন্ট ব্যতীত তৃতীয় কোনো ব্যক্তির অবহেলা বা অন্য কোনো ভুল; তবে সেক্ষেত্রে অধিক পরিমাণটুকু বিমান সংস্থা না দিয়ে সেই তৃতীয় ব্যক্তির ওপর সে দায়ভার বর্তাবে। একটি বিমান দুর্ঘটনা থেকে আঘাতপ্রাপ্ত জীবিত ব্যক্তি দুই ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন : এক. আর্থিক এবং দুই. মানসিক। চিকিৎসা খরচ, আয় হ্রাস, কোনো অঙ্গের ক্ষতি (যদি থাকে) হল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতি আর মানসিক ক্ষতি হল সেই দুর্ঘটনার ফলে সৃষ্ট মানসিক বেদনা ও যন্ত্রণার বোঝা, কখনও কখনও যা আজীবনও বয়ে বেড়ানো লাগতে পারে। তবে কোনো যাত্রী দুর্ঘটনার কারণে মেডিকেল স্বীকৃত মানসিক কোনো সমস্যায় ভুগছেন কিনা তা নির্ধারণ করে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। উপরন্তু, কোনো শারীরিক ক্ষতি ছাড়া কেবল মানসিক অসুস্থতার জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়ার নজির বিরল (মরিস বনাম কেএমএল, ২০০২, ইউকেএইচএল ৭। মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরাও একইভাবে তাদের নিকটজন হারানোর ব্যথা ও দুর্ভোগের ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। মন্ট্রিল কনভেনশনের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক আহত ব্যক্তি দুর্ঘটনাস্থল নির্বিশেষে তার দেশে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী। তাই ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনাটি নেপালে ঘটায় ক্ষতিপূরণ পেতে কারও কোনো অসুবিধা হবে না। উপরন্তু, এয়ার ক্যারিয়ারের দায়িত্ব এক্ষেত্রে কঠোর দায়বদ্ধতার নীতি দ্বারা পরিচালিত হবে; তাই যাত্রীকে বিমানের কোনো অবহেলা বা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।
তবে মনে রাখতে হবে, মন্ট্রিল কনভেনশন অনুসারে ব্যক্তিগত আঘাতের ক্ষতিপূরণ দাবির সর্বোচ্চ সময়সীমা দুর্ঘটনার দুই বছর পর্যন্ত। ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পারছি, সেদিনের সব যাত্রীর (৬৭ জন) বীমা করা হয়েছিল এবং ইউএস-বাংলা বিমান কর্তৃপক্ষ সব ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের (যারা মৃত) পরিবারকে চিকিৎসা খরচসহ প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দেবে। তবে মন্ট্রিল কনভেনশন কার্যকর করা এবং বিমান যাত্রী, লাগেজ ও পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের বিমান পরিবহন নিরাপত্তাবিষয়ক দ্রুত একটি আইন প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। যদিও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ গত বছরের শেষ নাগাদ এ সংক্রান্ত আধুনিক একটি আইন প্রণয়ন করার জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে একটি সুপারিশ পাঠিয়েছিল, তবে তা কার্যকর করার জন্য সরকারের তরফ থেকে এখনও কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সরকারকে তাই এখন নিশ্চিত করতে হবে যে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা এবং তাদের পরিবারগুলো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাবে। যদিও ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার ক্ষতি কোনোভাবেই আর পূরণ করা সম্ভব নয়, তথাপি আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা এড়ানোরও কোনো সুযোগ নেই এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ দ্বারা সেই দায়বদ্ধতা কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় নজরদারি, এমনকি প্রয়োজন হলে হস্তক্ষেপও কাম্য।
রাইসুল সৌরভ: আইনজীবী; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং সমতা ও অধিকার শ্রমিক; যুক্তরাজ্যের স্টারলিং বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি আইন ও নীতিতে
স্নাতকোত্তর
raisul.sourav@outlook.com

খড়কুটোর স্টেডিয়াম by সালমান রিয়াজ

২০১৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসছে রাশিয়ায়। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে দিন গণনা। বিশ্বের সবচেয়ে জমজমাট এ আসরকে কেন্দ্র করে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে দেশটি। বিশ্ব দরবারে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে ঐতিহ্যের সঙ্গে অভিনব সব জিনিস উপস্থাপনের চেষ্টায় ব্যস্ত রয়েছেন রাশিয়ানরা। পাশাপাশি হচ্ছে নানা প্রতিবাদও। বিশ্বকাপ আয়োজনে বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের প্রতিবাদে অভিনব এক পন্থা বেছে নিয়েছেন রাশিয়ার এক কৃষক। প্রতিবাদের অভিনব পন্থা হিসেবে তিনি বানিয়ে ফেলেছেন আস্ত এক স্টেডিয়াম। সেটি ইট-বালি-সিমেন্টের তৈরি নয়। খড়কুটো দিয়ে নির্মিত ওই স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার আগেই খড়ের তৈরি ফুটবল স্টেডিয়ামের রেপ্লিকা বানিয়ে সবার নজর কেড়েছেন তিনি। রাশিয়ার ওই কৃষকের নাম রোমান পুনোমারোভ। সেন্ট পিটার্সবুর্গ স্টেডিয়ামের রেপ্লিকা খড় দিয়ে বানিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপের জন্য উপযোগী করে তুলতে এই ভেন্যুর জন্য ৭২ কোটি ডলার খরচ করেছে রাশিয়া। আগামী বছরের বিশ্বকাপে এই ভেন্যুটিতে সেমিফাইনালসহ মোট সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। অনেকেই মনে করছেন, এই স্টেডিয়ামের জন্য এত বিপুল পরিমাণ অর্থের খরচ করাটা একেবারেই অন্যায্য। বিশাল এ খরচকে সবার সামনে তুলে ধরতেই পুনোমারোভের এমন প্রচেষ্টা। বালু ও খড়কুটো দিয়ে এই স্টেডিয়াম তৈরি করা হয়েছে।
স্টেডিয়ামের মাঠ থেকে শুরু করে দর্শকদের আসনও খড়ের তৈরি। এখানে দর্শকদের খেলা উপভোগ করার জন্য রয়েছে ৩০০টি আসনের ব্যবস্থা। ইতিমধ্যে স্থানীয় কয়েকটি দল খড়ের তৈরি স্টেডিয়ামে একটি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে। স্টেডিয়ামটি বানানো হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার খড়ের আঁটি দিয়ে। পাঁচ-ছয়টি ধাপে বিন্যস্ত করা হয়েছে দর্শক গ্যালারি। নিজে একটা আস্ত স্টেডিয়াম বানিয়ে ফেলেছেন বলেই হয়তো সেন্ট পিটার্সবুর্গের স্টেডিয়াম নির্মাণে দফায় দফায় সময়সীমা ও ব্যয় বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছেন না পুনোমারোভ। হোক না সেটা খড়ের তৈরি! পুনোমারোভ বলেন, ‘এটা খুবই অবাক করার মতো ব্যাপার, কিভাবে একটা স্টেডিয়ামের খরচ ও সময়সীমা এভাবে বেড়ে যেতে পারে!’ স্টেডিয়ামের রেপ্লিকা তৈরি করা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপের আগে মানুষের উত্তেজনা এবং খেলাধুলার পরিবেশ বিরাজ করতে দেখাটা আমার কাছে দারুণ।’ পুনোমারোভের তৈরি রেপ্লিকা বিশ্বকাপ ভেন্যু নির্মাণে খরচ, দুর্নীতি, বিলম্ব এবং শ্রমিকদের মৃত্যুকে তুলে ধরবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পুনোমারোভের এই কীর্তির ব্যাপারে শুনেছেন পিটার্সবুর্গে স্টেডিয়াম নির্মাণের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারাও। নিজেদের সমালোচনা শুনেও অবশ্য ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাননি তারা। বরং প্রশংসাই করেছেন এই কৃষকের রসবোধের। পুনোমারোভকে পিটার্সবুর্গের গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার আমন্ত্রণও জানানো হবে।